বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই, ২০২১

রিফিউজি কলোনি-র কমিউনিস্ট মেয়েরা ~ অভিজিৎ দাশগুপ্ত

আমাদের ছেলেবেলার বিজয়গড়, নেতাজীনগর, শ্রী কলোনি, আজাদগড়, সংহতি কলোনি, সমাজগড়, নিঃস্ব কলোনি, গান্ধী কলোনি – এইসব উদ্বাস্তু এলাকার চেহারা এখনকার সঙ্গে একদমই মিলবে না। শ্রী কলোনি-র মোড় থেকে যাদবপুর এইট বি বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তাটা পিচের। কিন্তু বাহন বলতে রিকশা। নাহলে সাইকেলে বা হেঁটে যেতে হবে। পাকা বাড়ি হাতে গোনা। বেড়ার বাড়ি বেশির ভাগ। টালি বা টিনের চাল। জমির সীমানাগুলো হয়তো রাংচিতের বেড়া দিয়ে ঘেরা বা বাঁশের। সব বাড়িতেই প্রায় ফল এবং ফুলের গাছ। উঠোনগুলো মাটির। বৃষ্টি হলেই পিছল, কাদাময়। তখন গেট থেকে ঘরের দাওয়া পর্যন্ত জোড়া জোড়া করে ইঁট পেতে রাখা হত। তুলসীতলা ছিল প্রায় সব বাড়িতে। সন্ধে দেওয়ার সময় অল্প আগে পরে শাঁখ বেজে উঠত বাড়িতে বাড়িতে। আমাদের বাড়িতে বাজত না। আমার মা বাবা দুজনেই 'পার্টির' লোক।

মা রান্না-টান্না করে স্কুলে পড়াতে চলে যেত। এক পা গোদে ফোলা রাজেনদা ছিল মা-র বাঁধা রিকশা। মা-কে কখনও শাদা শাড়ি ছাড়া কিছু পরতে দেখিনি। পাড়ের কারুকার্যই একমাত্র বিলাসিতা। শাঁখা বারবার ভেঙে যায় বলে মা একহাতে কেবল একটা লোহা পরত আর অন্য হাতে একটা কি দুটো খুব সরু সোনার চুড়ি। নেল পালিশ, লিপস্টিক, কাজল নিজে তো ব্যবহার করতই না, আমার নিতান্ত দুই বালিকা দিদিদেরও বারণ ছিল ওসব ব্যবহার করায়। উদ্বাস্তু কলোনির প্রসাধনের শেষ কথা বসন্ত মালতী। সন্ধেবেলা ফুলের গন্ধের সঙ্গে টক্কর দিত বসন্ত মালতী। কিন্তু সেই স্বর্গোদ্যানের বস্তু আমাদের বাড়িতে ঢুকত না। এখন বুঝতে পারি মা তখনও মধ্য তিরিশ।

মা-র বন্ধুরাও সব পঁচিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে বয়স। সবাই পাড় দেওয়া শাদা খোলের শাড়ি পরত। কেউ কেউ দু'-একবার শাদার উপরে ডুরে। কেউ লিপস্টিক লাগায় না, নেল পালিশ লাগায় না, কাজল কদাচিৎ, নিতান্ত সাধাসিধে। কেউ সন্ধে দেয় না, শিবরাত্রির উপোস করে না, হরির লুট দেয় না। সবাই আমার মাসি। কেবল পুলিশের অত্যাচারে নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে ছ'-মাস বিছানায় পড়ে একটু একটু করে আবার হাঁটতে শিখল যে সে অপর্ণা পিসি। কেননা সে বাবাকে দাদা মেনেছে। পিসিও শাদা শাড়ি পরে, সাজগোজ করে না, ইস্কুলে পড়ায়।

এখানে আমরা যে স্কুলে পড়েছি ছেলেবেলায় সেই 'শিশুর দেশ'-এর কথা একটু বলতে হবে। এই স্কুল ছিল বিজয়গড়ের ক্রেমলিন বিজয়গড় কলেজের অধ্যক্ষ অমিয়ভূষণ চক্রবর্তীর বাড়িতে। এখানে যে দিদিমণিরা পড়াতেন তাঁরা যে সব পার্টির লোক ছিলেন এমন নয়। তবে তাঁরাও মূলত শাদা শাড়ি পরতেন, সাজগোজ করতেন না। বড় দিদিমণি ছিলেন সুষমা চক্রবর্তী যাকে আমি জেঠিমা বলে ডাকতাম। জেঠিমা মায়েদের চেয়ে একটু বয়েসে বড়। মা-দের মত করে শাড়ি পরতেন না। উনি পড়তেন ঘরোয়া স্টাইলে।আঁচলে একগোছা চাবি বাঁধা থাকত।

পড়াশোনা নিয়ে বাচ্চাদের ভয় দেখানো ছিল একদম বারণ। অনেক কবিতা-গল্প পড়া, মজার মজার নানা খেলায় স্কুলের অনেকটা সময় দেওয়া হত। এই কর্মকান্ডের অধিনায়িকা ছিলেন জেঠিমা। তিনি ঠিক পার্টি কর্মী ছিলেন না। কিন্তু মনে প্রাণে কমিউনিস্ট আদর্শের প্রতি চির অনুগত। জ্যাঠামশাই মা-দের 'মাস্টারমশাই'। জীবনযাত্রা কতটা সাধাসিধে হবে এ ব্যাপারে মা-রা দেখেছি জেঠিমার নির্দেশ – উক্ত বা অনুক্ত – মেনে চলত। রবীন্দ্রজয়ন্তী ইত্যাদির নির্দেশক ছিলেন জ্যাঠামশাই – এইট বি বাসস্ট্যান্ড থেকে শ্রী কলোনি মোড় পর্যন্ত সংস্কৃতির সবচেয়ে স্বীকৃত, সবচেয়ে প্রতাপশালী কমিসার।

বিশ্বমাসি এলে পাশের বাড়ির লোকও জানত কেউ এসেছে। অত প্রাণখোলা অট্টহাস্য খুব কম শুনেছি। বিশ্বমাসিও ইস্কুলে পড়াত। আর সে যে কি অপূর্ব মেটের ঝোল রাঁধত সে আর কি বলব। পরে শুনেছি খুব অল্পবয়েসেই নাকি মহিলা আত্মরক্ষা সমিতিতে যোগ দিয়েছিল বিশ্বমাসি। এই মাসিরা মাঝে মাঝে রবীন্দ্রজয়ন্তী করত। গান হত, নাটক হত, এমনকি নৃত্যনাট্যও হত। আবার মিছিলও করত। বিজয়গড় বাজারের সামনে পথসভায় বক্তৃতাও দিত।

মা-র থেকে একটু ছোট কণিকা মাসি ছিল সবচেয়ে তুখোড় বক্তা। ছিপছিপে, ঘন কালো একজোড়া চোখ তীক্ষ্ণভাবে তাকিয়ে, জেদীভাবে একটু ঠেলে বেরোনো চোয়াল, রিনরিনে গলায় বক্তৃতা করত। প্রত্যেকটা কথা স্পষ্ট উচ্চারণে কেটে কেটে ঝরঝরে বাংলায় বলা। সহজেই ভিড় জমে যেত।

মা-দের একটা বড় আড্ডা ছিল বিজয়গড় আর শক্তিগড় এর সীমানায় ছায়া মাসির বাড়ি। মা-দের ছায়াদি আরেকজন যাকে সবসময়েই দেখেছি ঘরোয়া স্টাইলে শাড়ি পরতে। পান খেতেন খুব। স্থূলকায়া। পরিষ্কার বলতেন লেখাপড়া বেশি করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রবল বিক্রমে ছোট ছোট মেয়েদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পার্টির কাজ করতেন। ওঁর স্বামী ছিলেন অত্যন্ত মৃদুভাষী। এখন মনে হয় সাংসারিকভাবে নিশ্চয় অসফল ছিলেন না। কেননা ওঁদের ছিল পাকা দোতলা বাড়ি। মা-দের বৃত্তে প্রায় কারুরই ছিল না। কিন্তু ছায়া মাসির প্রবল ব্যক্তিত্বের কাছে সম্পূর্ণ আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। সবাই বলত ছায়াদির বাড়ি।

ছায়া মাসি অত পোষাকি ভদ্দরলোকির তোয়াক্কা করত না। কিন্তু সকলের আশ্রয়। ছায়া মাসি এলেই মাকে নিয়ে কোনো কাজে বেরিয়ে যাবে এই নিয়ে খুব ছোটবেলায় আমি হয়ত একবার অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলাম। আমাকে তাই নিত্য ক্ষ্যাপাত। এসেই বলত – খোকন, তর মা রে কিন্তু লইয়া যামু। কিন্তু ততদিনে আমার ছায়া মাসির সঙ্গে ভাব হয়ে গেছে। হাসতাম কেবল।

এই স্বচ্ছ ঋজু চেহারার মেয়েদের দেখলেই চেনা যেত। অনেকটা মেঘে ঢাকা তারার নীতার মত ছাঁচ। কেবল দাঁড়ানোটা আরেকটু আত্মবিশ্বাসী। বিশ্বমাসির হাসির মধ্যেও যেটা ছিল। একটা বাড়তি কোন আত্মপ্রত্যয়। 

শাদা শাড়ি আর সাজগোজের সম্পর্কে তাচ্ছিল্য নিশ্চয়ই খানিকটা ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এসেছিল। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধেই ধেই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে মেয়েরা তাদের চেহারায় হয়ত একটা শুচিতার ঘোষণা থাকা অনেক অনর্থক ইঙ্গিতকে আগেই রুখে দিত। আর নানা গরিব এলাকায় চটকদার সাজ করে কাজ করতে যাওয়ার মত অশ্লীলতা করার তো মানেই হয় না। কিন্তু এছাড়াও কোনো একটা ভাবে মেয়ে হয়ে ওঠার একটা অন্য গল্প এঁরা পেশ করছিলেন যাকে উপেক্ষা করা যায় না।

    - ✍️ Sunandan Chakraborty

π কাব্য ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

চাপের ব্যাপার আম খেতে সব যাচ্ছে চাπগঞ্জে
নকশীকাঁথার রূπ সাজু যাচ্ছে ময়ূরভঞ্জে।
πপয়সার হিসেবনিকেশ শুক্তো ইলিশ সর্ষে
πইক সেπ বরকন্দাজ চালাচ্ছে পা জোরসে।
πইন বনের মাথার ওপর চাঁদের দেখা πনি
দৈত্য দানো ভূত পেত্নী জীন পরী আর ডাইনি।
πকারী দর ছাπ সাড়ি হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি 
জল জলπ চাটনি হবে টক ঝাল আর মিষ্টি। 
πরিয়া কি πইলস সেতো যাচ্ছে বোঝা পষ্ট 
কোπ নদীর গভীর কত মাπ ভীষণ কষ্ট। 
πথন বা জাভায় দেখি কেমন কি বুৎপত্তি 
গান লেখা সব πরেটেডেট তাতেই বাজার ভর্তি।
πইকপাড়া পৌঁছে আমি দুধ ছাড়া চা খাই না
'মাঝে মাঝে তব দেখা π চিরদিন কেন π না'।।

আজ ২২/৭ যদিও অফিসিয়াল পাই দিবস ১৪ই মার্চ(৩.১৪)।

মঙ্গলবার, ২০ জুলাই, ২০২১

গ্রেগর যোহান মেন্ডেল - আধুনিক জিনশাস্ত্রের জনক ~ ডঃ বিষাণ বসু

বংশগতির মূলসূত্র লুকিয়ে আছে ডিএনএ-র গভীরে, এই বিষয়টি জানা গিয়েছে হালে - মানে, একশ বছরও পেরোয় নি। তার আগেও পারিবারিক সূত্রে মানুষ বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা বহিরঙ্গের ধর্ম কীভাবে পেয়ে থাকে, সে নিয়ে চিন্তাভাবনার অভাব ছিল না। পশ্চিমদেশে পিথাগোরাস যেমন ভেবেছিলেন, বংশগতভাবে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্যের পুরোটাই মানুষ পেয়ে থাকে বাবা, তথা শুক্রাণুর কাছ থেকে - মায়ের ভূমিকা সেখানে বিশেষ কিছু নেই। হ্যাঁ, ইনি জ্যামিতির উপপাদ্যের সেই পিথাগোরাসই বটেন - সেসময়ে তো অত স্পেশালাইজেশনের কড়াকড়ি ছিল না, অঙ্কের হিসেব সামলানোর ফাঁকে বংশগতি নিয়েও দুচারটে কথা কইলে কেউই সেটাকে খারাপ চোখে দেখতেন না। পরবর্তীতে অবশ্য অ্যারিস্টটল বলেন, না, বংশগতি শুধুই বাবার ব্যাপার নয় - মানুষ যদি বংশগতভাবে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্যের আদ্ধেক পায় বাবার কাছ থেকে, বাকি আদ্ধেক, অবশ্যই, মায়ের অবদান। জেনেটিক্সের সার্বিক ইতিহাস বুঝতে গেলে - এমন সব ধ্যানধারণাকে সেই সাপেক্ষে প্রাগইতিহাস হিসেবে দেখা যেতে পারে - সেই প্রাগইতিহাস কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু, মেন্ডেল নিয়ে জানতে গেলে অত কথা বিশদে না বুঝলেও চলবে। আমরা সটান চলে আসতে পারি উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি - বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত ক্রিশ্চান সন্ন্যাসীদের এক মঠে। বিজ্ঞানের অনেক ধারার ক্ষেত্রেই সেই বিশেষ ধারার জনক কে, সে নিয়ে বিস্তর মতভেদ রয়েছে - এককথায় কোনো একজনকে জনক বলে দাগিয়ে দেওয়া সম্ভব কিনা, সে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু, আধুনিক জেনেটিক্সের ক্ষেত্রে তেমন বিতর্ক কিছু নেই - জীববিদ্যায় প্রথাগত কোনো ডিগ্রি ছাড়াই একজন লাজুক সন্ন্যাসী একার হাতে আধুনিক জেনেটিক্সের উদ্ভাবক - এবং, শুধু জনকই নন, আশ্রমের নিভৃতে বসে, কোনো বড়সড় উপকরণ বা উপাদান ছাড়াই, স্রেফ পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রয়োগে, একার হাতে জেনেটিক্সের মূল সূত্রগুলো লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন - বংশগতি বিষয়ে যে সাধারণ সূত্রসমূহ আজও সমান মান্য।
১৮৫০ সাল নাগাদ সেই অস্ট্রিয়ান সন্ন্যাসী বাগান করতে করতে, কীভাবে শারীরিক বৈশিষ্ট্য এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হয়, সে নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করতে শুরু করেন। তাঁর নাম, গ্রেগর জোহান মেন্ডেল। তিনি ক্রিশ্চান মঠে সন্ন্যাসী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর আসল ভালোবাসার জায়গাটা ছিল বাগান। স্থানীয় ইশকুলে পড়িয়ে সন্ন্যাসজীবনের খরচা চালানোর চেষ্টাও করেছিলেন একাধিকবার - সেদিকে বিশেষ সুবিধে হয়নি। শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতামান পার হওয়ার পরীক্ষায় ফেল করেন তিনি - এবং আশ্চর্য, দুবার অকৃতকার্য হন বায়োলজিতে। তাঁর মটরগাছ নিয়ে পরীক্ষার কথা অল্পবয়সে জীবনবিজ্ঞান বইয়ে সবাই নিশ্চয়ই পড়েছেন, কাজেই সে বিষয়ে বিশদে আলোচনা করছি না। মোদ্দা কথা এই, মেন্ডেল খুব গভীরে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, কিছু মটরগাছ লম্বা এবং কিছু বেঁটে, কয়েকটির বীজ সবুজ তো কয়েকটির হরিদ্রাভ। মটরগাছের চারিত্রিক কয়েকটি বৈশিষ্ট্যকে তিনি গোড়াতেই বেছে নেন -
১. বীজ সুন্দর গোল, নাকি কুঞ্চিত
২. বীজ হলুদ, নাকি সবুজ
৩. ফুল সাদা, নাকি বেগুনি
৪. ফুল গাছের ডগায়, নাকি কোনো শাখায় অবস্থিত
৫. মটরের খোলাটির রঙ সবুজ, নাকি হরিদ্রাভ
৬. খোলাটি মসৃণ, নাকি কোঁচকানো
৭. গাছটি লম্বা, নাকি বেঁটে
এই পর্যবেক্ষণযোগ্য বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে গাছগুলোকে কয়েকটি বিভাগে সাজান। পরবর্তী মূল গবেষণার প্রস্তুতি হিসেবে, একই বৈশিষ্ট্যের গাছগুলির মধ্যে বারংবার প্রজনন ঘটিয়ে তিনি শুদ্ধ বৈশিষ্ট্যযুক্ত গাছ তৈরী করেন। এরপর একটি শুদ্ধ বৈশিষ্ট্যযুক্ত মটরগাছের সাথে অন্য বা বিপরীত শুদ্ধ বৈশিষ্ট্যের গাছের প্রজনন ঘটান - যাকে বলা হয় ক্রসিং (crossing)। এই ক্রসিং-এর ফলে উৎপন্ন মটরগাছের বৈশিষ্ট্য মেন্ডেল খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখেন, পরবর্তী প্রজন্মের গাছগুলি পূর্ববর্তী দুই বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের নয়, আগের প্রজন্মের দুটি বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের যেকোনো একটি বৈশিষ্ট্যযুক্ত। অর্থাৎ, একটি লম্বা ও একটি বেঁটে মটরগাছের সঙ্করজাত মটরগাছটি উচ্চতায় পূর্ব প্রজন্মের লম্বা মটরগাছের মতোই লম্বা - লম্বা ও বেঁটে মটরগাছের মাঝামাঝি উচ্চতার নয়। আপাতত কথাটা খুবই সাধারণ শোনালেও, তৎকালীন বিজ্ঞানের প্রেক্ষিতে এই ফলাফল খুবই অপ্রত্যাশিত - কেননা, বংশগতির যে বীজ এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তীতে প্রবাহিত হয়, সেই সময়ের বিজ্ঞানভাবনা অনুসারে, তাকে ভাবা হত এমন কোনো উপাদান, যা কিনা সহজেই মিশে লঘু হয়ে যেতে পারে - অর্থাৎ তদানীন্তন বিজ্ঞানভাবনা অনুসারে, শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উভয়পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ধর্ম মিলেমিশে একটা মাঝামাঝি গোছের ধর্ম অপত্যের মধ্যে পাওয়া যাওয়া উচিত। মেন্ডেল দেখলেন, ব্যাপারটা তেমন নয় - যেকোনো একটি ধর্মই সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মে। যে ধর্মটি প্রকাশিত হয়, তাকে বলা হল ডমিন্যান্ট - যে ধর্ম ধামাচাপা পড়ে রইল, তাকে বলা হল রিসেসিভ।
শুধু এইটুকু আবিষ্কার করে থেমে থাকলেও মেন্ডেল বিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন - কিন্তু, এরপরের ধাপে তিনি যে কাজ করলেন, তার অভিঘাত আশ্চর্য সুদূরপ্রসারী। তিনি পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্কর মটরগাছগুলির মধ্যে আবার প্রজনন ঘটালেন, যেগুলো কিনা দৈর্ঘ্যে লম্বা (শুদ্ধ লম্বা নয়, সঙ্কর লম্বা)। দেখা গেল, তৎপরবর্তী প্রজন্মে পুরোনো বৈশিষ্ট্য কিয়দংশে ফিরে এসেছে। মেন্ডেল সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, বংশগতির মূল উপাদানের কিছু অংশ আসে অপত্যের পিতার দিক থেকে, এবং বাকি অর্ধেক আসে মায়ের দিক থেকে। কিছু ধর্ম ডমিন্যান্ট এবং কিছু রিসেসিভ। যেকোনো তরফ থেকে ডমিন্যান্ট উপাদান পেলেই ডমিন্যান্ট বৈশিষ্ট্য বহিরঙ্গে প্রকাশ পাবে - কিন্তু, বহিরঙ্গে রিসেসিভ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাওয়ার জন্য দুই পক্ষ থেকেই তদনুরূপ উপাদান পাওয়া জরুরী। রিসেসিভ ধর্ম প্রকাশিত না হলেও হাপিস হয়ে যায় না, পরের প্রজন্মে সংবাহিত হয় সেই জিন - আরেকটি রিসেসিভ জিন পেলেই আবার বহিরঙ্গে প্রকাশ পেতে পারে।
কোনো একটি সাধারণ ধর্মের ভিত্তিতে একটি প্রজাতির মধ্যে ভাগ করতে চাইলে, তাকে বলা হয় অ্যালিল। যেমন ধরুন, গাছের দৈর্ঘ্য এই সাধারণ ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে চাইলে, দুধরণের অ্যালিল - লম্বা ও বেঁটে। প্রতিটি মটরগাছে দুটি অ্যালিল থাকে - একটি আসে বাবার দিক থেকে, আরেকটি মায়ের দিক থেকে। দুদিক থেকেই বেঁটে অ্যালিল পেলে তবেই মটরগাছটি বেঁটে হবে, কেননা বেঁটে অ্যালিল রিসেসিভ - যেকোনো এক তরফ থেকে লম্বা অ্যালিল পেলেই মটরগাছ দৈর্ঘ্যে লম্বা হবে, কেননা লম্বা অ্যালিল ডমিন্যান্ট। মেন্ডেল অ্যালিল শব্দটি ব্যবহার করেননি - কিন্তু, এখানে সাধারণভাবে প্রচলিত শব্দটিই ব্যবহার করলাম, সমকালীন পরিভাষা ব্যবহার করলে অনেকক্ষেত্রে বিষয়টি ধরতে সুবিধে হয়।
অনেক বছর ধরে, পরের পর প্রজন্মের মটরগাছ ও তাদের বৈশিষ্ট্যাবলী পর্যবেক্ষণ করে শেষমেশ মেন্ডেল উপনীত হলেন বংশগতি বিষয়ে কিছু সাধারণ সূত্রে, যাকে সচরাচর ল'জ অফ হেরিডিটি বা বংশগতির সূত্র বলা হয়ে থাকে। সূত্রগুলো কী, কেন, কীভাবে হয়, এসব নিয়ে আলোচনা এখুনি বাড়ালাম না।
মোদ্দা কথা, আমাদের শরীরে ঠিক কী কী অ্যালিল রয়েছে, তা সবক্ষেত্রে আমাদের বহিরঙ্গে প্রকাশিত হয় না। যেমন, সঙ্কর মটরগাছে যদি একটি বেঁটে অ্যালিল থাকে, তাহলেও তা বহিরঙ্গে শুদ্ধ লম্বা মটরগাছের মতোই লম্বা হবে - কিন্তু, দুটি সঙ্কর লম্বা মটরগাছের প্রজননে একটি বেঁটে মটরগাছ জন্মাতে পারে (দুই তরফ থেকেই একটি একটি করে বেঁটে অ্যালিল পেলে)। আমাদের শরীরের অ্যালিলের বিন্যাস, তথা জেনেটিক গঠন, তাকে বলা হয় জিনোটাইপ - আর বহিরঙ্গে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যাবলী, তাকে বলা হয়ে থাকে ফেনোটাইপ। আমাদের শরীরে ক্রোমোজোম থাকে জোড়ায় জোড়ায় - ক্রোমোজোম তৈরী হয় লম্বা ডিএনএ-র ফিতে দিয়ে - সেই ডিএনএ-র মধ্যে জিনের অবস্থান, যাকে বলে লোকাস, সেই লোকাসের উপর নির্ভর করে জিনের প্রকাশের প্রকারভেদ - নির্দিষ্ট লোকাস অনুসারে নির্ধারিত হয় অ্যালিল। যেহেতু ক্রোমোজোম থাকে জোড়ায় - অ্যালিলও থাকে তেমনই, জোড়ায় - ডিএনএ তন্তুতে অ্যালিলের অবস্থান হুবহু একই হলে, তাকে বলা হয় হোমোজাইগাস - না হলে, হেটেরোজাইগাস। কিন্তু, ব্যাপারটা উত্তরোত্তর জটিল হয়ে যাচ্ছে - আবারও বলি, এখুনি এত কথা না জানলেও চলবে।
মেন্ডেল জিনের ব্যাপারে জানতেন না - জেনোটাইপ বিষয়েও তাঁর জানার সুযোগ ছিল না। কিন্তু, স্রেফ দেখে এবং পরীক্ষা করেই তিনি যে কয়েকটি সূত্র দিয়েছিলেন, সেগুলো আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ডমিন্যান্স-এর তত্ত্ব - যেখানে বলা হয়, একটি জিন যদি ডমিন্যান্ট হয়, তাহলে তার বিপরীত জিনের উপস্থিতিতেও সেই জিনটি বহিরঙ্গে নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে (সূত্রটি মেন্ডেল এই ভাষায় বলেননি - এখানে একটু যুগোপযোগী এবং সরলীকৃত ভাষায় কথাটা বলা হলো)। যেমন, স্বাধীনভাবে আত্মপ্রকাশের সূত্র - অর্থাৎ একটি জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রকাশের উপর অপর জিনের প্রকাশ নির্ভরশীল নয় - যেমন, মটরগাছ লম্বা হওয়ার জিন এবং মটরশুঁটির রঙ হলুদ হওয়ার জিন পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীলতা ছাড়াই স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হতে পারে। একদিক থেকে মেন্ডেল ছিলেন সৌভাগ্যবান, কেননা সবসময় অঙ্ক এত সরল থাকে না - সত্যি বলতে কি, অধিকাংশ সময়েই সরল থাকে না। ভাগ্যিশ তিনি মটরগাছ বেছেছিলেন গবেষণার জন্য!! অন্য গাছ বাছলে!! যেমন ধরুন, ক্যাপসিকামের রঙ কেমন হবে, তা একাধিক জিনের উপর নির্ভরশীল - একাধিক জিনের প্রকাশের উপরেই নির্ভর করে রঙ হয় সবুজ, লাল, হলুদ অথবা তাদের মিশ্রণ। মটরগাছের মতো সরল পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পথ ধরে ক্যাপসিকামের বংশগতির হিসেব বোঝা মুশকিল। অনেকক্ষেত্রে একটি জিনের উপস্থিতি সমপর্যায়ের বিবিধ জিনকে দমিয়ে দিতে পারে (যার নাম এপিস্ট্যাসিস)। ঘোড়ার রঙ বিভিন্ন হতে পারে বিভিন্ন জিনের ক্রিয়ায় - গায়ের রঙ থেকে কেশরের রঙ, বিভিন্ন কম্বিনেশন সম্ভব। কিন্তু, একটি বিশেষ সাদা জিনের প্রভাব বাকি সব জিনের প্রকাশ দমিয়ে দিতে পারে - সে ঘোড়া একেবারে শ্বেতশুভ্র। অনেকসময় একাধিক জিন গায়ে গায়ে থাকে - পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হওয়ার সময় হয় একত্রে সংবাহিত হয়, নচেৎ একেবারেই নয়। সেক্ষেত্রে, প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জিন স্বাধীনভাবে সংবাহিত ও প্রকাশিত হবে, এমন নয়। এরকম আরো রকমভেদ সম্ভব - বিশদে যাচ্ছি না। কিন্তু, মূল কথাটা হলো, মটরগাছের পরিবর্তে অন্য গাছ বাছলে মেন্ডেলের পক্ষে অত সহজে বংশগতির মূল সূত্রগুলো খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতো না।
আবার একটিই জিন একাধিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণ হতে পারে। অর্থাৎ একটি জিন একাধিক ফেনোটাইপিক বৈশিষ্ট্যের জন্ম দিতে পারে। (এক্ষেত্রে জিনটিকে বলা হয় প্লিওট্রপিক।) বংশানুক্রমে প্রাপ্ত বিবিধ জটিল অসুখের ক্ষেত্রেই দায়ী জিনটি এরকম প্লিওট্রপিক হয়ে থাকে - যেকারণে, সাধারণত, অসুখটি কেবলমাত্র একটি অসুবিধে বা একটি অঙ্গের সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের অনেক বংশগত অসুখের মূলেই জিনের গোলমাল - অনেকক্ষেত্রেই মাত্র একটি জিনেরই গোলমাল - কিন্তু, যেহেতু আমাদের শরীরের প্রায় সব কোষেই সব জিন থাকে, সেই একটিই গণ্ডগোলের জিন অনেকক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন উপসর্গের জন্ম দিতে পারে। হ্যাঁ, এই ব্যাপারটাও খুবই ইন্টারেস্টিং - শরীরের সব কোষেই সব জিনের উপস্থিতি। অর্থাৎ, ভেবে দেখুন একবার, খাবার হজম করার উৎসেচক তৈরীর জিন পেটের সাথে সাথে থাকে মস্তিষ্ক কিম্বা হাতে-পায়ের কোষেও!! কিন্তু, খাবার হজমের সেই উৎসেচক ওই পাকস্থলী বা অন্ত্রেই তৈরী হবে, অন্যত্র নয়, এমনকি জিন বা অন্য কাঁচামাল উপস্থিত থাকলেও নয় - ঠিক কেন একই জিন সর্বত্র উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও সর্বত্র কাজ করে না - বা অনেকসময় একেক জায়গায় একেকরকম কাজ করে - সে বিষয়ে আমাদের ধ্যানধারণা এখনও খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে। জিনের উপরেও যে মানবজীবনের রহস্য, সেই বিজ্ঞান, অর্থাৎ এপিজেনেটিক্স (শব্দার্থ অনুসারে, জিনের উপরে, বা জিনের অধিক), আরো না এগোনো অব্দি জিন-এর টেকনোলজি ও তার কার্যকারিতা, অনেকদূর অব্দি এগোলেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণই রয়ে যাবে। সব মিলিয়ে দেখলে, মটরগাছ এবং পরীক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, দুটি বাছার ক্ষেত্রেই মেন্ডেলের ভাগ্য সদয় ছিল।
কিন্তু, কথায় কথায় অনেকদূর এগিয়ে এসেছি। আমরা বরং ফিরে যাই ১৮৬৫ সালের শীতের দুপুরে - ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাসের আট তারিখে, দুই ভাগে, মেন্ডেল পড়ে শোনালেন তাঁর গবেষণার কথা - ব্রুনো ন্যাচারাল সায়েন্স সোসাইটির সভায়। শ্রোতা জনাচল্লিশেক - কয়েকজন বটানিস্ট, বা জীববিদ্যায় উৎসুক, বাকি অনেকেই স্থানীয় কৃষক। মেন্ডেলের গবেষণা, জটিল করে সাজানো তথ্যের সমষ্টি বিরক্তির বেশী কিছু আগ্রহ সৃষ্টি করল না। সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হলো তাঁর গবেষণার কথা, কিন্তু সেও আর পড়ে দেখলেন কজন!! মেন্ডেল বিভিন্ন বিজ্ঞানীকে নিজের হাতে পাঠালেন তাঁর গবেষণাপত্রটি - যদি তাঁরা একটু পড়ে দেখেন - কিন্তু, প্রথাগত অর্থে অশিক্ষিত এক সন্ন্যাসীর জীববিদ্যা বিষয়ক গবেষণা, যে গবেষণার ফলাফল সমকালীন বিজ্ঞানের তত্ত্বের সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ, তাকে সিরিয়াসলি নেবেন কোন বিজ্ঞানী!! গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের আবিষ্কার অনাবিষ্কৃত রয়ে গেল সেই সময়ের বিজ্ঞানমহলে।
মটরগাছ নিয়ে গবেষণা করতে থাকলেও, মেন্ডেল বুঝেছিলেন তাঁর গবেষণার তাৎপর্য কেবল মটরগাছে সীমাবদ্ধ থাকবে না। লিখেছিলেন, জীবজগতের বিবর্তনের ধারাকে বুঝতে চাইলে বংশগতির ধরণটি বোঝা জরুরী এবং তাঁর গবেষণা সেই উদেশেই। সেই সময়ের নামজাদা উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল ভন নাগেলি-কে নিজের গবেষণাপত্র পাঠিয়ে পড়ে দেখতে অনুনয় করে বলেছিলেন, আমি জানি, আমার পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার ফলাফল এখনকার বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সাথে সহজে মেলানো যাবে না। তবুও, পড়ে মতামত জানান। নাহ, নাগেলি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। আস্তে আস্তে মঠে কাজকর্মের দায়িত্ব বাড়তে থাকলে মেন্ডেলও গবেষণা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশের প্রায় দুই দশক পরে মারা যান তিনি। ১৮৮৫ সালে। এতখানিই অনাবিষ্কৃত ছিলেন তিনি ও তাঁর গবেষণা, যে, মৃত্যু-পরবর্তী শোকসংবাদে গবেষক মেন্ডেলের সামান্য উল্লেখটুকুও ছিল না। কোনো বিজ্ঞানপত্রিকা বা বিজ্ঞানীদের কোনো সংগঠন তাঁর মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেননি। মঠ থেকে প্রকাশিত শোকবার্তায় শুধু বলা ছিল, নরম মনের মানুষটি বড্ডো ফুল ভালোবাসতেন।

