বৃহস্পতিবার, ১১ নভেম্বর, ২০২১

ম্যাডাম ক্যুরীর জন্মদিনে ~ অভিজিৎ মজুমদার

গল্পটার শুরু প্রায় দেড়শ বছর আগে। ১৮৬৭ সালের ৭ই নভেম্বর, রাশিয়া প্রভাবিত পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরে জন্ম হল পাঁচভাইবোনের মধ্যে সবথেকে ছোটো মারিয়া স্কলদোয়াস্কার। মারিয়ার প্রথমদিকের পড়াশোনা হল বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে আর স্থানীয় স্কুলে। বাবা-মা দুজনেই স্কুল টিচার। তাই বাড়িতে পড়াশনোর আবহাওয়াটা এমনিতেই ছিল। ফলতঃ মারিয়া যে স্কুলে খুব ভালো ফল করবে তাতে আর আশ্চর্যের কি আছে?  কিন্তু গোল বাঁধল একটু বড় হতেই। ওয়ারশতে যে কোনও মেয়েদের ইউনিভার্সিটি নেই। যেটি আছে, সেখানে তো মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ। অতএব উপায়? কথায় বলে যার ইচ্ছা থাকে সে নিজের রাস্তা নিজেই খুঁজে নেয়।  মারিয়াও তাই করল। ও ওর পড়াশুনো শুরু করল শহরের "ফ্লোটিং ইউনিভারসিটি"তে। এখানে পড়াশুনা করা হত গোপনে, যেন কোনো অপরাধ করা হচ্ছে। অবশ্য সেই সময়ে মেয়েদের ইউনিভারসিটিতে পড়াশুনো করা অপরাধের থেকে কম কিসে?
কিন্তু "ফ্লোটিং ইউনিভারসিটি"তে পড়ে মারিয়ার পড়াশুনো করার তৃষ্ণা মিটল না। ও চাইল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যা মেয়েদের জন্য তখনকার দিনে পাওয়া যেতে পারত প্যারিসে।  ততদিনে মারিয়ার মা মারা গেছেন। মারিয়াকে প্যারিসে পড়াশুনোর জন্য পাঠানোর মত অর্থ ওর গরীব বাবার  কাছে ছিল না। কিন্তু চিরলড়াকু অথচ শান্ত মারিয়া হার মানল না। পাঁচ বছর ধরে গভর্নেস আর টিউটরের কাজ করে টাকা যোগাড় করল ও। এরই ফাঁকে ফাঁকে নিজের মনের খোরাক হিসেবে চলতে লাগল ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর অংকের পাঠ। তারপর টাকাপয়সা জমিয়ে একদিন ও পাড়ি দিল প্যারিস, বহু মনন আর মনীষার রাজধানী পারী। সেটা ১৮৯১ সাল। 
প্যারিসে এসে  মারিয়া যোগ দিল বিখ্যাত সর্বন ইউনিভারসিটিতে।  ভরতি তো হল কিন্তু প্যারিসে জীবনধারনে অর্থসংস্থান কোথায়? চা আর পাঁউরুটি খেয়ে দিন কাটাতে লাগল বছর চব্বিশের মারিয়া। তবু হাল ছাড়ল না মেয়ে। ১৮৯৩ তে ফিজিক্স আর তার পরের বছর গণিতে ডিগ্রী নিয়ে সসম্মানে পাশ করল সে। এই সময়েই তার সঙ্গে দেখা হল তার জীবনসঙ্গীর, নিতান্তই কাজের সূত্রে। কিন্তু একে অপরের মেধার হীরকদ্যুতিতে আকৃষ্ট হতে দেরি হল না। ১৮৯৫-তে বিয়ে হল পিয়ের ক্যুরি আর মারিয়া  স্কলদোয়াস্কার যাকে এর পর থেকে আমরা চিনব মাদাম মেরি ক্যুরি নামে। বিজ্ঞানের জগতে এ যেন এক রূপকথার বিয়ে। জুটি বাঁধার মাত্র আট বছরের মাথায় যদি স্বামী-স্ত্রীর একসাথে নোবেল প্রাইজ পান, তাকে রূপকথা ছাড়া আর কিই বা বলা যেতে পারে?  তবে তার আগেই ১৯০০ সালে মাদাম ক্যুরি যোগ দিয়েছেন ইকোল নরমাল সুপিরিয়র-এ, ফিজিক্সের লেকচারার হিসেবে।  একবার নয়, দুবার নয়, তিন তিনবার (১৮৯৮, ১৯০০ এবং ১৯০২ সালে) পেয়েছেন ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞান আকাদেমির গেগনার প্রাইজ। ১৯০৩ সালে পেয়েছেন ডক্টর অফ ফিজিকাল সায়েন্স ডিগ্রী। পেয়েছেন ফ্রান্সের বারথলট মেডেল।
কিন্তু প্রতি পদক্ষেপেই তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে সমকালীন লিঙ্গবৈষম্যের বিরূদ্ধে।যেমন, তাঁর নিজের গেগনার পুরস্কার প্রাপ্তির খবর তাঁর কাছে না পাঠিয়ে ফ্রেঞ্চ আকাদেমি পাঠিয়েছে তাঁর স্বামী পিয়ের ক্যুরির কাছে। তবে এই সব কিছুর জবাব মেরি দিয়েছেন তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে।  তার স্বীকৃতি হিসেবে ইংল্যন্ড রয়াল সোসাইটি থেকে পেয়েছেন হাম্ফ্রে ডেভি মেডেল। আর নোবেল প্রাইজ তো আছেই।  তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে  তাঁর কাজের জন্য ১৯০৩ সালে মাদাম ক্যুরি  পদার্থবিদ্যায় নোবেল প্রাইজ পেলেন, স্বামী  পিয়ের ক্যুরি এবং আরেক ফরাসি বিজ্ঞানী বেকারেল-এর সাথে যৌথভাবে। বেকারেল দেখিয়েছিলেন যে ইউরেনিয়াম থেকে এক প্রকার বিকিরন হয় যা এক্সরের থেকেও মৃদু। ক্যুরি দম্পতি  সেই বিকিরণের নাম দিলেন রেডিওঅ্যাক্টিভিটি।  তাঁরা দেখালেন যে এই তেজষ্ক্রিয়তা ইউরেনিয়ামের একটি মৌলিক ধর্ম যা কিনা পারমাণবিক গঠন থেকে উদ্ভুত।  সেই সময়ের হিসেবে এ ছিল এক যুগান্তকারী ধারণা। তারই সাথে সাথে রচিত হয়েছিল আরেকটি  যুগান্তকারী ইতিহাস। সেই প্রথম কোনও নারীর হাতে উঠল সাহিত্য-শান্তি-বিজ্ঞানের এই সর্বোচ্চ সম্মান। ক্যুরি নোবেল পেয়ে সম্মানিত হলেন, না নোবেলপদক ক্যুরিকে পেয়ে তার এতদিনের পুরুষতন্ত্রের কলঙ্কমোচন করল, কে বলতে পারে? 
কিন্তু কে না জানে, রূপকথারা বাস্তবে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। যুগ্ম নোবেলের মাত্র তিন বছরের মাথায় পথ দুর্ঘটনায় মারা গেলেন পিয়ের। ব্যক্তিগত শোক কাটিয়ে পিয়েরের ছেড়ে যাওয়া পদ গ্রহন করলেন মেরী। তিনি হলেন সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা অধ্যাপক। বিজ্ঞানে জেন্ডার ইক্যুয়ালিটির ইতিহাসে যোগ হল আরেকটি ধাপ। এর পাঁচ বছরের মাথায়, ১৯১১ সালে, মেরী পেলেন তাঁর দ্বিতীয় নোবেল, রোডিয়াম আর পোলোনিয়াম আবিষ্কারের জন্য। তবে এইবার রসায়নে। এবং একলা। তাঁর নোবেল ভাষণে এই সম্মান স্বর্গত স্বামীর সাথে ভাগ করে নিলেন মেরী। এইবার দুটি রেকর্ড স্থাপন করলেন মাদাম ক্যুরি। এক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রথমবার দুবার নোবেল পাওয়ার কৃতিত্ব আর বিজ্ঞানের দুটি বিভাগে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার কৃতিত্ব। এই দ্বিতীয় রেকর্ডটি এখনও অক্ষত আছে। 
১৯১৪-তে শুরু হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্ব-রাজনীতির এই টালমাটাল সময়ে নিজের বিজ্ঞানের গজদন্তমিনারে বসে রইলেন না ক্যুরি। নিজের অর্থ ও সময় নিযুক্ত করলেন মানুষের সাহায্যে। ক্যুরির তৈরি পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন পৌঁছে গেল যুদ্ধক্ষেত্রে। তা এতই জনপ্রয় হল যে সেই যন্ত্রের নামই হয়ে গেল "লিটল ক্যুরি"।
যুদ্ধ থামলেও মাদাম ক্যুরির কাজ কমল না। তিনি তাঁর সময় এবার নিয়োগ করলেন ওয়ারশতে রেডিয়াম রিসার্চ ইন্সটিটিউট গড়ে তোলার কাজে। তাঁর খ্যাতি কাজে লাগল প্রয়োজনীয় অর্থ-সংগ্রহে। ১৯২১ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হার্ডিঞ্জ সমগ্র আমেরিকার নারীজাতির পক্ষ থেকে মাদাম ক্যুরিকে উপহার দিলেন এক গ্রাম রেডিয়াম। ১৯২৯ সালে তৎকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হোভার তাঁকে উপহার দিলেন পঞ্চাশ হাজার মার্কিন ডলার, তাঁর গবেষণাগারে রেডিয়াম কেনার জন্য। 
কিন্তু অবিশ্রাম পরিশ্রম আর ক্রমাগত তেজষ্ক্রিয় বিকরণের মধ্যে থাকার প্রভাবে ১৯৩৪ সালে সাতষট্টি বছর  বয়সে এপ্লাস্টিক এনিমিয়ায় চলে গেলেন মাদাম ক্যুরি। 
কিন্তু রূপকথারা শেষ হয় না। তাই শুধু জীবনেই নয়, মৃত্যুর বহুবছর বাদে এখনও বিজ্ঞানের সাম্রাজ্ঞী মাদাম ক্যুরি প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন নারী-পুরুষের সমানাধিকার। যেমন ধরা যাক, প্যারিসের প্যান্থেয়ন, যা কিনা ফ্রান্সের চিন্তাজগতের অগ্রাধিনায়কদের সমাধিস্থল, ১৯৯৫ সালে প্রথম নারী হিসেবে সেখানে প্রবেশ করেছেন মাদাম ক্যুরি। মৃত্যুর পরও জারী রয়েছে তাঁর জয়যাত্রা। যতদিন এই পৃথিবীতে লিঙ্গবৈষম্য থাকবে, ততদিন মাদাম মারিয়া স্কলদোয়াস্কা ক্যুরি নীল আকাশের বুকে উড়তে থাকবেন সমানাধিকারের  জয়পতাকা হিসেবে।

*****

এই লেখাটা লিখেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে। কেউ একটা নিয়েওছিল ছাপবে বলে। কিন্তু কাকে দিয়েছিলাম আর ছাপা হয়েছিল কি না, সে আমার জানা নেই। তাই এখানে দিলাম আরেকবার।

শুক্রবার, ৮ অক্টোবর, ২০২১

রাইখস্ট্যাগের আগুন" ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

মিউনিখের গেস্টাপো কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সৌমেন্দ্রনাথ, ঠাকুর প্যারিসে যান, যেখানে তিনি ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।  ১৯৩৩ সালের সেপ্টেম্বরে, প্যারিসে একটি বিশাল ফ্যাসিবাদবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সুপরিচিত ফরাসি নেতারা, টরেস এবং ডি মোরো-গাইফেরি ও অন্যান্য নেতারা কমিউনিস্টদের দাবিয়ে দেয়ার ভূমিকা হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে গোয়ারিং, গোয়েবলস এবং অন্যান্য নাৎসি নেতারা অজুহাত হিসেবে রাইখকস্ট্যাগে আগুন দেওয়ার অভিযোগ এনেছিলেন। ঠাকুরও সভায় বক্তব্য রাখেন।  বক্তৃতা এখানে আবার দেওয়া হল। [এই বক্তৃতাটি সৌমেন্দ্রনাথের 'রাইখস্ট্যাগ ফায়ার' রচনা হিসেবে পরিচিত। আর্কাইভ থেকে বঙ্গানুবাদ আমার]

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এত পুরোনো একটা বক্তৃতা কতটা প্রাসঙ্গিক সেটা সুধী পাঠক লক্ষ করবেন। উনি বলছেন, "কমরেডস, আমরা আজ এখানে মানব ইতিহাসের একটি সুনির্দিষ্ট কালে মিলিত হচ্ছি। আমাদের এই সময়ে মানবজাতিকে এমন দুটি তীব্রভাবে পৃথক, বিরোধী গোষ্ঠীতে বিভক্ত করা হয়েছে যা মানবজাতির ইতিহাসে এর আগে কখনোই করা হয়নি। অগ্রগতির অদম্য শক্তিরা কাজ করছে এবং একই সময়ে মানুষের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত পরিচিত সবচেয়ে নৃশংস এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন শক্তিরাও রাগী জন্তুর মতো চারদিক থেকে গর্জন করছে। প্রতিক্রিয়া ব্যাপকমাত্রায় সর্বত্র বিদ্যমান, এবং এর জান্তব গর্জন সারা বিশ্বে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সন্ত্রাস এবং উস্কানি ছাড়া এই প্রতিক্রিয়ার পক্ষে নিজেকে টিঁকিয়ে রাখার কোন সম্ভাবনা নেই।  বিশ্বের অর্থনৈতিক শক্তিগুলো প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে। অতএব, এটি তার অস্তিত্বের জন্য শুধুমাত্র সন্ত্রাস এবং উস্কানির উপর নির্ভরশীল।  কিন্তু কোথাও হিটলারাইট জার্মানির মত প্রতিক্রিয়ার বিশুদ্ধ ও সহজ সন্ত্রাসবাদী এবং উস্কানিমূলক চরিত্র এতটা স্পষ্ট হয়নি।"

সন্ত্রাস আর উস্কানি ছাড়া ফ্যাসিবাদ টিঁকে থাকতে পারে না এটা বোঝাতে গিয়ে সৌমেন্দ্রনাথ নিজের কারাবাসের কথা তুলে এনেছেন। সুধী পাঠকরা খেয়াল করে দেখবেন অধুনা ভারতে প্রচলিত ভাষ্য 'আর্বান নকশাল' আর কারাগার বন্দী স্ট্যান স্বামীদের সাথে সেই সময়ের এক জার্মানিতে এক বাঙালি ইন্টেলেকচুয়াল এর কি মিল। উনি বলছেন, "হিটলারের ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বটি সন্ত্রাস এবং শুধুমাত্র সন্ত্রাসের দ্বারা তার অস্তিত্ব অব্যাহত রেখেছে। মরফিনিস্ট গোয়ারিং এবং সেই অধঃপতিত জন্তু গোয়েবলস শুধুমাত্র উস্কানি তৈরির জন্য রাইখস্ট্যাগ পোড়ানোর আয়োজন করেছিল। বার্লিনে উড়োজাহাজ থেকে কমিউনিস্ট প্রচারপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার  গোয়ারিংয়ের "আবিষ্কার" আসলে এই ওই অপকর্মার উস্কানি ছাড়া অন্য কিছু নয়।"

"হিটলারকে হত্যার পরিকল্পনা করার বিদ্বেষমূলক এবং মিথ্যা অভিযোগে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।  জার্মান পুলিশের এটা খুব ভালভাবেই জানা ছিল যে বার্লিনে আমার সব কাজকর্ম জানত যে আমার রাজনৈতিক মতবাদ সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে।  কিন্তু আমার গ্রেফতারের কারণটা সেই একই রকম যেমনটি ছিল রাইখস্ট্যাগ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে অথবা বার্লিনে বিমান হামলার ক্ষেত্রে। এর উদ্দেশ্য ছিল উস্কানি। নাৎসি সংবাদপত্র আমার গ্রেফতারের খবর প্রকাশ করার সময়, উস্কানিমূলক চরিত্রের সাথে বেশ স্পষ্টভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা আমাকে হারকিউলিয়ান চেহারার একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে এবং বলেছিল যে আমি যে গাড়িতে করে ঘোরাঘুরি করছিলাম সেখানে অনেক সন্দেহজনক জিনিসপত্র পাওয়া গিয়েছিল, যখন বাস্তবে কিছুই পাওয়া যায়নি, কারণ সেখানে কিছুই ছিল না।  নাৎসিদের দ্বারা নির্মিত এই দীর্ঘ ধারাবাহিক প্ররোচনার একটি উদ্দেশ্য রয়েছে।"

ফ্যাসিবাদ যে আসলে পুঁজিবাদের ব্যর্থতারই একটা বহিঃপ্রকাশ, অন্য কিছু নয়, সেটা দেখাতে গিয়ে উনি বলছেন, "হিটলারিজম ইতোমধ্যেই জার্মান জনগণের অবস্থার অবনতি ঘটিয়েছে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে জার্মান জনতার অবস্থা খারাপ এবং আরও খারাপ হবে বলে নিশ্চিত।  ফ্যাসিবাদী সরকার লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত শ্রমিকদের রুটি দিতে যত বেশি ব্যর্থ হবে, বেকারত্বের সমস্যা সমাধানে যতই ব্যর্থ হবে, ততই উস্কানির পথ অবলম্বন করবে।অর্থনৈতিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ অভাব এবং অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে তার সম্পূর্ণ ব্যর্থতা ঢাকার জন্য এরা একের পর এক উস্কানিমূলক পরিকল্পনার জন্ম দেবে।" 

এবারে উনি মুখোশ খুলছেন একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে ঘিরে নাৎসি অপবাদ আর অপপ্রচারের মুখোশ।সেদিনের নাৎসি কৌশলের সাথে আজকের ভারতকে মিলিয়ে দেখুন সুধী পাঠক। কেন একটা বিশেষ সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সকল দুঃখ দুর্দশার জন্য তাদের দায়ী না করতে পারলে ফ্যাসিবাদ বাঁচে না, তা বোঝাতে গিয়ে উনি বলছেন, "জার্মানিতে, নাৎসিদের ইহুদি-বিরোধীতা দুটি উদ্দেশ্য সাধন করছে।  একটি হলো শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণীসংগ্রামকে জাতিগত সংগ্রামের অন্ধ গলিতে ঠেলে সরিয়ে বিপথগামী করা;  দ্বিতীয়টি হল জার্মান জনগণের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য ইহুদিদের দায়ী করে নাৎসি শাসনের ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়া।  নাৎসিদের এই ইহুদি-বিরোধী জাতিগত নরখাদকবাদকে বিশ্বের প্রতিটি সুসভ্য ব্যক্তি দ্বারা তিরষ্কার ও নিন্দা করা উচিত।"

নির্বিচারে জেলবন্দী বা ডিটেনশন ক্যাম্পিবন্দী মানুষজনের দুঃখদুর্দশা নিয়ে আমরা তেমন সরব হই না কারণ আমাদের বেশিরভাগেরই প্রত্যক্ষ কোনও অভিজ্ঞতা নেই, বীভৎসতা নিয়ে কোনও ধারণাই নেই। আর বৃহৎ পুঁজির কাছে বিকিয়ে যাওয়া সংবাদমাধ্যমও আমাদের পুরো খবর দেয় না, কোনোদিন দেয় নি, সেদিনের সেই নাৎসি জার্মানিতেও নয়। উনি বলছেন, "নাৎসি অপরাধী নেতারা বিদেশি প্রচারযন্ত্রের 'জান্তব হাহাকার' নিয়ে চিৎকার করে, কিন্তু নাৎসি সন্ত্রাসের শিকার, যাদের সাথে আমি কারাগারে ছিলাম, তারা আমাকে তাদের শরীরে নির্মম মারধরের চিহ্ন দেখিয়েছে এবং আমার কাছে নাৎসিদের নির্মমতার চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণনা করেছে। আমি নিজে যা দেখেছি এবং যা শুনেছি তা সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারা বর্বরতার সমস্ত বিবরণকে ছাপিয়ে যায়।"

ফ্যাসিবাদের বিপ্রতীপে বুর্জোয়া লিবারালদের তথাকথিত সংগ্রামী ভূমিকা নিয়ে কিছু কিছু বামপন্থীদেরর মনে সেই সময়েও বেশ ইলিউসন ছিল। কিন্ত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের এই মেধাবী ছাত্রের মনে সংশয় ছিল না। তিনি বলছেন, "কমরেডস, আমাকে আপনাদের সতর্ক করতে দিন যে সাম্রাজ্যবাদী সরকার সম্পর্কে আপনারা মনে কোন বিভ্রম রাখবেন না।  আপনি যদি মনে করেন যে এই সরকারগুলি জার্মানিতে নৃশংস নাৎসি শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য সত্যিই কিছু করবে, তাহলে আপনি সম্পূর্ণ ভুল করছেন। তারা কিছুই করবে না।  ইতিমধ্যে সারা বিশ্বের বুর্জোয়া প্রেস জার্মানিতে নাৎসি সন্ত্রাসের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েছে।  তাদের কাছ থেকে কিছু আশা করবেন না।" 

বুর্জোয়াদের প্রগতিশীল ভূমিকার ওপর ভরসা করে তাদের সাথে জোট টোট নয়, শ্রমিকশ্রেণীকে তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়। তাঁর একমাত্র নির্ভরযোগ্য মিত্র হল অন্যদেশের শ্রমিক শ্রেণী। সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ এটা বোঝাতে গিয়ে উনি বলছেন, "দীর্ঘ বক্তৃতা করার সময় শেষ। ক্রিয়াকর্মের সময় এসেছে, বিপ্লবী ক্রিয়াকর্মের সময়। মনে রাখবেন, কমরেডস, যে শৃঙ্খলটি জার্মানিতে আমাদের কমরেডদের আবদ্ধ করে, তার অন্য প্রান্তের সাথে, আমাদেরকে বিশ্বের সমস্ত দেশে, এবং জার্মানিতে যে কারাগারেগুলিতে তারা বসে আছে তা আমাদের চারপাশে অদৃশ্যভাবে বিদ্যমান।  আসুন আমরা সকলেই এটি মনে রাখি এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাই যতক্ষণ না আমরা কেবল জার্মানিতেই নয়, সারা বিশ্বেই প্রতিক্রিয়াকে ধ্বংস করতে পারবো।"

ফ্যাসিবাদীরা গোটা কয়েক দেশে শাসন ক্ষমতাচ্যূত হলেও ফ্যাসিবাদ কিন্তু পরাস্ত হয় নি। লেনিনের রাশিয়া থেকে থরেজ এর ফ্রান্স - ইউরোপ থেকে আমেরিকা - এশিয়ার নানান দেশ, সর্বত্র অতি দক্ষিণপন্থীরা ঘুরে ফিরে ফিরে আসছে। আজকের ভারতে এই সময়ে দাঁড়িয়ে তাই একবার ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের দিশা খুঁজতে গিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বাঙালি বিপ্লবী ও মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী নেতা সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও জীবনীকে ভুলে গেলে চলবে না।  

