রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

আয়ুর্বেদ ও শল্যচিকিৎসা ~ ডঃ কৌশিক দত্ত

আয়ুর্বেদ সম্বন্ধে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। আয়ুর্বেদের ভাবনা ও পদ্ধতির সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসার বেশ কিছু মিল আছে, আবার কিছু মৌলিক পার্থক্যও আছে, যার মধ্যে আছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পার্থক্য। আমি মনে করি, আয়ুর্বেদ বিষয়ে উপযুক্ত চর্চা হওয়া উচিত, পড়াশোনা আর গবেষণার সমন্বয়ে। বিশেষত যখন আধুনিক চিকিৎসা বহুজাতিক ব্যবসায়ীদের লোভের কবলে পড়ে ক্রমশ দুর্মূল্য হয়ে উঠছে, তখন আয়ুর্বেদকে নিয়ে গভীর বৈজ্ঞানিক চর্চার মাধ্যমে এর আধুনিকীকরণ ঘটিয়ে একে আরও বেশি কার্যকর এবং মানব-বান্ধব চিকিৎসার উপায়ে পরিণত করার চেষ্টা অন্তত করা উচিত। তা করতে হলে প্রথমেই ভেষজ আর গোমূত্র নিয়ে যারা ব্যবসা করে মানুষের কুসংস্কারকে মূলধন করে, বা যারা জ্যোতিষকে আয়ুর্বেদ বলে চালাতে চেষ্টা করে অথবা আয়ুর্বেদকে দৈব/ অলৌকিক বলে ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে আসলে আয়ুর্বেদকেই অপমান করে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতায়ন করা উচিত আয়ুর্বেদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্ক গবেষকদের। আয়ুর্বেদ কোনো অলৌকিক বা বিশ্বাস-নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, প্রাচীন ভারতের নিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক চর্চার ফসল। দুর্ভাগ্যক্রমে মধ্যযুগে এর অগ্রগতি রুদ্ধ হয়েছিল এবং ইউরোপীয়রা যেভাবে মহান গ্যালেনের ঘোর কাটিয়ে পাশ্চাত্য চিকিৎসা পদ্ধতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে শিল্পবিপ্লবোত্তর সময়ে, আমরা চরক-সুশ্রূতর প্রতি সেই সুবিচার করতে পারিনি। এবার চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু তা কি হচ্ছে? 

আপাতদৃষ্টিতে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। স্বভাবতই আয়ুর্বেদের প্রতিও তাঁদের শ্রদ্ধা থাকার কথা। শ্রদ্ধাবান সন্তান পিতার সম্পদ ফুটানি মেরে উড়িয়ে দেবার বদলে জ্ঞানার্জন করে এবং পূর্বজদের সম্মান বাড়ানোর চেষ্টা করে। তেমন কি হচ্ছে? নাকি গোদুগ্ধের সোনা, গোমূত্রের অমৃত আর গোময়ের মাইক্রোচিপের পথেই আয়ুর্বেদের সমাধি নির্মাণে তাঁরা উদ্যোগী? দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, আয়ুর্বেদকে প্রকৃত জাতীয় সম্পদে পরিণত করার বদলে সস্তা রাজনৈতিক লাভের খেলাতেই তাকে ব্যবহার করার উদ্যোগ বেশি। শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাহীন দুএকজন রাজনীতির কারবারি যে-ধরনের কথা বললে বা আচরণ করলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়, তেমন কাজ ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন করলে ততটা লঘুভাবে নেওয়া যায় না। 

সম্প্রতি এনএমসি একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, যাতে কিছু আধুনিক শল্যচিকিৎসার সংস্কৃত নামকরণের দ্বারা তাদের আয়ুর্বেদিক অস্ত্রোপচার হিসেবে চিহ্নিত করে, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের দ্বারা সেই সব অস্ত্রোপচার করানোর সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে। অচিরেই সরকারি হাসপাতালে এসব অস্ত্রোপচার সম্ভবত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা করবেন আর "পাশ করা সার্জেন"-এর হাতে অপারেশন করাতে চাইলে আপনাকে গাঁটের কড়ি খরচা করে ছুটতে হবে বেসরকারি হাসপাতালে। 

উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিলে কি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা এসব অস্ত্রোপচার করতে পারেন না? নিশ্চয় পারবেন। প্রশ্ন হল, কোন পদ্ধতিতে তাঁরা অস্ত্রোপচার করবেন? আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে, নাকি আধুনিক শল্যচিকিৎসার পদ্ধতিতে? এই জায়গায় এসে "আয়ুর্বেদিক শল্যচিকিৎসা" ব্যাপারটা নিয়েই অনেকে হাসবেন, বিশেষত যাঁরা প্রাচীন ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে শ্রদ্ধাশীল নন। হাসবেন না। প্রাচীন পৃথিবীতে ইংল্যান্ড অঞ্চলের অধিবাসীদের যখন ল্যাজ খসেনি, তখন মিশরে এবং প্রাচ্যে শল্যচিকিৎসার সূচনা হয়েছিল। ভারত বেশ কিছু ধরনের শল্যচিকিৎসার চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল বলেই সুশ্রুতর মতো মহান শল্যচিকিৎসক এদেশে তৈরি হতে পেরেছিলেন। প্রশ্ন হল, তারপর থেকে তাঁদের পদ্ধতিকে আমরা কতটা এগিয়ে নিয়ে গেছি? কোন পদ্ধতিতে আজকের এই আয়ুর্বেদিক অস্ত্রোপচারগুলো হবে? যদি প্রাচীন পদ্ধতিতে হয়, তবে তা স্পষ্ট জানানো হোক এবং মানুষকে বেছে নিতে দেওয়া হোক শল্যচিকিৎসার এত উন্নতির ফসল ছেড়ে দিয়ে তাঁরা প্রাচীন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করাতে চাইতেন কিনা। (সুশ্রুত বেঁচে থাকলে আধুনিকতম পদ্ধতিটিই শিখতেন বা নিজে উদ্ভাবন করতেন, আমি নিশ্চিত।) যদি এঁরা আধুনিক শল্যচিকিৎসার পদ্ধতিতেই কাজ করেন, তবে তার জন্য কী ধরনের প্রশিক্ষণ তাঁদের দেওয়া হয়েছে? সমগ্র এমবিবিএস এবং এমএস শিক্ষাক্রমের যাবতীয় শিক্ষণীয় বিষয়, যা শল্যচিকিৎসায় নানাভাবে কাজে লাগে (অবশ্যই কাজে লাগে, কারণ শুধু কাটতে আর জুড়তে জানলেই সার্জন হওয়া যায় না), তা কি তাঁদের শেখানো হয়েছে? যদি শেখানো হয়ে থাকে, তবে কি আর তাঁরা আয়ুর্বেদ চিকিৎসক রইলেন? যদি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের এই কৌশলে আধুনিক চিকিৎসার সহযোগী চিকিৎসকে পরিণত করা হয়, তবে কি তা আয়ুর্বেদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে না? এমন চলতে থাকলে আয়ুর্বেদ চর্চার প্রকৃত উন্নয়ন ঘটবে কীভাবে? 

ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের এই কার্যক্রম আদৌ সুবিধের লাগছে না। আধুনিক চিকিৎসা এবং আয়ুর্বেদ চিকিৎসার উন্নয়ন করা দরকার পাশাপাশি, দুটো স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে। একমাত্র তাহলেই একটা পদ্ধতি আরেকটির পরিপূরক হয়ে উঠতে পারবে এবং আয়ুর্বেদ আমাদের জাতীয় ঐশ্বর্যে পরিণত হবে। ঐতিহ্যকে ঐশ্বর্যে পরিণত করতে আরও সৎ উদ্যোগ প্রয়োজন।

শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০

সাম্প্রদায়িক বাংলা ~ সুশোভন পাত্র

- জ্যোতি বাবু গণেশ তো দুধ খাচ্ছে? এবার কি বলবেন? 
রাইটার্সের সিঁড়িতে জ্যোতি বসু কে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন এক সাংবাদিক। দিনটা ২১শে সেপ্টেম্বর। সালটা  ১৯৯৫। সকাল থেকে গোটা ভারত মেতেছে হুজুগে, গুজবে। BBC-তেও দেখাচ্ছে মূর্তির সামনে এক চামচ দুধ ঢাললেই 'গণেশ দুধ খাচ্ছে'। বুজরুকির উদ্যোক্তা RSS এবং VHP। দিল্লিতে গণেশ কে দুধ খাওয়ালেন বাবরি ধ্বংসের মাতব্বর, হিন্দুত্ব রাজনীতির 'পোস্টার বয়' লালকৃষ্ণ আদবানি। 'দৈব্য শক্তি জাগ্রত হয়েছে' –১৯৯৬-র লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে নেমে পড়ল বিজেপি। 
স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই জ্যোতি বাবু সেই সাংবাদিক কে উত্তর দিয়েছিলেন 
- গণেশ দুধ খাচ্ছে? খাক তাহলে! 
উত্তরটা তাচ্ছিল্যের, বিদ্রূপের। উত্তরটা গভীরও। গভীর কারণ, একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, একজন প্রশাসক হিসেবে এই আদ্যোপান্ত অবৈজ্ঞানিক, বুজরুকি তে মন্তব্য করাটাই যে বাতুলতা সেটা বিলক্ষণ জানতেন জ্যোতি বাবু। 'গণেশ দুধ খাচ্ছে? খাক তাহলে!' কেস, ওপেন অ্যান্ড শাট। মিডিয়ার কিম্বা ধর্মের রাজনীতির কারবারিদের আর দাঁত ফোটানোর জায়গা নেই।
বর্তমানে, রাজ্যে যারা বামপন্থীদের ন্যারেটিভে তৃণমূল-বিজেপির 'প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার' থিওরি তে বিশ্বাস করতে চান না, তারা জ্যোতি বাবুর এই উত্তরটাকে আপাতত ডিনারে সাইড ডিশ হিসেবে তুলে রেখে মেন কোর্সের মেনুটা শুনুন। 
২০১৯-র লোকসভা নির্বাচনের পর, এই জ্যোতি বাবুরই রাজ্যের সাম্প্রতিকতম মুখ্যমন্ত্রী কালীঘাটের সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন, "যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়াও উচিৎ।" মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য ডিকোড করলে দাঁড়ায়, মুসলিমরা (মানে গরু) যেহেতু ভোট (মানে দুধ) দেয় তাই 'মুসলিম তোষণ' উনি করবেনই। বকলেম সার্টিফিকেট দিলেন বিজেপির প্রোপাগাণ্ডাকেই। আর ঔদ্ধত্যের সাথেই বুঝিয়ে দিলেন 'বেশ করছি'।    
আচ্ছা, এই মন্তব্যে প্রান্তিক মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক কোন উপকারটা হল? রাজ্যের প্রশাসনের প্রধান হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার কোন তীরটা উনি মারলেন? বরং এই মন্তব্য বা এই ঢং-র রাজনীতিই যে আখেরে রাজ্যে বিজেপিকে পুষ্ট করছে এটা বুঝতে কি সত্যিই আপনাদের আলফা-বিটা-গামা-ডেলটার জটিল অন্তরকলন বা সমাকলনের অঙ্ক কষতে হচ্ছে? না অ্যাটমিক ফিজিক্স গাঁতিয়ে সাব-অল্টার্ন ডিসকোর্স নামাতে হচ্ছে? 
হোয়াটস-অ্যাপ ইউনিভার্সিটির কল্যাণে আজকাল মুড়ি-মিছরির একদর। না হলে, র‍্যাডক্লিফের আঁচড়ে ভাগ হয়ে যাওয়া বাংলার বাউন্সি পিচেও ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় বামপন্থীদের রাহুল দ্রাভিড়োচিত ডিফেন্সটা নিশ্চয় মনে থাকতো। শিখ দাঙ্গার স্মৃতিচারণায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক গুরপ্রীত সিং বলেছিলেন "আমি নিজে দেখেছি লালঝাণ্ডা হাতে সিপিআই(এম) ক্যাডাররা কলকাতার শিখ অধ্যুষিত এলাকা পাহারা দিচ্ছে। প্রবাসী শিখদের গায়ে আঁচড় লাগতে দেননি জ্যোতি বসু।" 
কাট টু ১৯৯২-র বাবরি ধ্বংসের রাত্রি কিম্বা ২০০২ গুজরাট দাঙ্গার দিন। জ্যোতি বাবু বলেছিলেন "পুলিশ কে শুট অ্যাট সাইটের অর্ডার দিয়েছি"। আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্তব্য ছিল, "দাঙ্গাবাজদের মাথা ভেঙ্গে দেবো।" একদম ঠাণ্ডা পানীয় স্প্রাইটের বিজ্ঞাপনের ক্যাচ-লাইনের মত। 'সিধি বাত, নো বকওয়াস'। আর সেই রাজ্যের সাম্প্রতিকতম মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, "আমরা চারদিন বিসর্জন দেবো, ওরা একদিন মহরম করবে।" কারা 'আমরা'? কারা 'ওরা'? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাহলে 'হিন্দু' মানে 'আমরা', আর মুসলিমরা মানে 'ওরা'? মাশা-আল্লহা ধর্মনিরপেক্ষতা! 
"বিজেপি কে ফ্রন্টে এনে লড়ব", "বিজেপি আমাদের স্বাভাবিক মিত্র", "RSS প্রকৃত দেশপ্রেমিক" কিম্বা গুজরাট দাঙ্গার পর হুইপ জারি করে দলের সাংসদদের বাজপেয়ী সরকারের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট দান থেকে বিরত রাখা –ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে পেরেক পোতার বহু কাজ, RSS-র 'সাক্ষাৎ দুর্গা' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিপুণ হস্তে করেছেন। কিন্তু অগত্যাই আপনিই যদি সে সব পুরনো কাসুন্দি ঘাটতে না চাওয়ার অজুহাতে 'সাত খুন মাফ' করে দেন, তাহলে না হয় ২০১৪-র পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই চোখ রাখুন।   
বিগত ৪বছরে বাংলাতে ৩টে উল্লেখযোগ্য সাম্প্রদায়িক 'দাঙ্গার' ঘটনা ঘটেছে। ধূলাগড়ে 'নবী দিবস', আর হাজিনগর এবং আসানসোলে 'রামনবমীর' মিছিল কে কেন্দ্র করে। ধূলাগড়ে নবী দিবসের মিছিল, RSS পরিচালিত অন্নপূর্ণা ব্যায়ামাগারে সামনে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উস্কানি কে দিয়েছিলেন জানেন? তৃণমূল বিধায়ক, গুলশন মল্লিক। হাজিনগর এবং আসানসোলে রামনবমী মিছিল থেকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ছড়ানোর প্রেক্ষিতে পুলিশি বয়ানে কি বলা হয়েছিল জানেন? "তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরাও, অনেকে মাথায় ফেট্টি বেঁধে, জয় শ্রী রাম ধ্বনি তুলে উত্তেজনা ছড়িয়ে ছিল।" RSS-র কর্মীদের সাথেই FIR-এ অভিযুক্ত ছিলেন তৃণমূল নেতা-কাউন্সিলরাও। 
আর ধূপগুড়ি? ১৯ বছরের দুই কিশোর কে গরু পাচারের ভুয়ো অভিযোগে পিটিয়ে খুন করা হয়েছিল যে ধূপগুড়ির বারহালিয়া গ্রামে, সেখানেও মানুষ খ্যাপানোর দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন মোট ৫ জন। ৩জন RSS কর্মী আর পঞ্চায়েত সদস্য সহ ২জন তৃণমূল কর্মী। 
এরপরও যদি আপনার তৃণমূলকে ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষার সাক্ষাৎ অবতার মনে হয়, তাহলে বরং আপনিই বলুন, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য কি? বলুন যে, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের ভোটাভুটি তে সংসদে তৃণমূলের সাংসদদের অনুপস্থিতির কারণ কি? বলুন যে, রামমন্দির সংক্রান্ত রায়দানের দিন কিম্বা প্যান্ডেমিকের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি লাটে তুলে ধর্মনিরপেক্ষে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিপূজায় সদর্প উপস্থিতি তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হিরণ্ময় নীরবতার রহস্যটাই বা কি?
জানি, এসব প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছে নেই। থাকার কথাও না, কারণ, মিডিয়া বা লিবারেল পণ্ডিতরা যতই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইমেজ বিল্ডিং-এ নামুন না কেন, 'ফ্যাসিস্ট' বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁকে ক্রুসেডর হিসেব প্রোজেক্ট করতে আদা জল খেয়ে পরিশ্রম করুক না কেন; বাস্তব এটাই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলেই RSS-র শাখার সংখ্যা পাঁচ গুন বেড়েছে, যাদবপুরে 'গরু পূজার' ছ্যাবলামি শুরু হয়েছে, রামনবমীর পাল্টা হনুমানজয়ন্তীর সংস্কৃতির আমদানি হয়েছে, সিদিকুল্লা-তোহা সিদ্দিকী'দের মাথায় তুলে রাখা হয়েছে, মোহন ভাগবত'দের কলকাতায় সভা করে বিষ ছড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে! আসলে গোটা রাজ্য কে ধর্মীয় মেরুকরণের বারুদে সাজিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে মুজরা দেখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 
তাই যারা ভাবছেন তৃণমূল, সাম্প্রদায়িক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তারা বাংলার রাজনীতির বাস্তবতার বহু ক্রোশ দূরে আছেন। সে থাকতেই পারেন। দূরে থাকুন, ভালো থাকুন, ভালো রাখুন। পারলে আকাশের ঠিকানায় তত্ত্ব কথার দুটো চিঠি লিখুন। শুধু জেনে রাখুন চোখ বন্ধ করলে যেমন প্রলয় আটকায় না, তেমন নগর পুড়লে দেবালয়ও বাঁচে না। তৃণমূল-বিজেপির এই বাইনারি তে যেদিন আপনার গায়েও আগুন লাগবে, সেদিন দেখা হবে রাস্তায়। দেখা হবে মিছিলে। 
নিশ্চিত থাকুন, আপনার গায়ের আগুন কে সেদিন প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গে বদলে দেবো আমরাই। আপনার গায়ের আগুন কে সেদিন প্রতিরোধের মশালে বদলে দেবো আমরাই। এই বামপন্থীরাই।

বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২০

"ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন" ~ সুশোভন পাত্র

কি বললেন? 
'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন'? তাই বলুন, আমি শুনলাম গৌরি লঙ্কেশ! 
দামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অপদার্থ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, লেজে-গোবরে অর্থমন্ত্রী, মেলোড্রামাটিক টেক্সটাইল মন্ত্রী -সবাই নাকি আজকে কেজি দরে টুইটারে অর্ণব গোস্বামীর 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন'র ঘুঁটে দিয়েছেন। তা বেশ করেছেন! তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশে 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন' থাকবে না? এ কেমন অলুক্ষণে কথা!  
কি বললেন? 'মিডিয়ার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ'? উরিব্বাস, আমি শুনলাম এম এস কালবুর্গি!
অর্ণব গোস্বামী গ্রেপ্তার হয়েছে বলে ভারতের 'স্বাধীন নিরপেক্ষ মিডিয়ার' পবিত্র দুধে চোনা পড়ে গেছে? ইস! কি লজ্জার ব্যাপার! এমনিতেই দেশের 'প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স' গত ১০ বছরে ১০৫ থেকে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৪২-এ এসে ঠেকেছে। সো হোয়াট? পাকিস্তানের থেকে ৩ ধাপ উপরে! 
'অর্ণব গোস্বামী', 'বিজেপি' আর 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন', 'প্রেস ফ্রিডম' - শব্দগুলো নিয়ে ক্রশওয়ার্ড খেলতে খেলতে বিকেলের চায়ের আড্ডায় নরেন্দ্র দাভোলকার খুব হেসেছেন। ওহ ওয়েট! 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন'-র সাক্ষাৎ অবতার আপনি কিনা নরেন্দ্র দাভোলকার কে চিনতে পারছেন না? আচ্ছা, মনে করিয়ে দিচ্ছি! 
মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে পুনের ওমকারেশ্বর মন্দিরের কাছে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি খেয়ে মরতে হয়েছিল হিন্দু ধর্মের জাত-পাত, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার সৈনিক দাভোলকার কে। আর কালবুর্গি বলেছিলেন, "হিন্দু দেবদেবীরা মোটেও মহাশক্তিধর নন"। বলেছিলেন, "হিন্দু ধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মীয় আচার আসলে সমাজ শোষণের যন্ত্র"। আর তাই কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে, নিজের বাড়িতেই প্রকাশ্য দিবালোকে, খুন হতে হয়েছিল কালবুর্গি কে। 
জানেন, গৌরি লঙ্কেশও সাংবাদিক ছিলেন। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার কর্পোরেট পাপেট গিরি ছেড়ে কান্নাড় ভাষায় চালাতেন সাপ্তাহিক, 'লঙ্কেশ পত্রিকা'। অপরাধ? বুজরুগির   মুখোশ খুলে দিতেন হিন্দুত্ব ও সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শের। আর তাই বৃষ্টি ভেজা ব্যাঙ্গালুরুর স্নিগ্ধ সন্ধ্যায়, রাজরাজেশ্বরী নগরের ফ্ল্যাটে, তাঁর মাথায়, গলায় আর বুকে; তিনটে গুলি গেঁথে দিয়েছিল আততায়ীরা। 
ফরেনসিক জানিয়েছিল কালবুর্গি আর লঙ্কেশ কে খুন করা হয়েছে একই পিস্তলে। পুলিশি রিপোর্ট বলেছিল 'একই গ্রুপের দুষ্কৃতীরা রয়েছে দাভোলকার-কালবুর্গি-লঙ্কেশ খুনের নেপথ্যে'। নব্য ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডাররা একটু ঘেঁটে দেখবেন নাকি, সেদিন আমাদের দামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অপদার্থ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, লেজ-গোবরে অর্থমন্ত্রী, মেলোড্রামাটিক টেক্সটাইল মন্ত্রীরা টুইটারে কতটা শোক প্রকাশ করেছিলেন? 
শুনেছি হিন্টস দিলে ট্রেজার হান্টে সুবিধা হয়। দিচ্ছি। সেদিন বজরং দলের নেতা, ভুবিথ শেট্টী, কালবুর্গির মৃত্যুতে জান্তব উল্লাসে টুইট করেছিলেন—"হিন্দুত্ব কে নিয়ে তামাশা এবং একটি কুকুরের মৃত্যু।" হিন্দুবাদী টুইটার হ্যান্ডল, যাকে 'ফলো' করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, সেই নিখিল ধাদিচ গৌরি লঙ্কেশের মৃত্যু তে লিখেছিল "এক কুতিয়া কুত্তে কি মউত ক্যায়া মারি, সারে পিল্লে এক সুর মে বিলবিলা রহে হ্য।' আর অর্ণব? নাইট-শো তে বাণী দিয়েছিলেন, 'গৌরি লঙ্কেশের মৃত্যু পারিবারিক মনমালিন্যর কারণে।' কিউট না? হতেই হবে, 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন' বলে কথা! 
'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের' আবার ভ্যারাটিস ডিজাইন আছে। এই তো ৫ই অক্টোবর, সিদ্দিকি কাপ্পান, মালায়ালাম নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক কে হাথরাস ধর্ষণ কাণ্ডের রিপোর্টিং–র অপরাধে UAPA ধারায় গ্রেপ্তার করল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। এই তো ১২ই সেপ্টেম্বর ত্রিপুরার সাংবাদিক পরাশর বিশ্বাস কে আক্রান্ত হতে হল বিপ্লব দেবের সমালোচনা করার জন্য। মনিপুরের সাংবাদিক কিশোরেচন্দ্র ওয়াংখেম কে মনে পড়ে? 'দেশদ্রোহিতার' অভিযোগে যাকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে দুবার। এছাড়াও উত্তর প্রদেশের সাংবাদিক প্রশান্ত কানোজিয়া, আসামের রাজীব শর্মা, গুজরাটের ধ্রুভল প্যাটেল, হরিয়ানার নরেশ খোয়াল, দিল্লির রাজীব শর্মা এদের সবাই কে গ্রেপ্তার করেছে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিজেপি পুলিশ। হয় UAPA আর না হয় দেশদ্রোহিতার' অভিযোগে। 
তা তখন বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদের 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের' টুইট গুলো কোন চিলে-কোঠায় তোলা ছিল বলতে পারেন? নর্থব্লকের ছাদে না আম্বানির ২৬তলা ফ্ল্যাটের রুফ টপে? না বিজেপির ব্যবসায় 'all journalist are equal but Arnab Goswami is more equal than others'? 
স্বাধীনতা আন্দোলনের গর্ভে মিডিয়ার জন্ম এদেশে ১৮৬০-এ। মাত্র ১৮ বছরে ভারতের জাতীয়তাবাদী মিডিয়া জনমানসে ব্রিটিশ'দের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কে এমন সঙ্ঘবদ্ধ ও সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল যে ব্রিটিশ কূটনীতিবিদ লর্ড লিট্টন Vernacular Press Act' প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিল ভারতীয় মিডিয়ার 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের' খর্ব করতে। লন্ডনের রয়টার্স এজেন্সি SHM Merryweather কে স্রেফ ভারতের মিডিয়ার মোকাবিলা করতে 'স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট' হিসেবে এদেশে পাঠিয়েছিল। সেইসময় ভারতের মিডিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতেন গান্ধী, বাল গঙ্গাধর তিলক, আম্বেদকার, লালা লাজপত রায়'রা। 
আচ্ছা বুকে হাত রেখে বলুন তো, এই নাম গুলোর সাথে সাংবাদিক হিসেবে অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরীর মত দালালদের নাম উচ্চারণ করতে আপনার জিভ জড়িয়ে যায় না? লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে না?   
মিডিয়ার গণতন্ত্রে মিডিয়ার ভূমিকার দিশা নির্ধারণে ১৯৫৪ এবং ১৯৮৮ সালে আমাদের দেশে দুটো প্রেস কমিশন গঠিত হয়েছিল। দুটো কমিশনই রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছিল, কর্পোরেট পুঁজির মালিকানা আটকাতে না পারলে মিডিয়ার স্বাধীন নিরপেক্ষ ভূমিকা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব না। অমিত শাহদের 'প্রেস ফ্রিডম' কিম্বা 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন' নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম না হলে ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করছেন না কেন? অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরীরা মিডিয়া তে কর্পোরেট পুঁজির মালিকানার বিরুদ্ধে দুটো প্রাইম টাইম ডিবেট নামাচ্ছেন না কেন?
তাই সিলেক্টিভ প্রতিবাদের হিপোক্রিসি করবেন না প্লিজ! যদি আপনি 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের' পক্ষে হন, তাহলে দাভোলকার-কালবুর্গি-লঙ্কেশের খুনের সঠিক তদন্তের দাবী তে সোচ্চার হবেন না কেন? উমর খালিদ, সাফুরা জারগরদের জেলে যেতে হবে কেন? ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নাভলাখারা সরকারের বিরুদ্ধে লিখলেই 'আরবান মাওইস্ট' দাগিয়ে দেওয়া হবে কেন? নেহা দীক্ষিত জীবন বাজি রেখে আউটলুক পত্রিকায় উত্তর পূর্ব ভারতে RSS চাইল্ড র‍্যাকেটিং-র সাহসী খবর করলে কিম্বা রায়া আয়ুব গুজরাট ফাইলসের পাতায় সাহেব-গোলামের মুখোশ খুলে দিলে বিজেপি পুলিশ লেলিয়ে দেবে কেন?
আর শুনুন, চিটিংবাজ সাংবাদিক আমরাও অনেক দেখেছি। 'এক ফোনে একলাখ'-র সাংবাদিক দেখেছি, বুদ্ধবাবুর খুঁত ধরা ভুবনেশ্বরের জেলে ঘানি টানা সাংবাদিক দেখেছি, মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সফরে গিয়ে 'চামচ চোর' সাংবাদিকও দেখেছি। তাই অযথা অর্ণব গোস্বামী কে শহীদ বানানোর চেষ্টা করবেন না। উনি গ্রেপ্তার হয়েছেন সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে খবর করে না। তদন্তের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের পর নির্দোষ প্রমাণিত হলে নিশ্চয় ছাড়া পাবেন। রিয়া চক্রবর্তীর 'উইচ হান্ট' হ্যান্ডলের অভিজ্ঞতা থেকে উনি নিজেও সেটা জানেন। 
তাই আপনারা অযথা আবেগতাড়িত হবেন না। উনি যতক্ষণ জেলে থাকেন ততক্ষণই লাভ। ওনার গলাটাও রেস্ট পাবে। কালীপূজাতে শব্দ দূষণও কম হবে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২০

জীবনানন্দ দাশকে যেমন দেখেছিলাম ~ অরুণকুমার সরকার

অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর দরজা একটুখানি ফাঁক হল। সেই সামান্য ফাঁকটুকু আড়াল ক'রে কবি এসে দাঁড়ালেন। মুখে চোখে কেমন যেন ভয়-ভয় ভাব। টুকরো টুকরো এমন কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করলেন যা প্রায় অর্থহীন স্বগতোক্তির সামিল। কথোপকথন হোঁচট খেতে খেতে আর এগোতে পারল না। দরজা থেকেই ফিরে আসতে হল। জীবনানন্দের সঙ্গে যাঁরা দেখা করতে গিয়েছেন তাঁদের অনেকেরই প্রাথমিক অবস্থা এই রকম।
আজ থেকে ষোল বছর আগে ১৯৫২ সালের একটি সন্ধ্যার কথা মনে পড়ছে। আমরা তিন বন্ধু––নরেশ গুহ, অশোক মিত্র, আর আমি একরকম জোরজার করে ঢুকে পড়েছি জীবনানন্দ দাশের ল্যান্সডাউন রোডের ভাড়াটে বাড়িতে। কবি থাকেন একতলার কোণের একটি ঘরে। একাই থাকেন। সম্পূর্ণ নিরাভরণ ঘর। একটি তক্তাপোষ, যৎসামান্য শয্যা, এককোণে কুঁজোভর্তি জল আর এককোণে একরাশ খবরের কাগজ। ঘরের সামনে চওড়া বারান্দা, একটুকরো জমি, নিমগাছ। অনুরোধের অপেক্ষা না রেখেই আমরা বারান্দায় বসে পড়লাম। চেয়ার, মোড়া বা মাদুরে নয়, স্রেফ সিমেন্টের উপরে। কবিও বাধ্য হয়ে আমাদের পাশে হাঁটু মুড়ে বসলেন। গায়ে গেঞ্জি।
এই তবে জীবনানন্দ দাশ?  এমন সাদামাঠা, মফঃস্বলের যে কোনও প্রৌঢ়ের মতো এত সাধারণ? আমি রিপন কলেজের ছাত্র। বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়––এই তিনজন আধুনিক কবিকে তাঁদের যৌবনকালে শিক্ষক হিসেবে খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি পোষাকে-পরিচ্ছদে তাঁরা কত ছিমছাম, আচারে ব্যবহারে কী শৌখিন, কত সাবধান, কিছুটাবা উন্নাসিক। নিখুঁত সাহেবী পোষাক পরা অনিন্দ্যকান্তি কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তকেও দেখেছি। সুতরাং আধুনিক কবিদের অন্যতম জীবনানন্দের চেহারা সম্বন্ধে মনের মধ্যে মোটামুটি একটা ছবি আঁকা হয়েই ছিল। বলাবাহুল্য, জীবনানন্দকে দেখে সে ছবিটা মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গেল।
কিন্তু কি আশ্চর্য তার জন্যে মোটেই দুঃখ পেলুম না। বরং আশ্বস্ত হলুম এমন একজন কবিকে দেখতে পেয়ে যাঁর কোন মুখোশ নেই, যাঁর কাছে হাত-পা ছড়িয়ে বসা যায়, যাঁর সঙ্গে কথা বলার আগে ভেবে নিতে হয় না কি বলব। যাই হোক, কোনরকম ভণিতা না করে আমরা সরাসরি দাবী জানালুম,  'আপনার মুখ থেকে কবিতা শুনতে চাই।'
জীবনানন্দ কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে উঠলেন। এড়িয়ে গেলেন আমাদের অনুরোধ। আমরাও নাছোড়বান্দা, কবিও অনড়। শেষ পর্যন্ত এক কাণ্ড করে বসলুম। শুরু করলুম জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করতে। কখনো একক, কখনোবা যৌথভাবে একনাগাড়ে দেড় ঘন্টা দু-ঘন্টা ধরে জীবনানন্দের একটির পর একটি কবিতা আমরা আবৃত্তি করে চললাম। বই দেখে নয়, মন থেকে। অশোক মিত্র থামেন তো আমি ধরি, আমি থামি তো নরেশ গুহ। কোথাও আঁটকে গেলে একে অন্যকে সাহায্য করি।
স্পষ্টই বোঝা গেল জীবনানন্দ অভিভূত হয়ে পড়েছেন; বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তরুণ কবিরা তাঁর কবিতা এত যত্ন নিয়ে, এত আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করে। চল্লিশ বা পঞ্চাশ দশকের প্রত্যেকটি কবির উপর যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, অনেককেই অনেক দিন ধরে আড়ষ্ট, আচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন, নিজের কবিতা সম্বন্ধে তাঁর মনে এত দ্বিধা ছিল কেন? ছিল একাধিক কারণে, নিজের অগণিত পাঠকদের সঙ্গে জীবনানন্দের কোন যোগাযোগ ছিল না। তাঁর না ছিল দল, না ছিল শিষ্য, না ছিল নিজস্ব কোন পত্রিকা। বলতে গেলে কলকাতার বাইরে বাইরেই জীবন কাটিয়েছেন। সভা সমিতিতে পদার্পণ করেছেন ক্বচিৎ কদাচিৎ অনেক টানাহেঁচড়ার পর, তাও জীবনের শেষ দুটো বছরে। তাই জীবনানন্দ জানতেন না, জানবার তাঁর কোন উপায় ছিল না যে রজনীগন্ধার মতো নিজের অগোচরে তিনি হাজার পাঠকহৃদয় স্বপ্নে ভরে রেখেছিলেন। নিজের কবিতা সম্পর্কে তাঁর সংকোচের আরো কারণ ছিল। প্রভাবশালী রক্ষণশীল দল যে তাঁর কবিতা পছন্দ করে না। তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে থাকে একথা তিনি জানতেন। আর এটাও তিনি পরম দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছিলেন যে এক বুদ্ধদেব বসু ছাড়া তিরিশের যুগের কোন কবিই তাঁকে বিশেষ আমল দেননি।
যাই হোক, ১৯৫২ সালের সেই স্মরণীয় সন্ধ্যায় শেষ পর্যন্ত আমাদের জিৎ হয়েছিল। জীবনানন্দ দাশ কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন আমাদের বনলতা সেন এবং আরো কয়েকটি কবিতা। আবৃত্তি কেমন করেছিলেন মনে নেই। শুধু মনে আছে, আবৃত্তিকালে তাঁকে আর সাধারণ মানুষ বলে মনে হচ্ছিল না। বারান্দার সেই অস্পষ্ট অন্ধকারে আমরা জীবনানন্দের চোখে এক অপার্থিব আলোক দেখতে পেয়েছিলাম। অবিস্মরণীয় সেই চোখ, সেই দৃষ্টি, গভীর, উজ্জ্বল, বাঙময়।
বাস্তবিক, জীবনানন্দের মতো এমন সহজ সরল নিরহঙ্কারী অথচ অতিরিক্ত আত্মসচেতন স্বভাব লাজুক মানুষ অল্পই চোখে পড়ে। একবার মনে আছে, কোন একটি পত্রিকার জন্য তাঁর কাছে একটি কবিতা আনতে গিয়েছিলাম। আমি আর আমার বন্ধু নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। আগে থাকতেই খবর দেওয়া ছিল তাই দরজা থেকে বিদায় নিতে হয়নি। মনে পড়ে, কোন বাক্য বিনিময়ের আগেই কবি একটি খাম আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন। খামের মুখ খুব শক্ত করে আঁটা। জীবনানন্দের কবিতা সম্বন্ধে আমাদের তখন অসীম আগ্রহ, নতুন কবিতাতে তো আরো বেশি। তাই তাঁর সামনেই খামটা খুলতে চেষ্টা করলুম! কবি হা-হা করে উঠলেন। হাত চেপে ধরলেন। কিছুতেই তাঁর সামনে খামটি খুলতে দিলেন না। কিছুতেই না। আমরা পরে রেঁস্তরায় বসে কবিতাটি পড়েছিলাম।
জীবনানন্দ একা একা তাঁর মনোজগতে বাস করতেই ভালোবাসতেন। মনুষ্য সঙ্গ, বিশেষ করে কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গ, যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতেন। তাদের সঙ্গে কিছুতেই সহজ––স্বাভাবিক হতে পারতেন না। তাই বলে ঘরে খিল এঁটে বসে থাকার লোক ছিলেন না তিনি। তাঁর নেশাই ছিল মানুষের ভিড়ে ঘুরে বেড়ানো। নিজেই দ্রষ্টব্য হয়ে পড়লে আর দর্শক থাকা যায় না। তাই কবি পরিচয় গোপন রেখে ছদ্মবেশীর মতো ঘুরে বেড়ানোই হয়তো জীবনানন্দের পছন্দসই ছিল। হেঁটে হেঁটে দেখেছেন বলেই হয়তো মানুষ এবং প্রকৃতিকে অমন নিবিড়ভাবে তিনি চিনতে পেরেছিলেন; অনেক অনেক বাস্তববাদী কবির চাইতেও বিভিন্ন স্তরের মানুষকে খুব কাছ থেকে আরো খুঁটিয়ে দেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। গ্রামের মাঠে, নদীকূলে যেমন, তেমন এই শহরের অলিগলি––ফিয়ার্স লেন, টেরিটি বাজার কি চেতলার হাটও তাঁর অনধিগম্য ছিল না। এমন কি রাস্তার ভিখিরিদের জীবনযাত্রার খুঁটিনাটিও তাঁর চোখ এড়ায়নি। এই পথ চলার অভিজ্ঞতা তাঁর বিভিন্ন কবিতায় ছড়িয়ে রয়েছে।
...........    >... 

