শুক্রবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৩

বিজয়া ~ ডাঃ বিষাণ বসু

শোনো, ছাতিমের ঘ্রাণ বিষাদ অতিক্রম করে মৃত্যু অবধি স্পর্শে সক্ষম, সে কথা তো তোমাকে আগেও বলেছি। নতুন বলতে, শিউলির বৃন্ত থেকে কমলা রঙ থেঁতলে - অশ্রু আর রক্তে ভিজিয়ে - গেরুয়া করে তোলা। যদিও সময় থাকতে তোমাদের আর বলে ওঠা হয়নি - এসবের পরেও - যে সাদা পাপড়িটুকু পড়ে আছে, মাঠে - বৃন্তচ্যুত যদিও - ওই দ্যাখো, ভেসে যাচ্ছে নদীর স্রোতে - সে তো মিছে কিছু নয়।

এই সবই ঠিক, শুধু এটুকু, আজও, রহস্য-ই রয়ে গেল, বিসর্জনের শেষে ফাঁকা মণ্ডপ, পরম অবিশ্বাসীর মনেও, কেন শূন্যতার আবাহন করে! মেঘলা আকাশ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। রহস্য ক্রমে আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। আকুল রহস্যের মধ্যে ঝরে পড়তে থাকে হিম। আর তো দুদিন মাত্র, তার পর চন্দননগরের আলো আস্তে আস্তে আকাশপ্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকবে। কার্তিক তো এসে পড়েছে হে।

তথাপি এ তো কিছু অজানা কথা নয়, যে, নতুন জামা, দুদিন পরেই পুরনো হয়ে যায়। এমনকি পুরনো হতে পারারও আগে, জামার তন্তুতে মিশে যেতে থাকে ঘামের গন্ধ। দর্পনে প্রতিফলিত প্রতিমা-মুখ, কেউ নাড়িয়ে দেওয়ার আগেই, ঝাপসা হয়ে যায়। বস্তুত, প্যান্ডেলের আয়োজন, সে যে নেহাতই চুক্তিভিত্তিক, একথা তো প্রথম খুঁটিটি পড়ার পূর্বেই জানা।

তবু পিছুটান এমনই, সবকিছু জানার পরেও, বিষণ্ণ চোখ শুধু দেখে, প্যান্ডেলের মেঝেতে পড়ে থাকা ইতস্তত সিঁদুর। বিষাদবিধুর।

দ্যাখো, ফুরিয়ে যায় না কিছুই। কেননা, ফুরোনোর পরেও কিছু গল্প শুরু হবে। শুরু হয়-ই। সমাপ্তি কীভাবে আসবে, সেটুকু জানা গেল না - কিন্ত ও নিয়ে আক্ষেপ অবান্তর। কিছু কিছু অজানা এমনই থাকুক না। কিছু অপ্রাপ্তি, কিছু ছাড়তে-না-পারা দীর্ঘশ্বাস। ঘন হয়ে থাকুকই না।

জানা বলতে, বিদায়ী ঢাকের শব্দের সঙ্গে মিলে যেতে থাকে 'চিরদিনই তুমি যে আমার'-এর প্রিল্যুড। গল্প না-ই বা জানলে, গানের কথা যদি জানতে চাও, আরেকটু সবুর করো। আলোগুলো ফুরিয়ে যাক, তারপর… শোনো…

এ জীবন ফুরিয়ে যেদিন
পাবো এক নতুন জীবন
সেদিনও হবে একাকার… 

না হে! ওসব নিতান্তই বাজে কথা। স্তোকবাক্য নিছক। তোমাকেই জানিয়ে রাখি, আসছে বছর আবার হবে, এই শব্দমালা, কোনও এক বছর থেকে, মিথ্যে হয়ে যায়। যাবেই। চিরতরে। 

আকাশে, বাতাসে, ধোঁয়ায়, মলিন হয়ে আসা আলোয় - কিংবা মাটির গভীরে - লীন হয়ে যাওয়ার আগে…

এই বেঁচে থাকাটা, উৎসবের মতোই, পরের বারের জন্য প্রতীক্ষা। একে কি মিথ্যে বলব, বলো? বলব, মায়া? একেই??

