শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪

ইস্কুল, মিড ডে মিল ও তাঁর নিজস্ব অনুভব ~ সীমান্ত গুহঠাকুরতা

 

"মাস দুয়েক হল এক চরম অভাবের সংসারের কর্তা সেজে বসেছি। এ এক অদ্ভুত 'নেই-রাজ্য'। স্কুল-বাড়ি ভেঙে পড়ছে -- রক্ষণাবেক্ষণের পয়সা নেই, শিক্ষক নিয়োগ হয় না -- আংশিক সময়ের শিক্ষকের বেতন দেবার সামর্থ্য নেই,  বাচ্চারা প্রচন্ড গরমে কষ্ট পাচ্ছে -- পর্যাপ্ত পাখা কেনার ফান্ড নেই, স্কুল চত্বরে রাত্রে বহিরাগত সমাজবিরোধী ঢুকছে – নিরাপত্তা রক্ষী রাখার অনুমতি-অধিকার কোনোটাই নেই। বাচ্চাগুলো ক্ষিধেয় মুখ কালো করে ঘুরে বেড়ায় -- তাদের পাতে একটু সুখাদ্য তুলে দেবার ক্ষমতাও নেই। মাথাপিছু বরাদ্দ যা, তা দিয়ে ওই ডাল-ভাত-আলু কুমড়ো অথবা আলু-সয়াবিনের 'থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোর' চালিয়ে যেতে হয় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। 

কিন্তু ভালোবাসা? সেটুকু কি আছে আমাদের? শাস্ত্রে বলেছে 'শ্রদ্ধায়া দেয়ম্‌', অর্থাৎ যাকে যেটুকু দেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবে। শ্রদ্ধা তো অনেক বড় ব্যাপার, বাচ্চাগুলোর পাতে দুপুরের অন্নটুকু তুলে দেবার সময় সামান্য দরদ বা ভালোবাসাটুকুও কি আমাদের থাকে? আমরা, পেটমোটা মধ্যবিত্তের দল আজও তো মিড-ডে মিলটাকে নিছক দয়া হিসেবেই দেখি, ভাবি রাষ্ট্রীয় খয়রাতি। আর আমার মত যারা ব্যবস্থাটার সঙ্গে জড়িত তারা তো এটাকে পড়াশুনার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটা উটকো ঝামেলা হিসেবেই গণ্য করি। তাই গ্রামের সেলফ-হেলফ গ্রুপের মহিলারা রান্না করেন, বাচ্চাগুলো থালা হাতে গিয়ে দাঁড়ায়, ভচাৎ করে এক থাবা ভাত আর এক হাতা ডাল এসে পড়ে, সেই থালা নিয়ে গিয়ে ওরা কোনো কোনায় গিয়ে বসে গপগপ করে গেলে। কেউ কোনোদিন ওদের ডেকে জিজ্ঞেসও করে না, 'কীরে, পেট ভরেছে?' কিংবা 'আরে একটু ভাত বা তরকারি নিবি?' কেউ ভুলেও জানতে চায় না, 'আজকের রান্নাটা কেমন হয়েছে রে?' 

মাঝে মাঝে পরিদর্শকরাও আসেন। তিনি রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর বা খাবার ঘর – কোথাও উঁকিটিও মারেন না। এসেই অফিসঘরে খাতা-পত্তর নিয়ে বসে যান, অর্থাৎ কাগজ-পত্রে হিসেব-নিকেশ ঠিক থাকলেই তিনি খুশি। সেই হিসেব উপর-মহলে গেলে উপর-মহলও খুশ্‌। বাচ্চাগুলো খাচ্ছে, নাকি কাগজপত্র খাচ্ছে – বোঝা দায়!! প্রতিবার পরিদর্শনের শেষে তিনি যখন প্রসন্ন চিত্তে গাড়িতে উঠে বসেন, তোতাকাহিনীর সেই নিন্দুকের মত তাঁকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে, 'মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি?' 

