বুধবার, ২৯ জুন, ২০২২

​গর্ভপাতের অধিকার প্রসঙ্গে ~ বিষাণ বসু

মার্কিন শীর্ষ আদালত মেয়েদের গর্ভপাতের অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। এটুকু নিশ্চিত। সেই রায়ের সূত্র ধরে সেদেশের বিভিন্ন রাজ্য নিজেদের আইনে ঠিক কী কী বদল আনবে, তা এখুনি বলা মুশকিল। তবে আসছে। ভবিষ্যতে আরও আসবে বলেই মনে হয়। মার্কিন দেশে মেয়েরা গর্ভপাতের অধিকার সহজে পায়নি। এদেশে যত অবাধে গর্ভপাত সংক্রান্ত আইন পাস হয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তা এসেছিল বিস্তর জটিলতা সহকারে।
Abortion is Legal 1971 India

ইহুদিরা বিশ্বাস করে, মনুষ্যজীবন শুরু হয় জন্মের মুহূর্ত থেকে। তাঁদের গর্ভপাত নিয়ে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু খ্রিষ্টানদের, বিশেষত ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের, বিশ্বাস - মনুষ্যজীবনের শুরু শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষেক ঘটার মুহূর্ত থেকেই (পরবর্তীতে জিনবিজ্ঞান থেকে লব্জ ধার করে যুক্তি সাজানো হয়, নিষেকের মুহূর্তেই জাইগোট তার একান্ত নিজস্ব জেনেটিক গঠন পেয়ে থাকে, যা জারি থাকবে জীবনভর)। অতএব, যেকোনও গর্ভপাতই হত্যা। সুতরাং ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের দ্বারা চালিত আমেরিকায় গর্ভপাত নিয়ে আপত্তি থাকবে, সে তো বলাই বাহুল্য। সে তুলনায়, হিন্দুধর্মের অপরিবর্তনীয় ও দেহাতীত আত্মায় বিশ্বাস - যে আত্মা কিনা ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে - এদেশে, সম্ভবত, গর্ভপাত বিষয়ক আইন নিয়ে বিচলিত না হওয়ার কারণ। তাছাড়া, এদেশে যখন সে আইন পাস হয়, তখন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত ধর্মের খুব একটা মাখামাখি বা সঙ্ঘাত ছিল না, কাজেই ধর্মসংক্রান্ত আপত্তি - যা হওয়ার এমনিতেও কারণ ছিল না - বা তদসংশ্লিষ্ট শোরগোল ওঠেনি।
কিন্তু গর্ভপাতের বিরুদ্ধে ধর্মীয় যুক্তি বাদ দিয়েও এথিক্সের দিক থেকে আপত্তিগুলো ঠিক কী ছিল? সে যুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিযুক্তিই বা কী কী? সেই কথাগুলো ফিরে দেখা যাক। তবে সে আলোচনায় যাওয়ার আগে মানবশিশুর জন্মের আগেকার পর্যায়গুলো বুঝে নেওয়া দরকার।
একেবারে শুরুর পর্যায়টা হলো নিষেক - ফার্টিলাইজেশন। শুক্রাণু ডিম্বানুর মিলন - দুইপক্ষের জিনের মিশ্রণে তৈরি হলো জাইগোট-এর জেনেটিক গঠন। এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে জাইগোট এসে আঁকড়ে ধরবে জয়ায়ুর দেওয়াল। ইমপ্ল্যান্টেশন। মায়ের জরায়ু আগলে রাখবে তাকে। (ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের মত অনুসারে, ফার্টিলাইজেশন থেকেই জাইগোট-টি মানুষ। অতএব, ইমপ্ল্যান্টেশন আটকানোটাও অনুচিত।) জাইগোট থেকে এমব্রায়ো, অর্থাৎ ভ্রূণে পরিবর্তন, ঘটতে থাকবে ধীরে ধীরে। শুরুর পর্যায়ের কোষগুলো থেকে শরীরের সবরকম কোষ তৈরি হতে পারে, কিন্তু আস্তে আস্তে 'বিশেষজ্ঞ কোষ' তৈরি হতে থাকে, যা থেকে কিনা নির্দিষ্ট অঙ্গ বা তন্ত্রের কোষই তৈরি হওয়া সম্ভব। ভ্রূণের রূপও বদলে যেতে থাকে। বারো থেকে ষোল সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণটি মানব-ভ্রূণের চেহারা নেয়। তার আগে অব্দি ভ্রূণটিকে আর পাঁচটা স্তন্যপায়ী প্রাণীর ভ্রূণ থেকে আলাদা করা মুশকিল। আগে ভাবা হতো, চব্বিশ থেকে আটাশ সপ্তাহ বয়সের মাথায় গর্ভস্থ শিশু মাতৃজঠরের বাইরে এসে বেঁচে থাকতে সক্ষম। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সময়টা এগিয়ে এসেছে - মাতৃগর্ভে বাইশ সপ্তাহ কাটিয়ে আসা শিশুকেও বাঁচানো সম্ভব। ঠিকঠাক পরিকাঠামো থাকলে চব্বিশ সপ্তাহে জন্মানো শিশুর বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় পঞ্চাশ-ষাট শতাংশ, বাইশ সপ্তাহে সেটা পঁচিশ শতাংশ।
এই সময়কালের মধ্যে ভ্রূণ ঠিক কবে মানবশিশু হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য হয়ে উঠল, তা বুঝে ওঠা মুশকিল। ২০১০ সালে নেব্রাস্কায় কুড়ি সপ্তাহের বেশি বয়সের ভ্রূণের গর্ভপাত নিষিদ্ধ হয়। কেননা, কুড়ি সপ্তাহে নাকি ভ্রূণ ব্যথা-যন্ত্রণা অনুভবে সক্ষম (যদিও ধাত্রীবিদরা এ বিষয়ে সহমত নন)। নেব্রাস্কার দেখাদেখি আরও বেশ কিছু রাজ্যে অনুরূপ আইন পাস হয়, যদিও ২০১৫ সালে মার্কিন সংসদে এই বাবদ বিল (Pain-capable Unborn Child Protection Act) পাস করানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
এবারে আসা যাক এথিক্সের প্রশ্নে।
গর্ভপাতের বিরুদ্ধে প্রাথমিক যুক্তিটা ধর্মীয়, যা শুরুতেই বললাম। কিন্তু এথিক্স ব্যাপারটা ধর্মের হাত ধরেই এসেছে, সুতরাং ধর্মীয় যুক্তিটা কিয়দংশে এথিক্সেরও যুক্তি। সেই যুক্তি অনুসারে, গর্ভাবস্থার প্রতিটি পর্যায়েই ভ্রূণটি মানব-ভ্রূণই। অতএব তাকে হত্যা মানব-হত্যা। আবার ধরুন, চব্বিশ সপ্তাহে গর্ভস্থ শিশু শরীরের বাইরে বেঁচে থাকতে সক্ষম - অন্তত এক-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রে বাইশ সপ্তাহের শিশুও তা-ই। মানুষ হিসেবেই। তাহলে কোনও একটি বিশেষ দিনে কেমন করে বলা সম্ভব, যে, ঠিক তার আগের দিনটিতে গর্ভস্থ ভ্রূণটি - নাকি শিশুটি - 'মানুষ' হিসেবে গণ্য হওয়ার উপযুক্ত নয়? এমন করে একদিন একদিন করে পেছোতে থাকলে একেবারে শুরুর মুহূর্ত, অর্থাৎ ফার্টিলাইজেশন, অব্দি যুক্তি পাওয়া যায়।
এটা অবশ্য লজিকের ভাষায় স্লিপারি স্লোপ আর্গুমেন্ট। এমন যুক্তি ধরতে থাকলে পরীক্ষায় পাসমার্ক বা গাড়ির স্পিড লিমিট, সবকিছুর বিরুদ্ধেই অনুরূপ যুক্তি দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, পরীক্ষায় তেত্রিশ পাওয়া মেয়েটি কি চৌত্রিশ পাওয়ার থেকে খারাপ? তাহলে কোন যুক্তিতে সে ফেল? আবার তেত্রিশকে যদি মানেন, বত্রিশ নয় কেন? এমন করে শূন্য অব্দি অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায়।
পরের যুক্তিটা আরেকটু জটিল। যেকোনও মানুষকে হত্যা অনুচিত কেন? মানে, এ তো জানা-ই কথা যে, মানুষটা একদিন না একদিন মরতই। কী এমন ক্ষতি যদি সেই অনিবার্য দিনটিকে কয়েক বছর এগিয়ে আনা হয়? গ্রহণযোগ্য উত্তর হলো, অন্যায়, কেননা মানুষটা তার ভবিষ্যত বেঁচে থাকার অধিকার, তার জীবনের পুরো ক্ষমতা, জীবনের পুরো সম্ভাবনা - আর পাঁচজন মানুষের মতো জীবন - তা উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হলো। একটি মানব-ভ্রূণের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা জন্মানো মানবশিশুর থেকে খুব আলাদা কি? এবং সেই সম্ভাবনা ভ্রূণাবস্থার প্রতিটি পর্যায়েই সমান (স্বাভাবিক কোনও কারণে গর্ভপাত হয়ে গেলে তা সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যু)। অতএব, গর্ভপাত মানে সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত হতে না দেওয়া। মানুষ খুনেও যেমনটা ঘটে, তেমনই।
প্রথমত, এই যুক্তি মানলে, গুরুতর রোগগ্রস্ত মানুষ বা মানবশিশু - যাদের 'আর পাঁচজন মানুষের মতো জীবন' গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই - তাদেরকে মেরে ফেলার যুক্তিও পাওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, 'আর পাঁচজন মানুষের মতো জীবন' এই সম্ভাবনা একজন মানুষেরই থাকে - 'পার্সন' অর্থে মানুষের, যার একটা স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও চিন্তাশক্তিসম্পন্ন মন রয়েছে। তার আগে অব্দি সে স্রেফ জিন-পরিচয় বা প্রজাতি-পরিচয়ে মানুষ - 'অর্গানিজম' হিসেবে মানুষ, 'পার্সন' হিসেবে নয়। অতএব, গর্ভপাত মানে 'অর্গানিজম' থেকে 'পার্সন'-এ পরিণত হতে না দেওয়া। অর্থাৎ 'পার্সন'-টি তৈরি হতে পারল না - যা তৈরি হলে আনুষঙ্গিক মনুষ্য-সম্ভাবনাও তৈরি হতো - কিন্তু যেহেতু 'পার্সন'-টি এক্ষেত্রে তৈরিই হয়নি, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনার অপমৃত্যু হিসেবে ভাবার যুক্তি নেই। অর্থাৎ, গর্ভপাত সেই অর্থে 'পার্সন' তৈরি হওয়া প্রতিরোধ করছে - গর্ভনিরোধকের ব্যবহারকে যদি 'সম্ভাবনার অপমৃত্যু' হিসেবে না দেখেন, গর্ভপাতকেও তেমন করে দেখার কারণ নেই।
যাঁরা গর্ভপাতের পক্ষে, তাঁরা মানব-ভ্রূণ ও মানবশিশুর মধ্যে এই 'পার্সন' কি 'পার্সন' নয়, এই যুক্তির উপরেই ভরসা করেন। অন্তত করতেন।
পরবর্তীতে জুডিথ থমসন ভ্রূণকে মনুষ্য-পদভুক্ত হিসেবে ধরেও চমৎকার এক যুক্তি সাজান। তাঁর বক্তব্য, ধরা যাক, মানব-ভ্রূণ একটি সম্পূর্ণ জীবন ও তাকে মায়ের দেহ ও অস্তিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক পৃথক অস্তিত্ব হিসেবে ভাবা সম্ভব। কিন্তু এক 'পৃথক অস্তিত্ব' যখন অপর একজনের শরীরকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে, তখন তা তো পারস্পরিক সম্মতি ভিন্ন উচিত নয়। অর্থাৎ ভ্রূণ যদি পৃথক অস্তিত্বসম্পন্ন হয়, তাহলে যে নারীর শরীর - অর্থাৎ মায়ের শরীর - সে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে, তা মায়ের সম্মতি ব্যতিরেকে হওয়া অনুচিত। সুতরাং, মা যদি চায়, ভ্রূণকে আশ্রয়চ্যুত - মাতৃজঠর থেকে বিচ্যুত - করতে পারে।
মূল যুক্তি-প্রতিযুক্তির জায়গাগুলো এই।
এছাড়া নারীর নিজের শরীরের উপর অধিকার, নিজের শরীর-বিষয়ক সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার ইত্যাদি যুক্তি তো আছেই। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভ্রূণের বাকি অর্ধেক জিন যে তরফ থেকে আসে - অর্থাৎ পুরুষ বা পিতার অধিকার, তাঁর সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার - সেসব যুক্তিও উঠে আসতে পারে।
ধর্ষণ বা বলাৎকারের ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়া নারীর গর্ভপাতের অধিকারের বিরুদ্ধে অবশ্য খুব জোরালো গলায় কেউই বলেন না, কিন্তু বাস্তবটা হলো, গর্ভপাতের ব্যাপারে আইন জটিল হলে তেমন নারীর পক্ষেও গর্ভপাত করাতে পারা দুস্তর হয়ে যায়।
পাশাপাশি এও বলে রাখা প্রয়োজন, গর্ভধারণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে গর্ভবতী নারীর প্রাণসংশয় ঘটলে গর্ভপাত করানোর অধিকার - যা কিনা চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত - সে নিয়ে বিশেষ বিতর্ক ছিল না।
এবারে সেই রায়ের প্রসঙ্গ, যা কিনা বারবার উঠে আসছে গত কয়েকদিন। মার্কিন শীর্ষ আদালতের Roe vs Wade মামলা, যেখানে আদালতের রায়ে সেদেশের মেয়েরা গর্ভপাতের যুক্তিসিদ্ধ অধিকার - নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতার স্বীকৃতির পথে একটি বড় ধাপ- তা অর্জন করতে পেরেছিলেন। মামলাটি বিষয়ে বিশদে জানতে হলে উইকিপিডিয়া থেকে দেখে নিতে পারেন। আমি সংক্ষেপে সারকথাটুকু বলব।
মামলার রায় আসে ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ঘটনাটা ১৯৬৯ সালের। টেক্সাসের নর্মা ম্যাককর্ভে - বহুলপরিচিত এই মামলায় ব্যক্তিপরিচিতি গোপন রাখার জন্য আইনি ছদ্মনাম জেন রো - তৃতীয়বারের জন্য গর্ভবতী হন, এবং উপলব্ধি করেন যে তাঁর পক্ষে তৃতীয় সন্তানকে মানুষ করা সম্ভব নয়। এমন ক্ষেত্রে, টেক্সাসে আইন অনুযায়ী, গর্ভপাতের অধিকার স্বীকৃত নয়। অতএব মামলা স্থানীয় ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি, হেনরি ওয়েড, তাঁর বিপক্ষে। রো বনাম ওয়েড।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন মূলত দুটি দিক থেকে। প্রথমত, মানব-ভ্রূণের ক্ষেত্রে আইনি অবস্থান - লিগাল স্টেটাস। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই গর্ভপাত আইন বাদে আর কোথাওই মানব-ভ্রূণের আর পাঁচটা মানুষের সমতুল্য আইনি পরিচিতি বা অধিকার - যেমন সম্পত্তির অধিকার ইত্যাদি - সেসব নেই। অতএব, মানব-ভ্রূণ সম্পূর্ণ মানুষের সমান কিনা সেসব পৃথক তর্কের বিষয়। দ্বিতীয়টি হলো, একজন মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার। তেমন তেমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র সে অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারে, ঠিকই - কিন্তু এই বিশেষ ক্ষেত্রে তেমন পরিস্থিতি ঘটেছে কি? তাহলে রাষ্ট্র কোন অধিকারে এক নাগরিকের এমন একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে?
রো বনাম ওয়েড মামলায় শীর্ষ আদালতের রায়ে গর্ভপাতের অধিকার স্বীকৃত হয় - অন্তত কিয়দংশে, কেননা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সুযোগ খানিক থাকেই, বিশেষত বারো সপ্তাহের পরে গর্ভপাত চাইলে। তবুও মার্কিন দেশের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এই রায় যথার্থই বৈপ্লবিক। কিন্তু বর্তমান রায়ে উলটপুরাণ ঘটল। পুনর্মূষিকোভবর সম্ভাবনা। সম্ভাবনা নয়, খুবই বাস্তব।
গত কয়েক দশকে মার্কিন বিচারব্যবস্থায় রক্ষণশীলদের প্রভাব বেড়েছে। গত দুই দশকে অন্তত শীর্ষ আদালতে অন্তত এমন পাঁচজন বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছেন, যাঁরা গর্ভপাতের বিরুদ্ধে। গত বছর টেক্সাসে এমন আইন পাস হয়, যাতে ভ্রূণের হৃদস্পন্দন পাওয়া গেলে গর্ভপাত নিষিদ্ধ। ভ্রূণের হৃদস্পন্দন ধরা পড়তে পারে মাত্র ছয় সপ্তাহেই। ওকলাহোমায় বিল পাস হয়, আইনবিরুদ্ধ গর্ভপাতের সাজা দশ বছরের জেল। লুইজিয়ানায় বিল আনা হয়, গর্ভপাতের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা মানুষ খুনের সমান - বিলটি যদিও আইনে পরিণত হয়নি। ওকলাহোমা-র নতুন আইন অনুসারে, নিষেক থেকেই মনুষ্যজীবনের শুরু - গর্ভনিরোধক হিসেবে আইইউডি (কপার-টি ইত্যাদি) কাজ করে অনেকাংশে নিষেকের পর, তার উপরও নিষেধাজ্ঞা আসবে না তো? গর্ভধারণের কারণে গর্ভবতী মহিলার প্রাণসংশয় ঘটলে গর্ভপাত এখনও আইনসিদ্ধ। কিন্তু গর্ভপাত আর মানুষ খুন সমান, এমন আইন হলে কজন ডাক্তার সাহস পাবে গর্ভপাত করাতে!!
আরও বড় সংশয়, রো বনাম ওয়েড মামলার রায়ের মূল বিবেচ্য ছিল, নাগরিকের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়ে রাষ্ট্রের নাক-গলানোর অধিকারের উচিত নাকি অনুচিত। শেষ বিচারে এটুকুর ভিত্তিতেই এসেছিল ঐতিহাসিক রায়। সেই রায় বাতিল হওয়ার পথ ধরে আসবে না তো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগ্রহণের স্বাধীনতার উপর আরও বড় কোনও আঘাত?
বিশ্বের রাজনীতিতে তো বটেই, গণতন্ত্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রক্ষণশীলদের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। বেড়ে চলেছে। সব দেশেই। এদেশেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়া ঘর অব্দি পৌঁছে না যায়, এই জন্যই না এত শত ভাবনা।

