রবিবার, ১৩ জুন, ২০২১

সাঁইবাড়ি তে কী ঘটেছিল ~ নীল লোহিত

১২ ই মার্চ, ১৯৭১। বর্ধমান টাউন হলে কংগ্রেসের জেলা জমায়েত ছিল। চাঁদু চৌধুরী নামে এক যুবক বাসে চেপে সেহারা, কাঁটাপুকুর থেকে আসছিল। সেই বাসেই ছিল জমায়েতে যোগদানকারী বিরোধী পক্ষের পান্ডারা। বাসে ওরা চাঁদুকে দেখতে পেয়েই পকেটমার, পকেটমার চিৎকার করে ওঠে। বাস তখন সগড়াই মোড়ে। ক্ষোভে লজ্জায়, নিজের প্রাণ বাঁচাতে চাঁদু সগড়াই মোড়ে নেমে ধানক্ষেতের উপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে। সগড়াই মোড় থেকে উদিত গ্রাম পেরিয়ে আহ্লাদিপুর। সেখানে ছিল তাঁর পিসির বাড়ি। গ্রামের মানুষ খেয়ে তখন ভাতঘুম দিচ্ছিল। এমন সময় ইশু চৌধুরীর নেতৃত্বে কংগ্রেসী গুন্ডারা চাঁদুর খোঁজে গ্রাম আক্রমণ করলো। চাঁদু তার পিসির বাড়িতে খবর দিয়েই পাশের গ্রাম উগ্রতিতে খবর দিতে চলে গেল। কংগ্রেসী গুন্ডাদের হাতে বন্দুক অন্যদিকে নিরীহ গ্রামবাসীরা। গ্রামবাসীদের সম্বল বলতে তীর ধনুক, টাঙ্গি। আহ্লাদিপুর গ্রামের পাশাপাশি উগ্রতি গ্রাম থেকে লালচাঁদ বাগদী সহ অন্যরা এসে গেছে। বিকেল চারটে সাড়ে চারটের সময় বন্দুক হাতে নব সাঁই এসে হাজির। ৭৫ বছরের আনসার মির্জাকে বলা হল গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে। আনসার মির্জা বললো আমরা তো বুড়ো মানুষ, কোথায় যাবো? টাঙ্গির এক কোপে পাশের ডোবায় আনসার মির্জার মুন্ডু পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সৈয়দ মির্জা প্রথমে পালিয়ে গেছিলো, পরে পরিবারের খবর নেওয়ার জন্য গ্রামে ফিরতেই খুন করা হল। ৬৫ বছরের শরৎ দলুই মাঠের উপর দিয়ে পালানোর সময় খুন হন। খুন হলেন কমঃ শিবু রাম। মোট ৪ জন শহীদ হলেন আহ্লাদিপুরে। গোটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ধানের মড়াই, গমের মড়াই সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। গ্রামের সবাই তখন পালিয়ে মাঠে বসবাস করছে।

ওমর আলির বয়স্ক বাবাকে মারধর করলো নব সাঁই এর নেতৃত্বে কংগ্রেসী গুন্ডারা। লালচাঁদের পায়ে গুলি করা হয়েছিল। লালচাঁদের পা ভেঙে যায়। ওই অবস্থায় ও নব সাঁই, ইশুকে আঁকড়ে ধরে মাটিতে ফেলে গলায় টাঙ্গির এক কোপ। মাথাটা ওদের ছিটকে গেল। রক্ত, রক্ত, রক্তে ভেসে গেল গোটা আহ্লাদিপুর গ্রাম। 

সাঁই রা ছিল অর্থ, ক্ষমতা আর বন্দুকের জোরে বর্ধমান জেলার অত্যাচার, সন্ত্রাস ও নৃশংসতার প্রতীক। 'ওই মলয়-প্রণব আসছে' গোটা বর্ধমানে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছিল সাঁইরা। মলয় সাঁই ও প্রণব সাঁই দু দফার পিভি অ্যাক্টে বন্দী ছিল। বহু খুন, জখম মামলার আসামী ছিল সাঁইরা। হরিসভার হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রাজলক্ষ্মী মুখার্জির বাড়িতে মলয় সাঁই এর নেতৃত্বে হামলা করা হয়েছিল। তাঁর মাকেও প্রহার করা হয়েছিল। আদালত থেকে জামিনের শর্তই ছিল বর্ধমান শহরের বাইরে থাকতে হবে। ওদের ভগ্নিপতিও পিভি অ্যাক্টে বন্দী ছিল। 

১৬ ই মার্চ মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি ইস্তফা দিলে যুক্তফ্রন্ট সরকার পরে যায়। অনৈতিকভাবে সরকার ভাঙার প্রতিবাদে বামফ্রন্ট ধর্মঘট ও মিছিলের ডাক দেয়। সারা রাজ্যের মত বর্ধমান শহরেও মিছিল হয়েছিল। মিছিল যখন এস বসু রোডে, প্রতাপেশ্বর শিবতলায় এসে উপস্থিত তখন সাঁইরা হাতবোমা, পাইপগান নিয়ে হামলা চালায়।সাঁইদের ছোঁড়া বোমার আঘাতে জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন গৌর সরকার। পরে এই গৌর সরকারকেই পুলিশ গ্রেফতার করে। বোমার ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা সাঁইবাড়িতে হামলা চালায়। মলয় সাঁই, প্রণব সাঁই ও জিতেন রাই মারা যান। সেদিন কিন্তু বাড়ির জামাই কিংবা নব সাঁই এর কিছু হয়নি। সাঁইদের বড়ভাই এর চোখে নাকি অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিল। রাজ্যপাল ধরমবীরের সামনে চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে মিডিয়ায় তাই বলেছিল। অথচ ১৫ দিন পর জনসভায় ভাষণ দেন তখন চোখে ব্যান্ডেজ ছিল না। ভাবা যায় অ্যাসিড ঢালার পর মাত্র কয়েকদিনে সুস্থ হয়ে গেছিলো নব সাঁই। এই নব সাঁই খুন হলেন ১২ ই জুন, রায়নার আহ্লাদিপুর গ্রামে আক্রমণ করতে গিয়ে।

সাঁই মামলায় একদিনে ৭০ জন গ্রেপ্তার হলেন। এলাকার হেডমাস্টার থেকে বহিরাগত সবাই গ্রেপ্তার হলেন। সাঁইদের সহানুভূতি দেখাতে তৎকালীন রাজ্যপাল ধরমবীর থেকে সিদ্ধার্থ শংকর রায় সবাই সাঁইবাড়ি গেছিলেন। রাজ্যপালের এই যাওয়াকে ব্যঙ্গ করে মিছিল সংগঠিত করলেন বিনয় কোঙার। এবার বিনয় কোঙার টার্গেট হয়ে গেলেন। এপ্রিলের ২/৩ তারিখে মেমারির বিধায়ক বিনয় কোঙার গ্রেপ্তার হলেন। এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামী বর্ধমান জেলা পার্টির সম্পাদক সুবোধ চৌধুরী পর্যন্ত গ্রেপ্তার হলেন। 

২৩ শে মে খুন হলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী শিবশঙ্কর চৌধুরী ওরফে কালো চৌধুরী। এহেন প্রবীণ নেতাকে ছাড় দেয়নি নব সাঁই এর নেতৃত্বে কংগ্রেসের গুন্ডাবাহিনী। মামলা লড়ার জন্য কোনও উকিল দাঁড়ায়নি। সবারই তো প্রাণের ভয় আছে। কালো চৌধুরীর এক কথাতে রাজী হয়ে গেলেন উকিল ভবদীশ রায়। বিনা অর্থে বিনয় কোঙার সহ অন্যান্য বন্দীদের হয়ে সাঁই মামলায় সওয়াল করার জন্য। ৬ ই এপ্রিল বর্ধমান শহরে খুন হলেন লক্ষ্মী নায়েক। তার কয়েকদিন পরে খুন হয়ে গেলেন উকিল ভবদীশ রায়। সকাল সাড়ে দশটায়, যখন রিকশায় চেপে মুহুরির সাথে কোর্টে যাচ্ছিলেন তখন বর্ধমান থানার পাশেই খোসবাগানে গুলি করা হল। পুলিশ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বার্তা পৌছে দেওয়া হল হত্যার সপক্ষে পুলিশ আছে। আর মে মাসে খুন হলেন কালো চৌধুরী। পার্টির কাজ সেরে ভাইপো অমিতাভের বাড়ি থেকে খেয়ে বর্ধমান শহরের নিজের ভাড়া বাড়িতে সাইকেলে করে যখন ফিরছিলেন সেই সময় রাতের অন্ধকারে গুলি করে খুন করলো কংগ্রেসী গুন্ডারা। দিনটা ছিল ২৩ শে মে, ১৯৭১। না ভবদীশ রায় না শিবশঙ্কর চৌধুরী ওরফে কালো চৌধুরীর খুনের ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার হলেন। সারা বর্ধমান জুড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব চললো।

১৯৭০ সালের ২৮শে এপ্রিল গঠিত হয় তারাপদ মুখার্জি কমিশন। তখন কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সব জেলে। টাউনহলে সেই কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দেবার মতো পরিবেশ ছিল না। শুধুমাত্র কংগ্রেসের কর্মী ও নেতারা কমিশনের কাছে সাক্ষী দেয়। সেই রিপোর্ট পেশ হয় ২৫শে এপ্রিল ১৯৭১সালে। সেখানে কমিশনের রিপোর্টে প্রকাশ- এটা কোন ষড়যন্ত্র বা সুপরিকল্পিত ঘটনা নয়। ১৯৭২সালের ১০ই মার্চ নির্বাচনে রিগিং-এর মাধ্যমে জিতে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী হন। তখন তারাপদ মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট বিধানসভাতে কেন পেশ করা হলো না? রাষ্ট্রপতি শাসন চলাকালীন তারাপদ মুখার্জি রিপোর্ট জমা করলেও লোকসভাতে সেই কমিশনের রিপোর্ট পেশ করা হয়নি।

১৯৭০ সালের ১৭ ই মার্চ সাঁই বাড়ির ঘটনায় যারা নিহত হন তাঁদের বর্ধমান শহরে ঢোকা নিষেধ ছিল আদালতের নির্দেশে। তারা শর্তাধীনে জামিন পেয়ে বাইরে ছিলেন। কমিশন বিষ্ময় প্রকাশ করে এরা বর্ধমান শহরে ঢুকলেন কিভাবে? তারাপদ মুখার্জি কমিশন কোথাও উল্লেখ করেননি নিরুপম সেন, বিনয় কোঙারের নাম। শুধুমাত্র পুলিস ও প্রশাসনের অপদার্থতার কথায় উল্লেখ ছিল। মহকুমা শাসককে সাসপেন্ডও করা হয়। বদলি করা হয় থানার আইসি ও অতিরিক্ত জেলাশাসককে।

সাঁই কান্ডের কয়েক মাস পরেই রাষ্ট্রপতি শাসনের মধ্যে ভোট হয়েছিল। যথারীতি সেই ভোটেও জিতেছিল বাম প্রার্থী বিনয় চৌধুরী।

আগামী ১২ ই জুন অন্যান্য বছরের মতো এবছরও আহ্লাদিপুর গ্রামে নব সাঁই এর গুন্ডাবাহিনীর হাতে নিহতদের স্মরণ করা হবে সামাজিক দূরত্ব মেনে। চাইলে আপনিও উপস্থিত থাকতে পারেন।

আহ্লাদিপুর গ্রামের ঠিকানা - 
গ্রাম - আহ্লাদিপুর, পোস্টঃ শ্যামসুন্দর, পি এস - রায়না, জেলা - পূর্ব বর্ধমান, পিন কোড - ৭১৩৪২৪

শনিবার, ১২ জুন, ২০২১

ডাক্তারদের প্রতীক চিহ্ন “ক্যাডুসিয়াস” - মড়ার গাড়ির লোগো ডাক্তারদের গাড়িতে ~ ডাঃ স্বপন কুমার গোস্বামী

একটি দণ্ডের দুপাশে দুটি ডানা ছড়ান রয়েছে । আর সেই দণ্ডকে বেষ্টন করে দুটো সাপ মুখোমুখি তাকিয়ে আছে । এই প্রতীক চিহ্নটি সকলেরই পরিচিত ।

 ডাক্তারদের প্যাডে ও  গাড়িতে এই লোগো লাগান হয় । 

 ডাক্তারদের এই প্রতীকচিহ্নের  নাম " ক্যাডুসিয়াস "
- এই নামটি সকলেরই অজানা।  

এর আগে ডাক্তাররা ভুল করে তাদের চিহ্ন হিসেবে "আন্তঃর্জাতিক রেড ক্রশ সোসাইটি"র  জন্য  সংরক্ষিত প্রতীক চিহ্ন লালরঙের ক্রস ব্যবহার করতেন । আন্তর্জাতিক রেডক্রশ সোসাইটির আইনি  নিষেধাজ্ঞায়  ডাক্তারদের প্যাড বা গাড়ি থেকে রেডক্রশ প্রতীক লাগান বন্ধ হয়ে যায় ,ফলে রেডক্রশের পরিবর্তে  বর্তমানে প্রতীক চিহ্ন হিসেবে  " ক্যাডুসিয়াস" ব্যবহৃত হতে থাকে ।

 কিন্তু এই ক্যাডুসিয়াস প্রতীক কি ডাক্তারদের পক্ষে উপযুক্ত ? 

ক্যাডুসিয়াস আসলে গ্রীক পুরাণে বর্ণিত দেবতা হোমার  বা মার্কারি  বা  হারমেস এর  ব্যবহৃত  দন্ড । একে "হেরাল্ড'স স্টাফ"ও বলা হয় । এনারা কেউই চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যের দেবতা নন ।

 গ্রীক দেবতা হারমেস ক্যাডুসিয়াস দণ্ড হাতে মৃত্যুর পরে মানুষের আত্মাকে মৃত্যুপুরীতে নিয়ে যান । অর্থাৎ ক্যাডুসিয়াস যমের বাড়ি নিয়ে যাবার প্রতীক দণ্ড । হ্যারি পটারের সিনেমাতে ক্যাডুসিয়াস হাতে আত্মাকে নিয়ে যাবার দৃশ্য দেখান হয়েছে । 

গ্রীক পুরাণে ডানাওলা সাপ জড়ানো দণ্ডটি ব্যবহৃত করা হত – প্রতারণা,  ছলনা , কথার জাল বুনে লোক ঠকানো ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ প্রতীক হিসেবে । 
তারও আগে হোমারের এই ক্যাডুসিয়াস দণ্ড ছিল বাণিজ্য সংক্রান্ত আলোচনার প্রতীক । গ্রীক দেবতা হারমেস বা মার্কারি ছিলেন দস্যু ,মেষপালক ,ব্যবসায়ী ও মুসাফিরদের দেবতা । 
তাই ক্যাডুসিয়াস দণ্ড সেকালে মৃত্যুরাজের দণ্ড ছাড়াও চোর জোচ্চোর প্রতারক ব্যবসায়ী ও বণিকদের লোগো হিসেবে স্বীকৃত । 

কোন মতেই এই ক্যাডুসিয়াস দণ্ড ডাক্তারদের প্রতীকচিহ্ন হতে পারে না । 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতকের গোড়ার দিকে  কিছুটা ভুল ব্যাখ্যা , কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি  ও  কিছুটা সংশয় নিয়ে  এবং একজন মানুষের অদ্ভুত খেয়ালের জন্যে ক্যাডুসিয়াস প্রতীক ডাক্তারদের চিহ্ন হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়ে গেল । 

সে এক বিচিত্র ইতিহাস । 

আমেরিকার এক মেডিক্যাল বইব্যবসায়ী ও প্রকাশক ও  জন চার্চিল কোন কিছু না ভেবেই নতুনত্ব আনার জন্যে তাঁর মেডিক্যাল বইয়ের বিজ্ঞাপনে ক্যাডুসিয়াস লোগো ছাপতে শুরু করলেন  ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে । এতদিন ডাক্তারি বইয়ের বিজ্ঞাপনে কোন চিহ্ন ব্যবহার করা হত না । কিন্তু এবার চার্চিল প্রকাশনার দেখাদেখি অন্য প্রকাশকরাও তাদের মেডিক্যাল বইয়ে ক্যাডুসিয়াস লোগো ছাপতে আরম্ভ করলেন । 

আমেরিকার ডাক্তারি বইয়ে এই ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপা শুরু হলেও গ্রেট বৃটেন বা ইউরোপের কোথাও মেডিক্যাল বইয়ে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপা হত না ।

পরবর্তীকালে  আমেরিকার দেখাদেখি   ক্রমে ক্রমে সারা পৃথিবীতেই মেডিক্যাল বইতে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপা শুরু হয়ে গেল । মেডিক্যাল বইতে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপাটাই  রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াল ।

 যদিও এই দুয়ের মধ্যে বিন্দুমাত্র  সম্পর্ক নেই । 

রাজা অষ্টম হেনরি'র ব্যাক্তিগত চিকিৎসক স্যর উইলিয়াম বাঠস এই ক্যাডুসিয়াস প্রতীকটি তাঁর  রাজকীয় মর্যাদার  স্বতন্ত্র চিহ্ন হিসেবে তাঁর নিজস্ব কাগজপত্রে ব্যবহার করা শুরু করলেন ।

 সেই প্রথম একজন চিকিৎসকের কাছে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন সমাদর লাভ করল । একজন হাই প্রোফাইল ডাক্তার ক্যাডুসিয়াস লোগো ব্যবহার করতে শুরু করলেন । 

পরবর্তীকালে  'রয়াল কলেজ অফ ফিজিসিয়ানস' এর প্রেসিডেন্ট এবং কেম্ব্রিজ কেইয়াস কলেজের প্র্তিষ্ঠাতা জন কেইয়াস  তাঁদের অধীনস্থ কলেজগুলি পরিদর্শনের সময়ে রূপোর তৈরী একটি বড় ক্যাডুসিয়াস দণ্ড সিংহাসনে  বসিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে শাখা কলেজ গুলিতে প্রবেশ করতেন । পরে  ঐ ক্যাডুসিয়াস দণ্ডটি কলেজে স্থাপন করা হত । এইভাবে মেডিক্যাল কলেজে ক্যাডুসিয়াস প্রতীক প্রবেশ করল । 

লাঠির গায়ে জোড়া সাপের বেষ্টনী যুক্ত হারমেস ,মার্কারি বা হেরাল্ডের যে ক্যাডুসিয়াস দণ্ডটি এতদিন প্রতারক, তঞ্চক , ও ব্যবসায়ীদের প্রতীক হিসেবে নির্দিষ্ট ছিল  সেটি উইলিয়াম বাঠস এবং জন কেইয়াসের পৃষ্ঠপোষকতায় দুই  নামী দামী  চিকিৎসকদের প্রতীক চিহ্নরূপে পরিচিতি লাভ করল । 

চিকিৎসা বিষয়ক ঐতিহাসিক ফিল্ডিং গ্যারিসন এর মতে ষোড়শ শতাব্দীতেও চিকিৎসাজগতের প্রতীক হিসেবে ক্যাডুসিয়াস ব্যবহার করা হত ।  ঐ শতাব্দীতে জার্মাণীর প্রকাশক জোহান্স ফ্লোবেন কিছু মেডিক্যাল বইয়ের প্রচ্ছদে ক্যাডুসিয়াস ছাপতে শুরু করেছিলেন । 

আমেরিকা ছেড়ে এবার ইংলণ্ডের  প্রকাশকরাও ডাক্তারি বইতে  ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপা শুরু   করল । 

ঐতিহাসিক ফিল্ডিং গ্যারিসন এর মতের বিরোধিতা করলেন ওয়াল্টার  ফ্রিডল্যান্ডার । তাঁর মতে জন কেইয়াস  শোভাযাত্রায় যে দণ্ডটি ব্যবহার করতেন তা কোনমতেই হেরাল্ডস স্টাফ ক্যাডুসিয়াস নয় । উচ্চপদস্থ সম্ভ্রান্ত রাজপুরুষগন বনেদীয়ানার পরিচয় দিতে রূপো বাঁধান এক দণ্ড  হাতে রাজপথে  ভ্রমন করতেন ।  জন কেইয়াসও তেমনি এক রাজকীয়  দণ্ড হাতে   শৌর্যের প্রকাশ দেখিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে মেডিক্যাল  কলেজ পরিদর্শনে যেতেন , যাতে তাঁকে দেখে লোকের মনে ভয় শ্রদ্ধা ও  সম্ভ্রম জাগে । 

১৮৫৪ সালে  গ্রেটব্রিটেন ডানাযুক্ত দণ্ডের গায়ে দুটি সাপের বেষ্টনী বা  ক্যাডুসিয়াস লোগো জুয়াড়ি  প্রতারক যমদূত বা ব্যাবসায়ীদের   পেশার প্রতীক বলে ঘোষণা করলেন ।

 পক্ষান্তরে  একটি দণ্ডের গায়ে একটি সাপ জড়ানো স্বাস্থ্যের দেবতা অ্যসক্লেপিয়াসের দণ্ড " রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস" কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীকচিহ্ন বলে নির্দিষ্ট করা  হল । 
এই ভাবে  দুরকম পেশার জন্য দুরকম প্রতীক নির্দিষ্ট করে দেওয়া হল ।  

অন্যপ্রান্তে  আমেরিকার সার্জন জেনারেলও  একটি দণ্ডকে বেষ্টন করা একটি সাপ -" রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস "কে   চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের নির্দেশ দিলেন।

 এখনকার  অ্যাম্বুলেন্সের  গায়ে এই চিহ্নটি দেখা যায় । 

এই বিভাজনের মধ্যেই ১৮৫৬ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হাসপাতালের স্টুয়ার্ডদের  ইউনিফর্মের  জামার  দুহাতের  পাশে ক্যাডুসিয়াস প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করতে শুরু করে দিল । 

চিকিৎসাজগতে জোড়াসাপযুক্ত দণ্ড  ক্যাডুসিয়াস চিহ্নকে এ ভাবে যুক্ত করা এক মহা ঐতিহাসিক ভুল । কিন্তু চিকিৎসার সঙ্গে কোন সম্পর্ক না থাকা সত্বেও  সেটাই সারা বিশ্বে গৃহীত হয়ে গেল । 

১৮৭১ সালে মেরিন হাসপাতালে সার্ভিস সিলমোহর হিসেবে ক্যাডুসিয়াস ছাপ ব্যবহার করা শুরু হল । ১৮৮৯ সালে এই দপ্তর ইউনাইটেড স্টেটস পাব্লিক হেলথ সার্ভিস এ রূপান্তরিত হয় । 

১৯০২ সালে ইউনাইটেড স্টেটস আর্মির মেডিক্যাল অফিসারদের ইউনিফর্মে ক্যাডুসিয়াস লোগো ব্যবহার করা শুরু হয় । 

প্রতারকদের প্রতীক , ব্যবসায়ীদের প্রতীক , মৃত্যুদূতের প্রতীক "ক্যাডুসিয়াস"কে ডাক্তারদের ইউনিফর্মে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে চিকিৎসক মহল প্রবল প্রতিবাদ জানালেন । প্রতিবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ১৯০২ সালের ২৮ শে জুন প্রকাশিত "দি আর্মি এন্ড নেভি রেজিস্টার"এ সামরিক বাহিনীর ডাক্তারদের ইউনিফর্মে ক্যাডুসিয়াস ব্যবহারের জন্য কর্তৃপক্ষকে  কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল । 

এই প্রতীকের ব্যাখ্যায় সেনাবাহিনীর তরফে  বলা হয়েছিল ক্যাডুসিয়াস প্রতীকটি কোন মতেই চিকিৎসা বিষয়ক প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয় নি । 

যে গুঢ় অর্থে ওই প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে তা হল ঃ 
১) ক্যাডুসিয়াসের মূল দণ্ডটি  ক্ষমতার প্রতীক
২) দন্ডের দুপাশে প্রসারিত ডানা – পরিশ্রম ও কর্মদক্ষতার প্রতীক 
৩) দণ্ডের গায়ে বেষ্টিত জোড়া সাপ জ্ঞানের প্রতীক 
আমেরিকার সেনাবিভাগের চিকিৎসকদের নিঃসন্দেহে উপরোক্ত গুণাবলী রয়েছে ,তাই সেনা চিকিৎসকদের পোশাকে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে ।
সেনা কর্তৃপক্ষ আরো জানিয়েছে যে , কোনমতেই হারমেস এর দণ্ড ক্যাডুসিয়াস চিকিৎসকদের প্রতীক নয় এমনকি  চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত কোন বিষয়ক চিহ্নও নয়  । 

আমেরিকার সেনা বিভাগ যে ব্যাখ্যাই দিক ততদিনে ক্যাডুসিয়াস চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীক চিহ্ন হিসেবে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রতীকটির আসল অর্থ না জেনেই ।

 এটা কাদের ব্যবহার করার উপযুক্ত  চিহ্ন সেটা না বুঝেই -  চিকিৎসাজগতের মানুষজন  ডাক্তারি বইয়ে বা  তাদের কাগজপত্রে ক্যাডুসিয়াস প্রতীক ব্যবহার শুরু করে দিল । 

যুক্তি সাজিয়েও আর ক্যাডুসিয়াসকে  ডাক্তারদের  কাছ থেকে স্থানচ্যুত করা গেল না । 

বেশ কিছুকাল পরে সার্জন জেনারেল অফিসের এক গ্রন্থগারিক নথিপত্র গেঁথে কর্তৃপক্ষকে জানালেন- ক্যাডুসিয়াস চিহ্নকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা এক বিরাট ঐতিহাসিক  ভুল ।

 তাই চিকিৎসকদের ব্যবহার করা এই চিহ্ন বাতিল করা হোক । 

কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এই আবেদন গ্রাহ্য না করে  প্রশাসনের তরফে  ঐ গ্রন্থাগারিকের আবেদনটাই  বাতিল করে দেওয়া হয় ।

 ফলে সেই ভুল জোড়াসাপ চিহ্ন আজও বহাল তবিয়তে চিকিৎসা জগতে  বিরাজমান। 

আমেরিকার সেনাবাহিনীর পোষাক ও প্রতীকচিহ্ন বিভাগের গবেষক ঐতিহাসিক এ মার্সন জানান ঃ ১৯২৪ সালের এপ্রিল সংখ্যায় "দি মিলিটারি সার্জন" এর "প্রেস মেডিক্যাল" বিভাগে পূর্ব প্রকাশিত এক নিবন্ধের  পুনর্মুদ্রনে বলা হয়েছিল – ক্যাডুসিয়াস চিহ্নকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীক হিসেবে গণ্য করার কোন ঐতিহাসিক যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই । সংশয়ের অবকাশ থাকা সত্বেও এটিকে ডাক্তারদের লোগো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে । 

স্টুয়ার্ট এল টাইসন " দি সায়েন্টিফিক মান্থলি" পত্রিকায় 'দি ক্যাডুসিয়াস'  প্রবন্ধে লিখেছেন  ঃ  " বাস্তবিক পক্ষে গ্রীক দেবতা হারমেসের দণ্ডকে চিকিৎসকদের প্রতীকরুপে কখনও মেনে নেওয়া সম্ভব নয় । কারণ হারমেস হলেন চোর , মিথাবাদি , ব্যবসায়ী ও জুয়াড়িদের পৃষ্ঠপোষক – চিকিৎসকদের নয় ।

হারমেস হলেন হাইওয়ে ,রাস্তার হকার , হাট বাজার ও ধনী বণিকদের দেবতা ,  যারা কথার তুবড়ি ছুটিয়ে হয় কে নয় করতে ওস্তাদ ।

 এই দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করলে ক্যাডুসিয়াস চিহ্নটি  নেতা রাজনীতিক নেতা  বা সেলসম্যানদের পেশার সঙ্গে মানানসই , কোন ডাক্তারদের পেশার সঙ্গে নয় । 

মৃত মানুষের আত্মাকে নিয়ে যেতে যে ক্যাডুসিয়াস দণ্ড ব্যবহার করা হয় , সেই মড়ার গাড়িতে লাগাবার উপযুক্ত প্রতীক কখনো ডাক্তারের গাড়ির লোগো হতে পারে না । " 

 লিউক ভ্যান অর্ডেন  " WHERE HAVE ALL THE HEALERS GONE – A DOCTORS RECOVERY JOURNEY " প্রবন্ধে বলেছেন ঃ " আধুনিক চিকিৎসকদের সঙ্গে ভুলক্রমে ক্যাডুসিয়াস প্রতীকচিহ্ন যুক্ত হয়ে গেছে , সত্যিই কি তাই ?

