রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

লাশ পড়ছে গণতন্ত্রের ~ শমীক লাহিড়ী

একটা নির্বাচন। ৫ জন মৃত। ৪৪ জন প্রার্থী আক্রান্ত। আক্রান্ত সাংবাদিকের সংখ্যা জানা যায়নি। আর আক্রান্ত ভোটার? ওদের নিয়ে আবার আলোচনা হয় নাকি!

কে নেবে দায়িত্ব?  সন্ধ্যাবেলায় সেজেগুজে নির্বাচন কমিশনের কর্তারা বলবেন শান্তিপূর্ণ ভোট, ঐ ৫টা লাশ বাদে। না মরলে ভালো হ'তো, কিন্তু মরেছে যখন, কি আর করা যাবে! 

অযথা হৈচৈ করবেন না। এখন  উৎসব চলছে গণতন্ত্রের! 

লাশের মালিকানা কার, টানাহেঁচড়া চলবে। প্রধানমন্ত্রী- মূখ্যমন্ত্রী- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চাপানউতর চলবে। বাকি ৪দফা নির্বাচনের দফায় দফায় কে বেশি ফায়দা তুলতে পারে, তার প্রতিযোগিতা  চলতে থাকবে। সন্ধ্যায় সেজেগুজে  টিভি-র সঞ্চালকরা হৈ হৈ করে, রে রে রব তুলে, ঝগড়া বাঁধিয়ে, TRP বাড়াবার জন্য গলা কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে তুমুল আলোচনায় মেতে উঠবে। লাশের পাশে মা-বৌদের আছাড়ি পিছাড়ি কান্না, যে যত নিখুঁত সম্পাদনায় উপস্থাপিত করতে পারবে, তার বিজ্ঞাপনও তত মিলবে। 

সবার মুনাফা - কিন্তু ঐ পাঁচের বাপ-মা-ভাই-বোনের কি হবে! ভোটের আইনের প্যাঁচে ইচ্ছা থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিপূরনের অঙ্ক ঘোষণা করে সহানুভূতি আদায়ের প্রতিযোগিতায় নামতে বা ফায়দা তুলতে পারছেন না। 

তাই বেচারা লাশগুলো অনেককেই অনেক মুনাফা তোলার সুযোগ দিলেও,  ওদের বাপ-মা-বৌ- সন্তানদের হাতে রইল শূণ্য। 
আসলে লাশ তো পড়েছে গণতন্ত্রের।

নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগে থেকেই নানা উস্কানিমূলক কথা বলেই চলেছেন দুই শাসকদলের চুনোপুঁটি নেতা মন্ত্রী থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশন অভিযোগ জমা পড়ার বা  দিল্লির ইশারার অপেক্ষায় না থেকে, নিজে থেকে কোনো উদ্যোগ নিতে পারতো না? 

জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০/৫১ এর ৩২৪ নং ধারায় নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া আছে অবাধ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সংগঠিত করার। ক্ষমতার কোনো অভাব নেই। তাও নখ-দন্তহীন এই দৈন্য চেহারা কেন? 

যারা উত্তেজক বক্তৃতা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারতো না নির্বাচন কমিশন? ৭২ ঘন্টার জন্য তাদের প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করতে পারতো না? 

প্রধানমন্ত্রী ৮ দফার নির্বাচনের প্রতিটি দিন এসে ভাষন দিচ্ছেন, আর তার সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে টিভি তে। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে সেই বক্তৃতা শুনছে ভোটার। একই কথা মুখ্যমন্ত্রী সহ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। হয় টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করা হোক, অথবা প্রতি দফার নির্বাচনের ৪৮ ঘন্টা আগে সব সভার অনুমতি  দেওয়া বন্ধ করা হোক। কিছু একটা রাস্তা বলুক।

কসবায় আজ নির্বাচন। রাস্তার ওপারে বালিগঞ্জ কেন্দ্রে পরে নির্বাচন। এপারে মাইক খাটিয়ে ইচ্ছেমতো প্রচার চলছে, বাইক বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। 

৪৮ ঘন্টা আগে প্রচার বন্ধ, ৭২ ঘন্টার মধ্যে বাইক মিছিল বন্ধ - এইসব ফাজলামির মানে কি? আসলে লাশ তো পড়ছে নির্বাচন বিধির।

আকাশে বাতাসে কোটি কোটি টাকা উড়ছে। আকাশময় বিজেপি- তৃণমূলের হেলিকপ্টার রোজ চক্কর কাটছে। এলি-তেলি যে খুশী ফাঁকতালে উড়ে নিচ্ছে। দেখছে না নির্বাচন কমিশন? কে দিচ্ছে টাকা? বিজেপি ১০০০ টাকার কুপন বিলি করছে, তৃণমূল ১০০০টাকা ভোট মিটলেই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিফলেট বিলি করছে। কমিশন নিজে তো কিছু করছেই না, অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর স্থান হচ্ছে কমিশন দপ্তরের ডাস্টবিনে। আসলে প্রতিদিন লাশ ছড়িয়ে পড়ছে ঐ ডাস্টবিনগুলোয়।

বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে হাজার হাজার কোটি টাকার বন্ডের টাকার সিংহভাগই  জমা পড়ছে বিজেপি-তৃণমূলের ভান্ডারে। কে দিচ্ছে জানতে চাওয়া নাকি অপরাধ! এই প্রকাশ্য ঘোষিত দুর্নীতির স্বপক্ষে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের সীল মোহর পড়েছে! 
লাশ তো গণতন্ত্রের পড়েছে সেইদিনই। 

প্রকাশ্যে নির্লজ্জভাবে অর্থের বিনিময়ে খবর প্রকাশিত হচ্ছে অনেকগুলো বড় বড় সংবাদমাধ্যমে। যাকে বলে খোলামেলা Paid News। দেখছে না নির্বাচন কমিশন? গণতন্ত্রের ৪র্থ স্তম্ভ এখন ফ্যাসিস্ট আর স্বৈরাচারের মুখপত্র। গণতন্ত্রের লাশ তৈরি হচ্ছে কর্পোরেট মিডিয়ার প্রতিটি অক্ষরে প্রতিদিন। গণতন্ত্রের  লাশে বিপুল উৎসাহে রোজই ফুল মালা চড়াচ্ছে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত টিভি  আর খবরের কাগজের খবর। 

নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক সংস্থাও যদি সরকারের পেটোয়া হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের শ্রাদ্ধশান্তির তারিখটাও ঘোষণা করে দেওয়া হোক।

৭৩ বছর আগে অর্জিত স্বাধীনতা, স্বৈরাচার আর ফ্যাসিস্টদের হাতে লাশ হতে পারে না। জীবন- জীবিকা-রুটি-রুজির লড়াই ব্যর্থ হয় না। 

ভোট দিন। সবাই ভোট দিন। দলবদ্ধভাবে ভোট দিন। শান্তি সম্প্রীতি জীবন জীবিকা শিক্ষা স্বাস্থ্যের লড়াইয়ের পক্ষে ভোট দিতে লম্বা লাইনে দাঁড়ান। 

গণতন্ত্রকে লাশ হতে দেওয়া যায়না।

শমীক লাহিড়ী 
১০এপ্রিল, ২০২১

শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১

সিঙ্গুর কেমন আছে ~ অর্ক ভাদুরী

এই লেখাটা দিন কুড়ি আগে লিখেছিলাম। তারপর থেকে আরও বার পাঁচেক সিঙ্গুরে যেতে হয়েছে। পরিস্থিতি বেশ খানিকটা বদলেছে। আগামীকাল সিঙ্গুরে ভোট, তার আগে একটু আধটু বদলে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলাম।


দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করা গেল, তাপসী মালিকের বাড়িটা কীভাবে যাব? তিন-চারজন এগিয়ে এলেন। "এই রাস্তাটা ধরে সোজা এগিয়ে যান। টাটার মাঠের পাশ দিয়ে যাবেন। তারপর কাউকে জিজ্ঞেস করবেন উজ্জ্বল সংঘের মাঠ, বাজেমেলিয়া…"

টাটার মাঠ?

হ্যাঁ, টাটার মাঠ। এক হাজার একরের মাঠ। যে জমিতে একদিন কারখানা হওয়ার কথা ছিল, রাজ্য রাজনীতির ভরকেন্দ্রে ছিল যে জমি, যে হাজার একরকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর ইতিহাসে সংসদীয় পথে গড়ে ওঠা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন কালীঘাটের টালির চালা থেকে উঠে আসা প্রাক্তন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই জমি এখন ধু ধু মাঠ। বিক্ষিপ্ত ভাবে দু-এক জায়গায় চাষের কাজ হচ্ছে, অধিকাংশ জায়গাই ফাঁকা, এককালে যে জমি সবুজে সবুজ হয়ে যেত, তার শরীরময় পড়ে আছে মৃত কারখানার কঙ্কাল। মাটির অনেক নিচে বসে থাকা সিমেন্টের ভিত, যা বহু চেষ্টাতেও উপড়ে ফেলা যায়নি, ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা এক দশক পুরনো সারি সারি লোহার রড, নিরাপত্তারক্ষীদের থাকার জায়গার ভগ্নাবশেষ। একটু দূরে পর পর কয়েকটি পুলিশ ভ্যান। টাটার মাঠ পাহারা দিচ্ছে বছরভর। চোখে পড়ল কয়েকদিন আগে সিপিএমের করা 'প্রতীকি' শিলান্যাসের ফলক। তার গায়ে ঝুলতে থাকা বাসি মালা যেন বুঝিয়ে দেয়, তরুণ প্রার্থীকে নিয়ে পার্টিবৃত্তে উৎসাহ থাকলেও এই তল্লাটে বামেদের সংগঠন এখনো সেই তিমিরেই। 

সিঙ্গুর স্টেশনের গায়ে মনোরঞ্জন মালিকের এক চিলতে দোকান। ভোট প্রচারে বেরিয়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন সিপিএমের তরুণ প্রার্থী ছাত্রনেতা সৃজন ভট্টাচার্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই ভিডিও। দেখা যাচ্ছে, সৃজনকে হাত তুলে আর্শীবাদ করছেন মনোরঞ্জন। ফাল্গুনের ভরদুপুরে যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছনো গেল, দোকান ফেরত মনোরঞ্জন তখন খেতে বসবেন। রং না হওয়া বাড়ির তক্তপোষে বসে সৃজনের কথা তুললাম।

- আপনি কি সিপিএম প্রার্থীকে আর্শীবাদ করেছেন?

 মনোরঞ্জন বললেন, "ছেলেটি বয়সে তরুণ। আমার দোকানে এসে বলল, আমি ভোটে দাঁড়িয়েছি। আর্শীবাদ করবেন। আমি তখন হাতটা তুলে বললাম, ভাল হোক। এইটুকুই। আমার বাড়িতে যদি কেউ আসে, সে যদি চরম শত্রুও হয়, ভাল ব্যবহার তো করতেই হবে।" এরপরেই তাঁর সংযোজন, "সিপিএম আমার মেয়েকে খুন করেছিল। মেয়েটা বেঁচে থাকলে আজ এই সৃজনের বয়সী হত। সিপিএমকে আমি কখনো ক্ষমা করব না।"

মালিক পরিবারে বাহ্যত নিম্মবিত্ততার ছাপ স্পষ্ট। বাইরের ঘরে দেওয়ালে একটা ফটোফ্রেমে  ছবির কোলাজ। কোন ছবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনোরঞ্জন, কোনটাতে মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে। কয়েকটি ছবিতে উপস্থিত রয়েছে সিঙ্গুরের 'মাস্টারমশাই', প্রবীণ বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। এই বছর যিনি দল বদলে বিজেপির প্রার্থী। কিন্তু একটি ছবিতেও নেই জমি আন্দোলনের অন্যতম মুখ বেচারাম মান্নার।

কেন? বেচাবাবুর সঙ্গে কি আপনার দূরত্ব রয়েছে?

মনোরঞ্জন দৃশ্যতই বিরক্ত। হাতজোড় করে বললেন, "বেচার সঙ্গে আমার খুবই সুসম্পর্ক। বড় বেশি সুসম্পর্ক। ওর সম্পর্কে কোনও কথা আমায় বলতে বলবেন না।"


সিঙ্গুরে কান পাতলে অবশ্য সেই সম্পর্কের রসায়ন ভালই বোঝা যায়। তাপসী মালিকের বাবার সঙ্গে কার্যত মুখ দেখাদেখি নেই বেচারামের। হরিপালের বিধায়ক এবার সিঙ্গুরে তৃণমূলের প্রার্থী। পাশের আসন হরিপালে লড়ছেন তাঁর স্ত্রী। রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা বেচারামের বিরুদ্ধে সিঙ্গুর জুড়ে অনেক অভিযোগ। তাঁর নাকি এই ক বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। একাধিক পেট্রল পাম্পের মালিক নাকি তিনি। এমনকি, বিজেপির আদি কর্মীদের একাংশের এমনও দাবি, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও নাকি হটলাইন রয়েছে বেচারামের। তাঁর জয় নিশ্চিত করতেই নাকি ৮৯ বছরের মাস্টারমশাইকে বিজেপির টিকিট দিয়েছেন লকেট। অন্যদিকে, বেচা শিবিরের পাল্টা দাবি, বাইরে থেকে বাড়ি যেমনই হোক, মনোরঞ্জনও নাকি অনেক সম্পত্তির মালিক। আর রবীন্দ্রনাথবাবু বাড়ির বাইরেই বেরোতে চান না। বহুদিন ধরেই নাকি দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলেন মাস্টারমশাই। বলা বাহুল্য, এই সব অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের কোন প্রমাণ নেই৷ বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া কথার মতোই সিঙ্গুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এরকম বহু ফিসফাস।

ভোটের প্রচারে অবশ্য কেবলই বেচারাম। সিপিএমের 'বহিরাগত' প্রার্থী সৃজন ছুটছেন ঠিকই, কিন্তু ধারে ভারে প্রত্যাশিতভাবেই অনেক এগিয়ে তৃণমূল। আর বিজেপি প্রথমে বেশ কয়েকদিন কার্যত প্রচার শুরুই করতে পারেনি। বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের নাম প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই সিঙ্গুর উত্তপ্ত। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন বিজেপির আদি কর্মীরা। প্রার্থী বদলের দাবিতে রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর – হয়েছে সবই। সিঙ্গুর স্টেশনের কাছে বিজেপির দফতর গমগম করছে, কিন্তু সেখানে মাস্টারমশাইয়ের কোন ছবি নেই। জমি আন্দোলনের স্মৃতি উস্কে প্রার্থী বদলের দাবিতে ধর্ণামঞ্চ সাজিয়ে বসেওছিন বিজেপি কর্মীদের একাংশ। সিঙ্গুরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল, প্রার্থী বদল করা হলেও হতে পারে। অথচ লোকসভা নির্বাচনের হিসাবে এই কেন্দ্রটি বিজেপির জন্য সম্ভাবনাময়। তবে আস্তে আস্তে পরিস্থিতি অনেকটাই সামলে নিয়েছে গেরুয়া শিবির। মাস্টারমশাইয়ের সমর্থনে এখন বিজেপি একটি বাদে বাকি শিবিরগুলি বাহ্যত এককাট্টা। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এসে রোড শো করে গিয়েছেন সিঙ্গুরে। কিন্তু তারপরেও প্রচারে, প্রভাবে এগিয়ে বেচারাম মান্নাই।

গত লোকসভা ভোটের ফল বলছে, হুগলী লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায় ১০ হাজার ৪২৯ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। লকেট পেয়েছেন ৯৩, ১৭৭টি ভোট (৪৬.০৬%)। সেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল প্রার্থী রত্না দে নাগের প্রাপ্ত ভোট ৮২,৭৪৮ (৪১.০৩%)।

বেড়াবেড়ি, কেজেডি এবং গোপালনগর — এই তিনটি মৌজা নিয়েই ছিল টাটাদের প্রকল্প এলাকা। এর মধ্যে গোপালনগর পঞ্চায়েতের মোট ১৮টি আসনের মধ্যে লোকসভায় বিজেপি ১১টিতেই জিতেছে। সাতটিতে জিতেছে তৃণমূল। কেজেডি-র ১৮টি আসনেও একই ফল। বেড়াবেড়ি মৌজারও কিছু আসন গিয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ফলে নিঃসন্দেহে অ্যাডভান্টেজ ছিল গেরুয়া শিবিরের  কিন্তু সব হিসাব গোলমাল করে দিচ্ছে বিজেপির অর্ন্তবিরোধ। যার ফলে হাসি চওড়া হচ্ছে বেচারামের।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা সেরে বেচারাম বললেন, "মাস্টারমশাই শ্রদ্ধেয় মানুষ। ৯০ বছর বয়সে টিকিটের জন্য দলবদল করলেন। কী আর বলব! বিজেপিও প্রার্থী পাচ্ছে না বলে ওঁকে টিকিট দিয়ে দিল। উনি অসুস্থ, তিনবার অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে, আশা করব রোদ লাগাবেন না।" মমতা নিজেও অবশ্য বয়স কটাক্ষই করেছেন। বলেছেন, "এই বয়সে পৌঁছে যাওয়া একজনকে প্রার্থী করে দিল বিজেপি! এত গরমে উনি ভোটে লড়বেন! ওঁর কি কষ্ট হয় না? বিজেপির উচিত ছিল মাস্টারমশাইকে সেদ্ধ-ভাত করে দেওয়া, পা টিপে দেওয়া, তেল মালিশ করে দেওয়া। সে সব না করে ভোটে লড়িয়ে দিয়েছে। অমানবিক দল কী আর সাধে বলি!"

রবীন্দ্রনাথবাবু অবশ্য বলছেন, "অসম্মানের জবাব দিতেই আমার লড়াই। আমার সততা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। অনেকের ভাবমূর্তি এমন নয়। মানুষই জবাব দেবেন।" বিজেপি প্রচারে বলছে, তারা সরকারে এলে সিঙ্গুরে কারখানা গড়বে। জমিরক্ষা কমিটির প্রধান নেতা হিসাবে আপনার অস্বস্তি হচ্ছে না? প্রসঙ্গ এড়িয়ে মাস্টারমশাইয়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর, "অসম্মান আর অসততা মেনে নেব না। লড়াই হবে।"

একথা ঠিক যে রবীন্দ্রনাথবাবুর ভাবমূর্তি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। বামপন্থী ছাত্রকর্মী বলছিলেন, "মাস্টারমশাইয়ের সততা নিয়ে তো প্রশ্ন নেই। ওঁর ইমেজের জন্য উনি প্রচুর ভোট পান। কিন্তু সংগঠনটা পুরোপুরি বেচা মান্নার। এলাকার সব ক্লাব ওঁর নিয়ন্ত্রণে, নিয়মিত জনসংযোগ করেন। তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সংগঠন ওঁর সঙ্গেই। মাস্টারমশাই তো বেরতেই পারেন না, বাড়িতে বসেই যা করার করেন। কাজেই ভাবমূর্তি যেমনই হোক, বেচারাম মান্না অনেক এগিয়ে।"

এ তো গেল ভোটের পাটিগণিতের কথা। তার বাইরে সিঙ্গুর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে চাপ চাপ হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। জমি আন্দোলনের দেড় দশক পরের সিঙ্গুরে কেবল বিশ্বাস আর স্বপ্নভঙ্গের  অন্ধকার। এতখানি হতাশা পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোন বিধানসভায় চোখে পড়েনি। নন্দীগ্রামে তো নয়ই। বস্তুত, ২০২১ সালের সিঙ্গুরে জমি আন্দোলনের  কোন রেশ আর অবশিষ্ট নেই। এক দিকে কারখানা হলে কী হত বা হত না, সেই আলোচনা। অন্য দিকে বন্ধ্যা হাজার একর নিয়ে হাহাকার। তবুও তার মধ্যে যেন ঝিলিক মারে দেড় দশকের পুরনো আবেগ। গোপালনগরে দেখা হল এস ইউ সি আই নেতা শঙ্কর জানার সঙ্গে। বেচারাম মান্নার সঙ্গে যৌথভাবে জমিরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন মৃৎশিল্পী শঙ্করবাবু৷ সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধের পোশাক মলিন। সংসার জুড়ে দারিদ্র্যের ছবি। দুপুরে ভাত খেতে খেতে শঙ্করবাবু বলছিলেন আন্দোলনের দিনগুলোর কথা। কেমন করে গড়ে উঠল জমিরক্ষা কমিটি, কেমন করে গ্রামে গ্রামে তৈরি হল কমিটির শাখা। বলছিলেন ২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের সেই রাতের কথা। যে রাতে  পুলিশের লাঠিতে গুরুতর আহত হন রাজকুমার ভুল। বাড়ি ফিরে মৃত্যু হয় তাঁর। শঙ্করবাবু বলছিলেন, "আমরা ডিএম-কে ঘেরাও করেছিলাম। আমি ছিলাম, আমাদের পার্টির নেতারা ছিলেন, মাস্টারমশাই ছিলেন, বেচা ছিল। তারপর কলকাতা থেকে মমতা এলেন। তখন অনেক রাত। মমতা ডিএম-কে বলতে লাগলেন, এখনই জমি ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি তো অবাক! এভাবে হয় নাকি…"।  তারপর শুরু হয় অবস্থান। পুলিশ লাঠিচার্জ করে অবরোধমুক্ত করে ডিএম-কে। বাংলার রাজনীতিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

