বুধবার, ১২ জুন, ২০২৪

জলছবিতে ছায়াপথ ~ মলয় চ্যাটার্জী

"আবার নিজের খেয়ালে ডুবে যায় সুমিতা। মানিকের কথা ফেলতেও পারছে না, আবার মেনে নিতেও বাধছে ওর। সুমিতা নিজে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। সেই যাদবপুর, যেখানকার ছাত্র ছিল কবি তিমিরবরণ সিংহ। সব ছেড়ে গ্রামে গিয়েছিলো কৃষকদের সংগঠিত করতে। ৭১-এর ২৪শে ফেব্রুয়ারি বহরমপুর জেলে পুলিশ গুলি করে মেরেছে তাকে। আর শুধু কি তিমিরবরণ? পুলিশের গুলিতে তো আরও তিন কবি খুন হয়ে গেছে। কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ, অমিয় চট্টোপাধ্যায় আর মুরারি মুখোপাধ্যায়। এদের মাঝে অমিয় চট্টোপাধ্যায় তো বেহালা পৌরসভার কাউন্সিলরও ছিলেন। পুরুলিয়ার গ্রামে 'সাগর' নাম নিয়ে কৃষকদের মাঝে কাজ শুরু করেছিলেন। তাকেও গ্রেপ্তার করে জেলের মধ্যেই হত্যা করে পুলিশ। হুগলি জেলায় চারু মজুমদারের ভাবনাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো দ্রোণ। পুলিশের হাতে ধরা পরে ঠাঁই হয় হুগলী জেলেই। সেখানেই পুলিশ পিটিয়ে মারে তাকে। আর মুরারি ছিল সত্যিই লড়াকু। গ্রেপ্তার হওয়ার পড়েও জেল থেকে তার মাকে চিঠিতে লিখেছিলো, "ওরা আমাদের জেলে ঢোকাচ্ছে, হত্যা করছে, কিন্তু মূর্খ ওরা। তুমিই বলো মা, হাত দিয়ে কি সূর্যের আলোকে আটকানো যায়?" সেই মুরারিকেও হাজারীবাগ সেন্ট্রাল জেলে হত্যা করে পুলিশ।
আর এই তো গতবছরের সেপ্টেম্বর মাসে, মনে করলে যেন এখনও সেদিন মনে হয় সুমিতার, পুলিশ গুলি করে মারলো অনিল চক্রবর্তী কে।
নাম অনিল চক্রবর্তী, কিন্তু বেহালার আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত শুধুই নীল নামে। প্রথমে সিপিআই(এম) করলেও ঊনসত্তরের সিপিআই(এমএল)-এর একেবারে শুরুর দিন থেকেই সে পার্টিতে যোগ দিয়েছিলো নীল। সুমিতা এবং আরও অনেকের প্রিয় নীলদা।
মনে আছে সুমিতার, ও তখন সবে ঢুকেছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে, সে সময়েই একদিন গিয়েছিলো বেহালা হরিসভার কাছে ওর বন্ধু পিউয়ের সাথে তার মাসির বাড়িতে। বিকালে সে বাড়িতে পৌঁছে আধঘন্টা কাটিয়ে যখন বেরিয়েছিল, তখন ওই পিউ দেখিয়েছিলো এক বছর ছাব্বিশ সাতাশের ছেলেকে। পেটানো চেহারার ছেলেটাকে দেখিয়ে পিউ শুধু বলেছিল সুমিতাকে...
-- এই সুমি, দেখে রাখ, ওটাই নীলদা।
-- দেখলাম, কিন্তু তুই দেখাচ্ছিস কেন বুঝলাম না।
-- আরে ওর সঙ্গেই তো আমার মাসতুতো দিদির...হি হি হি...
-- মানে তোর ভবিষ্যতের জামাইবাবু বল।
এবার উদাস হয়েছিল পিউ...
-- সেটা জানিনা রে...
-- জানিসনা! কেন?
-- তুই জানিস না? নীলদা তো নকশাল। আর শুধু নকশাল, ও তো পুরো লিডার এখানকার।
সেই পিউয়ের থেকেই শুনেছিলো সুমিতা যে নীলদা নাকি বক্সিং করতো বেহালা ক্লাবে, আর ভালোবাসতো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান গুনগুন করে গাইতে। তবে এলাকায় দাপট এতটাই ছিল যে বেহালার একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মেয়েরাও রাত বিরেতে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে আর ভয় পেতো না। তারা জেনেই গিয়েছিলো যে, তাদের কারও হাত ধরে টানা তো দূর, যদি কেউ একটা বাজে কথাও বলে আর সেটা তাদের নীলদার কানে যায় তো নির্ঘাৎ দলবল নিয়ে এসে যে ওসব বলার সাহস দেখাবে, মেরে তার হাড়গোড় ভেঙ্গে দেবে।
তবে সব থেকে আশ্চর্য্য হয়েছিল এর কিছুদিন পর, যখন শুনেছিলো যে অজন্তা সিনেমা হলের সামনে নাকি টিকিট ব্ল্যাক করা বন্ধ হয়ে গেছে। আর ওই অঞ্চলেরই আশেপাশে লোহার ছাঁটের যে বিশাল কালোবাজার আর তাকে ঘিরে কংগ্রেসি গুন্ডাদের দাপাদাপি, সেটাও হঠাৎ করেই থেমে গেছে। আর এই সবকিছুর পিছনেই নাকি আছে নীলদা। সে নাকি সাফ বলে দিয়েছে এদেরকে যে রাস্তার ধারে বসে সবজি বিক্রি করলেও কিছু বলবে না, কিন্তু এলাকায় কোনও তোলাবাজি ও বরদাস্ত করবে না কিছুতেই।
আর নীলদার মারা যাওয়ার ঘটনাও পরে শুনেছে ওর পুলিশে কাজ করা মেসোর থেকে। সে সময় নাকি বর্ধমানের গোপন কোনও আস্তানায় ছিল নীলদা। সেখান থেকেই দলের নির্দেশ দিয়েছিলো দলের কিছু সাথীকে। ওই বর্ধমানেরই এক জোতদার বাড়িতে মজুত করে রাখা দুটো বন্দুক লুঠ করে আনতে। যারা গিয়েছিলো সেই নির্দেশ পালন করতে, তারা বন্দুকের সাথে সাথে বাড়ির মেয়েদের গয়নাও নিয়ে এসেছিলো লুঠ করে। যা দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হয় নীলদা। পরিষ্কার বলে দেয় যে এটা পার্টির কর্মসূচির মধ্যে পড়েনা। আরও বলে যে পরের রাত্রে ও নিজেই গিয়ে সে বাড়ির মেয়েদের গয়না ফেরৎ দিয়ে আসবে। আর তার সাথে নিজের পার্টি কমরেডদের করা গর্হিত কাজের জন্য ক্ষমাও চেয়ে আসবে সে বাড়ির মহিলাদের কাছে। পুলিশ ইনফর্মারের কাজ করে এই খবরটাই কাছের থানাকে জানিয়ে দিয়েছিলো নীলদারই এক বিশ্বস্ত সঙ্গী। পরের রাতে সে বাড়িতে গিয়ে গয়না ফেরৎ দিয়ে যখন বেরিয়ে আসছে তখনই পুলিশ চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে এরেস্ট করে নীলদাকে। এমনকি নিজের কোমর থেকে আগ্নেয়াস্ত্রটা বার করার সময়ও পায়নি সে। সেই রাতেই খবর পাঠানো হয় বেহালা থানাকে। একেবারে সকালেই বর্ধমান পৌঁছে অনিল চক্রবর্তী, এলিয়াস নীলকে শনাক্ত করে বেহালা থানার পুলিশ। দেরি না করে সেদিনই নিয়ে আসা হয় তাকে বেহালা থানায়। বেহালা থানার দায়িত্বে তখন নকশাল দমনের জন্য বিশেষভাবে নিয়োগ করা ওসি সুবীর ঘোষ। তিনি অবশ্য সে দায়িত্বে এখনও আছেন। পুলিশের ওপর নির্দেশ ছিল যে এনকাউন্টার দেখিয়ে নীলকে গুলি করে মারার। কিন্তু মেসোর কাছে শুনেছে সুমিতা , বেহালা থানার পুলিশরাই নাকি বেঁকে বসেছিল। তারা নাকি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলো যে নীলের মতো ছেলেকে গুলি করা তো দূর, ওর গায়ে হাত দিতেও পারবে না তারা। কিন্তু কংগ্রেসের কোনও এক অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতার নির্দেশেই নাকি, লালবাজার থেকে ফোর্স নিয়ে এসে পরদিন কাকভোরে হাতকড়া পরানো নীলকে পুলিশ ভ্যানে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় চোঙার বনের পেয়ারাবাগান অঞ্চলে। সেখানেই ভ্যান থেকে নামিয়ে একেবারে পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি করা হয় নীলকে।
নীলের মৃতদেহ যখন নিয়ে আসা হয়েছিল বেহালা থানায়, তারপর তার বাড়িতে খবর দিয়ে ডেকে আনা হয়েছিল ওর মাকে। দূর থেকে শুধু একবার ছেলের মৃতদেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ওনাকে। স্থানীয় এক ডাক্তারকে দিয়ে লেখানো হয়েছিল ডেথ সার্টিফিকেট। কোনও পোস্ট মর্টেম হয়ইনি। সোজা নীলের মৃতদেহ নিয়ে কালীঘাট শ্মশানের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখন পুলিশ।
সত্যজিৎ রায়ের সীমাবদ্ধ রিলিজ করেছে ঠিক তার আগের দিন। অজন্তা সিনেমা হলেও এসেছে সে চলচ্চিত্র। আর বেহালার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ জড়ো হয়ে গিয়েছিলো বেহালা থানার সামনে। তাদের দাবী, নীলের মৃতদেহ তুলে দিতে হবে তাদের হাতে। সবাইকে অবাক করে সে মানুষদের সাথে মিশে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিল অজন্তা সিনেমাহলের সামনে একসময় টিকিট ব্ল্যাক করা ব্ল্যাকাররাও। যাদের টিকিট ব্ল্যাক করা বন্ধ করে দিয়েছিলো নীল একসময়, সেই ব্ল্যাকাররা। অবশেষে লালবাজার থেকে বিশাল পুলিশবাহিনী এসে সেদিন উত্তেজিত জনতাকে স্রেফ লাঠিচার্জ করেই হঠাতে পেরেছিলো।"
---------------------
ওপরের অংশটুকু নেওয়া হয়েছে এই অধমেরই লেখা "ছায়াপথ" উপন্যাস থেকে। কিন্তু সে উপন্যাস লিখতে গিয়ে যে সব তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম আমি, যত মানুষের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল, যত জায়গায় ঘুরেছি, তার মনে হয় সিকিভাগও লিখতে পারিনি উপন্যাসে। আর তা ছাড়া নিজেই তো ভেবেছি বহুবার যে গণহত্যা কী আদৌ কোনো দলীয় লাইন হতে পারে? না হওয়া উচিত?