 সত্যিই কি ক্যাডুসিয়াস চিকিৎসকদের পক্ষে বেমানান প্রতীক ? চিকিৎসার নামে যেভাবে রোগীদের কাছ থেকে টাকা শোষণ করা হচ্ছে , মূমুর্ষু রোগীর চিকিৎসার অজুহাতে যেভাবে বিরাট বহরের প্যাথলজি পরীক্ষার নামে অত্যাধিক টাকা আদায় করা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে প্রতারণা ,তঞ্চকতা ব্যবসার প্রতীক ক্যাডুসিয়াস চিকিৎসা ব্যবসায়ীদেরই উপযুক্ত প্রতীক ।" 

এই মন্তব্য  করেছেন কিন্তু খাস বিলেতের সমালোচক লিউক ভ্যান অর্ডেন , অনেক কাল আগেই  বিলিতি ডাক্তারদের আচার ব্যবহার দেখে । আজকের কলকাতার কর্পোরেট হাসপাতালের বা নার্সিং হোমের  পকেট  কাটা চিকিৎসা পদ্ধতি তিনি দেখেন নি । 

তাহলে ডাক্তারদের জন্য কোন প্রতীক ব্যবহার করা উচিত ? 

উইলিয়াম হাউব্রিচ এর মন্তব্যঃ  চিকিৎসকদের উপযুক্ত প্রতীক হল "রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস "- যেখানে একটি দণ্ডের গায়ে একটি সাপ জড়িয়ে আছে সেটি । গ্রীক পুরাণে অ্যাসক্লেপিয়াস স্বাস্থ্যের দেবতা অ্যানেলার পুত্র । তিনি স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও রোগ নিরাময়ের দেবতা । তাঁর হাতের দণ্ডের নাম " রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস "-সেবা শুশ্রূষার প্রতীক । অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে এই চিহ্নটিই দেখা যায় । 

সমীক্ষায় দেখা গেছে সেবাব্রতী  চিকিৎসকদের মধ্যে ৬২ % 'রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস' কেই তাদের পেশার সঙ্গে মানানসই প্রতীক হিসেবে মান্য করে । 

অন্য এক সমীক্ষায় ৭৬ % ডাক্তার ক্যাডুসিয়াস প্রতীক পছন্দ করে ।

এই সমীক্ষায় চিকিৎসকদের দু ভাগে ভাগ করা হয়েছে ।

 প্রথম দল সেবাকাজে নিযুক্ত চিকিৎসক ।

 দ্বিতীয় দলে রয়েছেন চিকিৎসা ব্যবসায়ীরা । 

যুক্তি তর্ক গপ্পো যাই হোক আজ দুটো সাপ জড়ান দণ্ড ক্যাডুসিয়াস মানেই ডাক্তারদের চিহ্ন – এই ধারণা থেকে মুক্তির উপায় নেই । 

চোর জোচ্চোর প্রতারকদের গ্রিক দেবতা হারমেস এর দন্ড আজ ডাক্তারদের লোগো ।
 
 মৃত আত্মাদের যমের বাড়ি নিয়ে যাবার প্রতীক ক্যাডুসিয়াস আজ ডাক্তারদের প্রতীক ।

মড়ার গাড়িতে লাগাবার লোগো আজ ডাক্তারদের গাড়িতে ।

স্বাস্থের দেবতা অ্যাসক্লেপিয়াসের হাতের দণ্ড "রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস" –যেটি ডাক্তারদের প্রকৃত প্রতীক তা উপেক্ষায় আজ অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে শোভা পাচ্ছে । 


শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১

শালকু সরেন ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

বুর্জোয়াদের দুটো মুখ - একটা বেশ আপাত ভদ্র সভ্য লিবারাল আর আরেকটা নখ দাঁত বের করা ক্রুড টাইপের ফ্যাসিজম। এক বিখ্যাত অতি বাম নেতার তত্ব অনুযায়ী লেসার ইভল আর গ্রেটার ইভল। টিভি ইত্যাদি দেখিনা তো লোকমুখে শুনলাম এক গ্রেটার ইভল না কি দল পাল্টে লেসার ইভল হয়েছেন তাতে ওই অতিবাম নেতা আনন্দে নৃত্য করতে পারেন যে তার সাধের ফ্যাসিবিরোধী যুক্তফ্রন্টে একজন সৈনিক বাড়ল বলে। কিন্ত আমরা যারা পাতিবাম তারা নাচতে পারছি না আজ ঠিক। না উঠোনের দোষ নয় উঠোন ঠিকই আছে। আসলে আজ দিনটা একটু অন্যরকম। আজকের দিনে ওই অতিবাম নেতাদের আরেক ঝাঁকের হাতে খুন হয়েছিল সালকু শোরেন নামের এক পাতিবাম পুঁচকে নেতা। তাকে খুন করে ওই অতিবামের দল রাস্তায় ফেলে গিয়েছিল। আমাদের পাতিবামেদের তখন সরকার ছিল, তার পুলিশ ছিল, প্রশাসন ছিল তবুও শালকুর লাশ রাস্তায় পরেছিল। সরকারে থাকা দল কিছুই করতে পারেনি। কেবল কেউ কেউ অস্ফুটে বলেছিল "প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, প্রতিশোধে কমরেড, গড়ে তোল, গড়ে তোল, গড়ে তোল ব্যারিকেড।" না ব্যারিকেড গড়ে তোলা যায় নি সেদিন। আজও যায় নি। বারবার লিবারাল, অতিডান, অতিবামদের হাতে সালকুরা খুন হয়েছে। সেদিন হয়েছে, লেসার ইভিলরা ক্ষমতায় আসার দিন খুন হয়েছে। তার পরের দিন হয়েছে। গ্রেটার ইভিলরা ক্ষমতায় আসলেও খুন হত। সরকারে না থাকা অবস্থায় খুন, সরকারে থাকা অবস্থায় খুন, সরকার থেকে চলে যাওয়ার পরেও খুন। এই নিধনযজ্ঞটাই সালকুদের মতো বামদের জন্য ধ্রুবক, অপরিবর্তনীয়। আপনি লেসার-গ্রেটার, দিমিত্রভ-রোজা লুক্সেমবার্গ, ফুকো-গ্রামশি কোনো তত্ব আউড়েই এ জিনিষ লুকোতে পারবেন না। বিপ্লব হয়নি এমন দেশে একটা কম্যুনিস্ট নাম যুক্ত পার্টির নাম করুন তো যাদের এত কমরেড খুন হয়েছে ? গ্রেটার-লেসার ইভিল তত্ত্বের প্রবক্তা বিখ্যাত দেড়েল নেতা নিজেকে যার অনুগামী বলেন সেই দাড়িহীন রোগা পাতলা কার্ডিয়াক এজমার রোগী আরেক অতিবাম নেতার একটা তত্ব ছিল, "শ্রেণী শত্রুর রক্তে যে হাত রাঙায় নি সে বিপ্লবী নয়"। এই ভোকাবুলারিরে সালকু নয়, সবচেয়ে বড় "বিপ্লবী" আজ সেই নেতা যিনি ঘরে ফিরলেন, গ্রেটার থেকে লেসার হলেন। অন্য দেড়েল অনুগামী বিপ্লবীরা তার জয়ধ্বনি করুন। আমরা কেবল অস্ফুট নয়, সোচ্চার হয়ে বলে যাবো, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, প্রতিশোধে কমরেড, গড়ে তোল, গড়ে তোল, গড়ে তোল ব্যারিকেড। 

শালকুর পার্টি যারা করেন তারা সবসময় মনে রাখবেন যে শ্রেণীহীন সমাজ যতদিন না গড়ে উঠছে ততদিন কমিউনিস্টরা কেউ বঙ্গশ্রী, পদ্মশ্রী পুরষ্কার পাবে না, ভোটের আগে পরে কোনো বুর্জোয়া নেতা নেত্রী তাদের ধন্যবাদ জানাবে না, তারা কেবল বুর্জোয়াদের হাতে খুনের পরে রাস্তায় লাশ হয়ে পরে থাকার পুরস্কার পাবে। ইভিল মানে ইভিল, শয়তানের শয়তানির কম-বেশি হয় না - এটাই অপরিবর্তনীয় ধ্রুব সত্য -সালকু জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছে। শহীদ কমরেড সালকু শোরেন অমর রহে। কমরেড সালকু শোরেন লাল সেলাম।

সোমবার, ৭ জুন, ২০২১

শ্রোডিংগারের বিড়াল ~ সৌমিক দাশগুপ্ত

এগেইন, ছেলেটার টি এর চয়েস গুলো যত দেখছি, তত অবাক হচ্ছি। 

শ্রোডিংগারের বিড়ালের থিয়োরী যারা জানে না, তাদের জন্য দু কলম লিখি৷ 

এই থিয়োরীর মুল বক্তব্য হল সহাবস্থান। অর্থাৎ একই সাথে দুটো বিপরীত অবস্থা সম্ভব, যতক্ষণ তাকে না দেখা হচ্ছে৷ অর্থাৎ আমরা দেখি বা অবসার্ভ করি বলেই, লাল টা লাল, সবুজটা সবুজ। যতক্ষণ না তাকে দেখছি, সে সম্ভাব্য সমস্ত রকম অবস্থায় বিদ্যমান। অর্থাৎ আমার চেতনার রঙে, পান্না হল সবুজ, চুনী উঠলো রাঙা হয়ে।

ধরা যাক, একটি বিড়াল কে একটি বাক্সে বন্ধ করে রাখা হল। এবার সেখানে একটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ রাখা হল, যার হাফ লাইফ এক ঘন্টা। (হাফ লাইফ হল, কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ যতক্ষণ পর ক্ষয় হয়ে প্রাথমিক ভরের অর্ধেক ভরে পরিণত হয়)। এবার এমন একটা ব্যবস্থা করা হল, মৌলটি যেই হাফ হয়ে যাবে, একটা হাতুড়ি একটা বিষাক্ত গ্যাসে ভরা কাঁচের পাত্রে আঘাত করে তাকে ভেঙে ফেলবে। এবং গ্যাসের বিষক্রিয়ায় বিড়ালটি মারা যাবে। এরপর বাক্সটি বন্ধ করে দেওয়া হল। 

এবার এক ঘন্টা পর বাক্সটি খোলার ঠিক আগে বিড়ালটি কেমন অবস্থায় থাকবে। শ্রোডিংগার বললেন, বিড়ালটি এই মুহুর্তে জীবিত এবং মৃত, দুই অবস্থাতেই আছে। বাক্সটি খোলার পর যখন তাকে অবসার্ভ করা হবে, সেই অবসার্ভেশন ঠিক করবে, বিড়ালটি ফাইনালি কোন অবস্থায় থাকবে। 

শুনতে খুব আষাঢ়ে মনে হলেও, এই তত্ত্ব জন্ম দেয় পদার্থবিদ্যার সবচেয়ে কূট শাখার। কোয়ান্টাম ফিজিক্স। এবং সত্যিই এই অনিশ্চয়তা বিড়াল, মানুষ, ফুটবল এর মত বড় বস্তুর ক্ষেত্রে কাজ না করলেও পারমাণবিক স্তরে দেখা যায়। সুশান্তের টি শার্টের ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাসি এবং কান্না দুটোই একই সাথে বিদ্যমান। 

এই কোয়ান্টাম তত্ত্ব জন্ম দিয়েছিল মাল্টিভার্স বা প্যারালাল ইউনিভার্স থিয়োরীর। যেখানে এই মহাবিশ্বের মত অসংখ্য মহাবিশ্ব বিদ্যমান। সেই বিশ্বে আমরাও আছি, সম্ভাব্য সব রকম অবস্থা নিয়ে। 

কে বলতে পারে, সেরকমই এক সমান্তরাল মহাবিশ্বে আজও সুশান্ত হুবহু মাহির মতোই স্টেপ আউট করে ছক্কা মেরে গ্যালারির বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে সমস্ত রকমের হেরে যাওয়াকে।

আলো কি কণা না তরঙ্গ ~ সৌমিক দাশগুপ্ত


আলো বস্তুটা কী? সেই ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি, আলো নিজে অদৃশ্য, অন্য বস্তুকে দৃশ্যমান করতে সাহায্য করে। এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন তিনি। কিনি? আরে আদ্ধেক বৈজ্ঞানিকের নাম না মনে পড়লে, সিধে পরম পিতা নিউটনকে স্মরণ করে নিতে হয়। ভদ্রলোক জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করে গেছেন। নিউটন না হলে আইনস্টাইন। অন্তত সেভেন্টি পার্সেন্ট কেসে এই ফর্মুলা কাজে লাগবেই লাগবে। অবশ্য আদিকাল থেকে ইউক্লিড, দেকার্তে, ডেমোক্রেটাসরা এই নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। আমরা নিউটনের কাজ নিয়েই কথা বলি। 


তা নিউটন সায়েবের কাছে অত যন্ত্রপাতি ছিল না সেই সময়ে। যা ছিল, তাই দিয়ে খুটুর খাটুর করে বলে দিলেন, আলো হল এক ধরনের পার্টিকল। নিউটন বলে কথা। লোকে মেনেও নিল। কিন্তু পাবলিক অনুভব করলো, কোথায় যেন একটা লোচা থেকে যাচ্ছে। আলোর নেচার, পার্টিকল থিয়োরিকে সাপোর্ট করছে না। লোকে আপত্তি করতে শুরু করলো। 

এমনই এক ঢ্যাঁটা লোক ছিলেন হিউজেন। প্রমাণ করেই ছাড়বেন, আলো কোনো কণা নয়। তরঙ্গ মাত্র। প্রমাণ করেই দেবেন, নিউটনের কণা তত্ত্ব বা করপাসকুলার থিয়োরি আসলে ভুল। 

কিন্তু বললেই তো করা সম্ভব নয়। হুঁ হুঁ বাওয়া। ওর নাম নিউটন। হিউজেন অনেক চেষ্টা করলেন। গাদা গাদা আলফা বিটা গামা ল্যামডা লেখা থিয়োরিটিকাল থিসিসও নামালেন। কিন্তু ইহা বিজ্ঞান। হাতে কলমে প্রমাণিত না হলে উহা প্রমাণ নহে। অবশেষে ভগ্নহৃদয়ে আলোর তরঙ্গ খোঁজার কাজে ক্ষান্ত দিলেন। 

গুরুর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে এলেন ইয়ং, হিউজেনের ছাত্র। অবশেষে এলো সেই দিন। প্রমাণিত হল, লাইট ইজ নট পার্টিকল। লাইট ইজ ওয়েভ। বিখ্যাত সেই এক্সপেরিমেন্টের নাম, ইয়ং'স ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট। 

খটোমটো লাগলেও, পরীক্ষাটি কিন্তু বেশ সহজ। একটা একরঙা আলো নিতে হবে। সাদা আলো চলবে না। কারণ সাদা মানে অনেক রঙের সমাহার। তাদের ওয়েভ লেংথ বা তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বিভিন্ন রকম। তা সেই একরঙা আলোকে একটা ধাতব পাত, যাতে দুটো ফাঁক (স্লিট) আছে, তার মধ্য দিয়ে পাঠানো হল। দেখা গেলো পেছনে রাখা পর্দায় আলোর দুটো ব্যান্ড নয়, ফুটে উঠেছে সারি সারি আলো আঁধারির ব্যান্ড। 

ধরা যাক, পুকুরে দুটো ঢিল ছোঁড়া হল। দুটো তরঙ্গ সৃষ্টি হল। দেখা যাবে, এই দুই তরঙ্গ মিলে গিয়ে কোথাও বড় তরঙ্গ সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও বা দুটো তরঙ্গই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ একই সাথে কনস্ট্রাকশন আর ডেসট্রাকশন। দুটো ওয়েভ খাপে খাপে মিলে গেলে, অর্থাৎ ক্রেস্টের সাথে ক্রেস্ট, ট্রফের সাথে ট্রফ মিলে গেলে সৃষ্টি হয় আরো বড় ওয়েভ, কিন্তু কোথাও যদি একের ক্রেস্ট অন্যের ট্রফের সাথে ধাক্কা খায়, একে অন্যকে খতম করে দেয়।

একই ভাবে আলো বিহেভ করেছিল। যেখানে কনস্ট্রাকশন, তৈরী হয়েছিল আলোর ব্যান্ড। যেখানে ডেস্ট্রাকশন, নেমে এসেছিল আঁধার। (সাথে ছবি দিলাম একটা)। প্রমাণ হল আলো একটি তরঙ্গ। পিছনে হটলো নিউটনের করপাসকুলার থিয়োরি। 

এর পর এলেন প্ল্যাংক, রাদারফোর্ড, নীলস বোরেরা। তাঁদের হাতে তখন ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্টের চাবিকাঠি এসে গেছে। ফের হল ডাবল স্লিটের পরীক্ষা। কিন্তু এবার আলোর বদলে নেওয়া হল ইলেক্ট্রন গান। যে আলোর মতোই ইলেক্ট্রনের স্রোত ছুঁড়ে দেবে ওই মেটাল পাতের মধ্য দিয়ে। ইলেক্ট্রন একটি দৃশ্যমান বস্তু। শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়। অর্থাৎ এনার্জির বদলে ম্যাটার নিয়ে শুরু হল পরীক্ষা। 

সবিস্ময়ে তাঁরা দেখলেন, ইলেকট্রন আচরণ করছে আলোর মতোই। পেছনে তৈরী হচ্ছে সেই আলো আঁধারির খেলা। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এটা? বস্তু আচরণ করছে শক্তির মত। কণা আচরণ করছে তরঙ্গের মত। ব্যাপারটাকে আরো ভালোভাবে দেখার জন্য তাঁরা ওই স্লিটের আগে একটা অবসার্ভার লাগালেন। যে গোয়েন্দার নজরে দেখবে, কীভাবে ইলেকট্রন বদলে যাচ্ছে ওয়েভে। ঘটছে বস্তু থেকে শক্তির রূপান্তর।

চুড়ান্ত, চুড়ান্ত বেকুব বনে গেলেন তাঁরা। যেই মুহুর্তে অবসার্ভার রাখা হল, পলকে পেছনের পর্দার সেই আলো আঁধারির প্যাটার্ন পালটে গেল দুটো সমান্তরাল রেখায়। অর্থাৎ স্বাভাবিক কণার স্রোত দুটো জানলার মধ্য দিয়ে গেলে যেরকম আচরণ হওয়া উচিত, সেরকমই। নজর সরাতেই আবার সেই আলো আঁধারী। আলো আঁধারীর ব্যান্ড। নজর দিলেই স্বাভাবিক আচরণ। 

সেদিন ইতিহাস তৈরী হয়েছিল। খুলে গেছিল বিজ্ঞানের এক নতুন দুনিয়া, যার নাম কোয়ান্টাম জগৎ। এ এমন জগৎ, যা অনিশ্চয়তায় ভরপুর। প্রমাণিত হল, আমরা বাস্তবে যা যা জিনিস দেখছি, তা আসলে তরঙ্গ। একেবারে বেসিক লেভেলে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুই তরঙ্গ। এই বস্তু সত্ত্বা আসলে এক ইল্যুশন মাত্র। আমরা দেখছি, আমরা অবসার্ভ করছি, তাই সে বস্তু। নয়ত সে আসলে ওয়েভ। এই মুহুর্তে যাকে আমি দেখছি না, তার আসলে কোনো অস্তিত্বই নেই। সে আছে তরঙ্গাকারে। আমি যখনই তাকে দেখবো, সে আমার জন্য নিজের আকার ধারণ করবে। তৈরী হল বিখ্যাত ওয়েভ পার্টিকল ডুয়ালিটি তত্ত্ব। কে তৈরী করলেন?  লেখার একদম শুরুতে নিউটনের সাথে যাঁর নাম নিয়েছিলাম, সেই ভদ্রলোক। নিউটন বিজ্ঞানের ব্রহ্মা হলে তিনি বিজ্ঞানের বিষ্ণু। আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি বললেন,
 "It seems as though we must use sometimes the one theory and sometimes the other, while at times we may use either. We are faced with a new kind of difficulty. We have two contradictory pictures of reality; separately neither of them fully explains the phenomena of light, but together they do."

 গোদা বাংলায় যার মানে দাঁড়ায় আলোর দুটো পরস্পর বিরোধী সত্ত্বা আছে। একই সাথে সে তরঙ্গ এবং কণা। মান রক্ষা হল নিউটনের করপাসকুলার থিয়োরির। আবিষ্কার হল আলোর কণা, 'ফোটন'।
লেখা শেষ করার আগে, মরফিউসের সেই দুর্দান্ত বক্তব্য মনে পড়ছে।
 "What is "real"? How do you define "real"? If you're talking about what you can feel, what you can smell, taste and see then "real" is simply electrical signals interpreted by your brain."

