মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০

ক্ষুদিরাম ~ ঋতুপর্ণ বসু

----- আমি মেদিনীপুর জেলার অধিবাসী। বাপ মা নেই, ভাই নেই, কাকা, মামা কেউ নেই। এক দিদি আছেন। তাঁর অনেক ছেলেপুলে, বড়টি আমার সমবয়সী। মেদিনীপুরে, জজের হেডক্লার্ক, বাবু অমৃতলাল রায়ের সঙ্গে দিদির বিয়ে হয়। ওঁরাই আমার একমাত্র আত্মীয়। অবিনাশচন্দ্র বসুও আমার আত্মীয় কিন্তু আমার সম্পর্কে তাঁর কোন আগ্ৰহ আছে বলে মনে হয় না।
Khsudiram Basu
আমি সেকেন্ড ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলাম কিন্তু দুতিন বছর আগে পড়া ছেড়ে দিয়েছি। তখন থেকে আমি স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্ৰহণ করি। সেই থেকে আমার জামাইবাবু ( অমৃতলাল রায় ) আমাকে ত্যাগ করেন। আমার মা নেই, আমার বাবা দশ এগারো বছর আগে মারা যান। আমার সৎমা ছিলেন। তিনি তাঁর ভাই সুরেন্দ্রনাথ ভন্জের কাছে থাকতেন। আমি তাঁর ঠিকানা জানি নে, কি করেন তাও জানি নে।
প্রশ্ন ; তুমি কি কাউকে দেখতে চাও ?
--- হ্যাঁ, আমি একবার মেদিনীপুর যেতে চাই, আমার দিদি ও ছেলেপুলেদের দেখতে চাই।
প্রশ্ন ; তোমার মনে কোন কষ্ট আছে ?
---- না, কোন কষ্ট নেই।
প্রশ্ন ; আত্মীয় স্বজনকে কোন কথা জানাতে চাও কি ? অথবা ওঁদের কেউ এসে তোমায় সাহায্য করুক এমন ইচ্ছে করে কি ?
---- না, আমার কোন ইচ্ছা তাঁদের জানাবার নেই। তাঁরা যদি ইচ্ছে করেন আসতে পারেন।
প্রশ্ন ; জেলে তোমার সাথে কি রকম ব্যবহার করা হয় ?
---- মোটামুটি ভাল। খাবারটা ( ভাতটা ?) বড় মোটা, আমার ঠিক সহ্য হয় না। শরীরটা খারাপ করে দিয়েছে। নচেৎ, আমার সঙ্গে অসৎ ব্যবহার করা হয় না। আমাকে একটা নিঃসঙ্গ সেলে আটকে রাখে। সেখানে দিনরাত্রি থাকতে হয়। একবার মাত্র স্নান করার সময় বেরিয়ে আসতে দেওয়া হয়। একা থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সংবাদপত্র বা অন্য কিছু পড়তে দেওয়া হয় না। এগুলো পেতে খুবই ইচ্ছা করে।
প্রশ্ন ঃ কোন রকম ভয় করে তোমার ?
---- ভয় করবে কেন ? ( হাসি )
প্রশ্ন ; গীতা পড়েছ ?
---- হ্যাঁ পড়েছি।
প্রশ্ন ; তুমি জান আমরা রংপুর থেকে তোমার পক্ষ সমর্থনে এসেছি, কিন্তু তুমি তো এর আগেই দোষ স্বীকার করেছ ?
----- কেন করব না ? ( হাসি )
( ক্ষুদিরামকে আইনি সহায়তা দেবার জন্য কালিদাস বসুর নেতৃত্বে একদল উকিল রংপুর থেকে মজঃফরপুরে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে বিচারাধীন ক্ষুদিরামের কথোপকথন প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক সন্জীবনি পত্রিকায়। তারিখ ১৮ ই জুন, ১৯০৮। ক্ষুদিরামের পক্ষ সমর্থনকারী বাবু সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর প্রশ্নের উত্তরে ক্ষুদিরাম উপরোক্ত কথাগুলি বলেন। )
ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির সময় দুজন বাঙালী উপস্থিত ছিলেন। একজন হলেন বেঙ্গলী কাগজের সংবাদদাতা ও উকিল উপেন্দ্র নাথ বসু আর অন্যজন হলেন ক্ষেত্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। উপেন্দ্র নাথ বসু ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি নিয়ে সেই সময় একটা লেখা লেখেন, নিচে রইল সেই লেখাটিই............
"মজঃফরপুরে আমাদের উকিলদের একটি ছোট্ট আড্ডা ছিল। আমরা প্রতি শনিবার সেখানে একত্রিত হইয়া গল্প করিতাম, রাজা উজির বধ করিতাম। ১লা মে শোনা গেল মজঃফরপুর হইতে ২৪ মাইল দূরে উষা নামক স্টেশনে একটি বাঙ্গালী ছাত্রকে পুলিশ ধরিয়া আনিয়াছে। দৌড়িয়া স্টেশনে গিয়া শুনিলাম পুলিশ ছাত্রটিকে লইয়া সোজা সাহেবদের ক্লাবের বাড়িতে গিয়াছে। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ উডম্যান তাহার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিতেছেন। পরদিন সকালে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ উডম্যান বাঙালী উকিলদিগকে নিজের এজলাসে ডাকাইয়া পাঠাইলেন। আমাদের মধ্যে প্রবীন উকিল শ্রীযুক্ত শিবচরণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সরকারী উকিল। তাঁর সঙ্গে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে উপস্থিত হইয়া দেখি, কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছে একটি ১৫/১৬ বছরের প্রিয়দর্শন বালক। এতোগুলো বাঙালী উকিল দেখিয়া ছেলেটি মৃদু মৃদু হাসিতেছে। কি সুন্দর চেহারা ছেলেটির, রঙ শ্যামবর্ণ কিন্তু মুখখানি এমনই চিত্তাকর্ষক যে দেখিলেই স্নেহ করিতে ইচ্ছা করে। উডম্যান সাহেব যখন ছেলেটির বর্ণনা পড়িয়া আমাদের শোনাইতে লাগিলেন, তখন জানিলাম ছেলেটির নাম ক্ষুদিরাম বসু নিবাস মেদিনীপুর। ক্ষুদিরামের বর্ণনা পড়িতে পড়িতে ক্রোধে উডম্যান সাহেবের বদন রক্তবর্ণ ও ওষ্ঠ কম্পিত হইতেছিল। দায়রায় ক্ষুদিরামের পক্ষ সমর্থনের জন্য কালিদাসবাবুর নেতৃত্বে আমরা প্রস্তুত হইতে লাগিলাম। নির্ধারিত দিনে রঙপুর হইতে দুজন উকিল এই কার্যে সহয়তা করিতে আসিলেন। একজনের নাম সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী। এজলাস লোকারণ্য, তিন-চার জন সাক্ষীর জবানবন্দী, জেরা ও বক্তৃতা শেষ হইলে, ক্ষুদিরামের উপর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হইল। আদেশ শুনিয়া ক্ষুদিরাম জজকে বলিলো, 'একটা কাগজ আর পেনসিল দিন, আমি বোমার চেহারাটা আঁকিয়া দেখাই। অনেকেরই ধারণাই নাই ওই বস্তুটি দেখিতে কিরকম'। জজ ক্ষুদিরামের এ অনুরোধ রক্ষা করিলেন না। বিরক্ত হইয়া ক্ষুদিরাম পাশে দাঁড়ানো কনস্টেবলকে ধাক্কা দিয়া বলিল, 'চলো বাইরে'। ইহার পর আমরা হাইকোর্টে আপিল করিলাম। ক্ষীণ আশা ছিল, যদি মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাব্বজীবন কারাদণ্ড হয়। জেলে তাহাকে এ প্রস্তাব করিতেই সে অসম্মতি জানালো, বলিল 'চিরজীবন জেলে থাকার চেয়ে মৃত্যু ভালো'। কালিদাস বোঝাইলেন দেশে এমন ঘটনা ঘটিতেও পারে যে তোমায় বেশিদিন জেলে থাকিতে নাও হইতে পারে। অবশেষে সে সম্মত হইল। কলকাতা হাইকোর্টের আপিলে প্রবীন উকিল শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র নাথ বসু হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা দিলেন। কিন্তু ফাঁসীর হুকুম বহাল রহিল। ১১ আগস্ট ফাঁসির দিন ধার্য হইল।
আমরা দরখাস্ত দিলাম যে ফাঁসীর সময় উপস্থিত থাকিব। উডম্যান সাহেব আদেশ দিলেন দুইজন মাত্র বাঙালী ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিতে পারিবে। আর শব বহনের জন্য ১২ জন এবং শবের অনুগমনের জন্য ১২ জন থাকিতে পারিবে। ইহারা কতৃপক্ষের নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে যাইবে। ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিবার জন্য আমি ও ক্ষেত্রনাথ বন্দোপাধ্যায় উকিলের অনুমতি পাইলাম। আমি তখন বেঙ্গলী কাগজের স্থানীয় সংবাদদাতা। ভোর ছ'টায় ফাঁসী হইবে। পাঁচটার সময় আমি গাড়ির মাথায় খাটিয়াখানি ও সৎকারের অত্যাবশকীয় বস্ত্রাদি লইয়া জেলের ফটকে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম নিকটবর্তী রাস্তা লোকারন্য। সহজেই আমরা জেলের ভিতরে প্রবেশ করিলাম। ঢুকিতেই একজন পুলিশ কর্মচারী প্রশ্ন করিলেন বেঙ্গলী কাগজের সংবাদদাতা কে?
আমি উত্তর দিলে হাসিয়া বলিল, আচ্ছা ভিতরে যান। দ্বিতীয় লোহার দ্বার উন্মুক্ত হইলে আমরা জেলের আঙ্গিনায় প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম ডানদিকে একটু দূরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ। দুই দিকে দুই খুঁটি আর একটি মোটা লোহার রড যা আড়াআড়িভাবে যুক্ত তারই মধ্যখানে বাঁধা মোটা একগাছি দড়ি ঝুলিয়া আছে। তাহার শেষ প্রান্তে একটি ফাঁস। একটু অগ্রসর হইতে দেখিলাম ক্ষুদিরামকে লইয়া আসিতেছে চারজন পুলিশ। কথাটা ঠিক বলা হইল না। ক্ষুদিরামই আগে আগে অগ্রসর হইয়া যেন সিপাহীদের টানিয়া আনিতেছে। আমাদের দেখিয়া একটু হাসিল। স্নান সমাপন করিয়া আসিয়া ছিল। মঞ্চের উপস্থিত হইলে তাহার হাত দুইখানি পিছন দিকে আনিয়া রজ্জুবদ্ধ করা হল। একটি সবুজ রঙের টুপি দিয়া তাহার গ্রীবামূল পর্যন্ত ঢাকিয়া দিয়া ফাঁসি লাগাইয়া দেওয়া হইল। ক্ষুদিরাম সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। এদিক ওদিক একটুও নড়িল না।
উডম্যান সাহেব ঘড়ি দেখিয়া একটি রুমাল উড়াইয়া দিলেন। একটি প্রহরী মঞ্চের একপ্রান্তে অবস্থিত একটি হ্যান্ডেল টানিয়া দিল। ক্ষুদিরাম নিচে অদৃশ্য হইয়া গেল। কেবল কয়েক সেকেণ্ড ধরিয়া উপরের দিকের দড়িটা একটু নড়িতে লাগিল। তারপর সব স্থির। কর্তপক্ষের আদেশে আমরা নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে চলিতে লাগিলাম। রাস্তার দুপাশে কিছু দূর অন্তর পুলিশ প্রহরী দাঁড়াইয়া আছে। তাহাদের পশ্চাতে শহরের অগণিত লোক ভীড় করিয়া আছে। অনেকে শবের উপর ফুল দিয়া গেল। শ্মশানেও অনেক ফুল আসিতে লাগিল। চিতারোহণের আগে স্নান করাইতে মৃতদেহ বসাইতে গিয়া দেখি মস্তকটি মেরুদণ্ড চ্যুত হইয়া বুকের উপর ঝুলিয়া পড়িয়াছে। দুঃখে – বেদনায় – ক্রোধে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাথাটি ধরিয়া রাখিলাম। বন্ধুগণ স্নান শেষ করাইলেন তারপর চিতায় শোয়ানো হইলে রাশিকৃত ফুল দিয়া মৃতদেহ সম্পূর্ণ ঢাকিয়া দেওয়া হইল। কেবল উহার হাস্যজ্বল মুখখানা অনাবৃত রহিল। দেহটি ভস্মিভূত হইতে বেশী সময় লাগিলো না। চিতার আগুন নিভাইতে গিয়া প্রথম কলসী ভরা জল ঢালিতেই তপ্ত ভস্মরাশির খানিকটা আমার বক্ষস্থলে আসিয়া পড়িল। তাহার জন্য জ্বালা যন্ত্রনা বোধ করিবার মতন মনের অবস্থা তখন ছিল না। আমরা শ্মশান বন্ধুগণ স্নান করিতে নদীতে নামিয়া গেলে পুলিশ প্রহরীগণ চলিয়া গেল। আর আমরা সমস্বরে বন্দেমাতরম বলিয়া মনের ভার খানিকটা লঘু করিয়া যে যাহার বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম। সঙ্গে লইয়া আসিলাম একটি টিনের কৌটায় কিছুটা চিতাভস্ম, কালিদাসবাবুর জন্য। ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলায় সে পবিত্র ভস্মাধার কোথায় হারাইয়া গিয়াছে ।"
বেঙ্গলী পত্রিকা, আগষ্ট, ১৯০৮
ফাঁসির সাজা ঘোষণা শুনে শুধু হেসেছিলেন। ফাঁসিকাঠে দাঁড়িয়ে যখন কালো মুখোশ পরানো হল, তখনও শেষবারের মতো দেখাগিয়েছিল সেই হাসি। তাঁর ফাঁসির পর ব্রিটিশ পত্রিকা 'এম্পায়ার'এ প্রকাশিত হয়, '…নিথর মৃতদেহ। কিন্তু, মুখের হাসি সেই হাসি।' এভাবেই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। এই অগ্নিযুবকই হলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের কনিষ্ঠতম শহিদ। আজ তাঁর ১০৯তম মৃত্যুদিবস।

অবিভক্ত মেদিনীপুরে জন্ম ক্ষুদিরামের। শৈশবেই বাবা মা-কে হারান। মাত্র ১২ বছর বয়সেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন ক্ষুদিরাম। স্কুলে পড়াকালীন রিভলবার চেয়ে চমকে দিয়েছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগোকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথমবার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাতে বোমা তুলে নেন। একাধিকবার পুলিশের হাতে ধরাও পড়েন।

তৎকালীন সময়ে বিহারের মুজাফ্ফরপুরের মেজিস্ট্রেট ছিলেন বড়লাট ডগলাস কিংসফোর্ড। কলকাতা প্রেসিডেন্সির চিফ মেজিস্ট্রেট থাকাকালীন বহু তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের নির্মম সাজা দিয়েছিলেন তিনি। অত্যাচারী এই ব্রিটিশ প্রশাসককে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে।

মুজাফ্ফরপুরের মোতিঝিল এলাকায় পাঠানো হয় ক্ষুদিরামকে। সেখানে হরেন সরকার নাম নিয়ে এক ধর্মাশালায় থাকতে শুরু করেন ক্ষুদিরাম। একইসঙ্গে নজর রাখছিলেন কিংসফোর্ডের গতিবিধির উপর।


১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় ইউরোপিয়ান ক্লাবের গেটে কিংসফোর্ডের গাড়ির অপেক্ষা করছিলেন ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী। গাড়ি ক্লাবের গেটে পৌঁছলে, একহাতে বন্দুক তুলে তা থামান ক্ষুদিরাম। এরপর আরেক হাতে বোমা নিয়ে গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়েন। বিস্ফোরণে ৩ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু, তাঁদের মধ্যে কিংসফোর্ড ছিলেন না। মুজাফ্ফরপুরের বার অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাডভোকেট প্রিঞ্জল কেনেডির পরিবারের সদস্যরা ওই বোমায় নিহত হন।

এরপরই প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরামের পিছনে ধাওয়া করে ব্রিটিশ পুলিশ। পরের দিনই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম। কয়েকদিন পর মোকামঘাটের কাছে এক রেলস্টেশনে পুলিশের জালে ধরা পড়েন চাকী। কিন্তু, তিনি নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। আদালত দোষীসাব্যস্ত করে ক্ষুদিরাম বসুকে। ১৯০৮ সালের ১১ অগাস্ট ফাঁসি দেওয়া হয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কনিষ্ঠতম বিপ্লবীকে। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই শহিদ হন ক্ষুদিরাম।

