বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২০

করোনা ভাইরাস ও চীন ~ সুশোভন পাত্র

ভাবুন আপনি আছেন চিনের Wuhan শহরে। করোনা ভাইরাস প্যান্ডেমিকের আঁতুড়ঘরে! 
না, আমি জানি আপনি টুনি বাল্ব থেকে মোবাইল, সস্তার টর্চ থেকে মেয়ের খেলনা –যে কোন জিনিসের শীঘ্রপতনেই 'চায়না মাল' বলে খিল্লি করেন, কালীপূজায় হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির কৃতী ছাত্র হিসেবে 'চাইনিজ বাজি' বর্জন করে বেজিং-র অর্থনীতি কে হেব্বি ধাক্কা দিয়ে দু-পেগ রাম সেবন করেন; তাহলে কোন দুঃখে আপনি চিনের Wuhan শহরে থাকতে যাবেন? সুপারপাওয়ার না ছাই! 
তবুও একটু কষ্ট করেই না হয় ভাবুন, আপনি আছেন চিনের Wuhan শহরে! আপনি আছেন করোনা ভাইরাস প্যান্ডেমিকের এক্কেরে আঁতুড়ঘরে! 
প্যান্ডেমিকের সতর্কতায় Wuhan-এ 'কমপ্লিট লকডাউন'। এমনিতে 'কমপ্লিট লকডাউন' শব্দটায় থ্রিলিং একটা ব্যাপার আছে! কিন্তু মুশকিল হল, 'কমপ্লিট লকডাউন' বিষয়টা এক্সিকিউট করার ক্ষেত্রে তার থেকে অনেক বেশি চাপ আছে। কারণ 'কমপ্লিট লকডাউনে' মানুষ ঘরে বসে থাকে, কর্পূরের মত উবে তো আর যায় না! তাঁরা স্নান করে, গান শোনে, প্রেম করে, খাবার খায়, এমনকি তাঁদের আমাশাও হয়। তাই 'কমপ্লিট লক ডাউনে'ও Wuhan-এ নাগরিক জীবন স্বাভাবিক রাখতে চিন সরকার ঘোষণা করেছে, মাসিক বিল বকেয়া থাকলেও নাগরিকদের ইলেকট্রিক, জল, ইন্টারনেট, টেলিফোন সহ কোন জরুরী পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কিন্তু তা হলেই বা! এসবে কি মানুষের পেট ভরে? এমনিতে যে সুইগি-জোমেটোর যুগে ঘরে বসেই যে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য খাওয়াই যায় সেটা আমার ৩ বছরের মেয়েও জানে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল অনলাইন ফুড ডেলিভারির বিশালতা। 'কমপ্লিট লকডাউন'-র সময় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১কোটি ৫০লক্ষ মানুষ Wuhan-এ অনলাইন খাবার অর্ডার করেছেন এবং ডেলিভারি পেয়েছেন¹।   
সে না হয় হল! কিন্তু খেয়ে আবার আমাশা হলে কি হবে? কারও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কি করবে? দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না বুঝেই প্রাথমিক চিকিৎসার ৫০%-ই অনলাইন করেছে চিন। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট থেকে প্রেসক্রিপশন, এমনকি ওষুধ ডেলিভারি –সবটাই অনলাইনে। প্যান্ডেমিকের আতঙ্কে বিশ্বের তাবড় শহরে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের হাহাকার। লন্ডনের শপিং মলে মামুলি টয়লেট পেপার নিয়ে হাতাহাতি হচ্ছে। ইতালির সুপার মার্কেটে গ্রোসারি জাস্ট ছবি হয়ে যাচ্ছে। খোদ কলকাতায় স্যানেটাইজার খুঁজতে আপনার প্যান্টালুন হলুদ হয়ে যাচ্ছে। আর চিন সমস্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার সমস্ত কাজ থামিয়ে, জরুরী ভিত্তিতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনে নিয়োগ করেছে। আলপিন থেকে এলিফ্যান্ট চিনে পাওয়া যাচ্ছে সবই, সুলভে²! 
এসবই তো গেলো সতর্কতা। ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় কি ম্যাজিক দেখাচ্ছে চিন? ম্যাজিকই বটে! ২০০২-র সার্স ফ্লু-র সময় গোটা দেশে যে অসংখ্য 'ফিভার ক্লিনিক' বানিয়েছিল চিন, সেই ফিভার ক্লিনিকই এখন চিকিৎসার প্রাথমিক স্তর। ফিভার ক্লিনিকের পরীক্ষায় যদি COVID19-র কোন লক্ষণ দেখা যায় তাহলে হচ্ছে বাকায়দা সিটি স্ক্যান! কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে এক্স-রে নয়, COVID19 আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসের 'গ্রাউন্ড-গ্লাস-অপাসিটিস' কার্যকরী ভাবে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে সিটি স্ক্যানেই। দিনে ২০০টা সিটি স্ক্যান করছে চিনের প্রতিটি মেশিন। আপনার ধারেপাশে খোঁজ নিয়ে দেখুন, সংখ্যাটা ৫০ পেরুবে না। সিটি স্ক্যানেও যদি COVID19-র লক্ষণ থাকে তখন পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে আক্রান্ত কে ক্যাটাগোরাইজেশন করা হচ্ছে -মাইল্ড, সিভিয়ার, কিম্বা ক্রিটিক্যাল। মাইল্ড আক্রান্তদের জন্য অপেক্ষা করছে চিনের স্টেডিয়াম, জিমনাসিয়াম, স্কুল, কমিউনিটি হল দখল করে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা অসংখ্য আইসোলেশন সেন্টার। আর সিভিয়ার বা ক্রিটিক্যালদের জন্য হাসপাতাল। 
করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষান করেছে চিন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪০,০০০ মেডিক্যাল কর্মী পৌঁছে গেছে Wuhan-এ³। কালকে যিনি ছিলেন হোটেলের রিসেপসনিস্ট আজ তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে জ্বর মাপছেন। পরশু যিনি নির্মাণ কর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন আজ তিনি সিচুয়ানের প্রত্যন্ত গ্রামে স্বাস্থ্য শিবির করছেন। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৬লক্ষ টেস্ট করার মেডিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বানিয়েছে চিন। ১০দিনে ৬৪৫,০০০ স্কয়ার ফুটের হাসপাতালে দাঁড় করিয়েছে চিন⁴। আক্রান্তদের মোবাইল ডেটা-স্যাম্পল থেকে 'কন্টাক্ট পয়েন্ট' ট্রেস করে রুগীর সংস্পর্শে আসা সকলকে আইসোললেট করার চেষ্টা করেছে চিন⁵। আর তাই, ডিসেম্বরও আক্রান্ত কাউকে চিহ্নিত করে চিকিৎসা শুরু করতে যেখানে ১৫ দিন সময় লাগছিল চিনের, এখন সেটা কমে গড়ে ২দিন। ডিসেম্বরও যেখানে প্রতিদিন ৪৬,০০০ সন্দেহভাজন কেস আসছিল চিনে এখন সেটা কমে ৫-১০। 
কি ভাবছেন 'চিনের দালাল'? 'চিনের প্রেসিডেন্ট আমার প্রেসিডেন্ট'? রেড আর্মির পুরনো পাপী? আরে চাপ নেবেন না! কারণ উপরের এই তথ্য গুলো মাও সে তুং বলেননি কিম্বা লি শাও চি লিখে যাননি। বলছে খোদ WHO-র যে টিম ফেব্রুয়ারি তে চিনে গিয়েছিল সেই টিমের লিডার; পোলিও, এবোলার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াই'র ক্রুসেডর ডঃ ব্রুস আইলওয়ার্ড। নিউইয়র্ক টাইমসের সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন "চিন সরকার COVID19 আক্রান্তদের টেস্ট এবং চিকিৎসার সমস্ত খরচা বহন করছে। আর এখানেই চিন দৃষ্টান্তমূলক। চিনের অভাবনীয় লড়াইর জন্যই গোটা বিশ্ব নিজেদের প্রস্তুত করতে কমপক্ষে ২সপ্তাহ সময় হাতে পেয়েছে।" 
আর অন্যদিকে প্যান্ডেমিকে ক্যাপিটালিজমের পিতামহ ভীষ্ম, আমেরিকার অবস্থা লেজে গোবরে⁶। ২০১৮তে ট্রাম্প সরকারী স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থায় ৮০% বরাদ্দ ছাঁটাই করে, শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে আমেরিকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কে ঠেলে দিয়েছিলেন আরও বেসরকারিকরণের পথে⁷। প্যান্ডেমিকের প্রাদুর্ভাবে তারই মাশুল গুনছেন সাধারণ নাগরিকরা। সাধারণ ডাক্তার ভিজিটের খরচা ১৪৯-১১৫১ ডলারে ঘোরাফেরা করছে⁸। বেসরকারি ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসের টেস্ট করাতে  ৩,২৭০ ডলার খরচা হচ্ছে⁹। কিছু প্রভিন্সে নামমাত্র সরকারি ভর্তুকির ঘোষণা করলেও গোটা আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের টেস্ট এবং চিকিৎসা মূলত বেসরকারি এবং ব্যাপক খরচা সাপেক্ষ। গোদের উপর বিষফোঁড়া ৩কোটি আমেরিকানদের কোন মেডিক্যাল ইনস্যুরেন্সই নেই, আরও ৪কোটির ইনস্যুরেন্স থাকলেও ব্যাপক খরচা কভার করতে অপর্যাপ্ত¹⁰। তাই চিনে যেখানে প্রতি ১০লক্ষ মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাসের টেস্ট হচ্ছে গড়ে ২,৮২০জনের, আমেরিকায় সেটা মাত্র ২৩জনের¹¹। আমেরিকায় তীব্রতর হচ্ছে প্যানিক। মুডি অ্যানালেটিক্সের অনুমান প্যান্ডেমিকে ক্যাসকেডিং এফেক্টে কর্মহীন হতে পারেন ৮ কোটি মানুষ¹²।   
বিশেষজ্ঞদের মতে সামনের কয়েক সপ্তাহে অগ্নিপরীক্ষা ভারতের। জানি, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রাতারাতি বদলাবে না। কিন্তু সরকারের পলিসি মেকিং-র প্রায়োরিটি তো বদলাতে পারে। হাতে গরম উদাহরণ তো রইলোই। একদিকে ক্যাপিটালিস্ট আমেরিকা। যারা স্বাস্থ্য পরিষেবা কে প্রফিটের জন্য বাজারের উপর ছেড়ে, সেনসেক্স আর নিফটি সূচকে বড়লোক শিল্পপতিদের পকেট ভরাতে, শ্রমিকদের পেড সিক লিভের আবেদন বাতিল করে¹³, ভাইরাসের 'কমিউনিটি স্প্রেড' আটকাতে 'কমপ্লিট লকডাউন' না করে সাধারণ মানুষ কে ঠেলে দিচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। আরেকদিকে রইলো সমাজতান্ত্রিক চিন, যারা সেনসেক্স-নিফটি-প্রফিট কে গুলি মেরে, 'কমিউনিটি স্প্রেড' আটকাতে তৎক্ষণাৎ 'কমপ্লিট লকডাউন' করে, নাগরিক জীবন সচল রাখতে বকেয়া বিল মকুব করে, শ্রমিকদের পেড সিক লিভ মঞ্জুর করে, পুরো রাষ্ট্রশক্তি কে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে লাগিয়ে দিতে পারে, চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচা বহন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। হাতে গরম উদাহরণ তো রইলোই। একদিকে ক্যাপিটালিজম, যেখানে প্রফিট আগে, পরে মানুষ। একদিকে সমাজতন্ত্র, যেখানে মানুষ আগে, অন্য সবকিছু পরে। চয়েস ইস ইয়োর্স!













সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২০

করোনা ভাইরাস ~ স্বপন ভট্টাচার্য

নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে একজন মাইক্রোবায়োলজির মাস্টার হয়ে ফেবুতে কিছু না বললে ইজ্জত থাকে না। সুতরাং দু চার কথা আমি যা জানি আর যেভাবে বলতে ভালবাসি সেভাবে বলি। উৎসাহ না থাকলে এখানেই পাঠক ছেড়ে যেতে পারেন এই লেখা, কেন না কোনোদিক থেকেই বিশেষজ্ঞ হবার দাবি আমি করছি না।

নভেল করোনাভাইরাস নভেল কেন? কেন না করোনাভাইরাসের চলতি প্রকরণগুলির থেকে এটা কিছুটা আলাদা বা ব্যতিক্রমী তাই নভেল।
সাধারন করোনাভাইরাস তো তেমন মারাত্মক নয়, এটা এমন হল কি করে? এটা একটা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার গল্প। এমনিতে আমাদের শরীর অন্ততপক্ষে ১০০০০০০০০০০০০ রকমের সংক্রমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম , কিন্তু তার একটা পুর্বশর্ত আছে। শরীরকে তার সাথে পরিচিত হওয়া দরকার। টীকাদান এরকম একটা পরিচিতি ঘটানোর উদাহরণ। মারক সংক্রমণের হাত থেকে তাতে বাঁচা যায় কেন না মানবশরীরের নিজস্ব একটা 'স্মৃতি' আছে। একবার পরিচিতি ঘটে গেলে সে দাঙ্গাকারী যতদিন পরেই আবার আসুক না কেন,শরীর তাকে স্মৃতি থেকে চিনে নিয়ে আটকে দেয়। ফলে ব্যারিকেডের ওধারে থাকা হামলাকারী সংক্রমণকে ঢুকতে হয় ট্রয়ের ঘোড়ার মত আপাতনির্বিষ হয়ে। নভেল করোনা হল ওই বহুদিন বেকার বসে থাকা গ্রীক সেনার মত প্রায় বেকার ভাইরাস যারা নিজেদের গঠণ একটু আধটু আড়াল করে ঢুকে পড়ছে শরীরে। এই প্রথম তার বদলানো রূপের সঙ্গে 'পরিচিত' হচ্ছে শরীর। এর কিছু প্রতিক্রিয়া আছে। যেমন বি সি জি নিলে বাচ্চার হয়,যেমন পোলিও প্রথমবার নিলে হয় ,তেমন এই চেনা পরিচিতির ফলস্বরূপ জ্বর, শ্বাসজনিত সমস্যা এসব হয়। মুশকিল আরো বাড়ে যখন এই অপরিচিত শত্রুর মোকাবিলায় ব্যস্ত শরীরকে আক্রমণ করে বসে অন্যান্য জীবাণু। সুতরাং নভেল করোনায় আক্রান্ত মানুষ ততদিন ভুগতে থাকবে যতদিন না শরীর এই চেনা পরিচিতিটা সম্পন্ন করে যথোচিত ব্যবস্থা নিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলবে। এই সময়টা দিতে হবে আক্রান্ত শরীরকে।
নভেল করোনা বয়স্কদের ক্ষেত্রেই মারাত্মক হয়ে উঠছে অথচ বাচ্চাদের মধ্যে তো মৃত্যুহার অতটা নয়। এটা কেন? আমার মনে হয় গত দশ পনের বছরে যে সব ইম্যুনাইজেশন প্রোটোকল WHO দ্বারা আবশ্যিক করা হয়েছে তা কিছুটা হলেও প্রোটেকশন দিতে পারছে বাচ্চাদের হয়তো অপ্রত্যক্ষভাবে, কিন্তু দিচ্ছে,সেটা MMR বা যার জন্যই হোক না কেন । নয়তো, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ফলাফল মারাত্মক হবার কথা। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক মানুষেরা, যাদের এইসব আধুনিক ইম্যুনাইজেশন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় নি তাদের শরীরকে এই পরিচিতি ঘটানোর ধকলটা নিতে হচ্ছে অনেক বেশি করে। যারা সেটা পারছে না তারা সহজেই অন্যান্য জীবাণুরও শিকার হয়ে পড়ছে এবং মারা যাচ্ছে।

