শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২০

মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি ~ সুশোভন পাত্র

ফোর্বসের 'রিয়েল টাইম বিলিওনারিস'-র লিস্টে পঞ্চম স্থানে উঠে এসে মুকেশ ভাই বলেছেন "টাকা কামানোর জন্য ব্যবসা করার মানেই হয় না। পৃথিবীতে টাকা দিয়ে বিশেষ কিছুই কেনা যায় না।" হ্যাংলা মিডিয়া মুকেশ ভাই-র হাম্বেল বাণী তে মুগ্ধ হয়ে হামলে পড়ে এমন জিভ বের করেছে যে, জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষকরা আজকাল অনলাইন ক্লাসে নাকি প্রতিবর্ত ক্রিয়া বোঝাতে কুকুরের জিভের বদলে অর্ণব গোস্বামীদের জিভের উদাহরণ দিচ্ছেন।  
কুকুরের কিংডমে এই নির্মম দখলদারি তে বিমর্ষ হয়ে, মুদি দোকানের লাইনে দাঁড়িয়ে রাস্তার কুকুরটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওমনি পাড়ার রাজনৈতিক বিরোধী কাকু এসে বললেন "দেখলে তো, মুকেশ আম্বানি কেমন দিল! অর্থনীতি কে এবার রোখে কোন বাপের ব্যাটার সাধ্যি দেখি।" অগত্যা প্রতিবর্ত ক্রিয়া থেকে অর্থনীতি তে সুইচ করে বললাম, "কাকু, ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষে প্রতি মিনিটে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি গড়ে ২৩,৪০,১৫০টাকা করে বেড়েছে¹। আপনার স্যালারিটা যেন কত বেড়েছে?" বিরোধী কাকু জনসমক্ষে স্যালারির প্রসঙ্গ তোলায় পুরো জেনারেশেনের স্বভাব-ভদ্রতার ১৪গুষ্ঠি উদ্ধার করে দিলেন। কুকুরটা অবশ্য বসেই ছিল।
থাকুক গে। বিবেকানন্দ তো বলেছেন, যে বসে থাকে, তার ভাগ্যও নাকি বসে থাকে। অবশ্য এসব থিওরি সাধারণ মানুষের জন্য। মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম। মুকেশ ভাই বসে থাকলেও, ভাগ্য দাঁড়িয়েই থাকে। ঐ যে কি বলে যেন? 'ক্রনি ক্যাপিটালিজম' না কি ছাই! 
'ক্রনি-ফনি' ছাড়ুন। পয়েন্টে আসুন। ৪২তম অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিং-এ মুকেশ ভাই যেদিন ঘোষণা করলেন ১৮মাসের মধ্যে রিলায়েন্স কে 'ঋণমুক্ত' করার রোডম্যাপ রেডি, তখন বাজারে রিলায়েন্সের মোট ঋণ ১.৫৪লক্ষ কোটি। ক্রেডিট সুইসের বিচারে স্টক মার্কেটে রিলায়েন্সের শেয়ারের মান 'নিম্ন'। 
ঘোষণার ৯দিনের মাথায়, Serious Fraud Investigation Office জানালো, যে সময়ে চিদাম্বরম INX মিডিয়া তে মরিসাসের কোম্পানির অবৈধ বিনিয়োগ কে মান্যতা দিয়েছিলেন, সেই সময়ে রিলায়েন্সই, INX-র অধীনস্থ নিউজ-X চ্যানেলের মালিকানা কিনে ঐ অবৈধ বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম করেছিল²। 
INX নিয়ে তদন্তের মাঝেই, মুম্বাই উপকূলে পান্না-মুক্তা-তাপ্তি বেসিনের গ্যাস এবং তেল উত্তোলনে আর্থিক অসঙ্গতির কারণে, দিল্লি হাইকোর্টে সৌদি আরামকোর সঙ্গে রিলায়েন্সের ৫৭হাজার কোটির চুক্তি আইনি জটিলতায় পড়ল। অন্যদিকে লকডাউনের মুখে, রাসায়নিক পিউরিফাইয়েড  টেরেফথালিক অ্যাসিডের আমদানি শুল্ক কমলে, পলিয়েস্টার তৈরিতে মার্কেটে রিলায়েন্সের একছত্র আধিপত্যও খর্ব হল। পর পর, বাণিজ্যিক ধাক্কায়, গোল্লায় যাওয়া 'মার্কেট রেপুটেশনের' ক্যাসক্যাডিং এফেক্টে রিলায়েন্সের শেয়ারের মূল্য তখন ১৩৫০টাকা থেকে গোত্তা খেয়ে ৮৬৭-তে³। 
কিন্তু মুকেশ ভাই তো ব্যতিক্রম। তাই মুকেশ ভাই-র ভাগ্য ফেরাতে মাঠে নামল স্বয়ং আরবিআই। রেপো রেট পরিবর্তন করে, সরকারী বন্ড কিনে, অর্থনীতি তে পর্যাপ্ত ক্যাশের জোগান বজায় রাখার মনিটারি পলিসির চল বহুদিনের। কিন্তু এই প্রথমবার আরবিআই জানালো, প্রয়োজনে ১৯৩৪-র অ্যাক্ট বদলে, 'কর্পোরেট বন্ড' কেনার কথাও ভাবছে তারা⁴। খবর চাউর হতেই রিলায়েন্সের শেয়ারের দাম বাড়ল ২৩%। ৬ মাসে প্রথমবার।  
প্রধানমন্ত্রীর 'আত্মনির্ভর' বক্তৃতার ২৪ঘণ্টা পেরনোর আগেই মুকেশ ভাই ঘোষণা করলেন 'সম্পূর্ণ দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে' টেলিকমে 5G-র বিপ্লব আনবে রিলায়েন্স। আমেরিকার Qualcomm আর দক্ষিণ কোরিয়ার Samsung-র সঙ্গে চুক্তি বদ্ধ হয়ে, Huawei-র পেটেন্ট ব্যবহার করে কিভাবে জিও "সম্পূর্ণ দেশীয় 5G-র বিপ্লব আনবে" সে প্রশ্ন শিকেয় তুলে, বক্তৃতা আর ঘোষণার আন্তঃ সম্পর্কের ইঙ্গিত বুঝতে ভুল হয়নি জুকেরবার্গের মত ব্যবসিকদের⁵। ফলত দু-মাসে জিও-র ঝুলিতে এলো ফেসবুক সহ বিভিন্ন কোম্পানির মোট ৮৬,৬৫৪কোটির চুক্তি। কিন্তু তখন রিলায়েন্স'র ১.৫লক্ষ কোটির 'ঋণমুক্তি'র লক্ষ্য দুরস্ত। 
তাই মুকেশ ভাই-র ইচ্ছে হল, মার্কিন শেয়ার বাজার ন্যাসড্যাকে রিলায়েন্সের 'রাইটস ইস্যু' করবেন। গোদা বাংলায়, শেয়ার হোল্ডারদের কম পয়সায় নতুন শেয়ার কেনার সুযোগ দিয়ে পয়সা কামাবেন। কিন্তু আপনি বলবেন তা আবার হয় নাকি? সেবি-র নিয়মে তো কোন কোম্পানির বিরুদ্ধে আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ থাকলে তার রাইটস নাকি ইস্যু করা যায় না? কাগজ-কলমে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া রাইটস নাকি ইস্যু করা যায় না? ভারতীয় কোন কোম্পানির রাইটস বিদেশী শেয়ার মার্কেটে নাকি ইস্যু করা যায় না⁶? 
'যায় না' নয়, বলুন যেত না। কারণ মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম। তাই দেখা গেলো মুকেশ ভাই-র 'রাইটস ইস্যু'র ইচ্ছে হওয়ার ঠিক আগেই, সেবি, প্রথম দুটি নিয়মই শিথিল করতে সার্কুলার জারি করেছে। আর অর্থমন্ত্রী স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার ভারতীয় কোম্পানির রাইটস ইস্যুর জন্য বিদেশের শেয়ার মার্কেটে ব্যবহারের অনুমতিও দিয়ে বসেছেন। অতএব, মুকেশ ভাই 'রাইটস ইস্যু'ও করলেন, ন্যাসড্যাকেই করলেন, ৮৪,৪৬৭কোটি ঘরেও তুললেন। রিলায়েন্স ঋণমুক্ত'ও হল। আর মুকেশ ভাই বিলিওনারিসের লিস্টে পঞ্চম স্থানে উঠেও এলো। 
রিলায়েন্স ছাড়া আর কোন কোম্পানি নতুন নিয়মের ভিত্তিতে রাইটস ইস্যু করল? হঠাৎ কেনই বা এতদিনের নিয়ম শিথিল হল? কেন INX মিডিয়ার তদন্ত থমকে গেলো? উত্তর খুঁজে লাভ নেই। কারণ মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম হতে পারেন, বেইমান নয়! গুরুদক্ষিণা বাবদ PMCares-এ ৫০০ কোটি উনি আগেই দিয়েছেন⁷! 
এতক্ষণ সব ঠিকই ছিল। কিন্তু 'গুরুদক্ষিণা' কথা শুনেই কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। আর অমনি বিরোধী কাকু খেঁকিয়ে উঠে বললেন, "তো কি এমন অন্যায় হয়েছে? রিলায়েন্স অর্থনীতি তে কত কর্মসংস্থান তৈরি করে জানো? সরকার ওনাকে সুযোগ-সুবিধা দেবে না তো তোমাকে দেবে? র‍্যাস্কাল কোথাকার।" 
আসলে বিরোধী কাকুর, ব্রেকফাস্টে চিজ-বাটার, লাঞ্চে পাৎসা আর ডিনারে লো-ক্যালরি কর্ণফেল্কস আছে। বিরোধী কাকুর, মাস গেলে বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে। তাই বিরোধী কাকুর, হাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন গুঁজে, দেশের অর্থনীতি নিয়ে বাতেলা দেওয়ার সুযোগ আছে। উইকঅ্যান্ডে 30ml স্কচের পেগে, "রিলায়েন্স অর্থনীতি তে কত কর্মসংস্থান তৈরি করে জানো?" -ভেবে নাবালক সুলভ অবাক হবার ফ্যান্টাসি আছে। দুঃখ একটাই, এতো কিছু 'আছে'র মধ্যে বিরোধী কাকুর শুধু গায়ে মানুষের চামড়া রাখার অভ্যাসটাই বাদ পড়ে গেছে। 
না হলে বিরোধী কাকু জানতেন কর্মসংস্থান মানে কেবল হোয়াইট কলার জব নয়, কর্মসংস্থান মানে MNREGA-ও। না হলে জানতেন রিলায়েন্স গ্রুপে মোট কর্মসংস্থান ৭৫০০০। আর MNREGA-তে ৫.২কোটি⁸। না হলে জানতেন সম্প্রতি রাষ্ট্রসঙ্ঘ জানিয়েছে ২০০৫-১৫ ২৭কোটি ৩০লক্ষ মানুষ কে দরিদ্রের অন্ধকার থেকে টেনে তুলছে ভারত⁹। কোনও রিলায়েন্স-র দৌলতে নয়, বরং MNREGA-র সৌজন্যে।
তাই যে আপনার আশে পাশের যে সব বিরোধী কাকুরা, কর্মসংস্থান বলতে রিলায়েন্স বোঝেন কিন্তু MNREGA বোঝেন না; কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড়ে কর্মসংস্থানের যুক্তি খোঁজেন, কিন্তু MNREGA-র বাজেট বরাদ্দ ছাঁটাই হলে পুছেও দেখেন না; আম্বানি নিয়ে আদিখ্যেতা করেন, কিন্তু পাড়ার মস্তান তৃণমূল নেতা ক্যালাবে বলে রাজ্যে এসএসসি-টেটের কর্মসংস্থান নিয়ে ট্যাঁ-ফোও করেন না। এই দুঃসময়ে তাঁদের চিনুন। চিজ-বাটার-পাৎসা-কর্ণফেল্কসের নেপথ্যে তাঁদের শ্রেণী চরিত্রটা বুঝুন। চিনুন-বুঝুন, কারণেই পৃথিবীর রোগ একদিন ঠিক সেরে যাবে। তখন অবিকল মানুষের মত দেখতে এই জন্তুদের সোশ্যাল ডিসটেন্সিং লাগবে। কোয়রেন্টাইন লাগবে। দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা লাগবে।

