রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

আয়ুর্বেদ ও শল্যচিকিৎসা ~ ডঃ কৌশিক দত্ত

আয়ুর্বেদ সম্বন্ধে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। আয়ুর্বেদের ভাবনা ও পদ্ধতির সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসার বেশ কিছু মিল আছে, আবার কিছু মৌলিক পার্থক্যও আছে, যার মধ্যে আছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক পার্থক্য। আমি মনে করি, আয়ুর্বেদ বিষয়ে উপযুক্ত চর্চা হওয়া উচিত, পড়াশোনা আর গবেষণার সমন্বয়ে। বিশেষত যখন আধুনিক চিকিৎসা বহুজাতিক ব্যবসায়ীদের লোভের কবলে পড়ে ক্রমশ দুর্মূল্য হয়ে উঠছে, তখন আয়ুর্বেদকে নিয়ে গভীর বৈজ্ঞানিক চর্চার মাধ্যমে এর আধুনিকীকরণ ঘটিয়ে একে আরও বেশি কার্যকর এবং মানব-বান্ধব চিকিৎসার উপায়ে পরিণত করার চেষ্টা অন্তত করা উচিত। তা করতে হলে প্রথমেই ভেষজ আর গোমূত্র নিয়ে যারা ব্যবসা করে মানুষের কুসংস্কারকে মূলধন করে, বা যারা জ্যোতিষকে আয়ুর্বেদ বলে চালাতে চেষ্টা করে অথবা আয়ুর্বেদকে দৈব/ অলৌকিক বলে ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে আসলে আয়ুর্বেদকেই অপমান করে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতায়ন করা উচিত আয়ুর্বেদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রকৃত বিজ্ঞানমনস্ক গবেষকদের। আয়ুর্বেদ কোনো অলৌকিক বা বিশ্বাস-নির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, প্রাচীন ভারতের নিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক চর্চার ফসল। দুর্ভাগ্যক্রমে মধ্যযুগে এর অগ্রগতি রুদ্ধ হয়েছিল এবং ইউরোপীয়রা যেভাবে মহান গ্যালেনের ঘোর কাটিয়ে পাশ্চাত্য চিকিৎসা পদ্ধতিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে শিল্পবিপ্লবোত্তর সময়ে, আমরা চরক-সুশ্রূতর প্রতি সেই সুবিচার করতে পারিনি। এবার চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু তা কি হচ্ছে? 

আপাতদৃষ্টিতে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। স্বভাবতই আয়ুর্বেদের প্রতিও তাঁদের শ্রদ্ধা থাকার কথা। শ্রদ্ধাবান সন্তান পিতার সম্পদ ফুটানি মেরে উড়িয়ে দেবার বদলে জ্ঞানার্জন করে এবং পূর্বজদের সম্মান বাড়ানোর চেষ্টা করে। তেমন কি হচ্ছে? নাকি গোদুগ্ধের সোনা, গোমূত্রের অমৃত আর গোময়ের মাইক্রোচিপের পথেই আয়ুর্বেদের সমাধি নির্মাণে তাঁরা উদ্যোগী? দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, আয়ুর্বেদকে প্রকৃত জাতীয় সম্পদে পরিণত করার বদলে সস্তা রাজনৈতিক লাভের খেলাতেই তাকে ব্যবহার করার উদ্যোগ বেশি। শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাহীন দুএকজন রাজনীতির কারবারি যে-ধরনের কথা বললে বা আচরণ করলে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়, তেমন কাজ ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন করলে ততটা লঘুভাবে নেওয়া যায় না। 