এর শেষ কোথায়? শরীর শত্রুকে ভালোভাবে চিনতে প্রথমবার যদি সময় নেয় ১৫ দিন তো দ্বিতীয়বার তা হয়ত হবে ১৫ ঘন্টায়।অর্থাৎ, নভেল ততদিনই নভেল যতদিন শরীরের চেনা না সম্পূর্ণ হচ্ছে। এই সময়টা সংক্রামিত শরীরকে দিতে হবে। যেহেতু চীন থেকে সংক্রমণ শুরু হয়েছে সেহেতু চীনের মানুষ সেরে উঠবে সবচেয়ে আগে,তারপর ইরান, ইটালী এই ক্রমে যদি না নতুন নতুন মানুষ আক্রান্ত হয়। সুতরাং দেশে দেশে প্রতিক্রিয়া বাড়াবাড়ি রকমের মনে হলেও যে কোন প্যানডেমিকের জন্য প্রতিক্রিয়ার বাড়াবাড়ি আদতে সবার জন্যই ভালো।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন? যারা ইমুনোসাপ্রেসিভ ওষুধ খান, কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে, অটো ইম্যুউন ডিজিজে ভোগেন তারা বাড়তি সতর্ক থাকবেন। ভাইরাস শরীরে ঢুকলে কিছু খেল দেখাবেই কেন না ওষুধ দিয়ে তাকে মারা যায় না। সে তখন আপনার শরীরের মালিক এবং যতদিন না শরীর সক্রিয়তা দেখাতে পারছে ততদিন জানবেন, আপনার সংক্রামিত কোষকলা তার দাসমাত্র, তার অর্ডারেই তারা চলবে,আপনি অসহায়। তবে আশার কথা, কোটিতে গুটিক ছাড়া বাকীরা সময় নিলেও ঠিক শত্রুকে সীমান্ত পার করে তাড়িয়ে ছাড়বে। অযথা আতঙ্কিত হলে তাড়াতাড়ি সেরে উঠবেন না, বরং শত্রু বুদ্ধিমান হলে তাকে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।বুঝুন, একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা যেটাকে পুরোপুরি জীবিত পদার্থই বলা যায় না তাকে মানুষ হয়ে 'বুদ্ধিমান' বলছি! এখন 'বুদ্ধি' জিনিষটাকে যদি মস্তিষ্ক নামক একদলা বাটার জাতীয় পদার্থ ছাড়া অন্যভাবে ভাবা যায় তাহলে খুব ভুল বললাম কী?

  

মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২০

ধর্ম ও মানুষ ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

তিন লক্ষ বছরের মানুষের ইতিহাসে অধিকাংশ সময় অধিকাংশ মানুষ থাকত ক্ষুধার্ত হয়ে। রাতে শিশুরা ঘুমাতে যেত খিদে নিয়ে।

১৮০০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মোটমাট ১০০ কোটি। 
দু'শ বছর আগেও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ খাদ্যের জন্য হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও দুই বেলা পেট ভরাতে পারেনি। 
দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধা ছিল অধিকাংশ মানুষের জীবনের অংশ। 

তাই, বিগত দুই শতক ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেছেন অধিকাংশ মানুষকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে বার করে আনতে। খাদ্য উৎপাদন ও বন্টনে জন্য বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন। সেই সব তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগের প্রচেষ্টা নিয়েছে রাষ্ট্র।

একইসাথে বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নিয়েছেন বিভিন্ন বিজ্ঞানী। এমনকি সেই প্রচেষ্টা স্বীকৃতি পেয়েছে নোবেল পুরস্কার প্রদানে। খাদ্যের উৎপাদনের দ্রুত বৃদ্ধির সাথে বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছিল বন্টন ব্যবস্থায় বিপ্লব।
শেষ দুইশ বছরে ভ্যাক্সিনেসন, আ্যন্টিবায়োটিক ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য পৃথিবীর জনসংখ্যা লাফ দিয়ে ১০০ কোটি থেকে হয়েছে প্রায় ৭৮০ কোটি।

১৯৭০ সালে পৃথিবীর ৩০% মানুষ থাকত ক্ষুধার্ত হয়ে। ভয়ানক জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও ২০১৮ সালে প্রায় ১০% মানুষ খিদে নিয়ে ঘুমাতে যায়। এই সংখ্যা ফেলে দেবার মত নয়। বোঝা যায় খাদ্য উৎপাদন ও বন্টনের যে প্রক্রিয়া বিগত শতাব্দীতে বিভিন্ন দেশে নেওয়া হয়েছিল, তার অনেকটা সাফল্য বিভিন্ন দেশে এসেছে। 
সত্যি কথা বলতে দূর্ভিক্ষের যে ছবি পৃথিবীতে ১০০ বছর আগেও দেখা যেত এখন তা কমে গেছে। 

নিশ্চিত আগামী একশ বছরের মধ্যে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা কমে যাবে। তবে বৈষম্য সম্ভবত কমবে না।

মানুষ অধিকাংশ সময়ে শুধু খাদ্য অন্বেষণ করেছে, খাদ্যের জন্য অন্যকে সংহার করেছে, খাদ্য প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করবার জন্য ধর্মের জন্ম দিয়েছে। 

পরবর্তীকালে সেই ধর্ম মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করল। শেষ আড়াই হাজর বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও তার বিভেদ রাষ্ট্রের হাতিয়ার হয়ে গেল। 

লক্ষ্য করে দেখবেন, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ৯০% মানুষ একটাই ধর্ম পালন করেন। এই একরূপতা এসেছে অনেক রক্তের বিনিময়ে। আর একরূপ সমাজে ধর্মের প্রভাবে জীবন যাপন, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক হয়ে গেছে বৈচিত্র্যহীন।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে সাথে নিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে সহজ হয়েছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা।
আমেরিকা, ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এর বাইরে নয়। 

ধর্মই জীবন, ধর্মই মরণ। তাই ধর্ম এত শক্তিশালী।

তবে বিগত অন্তত ২০০ বছরে পৃথিবীতে ধর্মের বাইরে গিয়ে বহু মানুষ চিন্তা করছেন। তারা সামগ্রিকভাবে মানুষকে নিয়ে ভাবছেন। বিংশ শতকে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বাদ দেবার প্রচেষ্টা শুরু হয়। 
রাষ্ট্র ধর্মের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সুবিধা হল বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘু ও নিরীশ্বরবাদীরা নিরাপদে থাকতে পারেন। ধর্মের অধিকারের বদলে মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হয়। তাই রোমান ক্যাথলিক পোপকেও বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান মানুষকে রক্ষা করতে সেকুলারিজমের কথা বলতে হয়। 

সেকুলারিজমের কথা সকলকে সৎভাবে ভাবতে হবে, বলতে হবে। 
আমি ভারতবর্ষ হিন্দুদের দেশ চাইব, বাংলাদেশ মুসলমানের জন্য চাইব আর ইউরোপে দেশান্তরী হয়ে সেকুলার হব - এই ভাবে চলে না, চলতে পারে না।

নিশ্চিত একদিন এই খাঁচাগুলি ভাঙবে। 

মানুষ নিজের স্বার্থেই ধর্মের উপরে স্থান দেবে মানবধর্মকে। সে এই কাজ করতে বাধ্য হবে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। কারণ যতদিন যাচ্ছে, দলবদ্ধভাবে নয়, এককভাবে মানুষ দেশান্তরে যাচ্ছে। শুধু ধনী নয়; কর্ম, শিক্ষা, বিবাহ উপলক্ষে বহু মানুষ অন্য দেশে যাচ্ছে। অন্যদের সাথে মিশছে। নিজের স্বার্থে সে বাধ্য হবে শান্তি ও সেকুলারিজমের কথা বলতে।

আমরা এক ক্রান্তি-কালে আছি। ট্রান্সিশন পিরিয়ড। পরিবর্তন আসবে।

Madhusree Bandyopadhyay
03/03/2020

রবিবার, ১ মার্চ, ২০২০

ভয়ের গল্প ~ আর্যতীর্থ

বাসটা লেট করে সর্বনাশ করে দিলো সৌরভের। মাঝরাত্তির ছুঁই ছুঁই সময়ে মনসাপোতা বাসস্টপে  নামালো, তখন পথঘাট শুনশান। সব দোকানে ঝাঁপ পড়ে গেছে। অবশ্য দোকান বলতে তো দুটো চা দোকান, একখানা মনিহারি কাম মুদি,
একটা পাইসহোটেল আর একটা নাপিতের দোকান।দিনের বেলায় রাস্তার ধারে আনাজপাতি বসে। এটাকেই এখানকার লোক মার্কেট বলে। 
মনসাপোতার নাম জানি কেউ শোনোনি। বর্ধমান থেকে বাঁকুড়ার দিকে যেতে গেলে এক মিনিটের জন্য বাস থামে এখানে। কোনোকালে নাকি কেউ মাটি খুঁড়ে মা মনসার মূর্তি পেয়েছিলো, সেই জন্য এই নাম। সে মায়ের মন্দির এখন পোড়ো, মা মনসার চেলাচামুন্ডাদের বাস, ওই যে গো, রাত্তিরে যাদের লতা বলতে হয়।
 এই পান্ডববর্জিত জায়গায় সখ করে যে আসেনি , বলাই বাহুল্য।গ্রামটির নামও মনসাপোতা, এখানে নেমে লোকে ওই একটা জায়গাতেই যায় সাধারনত, যদিও আশেপাশে ছোটোখাটো আরো কয়েকটা গাঁ আছে। সৌরভের প্রিয়তম পুরুষ ও নারীটি এই গাঁয়েই বাস করেন, মানে তার দাদা আর নাম্মা। দাদা পঁচাশি পেরিয়ে আজও সটান, নাম্মা আটাত্তরে একটু সুগারে কাবু হলেও,দিব্যি সচল আছেন।গ্রামের বাড়ি ছেড়ে থাকেননা, তবে দেখাশোনার দু তিনজন আছে। দিন কয়েক আগে নাতিকে অনেকদিন দেখেন নি বলে মোবাইলে করা অভিমানহেতু চমক দিতে আজকে সৌরভের মনসাপোতা অভিযান। কিন্তু আটটায় পৌঁছনোর বাস যে ঝুলিয়ে এরকম সাড়ে দশটা করবে, বোঝেনি ও। অন্যসময় হলে তবু ভ্যানগাড়ি থাকে একটা দুটো।কিন্তু এখন....
  এখনকার কথা মনে করেই শিরদাঁড়া বেয়ে হিম নামলো সৌরভের। গত ছয়মাসে পাঁচজন খুন হয়েছে এই অঞ্চলে,
সকলেই গভীর রাতে। খুব সম্ভব লোকাল কোনো ডাকাতের গ্যাং। সৌরভ শুনেছে রাত্রে সবাই দল বেঁধে চলা ফেরা করে। খুব বোকার মতো কাজ হয়েছে এই সময়ে একলা এসে পড়ে।
 কি করবে এখন? হেঁটে গেলে পাক্কা পয়তাল্লিশ মিনিট, তার বেশির ভাগটাই আলো নেই। একশো দিনের কাজের দৌলতে  খানাখন্দ নেই ঠিকই, কিন্তু  দুধারে ঝোপ, ওখানে ওত পেতে কেউ বসে থাকলে বোঝার উপায় নেই।
ক্রিং ক্রিং! রিকশার বেলের শব্দটা যেন জমাট অন্ধকার চিরে আছড়ে পড়লো সৌরভের কানে। অন্ধকার ফুঁড়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ধরা দিলো একটু বাদেই। সৌরভকে দেখে একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলো চালক, ' যাবেন?'। এ লাইনের রিকশা সব ওই মনসাপোতার আশেপাশেই যায়, সুতরাং কোথায় জানার খুব একটা দরকার নেই।
চালকটি সৌরভেরই বয়েসী হবে। হাঁফ ছেড়ে রিকশায় উঠে পড়তে বললো, ' বাঁচালেন! একা একা ফিরতে হবে ভেবে খুব চিন্তায় ছিলাম' 
' আমিও তাই রে ভাই। দুজন হলে একটু ভরসা পাওয়া যায়। নাম কি তোমার?'
 ' আজ্ঞে, রানা। আপনি মনসাপোতাতেই নামবেন তো? আমারও ঘর ওদিকপানেই।'।
 ' হ্যাঁ, সেনবাড়ি চেনো? ওখানেই যাবো। না চিনলে কাছাকাছি এলে চিনিয়ে দিতে পারি'
   ' আজ্ঞে খুব চিনি। কদিন আগেই সেনদাদুকে নিয়ে হাটে গেছিলাম তো । আপনি ওবাড়ির ছেলে ?'
   ' একদম। সম্বিত সেন আমার দাদু। '
বলতে বলতে ওরা আলোর বৃত্ত পেরিয়ে অন্ধকারের আয়ত্ত্বে চলে এসেছে। চাঁদের আলোয় দেখতে খুব অসুবিধে নেই, তবে গা ছমছম ভাবটা এড়ানো মুশকিল। সুবিধা এটাই, রানার রিকশাতে আলো রয়েছে, গ্রামদেশে প্রায়শই টর্চ দিয়ে এ কান্ডটা করা হয়। গোরুর গাড়ির হেডলাইট মোটেই হাসির বস্তু না, রীতিমতো বাস্তব।
 ভটভট .. ভটভট.. হঠাৎই দূর থেকে আরেকটা আলো রিকশার ওপরে। একটা মোটরসাইকেল। অনেকটা পেছন থেকে এলেও, পাশ দিয়ে হুট করে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। 
কিন্তু এখানে কিছু গণ্ডগোল দেখা যাচ্ছে। কেউ যেন অসম্ভব ধীরে রিকশাটার পেছন পেছন আসছে। রাস্তার বাঁক এলে আলো সরে যাচ্ছে, কিন্তু তারপরই আবার। রিকশার সাথে মোটামুটি সত্তর আশি ফুট দূরত্ত্বে চলেছে বাইকটা। দু চারবার ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছে সৌরভ আরোহীকে। আবছা হেলমেট পরা অবয়ব, তার বেশি কিছু দৃশ্যমন নয়।এসব দিকে দিনের বেলাতেই হেলমেটের বালাই থাকে না! তবে কি..?
   রানা চাপাস্বরে বলে, 'বাবু ভালো বুঝছি না। নির্ঘাত কোনো মতলবে আছে ওই বাইকটা।'
    'কি করা যায় বলো তো?  থেমে দেখবো কাছে আসে কিনা?'
 'না বাবু, আমরা যা ভাবছি তা ঠিক হলে ওর কাছে হাতিয়ার থাকবে। সামনেই বটতলার মাঠ। ওখান থেকে একটা শর্ট কাট  করা যাবে। ও রাস্তাটা সবাই জানেনা।'
  'কিন্তু, এটা যদি সেই খুনীটাই হবে, ও এখনো এগিয়ে আসছে না কেন? '
   'বোধহয় দুজন আছি বলে। কিংবা সামনে কোনো স্যাঙাৎ আছে ওর। ধরে বসুন বাবু।'
    বটতলার মাঠের সামনে গোত্তা খেয়ে রানা রিকশাটাকে আচমকা পাশের পাতলা জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিলো। বাঁক থাকায় বাইকটা তখনও এসে পৌঁছায় নি। এখানে পথ এবড়োখেবড়ো, মাঝে মাঝেই গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে গাছের ছুটকো ডাল। রানা প্রাণপণ চালাচ্ছে, অঘটনের আশঙ্কা মানুষের জোর বাড়িয়ে দেয়।একটু নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেলছিলো সৌরভ,
বাইকটাকে ছাড়িয়ে, হঠাৎই তার মনে তিরের মতো এক সন্দেহ বিঁধে গেলো।
     ব্যাপারটা প্ল্যান নয়তো?  রানা আর ওই বাইক, একই গ্যাংয়ের অংশ নয় তো? হঠাৎ রিকশার উদয়, ভাড়া নিয়ে দর না কষেই রাজী হওয়া, আর তার পরেই বাইক, যেটা আবার ঠিক পেছন পেছন, সবই কি কাকতালীয়? মূল রাস্তা থেকে এখন সে সরে এসেছে, এখানে কেটে ফেললেও টের পেতে লোকের এক দুদিন লাগবে। 
      বলতে বলতে একটা ঝাঁকুনি খেয়ে রিকশাটা দাঁড়ালো। হিসহিসে গলায় রানা বললো, 'চেন পড়ে গেছে। অন্ধকারে একটু সময় লাগবে বাবু।' হেডলাইট বনা টর্চ নিয়ে সে উবু হয়ে বসে পড়লো। টর্চের আধাআলো পড়ে রানার মুখটা কেমন ভয়ানক দেখাচ্ছিলো, গালের কাটা দাগ, চোয়াড়ে মুখে না কাটা দাড়ি, পুরু নিচেক ঠোঁট  সৌরভের মনে  একটা চেনা চেনা ছবির কথা তুলে আনছিলো। কোথায় দেখেছে, কোথায় দেখেছে..
    বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়লো, ক'মাস আগেই এই মুখ সে দেখেছে আনন্দবাজারের প্রথম পৃষ্ঠায়। রঞ্জিত! সাতটা খুন, গোটা পনেরো ডাকাতি। তিনটে পুলিশকে জখম করে আদালতের থেকে ফেরার, সেটাও ওই ছয়মাস আগেই। দাড়ি বাদ দিলে অবিকল সেই মুখ। হিম বয়ে যায় সৌরভের বুকে ।এই ভয়ঙ্কর অপরাধীর সামনে তো ও নস্যি। এমন সময় আবার .. ভট ভট ভট ভট.. দূরে সেই বাইক। ওদের ওপর আলো পড়তেই দাঁডিয়ে পড়লো দূরত্ব রেখে। 
   তক্ষুণি রানা অথবা রঞ্জিত চেন ঠিক করে উঠে প্যাডেলে উদ্দাম চাপ দিলো। শুরুর আগে একবার সৌরভের দিকে তাকালো, সেই তাকানোয় আর যাই থাক, আন্তরিকতা ছিলো না। রিকশা চলছে, পেছনে বাইক, আর একটু বাদেই নির্ঘাত ঝাঁপিয়ে পড়বে দুজনে সৌরভের ওপর। অদূরে একচিলতে আলো, কিছু লোকের নড়াচড়া, সৌরভকে ওরা নিয়ে আসছে ডাকাতদের বধ্যভূমিতে.. মা বাবা দাদু নাম্মা....
   দুম করে রিকশাটা মনসাপোতার প্রথম বাড়িটা পেরোলো। রানা রিকশাটা থামিয়ে বললো ' দাঁড়ান দেখি, বাইকটার সাথে বোঝাপড়া করে নিই।' কটা বাড়ি পেরোলেই সেনবাড়ি, চেনা জায়গায় ফিরে এসেছে সৌরভ। দেখতে দেখতে পাশে এসে দাঁড়ালো বাইকটা। হেলমেট খুলে ফেললো মাঝবয়েসী লোকটা। একগাল হেসে বললো, 'কি ভয়ই পেয়েছিলাম! এত রাত্রে রিকশা, ভাবলাম আপনারা নির্ঘাত ওই খুনীর দল, পেরোতে গেলেই কোনোভাবে ঝাঁপাবেন।'রানা খিকখিক করে হেসে বললো, ' আমি তো ভাবছিলাম এই বাবু আর আপনি ষড় করে আমাকে মারবেন, আজ নিঘঘাত গেছি।'
 সৌরভ হাসলো শুধু। সে কি ভাবছিলো সেটা আর খোলসা করলো না। এখন তার দাদু নাম্মার সাথে দেখা করার তাড়া।

