শনিবার, ২৯ জুলাই, ২০২৩

পার্টি ও আপোষ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

ভাবতে খুব অবাক লাগে যে লেনিন কি কোনো জাদুমন্ত্র বলে জানতে পেরেছিলেন যে ভারতের নামের একটি দেশে একটি বামপন্থী দলের একটি ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চে যোগদানকে ঘিরে গোটা বঙ্গ রাজনীতি তে আলোড়ন পরে যাবে গোটা জুলাই মাস ঘিরে? যে যোগদানকে আপোস হিসেবে চিহ্নিত করতে ওই দলের একদল কর্মী সমর্থক উঠে পরে লাগবেন।

সেই দল যারা ঘোষিত ভাবে মার্কসবাদী লেনিনবাদী তাদের অভ্যন্তরীণ এই বিতর্ককে মাথায় রেখেই কি লেনিন আস্ত একটা প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন তার ব্যস্ত জীবনের মাঝে সময় বের করে? ঠিক কি লিখেছিলেন লেনিন একটু দেখা যাক। [সূত্র: লেনিন কালেক্টেড ওয়ার্কস ভলিউম ২৫ পৃষ্ঠা ৩০৯-৩১৪]

যে কোনো বিতর্কিত বিষয় নিয়ে লেখার সময় লেনিন যে ভাবে শুরু করতেন এই প্রবন্ধটা ও  সেভাবেই শুরু করছেন, আপোস শব্দটা র একটি সংজ্ঞা নির্মাণ করে। তাঁর ভাষায়, "রাজনীতিতে আপোস শব্দটি বোঝায় নির্দিষ্ট 
কিছু দাবির আত্মসমর্পণ, অন্য দলের সাথে চুক্তির মাধ্যমে অন্যদলের দাবির কিছু অংশ ত্যাগ করা।"

এরপরে লেনিন ওই আপোস নিয়ে তার পার্টির দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছেন। লেনিন বলছেন, "বলশেভিকদের সম্বন্ধে রাস্তায় ঘোরাফেরা করা একজন সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ধারণা, যে ধারণা যে অপবাদ সংবাদপত্রের জগৎ উৎসাহের সাথে প্রচার করে, সেই অপবাদটি হল বলশেভিকরা কখনই কারও সাথে আপস করতে রাজি হবে না।

মনোযোগী পাঠকের কাছে আশা করা যায় যে এই শব্দগুলি নজর এড়িয়ে যাবে না, "সংবাদপত্রের উৎসাহ"। বামপন্থীদের নিজেদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব দেখে, সংবাদ মাধ্যম কি ভাবে উল্লাস করেছে এই গোটা জুলাই মাসটা ধরে, কি ভাবে পার্টির মধ্যেকার ফাটলটা আরো চওড়া করা যায় উৎসাহ যুগিয়ে, কোনো আপোস নয় এই স্লোগানকে চ্যাম্পিয়ন করার মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আপোসপন্থী হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে সেটা লেনিন বোধ হয় মুসোলিয়ামে শুয়ে শুয়ে দেখছেন আর হাসছেন। 

বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের পার্টি হিসেবে এই ধারণাটি আমাদের কাছে চাটুকারিতা মাত্র, কারণ এটি প্রমাণ করে যে এমনকি আমাদের শত্রুরাও সমাজতন্ত্র এবং বিপ্লবের মৌলিক নীতির প্রতি আমাদের যে আনুগত্য রয়ে গেছে সেটা স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবুও, আমাদের বলতে হবে যে এই ধারণাটি ভুল।"

কেন ধারণাটি ভুল, সেটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেনিন তুলে এনেছেন এঙ্গেলস যেভাবে ব্ল্যাঙ্কিপন্থী কমিউনিস্টদের সমালোচনা করেছিলেন সেই উদাহরণের কথা যেখানে এঙ্গেলস উপহাস করে বলছেন, "কোন আপস নয়!" এটি একটি ফাঁকা বুলি মাত্র, কারণ পরিস্থিতির জন্য প্রায়শই লড়াকু পার্টির উপর আপোষ করার বিষয়টা অনিবার্যভাবে চেপে বসে, এই বিষয়টা অস্বীকার করা অযৌক্তিক।" [মার্ক্স এঙ্গেলস সংগৃহীত রচনাবলী]।

এঙ্গেলস এর এই শিক্ষার সাথে লেনিন যোগ করছেন, "একটি সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টির কাজ এটা ঘোষণা করা নয় যে, সমস্ত আপস ত্যাগ করা অসম্ভব, তার কাজ হল এটাই যে, সব রকম আপসের মাধ্যমে, যখন সেগুলি অনিবার্য হয়, তখন তার নীতির প্রতি, তার শ্রেণির প্রতি, তার বিপ্লবী উদ্দেশ্যের প্রতি সৎ থাকতে থাকতে পারার মধ্যে দিয়ে বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করা এবং জনগণকে বিপ্লবে বিজয়ের জন্য শিক্ষিত করা"

আপোস শব্দটা শুনলেই যে সব কমিউনিস্টদের রক্ত গরম হয়ে ওঠে, তাদের উদ্দেশ্যে লেনিনের সাবধানবাণীর তাৎপর্য এটাই যে, পরিবেশ পরিস্থিতি না বুঝে একগুঁয়ে এর মতো আপোস এর বিরোধিতা করার অর্থ হল ব্ল্যাঙ্কিপন্থায় আত্মসমর্পণ করা, এককথায় অতিবাম বিচ্যুতি, বাম সংকীর্ণতাবাদ। 