আজ সেই দুমলাটের বাইরে থাকা কিছু কথা জানাই বরং। এই সব কথাই আমি সংগ্রহ করেছিলাম একেবারে ব্যক্তিগত কিছু সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে।
বেহালা অঞ্চলের ডাকাবুকো নকশাল নেতা নীল চক্রবর্তীর সম্মন্ধে তথ্য সংগ্রহ করার সময় সত্যিই পড়েছিলাম ঝামেলায়। নিজে থাকি বেহালায়। বেহালার ওঠাপড়া অনেক কিছুরই সাক্ষী আমি। কিন্তু নীলের বাড়ি আর কিছুতেই পাই না খুঁজে।
ধরলাম বেহালার আরেক পুরোনো নকশাল নেতা পরিতোষ ভট্টাচার্যকে। বর্তমানে নামের আগায় চন্দ্রবিন্দু বসে গেলেও ইনি ছিলেন বেহালার আর এক ডাকাবুকো নকশাল নেতা আশুতোষ ভট্টাচার্যের ছোটভাই। এবং এই দুই ভাই মিলেই বেহালা রবীন্দ্রনগরে স্থাপনা করেছেন চারু মজুমদার এবং সরোজ দত্ত'র আবক্ষ মূর্তি। পরিতোষ ভট্টাচার্য আমাকে যার সন্ধান দিলেন তিনি নীল চক্রবর্তীর একদা সহযোগী। তিনি অবশ্য সহযোদ্ধা বলেই করলেন সম্বোধন। ওঁর নাম? নাম ধরুন...ধরুন...ধরুন বুড়ো। আমি যদিও প্রথম সাক্ষাতেই ডেকে বসলাম বুড়ো'দা বলেই।
এবার প্রথম সাক্ষাতেই প্রশ্ন করে বসলেন এই বুড়ো'দা।
-- নকশাল নিয়ে লিখে কত লেখক তো বিখ্যাত হয়ে গেল। কিন্তু কাউকে দেখলাম না আসল কিছু ঘটনা লিখতে। সে বুঝি যে অনেকে জানেই না সব কিছু তো লিখবে কী? কিন্তু তুমি হঠাৎ এতদিন পর খোঁজ করছো নীলের? কেন বলো তো?
বললাম আমার উদ্দেশ্য ও বিধেয় সব। শুনে তিনি বললেন যে তুমি এক কাজ কর। তুমি সামনের সপ্তাহে এস। ততদিন আমি একটু মনে করে রাখি বরং।
গেলাম অগত্যা পরের সপ্তাহেই। আবার হাজির হলাম বুড়ো'দার ভাঙাচোরা ঘরে। এবার প্রথমেই তিনি বললেন যে শুধুমাত্র একটা কারণেই আমায় কিছু খোঁজ খবর দেবেন। কারণ উনি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন যে শুধু বেহালা নয়, গোটা রাজ্যেই এই প্রথম কেউ নীলের সম্মন্ধে কিছু লিখতে চাইছে।
বুড়ো'দা এখনো বর্তমান। বয়স আশি ছাড়িয়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালে ওঁর বয়স সম্ভবত ছিল তিয়াত্তর কী চুয়াত্তর। ওই বয়সেও ছ'ফুটের ওপর লম্বা মানুষটা বেঁকে যাননি একটুও। ঘরে থাকলে প্রায় সময়ই পরনে থাকে একটা লুঙ্গি। আর ঊর্ধাঙ্গ থাকে অনাবৃত। এবং দিনে মোটামুটি প্যাকেট দেড়েক বিড়ি তো লাগেই। সেই বিড়িই এবার আয়েশ করে ধরালেন একটা। তারপর শুরু করলেন বলতে।
-- বুঝলে, যদি এককথায় জানতে চাও তাহলে বলব যে নীল ওয়াজ আ জেম। আ আনকাট জেম।
-- এককথায় তো জানতে চাইছি না দাদা। আপনি বরং কথাগুলোকে বিস্তৃত করুন।
-- নীল ছিল হারা চক্রবর্তীর ভাই। এই অঞ্চলে তখন হারা'দা ছিল সিপিএম-এর একনিষ্ঠ কর্মী। নীল নিজেও আগে ওই সিপিএম পার্টি দিয়েই শুরু করেছিল জীবন। রাধিকাদা খুব ভালোবাসত নীলকে। ওর বয়স যখন কুড়ি হল, তখন ওই রাধিকাদাই ওকে ঢুকিয়ে দেয় ব্রিটানিয়ায়। সেটা মনে হয় '৬৬ সাল হবে। সিপিএম করার সময় নীলকে একবার ধরেওছিল দেবী রায়ের পুলিশ। ওই রাধিকাদাই ছাড়ায় তখন ওকে।
এবার আমি পড়ি ধন্দে। এই রাধিকাদা'টি আবার কে। ব্রিটানিয়া বিস্কুট কোম্পানির কোনো হোমরা চোমড়া নাকি। সে কথা শুধাতে উত্তর এল -- রাধিকা'দা মানে সিপিএমের রাধিকা রঞ্জন ব্যানার্জী। কামারহাটির এমএলএ ছিলেন।
নিভতে বসা বিড়িতে আবার দুটো টান দিয়ে শুরু করলেন বুড়ো'দা।
-- বিশালাক্ষীতলার যে খালপাড়ের বস্তিটা আছে, ওই বস্তিতেই জন্মেছিল নীল। ওখানেই ছিল ওদের ঘর। চারদিকের ওই খিস্তি খেউড় আর মদ গাঁজার চাষের মধ্যে থেকেও ও ছেলে জীবনে কোনোদিন কোনো নেশাও করেনি আর ওর মুখে কেউ কোনোদিন একটা নোংরা কথাও শোনেনি। ব্রিটানিয়াতে চাকরি করতে করতেই ওর মোহভঙ্গ হয় পার্টির প্রতি। ও চলে আসে এদিকে। অ্যাই তুমি তো বাইক নিয়ে এসেছ তাই না?
কোন কথা থেকে কোন কথা! হচ্ছিল নীল চক্রবর্তীর কথা। সেখানে আমার সাধের বাইকটা এল কোথা দিয়ে সেটাই এবার মিনমিন করে জিজ্ঞাসা করলাম আমি। ওদিকে বুড়ো'দা দেখি ততক্ষণে গায়ে একটা ফতুয়া পরে নিয়েছেন।
-- চল চল...তোমায় একটা জিনিস দেখিয়ে নিয়ে আসি।
বের হলাম অগত্যা। বাইক স্টার্ট দিয়ে দেখি বুড়ো'দা ওই লুঙ্গি পরিহিত অবস্থাতেই একদিকে পা দিয়ে উঠে বসলেন বাইকের পিছনে। ওঁর দেখানো রাস্তাতেই এবার ছুটল বাইক। এসে পৌঁছলাম বিশালাক্ষীতলার খালপাড়ের সেই বস্তিতে। আগে ছোট থাকলেও খালের জমি জবরদখলের কারণে বস্তি এখন কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকটাই। বস্তিতে ঢোকার মুখেই বড় রাস্তায় একটা বেশ বড় ধরনের স্কুলও আছে। তকমায় সে স্কুল হায়ার সেকেন্ডারি। স্কুলবাড়ির গায়ে দিব্যি পরেছে নীল সাদা রঙের পোঁচ। আর বস্তির ভিতরে ছোট্ট একটি বাড়ির সামনে নিয়ে এসে দাঁড় করালেন বুড়ো'দা। সে বাড়ি দেখিয়ে এবার বললেন...