পুঃ:  গল্পের রিকশাওয়ালাটিকে দলিত, সৌরভকে হিন্দু এবং বাইকচালককে মুসলিম ভাবলে আমাদের দেশের গল্পটা পেয়ে যাবেন হয়তো। খুনী কিন্তু এখনো অধরা...


রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

অতিভক্তি ~ অনীক চক্রবর্তী

তারপর সেই ভয়ানক দিন আসিয়া পড়িল। চন্দ্রবিন্দু কে তলব করা হইল 'আমার ভিনদেশী তারা' গানটি গাওয়ার অপরাধে। স্পষ্টতই ভিনদেশী বলিয়া কোনও শব্দ যে নাই এবং থাকিলেও তাকে আমার বলিয়া সম্বোধনের অপরাধ যে ক্ষমার অযোগ্য, তাহা বুঝাইয়া দিয়া হইল। চন্দ্রিল তাহার শেষ দু ছক্কা পাঁচ এ লিখিলেন, 'আমরা সক্কলে আ-মোদিত। সরকার চন্দ্রবিন্দু প্রাপ্ত হইয়াছে।' এতে চটিয়া গিয়া এক পাব্লিক চন্দ্রিলকে উদ্দেশ্য করিয়া একটি কড়া চিঠি লিখিল আনন্দবাজারে। তার শুরুটা হইল, 'আপনার মত আঁতেল যে ভিনদেশকে আমার বলিবেন এতে আর আশ্চর্য কী? আপনি এদেশের কলঙ্ক, কোনোদিনই বুঝা যায় নাই আপনি কোনদিকে, তাই আপনি দেশদ্রোহী হইতে বাধ্য। অতএব আপনার মা ও বোনকে...' ইত্যাদি ইত্যাদি

একইভাবে 'পরদেশী পরদেশী যানা নেহি' গানটির লিরিসিস্ট ও সুরকারের তলব পড়িল। তারা সমস্বরে বলিল, 'আমরা কিছু জানি না, আমির জানে'। ব্যাপার স্পষ্ট হইল। আমিরকে আগেও একবার চেতাবনি দিয়া হইয়াছিল, লাস্ট ওয়ার্নিং আর কি। ফলে এবার ঝটিতি 'শালা দেশ ছাড়, পাকিস্তান যা' বলিয়া দেশের লোক ট্যুইটারে লাফাইয়া পড়িল। আমির মুচকি হাসিয়া দেশ ছাড়িলেন- তবে পাকিস্তান নয়, আমেরিকা চলিয়া গেলেন। দু বছর পরে সেখেনে তারান্তিনোর পরবর্তী ছবিতে লিড রোল করিয়া অস্কার তুলিলেন। দেশের লোক ঝটিতি 'আমির আমাদের গর্ব' বলিয়া আবেগমথিত হইয়া কাঁদিয়া কাটিয়া ট্যুইটার ভাসাইয়া দিল। আমির মুচকি হাসিয়া শুধু বলিলেন, 'শালা'

তারপর তো আরেক কান্ড। সমস্ত 'কড়াপাক' মিষ্টি নিষিদ্ধ হইল। লোকে বলিল তাই তো, যে মিষ্টির নামেই 'কড়াপাক' সে ভারতীয় হয় কি করিয়া। বাঙালিরা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলিতে লাগিল, তবে মুখে বলিল 'হ্যাঁ, বটেই তো। কেমন ডায়াবিটিস বাধাইয়াছিলাম বাবা, খাইতেই চাইতাম না, তবু টানিত। এ মিষ্টি শত্তুর না হইয়া যায় না'। বাবা রামদেব সক্কলকে আশ্বস্ত করিয়া পতঞ্জলির 'কড়াদেশি মিষ্টি' আনিলেন মার্কেটে, খাইলে সুগার হয় না। একমাসে হু হু সেল-- বাবা আরেকটি আইল্যান্ড কিনিয়া তাতে প্রাচীন ভারতীয় 'কপালভাতি নাচ' করিতে লাগিলেন।
ক্রমে লোকে আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে চুলকুনি, বাচ্চা উৎপাদন, আয়ুর্বেদিক বিড়ি পান হইতে ট্যাক্স প্রদান- সবই করিতে লাগিল। ট্যাক্সের টাকা গুলি পাব্লিকের দিকে ফিরিয়া মুচকি হাসিয়া বলিল, 'শালা'।

সারাদেশ জুড়িয়া ক্রমে প্রবল আলোড়ন উঠিল। পাব্লিক বাচ্চা পকেটমারকে ধরিয়া আর পিটাইলো না। ল্যাম্পপোস্টে শক্ত করিয়া বাঁধিয়া বন্দেমাতরম ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করিয়া দিল। মেট্রোতে জিন্স পরা মেয়ে দেখিয়া জ্যেঠুদের লাল পড়িল না, গেরুয়া পড়িতে লাগিল। প্রসঙ্গত, লাল যে চৈনিক জিনিস এ কথা এখন সবাই জানেন। মোবাইল- টিভি- হেডফোন- সাউন্ড সিস্টেম- জাঙিয়া ঘড়ি জুতো বডি স্প্রে সাবান-- জাস্ট এইকটি ছাড়া দেশের মানুষ আর কোনও চৈনিক প্রোডাক্ট ব্যবহার করেন না। টোটাল অসহযোগ। অরিজিতের 'লাল ইশক' গানটিও ব্যান হইল। কমিউনিজম যে একটি ভয়ানক রোগ- অর্ণবের অনুষ্ঠানে আসিয়া সাধ্বী প্রাচী তা বলিয়া গেলেন। এর বিরুদ্ধে 'দেশভ্যাক- টি' নামের যে ভ্যাকসিনটি আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহাও জানাইতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অর্ণব 'নেশন ওয়ান্টস টু নো, নেশন ওয়ান্টস টু নো' বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলে উহা আর শুনা গেল না। অর্ণবের বিভূষণ এক বছর পিছাইয়া গেল-- কারা যেন ইহাকে 'ঐতিহাসিক চিৎকার' বলিয়া চিহ্নিত করিল।

অতঃপর 'মা মা' ডাকে স্বর্গ-মর্ত্য-পার্লামেন্ট ভরিয়া উঠিল। ছেলে 'মা, মাগোও' বলিয়া ছলোছলো চক্ষে মাকে বৃদ্ধাশ্রমের গেটে ড্রপ করিয়া গেল। কড়া এক্সটারনাল আসিয়া ভাইভা টেবিলে যখন টুঁটি চাপিয়া ধরিয়াছে তখন ছাত্র চোখ টিপিয়া শুধু বলিল 'মায়ের দিব্যি, আমি সব পড়িয়াছি', সে হায়েস্ট নম্বর পাইয়া সবাইকে চমকাইয়া দিল। দুষ্টু ছেলে পুলিশকে 'মা, মা' বলিলে তারা ভারী খুশি হইয়া তাকে তিনশ বিরানব্বইয়ের চারের এ ধারা অনুসারে একটি গোলাপ ফুল গিফট করিল। পান্নালাল ভট্টাচার্যকে জাতীয় গায়ক এবং চিরঞ্জিত কে জাতীয় নায়কের সম্মান দেওয়া হইল। তৃণমূলের কে একজন নেতা বলিল, আমাদের ক্যাচলাইনে তিনখানা মা-- মা তেও মা, মাটিতেও মা, মানুষেও মা-- আমরা দেশের সবচেয়ে জাতীয়তাবাদী দল। উপরমহল থেকে 'অ্যাই চোওপ, একদম চোপ, আমরা সেকুলার' বলিয়া তাকে খুব কড়কাইয়া দেওয়া হইল আর ব্যাটা ইলেকশানে টিকিট মিস করিল। বেচারা ঘরে আসিয়া ডিকশনারিতে বহু খুঁজিল, কিন্তু সেকুলার শব্দটি খুঁজিয়া পাইল না।

এবং তলে তলে গুটিকত লোক দেশকে পঞ্চাশ- ষাট গ্রামের ছোট ছোট পিস করিয়া দাঁড়িপাল্লায় চাপাইয়া একশ চল্লিশ টাকা কেজিতে বেস্পতিবারের হাটে বিক্রি করিতে লাগিল। সে হাটে পাবলিক যেতে পারে না, খোঁজও নাই কারোর কাছে। সে হাটের খবর, বেচাকেনার খবর যারা রাখিত লোকে তাদের আঁতেল, সিপিয়েম, দেশদ্রোহী ইত্যাদি বলিয়া কিছু জনকে খুন করিয়াছে, কিছুজন কে ভাগাইয়া দিয়াছে দেশ থেকে। আর যারা বাঁচিয়া আছে তারা এমনিতেই চুপ করিয়া গিয়াছে। এমনি করিয়া বেশ কয় বচ্ছর কাটিল। তখন কারো কারো সন্দেহ হইল। আরে চাকরি নাই, খাবার নাই, টাকাকড়ি শান্তিফান্তি নাই শুধু মা ডাকিয়া আর জওয়ানের ছবি শেয়ার করিয়া দিন চলে কেমনে! কেস কী? খোঁজ, খোঁজ। অবশেষে খুঁজিয়া দেখে শুধু বাউন্ডারিখানা পড়িয়া আছে, দেশখানা আর নাই।
শুনা যায়, তখন অনেকে চিৎকার করিতে চাহিয়াছিল। কিন্তু ম্যাট্রিক্সের শুরুতে মিস্টার অ্যান্ডারসন তার হকের দাবী জানাইবার পর নিজের মুখটিকে যেভাবে খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন, তাহারাও নিজের মুখ সেইরকম চামড়া ও মাংস দিয়া আটকানো দেখিতে পাইয়াছিলেন। বলা বাহুল্য, তখন আর কোথাও মরফিয়াস তার লাল এবং নীল পিল দুটি লইয়া অপেক্ষারত ছিলেন না।

বোবা শান্তিতে সেদিন চরাচর ভরিয়া গিয়াছিল...


শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

গল্পের গল্প ~ আর্কাদি গাইদার

ওদের দলটা সেদিন রাতের মতন বিশাল স্তেপভূমির এক কোনে আস্তানা গেড়েছিলো। এখন যেখানে কাজাকস্তানের বেরেল শহর, সেই সময় সেখানে ছিলো এক বিশাল হৃদ আর ধুধু ঘাসজমির প্রান্তর। বেশ কয়েকদিন ধরে এই অঞ্চলটাতেই ঘুরছিলো ওদের গোটা দলটা। এখানে শিকার করবার সুযোগ প্রচুর, হৃদে মাছ ধরা যায়, আর তার সাথে সাথে এদিক ওদিকে মাটির ওপর একধরনের খাটো গাছে একধরনের ফল হয়, যা দিয়ে খিদে মেটে। 

ওদের দলের একটাই সমস্যা, এই জায়গাটায় একটা বিশাল খড়্গ-দন্ত বাঘের উৎপাত। ইতিমধ্যেই দুজন তার পেটে গেছে। দিনের আলোতে ওরা খাবার আর শিকারের সন্ধানে দলবদ্ধ হয়ে থাকে, ওদের নিজেদের তৈরি অস্ত্রও সাথে থাকে, কিন্তু অন্ধকার নামতেই ওদের ভয় শুরু হয়। অন্ধকার ওদের শত্রু, আর বাঘের বন্ধু। কখন যে একদম ঘাড়ের ওপর থাবা এসে আছড়ে পড়বে, বোঝা যাবে না, হয়তো অন্তিম মুহুর্তে এক ফালি চাঁদের আলোয় শুধু ঝলসে উঠবে সাদা দুটো দাঁত। আর তাই, সূর্য ডুবলেই একটুকরো আগুনের পাশে জড়সড়ো হয়ে বসে ওরা ঝিমোতে থাকে, আগুনের শিখা যেটুকু জায়গায় আলো দিচ্ছে, সেই সীমানার বাইরেই বিশাল অন্ধকার যেন ওত পেতে থাকে ওদের গ্রাস করতে। আগুনের নাচানাচির সাথে সাথে আগুপিছু করতে থাকে অন্ধকার নামের ভয়ানক দানবটা, যেন ওদের সাথে খেলা করে, আর মাঝেমধ্যেই সেই জমাট কালোর মধ্যে থেকে ভেসে ভেসে আসে বাঘের ডাক। ওদের মধ্যে সবচেয়ে বুড়ো যে, তার চারপাশে তখন জোনাকির মতন ঘুরঘুর করে অনেক গল্প, সে তখন গল্প বলতে চায়, বলতে চায় কিভাবে বহুদিন আগে, যখন ওদের দলটা আরো উত্তর দিকে বরফঢাকা উপত্যকার মধ্যে বিচরণ করতো, সেইসময় ওদের দলের সবচেয়ে শক্তিশালী দুজন মিলে অনেকগুলো গাছের গুড়ির মাথা ঘষে ঘষে ছুচলোঁ বল্লম বানিয়েছিলো, আর তাই দিয়ে একসাথে একটি খড়্গ-দন্ত বাঘকে মেরেছিলো। বুড়োটা ভাবে, এই গল্পটা বলতে পারলেই অন্ধকার ওদের দিকে এগিয়ে আসতে ভয় পাবে। বুড়োটা চায়, সারারাত এরকম অনেক অনেক গল্প বলতে, যাতে কালো ভয়টা দুরেই থাকে। কিন্তু পারে না। কারন ওদের তো ভাষা নেই। শব্দ নেই। ওদের কারুর নামও নেই। বুড়োটা চেষ্টা করে অঙ্গভঙ্গি করে গল্প বলতে, কিন্তু সবাই বোঝে না। এরকম ভাবেই রোজ চেষ্টা করতে করতে কয়েকদিন পর বুড়ো এক নতুন কায়দা আবিষ্কার করে। আগুনের পাশে যেখানে মাটির ওপর আলো পড়েছে, সেখানে আঙুল দিয়ে সে প্রথমে একটা বাঘ আঁকে। সময় নিয়ে তার দাঁতগুলো বড় বড় করে আঁকে। তারপর আঁকে শক্তিশালী দুই মানুষকে। বাকিরা অবাক হয়ে বুড়োকে ঘিরে বসে আঁকা দেখে। মানুষগুলোর হাতে বল্লম আঁকে বুড়ো। শিখার আলো ছবিটার ওপর লাফাতে লাফাতে তাকে জীবন্ত করে তোলে। ওদের সবার চোখ চকচক করে, আর ওদের চারপাশের ভয়মিশ্রিত অন্ধকারটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু পিছিয়ে যায়।

এরকমভাবে সারারাত ধরে একের পর এক গল্প আঁকে বুড়ো। কখনও কখনও বাকিরা ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু বুড়ো এঁকেই চলে। একটা করে গল্প আঁকে, আবার মুছে ফেলে, আবার আঁকে। সারারাত ধরে গল্প আর অন্ধকারের মধ্যে চলে অবিরাম লড়াই। আর ওদের দলটা এরপর যেখানেই যায়, তাদের সাথে বস্তাবন্দি হয়ে সঙ্গী হিসেবে গল্পেরাও থাকে। তারপর কোন একদিন নদী পার হওয়ার সময় চোরাস্রোতে ভেসে যায় নামহীন বুড়োটা।

এরও বহুদিন পরে, যখন ওদের বংশধররা কয়েকটা শব্দ শিখেছে, হয়তো আদিম কিছু আওয়াজকে জীব দিয়ে খেলাতে শিখেছে, যখন ওদের দল সংখ্যায় বেড়েছে, তখনো অন্ধকার হলে ওরা আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে, আর আবার শুরু হয় গল্প বনাম কালোর লড়াই। ভাঙা ভাঙা শব্দ দিয়ে, হাত পা ছুড়ে, কখনো মাটিতে কিছু অবয়ব এঁকে, কখনো শিকার করা জন্তুর চামড়ার ওপর খোদাই করে, ওরা পালা করে গল্প বলতে থাকে, আর কুস্তি চলতে থাকে অন্ধকারের সাথে। আর তার মধ্যে অতি অবশ্যই থাকে বুড়োর সেই বাঘের গল্প, যা সময়ের সাথে সাথে ফুলেফেঁপে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, আর সেই গল্পটা বললেই অন্ধকার নামের রাক্ষসটা ভয়ে গুটিসুটি মেরে পিছিয়ে যেতে থাকে, আর সেই নিরেট কালোর পেট চিরে নিষ্ফল ক্রোধে গর্জন করতে থাকে ক্ষুদার্ত খড়্গ-দন্ত বাঘ।

হাজার হাজার বছর পরেও, বহু পথ পেরিয়ে এসে যখন ওদেরই কোন বংশধর মাটির ঘরে বাসা বাঁধে নদীর পারে, জঙ্গলের একদম সীমানায়, তখনো রাত হলে বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে সে, আর হাতমুঠো করে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পাশে রাখা বল্লমকে, আর গাছের পাতা দিয়ে তৈরি পলকা দরজার দিকে মুখ করে বসে। ঘরের এক কোনে জ্বলতে থাকে পুঁচকে একটা আগুন। বাইরে শিকারের আশায় ঠোঁট চাটতে চাটতে পায়চারি শুরু করে ডোরাকাটা বাঘ। আর  বাচ্চাটাকে বুকের কাছে এনে কানে কানে সে বলতে থাকে বুড়োর সেই বাঘের গল্প। গল্প আর অন্ধকারের অন্তহীন লড়াই আবার হয় শুরু।

লীলা মজুমদার বলেছিলেন, গল্প মোটে চার রকমের হয়।
ভূতের গল্প। 
চোরের গল্প।
প্রেমের গল্প। 
বাঘের গল্প। 
আর এই চাররকমের গল্প বলতে আমাদের রয়েছে ছয় হাজারেরও বেশি ভাষা। ভাষা দিবসের কসম, আমরা যেন গল্প বলা না থামাই। আমরা যেন অন্ধকারকে জিততে না দিই।

মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

যত গপ্পো জুতো নিয়ে ~ যূথিকা আচার্য্য

আমাদের শরীরের যত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে তাদের পায়ের পাতাদুটো হলো সবচাইতে বেশী লো মেইনটেনান্স। পা চাটা,পায়ের জুতো,পায়ের তলা এই শব্দগুলির প্রত্যেকটাই নেগেটিভিটি বহন করে। অথচ বলুন দেখি, এতে পা দুটোর কী দোষ? পুরো শরীরটাকে বয়ে নিয়ে বেড়ায় তারা সর্বক্ষণ। কোনো দাবী-দাওয়া নেই। আদর যত্নের বালাই নেই। মাথা ব্যথা হলে হাজারখানা দাবাই আছে,কিন্তু পা ব্যথা হলে আমরা বলি "ও কিছু না,সেরে যাবে!"

    আমাদের পায়ের পাতা দুটো হল সমাজের ওই অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষগুলোর মতো। যারা বড় কিছু দাবী করে না, শুধু একটু পেট ভরে খাওয়া। দুটো রুটি, বা একটুকরো পেঁয়াজ সহযোগে একথালা পান্তা খেতে পেলেই তারা ঐরাবতের মতো মহাতেজা হয়ে ওঠে । রোগভোগের বালাই নেই। অথচ আমাদের মতো লোকগুলোর অবস্থা দেখুন। দিনরাত গন্ডেপিন্ডে ভালোমন্দ গিলছি কিন্তু আজ অম্বল, কাল আমাশা, পরশু আর্থারাইটিস আমাদের লেগেই রয়েছে। 

     চরণকমলদুখানা বাদ দিলে দেখবেন শরীরের বাকী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গদের হাজারটা বায়নাক্কা। মুখের কথা তো ছেড়েই দিন। রকমারী রূপটানের দায় মিটোতে জেরবার হয়না এমন মানুষ নেই। 

কী বললেন, পুরুষদের সেসব বালাই নেই !

ও মশাই থামুন দিকি। বলি আছেন কোথায়? 

  আফটার শেভ, শেভিং ক্রীম, কোলন, মেনস্ ফেস ওয়াস এগুলো কী? এমনি এমনি এই কোম্পানীগুলো মিলিয়ন ডলারের বিজনেস করছে নাকি! 

তারপর গলা বা হাতের কথাই ধরুন। মালা-চুড়ি-নেকলেস-ব্রেসলেট-কড়া-আংটি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। গয়নাগাটির লম্বা লিস্টি শুরু হলে শেষ কবে হবে তা বলা মুশকিল। সেই তুলনায় নিজের পদযুগলের কথা একবার ভাবুন তো। নারী হলে নূপুর বা তোড়ার অলঙ্করণ জুটলেও জুটতে পারে,পুরুষ হলে বাপু জুতোটুকুই সার। মোটের উপর দেখবেন,পাদুটো বেশী বায়না করে না,দুপাটি আরামদায়ক পাঢাকনি অর্থাৎ জুতো পেলেই তারা দিব্যি খুশি!

   তাই এহেন নির্বাক সেবকদের প্রতি অবহেলা আসে খুব সহজে। পা দুখানা যত্নের দাবী করে না, অতএব তার যত্ন করে কী লাভ। এমতাবস্থায় যিনি পাদুটোকে যত্নআত্তি করে,ভালোবেসে রাখেন তিনি প্রকৃত অর্থেই তার নিজের শরীরের মর্যাদা দিতে জানেন,তার আভিজাত্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাটা বোকামো।

     জুতো নিয়ে গপ্পো হলেই সিরাজদৌল্লার কাহিনী মনে পড়ে। বাংলার শেষ নবাব সিরাজ যখন ছদ্মবেশ ধারণ করে, স্ত্রী লুৎফা ও কন্যা কে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি জুতোটি পরিবর্তন করতে ভুলে গিয়েছিলেন আর সেই জুতো দেখেই এক পীর তাকে চিনে ফেলছিল এবং ধরিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য গোরার দল বিশ্বাসঘাতকতা মাফ করেনি। সিরাজের মৃত্যুর পর সেই পীরকেও প্রাণদন্ডে পুরস্কৃত করা হয়েছিলো। যেমন কর্ম তেমন ফল!
    
     মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত জুতো জোড়াও ইতিহাস রচনা করেছিল। ব্যাপারটা মোটামুটি হয়েছিল এমন যে,শোভাবাজারের রাজবাড়িতে জলসা হবে, বিরাট আয়োজন। শহরের অর্ধেক লোক জমা হবে সেখানে; যত বড়ো বড়ো লোক, রাজরাজড়া সকলের নেমন্তন্ন হয়েছে। তখন ঠাকুরবাড়ির বিষয়সম্পত্তির অবস্থা বড়ো খারাপ। পিতা দ্বারকানাথের দেনা মেটানোর পর পুত্র দেবেন্দ্রনাথের হাত একবারেই শূন্য।  বড়ো বড়ো লোকেরা মজা দেখার অপেক্ষায় রইলেন। সবার মনে একই প্রশ্ন,ঠাকুরবাড়ির দিন গেছে, প্রিন্স দ্বারকানাথের ছেলে কী ভাবে নিজের মানরক্ষা করবেন? এবারে দেবেন্দ্রনাথ কী সাজে আসবেন নেমন্তন্ন রক্ষা করতে যাতে সাপও মরে এবং লাঠিও না ভাঙে! 