বৃদ্ধ শঙ্কর জানার আক্ষেপ, শহীদ রাজকুমার ভুলকে কেউ মনে রাখেনি। বলছিলেন, "মমতা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করে নিলেন। আন্দোলনের ফয়দা তুললেন উনি। সিঙ্গুরের মাটি থেকে আন্দোলনটা চলে গেল ধর্মতলার অনশন মঞ্চে। কৃষকরা ঠকলেন। আমরা চেষ্টা করেছিলাম রুখতে, দুর্বল শক্তি নিয়ে পারিনি। তারপর তো যা হল জানেনই…"।

ওঁকে প্রশ্ন করা গেল, এখন ঠিক কী মনে হয়? ভুল করেছিলেন? এই যে কারখানা হল না, চাষও হল না, আপনারা দায় নেবেন না? শঙ্কর জানা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, "নাঃ, ভুল কিছু করিনি। সময়ের ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম। কারখানা হলে যত লোক কাজ পেত, তার চেয়ে অনেক বেশি লোক কাজ হারাত। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শিল্পায়ন মানুষের ভাল করতে পারে না।" এরপর, একটু চুপ করে থেকে আবার বলেন, "তবে হ্যাঁ, জমিটাকে যদি বাঁচাতে পারতাম, নষ্ট করতে না দিতাম… তা তো পারিনি… তবে আজও যখন দেখি দিল্লির আন্দোলনকারী কৃষকরা সিঙ্গুরের কথা বলছেন, তখন গর্ব হয়…"

সিঙ্গুর জুড়ে চরকি পাক খেতে খেতে পৌঁছে গেলাম সেই সময়কার সিপিএম নেতা সুহৃদ দত্তের বাড়িতে। তাকানো যায় না বৃদ্ধের দিকে। সমস্ত শরীর জুড়ে দগদগে ঘা। হাঁটতে পারেন না। ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হয়। তিরিক্ষি মেজাজ। কয়েকদিন আগেই বাথরুমে পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছেন। বাড়ি গিয়ে চোখের দেখা দেখলেও কথা হল না। পরদিন ফোনে বললেন, "আমি কে! আমার সঙ্গে কথা বলে হবে কী! ওরা আমায় শেষ করে দিয়েছে, সিঙ্গুরকেও শেষ করে দিয়েছে।" তৃতীয় দিন  মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ দিল। বৃদ্ধের চোখে বোবা রাগ। "সমস্ত শরীরে জ্বালা। চামড়ার নিচটা যেন পুড়ে যাচ্ছে। ওরা ষড়যন্ত্র করে জিতে গেল। তবে আর বেশিদিন নয়..."। কী বলব বুঝতে পারলাম না, কিছু বলার থাকে না এমন সময়ে।

একটা মরে যাওয়া কারখানা। একটা মৃত বিতর্ক। অনেকগুলো জীবন্মৃত মানুষ আর দু কাল ছাপানো হতাশা — বিধানসভা নির্বাচনের আগে চুম্বকে সিঙ্গুরের ছবি এটাই। যেখানে দলবদল আছে, জমি আন্দোলন নেই।

বুধবার, ৩১ মার্চ, ২০২১

মীনাক্ষী ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

বয়সটা কম। প্রাজ্ঞতা নেই। ছত্তিরিশ বা সাঁইতিরিশ।
মনের ভেতর জ্বলছে আগুন, রাস্তাতে তুই তাই ফিরিস।

তুই কি পাগল? অ্যাম্বিশনের... আদৌ কি নেই ইচ্ছে তা?
সময় এখন গুছিয়ে নেবার, সবাই দিব্যি নিচ্ছে তা।

টেম্পারেচার চল্লিশ। তার গাল কপালে বইছে ঘাম।
তার মধ্যেই ঘুরছে মেয়ে। কখন নেবে সে বিশ্রাম?

ওদের তৈরি সিণ্ডিকেট আর ওদের আছে দাঙ্গা বিষ!
ভয় করে না? ওই যে ওরা... কীসের জোরে পাঙ্গা নিস?

মুখের ওপর তর্ক করিস, বড়ই দেখছি সাহস তোর।
খেলার ছলেই মুছতে পারে। সেই খেলা স্রেফ বাঁ হস্তর।

প্রশ্ন করলে অভয় শোনাস। কোথায় কারা শুধছে ঋণ!
তোর পাহারায় শুনছি হাজার চোখ জেগে রয় রাত্রিদিন। 

সবার চোখের মণির মতন। সবার আশার ফুল কি তুই?
হয় তো ঠিকই। এই রাত্রির তিমির বিনাশ ফুলকি তুই।

আমার কন্যা পিনাকপাণি। ওই জনতাই পিনাক কি?
বাবার চিন্তা মানতে চায় না! সাবধানে থাক্ মীনাক্ষী!



সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১

নন্দীগ্রামের চক্রান্ত ~ সৌনক দত্ত

কাল থেকে মমতার হয়ে এপোলোজিয়া নামানো স্বাধীন বাম , লিবু, ম্যাও সবারই অনেক ন্যারেটিভই চোখে পরছে। সব কটার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না, কিন্ত নির্দিষ্ট একটা ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়াটা খুবই জরুরি, সেটা হলো গুলি চালানো প্রসঙ্গে ১৪ই মার্চের পর  নাকি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের করা একটি মন্তব্য 𝗧𝗵𝗲𝘆 𝗵𝗮𝘃𝗲 𝗯𝗲𝗲𝗻 𝗽𝗮𝗶𝗱 𝗯𝘆 𝘁𝗵𝗲𝗶𝗿 𝗼𝘄𝗻 𝗰𝗼𝗶𝗻 "

টিপিকাল দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা মেশিনারির কায়দা গুলো কি নিখুঁত ভাবে রপ্ত করে ফেলেছে এই রাজ্যের সিপিআইএম বিরোধী লিবারেল, স্বাধীন সহি বাম, অতিবাম সহ কিছু বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবিশেষ। তা হলো আউট অফ কনটেক্স একটা স্টেটমেন্টকে পুরো পুরি বিকৃত করে একটি চূড়ান্ত মিথ্যা  ন্যারেটিভ কনস্ট্রাক্ট করে হোয়াটাবাউট্রি করে যাওয়া, অবাক লাগে এখনো  এরা এতটাই নির্লজ্জ, এতটাই সংকীর্ণ যে এই পর্যায়ের সিপিআইএম বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালাতে এতটুকু ক্লান্তি নেই এদের।

অবশ্যই বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য এই মন্তব্যটি করেছিলেন, কিন্তু মন্তব্যটি ছিল সম্পূর্ণ অন্য কনটেক্সে, অন্য প্রসঙ্গে। দেখা যাক সেই কনটেক্স।

নন্দীগ্রামে কোনো শিল্প অভিযান প্রক্রিয়া শুরুর আগেই, শুধুমাত্র কেমিকাল হাব নির্মাণের পূর্ব পরিকল্পনার আঁচ পেয়েই ২০০৬ এর ডিসেম্বর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে 'ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি ', যার অংশ ছিল তৃণমূল-কংগ্রেস-বিজেপি-নকশালপন্থী গোষ্ঠী-এসইউসিআই-জামাতে উলেমা হিন্দ -সবাই।  সাথে ঘাঁটি বেঁধেছিলো মাওবাদীরাও। এই ঘটনায় অগ্নিসংযোগ করে শুধুমাত্র দুটো ঘটনা--একটি  ২৩শে ডিসেম্বর সিপিআইএম এর শিল্পায়নের দাবিতে রাজারামচক থেকে সোনাচূড়া পর্যন্ত মিছিল আর দ্বিতীয়টি তার কদিন পরেই সংবাদমাধ্যমে বেরোনো একটি খবর, সালিম গোষ্ঠীর সাথে রাজ্য সরকারের একটি মৌ স্বাক্ষর।

২০০৭ এর  ২রা জানুয়ারি গঠিত  হয়ে যায় 'ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি' যথেষ্ট সময় এবং  চিন্তা করে ব্যাপক একটি পরিকল্পনার ওপরে ভিত্তি করে আগ্নেয়গিরির প্রথম বিস্ফোরণটা ঘটলো তার পরেরদিন অর্থাৎ ৩রা জানুয়ারি। শুরু হলো গোটা নন্দীগ্রাম জুড়ে অশান্তি। মাত্র দুই তিনদিনের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো গোটা নন্দীগ্রামকে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা অবশ্যই অনস্বীকার্য্য, সাথে ছিল অবশ্যই গ্রাস রুটে পার্টির প্রতিরোধের ব্যর্থতা।

এই সব ঘটনা চলছে যখন তখন মহাকরণে বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য জানান, নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তিই জারি হয়নি। নন্দীগ্রামের মানুষ না চাইলে সেখানে কোনো কোনো শিল্প হবে না, জমি অধিগ্রহণের তো প্রশ্নই নেই।

নন্দীগ্রামের সিপিআইএম বিরোধী রংধেনু জোট এতে কিন্তু কর্ণপাত করা দূরের ব্যাপারে, তারা ধরে নেয় সরকার পিছু হাটছে তাদের ভয়ে, এইখান থেকে শুরু হয় নন্দীগ্রামে সিপিআইএম কর্মীদের ওপর নৃশংস অত্যাচার, খুন হতে থাকে একের পর এক কর্মী, কেবল দুদিনে  জ্বালিয়ে দেওয়া, ভেঙে দেওয়া হয় ১০০র ওপর বাড়ি, হামলা চলতে থাকে সিপিআইএম এর পার্টি অফিস এবং দপ্তর গুলোতে। ৭ই জানুয়ারি পাঁচজন সিপিআইএম কর্মীকে ইট পাথর দিয়ে থেঁতলে কুপিয়ে পিটিয়ে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে ফেলে খুন করা হয়, এই পাঁচজন -বিশ্বজিৎ মাইতি (সাউডখালী), ভুদেব মন্ডল(সোনাচূড়া), রবীন ভূঁইয়া, সুদেব মন্ডল (সোনাচূড়া), শঙ্কর সামন্ত( তাল ডাংরা)। এদের মধ্যে শঙ্কর সামন্ত ছিলেন পঞ্চায়েত সদস্য। তাকে ছুড়ি দিয়ে চিরে জ্বলন্ত খড়ের গাদায় ছুড়ে ফেলা হয়। ভুদেব মন্ডলকে তাঁর পরিবারের লোকজনের সমানেই ইট দিয়ে থেঁতলে খুন করা হয়। শিল্প হওয়া দূরের ব্যাপার, শিল্প হচ্ছে না ঘোষণার পর ও আরো বেশি করে চলেছে এই হত্যালীলা। মাত্র দিন চারেকের মধ্যে সহাস্রাধিক সিপিআইএম কর্মী নিরাশ্রয় হয়ে নন্দীগ্রাম ত্যাগ করে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে পাশের খেজুরী, কনতাই, পটাশপুরের মতো সংলগ্ন অঞ্চলে। এর পরেই ঘটে যায় সেই ১৪ই মার্চের তোলপাড় করা ঘটনা, মুহূর্তের মধ্যে সংবাদমাধ্যম সহ সুশীল বুদ্ধিজীবী মহলের  তরফ থেকে শুরু হয়ে যায় মুখ্যমন্ত্রী সহ সিপিআইএম এর মুন্ডুপাত, একদিকে চলছে যেখানে মুন্ডুপাত, আরেকদিকে ঠিক এই ঘটনার পরেরদিন থেকে নন্দীগ্রাম হয়ে ওঠে সিপিআইএম কর্মীদের সমাধি ক্ষেত্র, নিত্যদিন ৩-৪ টে সিপিআইএম কর্মীদের মৃতদেহ ছিল নন্দীগ্রামের নিউ নরমাল। অত্যাচারের মাত্রা ছাড়িয়ে যায় কল্পনাতীত সীমা , নিত্য নতুন উপায়ে চলতে থাকে হত্যা প্রক্রিয়া, এর মধ্যেই নির্মম ভাবে গণধর্ষণের পর খুন হন সিপিআইএম এর আরেক পঞ্চায়েত সদস্য সুনিতা জানা, তালিকা এর পর শুধু দীর্ঘ হতে থেকেছে। নৈরাজ্য এবং 'গণতন্ত্রের হত্যাকারী' সিপিআইএম এর বিরুদ্ধে সেই সময় 'সদা সক্রিয়', 'সদা জাগ্রত' একটাও ব্যক্তি বাম অথবা বুদ্ধিজীবি মহল থেকে ওঠেনি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। রংধেনু জোটের 'মুক্তাঞ্চলে হয়তো এই হত্যালীলাই ছিল তাদের কাছে নব্য যুগের প্রতিষ্ঠান বিরোধী বিপ্লব।

এর পর সাত আট মাস যাবৎ গৃহ হীন সেই সহস্র সিপিআইএম কর্মীদের পরিস্থিতির এতটুকু বদল হয়নি  , ঈদ দুর্গাপুজো তাদের কাটাতে হয়েছে পাশের এলাকায় নয়তো ত্রাণ শিবিরে আর এর পাশাপাশি নন্দীগ্রাম তো তখন শ্মশান। রোজ ৩-৪টে লাশ পরছে সিপিআইএম কর্মী, সমর্থকদের, বাদ যায়নি সাধারণ মানুষও। যারা পালিয়ে আসতে সফল হননি অথবা মোহন মন্ডল, মীর খুরশেদ, চঞ্চল মিদ্যার মতো যারা  শেষ মুহূর্ত অব্দি থেকে যেতে চেয়েছেন অকুতোভয় হয়ে গর্বের সাথে লাল পতাকাকে আঁকড়ে, মূল্য চোকাতে হয়েছে প্রাণের বিনিময়ে।

অনেক আগেই পার্টি মেশিনরীকে ব্যবহার করে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, যা নিতে ব্যর্থ হলেও এবার সহ্যর সব বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর ২০০৭ এর নভেম্বর মাসে সিপিআইএম  তাদের কর্মীদের ঘরে ফেরানোর চেষ্টা করতেই জ্বলে ওঠে অশান্তির আগুন। ঘরের ফেরার এই লড়াই ও কম ভয়ঙ্কর ছিল না। হাজার অনুরোধ, প্রশাসনিক দিক দিয়ে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার প্রচেষ্টা, হাজার আকুতি মিনতি সত্ত্বেও বিরোধী  রঙধেনু জোট কর্ণপাত না করে উল্টে তাকে সরকারের দুর্বলতা ভেবে সিপিআইএম কর্মীদের খতম অভিযান জারি রাখার  ফলস্বরূপ  নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ওই ঘরে ফেরার পর্বে সিপিআইএম কর্মীদের সশস্ত্র অভিযান ছিল পাল্টা প্রতিরোধ মাত্র (যে প্রতিরোধ. দরকার ছিল আরো আগে থেকেই), এই অভিযান প্রসঙ্গেই বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য বলেছিলেন 𝗧𝗵𝗲𝘆 𝗵𝗮𝘃𝗲 𝗯𝗲𝗲𝗻 𝗽𝗮𝗶𝗱 𝗯𝘆 𝘁𝗵𝗲𝗶𝗿 𝗼𝘄𝗻 𝗰𝗼𝗶𝗻 " 

কোনোভাবেই এই কথা ১৪ই মার্চের দিন বলেননি উনি, বলেছিলেন ৮ মাস পর নিজের কর্মীদের আত্মরক্ষা প্রসঙ্গে।এবার প্রশ্ন উঠতে পারে উনি কী তাহলে এটা বলে ভুল করেননি, আমার মতো অনেকের মতেই হ্যা উনি ভুল করেছিলেন, বিশাল বড়ো ভুল করেছিলেন, এই মানসিকতা উনার শুধু ওই একদিনের জন্য নয়, গোটা ১০টা বছরই দেখানো প্রয়োজন ছিল,  সিপিআইএম এর একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসাবে উনার এই সফ্ট স্টান্স এর প্রবল সমালোচক আমি। 

যাই হোক শুধু একবার দেখা যাক ১৪ই মার্চ ঘটনা ঘটার পর বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্যর কি প্রতিক্রিয়া ছিল। অন্তত সিবিআই এর অফিসিয়াল রেকর্ড মতে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে। সেইদিন বিধানসভাতে অধিবেশন চলছিল, গুলি চালানোর ঘটনা শুনেই  হতবাক হয়ে যান বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য। বেশ কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে থাকেন, চোখে মুখে চূড়ান্ত হতাশার ছাপ স্পষ্ট, তারপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় একটাই কথা বলেন "গুলি চললো কেনো? গুলি চালানোর তো কথা ছিল না। কি এমন পরিস্থিতি হলো যে গুলি চালাতে হলো!" সেদিন বিধানসভায় কোনো সরকারি বিবৃতি দেননি তিনি, চূড়ান্ত হতাশা থেকে বাকি সময় নিজের ঘরেই কাটিয়ে দেন তিনি। "

 কৃষি নির্ভর এই রাজ্যকে একটি উন্নত শিল্প ভিত্তিক রাজ্যে পরিণত করতে চাওয়ার ব্যাপারে তার পার্টির  সিদ্ধান্ত এবং তার নিজের বাসনার  এরকম  পরিণতি হতে দেখে আত্মগ্লানি এবং অভিমানের মধ্যেই ডুবে গেছিলেন খানিক। ভাবতেও পারেননি সেই সময় থেকেই যে বৃহৎ ষড়যন্ত্রর উল্লেখ করতে গিয়ে বারবার অতি বোদ্ধা, ধান্দাবাজ বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর কাছে  হাস্যস্পদে পরিণত হয়েছিলেন তিনি এবং তার পার্টি, আজ ১৪ বছর পর সেই সময়ের এই ষড়যন্ত্রের মূল ঘুঁটি নিজের বিনাশকালে, একটি মরিয়া প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে এই ষড়যন্ত্রের মিসিং লিংক গুলো জুড়ে দেবেন।  যাই হোক সব চেয়ে বড়ো মিসিং লিংক এখনো বাকি। সময়ের থেকে এগিয়ে গিয়ে কোনো কিছুর ব্যাখ্যা দিলে মানুষের জেনারেল কনসেনসাসে গ্রহণযোগ্য হয় না, সময় মতো তাই অন্তিম মিসিং লিংক হিসাবে সিআইএ যোগসূত্র টাও প্রমান হবে। সবে তো শুরু।

P. S-  ওপরের লেখার প্রমান হিসাবে নিচে বিখ্যাত সাংবাদিক অঞ্জন বসুর বই "বাংলায় বামেরা : রাজ পথে ও রাজ্যপাটে"  বই এর দুটো পাতার ছবি কমেন্ট সেকশনে দিয়ে রাখলাম।

.