জীবনানন্দের হাঁটার কায়দাটাও অদ্ভুত ছিল। কোঁছাটাকে প্রায় হাঁটুর উপর পর্যন্ত তুলে, রাস্তায় যেন খুব জল জমেছে এমন ভঙ্গিতে, পথ চলতেন তিনি। কেমন যেন ধ্যানস্থ। পরিচিত জনকে এড়িয়ে চলতেন, দেখতে পেলেই চলার গতি অকস্মাৎ বাড়িয়ে দিতেন। কিংবা ঢুকে পড়তেন আশপাশের অলিগলিতে অথবা চলে যেতেন নাগালের বাইরে সটান অন্য ফুটপাথে। একেবারে মুখোমুখি হয়ে গেলে, ধরা পড়ে গেছেন এমন একটা ভাব ফুটে উঠত তাঁর চোখে। সাহিত্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করতেন না। বলতেন, ''একটা বাসা খুঁজে দিতে পারেন?" ইতর প্রতিবেশী তাঁর জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
একটু বেশি রাতে, অনেক সময় প্রায় একটা দুটো অব্দি, দক্ষিণ কলকাতার লোকাঞ্চলে প্রায়ই তাঁকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। কোন কোন দিন মৌন সঙ্গী থাকত কেউ, অধিকাংশ দিনই একা একা। বেশ কয়েক বার সন্দেহবশত পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে টালিগঞ্জ থানায়। থানা অফিসার কবিকে চিনতেন। জীপে করে আবার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছেন। জীবনানন্দের নৈশভ্রমণের একজন সঙ্গী্র কাছে শুনেছি মাঝে মাঝে কবি ছেলেমানুষের মতো ব্যবহার করতেন। এখন যেখানে রবীন্দ্র স্টেডিয়াম সেইখানে অন্ধকার মাঠের মধ্যে রেলিং টপকে ঢুকে পড়তেন। ভাঙা ডালপালা কুড়িয়ে নিয়ে ছুঁড়ে দিতেন পার্শ্ববর্তী কোন গাছের শাখা লক্ষ্য করে। কয়েকটা কাক বা চড়ুই চিৎকার করে উড়ে যেত। কবি বলতেন––'চুপ, চুপ।'
'দেখতে পাচ্ছ?'
'কি আবার দেখব?'
'দেখছ না অন্ধকারে সমুদ্রে কেমন ঢেউ উঠেছে? কেমন স্পষ্ট ঢেউ! দেখছ না হাওয়ার রঙ?' বলেই একেবারে স্তব্ধ হয়ে যেতেন। ভীষণ গম্ভীর।
পরদিন দেখা হলে বলতেন, 'কাল গাছটাকে লক্ষ্য করে ঢিল না ছুঁড়ে মরা ডাল ছুঁড়লুম কেন বলতে পারো?'
'না তো।'
'ঘুমের মধ্যে শরীরে প্রিয়জনের হাত এসে লাগলে ঘুম ভাঙে না কিন্তু অপরিচিতের স্পর্শে আঁতকে উঠি আমরা। ইঁট ছুঁড়লে ঘুমন্ত গাছটা ভয়ে চিৎকার করে উঠত।' বলেই হা-হা করে হেসে উঠতেন। জীবনানন্দের সেই না-থামা বিখ্যাত হাসি।
বাংলাদেশের গাছপালার প্রতি কবির পক্ষপাত এতই প্রবল ছিল যে এ ব্যাপারে তাঁর বাছবিচার ছিল না। এমন কি পুঁই গাছের ফুলও তাঁর ভালো লাগত। ছোটবেলায় তাঁর শখের পুঁইগাছটা কেটে কেউ চচ্চড়ি রেঁধেছিল বলে ভাত খাওয়া বন্ধ করেছিলেন তিনি। এ গল্প অনেকের কাছেই শোনা যায়। জীবনানন্দের একটা নেশা ছিল রাতের পর রাত জেগে তন্ময় হয়ে ফুল ফোটার রহস্য উপভোগ করা। কেমন করে পাপড়িগুলো আস্তে আস্তে কাঁপতে কাঁপতে এই একটুখানি খুলে যাচ্ছে, বন্ধ হচ্ছে, আবার খুলে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে, অবশেষে ভোরের আলোয় ফুল হয়ে ফুটে উঠছে–-এসব খুঁটিনাটি দেখতে কবি বিশেষ ভালোবাসতেন।
নিজেকে দ্রষ্টব্য করে তোলার অশ্লীলতা জীবনানন্দকে স্পর্শ করেনি, তাঁর প্রতি নয়, তাঁর কবিতার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হোক––এটাই তিনি চেয়েছিলেন। দাড়ি কামিয়ে এবং ঈষৎ গোঁফ রেখে, আর কোনরকম নেশাভাঙের মধ্যে না গিয়েও আধুনিক কবিদের তিনি বশীভূত করেছেন! আশ্চর্য নয় কি? আমার মনে হয় চল্লিশের কবিরা অনায়াসে দাবি করতে পারেন যে তাঁরাই জীবনানন্দকে তাঁর যথাযোগ্য স্থানে স্থাপন করেছেন। তিরিশের কবিরা বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে বাদ দিয়ে বলছি, জীবনানন্দকে সহ্য করেছেন কিন্তু স্বীকার করেননি। তাই, যদিও 'ধুসর পাণ্ডুলিপি' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৬ সালে, প্রাপ্য প্রতিষ্ঠা এবং স্বীকৃতির জন্য জীবনানন্দকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আধুনিক কবিতার ইতিহাসে ১৯৪২ সালটি উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এই বছরেই কবিতাভবন থেকে এক পয়সার একটি সিরিজে জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন' প্রকাশিত হয়। চার আনা দামের মাত্র ষোল পাতার এই কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকমহলে , বিশেষ করে তদানীন্তন তরুণ কবিদের মধ্যে এক নিদারূণ উত্তেজনা ও আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। কলেজে, কফি হাউসে, কথোপকথনে, চিঠিপত্রে তরুণ কাব্যানুরাগীদের মধ্যে জীবনানন্দ ছাড়া আর কোন আলোচ্য ছিল না। জীবনানন্দ প্রেমিক আমার এক বন্ধু একাই বনলতা সেনের কুড়ি, পঁচিশ কপি কিনে বন্ধুমহলে বিতরণ করেছিলেন বলে মনে পড়ে। অনেক অনেক গভীর রাত্রে মোমবাতির অস্পষ্ট আলোয় যূথবদ্ধভাবে আমরা জীবনানন্দের কবিতা পড়েছি। হয়তো একই কবিতা কিন্তু বারবার বারবার। হরিণেরা জানে তাহা!

[  লেখাটা ১৯৬৮তে কলকাতা বেতার কেন্দ্রে পঠিত... ]

বানান অপরিবর্তিত রয়েছে। সংগ্রাহকের জন্য শুভেচ্ছা, নাম মনে নেই।

সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২০

হুদুড় দূর্গা ~ ঋতুপর্ণ বসু

সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল,  অসুর, কুড়মি, মাহালী, কোড়াদের নিয়ে খেরোয়াল জাতি। 

সেই জাতির রাজা ছিলেন হুদুড় দুর্গা কিস্কু বা ঘোড়াসুর । তিনি সমস্ত পাহাড়, জঙ্গল, নদী ও চারণভূমির অধিপতি ছিলেন। 

আর্যরা বারবার তাঁর  রাজ‍্যকে আক্রমণ করেও পরাক্রমী হুদুড় দূর্গার কাছে হেরে যেতে লাগল। 

তখন তারা  এক সুন্দরী নারীকে হুদুড় দূর্গার কাছে পাঠালো। 

এই যুবতী  ছিলেন গণিকাপ্রধানা, সেইসঙ্গে  আর্যদের ট্রেনিংপ্রাপ্ত ঘাতক। 

 মহিলাটির সৌন্দর্য্য ও ছলাকলায় মুগ্ধ হয়ে হুদুড় রাজা তাকে বিয়ে করল। 

নয়দিন উদ্দাম মধুচন্দ্রিমার পরে নববধূ  হুদুড়কে মেরে ফেলল। 

দেবতাদের সমর্থনপুষ্ট ওই নারী হুদুড় দূর্গাকে হত‍্যা করে পরিচিত হন দেবী দুর্গা হিসেবে। 

আর্যরা এবার নেতৃত্বহীন ভূমিপুত্রদের  সুবিশাল সাম্রাজ‍্য দখল ক‍রে তাদের তাড়িয়ে দিল। 

তারা পালিয়ে বেড়াতে লাগল ঝাড়খন্ড, ওড়িশা, বাংলা ও ছত্তিশগড়ের পাহাড়ে জঙ্গলে। 

সেই ধাক্কা আজো  ভূমিপুত্র বা মূলনিবাসীরা  কাটিয়ে উঠতে পারেনি।  

এই হল সংক্ষেপে হুদুড় দূর্গার গল্প। 

প্রচার করা হচ্ছে যে এই  হুদুড় দুর্গাই হলেন দেবী দুর্গার বধ‍্য মহিষাসুর। 

..................................................................................

২০১৩ সালের ১৭ই অক্টোবর  দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ক‍্যাম্পাসের   SSS 1 প্রেক্ষাগৃহে   "মহিষাসুর শাহাদাত দিবস" পালন করে। 

অনুষ্ঠানটির আহ্বায়ক ছিল   All India Backward Students Forum. 

সেই উৎসবের প্রস্তাবনায় বলা হয় দুর্গা কোন নারীশক্তির প্রকাশ নয়।  দুর্গা আর তার আখ‍্যান হল আরও একটা ব্রাহ্মণ‍্যবাদী প্রকল্প, যে ব্রাহ্মণ‍্যবাদী দর্শনের প্রতি মজ্জায় মিশে আছে পুরুষতন্ত্র। 

"Durga Puja is the most controversial racial festival, where a fair skinned beautiful Goddess is depicted brutally killing a dark skinned native called Mahishashura. " 

মহিষাসুর কোন অশুভ শক্তির প্রতীক নন‌। তিনি শহীদ। 

দুর্গোৎসব হল আদিবাসী গণহত্যার উদযাপন। এটি অবিলম্বে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। 

" The festival is a celebration of genocide of natives.  .....  Its a celebration of murder unlike in any other religion. ....  It must be banned." 

দেবী দুর্গা হলেন দেবতাদের ভাড়া করা এক যৌনকর্মী। 

"They hired a  sex - worker  called Durga, who enticed Mahishashura into marriage and killed him after nine nights of honeymooning, during sleep. " 

( Pamphlet  by  AIBSF, Mahishashur Martyrdom Day, 17th October, 2013 ) 

শুভ অশুভের দ্বন্দ্ব নয়,  আগ্ৰাসী  বহিরাগত আর্যরা  ভারতবর্ষের মূলনিবাসী বহুজনদের কিভাবে পদানত করে সাংস্কৃতিক আধিপত‍্য কায়েম করে রেখেছে, দুর্গাপূজা তারই প্রতীক। 

বিষয়টি নিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী স্মৃতি ইরানি ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ সালে   সংসদে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। 

এই বিতর্কিত প্রচারপুস্তিকাটির অংশবিশেষ তিনি ভারতের জাতীয় সংসদে পড়ে শোনান। 

.............................................................................

মহিষাসুরের পিতৃপরিচয় পাওয়া যায় দেবী ভাগবত, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণ ও কালিকাপু্রাণে। 

ব্রহ্মার পুত্র মরীচি, মরীচির পুত্র কশ‍্যপ বিখ‍্যাত মুনি। এই কশ‍্যপমুনির ছেলে রম্ভ, আর রম্ভের ছেলে মহিষ। সে শিবের উপাসক। 

তবে সে অনার্য কোথায় হল ? 

বেদে অসুর ও দেব, ঐ দুই কথার অর্থই শুভ। 
দেব কথাটির অর্থ দীপ্তিমান / প্রকাশমান  এবং অসুর অর্থে প্রাণবান। 

ব্রহ্মার পুত্র কশ‍্যপের স্ত্রী অদিতি  থেকে উৎপন্ন হয়েছে  দেব উপাসকদের  বংশধারা । আরেক পত্নী দিতি হলেন অসুরপন্থীদের আদি মাতা।

বেদে ইন্দ্র, বরুণ,  রুদ্রকে  অসুর মহস বলা হয়েছে। 
 ( ত্বম অগ্ৰে রুদ্র অসুরঃ মহস দিবঃ  ঋগ্বেদ ২-১-৬)

ঋগ্বেদে আছে দেব ও অসুর দুজনেই সৌমনস (  জ্ঞান )  লাভ করছেন উপাসনা দ্বারা। 

যক্ষা মহে সৌমনসায় রুদ্রম। 
নমোভির্ দেবং অসুরং দুবস‍্য ।।

                                            (  ঋগ্বেদ ৫ - ৪২ - ১১ )

কাজেই পৌরানিক অসুর আর উপজাতীয় অসুর এক নয়। 

 চিরাচরিত  প্রথা অনুযায়ী দুর্গাপুজো হত বসন্তকালে। তাই একে বাসন্তীপুজোও বলেন কেউ কেউ। 

ট্র্যাজিক নায়ক হুদুড় দুর্গাকে নাকি  আদিবাসীরা যুগ যুগ ধরে দুর্গাপুজোর সময় স্মরণ করে আসছে। 

কিন্তু বাংলায় দুর্গাপুজা  ব‍্যাপারটাই তো অকালবোধন। এবং প্রচলন খুব বেশিদিনের নয়। 

তবে তার আগে কোথায় ছিলেন হুদুড় দুর্গা ?

সাঁওতালীতে   হুদুর শব্দের অর্থ মেঘের গর্জন বা বাজের শব্দ। সাঁওতালী লোককথাতে এমন এক বিশাল প্রভাবশালী এবং প্রজাদরদী রাজার উল্লেখ আছে। 

কিন্ত তিনিই যে মহিষাসুর এবং সেই হুদুর দুর্গা যে দুর্গা দ্বারা নিহত হন এমন কিন্ত উল্লেখ নেই।

দাঁশায়, সোহরাই, কারাম, লাগড়ে, দং - এর মত লৌকিক পরম্পরার মধ‍্যে  আর্য - অনার্য যুদ্ধ, মহিষাসুরের মত বিষয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এই নিয়ে বৃদ্ধ সাঁওতালদের অনেকেই ক্ষুব্ধ। 

তাঁরা নিজেদের বলেন ' খুৎকাঠিদার'। পৃথিবীতে বাসের অযোগ্য, আবাদের অযোগ‍্য ভূমিকে কঠোর পরিশ্রমে চাষের উপযোগী করে তুলেছিলেন এই হড় ( সাঁওতাল )  জাতি। তাদের সৃষ্টিতত্ত্বে আছে পিলচু হড়াম আর পিলচু বুড়ির কাহিনী। 

তাঁরা  যুগ যুগ করে প্রকৃতি উপাসক। তাঁদের মধ‍্যে হুদুড় দুর্গার পূজারীরা নেই। 

সোহরাই উৎসবেও মহিষাসুরের অনুষঙ্গ ঢোকানো হচ্ছে। কিন্তু সোহরাই তো আদ‍্যোপান্ত একটি কৃষি উৎসব। সেখানে গো - বন্দনাই মূল উপজীব‍্য। 

 সাঁওতাল ছেলেদের অনেকেই সিংহবাহিনীর মন্দিরে পূজো দেয়। স্কুলের সরস্বতী পূজোতেও শামিল হন সাঁওতাল ছাত্ররা । আবার একই উৎসাহে  তারা বড় বাঁধনা, ছোট বাঁধনা পরবেও মেতে ওঠে। 

কিন্তু এই বিষয়টিকে আদিবাসী জাতিসত্ত্বার নবীন রক্ষকরা ভালো চোখে দেখছেন না। এরাই হুদুড়ের প্রবক্তা। 

..............................................................................

আশ্বিন মাসকে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ বলেন দাঁসায় মাস। ঠিক দুর্গাপুজার সময় হলেই সাঁওতাল অধ‍্যুষিত অঞ্চলে পুরুষরা নারীসাজে সজ্জিত হয়ে এক গ্ৰাম থেকে অন‍্য গ্ৰামে দাঁশায় নাচ নেচে বেড়ায়। 

তাঁদের হাতে থাকে লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো     ভূয়াং নামে এক বাদ‍্যযন্ত্র। 

এই দাঁশায় সম্পূর্ণরূপে কৃষিভিত্তিক পরব ও প্রকৃতিবন্দনার উৎসব। ইদানিং এটিকে হুদুড় দুর্গার কাহিনীর সাথে  জুড়ে দেওয়া হয়েছে। 

বলা হচ্ছে, দুর্গা পুজা আদিম জনজাতির পক্ষে শোকের উৎসব। ঐসময় তাঁদের মহান রাজা ও দেশ হারানোর ব‍্যাথা নিয়ে আদিবাসীরা পিতৃপুরুষের স্মরণে ' হায় রে , হায় রে '  করতে করতে গ্ৰাম প্রদক্ষিণ করে। তারা ধারণ করে নারীর বেশ। 

 পূজার সময় নাকে, নাভিতে , বুকে করঞ্জার তেল লাগাতে হবে। ওই জায়গাগুলি থেকেই তো মহিষাসুরের রক্তক্ষরণ হয়েছিল। 

এছাড়া পুজোর কটাদিন দুয়োর এঁটে শোকপালন করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে  তাঁদের মধ‍্যে। 

এছাড়া মহিষাসুরের মূর্তি গড়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করার রীতি চালু হয়েছে তাঁদের মধ‍্যে। 

আগে কুড়মি মাহাতোরা গড়ামথানে মাটির হাতি ঘোড়া রেখে দিতেন, কিন্তু মূর্তি গড়ে হাত জোড় করার রীতি একেবারেই নবীন। 

................................................................................

কতটা তাত্ত্বিক ভিত্তি আছে এই হুদুড় দুর্গার  ? 

শরৎচন্দ্র দে ১৯২১  সালে  লিখেছিলেন Mundas and their Country.

সেখানে হুদুড়কে পাবার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত। 

১৯২৮  সালে John Baptist Hoffman এর পনেরটি ভল‍্যিউমে  Encyclopedia Mundarica  গ্ৰন্থ প্রকাশ হয়‌। 

মুন্ডা জনজাতির সামাজিক নিয়ম, রূপকথা, কিংবদন্তি, ভূতপ্রেত, সৃষ্টিতত্ত্ব, ওঝা, পরব ইত‍্যাদি প্রায় সবটাই ধরা রয়েছে ব‍্যাপটিস্ট সাহেবের অক্লান্ত প্রচেষ্টায়। 

সেখানে এই হুদুড় দূর্গার কাহিনী নেই। 

নৃতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক  K. K. Leuva ছিলেন রাঁচীর  Assistant Commissioner of Scheduled Castes and Scheduled Tribes.
 
১৯৬৩  সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ফল  The Asur -. A study of Primitive Iron Smelters. 

সেখানে কোথায় এই হুদুড় দূর্গার কাহিনী ? 

এছাড়া রয়েছে  Bulletin of Bihar Tribal Research Institute (1964). 

হুদুড় দুর্গা সেখানেও নিরুদ্দেশ। 

আরো বিস্তারিত জানার জন‍্য রয়েছে তিনটি বই ; 

  নর্মদেশ্বর প্রসাদের Tribal people of Bihar ( 1961) 

  K. S. Singh এর Tribes of India ( 1994 ) 

   জে এম কুজুরের  Asurs and their Dancers ( 1996)  

এই বইগুলিতেও কিছুই পাওয়া যায় না এই সম্পর্কে। 

নাদিম হাসনাইনের বইটি ভারতীয় জনজাতিদের সম্পর্কে একটি আকরগ্ৰন্থ। সেখানে অসুর সহ বিভিন্ন উপজাতির  উপর বিস্তারিত লেখা আছে। আছে তাদের  নানা সাংস্কৃতিক প্রবণতা নিয়ে বিশদ আলোচনা। বইটি এককালে খুঁটিয়ে পড়েছি। 

সেখানে ঘুনাক্ষরেও উচ্চারিত হয়নি এই হুদুড় দুর্গা। 

............................................................................