শুভ বিজয়া। ভালো থেকো।

পড়ে আসা বেলায় দাঁড়িয়েও বিশ্বাস করতে বড় লোভ হয় - আবার তাহলে…

© বিষাণ বসু

রবিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৩

পুজোয় চাই নতুন শাড়ি ~ সৌম্য চট্টোপাধ্যায়

কি কঠিন সব শাড়ির নাম হয়ে গ্যাছে আজকাল। বৌয়ের সাথে পুজোয় কেনাকাটা করতে গেছিলাম। একজন বলছে, আপনাকে একটা ফ্লোরাল জরি, জুট-কটন বালুচরি দেখাই! আর একজন বলছে, না, না!আপনি বরং প্রথমে একটা হাতে বোনা এথনিক-মোটিফ জুট সিল্ক দেখুন। শাড়ির নাম না ধামালের ভেনুগোপাল মুতথুস্বামী আইয়ারের পুরো নাম বলা শক্ত। শাড়ির দোকানে গেলে আমি কতগুলো বেসিক্স মাথায় রাখি। যদি দুটো শাড়ির রঙ একদম এক মনে হয়, তাহলে অবশ্যই তাদের রঙ পুরোপুরি আলাদা। প্রথম আধঘণ্টায় দেখানো কোন শাড়ি কখনো ভালো হয় না। এবং কোন শাড়ির কত দাম হতে পারে, পাড়ের নীচে স্টেপল করা কাগজে নিজে না দেখে বোঝা অসম্ভব। শাড়ি আর সৌরভ গাঙ্গুলী শেষ অবধি কত টাকায় বিক্রি হবে কেউ আগে থেকে জানতে পারে না।  

বউ, দুটো শাড়ি অনেকক্ষণ ধরে দেখছে, আমি জানি শেষ অবধি দুটোই নেওয়া হবে, কিন্তু সেটা এখন বললে মানবে না, আমি বলছিও না। দুটো একইরকম শাড়ি কেনার একটা প্রাথমিক শর্ত হল ডিসিশান-মেকিংটাকে প্রথম একঘণ্টা একটা ডিনায়ালের মধ্যে দিয়ে যেতে দিতে হবে। সে হোক, আমার তাড়া নেই, আমি ইউটিউবে ভিডিয়ো দেখছি, ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন জিরাফের গলা কি করে এতো লম্বা হলো দেখছি। হঠাত দেখি বৌ বলছে, এর মধ্যে কোনটা নেবো বলতো? এগুলো ট্রিক কোয়েশ্চেন, সত্যি করে উত্তর দিতে নেই। এরকম আমরা স্কুলে জিজ্ঞাসা করতাম, তুই কি এখনও আগের মত শেয়ালদা স্টেশানে পকেট মারিস? সে যাই হোক, এরকম প্রশ্নের উত্তর দেবার একটা টেম্পলেট আছে।দেখবেন মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল ডার্বির দিন হয়তো স্কুল গ্রুপে উদমা খিস্তিখাস্তা চলছে, হঠাত কোন এক শান্তিগোপাল লিখল, কিন্তু শেষ অবধি জিতে গেলো ফুটবল।

আমি বউকে বললাম, কোনটা নেবে সেটা বড়কথা না, দুটো শাড়িতেই কি সুন্দর হাতে বুনে কাজ করেছে। যেটাই নাও, শেষ অবধি জিতে যাবে শিল্পটা। বউ খুশি হয়েছে, বুটিকের মহিলা, যে কিনা রাত্তিরবেলাতেও অপর্ণা সেনের মত একটা বাদামী গগলস পরে বসে ছিলো, সে অবধি আমাকে গগলস খুলে মাপছে। সে মাপুক, আমি আবার মোবাইলে ফিরে গেছি। ফেসবুকে একজন ভদ্রমহিলা কবিতা লেখেন বলে ফলো করেছিলাম, দেখছি রিলসে কামার্ত দৃষ্টিতে ঠোঁট চিপে তাকিয়ে আছেন। নীচে বাপ্পা সমাদ্দার লিখেছে, দিদি খুব স্নিগ্ধ লাগছে। ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথের সময় রিলস ছিলো না, নইলে আমি স্পষ্ট দেখতে পারছি, রাশিয়ার চিঠিতে মস্কোর বারান্দা থেকে রবিবাবু নবাব গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া পরে পাউট করছেন আর রঞ্জন বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, দাদা, খুব স্নিগ্ধ লাগছে।  

বুটিকের মহিলা বউকে বলছে, আপনাকে একটু সুদীপার কালেকশান দেখাই, আমি কলকাতা থেকে আনিয়েছি।এটা শুনে একটু নড়েচড়ে বসলাম, সাবধান হওয়ার দরকার আছে। কোন শাড়ি দেখানোর আগেই মনে হচ্ছে সুদীপার হাতে আমার একটা কাটা কিডনি দেখতে পাচ্ছি।  সুদীপা রান্নাঘরে বলছে, প্রথমেই আমরা সৌম্যর একটা কিডনি, ছাঁকা তেলে মুচমুচে করে ভেজে নেবো। অপর্ণা সেন বৌকে একটা সাদা ন্যাতার মত শাড়ি দেখাচ্ছে, এরকম শাড়ি পরে জেনেরালি জয়া এহসান বিধবা সেজে ঘোরে কৌশিক গাঙ্গুলীর সিনেমায়। বলছে, একদম সিম্পলের মধ্যে, নাম আঙুরলতা, দামও রিজনেবেল, সত্তর হাজারের রেঞ্জে এইগুলো। আমি মানসচক্ষে দেখতে পারছি, সুদীপা আমাকে বলছে, শুধু কিডনি না, পুরো শরীরটাই চাই সৌম্য, নইলে আঙুরলতা হবে না। আমি দেখতে পাচ্ছি সুদীপার বাড়িতে একটা পুতুল সাজানো আছে, মুখটা একদম আমার মত দেখতে। বাড়িতে কেউ গেস্ট এলেই পুতুলটা ঠক করে নীচে পরে যায়। 

