রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

ভাষা বিদ্বেষ ~ সৌরদীপ চ্যাটার্জী

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা পৃথিবীর সমস্ত মাতৃভাষার দিন আজ—ঊনসত্তর বছর আগে যার পথ দেখিয়েছিল একদল বাঙালি ছাত্র। ভাষা বড় বিচিত্র এক বস্তু, বিচিত্র তার ইতিহাস। বোধ হয় তার থেকেও বিচিত্র হল—তাকে নিয়ে ঝগড়া করা। মজার কথা হল, এই ঝগড়া করতে গেলেই প্রায়ই সেমসাইড গোল হয়ে যায়। অথচ আমরা খেলাটা এতই কম বুঝি যে, ওতেই ধেই ধেই করে নাচতে থাকি, বুঝিও না যে বল কোন পোস্টে ঢুকল। চলুন সেরকমই কিছু গল্প হোক একটু।

আজ থেকে এক হাজার বছর আগে হিন্দুকুশ পেরিয়ে ভারতে অভিযান চালিয়েছিলেন মুহম্মদ ঘুরী, তার পাঁচশো বছর পরে বাবর। আজ একশ্রেণির বাঙালি রোজ ভয়ে দিন গুনছেন, এই বুঝি সেইরকম কোনও সৈন্য ইছামতী পেরিয়ে বনগাঁর দিকে ধেয়ে আসে। তাঁরা সেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে চোলায় চোলায় জয়ের ভেরি বাজাতে চান। ফলে বাংলায় কেন আরবি শব্দ থাকবে, কেন ফারসি থাকবে, 'পানি' বলা হবে, কেন 'গোসল' শব্দটি থাকবে—সেসব নিয়ে ঘোর আপত্তি তুলছেন। খুবই সঙ্গত দাবি। তবে তাহলে বোধ হয় তাঁদের উচিত, আইনকানুনের জন্য উকিলের কাছে না যাওয়া, মহকুমা কোনটা সেটাও না দেখা, অন্যকে হাজতবাসের ভয় না দেখানো বা কলকাতার বাইরে কোনও জেলার বাসিন্দা হলে সেটাও না বলা। কেননা—'আইন', 'কানুন', 'উকিল', 'মহকুমা', 'হাজত', 'জেলা' (দিলা) ইত্যাদি সবই আসলে আরবি শব্দ। আপনি ইংরেজিতে পেন না বলে বাংলায় কলম বলুন, সে কলমও আসলে আরবি। কাউকে বিদায় দিতে চাইবেন, সেই 'বিদায়'-ও আরবি। আমার কথা নয়, স্বয়ং সুকুমার সেন 'ভাষার ইতিহাস' বইতে এসব লিখে গেছেন। চাইলে কোনও অভিধান খুলেও শব্দমূল দেখে নিতে পারেন।

শুধু কি তাই? আপনি যে শব্দের আগে বসান 'আম-আদমি', 'আমজনতা', 'খাসজমি', 'খাসমহল'—সেই আম বা খাস সবই আরবির দেওয়া। গরম লাগলে যে একটু হাওয়াবাতাস গায়ে লাগাবেন তারও উপায় নেই। 'হাওয়া' আরবি; 'বাতাস' ফারসি। এদিকে আপনি যদি সংস্কৃত শব্দটা ধরে বলেন, একটু 'বায়ু' খেতে যাচ্ছি; পাবলিক অন্যকিছু ধরে নেবে। বায়ুত্যাগ বললে আরও জ্বালা, লোকে গ্যাস ছাড়া ধরে নিয়ে নাকে রুমাল দিতে পারে। সেই যে রবীন্দ্রনাথের উপেন বলেছিল, 'শুধু বিঘে দুই, ছিল মোর ভুঁই...', ব্যাস, তারপর আর কেউই ভুঁই (তদ্ভব) কেনে না, সবাই 'জমি' (ফারসি) কেনে। তা, জমি থাকলে একটা বাগানবাড়িও তুলে ফেলতে পারেন। ওহো, আবার গোলমাল হল—'বাগান' তো তুর্কি। আপনাকে 'উদ্যানবাটী' বানাতে হয় তাহলে। দেখবেন, বানান ভুল করবেন না যেন! অবশ্য বাগানবাড়ি তুলতে খুবই খরচ। এই 'খরচ' আবার ফারসি। খরচ বেশি না করাই ভাল যদিও। অমুক ডেটে অমুক খরচা বলে অনেকে হিসেব করে। অবশ্য ডেট আবার কী, আজ মাতৃভাষা দিবস, বলুন, তারিখ। কিন্তু এও এক জ্বালা... 'তারিখ' আবার আরবি। দোকানে জিনিসপত্র দর করবেন, সেই 'দর'-ও তাই, আরবি। 'দোকান'—ফারসি। কী জ্বালা বলুন দিকি!

সবচেয়ে বড় কথা, এই যে 'পানি'-র বিরুদ্ধে জিহাদ করছেন...সরি, যুদ্ধ করছেন, সে পানি আদপেই আরবি নয়, তা সংস্কৃত 'পানীয়' থেকেই এসেছে। 

এমনকি আরবি-ফারসি ঠেকাতে এই বোদ্ধা এবং যোদ্ধারা যার হাত ধরছেন, সেই হিন্দিতেই কি সমস্যা কম? কম তো নয়, বরং বেশি—বাংলার চেয়ে হিন্দির অনেক বেশি শব্দ আরবি-ফারসি থেকে নেওয়া। বেশিদূর যেতে হবে না, এই যে গান করেন, 'অগর' তুম মিল যাও, এই 'অগর' (যদি) এসেছে ফারসি থেকে। অমিতাভের ব্লগবাস্টার সিনেমা দিওয়ার—শব্দটা আসলে ফারসি। 'শহর' ফারসি, 'নগর' সংস্কৃত। 'হাম আভি জিন্দা হ্যায়'—সেই 'জিন্দা' ফারসি, 'কুদরত' আরবি, 'দুনিয়া'—বাংলা হিন্দি উভয়েই আছে—আরবি। 'গুজরনা' ফারসি, 'বাবু কো কুর্সি দো'—এই কুর্সি আরবি। 'ওয়াক্ত' (সময়)—আরবি, 'তকরীবন' (ওই মোটের ওপর), 'মুশকিল', 'খবর', 'অখবর' (বহুবচন), 'মহব্বত', 'বিলকুল', 'আখির', 'আজিজ', 'ফিলহাল' (বর্তমানে), 'মওত' (মৃত্যু), 'সহি', 'ইজাজত' (অনুমতি)—এসবই হল আরবি থেকে আসা। বল মা তারা, দাঁড়াই কোথা—!

আমাদের দেশে ঝালে-ঝোলে, অম্বলে, ডায়োভলে, প্যানফর্টিতে ধর্ম গুঁজে দেওয়ার রীতি আছে। ফলে এইভাবেই ভাষার সঙ্গেও ধর্মকে ভিড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হিন্দি হিন্দুর ভাষা, উর্দু মুসলমানের ভাষা, বাঙালি না মুসলমান—ইত্যাদি অনেক কিছুই চলে। এ' অবশ্য আজকের নয়, বহুদিনের। ১৮৭৭ সালে ভরতেন্দু হরিশচন্দ্র—যাঁকে বলা হয় আধুনিক হিন্দি ভাষার জনক—তিনি একে প্রায় গণ-অভ্যুত্থানের রূপ দিয়েছিলেন। তার আগে অবধি উত্তরপদেশে—তৎকালীন যুক্তপ্রদেশে উর্দুই ছিল সরকারি ভাষা, দপ্তরের ভাষা। পরে ব্রিটিশের আগমনে ইংরেজি এসেছিল সঙ্গে। অথচ মজার কথা, হিন্দি বা উর্দু আসলে একই ভাষার দুই সন্তান, যাকে বলে হিন্দুস্তানি। এই হিন্দুস্তানি বা হিন্দভি ভাষাই ছিল যুক্তপ্রদেশ থেকে রাজপুতানার এক বিরাট অংশের ভাষা। আঠারো শতকের আগে সম্ভবত 'উর্দু' বলে কোনও শব্দের অস্তিত্বই ছিল না। উর্দু আরবের ভাষা নয়, পারস্যের ভাষা নয়, এমনকি আফগানিস্তানের ভাষাও নয়। উর্দুর জন্ম এদেশে, এই ভারতবর্ষেই। তাও একেবারে ভারতের মধ্যভাগে, গাঙ্গেয় সমভূমিতে। বাংলা, ওড়িয়া, তামিল, অসমীয়ার মত উর্দুও একটি খাঁটি ভারতীয় ভাষা।

উর্দু সম্পর্কে এও বলা হয়—উর্দু নাকি 'লস্করি জবান'—অর্থাৎ সৈনিকের ভাষা। কারণ অনেকে মনে করেন, উর্দুর জন্ম হয় মুঘল সৈন্যবাহিনীতে। এ মতও আজ আর চলে না। উর্দু বলে যা আমরা চিনি, সেই হিন্দুস্তানির জন্ম ভারতীয় অপভ্রংশ অবহটঠ থেকেই। মুঘলযুগের আগেও এর অস্তিত্ব ছিল, স্বয়ং আমির খসরুও এই ভাষাতেই কাব্যচর্চা করেছেন। 

হিন্দিকে আজ মানা হয় হিন্দুর ভাষা বলে, পবিত্র ভাষা বলে। হিন্দি কীভাবে পবিত্রতা পেল তা অবশ্য জানা নেই। তবু বহু বঙ্গসন্তান আজ পশ্চিমবঙ্গকে আরব-পারস্যের দস্যুদের হাত থেকে বাঁচাতে হিন্দিতে কথা বলার পথ ধরছেন। যদিও এও আজকের কথা নয়। ১৯২৯ সালে বেরিয়েছিল 'হিন্দি সাহিত্য কা ইতিহাস', লেখক বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা পণ্ডিত আচার্য রামচন্দ্র শুক্লা। তিনিই অত্যন্ত সুচারুভাবে হিন্দিকে সংস্কৃতের উত্তরসূরি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন এবং উর্দুর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। মজার কথা, 'হিন্দি' শব্দটাই আসলে সংস্কৃত নয়, সম্ভবত বৈদিকও নয়। 'হিন্দি' এসেছে ফারসি থেকে, যার অর্থ হিন্দের অধিবাসী। এমনকি 'হিন্দু' শব্দটিও তাই—পারস্যের। বেশিদূর যেতে হবে না, এনসিইআরটির সরকারি বইতেই এই তথ্য মিলবে, স্কুলে পড়ানো হয়।

উর্দু নিয়েও সে কি টানাটানি! দেশভাগের পর স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হল, তার অফিশিয়াল ভাষা করা হল উর্দুকে। অথচ পাকিস্তান যে যে অংশ নিয়ে তৈরি, তা হল সিন্ধ—যার ভাষা সিন্ধ্রি, পশ্চিম পাঞ্জাব—যার ভাষা পাঞ্জাবি, বালোচিস্তানের একাংশ—যার ভাষা বালোচ, খাইবার পাখতুনখোয়ার ভাষা পশতো এবং এদিকে পূর্ব বাংলা—যার ভাষা বাংলা। এছাড়া দুইদিকেই রয়েছে প্রচুর ছোটোখাটো ভাষাগোষ্ঠী। আজও গোটা পাকিস্তানের সম্ভবত ১০%-এরও কম লোকের মাতৃভাষা উর্দু। তারপরেও উর্দুই পাকিস্তানের 'লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা'—ইসলামের প্রতীক। এ এক বিচিত্র প্যারাডক্স! পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্না নিজেও এর চেয়ে কম বৈচিত্র্যময় ছিলেন না। জিন্না নিজে খিলাফত আন্দোলনেও যোগ দেননি, কোনোদিন দাড়ি রাখেননি, বিবাহ করেছিলেন এক অমুসলিমকে এবং শোনা যায় কোনোদিন নাকি নমাজ অবধি পড়েননি। এককালে ছিলেন কামাল আতাতুর্কের ভক্ত। অথচ সেই তিনিই পরে দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রচার করলেন।

আরও একটা কথা কী জানেন? আমাদের দেশের প্রথম ফারসি সংবাদপত্র দিল্লি, হায়দরাবাদ, লাহোর বা আগ্রাতে নয়, প্রকাশিত হয়েছিল এই কলকাতায়। নাম ছিল—'মীরাট-উল-অখবর'। প্রকাশক কোনও মুঘল বা পাঠান ছিলেন না। তাঁর নাম ছিল রামমোহন রায়। ভাষাবিদ সুকুমার সেন যার সম্পর্কে লিখেছেন, "তিনি সংস্কৃত জানিতেন, ফারসী (এবং আরবীও সম্ভবত) আরও ভাল করিয়া জানিতেন, তিনি ভারতবর্ষের ইংরেজি শিক্ষিতদের অগ্রণী।..." 

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাই ভাষা নিয়ে আবেগের পাশাপাশি কিছু সহজ সত্যিকেও জেনে রাখা জরুরি। নিজের দেশকে নিয়ে গর্বিত হওয়াই যায়, কিন্তু সেই গর্বের কারণগুলো ঠিকমত বেছে নিতে পারলে আরও ভাল হয় আরকি। বেদে সব আছে, পুরাণে সব আছে, মহাভারতে প্লাস্টিক সার্জারি ছিল, দুধে সোনা পাওয়া যায়—এসবের চেয়েও জানা জরুরি সেই সব দিকগুলো, যেদিক দিয়ে সত্যিই "এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি!" ভারতবর্ষই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যাতে বাইশটা সরকারি ভাষা আছে। ২০১১ সালের জনগণনায় দেখা গেছে, ভারতে ১৯,৫৬৯-টি মাতৃভাষা আছে! এরকম ভাষার বৈচিত্র পৃথিবীতে ইন্দোনেশিয়া ছাড়া আর দেখা যায় না। তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচশোটা ভাষা বিলুপ্তির পথে। আজ এক কেন্দ্রীয় শক্তি দেশে হিন্দিকেই জাতীয় ভাষা করার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ ভারতের কোনও 'ন্যাশনাল ল্যাঙ্গোয়েজ' নেই। তাই সর্বত্র সুচারুভাবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমরা ঝগড়া করছি, কেন বাবাকে 'আব্বা' বলব। মজার কথা, এই 'আব্বা' শব্দটি আরবি ভাষাটার চেয়েই অনেক পুরনো, সম্ভবত প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি। আরও মজার কথা, এই শব্দের উৎস সম্ভবত সেমিটিক, যা থেকে হিব্রু বাইবেলে ঈশ্বর বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই যে আমরা খুব মান্যগন্য কাউকে বোঝাতে 'বাবা' বলি, সেই বাবা এসেছে ফারসি থেকে, আবার বাংলায় পিতা অর্থে বাবা এসেছে সংস্কৃত 'বপ্র' থেকে। ঝগড়া করতে গিয়ে যেন নিজের পায়ের দিকে খেয়াল রাখি, কুড়ুলটা কোথায় পড়ছে।

ওই যে বললাম, ভাষা বড় বিচিত্র। আমরা তাস পেটাই, অথচ জানি না যে 'হরতন', 'রুইতন' আসলে আর্জেন রবেন, ভ্যান ডার সরের দেশ থেকে এসেছে। বালতি বালতি জলে স্নান করি, করে জামা পরে বোতাম আটকাই, তারপর বাসনে খাওয়াদাওয়া করি, খেয়ে তোয়ালেতে হাত মুছি—এই 'বালতি', 'বোতাম', 'বাসন', 'তোয়ালে' ইত্যাদি সবই আসলে এসেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দেশ থেকে। এমনকি আমরা বাংলায় ডাচদের 'ওলন্দাজ' বলি, এই 'ওলন্দাজ' শব্দটিও আসলে এসেছে পোর্তুগিজ 'holandes' থেকে। বিশ্বাস না হলে গুগল ট্রান্সলেটে দেখে নিন। বরং এই রোববারের সন্ধ্যেতে একটু চা খেতে খেতেই দেখুন না হয়। চা হল সেই কয়েকটা বস্তুর একটি, পৃথিবীর বেশিরভাগ ভাষাতেই যার প্রতিশব্দ একই। জাপানি, চিনে, কোরিয়ান, হিন্দি, বাংলা, তুর্কি, ইউক্রেনিয়ান, গ্রিক, পর্তুগিজ, গুজরাতি, আরবি, পাঞ্জাবি, উজবেক ও রুশ ভাষায় চায়ের প্রতিশব্দ চা/চায়ে/চায়/চ'! এদিকে ইংরেজি, লাতিন, হিব্রু, কাতালান, বাস্ক, জার্মান, ফরাসি, এস্তোনিয়ান বা মালয় ভাষায় বলে টি/টে।

শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

এসএফআই ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

"ঐশীদের দাঁড় করাবেন শুনলাম। মহিলা প্রার্থী ? ছোহ্ এদের দিয়ে আর কিস্যু হবে না দাদা। এত সব বড় বড় ভাষণ, অমুক সে আজাদী, তমুক সে আজাদী। খালি ওই জেএনইউ ক্যাম্পাসের মধ্যে লাফ ঝাঁপই সার। এবারে ক'টা সিট জিতবেন? আরে জিতবেন কি, নোটার থেকেও কম ভোট পাবেন। ওসব ঐশী টইসির কম্ম নয়। এ লড়াই অন্য লড়াই। বুইলেন দাদা।"

সত্যিই তো। সারাদিন কাজের শেষে মন খারাপ।খালি মাঝে মধ্যে ক্লান্ত মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজলে একটা মেয়ের মুখ ভেসে আসে, বড় বড় চোখ, মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ। সত্যিই হল না আর। এ লড়াই অন্য লড়াই। 

চোখ বুঁজে থাকুন। খুলবেন না। আস্তে করে আপনাকে এমনি একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। একবছর আগের একটা জায়াগায়। কোন জায়াগায় ? ধৈর্য্য হারাবেন না। আসুন আমার সাথে। চারদিকে ক্ষেত, আর সবুজ জঙ্গল। দূরে একটা কালো পাহাড়। চা এর বাগান। কিছু খোলা, কিছু বন্ধ। দু'চারটে বাড়ি। কাঠের দেয়াল, টিনের চাল। সেই ঢালু চাল বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা। আমার মাতৃভূমি। 

তেমনই একটা ঘরে আবছা আলোয় মেঝেতে চাটাই পেতে গুটিকয় ছেলে মেয়ে। মিটিং করে ওরা। গাল ভরা নাম আছে, "সম্মেলন"। মিটিং শেষে সাদার মধ্যে লাল তারা আঁকা পতাকা হাতে ওদের ছবি ওঠে সস্তার মোবাইলে। জাফরীকাটা রোদের আলোয়। ছবিটা তোলার আগে আধা পেটা খাওয়া অপুষ্টিতে শীর্ন মুখগুলো তে অদ্ভুত হাসি। ওরা স্লোগান তোলে, "স্বাধীনতা, গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র জিন্দাবাদ।"

ওরা মানে ? হ্যাঁ, এইবার চোখ খুলতে পারেন। চোখ খুলে দেখে নিন, ওরা মানে শবনম, প্রিয়াঙ্কা, অঞ্জলি , স্বপ্না আর দীপা। ওরা স্লোগান তোলে, "ঐশী দিদি করো লড়াই, সাথে আছি আমরা সবাই"। স্লোগানের দমকে ছেঁড়া ফ্রকে লাগানো সেফটিপিনটা খুলে আসে, আবার লাগিয়ে নেয়। আবার স্লোগান দিতে হবে যে। লড়াই এর স্লোগান। ঠিকই বলেছেন একদম। এ লড়াই অন্য লড়াই। এ লড়াই জিততে হবে। লড়াই এর মানেটা কেবল বুঝে নিতে হবে।

ছবি: এসএফআই এর বীরপাড়া চা বাগান ইউনিট। কমঃ শবনম খাতুন (সভাপতি), কমঃ প্রিয়াঙ্কা মহাজন (সহ সভাপতি), কমঃ অঞ্জলি খাড়িয়া (সম্পাদক), কমঃ স্বপ্না কেরকেট্টা (সহ সম্পাদক), কমঃ দীপা লাকড়া (পত্রপত্রিকা)। এক বছর আগে।

মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

EIA2020, উত্তরাখন্ডের বিপর্যয় এবং... ~ সংগ্রাম চ্যাটার্জী

২০২০ সালে লকডাউনের মধ্যেই একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল কেন্দ্রের BJP সরকার— পরিবেশ সংক্রান্ত আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের ভাবনাটাকেই নস্যাৎ করে দেওয়ার সরকারি বন্দোবস্ত করার জন্য ড্রাফ্ট্ EIA2020 পেশ করে!
এ'নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত করার প্রতিবাদে বহু মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এবং বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে আদালতের দারস্থ হন, যার পরিনতিতে ২০২০'র ১১ আগস্ট পর্যন্ত মতামত দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় এবং বহু মানুষ (প্রায় ১৭ লক্ষ!) এই প্রশ্নে কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধেই মতামত দেন। 
যদিও তারপর গোটা প্রক্রিয়ার ফলাফল সামনে আসে নি, অন্ততঃ আমার কাছে! আর, এই সময়েই ঘটে গেল গতকালের উত্তরাখন্ডের ভয়াবহ ঘটনাটা! 