এই অবধি পড়ে যে সব আপোস পন্থীরা আহ্লাদে লাফালাফি করবেন আর যে সব আপোস বিরোধীরা এই লেখক কে দালাল ফালাল বলে দাগিয়ে দেয়ার তোড়জোড় করবেন তাদের একটাই অনুরোধ, আরেকটু পড়তে হবে। কারণ মূল প্রবন্ধের লেখকের নাম ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সফল বিপ্লবের বিচক্ষণ জনক হওয়ার পাশাপাশি তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা বিপ্লবীও বটে। তিনি জানতেন যে বাম সংকীর্ণতা বাদ এর গাড্ড থেকে পার্টিকে বাঁচাতে গিয়ে সেটা আবার ডান পন্থী বিচ্যুতির দিকে ঢলে না যায়। তিনি জানতেন যে সংশোধনবাদী এরা ভবিষ্যতে আপোস নিয়ে ওপরে লেখা তাঁর বক্তব্যকে প্রেক্ষিতহীন উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করার লোভ সামলাতে পারবে না। 

তাই একজন আদ্যন্ত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী হিসেবে লেনিন এইবার আসছেন আপোস প্রসঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় পয়েন্টে। আপোস করার দুটি স্পষ্ট ভাগ করছেন উনি। এক, যেখানে পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে আপোস করতে হয় কমিউনিস্ট পার্টিকে আর দুই, যেখানে সেই পরিমাণ বাধ্যবাধকতা নেই, কমিউনিস্ট পার্টি স্বেচ্ছায় আপোস করার রাস্তা বেছে নিচ্ছে। 

প্রথম পরিস্থিতির চেয়ে দ্বিতীয় পরিস্থিতির গুরুত্ব কিছু কম নয়, বরঞ্চ বেশি। কারণ সেখানে আপোস করা বা না করা দুটি পার্টি কৌশল প্রয়োগ করার রাস্তা খানিকটা খোলা আছে। সেই পরিস্থিতি তে কমিউনিস্ট পার্টি কি করবে ? লেনিন একটা ফ্রেম ওয়ার্ক তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যার জরুরী পয়েন্ট গুলি হল: 

এক) কমিউনিস্ট পার্টি কোনো অবস্থাতেই তার সরাসরি এবং প্রধান শ্রেণী শত্রু বুর্জোয়া পার্টি গুলিকে কোনো সমঝোতার প্রস্তাব দেবে না, বড়োজোর মেনশেভিক ও সোস্যালিস্ট রেভ পার্টির মতো পাতি বুর্জোয়া দলগুলিকে দিতে পারে, তারা শাসক দল হলেও;
দুই) এই আপোস সমঝোতাকে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে ধরতে হবে, রুটিন নয়,;
তিন) এই সমঝোতা আপোস হবে অতি স্বল্প মেয়াদী ঘটনা, কোনো পাকাপাকি বন্দোবস্ত নয়;
চার) এই আপোস এর সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতে কমিউনিস্ট পার্টি আরো শক্তিশালী হবে নাকি, বিপ্লবের পথ আরো সুগম হবে নাকি। 

ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চে কমিউনিস্ট পার্টির যোগদানের সিদ্ধান্তকে এইবার আপোস বিরোধী ও আপোসপন্থী দু'দল ই যদি এই লেনিনিয় ফ্রেম ওয়ার্ক এ ফেলে বিচার করেন তাহলে কমিউনিস্ট পার্টির এই অবস্থান নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়। মুশকিল টা এইখানেই যে কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য সমর্থকদের একটা বড় অংশ বিতর্কের বদলে বিশ্বাসে আস্থা রাখেন, "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর।"

একদল মনে করেন যে পলিটব্যুরো কোনো ভুল করতে পারে না, প্রায় কিং ক্যান ডু নো রং এর ঢংয়ে। অন্যদলের বিশ্বাস যে যাবতীয় প্রজ্ঞার উৎসস্থল হল জনগণের সাথে নিবিড় সংযোগ। ঠাণ্ডা ঘরে থাকা পলিট ব্যুরো থোড়াই জানে শ্রেণী শত্রুর হাতে সদ্য লাঞ্ছিত নিপীড়িত সংগ্রামী জনগণের মনের কথা। 

ভাবের ঘরে চুরি সেটা চুরিই। দু পাতা লেনিন পড়ে নিজেকে লেনিনের থেকেও বড় মার্কসবাদী ভেবে নেয়াটা যেমন ভুল, তেমনি পঞ্চায়েতে বুক দিয়ে বুথ আগলিয়েছেন বলেই ডলোরেসস ইবারুরি স্টাইলে "নো পাসারণ" বলে হুংকার ছাড়াটাও ভুল। ভাববাদের চর্চা তো অনেক হল, এবার কিঞ্চিৎ বস্তুবাদের চর্চা হোক, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের। বিতর্ক হোক  সেই পথ ধরে। লেনিন পথ দেখাবেন।

সোমবার, ২৪ জুলাই, ২০২৩

মণিপুর ~ সুমিত সান্যাল

জীবিকার কারণে বহুদিন মনিপুরে যেতে হতো। প্রতি মাসে ৪ দিনের জন্য ইম্ফল যেতাম। আর প্রতি দুমাসে একবার চূড়াচাঁদপুর যেতাম। মণিপুরের মানুষ গুলোকে খুব কাছ থেকে চিনি। এখনও অনেক বন্ধু আছে মনিপুরে।
মণিপুরের শহরাঞ্চলে মিতেই সম্প্রদায়ের বাস। মিতেই সম্প্রদায় মণিপুরের মূল উপজাতি। এদের বেশিরভাগ পদবী সিং। ধর্ম হিন্দু। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের পরে শ্রীহট্ট থেকে বৈষ্ণব ধর্মগুরুরা গিয়ে এদের বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করে। মিতেই দের সংখ্যা শহরে প্রায় ৮২%। আর মণিপুরের পাহাড় ঘেঁষা গ্রাম গুলোতে মূলত কয়েকশ বছর ধরে নাগা, মিজো আর কুকিরা বাস করে।
 কুকিরা মূলত নাগাল্যান্ডের উপজাতি। খ্রিষ্টান পাদ্রীরা মিজো, কুকি ও নাগাদের বেশিরভাগ উপজাতি কে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করে। আর আছে মুসলিম এদের সংখ্যা ৮.৫% সারা রাজ্য। মণিপুরের রাজা ১০০০ মুসলিম সৈন্য বঙ্গ দেশ থেকে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের উত্তরাধিকারীরা মুসলিমদের মূল অংশ। মনিপুর রাজ্য ৪২.৪% হিন্দু ৪২.৩% খ্রিষ্টান আর ৮.৫% মুসলিম। তবে মিতেইরা বেশিরভাগ শহরে বাস করে।