দুঃসাহসী ক্ষুদিরামের বলিদান দেশের যুব সম্প্রদায়ের কাছে চিরঅমর রয়ে গেছে।

শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২০

মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি ~ সুশোভন পাত্র

ফোর্বসের 'রিয়েল টাইম বিলিওনারিস'-র লিস্টে পঞ্চম স্থানে উঠে এসে মুকেশ ভাই বলেছেন "টাকা কামানোর জন্য ব্যবসা করার মানেই হয় না। পৃথিবীতে টাকা দিয়ে বিশেষ কিছুই কেনা যায় না।" হ্যাংলা মিডিয়া মুকেশ ভাই-র হাম্বেল বাণী তে মুগ্ধ হয়ে হামলে পড়ে এমন জিভ বের করেছে যে, জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষকরা আজকাল অনলাইন ক্লাসে নাকি প্রতিবর্ত ক্রিয়া বোঝাতে কুকুরের জিভের বদলে অর্ণব গোস্বামীদের জিভের উদাহরণ দিচ্ছেন।  
কুকুরের কিংডমে এই নির্মম দখলদারি তে বিমর্ষ হয়ে, মুদি দোকানের লাইনে দাঁড়িয়ে রাস্তার কুকুরটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওমনি পাড়ার রাজনৈতিক বিরোধী কাকু এসে বললেন "দেখলে তো, মুকেশ আম্বানি কেমন দিল! অর্থনীতি কে এবার রোখে কোন বাপের ব্যাটার সাধ্যি দেখি।" অগত্যা প্রতিবর্ত ক্রিয়া থেকে অর্থনীতি তে সুইচ করে বললাম, "কাকু, ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষে প্রতি মিনিটে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি গড়ে ২৩,৪০,১৫০টাকা করে বেড়েছে¹। আপনার স্যালারিটা যেন কত বেড়েছে?" বিরোধী কাকু জনসমক্ষে স্যালারির প্রসঙ্গ তোলায় পুরো জেনারেশেনের স্বভাব-ভদ্রতার ১৪গুষ্ঠি উদ্ধার করে দিলেন। কুকুরটা অবশ্য বসেই ছিল।
থাকুক গে। বিবেকানন্দ তো বলেছেন, যে বসে থাকে, তার ভাগ্যও নাকি বসে থাকে। অবশ্য এসব থিওরি সাধারণ মানুষের জন্য। মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম। মুকেশ ভাই বসে থাকলেও, ভাগ্য দাঁড়িয়েই থাকে। ঐ যে কি বলে যেন? 'ক্রনি ক্যাপিটালিজম' না কি ছাই! 
'ক্রনি-ফনি' ছাড়ুন। পয়েন্টে আসুন। ৪২তম অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিং-এ মুকেশ ভাই যেদিন ঘোষণা করলেন ১৮মাসের মধ্যে রিলায়েন্স কে 'ঋণমুক্ত' করার রোডম্যাপ রেডি, তখন বাজারে রিলায়েন্সের মোট ঋণ ১.৫৪লক্ষ কোটি। ক্রেডিট সুইসের বিচারে স্টক মার্কেটে রিলায়েন্সের শেয়ারের মান 'নিম্ন'। 
ঘোষণার ৯দিনের মাথায়, Serious Fraud Investigation Office জানালো, যে সময়ে চিদাম্বরম INX মিডিয়া তে মরিসাসের কোম্পানির অবৈধ বিনিয়োগ কে মান্যতা দিয়েছিলেন, সেই সময়ে রিলায়েন্সই, INX-র অধীনস্থ নিউজ-X চ্যানেলের মালিকানা কিনে ঐ অবৈধ বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম করেছিল²। 
INX নিয়ে তদন্তের মাঝেই, মুম্বাই উপকূলে পান্না-মুক্তা-তাপ্তি বেসিনের গ্যাস এবং তেল উত্তোলনে আর্থিক অসঙ্গতির কারণে, দিল্লি হাইকোর্টে সৌদি আরামকোর সঙ্গে রিলায়েন্সের ৫৭হাজার কোটির চুক্তি আইনি জটিলতায় পড়ল। অন্যদিকে লকডাউনের মুখে, রাসায়নিক পিউরিফাইয়েড  টেরেফথালিক অ্যাসিডের আমদানি শুল্ক কমলে, পলিয়েস্টার তৈরিতে মার্কেটে রিলায়েন্সের একছত্র আধিপত্যও খর্ব হল। পর পর, বাণিজ্যিক ধাক্কায়, গোল্লায় যাওয়া 'মার্কেট রেপুটেশনের' ক্যাসক্যাডিং এফেক্টে রিলায়েন্সের শেয়ারের মূল্য তখন ১৩৫০টাকা থেকে গোত্তা খেয়ে ৮৬৭-তে³। 
কিন্তু মুকেশ ভাই তো ব্যতিক্রম। তাই মুকেশ ভাই-র ভাগ্য ফেরাতে মাঠে নামল স্বয়ং আরবিআই। রেপো রেট পরিবর্তন করে, সরকারী বন্ড কিনে, অর্থনীতি তে পর্যাপ্ত ক্যাশের জোগান বজায় রাখার মনিটারি পলিসির চল বহুদিনের। কিন্তু এই প্রথমবার আরবিআই জানালো, প্রয়োজনে ১৯৩৪-র অ্যাক্ট বদলে, 'কর্পোরেট বন্ড' কেনার কথাও ভাবছে তারা⁴। খবর চাউর হতেই রিলায়েন্সের শেয়ারের দাম বাড়ল ২৩%। ৬ মাসে প্রথমবার।  
প্রধানমন্ত্রীর 'আত্মনির্ভর' বক্তৃতার ২৪ঘণ্টা পেরনোর আগেই মুকেশ ভাই ঘোষণা করলেন 'সম্পূর্ণ দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে' টেলিকমে 5G-র বিপ্লব আনবে রিলায়েন্স। আমেরিকার Qualcomm আর দক্ষিণ কোরিয়ার Samsung-র সঙ্গে চুক্তি বদ্ধ হয়ে, Huawei-র পেটেন্ট ব্যবহার করে কিভাবে জিও "সম্পূর্ণ দেশীয় 5G-র বিপ্লব আনবে" সে প্রশ্ন শিকেয় তুলে, বক্তৃতা আর ঘোষণার আন্তঃ সম্পর্কের ইঙ্গিত বুঝতে ভুল হয়নি জুকেরবার্গের মত ব্যবসিকদের⁵। ফলত দু-মাসে জিও-র ঝুলিতে এলো ফেসবুক সহ বিভিন্ন কোম্পানির মোট ৮৬,৬৫৪কোটির চুক্তি। কিন্তু তখন রিলায়েন্স'র ১.৫লক্ষ কোটির 'ঋণমুক্তি'র লক্ষ্য দুরস্ত। 
তাই মুকেশ ভাই-র ইচ্ছে হল, মার্কিন শেয়ার বাজার ন্যাসড্যাকে রিলায়েন্সের 'রাইটস ইস্যু' করবেন। গোদা বাংলায়, শেয়ার হোল্ডারদের কম পয়সায় নতুন শেয়ার কেনার সুযোগ দিয়ে পয়সা কামাবেন। কিন্তু আপনি বলবেন তা আবার হয় নাকি? সেবি-র নিয়মে তো কোন কোম্পানির বিরুদ্ধে আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ থাকলে তার রাইটস নাকি ইস্যু করা যায় না? কাগজ-কলমে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া রাইটস নাকি ইস্যু করা যায় না? ভারতীয় কোন কোম্পানির রাইটস বিদেশী শেয়ার মার্কেটে নাকি ইস্যু করা যায় না⁶? 
'যায় না' নয়, বলুন যেত না। কারণ মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম। তাই দেখা গেলো মুকেশ ভাই-র 'রাইটস ইস্যু'র ইচ্ছে হওয়ার ঠিক আগেই, সেবি, প্রথম দুটি নিয়মই শিথিল করতে সার্কুলার জারি করেছে। আর অর্থমন্ত্রী স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার ভারতীয় কোম্পানির রাইটস ইস্যুর জন্য বিদেশের শেয়ার মার্কেটে ব্যবহারের অনুমতিও দিয়ে বসেছেন। অতএব, মুকেশ ভাই 'রাইটস ইস্যু'ও করলেন, ন্যাসড্যাকেই করলেন, ৮৪,৪৬৭কোটি ঘরেও তুললেন। রিলায়েন্স ঋণমুক্ত'ও হল। আর মুকেশ ভাই বিলিওনারিসের লিস্টে পঞ্চম স্থানে উঠেও এলো। 
রিলায়েন্স ছাড়া আর কোন কোম্পানি নতুন নিয়মের ভিত্তিতে রাইটস ইস্যু করল? হঠাৎ কেনই বা এতদিনের নিয়ম শিথিল হল? কেন INX মিডিয়ার তদন্ত থমকে গেলো? উত্তর খুঁজে লাভ নেই। কারণ মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম হতে পারেন, বেইমান নয়! গুরুদক্ষিণা বাবদ PMCares-এ ৫০০ কোটি উনি আগেই দিয়েছেন⁷! 
এতক্ষণ সব ঠিকই ছিল। কিন্তু 'গুরুদক্ষিণা' কথা শুনেই কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। আর অমনি বিরোধী কাকু খেঁকিয়ে উঠে বললেন, "তো কি এমন অন্যায় হয়েছে? রিলায়েন্স অর্থনীতি তে কত কর্মসংস্থান তৈরি করে জানো? সরকার ওনাকে সুযোগ-সুবিধা দেবে না তো তোমাকে দেবে? র‍্যাস্কাল কোথাকার।" 
আসলে বিরোধী কাকুর, ব্রেকফাস্টে চিজ-বাটার, লাঞ্চে পাৎসা আর ডিনারে লো-ক্যালরি কর্ণফেল্কস আছে। বিরোধী কাকুর, মাস গেলে বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে। তাই বিরোধী কাকুর, হাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন গুঁজে, দেশের অর্থনীতি নিয়ে বাতেলা দেওয়ার সুযোগ আছে। উইকঅ্যান্ডে 30ml স্কচের পেগে, "রিলায়েন্স অর্থনীতি তে কত কর্মসংস্থান তৈরি করে জানো?" -ভেবে নাবালক সুলভ অবাক হবার ফ্যান্টাসি আছে। দুঃখ একটাই, এতো কিছু 'আছে'র মধ্যে বিরোধী কাকুর শুধু গায়ে মানুষের চামড়া রাখার অভ্যাসটাই বাদ পড়ে গেছে। 
না হলে বিরোধী কাকু জানতেন কর্মসংস্থান মানে কেবল হোয়াইট কলার জব নয়, কর্মসংস্থান মানে MNREGA-ও। না হলে জানতেন রিলায়েন্স গ্রুপে মোট কর্মসংস্থান ৭৫০০০। আর MNREGA-তে ৫.২কোটি⁸। না হলে জানতেন সম্প্রতি রাষ্ট্রসঙ্ঘ জানিয়েছে ২০০৫-১৫ ২৭কোটি ৩০লক্ষ মানুষ কে দরিদ্রের অন্ধকার থেকে টেনে তুলছে ভারত⁹। কোনও রিলায়েন্স-র দৌলতে নয়, বরং MNREGA-র সৌজন্যে।
তাই যে আপনার আশে পাশের যে সব বিরোধী কাকুরা, কর্মসংস্থান বলতে রিলায়েন্স বোঝেন কিন্তু MNREGA বোঝেন না; কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড়ে কর্মসংস্থানের যুক্তি খোঁজেন, কিন্তু MNREGA-র বাজেট বরাদ্দ ছাঁটাই হলে পুছেও দেখেন না; আম্বানি নিয়ে আদিখ্যেতা করেন, কিন্তু পাড়ার মস্তান তৃণমূল নেতা ক্যালাবে বলে রাজ্যে এসএসসি-টেটের কর্মসংস্থান নিয়ে ট্যাঁ-ফোও করেন না। এই দুঃসময়ে তাঁদের চিনুন। চিজ-বাটার-পাৎসা-কর্ণফেল্কসের নেপথ্যে তাঁদের শ্রেণী চরিত্রটা বুঝুন। চিনুন-বুঝুন, কারণেই পৃথিবীর রোগ একদিন ঠিক সেরে যাবে। তখন অবিকল মানুষের মত দেখতে এই জন্তুদের সোশ্যাল ডিসটেন্সিং লাগবে। কোয়রেন্টাইন লাগবে। দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা লাগবে।

সূত্র:



শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

উগ্রহিন্দুত্ববাদীর আদর্শ ~ অনির্বাণ রায়

সেকি আপনি কার্ল মার্ক্সের পরিচারিকার সাথে অবৈধ বাচ্চার কথা জানেন না? আরে ছিঃ ছিঃ জ্যোতি বসু তো বউ মরার পর শালীকে বিয়ে করেছিল! ফিদেল কাস্ত্রোর কটা রক্ষিতা ছিল জানিস? যাদবপুরে মেয়েরা ছোটো জামা পরে সিগ্রেট খায় আর ফাঁকা ফ্ল্যাটে লেনিন বোঝে।

আজ্ঞে হ্যাঁ। বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে, উগ্রহিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও আরএসএস মদতপুষ্ট 'বানরসেনা'রা এই ডিসকোর্সই ব্যবহার করে আজকাল। আপনি যদি না জেনে থাকেন, একটিবার ঘুরে আসুন তাদের পরিচালিত পেজগুলি থেকে৷ 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন? কেন আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আদর্শ থাকছে না? লজিকের ভাষায় এই জাতীয় কুযুক্তির একটা নাম আছে। Argumentum ad hominem, আর Graham's hierarchy of disagreement এর সবচেয়ে নীচুস্তরের সবচেয়ে কদর্য কুযুক্তি হলো এই অ্যাড হোমিনেম ও Name Calling, অর্থাৎ, মার্ক্স খারাপ কারণ, ডেম্যুথের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ভারতের সবচেয়ে বড়ো ও আজকের দিনে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকে ৭% এর বিরুদ্ধে এরকম কদর্য আক্রমণ করার দরকার পড়ছে কেন? 

পড়ছে তার কারণ খুব সোজা। Hate Sells, আমাদের সমাজে ঘৃণা বিক্রি হয়। আর তা যদি যৌনতাকেন্দ্রীক ঘৃণা হয়ে থাকে তবে তো কথাই নেই। "আমি শুতে পাচ্চিনে, ও কেন শোবে?" মানুষের ঈর্ষার আদিমতম প্রবৃত্তিকে উশকানি দিচ্ছে এই জাতীয় ডিস্কোর্স। খেয়াল করে দেখুন প্রথমে বলা সব কটি ব্যক্তিগতজীবনকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দেওয়া কুযুক্তির পিছনে রয়েছে এক অমোঘ হতাশা। যৌনহতাশা। আমি সারাজীবন ইনবক্সে "হাই ফ্র্যান্ডশিপ করবা" পাঠিয়ে একটা ন্যুড ছবি জোগাড় করতে পারলাম না, এরা যৌনতার উৎযাপন করবে কেন? তাদের বই, মতাদর্শ, চিন্তা, চেতনা সব তুচ্ছ। যৌনজীবনই বড়ো। আজ্ঞে হ্যাঁ, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাঙালির এই যৌনহতাশাকেই পুঁজি করে বছর বছর রবীন্দ্রকেচ্ছাকে 'বেস্টসেলার' বানিয়ে থাকেন। আজকের বাঙালি যতো না গীতবিতান ছুঁয়েছে, তার বেশি পড়েছে 'কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট', পেন্সিলে দাগ দিয়ে দিয়ে।

নীচের ছবি যে সংস্কৃতিতে মজার, 'কমন', স্বাভাবিক ও খিল্লি; সে সংস্কৃতিতে "পৃথিবীর ইতিহাস আসলে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস" এর থেকে "আব্বে শালীকে বিয়ে করেচে, জ্যোতি তো শালীমার" অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও অনেকবেশি জনমোহিনী হবে তা বলাই বাহুল্য।


বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০

৭% ভোট ~ সুশোভন পাত্র

গৃহপালিত মিডিয়ার ভাড়া করা পণ্ডিতরা বলেছেন বামপন্থীরা ভোট পাবে না! ৭%-র এক ইঞ্চিও এদিক সেদিক হবে না। সে বামপন্থীরা রাজ্য জুড়ে যতই ঐ সব, কমিউনিটি কিচেন করুক, শ্রমজীবী ক্যান্টিন খুলুক, মাস্ক-স্যানিটাইজার বিলি করুক, এক গলা জলে ডুবে রান্না করা খাবার ফেরি করুক, মুমূর্ষু রুগী কে রক্ত দান করুক, ত্রাণ নিয়ে আজ সন্দেশখালি, কাল হাসনাবাদে ঘুরুক, কৌটা নাড়িয়ে জোগাড় করা পয়সায় রেশন বিলি করুক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে পঞ্চায়েত অফিস ঘেরাও করুক, নন্দীগ্রামে বন্ধ হয়ে যাওয়া পার্টি অফিস খুলুক আর খেজুরি লাল ঝাণ্ডার মিছিলে সাজুক -বামপন্থীরা কিন্তু ভোট পাবে না! ৭%-র এক ইঞ্চিও এদিক সেদিক হবে না। 
তাহলে ভোট পাবে কে? পণ্ডিতরা সেফলজি গাঁতিয়ে বলেছেন, ভোট পাবেন 'বাংলার গব্বো মমতা'। ঐ যে ওনার খড়ি মাটি ঘষে রাস্তায় আঁকা গোল দাগে করোনা বৃত্তবন্দী হয়েছিল, ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে মিডিয়া খিচিক করে ফটো তুলেছিল, পরের দিনে ফ্রন্ট পেজে সিক্সটি পয়েন্টের গদগদ হেডিং টপকে পড়েছিল; ঐ যে টলিউডের নামকরা গ্রাফিক্স ডিজাইনারা আগুন ঝরা ছবি এঁকেছিল আর কিষানজির সেমি-হাফ-কোয়ার্টার-ফুল ভক্তরা ফেসবুকে 'দিদি-দিদি' করে উদ্বাহু হয়ে নেত্য করেছিল –এসবই নাকি পিকের কনটেম্পোরারি "হাউ টু উইন ইলেকশন"র কপিবুক ব্যাকরণ। মার্কেটে আজকাল নাকি এসবই ট্রেন্ডিং। কমিউনিটি কিচেন-টিচেন, ভুখা মানুষের পেট, যৌথ খামার -ওসব নাকি আজকাল ব্যাকডেটেড ফ্যাশন। 
আর ভোট পাবে কে? বিজেপি। ঐ যে দেখলেন না, দিলীপ ঘোষ আমফানের পর রাস্তায় দাঁড়িয়ে সং সেজে, ঢং করে গাছ কাটলেন, সন্ধেবেলা টক শো তে বাতেলা বাজির ঘুঁটে দিলেন, অগ্নিমিত্রা পল, লকেট চাটুজ্যে সাধ্যমত ফুটেজ খেলেন, আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা না করা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৮৫হাজার এলইডি টিভি লাগিয়ে বক্তৃতা দিলেন –এসবই নাকি অমিত মালব্য-র কনটেম্পোরারি "হাউ টু উইন ইলেকশন"র কপিবুক ব্যাকরণ। মার্কেটে আজকাল নাকি এসবই ট্রেন্ডিং। ওসব 'রক্ত দান জীবন দান' টাইপস শ্লোগান নাকি আজকাল আর কেউ খাচ্ছে না।
তৃণমূল ভোট পাবে কারণ, প্যান্ডেমিক ও আমফানের নির্মম আবহেও ত্রাণ লুটে লিমকা গিনেস বুকে নাম তুলছে তৃণমূল নেতারা। কেন পঞ্চায়েত-ব্লকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা টাঙ্গানো হচ্ছে না? কেন ওয়েবসাইটে তালিকা দেওয়া যাচ্ছে না? কে বানাল তালিকা? প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতি না শাসকদলের এমএলএ? কে সই করলেন তালিকায়? বিডিও না তার অধস্তন? কে পাঠালেন লুটের টাকা? ডিএম না তার অনুসঙ্গিরা  ? টাকা কি খোলামকুচি, না কারোর বাপের সম্পত্তি? লুটের দায় কার? চোরেদের বিরুদ্ধে সরকার কি ব্যবস্থা নিল? মুখ্যমন্ত্রী বলছেন "একটু দুর্নীতি!" কাইন্ডলি আপনারা মুখ্যমন্ত্রী কে এক-টু বিশ্বাস করুন। বোঝার চেষ্টা করুন, চোরেদের কে নিয়েই তো দল চালাতে হয় ওনাকে। তাই ওনার দোষ নেই। দুর্নীতির হিসেব নেই। সৎ প্রশ্নের জবাব নেই। কিন্তু গৃহপালিত মিডিয়া বলছে ভোট আছে। 
তৃণমূল ভোট পাবে কারণ, চিকিৎসার জন্য চোদ্দ ঘণ্টায় পাঁচটি হাসপাতাল-নার্সিংহোমে ঘুরে, মায়ের আত্মহত্যার হুমকি পর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে শুভ্রজিৎ-র। রাজ্যে, খোদ কলকাতায় সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে প্রতিদিন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বাড়ছে। রাজ্যে প্রথম ৫হাজার জন আক্রান্ত হয়েছিলেন ৭৪ দিনে। আর পরের ৫হাজার জন ৩দিনে। রেকর্ড হার আক্রান্ত গত ২৪ ঘণ্টায়। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যে কোভিড আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৬জন। মোট ১০৪৯। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু হার। সর্বনিম্ন পরীক্ষা। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন "সরকার কত করবে?"। ঠিকই তো! কাইন্ডলি আপনারা মুখ্যমন্ত্রী কে এক-টু বিশ্বাস করুন। বোঝার চেষ্টা করুন, এই সরকারের দায় নেই। দায়িত্ব নেই। লজ্জাও নেই। কিন্তু গৃহপালিত মিডিয়া বলছে ভোট আছে।
একান্তই তৃণমূল কে পছন্দ না হলে বিজেপি কে ভোট দিন। কারণ, আপনাকে বলা হয়েছিল 'মমতাকে আটকাতে পারে একমাত্র বিজেপি।' অতএব তৃণমূল ২২ বিজেপি ১৮। এই জরাসন্ধ-সময়ে সেই অমূল্য ১৮জন কোথায়? আমফান আছড়ে পড়ল। ৮৬জনের মৃত্যু হল। ঘর হারালেন কয়েক লক্ষ। তারপরও জল গড়াল মুড়িগঙ্গা, মৃদঙ্গভাঙা, তালপাটি দিয়ে। অথচ আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণার দাবী জানালেন না ১৮জন সাংসদের একজনও। লকডাউনে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি বাড়ল, পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ল, স্যানেটাইজারে ১৮% ট্যাক্স বসল। বিজেপির ইকুয়েশনে বিপর্যস্ত মানুষ নেই। অসহায় মানুষ নেই। বিপন্ন মানুষ নেই। কিন্তু বিজেপির ক্যালকুলেশনে ভোট আছে।    
বিজেপি ভোট পাবে কারণ বিজেপিই তো তৃণমূলের যোগ্য উত্তরসূরি। মিনাখায় হরিণখোল গ্রামে আমফানে যৌথভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করল বিজেপি এবং তৃণমূল। ক্ষতিগ্রস্ত ৫০৫। তালিকা হল ১২২ জনের। ভাগাভাগি তে ক্ষতিপূরণ পেল, তৃণমূলের ৬৭ বিজেপি'র ৫৫। আসল ক্ষতিগ্রস্তরা আঙুল চুষলেন। আর তাই, ৪১% ভোটে নিয়েও তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিজেপির প্রতিবাদ নেই, পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূলের সভাপতির চোখে চোখ রাখার হিম্মত নেই। লড়াই-সংগ্রামের-আন্দোলনের বালাই নেই। অবশ্য দরকারও নেই। কারণ তৃণমূলের সঙ্গে আপোষ আছে। পর্দার আড়ালে সেটিং আছে। 
কেমন সেটিং? কেমন আপোষ? যেমন ধরুন তৃণমূলের চাল চুরি তে বিজেপি স্পিকটি নট। বিজেপির ৪১টি কয়লা খনি নিলাম করলে মমতা ব্যানার্জি স্পিকটি নট। পিএম কেয়ারসের দুর্নীতি তে তৃণমূলের সাংসদরা স্পিকটি নট। আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় দাবী তে বিজেপির বাংলার সাংসদরা স্পিকটি নট। রেলের বেসরকারিকরণে প্রাক্তন রেলমন্ত্রী স্পিকটি নট। গোয়েঙ্কা ছাপ লাগাম ছাড়া ইলেকট্রিক বিলে দিলীপ ঘোষ স্পিকটি নট। কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার খর্ব হলে তৃণমূল স্পিকটি নট। শুভ্রজিৎ-র মৃত্যু নিয়ে বিজেপি স্পিকটি নট।   
তাই চোখ বন্ধ করে গৃহপালিত মিডিয়া কে বিশ্বাস করুন। ত্রাণের চাল চুরি তে রেকর্ড করতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। লোকাল  মস্তান নেতা কে আমফানের ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ করার সুযোগ দিতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। করোনার মৃত্যু হারে দেশের মধ্যে পয়লা র‍্যাঙ্ক ধরে রাখতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। সরকারী হসপিটালে শুভ্রজিৎ'দের বিনা চিকিৎসায় মরতে দিতে  তৃণমূলকেই ভোট দিন। 
আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা করার দাবী কে সাবোটেজ করতে বিজেপিকেই ভোট দিন। আপনার রক্ত চুষে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি বাড়াতে বিজেপিকেই ভোট দিন। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়াতে বিজেপিকেই ভোট দিন। তৃণমূলের সঙ্গে আপোষ করে লুটে খেতে বিজেপিকেই ভোট দিন। থানায় বসে তৃণমূলের পুলিশের সঙ্গে খাসি মাংস ভাত সাঁটাতে বিজেপিকেই ভোট দিন। 
আর তৃণমূল কে তাড়াতে চাইলে, বিজেপি কে ঠেকাতে চাইলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে চাইলে, আমফানের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবী তে সোচ্চার হতে চাইলে, আপনার জীবন-জীবিকার প্রতিদিনের সমস্যার বিরুদ্ধে আপোষ হীন সংগ্রাম চাইলে -প্রকাশ্যে লাল ঝাণ্ডা ধরুন। কারণ গোপনে বিজেপি তো দিদিমণিও করেন।

রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

বেসরকারী পরী ~ অঙ্কুর চক্রবর্তী

কাল রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলাম, ঘুম আসছিলো না... তাও চোখ বন্ধ করে জোর করে শুয়ে আছি- এমন সময় হঠাৎ বোম্ব্যাচ্যাক লেগে গেলো চোখে; বন্ধ চোখের মধ্যে দিয়েও বেশ বুঝতে পারলুম- ঘরের মধ্যে ঝকমকে আলো!!

চোখ অল্প ফাঁক করে দেখলুম- ঘরের মধ্যে সাদা কাপড় পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে, তার গা থেকেই কেমন যেন আলো বেরোচ্ছে... ঘুমচোখে ভাবছি- ইনি কি পাশের বাড়ির বিধবা ঠাকুমা, না কি রাণাঘাটের মিষ্টিপিসি- তখনই চটকাটা ভেঙে গেলো, আর চেয়ে দেখি- ও মা, এ যে নিযয্যস এক পরী! আমার ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে!!

গায়ে সাদা রঙের গাউনের মত কি যেন একটা, হাতে একটা সাদা লাঠির মতনও কি যেন আছে- লাঠির উপর আবার একটা তারামার্কা কি লাগানো...  মানে, একদম কপিবুক পরী আর কি... যখন দেখতে চেষ্টা করছি অন্য হাতে কাস্তে বা হাতুড়ি আছে কি না (এক হাতে তারা আছে কি না মশাই), পরী বলে উঠলো, "তা, বাবুমশাইয়ের ঘুম ভাঙলো?"

পরীর গলাটা কেমন যেন খ্যানখ্যানে... সে যাগগে; বললুম- "ঘুমাই নি তো; কিন্তু আপনি?..."

- "ধরেছিস ঠিকই, আমি একেবারে আদত পরীই বটে। কিন্তু বয়স হয়েছে, চোখেও ভালো দেখতে পাই না, এই পায়রার খোপের মত ফ্ল্যাটবাড়িতে ঠাওর করতে না পেরে কোন ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে কোন ফ্ল্যাটে ঢুকলুম কে জানে... হিসেবমতো এখানে তো একটা পাঁচ বছর একশো বিয়াল্লিশ দিন বয়সী কচি ফুটফুটে মেয়ে থাকার কথা, তা না, কোথাকার এক আধদামড়া মর্কট শুয়ে আছে..."

আমার ঘরে ঢুকে আমাকেই গাল দেওয়ায় একটু মাথা গরম হলো বৈ কি, কিন্তু ঠিক রিয়্যাক্ট করতে পারলুম না। একে তো পরী-টরী দেখে মাথা কেমন গুলিয়ে গেছে, তারপরে মনে মনে ভেবে দেখলাম- পরীদের ব্যাপারে আমার ডেটাবেস বড়ই কমজোরি। মানে, পরীরা পট করে রেগে উঠে চট করে শাপ দিয়ে ফেলে কি না, ঠিক কী ভাবে কথা বললে পরী তুষ্ট হয়, আর পরী রাগলেই বা কী করতে পারে- এসব কিছুই ঠিকমতো জানা নেই... অতএব, চটিয়ে লাভ নেই।

তাই আমতা আমতা করে বললুম- "এসেই যখন পড়েছেন, একটু বসুন না হয়..."
- "বসবো? বলছিস?" বলেই হাতের ডান্ডাটা দিয়ে ঘ্যাসঘ্যাস করে একটু পিঠ চুলকে নিলো পরী- "তা বসতে পারি, বলছিস যখন এত করে (একবারই বলেছি কিন্তু), কিন্তু কিছু খাওয়া, বড্ড ক্ষিদে লেগেছে।"

ইচ্ছে ছিলো না, কিন্তু ঘুমচোখেও উঠতেই হলো। আহা, খেতে চাইছে একজন, খাওয়াবো না? কিন্তু খাবার আছে কিছু? রান্না করা খাবার তো মনে হয় না কিছু আছে... আর আজকাল বাড়ি থেকে বেশি বেরোইনা বলে বাজারও কম করা হয়, আর সেই বাজার এক হপ্তা চালাতেও হয়। ফ্রিজ খুলে দেখি- একগাদা কোল্ডড্রিংক্স-এর বোতল। খাবার সেরকম কিছু চোখে পড়লো না। গোটাকয়েক টিফিন বাক্স আছে বটে, একটা খুলে দেখি- আধফালি কাঁচা কুমড়ো! আরেকটা খুলে দেখি, আদাবাটা!!

একটা টিফিন বাক্স খুলে কী একটা ঝোলের মত বেরোলো। শুঁকে বুঝলুম- দিন চারেক আগে বানানো মাংসের ঝোল। মাংস ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু ঝোলটা ভালো হয়েছিলো বলে বেঁচে যাওয়া ঝোলটা তুলে রেখেছি। অন্যসময় হলে রাখতুম না, কিন্তু এখন এই লকডাউন আর আনলকের বাজারে সবই দুর্মূল্য। 

কিন্তু ঝোলটা কী দিয়ে দেবো? আচমকা মনে পড়লো, বাড়িতে ফিশফ্রাই বানাবো বলে বাসা মাছের ফিলে এনেছিলাম, রাখা আছে ডিপফ্রিজে। ব্যস, চট করে একটা গ্যাসে ভাত বসিয়ে দিলাম, আর অন্য গ্যাসে একটা বাসার ফিলে নিয়ে, একটু নুন-হলুদ-লঙ্কাগুঁড়ো মাখিয়ে ভেজে নিয়ে, মাংসের ঝোলে দিয়ে বানিয়ে ফেললুম বাসা মাছের কারি। সিম্পল।

তারপর খাবার প্লেটে সাজিয়ে পরীকে ডাকতেই তার তো একগাল হাসি- "ও মা, এত তাড়াতাড়ি কী রান্না করলি রে?"

বললুম- "ভাত আর ভেটকি মাছের কারি..."

- "বাহ বাহ" বলে খেতে বসে এক টুকরো মাছ মুখে দিয়েই পরীর নাকচোখ কুঁচকে মুখটা কেমন ছাতুর পরোটার মত হয়ে গেল- "এটা কী মাছ রে? এটা ভেটকি মাছ? আমি খাস বাংলাদেশের মেয়ে, আমাকে ভেটকি মাছ চেনাচ্ছিস?"

এই রে, ভেটকি না বলে বাসা বললেই বোধহয় ভালো করতাম, রেগে আবার শাপটাপ না দিয়ে দেয়! মিনমিন করে বললাম- "আজ্ঞে, ভেটকি না, বাসা মাছ; একদম ভেটকির মতোই খেতে আর কি..."

- "অ্যাঁহ, একদম ভেটকির মত খেতে না কি! যত্তসব!! ভেটকি আমি খাইনি ভেবেছিস? আর বাড়িতে অতিথি এলে এইসব অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়াস বুঝি?"

মরিয়া হয়ে শেষচেষ্টা হিসেবে বলেই ফেললাম- "আজ্ঞে, পরীদের তো বাসার কারি খাইয়ে সেবা করাই নিয়ম!"

- "নিয়ম? এ আবার কোথাকার নিয়ম রে অলপ্পেয়ে??"

আমতা আমতা করে বললুম- "আজ্ঞে, ঠিক নিয়ম না, তবে বহুদিন ধরে অনেককেই বলতে শুনছি কি না যে...
.
.
.

..

Basarkari hola poriseba vala hoba" 🤭🤭😆😆

শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০

CESC বেসরকারীকরণ ~ সব্যসাচী চ্যাটার্জী

আচ্ছা  CESC নাকি জ্যোতি বোস বেসরকারিকরণ করেছিল...

এটা একটু পড়ে দেখতে পারেন।

সত্যিই কি লাভজনক সরকারি সংস্থা সি.ই.এস.সি. গোয়াঙ্কাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু ? 

লেটস চেক দ্যা ফ্যাক্ট এন্ড ল।

কলকাতার নগরায়নের ইতিহাসে বৈদ্যুতিকরণ ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৭৬ সালে কলকাতা মিউনিস্যিপ্যাল কর্পোরেশন গড়ে ওঠে। ১৮৭৯ সালে কলকাতায় প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে বিদ্যুতের আলো জ্বালানো হয়। এই কাজে যার ভূমিকা অবস্মরণীয় তিনি রুকস ইভেলিন বেল ক্রম্পটন নামে এক বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ ও শিল্পপতি। তাঁরই উদ্যোগে ইংল্যান্ডের  আলোকিকরন হয়েছিল।যেকোনো শিল্পের মত এক্ষেত্রেও প্রযুক্তি এবং পুঁজির একত্র উদ্যোগে গড়ে ওঠে  বিভিন্ন ব্রিটিশ বিদ্যুৎ কোম্পানী। যেহেতু ভারতের মত ব্রিটিশ উপনিবেশে বিদ্যুতায়ন শুরু হয়েছিল ইংরেজদের উদ্যোগে সেহেতু সেই উদ্যোগের উদ্যেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক অর্থাৎ এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরবারহ সমস্ত কিছু শুরু হয়েছিল প্রথমত অফিস কাছারি ও শহরের কার্যক্ষেত্রের চাহিদা অনুসারে।যেমন বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে না বুঝলে বিদ্যুতায়ন বা বিদ্যুৎ পরিষেবা বোঝা সম্ভব নয়।তেমন ভারতের বৈদ্যুতিকরণের অগ্রগতি না বুঝলে বিদ্যুৎ পরিষেবার সমস্যা গুলি বোঝা কার্যত অসম্ভব। আম্ফান পরবর্তী সময়ে আমার নিজস্ব মতামত সম্বলিত কয়েকটি পোষ্টে অনেকে অনেকগুলি প্রশ্ন করেছেন, আমি সেই প্রশ্নগুলির জবাব দেবার চেষ্টা করব। বলে রাখা ভালো যে, আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিদ্যুৎ শিল্প বা পরিষেবা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ নই, তাই আমার এই উত্তরগুলিকে একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মীর বক্তব্য হিসাবেই ধরে নেওয়াটাই সঠিক হবে। প্রথমে প্রশ্ন গুলিকে ভাগ করে নেওয়া যাক। 

👉 আম্ফান পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ পুনরায় সংযুক্তিকরনের কাজে কোলকাতার বিদ্যুৎ সরবারহ সংস্থার ব্যর্থতা কি সঙ্গত? মানে তাঁদের কি কিছুই করার ছিলনা ? 

👉ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাল্পাই কর্পোরেশন কি শুধুই একটি বেসরকারি সংস্থা ? সরকার বা পুরসভার কিছুই কি করার নেই ?

👉বামফ্রন্টের আমলে কি ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন সরকারি নিয়ন্ত্রনমুক্ত করে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ? বিদ্যুৎ পরিষেবার ক্ষেত্রে এক্ট অফ গড বা ফোর্স মেজিওর ক্লজ কি কার্যকরী এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে ?

👉একটি অত্যাবশ্যক পরিষেবা প্রদানকারী বেসরকারি সংস্থার উপর সরকারের কি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই ?

নীচের ফ্যাক্টস গুলি দেখলেই উপরের প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া যাবে। 

*পরাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রঃ
.............................................

পরাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্র ছিল সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। একমাত্র বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণের মত কয়েকটি ক্ষেত্রে আঞ্চলিক অথবা প্রাদেশিক সরকারগুলির ভূমিকা দেখা যায়।১৮৯৭ সালে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন গড়ে ওঠার প্রায় ষোল বছর আগে কলকাতায় প্রথম বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো হয়।সেটা ১৮৮৭ সালে চালু হয় কলকাতার বৈদ্যুতিকরনের আইন। এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবার কাজে কোনো কোম্পানীকে নিয়োগ করার ধারা ছিল না।১৮৯৬ সালে রুকস সাহেব গভর্মেন্ট বাহাদুরের আমন্ত্রণে এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো লাইসেন্সী নিয়োগের ধারা বানানোর জন্য ... কাজ শুরু করেন। এই সময়েই ১৯০০ সালে  সি.ই.এস. সি একচেটিয়া বিদ্যুতায়নের লাইসেন্স পায়।১৮৭৯ সালের ২৪ শে জুলাই কোলকাতায় P.W. Fleury and Co. এর উদ্যোগে প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে আলো জ্বালানো হয়।কলকাতার বৈদ্যুতিকরনের ক্ষেত্রে ইংরেজদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রখ্যাত ইংরেজ বিদ্যুৎ শিল্পপতি রুকস ইভলিন বেল ক্রম্পটন তিনি ইংরেজ সরকারকে প্রথম বিদ্যুত আইনের খসড়া বানাতে সহায়তা করেন।১৮৮৭ সালে বিদ্যুৎ আইন আসে। এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবার কাজে কোনো কোম্পানীকে নিয়োগ করার ধারা ছিল না।  ১৮৯৫ সালে ক্যালকাটা ইলেক্ট্রিক লাইটিং এক্ট আসে। এই আইনে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে লাইসেন্সী নিয়োগ পদ্ধতির কথা বলা হয়। এই আইন অনুসারে ১৮৯৭ সালে মেসার্স Kilburn and Company যা Indian Electric Company র এজেন্ট একুশ বছরের জন্য  কোলকাতার বিদ্যুৎ লাইসেন্স পায়। ১৮৯৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় Indian Electric Company র নাম  Calcutta Electric Supply Corporation Ltd. হয়। তারা কলকাতা ও লাগোয়া অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবারহের ইজারা (লাইসেন্স) লাভ করে। ১৯১০ সালের ভারতীয় বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী সরকারের হাতে লাইসেন্স দেবার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু বাজারে একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী অভিজ্ঞতার কারনে সি.ই.এস.সি. বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে মনোপলি অর্জন করে। সেই থেকেই কলকাতায় এই কোম্পানীটির মনোপলির জন্ম।

সি.ই.এস.সির ক্ষেত্রে সরকার বা পুরসভার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেও কিছু বক্তব্য আছে। আইন অনুসারে সি.ই.এস.সিকে সমস্ত সহায়তা করার দায়িত্ব সরকারের ও নির্দিষ্ট ভাবে বললে, পুলিশ ও প্রশাসনের। একই ভাবে, দুর্যোগের প্রশ্নে সরকারকে আবশ্যিক সহায়তা করার দায়িত্ব সি.ই.এস.সি বা অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার। তাই কিছুই করার নেই বলাটা শুধুই মুর্খামি। মানুষকে চরমতম বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানোর বদলে তাকে বিপদের সামনে ফেলে দেওয়ার জনৃ। চলুন ইতিহাসের পাতা থেকে একটু খুঁজে দেখার চেষ্টা করি এই ধরনের সংকট কিভাবে মোকাবিলা করা হয়েছিল কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে। এই প্রশ্নের উত্তরটি খুঁজতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে ১৯২৪ সালে। সেই যে বছর কোলকাতা কর্পোরেশন স্বরাজ পার্টির দখলে আসে।মেয়র হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস।এই সময় কলকাতা কর্পোরেশনের সাথে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের নানা বিষয়ে সংঘাত বাধে।প্রথমত, সেইসময় সি.ই.এস.সির সাথে বিরোধ হয় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে তাদের একচেটিয়া অধিকারের ইস্যুতে। সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কলকাতা কর্পোরেশন চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে বিদেশী নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ পরিষেবা কোম্পানীর জায়গায় দেশীয় কোম্পাণীগুলিকে উৎসাহিত করে।মনে রাখা দরকার এই যে এই সময় কলকাতা কর্পোরেশনের কাছে না ছিল ক্ষমতা, না ছিল আর্থিক সামর্থ।১৯৩০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকেই স্বরাজ পার্টির নিয়ন্ত্রণে থাকা কলকাতা কর্পোরেশন বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবীতে সি.ই.এস সি. কে চাপ দিতে থাকে। এই চাপ সৃষ্টির ফলে ১৯৩৩ সালে সি.ই.এস.সিকে তাদের বিদ্যুতের দাম কমাতে হয়।আসলে কলকাতা তথা ঔপনিবেশিক ভারতের বৈদ্যুতিকরণ না বুঝলে আজকের সমস্যা বোঝা যাবে না।

স্বাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রঃ
....…....................................
বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে বুঝতে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরবারহ সবটাই বুঝতে হবে। দেশ স্বাধীন হবার পর পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। সরবারহ সুনিশ্চিত করতে রাজ্যে রাজ্যে স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড গঠিত হয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে।পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫৫ সালে তৈরি হয় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ। ২০০৩ সালের কেন্দ্রীয় আইন অনুসারে এই সংস্থাটি অবলুপ্ত হয়ে বর্তমানে দুটি কোম্পানি গড়ে উঠেছে ২০০৭ সালে। প্রথমটি, পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য বিদ্যুৎ বন্টন নিগম বা ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেকট্রিসিটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী‌। অন্যটি (WBSETCL-Transmission Co. Ltd.)। সংবিধান অনুসারে বিদ্যুত হল একটি যুগ্ম তালিকাভুক্ত বিষয়। ফলত, কেন্দ্রীয় আইনের বাইরে গিয়ে রাজ্যগুলি আইন বানালেও কেন্দ্রীয় আইন লাগু হয়। দেশের সংবিধান ও আইন ঘাঁটলে আমরা দেখি বিদ্যুৎ একটি অধিকার।সুপ্রীম কোর্ট বা হাইকোর্টের রায় দেখলে আমরা আরো দেখি যে, বিদ্যুৎ সংযোগ আমাদের  জীবনের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।কারন জল বা বিদ্যুতের মত পরিষেবাগুলি মানুষের বেঁচে থাকার শর্ত। ঠিক যে কারনে কলকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন একটি বেসরকারি সংস্থা হলেও পরিষেবা প্রদানের চরিত্র অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট সংবিধানের ২২৬ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্দেশ জারী করতে পারে। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত সি.ই.এস.সি. গেজেটে কথা কোম্পানীর অন্যতম উপদেষ্টা শ্রী এস.কে রায় লিখেছিলেন যে, এটি দেশের হাতে গোনা বেসরকারি সংস্থাগুলির একটি যারা জন হিতকর ক্ষেত্রে নিয়োজিত।এই কারনেই তাদের একচেটিয়া অবস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। তাই আর পাঁচটা বেসরকারি সংস্থার সাথে সি.ই.এস.সির তুলনা করা যুক্তিসংগত নয়।সি.ই.এস.সি র ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে কোনোদিনই সি.ই.এস.সির পরিচালনা সরকারের হাতে ছিলনা ১৯৭০ সালে শুধুমাত্র লন্ডনের পরিচালকমন্ডলীর হাত থেকে ভারতের পরিচালক মন্ডলীর হাতে আসে। ভারতীয় করনের জন্য ১৯৭৮ সালে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই  (ইন্ডিয়া) লিমিটেড নাম হয় কোম্পানীর।১৯৮৭ সালে এই কোম্পানীর নাম বদল করে হয় সি.ই.এস.সি. লিমিটেড। অর্থাৎ, এগুলো শুধুই নাম বদল। জনহিতকর ক্ষেত্রে নিয়োজিত  একটি বেসরকারি কোম্পানীর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখতে ১৯৯৮ সালে ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশন আইন আসে। এতদিন শুধু লাইসেন্সের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। এবার বিদ্যুতের দাম নির্ধারনের ক্ষেত্রে সেই নিয়ন্ত্রণ এলো।১৯৮৯ সাল থেকে সি.ই.এস.সির সঙ্গে গোয়েঙ্কাদের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।সেই ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা লাইসেন্সের ভিত্তিতেই তাঁরা কাজ করে আসছে। তাই লাইসেন্স দেবার ক্ষেত্রে বিধান রায়, জ্যোতিবসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিংবা মমতা বন্দোপাধ্যায় নতুন কিছু করেন নি।

গোয়েঙ্কা ও সি.ই.এস.সি
.....................................

এবার আসি আশির দশকের শেষের সি.ই.এস.সির শেয়ার কেনায় প্রশ্নে। সঞ্জীব গোয়েঙ্কার প্রয়াত বাবা রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কা দেশের অধিগ্রহণ সম্রাট বা টেকওভার কিং  বলে পরিচিত ছিলেন, ১৯৮৯ সাল থেকে সি.ই.এস.সি র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এটি ছিল একটি বেসরকারি সংস্থার আভ্যন্তরীণ ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। ভারতের কোম্পানী আইন অনুসারে এক্ষেত্রে কোনো সরকারের কোনো ভূমিকা থাকেনা। জ্যোতি বসু সরকারেরও কোনো ভূমিকা ছিলনা।
২০০৩ সালের আগে চালু থাকা তিনিটি কেন্দ্রীয় আইনকে একত্রিত করে ইলেকট্রিসিটি এক্ট ২০০৩ আসে। এই আইনে স্পষ্ট করে ভারতের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকার প্রশ্নে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আসে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হল বেসরকারি সংস্থাগুলিকে লাইসেন্স দেওয়া ও একই জায়গায় দুটি সরবারহ কোম্পানীকে বিদ্যুত সরবারহের জন্য রাস্তা খুলে রাখা। এই প্রথম আইন করে একচেটিয়া সরবারহের সুযোগ পরিবর্তন করা হয়। সৃষ্টি হয় খোলা বাজারের প্রতিযোগিতা।তাহলে মমতা ব্যাণার্জীর সরকারের দোষ কোথায় ? না সি.ই.এস.সির আভ্যন্তরীণ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের হাত নেই।

কিন্তু পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিসের ক্ষেত্রে ডিসাসটার ম্যানেজমেন্ট এক্ট অনুযায়ী রাজ্য সরকার নিশ্চিত ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সি.ই.এস.সিকে।মমতা ব্যাণার্জী তা করেন নি।  বিদ্যুত বন্টন নেটওয়ার্কের যথাযথ মেনটিন্যান্সতো যেকোনও ইউটিলিটির পেরেনিয়াল নেচারের কাজ। সেই নেচারের কাজ যুগ যুগ ধরে ঠিকা শ্রমিকদের দিয়ে করানোটাইতো 'কন্ট্রাক্ট লেবার (রেগুলেশন এন্ড এ্যাবোলিশন) আইনে নিষিদ্ধ। বাকি রইল, এই কাজে যুক্ত স্থায়ী কর্মীবাহিনী যাদের লকডাউন ইত্যাদির কারনেও  যাদের বেতনে এখনও হাত পড়ে নি। তাহলে, যথেষ্ঠ পূর্বাভাস থাকা সত্বেও আগাম সতর্কতামূলক ম্যানপাওয়ার মোবিলাইজেসন করা যায় নি। শ্রমিকরা সব দেশে চলে গেছে বলে যুক্তিটা খুবই নড়বড়ে। সারা দেশে পরিযায়ী শ্রমিকরা যে সমস্যায় ঘরমুখি হতে উদগ্রীব হয়েছে, তা হল কর্মহীনতার সঙ্গে যুক্ত উপার্জনহীনতা এবং অনাহার। সিইএসসির একজন শ্রমিকেরওতো সেই সমস্যা নেই। তবে কেন তারা দলে দলে নিজের দেশে চলে যাবে ? একদম বাজে কথা। এছাড়া, আমরা জানি রাজ্য বন্টন সংস্থার প্রায় সব বন্টন সংযোগ ওভারহেড তারের মাধ্যমে হওয়ায়, ট্রাডিশনালি তারা খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকলেই নাগরিক সুরক্ষার জন্য নিজেরাই সংশ্লিষ্ট এলাকায় সব ট্রান্সফরমার বন্ধ করে গ্রাহককে সরবরাহ স্থগিত রাখে। আবার, আবহাওয়া ঠিক হলেই সেগুলি সচল করে দেয়। অথচ, সিইএসসি তে বন্টন ব্যাবস্থা ঠিক উল্টো। প্রায় সর্বত্র (এটা ৯৫% ক্ষেত্রে বলা যায়) আন্ডারগ্রাউন্ড তারের মাধ্যমে বন্টন। এখানেই তাদের যত ব্যর্থতার কারন লুকিয়ে আছে যা পেশাদারীত্বের বিলোপের জন্য তারা বুঝতে পারে নি। আন্ডারগ্রাউন্ড ডিসট্রিবিউসন নেটওয়ার্কেরও যে নিয়মিত পরীক্ষা, পরিচর্যা দরকার তা তারা কোনো দিনই ভাবে নি, করে নি। তাদের হয়ত একটা ধারনা তাড়া করে যে, মাটির ওপরে রাস্তা ইত্যাদি যতই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাক, ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের কোনও ক্ষতি সম্ভব নয়। আমরা রোজ দেখছি, একজন একসময়ের গামোছা বিক্রেতা বা চা ওয়ালাও পৌরসভাগুলি থেকে এখন রোড রিপেয়ারিং এর বরাত পাচ্ছে। সোসাল মিডিয়ায় দেখেছি সেই রাস্তার হাল কি। আজ প্রমানিত হল যে, সিইএসসি গ্রাহকের বাড়ীর মিটার যেমন নিয়ম করে বদলে ফেলে, তেমনিভাবে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কটাও শতবর্ষ প্রাচীন হয়েছে। তাকে ধাপে ধাপে বদলানোর সময় পার হয়েছে। হ্যাঁ, গাছ কাটা সিইএস সির কাজ নয় বলেই, তেমন পরিকাঠামো তাদের নেই। কিন্তু, সেনা বাহিনী আগাম জানিয়ে জরুরী ভিত্তিতে সেই কাজ করতে এসে, আমরা জেনেছি, সিইএসসির লোকজনের অভাবে দু'ঘন্টা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হয়েছে। তারাতো আগে ঐ সমস্ত ভেঙ্গে পড়া গাছে জড়িয়ে থাকা জীবন্ত তারগুলো বিচ্ছিন্ন করবে। তবে তো বাহিনী মহিরুহ কাটবে, সরাবে। ভেঙ্গে পড়া গাছে জড়িয়ে থাকা তারগুলো বিচ্ছিন্ন না করে, অন্য কাজ শুরু করাটাই প্রাণঘাতি। অতএব, আমরা যতক্ষন না সময় পাই, বাহিনী ততক্ষন হাত গুটিয়ে অপেক্ষা করুক। একেই কি বলে সবাই হাতে হাত মিলিয়ে বিপর্যয়ের মোকাবিলা করা ?ঠিক এই খানেই ভুল হচ্ছে ম্যাডাম।তাই প্রশ্ন উঠছে, আপনার আমলে বঙ্গ বিভূষণ সঞ্জীব গোয়েঙ্কার কোম্পানি বলেই কি আপনি ছাড় দিচ্ছন! সামলান, ম্যাডাম সামলান।বিজেপি ইতিমধ্যেই মনোপলি ভাঙার কথা বলছে। সাধারণত তা ভাঙার দল তারা নয়। তাই, আশঙ্কা করছি মনোপলি ভাঙার নামে আম্বানীদের দালালি হয়ে যাবে না তো ? ভারতের বিদ্যুৎ শক্তি ক্ষেত্রে তারা কিন্তু বিগ প্লেয়ার। তখন সামলাতে পারবেন না।

ও আর একটা কথা ম্যাডাম। সাধারণত পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিস দেওয়া কোম্পানীগুলি মূল কোম্পানীর টাকা অন্য কোনো কোম্পানীতে ব্যবহার করতে পারে না... এও জানি এই নিয়মটা করা হয়েছে রেগুলেটারি কমিশনের তত্বাবধানে মূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে। তবে কানা ঘুষো যা শুনছি মানে কোয়েস্ট মল, স্পেনসর্স, সিইএসসি প্রপার্টিজ ইত্যাদি ইত্যাদি আর কি ! তাতে আপনার আরো সচেতন থাকা উচিৎ এদের ব্যাপারে। আফটার অল 'বেওসায়ী' তো!!মুনাফা ছাড়া কিচ্ছু করে না। মূলত, 'জনস্বার্থ' দেখাটা কোনও বেনিয়ার কাজ নয়।

গুলজার ~ অরিজিৎ গুহ

বোম্বের খেতওয়ারি মেন রোডের ওপর 'রেড ফ্ল্যাগ হল' তখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পার্টি কমিউন। আটটা ঘর আর একটা হলঘর নিয়ে সেই কমিউনের অবস্থান। হলঘরে বসত পার্টির মিটিং আর আটটা ঘরে থাকতেন পরিবার সহ বিভিন্ন কমরেডরা। সেখানেই জীবনের প্রায় সারাটা বছর কাটিয়েছেন আলি সরদার জাফরি তাঁর স্ত্রী সুলতানা জাফরি আর দুই পুত্রকে নিয়ে। এখানে বসেই উনি খাজা আহমেদ আব্বাসের 'ধরতি কে লাল' সিনেমার গানের লিরিক্স সহ আরো অসাধারণ কিছু উর্দু কবিতার জন্ম দিয়েছেন।
   সদ্য সদ্য তখন পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠেছে। প্রকাশ্যে কাজকর্ম করা শুরু করেছে পার্টি। সেই সময়েই সরদার জাফরি রেড ফ্ল্যাগ হল এ নিয়ে এলেন একজন তরুণ পার্টির হোলটাইমার কমরেডকে। সাথে তাঁর স্ত্রী আর বছর খানেকের এক কন্যাসন্তান। একটা ঘর তখন ফাঁকা হয়েছে একজন কমরেড ছেড়ে দেওয়ার জন্য। সেই ফাঁকা ঘরে থাকতে এলেন সেই কমরেড। আইপিটিএর সক্রিয় কর্মী সেই তরুণ নিজের ব্রিফকেসে সব সময়ে পার্টির কার্ড নিয়ে ঘুরতেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলেই কার্ডটা বের করে বলতেন 'এটা আমার জীবনের সবথেকে বড় সম্পদ'। 
   তরুণ কমরেডটি পার্টির কাজের পাশাপাশি লেখালেখিও করেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু উর্দু কবিতা লিখে মোটামুটি একটা পরিচিতি পেয়েছেন। রেড ফ্ল্যাগ হল এ এসে সেই তরুণ কমরেড একটা ইয়াং রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তুললেন। প্রতি রবিবার হলঘরে ইয়াং রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের তরুণ সাহিত্যিকদের গল্প ও কবিতা পাঠের আসর বসে।  সেই আসরে আসত সাগর সারহাদি, জাফর গোরখপুরি ইত্যাদি। এরা প্রত্যেকেই আবার আইপিটিএরও সদস্য। এদের সাথে সাথেই ফর্সা লম্বা মতন আরেকটি ছেলে আসত। নাম ছিল সম্পূরণ সিং কালরা। সদ্য সদ্য দেশভাগের পর সম্পূরণের বাবা মাখখন সিং তাঁর পরিবার নিয়ে বোম্বে চলে এসেছিলেন। ছেলের লেখালেখি করার খুব শখ, কিন্তু কোনো কারণে বাবা মাখখন সিং এর লেখালেখি ব্যাপারটা খুব অপছন্দের। জীবন ধারণের তাগিদে সম্পূরণ সিং নানা রকম ছোটখাটো কাজকর্ম করে যাচ্ছে বোম্বেতে। তার মধ্যেই একটা গ্যারেজে মোটর মেকানিকের কাজ করে কিছু পয়সা আসতে শুরু করেছে। এরই সাথে বাড়িতে বাবাকে লুকিয়ে চলছে সাহিত্যচর্চা। সেই সাহিত্যের তাগিদেই আসা শুরু হল রেড ফ্ল্যাগ হল এ।
   তরুণ কমরেডটি কবি হিসেবে পরিচিত হলেও উপার্জনের দিক থেকে সেরকম কিছু করতে পারছিলেন না। এদিক ওদিক পত্র পত্রিকায় লিখে কিছু হয়ত উপার্জন হয়, কিন্তু কন্যা সন্তানের পর আবার এক পুত্র সন্তান যখন হল তখন সত্যিই খুব বিপদে পড়লেন তিনি। যদিও তাঁর স্ত্রী তখন পৃথ্বি থিয়েটারের অভিনেত্রী, কিন্তু সংসারের সুরাহা কিছুতেই হয়ে উঠছে না। এরকম এক সময়ে এক নামী পরিচালকের এক সিনেমায় গান লেখার অফার এলো। ঠিক তার পরপরই আরো কিছু ছবিতে গান লেখার সুযোগ পেলেন। কিন্তু কপাল এমনই খারাপ যে গানগুলো হিট করলেও ছবিগুলো খুব বেশি হিট করল না। সিনেমার জগতে সেই তরুণের ছাপ পড়ে গেল দুর্ভাগা বলে। সেই জন্য আর কেউই এগিয়ে এলো না সিনেমার কাজ নিয়ে।
   বেশ কয়েক বছর বাদে রেড ফ্ল্যাগ হল এ সেই কবির ঘরে এলেন এক পরিচালক। তাঁর পরের ছবিতে সেই কবিকে দিয়ে তিনি গান লেখাতে চান। শুনে কবি বললেন, কেন শুধু শুধু আমাকে দিয়ে লেখাচ্ছেন? লোকে বলে আমার গান খারাপ নয়, তবে আমার নসীব খুব খারাপ। আপনি ডুবে যাবেন। শুনে সেই পরিচালক বললেন আমার নসীবও খুব খারাপ বুঝলেন। পরপর কয়েকটা ছবি আমার ফ্লপ করেছে। একবার ভাগ্যের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেখাই যাক না।
   নেওয়া শুরু হল ভাগ্যের চ্যালেঞ্জ। ১৯৬২ সালের ভারত চিন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে তৈরি সেই সিনেমা রিলিজ করল ১৯৬৪ সালে। চেতন আনন্দের পরিচালনায় 'হাকিকত' জিতে নিল ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড সহ নানা পুরষ্কার। গীতিকার সেই কবি কইফি আজমির লেখা গান  'কার চলে হাম ফিদা জান ও তান সাথিও/ আব তুমহারে হাওয়ালে ওয়াতন সাথিও' গানটা ফিরতে লাগল সবার মুখে মুখে। আজও সেই গান অমর হয়ে রয়েছে।