আমি উশখুশ করে বলছি, না না, এইগুলো থাক, অন্য কোন কালেকশান আছে নাকি! বুটিকের অপর্ণা সেন বলছেন, তাহলে একটু সব্যসাচী দেখাবো নাকি? আসলে সকলে দেখতে চায় না! সুদীপার মত সব্যসাচী চক্রবর্তী যে শাড়ির ব্যবসায় নেমেছেন এটা জানতাম না। চিরদিন বামপন্থী মানুষ, গণআন্দোলনে থেকেছেন। নিশ্চয়ই মাস-সেগমেন্ট টার্গেট করেছেন। আমাদের প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টে শেখানো হত, Sensodyne এর কাস্টমার আলাদা, আবার বাবুল টুথপেস্টের কাস্টমার আলাদা, একদম ডিফারেন্ট প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট, আলাদা ক্যাচমেন্ট এরিয়া। ভালোই করেছেন, ছেলে দুটো তেমন দাঁড়াতে পারে নি। মাস-সেগমেন্টের, মেহনতি মানুষের প্রোডাক্ট যে এই বুটিকে কেউ দেখতে চাইবে না, এতে আর অবাক হওয়ার কি আছে।

এতক্ষণে বেশ কনফিডেন্ট ফিল করছি, শাড়ীর রঙগুলো ও বেশ ফ্যানাভাত, দুধভাত টাইপের, খেটে খাওয়া মানুষের শাড়ির রঙ যাকে বলে আরকি। বৌকে বললাম, নাহ এবারে তাহলে একটা সব্যসাচী নাও বুঝলে। বউ খুব অবাক, বলছে, এই না না, এইসবের একদম দরকার নেই, এইগুলো কেউ কেনে নাকি, পাগল হয়েছো! শাড়ির দাম দেখার জন্য, পাড়ের নীচটা উল্টে স্টেপল করা কাগজটা দেখলাম। দেখলাম শুধু আমি না, আমার পুরো গুষ্টি, আমার পুরো পাড়া হাতে কিডনি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 
 
শাড়ি আর সৌরভ গাঙ্গুলী! শেষ অবধি কত টাকায় বিক্রি হবে কেউ আগে থেকে জানতে পারে না মাইরি।

মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৩

ইজরায়েল ~ অভিষেক রয়

একটা ছোট্ট ভূখণ্ড নিয়ে ঝামেলার শেষ নেই। সভ্যতার উষাকাল থেকে যে কাটাকাটি চলছে তার কোনো স্থায়ী সমাধান মনে হয়না সম্ভব। জায়গাটাকে রিজার্ভ ফরেস্ট তৈরি করে মানুষের বদলে জন্তুদের থাকতে দিলে হয়ত এর পরিত্রাণ হতে পারে।

তা মুল ঝামেলা কি নিয়ে? জেরুজালেম (হ্যাঁ শেষের তিনটি অক্ষরই তিনটি গোষ্ঠীর মৌলবাদের পরিচয়), যে ৫৩ বার আক্রান্ত হয়েছে, ৪৪ বার দখলকৃত হয়েছে ২ বার ধ্বংস হয়েছে! 

প্রায় এক হাজার খৃষ্টপূর্ব সময়ে রাজা ডেভিডের সময়ে এটা ইসরায়েল এর রাজধানী ছিল, পরে রাজা সুলেমন এর সময়ে প্রথম মন্দির (যেখানে মসজিদ আল আকসা) তৈরি হয়। এখনকার ইহুদীরা ৯২৫ খৃষ্টপূর্ব সনেই মিশরীয় ফারাও দের দ্বারা বিতাড়িত হয়। এরপর খৃষ্টপূর্ব ৫৮৭ তে ব্যাবিলন সাম্রাজ্য  ও খৃষ্টপূর্ব ১৩৯ এ রোমান সাম্রাজ্যের সময় টেম্পল অফ সুলেমান ভেঙে ফেলা ও বিরাট সংখ্যক ইহুদী বিতাড়ন নথিবদ্ধ আছে।