মেন্ডেল পুনরাবিষ্কার
মেন্ডেলের গবেষণা অনাবিষ্কৃত থেকে যাওয়াটা যুগপৎ আশ্চর্যের এবং দুর্ভাগ্যজনক। আশ্চর্যের, কেননা ১৮৫৮ সালেই চার্লস ডারউইন প্রকাশ্যে এনেছেন তাঁর বিবর্তনের তত্ত্ব - ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে জীববিদ্যার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই, অন দ্য ওরিজিন অফ স্পিসিস বাই মিনস অফ ন্যাচারাল সিলেকশন। প্রজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ঠিক কেমন করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংবাহিত হয়, বিশেষত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কীভাবে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হয়, সে বিষয়ে ধারণা না করা গেলে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে করতেই একটি প্রজাতি দীর্ঘসময় অতিক্রম করে কেমন করে আরেকটি প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়, সে তত্ত্ব দাঁড় করানো মুশকিল। নিজের তত্ত্বের এই অসম্পূর্ণতা বিষয়ে ডারউইন স্বয়ং ওয়াকিবহাল ছিলেন না, এমন নয় - কিন্তু, তত্ত্বের সে খামতি তিনি মেটাতে পারেননি। অথচ, মেন্ডেল-বর্ণিত বংশগতির সূত্রের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সমাধান - আরো আশ্চর্যের বিষয়, ডারউইনের লাইব্রেরিতেই ছিল জার্নালের সেই সংখ্যা, যার মধ্যে মেন্ডেলের গবেষণাপত্রটি - কিন্তু সেই জার্নালে মেন্ডেলের গবেষণাপত্রের আগের এবং পরের আর্টিকলগুলো পড়ে দেখলেও ডারউইন মেন্ডেলের লেখাটি পড়ে দেখেছিলেন, এমন প্রমাণ নেই।
বিবর্তন ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত বংশগতির ধারাকে ব্যাখ্যা করতে ডারউইন আনেন জেমিউলস-এর ধারণা। জেমিউলস, যা কিনা শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে উৎসারিত নির্যাসের মতো বস্তু এবং যে নির্যাস রূপান্তরিত হবে শুক্রে - অনুরূপ জেমিউলস থাকবে নারীর ক্ষেত্রেও - অপত্যের দেহে সংবাহিত হবে দুই জেমিউলস-এর মিলনের ফলে উৎপন্ন মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যাবলী। বংশগতি বিষয়ে ডারউইন তাঁর তত্ত্ব প্রকাশ্যে আনেন ১৮৬৭ সালে - মনে করিয়ে দিই, মেন্ডেল মটরগাছের 'পরে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান এর দুবছর আগেই এবং মেন্ডেল পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন, অপত্যের ক্ষেত্রে মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্য সংবাহিত হয়, এমন নয়। বংশগতির ক্ষেত্রে, ডারউইনের তত্ত্ব মেনে, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রক্ষিত হওয়ার কোনো ব্যবস্থা যদি না-ই থাকে - এমন করে পরবর্তী প্রজন্ম পিতা-মাতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি ধর্ম পেতে থাকলে - কয়েকটি প্রজন্ম বাদে বংশগত বৈশিষ্ট্য, এবং অতএব জীবজগতের বৈচিত্র্যও, সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক - এবং দুনিয়াজুড়ে একই প্রজাতির ক্ষেত্রে সম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই সর্বময় হয়ে দাঁড়াবে, তাই না? অথচ তেমনটি তো হয় না। তাহলে?
বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলেন ডারউইনের অনুগামী ওলন্দাজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী, হুগো দি ভ্রিস-ও। তিনি বেছে নিলেন বিভিন্ন উদ্ভিদের কিছু কিছু আজব ও ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যকে - অর্থাৎ এমন কিছু বৈশিষ্ট্য, যা কিনা সেই প্রজাতির উদ্ভিদে খুব একটা পাওয়া যায় না। এবার সেই ব্যতিক্রমী গুণাবলী-সম্পন্ন উদ্ভিদের সাথে সাধারণ ও স্বাভাবিক আরেকটি গাছের প্রজনন ঘটালেন। দেখা গেল, ব্যতিক্রমী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো মোটেই মিলেমিশে লঘু আকারে পরের প্রজন্মে প্রকাশিত হচ্ছে না - হয় পুরোপুরি প্রকাশিত হচ্ছে, নচেৎ একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে। ১৮৯৭ সালে ডি ভ্রিস বিশ্বকে জানালেন তাঁর তত্ত্ব - প্রজাতির একেকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণ, কোষে থাকা একটি ক্ষুদ্র কণা - ডি ভ্রিস যার নাম দিলেন প্যানজিন। একেকটি বৈশিষ্ট্যের জন্যে দায়ী একেকটি প্যানজিন - অর্থাৎ একজোড়া প্যানজিন - কেননা, একটি বৈশিষ্ট্যের জন্যে প্রতি কোষে থাকে দুটি প্যানজিন, একটি আসে বাবার কাছ থেকে, আরেকটি মায়ের সুবাদে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বৈশিষ্ট্য মিলেমিশে যায় না - এবং প্রকাশ পাক বা না পাক, বংশগতির সুবাদে প্রবাহিত তথ্য হারিয়ে যায় না কখনোই। প্যানজিন নামকরণের অংশ বাদ দিলে এই তত্ত্ব একেবারেই মেন্ডেলের তত্ত্বের পুনরাবিষ্কার - এবং সত্যিসত্যিই ডি ভ্রিস, সেই সময় অব্দি, মেন্ডেল বিষয়ে কিছুই জানতেন না। জানতে জানতে গড়িয়ে যাবে আরো কয়েকটা বছর।
১৯০০ সালে ডি ভ্রিস-এর বন্ধু তাঁকে একখানা চিঠি পাঠালেন, সাথে সাড়ে তিন দশক প্রাচীন এক গবেষণাপত্র - চিঠিতে লেখা, তুমি তো গাছপালার প্রজনন বংশগতি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছ, দ্যাখো, জনৈক মেন্ডেলের এই পেপারখানা যদি ইন্টারেস্টিং বলে মনে হয়। ইন্টারেস্টিং!!! একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ডি ভ্রিস। তবে, তাঁর নিজেরই ভাষায়, বিনয় বা সৌজন্য খুবই ভালো গুণ, কিন্তু ওই গুণ না থাকলে জীবনে বেশী উন্নতি করা যায়। অতএব, ওই ১৯০০ সালেই ডি ভ্রিস-এর যে পেপারটি প্রকাশিত হলো, সেখানে জনৈক মেন্ডেলের প্রসঙ্গ অনুল্লেখিত রইল।
স্বাভাবিকভাবেই, গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নাম হিসেবে অনাবিষ্কৃতই রয়ে যেতেন - কিন্তু ডি ভ্রিস-এর গবেষণা মেন্ডেলের পরীক্ষালব্ধ সূত্রগুলিকে পুনরায় আলোচনায় এনে ফেলল। একইসময়, প্রায় কাকতালীয়ভাবেই, মেন্ডেলের গবেষণা ইউরোপে আরো তিনজন বিজ্ঞানীর চোখে পড়ল। তাঁরাও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে প্রবাহিত হয়, সে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছিলেন এবং পুরোনো গবেষণার খবর খুঁজতে খুঁজতে মেন্ডেলের পরীক্ষার হদিশ পেয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে একজন, কার্ল করেন্স, ছিলেন বিখ্যাত সুইস উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল ভন নাগেলির ছাত্র। হ্যাঁ, সেই কার্ল ভন নাগেলি, যাঁকে কিনা মেন্ডেল নিজের গবেষণাপত্রটি পাঠিয়ে মতামত জানতে চেয়েছিলেন, কিন্তু যিনি একেবারেই পাত্তা দেননি। স্বাভাবিকভাবেই, নাগেলি নিজের ছাত্রের কাছেও মেন্ডেলের কথা জানানোর প্রয়োজনবোধ করেননি। করেন্স মটরগাছ ও ভুট্টাগাছের প্রজনন ও সঙ্কর বিষয়ে নিজের গবেষণার সুবাদে, প্রায় আচমকাই, জানতে পেরেছিলেন মেন্ডেলের পরীক্ষা ও সিদ্ধান্তের কথা। অতএব, কার্ল করেন্স যখন জানতে পারলেন ডি ভ্রিস-এর গবেষণার খবর - যে গবেষণা ও তার ফলাফল সাড়ে তিন দশক আগেকার মেন্ডেলের পরীক্ষার প্রায় অনুরূপ, অথচ রেফারেন্স হিসেবে মেন্ডেলের গবেষণাপত্রের উল্লেখটুকুও নেই - তখন তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। রীতিমতো শ্লেষের সাথে বললেন, খুবই আশ্চর্য সমাপতন বলতে হবে, ডি ভ্রিস-এর গবেষণাপত্রে মেন্ডেলের বিষয় তো বটেই, তাঁর ভাষার ছায়াটি অব্দি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তাঁর নামটি অনুপস্থিত!! ডি ভ্রিস অবশ্য বিজ্ঞানী হিসেবে অসৎ ছিলেন না - একথা মাথায় রাখতে হবে, তিনি রীতিমতো পরীক্ষানিরীক্ষার শেষে যখন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, তখনও অব্দি তিনি মেন্ডেলের নামটুকুও শোনেননি। গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের গবেষণাপত্র তাঁর হাতে আসে তার পরে। এবং এত বছরের শ্রমের শেষে নিজের মতো করে পাওয়া সিদ্ধান্তের কৃতিত্বের ভাগ বিগত যুগের এক অপরিচিত নিভৃতবাসী সন্ন্যাসীকে দিতে তাঁর মন চায়নি। কিন্তু, করেন্স-এর বাক্যবাণে তাঁরও বোধোদয় হলো - পরের সংস্করণে গবেষণাপত্রের রেফারেন্সে তিনি মেন্ডেলের নাম জুড়ে নিলেন।
মেন্ডেলের পথ ধরে মেন্ডেলের সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও, ডি ভ্রিস তাঁর পরবর্তী গবেষণায় মেন্ডেলকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বংশগতির ধারা মেনে কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হয়, সেই প্রশ্নের সাথে সাথে তিনি তুলেছিলেন আরো বুনিয়াদি একটি প্রশ্ন। যে বৈশিষ্ট্যটি পরের প্রজন্মে সংবাহিত হবে কি হবে না, সে নিয়ে আমরা এত ভাবছি - কিন্তু, সেই নতুন বা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য প্রজাতির মধ্যে এলো কী করে? একই প্রজাতির মধ্যে কোনো গাছ লম্বা আর কোনো গাছ বেঁটে, কোনো গাছের ফুল সাদা আর কোনোটির রঙ বেগুনি - এবং এই প্রতিটি ধর্মই পরবর্তী প্রজন্মে সংবহনযোগ্য - এই বিভিন্নতা এলো কোন পথে? আর সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই যে প্রজাতি আদিকাল থেকেই পেয়ে আসে, এমনও তো নয়। সময়ের সাথে সাথে নিত্যনতুন বৈশিষ্ট্য অর্জিত হয়, যে বৈশিষ্ট্য ক্ষেত্রবিশেষে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিতও হয়। ব্যতিক্রমী বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য দীর্ঘসময় যাবৎ পর্যবেক্ষণ করে ডি ভ্রিস সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন - প্রাকৃতিক নিয়মেই এমন বৈশিষ্ট্য প্রজাতি অর্জন করতে পারছে। এমন বৈশিষ্ট্যের তিনি নাম দিলেন - মিউট্যান্ট - অর্থাৎ পরিবর্তিত। এই একটি পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়েই ডি ভ্রিস জিনতত্ত্ব এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদকে একই সূত্রে বেঁধে ফেললেন। সময়ের সাথে সাথে প্রকৃতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার স্বার্থে, নিজের উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে বংশগতির যে মূল বাহক, তার মধ্যে পরিবর্তন আসে - পরবর্তী গবেষণা আমাদের জানাবে, এই বদল ঘটে প্রজাতির জিনগত গঠনে, অর্থাৎ জিনোটাইপে - তারই নাম মিউটেশন। না, বিবর্তনের নিয়ম বিশেষ কিছু জিন-কে আলাদা করে সুনজরে দেখে, এমন নয় - বিবর্তনের ধারা বাছে বিশেষ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা প্রজাতির বহিরঙ্গের বিশেষ কিছু ধর্ম - অর্থাৎ, ফেনোটাইপ। ফেনোটাইপের পেছনে পরিবেশ এবং অন্যান্য বিষয়ের সাথে সাথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব প্রজাতির জিনগত গঠনের - অর্থাৎ জিনোটাইপের। অতএব, বিশেষ ফেনোটাইপ নির্বাচিত হওয়ার পথেই বিশেষ জিনের নির্বাচন ঘটে যায়। এমন করেই প্রজাতি নিজের জিনোটাইপে বদল এনে ফেলে - ঘটতে থাকে মিউটেশন। ডি ভ্রিস-এর সময়ে এত কথা জানার সুযোগ ছিল না। কিন্তু, বিবর্তনবাদের মূলে যে প্রজাতির ক্রমবিবর্তন এবং সেই ক্রমবিবর্তনের কারণ যে প্রজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ক্রমিক বদল, যে বদল সংবাহিত হতে পারবে পরবর্তী প্রজন্মে - প্রকৃতির নিয়মেই ঘটতে থাকে মিউটেশন, আর ঠিক সেই মিউটেশনগুলিই নির্বাচিত হয়ে পরবর্তী প্রজন্মে সংবাহিত হবে, যেগুলো প্রজাতিটিকে আরো বেশী টিকে থাকার উপযুক্ত করে তুলতে পারবে। মিউটেশনের ধারণার সাহায্যে ডি ভ্রিস বিবর্তনবাদকে আরো দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন।
কিন্তু, আমরা তো মেন্ডেলের পরীক্ষানিরীক্ষার পুনরাবিষ্কারের কথা বলছিলাম। ১৯০০ সালের কাছাকাছি সময়ে একইসাথে তিনচারজন গবেষক নিজ নিজ পরীক্ষার মাধ্যমে মেন্ডেল-উপনীত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন, এবং তাঁদের গবেষণা ও সিদ্ধান্তের পেছনে রেফারেন্স ঘাঁটতে গিয়ে একটি দুষ্প্রাপ্য জার্নালে মেন্ডেলকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তবু, মেন্ডেলের তত্ত্বের বিশ্বব্যাপী পুনরুত্থানের পেছনে কোনো একজনের নাম করতে হলে, সে মানুষটি কার্ল করেন্স বা ডি ভ্রিস নন - তিনি ব্রিটিশ বায়োলজিস্ট উইলিয়াম বেটসন।
লন্ডনে রয়াল হর্টিকালচারাল সোসাইটিতে বক্তৃতা দিতে যাওয়ার পথে ট্রেনে বসে তিনি পড়েন ডি ভ্রিস-এর পেপারটি (যে সংস্করণে মেন্ডেলের নাম রেফারেন্স হিসেবে ছিল)। সেদিনই বক্তৃতা দিতে গিয়ে এই তত্ত্বের কথা বারবার উল্লেখ করেন। গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে বলেন, বংশগতির এই নবলব্ধ সূত্রের তাৎপর্য যে কতোখানি, সেটা এখুনি আমরা উপলব্ধিই করে উঠতে পারছি না। এই বক্তৃতার মাসতিনেকের মাথায়, ১৯০০ সালের অগাস্ট মাসে, তিনি বন্ধু ফ্রান্সিস গ্যালটন-কে চিঠি লিখে মেন্ডেলের পেপারটি পড়ে দেখতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেন। বলেন, বংশগতি বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিন্তার মধ্যে পড়বে এই গবেষণা এবং এ প্রায় অবিশ্বাস্য, যে, এমন একখানা গবেষণার কথা এত বছর ধামাচাপা পড়ে ছিল!! প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা যাক, এই ফ্রান্সিস গ্যালটন সম্পর্কে ছিলেন চার্লস ডারউইনের ভাই এবং এককথায় বহুমুখী জিনিয়াস। ইউজেনিক্স তথা বংশানুক্রমিক জাতিগত শ্রেষ্ঠতা, জিনগত উচ্চাবচ বিভাজনের তত্ত্বের (যে তত্ত্বের পথ ধরেই আসবে নাৎসি কনসেনট্রেশান ক্যাম্প ইহুদি-নিধন ইত্যাদি) অন্যতম প্রচারক হিসেবে তিনি কুখ্যাত হয়ে গেলেও রাশিবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক অবদান ছিল তাঁর - এমনকি ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেখে অপরাধী ধরার কার্যকরী ভাবনাটিও গ্যালটনের। কিন্তু, গ্যালটনকে আপাতত সরিয়ে রেখে বেটসনে ফিরি।
ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি তো বটেই, সাগর পার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও উইলিয়াম বেটসন বক্তৃতা দিয়েছিলেন মেন্ডেলের তত্ত্ব ও বংশগতির ধারা নিয়ে। বিশ্বের দরবারে এক ভুলে যাওয়া অস্ট্রিয়ান সন্ন্যাসীর লুপ্ত মর্যাদা ফিরিয়ে দিলেন তিনি। বেটসন বুঝেছিলেন এই তত্ত্বের গুরুত্ব। কিন্তু, তত্ত্বটিকে জনপ্রিয় করতে হলে একখানা যুৎসই নাম তো জরুরী। ডি ভ্রিস-এর প্যানজিন ধরে নাম দেওয়াই যেত, প্যানজেনেটিক্স। কিন্তু, বেটসনের মনে ধরল না। অতএব, গ্রীক জেন্নো (genno), যার শব্দার্থ জন্ম দেওয়া, সেখান থেকে শব্দটি নিয়ে উইলিয়াম বেটসন জীববিদ্যার বংশগতি-চর্চার এই ধারার নাম দিলেন - জেনেটিক্স।
গ্রেগর যোহান মেন্ডেল। আধুনিক জিনশাস্ত্রের জনক। দুশো বছরে পা দিলেন।