* EIA কী? 
পুরো কথাটা: Environment Impact Assessment, বাংলা করলে দাঁড়ায় পরিবেশের উপর প্রভাবের পরিমাপ।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, কোনও একটি ডেভেলপমেন্টাল প্রজেক্ট বা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রকৃতি আর পরিবেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেই সম্ভবনা আগেভাগেই জরিপ করে নেওয়া হয়৷ কারণ প্রকৃতি বা পরিবেশের ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী কোনও বিপদ ডেকে আনতে পারে৷ তাই, উন্নয়নকে টেকসই করার আগে দরকার উপযুক্তভাবে প্রকৃতি, পরিবেশের ওপর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের ঠিকঠাক অ্যাসেসমেন্ট! সেইটে করা হলেই, কোনো উন্নয়নমূলক প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবুজ সংকেত পাওয়া যায়৷ এই অ্যাসেসমেন্টে প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের চরিত্র যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনই একইভাবে প্রজেক্ট সাইটে বসবাসকারী লোকজন, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিকভাবে বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর প্রভাবও এই অ্যাসেসমেন্টে বিবেচনা করা হয়৷ যাতে করে প্রকৃতি-পরিবেশকে যথাসম্ভব বাঁচিয়ে কার্যত একপ্রকার টেকসই উন্নয়নকে বা স্থিতিশীল উন্নয়নকে নিশ্চিত করা যায়।

* সমস্যা কী কী?
খুব বেশি কথায় না গিয়ে আরেকবার এই পাঁচটা পয়েন্টে একটু নজর দিন:
১) Post - Facto clearance! 
অর্থাৎ পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই কোনো প্রকল্পের কাজ চলতে পারে। ড্রাফ্ট অনুযায়ী এই ক্লিয়ারেন্স কাজ শুরুর পরেও পাওয়া যেতে পারে (যদিও এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্ট একটি জাজমেন্টে একে ভুল এবং এমন আইন করা উচিৎ নয় বলে জানিয়েছে)।

২) কোনও একটা প্রজেক্ট নিয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষদের বক্তব্য নথিভুক্ত করে পাবলিক হিয়ারিংয়ের সময় ক্রমাগত কমিয়ে এনে (এর আগে এর সময় ছিল ৩০ দিন, এখন ২০ দিন) বিষয়টা যথাসম্ভব গোপনে পাশ করার চেষ্টা! 

৩) নতুন ড্রাফট অনুযায়ী, যদি কোনো প্রকল্প পরিবেশ আইনকে উলঙ্ঘন করে তবে সাধারণ মানুষের অধিকার নেই সেটা চিহ্নিত করার বা সেটি নিয়ে কোনো অভিযোগ জানানোর। যদি উলঙ্ঘন হয় তবে শুধুমাত্র উলঙ্ঘনকারী (প্রকল্পকারী) বা সরকার বলতে পারে সেটা। 
ভাবুন— খুনি খুন করে এসে নিজেই বলবে— খুন করে ফেলেছি স্যর! 😀

৪)  কোনও প্রজেক্টের সাথে জাতীয় নিরাপত্তার কোনও সম্পর্ক না থাকলেও সরকার যেকোন প্রজেক্টকেই স্ট্র্যাটেজিক প্রজেক্ট বলতে পারে, আমি আপনি সেক্ষেত্রে কিস্যু বলতে পারবোনা। 
আর, এ'তো জানা কথাই যে— মহামান্য(!) সরকার যে কোনও প্রজেক্টকেই স্ট্র্যাটেজিক প্রজেক্ট বলে দিতে পারে! 

৫) ড্রাফটে বর্ডার এরিয়ার সংজ্ঞা দিয়ে যা বলেছে তার মানে দাঁড়ায় সীমান্ত থেকে মোটামুটি ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল! এবং এই অঞ্চলে কোনো এধরনের কাজে জনতার মতামত নেওয়া হবে না! মানে! 
মোদ্দা কথা পুরো গাড়োয়াল কুমায়ূণ হিমালয় থেকে শুরু করে একদম উত্তর পূর্ব হিমালয়ের ঘন জঙ্গল ওদের টার্গেট! এমনকি চাইলে সুন্দরবনও! যেখানে যতটুকু জঙ্গল বেঁচে ছিল নজর এখন সেইদিকে! 

আপাততঃ এইটুকুই থাকল।
এবার আপনি মিলিয়ে নিন গত কয়েক বছর ধরে কী কী চলছে গোটা দেশ জুড়ে!

আচ্ছা, সময়ের অভাবে না হয় গোটা দেশের কথা বাদই দিলাম। বাদ দিচ্ছি ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, সিকিম জুড়ে যা চলছে— সেই সব। 
শুধু এই উত্তরাখন্ড রাজ্যে 
১) নামে ৩৩ টা হলেও আদপে শতাধিক হাইড্রলিক প্রজেক্টের কাজ চলছে বা শুরু হয়েছে!! এবং এতে কোন নদী বাদ আছে? কেউ না!
হিমালয়ের দুর্গম ভুখণ্ডে 'উন্নয়ন' এর নাম করে একটার পর একটা তাগড়া প্রজেক্ট আদপে ভারী হয়ে দাঁড়িয়েছে গোটা বাস্তুতন্ত্রটার ওপরেই!
এই যে ঋষিগঙ্গার উপরের যে প্রজেক্টটা জলের তোড়ে কার্যত ভেসে গেল, এটা নিয়ে পরিবেশবিদরা আপত্তি করেন নি? করে গেছেন! কিন্ত ঐ কাকস্য পরিবেদনা! কাজ চলেছে! শুধু চলেছে না, আরো দ্রুততার সাথে চলেছে! মরছে কারা? গরীব মানুষ। শ্রমিকরা। 

২) ২০১৬ সালে শুরু হল প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রজেক্ট— #চারধাম_প্রকল্প! মনে রাখা দরকার, এর আগেই ২০১৩ সালে ঘটে গেছে কেদারনাথে সেই ভয়াবহ ঘটনা! তার পরেও ঐ ২০১৬ থেকে শুরু হল যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ ও বদ্রিনাথকে চওড়া সড়কপথে নতুন করে জোড়বার কাজ! শুরু হল পাহাড় ফাটিয়ে অবাধে রাস্তা চওড়া করার অপকাণ্ড! 
কোর্ট বলছে প্রস্থ কমাও! কে শোনে কার কথা! প্রায ৪৭ হাজারেরও বেশি গাছ কাটা হল! ধ্বংস হয়ে গেল ৭০০ হেক্টর বনাঞ্চল! 
শুধু ২০২০ সালেই এই প্রকল্পের রাস্তা জুড়ে ৬টা বড় বড় ধ্বস নেমেছে! মারা গেছেন বহু শ্রমিক! 
এর পরেও অনুমতি পেতে জোচ্চুরি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার— এই প্রজেক্টটাকে দেখিয়েছে আলাদা আলাদা ৫৩টা প্রজেক্ট, যার প্রতিটিই ১০০ কিলোমিটারের কম দূরত্বের! 
এই চারধামের ৯০০ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে পাথর পড়েছে পাশের নদীখাতগুলোতে। ক্রমশই বুজে আসছে নদীখাতগুলো! ফলে... 

৩) উত্তরাখন্ডের প্রচলিত ট্রেক রুট গুলিতে যান। দেখবেন, যেগুলো চীন সীমান্তের কাছাকাছি তার সবকটাতেই (মিলাম গ্লেসিয়ার, কিংবা পঞ্চচুল্লী বেস ক্যাম্প) চলছে পাকা সড়ক নির্মাণের কাজ! নরম হিমালয় মাঝেমধ্যেই এই আঘাত সহ্য করতে না পেরে ঝটকা দিচ্ছে, আর তখনই নামছে ব্যাপক বিপর্যয়!
এমনকি এই নন্দাদেবী স্যাংচুয়ারির মত বৈচিত্র্যময় ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর অরণ্যের লাগোয়া এলাকাগুলোতেও এই কাজ করে চলেছে অবাধে!! ধ্বংস হচ্ছে সব কিছু! সব...!!! 

৪) পাঁচ/সাত বছর আগে ছুঁয়ে আসা কোনও একটা গ্লেসিয়ারে আবার ট্রেক করে আসেন। চমকে যাবেন #পরিবর্তন দেখে! বুঝতে পারবেন কতটা পিছিয়ে গেছে হিমবাহটা! 
হ্যাঁ, ছোট হচ্ছে সবগুলো। সে আপনি গঙ্গোত্রী বলুন, আর বাগিনীই বলুন— সব। বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফল। 
এভারেস্টের উচ্চতা কয়েক মিলিমিটার বাড়তেই পারে, কিন্তু সব মিলিয়ে হিমবাহগুলোর গড় উচ্চতা বছরে ফুট দেড়েক করে কমছে! মানেটা কি বুঝতে পারছি!?  
এই রেটে যদি বরফ গলে, তাহলে হিমালয়ের জমে থাকা বরফের উপর নির্ভর করে থাকা গোটা উত্তর ও মধ্য ভারতের অজস্র নদী প্রথমে বন্যায় ভাসাবে, তারপর জলের অভাবে সারা বছর ধুঁকবে! আর গোটা দেশের কৃষি পড়ে যাবে এক ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে! 
এই রেটে যদি বরফ গলে, সমুদ্রের জলতল যদি বাড়ে তাহলে উপকূলবর্তী হাজারো গ্রাম আর কোটি কোটি মানুষের জীবন জীবিকা সব শেষ!! 
আর এই দুইয়ের যোগফল?? বোঝাই যাচ্ছে। 

আবারও মনে করা— পরিবেশকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া দ্বন্দ্বটা আসলে বিশ্বজোড়া শ্রম ও পুঁজির বেসিক যে দ্বন্দ্ব, তারই একটা সামাজিক বহিঃপ্রকাশ মাত্র। 
তীব্র থেকে তীব্রতম মুনাফার লোভ গোটা পৃথিবীর সামনে নামিয়ে আনছে ঘোর বিপদ। যার প্রথম বলি হবেন এবং হচ্ছেনও সেই গরীব মানুষ, সাথে মধ্যবিত্তও। 
আজকের আমার দেশের সরকারের এই পদক্ষেপ (#EIA2020) গোটা দেশের জল-জঙ্গল-জমিকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার একটা ধাপ। গতকালের ঘটনাটা আলাদা কিছু না, মুনাফার লোভে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার পুঁজিবাদী অপপ্রয়াসের একটা ফল মাত্র! ফলে পরিবেশ নিয়ে এই লড়াইটা দিনের শেষে মূল লড়াইয়েরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে, সেই লড়াইটা কীভাবে লড়ব সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা...

বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

প্রাউড টু বি অ্যান এমবিবিএস ~ ডঃ বিষাণ বসু

প্রাউড টু বি অ্যান এমবিবিএস। এ নিয়ে প্রচুর পোস্ট হচ্ছে। ডাক্তারি পাস করার বেসিক ডিগ্রী এমবিবিএস, কথাটা সবাই জানেন। এবং সেই ডিগ্রী অর্জন করার শেষে - এবং তদপরবর্তী প্রশিক্ষণের পর্ব পার হলে - সকলেই ডাক্তারি করার পক্ষে ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন। পাস করতে পাঁচ বছর - হাতেকলমে শিক্ষার বাড়তি বছরগুলো, অর্থাৎ ইন্টার্নশিপ-হাউসস্টাফশিপ ধরলে সাত বছর। জেনারেল লাইনে পড়লে ওর চেয়ে কম সময়ে মাস্টার ডিগ্রী হয়ে যায়। কাজেই, এমবিবিএস ডিগ্রীখানা সাধারণ ব্যাচেলর ডিগ্রীর থেকে কিঞ্চিৎ ভিন্ন গোত্রের - উন্নততর দাবী করছি না, বলছি ভিন্ন।

কথাগুলো কারোরই অজানা নয়। কিন্তু, নতুন বিতর্কের পেছনে সংবাদপত্রের একটি খবর। যেখানে হেডলাইন, "স্রেফ এমবিবিএস" করলেন প্রসূতির জটিল অস্ত্রোপচার - কথাটা ওই স্রেফ বিশেষণটি নিয়ে। 

সকলের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখা যাক, এমবিবিএস ডিগ্রীটিই কিন্তু শল্যচিকিৎসা এবং প্রসূতির চিকিৎসার পক্ষে যথেষ্ট ডিগ্রী। অন্তত, মেডিকেল কাউন্সিল তেমনই বলে থাকেন। অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে জটিলতা অনেকক্ষেত্রেই তৈরী হয় - চিকিৎসক এমবিবিএস বলেই হয়েছে, এমন নয়। কাজেই, অন্তত আমার চোখে, স্রেফ এমবিবিএস শব্দবন্ধ এক্ষেত্রে অনুচিত।

সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক অবশ্য জানিয়েছেন, এমবিবিএস-এর আগে স্রেফ বিশেষণটি তাঁর নয় - রাজ্যের ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশন-এর প্রধান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনিই রায়দানের মুহূর্তে বলেছেন, ওনলি এমবিবিএস - স্রেফ শব্দটি ওনলি-র বঙ্গানুবাদ মাত্র।

সহমত। এক্ষেত্রে সাংবাদিকের দোষ দেখছি না।

যেকোনো বিষয়ে মতামত দেওয়ার আগে সে বিষয়ে অল্পবিস্তর জ্ঞান অর্জন জরুরী - আমাদের শাস্ত্রে বলত, বলার আগে অধিকারী হও, অর্থাৎ বলার অধিকার তথা বিষয়ের উপর দখল অর্জন করো। মেডিকেল সায়েন্স ব্যাপারটা ইদানীং যেন সুলভ শৌচালয়ে পরিণত হয়েছে - পকেটে দুটি টাকা থাকলেই সকলেরই মলমূত্র ত্যাগের অধিকার জন্মে যাচ্ছে - থুতু ফেলা তো বিলকুল ফ্রী। সেখানে বিচারপতি এমন মন্তব্য করলে আপত্তির কী-ই বা আছে!!  

শুধু দুইখান কথা কইতে চাই।

আইন মোতাবেক ওনলি এমবিবিএস হলে ডাক্তারবাবু অমন অপারেশন করতে পারবেন না, এমনটি কোথায় লিখিত রয়েছে? (এই বিশেষ ঘটনাটিতে অবশ্য চিকিৎসক নিজেকে বিশেষজ্ঞ বলে দাবী করেছিলেন - এবং তেমন হলে, ঘটনাটি অবশ্যই প্রতারণার। কিন্তু, রায় এবং সংবাদপত্রের হেডলাইন, সর্বত্রই মিথ্যে দাবী এবং প্রতারণার দিকটাকে ছাপিয়ে গিয়েছে "স্রেফ এমবিবিএস")

দ্বিতীয়ত, ডাক্তারি লাইনটিই, অন্তত এদেশে, বোধহয় দুনিয়ার একমাত্র পেশায় পরিণত হয়েছে, যেখানে অভিজ্ঞতা ও চর্চার কোনো স্বীকৃতি নেই। তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জেনারেল প্র‍্যাকটিশনারের চাইতে পরশু এমডি পাস করা ডাক্তারের কদর বেশী - কেননা, প্রথমজন "স্রেফ এমবিবিএস"। এতে ক্ষতি চিকিৎসকদের যতখানি, তার চাইতে অনেকগুণে বেশী ক্ষতি আপনাদের সকলের। বিশেষজ্ঞ ট্রেনিং-এর অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া - নোয়িং মোর অ্যান্ড মোর অ্যাবাউট লেস অ্যান্ড লেস - আরো পরিমিত বিষয়ে আরো অনেকখানি বিস্তারে ও গভীরে জ্ঞান অর্জন করা। আমরা যারা তথাকথিত বিশেষজ্ঞ, তারা গাছখানা খুবই খুঁটিয়ে দেখতে শিখি - জঙ্গলের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে। জঙ্গলের আর পাঁচটা গাছের চাইতে এই বিশেষ গাছটিকেই খুঁটিয়ে দেখা প্রয়োজন কিনা, সেই বিচার সবচেয়ে ভালো করতে পারেন একজন জেনারেল প্র‍্যাকটিশনার - স্রেফ এমবিবিএস-ই। এর উল্টোপথে হাঁটলে প্রতিটি গাছকেই বিশেষ গাছ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে - পরীক্ষানিরীক্ষার সংখ্যা এবং চিকিৎসার খরচ, দুইই বাড়ে। বিপণনমুখী চিকিৎসা অবশ্য তেমনটিই চায় - আর সেজন্যেই এমবিবিএস পরিণত হয়েছে পাতি বা স্রেফ এমবিবিএস-এ। লাগামছাড়া চিকিৎসার খরচে তিতিবিরক্ত আপনিও অন্য কিছু ভাববেন না? এখনও ভাবা শুরু করবেন না?

এরই উল্টোপিঠে, এমবিবিএস-এর গুরুত্ব হ্রাসের কারণে, তরুণ চিকিৎসকরাও আর স্রেফ এমবিবিএস থাকতে চাইছেন না। এমবিবিএস ব্যাপারটাকেই উচ্চমাধ্যমিকের আগে মাধ্যমিকের মতো এমডি-র প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দায়সারা গোছের ভাবতে শিখছেন - যত্ন নিয়ে সার্বিক দৃষ্টি অর্জনের চেষ্টাটাই লুপ্ত হতে চলেছে। অতএব, তেমন দিন আর দূরে নেই, যখন পেটখারাপের চিকিৎসার জন্যেও গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টের শরণাপন্ন না হয়ে গতি থাকবে না - কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবস্থার রমরমা অবশ্য সেক্ষেত্রে আরো বাড়বে - আপনিও কি তেমনটাই চান? এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অভিজ্ঞ জেনারেল প্র‍্যাক্টিশনার ব্যাপারটাই অবলুপ্ত হয়ে যাবে। সেটাই চাইছেন তাহলে??

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছেন, চিকিৎসাকে মানবিক করে তুলতে আমাদের ফিরতে হবে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের ধারণায় - স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জেনারেল প্র‍্যাক্টিশনারের গুরুত্ব হবে সর্বাধিক। আমরা উল্টোপথে হাঁটব??

