বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২১

গোমাংস ভক্ষণ ~ শমীন্দ্র ঘোষ



বৈদিকসাহিত্যে সোচ্চারে গোমাংস খাওয়া সমর্থিত। গোবধ, গোমাংস রান্না, খাওয়া, দান, গোমাংসের কার্যকারিতা নিয়ে ভুরিভুরি বিবরণ রয়েছে বৈদিকসাহিত্যে ও বেদত্তোর পৌরাণিক সাহিত্যে। অধুনা প্রচারিত যে, হিন্দুদের শাস্ত্রগুলি নাকি শাকান্ন ভোজনের উপর গুরুত্ব দিয়েছে। তা সর্বাংশে সত্য নয়; বরং শাকান্ন ভোজন থেকে গোমাংস ভোজনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অতিথি আপ্যায়ণে গোমাংসই শ্রেষ্ঠ ছিল, এমন বিবরণ পাচ্ছি ঋগ্বেদে এবং বৈদিকসাহিত্যে। অতিথি আগমন মানেই গোবধ করতে হবে, গোমাংস দিতে হবে, এটাই ছিল রীতি। অতিথিদের ও গোবধের স্থানকে #গোঘ্ন বলা হতো। আদপে বৈদিক আর্য তথা নর্ডিকরা ছিল বর্বর, দুরন্ত যোদ্ধা এবং যাযাবর ও পশুপালক। চাষাবাদ, খাদ্যোত্‍পাদন জানত না। পালিত পশুর মাংসই প্রধান খাদ্য, সঙ্গে ফলমূল, দুধ। তারা মূলত মাংসাশী ছিল। তাদের সবচেয়ে প্রিয় ঘোড়ার মাংস, দ্বিতীয় প্রিয় গোমাংস। এজন্যই তাদের ধর্মীয় সমস্ত পরবেই পশুহত্যা ছিল এবং যজ্ঞে দেবতাদের উত্‍সর্গ করে খেত; অশ্বমেধ, গোমেধ তাদের যজ্ঞের রীতি ছিল। ঘোড়ার মাংস রান্না ও খাওয়ার লোলুপতা ঋগ্বেদে, পরবর্তীকালের গ্রন্থে বর্ণিত। গোমাংসের জন্য হাপিত্যেশের বিবরণও ভুরিভুরি।
বৈদিক আর্যরা হিন্দুকুশ পেরিয়ে যত পূর্ব ও দক্ষিণে ঢুকেছে, দেখেছে অশ্বের তুলনায় গরুর প্রাচুর্য ও সহজলভ্যতা। ফলে আহারে গোমাংস জনপ্রিয় হয়। পরে রীতিই হয়ে ওঠে। মনুসংহিতাতেও গোমাংস নিষিদ্ধ নয়।
ব্যাপক গোবধের জন্য গরুর সংখ্যা কমতে থাকে। গোবধে তিতিবিরক্ত হয়ে বৈদিকদেরই একশ্রেণি এর বিরোধিতা করে। ক্ষোভ প্রশমণে গোমাংস ভোজনের ওপর কিছু কিছু বিধিনিষেধ আরোপিত হয়। পৌরাণিককালেও গোবধ নিষিদ্ধ হয়নি, তবে গোবধ, গোমাংস ভোজন ও ব্যবহার কমানো হয়েছিল।
তারপরেও গোমাংস চলত।
ভারতবর্ষে ইসলাম আগমনের পরেও গোমাংস ভোজন হিন্দু ও ইসলামীদের দ্বারা চলেছে। কিন্তু, হিন্দুরা যেহেতু পৃথক ধর্মের, তাই হিন্দুধর্মের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখতে গোমাংস ভোজন ছাড়ে হিন্দুরা। এইসময়ে খাদ্যে নানান বিধিনিষেধ আনা হয়। মাছ, শূকর, মেষ, মুরগি, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি খাওয়া নিষিদ্ধ হয় ব্রাহ্মণদের দ্বারা; ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে নিষিদ্ধ খাদ্যতালিকা রয়েছে। অথচ, তৈত্তিরীয় সংহিতায় ইন্দ্রকে শূকর বলি দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ মতে ব্রাহ্মণরা পূর্ণিমা ছাড়া অন্য তিথিতে দেবতার উদ্দেশ্যে বলিপ্রদত্তের মাংস খেতে পারে।
বাংলা অঞ্চলের মানুষ মাছ খেত সহজলভ্যতায়, স্বাভাবিকতায়। ধর্মরক্ষায় লুকিয়ে খেত। ধরা পড়লে বৌদ্ধ বা পরে ইসলাম হতো। এটা রুখতে সেইসময়ে এই বাংলা অঞ্চলের বিখ্যাত পণ্ডিত ভবদেব ভট্ট, জীমূতবাহন হিন্দু ব্রাহ্মণের মাছ খাওয়ার বিধিনিষেধ তুলে নিলেন ও খাদ্যে, ভোজনে সংস্কার করলেন। এইসময় থেকেই উত্তর ও পশ্চিমভারতের বিশেষত গোবলয়ের হিন্দুদের সঙ্গে পূর্বভারতের হিন্দুদের খাদ্যে, ভোজনে, আচারে স্পষ্ট পার্থক্যের শুরু।
কালে কালে উত্তর ও পশ্চিমভারতের অতি আবেগপ্রবণ একশ্রেণির হিন্দু গরুকে দেবতা বানায়; গরুপূজা শুরু হয় এই ঊনবিংশ-বিংশ শতকে। অথচ, হিন্দুরা যে যে গ্রন্থগুলোকে ধর্মগ্রন্থ বলে এবং মানে, সেসবে গোবধ ও গোমাংস ভোজন রয়েছে রমরমিয়ে। গোদান আদপে গোমাংস দানের অপভ্রংশ রূপ।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ থেকে গোবধ ও গোমাংস ভোজনের উদাহরণ---
১) শ্রাদ্ধে অতিথিদের গোমাংস ভক্ষন করালে পূর্বপুরুষ ১ বছর স্বর্গসুখ পেতে পারে, এই উপদেশ যুধিষ্ঠিরের প্রতি পিতামহ ভীষ্মের, (মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, অধ্যায় ৮৮)।
২) বিরাট রাজার গোশালায় দৈনিক ২০০০টি গরু বলি দেওয়া হতো। ফলে রক্তনদী তৈরি হয় রাজপ্রাসাদের গা বেয়ে।
৩) রাম গরুর মাংসের সঙ্গে মদ খেতে ভালবাসত। বনবাস-প্রাক্কালে মায়ের কাছে রামের আক্ষেপ, সে ১৪ বছর গোমাংস খেতে ও সোমরস পান করতে পারবে না এবং সোনার খাটে ঘুমাতে পারবে না; "রাম গোমাংস ভক্ষণ করতেন।" (বাল্মীকী রামায়ণ, আদিকাণ্ড, অযোধ্যাকাণ্ড)।
রাম, লক্ষ্মণ, সীতা বনবাসে যাবার পথে ভরদ্বাজমুণির আশ্রমে বৃষমাংস, মধুপর্ক, ফলমূল খেয়েছিল, (বাল্মীকী রামায়ণ ২/৫৪)। 
৪) গোহত্যা এবং গোমাংস খাওয়ার বিধান রয়েছে শতপথ ব্রাহ্মণ ১১১/১/২১।
৫) ঋগ্বেদে বৈদিকআর্যদের গোমাংস খাওয়ার বহু উল্লেখের থেকে---
"ইন্দ্র বলল তাদের খাওয়ার জন্য ২০টি ষাঁড় রান্না করা হয়েছে (ঋগ্বেদ ১০/৮৬/১৪)।
গোমাংস ইন্দ্রের অতিপ্রিয় ছিল।
ঋগ্বেদে অগ্নির উদ্দেশ্যে ঘোড়া, বলদ, ষাঁড়, দুগ্ধহীন গাই, মেষ বলির উল্লেখ আছে। গরু বা ষাঁড়গুলিকে বৈদিকআর্যরা তরোয়াল বা কুড়ুল দিয়ে হত্যা করতো।
একটি বেঁটে ষাঁড় বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে, একটি চিত্‍কপালী শিংওয়ালা গরু ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে, একটি কালো গরু পুষনের উদ্দেশ্যে, একটি লাল গরু রুদ্রের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হতো।
ঋগ্বেদ সংহিতায় "বিবাহসূক্ত"-এ কন্যার বিয়েতে সমাগত অতিথিদের গোমাংস পরিবেষনের জন্য অজস্র গরু বলির বিধান আছে, (ঋগ্বেদ সংহিতা ১০/৮৫/১৩)।
৬) তৈত্তিরীয়ব্রাহ্মণে "পঞ্চশারদীয়-সেবা" নামক ভোজন অনুষ্ঠানের প্রধান বৈশিষ্ট্য, ৫বছরের কম বয়সী ১৭টি বাছুরের মাংসে অতিথি আপ্যায়ন।
৭) বিষ্ণুপুরাণও গোমাংস ভোজনকে সমর্থন করেছে। শ্রাদ্ধের দিনে ব্রাহ্মণদের মৎস্যদানে ২মাস, শশক মাংস দানে ৩মাস, ছাগ মাংস দানে ৬মাস, মেষ মাংস দানে ১০মাস এবং গোমাংস দানে ১১মাস পিতৃগণের আত্মা পরিতৃপ্ত থাকে, (বিষ্ণুপুরাণ ৩/১৬, ঔর্ব্য মুনির বচন)।
৮) গোপালকেরা মাংসের জন্য ছাপ দেওয়া গরুর মাংস কাঁচা অথবা শুকিয়ে বিক্রি করতে পারে, (চাণক্য অর্থশাস্ত্র ২/২৯/১২৯)।
৯) চরকসংহিতা গোমাংসের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও পুষ্টিগুণের কথা বলেছে এবং গোমাংস খাওয়া সমর্থন করেছে। গোমাংস বাত, নাক ফোলা, জ্বর, শুকনো কাশি, অত্যাগ্নি (অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গরম), কৃশতা প্রভৃতি অসুখের প্রতিকারে বিশেষ উপকারী (চরকসংহিতা ১/২৭/৭৯)।
১০) সুশ্রুতরও একই সুর, গোমাংস পবিত্র এবং ঠান্ডা; হাঁপানি, সর্দিকাশি, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অতি ক্ষুধা, বায়ু বিভ্রাটের নিরাময় করে, (সুশ্রুতসংহিতা ১/৪৬/৪৭)।
.
প্রশ্ন,
বেদসংহিতা, ব্রাহ্মণগ্রন্থ, পুরাণ, মনুসংহিতা, মহাভারত, রামায়ণ হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ। হিন্দুরা কি এই ধর্মগ্রন্থগুলো মানে না?
.
অতএব, গোমাংস হিন্দুদের বৈধ।
© #কপিরইটভূক্ত
#শমীন্দ্রঘোষ
২০/১০/১৮

শনিবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২১

কোভিভ ভ্যাকসিন কিছু প্রশ্ন কিছু জবাব ~ সমূদ্র সেনগুপ্ত

ভারত একটা গণতান্ত্রিক দেশ। টিকা নেয়া না নেয়া নিজস্ব ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আমি স্বাস্থ্য কর্মী হিসেবে নিজে নিয়েছি এবং অন্যদের নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি, গুজবে কান না দিয়ে আপনারাও নিন।  সেই অনুরোধ জানানোর সাথে কেন জানাচ্ছি তা ব্যাখ্যা করার দায় থেকে যায়। 

প্রথমে আসা যাক ভ্যাকসিন ঘটিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে যার চরম রূপ হল মৃত্যু। গুজব রটানো হয়েছে যে ভ্যাকসিন নিয়ে মৃত্যু ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে যা বলার তা হল, টেম্পোরালিটি অর্থাৎ ঘটনাক্রম দিয়ে কজাল অর্থাৎ কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা এক ধরণের ফ্যালাসি বা কুযুক্তি। কাক ডাকলো আর তার পরে তাল গাছ থেকে তাল খসে পড়লো এ দুটোর মধ্যে কোনও কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। ভ্যাকসিন নিল আর তার পরে মরে গেল মানেই ভ্যাকসিন এর জন্য মরে গেল তা নয়। অন্য কারণ থাকতে পারে। যার মৃত্যুর উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে, তিনি ভ্যাকসিন এর কারণে মারা গেছেন সেটি বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমাণিত হয়েছে কিনা দেখতে হবে।

দ্বিতীয় যে গুজব রটানো হচ্ছে তা হল এই যে ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ পূরণের জন্য ভ্যাকসিন তৈরির যে প্রথাগত পর্যায় বা সময়কাল লাগে তা ক্ষুন্ন করে অস্বাভাবিক দ্রুততায় এই ভ্যাকসিন তৈরি, অনুমোদন ও বাজার এ আনা হয়েছে। এর আগে ভ্যাকসিন তৈরির দ্রুততার রেকর্ড ছিল চার বছর, মাম্পস ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে। ডঃ মরিস হিলম্যান নিজের মেয়ের নামে জেরিল লিন স্ট্রেন তৈরি করেন ষাট এর দশকে। কোভিভ এর ক্ষেত্রে রেকর্ড ভাঙা হল একবছর এর কম সময়ে। 

এটা মনে রাখা দরকার যে সময়ের ওই রেকর্ড ভাঙার পেছনে ব্যবসায়ীক রাজনৈতিক তাগিদ ছাড়াও অন্য কারণ আছে। সারা পৃথিবীতে পঞ্চাশটির বেশি পরীক্ষাগারে একই সাথে একটি রোগের ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা এর আগে কোনো দিন হয় নি। ষাট এর দশকের পরে মেডিক্যাল সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজি, মলিকুলার বায়োলজি, কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স এত এগিয়ে গেছে তা অকল্পনীয়। 

এই এক বছরের রেকর্ড সময়ে আবিষ্কার সম্ভব এর পেছনে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার গবেষকদের বহু বছরের সাধনা আছে। যেমন অক্সফোর্ড - এস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন যে "ভাইরাল ভেক্টর টেকনোলজি" ChAdOx1 কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছে সেটা গত দশ বছরের গবেষণার ফল। ওই প্রযুক্তি ব্যবহার এই নতুন ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরির কাজে লেগেছে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এর আরেকটি প্রতিবন্ধকতা অর্থাৎ স্বেচ্ছাসেবক জোগাড় করাও এই ভ্যাকসিন এর ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হয়েই দাঁড়ায় নি। 

তৃতীয় যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে তা হল কার্যকারিতা নিয়ে। ভাববাদী শাস্ত্রগুলি থেকে যুক্তিবাদী বস্তুবাদী বিজ্ঞান এখানেই আলাদা যে বিজ্ঞান কোনো দিন দাবি করে না যে শেষ কথা বলে ফেলেছে, আর কিছু বলার নেই। ভ্যাকসিন এর দ্বিতীয় ডোজ এর এক মাস পরের ডাটা সংগ্রহ করা গেছে। এবং দেখা গেছে যে তাতে যথেষ্ঠ পরিমান প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে। বিভিন্ন মানব গোষ্ঠী অনুযায়ী এটা বিভিন্ন রকম হলেও কমবেশী ৭০% এফেক্টিভ (কোভিশিল্ড)। (একটি ভ্যাকসিন এর ক্ষেত্রে ৯০% এর বেশি)। মনে রাখতে হবে যে এযাবৎ কাল ১০০% কার্যকর এমন কোনো টিকা মনুষ্যজাতি আবিষ্কার করতে পারে নি।

ছয়মাস বাদে সক্ষমতা কতটা থাকবে এ প্রশ্ন যারা তুলছেন তাদের সবিনয়ে জানানো দরকার যে ছয়মাসের ডাটা এখনো হাতে আসে নি। আর আসে নি বলে সুনির্দিষ্টভাবে উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। 

ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর কিনা সে নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত দেয়ার ও বিতর্কে অংশ নেওয়ার অধিকার কেবল ডাক্তার নয় যে কোনো সাধারণ মানুষের আছে। কেবল অনুরোধ জানাবো যে সপক্ষে যুক্তি সাজানোর সময় জনপ্রিয় মিডিয়ার লিঙ্ক শেয়ার না করে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করুন। এভিডেন্স বেসড মেডিসিন এর সূত্রঃ ধরে পিয়ার রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধকে মান্যতা দিন। 

এই বাজার অর্থনীতির যুগে সবই বিক্রি হয়, বিজ্ঞানী গবেষকদের সততাও সন্দেহের ঊর্ধে নয়, তবে ল্যানসেট পয়সা খেয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করে বলে অতি বড় বামপন্থীরাও অভিযোগ করেন নি। সেই ল্যানসেট এর একটি ঝলক ভারতের কোভিশিল্ড এর আদি সংস্করণ নিয়ে। উৎসাহীরা পুরো প্রবন্ধটি দেখতে গুগলামো করুন। 

এই লেখাটি হয়তো "আপিল টু অথরিটি" ফ্যালাসি দোষে দুষ্ট। কিন্তু ল্যানসেট এর নাম নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না। 

শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২১

মূর্খ সংবাদ ~ আর্য তীর্থ

লোকটা হঠাৎ ঘরের দেওয়ালে 
আপনমনেই নিজের খেয়ালে
গোটা গোটা করে লিখে দিলো সোজা, মন্ত্রীমশাই মূর্খ!
কেন যে লিখলো, কে জানে বাবা, 
সে দেশে করেনা প্র্যাকটিস ভাবা,
বোকা হাবা সেজে থাবাকে এড়ালে তবে জোটে কিছু সুখ গো!
এ লোকটা মোটে দ্রোহীটোহি না, 
জীবন কাটায় রাজনীতি বিনা,
ছা পোষা বাকি লোকের মতনই ঝঞ্ঝাট চলে এড়িয়ে,
তবু দুম করে চারিদিক দেখে, 
ফেটে পড়ে আজ ওই কথা লেখে
অজানা এখনো কিসে গেলো তার ধৈর্য্যের বাঁধ পেরিয়ে।
বন্ধু এবং পড়শীরা এসে, 
বলে ও পাগল, ফেঁসে যাবি শেষে
কে কোথার থেকে উঁকি দিয়ে নেবে দেওয়াল-লিখন দেখে,
কেন বা ডাকিস বিপদ অযথা, 
লক্ষ্মীটি সোনা, শোন ভালো কথা,
ঘষে ঘষে ফেল মুছে ওই লেখা এখনই দেওয়াল থেকে।
মানুষটা হেসে বলে আরে ধুর, 
পেয়াদা আসবে কেন এতদূর,
বাইরে কোথাও বলতে যাইনি , লিখেছি নিজের ঘরে,
গালি তো দেইনি কোনো অশ্রাব্য , 
অথবা বলিনি কাগজে ছাপবো
লোক আমি নই এত কেউকেটা খবর রাখবে চরে।

কিন্তু লোকটা জানতো না ঠিক,
 সেদেশে নজরে সব নাগরিক,
পারলে মগজে ডুবুরীর মতো সেঁধোয় পেয়াদা যেন, 
পরদিন যেই গিয়েছে আপিস,
 দেখে বেচারির চাকরি হাপিস,
ম্যানেজার তাকে খোলসা করে না কাজ চলে গেলো কেন।
অবশেষে এক বন্ধু পুরোনো, 
ছিটকিনি এঁটে করে দোনোমোনো,
ফিসফিস করে বলে দিলো কানে কী তার ক্রাইমখানা,
মন্ত্রীর নামে দিয়েছে সে গালি, 
রাষ্ট্রের চোখে কড়কড়ে বালি,
এসব কথা যে ভাবাও বারণ , সকলের সেটা জানা। 

বলতে বলতে পুলিশের গাড়ি, 
হুটার বাজিয়ে এলো তাড়াতাড়ি,
থানাতে দারোগা ধমকে বলেন সাহস তো তোর নয় কম 
বলেছিস নাকি মন্ত্রী মূর্খ, 
পেছনে পড়বে এখন হুড়কো,
উনি চটে গেলে বাঁচা মুশকিল , যমকে বরং ভয় কম।
লোকটা বললো, আরে ও সাহেব, 
আমি মন্ত্রীর খাস মোসায়েব,
সকাল বিকেল তাঁকেই  স্মরণ করে তবে জল খাই 
আপনাকে খুলে বলি সোজাসুজি,
 খামোখা হয়েছে ভুল বোঝাবুঝি,
উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে যে চেপে গেছে পুরোটাই।
 ওই যে মন্ত্রী প্রতিবেশী দেশে,
 শয়তান ব্যাটা মানুষের বেশে,
আমি তো বলেছি ওই হতভাগা হস্তীমূর্খ আস্ত,
এদেশে মহান মন্ত্রীমশাই, 
খামোখা কেন বা গালি দেবো ছাই,
আহা ফুলেফেঁপে বেড়ে গিয়ে তাঁর  ভালো হোক আরো স্বাস্থ্য।

দারোগাটি করে প্রবল ভ্রুকুটি, 
কঠিন হস্তে টিপে ধরে টুঁটি,
লোকটাকে বলে ব্যাটা করছিস আমার সঙ্গে চালাকি
ফালতু না দিয়ে ভাংচি ভড়ং , 
সত্যিটা বলে ফেল না বরং,
থার্ড ডিগ্রীটা শুরু করে দেবো যদি দিতে চাস ফাঁকি।

এতদিন ধরে চড়াই লোককে, 
পারবি না দিতে ধুলো এ চক্ষে,
কাদের দেশের মন্ত্রী মূর্খ, আমি তা জানিনা নাকি?