অস্ট্রো এশিয়াটিক অসুর গোষ্ঠীকে দেখা যায় ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায়। 

এই অসুরদের মধ‍্যে তিনটি ভাগ। বীর অসুর, বীরজা অসুর, আগারী অসুর। 

এই অসুররা " লোহাপাথর " দেখলেই চিনতে পারে। 
অতুলনীয় দক্ষতায় নিজস্ব  লোকপ্রযুক্তি ব‍্যবহার করে পাথর থেকে লোহা গলিয়ে বের করে নেয় । এরা এককালে  নানারকমের আয়ুধ ও যন্ত্রপাতি বানাতে সিদ্ধহস্ত ছিল। 

 বলা হয়,মৌর্য সাম্রাজ‍্যের সাফল‍্যের  পিছনে  তাদের তৈরী লোহার অস্ত্র ও যন্ত্র একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। তাদের উৎপাদিত লোহার সামগ্ৰীতে জং ধরত না। 

তবে ১৯০৭  সালে তাদের বিচরণভূমির ওপরেই গড়ে ওঠে টাটা স্টীল কারখানা। ব্লাস্ট ফার্ণেস পদ্ধতিতে উৎপাদিত লোহার সামনে তাদের প্রযুক্তি হটে যায়। এখন তারা তাদের বংশপরম্পরায় চলে আসা দক্ষতাকে প্রায় ভুলেই গেছে। 

২০১১  সালের আদম শুমারী অনুযায়ী ভারতে অসুর জনজাতির সংখ্যা প্রায়  ৩৩, ০০০। পশ্চিমবঙ্গে ৪৯৮৭। ঝাড়খণ্ডে ২২, ৪৫৯।  বিহারে ৪১২৯। 

এই অসুরদের আসুরি ভাষা মুন্ডা উপভাষার মধ‍্যে গণ‍্য। কিন্তু এটি বলার লোক এখন বিরল। 

জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা ব্লকের ক‍্যারন চা বাগানের  ১০১ টি অসুর পরিবারের মধ‍্যে  ৯০  টি পরিবারই খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেছে মিশনারীদের ক্রমাগত প্রচেষ্টার ফলে। 

এছাড়া অসুর উপজাতিদের দেখা যায় বানারহাট, চালসা ইত‍্যাদি জায়গায়। 

এরা নিজেরা অবশ‍্য বলে যে তারা ঝাড়খণ্ডের গুমলা  ও লোহারডাগা থেকে এসেছে। 

এরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এদের বংশের আদিপুরুষ হলেন মহিষাসুর। 

কান‍্যকুব্জের ব্রাহ্মণদের একটি শাখা দাবী করে রাবণ তাদের পূর্বপুরুষ। 
 
যাদবরা মনে করেন তাঁরা কৃষ্ণের বংশ। 

হিমাচল প্রদেশে দূর্যোধনের মন্দির আছে। সেখানকার কিছু লোকজন মহাভারতের খলনায়ককে রীতিমতো উপাসনা করেন। 

বৈচিত্র্যময় ভারতবর্ষে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী পুরাণ ও মিথের সাথে নিজেদের জুড়তে চায়। 

মুশকিল হয় যখন এইসূত্রে কিছু দুষ্টু লোক সরল মানুষদের  জাতিসত্ত্বার নাম করে অন‍্যদের বিরুদ্ধে উসকে দেয়। 

....................................................................

" এটা মামুলি ব‍্যাপার নয়। এটা জাতিসত্ত্বার ব‍্যাপার। এটা নিজস্ব কালচারে উদ্ধুদ্ধ হবার একটা নিশানা। .... ইতিহাসটা আর্যরা লিখেছেন, তাদের পক্ষে। আর্যরা সেদিন সামনে আনতে দেননি, রামচন্দ্র কেন শম্বুককে হত‍্যা করেছিল। আপনারা সামনে আনতে দেননি একলব‍্যের আঙুল কাটা হয়েছিল কেন ? " 

 বললেন বাঁকুড়া জেলা পরিষদের সভাপতি মৃত‍্যুঞ্জয় মূর্মু। ৬ই অক্টোবর, ২০১৯  সালে বাঁকুড়ার রায়পুর সবুজ বাজার সিধু কানু মোড়ে  রায়পুর হুদুড় দূর্গা স্মরণসভা কমিটির অনুষ্ঠানে। 

উপস্থিত ছিলেন রায়পুর বিধানসভার বিধায়ক বীরেন্দ্রনাথ টুডু, ভারত জাকাত মাঝি পরগণা মহলের বাঁকুড়া জেলা গড়েৎ বিপ্লব সরেন। 

             ( সারসগুন পত্রিকা, ৮ই অক্টোবর, ২০১৯)

..........................................................................

  সাঁওতাল খেরোয়াল একটিভিস্ট অজিত হেমব্রম। ২০১৬  সাল থেকেই  তিনি হুদুড় দূর্গা স্মরণ উৎসবের প্রধান সংগঠক। ' আয়নানগর" পত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ ; 

" আমাদের একটি প্রধান উৎসব হলো দশানি।

 এটাকে দুঃখ উদযাপনের দিন বলা যেতে পারে। কেননা এই দিনে আমরা আমাদের সবকিছু হারিয়েছি। প্রাচীন কালে খেরোয়ালদের একজন মহান নেতা ছিলেন। যিনি বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। 

তাকে বিদেশিরা নানা ছলাকলায় যুদ্ধে পরাজিত করে। আমরা তার মতো এমন নেতৃত্ব আর পাইনি। তাই আমরা তাকে শ্রদ্ধা করি এবং হুদুড় দুর্গা বলে ডাকি। দশানি তার স্মরণেই পালন করা হয়ে থাকে।"

 "যখন ঝাড়খন্ড আন্দোলন এবং  আদিবাসী ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যখন যুক্ত হয়েছি তখন থেকে আমরা আমাদের আত্ম পরিচয় নিয়ে সচেতন হতে শুরু করেছি। 

আমরা জানতে পারি যে হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী আমরা আসলে হিন্দু নই। আমাদের পূর্বপুরুষদের হিন্দুরা অসুর, দানব এবং রাক্ষস বলেই জানে। 

২০১১ সালের দিকে বিজেপি ক্ষমতা আসার পূর্বে বাবা রামদেব ঘোষণা দিয়েছিলেন ভারতবর্ষকে পুনরায় তিনি রামরাজ্য, কৃষ্ণরাজ্যে পরিণত করতে চান। যখন আমি টিভিতে বাবা রামদেবের নির্বাচনী প্রচারণা দেখছিলাম তখন মনে হলো যদি হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে খুব দ্রুত আমাদের জাতিসত্তা ধ্বংস হয়ে যাবে।

 কিন্তু দুঃখজনক  ভাবে বিজেপি আবার ক্ষমতায় চলে আসে।  

তখনো আমি এ রকমভাবে এই উৎসব উদযাপনের কথা চিন্তা করিনি। 

আমাদের গ্রামে নানা উপজাতি এবং সম্প্রদায়ের লোকজন আছে। 

আমরা সাঁওতালরা হিন্দুদের মন্দিরে কখনো যাই না। আমরা তাদের রীতিনীতিও অনুসরন করি না।

 কিন্তু আমাদের স্ত্রীরা দুর্গাপূজা করেন। তবে সেদিন আমি বাড়িতেই থাকি এবং আমার কাছে এই বিষয়গুলো ভেবে অদ্ভুত লাগে। 

আসলে আমাদের লোকজন তাদের আত্মপরিচয় এবং ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না।

 যারা অল্প বিস্তর জানে তারাও দেখা যায় অন্যান্যদের মধ্যে সেটির কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। আমি একটা উপায় খুঁজছিলাম।

অনেক আগে পরিমল হেমব্রমের লেখা একটি বই পড়ে মহিষাসুর সম্পর্কে জানতে পারি যে, মূলত দুর্গা  ছিলেন আর্য শক্তি। তারপরেই আমি এই উৎসবটির কথা ভাবি।

মূলত অসুর এবং দেবতা কী ? ইতিহাসের কোথায় তারা মিথ্যে কথা বলেছে? অসুর এবং দেবতার বংশধর কিন্তু এখনো রয়েছে। তাহলে তারা কারা? আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে পারিনি।  এই দশানি আমাদের ইতিহাসকে জানার একটি বড় উপায় তাই আমি এটি শুরু করি।"

( আয়নানগর, ২০শে মে, ২০২০) 

............................................................................

 বিবেকানন্দ সরেনের তথ‍্য সহায়তায় মৃদুলকান্তি ঘোষ (  আদিবাসী সংস্কৃতি বিষয়ক লেখক)  এই বিষয়ে কলম ধরেছেন কৃষিকথা পত্রিকায়  ;  

 'দাঁশায় উৎসব সম্পূর্ণরূপে কৃষিভিত্তিক ও প্রকৃতি বন্দনার উৎসব। 
অনেকে এটাকে যুদ্ধের কাহিনী বা হুদুড় দুর্গা কিস্কুর লড়াইয়ের কাহিনী বলে প্রচার করে।

সেটা ইচ্ছাকৃত না অজ্ঞতার কারণে- আমার জানা নেই। 

কিছু প্রচারপ্রিয় বাঙালী তাতে উৎসাহ জোগাচ্ছে- মহিষাসুরকে কখনও অসুরদের রাজা, কখনও সাঁওতালদের রাজা বলে দাবী করছে।
 মাত্র দু একটা লাইন যেখান সেখান থেকে জুড়ে দিয়ে নিজেদের স্বপক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছে।

 "দাঁশায়" অর্থ- দা: + আঁশ + আয়, (কারো কারো মতে দা: + সাঁওহায়)

 "ইতিহাসের খোঁজে নয় জলের আশায় প্রকৃতি দেবীকে পুজা করাই দাঁশায়ের মুল উদ্দেশ্য ছিল"।

 আর হুদুড় বা হুডুর শব্দটা মেঘের সাথে তুলনা করা হয়েছে। হুডুর বিজলী, হুদুড় হুদুড় হয় ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। দাঁশায় উৎসবের প্রথম গানটা শুনলেই তা সহজে বোঝা যায়।

 

হায়রে হায়রে
অকয় যাপে জুঁডিয়াদা দেশ দ
অকয় যাপে আতার আদা দিশম দ
দেশ দরে ল-লাটিচ এন দ
দিশম দরে হাসায় ডিগিরেন
ঠাকুর গেচয় জুঁডিয়াদা দেশ দ
ঠাকুর গেচয় আতার আদা দিশম দ
হায়রে হায়রে
দেশ দরে ল-লাটিচ এন দ
দিশম দরে হাসায় ডিগিরেন
দেশে ঠাকুর জৗডি মেসে দা: দ
দেশে ঠাকুর জারগে মেসে জাপুদ দ
দেশ দরে ল-লাটিচ এন দ
দিশম দরে হাসায় ডিগিরেন।

"প্রচন্ড অনাবৃষ্টির ফলে দেশ দিশম জ্বলে পুড়ে যায়, হে ঠাকুর বৃষ্টি দাও" – এটাই মুল কথা, কৃষিজীবি মানুষের করুণ আর্তি বোঝাতে "হায় হায়" শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে। ভারতের আদিকালে যত ধর্মীয় উৎসব, তার প্রত্যেকটাই কৃষির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যুক্ত। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কারাম, দাঁশায়, সহরায়, বাহা ইত্যাদি সবকটাই কৃষি ভিত্তিক উৎসব।

অকয় যাপে জুঁডিয়াদা হায়রে হায
সিঞবির দ ল: কান দ হায়রে হায
মানবির দ হাসায় ডিগিরেন
দেসে ছিতৗ দেসে কৗপরা হায়রে হায
জারগে দা: দ নতে বিন হায়রে হায
তারসে রাকাব, তারসে নাড়গ হায়রে হায়
সিঞবির দ ল: কা দ হায়রে হায়
মানবির দ ল: কান দ হায়রে হায়।

অনাবৃষ্টির ফলে মানভূমের জঙ্গল এবং সিনভূমের জঙ্গলও যেন জ্বলে পুড়ে গেল। ছিতা- কাপরা (ছিতা ও কাপরা জাহের দেবীদের অন্যতম দুই দেবী) বৃষ্টি দাও |

হায়রে হায়রে দিবি দুর্গা দয় ওডোক এনা রে
আয়নম কাজল দকিন বাহের এনা রে
হায়রে হায়রে চেতে লাগিদ দয় ওডোক এনা রে
চেতে লাগিদ দ কিন বাহের এনা রে
হায়রে হায়রে দেশ লাগিদ দয় ওডোক এনা রে
দিশম লাগিদ দ কিন বাহের এনা রে
হায়রে হায়রে সুনুম সিঁদুর লাগিদ ওডোক এনা রে
বাহা টুসৗ লাগিদ দ কিন বাহের এনা রে
হায়রে হায়রে দেলা সে দিবি দুর্গা হয় লেকাতে
দেলাসে আয়নম কাজল বার্ডু লেকাতে
হায়রে হায়রে অটাং হিজু পেসে সেরমা সাগিন খন
ঘুরলাউ হিজু: পেসে সরগ পুরী খন
বঠেল বঠেল সেকরেজ সেকরেজ।

অর্থাৎ, দেবী দুর্গা বাহির হলো, আয়নম, কাজল (আয়নম ও কাজল দেবীর সহচর, লক্ষ্মী, সরস্বতীর প্রতিরূপ ও বলা যেতে পারে) বাইরে এল, দেশের জন্য, দিশমের জন্য এবং সিঁদুর-তেল-পুস্পের জন্য। অর্থাৎ পুজা পাবার জন্য এরা বাহির হলো, এসো দুর্গা বাতাস হয়ে, এসো আয়নম কাজল ঘুর্ণি হয়ে সুদূর মহাকাশের স্বর্গপুরী থেকে। এটা দেবী আবাহনও বলা যেতে পারে। এটা ধরে নেওয়া যেতেই পারে দেবী বন্দনা বা পুজো করার ফলে ভালো বৃষ্টি হয়েছিল- তাই "বঠেল বঠেল" আনন্দসূচক ধ্বনি প্রয়োগ হয়েছে।

 এবার আসা যাক মহিষাসুরবাদীদের উপমায়-

হায়রে হায়রে
চেতে লাগিদ ভুয়ৗং এম জানাম লেনা রে
চেতে লাগিদ ভুয়ৗং এম হারা লেনা রে
দেশ দাড়ান লাগিদ ভুয়ৗং এম জানাম লেনা রে
দিশম সাগাড লাগিদ ভুয়ৗং এম জানাম লেনা রে।

এই লাইনগুলোকে এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, দেশ রক্ষার জন্য লড়াই, এই জন্য ভুয়ৗং। 

আসলে দেবীর মাহাত্ম‍্য  প্রচার করতে দেশ বা দিশম পরিভ্রমণ, এখনও অনেকে বিশ্বাস করে ঠাকুর দেবতাদের মাহাত্ম‍্য  প্রচার করলে মনের আকাঙ্খা পুর্ণ হয়।

 কিন্তু পরের লাইনটা ইচ্ছা করে বলে না, পরের লাইনটা এই রকম-

সুনুমে সিঁদুর লাগিদ ভুয়ৗং এম জানাম লেনা রে
বাহা টুসৗ লাগিদ ভুয়ৗং এম হারা লেনা রে

পুরো শব্দার্থ এই রকম-

কেন ভুয়ৗং জন্ম নিয়ে ছিলে
কেন ভুয়ৗং বেড়ে উঠেছিলে
দেশ ঘোরার জন্য ভুয়ৗং জন্ম নিয়েছিলে
দিশম ভ্রমণ করার জন্য ভুয়ৗং বেড়ে উঠেছিলে
তেল সিঁদুর পাওয়ার জন্য ভুয়ৗং জন্ম নিয়েছিলে
পুস্প স্তবক পাওয়ার জন্য ভুয়ৗং বেড়ে উঠেছিলে ।

আর একটা দাবী করা হয়, ভুয়ৗং নাকি তীর রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়। এটা অনুমান মাত্র, ভুয়ৗং হচ্ছে ভূমির প্রতীক, ছিলার মতো ব্যবহৃত রুজুটাকে বলে তড়ে সূতাম।

তাগিঞ মেসে ভায়রো তাগিঞ মেসে হো
ভুয়ৗং ডান্টিজ ভায়রো রচদ আকান তিঞ
তড়ে সুতৗম ভায়রো তপা: আকান তিঞ।

আর একটা ভুল ব্যাখ্যা করে 'হুদুড়রে', 'দুর্গারে' শব্দের, যেন হুদুড় আর দুর্গা শব্দটা আলাদা বোঝায় | যদি কোন গানে থাকেও, ওটা দ্বিত সম্বোধন অর্থে ব্যবহৃত শব্দ। যেমন- "মাণিকরে সোনারে" অথবা "সোনা অমার মানিক অমার" একই সন্তানের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কোথায় মহিষাসুর? এখানে তো প্রকৃতি দেবী বা দেবী দুর্গারই বন্দনা করা হচ্ছে। এটাই প্রকৃত সত্য।' 

কৃষিকথা, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭

...........................................................................