© বিষাণ বসু


রবিবার, ২৬ জুন, ২০২২

ভারতের গর্ভপাত আইন ~ স্বাতী রায়

আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট গতকাল এক কলমের খোঁচায় সেখানকার মেয়েদের সংবিধানগত গর্ভপাতের অধিকারটিকে খারিজ করে দিয়েছেন। তারপরই বেশ একটু ভারতের প্রগতিশীলতা নিয়ে আনন্দ দেখা গেছে। হওয়ারই কথা। বলে কিনা সেই ১৯৭১ সাল থেকে এদেশে গর্ভপাত আর অপরাধ নয়। ০-১২ সপ্তাহের মধ্যে ( দুই ডাক্তারের অনুমতিক্রমে ২০ সপ্তাহ অবধি )। (সাম্প্রতিক বদলে অবশ্য উভয় সময়সীমা বেড়েছে।)   সেই '৭১ সালের আইনে অবশ্য বিবাহিত মেয়েদেরই শুধু আরও সন্তান আনতে না চেয়ে ব্যবহৃত কন্ট্রাসেপশন ফেলিয়রের সম্ভাবনা বলা ছিল। ধর্ষণজাত ভ্রূণের গর্ভপাত করতে হলে অবশ্য বিবাহিত-অবিবাহিত বাধা নেই। এই সবে ২০২১ সালে সেই বিবাহিত-অবিবাহিতের ফ্যাঁকড়া সরিয়ে বলা হল মহিলা ও তার পার্টনার, আর জোড়া হল সন্তান না চেয়ে ব্যবহার করা কন্ট্রাসেপশন মেথডের কথা । এইটুকুই ভারতের আধুনিকতার অর্জন।   

 কিন্তু সত্যিই সেই আইনের কতটা ছাপ পড়েছে সমাজের উপর? পশ্চিমবঙ্গের মেয়েদের অভিজ্ঞতা কি বলে? মেয়েদের কথা বাদ দিন, এমনিতেই ওদের বারোহাত কাপড়ে কাছা জোটে না, তাদের আবার মতামত! তার থেকে ডেটা দেখুন। ডেটা পাওয়া গেছে  http://www.johnstonsarchive.net/policy/abortion/india/ab-indias.html থেকে।  এখানে এই যে ১৯৯৩-৯৪ সালে রিপোর্টেড এবরশনের সংখ্যা ৬৪ হাজারের বেশি হল, এমন তো নয় যে সেবার কোন গ্রহ নক্ষত্রের যোগে সংখ্যাটা ওই মাত্রায় পৌঁছাল। বরং প্রশ্ন উঠুক, অন্যান্য বছর এত কম কেন? সত্যিই কি আবর্শনের দরকার পড়েনি ? নাকি দরকার পড়েছে, আর দরকার মেটাতে মেয়েরা বাধ্য হয়েছেন হাতুড়ের কাছে যেতে, বাড়িতে বিভিন্ন উপায় চেষ্টা করতে? 



কমিউনিটি মেডিসিনের চার অধ্যাপক ২০১৫-১৬ সালে নক্সালবাড়ি ব্লকে ৪২০ জন ১৫-৪৯ বছরের মহিলার মধ্যে সার্ভে করে জানিয়েছিলেন যে যদিও গড়ে প্রতি মহিলার ১.৩ টি গর্ভপাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে, এর মধ্যে ৪৮.৩%ই আপনাআপনি হয় না, অর্থাৎ কিনা সেগুলো ইনডিউসড এবরশন, ওষুধ দিয়ে বা সার্জিক্যালি করা হয়। আর তার ৫৮% হয় বাড়িতে, হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে ইত্যাদি। অনুমান করছি সেগুলো নিশ্চয় আর কোনভাবে রিপোর্টেড হয়না। ১৭৮টা এবর্শনে ৫০ টা  হিসেবের বাইরে থেকে গেল। আরও ৭১ টা হয় বেসরকারি জায়গায় – তারই বা কটা রিপোর্টেড হয় তা কে জানে! এই অবস্থায় প্রথম ছবির ওই পেন্ডুলামের মতন একবার চাগিয়ে উপরে ওঠা আবার ঝপ করে নেমে যাওয়া দেখলে কেমন সন্দেহজনক লাগে না? ( সূত্রঃ https://www.ijph.in/article.asp?issn=0019-557X;year=2019;volume=63;issue=4;spage=298;epage=304;aulast=Dasgupta )

আরও অবাক হতে হয়, দ্বিতীয় ছবিটা দেখলে। ডেটা সোর্স ঃ http://www.johnstonsarchive.net/policy/abortion/india/ab-indiad-westbengal.html  এটা ২০১০-১১ সালের ডেটা। কলকাতায় যেখানে প্রায় ১৫০০০ এবর্শন, সেখানে বীরভূমে মাত্র ৮২ টা, বাঁকুড়ায় মাত্র ৩২৭ টা। কী জানি হয়ত সেখানকার মানুষের জীবন খুবই সংযমী, কোনও উল্টোপাল্টা পা পড়ে না সেখানকার মানুষের, তবে আমি পাপী তাপী মানুষ আমার কেমন মনে হয় যে আসল কারণটা হয়ত অন্যত্র। রিপোর্ট যতদূরে দেখতে পায়, তার বাইরে হয়ত থেকে যায় অনেকটাই। সেই বাইরে যেটা থেকে যাচ্ছে,  তার কতটা সেফ এবর্শন? দেবা ন জানন্তি, কুতো মনুষ্যাঃ … 

বিবাহিত মেয়েদেরই হাতের আওতায় এল না সেফ এবর্শন, অবিবাহিত হলে তো কথাই নেই! কত যে কথা শুনতে হয়! একটি এমটিপি করতে আসা মেয়েকে নার্স বিভিন্ন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করায় এক বেসরকারি হাসপাতালের (পশ্চিমবঙ্গের বাইরের) ডাক্তার নার্সকে ডেকে কাউন্সেল করেছিলেন, বলেছিলেন এই সব কথা তো তোমার জানার দরকার নেই। ও একটা সার্ভিস নিতে এসেছে আমাদের কাছে, আমরা দেব এইটাই ওর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, বাকিটা ওকে বুঝে নিতে দাও। এই ডাক্তার মহিলাকে অসীম শ্রদ্ধা জানাই। এর পাশে রাখি সেই সব কলকাত্তাই ডাক্তারদের যারা শুধু সিঁদূর দেখতে না পাওয়ার জন্য একটি মেয়েকে কুমারী ধরে নিয়ে মোরাল পিসিমা হয়ে এমটিপি করা নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতে চেষ্টা করেছিলেন।  

এমনিতেই ভারতের এবর্শন সংক্রান্ত আইন নিয়ে একটা বড় বক্তব্য যে গর্ভ রাখা না রাখা গর্ভবতী জনের ইচ্ছার অধীন না, ডাক্তারের মতামতের দ্বারা পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত। তারউপর পিএনডিটি এক্টের জন্য এখন ডাক্তাররা চাপে থাকেন কি? গর্ভপাত করাতে হেজিটেট করেন? তাহলে কিন্তু আনসেফ এবর্শন বাড়বে বই কমবে না। আরও একটা কথা এই প্রাইড মাসে না তুললে অন্যায় হবে, এই আইন কিন্তু আগাগোড়া মেয়েদের কথাই বলে গেছে শুধু। অন্যদের কি হবে?
     
তবে এসব তো পরের কথা, এমনকি আইনে যেটুকু আছে, সেটুকুও যে কতটা হয় এই ছবিগুলো তার প্রমাণ। আইন থাকলেই হয় না, আইনকে সবার হাতের আওতায় পৌঁছে দিতে হয়। সেজন্য ইনফ্রাস্ট্রাকচার লাগে, মানুষ লাগে, সদিচ্ছা লাগে। নাহলে হয়ত প্রগতিশীলতার খাতায় অফিসিয়াল টিকটা মারা যায়, কিন্তু আখেরে কাজের কাজ কিছু হয় না। সংবিধানসম্মত অধিকারের আওতায় থাকা ভারত আর আওতার বাইরে থাকা আমেরিকার তফাৎটা তখন ঝাপসা হয়ে যায়।

সোমবার, ২০ জুন, ২০২২

পুড়ছ্যে রাবন ~ সুস্মিতা ওঝা

বল্যেছিলিস দেশট জুড়্যে চালাইন্ দিবিস 'বিকাশ' রথ!
দেশের বেকার ছেল্যা পাল্য কেমন ধারা 'অগ্নিপথ'!
বিকাশ যাঁয়্যে গড়গড়ায়্যেঁ ঢুকল্য পুঁজিপতির ঘর,
কাজ হারাল্যেক কত মানুষ, মরল্য কত পথের পর। 
কাঠ-কুচরি কুড়াইঁ আন্যে রাঁধত্য হামার গরীব মা,
দেখ্যে ত তর চ'খের আঁশু বাঁধন যেমন মানথ্য না!
একট ফিরি সিলিণ্ডারে, মায়ের সাথে ফটক ট,
গরীব মানুষ সাধাসিধা, বুঝল্য বাদে রগড় ট। 
দাম বাঢ়ালিস চড়চড়ায়্যেঁ, সব ল'কেরই মাথায় হাত,
দ্যাখ হুলক্যে উনানশালে, উনানে ফের পাল্হা-পাত। 
নোটবন্দী, সেটও ছিল তর কাছে এক মজার খেল,
কাল' টাকা করলি সাদা, ন্যাড়ার মাথায় ভাঙলি বেল! 
বল্যেছিলিস ফি বছরে দু'কোটি চাকরি হব্যেক,
আজ শুনাছিস দেড় বছরে চুক্তি কর‍্যে লাখ দশেক!
বারে বারে ভাঁওতা দিবিস, করবি তবে মস্ত ভুল,
চার বছরের চুক্তি সেনা! লড়ব্যে যারা জান কবুল! 
ভণ্ডামি তর দেখলি বহুত, ভণ্ডামি তর বেলাগাম,
'অগ্নিপথেই' পুড়ছ্যে রাবন, যতই সাজিস নকল রাম।
                      ----------------

সোমবার, ১৩ জুন, ২০২২

পাঠশালা কেন বন্ধ ~ ঊর্বা চৌধুরী

কয়েকটা বিষয় নজরে আনতে চাইছি -

১) নানা ছুতোয় স্কুলে লম্বা লম্বা ছুটি দেওয়ার ও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আদ্যন্ত অস্বাভাবিক একটি সরকারি শিক্ষানীতি। শিক্ষা প্রসঙ্গে কোনো সরকার সাধারণত এসব ক্রুড ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার সাহস চট্ করে দেখানোর কথা ভাবতে পারে না। আজকের জমানায় ধনতান্ত্রিক দেশেও না। 