 মিতেইরা মনে করে যে তাদের অঞ্চল কুকি,নাগা,মিজোরা অনুপ্রবেশ করে দখল করেছে। যা আংশিক সত্যি। তাই ছোটখাট জাতিভিত্তিক গন্ডগোল চিরকালই হয়। বড় গন্ডগোলও মিতেইদের সাথে কুকি বা নাগাদের হয়েছে। কিন্তু এতদিন এটা ছিল সম্পূর্ন জাতি ভিত্তিক। এমনিতে মিতেইরা ঠান্ডা প্রকৃতির ধর্মপরায়ণ জাতি। কয়েকশ বছর ধরে শ্রীহট্টর বাঙালিদের সাথে মিতেইদের সংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক। মণিপুরের ভাষার হরফ বাংলা হরফ। মিতেইদের ওপর বাঙালিদের প্রভাব কয়েকশ বছর ধরে। মিতেইরা শিক্ষিত জাতি ও প্রায় ১০০% হিন্দু বৈষ্ণব। কিন্তু এবার মিতেইদের সাথে কুকি বা নাগা বা মুসলিমদের গন্ডগোল কোন জাতি ভিত্তিক গন্ডগোল নয়। একে বারে ধর্ম ভিত্তিক গন্ডগোল। মণিপুরের জাতিসত্তা বজায় রাখতে কংগ্রেসের ও কমিউনিস্টদের একটা প্রধান ভূমিকা ছিল।
 কংগ্রেস তো এখানকার প্রধান দল ছিল আর কমিউনিস্ট বিশেষ করে সিপিআই এর একটা বড় সংগঠন ছিল। আর ছিল এমপিপি বা ওখানকার মনিপুর পিপলস পার্টি যারা জাতি ভিত্তিক রাজনীতি করত। কুকি ও নাগাদের রাজনৈতিক দল ছিল কিন্তু সব আঞ্চলিক ভিত্তিক। কংগ্রেসকে সরিয়ে বিজেপি আসার পরই শুরু হলো ধর্মভিত্তিক দ্বন্দ্ব। কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট দের সাংগঠনিক দুর্বলতায় বিজেপি ও আরএসএস মিতেইদের বোঝালো যে ওরা হিন্দু আর কুকি,মিজো ও নাগারা খ্রিষ্টান। বোঝালো যে একদিন খ্রিস্টানরা হিন্দুদের হটিয়ে মনিপুর দখল করে নেবে। সরলপ্রাণ মিতেইরা এটা বিশ্বাস করল আর একটা জাতিগত বিদ্বেষ সম্পূর্ন ধর্মগত বিদ্বেষে পরিণত হলো। মণিপুরের মানুষ নারীদের ভীষণ শ্রদ্ধা করে। ওখানে মহিলারা জাতির মূল চালিকা শক্তি। সেই মহিলাদের ধর্ষণ করে নগ্ন করে ঘোরানো মণিপুরের মিতেইদের সংস্কৃতির সম্পূর্ন পরিপন্থী ও আমার ভাবনার বাইরে।




 মার্কস বলেছিলেন ধর্ম মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে দেয় এটাযে কতটা সত্যি সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আজ মনিপুর তার জীবন্ত প্রমাণ। একটা হিন্দু বৈষ্ণব শান্ত শিক্ষিত জাতি ধর্মের ভাবাবেগে জন্তুতে পরিণত হয়ে গেল। এতদিনের গড়ে উঠা সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেল। বিজেপির ভোট রাজনীতি শুধু হিন্দু ভোটকে নিজের দিকে সংহত করতে ও কংগ্রেসের হিন্দু ভোট নিজের দিকে নিয়ে আসতে এরা মণিপুরের সব অংশের মানুষের বিরাট ক্ষতি করে দিল। এই ক্ষত শুকাতে কয়েক দশক লাগবে। একটা শিক্ষিত বৈষ্ণব ভাবধারায় বিশ্বাসী জাতিকে বিশ্ববাসীর সামনে ধর্ষক খুনীতে পরিণত করল। বিজেপির মতো দেশদ্রোহী পার্টি ভূ ভারতে তৈরি হয়নি। নিজের ক্ষমতা রক্ষা করতে এরা কতটা নীচে নামতে পারে মনিপুর তার একমাত্র প্রমাণ। আজ সুপ্রিম কোর্ট মণিপুরের ব্যাপারে একতরফা প্রক্রিয়া গ্রহণ করার ঘোষণা না করলে নরেন্দ্র মোদী সাংবাদিক ডেকে দুঃখের এই নাটক করত না। দুর্ভাগ্য ৭৮ দিন পর একটা গণধর্ষনের ব্যাপারে বিজেপি প্রশাসন মুখ খুললো বা খুলতে বাধ্য হলো। কারণ বিজেপি জানত হিন্দু ভোট সংহত করতে এই পুরো হিংসা,খুনের পটভূমি তাদের ও আরএসএস এর মস্তিষ্ক প্রসূত। এই গন্ডগোল চললে তাদের লাভ। ২০০২ সালে গুজরাট গনহত্যার পর ভারতে মণিপুরের মতো এত বড় গনহত্যা আর হয়নি। দুটো গনহত্যার পেছনেই বিজেপির মূল ভূমিকা। এই হলো বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার যে সরকার সরাসরি ধর্ম ভিত্তিক বা জাতি ভিত্তিক দাঙ্গা স্পন্সর করে। আজকের মনিপুর আমার কাছে সম্পূর্ন অচেনা। এ মনিপুর আমি দেখিনি এ মনিপুর আমি চাইনা। আমি আবার দেখতে চাই সেই মনিপুর যেখানে মিতেই,কুকি,মিজো,নাগা,মুসলিম সবাই একসাথে বাস করে। হিন্দু,খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে কোন ধর্মগত বিবাদ নেই।
 চার্চ আর মন্দির পাশাপাশি সহাবস্থান। তবে বিজেপি সরকারে থাকলে এটা কখনই সম্ভব নয়। ক্ষমতার জন্য এরা ধর্মে ধর্মে জাতে জাতে  হানাহানি করবেই। এদের মূল শত্রু ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা। তাই আবার বলব ২০২৪ সে বিজেপি হটাও দেশ বাঁচাও!