সূত্র:



শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

উগ্রহিন্দুত্ববাদীর আদর্শ ~ অনির্বাণ রায়

সেকি আপনি কার্ল মার্ক্সের পরিচারিকার সাথে অবৈধ বাচ্চার কথা জানেন না? আরে ছিঃ ছিঃ জ্যোতি বসু তো বউ মরার পর শালীকে বিয়ে করেছিল! ফিদেল কাস্ত্রোর কটা রক্ষিতা ছিল জানিস? যাদবপুরে মেয়েরা ছোটো জামা পরে সিগ্রেট খায় আর ফাঁকা ফ্ল্যাটে লেনিন বোঝে।

আজ্ঞে হ্যাঁ। বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে, উগ্রহিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও আরএসএস মদতপুষ্ট 'বানরসেনা'রা এই ডিসকোর্সই ব্যবহার করে আজকাল। আপনি যদি না জেনে থাকেন, একটিবার ঘুরে আসুন তাদের পরিচালিত পেজগুলি থেকে৷ 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন? কেন আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আদর্শ থাকছে না? লজিকের ভাষায় এই জাতীয় কুযুক্তির একটা নাম আছে। Argumentum ad hominem, আর Graham's hierarchy of disagreement এর সবচেয়ে নীচুস্তরের সবচেয়ে কদর্য কুযুক্তি হলো এই অ্যাড হোমিনেম ও Name Calling, অর্থাৎ, মার্ক্স খারাপ কারণ, ডেম্যুথের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ভারতের সবচেয়ে বড়ো ও আজকের দিনে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকে ৭% এর বিরুদ্ধে এরকম কদর্য আক্রমণ করার দরকার পড়ছে কেন? 

পড়ছে তার কারণ খুব সোজা। Hate Sells, আমাদের সমাজে ঘৃণা বিক্রি হয়। আর তা যদি যৌনতাকেন্দ্রীক ঘৃণা হয়ে থাকে তবে তো কথাই নেই। "আমি শুতে পাচ্চিনে, ও কেন শোবে?" মানুষের ঈর্ষার আদিমতম প্রবৃত্তিকে উশকানি দিচ্ছে এই জাতীয় ডিস্কোর্স। খেয়াল করে দেখুন প্রথমে বলা সব কটি ব্যক্তিগতজীবনকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দেওয়া কুযুক্তির পিছনে রয়েছে এক অমোঘ হতাশা। যৌনহতাশা। আমি সারাজীবন ইনবক্সে "হাই ফ্র্যান্ডশিপ করবা" পাঠিয়ে একটা ন্যুড ছবি জোগাড় করতে পারলাম না, এরা যৌনতার উৎযাপন করবে কেন? তাদের বই, মতাদর্শ, চিন্তা, চেতনা সব তুচ্ছ। যৌনজীবনই বড়ো। আজ্ঞে হ্যাঁ, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাঙালির এই যৌনহতাশাকেই পুঁজি করে বছর বছর রবীন্দ্রকেচ্ছাকে 'বেস্টসেলার' বানিয়ে থাকেন। আজকের বাঙালি যতো না গীতবিতান ছুঁয়েছে, তার বেশি পড়েছে 'কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট', পেন্সিলে দাগ দিয়ে দিয়ে।

নীচের ছবি যে সংস্কৃতিতে মজার, 'কমন', স্বাভাবিক ও খিল্লি; সে সংস্কৃতিতে "পৃথিবীর ইতিহাস আসলে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস" এর থেকে "আব্বে শালীকে বিয়ে করেচে, জ্যোতি তো শালীমার" অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও অনেকবেশি জনমোহিনী হবে তা বলাই বাহুল্য।


বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০

৭% ভোট ~ সুশোভন পাত্র

গৃহপালিত মিডিয়ার ভাড়া করা পণ্ডিতরা বলেছেন বামপন্থীরা ভোট পাবে না! ৭%-র এক ইঞ্চিও এদিক সেদিক হবে না। সে বামপন্থীরা রাজ্য জুড়ে যতই ঐ সব, কমিউনিটি কিচেন করুক, শ্রমজীবী ক্যান্টিন খুলুক, মাস্ক-স্যানিটাইজার বিলি করুক, এক গলা জলে ডুবে রান্না করা খাবার ফেরি করুক, মুমূর্ষু রুগী কে রক্ত দান করুক, ত্রাণ নিয়ে আজ সন্দেশখালি, কাল হাসনাবাদে ঘুরুক, কৌটা নাড়িয়ে জোগাড় করা পয়সায় রেশন বিলি করুক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে পঞ্চায়েত অফিস ঘেরাও করুক, নন্দীগ্রামে বন্ধ হয়ে যাওয়া পার্টি অফিস খুলুক আর খেজুরি লাল ঝাণ্ডার মিছিলে সাজুক -বামপন্থীরা কিন্তু ভোট পাবে না! ৭%-র এক ইঞ্চিও এদিক সেদিক হবে না। 
তাহলে ভোট পাবে কে? পণ্ডিতরা সেফলজি গাঁতিয়ে বলেছেন, ভোট পাবেন 'বাংলার গব্বো মমতা'। ঐ যে ওনার খড়ি মাটি ঘষে রাস্তায় আঁকা গোল দাগে করোনা বৃত্তবন্দী হয়েছিল, ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে মিডিয়া খিচিক করে ফটো তুলেছিল, পরের দিনে ফ্রন্ট পেজে সিক্সটি পয়েন্টের গদগদ হেডিং টপকে পড়েছিল; ঐ যে টলিউডের নামকরা গ্রাফিক্স ডিজাইনারা আগুন ঝরা ছবি এঁকেছিল আর কিষানজির সেমি-হাফ-কোয়ার্টার-ফুল ভক্তরা ফেসবুকে 'দিদি-দিদি' করে উদ্বাহু হয়ে নেত্য করেছিল –এসবই নাকি পিকের কনটেম্পোরারি "হাউ টু উইন ইলেকশন"র কপিবুক ব্যাকরণ। মার্কেটে আজকাল নাকি এসবই ট্রেন্ডিং। কমিউনিটি কিচেন-টিচেন, ভুখা মানুষের পেট, যৌথ খামার -ওসব নাকি আজকাল ব্যাকডেটেড ফ্যাশন। 
আর ভোট পাবে কে? বিজেপি। ঐ যে দেখলেন না, দিলীপ ঘোষ আমফানের পর রাস্তায় দাঁড়িয়ে সং সেজে, ঢং করে গাছ কাটলেন, সন্ধেবেলা টক শো তে বাতেলা বাজির ঘুঁটে দিলেন, অগ্নিমিত্রা পল, লকেট চাটুজ্যে সাধ্যমত ফুটেজ খেলেন, আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা না করা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৮৫হাজার এলইডি টিভি লাগিয়ে বক্তৃতা দিলেন –এসবই নাকি অমিত মালব্য-র কনটেম্পোরারি "হাউ টু উইন ইলেকশন"র কপিবুক ব্যাকরণ। মার্কেটে আজকাল নাকি এসবই ট্রেন্ডিং। ওসব 'রক্ত দান জীবন দান' টাইপস শ্লোগান নাকি আজকাল আর কেউ খাচ্ছে না।
তৃণমূল ভোট পাবে কারণ, প্যান্ডেমিক ও আমফানের নির্মম আবহেও ত্রাণ লুটে লিমকা গিনেস বুকে নাম তুলছে তৃণমূল নেতারা। কেন পঞ্চায়েত-ব্লকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা টাঙ্গানো হচ্ছে না? কেন ওয়েবসাইটে তালিকা দেওয়া যাচ্ছে না? কে বানাল তালিকা? প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতি না শাসকদলের এমএলএ? কে সই করলেন তালিকায়? বিডিও না তার অধস্তন? কে পাঠালেন লুটের টাকা? ডিএম না তার অনুসঙ্গিরা  ? টাকা কি খোলামকুচি, না কারোর বাপের সম্পত্তি? লুটের দায় কার? চোরেদের বিরুদ্ধে সরকার কি ব্যবস্থা নিল? মুখ্যমন্ত্রী বলছেন "একটু দুর্নীতি!" কাইন্ডলি আপনারা মুখ্যমন্ত্রী কে এক-টু বিশ্বাস করুন। বোঝার চেষ্টা করুন, চোরেদের কে নিয়েই তো দল চালাতে হয় ওনাকে। তাই ওনার দোষ নেই। দুর্নীতির হিসেব নেই। সৎ প্রশ্নের জবাব নেই। কিন্তু গৃহপালিত মিডিয়া বলছে ভোট আছে। 
তৃণমূল ভোট পাবে কারণ, চিকিৎসার জন্য চোদ্দ ঘণ্টায় পাঁচটি হাসপাতাল-নার্সিংহোমে ঘুরে, মায়ের আত্মহত্যার হুমকি পর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে শুভ্রজিৎ-র। রাজ্যে, খোদ কলকাতায় সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে প্রতিদিন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বাড়ছে। রাজ্যে প্রথম ৫হাজার জন আক্রান্ত হয়েছিলেন ৭৪ দিনে। আর পরের ৫হাজার জন ৩দিনে। রেকর্ড হার আক্রান্ত গত ২৪ ঘণ্টায়। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যে কোভিড আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৬জন। মোট ১০৪৯। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু হার। সর্বনিম্ন পরীক্ষা। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন "সরকার কত করবে?"। ঠিকই তো! কাইন্ডলি আপনারা মুখ্যমন্ত্রী কে এক-টু বিশ্বাস করুন। বোঝার চেষ্টা করুন, এই সরকারের দায় নেই। দায়িত্ব নেই। লজ্জাও নেই। কিন্তু গৃহপালিত মিডিয়া বলছে ভোট আছে।
একান্তই তৃণমূল কে পছন্দ না হলে বিজেপি কে ভোট দিন। কারণ, আপনাকে বলা হয়েছিল 'মমতাকে আটকাতে পারে একমাত্র বিজেপি।' অতএব তৃণমূল ২২ বিজেপি ১৮। এই জরাসন্ধ-সময়ে সেই অমূল্য ১৮জন কোথায়? আমফান আছড়ে পড়ল। ৮৬জনের মৃত্যু হল। ঘর হারালেন কয়েক লক্ষ। তারপরও জল গড়াল মুড়িগঙ্গা, মৃদঙ্গভাঙা, তালপাটি দিয়ে। অথচ আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণার দাবী জানালেন না ১৮জন সাংসদের একজনও। লকডাউনে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি বাড়ল, পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ল, স্যানেটাইজারে ১৮% ট্যাক্স বসল। বিজেপির ইকুয়েশনে বিপর্যস্ত মানুষ নেই। অসহায় মানুষ নেই। বিপন্ন মানুষ নেই। কিন্তু বিজেপির ক্যালকুলেশনে ভোট আছে।    
বিজেপি ভোট পাবে কারণ বিজেপিই তো তৃণমূলের যোগ্য উত্তরসূরি। মিনাখায় হরিণখোল গ্রামে আমফানে যৌথভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করল বিজেপি এবং তৃণমূল। ক্ষতিগ্রস্ত ৫০৫। তালিকা হল ১২২ জনের। ভাগাভাগি তে ক্ষতিপূরণ পেল, তৃণমূলের ৬৭ বিজেপি'র ৫৫। আসল ক্ষতিগ্রস্তরা আঙুল চুষলেন। আর তাই, ৪১% ভোটে নিয়েও তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিজেপির প্রতিবাদ নেই, পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূলের সভাপতির চোখে চোখ রাখার হিম্মত নেই। লড়াই-সংগ্রামের-আন্দোলনের বালাই নেই। অবশ্য দরকারও নেই। কারণ তৃণমূলের সঙ্গে আপোষ আছে। পর্দার আড়ালে সেটিং আছে। 
কেমন সেটিং? কেমন আপোষ? যেমন ধরুন তৃণমূলের চাল চুরি তে বিজেপি স্পিকটি নট। বিজেপির ৪১টি কয়লা খনি নিলাম করলে মমতা ব্যানার্জি স্পিকটি নট। পিএম কেয়ারসের দুর্নীতি তে তৃণমূলের সাংসদরা স্পিকটি নট। আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় দাবী তে বিজেপির বাংলার সাংসদরা স্পিকটি নট। রেলের বেসরকারিকরণে প্রাক্তন রেলমন্ত্রী স্পিকটি নট। গোয়েঙ্কা ছাপ লাগাম ছাড়া ইলেকট্রিক বিলে দিলীপ ঘোষ স্পিকটি নট। কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার খর্ব হলে তৃণমূল স্পিকটি নট। শুভ্রজিৎ-র মৃত্যু নিয়ে বিজেপি স্পিকটি নট।   
তাই চোখ বন্ধ করে গৃহপালিত মিডিয়া কে বিশ্বাস করুন। ত্রাণের চাল চুরি তে রেকর্ড করতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। লোকাল  মস্তান নেতা কে আমফানের ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ করার সুযোগ দিতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। করোনার মৃত্যু হারে দেশের মধ্যে পয়লা র‍্যাঙ্ক ধরে রাখতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। সরকারী হসপিটালে শুভ্রজিৎ'দের বিনা চিকিৎসায় মরতে দিতে  তৃণমূলকেই ভোট দিন। 
আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা করার দাবী কে সাবোটেজ করতে বিজেপিকেই ভোট দিন। আপনার রক্ত চুষে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি বাড়াতে বিজেপিকেই ভোট দিন। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়াতে বিজেপিকেই ভোট দিন। তৃণমূলের সঙ্গে আপোষ করে লুটে খেতে বিজেপিকেই ভোট দিন। থানায় বসে তৃণমূলের পুলিশের সঙ্গে খাসি মাংস ভাত সাঁটাতে বিজেপিকেই ভোট দিন। 
আর তৃণমূল কে তাড়াতে চাইলে, বিজেপি কে ঠেকাতে চাইলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে চাইলে, আমফানের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবী তে সোচ্চার হতে চাইলে, আপনার জীবন-জীবিকার প্রতিদিনের সমস্যার বিরুদ্ধে আপোষ হীন সংগ্রাম চাইলে -প্রকাশ্যে লাল ঝাণ্ডা ধরুন। কারণ গোপনে বিজেপি তো দিদিমণিও করেন।

রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

বেসরকারী পরী ~ অঙ্কুর চক্রবর্তী

কাল রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলাম, ঘুম আসছিলো না... তাও চোখ বন্ধ করে জোর করে শুয়ে আছি- এমন সময় হঠাৎ বোম্ব্যাচ্যাক লেগে গেলো চোখে; বন্ধ চোখের মধ্যে দিয়েও বেশ বুঝতে পারলুম- ঘরের মধ্যে ঝকমকে আলো!!