কারণ, স্কুল বন্ধ থাকা কেবল বাচ্চার জীবনযাত্রাকে বদলে দেয় না, অভিভাবকদের জীবনযাত্রাকেও চোখে পড়ার মতো করে বদলে দেয় - সকলে সহজেই বুঝতে পারেন যে, স্কুল বন্ধের সিদ্ধান্ত তাঁদের জীবনকে সম্পূর্ণ তালগোল পাকিয়ে দিচ্ছে। কুরাজনীতির সরকার এতটা বড় গোলমাল সমাজে পাকাতে চায় না।

এটি চরিত্রে কেবল ব্যতিক্রমী রকমের ক্ষতিকর নয়, সম্পূর্ণ "উৎকট" ব্যতিক্রমী রকমের ক্ষতিকর। আড়াই বছর হতে চলল এ রাজ্যে এই "একশ' শতাংশ উৎকট" ঘটনাটাই ঘটে চলেছে। 

অতএব এত বড় অনাচারের পিছনে গূঢ় কোনো বিপজ্জনক পরিকল্পনা, এবং বড়সড় পৃষ্ঠপোষকতা যে আছে - সে কথা নিশ্চিত। যা সরকারকে এ জাতীয় মোটাদাগের অনাচার চালাতে সহায়তা করছে।

২) বিপজ্জনক পরিকল্পনা সম্বন্ধে নিশ্চিত হচ্ছি কারণ, এ রাজ্যে আড়াই বছর ধরে স্কুল বন্ধ করে রাখা হয়েছে কেবল নয়, বন্ধ হয়ে থাকা সরকারি স্কুলের লাখ লাখ ছাত্রের জন্য ন্যূনতম কার্যকরী কোনো বিকল্প ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি, হচ্ছে না। 

আবারও উল্লেখ করছি - আড়াই বছর ধরে লাখ লাখ বাচ্চাদের সরকারি স্কুলগুলি বন্ধ করে রাখা হয়েছে এমনটাই নয় - বিকল্প কোনো বন্দোবস্ত চালু করা তো দূরের কথা, সরকারি তরফে তা কোনো চর্চার মধ্যেই নেই। 

অর্থাৎ বিদ্যালয় শিক্ষা প্রসঙ্গে এ রাজ্যের সরকার নিজেকে একশ' শতাংশ দায়হীন করে ফেলছে। দেশে রাইট অফ চিলড্রেন টু ফ্রি অ্যান্ড কমপালসারি এডুকেশন অ্যাক্ট ২০০৯ থাকা সত্ত্বেও সে দায়হীন হয়ে থাকতে পারছে। এবং এই আইনটি সংবিধানের মৌলিক অধিকার-এর ভিত্তিতে তৈরি করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দরাজদিলীর ব্যাপার নয়, এটি সরকারের একটি  বাধ্যতামূলক দায় সংক্রান্ত আইন। 

সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতির কারণে কোনো সরকার এই দায় অস্বীকার করার জায়গায় দর্শনগত দিকে থেকে ১৯৫০ সাল থেকেই ছিল না , এবং পরবর্তীকালে আইনতও ২০০৯ সাল থেকে এমন কাজ সরকার করার জায়গায় নাই।

৩) বাচ্চাদের লেখাপড়া, পুষ্টি, শারীরিক, বুদ্ধিগত, প্রাক্ষোভিক, সামাজিক, ভাব প্রকাশগত, ও নৈতিক বিকাশ, যা জড়ো করলে "শিক্ষা", তা সম্পর্কে এমন উৎকট সরকারি নীতির কথা শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মরত কর্মীরা, শিক্ষাবিদেরা, শিক্ষা গবেষকেরা আজগুবি কল্পনাতেও আনতে পারেন কি না সন্দেহ! 

৪) যে স্কুলগুলি বন্ধ রাখা হচ্ছে সেগুলি সরকারি, সরকার পোষিত, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিচালিত - অর্থাৎ কি না এগুলি স্থায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোনো সাময়িক প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্পের প্রতিষ্ঠান নয় - প্রকল্পের শুরু আর শেষ উদ্বায়ী। মূলস্রোতের প্রতিষ্ঠান কিন্তু তা নয় - এগুলি সাময়িক আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তৈরি হওয়া প্রতিষ্ঠান নয়। এই স্কুলগুলি সমাজে কোনো ইভেন্ট ঘটানোর জন্য বা প্রতীকী কাণ্ড ঘটানোর জন্য তৈরি হয়নি। জনগণের ৩৬৫ দিনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা দরকার মেটানোর জায়গা এই স্কুলগুলি। 

গোটা রাজ্যে আড়াই বছর ধরে বিদ্যুৎ, জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া আর এই আড়াই বছর ধরে স্কুল বন্ধ রাখার মানে যে এক্কেবারে এক - সে কথা কাউকে বোঝাতে হয় না।

নজর করাতে চাই এই সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক তাৎপর্যটির দিকে - এমন কাছাখোলা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কোনো স্বাভাবিক মাথা গ্রহণ করতেই পারে না।

নজর করাতে চাই এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্যটির দিকে - এমন ডেসপারেট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও কোনো স্বাভাবিক মাথা গ্রহণ করতে পারে না...

...যদি না শাসককে কোনো না কোনো শক্তপোক্ত ফোর্স পিছন থেকে মনোবল, কায়িক বল অবিশ্রাম জোগান দিতেই থাকে। 

এছাড়াও যেটি বলার - লক্ষ করবেন জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ -র "স্কুল ক্লাস্টার/ স্কুল কমপ্লেক্স " অংশটিতে - বোঝা যাবে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ করে দেওয়ার বন্দোবস্ত সেখান থেকেই শুরু। নতুন নতুন স্কুল তৈরি করার নীতি গত শতাব্দীর ছয়ের দশক থেকে এ শতাব্দীর প্রথম দশক অবধি বাধ্যতামূলকভাবে নেওয়া হয়েছে। হঠাৎ করে পরিস্থিতির গুণগত তফাত না ঘটা সত্ত্বেও, একাধিক সরকারি স্কুল বন্ধ করে "ক্লাস্টার" করে ফেলার পিছনে কোনো  সৎ উদ্দেশ্য থাকা সম্ভবই না - সরকারি স্কুল কমাতে কমাতে শূন্য করে ফেলাই একমাত্র জাস্টিফিকেশন। 

প্রসঙ্গত, বিরাট বিরাট কর্পোরেট স্কুলের ব্যবসা করে কিন্তু বিশাল মুনাফা করে। সরকারি স্কুলের নথিভুক্ত শিশুরা এখনো তাদের খরিদ্দার নয়। তবে খরিদ্দার যে তাদের বানাতে হবেই - তা নিয়ে ব্যবসাদারের মাথা দৃঢ়নিশ্চয়। কারণ সরকারি স্কুলের বাচ্চাদের সংখ্যা বিশাল। ফলে মুনাফাও অনেক।

কর্পোরেটদের ব্যবসার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল কর্পোরেট সোশাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর)। মুনাফা কামিয়ে না, কর ছাড় পেয়ে। এই সিএসআর-এর আওতাভুক্ত কাজকর্ম করে বিরাট কর ছাড় পাওয়া যায় - শিক্ষাক্ষেত্রও এই কাজকর্মের মধ্যে একটি এবং এদের কাজকর্মের দর্শন, মতাদর্শগত অবস্থান, কার্যপ্রক্রিয়া, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য - গোটাটাই নানা প্রকারে গভর্নেন্সের মিনিমাইজেশানকে সুনিশ্চিত করে, যাতে সেই সূত্রে কর্পোরেটদের ব্যবসায়িক আবাদ জমিকে সুবিধাজনক অবস্থায় রাখা যায়। এ কোনো তত্ত্ব চাবানোর ব্যাপার না - ব্যবহারিক ব্যাপার। 

আবারও উল্লেখ করছি - এ রাজ্যে আড়াই বছর ধরে স্কুল বন্ধ রাখার এ জাতীয় সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল - 

স্কুল বন্ধ রেখে বিকল্প যদি কিছু বন্দোবস্ত হত, তাহলে অন্তত তা নিয়ে চর্চা, তার মানোন্নয়ন করা সম্ভব হত। 

কিন্তু এক্ষেত্রে স্কুল শিক্ষা ক্ষেত্রে এইরকম সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন কারণ -

আড়াই বছর ধরে স্কুল বন্ধ রাখা হচ্ছে কেবল নয় - আড়াই বছর ধরে শিক্ষা প্রসঙ্গে কোনোরকম সরকারি বিকল্পের চর্চাই হচ্ছে না। গোটা সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাটাকে একটি "অনালোচ্য" বিষয়বস্তু বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। 

সরকারের মুখে শিক্ষা নিয়ে কার্যত তালা চাবি দিয়ে রাখা হয়েছে।

সিদ্ধান্তটি মামুলি বঞ্চনার নয়। অস্বাভাবিক। আনপ্রিসিডেন্টেড।

বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০২২

কেকের মৃত্যু~ সুশোভন পাত্র

- আর ইউ নট এন্টারটেন্ড?
রোমান কলজিয়ামে গ্ল্যাডিয়েটর ফাইটে, সশস্ত্র যোদ্ধাদের খুন করে প্রশ্ন করেছিলেন, ট্র্যাজিক হিরো ম্যাক্সিমাস! হয়ত নজরুল মঞ্চের কনসার্ট শেষে গতকালও একই প্রশ্ন করেছিলেন কেকে! 'আর ইউ নট এন্টারটেন্ড?'  
সামাজিক মাধ্যমে ভাসছে হোয়াইট বোর্ডের ছবি। কেকের ২০টি হিট গানের লিস্ট! সম্ভবত লিস্টটা কালকের কনসার্টে কেকের গাওয়া গানের। মোটামুটি একটা সাদামাটা হিসেব, সবমিলিয়ে ১০০ মিনিটের গান। আড়াই থেকে পৌনে তিন ঘণ্টার কনসার্ট! কলকাতার ভ্যাপসা গরম, নজরুল মঞ্চের ক্যাপাসিটির তিন-চার গুণ বেশি ভিড়, বন্ধ এসি, মঞ্চ জুড়ে উদ্যোক্তাদের উদ্ধত দাপাদাপি, বাহারি আলোর তীব্র ঝলকানি, আর অত্যুৎসাহী মাতব্বরদের র‍্যাম্পে উঠে কমপ্রেসড কার্বন ডাই-অক্সাইডের ফায়ার এক্সটিংগুইশার স্প্রে! 
সবকিছু উপেক্ষা করেই কনসার্ট শেষ করেছিলেন কেকে! কেন? কেউ বলছে, প্রফেসেনালিসজম। কেউ বলছে মোটা টাকা। কেউ বলছে উদ্যোক্তাদের চাপ। হয়ত তাই! কিম্বা হয়ত সকালে একজন শিল্পী যেমনটা বলছিলেন তেমনটাই! এত গুলো মানুষের গানের তালে উদ্বেলিত হওয়া, সুর-লয়ের মূর্ছনায় সাইন কার্ভের মত দুলে ওঠা, উচ্ছ্বাসে পাগল হয়ে ফেটে পড়া, ভালোবাসা, মুহূর্তের আনন্দে সমস্ত কষ্ট ভুলে যাওয়া ঐ মায়াবী পরিবেশের মোহময়তা –যে কোন শিল্পীই তো থ্রাইভস ফর দিস!  
সামান্য একটা গুগল সার্চ আপনাকে বলে দেবে কেকের মত প্রথিতযশা একজন প্লে-ব্যাক সিঙ্গারের আড়াই থেকে পৌনে তিন ঘণ্টার কনসার্টের আনুমানিক চার্জ ২৫-৩০ লাখ! সঙ্গে নজরুল মঞ্চের বুকিং। আনুষঙ্গিক খরচা আর পুরো ট্রুপের লজিস্টিক মিলিয়ে, জাস্ট একটা সন্ধ্যার কনসার্টের খরচা প্রায় ৩৫-৪০ লাখ! কলকাতার বহু কলেজের মধ্যে এই গুরুদাস মহাবিদ্যালয়ের একটা ফেস্টের একটা কনসার্টে এই বিপুল খরচা! চোখে লাগে না আপনার? এত টাকা আসছে কোথা থেকে? কিভাবে, কোন নিয়মে খরচা হচ্ছে টাকা? কারা এই ফেস্টের স্পন্সরার? উত্তর কলকাতার গলিতে কান পাতলে যে নাম গুলো উঠে আসবে সেগুলো কোন ছাত্র সংসদের চুনোপুঁটিদের না বরং লাল বাতি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো রাঘব বোয়ালদের! 
বাঙলার কলেজে নির্বাচন হয়না বহুদিন। 'শিক্ষায় অনিলায়ন'র থিওরি নামানো কাগুজে বাঘরা খবরই পাননা যে প্রত্যেক কলেজে বকলমে ছাত্র সংসদের নামে লোকাল তৃণমূলে নেতার সিন্ডিকেট চলছে। নিন্দুকে বলে গুরুদাস মহাবিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নাকি প্রয়াত সাধন পাণ্ডের স্নেহধন্য! পেট্রোল-ডিজেলে সেস বেড়েছে, টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে, বাজার আরও অগ্নিমূল্য হয়েছে; তাই মা-মাটি-মানুষের দামাল ভাইরাও কন্যাশ্রীর বোন'দের আর যুবশ্রীর ভাই'দের জন্য ফি-বছরে কলেজে কলেজে অনার্সের 'রেটে' ইনক্রিমেন্ট দিচ্ছে। কোথাও ইংরেজি যাচ্ছে ৬৫হাজার! আবার কোথাও ইতিহাসে লাগছে ৩৫হাজার! 
মেধা-অধ্যবসায়-নিয়ম-নীতি এসব এখন ব্যাকডেটেড, কনটেম্পোরারি ফ্যাশনে টাকা দিলে ইউনিয়ন রুমেই মার্কশিট জমা হয়ে যাবে, পছন্দের অনার্সের রেট ঠিক হয়ে যাবে, ভর্তির জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠের আনুষ্ঠানিকতা -ইউনিয়নের দাদারা নির্ঝঞ্ঝাটে সব করে দেবে। আর দাদা'দের সাথে 'হাই-হ্যালোর' সম্পর্ক থাকলে তো কেল্লা ফতে; মদের বোতলেই কেরিয়ার একদম 'সেট' হয়ে যাবে।
নির্বাচিত ছাত্র সংসদের অবর্তমানে তৃণমূলের 'গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল' ছাত্র সংসদের হাতে কলেজ কর্তৃপক্ষ ফি বছর ফেস্ট-ফ্রেশারের নামে কত টাকা তুলে দিচ্ছেন? ভর্তির সময়ে সাধারণ গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা তোলাই কি খরচা হচ্ছে এই মোচ্ছবে? সরকারের কাছে এই আয়-ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট আছে? যে কলেজে কোন নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেই তারা টাকা পাচ্ছে কোন আইনি ভিত্তিতে? পাস ছাড়া কালকে কেকের অনুষ্ঠানে তো কেউ ঢুকতে পারারই কথা না। তিনগুণ ভিড় হল কি করে? জাল পাস? দায় কার? কলেজের হোতাদের না 'গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল' তৃণমূল ছাত্র সংসদের? 
হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মত প্রজন্ম কে বিমোহিত করেছেন কেকে! সারাদিন ধরে সামাজিক মাধ্যমের দেওয়াল ভেসে যাচ্ছে আবেগে। এই মাপের একজন শিল্পীর মৃত্যুর সামাজিকরণ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনীতি কে বাদ দিয়ে তো এই সমাজ নয়, শিল্প কর্মও নয়। বরং সমাজের ও শিল্পের নিয়ন্ত্রক এই রাজনীতি!  আর তাই একজন শিল্পীর মৃত্যু তে বাঙলার এই রাজনীতির স্খলনটা বে-আব্রু হয়ে যাচ্ছে। 'সততা', 'রাজনৈতিক আদর্শ', 'মূল্যবোধ'–সব ক্লিশে হয়ে গিয়ে বাঙলার রাজনীতির পর্যবসিত হচ্ছে লাভ-লোকসানের অঙ্কে! পর্যবসিত হচ্ছে 'করে খাওয়ার' রসায়নে! খেলা হচ্ছে আগুন নিয়ে। খেলা হচ্ছে বাঙলার ভবিষ্যৎ নিয়ে। কেকে থেকে তুহিনা খাতুন, আনিস থেকে বিদ্যুৎ মণ্ডল -খেলা হচ্ছে মানুষের জীবন নিয়ে। 
বাঙলার শিল্পীদের বানানো হচ্ছে রাজনৈতিক বোড়ে! কেউ ভোটে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চ আলো করছেন, কেউ কমিটি তে জায়গা পাচ্ছেন, কেউ তো সরাসরি তৃণমূলের পদাধিকারী সেজে যাচ্ছেন! সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, চার্লি চ্যাপলিন, জোন বায়েজ, বব ডিলানদের মত সত্যের প্রতি, সমাজের বহমান বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়বদ্ধতা, আপোষহীনতা তো দূরের কথা কোদাল কে কোদাল বলার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বাঙলার শিল্পীদের কাছ থেকে! আর যারা আত্মসমর্পণ করছেন না? তাঁদের ভাতে মারার ফন্দি হচ্ছে ১৪ তলা থেকেই! তাই কেকের মৃত্যু ঘিরে সামাজিক আবেগের বাইরে গুরুতর রাজনৈতিক প্রশ্ন গুলো কে যত্ন করে ডজ করছেন বাঙালী শিল্পীরা!
রূপঙ্করের লাইভ, কলকাতার কালচার, বাঙালির চয়েস, জনগণের সচেতনতা -এই সব এন্টিটির ফিলজফির সাবজেক্টিভিজমে কেকের মৃত্যু কে আড়াল করে আদপে লাভ নেই! কেকের মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্নটা অবজেক্টিভ! প্রশ্নটা নিয়ন্ত্রক শক্তির কোয়ালিটির! প্রশ্নটা তৃণমূলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির! 
বাঙালি দীর্ঘদিন এই রাজ্যে ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেখেছে। নির্বাচিত ছাত্র সংসদের কলেজ পরিচালনা দেখেছে। ফেস্ট দেখেছে, ফ্রেশার দেখেছে, কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়াও দেখেছে। ছাত্র সংসদের আয় ব্যয়ের অডিট হয়েছে। হোপ ৮৬-এ বোম্বের তামাম সুপারস্টারদের অনুষ্ঠান দেখেছে। ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর গলায় 'জয় ভারত/জয় বাংলাদেশের' শ্লোগানে এই তিলোত্তমা কল্লোলিত হয়েছে। ৯০'র শীতে দীর্ঘ ২৭ বছর কারাগারে কাটানোর পর ম্যান্ডেলার কলকাতা সফরে ইডেন গার্ডেনস মানবসমুদ্রের উষ্ণতা মেপেছে। দেশ বিদেশের বহু কীর্তিমানদের বাঙালি সমাদর করেছে। আপ্যায়ন করেছে। আপন করেছে। দশকের পর দশক বাঙালি বহু আবেগের সাক্ষী থেকেছে! 
এই আবেগটাই ফাইন লাইন পেরিয়ে বেলাল্লাপনা তে বদলে যায় যখন তৃণমূলের মত একটা লুম্পেন সর্বস্ব দল রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে ওঠে! কেকের মৃত্যু আপামর দেশের কাছে যে প্রশ্নটা আবার একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেলো, শুধু গান স্যালুটের গর্জনে কি সেই প্রশ্ন ঢেকে রাখা যাবে মাননীয়া?