শুক্রবার, ২ জুলাই, ২০২১

মহাদেব ব্যানার্জী ও কালনা ~ অর্ক রাজপন্ডিত


জালিয়ানওয়ালাবাগের পৈশাচিক বর্বর হত্যা কান্ড সংগঠিত করলো কারা? কারা নির্বিচারে পুরুষ নারী শিশু বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের ওপর চালালো গুলি?


আপনি যদি উত্তর দেন গত শতাব্দীর প্রথম ভাগের  ভারতবর্ষের তদানীন্তন শাসক দল, তাহলে আপনি ইতিহাসের ওপর সুবিচার করছেন না।

হলোকাস্ট কারা সংগঠিত করলো? কারা কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে লক্ষ লক্ষ ইহুদি মানুষকে পৈশাচিক বর্বরতায় হত্যা করলো? কারা ছিল গণহত্যার নায়ক?

আপনি যদি উত্তর দেন গত শতাব্দীর চারের দশকের জার্মানীর তদানীন্তন শাসক দল, তাহলে আপনি ইতিহাসের ওপর সুবিচার করছেন না।

বলিভিয়ার লা হিগুয়েরাতে ১৯৬৭ সালের অক্টোবর মাসে চে গেভারাকে হত্যা করলো কারা?

আপনি যদি উত্তর দেন গত শতাব্দীর ছয়ের দশকে বলিভিয়ার তদানীন্তন শাসক দল, তাহলে আপনি ইতিহাসের ওপর সুবিচার করছেন না।

গুজরাটে ২০০২ সালে গণহত্যার নায়ক কারা?

 আপনি যদি বলেন এই শতকের প্রথম দশকের গুজরাটে তদানীন্তন শাসক দল, তাহলে আপনি ইতিহাসের ওপর সুবিচার করছেন না।

ইতিহাস নির্মম কিন্তু ইতিহাস সত্য। অপরাধীর খুনে বাহিনীর নাম আপনি না নিলেও ইতিহাস পাল্টে যাবে না।

আমি আপনি জানি, ছোট শিশুরাও জানে জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যা  সংগঠিত করেছিল ব্রিটিশ লুটেরা শাসকরা।

ছোট শিশুরাও জানে হলোকাস্ট আর কনসেনট্রেশন ক্যাম্প সংগঠিত করেছিল হিটলার আর তার নাৎজি পার্টি।

ছোট শিশুরাও জানে লা হিগুয়েরাতে চে গেভারাকে বুলেটে ঝাঁঝরা করেছিল সিআইএ'র ট্রেনিং প্রাপ্ত বলিভিয়ান আর্মি। কিউবান আমেরিকান সিআইএ এজেন্ট ফেলিক্স রডরিগেজ বলিভিয়ান আর্মির বেশে দাঁড়িয়ে থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ভাবুন দেখি একবার কি অনাসৃষ্টিই না হবে যদি শিশুপাঠ্য ইতিহাস বইতেও হত্যাকারিদের নাম, পরিচয় আড়াল করা হয়। ভাবুন দেখি হিটলার আর নাৎজি পার্টি,  ভারতে লুটেরা ব্রিটিশ শাসকদের নাম না লিখে যদি ইতিহাস বইতে জানানো হয় তদানীন্তন শাসক দল বলে!

ভাবুন দেখি একবার, গুজরাট গনহত্যার অপরাধী মোদী শাহ মায়া কোডনানি বাবু বজরঙ্গী আর সংঘ পরিবারের নানান শাখার খুনিদের নাম না নিয়ে যদি বলি তদানীন্তন শাসক দল, কেমন হবে! 

মার্কসবাদী ইতিহাসবেত্তা, চিন্তক এরিক হবসবমের ভাষায়, ' হিস্ট্রি ওয়াজ টু বি অ্যাবাউট আস্কিং দ্য বিগ হোয়াই কোয়েশ্চেনস'।

ইতিহাসের কাজ হল নির্মেদ ও নির্মোহ ভাবে সময়ের কাছে প্রশ্ন রেখে যাওয়া।

'কেন হল' তার উত্তর খোঁজা ইতিহাসের দায়।

কেন চে গেভারাকে হত্যা করা হল? কেন ব্রিটিশরা জালিওয়ানওয়ালাবাগে গুলি চালালো? কেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হল? নির্মেদ ও নির্মোহ ইতিহাস এই 'কেন' প্রশ্নগুলিকে জিইয়ে রাখে, ভাবতে বলে।

আজ ২জুলাই। ১৯৭১ সালের ২জুলাই কালনা স্টেশন চত্বরে পর পর ৩৫ বার ছুরি, বর্শা দিয়ে মেরে খুন করা হয় কমরেড মহাদেব ব্যানার্জিকে। কারফিউ ভেঙে পুলিশ, মিলিটারির বন্দুক মেশিনগানকে পরোয়া না করে শোক মিছিলে পা মিলিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

কারা হত্যা করলো কমরেড মহাদেব ব্যানার্জিকে? কি বলবো আমি আপনি? গত শতাব্দীর সাতের দশকে পশ্চিমবঙ্গে তদানীন্তন শাসক দল?

এতটুকু বললে ইতিহাসের ওপর সুবিচার করা হয় না। কালনায় শহীদ কমরেড মহাদেব ব্যানার্জিকে পর পর ৩৫ বার ছুরি মেরে খতম করেছিল কংগ্রেস, কংগ্রেসের খুনেবাহিনী।

পশ্চিমবঙ্গের সাতের দশকের আধা ফ্যাসিবাদী আক্রমন, খুন হামলার ইতিহাস বড় নির্মম। সাথীদের খুনে রাঙা ইতিহাস। কালনায়-আহ্লাদীপুরে-কাশিপুরে-বরানগরে-হিন্দমোটরে গোটা রাজ্য জুড়েই খুনের ইতিহাস।

সামলে চলতে হবে আমাদের, পাড়ায় পাড়ায়, কলোনীর মোড়ে, বস্তির সামনে রাখা শহীদ বেদীতে যাতে পা না পড়ে যায়।

সাতের দশকে গণহত্যা সংগঠিত করা কংগ্রেস আর তার খুনেবাহিনীর নাম মুখে আনতে আমরা দ্বিধাদ্বন্দে ভুগলে হবসবমের তোলা সেই প্রশ্ন হারিয়ে যাবে। 'কেন', ' হিস্ট্রি ওয়াজ টু বি অ্যাবাউট আস্কিং দ্য বিগ হোয়াই কোয়েশ্চেনস'।

কেন কমরেড মহাদেব ব্যানার্জিদের খুন হতে হয়েছিল? কেন রাজ্য জুড়ে সিপিআই(এম) কর্মীদের হত্যা করেছিল কংগ্রেস আর নকশালদের খুনোবাহিনী?

শ্রেনিশত্রুর প্রতিহিংসার বীভৎসা এখনো ছুঁয়ে আছে পাড়ায় পাড়ায় শহীদ বেদীর ফলকে।

২জুলাই, ১৯৭১। কালনায় কমরেড মহাদেব ব্যানার্জি খুন হয়েছিলেন, লাল নিশান রেখে গেছেন আমাদের জন্য। শহীদের রক্তে রাঙা নিশান হাতে আমরা যদি শহীদের ঘাতকদের নাম মুখে নিতে লজ্জা পাই, তাহলে আমি আপনি, আমরা কেউই ইতিহাসের ওপর সুবিচার করবো না।

ইতিহাস বিকৃতির জন্য আমার আপনার দিকে আঙুল তুলতে পারে যে শিশু এখনও ভূমিষ্ঠ হয়নি, তারা যখন একদিন কমিউনিস্ট পার্টির নিশান তুলে নেবে হাতে আমাদের তখন বলবে আমরা যাদের উত্তরাধিকার বহন করছি, সেই শহীদদের কারা খুন করলো তোমরা সেটাও স্পষ্ট করে বলতে পারোনি।

আগামীর সেই সব ক্লান্তিহীন লাল পতাকা হাতে ছুটে চলা কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের চোখে চোখ রাখতে আমাদের যেন ভাবতে না নয়!

ইতিহাসের কাছে সফেদ থাকার দায় আমাদের তাই সব্বারই।

১৯৭১ সালের ২জুলাই কালনায় কংগ্রেস ও তার খুনে বাহিনীর হাতে শহীদ কমরেড মহাদেব ব্যানার্জি লাল সেলাম।

ছবি: মহাদেব ব্যানার্জী ও ডঃ গৌরাঙ্গ গোস্বামী, কালনা

রবিবার, ২৭ জুন, ২০২১

ফেলুদা শেখাচ্ছেন সংকেতবিদ্যা ~ শুভময় মৈত্র

শুরুর কথা
-------

।।১।।

"শাধআঢঢাশআচেবাপযভুশেঝষেএঢ়"।

ধরা যাক ক্যাপ্টেন স্পার্ক ছোট্ট একটা চিরকুটে এই বিদঘুটে শব্দটি লিখে ধরিয়ে দিল ফেলুদার হাতে। ফিসফিস করে বলেও দিল, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে খুব গোপন একটি বার্তা। কী সেই বার্তা, সেটা উদ্ধার করাই রজনী সেন রোডের প্রদোষচন্দ্র মিত্রের কাজ। 

এর আগে তিনি 'রয়্যাল বেঙ্গল রহস্য'-তে 'মুড়ো হয় বুড়ো গাছ, হাত গোন ভাত পাঁচ'-এর রহস্যভেদ করেছেন। ঘুরঘুটিয়াতে 'ত্রিনয়ন' আর 'একটু' যে যথাক্রমে 'থ্রি-নাইন' এবং 'এইট-টু', তাও ধরে ফেলেছেন ঝট করে। কিন্তু, এ বার?

তোপসে বলল, এ আবার কী ফেলুদা! আগে তো তাও কিছু শব্দ শুনেছিলাম, তার কিছু অর্থ-টর্থ ছিল, এর তো না আছে মাথা না আছে মুণ্ডু!

ফেলুদা বলল, সেটাই তো চ্যালেঞ্জ রে তোপসে। মাথা আর মুণ্ডুটা খুঁজে বের করতে হবে। দ্যাখ, একটা ক্লু তো স্পার্ক দিয়েই দিয়েছে। এটা একটা বার্তা। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, যাদের মধ্যে এই কথার দেওয়া-নেওয়া, তারা চায় না যে অন্য কেউ এর হদিস পাক, তাই না?

তোপসে বলল, নির্ঘাত! তা না হলে আর গোপন কেন হবে?

ফেলুদা বলল, ওই দু'জন তেমনই যুক্তি কষেছে, এমন একটা সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা বানিয়ে ফেলবে যেখানে গোপনীয়তা বজায় রেখেই যোগাযোগ রাখা যায়। পরিচিত ভাষায় কথা বলে লাভ নেই। একটা আড়াল দরকার। ওই আপাত ভাবে হিজিবিজি অক্ষরগুলোই সেই আড়াল।

তোপসে বলল, তার মানে তুমি বলতে চাইছ, এটা একেবারেই পাগলামি নয়, বরং এর পিছনেও একটা কোনও যুক্তির কাঠামো আছে।

এগজ্যাক্টলি! — একটা চারমিনার ধরাল ফেলুদা, একে বলে মেথড ইন ম্যাডনেস! তুই যদি ওই বিদঘুটে কথাটা রাস্তার দেওয়ালেও লিখে দিস, কেউ কিস্যু বুঝবে না। শুধু দু'টি মানুষ ছাড়া। যারা জানে, কী ভাবে ভেতরের আসল কথাটাকে আড়াল করা হয়েছে। কিছু একটা সাংকেতিক সূত্র আছে এর মধ্যে। সেটা এক বার ধরতে পারলেই কেল্লা ফতে। 

কী জানি, সেটা ধরার কোনও রাস্তা আছে বলে তো মনে হচ্ছে না, হতাশ শোনাল তোপসের গলা।

ফেলুদা একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, কেসটা খুব ইজি হলে আর ফেলু মিত্তিরের কাছে আসবে কেন বল? ব্রেনের সেলগুলো একটু খাটাতে হবে।

রাত বেড়েছে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে তোপসে শুয়ে পড়ল। রাত্তিরে স্বপ্ন দেখল, বিশাল একটা ক্রসওয়ার্ডের মধ্যে সে হেঁটে বেড়াচ্ছে, সেখানে ফাঁকা ঘরগুলো এক-একটা গভীর গর্ত!

সকালে ঘুম ভেঙে দাঁতটাত মেজেই সোজা ফেলুদার ঘরে। যথারীতি যোগব্যায়াম-ট্যায়াম সেরে ফেলুদা রেডি। সামনে চায়ের পেয়ালা। তোপসে জিজ্ঞেস করল, কী হল? পারলে?

উত্তর না দিয়ে টোস্টে একটা কামড় দিল ফেলুদা, তারপর বলল, ক্রিপ্টোলজি কাকে বলে জানিস?

সে আবার কী? তোপসে থতমত। অনেক 'লজি' শুনেছি, কিন্তু এ রকম তো ...

বাংলায় বলতে পারিস, সংকেতবিদ্যা। এরকম প্রচুর উপায় এখন জানা আছে যার মাধ্যমে সুরক্ষিত উপায়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গোপনে বার্তা পাঠানো সম্ভব।

তোপসে বুঝল, ফেলুদা এখন একটু জ্ঞান দেওয়ার মুডে আছে। চুপচাপ শোনা ছাড়া গতি নেই।

ফেলুদা বলে চলল, সংকেতের চাবিটা কী তা না জানলে কারও ক্ষমতা নেই এই হেঁয়ালির কোনও তল পায়! এ ক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন স্পার্ক যে কায়দাটা ব্যবহার করেছে, বিজ্ঞানের পরিভাষায় তার নাম 'সিমেট্রিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি'।

তোপসে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে। যাক, ফেলুদা তা হলে ওই হযবরল-র মানে বই পেয়ে গেছে!

'সিমেট্রিক কী ক্রিপ্টোগ্রাফি'র ইতিহাস খুঁজতে খ্রিস্টপূর্বাব্দে ফিরতে হবে, বুঝলি। "সিমেট্রিক" অর্থে দুজনের কাছে একই "কী", অর্থাৎ গোপন চাবিকাঠি আছে। ইনিও জানেন, উনিও জানেন। প্রশ্ন হল, সেই চাবিটা এখানে কী?

উফ, ফেলুদা! তুমি মাঝে মাঝে এমন সাসপেন্সে রাখো! বলেই ফেলল তোপসে।

ফেলুদা বলল, ধরা যাক আগে থেকে নির্দিষ্ট করে রাখা হল যে কথাটার মধ্যে স্বরবর্ণগুলোকে একই রকম রেখে দেওয়া হবে, কিন্তু প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের জায়গায় তার পরের তৃতীয় অক্ষরটি লেখা হবে। ধর, তুই পড়ছিস শ, কিন্তু আসলে বলতে চাওয়া হয়েছে র। আর হ্যাঁ, এটাও সাজিয়ে নেওয়া হয়েছিল যে, দুটো শব্দের মাঝখানে ফাঁকগুলো আর থাকবে না। তাতেও দেখতে একটু বিচিত্র লাগবে। দেখ তো, এই দুটো জিনিস মাথায় রাখলে কথাটা কী দাঁড়ায়! এই নে, খাতায় লেখ! কাগজ-কলম এগিয়ে দিল ফেলুদা। তোপসে আস্তে আস্তে লিখে ফেলল আস্ত একটি বাক্য।

"রাত আটটার আগে যাদবপুরে চলে এস" 

।।২।।

ফেলুদা আর তোপসের এই কাল্পনিক কথাবার্তা আসলে এটুকুই বোঝানোর জন্য যে, ক্রিপ্টোলজি, কী ভাবে কাজ করে। হতে পারে দু'জন মানুষ, এমনকী হতেই পারে দুটি কম্পিউটারের মধ্যে বার্তা চালাচালি হবে। কী ভাবে গোপনীয়তা বজায় রেখে সেই যোগাযোগটা রাখা যায়, সেটাই প্রশ্ন।

আগের উদাহরণটি টেনে বলি, যিনি জানেন কী উপায়ে এই শব্দগুলোকে ঘেঁটে দেওয়া হয়েছে, তিনি তিনটি করে ব্যঞ্জনবর্ণ পিছিয়ে পড়ে নেবেন আর স্বরবর্ণগুলো বদলাবেন না। যারা এটা জানে না, তারা হাবুডুবু খাবে।

এটাই ক্রিপ্টোলজির একেবারে গোড়ার কথা। গোপন চাবিকাঠিটুকু জানা থাকলে যেমন অর্থপূর্ণ ভাষা থেকে অর্থহীন সংকেতে চলে যাওয়া যায়, তেমনই অর্থহীন শব্দরাশির জাল সরিয়ে সহজেই ফিরে আসা যায় অর্থপূর্ণ একটি বার্তায়।

আজকের দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে সুযোগ সুবিধে প্রচুর। মুঠোফোনে আঙুল ছুঁইয়ে কাজ হয়ে যাচ্ছে অনেকটা। ইলেকট্রিকের বিল দেওয়ার জন্যে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না, ব্যাঙ্কে গিয়ে এক কাউন্টার থেকে আর এক কাউন্টারে ছুটে বেড়ানোর হয়রানি নেই।

অবশ্য এই সব স্বস্তির গায়ে লেপটে আছে এক টুকরো অস্বস্তি। আসলে, প্রবল অস্বস্তি। মুঠোফোনের মাধ্যমে যে সমস্ত তথ্য যোগাযোগের খোলা রাস্তায় গিয়ে পড়ল, সে সব সুরক্ষিত থাকবে তো? এন্তার যে নেটব্যাঙ্কিং করছি, রেস্তোরাঁয় খেয়ে বিল মেটাচ্ছি কার্ডে, অনলাইনে জিনিস কিনে রাস্তাঘাটেই সোয়াইপ করছি কার্ড, যদি তথ্যগুলো চলে যায় চোরেদের হাতে! কী করে এদের রেখে দেওয়া যায় জালের নিরাপদ ঘেরাটোপে?