আজ তাঁর জন্মদিন। লাল সেলাম কমরেড।

শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আমার নায়ক ~ ডাঃ অরুণাচল দত্ত চৌধুরী


আমার নায়ক 
অথবা 
সোনার গৌরাঙ্গ চলে যায়

ইংরেজি সন ১৯৭৩। মেডিকেল কলেজে পা রাখলাম। তার আগে প্রি-মেডিকেল নামের অর্থহীন একবছরে আমার মাথা চিবোনোর প্রাথমিক কাজটি করেছে, সহপাঠী অমিতাভ।

কলেজে এসে আলাপ হল বড়দের সঙ্গে। পাঁচ ছ' বছরের বড় গৌরাঙ্গ দা'র সঙ্গেও। এ ছাড়া অমিতদা'(পান), আরও কতজন। কী ব্যাপার? কেন আলাপ? না, এরা সবাই এসএফআই করে। মেডিকেল কলেজের ছাত্র রাজনীতিতে তখন পতপত করে উড়ছে ছাত্র-পরিষদের পতাকা।

কেন সেই সিদ্ধার্থ-রাজ চলার সময় বিরোধী রাজনীতির মধ্যে ঢুকেছিলাম? অন্তত আমার নিজের কাছে তার একটা গোপন (অপ)ব্যাখ্যা আছে। গ্রামের ছেলে। এক কলকাতার মধ্যে নানান কলকাতাকে অনুভব করি। ঝাঁ চকচকে কলকাতার রকমসকম বুঝি না। মেডিকেল কলেজেও সহপাঠীদের মধ্যে স্পষ্ট স্তরবিন্যাস। একদল এসেছে আমার মতন গ্রাম থেকে বা খুব বেশি হলে কলকাতার বাংলা মাধ্যম স্কুল থেকে। আর এক দল সাউথ পয়েন্ট, লা মার্টিনিয়ার, লরেটো, হোলি চাইল্ড। আর সেই সতেরো আঠারো বছর বয়সে রক্তে প্রকৃতি ঢালছে বিষাক্ত হরমোন স্রোত। ওজন সাতচল্লিশ কিলো, উচ্চতা পাঁচ ফুট সাড়ে চার, মুখাবয়ব আর গাত্রবর্ণ...  ইয়ে। সেই বালকের মনেও দুরাশা, সবার বিশেষ করে সহপাঠিনীদের চোখে পরার তীব্র বাসনা। বিরোধী রাজনীতির হাত ধরলেই সম্ভব তা'। এই রকম ভেবেছিল সেই গ্রাম্য কিশোর অথবা সদ্য যুবক। 

গৌরাঙ্গ দা' তখন আমাদের, মানে সেই সরকার-বিরোধী ছাত্রদের পাণ্ডা। খুব যে হইচই করত, হল্লাবাজি করত, তা' মোটেই না।  সে'সব বরং করত অমিত দা'রা। গৌরাঙ্গদা' করত সংগঠনটা। বুঝতোও। লম্বা একহারা চেহারা। তীক্ষ্ণনাসা। গৌর বর্ণ। চাইলে হতেই পারত মেডিকেল নন্দিনীদের হার্টথ্রব। 

গৌরাঙ্গ দা'র পরিবার, যতদূর খেয়াল পড়ে, তখন কালনার বাড়ি থেকে বিতাড়িত। সেই বাহাত্তর সালের পর পশ্চিমবাংলার অনেক জায়গায়ই পরিস্থিতি ও'রকম। গৌরাঙ্গ দা' হোস্টেলে থাকত কি, কোনও সময়? সম্ভবত না। আমি যখন থেকে দাদাকে পেয়েছি, তখন ও থাকত পিআরসি(পিপলস রিলিফ কমিটি)র একটা আখরা ছিল বৌবাজার স্ট্রিটে, সেখানে। ফিরিঙ্গি কালিবাড়ির চারতলায়। সেখানে একটা খুপরি মতন জায়গায় থাকত সে।

নিজের ভরণপোষণ নিজেই করত। অ্যানাটমির উজ্জ্বল ছাত্র সে। তখনই কলকাতার তিনটে না চারটে হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের শিক্ষক।

সেই সঙ্গে সে ছিল আমাদেরও শিক্ষক। নানান চটি বই কিনতাম আমরা। আজ্ঞে না, ইন্টারনেট দুনিয়ায় চটি বই সার্চ দিলে যে সব বইয়ের খোঁজ পাওয়া যায়,  তার মত কিছু নয়। সেই সব পাতলা বইয়ের নাম ছিল, মার্কসবাদ জানতে হলে, সমাজতন্ত্রের অ আ ক খ, ম্যানিফেস্টো, জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এইসব পাতলা পাতলা প্রায় দুর্বোধ্য(আমার কাছে) বইয়ের মিল ছিল এক জায়গায়। বিশাল বিশাল বাক্য। এ'পাতার প্রথমে শুরু হয়ে ও'পাতার শেষে গিয়ে দাঁড়ি। মধ্যে অজস্র কমা, সেমিকোলন, কিন্তু, যেহেতু, সুতরাং, অতএব, এবং। আমি কোনও বাক্যই পড়ে শেষ করতে পারতাম না। কিম্বা পারলেও শেষ অবধি তালগোল পাকিয়ে ফেলতাম। সেই সব বই লাইন ধরে ধরে বোঝাত গৌরাঙ্গ দা'।

বাংলা আলোচনার মধ্যে আমাদের জমায়েতকে স্তম্ভিত করে দিয়ে মাঝে মধ্যে অ্যানাটমির গুগলি ছুঁড়ত, মার্ক্স লেনিন ও দেশীয় পরিস্থিতিকে সাক্ষী রেখে। আমি তো চিরকালের ফাঁকিবাজ। অ্যানাটমিই বলুন কিম্বা, মার্ক্স লেনিন আধা ফ্যাসিস্ট দেশীয় অবস্থা, সব কিছুকে ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখিয়ে ঝিমোতাম দেয়ালে হেলান দিয়ে। সন্দেহ হয়, আমি কি সত্যিই ওইসব তত্ত্বের ভুজুংভাজুং শুনতে যেতাম, নাকি একসঙ্গে থাকার উত্তেজনা আর পার্টি ক্লাসের শেষে যে সামান্য মুড়ি-বাদাম(মোটেই রোজ না,কোনও কোনও দিন) তার লোভে!

যে ব্যাপারটা গৌরাঙ্গদা'র খুব অধিগত ছিল তা হল সাংগঠনিক চর্চাটা। সত্যি কথা বলতে মেডিকেল ফ্রন্টে এসএফআই তথা পার্টিকে দাঁড় করাতে ওই একা মানুষটির মত তৎপর অন্য কেউ ছিল না। প্রতিভাবান, উজ্জ্বল তারারা নাম করতে চাই না, টুপটাপ করে একে একে খসে পড়ল ঐতিহাসিক ভুল না করে। শুধু গৌরাঙ্গদা' ফিরে গেল তার ছেড়ে আসা কালনায়। ফিরে গেল নিজের ইচ্ছায় কিছুটা। বাকি সত্যিটুকু হল, পাছে সে সত্যিই সংগঠন মজবুত করে ফেলে ক্ষমতাশালী কারওর এই আশঙ্কায়। 

সত্যি কথা বলতে কী, ডাক্তারি ছাত্র যারা পরে ডাক্তার হবে তারা তো মধ্যবিত্ত, বেজায় রকমের মধ্যবিত্ত। তারা বয়স যত এগোয়, একটু একটু করে 'খারাপ' থাকতে শুরু করে। 

মধ্যবিত্তের সেই খারাপ থাকার কারণটা ভারি অদ্ভুত। 'আমি কেন কষ্টে আছি' এই ভেবে মধ্যবিত্ত খারাপ থাকে না। তার খারাপ থাকার এক এবং একমাত্র কারণ হচ্ছে, 'ও কেন আমার চেয়ে ভালো আছে?' নতুন নতুনতর ডিগ্রির লেজ, বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্য্যাট, বিদেশ ভ্রমণ আর নাম-যশ এই সমস্ত সপ্তরথী সেই যুবক অভিমন্যুকে ঘিরে ধরে। তার অবয়বটা দেখতে একই রকম থাকে কিন্তু ভেতরটা মরে যায়। 

গৌরাঙ্গদা' কালনায় যখন ফিরে গেল, শুনতে অবাক লাগে, সে' তখন সার্জারির ডিগ্রি  এমএস পড়ার মধ্যপথে। তার বাকি সঙ্গীরা তখন উচ্চতর ডিগ্রি ও ঔজ্জ্বল্যের খোঁজে স্বদেশ ও বিদেশ ছানবিন করে ফেলছে। আজ প্রায় সবাইই সেই অর্থে 'সফল'। গৌরাঙ্গদা'ই শুধু আতি লোকের পাতি ভাষায়, চিরকাল সেই 'পাতি এমবিবিএস'ই থেকে গেল আজীবন।

পার্টি করা ডাক্তার গৌরাঙ্গদা' কি পার্টিতেও সাফল্য পেয়েছিল? নাঃ, চতুর মানুষেরা এই বুদ্ধিমান মানুষটিকে সে'খানেও ওপরে উঠতে দেয়নি। বহু কথিত ও চর্চিত চৌত্রিশ বছরে 'বাগিয়ে নেওয়া' বলতে যা বোঝায় আমার এই দাদাটি সেই রাস্তায় হাঁটেইনি।

গৌরাঙ্গদা' কালনায় আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে প্র‍্যাকটিস শুরু করল। ফি? পাঁচটাকা। তা'ও যারা দিতে পারে তাদের জন্য। তখনকার দিনেও পাঁচটাকা বেশি ছিল না। কিন্তু গৌরাঙ্গদা'ও তো মধ্যবিত্তই ছিল অন্য অর্থে। সেই মধ্যবিত্ত লজ্জাবোধ থেকেই বোধ হয় মানুষটা নিজের বিনিময় মূল্য বাড়াতেই পারল না সারা জীবনে। শেষ অবধিও, এই চল্লিশ বছর পরেও, ফি সেই পাঁচ টাকাই।  তার সমসাময়িক তারই মত উজ্জ্বল যারা ছিল তারা ধাপে ধাপে, তার অনেক জুনিয়রও অথচ... । এই লকডাউনের বাজারে, সুপ্রিম মান্যতাপ্রাপ্ত অনলাইনের ফি আড়াই তিন হাজার পেরিয়ে কারও কারও যে কোথায় দাঁড়ালো! যাক সে কথা। মোটমাট  গৌরাঙ্গদা' হয়ে দাঁড়াল, কালনার গরীবের ভগবান, পাঁচটাকার ডাক্তার। তার যে শুরুটা মেডিকেল কলেজে আমি দেখেছি, তাতে কিন্তু তার, কী অ্যাকাডেমিক চিকিৎসা ক্ষেত্রে, কী রাজনীতিতে, এই পাঁচটাকার ডাক্তার অভিধায় থমকে থাকার কথা ছিল না। সেই অর্থে এ'টা তার স্বআরোপিত স্বোপার্জিত এক অসাফল্য ছাড়া আর কিছু না। বস্তুত আমরা যখন এই বাংলাতেই আরও বেশ কিছু 'একটাকার' বা 'দুটাকার' ডাক্তারের সন্ধান জানি, যাঁদের প্রেসক্রিপশনের ফেসভ্যালু ওষুধ ল্যাবরেটরির ইয়ে মিলিয়ে পাঁচশ' কী হাজার টাকাই।

একবার, সেও প্রায় বছর পনেরো আগে, এক খবরের কাগজের সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, 'ডাক্তারবাবু, এই পাঁচটাকা ফি কি বাড়বে না।' গৌরাঙ্গদা' তাকে অল্প হেসে বলেছিল, 'হ্যাঁ, এই চারআনা আটআনা, যেমন উঠে গেল, তেমনি পাঁচটাকাও যখন উঠে যাবে তখন বাড়াতে হবে বই কি!' সেই হাসিতে বোধহয় মিশে ছিল অর্থনৈতিক অবমূল্যায়নের জন্য মার্কসিয় দর্শনে বিশ্বাসী মানুষটার অন্তর্গত ব্যথা।

কিছু টুকরো কোলাজ সাজাই।

তিয়াত্তর চুয়াত্তর সালে একটা নাটক অভিনয় করেছিলাম আমরা, বাম মেডিকেল ছাত্ররা। শ্রদ্ধানন্দ পার্কে। (প্রসঙ্গত সেই আমার প্রথম আর শেষ মঞ্চাভিনয়। যদিও একধরনের নকল বীরত্বের অভিনয় সারা জীবন করার চেষ্টা করেছি, কর্মক্ষেত্রে সংসারে আর অন্যত্রও)। তো যা বলছিলাম, কার লেখা মনে নেই, সেই ক্ষীণকায় হাসির নাটকটিকে, গৌরাঙ্গদা' বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করেছিল বাকিটা নিজে লিখে। কী বলব মূল নাটকের চাইতেও ধারাল ছিল সেই অংশটুকু। একটা সংলাপ আজও এই প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও মনে পড়ে। একজন নেতা বক্তৃতায় বলছে, ' আমি মন্ত্রী হলে? তোদের সক্কলের গাড়ি হবে, বাড়ি হবে, দন্তহীন বৃদ্ধদের মাংস খাবার মাড়ি হবে!' অলীক আশার রাষ্ট্রীয় দানছত্রের ভাণ্ডারফোঁড় লাইনে ভোটারকে দাঁড় করিয়ে নিজেদের আখের গোছানো এই সময়ে আজও কী প্রাসঙ্গিক মনে হয় এই লাইন! এক রাত্তিরে লেখা সেই পান্ডুলিপি আমাদের কারওর কাছে রাখা ছিল দীর্ঘদিন। তারপরে কালের গতিতে হারিয়েও যায়।

গৌরাঙ্গদা'র খুব আকর্ষণীয় একটা গুণ ছিল ওর বিশ্লেষণ ক্ষমতা। দক্ষ শল্যবিদের মত ডিসেকশন করতে পারত রাজনীতি আর তার বাইরের অনেক কিছুও। হিন্দি সিনেমা দেখে এসে বোঝাতো আমাদের, কী করে 'ববি' সিনেমাতে মৎস্যজীবীদের শ্রেণীচেতনা এড়িয়ে যেতে পারেনি বাজারি পরিচালক। 

শ্যামনগরে না কোথায় যেন চটকল মজদুরদের এক শ্রমিক সংগঠনের অধিবেশনে গৌরাঙ্গদা'র সঙ্গে গেছি পিআরসির তরফে মেডিকেল ক্যাম্পে। সারাদিন অভুক্ত। ও'টুকু অব্যবস্থা থাকেই। দাদা কিছু পরে রুটি-তরকারি আর জনপ্রতি একখানা করে জিলিপি জোগাড় করে ফেলল। নিজের পয়সায়ই সম্ভবত। ওষুধ দিতে ব্যস্ত সমস্ত আমাদেরকে বলল, 'কাজ থামিয়ে খেয়ে নাও। না খেলে লড়বে কীসে?'

বছর পাঁচ সাত আগে, বইমেলায় দাদার সঙ্গে দেখা। বৌদিও সঙ্গে। দাদা আগে কালনা মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ভোটে হেরে গেছেন নয়া জমানায়। বৌদিকে জিজ্ঞেস করতে রাগত গলায় বললেন, 'রাত নেই দিন নেই, পাঁচটাকা ফিএর ভিড় ঠেলছে। আর ওই লোকগুলোই... '

গৌরাঙ্গদা' মেলার একপাশে আমাকে ডেকে বোঝালেন, 'দ্যাখো অরুণাচল, পৃথিবীর অনেক দেশেই ফেডারেল স্ট্রাকচারের মধ্যে আঞ্চলিক ভাবে ফ্যাসিজমের বিকাশ সম্ভব কি না এই ব্যাপারে স্পনসরড এক্সপেরিমেন্ট চলছে, টের পাই'। অস্বীকার করতে পারিনি তার এই পর্যবেক্ষণ। 

আমার বন্ধু অমিতাভ কালনায় দেখা করতে গেছে দাদার সঙ্গে। দাদা কাজের শেষে অমিতাভকে যত্ন করে ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন সেখানের অমূল্য মন্দিরগুলি। সেখানের ভাস্কর্য আর ইতিহাস। অমিতাভ যখন জিজ্ঞেস করেছে, ভালোবাসার দাবীতেই,
- আমাদের অনেক আগেই  ডেকে কেন দেখাননি দাদা?
গৌরাঙ্গদা' হেসে বলেছে,
- ওটা তো আমাদের অ্যাজেন্ডায় ছিল না।
এই হচ্ছে গৌরাঙ্গদা', যার একমাত্র অ্যাজেন্ডা হয় তো ছিল, মানুষ... মানুষ... এবং মানুষ।

এ'বারে শেষের কথা বলি। এই কোভিড রোগটাকে এককথায় বললে আজও অবধি কেউ সে'রকম বোঝেনি। গৌরাঙ্গ দা'র ডাবল ভ্যাক্সিনেশন নেওয়া ছিল। রোগী দেখায় বিরাম নেয়নি। জ্বর হবার পর র‍্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট নেগেটিভ হবার পর ভুগতে  ভুগতে যখন ভর্তি হল বেশ দেরি হয়ে গেছে। কোভিড কার হবে কার হবে না আর কে এই বিরাট কোভিড স্পেকট্রামের কোন জায়গায় ধরা পড়বে, কে মরবে আর কে মরবে না, তার হিসেব কেউ জানে না। ভর্তির পর আস্তে আস্তে গৌরাঙ্গদা' এগিয়ে গেল তার ভবিতব্যের দিকে।

গৌরাঙ্গদা' কেরিয়ারিস্ট ছিল না। না পলিটিক্যাল কেরিয়ার, না প্রফেশনাল কেরিয়ার কোথাও পৌঁছোতে পারেনি, চায়ও নি আমার প্রথম যৌবনের সেই নায়ক। সে শুধুই মানুষের ভালোবাসা চেয়েছিল। 

আজ কালনায় ভিড় ভেঙে পড়েছে। সেই মূঢ় ভিড়, যারা অসুখ হলে ওকে দেখিয়েছে, ভোটে হারিয়েছে, আর আমি অতি নিশ্চিত আগামী কাল সেইভাবে মনেও রাখবে না।

শুক্রবার, ২৭ আগস্ট, ২০২১

লক্ষীর ভাণ্ডার ~ শতদ্রু দাস

লক্ষীর ভান্ডার নিয়ে কয়েকটি শুকনো পরিসংখ্যান: 

প্রথমত, এই প্রকল্পের আওতায় আসতে গেলে কী কী যোগ্যতাপূরণ করতে হবে সেটা দেখে নেওয়া যাক - ১) পশ্চিমবঙ্গবাসী হতে হবে ২) মহিলা হতে হবে ৩) বয়স ২৫-৬০ এর ভেতর হতে হবে ৪) সরকারী চাকুরিরতা বা পেনশনভোগী হওয়া চলবে না।

দ্বিতীয়ত, কত টাকা পাওয়া যাবে? জেনারেল ক্যাটাগরি হলে ৫০০ টাকা, সংরক্ষিত ক্যাটাগরি হলে ১০০০ টাকা।

তৃতীয়ত, সরকারের হিসেব অনুযায়ী কতজন উপভোক্তা ও কত কত খরচ হবে? সরকারী হিসেবে ১.৬ কোটি উপভোক্তা এবং মাসে ১১০০ কোটি টাকা খরচ হবে। অর্থাৎ মাথাপিছু ৬৮৮ টাকা। 

সরকারের হিসেব কি সঠিক? পশ্চিমবঙ্গে, ২০১১ জনগণনা অনুযায়ী ১৫-৫০ বছর বয়সী মহিলার সংখ্যা ছিল ২.৫৪ কোটি। ২০২১-এ এসে এনাদের বয়স হবে ২৫-৬০। এঁদের মধ্যে সরকারী চাকরি বা পেনশনভুক্ত হবেন খুব বেশি হলে ৪-৫ লক্ষ। ধরে নিচ্ছি আরো ১৫-২০ লক্ষ মহিলার অবস্থাপন্ন পরিবার হওয়ার কারণে এই প্রকল্পে আগ্রহী হবেন না। সে ক্ষেত্রে ২.৩ কোটি মহিলা এই প্রকল্পে যুক্ত হতে চাইবেন বলে ধরা যায়। অর্থাৎ, সরকারের ১.৬ কোটি উপভোক্তার হিসেব ভুল অথবা তারা সকলকে এই প্রকল্পের আওতায় আসতে দেবে না, কোনো ছুতো দিয়ে বাধা দেবে। সরকারের মাথাপিছু ৬৮৭ টাকার হিসেবও কি ঠিক? ৬৮৭ টাকা হতে গেলে, রাজ্যের ৬৩ শতাংশ মহিলাকে জেনারেল এবং ৩৭ শতাংশ মহিলাকে রিজার্ভ ক্যাটাগরি হতে হবে। ২০১১-এর জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের ৩১ শতাংশ মানুষ এসসি-এসটির আওতায় পড়েন। এর ওপর ১০ শতাংশের বেশি ওবিসি আছেন। অর্থাৎ সংখ্যাটা ৪০%-এর বেশি হবে। সেনসাসে বহুদিন যাবৎ দেখা গেছে যে এসসি-এসটির ভেতর জন্মহার জেনারেলের তুলনায় কিছু বেশি। তা ছাড়া যাঁরা অবস্থাপন্ন বা সরকারী চাকরি করার দরুন এই প্রকল্পতে আগ্রহী হবেন না, তাঁদের মধ্যেও অধিকাংশ  জেনারেল হবেন কারণ উচ্চবর্ণরা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এগিয়ে। অর্থাৎ অন্তত ৪০% রিজার্ভড ক্যাটাগরির উপভোক্তা হবেন। সে ক্ষেত্রে মাথাপিছু খরচ কম করে ৭০০ টাকা হওয়া উচিত। তাহলে মোট মাসিক খরচ হয়ে দাঁড়ায় ২.৩*৭০০ = ১৭১০ কোটি টাকা। বার্ষিক খরচ দাঁড়ায় ২০,৫০০ কোটি টাকা। 

সরকারের হিসেবের থেকে ৬০% বেশি।

হয় সরকার ঠিকই করেছে যে সকল যোগ্য ব্যক্তিকে প্রকল্পর আওতায় আনবে না, নয় সারা বছর এই টাকা আসবে না, বকেয়া পড়ে থাকবে। অথবা হিসেবে বড় সর গোলমাল করছে।