সোমবার, ২ মে, ২০২২

বিজন সেতু গণহত্যা ~ সমুদ্র সেনগুপ্ত

Purulia Arms Drop Anandamargi
পুরুলিয়া অস্ত্র বৃষ্টি 
বিজন সেতু গণহত্যা: প্রকাশ্য দিবালোকে মহানগরীর এক কলঙ্কের ইতিহাস
প্রথম ভাগ: সংগঠন ও তার কার্যকলাপ:
১৯৫৫ সালের ৯ই জানুয়ারি জামালপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের একজন একাউনটেন্ট প্রভাত রঞ্জন সরকার একটি "সোসিও-স্পিরিচুয়াল" সংগঠন গড়ে তোলেন এবং নিজের নামকরণ করেন "শ্রী শ্রী আনন্দমুর্তিজি"।
বিভিন্ন মাধ্যমে প্রভাত সরকারের শিব দর্শন, শৈশবে বাঘের পিঠে জঙ্গল ভ্রমণের অলৌকিক সব কাহিনী প্রচারিত হয়। আনন্দমার্গ'র সর্বক্ষণের কর্মী হতে দীক্ষা লাগে। পোশাকি নাম পড়ল 'অবধূত'। [সূত্র: সুশোভন পাত্র]
১৯৫৯ সালে পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের বিকল্প হিসেবে আনন্দমার্গ তাদের "প্রোগ্রেসিভ ইউটিলাইজেশন থিওরি" বা প্রাউট তত্ত্ব কে খাড়া করে। মার্গের রাজনৈতিক কর্মসূচী পরিচালনার জন্য তৈরি হয় 'প্রাউটিস্ট ব্লক অফ ইন্ডিয়া'। তাদের মুখপত্র 'প্রাউট' থেকে এদের বিভিন্ন বিচারধারা জানা যায়। যেমন, "অহিংসা উপর ভিত্তি করে আধ্যাত্মিকতা মানবতার কোন উপকারেই আসবে না", "ভারতবর্ষের গণতন্ত্রে নিরক্ষর ও অশিক্ষিতদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত", "কমিউনিজম মানুষ কে জন্তুতে পরিণত করে" ইত্যাদি।
১৯৬০ এর শেষের দিকে মার্গ ও তার দর্শন বেশ কিছু অনুগামীকে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। এর সাথে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং গুপ্ত ধর্মীয় ব্যঞ্জনার ফলে তদানীংতন যুক্তফ্রন্ট ও পরবর্তীতে বামফ্রন্টের সাথে সরাসরি আদর্শগত সংঘাত বাধে।
এই অনুগামীদের মধ্যে বেশ কিছু ধনী ও প্রভাবশালী ভক্ত ছিলেন। যাদের একজন, রাজস্থানের গড় এর মহারাজা পুরুলিয়াতে ৫০০ একর জমি দান করে যেখানে আনন্দনগর নামে হেড কোয়ার্টার তৈরি হয়। এই নগর কে ঘিরে শুরু থেকেই সন্দেহ দানা বাঁধে যে আধ্যাত্মিক কাজকর্মের আড়ালে কোনো ক্রিমিনাল কাজকর্ম চলছে কিনা। আশ্রমের বিপুল ধন সম্পত্তির আসল উৎস হিসেবে অস্ত্র স্মাগলিং কে সন্দেহ করা হয় তখন থেকেই। পরবর্তীতে কিম ডেভি দ্রষ্টব্য। [আউটলুক, ৩১শে আগস্ট, ২০১৭]
মতাদর্শগত সমস্যা ছাড়াও বামফ্রন্ট সরকার এই বিতর্কিত ধর্মীয় সম্প্রদায় কে তার সদস্যদের "সশস্ত্র" প্রশিক্ষণের দায়ে অভিযুক্ত করে এবং তাদের বার্ষিক "তান্ডব" মিছিলের ওপর ধরপাকড় করে। প বঙ্গ ও বিহারে রক্তবস্ত্র পরিহিত লাঠি, তরোয়াল ও নরমুন্ড সজ্জিত মার্গদের সাথে মার্ক্সবাদী ক্যাডারদের ঘন ঘন সংঘর্ষ হয়। ১৯৬৭ সালের ৫ই মার্চ পুরুলিয়ার আনন্দনগরে, হেড কোয়ার্টার এ পাঁচ জন মার্গ মারা যায়।
১৯৭০ সালের ৩১শে মার্চ পাটনা স্টেশনে দিল্লি এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে নামার পরেই জ্যোতি বসুর ওপরে গুলি চালানো হয়। সেই গুলি বিদ্ধ হয়ে মারা যান তার সাথে হাত মেলানো পার্টিকর্মী আলী ইমাম। সন্দেহের তীর আনন্দমার্গীদের দিকে।
প্রভাত সরকার ওরফে আনন্দমূর্তি তার এক শিষ্য অবধুত কে খুনের দায়ে ১৯৭১ সালে গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু তাকে ১৯৭৮ সালে মুক্তি দেওয়া হয়। ওই বছরে "সিডনি হিলটন বোমা বিস্ফোরণ" এর ফলে তিন জন মারা যান এবং ইভান পেডেরিক নামের একজন মার্গ তার অপরাধ স্বীকার করে।
১৯৭১'এ কলকাতার 'ধর্ম মহাচক্র'র পর 'আনন্দমূর্তি'র স্ত্রী উমা সরকার ও প্রাক্তন অবধূত, 'প্রাউটের' অর্থসচিব নওল কিশোর ফাঁস করে দেন যে "গুরুর বিরুদ্ধে জেহাদের অপরাধে ৩৬ জন আনন্দমার্গী কে ছোটনাগপুরের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে পেট চিরে, চোখ উপড়ে হত্যা করা হয়।" পরে ঐ মামলায় অভিযুক্ত অন্য এক অবধূত মাধবানন্দ'ও আদালতে জানান 'গুরুর নির্দেশে তিনি নিজেই ১৮ জন অবধূত কে হত্যা করেছেন।' [নওল কিশোর তাঁর 'আনন্দমার্গঃ সয়েলিং দি সাফরন রোব' ]
১৯৭৩ সালের ২৫শে এপ্রিল নয়াদিল্লির আচার্য দিনেস্বরানন্দ নামে এক অবধুত গায়ে আগুন লেগে মারা যান। তার সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে এটি প্রতিবাদের আত্মহুতি, আনন্দ মূর্তির গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে। দিল্লি পুলিশের বয়ান অনুযায়ী এটি হত্যাকান্ড এবং সেই অভিযোগে দু জন বিদেশি মার্গীকে গ্রেপ্তার করে যারা আগুন লাগিয়ে ওই অবধুত কে পুড়িয়ে মেরেছে বলে অভিযোগ।
[নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৬শে এপ্রিল, ১৯৭৩]
১৯৭৫ সালে রেলওয়ে মন্ত্রী ললিত নারায়ণ মিশ্র কে বোমা মেরে খুনের দায়ে চারজন মার্গ কে সাজা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজন বাদে বাকিরা আবার তদানীংতন চিফ জাস্টিস এ এন রায় কে হত্যার চেষ্টায় অভিযুক্ত। এদের সতেরো বছর সশ্রম কারাদণ্ডের সাজা হয়।
এই সংগঠনের চরিত্র বোঝার জন্য একটি ঘটনার উল্লেখ প্রয়োজন। ১৯৮৩ সালে কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে এক অবধুত একটি রিট পিটিশন দাখিল করে বলেন যে প্রকাশ্যে ছুরি, ত্রিশূল ও করোটি নিয়ে "তান্ডব নৃত্য" করার ওপরে জারি করা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে হবে কারণ এটি তাদের (আনন্দ মার্গীদের) ধর্মীয় আচরণ করার অধিকারে হস্তক্ষেপ।
সুপ্রিম কোর্ট এই আবেদন বাতিল করে ঘোষণা করে যে মার্গের প্রতিষ্ঠাতার রচনাপত্র লিখিত হয়েছে মূলত হিন্দু দর্শনকে আধার করে এবং আনন্দমার্গীদের "শৈব" বলে বিবেচনা করতে হবে যা আসলে হিন্দু ধর্মের একটি সম্প্রদায়। এটি কোনো পৃথক ধর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে না। [ল, কলোনিয়ালিজম এন্ড রিলিজিয়াস প্লেস ইন ইন্ডিয়া- গীতাঞ্জলি শ্রীকান্তন]
১৯৭৮ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি ফিলিপিন্স এর ম্যানিলায় ভারতীয় দূতাবাসের কর্মচারী জ্যোতি স্বরূপ বৈদ্য কে খুন করার চেষ্টার অপরাধে স্টিভেন মাইকেল ডায়ার (কানসাস) ও ভিকটোরিয়া সেফার্ড (মেরিল্যান্ড) নামের দুই মার্কিন আনন্দ মার্গীকে ১৭ বছরের কারাবাসের দন্ড হয়। এফবিআই আনন্দ মার্গ কে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে।
[এফবিআই ফাইল নম্বর ১০৫-২৮৯৪২০]
১৯৯০ সালের ১৪ই এপ্রিল অমৃত্সরে পাক-ভারত সীমান্তে বিএসএফ এর হাতে দুজন আনন্দ মার্গী ধরা পড়ে, অটোম্যাটিক অস্ত্র ও গুলি সহ। "মানব মুক্তি মঞ্চ" নামে মার্গীদের একটি শাখা সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পাকিস্তান থেকে এসব অস্ত্র আমদানি হচ্ছিল মার্গীদের প্রশিক্ষণের জন্য। [১৯৯০ সালের ১৮ই এপ্রিল লোকসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি]
ভারত সরকার আনন্দমার্গ কে একটি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী জঙ্গি, ছদ্ম-ধর্মীয় সংগঠন বলে বর্ণনা করেন যারা প্রায়শই হিংসার পথ নেয় এবং স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতি দাদাগিরি ফলায়। [প্রাগুক্ত বিবৃতি]
পুরুলিয়া ও বিহার সীমান্তে জয়পুর ও ঝালদা ২ নং ব্লকের আদিবাসী, সরকারী ও রায়তি জমি মিলিয়ে হাজার একর জমি বেআইনি ভাবে দখল করতে উদ্ধ্যত হয় এই মার্গীরা। পুরুলিয়ার বাঁশগড়ের জঙ্গলে বিদেশ থেকে আমদানি করা বে-আইনি অস্ত্র মজুতের দায়ে অভিযুক্ত [প্রাগুক্ত বিবৃতি]
১৯৯৫ সালে ১৭ই ডিসেম্বর পুরুলিয়ায় একটি এএন-২৬ বিমান থেকে কয়েকশ একে-৪৭ রাইফেল ও হাজার রাউন্ড গুলি ফেলা হয়। কিম ডেভি ধরা পড়ে। অভিযোগ ওঠে যে ওই অস্ত্রবর্ষণ এর গ্রাহক ছিল আনন্দমার্গীরা।
জরুরি অবস্থার সময় এই সংগঠনকে ভারত সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৭৭ সালে জনতা সরকার ক্ষমতায় আসার পরে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
পৃথিবীর ১৮০ টি দেশে এদের প্রায় ২০ লাখ সদস্য আছে। ভারতে প্রায় সাত হাজার শাখা আছে যার মধ্যে প বঙ্গে প্রায় তিন হাজার। এরা স্কুল, কলেজ, অনাথ আশ্রম ও হাসপাতাল চালায়। [ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ১৪ই ডিসেম্বর, ২০১১]
দ্বিতীয় ভাগ: বিজন সেতু গণহত্যা ও বিচার:
১৯৮২ সালের ৩০শে এপ্রিল দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ রেল স্টেশন, বিজন সেতু ও বন্ডেল গেট সংলগ্ন এলাকায় আনন্দ মার্গের সাথে যুক্ত ব্রহ্মচারী ও ব্রহ্মচারিণী দের ওপরে আক্রমন ও নিগ্রহের এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে যার ফলে ১৭ জন মারা যান
[কান্তি গাঙ্গুলি বনাম রাজ্য সরকার ও অন্যান্য: রিট পিটিশন নং ৯৯০৯ এর প্রেক্ষিতে জাস্টিস দীপঙ্কর দত্ত এর রায়, ৮ই জুলাই, ২০১৬]
জনস্বার্থে তাৎপর্যপূর্ণ এই ঘটনার তদন্তের জন্য রাজ্য সরকার ১৯৮২ সালের ১২ই মে কলকাতা হাইকোর্টের জাস্টিস সমরেন্দ্র চন্দ্র দেব কে নিয়ে গঠিত এক সদস্যের একটি তদন্ড কমিশন গঠন করেন। ওই কমিশনের টার্মস অফ রেফারেন্স ছিল:
(১) ১৭ জন মানুষ নিহত ও আরো মানুষ আহত হওয়ার সময় কি পরিস্থিতি ছিল ও ঘটনাক্রম ছিল; (২) আক্রমণ ও নিগ্রহ এর পেছনে কি কারণ ছিল নার ফলে ১৭ জন আনন্দমার্গী নিহত ও অন্যান্যরা আহত হয়েছিলেন; (৩) আনন্দমার্গীদের মৃত্যুর কি তাৎক্ষণিক কারণ ছিল; (৪) ঘটনাস্থলে পুলিশের পৌঁছতে দেরি হয়েছিল কি না; (৫) অন্যান্য যে কোনও অনুসন্ধানের বিষয় যা তদন্ত কমিশন প্রাসঙ্গিক মনে করবে; (৬) ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনা এড়ানোর জন্য সুপারিশ।
প্রাপ্ত নথিপত্র থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে দেব কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়ার তারিখ ১২ই জানুয়ারি, ১৯৮২ অবধি বাড়ানো হয় ও পরে ১৩ই সেপ্টেম্বর, ১৯৮৩ অবধি। দেব কমিশন এর পরে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন কিনা তার সপক্ষে কোনও নথি পাওয়া যাচ্ছে না।
২০১১ সালে বামফ্রন্ট কে পরাস্ত করে টিএমসি সরকার ক্ষমতায় আসে। বিজন সেতুর ঘটনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে আনন্দ মার্গীদের গণহত্যার অনুসন্ধানের জন্য ২০১২ সালের ১৪ই মার্চ জাস্টিস সন্তোষ কুমার ফৌজদার কে নিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়। পরে মেয়াদকাল আরও ছয় মাস বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
এর পরে ২০১৩ সালের ৯ই এপ্রিল এলাহাবাদ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জাস্টিস অমিতাভ লালা কে নিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠিত হয় জাস্টিস ফৌজদারের জায়গায়।
রিপোর্ট জমা দেওয়ার মেয়াদ ২রা মে, ২০১৩ থেকে আরো ছয় মাস বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পরে ২০১৫ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর আরো এক বছরের জন্য লালা কমিশনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
কান্তি গাঙ্গুলি নামে সিপিআইএম এর এক রাজনৈতিক নেতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। মূলত তিনটি বক্তব্য তুলে ধরেন।
(১) এই ধরনের ঘটনায় এক বার কমিশন গড়া হলে সেটিকে অবৈধ ঘোষণা না-করা পর্যন্ত দ্বিতীয় কোনও কমিশন গঠন করা যায় না। এ ক্ষেত্রে জ্যোতি বসুর আমলের দেব কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি।
(২) সিআইডি ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট পেশ করেছিল। নিম্ন আদালতে সাজাও হয়েছিল কয়েক জন অভিযুক্তের। সিআইডি নিম্ন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেনি। আপিল করা হয়নি আনন্দমার্গীদের পক্ষ থেকেও।
(৩) এই অবস্থায় নতুন তদন্ত কমিশনে ডেকে তাঁদের মক্কেলকে সিআইডি বা আনন্দমার্গীদের তরফে জেরা করার কোনও আইনি অধিকার নেই বলে দাবি করেন কান্তিবাবুর আইনজীবীরা। তাঁদের অভিযোগ, কান্তিবাবু নতুন কমিশনে যান। কিন্তু কমিশনের চেয়ারম্যানের বদলে তাঁকে জেরা করেন সিআইডি এবং আনন্দমার্গীদের আইনজীবীরা। এটা আইনবিরুদ্ধ।
এই পিটিশনের বিচার শেষে জাস্টিস দীপঙ্কর দত্তের রায়ে জানানো হয় যে বিজন সেতুতে আনন্দ মার্গী হত্যার তদন্তে গঠিত অমিতাভ লালা কমিশন বৈধ। ফলে তদন্তে স্বার্থে সিপিএম নেতা কান্তি গাঙ্গুলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে কমিশন। তবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া না দেওয়ার স্বাধীনতা থাকছে কান্তি গাঙ্গুলির। সিআইডিও তাঁকে জেরা করতে পারবে না।
[প্রাগুক্ত রায়]
সর্বশেষ পাওয়া খবরের ভিত্তিতে বলা যায় এখন পর্যন্ত লালা কমিশনের পেছনে খরচ হয়েছে ৩.২ কোটি টাকা।
কমিশন এ পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন। বেশ কিছু সাক্ষী মারা গেছে। কমিশনের মেয়াদ ২০১৯ সালের ১লা এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত হয়েছে। এর মাঝে কমিশনের সচিবের পদ বহুদিন শূন্য ছিল। বিচারপতি লালা কমিশনের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে নারাজ [এই সময়, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০১৮]
ইতোমধ্যে সংবাদপত্রের এক অংশে এই ঘটনার জন্য অর্থাৎ আনন্দ মার্গীদের পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে অপহরণ (ট্যাক্সি থেকে নামিয়ে), গায়ে আগুন ঢেলে পুড়িয়ে মারার দায়ে সিপিআইএম এর ছোট মাঝারি নেতাদের নামে অভিযোগ চালু আছে। সিপিএম বিধায়ক শচিন সেন, কান্তি গাঙ্গুলি প্রমুখের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়, বিচারও শুরু হয়।
স্বভাবতই ওই দলের পক্ষ থেকে পাল্টা অস্বীকার করাও চালু আছে। একটি থিওরি অনুযায়ী ছেলেধরা সন্দেহে উত্তেজিত জনগণ এই কাজ করেছিল।
যতদিন না লালা কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়বে ততদিন এই চাপ ও পাল্টা চাপ চলতে থাকবে।
বিজন সেতুতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ১৭ জন মার্গী মারা যাওয়ার ঘটনা ন্যক্কারজনক। 'ছোট্ট' , 'সাজানো ঘটনা' বা 'বিরোধীদের চক্রান্ত' নয় বরং ৪ঠা মে, সিপিএম রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত জানান "আনন্দমার্গীর ঘটনাতে আমরা গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। প্রকৃত ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক" [সূত্র: Sushovan Patra]
আজ আবার ৩০শে এপ্রিল। বাম আমলে দুই যুগ, আর এই আমলে অর্ধযুগ কেটে গেল। প্রয়াত দাসগুপ্তর মতো আমিও চাই প্রকৃত দোষীদের শাস্তি হোক। অবিলম্বে চাই।
(কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিবিশেষ কে আঘাত দেওয়া এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়)