ছোটবেলায় দেখেছি চূড়ান্তের অভাবের সংসারে মা কচু-ঘেঁচু কত কিছু রাঁধত। কিন্তু যা-ই রাঁধুক না কেন, খাবার সময় তা থালায় করে তা সাজিয়ে দিত পরম যত্নে। মায়ের সেই ভালবাসাটুকুই তো অর্ধেক পেট ভরিয়ে দিত। আমি তাই জানি, পাতে কী তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল সেই খাবারের সঙ্গে মিশে থাকা দরদটুকু, যত্নটুকু, ভালোবাসাটুকু। 

আজ সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। আবহাওয়া মনোরম। হুকুম দিয়েছিলাম, আজ তবে খিচুড়ি হোক। সঙ্গে ভাজাভুজি কিছু হবে না? ডোন্ট পরোয়া। খিচুড়িতেই পড়ল আলু, টমেটো আর ডিম ভুজিয়া। লোভ সামলাতে না পেরে থালা হাতে দাঁড়িয়ে গেলাম ওদের সঙ্গেই এক লাইনে। আনন্দে হইহই করে উঠল ভৈরব বাহিনী। তারপর ওদের সঙ্গেই বসে সুড়ুৎ-সুড়ুৎ করে গরম-গরম খিচুড়ি আর অঢেল গল্প। একজন বলল, 'স্যর, আজ কিন্তু খিচুড়িটা হেব্বি হয়েছে'। বললাম, 'যা, আরেকটু নিয়ে আয়'। একগাল হেসে ছেলে দৌড় মারল থালা হাতে। আরেকজন খেলার টানে অর্ধেক খেয়ে উঠে যাচ্ছিল, বাকিরা ধমক দিল, 'অ্যাই, স্যর বলেছে না, ভাত নষ্ট করতে নেই'। সে বেচারি কাচুমাচু মুখে আবার খাবারে মন দিল। 

'দেশে-বিদেশে'-তে মুজতবা আলি পাঠানদের মেহমান-নওয়াজীর বর্ণনা দিতে গিয়ে দিয়ে একটি বাক্যে লিখেছেন, 'দোস্ত/তুমহারে রোটি, হামারে গোস্ত', অর্থাৎ 'তুমি যে আমার বন্ধু এই আমার পরম সৌভাগ্য, শুধু শুকনো রুটি আছে? কুছ পরোয়া নেই, আমি আমার মাংস কেটে দেব'।"

শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০২৪

চন্দন বসু নিয়ে ~ অশোক চক্রবর্তী

ঢাকা পড়ে থাকা কিছু কথা॥ 

১৯৬৯ এ বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় ডিভিশনে পাশ করে চন্দন ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৭১ তে পারিবারিক পরিচিতির সূত্রে ফারুক আবদুল্লা তাকে রাজ্যের কোটায় জম্মু কাশ্মীর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করান । ১৯৭৪ তে পড়া অসমাপ্ত রেখে তিনি কলকাতায় ফিরে এসে আবার সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি হন । 
১৯৭৭ তে বেঙ্গল ল্যাম্প এ সেলস ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি হিসেবে কাজে ঢোকেন ,  স্নিগ্ধা ওয়াহির সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে হয়। স্নিগ্ধা হলেন ইন্ডিয়া স্টিমশিপে কাজ করা শিশির ওয়াহি'র বোন। শিশির রিটায়ার করে কলকাতা ফিরে কিছু ব্যবসা করার চেষ্টা করেন। এদিকে ১৯৭৮ এ চন্দনের প্রথম কন্যা হয় এবং যেহেতু তার সংসার আলাদা ছিলো, সেও খরচ সামলানোর জন্য কিছু একটা করার কথা ভাবছিলো। 

এসময় ব্রিটানিয়া বিস্কিট মুর্শিদাবাদে  তাদের সেলস ফ্রাঞ্চাইজি খুঁজছিলো।  শিশির ও চন্দন , "ওম্কার ট্রেডিং কোম্পানী" নামে সেই ফ্রাঞ্চাইজি নেয়।  তখন বিস্কিটের বাজার ছিলো বাংলায় প্রায় ৩০ কোটির আর বৃদ্ধি ছিলো বছরে ২০ % হারে। 