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই, ২০২৩

ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

কাঁথি হাসপাতালের নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে একটা কোর্সের পরীক্ষা ছিল। শেষবেলায় সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে যখন ঘরে ফিরে আসছি তখন চোখে পড়েছিল একটি দৃশ্য। অতি সাধারণ। ওই কোর্সের এক ছাত্রীকে নিতে এসেছে তার স্বামী আর তার কিশোরী মেয়ে স্কুটার নিয়ে। 

ওই কোর্সের অনেক ছাত্রীই বিবাহিত, সন্তানের মা কারণ ওটা ছিল ইন সার্ভিস কোর্স। চাকরি করতে করতে ছুটি নিয়ে পড়া। সংসার সামলে, স্বামী, সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করে ছাত্রী সুলভ টিপিক্যাল বয়েস পেরিয়ে এসেও অনেকেই যে অখন্ড মনযোগ সহকারে লেখাপড়াটা করলেন, থিওরি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেন তাদের চেয়ে অনেক ছোট সহপাঠিনীদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের কথাই আজ মনে পরে গেল কারণ আজ এক বিশেষ মহিলার জন্মদিন।

ঠিক কবে থেকে ওই মহিলা মানে কাদম্বিনী বসুর চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল সেটা জানতে পারিনি। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি যে ১৮৮২ সালে উনি এফ এ পাশ করার পরেই ডাক্তারি পড়ার চেষ্টা করেন কিন্তু গ্র্যাজুয়েট না হওয়ার কারণে সুযোগ পাননি। এর পরে ১৮৮৩ সালে বি এ পাশ এর মধ্যে উনি প্রেম করে বিয়ে করেছেন নিজের থেকে ১৭ বছরের বড় বিপত্নীক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে। বিয়ের সময় দ্বারকানাথের দুই সন্তান, কন্যা বিধুমুখী আর পুত্র মানসিক প্রতিবন্ধী সতীশচন্দ্র। চিকিৎসক হওয়ার সেই অদম্য ইচ্ছে কিন্তু কমে নি। 

বি এ পাশ করার পরে আবার আবেদন করেন। 
মেডিক্যাল কাউন্সিল আপত্তি করে। বিদেশি শাসকের আমলাতন্ত্রের আপত্তির কারণ তবু কিছুটা আন্দাজ করা যায়। কিন্তু এর সাথে দেশীয় লোকজনও হৈ চৈ শুরু করে। একটি মেয়ে ডাক্তারি পড়বে এমন অনাসৃষ্টি কান্ড তারা সহজে মেনে নেয় নি। মেডিক্যাল কলেজের একজন বাঙালি অধ্যাপকের তো ঘোর আপত্তি ছিল। 

বাজারী পত্রিকায় ২রা জুলাই, ১৮৮৩ সালে ওইসব আপত্তিকে তাদের বিবেচনায় "যুক্তিসঙ্গত" আখ্যা দিয়ে লেখা হল, "শ্রীমতি কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় (বসু?) বি. এ. কলিকাতার মেডিকেল কালেজে প্রবিষ্ট হইয়াছেন। মেডিকেল কালেজের অনেক শিক্ষক কয়েকটি প্রধান কারণ দর্শাইয়া স্ত্রীলোকদিগের উক্ত কালেজে প্রবিষ্ট করিবার সম্বন্ধে আপত্তি করেন। তাঁহারা বলেন, উক্ত কালেজে ছাত্র দিগের রাত্রিতে যখন কালেজে থাকিতে হয়, তখন দুইজন করিয়া ছাত্র একঘরে থাকে। এরূপ অবস্থায় স্ত্রীলোক কিরূপ করিয়া পুরুষের সহিত এক ঘরে থাকিবে। এবং যখন ছাত্রদিগকে পুরুষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বুঝাইয়া দিতে হয়, তখন পুরুষ শিক্ষক স্ত্রীলোকদিগকে কিরূপে উহা বুঝাইয়া দিবে। আরও অন্যান্য আপত্তির মধ্যে উক্ত কালেজের একজন ছাত্র বলেন যে নিয়ম আছে সমস্ত বক্তৃতাতে উপস্থিত না থাকিলে, পরীক্ষা তে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না। এবং যদি এই পাঁচ বৎসরের মধ্যে কোন রমণীর গর্ভ হয়, তবে প্রসবকালীন তিনি কি করিয়া বক্তৃতায় উপস্থিত থাকিবেন ?"