গোটা ইউরোপ ও মধ্যএশিয়া জুড়ে যে ইহুদী বিদ্বেষ তারাও কিন্তু অন্যদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষভাবই পোষণ করে এসেছে। ওল্ড টেস্টামেন্ট জুড়ে ফিলিস্তিনি দের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও গণহত্যার কথা নথিবদ্ধ: প্রমিসড ল্যান্ডের বাইরের শহর গুলোর সাথে যুদ্ধে ও প্রমিসড ল্যান্ডের ভেতরে যুদ্ধ (Deut 20:10-15) এবং (Deut 20:16-18) জেসুয়া ও মুসা উভয়েই গণহত্যা চালিয়েছেন। যীশুর ক্রুসিফিকেশন এও ইহুদী চক্রান্তর গল্প আছে।

এরপরে এলো খ্রিস্টানরা। নিউ টেস্টামেন্ট জুড়ে অ্যান্টি সেমিটিজম "Cleansing of the Temple" (11:15-19) ও "Parable of the Vineyard" (12:1-12). আবার যীশুর মৃত্যুর পর আমরা পাই বাইবেলের ভার্স:
"তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দাও যে তোমরা তাদেরই বংশধর যারা নবীদের হত্যা করেছে... হে সাপ, সাপের বংশ! জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচবে কিভাবে ?"
- Matthew (23:31-33)
Gospel of John এও ইহুদীদের তুলনা করা হয়েছে অন্ধকার ও শয়তানের সাথে।
এছাড়াও Book of Revelation: (2:9)
"যারা বলে তারা ইহুদী, তারা শয়তানের উপাসনালয়"
লক্ষ্যনীয়, এই ঘৃণার সময়কালে ফিলিস্তিনিরা খ্রিস্টান ছিল, ও ইহুদীদের জেরুজালেমে কোনো প্রবেশাধিকার ছিলনা। লুকিয়ে ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়লে মৃত্যু।

সপ্তম শতকে মুসলিম উত্থান হলে দেখা গেল কোরআন ইহুদীদের প্রতি তাৎপর্যপূর্ন বিদ্বেষ পোষণ করে। তারা ঈশ্বরের অবাধ্য (2:93), নিজস্ব চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে (2:100), তারা নিজস্ব তোরাহ অনুসরণ করতে ব্যার্থ (5:66) ঈশ্বরের দ্বারা অভিশপ্ত (2:88, 4:51-52) থেকে সূরা আল বাকারা যেখানে সরাসরি খুন ও বিতাড়নের আয়াত।

মোহাম্মদ নিজে বনু কুরাইজা গোষ্ঠীর উপর যে গণহত্যা ও অত্যাচার চালিয়েছেন তার তুলনা ইতিহাসে বিরল। এমনকি মৃত্যু শয্যাতেও ওনার শেষ ইচ্ছে ছিল আরবভূমি হতে ইহুদী বিতাড়ন!
আজ যে হামাস এর অতর্কিত হামলা, যুদ্ধবন্দী নারী ও শিশুদের তুলে নিয়ে যাওয়া তাও কোরআন সমর্থিত বর্বরতা।

আব্রাহামিক ধর্মমানুষদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ততক্ষণ শেষ হবেনা যতক্ষন না তারা নিজেদের ধর্মগ্রন্থগুলি ত্যাগ না করে। ইসলামের নামে ভারত ভাগ করে পাকিস্থান তৈরি যতটা ভুল ততটাই ভুল জয়নিজম এর নামে ইসরায়েল তৈরি। ২০০০ বছর আগে পূর্বপুরুষ ছিল বলেই করো অধিকার জন্মায়না যে  নিজেদের ঘরবাড়ি ফেলে অন্যদেশে এসে সেখানকার মানুষকে উৎখাত করে বসা। কাল এন আর আই শ্যামলবাবু আপনার বাড়ি এসে যদি বলেন "৫০ প্রজন্ম আগে আমার পূর্বপুরুষ এই জমিতে থাকতেন, ওই তো পশ্চিমের ভাঙ্গা পাঁচিলটা এখনও আছে, ওখানেই ওরা ইয়ে করতেন, আপনি নিজের বাড়ি থেকে চলে যান" তাহলে আপনি ছেড়ে দিতেন ?
কিন্তু ৭৫ বছর ধরে এটাই চলে আসছে, এর মূল কারণ ইহুদী ধর্মগরন্থ: তোরাহ, যেখানে লেখা আছে হেকেল (বর্তমানে মসজিদ আল আকসা) এর কাছাকাছি থাকা ইহুদীদের জন্য সবচেয়ে পুণ্যের। তাই জেরুজালেম এর এই অংশের প্রপার্টির দাম সবথেকে বেশি। মৌলবাদী ইহুদীরা লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে   এখানে থাকে। Third Temple গড়ে তোলার জন্য, কল্পিত মাসিহার আগমনের জন্য ইহুদী জনবসতি ইলাস্টিকের মত বাড়ানো হচ্ছে ওয়েস্ট ব্যাংক জুড়ে।