   এসব কথা বোধহয়  দেবেন্দ্রনাথের কানেও এসেছিল। তিনি বাড়ির দেওয়ানকে দিয়ে করমচাঁদ জহুরীকে বৈঠকখানায় ডাকিয়ে আনালেন। করমচাঁদ জহুরী সেকালের খুব পুরোনো জহুরী। ঠাকুরবাড়ির "বাবামশায়"-এর পছন্দ তার বেশ জানা ছিল। 
  দেবেন্দ্রনাথ তাকে বললেন, একজোড়া মখমলের জুতোয় আগাগোড়া মুক্তো দিয়ে কাজ করে আনতে। সেই আদেশমতো করমচাঁদ জহুরী দানা দানা মুক্তো সেলাই করে সাজানো সুন্দর একজোড়া মখমলের জুতো তৈরি করে এনে দিলেন। 

  জুতোর ঝামেলা তো মিটলো। এবার চিন্তা, কেমন জামা,কেমনই বা সাজপোশাক হবে ? রাজবাড়িতে নেমন্তন্ন বলে কথা, যেমন তেমন পোশাকে কী যাওয়া যায় ? সবাই ভাবছে তোষাখানা থেকে কাশ্মিরী পশমিনা শাল বের করবে, না রেশমের জোব্বা। দেবেন্দ্রনাথ হুকুম দিলেন,

"ও সব কিছুই নয়! আমি সাদা কাপড়ে যাব।" 

জলসার দিন তিনি পরলেন ধবধবে সাদা আচকানজোড়া। মাথার মোড়াসা পাগড়িটি অবধি সাদা, কোথাও জরি,কিংখাব বা জরোয়ার নামগন্ধ নেই। আগাগোড়া সাদা। পায়ে কেবল সেই মুক্তো বসানো মখমলের জুতোজোড়াটি।

    ভাবুন একবার অবস্থাখানা! রাজবাড়ির সভাস্থলে সবাই বসে রয়েছেন কিংখাব-জড়ি-মখমলের পোশাক পরে,হীরেমোতি-চুনিপান্না গলায় ঝুলিয়ে। এমন সময়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সেখানে প্রবেশ। সভাস্থলে সবাই নিস্তব্ধ। একখানা সূঁচ পড়লেও বুঝি আওয়াজ শোনা যাবে। দেবেন্দ্রনাথ কৌচে বসলেন পা-দুখানি একটু বের করে। সবাই চুপচাপ। শোভাবাজারের রাজামশাই ছিলেন তার বন্ধু। তিনি তখন ওনার পায়ের দিকে ইশারা করে হইহই করে উঠলেন,

 "ওরে দেখ, দেখ, তোরা দেখ, একবার চেয়ে দেখ এ দিকে, একেই বলে আভিজাত্য। আমরা ঝুলিয়েছি গলায়, মাথায়, আর ইনি তা পায়ে রেখেছেন।"

এই দুখানা গল্প বললাম বাঙলার ইতিহাসের পাতা থেকে। এবার একখানা বিদেশী গপ্পো শোনাই। এই গল্পটা আমার বন্ধু পিট টেয়লরের মুখে শোনা। পিটের প্রেমিকা পামেলা জুতোর ব্যাপারে বড় খুঁতখুতে। মানে জামা-টুপি-ব্যাগ এদিক ওদিক হলেও চলবে কিন্তু জুতোর ব্যাপারে এতটুকুও নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। তো সে যাকগে, ওদের নেমন্তন্ন ছিল প্রতিবেশী মিস্টার তাকাশাকির বাড়িতে। তাকাশাকিমশাই জাপানের মানুষ, একটু বয়স্ক এবং আদ্যোপান্ত পুরাতন জাপানী রীতিনীতিতে বিশ্বাসী। সেই হিসেবমতো পিট ও পামেলা দুজনেই হাল্কা, সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরলো, যাতে তাকাশাকি মশাইয়ের বাড়ির পরিবেশে তা বেশ মানানসই হয়। কিন্তু গোল বাঁধলো জুতো নিয়ে। প্যামির ইচ্ছে একটু দামী হাই হিল পরে, ওদিকে পিটের তা নিয়ে আপত্তি, প্যামির জামার সঙ্গে নাকি ফ্ল্যাট চটিজোড়া পরলেই বেশী মানাবে। আসল ব্যাপারটা আমরা জানি, পিট বেচারার হাইটটা একটু কম, সেই কারণে প্রেমিকা হাই হিল পরে তার সঙ্গে ঘুরলে সে ইনসিকিউরিটিতে ভোগে।  ঝগড়া শুরু হয়েছিল বেশ খাদের সুরে"ডার্লিং-হানি" এসব বলে, কিছুক্ষণ পরেই থার্মোমিটারের পারা চড়তে চড়তে বিবাদের সুর সপ্তকে পহুছিল। শেষকালে পিটের এনগেজমেন্ট প্রায় ভেঙে যায় যায় দশা।

    এতকিছু ঝামেলা করে পিট ও পামেলা দুজনে তাকাশাকিমশায়ের বাড়িতে গিয়ে পৌছল পার্টি শুরু হওয়ার ঘন্টাদেড়েক পর। পামেলা নিজে হীলস্ তো পরেছেই তার ওপর পিটারকেও হাই হীলড্ ফর্ম্যাল শ্যুজ পরিয়েছে ( হুঁ হুঁ বাওয়া, দেশী হোক বা বিদেশী,বৌ ইজ বৌ!) কিন্তু তাকাশাকি ভবনের দোরগোড়ায় পৌছতেই জোর কা ঝটকা লাগলো ধীরেসে ! সুসজ্জিতা ম্যাডাম তাকাশাকি ভারী মিষ্টিসুরে জানালেন, 

" দয়া করে জুতো খুলে ভেতরে আসবেন। জুতো জিনিসটা বাইরের, ওটাকে আমরা ঘরের ভেতর স্থান দিই না।" 

এই ঘটনার পর  পিটের প্রেমিকা নাকি তিনদিন তার সঙ্গে কথা কননি। রাগে না অনুরাগে তা অবশ্য জানা হয়নি। 

      সিন্ডেরেলা আর তার কাঁচের জুতোর গল্প সবাই জানে। রাত বারোটার সময় সিন্ডেরেলা প্রিন্স চার্মিংয়ের পার্টি থেকে ছুটে বেরিয়ে যান। যাওয়ার পথে তার পা থেকে একপাটি কাঁচের জুতো খুলে পড়ে যায়। পরে সেই জুতোর সাহায্যে রাজকুমার সিন্ডেরেলাকে খুঁজে পান অ্যান্ড দে লিভড্ হ্যাপিলি এভার আফটার! মোটের উপর এই হচ্ছে গল্পখানা। কিন্তু গল্প পড়ে একটু ভাবলেই বুঝবেন যে জুতো খুলে যাওয়া ব্যাপারটার মধ্যে যথেষ্ট ফাঁক রয়েছে। চমৎকার মাপে মাপে পায়ে বসে যাওয়া জুতো অমনি অমনি পা থেকে খুললো কী করে? বারোটা অবধি হইহুল্লোর নাচগান করা অবধি জুতো দিব্যি ঠিক ছিলো, ঠিক দৌড়ে পালানোর সময়ই তাকে খুলে পড়তে হল ! সিন্ডেরেলা কী তবে ইচ্ছে করেই জুতোখানা ওখানে ফেলে রেখে এসেছিল যাতে তাকে খুঁজে পেতে রাজকুমারের অসুবিধে না হয়! একটু ভাবুন, ভাবলেই বুঝবেন সিন্ডেরেলাকে আমি আপনি  যতটা সোজা সরল ভেবেছিলাম, ততটা ইনোসেন্ট সে মোটেই নয়। সিন্ডেরেলা যথেষ্ট সেয়ানা মেয়ে।

   আমার এক বাংলাদেশী বন্ধুর মুখে শোনা মোহাম্মদ নাসির আলির লেখা জুতো নিয়ে আরেকখানা গল্প দিয়ে শেষ করি।  গল্পের নাম "অলক্ষুণে জুতো।" গল্পখানা এমন, আলি আবু বাগদাদ শহরের অত্যন্ত ধনী অথচ কৃপণ লোক। তার কৃপণতার শ্রেষ্ঠ পরিচয় তার জুতো। তিনি বহু বছর ধরে জুতো বদলাননি। বছরের পর বছর সেলাই করিয়ে, পেরেক লাগিয়ে, তালি লাগিয়ে একই নাগরাই জুতা পরতেন। সময়ে এমন হল যে, আলি আবুকে সবাই তার জুতোর নামে চেনে। 
তা একদিন হল কী, একদিন আলি আবুর বন্ধু তার জুতো নিয়ে মজাক করলেন তার সঙ্গে। আবু এবং তার বন্ধু দুজনেই তখন হামামে। গোসল করছেন। বন্ধুটি সুযোগ বুঝে তার ছেঁড়াখোঁড়া, তালি মারা নাগরা জোড়া লুকিয়ে রাখলেন অন্য জায়গায়। মতলবখানা এই যে, জুতো হারিয়ে আবুর দশা কেমন হয়! 
  
     এদিকে আলি আবু তো এসব কিছুই জানেন না। তিনি গোসলখানা থেকে বেড়িয়ে দেখলেন তার জুতোর জায়গায় অন্য একটি কারুকাজময় সুন্দর,নতুন জুতো রাখা আছে। তিনি ভাবলেন এই জুতোজোড়া নিশ্চয় তার বন্ধু তার জন্যই রেখে গেছে। তিনি বিনি পয়সায় নতুন জুতো পেয়ে আল্লাহ্তালা কে সুক্রিয়া জানিয়ে, নতুন জুতো পরে ফিরে এলেন বাড়িতে।

   কিন্তু আসলে সেই নতুন জুতোটি ছিল কাজিসাহেবের। কাজিসাহেব বের হয়ে দেখলেন তার জুতোজোড়া গায়েব। অনেক খুঁজে দেখা গেল শুধু আবুর জুতোজোড়া পড়ে রয়েছে সেখানে। ব্যস আর কী, কাজিসাহেব ভেবে নিলেন আলি আবুই তার জুতো নিয়ে গেছেন।
এর জন্য জুতো চোর হিসেবে আবু আলির শাস্তি হয়। রাগে দুঃখে আলী আবু জুতো নদীতে ফেলে দেন। সেখানে এক জেলে জুতোটি পায়। সে আবুর জুতোজোড়া ঠিক চিনতে পারে এবং সরলমনে সে ভাবে হয়ত আবুর জুতোটি হারিয়ে গেছে। কারণ সবাই জানত এই জুতোজোড়া আবুর বড়ই প্রিয়। ভেবেচিন্তে পুরস্কারের লোভে জেলে বেচারা জুতোটি নিয়ে আসে আবুর বাড়িতে। আবু তখন বাড়িতে ছিলেন না। অনেক হাঁকডাক করে বিরক্ত হয়ে জেলে আবুর বাড়ির জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দেয় জুতো জোড়া। জুতো ভেতরে গিয়ে পড়ে আতরের বোতলে। এই বোতলগুলোর ভেতরে খাস আতর ছিল আবু বড়ই পেয়ারের। সব নষ্ট হয়।

বাড়িতে ফিরে সবকিছু দেখেশুনে রাগে দিশাহারা হন আলি আবু। তিনি সেই রাতেই জুতোজোড়া কে দফন করার জন্য গর্ত খুঁড়তে শুরু করেন প্রতিবেশীর দেয়ালের ধারে। কিছু লোক তাঁকে সেই অবস্থায় দেখে ভাবে তিনি হয়ত সিঁদ কেটে চুরি করতে যাচ্ছেন। অতএব আবার তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া  হয় কাজির কাছে। কাজিসাহেব শুধোলে আলি বলেন তিনি জুতোজোড়া মাটি চাপা দিচ্ছিলেন। কিন্তু কে আর সেকথা বিশ্বাস করবে! প্রাণের চেয়েও প্রিয় জুতো তিনি দফন করবেন, একথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বইকি! ফলস্বরূপ পুনরায় শাস্তি পেতে হয় তাকে।
এরপর আবু জুতো ছুঁড়ে ফেলে দেন। ঘটনাক্রমে তা গিয়ে পড়ে এক ছেলের ঘাড়ে। সে অজ্ঞান হয়ে যায়। লোকেরা আবুর নাগরাই জুতা চিনতে পারে। তারা বিচার নিয়ে যায় কাজির কাছে। আলি আবার শাস্তি পান।

    আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় "অলক্ষুণে জুতো"গল্পটির সারাংশ হল অত্যধিক কৃপণতা ভালো নয়, কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝবেন আসল কথা তা নয়। গল্পটি রূপকধর্মী। আমাদের মধ্যে অনেকেরই এই  অভ্যাস রয়েছে, যে আমরা সচেতনভাবে বা অবচেতনে কিছু বস্তুকে নিজের পরিচয়ের অংশ করে তুলি। যেমন এই গল্পের ক্ষেত্রে, গল্পের নায়ক আলি আবু তার ছেঁড়া জুতোজোড়াকে নিজের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছিলেন। ফলস্বরূপ জুতোর গুরুত্ব একসময় তার মালিককেও ছাড়িয়ে যায়। সাধারণ অবস্থাতেও মানুষ যেসব দুর্দশায় পড়েন তার বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কারণ কিন্তু তুচ্ছ বস্তু অথবা অপদার্থ পরিজনের ওপর অনর্থক বিশ্বাস এবং নির্ভরশীলতা। তাই সাধু সাবধান! তুচ্ছ বস্তু, খারাপ অভ্যাস এবং অযোগ্য মানুষ (সে আপনার যত প্রিয়ই হোক না কেন) এই তিনের সম্পর্কে সদা সতর্ক থাকবেন। এই ত্রয়ীর যে কোনো একটি যদি আপনার পরিচয়ের সর্বাধিক শক্তিশালী অংশ হয়ে ওঠে তাহলে খারাপ সময়ে তা আপনার অস্তিত্ব‍ ও স্বাধীনতা দুয়েরই বারোটা বাজাবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

সর্বজনীন স্যার ডঃ শংকর সেন ~ দেবেশ দাস

ব্রিটিশ ভারতে ছাত্রাবস্হা থেকেই দেশপ্রেমে অবিচল। এক বিকেলে একটা বাড়ী থেকে গ্রেফতার হয়ে গেল দুই স্কুল ছাত্র। পরের দিনের সকালের ধর্মঘটে তাদের রেলে নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা ছিল, সেই উদ্দেশ্যেই উঠেছিল ওখানে। স্যার বললেন, গ্রেফতার হতাম না জানো, যে বাড়ীতে উঠেছিলাম, বন্ধুর বোন পাড়ায় গল্প করেছিল যে বাইরে থেকে দাদার বন্ধুরা এসেছে, ব্যস খবরটা পুলিসের কানে পৌঁছল। সেই ছাত্রই শংকর  সেন। স্কুলশিক্ষা শেষে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া, অধ্যাপনায় ঢোকা। ইংল্যান্ডে বিশ্ববিখ্যাত এক অধ্যাপক এম জি সে এর কাছে পিএইচডি। 
কলেজে চলছে বার্ষিক পরীক্ষা, তারই অংশ হিসাবেই প্রত্যেককে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। সেই সময়ে করিডোরে ডঃ শংকর  সেন দেখলেন একটি ছাত্রকে। 'এই তোমার পরীক্ষা না? এখানে ঘুরছ কেন?' ছাত্রটি বলল, মৌখিক পরীক্ষা দিতে তার প্রথমেই ডাক পড়েছিল, যা প্রশ্ন করেছিল কিছু পারেনি, স্যার ঘর থেকে বার করে দিয়েছেন, বলেছে, একদম শেষে এসো, সবার শেষে তোমায় আবার ধরবো। ছাত্রটিকে বললেন, শিগগিরি তার ঘরে যেতে, ঘরে গিয়ে কী কী প্রশ্ন তাকে করা হয়েছিল শুনলেন, তারপর সেটাই ছাত্রটিকে দীর্ঘক্ষন ধরে বোঝালেন। সবার শেষে ছাত্রটির যখন আবার ডাক পড়লো, সেই একই প্রশ্নে ছাত্রটি সফল, প্রশ্নকর্তা অবাক।