এর বিপরীতে দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি প্রমুখ আন্দোলন করেন। এসব জানার পরে ছোট লাট রিভার্স অগাস্টাস টমসনের হস্তক্ষেপে মেডিক্যাল কাউন্সিল তাদের আগের সিদ্ধান্ত পাল্টে কাদম্বিনীকে ভর্তির অনুমতি দেয়। বাধা বিপত্তি এড়িয়ে ভর্তি হয়েও বিপদ কাটেনি। কিছু পরীক্ষকের রোষে (সম্ভবত ওই বাঙালি চিকিৎসক অধ্যাপক ও ছিলেন তার মধ্যে) কাদম্বিনী মেটিরিয়া মেডিকা ও এনাটমিতে ফেল করেন। তাঁকে গ্রেস নম্বর দিয়ে পাশ করানো হয়। 

এই গ্রেস দেয়া নিয়েও পত্রিকা লেখে, "শ্রীমতী গঙ্গোপাধ্যায় মেটিরিয়া মেডিকা ও এনাটমিতে ফেল হন। এখন শুনিতেছি সিন্ডিকেটের দয়ায় তিনি এ পরীক্ষায় পাশ করেন" 

এই আপত্তিকর "দয়া" শব্দটা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটা আমরা এক্ষুনি দেখবো। ১৮৮৮ সালে কাদম্বিনী গ্রাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ উপাধি পেয়ে কলেজ থেকে বের হন। এর পরে ১৮৯২ সালে স্বামী পুত্র কে বাড়িতে রেখে বিলেত যান আর ১৮৯৩ সালের মধ্যে এডিনবরা থেকে LRCPL এবং LRCS আর গ্লাসগো থেকে LFPS এই তিন খানি ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন। 

কোনোভাবে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল কাদম্বিনী (গঙ্গোপাধ্যায়) সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন।।১৮৮৮ সালের  ২০শে ফেব্রুয়ারি তিনি তার এক বন্ধুকে লিখছেন:-

"তুমি মিসেস গাঙ্গুলি সম্পর্কে কিছু জানো, আমায় কিছু পরামর্শ দিতে পারবে ? এর মধ্যেই ওই মহিলা সেই পাশ করে ফেলেছেন যাকে বলে মেডিসিন আর সার্জারিতে ফার্স্ট লাইসেনসিয়েট এর পরের মার্চে ফাইনাল এক্সামে বসছেন। এই ইয়াং লেডি, মিসেস গাঙ্গুলি নাকি বিবাহিত ! বিয়ের পরেই নাকি উনি ডাক্তার হবেন বলে মনস্থির করেন ! আর ওনার না কি একটি নয়, দুটি ছোট বাচ্ছা আছে ! ইনি বাচ্ছা হওয়ার পরে মাত্র তেরো দিন শুয়ে ছিলেন, একটাও লেকচার ক্লাশ না কি মিস করেন নি।"

মিস নাইটিংগেল নিজে একজন মেয়ে হয়ে বুঝতেন যে বিয়ের পরে, মা হয়ে যাওয়ার পরে, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, মেয়েদের পক্ষে কত কষ্টকর। তাও আবার সেই সময়ের ভারতে, বাংলাদেশে। তাই তার ওই ছোট্ট চিঠিতে বিস্ময়বোধক চিহ্নের এতো ছড়াছড়ি। সেই বিস্ময় বোধ থেকে জন্ম নেওয়া মুগ্ধতা, সে থেকে জন্ম নেওয়া শ্রদ্ধা, ভালোবাসা থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, উনি লেডি ডাফরিন কে সুপারিশ করছেন বাংলা তথা ভারত তথা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার এর একটা চাকরির জন্য, "ফর এনি পোস্টস এবাউট দ্যা ফিমেল ওয়ার্ড অফ ক্যালকাটা।

কাঁথি হাসপাতাল চত্বরের সেই পড়ন্ত বিকেলের আলোয় দেখা দৃশ্যটা আজও মনে পরে। শিক্ষক নয়, একটু আগের পরীক্ষক নয়, আমি তখন নিছক দর্শক। আমাদের ওই ছাত্রীটি স্কুটারের কাছে গিয়ে মেয়ের গাল টিপে একটু আদর করে চেপে বসল স্বামীর পেছনে। কোমরটা একটু জড়িয়ে। দ্বারকানাথ আর কাদম্বিনীর যুগলমূর্তি এগিয়ে গেল গেটের দিকে। 

বিশ্বাস করুন, সেকালেও সহজ ছিল না, আজও সহজ নয়, খুব, খুব কঠিন কাজ। কাদম্বিনীদের প্রেরণা হয়ে ওঠার কাহিনীগুলো মনে রাখাটা তাই জরুরী আমাদের কাছে। কাদম্বিনীরা আমাদের আসে পাশেই আছে, চিনে নিতে হবে শুধু।

শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০২৩

নেরুদা ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

আজকের গল্পটার চারজন নায়ক আছেন। তার মধ্যে দু জন কবি, একজন আবার নোবেল পুরষ্কার পাওয়া, একজন বিশ্ব খ্যাত চিত্রকর , আরেকজন হলেন এক ডাক্তার। গল্পটা বলতে একটু দেরি হয়ে গেল। এক কবির জন্মদিন গেছে দু দিন আগেই। সে দিন বলতে পারলে ভালো হতো, সময়ের অভাবে লিখতে না পারার জন্য সুধী পাঠক মার্জনা করবেন। 