আবার ঠিক তেমনভাবেই দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলতে হবে, ভোররাতে ঘুমন্ত জনপদে ৭৫০০ রকেট হামলা করে, নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করে নারী শিশুদের গনিমতের মাল বানিয়ে ধর্মীয় স্লোগান দেওয়া শুধুই সন্ত্রাসবাদ কোনো স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়। বরং ফিলিস্তিনদের স্বাধীনতা ব্যাহত হওয়ার মুল কালপ্রিট হল হামাস ও হিজবুল্লাহ।

এটাই সংগঠিত ধর্মের সমস্যা। শেষের সেদিন ত্বরান্বিত করার জন্য এরা নিজ নিজ গ্রন্থ অনুযায়ী বদমাইশি করতে থাকে। প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ গুলোতে প্রতি গুড ফ্রাইডে নিয়মিত টাকা তোলা হয় ও স্টেট অফ ইসরায়েল এর জন্য প্রার্থনা হয় যাতে ইহুদীরা যীশুকে ঈশ্বরপূত্র বলে মেনে নেয় (John XXIII)
সেই যীশু, যিনি বলেছিলেন তিনি ফিরবেন পরেরবার যোদ্ধার মত, শাসকের মত শাস্তি দিতে (অবশ্য মানুষকে দেখলে সত্যি মাথা ঠিক রাখা কঠিন, ৫০০ টাকায় যারা ভোট বিক্রি করে তাদের দেখলে আমারই আগাপাশতলা চাবকাতে ইচ্ছে করে)।

যাইহোক যা বলছিলাম, ভবিষ্যত সম্পর্কে সব ধর্মীয় মৌলবাদের প্রায় একই রকম একটা ধারণা আছে। ঈশ্বরপ্রেরিত দূত আসবেন; ইহুদীদের মসিহা, খৃষ্টানদের খ্রিস্ট ও অ্যান্টি খ্রিস্ট, মুসলিমদের দজ্জাল ও তাকে দমন করতে ইমাম মেহেদী ও যীশু, হিন্দুদের কল্কি অবতার। এলেই একটা বিভৎস মারামারি শুরু হয়ে যাবে। লাশ জমবে পাহাড়ের মত, রক্ত বইবে নদীর মত। তারপর ঠিক আপনার বাপ পিতামোর ধম্মটাই নাকি জিতে যাবে! সেই জিত উপভোগ করার জন্য আপনার বংশের কেউ বেঁচে নাও থাকতে পারে হয়ত সেই জয় ভোগ করবে রাস্তায় আপনার মেয়েকে যে টিজ করেছিল সে বা আপনার জমির ভেতরে যে আল দিয়েছে সে! 

তাই এই ভয়ঙ্কর ফ্যান্টাসি থেকে বেরিয়ে আসুন, মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে দেখুন, শিশুকে ভালোবাসুন শুধু শিশু বলে, পৃথিবীকে কেয়ামতের দিনের মাঠ না ভেবে আজকের পৃথিবীকে বাঁচতে দিন, গাছ লাগান। ধর্মনিরপেক্ষতা ও কল্যাণকামী বিজ্ঞাননস্কতাই একমাত্র শুভপথ।

রবিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৩

রামগ্রামের আদি স্তূপ ~ স্বাতী ভট্টাচার্য্য

রামগ্রামের নাম কখনও শুনিনি, তাই সেখানে যে একটা বৌদ্ধ স্তূপ আছে, এবং বিশ্বের সব স্তূপের মধ্যে তা বিশিষ্ট, তা জানার কোনও স্কোপ ছিল না। বেড়াতে গিয়ে যা শুনলাম, তাতে রীতিমতো একটা ওটিটি সিরিয়াল হয়ে যায়। যাকে বলে, পিরিয়ড পিস। মহাপরিনির্বাণ সূত্রে গল্পের মূলটা রয়েছে।
ব্যাপার হল, গৌতম বুদ্ধ তো কুশীনগরে দেহ রাখলেন। বছরটা খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩,  সেখানে তখন মল্ল বংশের এক রাজার রাজত্ব। তিনি বুদ্ধের ভস্মাধার এবং অন্যান্য যা কিছু স্মরণিকা, সেই সব কিছু একটি বৃহৎ জন-প্রকোষ্ঠে ('কাউন্সিল হল') কঠোর পাহারার মধ্যে রাখলেন। সেখানে ফুল, ধূপ, গান ইত্যাদি সহকারে শ্রদ্ধা নিবেদন চলতে থাকল। কিন্তু আশেপাশের রাজারা এক যোগে বুদ্ধের সেই সব স্মারকের ভাগ দাবি করলেন। তাদের মধ্যে  কপিলাবস্তুর শাক্য রাজা, পভার মল্ল রাজা, বেথদীপের ব্রাহ্মণ রাজা, বৈশালীর লিচ্ছবি, মগধের মৌর্য, পিপলিবনের মৌর্য এবং রামগ্রামের কোলিয়া (বা কল্য) রাজারা।  গোড়ায় কুশীনগরের মল্ল রাজা বেঁকে বসেছিলেন, কিন্তু অন্য রাজারা বুঝিয়ে দিলেন, দরকার হলে তাঁরা যুদ্ধ করবেন। শেষে কুশীনগরের এক ব্রাহ্মণ, তার নাম দ্রোণ বা দোন রাজাকে বোঝালেন, যে বুদ্ধ সারা জীবন করুণা আর অহিংসার বাণী প্রচার করলেন, তাঁর দেহাবশেষ নিয়ে রক্তারক্তি কি ভাল দেখায়? শেষমেষ সেই সব স্মারক আট ভাগ হল (অথবা দশ ভাগ, নানা মত পাচ্ছি)।