বাই দ্য ওয়ে, ওনলি এমবিবিএস কথাটা যিনি বললেন, জাস্টিস অসীম কুমার ব্যানার্জি, খুঁজে দেখলাম, তাঁর ডিগ্রি বলতে বিএ এলএলবি। ওনলি ব্যাচেলর ডিগ্রি - উইদাউট এনি মাস্টার ডিগ্রি। ইদানীং তো আইনবিদ্যায় মাস্টার ডিগ্রি - এলএলএম বা পিএইচডি - সবই হয়। বিচারপতি হতে গেলে - এমনকি হাইকোর্টের বিচারপতি - দুরূহ মামলার জটিল যুক্তি বিচার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্যে অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট, ডিগ্রী নয়। কিন্তু, চিকিৎসার ক্ষেত্রে, অভিজ্ঞতার বিচার নয়, শুধুই ডিগ্রীর হিসেবই শেষ কথা?? 

বিচারপতিরা কি বাড়িতে আয়না রাখেন না? দাড়ি কামান কীভাবে??

সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

আগ্রাসন – ফিরে দেখা ~ রাজা সিংহ

বাংলার থুড়ি কলকাতার বুদ্ধিজীবী কুলে গেল গেল রব, বিহারি, গুজরাতি, মারাঠি, কাশ্মীরি, এস্কিমো সবাই মিলে নাকি কলকাতার কালচার গ্রাস করে ফেলছে। তারা বাংলা বলে না, তারা হনুমান পুজো করে, করওয়া চৌথে সোনালি চুমকি বসানো লাল শাড়ি পরে য়সরাজ ফিল্ম বা সুরজ বরজাতিয়ার ফ্যামিলি ড্রামার ধরণে ছাদে গিয়ে চালনি দিয়ে চাঁদ ও বরের মুখ দেখে। আগ্রাসন বলে আগ্রাসন। এমন তেজের সঙ্গে স্বয়ং অগ্নিদেবতাও বোধহয় খাণ্ডবদাহন করেন নি।  কলকাতার বুকে (আজ্ঞে বাঙলা মানে তো কলকাতাই) বুকে রাজস্থান আর গুজরাতের মহল্লা নাকি বেড়ে উঠছে ফনফন করে। এক ভয়াবহ চক্রান্তের করাল ছায়া ধীরে ধীরে গ্রাস করছে বঙ্গদেশকে। ঠিক কি না? কান পাতুন চারদিক থেকে ধ্বনি উঠবে ঠিক ঠিক।

এবার একটু অন্যভাবে দেখা যাক।  আমার শৈশব ও কৈশোরের বেড়ে ওঠা বিহারের এক প্রত্যন্ত শহরে। শহরটি ছিল দুইভাগে বিভক্ত,  দুর্গন্ধময় নালা, পুরনো রংচটা গায়ে গায়ে লাগানো কদর্য বাড়ি, শ্যাওলা পড়া প্রায়ান্ধকার গলির সিভিল এরিয়া আর চওড়া পিচ রাস্তা, সবুজ মাঠ, লাইব্রেরী, থিয়েটার হল, ফুটবল মাঠ আর সুন্দর কোয়ার্টারে ঘেরা রেলওয়ে কলোনি। সিভিল এরিয়ায় বাস ছিল স্থানীয়, বিহারি, ভোজপুরি অর্থাৎ বিহারের স্থানীয় বাসিন্দাদের আর সুন্দর সাজানো রেলওয়ে কলোনি জুড়ে ছিল বাঙালী রেল বাবুদের বাস। সেই ছোট্ট শহরটিতে অন্তত: পঞ্চাশটি দুর্গাপূজা হত। আর এত ধুমধাম আর খরচ করে দুর্গাপুজো হত যে তাদের স্থানীয় ও সর্ববৃহৎ উৎসব ছটপুজোতেও অমন চাকচিক্য ও জাঁকজমক চোখে পড়ত না। বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বণের যাবতীয় উপকরণ তা শীতল ষষ্ঠীর তালপাতার পাখা, কচি বাঁশের কোড়ল, ডাঁট শুদ্ধ খেজুর যেমন বিক্রি হত তেমনি লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজোর যাবতীয় উপকরণের মেলা বসে যেত উৎসবের দিনগুলিতে। আড়াইটি বাংলা স্কুলে নিয়ম করে পালন হত রবীন্দ্র-নজরুল। বাংলার সংস্কৃতি ধরে রাখার যাবতীয় বন্দোবস্ত ছিল সেখানে। চাকুরীজীবী বাঙালীরা শুধু যে স্থায়ী বাসস্থান গড়ে তুলেছিলেন তাই নয় তাদের সংস্কৃতি, উৎসব সব কিছুই বজায় রেখেছিলেন বহুল প্রাচুর্যে। 

দেওঘর, গিরিডি, যশিডি, শিমুলতলা এদিকে বেনারস, এলাহাবাদ, কানপুর, দিল্লী, মুম্বাই, পুনে তে বঙ্গ-সন্তানেরা তাদের উৎসব, সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রেখেছেন বহু বছর ধরে। বাবার চাকরি সূত্রে ঘুরতে হয়েছে বহু জায়গায়। কোথাও শুনি নি, সেখানকার বাসিন্দারা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছে, মার শালাদের, আমাদের উৎসব সংস্কৃতি বানের জলে ভেসে গেল, সবই  গ্রাস করে ফেলছে এই বঙ্গ-পুঙ্গবরা। আজ নয় বহু বছর ধরেই বাঙালি যে শহরে বাসা বেঁধেছে তারা নির্মাণ করেছেন কালীবাড়ি। দিল্লী, পুনে, মুম্বই, ব্যাঙ্গালোর কোথাও তার ব্যতিক্রম নেই। স্থানীয় মানুষকে বলতে শুনি নি এই রে, এবার তো আমাদের আইয়াপ্পা মন্দিরের কিংবা গণেশ টেম্পলের খ্যাতিতে ভাগ বসবে। 

আজ ব্যাঙ্গালোরের যে কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকে আমি নির্দ্বিধায় যে কোন ওয়েটারের সাথে বাংলায় কথা বলি। কারণ তাদের নব্বই শতাংশ বাঙালী। শুধু ব্যাঙ্গালোর কেন খোঁজ নিয়ে দেখুন গত তিরিশ বছরে ভারতের অন্যান্য সব শহরগুলিতে বাঙালির সংখ্যা বেড়েছে হু-হু করে। তারা ভাগ বসিয়েছে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানে। কলকাতা থেকে বেড়াতে আসা বন্ধুবান্ধবরা বেশ গর্বের হাসি হেসে বলেন, 'বাওয়া সব জায়গায় বাঙালি, অ্যাঁ?' শপিং মলে দক্ষিনী পাঁপড়ের পাশেই বাংলা হরফে লেখা গোবিন্দ ভোগ চালের প্যাকেট, বাংলার বড়ি, খেজুর গুড়। মাছের দোকানে আঁকাবাঁকা বাংলা হরফে লেখা 'এখানে কলকাতার মাছ পাওয়া যায়।' দক্ষিণের মত ভাষা সচেতন প্রদেশগুলিতে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর ধরে বসবাসকারী বাঙালিরা বেশীরভাগই এখনো স্থানীয় ভাষা শেখেন নি। খোদ ব্যাঙ্গালোরের বুকে হ্যাল মার্কেট যেন লেক-মার্কেট বা গড়িয়া-হাট মার্কেটের মিনি সংস্করণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের কখনো বলতে শুনিনি, এইরে এই বঙ্গ-সন্তানেরা তো মিনি কলকাতা বানিয়ে ফেলেছে। তাদের কেন মনে হয় না, তাদের মহল্লা, টোলা, হাল্লি গুলো সব বাগবাজার, বৌবাজার কিংবা বাঘাযতীন হয়ে যাচ্ছে। এমনই তো হবে, চাকরি কিংবা ব্যবসার সূত্রে মানুষ বহমান হবে এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে, সাথে করে নিয়ে আসবে তাদের খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, সংস্কৃতি, অচেনা প্রদেশে গড়ে তুলবে তাদের সুখ-বসত বা কমফোর্ট জোন। সেখানে পালন করবে তাদের নিজস্ব উৎসব। গড়ে তুলবে নিজের প্রার্থনা-ক্ষেত্র। বাংলার বাইরে ছড়িয়ে থাকা ও ছড়িয়ে পড়া বাঙালিদের উৎসব, সাহিত্য, সংস্কৃতি পালন দেখতে যদি আপনাদের ভালো লাগে, বেশ 'অ্যাট হোম' বোধ হয় তবে একই জিনিস বাংলার বুকে প্রত্যক্ষ করলে এত প্রতিরোধ কেন? বাঙালি রিক্সা টানবে না, মোট বইবে না, ঠেলা চালাবে না। সে কাজ নির্দ্বিধায় তুলে নিল শ্রমজীবী বিহারের লোক। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে তারা মাছ ভাত কেন খাবে? তারা লিট্টি চোখাই খাবে। তারা কৃত্তিবাসী রামায়ণ নয় বরং তুলসিদাসী রামায়ণ ও হনুমান চালিশাই পড়বে। সুদূর মারোয়ার, গুজরাত থেকে ব্যবসা করতে আসা মানুষজন নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলেছে, বাড়িয়েছে বাণিজ্য। তারা পালন করবে তাদের চৌথ, তিজ কিংবা রাস উৎসব। যেমন আমরা করি 'বছরে তেইশ বার চিত্রাঙ্গদা আর শ্যামা, শাপমোচনের অশ্রুমোচন, বাংলায় কিংবা বাংলার বাইরে। 

বাংলার বুদ্ধিজীবীদের এই হঠাৎ 'তফাৎ যাও' মনোভাব যদি ছড়িয়ে পড়ে দেশে এবং বিদেশেও, বাংলার বাইরে বসবাসকারী বাঙালিদের কিন্তু এর মাসুল গুণতে হবে পুরোদস্তুর। যেমন নিউটন সাহেব তার তৃতীয় সূত্রে বলেছেন আর কি।

কুড়ি বছর আগের সেন্সাস অনুযায়ী ভারতবর্ষে হিন্দি ভাষীর সংখ্যা (তেরটি রাজ্য মিলিয়ে) ৫৩.৬ শতাংশ ছিল। তার পরেই ইংরেজি, ৪১ শতাংশ। এটা কুড়ি বছর আগের অর্থাৎ ২০০১ এর সেন্সাস। তার মানে দাঁড়ায় একটি 'নানা ভাষার দেশে' এই দুটি ভাষা 'মাস ল্যাঙ্গুয়েজ' বা 'মাস কমিউনিকেশন ল্যাংগুয়েজ'   হিসেবে কাজ করতে পারে। ঠিক তার ভিত্তিতেই স্থানীয় ভাষার পাশাপাশি, হিন্দি ও ইংরেজির ব্যবহার হয় রেলওয়ে স্টেশনের নেম-বোর্ড হিসেবে। ওড়িয়া বা কোঙ্কনি ব্যবহার হয় না।
আর কেন এই তেরোটি প্রদেশ হিন্দি বলেন, বোঝেন তার কারণ হিসবে স্থানীয় ভাষার উৎপত্তিগত ছোট্ট চার্টটি দিলাম। এবার হিন্দি প্রচার প্রসারের জন্য সরাসরি দেবভাষাকে দোষারোপ করতে পারেন। 

আর যারা চান স্থানীয় ভাষাই হোক কমিউনিকেশন ল্যাঙ্গুয়েজ তাদের বলি শুধু স্থানীয় ভাষায় বাস, ঠিকানা, দোকান ইত্যাদি লেখা থাকলে যে কি পরিমাণ অসুবিধেয় পড়তে হয় তার চাক্ষুষ প্রমাণ দেখা যায় বাংলা থেকে দক্ষিণে বেড়াতে, ডাক্তার দেখাতে আসা বাঙালির বিরক্তি ও হতাশা দেখলে।  

'মাস কমিউনিকেশন ল্যাঙ্গুয়েজ' না থাকলে আপনাকে ২৯টি রাজ্য সাতটি ইউনিয়ন টেরিটরিজ এর ভাষা শিখতে হবে, পড়তে ও বলতে পারার মত। আমার কিছু শ্রদ্ধেয় বন্ধু যারা 'আগ্রাসনের' ধুয়ো তুলেছেন তাঁদের কেউ কেউ বাংলার বাইরে তাঁদের গোটা চাকুরী জীবন স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে, বাংলায় ফিরে গেছেন স্থানীয় ভাষাটি বিলকুল না শিখেই। কি ভাবে? ঐ 'মাস কমিউনিকেশন ল্যাঙ্গুয়েজ' – ইংরেজি বা হিন্দির কল্যাণে। কোন ভাষা সেই প্রয়োজন মেটাবে তা নির্ভর করবে তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের উপর ১। তার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে সেই ভাষার ব্যবহার। এই প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালি একদিন ইংরেজ প্রভুর ভাষা আত্মস্থ করেছিল। ২। ভাষার সহজবোধ্যতা – এটি না থাকলে সে ভাষার প্রচার ও প্রসার মুশকিল, তার আদ্যন্ত প্রমাণ মালয়ালম ভাষা, এমনকি দক্ষিণের তামিল, তেলেগু ও কন্নড়রাও স্বীকার করেন মালয়ালম শিখে নেওয়া তেমন সহজ সাধ্য নয়। ৩। সে ভাষাটি রাজভাষা কিনা (এখানে তুমুল আলোড়ন উঠতে পারে) কিন্তু একথা অস্বীকার করা যায় না যে ৭৩ বছরের বেশিরভাগ সময়টাই দিল্লীর মসনদে যারা আরোহণ করেছেন তাঁদের ভাষা ছিল হিন্দি। রাজভাষার কারণেই ভারতে ব্যুৎপত্তি পেয়েছিল ফারসি, উর্দু ও পরবর্তীকালে ইংরেজি।

স্থানীয় ভাষার সিরিয়ালে হিন্দি ব্যবহার হবে না কোঙ্কনি? তা নির্ধারণ করেন সেই সিরিয়ালের দর্শক, তাঁরা ডিক্টেট করেন টি আর পি, পরিচালক শুধু সেই নির্ধারিত দর্শক সমূহ বা টার্গেট অডিয়েন্সকে পরিবেশন করেন। তাই হিন্দি ব্যবহার অগ্রাহ্য করে নিজের ভাষাটিকে আরও আরও বেশি জনপ্রিয় করলে তা কাজ দেবে বেশি।

আমার এক প্রিয় সুহৃদের প্রশ্নের উত্তরে বলি, 'না দক্ষিণে হিন্দি 'চাপিয়ে' দেওয়া সম্ভব হয় না।' বরং এঁরা যথেষ্ট সুচারু ও নির্মম ভাবে, স্থানীয় ভাষা চাপিয়ে দেন। বাংলায় কোন ব্যাঙ্কে গেলে তাকে হিন্দিতে কথা বলতে বাধ্য করা হয় এমন তথ্য আমার জানা নেই। তবে দক্ষিণে সমস্ত সরকারি আপিস, কাছাড়ি, প্রপার্টি রেজিস্ট্রেশন থেকে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সব ফর্ম স্থানীয় ভাষায় লেখা। তাঁরা কিছুতেই অন্য ভাষায় কথা বলবেন না। আমার এক সুহৃদ একটি অ্যাকসিডেন্ট কেসের কারণে বাধ্য হয়েছিল কন্নড় শিখতে। কারণ পুলিশ এবং তার আইনজীবী মায় জজ সাহেব পর্যন্ত কেউ তাঁর সাথে মাস কমিউনিকেশন ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করেন নি কঠোর এবং স্বেচ্ছা অভিপ্রেত ভাবে। এই চাপিয়ে দেওয়া গুলি কিন্তু আমার মত অনেকেরই যথেষ্ট অসুবিধের কারণ হয়, আপনারও হবে। তাই চাপিয়ে দেওয়াটা যে একতরফা নয় সেটা বুঝতেই পারছেন। সেই অসুবিধেটা আপনিও করবেন কিনা ভেবে দেখবেন।

আরও একটা কথা দক্ষিণে স্থানীয় ভাষাগুলিকে সংরক্ষণ করা হয় নিষ্ঠাভরে। তাঁরা শুধু উষ্মা প্রকাশ করে ক্ষান্ত থাকেন না। শিক্ষক, পুলিশ, প্রযুক্তিবিদ, নাট্য-ব্যক্তিত্ব এমন কি ওলা ড্রাইভার নিখরচায় কন্নড় ক্লাস করান সপ্তাহান্তে অস্থানীয় ভাষাভাষীদের জন্যে। হাতে গুনুন তো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানে নিজের গাঁটগচ্চা দিয়ে নিজের ভাষা শেখানোর কটি প্রকল্পের সাথে আপনি জড়িত। 

আরেকটা কথা বলি, আগেই বলেছি রাজভাষা শিখতেই হয়, বাংলার মতই দক্ষিণেও বা সারা ভারতবর্ষেই 'ব্যবসাজীবি' যে সম্প্রদায়রা রয়েছেন তাঁরা কিন্তু স্থানীয় ভাষা শিখে নিয়েছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে। হ্যাঁ তাঁদের উচ্চারণ নিখুঁত নয়, যাকে বলে অ্যাক্সেন্টেড। তা সে তো ইংরেজির ক্ষেত্রেও হয় বাঙালি থেকে অস্ট্রেলিয়ান সবার ইংরেজিতেই স্থানীয় প্রভাব রয়েছে এবং তা স্বীকৃত।

যারা প্রবাসে বাঙালিদের লাঞ্ছিত হতে হয় বলে কমেন্ট করেছেন, সে উত্তর গুলি এখানে দিলাম না, কারণ সে অন্য প্রসঙ্গ। এই পোস্টের উদ্দেশ্য ছিল 'চাপানো' সংস্কৃতি বা কালচার শাঁখের করাতের মত। তাই  নিজেকে সেখানে বসিয়ে দেখা যায় কি না। 

অনেকে উল্লেখ করেছেন বটে তবে প্রবাসের যাতনা নিয়ে এ পোস্ট নয়।  আমার কাছের এক দক্ষিণী মানুষ যারা তিনপুরুষ কলকাতায় এবং যে কোন বাঙালির মত স্বচ্ছন্দ বাংলা বলেন তাকেও মাঝে মধ্যে তির্যক 'তেঁতুল' মন্তব্যটি শুনতে হয়। 'খোট্টা, মেড়ো, গুজ্জু' শব্দগুলি বাঙালি শব্দ ভাণ্ডারে এমনি এমনি উঠে আসে নি। না কারো প্রবাস জীবনই ফুলশয্যা হয় না। তাই বিহারে আমাদের যখন 'বঙ্গালী মচ্ছি কা কাঙ্গালি'  বলে কৌতুক করেছে তখন আমরাও 'বিহারী ভূত, খাটিয়া পর সুত, টিক্কি মে আগ লগি, ধরফড়াকে উঠ' ইত্যাদি বলতে ছাড়ি নি। আরও আরও অনেক আছে। বাঙালিদের উদার মেলামেশার  সংস্কৃতির জন্য বাঙালি মেয়েদের সহজলভ্য মনে করা হয়েছে। এমন অনেক আছে। যেমন 'জাদু-টোনাওয়ালি বঙ্গালন' আপনি শুনেছেন তেমনি আসামের নারীরা যুগ যুগ ধরে তকমা বয়ে বেরিয়েছেন যে তারা পুরুষদের 'ভেড়া' বানিয়ে রাখেন। কিন্তু সে সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গ, এগুলির সাথে ভাষার আগ্রাসনের সম্পর্ক নেই। আছে মানসিকতার, মানবিকতার সম্পর্ক।



শনিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২১

ভক্ত ~ রণদীপ নস্কর

জন্তুটার রকম-সকম দেখে আমার ভারি অদ্ভুত লাগল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "তুমি কী? তোমার নাম কী?"