এই ২০,৫০০ কোটি টাকা ঠিক কতটা? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বার্ষিক আয় গত বছর ১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি টাকার কিছু কম ছিল। অর্থাৎ, লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্পে সরকারের বার্ষিক আয়ের ১৩.৩ শতাংশ খরচ হবে। 

কোথা থেকে আসবে এই বাড়তি টাকা? রাজ্য সরকারের হাতে কর বৃদ্ধির রাস্তা জিএসটির পর থেকে একেবারেই সংকুচিত। রাজ্য আয়কর নিতে পারে না, জিএসটির ফলে সামগ্রীর ওপরও নিজের ইচ্ছে মত কর চাপাতে পারে না। রাজ্যের হাতে পড়ে রয়েছে শুধু জমি থেকে আদায় করা কর আর আবগারি কর। এই দুই উৎস থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা কর বৃদ্ধির দূর দুরান্তের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাহলে? পড়ে রইলো দুটো পথ - ধার করা এবং অন্য খাতে খরচ কমানো। কিন্তু এই দুটো পথ আসলে একই। ধার করলে যে সুদ গুনতে হবে তা অন্য খাতে খরচের ওপর প্রভাব ফেলবে এবং শেষ অবধি সুদ সমেত ধার ফেরত দিতে খরচ হবে প্রায় দ্বিগুণ। আয় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে, সেই দ্বিগুন টাকা শোধ হবে অন্য খাতের খরচ কমিয়েই। 

অর্থাৎ লক্ষীর ভান্ডারের টাকা আসবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক, কৃষি, পঞ্চায়েত, যুবকল্যান, সংখ্যালঘু উন্নয়ন ইত্যাদি দফতর থেকে টাকা কেটেই। কেউ কেউ হয়ত বলবেন যে এসব সরকারী দফতরের প্রকল্প কাটছাঁট করে, সরাসরি লোকের হাতে বেশি টাকা গেলে ভালোই। তারা হয়ত বিশ্বাস করেন যে টাকার অভাবে ভাঙা রাস্তা সরকার মেরামত না করলে বা সেচের খালের সংস্কার না করলে, হাজার হাজার গ্রামবাসী লক্ষীর ভান্ডার থেকে কিছু টাকা চাঁদা তুলে নিজেরাই তা করে নেবে। 

বুধবার, ১৮ আগস্ট, ২০২১

১৫ই আগস্ট ও গিরিশ চন্দ্র সেন ~ শুভাশীষ মোদক চৌধুরী


পনেরই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য যা আমরা ভুলে যাই বলে মনে করি - তা হল অরবিন্দের জন্মদিন, কিন্তু সত্যি সত্যি ভুলিনা । যেটা ভুলে যাই তা হল গিরিশ সেনের মৃত্যুদিন । 

উনি কে ছিলেন, কেন মনে রাখবো, ইত্যাদি ইত্যাদি লেখার আজকাল আর কোনো প্রয়োজন নেই । কারন: যার ইচ্ছে, সে এখুনি একটু Google করতে পারে, আর যার ইচ্ছে নেই তার তো অন্য কাজ রয়েইছে । উনি অনেক কিছু করেছিলেন । কিন্তু যার জন্য ওনাকে কেউ কেউ হয়ত মনে রেখেছে, এবং যার জন্য এই post এর অবতারণা, তা হল: উনিই ছিলেন কোরান এর প্রথম (এবং তর্ক সাপেক্ষে সবচেয়ে ভাল) বাংলা অনুবাদক ।

এসব আমরা ছোটবেলায় পড়েছি, ভুলেও হয়ত যেতাম - যদিনা ওই বই এর এক খন্ড আমার ISI হোস্টেলের লাইব্রেরীতে থাকতো ।  প্রায় এক বছর আমার দায়িত্বে ওই লাইব্রেরি ছিল, ফলে বই প্রচুর পড়তাম । তার আগে ওটার ভার ছিল কৌ বলে একজনের ওপরে (কেউ কেউ হয়তো চিনবে), সে ওই কোরান এর অনেক জায়গায় দাগ দিয়ে রেখেছিল । কৌ যেহেতু কড়া হিন্দু ছিল, তাই দাগ দেয়া জায়গাগুলো খুব একটা সুবিধের ছিলনা । কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, সে জন্য পড়তে কোনো অসুবিধে তো হয়ইনি, বরং চটপট পড়া হয়ে গিয়ে ছিল ।

এই গিরিশ সেনকে যে হিন্দুরা ভুলে যাবে এতে নতুনত্ব বা আশ্চর্যের কিছু নেই । তবে অবাক হতে হবে যদি ধর্মপরায়ন বাঙালি মুসলিমরা ভোলে । এক দিন তা দেখেই মজা পেয়েছিলাম - এবং এটা তারই রোমন্থন আর কি ...

আমার বিলেত বাসের প্রায় এক দশক হতে চলল । আমি সুযোগ পেলেই যাই লন্ডনের ব্রিক লেনে।  ওখানে অনেক বাংলাদেশী/ বাঙালি মুদিখানা, মিষ্টান্নভাণ্ডার, খাওয়াদাওয়া এবং সর্বোপরি  বই এর দোকান (যা এখন উঠে গেছে) আছে । তাই গেলে বাঙলার মাছ, সবজি আর বই কিনে ফিরি । যে গল্প বলছি, তা প্রায় তিন-চার বছর আগেকার । তখন বইয়ের দোকানটি ছিল বেশ ভাল - পশ্চিম এবং পূর্ব দুই বঙ্গেরই বই পাওয়া যেত, এবং ভয়ঙ্কর সিরিয়াস বই থেকে বটতলা - সব কিছুর যোগান ছিল । দোকানদার মানুষটি যদিও ছিলেন বেশ গম্ভীর, ফলে তার সাথে কথা বিশেষ হয়নি ।

একদিন আমি যখন বই ঘাঁটছি, এক বয়স্ক দম্পতি দোকানে এলেন এবং বাংলা কোরানের খোঁজ করলেন । ওনাদের বেশ ভূষাতেই বোঝা যায় ওনারা practicing মুসলিম। দোকানদার দু-এক কথায় জিজ্ঞাসা করলেন কি কারনে বাংলা কোরান দরকার (আমি বই এর স্তুপের অন্য দিক থেকে শুনে জানতে পারলাম যে, কোরান মূল ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় পড়লেও দোষ হয়) ! ওই দম্পতি বললেন যে তারা ভালো করে বোঝার জন্য বাংলা কোরান চান, কারণ এই বয়সে আর নতুন ভাষা শিখতে পারবেননা ।   

দোকানদার তখন বললেন যে তাহলে উনি গিরিশ চন্দ্র সেনের অনূদিত কোরান কিনতে বলবেন । তারপর কিছুক্ষন নিস্তব্ধতা । আমি উঁকি মেরে দেখি দম্পতি, যাকে বলে, বজ্রাহত । ওনারা জিজ্ঞেস করলেন অন্য 'ভালো' কিছু আছে কিনা । তাতে দোকানদার জানালেন ওটাই সবচেয়ে ভালো এবং মূলের প্রতি তন্নিষ্ঠ । আমি ক্রেতা ভদ্রলোকের মুখ দেখে বুঝলাম 'আতান্তর'  কাকে বলে ।

শেষে ক্রেতা বললেন যে - যার নামই কোনো দিন শোনেননি তার অনুবাদ করা বই কিনতে ওনার ইচ্ছে নেই, এবং অন্য কারোর অনুবাদ করা বই আছে কিনা দোকানদার যেন জানান । বেগতিক বুঝে দোকানদারও আরো দু তিনটে নাম জানালেন । সত্যি কথা বলতে কি, ওনাদের নামও ক্রেতা ভদ্রলোক কোনোদিন শুনেছেন বলে আমার মনে হলনা, তবে একটা বই কিনলেন শেষ অবধি ।


আমি আমার বই কেনার সময় দোকানদার ভদ্রলোকের সাথে একটু কথা হয় । উনি জানান যে - গিরিশ সেনের বইই উনি পড়েন কিন্তু ওটা বিক্রি করা খুব কঠিন, কারন বাঙালি (উনি হিন্দু মুসলাম কিছু বলেন নি) ওনাকে ভুলে গেছে ।

এইতো আরেকটা পনেরই আগস্ট চলে গেলো, আরেকটা প্রয়াণ দিবস । আমরা সত্যি ভুলে গেছি ব্রাহ্ম গিরিশ সেনকে: (আমার মতে) হিন্দুরা - উনি কোরান অনুবাদ করেছিলেন বলে, আর মুসলিমরা -  উনি মুসলিম না হয়েও কোরান অনুবাদ করেছিলেন বলে ।

শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

‘‘আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি’’:সেকাল ও একাল ~ ডঃ সমুজ্জ্বল মাইতি

১৯৫৬ সাল । মুক্তি পেল উত্তম কুমার,সুচিত্রা সেনের বিখ্যাত ছায়াছবি সাগরিকা । সতীনাথ মুখোপাধ্যায়,উৎপলা সেন,দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গাওয়া সেই ছবির জনপ্রিয় গান,''আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি''।কিছুদিন আগে এক নিভৃত নিরালায় সেই গানখানি শুনতে শুনতে মনে হল,''আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি''---যে অহংকরের সঙ্গে গাওয়া হল,তার কারণখানি কি নিছকই চিকিৎসা শাস্ত্রের চর্চা করা?শুধুই কি অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, প্যাথোলজি সহ আরো বিভিন্ন ''লজি''-র জ্ঞানগম্ভীর অধ্যয়ন করা?এশিয়ার প্রাচীনতম মেডিকেল কলেজটির উৎকর্ষতা ঠিক কোন জায়গায়?কেন সেটি আজও অনন্য সাধারণ?

এই প্রশ্নগুলি যখন মাথায় ঘুরছে তখন হঠাৎই মনে পড়ল ২০০৮ সালে যখন মেডিকেল কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র,তখন অ্যানাটমির কোন এক ক্লাসে ডাঃ পীতবরণ চক্রর্তীর মুখে প্রথম শোনা পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্তর ইতিহাস । তিনি ছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক এবং আধুনিক মেডিসিনের শিক্ষা নেওয়া প্রথম ভারতীয় । মেডিকেল কলেজের ১৮৩৫ সালে পথ চলা শুরু হলে তিনি এই কলেজে যোগ দেন এবং রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখ রাঙানীকে নস্যাৎ করে প্রথম শব দেহের ব্যবচ্ছেদ করেন (১৮৩৬) ভারতে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নের স্বার্থে। প্রাণহানি,মর্যাদাহানি ও সমাজের দ্বারা বহিষ্কৃত হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের অন্ধত্বের বিরুদ্ধে বারবার সরব হন এবং পরিশেষে জয়ী হন।সেদিনই শুরু হয় মেডিকেল কলেজের আসল লড়াই।আসল পথ চলা।মেডিকেল কলেজের সামাজিক দায়িত্ব সেদিনই ঘোষিত হয়ে যায়।

এবার আসা যাক কাদম্বিনী গাঙ্গুলির কথায়।তিনি ছিলেন বিখ্যাত ব্রাহ্ম সমাজ সংস্কারক ব্রজকিশোর বসুর কন্যা এবং বেথুন কলেজ থেকে উত্তীর্ণ কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট(১৯৮৩)।১৮৮৬ সালে তিনি বেঙ্গল মেডিকেল কলেজ থেকে পশ্চিমী মেডিসিনের ডিগ্রী লাভ করেন এবং প্রথম ভারতীয় মহিলা চিকিৎসক হিসাবে ইতিহাসে পরিচিতা হন। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ,এমনকি মেডিকেল কলেজের কতিপয় চিকিৎসক শিক্ষকের বিরুদ্ধেও তাঁকে লড়াই করতে হয়।''Her decision to do so as a woman received severe backlash in the Bhadralok (upper caste Bengali) community''. এরই মধ্যে ১৮৮৩ সালে অন্যতম ব্রাহ্মসমাজ নেতৃত্ব দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে বিবাহ করার পর,পূর্ব ভারতের কয়লাখনিগুলিতে কর্মরত মহিলা শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়নের জন্য তিনি আন্দোলন শুরু করেন।১৮৮৯সালে জাতীয় কংগ্রেসের সম্মেলনে তিনি ছিলেন একজন মহিলা প্রতিনিধিও।১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে,তিনি মহিলাদের নিয়ে সম্মেলনে নেতৃত্ব দেন।১৯০৮ সালে সাউথ আফ্রিকাতে ভারতীয় শ্রমিকরা সত্যাগ্রহ শুরু করলে তার সমর্থনে কোলকাতাতে যে সংহতি সমাবেশ হয়,তাতে সভানেত্রীত্ব দেন ডাঃ কাদম্বিনী গাঙ্গুলি।শ্রমিকদের আর্থিকভাবে সহায়তা করার জন্য একটি কমিটি গড়ে তিনি অর্থ সংগ্রহও শুরু করেন।ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের পটভূমিতে বাংলা জুড়ে যে নব্য চেতনার জাগরণ হয়,যে অধিকার বোধের আলোকশিখা প্রজ্জ্বলিত হয়,ডাঃ কাদম্বিনী ছিলেন সেই চেতনারই এক অগ্রগণ্যা মহীয়সী।১৯১৫ সালে মেডিকেল সম্মেলনে তিনি বেঙ্গল মেডিকেল কলেজে মহিলা চিকিৎসকদের মেডিসিনের শিক্ষালাভের সুযোগ দানের পক্ষে প্রতিবাদী বক্তব্য রাখেন এবং এর অনতিকাল পরেই মেডিকেল কলেজের প্রবেশদ্বার ছাত্রীদের জন্য চিরকালের মত উন্মুক্ত হয়ে যায়।জীবনের সায়াহ্ণে পৌঁছে ১৯২২ সালে তিনি  বিহার ও ওড়িশার মহিলা খনি শ্রমিকদের চিকিৎসা শুরু করেন।মৃ্ত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত আর্তের সেবায় তিনি জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। 

এরপর এল স্বদেশী আন্দোলনের যুগ।ত্রিশের কোলকাতা।অনেক কর্মকাণ্ডে কোলকাতা তখন উত্তপ্ত।স্বরাজীরা মেতেছেন স্বরাজের চিন্তায়।প্রস্তাব আর প্রস্তাবের বয়ান নিয়ে তর্কবিতর্কের শেষ নেই।বিপ্লবীরা যে যেখানে পারছেন ঝাঁপিয়ে পড়ছেন ইংরেজের ওপরে।ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত আগেই ইওরোপ থেকে কোলকাতায় ফিরে এসে সাম্যবাদের কথা বলেছেন।বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনর নেতা মানবেন্দ্রনাথ রায় ভারতে এসে গা ঢাকা দিয়ে ঘুরছেন।চেষ্টা করছেন কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন গড়ে তুলতে।এই সময়ে কিছু ঘটনা গোটা ভারতবর্ষকে আন্দোলিত করল-১৯১৩-১৪ সালে রাসবিহারী বসুর সারা ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের পরিকল্পনা,১৯১৪-১৫ সালে বাঘাযতীনের বিদেশী অস্ত্রের সাহায্যে সারা ভারতে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা এবং ১৯৩০ সালে চট্টগ্রামে সময়িকভাবে স্বাধীন সরকারের প্রতিষ্ঠা।ঠিক এই অগ্নিগর্ভ সময়ে ডালহৌসী স্কোয়ারে পুলিশের বড়কর্তা টেগার্টের গাড়ীতে বোমা ছুঁড়লেন দুই বিপ্লবী অনুজা সেনগু্প্ত ও দীনেশ মজুমদার।টেগার্ট প্রাণে বাঁচলেন কিন্তু ভয়ে বিলেতে পালিয়ে গেলেন।সারা কোলকাতাতে ব্যাপক পুলিশী তল্লাশী শুরু হল।ডাঃ নারায়ন রায় ও ডাঃ ভূপাল বসু-দুই চিকিৎসক এবং কোলকাতা মেডিক্যাল কলেজের দুই প্রাক্তন ছাত্র- এঁদের কাছে পাওয়া গেল টি-এন-টি তৈরীর ফর্মূলা।দুজনেরই ১৯৩০ সালে ডালহৌসী স্কোয়্যার বোমানিক্ষেপ মামলায় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর সাজা হয়, জেল খাটেন আন্দামানে। ডাঃ নারায়ণ রায় মেডিকেল কলেজে তাঁর ছাত্রাবস্থাতেই বিপ্লববাদী 'যুগান্তর সমিতি'-তে যোগ দেন।১৯৩০ সালে তিনি মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।অনতিকালের মধ্যেই তিনি হন কোলকাতা কর্পোরেশনের সর্বকনিষ্ঠ কাউন্সিলার।সরকারি মতে ডাঃ নারায়ণ রায় ছিলেন যুগান্তর সমিতির বোমার কারখানার ভারপ্রাপ্ত কর্মী।তাঁর গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ ঐ কারখানাটিও আবিষ্কার করে।মামলার শুনানির সময় তিনি তাঁর সাথীদের বাঁচাবার উদ্দ্যেশ্যে এই ষড়যন্ত্রের সকল দায়িত্ব নিজের ও তাঁর পলাতক ভাই গোবিন্দ রায়ের ওপর দিয়ে আদালতে বিবৃতি দেন।আদালতের রায়ে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দী থাকার সময়ে কমরেড কালী সেনের সংস্পর্শে এসে তিনি কমিউনিস্ট হওয়ার পথের সন্ধান পান।পরে তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল থেকে বোম্বাইয়ের য়েড়ারা জেলে স্থানান্তরিত করা হয়।সেখানেই কারাগারের নির্জন কক্ষে বসে তিনি পড়ে ফেলেন ইডেন অ্যাণ্ড সিডার পল অনুদিত 'মার্কসের ক্যাপিটেল'।সেই বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছিলেন,
             Don't worry,
             Don't hurry,
             The wheel of time 
             Has not stopped
১৯৩৩ সালের এপ্রিলে তাঁকে পুনরায় আলিপুর জেলে,আন্দামানে প্রেরণ করার উদ্দেশ্যে স্থানান্তরিত করা হলে এখানেই তাঁর সাথে নিরঞ্জন সেন ও সতীশ পাকড়াশীর সাক্ষাৎ হয়।১৯৩৩-এর এপ্রিলের শেষ দিকে তিনি সেলুলার জেলে আসেন এবং সাথে করে নিয়ে আসেন কয়েকটি ট্রাঙ্ক ভর্তি মার্কসবাদী তত্ত্বের বই। ১৯৩৩ সালের ১২ই মে আন্দামানে শুরু হল অনশন ধর্মঘট।ডাঃ নারায়ণ রায়, ডাঃ ভূপাল বসু,উল্লাসকর দত্ত ও সতীশ পাকড়াশির নেতৃত্বে একটানা ৪৬ দিন অনশন হয় পাঁচটি দাবীতে - খাবার যোগ্য খাদ্য, স্নানের জন্য সাবান, ঘুমানোর জন্য বিছানা, নিজেদের মধ্যে কথা বলার সুযোগ ও পড়বার জন্য বই। ন'দিনের মাথায় জোর করে অনশন ভাঙতে গেল কুখ্যাত ব্রিটিশ জেলর ডেভিড ব্যারী। বাধা দিতে গিয়ে প্রাণ হারালেন তিন বন্দী বিপ্লবী - মহাবীর সিং গদর, মোহিতকুমার মৈত্র ও মোহনকিশোর।পরের দিন জলের ঘটিতে দুধ রেখে দেওয়া হ'ল লুকিয়ে। বিপ্লবী সুশীল দাশগুপ্ত রেগে চিৎকার করলেন, 'ওরা জলের জায়গায় দুধ রেখে গেছে, কি করা উচিত আমাদের?' পাশের সেল থেকে ডাঃ নারায়ন রায়ের উত্তর ভেসে এল - 'ফুটবল খেলিস নি কোনোদিন ? কিক্ করতে জানিস না ?' যেমন বলা, তেমনি কাজ। লাথি মেরে দুধের ঘটি ফেলে দিলেন সুশীল। ৪৬-তম দিনে ২৬শে জুন-যখন সকলেই প্রায় মরণাপন্ন, বাধ্য হয়ে সব ক'টা দাবী মেনে নিল জেল কর্তৃপক্ষ। দাস ক্যাপিটাল আর কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো দেওয়া হয়েছিল ওঁদের দাবী মেনে।অনশন ভঙ্গ করার পর জেলের ডাক্তাররা এসে মেপে মেপে খাবার দেওয়া শুরু করলে আবার উত্তেজনা তৈরী হয়।ডাঃ নারায়ণ রায় এই সময় জেনারেল বডি মিটিং করে সবাইকে বোঝান কেন মেপে মেপে খাবার খাওয়া জরুরী।এরপর সেলুলার জেলে ডাঃ নারায়ণ রায়ের উদ্যোগেই শুরু হল মার্কসীয় তত্ত্বের অধ্যয়ন।ক্লাসের রুটিনও তিনিই তৈরী করে ছিলেন।এই ক্লাসগুলিতেই জেলবন্দীরা তাঁর পরামর্শে ও নির্দেশে পড়েন বুখারিনের 'Historical Materialism',জুলিয়াস হেকারের 'Moscow Dialogues',প্লেখানভের 'Fundamental Problems of Marxism',মার্কসের ক্যাপিটাল,ল্যাপিডাস ও অস্ট্রোভিটিয়নেভ রচিত 'Outline of Political Economy',স্তালিনের লেখা 'Leninism',লেনিনের 'Materialism & Empirio Criticism' এবং মার্কস-অ্যাঙ্গেলস্ রচিত 'কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টো'।নারায়ণ বসুর উদ্যোগেই প্রকাশিত হতে শুরু করে মাসিক পত্রিকা 'কালাপানি'।ইনিই জেলবন্দীদের শিখিয়েছিলেন যে, ''বাইরে গিয়ে আমাদের শুধু পার্টি সভ্য নয়,পেশাদার বিপ্লবী হতে হবে,বিপ্লব ছাড়া আমাদের যে আর কোন চিন্তা ধারণা থাকবে না''।তিনিই ছিলেন সেলুলার জেলে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট কনসোলিডেশন-এর প্রকৃত রূপকার। অন্যদিকে ডাঃ ভূপাল বসু এই সময়ে ছিলেন কট্টর মার্কসবাদ বিরোধী।মার্কসবাদের অসারতা প্রমাণ করার জন্য তিনি বহু বই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। আন্দামানের জেল বন্দীরা তাঁর কাছ থেকে নিয়েই পড়েছিলেন Laidler-এর History of Socialist Thogut। ১৯৩৭ সালে মুক্তির দাবীতে আবার শুরু হ'ল আমরণ অনশন। এবারো নেতৃত্বে ডাঃ নারয়ণ রায় ও ডাঃ ভূপাল বসু। দাবী মিটল ৩৬ দিন পর। একে একে ছাড়া পেলেন সকলে, পরের বছর জানুয়ারিতে চিরতরে বন্ধ হ'ল সেলুলার জেল।কমিউনিস্ট নেতা ডাঃ রায় পরে কোলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হ'ন, জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে তিনি পুনরায় ডাক্তারি শুরু করেন এবং আমৃত্যু অসংখ্য সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে কোলকাতাতে দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসের প্রাক্কালে 'রেডগার্ড' তৈরী হলে সেই রেডগার্ডের একজন অন্যতম প্রধান হন ডাঃ নারায়ণ রায়।অন্যদিকে ডাঃ ভূপাল বসু প্রথমে ফরোয়ার্ড ব্লক, পরে সমাজবাদী পার্টির নেতৃত্ব দিয়েছেন।