শুধু পড়াশোনা না, যে কোনও ছাত্রকে যে কোনও সাহায্য করার জন্য সবসময় মুখিয়ে থাকতেন স্যার। 'ছাত্র' শব্দটাতেই এক অদ্ভুত দুর্বলতা। কখনো কোনও একটা প্রোগ্রামে হয়তো যেতে চাইছেন না, বকাবকি করছেন, একটা মোক্ষম অস্ত্র ছিল, 'ছাত্রকে আপনি সাহায্য করবেন না?' ব্যস কাত হয়ে যেতেন। তার মৃত্যুর দিনে তাই অগণিত ছাত্রদের ভীড়, সকলেই তার সরাসরি ছাত্র না, কিন্তু তাও প্রত্যেকেই এই সার্বজনীন শিক্ষকের ছাত্রই, কোনও না কোনও ভাবে তার কাছে চলার পথে সাহায্য পেয়েছে, জীবনের উপদেশ পেয়েছে। মেধাবী ছাত্র, গবেষক, অধ্যাপক, উপাচার্য, মন্ত্রী, সব কিছু ছাপিয়েই তার মূল পরিচয় তিনি অগণিত ছাত্রদের স্যার।
মন্ত্রিত্বের পর অবসর জীবনে এক বিখ্যাত তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানি তাকে বলেছিল পাওয়ার প্লান্ট পরিচালনার ব্যাপারে একটা সফটওয়্যার বানাতে তাদের সাহায্য করতে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রয়োগের ব্যাপার, সাথে সাথে রাজী হয়েছিলেন, তবে দুটি শর্তে। এক, যেদিন কোম্পানিতে যাবেন তাকে গাড়ী দিতে হবে, আর যতক্ষন থাকবেন, তাকে সামান্য কিছু খেতে দিতে হবে। না, কোনও কনসালটেন্সী ফি তিনি নেবেন না। কোম্পানিটি অবাক। অথচ, তার খুব স্বচ্ছল অবস্হা ছিল না। দীর্ঘদিন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ানো, তারপর কয়েকবছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, পেনশন পাওয়ার সময়ে যে কোনও কারণেই হোক তার শিবপুর ও যাদবপুরের সার্ভিস পিরিয়ডের সংযোগ না হওয়ায় পেনশন যা পাওয়ার কথা তার থেকে বেশ কম পেতেন। তাই নিয়েই চালাতেন।     
চিরকাল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো, তা নিয়ে বই লেখা, অথচ স্কুল শিক্ষা উন্নত করার জন্য বিশেষ ভাবিত ছিলেন। কখনো হয়তো কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক এসেছে তাকে সমাবর্তনে ভাষণ দেওয়ার জন্য, তিনি রাজী হননি, বলেছেন তিনি এখন স্কুলশিক্ষা নিয়ে বেশী চিন্তিত। সপ্তম বামফ্রন্ট মন্ত্রীসভায় তথ্যপ্রযুক্তি দফতরের স্কুলে স্লাইড সহযোগে পড়ানোর উদ্যোগে খুবই সক্রিয় হয়েছিলেন। মন্ত্রিত্বের পরেও বামফ্রন্ট মন্ত্রীসভার কোনও কোনও দফতরকে সাহায্য করেছেন।
রাজ্য সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি দফতরের কাজে একদিন তাকে গাড়ী পাঠানো হয়েছে। যাতায়াতের পথে সেই গাড়ী নিয়ে তিনি ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। যেহেতু ব্যক্তিগত কাজে সরকারী গাড়ী ব্যবহার করছেন, তাই সরকারী দফতরে হিসেব করে তার জন্য টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সরকারী অফিসার তো হতবাক, মন্ত্রীকে ধরলেন, এই টাকা কিভাবে নেওয়া হবে? মন্ত্রী বললেন, নিতেই হবে, এই টাকা ফেরত নিতে তার স্যারকে বলার সাহস নেই। উপাচার্য থাকার সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ী নিয়ে বিয়েবাড়িতে গেলে গাড়ীর ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। কলকাতার একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটা কাজে দু-একবার যাওয়ার সময়ে, প্রতিষ্ঠানটি তাকে একটা বড়ো গাড়ী পাঠিয়ে দিত, তাতে তার কি সংকোচ!
পার্টির সদস্য ছিলেন না। কিন্তু শৃঙ্খলা পরায়ণায় ঘাটতি ছিল না। কত রথী-মহারথী  তো পার্টির সাথে বিচ্ছিন্ন হওযার পর নানা কথা বলেছেন। তার সাথে কোনও না কোনও মতবিরোধেই তো তিনি বামফ্রন্ট মন্ত্রীসভা ছেড়েছিলেন, কিন্তু একটা কথা তার মুখ দিয়ে কেউ বার করতে পারেনি। না, শত একান্ত আলোচনাতেও আমরা ছাত্ররাও এ ব্যাপারে কোনদিন কিছু জানতে পারিনি। জ্যোতি বসুর প্রতি ছিল অগাধ আস্হা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা। মৃত্যুর আগে জ্যোতি বসু যখন দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলেন, তখন হাসপাতালের চারপাশে বহু লোক রোজ জড়ো হতেন। স্যারও একদিন গিয়েছিলেন, বহু লোকের সাথে বাইরে দাড়িয়ে চলে এসেছিলেন। 
মেয়েদের প্রতি দারুন সম্ভ্রম দেখিয়ে গেছেন চিরকাল। মন্ত্রী থাকাকালীনও তার সাথে দেখা করতে আসা ব্যক্তিদের সাথে কোনও মহিলা এলে সাথে সাথে উঠে দাড়াতেন। অবসর জীবনে নানা জায়গায় যেতেন। মানুষের সাথে কথা বলতেন। একবার কোনও এক জায়গায় খুব সাধারণ মহিলারা তাকে একটা প্রশ্ন করেন, মহিলা বিধবা হলে তার মাছ-মাংস খাওয়া বারণ, কিন্তু পুরুষ বিপত্নীক হলে তো সে সব খায়, এটা কেন চলবে? স্যারের তখন কয়েক বছর হল স্ত্রী মারা গেছেন, ট্রেনে ফিরতে ফিরতে তার মনে হল, এদেশের মেয়েদের ভীষন বঞ্চনা করা হচ্ছে, বাড়ী ফিরে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। 
জীবনে স্ত্রীর অবদানের কথা সোচ্চারে বলতেন।  তাঁর ছাত্র বাৎসল্যকে মদত দিতে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন একেবারে উদারহস্ত, আর অসহায় মানুষের প্রতি স্যারের মতোই আন্তরিক। স্যারের কাছেই গল্প শুনেছিলাম, একবার কোন একটা জায়গায় স্যারের সাথে গিয়ে মানুষের দারিদ্র্য দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। একবার একটা প্রোগ্রামে স্যারের যাওয়ার কথা হচ্ছিল, কিন্তু কিছুতেই কেন যেতে চাইছেন না বুঝতে পারছিলাম না। পরে বললেন, ঐদিন তাদের বিবাহবার্ষিকী, ওদিন তিনি একা থাকবেন, কোথাও যাবেন না, তাঁর স্ত্রী তখন ১০-১২ বছর মারা গেছেন।  
স্যারের সম্বন্ধে বলতে গেলে নানা গল্প আর শেষ হবে না। গত কয়েক দশকে অনেক বুদ্ধিজীবি তো রাজ্যে দেখা গেল। কেন জানিনা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির লোকদের কেউ বুদ্ধিজীবির পর্যায়ে ফেলে না। দেশপ্রেম, শিক্ষাঅনুরাগ, সমাজবোধ, সমাজ-সচেতনতা, মূল্যবোধ, প্রগতিশীল চিন্তা, মানুষের প্রতি দরদ, সব কিছুতেই স্যার একবাক্যে অনন্য। আজীবন প্রচারবিমুখ আদর্শের প্রতিমূর্তি মানুষটি নীরবেই চলে গেলেন।

আপের জয় ও এইরাজ্যের বাজেট ~ বিষাণ বসু

দিল্লিতে আপের জয়জয়কারে আপনার মতো আমিও খুশী - উচ্ছ্বসিত। আদার ব্যাপারী - তাই রাজধানীর খবর তেমন একটা পাই না -  তবে হাইএন্ড বন্ধুদের মুখে শুনেছি, সেখানকার সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর সরকারি ইশকুলের ভোল বদলে দিয়েছেন কেজরিওয়ালের সরকার - মহল্লা ক্লিনিকের কথা শুনেছি - কাগজেই পড়েছি, পরীক্ষাটরীক্ষায় দিল্লিতে বড়লোকি প্রাইভেট ইশকুলের চাইতে ভালো রেজাল্ট করছে সরকারি ইশকুল।  

গেরস্ত মধ্যবিত্ত মানুষ - দাঙ্গাহাঙ্গামায় বড় ভয় পাই। কাজেই, এরাজ্যেও বিজেপি না আসুক, এমনটাই চাই। প্লাস, ওই মধ্যবিত্ত বলেই, স্বাস্থ্য আর শিক্ষা নিয়ে খুব চিন্তায় থাকি - ভাবি, ওই পথেই উন্নতি-টুন্নতির আশা।

এইরাজ্যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র - তিনি খুবই হাইফাই অর্থনীতির লোক, শুনেছি।

রাজ্যের বাজেটের খোঁজ আজকাল কেউ রাখে না - খুব একটা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ কেউ করেন, এমনও দেখিনি। তবু, আমার মতো আনাড়ির চোখে একটু কেমন কেমন ঠেকল -      

গতবছরের রাজ্য বাজেটে -

স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়বরাদ্দ - ৯৫৫৬ কোটি টাকা
স্কুল শিক্ষায় - ২৭৫৪০ কোটি টাকা
উচ্চশিক্ষায় - ৩৯৬৪ কোটি টাকা
বৃত্তিমূলক শিক্ষায় - ১১০৬ কোটি টাকা

এবছরের বাজেট -

স্বাস্থ্যখাতে - ৪৬০৮ কোটি টাকা (গতবছরের আটচল্লিশ শতাংশ - অর্ধেকেরও কম) 
স্কুল শিক্ষায় - ৮৭৫০ কোটি টাকা (গতবছরের একতিরিশ শতাংশ - এক-তৃতীয়াংশেরও কম)
উচ্চশিক্ষা - ৭০০ কোটি টাকা (গতবছরের সতের শতাংশ - ছয় ভাগের এক ভাগ) 
বৃত্তিমূলক শিক্ষায় - ৯০০ কোটি টাকা (গতবছরের আশি শতাংশ) 

এসব নিয়ে কেউ হইচই করছেন, এমন খবর দেখিনি। মিডিয়াতেও শোরগোল চলছে, এমনও দেখিনি। আপনি কিছু খবর পেলে জানাবেন, প্লীজ।

হ্যাঁ, খুশীর খবরও কি নেই? আছে তো!! জাতপাতের ভিত্তিতে পেনশন চালু হবে এরকম অনেক খবরই আছে।

তা, এই পথেই বিভাজন আর জাতপাত আর হানাহানির রাজনীতি প্রতিহত হবে? শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ছেড়ে পাইয়ে-দেওয়ার রাজনীতি দিয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষের বয়ানের মোকাবিলা হতে পারবে? 

প্রসঙ্গত, দুই রাজ্যেই নাকি কর্ণধারদের স্ট্র‍্যাটেজি সাজিয়ে দিচ্ছেন প্রশান্ত কিশোর। তাহলে? আমরা, এই রাজ্যের নাগরিক তথা ভোটারেরা কি এমনই অর্বাচীন যে চুষিকাঠির বাইরে ভাবতে শিখিনি?? শিক্ষা-স্বাস্থ্য আমাদের অগ্রাধিকার নয়??? 

আপনি কী বলেন??

(তথ্যসূত্র - মাননীয় শ্রী অমিত মিত্র মহাশয়ের ২০১৯ ও ২০২০ সালের বাজেট বক্তৃতা)

বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২০

বিজেপির ভয় ~ সংকলন সরকার

২০১৯ নির্বাচনে মোট ৬০.৩৭ কোটি ভোট পড়েছিলো। তারমধ্যে বিজেপি ৩৭.৩৬% ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে, এনডিএর কম্বাইন্ড ভোট শেয়ার ছিলো ৪৫%... এই তথ্য সরকারি ওয়েবসাইট ঘাঁটলেই পাবেন। তারপর দেশের বিভিন্ন নির্বাচন উপনির্বাচনে ২০১৯ এই বিজেপির সমর্থনের হার ক্রমশ আরো কমেছে। হাতছাড়া হয়েছে বেশ কিছু রাজ্য। ২০১৪ থেকে হিসেব শুরু করলে বিজেপির জনপ্রিয়তা হ্রাসের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আচ্ছা, ২০১৯ এর ১১ই এপ্রিল থেকে ১৯শে মে অবধি পড়া ৬০.৩৭ কোটি ভোটের মধ্যে ৩৭.৩৬% বিজেপি ভোটারের মধ্যে একটু বেশি করেই না হয় ধরে নিচ্ছি ৫০% ভোটার হল অন্ধভক্ত। অর্থাৎ ১৮.৬৮% ভোট বিজেপির কমিটেড ভোটার। ওই ভোটটা বিজেপি পাবেই পাবে। বাকি ভোটের ঠিকানা নেই, বেশ কিছু ভোট ১৯শে মে ২০১৯ এর পরে আজকে ৩০শে জানুয়ারী ২০২০ অবধি ইতিমধ্যে বিভিন্ন গেরুয়া রাজ্যের হিসেব পাল্টে দিয়েছে। আগামীতে আরো অনেক ছক বদলাতে চলেছে। ফলে ক্রমান্বয়ে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভয় বিজেপি সুপ্রিমোদের মাথায় কি গেড়ে বসছে? মানসিকতা মেলানোর উত্তর জানি না তবে অঙ্কমেলানো সোজা। অন্ধভক্তরা কোনো কিছু না ভেবে পরম নিশ্চিন্তে থাকলেও বিজেপি থিঙ্কট্যাংক অসম্ভব অস্বস্তিতে রয়েছে এ কথা হলফ করে বলতে পারি। বিজেপির হাতের শেষ অস্ত্র হিংসা দ্বেষ এবং সন্ত্রাস! 

সবাই যখন ভারত-পাকিস্তান, ৩৭০-কাশ্মীর, হিন্দু-মুসলিম, সিএএ, এনআরসি, এনপিআর জামিয়া জেএনইউ ইত্যাদি নিয়ে বিতর্ক করতে ব্যস্ত, আমরা আমাদের দেশের আশেপাশে কী ঘটছে তা খেয়াল করছি না!
৩০.০১. ২০২০ তারিখের বিভিন্ন ডেটা সার্চ করে কী কী পাই দেখি চলুন

 আমাদের দেশের সাম্প্রতিক ডেটা এবং পরিস্থিতি 👇

- Vodafone is in loss of ₹50,000 Crore.

- Airtel is in loss of ₹23,000 Crore.

- BSNL is in loss of ₹14,000 Crore.

- MTNL is in loss of ₹755 Crore.

- BPCL is in loss of ₹750 Crore.

- SAIL is in loss of ₹286 Crore.

- AIR India is in loss of ₹4600 Crore.
 
- Spice Jet is in loss of ₹463 Crore.

- Indigo is in loss of ₹1062 Crore.

- BHEL is in loss of ₹219 Crore.

- India Post is in loss of ₹15,000 Crore.

- GMR Infra is in loss of ₹561 Crore.

- YES Bank is in loss of ₹600 Crore.

- Union Bank is in loss of ₹1190 Crore.
 
- PNB Bank is in loss of ₹4750 Crore।

- Axis Bank is in loss of ₹112 Crore.
 

Apart from the above 👆👇🏼

 - Jet Airways closed.

- BSNL 54,000 may cut more jobs.

- No money to pay salary for HAL employees.

- 1 million to be laid off in Auto Industry.

- 12.76 lakhs houses unsold in 30 major cities.

- Aircel and Docomo is dead.

- JP Group finished.

- Most profitable company in India - ONGC is now making losses.

- 36 largest debtors missing from country.

 - Rs 2.4 lakh crores loan waive off for a few corporates. 

- All banks incurring huge losses.

- External debt on country 500+ Billion Dollars.

- Railways are on sale.