সে খানিকক্ষণ ভেবে বলল, "আমার নাম ভক্ত। আমার নাম ভক্ত‌, আমার ভায়ের নাম ভক্ত, আমার বাবার নাম ভক্ত‌, আমার পিসের নাম ভক্ত—"
আমি বললাম, "তার চেয়ে সোজা বললেই হয় তোমার গুষ্টিসুদ্ধ সবাই ভক্ত।"

সে আবার খানিক ভেবে বলল, "তা তো নয়, আমার নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র! আমার মামার নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র, আমার খুড়োর নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র, আমার মেসোর নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র, আমার শ্বশুরের নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র—"

আমি ধমক দিয়ে বললাম, "সত্যি বলছ? না, বানিয়ে?"

জন্তুটা কেমন থতমত খেয়ে বলল, "না, না, আমার শ্বশুরের নাম ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে।"

কাট টু

শেয়াল বলল, "হাসছ কেন?"

হিজিবিজবিজ বলল, "একজনকে শিখিয়ে দিয়েছিল, তুই সাক্ষী দিবি যে, দেশদ্রোহীর বড় বড় দাড়ি, দেশদ্রোহী ঠিক বানানে লেখে, দেশদ্রোহীর গায়ে বেগুনি রঙ থাকে না। উকিল যেই তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, তুমি লালকেল্লা চেনো? অমনি সে বলে উঠেছে, আজ্ঞে হ্যাঁ, লালকেল্লার বড় বড় দাড়ি, লালকেল্লা ঠিক বানানে লেখে, লালকেল্লা লাল হয়, বেগুনি রঙের নয়—হোঃ হোঃ হোঃ হো—"

শেয়াল জিজ্ঞাসা করল, "তুমি মোকদ্দমার বিষয়ে কিছু জানো? কৃষকদের চেনো?"

হিজিবিজবিজ বলল, "তা আর জানি নে? আমি নিজেই ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে। আমরা এতটাই গরিব, ট্র্যাক্টর তো দূর, বলদ ছিল না বলে আমাকে দিয়েই চাষ করানো হত। তারপর থেকেই আমার মাথায় বলদের মত বুদ্ধি। আমি একাধারে ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের ছাত্র, বিদ্যাসাগর কলেজের ছেলে, লালকেল্লার অতিথি এবং ভিক্টোরিয়ার প্রত্যক্ষদর্শী। আমি নিজে চোখে দেখেছি কৃষক পরিবারে মূর্তি ভাঙার ঘটনা। এও জানি, বিদ্যাসাগর কলেজে কোনওরকম শ্লোগান ওঠেনি।"

শেয়াল বলল, বটে? তোমার নাম কী শুনি?"

সে বলল, "এখন আমার নাম হিজিবিজ‌বিজ‌।"

শেয়াল বলল, "নামের আবার এখন আর তখন কী? হিজি বিজ্‌ বিজ্‌ বলল, "তাও জানো না? এখন আমার নাম ভক্ত, ভোটের পরেই আমার নাম হয়ে যাবে কর্মহীন, অথবা অ-নাগরিক, অথবা দেশদ্রোহী।" বলে জন্তুটা ভয়ানক ফ্যাকফ্যাক করে হাসতে লাগল।

[সুকুমার রায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে...] 

বুধবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২১

পতাকা তোলার গল্প ~ সমুদ্র সেনগুপ্ত

পাঞ্জাবের খুব বেশি মানুষকে আমি চিনি না। যাদের চিনি তাদের একজনের পতাকা তোলার গল্প শুনিয়ে যাই-

"মার্চ ১৯৩২ সাল। ওই সময় সবে পরীক্ষা দিয়ে উঠেছি, সায়েন্স প্র্যাকটিক্যাল তখনো বাকি। ভগত সিং এর প্রথম শহিদ বার্ষিকী পালনের কথা হচ্ছে। গর্ভনর এর সেদিন জলন্ধর থেকে ৪০ কিমি দূরে হোসিয়ারপুর দেখতে আসার কথা। জেলা কংগ্রেস কমিটি ঘোষণা করলো যে সেদিন জেলা আদালত প্রাঙ্গনে ইউনিয়ান জ্যাক এর বদলে ত্রিবর্ন পতাকা ওড়ানো হবে। এই কর্মসূচি বানচাল করার জন্য জেলা শাসক আর্মি মোতায়েন করেন আর কেউ পতাকা তোলার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করার আদেশ জারি করেন। 

সেদিন হোসিয়ারপুর পোঁছে মন খারাপ। শুনলাম পতাকা তোলার কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। কংগ্রেস অফিস সম্পাদক হনুমানজির কাছে দাবি করলাম কেন বাতিল হল। উনি প্রশ্ন করলেন, গুলি চালানোর আদেশ এর কথা আমি জানি কি না। তাই শুনে খেপে গিয়ে পাল্টা বল্লাম, "গুলি খাওয়ার ভয়ে আপনারা হাল ছেড়ে দিলেন ? এত জাতির প্রতি অপমান!" উনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বসেন," এতই যদি তোমার সাহস, তাহলে তুমিই পতাকা তুলে দেখাও।"

আমি অফিসের একটি ডান্ডায় লাগানো পতাকা খুলে নিয়ে কোর্টের দিকে দৌড়ালাম। সেই আদালত যাকে সেই সময়ে ব্রিটিশ শক্তির একটা নিদর্শন হিসেবে ধরা হতো। কর্মসূচির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়াতে তখন পুলিশ আর সেনাবাহিনীর মধ্যে একটু ঢিলেঢালা ভাব। তার সুযোগ নিয়ে সিঁড়ি টপকে ছাদে উঠলাম, ইউনিয়ন জ্যাক খুলে নামিয়ে দিলাম। লাগিয়ে দিলাম ত্রিবর্ন পতাকা। তাই দেখার পরে গুলি চালানো শুরু হয়। দুটো গুলি আমার কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়, গায়ে লাগেনি। ডেপুটি কমিশনার বাখলে বেরিয়ে আসেন। আমাকে বাচ্চা ছেলে দেখে তিনি গুলি চালানো বন্ধ করার আদেশ দেন। আমি স্লোগান দিতে শুরু করি। আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই, আমি নিরস্ত্র এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে সেনারা সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে। আমাকে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে যায়।

পরের দিন বিচার শুরু হয়। ম্যাজিস্ট্রেট নাম জিজ্ঞেস করলে বলি, "আমার নাম লন্ডন তোড় সিং।" আসল নাম কিছুতেই বের করতে পারেনি। যা করেছি তার দায় স্বীকার করি, ভগত সিং এর অনুপ্রেরণার কথা বলি। আমার এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়। "মাত্র এক বছর ?" ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বাড়িয়ে চার বছর কারাবাস এর আদেশ দেন।" 

সেদিন জাতীয় পতাকা তোলার জন্য প্রাণ তুচ্ছ করে এগিয়ে আসা কিশোরের আসল নাম হরকিসেন সিংহ সুরজিৎ। ডান্ডা বেড়ি পরে অকথ্য পরিবেশে হাজতবাস করা সেদিনের সেই কিশোর পরবর্তীকালে ভারতের  মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

সুরজিৎ এর ফ্ল্যাগ পোল ছিল ব্রিটিশ কোর্টের ছাদে লাগানো। এর পাশাপাশি লাল কেল্লার র‍্যামপার্ট এ পতাকা লাগানোর কাহিনী একটু ছোট করে আসুক। 

আরএসএস এর ভাষায়, "ভাগ্যের ধাক্কায় ক্ষমতায় আসা লোকেরা আমাদের হাতে তেরঙা তুলে দিতে পারে তবে হিন্দুরা এটি কখনও শ্রদ্ধা করবেন না, নিজেদের বলে  মনেও করবেন না। তিন শব্দটি নিজেই একটি শয়তানি শব্দ এবং তিনটি বর্ণের সমাহারে তৈরি একটি পতাকা অবশ্যই একটি খুব খারাপ মনস্তত্ত্ব এর জন্ম দেবে। লালকেল্লায় র‍্যামপার্ট এ "ভাগয়া ধজ তুলতে হবে " 

লাল কেল্লার মাথায় এখনো তেরঙ্গা পতাকা উড়ছে। র‍্যামপার্ট এর ফ্ল্যাগপোলে ভাগোয়া ধজ তুলে ধরার ইচ্ছে দেশের মানুষ পূরণ হতে দেয় নি। সেই ইচ্ছে বুকে নিয়ে গুমরে মরা আরএসএস আজ দেশ ভক্তি শেখাতে আসে লন্ডন তোড় সিংদের। হাসি পায়। হাসি।

সূত্র: 
১) সাক্ষাৎকার, মানিনী চ্যাটার্জি, আগস্ট ১৬, ২০০৮ ফ্রন্টলাইন পত্রিকা
২) প্রবন্ধ, আমান সিং, মে ২৬, ২০০৯, শিখ ফিলজফি
৩) প্রবন্ধ, ভেঙ্কটেশ রামকৃষ্ণনন, আগস্ট ১৬, ২০০৮, ফ্রন্টলাইন পত্রিকা।
৪) অর্গানাইজার, আর এস এস মুখপাত্র, ১৪ই আগস্ট, ১৯৪৭

বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২১

গোমাংস ভক্ষণ ~ শমীন্দ্র ঘোষ



বৈদিকসাহিত্যে সোচ্চারে গোমাংস খাওয়া সমর্থিত। গোবধ, গোমাংস রান্না, খাওয়া, দান, গোমাংসের কার্যকারিতা নিয়ে ভুরিভুরি বিবরণ রয়েছে বৈদিকসাহিত্যে ও বেদত্তোর পৌরাণিক সাহিত্যে। অধুনা প্রচারিত যে, হিন্দুদের শাস্ত্রগুলি নাকি শাকান্ন ভোজনের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। তা সর্বাংশে সত্য নয়; বরং শাকান্ন ভোজন থেকে গোমাংস ভোজনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অতিথি আপ্যায়ণে গোমাংসই শ্রেষ্ঠ ছিল, এমন বিবরণ পাচ্ছি ঋগ্বেদে এবং বৈদিকসাহিত্যে। অতিথি আগমন মানেই গোবধ করতে হবে, গোমাংস দিতে হবে, এটাই ছিল রীতি। অতিথিদের ও গোবধের স্থানকে #গোঘ্ন বলা হতো। আদপে বৈদিক আর্য তথা নর্ডিকরা ছিল বর্বর, দুরন্ত যোদ্ধা এবং যাযাবর ও পশুপালক। চাষাবাদ, খাদ্যোত্‍পাদন জানত না। পালিত পশুর মাংসই প্রধান খাদ্য, সঙ্গে ফলমূল, দুধ। তারা মূলত মাংসাশী ছিল। তাদের সবচেয়ে প্রিয় ঘোড়ার মাংস, দ্বিতীয় প্রিয় গোমাংস। এজন্যই তাদের ধর্মীয় সমস্ত পরবেই পশুহত্যা ছিল এবং যজ্ঞে দেবতাদের উত্‍সর্গ করে খেত; অশ্বমেধ, গোমেধ তাদের যজ্ঞের রীতি ছিল। ঘোড়ার মাংস রান্না ও খাওয়ার লোলুপতা ঋগ্বেদে, পরবর্তীকালের গ্রন্থে বর্ণিত। গোমাংসের জন্য হাপিত্যেশের বিবরণও ভুরিভুরি।
বৈদিক আর্যরা হিন্দুকুশ পেরিয়ে যত পূর্ব ও দক্ষিণে ঢুকেছে, দেখেছে অশ্বের তুলনায় গরুর প্রাচুর্য ও সহজলভ্যতা। ফলে আহারে গোমাংস জনপ্রিয় হয়। পরে রীতিই হয়ে ওঠে। মনুসংহিতাতেও গোমাংস নিষিদ্ধ নয়।
ব্যাপক গোবধের জন্য গরুর সংখ্যা কমতে থাকে। গোবধে তিতিবিরক্ত হয়ে বৈদিকদেরই একশ্রেণি এর বিরোধিতা করে। ক্ষোভ প্রশমণে গোমাংস ভোজনের ওপর কিছু কিছু বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। পৌরাণিককালেও গোবধ নিষিদ্ধ হয়নি, তবে গোবধ, গোমাংস ভোজন ও ব্যবহার কমানো হয়েছিল।
তারপরেও গোমাংস চলত।
ভারতবর্ষে ইসলাম আগমনের পরেও গোমাংস ভোজন হিন্দু ও ইসলামীদের দ্বারা চলেছে। কিন্তু, হিন্দুরা যেহেতু পৃথক ধর্মের, তাই হিন্দুধর্মের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখতে গোমাংস ভোজন ছাড়ে হিন্দুরা। এইসময়ে খাদ্যে নানান বিধিনিষেধ আনা হয়। মাছ, শূকর, মেষ, মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি খাওয়া নিষিদ্ধ হয় ব্রাহ্মণদের দ্বারা; ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে নিষিদ্ধ খাদ্যতালিকা রয়েছে। অথচ, তৈত্তিরীয় সংহিতায় ইন্দ্রকে শূকর বলি দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ মতে ব্রাহ্মণরা পূর্ণিমা ছাড়া অন্য তিথিতে দেবতার উদ্দেশ্যে বলিপ্রদত্তের মাংস খেতে পারে।
বাংলা অঞ্চলের মানুষ মাছ খেত সহজলভ্যতায়, স্বাভাবিকতায়। ধর্মরক্ষায় লুকিয়ে খেত। ধরা পড়লে বৌদ্ধ বা পরে ইসলাম হতো। এটা রুখতে সেইসময়ে এই বাংলা অঞ্চলের বিখ্যাত পণ্ডিত ভবদেব ভট্ট, জীমূতবাহন হিন্দু ব্রাহ্মণের মাছ খাওয়ার বিধিনিষেধ তুলে নিলেন ও খাদ্যে, ভোজনে সংস্কার করলেন। এইসময় থেকেই উত্তর ও পশ্চিমভারতের বিশেষত গোবলয়ের হিন্দুদের সঙ্গে পূর্বভারতের হিন্দুদের খাদ্যে, ভোজনে, আচারে স্পষ্ট পার্থক্যের শুরু।
কালে কালে উত্তর ও পশ্চিমভারতের অতি আবেগপ্রবণ একশ্রেণির হিন্দু গরুকে দেবতা বানায়; গরুপূজা শুরু হয় এই ঊনবিংশ-বিংশ শতকে। অথচ, হিন্দুরা যে যে গ্রন্থগুলোকে ধর্মগ্রন্থ বলে এবং মানে, সেসবে গোবধ ও গোমাংস ভোজন রয়েছে রমরমিয়ে। গোদান আদপে গোমাংস দানের অপভ্রংশ রূপ।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ থেকে গোবধ ও গোমাংস ভোজনের উদাহরণ---
১) শ্রাদ্ধে অতিথিদের গোমাংস ভক্ষন করালে পূর্বপুরুষ ১ বছর স্বর্গসুখ পেতে পারে, এই উপদেশ যুধিষ্ঠিরের প্রতি পিতামহ ভীষ্মের, (মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, অধ্যায় ৮৮)।
২) বিরাট রাজার গোশালায় দৈনিক ২০০০টি গরু বলি দেওয়া হতো। ফলে রক্তনদী তৈরি হয় রাজপ্রাসাদের গা বেয়ে।
৩) রাম গরুর মাংসের সঙ্গে মদ খেতে ভালবাসত। বনবাস-প্রাক্কালে মায়ের কাছে রামের আক্ষেপ, সে ১৪ বছর গোমাংস খেতে ও সোমরস পান করতে পারবে না এবং সোনার খাটে ঘুমাতে পারবে না; "রাম গোমাংস ভক্ষণ করতেন।" (বাল্মীকী রামায়ণ, আদিকাণ্ড, অযোধ্যাকাণ্ড)।
রাম, লক্ষ্মণ, সীতা বনবাসে যাবার পথে ভরদ্বাজমুণির আশ্রমে বৃষমাংস, মধুপর্ক, ফলমূল খেয়েছিল, (বাল্মীকী রামায়ণ ২/৫৪)। 
৪) গোহত্যা এবং গোমাংস খাওয়ার বিধান রয়েছে শতপথ ব্রাহ্মণ ১১১/১/২১।
৫) ঋগ্বেদে বৈদিকআর্যদের গোমাংস খাওয়ার বহু উল্লেখের থেকে---
"ইন্দ্র বলল তাদের খাওয়ার জন্য ২০টি ষাঁড় রান্না করা হয়েছে (ঋগ্বেদ ১০/৮৬/১৪)।
গোমাংস ইন্দ্রের অতিপ্রিয় ছিল।
ঋগ্বেদে অগ্নির উদ্দেশ্যে ঘোড়া, বলদ, ষাঁড়, দুগ্ধহীন গাই, মেষ বলির উল্লেখ আছে। গরু বা ষাঁড়গুলিকে বৈদিকআর্যরা তরোয়াল বা কুড়ুল দিয়ে হত্যা করতো।
একটি বেঁটে ষাঁড় বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে, একটি চিত্‍কপালী শিংওয়ালা গরু ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে, একটি কালো গরু পুষনের উদ্দেশ্যে, একটি লাল গরু রুদ্রের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হতো।
ঋগ্বেদ সংহিতায় "বিবাহসূক্ত"-এ কন্যার বিয়েতে সমাগত অতিথিদের গোমাংস পরিবেষনের জন্য অজস্র গরু বলির বিধান আছে, (ঋগ্বেদ সংহিতা ১০/৮৫/১৩)।
৬) তৈত্তিরীয়ব্রাহ্মণে "পঞ্চশারদীয়-সেবা" নামক ভোজন অনুষ্ঠানের প্রধান বৈশিষ্ট্য, ৫বছরের কম বয়সী ১৭টি বাছুরের মাংসে অতিথি আপ্যায়ন।
৭) বিষ্ণুপুরাণও গোমাংস ভোজনকে সমর্থন করেছে। শ্রাদ্ধের দিনে ব্রাহ্মণদের মৎস্যদানে ২মাস, শশক মাংস দানে ৩মাস, ছাগ মাংস দানে ৬মাস, মেষ মাংস দানে ১০মাস এবং গোমাংস দানে ১১মাস পিতৃগণের আত্মা পরিতৃপ্ত থাকে, (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬, ঔর্ব্য মুনির বচন)।
৮) গোপালকেরা মাংসের জন্য ছাপ দেওয়া গরুর মাংস কাঁচা অথবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে, (চাণক্য অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)।
৯) চরকসংহিতা গোমাংসের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও পুষ্টিগুণের কথা বলেছে এবং গোমাংস খাওয়া সমর্থন করেছে। গোমাংস বাত, নাক ফোলা, জ্বর, শুকনো কাশি, অত্যাগ্নি (অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গরম), কৃশতা প্রভৃতি অসুখের প্রতিকারে বিশেষ উপকারী (চরকসংহিতা ১/২৭/৭৯)।
১০) সুশ্রুতরও একই সুর, গোমাংস পবিত্র এবং ঠান্ডা; হাঁপানি, সর্দিকাশি, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অতি ক্ষুধা, বায়ু বিভ্রাটের নিরাময় করে, (সুশ্রুতসংহিতা ১/৪৬/৪৭)।
.
প্রশ্ন,
বেদসংহিতা, ব্রাহ্মণগ্রন্থ, পুরাণ, মনুসংহিতা, মহাভারত, রামায়ণ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ। হিন্দুরা কি এই ধর্মগ্রন্থগুলো মানে না?
.
অতএব, গোমাংস হিন্দুদের বৈধ।
© #কপিরইটভূক্ত
#শমীন্দ্রঘোষ
২০/১০/১৮

শনিবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২১

কোভিভ ভ্যাকসিন কিছু প্রশ্ন কিছু জবাব ~ সমূদ্র সেনগুপ্ত

ভারত একটা গণতান্ত্রিক দেশ। টিকা নেয়া না নেয়া নিজস্ব ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আমি স্বাস্থ্য কর্মী হিসেবে নিজে নিয়েছি এবং অন্যদের নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি, গুজবে কান না দিয়ে আপনারাও নিন।  সেই অনুরোধ জানানোর সাথে কেন জানাচ্ছি তা ব্যাখ্যা করার দায় থেকে যায়। 