   এর ঠিক আগের বছরই ১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় বিমল রায়ের শেষ ক্লাসিক 'বন্দিনী', যেখানে সেই মোটর মেকানিক সম্পূরণ সিং ছেলেটি গীতিকার হিসেবে নজর কেড়ে নিয়েছে অনেকের। বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য তার বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই সম্পূরণ সিং এর বদলে নিজের নাম সে লিখত 'গুলজার'।

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০

বামফ্রন্টের ৩৪ ~ বিপুল ভট্টাচার্য্য

৩৪ বছরে এমন কী কী হয়েছিল যার জন্যে আপনার এত গর্ব?
মাঝে মাঝে এরকম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান নাকি?
বন্ধু সংখ্যাতত্ত্ববিদ ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত আপনার জন্যে ১৫টি ( মাত্র ১৫) কারণ রেডি করে দিয়েছেন। 
ভূমি সংস্কার আর পঞ্চায়েত বাদ রেখে  ।  
চোখ বুলিয়ে নিন , গর্বের ৩৪ কেন আমাদের উদ্বুদ্ধ করে আজও। 

১. সাক্ষরতা, গড় আয়ুষ্কাল ২০১১ সাল পর্যন্ত  জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। ২. মহিলা থেকে পুরুষ সাক্ষরতার ব্যবধান: ভারতের গড়ের  চেয়ে অনেক কম। ৩. শিশু মৃত্যুর হার - ভারতের তুলনায় অনেক কম। ৪.৫-৫ বছরের শিশুর মৃত্যুর হার - ভারতের তুলনায় অনেক কম । ৪.  ভারতের তুলনায় শিশু অপুষ্টি সূচক কম। ৫. ভারতের সর্বনিম্ন প্রজনন হারের  (ফারটিলিটি রেট)মধ্যে একটি। ৬. একমাত্র রাজ্য যেখানে রাজ্য সরকার পরিচালনাধীন  শীর্ষস্থানীয় দুটি  বিশ্ববিদ্যালয়  দেশের সর্বোৎকৃষ্ট দশটির তালিকায় ।৭. কাঠামোগতভাবে খাদ্য ঘাটতি রাজ্য  খাদ্য রফতানিকারী রাজ্যে   পরিণত হয়েছে। ৮. কাঠামোগতভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি রাজ্য  বিদ্যুত- উদ্বৃত্ত অবস্থায় পরিণত । ৯.  গ্রামীণ দারিদ্র্যের হারের বিচারে    ১৯৭৩-৭৪ সালে ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ যে রাজ্য , ২০১১-১২-এর মধ্যে সেখানে গ্রামীণ দারিদ্র্য জাতীয় হারের নিচে হ্রাস পায় । ১০. এনসিআরবি'র পরিসংখ্যান অনুসারে, গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তর দশকে  সর্বাধিক অপরাধ প্রবণ রাজ্যগুলির মধ্যে  অন্যতম এমন একটি রাজ্য  ২০০০ সালে ন্যূনতম অপরাধের রাজ্যগুলির একটিতে পরিণত হয়েছিল। ১১. সবচেয়ে দাঙ্গা-প্রবণ রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম একটি রাজ্য  স্বল্পতম ধর্মীয় সংঘর্ষের একটিতে পরিণত হয়েছিল। ১২.  ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বৃদ্ধির   হার দেশের সর্বোচ্চ। ১৩. কৃষক আত্মহত্যা  অতি সামান্য  পর্যায়ে। ১৪. ১৯৮৭-২০১১ সালের মধ্যে পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতের সব বড় রাজ্যের মধ্যে দ্রুততম জিএসডিপি প্রবৃদ্ধি। ১৫. ২০০৪-২০১১  পর্যন্ত  ভারতে সমস্ত নতুন উত্পাদন কাজের ৪০% সৃষ্টি হয় এই রাজ্যেই। 

তাই একটু গর্ব তো করাই যায় ৩৪ নিয়ে, বলুন?

(অনুবাদের ভুল ঘটলে দায় আমার )

Bipul Bhattacharya

বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০

ভারতীয় রেল বেসরকারীকরণ ~ শতদ্রু দাস

রেলের বেসরকারীকরণ নিয়ে কিছু ভুল ভাল মিথ্যে কথা বাজারে ঘুরছে,  যারা কিছু না জেনে না বুঝেই "basarkari hola bhalo hoba" বলে থাকে তারা সেগুলো চোখ কান বুজে খাচ্ছেও। তাই কয়েকটা কথা বলা জরুরি।

১. বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে, যেখানে বহু মানুষ ট্রেন ব্যবহার করেন, সেখানে রেল সরকারি সংস্থা বা পাবলিক সেক্টর ইউনিট।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ক্যানাডাতে রেল বেসরকারী কিন্তু ওই দেশগুলোতে খুব কম সংখ্যক মানুষ রেল ব্যবহার করেন। এসব দেশগুলোয় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের উপায় হলো গাড়ি বা বিমান। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়  অধিকাংশ স্থানে বিমান ভাড়া রেল ভাড়ার চেয়ে সস্তা বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রায়। এসব দেশগুলোতে রেল মূলত  বিলাসবহুল যাত্রার জন্য ব্যবহৃত হয়, পর্যটকরা ব্যবহার করে। 

৩. ইউরোপের সর্ববৃহৎ রেল সংস্থা ফ্রান্সের এসএনসিএফ, সরকারী সংস্থা। দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ হলো জার্মানির ডয়েচ বান, সেটাও পাবলিক সেক্টর ইউনিট।

৪. বিশ্বের সর্ববৃহৎ রেল নেটওয়ার্ক যে দেশের সেটি হলো চীন। বলাই বাহুল্য যে সেখানে রেল সরকারী সংস্থা।

৫. জাপান হলো এক মাত্র দেশ যেখানে  সাধারণ মানুষ রেল ব্যবহার করেন, রেলের নেটওয়ার্ক বৃহৎ, এবং রেল মূলত বেসরকারী (সরকারীও আছে, তবে সবচেয়ে ব্যস্ত রুটগুলো বেসরকারী।) কিন্তু জাপানের রেল বেসরকারীকরণ হয়েছে এক বৃহৎ কেলেঙ্কারির ওপর দাঁড়িয়ে, যার গল্প  ভারতের ক্ষেত্রে খুবই প্রযোজ্য। ভারতের মতোই জাপানের রেলও সম্পূর্ণ সরকারী সংস্থা ছিল ৮০-এর দশক অবধি। ৮০-এর দশকে জাপানে রেল বেসরকারীকরণ হয়, কিন্তু জাপানের রেলের বিপুল ঋণভার কোনো বেসরকারী সংস্থাই নিতে নারাজ হয়। তাই বেসরকারীকরণের জন্য এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করে জাপান সরকার। একটি সরকারী সংস্থা বানিয়ে রেলের যাবতীয় ঋণ সেই সংস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঋণের মোট পরিমাণ ২৪ লক্ষ কোটি টাকা আজকের টাকার অংকে, তৎকালীন জাপানের জাতীয় আয়ের চেয়েও বেশি। যে সব বেসরকারী সংস্থা রেলের নেটওয়ার্ক কিনবে তাদের সাথে এই মর্মে চুক্তি হয় যে প্রতি বছর রেল চালিয়ে লাভের একটা অংশ তারা দেবে এই ঋণগ্রস্ত সরকারী সংস্থাটিকে যা দিয়ে সেই ঋণকে একটু একটু করে শোধ করা হবে। যদি লোকসান হয় বা লাভ খুব কম হয় তাহলে বেসরকারী সংস্থাগুলোর কোনো দায় থাকবে না ঋণ শোধের। অর্থাৎ ভালোটা প্রাইভেট কোম্পানির, খারাপের বোঝা শুধু সরকারের। এরপর রেল চালাতে গিয়ে দেখা যায় যে বেসরকারী সংস্থার ল্যাজে গোবরে দশা, বিপুল কর্মী ছাঁটাই করেও তারা লাভ করতে হিমশিম খাচ্ছে, ঋণ শোধ করতে গিয়ে রেলের লাইন বা স্টেশন বা জমি বিক্রি করতে হচ্ছে। তখন সরকার ঠিক করে যে মানুষের করের টাকা থেকেই ধার মেটানো হবে, বেসরকারী সংস্থার দায় নেই। সেই ২৪ লক্ষ কোটি টাকার ভেতর ১৬ লক্ষ কোটি টাকা এখনো পর্যন্ত মানুষের করের টাকা থেকেই মিটেছে, বাকিটা এখনো বকেয়াই পড়ে আছে। অর্থাৎ ভাবুন, বেসরকারীকরণ করতে গিয়ে মানুষের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে বেসরকারী সংস্থাকেই সাবসিডি দিতে হয়েছে। 

ভারতে রেল বেসরকারীকরণ হলে সেটাও ওই জাপানী পথেই হওয়ার সম্ভাবনা। ভারতীয় রেল একসময় অনেক অংশেই বেসরকারী ছিল, সেগুলোকে সরকার বাধ্য হয়ে গ্রহণ করে কারণ বেসরকারী সংস্থাগুলো একে একে বন্ধ হয়েছিল। রেলের কোচ, কামরা, রেল লাইন বানানোর বহু সংস্থা কয়েক দশক আগেও বেসরকারী ছিল, তাদের ভরাডুবি হতেই সরকার বাধ্য হয়ে সেগুলো গ্রহণ করে। চোখের সামনেই উদাহরণ বার্ন স্ট্যান্ডার্ড আর টেক্সম্যাকো। বার্ন স্ট্যান্ডার্ড সরকার অধিগ্রহণ করে, আর টেকসম্যাকো ধুঁকছে, সরকারী খয়রাতির ওপর বেঁচে আছে।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০

জলিমোহন কৌল ~ আর্কাদি গাইদার

আমাদের একদম নিজস্ব দুটো কলকাতা শহর আছে। আমরা মানে তারা, যারা নয়ের দশকে বড় হয়েছি, স্কুলে বা কলেজে গেছি। আজকালকার নেটদুনিয়ার পরিভাষায় যাদের 'মিলেনিয়াল' বলে। 

উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ, বিশ্বায়ন, গ্যাট চুক্তি, নরসিমহা রাওদের আঁকা সীমানার দুপারে দুটো আলাদা শহর - এই দুই কলকাতাকে চেটেপুটে খেতে খেতে প্রাপ্তবয়স্ক  হয়েছি আমি, পাড়ার একটা বাড়িতে টেলিফোনের শৈশবের শহর থেকে এসটিডি বুথের ব্যবসাটাই সম্পূর্ন উঠে যাওয়ার মধ্যবয়সের শহরের মধ্যেই বিশ্বায়িত হয়েছি।

এসবের মধ্যেই খবর আসে, জলি কৌল মারা গেলেন। কমরেড জলিমোহন কৌল - অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টির কলকাতা জেলার শেষ সম্পাদক। উনি মারা না গেলে হয়তো জানতেও পারতাম না উনি বেচে ছিলেন। 

দুই কলকাতার বিশ্বায়িত নাগরিক আমরা যে কজন, আমরা নিয়ম মেনে পৃথিবীর আর দশটা শহরের মতনই বিশ্বায়নের টেমপ্লেট আপন করেছি। আমাদের দ্বিতীয় কলকাতায় আছে ধুসর কম্পোজিট ফাইবার আর কাচের উঁচু উঁচু অফিস বিল্ডিং। আছে আর্টিফিশিয়াল ল্যান্ডস্কেপিং, জিম আর কমিউনিটি সেন্টারওয়ালা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। আছে একটা স্টারবাক্স, গোটা কয়েক ম্যাকডোনাল্ডস, কয়েকটা কেএফসি। আছে মল, যেগুলোতে বারবেরির আউটলেট খোলবার তারিখের অধীর আগ্রহে আমরা অপেক্ষা করি। এইভাবে আমরা মনে মনে বিশ্বায়নের সূচকে নিজেদের ওঠাই নামাই - ব্যাংগালোরে এদের দুটো আউটলেট আছে, আমাদের নেই, সূচকে নেমে গেলাম। দিল্লিতে খোলবার আগে আমাদের এখানে ওরা আউটলেট খুললো, সূচকে একটু উঠে গেলাম। একদম একইরকম টেমপ্লেট মেনে অফিস বিল্ডিং, এপার্টমেন্ট, স্টারবাকস, ম্যাকডি, বার্গার কিং কে আপন করেছে সমস্ত বিশ্বায়িত শহর - সবার আছে একটা স্বতন্ত্র চরিত্রের মুমূর্ষু ওল্ডটাউন,  আর আছে নিউটাউন, যেখানে হংকং, সিংগাপুর, ব্যাংগালোর, মুম্বাই, কলকাতা সবাইকে একটু একটু করে একইরকম হয়ে যেতে হবে - একটি গ্লোবাল ভিলেজ, যার অভিন্নতাই আমাদের পরিচয়। 

এই ২০২০ র হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি - অবাঙালির বিশ্বায়িত কলকাতায় বসে আমার ভাবতে ভালো লাগে, আমার প্রথম কলকাতায় একদা কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা ছিলেন একজন কাশ্মীরি পন্ডিত - জলিমোহন কৌল। আমার ভাবতে ভালো লাগে, ১৯৪৬ এর ডাইরেক্ট একশন ডে'র দাঙ্গা মোকাবিলা, বন্দরের শ্রমিক আন্দোলন, শহরের উপকন্ঠে উদ্বাস্তু আন্দোলনে লাল ঝাণ্ডা হাতে জলি কৌলের সাথে একসাথে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তার বাঙালি স্ত্রী মনিকুন্তলা সেন, তার কমরেড উত্তরপ্রদেশের উর্দুভাষী শ্রমিক মহম্মদ ইসমাইল। 
বিশ্বায়িত এই দ্বিতীয় কলকাতায় বসে আমার ভাবতে ভালো লাগে, কমরেড জলিমোহন কৌলদের কলকাতা নিয়ে - ছাত্র, শ্রমিক, উদ্বাস্তুদের কলকাতা - টিরেট্টিবাজার, ছাতাওয়ালা গলি, বো ব্যারাকস, আর্মেনিয়ান চার্চ, পার্ক স্ট্রীট, পার্ক সার্কাস, খিদিরপুর, নিউমার্কেট, বালিগঞ্জ - পেয়াঁজের খোসার মতন অগুনতি স্তরগুলো নিয়ে, একেকটা গলি, একেকটা চৌমাথা পেরোলেই পালটে যাচ্ছে ভাষা, পালটে যাচ্ছে মানুষগুলো, পালটাচ্ছে চামড়ার রঙ, পোশাকের ধরন, পালটে যাচ্ছে স্থাপত্য, যেন একটা শহর নয়, সম্পূর্ণ আলাদা চরিত্রের কিছু জনবসতি বাড়তে বাড়তে একে অপরের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে চাপাচাপি করে জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। 

প্রাক বিশ্বায়ন যুগের সেই প্রকৃত বিশ্বজনীন প্রথম কলকাতার  ধীরমৃত্যুর সাক্ষ্য বহন করে আমার গ্লোবালাইজড, ইউনিফর্ম দ্বিতীয় কলকাতা। সেই তালিকায় যুক্ত হলেন কমরেড জলিমোহন কৌল।

শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২০

ধর্ষকাম IT Cell এবং আমরা ~ অর্কপ্রভ মুখোপাধ্যায়

সাফুরা জার্গারকে নিয়ে একটা পোস্ট। "এখন জেলে বসে কান্না ? দিল্লির দাঙ্গায় ইন্ধন দেওয়ার সময় মনে ছিল না?" আপনি স্বাভাবিকভাবেই কমেন্ট থ্রেডে বোঝাতে শুরু করেছেন, গর্ভবতী অবস্থায় একজন ব্যক্তিকে বিনা বিচারে জেলবন্দী করে রাখাটা কতটা অমানবিক, হঠাৎ আপনাকে মেনশন করে কমেন্ট "তোর মা কটা মোল্লার সাথে রাত কাটিয়ে তোকে পয়দা করেছিল রে? " আপাদমস্তক বিরক্ত হয়ে আপনি তখনও তর্ক চালানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন যুক্তি দিয়ে। আবার আপনি কমেন্ট থ্রেডে মেনশনড। আপনার প্রোফাইল থেকে, আপনার প্রেমিকার ছবি ডাউনলোড করে, কমেন্টে দেওয়া হয়েছে, সাথে লেখা "দেখে তো মনে হচ্ছে না আমার সামনে ঠিকমতো পা ফাঁক করতে পারবে !" আপনি স্তম্ভিত। শকড। কী লিখবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। কাঁপা হাতে ফেসবুকের ট্যাবটা অফ করে দিতে চাইছেন আপনি। কিন্তু ধাক্কাটা সামলে উঠতে পারছেন না। 

বিজেপির কুখ্যাত আইটি সেলের ফেক অ্যাকাউন্ট থেকে এইধরণের কদর্য আক্রমণ কমবেশি সবারই দেখা। ওদের পোস্টের কন্টেন্ট, শব্দচয়ন, আন্ডারটোন সুস্থ রুচির মানুষকে রীতিমতো ট্রমাটাইজড করার ক্ষমতা রাখে। অমর্ত্য সেনের দ্বিতীয় বিয়ে থেকে শুরু করে ঐশী ঘোষের শরীর – কুৎসিত রুচিহীনতার নজিরবিহীন মাইলস্টোন। 

ফ্যাসিস্ত রাজত্বে বিষাক্ত মানসিকতার চাষ। সোশ্যাল সায়েন্স, নিউরোসায়েন্স সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চর্চিত বিষয়। নারীবিরোধী, যৌন হিংসাকে খুল্লমখুল্লা উদযাপন করার খোলাবাজার। বহুদিনের, পুরোনো অভ্যেস।

১৯১৯ নাগাদ নারীমুক্তি বিরোধী ফিউচারিস্ট আন্দোলনের সাথে নিজেকে একাত্ম করে গুটি গুটি পায়ে এগোচ্ছিল ফ্যাসিবাদ। ক্ষমতায় আসার পর বেনিতো মুসোলিনির প্রকাশ্য ঘোষণা ছিল "l'eroismo dei vostri figlioli, dei vostri mariti, dei vostri fratelli, si deve anche a voi, o donne di Roma e 'Italia" – "the heroism of your sons, of your husbands, of your brothers, is also your merit, oh women of Rome and of Italy"। বটেই তো ! নারীর গৌরব তো ঠিক হবে তার সন্তান/স্বামী/ভাইয়ের বীরত্বের মাপকাঠিতে! 