সম্প্রতি এনএমসি একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, যাতে কিছু আধুনিক শল্যচিকিৎসার সংস্কৃত নামকরণের দ্বারা তাদের আয়ুর্বেদিক অস্ত্রোপচার হিসেবে চিহ্নিত করে, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের দ্বারা সেই সব অস্ত্রোপচার করানোর সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে। অচিরেই সরকারি হাসপাতালে এসব অস্ত্রোপচার সম্ভবত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা করবেন আর "পাশ করা সার্জেন"-এর হাতে অপারেশন করাতে চাইলে আপনাকে গাঁটের কড়ি খরচা করে ছুটতে হবে বেসরকারি হাসপাতালে। 

উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিলে কি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকেরা এসব অস্ত্রোপচার করতে পারেন না? নিশ্চয় পারবেন। প্রশ্ন হল, কোন পদ্ধতিতে তাঁরা অস্ত্রোপচার করবেন? আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে, নাকি আধুনিক শল্যচিকিৎসার পদ্ধতিতে? এই জায়গায় এসে "আয়ুর্বেদিক শল্যচিকিৎসা" ব্যাপারটা নিয়েই অনেকে হাসবেন, বিশেষত যাঁরা প্রাচীন ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে শ্রদ্ধাশীল নন। হাসবেন না। প্রাচীন পৃথিবীতে ইংল্যান্ড অঞ্চলের অধিবাসীদের যখন ল্যাজ খসেনি, তখন মিশরে এবং প্রাচ্যে শল্যচিকিৎসার সূচনা হয়েছিল। ভারত বেশ কিছু ধরনের শল্যচিকিৎসার চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল বলেই সুশ্রুতর মতো মহান শল্যচিকিৎসক এদেশে তৈরি হতে পেরেছিলেন। প্রশ্ন হল, তারপর থেকে তাঁদের পদ্ধতিকে আমরা কতটা এগিয়ে নিয়ে গেছি? কোন পদ্ধতিতে আজকের এই আয়ুর্বেদিক অস্ত্রোপচারগুলো হবে? যদি প্রাচীন পদ্ধতিতে হয়, তবে তা স্পষ্ট জানানো হোক এবং মানুষকে বেছে নিতে দেওয়া হোক শল্যচিকিৎসার এত উন্নতির ফসল ছেড়ে দিয়ে তাঁরা প্রাচীন পদ্ধতিতে চিকিৎসা করাতে চাইতেন কিনা। (সুশ্রুত বেঁচে থাকলে আধুনিকতম পদ্ধতিটিই শিখতেন বা নিজে উদ্ভাবন করতেন, আমি নিশ্চিত।) যদি এঁরা আধুনিক শল্যচিকিৎসার পদ্ধতিতেই কাজ করেন, তবে তার জন্য কী ধরনের প্রশিক্ষণ তাঁদের দেওয়া হয়েছে? সমগ্র এমবিবিএস এবং এমএস শিক্ষাক্রমের যাবতীয় শিক্ষণীয় বিষয়, যা শল্যচিকিৎসায় নানাভাবে কাজে লাগে (অবশ্যই কাজে লাগে, কারণ শুধু কাটতে আর জুড়তে জানলেই সার্জন হওয়া যায় না), তা কি তাঁদের শেখানো হয়েছে? যদি শেখানো হয়ে থাকে, তবে কি আর তাঁরা আয়ুর্বেদ চিকিৎসক রইলেন? যদি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের এই কৌশলে আধুনিক চিকিৎসার সহযোগী চিকিৎসকে পরিণত করা হয়, তবে কি তা আয়ুর্বেদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে না? এমন চলতে থাকলে আয়ুর্বেদ চর্চার প্রকৃত উন্নয়ন ঘটবে কীভাবে? 

ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশনের এই কার্যক্রম আদৌ সুবিধের লাগছে না। আধুনিক চিকিৎসা এবং আয়ুর্বেদ চিকিৎসার উন্নয়ন করা দরকার পাশাপাশি, দুটো স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে। একমাত্র তাহলেই একটা পদ্ধতি আরেকটির পরিপূরক হয়ে উঠতে পারবে এবং আয়ুর্বেদ আমাদের জাতীয় ঐশ্বর্যে পরিণত হবে। ঐতিহ্যকে ঐশ্বর্যে পরিণত করতে আরও সৎ উদ্যোগ প্রয়োজন।

শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০

সাম্প্রদায়িক বাংলা ~ সুশোভন পাত্র

- জ্যোতি বাবু গণেশ তো দুধ খাচ্ছে? এবার কি বলবেন? 