গল্পের প্রথম নায়ক এক কবি, গল্পটা শুরুর আগেই মারা গেছেন। গল্পের শুরুটা ১৯৩৯ সালের চৌঠা আগস্ট তারিখে। উইনিপেগ বলে একটা ছোট্ট জাহাজ ফ্রান্সের পইলাক বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে চিলির (বা চিলে) ভ্যালপেরাইজো বন্দরের উদ্দেশ্যে। এই যাত্রা শুরু এর মূল কারিগর বছর চিলের ছত্রিশের এক কবি যিনি সম্ভবত স্প্যানিশ ভাষায় সর্বকালের সেরা কবি, নাম পাবলো নেরুদা। 

সময়টা উত্তাল। একটানা গৃহযুদ্ধের পরে ইন্টারন্যাশনাল  বিগ্রেড পরাজিত, বিজয়ী ফ্যাসিস্ট একনায়ক ফ্র্যানকো দখল করে নিয়েছেন গোটা দেশটা। মরিয়া প্রজাতন্ত্রীরা দলে দলে দেশ ছাড়ছেন। তাদের একটা বড় অংশ ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে পিরেনিজ পর্বত টপকে ফ্রান্সে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। 

চিলের কনসাল হিসেবে স্প্যানিশ রিপাবলিকে কাজ করার সুবাদে নেরুদা খুব লাভ থেকে ফ্যাসিস্টদের কার্যকলাপ দেখেছিলেন। স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির ওপর এই আক্রমণ তাঁর মনকে গভীর ভাবে বিচলিত করেছিল। বিশেষত যার হাত ধরে স্পেন তথা ইউরোপের শিল্পী সাহিত্যিকদের সাথে নেরুদার যোগাযোগ শুরু সেই তরুণ স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা যখন ১৯৩৬ সালে ফ্যাসিস্টদের হাতে খুন হয়ে যান, তারপর থেকে নেরুদার দৃষ্টিভঙ্গি তে বড় পরিবর্তন আছে, আসে তার কাব্য রচনার শৈলীতে। বামপন্থী নেরুদা হয়ে ওঠেন পুরোপুরি কমিউনিজম এর সমর্থক। 

ফ্রান্সে পালিয়ে আসা এইসব স্প্যানিশ শরণার্থীদের জন্য নিজের দেশ চিলি হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় স্থল এই চিন্তা থেকে নেরুদা তার দেশের রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেন তাঁকে ফ্রান্সে কনসাল হিসেবে নিয়োগ করার জন্য এবং ওই গৃহহীন প্রজাতন্ত্রী দের চিলিতে জায়গা দেওয়ার জন্য। আগুরী কেরদা প্রথম অনুরোধটা রাখলেও দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে টালা বাহানা করেন। তাঁকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না। চিলির বিরোধী দক্ষিণপন্থী দল গলো এই আশ্রয় দেয়া দিয়ে তীব্র বিরোধিতা করে। শেষমেষ রাষ্ট্রপতি রাজি হয়ে যান।

নেরুদার সামনে তখন আর এক চ্যালেঞ্জ। দু চারজন করে শরণার্থী পাঠানোর বদলে উনি চেষ্টা করতে থাকেন যদি একসাথে অনেক জন কে পাঠানো যায়। একমাত্র উপায় হল জাহাজ। যাত্রীবাহী জাহাজ ভাড়া করা প্রায় অসম্ভব। তখন নজরে আসে এই উইনিপেগ। ছোট জাহাজ, আদতে মালবাহী। তাকে এবার যাত্রীবাহী বানিয়ে তুলতে হবে। থাকার শোয়ার জায়গা, ল্যাভেটারি, ছোট ডিসপেনসারি মায় ছোটখাটো নার্সারি। 

অর্থের প্রয়োজন। পাগলের মতো চেষ্টা করতে লাগলেন নেরুদা। ইউরোপ থেকে ল্যাটিন আমেরিকা, সমস্ত চেনাজানা মানুষজনের কাছে হাত পারলেন। নিরাশ করেন নি কেউ এই বিশ্বখ্যাত কবিকে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন পাবলো পিকাসোও। টাকা যোগাড় হল। জাহাজের খোল নলচে পাল্টে ফেলা হল। যাত্রা শুরু করলো উইনিপেগ। যাত্রী কমবেশি ২০০০ শরণার্থী। শিন্ডলার লিস্টের সিন্ডলার বাঁচিয়ে ছিলেন প্রায় বারোশ মানুষকে। 

কতগুলি অসীম সাহসী মানুষ যারা বুক চিতিয়ে নিজের দেশে ফ্যাসিস্ট দের মোকাবিলা করেছিল তারা অতল সাগরের বুকে মোচার খোলার মতো পুঁচকি জাহাজে চড়ে পাড়ি দিল হাজার মাইল। অচেনা অদেখা দেশ। কেবল ভাষাটা এক। 

কপর্দক শূন্য ওই মানুষগুলোকে সাদর অভ্যর্থনা করার জন্য জাহাজঘাটে প্রেসিডেন্ট কেরদা  পাঠিয়েছিলেন তাঁর মন্ত্রিসভার তরুণ স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে। যার নাম ডাক্তার সালভাদর আয়েন্দে। শরণার্থীদের প্রথম পা চিলির মাটিতে পড়ার আগেই তাদের সমস্ত ক্লান্তি সমস্ত আশঙ্কা হাওয়ায় উড়ে গেল। আয়েন্দের নেতৃত্বে জয়ধ্বনি দেয়া সমবেত জনতা গলা ছেড়ে গাইছে স্প্যানিশ প্রতিরোধের সেই সব চেনা গান। 

নেরুদা জীবনে বহু অবিস্মরণীয় কবিতা রচনা করে গেছেন। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষায়, "ধোঁয়া ছেড়ে ফ্রান্সের বন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়া উইনিপেগ এর দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, এটাই আমার জীবনে রচিত শ্রেষ্ট কবিতা।" লোহা লক্কর, কয়লা দিয়ে তৈরি কবিতার রচয়িতা নেরুদা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন একজন কমিউনিস্ট এর কাছে প্রলেতারি আন্তর্জাতিকতার এর মানে টা কি।  

কবিতা কি তাই ?
কবিতা কি শুধু তাই ?
মনের খেয়ালে কাগজে-কলমে
শব্দ সাজাই ?