এবার শেষ করি রবীন্দ্রনাথ দিয়ে। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যায় রবীন্দ্রনাথ???  হুঁ হুঁ বাওয়া। আছো কোথায়। এ নিয়েও কবিতা লিখে গেছেন উনি। আজও হয়ত কলম চালিয়ে যাচ্ছেন, কোনো কোয়ান্টাম সমান্তরাল জগতে। 

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম "সুন্দর',
সুন্দর হল সে।

সৃষ্টির গোড়ার কথাই এই 'আমি'। আমি আছি, তাই এই পৃথিবী আছে। আমি নেই, তো কিচ্ছু নেই। আছে এক সুবিশাল অন্তহীন তরঙ্গ।

শুক্রবার, ২৮ মে, ২০২১

মনোরঞ্জনবাদ ও তৃণমূল সরকার ~ সংঘমিত্রা ব্যানার্জী

তৃণমূল কংগ্রেসের নীতি-আদর্শ বা মতবাদ বলে কিছু নেই। বামপন্থীরা হামেশাই একথা বলেন। কথাটি কিন্তু ঠিক না। নীতি বা মতবাদ ব্যতীত কোন রাজনৈতিক দল কখন‌ও এই রকম সাফল্য পেতে পারেন না। তৃণমূলে কংগ্রেসেরও নীতি আছে, আছে নির্দিষ্ট মতবাদ। যে রাজনৈতিক মতবাদটি তৃণমূল কংগ্রেস গ্রহণ করেছেন, সেটি নিয়েই সমগ্র বিশ্বে রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা এখন চর্চায় ব্যস্ত। রাজনীতির এই ধারাটির নাম 'লোকরঞ্জনবাদ বা পপুলিজম'। 

'লোকরঞ্জনবাদ' কি? এই মতবাদের সাথে তৃণমূল কংগ্রেসের সম্পর্কই বা কি? আমি এই লেখায় আমার সীমিত ক্ষমতায়, তা আলোচনা করব। পরে আমি লোকরঞ্জনবাদের উত্থানের পিছনে যে কারণগুলি আছে এবং তার পরিণতি কি --- সেই বিষয়গুলিকে বন্ধুদের সাথে আলোচনার জন্য সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করবো। সমগ্র বিশ্বে লোকরঞ্জনবাদের উত্থানের যুগে তৃণমূল কংগ্রেস কি সুন্দরভাবে এই রাজ্যে সেই মতবাদের প্রয়োগ ঘটিয়ে চলেছেন, তা দেখে আমি নিজেই বিস্মিত। 

বামপন্থীদের জনসমর্থন হ্রাস পাওয়ার এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সাফল্যের কারণগুলিকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে না পারলে, জনগণ এবং সমাজের স্বার্থে বামদের পক্ষে কখনোই ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। তাই এইসব নিয়ে চর্চার খুবই প্রয়োজন। 

'লোকরঞ্জনবাদ'-র সেই রকম কোন নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। কিন্তু আছে, সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য, যা সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমি যতটুকু পারি, আমার সীমিত জ্ঞানে, তা আলোচনা করব। 

'Oxford Handbook of Populism'-এ  লেখা হয়েছে––
"লোকরঞ্জনবাদ (Populism) হল নির্বাচনে জয়লাভের এবং ক্ষমতায় আরোহনের কিছু কৌশল এবং তার কার্য-পদ্ধতির রূপ"। লোকরঞ্জনবাদী রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃত্বে থাকেন, কোন ক্যারিশম্যাটিক নেতা বা নেত্রী। প্রতিষ্ঠিত দলগুলিকে নিয়ে জনগণ যখন ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েন, সমাজে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি এবং অসমতা বাসা বাঁধে, তখন জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে ঐ নেতা-নেত্রীরা উঠে আসেন। এঁরা ক্ষমতায় এসে, প্রথমেই গণতন্ত্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেন। ডানপন্থীরা যেমন লোকরঞ্জনবাদকে আঁকড়ে ধরতে পারেন, তেমনি বামপন্থী ঘরানায়‌ও লোকরঞ্জনবাদ সম্ভব। 

আমেরিকার ট্রাম্প, ব্রাজিলের বোলসোনারো এবং আমাদের মোদীজী যেমন ডানপন্থী লোকরঞ্জনবাদী, তেমনি বলিভিয়ার ইভো মোরালেস এবং ভেনেজুয়েলার হুগো শ্যাভেজ বামপন্থী ঘরানার লোকরঞ্জনবাদী। পূর্ব ইউরোপের যে দেশগুলিতে মার্কসবাদীদের প্রভাব ছিল, বিশেষ করে সেই দেশগুলিতে গত কয়েক বছরে বামপন্থী ঘরানার লোকরঞ্জনবাদীরা ক্ষমতায় এসেছেন। এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়াতেও ২০১৭ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসেন, আর এক লোকরঞ্জনবাদী নেতা মুন জায়ে ইন। দেশের নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট অনুযায়ী এঁদের উত্থান ঘটে। 

আমাদের দেশের ক্ষেত্রে একই সময়ে সারা ভারতবর্ষে যেমন ডানপন্থী লোকরঞ্জনবাদী নরেন্দ্র মোদীর উত্থান ঘটেছে, তেমনি এই রাজ্যে বামপন্থীদের মোকাবিলায় বাম ঘরানার লোকরঞ্জনবাদী মমতা ব্যানার্জীর উত্থান ঘটেছে। দুই জন পরস্পরের রাজনৈতিক শত্রু হলেও অবিশ্বাস্য রকমের মিল খুঁজে পাবেন দুজনের মধ্যে; কারণ দুজনেই একই ধারার রাজনীতির লোক।

সাধারণভাবে 'লোকরঞ্জনবাদ' হল "To support the interest of mass people." অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জণগণের স্বার্থ দেখা। এ তো খুব ভালো কথা। বামেরাও তাই বলে। কিন্তু মুশকিল অন্যত্র। আপনার বাচ্চা যদি পুষ্টিকর খাবার না খেয়ে কেবল ফাস্ট ফুড খেতে চায় এবং যদি তার ঐ ফাস্ট ফুড খেতে চাওয়ার ইচ্ছেকে গুরুত্ব দেন, তাহলে তো আপনি তার ফেবারিট বাবা হয়ে যাবেন। কিন্তু তাতে কি আপনার বাচ্চার সত্যিকারের স্বার্থ রক্ষিত হয়? জনগণের কাছে যা জনপ্রিয় তা যদি অন্যায়, অনৈতিক হয়, তা সত্ত্বেও তাকে সমর্থন করাই হল 'লোকরঞ্জনবাদ'।  জণগণের বঞ্চনা এবং হতাশাজনিত আবেগকে কাজে লাগিয়ে লোকরঞ্জনবাদীরা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়। বাস্তবে রূপায়ণ সম্ভব না জেনেও, দেয় ঢালাও প্রতিশ্রুতি। চিত্তাকর্ষক বক্তৃতা এবং আচরণের দ্বারা, নির্বাচনে জনগণের হৃদয় জয় করাই এঁদের উদ্দেশ্য। এঁরা কৌশল হিসাবে কোন তথ্য ছাড়াই বিভিন্ন অভিযোগ এনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ায়। এঁরা জনগণের সব দুঃখ-দুর্দশার কারণ হিসাবে কিছু শত্রুকে নির্দিষ্ট করে দেন। লোকরঞ্জনবাদীরা ক্ষমতায় এলে, এঁদের প্রধান কাজ হয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রভাবকে সীমিত করা। তাই সমালোচকরা লোকরঞ্জনবাদকে গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন হিসাবেই চিহ্নিত করেছেন। শেষ অবধি, এই মতবাদ যে রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করে, তা হল মূলত নির্বাচিত সরকারের কর্তৃত্ববাদ বা একক শাসন। এই মতবাদের সব থেকে মজার বিষয়টি হল, ফলাফল কি হতে পারে, সেটি বিবেচনায় না রেখে, সমস্যার গভীরে না গিয়ে, দেশের জটিল ইস্যুগুলি সমাধানের জন্য সহজ পথ ধরা (এই রাজ্যে অতি সম্প্রতি স্বাস্থ্যসাথী কার্ড)। আরো কতগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে, এই ধারার রাজনীতির। ঘুরপথে নির্বাচন ব্যবস্থাকে দুর্বল করা। জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিচার প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করা। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানানো। আদর্শবাদী প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলি সম্পর্কে, 'লোকরঞ্জনবাদ' জনগণের মনে এক ধরণের উদাসীনতা তৈরি করেন। এমন এক ধরণের বিভাজন তৈরি করেন যে, সমাজের মঙ্গলে রাজনৈতিক দলগুলির ঐক্যমতে আসা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এই মতবাদ সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা বললেও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অধিকার এবং বহুত্ববাদকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। 

পরিশেষে বলি, 'লোকরঞ্জনবাদ' হল বর্জনমূলক ধারার রাজনীতি। কোন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী কিংবা দলকে বর্জনের কথা বলে।

মমতা ব্যানার্জীর দু-একটি সিদ্ধান্তকে তুলে ধরলেই, বুঝবেন তিনি কি সুচতুর ভাবে এই মতবাদকে প্রয়োগ করছেন।

১। আগে চলচ্চিত্র উৎসব ছিল সমাজের ক্ষুদ্র একটি অংশের জন্য। সেখানে মূলত আর্ট ফিল্ম এবং তার পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রীরাই গুরুত্ব পেতেন। মমতা দেবী ক্ষমতায় আসার পর শ্যাম বেনেগাল, মৃণাল সেন, তপন সিনহা ছেড়ে অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, জয়া বচ্চন, .. এবং মূলধারার ছবিকে ধরলেন। চলচ্চিত্র উৎসবকে করে দিলেন সর্বধারণের।

২। সাধারণভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করলে ছাত্র-ছাত্রীরা স্কলারশিপ পায়। উনি ঘোষণা করলেন, যে সমস্ত ছাত্রী পঞ্চাশ শতাংশের নিচে নন্বর পাবে তাদের  স্কলারশিপ দেওয়া হবে। 

৩। সরকারি কর্মীদের বর্ধিত ডি.এ. যা আইন অনুযায়ী সরকার দিতে বাধ্য, তা উনি দিলেন না। বরং তিনি সেই অর্থ থেকে ছয় হাজার টাকা মাইনেতে কিছু প্রান্তিক নারী-পুরুষকে কাজে নিয়োগ করলেন। 

৪। খেলা, মেলা, উৎসব বিশেষ করে দুর্গা পুজো সহ নানা পুজোকে গুরুত্ব দেওয়া।

৫। কখনো সম্ভব না জেনেও নানা প্রকল্প ঘোষণা। রেলমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর ঘোষণাগুলি তিনি নিজেই ভুলে গেছেন। জনগণও অবশ্য ভুলে গেছেন। 

৬। প্রথম দিকে সিপিআই(এম) দলকে বর্জনের রাজনীতি করা। ঘৃণা ছড়ানো। প্রতিদিন একটি করে সিপিআই(এম)-র লাশ কিংবা সিপিআই(এম)-কে বিষাক্ত সাপের সাথে তুলোনা করা। তথ্য ছাড়াই নানা অভিযোগ করে ঘৃণা ছড়ানো। টালা ট্যাঙ্কের জলে বিষ মেশানো, এই রকম নানা অপপ্রচার। সব দোষ সিপিআই(এম)-এর উপর চাপানো। নবজাতকের ওজন কম হলেও দোষ সিপিআই(এম)-এর।
  
৭। গণতন্ত্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুর্বল করে দেওয়া। মানবাধিকার কমিশন, মহিলা কমিশন, এই সব তিনি অনেক দিন আগেই পকেটে পুরে নিয়েছেন।

৮। প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রভাব সীমিত করা। নির্বাচিত পৌরসভাগুলিকে (হলদিয়া, হালিশহর, দাঁইহাট সহ অসংখ্য উদাহরণ আছে) গায়ের জোরে কেড়ে নেওয়া।

৯। বিচার প্রক্রিয়াকে পাত্তা না দেওয়া (নারদ নিয়েই দেখুন)। রাজ্য সরকার কোর্টে হলফনামা দিয়েছেন যে, নারদে ঘুষ নেওয়াকে তাঁরা অপরাধ বলেই মনে করছেন না।

১০। ফলাফল না ভেবে সহজ উপায়ে কঠিন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা। আগেও উল্লেখ করেছি অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে সেরা হল অতি সম্প্রতি স্বাস্থ্যসাথী কার্ড।

মনোরঞ্জনবাদী রাজনীতিবিদদের চরিত্র আন্তর্জাতিকস্তরে রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা যেভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তার সাথে তৃণমূল কংগ্রেসের চরিত্রের হুবুহু মিল পাওয়া যায়। রাজনীতির এই ধারাকে সামনে রেখে সচেতন এবং সুপরিকল্পিতভাবে বিশেষজ্ঞদের (পিকে এবং আরো অনেকের) সাহায্য নিয়ে তিনি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলেছেন। আপাতত সংখ্যাগরিষ্ঠ  মানুষ অবশ্যই খুশি। কিন্তু ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে গিয়ে আমরা শেষ হয়ে যাব। আমাদের সর্বনাশ নিশ্চিত। বিশ্বাস না হলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির গতিপ্রকৃতির দিকে নজর রাখুন।

আমি তৃনমূল কংগ্রেস ও বিজেপি-র বিরুদ্ধে।

যাঁরা শ্রেণী সংগ্রামের কথা বলেন, তাঁদের আরো‌ গভীরভাবে ভাবনা-চিন্তা করে নতুন পথ খুঁজতে হবে।


রবিবার, ১৬ মে, ২০২১

নির্বাচন ও সিপিআইএম ~ অর্ক রাজপন্ডিত।

হিমাচল প্রদেশে সিপিআই(এম) বিধায়ক একজন। ওডিশাতে সিপিআই(এম) বিধায়ক দুজন। বিহারে সিপিআই(এম) বিধায়ক তিনজন।

আসামে সিপিআই(এম) বিধায়ক একজন। তামিলনাড়ুতে সিপিআই(এম) বিধায়ক দুজন। রাজস্থানে সিপিআই(এম) বিধায়ক দুজন। মহারাষ্ট্রে সিপিআই(এম) বিধায়ক একজন।

কেরালায় সিপিআই(এম) বিধায়ক ৬২জন। ত্রিপুরায় সিপিআই(এম) বিধায়ক ১৬জন।

বাংলায় সিপিআই(এম) বিধায়ক একজনও নেই, শূণ্য।

বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনে কমিউনিস্টদের, বামপন্থীদের শোচনীয় পরাজয় নিয়ে নিশ্চিত ভাবেই চুলচেরা বিশ্লেষণ চলবে, তর্ক বিতর্ক চলবে। আগামী দিনের পথ চলার ক্ষেত্রে তা জরুরি, তা আবশ্যক।

কেন 'শূণ্য'? এই কারণের উত্তরের সন্ধান হতে হবে 'ডায়লেক্টিকাল', 'কমন সেন্স' নির্ভর নয়।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে বামপন্থী কর্মী সমর্থক এমনকি নেতৃত্বের মধ্যেও উঠে এসেছে খানিক যেন 'কমন সেন্স' ভিত্তিক উত্তর। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের হারের পর একই ভাবে 'কমন সেন্স' ভিত্তিক উত্তর খোঁজার চেষ্টা চোখে পড়েছে।

যেমন, 'আমরা জনগনকে বোঝাতে পারিনি'। যেমন 'শাসকশ্রেণি বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে যে বাইনারি তৈরি করেছে তা ভাঙা যায়নি'। যেমন 'আমাদের মানুষ শক্তিশালী নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসাবে গ্রহণযোগ্য মনে করেননি', 'বিভাজনের রাজনীতির আবহে, পোলারাইজেশনের আবহে রুটিরুজির স্লোগান মিলিয়ে গিয়েছে', ইত্যদি ইত্যাদি।

এই 'কমন সেন্স' ভিত্তিক উত্তর সন্ধানের মধ্যে কিছু চটজলদি প্রত্যক্ষ সমাধানের নিদানও আছে। যেমন, 'আমাদের কথা পৌঁছতে পারেনি মানুষের কাছে, আমাদের ডেটা অ্যানালাইসিস দুর্বল', 'সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে টার্গেট করে আমাদের কথা পৌঁছতে পারিনি', 'কমরেড ওরা আমাদের কথা বলবে না, আমাদের আগে একটা টিভি চ্যানেল চাই', ইত্যাদি ইত্যাদি। এই প্রবণতাগুলিকে এক কথায় চিহ্নিত করা যায় 'প্রশান্ত কিশোর সিনড্রোম' হিসাবে।

এই 'কমন সেন্স' ভিত্তিক উত্তর বার বার বলা মানে হয় যেন আমাদের সব ঠিকই ছিল শুধু ডেটা অ্যানালাইসিস ঠিক না হওয়ার জন্যই যেন বিপর্যয়! বা আমাদের সব ঠিকই ছিল শুধু একটা টিভি চ্যানেল না থাকায় মানুষ জানতে না পারায় আমাদের কথায় তাই এই বিপর্যয়!

ঠান্ডা মাথায় প্রথমে যেটা মানতে হবে, 'পিপলস রিজেকশন'। জনগণের প্রত্যাখান। যতক্ষণ না এই 'প্রত্যাখান' আমরা স্বীকার করতে না পারবো ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সব সমাধানের উত্তর খোঁজাই হবে 'কমন সেন্স' নির্ভর।

যা সর্বাগ্রে প্রয়োজন 'কমন সেন্স' নির্ভর বিশ্লেষণ ও সমাধানের রাস্তায় না হেঁটে 'ডায়লেক্টিকাল সেন্স'এ উত্তর খোঁজার চেষ্টা, দ্বান্দিক পদ্ধতিতে ভাবনা।

বিজেপি-তৃণমলের বিভাজনের রাজনীতির কথা আমরা বলেছি। বার বার।

এরাজ্যে মেরুকরণের রাজনীতির কথা আমরা বলেছি। বার বার।

ধর্মকে ব্যবহার করে বিভাজনের রাজনীতির কথা আমরা মানুষকে বলেছি । বার বার।

প্রশ্ন হল এই বিভাজনের রাজনীতিকে হারানোর জন্য, এই পোলারাইজেশনকে হারানোর জন্য, এই বাইনারিকে ভাঙার জন্য আমাদের পদক্ষেপ কি ছিল? কি কি আমরা করেছি?

'বিভাজনের রাজনীতি'কে কিভাবে ভাঙতে হয় কিভাবে 'মেরুকরণ'কে ভেঙে এগোতে হয় সারা দেশকে শিখিয়েছে এই বাংলাই।

১৯৪৬'র ভয়াবহ দাঙ্গা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নির্মিত মেরুকরণ, বিভাজনের রাজনীতিকে ভেঙে দিয়েছিল তেভাগার আন্দোলন। ১৯৪৬'র আগস্ট'এ কলকাতা জুড়ে দাঙ্গা। রাস্তায় রাস্তায় লাশ। ধর্মের নামে নারকীয় গণহত্যা। আর ঠিক পাঁচ মাস মাত্র পরেই গ্রাম গ্রামে জ্বলে উঠলো তেভাগার অনির্বাণ আগুণ। দুই বাংলা জুড়েই সশস্ত্র কৃষকরা।

১৯৮৬ সালে এআইকেএস থেকে প্রকাশিত আবদুল্লা রসুলের 'তেভাগা স্ট্রাগল অফ বেঙ্গল'এ রসুল সাহেব লিখছেন, 'ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঘৃণ্য মেরুকরণ, বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই তেভাগা আন্দোলন ছিল শক্তিশালী প্রত্যাঘাত। হিন্দু মুসলমান ধর্মের পরিচয় ভুলে কৃষকের পরিচয়ে তেভাগায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে'।

১৯৪৬'র দাঙ্গা, সেই সময়ের বিভাজন, মেরুকরণকেও থামিয়ে দিতে পেরেছিল দুর্ধর্ষ কৃষক আন্দোলন। সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টি বিভাজন ঠেকাতে হাতিয়ার করেছিল 'বেসিক ক্লাশ'কেই, মৌল শ্রেণিকেই।

আজকের মেরুকরণ, আজকের বিভাজন, আজকের পোলারাইজেশনকে রুখে দেওয়া গেল না কি 'বেসিক ক্লাশ'র আন্দোলনের অভাবে? শ্রমিক কৃষক খেতমজুর, গ্রামীণ সর্বহারা যাঁরা জনসংখ্যার শতকরা আশি ভাগ তাঁদের নিয়ে দুর্বার শ্রেণি আন্দোলন গড়ে তোলা গেল না কেন?

অন্য সব রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক জোট বা রাজনৈতিক সমীকরণের থেকে কমিউনিস্ট পার্টিকে আলাদা করে চেনা যায় একটিই কারণে, কমিউনিস্ট পার্টি যে কাজই করুক না কেন তার মধ্যে একটিই ভাবনা থাকে পুঁজিবাদকে কিভাবে হারানো যায়, পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তোরণের পদ্ধতিতে। জর্জ লুকাচ বলেছেন 'অ্যাকচুয়ালিটি অফ রেভোলিউশন', আমি যাই করি না কেন তা হবে 'বিপ্লবের বাস্তবতা'র সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখানে 'অ্যাকচুয়ালিটি অফ রেভোলিউশন' মানে এমনও নয়, যে বিপ্লব আসন্ন।

যদি সাময়িক সঙ্কটের জন্যও এক্ষুনি ও এখনকার জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়াও হয়ে থাকে তার মধ্যে থাকতে হবে পুঁজিবাদকে উত্তরোণের রসদ, আর পুঁজিবাদকে খতম করার লক্ষ্য বাদ দিয়ে যা কিছুই ব্যবস্থা নেওয়া হোক না কেন তা হবে চটজলদি প্রত্যক্ষ সমাধানবাদ।

কমিউনিস্ট পার্টিতে চটজলদি প্রত্যাক্ষ সমাধানবাদের প্রবণতা বাড়তে থাকলে পার্টির সঙ্গে মৌল শ্রেণির বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকে, ফলত 'পার্টি স্বার্থ' বড় হয়ে যায় বেসিক ক্লাশের 'শ্রেণি স্বার্থ'র থেকে।

নির্বাচনে কিছু আসন দরকার, লোকসভায় প্রতিনিধি দরকার, বিধানসভায় কিছু বিধায়ক দরকার, এই ধরণের 'পার্টি স্বার্থ' রক্ষার জন্য চটজলদি সমাধান কিছু নেওয়া হলে সেখানে থাকে না 'বেসিক ক্লাশ'র শ্রেণি স্বার্থ। চটজলদি সমাধানবাদকে এখনই যদি রোখা না যায় তাহলে 'পার্টি স্বার্থ' রক্ষা করতে গিয়ে আগামীতে পার্টি যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে সেই শ্রেণির স্বার্থ ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকে। চটজলদি সমাধানবাদ কমিউনিস্ট পার্টিকে তখন অন্য চার পাঁচটা রাজনৈতিক দলের থেকে আলাদা করতে পারে না জনগণের কাছে।

কোন পথে ঘুরে দাঁড়াবে কমিউনিস্ট পার্টি? এই নিয়েও চর্চা চলবে, তর্ক বিতর্ক চলবে। কিছু ওপিনিয়ান পেজ লেখক মূলত কয়েকটি সমাধান হাজির করেন বামপন্থীদের ভালো চেয়ে! যেমন কমিউনিস্ট পার্টি সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি হয়ে উঠুক তারা সাম্রাজ্যবাদের 'পুরোন বস্তাপচা ধারণা'কে ছেড়ে দিক।

আবার কেউ কেউ বলেন কমিউনিস্ট পার্টির ভালোর জন্যই এই ধরনের 'সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক' টাইপ স্লোগান ছেড়ে সব অংশের কাছে অ্যাপিলিং হয়ে উঠতে পারে। যাঁ তাঁরা বলেন না কমিউনিস্ট পার্টি যাঁদের স্বার্থ রক্ষা করে 'বেসিক ক্লাশ', শ্রমিক কৃষক ক্ষেতমজুর যাঁরা জনসংখ্যার আশি শতাংশ, যাঁরা নয়া উদারবাদী আক্রমনের প্রতিনিয়ত শিকার, যে নয়া উদারবাদের নিয়ন্ত্রক আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজি যা আজকের সমসাময়িক সাম্রাজ্যবাদের মূল আকর।

আজকের এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরোণের জন্য শুধু রাস্তায় থাকতে হবে বা রাস্তাই একমাত্র রাস্তা বলার থেকেও জরুরি কোন রাস্তায় থাকবো? কোনটা ঠিক রাস্তা? সঠিক রাস্তার সন্ধান না পেলে একই রাস্তায় বার বার ঘুরে ঘুরে থাকার বিভ্রান্তি আরও চটজলদি সমাধানবাদ হাজির করতে পারে।

ইতিহাস দেখিয়েছে বারে বারে কমিউনস্টদের হারানো গণভিত্তি ফিরে পেতে এলে চটজলদি সমাধানবাদ কাজে লাগে না, একটাই সমাধান তখন ফিরে যাও 'বেসিক ক্লাশ'র কাছে। মৌল শ্রেণির কাছে ফিরে যাও।

এইরকম সঙ্কটের সময়ে পার্টি নেতৃত্বের ভূমিকা হবে সব থেকে কার্যকরি। লেনিন বার বার জোর দিয়েছোন 'ক্লাশ লিডারশিপ'র কথা, সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে হলে পার্টি কমিটি ভরিয়ে দাও 'বেসিক ক্লাশ' কে নিয়ে এসে, কমিটি ভরিয়ে দাও মজুর, কৃষক, খেতমজুরদের দিয়ে।

১৯২২ সালে রুশ পার্টির পার্টি কংগ্রেসে চিঠি লিখে লেনিন প্রস্তাব দিয়েছেন 'কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আমার মনে হয় পার্টির অধিকার আছে দাবি করার যে সিসি'তে ওয়ার্কিং ক্লাশের প্রতিনিধি ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০জন করতে হবে। এই ধরণের ব্যবস্থা পার্টিকে আরও সুসংহত করতে কবে লড়াইতে। পার্টি নেতৃত্বে শ্রমিকশ্রেণির প্রতিনিধি বাড়ালে পার্টি হাজারগুণ বেশি সুসংহত হবে'।

বারে বারেই শিখিয়ে যান ভ্লাদিমির। 

বালাসাহেব ঠাকরে ~ ঋতুপর্ণ বসু

বিরাট বোম্বে শহরে বাল কেশব থ‍্যাকারে নামে এক  সাদামাটা তরুণ  আর পাঁচজন নিম্নবিত্ত মারাঠির মতই লোকাল ট্রেনে চেপে অফিস যান। 

তার কাঁধে ঝোলানো ব‍্যাগে থাকে রং, তুলি,পেনসিল,  আ্যলুমিনিয়ামের টিফিন বক্স। 

ফ্রি প্রেস জার্ণাল কাগজের ব‍্যঙ্গচিত্রী তিনি । বেতন ৭৫ টাকা। 

ওই অল্প টাকায় সংসারের খরচ চলে না বলে তাকে  মারাঠা,  কেসরী, ধণুর্ধারী প্রভৃতি পত্রপত্রিকা ও  বিজ্ঞাপন সংস্থার জন‍্যেও ছবিও আঁকতে হয়। আঁকতে হয় সিনেমার শো- কার্ড। 

অফিসে এতদিন তাঁকে বসতে দেওয়া হত টেলিফোন অপারেটরের পাশে।

 খবরের কাগজের অফিসে বিরামহীনভাবে ফোন আসতেই থাকে। কার্টুন আঁকতে গিয়ে  কার্টুনিস্টের মনঃসংযোগ নষ্ট হয় বারে বারে। 

কর্তৃপক্ষের কাছে ক্রমাগত আবেদন করে কিছুদিন হল একটা নতুন জায়গা পেয়েছেন তিনি।  

এই কাগজের আরেক স্টাফ কার্টুনিস্ট এক তরুণ  দক্ষিন ভারতীয়। নাম আর. কে. লক্ষণ। কর্তৃপক্ষের স্নেহধন্য  লক্ষণের জন‍্য অফিসে রয়েছে আলাদা চেম্বার। 

.............................................................................