কোলিয়া রাজা বুদ্ধের স্মারক পেয়ে মহাসমারোহে শোভাযাত্রা করে তাঁর রাজধানী রামগ্রামে এনে রাখলেন, এবং তার উপর মহাস্তূপ রচনা করলেন। এই কোলিয়া রাজারা ছিলেন গৌতম বুদ্ধের মাতুলকুল — এঁদেরই কন্যা মায়াদেবী এবং প্রজাপতি গোতমী (দুই বোনকেই বিয়ে করেছিলেন শুদ্ধোধন, বুদ্ধের জন্মের পরে মায়াদেবী মারা যান, গোতমী তাঁকে মায়ের মতোই বড় করেন, তাঁর নিজের দুই ছেলেমেয়েও ছিল)। বুদ্ধের স্ত্রী যশোধরাও কোলিয়া বংশের মেয়ে।
সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর স্থির করলেন, তাঁর গোটা রাজ্যে চুরাশি হাজার স্তূপ তৈরি হবে। তাই তিনি আদি স্তূপগুলি খুলে, তার ভিতরে রক্ষিত স্মারকগুলির অধিকাংশই বার করে নেন। কেবল রামগ্রামের স্তূপটি তিনি খুলতে পারেননি। কেন, তা নিয়ে যথারীতি কাহিনি তৈরি হয়েছে। যেমন, অশোক সেখানে এসে দেখেন, এক মহানাগ সেই স্তূপ রক্ষা করছে। অথবা, হাতির দল সেখানে শুঁড়ে করে জল দিচ্ছে, ফুল দিচ্ছে। এমন কোনও অলৌকিক দৃশ্য দেখে অশোক নিরস্ত হয়েছিলেন। কিংবা হয়তো বুদ্ধের মামাবাড়ির লোকেরা অশোকের 'মামাবাড়ির আবদার' পাত্তা দিতে চাননি, রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। কী হয়েছিল, কে বলতে পারে। শরদিন্দু থাকলে এ নিয়ে একটা আস্ত উপন্যাস লিখতে পারতেন। সেখানে হয়তো রামগ্রামের কোনও দৃপ্ত ভিক্ষুণী দিগ্বিজয়ী সম্রাটকে নতমস্তকে প্রণিপাত করে বিদায় গ্রহণ করতে বাধ্য করতেন।
সে যা-ই হোক, হিস্টরিক্যাল ফ্যাক্ট (কিংবা কনসেনসাস অন ফ্যাক্ট) হল এই যে, রামগ্রামই বিশ্বের একমাত্র আদি স্তূপ, যা আড়াই হাজার বছর ধরে অক্ষত রয়েছে।
তা বলে কি কালের ছায়া পড়েনি তার উপরেও? কয়েকশো বছর লোকে ভুলে গিয়েছিল, কী এই জায়গা, কী এর মাহাত্ম্য। স্থানীয় চাষিরা এই ভূখণ্ডকে বলতেন দুর্ভাগা জমি, কারণ এখানে ফসল লাগালে তা বড় হয় না। হবে কী করে, স্তূপকে ঘিরে মাটির তলায় ঘন ইটের গাঁথনিতে তৈরি সঙ্ঘারাম রয়েছে, তা কি আর তখন জানা গিয়েছিল? ১৮৯৯ সালে এক ব্রিটিশ প্রত্নতাত্তিক ডব্লিই হোয়ি (W Hoey) এটিকে আবিষ্কার করেন। 

লুম্বিনী থেকে চুয়াল্লিশ কিলোমিটার দূরে রামগ্রামের এই স্তূপ রয়েছে মাটির তলায়, সবুজ ঘাসের আচ্ছাদনে ঢাকা তার উপরিভাগ। তবে সত্যি বলতে কী, কারুকার্যময়, সোনালী চূড়ায় শোভিত , বিচিত্র স্থাপত্যে সাজানো স্তূপ তো নেপালে বা ভারতে কম নেই। তার চাইতে এই সবুজ ঘাসে ঢাকা, এক বৃহৎ অশ্বত্থের ছায়ায় শীতল, অতি শান্ত পরিবেশে শুয়ে থাকা স্তূপটি যেন অনেক বেশি স্পর্শ করে মনকে। এমন কোমল কিন্তু অবিচল স্থানে এসেই তো রাজশক্তি লজ্জা পায়, হেরে গিয়ে ফিরে যায়।