কবিতা কি শুধু রম্য-রচনা
ফুল পাখি আর চাঁদের জোছোনা
প্রিয়ার সঙ্গে জল-তরঙ্গ
নৌকো ভাসাই ?

কবিতা কি শুধু "ওমর খয়াম"
অথবা বিরহী যক্ষের নাম
প্রেমের অনলে একাকিনী জ্বলে
"বিরহিনী রাই" ?

কবিতা বন্দী চার-দেওয়ালে
তোমার আমার চোখের আড়ালে
কবিতাকে আনো রাজপথে আজ
মিছিলে চাই॥

সেলাম, কবি, তোমাকে সেলাম।

রবিবার, ৯ জুলাই, ২০২৩

পঞ্চায়েত নির্বাচনের হিসেব ~ ডাঃ বিষাণ বসু

হিসেব খুব সহজ নয়, আবার অত জটিলও নয়।

পঞ্চায়েতে এরকম জালিবাজি হবে। হতে থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকার সে নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে না (করাটা খুব অভিপ্রেত, এমনও নয়, কেননা তাঁদের রেকর্ডটিও তো বড় মুখ করে গল্প করার মতো নয়)। কেননা, এই রাজ্যে প্রশাসন তৃণমূলের হাতে থাকলে বিজেপির ক্ষতি নেই। বরং যত বেশি পঞ্চায়েত তৃণমূলের হাতে, তত দুর্নীতি, তত ইডি-সিবিআই, তত বেশি করে তৃণমূল নেতাদের টিকি বিজেপির ঘরে বাঁধা। বিজেপির লক্ষ্য, লোকসভায় এই রাজ্য থেকে গোটা বারো-পনের সিট - বেশি হলে ভালো, নইলে ওটুকু দিয়ে আপাতত কাজ চালানো। আর রাজ্যসভা-লোকসভায় যেকোনও ইস্যুতে তৃণমূলের সমর্থন - সরাসরি না হয়ে অভিনব পদ্ধতিতে হলেও ক্ষতি নেই, যেমন ওয়াক-আউট ইত্যাদি প্রভৃতি। এবং মাঝেমধ্যে কিছু রাজ্যের নির্বাচনে টুকটাক ভোট কাটাকাটি করে সাহায্য, এটুকু।

লোকসভায় তৃণমূল বিজেপিকে সেই কোটার সিট দেবে। বছরভর বাকি সহযোগিতা তো বলাই বাহুল্য। উপায়ও নেই, কেননা চুরিচামারির কারণে টিকি ওপাড়ায় বাঁধা।

তো পঞ্চায়েতের মাসকয়েকের মাথায় লোকসভা নির্বাচনে এমন ফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মিডিয়া সমস্বরে বলবে, এই ফল হলো পঞ্চায়েত ভোটে অনাচারের প্রতিবাদে মানুষের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। তৃণমূলের দু-চারজনও সেই মর্মে কথা বলবেন - মানে, আত্মসমীক্ষা আত্মবিশ্লেষণ জাতীয় কথাবার্তা, তৃণমূলের পক্ষে যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই আর কি।

তবে সেই রেজাল্ট দেখে আসল বিচলিত হবেন বুদ্ধিজীবী-বিচক্ষণ-বোদ্ধারা। বলার সুযোগ পেয়ে যাবেন, রাজ্যের পক্ষে বিজেপি বড় বিপদ। প্রাথমিক বিপদ বিজেপিই। অতএব, যেকোনও মূল্যে বিজেপিকে ঠেকাতে, ইত্যাদি প্রভৃতি... 

আর হ্যাঁ, এসবের মাঝে মিডিয়া শোনাতে থাকবে, এই রাজ্যের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বলতে খুনোখুনি আর হিংসা। দায়ী বলতে প্রশাসন বা কোনও দল নয় - দায়ী আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অশিক্ষা, দারিদ্র্য ইত্যাদি প্রভৃতি আর কিয়দংশে দুর্ভাগ্য। অনেকে বলবেন, আগে তো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল না, থাকলে আরও অনেক খবর জানা যেত। এমনিতে এই রাজ্যের মিডিয়া চট করে তথ্যটথ্যর ধারপাশ মাড়ায় না - নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে যায়, জানি না - নইলে পরিবর্তনের আগের চৌঁত্রিশ বছরে রাজ্যে ঠিক কতগুলো পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি আর জেলা পরিষদ বিরোধীদের হাতে ছিল, এই সহজ তথ্যটুকু কেন যে কেউ খুঁজে দেখে না!! নাকি, উন্নয়নের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহে বিরোধী শক্তি স্রেফ ভেসে চলে গেছে, একথা তাঁরাও বিশ্বাস করেন, কে জানে!

তো এভাবেই চলতে থাকবে।

পাপচক্র, দুষ্টচক্র, বিষচক্র - যা-ই বলুন - এই চক্র ভাঙা সহজ নয়।

হতাশ লাগে। আবার যাঁরা প্রতিরোধে সামিল হলেন, তাঁদের জন্য গর্বও হয়। ঘরকুনো মধ্যবিত্ত অপোগণ্ড হিসেবে এর বেশি আর কী-ই বা পারি!