উত্তরটি সংক্ষিপ্ত, একে সুরক্ষিত রাখাই যায়, কিন্তু তার জন্যে বেশ কিছু সতর্কতা জরুরি। সেই সব সতর্কতারই হদিস দেয় ক্রিপ্টোলজি।

  ———

দু'রকমের চাবি এবং উৎপাদকে বিশ্লেষণ
--------------------------           

।।১।।

"বুঝলেন মশাই, এবার পুজোয় ক্রিপ্টোলজি নিয়ে লিখছি। আগের দিন আপনার আর তপেশ ভাইয়ের কথোপকথন শুনে বেশ উৎসাহ পেলাম। চট করে বলুন তো 'বেবুধা' মানে কি?" বক্তা কে তা আর বলে দিতে হয় না।

আমি তো অক্ষর এগিয়ে পিছিয়ে চেষ্টা করছি, কিন্তু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। দেখি পদ্মাসনে বসে চোখ বন্ধ করে মিটি মিটি হাসছে ফেলুদা। মিনিট খানেক দেরি হল বুঝতে, তবে তার জন্যে বাংলার দুটো 'ব' দায়ী। একটা 'ব'-এর আগের অক্ষর 'ফ' আর অন্যটার 'ল'। আগের দিন 'সিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি' শিখে সে বিদ্যে কাজে লাগাতে শুরু করেছেন জটায়ু। এবার পুজোয় তাঁর উপন্যাসে যে এলোমেলো অক্ষর গড়াগড়ি খাবে সে তো বোঝাই যাচ্ছে। এর মধ্যেই পরের বোমাটা ছাড়লেন তিনি। 

"বুঝলে ভাই তপেশ, দুজনের কাছে একই কি, মানে গোপন চাবিকাঠি থাকলে তো সুরক্ষিত যোগাযোগ বেশ সহজ। কিন্তু ধর তুমি কলকাতায়, আর তোমার দাদা গেছেন লন্ডনে। গোপনে খুব জরুরি একটা খবর পৌঁছতে হবে। আর তোমাদের কাছে কোন গোপন চাবিকাঠি নেই। তখন কি করবে?" 

উত্তরটা আমার জানাই ছিল, কিন্তু তাড়াতাড়ি উত্তর দিয়ে জটায়ুকে হতাশ করতে চাইলাম না। তাই একটু সময় নিয়ে ভাবার ভান করতেই হল। এর মধ্যে জটায়ু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। আসন পরিবর্তন করার ফাঁকে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ফেলুদা বলল, "৬৭ গুণ ৩৭ কত হয় বলুন তো?"

লালমোহনবাবু পকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করে গুণ করতে যাচ্ছিলেন। "ওইটির অনুমতি নেই, গুণটা মনে মনে করতে হবে, যাকে বলে মুখে মুখে"। ফেলুদার কথা শুনে বিড় বিড় করে গুণ শুরু করলেন ভদ্রলোক। পাক্কা এক মিনিটের মাথায় বলে দিলেন ২৪৭৯। 

"বাহ বেশ তাড়াতাড়ি করলেন তো।" 

ফেলুদার প্রশংসায় জটায়ু আপ্লুত। "বুঝলেন কিনা, সেদিন বাজারে ১২২ টাকা কিলো পিঁয়াজ ৩৭৫ গ্রাম কিনেছি। সেই হিসেবের তুলনায় এটা তো নস্যি। গুণ-ভাগ আমি ছোটবেলা থেকেই বেশ তাড়াতাড়ি করে ফেলতে পারি।"

"তা হলে একটা সহজ ভাগের অঙ্ক করুন। বলুন তো কোন দু'টো সংখ্যা গুণ করলে ১১৮৯ হয়?"

এ বার শুধু জটায়ু নন, আমিও বিপাকে পড়লাম। কিছুতেই ঝট করে সংখ্যা দুটো খুঁজে বার করতে পারছি না। এদিকে ফেলুদা নিশ্চিন্তে শবাসনে। লালমোহনবাবু সেই যে চায়ের কাপটা আঙুলে আঁকড়ে টেবিল আর মুখের মাঝামাঝি জায়গায় নিয়ে গেছিলেন, সেই অবস্থাতেই স্ট্যাচু। পাক্কা দু মিনিট চেষ্টা করার পর আমার মাথায় এল ২৯ কে ৪১ দিয়ে গুণ করলে এমনটা হয়। এ বার কিন্তু লালমোহনবাবু ফেল।

"এটা কি রকম ভাগের অঙ্ক মশাই? এ তো উৎপাদকে বিশ্লেষণ।"

"এক্কেবারে আসল কথা বলে ফেলেছেন।" ফেলুদার শবাসনের তিন মিনিট শেষ। "ভাজক আর ভাজ্য দেওয়া থাকলে ভাগফল আর ভাগশেষ বার করা সহজ। কিন্তু তার থেকে উৎপাদকে বিশ্লেষণ অনেক বেশি শক্ত। তারপর সেই উৎপাদক যদি হয় দুটো বড় বড় মৌলিক সংখ্যা, তাহলে মুশকিল আরও বেড়ে যায়। তখন শুধু আপনি কেন? আপনার প্রখর রুদ্রও পাশ করতে পারবে না। সত্তরের দশকে রিভেস্ট, শামির আর অ্যাডলেম্যান নামের তিন ইহুদি সঙ্কেতবিদ এই তত্ত্ব থেকেই শুরু করেন ক্রিপ্টোলজির নতুন দিগন্ত, যার নাম 'পাবলিক কী ক্রিপ্টোলজি'। এদের নামের প্রথম অক্ষরগুলো নিয়ে এই তত্ত্ব 'আরএসএ' বলে পরিচিত। বুঝতেই পারছেন, এরপর থেকে গোপনে যোগাযোগ করার জন্যে দুজনকে আর একই চাবিকাঠি ব্যবহার করতে হয় না। ফলে কলকাতায় থেকে তোপসের আমাকে গোপন বার্তা পাঠাতে খুব অসুবিধে নেই। সে আমি লন্ডনেই থাকি বা হংকং-এ"।

।।২।।

ওপরে কাল্পনিক বাক্যালাপ ক্রিপ্টোলজির আর একটু গভীরে উঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ধরুন যে দুজন খোলা রাস্তা ব্যবহার করে গোপন সংকেতের মাধ্যমে বার্তা পাঠাতে চান, তাঁদের আগে কখনও দেখা হয়নি। এমন হতেই পারে যে অন্তর্জাল ব্যবহার করে আপনি যার কাছ থেকে জিনিস কিনছেন তিনি অন্য দেশের নাগরিক, থাকেনও সেই দেশে। সেক্ষেত্রে গোপন চাবিকাঠিটি দুজন মিলে এক টেবিলে বসে স্থির করা যাবে না। অর্থাৎ এই সমস্যার সমাধানের জন্যে 'সিমেট্রিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি'-র থেকে আর একটু বেশি কিছু ভাবতে হবে। আর সেই সুরক্ষা অর্জন করতে হবে অরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই। এই ধরণের উপায় "পাবলিক কি ক্রিপ্টোগ্রাফি" নামে পরিচিত। 

একটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি কিছুটা পরিষ্কার হবে। ধরা যাক কোন এক শিক্ষকের (ক) সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের (খ) মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এদিকে সময় মতো প্রশ্নপত্রটি পাঠাতে হবে। একমাত্র উপায় অফিসের কর্মচারির সাহায্য নেওয়া। কিন্তু সেই কর্মচারি (গ) মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে কী উপায় আছে দেখা যাক। একটি বাক্সে তালা মেরে চাবি নিজের কাছে রেখে দেবেন ক-বাবু। তারপর তালাবন্দি বাক্স দেবেন গ-কে। যেহেতু বাক্সে তালা দেওয়া, তাই গ-এর পক্ষে সেই প্রশ্ন দেখা সম্ভব নয়। সে বাক্স নিয়ে গেল খ-বাবুর কাছে। তিনি বাক্সের আঁকড়ায় আর একটি তালা লাগিয়ে দিলেন, চাবি রাখলেন নিজের কাছে। 

এবার গ সেই ডবল-তালা লাগানো বাক্স নিয়ে ফিরে গেল ক-এর কাছে। ক-বাবু নিজের চাবি দিয়ে নিজের তালা খুলে নিলেন। কিন্তু বাক্সের মুখ তখনও আটকে থাকল খ-বাবুর তালার সুরক্ষায়। গ আবার সেই বাক্স নিয়ে ফিরে গেল খ-এর কাছে। তিনি এবার তাঁর চাবি নিয়ে খুলে ফেললেন বাক্স। অর্থাৎ দুজন নিজের নিজের তালা-চাবি কাজে লাগিয়ে একটি সুরক্ষিত বার্তা পাঠিয়ে দিলেন অবিশ্বাসী কোন ব্যক্তির মাধ্যমে। তবে একবারের বদলে যাতায়াত হল মোট তিনবার। একই ধরনের নীতি কাজ করে দুটি কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে, যদিও সেখানে তালা-চাবির বদলে ব্যবহার করা হয় অঙ্কের কিছু নিয়ম। কিন্তু অবিশ্বাসী ব্যক্তি যদি বাক্স ভেঙে চিঠি পড়ে নেয়? সে ক্ষেত্রে ভাঙা বাক্স দেখে ক অথবা খ-বাবু প্রশ্নপত্র যে চুরি হয়েছে সেটা বুঝতে পারবেন। তখন আবার নতুন করে প্রশ্ন বানাতে হবে। 

।।৩।।

দুটি উদাহরণ দিয়ে এই আলোচনা শেষ করা যাক। ধরা যাক আপনার এবং আপনার স্ত্রীর কাছে আছে একই আলমারির দুটি একই ধরনের চাবি। আপনার স্ত্রী সেই আলমারিতে টাকা রেখে চাবি বন্ধ করে দিলে তিনি ছাড়াও আর একজন সেই টাকা সরাতে পারেন। আর তার নাম বলে দেওয়ার জন্যে কোনও পুরস্কার নেই। এখানে দুটি চাবি কিংবা 'কি' একই। অর্থাৎ এটি 'সিমেট্রিক কি'-র উদাহরণ। 

এবার ভাবুন আপনার বাড়ির পয়সা জমানোর পেতলের ঘটের কথা। সেই ঘটের ওপরের দিকে আছে একটি ছোট ফাঁক, যেখান দিয়ে টাকা পয়সা ভরে দেওয়া যায়, কিন্তু বার করে আনা যায় না। ঘটের নিচের দিকে একটি আঁকড়ায় ঝোলানো আছে চাবিবন্ধ তালা। সেই চাবি যার কাছে, তিনিই তালা খুলে ঘটের ভেতরের মণিমাণিক্য হাতাতে পারবেন। এক্ষেত্রে ঘটের ওপরের ফাঁকটি হল 'পাবলিক কি', যে রাস্তায় টাকা পয়সা ছাড়াও জনগণ আপনাকে গোপন বার্তা কাগজে লিখে গুঁজে দিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ আপনার 'পাবলিক কি' জানা আছে সকলেরই, যা দিয়ে আপনাকে লুকোনো চিঠি পাঠানো যায়। কিন্তু একবার সেই কাগজ ঘটে ঢুকে গেলে আর তাকে ছোট্ট ফাঁক দিয়ে উদ্ধারের রাস্তা নেই। একমাত্র আপনি যদি নিচের তালা খুলে ফেলেন তখন সেই বার্তা আপনার হাতের মুঠোয়। 

এই চাবিটিকে বলে 'প্রাইভেট কি', যার সাহায্যে আপনি ফিরে পান আপনাকে লেখা গোপন চিঠি, কিংবা বহুদিনের জমানো টাকাপয়সা। আর কম্পিউটারের জগতে এই সুরক্ষাব্যবস্থার মূল তত্ত্ব হল দুটি বিশাল মৌলিক সংখ্যার গুণফল নির্ধারণ করা সহজ, কিন্তু শুধু গুণফল দিয়ে দিলে সেখান থেকে উৎপাদকে বিশ্লেষণ করে সেই মৌলিক সংখ্যাদুটিকে বার করা প্রায় অসম্ভব। 

একটি সাবধানবাণী দিয়ে এই অংশটি শেষ করা যাক। আজকের দিনে কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে অনেক, আর সেই কম্পিউটার আর একটু উন্নত হলে 'পাবলিক কি'-এর সুরক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। তবে সেদিন আসতে এখনও কিছুটা দেরি আছে। আপাতত তাই প্রখর রুদ্র খুব তাড়াতাড়ি উৎপাদকে বিশ্লেষণ না করতে পারলেই নিশ্চিন্ত!

            -----------
                      
তথ্যশূন্য প্রমাণ
----------

।।১।।

পুজোর বই আজকাল অনেক আগে থেকেই বেরোতে শুরু করে। সেদিনই লালমোহনবাবু বলছিলেন, "বুঝলে ভাই তপেশ, এখন তো ইংরিজি বছর শুরু হতে না হতেই পুজোর উপন্যাসে হাত দিতে হয়। তবে কম্পিউটার আর প্রিন্টারের ব্যাপার স্যাপার অনেকটা এগিয়ে যাওয়ায় ছাপার সময় এখন লাগে কম, সেটুকুই যা ভরসা। তাও মে-জুনের মধ্যে লেখা শেষ করে ফেলতে হয়।"

"তা এবার লিখছেন কী নিয়ে?" 

"সে অনেক বড় গল্প। প্রখর রুদ্র যাচ্ছেন মেঘালয়ে। গোটা রাস্তা ঢেকে ফেলেছে মেঘ, একপাশে পাহাড়, অন্যদিকে খাড়াই নেমে গেছে খাদ। সেই রাস্তায় চেজ। শেষের দিকটায় সাসপেন্স নিয়ে গিয়ে ফেলছি একেবারে একটা গুহার সামনে। সেখানে গুহার মুখ থেকে ভেতরে ঢোকার দুটো পথ। সেই দুটো সুড়ঙ্গ ঢুকে গিয়ে মিশেছে একটাই ঘরে। আর সেখানেই আছে অমূল্য এক অষ্টধাতুর মূর্তি।" 

"বাহ, দিব্যি ফেঁদেছেন তো!" 

"কীসের আর দিব্যি? শেষটায় নিজের জালে নিজেই খানিক জড়িয়ে গেছি।"

"মানে?" 

"সহজ। নিজেই নিজের কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না।" বলল ফেলুদা। এতক্ষণ ধরে সে খুঁটিয়ে কাগজ পড়ছিল। চোখ এখনও কাগজেই, তবে কানটা যে এ দিকেই ছিল, তা বুঝলাম। 

"প্রবলেমটা কিন্তু জম্পেশ ফেঁদেছি, ইউ মাস্ট অ্যাডমিট স্যর! তবে কি না শেষে ওই ইয়েটা একটু ..." 

"সেটাই শুনি না, কী ইয়ে ..." 

ফেলুদার এই কথায় জটায়ুর আহ্লাদের সীমা থাকল না। আনন্দের চোটে 'ডিমটোস্ট' গুলিয়ে 'মিটাডোস্ট' চেয়ে বসলেন, তারপর চায়ের পেয়ালায় লম্বা একটা চুমুক দিয়ে যা বললেন, তার সারমর্মটুকু এ রকম: 

দুটি সুড়ঙ্গই শেষ হচ্ছে একটি করে দরজায়। তার মানে দরজা হল দুটি, যদিও দুটি দরজা দিয়েই একটাই মাত্র ঘরে গিয়ে ঢোকা যায়। অর্থাৎ, সেই ঘরটা কমন ফ্যাক্টর। দুটি দরজাই তালা লাগানো। ভেতর আর বাইরে দুদিক থেকেই খোলা যায় সেই তালা, আজকের দিনে ঘরবাড়িতে যেমন থাকে। ঘরের ভেতর থেকে বাইরে বেরোনোর জন্যে চাবি লাগে না, কবজা ঘোরালেই খুলে যাবে। কিন্তু বাইরে থেকে, অর্থাৎ সুড়ঙ্গ থেকে ঘরে ঢুকতে গেলে চাবি লাগবেই, আবার ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় আটকেও দেওয়া যাবে সেই তালা। দুটো তালা একই রকম, অর্থাৎ চাবি একটাই। 

"সবই তো বুঝলাম, কিন্তু আপনার ইয়েটা গেল কোনখানে?" 

জটায়ু একটু কাঁচুমাচু মুখে বললেন, "ধরুন, অনেকেই দাবি করছে যে তার কাছে আসল চাবিটা আছে। আরও দাবি করছে, তারা প্রত্যেকেই নাকি ওই মন্দিরের কুলপুরোহিতের বংশধর। ঘরে ঢোকার ব্যাপারটা, বুঝতেই পারছেন, হাইলি সেনসিটিভ। প্রাচীন উপজাতি সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস। পুলিশ তো দূরে থাক, ওই বিশেষ ট্রাইবটি ছাড়া একটি মাছিরও ক্ষমতা নেই যে সেই গুপ্তঘরে সেঁধোয়। এ দিকে সরকার জানতে চায় আসল চাবি কার কাছে।"

"প্রখর রুদ্রকে সেটা বলে দিতে হবে তো?" এতক্ষণে খবরের কাগজ থেকে মুখ তুললো ফেলুদা।

"এগজ্যাক্টলি স্যর। কিন্তু, ফ্যাকড়া আছে। লোকগুলোকে ইন্টারোগেট করা যাবে না, বাড়ি সার্চ করা যাবে না, বডি সার্চফার্চ তো ছেড়েই দিন। তাই সত্যিমিথ্যে কী বলছে, জানার উপায় নেই।" 

"অর্থাৎ ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই দিয়ে চলবে না, তাই আপনার হিরো পড়েছেন বেকায়দায়, এই তো?" 

লালমোহনবাবুর মৌনব্রত সম্মতির লক্ষণ হয়েই দেখা দিল। 

ফেলুদা বলল, "জটায়ুজি, হিরোকে মগজাস্ত্র অ্যাপ্লাই করতে বলুন।" 

লালমোহনবাবু এ কথায় এমন করুণ চোখে তাকালেন যে, ফেলুদা একটু হেসেই ফেলল। তারপর বলল, "এক এক করে লোকগুলোকে একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকতে বলুন ওই গুহায়, আর বেরিয়ে আসতে বলুন অন্য সুড়ঙ্গটা দিয়ে। যে পারবে তার কাছেই আছে আসল চাবি।" 

"তাই তো!" লালমোহনবাবুর চোখেমুখে আলো দেখা দিল, আবার নিভেও গেল অচিরেই। বললেন, "কিন্তু, ঘরে ঢুকে পড়লে তো বেরোনো কোনও ব্যাপারই না। তখন তো আর চাবি লাগবে না। অন্য সুড়ঙ্গটা দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে আসবে।" 

"বুঝলাম বেরিয়ে আসবে। কিন্তু, ঘরে যদি নাই ঢুকতে পারে, তা হলে অন্য সুড়ঙ্গটা দিয়ে বেরোবে কী করে? টানেলগুলো তো ইন্টারকানেক্টেড নয়।" 

এ বার আমার মাথার মধ্যেও আলো জ্বলেছে। আমি বললাম, "দেখুন, একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকে অন্যটা দিয়ে বেরোতে তখনই পারবে, যখন সে ঘরে ঢুকতে পেরেছে। আর ঘরে ঢুকতে সে-ই পারবে, যার কাছে আসল চাবিটা আছে। যাদের কাছে আসল চাবি নেই তাদের ফিরতে হবে ঢোকার দিক দিয়েই।"

"ব্রাভো, এই তো সলিউশন!" জটায়ু আনন্দে প্রায় তুড়িলাফ খেলেন। 

ফেলুদা বলল, "আপনার বুদ্ধিটা যে কিছুটা হলেও পাকছে তার প্রমাণ যে, আপনি এই জিনিসটা অন্তত ভাবতে পেরেছেন। ক্রিপ্টোলজির ভাষায় একে বলে 'জিরো নলেজ প্রুফ'।" 

জটায়ুর মুখটা একটু ফ্যালফেলে আর দু'চোখ গোলগোল হয়ে গেল। ফেলুদা বলল, "এটা একটা টার্ম। আপনার গপ্পেরও এটাই প্রাণভোমরা। যার কাছে চাবিটা আছে, তার কাছ থেকে সরকার চাবিটা নিতে চায় না বটে, কিন্তু জেনে নিতে চায়, আদতে কার কাছে চাবিটা আছে। অন্য দিকে, ওই ট্রাইবের লোকজনও চাইছে, প্রমাণ দেব যে চাবিটা আমার কাছেই আছে, কিন্তু চাবিটা দেব না।" 

"কিন্তু, ওই ক্রিপ্টোলজির ইয়েটা..." বললেন জটায়ু। 

"হ্যাঁ, জিরো নলেজ প্রুফ। ধরুন, আপনি আমার থেকে একটা তথ্য জানতে চাইছেন। আমি তার জন্য আপনার থেকে টাকা চাইব। কিন্তু, আপনিই বা নিশ্চিত না হয়ে আমাকে টাকা দেবেন কেন? তখন আমি আপনাকে প্রমাণ দেব যে, তথ্যটি আমি জানি, কিন্তু আপনি কখনওই জানতে পারবেন না যে তথ্যটা আসলে কী।" 

জটায়ু সোল্লাসে বললেন, "এ তো একেবারে জলবৎ! অর্থাৎ চাবিটা থেকে গেল উপজাতি পুরোহিতের কাছেই। কেউ সে চাবি পেল না। কিন্তু প্রখর রুদ্র এবং সরকার নিশ্চিত হয়ে গেল কে ওই গুপ্তমন্দিরের পুরোহিতের আসল বংশধর।" 

"যাক!" সংক্ষিপ্ত হাঁফ ছেড়ে ফেলুদা বলল, "আর এক কাপ চা খাবেন না কি?" 

||২||                 

ধরা যাক, একটি লোক বব, আর অন্য একজন হল অ্যালিস। ধরা যাক, ববের আছে এমন একটা গোপন খবর আছে, যার জন্যে অ্যালিস অনেক টাকা দিতে রাজি, কিন্তু ...