কপিলাবস্তু ~ স্বাতী ভট্টাচর্য্য

কপিলাবস্তু। ক'জনই বা গেছে, অথচ, কে না গেছে? প্রাচীন সে শহর মনের চোখে চিরজীবন্ত। এক প্রৌঢ় পিতার তৈরি এমন রমণীয় এক নগরী, যাতে তার তরুণ পুত্র সংসারের প্রতি বীতরাগ না হয়, পিতার সিংহাসনেকে উপেক্ষা করে চলে না যায়। তা-ও সেই পুত্র, মাত্র ২৯ বছর বয়সে, সুন্দরী স্ত্রী আর শিশুপুত্রকে ছেড়ে, স্নেহময়ী বিমাতা প্রজাপতি গোতমীকে ছেড়ে, কপিলাবস্তুর পূর্ব দ্বার দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। নির্বাণ লাভের পরে পিতার আহ্বানে ফিরেছিলেন বটে, তবে কপিলাবস্তু নগরীতে প্রবেশ করেননি। নগরী থেকে ছ'কিলোমিটার দূরে,  বটগাছের বনের ছায়ায় থাকতেন। সেই জায়গার নাম নিগ্রোধারাম। সেখানে সঙ্ঘও তৈরি হয়, সম্ভবত বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই। তার সাক্ষ্য মেলে ধ্বংসাবশেষে।  এখানেই নাকি গোতমী বুদ্ধের থেকে সন্ন্যাস প্রার্থনা করেছিলেন, বুদ্ধের ছেলে রাহুল এখানেই দীক্ষিত হয়েছিলেন সন্ন্যাসে।

যে কোনও তীর্থস্থান তার  মাহাত্ম্য খুঁজে পায় বহু প্রজন্ম-লালিত কাহিনিতে, সেগুলোকে 'আরও সত্য' বলা চলে। পাশাপাশি চলে আর এক বয়ান — ইতিহাসের, প্রত্নতত্ত্বের। ভারত আর নেপাল মিলিয়ে অন্তত তিনটি স্থান ছিল কপিলাবস্তু হওয়ার দাবিদার। শেষ অবধি লুম্বিনীর অনতিদূরে তিলৌরকোটে খননকার্য চালিয়ে প্রাচীন  নগরীর যে নিদর্শন মিলেছে, তাকেই ঐতিহাসিকরা কপিলাবস্তু বলে মোটামুটি স্বীকার করে নিয়েছেন। তা হয়তো আমাদের কল্পিত রাজধানী ছিল না, ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র। শুদ্ধোধনও মস্ত রাজা ছিলেন না, ছিলেন রাজপুরুষদের প্রধান। কপিলাবস্তুর চাইতে অনেক বড়, অনেক বিলাসবহুল, সুরম্য নগর তখন ভারতে ছিল। হয়তো তরুণ সিদ্ধার্থ সে সব দেখেওছেন। তবে জীবনের প্রথম ভাগ কপিলাবস্তুতেই যে তিনি কাটিয়েছেন, সে বিষয়ে সংশয় নেই।

১৮৯৯ সালে তিলৌরকোটের প্রত্নতাত্ত্বিক  আবিষ্কারকে প্রাচীন কপিলাবস্তু বলে চিহ্নিত করার কৃতিত্ব এক বাঙালির, তাঁর নাম পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। সলজ্জে স্বীকার করি, কপিলাবস্তুতে দাঁড়িয়ে সে দেশের সরকারি দফতরের বোর্ডে তাঁর নাম ( পি সি মুখার্জি) দেখে তাঁর কথা প্রথম জানলাম। আমাদের ইতিহাসের সিলেবাস রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়েই ক্ষান্ত দিয়েছিল, আর নিজের পড়াশোনার দৌড় তথৈবচ। নেট সন্ধান করছে দেখছি, বহু সাহেব হর্তাকর্তার ঈর্ষা-বিষ সয়ে পূর্ণচন্দ্রকে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াতে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হয়েছিল।