" বালাসাহেব ঠাকরের উত্থান আমার চোখের সামনেই ঘটেছিল। 

যেদিন ফ্রি প্রেস জার্ণালে যোগ দিই, সেদিনই প্রথম আলাপ করিয়ে দেন এক সহকর্মী। 

"ইনি হলেন মিঃ ঠাকরে। আমাদের কাগজের কার্টুনিস্ট।" 

 ক্ষীণকায় তরুন মিঃ ঠাকরের ঘন  চুলগুলি ব‍্যাকব্রাশ করা । চোখে চশমা, মুখে চুরুট। 

ওইসময় আমাদের অফিসে দুজন চুরুট খেতেন। সম্পাদক ও ব‍্যঙ্গচিত্রী।  সম্পাদক নটরাজনের  দামী  চুরুটের  হালকা গন্ধটা বিশেষ প্রিয় ছিল আমার।

কার্টুনিস্টের চুরুটের ঘ্রাণ  ছিল উগ্ৰ, কড়া। মোটেই ভাল লাগত না। 

বালাসাহেব একটা বড় কাঠের বোর্ডের ওপর কাগজ রেখে টুলির একটানে বড় বড় ছবি এঁকে ফেলতেন। 

আঁকার সময় কখনও কখনও  একটি পাইপ ধরিয়ে নিতেন দেখেছি। 

আরেক ব‍্যঙ্গচিত্রী আর. কে. লক্ষণের নিজস্ব সাউন্ড প্রুফ ঘর ছিল। তার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকত এক চাপরাশী  তাঁর ফাইফরমাশ খাটার জন‍্য। 

মিঃ ঠাকরের ঘরটিকে আমরা বলতাম লাইব্রেরি। কারণ  রিভিউ হবার জন‍্য যত রাজ‍্যের বই অফিসে দেওয়া হত, সেগুলি স্তূপ হয়ে পড়ে থাকত ওখানে।

মিঃ ঠাকরেকে  ফিল্ম পেজ এডিটর ও এক করণিকের সঙ্গে ঘরটিকে ভাগ করে নিতে হয়েছিল। 

মিঃ ঠাকরে ছিলেন অর্ন্তমুখী, মৃদুভাষী, ভদ্র, সংযত। 

আমরা গর্বিত ছিলাম আমাদের কার্টুনিস্টকে নিয়ে। 
তাঁর দুটি ব‍্যঙ্গচিত্র একটি ব্রিটিশ কার্টুন সংকলনে স্থান পেয়েছিল। লক্ষণের কার্টুন কিন্তু মনোনীত হয়নি। 

একবার একটি আমেরিকান সংবাদপত্র ফ্রি প্রেস জার্ণালে প্রকাশিত মিঃ ঠাকরের কার্টুন পুনর্মুদ্রণ করে। সাম্মানিক হিসেবে কার্টুনিস্টের উদ্দ‍্যেশ‍্যে একটি ভদ্রস্থ পরিমাণ ডলারের চেক পাঠায়। 

সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ কিন্তু পুরো টাকাটাই আত্মসাৎ করলেন। মিঃ ঠাকরেকে বলা হল, তাঁর কার্টুন ফ্রি প্রেস জার্ণালের সম্পত্তি। 

মিঃ ঠাকরে ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। অন্ততঃ, তাঁর মত একজন  নিরীহ ভদ্রলোকের পক্ষে যতটা রাগ করা সম্ভব !! 

আমাদের সংবাদপত্রের কর্তাব‍্যক্তিরা অধিকাংশই ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয়। " 

 স্মৃতিচারণা করেছেন প্রখ‍্যাত সাংবাদিক ও কলাম লিখিয়ে বেরহাম কন্ট্রাকটর, তাঁর  " Busy Bee ; Best of 1996 - 97 " ( Oriana Communications, 1998 )  বইতে। 
….............................................................................

১৯৫২ সালে  মাদ্রাজ প্রদেশের তেলুগু  ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে একটি আলাদা রাজ‍্যের দাবীতে পট্টি শ্রীরামালু ৫৬ দিন অনশন করে মৃত‍্যুবরণ করেন।

 কানাড়া ভাষাভাষী একটি প্রদেশ তৈরীর দাবি নিয়ে জোর সওয়াল করেন আলুরু বেঙ্কট রাও। 

১৯৫৩  সালে রাজ‍্য পুনর্গঠন কমিশন  তৈরী করা হয়েছিল। এই কমিশন ভারতে ভাষাভিত্তিক ১৪টি রাজ‍্য বিভক্ত করার সুপারিশ করে। সাথে থাকবে ৬টি  কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। 

১৯৫৬ এ পাশ হয় রাজ‍্য পুণর্গঠন আইন। 

ব্রিটিশ আমলে তৈরী বম্বে প্রদেশকে বিভক্ত করে  গুজরাটি ও মারাঠিভাষী রাজ‍্য তৈরির জোরদার দাবী উঠতে থাকে। 

কিন্তু রাজ‍্য পুণর্গঠন কমিশন অদ্ভুতভাবে গুজরাতি ও মারাঠি ভাষাভাষী এলাকাগুলি জুড়ে একটি দ্বিভাষিক রাজ‍্য তৈরীর প্রস্তাব দেয়। সেইসঙ্গে বিদর্ভ অঞ্চলকে একটি আলাদা রাজ‍্য হিসাবে গঠন করার সুপারিশ। 

এর বিরুদ্ধে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র সমিতির নেতৃত্বে  তুমুল আন্দোলন হয়। 

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, প্রাবন্ধিক কেশব সীতারাম ঠাকরে ছিলেন এই আন্দোলনের একজন বর্ষীয়ান  নেতা। 

চিত্রশিল্পী , নানারকম বাদ‍্যযন্ত্র বাজাতে সিদ্ধহস্ত , শাস্ত্রীয় সংগীতে পারদর্শী, সাহিত‍্যে অগাধ পান্ডিত্য -  এহেন বহু গুণের অধিকারী কেশবে ঠাকরের নিজস্ব পারফর্মিং ট্রুপ বা  মারাঠি লোকায়ত নাচগানের দল ছিল। 

 তরুন বয়সে জ‍্যোতিবা ফুলের জাতপাতবিরোধী "সত‍্যশোধক" আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন, একসাথে কাজ করেছেন বাবাসাহেব বি.  আর. আম্বেদকরের সাথে। 

প্রখ‍্যাত ইংরেজি সাহিত‍্যিক উইলিয়ম মেকপিস থ‍্যাকারের ভক্ত কেশব নিজের পদবীর বানানটি লিখতেন " Thackeray". 
তাঁর " প্রবোধন"  পত্রিকা মহারাষ্ট্রে তুমুল জনপ্রিয়।  "প্রবোধন"  কথাটির অর্থ " নবজাগরণ"। 
মারাঠা মুলুকে কেশব " প্রবোধঙ্কর"  নামেই অধিক পরিচিত। 
সিনিয়র ঠাকরে সারা জীবনে  অর্থ ছাড়া আর সবকিছুই উপার্জন করেছেন। 
জীবনের নানা ওঠাপড়ার সুন্দর বিবরণ তিনি দিয়ে গেছেন "  মাঝি জীবনগাথা ; (The Collected Works of Pravodhankar Thakre, Volume 1,  মহারাষ্ট্র রাজ‍্য সাহিত্য আণি সংস্কৃতি মন্ডল, মুম্বই,) বইতে। 

এই ঠাকরেরা চান্দ্রসেনীয় প্রভু কায়স্থ। 

মহারাষ্ট্রে কায়স্থদের  সংখ‍্যা কম। চান্দ্রসেনীয় প্রভু কায়স্থদের  নিবাস ছিল কোলাবা জেলা ও তার আশেপাশে। এঁদের আচার ব‍্যবহার উচ্চবংশীয় ক্ষত্রিয়ের মত। কায়স্থ প্রভুরা মূলতঃ মসীজীবী।

 ব্রাহ্মণদের সঙ্গে একসময় এঁদের সম্পর্ক ছিল আদায় কাঁচকলায়। বুদ্ধিবলে কেউ খাটো নয়, তাই এদের ঝগড়াঝাটি সর্বত্র সর্ব কার্যে চলেছে।
ছত্রপতি  শিবাজীর বিশ্বস্ত সেনাপতি বাজী প্রভুর বীরত্বের কথা, ছত্রপতিকে রক্ষা করার জন‍্য তাঁর পাবনখিন্ডের লড়াইয়ে আত্মদানের কথা  মহারাষ্ট্রে কে না শুনেছে ? 

শিবাজী মহারাজ কত দূরদর্শী মানুষ ছিলেন। তাঁর একটা সার্বজনীন ভাব ছিল। তাঁর আমলে তিনি দপ্তরে, পল্টনে তিনি সব জাতি, সব ধর্মকে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি মারা যাবার পর ব্রাহ্মণ অব্রাহ্মণে রেষারেষি ক্রমশ বেড়ে উঠেছিল। 

অনেকে বলেন যে এই কায়স্থ প্রভুরা মহারাষ্ট্রের সাবেক বাসিন্দা নয়, উত্তর ভারত থেকে এসেছে। 
এঁদের কূলদেবী বিন্ধ‍্যাচলবাসিনী -- দেবীর মন্দির মির্জাপুরের কাছাকাছি বিন্ধ‍্যপর্বতে অবস্থিত, দক্ষিণদেশে নয়। 

মারাঠাশাহীর সময় কেশব সীতারাম ঠাকরের এক পূর্বপুরুষ ধোপড়ে অঞ্চলের দুর্গরক্ষক ছিলেন। 

লড়াইয়ের সাথে তাঁরা  অপরিচিত নন। 

..............................................................................

মহারাষ্ট্র বিবিধ  চিন্তাধারা ও আদর্শের উৎসভূমি। 

বাল গঙ্গাধর তিলকের স্বরাজ‍্য আন্দোলন, জ‍্যোতিবা ফুলের সামাজিক সংস্কার আন্দোলন এখান থেকেই শুরু হয়েছে। 

নাগপুরের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ধীরে ধীরে সারা দেশে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করছে। 

বাবাসাহেব আম্বেদকরের দলিত চেতনা মহারাষ্ট্রের ব‍্যাপ্তি ছাড়িয়ে দেশের দূরতম প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। 

বম্বে শহরে কমিউনিস্ট ট্রেড ইউনিয়নের রমরমা। 

কিন্তু এইসব তত্ত্বের প্রবক্তারা মারাঠি মানুষের সংস্কৃতি, জীবিকা , বাসস্থান নিয়ে কিছু বলছে কি ?

 স্বাধীনতার বেশিদিন হয়নি, অথচ আজ  নিজের শহরেই অবাঞ্ছিত মহারাষ্ট্রের ভূমিপুত্ররা।  যারা এককালে ছিল ছত্রপতি শিবাজীর ফৌজের গর্বিত যোদ্ধা, তারা আজ সারা শরীরে আত্মগ্লানি মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

পশ্চিমঘাটের গ্ৰাম‍্য, দরিদ্র  মানুষের বম্বেতে একটাই পরিচয় --- "ঘাটী"। এই  মলিন ঘাটীরা সুসজ্জিত বিপণীতে ঢুকে পড়লে বম্বের বাবুরা হাসে। 
এই ঘাটি বা গরীব মারাঠিদের   পিওন, মুটে, অটোচালক আর পুলিশ কনস্টেবল হিসাবে দেখা যায়। এই পুলিশের হাবিলদারদের অমারাঠিরা ব‍্যঙ্গ করে বলে "পান্ডু"। 

সারা শহর জুড়ে মাকড়সার জালের  মত রেল লাইন  --- কয়েক মিনিট অন্তর অন্তর ট্রেন। বস্তাবন্দি আলুপটলের মত বোঝাই হয়ে লোক চলেছে।  হট্টগোলের মধ‍্যে কান পাতলে মারাঠি কথা কানে  আসে খুব কম। 

চোখের সামনে দিয়ে মারাঠি মানুষের নিজের শহরটা, মুখের রুটিটা চুরি হয়ে গেল, তার খেসারত কে দেবে ? 

মুম্বাদেবীর স্নেহধন্য এই শহর মুম্বই, আজ নিজের মারাঠি নামটাও হারিয়ে ফেলেছে। 

  "ওরা" অবশ‍্য বলে যে কসমোপলিটান বম্বে শহরকে নাকি গড়ে তুলেছে পার্সী, আর্মেনিয়ান, বোহরা মুসলীম আর গুজরাটি জৈনরা। মারাঠিরাই এখানে  বেমানান, বহিরাগত। 

বম্বের স্টুডিওগুলিতে চোপড়া, কাপুর, আনন্দদের একাধিপত‍্য !  

শহরের উদিপী রেস্তোরাগুলির মালিক  দক্ষিণ ভারতীয়রা। রয়েছে পার্সী টি হাউস। 

 বাল ঠাকরে লক্ষ‍্য করেছেন দক্ষিণ ভারতীয়রা সবসময়  পরস্পর নাকশোঁকাশুকি করে চলে, ভুলেও মারাঠিদের চাকরীতে বহাল করে না। 

 অফিস কাছারী রেস্তোরাঁ মাদ্রাজী   "আন্না"দের, সিনেমাজগত পাঞ্জাবীদের, ইন্ডাস্ট্রিগুলো গুজরাটি আর পার্সীদের ---  কেবল গালিগালাজ ও বিদ্রুপ  মারাঠিদের জন‍্য বরাদ্দ !!! 

বিদর্ভ ও কোঙ্কন অঞ্চল থেকে প্রচুর মানুষ  বম্বের কাপড়ের মিলে কাজ করেন। কিন্তু মিলগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মারাঠি "কামগার" ( শ্রমিক )  
পরিবারে যাদের চাকরির বয়স হয়েছে, সেইসব বেকার যুবকদের মধ‍্যে তৈরী হয়েছে  তীব্র ক্ষোভ। 

বম্বের অপরাধ জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করছে যারা , সেই বরদারাজন মুদেলিয়র, হাজী মাস্তান আর করিম লালা পাঠান কেউই মারাঠি নয়। এটা বাল ঠাকরেকে বেশ ভাবিয়ে তোলে। 

 নানা জাতি, নানা ধর্মের ভিড়ে ধুঁকতে থাকা একটা তৃতীয় বিশ্বের শহর  কখনই অপরাধ মুক্ত হবে না।

 ফলে মহারাষ্ট্রেও গুন্ডা-মাফিয়া-অপরাধী থাকবেই। মারাঠি গুন্ডা যদি তৈরি না হয়, জায়গা ফাঁকা থাকবে না। ভিন্ন জাতির লুম্পেনরা অপেক্ষা করছে।

 অতএব বিজাতীয় গুন্ডার থেকে "আমচি মূলে" (আমাদের ছেলেরা)  কম বিপদজনক।  কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডে "মারাঠি ডন"  কোথায় ? 

এইসব চিন্তা করতে করতে  যখন বাল ঠাকরের মন আনমনা, হঠাৎ ধাক্কা লাগল উল্টোদিক থেকে আসা এক পথচারীর সাথে। 

রাগের মাথায় মানুষের মুখ দিয়ে  মাতৃভাষা বেরোয়। লোকটি বাল ঠাকরেকে যা তা গালমন্দ করতে লাগল। 

লোকটার অনর্গল  আ্যন্ডাপ‍্যান্ডা য়ান্ডুগুন্ডু  শুনে রাগের চেয়ে হাসি পেল বেশি।

মাদ্রাজীদের   কি আজব ভাষা !! 

তবে  এই " য়ান্ডুগুন্ডু"গুলোর বড্ড বাড় বেড়েছে। 

মালাবার থেকে আসা  হকারগুলো শহরের ফুটপাতগুলোতে যত স্মাগলড জিনিস ফিরি করে বেড়ায়। 

বাইরে থেকে যতরাজ‍্যের লোক  এসে শহরটাকে ঘিঞ্জি আর অপরাধপ্রবণ করে তুলেছে !!! 

কিছু একটা করা দরকার !! 

…….......….....................................................

  দাদারের ৭৭এ, রানাডে রোডের বাড়িতে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ভিড় লেগেই থাকে। কাছেই শিবাজী পার্ক। 

১৯২৫ সালে এ পার্ক স্থাপিত হয়। তখন এর নাম ছিল মাহিম পার্ক। ১৯২৭ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা বিএমসি কাউন্সিলর অবন্তিকাবাই গোখলের উদ্যমে এ পার্কের নামকরণ হয় শিবাজি পার্ক। জনগণের চাঁদায় এখানে শিবাজির একটি মূর্তি স্থাপিত হয়।

 বাড়ির হৈ হট্টগোলের মধ‍্যেই  বসার ঘরে চৌকি পেতে বাল ঠাকরে কার্টুন এঁকে চলেন। ইদানিং সংযুক্ত মহারাষ্ট্র আন্দোলনের সমর্থনে প্রায় আটটি কাগজে ব‍্যঙ্গচিত্র আঁকছেন " মাওলা " ছদ্মনামে।  মহারাষ্ট্রের পার্বত‍্য অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের বলে "মাওলা"। এঁরাই শিবাজীর বিশ্বস্ত সৈনিক ছিল। 

মোরারজী দেশাই কিছুতেই আলাদা রাজ‍্য দেবেন না মারাঠিদের। শহরের ফ্লোরা ফাউন্টেন এলাকায়  (  এখন হুতাত্মা চৌক )  বিক্ষোভরত আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে পুলিশ ১০৫ জনকে মেরে ফেলল। 
" বম্বে" নামে একটি কাগজে ঠাকরের কার্টুন প্রকাশিত হল। মোরারজি দেশাইকে নররাক্ষস রূপে খুলির পাহাড়ের ওপর বসে আছেন। 
পুলিশ কেস নথিভুক্ত করল, ফলে কয়েকদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হল বাল ঠাকরেকে। 

...........................................................................

শেষ পর্যন্ত ফ্রি প্রেস জার্ণালের চাকরি ছেড়ে দিলেন বাল ঠাকরে। মহারাষ্ট্রের খ‍্যাতনামা নেতা এস. কে. পাতিলকে আক্রমণ করে করা  কার্টুন নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তীব্র মতান্তর হয়েছে সদ‍্য। এছাড়াও নানা কারণে মনটা তিক্ত হয়ে আছে। 

  ঠিক করলেন, একটি কার্টুন সাপ্তাহিক বের করবেন। সেইসময় মহারাষ্ট্রে স্ত্রী, কিরলোসকার, মৌজ, জ‍্যোৎস্না ইত‍্যাদি পত্রিকা থাকলেও কোন কার্টুন সাপ্তাহিক ছিল না। কেবলমাত্র দিল্লি থেকে বেরোত ইংরেজি "  শংকরস উইকলি "  নামে মূলত কার্টুন ও ফিচারধর্মী পত্রিকা। 

" খিঁচো না কামান    
 না তলওয়ার নিকালো
 জব তক মুকাবিল হো
 তো আখবার নিকালো। " 

তুলিকলমের জোরই আসল জোর।
প্রবোধঙ্কর ঠাকরের এক গুণমুগ্ধের দেওয়া পাঁচ হাজার টাকার আর্থিক অনুদানে প্রকাশিত হল একটি পত্রিকা। 
১৯৬০ সালের ১৩ই এপ্রিল , স্থানীয় বালমোহন বিদ‍্যামন্দিরে  বাল ঠাকরের পত্রিকার  আনুষ্ঠানিক প্রকাশ উপলক্ষ‍্যে এসেছিলেন তৎকালীন মুখ‍্যমন্ত্রী ওয়াই.  বি.  চবন। প্রবোধঙ্করের গুণমুগ্ধ তিনি। 
সমস্ত মারাঠি জনগণের মর্মস্থলের আশা ভরসা থেকে উৎসারিত হয়েছে বলে প্রবোধঙ্কর এর নাম রেখেছেন " মার্মিক"। প্রচ্ছদ জুড়ে  বাল ঠাকরের কার্টুন। সঙ্গে কড়া সম্পাদকীয়,  শ্লেষাত্বক নিবন্ধ ও সিনেমার পাতা।  
ধীরে ধীরে মারাঠি মানুষের মনে জায়গা করে নিল এই পত্রিকা। রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্র "রবিবারচি যত্রা" ছিল অন‍্যতম আকর্ষণ। 

.......................................................................

 আর্কিটেক্ট মাধব দেশপান্ডে, পদ্মাকর অধিকারী, শ‍্যাম দেশমুখ এবং বসন্ত প্রধান (  রেলকর্মী ও পরবর্তীতে আইনজীবি )  বম্বে শহরের বিভিন্ন গণেশ  মন্ডল, স্থানীয় ক্লাব ও ব‍্যায়ামশালায় গিয়ে মারাঠি তরুনদের সংগঠিত করার চেষ্টা করতেন।  

ওই সময়  " মার্মিক " একটি জনপ্রিয় পত্রিকা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। প্রায় ৫০,০০০ কপি বিক্রি হত, প্রায় দু লক্ষ মানুষ পত্রিকাটি পড়তেন। 
একদিন তাঁরা ওই পত্রিকায় একটি বিজ্ঞপ্তি দেখলেন। মারাঠিদের স্বার্থরক্ষার জন‍্যে  নিজস্ব সংগঠন তৈরী হবে। 
তাঁরা বুঝলেন তাঁদের উদ‍্যোগের সাথে এই প্রচেষ্টা পুরোপুরিভাবে মিলে যাচ্ছে। তাঁরা সদলবলে বাল ঠাকরের সাথে সাক্ষাৎ করে জিজ্ঞাসা করলেন, এই সংগঠনের কোন কাঠামোর বিষয়ে মিঃ ঠাকরে কিছু ভেবেছেন কিনা। 
"কাঠামো ? কিসের কাঠামো ?  আমি রয়েছি, কিছু বন্ধু রয়েছেন, আর এই পত্রিকাটা রয়েছে।" বাল ঠাকরে সবিস্ময়ে  বললেন। 
 মাধব দেশপান্ডে ও তাঁর সাথীরা মিঃ ঠাকরেকে বোঝালেন শুধুমাত্র সীমিত লোকবল ও  পত্রিকার প্রচারের ওপর ভরসা করলে চলবে না। 

পেশাদার দক্ষতায় তাঁরা নতুন  দলের সাংগঠনিক কাঠামোর রূপরেখা এঁকে দিলেন। বম্বে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের এলাকাভিত্তিক ম‍্যাপকে সামনে রেখে প্রতিটি ওয়ার্ডে শাখা প্রমুখের নেতৃত্বে বিভাগ প্রমুখ, ও বিভাগ প্রমুখের অধীনে সাধারণ কর্মীদের মধ‍্যে  দায়িত্ব কিভাবে ভাগ হবে, তার একটি নীল নকশা তৈরি করলেন। 

একটা জিনিস তাঁরা লক্ষ‍্য করেছিলেন, যে পত্রিকা সম্পাদককে  যদি তাঁর কমফর্ট জোন থেকে একবার  বাইরে বার করে এনে মঞ্চে  তুলে দেওয়া যায়, তবেই কেল্লাফতে। মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মত তাঁর কথা শোনে। 
এই নিঃস্বার্থ কর্মীরা একমত হলেন যে মারাঠি অস্মিতার মুখ হবেন একজনই -- বালাসাহেব ঠাকরে। 

( তথ‍্যসূত্র : হিন্দু হৃদয় সম্রাট ; সুজাতা আনন্দন, হারপার কলিন্স। ) 
.............................................................................