নন্দীগ্রাম ~ সুশোভন পাত্র

পাঁচ বছর আগে এক সন্ধ্যায় প্রথমবার আলিমুদ্দিন গিয়ে ঘড়ি ধরে ৩০ সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। মাথা ভর্তি সাদা চুল,  গাল ভর্তি দাড়ি, সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে বুদ্ধবাবু, 'ফিরে দেখা'র ডিকটেশন দিচ্ছেন। আমি লেখালিখি করার চেষ্টা করি শুনে বললেন, 'লেখ। আমাদের যে ভুলের কথা গুলো কেউ লিখছে না, সেগুলোই সাহস করে লেখ।' 
কাল যখন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নন্দীগ্রামের স্বীকারোক্তি শুনেছি, পাঁচ বছর আগের সন্ধের ৩০ সেকেন্ডের ঐ অমলিন মুহূর্তটা চোখে ভাসছে বারবার। বুদ্ধবাবু মাফ করবেন। আমি আজ 'আমাদের ভুলের' কথা লিখতে বসিনি। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নন্দীগ্রাম এবং পরে সিঙ্গুর নিয়ে রাজ্যে, দেশে, বিদেশে আপনার বিরুদ্ধে, বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে, 'আমাদের' বিরুদ্ধে; প্রতিদিন, 'ভুলের' নামে ষড়যন্ত্রের গালগল্প লেখার, কাব্য করার ছ্যাবলামি অনেক হয়েছে। আর না, বুদ্ধবাবু মাফ করবেন!  
তৃণমূল তো ছিলই। গৃহপালিত মিডিয়া তো আছেই। বিসেলেরির ঠাণ্ডা বোতলে চুমুক দিয়ে, কালো সানগ্লাস চোখে চাপিয়ে শহীদ বেদী তে লাথি মারা বুদ্ধিজীবী, কফি হাউসের সিগারেটখোর আঁতেলবাজ, সিপিএম'র থেকে আর একটু বেশি লেনিন জানা স্বাধীন-লিবারেল অণু কিম্বা আর একটু বেশি মার্ক্স বোঝা সংশোধনবাদী সিপিএম কে 'প্রকৃত বিপ্লবের' শত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া অতি বাম পরমাণু –নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের আদ্যোপান্ত ষড়যন্ত্র কে 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস'-র স্ট্যাম্প মেরে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে অবিরাম। আর না, বুদ্ধবাবু মাফ করবেন!
মর্ফড ছবিতে আপনার মুখে ক্যানাইন দাঁত বসিয়ে, আপনার পাঞ্জাবি তে রক্তের দাগ লাগিয়ে, আপনাকে 'খুনি বুদ্ধ' হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে, পুঁজিবাদের দালাল সাজিয়ে দিয়ে, 'পরিবর্তন চাই' ফেস্টুনে দাঁত কেলিয়ে, নেতা-মন্ত্রীর টিকিট বাগিয়ে, রেল কমিটির ল্যাজ ধরে পয়সা কামিয়ে, ক্যাডবেরি খাওয়া 'অনশন'-'আন্দোলনের' দোহাই দিয়ে রাজ্যটাকে ১০ বছর পিছিয়ে দেওয়া অনুঘটকদের মাতব্বরি অনেক হয়েছে। আর না, বুদ্ধবাবু মাফ করবেন!  
দৃপ্ত কণ্ঠে, কলার তুলে, বুক বাজিয়ে আবারও বলতে চাই; আগেও বলছি, পরেও বলব –কোন ভুল সেদিন বুদ্ধবাবু করেননি। কোন ভুল সিদ্ধান্ত সেদিন বামফ্রন্ট সরকার নেয়নি। কোন বিচ্যুতি সিপিএম-র হয়নি। নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরে একইঞ্চি 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস' হয়নি। যা হয়েছিল সেটা আগাপাশতলা  নোংরা রাজনৈতিক চক্রান্ত। আদ্যোপান্ত একটা ষড়যন্ত্র।   
টানা বাহাত্তর দিন পুলিশ-প্রশাসনের প্রবেশ নিষিদ্ধ তখন নন্দীগ্রামে। বিস্তীর্ণ এলাকা তখন অবরুদ্ধ নন্দীগ্রামে। ভাঙা রাস্তা, ভাঙা সেতুর দৌলতে বিপন্ন, বিচ্ছিন্ন জনজীবন নন্দীগ্রামে। 'জমি আন্দোলনে'র সলতেতে সাম্প্রদায়িকতার বারুদ তখন নন্দীগ্রামে। বিরোধী নেতা-সাংসদ'দের মদতে বেআইনি অস্ত্রের পাহাড় জমছে তখন নন্দীগ্রামে। একদিনে সিপিএম'র ২৫টা পার্টি অফিসে আগুন জ্বলছে তখন নন্দীগ্রামে। নিয়ম করে শঙ্কর সামন্ত, সুনীতা মণ্ডলদের লাশ পড়ছে তখন নন্দীগ্রামে। 
লাগাতার হামলা শুরু হয় শিল্পের পক্ষে থাকা গ্রামবাসীদের উপর। কেউ ঘরছাড়া, কেউ খুন, কেউ ধর্ষিতা। প্রশাসনের ডাকা সাত-সাতটা শান্তি বৈঠকে যোগ দিলো না তৃণমূল। ৯'ই ফেব্রুয়ারি যেদিন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধবাবু হেড়িয়ার জনসভায় বলেছিলেন "মানুষ না চাইলে কেমিকাল হাব হবে না নন্দীগ্রামে। অধিগ্রহণ হবে না এক ইঞ্চি জমিও"; ঠিক সেদিনেই পেট চিরে পুলিশ কর্মী সাধুচরণ চ্যাটার্জি'র লাশটা ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল হলদি নদীর জলে।
কি করত সরকার? বুড়ো আঙুল চুষত? ললিপপ খেতো? ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রামে পুলিশকে গোপনে পাঠায়নি বামফ্রন্ট সরকার। ১২ই মার্চ সাংবাদিক সম্মেলন করে পুলিশ যাওয়ার পরিকল্পনা জানিয়ে তবেই নন্দীগ্রামে পুলিশ ঢুকেছিল। শখে গুলিও চালায়নি পুলিশ। মাইকে ঘোষণা, কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট, শূন্যে গুলি -আইনি কপিবুকের ক্রনোলজিতে ভুল করেনি সেদিন পুলিশ।
২০১৪'তে নন্দীগ্রামের ঘটনার চার্জশিট জমা দিয়েছিল সিবিআই। সিপিএম'র 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের' কোন নিদর্শনই খুঁজে পায়নি সিবিআই। তালপাটি খালে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে 'সিপিএম'র হার্মাদ বাহিনীর হাতে পা চিরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া একটাও শিশুর লাশ খুঁজে পায়নি সিবিআই। গোটা নন্দীগ্রাম ঘুরে একটাও 'স্তন কাটা মহিলা' খুঁজে পায়নি সিবিআই। 
বরং চার্জশিটে বলা হয়েছিল, সেদিন পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছোঁড়া হচ্ছিল। বলা হয়েছিল, হামলাকারীদের হাতে তীক্ষ্ণ অস্ত্র ছিল। বলা হয়েছিল, "নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসন এবং পুলিশ অফিসাররা চেষ্টা করেছিলেন। বৈঠকে বিরোধী দলগুলির নেতা এবং ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির অনুপস্থিতির জন্য তা সম্ভব হয়নি।" 
যারা এরপরেও ২০১১-র বামফ্রন্টের নির্বাচনী পরাজয় কে স্বাভাবিক গণতন্ত্রীয় লিনিয়ার ইকুয়েশন মনে করেন, নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর কে সিপিএম'র 'ক্লাস ক্যারেক্টার'-র স্খলন বলে মনে করেন, কিম্বা নেত্রী মমতার একক রাজনৈতিক ক্যারিশ্মার জাবর কাটেন, তারা কি বলতে পারেন ক্ষমতায় এসে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারদের পদন্নোতির ব্যবস্থা কেন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? বলতে পারেন, কেন তৃণমূল-মাওবাদী-জামাতের নেক্সাস কে প্রচুর অস্ত্র মজুতে মদত দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? 
আর যারা বিজেপির বাইনারি তে দোল খাচ্ছেন তারা কি বলতে পারেন, কেন্দ্রীয় সরকারের একই সময় অনুমোদিত নন্দীগ্রামের মতই একটি পেট্রো রসায়ন শিল্প তালুক গুজরাটের দাভোসে হল কি করে? আর হলে, এখানে বিজেপি, সেদিন তৃণমূলের শিল্প বিরোধী ষড়যন্ত্রের পার্টনার ছিল কি করে? না, গুজরাটের মত আম্বানিদের বরাত না দিয়ে বামফ্রন্ট সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মাধ্যমে শিল্প করতে চেয়েছিল বলে বিজেপির গোঁসা হয়েছিল? কিম্বা আরএসএস-র দুর্গা কে পলিটিক্যাল মাইলেজ দিতে হবে বলে কি বিজেপি কসম খেয়েছিল? 
চার আনার পলিটিক্যাল পণ্ডিতরা সেদিন বলেছিলেন বুদ্ধবাবুর 'নৈতিক পরাজয়'। মাননীয়া বলেছিলেন বামফ্রন্টের কৃতকর্মের 'পাপস্খলন' । জানতে চাই কোন পাপস্খলন? কিসের নৈতিকতা? আজ যে, নিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাওয়া বাংলার যুব সমাজের হিমোগ্লোবিনে প্রতিদিন মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মের আফিম; ভেঙে ফেলা হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি, রাজবংশী-মতুয়ার আইডেন্টিটির টুকরোতে -সেই পাপস্খলনের দায়িত্ব নেবার যোগ্যতা, তার দায় বয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা অবশ্য সেদিনও মাননীয়ার ছিল না, আর আজও নেই। রাজ্যের যুব সমাজের এই সামাজিক ও নৈতিক স্খলন চাক্ষুষ করার মত দূরবীন সেদিনও জাতীয় সড়ক অবরোধকারী অনশন মঞ্চে ছিল না, আজও নবান্নের চোদ্দ তলায় নেই। 
না! আজকে নন্দীগ্রামের চক্রান্তের পর্দা ফাঁস হয়ে গেছে বলে প্রায় শয্যাশায়ী, রোগাক্রান্ত বুদ্ধবাবুর নামে সিম্প্যাথি কুড়িয়ে ভোটের বৈতরণী পেরোনোর চেষ্টা করছে না সিপিএম। হুইলে চেয়ারের মেলড্রামা কিম্বা দাড়ি বাড়িয়ে জোকার সেজে রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হওয়ার বদভ্যাস বামপন্থীদের কোনদিন ছিল না। আজও নেই।   
বরং আপামর দুনিয়ার বহমান কমিউনিস্ট আন্দোলনের ও পুঁজিবাদের দ্বান্দ্বিকতার যে  প্রেক্ষিতে বুদ্ধবাবু বাংলা কে গড়ার চেষ্টা করেছিলেন সেই সময়ে, রাজ্য তো বটেই, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও তার গুরুত্ব বোঝে সিপিএম। ৬২ সাংসদ নিয়ে অপ্রতিরোধ্য বামেদের সেই সময় বোতলবন্দী না করতে পারলে কোন শ্রেণীর মানুষের ক্ষতি হতে পারতো সেই শ্রেণীশত্রুদের চেনে সিপিএম। নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর জঙ্গলমহল, কিম্বা গোর্খাল্যান্ড -সেই সময়ের বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে রামধনু জোটের বে-নি-আ-স-হ-ক-লা, প্রতিটা রঙ কে আলাদা করে বিশ্লেষণের ক্ষমতা আছে সিপিএম-র। রাজনীতির রিলে রেসে বুদ্ধবাবুর তুলে দেওয়া ব্যাটন নিয়ে লড়াই করার বারুদ বুকে আছে আমাদের। আর তাই সিম্প্যাথি কুড়োতে নয় লড়তে শিখতে হয় আমাদের।   
ফিদেল বলেছিলেন History will absolve me। বুদ্ধবাবু বলেছিলেন "একটা বড় চক্রান্তের শিকার রাজ্য। ১০ বছর মানুষ ঠিক বুঝতে পারবেন।" পারছেনও। পারবেনও। History কি Absolve করবে কি করবেনা সেটা সময় বলবে। কিন্তু ইতিহাস পড়ার জন্য নয়, ইতিহাসে গড়ার জন্যই লড়ছি আমরা। লড়ছে মীনাক্ষী, লড়ছে সায়নদীপরা। লড়ছে আকিক ,সাদ্দাম, প্রতিকুর, সৃজনরা। লড়ছে দিপ্সিতা-ঐশী-পৃথা-সেলিম-সুজন-পলাশরা। লড়ছি আমরা, বামপন্থীরা। লড়ছি রাজপথে। লড়ছি আলপথে। হেঁটে এবং নেটে। লড়ছি নির্বাচনেও। লড়ব নির্বাচনের পরেও। লড়ব শেষতক। জিতব শেষতক।

বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ, ২০২১

সংযুক্ত মোর্চা বনাম বিজেমূল ~ সুশোভন পাত্র

শাট আপ! ধর্ম নিরপেক্ষতার জ্ঞান কে দিচ্ছে? তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা? কিষানজীর কোয়ার্টার-হাফ-ফুল চামচারা? মার্কামারা বিজেপি? তাদের আদর্শগত বাপ সঙ্ঘ পরিবার? না চার আনার আইটি সেলের ভক্তরা? মুখে ঝামা ঘষে বলে দিন ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে বামপন্থীদের জ্ঞান দেওয়ার যোগ্যতা এদের কোনদিন ছিলনা। আজও নেই। পরেও থাকবে না। 
ধর্ম নিরপেক্ষতার জ্ঞান কে দিচ্ছে? সিমির দালাল আহমেদ হাসান ইমরানকে যারা রাজ্যসভার টিকিট দিয়েছিল? সিদ্দিকুল্লাকে মন্ত্রী বানিয়ে যারা ঠুমকা নেচেছিল? বরকতিকে যারা ব্রিগেডের মঞ্চে তুলে ভাঁজ দেওয়া সাম্প্রদায়িক ভাষণ দেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল? না যারা, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে 'জয় শ্রী রাম' শ্লোগান শুনে মুচকি হেসে রোয়াব নিয়েছিল? গেরুয়া পোশাকের ক্লাউন আদিত্যনাথ কে গতকাল মালদাতে দাঙ্গা লাগাতে চরতে ছেড়েছিল? প্রজ্ঞা ঠাকুরদের পুষে লোকসভা তে পা রাখতে শিখিয়েছিল? বামপন্থীদের ধর্ম নিরপেক্ষতা শেখাবে এরা? জাস্ট শাট আপ!     
ফেজ টুপির সিদ্দিকি বামপন্থীদের হাত ধরলে গায়ে ছ্যাঁকা লেগেছে? ISF-র সভাপতি শিমুল সোরেন। মুসলিম নন, আদিবাসী। ISF-র সর্বোচ্চ নেতাদের অনেকেই তফসিলি জাতি ও অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষ। তথাকথিত 'হিন্দু'। তবুও ফেজ টুপি দিয়েই দল চিনবেন, তাই তো? বেশ, চিনুন। রাজনাথ সিং মাথায় ফেজ টুপি পরলেও চিনুন, মোদী ভোটের আগের সলমান খানের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ালেও চিনুন, লকেট হাঁটু মুড়ে দোয়া চাইলেও চিনুন, আর মমতা হিজাব দিয়ে ইফতার পার্টি তে গেলেও চিনুন। আছে হিম্মত?   
আসলে বিজেমূলের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে ব্রিগেড। একদিকে 'যে গরু দুধ দেয় তার লাথ তো খেতেই হবে' বলে দিদি মুসলিম ভোট কুড়বেন, আর অন্য দিকে 'হিন্দু খতরে ম্যা' বলে বিজেপি হিন্দু ভোট কনসলিডেট করবে, রাজ্য কে ধর্মীয় মেরুকরণের বারুদে সাজিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে দাদা-দিদি মুজরা দেখবেন আর মিডিয়া আম্বানিদের পা-চাটার ব্লু প্রিন্ট রেডি করবে –প্ল্যান গুলো ভেস্তে যাচ্ছে? কি তাই তো?    
ভেবেছিলেন, ফেজ টুপি পরে আব্বাস সিদ্দিকি বক্তৃতা করলেই 'মোল্লাদের ব্রিগেড' বলে দাগিয়ে দেবেন! ভেবেছিলেন, রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে দুধের দাঁত না ভাঙা সিদ্দিকি বক্তৃতার সময় একটা ফাউল করলেই লাল কার্ড দেখিয়ে দেবেন, ভেবেছিলেন আস্সালাম ওয়ালেকুম, ইনশাল্লাহ বা খোদা হাফেজ দিয়ে বক্তৃতা করবেন, ভেবেছিলেন মঞ্চের উপর থেকে না হোক নীচ থেকে কমপক্ষে আল্লা-হু-আকবর, নারায়ে তকবীর শুনবেন –প্ল্যান গুলো ভেস্তে গেছে? কি তাই তো? 
সিদ্দিকি থেকে দেবলীনা, সূর্য মিশ্র থেকে সেলিম হয়ে সীতারাম, ২৮শে-র ব্রিগেড জুড়ে রুজিরুটির কথা, চাকরির কথা, ধর্ম-জাত-বর্ণ নির্বিশেষে নিপীড়িত শ্রেণীর কথা, বিকল্পের কথা –ঘাবড়ে গেছেন তো? বিজেমূল বিরোধী সমস্ত দলকে এক জায়গায় এনে সংযুক্ত মোর্চা গ্লুয়িং ফ্যাক্টর হিসেবে রকস্টার সিপিএম-র ভূমিকাকে দেখে চমকে চ হয়ে গেছেন তো? এতদিন তিল তিল করে গড়ে তোলা বাইনারি ন্যারেটিভটা ভেঙে যাচ্ছে দেখে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে তো? 
এসব একটু হবে! আগামী দু-মাস এরকম অনেক বাইনারি-টাইনারি, লেসার ইভিল-ফিভিলের ফান্ডা হুব্বা হয়ে যাবে। মানিয়ে নিতে অভ্যাস করুন। আব্বাস সিদ্দিকির পুরনো ভিডিও খুঁজে ক্যালোরি খরচা না করে, ২৪ বছরের তৃণমূলের ও তার সুপ্রিমোর ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে ছ্যাবলামির ইতিহাসটা দূরবীন দিয়ে দেখা অভ্যাস করুন। কামাল হাসানের ভূমিকায় সদমা সিনেমার শ্রীদেবীর মত 'লিবারেলদের' স্মৃতিশক্তির যত্ন নেওয়া অভ্যাস করুন।  
দেখবেন, দূরবীনে অতীতের প্রিজমে ধরা পড়বে, ৯২-র ৪ঠা ডিসেম্বর, অযোধ্যায় জুটছেন কর-সেবকরা; সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শহীদ মিনারে জনসভা ডাকল বামফ্রন্ট। আর সেদিনই সিধো-কানহু ডহরের সভায় মমতা বললেন, "সব সিপিএম'র ষড়যন্ত্র। বিজেপি অযোধ্যায় কিছুই করবে না।" মনে পড়বে, ৯৮-র লোকসভা ভোটে তৃণমূলের হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে খাতা খুলল বিজেপি, আর ৯৯-এ এনডিএ-র শরিক মমতা হলেন রেলমন্ত্রী। ভেসে উঠবে, বিবিসি'র সাক্ষাৎকারে এক ভদ্রমহিলা নিঃসংকোচে বলছেন "বিজেপি তৃণমূলের ন্যাচারাল অ্যালি"। দাঙ্গা পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর মোদী কে অভিবাদন জানিয়ে পুষ্পস্তবক পাঠাচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি। কিম্বা দিল্লিতে 'পাঞ্চজন্য'র অনুষ্ঠানে সংঘ নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে যিনি বলেছিলেন, ''আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আপনারা দেশকে ভালোবাসেন' -তার নামও মমতা ব্যানার্জি। গদগদ আরএসএস নেতারা যাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ''হামারি পেয়ারি দুর্গা" -তার নামও মমতা ব্যানার্জি।  
বামপন্থীরা সময়ের দায়িত্ব জানে। 'One Step Forward, Two Steps Back'-র গুরুত্ব বোঝে। সিপিএম'র হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে "কী করিতে হইবে" সে বিষয়ে প্রতিদিন হোয়াটস-অ্যাপে দু-মুঠো উপদেশ দেওয়া টেক্সাসের টেকনোক্র্যাট, ফেসবুকে পার্টি-লাইনের অন্তঃসার শূন্যতার গবেষক লন্ডনের চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, পার্টির অভূতপূর্ব দিশাহীনতায় মাথায় হাত রাখা সাংবাদিক, 'সাম্প্রদায়িকতার ব্যাধি' নিরাময়ের ১০৮ প্রকার ওষুধ নিয়ে হাজির সবার থেকে একটু বেশি লেনিন জানা, একটু বেশি মার্ক্স বোঝা তাত্ত্বিক, সংশোধনবাদ কে 'প্রকৃত বিপ্লবের' শত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া কফি হাউসের সিগারেটখোর বিপ্লবী  -এদের সামনে দাঁড়িয়েই ১০০ বছরের বেশি পথ চলছে সিপিএম। এবারও চলবে। 
অভাব-অভিযোগ-কুৎসা-অপপ্রচার-আলোচনা-সমালোচনার বিষমসত্ততা নিয়েই সিপিএম। সাংগঠনিক সাফল্য কিম্বা ব্যর্থতা, নির্বাচনী জয় কিম্বা পরাজয়, আদর্শ বোধের বিচ্ছুরণ কিম্বা বিচ্যুতি এই সব কিছুর বৈপরীত্য নিয়েই সিপিএম। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ চলায় রাজনৈতিক ও মতাদর্শ গত এই আক্রমণের আগুনে জ্বলে পুড়েই ইস্পাত কাঠিন্যে বলিয়ান আজ সিপিএম। রাশিয়ান দার্শনিক নিকোলাই চেরনিশেভেস্কি কে উদ্ধৃত করে লেনিন বলতেন "কমিউনিজমের পথটা সেন্ট পিটার্সবার্গের সবচেয়ে লম্বা এবং সুসজ্জিত নেভস্কি প্রস্পেক্টর রাস্তার মত সহজ সরল আর প্রশস্ত নয়। বরং কণ্টকাকীর্ণ"। ঐ কণ্টকাকীর্ণ পথেরই পথিক সিপিএম।
দীর্ঘ পথ চলতে গিয়ে সিপিএম মৌলানা হসরৎ মোহানী এবং অপরজন স্বামী কুমারানন্দ মিলিয়ে দিতে শিখেছে। "Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people"- বুঝতে শিখেছে। সিপিএম চিনছে, মৌলবাদীদের। চিনেছে সাম্প্রদায়িকদের। চিনেছে ধর্মপ্রাণ কিম্বা ধর্মভীরু সাধারণ মানুষদের। 
সিপিএম স্বপ্ন দেখে এমন একটা সমাজের যে সমাজে, টিকি কিম্বা দাড়ি, সবাই থাকবে মিলে মিশে, সবাই থাকবে নিজের মত।  নাস্তিক কিম্বা আস্তিক সবাই বাঁচবে রাজার মত। যে সমাজে ধর্ম পালনের অধিকার থাকবে। ধর্ম কে নিয়ে হাসাহাসি করার অধিকারও থাকবে। শিল্পী ঈশ্বর কে নিয়ে ব্যাঙ্গ চিত্র আঁকবে। ভগবানের শুঁড় কেন, চারটে হাত কেন, তিনটে মাথা কেন –যুক্তিবাদীরা প্রশ্নও করবে। দাঙ্গাবাজদের মাথা ভেঙে দেওয়ার লোক প্রশাসন চালাবে। যে সমাজে ধর্মচারণ হবে ব্যক্তিগত। যে রাষ্ট্রের কাজ, সরকার পরিচালনা হবে ধর্ম নিরপেক্ষ। 
৭৭-র বামফ্রন্ট সরকার হয়েছিল ৫ মিনিটের সিদ্ধান্তে। ৫২% আসন জনতা দল কে ছেড়ে দিয়ে সেবারও প্রকৃত জোট ধর্মই পালন করেছিল বামফ্রন্ট। রাজি হননি জয়প্রকাশ। পড়ন্ত বিকেলে ৫ মিনিটের সিদ্ধান্তে প্রমোদ দাশগুপ্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন ৫২% বেশি এক ইঞ্চি জমি ছাড়বেনা বামফ্রন্ট। ভেস্তে যায় জোট, ৭৭-র নির্বাচনে ১০০% আসনেই প্রার্থী দেয় বামফ্রন্ট। বাকি লড়াইটা হয়েছিল বুথে। বাকিটা লেখা আছে ইতিহাসে। 
রাজ্য রাজনীতি আরও একটা ঐতিহাসিক কঞ্জাংচারে দাঁড়িয়ে। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। 'Concrete analysis of the concrete situation'- আরও একবার প্রকৃত জোট ধর্মই পালন করছে বামফ্রন্ট। সিদ্ধান্ত ভুল বা ঠিক হয় না। সিদ্ধান্তকে ভুল বা ঠিক প্রমাণ করতে হয়। তাই এবার ব্রিগেড যাবে বুথে। আগামী দু-মাস সংগ্রামের। আগামী দু মাস লড়াইয়ের। আগামী দু-মাস লেখা থাকবে ইতিহাসে।  
পাড়ার কুকুরটা খেপেছে। যাকে তাকে কামড়ে বেড়াচ্ছে। কুকুরের নাম বিজেমূল । মুগুরের নাম সংযুক্ত মোর্চা। পাগলা কুকুর কে মারবে যারা সব্বাই তারা এক দলে। এবার আপনি ঠিক করুন। কুকুরের সাথে থাকবেন, না মুগুরের। আমরা দাঁড়িয়ে আছি আপনার পাড়ার মোড়ে। পাগল কুকুর কে ঠাণ্ডা করার ডাণ্ডা নিয়ে। উন্নত বিকল্পের সরকার গড়ার ঝাণ্ডা নিয়ে।

মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১

কেন সংযুক্ত মোর্চা ~ শমীক লাহিড়ী

এতো মহা মুস্কিলে পড়া গেল। লোক জুটে গেল , মাঠ ভরে গেল।বিরিয়ানি, মায় ডিম-ভাত খাওয়ানোর গল্প বের করা গেলনা। চিড়িয়াখানা-ভিক্টোরিয়া দেখতে ক'লকাতা আসার গল্পও নেই। পাকাচুলে ভর্তি ব্রিগেডের সবুজ ঘাসকে সাদা দেখানো – সেটাও খাওয়ানো যাচ্ছে না। ছবি অন্য কথা বলে দিচ্ছে। 

তাহলে? দুপুরে ব্রিগেড সভা চলার সময়েই মাথা চুলকে, ঘাড়ের ঘাম মুছে তৃণমূল-বিজেপি-র ভোট ম্যানেজাররা ভেবে কুল পাচ্ছিল না – এবারের ব্রিগেড নিয়ে কি বলা হবে!

কংগ্রেসের সবাই আসেনি, বলাও মুস্কিল। বিশাল সমাবেশে এসে অধীর চৌধুরী আপ্লুত, মান্নান সাহেবও সকাল থেকেই হাজির। দীপা দাশমুন্সীও বেসুরে গাইলেন না। যাকে দিয়ে অনেক কিছু বলিয়ে নেওয়া যায়, সেই মনোজ চক্রবর্তী ব্যস্ত সভা সুষ্ঠুভাবে চলার আয়োজনে। মহা মুস্কিল! 

বামফ্রন্টের শরিকদলের নেতাদের খুঁচিয়ে কিছু পাওয়া যাচ্ছেনা? ঠান্ডা ঘরের নির্দেশ পেয়ে বেচারা সাংবাদিকদের ২/১ জন নেতাকে খোঁচাতে গিয়ে উলটে বিদ্রুপ শুনতে হ'লো।

তাহলে! একজন লাইন দিল - '২০১৯ সালেও ব্রিগেড ভরেছিল - কিন্তু ভোট পেয়েছিল ৭%। তাই এবারের ব্রিগেড ভরলেও ভোট সেই ৭%। এটাই চালানো হোক।'

পালে পালে লোক হাজার হুমকি, বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে, গাঁটের পয়সা খরচ করে শত-শত মাইল পথ পেরিয়ে ব্রিগেড এসেছে। এই ব্রিগেড ফিরে গিয়ে বুথেও মরণপণ লড়াই চালাবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়? ৭%+৫%= ১৩% ভোট ছিল মরা ভোট বাজারেও, ২০১৯ এ ভাঁটার টানেও।

তাই এত লঘু বস্তাপচা কথায় ভোট ম্যানেজার কোম্পানির  বাবুদের মন ভরলোনা। ভাবো ভাবো। সময় নেই। এক্ষুনি টিভি তে নেমে পড়তে হবে। কাগজে লাইন নামাবার জন্য কয়েক ঘন্টা সময় পাবে, কিন্তু টিভি তে এক্ষুনি লাইন চালু করতে হবে। একবার যদি মানুষের মাথায় ঢুকে যায় বিজেপি-তৃণমূল এই দুইয়ের বিকল্প আছে, তাহলেই ঘোর বিপদ। 

অবশেষে কয়েকটা লাইন পাওয়া গেল - 
লাইন ১ - আব্বাস সিদ্দিকী মাঠে ঢোকার সময়ে, জনতার উচ্ছাসে থামতে হ'লো অধীর চৌধুরীকে। 
না!  শুধু এতে কি হবে? বলো - 'ক্ষুব্ধ  অধীর চৌধুরীকে ভাষণ সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করতে হ'লো আব্বাস সিদ্দিকীর জন্য।'

কিন্তু এটাতে ঠিক সিপিআই(এম) কে জড়ানো গেলনা। আরও কিছু চাই। ৩০ মিনিট বাদে ভাষ্য পাল্টে হ'লো - 'সিপিআই(এম) নেতা মহঃ সেলিম, লোকসভার বিরোধী দলনেতা অধীর চৌধুরীকে ভাষণ শেষ করতে বললেন, আব্বাস সিদ্দিকী মঞ্চে প্রবেশ করার সময়ে। অপমানিত অধীর চৌধুরীকে কোনোক্রমে বিমান বসু সামাল দিলেন, তাঁকে আবার বলতে দিয়ে।' 

ঠিক আছে - চলবে। তবে এই মান-অপমানের ব্যাপারটা খুব খেলো করে দিয়েছেন ধনকর সাহেব। এত ঘন ঘন নানা ব্যাপারে অপমানিত বোধ করে 'অপমান' শব্দটার মান-সম্মান কিছু রাখেননি।

তাই আরও কিছু চাই। এভাবে ব্রিগেড জমায়েতের প্রভাব কিছুতেই মানুষের ওপর পড়তে দেওয়া যাবেনা। 

মাথা ঘামালেই উপায় বেরোয়। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বুদ্ধিমান জীব পুষেছে বিজেমূল , আর উপায় বেরোবে না, তা হয় নাকি!

এবার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতে হবে। নতুন লাইন নেমে পড়লো সূর্যাস্তের আগেই।

লাইন ২ -  ছিঃ ছিঃ!! একটা কমিউনিস্ট পার্টি শেষে কি না ধর্মীয় নেতার হাত ধরে  ব্রিগেডের স্টেজে তুলে এই আদিক্ষেতা করলো! ভাবা যায়! এখানে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-রা বক্তৃতা করতেন। সেখানে শেষে কি না...!! ছিঃ ছিঃ!

এই লাইনটা বেশ ভালো। ২০১৯ সালে যেসব বাম সমর্থক তৃণমূলকে হারাবার প্রবল স্পৃহায় বামদের জয়ের প্রতি সন্দিহান হয়ে বিজেপির ওপর আস্থা রেখেছিল, তাদের বাম ঘরে ফিরে যাওয়াও  রোখা যাবে। 

এই অংশের বাম সমর্থকেরা আবার ভাবতে শুরু করেছে - বামরা রাস্তায় লড়ছে। হাজার হাজার বাম ছাত্র-যুব কর্মী বেকারত্বের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়ছে। সহযোদ্ধার মৃত্যু বা পুলিশের ভয়াবহ অত্যাচারও এদের দমাতে পারেনি। বাম মহিলা কর্মীরা আত্মমর্যাদার দাবীতে সমবেত হ'য়ে পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়েও পালায় নি। এ-সব মানুষ দেখছে। মিডিয়া না দেখালেও বিকল্প সামাজিক মাধ্যমে দেখছে। 

তাই বামের ছেড়ে যাওয়া সমুর্থকদের ফেরার পালা শুরুর আগেই এই ফিরে যাওয়া আটকাতেই হবে। তাই নেমে পড়ো সংবাদমাধ্যম। বসে পড়লো আলোচনা। যাদের ধরে আনা হ'লো, তারা যেখানে জমাতে পারলেন না ভালো, সেখানে সঞ্চালক/সঞ্চালিকারাই লজ্জার মাথা খেয়ে নেমে পড়লেন, চাকরি বাঁচানোর দোহাই দিয়ে। পরের দিন সকালের কাগজে গুছিয়ে গল্প লেখা হ'লো। কোথাও আলিমুদ্দিনের অন্দরমহলের কল্পিত খবর,  কোথাও মাঠে আসা কল্পিত প্রবীণ বা নবীনের মুখে বলে নিজেদের ভাষ্য প্রচার - সবই চলছে বাজারী কাগজে। 

লাইন ৩ - কিন্তু শুধু এতেও হবে না। সংযুক্ত মোর্চাকে ভাঙতেই হবে। কিছুতেই একসাথে এত শক্তিকে রাখা যায় না। বিজেপি-তৃণমূল এই দুয়েরই ভোট কেটে নেবে এরা, আর এটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে এই দুই দলের স্পনসর কর্পোরেট আর তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া?  এ হতেই পারে না। 

খোঁচাও কংগ্রেসের নেতাকে, খোঁচাও IFS নেতাদের। দেখো খুঁচিয়ে কিছু বলানো যায় কি না! সংযুক্ত মোর্চা ভাঙার এই খেলায় টাকার বন্যা বইবে। মিথ্যে প্রচারের বন্যা বইবে। বাজারে অনেক এজেন্ট/এজেন্সি ঘুরবে। কারণ সংযুক্ত মোর্চার ঐক্য দুই শাসক দলের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

রাজ্যের হালহকিকত কি - সবারই জানা। রাজ্যে ১০বছরে কোনও নতুন কলকারখানা হয়নি। আগেরগুলোর বেশীরভাগই তোলাবাজির ঠেলায় পালিয়েছে রাজ্য ছেড়ে। লক্ষ লক্ষ সরকারি পদ খালি - কোনো নিয়োগ নেই। নিয়োগ মানেই ঘুষ দাও তৃণমূলের নেতাদের। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতী রাজ্য ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে ভিনরাজ্যে কাজের খোঁজে। 

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলে টাকা দাও। নম্বর যতই থাকুক টাকা না দিলে প্রবেশ নিষেধ। মাস্টার মশাই/দিদিমণি  এই তোলাবাজির বিরুদ্ধে বললে, ধরে পেটাও। 

চাষীর ফসল সরকার আইন করে কার্যত ফড়ে দালালদের হাতে তুলে দিয়েছে। ফল? চাষি আলুর দাম পায় ৫/৬টাকা, আর সেই আলু ক্রেতাকে কিনতে হয়েছে এমনকি ৪৫ টাকাতেও। অবাধ পয়সা লুঠছে ফড়ে-দালালরা।

গ্যাসের দাম-তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। দেশে ৭০ বছরে যেটুকু সরকারি  সম্পদ তৈরি হয়েছে, সব তুলে দাও আদানি-আম্বানী বা অন্য কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে। মানুষের জমানো ব্যাঙ্ক-বীমার টাকা লুঠের সুযোগও উন্মুক্ত হোক বেসরকারিকরনে - এটাই বিজেপির লক্ষ্য।

রাজ্যের-কেন্দ্রের সরকারের এইসব কাজের সমালোচনা বা  প্রতিবাদ করলেই হামলা নয়তো মিথ্যা মামলা। এই রাজ্যে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার  নেই। এমনকি ভোটও দিতে পারেনা বহু মানুষ। পঞ্চায়েত পৌরসভার ভোটে দাঁড়ানোর অধিকারটুকুও নেই। ওদিকে পার্লামেন্টে সাংসদদেরও ভোট দিতে দেয়না বিজেপি সরকার। 

রাজ্যের ক্ষমতায় স্বৈরাচারী শক্তি। কেন্দ্রে ফ্যাসিস্ট শক্তি। যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষ কি করবে? জ্বলন্ত উনুন আর ফুটন্ত কড়াইয়ের মধ্যেই তাদের জীবন আটকে থাকবে? 

এই পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট পার্টি বা বাম আন্দোলন কি ভূমিকা গ্রহণ করবে? এটাই যদি প্রশ্ন হয় তাহলে উত্তর - দুই শক্তিকেই পরাস্ত করতে হবে। লেসার এভিল বা কম ক্ষতিকর গল্প চলেনা জীবন মরনের মুখে দাঁড়িয়ে। গোখরো না কেউটে - কোনটা বেছে নেবেন, এই আলোচনা পাগলেও করেনা।

কিন্তু কি ভাবে এই দুই শক্তিকেই হারানো আর ঠেকানো সম্ভব? এটা সম্ভব হবে তখনই, যখন সব স্বৈরাচার ও ফ্যাসীবাদ বিরোধী মানুষকে একসাথে এক মঞ্চে এনে লড়াই করা সম্ভব হবে। এই সব মানুষ বা রাজনৈতিক দলগুলো বা সামাজিক শক্তিগুলো অনেক প্রশ্নেই ভিন্ন মত পোষণ করতে পারে, কিন্তু এই দুই মারণ-শক্তিকে পরাস্ত করার বিষয়ে সহমত থাকলেই, এদের ঐক্যবদ্ধ করার সর্বোচ্চ প্র‍য়াস চালাতে হবে।

সেই লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছে *সংযুক্ত মোর্চা*। এই মোর্চার লক্ষ্য ব্রিগেড সভা থেকেই ঘোষিত হয়েছে। 

বাজারি সংবাদমাধ্যম ও বিজেপি-তৃণমূল যৌথভাবে এইজন্যই রে রে করে উঠেছে। নানা ভেক ধরে নানা প্রশ্ন তুলছে।

৭% ছিলে তাই থাকো। ৫% কংগ্রেসকে সাথে নেওয়ার সাথে সাথে কমিউনিস্ট পার্টির শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে কি সাংঘাতিক মাথা ব্যথা এক অংশের সংবাদমাধ্যমের। ৭ আর ৫ যোগ করলে তো মাত্র ১৩। তাতে এত  সমস্যা হচ্ছে কেন? কারণ এরা ভালোই জানে ভোটের অঙ্কে ৭+৫ সব সময় ১৩ হয়না। এই যোগফলটাই গত বিধানসভা নির্বাচনে ছিল ৩৬%। কারণ বিকল্প শক্তি জিততে পারে, এই বার্তাটাই বহু অতিরিক্ত ভোট টেনে আনে। আর বিচ্ছিন্ন হয়ে লড়লে কি হয় এই ৩৬% ভোটের, সেটা গত লোকসভা নির্বাচনে দেখা গেছে।

তাই এই যোগ যাতে না হয়, সেইজন্যই বিজেপি-তৃণমূলের  ভোট ম্যানেজাররা অনেক এজেন্ট /এজেন্সিকে বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। এদের সাদা চোখে দেখা যায় না। এরা কেউ ৭২-৭৭ সালে অত্যাচারিতের ভেক ধরে লিখছে। কেউ এই জন্যই সিপি আই(এম) ছাড়লাম, বলে ঘোষণা করছে।  নবগঠিত সংযুক্ত মোর্চার ভেতরে পঞ্চম বাহিনীর কেউ আছে কিনা খুঁজতে বেরিয়েছে টাকার থলে নিয়ে এরা। 

এবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া। তপশিলি জাতি-উপজাতি, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু  মানুষরা গত ২/৩ বছর ধরেই ফুঁসছিল, তৃণমূল সরকারের বিশ্বাসঘাতকতায়, আর বিজেপির দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণে। নানা সংগঠনের ছাতার তলায় এরা সংগঠিত হচ্ছিল।

এবার এরা সবাই মিলে একটা বড় মঞ্চ তৈরি করেছেন - ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট। সভাপতি হয়েছেন শিমূল সোরেন আর সম্পাদক আব্বাস সিদ্দিকী। এদের লক্ষ্যও বিজেপি ঠেকাও, তৃণমূল হঠাও।

বাজারে বিজেপি-তৃণমূল এজেন্টরা এদের কাছে টানার জন্য কি না করেছে গত কয়েক মাস ধরে। সাফল্য না পেয়ে এখন মায়াকান্না জুড়েছে। এরা কত সাম্প্রদায়িক, জাতপাতের রাজনীতি করছে, সেই প্রচারে মত্ত হাতির মতো আচরণ করছে সংবাদমাধ্যম।

সোরেন-সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই নতুন দল ব্রিগেড মঞ্চে কি বলেছে? 

না মুখ্যমন্ত্রীর মতো আব্বাস সিদ্দিকী কথায় কথায় ইনশাল্লাহ বলেন নি। ইমাম ভাতা বা হজ যাত্রায় ভাতার দাবী তোলান নি। বলেছেন কর্মসংস্থানের কথা। প্রশ্ন করেছেন কেন চাকরি চাইতে আসা ছাত্র-যুবদের লাঠি মারলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পুলিশ। কেন পঞ্চায়েত-পৌরসভা- সরকারের টাকা লুঠ হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো সাম্প্রদায়িক? 

কোন কথাটা সাম্প্রদায়িক? কেউ তা বলতে পারছে না। বলছে কেন ফেজটুপী? মুখ্যমন্ত্রী হিজাবী টেনে ভাষণ দিতে পারেন অসুবিধা নেই, কিন্তু একজন মুসলমান কেন ধর্মীয় প্রথা মেনে ফেজ টুপি পড়েছেন সেই প্রশ্ন তুলছেন এরা কি উদ্দেশ্যে, সেটা স্পষ্ট। 

তৃণমূলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করলে অসুবিধা নেই, যোগী আদিত্যনাথ ঘৃণা ও খুনের রাজনীতির কথা প্রকাশ্যে বলেও বিজেপির নেতা হ'লেও অসুবিধা নেই, গুজরাট দাঙ্গার নায়ক নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দেওয়া যায়, কিন্তু সব বেকারের চাকরির দাবি জানানো আব্বাস সিদ্দিকী সাম্প্রদায়িক? 
বাহঃ। চমৎকার যুক্তি!!

মুসলমান, তপশিলি জাতি-উপজাতি, আদিবাসী মানুষ  কোনো ভিক্ষা চায়না, চায় সংবিধান স্বীকৃত অধিকারের বাস্তবায়ন। ব্রিগেডের মঞ্চে এই কথা বলে কি সাংঘাতিক অপরাধই না করেছে সোরেন-সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ISF !!

অনেক বাম সমর্থক ভাবছেন, কাজটা কি ঠিক হ'লো! একজন ধর্মীয় নেতার দলের সাথে বাম দল কেন মোর্চা করবে? 

প্রথমত ধর্ম বিশ্বাস আর সাম্প্রদায়িকতা কি এক? কেবল নাস্তিকরাই কি বামপন্থী হবে? ধর্মাচরণে ব্রতী কি তবে ব্রাত্য বামদের কাছে? 