 অসুর সম্প্রদায় একটি প্রাচীন জনজাতি হলেও লক্ষ্য করলে দেখা যাবে তাদের নিয়ে আলোচনা বিগত ছয় সাত বছর ধরে বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এর পেছনে রয়েছে একটি অসুর নারীর অদম‍্য প্রচেষ্টা।

ঝাড়খন্ডের সাখুয়াপানির সুষমা অসুর একজন অসুর একটিভিস্ট। তিনি গড়ে তুলেছেন " ঝাড়খন্ডী ভাষা সাহিত‍্য সংস্কৃতি আখড়া "। উদ্দেশ্য, প্রান্তিক ও মৃতপ্রায় উপজাতি সংস্কৃতি ও ভাষার চর্চা ও সংরক্ষণ।  ওই প্রত‍্যন্ত গ্ৰামগুলিতে অসুর ভাষায় একটি কমিউনিটি রেডিও সার্ভিসের তিনি মূল চালিকাশক্তি। 

দিল্লির " ইন্ডিয়ান  ল‍্যাঙ্গুয়েজ ফেস্টিভ্যাল "এ   তাঁর রচিত "অসুর সিরিং"  সমাদৃত হয়েছিল। 

ফেসবুকে " অসুর আদিবাসী ডকুমেন্টেশন সেন্টার" নামে একটি পেজ চালান সুষমা ও তাঁর অনুগামী। 

সেই পেজের একটি ভিডিওতে দেখা যায় যে কলকাতা, পাটনা ও রাঁচীতে চলে আসা দুর্গোৎসব বন্ধ করে দেবার আবেদন করছেন তিনি। 

সুষমার সাথে যোগ আছে শহুরে র‍্যাডিকাল বুদ্ধিজীবী,  মানবাধিকার কর্মী, গ্ৰুপ থিয়েটার, লিটল ম‍্যাগের প্রগতিশীলদের। 

 ২০১৩ সালের দিল্লির জে এন ইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অনুষ্ঠানটি মূলত অসুর নিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন প্রচারের ফসল। 

সেখানে উপস্থিত ছিলেন দলিত আ্যকাডেমিশিয়ান কাঞ্চা এলাইয়া, যিনি  Christian Solidarity Network এর সাথে যুক্ত। 

আম্বেদকরবাদী বামসেফ পার্টির বামন মেশরাম বক্তা ছিলেন ওই অনুষ্ঠানে। তাঁর প্রচুর বক্তৃতা আছে ইউটিউবে। একটি ভিডিওতে শোনা যায় তিনি রামচন্দ্রকে ঋষ‍্যশৃঙ্গ মুনির ছেলে বলছেন। এই রামচন্দ্রই নাকি  ইতিহাসের পূষ‍্যমিত্র শুঙ্গ। 

জ‍্যোতিবা ফুলের বিখ‍্যাত "গোলামগিরি"  বইতে আছে ব্রাহ্মণ‍্যবাদী দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের লড়াইয়ের কল্পকাহিনী। দলিতরা নাকি  অসুরদেরই বংশধর। 

দক্ষিনের পেরিয়ারের চোখে রাবণই নায়ক। রাক্ষস, অসুর এরাই মেহনতী মানুষের প্রতিনিধি। জোর করে আর্য সংস্কৃতি চাপিয়ে দেবার প্রতিবাদে তাঁর দ্রাবিড় কাজাঘাম শ্রীরামচন্দ্রের ছবি ও মূর্তিতে জুতোর মালা পরিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরাত।
 
মহম্মদ হেলালউদ্দিনের একটি প্রচারপুস্তিকা পাওয়া যায়। সেখানে তিনি লিখেছেন দুর্গাপূজা বাংলার মূলনিবাসীদের উৎসব নয়, এর শুরু হয়েছিল প্রধানতঃ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকত্বে।  নব‍্য জমিদাররা পলাশীর যুদ্ধের পর থেকেই জাঁকজমক সহকারে এটির আয়োজন করতে আরম্ভ করেন। 

" বাজেয়াপ্ত ইতিহাস", " চেপে রাখা ইতিহাস" এর লেখক  গোলাম মোর্তাজাও  এপার বাংলার প্রধান উৎসব বলে পরিচিত  দুর্গাপুজার উৎপত্তির কলঙ্কিত ইতিহাস শুনিয়েছেন। 

অসুরের প্রতি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল ও মানবতাবাদীদের বিশেষ পক্ষপাত রয়েছে। 

এবং নব‍্য  অসুরপুজার কাল্ট ধীরে ধীরে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে । এর প্রচার ও প্রসারের জন‍্য সুষমাকে সারা দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়। 

বর্তমানে ভারতের প্রায় ৫০০ টি জায়গায় ঐ মহিষাসুর স্মরণ অনুষ্ঠান হচ্ছে। 

ওঁরা চাইছেন ব্রাহ্মণ‍্যবাদের  কাউন্টার ন‍্যারেটিভ হিসাবে অসুর স্মরণ অনুষ্ঠানকে  আরো গ্ৰাসরুট লেভেলে ছড়িয়ে দিতে। 

অসুরপন্থীদের  বৃহত্তর  লক্ষ‍্য  হল জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে  ভারতের বুকে ছোট ছোট  স্বাধীন সার্বভৌম কনফেডারেশন গড়ে তোলা। 

................................................................................

বাংলায় হুদুড় দুর্গাকে নিয়ে প্রথম অনুষ্ঠান হয় ২০০৩  সালে, পুরুলিয়ার ভুলুরডিতে। 

এরপর থেকে ধীরে ধীরে অন‍্যান‍্য আদিবাসী অধ‍্যুষিত অঞ্চলে পা রাখেন হুদুড় দুর্গা। 

২০১০  সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় আর্যভট্ট খানের একটি বিস্তারিত লেখা প্রকাশিত হয় হুদুড় দুর্গা সম্পর্কে। তখন বিষয়টি আরো প্রকাশ‍্যে আসে। 

২০১১ সালে কাশীপুর থানার সোনাইজুড়ি গ্ৰামে বেশ বড় করে 'হুদুড় দুর্গা স্মরণ দিবস'  অনুষ্ঠিত হয়। উদ‍্যোক্তা দিশম খেরওয়াল বীর কালচার কমিটি। অমিত হেমব্রম ও চারিয়ান মাহাতো ছিলেন অন‍্যতম সংগঠক।

‍এরপর থেকে বাংলার আদিবাসী অধ‍্যুষিত এলাকাগুলিতে প্রতিবছর শারদোৎসবে  নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে হুদুড় দুর্গা বা  মহিষাসুর স্মরণ উৎসব। 

এই উপলক্ষ‍্যে পাতা সেলাই, ছোট ছেলেমেয়েদের বিস্কুট দৌড়, সূঁচে সূতো পরানো, ফুটবল ম‍্যাচ, স্লো সাইকেল রেস ইত‍্যাদি ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। 
হয় দাঁশাই, সাড়পা ও কাঠি নাচের আয়োজন। 

কখনো কখনো দুর্গামন্ডপের দুশো মিটারের মধ‍্যেই দুটি অনুষ্ঠানই একসাথে হয়েছে। সাধারন মানুষ দুয়েই শামিল হয়েছেন। 

২০১৭  সালে খাস কলকাতার কাছে গড়িয়ায় প্রকৃতি সেবাশ্রম সংঘ নামে একটি সংগঠন আয়োজন করেছিল মহিষাসুর স্মরণ দিবস। 

................................................................................

হুদুড় দুর্গা আসলে একটি অর্বাচীন quasi academic  তত্ত্ব। 

হুদুড় নয়, এটিকে হুজুগদুর্গা বলাই ভালো। 

কোন ভালো মানের নৃতত্ত্বের জার্ণাল, ইতিহাসের গবেষণামূলক গ্ৰন্থ, মেইনস্ট্রিম পত্র পত্রিকায় এই নিয়ে কোন স্ট‍্যান্ডার্ড লেখা নেই। নেই কোন ভালো বই। 
আদিবাসী অঞ্চলে যাঁরা  দীর্ঘদিন ক্ষেত্রসমীক্ষা করেছেন, সেইসব বিশেষজ্ঞরাও সুনির্দিষ্ট কিছু লেখেননি এই বিষয়টি নিয়ে। 

তাই বিতর্কটি আপাততঃ শেষ হচ্ছে না। 

ব‍্যবহৃত কার্টুন ; রেবতীভূষণ ঘোষ।

শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২০

বিষয়- কলাবউ আর মহাসপ্তমীর গল্প ~ কৌশিক মজুমদার


মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন কিন্তু পুজো শুরু হয় আজকের দিন থেকেই। আর তাঁর শুরুতেই সকালে কাছাকাছি নদী বা কোনো জলাশয়ে কলাবউকে নিয়ে যাওয়া হয়। এই কলাবউয়ের নাম আসলে নবপত্রিকা, এটাও সবাই জানি। আর তিনি যে গনেশের বউ নন এটাও বোধ করি অনেকেরই জানা এখন।
পুরোহিত নিজেই কাঁধে করে নবপত্রিকা নিয়ে যান। তাঁর পিছন পিছন ঢাকীরা ঢাক বাজাতে বাজাতে এবং মহিলারা শঙ্খ ও উলুধ্বনি করতে করতে যান। শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী স্নান করানোর পর নবপত্রিকাকে নতুন শাড়ি পরানো হয়। তারপর পূজামণ্ডপে নিয়ে এসে নবপত্রিকাকে দেবীর ডান দিকে একটি
কাষ্ঠসিংহাসনে স্থাপন করা হয়। পূজামণ্ডপে নবপত্রিকা প্রবেশের মাধ্যমে দুর্গাপূজার মূল অনুষ্ঠানটির প্রথাগত সূচনা হয়। নবপত্রিকা
প্রবেশের পর দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। এরপর বাকি দিনগুলিতে নবপত্রিকা প্রতিমাস্থ দেবদেবীদের সঙ্গেই পূজিত হতে থাকেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে,নবপত্রিকা প্রবেশের পূর্বে পত্রিকার সম্মুখে দেবী চামুণ্ডার আবাহন ও পূজা করা হয়।
প্রশ্ন হল, কি এই নবপত্রিকা আর তার চেয়েও বড় কথা কেন এই নবপত্রিকা? একে একে বলি।
নবপত্রিকা নয়টি গাছের পাতা নয়, নয়টি উদ্ভিদ। এগুলি হল-কদলী বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (ডালিম), অশোক, মান ও ধান। একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ একত্র করে একজোড়া বেল সহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা অথবা হলুদ শাড়ি পড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবারে দেবীপ্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পূজা করা হয়।
এখানেই প্রশ্ন আসবে কেন নয়টা? দশ বা এগারো না কেন? নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ আসলে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীকরূপে কল্পিত হয়-
১. কদলী বা রম্ভা- কদলি গাছ এর অধিষ্টাত্রী দেবী ব্রহ্মাণী।
২. কচু- কচু গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী কালিকা।
৩. হরিদ্রা- হরিদ্রা গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী উমা।
৪. জয়ন্তী- জয়ন্তী গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী কার্তিকী।
৫. বিল্ব- বিল্ব গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী শিবা।
৬. দাড়িম্ব- দাড়িম্ব গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী রক্তদন্তিকা।
৭. অশোক- অশোক গাছের অধিষ্টাত্রীদেবী শোকরহিতা।
৮. মান- মান গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী চামুণ্ডা।
৯. ধান- ধান গাছের অধিষ্টাত্রী দেবী লক্ষ্মী
মানে এই নবপত্রিকা পুজোর মাধ্যমে দেবীর সকল রূপের পুজো একসঙ্গে করা হয়। ড. শশীভূষণ দাসগুপ্ত লিখছেন, " শারদীয়া পূজা মূলে বোধহয় এই শস্য-দেবীরই পূজা। পরবর্তীকালের বিভিন্ন দুর্গাপূজার বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে। ... বলাবাহুল্য এই সবই হইল পৌরাণিক দুর্গাদেবীর সহিত এই শস্যদেবীকে সর্বাংশে মিলাইয়া লইবার একটা সচেতন চেষ্টা। এই শস্য-দেবী মাতা পৃথিবীরই রূপভেদ, সুতরাং আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের দুর্গাপূজার ভিতরে এখনও সেই আদিমাতা পৃথিবীর পূজা অনেকখানি মিশিয়া আছে। পরবর্তীকালে বিভিন্ন দুর্গাপূজার বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হইয়াছে।"
দুর্গাপুজো বা যে কোন পুজো শুরুর আগে আদি মানব প্রকৃতির পুজো করে তাঁকে তুষ্ট করার চেষ্টা করত। কৃষিজীবী আর্যরা ভারতে আসার  আগে থেকেই শস্যভিত্তিক ধর্মাচরণের শুরু হয়।  অনেক পরে যখন দুর্গাপুজো এলো মানুষ আগের শস্যপুজোকে‍‍ রাতারাতি ত্যাগ করে নতুন দেবীকে পুজো শুরু করেনি। বরং সেই " মেলাবেন তিনি মেলাবেন" মেনে তাঁদের শস্যদেবীকে মিলিয়ে দিলেন দেবী দুর্গার সঙ্গে।
জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে,"দেবীপুরাণে নবদুর্গা আছে, কিন্তু নবপত্রিকা নাই।... নবপত্রিকা দুর্গাপূজার এক আগন্তুক অঙ্গ হইয়াছে।... বোধ হয় কোনও প্রদেশে শবরাদি জাতি নয়টি গাছের পাতা সম্মুখে রাখিয়া নবরাত্রি উৎসব করিত। তাহাদের নবপত্রী দুর্গা-প্রতিমার পার্শ্বে স্থাপিত হইতেছে। পত্রিকাস্থ অপর কোনো দেবীকে পৃথকভাবে পূজা করা হয় না।"
উল্লেখ্য, মার্কণ্ডেয় পুরাণে নবপত্রিকার কোন কথা উল্লেখ নেই। কালিকাপুরাণে নবপত্রিকার উল্লেখ না থাকলেও, সপ্তমী তিথিতে পত্রিকাপূজার নির্দেশ রয়েছে। নবপত্রিকার উল্লেখ সেই ভাবে প্রথম পাই কৃত্তিবাস ওঝা বিরচিত রামায়ণে। সেখানে রামচন্দ্র কর্তৃক
নবপত্রিকা পূজার উল্লেখ রয়েছে- "বাঁধিলা পত্রিকা নববৃক্ষের বিলাস"।
তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো। প্যাগান বা পৌত্তলিক ধর্মের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখতে পাব, মানুষ একেবারে শুরুতে পাথর, জল, গাছ, শস্য ইত্যাদির পুজো করে তাঁদের আদিমতম ধর্মাচরণ শুরু করে। মুর্তির কনসেপ্ট এসেছে অনেক পরে। কিন্তু প্রকৃতিভীরু মানুষ ভয়ে ভয়ে কাউকেই ত্যাগ করতে পারে নি।  আজকের দিনে তাই আমরা ফিরে যাই আমাদের সেই প্রাচীনতম দিনগুলোতে আর তারসঙ্গে মিশে যায় অধুনার ধর্মাচরণ। রবি ঠাকুরের ভাষায়  আর্য অনার্য " এক দেহে হল লীন।"

ছবি- বিকাশ ভট্টাচার্য্য, বিমল দাস।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২০

বিষ্ণুপুর মল্লভূম ~ অরিজিৎ গুহ

শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় যে দেড়শ বছরের মাৎসান্যায় চলেছিল তার অবসান হয় গৌড়ে পাল বংশের প্রথম রাজা গোপালের সিংহাসন লাভের পর। অরাজকতার শেষ হয়ে প্রায় পুরো উত্তর ভারত আর পূর্ব ভারত জুড়ে এক শক্তিশালি রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয় গোপালের হাত ধরে। তবে এই মাৎসান্যায়ের সুবাদে তৎকালীন বাংলার বেশ কিছু অঞ্চলে কিছু আঞ্চলিক রাজার উত্থান ঘটে। বেশিরভাগই ছিল স্থানীয় উপজাতি গোষ্ঠির নেতা যারা পরে নিজেদের রাজা বলে ঘোষণা করেন।
    ৬৯৪ খৃষ্টাব্দে এরকমই এক উপজাতি নেতা 'আদি মল্ল' মল্লভূম অঞ্চলের অর্থাৎ এখনকার বাকুঁড়া বিষ্ণুপুর অঞ্চলের রাজা হয়ে ওঠেন। মূলত জঙ্গলে ঘেরা অঞ্চল এবং সেখানকার মল জাতিদের থেকে মল্লভূম নামটি এসেছে বলে মনে করা হয়ে থাকে। আরেকটি মতে সংস্কৃতে মল্ল মানে যোদ্ধা বা যারা খালি হাতে যুদ্ধ করে। সেই মল্লযোদ্ধাদের থেকেই মল্ল নামটি এসেছে বলেও অনেকে মনে করে থাকেন। অর্থাৎ মল্ল রাজারা কোনো মল্লযোদ্ধার বংশধর বলে মনে করা হয়।
    বিষ্ণুপুর অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধার জন্য বাংলা তথা ভারতের নানা রাজনৈতিক উথালপাথাল সত্ত্বেও জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চলে মল্লরাজারা মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই শাসন করে গেছেন। খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ শাসন অব্দি মল্লরাজাদের সুদীর্ঘ সময়কাল। মল্ল রাজা হাম্বির মল্ল বা বীর হাম্বির মল্লের সময় থেকে বিষ্ণুপুরের স্থাপত্য ও শিল্প সংস্কৃতির উত্থান বলা যেতে পারে। তিনি ছিলেন আকবরের সমসাময়িক। তাঁর সময়েই তৈরি হয় বিষ্ণুপুরের প্রসিদ্ধ রাসমঞ্চ।
 
    ১৬০০ খৃষ্টাব্দে তৈরি এই রাসমঞ্চের স্থাপত্যে মিশরীয় ইসলামিক আর বাংলার নিজস্ব স্থাপত্য রীতির পরিচয় পাওয়া যায়। মূল মঞ্চের একদম ওপরের অংশ পিরামিডাকৃতি। এখানে মিশরীয় স্থাপত্য রীতির ছাপ রয়েছে। এরপরের অংশ বাংলার কুঁড়েঘরের স্থাপত্যের অনুকরণে আর একদম নিচের অংশের যে আর্চ বা খিলান রয়েছে তা ইসলামিক স্থাপত্য রীতি অনুযায়ী। প্রসঙ্গত হাম্বির মল্ল বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে মল্লভূমে বৈষ্ণব ধর্মের প্রসার ঘটান। মদন মোহনের উপাসনা তিনিই প্রচলন করেন মল্লভূমে। সেখান থেকেই মল্লভূমের নাম বিষ্ণুপুর হয়েছে। বিষ্ণুর পুর অর্থাৎ ঘর। রাস উৎসবে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি এই রাসমঞ্চে নিয়ে আসা হত। সেখানে একশ আটটি কুঠুরিতে একশ আট রকমের মূর্তি থাকত।  সামনের খোলা প্রান্তরে অর্থাৎ নাটমন্দিরে ঢোল বাজিয়ে কীর্তন করত কীর্তনীয়ার দল। সারা মল্লভূম রাস উৎসবে তখন কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা আর জনতার ঢল এসে মিশত এই রাসমঞ্চে।

     হাম্বির মল্লের সময় থেকে মল্লভূম পরিণত হচ্ছে বিষ্ণুপুরে। স্থাপত্যের কীর্তি তৈরি হচ্ছে তাঁর সময় থেকে আগেই বলেছি, তবে রঘুনাথ সিংহের রাজত্বকালে (১৬২৬-১৬৫৬) বিষ্ণুপুরের ইতিহাসে স্বর্ণালী সময় বলা যেতে পারে। মুর্শিদাবাদের নবাব রঘুনাথ সিংহকে সিংহ উপাধি দেন। প্রথম মল্ল রাজা হিসেবে তিনি এই উপাধি লাভ করেন। কথিত আছে বিষ্ণুপুর সেই সময়ে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা পরিচিত শহর ছিল। এমনকি ইন্দ্রের প্রাসাদকেও নাকি বিষ্ণুপুর হার মানাত।
    তাঁর সময়কালে বিষ্ণুপুর স্থাপত্যের দিক থেকে সর্বাপেক্ষা পরিচিতি লাভ করে। আজকের বিষ্ণুপুরের যে কটি মন্দির দেখা যায় তার বেশিরভাগই তাঁর সময়ে তৈরি।

    গোকুলচাঁদ মন্দির জয়পুরের গোকুলনগর গ্রামে ১৬৪৩ খৃষ্টাব্দে স্থাপিত হয় মহারাজ রঘুনাথ সিংহের আমলে। এই পঞ্চরত্ন মন্দিরটি বাঁকুড়া জেলার সব থেকে বড় প্রস্তর নির্মিত মন্দির।
   ওই একই বছরেই রঘুনাথ সিংহ শ্যামরায় মন্দির স্থাপন করেন। প্রতিটি মন্দিরের মত এই মন্দিরেও রামায়ন মহাভার‍তের বিভিন্ন দৃশ্য খোদাই করা রয়েছে টেরাকোটার ফলকে। তবে এখানে একটি খুব ইন্টারেস্টিং জিনিস রয়েছে। রঘুনাথ সিংহ খুবই জনপ্রিয় রাজা ছিলেন। তাঁর সাথে এমনকি মুঘল রাজপরিবারেরও বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। শাহজাহান সেই সময়ে মুঘল বাদশাহ। শ্যামরাই মন্দিরের নানান রকম টেরাকোটার ফলকের মধ্যে একটা ফলকে পাওয়া যায় যেখানে একজন উষ্ণীষ পরিহিত রাজা বাঁ হাতে বাজপাখি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। শাহজাহানের পোষা বাজপাখি ছিল সবাই জানে। মনে করা হয় রঘুনাথ সিংহ শাহজাহানের প্রতি অনুরাগ বশত ওই ফলকটি খোদাই করান। অর্থাৎ শ্যামরায়ের মন্দিরগাত্রে রামায়ন মহাভার‍তের বিভিন্ন ফলকের সাথে শাহজাহানকে চিত্রিত করা ফলকও পাওয়া যায়।