রাইটার্সের সিঁড়িতে জ্যোতি বসু কে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন এক সাংবাদিক। দিনটা ২১শে সেপ্টেম্বর। সালটা  ১৯৯৫। সকাল থেকে গোটা ভারত মেতেছে হুজুগে, গুজবে। BBC-তেও দেখাচ্ছে মূর্তির সামনে এক চামচ দুধ ঢাললেই 'গণেশ দুধ খাচ্ছে'। বুজরুকির উদ্যোক্তা RSS এবং VHP। দিল্লিতে গণেশ কে দুধ খাওয়ালেন বাবরি ধ্বংসের মাতব্বর, হিন্দুত্ব রাজনীতির 'পোস্টার বয়' লালকৃষ্ণ আদবানি। 'দৈব্য শক্তি জাগ্রত হয়েছে' –১৯৯৬-র লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে নেমে পড়ল বিজেপি। 
স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই জ্যোতি বাবু সেই সাংবাদিক কে উত্তর দিয়েছিলেন 
- গণেশ দুধ খাচ্ছে? খাক তাহলে! 
উত্তরটা তাচ্ছিল্যের, বিদ্রূপের। উত্তরটা গভীরও। গভীর কারণ, একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, একজন প্রশাসক হিসেবে এই আদ্যোপান্ত অবৈজ্ঞানিক, বুজরুকি তে মন্তব্য করাটাই যে বাতুলতা সেটা বিলক্ষণ জানতেন জ্যোতি বাবু। 'গণেশ দুধ খাচ্ছে? খাক তাহলে!' কেস, ওপেন অ্যান্ড শাট। মিডিয়ার কিম্বা ধর্মের রাজনীতির কারবারিদের আর দাঁত ফোটানোর জায়গা নেই।
বর্তমানে, রাজ্যে যারা বামপন্থীদের ন্যারেটিভে তৃণমূল-বিজেপির 'প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার' থিওরি তে বিশ্বাস করতে চান না, তারা জ্যোতি বাবুর এই উত্তরটাকে আপাতত ডিনারে সাইড ডিশ হিসেবে তুলে রেখে মেন কোর্সের মেনুটা শুনুন। 
২০১৯-র লোকসভা নির্বাচনের পর, এই জ্যোতি বাবুরই রাজ্যের সাম্প্রতিকতম মুখ্যমন্ত্রী কালীঘাটের সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন, "যে গরু দুধ দেয় তার লাথি খাওয়াও উচিৎ।" মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য ডিকোড করলে দাঁড়ায়, মুসলিমরা (মানে গরু) যেহেতু ভোট (মানে দুধ) দেয় তাই 'মুসলিম তোষণ' উনি করবেনই। বকলেম সার্টিফিকেট দিলেন বিজেপির প্রোপাগাণ্ডাকেই। আর ঔদ্ধত্যের সাথেই বুঝিয়ে দিলেন 'বেশ করছি'।    
আচ্ছা, এই মন্তব্যে প্রান্তিক মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক কোন উপকারটা হল? রাজ্যের প্রশাসনের প্রধান হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতার কোন তীরটা উনি মারলেন? বরং এই মন্তব্য বা এই ঢং-র রাজনীতিই যে আখেরে রাজ্যে বিজেপিকে পুষ্ট করছে এটা বুঝতে কি সত্যিই আপনাদের আলফা-বিটা-গামা-ডেলটার জটিল অন্তরকলন বা সমাকলনের অঙ্ক কষতে হচ্ছে? না অ্যাটমিক ফিজিক্স গাঁতিয়ে সাব-অল্টার্ন ডিসকোর্স নামাতে হচ্ছে? 
হোয়াটস-অ্যাপ ইউনিভার্সিটির কল্যাণে আজকাল মুড়ি-মিছরির একদর। না হলে, র‍্যাডক্লিফের আঁচড়ে ভাগ হয়ে যাওয়া বাংলার বাউন্সি পিচেও ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষায় বামপন্থীদের রাহুল দ্রাভিড়োচিত ডিফেন্সটা নিশ্চয় মনে থাকতো। শিখ দাঙ্গার স্মৃতিচারণায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক গুরপ্রীত সিং বলেছিলেন "আমি নিজে দেখেছি লালঝাণ্ডা হাতে সিপিআই(এম) ক্যাডাররা কলকাতার শিখ অধ্যুষিত এলাকা পাহারা দিচ্ছে। প্রবাসী শিখদের গায়ে আঁচড় লাগতে দেননি জ্যোতি বসু।" 
কাট টু ১৯৯২-র বাবরি ধ্বংসের রাত্রি কিম্বা ২০০২ গুজরাট দাঙ্গার দিন। জ্যোতি বাবু বলেছিলেন "পুলিশ কে শুট অ্যাট সাইটের অর্ডার দিয়েছি"। আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্তব্য ছিল, "দাঙ্গাবাজদের মাথা ভেঙ্গে দেবো।" একদম ঠাণ্ডা পানীয় স্প্রাইটের বিজ্ঞাপনের ক্যাচ-লাইনের মত। 'সিধি বাত, নো বকওয়াস'। আর সেই রাজ্যের সাম্প্রতিকতম মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, "আমরা চারদিন বিসর্জন দেবো, ওরা একদিন মহরম করবে।" কারা 'আমরা'? কারা 'ওরা'? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাহলে 'হিন্দু' মানে 'আমরা', আর মুসলিমরা মানে 'ওরা'? মাশা-আল্লহা ধর্মনিরপেক্ষতা! 