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০২২

সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসকের রাজনীতি সচেতনতা ~ বিষাণ বসু

কথাটা হলো, রাজনীতি ব্যাপারটাই খুব খারাপ। রাজনীতির লোকেরা তোয়ালে মুড়ে পয়সা নেন (আরও উচ্চপর্যায়ের লোকেরা তোয়ালে না মুড়েও নেন এবং সামান্য তোয়ালেতে ধরবে না এত বেশি টাকা নেন), পুলিশকে বোম মারতে বলেন, পুলিশকে না মারা হলেও পাব্লিকের উপর তো সে বোম পড়েই, ধর্মের নামে ঘেন্না ছড়িয়ে মানুষকে খুন করান, যতজন খুন হয় তার কয়েক হাজার গুণ মানুষ আতঙ্কে কাঠ হয়ে বাঁচেন- অর্থাৎ কিনা, রাজনীতি একটা নোংরা ব্যাপার, ভদ্রঘরের লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েদের ওদিকে পা না বাড়ানোই ভালো। এমনকি, লেখাপড়া জানা আপাতদৃষ্টিতে ভদ্রঘরের লোকজন যখন রাজনীতি করত, তখনও, আপনি জানেন, বা না জানলেও বারবার একই কথা শুনতে শুনতে আজকাল নিশ্চিত মানেন, সুজলা-সুফলা রাজ্যের শিল্পসম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছে ওই পলিটিক্স-ই। আজও যখন মিটিং-মিছিলের কারণে - বনধ হলে তো কথা-ই নেই - আপনাকে রাস্তায় আটকে যেতে হলে দাঁতে দাঁত ঘষটে বলেন, সেই পলিটিক্স করে করে রাজ্যটা শেষ হয়ে গেল, তাতেও শিক্ষা নেই…

অতএব, নিজের সন্তানদের পলিটিক্স থেকে দূরে রাখেন তো বটেই, আপনি নিজেও রাজনীতি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেন। তাছাড়া আপনি চিকিৎসক। মহান পেশা। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে মানুষকে সুস্থ করে তোলার নিরন্তর দায় আপনার 'পরে ন্যস্ত। সেখানে রাজনীতির ক্ষুদ্রতা কি আপনাকে সাজে!!

কিন্তু কী গেরো দেখুন, বহুশ্রুত কমলি-র মতোই, আপনি রাজনীতি এড়িয়ে থাকতে চাইলেও, রাজনীতি কিছুতেই আপনাকে ছাড়তে চায় না। কীভাবে? আপনি হয়ত উত্তরটা ভাবছেন এভাবে - অমুক নেতাকে ম্যানেজ করে ডা. তমুক ঘরের কাছে বহাল তবিয়তে পোস্টিং পেল, কিন্তু আমাকে গত চোদ্দ বছর ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে পড়ে থাকতে হচ্ছে! অথবা, তমুক লোকাল নেতা প্রায়শই হাসপাতালে এসে ঝামেলা করেন, কিন্তু হাসপাতালের দরকারের সময় তাঁর টিকির ডগাটি মেলে না। কিংবা… নাহ্, ফর্দ বাড়ানোর দরকার নেই, ব্যাপারটা আপনি জানেন, সুতরাং একগাদা উদাহরণ নিষ্প্রয়োজন।

অথচ, শুধু নিজের কর্মক্ষেত্রটির কথাও যদি ভাবতে চান, তাহলেও ক্ষুদ্র দলীয় রাজনীতি বা তার অপপ্রয়োগের বাড়বাড়ন্তের পিছনে আসল রাজনীতিটা আপনার চিনতে পারা জরুরি। রাজনীতি করুন বা না করুন, রাজনৈতিক সচেতনতা খুব দরকার। আপনি যদি চিকিৎসক হিসেবে গর্ব বোধ করতে চান, রাজনীতি সচেতনতা বাদ দিয়ে তেমন আত্মশ্লাঘা একেবারেই অবান্তর। কিন্তু কেন?