   ১৬৫৫ সালে তৈরি জোড় বাংলা স্থাপত্য রীতিতে তৈরি কেষ্ট রাই মন্দির এক বিশেষ স্থাপত্য রীতির পরিচয় রাখে। জোড় বাংলা মন্দিরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি দুটি চালার সমাহারে তৈরি হয়। একটা অংশ দালান হিসেবে আরেকটা অংশটি মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অধিকতর স্থায়িত্বের জন্য দুটি দোচালা পাশাপাশি জোড়া থাকে। কালনার সিদ্ধেশ্বরী কালিমন্দির গড়পঞ্চকোটের জোড় বাংলা মন্দির হুগলির গুপ্তিপাড়ার শ্রীচৈতন্য মন্দির জোড় বাংলা মন্দিরের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এটিও রঘুনাথ সিংহ দেব এর রাজত্বকালে তৈরি।

     মহারাজ দুর্জন সিংহ দেবের আমলে তৈরি মদনমোহন মন্দির একটি একচালা মন্দির। এই মন্দিরে মদনমোহনের যে মূর্তি আছে কথিত রয়েছে সেই মূর্তি নাকি চৈতন্য মহাপ্রভু দর্শন করে গেছিলেন। সেই মূর্তি তখন ছিল কোনো এক গ্রামে। মূর্তির এতই খ্যাতি ছিল যার জন্য চৈতন্যদেবও ছুটে আসেন সেই টানে। এরপর মহারাজা দুর্জন সিংহ দেব সেই মূর্তি এনে স্থাপন করেন মদনমোহন মন্দিরে।
    রঘুজি ভোঁসলের সেনাপতি ভাস্কর রাও এর নেতৃত্বে মারাঠা বর্গীরা যখন আক্রমণ করে বিষ্ণুপুর তখন তৎকালীন মল্ল রাজা গোপাল সিংহ দেব শরনাপন্ন হন মদনমোহনের। প্রত্যেক প্রজাকে নির্দেশ দেন দুর্গের মধ্যে মদনমোহনের নাম করার জন্য। কথিত আছে সেই মদনমোহনের কৃপাতেই ভাস্কর রাও আর দুর্গ প্রাকার ভেদ করতে পারেন নি। কয়েকদিনের মধ্যেই বর্গীরা বিষ্ণুপুর ছেড়ে চলে যায়। যাই হোক, সেবার আসলে মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দি খাঁ বীর বিক্রমে লড়াই করে বাংলা থেকে বর্গী আক্রমণ প্রতিহত করেন। সেই কারণেই বিষ্ণুপুরও রক্ষা পায় বর্গী আক্রমণের হাত থেকে।
   ১৮২০ সালে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পে আদি মন্দিরটি ভেঙে যাওয়ার পরে বর্তমান মন্দিরটি তৈরি করা হয়।
শেষ মল্লরাজা কালিপদ সিংহ ঠাকুর ১৯৮৩ সালে মারা যাওয়ার পর থেকে আর কেউ রাজা উপাধি পান নি। তবে রাজবংশ এখনো রয়েছে। তারা থাকেন বিষ্ণুপুরের প্রাচীন দুর্গা মন্দিরের পিছনের এক বাড়িতে। পুজোর দেখাশোনা এখনো তাঁরাই করে থাকেন। রাজা বা রাজত্ব না থাকলেও ঐতিহ্য পরম্পরা সবই থেকে গেছে এখনো। পুজোর শুরু হয় দলমাদল কামান থেকে তোপধ্বনি দিয়ে। এটাই এই পুজোর ঐতিহ্য।

Escape Thrill এর সৌজন্যে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল জয়পুরের জঙ্গল। সেখান থেকেই একটু এগিয়ে গোকুলনগর গ্রামে গোকুলচাঁদ মন্দির। এরপর দিন বিষ্ণুপুরের মন্দির দেখে সোজা চলে যাওয়া মুকুটমনিপুর।

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২০

নিলামের নোবেল ~ অর্ক রাজপন্ডিত

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ধরা যাক আমার আর আপনার দেখা হল। বিভূতিভূষণ বলছেন তিনিই আমাকে বা আপনাকে নিয়ে যাবেন ফুলকিয়া বইহার বা লবটুলিয়ার দেশে।

'আরণ্যক'র সত্যচরণ বন পাহাড়ের দেশে দেশে যেভাবে চিনেছিলেন সেভাবেই বিভূতিভূষণ আমাদের চিনিয়ে দেবেন কুশি নদীর ধারের সেই সুবিশাল প্রান্তর, গাছগাছালি, পরিচিত-অপরিচিত অদ্ভুত সব লতাপাতা, বিচিত্র পাখির সমাবেশ, বন্য প্রাণীর আনাগোনা, জ্যোৎস্নাশোভিত রাত্রির রহস্যময়তা। দেখা হয়ে যাবে যুগলপ্রসাদ, দোবরু পান্না বা রাজকন্যা ভানুমতীর সঙ্গেও!

কিন্তু আমি বা আপনি, দুজনের মধ্যে মাত্র একজনই সঙ্গী হতে পারবো বিভূতিভূষণের, টাইমমেশিনে চড়ে এক ছুটে যেতে পারবো লবটুলিয়া।

কে যাবেন? কে সঙ্গী হবেন বিভূতিভূষণের? আমি আর আপনি বিভূতিভূষণের সঙ্গে আশ্চর্য সফরে সঙ্গী হওয়ার জন্য বাজি ধরলাম। নিলামে হাঁকলাম আমি, এই সফরের গুরুত্ব, মূল্য আমার কাছে ভীষণ দামি। এক কোটি টাকা অবধি খরচ করে ফেলতে পারি নিমেষে এমন স্বপ্নমাখা সফরের জন্য। আপনিও দমবার পাত্র নন, আপনি বলে ফেললেন দেড় কোটি টাকা অবধি আপনিও খরচ করতে পারেন। আমি বললাম দু কোটি, আপনি বললেন তিন কোটি। আমি আর পেরে উঠলাম না! আপনিই জিতলেন।

এর পরে আবার একদিন আমার আপনার দেখা হল। আমি আর আপনি বাজি ধরলাম, দেখি তো কার মানিব্যাগে টাকা বেশি আছে, দুজনের মিলিয়ে মোট কত টাকা আছে। এটা একটু জটিল হল। কারণ আপনার মানি ব্যাগে কত টাকা আছে আমি জানি না তেমনই আমার মানি ব্যাগে কত টাকা আছে আপনি জানেন না। আমরা দুজনেই উৎসাহী হলাম দেখি তো শেষ পর্যন্ত কার মানি ব্যাগে টাকা বেশি আছে আর দুজনের মোট কত টাকা আছে।

অর্থনীতিবিদরা বিভূতিভূষণের সঙ্গে আরণ্যকের দেশ দেখতে চেয়ে আমার আপনার দর হাঁকাকে বলবেন 'পার্সোনাল ভ্যালু অফ অকশন'। ব্যক্তিগত মূল্যের নিলাম। আমার দোবরু পান্নার দেশ দেখার জন্য নিজস্ব অনুভূতি আছে, আমার মত করে তার মূল্য রয়েছে, তেমনি আপনারও আরণ্যকের সফরে যাওয়ার জন্য আপনার নিজস্ব অনুভূতি আছে তার জন্য যত দূর পর্যন্ত টাকা খরচ করা যায় তার সাধ আছে। প্রশ্ন হল কার অনুভূতি টাকার নিরিখে জিতবে।

আমার আপনার ওয়ালেটে টাকা নিয়ে দর হাঁকাকে অর্থনীতিবিদরা বলবেন 'কমন ভ্যালু অফ অকশন'। অভিন্ন মূল্যের নিলাম। কিন্তু দুজনেই ধাঁধায় আছি কার ম্যানি ব্যাগে কত টাকা।

নিলাম পদ্ধতি তাই সব ক্ষেত্রেই সহজ নয় বরং জটিল। যবে থেকে বাজার তবে থেকেই প্রায় নিলাম। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রীক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস লিখেছিলেন ব্যাবিলনের পুরুষরা আকর্ষক স্ত্রী বেছে নেওয়ার জন্য কিভাবে নিলামে অংশ নিতেন, বলাই বাহুল্য প্রাচীণ সেই নিলামও ছিল পিতৃতন্ত্র নিয়ন্ত্রিত।

১৯৯৬ সালে 'অকশন থিওরি'র জন্য অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছিলেন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ভিকরি। তাঁর নিলাম তত্ত্ব অর্থনীতির দুনিয়াকে চমকে দিলেও অর্থনীতিবিদদের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশ ছিল না জটিল নিলাম প্রক্রিয়াকে কিভাবে সুবিন্যস্ত করা যায়।

জটিল নিলাম প্রক্রিয়াকে সুবিন্যস্তভাবে বাস্তবের মিশেলে হাজির করার জন্য এই বছরে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট উইলসন এবং তাঁর ছাত্র পল মিলগ্রম।

'অকশন থিওরি'  শুধু তত্ত্বের মোড়কের বাইরে এসে গত প্রায় তিন দশক ধরে নয়া উদারবাদ তাকে ব্যবহার করছে দেশে দেশে জাতীয় সম্পদ নিলামে চড়িয়ে বিক্রি বাট্টার জন্য। নদী, খনিজ, পাহাড়, কারখানা সবই নিলামে চড়িয়ে বিক্রি। নয়া উদারবাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদের বেসরকারিকরণ অভিযানে তাই 'অকশন থিওরি' শুধু থিওরি হয়ে থাকলেই চলবে না বিক্রিবাট্টা সুগম সহজ করার পথে তাকে কার্যকরি হাতিয়ার হয়ে উঠতে হবে।

রবার্ট উইলিয়াম হচ্ছেন সেই 'প্র্যাক্টিকাল ডিজাইন অফ অকশন থিওরি'র কার্যত বেতাজ বাদশা।

১৯৯০ সালে মার্কিন দেশের সরকার এই দুই অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম আর মিলগ্রমের শরণাপন্ন হন সেদেশের 'রেডিও স্পেকট্রাম' নিলামে চড়াতে। খুবই জটিল ছিল সেই প্রক্রিয়া। বিভিন্ন চাহিদা অনুয়ায়ী নিলাম। ধরা যাক 'ক' টিভি কোম্পানি 'এক্স' ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নেবে বা 'ওয়াই' ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নেবে বা দুটোই নেবে। আবার 'খ' টিভি কোম্পানির আবদার তারা শুধু মার্কিন দেশের উত্তরে রাজ্যগুলিতে তাদের চ্যানেল দেখাবে কিন্তু দক্ষিণের রাজ্যগুলির স্পেকট্রামও তাদের চাই। এই বহুবিধ সমাহারের নিলাম প্রক্রিয়াকে কিভাবে সহজ করা যায় তার বাস্তব ধারণাই দিয়েছেন এবারের নোবেল জয়ী দুই অর্থনীতিবিদ।

মনে রাখতে হবে যে বছরে নোবেল কমিটি  'অকশন থিওরি'র জন্য অর্থনীতিতে নোবেল দিচ্ছে সেই বছরই সারা দুনিয়া মহামারিতে আক্রান্ত। দুনিয়া জুড়ে অনাহার আর মৃত্যু। হাত ধরাধরি করা মাড়ী আর মড়ক।

সেই বছরেই নোবেল কমিটি অর্থনীতিতে নোবেল দিচ্ছে নিলাম চড়ানোর জন্য! কিভাবে দেশে দেশে সরকারগুলি নিও লিবারেল প্রেসক্রিপশন মেনে সহজে নিলাম চড়াতে পারে দেশের জাতীয় সম্পদ।

সুইডিশ একাডেমির নোবেল কমিটির ও শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি আছে।

 আকাশছোঁয়া বৈষম্য আর তার সমাধান নিয়ে কাজ করে যাওয়া ফরাসী অর্থনীতিবিদ থমাস পিকেট্টি যে কোনদিনই নোবেল পাবেন না তা জানা কথাই, তিনি ঘোষিত বামপন্থী।

কানাঘুঁষো ছিল যে এই মহামারির বছরে অন্তত বৈষম্য নিয়ে কাজ করা,  শ্রমশক্তির উপর বৈষম্যের প্রভাব নিয়ে কাজ করা কেউ অন্তত নোবেল পাবেন অর্থনীতিতে। নাহ! পাননি।

নিলাম তো আমরা জানি। জানে জানে দেশে দেশে মার খাওয়া মানুষ। চিলিতে আর্জেন্টিনায় গুয়াতেমালায় তুরস্কে গ্রীস থেকে আমাদের ভারতে কিভাবে নয়া উদারবাদ নিলাম চড়ায় দেশের জাতীয় সম্পদ।

আমরা দেখেছি। কিভাবে মহামারিকে সামনে রেখে মুনাফাখোর দের দেশ লোটার সুযোগ দিয়েছে মোদী সরকার। মহামারির মধ্যেই নিলামে চড়ছে কয়লা খাদান। অর্ডন্যান্স কারখানা। বিপিসিএল থেকে কনকর।

'অকশন থিওরি'র নামে বেসরকারিকরণ অভিযানের অ্যান্টিথিসিস হচ্ছে 'রেসিস্ট্যান্স'। 'প্র্যাকটিকাল ডিজাইন অফ অকশন'কে রুখে দিতে পারে দেশের নদী পাহাড় প্রতিরক্ষা খনি বাঁচাতে চাওয়া সাচ্চা দেশপ্রেমিক জনগণের যৌথ প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ।

যেভাবে কয়লা ব্লক নিলামে চড়ানোর বিরুদ্ধে তির ধুনক নিয়ে ধর্মঘটে ছিল ছত্তিশগড় থেকে ঝাড়খন্ডের জংলা মহল। যেভাবে প্রতিরক্ষায় নিলাম চড়ানোর বিরুদ্ধে অনির্দিষ্টকালিন ধর্মঘটে ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসে সরকার। যেভাবে ব্রিজ অ্যান্ড রুফ কারখানাকে ঘিরে রাখে শ্রমিকরা নিলাম চড়ানোর বিরুদ্ধে। নিলাম চড়িয়ে বিক্রিবাট্টার বিরুদ্ধে যেভাবে লড়ছে আমাদের দুর্গাপুর এএসপি।

'অকশন থিওরি' বাস্তবে বিক্রিবাট্টার দুনিয়ায় জিতে গেলে এই আশ্বিনেও ফুলকিয়া বইহার থেকে, লবটুলিয়ার চাঁদের আলো মাখা জ্যোৎস্নামাখা মাটি থেকে নদী থেকে মাটির নিচে খনিজ বুকে করে রাখা মালভূমি থেকে উচ্ছেদ হবেন আজকের যুগলপ্রসাদ, ধাতুরিয়া, দোবরু পান্না আর ভানুমতীরা।

অকশনওয়ালাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বনপথ থেকে আলপথ থেকে জাতীয় সড়কে যুগলপ্রসাদ, ধাতুরিয়া, দোবরু পান্না আর ভানুমতীদের সঙ্গে হাতে হাত রাখা থাক আমার আর আপনার।

রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২০

কোরোনা ও সরকার ~ স্বাতী মৈত্র

আপনি বাস করেন একটা ভোগবাদী অর্থনীতিতে। আপনার রাজ্যের মানুষজনকে রোজ বলা হচ্ছে সেলফিশ কনজিউমারিস্ট চয়েস করুন। তারপর তারা সেলফিশ কনজিউমারিস্ট চয়েস করলে – সেটা ঝাঁ চকচকে বিয়ার রিপাবলিক ক্রাউডই হোক বা নিউ মার্কেট-হাতিবাগানের মফস্বল – গালিগালাজ করছেন, এ তো মহা মুশকিল। অর্থনীতি নিয়ে রোজ কান্নাকাটি করেন, কনজিউমার স্পেন্ডিং কতটা জরুরি আপনার অর্থনীতিতে আপনি জানেন? 

আপনি ভাবছেন দুম করে বন্ধ করে দিলেই হয়ে গেল, যেমন অন্য কিছু রাজ্যে করেছে? ছোট ব্যবসায়ীদের বিকল্প তারা করেছে কি না, খোঁজ নিয়েছেন? খোঁজ নিয়ে দেখুন, করেনি। এমনি বন্ধ করে দিয়েছে, আরো কিছু মানুষ দারিদ্র্যের অন্ধকারে নেমে গেছেন। 

আপনি ভাবছেন, অত চিন্তার কী আছে? কেরালা বিকল্প তৈরি করতে না পারায় এবং ভোটের বছর হওয়ায় ওনামে কড়াকড়ি করেনি। আজকে কেরালায় মহারাষ্ট্রের থেকে বেশি সংক্রমন হয়েছে। ভয়াবহ দ্বিতীয় ওয়েভ চলছে আপাতত। ওদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আপনার রাজ্যের চেয়ে উন্নত, মনে রাখবেন।

অথচ এখানে একটা খুব সহজ স্বাভাবিক প্রশ্ন আদৌ শোনা যাচ্ছেনা। কেন্দ্রে একটি সরকার পুষেছেন আপনি যেটা রোজ আনলক সম্পর্কে নিত্য নতুন নিয়ম করছে। তাদের কোন দায় নেই? রাজ্য সরকার এবার ভোটের ব্যালটে নতুন করে নির্বাচিত হতে চাইবে, তাদের কোন দায় নেই? উৎসবের মরসুমে কোন নিয়ম নেই কেন? ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া যাবেনা কেন? রাজ্য জিএসটির টাকা কবে পাবে? কেন্দ্র প্যাকেজ করছেনা কেন? ট্রেন চলছে না কেন? লোকে বাদুড়ঝোলা হয়ে অফিস গেলে করোনা হয়না? Aerosolization যে আসল ভয়ের জায়গা, সেটা নিয়ে প্রচার কেন হচ্ছেনা? স্যানিটাইজেশন নামক ভাঁওতাবাজি এখনো কেন সব পুজো কমিটি বলে চলেছে?

আসলে আপনি মনে মনে স্বীকার করে নিয়েছেন, রাষ্ট্রের কোন দায় নেই। একটা অতিমারী ও অর্থনৈতিক সংকোচনের সময়ে সরকারের কী করা উচিত, সেটা আপনার দক্ষিণপন্থী সরকার অন্তত বোঝেনা, এবং আপনি মনে করেন রাষ্ট্রের প্রয়োজন নেই, মানুষের বিবেকের প্রতি আপিল করে অথবা ভয় দেখিয়েই সামাল দিয়ে দেবেন। আপনার সরকার অর্থনীতির তাগিদে আপনাকে দিয়ে খাটাবে এবং খরচ করাবে বলে আপনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে কিন্তু পরিষেবা দেবেনা, আর আপনি আইটি সেলের মতন বলে যাবেন, bsrkri hle prisaba vlo hba, মোদীজি কী করবেন, লোকজন গাড়ল। 

ইতনে প্যায়সে মে ইতনাইচ হি মিলতা হ্যায়।

পুনশ্চ: সঙ্ঘ পরিবার ফ্যাসিবাদী এবং ইউজেনিক্সে বিশ্বাস করে। দেশের টেকনোক্র্যাটদের একটা বড় অংশ ইউজেনিসিস্ট মনে মনে, যেটা জনসংখ্যার গল্প দিয়ে চালায়। অর্থনীতি সচল রাখবার জন্য ১ লাখ কেন, ১ কোটি লোক মরলেও সেটা কোলাটেরাল হিসেবেই ধরবে, ধরছে। 


বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২০

ফেকু ~ সৌরভ মুখোপাধ্যায়

মহারাজ, এ কী সাজে, এলে হৃদয়পুর মাঝে
চরণতলে জিডিপি পড়ে, বিকাশ মরে লাজে

গর্ব সব টুটিয়া, রামমন্দিরে লুটিয়া
সকল থালা অসমসালা, করোনায় কেন বাজে...