প্রথমে আসা যাক ভ্যাকসিন ঘটিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে যার চরম রূপ হল মৃত্যু। গুজব রটানো হয়েছে যে ভ্যাকসিন নিয়ে মৃত্যু ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে যা বলার তা হল, টেম্পোরালিটি অর্থাৎ ঘটনাক্রম দিয়ে কজাল অর্থাৎ কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা এক ধরণের ফ্যালাসি বা কুযুক্তি। কাক ডাকলো আর তার পরে তাল গাছ থেকে তাল খসে পড়লো এ দুটোর মধ্যে কোনও কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। ভ্যাকসিন নিল আর তার পরে মরে গেল মানেই ভ্যাকসিন এর জন্য মরে গেল তা নয়। অন্য কারণ থাকতে পারে। যার মৃত্যুর উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে, তিনি ভ্যাকসিন এর কারণে মারা গেছেন সেটি বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত হয়েছে কিনা দেখতে হবে।

দ্বিতীয় যে গুজব রটানো হচ্ছে তা হল এই যে ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য ভ্যাকসিন তৈরির যে প্রথাগত পর্যায় বা সময়কাল লাগে তা ক্ষুন্ন করে অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই ভ্যাকসিন তৈরি, অনুমোদন ও বাজার এ আনা হয়েছে। এর আগে ভ্যাকসিন তৈরির দ্রুততার রেকর্ড ছিল চার বছর, মাম্পস ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে। ডঃ মরিস হিলম্যান নিজের মেয়ের নামে জেরিল লিন স্ট্রেন তৈরি করেন ষাট এর দশকে। কোভিভ এর ক্ষেত্রে রেকর্ড ভাঙা হল একবছর এর কম সময়ে। 

এটা মনে রাখা দরকার যে সময়ের ওই রেকর্ড ভাঙার পেছনে ব্যবসায়ীক রাজনৈতিক তাগিদ ছাড়াও অন্য কারণ আছে। সারা পৃথিবীতে পঞ্চাশটির বেশি পরীক্ষাগারে একই সাথে একটি রোগের ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা এর আগে কোনো দিন হয় নি। ষাট এর দশকের পরে মেডিক্যাল সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজি, মলিকুলার বায়োলজি, কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স এত এগিয়ে গেছে তা অকল্পনীয়। 

এই এক বছরের রেকর্ড সময়ে আবিষ্কার সম্ভব এর পেছনে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার গবেষকদের বহু বছরের সাধনা আছে। যেমন অক্সফোর্ড - এস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন যে "ভাইরাল ভেক্টর টেকনোলজি" ChAdOx1 কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছে সেটা গত দশ বছরের গবেষণার ফল। ওই প্রযুক্তি ব্যবহার এই নতুন ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরির কাজে লেগেছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এর আরেকটি প্রতিবন্ধকতা অর্থাৎ স্বেচ্ছাসেবক জোগাড় করাও এই ভ্যাকসিন এর ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হয়েই দাঁড়ায় নি। 

তৃতীয় যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে তা হল কার্যকারিতা নিয়ে। ভাববাদী শাস্ত্রগুলি থেকে যুক্তিবাদী বস্তুবাদী বিজ্ঞান এখানেই আলাদা যে বিজ্ঞান কোনো দিন দাবি করে না যে শেষ কথা বলে ফেলেছে, আর কিছু বলার নেই। ভ্যাকসিন এর দ্বিতীয় ডোজ এর এক মাস পরের ডাটা সংগ্রহ করা গেছে। এবং দেখা গেছে যে তাতে যথেষ্ঠ পরিমান প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে। বিভিন্ন মানব গোষ্ঠী অনুযায়ী এটা বিভিন্ন রকম হলেও কমবেশী ৭০% এফেক্টিভ (কোভিশিল্ড)। (একটি ভ্যাকসিন এর ক্ষেত্রে ৯০% এর বেশি)। মনে রাখতে হবে যে এযাবৎ কাল ১০০% কার্যকর এমন কোনো টিকা মনুষ্যজাতি আবিষ্কার করতে পারে নি।

ছয়মাস বাদে সক্ষমতা কতটা থাকবে এ প্রশ্ন যারা তুলছেন তাদের সবিনয়ে জানানো দরকার যে ছয়মাসের ডাটা এখনো হাতে আসে নি। আর আসে নি বলে সুনির্দিষ্টভাবে উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। 

ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর কিনা সে নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত দেয়ার ও বিতর্কে অংশ নেওয়ার অধিকার কেবল ডাক্তার নয় যে কোনো সাধারণ মানুষের আছে। কেবল অনুরোধ জানাবো যে সপক্ষে যুক্তি সাজানোর সময় জনপ্রিয় মিডিয়ার লিঙ্ক শেয়ার না করে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন। এভিডেন্স বেসড মেডিসিন এর সূত্রঃ ধরে পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধকে মান্যতা দিন। 

এই বাজার অর্থনীতির যুগে সবই বিক্রি হয়, বিজ্ঞানী গবেষকদের সততাও সন্দেহের ঊর্ধে নয়, তবে ল্যানসেট পয়সা খেয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করে বলে অতি বড় বামপন্থীরাও অভিযোগ করেন নি। সেই ল্যানসেট এর একটি ঝলক ভারতের কোভিশিল্ড এর আদি সংস্করণ নিয়ে। উৎসাহীরা পুরো প্রবন্ধটি দেখতে গুগলামো করুন। 

এই লেখাটি হয়তো "আপিল টু অথরিটি" ফ্যালাসি দোষে দুষ্ট। কিন্তু ল্যানসেট এর নাম নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না। 

শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২১

মূর্খ সংবাদ ~ আর্য তীর্থ

লোকটা হঠাৎ ঘরের দেওয়ালে 
আপনমনেই নিজের খেয়ালে
গোটা গোটা করে লিখে দিলো সোজা, মন্ত্রীমশাই মূর্খ!
কেন যে লিখলো, কে জানে বাবা, 
সে দেশে করেনা প্র্যাকটিস ভাবা,
বোকা হাবা সেজে থাবাকে এড়ালে তবে জোটে কিছু সুখ গো!
এ লোকটা মোটে দ্রোহীটোহি না, 
জীবন কাটায় রাজনীতি বিনা,
ছা পোষা বাকি লোকের মতনই ঝঞ্ঝাট চলে এড়িয়ে,
তবু দুম করে চারিদিক দেখে, 
ফেটে পড়ে আজ ওই কথা লেখে
অজানা এখনো কিসে গেলো তার ধৈর্য্যের বাঁধ পেরিয়ে।
বন্ধু এবং পড়শীরা এসে, 
বলে ও পাগল, ফেঁসে যাবি শেষে
কে কোথার থেকে উঁকি দিয়ে নেবে দেওয়াল-লিখন দেখে,
কেন বা ডাকিস বিপদ অযথা, 
লক্ষ্মীটি সোনা, শোন ভালো কথা,
ঘষে ঘষে ফেল মুছে ওই লেখা এখনই দেওয়াল থেকে।
মানুষটা হেসে বলে আরে ধুর, 
পেয়াদা আসবে কেন এতদূর,
বাইরে কোথাও বলতে যাইনি , লিখেছি নিজের ঘরে,
গালি তো দেইনি কোনো অশ্রাব্য , 
অথবা বলিনি কাগজে ছাপবো
লোক আমি নই এত কেউকেটা খবর রাখবে চরে।

কিন্তু লোকটা জানতো না ঠিক,
 সেদেশে নজরে সব নাগরিক,
পারলে মগজে ডুবুরীর মতো সেঁধোয় পেয়াদা যেন, 
পরদিন যেই গিয়েছে আপিস,
 দেখে বেচারির চাকরি হাপিস,
ম্যানেজার তাকে খোলসা করে না কাজ চলে গেলো কেন।
অবশেষে এক বন্ধু পুরোনো, 
ছিটকিনি এঁটে করে দোনোমোনো,
ফিসফিস করে বলে দিলো কানে কী তার ক্রাইমখানা,
মন্ত্রীর নামে দিয়েছে সে গালি, 
রাষ্ট্রের চোখে কড়কড়ে বালি,
এসব কথা যে ভাবাও বারণ , সকলের সেটা জানা। 

বলতে বলতে পুলিশের গাড়ি, 
হুটার বাজিয়ে এলো তাড়াতাড়ি,
থানাতে দারোগা ধমকে বলেন সাহস তো তোর নয় কম 
বলেছিস নাকি মন্ত্রী মূর্খ, 
পেছনে পড়বে এখন হুড়কো,
উনি চটে গেলে বাঁচা মুশকিল , যমকে বরং ভয় কম।
লোকটা বললো, আরে ও সাহেব, 
আমি মন্ত্রীর খাস মোসায়েব,
সকাল বিকেল তাঁকেই  স্মরণ করে তবে জল খাই 
আপনাকে খুলে বলি সোজাসুজি,
 খামোখা হয়েছে ভুল বোঝাবুঝি,
উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে যে চেপে গেছে পুরোটাই।
 ওই যে মন্ত্রী প্রতিবেশী দেশে,
 শয়তান ব্যাটা মানুষের বেশে,
আমি তো বলেছি ওই হতভাগা হস্তীমূর্খ আস্ত,
এদেশে মহান মন্ত্রীমশাই, 
খামোখা কেন বা গালি দেবো ছাই,
আহা ফুলেফেঁপে বেড়ে গিয়ে তাঁর  ভালো হোক আরো স্বাস্থ্য।

দারোগাটি করে প্রবল ভ্রুকুটি, 
কঠিন হস্তে টিপে ধরে টুঁটি,
লোকটাকে বলে ব্যাটা করছিস আমার সঙ্গে চালাকি
ফালতু না দিয়ে ভাংচি ভড়ং , 
সত্যিটা বলে ফেল না বরং,
থার্ড ডিগ্রীটা শুরু করে দেবো যদি দিতে চাস ফাঁকি।

এতদিন ধরে চড়াই লোককে, 
পারবি না দিতে ধুলো এ চক্ষে,
কাদের দেশের মন্ত্রী মূর্খ, আমি তা জানিনা নাকি?

আর্যতীর্থ

লেসার ইভিল ~ সুশোভন পাত্র

তৃণমূল কে হারাতে, বিজেপির প্রতীকে তৃণমূল কেই ভোট দিন।
যেমন ধরুন, তৃণমূলের তোলাবাজ শুভেন্দু কে হারাতে, বিজেপির তোলাবাজ শুভেন্দু কে ভোট দিন।  কিম্বা তৃণমূলের ঘুষখোর মুকুল কে হারাতে, বিজেপির ঘুষখোর মুকুল কে ভোট দিন। আসুন, বাংলার চিটিংবাজ মিডিয়া কে তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি ন্যারেটিভে আপনার মাথা খাওয়ার সুযোগ করে দিন। কিন্তু, খবরদার সিপিএম'র কথা বিশ্বাস করবেন না।

ঐ যে আপনি শুনেছিলেন, সিপিএম বলেছিল 'কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ' –আসলে আপনি ওটা ষোল আনাই ভুল শুনেছিলেন। মকর-সংক্রান্তির বাজারে ড্রইংরুমের সোফা তে গা এলিয়ে চুপটি করে এবিপি আনন্দ চালিয়ে বসুন। দেখবেন কিছুক্ষণ পর আপনার মনে হবে নন্দীগ্রামের কেমিক্যাল হাবটা আসলে বানাতে চেয়েছিল শুভেন্দু অধিকারী। চেয়েছিল অখিল গিরি। চেয়েছিল তৃণমূল। চায়নি শুধু বামফ্রন্ট! চায়নি শুধু সিপিএম! চায়নি শুধু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য!
রিমোট টিপে চ্যানেল বদলে চোখ রাখুন জি-২৪ ঘণ্টার পর্দায়, মনে হবে সিঙ্গুরে আসলে কারখানা করতে চেয়েছিল মুকুল রায়। চেয়েছিল বেচারাম। চেয়েছিল বিজেপি। কদিন পর হয়ত শুনবেন চেয়েছিল মমতাও। চায়নি শুধু বামফ্রন্ট! চায়নি শুধু সিপিএম! চায়নি শুধু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য!

ঐ যে আপনি দেখেছিলেন, ২০০৬-র ৩রা ডিসেম্বর, সিঙ্গুর ইস্যুতে মমতার ধর্মতলার অনশন মঞ্চের বয়স যখন জাস্ট ৬ঘণ্টা, তখন অনশন মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন বিজেপি শীর্ষ নেতা রাজনাথ সিং; আসলে উনি রাজনাথ সিং ছিলেন না, ছিলেন আলাদীনের প্রদীপের জিন। একটা থেকে আড়াইটা; ছিলেন টানা দেড় ঘণ্টা। সাথে সমর্থকরা, বিজেপির দলীয় পতাকা নিয়ে।
সদ্য সংবিধান হাতে বিধানসভার ভাঙচুর করে গণতন্ত্রের শ্রাদ্ধ করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন যখন অনশন মঞ্চ থেকে বলছেন "মুখ্যমন্ত্রী ডাকলেও রাজ্য সরকার সাথে সিঙ্গুর নিয়ে কোন আলোচনায় বসব না। যা হওয়ার হোক প্রয়োজনে রক্ত ঝরিয়ে সিঙ্গুর আন্দোলন চলবে" -বিজেপি নেতা রাজনাথ সিং তখন ঠাই দাঁড়িয়ে মমতার পাশে। মাইক হাতে তিনি বলেছিলেন,
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় NDA-র গুরুত্বপূর্ণ শরিক। বিজেপি শুধু তাকে সমর্থন করে তাই না, সক্রিয় সমর্থন করে!
সেদিনই সন্ধেবেলা মমতার অনশন মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন কার্গিলের নিহত জওয়ানদের কফিন কেলেঙ্কারির 'মিডলম্যান' প্রাক্তন NDA-র প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজ।

যারা ২০১১-র বামফ্রন্টের নির্বাচনী পরাজয় কে স্বাভাবিক গণতন্ত্রীয় লিনিয়ার ইকুয়েশন মনে করেন, কিম্বা নেত্রী মমতার একক রাজনৈতিক ক্যারিশ্মার জাবর কাটেন, তারা কি বলতে পারেন আজ শুভেন্দু কেন বলছে অটল বিহারী বাজপেয়ী পরামর্শেই এ রাজ্যে নাকি পথ চলা শুরু তৃণমূলের? কেন সেদিন RSS-র প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তথাকথিত জমি আন্দোলনেও? বলতে পারেন মমতার অনশন মঞ্চের ২০০৬-র রাজনাথ সিং আর আজকের ২০২১-র রাজনাথ সিং কি একই ব্যক্তি না আলাদা? কিম্বা ঠিক কোন কারণে নন্দীগ্রাম ষড়যন্ত্রের 'মাস্টারমাইন্ড' শুভেন্দু বিজেপি ওয়াশিং মেশিনে আজ ধোয়া তুলসী পাতা? সিঙ্গুর আন্দোলনে মমতার ছায়াসঙ্গী মুকুল রায়ের কেন আজ শিল্পের জন্য এই কুমীরের কান্না?
বলতে পারেন পৃথিবীর আর কোন অঙ্গরাজ্যের মহিলা প্রধানের সঙ্গে স্বয়ং এসে দেখা করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন? কিম্বা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন? কেনই বা ২০০৭-র ফেব্রুয়ারিতে রাজ্যের আপাদমস্তক এক ধর্মীয় নেতা এবং তৎকালীন নন্দীগ্রাম আন্দোলনের বামফ্রন্ট বিরোধী মুখ সিদিক্কুলা চৌধুরীর সাথে রুদ্ধদ্বার মিটিং করেছিলেন মার্কিন কনস্যুলেটের প্রধান? লেনিনিস্ট কনজাংচারে পেয়দাইশ জঙ্গলমহলে কিষানজীর অবশিষ্ট কিছু শহুরে কোয়ার্টার-হাফ-সেম-ফুল ভক্তরা কি বলতে পারেন পুঁজিবাদের এই ম্যাসকটদের ব্লু-আইড কন্যা মমতার 'ক্লাস ক্যারেক্টার'টা ঠিক কি?

উত্তর খুঁজুন। কারণ আপনার হয়ে রাজনৈতিক নেতাদের এই প্রশ্ন গুলো করবে না গণতন্ত্রের 'চতুর্থ স্তম্ভ' মিডিয়া! আসলে আপনার-আমার মত আম পাবলিক কে এই নেতা-মিডিয়ারা 'মানুষ'ই ভাবে না। ভাবে গুরু-ছাগল। ভাবে এরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলে। এরাই আপনাকে ২০১১-র আগে গিলিয়েছিলে 'পরিবর্তন চাই'। এরাই আপনাকে ২০২১-র গেলানোর চেষ্টা করছে 'হয় তৃণমূল না হয় বিজেপি!'

বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা আপনি বরং গত এক মাসের বাংলা সংবাদমাধ্যমের যে কোনও টক শো কিম্বা যে কোনও সাংবাদিক সম্মেলনের ভিডিও প্লে-পস-রিওয়াইন্ড করে দেখুন! দেশে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা, ২৪টি কোয়ার্টারে নিম্নগামী জিডিপি বৃদ্ধির হার, ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ বেকারত্ব, হাঙ্গার ইনডেক্সে কিম্বা ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে –খেয়াল করে দেখুন তো এসব বিষয়ে কোন সংবাদ মাধ্যম কে কোনদিন দিলীপ ঘোষদের একটাও প্রশ্ন করতে শুনেছেন? শোনেননি তো? আগামী ৩ মাসেও শুনবেন না!