-- এই যে বাড়িটা দেখছ, এই বাড়িটায় একসময় ছিল প্রাইমারী স্কুল। আর এটা বলতে গেলে একাই তৈরি করেছিল নীল। ওদের ঘর ওই বাঁদিক দিয়ে গেলে পড়বে। এই জমিটা তখন ছিল খালি। সঙ্গে আরও দু'চারজন ছেলে জুটিয়ে এ জমিতে বাঁশ পুঁতেছিল ও। তার পরদিন এখানেই দরমা আর টালি দিয়ে তিনটে ঘরও ফেলল বানিয়ে। আর বলে দিল যে বস্তির বাচ্চারা এখন থেকে এখানে এসে পড়ালেখা করবে। তখন কতই বা বয়স ছিল ওর? ওই আঠারো উনিশ হবে মনে হয়।
দেখলাম সেই বাড়ি। সে বাড়ির দশাও একেবারে তথৈবচ। সেটাই বললাম এবার। শুনে দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন বুড়ো'দা...
-- এখন এই বাড়ির আর সে পরিচয় নেই ভাই। চল, এবার ফিরে যাই আমরা।
সেদিনের কথার সেখানেই ইতি টানা হলেও পরদিন আবার আমি হাজির বুড়ো'দার ঘরে। আজ বুড়ো'দা পরেছেন ফতুয়া এবং পাজামা। এবার বাইকে বসে দিকনির্দেশ করলেন তিনি। আর বাইক চালিয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম বনমালী নস্কর রোডের সমান্তরাল এক ছোট্ট রাস্তায়। এ রাস্তাতেও দেশলাই বাক্সের মত বেশ কিছু ফ্ল্যাটবাড়ী মাথা তুললেও একটি বাড়ি যেন আজও রয়েছে রংচটা মলিন অবস্থাতেই। সে বাড়ির সামনে এসে হাঁক পারলেন বুড়ো'দা...
-- গৌরা আছিস নাকি রে?
ভাঙ্গা লোহার দরজা খুলে যিনি বের হলেন তিনিও বুড়ো'দার সমবয়সীই হবেন। তবে উচ্চতায় অনেক কম। ডেকে নিয়ে গেলেন বাড়ির ভিতরে। সে বাড়িতে ঢুকেই ডানহাতের একটি ঘরে এসে বসলাম আমরা। এ ঘরে আছে একটি তক্তপোষ আর একটি মাত্র চেয়ার। আমি বসলাম সেই চেয়ারেই। বুড়োদা বসলেন তক্তপোষে। সে ভদ্রলোকের দিকে দেখিয়ে বললেন...
-- দেখে রাখো। এ হচ্ছে গৌর। আর এই হচ্ছে সেই ঘর।
দেখলাম, এবং কিছুই বুঝলাম না। আমার অবস্থা বুঝেই এবার আবার বললেন তিনি...
-- এই গৌরের বাড়িতে, এই ঘরেই হয়েছিল সিপিআই( এম এল) - এর ফার্স্ট পার্টি প্লেনাম।
এমন একটা কথা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না আমি। শুনে কেমন জানি একটা ঘোর লেগে গেল আমার। শুধু বলতে পারলাম...
-- এই ঘরে???
-- হ্যাঁ ভাই। এত লোক তো লেখে নকশালদের নিয়ে। কিন্তু ক'জন জানে এই কথা?
-- বুড়ো'দা, ফার্স্ট পার্টি প্লেনাম মানে তো তখন সিপিআই(এম এল)-এর সব প্রথমসারির নেতাই এসেছিলেন?
-- হ্যাঁ, এসেছিলেন তো। কে আসেননি সেদিন? সিএম তো ছিলেনই...
-- সিএম মানে?
-- চারু বাবু। তোমরা যাকে চারু মজুমদার নামেই চেন। ওঁর নাম আর পদবীর আদ্যক্ষর নিয়েই ওই সিএম তৈরি হয়। পার্টিতে উনি সিএম নামেই পরিচিত ছিলেন।
-- বুঝলাম। আর কে কে ছিলেন দাদা?
-- কে ছিলেন না সেটা বলো? সিএম নিজে ছিলেন। এ ছাড়া সরোজ দত্ত, সুশীতল রায়চৌধুরী, কানু স্যানাল, কাকা...মানে অসীম চ্যাটার্জী, মেদিনীপুর থেকে বাবলু মজুমদার, ওড়িশা থেকে আপ্পাসুহৃৎ পট্টনায়েক, জঙ্গল সাঁওতাল...সবাই ছিলেন সেদিন।
এবার একটু থেমে আবার শুরু করলেন তিনি।
-- সিএম, সুশীতল রায়চৌধুরী আর কানু স্যানালকে নিয়ে আসা হয়েছিল হাইড রোড দিয়ে। জিনজিরার পোল টপকে পর্নশ্রীর ঝোপ ঝাড় আর খাল পার করে সে ট্যাক্সি এসেছিল এখানে। কাকার সঙ্গে এসেছিল বাবলু মজুমদার আর আপ্পাসুহৃৎ পট্টনায়েক। আর জঙ্গল সাঁওতালকে সেন্ট্রাল অ্যাভেন্যুর এক ডেরা থেকে নিয়ে এসেছিলাম আমি নিজে। এই বেহালার থেকে সেদিন উপস্থিত ছিল নীল, আশু ভটচাজ আর গণেশ ঘোষাল।
-- কিন্তু বুড়ো'দা, চারু মজুমদারের ট্যাক্সি রাস্তা চিনে এ বাড়িতে এল কীভাবে?
এবার হাসলেন বুড়ো'দা। হেসে বললেন -- ও ট্যাক্সির সামনে বসেছিল নীল নিজে। তবে সবচেয়ে মজা হয়েছিল সরোজ দত্তের বেলা।
-- মজা?
-- তবে আর বলছি কী। '৬৯ এর ২২শে এপ্রিল লেনিনের জন্মদিনের দিন তৈরি হল পার্টি। ১লা মে প্রথম মিটিং হল ময়দানে। ওইদিনই সবাই জানলো পার্টির নাম। সরোজ দত্তের ওপর সেদিন থেকেই পুলিশ রাখছিল নজর। জুন মাসে হয়েছিল প্লেনাম।এবার প্লেনামের দিন সকালে সরোজ দত্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন যে নিউ আলিপুরের বুড়ো শিবতলায় এক পরিচিতর বাড়িতে আসবেন সন্ধ্যাবেলায়। সেই মতো বেরও হলেন বাড়ি থেকে। কবি মানুষ। গায়ে সাদা পাঞ্জাবির ওপর কাঁধে ঝোলানো একটা শান্তিনিকেতনি ব্যাগ। সবাই জানে যে ও ব্যাগের ভিতর কবিতার খাতা ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু সেই ব্যাগে একটা খদ্দরের পাঞ্জাবিও নিয়েছেন তিনি।
-- বুঝেছি। মানে রাস্তাতেই ওই পাঞ্জাবি বদল করে...
-- উঁহু অতটা সোজা নয় গো। উনি আসলেন সেই পরিচিতর বাড়ি। ওদিকে পুলিশের ফেউ পিছন পিছন এসে অপেক্ষা করতে থাকল রাস্তায়। আর উনি পাঞ্জাবি পাল্টে সে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এলেন এখানে সুচিত্রা সিনেমার পিছনের রাস্তায়। তখন বেহালা থানাটা ছিল বনমালী নস্কর রোডে ঢুকে বাঁদিকে। উনি একে তাকে জিজ্ঞাসা করে যেন কিছুই জানেন না এমন ভাবে আর্য সমিতির পাশের গলি দিয়ে হেঁটে আসলেন হরিসভার সামনে। ওখান থেকে দলের ছেলেরা নিয়ে আসলো এই বাড়িতে।
কোনো ক্রাইম থ্রিলারের চেয়ে কম নয় এই কাহিনী। আমি শুনছি আর কুড়িয়ে নিয়ে জমানোর চেষ্টা করছি সেদিনের সব ঘটনাবলী। বুড়ো'দা খানিক হাসলেন এবার। একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করলেন...
-- এ ঘরে ওই জানালার ধার ঘেঁষে বসেছিলেন চারুবাবু। দুপাশে বসেছিলেন কানু স্যানাল এবং সরোজ দত্ত। এই ঘরে সেদিন পার্টির ফার্স্ট প্লেনামের সাথে সাথেই তৈরি হয়েছিল বি আর এস এফ।
-- সেটা আবার কী দাদা?
-- বেহালা রিজিওনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন। আসলে প্রথমে ঠিক হয়েছিল যে এই প্লেনাম হবে যাদবপুরের কোথাও। কিন্তু আশুদা বলে পাঠালো যে যাদবপুরের প্রায় প্রতিটা ঘরের দিকেই নজর রেখেছে পুলিশ। নীল শুনে বলল যে তাহলে আমরা ব্যবস্থা করি।
-- আশুদা মানে...
-- আরে আশু মজুমদার। আমাদের বেহালার সঙ্গে তখন যাদবপুরের যোগাযোগ থাকত শুধু হাবুলের মাধ্যমেই। এটা যদিও ওর আসল নাম নয়। এটা ছিল পার্টির ভিতরের নাম। আর জানো তো, এই হাবুলকে কিন্তু কোনোদিন ধরতে পারেনি পুলিশ।
-- এ তো পুরো গুপ্তচর দাদা।
-- তবে আর বলছি কী। এমনিতেও হাবুল কাজ করত ভবানীপুরের একটা ট্রান্সপোর্ট অফিসে। আর নেশার মধ্যে ছিল তাস খেলা আর পান খাওয়া। পুলিশ কোনো সন্দেহই করেনি কোনোদিন।
-- কেন দাদা?