১৯৩৭ সাল ।চীন,জাপানী সাম্রাজ্যবাদী যু্দ্ধে আক্রান্ত । সাংহাই শহরের পতন আসন্ন ।সুং চিং লিং হংকং-এ ।গঠিত হয়েছে China Defence League,International Peace Hospital,যুদ্ধ ফ্রন্টের জন্য বিয়াল্লিশটি Mobile Medical Unit এবং আটটি Medical School।এহেন পরিস্থিতিতে জাপানী আক্রমণের তীব্রতা আরো বৃদ্ধি পেলে,কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে গৃহীত হয় ভারত থেকে চীনে মেডিকেল মিশন প্রেরণের সিদ্ধান্ত । অবশেষে ১৯৩৮ সালে ডাঃ মোহনলাল অটল,ডাঃ মোরেশ্বর রামচন্দ্র চোলকার,ডাঃ দ্বারকানাথ শান্তারাম কোটনিস,ডাঃ রনেন্দ্রনাথ সেন এবং ডাঃ দেবেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়-কে নিয়ে পাঁচ সদস্যের মেডিকেল মিশন গঠিত হয় । ডাঃ দেবেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন কোলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র,কোলকাতা মেডিকেল থেকে ডাক্তারি পাশ করে তিনি আসামের ডিব্রুগড়ে চিকিৎসা করতেন। মেডিকেল মিশনের আহ্বান তিনি সাদরে গ্রহণ করেন এবং নেতাজীর সাথে সাক্ষাৎ করে বিদায় সম্বর্ধনা নেন।এই মিশনেরই অন্য সদস্য ছিলেন ডাঃ রনেন্দ্রনাথ সেন,তিনি ছিলেন বেআইনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং কোলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম সংগঠক।কিন্তু কমিউনিস্ট বিপ্লবী হওয়ার কারণে সরকার তাঁকে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করে।তাই তাঁর জায়গাতে মেডিকেল মিশনের অন্তর্ভুক্ত হন ডাঃ বিজয়কুমার বসু।তিনিও ছিলেন কোলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র।তিনি ছাত্র জীবনে রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন এবং রনেন সেনের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।কমিউনিস্ট নেতা সরোজ মুখার্জীর 'দীর্ঘ পথ পেরিয়ে' নিবন্ধ থেকে জানা যায় যে,কোলকাতাতে মীরাট মামলা ডিফেন্স কমিটি গড়ে উঠলে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে নৃত্যগীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অর্থ সংগ্রহের কর্মসূচী গৃহীত হয়।''পার্টি অফিসে তখন টেবিল চেয়ার হয়নি।টাইপরাইটার,সাইক্লো যোগাড় হয়েছে।গোপনে সাইক্লো করার যে ব্যবস্থা ছিল তার মধ্যে একটি ছিল পার্টি দপ্তরের কাছাকাছি ডাঃ বিজয় বসুর মেসে।''স্বভাবতই চীনের ঘটনাবলী প্রত্যক্ষভাবে দেখবার সুযোগলাভে তিনি খুবই আগ্রহী ছিলেন।চীনে পৌঁছে হাঙ্কাউয়ের হাসপাতালে একটানা সতেরোদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে জাপানী আক্রমণে আহত রোগীদের সেবা করেন।এরপর ইচাং-এর একটি হাসপাতালেও প্রায় একমাস কাজ করেন।১৯৩৯ সালে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে চৌ-এন-লাইয়ের হাত ভেঙে গেলে তিনি তাঁর চিকিৎসা করেন।১৯৩৯ সালে তিনি ইয়েনানের মডেল হাসপাতালেও যোগ দেন।এখানেই মাও-সে-তুঙ এবং এডগার স্নো-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।১৯৪০ সালের শেষের দিকে তিনি চিন ছাছি অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছলেন।ডাঃ নর্মান বেথুনের Beshao হাসপাতালেই তিনি নিযুক্ত হন।১৯৪০-১৯৪২ পর্যন্ত ইয়েনানের জীবনযাত্রা কতটা কষ্টকর ছিল তা ডাঃ বসু প্রত্যক্ষ করেন।খাদ্য বস্ত্র ওষুধের খুব অভাব।শুরু হল 'Production Movement'।এই সময়ে তিনি ইয়েনানের উপকণ্ঠে 'আন্তর্জাতিক শান্তি হাসপাতালে' কাজ করেন।পরে তিনি অষ্টম রুট বাহিনীর Central Outdoor হাসপাতালে নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান হন।ডাঃ বসু ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি চীনের নির্বাচিত পার্লামেন্টের সদস্য হন।১৯৪১ সালে তিনি চীনের কমিউনস্ট পার্টির ও সভ্যপদ লাভ করেন।অন্যদিকে,মেডিকেল কলেজের আরেক ছাত্র ডাঃ দেবেশ মুখার্জী।মেডিকেল মিশনের সঙ্গেই চীনে যাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে তিনি ভারতে ফিরে আসতে বাধ্য হন।তাঁর একটি কিডনি অপারেশন করে বাদ দিতে হয়।তাসত্ত্বেও সুস্থ হয়ে ওষুধপত্র জোগাড় করে তিনি আবার চীনের পথে রওনা হন।এই সময়ে তিনি প্রায় ১লক্ষ টাকার ওষুধ সংগ্রহ করেন এবং খিদিরপুর ডক থেকে বর্মা উদ্দেশ্যে রওনা হন।কিনতু বর্মাতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ সরকার তাঁর পাসপোর্ট কেড়ে নেয় ও তাঁকে ভারতে প্রেরণ করে।ডাঃ দেবেশ মুখার্জী পরবর্তী কালে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী ভাবধারার প্রভাবে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ অনুসরণ করেন।১৯৪২ সালে তাঁর কর্মপদ্ধতিতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
এরপর এল ১৯৪২ সালের অক্টোবর মাস।ভয়াবহ সাইক্লোন আর সামুদ্রিক বন্যার আঘাতে মেদিনীপুর আর ২৪ পরগণা বিধ্বস্ত।প্রায় ২৫লক্ষ মনুষ বিপন্ন হয়ে পড়ে।তারপরই কৃষকসভা ও অন্যান্য কিছু সংগঠনের উদ্যোগে ২৪৯ বৌবাজার স্ট্রীটে কৃষক সভার অফিসে গঠিত হল পিপলস্ সাইক্লোন রিলিফ কমিটি।আবার ১৯৪৩ সালে দামোদরের বন্যা।এবার গঠিত হল পিপলস্ ফ্লাড রিলিফ কমিটি।অনতিবিলম্বে আছড়ে পড়ল ১৩৫০-এর দুর্ভিক্ষ।এই সমস্ত কমিটিগুলিকে মিলিয়ে দিয়ে তৈরী হল পিপলস রিলিফ কমিটি।কোলকাতা মেডিকেল কলেজের বহু ছাত্র,চিকিৎসক এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন।১৯৪৬ সলে নোয়াখালির দাঙ্গার পর এবং রংপুরে দুর্ভিক্ষ কবলিত এলাকাতে পিআরসি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে।মেডিকেল কলেজের যে সব কৃতি ছাত্ররা পিআরসি-র সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন তাঁদের মধ্যে ডঃপূর্ণেন্দু ঝাঁ,ডাঃবিমল সেনগুপ্ত,ডাঃকনক কাঞ্জিলাল,ডাঃ হিমাংশু রায়,ডাঃ কৌস্তভকান্তি মুখার্জী, ডাঃ অমিয় বসু,ডাঃনীরদ মুখার্জীদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।ডাঃ নীরদ মুখার্জী পিআরসি-র কমিটি গঠিত হওয়ার পরই কাঁথি যান।কাঁথি মহকুমার খেজুরি ইউনিয়নে সেন্টার খোলা হয়।পরবর্তীকালে ডাঃ কনক কাঞ্জিলালও এখানে কাজ করতে শুরু করেন।১৯৪৬ সালে নোয়াখালিতে হাজার তিনেক হিন্দুকে যখন কৃষক সভার কর্মীরা উ্দ্ধার করেন ও নিজেদের ঘরবাড়ীতে আশ্রয় দেন,তখন তাঁদের চিকিৎসা ও অন্যান্য রিলিফের জন্য ডাক পড়ে পিআরসি-র।ডাঃ শান্তি রায়ের নেতৃত্বে একটি স্কোয়াড সেখানে গিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে।১৯৪৭ সালে হাইম চরে যে ক্যাম্প খোলা হয় তার দায়িত্ব পান ডাঃ পূর্ণেন্দু ঝাঁ।এরপরেই সুন্দরবনের কৃষক আন্দোলন দমনে গুলি চলে।সাতজন কৃষকের মৃত্যু হয়।সেখানে তিনি রিলিফ নিয়ে যান কালীমোহন দাসের সাথে।মালদা ও দিনাজপুরের বন্যাতেও তিনি পিআরসির কাজ করেন।পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সীমান্তে সিংহাবাদে তিনি পিআরসি-র তরফে যান।প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে,ডাঃ পূর্ণেন্দু ঝাঁ ছিলেন কোলকাতা মেডিকেল কলেজ স্টুডেন্টস্ ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম।এই কলেজ থেকেই এমবিবিএস পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থানাধিকারী ডাঃ পূর্ণেন্দু ঝা বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেন, আলিপুর ও বক্সার জেলে বন্দী ছিলেন বহুবছর। ১৯৪৮ সালে বিপিএসএফ মেডিক্যাল কলেজে প্রথম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন গঠন করলে তিনি সম্পাদক হ'ন। এই কমিউনিস্ট নেতা পরে কোলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র পারিষদও নির্বাচিত হ'ন।বাংলাদেশের রংপুর জেলায় ৫০এর মন্বন্তরে ও তেভাগা আন্দোলনে পিআরসির হয়ে কাজ করেন যাঁরা তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্র ডাঃ বিমল সেনগুপ্ত।১৯৪৯ সালে পিআরসি কোলকাতায় বক্স কালেকশনের ডাক দিলে তিনি ও মেডিকেল কলেজের বহু ছাত্র এতে অংশগ্রহণ করেন।৬৮ টাকা সংগ্রহ করে তিনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংগ্রাহক হন।এক আমেরিকান ভদ্রলোক প্রায় কুড়ি মিনিট কথা বলে তাঁকে একটি পাঁচ টাকার নোট দেন।''তিনি ঘুরিয়ে জানতে চেয়েছিলেন এর পেছনে মার্কসিস্টরা আছেন কিনা।তাহলে তিনি টাকা দেবেন।''মেডিকেল কলেজেরই ছাত্র ডাঃ অমিয় বসু বিপ্লবী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন,পরে কমিউনিষ্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ হন, খুবই নামকরা ডাক্তার ছিলেন,গরীবের জন্য বিনাপয়সায় ডাক্তারিও করতেন,পিআরসির অন্যতম সংগঠক,'৭২ সালে এপিডিআর তৈরী হলে তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হন।পিআরসির আরেকজন কর্মী ছিলেন মেডিকেল কলেজের বিপিএসএফ কর্মী,ডাঃ কৌস্তভকান্তি মুখার্জী। ১৯৪৮ সালে বিপিএসএফের ক্যালকাটা সিটি কমিটির সভাপতি হন, বিটিআর পিরিয়ডে জেলে যান-প্রথমে প্রেসিডেন্সী, পরে বক্সা। প্রেসিডেন্সী জেলের রাজনৈতিক বন্দীরা ১৯৫২ সালে বাহান্ন দিনের ঐতিহাসিক অনশন করেন, ওখানে মহিলা রাজনৈতিক বন্দীরাও ছিলেন-মণিকুন্তলা সেন, মঞ্জুশ্রী চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।কৌস্তভ মুখার্জী, পূর্ণেন্দু ঝাঁ-রাও তখন প্রেসিডেন্সীতে, সাতজন ডাক্তার/ডাক্তারীর ছাত্র তখন প্রেসিডেন্সীতে বন্দী ছিল, অনশনের সময় ওরাই বাকি কমরেডদের শরীরের হাল-হকিকতের দিকে নজর রাখত।
ইতোমধ্যেই তেলেঙ্গানাতে সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থান হয়।১৯৪৪ সালে সামন্ত রাজ্য তেলেঙ্গানার কৃষক-সাধারণ মানুষ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সামন্ততান্ত্রিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে 'Armed Partisan Struggle' শুরু করে।এই সশস্ত্র সংগ্রাম স্থায়ী হয় প্রায় ৭ বছর।১৯৫১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ প্রত্যাহার করে নেয়।কিন্তু এরই মধ্যে কোলকাতা মেডিক্যাল কলেজের এক কৃতী ছাত্র ডাঃ রমেন কুন্ডুর নেতৃত্বে একদল তরুন বিপিএসএফ সদস্য ১৯৪৭ সালে বি টি রণদিভের ডাকে সাড়া দিয়ে রাইফেল কাঁধে তেলেঙ্গানা সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিতে বেরিয়ে পড়েন।
এরপর এল ১৯৪৭-এর জানুয়ারী মাস।ফরাসী ঔপনিবেশকদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধে পাশে এসে দাঁড়াল বাংলার ছাত্র সমাজ।২১শে জানুয়ারী ভিয়েতনাম দিবস পালনের ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়।ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি,এআইটিইউসি এবং বিপিএসএফ ব্যাপক প্রচার সংগঠিত করে।শেষ মুহূর্তে এগিয়ে আসে ছাত্র-কংগ্রেস।সমর্থন জানায় মুসলীম স্টুডেন্টস্ লীগ।ভিয়েতনাম দিবসকে সমর্থন জানান শরৎচন্দ্র বসুও।কিন্তু বাংলর গভর্নর ব্যারোজ কোলকাতাতে ১৪৪ধারা জারি করেন।বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রী মুসলীম লীগের সুরাবর্দীও এবিষয়ে কোন উচ্যবাচ্য করেননি।ফলস্বরূপ ২১শে জানুয়ারী কোলকাতার বিভিন্ন অংশে পুলিশ মিছিলের ওপর লাঠি চালায়।সিনেট হলের সামনের সিঁড়িতে বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলি চললো।মেডিকেল কলেজের ছাত্র ধীররঞ্জন সেনকে হাসপাতালে নিয়ে আসার পর মারা গেলেন।ঘটনার প্রতিবাদে ২২শে জানুয়ারি কোলকাতায় হরতাল পালন করা হয়।ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে সেদিনের সভায় বক্তব্য রাখেন মেডিকেল স্টুডেন্টস্ অ্যাসোসিয়েশনের সংগঠক সলিল ঘোষ।এই ঘটনার কারণে বিধানসভা মুলতুবি হয়ে যায়,ঐ বছরেরই মার্চ মাসে শোকপ্রস্তাব প্রকাশিত হয় ভিয়েতনাম স্টুডেন্টস্ অ্যাসোশিয়েশনের Hanoi সম্মেলনে।

১৯৫২ সালে হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত এআইএসএফ-এর সম্মেলনে Self-Help আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত সম্বলিত প্রস্তাব অনুযায়ী একটি X-ray যন্ত্রসহ কোলকাতাতে ছাত্রদের জন্য একটি পরীক্ষা ও চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।এই পরিপ্রেক্ষিতে কোলকাতার কয়েকজন সদ্য পাশ করা ও ছাত্র আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ডাক্তার ছাত্রনেতা নিয়ে কমিটি গঠন করা হল হেলথ্ হোম গড়ে তোলার জন্য।১৯৫২ সালে ধর্মতলা স্ট্রীটে যাঁর চেম্বারে শুরু হ'ল স্টুডেন্টস হেলথ হোমের পথ চলা, সেই ডাঃ অমিয় কুমার বসু ছিলেন কোলকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র এবং বিপিএসএফের কর্মী।হেলথ্ হোম সংগঠিতভাবে গড়ে তোলার জন্য যে কমিটি তৈরী হল তার অন্যতম আরেকজন সদস্য ছিলেন মেডিকেল কলেজেরই ছাত্র ডাঃ কৌস্তভ মুখোপাধ্যায়।

১৯৫৯ সালের আগস্ট মাস।পঃবঃ-র জেলায় জেলায় খাদ্য আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হল।৮ই আগস্ট দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে রাজ্য খাদ্য সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হল।এই পরিস্থিতিতে ৩১শে আগস্ট সভা ও আইন অমান্য কর্মসূচী নেওয়া হয়।বহু প্রতীক্ষিত ৩১শে আগস্ট।মেঘাচ্ছন্ন আকাশ।সারাদিন বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ,প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে তাও জেলাগুলি থেকে প্রচুর মানুষ এসেছেন।মনুমেন্ট ময়দানে অসংখ্য অগণিত কালো মাথা।কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে শ্রমিকরাও।বিশ্ববিদ্যালয়ে সভার পর ৮-১০ হাজারের এক বৃহৎ ছাত্র মিছিলও সমবেত হল মনুমেন্ট ময়দানে।৬:১০ মিনিটে প্রায় ১লক্ষ মানুষের শোভাযাত্রা রাইটার্স বিল্ডিং-এর দিকে অগ্রসর হল।'আন্দোলনকারীদর শিক্ষা' দেওয়ার বাসনাকে চরিতার্থ করতে গিয়ে পুলিশের লাঠির আঘাতে ৮০জনের বেশী মানুষ নিহত হলেন। পরের দিন ১লা সেপ্টেম্বর সারা পশ্চিমবঙ্গে সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হল।ছাত্ররা মিছিল করে রাইটার্স বিল্ডিং-এর দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়।৪জন ছাত্র নিহত হয়।পরেরদিন মেডিকেল কলেজে মৃতদেহগুলির ময়নাতদন্তের পর মৃতদেহগুলি নিয়ে পুনরায় মিছিল হয়।এই গোটা ঘটনার প্রতি সংহতি জানিয়ে এগিয়ে আসে মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা।মেডিকেল কলেজে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ডাঃ জ্ঞানব্রত শীল,ডাঃ ইন্দ্রজিৎ রায়।প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য ডাঃ জ্ঞানব্রত শীল ছিলেন মেডিকেল কলেজ হস্টেল স্টুডেন্টস্ ইউনিয়নের সম্পাদকও।স্মৃতিচারণায় তিনি লিখেছেন,Our Principal,Prof.Sudhir Bose came,was stuck dumb for some moment and then commented,I HAVE NOT SEEN SUCH BRUTAL KILLING EVEN IN BRITISH PERIOD''…there was a reportedly Bullet-proof Ambulance in our hospital and our principal allowed some of us to take it in search of Casualties''…
ডাঃ অমিত পান, কোলকাতা মেডিক্যাল কলেজের আরেক বামপন্থী(ভারতের ছাত্র ফেডারেশন) ছাত্রনেতা, তাঁর নেতৃত্বে ছাত্ররা কেরোসিনের দাবীতে প্রথমে পুরুলিয়ায়, পরে সারা রাজ্যে ব্যাপক ছাত্র-আন্দোলন গড়ে তোলেন সাতের দশকে।১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার অবসানের পর সারা দেশে আবার কিছু পরিমাণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফরে আসতে শুরু করে।নকশালন্থী ছাত্ররা এই সময়ে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত ছিল।১৯৭৭-৭৮ সালে এই সব 'বিপ্লবী ছাত্র'-রা কলেজে কলেজে কলেজভিত্তিক ছাত্রসংগঠন গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করে।প্রথমে এই ধরনের যে সংগঠনগুলি গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল SA[Student Association] ও DSA[Democratic Student Association]।যদিও ইতোমধ্যেই ১৯৭৩ সালে মেডিকেল কলেজে এসএফআই-এর উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল PCSA এবং Social Service Forum।এগুলিরই অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে '৭১ থেকে '৭৭ সন্ত্রাসের পর মেডিক্যাল কলেজে গণতন্ত্র ফেরানোর লক্ষ্যে মেডিক্যাল কলেজ ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (MCDSA) গঠিত হয়।শ্লোগান ওঠে, "Democracy, Unity, Progress"-এর। এর প্রথম কনভেনর হ'ন ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সদস্য অমিত পান ও স্বরূপ সরকার।১৭৭৭-৮৩ মেডিকেল কলেজের গণতান্ত্রিক আন্দোলন তথা ছাত্র সংসদ পরিচালিত হয় এমসিডিএসএ-রই নেতৃত্বে।আশির দশকে জুনিয়ার ডাক্তার আন্দোলনে এমসিডিএসএ-র ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।
এরপর ২০০৭-২০০৮ সাল।রাজ্য সরকার সিঙ্গুরে মোটরগাড়ী শিল্প এবং নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে জমি অধিগ্রহণ বিরোধী কৃষক আন্দোলন শুরু হয়।মেডিকেল কলেজের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী তাতে সংহতি জানায় এবং শাসক বিরোধী কৃষক আন্দোলনে সামিল হয়।