শিশির চন্দন একটা বিস্কিটের নিজেদের কোম্পানী খুলতে চেয়ে ১৯৭৯ তে তৈরি করলো, নিজেদের সঞ্চয়ের ৫ লাখ ক্যাপিটালের "ইস্টার্ন বিস্কিট কোম্পানি"। Durgapur Development Authority এর কাছে ৬০ বছরের জন্য জমি লিজে পেলো,  SME হিসেবে ২ একর, একর প্রতি ৫০,০০০টাকায় ।  ৩৪,০০০ টাকা জমা দিয়ে ও বাকি টাকা ৪ টি কিস্তিতে দেবার চুক্তিতে জমির পজেসন পেলো। এসবই সরকারি নিয়মে চলছিলো। প্ল্যান্ট ডিজাইন সরকারি কর্তাদের পরামর্শ নিয়ে স্ক্রুটিণি করিয়ে জমা দেওয়া হলো আর সেভাবেই প্ল্যান্ট তৈরি এগিয়ে চললো । 

সরকারি নিয়ম মেনে WBFC এর কাছে ২৪ লাখ  ব্যাংক লোনের জন্য কোম্পানী দরখাস্ত করলো। টার্ম ক্যাপিটাল ২৯ লাখ, ওয়ার্কিং ক্যাপিটল ১২ লাখ ,  মোট ৪১ লাখ । মার্চ,  ১৯৮০ স্যাংসন হলো ১৮ লাখ, মে তে ডিসবার্স হয় ৯ লাখ। সরকারি ও ব্যাংকের নিয়মে এক SSI হিসেবে ৩,৪৫ লাখ টাকা ক্যাশ সাবসিডি ও   ৭৫ হাজার টাকা সিড মানি পাওয়ার কথা।  একেতো প্রোজেক্ট আর্থিক সহায়তা ৬৬ % কমিয়ে দিলো ব্যাংক তার উপর ৪,২০ লাখ টাকা আটকে রাখলো তারা। 

এদিকে যখন প্ল্যান্ট অনেকটাই হয়েছে,  DDA আসরে এসে জানালো প্ল্যান্ট ডিজাইনে ভুল আছে। ক্যাশ ক্রাঞ্চ এ ভুগতে থাকা একজন এন্টারপ্রেনার এর কাছে এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর হয়না । 

কিন্তু আরও বড় দুঃসংবাদ টা এলো "বিপ্লবী" যতীন ও তার সহোদর(!) সুবোধ বাবুদের দলের কাছ থেকে। আনন্দবাজার/ বর্তমান দের কাজে লাগিয়ে চন্দনের বিরুদ্ধে কুৎসা শুরু করলেন কারন তারা ভেবেছিলেন এতেই জ্যোতি বাবুকে পাঁকে নামাতে পারবেন।  

মমতা দেবীর ভাইপো , হেকিম সাহেবের মেয়ে, মাঝি সাহেবের ছেলে , কাকলী দেবীর দুই ছেলের নাম সম্প্রতি আম জনতা জানতে পেরেছে ডাক্তার বলে। এর বাইরে কতো সব ""পোতিভাবান" ছেলে মেয়ে আছে এমন নেতাদের যারা ডাক্তার হয়ে বসে আছেন। কিভাবে তারা ডাক্তার হয়েছেন তার একটা নমুনা ছিলো মাঝি সাবের ছেলের পরীক্ষা নিয়ে সংবাদ ভাষ্যে। 