ধর্ম নিয়ে কার্ল মার্কসের বিখ্যাত উক্তির পুরোটা অনেকেই বলেন না, বলেন একটা অংশ - ধর্ম হ'লো আফিম। কার্ল মার্কস 'A Contribution to the Critique of Hegel's Philosophy of Rights'  লেখায় উল্লেখ করেছিলেন - "ধর্ম হলো শোষিতদের মর্মযাতনা, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, আত্মাহীন অবস্থার আত্মা। শোষিত মানুষের কাছে ধর্ম হ'লো  আফিম।"

কার্ল মার্কস এই উক্তিটির মাধ্যমে ধর্ম‌কে আফিমের সা‌থে তুলনা ক‌রে‌ছি‌লেন। কিন্তু কেন ?

এই বিষয়‌টির গভী‌রে না গি‌য়ে মোল্লা, পু‌রো‌হিত, ধর্ম ব্যবসায়ীদের কার্যকলাপ না বু‌ঝে কিংবা না জেনে এক‌রৈ‌খিকভা‌বে সরল মানুষগু‌লোর কা‌ছে উপস্থাপন ক‌রে সাধারণ মানুষ‌কে ক‌মিউনিস্ট  বি‌দ্বেষী গড়ে তুলতে এর প্রকৃত ব্যাখ্যা উপস্থিত করে না কমিউনিস্ট বিরোধীরা। এমন‌কি অনেক ক‌মিউনিস্ট কর্মীও এই বিষয়‌টির স‌ঠিক মর্মার্থ উদ্ধার কর‌তে ব্যর্থ হয়ে পু‌রো বিষয়টি‌কেই গুলিয়ে ফে‌লেন।

আস‌লে মূল বিষয়‌টি হ‌চ্ছে, আজ‌কালকার ম‌তো তখনকার সম‌য়ে আফিম কোন নেশাদ্রব্য ছিল না। তখনকার চি‌কিৎসকরা ব্যাথা বা চেতনা নাশক হিসা‌বে আফিমকে ব্যবহার করতেন। আর মার্কস নি‌পীড়িত, শো‌ষিত মানু‌ষের কা‌ছে ধর্ম আফিম স্বরূপ বল‌তে এটাই বোঝা‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লেন যে - সমাজ থে‌কে প্রাপ্ত যাবতীয় দুঃখ, যন্ত্রনা, কষ্ট, অন্যায়, নির্যাতন লাঘবের চেষ্টায় যখন ‌কোনও ব্যা‌ক্তি ব্যর্থ হয়, তখন সৃ‌ষ্টিকর্তার কা‌ছে সমস্ত অন্যা‌য়ের বিচা‌রের ভার সে অর্পন ক‌রে।

ধর্ম‌কে আশ্রয় ক‌রেই তার সকল যন্ত্রনা লাঘ‌বের চেষ্টা ক‌রে ‌কিংবা ভুলে থা‌কতে চায়। নি‌জে যখন বদলা নি‌তে ব্যর্থ হয়, তখন সে ম‌নে ক‌রে, এক দিন না এক‌দিন তার প্রতি এ অন্যা‌য়ের বিচার সৃ‌ষ্টিকর্তাই কর‌বেন। এ প্রেক্ষাপ‌টেই মার্কস এ উক্তিটি ক‌রে‌ছি‌লেন।

লেনিনের লেখা ধর্ম প্রসঙ্গে প্রবন্ধাবলীর মধ্যে 'সমাজতন্ত্র ও ধর্ম' প্রবন্ধটি এই প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য।  এখানে তিনি বলছেন - "ধর্মকে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার বলে ঘোষণা করা উচিত। এই উক্তিতেই সাধারণত ধর্ম সম্পর্কে সমাজতন্ত্রীদের মনোভাব স্পষ্ট হয়।..... রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা ধর্মকে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার বলে বিবেচনার দাবী করছি। ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো গরজ থাকা চলবে না এবং ধর্মীয় সংস্থাসমুহের রাষ্ট্রের ক্ষমতার সাথে জড়িত থাকা চলবে না। যে কোনও ধর্মে বিশ্বাস  অথবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না রাখার অধিকারে সবাই থাকবে স্বাধীন।''

এই প্রবন্ধেই তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন - কেন কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদের পার্টি কর্মসূচীতে নাস্তিকতাবাদ ঘোষণা করেনি এবং কেন তা উচিত নয়। স্থানাভাবে সমগ্র উদ্ধৃতি উল্লেখ করলাম না, আগ্রহী পাঠকরা সমগ্র প্রবন্ধটি পড়ে দেখতে পারেন।

এই প্রসঙ্গে ফিডেল কাস্ত্রোর সাথে ব্রাজিলিয় ধর্মতাত্ত্বিক ফ্রেই ব্রিট্টোর একাধিক সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ের উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবেনা। ১৯৮৫ সালে 'ফিডেল এন্ড রিলিজিয়ন' নামে এই বইটি প্রকাশিত হয়। 

কিউবার বিপ্লবের পর স্পেনের ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সাহায্য করার জন্য সেই দেশের চার্চের প্রধানদের বিতাড়িত করেছিল নতুন বিপ্লবী সরকার। কিন্তু ধীরে ধীরে চার্চের ভূমিকার পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই দেশের সমাজতান্ত্রিক সরকারও তাদের পরিবর্তিত অবস্থান ঘোষণা করে। ১৯৯২ সালে স্বঘোষিত নাস্তিকদের দেশ কিউবা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বলে ঘোষণা করে। 

'আজকের যুগে যীশু জন্ম নিলে তিনি অবশ্যই আমাদের বিপ্লবীদের মতই প্রচার করতেন' - একথা ফিডেল ১৯৯৮ সালে বলেছিলেন। 

কমিউনিস্ট পার্টি রাষ্ট্র ও ধর্ম প্রতিষ্ঠানের পৃথক অস্তিত্বের কথাই বলে। কেউ কারোর কাজে নাক গলাবে না, এটাই আধুনিক রাষ্ট্রের মূল কথা - এটাই মনে করে কমিউনিস্টরা।

যারা এতদিন কমিউনিস্টদের নাস্তিক, ধর্ম বিরোধী বলে প্রচার করতো, তারাই এখন ধর্মীয় মানুষের সাথে কেন কমিউনিস্টরা হাত মেলাচ্ছে বলে গলা ফাটাচ্ছে। সত্যি কি বিচিত্র এদের প্রচার!!!

আমার মা ধার্মিক ছিলেন। নিয়মিত পূজা আর্চা ধর্ম পালন করতেন। কিন্তু তাতে আমাদের বাড়িতে আসমাদি'র কাজ করতে কোনো সমস্যা হয়নি। ওর রাঁধা ভাত আমরা দিব্যি পেটপুরে খেয়েছি। আসমাদি আমাদের বাড়ির ঠাকুর ঘরের সামনেই নমাজ পড়তেন, মা'কে কোনোদিন আপত্তি করতে শুনিনি। আমার মা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, ছিলেন ধার্মিক।

তাই ধর্মাচরণে অভ্যস্ত বা ধর্মীয়যাজকদের সাথে পথ চলতে অসুবিধা কিসের, যদি তিনি স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরোধী হন?

যোগী আদিত্যনাথেরা ধর্ম পালন করেনা, ঘৃণার আগুন ছড়ায়। বিজেপি স্পনসর্ড ভোগ বিলাসে মত্ত 'বাবা রামরহিম বা আশারাম বাপু'-রা ধর্মের নামে ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা কামায়। নরেন্দ্র মোদি ধর্মকে ব্যবহার করেন ক্ষমতা দখলের জন্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এর ব্যতিক্রম নন।

আর এদের সমর্থক বাহিনী প্রশ্ন তুলছে - কেন পীরযাদা ব্রিগেডে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই ত্রিশক্তির মিলনে বিজেপি-তৃণমূল আর এদের ক্ষমতায় রাখতে মরীয়া কর্পোরেটরা কেন থরহরিকম্প। এতদিন প্রচার চালাচ্ছিল - বিজেপি তৃণমূলের বিকল্প কেউ নেই, তাই অপছন্দ হলেও বাঁ হাতে মনসা পূজার মতো এই দুজনের কাউকে একটা ভোটটা দিয়ে দিন।

এখন প্রকৃত বিকল্প সামনে উঠে আসছে। যারা ধর্ম জাতপাতের বদলে কাজ, শিক্ষা, গণতন্ত্র,  সংবিধান স্বীকৃত অধিকারগুলোর বাস্তবায়নের দাবী করছে। 

এতদিন মুসলমানদের সামান্য কিছু ইমাম-মোয়াজ্জেম ভাতা ধরিয়েই ঠান্ডা রেখে দিব্যি এদের ভোট পকেটস্থ করতে পারছিল তৃণমূল। মুসলমানদের জুজু দেখিয়ে হিন্দুদের ভোটটাও পাচ্ছিল বিজেপি। কিন্তু ভাত-রুটি-কাজ- অধিকারের দাবী তুলে সব ঘেঁটে দিয়েছে *সংযুক্ত মোর্চা*। তাই  দেশের লগ্নি পুঁজির ধারক বাহকেরা কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে, শিশু অবস্থাতেই একে হত্যা করতে।

এতদিন জাতপাত ধর্ম দিয়ে বেশ ভুলিয়ে রাখা গেছিল সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এই অংশকে। কিন্তু বামপন্থীরা এদের ভাত-কাপড়-কাজ-অধিকারের লড়াইতে এনেছে। দেশের মূল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারায় সম্পৃক্ত করার চেষ্টায় নেমেছে সিপি আই(এম)। হ্যাঁ, এটাই মূল কাজ এখন বামপন্থীদের। জড়ো করো বঞ্চিত, অত্যাচারিত, লাঞ্চিত সব মানুষকে, নিজের হক বুঝে পাওয়ার লড়াইতে।

ওরা চেয়েছিল - বামপন্থীরা ছুৎমার্গ দেখিয়ে এদের দূরে সরিয়ে রাখুক। ছূঁয়ো না ছুঁয়োনা ছিঃ, ও যে চন্ডালিকার ঝি - এই মন্ত্র বামপন্থীরা গেলেনি কোনোদিনই। কিন্তু  বামপন্থীদের থেকে সুকৌশলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল এই নিপিড়ীত মানুষদের। যেই ওদের ছলা-কলা- কৌশল বুঝে আদিবাসী, তপশিলি জাতি-উপজাতি, সংখ্যালঘুরা নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াইয়ের সাথী হিসেবে বামপন্থীদের বেছে নিয়েছে - তখনই শুরু হয়েছে মিথ্যার নির্মান। 

যে সমস্ত স্বঘোষিত বামপন্থীরা প্রশ্ন তুলছেন কেন ধর্মীয় নেতার সাথে হাত মেলাচ্ছে সিপি আই(এম), তাঁরা কি ইতিহাস ভুলে গেছেন, না কি ইচ্ছে করে বলছেন না সেই অধ্যায়গুলো। সারা ভারত কৃষক সভার প্রথম সভাপতির নাম ছিল -   স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী। ১৯২১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের এলাহাবাদ অধিবেশনে প্রথম পূর্ণ স্বরাজের দাবী তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে উত্থাপন করেছিলেন কারা? একজন মৌলানা হসরৎ মোহানী এবং অপরজন স্বামী কুমারানন্দ। এইসব ইতিহাস ওরা আলোচনা করবে না, কারণ বকলমে তৃণমূলের হয়ে ঠিকেদারির অগ্রীম গ্রহণ  করে ফেলেছে এইসব স্বঘোষিত বামপন্থীদের অনেকেই।

তবে একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদের সাথে লড়াইটা হবে দীর্ঘ। লম্বা পথ। এই পথে চলতে গিয়ে অনেকেই আসবে। সবাই যে শেষ পর্যন্ত থাকে বা থাকতে পারবে, তার কোনও মানে নেই। এ অনেকটা দিল্লি গামী ট্রেনের মতো। হাওড়া থেকে ওঠা সব যাত্রী দিল্লি যায়না। অনেকে মাঝপথে নানা স্টেশনে নেমে যায়, আবার মাঝপথেই অন্য যাত্রী ওঠে। এই ওঠানামা চলতেই থাকে। সবাই দিল্লি পর্যন্ত যায়না। এই লড়াইয়ের দীর্ঘ পথেও তাই হয়।

সাবধান! অনেক ঝানু লোক মিত্র সেজে ঘুরছে সদ্যগঠিত *সংযুক্ত মোর্চা* ভেঙে দেওয়ার জন্যই। কেউ টাকার থলে নিয়ে, কেউ পরামর্শ দেওয়ার ছলে, কেউ বা নারদের ভূমিকায়। 

পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতার মতো পাশ কাটিয়ে, কথা খেলিয়ে, কিছু কথা পেটে কিছু কথা ঠোঁটে,  আর অন্য কিছু মাথায় রেখে কথা বলা এখনো আয়ত্ব করে উঠতে পারেন নি, রাজনীতিতে নবাগত আব্বাস সিদ্দিকী। তাই একে দিয়ে ঐক্য বিরোধী কথা বলিয়ে নেওয়ার জন্য ঝানু সাংবাদিকদের লাগিয়ে রেখেছে কর্পোরেট মিডিয়া। সতর্ক অবশ্যই থাকতে হবে সংযুক্ত মোর্চার অন্তর্ভুক্ত সব কটি দলের নেতাদেরই। 

তবে হ্যাঁ মনে রাখতে হবে সংযুক্ত মোর্চায় অনেক দল আছে। তাই সব প্রশ্নে সবাই একমত হবে কেন? তাহলে তো একটা দলেই সবাই মিশে যেত। সবাই একমত হয়েছে - তৃণমূলকে হটিয়ে,  বিজেপিকে ঠেকিয়ে নতুন বাংলা গড়তে হবে, আগামীর জন্য।

তৃণমূল বা বিজেপি তো নিজেদের মধ্যেই মারামারি খুনোখুনি করে। ওদের সভা মানেই চেয়ার টেবিল ভাঙার প্রতিযোগিতা। আর এতগুলো দল নিয়ে সংযুক্ত মোর্চার প্রথম কর্মসূচী ছিল ব্রিগেড সভা। ১০লাখ লোক নিয়ে এমন সুশৃঙ্খল সভা করার হিম্মত আছে নাকি বিজেপি বা তৃণমূলের!!

এখন সুবর্ণ এক সুযোগ ও অধ্যায় সৃষ্টির মুখে বাংলা। জাতপাত ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে ভাত-রুটি-কাজ- অধিকারের দাবীতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে সংযুক্ত মোর্চা। এই ঐক্য অটুট রাখার দায় যেমন নেতাদের, তেমনি কর্মী-সমর্থকদেরও। মানুষের জন্যই এই ঐক্য অটুট রাখতেই হবে। ব্রিগেডের লড়াই নিয়ে পৌঁছে দিতেই হবে বাংলার পাহাড় থেকে সুন্দরবনের প্রতিটি বুথে। আগামী ২টো মাস ঐক্য আর সংগ্রামের মাস।

শমীক লাহিড়ী 
২রা মার্চ, ২০২১

রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

ভাষা বিদ্বেষ ~ সৌরদীপ চ্যাটার্জী

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা পৃথিবীর সমস্ত মাতৃভাষার দিন আজ—ঊনসত্তর বছর আগে যার পথ দেখিয়েছিল একদল বাঙালি ছাত্র। ভাষা বড় বিচিত্র এক বস্তু, বিচিত্র তার ইতিহাস। বোধ হয় তার থেকেও বিচিত্র হল—তাকে নিয়ে ঝগড়া করা। মজার কথা হল, এই ঝগড়া করতে গেলেই প্রায়ই সেমসাইড গোল হয়ে যায়। অথচ আমরা খেলাটা এতই কম বুঝি যে, ওতেই ধেই ধেই করে নাচতে থাকি, বুঝিও না যে বল কোন পোস্টে ঢুকল। চলুন সেরকমই কিছু গল্প হোক একটু।

আজ থেকে এক হাজার বছর আগে হিন্দুকুশ পেরিয়ে ভারতে অভিযান চালিয়েছিলেন মুহম্মদ ঘুরী, তার পাঁচশো বছর পরে বাবর। আজ একশ্রেণির বাঙালি রোজ ভয়ে দিন গুনছেন, এই বুঝি সেইরকম কোনও সৈন্য ইছামতী পেরিয়ে বনগাঁর দিকে ধেয়ে আসে। তাঁরা সেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে চোলায় চোলায় জয়ের ভেরি বাজাতে চান। ফলে বাংলায় কেন আরবি শব্দ থাকবে, কেন ফারসি থাকবে, 'পানি' বলা হবে, কেন 'গোসল' শব্দটি থাকবে—সেসব নিয়ে ঘোর আপত্তি তুলছেন। খুবই সঙ্গত দাবি। তবে তাহলে বোধ হয় তাঁদের উচিত, আইনকানুনের জন্য উকিলের কাছে না যাওয়া, মহকুমা কোনটা সেটাও না দেখা, অন্যকে হাজতবাসের ভয় না দেখানো বা কলকাতার বাইরে কোনও জেলার বাসিন্দা হলে সেটাও না বলা। কেননা—'আইন', 'কানুন', 'উকিল', 'মহকুমা', 'হাজত', 'জেলা' (দিলা) ইত্যাদি সবই আসলে আরবি শব্দ। আপনি ইংরেজিতে পেন না বলে বাংলায় কলম বলুন, সে কলমও আসলে আরবি। কাউকে বিদায় দিতে চাইবেন, সেই 'বিদায়'-ও আরবি। আমার কথা নয়, স্বয়ং সুকুমার সেন 'ভাষার ইতিহাস' বইতে এসব লিখে গেছেন। চাইলে কোনও অভিধান খুলেও শব্দমূল দেখে নিতে পারেন।

শুধু কি তাই? আপনি যে শব্দের আগে বসান 'আম-আদমি', 'আমজনতা', 'খাসজমি', 'খাসমহল'—সেই আম বা খাস সবই আরবির দেওয়া। গরম লাগলে যে একটু হাওয়াবাতাস গায়ে লাগাবেন তারও উপায় নেই। 'হাওয়া' আরবি; 'বাতাস' ফারসি। এদিকে আপনি যদি সংস্কৃত শব্দটা ধরে বলেন, একটু 'বায়ু' খেতে যাচ্ছি; পাবলিক অন্যকিছু ধরে নেবে। বায়ুত্যাগ বললে আরও জ্বালা, লোকে গ্যাস ছাড়া ধরে নিয়ে নাকে রুমাল দিতে পারে। সেই যে রবীন্দ্রনাথের উপেন বলেছিল, 'শুধু বিঘে দুই, ছিল মোর ভুঁই...', ব্যাস, তারপর আর কেউই ভুঁই (তদ্ভব) কেনে না, সবাই 'জমি' (ফারসি) কেনে। তা, জমি থাকলে একটা বাগানবাড়িও তুলে ফেলতে পারেন। ওহো, আবার গোলমাল হল—'বাগান' তো তুর্কি। আপনাকে 'উদ্যানবাটী' বানাতে হয় তাহলে। দেখবেন, বানান ভুল করবেন না যেন! অবশ্য বাগানবাড়ি তুলতে খুবই খরচ। এই 'খরচ' আবার ফারসি। খরচ বেশি না করাই ভাল যদিও। অমুক ডেটে অমুক খরচা বলে অনেকে হিসেব করে। অবশ্য ডেট আবার কী, আজ মাতৃভাষা দিবস, বলুন, তারিখ। কিন্তু এও এক জ্বালা... 'তারিখ' আবার আরবি। দোকানে জিনিসপত্র দর করবেন, সেই 'দর'-ও তাই, আরবি। 'দোকান'—ফারসি। কী জ্বালা বলুন দিকি!

সবচেয়ে বড় কথা, এই যে 'পানি'-র বিরুদ্ধে জিহাদ করছেন...সরি, যুদ্ধ করছেন, সে পানি আদপেই আরবি নয়, তা সংস্কৃত 'পানীয়' থেকেই এসেছে। 

এমনকি আরবি-ফারসি ঠেকাতে এই বোদ্ধা এবং যোদ্ধারা যার হাত ধরছেন, সেই হিন্দিতেই কি সমস্যা কম? কম তো নয়, বরং বেশি—বাংলার চেয়ে হিন্দির অনেক বেশি শব্দ আরবি-ফারসি থেকে নেওয়া। বেশিদূর যেতে হবে না, এই যে গান করেন, 'অগর' তুম মিল যাও, এই 'অগর' (যদি) এসেছে ফারসি থেকে। অমিতাভের ব্লগবাস্টার সিনেমা দিওয়ার—শব্দটা আসলে ফারসি। 'শহর' ফারসি, 'নগর' সংস্কৃত। 'হাম আভি জিন্দা হ্যায়'—সেই 'জিন্দা' ফারসি, 'কুদরত' আরবি, 'দুনিয়া'—বাংলা হিন্দি উভয়েই আছে—আরবি। 'গুজরনা' ফারসি, 'বাবু কো কুর্সি দো'—এই কুর্সি আরবি। 'ওয়াক্ত' (সময়)—আরবি, 'তকরীবন' (ওই মোটের ওপর), 'মুশকিল', 'খবর', 'অখবর' (বহুবচন), 'মহব্বত', 'বিলকুল', 'আখির', 'আজিজ', 'ফিলহাল' (বর্তমানে), 'মওত' (মৃত্যু), 'সহি', 'ইজাজত' (অনুমতি)—এসবই হল আরবি থেকে আসা। বল মা তারা, দাঁড়াই কোথা—!