হ্যাঁ, ক্রিপ্টোলজিতে এই 'কিন্তু'-টা খুব জরুরি, কারণ এখান থেকে কথাটা অনেকগুলো দিকে এগোতে পারে। এক, বব যদি গোপন খবরটি অ্যালিসকে আগেই দিয়ে দেয়, তাহলে অ্যালিস হয়ত বিনিময়ে পয়সাটা আর দিলই না। অন্য দিকে আগে পয়সা দিয়ে দিলে বব হয়তো তারপর খবরটাই দিতে অস্বীকার করল। আবার এমনটাও হতে পারে যে ববের কাছে আদতে আসল খবরটিই নেই, তাই লেনদেনে যাওয়ার আগে অ্যালিস নিশ্চিত হতে চায় যে, বব মিথ্যে বলছে না, বাস্তবিকই খবরটা তার কাছে আছে। আজকের অন্তর্জালের যুগে কিন্তু এই সমস্যা অনেক তীব্র। যাদের মধ্যে দেওয়া নেওয়া, তাদের একজন হয়ত কলকাতায়, অন্য জন কোলনে। ফলে এক্ষেত্রে কোনও একটি চুক্তির ক্ষেত্রে গণ্ডগোল হলে মুখোমুখি ঝগড়া করে মিটিয়ে নেওয়ার কোনও সুযোগই নেই।

সে ক্ষেত্রে দু'তরফকেই একটা চুক্তিতে আসতে হবে।  

এই ধরণের চুক্তিভিত্তিক বহু বিষয় নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর গোড়া থেকেই। আর তারপর নব্বুইয়ের দশক থেকে যখন বোঝা গেল যে যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্তর্জলি যাত্রায় গেছে (অর্থাৎ, ইংরিজিতে যাকে বলে ইন্টারনেট, বাংলায় অন্তর্জাল), তখন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে নানারকম চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ের সমাধানের প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির এই ধারায় বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন উঠে আসতে লাগল একের পর এক। এর মধ্যে আমরা এখন যে বিশেষ সমস্যাটির দিকে নজর দিচ্ছি, সেখানে একপক্ষের হাতে আছে খুবই মূল্যবান এবং গোপন কোনও তথ্য। তিনি প্রমাণ করবেন যে তাঁর কাছে সেই তথ্যটি আছে, কিন্তু কখনওই সেই তথ্যটি জানাবেন না।

ক্রিপ্টোলজির ভাষায় একেই বলে 'জিরো নলেজ প্রুফ' অর্থাৎ প্রমাণ দেব যে তথ্যটি আমি জানি, কিন্তু যে প্রমাণ চাইছে সে কখনওই জানতে পারবে না যে তথ্যটি কী। বিষয়টি বোঝার জন্যে অনেক রকমের উদাহরণ আছে। তার মধ্যে একটি উপায় ফেলুদাই বুঝিয়ে দিয়েছেন লালমোহনবাবুকে।

আর এক বার সেটা মনে করে নেওয়া ভাল। ধরা যাক, একটি ঘরে ঢোকার দুটো দরজা। যে কোন দরজা খোলার জন্যে আছে একটি গোপন চাবিকাঠি, কম্বিনেশন লকে যেমন হয়। একটি দরজা দিয়ে ঢুকে সেটি বা অন্যদিকের দরজা দিয়ে বেরোনো যায়। আর ঢুকে যাওয়া বা বেরিয়ে আসার পরে বন্ধ হয়ে যায় সেই ঘরের দরজা। ধরুন, সেখানে রাখা আছে কোনও গুপ্তধনের সংকেত। অর্থাৎ চাবিটা পেয়ে গেলেই কেল্লা ফতে।

বুঝতে অসুবিধে নেই যে সেই ঘরের চাবি পেতে একগাদা টাকা দিতে রাজি থাকবে অনেকেই। ববের কাছে আছে এই ঘরে ঢোকার চাবি, যা কিনা অন্তর্জালের বৈদ্যুতিন জগতে একটি গোপন সংখ্যা। কিন্তু আগেই বলেছি, শুরুতেই সংখ্যাটা জানিয়ে দিলে ববের চলবে না, অথচ বোঝাতে হবে যে সেটা তার জানা আছে। আর অ্যালিস শুধু নিশ্চিত হতে চায় ববের কাছে সত্যিই ঘরের চাবিটা অর্থাৎ সেই গোপন সংখ্যাটা আছে কিনা।

এটা বোঝার জন্যে অ্যালিস কী করবে? সে নজর রাখবে যে বব কোন দরজা দিয়ে ঢুকছে আর কোন দরজা দিয়ে বেরোচ্ছে। এক দিকের দরজা দিয়ে ঢুকে যদি অন্য দিকের দরজা দিয়ে বব বেরিয়ে আসতে পারে, তার মানে বোঝাই যাবে যে চাবিটা তার কাছে আছে। ফলে এক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান পরিষ্কার।

কিন্তু মানুষের ঝামেলা সহজে মেটে না। তাই ববও এ ক্ষেত্রে কিছুটা গোলমাল পাকাতে পারে। ধরা যাক, সে একেবারেই চায় না যে অ্যালিস জেনে যাক, কোন সুড়ঙ্গ দিয়ে সে ঢুকছে। তাই বব চাইছে, সুড়ঙ্গের কাছে যাওয়া পর্যন্ত একটু দূরে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকবে অ্যালিস। বব কিছুটা ঢোকার পরে চিৎকার করে জানালে তখন অ্যালিস ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ অ্যালিস জানতে পারবে না যে বব কোন সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকছে, কিন্তু দেখতে পাবে যে সে কোন সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরোচ্ছে। এ বার তা হলে সমাধান কী ভাবে সম্ভব?

এখানেই কাজে লাগানো হয় সম্ভাবনাতত্ত্ব। বব ঢুকে যাওয়ার পর অ্যালিস উঁচু গলায় জানিয়ে দেবে যে কোন দরজা দিয়ে বেরোতে হবে। বব যে সুড়ঙ্গ দিয়ে ঢুকেছে, অ্যালিস যদি সেই সুড়ঙ্গের কথাই বলে তা হলে ববকে আর চাবি খুলতে হবে না, যেখান দিয়ে ঢুকেছে, স্রেফ বেরিয়ে এলেই হল। কিন্তু অ্যালিস যদি অন্য দরজার কথা বলে, তখন চাবি খুলে ঘরে ঢোকা অন্য দরজা দিয়ে বেরোনো ছাড়া উপায় নেই।

তর্কের খাতিরে না হয় ধরে নেওয়া গেল যে, অ্যালিস এক বার এমন দরজার কথা বলল, যেখানে ববকে চাবিটা খুলতে হল না। কিন্তু, এই ঢোকা-বেরোনোর কাজটা যদি বারবার করা হয়, তা হলে বোঝাই যায় যে, একবার না একবার বব ধরা পড়ে যাবেই। আছেই দু'টি মাত্র সুড়ঙ্গ, তাই অ্যালিস একবার কোনও একটার কথা বললেও বারবার সেটাই বলবে, তা হওয়ার সম্ভাবনা কম, আসলে নেই বললেই চলে। তাই, একবার না একবার ববকে দরজা খুলতে হবেই। আর, সেটা করতে গেলে চাবিটি থাকতেই হবে।

পুনশ্চ: লালমোহনবাবুর খুব ইচ্ছা যে প্রখর রুদ্রের জ্ঞানের বহর বোঝাতে এই সম্ভাবনাতত্ত্বের বিষয়টিও রহস্যপোন্যাসে ঢুকিয়ে দেবেন। ফেলুদা অবশ্য তা শুনে হাঁ হাঁ করে উঠেছে। আপনারা বুঝতেই পারছেন, কেন।

———

ভাইরাস — জীবন থেকে মুঠোফোন
----------------------

।।১।।

ভাগ্যিস করোনার আক্রমণে বাড়াবাড়ি হতে পারে বুঝে লালমোহনবাবুকে আগেই সাবধান করেছিল ফেলুদা। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত তিনি একেবারে সাদামাটা ছোট্ট মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন। গত কয়েক বছরে ফেলুদা বেশ কয়েকবার চাপাচাপি করে হাল ছেড়ে দিয়েছিল।

— "আমার দ্বারা এসব হবে না ফেলুবাবু। কতদিন ধরে পাবলিশার বলছে উপন্যাসগুলো কম্পিউটারে টাইপ করে দিতে। আমাকে একটা ভালো ল্যাপটপও দিয়েছিল। কিন্তু বাংলা টাইপ দূরে থাক, কম্পিউটারের সুইচ অন্য করতেই আমার গায়ে জ্বর আসে। আমার হল — কালি, কলম, মন, লেখে তিনজন। কী-বোর্ড আর মাউসের ভয়ে মাথা থেকে প্রখর রুদ্র তিন লাফ মেরে ভ্যানিশ হয়ে যায়।"

তবে কোভিদ-১৯ এর আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফেলুদা অনেক বেশি সিরিয়াস হয়ে গেছিল। শুরুতে কয়েকদিন চোখ কুঁচকে ভাবছিলও অনেকটা সময় ধরে। শীতের সকালে যোগব্যায়াম শেষ করে উঠে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলল, 
— "বুঝলি তোপসে, এবারের ভাইরাসটা কিন্তু অত সহজ সরল বলে মনে হচ্ছে না। সার্স বা মার্স গোত্রের হলেও এর চরিত্রে অনেক বেশি গোলমাল আছে। সত্যিই উহানের উদ্ভট পশুপাখির বাজার থেকে ভাইরাসটা এলো, নাকি বানানো হল কোন ল্যাবরেটরিতে, তা হয়ত কোনদিনই জানা যাবে না। তবে জীবাণুটা এমনই সাংঘাতিক যে দুতিন মাসের মধ্যে কিন্তু একেবারে সভ্যতার সংকট ঘটে যেতে পারে।"

জানুয়ারি শেষের দিকে এক সন্ধেয় সেই গল্পই হচ্ছিল। ফেলুদা আবার মনে করিয়ে দিল। 
— "শুনুন লালমোহনবাবু, এযাত্রা খুব তাড়াতাড়ি স্মার্টফোন নিয়ে নিন। করোনার উপদ্রবে কিন্তু দেশের সব কিছু থমকে যেতে পারে। স্মার্টফোন না থাকলে যে কত ঝামেলা তা তখন হাড়ে হাড়ে টের পাবেন।"

ভাগ্যিস লালমোহনবাবু কথা শুনেছিলেন। আর কথা শোনা শুধু নয়। মাসখানেকের চেষ্টায় একেবারে এক্সপার্ট। এই মার্চের শেষ রবিবারে "লকডাউনে লালমোহন" গড়পাড়ের বাড়িতে বসে যে ২১ রজনী সেন রোডে উঁকি মারছেন, তার কৃতিত্ব ফেলুদার সঙ্গে জটায়ুকেও দিতে হবে। একেবারে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল। কত কি যে শিখে নিয়েছেন এরমধ্যে। এমনকি খাতায় লিখে তার ছবি তুলে পাঠিয়ে দিচ্ছেন প্রকাশককে। 

জানালেন এবারের পুজোতে একেবারে হাইটেক প্রখর রুদ্রকে খুঁজে পাওয়া যাবে। এমনিতে শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি ঘুরে বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার করবেন হিরো। গত শীতে জটায়ু যেহেতু ওইদিকটা ঘুরে এসেছিলেন তাই উপন্যাস নিয়ে গিয়ে ফেলেছেন আসামে। তবে শেষমেশ যখন বললেন যে প্রখর রুদ্র নাকি এমন যন্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছে যে একেবারে তরঙ্গপথে অন্যের কম্পিউটারে ঢুকে যাবে, তখন বাধ্য হয়ে ফেলুদাকে আবার নাক গলাতে হল। 

— "এতোটা বাড়াবাড়ি করবেন না লালমোহনবাবু। বাংলার ছেলেমেয়েরা চট করে এতোটা গাঁজা টানতে চাইবে না। তার থেকে বরং প্রখরবাবুকে সফটওয়্যার বিশারদ করে দিন, যিনি কিনা ভাইরাসের প্রোগ্রাম লিখতে পারেন। সেই ভাইরাস তিনি অন্তর্জালের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেবেন ভিলেনের কম্পিউটারে। সেখান থেকে তথ্য চুরি করে আনবে প্রখরবাবুর প্রোগ্রাম।"

এর মধ্যে মুঠোফোনের দৌলতে প্রযুক্তির অনেকটাই শিখেছেন লালমোহনবাবু। কিন্তু সর্দিজ্বর থেকে কোভিড-১৯ পর্যন্ত জীবনমুখী ভাইরাসের কথা জানলেও, কম্পিউটারের ভাইরাস সম্পর্কে খুব কিছু বুঝে উঠতে পারেন নি। তাই ফেলুদাকে আবার একটা ছোট্ট লেকচার দিতে হল। সেটাই হুবহু টুকে দিলাম নিচে।

।।২।।

কম্পিউটার বলুন কিংবা মুঠোফোন, সবেরই মূলত দুটো ভাগ — হার্ডওয়্যার আর সফটওয়্যার। প্রথমটা হল যন্ত্রটা, যার মধ্যে আছে বিভিন্ন বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি। আর তার ওপরে লেখা হয় কিছু নির্দেশ। একেবারে মানুষের ভাষায় নয়, তবে অনেকটা সেই রকমই নিয়ম মেনে। সেই নির্দেশগুলো পরপর কাজ করে যন্ত্রের ওপর। এদের বলা হয় কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা সফটওয়্যারের অন্তর্গত। আজকাল অন্তর্জালের কল্যাণে আপনি সবসময়েই অনলাইন। অর্থাৎ সারা বিশ্বের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ একেবারে খোলা রাস্তায়। ফলে আপনি সুবিধেমত যখন তখন অন্যের লেখা প্রোগ্রাম নিজের কম্পিউটারে নামিয়ে নিতে পারেন। স্মার্টফোনও একধরণের কম্পিউটার। সেখানে আমরা যে প্রোগ্রামগুলো নামিয়ে আনি তাদের বলে অ্যাপ্লিকেশান, বা ছোট করে বহুবচনে অ্যাপস। একটু ভেবে দেখলেই বুঝবেন যে এই সমস্ত প্রোগ্রাম যে আসলে কি কাজ করে সেটা বোঝার মত প্রযুক্তিগত জ্ঞান সাধারণ মানুষের নেই। এ বিষয়ে প্রচুর জানা থাকলেও এই যে হাজার হাজার অ্যাপস তাদের মধ্যে আদতে কি কি লেখা আছে তা বোঝা খুব শক্ত। আর এই পথেই আসে বিপদ। ধরুন অন্তর্জালের মাধ্যমে ডাউনলোড করেছেন কোন সিনেমা দেখার সফটওয়্যার। সঙ্গে ঢুকে পড়েছে অন্য কোন চর। যে কিনা আবার আপনার যন্ত্র থেকে সুযোগ পেলেই ইন্টারনেট বেয়ে ঢুকে পড়বে অন্যের যন্ত্রে। এবার নিজের কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনে যে সমস্ত গোপন তথ্য রাখা আছে তা যদি সঠিকভাবে সুরক্ষিত না থাকে তাহলে সমস্ত কিছুই চলে যাবে দুষ্টু লোকের হাতে। এমনকি আপনার যন্ত্রে সঠিকভাবে কাজ করা বেশ কিছু সফটওয়্যারকেও গোলমাল করে দিতে পারে সেই প্রোগ্রাম। অর্থাৎ এই ধরণের প্রোগ্রাম কাজ করে ভাইরাসের মতই। আপনার যন্ত্রে ঢুকে পড়ে ক্ষতি করে আর সুযোগমত সেখান থেকে পাড়ি দেয় অন্য কোন যন্ত্রে। 

"সাবধানে লিখবেন লালমোহনবাবু। ভুলভাল প্রোগ্রাম লিখে ফেলে উল্টে প্রখর রুদ্রের কম্পিউটারে যেন ভিলেনের ভাইরাস ঢুকে না যায়", ফেলুদা অবশ্যই বিধিসম্মত সতর্কীকরণ শুনিয়ে দিয়েছে।     

-----------

শুক্রবার, ২৫ জুন, ২০২১

টক্সিন-গবেষণায় এক নিভৃতচারী ~ অমিতাভ প্রামাণিক

ডিটক্স ওয়াটার নামে এক বস্তুর হালে খুব সমাদর হয়েছে। জলের মধ্যে চাকা চাকা করে কাটা লেবু, শশা, পুদিনা-পাতা আর কীসব ঘাস-ফুস ডুবিয়ে রেখে মাঝেমধ্যে চুকচুক করে খেলে নাকি শরীর থেকে যাবতীয় টক্সিন বেরিয়ে যায়। 

কথা হচ্ছে, বড়লোকদের অনেক রকম ব্যামো থাকে। বড়লোক হওয়াটাই একটা ব্যামো ছাড়া আর কী? সুতরাং তাদের ব্যাপার স্যাপার আলাদা। তারা আকুপ্রেশার হাওয়াই চপ্পল পরছে বলেই আপনাকে পাঁচগুণ দাম দিয়ে ঐ ছাতা কিনতে হবে, বিকল্পে নিজের চটিতে পিরিতি-কাঁঠালের আঠা দিয়ে সমভাবাপন্ন এঁচোড়ের ছাল লাগাতে হবে – এসব করতে যাবেন না। তেষ্টা পেলে শুধু জল খান, বিশুদ্ধ জল। ওর মধ্যে শশা-ফশা ডুবিয়ে খেলে এক্সট্রা কিছু লাভবান হবেন না। আমাদের শরীরের মধ্যে যে সব যন্ত্রপাতি আছে – লিভার, কিডনি থেকে শুরু করে রক্তের শ্বেতকণিকা, অণুচক্রিকা ও বিশেষ ধরনের কোষসমূহ – এদের কাজই শরীর থেকে অব্যবহার্য বস্তু দূরীকরণ। শশা-লেবু-পুদিনার সাহায্য ছাড়াই। এবং শশা-লেবু-পুদিনার অস্ত্রে সজ্জিত না হলে তাদের কর্মকাণ্ডে যে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়, তেমন কোনো বদনাম তাদের নেই। 

এর মানে এই নয় যে শশা-লেবু-পুদিনা বাজে জিনিস। এগুলো খান যত খুশি। সুষম খাদ্যের অঙ্গ হিসাবে খান। ডিটক্স ওয়াটারের অঙ্গ হিসাবে নয়। কেননা ডিটক্স জিনিসটা ইমিউনিটি বাড়ানোর মতই এক প্রবল ঢপ। এবং তার কারণ টক্সিন জিনিসটা আসলে কী, তা না-জানা বা ভুল জানা। মনে করুন কোনো বিষধর সাপে আপনাকে ছোবল মারল। এর ফলে আপনি মারা যেতে পারেন। এ রকম বিষাক্ত মাকড়সাও আছে, যা কামড়ালে নিয়তি ঘনিয়ে আসে ফটাফট। বা ধরুন ভিমরুলে হুল ফোটাল। বা আপনি এমন কোনো মাশরুম খেয়ে ফেললেন, যা 'বিষাক্ত'। এই যে 'বিষ', আদতে এক ধরনের প্রোটিন যা আমাদের শরীরে বিষক্রিয়া করে, সেগুলোকে বলা হয় টক্সিন। সাইটোটক্সিন, নিউরোটক্সিন, হিমোটক্সিন, সায়ানোটক্সিন ইত্যাদি নানাবিধ টক্সিন আছে, যা বিভিন্ন প্রত্যঙ্গকে বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ দিয়ে অকার্যকর করে দেয়। সাইটোটক্সিন কোষের ক্রিয়াকর্মকে, নিউরোটক্সিন নিউরাল নেটওয়ার্ককে, এটসেট্রা। 

এই সমস্ত কথা এখন বলতে যাচ্ছি কেন? সেই গল্পে এবার আসি। 

ইউজিন গারফিল্ডের নাম আপনাদের অনেকেই শোনেননি হয়ত। না, না, এর সঙ্গে কোনো কমিক স্ট্রিপের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। ভদ্রলোক একজন আমেরিকান ভাষাবিদ, কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট ও ব্যবসায়ী, যিনি বিব্লিওমেট্রি ও সায়েন্টোমেট্রি নামে দুই বিষয়ের প্রবক্তা, যার সূত্র ধরে তিনি 'সায়েন্স সাইটেশন ইন্ডেক্স' নামে এক সূচক প্রবর্তন করেছিলেন। গত শতকের মাঝামাঝি এক সময় তিনি 'ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্টিফিক ইনফর্মেশন' নামে এক সংস্থা চালু করেন, যার পোশাকি নাম আইএসআই। এটা পাকিস্তানের গুপ্তচর শাখা নয়, এর কাজ হচ্ছে ঐ সাইটেশন ইন্ডেক্স জিনিসটাকে প্রতিষ্ঠিত করা। যাঁরা বিজ্ঞানে গবেষণার লাইনে আছেন, তাঁরা তো জানবেনই, যাঁরা নন, তাঁদের জন্যে খুব অল্প কথায় বলি – গবেষকরা যে 'পেপার' লেখে, সেই পেপারের গুরুত্ব কেমন, তার এক বিচার হয় সেই লেখা পড়ে কেউ তাদের-লেখা পেপারে এই পেপারের কাজের কথা উল্লেখ (রেফার) করেছে কিনা। আমি যদি একটা পেপার লিখি, যা কেউ পড়ে না, বা পড়লেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে না, তার মানে আমার পেপারটা একটা জাঙ্ক, ওর কোনো ভ্যালু নেই। পক্ষান্তরে যদি শ' খানেক বিজ্ঞানী সেই লেখা পড়ে তাকে গুরুত্বপূর্ণ জেনে তাঁদের নিজের পেপারে রেফার করেন (মানে কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য বা সিদ্ধান্ত আমার ঐ পেপার থেকে তিনি পেয়েছেন), তবে আমার পেপারের শ'-খানেক সাইটেশন হল। এই সাইটেশন অনুযায়ী জার্নালগুলোর আবার র‍্যাঙ্কিং হয়, তাকে বলা হয় 'ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর'। যে জার্নালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর বেশি, সে তত বেশি কুলীন, তাতে পেপার পাবলিশ করা তত বেশি টাফ। 'নেচার' আর 'সায়েন্স' নামে দুটো ম্যাগাজিন আছে, তারা হচ্ছে কুলীনস্য কুলীন। সেখানে কারও পেপার বেরোলে সে কদিন কলার উঁচু করে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায়। 

সাধারণ প্রবন্ধে যে তথ্যসূত্র লেখা হয়, যাকে ইংরাজিতে বলা হয় বিব্লিওগ্রাফি, তার বিজ্ঞানভিত্তিক বিশেষ পর্যালোচনাই বিব্লিওমেট্রি। একজন সারা জীবনে কোথায় কতগুলো পেপার পাবলিশ করেছেন, তাদের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর ও সাইটেশন কত, ইত্যাদি নিয়ে তেমনি সায়েন্টোমেন্ট্রি। ইউজিন গারফিল্ড এই জিনিসটা প্রথম চালু করেছিলেন, তাঁর পরে আরও অনেকে নতুন নতুন ইকুয়েশন বানিয়ে জিনিসটা ক্রমে ক্রমে বেশ কঠিন এক খিচুড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। 

রিল্যাক্স। আমার এই নগণ্য প্রতিবেদন এ সব জিনিস নিয়ে ততটা নয়। 


ইউজিন গারফিল্ড আরও একটা কাজ করেছিলেন। তিনি 'কারেন্ট কনটেন্টস' নামে এক জার্নাল বের করেছিলেন। ঐ যে নেচার, সায়েন্স নামের ম্যাগাজিনের কথা বললাম, সায়েন্স জার্নাল তো আর দু-একটা না, বেশ কয়েক হাজার। শুধু কেমিস্ট্রির জার্নালই কয়েক শো। লোকে জানবে কী করে কোথায় কী পাবলিশ হচ্ছে? তার জন্যে প্রতিটি জার্নাল আলাদা আলাদা করে তো পড়তে হবে। সে এক মস্ত হ্যাপা। উনি যেটা করেছিলেন, তা হচ্ছে, এক জার্নাল বের করলেন, যাতে প্রথম সারির বেশ কিছু জার্নালের লেটেস্ট ইস্যুর কন্টেন্ট পেজ একসঙ্গে করে ছাপিয়ে দিতেন। শুধুমাত্র সূচিপত্র। সেটাতে চোখ বুলিয়ে নিলে নজরে পড়ে যাবে কোন জার্নালে কী বিষয়ে লেখা ছাপা হয়েছে। তার সবগুলো তো নিজের কাজে গুরুত্বপূর্ণ হয় না। যেটা হয়, এবার সেই জার্নাল বের করে পড়ে নাও। 

এই নীরস জিনিসের সঙ্গে তিনি নিজের লেখা কিছু কিছু প্রবন্ধ ছাপতেন। সাইটেশন জিনিসটার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি ১৯৮৬ সালের কারেন্ট কনটেন্টসের এক ইস্যুতে এমন এক প্রবন্ধ ছাপলেন, যা পড়ে অবাক হয়ে গেল পৃথিবীর এক শ্রেণির গবেষকরা। 

সে সময় কলেরা রোগের ভীষণ প্রাদুর্ভাব হয়েছিল পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে, মহামারীর মতো। গারফিল্ড দেখালেন গত প্রায় দুশো বছরে সেটা হচ্ছে কলেরা সংক্রান্ত সপ্তম মহামারী। কলেরা নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা যাঁরা করেছেন, আইএসআই সাইটেশনে তাঁদের কাজের এক ডেটাবেস তৈরি করে সেই কাজকর্মের সাইটেশন পিছন ফিরে দেখতে দেখতে তিনি আবিষ্কার করলেন – 'সব পথ শেষে মিলে গেল এসে' এমন একজনের গবেষণালব্ধ পেপারে, যাঁর তেমন কোনো নামই শোনেনি বৃহৎ বিজ্ঞানজগত। 

সেই মানুষটির নাম শম্ভুনাথ দে! একজন বঙ্গসন্তান! 