চোখ অল্প ফাঁক করে দেখলুম- ঘরের মধ্যে সাদা কাপড় পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে, তার গা থেকেই কেমন যেন আলো বেরোচ্ছে... ঘুমচোখে ভাবছি- ইনি কি পাশের বাড়ির বিধবা ঠাকুমা, না কি রাণাঘাটের মিষ্টিপিসি- তখনই চটকাটা ভেঙে গেলো, আর চেয়ে দেখি- ও মা, এ যে নিযয্যস এক পরী! আমার ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে!!

গায়ে সাদা রঙের গাউনের মত কি যেন একটা, হাতে একটা সাদা লাঠির মতনও কি যেন আছে- লাঠির উপর আবার একটা তারামার্কা কি লাগানো...  মানে, একদম কপিবুক পরী আর কি... যখন দেখতে চেষ্টা করছি অন্য হাতে কাস্তে বা হাতুড়ি আছে কি না (এক হাতে তারা আছে কি না মশাই), পরী বলে উঠলো, "তা, বাবুমশাইয়ের ঘুম ভাঙলো?"

পরীর গলাটা কেমন যেন খ্যানখ্যানে... সে যাগগে; বললুম- "ঘুমাই নি তো; কিন্তু আপনি?..."

- "ধরেছিস ঠিকই, আমি একেবারে আদত পরীই বটে। কিন্তু বয়স হয়েছে, চোখেও ভালো দেখতে পাই না, এই পায়রার খোপের মত ফ্ল্যাটবাড়িতে ঠাওর করতে না পেরে কোন ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে কোন ফ্ল্যাটে ঢুকলুম কে জানে... হিসেবমতো এখানে তো একটা পাঁচ বছর একশো বিয়াল্লিশ দিন বয়সী কচি ফুটফুটে মেয়ে থাকার কথা, তা না, কোথাকার এক আধদামড়া মর্কট শুয়ে আছে..."

আমার ঘরে ঢুকে আমাকেই গাল দেওয়ায় একটু মাথা গরম হলো বৈ কি, কিন্তু ঠিক রিয়্যাক্ট করতে পারলুম না। একে তো পরী-টরী দেখে মাথা কেমন গুলিয়ে গেছে, তারপরে মনে মনে ভেবে দেখলাম- পরীদের ব্যাপারে আমার ডেটাবেস বড়ই কমজোরি। মানে, পরীরা পট করে রেগে উঠে চট করে শাপ দিয়ে ফেলে কি না, ঠিক কী ভাবে কথা বললে পরী তুষ্ট হয়, আর পরী রাগলেই বা কী করতে পারে- এসব কিছুই ঠিকমতো জানা নেই... অতএব, চটিয়ে লাভ নেই।

তাই আমতা আমতা করে বললুম- "এসেই যখন পড়েছেন, একটু বসুন না হয়..."
- "বসবো? বলছিস?" বলেই হাতের ডান্ডাটা দিয়ে ঘ্যাসঘ্যাস করে একটু পিঠ চুলকে নিলো পরী- "তা বসতে পারি, বলছিস যখন এত করে (একবারই বলেছি কিন্তু), কিন্তু কিছু খাওয়া, বড্ড ক্ষিদে লেগেছে।"

ইচ্ছে ছিলো না, কিন্তু ঘুমচোখেও উঠতেই হলো। আহা, খেতে চাইছে একজন, খাওয়াবো না? কিন্তু খাবার আছে কিছু? রান্না করা খাবার তো মনে হয় না কিছু আছে... আর আজকাল বাড়ি থেকে বেশি বেরোইনা বলে বাজারও কম করা হয়, আর সেই বাজার এক হপ্তা চালাতেও হয়। ফ্রিজ খুলে দেখি- একগাদা কোল্ডড্রিংক্স-এর বোতল। খাবার সেরকম কিছু চোখে পড়লো না। গোটাকয়েক টিফিন বাক্স আছে বটে, একটা খুলে দেখি- আধফালি কাঁচা কুমড়ো! আরেকটা খুলে দেখি, আদাবাটা!!

একটা টিফিন বাক্স খুলে কী একটা ঝোলের মত বেরোলো। শুঁকে বুঝলুম- দিন চারেক আগে বানানো মাংসের ঝোল। মাংস ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু ঝোলটা ভালো হয়েছিলো বলে বেঁচে যাওয়া ঝোলটা তুলে রেখেছি। অন্যসময় হলে রাখতুম না, কিন্তু এখন এই লকডাউন আর আনলকের বাজারে সবই দুর্মূল্য। 

কিন্তু ঝোলটা কী দিয়ে দেবো? আচমকা মনে পড়লো, বাড়িতে ফিশফ্রাই বানাবো বলে বাসা মাছের ফিলে এনেছিলাম, রাখা আছে ডিপফ্রিজে। ব্যস, চট করে একটা গ্যাসে ভাত বসিয়ে দিলাম, আর অন্য গ্যাসে একটা বাসার ফিলে নিয়ে, একটু নুন-হলুদ-লঙ্কাগুঁড়ো মাখিয়ে ভেজে নিয়ে, মাংসের ঝোলে দিয়ে বানিয়ে ফেললুম বাসা মাছের কারি। সিম্পল।

তারপর খাবার প্লেটে সাজিয়ে পরীকে ডাকতেই তার তো একগাল হাসি- "ও মা, এত তাড়াতাড়ি কী রান্না করলি রে?"

বললুম- "ভাত আর ভেটকি মাছের কারি..."

- "বাহ বাহ" বলে খেতে বসে এক টুকরো মাছ মুখে দিয়েই পরীর নাকচোখ কুঁচকে মুখটা কেমন ছাতুর পরোটার মত হয়ে গেল- "এটা কী মাছ রে? এটা ভেটকি মাছ? আমি খাস বাংলাদেশের মেয়ে, আমাকে ভেটকি মাছ চেনাচ্ছিস?"

এই রে, ভেটকি না বলে বাসা বললেই বোধহয় ভালো করতাম, রেগে আবার শাপটাপ না দিয়ে দেয়! মিনমিন করে বললাম- "আজ্ঞে, ভেটকি না, বাসা মাছ; একদম ভেটকির মতোই খেতে আর কি..."

- "অ্যাঁহ, একদম ভেটকির মত খেতে না কি! যত্তসব!! ভেটকি আমি খাইনি ভেবেছিস? আর বাড়িতে অতিথি এলে এইসব অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়াস বুঝি?"

মরিয়া হয়ে শেষচেষ্টা হিসেবে বলেই ফেললাম- "আজ্ঞে, পরীদের তো বাসার কারি খাইয়ে সেবা করাই নিয়ম!"

- "নিয়ম? এ আবার কোথাকার নিয়ম রে অলপ্পেয়ে??"

আমতা আমতা করে বললুম- "আজ্ঞে, ঠিক নিয়ম না, তবে বহুদিন ধরে অনেককেই বলতে শুনছি কি না যে...
.

.
.

..

Basarkari hola poriseba vala hoba" 🤭🤭😆😆

শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০

CESC বেসরকারীকরণ ~ সব্যসাচী চ্যাটার্জী

আচ্ছা  CESC নাকি জ্যোতি বোস বেসরকারিকরণ করেছিল...

এটা একটু পড়ে দেখতে পারেন।

সত্যিই কি লাভজনক সরকারি সংস্থা সি.ই.এস.সি. গোয়াঙ্কাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু ? 