পাঠক,এটাই ছিল খুব সংক্ষেপে আমাদের মেডিকেল কলেজ বেঙ্গল-এর আন্দোলনের ঐতিহ্য।এর মধ্যে আছে আরো অসংখ্য ছোট বড় ঘটনা।বহু কিছু ই আজ বিস্মৃতপ্রায়।এর পরও আছে নকশাল যুগে বহু মানুষ,ছাত্রের,চিকিৎসকের আত্মত্যাগের ইতিহাস।যে ইতিহাসের সঠিক তথ্য দলিল দস্তাবেজের অভাবে আজ লিখে উঠতে পারলাম না।
মেডিকেল  কলেজ কোলকাতা তার প্রতিষ্ঠার সময়কাল থেকে সামাজিক ক্ষেত্রে,রাজনৈতিক  ক্ষেত্রে তার যে অনন্যতার দৃষ্টান্ত গড়ে এসেছে তা প্রায় গত তিরিশ বছর যাবৎ বিস্মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। মধুসূদন গুপ্ত,কাদম্বিনী গাঙ্গুলী,ডাঃ নারায়ণ রায়,ধীররঞ্জন সেনদের স্মৃতি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে। অস্বীকার করা যায়না যে '৯০ এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং উদারঅর্থনীতির যাত্রা রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক  ক্ষেত্রে যে বিষময় প্রভাব ফেলেছে ও ফেলে চলেছে,মেডিকেল কলেজ ও তার প্রভাবকে অতিক্রম করতে পারেনি। আমার ছাত্রজীবনে যে কয়েকজন প্রবীণ চিকিৎসকের সাথে আমার আলাপ হয়েছে তাদের কাছে শুনেছি '৫০ ও ' ৬০এর দশকের মেডিকেল কলেজের কথা,সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সেদিনের মেডিকেল কলেজের অবদানের কথা। কিন্তু বর্তমানে সেই অবস্থা পরিবর্তিত। কিছু ব্যক্তি মানুষের স্বল্প কিছু উদ্যোগ ছাড়া তেমন কোন দৃষ্টান্ত নেই। চারিদিকে অবক্ষয়ের এই নৈরাশ্যজনক প্রেক্ষাপটে আজকের ২০১৮ সালের এই ছাত্র আন্দোলন তাই অনন্য সাধারণ,ব্যতিক্রমী। মেডিকেল কলেজের এই অনশন আন্দোলন আজ মেডিকেল  কলেজের ক্ষুদ্র পরিসর অতিক্রম করে গোটা ভারত তথা বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করেছে। আজকের এই আন্দোলনটি একটি বিষয়ে অন্যান্য সমকালীন অনশন আন্দোলন অপেক্ষা ভিন্ন। সেটা হল আন্দোলনটির কেন্দ্রীয় দাবীটি। হোস্টেলের বোর্ডারশিপের দাবীকে কেন্দ্র করে এই ধরনের অনশন আন্দোলন ও তাকে ঘিরে গণ উন্মাদনা বিরল ঘটনা।আসা যাক কোলকাতা মেডিকেল কলেজে আজকের দিনে ঘটা সেই বিরল ঐতিহাসিক অনশন আন্দোলনটির আলোচনায়।
গত একমাস ধরে মেডিকেল কলেজ কলকাতায় চলা আন্দোলনের খবর প্রত্যেকেই কমবেশি জানেন। মেডিকেল কলেজ কলকাতায় হোস্টেলের সমস্যা দীর্ঘদিনের। MCI রেগুলেশন অনুযায়ী যেখানে প্রতিটি শিক্ষাবর্ষের ৭৫% কে হোস্টেল দেওয়ার কথা সেখানে গত দুবছর কোনো হোস্টেল কাউন্সেলিং ই হয়নি অর্থাৎ কলেজ কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এই দুবছর কোনো ছাত্রছাত্রীকে হোস্টেল দেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে একটি ১১ তলা হোস্টেল বিল্ডিং কলেজ ক্যাম্পাসে তৈরি হয়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে বলা হয় যে গত দু বছরের ছাত্রদের কোনো জায়গা না দিয়ে কেবল নতুন ফার্স্ট ইয়ারকে (২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রদের) দেওয়া হবে এবং তার সুপার হবে রাজ্যের শাসকদল ঘনিষ্ঠ এক ছাত্র নেতা। 
স্পষ্টতই এই গোটা পরিকল্পনা ছিল ডাক্তারি পড়ুয়াদের অবাধে শাসক দলের দলদাসে পরিণত করার জন্য। কিন্তু মেডিকেল কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা সবাই এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। গত দু বছরে হোস্টেল না পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য নতুন হোস্টেলসহ সমস্ত হোস্টেলে স্বচ্ছ হোস্টেল কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে(দূরত্ব ও সিনয়রিটি অনুযায়ী) হোস্টেল দেওয়া ও শাসকদল ঘনিষ্ঠ ছাত্র নেতার বদলে কোনো যোগ্য লোককে হোস্টেল সুপার করার দাবীতে ছাত্ররা অবস্থান শুরু করে। কিন্তু তৎকালীন প্রিন্সিপাল পুলিশ ও শাসকদল আশ্রিত দুষ্কৃতি দিয়ে মারধর করে ছাত্রদের অবস্থান তুলে দেন। তারপর ৬ জন ছাত্র এই দাবীতে আমরণ অনশনে বসে, পরে আরো ১৫ জন ছাত্রছাত্রী আমরণ অনশনে যোগদান করে। এর মধ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষ মেনে নেয় ছাত্রদের দাবী ন্যায্য কিন্তু "উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের" শীলমোহরের অভাবে দাবী মানা যাচ্ছে না। এরপর ২৩শে জুলাই, ২০১৮ আপদকালীন কলেজ কাউন্সিল মিটিং এ সমস্ত বিভাগীয় প্রধানরা, নতুন প্রিন্সিপাল এবং কলেজের সুপার একসাথে সিদ্ধান্ত নেন কোনো 'Higher Authority' এর সম্মতির অপেক্ষা না করে ছাত্রছাত্রীদের ন্যায্য দাবী মেনে নেওয়ার, কেননা কলেজের আভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় মেটানোর জন্য কলেজ কাউন্সিলই যথেষ্ট । দাবী মানার পর অনশনকারীরা অনশন প্রত্যাহার করে।
কয়েকটা জিনিস স্পষ্ট করার আছে, এই আন্দোলন কিন্তু কেবল মেডিকেলের হোস্টেলের দাবীর লড়াই এ আর আটকে ছিল না, পরিকাঠামোর অভাবে ধুকতে থাকা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দশা সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার লড়াই ছিল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ক্ষমতালোভীদের দখলদারি আর দলতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল, আপামর চিকিৎসক সমাজের আত্মসম্মানের লড়াই ছিল, সর্বোপরি সমস্ত রাজ্যবাসীর গণতন্ত্রের লড়াই ছিল। 
আন্দোলনকারীরা প্রত্যেকেই ভবিষ্যতের চিকিৎসক। আজকের এই লড়াই হবু চিকিৎসকদের জীবনের লড়াই এর অংশ বলেও আমার ব্যক্তিগত অভিমত। আজকের এই আন্দোলন স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বেসরকারীকরণের বিরুদ্ধে কথা বলা, মানুষের জন্য মানুষের পাশে থেকে ডাক্তারি করা, সবার জন্য স্বাস্থ্যের দাবিতে মুখর হওয়ার ভবিষ্যত অঙ্গীকারও।এই আন্দোলন কোলকাতা মেডিকেল কলেজের ১৮০ বছরের বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাসকে আবারও একবার পুনর্জীবিত করল।ইতিহাসের উত্তরাধিকার যথার্থভাবে রক্ষা করল।নৈরাশ্যের অন্ধকারে  সন্ধান দিল চেতনার দাসত্বকে ভেঙে এগিয়ে চলার একটি নতুন সংগ্রামী পথের।সমস্ত ভণ্ডামী আর মিথ্যাচারীতার মুখোশকে ছুঁড়ে ফেলে ঘোষণা করল-
         '' কেঁপে ওঠে রঙ্গশালা 
           ভেঙ্গে পড়ে নিষিদ্ধ তোরণ
           শুয়োরের চামড়া ঢাকা
           খসে পড়ে সভ্যতার ক্লীব অঙ্গরেখা 
           পরাক্রান্ত মিছিলের
            দুরন্ত দুর্জয় পদাঘাতে
            রাজপথে গড়ায় মুখোশ।''
তথ্য সংগ্রহঃ
১। চীনে ভারতীয় মেডিকেল মিশন-অমলেন্দু দে
২। পিপলস্ রিলিফ কমিটির দ্যুতিময় ইতিবৃত্ত
৩। স্টুডেন্টস্ হেলথ্ হোম(প্রথম দশক)-পশুপতিনাথ চট্টোপাধ্যায়
৪। ভারতীয় উপমহাদেশের ছাত্র আন্দোলন-হীরেন দাশগুপ্ত,হরিনারায়ণ অধিকারী
৫।আন্দামান জেল থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে-সুধাংশু দাশগুপ্ত
৬।ভারতের জাতীয়তাবাদী বৈপ্লবিক সংগ্রাম-সুপ্রকাশ রায়
৭।চরকা-বুলেট-ব্যালট-কৃত্তিবাস ওঝা
৮।মুক্তি সংগ্রামে বাংলার ছাত্রসমাজ-পঃবঃ ইতিহাস সংসদ
৯।পশ্চিমবঙ্গের গণআন্দোলন ও খাদ্য আন্দোলন-ডঃ দিলীপ মজুমদার
১০।Jnanabrata Sil (16 September 2010). "Reminiscence of Food Movement - 1959".

বুধবার, ১১ আগস্ট, ২০২১

ক্ষুদিরাম বসু ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে ক্ষুদিরাম বসুর ছোঁড়া বোমাটা সেদিন সঠিক লক্ষ্যে লাগেনি। এক অর্থে ব্যর্থ। সেই ব্যর্থ মানুষটিকে নিয়ে লিখতে বসার কিছুতো কারণ থাকবে। সেটা জানার ইচ্ছে হলে সুধী পাঠক এই লেখাটার বাকি অংশ পড়ে দেখতে পারেন।

কে এই কিংসফোর্ড, কেন তাঁকে মারার জন্য বিপ্লবীরা তৎপর হয়েছিলেন জানতে একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক। বন্দে মাতরম পত্রিকায় রাজদ্রোহমূলক প্রবন্ধের জন্য অরবিন্দ ঘোষ অভিযুক্ত হয়েছিলেন। সেই মামলায় সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করায় বিপিন চন্দ্র পাল অভিযুক্ত হন। তার বিচারের দিন লালবাজার পুলিশ কোর্টের সামনে জমায়েত হওয়া জনতার ওপর এক ইউরোপীয় ইন্সপেক্টর লাঠি চালানোর নির্দেশ দেয়। তাতে উত্তজিত হয়ে সুশীল সেন ওই ইন্সপেক্টর এর মুখে ঘুষি চালায়। এই অপরাধে সেই ১৪ বছরের কিশোর কে ১৪ ঘা বেতের বাড়ি খেতে হয় যে বিচারকের আদেশে তার নাম ম্যাজিষ্ট্রেট কিংসফোর্ড। (হেমচন্দ্র কানুনগো: বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা)

নিজের দেশে মহান "বুর্জোয়া লিবারাল গণতন্ত্রী" সাজা বৃটিশরা এভাবেই ভারতের বুকে তাদের "ব্রুট" শাসন চালিয়ে এসেছিল। তাতে সাথে পেয়েছিল এই দেশেরই কিছু অনুচর কে। কিংসফোর্ড কে হত্যার চেষ্টায় জড়িত ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকির এই কাজ কে সমর্থন করে বাল গন্ধাধর তিলক তার মারাঠি পত্রিকা কেশরী তে লিখেছিলেন যদিও তিনি ভায়োলেন্স কে সমর্থন করেন না, তবুও "The rulers who always exercise unrestrained power must remember that there is always a limit to the patience of humanity". And so, 'violence', however deplorable, became inevitable"

এই কারণে তিলক এর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ভারতীয় জুরীরা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করলেও ইউরোপীয় জুরীদের রায়ে বার্মার মান্দালয় জেলে তাঁর ছয় বছরের কারাবাসের সাজা হয়। 

সেই রায়ের খবর শুনে প্রতিক্রিয়া দিলেন কয়েক হাজার মাইল দূরে থাকা এক রাশিয়ান বিপ্লবী। জেনিভার এক ছোট্ট কুঠুরি থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড ট্রেডল মেশিন থেকে পত্রিকায় ছাপা হ'ল সেই বিখ্যাত প্রবন্ধ "বিশ্ব রাজনীতির বিস্ফোরক মালমসলা"। কি অদ্ভুত যোগাযোগ। সেই লেখকও নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত। নাম ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। কাগজের নাম প্রলেটারী। সংখ্যা তেত্রিশ।

"ব্রিটিশ খ্যাকশিয়ালরা ভারতীয় গণতন্ত্রী তিলক কে যে কুখ্যাত সাজা শুনিয়েছে" তার তীব্র সমালোচনা করে, বিপ্লবী তিলক এর অবমাননার প্রতিবাদে তথাকথিত সভ্য, নিজেদের দেশে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের চর্চা করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ খুলে নিজের লেখনী তে উলঙ্গ করে দিলেন লেনিন লিখলেন, "In India lately, the native slaves of the "civilised" British capitalists have been a source of worry to their "masters". There Is no end to the acts of violence and plunder which goes under the name of the British system of government in India." (লেনিন: ইনফ্লেমেবল মেটেরিয়াল ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স)

"মহান" ব্রিটিশ ন্যায়বিচার কে ব্যঙ্গ করে লেনিন আরো লেখেন, "The infamous sentence pronounced by the British jackals on the Indian democrat Tilak—he was sentenced to a long term of exile, the question in the British House of Commons the other day revealing that the Indian jurors had declared for acquittal and that the verdict had been passed by the vote of the British jurors!—this revenge against a democrat by the lackeys of the money-bag evoked street demonstrations and a strike in Bombay."

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে দুই বিপ্লবীর বুকে আলোড়ন তুলে দেওয়া ক্ষুদিরাম এর মতো মানুষরা নিজেদের জন্য বিপ্লবী, মুক্তিযোদ্ধা, দেশের জন্য বলিপ্রদত্ত, স্বাধীনতা সংগ্রামী— এই সব বিশেষণই ব্যবহার করতেন। কিন্তু এই জাতীয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের অফিসাররা 'অ্যানার্কিস্ট', 'টেররিস্ট' ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন। ডিরেক্টর অব ইন্টেলিজেন্স সি আর মিডল্যান্ড তো এঁদের 'পলিটিকো-ক্রিমিনাল কনস্পিরেটর' বলে নিন্দা করেন। সশস্ত্র সংগ্রামীদের সন্ত্রাসবাদী তকমা ব্রিটিশরাই দিয়েছে। (দ্র: অনুশীলন সমিতির ইতিহাস, সম্পা: অমলেন্দু দে, পৃ ১৬-১৭)। 

কলোনিয়াল শাসক ও তাদের ধামাধরা ইতিহাসবিদদের লেখা পড়ে আমাদের পূর্বসূরী ও আমাদের প্রজন্মের অনেকেই বড় হয়েছি। ওই "সন্ত্রাসবাদী" শব্দটা আমাদের মনে শিকড় গেঁড়ে বসে আছে। তাই স্বাধীনতার পরে পরেই স্বাধীন ভারতের প্রধান ক্ষুদিরাম এর মূর্তি উন্মোচন করতে অস্বীকার করেন। উনি ভিন্নধারার রাজনীতিবিদ বলে নয় শুধু, উনি "পন্ডিত" মানুষ ছিলেন, জানতেন যে ক্ষুদিরাম জাতীয় মানুষরা শুধু বৃটিশ নয়, তাঁর পক্ষেও বিপদজনক। তাঁর ধারা ধরে আমাদের অনেকেই এখনো ক্ষুদিরামকে নিয়ে বলতে ইতস্ততঃ করেন। মানুষটা "টেরোরিস্ট" ছিল যে। 

ক্ষুদিরাম ও তার সহযোগীরা ঠিক কি ছিলেন সেটা বুঝতে সম্পূর্ণ আলাদা দৃষ্টিকোন এর আশ্রয় নিতে হচ্ছে। তথ্য এক) বিপ্লবীদের দমনের জন্য সবচেয়ে কুখ্যাত ব্রিটিশ আইন এর নাম "রাউলাট বিল"। বিলটার পোশাকি নাম খেয়াল করুন সুধী পাঠক, "দি এনারকিক্যাল এন্ড রেভলিউশনারী ক্রাইম এক্ট"। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ লিখছে "রেভলিউশনারী"!! লিখতে বাধ্য হচ্ছে। 

তথ্য দুই) স্যার চার্লস টেগার্ট তার বক্তৃতায় বলছেন, "বিপ্লবীদের কর্মতৎপরতায় সরকারি যন্ত্র অচল হওয়ার মতো বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল" ( টেরোরিসম ইন ইন্ডিয়া, ১লা নভেম্বর, ১৯৩২, রয়েল এম্পায়ার সোসাইটি)

১৮ বছরের একটা বাঙালি ছেলে ভুল লোককে বোমা ছুঁড়ে যদি সরকারি যন্ত্র তথা রাষ্ট্র যন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে তাহলে তাকে নিয়ে লেখাই যায় কি বলুন সুধী পাঠক। আজ ১১ আগস্ট তাঁর আত্মবলিদান দিবস। মনটা ভার হয়ে আছে। তাঁর জীবন কাহিনী নিয়ে আরেক দিন লেখা যাবে। আজ শুধু এইটুকু থাক যে আমাদেরই কেউ একজন পেরেছিল। তাঁকে শ্রদ্ধা, প্রণাম, সেলাম।

সোমবার, ৯ আগস্ট, ২০২১

বিজয় রাঙ্খলের জোটসঙ্গী তৃণমূল এখন বিপ্লব দেবদের অক্সিজেন ~ সুদীপ্ত বসু

আগরতলায় চিলড্রেন্স পার্কের কাছে অফিস খুলেছিল তৃণমূল।

২০১৭ সালের ১০ জুলাই সেই অফিসের সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলা হয়, খুলে ফেলা হয় মমতা ব্যানার্জির ছবিও।খুলে ফেলে তৃণমূলীরাই...

সাইনবোর্ডটুকুও নামিয়ে ফেলার আগে অন্য দল থেকে ভাঙিয়ে আনা ছয় তৃনমূল বিধায়কই বেমালুম যোগ দেয় বিজেপিতে। সুদীপ রায়বর্মণের নেতৃত্বে ছয় বিধায়কই ফের একবার প্রদুনোভা ভোল্টে ডিগবাজি খেয়ে বি জে পি-তে ঢুকে পড়েছিল, তখন ২০১৭..

২০১৬সালে এ'রাজ্যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই সরকার গড়ে তৃণমূল। বিধানসভা ভোটে জেতার পরেই প্রথম কয়েকমাস 'সর্বভারতীয় দল'এর হ্যাংওভার থাকে...

তখন ত্রিপুরায় বামফ্রন্ট সরকার..ফলে টার্গেট ত্রিপুরা...যদিও গোটা ছয় বিধায়কই ততক্ষনে বিজেপিতে ঢুকে গেছে...কংগ্রেস থেকে বি জে পি-তে যাওয়ার জন্য ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে উঠেছিল ওয়েটিং লাউঞ্জ!

যাই হোক, এরপর ২০১৭ থেকে ফের সলতে পাকানো শুরু। লক্ষ্য ছিল ১৮ সালের ভোটে বামফ্রন্ট সরকারকে হটানো। ভালো কথা!

তো এদিক ওদিক থেকে কয়েকজনকে জড়ো করে, টাকা দিয়ে ভাড়া করে শুরু হলো অভিযান। দায়িত্ব পেলেন তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক সব্যসাচী দত্ত, এখন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির রাজ্য নেতা।

সেই ভোটে বিজেপি জোট বাঁধে 'তুইপ্রাল্যান্ড'-র দাবি তোলা আই পি এফ টির সঙ্গে।

আর মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল জোট সঙ্গী হয় আই এন পি টি!

 আই এন পি টি-র নেতার নাম বিজয় রাঙ্খল...

কে বিজয় রাঙ্খল? ত্রিপুরার তো বটেই, স্বাধীনোত্তর ভারতে হিংসার কোনও ইতিবৃত্ত লেখা হলে বিজয় রাঙ্খলের নাম থাকবে প্রথম দিকেই । রক্তের বন্যায় 'বাঙালী খেদাও', 'স্বাধীন ত্রিপুরার' অভিযান তারই হাত ধরে শুরু হয়েছিল। বিজয় রাঙ্খলের উগ্র নেতৃত্বে সেই ত্রাসের দিনগুলিতে শুধু মান্দাইয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় ১৯৭৮ সাল থেকে  প্রায় ১৬৪জন খুন হয়েছেন। সিপিআই(এম)র বিধায়ক কালিদাস দেববর্মা, এ ডি সি সদস্য শচীন্দ্র দেববর্মাও রয়েছেন সেই তালিকায়। রক্তাক্ত সেই ইতিহাস।

স্বাভাবিক ভাবেই তাই তখন তৃণমূলের মসৃনতম জোটসঙ্গী আইএনপিটি!পৃথক রাজ্যের আশা আইএনপিটি'র ও  ছিল।

যারা এখন ত্রিপুরা 'বিট' করছেন সেই সাংবাদিকদেরও জেনে রাখা ভালো। ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতায়।

ত্রিপুরায় গত তিন বছরে বামপন্থী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের হাজার হাজার  নেতা, কর্মী, সমর্থকের ওপর শারীরিক আক্রমণ ছাড়াও, বাড়িঘর-দোকানপাট লুট, ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে রাবার বাগান, সবজি বাগান ধ্বংস করা, পুকুর থেকে মাছ লুটপাট এবং বিষ মেশানো, গৃহপালিত পশু-পাখি লুট করা, গাড়ি ভাঙচুর, তোলবাজি, জরিমানা আদায়, হুলিয়া জারি করে গৃহবন্দি করে রাখা, গ্রামে একঘর করে রাখা, বিভিন্ন স্কিমে নিযুক্ত কর্মীদের জবরদস্তি ছাঁটাই, রেগা, টুয়েপ ইত্যাদি কাজ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সশস্ত্র দুর্বৃত্তবাহিনী রাজ্যের প্রতিটি মহকুমায় সি পি আই (এম) এবং বামফ্রন্ট শরিকদল ও গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলোর প্রচুর অফিস ভেঙে আগুনে পুড়িয়েছে, দখল করেছে। ৩০-৪০ বছর আগে খাস জমিতে গড়ে ওঠা সি পি আই (এম) এবং বিভিন্ন গণসংগঠনের অফিস বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁ‍‌ড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্রীরের ওপরেও হামলা হয়েছে। মিথ্যা মামলা, পার্টি অফিসে অস্ত্র রয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে হামলা চালানো, পার্টি অফিস বন্ধ করে দেওয়া ,স্থানীয় নির্বাচনগুলিতে মনোননয় পেশেও বাধা, প্রার্থীদেরই অপহরণ করা, ভোট লুট কোন কিচ্ছু বাদ রাখেনি বিজেপি...

বিজেপির দুষ্কৃতীবাহিনী ভেঙে চুরমার করেছে কার্ল মার্কস, ভি আই লেনিন, চে গুয়েভারা, দশরথ দেব, বৈদ্যনাথ মজুমদারের প্রতিমূর্তি এবং অসংখ্য শহীদবেদী। মার্কসের জন্মদিন উদ্‌যাপন, মে দিবস উদ্‌যাপন, নভেম্বর বিপ্লব বার্ষিকী উদ্‌যাপনেও বাধা দিয়েছে। মে দিবসকে সরকারি ছুটির তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানির একের পর এক ঘটনা, সরকার অপরাধীদের পাশে...

আচ্ছা বলুন তো ওপরের বর্ণনা করা সিপিআই(এম)র ওপর বিজেপি'র সন্ত্রাসের অভিযানের সঙ্গে এরাজ্যে বামপন্থীদের ওপর তৃণমূলী হামলার কোন ফারাক রয়েছে? সন্ত্রাসের পদ্ধতি, কৌশল সবই প্রায় এক...