এর বাইরে যারা আজ প্রকাশ্যে তাড়া তাড়া নোট নিচ্ছেন, যাদের মধ্যে আছেন অমিত শা'র ছেলে জয় শা বা মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জী ,(এমনকি মোরারজি'র ছেলে কান্তিভাই)  যাদের কড়ে আংগুল সঞ্চালনে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লুট হয়ে যায়, যেসব পার্টির খুচরো পাড়ার নেতা ঠিক করে দেন কার কপালে কতো কাটমানি জমা পড়বে  তারা ভাবতেই পারবে না সর্ব শক্তিমান মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে ২০/ ২৫ লাখ টাকার সংস্থান না করতে পারার জন্য আর DDA /WBFC স্তরের কিছু পুঁটি অফিসারের বিরোধিতার জন্য এক নবীন এন্টারপ্রেনার তার সঞ্চয় জলে ফেলে বাড়ি চলে এলো। 

জ্যোতিবাবুকে কিছু বলতে হতো না ,  শুধুই জয়কৃষ্ণ বাবু এদের কাউকে দেখে না হাসলেই যখন চন্দন হার্ডল মুক্ত হতে পারতো সেখানে সেটুকু মাত্র এঁরা করেননি।  

আনন্দবাজার/ বর্তমান এবং যতীন/সুবোধ চক্র এক নবীন এন্টারপ্রেনার কে ধংস করতে চেয়েছিলেন ।  

চন্দন তাই বলেছিলেন,  আমার অপরাধ ছিলো আমি জ্যোতি বসুর মতো এক রাজনীতিকের ছেলে হয়ে জন্মেছিলাম তাও আবার এই বাংলায়। 

জ্যোতিবাবুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর ছেলেকে নিয়ে কেনো লিখলাম ? 
উপসংহার টা হলো ,  জ্যোতি বাবুর এই ঋজু ও সততাকে কোনও মতে  ঢাকা দেওয়া যাবে না  "মমতা সততা শাড়ি"র ঢক্কানিনাদে॥ জ্যোতিবাবু তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রেও সৎ জীবন কাটিয়েছেন॥ 

জ্যোতিবাবু / বুদ্ধবাবুর ব্যক্তি সততার ক্ষেত্রে পায়ের নখের যোগ্য নন তাঁদের সমালোচকেরা ॥ রাজনীতির সমালোচকরা রাজনীতির সমালোচনা করুন কিন্তু ব্যক্তিগত সততার প্রশ্নে কিছু বলার আগে নিজের দিকে তাকান ॥  

কৃতজ্ঞতা :  জ্যোতির্ময় হাজরা দা 

তিনি নেই, তাঁর ছড়িয়ে যাওয়া মণিমানিক্য গুলো আছে!❤❤

সোমবার, ১ জুলাই, ২০২৪

ডক্টরস ডে ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


চেতনার জগতের এক মহাশূন্যতা আর ভারসাম্য রক্ষা করার খেলায় নিয়োজিত দুই খেলোয়াড়, চিকিৎসক আর রুগী আর বাকি অসংখ্য মানুষ যারা সবাই স্বঘোষিত আদর্শবান রেফারি হিসেবে হুইসিল মুখে অপেক্ষমান যে চিকিৎসকদের বিন্দুমাত্র ত্রুটি বিচ্যুতি দেখলে "ফাউল" বলে ফুউউউর করে বাঁশি বাজিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষার স্বার্থে চিকিৎসক সমাজের একটা বড় অংশ নিজেদের, ঈশ্বর নই, নিছক পেশাদার" এই মডেলটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছেন। 

দার্শনিক রেনে দেকর্তে এর দ্বিত্ববাদের এই মডেল, যাতে প্রাণ ও মনকে আলাদা ভাবে দেখানো হয়েছে তার সীমাবদ্ধতা এইখানেই যে সেটা চিকিৎসককে নিরাসক্ত, নৈব্যর্তিক বিজ্ঞান-পেশাদার এর সীমাবদ্ধ ভূমিকায় আটকে রেখেছে। ওই মডেল এর বিপ্রতীপ কোনো মডেল যেখানে যুক্তিশাস্ত্র, মনস্তত্ববিদ্যা, নীতিশাস্ত্র সবকিছুই মিশে আছে,  মেডিসিন এর তেমন  দর্শনতত্ত্ব এর তত্ত্বতলাশ সামান্য একটু করে দেখা যেতে পারে। 