এ কী কেলোর কীর্তি হল
নোটবন্দি-পাকে,
চিনেতে যত সৈন্য ছিল, মিলিল সে-লাদাখে।

করোনা নাহি পাঁপড়ে, ভাবিজী পড়ে ফাঁপড়ে...
নিরখি শুধু বিজনেসেতে
আম্বানি বিরাজে।

রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২০

বামপন্থা কি? সারা পৃথিবীতে এরা কোথায়? ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

সাধারণভাবে বামপন্থা বিশ্বাস করে সমানাধিকারে, সামাজিক সমতায়। শক্তি ও সম্পত্তির অত্যধিক পার্থক্য যখন কমে আসে, তখনই আসতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক। আর তখন মানুষের পূর্ণ বিকাশ ঘটা সম্ভব। এই হলো মূল কথা।

বামপন্থীদের চওড়া বর্ণালীতে আছে বিভিন্ন লেবার পার্টি, কম্যুনিষ্ট পার্টি, সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টি, সোশালিষ্ট পার্টি, গ্রীন পার্টি অথবা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তারা হয়ত কোন নির্দিষ্ট পার্টি পলিটিক্সের সাথে যুক্ত নন, তবে বামপন্থী চিন্তার বিকাশে কাজ করে চলেছেন।

বামপন্থীদের বিশেষ অবদান আছে সামাজিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে। পৃথিবীর বহু দেশে মানুষকে সামন্ততান্ত্রিক চিন্তা থেকে বার করে নিয়ে এসে প্রগতিশীল চিন্তা, অর্থনৈতিক সাচ্ছল্য ওরা দিয়েছেন। এমনকি কট্টর ডানপন্থীরা জানেওনা তারা আজ অনেক বাম চিন্তার উত্তরসূরী। সমাজ সমষ্টিগত ভাবে সেই কাজের সুফল গ্রহণ করেছে।

যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম আক্রমণ করে তখন সেই স্বচ্ছাচারী শক্তিকে বাঁধা দেয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ভিয়েতনামের আপামর জনগণ। সেই লড়াই হয়েছিল নাপাম বোমার বিরুদ্ধে শরকাঠি নিয়ে। কিভাবে জিতল দরিদ্র দেশের সামরিক শক্তিহীন মানুষ? সেই লড়াই সম্ভব হয়েছে কারণ আমেরিকার বব ডিলান, জন লেনন বা পিট সিগার গিটার নিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে পৃথিবী জুড়ে গান গেয়ে নিজের কণ্ঠ দিয়ে প্রতিবাদ করেছে। সেই সুর ঢেউ তুলেছে কলকাতার বুকে কয়ারগুলিতে, ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। ভিয়েতনামের জনগণ একা এই লড়াই করে নি, ওদের পশে দাঁড়িয়েছে সমগ্র পৃথিবীর ছাত্র ও যুবকরা, আর তাতে নেতৃত্ব দিয়েছে বামপন্থীরা।

ভিয়েতনামিজদের সাথে বুক পেতে বুলেট নিতে হয়েছে জন লেননকেও।

১৯৪৩ সালে, বিশ্ব যুদ্ধের সময়কালে, বাংলায় এক অভূতপূর্ব মন্বন্তর হয়। বৃটিশ সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের ফলে একদা দেশের খাদ্যভাণ্ডার অবিভক্ত বাংলায় ৫% মানুষ প্রাণ হারায়। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম লীগ আগস্ট মাসে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু করার ডাক দেয়। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম পরিণত হয় হিন্দু-মুসলমান ভ্রাতৃঘাতি দাঙ্গায়। দাঙ্গা বিধস্ত কলকাতায় সেদিন বামপন্থী কৃষকসভা তেভাগা আন্দোলনের ডাক দেয়। ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত শেষকথা নয়, মানুষকে তার রুটিরুজির জন্য আন্দোলনে ফিরে আসতে সাহায্য করে বামপন্থীরাই।

পৃথিবীতে যত নাগরিক অধিকার আন্দোলন, নারী রক্ষার আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, সমকামীদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের আন্দোলন হয়েছে, জানবেন পিছনে আছে বামপন্থীরা।

অভিবাসীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যত আন্দোলন হয়েছে, তাতে নেতৃত্ব দিয়েছে উন্নতদেশের সোশালিস্টরা, বামেরা। ইউরোপের প্রত্যেকটি দেশে এই ভারত, বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীরা অপেক্ষা করে কখন লেবার সরকার আসবে, ওরা নাগরিক অধিকার পাবে।

এদেশে প্রথম পঞ্চায়েত রাজ প্রতিষ্ঠা করে বামেরা, দেশে প্রথম ক্ষমতা নিম্নতম স্তরে পৌঁছে যায়। নিম্নতম শ্রেণীর মধ্যে অধিকার সচেতনতা আনে বামেরা। নূন্যতম মজুরীর লড়াই করেছে ওরা। আজকে যারা স্কুল কলেজে চাকরি করে তারা ভাবতেও পারবেনা, ঠিক এক প্রজন্ম আগে আমাদের মা, মাসিরা কি টাকা পেতেন ওই শিক্ষকতার চাকরি করে।

এই দশ বছর আগেও কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার প্রগতিমূলক যে কাজগুলি করেছে, যেমন Right to Information Act, তার পেছনে আছে বামেরা। 

এমনকি এই সেদিন কেরালার সাবরিমালাতে সেখানকার বাম সরকার নিজেদের ক্ষমতাকে বাজি রেখে মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশের পক্ষে দাঁড়াল।

আর কোন মতাদর্শগত গ্রুপের কথা চিন্তা করতে পারেন যারা নিজের ক্ষমতার এক চুল অধিকার ছাড়তে রাজি হয় নারীর অধিকার রক্ষার জন্য?

তাই বামপন্থীদের কাজটা সবসময়েই ছিল কঠিন। কারণ তারা ভেসে যায় না, মানুষকে ভাসিয়ে দেয় না, তারা গঠন করে। নিজেরা চিন্তা করে, মানুষকে চিন্তা করায়। তারা কঠিন কাজটার দায়িত্ব নেয়।

ভেবে দেখুন, কোন কাজটা কঠিন?
· ১৯৯০তে এক রথযাত্রা করে মানুষকে উত্তেজিত করা ও দাঙ্গা বাঁধাতে উস্কানি দেওয়া নাকি সেই দাঙ্গা মানুষের মধ্যে যাতে ছড়িয়ে না পড়ে তার প্রতি দায়বোধ? সারা পৃথিবীতে সমস্ত দেশে যদি একজনও বামপন্থী থাকে সে দাঁড়িয়েছে সেই দেশের সংখ্যালঘু মানুষের পক্ষে।

·তুরস্কে আইয়া সোফিয়া গির্জা তথা মিউজিয়াম মসজিদে পরিবর্তিত করা নাকি ওই তুরস্কের মেয়ে হেলিন বোলিকের ওই দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৮৮ দিন অনশনের শেষে মৃত্যুবরণ?

· মসজিদে বোমা মেরে অসহায় মানুষ খুন নাকি বিধ্বংসী ঘৃণা রুখতে ক্রাইস্টচার্চ পর্বের পরে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জ্যাসিন্ডা আর্ডেনের মানবিক পদক্ষেপ?

মতাদর্শগতভাবে জ্যাসিন্ডা সোশ্যাল ডেমোক্রাট আর হেলিন ছিলেন কমিউনিস্ট।

সমাজে ধনী ও দরিদ্রের পার্থক্য বেড়েই চলেছে। এই কোভিদকালে সেই বৈষম্য রকেটের গতিতে বেড়েছে। সেই ব্যর্থতার দায় শাসকবর্গ নেয় না, তার ব্যর্থতার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে আমদানি করে ঘৃণার রাজনীতি, বিভেদের রাজনীতি। মানুষ একে অপরকে তীব্রতর ঘৃণা করে। এই ঘৃণা যত বাড়বে ততই দৃষ্টির বাইরে চলে যাবে সামাজিক বৈষম্যের কথা, দারিদ্রের কথা।

মিশর থেকে ইন্দোনেশিয়া, ফ্রান্স থেকে ভারতবর্ষ, ইরান থেকে বাংলাদেশ - দেশ, কাল, ধর্ম, জাত ব্যতিরেকে ঘৃণার বিরুদ্ধেএই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে বামেরা। 

মিসরে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকের রক্তপাত হয়েছে, ইন্দোনেশিয়া লক্ষ বামপন্থী রক্ত দিয়েছে, তবু লড়াই করে গেছে। তারা ভোটার কথা ভাবেনি, মানুষের কথা ভেবেছে।
ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেও তারা এগিয়ে এসেছে। আবার তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। লড়াইয়ের ময়দানে থাকতে হবে। 

কারণ এই কাজ কোন আঞ্চলিক ক্ষুদ্রস্বার্থসম্পন্ন দল করবে না। ভোট শেষ কথা নয়, ২০১৯ এর ভোট নয়, ২০২১ এর ভোটও নয়। 
মূল কথা মানুষকে সঠিক আন্দোলনে নিয়ে এসে তার অবস্থার উন্নতি ঘটান, সমাজের বিভেদ ঘোঁচানো।

এখানে হতাশার কোন জায়গা নেই, কিসের হতাশা? মনে রাখতে হবে সোভিয়েত পরবর্তী সময়েও, এই ২০০৪ সালে, BBC Radio 4-এ ভোটে কার্ল মার্কস সর্বকালের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে শীর্ষ স্থান পায়।

বামপন্থা আছে। আছে মানুষের মনে, মননে। মানুষ ক্লান্ত, তাকে নেতৃত্ব দিতে হবে বামপন্থীদেরই।

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২০

যোগীর রাজ্যে নিম্ন বর্ণের মানুষ ~ সুশোভন পাত্র

- মর্নিং ওয়াকে কর্মসূত্রে কলকাতায় থাকা উত্তরপ্রদেশের দাদা বললেন 'যোগীর রাজ্যে মেজরিটি লোকজন ভালোই আছে। দলিতরা বরং সরকারের দেওয়া চাল-ডাল ফ্রিতে নিয়ে অন্ন ধ্বংস করছে। রেপ-টেপ তো চলতা রেহেগা ভাই। আসলি মুদ্দা হ্যা ৩৭০ কো হাটানা অউর এনআরসি লে আনা।' 
 
- কলেজে, গণিতে স্নাতকোত্তর বিভাগের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট বন্ধু ফোনে বলল 'মেয়েদের সাবধানে চলাফেরা করাই ভালো। পোশাক আর আচার-আচরণে শালীনতা বজায় রাখাই ভালো। আফটার অল, মেয়ে তো। তাই না?'    

- সাড়ে সাত বছরের বিহুর ৯টার আগে ঘুম ভাঙ্গে না। ব্যতিক্রম মহালয়া। বিহু কে জিজ্ঞাসা করলাম, মহালয়া দেখে কি কি শিখলি? অনেক খুচরো কথার নির্যাস টেনে বলল 'জানো মেসো, কালো মানে বদ লোক, কালো মানে মহিষাসুর। ফর্সা মানে মা দুর্গা। ফর্সা মানে ভালো।' 

- কেরালার হাতির মৃত্যুতে বিহ্বল হয়ে পাড়া মাথায় তোলা আমার দুঃসম্পর্কের আত্মীয় গত তিনদিন হোয়াটস-অ্যাপ গ্রুপে নিখোঁজ। দলিত কিশোরীর ধর্ষণ, খুন কিম্বা রাতের অন্ধকারে তাঁর পরিবারের অসম্মতি তে, অনুপস্থিতি তে পুলিশ লেলিয়ে লাশের লেলিহান শিখা, আমার দুঃসম্পর্কের আত্মীয়র ভাবাবেগে বিন্দুমাত্র আঘাত করতে পারেনি। কথায় বলে মরা হাতির দাম লাখ টাকা। মরা দলিতের মেয়ের দাম কত? 
নিজেদের প্রতিদিনের জীবন অনুশীলনীর ল্যান্ডস্কেপে ছড়িয়ে থাকা এরকম বিন্দু গুলো কে যুক্ত করলেই দেখবেন ধর্ষণের কিম্বা ধর্ষণের প্রতিবাদে প্রিভিলেজড ক্লাসের সিলেক্টিভ উদাসীনতার ব্যাকগ্রাউন্ডে নকশাটা আসলে সমাজে রুবারু হয়ে থাকা শ্রেণী বৈষম্যের, নকশাটা জাত-বর্ণ বিদ্বেষের, নকশাটা পুরুষতান্ত্রিকতার এবং অবশ্যই সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার। 
যারা ভাবছেন, যে দেশে প্রতি ১৫ মিনিটে কেউ না কেউ ধর্ষিতা হচ্ছেন সেখানে উত্তরপ্রদেশের কিশোরীর ধর্ষণ নিয়ে দেশ তোলপাড় করা আসলে, বিরোধীদের চক্রান্ত, দলিত সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিতে দেশদ্রোহীদের রাজনৈতিক নখরামি কিম্বা মোদী কে বদনাম করার অন্তঃ-রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র; তারা হালকা পাশ ফিরে শুয়ে পড়ার আগে জেনে রাখুন, ভারতে গত ১০ বছরে মহিলাদের ধর্ষণের আশঙ্কা বেড়েছে ৪৪%। প্রতিদিন দলিত মহিলা ধর্ষিত হচ্ছেন গড়ে ১০জন আর ২০১৪-২০১৮-র উত্তরপ্রদেশে দলিতদের উপর অত্যাচারের  ঘটনা বেড়েছে ৪৭%। 
যদি ভাবেন নিছক পরিসংখ্যান, তাহলে কষ্ট করে সামান্য কটা গুগল সার্চ করুন। দেখবেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন "ঘরে মেয়ে জন্মালে বাগানে ৫টি গাছ লাগান। পরে গাছ বিক্রি করে মেয়ের বিয়ে দেবেন।" মন দিয়ে যোগী আদিত্যনাথের কথা শুনুন। বলছেন "মহিলাদের স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার যোগ্যতাই নেই।" আর সঙ্ঘ পরিবার হোতা মোহন ভাগবতের নিদান? "পুরুষরা উপার্জন করবে। মহিলাদের ঘরের কাজ করবে। এটাই সমাজের নিয়ম।" 
এখন আপনার যদি এই মন্তব্য গুলো নেহাত সাদামাটা লাগে তাহলে বলুন তো, মেয়ে জন্মালেই গাছ কেন লাগাতে হবে? মেয়েদের বিয়ের সঙ্গে কি পয়সার কোন বিশেষ সম্পর্ক আছে? না, প্রধানমন্ত্রী হালফিলে জিও ছেড়ে পণ প্রথার ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডার হয়েছেন? বলুন তো, মেয়েরা কেন স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবেন না? বাইরে গিয়ে উপার্জন করতে পারবেন না? কল্পনা চাউলা, ভেলেনটিনা তেরেসকোভা, গীতা গোপীনাথন কিম্বা হিমা দাসদের কর্মদক্ষতা বা উপার্জন করার ক্ষমতা চামচা সম্বিত পাত্রদের থেকেও কম নাকি? তাই আপনি হয়ত তাসের দেশের নিয়মমতে ধর্ষণের বিরোধিতা করলেন, কিন্তু এই মন্তব্য গুলির সংশ্লেষে মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলেন তাহলে বুঝতে হবে, you are not part of the solution, you are part of the problem.
কারণ আপনার সাদা মনে কাদা না থাকলেও মোদী-যোগী-মোহন ভাগবতদের আদর্শগত বাপ-ঠাকুরদাদের ছিল। আর ছিল বলেই সঙ্ঘ-পরিবারের ব্রেন-চাইল্ড হিন্দুরাষ্ট্রের ব্লু-প্রিন্ট লিখতে বসে দ্বিতীয় সরসঙ্ঘ চালক গোলওয়ালকার লিখেছিলেন "শঙ্কর প্রজনন পদ্ধতিতে, প্রভূত লাভ হতে পারে মনুষ্য প্রজাতির। কেরলে নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণ পরিবারের প্রথম সন্তান সব সময় নিম্নবর্ণের মেয়ের সাথে বিবাহ করবে এবং সন্তানের জন্ম দেবে। এইসব সন্তানেরা নাম্বুদিরি বামুনদের গুণাবলী তাদের পিতার থেকে পাবে। কেরলের যে কোনও জাতের যে কোনও বিবাহিত মহিলার প্রথম সন্তান নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণজাত হতে হবে। তার বিবাহ অন্য যার সাথেই হোক, সেই মহিলার প্রথম সন্তানটি যেন নাম্বুদিরি বামুনদের ঔরসজাত হয়।" 
আপনি মনুস্মৃতি খুলুন। চ্যাপ্টার ১, শ্লোক ৯.৩। লেখা আছে, "একজন মহিলা, কখনই স্বাধীন হতে পারেন না। তাকে বিয়ের আগে পিতা, বিয়ের পর স্বামী এবং বৃদ্ধ বয়সে পুত্রর উপর নির্ভরশীল হতেই হবে।" শ্লোক ৮.৩৬৫-তে বলছে, কোনও 'নিম্ন বর্ণের' মহিলা যদি 'উচ্চ বর্ণের' পুরুষের সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করলে তা শাস্তি যোগ্য অপরাধ নয়। কিন্তু উল্টোটা হলে মেয়েটির কঠোরতম শাস্তির জন্য প্রস্তুত থাকা উচিৎ। রামচরিতমানস বলছে, মহিলারা স্বাধীন হলে 'নষ্ট' হতে বাধ্য কিম্বা পাত্রের জাতের থেকে কনের জাত নিচু হলে, সেটা 'বিপরীত বিবাহ', অতএব হিন্দু ধর্মে 'অবৈধ'। এখন এগুলো যদি আপনার 'উচ্চবর্ণের' পুরুষদের 'নিম্নবর্ণের' মেয়েদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করার লাইসেন্স না মনে হয় তাহলে বুঝতে হবে, you are not part of the solution, you are part of the problem.
তাই নেটফ্লিক্সে আর্টিকেল 15 কিম্বা অ্যামাজন প্রাইমে পাতাললোক -মির্জাপুরের ওয়েব সিরিজ দেখে, নিজেকে উত্তর আধুনিক ভেবে ফুটেজ খাওয়ার আগে একটিবার ভাবুন, কোন ঢং-র রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হচ্ছে এসব ডার্ক থ্রিলারের চিত্রনাট্য? কেনই বা এই প্রতিটি ডার্ক থ্রিলারের পটভূমি কেবলমাত্র গোবলয়ের রাজ্যগুলি? ধর্মের আর রাজনীতির কোন ককটেলে উত্তরপ্রদেশ-রাজস্থান-হরিয়ানার মত রাজ্যগুলিতে দিনের পর দিন পুষ্ট হচ্ছে জাতপাতের ভিত্তি?  
ভাবুন কারণ বাংলা বাঁচাতে লড়তে হবে। যে বাংলা রবীন্দ্রনাথের, যে বাংলা নজরুলের। যে বাংলা লালনের, যে বাংলা মাইকেলের। যে বাংলা র‍্যাডক্লিফের টানা লাইনে রক্তাক্ত হয়েছে কিন্তু ধর্মান্ধতার সঙ্গে এক ইঞ্চি আপোষ করেনি। যে বাংলা জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে কিন্তু অস্পৃশ্যতার কানাগলিতে কখনও পথ হারায়নি। রামমোহনের যে বাংলার সতীদাহ রুখতে জানে। বিদ্যাসাগরের  যে বাংলা বিধবাবিবাহের নবজাগরণে দুনিয়া কে পথ দেখাতে পারে।  
যোগী-মোদীরা জানুক, এই বাংলা ঠিক যতটা সর্ষে ইলিশের, ঠিক ততটাই ধামসা মাদলের। এই বাংলা সাজে দুর্গাপূজার অঞ্জলিতে, এই বাংলা চেনে ভাদু পরবে লেগে থাকা সোঁদা মাটির গন্ধটাকে। এই বাংলা হক যতটা হেমরাজ তামাঙ্গদের ঠিক ততটাই হক আছে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গিদেরও। গোবলয়ের মামদোবাজরা জাত-ধর্মের রাজনীতি চাষ করতে এলে মুখে ঝাঁটার বাড়ি মারুন। আর আপনার চারপাশের জাত-ধর্মে বিচার করা অবিকল মানুষের মত দেখতে জন্তুগুলো কে মানসিক রোগী ভেবে ঘেন্না করুন, করুণা করুন। পারলে, চিড়িয়াখানাতে চালান করুন।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বীণা দাস ~ দিপাঞ্জন ঘোষ



আচ্ছা, আপনারা এ পাড়ায় অনেকদিন আছেন?