এখানেও ২০১১ তে ভোটের জেতার পরেই গড়বেতায়, যাদবপুরে লেননি মুর্তি ভাঙা, হাওড়ায় জ্যোতি বসুর আবক্ষ মূর্তিতে কালি লেপে দেওয়া সব সবই তো হয়েছে..বরং আরো বেশি করে...গত দশ বছরে এরাজ্যে  শহীদের সংখ্যা ২৭০...মিথ্যা,মামলা, ঘরছাড়া করা, ভোট লুট এসব আর নাই বা লিখলাম।

আচ্ছা, আজ পর্যন্ত গত তিনবছরে এ'বাংলার কোন মিডিয়ায় টানা পাঁচ মিনিট এমন কোন খবর কভার করা হয়েছে যে বিজেপির হাতে সিপিআই(এম) আক্রান্ত ত্রিপুরায়..হয়নি...বরং  বিজেপির আক্রমনের পরে লেখা হয়েছে, ত্রিপুরাতেও 'সিপিএমের সংগঠনের দৈন্যদশা'/ ' জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন সিপিএম, প্রতিরোধের আহ্বান দিলেও সাড়া মিলছে না' ইত্যাদি...

খবরের ভাষা আবার বদলে গেলো গত কয়েক সপ্তাহে...

যাই হোক....

এবার গোটা দল সহ বিজেপিতে ভিড়ে যাওয়া নয়, কৌশল বদলানো হয়েছে...

লাফালাফি করে বিজেপি বিরোধী ভোট ভাঙো, বামপন্থীদের দূর্বল করার চেষ্টা চালাও...প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট ভাগে সুযোগে সরকারের থাকবে বিজেপি, বিরোধী দলে ভাইপোর বাহিনী..এদিকে পশ্চিমবঙ্গে আবার বিরোধী দলে শুভেন্দু...

আহা!

রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

বাংলার রাজনীতিতে নারী ~ পঙ্কজ কুমার ভাদুরী

ইলা মিত্র, স্তালিন নন্দিনী

গতবার এনেছিলেন রুপো, এবার ব্রোঞ্জ। পি বি সিন্ধু, দেশে ফিরলে সম্বর্ধনা দেওয়া হবে, ফুল মালা, রাজ্য সরকার বাড়ি দিলে ইউনিয়ন গভর্নমেন্ট নগদ টাকা দেবেন, একই অভ্যর্থনা পাচ্ছেন, মীরাবাই চানু, কদিন আগে যাঁকে কেউ চিনতো না, তিনি এখন দেশের গৌরব, এবার তাঁর জীবনী লেখা হবে, তাই নিয়ে সিনেমা হবে। হোক। ঠিক তখনই আমার মনে পড়ে গ্যালো এক বাঙালি মহিলার কথা, যিনিও পেতে পারতেন এই সম্বর্ধনা, ভেসে যেতেন সামূহিক উচ্ছাস, অভিনন্দনে। পান নি। কারণ হিটলার। অবিবেচক ঐ ফাসিস্ট নেতা, পৃথিবী দখল করার স্বপ্ন দেখেছিল, স্বপ্ন ভেঙেছিল এক বাঙালি কিশোরীর, কারণ সেবার, ১৯৪০ এ হেলসিঙ্কি সামার অলিম্পিক বাতিল হয়ে গিয়েছিল, বেথুনের ছাত্রী ইলা মিত্র, সেই ১৯৪০ সালে, বাংলার অ্যাথলেটিক্স এর উজ্জ্বল  নাম, তখন পদবী তাঁর বাবার, ইলা সেন। সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স এ তাঁর পারফরমেন্স এর জন্য, জাতীয় যুব সঙ্ঘ, ১৯৩৭, ১৯৩৮ পরপর দু বছর বাংলার জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন এর খেতাব দিয়েছে, ১৯৩৮ এ তখনকার জনপ্রিয় পত্রিকা, সচিত্র ভারত এ ছাপা হয়েছে তাঁর ছবি, পাশে নয় নয় করে ৪৭ টা ট্রফি, সেই পত্রিকার ঐ ইস্যুতে আর যাদের ছবি ছিল তাঁরা হলেন, ব্রিটিশ – ইন্ডিয়ার হকি টিম এর সদস্য, একজন পর্বতারোহী যিনি তিব্বত যাচ্ছেন, আর ১০ কিলোমিটার হাঁটা প্রতিযোগিতায় জিতেছেন এমন একজনের ছবি। মানে বোঝাতে চাইছি যে, সেই ১৯৩৮ এ এক ১৫ বছরের কিশোরী বাংলার খেলার জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি অলিম্পিক্স এ যাবেন, সেই খবর লিখছে বাংলার পত্রপত্রিকা, তিনি যেতে পারলেন না, কারণ যুদ্ধ। এবং আজ দেশ বাদই দিলাম বাংলার খেলার ময়দানে গিয়ে জিজ্ঞেষ করুন, ইলা সেন, বিয়ের পরে যিনি ইলা মিত্র হলেন, তিনি যে বাংলার প্রথম সারির অ্যাথলেটিক্স, সাঁতারু ছিলেন, তা হাতে গোনা কিছু মানুষ ছাড়া কেউ জানেন না, ইলা মিত্র কে মানুষ মনে রাখে নি। 

এ তো গ্যালো খেলা ধুলোর কথা, আসুন ইলা মিত্র নিয়ে আরও কটা কথা বলা যাক, ইদানিং বাংলার রাজনীতিতে, মহিলাদের ভূমিকা নিয়ে অনেকে বলছেন, আমিও কটা কথা বলি। এই ইলা সেন, মিত্র হলেন বিয়ের পরে, বিয়ে হবার আগেই বেথুন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েসন এ ফার্স্ট ক্লাস, পরে বাংলা আর সংস্কৃত তে মাস্টার্স ডিগ্রি পাওয়া হয়ে গ্যাছে, এবং ইতিমধ্যেই কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও হয়েছে, অনেকে মনে করেন নবাবগঞ্জের জমিদার বাড়ির ছেলে, রমেন্দ্র নাথ মিত্রের সঙ্গে বিয়ে হবার পর তিনি কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগ দেন, তা ঠিক নয়, তার বহু আগেই ১৯৪২ এ, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্য হন, দুর্ভিক্ষে ত্রাণ এর কাজে সারা বাংলা ঘুরতে থাকেন, দলের সদস্যপদও তখনই পান। ওদিকে মালদার নবাবগঞ্জ এর জমিদার বাড়ির ছেলে, রমেন্দ্র নাথ মিত্র ও কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন, ১৯৪৪ এ তাঁর সঙ্গে বিয়ে হল ইলা সেন এর, হলেন ইলা মিত্র, জড়িয়ে পড়লেন কৃষকসভার কাজে। বাংলাদেশ জুড়ে ইলা মিত্র কৃষক সভার পচিত মুখ, আবার মেয়েদের স্কুলও শুরু করেছেন, ৩ জন ছাত্রী থেকে কিছুদিনের মধ্যেই ৫০ জন ছাত্রী। স্বাধীনতা এগিয়ে এল, লাগল দাঙ্গা, নোয়াখালিতে এলেন গান্ধীজী, ইলা মিত্র ছুটলেন সেখানে, কমিউনিস্ট পার্টি তখন দাঙ্গা থামানোর কাজে এমন কি গান্ধীর সংগে রাস্তায় নেমেছে, নোয়াখালির হাসনাবাদে ইলা মিত্র যাওয়ার পরে একটা দাঙ্গার ঘটনা পাওয়া যায়নি, রমেন্দ্র মিত্রও তখন নোয়াখালিতেই, দাঙ্গা থামল। 

দেশ ভাগ হল। রমেন্দ্র মিত্র, ইলা মিত্র থেকে গেলেন পূর্ব পাকিস্থানেই, থেকে গেলেন কারণ ততদিনে শুরু হয়ে গ্যাছে কৃষক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলনের সূচনা পর্ব। ভূমিহীন চাষিরা মালিকের জমিতে চাষ করতো, লাঙল, বীজ, শ্রম সবই তার, জমিদার নিত আধখানা ভাগ, কিচ্ছুটি না করে। ঐ চাষিদের বলা হত আধিয়ার, আর বিনা মজুরিতে কাজ করানোতো ছিলই, কিছু টাকা ধার দিয়ে সারা বছর বিনা পয়সায় কাজ করানো, তাদের মধ্যে সংগঠন তৈরি করলেন রমেন্দ্র, ইলা, কৃষক সভা, কমিউনিস্ট পার্টি। ঐ অঞ্চলে আদিবাসীদের সংখ্যা বিরাট, ততদিনে ইলা মিত্র অনায়াসে তাদের ভাষায় কথা বলতে পারেন, যে গ্রামে যান, সেই গ্রামেই মানুষ পাশে এসে দাঁড়ায়, ওদের ছেড়ে কলকাতায় ফিরতে পারলেন না, ইলা মিত্র। স্বাধীনতার পর পশ্চিম পাকিস্থানের সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল, রমেন্দ্র ইলার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন মাতলা মাঝি, ওনারা তখন নাচোলে। আজ এই বাড়ি তো কাল ঐ বাড়ি, পুলিশ তাদের খুঁজে পায় না, আন্দোলন চলছে। তেভাগা আন্দোলন, তিন ভাগ ফসল চাই। ৫ জানুয়ারি ১৯৫০, এই অবস্থার মধ্যেই নাচোলে ৫ জন পুলিশ কর্মী খুন হয়, তাদের অস্ত্র লুঠ হয়, এবার সরকার তার সব শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কৃষক সভার ওপর, শুরু হয় নাচোল হত্যা মামলা, ১০০ জনেরও বেশি জন কে অভিযুক্ত করা হয়, রমেন্দ্র মিত্র, মাতলা মাঝি, ইলা মিত্রের নামে ওয়ারেন্ট জারি হয়, ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার দেবে, এমন ঘোষণাও করা হয়। রমেন্দ্রনাথ মিত্র, মাতলা মাঝি সীমান্ত পেরিয়ে চলে এলেন ভারতে, আশ্রয় দিল সেই সময়ের ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিও তখন বে আইনী, ওদিকে ইলা মিত্র কেও আনানোর ব্যবস্থা শুরু হল, কিন্তু সীমান্ত পার হবার আগেই নাচোল স্টেষনে তাঁকে চিনে ফেললো এক কনস্টেবল, তিনি ধরা পড়লেন। 


এবং তারপর বর্বর অত্যাচার, যে অত্যাচারের কথা তিনি নিজেই লিখেছেন, পুলিশ জানতে চেয়েছিল, সংগঠনের নেতাদের হদিশ, জানতে চেয়েছিল, আন্দোলনের মাথারা কোথায়? একটা কথাও বলেন নি ইলা মিত্র, ও একটা কথা বলা হয়নি, ইলা মিত্র এর মধ্যে ১৯৪৮ এ একবার কলকাতায় এসেছিলেন, বাপের বাড়িতে এক সন্তানের জন্ম দিয়ে, ৬ মাস থাকার পর, আবার চলে গিয়েছিলেন নাচোলে, আন্দোলনের জমিতে। পুলিশ প্রথমে সাধারণ মারধোর শুরু করে, ইলা মিত্র জানিয়ে দেন, তিনি একটা কথাও বলবেন না, এবার শুরু হল অকথ্য অত্যাচার, থানা হাজতে তাঁকে নগ্ন করে রাখা হল, মাথা, পিঠে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে মারা শুরু হল, তাঁর নাক মুখ দিয়ে রক্তপাত শুরু হল, তাঁকে একদিন থানার পাশেই এক সাব ইনসপেক্টরের কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হল, মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে পায়ের দুটো গোড়ালি, লাঠি মেরে মেরে ভেঙে দেওয়া হল, তারপর আবার রেখে দিয়ে আসা হল হাজতে, এর পরে দিন, ইলা মিত্র লিখছেন, তাঁকে নগ্ন করে শুইয়ে দেওয়া হয়, গরম ডিমসেদ্ধ এনে তাঁর যৌনাঙ্গে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন তিনি, জ্ঞান যখন ফেরে তখন ধূম জ্বর, তখন তাঁর গোড়ালিতে পেরেক পুঁতে দেওয়া হয়, একজন একজন করে তিন চার জন কনস্টেবল তাঁকে ধর্ষণ করে। না, ইলা মিত্র অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু একটা কথাও বলেন নি, মরে যাবেই জেনে তাঁকে নবাবগঞ্জ জেলে পাঠানো হয়, সেই জেলের জেল ওয়ার্ডেন, ও সি রহমান, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহপাঠি ছিলেন, মূলত তাঁর প্রচেষ্টায় তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়, তখন তাঁর ১০৫ জ্বর, সুস্থ হতে থাকেন, নাচোল হত্যা মামলাও চলতে থাকে, ১৯৫১ তে তিনিই সম্ভবত এই উপমহাদেশের প্রথম মহিলা যিনি রাজসাহী কোর্টে সবার সামনে, তাঁর ওপর কিভাবে ধর্ষণ অত্যাচার চালানো হয়েছিল, তার বিবরণ দেন, কদিনের মধ্যে সেই বিবরণ ওপার বাংলা এপার বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে, মানুষের মুখে মুখে তখন ইলা মিত্রের নাম, 

গোলাম কুদ্দুস কবিতা লিখলেন, 

ইলা মিত্র ফাঁসির আসামী !
লোকারণ্য রাজশাহী কোর্ট !
একটি উকিল মেলা ভার,
ওরা ভীত 'স্বাধীন' স্বদেশ |
স্ট্রেচারেতে শায়িতা একাকী,
ইলা মিত্র বাকশক্তিহীনা,
পাঁজরের হাড়গোড় ভাঙ্গা,
মুখে চোখে কপালে ব্যান্ডেজ,
রক্তাক্ত আঙ্গুলগুলি ফাটা,
তবুও কাগজ টেনে নিয়ে,
দুনিয়ার ইচ্ছা শক্তি বলে,
আত্মপক্ষ করে সমর্থন,
হাতে লিখে ---- রক্তাক্ত অক্ষরে—
অপরাধী লিগ সরকার,
অপরাধী নুরুল আমিন
অপরাধী তাহারি পুলিশ,
খুনি তারা ব্যাভিচারী।
কোর্টে আজ তারাই আসামী।
তারপর ইলা মিত্র বলে,
একে একে পীড়নের কথা
ঠেলে ফেলে সমস্ত সঙ্কোচ
ইলা মিত্র মর্মে মর্মে জানে
যৌন নয়, সমস্যা জমির।
তারি সঙ্গে বাঁধা আছে যত
পুরুষদের নিষ্ঠুর লাঞ্ছনা,
নারীর নিকৃষ্ট অপমান
পুলিশেরা আদালত থেকে 
ফিরে যায় মুখ চুন করে।
ইলা মিত্র স্ট্রেচারে আবার
ফিরে আসে কয়েদখানায়, 
ফেরে না কাহিনী তবু তার
বাতাসে ছড়ায় মুখে মুখে
 গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে,
দেশ হতে দেশান্তরে
 সীমান্ত পেরিয়ে সেই নাম
ব্যপ্ত হয় ভারতের বুকে, 
যায় মুক্ত মানুষের দেশে
সেই নাম চীন সোভিয়েতে
ছড়ায় স্পেনের কারাগারে।
ইলা মিত্র কৃষকের প্রাণ
ইলা মিত্র ফুচিকের বোন
ইলা মিত্র স্তালিন নন্দিনী
ইলা মিত্র তোমার আমার
সংগ্রামের সুতীক্ষ্ণ বিবেক
ইলা মিত্র দলাদলি আর
ক্ষুদ্রতার রূঢ় ভৎর্সনা
ইলা মিত্র নারীর মহিমা
ইলা মিত্র বাঙালির মেয়ে

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখলেন পারুল বোন

অন্ধকার পিছিয়ে যায়

দেয়াল ভাঙে বাধার

সাতটি ভাই পাহারা দেয়

পারুল, বোন আমার-

দেখি তো কে তোমায় পায়

বেড়ি পরায় আবার?

শুয়ে শুয়ে দিন গুনছে

পারুল বোন আমার।

সোনার ধানের সিংহাসনে

কবে বসবে রাখাল

কবে সুখের বান ডাকবে

কবে হবে সকাল!

এখানেই শেষ নয়। ১৯৫৪ তে ইলা মিত্র কে নিয়ে আসা হল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে, সবাই দেখল পুলিশের সেই বর্বর অত্যাচার, সেই বছরের ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট সরকার তৈরি হল, তিনি হলেন মুখ্যমন্ত্রী, ইলা মিত্র কে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় পাঠানোর ব্যবস্থা হয়, পাসপোর্ট এর ব্যবস্থা করে দেন ফজলুল হক, ইলা মিত্র ১৯৫৪ তেই কলকাতায় ফেরেন, ক্রমশ সুস্থ হন, ১৯৫৬ তে তিনি হাঁটতে শুরু করেন, এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সম্ভবত আমার কৈশোরে অ্যাথলেটিকস আমায় সুস্থ করে তুলেছিল, তিনি সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন, ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৬৯ আর ১৯৭২, চারবার মানিকতলা বিধানসভার বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হন। বেশ কিছু বই লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, আর কাকভোরে উঠে অ্যান্ডারসন ক্লাবে নাতি কে নিয়ে রোজ সাঁতার কাটতে চলে গেছেন।

আজ যখন দুজন মহিলা অলিম্পিকের মেডেল আনলেন, আর একজন দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন মনে পড়ে গ্যালো ইলা মিত্রের কথা, যিনি অলিম্পিকে যেতেই পারলেন না, কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে মহিলা হিসেবে এক অসামান্য অধ্যায় রচনা করলেন, যা আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত। আলালের ঘরে দুলালী, ১৯৪০ বাংলার জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন, তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী, থানায় ধর্ষিতা, অত্যাচারে পঙ্গু এক মহিলা আবার জীবনে ফিরে অধ্যাপনা করলেন, চারবার মানুষের ভোটে জিতলেন, বিধান সভায় কমিউনিস্ট পার্টির ডেপুটি লিডার হলেন, মারা গেছেন মাত্র ২০০২ সালে, অথচ এরই মধ্যে বিস্মরণের ওপারে চলে গেছেন। সাধে কি বলে জীবন তো নয় যেন পদ্ম পাতার জল।

বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই, ২০২১

রিফিউজি কলোনি-র কমিউনিস্ট মেয়েরা ~ সুনন্দন চক্রবর্তী

আমাদের ছেলেবেলার বিজয়গড়, নেতাজীনগর, শ্রী কলোনি, আজাদগড়, সংহতি কলোনি, সমাজগড়, নিঃস্ব কলোনি, গান্ধী কলোনি – এইসব উদ্বাস্তু এলাকার চেহারা এখনকার সঙ্গে একদমই মিলবে না। শ্রী কলোনি-র মোড় থেকে যাদবপুর এইট বি বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তাটা পিচের। কিন্তু বাহন বলতে রিকশা। নাহলে সাইকেলে বা হেঁটে যেতে হবে। পাকা বাড়ি হাতে গোনা। বেড়ার বাড়ি বেশির ভাগ। টালি বা টিনের চাল। জমির সীমানাগুলো হয়তো রাংচিতের বেড়া দিয়ে ঘেরা বা বাঁশের। সব বাড়িতেই প্রায় ফল এবং ফুলের গাছ। উঠোনগুলো মাটির। বৃষ্টি হলেই পিছল, কাদাময়। তখন গেট থেকে ঘরের দাওয়া পর্যন্ত জোড়া জোড়া করে ইঁট পেতে রাখা হত। তুলসীতলা ছিল প্রায় সব বাড়িতে। সন্ধে দেওয়ার সময় অল্প আগে পরে শাঁখ বেজে উঠত বাড়িতে বাড়িতে। আমাদের বাড়িতে বাজত না। আমার মা বাবা দুজনেই 'পার্টির' লোক।

মা রান্না-টান্না করে স্কুলে পড়াতে চলে যেত। এক পা গোদে ফোলা রাজেনদা ছিল মা-র বাঁধা রিকশা। মা-কে কখনও শাদা শাড়ি ছাড়া কিছু পরতে দেখিনি। পাড়ের কারুকার্যই একমাত্র বিলাসিতা। শাঁখা বারবার ভেঙে যায় বলে মা একহাতে কেবল একটা লোহা পরত আর অন্য হাতে একটা কি দুটো খুব সরু সোনার চুড়ি। নেল পালিশ, লিপস্টিক, কাজল নিজে তো ব্যবহার করতই না, আমার নিতান্ত দুই বালিকা দিদিদেরও বারণ ছিল ওসব ব্যবহার করায়। উদ্বাস্তু কলোনির প্রসাধনের শেষ কথা বসন্ত মালতী। সন্ধেবেলা ফুলের গন্ধের সঙ্গে টক্কর দিত বসন্ত মালতী। কিন্তু সেই স্বর্গোদ্যানের বস্তু আমাদের বাড়িতে ঢুকত না। এখন বুঝতে পারি মা তখনও মধ্য তিরিশ।

মা-র বন্ধুরাও সব পঁচিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে বয়স। সবাই পাড় দেওয়া শাদা খোলের শাড়ি পরত। কেউ কেউ দু'-একবার শাদার উপরে ডুরে। কেউ লিপস্টিক লাগায় না, নেল পালিশ লাগায় না, কাজল কদাচিৎ, নিতান্ত সাধাসিধে। কেউ সন্ধে দেয় না, শিবরাত্রির উপোস করে না, হরির লুট দেয় না। সবাই আমার মাসি। কেবল পুলিশের অত্যাচারে নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে ছ'-মাস বিছানায় পড়ে একটু একটু করে আবার হাঁটতে শিখল যে সে অপর্ণা পিসি। কেননা সে বাবাকে দাদা মেনেছে। পিসিও শাদা শাড়ি পরে, সাজগোজ করে না, ইস্কুলে পড়ায়।


এখানে আমরা যে স্কুলে পড়েছি ছেলেবেলায় সেই 'শিশুর দেশ'-এর কথা একটু বলতে হবে। এই স্কুল ছিল বিজয়গড়ের ক্রেমলিন বিজয়গড় কলেজের অধ্যক্ষ অমিয়ভূষণ চক্রবর্তীর বাড়িতে। এখানে যে দিদিমণিরা পড়াতেন তাঁরা যে সব পার্টির লোক ছিলেন এমন নয়। তবে তাঁরাও মূলত শাদা শাড়ি পরতেন, সাজগোজ করতেন না। বড় দিদিমণি ছিলেন সুষমা চক্রবর্তী যাকে আমি জেঠিমা বলে ডাকতাম। জেঠিমা মায়েদের চেয়ে একটু বয়েসে বড়। মা-দের মত করে শাড়ি পরতেন না। উনি পড়তেন ঘরোয়া স্টাইলে।আঁচলে একগোছা চাবি বাঁধা থাকত।