আপনি যদি অনেক বছর ধরে চাকরি করে থাকেন, তাহলে নিশ্চিত লক্ষ করেছেন, অন্তত শহরাঞ্চলে তো বটেই, সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কারা পরিষেবা গ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে প্রায় মৌলিক শ্রেণীপরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। উচ্চমধ্যবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তও আর সরকারি হাসপাতালে আসেন না। ইদানীং নিম্ন-মধ্যবিত্তও যথাসাধ্য না আসার চেষ্টা করছেন। সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্র প্রায় পুরোপুরিভাবে নিম্নবিত্ত রোগীদের চিকিৎসা কেন্দ্র। সে হোক গে, তাতে কী-ই বা যায় আসে!! তাই না? না, বিশ্বাস করুন, যায় আসে। আমাদের গরীব দেশে, দেশের অধিকাংশ মানুষই নিম্নবিত্ত, এমনকি হতদরিদ্র। গণতন্ত্রের বিচারে তাঁরা অনিবার্যভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু কণ্ঠের বিচারে যদি বলেন, বা কণ্ঠ শুনতে পাওয়ার বিচারে যদি ভাবেন, তাহলে সবচাইতে উচ্চকিত কণ্ঠ মধ্যবিত্তের। তাতে কী? হ্যাঁ, তাতে অনেক কিছু। ক্রমবর্ধমান আত্মকেন্দ্রিকতার বাজারে নিজের গায়ে আঁচ আসা অব্দি মানুষ কিছুই বলে না। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যেহেতু মধ্যবিত্ত নিজের চিকিৎসা করান না, তাই সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও মধ্যবিত্তর কিছু যায় আসে না। বরং তাঁরা অনেক বেশি বিচলিত পাঁচতারা কর্পোরেট হাসপাতালের বাড়তি বিল নিয়ে - সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা, সরকার যাতে সেদিকে কড়া নজর রাখেন ও উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন - সেই প্রত্যাশার ব্যাপারে সরকারও সচেতন, অতএব নিয়মিতভাবে ঘোষণা হয়, কর্পোরেট হাসপাতালে লাগামছাড়া খরচের বিরুদ্ধে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। এই সব হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে কেউ প্রশ্নই করে না, সরকারের তো নিজের হাতেই একখানা স্বাস্থ্য-পরিকাঠামো রয়েছে; পড়শির (অর্থাৎ বেসরকারি হাসপাতালের) ঘরের হ্যাপা দেখার পাশাপাশি সরকার বাহাদুর নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি কেমন সামলাচ্ছেন? হ্যাঁ, আপনার কর্মক্ষেত্র, অর্থাৎ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি নিয়ে সরকার তো ভাবিত ননই, সেই ব্যবস্থার অব্যবস্থা বা খামতি নিয়ে আজকাল কেউ প্রশ্নই করে না। ভয়টা সেখানেই। বিশ্বাস করুন, আপনি রাজনীতিকে যতই ঘেন্না করুন, রাজনীতি না বুঝলে আপনি এই সমস্যার আসল চেহারাটা ধরতে পারবেন না।

তবে কি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কথা একেবারেই হয় না? সরকারের কি এদিকে নজর একেবারেই নেই? না না, বালাই ষাট, অবশ্যই আছে। মধ্যবিত্ত নিজেদের চিকিৎসা করাতে সরকারি হাসপাতালে না আসুক, অন্য কারণে আসে তো। ড্রাইভারের পা ভাঙলে, কাজের মাসি অসুস্থ হয়ে পড়লে, এমন ইতিউতি দরকারে আসতে তো হয়ই। এসে তাঁরা দেখেন, হাসপাতালে নতুন বিল্ডিং হচ্ছে, বিল্ডিং-এ নতুন রঙ পড়েছে, মস্ত উঁচু আলোয় ভরা গেট হয়েছে - দেখেটেখে তাঁরা খুশি, অন্তত অখুশির কারণ তো নেই। অবশ্য চিকিৎসা করাতে গেলে…

হ্যাঁ, চিকিৎসা করাতে গেলে তাঁরা জানতে পারতেন, হাসপাতালে প্রায় সর্বস্তরে নিয়োগ সঙ্কুচিত। গত এক দশকে দন্ত-চিকিৎসক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও রীতিমতো কম। মেডিকেল অফিসার বলতে অনেকাংশে কন্ট্র‍্যাকচুয়াল ডাক্তার, বা সদ্য এমডি/এমএস পাস করে বন্ডে থাকা ডাক্তার। পরিকাঠামোর কথা বলতে, গত এক দশক ধরে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ডায়াগনস্টিক সার্ভিস অংশটা প্রায় পুরোপুরিভাবে প্রাইভেট সেন্টারের হাতে - পাব্লিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ওরফে পিপিপি মডেলের দৌলতে। বহুলপ্রচারিত 'সব ওষুধ ফ্রি'-ও এখন হাস্যকর কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এতশত কথা আর কে-ই বা শুনছে!!

বড়লোক থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণী, তাঁদের চিকিৎসার জন্য কর্পোরেট হাসপাতাল - আর গরীবের চিকিৎসা হবে সরকারি হাসপাতালে। ব্যবস্থাটা দিব্যি ছিল। কিন্তু মুশকিল হলো, চিকিৎসা ব্যাপারটা এমনই সেনসিটিভ আর বিজ্ঞাপনের রমরমার সুবাদে পাঁচতারা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারাটা এমনই "অ্যাস্পিরেশনাল" হয়ে গিয়েছে, যে, এতখানি অসাম্য দীর্ঘদিন চলতে পারে না। ক্ষোভ অবশ্যম্ভাবী। আপনি যদি দীর্ঘদিন সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই লক্ষ করে থাকবেন, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মুখাপেক্ষী যাঁরা, তাঁদের অধিকাংশের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে পরিষ্কার যে তাঁরা নিরুপায় হয়েই এই হাসপাতালে এসেছেন। অর্থাৎ আসাটা "বাই চয়েস" নয়, আসা "বাই কম্পালসান"!! এমতাবস্থায়, আশানুরূপ ফল না পেলেই - কথাটা আরেকবার পড়ুল, আশানুরূপ চিকিৎসা নয়, চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল না পেলেই - হাসপাতালে ভাঙচুর বা স্বাস্থ্যকর্মীদের মারধর অবশ্যম্ভাবী। সেরকম ঘটনা যে ঘটেছে, তা আপনিও জানেন। কিন্তু আপনি তো ঘটনাগুলোকে বৃহত্তর রাজনীতির প্রেক্ষাপটে চিনতে চাননি। চানও না। তাই তো?

তা বেশ। এসবেরই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী খ্যাতিমান গায়িকাকে "বেটার ট্রিটমেন্ট"-এর জন্য রাজ্যের সেরা সরকারি হাসপাতাল থেকে কর্পোরেট হাসপাতালে সরানোর তোড়জোড় করবেন, পাড়ার ছুটকো নেতা থেকে মন্ত্রীসান্ত্রী, সবাই চিকিৎসা করাবেন বেসরকারি হাসপাতালে (ব্যতিক্রম - যদি না তাদের পুলিশ ধরতে আসে), স্বাস্থ্যসাথী কার্ড চালু করার সময় ঘোষণা হবে, এবার থেকে সবাই "বেস্ট ট্রিটমেন্ট" করাতে পারবেন - অর্থাৎ জনসাধারণের চোখে পাঁচতারা হাসপাতাল যে সত্যিই স্বপ্নের মায়াপুরী, সে নিয়ে তিলমাত্র সন্দেহ থাকবে না - আর সরকার আপনাকে বলবেন, সরকারি হাসপাতালে যাতে "স্বাস্থ্যসাথী কেস" বাড়ে, সে দিকটায় নজর দিতে, যদিও সরকারি হাসপাতালে তো সব চিকিৎসাই ফ্রি, সেখানে আবার কার্ডের প্রশ্ন আসছে কেন!!

অতএব, আপনার "রাজনীতি খুব নোংরা ব্যাপার" বুকনির মাঝেই আপনার কর্মক্ষেত্রটির মান - গুণগত ও সম্মান, উভয়ার্থেই - তলানিতে এসে ঠেকেছে। এবং সেই সঙ্গে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে আপনার সম্মানও। আমার এক অগ্রজপ্রতিম শিক্ষকের স্কুলপড়ুয়া সন্তান বাবাকে বলেছিল - জানো তো, আগে লোকে বলত, যাদের কোত্থাও যাওয়ার উপায় নেই, তারাই সরকারি হাসপাতালে যায়, এই কথাটা আগে পেশেন্ট নিয়ে বলত, এখন ডাক্তারদের নিয়েও বলে। মানে, যে ডাক্তাররা অন্য কোথাও কাজ পান না, তাঁরাই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যোগ দেন। তার পর থেকে সেই চিকিৎসক-শিক্ষক কোথায় কর্মরত এই প্রশ্নের জবাবে সরকারি মেডিকেল কলেজের নামটি গোপন রেখে যে প্রাইভেট হাসপাতালে তিনি ভিজিটিং কনসালট্যান্ট, সেই হাসপাতালের নামটি বলে থাকেন।

তবে ঘটনাটা শুধু ওঁর ক্ষেত্রে সত্যি, এমন নয়। আজকাল সবাইকেই বলতে শুনি, আমি চাকরির উপর ডিপেন্ড্যান্ট নই, আমার প্র‍্যাক্টিস আছে। খুবই ভালো কথা। কিন্তু, প্লিজ, অন্যভাবে ভাবতে শুরু করুন। জোর গলায় বলুন, হ্যাঁ, আমি সরকারি চাকরি করি। এই চাকরির মাইনেয় আমার সংসার চলে। এই ব্যবস্থাটার ভালোমন্দের সঙ্গে আমার ব্যক্তিজীবনের ভালোমন্দ জড়িয়ে। অতএব, বৃহত্তর স্বার্থেই বলুন বা ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে - সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি যেন মজবুত হয়, সে ব্যাপারে গলা তুলুন।

হয়ত আপনিই ঠিক। রাজনীতি হয়ত খুবই নোংরা ব্যাপার। কিন্তু রাজনীতি সচেতন না হলে সঙ্কটের রূপ আপনি বুঝে উঠতে পারবেন না। এও হয়ত ঠিক, যে, আপনি একা সচেতন হয়ে কিছুই করে উঠতে পারবেন না। কিন্তু শিশু যখন প্রথম পা ফেলে, প্রথম ইশকুলে যায় - সে বহুদূর যেতে পারবেই এমন নিশ্চয়তা থাকে না। তবে অনেকেই যায় শেষমেশ। অনেকে পারে না, সেও ঠিক। তবু, পা-টা ফেলতেই হয়। ওটাই শুরু। ওটা না হলে কিছুই হয় না।
একা একা না পারলেও অনেকে মিলে অনেকটাই হয়। অনেক কিছুই করা যায়। তাই বলি, রাজনীতি সচেতন হোন। ব্যক্তিগতভাবে। গোষ্ঠীবদ্ধভাবেও। এটুকু হতে না পারলে কিছুই এগোনো যাবে না।

জাহাঙ্গীরপুরীতে 'অবৈধ' উচ্ছেদ ~ অর্ক ভাদুড়ী


পেটের দায়ে যে গরীব মানুষ ভিন্ রাজ্যে কাজ করতে যান, তাঁর মাথাগোঁজার ঠাঁইকে কোনও বামপন্থী 'অবৈধ' বলতে পারেন না। 'সরকারি জমিতে বেআইনি বস্তি' গড়ে উঠেছে এবং আগামীতেও উঠবে। যতদিন না রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য সুস্থভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, ততদিন তাড়া খাওয়া মানুষ, পেট চালাতে ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষ রাস্তার ধারে, ফুটপাথে, সরকারি জায়গায় নিজের মাথা গোঁজার জায়গা নিজেই করে নেবেন। রাষ্ট্র যখন উচ্ছেদ করতে আসবে, তখন প্রতিরোধ করবেন।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে অসংখ্য মানুষ কাজ করতে দিল্লিতে যান। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ জোগাড়ে, কেউ অন্য কিছু। তাঁদের অনেকেই মুসলিম। এই মানুষগুলোকে 'অবৈধ বাংলাদেশি' বা 'রোহিঙ্গা' বলে দাগিয়ে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র হলে প্রতিরোধ না করে উপায় নেই।
হনুমানজয়ন্তীর মিছিল থেকে যদি হামলা হয়- একবার নয়, পর পর দু'বার যদি হামলা হয়, তাহলে তৃতীয়বারে স্থানীয় মানুষজনকে রুখে দাঁড়াতেই হয়। উচ্ছেদই যেখানে একমাত্র সত্য, সেখানে কার আইন, কীসের আইন? নিজের সবটুকু শক্তি জড়ো করে রুখে না দাঁড়ালে তো তাঁদের উপায় নেই!
আমাদের মতো অসংখ্য পরিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে উচ্ছেদ হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল। থাকার জায়গা ছিল না। করে নিতে হয়েছিল। সে-সবও ছিল বেআইনি বসত। সেই বসত গড়ার সাহস জুগিয়েছিল ইউসিআরসি, সাহস জুগিয়েছিল বামপন্থীরা, কমিউনিস্ট পার্টি।
জাহাঙ্গীরপুরীতে যাঁরা নিজেদের বসত বাঁচাতে লড়ছেন, তাঁরা জেনে হোক বা না জেনে, এই ঐতিহ্যের ধারক। তাঁদের প্রতিরোধেই বাংলার মর্যাদা বাড়ছে।
জাহাঙ্গীরপুরীর মানুষগুলো চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ওখানে আছেন। কেউ মাছ বিক্রি করেন, কেউ কাগজ কুড়োন, কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ অন্য কোনও পেশায়। তাঁদের বসত বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে বিজেপির প্রশাসন। ওই বুলডোজারের পক্ষে যিনি সরাসরি বা পরোক্ষে কথা বলবেন, যিনি কথা বলবেন উচ্ছেদ হওয়া মানুষের বিরুদ্ধে, তিনি বিজেপির মিত্র, তিনি রাষ্ট্রের দালাল।
বামপন্থীরা জাহাঙ্গীরপুরীর উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের রিপোর্ট স্পষ্ট বলছে এই উচ্ছেদ সংখ্যালঘুদের ভিটেমাটি কাড়ার চেষ্টা। বুলডোজারের সামনে প্রতিবাদী মানুষের কাতারে দাঁড়িয়েছেন শীর্ষ বামপন্থী নেতৃত্ব। আম আদমি পার্টি দাঁড়ায়নি, কংগ্রেস দাঁড়ায়নি, কমিউনিস্টরা দাঁড়িয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও যখন বুলডোজার চলছে, তখন কমিউনিস্ট নেতৃত্ব তার গতিরোধ করেছেন। আর যাঁরা সরাসরি বা পরোক্ষে উচ্ছেদ সমর্থন করছেন, হনুমানজয়ন্তীর মিছিল থেকে সংগঠিত হিংসা দেখতে পাচ্ছেন না, তাঁরা বামপন্থী নন, বাম পোশাক পরা রাষ্ট্রশক্তির পোষা দালাল।

শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২২

পয়লা বৈশাখের অঙ্ক ~ অমিতাভ প্রামাণিক

শুভ নববর্ষ ১৪২৯। 

প্রসঙ্গত বলা যাক, ১৪২৯ একটা মৌলিক সংখ্যা। আজ থেকে দু'বছর আগের সালটাও মৌলিক ছিল, আজ থেকে চার বছর পরের সালটাও মৌলিক হবে। 

এই সালটা আমরা যেভাবে লিখি, অর্থাৎ ১, ৪, ২, ৯ পাশাপাশি বসিয়ে (এ আর এমন কী!), এই রীতি ছ'-সাতশো বছর আগেও ইওরোপে অজানা ছিল, আমেরিকা মহাদেশের তো অস্তিত্বই অজানা ছিল প্রায়। রোমানরা ১৪২৯ লিখত এইভাবে - MCDXXIX. 

এইভাবে দুটো সংখ্যা যোগ করাই দায়, গুণ-ভাগ-বর্গমূল-গসাগু-লসাগু তো অনেক দূরের কথা। অথচ তারা নাকি সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কারক! চোর কি আর গাছে ফলে! 