" আমি ১৯৬৯ সালে  পুনে থেকে বম্বেতে ডেপুটি কমিশনার হিসাবে বদলি হই। জোন থ্রি এলাকাটি আমার দায়িত্বে ছিল। এখানেই শিবাজী পার্ক, বালাসাহেব ঠাকরের খাসতালুক।  তাঁর সাথে আমার বেশ কয়েকবার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছিল।

 একটা ইন্টারেস্টিং চরিত্র উনি। ওনার সাথে কথা বললে মোটেই রাগ হত না  আমার। তবে ওনাকে ক্রমাগত ট‍্যাকল করতে হত প্রশাসনের তরফ থেকে।  

আমাকে বারবার বলতে হত -  আপনি এটা করতে পারবেন না  -- এটা করলে আম‍রা এই ব‍্যবস্থা নিতে বাধ‍্য হব। 

তখন উনি আমাদের সাথে তর্ক করতেন, কিন্তু কোথাও  যেন ওনার মধ‍্যে  পুলিশ প্রশাসনের প্রতি একটা রেসপেক্ট ছিল। উনি জানতেন, একমাত্র আমরাই ওঁকে রুখে দিতে পারি। 

মিঃ ঠাকরের সাথে কথা বলে তাঁকে মোটের ওপর মিশুকে ও  বন্ধুবৎসল বলেই মনে হয়েছে। তবে  বক্তৃতা দেবার সময় যেন তাঁর ঘাড়ে ভূত চাপত। তাঁর কথার তোড়ে সকলে ভেসে যেত। গল্পের ঢংয়ে যখন কথা বলতেন তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত মাঠভর্তি লোক। 

 মানুষ তাঁর কথায় হাসত, কাঁদত, ক্রুদ্ধ হত  -- মারাঠি হিসাবে গর্ব অনুভব করত। মিঃ ঠাকরে না থাকলে এই নবীন প্রজন্মের ছেলেরা হয়ত বামপন্থী দলে যোগ দিত, অথবা জর্জ ফার্নান্ডেজের সোসালিস্ট পার্টির দল ভারী করত। 

 তৎকালীন কংগ্রেস মুখ‍্যমন্ত্রী বসন্তরাও নায়েকের সস্নেহ সমর্থন পেতেন মিঃ ঠাকরে। সেসময় অনেকেই ওনার দল  শিবসেনাকে ব‍্যঙ্গ করে বলত "বসন্তসেনা"।   আরো বিভিন্ন প্রভাবশালী ব‍্যক্তি ও গোষ্ঠীর  মদতও ছিল। তাঁরা চাইতেন মিঃ ঠাকরে কমিউনিস্টদের উৎখাত করুন শহর ও রাজ‍্য থেকে। 

 আবার বলছি,  মিঃ ঠাকরে  খুব বুদ্ধিমান মানুষ  --- মানুষের ওপরে প্রভাব বিস্তার করার  একটা অদ্ভুত  ক্ষমতা ছিল ভদ্রলোকের।  আমাদের পুলিশ ফোর্সের জুনিয়র অফিসার ও কর্মীদের  পুরোপুরি নিজের দিকে করে নিতে পেরেছিলেন। এদের সকলেই ছিল  মারাঠি।
আমার স্টেশন হাউস অফিসারদের মধ‍্যে বাল ঠাকরের অসংখ‍্য গুণমুগ্ধ ছিল। আমি  দৈনিক  "পুলিস নোটিশ" এর মাধ‍্যমে তাদের বার্তা দিতাম যে কোন পুলিশকর্মী যদি   রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারনে  কর্তব‍্যের সাথে আপোষ করে তবে  বিভাগীয় ব‍্যবস্থা নেওয়া হবে। 

প্রখ‍্যাত  পুলিশ অফিসার জুলিও রিবেইরো। 
মুম্বই মিরর, সেপ্টেম্বর, ২০১৯
...................................................................

 বালাসাহেব ঠাকরের সভাপতিত্বে কোলাপুরে অনুষ্ঠিত কার্টুনিস্টদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি সেখানে সকলের সামনে নানা ধরনের ক‍্যারিকেচার এঁকে দেখিয়েছিলেন। 
 কার্টুন আঁকায় এ্যনাটমির গুরুত্ব,  ক‍্যারিকেচার কিভাবে অল্প রেখায়  পরিচিত মানুষের ব‍্যক্তিত্বের নির্যাস ফুটিয়ে তোলে, রাজনৈতিক কার্টুন কাকে বলে  -- এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রাঞ্জল ভাষায় তিনি  আলোচনা করেন। 

পরবর্তীকালে ভিলে পার্লে ও গিরগামে অনুষ্ঠিত  কার্টুনিস্টদের কনভেনশনেও  তিনি সাগ্ৰহে যোগদান করেন। মহারাষ্ট্রে কার্টুনশিল্পের প্রচার ও প্রসারে তিনি অকুন্ঠভাবে সাহায্য করেছেন। 

 ২০০০  সালে মহারাষ্ট্রের বিখ‍্যাত কার্টুনিস্ট শিবরাম দত্তাত্রেয় ফডনিসের ৭৫  বছরের জন্মদিনে যে  অনুষ্ঠান হয়, তাতে বালাসাহেব উপস্থিত হয়ে সম্বর্ধনা জানান --  ভূয়সী প্রশংসা করেন বর্ষীয়ান শিল্পীর। 

"  ফাডনিস ক‍্যাপশনলেস কার্টুনের একজন সার্থক রূপকার। আমার কার্টুনে অবশ‍্য সংলাপ থাকত, কারণ আমার অধিকাংশ বক্তব‍্যই ছিল রাজনৈতিক।"  বলেছিলেন বালাসাহেব ঠাকরে। 

লক্ষণের " কমনম‍্যান" এর  মতই বালাসাহেবের" মারাঠী মানুস"  ছিল কাক্কাজী। এই গোবেচারা, প্রৌঢ় মারাঠি পারিপার্শ্বিক চাপে বিপর্যস্ত। 

" মার্মিক ছাড়াও বালাসাহেবের কার্টুন আমি নিয়মিত দেখতাম আওয়াজ, নবযুগ, কেশরী, নবশক্তি ইত্যাদি পত্রপত্রিকায়। আমাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল তাঁর রেখা ও বক্তব‍্য।"  জানান ফাডনিস। ফডনিসের  সংলাপহীন কার্টুনের বই " Laughing Gallery"  সারা ভারতের কার্টুনিস্টদের কাছে পরিচিত। 
.............................................................................

বালাসাহেব ঠাকরে ও আর. কে. লক্ষণ ছিলেন একে অপরের কাজের গুণমুগ্ধ। দুজনেই প্রবাদপ্রতীম ব্রিটিশ কার্টুনিস্ট ডেভিড লোকে অনুসরণ করতেন। 
২০১০ সালে একটি স্ট্রোকের পরে  লক্ষণ যখন অসুস্থ, বালাসাহেব এসেছিলেন বন্ধুকে দেখতে তাঁর পুনের বাসভবনে। 

"  রাজনৈতিক নেতা বালাসাহেব ঠাকরে নন, কার্টুনিস্ট বালাসাহেবকে আমাদের বেশি পছন্দ। ঠাকরে পরিবারের সাথে বরাবরের  আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ওঁর প্রয়াত স্ত্রী মীণাতাই আমার বান্ধবী ছিলেন। ১৯৫০ সালে লক্ষণ ফ্রি প্রেস জার্ণালের চাকরি ছেড়ে দিয়ে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় যোগ দেন। ওখানে চাকরি করা সম্ভব হচ্ছিল না। কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদের দিকে ঝুঁকে থাকায় কাজের পরিবেশ ছিল না। 

দক্ষিণ ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বালাসাহেবের দলের আন্দোলন, সেটির প্রকাশ‍্য  সমালোচনা  তাঁর সতীর্থ লক্ষণ কখনও করেননি। এমনকি, কোন কার্টুনও আঁকেননি।
মাঝে মাঝে অবশ‍্য বলেছেন, ও কি পাগল হয়ে গেল ? 
 অথবা, এতটা বাড়াবাড়ির কোন দরকার ছিল না। 
কিন্তু বন্ধুর রাজনৈতিক বাধ‍্যবাধকতা ভেবে বিষয়টা নিয়ে সোচ্চার হননি। 

 হয়ত, নীরব থাকাও একরকমের প্রতিবাদ। " 

 বলেছেন কমলা লক্ষণ।  আর. কে. লক্ষণের স্ত্রী। 

মৃত্যুর দুদিন আগেও বালাসাহেব ঠাকরের সঙ্গে ফোনে কথা হয় লক্ষণের স্ত্রীর। 
" আমি প্রস্থানের পথে। "  বালাসাহেব জানিয়েছিলেন তাঁকে। 
বালাসাহেব ঠাকরে ও আর. কে লক্ষণ প্রয়াত হন যথাক্রমে ২০১২  ও ২০১৫ সালে। 

.............................................................................

"  আমি একজন কার্টুনিস্ট। সকলে খবর পড়ে আর আমি খবরের ভিতরে থাকে যে খবরটা, তা দেখতে পাই।" 
পৃথীশ নন্দীকে দেওয়া একটি টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি। 

" মানুষ আমার হুলটাকে নিয়েই ব‍্যতিব‍্যস্ত। কিন্তু আমি যে মধুটা তৈরী করি, সেটার আস্বাদ পায় খুব কম লোক।" 
 ছদ্ম আক্ষেপ করে বলেছিলেন বালাসাহেব। 

 বালাসাহেব ঠাকরের নির্বাচিত কার্টুন সংকলন  "ফটকারে" ( কশাঘাত )  প্রকাশিত হয়েছিল ২০১২  সালের অক্টোবর মাসে। ১৯৪৭  থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত তাঁর  ব‍্যঙ্গের অভিব‍্যক্তি যে  মারাঠি মানুষকে আলোড়িত করেছিল, তাঁর প্রত‍্যক্ষ প্রমাণ এই বইটি। 
চার্চিল, স্ট‍্যালিন, টিটো, নাসের, মাও সে তুং থেকে নেহরু, ইন্দিরা, মহারাষ্ট্রের নানা রাজনৈতিক কুশীলবদের নানা কান্ডকারখানার তীর্যক অবলোকন রয়েছে এই কার্টুনের বইটিতে। 

পোস্ট  ;  ঋতুপর্ণ বসু
কৃতজ্ঞতা ;  প্রসন্ন মাঙ্গরুলকর

তথ‍্যসূত্র; 

The Sena Story by Vaibhav Purandare (Business Publications Incorporated)

 Marathi Manoos by Sujata Anandan  (Harpercollins)

 The Emergence of Regionalism in Mumbai: History of the Shiv Sena by Sudha Gogate (Popular Prakashan Private Limited )

মঙ্গলবার, ১১ মে, ২০২১

রেড ভলান্টিয়ার্স ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

১৯৪২ সালে ঘূর্ণিঝড়ে বিধস্ত মানুষদের ত্রাণ দেওয়ার লক্ষ্যে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে পার্টির ডাকে গড়ে ওঠে পিপলস্‌ সাইক্লোন রিলিফ কমিটি। ১৯৪৩ সালের বন্যা ও দুর্ভিক্ষে ত্রাণ দেওয়ার লক্ষ্যে পার্টির ডাকে আবার গড়ে ওঠে "পিপলস ফ্লাড রিলিফ কমিটি"। প্রথম কমিটিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হন কৃষকসভা,শ্রমিক সংগঠণ, ছাত্র -শিক্ষকরা, দ্বিতীয়টিতে যুক্ত হন মেডিক্যাল ছাত্ররা। 

১৯৪৫ সালের ১লা মে থেকে পি আর সি দপ্তরের বহির্বিভাগে প্রথমে বিনামূল্যে রোগী দেখা শুরু হলো। পরে ২আনা করে ফি ধার্য হয়। বহু স্বনামধন্য চিকিৎসকরা এই অভিযানে এগিয়ে আসেন। ওই বছরই শুরু হয় অ্যাম্বুল্যান্স বাহিনী। ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে দাঙ্গার কারণে বহু মানুষ ঘরছাড়া হলে তাঁদের পুনর্বাসন দেওয়ার কাজও শুরু হয় পি আর সি-র উদ্যোগে। 

এর পরে বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় সীমান্ত এলাকায় পিআরসি এর উদ্যোগ্যে স্বাস্থ্যশিবির খোলা হয় শরণার্থীদের জন্য। পার্টির ডাকে বহু চিকিৎসক যোগ দেন। দুটি উল্লেখযোগ্য নাম সূর্যকান্ত মিশ্র ও লক্ষ্মী সায়গল।

সারা পৃথিবীর সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টি নিজ নিজ দেশে নিজস্ব ঢঙ্গে পথ চলার সময় প্রেরণার উৎস হিসেবে ১৮৭১ সালে পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, শিশু রাষ্ট্র পারি কমিউনকে স্মরণ করে এসেছে। এই কমিউনকে  প্রতিবিপ্লবী আক্রমণকারী বুর্জোয়াদের (যাদের ঘাঁটি ছিল ভার্সাই) আক্রমণ থেকে বাঁচাতে প্যারিসের অলিগলিতে, পাড়ায় মহল্লায় গড়ে উঠেছিল জনগণের সশস্ত্র বাহিনী। নারী কমুনার্ডরা প্রথমদিকে আহতদের সেবা, এম্বুলেন্স সার্ভিস, কমিউনিটি ক্যান্টিন চালানো এই সব কাজে নিযুক্ত থাকেন,গড়ে ওঠে Union des Femmes pour la Defense de Paris et les Soins aux Blesses (দি ইউনিয়ন অফ উইমেন ফর দ্যা ডিফেন্স অফ প্যারিস এন্ড এইড টু দ্যা উন্ডেড)। 

সেই সময় থেকে পিপলস রিফিল কম্যুনিস্টদের কাছে একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে গণ্য। আর পাঁচটি এনজিও বা এফবিও এর সাথে এই রাজনৈতিক কর্মসূচির তফাৎ কোথায় সেটা বুঝতে গেলে ১৯৪৩ সালের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির একটি পার্টি চিঠির অংশ উদ্ধৃত করা হল। শিরোনাম ছিল - - - "মহামারীর হাত হইতে বাংলাকে বাঁচাও/মেডিক্যাল স্কোয়াড গঠন কর" (বানান অপরিবর্তিত) 

(১) সহরে সহরে সভা ও শোভাযাত্রা করিয়া জনগনের মধ্যে মহামারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াইবার বানী প্রচার কর। গভর্নমেন্ট যাহাতে আরও ঔষধ পত্রের ও চিকিৎসা কেন্দ্রের ব্যবস্থা করে তাহার দাবী জানাও এবং গভর্নমেন্ট ও মিলিটারী যেখানে সাহায্য দান করিতেছে তাহার সঙ্গে সহযোগিতা করিবার জন্য জনগনকে উদ্বুদ্ধ কর।
আমলাতন্ত্রের অব্যবস্থাই প্রধানত: দুর্ভিক্ষ ও মহামারী সৃষ্টি করিয়াছে। সেই মহামারী রোধ করিবার জন্য আমলাতন্ত্রই আজ আবার কাজ করিতে বাধ্য হইতেছে। ইহা আমলাতন্ত্রের পরাজয়ের নিদর্শন। সেই জন্য সেই কাজে সহযোগিতা করিলে আমলাতন্ত্রকে সাহায্য করা হয় না। ইহাতে আমলাতন্ত্রের পরাজয়কেই সাহায্য করা হয় এবং জনগনও রক্ষা পায়। 
(২) সমস্ত শ্রেণীর, সমস্ত দলের লোকের নিকট এই কাজে সাহায্যের জন্য আবেদন জানাও।
(এখানে কংগ্রেস, লীগ এবং হিন্দু মহাসভার নেতা, কর্মীদের কী আহ্বান জানাতে হবে, তার বিবরণ ছিল। উল্লেখ করলাম না। বড় হয়ে যাবে বলে।)
আমাদের প্রধান শ্লোগান হইবে মহামারীর হাত হইতে জনগনকে রক্ষা করিবার জন্য সকল দলের ঐক্য চাই। 
(৩) ঔষধের চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত সৃষ্টি কর।
(৪) ডাক্তার ও মেডিক্যাল ছাত্রদের মহামারীর বিরুদ্ধে উদ্বুদ্ধ কর।

"মেডিক্যাল স্কোয়াড গঠন কর"
------------------------------------------------
(১) স্থানীয় এক এক জন ডাক্তারকে রাজী করাইতে হইবে যিনি স্কোয়াডের নেতা হইবেন। পার্টির আর তিন চার জন স্বাস্থ্যবান কর্মীকে শিক্ষা দেওয়া হইবে।
(২) স্কোয়াডগুলি পার্টি কর্মীদের চিকিৎসার কাজ প্রথম আরম্ভ করিবে। মনে রাখা দরকার যে, পার্টি কর্মীরাই যদি রোগে ভুগতে থাকে কিংবা মারা যায়, তাহা হইলে মহামারীর বিরুদ্ধে কোন লড়াই হইবে না, বরঞ্চ মহামারীই পার্টিকে গ্রাস করিবে।
(৩) এই সব স্কোয়াডের কর্মীদের অত্যন্ত সংযত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যাপন করিতে হইবে। স্কোয়াডগুলি রিলিফ কমিটির কাজ করিবে বটে, কিন্তু সবাই বুঝিতে পারিবে যে, এগুলি কম্যুনিস্ট পার্টির স্কোয়াড।

"হুঁশিয়ার! এ-সব কাজ করিও না।"
-------------------------------------------------
(১)অনর্থক রাজনৈতিক বাগ বিতন্ডা সৃষ্টি করিও না।.... আবার স্কোয়াডগুলি যে রাজনৈতিক আলোচনা করিবে না---তাহাও নয়। স্থান, কাল পাত্র বুঝিয়া রাজনৈতিক আলোচনা করিতে হইবে।
(২) কাজে, কর্মে, আলাপে পার্টিগত সংকীর্ণতার পরিচয় দিও না কিংবা পার্টি লইয়া বড়াই করিও না।
(৩) আড্ডা দিয়া সময় নষ্ট করিও না।
(৪)স্থানীয় পার্টি ইউনিটের উপর মাতববরি করিও না।

ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি এই পিপলস রিলিফ কাজের একটি বিরাট ঐতিহ্যবাহী লিগ্যাসি পরম্পরা বহন করে। ১৯৪৩ এর কমিটির স্বেচ্ছাসেবক থেকে আজকের রেড ভলান্টিয়ার - সবাই জনগণের পাশে তাদের সীমিত ক্ষমতা নিয়ে দাঁড়ান ত্রানকাজে এটা জেনেই যে তাদের পরিষেবা দেওয়ার ক্ষমতা অপ্রতুল। তবুও জনগণের বিপদের সময় ঘরে বসে  বিবৃতি না দিয়ে (সেই সময় ফেসবুক ছিল না) তারা জীবন তুচ্ছ করে রাস্তায় নেমেছিলেন এটাই বোঝাতে যে ভূস্বামী-পুঁজিপতিদের পরিচালিত সরকার ও তার আমলাতন্ত্র মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বারবার ব্যর্থ। কারণ তাদের শ্রেণী চরিত্রই এই ব্যর্থতার মূলে। 

তাই আজ ২০২১ সালে অক্সিজেন এর কালোবাজারি হয় দেশ জুড়ে, যার পয়সার জোর আছে সে কিছুটা সেবা কিনতে পায়, যার নেই সে পথে বসে মরে। শত বিজ্ঞানীর সাধনার ফল ভ্যাকসিন শেষ পর্যন্ত মুনাফা কামানোর একটি হাতিয়ার মাত্রে পরিণত হয়। এই সবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্যই রাস্তায় নামা রেড ভলান্টিয়ারদের। পাঁচ বছর বাদে ভোটের সময় কে এই সেবা কাজের কথা মনে রেখে কাস্তে-হাতুড়িতে বোতাম টিপবে সে জন্য "জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য" মনোভাব নিয়ে রেড ভলান্টিয়াররা রাস্তায় নামছে না। বামপন্থায় আস্থা রাখা প্রতিটি মানুষের কাছে আবেদন এদের উৎসাহ দিন - এরা আমার আপনার ঘরের ছেলেমেয়ে। এরা পারি কমিউন এর সেই অসীম সাহসী কমুনার্ডদের উত্তরাধিকারী। এদের সবাইকে লাল সেলাম।

[পার্টি চিঠির জন্য কৃতজ্ঞতা: কমরেড ডা: Avijit Dasgupta  ও।সাংবাদিক চন্দন দাস]

#RedVolunteers 

নির্বাচনের খরচ খরচা ~ সুশোভন পাত্র

- মিনিমাম ৪০-৪৫ লাখ খরচা করার ক্ষমতা না থাকলে ইউটিউবে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন দেবেন না। লাভ নেই! আর এই বাজেটেও আপনার বিজ্ঞাপন ৪.৫ মিলিয়নের বেশি ইউনিক ইউজারের কাছে পৌঁছাবে না, ২০ মিলিয়নের বেশি টোটাল ভিউ হবে না। সার্ভিস ক্লসের জন্য আমি বলতে পারবো না যে তৃণমূল-বিজেপি ইউটিউবের বিজ্ঞাপনে কত টাকা খরচা করছে। শুনলে আপনাদের মাথায় হাত পড়ে যাবে!       

ফোনের অপর প্রান্তে যিনি কথাগুলো বলছিলেন তিনি আমাদের দেশের গুগলের পলিটিক্যাল বিজ্ঞাপনের মার্কেটিং হেড। ইউটিউবে তৃণমূল-বিজেপির বিজ্ঞাপনের বাজেট সম্পর্কে প্রাথমিক একটা ধারণা করতে চাইলে শুনুন, নির্বাচনী প্রচারের মোটামুটি ৫০ দিনে আপনি যদি ইউটিউব সার্ফ করে কমপক্ষে ৫০ বার তৃণমূল-বিজেপির বিজ্ঞাপন দেখেছেন তাহলে বাজেটটা ৫ কোটি। আর দিনে ২ বার করে গড়ে ১০০ বার দেখে থাকলে ১০ কোটি। 

- ২০ হাজার সেকেন্ড বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের FM চ্যানেলের কোটেশন হল ২০ লাখ! 

ফোনের অপর প্রান্তে যিনি কথা গুলো বলছিলেন তিনি কলকাতার জনপ্রিয় FM চ্যানেলের মার্কেটিং টিমের কর্মী। মানে একটা FM চ্যানেলে, আপনার একটা ২০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন, নির্বাচনী প্রচারের ৫০ দিন, সকাল ৭ থেকে রাত ১২টা, মোট ৮৫০ ঘণ্টায়, গড়ে ১ বার করে প্রায় ১০০০ বার চললে, খরচা ২০ লাখ। ৫টা FM চ্যানেলে হলে ১কোটি। যারা শহর বা শহরতলি তে FM শোনেন, তারা জানেন নির্বাচনী প্রচারের ৫০ দিনে যে কোনও FM চ্যানেলে ঘণ্টায় ১০ বার তৃণমূল-বিজেপির বিজ্ঞাপন শোনাটা জাস্ট জল ভাত! 