পড়াশোনা নিয়ে বাচ্চাদের ভয় দেখানো ছিল একদম বারণ। অনেক কবিতা-গল্প পড়া, মজার মজার নানা খেলায় স্কুলের অনেকটা সময় দেওয়া হত। এই কর্মকান্ডের অধিনায়িকা ছিলেন জেঠিমা। তিনি ঠিক পার্টি কর্মী ছিলেন না। কিন্তু মনে প্রাণে কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি চির অনুগত। জ্যাঠামশাই মা-দের 'মাস্টারমশাই'। জীবনযাত্রা কতটা সাধাসিধে হবে এ ব্যাপারে মা-রা দেখেছি জেঠিমার নির্দেশ – উক্ত বা অনুক্ত – মেনে চলত। রবীন্দ্রজয়ন্তী ইত্যাদির নির্দেশক ছিলেন জ্যাঠামশাই – এইট বি বাসস্ট্যান্ড থেকে শ্রী কলোনি মোড় পর্যন্ত সংস্কৃতির সবচেয়ে স্বীকৃত, সবচেয়ে প্রতাপশালী কমিসার।

বিশ্বমাসি এলে পাশের বাড়ির লোকও জানত কেউ এসেছে। অত প্রাণখোলা অট্টহাস্য খুব কম শুনেছি। বিশ্বমাসিও ইস্কুলে পড়াত। আর সে যে কি অপূর্ব মেটের ঝোল রাঁধত সে আর কি বলব। পরে শুনেছি খুব অল্পবয়েসেই নাকি মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিতে যোগ দিয়েছিল বিশ্বমাসি। এই মাসিরা মাঝে মাঝে রবীন্দ্রজয়ন্তী করত। গান হত, নাটক হত, এমনকি নৃত্যনাট্যও হত। আবার মিছিলও করত। বিজয়গড় বাজারের সামনে পথসভায় বক্তৃতাও দিত।

মা-র থেকে একটু ছোট কণিকা মাসি ছিল সবচেয়ে তুখোড় বক্তা। ছিপছিপে, ঘন কালো একজোড়া চোখ তীক্ষ্ণভাবে তাকিয়ে, জেদীভাবে একটু ঠেলে বেরোনো চোয়াল, রিনরিনে গলায় বক্তৃতা করত। প্রত্যেকটা কথা স্পষ্ট উচ্চারণে কেটে কেটে ঝরঝরে বাংলায় বলা। সহজেই ভিড় জমে যেত।

মা-দের একটা বড় আড্ডা ছিল বিজয়গড় আর শক্তিগড় এর সীমানায় ছায়া মাসির বাড়ি। মা-দের ছায়াদি আরেকজন যাকে সবসময়েই দেখেছি ঘরোয়া স্টাইলে শাড়ি পরতে। পান খেতেন খুব। স্থূলকায়া। পরিষ্কার বলতেন লেখাপড়া বেশি করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রবল বিক্রমে ছোট ছোট মেয়েদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পার্টির কাজ করতেন। ওঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত মৃদুভাষী। এখন মনে হয় সাংসারিকভাবে নিশ্চয় অসফল ছিলেন না। কেননা ওঁদের ছিল পাকা দোতলা বাড়ি। মা-দের বৃত্তে প্রায় কারুরই ছিল না। কিন্তু ছায়া মাসির প্রবল ব্যক্তিত্বের কাছে সম্পূর্ণ আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। সবাই বলত ছায়াদির বাড়ি।

ছায়া মাসি অত পোষাকি ভদ্দরলোকির তোয়াক্কা করত না। কিন্তু সকলের আশ্রয়। ছায়া মাসি এলেই মাকে নিয়ে কোনো কাজে বেরিয়ে যাবে এই নিয়ে খুব ছোটবেলায় আমি হয়ত একবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলাম। আমাকে তাই নিত্য ক্ষ্যাপাত। এসেই বলত – খোকন, তর মা রে কিন্তু লইয়া যামু। কিন্তু ততদিনে আমার ছায়া মাসির সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে। হাসতাম কেবল।

এই স্বচ্ছ ঋজু চেহারার মেয়েদের দেখলেই চেনা যেত। অনেকটা মেঘে ঢাকা তারার নীতার মত ছাঁচ। কেবল দাঁড়ানোটা আরেকটু আত্মবিশ্বাসী। বিশ্বমাসির হাসির মধ্যেও যেটা ছিল। একটা বাড়তি কোন আত্মপ্রত্যয়। 

শাদা শাড়ি আর সাজগোজের সম্পর্কে তাচ্ছিল্য নিশ্চয়ই খানিকটা ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এসেছিল। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধেই ধেই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে মেয়েরা তাদের চেহারায় হয়ত একটা শুচিতার ঘোষণা থাকা অনেক অনর্থক ইঙ্গিতকে আগেই রুখে দিত। আর নানা গরিব এলাকায় চটকদার সাজ করে কাজ করতে যাওয়ার মত অশ্লীলতা করার তো মানেই হয় না। কিন্তু এছাড়াও কোনো একটা ভাবে মেয়ে হয়ে ওঠার একটা অন্য গল্প এঁরা পেশ করছিলেন যাকে উপেক্ষা করা যায় না।

    - ✍️ Sunandan Chakraborty

π কাব্য ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

চাপের ব্যাপার আম খেতে সব যাচ্ছে চাπগঞ্জে
নকশীকাঁথার রূπ সাজু যাচ্ছে ময়ূরভঞ্জে।
πপয়সার হিসেবনিকেশ শুক্তো ইলিশ সর্ষে
πইক সেπ বরকন্দাজ চালাচ্ছে পা জোরসে।
πইন বনের মাথার ওপর চাঁদের দেখা πনি
দৈত্য দানো ভূত পেত্নী জীন পরী আর ডাইনি।
πকারী দর ছাπ সাড়ি হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি 
জল জলπ চাটনি হবে টক ঝাল আর মিষ্টি। 
πরিয়া কি πইলস সেতো যাচ্ছে বোঝা পষ্ট 
কোπ নদীর গভীর কত মাπ ভীষণ কষ্ট। 
πথন বা জাভায় দেখি কেমন কি বুৎপত্তি 
গান লেখা সব πরেটেডেট তাতেই বাজার ভর্তি।
πইকপাড়া পৌঁছে আমি দুধ ছাড়া চা খাই না
'মাঝে মাঝে তব দেখা π চিরদিন কেন π না'।।

আজ ২২/৭ যদিও অফিসিয়াল পাই দিবস ১৪ই মার্চ(৩.১৪)।

মঙ্গলবার, ২০ জুলাই, ২০২১

গ্রেগর যোহান মেন্ডেল - আধুনিক জিনশাস্ত্রের জনক ~ ডঃ বিষাণ বসু

বংশগতির মূলসূত্র লুকিয়ে আছে ডিএনএ-র গভীরে, এই বিষয়টি জানা গিয়েছে হালে - মানে, একশ বছরও পেরোয় নি। তার আগেও পারিবারিক সূত্রে মানুষ বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা বহিরঙ্গের ধর্ম কীভাবে পেয়ে থাকে, সে নিয়ে চিন্তাভাবনার অভাব ছিল না। পশ্চিমদেশে পিথাগোরাস যেমন ভেবেছিলেন, বংশগতভাবে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্যের পুরোটাই মানুষ পেয়ে থাকে বাবা, তথা শুক্রাণুর কাছ থেকে - মায়ের ভূমিকা সেখানে বিশেষ কিছু নেই। হ্যাঁ, ইনি জ্যামিতির উপপাদ্যের সেই পিথাগোরাসই বটেন - সেসময়ে তো অত স্পেশালাইজেশনের কড়াকড়ি ছিল না, অঙ্কের হিসেব সামলানোর ফাঁকে বংশগতি নিয়েও দুচারটে কথা কইলে কেউই সেটাকে খারাপ চোখে দেখতেন না। পরবর্তীতে অবশ্য অ্যারিস্টটল বলেন, না, বংশগতি শুধুই বাবার ব্যাপার নয় - মানুষ যদি বংশগতভাবে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্যের আদ্ধেক পায় বাবার কাছ থেকে, বাকি আদ্ধেক, অবশ্যই, মায়ের অবদান। জেনেটিক্সের সার্বিক ইতিহাস বুঝতে গেলে - এমন সব ধ্যানধারণাকে সেই সাপেক্ষে প্রাগইতিহাস হিসেবে দেখা যেতে পারে - সেই প্রাগইতিহাস কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু, মেন্ডেল নিয়ে জানতে গেলে অত কথা বিশদে না বুঝলেও চলবে। আমরা সটান চলে আসতে পারি উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি - বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত ক্রিশ্চান সন্ন্যাসীদের এক মঠে। বিজ্ঞানের অনেক ধারার ক্ষেত্রেই সেই বিশেষ ধারার জনক কে, সে নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে - এককথায় কোনো একজনকে জনক বলে দাগিয়ে দেওয়া সম্ভব কিনা, সে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু, আধুনিক জেনেটিক্সের ক্ষেত্রে তেমন বিতর্ক কিছু নেই - জীববিদ্যায় প্রথাগত কোনো ডিগ্রি ছাড়াই একজন লাজুক সন্ন্যাসী একার হাতে আধুনিক জেনেটিক্সের উদ্ভাবক - এবং, শুধু জনকই নন, আশ্রমের নিভৃতে বসে, কোনো বড়সড় উপকরণ বা উপাদান ছাড়াই, স্রেফ পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রয়োগে, একার হাতে জেনেটিক্সের মূল সূত্রগুলো লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন - বংশগতি বিষয়ে যে সাধারণ সূত্রসমূহ আজও সমান মান্য।
১৮৫০ সাল নাগাদ সেই অস্ট্রিয়ান সন্ন্যাসী বাগান করতে করতে, কীভাবে শারীরিক বৈশিষ্ট্য এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হয়, সে নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করতে শুরু করেন। তাঁর নাম, গ্রেগর জোহান মেন্ডেল। তিনি ক্রিশ্চান মঠে সন্ন্যাসী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আসল ভালোবাসার জায়গাটা ছিল বাগান। স্থানীয় ইশকুলে পড়িয়ে সন্ন্যাসজীবনের খরচা চালানোর চেষ্টাও করেছিলেন একাধিকবার - সেদিকে বিশেষ সুবিধে হয়নি। শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতামান পার হওয়ার পরীক্ষায় ফেল করেন তিনি - এবং আশ্চর্য, দুবার অকৃতকার্য হন বায়োলজিতে। তাঁর মটরগাছ নিয়ে পরীক্ষার কথা অল্পবয়সে জীবনবিজ্ঞান বইয়ে সবাই নিশ্চয়ই পড়েছেন, কাজেই সে বিষয়ে বিশদে আলোচনা করছি না। মোদ্দা কথা এই, মেন্ডেল খুব গভীরে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, কিছু মটরগাছ লম্বা এবং কিছু বেঁটে, কয়েকটির বীজ সবুজ তো কয়েকটির হরিদ্রাভ। মটরগাছের চারিত্রিক কয়েকটি বৈশিষ্ট্যকে তিনি গোড়াতেই বেছে নেন -
১. বীজ সুন্দর গোল, নাকি কুঞ্চিত
২. বীজ হলুদ, নাকি সবুজ
৩. ফুল সাদা, নাকি বেগুনি
৪. ফুল গাছের ডগায়, নাকি কোনো শাখায় অবস্থিত
৫. মটরের খোলাটির রঙ সবুজ, নাকি হরিদ্রাভ
৬. খোলাটি মসৃণ, নাকি কোঁচকানো
৭. গাছটি লম্বা, নাকি বেঁটে
এই পর্যবেক্ষণযোগ্য বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে গাছগুলোকে কয়েকটি বিভাগে সাজান। পরবর্তী মূল গবেষণার প্রস্তুতি হিসেবে, একই বৈশিষ্ট্যের গাছগুলির মধ্যে বারংবার প্রজনন ঘটিয়ে তিনি শুদ্ধ বৈশিষ্ট্যযুক্ত গাছ তৈরী করেন। এরপর একটি শুদ্ধ বৈশিষ্ট্যযুক্ত মটরগাছের সাথে অন্য বা বিপরীত শুদ্ধ বৈশিষ্ট্যের গাছের প্রজনন ঘটান - যাকে বলা হয় ক্রসিং (crossing)। এই ক্রসিং-এর ফলে উৎপন্ন মটরগাছের বৈশিষ্ট্য মেন্ডেল খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখেন, পরবর্তী প্রজন্মের গাছগুলি পূর্ববর্তী দুই বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের নয়, আগের প্রজন্মের দুটি বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের যেকোনো একটি বৈশিষ্ট্যযুক্ত। অর্থাৎ, একটি লম্বা ও একটি বেঁটে মটরগাছের সঙ্করজাত মটরগাছটি উচ্চতায় পূর্ব প্রজন্মের লম্বা মটরগাছের মতোই লম্বা - লম্বা ও বেঁটে মটরগাছের মাঝামাঝি উচ্চতার নয়। আপাতত কথাটা খুবই সাধারণ শোনালেও, তৎকালীন বিজ্ঞানের প্রেক্ষিতে এই ফলাফল খুবই অপ্রত্যাশিত - কেননা, বংশগতির যে বীজ এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তীতে প্রবাহিত হয়, সেই সময়ের বিজ্ঞানভাবনা অনুসারে, তাকে ভাবা হত এমন কোনো উপাদান, যা কিনা সহজেই মিশে লঘু হয়ে যেতে পারে - অর্থাৎ তদানীন্তন বিজ্ঞানভাবনা অনুসারে, শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উভয়পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ধর্ম মিলেমিশে একটা মাঝামাঝি গোছের ধর্ম অপত্যের মধ্যে পাওয়া যাওয়া উচিত। মেন্ডেল দেখলেন, ব্যাপারটা তেমন নয় - যেকোনো একটি ধর্মই সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মে। যে ধর্মটি প্রকাশিত হয়, তাকে বলা হল ডমিন্যান্ট - যে ধর্ম ধামাচাপা পড়ে রইল, তাকে বলা হল রিসেসিভ।
শুধু এইটুকু আবিষ্কার করে থেমে থাকলেও মেন্ডেল বিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন - কিন্তু, এরপরের ধাপে তিনি যে কাজ করলেন, তার অভিঘাত আশ্চর্য সুদূরপ্রসারী। তিনি পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্কর মটরগাছগুলির মধ্যে আবার প্রজনন ঘটালেন, যেগুলো কিনা দৈর্ঘ্যে লম্বা (শুদ্ধ লম্বা নয়, সঙ্কর লম্বা)। দেখা গেল, তৎপরবর্তী প্রজন্মে পুরোনো বৈশিষ্ট্য কিয়দংশে ফিরে এসেছে। মেন্ডেল সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, বংশগতির মূল উপাদানের কিছু অংশ আসে অপত্যের পিতার দিক থেকে, এবং বাকি অর্ধেক আসে মায়ের দিক থেকে। কিছু ধর্ম ডমিন্যান্ট এবং কিছু রিসেসিভ। যেকোনো তরফ থেকে ডমিন্যান্ট উপাদান পেলেই ডমিন্যান্ট বৈশিষ্ট্য বহিরঙ্গে প্রকাশ পাবে - কিন্তু, বহিরঙ্গে রিসেসিভ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাওয়ার জন্য দুই পক্ষ থেকেই তদনুরূপ উপাদান পাওয়া জরুরী। রিসেসিভ ধর্ম প্রকাশিত না হলেও হাপিস হয়ে যায় না, পরের প্রজন্মে সংবাহিত হয় সেই জিন - আরেকটি রিসেসিভ জিন পেলেই আবার বহিরঙ্গে প্রকাশ পেতে পারে।
কোনো একটি সাধারণ ধর্মের ভিত্তিতে একটি প্রজাতির মধ্যে ভাগ করতে চাইলে, তাকে বলা হয় অ্যালিল। যেমন ধরুন, গাছের দৈর্ঘ্য এই সাধারণ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে চাইলে, দুধরণের অ্যালিল - লম্বা ও বেঁটে। প্রতিটি মটরগাছে দুটি অ্যালিল থাকে - একটি আসে বাবার দিক থেকে, আরেকটি মায়ের দিক থেকে। দুদিক থেকেই বেঁটে অ্যালিল পেলে তবেই মটরগাছটি বেঁটে হবে, কেননা বেঁটে অ্যালিল রিসেসিভ - যেকোনো এক তরফ থেকে লম্বা অ্যালিল পেলেই মটরগাছ দৈর্ঘ্যে লম্বা হবে, কেননা লম্বা অ্যালিল ডমিন্যান্ট। মেন্ডেল অ্যালিল শব্দটি ব্যবহার করেননি - কিন্তু, এখানে সাধারণভাবে প্রচলিত শব্দটিই ব্যবহার করলাম, সমকালীন পরিভাষা ব্যবহার করলে অনেকক্ষেত্রে বিষয়টি ধরতে সুবিধে হয়।
অনেক বছর ধরে, পরের পর প্রজন্মের মটরগাছ ও তাদের বৈশিষ্ট্যাবলী পর্যবেক্ষণ করে শেষমেশ মেন্ডেল উপনীত হলেন বংশগতি বিষয়ে কিছু সাধারণ সূত্রে, যাকে সচরাচর ল'জ অফ হেরিডিটি বা বংশগতির সূত্র বলা হয়ে থাকে। সূত্রগুলো কী, কেন, কীভাবে হয়, এসব নিয়ে আলোচনা এখুনি বাড়ালাম না।
মোদ্দা কথা, আমাদের শরীরে ঠিক কী কী অ্যালিল রয়েছে, তা সবক্ষেত্রে আমাদের বহিরঙ্গে প্রকাশিত হয় না। যেমন, সঙ্কর মটরগাছে যদি একটি বেঁটে অ্যালিল থাকে, তাহলেও তা বহিরঙ্গে শুদ্ধ লম্বা মটরগাছের মতোই লম্বা হবে - কিন্তু, দুটি সঙ্কর লম্বা মটরগাছের প্রজননে একটি বেঁটে মটরগাছ জন্মাতে পারে (দুই তরফ থেকেই একটি একটি করে বেঁটে অ্যালিল পেলে)। আমাদের শরীরের অ্যালিলের বিন্যাস, তথা জেনেটিক গঠন, তাকে বলা হয় জিনোটাইপ - আর বহিরঙ্গে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যাবলী, তাকে বলা হয়ে থাকে ফেনোটাইপ। আমাদের শরীরে ক্রোমোজোম থাকে জোড়ায় জোড়ায় - ক্রোমোজোম তৈরী হয় লম্বা ডিএনএ-র ফিতে দিয়ে - সেই ডিএনএ-র মধ্যে জিনের অবস্থান, যাকে বলে লোকাস, সেই লোকাসের উপর নির্ভর করে জিনের প্রকাশের প্রকারভেদ - নির্দিষ্ট লোকাস অনুসারে নির্ধারিত হয় অ্যালিল। যেহেতু ক্রোমোজোম থাকে জোড়ায় - অ্যালিলও থাকে তেমনই, জোড়ায় - ডিএনএ তন্তুতে অ্যালিলের অবস্থান হুবহু একই হলে, তাকে বলা হয় হোমোজাইগাস - না হলে, হেটেরোজাইগাস। কিন্তু, ব্যাপারটা উত্তরোত্তর জটিল হয়ে যাচ্ছে - আবারও বলি, এখুনি এত কথা না জানলেও চলবে।
মেন্ডেল জিনের ব্যাপারে জানতেন না - জেনোটাইপ বিষয়েও তাঁর জানার সুযোগ ছিল না। কিন্তু, স্রেফ দেখে এবং পরীক্ষা করেই তিনি যে কয়েকটি সূত্র দিয়েছিলেন, সেগুলো আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ডমিন্যান্স-এর তত্ত্ব - যেখানে বলা হয়, একটি জিন যদি ডমিন্যান্ট হয়, তাহলে তার বিপরীত জিনের উপস্থিতিতেও সেই জিনটি বহিরঙ্গে নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে (সূত্রটি মেন্ডেল এই ভাষায় বলেননি - এখানে একটু যুগোপযোগী এবং সরলীকৃত ভাষায় কথাটা বলা হলো)। যেমন, স্বাধীনভাবে আত্মপ্রকাশের সূত্র - অর্থাৎ একটি জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রকাশের উপর অপর জিনের প্রকাশ নির্ভরশীল নয় - যেমন, মটরগাছ লম্বা হওয়ার জিন এবং মটরশুঁটির রঙ হলুদ হওয়ার জিন পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীলতা ছাড়াই স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হতে পারে। একদিক থেকে মেন্ডেল ছিলেন সৌভাগ্যবান, কেননা সবসময় অঙ্ক এত সরল থাকে না - সত্যি বলতে কি, অধিকাংশ সময়েই সরল থাকে না। ভাগ্যিশ তিনি মটরগাছ বেছেছিলেন গবেষণার জন্য!! অন্য গাছ বাছলে!! যেমন ধরুন, ক্যাপসিকামের রঙ কেমন হবে, তা একাধিক জিনের উপর নির্ভরশীল - একাধিক জিনের প্রকাশের উপরেই নির্ভর করে রঙ হয় সবুজ, লাল, হলুদ অথবা তাদের মিশ্রণ। মটরগাছের মতো সরল পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পথ ধরে ক্যাপসিকামের বংশগতির হিসেব বোঝা মুশকিল। অনেকক্ষেত্রে একটি জিনের উপস্থিতি সমপর্যায়ের বিবিধ জিনকে দমিয়ে দিতে পারে (যার নাম এপিস্ট্যাসিস)। ঘোড়ার রঙ বিভিন্ন হতে পারে বিভিন্ন জিনের ক্রিয়ায় - গায়ের রঙ থেকে কেশরের রঙ, বিভিন্ন কম্বিনেশন সম্ভব। কিন্তু, একটি বিশেষ সাদা জিনের প্রভাব বাকি সব জিনের প্রকাশ দমিয়ে দিতে পারে - সে ঘোড়া একেবারে শ্বেতশুভ্র। অনেকসময় একাধিক জিন গায়ে গায়ে থাকে - পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হওয়ার সময় হয় একত্রে সংবাহিত হয়, নচেৎ একেবারেই নয়। সেক্ষেত্রে, প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জিন স্বাধীনভাবে সংবাহিত ও প্রকাশিত হবে, এমন নয়। এরকম আরো রকমভেদ সম্ভব - বিশদে যাচ্ছি না। কিন্তু, মূল কথাটা হলো, মটরগাছের পরিবর্তে অন্য গাছ বাছলে মেন্ডেলের পক্ষে অত সহজে বংশগতির মূল সূত্রগুলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতো না।
আবার একটিই জিন একাধিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণ হতে পারে। অর্থাৎ একটি জিন একাধিক ফেনোটাইপিক বৈশিষ্ট্যের জন্ম দিতে পারে। (এক্ষেত্রে জিনটিকে বলা হয় প্লিওট্রপিক।) বংশানুক্রমে প্রাপ্ত বিবিধ জটিল অসুখের ক্ষেত্রেই দায়ী জিনটি এরকম প্লিওট্রপিক হয়ে থাকে - যেকারণে, সাধারণত, অসুখটি কেবলমাত্র একটি অসুবিধে বা একটি অঙ্গের সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের অনেক বংশগত অসুখের মূলেই জিনের গোলমাল - অনেকক্ষেত্রেই মাত্র একটি জিনেরই গোলমাল - কিন্তু, যেহেতু আমাদের শরীরের প্রায় সব কোষেই সব জিন থাকে, সেই একটিই গণ্ডগোলের জিন অনেকক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন উপসর্গের জন্ম দিতে পারে। হ্যাঁ, এই ব্যাপারটাও খুবই ইন্টারেস্টিং - শরীরের সব কোষেই সব জিনের উপস্থিতি। অর্থাৎ, ভেবে দেখুন একবার, খাবার হজম করার উৎসেচক তৈরীর জিন পেটের সাথে সাথে থাকে মস্তিষ্ক কিম্বা হাতে-পায়ের কোষেও!! কিন্তু, খাবার হজমের সেই উৎসেচক ওই পাকস্থলী বা অন্ত্রেই তৈরী হবে, অন্যত্র নয়, এমনকি জিন বা অন্য কাঁচামাল উপস্থিত থাকলেও নয় - ঠিক কেন একই জিন সর্বত্র উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও সর্বত্র কাজ করে না - বা অনেকসময় একেক জায়গায় একেকরকম কাজ করে - সে বিষয়ে আমাদের ধ্যানধারণা এখনও খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে। জিনের উপরেও যে মানবজীবনের রহস্য, সেই বিজ্ঞান, অর্থাৎ এপিজেনেটিক্স (শব্দার্থ অনুসারে, জিনের উপরে, বা জিনের অধিক), আরো না এগোনো অব্দি জিন-এর টেকনোলজি ও তার কার্যকারিতা, অনেকদূর অব্দি এগোলেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। সব মিলিয়ে দেখলে, মটরগাছ এবং পরীক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, দুটি বাছার ক্ষেত্রেই মেন্ডেলের ভাগ্য সদয় ছিল।
কিন্তু, কথায় কথায় অনেকদূর এগিয়ে এসেছি। আমরা বরং ফিরে যাই ১৮৬৫ সালের শীতের দুপুরে - ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাসের আট তারিখে, দুই ভাগে, মেন্ডেল পড়ে শোনালেন তাঁর গবেষণার কথা - ব্রুনো ন্যাচারাল সায়েন্স সোসাইটির সভায়। শ্রোতা জনাচল্লিশেক - কয়েকজন বটানিস্ট, বা জীববিদ্যায় উৎসুক, বাকি অনেকেই স্থানীয় কৃষক। মেন্ডেলের গবেষণা, জটিল করে সাজানো তথ্যের সমষ্টি বিরক্তির বেশী কিছু আগ্রহ সৃষ্টি করল না। সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হলো তাঁর গবেষণার কথা, কিন্তু সেও আর পড়ে দেখলেন কজন!! মেন্ডেল বিভিন্ন বিজ্ঞানীকে নিজের হাতে পাঠালেন তাঁর গবেষণাপত্রটি - যদি তাঁরা একটু পড়ে দেখেন - কিন্তু, প্রথাগত অর্থে অশিক্ষিত এক সন্ন্যাসীর জীববিদ্যা বিষয়ক গবেষণা, যে গবেষণার ফলাফল সমকালীন বিজ্ঞানের তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ, তাকে সিরিয়াসলি নেবেন কোন বিজ্ঞানী!! গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের আবিষ্কার অনাবিষ্কৃত রয়ে গেল সেই সময়ের বিজ্ঞানমহলে।
মটরগাছ নিয়ে গবেষণা করতে থাকলেও, মেন্ডেল বুঝেছিলেন তাঁর গবেষণার তাৎপর্য কেবল মটরগাছে সীমাবদ্ধ থাকবে না। লিখেছিলেন, জীবজগতের বিবর্তনের ধারাকে বুঝতে চাইলে বংশগতির ধরণটি বোঝা জরুরী এবং তাঁর গবেষণা সেই উদেশেই। সেই সময়ের নামজাদা উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল ভন নাগেলি-কে নিজের গবেষণাপত্র পাঠিয়ে পড়ে দেখতে অনুনয় করে বলেছিলেন, আমি জানি, আমার পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ফলাফল এখনকার বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাথে সহজে মেলানো যাবে না। তবুও, পড়ে মতামত জানান। নাহ, নাগেলি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। আস্তে আস্তে মঠে কাজকর্মের দায়িত্ব বাড়তে থাকলে মেন্ডেলও গবেষণা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশের প্রায় দুই দশক পরে মারা যান তিনি। ১৮৮৫ সালে। এতখানিই অনাবিষ্কৃত ছিলেন তিনি ও তাঁর গবেষণা, যে, মৃত্যু-পরবর্তী শোকসংবাদে গবেষক মেন্ডেলের সামান্য উল্লেখটুকুও ছিল না। কোনো বিজ্ঞানপত্রিকা বা বিজ্ঞানীদের কোনো সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেননি। মঠ থেকে প্রকাশিত শোকবার্তায় শুধু বলা ছিল, নরম মনের মানুষটি বড্ডো ফুল ভালোবাসতেন।