- Renting heritages including Red Fort.

- Largest car maker Maruti cuts production.

- Rs 55000 crores car inventory lying at factories, with no buyers.

- Builders all over stressed. Some committing Suicide, no buyers.  Construction Stopped due Mat cost rise (GST at 18% to 28%).

- OFB under corporatization affecting over 1.5 lac employee & families.

- Millions unemployed due to Demonetization.

- Highest unemployment in 45 years.

- 5 airports sold to Adani.

- Highest domestic stagflation.

- Record HNI individuals leaving India.

- Videocon bankrupt.

- Tata Docomo perished.

- CCD founder VG Siddhartha committed Sucide due to huge debt.

- Reputed Biscuits Companies like Parle-G on the verge of terminating it's employees.

...Many nationalized banks have merged, many branches have literally closed, huge numbers of ATM's Rooms are set down, 

May be many more...

Note: Nothing is shown in media. And media is busy debating India Vs Pakistan, and Hindu Vs Muslims who were living peacefully with tranquility till recently. 

বিজেপি ম্যানেজমেন্ট ভয় পাচ্ছে, তাই ক্ষমতা ছুঁয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দেশ ভক্তি অনেক দূরের কথা, দেশ নিয়ে এদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। এরা কথাবলা লোকজনদের ভয় পায়, শিক্ষিত সমাজকে ভয় পায়, এই দেশ ব্যবসায়ীরা দেশ ভক্তির নামে দেশকে ছিঁড়ে খুঁড়ে নিজেরা অত্যন্ত স্বল্প সংখ্যক কতিপয় শ্রেণীর পকেটে ভরে নিতে উদ্যত। দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে এই বানিয়ারা যখন লুটের ভাগ সামলাবে সেই মাস্টার প্ল্যানে দেশের অনেক তাবড়-তাবড় নেতা মন্ত্রী সমর্থক অবধি থাকবে না তো ছোটোখাটো স্টেটলেভেলের নেতা মন্ত্রীর কথা বাদ দিলাম। আর ভোটে জেতানো ভক্ত বা অন্ধভক্তদের কথা ধর্তব্যের মধ্যেই আনছি না। আচ্ছে দিনের নামে ২০১৪ থেকে মাত্র ৬ বছর সময়কালের হিসেবে ভারত জেট গতিতে ঠিক ৪৫ বছর পিছিয়ে গেছে। 

সামনে মার্চ ইয়ারএন্ডিং নতুন বাজেট লালশালু মুড়ে সংসদে আসতে চলেছে ফ্রেন্ডস... আপনারা দম বন্ধ করে হিন্দু মুসলমান সিএএ পাকিস্তান বাংলাদেশ নিয়ে লাট্টু হয়ে থাকুন, দুনিয়ার সবথেকে উঁচু মূর্তি দেখে আসুন, সিয়াচেন সিয়াচেন খেলুন, বাংলাদেশি খুঁজুন, তোতাপাখির মতন শেখানো বুলি কপচান। হিন্দু মুসলমান একে অপরের সঙ্গে বাকযুদ্ধ জারী রাখুন, মুখোমুখি হলে একে অপরের মাথা ফাটিয়ে দিন, মন্দির মসজিদ ভাঙুন, হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে বসে মন দিয়ে পড়াশোনা করুন। স্কুল কলেজ লাইব্রেরী ইউনিভার্সিটিতে যাবেন না। নিজের ইচ্ছে মতন পড়াশোনা একদম করবেন না। নিজের ইচ্ছেমতন কথা বলবেন না, ভেদ ভাব বিভাজন দ্বেষ ছড়ান, রাম মন্দির বানান, রাম মন্দিরে বসে ঘন্টা নাড়ুন...

যদিও রামের বাপ দশরথের বাপের নাম ছিল অজ, সেই শ্রীঅজ'র অবধি ক্ষমতা নেই যে আপনাকে বাঁচায়! 

জ্জ্যায়শ্রীরাম

সংকলন সরকার
৩০/০১/২০২০

তথ্যঋণঃ ইলেকশন কমিশন, গুগল, সেমিমা হাকিম।

একটি পুজো, নায়ক, খলনায়ক, গায়ক ও একজন কবি ~ সমুদ্র সেনগুপ্ত

১৩৩৩, ১৩ই ফাল্গুন (২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৮) কলকাতার সিটি কলেজ-সংলগ্ন রামমোহন ছাত্রাবাসে সরস্বতী-প্রতিমা স্থাপন করে পুজোর দাবিতে কলেজ-কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রদের সংঘর্ষজনিত গোলযোগের সূত্রপাত হয়। 

সিটি কলেজ ব্রাহ্মদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত একটি নামকরা কলেজ সেই সময়ে। কিন্তু কলেজের অধিকাংশ ছাত্র ছিল হিন্দু। কলেজের ছাত্রাবাসটির নাম ছিল 'রামমোহন হোস্টেল'। সেই ছাত্রাবাসের অধিকাংশ আবাসিকও হিন্দু। তারা সরস্বতী পুজো আয়োজন করতে চায়। 

সে সময়ে সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন হেরম্বচন্দ্র মৈত্র। কলেজের সংবিধান অনুসারে সরস্বতী পুজোর মতন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করতে দেওয়া চলে না, এই কারণে কর্তৃপক্ষ হস্টেলে পুজো করার অনুমতি দিতে অস্বীকৃত হন। শুরু হয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছাত্রবিক্ষোভ। বাধাপ্রাপ্ত ছাত্ররা অনশন সত্যাগ্রহ শুরু করে। পক্ষে বিপক্ষে বহুলোক। 

এর ছয় বছর আগে ১৯২২ সালে ঐ সিটি কলেজে ইংরেজি বিভাগে যোগ দিয়েছেন এক তরুণ অধ্যাপক। ঠাকুর্দা সর্বানন্দ দাশগুপ্ত ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করাতে তিনিও তাই। বছর খানেক আগে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হল তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'ঝরা পালক'। কবির নামের শেষে দাশগুপ্তের বদলে কেবল দাশ, শ্রী জীবনানন্দ দাশ। আমাদের ছোট্ট এই কাহিনীর নায়ক নন, স্রেফ ট্র্যাজেডির একটা চরিত্র।

নায়কদের দিকে একবার চোখ ফেরানো যাক। আন্দোলনকারী ছাত্রদের সপক্ষে সবচেয়ে বড় নাম এক তরুণ যুব ছাত্রনেতা। বছর খানেক আগে ১৯২৭ সালে মান্দালয় জেল এর কারাবাস থেকে মুক্ত হয়েছেন এই তরুণ তুর্কি নেতা। তার কাছে এটা নিছক পুজোর অনুমতি আদায়ের গোলযোগ নয়, তার চেয়েও কিছু বেশি। ছাত্রদের অধিকার রক্ষার লড়াই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। তিনি তখন নেতা বটে তবে নেতাজি নামে খ্যাত হন নি, তখন কেবলই সুভাষ বোস। এলবার্ট হলে বিরাট সভা। জ্বালাময়ী বক্তৃতা। 

২রা মার্চ সভায় বললেন, " হিন্দু ছাত্রদের কোমল ধর্মীয় অনুভূতি কে পদদলিত করে সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ এর স্বেচ্ছাচারী আচরণের ফলে সিটি কলেজের ছাত্ররা বর্তমানে যে আন্দোলন শুরু করেছে, তার প্রতি আমার সাগ্রহ ও সাদর সমর্থন আছে। আলোকপ্রাপ্ত ও অগ্রসর ব্রাহ্ম ভদ্রলোকরা হিন্দু ছাত্রদের ওপর নিজেদের ধর্মবিশ্বাস চাপিযে দেয়ার জন্য এতো নিচে কি করে নামলেন তা আমি অনুধাবন করতে অক্ষম।"

কলেজ কর্তৃপক্ষ এর সপক্ষে বেশকিছু নামিদামি ব্যক্তিত্ব। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সি এফ এন্দ্রুজ, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।এবং এবং রবি ঠাকুর। তরুণ নেতার হাতিয়ার যদি হয় তার তেজস্বী বক্তৃতা, প্রৌঢ় কবির হাতিয়ার তাহলে কলম। মর্ডান রিভিউ তে প্রবাসীতে চিঠি, প্রবন্ধ। সেই কলম থেকে বেরিয়ে আসছে এই লেখা, ".....  ধর্মের স্বাধীনতাই যদি কাম্য হয় তবে সে স্বাধীনতা শুধু রামমোহন হোস্টেলের হিন্দু ছাত্ররা পাইবে এমন তো নহে, মুসলমান ছাত্ররাও পাইবে। মুসলমানদের পক্ষে গো-কোরবানি ধর্মের অঙ্গ। সুতরাং কর্তৃপক্ষ হোস্টেলে তাহাদের তাহাও করিতে দিতে বাধ্য। সুতরাং এভাবে যুক্তি চলে না। একটা প্রতিষ্ঠিত সমাজের বিধিবদ্ধ কতকগুলি নিয়ম আছে, সেগুলিকে ভাঙিতে চেষ্টা করায় সৌজন্যের অভাব প্রকাশ পায়। সিটি কলেজ ব্রাহ্মদের এবং ব্রাহ্মরা মূর্তিপূজক নয়, একথা প্রত্যেক ছাত্রই জানেন।"

এই সময়ে ময়দানে নামলো সজনীকান্ত দাসের 'শনিবারের চিঠি'। দু দিন আগেই প্রমথ হাতিয়ার নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে বাক্যবানে বিদ্ধ করার অনুতাপেই বোধহয় এবার তারা কবির পক্ষে। সুভাষ কে 'খোকা ভগবান' নাম দিয়ে লেখা হলো :- "খোকা ভগবান নামে/ গজানন  বঙ্গধামে/ সম্প্রতি খুলেছে রাজ্যপাট।..." ['মর্ত্য হইতে সরস্বতী বিদায়']।

সজনীকান্তের— "হিন্দু রিলিজিয়ন ইনসালটেড (স্বপ্নদর্শন)", অশোক চট্টোপাধ্যায়ের —"এই কি হিন্দু-জাগরণ" এবং যোগানন্দ দাসের—"নায়মাত্মা চৌর্যেন বা লভ্যতে" প্রকাশিত হল। ১৩৩৫ শ্রাবণ সংখ্যা "শনিবারের চিঠিতে প্রকাশিত হল এলবার্ট হলের সেই জনসভা কে ব্যঙ্গ করে :-

"খোকা ভগবান আসিল নিজে,/ চোখের জলেতে বেজায় ভিজে।/ বুকেতে কি জানি ঘটিল দোষ,/ সাক্ষী কুলীন বৈদ্য বোস।/ দেবদ্বিজে অতি ভক্তিমান/ সন্ধ্যা করিয়া তামাক খান।/...গোটে গোটে ছোটে খোকার বাণী/ নববেদ বলে তারে বাখানি। ...বিবাহযোগ্যা পাননি কনে/ কেহ নাই বামে সিংহাসনে।.../ হিন্দুয়ানির পান্ডাপাঁড়/ জয়রব তাই উঠিল তাঁর"। ইত্যাদি [ 'ধর্মরক্ষা']

পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে আরও উত্তপ হয়ে উঠলো। সুভাষ বোস সব হিন্দু ছাত্রদের ওই কলেজ (সিটি কলেজ) ছেড়ে অন্যান্য কলেজে ভর্তি হবার নির্দেশ দিলেন। ফলে অনেকেই অন্যান্য কলেজে চলে যেতে আরম্ভ করল। সেই সময়ে কলকাতা ব্রাহ্মসমাজ থেকে দেশের সব ব্রাহ্ম ছাত্রছাত্রীদের সিটি কলেজে ভর্তি হয়ে কলেজটিকে টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানানো হ'ল।

এই যুদ্ধে কার জয় হল জানা নেই। কিন্তু দলে দলে ছাত্র সিটি কলেজ ছেড়ে দিতে লাগলো। কিছু ছাত্র রয়ে গেল। সিটি কলেজের ছাত্র কিন্ত অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেলের আবাসিক এক তরুণ যিনি পরে হবেন জীবন বীমা নিগমের কেরানি আর তারও পরে গাইবেন গান যতদিন না পর্যন্ত তার মতো ব্রাত্যজনের সংগীত রুদ্ধ করে দেবে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু  জর্জ বিশ্বাসরা সংখ্যালঘু। বেশির ভাগই ছেড়ে গেল কলেজ। উল্লেখ যোগ্য ভাবে ছাত্র সংখ্যা হ্রাসের ফলে কলেজ কর্তৃপক্ষ আর্থিক সংকটের মুখে পড়েন এবং তার মোকাবিলার জন্য কিছু তরুণ অধ্যাপককে ছাঁটাই করে ব্যয় সংকোচের চিরাচরিত রাস্তা নেন। এই ছাঁটাই তালিকায় নাম সেই তরুণ কবির। অধ্যক্ষ হেরম্ব চন্দ্র মৈত্র কবির বাবা সত্যানন্দ কে পরিস্থিতি জানিয়ে একটি চিঠিও দেন ও আর্থিক হাল ফিরলে পুনর্বহাল এর আশ্বাসও দেন।

না কবির ফিরে আসা হয় নি। বেকার কবি কে অর্থ কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়। এই পোড়া বাংলাদেশে স্রেফ কবিতার বই লিখে কে কবে স্বচ্ছলতার মুখ দেখেছে। বিশেষ করে সেই কবি যার সম্বল তখন কেবলমাত্র একখানি কবিতার বই। 

রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি, সুভাষ বোস দেশনায়ক নেতাজি, বিশাল সব বড় মাপের মানুষ। একযুগ বাদে ১৩৪৫ সালে একজন আরেক জনকে উৎসর্গ করেছেন 'তাসের দেশ' নাটিকা। কেবল সেই কবিই সেই সংঘর্ষের কো ল্যটারাল ড্যামেজ হিসেবে রয়ে গেলেন। 

বাগদেবীকে নিয়ে সেবারের যুদ্ধে বলি হয়েছিল বাংলার 'নির্জনতম কবি'র রুটি রোজগার। আজ আবার সরস্বতী পুজো। কিন্তু বাতাসে সেই সংঘর্ষের বারুদের ঘ্রাণ। আজ যেন কোনো কবির জীবনে এমন কোনও ট্র্যাজেডি নতুন করে নেমে না আসে। নইলে  বাগদেবীর আরাধনা মিছে।

আগ্রহী পাঠকের জন্য তথ্যসূত্রঃ
১. চিঠিপত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ঊনবিংশ খন্ড), পৃষ্ঠা ১৩৭, উইকি সংকলন, একটি মুক্ত পাঠাগার
২. চতুরঙ্গ, বর্ষ ৫৬, সংখ্যা এক, ১৪০৩
লাইফ অফ জীবনানন্দ দাশ, মহীতোষ বিশ্বাস, গ্রন্থতীর্থ
৩. ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত, দেবব্রত বিশ্বাস
৪. রবি, নেতাজি ও জীবনানন্দ, গৌতম মিত্র, ব্লগ

রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০

বোলসোনারো সম্পর্কে দুতিনটে বিষয় যা জানি ~ পরিচয় পাত্র

বোলসোনারো সম্পর্কে দুতিনটে বিষয় যা জানি 

জাইর বোলসোনারো সম্পর্কে তাঁর নারী এবং সমকামবিদ্বেষ, পরিবেশধ্বংসী কাজকর্মের কথাই আসে মূলত, অর্থাৎ যা দেখা যায়। যা দেখা যায় না তা হল এর উৎস, নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ। বোলসোনারো সাতের দশকের আবিশ্ব এবং আ-লাতিন ডিক্টেটরশিপের জীবাশ্মমাত্র নন, তিনি এর অবশেষ, এর স্মৃতি এবং বর্তমান, তিনি অতীতের দেহধারী। তাঁর মিলিটারি কেরিয়ার নিতান্তই হতাশাব্যঞ্জক, কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে জনবিরোধী, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং দায়িত্বহীন ক্ষমতার অধিকারী মিলিটারি রেজিমগুলির তিনি মানসিক উত্তরাধিকারী, বাহিনীতে কেমন সার্ভিস দিলেন কী এসে যায় তাতে? 