KMC-র ওয়েবসাইট ঘাঁটলে দেখবেন ৮০০ sq ft পর্যন্ত কলকাতা শহরে হোর্ডিং বিজ্ঞাপনের ট্যাক্স, লোকেশন অনুযায়ী ১.৮-৩ লাখের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আচ্ছা নির্বাচনী প্রচারের সময় শহর কলকাতা তে তৃণমূল-বিজেপির বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং-র সংখ্যা কত ছিল? ৫০০ ধরলে খরচাটা ১০ কোটি। ১০০০ ধরলে ২০ কোটি।  

এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের তথ্য অনুসারে স্রেফ মার্চ মাসে দিল্লির রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে কলকাতা বিমানবন্দরে নেমেছে প্রায় ১৫০টি চার্টার্ড বিমান। কত খরচা হয় দিল্লি থেকে কলকাতার চার্টার্ড বিমান সার্ভিসে? আনুমানিক ১২ লাখ। আর এই যে ভোটের মরশুমে বাংলার আকাশে কাক-চিলের মত দাপিয়ে বেড়াল হেলিকপ্টার! তার খরচা? ১.৫লাখ/ঘণ্টা। 

না ঘাবড়াবেন না। তৃণমূল-বিজেপির নির্বাচনী খরচা সম্পর্কে এই অবধি আপনি যা শুনলেন, সেগুলো জাস্ট টিপ অফ দ্য আইসবার্গ। এর মধ্যে টিভি, প্রিন্ট-মিডিয়া, অন্য ডিজিটাল স্পেস, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের কথা উল্লেখই নেই। আই-প্যাক কিম্বা অ্যাসোসিয়েশেন অফ বিলিয়ন মাইন্ডস-এর মতো বিভিন্ন পেশাদারী সংস্থার খরচার উল্লেখ নেই। প্রার্থীদের নিজের বিধানসভা কেন্দ্রের কোন খরচা উল্লেখ নেই। আন্ডার দা টেবিল কোনও খরচার উল্লেখ নেই। কেন্দ্রীয় ভাবে তৃণমূল-বিজেপির মতো রাজনৈতিক দলগুলির খরচার উল্লেখ নেই। আসলে সব মিলিয়ে বাংলার সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে তৃণমূল-বিজেপি ঠিক কত টাকা খরচা করছে, তার কোন হিসেবই নেই! 

কোথা থেকে আসছে এতো টাকা? বিজেপির না হয় ইলেক্টোরাল বন্ড? PM Cares? কিন্তু 'লেসার ইভিল' তৃণমূলের? বালি খাদানের মাফিয়া রাজ? কয়লার কালো বাজারি? না গরু পাচারের সিন্ডিকেট? আচ্ছা বুকে হাত রেখে বলুন তো, নির্বাচনের পর বহু রাজনৈতিক পণ্ডিতরা তো ফেসবুকে, মিডিয়ার প্রাইম-টাইমে সিপিএম-র পিণ্ডি দান করছেন, তাঁদের কাউকে তৃণমূল-বিজেপির এই বিপুল নির্বাচনী খরচার স্বচ্ছ হিসেব চাইতে দেখেছেন? যে 'নো ভোট টু ওয়ালারা' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে ক্লাসিক্যাল বামপন্থী  'ক্লাস ক্যারেক্টারের' রিফ্লেকশন দেখতে পান তারা কি এই ব্যায়ের হিসেব চাইতে পারবেন? আছে হিম্মত?  
কী বলছেন? অ্যাপোলোজেটিক? আজ্ঞে না! শুষ্ক সিম্প্যাথির জন্য এসব বলছি? আজ্ঞে না! সিপিএম-এর টাকা নেই তাই হেরে যাচ্ছে টাকা থাকলে জিতে যেত, এটা বলতে চাইছি? আজ্ঞে না। বরং আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাইছি, কেবল নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর নয়, সিপিএম দীর্ঘদিনই সংসদীয় রাজনীতিতে নির্বাচনী অ্যায়-ব্যায়ের এই পক্ষপাতদুষ্ট বিষয়টির বিরুদ্ধে লড়ছে, অন অ্যান্ড অফ দি ফিল্ড। ঠিকই, লড়ে হারছে, হোঁচট খাচ্ছে, আঘাত পাচ্ছে, শিখছে; কিন্তু তারপর, আবার লড়ছে। অ্যাটলিস্ট গ্যালারি তে বসে 'লেসার ইভিল'এর নামে লেজুড় বৃত্তি করছে না!

'লেসার ইভিল'এর তাত্ত্বিকদের অবগতির জয় জানাই, বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এন.ডি.এ সরকার ক্ষমতায় এসেই, 'ন্যাশনাল এজেন্ডা ফর গভর্ণেন্স'র ২২নং অনুচ্ছেদে, 'গোস্বামী কমিটির' সুপারিশের ভিত্তিতে এই নির্বাচনী ব্যবস্থা কে দুর্নীতি এবং অপকর্ম মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রবীণ সাংসদ ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত'র নেতৃত্বে, সোমনাথ চ্যাটার্জি, মনমোহন সিং-দের নিয়ে গঠিত হয়েছিল সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি। 

সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক শেষে; মেম্বারশিপ ফিজ ছাড়া পার্টি ফান্ডে সমস্ত প্রাইভেট অনুদান বন্ধ, শুধুমাত্র সরকারি বরাদ্দ থেকেই রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী তহবিল গঠনের আইনানুগ বাধ্যবাধকতা, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের রাজ্য শাখায় নির্দিষ্ট এবং সমান ভর্তুকি প্রদানসহ একগুচ্ছ প্রস্তাবের পাশাপাশি কমিটি সেই রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছিল, ভবিষ্যতে সরকারি বরাদ্দের মধ্যেই সম্পূর্ণ নির্বাচনী ব্যবস্থা কে সীমায়িত করা না গেলে এই দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়। 

খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন, সেদিনও সিপিএম সহ বামপন্থী দলগুলি ছাড়া পার্টি ফান্ডে কর্পোরেট ডোনেশেন বন্ধের প্রস্তাব সমর্থন করেনি কেউ। বিজেপি-কংগ্রেস তো বটেই, এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খোদ নিজেও। স্বাধীন ভারতের অন্য অনেক কমিটি আর কমিশনের পাতা জোড়া রিপোর্টের মতোই, ঐ রিপোর্টেরও জায়গা হয়েছে ডাস্টবিনেই।

আর আপনার যারা কেউ কেউ সিপিএম-এর রোগ সারানোর জন্য মিডিয়া কিম্বা ফেসবুকে ফুটেজ খাচ্ছেন, দশ-বারো দফা প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছেন; যারা ঠাট্টা করছেন, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন, খিল্লি করছেন, খিস্তি করছেন, অলঙ্করণে ব্যক্তি আক্রমণ করছেন, তরুণ তুর্কি থেকে সো-কলড 'পক্বকেশ', পলিটব্যুরো থেকে সিপিএম দরদী শিল্পী-সাহিত্যিক এমনকি লেনিন-স্তালিন কাউকেই বাদ দিচ্ছেন না; তাদের সকলের সমালোচনা কে স্বাগত জানিয়েই মনে করিয়ে দিই, আপনারা সিপিএম-এর লড়াইটা যতটা সহজ ভাবছেন, যতটা লিনিয়ার ভাবছেন ঠিক ততটা নয়! রাজনৈতিক নাবালকত্ব কাটলে নিশ্চয় বুঝবেন! 

ধৈর্য্য ধরুন। যদি মনে হচ্ছে বহু ধৈর্য্য আপনি ধরে নিয়েছেন এবার অধৈর্য্য হওয়াই আপনার পবিত্র কর্তব্য পারলে তাহলে একটু ইতিহাস পড়ুন। দেখবেন, ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ ৫০ বছরের রক্ত-ঘাম-অশ্রু-আত্মত্যাগের বিশাল ইতিহাস। সেই ইতিহাসের প্রতি বাঁক বামপন্থীদের জন্য সুখের ছিল কি? ২০০৯-২০২১ যে প্রবল আক্রমণ ও সন্ত্রাসের মুখে সিপিএমের অসংখ্য কর্মী সমর্থকদের এ রাজ্যে পড়তে হয়েছে ভূ-ভারতে জ্ঞানত তার কোন তুলনা আপনারা দিতে পারেন কি?

সিপিএম-এর নিশ্চই দুর্বলতা আছে, সাংগঠনিক ও কৌশলগত ত্রুটিও আছে। নির্বাচনী পরাজয়ে তার মুখ্য দায়ও আছে। কিন্তু সার্বিক ভাবে সেই সমস্যার বিশ্লেষণ করা, সমাধান খোঁজা এবং প্রয়োগের কাজ ধারাবাহিক ও জটিল। আপনি যদি বামপন্থীদের নির্বাচনী পরাজয়ের সমব্যথী হন তাহলে নির্বাচনী পরাজয়ের পর সমস্যা গুলো সিপিএম নেতৃত্বের বা সদস্যদের উপর চাপিয়ে না দিয়ে বরং আসুন সেই ধারাবাহিক ও জটিল প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করুন। খামকা ফেসবুকে কিম্বা মিডিয়া তে টেনিদা সেজে হতাশার চাষ করবেন না।  

হতাশ লাগলে একঝাঁক বামপন্থী তরুণ তুর্কি প্রার্থীর কথা ভাবুন, যারা এই ভোগবাদী সমাজের মধ্যে থেকেই পার্টির জন্য নিজেদের কেরিয়ার বিসর্জন দিয়ে এই কঠিন লড়াইর ব্যাটন তুলে নিয়েছে। হতাশ লাগলে লকডাউনের সময়, অনলাইন জনস্বাস্থ্য, পরিযায়ী শ্রমিকদের সাহায্য, শ্রমজীবী ক্যান্টিন, বিনামূল্যে বাজার, আম্ফানের ত্রাণ -রাজ্যের প্রতি কোণাতে বামপন্থীদের মানবিক উদ্যোগে যে অসংখ্য নতুন মুখের ভিড় এসেছে তাঁদের কথা ভাবুন। হতাশ লাগলে, এই কোভিড সংক্রমণের বারুদ স্তূপে বসে যে হাজার হাজার বামপন্থী ছেলে মেয়ে রেড ভলান্টিয়ার্সের কাজ করছেন তাঁদের কথা ভাবুন। বামপন্থী কর্মী-সমর্থক-দরদী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন তো, তাহলে শৃঙ্খলাটা শিখুন। সদস্য নাই বা হলেন। 
আসল কী জানেন, কমিউনিস্ট পার্টি তো। সদস্য হয়ে কেউ শৃঙ্খলা শেখে না। শৃঙ্খলা শেখে বলেই সদস্য হয়।


বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১

শঙ্খ ঘোষের একটি বক্তৃতা ~ সংকলন সরকার

"অন্ধের স্পর্শের মতো" কবি শঙ্খ ঘোষের একটি বক্তৃতা। প্রণবেশ সেন স্মৃতি রক্ষা কমিটির অনুরোধে শঙ্খ বাবু এই ভাষ্যটি রাখেন এবং ভাষ্যটির অডিও রেকর্ড করে রাখা ছিলো। পরে সেই অডিও রেকর্ড থেকে 'গাঙচিল' প্রকাশনার তরফে ভাষণটি মুদ্রিত করে একটি চটি বই প্রকাশ করা হয়। আমি সেই স্মারক বক্তৃতাটিকে এখানে তুলে ধরলাম। যদিও গড়পড়তা ফেসবুকের পোস্ট আন্দাজে এইটি বেশ খানিকটা বড় পোস্ট...  যাঁরা ইতিপূর্বে পড়েননি তাঁরা সংগ্রহে রাখতে পারেন। 

অন্ধের স্পর্শের মতো 
সম্প্রচারের ভাষা
প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা ২০০৭
শঙ্খ ঘোষ

'ভালো করে কথা ভাবা এখন কঠিন'

অভ্যাগত সবাইকে আমার নমস্কার জানাই। প্রণবেশ সেনের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাই।

এখানে যে বলা হলাে, এ বছরের স্মারক বক্তৃতা দিতে আমি রাজি হয়েছি, তা ঠিক। কিন্তু সাত দিন আগে পর্যন্তও চেষ্টা করেছিলাম যে, যদি কোনােরকমে এটা বন্ধ করে দেওয়া যায়।

এগুলাে আমি এমনিতেই পারি না। আর তাছাড়া, এই সময়টা! এমন একটা সময়ে এসে পৌছেছি আমরা— জীবনানন্দের কবিতার লাইন মনে পড়ে, 'ভালাে করে কথা ভাবা এখন কঠিন'!

কিন্তু বলতে তবু হবে। তার কারণ ইতিমধ্যেই আমার শেষ মিনতি জানাবার আগেই ছাপা চিঠি নানা জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছেন ভবেশ।

তাঁকে তখন জানাতেও পারিনি যে কী বিষয়ে বলব। এখন যেটা বলা হলাে ('সংযােগের ভাষা') দিনতিনেক আগে কাউকে বলেছি এ-রকম একটা নাম। নাম না, বিষয়। ঘণ্টাখানেক আগে আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করছিলেন, কী বিষয়ে বলব। লিখে এনেছি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাকে যে বিষয়টা বলতে পেরেছি, তা নয়। একথাগুলাে বলে নিচ্ছি এইজন্যে যে একটু এলােমেলাে কথা হয়তাে থাকবে, লিখে আনা সত্ত্বেও।

ভবেশ আরাে আমাকে বলেছেন যে, এক ঘণ্টা বলতে হবে। সেটা আমার পক্ষে একটু শক্ত হলেও ওটা নিয়ে ভাবছি না, ভাবছি আপনাদের কথা। এই সময়টা আপনাদের একটু সহ্য করতে হবে।

 
এই লেখার প্রথম দিকের কয়েকটা লাইন, পাঁচছটা লাইন, ছেড়ে দিলে, এর আছে পাঁচটা অংশ। অংশগুলি আপনারা বুঝতে পারবেন, সেটা আমি বলে দেব। লেখার একটা নাম আছে। নাম: 'অন্ধের স্পর্শের মতাে'।

জীবনের শেষ কয়েকটা বছর চোখে দেখতে পেতেন না আমার বাবা। বই পড়তে ভালােবাসতেন, কিন্তু পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ভালােবাসতেন কথা বলতে। কিন্তু কথাও কিছুটা থমকে গেল। অভ্যাগতেরা কেউ দরজায় এসে দাঁড়ালে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করতেন: 'কে?' নাম শুনে কই, হাতটা দেখি' বলে বাড়িয়ে দিতেন হাত। তারপর সেই অভ্যাগতের হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকতেন চুপ করে। কথা কখনাে হতাে, কখনাে হতাে না। কিন্তু হাতের ওই জড়িয়ে-থাকাটুকু ছিলই।

০১.

কারাে সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, আমরা চাই যে সেই কথাটা সে বুঝুক; আমার ভাবনাটা বা দৃষ্টিভঙ্গিটা তার কাছে গিয়ে পৌছক। এইরকমই হবার কথা। কিন্তু সবসময়েই কি সে-রকম চাই আমরা? বা, প্রশ্নটাকে অন্যভাবেও সাজানাে যায়: জ্ঞাতসারে তেমনটা চাইলেও, অজ্ঞাতেও কি সেইরকমই চাই সবসময়ে ? সে বুঝুক, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে এটা অবশ্য চাই। কিন্তু কী বুঝুক? আমার কথাটা? ভাবনাটা? না কি অনেকসময়ে এইটে: আমি-যে ভাবতে পারি, সেই ক্ষমতাটা? কিংবা অনেকসময়ে, তারও চেয়ে একটু এগিয়ে, ভাবতে পারি বা না পারি, আমি যে আমি, সেই অবস্থানটা? কথা বলা একটা সংযােগ। কিন্তু ওইসব সময়ে, ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় কেবলমাত্র অ-যােগ নয়— সেটা সমূহ বি-যােগেও গিয়ে পৌছতে পারে।

এসব নিয়ে অল্পসময়ের জন্য একটু ভাবতে হয়েছিল একবার, প্রায় চল্লিশ বছর আগে, আকাশবাণী-গত একটা অভিজ্ঞতার ফলে। সেখান থেকে একটা ডাক এসেছিল অলােকরঞ্জন দাশগুপ্তের আর আমার, বলবার মতাে একটা কাজ পাওয়া গিয়েছিল কয়েক সপ্তাহের জন্য। সন্ধেবেলায়, সংবাদ আর স্থানীয় সংবাদের মধ্যবর্তী পাঁচ মিনিটের বিরতিপর্বে, একটা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হয়েছিল 'সমীক্ষা' নামে। সেই সমীক্ষায় আমাদের উপর দায়িত্ব বর্তেছিল সাহিত্যসংস্কৃতি নিয়ে কিছু বলবার। সংবাদ-স্থানীয়সংবাদের মাঝখানে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে সাহিত্যের কোনাে প্রসঙ্গে কী করে কথা বলব, কী কথাই-বা বলব, অল্পবয়সের উত্তেজনায় সেসব দুরূহ সমস্যা নিয়ে কিছু ভাবিইনি আমরা। সাগ্রহেই, সপ্তাহে একদিন করে, বলেছিলাম কিছু কথা।

 

কিন্তু শ্রোতাদের কেমন লাগছিল সেটা? নিকটবন্ধুদের প্রশ্রয়ে আমরা অবশ্য তৃপ্তই ছিলাম, কিন্তু সে-তৃপ্তিতে ধ্বস নামল একদিন। অলােকরঞ্জনের মা, আমাদের মাসিমা, দুঃখের স্বরে একদিন বললেন আমাকে: অলােক বলে শক্ত শক্ত শব্দ আর তুমি সহজ সহজ, কিন্তু তােমাদের কারাে কথাই যে বুঝতে পারে না কেউ! চমক লাগল শুনে। বুঝতে পারে না? তাহলে বলছি কেন? এ-প্রশ্নের পরেই মনে হলাে: কারা বুঝতে পারে না? মাসিমার কাছে কারা এই অভিযােগ জানিয়েছে? খেয়াল হলাে তখন: সংবাদ আর স্থানীয় সংবাদ শােনেন যে অসংখ্য মানুষজন, সাহিত্য-বিষয়ে যাঁদের মধ্যে অনেকেরই কোনাে স্বতন্ত্র আকাঙক্ষা বা অধিকার নেই, তাদের আকাঙক্ষা জাগাবার মতাে কোনাে ভাষা বা রীতি কি আমরা ব্যবহার করতে পারছি? সাহিত্য-বিষয়ে অভিজ্ঞ যারা এবং সে-বিষয়ে যাঁরা অনভিজ্ঞ, একইসঙ্গে এই দু-রকমের শ্রোতার কাছে পৌছবার কোনাে পথের কথা কি আমরা ভেবে নিয়েছি? অর্থাৎ এ-লেখার সূচনায় যে-প্রশ্নগুলি তুলেছিলাম, তার সঙ্গে এখানে জুড়ে যায় আরাে কিছু প্রশ্ন: ভেবেছি কি কার সঙ্গে কথা বলছি আমরা, বা কাদের সঙ্গে? কথাটা পৌছে দিতে চাইছি ঠিক কাদের কাছে?

না, শুধু এইটুকুই নয়, প্রশ্ন ওঠে আরাে। শ্রোতাচরিত্রের কথা ছেড়ে দিলেও, যিনি বলছেন, তার অবস্থানটা ঠিক কী? তিনি কি সামনাসামনি একজনের সঙ্গে কথা বলছেন? তিনি কি সামনাসামনি অনেকের সঙ্গে কথা বলছেন? তিনি কি মঞ্চগত দূরত্ব থেকে বলছেন? কিংবা, শ্রোতা বা দর্শক যেখানে অদৃশ্য, সেই দূরদর্শনে বলছেন নিজে দৃশ্যমান থেকে? না কি রাজা নাটকের রাজার মতাে স্বরমাত্র হয়ে ভেসে থাকছেন আকাশবাণীতে? এর প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রোতা আর বক্তার সম্পর্কের মধ্যে একটা বদল ঘটে যায়, আর সেই অনুযায়ী স্থির করে নিতে হয় ভাষা। এমনকী, কখনাে কখনাে হয়তাে, সেই অনুযায়ী স্থির করে নিতে হয়। বিষয়ও। এসব কথা সেদিন আমরা অন্তত আমি ভেবে নিয়েছিলাম বলে মনে পড়ে না। অত্যুৎসাহে আমরা কেবল আমাদের জানা-বােঝাটাকেই প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম সেইভাবে, যেভাবে আমরা লিখি, যে-লেখার সামনে কোনাে শ্রোতা নেই, আছে পাঠক। পাঠকের জন্য উদ্দিষ্ট লেখা শ্রোতারও কাছে পৌছবে কীভাবে, সেটা তেমন করে ভাবিনি বলেই মাসিমাকে সকাতরে বলতে হয়: তােমাদের কারাে কথাই যে বুঝতে পারে না কেউ!

 

ধরা যাক আমি কথা বলছি কবিতা আর সমসময়ের সম্পর্ক নিয়ে। কোনাে আনুমানিক ব্যাপার নয় এটা, একদিনের সমীক্ষার বিষয় হিসেবে এটাই ছিল একবার আমার নির্বাচন। পাঁচ মিনিটের অবকাশে সেদিনকার কথিকায় শেষ অনুচ্ছেদটি এবং তার পূর্ববর্তী একটি বাক্য ছিল এইরকম:

কেবল ঐতিহ্য নয়, তখন তিনি [কবি] চান প্রবহমান বিশ্বকালকে তার মধ্যে বহন করতে, আর এ-দুয়ের নিরন্তর সংঘর্ষ থেকে দেখা দিতে থাকে আজকের দিনের আধুনিকতা।

এইটেই মনে ছিল, যখন জীবনানন্দ বলেছিলেন, কবিতার অস্থির মধ্যে চাই ইতিহাসচেতনা আর তার মর্মে চাই পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান। এই জ্ঞানেই উজ্জয়িনীর সময় মিশে যায় মিশর বা গ্রীসের সঙ্গে, এই চেতনাতেই একনিশ্বাসে বাঁধা পড়ে উর্বশী আর আর্টেমিস। কিন্তু কবি কখনােই ভুলে যান না যে এক হাতে এই দেশনিহিত কাল আর অন্য হাতে দেশােত্তর কাল ধারণ করবার মুহূর্তেও তিনি পা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন অস্থির সমসময়ের সংকটের ওপর। সময়ের এই জটিল প্রত্যাঘাতই কবিতাকে এক মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্তে সঞ্চারিত করে নেয়। 

কথাগুলি লিখবার সময়ে সেদিন নিশ্চয় মনেই রাখিনি যে এটা যারা শুনছেন তাদের অনেকেরই কাছে এর কয়েকটি শব্দ প্রায় ধাঁধার মতাে লাগবে, কেননা তারা অনেকেই আধুনিক কবিতার জগৎটাকে ঠিকমতাে জানেন না। তাই উজ্জয়িনীর সঙ্গে মিশর বা উর্বশীর সঙ্গে আর্টেমিস একসঙ্গে বাঁধা পড়বার কথা কেন এখানে উঠে এল হঠাৎ, জীবনানন্দ বা বিষ্ণু দে-র কবিতা নিয়ে সামান্য একটু বিস্তারে না বললে অনেকেরই কাছে পৌঁছবে না এর কোনাে তাৎপর্য। ফলে গােটা অনুচ্ছেদটাই সেই শ্রোতার কাছে থেকে যাবে অনধিগম্য, প্রায় অর্থহীন। কথাগুলি যদি কেউ পড়েন, তাহলে হয়তাে-বা তিনি সময় পেতে পারেন বুঝে নেবার, বিশ্লেষণ করে নেবার, কিন্তু সেই সময়টা তাে শ্রোতার আয়ত্তে নেই। আমাদের বােঝা উচিত ছিল যে অলক্ষ্য এবং অসংখ্য সেইসব শ্রোতার জন্য চাই ভিন্ন একটা ভাষা। ব্যক্তিগত জানার অভিমানে সেকথাটা সর্বতােভাবে আমরা ভাবিনি সেদিন।

কিন্তু আরাে একটা প্রশ্ন আছে এখানে, মাসিমা যখন দুঃখটা জানিয়েছিলেন, তখন কি পুরােপুরি ব্যর্থতারই বােধ জেগেছিল মনে? না কি সেইসঙ্গে গােপন একটা অহমিকাও লালিত হচ্ছিল সেখানে? এই অহমিকা, যে, আমি এমন-কিছু বলছি যা অন্যের আয়ত্তের বাইরে। অর্থাৎ, এইখানে আমি পৃথক, এইখানে আমি খানিকটা উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। আর, সেই পৃথক অধিষ্ঠানকে সম্ভ্রম করছে অন্য লােকে। না-বুঝবার সম্ভ্রম । আমার বুঝবার বা জানবার ক্ষমতার প্রতি অন্যের অক্ষমতার সম্ভ্রম । আর এইটেকেই আমি আমার স্বতন্ত্রতা বলে ভাবছি, ভেবে তৃপ্ত হচ্ছি।

 

কিছুদিন আগেকার একটি সংলাপে নােঅম চম্‌স্কি একবার বলেছিলেন, কারাে কাছে চার সিলেবলের কোনাে শব্দ শুনলেও তিনি বুঝে নিতে চান ওটা এক সিলেবলে বলা সম্ভব ছিল কি না। বলেছিলেন যে, বক্তা অনেকসময়ে ভাবেন তার সব কথা যদি বুঝেই ফেলল সবাই তাহলে তিনি আর বিশিষ্ট কিসে? অনেক চেষ্টায় অনেক কষ্টে একটা জিনিস বুঝতে হয়েছে তাকে, অধিগত করতে হয়েছে, আর অন্যেরা সেটা বুঝতে পারছে না, 'and then that becomes the basis for your privilege and your power'। আমরাও কি সেইদিকেই চলে যাচ্ছিলাম? কিংবা, যাচ্ছি আজও?