-- আরে সন্দেহ করবে কী? একে তো হাবুলের চেহারা ছিল একদম সাদামাটা। তার ওপর ওই পান জর্দার নেশা।
-- কিচ্ছু বুঝলাম না দাদা।
-- শোনো, তুমি ক'জন পার্টির লোককে দেখেছ বলো তো যাদের পান জর্দার নেশা আছে? প্রায় নেই বললেই চলে। পার্টির ছেলেরা করতো বিড়ির নেশা। অতএব...
কথা এগোনোর সাথে এবার ঘরে ঢুকলেন গৃহকর্তা গৌরদা নিজে। পিছনে একটি বাচ্চা মেয়ে। এ মেয়েটি গৌরদার নাতনি। সে বয়ে নিয়ে এসেছে চায়ের কাপ আর বিস্কুট সমেত একখানা ট্রে। বিস্কুট সহযোগে সেই চা খেতে খেতেই শুনলাম এবার অনিল চক্রবর্তী ওরফে নীলের কাহিনী। দুজনেই বললেন নিজেদের মতো করে। কথাপৃষ্ঠেই বললেন বুড়ো'দা...
-- বর্ধমান থেকে ধরে নিয়ে এসে আলিপুর জেলে রাখা হয়েছিল নীলকে। সেখান থেকেই সিআরপি আর বেহালা থানার পুলিশ বের করে আনে নীলকে। কোনো কোর্টের অনুমতি ছাড়াই সেদিন এ কাজ করেছিল পুলিশ।
আমি নিশ্চুপ হয়ে শুনে চলেছি সেদিনের সেই ঘটনার কথা। গৌর'দা এবং বুড়ো'দা দুজনে মিলেই একসাথে জানালেন এবার...
"চোঙারবনে ভ্যান থেকে নামিয়ে নীলের পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি চালিয়েছিল অবশ্য বেহালা থানারই দুজন। তারা হল..."
না, সে নাম সেদিন শুনলেও প্রকাশ করতে অপারগ আমি। কারণ শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছুই লেখা উচিত নয়। কিন্তু এরপর যা শুনলাম তাতে মাথাটা আমার কেমন জানি ঘুরেই গেল এবার।
-- শুধু কি পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি? মৃত্যু নিশ্চিত করতে এবার রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে কেটে দেওয়া হয় নীলের গোড়ালির ওপর দু'পায়ের শিরা।
এরপরই নীল চক্রবর্তীর প্রাণহীন নিথর দেহ নিয়ে পুলিশের কালো ভ্যান এসে পৌঁছায় বিশালাক্ষীতলার বস্তির সামনে। সকাল তখন সবে সাত কী সাড়ে সাত হবে। নীলের মা'কে ডেকে নিয়ে এসে দেখানো হয় ছেলের মৃতদেহ। এরপরই ভ্যান ঘুরিয়ে চলে যায় আবার বেহালা থানার উদ্দেশে। সে ভ্যানের সামনে থাকা জিপে তখন ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে আছেন বেহালা থানার ওসি সুবীর ঘোষ। কড়া হাতে নকশাল দমন করার জন্য যাকে বিশেষ ভাবে নিযুক্ত করেছিলেন ডিসি ডিডি দেবী রায় নিজে।
যদিও থানায় সে ভ্যান ফিরে যাওয়ার আগে দাঁড়িয়েছিল আরো একবার। বনমালী নস্কর রোড সংলগ্ন এক গলির সামনে দাঁড়িয়েছিল সেই ভ্যান। সামনের জিপ থেকে নেমে গলিতে ঢুকেছিলেন ওসি সুবীর ঘোষ। সে গলির ভিতরের এক বাড়ির থেকে টেনে বের করা হয়েছিল বছর বাইশ তেইশের এক তরুণীকে। জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে তাকে দেখানো হয়েছিল নীলের রক্তাক্ত মৃতদেহ। সে তরুণীর অপরাধ? অপরাধ একটিই। সে ছিল নীলের প্রেমিকা। সে তরুণীর নাম? নাম ধরে নিন না মহুয়া...মৌপিয়া...মহানন্দা...অথবা...মন্দাক্রান্তা।
শেকসপিয়র তো কবেই বলে গেছেন...নামে কী এসে যায়।
চা শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। আয়েশ করে বুড়ো'দা এবার নিজে একটা বিড়ি ধরিয়ে গৌরদাকেও এগিয়ে বিড়ির প্যাকেট। দুজনে মিলে একসাথে বিড়ি টানবার ফাঁকেই আবার বললেন বুড়ো'দা...
-- বেলা ওই দুটো আড়াইটে নাগাদ নীলের বডি যখন নিয়ে আসা হয়েছিল ক্যাওড়াতলায়, আমরা তখন হাজির হয়েছিলাম খালের উল্টো দিকে কটা কালীর চায়ের দোকানের সামনে। অনেকেই ছিলাম বুঝলে। আমি, পল্টু, বাবু দত্ত, দ্বারকা, কান্ত, কানু, মন্টু সবাই ছিলাম সেদিন ওখানে। ওখান থেকেই স্লোগান দিচ্ছিলাম আমরা কমরেড নীল চক্রবর্তী অমর রহে।
-- সেকি বুড়োদা! পুলিশ তাড়া করেনি আপনাদের।
-- আরে খালের ওপার থেকে সবই দেখছিল পুলিশ। কিন্তু কিছু বলতে করতে পারছিল না। আসলে আমাদের সেদিন গার্ড দিয়ে রেখেছিল ভীমের ছেলেরা।
-- ভীম মানে...?
-- ভীম মানে চেতলার ভীম। ও নিজে ছিল কংগ্রেসের। কিন্তু নীলের থেকে ওর গোটা ফ্যমিলি আর চেতলার অনেক ছেলে এত উপকার পেয়েছিল যে ও বলেছিল --"তোরা খালের এ পাড়ে দাঁড়া। গোটা চেতলার ছেলেরা আজ তোদের সঙ্গে আছে। আজ পুলিসকে খাল পোল টপকাতে দেব না কিছুতেই।"
অনেকক্ষণ বসলাম গৌরদার এই বাড়িতে। এবার ওঠার পালা। বুড়োদাকে আবার ছেড়ে দিয়ে আসবো বাড়িতে। ওঠবার মুখেই কেমন জানি হতাশ মুখেই বললেন এবার তিনি...
-- আসলে কী জানো? মরতে নীল'কে হতই। হয় দলের ভিতরের কেউ মারতো। আর নয়তো বাইরের কেউ। পুলিশ শুধু সেদিন গুলি করেছিল।
-- সে কি বুড়ো'দা? এত কিছুর পর এখন আপনি বলছেন এই কথা?
-- বলব না? আজকাল তো কথায় কথায় তোমরা ব্যবহার করো সোশ্যাল রিফর্মার কথাটা। কিন্তু আদতে ক'জন হয় বলো তো ওই সোশ্যাল রিফর্মার? নীল ছিল সেই সত্যিকারের সমাজ সংস্কারকদের একজন।
-- কেন বলছেন দাদা এই কথাটা?
-- ভেবে দেখো। একটা ছেলের মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে জীবনটা শেষ হয়ে গেল। আর ওই বয়সের মধ্যেই ও নিজের বস্তিতে একটা প্রাইমারী স্কুল চালু করেছিল। ওই তারাতলার ওপারটা ছিল মন্টুর, আর এপারটা ছিল মোটুর দখলে। শঙ্কর পাইক ওই মোটুর দলেই ছিল। পরে তো মোটুকে মেরে নিজেই...। সে হোক, ওদের ওই লোহার ছাঁটের ব্ল্যাক মার্কেট আর তা নিয়ে খুনোখুনি মারামারি বন্ধ করে দিয়েছিল নীল। অজন্তা সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক বন্ধ করে দিল। এখন তো ক্রেডিট নিতে অনেকেই আসে। কিন্তু ওই ব্ল্যাকারদের ও নিজে বসিয়ে দিয়েছিল ঘোলসাহাপুর বাজারে। বলেছিল এখানে বসে সবজি বিক্রি কর সবাই, কিন্তু টিকিট ব্ল্যাক চলবে না। তা ছাড়া গোটা এলাকার মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে শুরু করেছিল ও দলের ছেলেদের নিয়ে। সেই দলেরই অনেকের চক্ষুশূল হয়ে গেল ও।
-- কেন বুড়ো'দা?
-- কেন আবার? Mass Annihilation এর বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছিল। বলতে শুরু করেছিল যে গণহত্যা কোনো দলের লাইন হতে পারে না। বাইরে শত্রু, দলে শত্রু। প্রচুর শত্রু বানিয়ে ফেলেছিল বুঝলে। সমাজের সংস্কার চেয়েছিল। সেই সমাজই শেষে ওকে মারলো।
বাইক চালিয়ে আবার এলাম বুড়ো'দার বাড়ির সামনে। ফেরার আগে শুধু কৌতূহলবশতঃই বলে বসলাম আমি।
-- ও বুড়ো'দা...একটা কথা বলব?
-- হ্যাঁ, বলো না।
-- মানে একটা আবদার আর কি।
-- আরে শুনিই না।
-- বলছি যে ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করা যায় একবার?