ভার্জিনিয়া উলফ, ১৯৪০-এর দশকে স্পষ্টই বলেছিলেন নাৎসি জমানার রিগ্রেসিভ চরিত্র এবং নারী-নির্যাতন দুয়েরই শেকড়ে রয়েছে শোষণ। সামাজিক শোষণকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে মহিলাদের কেবলমাত্র সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে চরিত্রায়িত করে ফ্যাসিবাদ। আর ঢাকের বাঁয়া হয়ে প্রশ্রয় দেয় প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, যেগুলোর ভিত্তিতে জ্বলজ্বল করছে মিসোজিনি বা নারীবিদ্বেষ। উইচহান্ট কিংবা দেবদাসী প্রথার স্রোত ফ্যাসিবাদ বয়ে নিয়ে চলে তার ধমনীতে। রোজা লুক্সেমবার্গকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে তবেই রাইখস্ট্যাগ দখল করতে পেরেছিল নাৎসি বাহিনী। 'দ্য বার্লিন রেপ' কিংবা গুলাগে টর্চারের রোমহর্ষক গল্প বাজারে ছেড়েও ফ্যাসিবাদের দালালরা ভোলাতে পারেনি নাৎসি ঘেটো আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে ইহুদি কিংবা কমিউনিস্ট মহিলাদের ওপর এসএস অফিসারদের গণধর্ষণের কথা; এবং অত্যাচারের পর রক্তাক্ত নিগৃহীতার গায়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার একের পর এক ঘটনা। প্রায় দুই মিলিয়ন মহিলাকে খুন করা হয় এই নাৎসি জমানায়, যাদের খুনের আগে অমানবিক সব এক্সপেরিমেন্ট কিংবা ধর্ষণ করা ছিল দস্তুর। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভয়াবহতম গণহত্যার মঞ্চ ছিল ১৯৭১-এর অব্যবহিত আগের পূর্ব পাকিস্তান। ধর্মান্ধ, স্বৈরাচারী আয়ুব খান কিংবা ইয়াহিয়ার সরকার হিংস্র টার্গেটে ছিঁড়ে খেয়েছিল ওপার বাংলার শরীর – একরাতে একশোরও বেশি পাক মিলিটারি কর্তৃক একজন নাবালিকাকে ধর্ষণ রিপোর্টেড ছিল একাধিক সময়ে। ২০০২-এর গুজরাট দেখেছে যোনিতে ত্রিশূল ঢুকিয়ে ভ্রূণ বের করে আনার নৃশংসতা। 

এগুলো তো তথ্য; ঘটনা। এই প্রতিটা ক্ষেত্রে বিকৃত পাশবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রোপাগেট করেছিল রাষ্ট্র। কেননা, ফ্যাসিবাদ প্রতিবারই মুখ থুবড়ে পড়েছে নারী ক্ষমতায়নের, সমানাধিকারের সুস্থ মানসিকতার সামনে। স্তালিনগ্রাদের অসম যুদ্ধে পুরুষ-নির্ভর নাৎসি বাহিনীর মনোবলকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে উড়িয়ে দিয়েছিল লাল ফৌজের নারী-ক্ষমতায়ন। বর্বর নাৎসিদের কাছে বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মোসিন-নাগান্ত রাইফেল কাঁধে সোভিয়েত লাল ফৌজের মহিলা জেনারেলরা, স্নাইপাররা। তাঁদেরই একজন, ল্যুডমিলা প্যাভলিশেংকোকে যুদ্ধের পর যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, "কতজনকে খুন করেছেন আপনি ?" – ওনার দৃপ্ত জবাব ছিল "একজনও মানুষকে মারিনি। ৩০৯ জন ফ্যাসিস্তকে মেরেছি!" 

প্রগতির বিরুদ্ধে নীতিগত অবস্থান ফ্যাসিবাদের – ঠিক তার বিপ্রতীপেই মানবতাবাদ, প্রগতিশীল আদর্শের দৃঢ় ব্যারিকেড। যেখানে অন্য বসন্তে মহাকাশে পৌঁছে যান ভ্যালেন্তনা তেরেস্কোভা। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা কাঁধে গেরিলা যুদ্ধে ধর্মোন্মাদদের ধ্বংসস্তূপের ওপর পা রাখেন মুক্তিযোদ্ধা নারীপুরুষ। মধ্যপ্রাচ্যে কিংবা সুদানে কানের পাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে যাওয়ায় খিলখিল করে হেসে ওঠেন আইসিসের ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা তরুণী - একুশ শতকের কমরেড। কমরেড। যে শব্দের নারী-পুরুষ লিঙ্গভেদ নেই। 

ডিয়ার চাড্ডি বাহিনী, আইটি সেলের ফ্রাস্ট্রেটেড জানোয়ার! আপনাদের জেনে রাখা জরুরী, আপনাদের ধর্ষকাম আগ্রাসী ভঙ্গিতে আমাদের কপালে একফোঁটা ঘামও যাতে না ঝরে, তার জন্য তৈরি হয়ে নিচ্ছি আমরা। আপনাদের বিকৃতরুচিকে কফিনে পুরে দিতে শুভবুদ্ধির লংমার্চে পা মেলান রবীন্দ্রনাথ; পা মেলান রোমা র‍্যঁলা, লোরকা, সিগার, জোন বায়েজ, ভিক্টর জারা। ভুলে যাবেন না, এই লংমার্চকে থামাতে চেয়ে স্যুইসাইডাল স্টেপে খতম হয়ে গেছে আপনাদের অনেক গডফাদার। আমাদের চেতনাকে সংহত করেন মিশেল ব্যাসেলেট – ২১ বছর বয়সে সান্তিয়াগোর অদূরে ভিল্লা গ্রিমালদির কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে তীব্র শারীরিক নির্যাতন সহ্য করে ২০০৬-এ মেজর কামব্যাক – চিলির ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য একজন মহিলা রাষ্ট্রপতি। যে ইতিহাস আর বর্তমানকে না জেনে আদালতে, জেলখানায়, ফেসবুকে আর হোয়াটস্যাপে উল্টোদিকে ঘোরাতে চাইছেন সভ্যতার চাকা, সেই সিরিজের লেটেস্ট এপিসোডে দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ হবে রাস্তাতেই।

"হে আমার স্বদেশ! আহত তুমি হতে পারো, কিন্তু বিজিত কখনও না।" বলেছিলেন পাবলো নেরুদা। ভারতবর্ষও কারুর কেনা জমিদারি নয়। এই দেশ কোনও যুদ্ধবাজ ধর্মোন্মাদ ফ্রেঞ্চকাটের সামনে নতজানু হয়ে থাকবে না।

"La historia nos absolverá"! ইতিহাস আমাদের মুক্ত করবে !

চ্যালেঞ্জ !

বুধবার, ২৪ জুন, ২০২০

হারিয়ে যাওয়া পার্বত্য রেলপথ ~ অরুণাভ দাস

হারিয়ে যাওয়া পার্বত্য রেলপথ 

(১)
রেল সংক্রান্ত কিছু লেখালিখির জন্য কয়েকটা কাগজ জেরক্স করাতে গিয়েছিলাম। দোকানে পাড়ার পরিতোষদার সঙ্গে দেখা। আমার চেনা প্রথম ও একমাত্র প্রতিবেশী রেলফ্যান। এমন কী, সারা দেশের রেলওয়ে টাইম টেবিল মুখস্থ করে রেখেছেন। আমাকে দেখেই বললেন, 'দার্জিলিঙয়ের টয়ট্রেন নিয়ে তোমার বইটা বেশ কাজের হয়েছে। এবার নতুন কী লিখছ?' 
      বললাম, 'একটা নতুন লেখায় হাত দিয়েছি। সময় হলে আপনাকে বলব।'
      'বেশ বেশ। তাহলে তোমার বুদ্ধির গোড়ায় একটু শান দেয়ার ব্যবস্থা করি। বল তো দেখি, আমাদের দেশে পাহাড়ি রেলপথ কটি?' 
      'এ তো খুব সহজ প্রশ্ন, পাঁচটি।'
      পরিতোষ দা হেসে ফেললেন। 'একটা ছ-নম্বর ছিল, এখন আর নেই। মানে বিলুপ্ত।'
      'মানে, বলেন কী? কোনটা সেটা?' 
      'বললে তো হয়েই গেল। সেটা খুঁজে বার করাই তো তোমার কাজ। দুদিন নাও। না পারলে ফোন কোরো, বলে দেব। আর পারলে বাড়িতেই চলে এসো। তোমার বউদির হাতের চায়ের নেমন্তন্ন।' 
      ভালোই বুঝলাম, এবার আমার ঘুম ছুটল। ছয় নম্বর হিল রেলওয়ে সম্পর্কে কোনো ধারনাই নেই। কিন্তু খুঁজে বার করতেই হবে। মনে মনে নিজেকে এক দিন সময় দিলাম। পরিতোষ দার পরিতোষ হয়, এমন তথ্য পেয়ে গেলাম সহজেই। ভদ্রলোক অনুসন্ধিৎসার আলোটা জ্বালিয়ে দিতে ভালোই পারেন। 

(২) 
আমাদের দেশে চালু আছে পাঁচটি পার্বত্য রেলপথ। এর মধ্যে কয়েকটা আবার ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায়। পাঁচটি হল; দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে, কালকা-সিমলা রেলওয়ে, নীলগিরি রেলওয়ে, কাঙড়া ভ্যালি রেলওয়ে এবং নেরাল-মাথেরন রেলওয়ে। ছিল একটি ছয় নম্বরও, এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। সেটি ছিল চাবাগানের জন্য বিখ্যাত কেরালার হিলস্টেশন মুন্নারে। নাম কুন্ডালা ভ্যালি রেলওয়ে। মানুষ পরিবহনের থেকে মুন্নারের চা বদিয়াকান্নুর হয়ে বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছে দিতে বেসরকারি উদ্যোগে এই অভিনব রেলপথের প্রবর্তন। 
      ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভারতের এই প্রথম মোনোরেল প্রকল্প চালু হয় ১৯০২ সালে। মুন্নার বা কুন্ডালা ভ্যালি থেকে রেলপথ গিয়েছিল প্রায় ৩৫ কিমি দূরবর্তী কান্নান দেবান পাহাড়ের মাথায়। উচ্চতম প্রান্ত বলে এই অন্তিম বিন্দু টপ স্টেশন নামে পরিচিত হয়, যার উচ্চতা ১৭০০ মিটার। অভিনব ব্যাপার হল, প্রথম পর্বে একটি রাস্তা বরাবর একটাই রেললাইন পাতা হয়। লাইনের ওপর থাকত ছোটো চাকা ও রাস্তায় থাকত বড়ো চাকা। এইভাবে কামরার ভারসাম্য বজায় রাখা হত। ট্রেন টানত বলদে। অতীতে উত্তর ভারতে পাঞ্জাবের পাতিয়ালা রাজ্যে একই ধরনের রেলপথ ছিল। ৬ বছর বলদে ট্রেন টানলেও পরে ১৯০৮ সালে ন্যারোগেজ রেলপথ তৈরি করা হয় ও ইঞ্জিনের ব্যবহার আরম্ভ হয়। এই পর্বেই কুন্ডলা উপত্যকায় বিখ্যাত এলুমিনিয়াম রেলব্রিজ নির্মিত হয়। ৬১০ মিলিমিটারের ন্যারোগেজ রেলপথ ১৯২৪ সাল পর্যন্ত চা ও বাগিচার অন্যান্য দ্রব্য পরিবহন করত। কুন্ডালা ভ্যালি ও মাদুপেট্টি অঞ্চল থেকে চা টপ স্টেশনে পৌঁছানোর পর পাত্রগুলিকে রোপওয়েতে চাপিয়ে ৫ কিমি দূরে কোট্টাগুড়ির দক্ষিণে নিম্নবর্তী স্থানে নিয়ে যাওয়া হত। এই জায়গাটি পরিচিত ছিল বটম স্টেশন নামে। জায়গাটি বর্তমান তামিলনাড়ু রাজ্যে। বটম স্টেশন থেকে গরুর গাড়িতে চা যেত ১৫ কিমি দূরে বদিয়াকান্নুর। সেখান থেকে ট্রেনযোগে সারা দেশে। এমন কী বন্দর থেকে জাহাজে ইউরোপের বাজারেও পৌঁছাত।
      ১৯২৪ সালে কুন্ডালা ভ্যালি রেলপথের অন্তিম দিন ঘনিয়ে আসে। পাহাড়ে হঠাত ভয়াবহ বন্যা হলে ছোটো রেলপথ ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। কেরালার নিজস্ব ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী এই বন্যা ৯৯ এর বন্যা নামে কুখ্যাত।
      এখন মুন্নার বা টপ স্টেশনে রেলপথ, স্টেশন বা সেতু ইত্যাদির কোনো চিহ্ন নেই। মুন্নারে যেখানে স্টেশন বিল্ডিং ছিল, সেটি সংস্কার করে টাটা-টির আঞ্চলিক অফিস করা হয়েছে। প্লাটফর্ম এখন রাস্তা। চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য টপ স্টেশন একটি জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। মুন্নার থেকে গাড়িতে অনেকে ঘুরতে যান।

(৩)
পরিতোষ দা ভারতের ষষ্ঠ পার্বত্য রেলপথের গল্প শুনে এমনই খুশি, চায়ের সঙ্গে মুখরোচক টা সহ একশয় একশ দিলেন৷ তার সঙ্গে রেল বিষয়ক নতুন একটা হোমটাস্ক। সে গল্প পরে আর একদিন।

ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত।

শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২০

ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা ~ অর্কপ্রভ ও শঙ্খনীল

বর্তমানে ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজমান অবস্থায় আইটি সেলের কর্মীদের একাংশ কেন্দ্রীয় সরকারের চরম কুটনৈতিক ব্যর্থতাকে আড়াল করতে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে বঙ্গ কমিউনিস্টদের চীনের সাথে জড়িয়ে এর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন।
আজকে এর কিছুটা জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম।।
১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ৩১শে অক্টোবর The Statesman পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে জ্যোতি বসু বলেন-
"Our stands is clear. I think India's border defence should be strengthened and my party will not hesitate to put in all its efforts for the defence of India's freedom, irrespective of the political character of the attacking country."
এরপর ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে দলের পক্ষ থেকে ভারত – চীন যুদ্ধ প্রসঙ্গে তাঁর দেওয়ার বক্তৃতার খণ্ডাংশ উদ্ধৃত করলাম। কিঞ্চির লম্বা হলেও পড়তে অনুরোধ করব। অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারি থাকুক –
-এইরকম প্ররোচনামূলক বক্তৃতা সত্ত্বেও আমরা এখনও বলতে চাই এই ব্যপারে ভারতবর্ষের কোথাও যেন কোনো দ্বিমত না থাকে। আমরা চাই দেশ রক্ষার ব্যপারে সমস্ত জাতিকে একতাবদ্ধ করতে। আমাদের এই পার্টি প্রস্তাব পাশ হবার পর আপনি জানেন, দিকে দিকে এই প্রস্তাব সমর্থিত হয়েছে, দিকে দিকে এই প্রস্তাব কার্যকরী করবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে এও আপনি জানেন ...আপনি জানেন, 'সংগ্রাম যতই কষ্টসাধ্য দীর্ঘ হোক না-কেন চীন আক্রমণকারীদের পবিত্র ভারতভূমি হতে বিতাড়ন করার দৃঢ় সঙ্কল্প' একথা ঘোষণা দ্বারা সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করে পার্লামেন্ট নেতৃত্ব দিয়েছেন।...দ্বিতীয় কথা, ...আমি এটা পরিষ্কার বলতে চাই আমাদের কথা, ভারতবর্ষের কমিউনিস্টদের কথা যে চীন থেকে বা চীনের কমিউনিস্ট পার্টি যে কথা প্রচার করছেন কদিন ধরে, তাতে তাঁরা বলছেন যে পণ্ডিত নেহেরু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীর দিকে চলে গিয়েছেন, শুধু চলে যাননি তাঁদের তাঁবেদারি করছেন। শুধু তাই নয় তাঁরা বলছেন ভারতের জোট নিরপেক্ষতা নীতি অতীতের ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে। ভারতবর্ষের কমিউনিস্টরা একথা আগেও মানেননি, এখনও মানছেন না। অস্ত্র নেওয়া সত্ত্বেও একথা জোর করে পণ্ডিত নেহেরু ঘোষণা করেছেন যে, জোট নিরপেক্ষ নীতি বজায় আছে। আমরাও একথা মনে করি। ...চীনের এই প্রচার অত্যন্ত ক্ষতিকারক বলে আমরা মনে করি। ...যখন কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাবের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তাঁরা ভারতবর্ষের জনগণকে চীনা আক্রমণ রুখবার জন্য যখন ঐক্যবদ্ধ করবার আবেদন জানিয়েছেন, তখন পশ্চিমবাংলায় দেখছি সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। এখানে অনৈক্য সৃষ্টি করা হচ্ছে, জনসাধারণকে বিভক্ত করা হচ্ছে, এখানে কমিউনিস্ট পার্টির অফিস আক্রান্ত হচ্ছে।
কংগ্রেস বিধায়ক নেপাল চন্দ্র রায়ঃ খুব ভালো করেছে, আরও হবে।
-এখানে কোথাও কোথাও অফিসের কাগজপত্র বের করে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং বিভিন্ন কমিউনিস্টদের বাড়িতে গিয়ে ধমকানো হচ্ছে, অপমান ও আক্রমণ করবার চেষ্টা হচ্ছে। ...প্রতাপবাবু এখানে যে বক্তৃতা দিয়েছেন এটাতো কল টু মার্ডার কমিউনিস্ট। এর মানে হচ্ছে
– তোমরা আজ কমিউনিস্টদের খুন কর, তাদের বারিঘর আক্রমণ করো, তাদের অফিস জ্বালিয়ে দাও, তা হলে তোমরা দেশপ্রেমিক।
-পন্ডিত নেহেরু বলেছেন চীনারা ভেবেছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তাদের সমর্থন করবেন কিন্তু সে সমর্থনও তাঁরা পায়নি। ...প্রকাশ্যে সভায় সভায় এই কথা বলা হচ্ছে দাঁড়িয়ে যে, কমিউনিস্টদের টেনে টেনে বাড়ি থেকে বের করো, তাদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মারো, চাবুক মারো, খুন করো। এইসব কথা বলা হচ্ছে যেন আইনের মধ্যে পড়ে।
নেপাল চন্দ্র রায়ঃ ওদের খাঁচায় পুরে থুথু দিয়ে মারা দরকার।
অধ্যক্ষর নেপাল চন্দ্র রায়কে সতর্কীকরণ।
-স্পিকার মহাশয়, আমি বলি নেপালবাবুদের চেঁচিয়ে লাভ কি ? ...দু-একটা কমিউনিস্টকে খুন করলে যদি দেশ রক্ষা হয় চীন আক্রমণ ঠেকানো যায় আমার দুঃখ নেই, - আমি এখানেই পেতে দিচ্ছি আমার বুক রিভলভারের সামনে। ...আমাদের বাড়ির চারদিকে ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের লোকেরা ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে।...দেশের যখন বিপদ এবং আমাদের জওয়ানরা যখন আত্মত্যাগ করছে তখন এইভাবে হানাহানি খুনোখুনি সৃষ্টি করবেন না, আপনারা আপনাদের দায়িত্ব ঠিক করুন। আমি আপনাদের প্ররোচনার কোন জবাব দিতে চাই না। কোন কটূক্তি করতে চাই না। দেশপ্রেমের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা কাজ করতে চাই। দেশ রক্ষা আমাদের কর্তব্য এবং সমস্ত কমিউনিস্ট সেই কাজ করবে। আপনারা খুন করে যান, বে-আইনি কাজ করে যান, যে পথে চলতে চান চলুন, আমরা আমাদের কর্তব্য পালন করে যাব।
এর পাঁচ দিন পরে জ্যোতি বসু সহ বেশ কয়েকজন নেতাকে প্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পরদিন আনন্দবাজারের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল 'সারা দেশে দেশদ্রোহীদের ধরপাকড়।
ভোররাতে ঘুমন্ত অবস্থায় গ্ৰেফতার হলেন জ্যোতি বসু। টানা ১ বছর হাজতবাসের পর পেলেন ছাড়া।
দক্ষিণ কলকাতায় কমিউনিস্ট পার্টির অফিস পুড়ল। পাড়ায় পাড়ায় চৌ এন লাইয়ের পাশাপাশি বাংলার কমিউনিস্ট নেতাদের কুশপুতুল পোড়ানো হল। বিপুল চাহিদা দেখে কালীঘাটে একটা কুশপুতুল বিক্রির দোকান তৈরি হয়েছিল। সামান্য দামে সহজপাচ্য দেশপ্রেম।
এর ঠিক চার বছর পর ১৯৬৬ সাল। খাদ্য আন্দোলন। পরের বছর ১৯৬৭। যুক্তফ্রন্ট সরকার, নকশালবাড়ি।
আর তার ঠিক দশবছর পর ব্যাপক জনমতের সঙ্গে রাজ্যে বামেদের সরকার গঠন। মূখ্যমন্ত্রী সেই জ্যোতি বসু।। নিজের নির্বাচনী কেন্দ্রে একাই পেলেন প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট ।।
তাই সত্য কখনো চাপা থাকা না।

মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২০

দুর্গাপুর কি পাল্টে যাচ্ছে ~ নীলাঞ্জনা চৌধুরী

আমার ছোট্ট শহর দূর্গাপুর। বেড়ে ওঠার সময় লক্ষ্য করেছিলাম নবী'র সদ্যজাত বোন রিঙ্কিদের বাড়িতে খুব আদর-যত্ন পেতো। রিঙ্কিদের বাড়িতে আমার-ও খুব যাওয়া-আসা ছিল ছুটির দিনে। দূর্গাপূজোর ছুটির আগে আমাদের এক বিশেষ আলোচনার বিষয় ছিল কার ক'টা নতুন জামা হয়েছে। এমনি এক বছর জানতে পারলাম নবীদের নাকি পূজোতে নতুন জামা হয় না। তাই রিঙ্কির বাড়ি থেকে জামা দেয়া হয়। ব্যাপারটা কেন এমনি জানার কৌতূহল প্রকাশের বিশেষ জায়গা ছিল না। বাবা-মা খুব কড়া করে বুঝিয়েছিলেন কার কতগুলো জামা হয়েছে সেই নিয়ে আলোচনা করা মোটেই ভালো জিনিস নয়। পরে বড়ো হয়ে বুঝেছিলাম নবীরা ইসলাম ধর্মালম্বী তাই ওদের বছরকার জামা ঈদ এর সময় হয়। এই বেলা বলে রাখি আমাদের বাবাদের বেতনে তখন নতুন জামা বছরে একবারই কেনা সম্ভব ছিল। অনেকের তা-ও হতোনা নানা রকম পারিবারিক দায়বদ্ধতা সামাল দিতে গিয়ে।

তখন আমি ক্লাস ৭ কি ৮। ওই সময় জানতে পারলাম আমার অনেক বন্ধুরা পূজোতে অষ্টমী র পূজো দেয়।ছায়া-কে তখন নতুন নতুন চিনছি। সে বললো ওর নাকি আগের বছরের মতো সেই বছরও অষ্টমীর অঞ্জলির সব প্ল্যান সারা। খুব সমস্যায় পড়লো মন। বললাম, হোক তাহলে এবার। আমিও দেব পূজো। ছায়ার কাছেই জেনেছিলাম কি কি করতে হবে। কারণ পূজোর ব্যাপারে পটুয়া বন্ধুরা আমাকে নিয়ে মজা করতো কিন্তু ছায়া খুব ভালো করে আমাকে দু'-চারটে জিনিস বুঝিয়ে দিয়েছিলো। ছায়ার ভালো নাম ছিল রেহানা বেগম।

ইরফান মামা, ছোটবেলা থেকেই জানলাম উনি মামা। বাবা-কাকা রা মানে ওনার বন্ধুরা ওনাকে 'ভটচাজ' বলে ডাকতেন। কেন, সে সব জানতাম না। বড়ো হয়ে জেনেছিলাম বাবা রা যখন SAIL এর হোস্টেলে তখন ইমার্জেন্সির সময়। তখনই সবার ছদ্মনাম দেওয়া হয়েছিল। আর ইরফান মামা কে ওই নাম-ই অনেকবার বাঁচিয়েছিল। কাকা-র জীবনের শেষ দিকে যখন বাবা মানসিক আর শারীরিক ভাবে ভেঙে পড়ছিলেন তখন ইরফান মামাই কিন্তু এক ডাকে দূর্গাপুর থেকে দিল্লি এসে গেছিলেন অনির্দিষ্টকালের জন্য।

এ-তো হলো আমার আসে-পাশের ধর্ম নিয়ে কষাকষি! অঙ্কটাতে যদি-ও আমি খুব কাঁচা ছিলাম। কিন্তু বেশতো ছিল। সবাই তো দিব্যি ছিলাম। শুনেছি বন্ধে শ্রমিকরা কারখানায় আটকে গেলে রাজনীতিটির দলের উর্ধে গিয়ে তাদের বাড়ির লোকের কাছে বাজার পৌঁছে যেত। যাতে পরিবারের মানুষের বা বাচ্চাদের কোনো ক্ষতি না হয়। ধর্ম, জাত, রাজনৈতিক দল মানুষ চেনার বা বিচার করার বস্তু ছিল না। তোমার পাশের বাড়ি, পাড়ার লোক, ক্লাসের বন্ধু, ঠেকের দাদা, এই ছিল আইডেন্টিটি।

তরপর হলাম বড়ো। বেরোলাম ছোট্ট শহরের গন্ডি ছেড়ে। বুঝলাম মানুষ বন্ধু হওয়ার আগে জাত জানতে চায়। বললাম, সে তো আমি জানি না। তারা আমার থেকেও বেশি অবাক হলো, আমার অজ্ঞতা দেখে। তারপর দেশ ছাড়লাম মানুষ এখন ধর্ম-ও জানতে চায় - বলি মানুষ! ছোটবেলা থেকে তাই-তো জেনে এসেছি। তারা আরো বেশি চিন্তায় পরে যায়। মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে আমার আসে-পাশের পরিধিটা বাড়লো নাকি কমলো।

আজ যখন বিদেশে বসে দেখলাম দূর্গাপুরে এক অনুমানিক COVID-১৯ রোগাক্রান্ত প্রৌঢ়কে ঘিরে তার বাড়ির লোক কে সবাই জেরা করছে তখন মনে হলো তাহলে কি আর আমার সেই বেড়ে ওঠার শহরের অস্তিত্ব আর নেই। হারিয়ে গেছে অন্যের বিপদকে নিজের ভেবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সেই ইচ্ছে? সেই পরিবারের কি দোষ? তাঁদের নাম? আর যা দেয় মানুষকে মানুষ না ভেবে তাদের এক গন্ডির মধ্যে বেঁধে নিজেদের মনের অন্ধকারকে চর্চা করার সম্পূর্ণ সুযোগ! যাঁরা এতদিন ওই পরিবারের নামের ভিত্তিতে কারণ খুঁজে তাঁদের হয়রান করলেন, জানতে চাইলেন ওই পরিবারের কেও কোন ধর্ম সভায় গেছিলেন কি না, বিচার করলেন, নিজের অনুমানকে প্রকৃত ঘটনা বলে অন্যদের কাছে বললেন, তাঁরা কি কেও COVID-১৯ টেস্ট নেগেটিভ আসার পর ক্ষমা চেয়েছেন? ওই দিনগুলো যখন ওনাদের পরিবারের সবচেয়ে দুর্বিসহ দিন ছিল তখন কি কেও ওঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন ওঁদের বাড়িতে কারোর কিছু লাগবে কি না যাতে ওঁদের বাড়ি থেকে বের হয়ে ওই সব প্রশ্নের সম্মুখীন না হতে হয়? কেও কি ভেবেছেন এই রোগ কাল আমার-আপনার বা আমাদের প্রিয়জনের হতে পারে আর তখন আমরা আমাদের প্রিয় শহরবাসীর কাছে কি রকম সাহায্যের আশা রাখবো?

হ্যাঁ, আজ দূর্গাপুর ছোট আর নেই। আমাদের ছেলেবেলা থেকে বেড়ে ওঠার মতো সে-ও নিজের গন্ডী ছাড়িয়ে বেড়েই চলেছে। রোজই শুনি একটা নতুন কিছু গড়ে উঠেছে সেখানে- কখনো আধুনিকতার দরুন কখনো বা সংস্কৃতির ছোঁয়ায়। কিন্তু আমাদের কি তাহলে প্রকৃত অর্থে বড়ো হওয়া হলো? গন্ডী কি সত্যিই বড় হলো? নাকি ছোট হতে হতে মনুষ্যধর্মের নিঃকৃষ্টতম জায়গায় পৌঁছে গেছি আমরা সবাই? খুব মিস করছি আজ ওই নবী, রিঙ্কি, ছায়া ও ইরফান মামাদের। এখনো কি আমাদের উপায় আছে আবার একবার মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবার?

*নাম ও পরিচয় পরিবর্তিত

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

গ্লানি ~ অংশুমান ভট্টাচার্য্য

ভারত বর্ষ এই কোভিডের লড়াই শেষ পর্যন্ত জিতেই যাবে। অন্য দেশের তুলনায় সংক্রামিত হবেন অনেক কম, জনসংখ্যার নিরিখে। মৃত্যুহারও হয়তো কমই হবে। কয়েক মাস বাদে আমরা ফিরে যাবো পুরনো জীবনে। নতুন ছন্দে ফিরে আসবে গোটা সমাজ।

তবুও এইসব আশা-ভরসার মাঝেই আমাদের তাড়া করে যাবে কিছু ছবি। ছবিগুলো অনেক কাল আমাদের খোঁচাবে, ভাবাবে, ভয় পাওয়াবে। মাঝে মাঝে হয়তো শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে যাবে ঠান্ডা একটা স্রোত। কখনো কারো চোখের কোনে দু ফোঁটা জল।

জামলো মাকদম। বছর বারোর সেই কিশোরী যে তেলেঙ্গানার লঙ্কার ক্ষেতের কাজ হারিয়ে দুশ মাইল হেঁটে ফিরে আসছিল ছত্তিশগড়ে। বন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। কিংবা নাম না জানা বছর তিনেকের সেই ছেলেটি। চাকা লাগানো সুটকেসের উপরে যে ঘুমিয়ে পড়েছে মে মাসের দুপুরের রাস্তায়। মা তার টেনে চলেছেন দড়ি বাঁধা সুটকেস। অথবা রেললাইনে ছড়িয়ে থাকা রুটিগুলো। মাল গাড়ির চাকা ষোল জন মানুষকে পিষে দিয়ে গেলেও রুটিগুলো রয়ে গেছে। আবার মুজাফফরনগরের থেঁতলানো ট্রাক্টর, যাতে করে ছজন বাড়ি ফিরছিলেন। অথবা মধ্যপ্রদেশের গুনা রাস্তায় পড়ে থাকা ট্রাকের নিচে পিষ্ট কটা লাশ।

চলচ্ছবির মত আমরা দেখে যাই অগুনতি মানুষ হেঁটে চলেছেন ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে। গুরগাঁও রাজস্থান গুজরাট মহারাষ্ট্র কেরল থেকে পুবের রাজ্যে। ঘাড়ে মাথায় বস্তা, ব্যাগ‌, সস্তার সুটকেস। আর বাচ্চা। ভবিষ্যতের ভারতবর্ষ। এই স্মৃতি নিয়েই তারা নাগরিক হতে চলেছে। 

নতুন একটা শব্দ শিখলো ভারতবাসী - পরিযায়ী শ্রমিক। অর্থনীতির ছাত্র রা আরেকবার ঝালিয়ে নিল মাইগ্রেশনের থিওরি, গ্রাম থেকে শহরে শ্রমিকের গতায়াত। সাধারণ মানুষ আবার শিখলো ভূগোল। তেলেঙ্গানা থেকে ঔরঙ্গাবাদ হয়ে মোজাফফরপুর অব্দি ছড়ানো ভূগোল সেই দেশের।

লকডাউন শুরু হওয়ার পর প্রায় পঞ্চাশ দিন বাদে কেন্দ্রীয় সরকারের মুখে শোনা গেল এদের কথা। কি আশ্চর্য যে এত বড় পরিকল্পনার ফাঁকে হারিয়ে গেছিলেন প্রায় দশ কোটি মানুষ। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যিনি যেখানে আছেন তিনি সেখানেই রয়ে যাবেন। এই প্রান্তিক মানুষদের ব্যবস্থা রাজ্য কেন্দ্র কেউই করে উঠতে পারলো না প্রায় দু'মাসে, স্রেফ ভোটার নয় বলে। ইতিহাস কেন আমাদের ক্ষমা করবে!