মেন্ডেল পুনরাবিষ্কার
মেন্ডেলের গবেষণা অনাবিষ্কৃত থেকে যাওয়াটা যুগপৎ আশ্চর্যের এবং দুর্ভাগ্যজনক। আশ্চর্যের, কেননা ১৮৫৮ সালেই চার্লস ডারউইন প্রকাশ্যে এনেছেন তাঁর বিবর্তনের তত্ত্ব - ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে জীববিদ্যার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই, অন দ্য ওরিজিন অফ স্পিসিস বাই মিনস অফ ন্যাচারাল সিলেকশন। প্রজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ঠিক কেমন করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংবাহিত হয়, বিশেষত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কীভাবে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হয়, সে বিষয়ে ধারণা না করা গেলে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে করতেই একটি প্রজাতি দীর্ঘসময় অতিক্রম করে কেমন করে আরেকটি প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়, সে তত্ত্ব দাঁড় করানো মুশকিল। নিজের তত্ত্বের এই অসম্পূর্ণতা বিষয়ে ডারউইন স্বয়ং ওয়াকিবহাল ছিলেন না, এমন নয় - কিন্তু, তত্ত্বের সে খামতি তিনি মেটাতে পারেননি। অথচ, মেন্ডেল-বর্ণিত বংশগতির সূত্রের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সমাধান - আরো আশ্চর্যের বিষয়, ডারউইনের লাইব্রেরিতেই ছিল জার্নালের সেই সংখ্যা, যার মধ্যে মেন্ডেলের গবেষণাপত্রটি - কিন্তু সেই জার্নালে মেন্ডেলের গবেষণাপত্রের আগের এবং পরের আর্টিকলগুলো পড়ে দেখলেও ডারউইন মেন্ডেলের লেখাটি পড়ে দেখেছিলেন, এমন প্রমাণ নেই।
বিবর্তন ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত বংশগতির ধারাকে ব্যাখ্যা করতে ডারউইন আনেন জেমিউলস-এর ধারণা। জেমিউলস, যা কিনা শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে উৎসারিত নির্যাসের মতো বস্তু এবং যে নির্যাস রূপান্তরিত হবে শুক্রে - অনুরূপ জেমিউলস থাকবে নারীর ক্ষেত্রেও - অপত্যের দেহে সংবাহিত হবে দুই জেমিউলস-এর মিলনের ফলে উৎপন্ন মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যাবলী। বংশগতি বিষয়ে ডারউইন তাঁর তত্ত্ব প্রকাশ্যে আনেন ১৮৬৭ সালে - মনে করিয়ে দিই, মেন্ডেল মটরগাছের 'পরে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান এর দুবছর আগেই এবং মেন্ডেল পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন, অপত্যের ক্ষেত্রে মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্য সংবাহিত হয়, এমন নয়। বংশগতির ক্ষেত্রে, ডারউইনের তত্ত্ব মেনে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হওয়ার কোনো ব্যবস্থা যদি না-ই থাকে - এমন করে পরবর্তী প্রজন্ম পিতা-মাতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি ধর্ম পেতে থাকলে - কয়েকটি প্রজন্ম বাদে বংশগত বৈশিষ্ট্য, এবং অতএব জীবজগতের বৈচিত্র্যও, সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক - এবং দুনিয়াজুড়ে একই প্রজাতির ক্ষেত্রে সম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই সর্বময় হয়ে দাঁড়াবে, তাই না? অথচ তেমনটি তো হয় না। তাহলে?
বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলেন ডারউইনের অনুগামী ওলন্দাজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী, হুগো দি ভ্রিস-ও। তিনি বেছে নিলেন বিভিন্ন উদ্ভিদের কিছু কিছু আজব ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যকে - অর্থাৎ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য, যা কিনা সেই প্রজাতির উদ্ভিদে খুব একটা পাওয়া যায় না। এবার সেই ব্যতিক্রমী গুণাবলী-সম্পন্ন উদ্ভিদের সাথে সাধারণ ও স্বাভাবিক আরেকটি গাছের প্রজনন ঘটালেন। দেখা গেল, ব্যতিক্রমী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো মোটেই মিলেমিশে লঘু আকারে পরের প্রজন্মে প্রকাশিত হচ্ছে না - হয় পুরোপুরি প্রকাশিত হচ্ছে, নচেৎ একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে। ১৮৯৭ সালে ডি ভ্রিস বিশ্বকে জানালেন তাঁর তত্ত্ব - প্রজাতির একেকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণ, কোষে থাকা একটি ক্ষুদ্র কণা - ডি ভ্রিস যার নাম দিলেন প্যানজিন। একেকটি বৈশিষ্ট্যের জন্যে দায়ী একেকটি প্যানজিন - অর্থাৎ একজোড়া প্যানজিন - কেননা, একটি বৈশিষ্ট্যের জন্যে প্রতি কোষে থাকে দুটি প্যানজিন, একটি আসে বাবার কাছ থেকে, আরেকটি মায়ের সুবাদে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বৈশিষ্ট্য মিলেমিশে যায় না - এবং প্রকাশ পাক বা না পাক, বংশগতির সুবাদে প্রবাহিত তথ্য হারিয়ে যায় না কখনোই। প্যানজিন নামকরণের অংশ বাদ দিলে এই তত্ত্ব একেবারেই মেন্ডেলের তত্ত্বের পুনরাবিষ্কার - এবং সত্যিসত্যিই ডি ভ্রিস, সেই সময় অব্দি, মেন্ডেল বিষয়ে কিছুই জানতেন না। জানতে জানতে গড়িয়ে যাবে আরো কয়েকটা বছর।
১৯০০ সালে ডি ভ্রিস-এর বন্ধু তাঁকে একখানা চিঠি পাঠালেন, সাথে সাড়ে তিন দশক প্রাচীন এক গবেষণাপত্র - চিঠিতে লেখা, তুমি তো গাছপালার প্রজনন বংশগতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছ, দ্যাখো, জনৈক মেন্ডেলের এই পেপারখানা যদি ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়। ইন্টারেস্টিং!!! একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ডি ভ্রিস। তবে, তাঁর নিজেরই ভাষায়, বিনয় বা সৌজন্য খুবই ভালো গুণ, কিন্তু ওই গুণ না থাকলে জীবনে বেশী উন্নতি করা যায়। অতএব, ওই ১৯০০ সালেই ডি ভ্রিস-এর যে পেপারটি প্রকাশিত হলো, সেখানে জনৈক মেন্ডেলের প্রসঙ্গ অনুল্লেখিত রইল।
স্বাভাবিকভাবেই, গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নাম হিসেবে অনাবিষ্কৃতই রয়ে যেতেন - কিন্তু ডি ভ্রিস-এর গবেষণা মেন্ডেলের পরীক্ষালব্ধ সূত্রগুলিকে পুনরায় আলোচনায় এনে ফেলল। একইসময়, প্রায় কাকতালীয়ভাবেই, মেন্ডেলের গবেষণা ইউরোপে আরো তিনজন বিজ্ঞানীর চোখে পড়ল। তাঁরাও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে প্রবাহিত হয়, সে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন এবং পুরোনো গবেষণার খবর খুঁজতে খুঁজতে মেন্ডেলের পরীক্ষার হদিশ পেয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে একজন, কার্ল করেন্স, ছিলেন বিখ্যাত সুইস উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল ভন নাগেলির ছাত্র। হ্যাঁ, সেই কার্ল ভন নাগেলি, যাঁকে কিনা মেন্ডেল নিজের গবেষণাপত্রটি পাঠিয়ে মতামত জানতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যিনি একেবারেই পাত্তা দেননি। স্বাভাবিকভাবেই, নাগেলি নিজের ছাত্রের কাছেও মেন্ডেলের কথা জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি। করেন্স মটরগাছ ও ভুট্টাগাছের প্রজনন ও সঙ্কর বিষয়ে নিজের গবেষণার সুবাদে, প্রায় আচমকাই, জানতে পেরেছিলেন মেন্ডেলের পরীক্ষা ও সিদ্ধান্তের কথা। অতএব, কার্ল করেন্স যখন জানতে পারলেন ডি ভ্রিস-এর গবেষণার খবর - যে গবেষণা ও তার ফলাফল সাড়ে তিন দশক আগেকার মেন্ডেলের পরীক্ষার প্রায় অনুরূপ, অথচ রেফারেন্স হিসেবে মেন্ডেলের গবেষণাপত্রের উল্লেখটুকুও নেই - তখন তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। রীতিমতো শ্লেষের সাথে বললেন, খুবই আশ্চর্য সমাপতন বলতে হবে, ডি ভ্রিস-এর গবেষণাপত্রে মেন্ডেলের বিষয় তো বটেই, তাঁর ভাষার ছায়াটি অব্দি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর নামটি অনুপস্থিত!! ডি ভ্রিস অবশ্য বিজ্ঞানী হিসেবে অসৎ ছিলেন না - একথা মাথায় রাখতে হবে, তিনি রীতিমতো পরীক্ষানিরীক্ষার শেষে যখন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, তখনও অব্দি তিনি মেন্ডেলের নামটুকুও শোনেননি। গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের গবেষণাপত্র তাঁর হাতে আসে তার পরে। এবং এত বছরের শ্রমের শেষে নিজের মতো করে পাওয়া সিদ্ধান্তের কৃতিত্বের ভাগ বিগত যুগের এক অপরিচিত নিভৃতবাসী সন্ন্যাসীকে দিতে তাঁর মন চায়নি। কিন্তু, করেন্স-এর বাক্যবাণে তাঁরও বোধোদয় হলো - পরের সংস্করণে গবেষণাপত্রের রেফারেন্সে তিনি মেন্ডেলের নাম জুড়ে নিলেন।
মেন্ডেলের পথ ধরে মেন্ডেলের সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও, ডি ভ্রিস তাঁর পরবর্তী গবেষণায় মেন্ডেলকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বংশগতির ধারা মেনে কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হয়, সেই প্রশ্নের সাথে সাথে তিনি তুলেছিলেন আরো বুনিয়াদি একটি প্রশ্ন। যে বৈশিষ্ট্যটি পরের প্রজন্মে সংবাহিত হবে কি হবে না, সে নিয়ে আমরা এত ভাবছি - কিন্তু, সেই নতুন বা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য প্রজাতির মধ্যে এলো কী করে? একই প্রজাতির মধ্যে কোনো গাছ লম্বা আর কোনো গাছ বেঁটে, কোনো গাছের ফুল সাদা আর কোনোটির রঙ বেগুনি - এবং এই প্রতিটি ধর্মই পরবর্তী প্রজন্মে সংবহনযোগ্য - এই বিভিন্নতা এলো কোন পথে? আর সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই যে প্রজাতি আদিকাল থেকেই পেয়ে আসে, এমনও তো নয়। সময়ের সাথে সাথে নিত্যনতুন বৈশিষ্ট্য অর্জিত হয়, যে বৈশিষ্ট্য ক্ষেত্রবিশেষে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিতও হয়। ব্যতিক্রমী বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দীর্ঘসময় যাবৎ পর্যবেক্ষণ করে ডি ভ্রিস সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন - প্রাকৃতিক নিয়মেই এমন বৈশিষ্ট্য প্রজাতি অর্জন করতে পারছে। এমন বৈশিষ্ট্যের তিনি নাম দিলেন - মিউট্যান্ট - অর্থাৎ পরিবর্তিত। এই একটি পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়েই ডি ভ্রিস জিনতত্ত্ব এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদকে একই সূত্রে বেঁধে ফেললেন। সময়ের সাথে সাথে প্রকৃতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার স্বার্থে, নিজের উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে বংশগতির যে মূল বাহক, তার মধ্যে পরিবর্তন আসে - পরবর্তী গবেষণা আমাদের জানাবে, এই বদল ঘটে প্রজাতির জিনগত গঠনে, অর্থাৎ জিনোটাইপে - তারই নাম মিউটেশন। না, বিবর্তনের নিয়ম বিশেষ কিছু জিন-কে আলাদা করে সুনজরে দেখে, এমন নয় - বিবর্তনের ধারা বাছে বিশেষ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা প্রজাতির বহিরঙ্গের বিশেষ কিছু ধর্ম - অর্থাৎ, ফেনোটাইপ। ফেনোটাইপের পেছনে পরিবেশ এবং অন্যান্য বিষয়ের সাথে সাথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব প্রজাতির জিনগত গঠনের - অর্থাৎ জিনোটাইপের। অতএব, বিশেষ ফেনোটাইপ নির্বাচিত হওয়ার পথেই বিশেষ জিনের নির্বাচন ঘটে যায়। এমন করেই প্রজাতি নিজের জিনোটাইপে বদল এনে ফেলে - ঘটতে থাকে মিউটেশন। ডি ভ্রিস-এর সময়ে এত কথা জানার সুযোগ ছিল না। কিন্তু, বিবর্তনবাদের মূলে যে প্রজাতির ক্রমবিবর্তন এবং সেই ক্রমবিবর্তনের কারণ যে প্রজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ক্রমিক বদল, যে বদল সংবাহিত হতে পারবে পরবর্তী প্রজন্মে - প্রকৃতির নিয়মেই ঘটতে থাকে মিউটেশন, আর ঠিক সেই মিউটেশনগুলিই নির্বাচিত হয়ে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হবে, যেগুলো প্রজাতিটিকে আরো বেশী টিকে থাকার উপযুক্ত করে তুলতে পারবে। মিউটেশনের ধারণার সাহায্যে ডি ভ্রিস বিবর্তনবাদকে আরো দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন।
কিন্তু, আমরা তো মেন্ডেলের পরীক্ষানিরীক্ষার পুনরাবিষ্কারের কথা বলছিলাম। ১৯০০ সালের কাছাকাছি সময়ে একইসাথে তিনচারজন গবেষক নিজ নিজ পরীক্ষার মাধ্যমে মেন্ডেল-উপনীত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, এবং তাঁদের গবেষণা ও সিদ্ধান্তের পেছনে রেফারেন্স ঘাঁটতে গিয়ে একটি দুষ্প্রাপ্য জার্নালে মেন্ডেলকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তবু, মেন্ডেলের তত্ত্বের বিশ্বব্যাপী পুনরুত্থানের পেছনে কোনো একজনের নাম করতে হলে, সে মানুষটি কার্ল করেন্স বা ডি ভ্রিস নন - তিনি ব্রিটিশ বায়োলজিস্ট উইলিয়াম বেটসন।
লন্ডনে রয়াল হর্টিকালচারাল সোসাইটিতে বক্তৃতা দিতে যাওয়ার পথে ট্রেনে বসে তিনি পড়েন ডি ভ্রিস-এর পেপারটি (যে সংস্করণে মেন্ডেলের নাম রেফারেন্স হিসেবে ছিল)। সেদিনই বক্তৃতা দিতে গিয়ে এই তত্ত্বের কথা বারবার উল্লেখ করেন। গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেন, বংশগতির এই নবলব্ধ সূত্রের তাৎপর্য যে কতোখানি, সেটা এখুনি আমরা উপলব্ধিই করে উঠতে পারছি না। এই বক্তৃতার মাসতিনেকের মাথায়, ১৯০০ সালের অগাস্ট মাসে, তিনি বন্ধু ফ্রান্সিস গ্যালটন-কে চিঠি লিখে মেন্ডেলের পেপারটি পড়ে দেখতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। বলেন, বংশগতি বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিন্তার মধ্যে পড়বে এই গবেষণা এবং এ প্রায় অবিশ্বাস্য, যে, এমন একখানা গবেষণার কথা এত বছর ধামাচাপা পড়ে ছিল!! প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা যাক, এই ফ্রান্সিস গ্যালটন সম্পর্কে ছিলেন চার্লস ডারউইনের ভাই এবং এককথায় বহুমুখী জিনিয়াস। ইউজেনিক্স তথা বংশানুক্রমিক জাতিগত শ্রেষ্ঠতা, জিনগত উচ্চাবচ বিভাজনের তত্ত্বের (যে তত্ত্বের পথ ধরেই আসবে নাৎসি কনসেনট্রেশান ক্যাম্প ইহুদি-নিধন ইত্যাদি) অন্যতম প্রচারক হিসেবে তিনি কুখ্যাত হয়ে গেলেও রাশিবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অবদান ছিল তাঁর - এমনকি ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেখে অপরাধী ধরার কার্যকরী ভাবনাটিও গ্যালটনের। কিন্তু, গ্যালটনকে আপাতত সরিয়ে রেখে বেটসনে ফিরি।
ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি তো বটেই, সাগর পার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও উইলিয়াম বেটসন বক্তৃতা দিয়েছিলেন মেন্ডেলের তত্ত্ব ও বংশগতির ধারা নিয়ে। বিশ্বের দরবারে এক ভুলে যাওয়া অস্ট্রিয়ান সন্ন্যাসীর লুপ্ত মর্যাদা ফিরিয়ে দিলেন তিনি। বেটসন বুঝেছিলেন এই তত্ত্বের গুরুত্ব। কিন্তু, তত্ত্বটিকে জনপ্রিয় করতে হলে একখানা যুৎসই নাম তো জরুরী। ডি ভ্রিস-এর প্যানজিন ধরে নাম দেওয়াই যেত, প্যানজেনেটিক্স। কিন্তু, বেটসনের মনে ধরল না। অতএব, গ্রীক জেন্নো (genno), যার শব্দার্থ জন্ম দেওয়া, সেখান থেকে শব্দটি নিয়ে উইলিয়াম বেটসন জীববিদ্যার বংশগতি-চর্চার এই ধারার নাম দিলেন - জেনেটিক্স।
গ্রেগর যোহান মেন্ডেল। আধুনিক জিনশাস্ত্রের জনক। দুশো বছরে পা দিলেন।