-- কোন মহিলা গো?
-- ওই যে... নীল চক্রবর্তীর বান্ধবী।
-- অ্যাই...যাও তো তুমি। আমার মেলা কাজ আছে এখন।
ঘরে ঢুকে যান বুড়ো'দা। কিন্তু একটা জেদের বশেই আবার পরদিন হাজির হই ওঁর বাড়িতে। অনুরোধ আবদার সব ওই একটাই। দেখি সেটা পূরণ হয় কিনা।
বহুক্ষণ ধরে বুড়ো'দাকে বোঝানোর পর রাজি হলেন তিনি। ঠিক হলো পরের সপ্তাহে যাব সেই মহিলার বাড়ি। তবে পইপই করে বলেও দিলেন বুড়ো'দা যে আমি যেন বাড়তি কথা একেবারেই না বলি সেখানে। কারণ জিজ্ঞাসা করায় জানালেন যে শুধুমাত্র নীল চক্রবর্তীর বান্ধবী হওয়ার কারণেই তাকে একসময় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পাঁচ বছর জেলে থেকে '৭৭ সালে আর সবার সঙ্গেই ছাড়া পান তিনি। বুড়ো'দা নিজেও জেল থেকে ছাড়া পান ওই সময়ই। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার কয়েক মাস পর দলেরই অন্য এক কমরেডের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। কারণ নিজের বাড়িরই কেউ আর ঠাঁই দিতে রাজি হয়নি ওঁকে। বিয়েটা বলতে গেলে এই বুড়ো'দাদের গ্রুপেরই সবাই মিলে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছিলেন দুজনকে। বিয়ে হয়েছে। কিন্তু মহিলা থেকে গেছেন নিঃসন্তান হয়েই। কারণ? কারণ অতি সামান্যই। গ্রেপ্তারের পর তখনকার মত পুলিশি অত্যাচার সামলে নিলেও সন্তান ধারণের ক্ষমতাই আর ছিল না ওঁর।
প্রায় দু'সপ্তাহ পর বুড়ো'দা আমায় নিয়ে চলেছেন শহরের উপকন্ঠের এক বাড়িতে। সেখানেই থাকেন তিনি। স্বামী মারা গেছেন কয়েক বছর হল। এখন একাই থাকেন। স্বামী কাজ করতেন এক প্রাইভেট কোম্পানীতে। সেখানে কাজ করেই যেটুকু জমাতে পেরেছেন, সেই জমানো টাকার সামান্য সুদেই এখন জীবন নির্বাহ করেন তিনি।
আজ আর বাইক নয়। আজ উবের বুক করেই চলেছি দু'জনে। যেখানে এসে থামলাম তার সামনেই ইট বাঁধানো রাস্তার ওপর ছোট্ট একটি দেড়তলা বাড়ি। দরজা খুললেন সেই মহিলাই। এবং প্রথম দর্শনেই মনে হল যে জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন যেন বয়সটা খানিক বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সামনে। দরজা খুলেই ডাক দিলেন তিনি...
-- আয় বুড়ো'দা। এস ভাই। ভিতরে এসে বসো।
ভিতরে ঢুকে বসলাম সে বাড়ির দুটি ঘরের একটিতে রাখা চেয়ারে। তিনি গেলেন অন্য ঘরে। খানিক পর দুটো থালায় চারটে করে রুটি আর খানিকটা তরকারি নিয়ে এসে দাড়ালেন তিনি।
-- বুড়োদা, এই রাত আটটায় এসেছিস। এখান থেকেই খেয়ে যা। নাও ভাই, তুমিও খাও।
ঠিক বুঝতেই পারছি না যে কী করব? কী করা উচিত? এই সত্তরোর্ধ্ব মহিলা এমন ভাবে কথা বলছেন যেন আমিও কতকালের চেনা। বুড়ো'দা দেখলাম বিনা বাক্যব্যয়ে শুরু করে দিলেন খাওয়া। ইশারায় বললেন যে আমিও যেন শুরু করেই দিই।
খাওয়া শেষে আবার সামনে এসে বসলেন তিনি। এবার ঝকঝকে একটা হাসি হেসে বলে উঠলেন...
-- তুমি নাকি আমাকে দেখতে চেয়েছো? কেন বলো তো? এই বুড়িকে দেখে তোমার কী কোনো আনন্দ হবে?
খুবই আমতা আমতা করে বললাম এবার আমার উদ্দেশ্য। উত্তরে তিনি জানালেন যে শুধুমাত্র একটি কারণেই তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছেন। কারণ এতদিন পরে হলেও কেউ তো অন্তত দুকলম লিখতে চায় নীল চক্রবর্তীর সম্মন্ধে।
ওঁর পিতৃগৃহের ফটো আগেই তুলেছিলাম মোবাইলে। সেটাই এবার দেখালাম। ফটোটা দেখতে দেখতে খুবই মৃদু স্বর শোনা গেল সেই কন্ঠ থেকে।
-- '৭৮ সালে বিয়ের পর থেকেই আর যাইনি ও বাড়িতে। কেন যাব? যেখানে কেউ চায় না আমায়, যেখানে সবাই আমায় মনে করে অবাঞ্ছিত, সেখানে আর যাবই বা কেন আমি?
এবার তিনি মুখ ঘোরালেন বুড়ো'দার দিকে।
-- বাড়িটা সেই একই রকম রয়ে গেছে। তাই না রে বুড়ো'দা?
বুড়ো'দা নিশ্চুপ। মহিলা এবার বাড়ির ছবিটার সামনে এক জায়গায় আঙুল রেখে আমায় উদ্দেশ করে বললেন...
-- এই জায়গা...বর্ধমান যাওয়ার আগে ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়েই বলে গিয়েছিল সে -- আসি রে। ভাবিস না, ঠিক ফিরে আসব আমি।
ঘরের আবহাওয়া কেমন জানি গুমোট হয়ে উঠেছে এখন। রাতও হয়েছে। বাড়ির দিকে ফিরতে হবে এবার। ওঠার আগে সামনের টেবিলে রাখা একটা খাম নিয়ে আমার হাতে দিলেন তিনি।
-- তুমি এটা রাখো। ওর মনে হয় আর কোনো ফটোই নেই। ব্রিটানিয়ার কয়েকজন মিলে ঘুরতে গিয়েছিল আগ্রায় তাজমহল দেখবে বলে। তখনই শখ করে তুলেছিল এই ফটোটা।
আমি পুরো বিহ্বল এইবারে।
-- সেকি!!! এ ছবি তো আপনার সম্পত্তি। আমায় দিচ্ছেন কেন?
-- না ভাই। এতদিন তো কাছেই রেখে দিয়েছিলাম। এখন তুমি রাখো। লেখো সেই মানুষটার কথা। যে কিনা একদিন দিন বদলের স্বপ্ন দেখেছিল।
শুধু জিজ্ঞাসা করতে পেরেছিলাম সেদিন যে -- আপনার রাগ হয় না? কষ্ট হয় না এখন?
হেসেই উত্তর দিলেন তিনি...
-- কষ্ট তো একটু হয়ই। তবে রাগ হয় না। আমি সবাইকেই ক্ষমা করে দিয়েছি এখন। এখন বুঝি যে রাগ হিংসা দ্বেষ এগুলো শুধু ক্ষতিই করে আমাদের। আর সত্যিই তো, হত্যা বা গণহত্যা, মানুষ মেনে নেয় না কোনোটাই।
ফিরে আসলাম সেদিন।
আর মনের মাঝে যেন গুমরে উঠতে থাকল কবি আরণ্যক বসুর মনে থাকবে- র কতকগুলো লাইন...
....
আমার অনেক কথা ছিল
এ জন্মে তা যায়না বলা
বুকে অনেক শব্দ ছিল__
সাজিয়ে গুছিয়ে তবুও ঠিক
কাব্য করে বলা গেল না!
এ জন্ম তো কেটেই গেল অসম্ভবের অসঙ্গতে
পরের জন্মে মানুষ হবো
তোমার ভালোবাসা পেলে
মানুষ হবোই__ মিলিয়ে নিও!পরের জন্মে তোমায় নিয়ে…
বলতে ভীষণ লজ্জা করছে
ভীষণ ভীষণ লজ্জা করছে
পরের জন্মে তোমায় নিয়ে…
মনে থাকবে?
সেদিন ফিরে আসার এতদিন বাদে লিখলাম সেই মানুষের কথা। সেই নীল চক্রবর্তী এবং তার কর্মকাণ্ডের কথা।
ওপরের ছবিতে তাজমহলের সামনে বসে থাকা নীল চক্রবর্তী।

শুক্রবার, ৭ জুন, ২০২৪

দ্বারকানাথ ঠাকুর কি সত্যিই বৌ-বাজারের ৪৩ টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন? ~ স্বপনকুমার ঘোষ

দ্বারকানাথ ঠাকুর বৌবাজারের ৪৩টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন বলে একজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন।
তার প্রতি উত্তরে আমার সংগ্রহে থাকা এই লেখাটি ছিল l
আমি পোস্ট করতে চাইনি কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে সেই প্রাইমারীস্কুল জীবন থেকে আজও শুনে আসছি।
♦♦যারা এগুলো করে তাদের একটা নিজস্ব মাইন্ডসেট আছে।
♦💥যতই প্রতি উত্তর দেয়া হোক তারা তাদের বিশ্বাস বা মনোভাব বদলাবে না।
♦তবুও পোস্ট দিলাম মূলতঃ বদিউদ্দীন নাজির ভাইয়ের পরামর্শে।
নাজির ভাইয়ের সাথে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই।
ফেসবুকেই যোগাযোগ।
এই যোগাযোগের মাধ্যমে ওনাকে যতটুকু জেনেছি তাতেই আমার মনে হল তাঁর পরামর্শ আমার মেনে নেওয়া উচিট।
♦লেখকের নাম ও যে গ্রুপ থেকে এ লেখাটি সংগ্রহ করেছি তা যথাযথভাবে উল্লেখ করেছি।
রোহিত সেনঃ মলাটগ্রুপ :-
♦দ্বারকানাথ ঠাকুর কি সত্যিই বৌ-বাজারের ৪৩ টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন ?