আর্যতীর্থ

লেসার ইভিল ~ সুশোভন পাত্র

তৃণমূল কে হারাতে, বিজেপির প্রতীকে তৃণমূল কেই ভোট দিন।
যেমন ধরুন, তৃণমূলের তোলাবাজ শুভেন্দু কে হারাতে, বিজেপির তোলাবাজ শুভেন্দু কে ভোট দিন।  কিম্বা তৃণমূলের ঘুষখোর মুকুল কে হারাতে, বিজেপির ঘুষখোর মুকুল কে ভোট দিন। আসুন, বাংলার চিটিংবাজ মিডিয়া কে তৃণমূল-বিজেপির বাইনারি ন্যারেটিভে আপনার মাথা খাওয়ার সুযোগ করে দিন। কিন্তু, খবরদার সিপিএম'র কথা বিশ্বাস করবেন না।

ঐ যে আপনি শুনেছিলেন, সিপিএম বলেছিল 'কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ' –আসলে আপনি ওটা ষোল আনাই ভুল শুনেছিলেন। মকর-সংক্রান্তির বাজারে ড্রইংরুমের সোফা তে গা এলিয়ে চুপটি করে এবিপি আনন্দ চালিয়ে বসুন। দেখবেন কিছুক্ষণ পর আপনার মনে হবে নন্দীগ্রামের কেমিক্যাল হাবটা আসলে বানাতে চেয়েছিল শুভেন্দু অধিকারী। চেয়েছিল অখিল গিরি। চেয়েছিল তৃণমূল। চায়নি শুধু বামফ্রন্ট! চায়নি শুধু সিপিএম! চায়নি শুধু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য!
রিমোট টিপে চ্যানেল বদলে চোখ রাখুন জি-২৪ ঘণ্টার পর্দায়, মনে হবে সিঙ্গুরে আসলে কারখানা করতে চেয়েছিল মুকুল রায়। চেয়েছিল বেচারাম। চেয়েছিল বিজেপি। কদিন পর হয়ত শুনবেন চেয়েছিল মমতাও। চায়নি শুধু বামফ্রন্ট! চায়নি শুধু সিপিএম! চায়নি শুধু বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য!

ঐ যে আপনি দেখেছিলেন, ২০০৬-র ৩রা ডিসেম্বর, সিঙ্গুর ইস্যুতে মমতার ধর্মতলার অনশন মঞ্চের বয়স যখন জাস্ট ৬ঘণ্টা, তখন অনশন মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন বিজেপি শীর্ষ নেতা রাজনাথ সিং; আসলে উনি রাজনাথ সিং ছিলেন না, ছিলেন আলাদীনের প্রদীপের জিন। একটা থেকে আড়াইটা; ছিলেন টানা দেড় ঘণ্টা। সাথে সমর্থকরা, বিজেপির দলীয় পতাকা নিয়ে।
সদ্য সংবিধান হাতে বিধানসভার ভাঙচুর করে গণতন্ত্রের শ্রাদ্ধ করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন যখন অনশন মঞ্চ থেকে বলছেন "মুখ্যমন্ত্রী ডাকলেও রাজ্য সরকার সাথে সিঙ্গুর নিয়ে কোন আলোচনায় বসব না। যা হওয়ার হোক প্রয়োজনে রক্ত ঝরিয়ে সিঙ্গুর আন্দোলন চলবে" -বিজেপি নেতা রাজনাথ সিং তখন ঠাই দাঁড়িয়ে মমতার পাশে। মাইক হাতে তিনি বলেছিলেন,
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় NDA-র গুরুত্বপূর্ণ শরিক। বিজেপি শুধু তাকে সমর্থন করে তাই না, সক্রিয় সমর্থন করে!
সেদিনই সন্ধেবেলা মমতার অনশন মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন কার্গিলের নিহত জওয়ানদের কফিন কেলেঙ্কারির 'মিডলম্যান' প্রাক্তন NDA-র প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজ।

যারা ২০১১-র বামফ্রন্টের নির্বাচনী পরাজয় কে স্বাভাবিক গণতন্ত্রীয় লিনিয়ার ইকুয়েশন মনে করেন, কিম্বা নেত্রী মমতার একক রাজনৈতিক ক্যারিশ্মার জাবর কাটেন, তারা কি বলতে পারেন আজ শুভেন্দু কেন বলছে অটল বিহারী বাজপেয়ী পরামর্শেই এ রাজ্যে নাকি পথ চলা শুরু তৃণমূলের? কেন সেদিন RSS-র প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তথাকথিত জমি আন্দোলনেও? বলতে পারেন মমতার অনশন মঞ্চের ২০০৬-র রাজনাথ সিং আর আজকের ২০২১-র রাজনাথ সিং কি একই ব্যক্তি না আলাদা? কিম্বা ঠিক কোন কারণে নন্দীগ্রাম ষড়যন্ত্রের 'মাস্টারমাইন্ড' শুভেন্দু বিজেপি ওয়াশিং মেশিনে আজ ধোয়া তুলসী পাতা? সিঙ্গুর আন্দোলনে মমতার ছায়াসঙ্গী মুকুল রায়ের কেন আজ শিল্পের জন্য এই কুমীরের কান্না?
বলতে পারেন পৃথিবীর আর কোন অঙ্গরাজ্যের মহিলা প্রধানের সঙ্গে স্বয়ং এসে দেখা করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট হিলারি ক্লিনটন? কিম্বা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন? কেনই বা ২০০৭-র ফেব্রুয়ারিতে রাজ্যের আপাদমস্তক এক ধর্মীয় নেতা এবং তৎকালীন নন্দীগ্রাম আন্দোলনের বামফ্রন্ট বিরোধী মুখ সিদিক্কুলা চৌধুরীর সাথে রুদ্ধদ্বার মিটিং করেছিলেন মার্কিন কনস্যুলেটের প্রধান? লেনিনিস্ট কনজাংচারে পেয়দাইশ জঙ্গলমহলে কিষানজীর অবশিষ্ট কিছু শহুরে কোয়ার্টার-হাফ-সেম-ফুল ভক্তরা কি বলতে পারেন পুঁজিবাদের এই ম্যাসকটদের ব্লু-আইড কন্যা মমতার 'ক্লাস ক্যারেক্টার'টা ঠিক কি?

উত্তর খুঁজুন। কারণ আপনার হয়ে রাজনৈতিক নেতাদের এই প্রশ্ন গুলো করবে না গণতন্ত্রের 'চতুর্থ স্তম্ভ' মিডিয়া! আসলে আপনার-আমার মত আম পাবলিক কে এই নেতা-মিডিয়ারা 'মানুষ'ই ভাবে না। ভাবে গুরু-ছাগল। ভাবে এরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলে। এরাই আপনাকে ২০১১-র আগে গিলিয়েছিলে 'পরিবর্তন চাই'। এরাই আপনাকে ২০২১-র গেলানোর চেষ্টা করছে 'হয় তৃণমূল না হয় বিজেপি!'

বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা আপনি বরং গত এক মাসের বাংলা সংবাদমাধ্যমের যে কোনও টক শো কিম্বা যে কোনও সাংবাদিক সম্মেলনের ভিডিও প্লে-পস-রিওয়াইন্ড করে দেখুন! দেশে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা, ২৪টি কোয়ার্টারে নিম্নগামী জিডিপি বৃদ্ধির হার, ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ বেকারত্ব, হাঙ্গার ইনডেক্সে কিম্বা ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে –খেয়াল করে দেখুন তো এসব বিষয়ে কোন সংবাদ মাধ্যম কে কোনদিন দিলীপ ঘোষদের একটাও প্রশ্ন করতে শুনেছেন? শোনেননি তো? আগামী ৩ মাসেও শুনবেন না!

কিম্বা রাজ্যের আম্ফান দুর্নীতি, বেকারত্ব, তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের দলবদলের রাজনীতি, সরকারী শূন্যপদ বা সংসদে একের পর এক জনবিরোধী বিলে তৃণমূলের সাংসদদের বিজেপি কে প্যাসিভ সমর্থন– খেয়াল করে দেখুন তো এসব বিষয়ে কোন সংবাদ মাধ্যম কে কোনদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে একটাও প্রশ্ন করতে শুনেছেন? শোনেননি তো? আগামী ৩ মাসেও শুনবেন না!
কেন বলুন তো? উত্তর খুঁজুন! অবশ্যই সিপিএম-র সমালোচনা করুন।  কিন্তু অন্ধ সিপিএম বিরোধিতা ছেড়ে যদি যুক্তির বুনিয়াদী বিন্যাসে বিশ্বাস করেন তাহলে উপরের প্রশ্ন গুলোর বস্তুনিষ্ঠ উত্তর খুঁজুন! সিপিএম-র প্রশ্ন গুলোর উত্তর খুঁজুন।
সিপিএম বলেছিলে, রাজ্যের বেকারদের জন্য বৃহৎ শিল্পের প্রয়োজন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-শালবনী, বেকারদের স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিলে সিপিএম। ভুল করেছিল? সিপিএম বলেছিল, ২০১১-র নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস কালো টাকা ব্যবহার করে ভোট করেছে। সুদীপ্ত সেন, কেডি সিং কিম্বা গৌতম কুণ্ড - সিপিএম ভুল বলেছিল? সিপিএম বলেছিল, নন্দীগ্রামের ষড়যন্ত্রের জন্য আপাদমস্তক দায়ী তৃণমূল। ২০১৪ তে বামফ্রন্ট সরকার কে সিবিআই-র ক্লিনচিট, মমতা সরকারের পক্ষে অভিযুক্ত পুলিশদের পদন্নোতি আর আজকের শুভেন্দু স্বীকারোক্তি -সিপিএম ভুল বলেছিল? সিপিএম বলেছিল, সিঙ্গুরে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরত দিয়েই না হয় শিল্প হোক। সেদিন রাজি হননি মমতা। আজ সিঙ্গুরে এসে একবার দেখেই যান না হয় –সিপিএম কি ভুল বলেছিল?
সিপিএম বলছে তৃণমূলের জন্যই রাজ্যে বেড়েছে বিজেপি। ভুল বলছে? সিপিএম বলছে একটা নির্বাচন হারলেই তৃণমূল তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে। ভুল বলছে? সিপিএম বলছে এ রাজ্যের ৯০% বিজেপি নেতা হবেই আসলে প্রাক্তন তৃণমূলী। ভুল বলছে? সিপিএম বলছে বিজেপি হারাতে কেবল বিজেপি নয় হারাতে হবে তৃণমূলকেও? ভুল বলছে? উত্তর খুঁজুন।

হিসেব হবে। রইলাম আমরা। মাটি কামড়ে। শেষতক।

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

মাস্টারদা ~ অরিজিৎ গুহ

Masterda

১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিলের পর থেকে চট্টগ্রাম শহরে দিনের বেলাতেই রাত নেমে আসত। সূর্য ঢলে পড়লেই ব্রিটিশ মহিলা পুরুষরা কেউ আর ঘরের বাইরে থাকত না, সে যত কাজই থাকুক না কেন। তাদের গ্রাস করেছিল এক অজানা আতঙ্ক। চারিদিকে তারা ফিসফাস শুনতে পেত ওই, ওই যে আসছে। ওই শুনেই যে যেখানে পারত লুকিয়ে পড়ত। তারা সবাই ভুতের ভয় পেত। সেই ভুতের নাম ছিল মাস্টারদা।
     'মাস্টারদা' এই একটা শব্দই প্রত্যেক ইউরোপিয়ানের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এলাকায় এলাকায় গল্পগাথা যেত মাস্টারদা নাকি যে কোনো সময়ে যে কোনো রকমের বেশ ধারণ করতে পারেন। কোথাও যদি শোনা যেত যে মাস্টারদা মালির বেশ ধারণ করে কোথাও লুকিয়ে রয়েছেন তো পরক্ষণেই শোনা যেত অন্য কোনো জায়গায় সেই একই সময়ে মাস্টারদা নাকি সন্ন্যাসির বেশে কোনো গ্রামবাসীর সাথে কথা বলছেন। কেউ কেউ আবার বলে মাস্টারদা নাকি মন্ত্র জানেন। চোখের সামনে তিনি হাওয়ায় মিলিয়ে যান। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মামলায় ব্রিটিশ পুলিশ তখন তন্নতন্ন করে খুঁজে বেরাচ্ছে মাস্টারদা কে। অথচ মাস্টারদা কে ধরা শুধু মুশকিলই নয়, নামুমকিন।

    একবার গোপনে খবর পেয়ে এক বাড়ি ঘিরে ফেলল ব্রিটিশ পুলিশ। ইনফরমেশন ছিল ওই বাড়িতে নাকি মাস্টারদা লুকিয়ে রয়েছেন। বাড়ির মালিককে ধরে বেধে পুলিশের কর্তার সামনে হাজির করল কনস্টেবলরা। কর্তা জিজ্ঞাসা করলেন আপনার নাম কি? উত্তর এলো সূর্য সেন। চমকে উঠল পুলিশের কর্তা। কোন সূর্য সেন? উত্তর মাস্টার সূর্য সেন। পুলিশ কর্তার তখন স্নায়ু উত্তেজন চরমে। ভাবছে সারা বাংলাদেশ জুড়ে যে লোকটাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেরাচ্ছে ব্রিটিশ ইন্টালিজেন্স সেই লোকটাকে এত সহজে ধরে ফেলল সে! হাত পা থরথর করে কাঁপা শুরু হয়েছে পুলিশ কর্তার। লোকটাকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম শহরে ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চে চলে গেল পুলিশ কনস্টেবলরা। সেখান থেকে মাস্টারদা সূর্য সেনের ছবি নিয়ে আসা হল। দেখা গেল এই মাস্টার তো সেই মাস্টার নয়! পরে খোঁজখবর করে জানা গেল এই মাস্টার হচ্ছে স্থানীয় একটা স্কুলের হেড মাস্টার যার নামও সূর্য সেন। মহা পরাক্রমশালী ব্রিটিশ পুলিশ সাধারণ মানুষের চোখে হয়ে উঠল ইয়ার্কির পাত্র। পুলিশ দেখলেই লোকজন এখনকার ভাষায় যাকে বলে ট্রোল করা, সেই ট্রোল করা শুরু করল।

   ছোটবেলা থেকেই অদম্য সাহসী সূর্য সেন ব্রত নিয়েছিলেন ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার। সেই লক্ষ্যে রত ছিলেন আজীবন। কলেজে পড়তে পড়তেই অনুশীলন সমিতির সদস্য হন। সেখান থেকেই বিপ্লবী জীবনে হাতেখড়ি। কলেজ শেষ করে চট্টগ্রাম শহরে ফিরে কংগ্রেসে যোগ দেন। সেই সময়ে দেশে কংগ্রেস ছিল ব্রিটিশ বিরোধী একমাত্র বড় রাজনৈতিক শক্তি। কংগ্রেসে থাকতে থাকতেই বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের দেশের প্রতি স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করতে শুরু করেন। স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে প্রচুর ছাত্র ছাত্রীর সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান। সেই সুযোগকেই কাজে লাগান। ১৯৩০ সালে গণেশ ঘোষ অনন্ত সিংহ সহ আরো কয়েকজন আর বেশ কিছু স্কুল কলেজের ছাত্র নিয়ে বিপ্লবী দল গঠন করে চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরিকল্পনা করলেন। আর তার সাথে টেলিগ্রাফ অফিস টেলিফোন অফিস আর রেলওয়ে দখল করে পুরো ব্রিটিশ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মূল থেকে উপড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন। 

   জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে অনেক সহযোদ্ধা কমরেড নিহত হলেও সূর্য সেনকে ধরা যায় নি। অবশেষে ব্রিটিশ পুলিশকে অনেক নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানোর পর ধরা পড়েন মাস্টারদা সূর্য সেন। জেল কাস্টডিতেই প্রভূত অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয় সূর্য সেনকে। মেরে ফেলার আগে ব্রিটিশ পুলিশ সাঁড়াশি দিয়ে সব কটা দাঁত উপড়ে নিয়েছিল। হাত পায়ের সমস্ত নখ উপড়ে নেওয়া হয়েছিল সূর্য সেনের। কিন্তু তাও তিনি তাঁর আদর্শের প্রতি জীবনের শেষদিন অব্দি অবিচল ছিলেন।

   আমাদের স্মৃতি আসলে খুব দুর্বল। অনেককিছুই ভুলে যাই। এত শত শত বিপ্লবীর আত্মবলিদানও অবলীলায় ভুলে গেছি আমরা। ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি আজকের দিনেই অকথ্যা অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়েছিল মহান এই বিপ্লবীকে। শরীরটাকে মেরে ফেললেও তাঁর আদর্শকে মেরে ফেলা যায় নি। কারণ Ideas are bulletproof.

রবিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২১

বিজ্ঞান কংগ্রেস ~ অমিতাভ প্রামাণিক

১৯১১ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরে গেল দিল্লিতে। ল্যুটিয়েন্স সাহেব এসে ডিজাইন করলেন ল্যুটিয়েন্স ডেলহির। সেখানকার কিছু রেলপথ উপড়ে ফেলে স্থানান্তরিত করা হল সে কারণে। কলকাতার উন্নতিমূলক কয়েকটা বড়সড় প্রকল্প এ কারণে থেমে রইল বেশ কয়েক বছর, কেননা সাহেবদের লক্ষ্য এখন দিল্লি নির্মাণ।

তাতে কি কলকাতার গুরুত্ব ফট করে কমে গেল? ঠিক তার উল্টো। কয়েকজন বাঘা বাঘা লোক এ সময় উঠে এলেন, যাঁদের মাথা অন্য সকলের চেয়ে ওপরে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেলেন ১৯১৩ সালে, দু-বছর পরে নাইট উপাধি। আচার্য জগদীশচন্দ্র ক্রেস্কোগ্রাফ বানিয়ে প্রমাণ করে দেখালেন বিভিন্ন উদ্দীপকের সংস্পর্শে গাছ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন বসু বিজ্ঞান মন্দির। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে চললেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজে, প্রতিষ্ঠা করলেন স্কুল অভ কেমিস্ট্রি। রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জির মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি নির্মাণ করল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, বাংলায় তিনি স্থাপন করলেন দেশের দ্বিতীয় ইস্পাত কারখানা, পড়ে-থাকা হাওড়া ব্রিজ তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে কলকাতার অন্যতম দর্শনীয় বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে গেল ক্যান্টিলিভার ব্রিজ হিসাবে। চিত্তরঞ্জন দাশের সুযোগ্য শিষ্য হিসাবে ভারতীয় রাজনীতির অঙ্গনে উঠে এলেন সুভাষচন্দ্র।

এবং সেই একই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। সায়েন্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বিজ্ঞানের ভবন নয়, দেশে বিজ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটাতে তিনিই উদ্যোগী হয়ে শুরু করলেন ভারতের সায়েন্স কংগ্রেস। কলকাতায় ১৯১৪ সালে তৈরি এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন তিনি নিজে। বললেন, তিনি চান প্রতি বছর এর সদস্যরা মিলিত হবে দেশের কোনো এক শহরে, আলোচনা করবে বিজ্ঞানের কোনো এক সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যা দেশের পক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ এবং এই অধিবেশনগুলোতে সভাপতিত্ব করবেন কোনো এক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী।

নিরবচ্ছিন্নভাবে বিগত একশো সাত বছর ধরে প্রতি বছর এই কংগ্রেসের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, যদিও শুরুর সেই গাম্ভীর্য এখন আর নেই। কয়েক বছর আগে একজন বিশিষ্ট নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী একে রাজনৈতিক তামাশা আখ্যা দিয়ে গেছেন।

অথচ শুরুর সেই সময়ে এটা ছিল বিজ্ঞান আলোচনার এক প্রকৃষ্ট মাধ্যম। সভাপতি হতেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদরা। ব্রিটিশ ভারতে সে সময় ভারতীয় বিজ্ঞানীর সংখ্যা হাতে গোনা, তাই ধরে আনতে হত বিদেশীদেরই। আশুতোষের উদ্বোধনের ছয় বছর পর দ্বিতীয় একজন ভারতীয় সভাপতিত্ব করেছিলেন, তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ১৯২০ সালে, সপ্তম বিজ্ঞান কংগ্রেসের নাগপুর অধিবেশনে। পরের বছর রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি, কলকাতায়। ১৯২৩ সালে লক্ষ্ণৌয়ের দশম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন এম বিশ্বেশ্বরাইয়া, ১৯২৭ সালে লাহোরের চতুর্দশ অধিবেশনের জগদীশচন্দ্র বসু এবং ১৯২৯ সালে মাদ্রাজে ষষ্ঠ অধিবেশনের চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন। এর পরের বছর ১৯৩০ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান। মধ্যবর্তী সমস্ত অধিবেশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিদেশী কেউ।

সমস্ত অধিবেশনই ছিল থিমেটিক। প্রফুল্লচন্দ্রের সময় থিম ছিল আধুনিক ভারতে বিজ্ঞানের উন্মেষ, পরের বছর রাজেন্দ্রনাথের সময় বিজ্ঞান ও শিল্প। বিশ্বেশ্বরাইয়ার অধিবেশনের থিম বিজ্ঞানকেন্দ্র ও বিজ্ঞানী, জগদীশচন্দ্রের অধিবেশনে ইউনিটি ইন লাইফ তথা জীবনে ঐক্য। এইগুলো এবং অন্যান্য সমস্ত অধিবেশনে থিম ছিল বিজ্ঞানের বা বিজ্ঞানচর্চার কোনো সাধারণ বিষয়। রামনের সময় অবশ্য রামনের গবেষণাকেই প্রাধান্য দিতে থিম হল রামন এফেক্ট সংক্রান্ত।

এ সবের অনেক আগেই স্যার আশুতোষ বিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপক হিসাবে নিয়ে এসেছেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহাকে, পরের বছর রামনকেও। কিছুকাল পরে ১৯২১ সালে বসু চলে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সাহা চলে গেলেন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৩ সালে। ১৯২৪ সালে মারা গেলেন স্যার আশুতোষ, রামন এফেক্ট আবিষ্কারের বছর চারেক আগে।

১৯৩৩ সালের বিজ্ঞান কংগ্রেসের অধিবেশন বসল পাটনায়, সভাপতি এল এল ফার্মার, থিম জাতির জীবনে ভূবিদ্যার স্থান। ততদিনে দেশে বিজ্ঞানচর্চায় বেশ কিছু নতুন মুখ উঠে এসেছে। জাতীয় ক্ষেত্রে জায়গা করে নিচ্ছেন শান্তিস্বরূপ ভাটনগর, হোমি জাহাঙ্গির ভাবা, বিক্রম সারাভাই। অধিবেশনের অতিথি হয়ে ভারতে এসেছেন বিখ্যাত নেচার পত্রিকার সম্পাদক স্যার রিচার্ড গ্রেগরি। নেচার পত্রিকা অনুসরণ করেই ভারতে কারেন্ট সায়েন্স নামে এক পত্রিকা বের হয়, তখন তার সম্পাদক রামন। রামনের সঙ্গে গ্রেগরির কথাপ্রসঙ্গে উঠল ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটির কথা। রয়্যাল সোসাইটির ধাঁচে ভারতে একটা সোসাইটি তৈরির পরামর্শ রামনকে দিলেন স্যার রিচার্ড।

রামন সে কথা সভায় পাড়তে অন্যান্যরা একবাক্যে সায় দিল। বিজ্ঞান কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরাই হয়ে যাবে এই ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্সের সদস্য। রামন বললেন, না, এখানে তো তিরিশ জন সদস্যের মধ্যে আদ্ধেকই ব্রিটিশ। তাদের মধ্যে দু-তিন জন ছাড়া সবাই বুড়ো-হাবড়া, সায়েন্সের সঙ্গে তাদের সংস্পর্শ বহুদিন ঘুচে গেছে, ওদের দিয়ে আমাদের কী লাভ? ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্স হবে শুধু ইন্ডিয়ানদের নিয়ে, ইয়াংদের নিয়ে, যারা সায়েন্সের চর্চা করে একমাত্র তাদের নিয়ে। ফালতু লোক দিয়ে সায়েন্স হয় না, সায়েন্স আর পলিটিক্স আমি এক করতে চাই না।

অন্যরা তাঁর এ কথা মেনে না নিলে রামন রেগেমেগে সে সভা ত্যাগ করলেন। কয়েকদিন পরেই তিনি দক্ষিণ ভারতের কয়েকজন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এক মিটিং করে সে বছরই তাদের নিয়ে ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অভ সায়েন্স নামে এক সোসাইটি রেজিস্টার করে ফেললেন। রেজিস্টার্ড এই সোসাইটিকে সরকার দেশের সায়েন্স সোসাইটি বলে মেনে নিল না। রামন এবং সুব্বারাও-এর মত দক্ষিণী বিজ্ঞানীরা সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশন থেকে পদত্যাগ করলেন। বাকিরা তৈরি করলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি বা ইনসা। এর পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন একে একে মেঘনাদ, ভাবা, ভাটনগর এমনকি রামনের সহকর্মী কৃষ্ণাণ।

রামন পলিটিক্স পছন্দ করেন না অথচ তিনি নিজেই উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনে ব্যস্ত – এই ব্যাপারটা কলকাতার কেউ ভালো চোখে দেখল না। রামনও সুযোগ খুঁজছিলেন কলকাতা ত্যাগের। পরের বছর সুযোগ এসে গেল। ১৯৩৪ সালে রামন চলে গেলেন ব্যাঙ্গালোরে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্সের প্রথম ভারতীয় ডিরেক্টর হিসাবে। কিন্তু পৃথিবীর যাবতীয় উন্নত দেশে যখন একটাই মুখ্য সায়েন্স অ্যাকাডেমি, ভারতে শূন্য থেকে গজিয়ে গেল দুটো এবং এখনও দুটোই সমানভাবে সক্রিয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় যতই এগিয়ে এল, ততই দেখা গেল ইনসার অধিকর্তারাই পেয়ে যাচ্ছেন দেশীয় বড় বড় বিজ্ঞানসংস্থার দায়িত্ব। শান্তিস্বরূপ ভাটনগরের হাতে দায়িত্ব এল বিশাল টাকা খরচ করে বহু গবেষণাগার সমৃদ্ধ সিএসআইআর বা কাউন্সিল অভ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের। ভাবা পরমাণু গবেষণা শুরু করলেন, তৈরি হল বিএআরসি। সারাভাই দায়িত্ব পেলেন স্পেস রিসার্চের। রামন এ সব শোনেন আর হো হো করে হাসেন – মূর্খের দল, সায়েন্সের নামে টাকা ওড়াচ্ছে দ্যাখো! টাকা দিয়ে কি সায়েন্স কেনা যায় রে ছাগলের দল!

এদের সবাই এবং এদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে জওহরলাল নেহরু হয়ে গেলেন রামনের চোখে শত্রু।

ডিরেক্টর হিসাবে রামন আই আই এস সি-তেও টিঁকলেন না। দু-বছর যেতে না যেতেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এল – তিনি বরাদ্দ টাকার সিংহভাগ বে-আইনিভাবে নিজের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের পেছনে খরচা করছেন, অন্য ডিপার্টমেন্টের উন্নতিতে তাঁর কোনো দৃষ্টি নেই। জার্মানি থেকে ম্যাক্স বর্নকে প্রফেসর করে ধরে এনেছেন তিনি, এনে নিজেই তাঁর সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়েছেন। তাঁর কাছে কাউন্সিলের চিঠি এল – হয় ইনস্টিট্যুট থেকে রিজাইন করো, নয় ডিরেক্টর থেকে রিজাইন করে ফিজিক্সের প্রফেসরগিরি করো। এই দুটোর মধ্যে বেছে না নিলে তাঁকে বরখাস্ত করা হবে। নিরুপায় রামন বেছে নিলেন সম্মানহীন দ্বিতীয় শর্তটাই। ১৯৪৮ সালে রামন রিসার্চ ল্যাবরেটরি নির্মাণ করে তিনি অবশেষে আই আই এস সি-র সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিছুকাল পরে জওহরলাল কন্যা ইন্দিরা ও দুই শিশু নাতিকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে এসেছেন। ইন্দিরা শুনেছেন নোবেলজয়ী রামনের নাম, তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চান। সুন্দরী ইন্দিরাকে রামন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন তাঁর রিসার্চ সেন্টার। দোতলার পোর্টিকো থেকে দূরে নন্দী হিলস দেখালেন। তারপর বললেন, বাবাকে গিয়ে বলবে কী দেখলেন, যদি ওঁর সময় হয় উনিও যেন একবার ঘুরে যান এখানে। সেদিন সন্ধেতেই তাঁর কাছে খবর এল, জওহরলাল পরদিন রামন রিসার্চ ল্যাবে আসতে চান।

রামন খুব আতিশয্য নিয়েই জওহরলালকে স্বাগত জানালেন এবং শুরু করে দিলেন তাঁর বক্তৃতা, যার সারমর্ম হচ্ছে তিনি বহু কষ্ট করে এই প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, সরকার যেন অবিলম্বে এর পেছনে একটা লাখ দশেক টাকার এনডাউমেন্ট ফান্ড তৈরি করে, যাতে তাঁর পরেও এই প্রতিষ্ঠান চালাতে অসুবিধে না হয়। ফট করে এ রকম টাকার কথা বলায় জওহরলাল খানিকটা অপ্রস্তুত হলেও ঝানু পলিটিশিয়ানের মত উত্তর দিলেন, আপনি এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হচ্ছেন কেন? সরকার কি আর রত্ন চেনে না? নিশ্চয় এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার সমস্ত ব্যাপার সরকার দেখবে।

টাকার প্রতিশ্রুতি না পেয়ে রামন নিরাশ হলেন এবং তারপরেই যা করলেন, সেটা অত্যন্ত অভিনব। জওহরলালকে তাঁর এক ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গেলেন, যেখানে একটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল দুটো ধাতব পাত। রামনের নির্দেশে সেই ঘরে একটা ইউভি ল্যাম্প বাদে সমস্ত লাইট নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইউভি ল্যাম্পের আলোয় সেই দুটো পাতের একটা খুব চকচক করছিল। রামন জিজ্ঞেস করলেন, এর মধ্যে একটা সোনা, কোনটা বলুন তো? জওহরলাল চকচকে পাতটা দেখালেন। রামন হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ওটাই তো পলিটিশিয়ানদের নিয়ে সমস্যা, স্যার, চকচক করলেই সোনা হয় না। ওটা আসলে তামা, পাশেরটা সোনা।

ঠারেঠোরে রামন বুঝিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী অপদার্থ লোকদেরই সোনা ভেবে গাদা গাদা টাকা খরচ করে বিজ্ঞানের পিন্ডি চটকাচ্ছেন।

এ সব সত্ত্বেও রামন ১৯৫৪ সালে ভারতরত্ন উপাধি পেলেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর গলায় পরিয়ে দিলেন ভারতরত্নের মেডেল। অপমান গায়ে মেখে থাকলে পলিটিশিয়ানদের চলে না। একই বছরে জওহরলালের নির্দেশেই তাঁকে ন্যাশনাল প্রফেসরের পদও দেওয়া হল।

পরের বছর সেন্ট্রাল এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে রামনের কাছে একটা চিঠি গেল। এডুকেশন সেক্রেটারির সই করা সেই চিঠিতে সবিনয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, ন্যাশনাল প্রফেসর হিসাবে তিনি গত এক বছরে কী করেছেন, তা যেন তিনি চিঠি লিখে জানান।

মাথায় আগুন জ্বলে গেল রামনের। সেক্রেটারিকে ডেকে বললেন একটা হাতুড়ি খুঁজে আনতে। তার সামনেই ভারতরত্নের মেডেলটা ড্রয়ার থেকে বের করে মেঝেতে ফেলে হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মেরে চারখন্ড করে পিসগুলো একটা লেফাফায় ভরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে রেজিস্টার্ড পোস্টে পাঠিয়ে দিলেন নোবেলজয়ী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন।

১০ জানুয়ারি ২০২১

শনিবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২১

আরেক অলিন্দ যুদ্ধ ~ পি বিশ্বাস

বিধান সরণীর এই বাড়িটা। এইখানে সংঘটিত হয়েছিল মাত্র তিনজন বাঙালি বিপ্লবীর সাথে একদল সশস্ত্র ব্রিটিশ পুলিশের গানফাইট। যা ঐতিহাসিক অলিন্দ যুদ্ধের মতই দুর্ধর্ষ, ভয়াবহ। যে কাহিনী বিদেশীর খুনে গুলি, বন্দুক, বোমার আগুনে আজো রোমাঞ্চকর।

চন্দননগরের পুলিশ কমিশনার কুইন সাহেবকে খতম করার পরে দুঃসাহসী দীনেশ মজুমদার ও নলিনী দাস আশ্রয়ের সন্ধানে ছিলেন। পুলিশ তাদের খ্যাপা কুকুরের মত খুঁজছে। ইতিমধ্যে দীনেশ টেগার্টকে হত্যা করতে গিয়ে অল্পের জন্য ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হলে তিনি মেদিনীপুর জেল ব্রেক করে পালান ও দু বার স্টেটসম্যানের সম্পাদক ওয়াটসনকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে ফেরার ছিলেন। নলিনীও হিজলী জেল পলাতক আসামী। যার মাথার ওপর ৫ হাজার টাকা পুরষ্কার।

অনেক অনুসন্ধানের পর দঃ ২৪ পরগণার মল্লিকপুরের বাসিন্দা নারায়ণ ব্যানার্জী ও তার স্ত্রী শৈলবালা এই বাড়িটি ভাড়া নিয়ে শেল্টার দেন দীনেশ মজুমদার, সাথী নলিনী ও অনুশীলন সমিতির জগদানন্দ মুখার্জীকে।

পুলিশ কিভাবে সন্ধান পেয়ে যায় এই গোপন আস্তানার। ২২ মে, ১৯৩৩ রাত্রের শেষ প্রহর, গোটা কলকাতা যখন ঘুমন্ত, কাউকে প্রস্তুত না হতে দিয়ে, বিপুল বাহিনী নিয়ে আক্রমন করে বসে তাদের হাইড আউট।

দোতালা থেকে শুরু হয় মরণপন সম্মুখ যুদ্ধ। বিনয়-বাদল-দীনেশের মত ব্যাঘ্রবিক্রমে লড়লেন নলিনী-জগদানন্দ-দীনেশ, অন্তিম বুলেটটি নিঃশেষ না হওয়া অব্দি। আহত হয়ে ভূমিশয্যা নিল ডিএসপি পোলার্ড আর ডিআইবি ইন্সপেক্টর মুকুন্দ ভট্টাচার্য। তিন বিপ্লবীই রক্তাক্ত অবস্থায় ধরা পড়েন। বিচারে নলিনী ও জগদানন্দের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর আর যক্ষারোগে মৃত্যুপথযাত্রী দীনেশ মজুমদারের ফাঁসি হয়ে গেল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে।

স্বাধীনতাকামী তিন যুবকের অসম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৩৬/৪ কর্নওয়ালিশ স্ট্রীটের বাড়িখানা। যদি খোঁজেন, ফুটপাতের দোকানে প্রায় ঢেকে যাওয়া একটা ধুলিমলিন স্মৃতিফলক আপনার চোখে পড়লেও পড়তে পারে।