আমাদের দেশে ঝালে-ঝোলে, অম্বলে, ডায়োভলে, প্যানফর্টিতে ধর্ম গুঁজে দেওয়ার রীতি আছে। ফলে এইভাবেই ভাষার সঙ্গেও ধর্মকে ভিড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হিন্দি হিন্দুর ভাষা, উর্দু মুসলমানের ভাষা, বাঙালি না মুসলমান—ইত্যাদি অনেক কিছুই চলে। এ' অবশ্য আজকের নয়, বহুদিনের। ১৮৭৭ সালে ভরতেন্দু হরিশচন্দ্র—যাঁকে বলা হয় আধুনিক হিন্দি ভাষার জনক—তিনি একে প্রায় গণ-অভ্যুত্থানের রূপ দিয়েছিলেন। তার আগে অবধি উত্তরপদেশে—তৎকালীন যুক্তপ্রদেশে উর্দুই ছিল সরকারি ভাষা, দপ্তরের ভাষা। পরে ব্রিটিশের আগমনে ইংরেজি এসেছিল সঙ্গে। অথচ মজার কথা, হিন্দি বা উর্দু আসলে একই ভাষার দুই সন্তান, যাকে বলে হিন্দুস্তানি। এই হিন্দুস্তানি বা হিন্দভি ভাষাই ছিল যুক্তপ্রদেশ থেকে রাজপুতানার এক বিরাট অংশের ভাষা। আঠারো শতকের আগে সম্ভবত 'উর্দু' বলে কোনও শব্দের অস্তিত্বই ছিল না। উর্দু আরবের ভাষা নয়, পারস্যের ভাষা নয়, এমনকি আফগানিস্তানের ভাষাও নয়। উর্দুর জন্ম এদেশে, এই ভারতবর্ষেই। তাও একেবারে ভারতের মধ্যভাগে, গাঙ্গেয় সমভূমিতে। বাংলা, ওড়িয়া, তামিল, অসমীয়ার মত উর্দুও একটি খাঁটি ভারতীয় ভাষা।

উর্দু সম্পর্কে এও বলা হয়—উর্দু নাকি 'লস্করি জবান'—অর্থাৎ সৈনিকের ভাষা। কারণ অনেকে মনে করেন, উর্দুর জন্ম হয় মুঘল সৈন্যবাহিনীতে। এ মতও আজ আর চলে না। উর্দু বলে যা আমরা চিনি, সেই হিন্দুস্তানির জন্ম ভারতীয় অপভ্রংশ অবহটঠ থেকেই। মুঘলযুগের আগেও এর অস্তিত্ব ছিল, স্বয়ং আমির খসরুও এই ভাষাতেই কাব্যচর্চা করেছেন। 

হিন্দিকে আজ মানা হয় হিন্দুর ভাষা বলে, পবিত্র ভাষা বলে। হিন্দি কীভাবে পবিত্রতা পেল তা অবশ্য জানা নেই। তবু বহু বঙ্গসন্তান আজ পশ্চিমবঙ্গকে আরব-পারস্যের দস্যুদের হাত থেকে বাঁচাতে হিন্দিতে কথা বলার পথ ধরছেন। যদিও এও আজকের কথা নয়। ১৯২৯ সালে বেরিয়েছিল 'হিন্দি সাহিত্য কা ইতিহাস', লেখক বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা পণ্ডিত আচার্য রামচন্দ্র শুক্লা। তিনিই অত্যন্ত সুচারুভাবে হিন্দিকে সংস্কৃতের উত্তরসূরি হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন এবং উর্দুর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। মজার কথা, 'হিন্দি' শব্দটাই আসলে সংস্কৃত নয়, সম্ভবত বৈদিকও নয়। 'হিন্দি' এসেছে ফারসি থেকে, যার অর্থ হিন্দের অধিবাসী। এমনকি 'হিন্দু' শব্দটিও তাই—পারস্যের। বেশিদূর যেতে হবে না, এনসিইআরটির সরকারি বইতেই এই তথ্য মিলবে, স্কুলে পড়ানো হয়।

উর্দু নিয়েও সে কি টানাটানি! দেশভাগের পর স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হল, তার অফিশিয়াল ভাষা করা হল উর্দুকে। অথচ পাকিস্তান যে যে অংশ নিয়ে তৈরি, তা হল সিন্ধ—যার ভাষা সিন্ধ্রি, পশ্চিম পাঞ্জাব—যার ভাষা পাঞ্জাবি, বালোচিস্তানের একাংশ—যার ভাষা বালোচ, খাইবার পাখতুনখোয়ার ভাষা পশতো এবং এদিকে পূর্ব বাংলা—যার ভাষা বাংলা। এছাড়া দুইদিকেই রয়েছে প্রচুর ছোটোখাটো ভাষাগোষ্ঠী। আজও গোটা পাকিস্তানের সম্ভবত ১০%-এরও কম লোকের মাতৃভাষা উর্দু। তারপরেও উর্দুই পাকিস্তানের 'লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা'—ইসলামের প্রতীক। এ এক বিচিত্র প্যারাডক্স! পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্না নিজেও এর চেয়ে কম বৈচিত্র্যময় ছিলেন না। জিন্না নিজে খিলাফত আন্দোলনেও যোগ দেননি, কোনোদিন দাড়ি রাখেননি, বিবাহ করেছিলেন এক অমুসলিমকে এবং শোনা যায় কোনোদিন নাকি নমাজ অবধি পড়েননি। এককালে ছিলেন কামাল আতাতুর্কের ভক্ত। অথচ সেই তিনিই পরে দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রচার করলেন।

আরও একটা কথা কী জানেন? আমাদের দেশের প্রথম ফারসি সংবাদপত্র দিল্লি, হায়দরাবাদ, লাহোর বা আগ্রাতে নয়, প্রকাশিত হয়েছিল এই কলকাতায়। নাম ছিল—'মীরাট-উল-অখবর'। প্রকাশক কোনও মুঘল বা পাঠান ছিলেন না। তাঁর নাম ছিল রামমোহন রায়। ভাষাবিদ সুকুমার সেন যার সম্পর্কে লিখেছেন, "তিনি সংস্কৃত জানিতেন, ফারসী (এবং আরবীও সম্ভবত) আরও ভাল করিয়া জানিতেন, তিনি ভারতবর্ষের ইংরেজি শিক্ষিতদের অগ্রণী।..." 

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তাই ভাষা নিয়ে আবেগের পাশাপাশি কিছু সহজ সত্যিকেও জেনে রাখা জরুরি। নিজের দেশকে নিয়ে গর্বিত হওয়াই যায়, কিন্তু সেই গর্বের কারণগুলো ঠিকমত বেছে নিতে পারলে আরও ভাল হয় আরকি। বেদে সব আছে, পুরাণে সব আছে, মহাভারতে প্লাস্টিক সার্জারি ছিল, দুধে সোনা পাওয়া যায়—এসবের চেয়েও জানা জরুরি সেই সব দিকগুলো, যেদিক দিয়ে সত্যিই "এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি!" ভারতবর্ষই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যাতে বাইশটা সরকারি ভাষা আছে। ২০১১ সালের জনগণনায় দেখা গেছে, ভারতে ১৯,৫৬৯-টি মাতৃভাষা আছে! এরকম ভাষার বৈচিত্র পৃথিবীতে ইন্দোনেশিয়া ছাড়া আর দেখা যায় না। তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচশোটা ভাষা বিলুপ্তির পথে। আজ এক কেন্দ্রীয় শক্তি দেশে হিন্দিকেই জাতীয় ভাষা করার দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ ভারতের কোনও 'ন্যাশনাল ল্যাঙ্গোয়েজ' নেই। তাই সর্বত্র সুচারুভাবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ আমরা ঝগড়া করছি, কেন বাবাকে 'আব্বা' বলব। মজার কথা, এই 'আব্বা' শব্দটি আরবি ভাষাটার চেয়েই অনেক পুরনো, সম্ভবত প্রায় এক হাজার বছরেরও বেশি। আরও মজার কথা, এই শব্দের উৎস সম্ভবত সেমিটিক, যা থেকে হিব্রু বাইবেলে ঈশ্বর বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছিল। এই যে আমরা খুব মান্যগন্য কাউকে বোঝাতে 'বাবা' বলি, সেই বাবা এসেছে ফারসি থেকে, আবার বাংলায় পিতা অর্থে বাবা এসেছে সংস্কৃত 'বপ্র' থেকে। ঝগড়া করতে গিয়ে যেন নিজের পায়ের দিকে খেয়াল রাখি, কুড়ুলটা কোথায় পড়ছে।

ওই যে বললাম, ভাষা বড় বিচিত্র। আমরা তাস পেটাই, অথচ জানি না যে 'হরতন', 'রুইতন' আসলে আর্জেন রবেন, ভ্যান ডার সরের দেশ থেকে এসেছে। বালতি বালতি জলে স্নান করি, করে জামা পরে বোতাম আটকাই, তারপর বাসনে খাওয়াদাওয়া করি, খেয়ে তোয়ালেতে হাত মুছি—এই 'বালতি', 'বোতাম', 'বাসন', 'তোয়ালে' ইত্যাদি সবই আসলে এসেছে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর দেশ থেকে। এমনকি আমরা বাংলায় ডাচদের 'ওলন্দাজ' বলি, এই 'ওলন্দাজ' শব্দটিও আসলে এসেছে পোর্তুগিজ 'holandes' থেকে। বিশ্বাস না হলে গুগল ট্রান্সলেটে দেখে নিন। বরং এই রোববারের সন্ধ্যেতে একটু চা খেতে খেতেই দেখুন না হয়। চা হল সেই কয়েকটা বস্তুর একটি, পৃথিবীর বেশিরভাগ ভাষাতেই যার প্রতিশব্দ একই। জাপানি, চিনে, কোরিয়ান, হিন্দি, বাংলা, তুর্কি, ইউক্রেনিয়ান, গ্রিক, পর্তুগিজ, গুজরাতি, আরবি, পাঞ্জাবি, উজবেক ও রুশ ভাষায় চায়ের প্রতিশব্দ চা/চায়ে/চায়/চ'! এদিকে ইংরেজি, লাতিন, হিব্রু, কাতালান, বাস্ক, জার্মান, ফরাসি, এস্তোনিয়ান বা মালয় ভাষায় বলে টি/টে।

শুক্রবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

এসএফআই ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

"ঐশীদের দাঁড় করাবেন শুনলাম। মহিলা প্রার্থী ? ছোহ্ এদের দিয়ে আর কিস্যু হবে না দাদা। এত সব বড় বড় ভাষণ, অমুক সে আজাদী, তমুক সে আজাদী। খালি ওই জেএনইউ ক্যাম্পাসের মধ্যে লাফ ঝাঁপই সার। এবারে ক'টা সিট জিতবেন? আরে জিতবেন কি, নোটার থেকেও কম ভোট পাবেন। ওসব ঐশী টইসির কম্ম নয়। এ লড়াই অন্য লড়াই। বুইলেন দাদা।"

সত্যিই তো। সারাদিন কাজের শেষে মন খারাপ।খালি মাঝে মধ্যে ক্লান্ত মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজলে একটা মেয়ের মুখ ভেসে আসে, বড় বড় চোখ, মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ। সত্যিই হল না আর। এ লড়াই অন্য লড়াই। 

চোখ বুঁজে থাকুন। খুলবেন না। আস্তে করে আপনাকে এমনি একটা জায়গায় নিয়ে যাবো। একবছর আগের একটা জায়াগায়। কোন জায়াগায় ? ধৈর্য্য হারাবেন না। আসুন আমার সাথে। চারদিকে ক্ষেত, আর সবুজ জঙ্গল। দূরে একটা কালো পাহাড়। চা এর বাগান। কিছু খোলা, কিছু বন্ধ। দু'চারটে বাড়ি। কাঠের দেয়াল, টিনের চাল। সেই ঢালু চাল বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা। আমার মাতৃভূমি। 

তেমনই একটা ঘরে আবছা আলোয় মেঝেতে চাটাই পেতে গুটিকয় ছেলে মেয়ে। মিটিং করে ওরা। গাল ভরা নাম আছে, "সম্মেলন"। মিটিং শেষে সাদার মধ্যে লাল তারা আঁকা পতাকা হাতে ওদের ছবি ওঠে সস্তার মোবাইলে। জাফরীকাটা রোদের আলোয়। ছবিটা তোলার আগে আধা পেটা খাওয়া অপুষ্টিতে শীর্ন মুখগুলো তে অদ্ভুত হাসি। ওরা স্লোগান তোলে, "স্বাধীনতা, গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র জিন্দাবাদ।"

ওরা মানে ? হ্যাঁ, এইবার চোখ খুলতে পারেন। চোখ খুলে দেখে নিন, ওরা মানে শবনম, প্রিয়াঙ্কা, অঞ্জলি , স্বপ্না আর দীপা। ওরা স্লোগান তোলে, "ঐশী দিদি করো লড়াই, সাথে আছি আমরা সবাই"। স্লোগানের দমকে ছেঁড়া ফ্রকে লাগানো সেফটিপিনটা খুলে আসে, আবার লাগিয়ে নেয়। আবার স্লোগান দিতে হবে যে। লড়াই এর স্লোগান। ঠিকই বলেছেন একদম। এ লড়াই অন্য লড়াই। এ লড়াই জিততে হবে। লড়াই এর মানেটা কেবল বুঝে নিতে হবে।

ছবি: এসএফআই এর বীরপাড়া চা বাগান ইউনিট। কমঃ শবনম খাতুন (সভাপতি), কমঃ প্রিয়াঙ্কা মহাজন (সহ সভাপতি), কমঃ অঞ্জলি খাড়িয়া (সম্পাদক), কমঃ স্বপ্না কেরকেট্টা (সহ সম্পাদক), কমঃ দীপা লাকড়া (পত্রপত্রিকা)। এক বছর আগে।

মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

EIA2020, উত্তরাখন্ডের বিপর্যয় এবং... ~ সংগ্রাম চ্যাটার্জী

২০২০ সালে লকডাউনের মধ্যেই একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিল কেন্দ্রের BJP সরকার— পরিবেশ সংক্রান্ত আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের ভাবনাটাকেই নস্যাৎ করে দেওয়ার সরকারি বন্দোবস্ত করার জন্য ড্রাফ্ট্ EIA2020 পেশ করে!
এ'নিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত দেওয়ার সুযোগ সংকুচিত করার প্রতিবাদে বহু মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এবং বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে আদালতের দারস্থ হন, যার পরিনতিতে ২০২০'র ১১ আগস্ট পর্যন্ত মতামত দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় এবং বহু মানুষ (প্রায় ১৭ লক্ষ!) এই প্রশ্নে কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধেই মতামত দেন। 
যদিও তারপর গোটা প্রক্রিয়ার ফলাফল সামনে আসে নি, অন্ততঃ আমার কাছে! আর, এই সময়েই ঘটে গেল গতকালের উত্তরাখন্ডের ভয়াবহ ঘটনাটা! 

* EIA কী? 
পুরো কথাটা: Environment Impact Assessment, বাংলা করলে দাঁড়ায় পরিবেশের উপর প্রভাবের পরিমাপ।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, কোনও একটি ডেভেলপমেন্টাল প্রজেক্ট বা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রকৃতি আর পরিবেশ কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেই সম্ভবনা আগেভাগেই জরিপ করে নেওয়া হয়৷ কারণ প্রকৃতি বা পরিবেশের ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী কোনও বিপদ ডেকে আনতে পারে৷ তাই, উন্নয়নকে টেকসই করার আগে দরকার উপযুক্তভাবে প্রকৃতি, পরিবেশের ওপর তার সুদূরপ্রসারী প্রভাবের ঠিকঠাক অ্যাসেসমেন্ট! সেইটে করা হলেই, কোনো উন্নয়নমূলক প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবুজ সংকেত পাওয়া যায়৷ এই অ্যাসেসমেন্টে প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের চরিত্র যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনই একইভাবে প্রজেক্ট সাইটে বসবাসকারী লোকজন, জীববৈচিত্র্য এবং সামগ্রিকভাবে বাস্তুতন্ত্রের ওপর এর প্রভাবও এই অ্যাসেসমেন্টে বিবেচনা করা হয়৷ যাতে করে প্রকৃতি-পরিবেশকে যথাসম্ভব বাঁচিয়ে কার্যত একপ্রকার টেকসই উন্নয়নকে বা স্থিতিশীল উন্নয়নকে নিশ্চিত করা যায়।

* সমস্যা কী কী?
খুব বেশি কথায় না গিয়ে আরেকবার এই পাঁচটা পয়েন্টে একটু নজর দিন:
১) Post - Facto clearance! 
অর্থাৎ পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই কোনো প্রকল্পের কাজ চলতে পারে। ড্রাফ্ট অনুযায়ী এই ক্লিয়ারেন্স কাজ শুরুর পরেও পাওয়া যেতে পারে (যদিও এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্ট একটি জাজমেন্টে একে ভুল এবং এমন আইন করা উচিৎ নয় বলে জানিয়েছে)।

২) কোনও একটা প্রজেক্ট নিয়ে সংশ্লিষ্ট মানুষদের বক্তব্য নথিভুক্ত করে পাবলিক হিয়ারিংয়ের সময় ক্রমাগত কমিয়ে এনে (এর আগে এর সময় ছিল ৩০ দিন, এখন ২০ দিন) বিষয়টা যথাসম্ভব গোপনে পাশ করার চেষ্টা! 

৩) নতুন ড্রাফট অনুযায়ী, যদি কোনো প্রকল্প পরিবেশ আইনকে উলঙ্ঘন করে তবে সাধারণ মানুষের অধিকার নেই সেটা চিহ্নিত করার বা সেটি নিয়ে কোনো অভিযোগ জানানোর। যদি উলঙ্ঘন হয় তবে শুধুমাত্র উলঙ্ঘনকারী (প্রকল্পকারী) বা সরকার বলতে পারে সেটা। 
ভাবুন— খুনি খুন করে এসে নিজেই বলবে— খুন করে ফেলেছি স্যর! 😀

৪)  কোনও প্রজেক্টের সাথে জাতীয় নিরাপত্তার কোনও সম্পর্ক না থাকলেও সরকার যেকোন প্রজেক্টকেই স্ট্র্যাটেজিক প্রজেক্ট বলতে পারে, আমি আপনি সেক্ষেত্রে কিস্যু বলতে পারবোনা। 
আর, এ'তো জানা কথাই যে— মহামান্য(!) সরকার যে কোনও প্রজেক্টকেই স্ট্র্যাটেজিক প্রজেক্ট বলে দিতে পারে! 

৫) ড্রাফটে বর্ডার এরিয়ার সংজ্ঞা দিয়ে যা বলেছে তার মানে দাঁড়ায় সীমান্ত থেকে মোটামুটি ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সমস্ত অঞ্চল! এবং এই অঞ্চলে কোনো এধরনের কাজে জনতার মতামত নেওয়া হবে না! মানে! 
মোদ্দা কথা পুরো গাড়োয়াল কুমায়ূণ হিমালয় থেকে শুরু করে একদম উত্তর পূর্ব হিমালয়ের ঘন জঙ্গল ওদের টার্গেট! এমনকি চাইলে সুন্দরবনও! যেখানে যতটুকু জঙ্গল বেঁচে ছিল নজর এখন সেইদিকে! 

আপাততঃ এইটুকুই থাকল।
এবার আপনি মিলিয়ে নিন গত কয়েক বছর ধরে কী কী চলছে গোটা দেশ জুড়ে!