♦সেই পতিতা পল্লীর উপার্জনের টাকাতেই কি বোল বোলাও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ?
♦নাকি পুরোটা কাহিনীই একশ্রেণীর তথাকথিত গবেষকদের দ্বারা রবীন্দ্রনাথকে নিচে নামানোর প্রচেষ্টা ??
♦গবেষকের ভ্রান্তি : দ্বারকানাথ ঠাকুরের পতিতাপল্লী l
শ্রদ্ধেয় লেখক : কৃষাণু নস্কর l
♦এই লেখার মূল উদ্দেশ্য একটি l
♦দ্বারকানাথ ঠাকুর বিষয়ক একটি তথ্যের যাথার্থ বিচার।
♦প্রয়োজনীয় বইপত্র যা ব্যবহার করা হয়েছে সব গুলোই উল্লেখ করা হলো।
♦প্রথমেই এটা দেওয়ার কারণ লেখার মধ্যে যাতে সহজেই reference দিতে পারি।
কোনো তথ্যের পরে reference রূপে দুটো সংখ্যা থাকবে যার প্রথমটি নীচের তালিকায় থাকা বই বা পত্রিকার ক্রমিক আর দ্বিতীয়টি সেই বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা।
যেমন (৩, ১২৩) হলে তৃতীয় সূত্রে উল্লিখিত বইয়ের ১২৩ পৃষ্ঠা দেখতে হবে।
১) ডার্লিং ডোয়ার্কি – রঞ্জন বন্দোপ্যাধায় (প্রকাশক - শংকর মণ্ডল ২০১৮)
২) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা - ১৮৪৮ শক (1926)
৩) UNDER THE RAJ : PROSTITUTION IN COLONIAL BENGAL by SUMANTA BANERJEE (Monthly review press, 1988)
৪) Calcutta: Myths and History -
S.N. Mukherjee ( Subarnarekha 1977)
৫) Essays in Urban History - S.N. Mukherjee ( Subarnarekha 1993)
৬) সমকালীন ষষ্ঠ বর্ষ (১৩৬৫)
৭) রবিজীবনী ১ম খণ্ড - প্রশান্তকুমার পাল (ভুর্জপত্র)
৮) Modern History Of The Indian Chiefs Raja and Zamindar Part 2 - Loke Nath Ghosh (Calcutta 1881)
♦রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা দ্বারকানাথ ঠাকুর সেকালের কলকাতা তথা বঙ্গদেশের একজন প্রধান ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তি ছিলেন তা আমরা অনেকেই জানি।
বিভিন্ন রকমের ব্যবসা ছিল তাঁর।
♦ কিন্তু এই বিভিন্ন ব্যবসার মধ্যে একটি ব্যবসা কি ছিল পতিতালয়ের ব্যবসা ?
♦তিনি কি কলকাতা শহরের মধ্যেই একটি পতিতালয়ের মালিক ছিলেন বা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ?
♦প্রশ্নটা উঠছে কারণ বর্তমানে বেশ কিছু স্বনামধন্য ব্যক্তি এমন অভিযোগ করেছেন।
♦এবং এই সূত্র ধরে কিছু স্বঘোষিত রবীন্দ্র গবেষক (?) অভিযোগ করেন যে ঠাকুর পরিবারের একসময় রোজগারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এই বাঈজী ও বেশ্যাদের নিয়ে, যে টাকায় ঠাকুর বাড়ির সব সদস্যদের মতন রবীন্দ্রনাথও পরজীবীর মতন খেয়ে পরে দিনাতিপাত করেছেন আজীবন!!
♦সত্যিই তো, এমন ভয়ংকর অপরাধ যিনি করেছেন তাঁকেই কিনা আমরা "কবিগুরু" বলে সম্মান করি!!🥺
♦সুতরাং এ অভিযোগের সারবত্তা খতিয়ে দেখা জরুরি মনে হলো।
♦এই অভিযোগটির উৎস খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল ছিল কারণ বর্তমানে Google এ "দ্বারকানাথের বেশ্যালয়" শব্দবন্ধ উল্লেখ করে search করলেই উঠে আসে প্রচুর ব্লগের আন্তর্জাল ঠিকানা যেখানে এই কথাটি লেখা আছে এভাবে, "দ্বারকানাথঠাকুর কলকাতার একটি এলাকায় প্রায় তেতাল্লিশটি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন।
" বা এভাবে " রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকানাথের কলকাতা নগরীতে ৪৩টা বেশ্যালয় ছিলো।"
♦তো এ সব লেখার তথ্যসূত্র কি ?
♦দু- তিনটি সূত্র দেখা যায় ঘুরে ফিরে সব জায়গায় দেয়া।
♦সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, ১৯৬২, পৃ.৩৫৮-৬০ , এ এক অন্য ইতিহাস,অধ্যায় : অসাধারণ দ্বারকানাথ, লেখক: গোলাম আহমদ মর্তুজা পৃষ্ঠা: ১৪১,কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকা,২৮শে কার্তিক,১৪০৬,রঞ্জনবন্দ্যোপাধ্যায় l
♦এরমধ্যে শেষ দুটি সূত্র আসলে একই সূত্র কারণ গোলাম আহমদ তথ্যসূত্ররূপে দেখিয়েছেন ঐ রঞ্জন বন্দ্যোর: প্রবন্ধটিকে- ই।
♦রঞ্জন বন্দোপধ্যায়ের প্রবন্ধটি অবশ্য আমি হাতে পাইনি তাই জানিনা তিনি কেমন তথ্যসূত্র দিয়েছেন।
♦অবশ্য নিজের রচনাকে তথ্য সূত্রের ভারে ভারাক্রান্ত করার বদভ্যাস তাঁর আছে এমন দুর্নাম তাঁর অতিবড় শত্রু ও দেবে না।
💥কপোলকল্পিত উপন্যাস রচনায় তাঁর দক্ষতা অনস্বীকার্য।
♦কিন্তু সেই উপন্যাসগুলিতে প্রদত্ত তথ্যগুলিকে পরম সত্য বলে ভেবে নেওয়াতে আমার অন্তত ঘোরতর আপত্তি আছে।
♦২০১৫সালে প্রকাশিত "ঠাকুরবাড়ীর গোপনকথা: দ্বারকা নাথ থেকে রবীন্দ্রনাথ " গ্রন্থটিতে যদিও দ্বারকানাথের পতিতাপল্লীর ব্যবসা বিষয়ে কোনো কথা নেই ♦কিন্তু ২০১৮ সালে প্রকাশিত উপন্যাস "ডার্লিং ডোয়ার্কি" - তে পুনরায় একথা বলা হয়েছে যে "ফ্লেশট্রেড" করতেন দ্বারকানাথ, "নিষিদ্ধপাড়ায় তাঁর বাড়ী ছিল " (১, ১২৯)।
♦যদিও নিজের সুনামের প্রতি লক্ষ্য রেখে এখানেও ঐ তথ্য দেওয়া হয়েছে কোনো সূত্র বা reference ব্যতিরেকেই।
♦আচ্ছা তাহলে এ তথ্য টি কি ঐ ১ম সূত্রে উল্লিখিত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্ম জীবনীতে আছে? না নেই।
৩৫৮-৬০ পৃষ্ঠায় আছে "ঋণশোধ বিষয়ে দেবেন্দ্রনাথের সাধুতা" নামক অধ্যায়টি এবং সেখানে এমন কোনো তথ্যের সন্ধান আমি পেলাম না।
এবং হ্যাঁ আমি ঐ ১৯৬২ সালের সংস্করণটিই দেখেছি।
ঐ বইটির ৩৫৬ পৃষ্ঠায় "১৮৪০ সালে দ্বারকানাথের জমিদারী ও কারবার " নামে একটি ক্ষুদ্র অধ্যায় আছে কিন্তু সেখানেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্যনেই।
♦তাহলে শ্রী বন্দোপাধ্যায় কোথায় পেলেন এ তথ্য ?