কিম্বা রাজ্যের আম্ফান দুর্নীতি, বেকারত্ব, তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের দলবদলের রাজনীতি, সরকারী শূন্যপদ বা সংসদে একের পর এক জনবিরোধী বিলে তৃণমূলের সাংসদদের বিজেপি কে প্যাসিভ সমর্থন– খেয়াল করে দেখুন তো এসব বিষয়ে কোন সংবাদ মাধ্যম কে কোনদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে একটাও প্রশ্ন করতে শুনেছেন? শোনেননি তো? আগামী ৩ মাসেও শুনবেন না!
কেন বলুন তো? উত্তর খুঁজুন! অবশ্যই সিপিএম-র সমালোচনা করুন।  কিন্তু অন্ধ সিপিএম বিরোধিতা ছেড়ে যদি যুক্তির বুনিয়াদী বিন্যাসে বিশ্বাস করেন তাহলে উপরের প্রশ্ন গুলোর বস্তুনিষ্ঠ উত্তর খুঁজুন! সিপিএম-র প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজুন।
সিপিএম বলেছিলে, রাজ্যের বেকারদের জন্য বৃহৎ শিল্পের প্রয়োজন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-শালবনী, বেকারদের স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিলে সিপিএম। ভুল করেছিল? সিপিএম বলেছিল, ২০১১-র নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস কালো টাকা ব্যবহার করে ভোট করেছে। সুদীপ্ত সেন, কেডি সিং কিম্বা গৌতম কুণ্ড - সিপিএম ভুল বলেছিল? সিপিএম বলেছিল, নন্দীগ্রামের ষড়যন্ত্রের জন্য আপাদমস্তক দায়ী তৃণমূল। ২০১৪ তে বামফ্রন্ট সরকার কে সিবিআই-র ক্লিনচিট, মমতা সরকারের পক্ষে অভিযুক্ত পুলিশদের পদন্নোতি আর আজকের শুভেন্দু স্বীকারোক্তি -সিপিএম ভুল বলেছিল? সিপিএম বলেছিল, সিঙ্গুরে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরত দিয়েই না হয় শিল্প হোক। সেদিন রাজি হননি মমতা। আজ সিঙ্গুরে এসে একবার দেখেই যান না হয় –সিপিএম কি ভুল বলেছিল?
সিপিএম বলছে তৃণমূলের জন্যই রাজ্যে বেড়েছে বিজেপি। ভুল বলছে? সিপিএম বলছে একটা নির্বাচন হারলেই তৃণমূল তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে। ভুল বলছে? সিপিএম বলছে এ রাজ্যের ৯০% বিজেপি নেতা হবেই আসলে প্রাক্তন তৃণমূলী। ভুল বলছে? সিপিএম বলছে বিজেপি হারাতে কেবল বিজেপি নয় হারাতে হবে তৃণমূলকেও? ভুল বলছে? উত্তর খুঁজুন।

হিসেব হবে। রইলাম আমরা। মাটি কামড়ে। শেষতক।

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

মাস্টারদা ~ অরিজিৎ গুহ

Masterda

১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিলের পর থেকে চট্টগ্রাম শহরে দিনের বেলাতেই রাত নেমে আসত। সূর্য ঢলে পড়লেই ব্রিটিশ মহিলা পুরুষরা কেউ আর ঘরের বাইরে থাকত না, সে যত কাজই থাকুক না কেন। তাদের গ্রাস করেছিল এক অজানা আতঙ্ক। চারিদিকে তারা ফিসফাস শুনতে পেত ওই, ওই যে আসছে। ওই শুনেই যে যেখানে পারত লুকিয়ে পড়ত। তারা সবাই ভুতের ভয় পেত। সেই ভুতের নাম ছিল মাস্টারদা।
     'মাস্টারদা' এই একটা শব্দই প্রত্যেক ইউরোপিয়ানের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এলাকায় এলাকায় গল্পগাথা যেত মাস্টারদা নাকি যে কোনো সময়ে যে কোনো রকমের বেশ ধারণ করতে পারেন। কোথাও যদি শোনা যেত যে মাস্টারদা মালির বেশ ধারণ করে কোথাও লুকিয়ে রয়েছেন তো পরক্ষণেই শোনা যেত অন্য কোনো জায়গায় সেই একই সময়ে মাস্টারদা নাকি সন্ন্যাসির বেশে কোনো গ্রামবাসীর সাথে কথা বলছেন। কেউ কেউ আবার বলে মাস্টারদা নাকি মন্ত্র জানেন। চোখের সামনে তিনি হাওয়ায় মিলিয়ে যান। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মামলায় ব্রিটিশ পুলিশ তখন তন্নতন্ন করে খুঁজে বেরাচ্ছে মাস্টারদা কে। অথচ মাস্টারদা কে ধরা শুধু মুশকিলই নয়, নামুমকিন।

    একবার গোপনে খবর পেয়ে এক বাড়ি ঘিরে ফেলল ব্রিটিশ পুলিশ। ইনফরমেশন ছিল ওই বাড়িতে নাকি মাস্টারদা লুকিয়ে রয়েছেন। বাড়ির মালিককে ধরে বেধে পুলিশের কর্তার সামনে হাজির করল কনস্টেবলরা। কর্তা জিজ্ঞাসা করলেন আপনার নাম কি? উত্তর এলো সূর্য সেন। চমকে উঠল পুলিশের কর্তা। কোন সূর্য সেন? উত্তর মাস্টার সূর্য সেন। পুলিশ কর্তার তখন স্নায়ু উত্তেজন চরমে। ভাবছে সারা বাংলাদেশ জুড়ে যে লোকটাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেরাচ্ছে ব্রিটিশ ইন্টালিজেন্স সেই লোকটাকে এত সহজে ধরে ফেলল সে! হাত পা থরথর করে কাঁপা শুরু হয়েছে পুলিশ কর্তার। লোকটাকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম শহরে ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চে চলে গেল পুলিশ কনস্টেবলরা। সেখান থেকে মাস্টারদা সূর্য সেনের ছবি নিয়ে আসা হল। দেখা গেল এই মাস্টার তো সেই মাস্টার নয়! পরে খোঁজখবর করে জানা গেল এই মাস্টার হচ্ছে স্থানীয় একটা স্কুলের হেড মাস্টার যার নামও সূর্য সেন। মহা পরাক্রমশালী ব্রিটিশ পুলিশ সাধারণ মানুষের চোখে হয়ে উঠল ইয়ার্কির পাত্র। পুলিশ দেখলেই লোকজন এখনকার ভাষায় যাকে বলে ট্রোল করা, সেই ট্রোল করা শুরু করল।

   ছোটবেলা থেকেই অদম্য সাহসী সূর্য সেন ব্রত নিয়েছিলেন ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার। সেই লক্ষ্যে রত ছিলেন আজীবন। কলেজে পড়তে পড়তেই অনুশীলন সমিতির সদস্য হন। সেখান থেকেই বিপ্লবী জীবনে হাতেখড়ি। কলেজ শেষ করে চট্টগ্রাম শহরে ফিরে কংগ্রেসে যোগ দেন। সেই সময়ে দেশে কংগ্রেস ছিল ব্রিটিশ বিরোধী একমাত্র বড় রাজনৈতিক শক্তি। কংগ্রেসে থাকতে থাকতেই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের দেশের প্রতি স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করতে শুরু করেন। স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে প্রচুর ছাত্র ছাত্রীর সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান। সেই সুযোগকেই কাজে লাগান। ১৯৩০ সালে গণেশ ঘোষ অনন্ত সিংহ সহ আরো কয়েকজন আর বেশ কিছু স্কুল কলেজের ছাত্র নিয়ে বিপ্লবী দল গঠন করে চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরিকল্পনা করলেন। আর তার সাথে টেলিগ্রাফ অফিস টেলিফোন অফিস আর রেলওয়ে দখল করে পুরো ব্রিটিশ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মূল থেকে উপড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন। 

   জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে অনেক সহযোদ্ধা কমরেড নিহত হলেও সূর্য সেনকে ধরা যায় নি। অবশেষে ব্রিটিশ পুলিশকে অনেক নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর পর ধরা পড়েন মাস্টারদা সূর্য সেন। জেল কাস্টডিতেই প্রভূত অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয় সূর্য সেনকে। মেরে ফেলার আগে ব্রিটিশ পুলিশ সাঁড়াশি দিয়ে সব কটা দাঁত উপড়ে নিয়েছিল। হাত পায়ের সমস্ত নখ উপড়ে নেওয়া হয়েছিল সূর্য সেনের। কিন্তু তাও তিনি তাঁর আদর্শের প্রতি জীবনের শেষদিন অব্দি অবিচল ছিলেন।

   আমাদের স্মৃতি আসলে খুব দুর্বল। অনেককিছুই ভুলে যাই। এত শত শত বিপ্লবীর আত্মবলিদানও অবলীলায় ভুলে গেছি আমরা। ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি আজকের দিনেই অকথ্যা অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছিল মহান এই বিপ্লবীকে। শরীরটাকে মেরে ফেললেও তাঁর আদর্শকে মেরে ফেলা যায় নি। কারণ Ideas are bulletproof.

রবিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২১

বিজ্ঞান কংগ্রেস ~ অমিতাভ প্রামাণিক

১৯১১ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরে গেল দিল্লিতে। ল্যুটিয়েন্স সাহেব এসে ডিজাইন করলেন ল্যুটিয়েন্স ডেলহির। সেখানকার কিছু রেলপথ উপড়ে ফেলে স্থানান্তরিত করা হল সে কারণে। কলকাতার উন্নতিমূলক কয়েকটা বড়সড় প্রকল্প এ কারণে থেমে রইল বেশ কয়েক বছর, কেননা সাহেবদের লক্ষ্য এখন দিল্লি নির্মাণ।

তাতে কি কলকাতার গুরুত্ব ফট করে কমে গেল? ঠিক তার উল্টো। কয়েকজন বাঘা বাঘা লোক এ সময় উঠে এলেন, যাঁদের মাথা অন্য সকলের চেয়ে ওপরে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেলেন ১৯১৩ সালে, দু-বছর পরে নাইট উপাধি। আচার্য জগদীশচন্দ্র ক্রেস্কোগ্রাফ বানিয়ে প্রমাণ করে দেখালেন বিভিন্ন উদ্দীপকের সংস্পর্শে গাছ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন বসু বিজ্ঞান মন্দির। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চললেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজে, প্রতিষ্ঠা করলেন স্কুল অভ কেমিস্ট্রি। রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জির মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি নির্মাণ করল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, বাংলায় তিনি স্থাপন করলেন দেশের দ্বিতীয় ইস্পাত কারখানা, পড়ে-থাকা হাওড়া ব্রিজ তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে কলকাতার অন্যতম দর্শনীয় বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে গেল ক্যান্টিলিভার ব্রিজ হিসাবে। চিত্তরঞ্জন দাশের সুযোগ্য শিষ্য হিসাবে ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গনে উঠে এলেন সুভাষচন্দ্র।

এবং সেই একই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বিজ্ঞানের ভবন নয়, দেশে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটাতে তিনিই উদ্যোগী হয়ে শুরু করলেন ভারতের সায়েন্স কংগ্রেস। কলকাতায় ১৯১৪ সালে তৈরি এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন তিনি নিজে। বললেন, তিনি চান প্রতি বছর এর সদস্যরা মিলিত হবে দেশের কোনো এক শহরে, আলোচনা করবে বিজ্ঞানের কোনো এক সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যা দেশের পক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ এবং এই অধিবেশনগুলোতে সভাপতিত্ব করবেন কোনো এক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী।

নিরবচ্ছিন্নভাবে বিগত একশো সাত বছর ধরে প্রতি বছর এই কংগ্রেসের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, যদিও শুরুর সেই গাম্ভীর্য এখন আর নেই। কয়েক বছর আগে একজন বিশিষ্ট নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী একে রাজনৈতিক তামাশা আখ্যা দিয়ে গেছেন।

অথচ শুরুর সেই সময়ে এটা ছিল বিজ্ঞান আলোচনার এক প্রকৃষ্ট মাধ্যম। সভাপতি হতেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা। ব্রিটিশ ভারতে সে সময় ভারতীয় বিজ্ঞানীর সংখ্যা হাতে গোনা, তাই ধরে আনতে হত বিদেশীদেরই। আশুতোষের উদ্বোধনের ছয় বছর পর দ্বিতীয় একজন ভারতীয় সভাপতিত্ব করেছিলেন, তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ১৯২০ সালে, সপ্তম বিজ্ঞান কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে। পরের বছর রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি, কলকাতায়। ১৯২৩ সালে লক্ষ্ণৌয়ের দশম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন এম বিশ্বেশ্বরাইয়া, ১৯২৭ সালে লাহোরের চতুর্দশ অধিবেশনের জগদীশচন্দ্র বসু এবং ১৯২৯ সালে মাদ্রাজে ষষ্ঠ অধিবেশনের চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন। এর পরের বছর ১৯৩০ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। মধ্যবর্তী সমস্ত অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিদেশী কেউ।

সমস্ত অধিবেশনই ছিল থিমেটিক। প্রফুল্লচন্দ্রের সময় থিম ছিল আধুনিক ভারতে বিজ্ঞানের উন্মেষ, পরের বছর রাজেন্দ্রনাথের সময় বিজ্ঞান ও শিল্প। বিশ্বেশ্বরাইয়ার অধিবেশনের থিম বিজ্ঞানকেন্দ্র ও বিজ্ঞানী, জগদীশচন্দ্রের অধিবেশনে ইউনিটি ইন লাইফ তথা জীবনে ঐক্য। এইগুলো এবং অন্যান্য সমস্ত অধিবেশনে থিম ছিল বিজ্ঞানের বা বিজ্ঞানচর্চার কোনো সাধারণ বিষয়। রামনের সময় অবশ্য রামনের গবেষণাকেই প্রাধান্য দিতে থিম হল রামন এফেক্ট সংক্রান্ত।

এ সবের অনেক আগেই স্যার আশুতোষ বিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপক হিসাবে নিয়ে এসেছেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহাকে, পরের বছর রামনকেও। কিছুকাল পরে ১৯২১ সালে বসু চলে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সাহা চলে গেলেন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৩ সালে। ১৯২৪ সালে মারা গেলেন স্যার আশুতোষ, রামন এফেক্ট আবিষ্কারের বছর চারেক আগে।

১৯৩৩ সালের বিজ্ঞান কংগ্রেসের অধিবেশন বসল পাটনায়, সভাপতি এল এল ফার্মার, থিম জাতির জীবনে ভূবিদ্যার স্থান। ততদিনে দেশে বিজ্ঞানচর্চায় বেশ কিছু নতুন মুখ উঠে এসেছে। জাতীয় ক্ষেত্রে জায়গা করে নিচ্ছেন শান্তিস্বরূপ ভাটনগর, হোমি জাহাঙ্গির ভাবা, বিক্রম সারাভাই। অধিবেশনের অতিথি হয়ে ভারতে এসেছেন বিখ্যাত নেচার পত্রিকার সম্পাদক স্যার রিচার্ড গ্রেগরি। নেচার পত্রিকা অনুসরণ করেই ভারতে কারেন্ট সায়েন্স নামে এক পত্রিকা বের হয়, তখন তার সম্পাদক রামন। রামনের সঙ্গে গ্রেগরির কথাপ্রসঙ্গে উঠল ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটির কথা। রয়্যাল সোসাইটির ধাঁচে ভারতে একটা সোসাইটি তৈরির পরামর্শ রামনকে দিলেন স্যার রিচার্ড।

রামন সে কথা সভায় পাড়তে অন্যান্যরা একবাক্যে সায় দিল। বিজ্ঞান কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরাই হয়ে যাবে এই ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্সের সদস্য। রামন বললেন, না, এখানে তো তিরিশ জন সদস্যের মধ্যে আদ্ধেকই ব্রিটিশ। তাদের মধ্যে দু-তিন জন ছাড়া সবাই বুড়ো-হাবড়া, সায়েন্সের সঙ্গে তাদের সংস্পর্শ বহুদিন ঘুচে গেছে, ওদের দিয়ে আমাদের কী লাভ? ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্স হবে শুধু ইন্ডিয়ানদের নিয়ে, ইয়াংদের নিয়ে, যারা সায়েন্সের চর্চা করে একমাত্র তাদের নিয়ে। ফালতু লোক দিয়ে সায়েন্স হয় না, সায়েন্স আর পলিটিক্স আমি এক করতে চাই না।

অন্যরা তাঁর এ কথা মেনে না নিলে রামন রেগেমেগে সে সভা ত্যাগ করলেন। কয়েকদিন পরেই তিনি দক্ষিণ ভারতের কয়েকজন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এক মিটিং করে সে বছরই তাদের নিয়ে ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্স নামে এক সোসাইটি রেজিস্টার করে ফেললেন। রেজিস্টার্ড এই সোসাইটিকে সরকার দেশের সায়েন্স সোসাইটি বলে মেনে নিল না। রামন এবং সুব্বারাও-এর মত দক্ষিণী বিজ্ঞানীরা সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন থেকে পদত্যাগ করলেন। বাকিরা তৈরি করলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি বা ইনসা। এর পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন একে একে মেঘনাদ, ভাবা, ভাটনগর এমনকি রামনের সহকর্মী কৃষ্ণাণ।

রামন পলিটিক্স পছন্দ করেন না অথচ তিনি নিজেই উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনে ব্যস্ত – এই ব্যাপারটা কলকাতার কেউ ভালো চোখে দেখল না। রামনও সুযোগ খুঁজছিলেন কলকাতা ত্যাগের। পরের বছর সুযোগ এসে গেল। ১৯৩৪ সালে রামন চলে গেলেন ব্যাঙ্গালোরে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্সের প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর হিসাবে। কিন্তু পৃথিবীর যাবতীয় উন্নত দেশে যখন একটাই মুখ্য সায়েন্স অ্যাকাডেমি, ভারতে শূন্য থেকে গজিয়ে গেল দুটো এবং এখনও দুটোই সমানভাবে সক্রিয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় যতই এগিয়ে এল, ততই দেখা গেল ইনসার অধিকর্তারাই পেয়ে যাচ্ছেন দেশীয় বড় বড় বিজ্ঞানসংস্থার দায়িত্ব। শান্তিস্বরূপ ভাটনগরের হাতে দায়িত্ব এল বিশাল টাকা খরচ করে বহু গবেষণাগার সমৃদ্ধ সিএসআইআর বা কাউন্সিল অভ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের। ভাবা পরমাণু গবেষণা শুরু করলেন, তৈরি হল বিএআরসি। সারাভাই দায়িত্ব পেলেন স্পেস রিসার্চের। রামন এ সব শোনেন আর হো হো করে হাসেন – মূর্খের দল, সায়েন্সের নামে টাকা ওড়াচ্ছে দ্যাখো! টাকা দিয়ে কি সায়েন্স কেনা যায় রে ছাগলের দল!