লেটস চেক দ্যা ফ্যাক্ট এন্ড ল।

কলকাতার নগরায়নের ইতিহাসে বৈদ্যুতিকরণ ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৭৬ সালে কলকাতা মিউনিস্যিপ্যাল কর্পোরেশন গড়ে ওঠে। ১৮৭৯ সালে কলকাতায় প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে বিদ্যুতের আলো জ্বালানো হয়। এই কাজে যার ভূমিকা অবস্মরণীয় তিনি রুকস ইভেলিন বেল ক্রম্পটন নামে এক বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ ও শিল্পপতি। তাঁরই উদ্যোগে ইংল্যান্ডের  আলোকিকরন হয়েছিল।যেকোনো শিল্পের মত এক্ষেত্রেও প্রযুক্তি এবং পুঁজির একত্র উদ্যোগে গড়ে ওঠে  বিভিন্ন ব্রিটিশ বিদ্যুৎ কোম্পানী। যেহেতু ভারতের মত ব্রিটিশ উপনিবেশে বিদ্যুতায়ন শুরু হয়েছিল ইংরেজদের উদ্যোগে সেহেতু সেই উদ্যোগের উদ্যেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক অর্থাৎ এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরবারহ সমস্ত কিছু শুরু হয়েছিল প্রথমত অফিস কাছারি ও শহরের কার্যক্ষেত্রের চাহিদা অনুসারে।যেমন বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে না বুঝলে বিদ্যুতায়ন বা বিদ্যুৎ পরিষেবা বোঝা সম্ভব নয়।তেমন ভারতের বৈদ্যুতিকরণের অগ্রগতি না বুঝলে বিদ্যুৎ পরিষেবার সমস্যা গুলি বোঝা কার্যত অসম্ভব। আম্ফান পরবর্তী সময়ে আমার নিজস্ব মতামত সম্বলিত কয়েকটি পোষ্টে অনেকে অনেকগুলি প্রশ্ন করেছেন, আমি সেই প্রশ্নগুলির জবাব দেবার চেষ্টা করব। বলে রাখা ভালো যে, আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিদ্যুৎ শিল্প বা পরিষেবা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ নই, তাই আমার এই উত্তরগুলিকে একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মীর বক্তব্য হিসাবেই ধরে নেওয়াটাই সঠিক হবে। প্রথমে প্রশ্ন গুলিকে ভাগ করে নেওয়া যাক। 

👉 আম্ফান পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ পুনরায় সংযুক্তিকরনের কাজে কোলকাতার বিদ্যুৎ সরবারহ সংস্থার ব্যর্থতা কি সঙ্গত? মানে তাঁদের কি কিছুই করার ছিলনা ? 

👉ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাল্পাই কর্পোরেশন কি শুধুই একটি বেসরকারি সংস্থা ? সরকার বা পুরসভার কিছুই কি করার নেই ?

👉বামফ্রন্টের আমলে কি ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন সরকারি নিয়ন্ত্রনমুক্ত করে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ? বিদ্যুৎ পরিষেবার ক্ষেত্রে এক্ট অফ গড বা ফোর্স মেজিওর ক্লজ কি কার্যকরী এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে ?

👉একটি অত্যাবশ্যক পরিষেবা প্রদানকারী বেসরকারি সংস্থার উপর সরকারের কি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই ?

নীচের ফ্যাক্টস গুলি দেখলেই উপরের প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া যাবে। 

*পরাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রঃ
.............................................

পরাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্র ছিল সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। একমাত্র বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণের মত কয়েকটি ক্ষেত্রে আঞ্চলিক অথবা প্রাদেশিক সরকারগুলির ভূমিকা দেখা যায়।১৮৯৭ সালে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন গড়ে ওঠার প্রায় ষোল বছর আগে কলকাতায় প্রথম বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো হয়।সেটা ১৮৮৭ সালে চালু হয় কলকাতার বৈদ্যুতিকরনের আইন। এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবার কাজে কোনো কোম্পানীকে নিয়োগ করার ধারা ছিল না।১৮৯৬ সালে রুকস সাহেব গভর্মেন্ট বাহাদুরের আমন্ত্রণে এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো লাইসেন্সী নিয়োগের ধারা বানানোর জন্য ... কাজ শুরু করেন। এই সময়েই ১৯০০ সালে  সি.ই.এস. সি একচেটিয়া বিদ্যুতায়নের লাইসেন্স পায়।১৮৭৯ সালের ২৪ শে জুলাই কোলকাতায় P.W. Fleury and Co. এর উদ্যোগে প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে আলো জ্বালানো হয়।কলকাতার বৈদ্যুতিকরনের ক্ষেত্রে ইংরেজদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রখ্যাত ইংরেজ বিদ্যুৎ শিল্পপতি রুকস ইভলিন বেল ক্রম্পটন তিনি ইংরেজ সরকারকে প্রথম বিদ্যুত আইনের খসড়া বানাতে সহায়তা করেন।১৮৮৭ সালে বিদ্যুৎ আইন আসে। এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবার কাজে কোনো কোম্পানীকে নিয়োগ করার ধারা ছিল না।  ১৮৯৫ সালে ক্যালকাটা ইলেক্ট্রিক লাইটিং এক্ট আসে। এই আইনে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে লাইসেন্সী নিয়োগ পদ্ধতির কথা বলা হয়। এই আইন অনুসারে ১৮৯৭ সালে মেসার্স Kilburn and Company যা Indian Electric Company র এজেন্ট একুশ বছরের জন্য  কোলকাতার বিদ্যুৎ লাইসেন্স পায়। ১৮৯৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় Indian Electric Company র নাম  Calcutta Electric Supply Corporation Ltd. হয়। তারা কলকাতা ও লাগোয়া অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবারহের ইজারা (লাইসেন্স) লাভ করে। ১৯১০ সালের ভারতীয় বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী সরকারের হাতে লাইসেন্স দেবার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু বাজারে একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী অভিজ্ঞতার কারনে সি.ই.এস.সি. বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে মনোপলি অর্জন করে। সেই থেকেই কলকাতায় এই কোম্পানীটির মনোপলির জন্ম।

সি.ই.এস.সির ক্ষেত্রে সরকার বা পুরসভার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেও কিছু বক্তব্য আছে। আইন অনুসারে সি.ই.এস.সিকে সমস্ত সহায়তা করার দায়িত্ব সরকারের ও নির্দিষ্ট ভাবে বললে, পুলিশ ও প্রশাসনের। একই ভাবে, দুর্যোগের প্রশ্নে সরকারকে আবশ্যিক সহায়তা করার দায়িত্ব সি.ই.এস.সি বা অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার। তাই কিছুই করার নেই বলাটা শুধুই মুর্খামি। মানুষকে চরমতম বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানোর বদলে তাকে বিপদের সামনে ফেলে দেওয়ার জনৃ। চলুন ইতিহাসের পাতা থেকে একটু খুঁজে দেখার চেষ্টা করি এই ধরনের সংকট কিভাবে মোকাবিলা করা হয়েছিল কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে। এই প্রশ্নের উত্তরটি খুঁজতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে ১৯২৪ সালে। সেই যে বছর কোলকাতা কর্পোরেশন স্বরাজ পার্টির দখলে আসে।মেয়র হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস।এই সময় কলকাতা কর্পোরেশনের সাথে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের নানা বিষয়ে সংঘাত বাধে।প্রথমত, সেইসময় সি.ই.এস.সির সাথে বিরোধ হয় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে তাদের একচেটিয়া অধিকারের ইস্যুতে। সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কলকাতা কর্পোরেশন চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে বিদেশী নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ পরিষেবা কোম্পানীর জায়গায় দেশীয় কোম্পাণীগুলিকে উৎসাহিত করে।মনে রাখা দরকার এই যে এই সময় কলকাতা কর্পোরেশনের কাছে না ছিল ক্ষমতা, না ছিল আর্থিক সামর্থ।১৯৩০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকেই স্বরাজ পার্টির নিয়ন্ত্রণে থাকা কলকাতা কর্পোরেশন বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবীতে সি.ই.এস সি. কে চাপ দিতে থাকে। এই চাপ সৃষ্টির ফলে ১৯৩৩ সালে সি.ই.এস.সিকে তাদের বিদ্যুতের দাম কমাতে হয়।আসলে কলকাতা তথা ঔপনিবেশিক ভারতের বৈদ্যুতিকরণ না বুঝলে আজকের সমস্যা বোঝা যাবে না।