আমাদের সঙ্গের গাইডটি নিজেকে 'গভর্নমেন্ট রেজিস্টার্ড' বলে দাবি করলেন, এবং আগাগোড়া কল্পকাহিনী শুনিয়ে গেলেন। ভাগ্যিস, আবছা হয়ে-আসা সরকারি বোর্ডগুলো ছিল। গাইড বললেন, এই পশ্চিমের দরজা দিয়ে শুদ্ধোধন ঢুকতেন কপিলাবস্তুতে, এটাই ছিল নগরের প্রধান রাজপথ। বোর্ড বলল, এই এলাকায় সম্ভবত সব চাইতে গরিবরা থাকত, কারণ এখানকার বাড়িগুলো সব ভাঙা ইটে তৈরি, বেঁটে বেঁটে দেওয়াল। অতঃপর 'এখানেই মায়া দেবী চান করতেন' 'এটাই রাজার শোয়ার ঘর ছিল' ইত্যাদি ব্যাখান চলল। বোর্ড বলল, এ সবই কুশান আর মৌর্য আমলের, বুদ্ধের সময়ের শহর সম্ভবত মাটির অনেক তলায়। তবে এলাকা যে প্রাচীন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, খ্রিস্টের জন্মের আটশো বছর আগেকার সাক্ষ্যও মিলেছে। বুদ্ধের জন্যই এ নগরীকে সবাই চিনলেও, এর নাম তাঁর চাইতেও অন্তত একশো বছর আগেকার এক ঋষির নামে, তিনি কপিল, সাংখ্য দর্শন যাঁর দান। কপিলের বাস্তু, সেই থেকে কপিলাবস্তু। শাক্যদের মধ্যে সাংখ্যের গভীর প্রভাব ছিল, এবং অনেকে মনে করেন যে বুদ্ধের চিন্তাতেও নিরীশ্বরবাদী সাংখ্য দর্শনের প্রভাব রয়েছে।

সর্বত্র যেমন হয়, এখানেও তাই — এক ধর্মস্থান কালক্রমে দখল করেছে অন্য ধর্ম, তৈরি করেছে নিজের বিকল্প কাহিনি। নিগ্রোধারামের নাম এখন কুদান — 'কুদা' অর্থাৎ লাফানো থেকে। শিব নাকি এখানে লাফ দিয়ে দিয়ে নৃত্য করেছিলেন। এই অঞ্চলে দেখা যায়, প্রায় সব বৌদ্ধস্তূপের কাছাকাছি একটা না একটা শিবলিঙ্গ মিলেছে। এই ইতিহাসের বয়সও ফেলনা নয়, ১৮৯৯ সালে পূর্ণচন্দ্র কপিলাবস্তুর প্রাচীর ঘেরা এলাকার মধ্যে এক দেবী মন্দির দেখেছিলেন, যেখানে মনস্কামনা পূর্ণ করতে হাতি গড়ে রেখে দিয়ে যায় লোকে। এখনও সেখানে নানা রঙের, নানা মাপের হাতি দেখে এলাম।  মন্দিরটি নিত্য ব্যবহৃত।  কপিলাবস্তুতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, পরিব্রাজকরা বিশেষ তিথিতে পুজো করেন, তার ছবি দেখলাম। তবে লুম্বিনীতে মায়া দেবীর মন্দিরে যেমন নিত্য আরাধনা, কপিলাবস্তুতে তেমন ব্যবস্থা আছে বলে মনে হল না।

কপিলাবস্তু বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই তছনছ হয়ে যায় কোশল রাজাদের আক্রমণে। সম্ভবত রোহিনী নদীর জল নিয়ে বিবাদ বেধেছিল। অশোক লুম্বিনীতে এসে কপিলাবস্তুতেও এসেছিলেন। চিনা তীর্থযাত্রীরা এখানে ঘুরে গিয়েছেন এবং বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। তাদের বিবরণের সূত্রেই ফের কপিলাবস্তুকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন এক বাঙালি সন্তান।

দুপুরের ঠাঠা রোদে কপিলাবস্তুর সামনে দাঁড়িয়ে কী দেখা যায়? মস্ত এক জমি, সবুজ ঘাসে ঢাকা, নানা জায়গায় আয়তক্ষেত্রের মতো পুরনো ইঁটের গাঁথনি। বুদ্ধের বিচরণক্ষেত্র যদি বা এটাই হয়ে থাকে, তা রয়েছে মাটির নীচে। তাতে কী? ঠিক এখানেই যদি বা না হয়, যদি হয় একটু এ পাশ বা ও পাশে, যদি বা সম্পূর্ণ অন্য রকম হয় ভূগর্ভে প্রোথিত নগরীটির নকশা, তাতে কী আসে যায়? তরুণ সিদ্ধার্থ এই আকাশের নীচেই বিচরণ করেছেন, অকল্পনীয় কষ্টসাধ্য সাধনার পরে ফিরেছেন জ্ঞানপ্রাপ্ত মহামানব হয়ে, করুণাঘন রূপে, বানগঙ্গার তীরে এই জায়গাটি সেই অলৌকিক জীবনের একটি লৌকিক চিহ্ন তো বটে। সেই অচিন্তনীয়কে একটু আপন করে নেওয়ার উপায় — দুপুর রোদে চোখ-মুখ কুঁচকে, গাইডের বকর বকর অগ্রাহ্য করে, সবুজ ঘাস আর ছাতা-পড়া ইটের সারির দিকে তাকিয়ে চিন্তা করা — এই কপিলাবস্তু। এই কপিলাবস্তু।