শম্ভুনাথ দে-র যে পেপারটা নিয়ে এই মন্তব্য, সেটা ছাপা হয়েছিল নেচার পত্রিকায়। তার বিষয় ছিল কলেরার জীবাণু ভিব্রিও কলেরি-নিঃসৃত এক এন্টারোটক্সিনের কথা। শম্ভুনাথ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, এই টক্সিন তথা প্রোটিন নিঃসৃত হয় ভিব্রিও কলেরি জীবাণু থেকে, যা অন্ত্রের আভ্যন্তরীণ ঝিল্লিতে সেঁটে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় শরীর প্রচুর জল ঐ ঝিল্লি মারফত ঢেলে দেয় অন্ত্রের মধ্যে। এর ফলেই পাৎলা পায়খানা ও দ্রুত ডিহাইড্রেশন। নির্গত জল প্রতিস্থাপনের উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অবধারিত মৃত্যু। 

শম্ভুনাথের এই গবেষণালব্ধ ফলই জন্ম দেয় ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন তথা ওআরএসের, তার আবিষ্কারকদের অন্যতম আর এক বঙ্গসন্তান কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের ডাক্তার হেমেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। এবং জীবন্ত ব্যাক্টেরিয়া নয়, বরং তার দেহনিঃসৃত এই টক্সিনই যে কলেরার কারণ, শম্ভুনাথ এই সত্য প্রতিষ্ঠিত করায় সেই টক্সিনের প্রতিষেধক টিকা প্রস্তুতির লক্ষ্যও স্থির করে দেয় তাঁর গবেষণা। 

শম্ভুনাথের জন্ম চুঁচড়োর বুড়োশিবতলার কাছে গড়বাটিতে, ১৯১৫ সালে, এক অভাবী পরিবারে। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ঠাকুরদার অকালমৃত্যুতে বাবা দাশরথিকে অনেকগুলো ভাইবোনদের মধ্যে বড় বলে ছোটবেলা থেকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল, তিনি এক মুদিখানার দোকানে কাজ করতেন। পরে নিজের ব্যবসা শুরু করেছিলেন, যদিও তা তেমন চলেনি। কাকা পড়াশুনা শিখেছিলেন, তিনিই ছিলেন শম্ভুনাথের অনুপ্রেরণা। গড়বাটি হাই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি হুগলি মহসীন কলেজে স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হন। সেখানেও ভালো রেজাল্টের সুবাদে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ আসে। পরিবারের আর্থিক অনটনের দিনে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন কলকাতার ধনী ব্যবসায়ী কেষ্টধন শেঠ। মেধাবী ও ধীরস্থির প্রকৃতির শম্ভুনাথ অধ্যাপকদের প্রিয়পাত্র ছিলেন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে শম্ভুনাথ এমবি এবং ১৯৪২ সালে ট্রপিক্যাল মেডিসিনে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক মণীন্দ্রনাথ দে তাঁকে বিশেষ স্নেহ করতেন। নিজের মেয়ে তরুবালার সঙ্গে শম্ভুনাথের বিয়ে দেন তিনি। 

১৯৪২ সালে শম্ভুনাথ কলকাতা মেডিকেল কলেজে প্যাথলজির ডেমনস্ট্রেটর পদে নিযুক্ত হন ও অধ্যাপক বিপি ত্রিবেদীর অধীনে গবেষণা শুরু করেন। কয়েকটা পেপারও পাব্লিশ করেছিলেন তাঁরা। দেশ স্বাধীন হল যে বছর, সে বছর শ্বশুরমশাই তাঁকে পাঠালেন লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালে গবেষণার জন্যে। প্রফেসর জি আর ক্যামেরনের অধীনে হাইড্রোসেফালাস নিয়ে তিনি গবেষণা করে পিএইচডি পেলেন ১৯৪৯ সালে। দেশে ফিরে তিনি নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি ও ব্যাক্টিরিয়লজি বিভাগে যোগ দেন। কলেরা নিয়ে তাঁর গবেষণা শুরু তখনই। ১৯৫৫ সালে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্যাথলজি ও ব্যাক্টিরিয়লজি বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ দেন ও অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত সেই কাজেই ব্যস্ত ছিলেন। অবসরের পর বোস ইনস্টিটিউটেও তিনি কিছুদিন গবেষণা করেছিলেন।

স্মরণ থাকতে পারে, এই কলকাতায় এসেই রবার্ট কখ কলেরার জীবাণু ভিব্রিও কলেরি আবিষ্কার করেছিলেন ১৮৮৩-৮৪ সালে। কিন্তু তিনি এই জীবাণুর প্রভাবে কীভাবে কলেরা হয়, তা বের করতে পারেননি, যে জন্যে এর প্রতিষেধক বা ওষুধ কিছুই তৈরি করা সম্ভব হচ্ছিল না। পঞ্চাশের দশকে তিনখানা যুগান্তকারী পেপারে শম্ভুনাথ সেই সমস্যার সমাধান করলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি পাবলিশ করলেন জার্নাল অফ প্যাথলজি অ্যান্ড ব্যাক্টিরিওলজিতে একটা পেপার বের করে দেখালেন একটা খরগোশের ক্ষুদ্রান্ত্রের কিছুটা কেটে নিয়ে দুপাশে সুতো দিয়ে বেঁধে তার মধ্যে কলেরার জীবাণু ভরে দিলে এক দিনের মধ্যেই ওই ক্ষুদ্রান্ত্র কলেরার পাৎলা পায়খানার মত চালধোয়া রঙের তরলে ভরে যায়। জীবাণুর বদলে তাদের কালচার করে ছেঁকে ফেলে শুধু জলটা ভরে দিলেও একই রেজাল্ট পাওয়া যায়। অর্থাৎ জীবাণু নিশ্চয় এমন কিছু নিঃসরণ করছে, যার ফলে কলেরার উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। 

১৯৫৬ সালে কলেরার বদলে প্যাথজেনিক ইসচিরিচিয়া কোলাই নিয়ে একই জার্নালে এবং ১৯৫৯ সালে পুরো ব্যাপারটার ব্যাখ্যা দিতে নেচার পত্রিকায় তিনি আরও দুটো পেপার পাবলিশ করেন। নেচার পত্রিকার প্রবন্ধটার শিরোনাম ছিল – এন্টারোটক্সিসিটি অভ ব্যাক্টেরিয়া-ফ্রি কালচার-ফিলট্রেট অভ ভিব্রিও কলেরি। সেই প্রথম কলেরার ক্ষেত্রে এন্টারোটক্সিসিটি শব্দটার ব্যবহার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রির স্বনামধন্য এমিরিটাস প্রফেসর হাইনিঙ্গেনের মতে - De's paper deserves to go down as a classic in the history of cholera, and indeed, as later developments have shown, in the history of cellular physiology and biochemistry.   

পৃথিবীর যত দেশে বিজ্ঞান চর্চা হয়, প্রায় সকলেরই একটা করে সায়েন্স অ্যাকাডেমি থাকে। ইন্ডিয়ার একটা না, দু-দুখানা এই রকম অ্যাকাডেমি আছে। একটার নাম ইনসা বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি, যা শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার আগেই। এর কেষ্টবিষ্টুদের সঙ্গে মতের মিল না হওয়ায় নোবেলজয়ী সিভি রামন দাক্ষিণাত্যে নিজের দল বানিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন আইএএস বা ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেজ-এর। ইনসা দিল্লি চালায়, আইএএস চালায় ব্যাঙ্গালোর। দেশের অধিকাংশ নামী বিজ্ঞানীরা দুটো অ্যাকাডেমিরই সদস্য। 

শম্ভুনাথ দে একটারও সদস্য ছিলেন না। তিনি যে এই এলিট সংস্থার উপযুক্ত, তা কারও মাথায় আসেনি। ইউজিন গারফিল্ডের 'ম্যাপিং কলেরা রিসার্চ অ্যান্ড দি ইমপ্যাক্ট অফ শম্ভুনাথ দে অভ ক্যালকাটা'-শীর্ষক সেই প্রবন্ধ ছাপা হওয়ার পর যখন দেশের কেষ্টবিষ্টুদের নজরে পড়ল, আরে, তাই তো, আমাদের মধ্যে তো একজন মহান ব্যক্তি আছেন, যাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ একজন বিদেশীও, তার এক বছর আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন শম্ভুনাথ। 

গারফিল্ড লিখছেন, একটা ব্যাপারে শম্ভুনাথের সঙ্গে তুলনা করা যায় বারবারা ম্যাকক্লিনটকের। দুজনেই ছিলেন প্রচারবিমুখ এবং নিজস্ব গণ্ডিতে আবদ্ধ। কিন্তু বারবারা আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমির সদস্য হয়েছিলেন, ফলে ১৯৮৩ সালের মেডিসিন নোবেল পেতে সুবিধে হয়েছিল। শম্ভুনাথ কোনো অ্যাকাডেমির সদস্য ছিলেন না। ফলে তাঁর কিছুই জোটেনি। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে নোবেল ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে তিনি কলেরা ও ডায়রিয়ার উপর অনুষ্ঠিত বার্ষিক সম্মেলনে তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কারের ওপর বক্তৃতা দিতে গেছিলেন মাত্র।

সায়েন্স পত্রিকা প্রকাশ করে যে সংস্থা, যার নাম আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অভ সায়েন্স (এএএএস), তার এক সভায় ইন্ডিয়ান জার্নাল অভ টেকনোলজির এডিটর সুব্বাইয়া অরুণাচলম ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন – তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে হাই-ইমপ্যাক্ট-ফ্যাক্টর জার্নালে পেপার ছাপানো অতি দুঃসাধ্য কাজ। কিন্তু তা যদি সম্ভব হয়ও, সেই পেপারকে সাধারণভাবে অবজ্ঞা করেন প্রথম বিশ্বের বিজ্ঞানীরা। হাই-ইমপ্যাক্ট-ফ্যাক্টর জার্নালে পরে ছাপা-হওয়া প্রথম বিশ্বের অন্য কারও পেপার সাধারণভাবে অগ্রাধিকার পেয়ে যায়, তাঁরই নামডাক হয়। শম্ভুনাথের ক্ষেত্রেও সেই ব্যাপার ঘটেছিল। 

১৯৯০ সালে কারেন্ট সায়েন্স জার্নালের এক গোটা ইস্যু নিবেদিত হয় শম্ভুনাথের প্রতি শ্রদ্ধায়। তাতে প্রবন্ধ পাবলিশ করেন দেশ-বিদেশের বহু স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জশুয়া লিডেরবার্গও। তিনি জানান, তিনি একাধিকবার শম্ভুনাথের নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন করেছিলেন। তাঁর মতে - our appreciation of De must extend beyond the humanitarian consequences of his discovery. . . he is also an examplar and inspiration for a boldness of challenge to the established wisdom, a style of thought that should be more aggressively taught by example as well as precept. 

ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুটের (তখনকার ভাবী, এখনকার প্রাক্তন) ডিরেক্টর অধ্যাপক বলরাম লিখলেন, শম্ভুনাথের মৃত্যু হয়েছে সম্মানহীনভাবে, অগীতভাবে। তিনি যে জীবনে বিশেষ কোনো সম্মান বা পুরস্কার পাননি, এটা আমাদের বিজ্ঞানী-সমাজের এক বিশাল ত্রুটি। যে বিষয় নিয়ে তিনি গবেষণা করেছিলেন, দেশের পক্ষে তা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সাহসী চিন্তাধারা, দৃঢ় অধ্যবসায় ও গভীর মনোনিবেশে তিনি এক ব্রেক-থ্রু সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিলেন। তাঁর দৃষ্টান্ত নিঃসন্দেহে উদ্বুদ্ধ করবে সেই সমস্ত তরুণ গবেষকদের যাদের সামনে ঝুলছে গবেষণার নামে বড় বড় প্রোজেক্ট, প্রচুর টাকা-পয়সা-ডলার এবং ঢক্কানিনাদ-সর্বস্ব এক অন্তঃসারশূন্য প্রচার।    

আশ্চর্য এই, আমেরিকান কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট ইউজিন গারফিল্ড সায়েন্স সাইটেশনের খড়ের গাদায় সূঁচের মতন তাঁর খোঁজ না পেলে এতসব হয়ত আমরা জানতেও পারতাম না।  

অমিতাভ প্রামাণিক / ২৩ জুন ২০২১

বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১

ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায় কে নিয়ে বিতর্ক ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

"গোড়ার কথা"---
একেবারে শুরুতেই একটি কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর মৃত্যুদিনে তাকে নিয়ে অজস্র ভুলে ভরা বা অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে মনগড়া কাহিনীমূলক নানান লেখার রিবাটাল নয় এই লেখাটা। এটা লেখার কারণ অন্য। একটি লেখায় আহুত হয়ে মন্তব্য করেছিলাম যে "ওনার মৃত্যুতে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের একজন প্রাক্তনী হিসেবে আমি গভীরভাবে দুঃখিত, পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে, ও ভারতীয় হিসেবে, আমি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ, এবং বামপন্থী হিসেবে অত্যন্ত লজ্জিত।" এইটে পড়ে এক বন্ধু জানতে চেয়েছেন যে এমনধারা মন্তব্য করার কারণ কি। বলতে পারেন বাকি লেখাটা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাগিদে লেখা।

"জীবন খাতার প্রতি পাতায়"---
ডা: মুখোপাধ্যায় ঠিক কি কি কারণে আত্মহনের পথ বেছে নিয়েছিলেন সেটা জানা বোঝার চেষ্টা আমরা অবশ্যই করবো। আমাদের আগেও অনেকেই জানতে বুঝতে চেয়েছেন। তাদের মতামতের মধ্যে অনেক অমিল থাকলেও একটি বিষয়ে অনেকেই একমত যে ওনার মন ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেতে পারে তাদের অন্যতম হল একটি কমিটি। এই বিখ্যাত বা কুখ্যাত কমিটির কাজকর্মের অনেক নমুনা আমরা পেশ করবো। শুরু করা যাক সেই জায়গাটা থেকে যখন তাঁর আবিষ্কারের কাহিনী শুনে সন্দেহ এর বীজ বপনটা সুকৌশলে এইভাবে ছড়ানো হয়েছিল ওই কমিটি দ্বারা যে উনি তো ফিজিওলজির শিক্ষক, টেস্ট টিউব বেবির উনি কি জানেন। মার্জনা করবেন। আমাদের আলোচনায় এই টেস্ট টিউব বেবি শব্দ গুলি ঘুরে ফিরে আসলেও প্রাজ্ঞ পাঠক জানেন যে আসলে বলতে চেয়েছি ইন ভিট্র ফার্টিলাইজেশন (সংক্ষেপে আইভিএফ) এর কথা যা চলতি ভাষায় টেস্ট টিউব বেবি (বাংলায় নলজাতক) নামে পরিচিত। 

তথ্যগত দিক থেকে ওই কমিটি সঠিক ছিল। সত্যিই তো, ৩রা অকটবর ১৯৭৮ সালে কলকাতার বেলভিউ ক্লিনিকে পৃথিবীর দ্বিতীয় এবং এশিয়া তথা ভারতের প্রথম নলজাতক কানুপ্রিয়া ওরফে দুর্গা জন্ম নেয় তখন তার মানসপিতা ডা: মুখোপাধ্যায় বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ফিজিওলজির প্রফেসর। কথায় বলে না, অর্ধসত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর। ওই কমিটি এবং কেউ কেউ সযত্নে যে তথ্যগুলো এড়িয়ে যেতে চায় তা'হল - এক) 
ডা: মুখোপাধ্যায় কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ফাইনাল এমবিবিএস পরীক্ষার গাইনকোলজি ও ধাত্রীবিদ্যার শাখায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন, "হেমাঙ্গিনী স্কলারশিপ ও কলেজ মেডেল পেয়েছিলেন। আমার জানা নেই যে বন্ধ্যাত্ব নিবারণ এর ভাবনা চিন্তা ঠিক কবে তার মাথায় এসেছিল। কিন্তু এটা অনুমান করা যায় যে ধাত্রীবিদ্যা তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয় ছিল। এই তথ্যটা আমাদের মহামান্য উইকি সাহেব আবার চেপে গেছেন কেন কে জানে। 

দুই) দু'বার পিএইচডি করা এই মানুষটি প্রথমবার উপাধিটি পান ১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ড: সচ্চিদানন্দ ব্যানার্জির তত্ত্বাবধানে রিপ্রোডাকটিভ ফিজিওলজি নিয়ে গবেষনা করে যে গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল " দি বায়োকেমিক্যাল চেঞ্জেস ইন নর্মাল এন্ড এবনর্মাল প্রেগনেন্সি"।

তিন) এডিনবরাতে জুটিয়ে আনা দ্বিতীয় পিএইচডিটার কথা সুধী পাঠক ভুলে গেলে আরেকবার মনে করিয়ে দি, কলম্বো স্কলারশিপ পেয়ে উনি পিএইচডিটা করতে যেখানে গিয়েছিলেন সেটার নাম, "ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রিনোলজি রিসার্চ ইউনিট। ওনার গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক জন লোরেইন যিনি নিজে একজন রিপ্রোডাক্টিভ ফিজিওলজিস্ট হিসেবে পরিচিত; 

চার) নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে তাঁর সমসাময়িক স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ ডা: বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী স্মৃতিচারণে বলেছেন যে উনি উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল এ ও ডা: মুখোপাধ্যায় বাঁকুড়ায় বদলি হয়ে যাওয়ার আগেও তাঁদের মধ্যে আলাপচারিতায় ওই টেস্ট টিউব বেবি নিয়ে গবেষণার কথা উঠে আসে;


এহ বাহ্য। ডা: মুখোপাধ্যায় এমবিবিএস এর আগে ওই প্রেসিডেন্সি থেকে ফিজিওলজি নিয়ে অনার্স পাশ করেছেন এবং এডিনবরা থেকে দ্বিতীয় পিএইচডি করার পরে নীলরতন সরকার এ ফিজিওলজির লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছেন এই তথ্যই তাঁকে "ফিজিওলজির লোক" হিসেবে দেগে দেওয়া যথেষ্ট কারুর কারুর কাছে। 

"আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে"---
সত্যিই তো। কি এমন হাতিঘোড়া আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন যে তাঁকে নিয়ে মাতামাতি করতে হবে। তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নি যে তিনিই এশিয়া তথা ভারতের প্রথম ইত্যাদি তথ্য তো এটাই যে তিনি প্রথম হতে পারেন নি, সেকেন্ড বয়। ফার্স্ট বয় তো সেই ব্রিটিশ বায়োলজিস্ট রবার্ট এডওয়ার্ডস যিনি সুভাষবাবুর ৬৭ দিন আগে ওল্ডহ্যাম, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে লুই জয় ব্রাউন এর মানসপিতা হয়েছেন ডা: স্টেপটো এর সহযোগিতায়, নোবেল পকেটে পুরেছেন। 

একবারটি দেখে নেওয়া যাক যে গোরা সাহেবের থেকে নেটিভ বাঙালিবাবু কোথায় কোথায় আলাদা। অধ্যাপক এডওয়ার্ডস এর টিম যেখানে স্বাভাবিক ঋতুচক্রের উসাইট ব্যবহার করেছিলেন, সেখানে প্রফেসর মুখার্জির টিম ব্যবহার করেছিল হিউম্যান মেনোপজাল গোনাডোট্রপিন হরমোন স্টিমুলেটেড সাইকেল।  অবাক কথা এই যে আজকাল সবাই এসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনলোজির যে পদ্ধতি অনুসরণ করে সেটা নোবেল পাওয়া এডওয়ার্ড সাহেবের ওই ন্যাচারাল সাইকেল নয়, বরঞ্চ খেলাতচন্দ্র স্কুলের বাংলার মাস্টার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর ছাত্তর ওই ভেতো বাঙালির আবিষ্কার করা স্টিমুলেটেড সাইকেল। সাহেবকে বাঙালির দেওয়া এক নম্বর গোল।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হ'ল ক্রায়ো-প্রিজারভেশন অফ হিউম্যান এমব্রাও - এডওয়ার্ডস এর টিম জরায়ুতে এমব্রাওটিকে প্রতিস্থাপিত করেছিল ওই একই ঋতুচক্রে। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর টিম মনে করেছিল যে  ইউটেরাসকে সময় দেওয়া হোক ইমপ্লান্টেশনের জন্য রেডি হতে। তাই
অন্য ঋতুচক্র তে এমব্রাওটিকে প্রতিস্থাপনের আগে প্রিজার্ভ করা হয়েছিল হিমায়িত অবস্থায়  ৫৩ দিন রেখে। ওঁর টিম বিশ্বে সর্ব প্রথম এই এমব্রাও ক্রায়ো-প্রিজারভেশন টেকনিক ব্যবহার করে সফল ভাবে। এর পরে দ্বিতীয়বার এই টেকনিক ব্যবহার করে ট্রনসন ও সহযোগীরা নেচার পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন ১৯৮৩ সালে। এখন এই টেকনিকই ব্যবহার করা হয়। সাহেবকে দেওয়া বাঙ্গালির দু'নম্বর গোল। এই হিমায়িত করা বিষয়টা সুধী পাঠক মনে রাখবেন। আবার আসবে এই প্রসঙ্গ। কুখ্যাত সেই এনকোয়ারী কমিটি এটা নিয়েও ব্যঙ্গ করেছিল। তাদের প্রশ্ন ছিল ওই লোড শেডিং এর বাজারে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা গেল কি ভাবে, কারেন্ট চলে যায় নি ?