আমরা এসেছি নাইন্টিন এইট্টি।

ও, তাহলে আপানারা বলতে পারবেন। এখানে কি বীণা দাস বলে কেউ…

থাকতেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন।

***

আজ হয়তো বীণা দাসের নাম শুনে আপনি চিনতে পারছেন না। কিন্তু আজ থেকে ৮৮ বছর আগে সবাই তাঁকে এক নামে চিনত। ১৯৩২ সালের ৬-ই ফেব্রুয়ারি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশান অনুষ্ঠান চলছে। বক্তৃতা দিতে উঠে দাঁড়ালেন ইংরেজ রাজ্যপাল, স্যার স্ট্যানলি জ্যাক্সন। হঠাৎ দর্শকের আসন থেকে উঠে এলেন এক ছাত্রি - বীণা দাস। কনভোকেশানের গাউনের ভেতর থেকে বার করলেন রিভলভার। গুলি চালালেন সোজা জ্যাকসনকে লক্ষ করে। কানের পাস দিয়ে বেরিয়ে গেলো গুলি। লাফিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হাসান সুরাওয়ার্দি। টিপে ধরলেন বীণার টুটি। ধ্বস্তাধস্তির মধ্যেও আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন বীণা। রিভলভার থেকে পর পর পাঁচটি গুলি চালালেন, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন। ওইটুকু মেয়েকে ঠেকাতে সেদিন দুজন জোয়ান পুরুষমানুষের সমস্ত শারীরিক শক্তির দরকার পড়েছিল।

বীণাকে নিয়ে যাওয়া হল লালবাজার। ডাকা হল মা বাবাকে। পুলিশের তরফ থেকে বলা হল, বীণা যদি শুধু বলে দেন যে রিভলভার তাঁকে কে দিয়েছে, তাহলেই তাঁর সাজা অনেক কমিয়ে দেওয়া হবে। তবে বাবা বেনিমাধব ছিলেন গান্ধিবাদি শিক্ষক। কটকের র‍্যাভেনশ কলেজে যখন পড়াতেন, তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস। বেনিমাধবের অন্য দুই সন্তান তখন স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে জেল খাটছেন। তিনি এ কাজ কোনভাবেই করতেন না। "আমার বাবা মেয়েকে বিশ্বাসঘাতক হতে শেখাননি", বলেন বীণা।

মাত্র একদিনের বিচার। ভাগ্যে জুটল ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। কারাগারের অবস্থার উন্নতির জন্যে সেখানে অনশন করেন। ৭ বছরের মাথায় মুক্তি পান। ছাড়া পেয়ে যোগ দেন অসহযোগ আন্দোলনে। ভাগ্যে জোটে আরও তিন বছরের কারাবাস। স্বাধীনতার বছর, বিয়ে করেন আর এক স্বাধীনতা সংগ্রামী জ্যোতীশ ভৌমিককে। ১৯৫১ নাগাদ বাংলা সংবাদপত্র অমৃত বাজার পত্রিকার কর্মিরা আন্দোলন শুরু করেন বেতন বৃদ্ধির দাবিতে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বীণা। কিন্তু তাঁর দল, কংগ্রেস, মালিকের পক্ষ্য নেয়। কিন্তু তাও আন্দোলন চালিয়ে যান বীণা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত বাঙালীদের দণ্ডকারণ্যে পাঠিয়ে দেওয়া, তারা পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে চাইলে তাদের ওপর পুলিশি জুলুম, তারও প্রতিবাদ করেন।

কিন্তু বারংবার নিজের দলের কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা পেয়ে, হতাশ হয়ে দল ছাড়েন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য সরকারি পেনশন নিতে অস্বীকার করেন। আসলে বীণার আনুগত্য কোন সরকার বা দলের প্রতি ছিলনা। বীণার আনুগত্য ছিল শুধু নিজের আদর্শের প্রতি। আদর্শের ব্যাপারে আপোশ করতে তিনি নারাজ, পরিণতি যাইই হোক না কেন। স্বামীর মৃত্যুর পর, কেমন যেন গোলমাল হয়ে যেতে থাকে বীণার জীবন। ছোট হয়ে আসতে থাকে সামাজিক বৃত্য। শেষে সব ছেড়ে দিয়ে চলে যান হরিদ্বার।

২৬-এ ডিসেম্বর ১৯৮৬ সাল। হরিদ্বারের রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখা যায় একটি মহিলার মৃতদেহ। খবর যায় পুলিশে। পুলিশ এসে দেখে মহিলার মৃত্যু হয়েছে কয়েকদিন আগেই। দেহে পচন ধরেছে। তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মৃতদেহ। শনাক্ত করতে লাগে এক মাস সময়। হরিদ্বারের রাস্তার ধারে, কপর্দকশূন্য অবস্থায় যিনি মারা গেছেন, তিনি বাংলার অগ্নিকন্যা, বীণা দাস।

***
১৭/এ একডালিয়া প্লেস। এটাই ছিল বীণার শেষ ঠিকানা। সে বাড়ি আজ আর নেই। তার যায়গায় গড়ে উঠেছে হোটেল। একমাত্র পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠরা আজও মনে রেখেছেন বীণাকে। আপনি যদি বীণা দাসের নাম না শুনে থাকেন, তাঁর বাড়ি না দেখে থাকেন, তাতে লজ্জার কিছু নেই। আসলে আমাদের দেশে সব উৎসব, সব উন্মাদনা, কেবল ধর্ম নিয়ে। স্বাধীনতা দিবস স্রেফ একটি সরকারি ছুটির দিন। তাই জন্যেই আপনি একডালিয়ার পুজোর কথা জানেন। কিন্তু একডালিয়ার বীণা দাসের কথা জানেন না। শুনেছি বড় পুজোয় নাকি প্রায় কোটি টাকা খরচ হয়। সেই খরচের একটি ছোট অংশ বাঁচিয়ে, একটা স্মৃতিস্তম্ভ, একটা পাথরের ফলক, কিছুই কি বসানো যেত না?

কাদের জন্য আপনি আন্দোলন করেছিলেন বীণা? কাদের ওপর অভিমান করে চলে গেছিলেন? আপনার শহর, আপনার মানুষ, আপনাকে কবে ভুলে গেছে। শেষ ঠিকানা ১৭/এ, গ্রেফতারের সময় ৬৭/১ একডালিয়া প্লেস।

কৃষি আইন ~ সুশোভন পাত্র

লেডিস অ্যান্ড জেন্টেলমেন, লেটস টক অ্যাবাউট কিষান টু-নাইট! 
না এরকম কোন মিডিয়া বলেনি। বলেনি কারণ কিষান মিডিয়াতে নন ইস্যু! কিষান মানে ঐ, যাদের সৌজন্যে আপনি তুলতুলে রুটি পুরুষতান্ত্রিকতার ঝোলে ডুবিয়ে প্রাইমে টাইমে রিয়া চক্রবর্তীর গুষ্ঠি উদ্ধার করেন, সেই কিষান। কিষান মানে ঐ, যাদের সৌজন্যে আমারা ধোঁয়া ওঠা ভাতের উপর তৃপ্তির ঘি ছড়িয়ে IPL-র ফটো ফিনিশ উপভোগ করি, সেই কিষান। 
কিম্বা ধরুন, ভারতে প্রতি ১২ মিনিটে যাদের একজন কে ঋণের দায়ে আত্মঘাতী হতে হয়, সেই কিষান। কিষান মানে, যাদের রক্ত জল করা উপার্জনের টাকা সমবায় ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে, জন্মদিনের পার্টি তে  পপ গায়ক এনরিকে ইগলেসিয়াসের সুরে কোমর নাচিয়ে, নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করে, বিজয় মালিয়া নিশ্চিন্তে বিদেশে গিয়ে বসে থাকতে পারেন, সেই কিষান। 
এককালের 'জয় জওয়ান জয় কিষানদের' দেশে আজকাল নাকি 'সব চাঙ্গা সি'! তাই জোরজবরদস্তি কৃষি বিল পাশ করানো ছাড়া সরকারের মনসুন সিজনে আর কোন কাজই নেই! অপরিকল্পিত লকডাউনের জন্য কত পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে -শ্রম মন্ত্রকের কাছে ডেটা নেই। কোভিড সংক্রমণের বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াইয়ে কতজন ডাক্তারের প্রাণ গেছে -স্বাস্থ্য মন্ত্রকের কাছে ডেটা নেই। কত মানুষ আধ পেটা রইলো, কত মানুষ না খেতে পেয়ে মরল -খাদ্য মন্ত্রকের কাছে ডেটা নেই। দেশে কত মানুষ কাজ হারিয়েছেন -অর্থমন্ত্রকের কাছে ডেটা নেই। 
ডেটা নেই। তাই সমস্যা নেই। সমস্যা নেই তাই সমাধানের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই তাই সরকারের কাজ নেই। Ignorance is bliss, ১৭৪২-এ বলেছিলেন ব্রিটিশ কবি থমাস গ্রে। Ignorance is governacne, ২০২০ তে বুঝিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। সরকার নয়, সার্কাস চলছে বুঝিয়ে দিচ্ছে বিজেপি।  
সার্কাসের রিং মাস্টার নরেন্দ্র মোদী কিষান'দের উদ্দেশ্যে বলেছেন 'কৃষকদরদী বিল', 'ঐতিহাসিক বিল'। তা এমন 'ঐতিহাসিক বিল' মুখ লুকিয়ে পাশ হল কেন? 'কৃষকদরদী বিল' যখন দেশের কিষানরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে কেন? যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোয় রাজ্য সরকারের মতামত নেওয়া হল না কেন? সম্প্রচার বন্ধ করে রাজ্যসভায় মার্শাল লেলিয়ে গলার জোরে ভোট করাতে হল কেন? চোরের মন এক পুলিশ পুলিশ কেন? আসলে ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি! বিল ঐতিহাসিকই, তবে কিষানদের জন্য নয়, রিং মাস্টারের পীরিতের কর্পোরেট শিল্পপতিদের জন্য। কেন? সিম্পল! 
অত্যাবশ্যক পণ্য আইনের সংশোধনীতে বলা হচ্ছে, চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজ-গম-ভোজ্য-তেল তৈলবীজ নাকি যত ইচ্ছে মজুত করা যাবে। প্রশ্ন হল মজুত করা তো যাবে, কিন্তু করবে কে? আপনার-আমার মত ছা-পোষা সাধারণ মানুষ? না, গড়ে ২ হেক্টরের কম জমির মালিক দেশের ৮৬% চাষি? আসলে মজুত করবে তারাই যাদের মজুত করার মত পকেটের জোর আছে। ব্যাঙ্কে ব্যালেন্স আছে। পরিকাঠামো আছে। পাতি অর্থে কর্পোরেট। 
কথায় বলে There is always a method in madness; একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন তো খাদ্যশস্য মজুতের ব্যবসায় এই দেশের অগ্রণী শিল্পপতি কে? নো পয়েন্ট গেসিং! তিনি মোদীর নির্বাচনী প্রচারে চার্টার্ড বিমান সাপ্লাইকারী গৌতম আদানি। আফ্রিকা-ইউরোপ ছাড়াও আদানি-উইল্মারের খাদ্যশস্য মজুতের ব্যবসায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। বিনিয়োগ হচ্ছে বাংলাতেও। 
APMC অ্যাক্টের হাত ধরে ভারতে কিষান মান্ডির পথ চলা শুরু ষাটের দশকে। সংখ্যায় অপ্রতুল ও দুর্নীতি সহ বহু সমস্যায় জর্জরিত হলেও আজও ৭.৫ হাজার মান্ডি চাষিদের কাছে বটবৃক্ষের প্রশস্ত ছায়ার মত। যে ছায়ার শীতলতা দিনের পর দিন লোভী ব্যবসিকদের লালসা থেকে চাষিদের রক্ষা করেছে। সম্মিলিত ভাবে কৃষকদের দরকষাকষির সুযোগ দিয়েছে। অন্তত খাতায় কলমে MSP-র একটা নিশ্চয়তা রয়েছে। কৃষিপণ্য ব্যবসা বাণিজ্য উন্নয়ন অর্ডিন্যান্সের উদ্দেশ্যই হল মান্ডির বাইরেও প্রাইভেট মার্কেট তৈরি করা এবং মার্কেট গুলি কে রাজ্য সরকারের ট্যাক্স বা সেসের আওতার বাইরে রেখে সেখানেই চাষিদের ফসল বেচতে বাধ্য করা।
তাই ব্রহ্মা জানেন, রিং মাস্টার টুইটে যতই 'একদেশ একবাজারের' গুলতানি করুন না কেন, এই প্রাইভেট মার্কেট গুলি অচিরেই কিষান মান্ডি গুলির বিলুপ্তির অনুঘটক হবে। MSP-র নিশ্চয়তা কর্পূরের মত উবে যাবে। আর মান্ডির অনুপস্থিতিতে প্রাইভেট মার্কেট গুলির হাত ধরে কর্পোরেটই সরকারের রেশন ব্যবস্থার মুখ্য জোগানদার হয়ে উঠবে। এতদিনের সরকার ও চাষির মধ্যে ফসল কেনাবেচার সম্পর্কে হাড্ডি হিসেবে আবির্ভাব ঘটবে কর্পোরেট ফোঁড়েদের।  
টেকনিক্যাল দুনিয়ায় প্রোটোটাইপ মডেলিং বলে একটা টার্ম চালু আছে। ঐ ডাবু দিয়ে কয়েকটা ভাত তুলে একটু টিপে সেদ্ধ হয়েছে কিনা বুঝে নেওয়া কিম্বা সরষে ইলিশে নুনটা ঠিকঠাক পড়েছে কিনা একটু চেখে দেখে নেওয়ার মত আর কি। মান্ডি তুলে দিয়ে প্রাইভেট মার্কেট তৈরির প্রোটোটাইপ মডেল বিহারে ২০০৬ থেকেই চালু। অভিজ্ঞতা কি বলছে? বিহারের একজন কৃষকের গড় মাসিক অ্যায় ৩,৫৩৮টাকা। যা দেশের কৃষকদের মাসিক গড় আয় ৬,৪২৬টাকার তুলনায় ৪৫% কম। আর দেশের যে দুই রাজ্যে মান্ডির রমরমা সেই পাঞ্জাব ও হরিয়ানা তে কৃষকদের গড় মাসিক আয় ১৮হাজার এবং ১৪হাজারের তুলনায় ৮০% এবং ৭৫% কম। 
রইলো বাকি কন্ট্রাক্ট ফার্মিং। আমেরিকায় গত ৬দশক ধরে চালু আছে প্রাইভেট কন্ট্রাক্ট ফার্মিং-র মডেল। তবুও ১৯৬০'র পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে কমেছে কৃষকদের আয়। বেড়েছে কৃষি ক্ষেত্রে সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ। বর্তমানে প্রায় ৪২৫ বিলিয়ন ডলার। বেড়েছে কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা। আমেরিকার সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় ৪৫% বেশি। ইউরোপের কৃষি ব্যবস্থাও দাঁড়িয়ে  আছে প্রাইভেট মার্কেটের জোরে না বরং ফি-বছরে সরকারের ১০০ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকির সৌজন্যেই।    
১৯৩০-র গ্রেট ডিপ্রেশনের মোকাবিলায় সোভিয়েতে স্তালিনের হাত ধরে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার নিউ ইকনমিক পলিসিতে  ছিল দ্রুত শিল্পায়ন এবং কৃষির সমষ্টিকরণ। রাশিয়ার জমিদার-জোতদার কুলাকদের হাত থেকে জমির দখল নিয়ে ছোট-মাঝারি কৃষকদের সমষ্টি চাষের প্রথা শুরু হয় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কৃষির সমষ্টিকরণের মাধ্যমই। কৃষির অগ্রগতির ব্যাপক সাফল্যই রসদ জুগিয়েছিল সোভিয়েতর রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে দ্রুত শিল্পায়নে। পুঁজিবাদী দেশের মুখে ঝামা ঘষে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সৌজন্যেই সোভিয়েত বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে।  
প্রায় ৯০ বছর পর, প্যান্ডেমিকের ক্যাসক্যাডিং এফেক্টে বিশ্বে অনুরূপ আর্থিক মন্দার প্রেক্ষাপটে ভারত চলেছে ঠিক উল্টো পথে। রেল কিম্বা কয়লা, শিক্ষা কিম্বা রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র -আত্ম-নির্ভরতার মুখোশে প্রতিদিন ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বিক্রি হচ্ছে দেশ। কিষানদের পেটে লাথি মেরে আঁকা হচ্ছে আম্বানি-আদানিদের পকেট ভরানোর নীল নকশা। 
তাই কর্পোরেটদের মালাই চেটে চর্বি জমানো এই সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই হবে রাস্তায়। যে লড়াইয়ে হিসেব হবে ফসলের দামের। পেটের খিদের। বেকারের কাজের। যে লড়াইয়ে হিন্দুর শিরা ভেসে যাবে মুসলিম রক্তে। ব্রাহ্মণ মেয়ের হাত ধরবে দলিত ছেলে। যে লড়াইয়ে 'মহুল ফুটবে শৌখিনতার গোলাপ কুঞ্জে/সাঁওতাল তার ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে'। 
আপনি বরং ঠিক করুন সেই লড়াইয়ে আপনি কোন পক্ষে। সরকারের পক্ষ, না মানুষের পক্ষ। পক্ষ দুটো। চয়েস একটাই।