"বিজেপি কে ফ্রন্টে এনে লড়ব", "বিজেপি আমাদের স্বাভাবিক মিত্র", "RSS প্রকৃত দেশপ্রেমিক" কিম্বা গুজরাট দাঙ্গার পর হুইপ জারি করে দলের সাংসদদের বাজপেয়ী সরকারের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট দান থেকে বিরত রাখা –ধর্মনিরপেক্ষতার কফিনে পেরেক পোতার বহু কাজ, RSS-র 'সাক্ষাৎ দুর্গা' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিপুণ হস্তে করেছেন। কিন্তু অগত্যাই আপনিই যদি সে সব পুরনো কাসুন্দি ঘাটতে না চাওয়ার অজুহাতে 'সাত খুন মাফ' করে দেন, তাহলে না হয় ২০১৪-র পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই চোখ রাখুন।   
বিগত ৪বছরে বাংলাতে ৩টে উল্লেখযোগ্য সাম্প্রদায়িক 'দাঙ্গার' ঘটনা ঘটেছে। ধূলাগড়ে 'নবী দিবস', আর হাজিনগর এবং আসানসোলে 'রামনবমীর' মিছিল কে কেন্দ্র করে। ধূলাগড়ে নবী দিবসের মিছিল, RSS পরিচালিত অন্নপূর্ণা ব্যায়ামাগারে সামনে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উস্কানি কে দিয়েছিলেন জানেন? তৃণমূল বিধায়ক, গুলশন মল্লিক। হাজিনগর এবং আসানসোলে রামনবমী মিছিল থেকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ছড়ানোর প্রেক্ষিতে পুলিশি বয়ানে কি বলা হয়েছিল জানেন? "তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরাও, অনেকে মাথায় ফেট্টি বেঁধে, জয় শ্রী রাম ধ্বনি তুলে উত্তেজনা ছড়িয়ে ছিল।" RSS-র কর্মীদের সাথেই FIR-এ অভিযুক্ত ছিলেন তৃণমূল নেতা-কাউন্সিলরাও। 
আর ধূপগুড়ি? ১৯ বছরের দুই কিশোর কে গরু পাচারের ভুয়ো অভিযোগে পিটিয়ে খুন করা হয়েছিল যে ধূপগুড়ির বারহালিয়া গ্রামে, সেখানেও মানুষ খ্যাপানোর দায়ে অভিযুক্ত ছিলেন মোট ৫ জন। ৩জন RSS কর্মী আর পঞ্চায়েত সদস্য সহ ২জন তৃণমূল কর্মী। 
এরপরও যদি আপনার তৃণমূলকে ধর্মনিরপেক্ষতার রক্ষার সাক্ষাৎ অবতার মনে হয়, তাহলে বরং আপনিই বলুন, কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার অবলুপ্তি সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য কি? বলুন যে, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের ভোটাভুটি তে সংসদে তৃণমূলের সাংসদদের অনুপস্থিতির কারণ কি? বলুন যে, রামমন্দির সংক্রান্ত রায়দানের দিন কিম্বা প্যান্ডেমিকের মাঝে স্বাস্থ্যবিধি লাটে তুলে ধর্মনিরপেক্ষে রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিপূজায় সদর্প উপস্থিতি তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হিরণ্ময় নীরবতার রহস্যটাই বা কি?