আচ্ছা, সময়ের অভাবে না হয় গোটা দেশের কথা বাদই দিলাম। বাদ দিচ্ছি ছত্রিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওডিশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, সিকিম জুড়ে যা চলছে— সেই সব। 
শুধু এই উত্তরাখন্ড রাজ্যে 
১) নামে ৩৩ টা হলেও আদপে শতাধিক হাইড্রলিক প্রজেক্টের কাজ চলছে বা শুরু হয়েছে!! এবং এতে কোন নদী বাদ আছে? কেউ না!
হিমালয়ের দুর্গম ভুখণ্ডে 'উন্নয়ন' এর নাম করে একটার পর একটা তাগড়া প্রজেক্ট আদপে ভারী হয়ে দাঁড়িয়েছে গোটা বাস্তুতন্ত্রটার ওপরেই!
এই যে ঋষিগঙ্গার উপরের যে প্রজেক্টটা জলের তোড়ে কার্যত ভেসে গেল, এটা নিয়ে পরিবেশবিদরা আপত্তি করেন নি? করে গেছেন! কিন্ত ঐ কাকস্য পরিবেদনা! কাজ চলেছে! শুধু চলেছে না, আরো দ্রুততার সাথে চলেছে! মরছে কারা? গরীব মানুষ। শ্রমিকরা। 

২) ২০১৬ সালে শুরু হল প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রজেক্ট— #চারধাম_প্রকল্প! মনে রাখা দরকার, এর আগেই ২০১৩ সালে ঘটে গেছে কেদারনাথে সেই ভয়াবহ ঘটনা! তার পরেও ঐ ২০১৬ থেকে শুরু হল যমুনোত্রী, গঙ্গোত্রী, কেদারনাথ ও বদ্রিনাথকে চওড়া সড়কপথে নতুন করে জোড়বার কাজ! শুরু হল পাহাড় ফাটিয়ে অবাধে রাস্তা চওড়া করার অপকাণ্ড! 
কোর্ট বলছে প্রস্থ কমাও! কে শোনে কার কথা! প্রায ৪৭ হাজারেরও বেশি গাছ কাটা হল! ধ্বংস হয়ে গেল ৭০০ হেক্টর বনাঞ্চল! 
শুধু ২০২০ সালেই এই প্রকল্পের রাস্তা জুড়ে ৬টা বড় বড় ধ্বস নেমেছে! মারা গেছেন বহু শ্রমিক! 
এর পরেও অনুমতি পেতে জোচ্চুরি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার— এই প্রজেক্টটাকে দেখিয়েছে আলাদা আলাদা ৫৩টা প্রজেক্ট, যার প্রতিটিই ১০০ কিলোমিটারের কম দূরত্বের! 
এই চারধামের ৯০০ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে পাথর পড়েছে পাশের নদীখাতগুলোতে। ক্রমশই বুজে আসছে নদীখাতগুলো! ফলে... 

৩) উত্তরাখন্ডের প্রচলিত ট্রেক রুট গুলিতে যান। দেখবেন, যেগুলো চীন সীমান্তের কাছাকাছি তার সবকটাতেই (মিলাম গ্লেসিয়ার, কিংবা পঞ্চচুল্লী বেস ক্যাম্প) চলছে পাকা সড়ক নির্মাণের কাজ! নরম হিমালয় মাঝেমধ্যেই এই আঘাত সহ্য করতে না পেরে ঝটকা দিচ্ছে, আর তখনই নামছে ব্যাপক বিপর্যয়!
এমনকি এই নন্দাদেবী স্যাংচুয়ারির মত বৈচিত্র্যময় ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর অরণ্যের লাগোয়া এলাকাগুলোতেও এই কাজ করে চলেছে অবাধে!! ধ্বংস হচ্ছে সব কিছু! সব...!!! 

৪) পাঁচ/সাত বছর আগে ছুঁয়ে আসা কোনও একটা গ্লেসিয়ারে আবার ট্রেক করে আসেন। চমকে যাবেন #পরিবর্তন দেখে! বুঝতে পারবেন কতটা পিছিয়ে গেছে হিমবাহটা! 
হ্যাঁ, ছোট হচ্ছে সবগুলো। সে আপনি গঙ্গোত্রী বলুন, আর বাগিনীই বলুন— সব। বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফল। 
এভারেস্টের উচ্চতা কয়েক মিলিমিটার বাড়তেই পারে, কিন্তু সব মিলিয়ে হিমবাহগুলোর গড় উচ্চতা বছরে ফুট দেড়েক করে কমছে! মানেটা কি বুঝতে পারছি!?  
এই রেটে যদি বরফ গলে, তাহলে হিমালয়ের জমে থাকা বরফের উপর নির্ভর করে থাকা গোটা উত্তর ও মধ্য ভারতের অজস্র নদী প্রথমে বন্যায় ভাসাবে, তারপর জলের অভাবে সারা বছর ধুঁকবে! আর গোটা দেশের কৃষি পড়ে যাবে এক ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে! 
এই রেটে যদি বরফ গলে, সমুদ্রের জলতল যদি বাড়ে তাহলে উপকূলবর্তী হাজারো গ্রাম আর কোটি কোটি মানুষের জীবন জীবিকা সব শেষ!! 
আর এই দুইয়ের যোগফল?? বোঝাই যাচ্ছে। 

আবারও মনে করা— পরিবেশকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া দ্বন্দ্বটা আসলে বিশ্বজোড়া শ্রম ও পুঁজির বেসিক যে দ্বন্দ্ব, তারই একটা সামাজিক বহিঃপ্রকাশ মাত্র। 
তীব্র থেকে তীব্রতম মুনাফার লোভ গোটা পৃথিবীর সামনে নামিয়ে আনছে ঘোর বিপদ। যার প্রথম বলি হবেন এবং হচ্ছেনও সেই গরীব মানুষ, সাথে মধ্যবিত্তও। 
আজকের আমার দেশের সরকারের এই পদক্ষেপ (#EIA2020) গোটা দেশের জল-জঙ্গল-জমিকে কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার একটা ধাপ। গতকালের ঘটনাটা আলাদা কিছু না, মুনাফার লোভে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার পুঁজিবাদী অপপ্রয়াসের একটা ফল মাত্র! ফলে পরিবেশ নিয়ে এই লড়াইটা দিনের শেষে মূল লড়াইয়েরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে, সেই লড়াইটা কীভাবে লড়ব সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা...

বৃহস্পতিবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

প্রাউড টু বি অ্যান এমবিবিএস ~ ডঃ বিষাণ বসু

প্রাউড টু বি অ্যান এমবিবিএস। এ নিয়ে প্রচুর পোস্ট হচ্ছে। ডাক্তারি পাস করার বেসিক ডিগ্রী এমবিবিএস, কথাটা সবাই জানেন। এবং সেই ডিগ্রী অর্জন করার শেষে - এবং তদপরবর্তী প্রশিক্ষণের পর্ব পার হলে - সকলেই ডাক্তারি করার পক্ষে ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন। পাস করতে পাঁচ বছর - হাতেকলমে শিক্ষার বাড়তি বছরগুলো, অর্থাৎ ইন্টার্নশিপ-হাউসস্টাফশিপ ধরলে সাত বছর। জেনারেল লাইনে পড়লে ওর চেয়ে কম সময়ে মাস্টার ডিগ্রী হয়ে যায়। কাজেই, এমবিবিএস ডিগ্রীখানা সাধারণ ব্যাচেলর ডিগ্রীর থেকে কিঞ্চিৎ ভিন্ন গোত্রের - উন্নততর দাবী করছি না, বলছি ভিন্ন।

কথাগুলো কারোরই অজানা নয়। কিন্তু, নতুন বিতর্কের পেছনে সংবাদপত্রের একটি খবর। যেখানে হেডলাইন, "স্রেফ এমবিবিএস" করলেন প্রসূতির জটিল অস্ত্রোপচার - কথাটা ওই স্রেফ বিশেষণটি নিয়ে। 

সকলের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখা যাক, এমবিবিএস ডিগ্রীটিই কিন্তু শল্যচিকিৎসা এবং প্রসূতির চিকিৎসার পক্ষে যথেষ্ট ডিগ্রী। অন্তত, মেডিকেল কাউন্সিল তেমনই বলে থাকেন। অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে জটিলতা অনেকক্ষেত্রেই তৈরী হয় - চিকিৎসক এমবিবিএস বলেই হয়েছে, এমন নয়। কাজেই, অন্তত আমার চোখে, স্রেফ এমবিবিএস শব্দবন্ধ এক্ষেত্রে অনুচিত।

সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক অবশ্য জানিয়েছেন, এমবিবিএস-এর আগে স্রেফ বিশেষণটি তাঁর নয় - রাজ্যের ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশন-এর প্রধান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীম কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনিই রায়দানের মুহূর্তে বলেছেন, ওনলি এমবিবিএস - স্রেফ শব্দটি ওনলি-র বঙ্গানুবাদ মাত্র।

সহমত। এক্ষেত্রে সাংবাদিকের দোষ দেখছি না।

যেকোনো বিষয়ে মতামত দেওয়ার আগে সে বিষয়ে অল্পবিস্তর জ্ঞান অর্জন জরুরী - আমাদের শাস্ত্রে বলত, বলার আগে অধিকারী হও, অর্থাৎ বলার অধিকার তথা বিষয়ের উপর দখল অর্জন করো। মেডিকেল সায়েন্স ব্যাপারটা ইদানীং যেন সুলভ শৌচালয়ে পরিণত হয়েছে - পকেটে দুটি টাকা থাকলেই সকলেরই মলমূত্র ত্যাগের অধিকার জন্মে যাচ্ছে - থুতু ফেলা তো বিলকুল ফ্রী। সেখানে বিচারপতি এমন মন্তব্য করলে আপত্তির কী-ই বা আছে!!  

শুধু দুইখান কথা কইতে চাই।

আইন মোতাবেক ওনলি এমবিবিএস হলে ডাক্তারবাবু অমন অপারেশন করতে পারবেন না, এমনটি কোথায় লিখিত রয়েছে? (এই বিশেষ ঘটনাটিতে অবশ্য চিকিৎসক নিজেকে বিশেষজ্ঞ বলে দাবী করেছিলেন - এবং তেমন হলে, ঘটনাটি অবশ্যই প্রতারণার। কিন্তু, রায় এবং সংবাদপত্রের হেডলাইন, সর্বত্রই মিথ্যে দাবী এবং প্রতারণার দিকটাকে ছাপিয়ে গিয়েছে "স্রেফ এমবিবিএস")

দ্বিতীয়ত, ডাক্তারি লাইনটিই, অন্তত এদেশে, বোধহয় দুনিয়ার একমাত্র পেশায় পরিণত হয়েছে, যেখানে অভিজ্ঞতা ও চর্চার কোনো স্বীকৃতি নেই। তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন জেনারেল প্র‍্যাকটিশনারের চাইতে পরশু এমডি পাস করা ডাক্তারের কদর বেশী - কেননা, প্রথমজন "স্রেফ এমবিবিএস"। এতে ক্ষতি চিকিৎসকদের যতখানি, তার চাইতে অনেকগুণে বেশী ক্ষতি আপনাদের সকলের। বিশেষজ্ঞ ট্রেনিং-এর অনিবার্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া - নোয়িং মোর অ্যান্ড মোর অ্যাবাউট লেস অ্যান্ড লেস - আরো পরিমিত বিষয়ে আরো অনেকখানি বিস্তারে ও গভীরে জ্ঞান অর্জন করা। আমরা যারা তথাকথিত বিশেষজ্ঞ, তারা গাছখানা খুবই খুঁটিয়ে দেখতে শিখি - জঙ্গলের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে। জঙ্গলের আর পাঁচটা গাছের চাইতে এই বিশেষ গাছটিকেই খুঁটিয়ে দেখা প্রয়োজন কিনা, সেই বিচার সবচেয়ে ভালো করতে পারেন একজন জেনারেল প্র‍্যাকটিশনার - স্রেফ এমবিবিএস-ই। এর উল্টোপথে হাঁটলে প্রতিটি গাছকেই বিশেষ গাছ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে - পরীক্ষানিরীক্ষার সংখ্যা এবং চিকিৎসার খরচ, দুইই বাড়ে। বিপণনমুখী চিকিৎসা অবশ্য তেমনটিই চায় - আর সেজন্যেই এমবিবিএস পরিণত হয়েছে পাতি বা স্রেফ এমবিবিএস-এ। লাগামছাড়া চিকিৎসার খরচে তিতিবিরক্ত আপনিও অন্য কিছু ভাববেন না? এখনও ভাবা শুরু করবেন না?

এরই উল্টোপিঠে, এমবিবিএস-এর গুরুত্ব হ্রাসের কারণে, তরুণ চিকিৎসকরাও আর স্রেফ এমবিবিএস থাকতে চাইছেন না। এমবিবিএস ব্যাপারটাকেই উচ্চমাধ্যমিকের আগে মাধ্যমিকের মতো এমডি-র প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দায়সারা গোছের ভাবতে শিখছেন - যত্ন নিয়ে সার্বিক দৃষ্টি অর্জনের চেষ্টাটাই লুপ্ত হতে চলেছে। অতএব, তেমন দিন আর দূরে নেই, যখন পেটখারাপের চিকিৎসার জন্যেও গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টের শরণাপন্ন না হয়ে গতি থাকবে না - কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবস্থার রমরমা অবশ্য সেক্ষেত্রে আরো বাড়বে - আপনিও কি তেমনটাই চান? এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অভিজ্ঞ জেনারেল প্র‍্যাক্টিশনার ব্যাপারটাই অবলুপ্ত হয়ে যাবে। সেটাই চাইছেন তাহলে??

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছেন, চিকিৎসাকে মানবিক করে তুলতে আমাদের ফিরতে হবে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের ধারণায় - স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জেনারেল প্র‍্যাক্টিশনারের গুরুত্ব হবে সর্বাধিক। আমরা উল্টোপথে হাঁটব??

বাই দ্য ওয়ে, ওনলি এমবিবিএস কথাটা যিনি বললেন, জাস্টিস অসীম কুমার ব্যানার্জি, খুঁজে দেখলাম, তাঁর ডিগ্রি বলতে বিএ এলএলবি। ওনলি ব্যাচেলর ডিগ্রি - উইদাউট এনি মাস্টার ডিগ্রি। ইদানীং তো আইনবিদ্যায় মাস্টার ডিগ্রি - এলএলএম বা পিএইচডি - সবই হয়। বিচারপতি হতে গেলে - এমনকি হাইকোর্টের বিচারপতি - দুরূহ মামলার জটিল যুক্তি বিচার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্যে অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট, ডিগ্রী নয়। কিন্তু, চিকিৎসার ক্ষেত্রে, অভিজ্ঞতার বিচার নয়, শুধুই ডিগ্রীর হিসেবই শেষ কথা?? 

বিচারপতিরা কি বাড়িতে আয়না রাখেন না? দাড়ি কামান কীভাবে??

সোমবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

আগ্রাসন – ফিরে দেখা ~ রাজা সিংহ

বাংলার থুড়ি কলকাতার বুদ্ধিজীবী কুলে গেল গেল রব, বিহারি, গুজরাতি, মারাঠি, কাশ্মীরি, এস্কিমো সবাই মিলে নাকি কলকাতার কালচার গ্রাস করে ফেলছে। তারা বাংলা বলে না, তারা হনুমান পুজো করে, করওয়া চৌথে সোনালি চুমকি বসানো লাল শাড়ি পরে য়সরাজ ফিল্ম বা সুরজ বরজাতিয়ার ফ্যামিলি ড্রামার ধরণে ছাদে গিয়ে চালনি দিয়ে চাঁদ ও বরের মুখ দেখে। আগ্রাসন বলে আগ্রাসন। এমন তেজের সঙ্গে স্বয়ং অগ্নিদেবতাও বোধহয় খাণ্ডবদাহন করেন নি।  কলকাতার বুকে (আজ্ঞে বাঙলা মানে তো কলকাতাই) বুকে রাজস্থান আর গুজরাতের মহল্লা নাকি বেড়ে উঠছে ফনফন করে। এক ভয়াবহ চক্রান্তের করাল ছায়া ধীরে ধীরে গ্রাস করছে বঙ্গদেশকে। ঠিক কি না? কান পাতুন চারদিক থেকে ধ্বনি উঠবে ঠিক ঠিক।

এবার একটু অন্যভাবে দেখা যাক।  আমার শৈশব ও কৈশোরের বেড়ে ওঠা বিহারের এক প্রত্যন্ত শহরে। শহরটি ছিল দুইভাগে বিভক্ত,  দুর্গন্ধময় নালা, পুরনো রংচটা গায়ে গায়ে লাগানো কদর্য বাড়ি, শ্যাওলা পড়া প্রায়ান্ধকার গলির সিভিল এরিয়া আর চওড়া পিচ রাস্তা, সবুজ মাঠ, লাইব্রেরী, থিয়েটার হল, ফুটবল মাঠ আর সুন্দর কোয়ার্টারে ঘেরা রেলওয়ে কলোনি। সিভিল এরিয়ায় বাস ছিল স্থানীয়, বিহারি, ভোজপুরি অর্থাৎ বিহারের স্থানীয় বাসিন্দাদের আর সুন্দর সাজানো রেলওয়ে কলোনি জুড়ে ছিল বাঙালী রেল বাবুদের বাস। সেই ছোট্ট শহরটিতে অন্তত: পঞ্চাশটি দুর্গাপূজা হত। আর এত ধুমধাম আর খরচ করে দুর্গাপুজো হত যে তাদের স্থানীয় ও সর্ববৃহৎ উৎসব ছটপুজোতেও অমন চাকচিক্য ও জাঁকজমক চোখে পড়ত না। বাঙালির বারোমাসে তেরো পার্বণের যাবতীয় উপকরণ তা শীতল ষষ্ঠীর তালপাতার পাখা, কচি বাঁশের কোড়ল, ডাঁট শুদ্ধ খেজুর যেমন বিক্রি হত তেমনি লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজোর যাবতীয় উপকরণের মেলা বসে যেত উৎসবের দিনগুলিতে। আড়াইটি বাংলা স্কুলে নিয়ম করে পালন হত রবীন্দ্র-নজরুল। বাংলার সংস্কৃতি ধরে রাখার যাবতীয় বন্দোবস্ত ছিল সেখানে। চাকুরীজীবী বাঙালীরা শুধু যে স্থায়ী বাসস্থান গড়ে তুলেছিলেন তাই নয় তাদের সংস্কৃতি, উৎসব সব কিছুই বজায় রেখেছিলেন বহুল প্রাচুর্যে। 

দেওঘর, গিরিডি, যশিডি, শিমুলতলা এদিকে বেনারস, এলাহাবাদ, কানপুর, দিল্লী, মুম্বাই, পুনে তে বঙ্গ-সন্তানেরা তাদের উৎসব, সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রেখেছেন বহু বছর ধরে। বাবার চাকরি সূত্রে ঘুরতে হয়েছে বহু জায়গায়। কোথাও শুনি নি, সেখানকার বাসিন্দারা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছে, মার শালাদের, আমাদের উৎসব সংস্কৃতি বানের জলে ভেসে গেল, সবই  গ্রাস করে ফেলছে এই বঙ্গ-পুঙ্গবরা। আজ নয় বহু বছর ধরেই বাঙালি যে শহরে বাসা বেঁধেছে তারা নির্মাণ করেছেন কালীবাড়ি। দিল্লী, পুনে, মুম্বই, ব্যাঙ্গালোর কোথাও তার ব্যতিক্রম নেই। স্থানীয় মানুষকে বলতে শুনি নি এই রে, এবার তো আমাদের আইয়াপ্পা মন্দিরের কিংবা গণেশ টেম্পলের খ্যাতিতে ভাগ বসবে। 

আজ ব্যাঙ্গালোরের যে কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকে আমি নির্দ্বিধায় যে কোন ওয়েটারের সাথে বাংলায় কথা বলি। কারণ তাদের নব্বই শতাংশ বাঙালী। শুধু ব্যাঙ্গালোর কেন খোঁজ নিয়ে দেখুন গত তিরিশ বছরে ভারতের অন্যান্য সব শহরগুলিতে বাঙালির সংখ্যা বেড়েছে হু-হু করে। তারা ভাগ বসিয়েছে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানে। কলকাতা থেকে বেড়াতে আসা বন্ধুবান্ধবরা বেশ গর্বের হাসি হেসে বলেন, 'বাওয়া সব জায়গায় বাঙালি, অ্যাঁ?' শপিং মলে দক্ষিনী পাঁপড়ের পাশেই বাংলা হরফে লেখা গোবিন্দ ভোগ চালের প্যাকেট, বাংলার বড়ি, খেজুর গুড়। মাছের দোকানে আঁকাবাঁকা বাংলা হরফে লেখা 'এখানে কলকাতার মাছ পাওয়া যায়।' দক্ষিণের মত ভাষা সচেতন প্রদেশগুলিতে চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর ধরে বসবাসকারী বাঙালিরা বেশীরভাগই এখনো স্থানীয় ভাষা শেখেন নি। খোদ ব্যাঙ্গালোরের বুকে হ্যাল মার্কেট যেন লেক-মার্কেট বা গড়িয়া-হাট মার্কেটের মিনি সংস্করণ। স্থানীয় বাসিন্দাদের কখনো বলতে শুনিনি, এইরে এই বঙ্গ-সন্তানেরা তো মিনি কলকাতা বানিয়ে ফেলেছে। তাদের কেন মনে হয় না, তাদের মহল্লা, টোলা, হাল্লি গুলো সব বাগবাজার, বৌবাজার কিংবা বাঘাযতীন হয়ে যাচ্ছে। এমনই তো হবে, চাকরি কিংবা ব্যবসার সূত্রে মানুষ বহমান হবে এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে, সাথে করে নিয়ে আসবে তাদের খাদ্যাভ্যাস, ভাষা, সংস্কৃতি, অচেনা প্রদেশে গড়ে তুলবে তাদের সুখ-বসত বা কমফোর্ট জোন। সেখানে পালন করবে তাদের নিজস্ব উৎসব। গড়ে তুলবে নিজের প্রার্থনা-ক্ষেত্র। বাংলার বাইরে ছড়িয়ে থাকা ও ছড়িয়ে পড়া বাঙালিদের উৎসব, সাহিত্য, সংস্কৃতি পালন দেখতে যদি আপনাদের ভালো লাগে, বেশ 'অ্যাট হোম' বোধ হয় তবে একই জিনিস বাংলার বুকে প্রত্যক্ষ করলে এত প্রতিরোধ কেন? বাঙালি রিক্সা টানবে না, মোট বইবে না, ঠেলা চালাবে না। সে কাজ নির্দ্বিধায় তুলে নিল শ্রমজীবী বিহারের লোক। দিনের শেষে বাড়ি ফিরে তারা মাছ ভাত কেন খাবে? তারা লিট্টি চোখাই খাবে। তারা কৃত্তিবাসী রামায়ণ নয় বরং তুলসিদাসী রামায়ণ ও হনুমান চালিশাই পড়বে। সুদূর মারোয়ার, গুজরাত থেকে ব্যবসা করতে আসা মানুষজন নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলেছে, বাড়িয়েছে বাণিজ্য। তারা পালন করবে তাদের চৌথ, তিজ কিংবা রাস উৎসব। যেমন আমরা করি 'বছরে তেইশ বার চিত্রাঙ্গদা আর শ্যামা, শাপমোচনের অশ্রুমোচন, বাংলায় কিংবা বাংলার বাইরে। 