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হ'ল - ট্রান্স ভ্যাজাইন্যাল রিট্রিভাল অফ উসাইট। উসাইট সংগ্রহ করার জন্য ডা: স্টেপটো ব্যবহার করেছিলেন ঝুঁকিপূর্ণ ইনভেসিভ ট্রান্স এবডমিনাল রুট, পেট কেটে ল্যাপরোস্কপি দিয়ে, আর ডা: মুখার্জির টিম করেছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মিনিমাল ইনভেসিভ ট্রান্সভ্যাজাইন্যাল রুট। ওনারা কলকাতায় বসে সেই সময়ে আল্ট্রা সোনোগ্রাফি ব্যবহারের সুযোগ পান নি তাই পোস্টিরিয়ার কল্পটমি করতে হয়েছিল। মধ্য-আশির দশক থেকে আল্ট্রা সোনোগ্রাফির সুযোগ নিয়ে ওই ট্রান্সভ্যাজাইন্যাল রুটই ব্যবহার করা শুরু হয় এবং এখন সেটাই চলছে। বাঙালির তিন নম্বর গোল। 

বৈজ্ঞানিক জার্গনের কচকচি ছেড়ে মোদ্দা কথা এটাই দাঁড়ালো যে ডা: মুখার্জীদের আবিষ্কৃত টেকনিক ওই লন্ডন স্কুলের  পদ্ধতি থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। পরবর্তীকালে ডা: মুখার্জীর পদ্ধতিটিই মোটামুটি অনুসরণ করা হয় অন্যান্য জায়াগায় কারণ ওনাদের পদ্ধতিটি তুলনামূলক ভাবে অনেক সহজ-সরল, নিরাপদ ও সাফল্যের হার অনেক বেশি। ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে মোহনবাগানের দুই-এক গোলে হারানো নয়, এ একেবারে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে তিন-শূন্য গোলে হারানো। জিতে মোহনবাগান শিল্ড পেয়েছিল, আর ডা: মুখোপাধ্যায় কি পেয়েছিলেন ?

"কি পেয়েছি তার হিসাব মিলাতে" ---
বেঁচে থাকতে যা যা সাহায্য সহযোগিতা সন্মান পেয়েছিলেন তা নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় তাঁর স্ত্রী নমিতার কথা। ....


এর পরে বলতে হয় ১৯৬৬ এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে তাঁর সমসাময়িক গাইনকলজি বিভাগের এসিস্টেন্ট প্রফেসর বৈদ্যনাথ চক্রবর্তীর কথা। অধ্যাপক চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী তিনি ও তাঁর বন্ধু ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দুজনেরই আনকমন সাবজেক্ট নিয়ে গবেষণার ঝোঁক ছিল ও সেই সময়ে সুভাষবাবু এন্ডোক্রিনোলজি নিয়ে কাজ করছেন। সেই সময়ে দুজনেই বয়েস মধ্য চল্লিশ। নিজেদের মধ্যে প্রচুর আইডিয়া ও উৎসাহের আদান-প্রদান হ'ত।

কালক্রম অনুসারে এর পরে আসবে ওনার রিচার্চ টিমের অন্য দুই সদস্যের কথা। টেস্ট টিউব বেবি সংক্রান্ত গবেষণায় ওনার সহযোগী ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের গাইনকোলজি বিভাগের প্রফেসর ডা: সরোজকান্তি ভট্টাচার্য এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি ও বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর সুনীত মুখার্জি। উইকিবাবা আবার ভুল করে এনাকে "ক্রায়ো-বায়োলজিস্ট" বানিয়ে ছেড়েছে। ডা: মুখোপাধ্যায় এর সহযোগী ও আজীবন তাঁর একনিষ্ঠ অনুগামী এই ইঞ্জিনিয়ার মানুষটির কথায় আমরা আবার ফিরে আসবো। আপাততঃ এটুকু বলে রাখি যে সুনীতবাবু .. এর সহযোগিতায় "ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায় মেমোরিয়াল রিপ্রোডাক্টিভ বায়লজি রিসার্চ সেন্টার" গড়ে তোলেন। 



এছাড়াও সহযোগিতার একটি বিচিত্র নমুনা পেশ করা যাক। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর গবেষণার জন্য প্রয়োজন "এনিম্যাল হাউস"। অর্থবরাদ্দে কলেজের প্রিন্সিপাল রাজি তবে তার জন্য বিনিময়প্রথায় আসতে হবে। ওনাকে হোস্টেল সুপারের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হবে। গবেষণারত এক বিজ্ঞানীর কাছে সময়ের মূল্য অপরিসীম। সেই মূল্যবান সময়ের কিছুটা খরচ হবে হোস্টেলের পেছনে। তাই হোক, অন্য উপায় কি। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় রাজি হয়ে গেলেন। পেলেন ইঁদুর, বাঁদর, গিনিপিগ ওয়ালা এনিম্যাল হাউস। আরেকটা লাভ হয়েছিল, তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্র-ছাত্রীদের তালিকায় যুক্ত হল ওই হোস্টেলের আবাসিকবৃন্দ।

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর মৃত্যুর পরে বিশেষকরে তাঁর মরণোত্তর খ্যাতিলাভের পরে তাঁর একসময়ের সহকর্মীদের একাংশ নিজেদের গুণমুগ্ধ বলে দাবি করেছিলেন কিন্তু ওনার বিপদের দিনে তাঁদের আচার-আচরণ তাঁদের বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তাঁদের মরাল সাপোর্টের অভাব ইত্যাদি দেখেশুনে তাঁদের ওই গুণমুগ্ধতার দাবি ঠিক ধোপে টিঁকছে না।

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর চাওয়া-পাওয়ার তালিকায় সর্বশেষ ও সম্ভবত সর্ববৃহৎ অবদান যাঁর, যিনি প্রায় একক প্রচেষ্টায় অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর ভাবমূর্তিকে একজন টিপিক্যাল ট্র্যাজিক বাঙালি হিরো থেকে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীতে রূপান্তরিত করেছেন তিনি কোনও বাঙালিই নন, তিনি নিজে প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ও আইসিএমআর এর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রিপ্রোডাক্টিভ হেল্থ এর প্রাক্তন ডিরেক্টর ডা: তিরুচিলাপল্লি চেলভারাজ আনন্দকুমার। তাঁর আরেকটি পরিচয় যে তিনি ও তাঁর সহযোগী ডা: ইন্দিরা হিন্দুজা ও তাঁদের টিম ১৯৮৬ সালের ১৬ই আগস্ট ভারতের প্রথম "সায়েন্টিফিক্যালি ডকুমেন্টেড" টেস্ট টিউব বেবির জন্ম দেয়। ওনার এই কাজ ১৯৮৬ সালে আইসিএমআর বুলেটিনে প্রকাশিত হয় এবং  ১৯৮৮ সালে "জার্নাল অফ ইন ভিটরো ফার্টিলাইজেশন এন্ড এমব্রাও ট্রান্সফার" এ প্রকাশিত হয়।

অধ্যাপক সুনীত মুখার্জি ১৯৮৩ সালে ডা: কুমারকে সুভাষ মুখার্জি মেমোরিয়াল বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ডা: কুমার আসতে পারেন নি। পরে ১৯৯৭ সালে কলকাতায় এআরটি এর তৃতীয় জাতীয় কনফারেন্স এ এসে উনি ডা: সুভাষ মুখার্জী মেমোরিয়াল লেকচার দিতে আসেন। এই সময়ে সুনীতবাবু ডা: কুমারের হাতে তাঁর কাছে সযত্নে রাখা অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর গবেষণার বেশ কিছু কাগজপত্র ও হাতে লেখা নোটস তুলে দেন এবং অনুরোধ করেন সেগুলি উল্টে পাল্টে দেখতে। 

স্বভাবসিদ্ধ চালে ডা: কুমার ওই কাগজপত্র ও নোটসগুলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন এবং স্তম্ভিত হয়ে যান। ততদিনে ভারতের প্রথম নলজাতক এর আবিষ্কারক হিসেবে তাঁর ভুবন জোড়া খ্যাতি লাভ হয়ে গেছে। তবুও তিনি অসীম সাহস ও উদার্যের পরিচয় দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নন, ডা: মুখোপাধ্যায়ই ভারতের প্রথম টেস্ট টিউব বেবির জনক। তিনি কেবলমাত্র "সায়েন্টিফিক্যালি ডকুমেন্টেড ফার্স্ট টেস্ট টিউব বেবি" এর জনক। তাঁর এই দাবি প্রমাণ করার জন্য তিনি ডা: মুখোপাধ্যায় এর এতাবৎকাল প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গবেষণা কাজের ওপর ভিত্তি করে  একটি নিবন্ধ লেখেন এবং সেটি "দি আর্কিটেক্ট অফ ইন্ডিয়াজ ফার্স্ট টেস্ট টিউব বেবি - ডা: সুভাষ মুখার্জি" এই শিরোনামে কারেন্ট সায়েন্স পত্রিকায় ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। 

কলকাতার কনফারেন্সে যখন ডা: আনন্দ কুমার স্বেচ্ছায় তাঁর প্রথম আসনটি ত্যাগ করে দ্বর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, "লেট মি টেল ইউ দ্যাট সুভাষ মুখার্জি মাস্ট বি গিভেন ক্রেডিট ফর দ্যা ফার্স্ট টেস্ট-টিউব বেবি" এবং "অল আদার এচিভমেন্টস ডোয়ারফ ইন কম্পরাইজন টু হোয়াট হি এচিভড" তখন যথারীতি গণমাধ্যম লুফে নেয় এই চনমনে খবরটি। বন্যায় জলের মতো একের পর এক খবরের কাগজে টিভিতে খবর প্রকাশিত হয়। 

"জীবনে যারে তুমি দাও নি মালা"---
অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর মৃত্যুর পরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যে যে উদ্যোগগুলি গ্রহণ করা হয়েছিল তার কয়েকটি উল্লেখ না করলে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে বাধ্য। কালক্রম অনুযায়ী:-

১৯৮২ সালে ইন্ডিয়ান ক্রায়োজেনিক্স কাউন্সিল শুরু করেন "ডা: সুভাষ মুখার্জি মেমোরিয়াল অরেশন"। ১৯৮৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ান ক্রায়োজেনিক্স কাউন্সিল এবং বেহালা বালানন্দ ব্রহ্মচারী হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে বেহালায় তৈরি হয় 'ডা: সুভাষ মুখার্জি মেমোরিয়াল রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজি রিসার্চ সেন্টার"। 

এর পরে স্মৃতি রক্ষার কাজকর্মে ভাঁটা পরে কিছুদিন। তাতে আবার জোয়ার আসে ডা: আনন্দ কুমারের প্রবন্ধের পরে। 

২০০২ সালে, তাঁর মৃত্যুর ২১ বছর পরে আইসিএমআর তাঁর বিষয় নিয়ে চর্চার জন্য একটি বারো সদস্যের কমিটি গঠন করেন। কমিটি শব্দটি দেখে সুধী পাঠক আঁতকে উঠবেন না। দিনের শেষে আইসিএমআরও একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র বাদ দিয়ে চলতে পারে না। তবে এবারের অভিজ্ঞতা সুখকর। শেষ অবধি ২০০৩ সালে অধ্যাপক মুখার্জির কাজ স্বীকৃতি পায়। এবং ২০০৮ সালে তাতে সরকারি সিলমোহর পরে।

১৯শে ২০০৬ সালে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের একাডেমিক বিল্ডিং এ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের স্বীকৃতি হিসেবে একটি স্মৃতিফলক বসে যার আবরণ উন্মোচন করেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা: সূর্যকান্ত মিশ্র।

২০০৭ সালে মেডিক্যাল সায়েন্সের জগতে মার্গদর্শনের কাজ করে গেছেন এমন ১১০০ জন বিজ্ঞানীকে নিয়ে ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন একটি "ডিকশনারী অফ মেডিক্যাল বায়োগ্রাফি" প্রকাশ করে। তাতে জায়গা পান অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়। 

আইভিএফ এর ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৭ সালের ৭ই নভেম্বর ব্রাজিলীয় মেডিক্যাল সোসাইটি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং তারা 'ডা: সুভাষ মুখার্জি মেমোরিয়াল রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজি রিসার্চ সেন্টার" কে একটি ট্রফি প্রদান করে।

২০১২ সালে এসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনলোজি, রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজি এন্ড এনডোক্রিনলোজির জগতে অসামান্য অবদানের জন্য আইসিএমআর চালু করে "ডা: সুভাষ মুখার্জি পুরস্কার"। 

গণমাধ্যমে ও জনপ্রিয় মাধ্যমে অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে নানান "চনমনে" চর্চার পাশাপাশি কয়েকটি অবদান আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। 

প্রখ্যাত কথাশিল্পী রমাপদ চৌধুরী অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়ের জীবনী অবলম্বনে ১৯৮২ সালে লেখেন 'অভিমন্যু' উপন্যাসটি। ১৯৯১ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে প্রকাশ পায় তপন সিনহা পরিচালিত ছায়াছবি "এক ডক্টর কি মৌত"। ২০১৯ সালে তাঁর মৃত্যুকে নিয়ে রাজীব সরকার ডকুমেন্টারি ফিল্ম "ব্লাড স্টেইনস নেভার ফেড" মুক্তি পায়। ছবিটি ইউ টিউবে উপলব্ধ। আগ্রহী পাঠক দেখতে পারেন।

একাডেমিক জগতে মেডিক্যাল সায়েন্সের নানান জার্নালে লেখাপত্র এর পাশাপাশি দুটি লেখা অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার। ডন নামের পিয়ার-রিভিউড জার্নালে ২০১১ সালের ১১ নং সংখ্যায় প্রকাশিত হয় " লাইফ এন্ড ওয়ার্কস অফ ডা: সুভাষ মুখার্জি" প্রবন্ধটি।

হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সান্দ্রা বার্নাথর তাঁর পিএইচডির থিসিস হিসেবে রচনা করেন "দ্যা হিস্ট্রি অফ আইভিএফ ইন ইন্ডিয়া" যেখানে তিনি অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর অবদানকে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর জীবন ও কাজকর্ম নিয়ে আগ্রহ তৈরি করার উদ্দেশ্যে আইসিএমআর এর অর্থসাহায্যে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমি একটি প্রজেক্ট নেয়। তার ফলশ্রুতিতে ড: শ্রাবনী মুখার্জি ও ড: রাজভী মেহতা একটি পুস্তিকা লেখেন যেটি নাম, "ডা: সুভাষ মুখার্জি - এ ভিশনারী এন্ড পাইয়নিয়ার অফ আইভিএফ" নামে ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইটি অন্তর্জাল জগতে পিডিএফ ফরম্যাটে পাওয়া যায়। 

ওপরে উল্লেখিত বেশ কিছু রচনা এই প্রবন্ধ লেখার তথ্য সূত্র হিসেবে কাজ করেছে। একটি বইকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে যাতে বায়াসনেস এর অভিযোগ না ওঠে। বইটি হল সুনীত মুখার্জি রচিত "সুভাষ-নমিতা-সুনীতের উপকথা। আগ্রহী পাঠক চাইলে পড়ে দেখতে পারেন।

"এ কাকে দিয়েছ রাজার পার্ট"---
ভালো কথা অনেক হল এবার খারাপ কথা বলার পালা। সেই এনকোয়ারী কমিটি নিয়ে আরো একটু কথা বলা যাক যেটি "দাশগুপ্ত কমিটি" নামেও পরিচিত। কমিটির সদস্যরা হলেন: ডা: মৃণালকান্তি দাশগুপ্ত, রেডিও ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স; ডা: ডি এন কুন্ডু, ডিরেক্টর, সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, ডা: জে সি চট্টোপাধ্যায় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ; ডা: কৃপা মিনা, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক অজিত মাইতি, নিউরোফিজিওলজি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়; অধ্যাপক অচিন্ত্য মুখোপাধ্যায়, প্রেসিডেন্সি কলেজ।


কোনও গবেষণামূলক কাজের পিয়ার রিভিউ একটি অতি প্রচলিত পদ্ধতি। ওই এক্সপার্ট কমিটি কিছুটা পিয়ার রিভিউ টেকনিক অবলম্বন করে থাকবেন এটা আমরা ধরে নিতে পারতাম। মুশকিলটা এখানেই যে পিয়ার রিভিউয়ার হতে গেলে কিছু যোগ্যতা লাগে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা লাগে- সেটা যে এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে বহুল পরিমানে অনুপস্থিত ছিল তা কমিটির প্রশ্নোত্তর পর্বগুলি খুঁটিয়ে দেখলে ধরা পরবে। শুধু এই লেখক নয়, ডা:আনন্দ কুমার এর মতো বিজ্ঞানীও ওই আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, "নান অফ দিজ কমিটি মেম্বার্স কুড হ্যাভ হ্যাড এনি ব্যাকগ্রাউন্ড অর ইনসাইট ইনটু মর্ডান রিপ্রোডাক্টিভ টেকনলোজি, এ সাবজেক্ট আপঅন হুইচ দে ওয়ার টু হোল্ড এন এনকোয়ারী"। 

দু'একটি নমুনা পেশ করা যাক, এক সদস্য বই পড়ে সবজান্তাভাব দেখিয়ে ওভাম নেগেটিভলি চার্জড এর সমস্যা নিয়ে কূটপ্রশ্ন তুলে ডা: মুখার্জিকে বিব্রত করতে চাইলেন যেটা আদৌ এই কাজের সাথে সম্পর্ক যুক্ত নয়। সেই সদস্যকে ডা: মুখার্জীর পাল্টা প্রশ্ন ছিল, "আপনি জীবনে কোনোদিন ওভাম দেখেছেন ? দেখেন নি।"

ভ্রূণ হিমায়ণ প্রসঙ্গে এক সদস্য প্রশ্ন করেছিলেন যে এই লোডশেডিং এর বাজারে উনি ফ্রীজে রেখে ঠান্ডা করাটা বজায় রাখলেন কি করে। হ্যাঁ এটা সত্যি যে সেই সময়ে প্রচুর লোডশেডিং হত। এমন প্রশ্ন কোনো সাধারণ মানুষ করলে তাকে মানতো কিন্তু তাই বলে একজন বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য জানবেন না, তাঁর এই নূন্যতম পড়াশোনাটুকু থাকবে না যে ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন এর জন্য বাড়ির ডোমেস্টিক ফ্রিজ নয়, লিকুইড নাইট্রোজেন ব্যবহার করা হয়। 

আরেকটি প্রশ্নের নমুনা এই রকম। এম্পিউলসগুলি হিট সিল করা হয়েছিল জানার পরে এক সদস্যের প্রশ্ন, আচ্ছা, ওই  সময় তাপ লেগে গোটা মিশ্রণটা গলে গেল না কেন। তাকে কে বোঝাবে যে হাজার লক্ষ ওষুধের এম্পিউলস হিট সিলই করা হয় আর কাচ তাপের অত্যন্ত কূপরিবাহী। সেজন্যই অন্য মেটেরিয়াল এর বদলে কাচ ব্যবহার করা হয়। 

আর নমুনা দিয়ে পাঠকদের ধৈর্য্যচুতি ঘটাবো না। মোদ্দা কথা এই যে, ক্রমাগত প্রশ্নকর্তাদের এই ধরনের অপরিসীম অজ্ঞতা মিশ্রিত ঔদ্ধত্যমূলক প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হতে  উত্তরদাতার উত্তরের মধ্যেও ফুটে উঠতে থাকে একধরণের করুণা মিশ্রিত তাচ্ছিল্য। 

এই কমিটি কি রায় দিতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আমরা এবার একটু জানা বোঝার চেষ্টা করবো যে এই তথাকথিত এক্সপার্ট কমিটির এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কেন। কারণ অধ্যাপক মুখার্জিকে নিয়ে সামান্য চর্চার পরে এই প্রবন্ধ লেখকের এটাই মনে হয়েছে যে কেবলমাত্র খ্যাতি উদ্ভূত ঈর্ষা বা প্রফেশনাল জেলাসি বা তথাকথিত কাঁকড়া মনোবৃত্তি দিয়েই এটা ব্যাখ্যা করা অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে।  

সমসাময়িক বিজ্ঞানের জগৎ থেকে অনেকটা এগিয়ে থাকা মানুষের চিন্তাভাবনার নাগাল পাওয়া অন্যদের পক্ষে প্রায়ই সম্ভব হয় নি- এই ঘটনা বিজ্ঞানের ইতিহাসের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে অজানা নয়। নাগাল না পাওয়ার ফলে নতুন কোনও আবিষ্কারকে গড়পড়তা মানুষতো বটেই, এমনকি গড়পড়তা চিকিৎসক বিজ্ঞানীর কাছেও "অবিশ্বাস্য" ঠেকতে পারে। অধ্যাপক মুখার্জি যে তার সময়ের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন  এটা তার সমস্ত আলোচকদের কথায় বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। ডা: আনন্দ কুমারের ভাষায় "পাইয়নিয়ারিং ওয়ার্ক"।

অধ্যাপক মুখার্জি গণমাধ্যমেতো বটেই এমনকি  পেশাদার সহকর্মীদের সাথেও তাঁর গবেষণার বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করেন নি, বৈজ্ঞানিক জার্নালে ধারাবাহিক এমন কোনও নিবন্ধ প্রকাশ করেননি যা থেকে ওয়াকিবহাল মহলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে উনি একটা বড়সড় ব্রেক থ্রু এর সামনে আছেন। তাই ওনার সাফল্য সংবাদটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। খবরটা প্রকাশিত হওয়ার পরে প্রচন্ড বিস্ময়বোধের জন্ম দিয়েছিল। এই বিস্ময়বোধ কিন্ত প্রকারান্তরে ওই অবিশ্বাসকেই বাড়িয়ে তুলেছে, বিশ্বাসকে নয়।এই অপরিচিত অচিন্তনীয় পদ্ধতিটি নিয়ে অবিশ্বাস ও সন্দেহ এর মাত্রা উত্তরোত্তর বেড়েছে। 