ডাক্তার শব্দটা শব্দতত্ব অনুযায়ী আসলে শিক্ষক থেকে এসেছে। চিকিৎসকের ঐতিয্যপূর্ণ অবয়ব ও অবস্থানের ঐতিহাসিক বস্তুগত উপাদান আছে যার ওপরে দাঁড়িয়ে রুগীর সাথে(এবং তার বাড়ির লোকের সাথে) সংলাপে তার ভূমিকাটা নিরূপিত হচ্ছে।ইন্টেলেকচুয়াল হেজিমনির আসন থেকে সরে এসে (যেমনটা রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন), একজন চিকিৎসক রোগীকে বা তার বাড়ির লোককে ঠিক কি ধরনের যে ভাষা, শব্দ প্রয়োগ করে সংলাপে যাবেন যাতে করে সেটা অন্যদের অনুধাবনযোগ্য হয়, সেটা মস্ত একটা চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জের এটা শেষ নয়, এটা শুরু। 

বিংশ শতাব্দীর মেডিক্যাল এথিক্স এর সম্ভবতঃ সবচেয়ে পরিচিত বিশেষজ্ঞ ডাঃ এডমান্ড পেলেগ্রিনো এর ভাষায় "মেডিসিন হল বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মানবিক, শিল্পকলাগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রায়োগিক এবং মানবীবিদ্যাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত।" উনি লক্ষ্য করেছেন যে "মানবজীবনের সমস্ত সমস্যা - নিরাসক্তি, অনুরাগ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা, এমনকি মোক্ষলাভ অবধি মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে যে অস্তিত্ববাদী পরীক্ষণাগারে তার নাম হাসপাতাল। প্রতিটি মানবতাবাদী প্রশ্ন আরো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে যখন বস্তুগত পরিবেশে তাকে ফেলা হয়।" 

ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিতে মেডিসিন এর বিষয়গুলি (স্বাস্থ্য, অসুস্থতা এবং অসুস্থ মানুষ) এবং মেডিসিন এর লক্ষ্যবস্তু (চিকিৎসা, হৃত স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার, অথবা স্রেফ কষ্ট যন্ত্রণার উপশম) চিহ্নিত করতে আমাদের সাহায্য করেছে কিছুদূর অবধি। পরিবেশগত, পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার জন্য যে চিকিৎসক তার অধিত বিদ্যার পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারছেন না, তার মানবতাবাদী প্রশ্নগুলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসক,  আয়োজকদের নির্মম নিরাসক্ত উদাসীনতার নিরেট পাথরের দেয়ালে মাথা কুটে মরছে, দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জের সেইখানে শুরু। ওয়ার্ডে কুকুর বিড়ালের সাথে সদ্যজাত মনুষ্য সন্তানের  শান্তি পূর্ন সহবস্থানকে একজন চিকিৎসকের পক্ষে নিরাসক্ত, নৈব্যর্তিক বিজ্ঞান-পেশাদার হিসেবে মেনে নেয়াকে আর যাই হোক, দেকার্তে মডেল বলা যায় না। 

ডাক্তার তাহলে আর ঈশ্বর রইলেন না, চিরন্তন শিক্ষক রইলেন না, নৈব্যর্তিক পেশাদার রইলেন না, তিনি নেমে আসলেন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে রুগীদের মাঝে তাঁর যাবতীয় যত্নআত্তি, সমবেদনা ও করুণা দিয়ে রুগীকে জড়িয়ে ধরতে। এই থ্রি সি মডেল (Care, compassion & Charity) অনুযায়ী রোগীকে মেডিক্যাল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ধরে নিয়ে মেডিক্যাল দর্শন একজন চিকিৎসককে শেখায় কিভাবে সে রোগীর মধ্যে এক যন্ত্রণাকাতর সহনাগরিককে দেখতে পাবে। এইবার আসছে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। 