বাংলার বুদ্ধিজীবীদের এই হঠাৎ 'তফাৎ যাও' মনোভাব যদি ছড়িয়ে পড়ে দেশে এবং বিদেশেও, বাংলার বাইরে বসবাসকারী বাঙালিদের কিন্তু এর মাসুল গুণতে হবে পুরোদস্তুর। যেমন নিউটন সাহেব তার তৃতীয় সূত্রে বলেছেন আর কি।

কুড়ি বছর আগের সেন্সাস অনুযায়ী ভারতবর্ষে হিন্দি ভাষীর সংখ্যা (তেরটি রাজ্য মিলিয়ে) ৫৩.৬ শতাংশ ছিল। তার পরেই ইংরেজি, ৪১ শতাংশ। এটা কুড়ি বছর আগের অর্থাৎ ২০০১ এর সেন্সাস। তার মানে দাঁড়ায় একটি 'নানা ভাষার দেশে' এই দুটি ভাষা 'মাস ল্যাঙ্গুয়েজ' বা 'মাস কমিউনিকেশন ল্যাংগুয়েজ'   হিসেবে কাজ করতে পারে। ঠিক তার ভিত্তিতেই স্থানীয় ভাষার পাশাপাশি, হিন্দি ও ইংরেজির ব্যবহার হয় রেলওয়ে স্টেশনের নেম-বোর্ড হিসেবে। ওড়িয়া বা কোঙ্কনি ব্যবহার হয় না।
আর কেন এই তেরোটি প্রদেশ হিন্দি বলেন, বোঝেন তার কারণ হিসবে স্থানীয় ভাষার উৎপত্তিগত ছোট্ট চার্টটি দিলাম। এবার হিন্দি প্রচার প্রসারের জন্য সরাসরি দেবভাষাকে দোষারোপ করতে পারেন। 

আর যারা চান স্থানীয় ভাষাই হোক কমিউনিকেশন ল্যাঙ্গুয়েজ তাদের বলি শুধু স্থানীয় ভাষায় বাস, ঠিকানা, দোকান ইত্যাদি লেখা থাকলে যে কি পরিমাণ অসুবিধেয় পড়তে হয় তার চাক্ষুষ প্রমাণ দেখা যায় বাংলা থেকে দক্ষিণে বেড়াতে, ডাক্তার দেখাতে আসা বাঙালির বিরক্তি ও হতাশা দেখলে।  

'মাস কমিউনিকেশন ল্যাঙ্গুয়েজ' না থাকলে আপনাকে ২৯টি রাজ্য সাতটি ইউনিয়ন টেরিটরিজ এর ভাষা শিখতে হবে, পড়তে ও বলতে পারার মত। আমার কিছু শ্রদ্ধেয় বন্ধু যারা 'আগ্রাসনের' ধুয়ো তুলেছেন তাঁদের কেউ কেউ বাংলার বাইরে তাঁদের গোটা চাকুরী জীবন স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে, বাংলায় ফিরে গেছেন স্থানীয় ভাষাটি বিলকুল না শিখেই। কি ভাবে? ঐ 'মাস কমিউনিকেশন ল্যাঙ্গুয়েজ' – ইংরেজি বা হিন্দির কল্যাণে। কোন ভাষা সেই প্রয়োজন মেটাবে তা নির্ভর করবে তা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের উপর ১। তার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনে সেই ভাষার ব্যবহার। এই প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালি একদিন ইংরেজ প্রভুর ভাষা আত্মস্থ করেছিল। ২। ভাষার সহজবোধ্যতা – এটি না থাকলে সে ভাষার প্রচার ও প্রসার মুশকিল, তার আদ্যন্ত প্রমাণ মালয়ালম ভাষা, এমনকি দক্ষিণের তামিল, তেলেগু ও কন্নড়রাও স্বীকার করেন মালয়ালম শিখে নেওয়া তেমন সহজ সাধ্য নয়। ৩। সে ভাষাটি রাজভাষা কিনা (এখানে তুমুল আলোড়ন উঠতে পারে) কিন্তু একথা অস্বীকার করা যায় না যে ৭৩ বছরের বেশিরভাগ সময়টাই দিল্লীর মসনদে যারা আরোহণ করেছেন তাঁদের ভাষা ছিল হিন্দি। রাজভাষার কারণেই ভারতে ব্যুৎপত্তি পেয়েছিল ফারসি, উর্দু ও পরবর্তীকালে ইংরেজি।

স্থানীয় ভাষার সিরিয়ালে হিন্দি ব্যবহার হবে না কোঙ্কনি? তা নির্ধারণ করেন সেই সিরিয়ালের দর্শক, তাঁরা ডিক্টেট করেন টি আর পি, পরিচালক শুধু সেই নির্ধারিত দর্শক সমূহ বা টার্গেট অডিয়েন্সকে পরিবেশন করেন। তাই হিন্দি ব্যবহার অগ্রাহ্য করে নিজের ভাষাটিকে আরও আরও বেশি জনপ্রিয় করলে তা কাজ দেবে বেশি।

আমার এক প্রিয় সুহৃদের প্রশ্নের উত্তরে বলি, 'না দক্ষিণে হিন্দি 'চাপিয়ে' দেওয়া সম্ভব হয় না।' বরং এঁরা যথেষ্ট সুচারু ও নির্মম ভাবে, স্থানীয় ভাষা চাপিয়ে দেন। বাংলায় কোন ব্যাঙ্কে গেলে তাকে হিন্দিতে কথা বলতে বাধ্য করা হয় এমন তথ্য আমার জানা নেই। তবে দক্ষিণে সমস্ত সরকারি আপিস, কাছাড়ি, প্রপার্টি রেজিস্ট্রেশন থেকে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সব ফর্ম স্থানীয় ভাষায় লেখা। তাঁরা কিছুতেই অন্য ভাষায় কথা বলবেন না। আমার এক সুহৃদ একটি অ্যাকসিডেন্ট কেসের কারণে বাধ্য হয়েছিল কন্নড় শিখতে। কারণ পুলিশ এবং তার আইনজীবী মায় জজ সাহেব পর্যন্ত কেউ তাঁর সাথে মাস কমিউনিকেশন ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করেন নি কঠোর এবং স্বেচ্ছা অভিপ্রেত ভাবে। এই চাপিয়ে দেওয়া গুলি কিন্তু আমার মত অনেকেরই যথেষ্ট অসুবিধের কারণ হয়, আপনারও হবে। তাই চাপিয়ে দেওয়াটা যে একতরফা নয় সেটা বুঝতেই পারছেন। সেই অসুবিধেটা আপনিও করবেন কিনা ভেবে দেখবেন।

আরও একটা কথা দক্ষিণে স্থানীয় ভাষাগুলিকে সংরক্ষণ করা হয় নিষ্ঠাভরে। তাঁরা শুধু উষ্মা প্রকাশ করে ক্ষান্ত থাকেন না। শিক্ষক, পুলিশ, প্রযুক্তিবিদ, নাট্য-ব্যক্তিত্ব এমন কি ওলা ড্রাইভার নিখরচায় কন্নড় ক্লাস করান সপ্তাহান্তে অস্থানীয় ভাষাভাষীদের জন্যে। হাতে গুনুন তো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানে নিজের গাঁটগচ্চা দিয়ে নিজের ভাষা শেখানোর কটি প্রকল্পের সাথে আপনি জড়িত। 

আরেকটা কথা বলি, আগেই বলেছি রাজভাষা শিখতেই হয়, বাংলার মতই দক্ষিণেও বা সারা ভারতবর্ষেই 'ব্যবসাজীবি' যে সম্প্রদায়রা রয়েছেন তাঁরা কিন্তু স্থানীয় ভাষা শিখে নিয়েছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে। হ্যাঁ তাঁদের উচ্চারণ নিখুঁত নয়, যাকে বলে অ্যাক্সেন্টেড। তা সে তো ইংরেজির ক্ষেত্রেও হয় বাঙালি থেকে অস্ট্রেলিয়ান সবার ইংরেজিতেই স্থানীয় প্রভাব রয়েছে এবং তা স্বীকৃত।

যারা প্রবাসে বাঙালিদের লাঞ্ছিত হতে হয় বলে কমেন্ট করেছেন, সে উত্তর গুলি এখানে দিলাম না, কারণ সে অন্য প্রসঙ্গ। এই পোস্টের উদ্দেশ্য ছিল 'চাপানো' সংস্কৃতি বা কালচার শাঁখের করাতের মত। তাই  নিজেকে সেখানে বসিয়ে দেখা যায় কি না। 

অনেকে উল্লেখ করেছেন বটে তবে প্রবাসের যাতনা নিয়ে এ পোস্ট নয়।  আমার কাছের এক দক্ষিণী মানুষ যারা তিনপুরুষ কলকাতায় এবং যে কোন বাঙালির মত স্বচ্ছন্দ বাংলা বলেন তাকেও মাঝে মধ্যে তির্যক 'তেঁতুল' মন্তব্যটি শুনতে হয়। 'খোট্টা, মেড়ো, গুজ্জু' শব্দগুলি বাঙালি শব্দ ভাণ্ডারে এমনি এমনি উঠে আসে নি। না কারো প্রবাস জীবনই ফুলশয্যা হয় না। তাই বিহারে আমাদের যখন 'বঙ্গালী মচ্ছি কা কাঙ্গালি'  বলে কৌতুক করেছে তখন আমরাও 'বিহারী ভূত, খাটিয়া পর সুত, টিক্কি মে আগ লগি, ধরফড়াকে উঠ' ইত্যাদি বলতে ছাড়ি নি। আরও আরও অনেক আছে। বাঙালিদের উদার মেলামেশার  সংস্কৃতির জন্য বাঙালি মেয়েদের সহজলভ্য মনে করা হয়েছে। এমন অনেক আছে। যেমন 'জাদু-টোনাওয়ালি বঙ্গালন' আপনি শুনেছেন তেমনি আসামের নারীরা যুগ যুগ ধরে তকমা বয়ে বেরিয়েছেন যে তারা পুরুষদের 'ভেড়া' বানিয়ে রাখেন। কিন্তু সে সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গ, এগুলির সাথে ভাষার আগ্রাসনের সম্পর্ক নেই। আছে মানসিকতার, মানবিকতার সম্পর্ক।



শনিবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২১

ভক্ত ~ রণদীপ নস্কর

জন্তুটার রকম-সকম দেখে আমার ভারি অদ্ভুত লাগল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "তুমি কী? তোমার নাম কী?"

সে খানিকক্ষণ ভেবে বলল, "আমার নাম ভক্ত। আমার নাম ভক্ত‌, আমার ভায়ের নাম ভক্ত, আমার বাবার নাম ভক্ত‌, আমার পিসের নাম ভক্ত—"
আমি বললাম, "তার চেয়ে সোজা বললেই হয় তোমার গুষ্টিসুদ্ধ সবাই ভক্ত।"

সে আবার খানিক ভেবে বলল, "তা তো নয়, আমার নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র! আমার মামার নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র, আমার খুড়োর নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র, আমার মেসোর নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র, আমার শ্বশুরের নাম বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র—"

আমি ধমক দিয়ে বললাম, "সত্যি বলছ? না, বানিয়ে?"

জন্তুটা কেমন থতমত খেয়ে বলল, "না, না, আমার শ্বশুরের নাম ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে।"

কাট টু

শেয়াল বলল, "হাসছ কেন?"

হিজিবিজবিজ বলল, "একজনকে শিখিয়ে দিয়েছিল, তুই সাক্ষী দিবি যে, দেশদ্রোহীর বড় বড় দাড়ি, দেশদ্রোহী ঠিক বানানে লেখে, দেশদ্রোহীর গায়ে বেগুনি রঙ থাকে না। উকিল যেই তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, তুমি লালকেল্লা চেনো? অমনি সে বলে উঠেছে, আজ্ঞে হ্যাঁ, লালকেল্লার বড় বড় দাড়ি, লালকেল্লা ঠিক বানানে লেখে, লালকেল্লা লাল হয়, বেগুনি রঙের নয়—হোঃ হোঃ হোঃ হো—"

শেয়াল জিজ্ঞাসা করল, "তুমি মোকদ্দমার বিষয়ে কিছু জানো? কৃষকদের চেনো?"

হিজিবিজবিজ বলল, "তা আর জানি নে? আমি নিজেই ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে। আমরা এতটাই গরিব, ট্র্যাক্টর তো দূর, বলদ ছিল না বলে আমাকে দিয়েই চাষ করানো হত। তারপর থেকেই আমার মাথায় বলদের মত বুদ্ধি। আমি একাধারে ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের ছাত্র, বিদ্যাসাগর কলেজের ছেলে, লালকেল্লার অতিথি এবং ভিক্টোরিয়ার প্রত্যক্ষদর্শী। আমি নিজে চোখে দেখেছি কৃষক পরিবারে মূর্তি ভাঙার ঘটনা। এও জানি, বিদ্যাসাগর কলেজে কোনওরকম শ্লোগান ওঠেনি।"

শেয়াল বলল, বটে? তোমার নাম কী শুনি?"

সে বলল, "এখন আমার নাম হিজিবিজ‌বিজ‌।"

শেয়াল বলল, "নামের আবার এখন আর তখন কী? হিজি বিজ্‌ বিজ্‌ বলল, "তাও জানো না? এখন আমার নাম ভক্ত, ভোটের পরেই আমার নাম হয়ে যাবে কর্মহীন, অথবা অ-নাগরিক, অথবা দেশদ্রোহী।" বলে জন্তুটা ভয়ানক ফ্যাকফ্যাক করে হাসতে লাগল।

[সুকুমার রায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে...] 

বুধবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২১

পতাকা তোলার গল্প ~ সমুদ্র সেনগুপ্ত

পাঞ্জাবের খুব বেশি মানুষকে আমি চিনি না। যাদের চিনি তাদের একজনের পতাকা তোলার গল্প শুনিয়ে যাই-

"মার্চ ১৯৩২ সাল। ওই সময় সবে পরীক্ষা দিয়ে উঠেছি, সায়েন্স প্র্যাকটিক্যাল তখনো বাকি। ভগত সিং এর প্রথম শহিদ বার্ষিকী পালনের কথা হচ্ছে। গর্ভনর এর সেদিন জলন্ধর থেকে ৪০ কিমি দূরে হোসিয়ারপুর দেখতে আসার কথা। জেলা কংগ্রেস কমিটি ঘোষণা করলো যে সেদিন জেলা আদালত প্রাঙ্গনে ইউনিয়ান জ্যাক এর বদলে ত্রিবর্ন পতাকা ওড়ানো হবে। এই কর্মসূচি বানচাল করার জন্য জেলা শাসক আর্মি মোতায়েন করেন আর কেউ পতাকা তোলার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করার আদেশ জারি করেন। 

সেদিন হোসিয়ারপুর পোঁছে মন খারাপ। শুনলাম পতাকা তোলার কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। কংগ্রেস অফিস সম্পাদক হনুমানজির কাছে দাবি করলাম কেন বাতিল হল। উনি প্রশ্ন করলেন, গুলি চালানোর আদেশ এর কথা আমি জানি কি না। তাই শুনে খেপে গিয়ে পাল্টা বল্লাম, "গুলি খাওয়ার ভয়ে আপনারা হাল ছেড়ে দিলেন ? এত জাতির প্রতি অপমান!" উনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বসেন," এতই যদি তোমার সাহস, তাহলে তুমিই পতাকা তুলে দেখাও।"

আমি অফিসের একটি ডান্ডায় লাগানো পতাকা খুলে নিয়ে কোর্টের দিকে দৌড়ালাম। সেই আদালত যাকে সেই সময়ে ব্রিটিশ শক্তির একটা নিদর্শন হিসেবে ধরা হতো। কর্মসূচির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়াতে তখন পুলিশ আর সেনাবাহিনীর মধ্যে একটু ঢিলেঢালা ভাব। তার সুযোগ নিয়ে সিঁড়ি টপকে ছাদে উঠলাম, ইউনিয়ন জ্যাক খুলে নামিয়ে দিলাম। লাগিয়ে দিলাম ত্রিবর্ন পতাকা। তাই দেখার পরে গুলি চালানো শুরু হয়। দুটো গুলি আমার কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়, গায়ে লাগেনি। ডেপুটি কমিশনার বাখলে বেরিয়ে আসেন। আমাকে বাচ্চা ছেলে দেখে তিনি গুলি চালানো বন্ধ করার আদেশ দেন। আমি স্লোগান দিতে শুরু করি। আমার কাছে কোনো অস্ত্র নেই, আমি নিরস্ত্র এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে সেনারা সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে। আমাকে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে যায়।

পরের দিন বিচার শুরু হয়। ম্যাজিস্ট্রেট নাম জিজ্ঞেস করলে বলি, "আমার নাম লন্ডন তোড় সিং।" আসল নাম কিছুতেই বের করতে পারেনি। যা করেছি তার দায় স্বীকার করি, ভগত সিং এর অনুপ্রেরণার কথা বলি। আমার এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়। "মাত্র এক বছর ?" ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বাড়িয়ে চার বছর কারাবাস এর আদেশ দেন।" 

সেদিন জাতীয় পতাকা তোলার জন্য প্রাণ তুচ্ছ করে এগিয়ে আসা কিশোরের আসল নাম হরকিসেন সিংহ সুরজিৎ। ডান্ডা বেড়ি পরে অকথ্য পরিবেশে হাজতবাস করা সেদিনের সেই কিশোর পরবর্তীকালে ভারতের  মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

সুরজিৎ এর ফ্ল্যাগ পোল ছিল ব্রিটিশ কোর্টের ছাদে লাগানো। এর পাশাপাশি লাল কেল্লার র‍্যামপার্ট এ পতাকা লাগানোর কাহিনী একটু ছোট করে আসুক। 

আরএসএস এর ভাষায়, "ভাগ্যের ধাক্কায় ক্ষমতায় আসা লোকেরা আমাদের হাতে তেরঙা তুলে দিতে পারে তবে হিন্দুরা এটি কখনও শ্রদ্ধা করবেন না, নিজেদের বলে  মনেও করবেন না। তিন শব্দটি নিজেই একটি শয়তানি শব্দ এবং তিনটি বর্ণের সমাহারে তৈরি একটি পতাকা অবশ্যই একটি খুব খারাপ মনস্তত্ত্ব এর জন্ম দেবে। লালকেল্লায় র‍্যামপার্ট এ "ভাগয়া ধজ তুলতে হবে " 

লাল কেল্লার মাথায় এখনো তেরঙ্গা পতাকা উড়ছে। র‍্যামপার্ট এর ফ্ল্যাগপোলে ভাগোয়া ধজ তুলে ধরার ইচ্ছে দেশের মানুষ পূরণ হতে দেয় নি। সেই ইচ্ছে বুকে নিয়ে গুমরে মরা আরএসএস আজ দেশ ভক্তি শেখাতে আসে লন্ডন তোড় সিংদের। হাসি পায়। হাসি।

সূত্র: 
১) সাক্ষাৎকার, মানিনী চ্যাটার্জি, আগস্ট ১৬, ২০০৮ ফ্রন্টলাইন পত্রিকা
২) প্রবন্ধ, আমান সিং, মে ২৬, ২০০৯, শিখ ফিলজফি
৩) প্রবন্ধ, ভেঙ্কটেশ রামকৃষ্ণনন, আগস্ট ১৬, ২০০৮, ফ্রন্টলাইন পত্রিকা।
৪) অর্গানাইজার, আর এস এস মুখপাত্র, ১৪ই আগস্ট, ১৯৪৭