জানি, এসব প্রশ্নের উত্তর আপনার কাছে নেই। থাকার কথাও না, কারণ, মিডিয়া বা লিবারেল পণ্ডিতরা যতই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইমেজ বিল্ডিং-এ নামুন না কেন, 'ফ্যাসিস্ট' বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁকে ক্রুসেডর হিসেব প্রোজেক্ট করতে আদা জল খেয়ে পরিশ্রম করুক না কেন; বাস্তব এটাই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলেই RSS-র শাখার সংখ্যা পাঁচ গুন বেড়েছে, যাদবপুরে 'গরু পূজার' ছ্যাবলামি শুরু হয়েছে, রামনবমীর পাল্টা হনুমানজয়ন্তীর সংস্কৃতির আমদানি হয়েছে, সিদিকুল্লা-তোহা সিদ্দিকী'দের মাথায় তুলে রাখা হয়েছে, মোহন ভাগবত'দের কলকাতায় সভা করে বিষ ছড়ানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে! আসলে গোটা রাজ্য কে ধর্মীয় মেরুকরণের বারুদে সাজিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে মুজরা দেখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 
তাই যারা ভাবছেন তৃণমূল, সাম্প্রদায়িক বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তারা বাংলার রাজনীতির বাস্তবতার বহু ক্রোশ দূরে আছেন। সে থাকতেই পারেন। দূরে থাকুন, ভালো থাকুন, ভালো রাখুন। পারলে আকাশের ঠিকানায় তত্ত্ব কথার দুটো চিঠি লিখুন। শুধু জেনে রাখুন চোখ বন্ধ করলে যেমন প্রলয় আটকায় না, তেমন নগর পুড়লে দেবালয়ও বাঁচে না। তৃণমূল-বিজেপির এই বাইনারি তে যেদিন আপনার গায়েও আগুন লাগবে, সেদিন দেখা হবে রাস্তায়। দেখা হবে মিছিলে। 
নিশ্চিত থাকুন, আপনার গায়ের আগুন কে সেদিন প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গে বদলে দেবো আমরাই। আপনার গায়ের আগুন কে সেদিন প্রতিরোধের মশালে বদলে দেবো আমরাই। এই বামপন্থীরাই।

বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২০

"ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন" ~ সুশোভন পাত্র

কি বললেন? 
'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন'? তাই বলুন, আমি শুনলাম গৌরি লঙ্কেশ! 
দামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অপদার্থ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, লেজে-গোবরে অর্থমন্ত্রী, মেলোড্রামাটিক টেক্সটাইল মন্ত্রী -সবাই নাকি আজকে কেজি দরে টুইটারে অর্ণব গোস্বামীর 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন'র ঘুঁটে দিয়েছেন। তা বেশ করেছেন! তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশে 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন' থাকবে না? এ কেমন অলুক্ষণে কথা!  
কি বললেন? 'মিডিয়ার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ'? উরিব্বাস, আমি শুনলাম এম এস কালবুর্গি!
অর্ণব গোস্বামী গ্রেপ্তার হয়েছে বলে ভারতের 'স্বাধীন নিরপেক্ষ মিডিয়ার' পবিত্র দুধে চোনা পড়ে গেছে? ইস! কি লজ্জার ব্যাপার! এমনিতেই দেশের 'প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স' গত ১০ বছরে ১০৫ থেকে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৪২-এ এসে ঠেকেছে। সো হোয়াট? পাকিস্তানের থেকে ৩ ধাপ উপরে! 
'অর্ণব গোস্বামী', 'বিজেপি' আর 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন', 'প্রেস ফ্রিডম' - শব্দগুলো নিয়ে ক্রশওয়ার্ড খেলতে খেলতে বিকেলের চায়ের আড্ডায় নরেন্দ্র দাভোলকার খুব হেসেছেন। ওহ ওয়েট! 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন'-র সাক্ষাৎ অবতার আপনি কিনা নরেন্দ্র দাভোলকার কে চিনতে পারছেন না? আচ্ছা, মনে করিয়ে দিচ্ছি! 
মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে পুনের ওমকারেশ্বর মন্দিরের কাছে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি খেয়ে মরতে হয়েছিল হিন্দু ধর্মের জাত-পাত, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার সৈনিক দাভোলকার কে। আর কালবুর্গি বলেছিলেন, "হিন্দু দেবদেবীরা মোটেও মহাশক্তিধর নন"। বলেছিলেন, "হিন্দু ধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মীয় আচার আসলে সমাজ শোষণের যন্ত্র"। আর তাই কর্ণাটকের ধারওয়াড়ে, নিজের বাড়িতেই প্রকাশ্য দিবালোকে, খুন হতে হয়েছিল কালবুর্গি কে। 
জানেন, গৌরি লঙ্কেশও সাংবাদিক ছিলেন। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার কর্পোরেট পাপেট গিরি ছেড়ে কান্নাড় ভাষায় চালাতেন সাপ্তাহিক, 'লঙ্কেশ পত্রিকা'। অপরাধ? বুজরুগির   মুখোশ খুলে দিতেন হিন্দুত্ব ও সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শের। আর তাই বৃষ্টি ভেজা ব্যাঙ্গালুরুর স্নিগ্ধ সন্ধ্যায়, রাজরাজেশ্বরী নগরের ফ্ল্যাটে, তাঁর মাথায়, গলায় আর বুকে; তিনটে গুলি গেঁথে দিয়েছিল আততায়ীরা। 
ফরেনসিক জানিয়েছিল কালবুর্গি আর লঙ্কেশ কে খুন করা হয়েছে একই পিস্তলে। পুলিশি রিপোর্ট বলেছিল 'একই গ্রুপের দুষ্কৃতীরা রয়েছে দাভোলকার-কালবুর্গি-লঙ্কেশ খুনের নেপথ্যে'। নব্য ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বেসেডাররা একটু ঘেঁটে দেখবেন নাকি, সেদিন আমাদের দামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অপদার্থ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, লেজ-গোবরে অর্থমন্ত্রী, মেলোড্রামাটিক টেক্সটাইল মন্ত্রীরা টুইটারে কতটা শোক প্রকাশ করেছিলেন? 
শুনেছি হিন্টস দিলে ট্রেজার হান্টে সুবিধা হয়। দিচ্ছি। সেদিন বজরং দলের নেতা, ভুবিথ শেট্টী, কালবুর্গির মৃত্যুতে জান্তব উল্লাসে টুইট করেছিলেন—"হিন্দুত্ব কে নিয়ে তামাশা এবং একটি কুকুরের মৃত্যু।" হিন্দুবাদী টুইটার হ্যান্ডল, যাকে 'ফলো' করেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, সেই নিখিল ধাদিচ গৌরি লঙ্কেশের মৃত্যু তে লিখেছিল "এক কুতিয়া কুত্তে কি মউত ক্যায়া মারি, সারে পিল্লে এক সুর মে বিলবিলা রহে হ্য।' আর অর্ণব? নাইট-শো তে বাণী দিয়েছিলেন, 'গৌরি লঙ্কেশের মৃত্যু পারিবারিক মনমালিন্যর কারণে।' কিউট না? হতেই হবে, 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন' বলে কথা! 
'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের' আবার ভ্যারাটিস ডিজাইন আছে। এই তো ৫ই অক্টোবর, সিদ্দিকি কাপ্পান, মালায়ালাম নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক কে হাথরাস ধর্ষণ কাণ্ডের রিপোর্টিং–র অপরাধে UAPA ধারায় গ্রেপ্তার করল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। এই তো ১২ই সেপ্টেম্বর ত্রিপুরার সাংবাদিক পরাশর বিশ্বাস কে আক্রান্ত হতে হল বিপ্লব দেবের সমালোচনা করার জন্য। মনিপুরের সাংবাদিক কিশোরেচন্দ্র ওয়াংখেম কে মনে পড়ে? 'দেশদ্রোহিতার' অভিযোগে যাকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে দুবার। এছাড়াও উত্তর প্রদেশের সাংবাদিক প্রশান্ত কানোজিয়া, আসামের রাজীব শর্মা, গুজরাটের ধ্রুভল প্যাটেল, হরিয়ানার নরেশ খোয়াল, দিল্লির রাজীব শর্মা এদের সবাই কে গ্রেপ্তার করেছে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিজেপি পুলিশ। হয় UAPA আর না হয় দেশদ্রোহিতার' অভিযোগে। 
তা তখন বিজেপি নেতা-মন্ত্রীদের 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের' টুইট গুলো কোন চিলে-কোঠায় তোলা ছিল বলতে পারেন? নর্থব্লকের ছাদে না আম্বানির ২৬তলা ফ্ল্যাটের রুফ টপে? না বিজেপির ব্যবসায় 'all journalist are equal but Arnab Goswami is more equal than others'? 