যাক সে কথা। ভারতীয় পঞ্জিকা সূর্যসিদ্ধান্তমতে সূর্য আকাশের প্রেক্ষাপটে যেদিন মেষরাশিতে প্রবেশ করে, সেদিন থেকেই নতুন বছর শুরু, সেটাই পয়লা বৈশাখ আমাদের। মেষ ছেড়ে যেদিন বৃষতে প্রবেশ করবে সূর্য, আসবে দ্বিতীয় মাস জ্যৈষ্ঠ। দক্ষিণ ভারতে কিছু রাজ্যে যুগাদি ও গুডি পড়োয়া নামে বর্ষবরণ শুরু হয় এর ঠিক আগের অমাবস্যাশেষে, চান্দ্রসৌরমতে।

গুচ্ছ-গুচ্ছ রিফর্মের শেষে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার এখন দুনিয়ার মানুষ অনুসরণ করে, তার নববর্ষ পয়লা জানুয়ারি। পয়লা জানুয়ারির বৈশিষ্ট্য কী, সেদিন জাগতিক কোন্ ব্যাপারটা ঘটে? কিছুই না। পুরো আরবিট্রেরি দিন একটা। 

গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার আর সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী বছরের দৈর্ঘ্য সমান নয়, কুড়ি মিনিটের পার্থক্য আছে (এই কারণেই গ্রেগোরিয়ান নিয়ম অনুসরণ করে বাংলাদেশে গতকাল নববর্ষ পালিত হয়েছে)। এর কারণ আহ্নিক ও বার্ষিক গতি ছাড়াও পৃথিবীর তৃতীয় গতি, যার নাম অয়নচলন (লাট্টু ঘোরালে যেমন তার মাথাটা ঘোরে, যার ইংরাজি নাম প্রিসিশন)। অয়নচলন বিষয়ে ভারতীয় গণিতজ্ঞরা আদৌ অজ্ঞ ছিলেন না, তাঁরা ঠিক করে নিয়েছিলেন আকাশের রাশিমণ্ডলের একটাতে (এক্ষেত্রে মেষ) প্রবেশের সময় থেকে পরবর্তী প্রবেশের সময়কালই এক বছর। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারে তেমন নয়, এক ইকুইনক্স (ইক্যুয়াল নাইট, যে দিন দিনরাত্রি সমান) থেকে পরবর্তী ইক্যুইভ্যালেন্ট ইকুইনক্সের মধ্যবর্তী সময় হচ্ছে এক বছর। কিন্তু তাতে বছরের প্রথম দিনটা একেবারে আরবিট্রেরি, কেননা এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইস্টারের দিন ফিক্স করা (যা যিশুর রেজারেকশন-সংক্রান্ত, ধর্মীয় ও আধুনিক বিজ্ঞানমতে গাঁজাখুরি; এবং সেই উদ্দেশ্যও অসফল, কেননা ইস্টারের তারিখ ফিক্সড হয় না)। 

অনেককে লিখতে দেখি, সূর্যসিদ্ধান্তের গণনা ভুল ইত্যাদি, গ্রেগোরিয়ান কারেক্ট। সেটা সত্যি না। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে এই গ্রেগোরি কে, তিনি কীভাবে ঠিকটা জানলেন, তার ইতিহাস দেখতে গেলে দেখা যাবে, এটা টোকা জিনিস এবং যাঁদের জ্ঞানলব্ধ বস্তু থেকে টোকা, তাঁরা কেরালার 'আর্যভট গণিতবিদ্যালয়'-এর সদস্য ছিলেন। কেরালার সঙ্গমগ্রামের আচার্য মাধব এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। জ্যেষ্ঠদেব, নীলকণ্ঠ, শঙ্কর ইত্যাদি নামের শিষ্যবৃন্দ সেই বিদ্যালয়ের গৌরব বৃদ্ধি করেছিলেন। ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো ডা গামার কালিকটে আগমন ও তার পরবর্তী উদ্ভূত স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয় সম্ভবত এই বিদ্যালয়, যদিও গ্রেগোরিয়ান রিফর্ম তার অনেক পরের ঘটনা। ততদিনে প্রাচ্যদেশের জ্ঞান চুরি করার জন্যে বহুস্থানে গজিয়ে গেছে বহু গির্জা, স্থাপিত হয়েছে বহু মিশন। 

সে সব গল্প অন্যদিন হবে। আজ বছরের প্রথম দিন। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন। নতুন বছর সকলের জন্যে আনন্দময় হোক, খুশির হোক, সুখের হোক - এই প্রার্থনা।

বৃহস্পতিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২২

ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ~ অমিতাভ প্রামাণিক

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ বা ইকনমিস্ট শুনলেই যে নামগুলো গড়গড় করে মাথায় আসে, তা হচ্ছে অমর্ত্য সেন, অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জী, মনমোহন সিং, সুব্রহ্মণ্যম স্বামী, কৌশিক বসু, প্রণব মুখার্জী, অসীম দাশগুপ্ত, অমিত মিত্র প্রমুখ। অথচ মৌলিক ধারণা ও ভারতীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাবে সমুজ্জ্বল এক রত্নের জন্মদিন আজ, অর্থনীতিবিদ হিসাবে তাঁর নাম শোনা যায় না বিশেষ। 

তিনি ভারতের সংবিধানের রূপকার – ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। 

১৮৯১ সালের ১৪ই এপ্রিল মহারাষ্ট্রের এক অন্ত্যজ (অস্পৃশ্য!) মাহার পরিবারের চোদ্দ নম্বর সন্তান হিসাবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভীমরাও। পিতৃপুরুষেরা ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীচুতলার সৈনিক। খুব অল্পবয়সে মাকে হারান তিনি, মানুষ হয়েছিলেন পিসির কাছে। চোদ্দজন ভাইবোনের মাত্র পাঁচজন যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন। স্কুলে যেতেন চটের ব্যাগ নিয়ে, তাতেই বসতে হত অন্যদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে। জলতেষ্টা পেলে স্কুলের (উচ্চবর্ণের) পিওন দূরত্ব বজায় রেখে জল ঢেলে দিত, সেই জল আঁজলা ভরে পান করতে হত। যেদিন পিওন স্কুলে আসত না, সেদিন জল পাওয়া যেত না। 

পরিবারের পদবি ছিল সকপাল, কিন্তু রত্নগিরির অম্বাদাবে গ্রাম থেকে এসেছিলেন বলে বাবা তাঁকে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন অম্বাদাবেকর নামে। ভীমরাওয়ের পড়াশুনা ও আচরণে সন্তুষ্ট শিক্ষক উচ্চবর্ণীয় কৃষ্ণজি কেশব আম্বেদকর স্কুল রেজিস্টারে তাঁর পদবি পরিবর্তন করে আম্বেদকর করে দেন। 

ষোল বছর বয়সে বোম্বে ইউনিভার্সিটির অধীনস্থ এলফিনস্টোন কলেজ থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি – মাহার কমিউনিটির মধ্যে প্রথম। তার আগের বছরেই তার বিয়ে হয়ে গেছে। ম্যাট্রিকের পাঁচ বছর পরে তিনি অর্থনীতি ও পলিটিক্যাল সায়েন্সে বোম্বে ইউনিভার্সিটি থেকে বিএ পাশ করে বরোদা রাজ্যে চাকরি করতে যান। বরোদারাজ সয়াজিরাও গায়কোয়াড়ের আনুকূল্যে তাঁর কপালে মাসে সাড়ে এগারো পাউন্ডের স্টেট স্কলারশিপ জুটে যায় তিন বছরের জন্যে, উচ্চশিক্ষার জন্যে তিনি চেপে বসেন আমেরিকাগামী জাহাজে। নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার জন্যে এই স্কলারশিপ। 

এই তিন বছরে আম্বেদকর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ২৯টা, ইতিহাসে ১১টা, সোশিওলজিতে ৬টা, দর্শনে ৫টা, নৃতত্ত্বে ৪টে, রাজনীতিতে ৩টে এবং ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষায় ১টা করে কোর্স করেছিলেন। ১৯১৫ সালে তিনি এম এ ডিগ্রি লাভ করেন, তার দু-বছর পরে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডক্টরেট ডিগ্রি পান। অর্থনীতিতে তিনি ভারতের প্রথম ডক্টরেট এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ডবল-ডক্টরেট, একটা ডিগ্রি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, দ্বিতীয়টা লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি একটা এম এসসি ডিগ্রিও পেয়েছিলেন! তাঁর সময়ে তাঁর সমতুল্য ডিগ্রিধারী ব্যক্তি ভারতে সম্ভবত আর কেউ ছিলেন না। 

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবমিট করা তাঁর থিসিস ও পেপারগুলো প্রত্যেকটাই মৌলিক ধারণায় এক একটি আকরগ্রন্থ। এগুলোর শীর্ষক – 'Ancient Indian Commerce', 'Castes in India – their Mechanisms, Genesis and Development', 'National Dividend of India - A History and Analytical Study'. 

লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে তিনি এম এসসি পান 'Provincial Decentralization of Imperial finance in British India' শীর্ষক থিসিসের জন্য। ডি এস সি-র থিসিস শীর্ষক 'The Problem of the Rupee – Its Origin and Its Solution'. এর কাজ করার মাঝপথেই ১৯১৭ সালের জুন মাসে বরোদারাজ-প্রদত্ত স্কলারশিপ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে বাড়ি ফেরার জাহাজ ধরতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে থিসিস জমা দিতে। আম্বেদকর আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে কেনা তাঁর সমস্ত বইপত্র আলাদা এক জাহাজে পাঠিয়ে দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাজার তখন, সেই জাহাজ টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দেয় জার্মান সাবমেরিন। 

বরোদারাজের সঙ্গে চুক্তিমতো তাদের 'মিলিটারি সেক্রেটারি'-র চাকরি নিতে বাধ্য হন আম্বেদকর, যদিও ব্যাপারটা সুখকর ছিল না। বরোদায় পৌঁছানোর খরচা তাঁকেই বহন করতে হয়েছিল। জাহাজডুবির জন্যে থমাস কুক তাঁকে যে ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল, তা চলে যায় এই খরচা মেটাতে। 

পরে প্রথম সুযোগেই তিনি লন্ডনে ফিরে গবেষণার কাজ শেষ করেন ও ডি এসসি ডিগ্রি পান। রয়্যাল কমিশন অন ইন্ডিয়ান কারেন্সি অ্যান্ড ফিনান্সে (হিল্টন ইয়াং কমিশন) জমা দেওয়া তাঁর থিসিসে তাঁর অনুমোদনসমূহ – যাতে তিনি মুদ্রাস্ফীতি ও ভারতীয় মুদ্রার ক্রমাগত পতন এড়াতে এর 'জেনারেল পার্চেজিং পাওয়ার' নির্দিষ্ট মাত্রায় বেঁধে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন – থেকে জন্ম নেয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-র ধারণা। 

সমস্ত ভারতবাসীর সমান অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, নারীর অধিকার ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ে আম্বেদকরের চেয়ে বেশি সরব কেউ ছিলেন না। গান্ধীর প্রকাশ্য সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইংরেজদের কাছে নিজেকে প্রোগ্রেসিভ প্রতিপন্ন করতে যে গান্ধী ইংরাজি ভাষায় দলিত হরিজনদের ওপর উচ্চবর্ণের অত্যাচারের কথা বলেন, সেই একই গান্ধী গুজরাতি ভাষায় লেখা তাঁর প্রবন্ধগুলিতে বর্ণভেদের একনিষ্ঠ প্রচারক। ১৯৩০ সালে গান্ধীর প্রবল-প্রচারিত ডান্ডি মার্চের তিন বছর আগে আম্বেদকর মাহার অন্ত্যজদের নিয়ে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেছিলেন চাওদার তালাও থেকে বঞ্চিত তাদের জলপান করিয়ে। ভাইসরয় এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের উল্লেখযোগ্য সদস্য (লেবার মিনিস্টার) হিসাবে আম্বেদকরই কারখানার শ্রমিকদের দিনে বারো ঘন্টার বদলে আটঘন্টা কাজের এবং ডি এ, ছুটির অধিকার, বীমা, মেডিক্যাল লীভ, পে-স্কেল ইত্যাদি আধুনিক ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন।

দেশের জল ও বিদ্যুৎ নীতি রূপায়ণে (দামোদর ভ্যালি, ভাকরা নাঙ্গাল, হিরাকুদ ইত্যাদি বাঁধ প্রকল্পে এবং সেন্ট্রাল টেকনিক্যাল পাওয়ার বোর্ড, সেন্ট্রাল ইলেকট্রিক্যাল অথরিটি স্থাপনে) তাঁর ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রদেশ ও বিহারের মত বড় রাজ্যকে ভাগ করে দেওয়ার কথা লিখে গেছিলেন তাঁর Thoughts on Linguistic States বইতে, যা রূপায়িত হতে লেগে গেল ৪০-৪৫ বছর। ১৯৫১ সালে তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় ফিনান্স কমিশনের। কাশ্মীর-সংক্রান্ত সংবিধানের ধারা ৩৭০ এবং রিজার্ভেশন-সংক্রান্ত নীতির প্রবল বিরোধী ছিলেন আম্বেদকর। হিন্দু নারীর অধিকার প্রসঙ্গে তাঁর আনা বিল – যাতে ছিল বিবাহিতা নারীরা পিতার সম্পত্তির অধিকারিণী হবে, ডাইভোর্সে পুরুষ-নারীর সমান অধিকার থাকবে, বিধবা ও ডাইভোর্সিদের পুনর্বিবাহে অধিকার থাকবে, পলিগ্যামি বে-আইনি ঘোষিত হবে, ইত্যাদি – সংসদে গৃহীত না হলে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর পদ থেকে তিনি ইস্তফা দেন।  

মাহার জাতের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর তাঁর সম্মানে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, সেখানে কিশোর ভীমরাওকে দাদা কেলুস্কর নামে একজন লেখক বুদ্ধের জীবনীগ্রন্থ উপহার দিয়েছিলেন। আম্বেদকর সেই বই পড়ে প্রভাবিত হয়ে বুদ্ধের শরণ নিতে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ভারতের বর্ণাশ্রম প্রথার উদ্ভব বিষয়ে তাঁর প্রচুর লেখালিখি, যাতে তিনি আর্য-অভিযান তত্ত্বকে নস্যাৎ করে শূদ্রজাতির উদ্ভব বিষয়ে তাঁর মত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

মধুমেহ রোগে হীনস্বাস্থ্য হয়ে ১৯৫৬ সালের ৬ই ডিসেম্বর মৃত্যু হয় এই স্পষ্টবাদী মনীষীর।  