ওরা আকাশে জাগাতো ঝড়, অথচ ওদের স্মৃতি বলতে কলকাতা শহরে এটুকুই।

রবিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২১

সফদার হাশমী ~ অর্ক রাজপন্ডিত

১৯৮৪ সালের দাঙ্গায় যুক্ত ছিলেন তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী কংগ্রেস নেতা এইচ কে এল ভগত। কোন মধ্যপন্থা নেই। হয় আমরা ভগতের হাত থেকে পুরস্কার নেব না হয় নেব না। জনম'র বৈঠকে বলেছিলেন সফদার।

নাহ! ভগতের হাত থেকে পুরস্কারের ট্রফি আর তখনকার দিনে মোটা অঙ্ক দশ হাজার টাকা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জনম। কথা ছিল, ১৯৮৯ সালের ২ জানুয়ারি সাংবাদিক সম্মেলন করবে জনম। খোলাখুলি জানাবে তাদের অবস্থান।

দিল্লি থেকে বাসে ঝান্ডাপুর যাওয়ার পথে সহযোদ্ধা সুধন্য দেশপান্ডেকে বলেছিলেন সফদার।' ১৮ বছর পর ইউপি সরকার পৌরসভার নির্বাচন করছে। কেউই প্রতীকে লড়ছে না আমরা ছাড়া। আমরাই একমাত্র কাস্তে হাতুড়ি তারায় লড়ছি। ঝান্ডাপুরের যে আমাদের প্রার্থী রামনাথ ঝা খুব মিলিট্যান্ট ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী'।

কথা বলতে বলতে বাস এসে দাঁড়ায় ঝান্ডাপুরে। সফদার ও তাঁর কমরেডরা হেঁটে চলেছেন সিআইটিইউ অফিসের দিকে, ওখানেই হবে হাল্লা বোল।

লাঠি আর লোহার রড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে গাজিয়াবাদ সিটি বোর্ডের মেয়র পদপ্রার্থী কংগ্রেস কর্মী মুকেশ সিং ও তার দলবল। এলোপাথাড়ি মার শুরু। সুধন্য দেশপান্ডে লিখেছেন, 'আমাদের কাছে ঝান্ডার লাঠি ছাড়া কিছু ছিল না, তাই দিয়েই আমরা রুখছি। পাথড় ছুঁড়ে পাল্টা মারার চেষ্টা করছি। সফদার আমাদের নেতা, চেঁচিয়ে উঠলো সবাই সিআইটিইউ অফিস চলো। সিআইটিইউ কমরেড যদুমনি বেহারার ততক্ষণে মাথা ফেটে গেছে, রক্ত ঝড়ছে। আমাদের দেখে এক মহিলা ছুটে এলেন চিৎকার করতে করতে পাঁচ জনের গুলি লেগেছে। তোমাদের একজন পড়ে আছে মাটিতে'।

সুধন্য দেশপান্ডে ও তাঁর কমরেড ব্রিজেশ ছুটছেন রাস্তায়। ব্রিজেশ রাস্তার এক কোনে রক্তাক্ত একজনকে দেখে ভাবছেন আরেকজন কমরেড বিনোদ। কিন্তু তিনি বিনোদ নন, সবুজ সোয়েটার লাল হয়েছে রক্তে, চিনতে পেরেছেন মুহুর্তেই সুধন্য, সফদার!

সফদারের সঙ্গেই খুন হয়েছিলেন সিআইটিইউ কর্মী  রাম বাহাদুর।

নাম গুলো চিনে রাখা দরকার। কারা মেরেছিল সফদারকে। ৫নভেম্বর, ২০০৩  গাজিয়াবাদ কোর্ট দশ জনকে দেষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবনের সাজা দেয়। মুকেশ শর্মা, দেবী সারন শর্মা, জিতেন্দ্র, রাম অবতার, বিনোদ সিং, ইউনুস আলি, তাহির হুসেন, রমেশ, করণ সিং এবং ভগত বাহাদুর। সবাই ছিল কংগ্রেস কর্মী।

গাজিয়াবাদ আদালতে খুনিদের পক্ষের আইনজীবী সাফাই গেয়েছিলেন, মলয়শ্রী হাসমি যা বলছেন ঠিক না, এটা ঠিক খুন না, একটা স্কাফল! ধস্তাধস্তির জেরে মৃত্যু হয়।

জনম থামেনি। হল্লা বোল থামেনি। একই জায়গায় ফিরে এসেছিলেন সফদারের কমরেডরা হল্লা বোল নাটক নিয়েই।

সফদার বেঁচে আছেন!

সফদারের কমরেডদের  শ্রেণি ঘৃনা মরেনি।

শনিবার, ২ জানুয়ারী, ২০২১

দুই ইঞ্জিনিয়ারের গল্প ~ অমিতাভ প্রামাণিক


- স্যার, একটা কথা বলব, যদি কিছু মনে না করেন?
- বলো।
- আচ্ছা, আমরা এই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রোজেক্টে কাজ করছি কেন? আপনি নিশ্চয় শুনেছেন যে আমেরিকা-জার্মানিতে ওরা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট ইনস্টল করে কোটি কোটি টাকা লস খেয়েছে। তা সত্ত্বেও আমরা এই প্রোজেক্টটা নিলাম কেন?
- ইয়াং ম্যান, ইন্ডিয়ার দরকার নিউক্লিয়ার পাওয়ার। নিউক্লিয়ার পাওয়ার পেতে হলে তো এই পাওয়ার প্ল্যান্ট বানাতেই হবে। আমরা যদি সেই কাজটা না করি, তো কে করবে?

কথাটা যিনি বললেন, তাঁর নাম হেনিং, তিনি একজন ড্যানিশ। ডেনমার্ক যে শুধু শ্রীরামপুরেই কলোনি বানিয়েছিল, তা তো নয়। এই হেনিং-এর বন্ধু ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান ডক্টর হোমি জাহাঙ্গির ভাবা। তিনি জানতেন, এ কাজের উপযুক্ত লোক হেনিং, তাই এই পরিকল্পনার ক্রিটিক্যাল কম্পোনেন্ট যেগুলো, তা তৈরির বরাত পেয়েছে তারই সংস্থা।

হেনিং 'ইউনিভার্সিটি অভ কোপেনহেগেন' থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ, এখন যার নামের আগে 'টেকনিক্যাল' শব্দটা যোগ হয়েছে। পাশ করেই কোপেনহেগেনের এফ এল স্মিথ অ্যান্ড কোম্পানির একটা অ্যাসাইনমেন্ট জুটে যায় তার কপালে। কাজটা হচ্ছে দক্ষিণ ভারতের কোয়েম্বাটোরের কাছে মাদুক্কারাই নামে এক জায়গায় একটা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি দাঁড় করাতে হবে। তার জন্যে যন্ত্রপাতি যা লাগবে, সব আসবে বিদেশ থেকে, তাকে এর ইনস্টলেশন-কমিশনিং করতে সহায়তা করতে হবে। সেটা ১৯৩৮ সাল। কাজে যোগ দিয়েই সে অবাক, এখানে এসে কাজ করছে তার ছোটবেলার স্কুলের বন্ধু সোরেন, ঐ একই কোম্পানির হয়ে। সে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, চার বছর আগে সে ইন্ডিয়াতে এসে সিন্ধুপ্রদেশের রোহরিতে অলরেডি একটা সিমেন্ট কারখানা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, এখন তারও কাজ এই মাদুক্কারাই প্রোজেক্টেই।

যথাসময়ে দুই প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে গেল। বোম্বের কাছে মাথেরান হিল স্টেশনে ছুটি কাটাতে গিয়ে দুই বন্ধু এ ওকে বলল – দেশে ফিরে লাভ নেই। চল, এখানেই একটা কোম্পানি খুলে ফেলা যাক। মনে হচ্ছে, ব্যবসা খারাপ হবে না।

বোম্বেতে এক খুদে অফিস খুলে বসে গেল দুই বন্ধু। অফিস মানে একটা পাঁচ বাই পাঁচ মেঝে, তাতে একটা ছোট্ট টেবিল আর একটা চেয়ার। একজন বসলে অন্যজনের সেখানে জায়গা নেই, তাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ওরা বুঝে গেল, ইন্ডিয়াতে দুধের ভাল চাহিদা আছে। দুগ্ধজাত বস্তু তৈরির যন্ত্রপাতি বিক্রি হবে ভালো। ডেনমার্কের এক ডেয়ারি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকের এজেন্ট হিসাবে কাজ করলে আমদানি মন্দ হবে না।

কিন্তু বেশিদিন সে সব চালানো গেল না। বিদেশ হয়ে উঠল উত্তাল, বেধে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানি ডেনমার্কের দখল নিয়ে নিল, ফলে ডেনমার্ক থেকে ইমপোর্ট হয়ে পড়ল অসম্ভব। যন্ত্রপাতি না এলে ব্যবসা কী করে চলবে? বাধ্য হয়ে দুই বন্ধু ঠিক করল, তারা নিজেরাই যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু করবে। হেনিং এমনিতেই ঝুঁকি নিতে পছন্দ করে, সে বলল, আমরা সব রকম যন্ত্রপাতি বানাব। সোরেন অপেক্ষাকৃত সাবধানী, কিন্তু তার কাজ নিখুঁত, সে প্রবল পরিশ্রমী ও হার্ড টাস্কমাস্টার। একটা ওয়ার্কশপ মতন খুলে প্রথমে কিছুদিন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ছোটখাটো কাজকারবার করতে লাগল, মূলত সার্ভিসিং। পরে নিজেরাই ডেয়ারি ইকুইপমেন্ট তৈরিতে মন দিল।

যুদ্ধ ঘনিয়ে এলে অবশ্য তড়িঘড়ি বুঝে গেল আসল মুনাফা এইসবে নয়, বরং যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসায়। যা তৈরি করবে, নিমেষে সব বিক্রি হয়ে যাবে। সুতরাং আদা নয়, তাদের ব্যবসা হতে হবে জাহাজের। কদিন পরেই হিলডা লিমিটেড নাম দিয়ে তারা জাহাজ সারানোর আর জাহাজের প্রয়োজনীয় পার্টস বানানোর কোম্পানি খুলে ফেলল। তরতরিয়ে চলতে লাগল সেই ব্যবসা।

এদিকে টাটারা তাদের সোডা অ্যাশ কারখানা বানানোর পুরো পরিকল্পনা করে তখন গেছে ফেঁসে। তাদের ইঞ্জিনিয়ার আসার কথা জার্মানি থেকে, এদিকে জার্মানির অক্ষশক্তির সঙ্গেই তো ব্রিটিশ মিত্রশক্তির যুদ্ধ! জার্মানি থেকে ব্রিটিশ ভারতে কাকে আসতে দেবে তখন? ফলে টাটারা লোক খুঁজতে লাগল, যদি উপযুক্ত কাউকে এ কাজের জন্যে পাওয়া যায়।

খবর পেয়ে হেনিং আর সোরেন হাজির হল টাটাদের দপ্তরে। তারা নামিয়ে দেবে ওদের বিশাল সোডা-অ্যাশ কারখানা।

সেই কারখানা সাফল্যের সঙ্গে বানিয়ে তাদের ছক বদলে গেল। ছুটকো-ছাটকা কাজ না, তাদের এখন দরকার বড় বড় এমন প্রোজেক্টের কাজ। ইঞ্জিনিয়ারিং আর কনস্ট্রাকশনের কন্ট্রাক্ট নেবে তারা, ক্লায়েন্ট শুধু বলে দেবে তার কী চাই, তারা পুরো কাজটা নামিয়ে দেবে। বিশ্বযুদ্ধের দমক কমে যেতে বিদেশি কোম্পানিদের সঙ্গেও একসঙ্গে কাজ করতে লাগল তারা। আমেরিকার ক্যাটারপিলার ট্র্যাকটর কোম্পানির সঙ্গে কথাবার্তা হল, তারা বড় বড় কনস্ট্রাকশনের উপযোগী হুঁদো হুঁদো সব আর্থ-মুভিং ইকুইপমেন্ট বিক্রি করবে ইন্ডিয়ায়। দেশে তখন বিস্কুট, কাচ, বনস্পতি, সাবান ইত্যাদির কারখানার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে ব্রিটিশ কোম্পানিরা। এরা তাদেরও এজেন্সি নিয়ে ব্যবসা বাড়িয়ে চলল। এক এক রকম বিজনেসের জন্যে আলাদা আলাদা নামের কোম্পানি চালু করে দিল।

যুদ্ধ শেষ হতে আমেরিকান ক্যাটারপিলার ট্র্যাক্টর কোম্পানির ইন্টারেস্ট কমে গেল। তাদের তৈরি বড় বড় আর্থ-মুভার অবশ্য এদের কনস্ট্রাকশনের জন্যে খুবই কাজের। ওরা বলল, তাহলে তোমাদের এগুলো সস্তায় দিয়ে দিচ্ছি, তোমরা কিনে নাও।

জলের দরে হলেও অতগুলো মেশিন কেনার পয়সা তাদের নেই। দরকার ইনভেস্টমেন্টের, তার জন্যে বাজার থেকে টাকা তুলতে হবে। যার কাছেই টাকা চায়, তারাই ওদের কোম্পানির ব্যবসাপত্রের হিসেব দেখতে চায়। কোম্পানিগুলো ছোট ছোট, তাই ধার পাওয়া মুশকিল। বাধ্য হয়ে সবগুলো একসঙ্গে করে তারা একখানা বড় প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি বানিয়ে ফেলল, টাকা চলে এল। দেশ স্বাধীন হতে তাদের নতুন অফিস খুলে গেল দিল্লি, কলকাতা, মাদ্রাজেও। পরের বছর বোম্বের এক বড়সড় জলা এলাকা পরিষ্কার করে সেখানে খুলে বসল বিশাল সাইজের ফ্যাক্টরি।

অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান হোমি ভাবার মতই ইসরোর চেয়ারম্যান বিক্রম সারাভাই-ও এদেরই শরণাপন্ন হলেন, যখন ১৯৭২ সালে ভারতের স্পেস প্রোগ্রাম শুরু হল। পরে এমনকি ভারতের ডিফেন্স রিসার্চের বড় বড় ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্পের জন্যেও এদের কথাই ভাবা হয়। প্রতিরক্ষার সামগ্রী ভারতের সরকারী ব্যবস্থায় বেসরকারি সংস্থা থেকে নেওয়া যায় না বলে ওদের কাছ থেকে ডিজাইন চাওয়া হয়। সেই ডিজাইন পরখ করে তার বরাত দেওয়া হয় সরকারি কোনো সংস্থাকে।

হেনিং ও তার বাল্যবন্ধু সোরেন ভারতকেই তাঁদের ঘর বানিয়ে নিয়েছিলেন। নিজেদের তৈরি কোম্পানি থেকে অবসর নিয়েও হেনিং দেশে ফিরে যাননি। ২০০৩ সালে ৯৬ বছর বয়সে বোম্বের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে মারা যাওয়ার আগে তাঁর নামের আগে অনেকগুলো পুরস্কার জ্বলজ্বল করছে। ১৯৭৬ সালে রামন ম্যাগসেসে থেকে শুরু করে তার পরের বছর ড্যানিশ নাইটহুড হয়ে মৃত্যুর আগের বছর তিনি পেয়েছেন ভারতের পদ্মভূষণ, ভারতীয় ডাক তাঁর নামে পোস্টেজ স্ট্যাম্পও ছাপিয়েছে। সোরেন অবশ্য দেশে ফিরে গেছিলেন প্রায় পঞ্চাশ বছর ভারতে কাটিয়ে, ১৯৮১ সালে। কিন্তু সে তাঁর সহ্য হয়নি, পরের বছরই তিনি সেখানে মারা যান। তাঁর স্ত্রী জীবনের শেষ বছরগুলো কাটিয়েছিলেন কোদাইকানালে তাঁদের পারিবারিক বাড়িতেই।

বিভিন্ন ধরনের কারখানা, কমার্শিয়াল ও রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং, এয়ারপোর্ট, রানওয়ে, হাইওয়ে, রেলওয়ে, মেট্রোরেল, মনোরেল, এলিভেটেড করিডোর, আইটি পার্ক, হাসপাতাল, টানেল, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পরমাণু শক্তিকেন্দ্র – বহুসংখ্যক বড় বড় প্রোজেক্ট সাফল্যের সঙ্গে রূপায়িত করে দেশনির্মাণের এক অন্যতম সহচর এঁদের এই সংস্থা।


দুই উৎসাহী তরুণ ড্যানিশ ইঞ্জিনিয়ার কলেজ থেকে পাশ করেই চলে এসেছিল ভারতে, সেখানেই কেটে গেল তাদের সমস্ত জীবন। হেনিং হল্ক-লার্সেন এবং সোরেন ক্রিস্টিয়ান টুব্রোর 'লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো' এখন আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং কুড়িটা বৃহত্তম মূল্যবান কোম্পানির অন্যতম। 'এল অ্যান্ড টি' এখন পৌনে দু-লক্ষ কোটি টাকার কোম্পানি।
২৩ ডিসেম্বর ২০২০

মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২০

দারুণ দিন ~ রজত শুভ্র বন্দোপাধ্যায়

ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না, 
সত্যি বলছি, তোমার সঙ্গে রংবাজিতে পারব না!
মনটা আমার বড্ড নরম, মারতে গেলেই ক্লান্তি হয়, 
ভাষা আমার রুক্ষ হলেও স্বভাব আমার শান্তিময়।

আমার হাতে ডাণ্ডা দেখে ভয় পেয়েছ? মোটেই না! 
ওইটা কেবল লোক দেখানো, কাউকে আমি পেটাই না।
তিলক কাটা সাঙ্গ-পাঙ্গ? যাহ! ওরা সব বালক দল, 
শান্ত-শিষ্ট, ল্যাজ বিশিষ্ট – মন গুলো সব স্বচ্ছ জল!

এস, এস, বসবে এস, পদ্ম ফুলের আসনটায়, 
আদর করে ভরিয়ে দেব, মাথায় করে রাখব তায়।
বসবে এস মামার ঘরে; কই রে মুকু, ফ্যান চালা! 
গেস্ট এসেছেন, কর রে তোয়াজ, এই আদানি, ঠাণ্ডা লা!

দেশ জুড়ে আজ শিল্প এনে উন্নয়নের ডাক ছেড়ে 
করছি কেমন সুব্যবস্থা, সবাই খাবে পাত পেড়ে!
নাহয় দুটো ক্ষেত নিয়েছি, তাইতে আমায় দোষ দেবে?
নয় মরেছে কোন সে চাষা, অন্যরা তো ফল নেবে!

মিছেই কেন বিরোধ কর? বিল বদলের রব তোলো?
পাগড়ি পরে আটকালে পথ, কাজটা কি ভাই ঠিক হলো?
কী বললে ভাই? আদুর দলিল? চোখ বোলাবে চুক্তিতে?
রাজার কাজে নাক গলাবে? এ আবার কী যুক্তি হে!

যাও, ছাড় তো ওসব কথা! ফালতু কেন ভাবছ, ভাই?
আয়েশ করে পায়েস খেয়ো, এই তো জীবন! আর কী চাই?
যাও দেখ গে, মল করেছি, আরাম করে দর কর,
এস্কালেটর চেপেই নাহয় ওপর তলায় ভর কর।

.................................