স্বাধীনতা আন্দোলনের গর্ভে মিডিয়ার জন্ম এদেশে ১৮৬০-এ। মাত্র ১৮ বছরে ভারতের জাতীয়তাবাদী মিডিয়া জনমানসে ব্রিটিশ'দের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কে এমন সঙ্ঘবদ্ধ ও সংগঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল যে ব্রিটিশ কূটনীতিবিদ লর্ড লিট্টন Vernacular Press Act' প্রণয়ন করতে বাধ্য হয়েছিল ভারতীয় মিডিয়ার 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের' খর্ব করতে। লন্ডনের রয়টার্স এজেন্সি SHM Merryweather কে স্রেফ ভারতের মিডিয়ার মোকাবিলা করতে 'স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট' হিসেবে এদেশে পাঠিয়েছিল। সেইসময় ভারতের মিডিয়ার প্রতিনিধিত্ব করতেন গান্ধী, বাল গঙ্গাধর তিলক, আম্বেদকার, লালা লাজপত রায়'রা। 
আচ্ছা বুকে হাত রেখে বলুন তো, এই নাম গুলোর সাথে সাংবাদিক হিসেবে অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরীর মত দালালদের নাম উচ্চারণ করতে আপনার জিভ জড়িয়ে যায় না? লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে না?   
মিডিয়ার গণতন্ত্রে মিডিয়ার ভূমিকার দিশা নির্ধারণে ১৯৫৪ এবং ১৯৮৮ সালে আমাদের দেশে দুটো প্রেস কমিশন গঠিত হয়েছিল। দুটো কমিশনই রিপোর্টে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছিল, কর্পোরেট পুঁজির মালিকানা আটকাতে না পারলে মিডিয়ার স্বাধীন নিরপেক্ষ ভূমিকা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব না। অমিত শাহদের 'প্রেস ফ্রিডম' কিম্বা 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন' নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম না হলে ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করছেন না কেন? অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরীরা মিডিয়া তে কর্পোরেট পুঁজির মালিকানার বিরুদ্ধে দুটো প্রাইম টাইম ডিবেট নামাচ্ছেন না কেন?
তাই সিলেক্টিভ প্রতিবাদের হিপোক্রিসি করবেন না প্লিজ! যদি আপনি 'ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের' পক্ষে হন, তাহলে দাভোলকার-কালবুর্গি-লঙ্কেশের খুনের সঠিক তদন্তের দাবী তে সোচ্চার হবেন না কেন? উমর খালিদ, সাফুরা জারগরদের জেলে যেতে হবে কেন? ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নাভলাখারা সরকারের বিরুদ্ধে লিখলেই 'আরবান মাওইস্ট' দাগিয়ে দেওয়া হবে কেন? নেহা দীক্ষিত জীবন বাজি রেখে আউটলুক পত্রিকায় উত্তর পূর্ব ভারতে RSS চাইল্ড র‍্যাকেটিং-র সাহসী খবর করলে কিম্বা রায়া আয়ুব গুজরাট ফাইলসের পাতায় সাহেব-গোলামের মুখোশ খুলে দিলে বিজেপি পুলিশ লেলিয়ে দেবে কেন?
আর শুনুন, চিটিংবাজ সাংবাদিক আমরাও অনেক দেখেছি। 'এক ফোনে একলাখ'-র সাংবাদিক দেখেছি, বুদ্ধবাবুর খুঁত ধরা ভুবনেশ্বরের জেলে ঘানি টানা সাংবাদিক দেখেছি, মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সফরে গিয়ে 'চামচ চোর' সাংবাদিকও দেখেছি। তাই অযথা অর্ণব গোস্বামী কে শহীদ বানানোর চেষ্টা করবেন না। উনি গ্রেপ্তার হয়েছেন সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে খবর করে না। তদন্তের জন্য জিজ্ঞাসাবাদের পর নির্দোষ প্রমাণিত হলে নিশ্চয় ছাড়া পাবেন। রিয়া চক্রবর্তীর 'উইচ হান্ট' হ্যান্ডলের অভিজ্ঞতা থেকে উনি নিজেও সেটা জানেন। 
তাই আপনারা অযথা আবেগতাড়িত হবেন না। উনি যতক্ষণ জেলে থাকেন ততক্ষণই লাভ। ওনার গলাটাও রেস্ট পাবে। কালীপূজাতে শব্দ দূষণও কম হবে।