অর্থমন্ত্রীর বয়ানে আগামী প্রকল্প পরিকল্পনা জানা গেল। কিন্তু এই পরিকল্পনা কি পঞ্চাশ দিনের গবেষণার ফসল! এক দেশ এক রেশন কার্ড তো খাদ্যমন্ত্রী পাসোয়ান গত বাজেটেই ঘোষণা করেছিলেন। এই বছরের মার্চে তা সম্পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। সে যদি নাও হয়ে থাকে, এক দেশ এক আধার কার্ড তো ছিলই। তা দিয়ে ভিন রাজ্যের শ্রমিকদের রেশন কেন দেওয়া গেল না তার সদুত্তর পাওয়া যায় না। 

পঞ্চাশ দিন বাদে যে ব্যবস্থা নিয়ে আপনি আসলেন মাননীয়া অর্থমন্ত্রী তা খুবই সাধারন, খুবই অপ্রতুল। আশা ও প্রয়োজন দুটোই অনেক অনেক বেশি ছিল। ক্ষমা করবেন ম্যাডাম কিছুতেই বলতে পারছিনা যে দের আয়ে দুরস্ত আয়ে। 

দিনের শেষে রাজ্য কেন্দ্র সব সরকারই আমাদের বিশ্বাস করিয়ে ছাড়বেন যে এই করোনা যুদ্ধে আমাদেরই জয় হয়েছে। সংখ্যাতত্ত্বও সে কথাই সপ্রমাণ করবে। রাষ্ট্র তার বিধি নিষেধ পালনে, নিয়মের নিগড়ে, নাগরিকের বাধ্যতায় প্রমাণ রেখে যাবে কি কঠোরতায় আমরা এ জয় সম্ভব করেছি। 

তবুও জামলো মাকদমের মাতৃভূমি হিসেবে, সুটকেসের ওপরের নাম-না-জানা ঘুমন্ত বাচ্চাটির জন্মভূমি হিসেবে, এই দেশ শেষমেষ পরাজিত। রেল লাইনের উপরে ছড়িয়ে থাকা রুটিগুলো আজন্ম এই পরাজয়ের দলিল হয়ে থাকবে। সরকার বা রাষ্ট্র জয় ঘোষণা করলেও এই দেশ শেষ পর্যন্ত হেরেই গেছে। পরাজয়ের এই গ্লানি থেকে আমাদের কোনো মুক্তি নেই।

ছবি গুলো বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে নেওয়া। এত পরিচিত হয়ে গেছে আজ যে আলাদা করে নাম দেবার দরকার নেই। কোলাজ ও  স্কেচ এফেক্ট আমার করা কম্পিউটারে।

সোমবার, ১১ মে, ২০২০

করোনা ও শ্রমিক ~ পুরন্দর ভাট

প্রতিদিন আমরা দেখতে পারছি লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক শ'য়ে শ'য়ে কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে নিজের দেশে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে শহরগুলো থেকে। অনেকে শেষ অবধি পৌঁছতে পারছে না, রাস্তাতেই হার স্বীকার করে নিচ্ছে। মৃত শ্রমিকের সংখ্যা করোনায় মৃতের সংখ্যার মত গোনা হচ্ছে না, কোনো ওয়েবসাইট মৃত শ্রমিকের সংখ্যার "ইউনিফর্ম" বা "লগারিদমিক" - কোনো স্কেলেই "কার্ভ" তৈরি করে দেখাচ্ছে না। হাতে গোনা কিছু খবর আসছে যেমন ট্রাকের ধাক্কায় গুজরাটে ৫ জনের মৃত্যু বা অরঙ্গাবাদে ট্রেনের তলায় ১৫ জন অথবা আম বোঝাই ট্রাক উল্টে ৫ জন। এর বাইরেও যে অনেক বড় সংখ্যক শ্রমিক মাঝরাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছে সেই নিয়ে সন্দেহ নেই।

তবে করোনায় মৃত্যুর সঙ্গে শ্রমিকের মৃত্যুর একটা তফাৎ রয়েছে। করোনায় মৃত্যু ভাইরাসে, আর শ্রমিকের মৃত্যু রাষ্ট্রের জন্য। করোনায় মৃত্যুগুলো রোখা সম্ভব ছিল না, শ্রমিকদের মৃত্যুগুলো রোখা যেত। রাষ্ট্র যদি এদের থাকার-খাওয়ার ব্যবস্থা করতো, অথবা প্রত্যেকের হাতে এক মাসের রোজগার পৌঁছে দিত তাহলে এই পরিণতি হতো না। কিছু কিছু বিজ্ঞ দেখছি বলছে যে সরকারের কী দোষ, সরকার কী করবে ইত্যাদি। তাদেরকে শুধু একটাই কথা বলব যে অপেক্ষা করুন, যে অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে চলেছে দেশ এবং বিশ্ব তাতে সরকারি চাকুরেদেরও মাইনে এবং চাকরিতে কাট ছাঁট হতে চলেছে, বেসরকারি চাকরি... হেঁ হেঁ। আপনি আইটিতে কাজ করেন? ভাবছেন আইটিতে ওয়ার্ক ফ্রম হোম হয়, চাকরিতে টান পড়বে না? কে নেবে আপনার সার্ভিস? কে হবে আপনার ক্লায়েন্ট? আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান - যে দেশগুলোয় ভারতের সবচেয়ে বেশি আইটি রফতানি সেখানকার সব থেকে বড় বড় কোম্পানিগুলোও চরম অর্থনৈতিক সংকটে। ২০০৮-এর মত এখনো লেম্যান ব্রাদার্স বা এআইজি দেখতে পাননি তার কারণ এদের ব্যালেন্স শিট এবং ব্যাংকগুলোর কাছে প্রকৃত বকেয়া ঋণের হিসেব এখনো করে ওঠা হয়নি। লকডাউন ওঠার পরেই আসল চিত্র দেখতে পাবেন। আমেরিকায় বেকারত্ব ১৫%-এ পৌঁছেছে যা ঐতিহাসিক। সেখানকার সরকারও আউটসোর্সিংয়ের ওপর বিধিনিষেধ চাপাবে। মার্কিনী বিশেষজ্ঞরা সকলেই এক মত যে এই ক্রাইসিস ২০০৮-এর গ্রেট রিসেশনের থেকেও অনেক গ্রেটার। তাই আইটি ভাই বোনেরা একটু ধৈর্য ধরুন, আমি নিশ্চিত যারা এখনো পরিযায়ী শ্রমিকদের সাথে সমব্যথী হতে পারছেন না তারা কয়েক মাস পরেই হতে পারবেন।

তবে শুধু কয়েক কোটি পরিযায়ী শ্রমিকই এতে বিপর্যস্ত এটা খুব ভুল ধারণা। তাদের কষ্টটা হয়ত সর্বাধিক এবং তারা শ'য়ে শ'য়ে কিলোমিটার হাঁটছে বলে সেটা সামনে আসছে, কিন্তু অর্থনৈতিক বিপর্যয় চিত্রটা যে অনেক বিপুল বুঝতে পারবেন যখন আপনি নিজের পাড়ায় খোঁজ নেবেন। ছোট কারখানা, রেস্তোরাঁ, দোকান, ট্যাক্সি বা অটোচালক, রিকশাচালক, হকার - এই বিপুল সংখ্যক মানুষ, যারা ছোট ব্যবসা বা অস্থায়ী চাকরি করে পেট চালান তাদের রেশনের চাল আর আটা ছাড়া বাকি কোনো কিছু কেনার আর পয়সা নেই। শুধু এরাই নন, টিউশন করে পেট চালানো, অথবা স্কুল বা কলেজের অস্থায়ী শিক্ষক/শিক্ষিকা, যারা আপাত মধ্যবিত্ব তাদেরও অনেকের অবস্থা এরকম, আত্মীয় স্বজনের থেকে ধার চাইতে হচ্ছে বিদ্যুতের বা টেলিফোনের বিল দিতে। যাঁরা ত্রাণ দিচ্ছে পাড়ায় পাড়ায়, অথবা কমিউনিটি কিচেন চালাচ্ছেন তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, কত মধ্যবিত্ব বাড়ির লোকজনকেও খাবার দিতে হচ্ছে কারণ তাদের বাড়িতে গ্যাস কেনার টাকা নেই।

অথচ এই অর্থনৈতিক সংকট আটকানো না গেলেও কিছুটা সুরাহা মানুষকে হয়ত দেওয়া যেত। আমেরিকা ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশের সরকার নিঃশর্তে প্রত্যেকটা মানুষের একাউন্টে বেশ কিছু টাকা দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উচ্চবিত্ত বাদ দিয়ে বাকি প্রতিটা মানুষের একাউন্টে ১,২০০ ডলার দিয়েছে, ৯০,০০০ টাকা। জার্মান সরকার প্রত্যেকের একাউন্টে দিয়েছে ৮০০ ইউরো, তা ছাড়া ছোট ব্যবসায়ীদের দিয়েছে ৫০০০ ইউরো করে যাতে তারা কর্মচারীদের মাইনে দিতে পারে। উন্নত দেশ বাদ দিন, অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশও ভারত সরকারের চেয়ে বেশি ত্রাণ দিয়েছে। নীচে একটি গ্রাফ রয়েছে (চিত্র-১)। ইউরোপের সেন্টার ফর ইকোনোমিক পলিসি রিসার্চ বিশ্বের অর্থনৈতিক গবেষণার একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তারা প্রতি সপ্তাহে কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে। এই গ্রাফটি সেখানকারই একটি গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া যার লিংক শেষে পাবেন (লিংক-১)। এই গ্রাফে এক একটা নীল বিন্দু হলো এক একটি দেশ। এই গ্রাফে এক একটি দেশের অর্থাৎ বিন্দুর অবস্থান নির্ভর করছে দুটো সংখ্যার ওপর - এক, সে দেশের সরকার কতটা কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে এবং দুই, সে দেশের সরকার কতটা ইকোনোমিক রিলিফ দিয়েছে জাতীয় আয়ের শতাংশের হিসেবে। যে দেশের সরকার যত বেশি কঠোর লকডাউন ঘোষণা করবে তত বেশি সেই দেশের মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং তাই মানবতার খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সেই দেশের সরকার তত বেশি অর্থনৈতিক ত্রাণ দেবে। ওই চিত্রটিতে দেখা যাচ্ছে যে অধিকাংশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই সেটা সত্যি - যত কঠিন লকডাউন তত বেশি ত্রাণ, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কখনো দেশের নাগরিকদের আধ পেটা খেয়ে থাকতে বাধ্য করতে পারে না। কিন্তু দেখুন, একমাত্র ব্যতিক্রম কে? ভারতবর্ষ! এই দেশ লকডাউনের দিক দিয়ে প্রায় কঠোরতম অথচ অর্থনৈতিক ত্রাণের দিক দিয়ে প্রায় কৃপণতম। ভুল বুঝবেন না, এখানে কিন্তু ত্রাণের হিসেবটা জাতীয় আয়ের শতাংশে করা হচ্ছে তাই আমাদের দেশ গরিব সেই যুক্তি খাটবে না। ও হ্যাঁ, এই গ্রাফ তৈরির জন্য সমস্ত তথ্যই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোভিড ডেটাবেস থেকে জোগাড় করা। এই ডেটাবেসের হিসেবেই ভারতের লকডাউনকে বিশ্বের মধ্যে কঠিনতম বলা হয়েছিল, যা দেখিয়ে ভারতের সরকারপন্থী মিডিয়া মোদির গুনগান গেয়েছিল। তখন বোধয় তারা জানতো না যে সেই ডেটাবেসে অর্থনৈতিক ত্রাণেরও হিসেবও দেওয়া থাকে।

অর্থাৎ ভারতের রাষ্ট্র বিশ্বের সমস্ত দেশের তুলনায় সব থেকে শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নিয়েছে করোনাযুদ্ধে। কিন্তু প্রশ্ন হলো - কেন? এই কোটি কোটি মানুষের তো ভোটাধিকার আছে, ভারত এখনো গণতন্ত্র, এখনো ভোট হয়, তাহলে কী এমন দায় পড়লো সরকারের যে তারা এই কোটি কোটি মানুষের চরম বিপর্যয়ে একটু সাহায্যের হাতও বাড়াতে চাইছে না? কার স্বার্থ কোটি কোটি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের চেয়েও বেশি? এর উত্তর আছে দ্বিতীয় চিত্রে। দ্বিতীয় চিত্রে ফের এক একটি বিন্দু হলো এক একটি দেশ এবং এই গ্রাফে এক একটি দেশের অবস্থার নির্ধারিত হয়েছে ফের দুটি সংখ্যামানের দ্বারা যার একটি আগের মতোই অর্থনৈতিক ত্রাণ কিন্তু অপরটি হলো "সভরেন ক্রেডিট রেটিং"। সভরেন ক্রেডিট রেটিং কী? এটি হলো একটা মাপকাঠি যা নির্ধারণ করে কোন দেশের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে কতটা আকর্ষণীয় হওয়া উচিত। সভরেন ক্রেডিট রেটিং যদি খারাপ হয়ে যায় কোনো দেশের তাহলে সে দেশের শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পয়সা তুলে নেবে, সে দেশের কোম্পানিগুলোর বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া মুশকিল হবে বা সুদের হার বেশি দিতে হবে, সে দেশের সরকারকেও বিদেশ থেকে ধার করলে সুদের হার বেশি দিতে হবে। এই গ্রাফটিতে দেখতে পাচ্ছেন যে যেসব দেশগুলির ক্রেডিট রেটিং খারাপ সেই দেশগুলো করোনার জন্য অর্থনৈতিক ত্রাণও কম দিয়েছে এবং ভারতও সেই দেশগুলির মধ্যে একটা। এর কারণ হলো সরকারি খরচ বাড়ালে ক্রেডিট রেটিং কমার সম্ভাবনা থাকে, তাই যাদের ক্রেডিট রেটিং আগের থেকেই খারাপ তারা ত্রাণও কম দেবে এই ভয়ে যে রেটিং তাতে আরো খারাপ হয়ে যেতে পারে।

তাহলে এটা বোঝা গেল যে ভারত সরকার শ্রমিক বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, ত্রাণ দিচ্ছে না তার কারণ ক্রেডিট রেটিংয়ের ভয়। কিন্তু ক্রেডিট রেটিং খারাপ হলেই বা কী? অসুবিধে কোথায়? আগেই বলেছি যে তাতে শেয়ার বাজার ধাক্কা খাবে কারণ বিদেশি বিনিয়োগ বেরিয়ে যাবে। শেয়ার বাজারে এই বিদেশি বিনিয়োগটা মূলত ফাটকা পুঁজি। কিন্তু তা বেরিয়ে গেলেই বা কী? অনেকেরই ভুল ধারণা থাকে যে শেয়ার বাজারের ওপর অর্থনীতির স্বাস্থ্য নির্ভর করে, কিন্তু আসলে বিষয়টা উল্টো - অর্থনীতির স্বাস্থ্যর ওপর শেয়ার বাজার নির্ভর করে (যদিও সেটাও সবসময় হয় না)। তাই শেয়ার বাজার পড়লে অর্থনীতির আলাদা করে বড় ক্ষতি হবে না, বিশেষ করে যেখানে আমাদের দেশে খুব কম সংখ্যক মানুষ শেয়ার বাজারে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে। তাহলে? শেয়ার বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকের সাথে বিজেপি আরএসএস-এর দহরম মহরম কোনো গোপন তথ্য নয়, তাদের স্বার্থ রক্ষা করাটা হয়ত একটা উদ্দেশ্য হতে পারে। অপর একটা যুক্তি হতে পারে যে বিদেশি ফাটকা পুঁজি বেরিয়ে চলে গেলে টাকার দাম পড়বে। সেটার একটা সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে ভারতের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার বিশ্বের মধ্যে অন্য বৃহত্তম, তা ছাড়া তেলের ও সোনার দাম তলানিতে। এই দুটো দ্রব্য ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানি, তাই এদের দাম কমলে/বাড়লে টাকার দামও বাড়ে/কমে। সেই দিক দিয়ে তাই এক্ষুনি টাকার ওপর চাপ আসার তেমন কারণ নেই। সম্প্রতি, আইএমএফ উন্নয়নশীল দেশগুলোর মুদ্রার দাম করোনা সংকটের জন্য যাতে হঠাৎ করে পড়ে না যায়, আর তাদের বিদেশি মুদ্রার কোষাগার যাতে ফাঁকা না হয়ে যায়, তার জন্য সব উন্নয়নশীল দেশকে ব্যাপক বিদেশি মুদ্রা ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দেয় (স্পেশ্যাল ড্রয়িং রাইটসের লিমিট বাড়িয়ে), কিন্তু ভারত একমাত্র উন্নয়নশীল দেশ যে এটার বিরোধিতা করেছে। তাই ধরে নেওয়া যায় যে ভারত সরকার টাকার মূল্য পড়া নিয়ে ভাবিত নয়।

তাহলে ক্রেডিট রেটিং খারাপ হলে আর কী কী ক্ষতি হতে পারে যার জন্য সরকার এত ভাবিত? ভারত সরকার বিদেশ থেকে ঋণ নিতে চাইলে সুদ বেশি দিতে হতে পারে। কিন্তু ভারত সরকারের বিদেশ থেকে ঋণ খুবই সামান্য, আর যেটুকু সেগুলোও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মত সংস্থা থেকে স্পেশ্যাল ডেভেলপমেন্টাল লোন যাতে সুদ নামমাত্র। তাহলে? দেখুন আরো একটা কারণ ওপরে লেখা রয়েছে। দেখছেন? - ভারতীয় "কোম্পানিগুলোর বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া মুশকিল হবে বা সুদের হার বেশি দিতে হবে"। এই, এইটেই হলো সেই গোপন কথাটি যেটা সরকার কোনোদিন উচ্চারণ করবে না। ব্যাংক অফ ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট জানাচ্ছে যে ভারতের কর্পোরেট সেক্টরের মোট বিদেশী ব্যাংকগুলো থেকে বিদেশী মুদ্রার ঋণ হলো ৫৯০০ কোটি ডলার, ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা (লিংক-২)। এটা শুধুই কিন্তু বিদেশী ব্যাংক থেকে। অন্য জায়গা থেকে বিদেশী মুদ্রার ঋণ ধরলে সংখ্যাটা আরো বেশি। শুধু ২০-টা বৃহত্তম কর্পোরেট সংস্থার বিদেশী ঋণই ১৮০০ কোটি ডলার, ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে রিলায়েন্স, টাটা, বিড়লা - সবই আছে (কোম্পানিগুলির ব্যালেন্স শিট থেকে এই তথ্য পেয়ে যাবেন।) সভরেন রেটিং খারাপ হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে এদের ওপরেই। এই ঋণের ওপর সুদ বেড়ে যাবে, নতুন ঋণ পেতে অসুবিধে হবে, লাভ কমবে।

তাহলে বোঝা গেল যে ভারতের কোটি কোটি শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, দিন আনি দিন খাই মানুষের প্রতি সরকারের অমানবিক আচরণ এবং পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ত্রাণ দেওয়ায় অনীহার পেছনে কারণ হলো যে এই সরকার বৃহৎ পুঁজিপতি ও শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে বেশি ব্যস্ত। শ্রমিকদের ট্রেনের টিকিটের টাকা না দেওয়ার অমানবিক সিদ্ধান্তের পেছনেও রয়েছে টাটা আম্বানি - যারা বিজেপির ইলেক্টরাল বন্ডে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়েছে - সেই তাদের স্বার্থ রক্ষার তাগিদ। ভারতের শ্রেণী সংঘাত বোধয় এতটা সরাসরি এবং এতটা ক্ষিপ্র আকার ইদানিংকালে নেয়নি। কিন্তু অধিকংশ মানুষ জানবে না যে লক্ষ লক্ষ মানুষ হাজার হাজার কিলোমিটার হাঁটছে আসলে শ্রেণী সংঘাতের কারণে, তারা জানবে না যে তাদের ওপর শ্রেনিযুদ্ধর ঘোষণা হয়েছে। ভাববার সময় হয়েছে যে এই বৃহৎ পুঁজিপতিরা কতটুকু সম্পদ ও চাকরি তৈরি করে দেশের জন্য যার জন্য এরকম কোটি কোটি মানুষ আধপেটা খাবে? যারা এখনও পুঁজিপতিদের পক্ষ নেবে তাদের সাথে এখনই কোনো তর্ক করবো না, তিন মাস পর করবো কারণ আমি নিশ্চিত যে তিন মাসের মধ্যে এর আঁচ কর্পোরেট চাকরি করা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গায়ও লাগবে। তখন না হয় তাদের মতামত শুনতে চাইবো।
*******************

লিংক ১: https://cepr.org/si…/default/files/news/CovidEconomics11.pdf

লিংক ২: https://stats.bis.org/statx/srs/table/A6.1?c=IN&p