স্বাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রঃ
....…....................................
বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে বুঝতে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরবারহ সবটাই বুঝতে হবে। দেশ স্বাধীন হবার পর পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। সরবারহ সুনিশ্চিত করতে রাজ্যে রাজ্যে স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড গঠিত হয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে।পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫৫ সালে তৈরি হয় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ। ২০০৩ সালের কেন্দ্রীয় আইন অনুসারে এই সংস্থাটি অবলুপ্ত হয়ে বর্তমানে দুটি কোম্পানি গড়ে উঠেছে ২০০৭ সালে। প্রথমটি, পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য বিদ্যুৎ বন্টন নিগম বা ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেকট্রিসিটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী‌। অন্যটি (WBSETCL-Transmission Co. Ltd.)। সংবিধান অনুসারে বিদ্যুত হল একটি যুগ্ম তালিকাভুক্ত বিষয়। ফলত, কেন্দ্রীয় আইনের বাইরে গিয়ে রাজ্যগুলি আইন বানালেও কেন্দ্রীয় আইন লাগু হয়। দেশের সংবিধান ও আইন ঘাঁটলে আমরা দেখি বিদ্যুৎ একটি অধিকার।সুপ্রীম কোর্ট বা হাইকোর্টের রায় দেখলে আমরা আরো দেখি যে, বিদ্যুৎ সংযোগ আমাদের  জীবনের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।কারন জল বা বিদ্যুতের মত পরিষেবাগুলি মানুষের বেঁচে থাকার শর্ত। ঠিক যে কারনে কলকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন একটি বেসরকারি সংস্থা হলেও পরিষেবা প্রদানের চরিত্র অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট সংবিধানের ২২৬ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্দেশ জারী করতে পারে। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত সি.ই.এস.সি. গেজেটে কথা কোম্পানীর অন্যতম উপদেষ্টা শ্রী এস.কে রায় লিখেছিলেন যে, এটি দেশের হাতে গোনা বেসরকারি সংস্থাগুলির একটি যারা জন হিতকর ক্ষেত্রে নিয়োজিত।এই কারনেই তাদের একচেটিয়া অবস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। তাই আর পাঁচটা বেসরকারি সংস্থার সাথে সি.ই.এস.সির তুলনা করা যুক্তিসংগত নয়।সি.ই.এস.সি র ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে কোনোদিনই সি.ই.এস.সির পরিচালনা সরকারের হাতে ছিলনা ১৯৭০ সালে শুধুমাত্র লন্ডনের পরিচালকমন্ডলীর হাত থেকে ভারতের পরিচালক মন্ডলীর হাতে আসে। ভারতীয় করনের জন্য ১৯৭৮ সালে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই  (ইন্ডিয়া) লিমিটেড নাম হয় কোম্পানীর।১৯৮৭ সালে এই কোম্পানীর নাম বদল করে হয় সি.ই.এস.সি. লিমিটেড। অর্থাৎ, এগুলো শুধুই নাম বদল। জনহিতকর ক্ষেত্রে নিয়োজিত  একটি বেসরকারি কোম্পানীর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখতে ১৯৯৮ সালে ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশন আইন আসে। এতদিন শুধু লাইসেন্সের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। এবার বিদ্যুতের দাম নির্ধারনের ক্ষেত্রে সেই নিয়ন্ত্রণ এলো।১৯৮৯ সাল থেকে সি.ই.এস.সির সঙ্গে গোয়েঙ্কাদের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।সেই ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা লাইসেন্সের ভিত্তিতেই তাঁরা কাজ করে আসছে। তাই লাইসেন্স দেবার ক্ষেত্রে বিধান রায়, জ্যোতিবসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিংবা মমতা বন্দোপাধ্যায় নতুন কিছু করেন নি।

গোয়েঙ্কা ও সি.ই.এস.সি
.....................................

এবার আসি আশির দশকের শেষের সি.ই.এস.সির শেয়ার কেনায় প্রশ্নে। সঞ্জীব গোয়েঙ্কার প্রয়াত বাবা রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কা দেশের অধিগ্রহণ সম্রাট বা টেকওভার কিং  বলে পরিচিত ছিলেন, ১৯৮৯ সাল থেকে সি.ই.এস.সি র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এটি ছিল একটি বেসরকারি সংস্থার আভ্যন্তরীণ ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। ভারতের কোম্পানী আইন অনুসারে এক্ষেত্রে কোনো সরকারের কোনো ভূমিকা থাকেনা। জ্যোতি বসু সরকারেরও কোনো ভূমিকা ছিলনা।
২০০৩ সালের আগে চালু থাকা তিনিটি কেন্দ্রীয় আইনকে একত্রিত করে ইলেকট্রিসিটি এক্ট ২০০৩ আসে। এই আইনে স্পষ্ট করে ভারতের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকার প্রশ্নে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আসে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হল বেসরকারি সংস্থাগুলিকে লাইসেন্স দেওয়া ও একই জায়গায় দুটি সরবারহ কোম্পানীকে বিদ্যুত সরবারহের জন্য রাস্তা খুলে রাখা। এই প্রথম আইন করে একচেটিয়া সরবারহের সুযোগ পরিবর্তন করা হয়। সৃষ্টি হয় খোলা বাজারের প্রতিযোগিতা।তাহলে মমতা ব্যাণার্জীর সরকারের দোষ কোথায় ? না সি.ই.এস.সির আভ্যন্তরীণ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের হাত নেই।

কিন্তু পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিসের ক্ষেত্রে ডিসাসটার ম্যানেজমেন্ট এক্ট অনুযায়ী রাজ্য সরকার নিশ্চিত ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সি.ই.এস.সিকে।মমতা ব্যাণার্জী তা করেন নি।  বিদ্যুত বন্টন নেটওয়ার্কের যথাযথ মেনটিন্যান্সতো যেকোনও ইউটিলিটির পেরেনিয়াল নেচারের কাজ। সেই নেচারের কাজ যুগ যুগ ধরে ঠিকা শ্রমিকদের দিয়ে করানোটাইতো 'কন্ট্রাক্ট লেবার (রেগুলেশন এন্ড এ্যাবোলিশন) আইনে নিষিদ্ধ। বাকি রইল, এই কাজে যুক্ত স্থায়ী কর্মীবাহিনী যাদের লকডাউন ইত্যাদির কারনেও  যাদের বেতনে এখনও হাত পড়ে নি। তাহলে, যথেষ্ঠ পূর্বাভাস থাকা সত্বেও আগাম সতর্কতামূলক ম্যানপাওয়ার মোবিলাইজেসন করা যায় নি। শ্রমিকরা সব দেশে চলে গেছে বলে যুক্তিটা খুবই নড়বড়ে। সারা দেশে পরিযায়ী শ্রমিকরা যে সমস্যায় ঘরমুখি হতে উদগ্রীব হয়েছে, তা হল কর্মহীনতার সঙ্গে যুক্ত উপার্জনহীনতা এবং অনাহার। সিইএসসির একজন শ্রমিকেরওতো সেই সমস্যা নেই। তবে কেন তারা দলে দলে নিজের দেশে চলে যাবে ? একদম বাজে কথা। এছাড়া, আমরা জানি রাজ্য বন্টন সংস্থার প্রায় সব বন্টন সংযোগ ওভারহেড তারের মাধ্যমে হওয়ায়, ট্রাডিশনালি তারা খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকলেই নাগরিক সুরক্ষার জন্য নিজেরাই সংশ্লিষ্ট এলাকায় সব ট্রান্সফরমার বন্ধ করে গ্রাহককে সরবরাহ স্থগিত রাখে। আবার, আবহাওয়া ঠিক হলেই সেগুলি সচল করে দেয়। অথচ, সিইএসসি তে বন্টন ব্যাবস্থা ঠিক উল্টো। প্রায় সর্বত্র (এটা ৯৫% ক্ষেত্রে বলা যায়) আন্ডারগ্রাউন্ড তারের মাধ্যমে বন্টন। এখানেই তাদের যত ব্যর্থতার কারন লুকিয়ে আছে যা পেশাদারীত্বের বিলোপের জন্য তারা বুঝতে পারে নি। আন্ডারগ্রাউন্ড ডিসট্রিবিউসন নেটওয়ার্কেরও যে নিয়মিত পরীক্ষা, পরিচর্যা দরকার তা তারা কোনো দিনই ভাবে নি, করে নি। তাদের হয়ত একটা ধারনা তাড়া করে যে, মাটির ওপরে রাস্তা ইত্যাদি যতই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাক, ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের কোনও ক্ষতি সম্ভব নয়। আমরা রোজ দেখছি, একজন একসময়ের গামোছা বিক্রেতা বা চা ওয়ালাও পৌরসভাগুলি থেকে এখন রোড রিপেয়ারিং এর বরাত পাচ্ছে। সোসাল মিডিয়ায় দেখেছি সেই রাস্তার হাল কি। আজ প্রমানিত হল যে, সিইএসসি গ্রাহকের বাড়ীর মিটার যেমন নিয়ম করে বদলে ফেলে, তেমনিভাবে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কটাও শতবর্ষ প্রাচীন হয়েছে। তাকে ধাপে ধাপে বদলানোর সময় পার হয়েছে। হ্যাঁ, গাছ কাটা সিইএস সির কাজ নয় বলেই, তেমন পরিকাঠামো তাদের নেই। কিন্তু, সেনা বাহিনী আগাম জানিয়ে জরুরী ভিত্তিতে সেই কাজ করতে এসে, আমরা জেনেছি, সিইএসসির লোকজনের অভাবে দু'ঘন্টা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হয়েছে। তারাতো আগে ঐ সমস্ত ভেঙ্গে পড়া গাছে জড়িয়ে থাকা জীবন্ত তারগুলো বিচ্ছিন্ন করবে। তবে তো বাহিনী মহিরুহ কাটবে, সরাবে। ভেঙ্গে পড়া গাছে জড়িয়ে থাকা তারগুলো বিচ্ছিন্ন না করে, অন্য কাজ শুরু করাটাই প্রাণঘাতি। অতএব, আমরা যতক্ষন না সময় পাই, বাহিনী ততক্ষন হাত গুটিয়ে অপেক্ষা করুক। একেই কি বলে সবাই হাতে হাত মিলিয়ে বিপর্যয়ের মোকাবিলা করা ?ঠিক এই খানেই ভুল হচ্ছে ম্যাডাম।তাই প্রশ্ন উঠছে, আপনার আমলে বঙ্গ বিভূষণ সঞ্জীব গোয়েঙ্কার কোম্পানি বলেই কি আপনি ছাড় দিচ্ছন! সামলান, ম্যাডাম সামলান।বিজেপি ইতিমধ্যেই মনোপলি ভাঙার কথা বলছে। সাধারণত তা ভাঙার দল তারা নয়। তাই, আশঙ্কা করছি মনোপলি ভাঙার নামে আম্বানীদের দালালি হয়ে যাবে না তো ? ভারতের বিদ্যুৎ শক্তি ক্ষেত্রে তারা কিন্তু বিগ প্লেয়ার। তখন সামলাতে পারবেন না।