আরে, আরে, তবুও রাগিস? আইন দেখে ভয় পেলি?
বলছি তো ভাই, গিমিক শুধু, আয় কাছে আয়, বল খেলি!
মিষ্টি করে বলছি এত, হ' না রে ভাই নিমরাজী!
তবুও তোরা কান দিবি না, চালিয়ে যাবি দল-বাজি?

বেশ, ঠিক আছে, ঘাট হয়েছে, থাক তবে তোর রাগ নিয়ে,
মিষ্টি কথা বলব না আর, শোন তবে ভাই মন দিয়ে;
আমি আছি, মোটকা আছে, আছে আমার তিনশো দুই,
সবাই মিলে কামড়ে দেব, আবার যদি লড়িস তুই!!

শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২০

সোভিয়েতের পতন ~ কৌস্তভ কুন্ডু

১৯৯১, ২৫ শে ডিসেম্বর, ঠিক সন্ধ্যা ৭:৩২ মিনিটে ভেঙে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ক্রেমলিনের মাথা থেকে নামানো হয় কাস্তে হাতুড়ি পতাকা। ভেঙে পড়ে দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্নের সোভিয়েত ইউনিয়ন। 

কিন্তু কি কারণ থাকতে পারে, পৃথিবীর দ্বিতীয় সুপার পাওয়ার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার! বহু জায়গায় বহু ব্যখ্যা পড়েছি কিন্তু যুক্তিসঙ্গত লাগেনি, তাই খোঁজার চেষ্টা করলাম নিজের মতো করে।

তবে কি মানুষ চায়নি? কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত নিয়ে যে রেফারেন্ডাম আনা হয় তাতে ৭৭.৮৫ % ভোট পড়ে সোভিয়েতের পক্ষে। তবে? 
অনেকে বলে অর্থনৈতিক ফেলিওর, যে দেশ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৩ কোটি প্রাণ দেবার পর ১০ বছরে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হতে পারে, অন্য কোনও দেশ দখল না করে, উপনিবেশ ছাড়াই, তারা অর্থনৈতিক ফেলিওর বিশ্বাস করিনা আমি। ১৯৯০ - ৯১ তেও উৎপাদন স্ট্যাটিসটিক্স দেখুন, বা আমেরিকার মানুষের থেকে বেশী প্রোটিন ইনটেক দেখুন, তথ্য কিন্তু সে কথা বলে না।

তবে কি কারণ থাকতে পারে?
আসুন আগে দেখি কি ঘটেছিল সেসময়। মদ বিরোধী আন্দোলন করে কমিউনিস্ট পার্টির ভিতর বিখ্যাত হন এবং ১৯৮৫ সালে কম্যুনিস্ট পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হন মিখাইল গর্বাচেভ। উনি এসে ইমপ্লিমেন্ট করেন পেরেস্ত্রইকা এবং গ্লাসনস্ত। অর্থাৎ খোলামেলা রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং খোলা বাজার। ১৯৯১ এ খোদ কমিউনিস্ট পার্টির জেনেরাল সেক্রেটারি মিখাইল গর্বাচেভ কম্যুনিস্ট পার্টির অফিসে তালা মারেন। সোভিয়েত ভেঙে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। আগস্ট মাসে যদিও কমিউনিস্ট পার্টির একাংশ চেষ্টা করে গর্বাচেভ কে উচ্ছেদ করার সশস্ত্র অভ্যুত্থান এর মধ্যে দিয়ে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসেন বরিস ইয়়েলিৎসিন, যে কিনা একসময় ৪ বিলিয়ন ডলার চেয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে, নির্বাচন জিততে। গর্বাচেভ জানায় রেফারেন্ডাম এ মানুষ নাকি ভয়ে ভোট দিয়েছিল, তাই জনাদেশের বিপক্ষে ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ইয়়েলিৎসিন এর নেতৃত্বে এবং আমেরিকার অর্থদপ্তরের সহযোগিতায় ইমপ্লিমেন্ট হয় 'শক থেরাপি', একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে সমস্ত সামাজিক মালিকানা তুলে দেওয়া হল পুঁজিবাদের হাতে। শুধু সোভিয়েতের ক্ষেত মজুররা প্রতিরোধ করেছিল, তাই আজও রাশিয়ার ৭০% কৃষিজমি যৌথ খামার।

পেরেস্ত্রইকা, গ্লাসনস্ত, শক থেরাপি পরপর অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গুলোকে সাজান মাথায় রাখুন।
এবার আপনি যদি ব্যাক ক্যালকুলেশন করে কোনোদিন অঙ্ক মিলিয়ে থাকেন, একটা ব্যাক ক্যালকুলেশন করি চলুন।
প্রথম যে কথাটা মাথায় আসল, সেটা হল শক থেরাপির মধ্য দিয়ে যে হঠাৎ করে যে পুঁজিবাদে পরিণত হল সমাজতান্ত্রিক দেশ। কিকরে সম্ভব!! পুঁজিবাদের জন্য যেটা সবচেয়ে প্রয়োজন, যেটা ছাড়া চলে না, সেটা হল পুঁজিপতি। কিন্তু প্রশ্নটা আসে যে সমাজতান্ত্রিক দেশে যেখানে পুঁজিপতি শ্রেণীটাই অ্যবোলিশড সেখানে পুঁজিপতি এলো কোথা থেকে, পুঁজিই বা এলো কোত্থেকে? এখানেই খটকা লাগে আমার।

এবার শুরু করি ব্যাক ক্যালকুলেশন।
গুগলে যান সার্চ করুন রাশিয়ার বিলিওনিয়ার লিস্ট। এবার পরপর যা নাম আসবে তাদের বায়োগ্রাফি চেক করুন। একটা অদ্ভুত জিনিস দেখবেন, বিলিওনিয়ার লিস্টের ৭০% সোভিয়েত আমলের আমলা অথবা কমিউনিস্ট পার্টির উঁচু লিডার। লজ্জার ব্যাপার।
যেমন ধরুন - রাশিয়ার ৫ম ধনী ব্যক্তি ভাগিট আলেকপেরভ, উনি সোভিয়েত আমলে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন, এরপরে উনি সোভিয়েতের গ্যাস এবং পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের মন্ত্রী নিযুক্ত হন।
বা, গেনাডি টিমোশেঙ্কো, উনি সোভিয়েতে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন। অর্ডার অব ফাদারল্যান্ড পেয়েছিলেন। 
বা, সুলেমান কেরিমোভ ডেপুটি ডিরেক্টর ছিলেন আলতাব সংস্থার।
মোট ৪৬ জন বিলিওনিয়ার এর লিস্ট খুঁজে দেখুন ৭০% সোভিয়েত আমলের আমলা অথবা কমিউনিস্ট পার্টির উঁচু লিডার।
এদের হাতেই তুলে দেয় বরিস ইয়েলিৎসিন পুঁজিবাদের ভার, পুঁজি হিসেবে আসে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের অর্থ সাহায্য।

সমস্যাটা শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ পেরেস্ত্রইকা, গ্লাসনস্ত আমল থেকে। মিখাইল গর্বাচেভ খোলামেলা ব্যবস্থার নামে কিছু কিছু সংস্থাকে পুঁজি এবং আমলাদের পুঁজিপতি হওয়ার সুযোগ দেন। তখনই রক্তের স্বাদ পেয়ে যায় তারা। তারা বোঝে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পুঁজিবাদ এলে তারা কোটিপতিতে পরিণত হতে চলেছে। তাই তাদের সমর্থন ছিল মিখাইল গর্বাচেভ এবং বরিস ইয়েলিৎসিন দের ওপর। এরাই কমিউনিস্ট পার্টির বড় বড় কমিটিতে মেজরিটি ছিল। ফলে ষড়যন্ত্র হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ফেলার, আমেরিকার ফান্ড সাহায্য নিয়ে। মিখাইল গর্বাচেভ এবং বরিস ইয়েলিৎসিন এর নাটক, তারা একদিকে দেখাত শত্রু এদিকে অ্যালাই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙা হয় রেফারেন্ডামে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা, আমলারাই ভাঙে সোভিয়েত, তাদের চোখে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন। সোভিয়েত মানুষ ভাঙেনি, ৭৭.৮৫% মানুষের হৃদয়ে ছিল তাদের শ্রমিকরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। এখনও রাশিয়ার ৭০% কৃষিজমি যৌথ খামার, তাদের হৃদয়ে সোভিয়েত বেঁচে আছে।

কিন্তু প্রশ্নটা আসে এই যে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কতন্ত্রের যে সোভিয়েত মডেলকে আমরা মডেল হিসেবে দেখি, এখানে আদর্শবিচ্যুত দূর্নীতিগ্রস্ত লোকেরা মেজরিটি পেলে কি হতে পারে? ধরুন যেমন উত্তর কোরিয়া, ৬০ এর দশকেই অফিসিয়ালি ঘোষিত ভাবে তারা কম্যুনিস্ট আদর্শ ত্যাগ করে, যুচে নামক একটি জগা খিচুড়ি প্রতিষ্ঠা করে, তার ফলস্বরূপ উত্তর কোরিয়া আজ পুঁজিবাদহীন কিন্তু একটি পরিবারতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয়েছে।  শ্রমিক শ্রেণীর একনায়কতন্ত্রকে আরও স্বতঃস্ফূর্ত, স্টেবল, এবং মাস পার্টিসিপেশন ওয়ালা ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে। মাস পার্টিসিপেশন বলতে লাতিন আমেরিকা খুব ভালো কাজ করছে, তারা পপুলার কমিউনিস্ট পার্টি তৈরী করছে। অন্যদিকে চীন, সেখানে পুঁজিপতি আছে, পুঁজিবাদ আছে, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির কন্ট্রোল রয়েছে সেসবের ওপর, দেখতে হবে চীনের ভবিষ্যৎ।

মোট কথা মার্ক্সবাদীরা ভুল কে এড়িয়ে যায় না, সেটা স্বীকার করে এবং সমাধান করার চেষ্টা করে, ব্লেমগেম খেলে না। আরও ভাবতে হবে আমাদের। তাই ভাববাদী না তথ্যনির্ভর কারণ খোঁজার চেষ্টা করলাম, বিরোধিতা থাকলে জানান। 
আর আমরা যারা বামপন্থী, যারা একটা বয়সের পর উঠতে বসতে একটাই স্বপ্ন দেখেছি, তাদের একটা সেভিয়েত পতনে স্বপ্নভঙ্গ হবে না। গর্বাচেভ, বরিস ইয়েলিৎসিনরা কমিউনিস্ট আদর্শকে ভেঙে ফেলতে পারবে না। ক্রেমলিনে আবার কাস্তে হাতুড়িই উড়বে।

রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

কৃষক আন্দোলন ~ অনির্বান অনীক

আজ পবন দুজ্ঞালের গল্প বলি আপনাদের। শাহজাহানপুর সীমান্তে রাজস্থানী কৃষকদের জান কবুল, মান কবুল হিম্মতের ছবি আমরা দেখেছি। পবন রাজস্থানের অনুপগড় কেন্দ্র থেকে সিপিআই(এম)'এর বিধায়ক ছিলেন। ২০১৮ সালে পরাজিত। সর্বভারতীয় কৃষি-শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক। মোদ্দা কথা রাজস্থান সিপিআই(এম)'এর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব।

ঘরসনা, গঙ্গানগর থেকে রাজস্থান-হরিয়ানা সীমান্তে আগত প্রথম জাঠাটি এসেছে পবনের নেতৃত্বে। ট্র্যাক্টরে করে ৬০০ কিলোমিটার পথ। ভুখা মানুষ। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া গরীব "ছোটোলোকের" দল। পবনের নেতৃত্বে ২ দিন ধরে পাড়ি দিয়েছেন। সঙ্গে এনেছেন ৫ মাসের রেশন। খাবার-দাবার জোগাড়ের দায়িত্বে লাল ঝাণ্ডা। কিষান সভা, কৃষি-শ্রমিক ইউনিয়ন, সুশীল-লিবেরাল সমাজে বহুনিন্দিত সিপিআই(এম)। আলপথ থেকে গলিপথ - দেশের সম্বিৎ ফেরানোর লড়াইয়ের এই শরিকদের নিয়ে পবন একা আসেননি,  সাথে এসেছে পবনের গোটা পরিবার। 


বর্তমানে পবনের দায়িত্বে কৃষক বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কমিউন। এই দেশের রাজপথে, হৃদযন্ত্রে আলোড়ন তুলে আন্দোলনে সামিল হাজারো অন্নদাতা কৃষকের  অন্নের দায়িত্ব কিষান সভা,বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন, মসজিদ এবং গুরদোয়ারা পরিচালিত লঙ্গরখানাগুলি কাঁধে তুলে নিয়েছে। এই কমিউনের লঙ্গরখানা তার মধ্যে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করছে। পবন, তাঁর স্ত্রী , কন্যা হাতে হাত মিলিয়ে আজ  এই কমিউনে যুদ্ধ লড়ছেন। পবন ব্যস্ত থাকেন রান্নার কাঠ সংগ্রহে, সাহায্য করেন রান্না-বান্নায়, খাদ্যবিতরণে। তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাহায্য করেন সবার জন্য রান্না-বান্নায়, সব্জি কুটতে।     
 
খোলা আকাশের নীচে দিল্লী সীমান্তে তাপমাত্রা  চলে যায় শূণ্য ডিগ্রিরও নীচে। শীতল প্রান্তরে অন্নদাতারা তখনো দিয়ে চলেন দিল্লির কৃষক আন্দোলনের লিটমাস টেস্টের রিপোর্ট কার্ড। তবু অন্নদাতার মুখে লেগে থাকে হাসির টুকরোখানি।  দিল্লী সীমান্তে যখন ঊষাকাল, কমিউনিটি কিচেনের দায়িত্ব শীতের ভোরের সুখশয্যা থেকে টেনে তোলে পবনকে। প্রতিটি ভিডিওতে কর্মব্যস্ত পবনের মুখে ছুঁয়ে থাকে এক টুকরো মিষ্টি  হাসি। পুলিস ব্যারিকেডে, ট্র্যাক্টরের উপরে পবনের ছোট্ট মেয়েটি উড়িয়ে দেয় লাল ঝাণ্ডা। সংসদীয় রাজনীতির পাটিগণিতে তুরুপের তাস না হয়েও, প্রতিবারের মত খেটে খাওয়া  মানুষের জীবন-জীবিকার যন্ত্রণার শীতলপাটি হওয়ার দায়িত্ব তো পবনের মত বামপন্থী নেতৃত্বেরই কাঁধে।

এ শুধু বিক্ষোভ নয়, এ এক উৎসব। বিপ্লবের উৎসব। লাল সেলাম।
 
[ অবিন দত্তগুপ্ত র ইংরেজি পোস্ট থেকে আমার অনুবাদ]

শনিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২০

গিরগিটি বনাম লাল ঝান্ডা ~ সুশোভন পাত্র

শুভেন্দু অধিকারী বিজেপি জয়েন করল। মহম্মদ ইলিয়াস রয়ে গেলো।
ওহ, ওয়েট! আপনি বোধহয়য় মহম্মদ ইলিয়াস কে চিনতে পারছেন না। তাই তো? স্বাভাবিক। মিডিয়া তে শুভেন্দুর মাঞ্জা দেওয়া পাঞ্জাবি আর অমিত শাহ'র হেলিকপ্টার –এর বাইরে মহম্মদ ইলিয়াসের 'সাধারণ' রাজনৈতিক জীবনে ফোকাস করার মত আপনার সময় কোথায় বলুন!
১১ বছর আগের একটা স্টিং অপারেশন। নন্দীগ্রামের সিপিআই'র বিধায়ক মহম্মদ ইলিয়াসের হাতে প্রায় জোর করেই গুঁজে দেওয়া হল ১০,০০০ টাকা। বিধানসভায় জমা পড়ল স্টিং অপারেশনের সিডি। চিত্রনাট্যর স্ক্রিপ্ট মেনেই, স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিশ আনলেন নারদা কাণ্ডে অন ক্যামেরা ৫লাখ ঘুষ খাওয়া সৌগত রায়। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে পদত্যাগ করলেন ইলিয়াস।
আচ্ছা, মনে করুন তো ঐ স্টিং অপারেশনে করেছিল কোন মিডিয়া? সুদীপ্ত সেনের সারদার চিট ফান্ডের কালো টাকায় ফুলে ফেঁপে ওঠা চ্যানেল টেন। ঐ স্টিং অপারেশনে সাংবাদিক কে সেজেছিলেন? তৃণমূলের প্রাক্তন, বিজেপির বর্তমান কচিনেতা শঙ্কুদেব পাণ্ডা। আর ঐ স্টিং অপারেশনের মাস্টার মাইন্ড কে ছিলেন? তৃণমূলের প্রাক্তন, বিজেপির বর্তমান 'জননেতা' শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামে বামফ্রন্ট বিরোধী বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের পার্ট অ্যান্ড পার্সেল -স্টিং অপারেশন।
আজ, ২০২০-র ডিসেম্বর। আজ অবধি তদন্তে ইলিয়াসের বিরুদ্ধে প্রমাণ হলনা কিছুই। হওয়ার ছিলোওনা। আজ যখন শুভেন্দু তৃণমূল থেকে বিজেপি হলেন তখন গুরুতর অসুস্থ ইলিয়াস। দু-বিঘা জমি বেঁচে তাঁর চিকিৎসা চলছে। সংসার চলে কোনওমতে, বিধায়কের পেনশনে। কিন্তু আজও আদর্শের সাথে এক ইঞ্চি আপোষ করেননি ইলিয়াস। আজও লাল ঝাণ্ডার রাজনীতি থেকে এক পা সরে আসেননি ইলিয়াস। আজও ইনকিলাবি স্লোগানে সমাজ পরিবর্তনের ফিনিক্স স্বপ্ন বন্ধক দেননি ইলিয়াস।
সুশান্ত ঘোষের দিকে আঙুল দেখিয়ে বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "ঐ লোকটাই কঙ্কাল কাণ্ডের নায়ক না"। বলেছিলাম "মিডিয়া বলে। আমরা বলি না। বিশ্বাসও করি না"। দীর্ঘ আইনি লড়াইর পর আমাদের বিশ্বাসটাই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। CID তথাকথিত 'কঙ্কাল কাণ্ডে'র DNA টেস্টের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনতে পারেনি, অভিযোগের প্রামাণ্য নথি আদালতে জমা দিতে পারেনি, পুলিশও চার্জশিট গঠন করতে পারেনি। আর তাই হাজার চেষ্টা করেও সুশান্ত ঘোষ কে নিজের ভিটে থেকে উৎখাত করার চক্রান্ত সফল হয়নি।
সেদিন মিথ্যে মামলায় সুশান্ত ঘোষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর, এই শুভেন্দু অধিকারীই বলেছিলেন "জঙ্গলমহলে লাল ঝাণ্ডা ধরার লোক থাকবে না"।  ৯ বছর পর জঙ্গলমহলে ফিরেছেন সুশান্ত ঘোষ। ধামসা-মাদল বেজেছে। মিছিল সেজেছে। মঞ্চ বেঁধে মিটিংও হয়েছে।
যে মঞ্চে ছিলেন ছিতামণি সরেন। ছিতামণি সরেন সালুকর মা। ঐ যে সালকু'র গলায় ছ-খানা টাঙ্গির কোপ পড়েছিল, লাশটা লালগড়ের জঙ্গলে পাওয়া গিয়েছিলো; সেই সালুকর মা। শরীরের চামড়া পচে গলে যাচ্ছে, পোকাতে কুরে খাচ্ছে সারা দেহ, চারিদিকে দুর্গন্ধ; অথচ মাওবাদী'দের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, যে সালকুর মৃতদেহ সৎকারের সাহস করেননি ধরমপুর গ্রামের কেউ; সেই সালুকর মা! সিপিআই(এম) মধ্যমকুমারি শাখার পার্টি সদস্য ছিল যে সালকু; সেই সালুকর মা!
সালকুর খুনের পর এই শুভেন্দু বলেছিলেন, "ও সব সিপিএম-র গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব"। আজ শুভেন্দুর সৎ সাহস আছে নাকি একবার ছিতামণি সরেনের মুখোমুখি দাঁড়ানোর। হিম্মত আছে লালগড়ের পার্টি অফিসে আজও যে এক টুকোর লালপতাকা সালকুর রক্ত গায়ে মেখে পতপত করে ওড়ে সেটার দিকে মাথা তুলে তাকানোর?
শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি জয়েন করল! ছিতামণি সরেন রয়ে গেলো।
কদিন আগে হাসপাতালে জ্ঞান ফিরতেই বুদ্ধবাবু নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁকে আলাদা VIP পরিষেবা দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চিকিৎসা পরিষেবার কোন ক্ষতি হচ্ছে নাকি? আচ্ছা ইনিই কি সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যে লোকটার "আমরা ২৩৬ ওরা ৩৬"-র গালভরা মন্তব্যে মিডিয়া ঔদ্ধত্য'র মহাভারত লিখেছিল? ইনিই কি সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়ে যার সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, "বুদ্ধদেবের পাঞ্জাবি তে রক্তের দাগ" –বলতেন? ইনি কি সেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য যার সম্পর্কে শুভেন্দু অধিকারী "খুনি বুদ্ধর ফাঁসি চাই" স্লোগান দিয়ে মেদিনীপুরের রাস্তায় মিছিল বের করতেন?
বুদ্ধবাবুর তো নিশ্চয় আজ কোন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নেই? ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অধরা কোন স্বপ্ন নেই? অমুক কমিটির তমুক মেম্বার হয়ে আখের গোছানর ব্যাপার নেই? নিদেনপক্ষে প্রোমোট করার জন্য নাদুস-নুদুস একটা ভাইপোও নেই? তবুও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে কোনক্রমে ফিরে আসা এই লোকটা জ্ঞান ফিরতেই হাসপাতালের সাধারণ মানুষের অসুবিধার কথা কেন জিজ্ঞেস করছে বলুন তো?
উত্তর খুঁজবেন। একদিকে এই মহম্মদ ইলিয়াস, ছিতামনি সরেনরা। আর অন্যদিকে মিডিয়ার বানানো মুকুল রায় কিম্বা শুভেন্দু অধিকারীর মত 'দোর্দণ্ডপ্রতাপ' তৃণমূলর প্রথম সারির নেতারা। একদিকে সব হারিয়েও লালঝাণ্ডাতেই আস্থা রাখার স্পর্ধা। আর অন্যদিকে ঘুষ খেয়ে, দলের সেকেন্ড ইন কম্যান্ড না হতে পেরে; লাইন দিয়ে বিজেপি-তে গিয়ে আখের গোছানোর ধান্দা। পার্থক্যটা কোথায় বলুন তো? সততার? রাজনৈতিক আদর্শের? না মূল্যবোধের? উত্তর খুঁজবেন।
আজকাল 'সততা', 'রাজনৈতিক আদর্শ', 'মূল্যবোধ' -শব্দ গুলোই বড্ড ক্লিশে হয়ে গেছে রাজনীতি তে। অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরী, সুমন দে'র সৌজন্যে আপনারও মনে হতে শুরু করেছে শুভেন্দু ইন্সটলমেন্টে বিজেপি তে যাবে –সেটাই তো রাজনীতি। 'ভাগ মুকুল ভাগ' বলা বিজেপি মুকুল কে সংগঠনের মধ্যমণি করে পুষে রাখবে -সেটাই তো রাজনীতি। তোয়ালে মুড়ে মেয়র ঘুষ খাবে -সেটাই তো রাজনীতি। নেতা-মন্ত্রীরা আদর্শ বেচে ভোটের মরশুমে গিরগিটির মত রং বদলাবে -সেটাই তো রাজনীতি।
আসলে এই গিরগিটীময় রাজনীতির রসদ আছে আপনার চারপাশেই। আপনার পরিবারেই, আপনার বন্ধু মহলেই। দেখবেন এই কদিন আগেও আপনার দুঃসম্পর্কের যে আত্মীয় তৃণমূলের শুভেন্দু কে সকাল-সন্ধ্যা খিস্তি করছিল, তারাই কাল থেকে সবার আগে গায়ে শুভেন্দুর নামাবলী জড়িয়ে বসে আছে, নির্দ্বিধায়! আপনার যে বন্ধুরা তৃণমূলের দুর্নীতি নিয়ে চায়ের দোকানে মাতিয়ে দিচ্ছিল তারাই মুকুল রায়ের ঘুষ খাওয়ার ভিডিও দেখে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে, নিঃসংকোচে! অবিকল মানুষের মত দেখতে এই প্রাণী গুলোই আসলে গিরগিটী। আদ্যোপান্ত ধান্দাবাজ। আপাদমস্তক সুবিধাবাদী।
তাই কেবল শুভেন্দু-মুকুল নয়, যে রাজনীতি, যে রাজনৈতিক দল এই গিরগিটীদের দল চালানোর দায়িত্ব দেয়, নেতা-মন্ত্রী বানিয়ে মাথায় তুলে নাচে; আর আমার চারপাশে যে মানুষ গুলো সেই রাজনীতি সমর্থন করে, গিরগিটীদের নেতা মানে, এদের প্রত্যেক কে আমি ঘেন্না করি। আমার গর্ব, আমার অতিক্ষুদ্র রাজনৈতিক সামর্থ্যে, আমি এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে লড়াই করি।

রাত্রি এসে যেথায় মেশে ~ শুভলক্ষী গোস্বামী





*************
আমরা যারা শান্তিনিকেতন আশ্রমকে ভালবাসার আঁধারে জড়িয়ে আজ ও বেঁচে আছি, সে থাকা না থাকার সামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের কাছে। সারা দিনের ক্লান্তির কালো ছায়া ঘনিয়েছে এসেছে আশ্রমিকদের মনে প্রাণে। প্রভাতের সূর্য কিরণ মনে হয় এক বিষাদের সুর বাজিয়ে চলেছে।।শান্তির নীড় হারা পাখি উড়ে চলে শান্তির খোঁজে। আজ অন্তরে একটি গান‌ই গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে করছে,
   "কাঙাল আমারে কাঙাল করেছ আরো কী তোমার চাই।" সত্যি আমাদের সব হতে আপন আমাদের শান্তিনিকেতনের রূপ রঙ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সব হতে আপন, তার রূপের সৌন্দর্যে মুগ্ধ সারা বিশ্ববাসী! সেই সৌন্দর্যকে নানা রঙের তুলির আঁচড় কাটতে গিয়ে নিজেদের অপদার্থতার পরিচয়ে পরিচিত করে তুলতে দ্বিধাবোধ করছেন না। উত্তাল সমুদ্রের ভয়ঙ্কর ঢেউ আছড়ে পড়ছে শান্তিনিকেতন আশ্রমে। আমাদের স্মৃতি বিজড়িত দিন,কাল,সব ভাসিয়ে নিয়ে চলেছেন দন্ডায়মান বিদ্যুৎ স্তম্ভ। স্তম্ভিত আপামর  বিশ্ববাসী বাঙালি! গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদচিহ্ন আঁকা শান্তিনিকেতন। সেই আম্রকুঞ্জ, শালবীথি ,ছাতিম তলা, উত্তরায়ণ সব ভবনে কান্নায় ভেঙে পড়েছে দাও আমায় মুক্তির স্বাদ নিতে এই আকাশে বাতাসে জলে স্থলে উপাসনালয়ের দ্বারে।আজ ভুলুন্ঠিত হয়ে পড়ে আছি তোমাদের সেই পুরনো ঘন্টা তলা !আমি!!এই দেখ আমার ভগ্নদশা। ঘন্টা ধ্বনিত হবে কী করে আমি শরশয্যায় শায়িত।এখান থেকে কার বাড়ি চলে যাব কেউ জানতে পারবে না। তখন  চুরি হয়ে গেছে রাজ কোষে চোর চাই বলে চিৎকার চেঁচামেচি করে পাওয়া যাবে না চোর।চোর তো ঘরে বাইরে কাকে ধরি! এই খেলা চলতে থাকবে! বিদ্যুতের আলো সেখানে এখন পৌঁছতে পারেনি। আমি তাই আলো ফেলে দেখিয়ে দিলাম।চোর ধরতে যদি একটু সুবিধা হয়।

শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২০

কৃষক আন্দোলন ও হান্নান মোল্লা ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়


২০১৮-র মার্চ মাসে মহারাষ্ট্রের কিষান লং মার্চ মনে আছে? প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ কৃষক মহারাষ্ট্র বিধানসভাকে ঘেরাও করার জন্য নাসিক থেকে মুম্বইয় যেতে ১৮০ কিলোমিটার পথ হেঁটেছিলেন। 
ওই অন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা, দেশের প্রান্তিক মানুষের প্রধান বাণিজ্য নগরীতে আগমন, তাদের ছেঁড়া চপ্পল, টুটাফাটা চরণযুগল, ধ্রুপদী উপন্যাসের ভাবগম্ভীর আবহাওয়া সৃষ্টি করে। সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, অনেক গন্যমান্য দেশের দরিদ্রতম মানুষের পাশে থাকবার প্রতিশ্রুতি দেন।
তৎকালীন মহারাষ্ট্র সরকার দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়ার পরে এই আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়। তবে অনেকেই জানেন না যে, সরকার ওদের দাবিগুলি মেনে নিলেও পরে কার্যকর করে নি।

ওই একই বছরে রাজস্থানে ন্যাশনাল হাইওয়ে ৫২-তে কয়েক হাজার কিসান বসুন্ধরা রাজে সরকারের কৃষকবিরোধী আইন ও পুলিশী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। কৃষিকাজের ব্যয় বৃদ্ধি, লাভ হ্রাস এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা উদ্বিগ্ন।

২০১৮-র শেষের দিকে নভেম্বরের শীতে লাল পতাকা ও ব্যানার বহনকারী কৃষকদের সমুদ্র পূর্ব দিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ পার্ক থেকে মধ্য দিল্লির রামলীলা ময়দান দখল করতে এগিয়ে এসেছিল।
তখন এক পুলিশকর্তা তার স্বাভাবিক উন্নাসিকতায় বলেছিলেন, "আমি বাজি ধরতে পারি যে এখানকার ৮০% কৃষক তাদের দাবি কী এমনকি তাও জানে না"। কয়েক মুহুর্ত পরে, হরিয়ানা থেকে তিনজন কৃষক তাকে বললেন, "এখনই আমাদের জিজ্ঞাসা করুন, আমরা আপনাকে বলে দেব আমাদের আন্দোলনের দাবিদাওয়াগুলি।"

২০১৩-তে বিবিসির রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯৫ থেকে ২০১১-র মধ্যে অন্ততপক্ষে ২.৭ লক্ষ কৃষক আমাদের দেশে আত্মহত্যা করেছে।

শেষ কয়েক বছর ধরে সারা ভারতবর্ষে একের পর এক কৃষক আন্দোলন চলেছে। দাবি দাওয়া হয়তো ভিন্ন, তবে মূল সুর বাধা আছে এক তারে। ওরা দেশের মানুষকে মেসেজ দিতে চায় যে, কৃষকরা বিপন্ন। আর ওরা বিপন্ন হলে আমরা কেউ ভাল থাকব না। 

এই ফাঁকে একটা কথা একটু আলোচনা করা দরকার। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে সারা ভারত জুড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে কৃষক আন্দোলন? কারা সংগঠিত করছে এদের?

২০১৭-তে ২৫০-টি কৃষক সংগঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে 'অল ইন্ডিয়া কিষান সংঘর্ষ কোঅর্ডিনেশন কমিটি'। 
এই কমিটি এই বছরে সেপ্টেম্বর মাসে পাশ করা কেন্দ্রীয় সকারের তিনটি কৃষি আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। আর তাতে সহস্র সহস্র কৃষিজীবী মানুষ যোগ দিয়েছেন। পঞ্জাব, হরিয়ানা সহ দেশের অধিকাংশ রাজ্যের কৃষক এই আন্দোলনের পাশে আছেন।

এ এক যুগান্তকারী সময়।

আমাদের এই বহুধা বিভক্ত দেশে যেখানে প্রতিটি রাজ্যে আছে কয়েকটি আঞ্চলিক দল সেখানে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব ধরে রাখা তো সহজসাধ্য কাজ নয়।

সারা দেশ জুড়ে এই ধরণের মানুষের আন্দোলনে আছেন বামপন্থী আন্দোলনের নেতৃত্ব।

হান্নান মোল্লা 'সারা ভারত কিষান সভার সম্পাদক'। এই হাওড়ার মানুষ। বাবা ছিলেন জুট মিলের শ্রমিক। তায় আবার শৈশবেই পিতৃহারা। মায়ের সঙ্গে মামা বাড়িতে মানুষ। জুনিয়ার মাদ্রাসা থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজ। এই তার পূর্ববর্তী জীবন।
আর বর্তমানে দিল্লি পুলিশ তার বিরুদ্ধে নোটিস জারি করেছে কৃষক আন্দোলনে নেতৃত্বে দেবার জন্য। কারণ সারা ভারত জুড়ে বিভিন্ন কৃষক সংগঠনগুলিকে একত্রিত করে, তাদের একসাথে চলতে শিখিয়েছে তার মত কিছু বামপন্থী মানুষ। তাদের নেতৃত্বে বিগত কয়েক বছরে কৃষক আন্দোলনগুলি ব্যাপক ভিত্তি পেয়েছে। এই নেতৃত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে যে কৃষকের দাবিদাওয়াকে আর পাশ কাটিয়ে যাওয়া যাবে না।

এই আন্দোলনগুলি দেশের প্রান্তিক মানুষের জন্য সংগঠিত হয়েছে। এতে যারা যোগ দিয়েছেন, মনে ভাববার কোন কারণ নেই যে, তারা সকলে বামপন্থী। অনেকে সক্রিয় রাজনীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরিয়ে রাখবার বাসনাই প্রকাশ করেছেন। তবে সারা ভারত কিষান সভা ও তার নেতৃত্বকে নয়। এরা ভালোই জানে, এদের ছাড়া আন্দোলনে সফলকাম হওয়া মুশকিল।

"In the ongoing farmer agitation, under the umbrella of the All India Kisan Sangharsh Coordination Committee (AIKSCC), Hannan brought together unions from different parts of the country — not just from Punjab. He has made farmer agitations broad-based in the last few years and ensured that they are not sidelined." বলেছেন সুরিন্দর সিং  কিষান সভার রোহতকের সম্পাদক।

আর অভীক সাহা, 'অল ইন্ডিয়া কিষান সংঘর্ষ কোঅর্ডিনেশন কমিটি'র সম্পাদক বললেন,"He's the most soft spoken of all the farmer leaders and has an amazing grasp of the issue as he has been a farmer leader for 40 years."

শেষ করি ছোট্ট একটা কথা দিয়ে। বাংলায় ২১-এর ভোট নিয়ে টানটান উত্তেজনা। টিভির সামনে বসলে মনে হবে টি-২০ ম্যাচ চলছে। কে কবে কোথায় আছেন সেসব মনে রাখতে মাইন্ড ম্যাপ তৈরি করতে হয়। 
এসব চলছে একটি কারণে, ভোট। ক্ষমতা দখল।

তার পাশে এই দীর্ঘ মেয়াদি আন্দোলনগুলি বড়ই পানসে। তবে এই দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন ছাড়া কোথাও মানুষের কোন দাবিদাওয়া সফলকাম হয় নি। দাবি আদায়ে গিমিক চলে না। ধর্ম, বর্ণ, জাতের লড়াইও চলে না। দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যেতে হয়। দিল্লির শীতের রাতে বা মহারাষ্ট্রে খর রদ্দুরে।

এই রাজ্যে বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। তাদের আন্দোলনে ভাটা পড়লে চলবে না। দেশের কৃষকদের থেকে এই রাজ্যকে শিখতে হবে।
মানুষের পাশে তাদের থাকার অঙ্গীকার ভোটের জন্য নয়। ক্ষমতার জন্য নয়।

ক্ষমতা চাই। তবে তা চাই প্রান্তিক মানুষের উন্নয়নের জন্য। যেমন করে একদিন এই রাজ্যে দেশের মধ্যে প্রথম পঞ্চায়েত ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে, বর্গা প্রথা এসেছে, গ্রামের মানুষ প্রথম পয়সার মুখ দেখেছে। 
সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হবে তাদের।

আর হ্যাঁ, সেই আন্দোলনে আসবে না হিন্দু কি মুসলমান প্রশ্ন, সে গ্রামের না শহরের মানুষ। অথবা সে কতটা জোরে আর কতটা খারাপ ভাষায় চেঁচিয়ে গালি দিতে পারে বিরোধীদের। 
সে হবে মাটি থেকে আন্দোলনের মাধ্যমে উঠে আসা নেতৃত্ব।

যেমন হান্নান মোল্লা।

বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০

ট্যাবলেটের ডাইরি ~ অংশুমান মজুমদার

সভা শেষে কাকাকে জিজ্ঞাসা করলুম, 'তিনি কোথায়?' কাকা বলল, 'কে?' আমি মুখ ফসকে নীলকর বলেই শুধরে বললুম, 'ধনকড়।' কাকা বলল, 'তিনি গা ঢাকা দিয়ে চোরের সংখ্যা গুনছেন, কৃষকদের দাবিপত্র নিতে ভয় পেয়েছেন।

কগজেই দেখেছি আজ চাষিদের আজকে রাজভবন ঘেরাও প্রোগ্রাম ছিল। অফিস থেকে কাকার ফোন। বলল, 'যাবি?' আমি রাজি হতেই ফোনের ওধার থেকে কাকার গলা: তাহলে ১০ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়েনে আমি তুলে নেব।

অটোটা শিয়ালদা ব্রিজের ওপর থেকে আর এগোতে পারছিলনা। কাকা বলল, 'চল এখানেই নেমে যাই, শিয়ালদা কাছেই, হেঁটে মেরে দিই'। শিয়ালদা স্টেশনে ঢোকার মুখটাতে গিয়ে দেখি মিছিল শুরু হয়ে গেছে। কাকা বলল, 'তাহলে আমরাও পা মেলাই'।