💥শ্রীসতীশচন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয় "দ্বারকানাথের বিষয়সম্পত্তি"নামে এক টি প্রবন্ধ লিখেছেন যা ১৮৪৮ শক অর্থাৎ 1926 সালের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার কার্তিক ও অগ্রহায়ণ সংখ্যায় দুই পর্বে প্রকাশিত হয় (২,১৮৮-১৯২ ও২০৬-২১১) সেখানে ও দ্বারকানাথের এই বিশেষ ব্যবসাটির কোনো উল্লেখ নেই।
♦ব্লেয়ার বি কিং, কিশোরীচাঁদ মিত্র, ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কৃষ্ণ কৃপালনী প্রমুখ দ্বারকানাথের কোনো জীবনীকার যে এর কথা লেখেননি তা বলাই বাহুল্য।
♦এমনকি শুধুমাত্র দ্বারকানাথের ব্যবসা ও জমিদারী বিষয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন সেই রঞ্জিত চক্রবর্তী (দ্বারকানাথ ঠাকুর : ঐতিহাসিক সমীক্ষা) বা সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ( ভারতের শিল্পবিপ্লব : রামমোহন ও দ্বারকানাথ) ও নয়।
♦তাহলে এই তথ্যের উৎস কোথায় ?
♦অনেক খোঁজার পর সুমন্ত ব্যানার্জীর লেখায় পেলাম, " The old records showed up a 'brothel in 235 and 236 Bow Bazar Street, owned by a member of Dwarkanath Tagore's family. It had 43 rooms for prostitutes. . .' " (৩, ৭২)
♦এখানে তথ্যসূত্রের উল্লেখ্য আছে সেটি হলো "Essays in Urban History "by S.N.Mukherjee. S,N,Mukherjee বা সৌমেন্দ্রনাথ মুখার্জী Urban History বিষয়ে একজন গবেষক এবং গত শতকের সত্তরেরদশকে ইনি কলকাতা শহরের গড়েওঠা বিষয়ে কিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখেন যার মধ্যে একটি প্রবন্ধ আমাদের আগ্রহের বিষয় যার নাম " Calcutta in 1806: An essay in urban history and computer ".
এ প্রবন্ধটি 1993 সালে উপরোক্ত বইটি তে সংকলিত হয় যদিও তার আগেই 1977 সালে "Calcutta: Myths and History " নামক একটিবইতে সংকলিত হয়ে ছিল।
দুটি বইয়েরই প্রকাশক সুবর্ণরেখা।
♦উক্ত প্রবন্ধে তৎকালীন কলকাতার বাড়ি ঘর এর ধরন, মালিকানা, ভাড়া ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংকলিত হয়েছে।
♦লেখকের বক্তব্য অনুসারে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন কলকাতা কর্পোরেশনের ১৮০৬ সালের House Assessment Book (HAB) থেকে।
♦ইনি জানাচ্ছেন, "Notice the salient feature of our research: the major part of our time was absorbed in disaggregating and rearranging the data prior to the application of the Computer.
We analysed HABS withthe aid of non quantitative sources and applied the Computer to read, to identify, to count to classify and co-relate our variables.
The Computer is asked to do the tedious job of counting, but decisions about the data are made by the researcher.
His power is however limited by the very nature of the Computer program.
Many individual characteristics of our variables cannot be quantified and are lost in the IBM Punch Cards.
To save some of this interesting information we have used a system of comment cards. --------
For instance we have been able to retain some information about a prostitute called Moynah Tackooraney who owned two lots in Moonshy Suderuddy's Lane in which there were 14 straw huts, one upper roomed house and a mosque.
We do not know who were her clients and whether they prayed in her mosque.
The comment cards also preserved such information as that of a brothel in 235 and 236 Bow Bazar St., owned by a member of Dwarkanath Tagore's family.
It had 43 rooms for prostitutes and its rental value was 140." (৪, ১০০-১), (৫, ১২-৩)
এখানে লক্ষণীয় ঐ শেষ বাক্যটি "....a brothel in 235 and 236 Bow Bazar St., owned by a member of Dwarkanath Tagore's family.
It had 43 rooms for prostitutes and its rental value was140."
এটিই তাহলে ঐ তথ্যের উৎস যে দ্বারকানাথ ৪৩ (তেতাল্লিশ) টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন ?
♦আচ্ছা ভালো করে দেখুন তো বাক্যটি দ্বারকানাথ মালিক ছিলেন ঐ বেশ্যালয়গুলির এমন কথা কি বলা হয়েছে আদৌ ?
বলা হয়েছে দ্বারকানাথের পরিবারের কোনো সদস্য"।
♦তার মানে কি বকলমে দ্বারকা নাথ হতে পারেন না ?
♦না,পারেন না কারণ তথ্যটা ১৮০৬ সালের।
দ্বারকানাথ তখন ১১-১২ বছরের বালক মাত্র।
♦কোনো রকম আর্থিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি যুক্ত নন সে সময়ে।
দ্বারকানাথ উপার্জন করতে আরম্ভ করেন ষোলো বছর বয়সে অর্থাৎ আরও চারপাঁচ বছর পরে।
♦এমন তো হতেই পারে, যে ঐপতিতা পল্লীটি ছিল দ্বারকানাথের পালক পিতা , যিনি , তাঁকে দত্তক নিয়ে ছিলেন সেই রামলোচন ঠাকুরের।
♦পরবর্তীকালে দ্বারকানাথই এর মালিক হন এবং ব্যবসাটি পরিচালনা করতে শুরু করেন বয়ঃপ্রাপ্তির পরে ?
♦বিশেষত রামলোচন ঠাকুরের মৃত্যু হয় ১৮০৭ সালে এবং তাঁর সম্পত্তি সব দ্বারকানাথই পান।
♦সেক্ষেত্রে দেখা যাক, রামলোচনের থেকে দ্বারকানাথ উত্তরাধিকারসূত্রে কী কী পেয়েছেন।
♦রামলোচন মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে একটি will বা ইচ্ছাপত্র মারফৎ দ্বারকা নাথ কে নিজের সব সম্পত্তির উত্তরাধিকার দিয়ে যান।
♦সেই ইচ্ছাপত্রটি দেখে নেওয়া যেতে পারে
"আপন জ্ঞানপূর্ব্বক ও সেই উইল করিতেছি আমার পৈতৃক দৌলত নাই।
শ্রীশ্রী ঠাকুর ও জায়গা ও বাটী ও এলবাস পোষাক তাঁরা পিতল কাঁসার ও রূপা সোণার বাসনদিগর সেওয়ায় গহনা পৈত্রিক যা কিছু আছে ইহার তিন অংশের এক অংশ আমি পাইব দুই অংশ ভায়ারা পাইবেন পৈত্রিক ও আমার দত্ত সোনা রূপার গহনার অংশ হইবেক না, জাহির থাকে যে চিহ্ণিত আছে সে তাহারই থাকিবে।
আর সংসারের খরচ ও ধর্মতলার বাটীদিগর বানাতে মবল গহায় আমার নিজ ঢাকা বিং খাতা রোকড় ভায়াদিগের স্থানে আমার পাওনা আছে এবং অন্য অন্য লোকের স্থানেও যে পাওনা আছে আমার দেনা নাই এই সকল পাওনা ও পৈত্রিক হিস্যা ও আমার স্বোপার্জ্জিত দৌলত, সোনা রূপার বাসন ও এলবাস পোষাক ও জেলা যশোহরের মোতালক পরগণে বিরাহিমপুর জমিদারী ও সহর কলিকাতার মধ্যের খরিদা জায়গা ওগায়রহ সেওয়ায় রতন রাড়ের দরুন বাটী আমার সোপার্জ্জিত ও পৈত্রিক হিস্যা যাহা কিছু, সব তোমাকে দিলাম রতন রাড়ের দরুন বাটী খরিদ করিয়া তৎকালীন তোমার মাতাকে দিয়াছি এবং সন ১২১৩ সালে তোমার মাতার পূণ্যক্রিয়া অর্থে আমি তুষ্ট হইইয়া সিক্কা ১০,০০০ দশ হাজার টাকা দিয়াছি এ টাকা এবং রতন রাড়ের দরূণ বাটী ইহার সহিত তোমার এলাকা নাই ইহার দান বিতরণ এক্তার তোমার মাতার।
এখনও তুমি নাবালক একারণ এই জমিদারি ও গায়রহ জে কিছু বিষয় তোমাকে দিলাম ইহার কর্ম্মকার্য যাবৎ আমি বর্ত্তমান থাকিব তাবৎ আমিই করিব আমার অবর্তমানে যাবৎ তুমি বয়সপ্রাপ্ত না হও তাবৎ পরগণাদিগর এ সকল বিষয়ের কৰ্ম্মকাৰ্য্য ও সহী দস্তখত ও বন্দবস্ত ও হুকুম হাকাম সকলি তোমার মাতা করিবেন তুমি প্রাপ্ত বয়স হইলে জমিদারিদিগর আপন নামে হজর লেখাইয়া এবং আপন এক্তারে আনিয়া জমিদারির ও সংসারের কর্ম্ম কার্য ও জমিদারির বন্দবস্ত ও খরচপত্র ও গায়রহ মাতার অনুমতি পরামর্শে তুমি করিবা এবং জাবত তোমার মাতা বর্ত্তমান থাকিবেন ভাবত পরগণার মুনাফা ও গায়রাহ যাহা কিছু, আমদানির তহবিল তোমার মাতার নিকট যেমন আমি রাখিতাম তুমিও সেই মতো রাখিবা।
আমি ও তোমার মাতা যাবৎ বর্ত্তমান ও বর্ত্তমানা থাকিবেন ও থাকিব তাবত আমারদিগর পণ্য ক্রিয়া আদি যে কিছু, খরচপত্র এই দৌলাত হইতে পাইব।
আমার সোপার্জিত জায়গার কবালা ও বরনামা ও গায়রহ আমার স্থানে ছিল!