এর সাথে যে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি যোগ করতে হবে, সেটি হ'ল আমাদের, ভারতীয়দের কলোনিয়াল হ্যাংওভার। সাহেবরা এতকিছু টেকনোলজি ও ফান্ডের সাপোর্ট পেয়ে কিছু করতে পারলো না আর আমাদের ঘরের ছেলে সুভাষ একটা "ডোমেস্টিক" ফ্রিজ নিয়েই কামাল করে দিলো - এ হতেই পারে না। একথা সত্যি যে আজকালকার দিনে সাইনিটিফিক রিসার্চ এর সাফল্যলাভের সম্ভাবনার এর সাথে ওই অত্যাধুনিক টেকনোলজি ও প্রভূত ফান্ডিং যোগসূত্রটি চিহ্নিত এবং সেই কারণে আমাদের মননে স্মরনে গ্রথিত ও প্রোথিত তাই অবিশ্বাসটা খুব আনকমন নয়। 

ভারতীয় তথা বাঙালির আরেকটি বৈশিষ্ট্য এর কথাও না বললেই নয়। কুপমণ্ডূকতা। বিজ্ঞানের জগৎ এ নিজেকে ওয়াকিবহাল রাখতে আপটুডেট রাখতে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জার্নাল পত্রপত্রিকা পড়ে যেতে হয় নৈলে পিছিয়ে পরতে হয় - যে অভ্যাসটি অনেকে বিজ্ঞানীই ত্যাগ করে থাকেন বিশেষ করে তার যদি মাস গেলে একটা ভদ্রস্থ মাইনের বন্দোবস্ত থাকে। এই কমিটির কারুর মধ্যে যে এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা, জাতীয়/ আন্তর্জাতিক স্তরের গবেষনা সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল - তার প্রমাণ অন্ততঃ তাদের প্রশ্নোত্তরে ধরা পরেনি। 

"দোষ কারো নয় গো মা"---
আমরা এবার ফিরে আসছি অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টিতে। কি এমন ঘটলো যে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার বদলে মানুষটি আত্মহত্যা করলেন। 

সিজার করে দুর্গা জন্ম নেয় ৩রা অক্টোবর ১৯৭৮ সালে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে। তার জন্মের খবর অর্থাৎ সে যে নলজাতক সেটি সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। অধুনালুপ্ত অমৃতবাজার পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হয় ৬ই অক্টোবর। 

সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার যার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ননী ভট্টাচার্য। স্বাস্থ্য অধিকর্তার পদে ডা: মনিকুমার ছেত্রী। স্বাস্থ্য অধিকর্তাই তখন স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য-প্রশাসক, তখনও এখনকার মতো আলাদা মেডিক্যাল এডুকেশন ডাইরেকটরেট তৈরি হয় নি। তাঁর নির্দেশে ১৯৭৮ সালের ১৯শে অক্টোবর অধ্যাপক মুখার্জি একটি রিপোর্ট জমা দেন। নানান কারণে রিপোর্টটি সংক্ষিপ্ত ছিল। কেন ছিল এ বিষয়ে অধ্যাপক মুখার্জি স্বাস্থ্য অধিকর্তাকে তাঁর লেখা ১লা ডিসেম্বরের চিঠিতে পরে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

ওই রিপোর্ট এর ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্যদপ্তর অধ্যাপক মুখার্জির দাবির সত্যাসত্য জানার জন্য ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন ও বেঙ্গল অবসটেট্রিক্স এন্ড গাইনকোলজি এসোসিয়েশনের অধীনে একটি "এক্সপার্ট" কমিটি তৈরি করেন। 

১৭ই নভেম্বর, ১৯৭৮ সালে ইনস্টিটিউট অফ রেডিও ফিজিক্স এন্ড ইলেকট্রনিক্স এর সভাঘরে বিশদ আলোচনার পরে কমিটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এবং ঘোষণা করে যে "দ্যা ওয়ার্ক অফ ড: সুভাষ মুখার্জি এন্ড হিজ টিম এজ ইমপ্লজিবল এবং বোগাস।

তদন্ত কমিটির এই রায় সামনে আসার পরে অধ্যাপক মুখার্জি ১লা ডিসেম্বরের সেই চিঠিটি লেখেন। তাতে তিনি জানান যে তাঁর প্রাথমিক রিপোর্টটি তৈরি করার জন্য তিনি বিশেষ সময় পান নি। তাকে আরেকটু সময় দেওয়া হোক। আগের সংক্ষিপ্ত রিপোর্টে বেশ কিছু তথ্য হাজির না করার কারণ হিসেবে তিনি জানান যে তার ইচ্ছে ছিল যে "ওই এক্সপেরিমেন্ট এর রিপ্রোডিউসেবিলিটি সম্পর্কে মোটামুটি আশ্বস্ত হয়ে সেটি কোনো স্বীকৃত মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশ করার।"। 

তিনি ওই চিঠিতে তদন্ত কমিটির তোলা একটি বিশেষ পয়েন্ট - তাঁর আবিষ্কৃত হিমায়ণ এর পদ্ধতি ও ডিএমএসও নামের উপাদানের বিস্তারিত তথ্য তিনি জনসমক্ষে আনতে চাননি বলেই ইচ্ছে করেই উল্লেখ করা থেকে বাদ দিয়েছেন কারণ, তাঁর ভাষায়, "আই হ্যাড টু বি কেয়ারফুল টু গার্ড আওয়ার আনপাবলিশড ডাটা বিকজ বাই দ্যাট টাইম আই বিকেম এওয়ার অফ দ্যা পেনিট্রেটিং এফিসিয়েন্সি অফ দ্যা টেনটাকলস অফ দি মাস মিডিয়া।"

ডা: আনন্দ কুমার এই চিঠির বয়ানকে অর্থাৎ ডাটা গোপন রাখার সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। বৈজ্ঞানিক গবেষনা ও তার ফলাফল প্রকাশ সম্পর্কে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণা আছে তারাও ডা: কুমারের সাথে একমত হবেন। অন্যের গবেষণার ফল চুরি করে নিজে নামী হওয়া (এবং কিছু ক্ষেত্রে দামী) এর ঘটনা আকছার ঘটে।

গবেষণাপত্র প্রকাশের তাগিদে নিয়োগকর্তার কাছে তথ্য গোপন করার এই "অপরাধ" এর জন্য অধ্যাপক মুখার্জিকে কি নিদারুণভাবে শাস্তি পেতে হয়েছে সেটা আমরা পরে দেখবো। ওই শাস্তি ওনাকে পেতে হয়েছে কারণ দিনের শেষে তিনি অধ্যাপক, বিজ্ঞানী ফিজ্ঞানী কিস্যু নন, তিনি স্রেফ সরকারি চাকুরী করা একজন ডাক্তার। 

একটি তথ্যসূত্র মোতাবেক কেবল এনকোয়ারী কমিটি নয়, কেবল আমলাতন্ত্রও নয়, "সাম প্রফেসনাল বডিজ অলসো হেকেলড হিম ইন সাম মিটিংস", অর্থাৎ ডাক্তারদের কিছু পেশাদারি সংগঠনও কিছু সভায় তাঁকে হেনস্থা করে।  

আমরা আমাদের গোটা আলোচনায় একটি প্রসঙ্গ প্রায় এড়িয়ে গেলাম -সেটা হল, বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ কর্মসূচির অর্থকরী দিকটি। এড়ানো হল এই কারণে নয় যে অর্থ এই লেখকের একটি ব্যক্তিগত অপ্রীতিকর বিষয়, এই কারণেই এড়ানো হল যে এ বিষয়ে পাথুরে প্রমান ও তথ্যের অভাব। 

এসিস্টেড রিপ্রোডাকটিভ টেকনোলজিতে পাইয়নিয়ার হিসেবে বিখ্যাত একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ যিনি পরবর্তীকালে এই ফিল্ডে সুনাম ও অর্থ দুই কুড়িয়েছেন, তিনি ডা: মুখার্জির সাথে বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে থিসিস চুরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। ওনার স্ত্রী যেহেতু নামটি নিতে চান নি তাই সেটি অপ্রকাশিতই রয়ে গেল। 

এনকোয়ারী কমিটি, আমলাতন্ত্র, সহকর্মী, প্রফেশনাল বডি - কাকে বাদ রাখবো ! সাধে কি আর রমাপদ চৌধুরী মশাই তাঁর উপন্যাসের নাম রেখেছিলেন "অভিমন্যু"। পুরানের অভিমন্যু বাঁচে নি। আমাদের অভিমন্যুরও বাঁচার কথা ছিল না।

যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা-
ওই তথাকথিত এক্সপার্ট কমিটির সমালোচনা এবং মাস মিডিয়া সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশিত নানান খবর পড়ে কোনো পাঠকের মনে হতে পারে যে অধ্যাপক মুখার্জি তাঁর গবেষণার কাজের ডকুমেন্টেশন এ অবহেলা করেছিলেন, স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম অনুযায়ী পিয়ার রিভিউ জার্নালে তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন নি। প্রকৃত পক্ষে এর কোনোটাই সত্যি নয়। 

তিনি জার্নালে অনেক পেপার পাবলিশ করেছেন, সাইন্টিফিক কনফারেন্স এ বক্তৃতা দিয়েছেন। কয়েকটি উল্লেখ করা হল। হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন এর উৎস সম্পর্কে তাঁর গবেষণা ১৮৭০ সালের হাইপোথিসিসকে ভুল প্রমাণিত করে। ফিমেল ইনফার্টিলিটি নিয়ে টেস্টস্টেরণ এর প্রয়োগ নিয়েও তাঁর গবেষণা ছিল। ফিমেল ইনফার্টিলিটি এর কারণ এর মানসিক চাপ এর যোগাযোগ আছে এনিয়ে তিনি ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে প্যারিসে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পেপার হাজির করেন।

১৯৭৮ সালের ১৭ই আগস্ট বেলুড় রোটারি ক্লাবে টেস্ট টিউব বেবি নিয়ে বক্তব্য রাখেন। ১৯৭৮ সালের ৩রা অক্টোবর তাঁর টেস্ট টিউব বেবির জন্ম হয়। তিনি তাঁর গবেষণার কিছুটা অংশ ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ক্রায়োজেনিক্স এ প্রকাশ করেন এবং ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসে হাজির করেন।

তিনি তার গবেষণা নিয়ে নয়া দিল্লিতে ১৯৭৮ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ফিফথ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন হরমোনাল স্টেরয়েড এ আলোচনা করেন। তিনি এ বিষয়টি নিয়ে হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ল্যাবরেটরি অফ হিউম্যান রিপ্রোডাকশন এর অধ্যাপক জন ব্রিগস এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক সাক্সেনার সাথে আলোচনা করেন। 

তিনি বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি দ্বারা আমন্ত্রিত হন এমব্রাও ট্রান্সফার নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তিনি গৌহাটি ও এন্ড জি সোসাইটি দ্বারা আয়োজিত কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন ও একটি মানপত্র দ্বারা সম্মানিত হন। 

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ  অভিযোগ ছিল অধ্যাপক মুখার্জির টিমের বিরুদ্ধে। মিডিয়া একটা সময় সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয় যে অধ্যাপক মুখার্জির সবচেয়ে বড় অসুবিধের জায়গা ছিল তাঁর দাবির সপক্ষে ফিজিক্যাল এভিডেন্স হিসেবে নলজাতককে হাজির করতে না পারা। ১৯৭৮ সালে দুর্গার মা-বাবা প্রভাতকুমার ও বেলা আগরওয়াল তাদের কন্যার জন্মের বিশদ বিবরণ লোকসমক্ষে আনার অনুমতি দেন নি অধ্যাপক মুখার্জিকে।  লোকলজ্জা, রক্ষণশীল মাড়ওয়ারিসমাজে একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয় - কারণটা সুধী পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারেন। যদিও পরবর্তী কালে এক সাক্ষাতকারে দুর্গার বাবা প্রভাতবাবু দাবি করেছেন যে ভয় নয়, মিডিয়া হাইপ ও এটেনশনে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন তাই তার ওই সিদ্ধান্ত। এই প্রসঙ্গে ডা: আনন্দ কুমারের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বারবার সেই বিশেষ "ইন্ডিয়ান সাইকি" এর কথা বলেছেন যা সন্তান উৎপাদন হীনতা কে, "বাঁজা" হওয়াকে একটা অভিশাপ বলে মনে করে।

একথা মনে করার কারণ নেই যে সশরীরে ওই শিশু দুর্গা ও তার বাবা-মাকে উপস্থিত করলেই সব ঝামেলা মিতে যেত। অধ্যাপক মুখার্জিকে এমন প্রশ্নও শুনতে হয়েছে যে ওই সদ্যজাতক যে  'ইন ভিভো' ফার্টিলাইজেশন অর্থাৎ স্বাভাবিক জনন ক্রিয়ার উৎপাদন নয়, ওনার দাবি মতো 'ইন ভিট্রো' ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) এর ফসল অর্থাৎ 'টেস্ট টিউব বেবি'- তার কি প্রমাণ আছে। শিশুটির মা বেলা দেবীর ঋতুচক্র স্বাভাবিক থাকলেও তার ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্ষতিগ্রস্থ ছিল, স্বাভাবিক পদ্ধতি মেনে ওই মা কোনোদিনই সন্তান ধারণ করতে পারার কথা নয়। ডাক্তারি পরিভাষায় প্রাইমারি ইনফার্টিলিটি। অন্য এক চিকিৎসক তার কেসটা ডা: মুখার্জিকে রেফার করে। তিনি ওই দম্পত্তিকে একটি অভুতপূর্ব পদ্ধতি অবলম্বন করার প্রস্তাব দেন। সেই সময় তিনি ওদের আরো জানিয়ে দেন যে এটি একটি পরীক্ষামূলক পদ্ধতি, এতে সাফল্যের কোনো গ্যারান্টি নেই। দম্পত্তি রাজি হয়ে যায়। 

এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয় অধ্যাপক মুখার্জির নেতৃত্বে, তিনি তখন বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে পোস্টেড, সপ্তাহ অন্তে বাড়ি আসতেন। উসাইট সংগ্রহ করার আগে ওভারিকে স্টিমুলেট করার জন্য গোনাডোট্রপিন ব্যবহার করা হয়। ট্রান্স ভ্যাজাইন্যাল রুটে ফ্লুইড এসপিরেট করা হয়। শেষ পর্যায়ে এমব্রাওকে লিকুইড নাইট্রোজেন ব্যবহার করে হিমায়িত করা হয়। এই কাজে ডাইমিথাইল সালফক্সাইড (ডিএমএসও) যৌগটিকে ক্রায়োপ্রটেকট্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ৫৩ দিন বাদে ভ্রূণ কে হিমায়িত অবস্থা থেকে বের করে ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ১ ঘন্টার জন্য ইনকিউবেটরে দিয়ে গলানো হয় এবং তারপরে মায়ের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বেলা দেবীর প্রেগনেন্সি রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এ সবই ডকুমেন্টেড ছিল। 

সর্বোপরি অধ্যাপক মুখার্জির টিমের অন্যতম সদস্য সুনীত বাবুর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দম্পত্তিকে এক্সপেরিমেন্ট চলাকালীন যৌনমিলন থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছিল এবং ওরা সেই পরামর্শ মেনে চলেছিলেন। 

ওই দম্পত্তিকে যেহেতু সশরীরে হাজির করা যায় নি সেহেতু অধ্যাপক মুখার্জির কাছে বিশেষ কোনো অপশন ছিল না। তিনি প্রকৃত বিজ্ঞানীর মতোই সুনির্দিষ্টভাবে বলেছিলেন যে এই মুহূর্তে তিনি আইভিএফ এর সপক্ষে কোনো সুনিশ্চিত প্রমাণ দাখিল করতে পারছেন না কিন্তু কোনো জেনেটিক মার্কার তাঁর হাতে থাকলে এটা প্রমাণ করা যেত। সেই সত্তর দশকের শেষের দিকে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে এর বেশি কিছু বলা তিনি কেন, অন্য কোনও বিজ্ঞানীর পক্ষেও সম্ভব ছিল না। 

"উটের পিঠে শেষ খড়ের টুকরো"---
তাঁর নিজের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করার জন্য অধ্যাপক মুখার্জি ১৯৭৯ সালের ২৫শে জানুয়ারি জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইমেট রিসার্চ সেন্টার আয়োজিত একটি বৈঠকে যোগদানের আমন্ত্রণ পান। খরচ ওদের। তিনি নিয়ম মেনে বিদেশযাত্রার অনুমতি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) চেয়ে আবেদন করেন। তখনও স্বাস্থ্য ভবন তৈরি হয় নি, রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তরের ঠিকানা রাইটার্স বিলিডিং। তাঁর আবেদনপত্রের ফাইলে রাইটার্স এর কনিষ্ঠ রাইটার বাবু বা বরিষ্ঠ মন্ত্রী কি নোট দিয়েছিলেন তা জানা নেই (একদিন জানার ইচ্ছে আছে)। স্বাস্থ্য অধিকর্তার সই করা চিঠি গেল চটপট তাঁর কাছে। ১৬ই ফেব্রুয়ারি তারিখের ওই চিঠিতে স্বাস্থ্য অধিকর্তা অশেষ দুঃখের সাথে জানালেন যে তাঁর আবেদন নামঞ্জুর। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে তিনি যেন সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে দেশত্যাগ না করেন। ভাবুন একবার, অধ্যাপক মুখার্জি যেন কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানী-গবেষক নন, তিনি যেন কোনও কুখ্যাত অপরাধী যে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ধান্দায় আছে।

এই পর্যন্ত পড়ে যারা ভাবছেন যে যাক নিশ্চিত হওয়া গেল, এই গল্পের হিরো কে সেতো জানাই ছিল, এইবার ভিলেন কে সেটাও জানা গেল - তাদের জন্য তথ্য হিসেবে দু'একটা কথা। কারণ এই উপাখ্যানটি কোনো রগরগে বাজার চলতি তৃতীয় শ্রেণীর হিন্দি সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। এতে সম্পুর্ন সাদা বা সম্পূর্ণ কালো কোনো চরিত্র নেই। সবাই ডিফারেন্ট সেডস অফ গ্রে - ধূসর। স্বাস্থ্য অধিকর্তা ডা: ছেত্রী নিজগুনে একজন প্রোথিতযশা চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ১৯৭৬ সালে, বাম সরকারের আগের সরকারের আমলে নিযুক্ত হলেও বাম সরকারের যথেষ্ট আস্থাভাজন ছিলেন এর ভুরি ভুরি প্রমাণ আছে। 

উল্টোদিকে তদানীংতন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ননী ভট্টাচার্য  ডুয়ার্স-তরাই অঞ্চলের পরিচিত ট্রেড ইউনিয়ন নেতা থেকে মন্ত্রীর আসনে বসেছিলেন। প্রয়াত এই মানুষটির অতিবড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও স্বীকার করবেন যে এককথায় তিনি স্বজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। অধ্যাপক মুখার্জির এই হেনস্থার জন্য তিনি ডা: ছেত্রীর সাথে বা অন্যকারুর সাথে হাত মিলিয়ে ষড়যন্ত্র রচনা করেছিলেন এটা ভাবা কষ্টকর। কিন্তু হেনস্থাতো হয়েছিল। তাই তার মন্ত্রকের নৈতিক দায়িত্ব তিনি এড়াতে পারেন না, যেমন পারেন না ডা: ছেত্রী। 

উটের কথায় ফিরে আসা যাক। বিদেশ যাত্রা প্রত্যাখ্যান এর ওই ঘটনার অল্প কিছুদিন পরে অধ্যাপক মুখার্জির হার্ট এটাক হয়। সুধী পাঠক, আপনি কি বলবেন জানি না, "দুষ্টজনে" বলে থাকে যে ওই বিদেশযাত্রা প্রত্যাখ্যান আর হার্ট এটাকের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে। অসুস্থ অধ্যাপক মুখার্জি দুটি আবেদন করেন স্বাস্থ্য অধিকর্তার কাছে। স্পেশাল লিভ এবং বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাড়ির কাছে বদলি। স্বাস্থ্য অধিকর্তা প্রথমটি নামঞ্জুর করলেও দ্বিতীয়টি মঞ্জুর করেন। তাঁকে ১৯৮১ সালের ৫ই জুন বদলি করা হয় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ অপথ্যালমোলজিতে "ইলেক্ট্রফিজিওলজি" বিভাগের প্রফেসর হিসেবে। এমন একটি বিভাগ যে বিষয়ে তার কোনও অভিজ্ঞতাই নেই।

এটাই বোধহয় ছিল সেই প্রবাদবাক্যের উটের পিঠে শেষ খড়ের টুকরো। সরকার তাঁকে বিজ্ঞান-সম্মেলনে গিয়ে নিজের গবেষনাপত্র হাজির করার সুযোগ দেবে না, গবেষণার ফলাফল গুছিয়ে লেখার জন্য সময় বের করার ছুটি দেবে না, সহকর্মীরা করবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ। উট আর বইতে পারে নি। ক্লান্ত শ্রান্ত ন্যুব্জ পিঠ ভেঙে গেছিল। তাঁর বদলির আদেশনামা বেরোনোর ৪৪ দিন পরে ১৯শে জুলাই, ১৯৮১ অধ্যাপক মুখার্জি আত্মহননের রাস্তা বেছে নেন। সুইসাইড নোটে লিখেছিলেন,"প্রত্যেক দিন হার্ট এটাক হওয়ার চেয়ে একবার হওয়া ভালো"।  নোটের এই "হার্ট" শব্দটা বেছে নিয়ে তাঁর এক নিকট আত্নীয় আবেদন করেছিলেন আমাদের কাছে, "দোহাই আপনাদের, দয়া করে ওই হার্ট শব্দটার বাংলা তর্জমা করার সময় "হৃদযন্ত্র" আনবেন না, জানেন তো হার্ট এর আরেকটা বাংলা 'হৃদয়' ?"

"তোমার মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয় চে"---
ফিজিওলজি বা বিজ্ঞানের কোনো শাখায় কোনো বাঙালি নোবেল পান নি আজ অবধি।অধ্যাপক মুখার্জির আবিষ্কার বোধহয় সবচেয়ে কাছাকাছি সুযোগ ছিল। 

পিতৃদিবসে অনেকেই তাঁর বাবাকে নিয়ে তাদের ভালোবাসা শ্রদ্ধার কাহিনী শুনিয়েছেন। আমার অদেখা এই মানুষটি কে আজ স্মরণ করলাম যিনি ডা: আনন্দ কুমারের ভাষায় ছিলেন ভারতের তথা এশিয়া মহাদেশের প্রথম নলজাতকের "সাইন্টিফিক ফাদার"। গবেষণা পাগল নিঃসন্তান এই মানুষটি আমাদের জন্য যে লিগ্যাসি রেখে গেছেন তা হল এই যে আমরা বাঙালিরা, ভারতীয়রাও পারি। 

তার জীবন কেবল কতগুলি কুচক্রী মানুষের হাতে এক প্রতিভাবান এর মৃত্যুর উপাখ্যান নয়। বাঙালি তথা ভারতীয়রাও যে চেষ্টা করলে বিজ্ঞানেও নোবেল পেতে পারে সেই আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার জন্যই তাঁর জীবনের কাছে ফিরে যেতে হবে। ফিরে যাবো বার বার দু হাত জড়ো করে তাঁর আশীর্বাদ পেতে।