কনজ্যুমার প্রটেকশন এক্ট বা ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড এর যত যাবতীয় ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে মা উড়ালপুলের ওপর আকস্মিক হৃদ রোগে আক্রান্ত সহ নাগরিক কে সিপিয়ার প্রয়োগ করে যে চিকিৎসক বাঁচিয়ে তুললেন, জনগণের যাবতীয় জয়ধ্বনির মাঝে তিনি সেই নিঃসঙ্গ মানুষ যিনি জানেন মেডিক্যাল এপিস্টেমলজি বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানতত্বের সীমাবদ্ধতা ঠিক কতটা। ওই রুগী বেঁচেছে বলে একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে পরবর্তী রুগী টিকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। 

কোন রোগকে নিরাময় করতে যখন একজন চিকিৎসক ব্যর্থ হ'ন তখন তার সামনে কি কি পথ খোলা থাকছে আসুন একবার দেখা যাক। মেডিক্যাল রাশিবিজ্ঞানের প্রয়োগ হয়তো বলছে ওই নির্দিষ্ট রুগীর আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা মাত্র দুই শতাংশ। এই তথ্যটি অবিকৃত, অবজেক্টিভ ভাবে রুগী বা তার বাড়ির লোকের কাছে উপস্থাপন করাই কোনো মানবিক চিকিৎসকের আদর্শ কাজ হতে পারে না। রুগীর বা তার বাড়ির লোকের সাথে সংলাপ এর সাবজেক্টিভ ভাষ্য সেই চিকিৎসককে সেই রুগীর জন্য আলাদা করে প্রস্তুত করতে হয়। প্রব্যবিলিটির থিওরি প্রয়োগ করে কোন নির্বিকল্প একাডেমিক ডিসকোর্স হচ্ছে না। একটি মানুষের বাঁচা মরা এবং অবধারিত মৃত্যু হলে তার শেষ দিনগুলোর জন্য একটা টার্মিনাল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান বা পরিকল্পনা তৈরি হয় ওই সংলাপের মধ্যে দিয়ে।

ডাক্তার যেখানে নিরাময়কারী নয়, পেশাদার গ্রিফ কাউন্সিলর মাত্র। অন্ততঃ হাজার খানেক স্টাডি আছে যেখানে রুগী বা তার বাড়ির লোক চিকিৎসকের ডিগ্রি এই সাথে তার ব্যবহার, সমবেদনার ভাষা জানানোর ক্ষমতাকে একজন 'ভালো ডাক্তার" আখ্যা পাওয়ার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে ঘোষণা করেছে। এই বার আসছে চতুর্থ চ্যালেঞ্জ। 

সমাজ সভ্যতার যে বিকৃত অগ্রগতি একই সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটিয়েছে আর একই সাথে স্বাস্থ্য কে মৌলিক অধিকার থেকে রূপান্তরিত করেছে পণ্যে, সেই শীর্ষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে একজন চিকিৎসকের কতটুকু ক্ষমতা আছে সমবেদনার সেই বয়ান ভাষ্য রচনা করার। প্রিয়জনের মৃত্যু তে শোকে অধীর, সাধ্য অতিরিক্ত ব্যয় করে বাঁচাতে না পারার জ্বালা যন্ত্রণায় অস্থির ক্রুদ্ধ জনতার সামনে একজন চিকিৎসক তো অসহায় নিগ্রহের বস্তু, যার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে না নেয়া অবধি ওই জনতার শান্তি নেই, "আমি তোমাদের লোক" বলে তাঁকে কেউ ভাবছেই না। 