অনেকেই যে যাচ্ছি, তাতে সন্দেহ নেই। মনীষার নিয়মিত প্রকাশ থাকে, এই শহরেরই এমন একটি পত্রিকায় তার দু-একটি লেখা বুঝতে না পেরে যখন নিজের বােধবুদ্ধির সীমা ভেবে অবসন্ন হয়ে পড়ছি, তখন একদিন হঠাৎ তার ধীসম্পন্ন অভিজ্ঞ সম্পাদকের একটি মন্তব্য পাওয়া গেল। তিনি বিলাপ করছিলেন এই বলে যে সম্প্রতি এমন লেখাও তাকে ছাপতে হচ্ছে যার সবটা তিনি বুঝে উঠতে পারেন না। তখন নিশ্চয় এই প্রশ্ন ওঠে, ওঠা উচিত, যে, তাঁর মতাে ধীমানও যদি বুঝতে না পারেন তাহলে সেটা পৌছচ্ছে কোথায় ? কোন্ দু-চারজনের বৃত্তে আবদ্ধ থেকে আবর্তিত হচ্ছে সেটা? এ-সমস্যাটা যে কেবল এই শহরের তা নয়, পৃথিবীজোড়া এই সমস্যা। চস্কির যে সংলাপের কথা একটু আগেই ছিল, বিশ্বগত এই দুর্লক্ষণটার কথা সেখানে তিনি তুলেছিলেন এইভাবে:

...it's not necessarily a criticism to say that something doesn't make sense: there are subjects that it's hard to talk sensibly about. But if I read, say, Russell, or analytic philosophy, or Wittgenstein and so on, I think I can come to understand what they're saying, and I can see why I think it's wrong, as I often do. But when I read, you know, Derrida, or Lacan, or Althusser,

It's like words passing in front of my eyes: I can't follow the arguments, I don't see the arguments, anything that looks like a description of a fact looks wrong to me. So may be I'm missing a gene or something, its possible. But my honest opinion is, I think it's all fraud. 

চমস্কির এই শেষ লাইনটির সঙ্গে আমরা অনেকেই নিশ্চয় একমত হব না, এমনকী তিনিও হয়তাে এতটা বলে বসেছেন কোনাে সাময়িক উত্তেজনাবশে।(১) কিন্তু এখান থেকে উঠে আসা এই প্রশ্নটা তবু জরুরি যে কীভাবে, কতটা সহজে, কোনাে ভাবনাকে আমরা পৌছে দিতে পারি শ্রোতার কাছে, বা পাঠকের কাছে।

এটা বুঝে নেওয়া খুব জরুরি যে আমরা কী চাই। আমরা-যে জানি, সেই খবরটাই কি জানাতে চাই? না কি আমরা যা বুঝি, সেই বােঝাটাকে বােঝাতে চাই? দ্বিতীয়টাই হবার কথা, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে অনেকসময়েই ঘটে ওঠে না সেটা।

০২.

আমাদের কৈশাের বা যৌবনে যেসব মাস্টারমশাইয়ের কাছে আমরা পড়েছি, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকেই মনে হয় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবার যােগ্য। তাদের মধ্যে বিশেষ একজনের কথা প্রায় প্রতিদিনই মনে পড়ে: তিনি গােপীনাথ ভট্টাচার্য। প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। চালচলনে কথায়বার্তায় ছিল স্থির একটা সমাহিত ভাব। ধীর পায়ে ক্লাসে এসে, নাম ডাকবার পর খাতাখানা বন্ধ করে, টেবিলের ওপর চক দিয়ে আলতাে করে লিখতেন দু-একটা কথা, লিখে মুছে দিতেন, তারপর তাকাতেন আমাদের দিকে, শুরু করতেন পড়ানো। মধ্যবর্তী ওই নিঃশব্দ সময়টায়, আমরা বুঝতে পারতাম, আত্মস্থ হয়ে নিচ্ছেন তিনি, নিজেকে অভিমুখী করে তুলছেন বিশেষ এই ক্লাসটির জন্য।

কেমন ছিল তার পড়াবার ধরণ ? খুব শান্ত আর নীচু গলায় কথা বলে যেতেন তিনি। সে-বলার মধ্যে কোনাে বাগ্মিতা থাকত না, কিন্তু একটা জোর থাকত, প্রবাহ থাকত, আর থাকত সরল একটা কথােপকথনের ভঙ্গি।
 

কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়েছিলেন একদিন। খাতায় নােট নিচ্ছিল যে ছেলেমেয়েরা, একটু অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকিয়েছিল তারা। অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাদের দিকে চোখ রেখে স্মিতভাবে বলেছিলেন তিনি: 'তাহলে আমি কথা বলব কার সঙ্গে? বােঝাব কাকে যদি তােমাদের চোখ থাকে খাতায়? বুঝব কেমন করে যে কথাগুলি পৌছচ্ছে কোথাও? বিষয়টা তাে তােমাদের আমি বােঝাতেই চাইছি? বুঝে নাও যদি, মাথা ঝুঁকিয়ে নােট নেবার তাে আর দরকারই হয় না তবে।'

ছেলেমেয়েরা কতটা মানত তার এই নির্দেশ, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু ওই-যে তিনি সকলের চোখে চোখে তাকিয়ে কথা বলতে চাইতেন, তার মধ্যে ছিল একটা সহজ সংযােগের ব্যাকুলতা। শুকনাে ক্লাসপড়ানাে নয়। যেন সেটা, সে যেন কোনাে-একটা সঞ্চারের সময়। আর এই সঞ্চারটা তিনি ঘটাতে চাইতেন একটা মৃদুতার মধ্য দিয়ে, একটা নিরুত্তেজ শান্ত স্বরের মধ্য দিয়ে। কথা বলবার মতাে করে।

এখানে ওই মাত্রাবােধের সূত্রে। 'তাঁর শাস্তি, তাঁর সত্য, তাঁর পবিত্র মূর্তিখানি নিয়ে সেই মাস্টারমশাই তার ছাত্রের জীবনের মাঝখানটিতে তার নিজের জীবনের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যিনি না ভয় করেন নিন্দাকে, না ক্ষতিকে, না মৃত্যুকে', যিনি তাঁর 'অন্তর্যামীকে দেখতে পেয়েছেন, সেইজন্যে আর কিছুতে ওঁকে ভােলাতে পারে না', ঘরে-বাইরে উপন্যাসের সেই চন্দ্রনাথবাবু তার স্বাভাবিক স্থৈর্যের সঞ্চার করে দিয়েছিলেন ছাত্র নিখিলেশের দৈনন্দিনে। চন্দ্রনাথবাবু ছিলেন, তাই আমি কল্যাণকে এমন সত্য করে এমন প্রত্যক্ষ করে পেয়েছি' বলেছিল নিখিলেশ। শান্তিনিকেতন-ভাষণের ওই 'একটু চুপ করাে, একটু স্থির হও' কথাকটিই যেন বারে বারে রূপায়িত হতে থাকে চন্দ্রনাথবাবুরও কথায় বা নিখিলেশের আচরণে। স্বদেশী আন্দোলনের উত্তেজনার। পক্ষে যখন চড়া ভাষায় সওয়াল করে সন্দীপ, তখন চন্দ্রনাথবাবু একটু হেসে বলেন: ছটফট করতে চান করুন, কিন্তু সেইটেকেই বীরত্ব কিংবা কৃতিত্ব মনে করে নিজেকে বাহবা দেবেন না। পৃথিবীতে যে জাত আপনার জাতকে বাঁচিয়েছে তারা ছটফট করে নি, তার কাজ। করেছে।

এতটা যে তাকে মনে পড়ে সে কেবল এজন্য নয় যে পঠিতব্য বিষয়টাকে খুব ভালােমতাে বােঝাতে পারতেন তিনি। মনে পড়ে এইজন্য যে তার ওই ব্যক্তিত্বের মধ্যে, ব্যক্তিত্বপ্রকাশের প্রকরণের মধ্যে, শান্ত স্থির একটা প্রত্যয়ের বিচ্ছুরণ হতাে। বলা যায়, তার ভিতরকার প্রত্যয়টাই সে-প্রত্যয়ের শক্তিটাই এতটা শান্ত রাখতে পারত তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন ভাষণমালার এক জায়গায় আছে:"আমরা সমস্ত দিন কতরকম করে যে শক্তির অপব্যয় করে চলি তার ঠিকানা নেই— কত বাজে কথায়, কত বাজে কাজে। নিষ্ঠা হঠাৎ স্মরণ করিয়ে দেয়, এই যে-জিনিসটা এমন করে ফেলাছড়া করছ এটার যে খুব প্রয়ােজন আছে। একটু চুপ করাে, একটু স্থির হও, অত বাড়িয়ে বলাে না, অমন মাত্রা ছাড়িয়ে চলাে না।" সেখানে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ: 'সিদ্ধিলাভের কাছাকাছি গেলে প্রেমের সহজ প্রাজ্ঞতা লাভ হয়, তখন মাত্রাবােধ আপনি ঘটে।' আমাদের ওই মাস্টারমশাইয়ের কাছে সবচেয়ে বড়াে শিক্ষণীয় যা ছিল, তা এই মাত্রাবােধ। স্বরের, বাচনের, এবং নীরবতার মাত্রা।
 

জীবন থেকে নেওয়া নয়, সাহিত্য থেকে নেওয়া ভিন্ন আরেক মাস্টারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে দেশবােধের বা দেশের কাজের এই ভিন্ন দুটো পথের প্রতিস্পর্ধিতা নিয়ে ঘরে-বাইরে উপন্যাস: এই ছটফট করা আর কাজ করা। বা, বলা যায়, ছটফট করে কাজ করা আর স্থিরভাবে কাজ করা। সন্দীপ আর নিখিলেশ। আপাতশক্তি আর নিহিতশক্তি। আপাতশক্তির আস্ফালনে সন্দীপ দ্রুত একটা সংযােগ তৈরি করতে পারবে বলে ভাবে, প্রভাবিত করতে পারবে, সে-প্রভাবের দ্রুত ফল দেখতে পাবে। আর নিহিতশক্তির সঞ্চারে নিখিলেশ চায় কিছু গড়ে তুলতে, যদিও সে জানে যে এ-সংযােগের কোনাে ফল হাতেহাতে মেলে না, এর জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয় অনেকদিন পর্যন্ত।

এই অপেক্ষা করে থাকাকে কারাে মনে হতে পারে সংকল্পের অভাব বা পৌরুষের অভাব নিখিলেশের হালচাল দেখে বিমলার যেমন মনে হয়েছিল। মনে হতে পারে যে বার্তাটা কোথাও পৌছচ্ছে না, কারাে সঙ্গেই সংযােগ ঘটছে না কোথাও। রেগেমেগে হঠাৎ কিছু করায় যে সংকোচ বোধ করে নিখিলেশ, স্বভাবের সেই মৃদুতাকে অশ্রদ্ধা করতে শিখছে বিমলা। এ-মৃদুতাই যে এনে দেয় ভিতরকার জোর, আর তাও যে কোথাও সঞ্চারিত হতে পারে, বিমলার মতাে আমাদেরও অনেকসময়ে সেটা বিশ্বাস করতে বাধে।

কিন্তু এই মৃদুতা মানে কি সবকিছুকে নির্বিচারে মেনে নেওয়া ? তর্ক থেকে, যুক্তি থেকে, পিছিয়ে আসা? শান্ত ভঙ্গি নিয়েও ঘরে-বাইরে উপন্যাসে একাধিকবার আমরা তর্কে রত দেখেছি নিখিলেশকে, দেখেছি মৃদুতার সঙ্গে তেজের সংযােগ। আগে বিমলা কোনােদিন তার স্বামীকে বাইরের লােকের সঙ্গে তর্ক করতে শােনেনি, সন্দীপের সঙ্গে তার একদিনকার বাগবিনিময় শুনে মনে হলাে 'আজ দেখলুম তার অস্ত্রচালনা'। অথচ, এর কয়েকটা মাত্র লাইন পরেই আছে: 'আমার স্বামীর অন্তরের একটি গভীর বেদনা তার মুখের ওপর ছায়া ফেলে চলে গেল। তিনি খুব মৃদু স্বরে বললেন...' ইত্যাদি। বিমলা দেখতে পায়, আর সেইসঙ্গে আমরাও, যে, অস্ত্ৰচালনা আর মৃদুস্বর হাত-ধরাধরি করে চলতে পারে কীভাবে।

আমাদের যে মাস্টারমশাইয়ের কথা বলছিলাম, যাঁর শান্ত আত্মস্থ প্রত্যয় একটা আভা ছড়িয়ে দিত আমাদের মনে, তিনিও কিন্তু তর্ক করতেই শিখিয়েছিলেন তার ছাত্রছাত্রীদের। ক্লাসের মধ্যে কোনাে তর্কণীয় বিষয়ের উত্থাপন করে তিনি চাইতেন সমানে সমানে একটা কথা হােক। ব্যক্তিত্বের নমনীয়তা আর যুক্তির দৃঢ়তা একসঙ্গেই জড়ানাে থাকত তাতে। তিনি শিক্ষক, এই উচ্চপদবলে কখনাে তিনি মাঝপথে থামিয়ে দেননি ছাত্রকে, তর্ক এগিয়ে যেতে দিয়েছেন অবাধে, যাতে নিজেরই বিচারবােধের জাগরণে যথার্থ একটা লক্ষ্যে এসে পৌছতে পারে তার্কিক।

এই তর্কসৌন্দর্যের আরেক বিকাশ আমরা দেখেছি আবু সয়ীদ আইয়ুবের লেখায়, কিংবা তার সঙ্গে নানাজনের ব্যক্তিগত আলাপনে। কথায় বা লেখায় স্বরগ্রাম কখনাে উঁচু হতাে না তাঁর, বিপরীত পথকে বুঝতে চাইতেন এবং বােঝাতে চাইতেন প্রসারিত এক স্থৈর্য নিয়ে, লাবণ্যময় দৃঢ়তায় ভরপুর থাকত তার কথা। প্রকাশ্য একটি বিতর্কের প্রসঙ্গে একপক্ষ যখন একবার চিঠিতে তাকে জানিয়েছিল কোনাে-এক, সাধারণ পাঠকের এই মন্তব্য যে দুজনের ওই তর্কে আইয়ুবই জিতেছেন, তার উত্তরে আইয়ুব লিখেছিলেন একটা স্মরণীয় কথা: 'আমাদের লেখাগুলিকে যাঁরা তর্কের হারজিতের খেলারূপে দেখেছেন তারা ভুল করেছেন; তাদের কথা গণ্য করবার মতাে নয়।'

কেন লিখেছিলেন কথাটা? কেননা যথার্থ তর্ক যাঁরা করেন তারা তাে কোনাে-একটা বিষয়ের সত্যকে বুঝতে চান, বােঝাতে চান। সত্যানুসন্ধানটাই সেখানে বড়াে কথা। আর, দুজনে মিলে কথা বলতে বলতেই পৌছনো যায় - পৌছনাের চেষ্টা করা যায় সেই সত্যে। সে-সত্যে পৌছলে তার্কিকদের মধ্যে কোনাে এক পক্ষ যে জিতে যায় তা নয়, জিতে যায় শুধু সত্য, সত্যের বােধ। তা যদি না ভাবি, তাহলে, তখন, বিষয়ের চেয়ে বিষয়ী হয়ে ওঠে বড়াে, সত্যের চেয়ে বড়াে হয়ে ওঠে অহং। আমিকে রেখেও কীভাবে সেই আমিটিকে মুছে নিতে হয়, তার কিছু নজির আমরা দেখেছিলাম গােপীনাথবাবুর অধ্যাপনায়, আইয়ুবের বিচারণায়, চন্দ্রনাথবাবুর দীক্ষাদানে, নিখিলেশের আচরণে। অন্যদের কাছে এঁরা যা প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা করেছেন, অন্যদের যা বােঝাতে চেয়েছেন, তা এঁদের আমিটাকে নয়, এঁদের অনুভূত সামগ্রিক এক সত্যকে। আমি দিয়ে প্রকাশের আর আমিকে মুছে নিয়ে প্রকাশের এই দুই ভঙ্গিতে বােধেরও ঘটে যায় অনেকখানি প্রভেদ।

০৩.

অনেকদিন আগে একজন চিকিৎসক এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে, রােগী দেখবার জন্য। প্রাথমিক পরীক্ষা করে নেবার পর যখন তিনি বিধান লিখতে যাবেন, তখন বললেন আমাকে: 'এই ওষুধটা দিয়ে দুদিন। আমরা দেখব। এতে যদি ফল না হয় তাহলে আমাদের আরেকম করে ভাবতে হবে। তার কথা শুনে অবাক হচ্ছিলাম। চিকিৎসা তাে করবেন উনি, তাহলে আমরা দেখব' 'আমাদের ভাবতে হবে' এভাবে কেন বলছেন? বলার তাে কথা আমি দেখব' 'আমাকে অন্যরকম ভাবতে হবে'? সেটাই তাে হতাে সত্য কথা? সত্যি হতাে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও ঠিক যে ওই একটিমাত্র সত্যিকে মিথ্যে করে দিয়ে, ওই একটিমাত্র শব্দবদলে, 'আমি'র থেকে 'আমরায় পৌছে দিয়ে, ডাক্তারবাবু তার রােগীটির সঙ্গে সঙ্গে রােগীর পরিজনদেরও অনেকখানি শুশ্রুষা করে নিলেন। সেই মুহূর্তে আশ্বস্ত মন বলছিল, উনি আমাদের পারিবারিক লােক, আপনজন। রােগীর এই সমস্যাটাকে কেবল ওঁর জীবিকার দিক থেকে দেখছেন না, দেখছেন ব্যক্তিগতভাবে।

একটু আগে বললাম সত্যিকে মিথ্যে করে দিয়ে। কিন্তু মিথ্যেই কি ওটা? এটা নিশ্চয় শুধু পদ্ধতি হিসেবেই নয়, সত্য করেই তুলতে চেয়েছিলেন সেই ডাক্তারবাবু। অন্তত পরবর্তী কিছুদিনের আনাগােনায় আর। উদ্‌বেগকাতরতায়, নিরাময়ের পর তাঁর অনাবিল আনন্দপ্রকাশে, সত্যই হয়ে উঠেছিল সেটা। একটামাত্র ওই শব্দব্যবহারের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমাদের পারস্পরিক ধারাবাহিক এক সখ্য।

'আমি'কে 'আমরা' করে তােলার ভিন্ন একটা বিবরণ পড়েছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লেখায়। কমলকুমার মজুমদার একটি উপন্যাস লিখছেন কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য, অল্পে অল্পে এগােচ্ছে সেটা, তাড়া দিচ্ছেন সুনীল। সেইরকম একটা সময়ে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মােড়ে দাঁড়িয়ে কমলকুমার বলছেন: "শােনাে, এই-যে আমরা উপন্যাসটা লিখছি—', বাধা দিয়ে সুনীল বলেন: 'আমরা বলছেন কেন কমলদা, লিখছেন তাে আপনি! কমলকুমার বললেন: "আঃ, থামাে তাে, আমি তাে লিখছি না, ঠাকুর আমাকে দিয়ে লেখাচ্ছেন মাত্র। সেটা আমি না হয়ে তুমিও হতে পারতে, বা অন্য কেউ। আমরা সবাই মিলেই লিখছি।"

এই বলার মধ্যে যে নিছক একটা বিনয় আছে তা নয়, আছে একটা বিশ্বাস। বিশ্বাসটা এই যে, আমার আমিটা খুব বড় কথা নয়, ওটা একটা উপলক্ষ মাত্র। চারদিকের অভিজ্ঞতা একইসঙ্গে নানা ব্যক্তির মধ্যে সঞ্চিত হচ্ছে, কিন্তু তার প্রকাশ হচ্ছে হয়তাে-বা একজন-দুজনের মধ্য দিয়ে। সেই প্রকাশের মুহূর্তে কেউ কখনাে জোর দিয়েই বলতে পারেন যে এটা 'আমি' বলছি, বললে ভুল হয় না। আবার সেইটেকেই কেউ বলতে পারেন আমরা বলছি, আমরা ভাবছি। কমলকুমার একেবারে নিজের উপন্যাস লেখার প্রসঙ্গে ওই বহুবচনটির ব্যবহার কয়েছেন বলে স্বভাবতই চমক লেগেছিল সুনীলের, কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে আমাদের লেখায় বা বলায় ও-রকম প্রয়ােগ তাে হামেশাই ঘটে। ঘটে না কি? ধরা যাক অমিয় চক্রবর্তীর পালাবদল বইটির আলােচনায় বুদ্ধদেব বসু যখন লেখেন:

....এর রাত্রি' কবিতার হঠাৎ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোৎস্না, / দেখি তুমি নেই'—আমাদের মনে
পড়িয়ে দেয় লিপিকা'র 'পরির পরিচয়'.. 

তখন নিশ্চয় সেটা একক বুদ্ধদেব বসুরই মনে পড়া, এটা বলা যায় না যে অনিবার্যভাবে সব পাঠকেরই ওখানে লিপিকার কথা মনে পড়বে। কিংবা,

তিনটি যাত্রার কবিতা অক্ষয়ভাবে মুদ্রিত আছে আমাদের মনে: বােদলেয়রের ভ্রমণ', রাবাের মাতাল তরণী', ও রবীন্দ্রনাথের 'নিরুদ্দেশ যাত্রা'... 

বা, এইরকম আরাে আরাে অনেক উত্তমপুরুষ বহুবচনের ব্যবহারে বােঝা যায় যে ওটা লেখকের নিজস্ব বক্তব্য, নিজস্ব বিবেচনা, একেবারেই তার। বড়াে জোর তিনি চাইছেন যে, এটা সকলের হয়ে উঠুক। কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে উদ্ধৃত ওই বাক্যগুলির বহুবচনকে একবচন করে দিলে কথাটা একই থাকে, শুধু মেজাজটা যায় পালটে। এই ধরনটি তার পরবর্তী রচনার মধ্যে যদি ফিরে আসতে থাকে তাহলে আমরা বলতে পারবাে যে বাংলা কবিতার জন্য নতুন একটি প্রদেশ তিনি জয় করলেন'- এই কথাটার 'আমরা'কে যদি 'আমি' করে দেওয়া যায়, সেই আমি-টা তবে বড়াে প্রত্যক্ষ হয়ে বড়াে স্পর্ধিতভাবে ধাক্কা দিতে পারে কোনাে শ্রোতাকে বা পাঠককে, আমরা বলে তাই হয়তাে একটু নরম করে নিতে চাই তাকে।

অবশ্য, এমন 'আমরা'র ব্যবহারও সম্ভব, যেখানে 'আমি'টাই নেই। আমি'র বাইরে অন্য সবকিছু নিয়ে, বা প্রতিপক্ষ নিয়ে, আমরা চেকোস্লোভাকিয়ার কবি মিরােস্লাভ হােলুবের কবিতার প্রশস্তি করতে গিয়ে যদি কেউ লেখেন যে এ-কবিতা পাঠকদের ধাক্কা দেবে, কেননা: আমাদের কুসংস্কারগুলিকে আমরা বড়াে বেশি ভালােবাসি, সেগুলি কেউ ভাঙতে এলে সেই পরিত্রাতাকেই কুৎসিত ভাষায় গাল পাড়ি আমরা, অন্ধকার হতে জ্যোতিতে উত্তীর্ণ হতে আদৌ আমাদের আগ্রহ নেই', তখন বুঝতে পারি যে এই 'আমরা'র মধ্যে বক্তার 'আমি'টি নেই, কেননা তিনি তাে আর কুৎসিত ভাষায় পরিত্রাতাকে গাল দিতে চাইছেন না, প্রশস্তি করতেই তাে চাইছেন তিনি। কিংবা, সমর সেন বিষয়ে শ্রদ্ধা জানাতে কেউ যদি লেখেন যে 'তার কথা ভেবে আমাদের আর লাভ কী, আমরা কলেজে-কি-অফিসে যাবাে, পান চিবােবাে, একে ওকে খােশামােদ করে বাড়তি দু-পয়সার ব্যবস্থা করবাে, আখেরে সুবিধে হলে দু-তিনটে শৌখিন বক্তৃতা দেবাে, রাত্রিতে আমাদের ঘুম খুব নিটোল হবে, পড়ে মরুক গে সমর সেন' তখন, স্বভাবতই এই হীন আমরা-গুলির মধ্যে আমি নেই, কেননা সে-আমিই তাে সমর সেনের কথা এত করে বলছেন।

ফিরে যাই আবার পুরােনাে কথায়। 'আমি'কে 'আমরা'য় পালটে নেবার কথা বলছিলাম আগে। এমনও কখনাে হতে পারে যে 'আমরা'ই পালটে গেল 'আমি'তে। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়ের একটি বইয়ের নাম অনেকেরই মনে পড়বে: আমরা ও তাঁহারা। গােটা বইটি দুইপক্ষের সংলাপ দিয়ে সাজানাে। একপক্ষে তাহারা। আর অন্যপক্ষে? যে-বইয়ের নামের মধ্যে আছে 'আমরা', সে-বইয়ের পাঠের মধ্যে কিন্তু সবসময়েই 'আমি'। ভূমিকায় ধূর্জটিপ্রসাদ বলে নিয়েছেন: 'আমরা ও তাঁহারা-তে একদিকের বক্তা আমি, অন্যদিকের বক্তা তাহারা। নামে তাহলে আমরা কেন? লেখকের কৈফিয়ত: 'নিজের মধ্যে তথাকথিত উচ্চশিক্ষিতের দোষগুলাে লক্ষ্য করেছি বলেই একবচন ব্যবহার করেছি। অর্থাৎ আমি এখানে আমরা-র প্রতিভূ।

সবসময়ে সেটা হয়ে উঠতে পেরেছে কি না, সে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। আমার মুখ দিয়ে ব্যক্ত মতামতগুলাে ঠিক আমার নয়, আমার দলের' একথাটা তিনি মনে রাখতে বলেন পাঠকদের, কিন্তু সেই দল' অর্থাৎ তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত'দের সাধারণ গােত্র থেকে সরে এসে একেবারে ব্যক্তিগত ধূর্জটিপ্রসাদ হিসেবেই কথাগুলি তিনি উচ্চারণ করেন অনেকসময়ে। সে-প্রসঙ্গটা আপাতত বিবেচ্য নয়। আপাতত যেটা বলতে চাই তা এই যে, ধূর্জটিপ্রসাদের অভীষ্ট আমরা এখানে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডি তৈরি করে নিচ্ছে। শহুরে উচ্চশিক্ষিতের গণ্ডি। অন্যদিকে আছেন কারা? সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই সাধারণ মানুষ আবার নির্বাচিত। কেননা, ঘােষণা করেই বলেন ধূর্জটিপ্রসাদ: উচ্চশিক্ষিত এবং মুখের সঙ্গে কোন প্রকার কথােপকথন কি ভাবের বিনিময় সম্ভব নয়। সেইজন্যে শিক্ষাভিমানী বুদ্ধিজীবীকে এবং শহরের অন্য শ্রেণীর বন্ধুদেরকে প্রতীক হিসেবে নিতে হয়েছে। এই তাহারা-র প্রকল্পে তাহলে গ্রামীণ মানুষ নেই, মূখ মানুষ নেই, অন্ত্যজ মানুষ নেই।

সেটা তত বিস্ময়ের কথা নয়। বিস্ময়ের কথা এই ঘােষণা যে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে কোনাে ভাবের বিনিময় বা কোনাে কথােপকথনই সম্ভব নয় বলে ভাবছেন একজন সমাজতত্ত্ববিদ। তাহলে নির্দিষ্ট এই 'আমরা' ও 'তাহারা'-র বাইরেও যে বিরাট একটা ওরা-র অস্তিত্ব আছে, তাদের সঙ্গে আমাদের সংযােগ হবে কোথায় ? বা, কীভাবে হবে সেটা?