শনিবার, ৮ জুলাই, ২০২৩

পঞ্চায়েত নির্বাচন ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


একটা সময় ছিল যখন শহরবাসী বাঙালির বেশিভাগের একটা দেশের বাড়ি থাকতো, সপ্তাহান্তে না হোক, বছরে অন্তত দুবার বাঙালি তার সেই দেশের বাড়ি ফিরে যেত। গ্রামের সাথে শহরের বাঙালির দেখা সাক্ষাৎ হত। ষাট এর দশকেও বাঙালির উপন্যাস চলচ্চিত্র, কবিতায় নাটকে একটা গ্রাম বাংলা থাকতো।


এর পরে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই শহররায়ন হল। বাঙালি মধ্যবিত্ত মেট্রোপলিটন মননে গ্রাম বাংলার জায়গা সংকুচিত হতে থাকলো। শিল্পী হিসেবে নবান্নের ধানের গন্ধের সাথে রাত দেড়টায় মাচায় উঠে, "ভালো আছো বাংলা?" বলে ইকো চেম্বার নিয়ে চিৎকার করা ছাড়া আর কিছু বাকি থাকলো না। গ্রাম নিয়ে যাবতীয় খবরাখবর এর উৎস হয়ে পড়ে থাকলো লক্ষ্মীকান্তপুর বা ক্যানিং লোকাল থেকে আগত গৃহকর্মীদের সাথে গৃহিণীর অলস বিশ্রম্ভালাপ। টেলিগ্রাফ বা স্টেটসম্যানের পাতা ওলটানোর ফাঁকে গৃহকর্তার কানে যাওয়া সেই আলাপের ছেঁড়া টুকরো। গ্রাম বাংলা কেবল ফিরে আসে মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে পঞ্চায়েত ভোটের সময়। সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের শুরুতে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে অশোক মিত্র, বিনয় চৌধুরীর নেতৃত্বে গ্রাম বাংলায় ঘটে যাওয়া পঞ্চায়েত নামক নিঃশব্দ বিপ্লব নিয়ে মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালি উদাসীন থেকেছে, বড়জোর গ্রাম থেকে আগত অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহ পরিচারিকার সরবরাহে ঘাটতি পড়ায় কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করেছে।

বার্কলে থেকে প্রণব বর্ধন একের পর এক গবেষণাপত্রে সংসদীয় বামপন্থীদের এই বিকেন্দ্রিকরণের মহত্তম এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে উচ্ছাসিত হলেও শিক্ষিত বাঙালির তাতে বিশেষ হেলদোল দেখা যায় নি। জ্যোতি বাবু ও তাঁর সহযোগীরা অতি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি যে ফান্ড ফাংশন ফাংশানারির বিকেন্দ্রীকরণের তাদের এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে জন্ম দেবে এক ফ্র্যাঙ্কনস্টাইনের। পঞ্চায়েত এর এই মধু ভান্ডারের স্বাদ পেতে মরিয়া হয়ে বাংলার বুকে এমন মুষল পর্ব দেখবে গোটা ভারত যে যদু বংশও লজ্জা পাবে। গণতন্ত্রের এই ধর্ষণ বোধ করি হিটলারকেও লজ্জিত করতো। বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল জানে যে না তারা না কোনো পার্টির প্রথম সারির নেতা নেত্রী, কারুর গায়েই আঁচটি পরবে না এই গ্রামের নির্বাচনে। নির্বাচনের দিন ঘোষণা থেকে নির্বাচনের দিন, বড়জোর হপ্তা দুয়েক বাংলা জুড়ে একটা উন্মত্ততা চলবে, যেটা নজর আন্দাজ করলেই হল। এর পরেই জাতীয় বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যাবে রহিম শেখ বা রামা কৈবর্ত নামক শহীদদের কাহিনী। টিভির চ্যানেলে চ্যানেলের সান্ধ্য আসরে কেচ্ছা কাহিনীর অভাব হবে না।

বিবেক খুব কুটকুট করলে সোশ্যাল মিডিয়াতে একবেলার জন্য পবিত্র ঘৃনা উগড়ে দিলেই হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাশাপাশি বসবাস করা পরিবার গুলোর মধ্যে যে ঘৃণার রাজনীতির চাষ অনায়াসে অক্লেশে মানুষকে লাশ বানিয়ে ফেলছে, গ্রামীণ পল্লী সমাজে আমদানি করছে সন্দেহ অবিশ্বাস এর বাতাবরণ, ধ্বংস করে দিচ্ছে গরীব খেটে খাওয়া মানুষের ঐক্য, তাদের একে অন্যকে দাঁড় করাচ্ছে মুখোমুখি সংঘর্ষের আঙিনায় সে নিয়ে বাংলার বুদ্ধিজীবি সমাজের বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই। আগ্নেয়গিরির শিখরে বসে নাগরিক বাঙালি বুদ্ধিজীবী পিকনিক করছে, বুঝতে পারছে না পঁচাত্তর হাজার গ্রাম বাঁচলে তবেই বাঁচবে বাংলা। বুঝতে পারছে না বাংলার সর্বনাশ হচ্ছে, হয়ে গেছে। 

"আমরা যে গাছটিকে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেবেছিলাম
যার উদ্দেশ্যে ধ্রূপদী বিন্যাসে কয়েক অনুচ্ছেদ প্রশস্তি লিখেছিলাম
গতকাল বলাই বাবু বললেন, 'ঐটি বাঁদরলাঠি গাছ'।
অ্যালসেশিয়ান ভেবে যে সারমেয় শাবকটিকে
আমরা তিন মাস বক্‌লস পরিয়ে মাংস খাওয়ালাম
ক্রমশ তার খেঁকিভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
আমরা টের পাইনি
আমাদের ঝরণা কলম কবে ডট্‌ পেন হয়ে গেছে
আমাদের বড়বাবু কবে হেড অ্যসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন
আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন।
আমরা বুঝতে পারিনি
আমাদের কবে সর্বনাশ হয়ে গেছে।"