এদের সবাই এবং এদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে জওহরলাল নেহরু হয়ে গেলেন রামনের চোখে শত্রু।

ডিরেক্টর হিসাবে রামন আই আই এস সি-তেও টিঁকলেন না। দু-বছর যেতে না যেতেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এল – তিনি বরাদ্দ টাকার সিংহভাগ বে-আইনিভাবে নিজের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের পেছনে খরচা করছেন, অন্য ডিপার্টমেন্টের উন্নতিতে তাঁর কোনো দৃষ্টি নেই। জার্মানি থেকে ম্যাক্স বর্নকে প্রফেসর করে ধরে এনেছেন তিনি, এনে নিজেই তাঁর সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়েছেন। তাঁর কাছে কাউন্সিলের চিঠি এল – হয় ইনস্টিট্যুট থেকে রিজাইন করো, নয় ডিরেক্টর থেকে রিজাইন করে ফিজিক্সের প্রফেসরগিরি করো। এই দুটোর মধ্যে বেছে না নিলে তাঁকে বরখাস্ত করা হবে। নিরুপায় রামন বেছে নিলেন সম্মানহীন দ্বিতীয় শর্তটাই। ১৯৪৮ সালে রামন রিসার্চ ল্যাবরেটরি নির্মাণ করে তিনি অবশেষে আই আই এস সি-র সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিছুকাল পরে জওহরলাল কন্যা ইন্দিরা ও দুই শিশু নাতিকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে এসেছেন। ইন্দিরা শুনেছেন নোবেলজয়ী রামনের নাম, তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান। সুন্দরী ইন্দিরাকে রামন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন তাঁর রিসার্চ সেন্টার। দোতলার পোর্টিকো থেকে দূরে নন্দী হিলস দেখালেন। তারপর বললেন, বাবাকে গিয়ে বলবে কী দেখলেন, যদি ওঁর সময় হয় উনিও যেন একবার ঘুরে যান এখানে। সেদিন সন্ধেতেই তাঁর কাছে খবর এল, জওহরলাল পরদিন রামন রিসার্চ ল্যাবে আসতে চান।

রামন খুব আতিশয্য নিয়েই জওহরলালকে স্বাগত জানালেন এবং শুরু করে দিলেন তাঁর বক্তৃতা, যার সারমর্ম হচ্ছে তিনি বহু কষ্ট করে এই প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, সরকার যেন অবিলম্বে এর পেছনে একটা লাখ দশেক টাকার এনডাউমেন্ট ফান্ড তৈরি করে, যাতে তাঁর পরেও এই প্রতিষ্ঠান চালাতে অসুবিধে না হয়। ফট করে এ রকম টাকার কথা বলায় জওহরলাল খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও ঝানু পলিটিশিয়ানের মত উত্তর দিলেন, আপনি এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হচ্ছেন কেন? সরকার কি আর রত্ন চেনে না? নিশ্চয় এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার সমস্ত ব্যাপার সরকার দেখবে।

টাকার প্রতিশ্রুতি না পেয়ে রামন নিরাশ হলেন এবং তারপরেই যা করলেন, সেটা অত্যন্ত অভিনব। জওহরলালকে তাঁর এক ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গেলেন, যেখানে একটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল দুটো ধাতব পাত। রামনের নির্দেশে সেই ঘরে একটা ইউভি ল্যাম্প বাদে সমস্ত লাইট নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইউভি ল্যাম্পের আলোয় সেই দুটো পাতের একটা খুব চকচক করছিল। রামন জিজ্ঞেস করলেন, এর মধ্যে একটা সোনা, কোনটা বলুন তো? জওহরলাল চকচকে পাতটা দেখালেন। রামন হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ওটাই তো পলিটিশিয়ানদের নিয়ে সমস্যা, স্যার, চকচক করলেই সোনা হয় না। ওটা আসলে তামা, পাশেরটা সোনা।

ঠারেঠোরে রামন বুঝিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী অপদার্থ লোকদেরই সোনা ভেবে গাদা গাদা টাকা খরচ করে বিজ্ঞানের পিন্ডি চটকাচ্ছেন।

এ সব সত্ত্বেও রামন ১৯৫৪ সালে ভারতরত্ন উপাধি পেলেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর গলায় পরিয়ে দিলেন ভারতরত্নের মেডেল। অপমান গায়ে মেখে থাকলে পলিটিশিয়ানদের চলে না। একই বছরে জওহরলালের নির্দেশেই তাঁকে ন্যাশনাল প্রফেসরের পদও দেওয়া হল।

পরের বছর সেন্ট্রাল এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে রামনের কাছে একটা চিঠি গেল। এডুকেশন সেক্রেটারির সই করা সেই চিঠিতে সবিনয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, ন্যাশনাল প্রফেসর হিসাবে তিনি গত এক বছরে কী করেছেন, তা যেন তিনি চিঠি লিখে জানান।

মাথায় আগুন জ্বলে গেল রামনের। সেক্রেটারিকে ডেকে বললেন একটা হাতুড়ি খুঁজে আনতে। তার সামনেই ভারতরত্নের মেডেলটা ড্রয়ার থেকে বের করে মেঝেতে ফেলে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মেরে চারখন্ড করে পিসগুলো একটা লেফাফায় ভরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে রেজিস্টার্ড পোস্টে পাঠিয়ে দিলেন নোবেলজয়ী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন।

১০ জানুয়ারি ২০২১

শনিবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২১

আরেক অলিন্দ যুদ্ধ ~ পি বিশ্বাস

বিধান সরণীর এই বাড়িটা। এইখানে সংঘটিত হয়েছিল মাত্র তিনজন বাঙালি বিপ্লবীর সাথে একদল সশস্ত্র ব্রিটিশ পুলিশের গানফাইট। যা ঐতিহাসিক অলিন্দ যুদ্ধের মতই দুর্ধর্ষ, ভয়াবহ। যে কাহিনী বিদেশীর খুনে গুলি, বন্দুক, বোমার আগুনে আজো রোমাঞ্চকর।

চন্দননগরের পুলিশ কমিশনার কুইন সাহেবকে খতম করার পরে দুঃসাহসী দীনেশ মজুমদার ও নলিনী দাস আশ্রয়ের সন্ধানে ছিলেন। পুলিশ তাদের খ্যাপা কুকুরের মত খুঁজছে। ইতিমধ্যে দীনেশ টেগার্টকে হত্যা করতে গিয়ে অল্পের জন্য ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হলে তিনি মেদিনীপুর জেল ব্রেক করে পালান ও দু বার স্টেটসম্যানের সম্পাদক ওয়াটসনকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে ফেরার ছিলেন। নলিনীও হিজলী জেল পলাতক আসামী। যার মাথার ওপর ৫ হাজার টাকা পুরষ্কার।

অনেক অনুসন্ধানের পর দঃ ২৪ পরগণার মল্লিকপুরের বাসিন্দা নারায়ণ ব্যানার্জী ও তার স্ত্রী শৈলবালা এই বাড়িটি ভাড়া নিয়ে শেল্টার দেন দীনেশ মজুমদার, সাথী নলিনী ও অনুশীলন সমিতির জগদানন্দ মুখার্জীকে।

পুলিশ কিভাবে সন্ধান পেয়ে যায় এই গোপন আস্তানার। ২২ মে, ১৯৩৩ রাত্রের শেষ প্রহর, গোটা কলকাতা যখন ঘুমন্ত, কাউকে প্রস্তুত না হতে দিয়ে, বিপুল বাহিনী নিয়ে আক্রমন করে বসে তাদের হাইড আউট।

দোতালা থেকে শুরু হয় মরণপন সম্মুখ যুদ্ধ। বিনয়-বাদল-দীনেশের মত ব্যাঘ্রবিক্রমে লড়লেন নলিনী-জগদানন্দ-দীনেশ, অন্তিম বুলেটটি নিঃশেষ না হওয়া অব্দি। আহত হয়ে ভূমিশয্যা নিল ডিএসপি পোলার্ড আর ডিআইবি ইন্সপেক্টর মুকুন্দ ভট্টাচার্য। তিন বিপ্লবীই রক্তাক্ত অবস্থায় ধরা পড়েন। বিচারে নলিনী ও জগদানন্দের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর আর যক্ষারোগে মৃত্যুপথযাত্রী দীনেশ মজুমদারের ফাঁসি হয়ে গেল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।

স্বাধীনতাকামী তিন যুবকের অসম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৩৬/৪ কর্নওয়ালিশ স্ট্রীটের বাড়িখানা। যদি খোঁজেন, ফুটপাতের দোকানে প্রায় ঢেকে যাওয়া একটা ধুলিমলিন স্মৃতিফলক আপনার চোখে পড়লেও পড়তে পারে।

ওরা আকাশে জাগাতো ঝড়, অথচ ওদের স্মৃতি বলতে কলকাতা শহরে এটুকুই।

রবিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২১

সফদার হাশমী ~ অর্ক রাজপন্ডিত

১৯৮৪ সালের দাঙ্গায় যুক্ত ছিলেন তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী কংগ্রেস নেতা এইচ কে এল ভগত। কোন মধ্যপন্থা নেই। হয় আমরা ভগতের হাত থেকে পুরস্কার নেব না হয় নেব না। জনম'র বৈঠকে বলেছিলেন সফদার।

নাহ! ভগতের হাত থেকে পুরস্কারের ট্রফি আর তখনকার দিনে মোটা অঙ্ক দশ হাজার টাকা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জনম। কথা ছিল, ১৯৮৯ সালের ২ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলন করবে জনম। খোলাখুলি জানাবে তাদের অবস্থান।

দিল্লি থেকে বাসে ঝান্ডাপুর যাওয়ার পথে সহযোদ্ধা সুধন্য দেশপান্ডেকে বলেছিলেন সফদার।' ১৮ বছর পর ইউপি সরকার পৌরসভার নির্বাচন করছে। কেউই প্রতীকে লড়ছে না আমরা ছাড়া। আমরাই একমাত্র কাস্তে হাতুড়ি তারায় লড়ছি। ঝান্ডাপুরের যে আমাদের প্রার্থী রামনাথ ঝা খুব মিলিট্যান্ট ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী'।

কথা বলতে বলতে বাস এসে দাঁড়ায় ঝান্ডাপুরে। সফদার ও তাঁর কমরেডরা হেঁটে চলেছেন সিআইটিইউ অফিসের দিকে, ওখানেই হবে হাল্লা বোল।

লাঠি আর লোহার রড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গাজিয়াবাদ সিটি বোর্ডের মেয়র পদপ্রার্থী কংগ্রেস কর্মী মুকেশ সিং ও তার দলবল। এলোপাথাড়ি মার শুরু। সুধন্য দেশপান্ডে লিখেছেন, 'আমাদের কাছে ঝান্ডার লাঠি ছাড়া কিছু ছিল না, তাই দিয়েই আমরা রুখছি। পাথড় ছুঁড়ে পাল্টা মারার চেষ্টা করছি। সফদার আমাদের নেতা, চেঁচিয়ে উঠলো সবাই সিআইটিইউ অফিস চলো। সিআইটিইউ কমরেড যদুমনি বেহারার ততক্ষণে মাথা ফেটে গেছে, রক্ত ঝড়ছে। আমাদের দেখে এক মহিলা ছুটে এলেন চিৎকার করতে করতে পাঁচ জনের গুলি লেগেছে। তোমাদের একজন পড়ে আছে মাটিতে'।

সুধন্য দেশপান্ডে ও তাঁর কমরেড ব্রিজেশ ছুটছেন রাস্তায়। ব্রিজেশ রাস্তার এক কোনে রক্তাক্ত একজনকে দেখে ভাবছেন আরেকজন কমরেড বিনোদ। কিন্তু তিনি বিনোদ নন, সবুজ সোয়েটার লাল হয়েছে রক্তে, চিনতে পেরেছেন মুহুর্তেই সুধন্য, সফদার!

সফদারের সঙ্গেই খুন হয়েছিলেন সিআইটিইউ কর্মী  রাম বাহাদুর।

নাম গুলো চিনে রাখা দরকার। কারা মেরেছিল সফদারকে। ৫নভেম্বর, ২০০৩  গাজিয়াবাদ কোর্ট দশ জনকে দেষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবনের সাজা দেয়। মুকেশ শর্মা, দেবী সারন শর্মা, জিতেন্দ্র, রাম অবতার, বিনোদ সিং, ইউনুস আলি, তাহির হুসেন, রমেশ, করণ সিং এবং ভগত বাহাদুর। সবাই ছিল কংগ্রেস কর্মী।

গাজিয়াবাদ আদালতে খুনিদের পক্ষের আইনজীবী সাফাই গেয়েছিলেন, মলয়শ্রী হাসমি যা বলছেন ঠিক না, এটা ঠিক খুন না, একটা স্কাফল! ধস্তাধস্তির জেরে মৃত্যু হয়।

জনম থামেনি। হল্লা বোল থামেনি। একই জায়গায় ফিরে এসেছিলেন সফদারের কমরেডরা হল্লা বোল নাটক নিয়েই।

সফদার বেঁচে আছেন!

সফদারের কমরেডদের  শ্রেণি ঘৃনা মরেনি।

শনিবার, ২ জানুয়ারী, ২০২১

দুই ইঞ্জিনিয়ারের গল্প ~ অমিতাভ প্রামাণিক


- স্যার, একটা কথা বলব, যদি কিছু মনে না করেন?
- বলো।
- আচ্ছা, আমরা এই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রোজেক্টে কাজ করছি কেন? আপনি নিশ্চয় শুনেছেন যে আমেরিকা-জার্মানিতে ওরা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট ইনস্টল করে কোটি কোটি টাকা লস খেয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা এই প্রোজেক্টটা নিলাম কেন?
- ইয়াং ম্যান, ইন্ডিয়ার দরকার নিউক্লিয়ার পাওয়ার। নিউক্লিয়ার পাওয়ার পেতে হলে তো এই পাওয়ার প্ল্যান্ট বানাতেই হবে। আমরা যদি সেই কাজটা না করি, তো কে করবে?

কথাটা যিনি বললেন, তাঁর নাম হেনিং, তিনি একজন ড্যানিশ। ডেনমার্ক যে শুধু শ্রীরামপুরেই কলোনি বানিয়েছিল, তা তো নয়। এই হেনিং-এর বন্ধু ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান ডক্টর হোমি জাহাঙ্গির ভাবা। তিনি জানতেন, এ কাজের উপযুক্ত লোক হেনিং, তাই এই পরিকল্পনার ক্রিটিক্যাল কম্পোনেন্ট যেগুলো, তা তৈরির বরাত পেয়েছে তারই সংস্থা।

হেনিং 'ইউনিভার্সিটি অভ কোপেনহেগেন' থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ, এখন যার নামের আগে 'টেকনিক্যাল' শব্দটা যোগ হয়েছে। পাশ করেই কোপেনহেগেনের এফ এল স্মিথ অ্যান্ড কোম্পানির একটা অ্যাসাইনমেন্ট জুটে যায় তার কপালে। কাজটা হচ্ছে দক্ষিণ ভারতের কোয়েম্বাটোরের কাছে মাদুক্কারাই নামে এক জায়গায় একটা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি দাঁড় করাতে হবে। তার জন্যে যন্ত্রপাতি যা লাগবে, সব আসবে বিদেশ থেকে, তাকে এর ইনস্টলেশন-কমিশনিং করতে সহায়তা করতে হবে। সেটা ১৯৩৮ সাল। কাজে যোগ দিয়েই সে অবাক, এখানে এসে কাজ করছে তার ছোটবেলার স্কুলের বন্ধু সোরেন, ঐ একই কোম্পানির হয়ে। সে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, চার বছর আগে সে ইন্ডিয়াতে এসে সিন্ধুপ্রদেশের রোহরিতে অলরেডি একটা সিমেন্ট কারখানা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, এখন তারও কাজ এই মাদুক্কারাই প্রোজেক্টেই।

যথাসময়ে দুই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে গেল। বোম্বের কাছে মাথেরান হিল স্টেশনে ছুটি কাটাতে গিয়ে দুই বন্ধু এ ওকে বলল – দেশে ফিরে লাভ নেই। চল, এখানেই একটা কোম্পানি খুলে ফেলা যাক। মনে হচ্ছে, ব্যবসা খারাপ হবে না।

বোম্বেতে এক খুদে অফিস খুলে বসে গেল দুই বন্ধু। অফিস মানে একটা পাঁচ বাই পাঁচ মেঝে, তাতে একটা ছোট্ট টেবিল আর একটা চেয়ার। একজন বসলে অন্যজনের সেখানে জায়গা নেই, তাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ওরা বুঝে গেল, ইন্ডিয়াতে দুধের ভাল চাহিদা আছে। দুগ্ধজাত বস্তু তৈরির যন্ত্রপাতি বিক্রি হবে ভালো। ডেনমার্কের এক ডেয়ারি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকের এজেন্ট হিসাবে কাজ করলে আমদানি মন্দ হবে না।

কিন্তু বেশিদিন সে সব চালানো গেল না। বিদেশ হয়ে উঠল উত্তাল, বেধে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানি ডেনমার্কের দখল নিয়ে নিল, ফলে ডেনমার্ক থেকে ইমপোর্ট হয়ে পড়ল অসম্ভব। যন্ত্রপাতি না এলে ব্যবসা কী করে চলবে? বাধ্য হয়ে দুই বন্ধু ঠিক করল, তারা নিজেরাই যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু করবে। হেনিং এমনিতেই ঝুঁকি নিতে পছন্দ করে, সে বলল, আমরা সব রকম যন্ত্রপাতি বানাব। সোরেন অপেক্ষাকৃত সাবধানী, কিন্তু তার কাজ নিখুঁত, সে প্রবল পরিশ্রমী ও হার্ড টাস্কমাস্টার। একটা ওয়ার্কশপ মতন খুলে প্রথমে কিছুদিন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ছোটখাটো কাজকারবার করতে লাগল, মূলত সার্ভিসিং। পরে নিজেরাই ডেয়ারি ইকুইপমেন্ট তৈরিতে মন দিল।

যুদ্ধ ঘনিয়ে এলে অবশ্য তড়িঘড়ি বুঝে গেল আসল মুনাফা এইসবে নয়, বরং যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসায়। যা তৈরি করবে, নিমেষে সব বিক্রি হয়ে যাবে। সুতরাং আদা নয়, তাদের ব্যবসা হতে হবে জাহাজের। কদিন পরেই হিলডা লিমিটেড নাম দিয়ে তারা জাহাজ সারানোর আর জাহাজের প্রয়োজনীয় পার্টস বানানোর কোম্পানি খুলে ফেলল। তরতরিয়ে চলতে লাগল সেই ব্যবসা।

এদিকে টাটারা তাদের সোডা অ্যাশ কারখানা বানানোর পুরো পরিকল্পনা করে তখন গেছে ফেঁসে। তাদের ইঞ্জিনিয়ার আসার কথা জার্মানি থেকে, এদিকে জার্মানির অক্ষশক্তির সঙ্গেই তো ব্রিটিশ মিত্রশক্তির যুদ্ধ! জার্মানি থেকে ব্রিটিশ ভারতে কাকে আসতে দেবে তখন? ফলে টাটারা লোক খুঁজতে লাগল, যদি উপযুক্ত কাউকে এ কাজের জন্যে পাওয়া যায়।

খবর পেয়ে হেনিং আর সোরেন হাজির হল টাটাদের দপ্তরে। তারা নামিয়ে দেবে ওদের বিশাল সোডা-অ্যাশ কারখানা।

সেই কারখানা সাফল্যের সঙ্গে বানিয়ে তাদের ছক বদলে গেল। ছুটকো-ছাটকা কাজ না, তাদের এখন দরকার বড় বড় এমন প্রোজেক্টের কাজ। ইঞ্জিনিয়ারিং আর কনস্ট্রাকশনের কন্ট্রাক্ট নেবে তারা, ক্লায়েন্ট শুধু বলে দেবে তার কী চাই, তারা পুরো কাজটা নামিয়ে দেবে। বিশ্বযুদ্ধের দমক কমে যেতে বিদেশি কোম্পানিদের সঙ্গেও একসঙ্গে কাজ করতে লাগল তারা। আমেরিকার ক্যাটারপিলার ট্র্যাকটর কোম্পানির সঙ্গে কথাবার্তা হল, তারা বড় বড় কনস্ট্রাকশনের উপযোগী হুঁদো হুঁদো সব আর্থ-মুভিং ইকুইপমেন্ট বিক্রি করবে ইন্ডিয়ায়। দেশে তখন বিস্কুট, কাচ, বনস্পতি, সাবান ইত্যাদির কারখানার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে ব্রিটিশ কোম্পানিরা। এরা তাদেরও এজেন্সি নিয়ে ব্যবসা বাড়িয়ে চলল। এক এক রকম বিজনেসের জন্যে আলাদা আলাদা নামের কোম্পানি চালু করে দিল।

যুদ্ধ শেষ হতে আমেরিকান ক্যাটারপিলার ট্র্যাক্টর কোম্পানির ইন্টারেস্ট কমে গেল। তাদের তৈরি বড় বড় আর্থ-মুভার অবশ্য এদের কনস্ট্রাকশনের জন্যে খুবই কাজের। ওরা বলল, তাহলে তোমাদের এগুলো সস্তায় দিয়ে দিচ্ছি, তোমরা কিনে নাও।

জলের দরে হলেও অতগুলো মেশিন কেনার পয়সা তাদের নেই। দরকার ইনভেস্টমেন্টের, তার জন্যে বাজার থেকে টাকা তুলতে হবে। যার কাছেই টাকা চায়, তারাই ওদের কোম্পানির ব্যবসাপত্রের হিসেব দেখতে চায়। কোম্পানিগুলো ছোট ছোট, তাই ধার পাওয়া মুশকিল। বাধ্য হয়ে সবগুলো একসঙ্গে করে তারা একখানা বড় প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি বানিয়ে ফেলল, টাকা চলে এল। দেশ স্বাধীন হতে তাদের নতুন অফিস খুলে গেল দিল্লি, কলকাতা, মাদ্রাজেও। পরের বছর বোম্বের এক বড়সড় জলা এলাকা পরিষ্কার করে সেখানে খুলে বসল বিশাল সাইজের ফ্যাক্টরি।

অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান হোমি ভাবার মতই ইসরোর চেয়ারম্যান বিক্রম সারাভাই-ও এদেরই শরণাপন্ন হলেন, যখন ১৯৭২ সালে ভারতের স্পেস প্রোগ্রাম শুরু হল। পরে এমনকি ভারতের ডিফেন্স রিসার্চের বড় বড় ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের জন্যেও এদের কথাই ভাবা হয়। প্রতিরক্ষার সামগ্রী ভারতের সরকারী ব্যবস্থায় বেসরকারি সংস্থা থেকে নেওয়া যায় না বলে ওদের কাছ থেকে ডিজাইন চাওয়া হয়। সেই ডিজাইন পরখ করে তার বরাত দেওয়া হয় সরকারি কোনো সংস্থাকে।

হেনিং ও তার বাল্যবন্ধু সোরেন ভারতকেই তাঁদের ঘর বানিয়ে নিয়েছিলেন। নিজেদের তৈরি কোম্পানি থেকে অবসর নিয়েও হেনিং দেশে ফিরে যাননি। ২০০৩ সালে ৯৬ বছর বয়সে বোম্বের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে মারা যাওয়ার আগে তাঁর নামের আগে অনেকগুলো পুরস্কার জ্বলজ্বল করছে। ১৯৭৬ সালে রামন ম্যাগসেসে থেকে শুরু করে তার পরের বছর ড্যানিশ নাইটহুড হয়ে মৃত্যুর আগের বছর তিনি পেয়েছেন ভারতের পদ্মভূষণ, ভারতীয় ডাক তাঁর নামে পোস্টেজ স্ট্যাম্পও ছাপিয়েছে। সোরেন অবশ্য দেশে ফিরে গেছিলেন প্রায় পঞ্চাশ বছর ভারতে কাটিয়ে, ১৯৮১ সালে। কিন্তু সে তাঁর সহ্য হয়নি, পরের বছরই তিনি সেখানে মারা যান। তাঁর স্ত্রী জীবনের শেষ বছরগুলো কাটিয়েছিলেন কোদাইকানালে তাঁদের পারিবারিক বাড়িতেই।

বিভিন্ন ধরনের কারখানা, কমার্শিয়াল ও রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং, এয়ারপোর্ট, রানওয়ে, হাইওয়ে, রেলওয়ে, মেট্রোরেল, মনোরেল, এলিভেটেড করিডোর, আইটি পার্ক, হাসপাতাল, টানেল, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পরমাণু শক্তিকেন্দ্র – বহুসংখ্যক বড় বড় প্রোজেক্ট সাফল্যের সঙ্গে রূপায়িত করে দেশনির্মাণের এক অন্যতম সহচর এঁদের এই সংস্থা।


দুই উৎসাহী তরুণ ড্যানিশ ইঞ্জিনিয়ার কলেজ থেকে পাশ করেই চলে এসেছিল ভারতে, সেখানেই কেটে গেল তাদের সমস্ত জীবন। হেনিং হল্ক-লার্সেন এবং সোরেন ক্রিস্টিয়ান টুব্রোর 'লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো' এখন আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং কুড়িটা বৃহত্তম মূল্যবান কোম্পানির অন্যতম। 'এল অ্যান্ড টি' এখন পৌনে দু-লক্ষ কোটি টাকার কোম্পানি।
২৩ ডিসেম্বর ২০২০

মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

দারুণ দিন ~ রজত শুভ্র বন্দোপাধ্যায়

ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না, 
সত্যি বলছি, তোমার সঙ্গে রংবাজিতে পারব না!
মনটা আমার বড্ড নরম, মারতে গেলেই ক্লান্তি হয়, 
ভাষা আমার রুক্ষ হলেও স্বভাব আমার শান্তিময়।

আমার হাতে ডাণ্ডা দেখে ভয় পেয়েছ? মোটেই না! 
ওইটা কেবল লোক দেখানো, কাউকে আমি পেটাই না।
তিলক কাটা সাঙ্গ-পাঙ্গ? যাহ! ওরা সব বালক দল, 
শান্ত-শিষ্ট, ল্যাজ বিশিষ্ট – মন গুলো সব স্বচ্ছ জল!

এস, এস, বসবে এস, পদ্ম ফুলের আসনটায়, 
আদর করে ভরিয়ে দেব, মাথায় করে রাখব তায়।
বসবে এস মামার ঘরে; কই রে মুকু, ফ্যান চালা! 
গেস্ট এসেছেন, কর রে তোয়াজ, এই আদানি, ঠাণ্ডা লা!

দেশ জুড়ে আজ শিল্প এনে উন্নয়নের ডাক ছেড়ে 
করছি কেমন সুব্যবস্থা, সবাই খাবে পাত পেড়ে!
নাহয় দুটো ক্ষেত নিয়েছি, তাইতে আমায় দোষ দেবে?
নয় মরেছে কোন সে চাষা, অন্যরা তো ফল নেবে!

মিছেই কেন বিরোধ কর? বিল বদলের রব তোলো?
পাগড়ি পরে আটকালে পথ, কাজটা কি ভাই ঠিক হলো?
কী বললে ভাই? আদুর দলিল? চোখ বোলাবে চুক্তিতে?
রাজার কাজে নাক গলাবে? এ আবার কী যুক্তি হে!

যাও, ছাড় তো ওসব কথা! ফালতু কেন ভাবছ, ভাই?
আয়েশ করে পায়েস খেয়ো, এই তো জীবন! আর কী চাই?
যাও দেখ গে, মল করেছি, আরাম করে দর কর,
এস্কালেটর চেপেই নাহয় ওপর তলায় ভর কর।

.................................

আরে, আরে, তবুও রাগিস? আইন দেখে ভয় পেলি?
বলছি তো ভাই, গিমিক শুধু, আয় কাছে আয়, বল খেলি!
মিষ্টি করে বলছি এত, হ' না রে ভাই নিমরাজী!
তবুও তোরা কান দিবি না, চালিয়ে যাবি দল-বাজি?

বেশ, ঠিক আছে, ঘাট হয়েছে, থাক তবে তোর রাগ নিয়ে,
মিষ্টি কথা বলব না আর, শোন তবে ভাই মন দিয়ে;
আমি আছি, মোটকা আছে, আছে আমার তিনশো দুই,
সবাই মিলে কামড়ে দেব, আবার যদি লড়িস তুই!!

শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২০

সোভিয়েতের পতন ~ কৌস্তভ কুন্ডু

১৯৯১, ২৫ শে ডিসেম্বর, ঠিক সন্ধ্যা ৭:৩২ মিনিটে ভেঙে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ক্রেমলিনের মাথা থেকে নামানো হয় কাস্তে হাতুড়ি পতাকা। ভেঙে পড়ে দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্নের সোভিয়েত ইউনিয়ন। 

কিন্তু কি কারণ থাকতে পারে, পৃথিবীর দ্বিতীয় সুপার পাওয়ার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার! বহু জায়গায় বহু ব্যখ্যা পড়েছি কিন্তু যুক্তিসঙ্গত লাগেনি, তাই খোঁজার চেষ্টা করলাম নিজের মতো করে।

তবে কি মানুষ চায়নি? কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত নিয়ে যে রেফারেন্ডাম আনা হয় তাতে ৭৭.৮৫ % ভোট পড়ে সোভিয়েতের পক্ষে। তবে? 
অনেকে বলে অর্থনৈতিক ফেলিওর, যে দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৩ কোটি প্রাণ দেবার পর ১০ বছরে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হতে পারে, অন্য কোনও দেশ দখল না করে, উপনিবেশ ছাড়াই, তারা অর্থনৈতিক ফেলিওর বিশ্বাস করিনা আমি। ১৯৯০ - ৯১ তেও উৎপাদন স্ট্যাটিসটিক্স দেখুন, বা আমেরিকার মানুষের থেকে বেশী প্রোটিন ইনটেক দেখুন, তথ্য কিন্তু সে কথা বলে না।

তবে কি কারণ থাকতে পারে?
আসুন আগে দেখি কি ঘটেছিল সেসময়। মদ বিরোধী আন্দোলন করে কমিউনিস্ট পার্টির ভিতর বিখ্যাত হন এবং ১৯৮৫ সালে কম্যুনিস্ট পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হন মিখাইল গর্বাচেভ। উনি এসে ইমপ্লিমেন্ট করেন পেরেস্ত্রইকা এবং গ্লাসনস্ত। অর্থাৎ খোলামেলা রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং খোলা বাজার। ১৯৯১ এ খোদ কমিউনিস্ট পার্টির জেনেরাল সেক্রেটারি মিখাইল গর্বাচেভ কম্যুনিস্ট পার্টির অফিসে তালা মারেন। সোভিয়েত ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। আগস্ট মাসে যদিও কমিউনিস্ট পার্টির একাংশ চেষ্টা করে গর্বাচেভ কে উচ্ছেদ করার সশস্ত্র অভ্যুত্থান এর মধ্যে দিয়ে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন বরিস ইয়়েলিৎসিন, যে কিনা একসময় ৪ বিলিয়ন ডলার চেয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে, নির্বাচন জিততে। গর্বাচেভ জানায় রেফারেন্ডাম এ মানুষ নাকি ভয়ে ভোট দিয়েছিল, তাই জনাদেশের বিপক্ষে ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ইয়়েলিৎসিন এর নেতৃত্বে এবং আমেরিকার অর্থদপ্তরের সহযোগিতায় ইমপ্লিমেন্ট হয় 'শক থেরাপি', একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সমস্ত সামাজিক মালিকানা তুলে দেওয়া হল পুঁজিবাদের হাতে। শুধু সোভিয়েতের ক্ষেত মজুররা প্রতিরোধ করেছিল, তাই আজও রাশিয়ার ৭০% কৃষিজমি যৌথ খামার।

পেরেস্ত্রইকা, গ্লাসনস্ত, শক থেরাপি পরপর অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গুলোকে সাজান মাথায় রাখুন।
এবার আপনি যদি ব্যাক ক্যালকুলেশন করে কোনোদিন অঙ্ক মিলিয়ে থাকেন, একটা ব্যাক ক্যালকুলেশন করি চলুন।
প্রথম যে কথাটা মাথায় আসল, সেটা হল শক থেরাপির মধ্য দিয়ে যে হঠাৎ করে যে পুঁজিবাদে পরিণত হল সমাজতান্ত্রিক দেশ। কিকরে সম্ভব!! পুঁজিবাদের জন্য যেটা সবচেয়ে প্রয়োজন, যেটা ছাড়া চলে না, সেটা হল পুঁজিপতি। কিন্তু প্রশ্নটা আসে যে সমাজতান্ত্রিক দেশে যেখানে পুঁজিপতি শ্রেণীটাই অ্যবোলিশড সেখানে পুঁজিপতি এলো কোথা থেকে, পুঁজিই বা এলো কোত্থেকে? এখানেই খটকা লাগে আমার।

এবার শুরু করি ব্যাক ক্যালকুলেশন।
গুগলে যান সার্চ করুন রাশিয়ার বিলিওনিয়ার লিস্ট। এবার পরপর যা নাম আসবে তাদের বায়োগ্রাফি চেক করুন। একটা অদ্ভুত জিনিস দেখবেন, বিলিওনিয়ার লিস্টের ৭০% সোভিয়েত আমলের আমলা অথবা কমিউনিস্ট পার্টির উঁচু লিডার। লজ্জার ব্যাপার।
যেমন ধরুন - রাশিয়ার ৫ম ধনী ব্যক্তি ভাগিট আলেকপেরভ, উনি সোভিয়েত আমলে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন, এরপরে উনি সোভিয়েতের গ্যাস এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের মন্ত্রী নিযুক্ত হন।
বা, গেনাডি টিমোশেঙ্কো, উনি সোভিয়েতে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন। অর্ডার অব ফাদারল্যান্ড পেয়েছিলেন। 
বা, সুলেমান কেরিমোভ ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন আলতাব সংস্থার।
মোট ৪৬ জন বিলিওনিয়ার এর লিস্ট খুঁজে দেখুন ৭০% সোভিয়েত আমলের আমলা অথবা কমিউনিস্ট পার্টির উঁচু লিডার।
এদের হাতেই তুলে দেয় বরিস ইয়েলিৎসিন পুঁজিবাদের ভার, পুঁজি হিসেবে আসে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের অর্থ সাহায্য।

সমস্যাটা শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ পেরেস্ত্রইকা, গ্লাসনস্ত আমল থেকে। মিখাইল গর্বাচেভ খোলামেলা ব্যবস্থার নামে কিছু কিছু সংস্থাকে পুঁজি এবং আমলাদের পুঁজিপতি হওয়ার সুযোগ দেন। তখনই রক্তের স্বাদ পেয়ে যায় তারা। তারা বোঝে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পুঁজিবাদ এলে তারা কোটিপতিতে পরিণত হতে চলেছে। তাই তাদের সমর্থন ছিল মিখাইল গর্বাচেভ এবং বরিস ইয়েলিৎসিন দের ওপর। এরাই কমিউনিস্ট পার্টির বড় বড় কমিটিতে মেজরিটি ছিল। ফলে ষড়যন্ত্র হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ফেলার, আমেরিকার ফান্ড সাহায্য নিয়ে। মিখাইল গর্বাচেভ এবং বরিস ইয়েলিৎসিন এর নাটক, তারা একদিকে দেখাত শত্রু এদিকে অ্যালাই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙা হয় রেফারেন্ডামে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, আমলারাই ভাঙে সোভিয়েত, তাদের চোখে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন। সোভিয়েত মানুষ ভাঙেনি, ৭৭.৮৫% মানুষের হৃদয়ে ছিল তাদের শ্রমিকরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। এখনও রাশিয়ার ৭০% কৃষিজমি যৌথ খামার, তাদের হৃদয়ে সোভিয়েত বেঁচে আছে।

কিন্তু প্রশ্নটা আসে এই যে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কতন্ত্রের যে সোভিয়েত মডেলকে আমরা মডেল হিসেবে দেখি, এখানে আদর্শবিচ্যুত দূর্নীতিগ্রস্ত লোকেরা মেজরিটি পেলে কি হতে পারে? ধরুন যেমন উত্তর কোরিয়া, ৬০ এর দশকেই অফিসিয়ালি ঘোষিত ভাবে তারা কম্যুনিস্ট আদর্শ ত্যাগ করে, যুচে নামক একটি জগা খিচুড়ি প্রতিষ্ঠা করে, তার ফলস্বরূপ উত্তর কোরিয়া আজ পুঁজিবাদহীন কিন্তু একটি পরিবারতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয়েছে।  শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কতন্ত্রকে আরও স্বতঃস্ফূর্ত, স্টেবল, এবং মাস পার্টিসিপেশন ওয়ালা ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। মাস পার্টিসিপেশন বলতে লাতিন আমেরিকা খুব ভালো কাজ করছে, তারা পপুলার কমিউনিস্ট পার্টি তৈরী করছে। অন্যদিকে চীন, সেখানে পুঁজিপতি আছে, পুঁজিবাদ আছে, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির কন্ট্রোল রয়েছে সেসবের ওপর, দেখতে হবে চীনের ভবিষ্যৎ।

মোট কথা মার্ক্সবাদীরা ভুল কে এড়িয়ে যায় না, সেটা স্বীকার করে এবং সমাধান করার চেষ্টা করে, ব্লেমগেম খেলে না। আরও ভাবতে হবে আমাদের। তাই ভাববাদী না তথ্যনির্ভর কারণ খোঁজার চেষ্টা করলাম, বিরোধিতা থাকলে জানান। 
আর আমরা যারা বামপন্থী, যারা একটা বয়সের পর উঠতে বসতে একটাই স্বপ্ন দেখেছি, তাদের একটা সেভিয়েত পতনে স্বপ্নভঙ্গ হবে না। গর্বাচেভ, বরিস ইয়েলিৎসিনরা কমিউনিস্ট আদর্শকে ভেঙে ফেলতে পারবে না। ক্রেমলিনে আবার কাস্তে হাতুড়িই উড়বে।

রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

কৃষক আন্দোলন ~ অনির্বান অনীক

আজ পবন দুজ্ঞালের গল্প বলি আপনাদের। শাহজাহানপুর সীমান্তে রাজস্থানী কৃষকদের জান কবুল, মান কবুল হিম্মতের ছবি আমরা দেখেছি। পবন রাজস্থানের অনুপগড় কেন্দ্র থেকে সিপিআই(এম)'এর বিধায়ক ছিলেন। ২০১৮ সালে পরাজিত। সর্বভারতীয় কৃষি-শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক। মোদ্দা কথা রাজস্থান সিপিআই(এম)'এর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব।

ঘরসনা, গঙ্গানগর থেকে রাজস্থান-হরিয়ানা সীমান্তে আগত প্রথম জাঠাটি এসেছে পবনের নেতৃত্বে। ট্র্যাক্টরে করে ৬০০ কিলোমিটার পথ। ভুখা মানুষ। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া গরীব "ছোটোলোকের" দল। পবনের নেতৃত্বে ২ দিন ধরে পাড়ি দিয়েছেন। সঙ্গে এনেছেন ৫ মাসের রেশন। খাবার-দাবার জোগাড়ের দায়িত্বে লাল ঝাণ্ডা। কিষান সভা, কৃষি-শ্রমিক ইউনিয়ন, সুশীল-লিবেরাল সমাজে বহুনিন্দিত সিপিআই(এম)। আলপথ থেকে গলিপথ - দেশের সম্বিৎ ফেরানোর লড়াইয়ের এই শরিকদের নিয়ে পবন একা আসেননি,  সাথে এসেছে পবনের গোটা পরিবার। 


বর্তমানে পবনের দায়িত্বে কৃষক বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কমিউন। এই দেশের রাজপথে, হৃদযন্ত্রে আলোড়ন তুলে আন্দোলনে সামিল হাজারো অন্নদাতা কৃষকের  অন্নের দায়িত্ব কিষান সভা,বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন, মসজিদ এবং গুরদোয়ারা পরিচালিত লঙ্গরখানাগুলি কাঁধে তুলে নিয়েছে। এই কমিউনের লঙ্গরখানা তার মধ্যে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করছে। পবন, তাঁর স্ত্রী , কন্যা হাতে হাত মিলিয়ে আজ  এই কমিউনে যুদ্ধ লড়ছেন। পবন ব্যস্ত থাকেন রান্নার কাঠ সংগ্রহে, সাহায্য করেন রান্না-বান্নায়, খাদ্যবিতরণে। তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাহায্য করেন সবার জন্য রান্না-বান্নায়, সব্জি কুটতে।     
 
খোলা আকাশের নীচে দিল্লী সীমান্তে তাপমাত্রা  চলে যায় শূণ্য ডিগ্রিরও নীচে। শীতল প্রান্তরে অন্নদাতারা তখনো দিয়ে চলেন দিল্লির কৃষক আন্দোলনের লিটমাস টেস্টের রিপোর্ট কার্ড। তবু অন্নদাতার মুখে লেগে থাকে হাসির টুকরোখানি।  দিল্লী সীমান্তে যখন ঊষাকাল, কমিউনিটি কিচেনের দায়িত্ব শীতের ভোরের সুখশয্যা থেকে টেনে তোলে পবনকে। প্রতিটি ভিডিওতে কর্মব্যস্ত পবনের মুখে ছুঁয়ে থাকে এক টুকরো মিষ্টি  হাসি। পুলিস ব্যারিকেডে, ট্র্যাক্টরের উপরে পবনের ছোট্ট মেয়েটি উড়িয়ে দেয় লাল ঝাণ্ডা। সংসদীয় রাজনীতির পাটিগণিতে তুরুপের তাস না হয়েও, প্রতিবারের মত খেটে খাওয়া  মানুষের জীবন-জীবিকার যন্ত্রণার শীতলপাটি হওয়ার দায়িত্ব তো পবনের মত বামপন্থী নেতৃত্বেরই কাঁধে।

এ শুধু বিক্ষোভ নয়, এ এক উৎসব। বিপ্লবের উৎসব। লাল সেলাম।
 
[ অবিন দত্তগুপ্ত র ইংরেজি পোস্ট থেকে আমার অনুবাদ]