আমরা যেখানে সত্যিই আমরা, আমরা যেখানে আমি, আমরা যেখানে আমিটাই নেই, আমিই যেখানে। আমরা, আর আমরা যেখানে বৃত্তায়িত একটা গােষ্ঠী এই নানারকমের প্রয়ােগের কথা যে ভাবছি, তার সঙ্গে আমাদের জনসংযােগ বা সংযােগহীনতার একটা সম্পর্ক আছে। ধূর্জটিপ্রসাদ 'আমরা' শব্দে যে-শ্রেণীটির কল্পনা করে নিয়েছেন, সে হলাে একরকমের বিভাজন। নানাসময়ে নানাপ্রসঙ্গে, এই বিভাজনটাকে আমরা ভিন্ন নানা জায়গায় পৌছে দিতে পারি। আমরা বিদ্বান ওরা অবিদ্বান, আমরা শহুরে ওরা গেঁয়াে, আমরা শাদা ওরা কালাে, আমরা মুসলমান ওরা হিন্দু, আমরা মেয়ে ওরা পুরুষ, আমরা সি পি এম ওরা কংগ্রেস এবং এ-রকম আরাে আরাে অনেক। কোনাে কোনাে বিবরণের জন্য এ-রকম বিভাজন দেখানাের দরকার হয়ে পড়ে। কিন্তু যেসব সময়ে এই সমস্তটাকে জড়িয়ে নিয়ে ভাবনা করবার কথা, তখন 'আমরা' শব্দের এমন বিভাজিত প্রয়ােগ হয়তাে স্থায়ী কোনাে সংকট তৈরি করে তুলতে পারে, আমাদের বােঝায় অনেক ভুল ঘটে যেতে পারে। ধরা যাক, কোনাে সরকার যখন আমরা উচ্চারণে কোনাে কথা বলেন, তখন সে-আমরা থেকে বিরােধী কোনাে রাজনৈতিক পক্ষ বর্জিত থাকতে পারে বটে, কিন্তু তার অন্তর্গত করে নেবার কথা দেশের সমস্ত সাধারণ মানুষকে। অর্থাৎ, বক্তাকে বুঝতে হবে যে তার সেই 'আমরা'র পরিসর যত ছােটো হয়ে আসবে, তার দেশও হয়ে উঠবে ততটাই খণ্ডিত। কথাটা এ নয় যে 'ওদের' 'আমরা' করে তুলতে হবে, বরং এই হবার কথা ছিল যে ওরা আমরাই'। সেটা লক্ষ না করে, আমরাওরার যে বিভাজনটা দূর করবারই দায়িত্ব ছিল আমাদের, একটা শব্দব্যবহারের মধ্য দিয়ে সেটাকে হয়তাে-বা বাড়িয়েই চলেছি আমরা।

বলা যায়, শব্দব্যবহারটা স্বতন্ত্র কোনাে সমস্যা নয়। শব্দব্যবহার মানসিকতারই বাইরের একটা প্রকাশ মাত্র। ঠিক। কিন্তু এও ঠিক যে মানসিকতা থেকে জাত শব্দটাই আবার সেই মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে থাকে। গণ্ডিবদ্ধ 'আমরা বলতে বলতে আরাে বেশি করে একটা দলীয় 'আমরা'র গণ্ডির মধ্যে ঢুকে পড়তে চায় মন, আত্মবিস্মৃত মন।

আর, বাচনের এই 'আমরা' যদি কখনাে হয়ে ওঠে 'আমি'? প্রভুত্বের ওজনটা তখন আরাে বেশি সামনে চলে আসে, আমাদের পেয়ে বসে। যে-কোনাে একটা জায়গায় অল্পবিস্তর স্তরবিন্যাস থাকেই কর্মীদের মধ্যে। সেখানে প্রধান দায়িত্বে যিনি থাকেন, তিনি যদি কেবলই বলতে শুরু করেন 'আমার বিভাগ' 'আমার কর্মী 'আমার লক্ষ্য', তাহলে তার মধ্য দিয়েই একটা বিপদের সূত্রপাত হয়। আমাদের যে ডাক্তারবাবুর কথা বলছিলাম আগে, তিনি একার করা কাজটা নিয়েই বলতেন 'আমাদের কাজ'। আর আমরা অনেকসময়েই সকলের করা কাজটাকে বলতে শুরু করি আমার কাজ। ব্যক্তিগত স্তর থেকে সামাজিক রাজনৈতিক স্তর পর্যন্ত এই 'আমি' তখন হয়ে ওঠে এক ঘােষণা-শব্দ, চিৎকারশব্দ, যার মধ্য দিয়ে এগােতে থাকে অবারণ একটা জোর দিয়ে বলবার প্রতাপভঙ্গি। আর সেই চোরাপথে এগিয়ে আসে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ আমাদের স্বভাবের একটা অনিয়ন্ত্রিত চিৎকার।

০৪.

একশাে চব্বিশ বছর আগে ভারতী পত্রিকায় একটি লেখা ছাপা হয়েছিল, তার নাম 'চেঁচিয়ে বলা'। সেলেখায় যে-সাধুভাষার ব্যবহার ছিল, তাকে চলিতের রূপে পালটে নিলে, মনে হতে পারে যেন একেবারে আজকের এই সময়টা নিয়ে, এর সমস্যাটা নিয়ে, কথা বলতে চাইছেন কেউ। সে-লেখার ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে বেশকয়েকটি লাইন এখানে একবার শুনে নেব আমরা:

১. আজকাল সকলেই সকল বিষয়েই চেঁচিয়ে কথা কয়। আস্তে বলা একেবারে উঠিয়া গিয়াছে।...সেকরা গাড়ি যত না চলে, ততােধিক শব্দ করে; তাহার চাকা ঝনঝন করে, তাহার জানলা ঝরঝর করে, তাহার গাড়ােয়ান গাল পাড়িতে থাকে, তাহার চাবুকের শব্দে অস্থির হইতে হয়। বঙ্গসমাজও আজকাল সেই চালে চলিতেছে, তাহার প্রত্যেক ইঞ্চি হইতে শব্দ বাহির হইতেছে।

২. কানটাই আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হইয়াছে। দেখােনা, বাংলা খবরের কাগজগুলি কেবল শব্দের। প্রভাবেই পাঠকদের কান দখল করিয়া বসিয়া আছে। কী যে বলিতেছে তাহা বড়াে একটা ভাবিয়া দেখে না, কেবল গলা খাটো না হইলেই হইল। একটা কথা উঠিলে হয়, অমনি বাংলা খবরের কাগজে মহা চেঁচামেচি পড়িয়া যায়। কথাটা হয়তাে বােঝাই হয় নাই। ভালাে করিয়া শােনাই হয় নাই, হয়তাে সে বিষয়ে কিছু জানাই নাই কিন্তু আবশ্যক কী ? বিষয়টা যত কম বােঝা যায়, বােধ করি, ততই হাে হাে করিয়া চেঁচাইবার সুবিধা হয়। 

লেখাটা, হয়তাে না-বললেও চলে, রবীন্দ্রনাথের। লিখেছিলেন, যখন তার বাইশ বছর বয়স। 'গলা খাটো না হইলেই হইল'— একথা অবশ্য এই সােয়াশাে বছরে ভিন্ন একটা মাত্রা পেয়ে গেছে, কেননা খবরের কাগজের বাইরে এখন আরাে আছে আকাশবাণী বা দূরদর্শন। সেখানে, আলংকারিক অর্থে নয়, বাস্তবতই গলা খাটো করবার একটা যেন প্রতিযােগিতাই চলে। সভাস্থলের বক্তৃতা বিষয়ে 'চেঁচিয়ে বলা' প্রবন্ধে একটা কথা আছে এইরকম: 'বক্তা যখন বক্তৃতা দিতে উঠেন, তখন সে এক অতি কষ্টকর দৃশ্য উপস্থিত হয়। গ্রহণী রােগীর ন্যায় তাহার হাতে পায়ে আক্ষেপ ধরিতে থাকে, গলার শির। ফুলিয়া ওঠে, চোখ দুটো বাহির হইয়া আসিতে চায়। কেবল সভাস্থলে নয়, এ-রকম দৃশ্য অনেকসময়েই আজকাল দেখতে হয় আমাদের, নানা জায়গাতেই।

দেখতে হয়, কেননা, শুধু এ-মাধ্যমে ও-মাধ্যমে নয়, দুরদর্শনের এ-খাতে ও-খাতেও ঘাের একটা প্রতিযােগিতা চলতে থাকে, স্কুপ বা এক্সক্লসিভ বা বাইটজাতীয় নেশার তাড়নায় উত্তেজনার ঝোঁকটা বেড়ে যায়, খবরদেনেওয়ালারা অথবা তার্কিকেরা ভাবতে থাকেন যে স্বরগ্রাম উঁচু থেকে উঁচুতে তুলতে পারলেই সত্য আরাে বেশি করে জোর পাবে। কথাটা যাঁরা শুনছেন তাদের বােধ বা বিবেচনার উপর কোনাে আস্থা থাকে না বলেই এমনটা ঘটে, না কি বক্তা নিজের কথার উপর ততটা ভরসা রাখতে পারেন না বলেই এটা করেন? হয়তাে দুটোই সত্যি। প্রাণের সঙ্গে যখন কোনাে কথা বলি, তখন যাহা বলি তাহারই একটা বল থাকে— যখন প্রাণে বাজে নাই অথচ মুখে বলিতে হইবে, তখন চেঁচাইয়া বলিতে হয়, বিস্তর বলিতে হয়। লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

চেঁচিয়ে বলার সঙ্গে এখানে যুক্ত হলাে তবে বাড়িয়ে বলা, অত্যুক্তি। আর সেই বাড়িয়ে বলা সহজেই পৌছে যায় বানিয়ে বলায়, মিথ্যাচারে। বুঝিয়ে বলার চেয়ে বক্তার তখন দরকার হয় ঘাের লাগানাে, নেশা ধরানাে, হিনটিজম। এই তাে 'হিপনটিজম' বলেছিল সন্দীপ। এই শক্তিই পৃথিবী জয় করবার শক্তি। কোনাে উপায় নয়, উপকরণ নয়, এই সম্মােহন। কে বলে সত্যমেব জয়তে? জয় হবে মােহের। বলেছিল সে। অত্যুক্তি সইতে পারত না নিখিলেশ, আর সন্দীপের অস্ত্রই হলাে অত্যুক্তি। তাই সন্দীপের প্রসঙ্গ এলেই উপন্যাসে আমাদের শুনতে হয় 'ঝড়ের দমকা হাওয়া'র কথা, বজ্রের উপর বজ্রের গর্জন, বিদ্যুতের উপর বিদ্যুতের চমকানি'র কথা। তার দলবলের চিৎকারে 'আকাশটা যেন ফেটে টুকরাে টুকরাে হয়ে ছিড়ে পড়ে, তার স্বপ্ন জনসমুদ্রের ঢেউয়ের উপর' দুলতে থাকা, যার চারিদিকে গর্জন আর ফেনা। তর্কের জোর বােঝাতে মেঝের উপর লাথি মারে সে, কার্পেট থেকে অনেকখানি নিদ্রিত ধুলাে চম্‌কে উপরে উঠে পড়ে। ভিতরকার শক্তিতে যত দীনতা, বাইরে ততটাই বেড়ে ওঠে আস্ফালন, তাই এত ঠুকতে হয়, এত শব্দ করতে হয়। সত্যকে সে চায় না, সত্যকে সে বানিয়ে তােলে।

বানিয়ে তােলার এই আস্ফালনে এই চিৎকারে চারপাশে গড়ে তােলা যায় নেশায়-পাওয়া দল, যেখানে আত্মব্যক্তিত্বের কোনাে দরকার হয় না আর, দরকার হয় না নিজের প্রতি বা সত্যের প্রতি কোনাে বিশ্বাসের বা অভিমুখিতার। তখন যে-সংযােগ ঘটে, সেটা কোনাে বােধের সঙ্গে বােধের নয়, যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের। সে-রকম সংযােগের— না কি অসংযােগের কথা ভেবেই চার অধ্যায়-এর উত্তপ্ত অন্তু বলেছিল দিশেহারা এলাকে: 'আপন শক্তির পরে বিশ্বাসকে গােড়াতেই এমনি করে ঘুচিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, সবাই সরকারি পুতুলের ছাঁচে নিজেকে ঢালাই করতে দিতে স্পর্ধা করেই রাজি হল।' শুধু চার অধ্যায় বা ঘরে-বাইরের ঘটনাকালে নয়, যে-কোনাে রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনের বড়াে বড়াে মুহূর্তে এই কথাগুলির সত্যতা আমরা বারে বারেই দেখতে পাই। দেখতে পাই যে, পারস্পরিক সংযােগের কোনাে সুঠাম পথে আমাদের সন্ধান থাকে কম, দ্রুত সিদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ব্যক্তির বা দলীয়তার জোর খাটানােটাই হয়ে ওঠে বড়াে। জোর যে শুধু আস্ফালনে নয়, নেশাটাই যে ফলপ্রদ শক্তি নয়, সত্যের সঙ্গে খাটে না কোনাে জোর-জবরদস্তি,-- নিখিলেশের মতাে সেইসব আত্মস্থ বিশ্বাসে আর ভরসা রাখতে পারি না আমরা।

বলছি না যে এ কেবল আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক সমস্যা। ঘরে-বাইরে যেমন একইসঙ্গে রাজনৈতিক আর গৃহনৈতিক, আমাদের সমস্ত সমস্যাই প্রায় সেইরকম, একাধিক তলে একইসঙ্গে তার চলাচল। ঘরে কিংবা বাইরে, কাজে কিংবা খেলায়, একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্ক রচনায় এই প্রভুত্ব বা জোরটাই আমাদের চালাতে থাকে পদে পদে, সংযােগের অর্থ তখন দাঁড়ায় শুধু প্রচ্ছন্ন সংযােগহীনতা। হাতের থেকে একটু দূরেই থেকে যায় হাত। মাঝখানে জেগে থাকে শুধু আস্ফালনের কথা, অহংগণ্ডির কথা, মহানগরের ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে-থাকা অলস উৎক্ষিপ্ত নিষ্ফল বিবর্ণ কিছু কথা। মনে পড়ে, আর্তুরাে উই'তে ব্রেখট্‌ একবার লিখেছিলেন: 'কথা বলবার বদলে যদি শুধু একটু কাজ করতে পারতাম আমরা!'

০৫.

ঘরে-বাইরের নিখিলেশ তর্ক করেছে অনেকসময়ে, সন্দীপের সঙ্গে বিমলার সঙ্গে, কিন্তু অনেক অনেক বলবার-মতাে মুহূর্তে সে বলেওনি কোনাে কথা। আস্তে আস্তে তার উঠে চলে যাওয়ার কিংবা আস্তে আস্তে অল্প কয়েকটা কথা বলার ছবি ধরা আছে বিমলার মনে। একবার যেমন: মনে হল আমার স্বামীর কিছু বলবার আছে, কিন্তু তিনি বললেন না, আস্তে আস্তে চলে গেলেন। এই চলে-যাওয়াও কিছু বলে না কি? দীর্ঘ তপ্ত বাগ্মিতায় সন্দীপ যখন দেশের মেয়েদের অন্যায় শক্তির স্তুতি করছে, আবেগভরে কবিতা শােনাচ্ছে, গর্জে উঠে বলছে আমাদের সকলকে নষ্ট হবার দুর্জয় তেজ দাও', নিখিলেশ তখন তার গায়ে হাত রেখে আস্তে আস্তে বলছে: সন্দীপ, চন্দ্রনাথবাবু এসেছেন। সবকিছুর ওপর নম্রতার একটা প্রলেপ এসে পড়ল।

এই ধীরতার কোনাে সুদূর ফলও কি নেই? এত-যে উদ্ভ্রান্ত অবুঝ বিমলা, সেও কিন্তু কখনাে শরীরের নীরব ভাষায় দেখতে পায়: 'আমার স্বামীর অন্তরের একটি গভীর বেদনা তার মুখের উপর ছায়া ফেলে চলে গেল।' শব্দহীনতা কিছুই যে তাকে বলেনি তা নয়। সে দেখতে পায় কীভাবে সমস্ত উত্তেজনার মধ্যে নিখিলেশকে যেন একটা বিষাদ এসে আঘাত করত। যেটা সামনে দেখা যাচ্ছে তার উপর দিয়েও তিনি যেন আর একটা-কিছুকে দেখতে পেতেন।'

একাধিকবার এ-উপন্যাসে বলা আছে যে নিখিল চুপ করে রইল। নীরবতারও একটা ভাষা আছে। সে-ভাষা পড়তে অনেকসময়ে ভুলে যাই আমরা। শুধু যে পড়তে ভুলি তা নয়, তার ব্যবহারও হয়তাে ভুলে যাই জীবনে, ভুলে যাই যে অনেকসময়ে নীরবতা একটা সামর্থ্য। ভাষার সংযােগের সঙ্গে নীরবতার সংযােগ মিলে গিয়ে যৌথভাবে গড়ে ওঠে একটা সংযােগের ভাষা। জীবনব্যবহারে সেই ভাষাটাকে বারেবারেই হারিয়ে ফেলি আমরা। আর তখনই বেড়ে ওঠে চিৎকার, তখনই বেড়ে ওঠে আমি, তখনই বেড়ে ওঠে পরস্পরের মধ্যে সেতুহীন এক দূরত্ব।

পশ্চিম জগতের একটা প্রথা আছে, সামান্যতম যে-কোনাে প্রাপ্তিতে বলতে হয় 'ধন্যবাদ', না-বলাটা সেখানে অপরাধ। অবশ্য এখন আর পশ্চিমজগতে' বলবার মানে নেই, আমাদেরও এটা কৃত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই কথাটা কিন্তু এমনভাবেও উচ্চারণ করতে পারি আমরা করে থাকি অনেকসময়ে যাতে শব্দটা থাকে, ধন্যতাটা থাকে না কোথাও। উলটোপক্ষে, কোনাে শব্দের সাহায্য ছাড়াও, আমাদের সেই কৃতজ্ঞ মনােভাবটা প্রকাশ করতে পারি আমরা, আমাদের মুখের রেখায়, চোখের চাওয়ায়, আমাদের সামগ্রিক দৈহিক আভায়। রবীন্দ্রনাথের কণিকায় দুটি লাইন আছে এ-রকম:

দয়া বলে, কে গাে তুমি মুখে নাই কথা?
অশ্রুভরা আঁখি বলে, আমি কৃতজ্ঞতা। 

অশ্রুভরা আঁখিই কেবল নয়, শব্দহীন শরীর নানামুহূর্তে খুঁজে নেয় তার নানারকমের ভাষা। উচ্চারিত শব্দের বাইরেও তখন তৈরি হয়ে ওঠে ভিন্নরকম সংযােগের বােধ। আবার, শব্দের মধ্যে মেলানাে থাকতে পারে অনেক সেই অনুচ্চারণ।

'কানটাই আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হইয়াছে' এই আক্ষেপের কথাটা ছিল চেঁচিয়ে বলা' প্রবন্ধে। আর, তার অনেকদিন পরে, এর একেবারে উলটোপ্রান্তে, ফাল্গুনী নাটকে, অন্ধ বাউলের সঙ্গে নবযৌবনের দলবলের একটা সংলাপ চলছিল এইরকম:

কী হে ভাই, ঠিক নিয়ে যেতে পারবে তাে?
ঠিক নিয়ে যাব।
কেমন করে।
আমি-যে পায়ের শব্দ শুনতে পাই।
কান তাে আমাদেরও আছে, কিন্তু
আমি যে সব-দিয়ে শুনি শুধু কান দিয়ে না। 

এই সব দিয়ে শােনার জন্য কখনাে কখনাে প্রস্তুত হতে হয় আমাদের। সে যে কেবল শিল্পের আস্বাদনে তা নয়, সে যে কেবল প্রণয়ের মুহূর্তে তা নয়, সে আমাদের নিছক দৈনন্দিনেও, সে আমাদের সমাজনৈতিক চর্চাতেও। সংযােগের অভিপ্রায়ে তৈরি করে তােলা আমাদের সমস্ত ভাষারই মধ্যে আমরা তাই ছড়িয়ে রাখতে চাই একটা নীরবতার পরিসর, সমস্ত চিৎকারের বাইরে, সমস্ত আমিত্বের বাইরে। আর সেইভাবে, আমাদের যে-কোনাে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই, এই এক সব-দিয়ে শােনার জন্য নিজেকে উন্মুখ রাখতে চাই আমরা। তখন, শুধু বাণী নয়, আমাদের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় অন্য কোনাে স্পর্শের জন্য, বলতে ইচ্ছে হয়: হাতখানি ওই বাড়িয়ে আনো।

মাসদেড়েক আগে, বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের প্রযােজনায়, একটি অভিনয় চলছিল কার্জন পার্কে। পড়তি বিকেলে, খােলা জায়গায়, ছােটো একটি বৃত্ত তৈরি করে নিয়ে সেখানে রক্তকরবীর অভিনয় করছিলেন কয়েকজন মানুষ, কেউ যাঁরা চোখে দেখতে পান না। দর্শক ছিলেন অল্প কয়েকজন। পূর্ণ অন্ধদের সেই সুঠাম অভিনয়শেষে দর্শকেরা যখন উচ্ছাস জানাচ্ছেন, আশ্চর্য একটি দৃশ্যের জন্ম হলাে তখন। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে কুশীলবেরা সবাই তাদের খােলা দুহাত বাড়িয়ে রেখেছেন প্রার্থীর মতাে। কী চান তারা? কিছু কি চান? তাঁদের মধ্যে একজন বললেন: 'আপনারা। সবাই এসেছেন, কিন্তু আমরা তাে দেখতে পাচ্ছি না। আপনারা যদি আমাদের সকলের হাতের ওপর একটু হাত ছুঁয়ে যান, আপনাদের ভালােলাগাটা আমাদের মধ্যে পৌছবে, আমাদের ভালাে লাগবে।' দর্শকেরা একে একে সকলের হাতে হাত রাখলেন, কারাে কারাে চোখে এল জল।

আমরা যখন সত্যিকারের সংযােগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতাে একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়। পারি না হয়তাে, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।

শঙ্খ ঘোষ