ও আর একটা কথা ম্যাডাম। সাধারণত পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিস দেওয়া কোম্পানীগুলি মূল কোম্পানীর টাকা অন্য কোনো কোম্পানীতে ব্যবহার করতে পারে না... এও জানি এই নিয়মটা করা হয়েছে রেগুলেটারি কমিশনের তত্বাবধানে মূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে। তবে কানা ঘুষো যা শুনছি মানে কোয়েস্ট মল, স্পেনসর্স, সিইএসসি প্রপার্টিজ ইত্যাদি ইত্যাদি আর কি ! তাতে আপনার আরো সচেতন থাকা উচিৎ এদের ব্যাপারে। আফটার অল 'বেওসায়ী' তো!!মুনাফা ছাড়া কিচ্ছু করে না। মূলত, 'জনস্বার্থ' দেখাটা কোনও বেনিয়ার কাজ নয়।

গুলজার ~ অরিজিৎ গুহ

বোম্বের খেতওয়ারি মেন রোডের ওপর 'রেড ফ্ল্যাগ হল' তখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পার্টি কমিউন। আটটা ঘর আর একটা হলঘর নিয়ে সেই কমিউনের অবস্থান। হলঘরে বসত পার্টির মিটিং আর আটটা ঘরে থাকতেন পরিবার সহ বিভিন্ন কমরেডরা। সেখানেই জীবনের প্রায় সারাটা বছর কাটিয়েছেন আলি সরদার জাফরি তাঁর স্ত্রী সুলতানা জাফরি আর দুই পুত্রকে নিয়ে। এখানে বসেই উনি খাজা আহমেদ আব্বাসের 'ধরতি কে লাল' সিনেমার গানের লিরিক্স সহ আরো অসাধারণ কিছু উর্দু কবিতার জন্ম দিয়েছেন।
   সদ্য সদ্য তখন পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠেছে। প্রকাশ্যে কাজকর্ম করা শুরু করেছে পার্টি। সেই সময়েই সরদার জাফরি রেড ফ্ল্যাগ হল এ নিয়ে এলেন একজন তরুণ পার্টির হোলটাইমার কমরেডকে। সাথে তাঁর স্ত্রী আর বছর খানেকের এক কন্যাসন্তান। একটা ঘর তখন ফাঁকা হয়েছে একজন কমরেড ছেড়ে দেওয়ার জন্য। সেই ফাঁকা ঘরে থাকতে এলেন সেই কমরেড। আইপিটিএর সক্রিয় কর্মী সেই তরুণ নিজের ব্রিফকেসে সব সময়ে পার্টির কার্ড নিয়ে ঘুরতেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলেই কার্ডটা বের করে বলতেন 'এটা আমার জীবনের সবথেকে বড় সম্পদ'। 
   তরুণ কমরেডটি পার্টির কাজের পাশাপাশি লেখালেখিও করেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু উর্দু কবিতা লিখে মোটামুটি একটা পরিচিতি পেয়েছেন। রেড ফ্ল্যাগ হল এ এসে সেই তরুণ কমরেড একটা ইয়াং রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তুললেন। প্রতি রবিবার হলঘরে ইয়াং রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের তরুণ সাহিত্যিকদের গল্প ও কবিতা পাঠের আসর বসে।  সেই আসরে আসত সাগর সারহাদি, জাফর গোরখপুরি ইত্যাদি। এরা প্রত্যেকেই আবার আইপিটিএরও সদস্য। এদের সাথে সাথেই ফর্সা লম্বা মতন আরেকটি ছেলে আসত। নাম ছিল সম্পূরণ সিং কালরা। সদ্য সদ্য দেশভাগের পর সম্পূরণের বাবা মাখখন সিং তাঁর পরিবার নিয়ে বোম্বে চলে এসেছিলেন। ছেলের লেখালেখি করার খুব শখ, কিন্তু কোনো কারণে বাবা মাখখন সিং এর লেখালেখি ব্যাপারটা খুব অপছন্দের। জীবন ধারণের তাগিদে সম্পূরণ সিং নানা রকম ছোটখাটো কাজকর্ম করে যাচ্ছে বোম্বেতে। তার মধ্যেই একটা গ্যারেজে মোটর মেকানিকের কাজ করে কিছু পয়সা আসতে শুরু করেছে। এরই সাথে বাড়িতে বাবাকে লুকিয়ে চলছে সাহিত্যচর্চা। সেই সাহিত্যের তাগিদেই আসা শুরু হল রেড ফ্ল্যাগ হল এ।
   তরুণ কমরেডটি কবি হিসেবে পরিচিত হলেও উপার্জনের দিক থেকে সেরকম কিছু করতে পারছিলেন না। এদিক ওদিক পত্র পত্রিকায় লিখে কিছু হয়ত উপার্জন হয়, কিন্তু কন্যা সন্তানের পর আবার এক পুত্র সন্তান যখন হল তখন সত্যিই খুব বিপদে পড়লেন তিনি। যদিও তাঁর স্ত্রী তখন পৃথ্বি থিয়েটারের অভিনেত্রী, কিন্তু সংসারের সুরাহা কিছুতেই হয়ে উঠছে না। এরকম এক সময়ে এক নামী পরিচালকের এক সিনেমায় গান লেখার অফার এলো। ঠিক তার পরপরই আরো কিছু ছবিতে গান লেখার সুযোগ পেলেন। কিন্তু কপাল এমনই খারাপ যে গানগুলো হিট করলেও ছবিগুলো খুব বেশি হিট করল না। সিনেমার জগতে সেই তরুণের ছাপ পড়ে গেল দুর্ভাগা বলে। সেই জন্য আর কেউই এগিয়ে এলো না সিনেমার কাজ নিয়ে।
   বেশ কয়েক বছর বাদে রেড ফ্ল্যাগ হল এ সেই কবির ঘরে এলেন এক পরিচালক। তাঁর পরের ছবিতে সেই কবিকে দিয়ে তিনি গান লেখাতে চান। শুনে কবি বললেন, কেন শুধু শুধু আমাকে দিয়ে লেখাচ্ছেন? লোকে বলে আমার গান খারাপ নয়, তবে আমার নসীব খুব খারাপ। আপনি ডুবে যাবেন। শুনে সেই পরিচালক বললেন আমার নসীবও খুব খারাপ বুঝলেন। পরপর কয়েকটা ছবি আমার ফ্লপ করেছে। একবার ভাগ্যের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেখাই যাক না।
   নেওয়া শুরু হল ভাগ্যের চ্যালেঞ্জ। ১৯৬২ সালের ভারত চিন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে তৈরি সেই সিনেমা রিলিজ করল ১৯৬৪ সালে। চেতন আনন্দের পরিচালনায় 'হাকিকত' জিতে নিল ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড সহ নানা পুরষ্কার। গীতিকার সেই কবি কইফি আজমির লেখা গান  'কার চলে হাম ফিদা জান ও তান সাথিও/ আব তুমহারে হাওয়ালে ওয়াতন সাথিও' গানটা ফিরতে লাগল সবার মুখে মুখে। আজও সেই গান অমর হয়ে রয়েছে।

   এর ঠিক আগের বছরই ১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় বিমল রায়ের শেষ ক্লাসিক 'বন্দিনী', যেখানে সেই মোটর মেকানিক সম্পূরণ সিং ছেলেটি গীতিকার হিসেবে নজর কেড়ে নিয়েছে অনেকের। বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য তার বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই সম্পূরণ সিং এর বদলে নিজের নাম সে লিখত 'গুলজার'।

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০

বামফ্রন্টের ৩৪ ~ বিপুল ভট্টাচার্য্য

৩৪ বছরে এমন কী কী হয়েছিল যার জন্যে আপনার এত গর্ব?
মাঝে মাঝে এরকম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান নাকি?
বন্ধু সংখ্যাতত্ত্ববিদ ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত আপনার জন্যে ১৫টি ( মাত্র ১৫) কারণ রেডি করে দিয়েছেন। 
ভূমি সংস্কার আর পঞ্চায়েত বাদ রেখে  ।  
চোখ বুলিয়ে নিন , গর্বের ৩৪ কেন আমাদের উদ্বুদ্ধ করে আজও। 