আমি অবশ্য মিছিলের আগা বা শেষ কোনও দিকটাই দেখতে পারিনি। অনেক মানুষ। কাকা বলল, সবাই কে লক্ষ্য কর, দেখবি চাষি, মজুর, ছাত্র, বেকার যুবক, মহিলা সব অংশের মানুষই এই মিছিলে হাঁটছে।

সত্যিই বেশভূষা দেখে, স্লোগান শুনে, ফেস্টুন দেখে খানিকটা বোঝা যাচ্ছে যে ভাঙর থেকে চাষিরা, নদীয়া থেকে ছাত্ররা, ট্রাম কোম্পানির কর্মচারী সবাই মিছিলে।

আমরা যখন রাসমণি রোডে পৌঁছুলুম, সভা সবে শুরু হয়েছে। কত মানুষ! ভীড় ঠেলে এগিয়ে কাকা বলল 'এখানেই দাঁড়াই।' আমাকে বলল, 'সভায় মূল কথাগুলি নোট করবি।' 'রাতে লিখে আমায় দেখাবি।' আমি বললুম, তাহলে কালোজাম কনফার্ম করতে হবে। কাকার মুখ থেকে শুধু 'হুম' শব্দটি বেরুল।

যিনি মঞ্চে বলছিলেন তার নাম জিজ্ঞাসা করতে কাকা বলল ইনি রাজ্যের কৃষক সভার নেতা অমল হালদার। আমি শুরু থেকে দেশের কৃষক নেতা হান্নান মোল্লা সবার বক্তব্যই শুনেছি। কয়েকটা পয়েন্ট নোট করেছি।

১। স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে বড় শান্তিপূর্ণ কৃষক আন্দোলন। 
২। কৃষক এবং কৃষি বিরোধী তিনটি আইনই বাতিল করার দাবি থেকে কৃষকরা এক চুল নড়বে না।
৩। অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কো-অর্ডিনেশন কমিটির ব্যানারে দেশের কমবেশি ৫০০ টি কৃষক সংগঠন, ফেডারেশন লড়াই করছেন।
৪। দেশের কৃষি নীতি কৃষক কেন্দ্রিক নয়। বরং বৃহৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখার নীতি। 

৫। এই কৃষি নীতি এমনই যে সারাদিন খেটেও কৃষকরা দিনগুজরান করতে হিমসিম খাচ্ছে।
৬। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি কৃষক বিরোধী। 
৭। এই সরকারের দল ক্ষমতায় আসার আগে স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কিন্তু ক্ষমতায় এসেই চোখ ওল্টায়।
৮। তিনটি কৃষি সংক্রান্ত আইনের ভিত্তি কৃষি নয় বরং কর্পোরেট ভিত্তি।
৯। সারা দেশের মত এই রাজ্যেও ২১৯ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছে। রাজ্য সরকার সেই তথ্য হাপিস করে তিনগুন আয় বেড়ে যাওয়ার ভূয়া প্রচার করছে। 
১০। মিডিয়া দেশের কৃষক আন্দোলনের নামে ভুয়া প্রচার করে বলে খালিস্তানি আন্দোলন। কখনও পাকিস্তান আর চিনের ভূত দেখেছে। 
১১। সারা দেশের কৃষক আন্দোলনকে মর্যাদা না দিয়ে বলার চেষ্টা করেছে এই আন্দোলন শুধু পাঞ্জাবের।
১২। সরকার ভুয়া সংগঠন তৈরি করে এই আন্দোলন ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
১৩। কৃষকদের আন্দোলন প্রতিবাদ থেকে রাস্তায় প্রতিরোধের জায়গায় গেছে।
১৪।  অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কো-অর্ডিনেশন কমিটির ছত্রছায়ায় থাকা  ৫০০ টি কৃষক সংগঠন, ফেডারেশনের মধ্যে আন্দোলনের রণকৌশল নিয়ে কোনও মতভেদ নেই।
১৫। কৃষি আইন বাতিলের দাবি থেকে দেশের কৃষক সংগঠনগুলি একচুলও নড়বে না। সংশোধন করার সরকারি প্রস্তাব বাতিল করেছে।
১৬। সরকার যে ভাবে লকডাউনের সময় আইন পাস করেছে তার সাথে তুলনীয় ডাকাত যেমন ডাকাতির জন্য রাতের অন্ধকার বেছে নেয়।
১৭। সরকারের কাছে একটাই দাবি কৃষি এবং কৃষক বিরোধী তিনটি কৃষি সংক্রান্ত আইন সহ বিদ্যুৎ বিল ২০২০ বাতিল করতে হবে। 

১৮। সমস্ত জিও পরিষেবা বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
১৯। রাজ্যে রিলায়েন্সের মল, বিক্রয়কেন্দ্র, পেট্রোল পাম্পে পিকেটিং হবে।
২০। রাজ্যের কৃষকদের কাছে আইনের বিষয়বস্তুর বিবরণ বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরতে হবে।
২১। দেশের কৃষক আন্দোলন ভাঙার জন্য শুধু পাঞ্জাবের আন্দোলন বলে যে অপপ্রচার চলছে তার যোগ্য জবাব দিতে হবে।
২২। সুপ্রিম কোর্ট কমিটি তৈরি করে কৃষকদের দাবির মিমাংসা করার প্রস্তাব অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কো-অর্ডিনেশন কমিটির বাতিল করেছে।

সভা শেষে কাকা আমায় ডেকার্স লেনে নিয়ে গেল। এগ ডেভিল খেয়ে বাড়ি ফিরেছি। পয়েন্টগুলি ঠিকঠাক হলে কাল কালোজাম।

মঙ্গলবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০

তালাচাবি ~ অমিতাভ প্রামাণিক

বিয়ের এক বছর গড়াতে না গড়াতেই অন্ধকার নেমে এল আরদেশিরের পারিবারিক জীবনে।

বোম্বের ফোর্টে পঁচিশ-ছাব্বিশতলা বাড়ি সমান উঁচু রাজাবাঈ টাওয়ার তৈরি শুরু হয়েছে, যখন তার বয়স মাত্র এক বছর। বছর দশেক লেগেছে পুরো টাওয়ারটা বানাতে। এই রাজাবাঈ হচ্ছেন বোম্বের বিখ্যাত শেয়ার ব্যবসায়ী এবং 'নেটিভ শেয়ার অ্যান্ড স্টক ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর প্রতিষ্ঠাতা (পরে যার নাম হবে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ বা বিএসই) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবী ছাত্রদের জন্যে স্কলারশিপ চালু করা প্রেমচাঁদ রায়চাঁদের মা। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচা হয়েছে টাওয়ারটা বানাতে, তার মধ্যে দু-লাখ দিয়েছেন প্রেমচাঁদ। ইংরেজ স্থপতি একে বানিয়েছেন লন্ডনের বিখ্যাত বিগ বেনের আদলে। তার মাথা থেকে বোম্বের বহুদূর অবধি দেখা যায়, স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ছেলে-ছোকরাদের ভিড় লেগেই থাকে।

তেইশ বছর বয়সী আরদেশিরের নবোঢ়া স্ত্রী উনিশ বছরের বাচুবাঈ ননদ (আরদেশিরের খুড়তুতো বোন) পিরোজবাঈকে নিয়ে চড়েছিল সেই টাওয়ারের মাথায়। সেখানে কী হয়েছিল, তা কেউ ঠিক জানে না, কেউ বলেছে সেখানে নাকি তাদের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেছিল কেউ, দুজনেই নিজের সম্মানরক্ষার্থে সেই উঁচু টাওয়ারের মাথা থেকে ঝাঁপ দিল।

পার্শি নিয়ম অনুসরণ করে তাদের মৃতদেহ রেখে দেওয়া হল পার্শি গোরস্থানে। চিল শকুনে খেয়ে গেল তাদের দেহাবশেষ।

সেটা ১৮৯১ সাল। ভগ্নহৃদয় আরদেশির ভেবে পাচ্ছিল না, সে কী করবে। তার ঠাকুরদা সোরাবজি গুথারজি আর বাবা বুর্জোরজির রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা। ছয় ভাইবোনের সবচেয়ে বড় আরদেশির, বাবা-মায়ের ইচ্ছে সে বড় হয়ে নামী উকিল হয়। সেই লক্ষ্যে পড়াশুনাও করছে সে। সে সময় আফ্রিকায় ভারতীয় উকিলদের চাহিদা ভালো। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নামে এক বিলেত-ফেরত উকিল গেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৮৯৩ সালে। তার পরের বছর আইনে ডিগ্রি পেয়ে আরদেশির কাজ পেল এক নামী সংস্থায়। এক ক্লায়েন্টের কেস লড়তে তাকে যেতে হল জাঞ্জিবারে।

কেস ভালোই এগোচ্ছিল, আরদেশিরের ক্লায়েন্টের পক্ষেই রায় যেত হয়ত। কিন্তু শেষদিকে আরদেশির বিপক্ষ উকিলের এক ক্রস-এগজামিনে আটকে গেল। প্রশ্নটা ছিল কোনো এক নির্দিষ্ট সময়ে তার ক্লায়েন্টের অ্যালিবাই সংক্রান্ত। আরদেশির তার ক্লায়েন্টের কথামত চলতে রাজি হল না, কেননা তার কোনো প্রমাণ তাদের বা তার কাছে নেই। ক্লায়েন্টের বক্তব্য, আরদেশির তাদের উকিল, তাকে তো তাদের কথামতই চলতে হবে। আরদেশিরের বক্তব্য, আমি আইনের রক্ষক, আমি সত্যসন্ধানী।

ক্লায়েন্ট বুঝে গেল, একে দিয়ে কাজ হবে না। তাকে বরখাস্ত করে অন্য উকিল নিয়োগ করল তারা। আরদেশির দেশে ফিরে এল, বুঝে গেল, তার পক্ষে উকিলগিরি সম্ভব নয়।

বোম্বে ফিরে এক বড়সড় ওষুধের দোকানে কাজে লেগে গেল আরদেশির। দোকানের মালিক ইংরেজ। কিছুদিন যেতেই মালিকের নজরে পড়ে গেল পরিশ্রমী, বুদ্ধিমান আরদেশির। মালিককে বলল, সে এই দোকানের প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী নিজে তৈরি করতে চায়, যদি পারে তবে সেগুলো ইনি দোকানে রাখবেন কিনা। মালিক বললেন, সেগুলো যদি তাদের নির্দিষ্ট মান বজায় রাখতে পারে, অবশ্যই তিনি দোকানে রাখবেন, বিক্রি করবেন।

ছক প্রস্তুত করে পরের বছর আরদেশির গেল বাবার বন্ধু বড় ব্যবসায়ী মেরবানজি কামার কাছে। সে সার্জিক্যাল ইকুইপমেন্ট বানাবে, তার জন্যে টাকা ধার চাই। কামা তো শুনে অবাক! বাবার কাছে না গিয়ে আরদেশির কেন টাকার জন্যে এসেছে চাচাজির কাছে! আরদেশিরের স্পষ্ট জবাব, বাবার কাছে টাকা চাইলে বাবা তো সেটা উপহার দেবে, ফেরত চাইবে না। সে দান চায় না, ধার চায়, সে কিছু সময় পরেই পরিশোধ করে দেবে এই ধার।

কামা-র কাছ থেকে তিন হাজার টাকা ধার নিয়ে শুরু হল আরদেশিরের হাসপাতালে সার্জনদের ব্যবহারযোগ্য ছুরি-কাঁচি ইত্যাদির কারখানা। প্রতিদিন আরদেশির নিজে পরীক্ষা করে জিনিসপত্রের গুণাগুণ। যখন সমস্ত কিছু তার পছন্দমত হল, সে গিয়ে একদিন ডেকে আনল তার সেই ওষুধের দোকানের মালিককে – এই দেখুন, কী সুন্দর সার্জিক্যাল ইকুইপমেন্ট বানিয়েছি।

মালিক জিনিস দেখে খুব সন্তুষ্ট হল। জিজ্ঞেস করল, কবে সে অর্ডার নিতে পারবে। আরদেশির বলল, আর অতি অল্প একটু কাজ বাকি, এর ওপরে 'মেড ইন ইন্ডিয়া' ছাপ মারা। মালিক বললেন, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে! এত উৎকৃষ্ট জিনিসে কেউ মেড ইন ইন্ডিয়া ছাপ মারে! 

আরদেশির বলল, আমি কি মিথ্যা বলছি নাকি, এগুলো সব এরা নিজেরা বানিয়েছে, এ তো মেড ইন ইন্ডিয়াই। ওষুধের দোকানের মালিক বললেন, আরে বাবা, এটা মার্কেটিঙের ব্যাপার, ভালো করে ভাবো, বোঝো। ইন্ডিয়া সম্বন্ধে আমি কিছু খারাপ তো বলছি না। অ্যান্টিক-ফ্যান্টিক কিনতে হলে ইন্ডিয়ার জিনিস ঠিক আছে, বড় বড় করে 'মেড ইন ইন্ডিয়া' লেখো তার ওপর। কিন্তু আধুনিক হাসপাতাল-উপযোগী যন্ত্রপাতি 'মেড ইন ইন্ডিয়া'! চলবেই না, কেউ কিনবে না। আমাকে ব্যবসা শেখাতে এসো না, যা বলছি তাই শোনো।

আরদেশির শুনল না। সার্জিক্যাল ইকুইপমেন্টের ব্যবসা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল তার।

মাথার ওপরে ধার, আরদেশির উপায় খুঁজতে লাগল নতুন কিছু করার। লোকের দোকানে কাজ করে তার পোষাবে না, তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়ে সে, যদি কোনো আইডিয়া পাওয়া যায়। এ ভাবেই একদিন নজরে পড়ল পর পর বেশ কয়েকদিন ধরে খবর হচ্ছে বোম্বের কিছু কিছু অঞ্চলে চুরিচামারি খুব বেড়ে গেছে। বাড়ি খালি রেখে কোথাও কয়েকদিনের জন্যে বেড়াতে গেলেই ফিরে এসে লোক দেখছে বাড়ি ফাঁকা, চোরে সব চুরি করে নিয়ে গেছে। শুধু বাড়িতে নয়, অফিস-কাছারিতেই একই সমস্যা। রাস্তা দিয়ে সারাদিন পুলিশের গাড়ি ছুটছে, চুরির নতুন নতুন খবর পেয়ে।

খোঁজখবর নিয়ে আরদেশির বুঝল, সমস্যাটা তালা-সংক্রান্ত। লোকে তালা ঝুলিয়ে বেড়াতে যায়, চোরে সেই তালা সহজে খুলে ফেলতে পারে। মানে, ভালো তালা, যা কোনোভাবেই খোলা সম্ভব না, যদি বানানো যায় তবে তার ভালো ব্যবসা হতে পারে।

আরদেশির আবার হাজির হল চাচাজি মেরবানজি কামা-র কাছে – চাচাজি, আপনার টাকা তো ফেরত দিতে পারছি না এখনই। খুব ভালো ছুরি-কাঁচি বানিয়েছিলাম, কিন্তু কিনতে চাইল না দোকানে। এবারে আমি তৈরি করতে চাই এমন তালা, যা কেউ খুলতে পারবে না। আমার আরও কিছু টাকা চাই।

কামা চুরিচামারির খবর কাগজে পড়েছিলেন। তিনি জানেন, আরদেশির কাজের ছেলে। তাও তাকে বাজিয়ে নিতে জিজ্ঞেস করলেন – হ্যাঁ রে, আমাদের পার্শিদের মধ্যে তালা বানাতে জানে কেউ? নাকি তুই-ই হবি প্রথম? আরদেশির বলল, প্রথম কিনা জানি না চাচাজি, তবে আমিই হব বেস্ট। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

ডজনখানেক কর্মচারী আর এদিক-ওদিক থেকে সংগ্রহ করা কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে একটা দুশো স্কয়ার ফুটের শেডে শুরু হল আরদেশিরের তালা তৈরির কারখানা, ১৮৯৭ সালে। আরদেশির এমন তালা বানাতে চায়, যা কেউ খুলতে পারবে না। এ তালার চাবি তৈরি হবে প্রথমে, তারপর সেই অনুযায়ী তালা। প্রত্যেকটা চাবি আলাদা, সুতরাং তালাও আলাদা। 'অ্যাঙ্কর' ব্র্যান্ডে সেই তালা বাজারে ছাড়া হল, প্রত্যেকটার সঙ্গে গ্যারান্টি যে এই তালা এর চাবি ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে খোলা অসম্ভব।

বিপুল সাফল্য এলো এই তালার ব্যবসায়।

আরদেশির অবশ্য উপলব্ধি করল, দৈনন্দিন সমস্ত প্রয়োজনে এই অতি-সুরক্ষাবাহী তালার প্রয়োজন নেই। তার পরবর্তী পদক্ষেপ কমদামী, সিম্পল তালা। কিন্তু অ্যাঙ্করের চেয়ে এটা যে আলাদা, সেটা যাতে ক্রেতারা কেনার সময় বুঝতে পারে, সে জন্যে তালার বাক্সে লিখে দেওয়া, এতে কিন্তু অ্যাঙ্করের মত সুরক্ষার গ্যারান্টি নেই। তার সঙ্গে বিজ্ঞাপনে আরও যোগ করল সে – তালা কিনতে গিয়ে লিভারের সংখ্যা দেখে গলে যাবেন না। ভালোভাবে তৈরি একটা চার-লিভারের তালা বাজেভাবে তৈরি আট-লিভারের তালার চেয়ে অনেক অনেক বেশি সুরক্ষা দেয়।

আরদেশিরের জিনিসের গুণমান আর তার খোলামেলা বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞাপন জনগণের আস্থা অর্জন করে নিল। একের পর এক নতুন নতুন ধরনের তালা ডিজাইন করে তার পেটেন্ট নিতে লাগল আরদেশির। এলো গর্ডিয়ান তালা, যার সঙ্গে দেওয়া হয় দুটো চাবি। দুটোর যে-কোনোটা দিয়ে তালাটা খোলা ও বন্ধ দুই-ই করা যায়। তবে কেবলমাত্র দ্বিতীয় চাবিটা দিয়ে এর ভেতরের সেটিং বদলে দেওয়া যায়, দিলে তখন প্রথম চাবিটা অকেজো হয়ে যায় কিন্তু দ্বিতীয় চাবি চলতেই থাকে। এর মানে, প্রথম চাবিটা হারিয়ে গেলে বা কেউ প্রথম চাবিটা কোনোভাবে 'কপি' করে নিলেও কোনো অসুবিধা নেই, দ্বিতীয় চাবি দিয়ে সেটিং বদলে ঐ তালাকেই নতুন-কেনা তালার মত ব্যবহার করা যায়, যেটা প্রথম চাবি দিয়ে খুলবে না আর। এর পর এলো ডিটেক্টর তালা। এর সঙ্গে দেওয়া চাবি ছাড়া এই তালার গর্তে অন্য যে-কোনো চাবি ঢোকালেই এর মধ্যে থেকে এক বোল্ট বেরিয়ে তালাটা জ্যাম করে দেবে, যা ছাড়ানো যাবে শুধু এই চাবি দিয়েই। এর অর্থ এর মালিক সহজেই বুঝে যাবে অন্য কেউ এই তালাটা খোলার চেষ্টা করেছিল, সে সাবধান হয়ে যাবে। এক বিদেশী – চার্লস চাব – এই ধরনের তালার পেটেন্ট করেছিলেন, কিন্তু তাতে ঐ বোল্টের জ্যাম ছাড়াতে দ্বিতীয় এক চাবি লাগত, আরদেশিরের তালায় সে সবের প্রয়োজন ছিল না, একটা চাবিতেই সব ব্যবস্থা। এরপর এল স্প্রিংবিহীন তালা, যাতে বহু ব্যবহারে তালার স্প্রিং আলগা হয়ে লিভারের নড়বড়ে হয়ে যাওয়া আটকানো গেল।