নিস্তীমতো তোমাকে দিলাম পৈত্রিক জায়গা ও বাটীদিগরের কবালা ও পাট্টা ও গায়রহ কাগজ রামমণি বাবুর স্থানে আছে জায়গা হিস্যা চিহ্ণিত মতো বুঝিয়া লইবা এতদৰ্থে উইলপত্র লিখিয়া দিলাম।" (৬, ৫৪৯) l
ঐ ইচ্ছাপত্রের সঙ্গে উল্লিখিত সম্পত্তির একটি তালিকাও ছিল যেটি এই প্রকার l --------
"জায় জায়গা সোপার্জ্জিত জমিদারি পরগণে বিরাহিম- -পুর মোতালকে , জেলা জসোহর - ১
সহর কলিকাতার মধ্যে ডোম পিদুরু সাহেবের দরুন জায়গা – ১ l
বামদেব বাইতির দঃ জায়গা – ১
কৃষ্ণচন্দ্র রায় কবিরাজের দঃ জায়গা-
তিলক বসাকের দঃ জায়গা – ১
শঙ্কর মুখোপাধ্যায় দঃ বাটী-১
রামকিশোর মিস্ত্রীর দঃ জায়গা – ১
রামনিধি সাহার দঃ বাটী – ১
রতনরাড়ের দঃবাটী- এবাটী তোমারমাতাকে দিয়াছি–১
পৈত্রিক --- নিজবাটী- ১, ধর্ম্মতলার বাটী - ১,
বড়বাজারের বটতলার বাটী - ১
জানবাজারের হাড়িটোলার জায়গা – ১
ডোমটোলার জায়গা - ১ , মাহুতের দঃ জায়গা- ১,
কলিঙ্গা ব্রহ্মচারীর দঃ জায়গা - ১
পরগণে মাগুরা মৌজে ফতেপুর ব্রহ্মত্তর জমি - ১
মৌজে কপিলেশ্বর ব্রহ্মত্তর জমি - ১ "
(৭, ৮)এখানে কি বৌবাজারের২৩৫ ও২৩৬ নং premises অর্থাৎ জাগা বা বাড়ির কোনো উল্লেখ পেলেন ?
♦তাহলে কিসের ভিত্তিতে বলা যায় যে দ্বারকানাথ ঐ পতিতাপল্লীর প্রতিষ্ঠাতা বা মালিক বা লভ্যাংশ ভোগী ?
💥শুধু ঐ "দ্বারকানাথের পরিবারের কোনো সদস্য এর মালিক " কথাটি আছে বলে দ্বারকানাথ পতিতাপল্লী চালাতেন, তিনি এর মালিক এমনকি রবীন্দ্রনাথ এর টাকায় পরজীবীর মতন খেয়ে পরে দিনাতিপাত করেছেন এমন সব অপপ্রচার করা যায় ?
♦দ্বারকানাথের পরিবার অর্থাৎ ঠাকুর পরিবারের ছোট তরফ যাকে বলা হয় সেখানে কি দ্বারকানাথ ছাড়া আর কোনো সদস্য ছিলেন না ?
♦মনে রাখতে হবে, রামলোচন ঠাকুররা ছিলেন পাঁচ ভাই (কারু কারুর মতে অবশ্য তিন ভাই এক মবোন)। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল অনেক সুতরাং তাদের মধ্যে যে কেউ ঐ বৌবাজারের সম্পত্তিটির মালিক হতে পারেন।
♦দ্বারকানাথের মাথায় এই দায়টা চাপানোর কারণ কি ?
♦আচ্ছা দ্বারকানাথের সঙ্গে যদি এর কোনো সম্পর্ক নাই থাকবে তাহলে ঐ গবেষণাপত্রে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে কেন ?
কারণটা জানা যায় ঐ গবেষণাপত্রটি খুঁটিয়ে পড়লে যেখানে বলা হচ্ছে....... ,
"A list of 'famous families' was made on the basis of our studies of the lists found in the Foreign Miscellanous Series, National Archives of India, in L. N. Ghose's work and in the proceedings and reports of public meetings and associations as reported in the newspapers. When we made our list we took into account the political and social allegiance of a particular kinsgroup, hence we have two Tagore families and two Deb families. On the other hand there were leading men like Rev. KrishnaMohun Banerjee whohad no families With the aid of L. N. Ghose, Sambandha Nirnay'- and N. N. Basu's Banger Jatiya Itihas, genealogies of most of these 'famous families' were made. Each 'family' was given a number ; all 'family' members whose names appear in the family genealogy and who lived between c. 1800 and 1870, received a family number. For instance no. 3 refers to all members of Gopimohun Deb's family. " (৪, ৯৯-১০০)
অর্থাৎ কিনা, বিখ্যাত পরিবারগুলির তালিকা তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন সূত্র থেকে যাদের মধ্যে অন্যতম হলো L. N. Ghosh বা লোকনাথ ঘোষ রচিত Modern History Of The Indian Chiefs Raja &Zamindar Part 2. পূর্বোক্ত সূত্রে উল্লিখিত পৃষ্ঠার পাদটীকা দ্রষ্টব্য l
এবার ঐ বইটির পাতা ওল্টালেই দেখা যাবে ঠাকুর বংশের বড় তরফ অর্থাৎ দর্পনারায়ণের পরিবারের প্রধান রূপে প্রথম (দর্পনারায়ণ বিষয়ে সংক্ষিপ্তাকারে বলার পর) বলা হয়েছে গোপীমোহন ঠাকুরের বিষয়ে।
(৮, ১৬৩) আর ছোট তরফ অর্থাৎ নীলমণির পরিবারের প্রধান পুরুষ রূপে বর্ণনা (নীলমণি ঠাকুরের সন্তানদের নামোল্লেখের পর) করা হয়েছে দ্বারকানাথকে (৮,২১৫)।
💥দেবেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সেখানে অন্তিমে অত্যন্ত সংক্ষেপে উল্লিখিত। ♦রবীন্দ্রনাথের নামই নেই।
💥সুতরাং ১৮০৬ সালের বিখ্যাত পরিবারগুলির তালিকা প্রণয়ন কালে কেন গবেষক সৌমেন্দ্র নাথ মুখার্জী (S.N. Mukherjee) ঠাকুর পরিবারের বড় তরফকে গোপীমোহন ঠাকুরের ও ছোট তরফকে দ্বারকানাথের পরিবার বলছেন তা আশা করি বোঝা যাচ্ছে।
💥যদিও উল্লিখিত সময় দ্বারকা নাথ বালক মাত্র এবং কোনো ব্যবসার সঙ্গেই তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।
💥এর সঙ্গেই আরো একটা বিষয় লক্ষণীয় যে কর্পোরেশনের House Assessment Book এ ঐ বিশেষ সম্পত্তির মালিকের নাম থাকবে না তা তো হতে পারে না তাহলে গবেষক সেই নামটি উল্লেখ না করে দ্বারকানাথের পরিবারের সদস্য বলছেন কেন ?
♦ সম্ভবত নামটি এমনই অকিঞ্চিৎ কর কোনো ব্যক্তির যাঁর নামোল্লেখে তাঁকে'কেউ চিনবেন না বা ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক কেউ বুঝতে পারবেননা।
সে কারণে পরিবারের সর্বাপেক্ষা নামজাদা ব্যক্তিটির নামোল্লেখ করা হয়েছে পরিবার টিকে চিহ্নিত করার জন্য। এবং সর্বাপেক্ষা নামজাদা ব্যক্তিটিকে কেমন করে নির্বাচন করা হয়েছে তা আগেই বলা হয়েছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, দ্বারকানাথ পতিতাপল্লী চালাতেন এই অভিযোগের আদৌ কোনো প্রামাণ্য সূত্র বা reference নেই। প্রত্যক্ষ প্রমাণ তো নেই-ই এমনকি পরোক্ষ কোনো প্রমাণও নেই। তবুও এই অপপ্রচার চলছে এবং বিভিন্ন অপ্রামাণ্য সূত্র, secondary এমনকি tertiary সূত্র উল্লেখ করে তথাকথিত গবেষণাগ্রন্থ পর্যন্ত লেখাও ছাপানোহচ্ছে। কিছু স্বঘোষিত গবেষক নিজেদের কপোলকল্পনাকে সত্য বলে দাবী করে শুধু দ্বারকানাথ নন এমনকি রবীন্দ্রনাথের নামও টেনে আনছেন এমন একটি ঘৃণ্য ব্যবসায় যার সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্কই ছিল না।
প্রকৃত গবেষণা যাঁরা করতে চান তাঁদের উচিত ঐ ১৮০৬ সালের House Assessment Book থেকে প্রকৃত নামটা উদ্ধার করে এই বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের অবসান ঘটানো।
যথেষ্ট সময় সুযোগ পেলে এ প্রবন্ধের লেখকও সে কাজে আত্মনিয়োগ করবে।
যদি ঐ বিশেষ তথ্য টি উদ্ধার করতে পারি তাহলে অবশ্যই সকলকে জানাব।
সকল রেফারেন্স মিলিয়ে দেখার অনুরোধ রইল।আশা করি যারা কনফিউ- -শনে ছিলেন তারা উত্তর পেয়েছেন।
♦সত্যমেব জয়তে। ♦
অগ্নিবীর নামক গ্রুপ থেকে প্রাপ্ত।
Courtesy. Abdul Latif.