১. সাক্ষরতা, গড় আয়ুষ্কাল ২০১১ সাল পর্যন্ত  জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। ২. মহিলা থেকে পুরুষ সাক্ষরতার ব্যবধান: ভারতের গড়ের  চেয়ে অনেক কম। ৩. শিশু মৃত্যুর হার - ভারতের তুলনায় অনেক কম। ৪.৫-৫ বছরের শিশুর মৃত্যুর হার - ভারতের তুলনায় অনেক কম । ৪.  ভারতের তুলনায় শিশু অপুষ্টি সূচক কম। ৫. ভারতের সর্বনিম্ন প্রজনন হারের  (ফারটিলিটি রেট)মধ্যে একটি। ৬. একমাত্র রাজ্য যেখানে রাজ্য সরকার পরিচালনাধীন  শীর্ষস্থানীয় দুটি  বিশ্ববিদ্যালয়  দেশের সর্বোৎকৃষ্ট দশটির তালিকায় ।৭. কাঠামোগতভাবে খাদ্য ঘাটতি রাজ্য  খাদ্য রফতানিকারী রাজ্যে   পরিণত হয়েছে। ৮. কাঠামোগতভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি রাজ্য  বিদ্যুত- উদ্বৃত্ত অবস্থায় পরিণত । ৯.  গ্রামীণ দারিদ্র্যের হারের বিচারে    ১৯৭৩-৭৪ সালে ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ যে রাজ্য , ২০১১-১২-এর মধ্যে সেখানে গ্রামীণ দারিদ্র্য জাতীয় হারের নিচে হ্রাস পায় । ১০. এনসিআরবি'র পরিসংখ্যান অনুসারে, গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তর দশকে  সর্বাধিক অপরাধ প্রবণ রাজ্যগুলির মধ্যে  অন্যতম এমন একটি রাজ্য  ২০০০ সালে ন্যূনতম অপরাধের রাজ্যগুলির একটিতে পরিণত হয়েছিল। ১১. সবচেয়ে দাঙ্গা-প্রবণ রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম একটি রাজ্য  স্বল্পতম ধর্মীয় সংঘর্ষের একটিতে পরিণত হয়েছিল। ১২.  ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বৃদ্ধির   হার দেশের সর্বোচ্চ। ১৩. কৃষক আত্মহত্যা  অতি সামান্য  পর্যায়ে। ১৪. ১৯৮৭-২০১১ সালের মধ্যে পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতের সব বড় রাজ্যের মধ্যে দ্রুততম জিএসডিপি প্রবৃদ্ধি। ১৫. ২০০৪-২০১১  পর্যন্ত  ভারতে সমস্ত নতুন উত্পাদন কাজের ৪০% সৃষ্টি হয় এই রাজ্যেই। 

তাই একটু গর্ব তো করাই যায় ৩৪ নিয়ে, বলুন?

(অনুবাদের ভুল ঘটলে দায় আমার )

Bipul Bhattacharya

বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০

ভারতীয় রেল বেসরকারীকরণ ~ শতদ্রু দাস

রেলের বেসরকারীকরণ নিয়ে কিছু ভুল ভাল মিথ্যে কথা বাজারে ঘুরছে,  যারা কিছু না জেনে না বুঝেই "basarkari hola bhalo hoba" বলে থাকে তারা সেগুলো চোখ কান বুজে খাচ্ছেও। তাই কয়েকটা কথা বলা জরুরি।

১. বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে, যেখানে বহু মানুষ ট্রেন ব্যবহার করেন, সেখানে রেল সরকারি সংস্থা বা পাবলিক সেক্টর ইউনিট।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ক্যানাডাতে রেল বেসরকারী কিন্তু ওই দেশগুলোতে খুব কম সংখ্যক মানুষ রেল ব্যবহার করেন। এসব দেশগুলোয় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের উপায় হলো গাড়ি বা বিমান। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়  অধিকাংশ স্থানে বিমান ভাড়া রেল ভাড়ার চেয়ে সস্তা বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রায়। এসব দেশগুলোতে রেল মূলত  বিলাসবহুল যাত্রার জন্য ব্যবহৃত হয়, পর্যটকরা ব্যবহার করে। 

৩. ইউরোপের সর্ববৃহৎ রেল সংস্থা ফ্রান্সের এসএনসিএফ, সরকারী সংস্থা। দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ হলো জার্মানির ডয়েচ বান, সেটাও পাবলিক সেক্টর ইউনিট।

৪. বিশ্বের সর্ববৃহৎ রেল নেটওয়ার্ক যে দেশের সেটি হলো চীন। বলাই বাহুল্য যে সেখানে রেল সরকারী সংস্থা।

৫. জাপান হলো এক মাত্র দেশ যেখানে  সাধারণ মানুষ রেল ব্যবহার করেন, রেলের নেটওয়ার্ক বৃহৎ, এবং রেল মূলত বেসরকারী (সরকারীও আছে, তবে সবচেয়ে ব্যস্ত রুটগুলো বেসরকারী।) কিন্তু জাপানের রেল বেসরকারীকরণ হয়েছে এক বৃহৎ কেলেঙ্কারির ওপর দাঁড়িয়ে, যার গল্প  ভারতের ক্ষেত্রে খুবই প্রযোজ্য। ভারতের মতোই জাপানের রেলও সম্পূর্ণ সরকারী সংস্থা ছিল ৮০-এর দশক অবধি। ৮০-এর দশকে জাপানে রেল বেসরকারীকরণ হয়, কিন্তু জাপানের রেলের বিপুল ঋণভার কোনো বেসরকারী সংস্থাই নিতে নারাজ হয়। তাই বেসরকারীকরণের জন্য এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করে জাপান সরকার। একটি সরকারী সংস্থা বানিয়ে রেলের যাবতীয় ঋণ সেই সংস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঋণের মোট পরিমাণ ২৪ লক্ষ কোটি টাকা আজকের টাকার অংকে, তৎকালীন জাপানের জাতীয় আয়ের চেয়েও বেশি। যে সব বেসরকারী সংস্থা রেলের নেটওয়ার্ক কিনবে তাদের সাথে এই মর্মে চুক্তি হয় যে প্রতি বছর রেল চালিয়ে লাভের একটা অংশ তারা দেবে এই ঋণগ্রস্ত সরকারী সংস্থাটিকে যা দিয়ে সেই ঋণকে একটু একটু করে শোধ করা হবে। যদি লোকসান হয় বা লাভ খুব কম হয় তাহলে বেসরকারী সংস্থাগুলোর কোনো দায় থাকবে না ঋণ শোধের। অর্থাৎ ভালোটা প্রাইভেট কোম্পানির, খারাপের বোঝা শুধু সরকারের। এরপর রেল চালাতে গিয়ে দেখা যায় যে বেসরকারী সংস্থার ল্যাজে গোবরে দশা, বিপুল কর্মী ছাঁটাই করেও তারা লাভ করতে হিমশিম খাচ্ছে, ঋণ শোধ করতে গিয়ে রেলের লাইন বা স্টেশন বা জমি বিক্রি করতে হচ্ছে। তখন সরকার ঠিক করে যে মানুষের করের টাকা থেকেই ধার মেটানো হবে, বেসরকারী সংস্থার দায় নেই। সেই ২৪ লক্ষ কোটি টাকার ভেতর ১৬ লক্ষ কোটি টাকা এখনো পর্যন্ত মানুষের করের টাকা থেকেই মিটেছে, বাকিটা এখনো বকেয়াই পড়ে আছে। অর্থাৎ ভাবুন, বেসরকারীকরণ করতে গিয়ে মানুষের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে বেসরকারী সংস্থাকেই সাবসিডি দিতে হয়েছে। 

ভারতে রেল বেসরকারীকরণ হলে সেটাও ওই জাপানী পথেই হওয়ার সম্ভাবনা। ভারতীয় রেল একসময় অনেক অংশেই বেসরকারী ছিল, সেগুলোকে সরকার বাধ্য হয়ে গ্রহণ করে কারণ বেসরকারী সংস্থাগুলো একে একে বন্ধ হয়েছিল। রেলের কোচ, কামরা, রেল লাইন বানানোর বহু সংস্থা কয়েক দশক আগেও বেসরকারী ছিল, তাদের ভরাডুবি হতেই সরকার বাধ্য হয়ে সেগুলো গ্রহণ করে। চোখের সামনেই উদাহরণ বার্ন স্ট্যান্ডার্ড আর টেক্সম্যাকো। বার্ন স্ট্যান্ডার্ড সরকার অধিগ্রহণ করে, আর টেকসম্যাকো ধুঁকছে, সরকারী খয়রাতির ওপর বেঁচে আছে।