এর পাশাপাশি আরদেশির তার সংস্থার ছোট ছোট পুস্তিকা ছাপাতে লাগল। সেখানে পরিষ্কার লেখা – আমাদের সমস্ত তালাই আধুনিক প্রযুক্তিতে আধুনিক মেশিনে অন্তত পনের বছরের অভিজ্ঞ কর্মীদের দিয়ে প্রস্তুত। আমরা আমাদের সমস্ত পার্টস নিজেরাই তৈরি করি, এগুলো দেশের বা বিদেশের অন্য কোনো জায়গা থেকে কেনা নয়। কাজেই আমাদের তালা একদম স্বকীয় এবং আপনাকে দেবে সম্পূর্ণ সুরক্ষা।

তালা বিক্রি করতে করতেই আরদেশিরের খেয়াল হল, লোক সুরক্ষার জন্যে কেনে সেফ বা সিন্দুক। বাজারের সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির সিন্দুক মানে যেগুলো চোরে খুলতে পারবে না, সেগুলো। কিন্তু সেই সময়েই সানফ্রানসিস্কোয় এক বিশাল ভূমিকম্পের পর এমন বিশাল আগুন লাগল যে সেই আগুনেই লোকের ক্ষতি হল ভূমিকম্পের ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে লোকের বহু দুর্মূল্য বস্তু যা রাখা ছিল সিন্দুকে, তা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। আরদেশির বুঝল, সিন্দুক যদি অগ্নিনিরোধক করা যায়, তবে তার মূল্য অনেক বেড়ে যাবে। যেমন ভাবা, অমনি কাজ। তৈরি হয়ে গেল পৌনে দু-টন ওজনের সম্পূর্ণ সুরক্ষাদায়ী সিন্দুক। কলকাতার ধর্মতলা আর বোম্বের ভিক্টোরিয়া ডকে বিশাল আগুন লাগলেও যে সিন্দুকের ভেতরের জিনিস ছিল সুরক্ষিত।

এগুলো পরের কথা। এর আগে বাবার বন্ধু মেরবানজি কামা-র ধার শোধ করতে গেল যখন আরদেশির, তখন কামা বেশ অসুস্থ। তিনি কিছুতেই আরদেশিরের কাছ থেকে টাকা নিতে চাইলেন না। বললেন, বেটা, এই যে তুই ধীরে ধীরে একটা ব্যবসা দাঁড় করলি, নতুন নতুন জিনিস তৈরি করে ব্যবসা বাড়িয়ে চললি, এ সব নিজের চোখের সামনে দেখার সৌভাগ্যের একটা মূল্য নেই? এ থেকে তুই আমাকে বঞ্চিত করিস না। আমার তো দিন শেষ হয়ে এল, আমি টাকা দিয়ে কীই বা করব? যদি সত্যিই কিছু করতে চাস, আমার ভাইপোটাকে একটু দেখিস, বাবা।

আরদেশির বলল, চাচাজি, আপনার ইচ্ছেই আমার কাছে আদেশ। ওকে আমাদের পার্টনার করে নিচ্ছি।

আরদেশিরের জন্মের কয়েক বছর পর আরদেশিরের বাবা বুর্জোরজি গুথারজি তাদের পারিবারিক পদবি গুথারজি বদলে করে নিয়েছিলেন গোদরেজ। মেরবানজি কামা-র ভাইপো বয়েসকে পার্টনার করে আদরেশিরের কোম্পানির নাম হল – গোদরেজ অ্যান্ড বয়েস ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি।

এর পরবর্তী ঘটনাবলি আপনাদের অজানা নয়। সামান্য তালা থেকে একের পর এক নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করে ও তাদের বাড়িয়ে গোদরেজ গ্রুপ এখন সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার কোম্পানি, দেশের অন্যতম নামী প্রতিষ্ঠান। কামা-র ভাইপো বয়েস বেশিদিন এই কোম্পানির পার্টনার থাকতে চাননি, নিজেই সরে গেছিলেন এ থেকে। কিন্তু চাচাজির প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার নাম এখনও রয়ে গেছে এই কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

আরদেশির যখন ছুরি-কাঁচি তৈরি শুরু করেছিলেন, তার বছর দুয়েক আগে কলকাতায় এক বাঙালি এক প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলেন, তার নাম বেঙ্গল কেমিক্যালস। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র যতদিন জীবিত ছিলেন, এর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু আজ গোদরেজ কোথায় আর এ কোথায়!

১৫ ডিসেম্বর ২০২০

রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০

রোগ ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

কিছু রোগ দাওয়াই লাগে,
কিছু রোগ এমনি সারে,
কিছু রোগ ছড়িয়ে থাকে রাস্তাঘাটে, ক্ষেত খামারে।
কিছু রোগ সংক্রমিত,
কিছু রোগ জন্মাবধি,
কিছু রোগ বদ প্রকৃতির, জঙ্গল আর পাহাড় নদী।
কিছু রোগ পঙ্গু করে।
কিছু রোগ প্রাণেও মারে,
কিছু রোগ যায় না দেখা আলোয় কিংবা অন্ধকারে।
কিছু রোগ একটু বিরল
কিছু রোগ সবার থাকে,
কিছু রোগ আমার আছে। খুব ছোঁয়াচে। চাই তোমাকে!

শনিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২০

ওটিস এলিভেটর, আমেরিকান আদম, রাজপুত ইভ এবং হিমাচলী আপেল ~ অমিতাভ প্রামাণিক

আসুন, আজ আপনাদের এক মন-ভালো-করা গল্প শোনাই।

লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ রূপায়িত হয়েছিল ১৯০৫ সালে। বিভক্ত দুই বাংলা ফের জুড়ে গেল ১৯১১ সালে, কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে উঠে চলে গেল দিল্লিতে। এডউইন ল্যুটিয়েন্স নামে এক সাহেব আর্কিটেক্ট এলেন নতুন দিল্লির খোলনলচে বদলে সাহেবসুবোদের উপযুক্ত অফিস ও ভবন ডিজাইন করতে। লাট-বেলাটদের জন্যে পত্তন হল ল্যুটিয়েন্স' ডেলহির।

তবে সাহেবরা তো কলকাতার পচা ঘেমো গরমে হাঁসফাঁস করে এমনিতেই কাহিল হয়ে যেত। গরম পড়লে তারা কলকাতার বাস সাময়িকভাবে উঠিয়ে চলে যেত সিমলায়। সেখানেই পাহাড়ের কোলে ছিল তাদের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী।

দিল্লিতে রাজধানী উঠে যাওয়ার আগে কলকাতার কার্জনসাহেব এক গ্রীষ্মের দ্বিপ্রহরে তাঁর সিমলার রাজভবনে নেমন্তন্ন করলেন তৎকালীন ভারতভ্রমণরত আর্চবিশপ অভ ক্যান্টারবেরি, র‍্যান্ডাল ডেভিডসনকে। দ্বিপ্রাহরিক খানাপিনার সময় গল্প করলেন, সিমলার কাছেই একটা কুষ্ঠরোগীদের আশ্রম আছে, সেখানে এক ডাক্তার দম্পতি – মিসেস অ্যান্ড মিস্টার কার্লটন – ভারতীয় কুষ্ঠরোগীদের সেবাশুশ্রূষা করেন। আর্চবিশপ যদি সেটা দেখতে চান, তবে তিনি তার ব্যবস্থা করবেন।

বিশপ সেখানে গেলেন, কাজকর্ম দেখে খুব সন্তুষ্ট হলেন। জানলেন, এখানে এই আশ্রমটা বেশ কিছুদিন আছে বটে, তবে সম্প্রতি আমেরিকা থেকে এক যুবক সেখানে হাজির হওয়ার পর এর কাজকর্মে অনেক গতি এসেছে। যুবকটির নাম স্যামুয়েল ইভান্স স্টোকস। একুশ-বাইশ বছর বয়স তার।

স্যামুয়েলের সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানা গেল, সে ফিলাডেলফিয়ার এক ধনী পরিবারের ছেলে। তার বাবা 'স্টোকস অ্যান্ড প্যারিশ মেশিন কোম্পানি' নামে এক বড়সড় যন্ত্রপাতি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও মালিক। তাদের মূল ব্যবসা হচ্ছে এলিভেটর অর্থাৎ লিফট তৈরির। বাবার ইচ্ছে স্যামুয়েল লেখাপড়া শিখে এই ব্যবসার দায়িত্ব নিক। কিন্তু স্যামুয়েলের ব্যবসাপাতিতে একেবারে মন নেই। সে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে বেড়ায়। মা-বাবা অখুশি হলেও ছেলের সব আবদার মেনে নেন। এইভাবেই একদিন ঘুরতে ঘুরতে ফিলাডেলফিয়ার এক চার্চে কার্লটন দম্পতির সঙ্গে তার আলাপ, তাঁরা সেখানে গেছিলেন ভারতীয় কুষ্ঠ মিশনের জন্যে চাঁদা চাইতে। স্যামুয়েল তাঁদের জিজ্ঞেস করলেন, সে তাঁদের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারে কিনা। তাঁরা সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন।

১৯০৪ সালের ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি জাহাজে কার্লটনদের সঙ্গে স্যামুয়েল এসে হাজির হলেন বোম্বেতে। সেখান থেকে তাঁরা গেলেন পাঞ্জাবের সাবাটু-তে, সেখানেই লেপ্রসি মিশনের বড়সড় কাজকারবার।

পাঞ্জাবের গরম আর ধুলো সহ্য হল না স্যামুয়েলের, কিছুদিন পরপরই অসুস্থ হয়ে যেতে লাগলেন। তার এক অবস্থা দেখে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল উত্তরে পাহাড়ের কোলে, সিমলার কাছে কোটগড়ে। সেখানে এক চার্চের অধীনে তাদের এক ছোটোখাটো মিশন চলছে, স্যামুয়েল সেখানেই কাজ করতে পারে। ১৯০৪ সালের মে মাসে স্যামুয়েল চলে গেল সেখানে। এখানেই আর্চবিশপের সঙ্গে দেখা হল তার।

মিশনারিরা কাজের লোক, তাঁরা নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণ করে নিতে জানেন। স্যামুয়েলের প্রভূত প্রশংসা করে আর্চবিশপ র‍্যান্ডাল জানালেন, তাঁর ইচ্ছা, স্যামুয়েল ওখানে ফ্র্যান্সিস্কান অর্ডার প্রতিষ্ঠা করে, যাদের বক্তব্য হচ্ছে গরিবদের সেবা করতে গেলে তাদের মধ্যে গরিব হয়ে সন্ন্যাসী হয়ে বাস করো। স্যামুয়েল সন্ন্যাসী হয়ে বাস করতে লাগল কোটগড়ের কাছে থানেদার নামে এক সুন্দর গ্রামে।

ওদিকে ফিলাডেলফিয়ায় এই খবর পৌঁছে গেল স্টোকস পরিবারে। এতদিন মা-বাবা স্যামুয়েলকে নিয়মিত ভালো টাকাপয়সা পাঠাচ্ছিলেন আর সে তা কাজে লাগাচ্ছিল জনগণের সেবায়। যখনই খবর গেল স্যামুয়েল মঙ্ক হতে চলেছে, মায়ের মন কেঁদে পড়ল। ১৯১১ সালে মিসেস ফ্লোরেন্স স্টোকস এসে হাজির হলেন ছেলে স্যামুয়েলের কাছে থানেদারে। অনেক বোঝালেন, এই জীবন তাঁদের জন্যে নয়। বাবার ব্যবসা সে যদি দেখাশুনা করতে নাও চায়, ঠিক আছে, কিন্তু তাকে এইভাবে হতদরিদ্র হয়ে থাকতে হবে কেন? এভাবে সে কীই বা সেবা করতে পারবে?

ছেলে দেশে ফিরতে রাজি হল না। থানেদারে ২০০ একর জমিতে চা-গাছ লাগিয়েছিলেন মিসেস বেটস নামে এক বিধবা ইংরেজ মহিলা। ১৯১২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি সেই জমি তিরিশ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে ফ্লোরেন্স ছেলেকে বললেন, তাহলে এখানে কিছু কর। টাকা-পয়সা যা দরকার, আমাকে বলবি, আমি দেব। নেংটি পরে তুই এদের সেবা কী করে করবি?

স্যামুয়েল ভেবেচিন্তে দেখল, মায়ের কথা ঠিক। আট বছর হয়ে গেছে তার ভারতে আসার পর। এতদিন সে যা করেছে, যাতে স্থানীয় লোকের কাছে তার ভাবমূর্তি অতি উজ্জ্বল, তার পেছনে মা-বাবার অনুদানের বিরাট ভূমিকা আছে। সন্ন্যাসী হয়ে চললে এ সব কিছুই সম্ভব হবে না।

ফ্র্যান্সিস্কান রোব ছুঁড়ে ফেলে দিল স্যামুয়েল। সে বছরেই সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে সে বিয়ে করল স্থানীয় এক ভারতীয় রাজপুত মেয়েকে, খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত যার নাম অ্যাগনেস।

অ্যাগনেস-স্যামুয়েল জুড়ি নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করল স্থানীয় লোকজনের সেবায়।

মোগল-সম্রাট বাবর দিল্লির গদিতে কিছুদিন শাসন করে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন – এ কেমন দেশ, যেখানে না আছে বসরাই গোলাপ, না আছে ফরগানার উৎকৃষ্ট ফল। মোগল উদ্যান স্থাপন করে তিনি ভূমধ্যসাগরীয় ফল-ফুলাদির চাষের চেষ্টা করেছিলেন। কিছু সাফল্য ছিল, কিছু ব্যর্থতাও। আপেল অবশ্য ফলেনি। ইংরেজরা আপেল খেতে ভালোবাসে, ভারতের ব্রিটিশ সাহেবরা আপেল আমদানি করে জাপান থেকে। ১৮৭০ সালে ক্যাপ্টেন আর সি স্কট নামে ব্রিটিশ আর্মির এক সাহেব নিউটন পিপ্পিন, কিং অভ পিপ্পিন আর কক্সেজ অরেঞ্জ পিপ্পিন নামে তিন প্রজাতির আপেল চাষের চেষ্টা করেছিলেন হিমাচলের কুলু উপত্যকায়। আপেল ফলেছিল যদিও, সে অতি টক আপেল। টক জিনিস আদৌ সহ্য হয় না সাহেবদের জিভে।

১৯১৫ সালে স্যামুয়েল স্টোক্স মা-বাবাকে ভারতীয় বৌ দেখাতে নিয়ে গেল আমেরিকায়। গিয়ে শুনল, সেখানে লুজিয়ানায় স্টার্ক ব্রাদার্স নার্সারি নামে এক কোম্পানি রেড ডেলিশাস নামে এক জাতের আপেল ফলিয়ে তার পেটেন্ট নিয়েছে। এই রেড ডেলিশাস অতি উৎকৃষ্ট আপেল, যেমন কচকচে আর রসালো, তেমনি মিষ্টি। সেই নার্সারি থেকে কয়েকটা চারা কিনে এনে থানেদারে পোঁতা হল পরের বছর শীতে। গাছগুলো ভালোই বেড়ে উঠছে জানতে পেরে বছর পাঁচেক পরে ১৯২১ সালে মা ফ্লোরেন্স বড়দিনের উপহার হিসাবে ওয়াশিংটন থেকে পাঠালেন স্টার্ক ব্রাদার্সেরই পরের দিকে পেটেন্ট-করা গোল্ডেন ডেলিশাস প্রজাতির আপেলের একগুচ্ছ চারা। সেগুলোও পোঁতা হল থানেদারের বাগানে।

থানেদারের বাগান কয়েক বছর পরেই সুস্বাদু আপেল গাছে ভরে গেল। যেমন এর রং, তেমন এর স্বাদ। সিমলার সাহেবরা গপগপিয়ে খেতে লাগল দিশি আপেল। জাহাজ ভর্তি হয়ে রপ্তানি হতে লাগল অন্য দেশে। স্যামুয়েল আরও জমি কিনলেন। স্থানীয় লোকেরা আলু আর প্লামের চাষ ছেড়ে বাগান ভর্তি করে এই আপেলের চাষ করতে লাগল। হিমাচলী আপেল খেয়ে ধন্য ধন্য করতে লাগল সারা দেশের মানুষ। জাপান থেকে আমদানি বন্ধ হয়ে গেল অনতিবিলম্বে।

গল্পটা এইটুকুই। ফিলাডেলফিয়ার 'স্টোকস অ্যান্ড প্যারিশ মেশিন কোম্পানি' পরে কিনে নেয় ওটিস এলিভেটর্স। স্যামুয়েল স্টোক্স হিন্দুধর্মে দীক্ষা নিয়ে সত্যানন্দ নাম নিয়ে আর্য সমাজে যোগ দেন ও থানেদারে পরমজ্যোতি মন্দির নামে এক মন্দির স্থাপন করেন। তাঁর স্ত্রী অ্যাগনেস স্টোক্স স্বামীকে অনুসরণ করে নাম নেন প্রিয়াদেবী। সত্যানন্দ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে এবং একমাত্র আমেরিকান হিসাবে ব্রিটিশ জেলে বন্দি হন, তাঁর জেলসঙ্গী ছিলেন লালা লাজপত রাই। মায়ের পাঠানো ১৯২১ সালের আপেলের চারাগুলো যখন থানেদারে পৌঁছায়, তখন সত্যানন্দ জেলে, সেই আপেলের চারা পুঁতেছিলেন প্রিয়াদেবী নিজের হাতে।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই আমেরিকান প্রবাসীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ১৯২১ সালের কংগ্রেসের ম্যানিফেস্টোতে একমাত্র অ-ভারতীয় হিসাবে তাঁর সই ছিল। তিনি অবশ্য স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি। স্ত্রী ও ছয় সন্তানকে রেখে চৌষট্টিতম জন্মদিনের আগেই ১৯৪৬ সালের ১৪ই মে তাঁর মৃত্যু হয়।

সঙ্গের ছবিটি সত্যানন্দ ও প্রিয়াদেবীর, নেট থেকে সংগৃহীত।

৭ ডিসেম্বর ২০২০