১৪ই এপ্রিল ২০২১

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২২

"রেফার রোগ"~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

রেফার রোগ অর্থাৎ আননেসেসারি রেফারাল এর সর্বজনগ্রাহ্য কারণ খুঁজতে সিস্টেম এনালিসিস করে প্রথমেই যেটা মাথায় আসে তা হল - উপযুক্ত সংখ্যায় উপযুক্ত ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীর অভাব। সংখ্যার বিষয়টা পরে আসছি। আগে এই উপযুক্ত ডাক্তার শব্দটা নিয়ে নাড়াচাড়া করা যাক। বিশেষজ্ঞ ছেড়ে অ বিশেষজ্ঞ বা সাধারণ ডাক্তারের কথা আগে, সরকারি পরিভাষায় যাদের নাম জেনারেল ডিউটি এম ও। ধরুন একটি ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। তাতে নিয়ম অনুযায়ী যত জন GDMO থাকার কথা তাই আছে। তাহলে কি অপ্রয়জনীয় রেফারাল আটকানো যাবে ? যাবে না। এক এক করে আসুন। 

নলেজ এর ঘাটতি। সাপের কামড় গত বারের পরীক্ষায় এসেছিল তাই এবারে সেটা না পড়েই পরীক্ষা দিতে যাওয়া ও এমবিবিএস পাশ করে যাওয়া সম্ভব। ফলে সেই ডাক্তার ডিউটিতে থাকলে সাপে কাটা রুগী রেফার হবেই। স্কিল এ ঘাটতি। এপিসিওটমি রিপেয়ার করতে জানে না, নরমাল ডেলিভারি নিজের হাতে কোনোদিন করায় নি এমন জিডিএমও দেখেছি। পোস্টিরিয়ার ন্যাজাল প্যাকিং দিতে পারে না, ছোট বাচ্চাদের ফ্লুইড চালাতে পারে না এমন ডাক্তারও দেখেছি। সেই ডাক্তার ডিউটিতে থাকলে ওই সব কেস রেফার হতে বাধ্য। দোষটা তার নয়, সিস্টেম এর দোষ। সিস্টেম তাকে সুযোগ দিয়েছে এই ভাবে বেড়ে ওঠার। 

এবারে আসুন নেক্সট পয়েন্টে। এক্সপেরিয়েন্স এ ঘাটতি। ডার্মাটোলজি এর ইন্টার্নশিপ এর সময় কোনো কুষ্ঠ রুগী দেখেনি। অগত্যা সাসপেক্ট কেস এলেই রেফার। একজন ডাক্তার কেস ডায়াগনসিস করতে পারছে না অভিজ্ঞতার ঘাটতির জন্য সে জীবনে জলাতঙ্ক রোগীই দেখেনি। কিন্তু তার সহকর্মী দেখেছে। তার সাথে কনসালটেশন এর কোনো চল নেই। জেলাস্তর থেকে তার নিচের হাসপাতালে কোনো ক্লিনিক্যাল মিটিং, ক্লিনিক্যাল অডিট এর চল নেই, প্যাথলজিক্যাল অটপসি এর ব্যবস্থা নেই। বেশ বোঝা যাচ্ছে যে স্রেফ উপযুক্ত সংখ্যায় ডাক্তার দিলেই রেফার আটকানো যাবে না। নলেজ, স্কিল, এক্সপেরিয়েন্স এর ঘাটতি মেটাতে মেডিক্যাল এডুকেশন, ট্রেনিং, পরীক্ষা পাস, পাস করার পরে continuing Medical Education বা CME - এই গোটা সিস্টেমটা নিয়েই ভাবতে হবে। জেলা স্তরে ক্লিনিক্যাল বিষয় যেমন ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট, বা পয়জনিং এর ট্রেনিং এ ও দেখেছি ২০- ২৫% অনুপস্থিত থাকেন। অতএব মেকানিক্যালি CME কথাটা উচ্চারণ করলেই সমস্যা মিটবে না। সরকারি চাকরিতে ঢোকার পরে উপযুক্ত সময় ধরে সবার ইনডাকশন ট্রেনিং হোক, নিয়ম কানুনের পাশাপাশি এসেন্সিয়াল SOP গুলোও আলোচনা হবে। IAS দের ট্রেনি থাকতে হয় কত দিন ? 

এবার আসুন।  এটিচুড এর ঘাটতি। একই কেস একই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন দেখে দিচ্ছে আর অন্য জন রেফার করছে। দুজনের যোগ্যতা একই এমনটাও দেখেছি। যে রেফার করছে তার দৃষ্টিভংগী কিঞ্চিৎ ভিন্ন। সে হয়তো ঝুঁকি নিতে চায় না, কেস কিছুটা খারাপ , মরে গেলে রুগীর বাড়ির লোকের হাতে মারধর, বা CPA ইত্যাদি। এই দৃষ্টিভঙ্গি কি ভাবে পাল্টানো যাবে সে মস্ত প্রশ্ন। গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে নিরাপত্তার নূন্যতম ব্যবস্থা না করে বা আধা শহরের মহকুমা / জেলা হাসপাতালগুলিতে প্রশিক্ষণ বিহীন নিরাপত্তা কর্মীদের দিয়ে নাম কা ওয়াস্তে ব্যবস্থা করে কি ভাবে ডাক্তার সহ অন্যান্য কর্মীদের মনে নিরাপত্তার ভাব জাগানো যায় সেটা মস্ত চ্যালেঞ্জ। 

ধরা যাক কোনো এক যাদু মন্ত্র বলে ওপরের বর্ণিত ওই ঘাটতি গুলি মেটানো গেল। এবারেও কি রেফার আটকানো যাবে ? ডাক্তার একদম ঠিকথাক, কিন্তু ধরুন যদি উপযুক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার সুবিধে না থাকে ? ছোট গ্রামীণ হাসপাতালের কথা ছেড়েই দিন। কটা জেলা হাসপাতালে ২৪ x ৭ এক্স রে ইসিজি, প্যাথলজি, বায়কেমিস্ট্রি এর ব্যবস্থা থাকে ?  হয় মেশিন নেই, অথবা টেকনিশিয়ান/ টেকনোলজিস্ট নেই অথবা রিয়েজেন্ট নেই, মেশিন আছে, কিন্তু সেটা বিকল। বিকল মেশিনকে তাড়াতাড়ি সচল করার কোনো ফুলপ্রুফ সিস্টেম এদ্দিন এও তৈরি করা গেল না। কেন গেল না ? উপযুক্ত সংখ্যায় ডাক্তার না পাওয়ার একটা যুক্তি আছে। কিন্তু প্যারামেডিকেল বা নার্সিং স্টাফ না পাওয়ার কি যুক্তি আছে। একটিবার খোঁজ করে দেখুন তো শেষ কবে MT lab বা MT opto রিক্রুটমেন্ট হয়েছে ? 

আর এই উপযুক্ত সংখ্যা কথাটাই তো ভীষন গোলমেলে। সরকার এর ম্যানপাওয়ার নর্ম হল ১৯৯১ সালের establishment table নামের একটি বস্তু। তার পরে গঙ্গা তিস্তা দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেল, Indian Public health standards, quality assurance কত কি ম্যান পাওয়ার নর্ম এলো গেল কিন্তু সেই ৯১ এর টেবল এর কোনো রিফর্ম হল না। রিফর্ম বাদ দিন। ওই টেবিল অনুযায়ী কটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, মহকুমা হাসপাতালে কর্মী নিযুক্ত আছে ? সব ধরনের কর্মীর অপ্রতুলতা। এমন কি কেরানিদের ও। আপনি বলবেন রেফার আটকাতে কেরানীর কি ভূমিকা ? আরে বাবা, একটা চিঠি, ধরুন যন্ত্র খারাপ সেটা লিখতে বা ডাক্তারদের ছুটির হিসেব রাখতেও তো ডিলিং এসিস্ট্যান্ট লাগে। PsC বাদ দিয়ে নিজস্ব হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড তৈরি হয়েছিল এসব এর জন্য। তারা করে টা কি ? ডোম এর পোস্ট ফাঁকা। তাদের জন্য একটা সঠিক TOR তৈরি করা গেল না ? PhD ক্যান্ডিডেট এপ্লাই করছে আর লোকে হাসছে।  

আর অভাবের সংসারে সবচেয়ে বেশি লাগে প্ল্যানিং। আমাদের ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিং এর নমুনা ? রুগী মৃত্যুর পরে কাগজ পড়ে জানা গেল যে জেলা হাসপাতালে ছয় জন অর্থোপেডিক সার্জেন ছিল। আর এদিকে অন্য জেলা হাসপাতালে একজন মাত্র। এই posting কে করলো কিভাবে করলো, কেন তাকে শো কজ করা হবে না ? দোষ কেবল ক্লিনিশিয়ানদের ? সেই স্বাস্থ্য প্রশাসকদের নয় ?

সব শেষে আসুন রেফার এর সবচেয়ে বাজে কারণটাতে। ফাঁকিবাজি। আপনি যদি দিনের পর দিন দেখেন যে আপনার ফাঁকিবাজ সহকর্মী আর আর আপনি মাসের শেষে একই মাইনে পান, বছর শেষে একই ইনক্রিমেন্ট তাহলে আপনিই বা "বোকা" এর মতো খাটতে যাবেন কেন। পারফরমেন্স বেসড ইনসেনটিভ বলে কিছু নেই। না মানিটারি, না নন-মানিটারি। এর উল্টো দিকে শাস্তি ? দূরে বদলির ভয় ? অর্ধেক তো চাকরিই ছেড়ে দেয়। আর বদলি হতে হবে জেনে শুনে যারা চাকরিতে আসে তাদের মনে ওই ভয় কতটা কাজ করে বলে আপনার মনে হয় ? আর যাদের ভয় আছে তাদের জন্য তো ইউনিয়ন আছে। 

আর কাজের পরিবেশ ? কষ্ট করে লেখা পড়া শিখে আই এর মাইক্রো সার্জারি শিখে আসা সার্জেনকে দিয়ে মেডিকো লিগ্যাল পোস্ট মর্টেম করিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করে এই সিস্টেম। নিত্য ঝামেলার জন্য হাসপাতাল সুপার এর পোস্ট এখন স্বাস্থ্য প্রশাসকদের কাছে বিভীষিকা। সবাই প্রোগ্রাম অফিসার হতে চায়। আর ক'জন সুপার এর হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট এর ডিগ্রি ডিপ্লোমা আছে ? বড়জোর DPH বা MPH এই তো।  ক'জন সিএমওএইচ এর বড় হাসপাতাল চালানোর অভিজ্ঞতা আছে ? প্রমোশন পলিসিতেও গন্ডগোল। 

আর আমাদের প্ল্যানিং এর নমুনা ? কোটি টাকা ব্যয় করে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি হল তাতে কোনো অফিস কমপ্লেক্স ঘর নেই। সুপার কি রাস্তায় বসে অফিস চালাবে ? তাই সই। আরো আজব ব্যপার হল তাতে ছ টা OT আছে কিন্তু কোনো ফার্মেসি স্টোর নেই। এত ওষুধ পত্র যন্ত্রপাতি, লিনেন রাখবে কোথায়। হেন হাসপাতাল নেই যে খানে প্রায় প্রতিমাসে আদেশ আসে ওপর থেকে অমুক ক্লিনিক খুলতে হবে, তমুক OPD খুলতে হবে। আজ জেরিয়াট্রিক তো কাল টেলিমেডিসিন। সুপার জায়গা বের করবে কি করে সে নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই ওপরওয়ালাদের। ফলে সংকুচিত হয় সেই ইনডোর ইনডোর এর করিডোর, বারান্দা। ফলে বেড নেই, ফলে রেফার। এ ভাবে কোনো সভ্য দেশে হসপিটাল সিস্টেম চলে না। 

সবটা মিলিয়ে খুব জটিল অপ্রীতিকর একটা পরিস্থিতির মধ্যে স্বাস্থ্যকর্তারা রেফার রোগের মোকাবিলায় নেমেছেন। দুটো হাসপাতাল সারপ্রাইজ ভিজিট করে (এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে ভিজিট করে কেন জানতে হবে কোথায় "বেশি" ডাক্তার সেটা বোধগম্য নয়, ডাটাবেস কি হল তাহলে?) সেই রোগ সারানো যাবে না। হ্যাঁ কিছু লোক খেপিয়ে তোলা যাবে। ইন্দ্ধন যোগানোর জন্য সবজান্তা সংবাদ মাধ্যম তো আছেই। 

রেফার রোগ সারাতে গেলে সঠিক তথ্য সংগ্রহ (তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার) করা দরকার সবার প্রথমে। তার সাথে সঠিক যুগোপযোগী চিন্তাভাবনা যুক্ত করে সঠিক পরিকল্পনা করার দরকার। প্রচুর খাটতে হবে, সিস্টেম এর খোল নলচে পাল্টে রিফর্ম করতে হবে। দেশ বিদেশের বেস্ট প্রাকটিস মডেলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে আর প্রতিপদে সঠিক চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট টেকনিক এর প্রয়োগ করে সব স্টেকহোল্ডারদের এই রিফর্ম এ সামিল করতে হবে। একা কোনো সুপার বা সিএমওএইচ ধমকে চমকে এটা করতে পারবে না। 

সাধারণ মানুষের হয়রানি যাতে কমে (শূন্য করা সম্ভব নয়), গরীব মানুষ যাতে আরও গরীব না হয়ে যায় তার জন্য তার বাড়ির কাছের (ডোর স্টেপ) সরকারি ছোট বড় হাসপাতালে যতটা সম্ভব চিকিৎসা দেয়াটা আমাদের দায়িত্ত্ব কর্তব্য এ নিয়ে কোনো বিতর্কই চলতে পারে না। কিন্তু এই সীমিত বাজেট নিয়ে স্রেফ ধমকে চমকে সেই কর্তব্য পালিত হবে কিভাবে - সেই সুস্থ বিতর্ক চলতে থাকুক যতক্ষণ না বাস্তব সম্মত সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসে। স্রেফ ডাক্তার নয়, চিকিৎসাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষও এই বিতর্কে অংশ নিন। 

সব শেষে বলবো আমাদের আশাবাদী হতেই হবে। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এই সিস্টেমটা খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার নিরিখে বলতে পারি, ডাক্তার সহ অধিকাংশ কর্মচারীরা বেসিক্যালি ফাঁকিবাজ নন, তারা কাজ করতে চান। উপযুক্ত কাজের পরিবেশ চান শুধু, সঙ্গে একটু ঠিকমতো ব্যাকআপ সাপোর্ট সিস্টেম। কোভিড এর সময় এই সহকর্মীদের নিয়ে মিরাকল দেখিয়েছি আমরা। সব্বাই ভয়ে পালিয়ে গেছে। তাবড় দাপুটে নেতা মন্ত্রীসান্ত্রিরা হাসপাতালের ৫০০ মিটারের মধ্যে আসেন নি। স্রেফ ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মী - এরাই বুক দিয়ে আগলিয়েছে সরকারি হাসপাতালের সিস্টেম। ধমকে চমকে এ জিনিস হয় নি। আমাদের ওপর ভরসা রাখুন আমাদের পাশে দাঁড়ান সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে। আমরা নিরাশ করবো না।