এত চ্যালেঞ্জের পরেও তাহলে এই পেশায় আসে কেন কেউ? বেশ কিছু পেশা আছে, মানুষ নানা কারণে বেছে নিতে বাধ্য হয় যাতে তার ছাত্র জীবনের অধিত বিদ্যে কাজে লাগে না। ফিজিক্স অনার্স পড়ে ব্যাংক এর চাকরি, ইলেকট্রনিকস এ এম টেক হয়ে মৎস দপ্তরের আইএএস সচিব। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এম বি এ করে টুথ পেস্ট বিক্রি। সে দিক দিয়ে ডাক্তারদের বেশির ভাগই সৌভাগ্যবান। যা শিখেছে, সেটাই রোজ কাজে প্রয়োগ করতে হয়। ডাক্তারি পাস করার প্রত্যেকটা পরীক্ষা খুব ভয়াবহ হয়। প্রচুর ফেল করে, সাপ্লি পায়। এপ্রোন পড়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আট ঘন্টা ধরে ভাইভা আর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিতে হয়। যারা দিয়েছে, তারাই জানে সেই নরক যন্ত্রণা কাকে বলে। ফাইনাল পাশ করে যাওয়ার পরে মনে হয়েছিল আঃ কি আরাম, এসব থেকে মুক্তি। কেউ সেদিন বলে দেয়নি যে মুক্তি নেই, এই সবে শুরু। সারা জীবন, রোজ, অসংখ্যবার ওই পরীক্ষায় বসতে হবে।

যেমন ধরা যাক সামান্য জ্বরের রোগী (যদিও সামান্য জ্বর বলে কিছু হয় না)। ডাক্তার অনেক কিছু দেখে ভেবে ওষুধ লিখলেন। জ্বর না সারলে ফেল। সাধারণ থেকে জটিল অস্ত্রোপচার, কথাই নেই, প্রত্যাকটাই এক একটা পরীক্ষা। অসফল মানে রুগীর মৃত্যু। তবুও সারা পৃথিবী জুড়ে, ভারত জুড়ে, অসংখ্য ডাক্তার রোজ কত বার এই পরীক্ষায় বসে স্বেচ্ছায়। মার্কশিট মহাকালের হাতে। পাশ না ফেল, সেটার ওপর নির্ভর করে একটা পরিবারের ভবিষ্যৎ। সবটা জেনে বা না জেনে, এই পরীক্ষায় বসতেই হয়। সিন-আনসিন, কমন-আনকমন যে কোনো প্রশ্ন আসতে পারে। এক্সামিনেশন হল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সেই কুড়ি বছরের নার্ভাস তরুণ বা তরুণী যে ভাবে এক্সাম হলের সামনে অপেক্ষা করতো, বাঘা বাঘা সব এক্সামিনারের নানা প্রশ্ন ফেস করার আশংকায় তার হাতের তালু ঘেমে যেত, ঘন ঘন জল তেষ্টা পেত, সেই রকম নার্ভাস না হলেও, প্রতিবার একজন নতুন রুগী নামক প্রশ্নপত্রের সম্মুখীন হওয়ার সময় বুকের স্পন্দন সামান্য হলেও দ্রুত হয়, কি একটা আবেগ তিরতির করে কাজ করে। নিজের হার্টবিট এর শব্দ নিজেই শুনতে পায় সেই ডাক্তার। প্রত্যেকবার তাকে যে করেই হোক, পাশ করতেই হবে, ফেলের কোনো জায়গা নেই।

অসফল হওয়ার আশঙ্কায় ভুগে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পরার ঝুঁকি নিয়ে, সফল হওয়ার তাগিদে অসম্ভব পরিশ্রমের ফলে বয়সের আগেই বুড়িয়ে গিয়ে, ফুরিয়ে গিয়ে, বার্নট আউট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও জীবন মৃত্যুর এই খেলায় একজন চিকিৎসক জয়ী হতে চায়।  নিজের বুকে স্টেথো বসিয়ে সে নিজেই শুনে নিতে চায় তার হৃদয়ের সেই শব্দ যেটা বলে দেয় যে সে চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত, সে সুখী হতে চায় না, জয়ী হতে চায়। সুখী চিকিৎসক দিবস বলে কিছু নাই। নো হ্যাপি ডক্টরস ডে।