বোলসোনারো একটি মহাদেশীয় আন্তর্জাতিক অগণতন্ত্রের অস্তিত্বে উৎসাহী, যেমন সাতের দশকে সবকটি লাতিন দেশের সামরিক সরকারের মধ্যে ছিল অপারেশন কণ্ডর, সেই অক্টোপাসের শুঁড় আপনাকে যে প্রান্তেই চলে যান টেনে আনবেই। এমনকি ইউরোপে নির্বাসনও নিরাপদ ছিল না, আর্জেন্টিনীয় ফিল্মমেকার হোরহে সেদরোন ফ্রান্সেও টিকতে পারেন নি। তাঁর আত্মীয় অপহৃত হন আর্জেন্টিনীয় উচ্চারণের কিছু রহস্যময় লোকের হাতে, আর প্যারিসীয় পুলিশ দপ্তর সাহায্যের বদলে জেরা করে তাঁকে পৌঁছে দেয় সেই আশ্চর্য চারতলায় যেখানে নিজেকে ছুরি মারতে একটুও অসুবিধা হবে না। ১৯৮১ তে হুলিও কোরতাসার একটি প্রবন্ধ লিখবেন এই আত্মঘাতীকে স্মরণ করে, পড়তে চাইলে সেজ গ্রুপের 'ইনডেক্স অন সেন্সরশিপ' ম্যাগাজিন দেখতে পারেন। 

বোলসোনারো সব কয়টি মহাদেশীয় পুণ্যশ্লোক ডিক্টেটরকেই সশ্রদ্ধ স্মরণ করেন বারেবারেই, পেরুর আলবের্তো ফুজিমোরি, চিলের আউগুস্তো পিনোচেত, পারাগুয়াইয়ের আলফ্রেদো স্ত্রোয়েসনার। শেষোক্তজন, বিখ্যাত শিশুকামী ও টিনএজার-ধর্ষক তিনি, বিরোধীদের ইলেকট্রিক করাত দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করাতেন, সেটা টেলিফোনে শুনতেন এল প্রেসিদেন্তে, পরে তার রেকর্ড পাঠানো হত মৃতের আত্মীয়দের কাছে। 

ব্রাজিলের ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ র ডিক্টেটরশিপ নিয়ে ভারী খেদ আছে বোলসোনারোর, কেননা অত্যাচারকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলেও ব্রাজিলীয় মিলিটারি রেজিমের হত্যার সংখ্যা কম, চিলে আর আর্জেন্টিনার বডি কাউণ্ট অনেক বেশি। তিনি আরও অনেক মৃত্যু চান। বোলসোনারো ১৯৬৪ র ক্যুয়ের দিনটিকে উদযাপন করেন, তিনি ও তাঁর ছেলে সেদিন জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন পার্লামেন্টে, যেখানে পাশেই অন্য এক সাংসদ দাঁড়িয়ে ছিলেন ফ্রায়ার তিতোর ছবি হাতে, ব্রাজিলীয় ডিক্টেটরশিপে নির্যাতিত ও নির্বাসিত যে ফ্রায়ারের ফ্রান্সে আত্মহত্যার গল্প আগে লিখেছি। 

প্রাক্তন মানবাধিকার সচিব মারিয়া দে রোসারিওর উদ্দেশে বোলসোনারোর সেই বিখ্যাত "ওঁকে কেউ ধর্ষণ করবে না, উনি কুৎসিত" মন্তব্য কোন প্রসঙ্গহীন ঘটনা নয়। দক্ষিণ আমেরিকার মিলিটারি দশকে টর্চার ক্যাম্পগুলিতে যৌন নির্যাতনের আধিক্য প্রমাণিত। চিলের এক ধর্ষকামী সমাজবিরোধী ও গুপ্তচর সাক্ষাৎকারে তার বিরুদ্ধে ক্যাম্পে রাজনৈতিক কর্মীদের ধর্ষণ করার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিল, "এসব জঘন্য, নোংরা, পেচ্ছাপে মাখামাখি, পা বেয়ে রক্ত গড়ানো মেয়েদের কে ধর্ষণ করতে যাবে?" (টমাস সি. রাইটের 'স্টেট টেররিজম ইন ল্যাটিন আমেরিকা' দ্রষ্টব্য)। 

এই মহাদেশে পরস্পর বিবদমান নানা রাজনৈতিক গ্রুপের মধ্যে বিসম্বাদ-হানাহানি অসহনীয় হয়ে উঠলে, সংলাপের রাস্তাটুকুও বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে হস্তক্ষেপ করত ক্ষমতাভিলাষী মিলিটারি, উচ্চমধ্যবিত্ত গণপরিসর এবং মিডিয়ার একপ্রকার প্রশ্রয়েই, যেহেতু বোঝা যেত না কখন তাদের রাজদণ্ড একেবারে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাকাপোক্ত হবে, বোঝা যেত না কখন তারা সব বেসামরিক দলের জন্যই রাজনৈতিক পরিসরটিই বন্ধ করে দেবে। কেউ কেউ, যেমন চিলে, ভেবেছিল প্রতিবেশী দেশগুলির মতো তারা কোনদিনই সামরিক শাসন দেখবে না, তাদের নিরবচ্ছিন্ন গণতন্ত্রই থেকে যাবে। আউগুস্তো পিনোচেত নামক ধূমকেতুর তখনো উদয় হয়নি। 

জাইর বোলসোনারো এবং তাঁর সমকাল তাই এক চেকলিস্টও বটে। সবকটা বক্সে টিক পড়ছে কিনা তা দেখে নিতে হয় কেবল। 

শেষ করার আগে মারিয়েল ফ্রাঙ্কোর কথা মনে পড়ল। এই বিরোধী রাজনৈতিক নেত্রী ২০১৮ র ১৪ই মার্চ রিওতেই কৃষ্ণাঙ্গী তরুণীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক আলোচনা থেকে ফেরার পথে আক্রান্ত হন। একঝাঁক বুলেটবৃষ্টি তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল, সংশ্লিষ্টরা একটি ভিজিল্যান্টি মিলিশিয়া হিসেবে চিহ্নিত হয়, দুই আততায়ীই নাকি অতীতে মিলিটারি পুলিশে ছিল, দুজনকেই নাকি একদা পুরস্কৃত করেছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্টের পুত্র। বর্তমানে সেই তদন্ত কেমন চলবে আমি জানি না। কেবল জানি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ছিলেন সেবছরের একমাত্র ভোটপ্রার্থী যিনি এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করতে অস্বীকার করেন। 

মারিয়েল ফ্রাঙ্কো কৃষ্ণাঙ্গী, উভকামী, সিঙ্গল মাদার। ফেলে আসা বছরে এই উজ্জ্বল তরুণীটির সঙ্গে তাঁর অনেকদিনের সমকামী পার্টনার মোনিকা বেনিসিওর বিয়ে হত।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০

নেতাজী ~ ত্রিদিব বাইন

বাঙালি বড়ো হয় সুভাষ বনাম গান্ধী শুনে। আর শোনে সুভাষের সেরা শত্রু নেহেরু। ঐ হারামিটাই চোরাগোপ্তায় চৌপাট করেছে নেতাজিকে।

বোধগম্য হয়না, কি করে মহাত্মাই সুভাষের নাম প্রস্তাব করেন ১৯৩৫ কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে। কি করে ৫ বছর বাদে ইলেকশনে সুভাষ পাশে পান নেহেরুকে। কি করে সুভাষ আজাদ হিন্দের দুই ব্রিগেডের নাম রাখেন 'গান্ধী ব্রিগেড' আর 'নেহেরু ব্রিগেড' ! কি করে ১৯৪৪শে গান্ধীকে "জাতির জনক" তকমা দিলেন সুভাষ।

তবে হ্যাঁ, একজন ছিলেন। ঘোষিত সুভাষ বিরোধী। গুজরাটি।যার ১৮২ মিটার ষ্ট্যাচু দেখে হাঘরে হাত্তালি সাবড়ায় ইতিহাস অশিক্ষিত কিছু সদ্য গুজরাটি ভক্ত বাঙালি ! হ্যাঁ, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। ১৯৩৯ এ সুভাষের কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট হওয়া আটকাতে ধুতি ফুতি ঢিল করে ফ্যালা আয়রন ম্যান। ডিপ্লোম্যাসি করে দলে টেনেছিলেন গান্ধীকে। রাজেন্দ্র প্রসাদকে চিঠি লিখলেন সুভাষকে খিস্তিয়ে। বল্লেন সুভাষের প্রেসিডেন্ট হওয়া দেশের পক্ষে ক্ষতিকর। তারপরও যখন তার জয় আটকানো গ্যালোনা, সুভাষকে ব্যাঙ্গিয়ে বল্লেন, "সিংহরা জন্মসূত্রে রাজা হয়, সামান্য একটা জঙ্গলের নির্বাচনে জিতে নয়" ! সুভাষের প্রতি প্যাটেলের ছিলো "নীচ, বিদ্বেষ আর প্রতিহিংসা"! বলেছেন দাদা শরৎ বোস।

গান্ধী নেহেরু'র বিরুদ্ধে সুভাষ নামিয়ে, ফুরফুরে সুরসুরি দিয়ে কিছু হিন্দুত্বের গোজলে চোবানো মস্তিষ্কের দখল নেওয়া যায়। ইতিহাস বদলানো যায়না। যে ইতিহাস বলে, আজীবন হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের চাবকিয়েছেন চিত্তরঞ্জনের এই শিষ্য। ১৯৩৫ এর "ইন্ডিয়ান ষ্ট্রাগেল" বই থেকে ৪০ এর ঝাড়খণ্ড জনসভা। ছানাবড়া চোখে ১৯৪০ নাগাদ শ্যামাপ্রসাদ ডায়রিতে লিখছে 'সুভাষ যদি থাকতেন, সৃষ্টির আগেই ভাঙচুরে চুরমার হতো হিন্দু মহাসভা'! সুভাষ যখন আজাদ হিন্দ নিয়ে ইংরেজদের চামড়া গোটানোর জন্য তৈরি, আজকের শাসকের সৃষ্টিপুরুষ সাভারকার তখন ১৯৪১ এ ভাগলপুরে আহ্বান দিচ্ছেন দলে দলে হিন্দু ইংরেজদের দলে নাম লেখাক ! 
সেই কবে, ১৯৪০ এর ১২ই মে সুভাষ বলেছিলেন, "হিন্দু মহাসভাকে দেশছাড়া করুন। এরা বিশ্বাসঘাতক" ! প্রফেটিক !

আজ তার জন্মদিন। তার জীবন, তার আদর্শ, তার চেতনা সব্বাই জানে। আজ শুধু তার নাম ভাড়িয়ে ভোট চাখা ভাঁড়গুলোকে ভাঙচুর করার তাগিদ নিক বাঙালি।

বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০

আপ ক্রনোলজি সমঝিয়ে ~ আর্কাদি গাইদার

আপ ক্রোনোলজি সমঝিয়ে।

প্রথমে আরএসএস আসামে 'বংগাল খেদা'র আগুনে ঘী ঢালবে। বাজপেয়ী আসাম আন্দোলনকে সমর্থন করে পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেবে। তারপর আসামে গিয়ে বলবে 'এখানে বিদেশীরা এসে সব দখল করে নিচ্ছে। পাঞ্জাবে এরকম করলে আমরা কেটে টুকরো টুকরো করে দিতাম'। এরপর ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে বাঙালিদের কচুকাটা আর বিতাড়ন চলবে। 
তারপর বরাক উপত্যকার বাঙালীদের আরএসএস বোঝাবে হিন্দু বাঙালী আমাদের আপন। মুসলিম বাঙালী বহিরাগত। তাদের এনআরসি করে বার করে দেবো। 
তারপর অহমীয়াদের বোঝাবে এনআরসি করে সব বাঙালিকে তাড়াবো। এরকম করে ১৯ লাখ বাঙালী আর সাথে কিছু কোল্যাটারাল হিসেবে বিহারী গোর্খা পাড়ি দেবে ডিটেনশন ক্যাম্পে। সর্বানন্দ সোনেওয়াল বলবে বাজপেয়ীজি আমাদের কাছে পরম শ্রদ্ধেয়, আসাম আন্দোলনে ওনার অবদান চিরস্মরণীয়। এরপর ভীত বাঙালী হিন্দুকে বিজেপি বোঝাবে তোমাদের আবার ক্যা এনে ঢুকিয়ে নেবো। আমরাই তোমাদের রক্ষাকর্তা।

আপ ক্রোনোলজি সমঝিয়ে।

কাশ্মীরে পন্ডিতদের ওপর আক্রমণের সময় কেন্দ্রে বিজেপির জোট সরকার। কাশ্মীরের গভর্নর আরএসএসের সদস্য জগমোহন পন্ডিতদের উদ্দেশ্য ঘোষণা করবে - ৩,৪ মাসের জন্যে জম্মুতে সাময়িক ভাবে আশ্রয় নাও। এরপর কাশ্মীরের পরিস্থিতি শান্ত করেই তোমাদের আবার ঢুকিয়ে নেবো। পন্ডিতদের স্থানান্তরিত করতে গাদা গাদা সরকারি বাস, প্লেনের আয়োজন করা হবে। এরপর দুবার বাজপেয়ীর সরকার আসবে। দুবার মোদীর সরকার আসবে। স্থানান্তরিত পন্ডিতরা সেই ক্যাম্পেই থাকবে। তার কারন প্রতিবার আপনার মতন বেয়াদবকে প্রশ্ন করবার অবকাশ রাখতে হবে - কাশ্মীরী পন্ডিতদের বিতাড়নের সময় আপনি কি করছিলেন? আর আপনি, যিনি অত খবর রাখেন না, তিনি ভুলেই যাবেন, যে বিতাড়নের সময় কেন্দ্রের সরকারের জোটসঙ্গী বিজেপি কাশ্মীরি পন্ডিতদের বিতাড়ণের সময় দেশজুড়ে রথযাত্রা করছিলো। আর কাশ্মীরি পন্ডিতদের ক্যাম্পে গিয়ে গিয়ে বছরে একবার বিজেপি নেতারা মুসলমানদের গালি দিয়ে বলবে - আমরাই তোমাদের রক্ষাকর্তা। 

আপ ক্রোনোলজি সমঝিয়ে।

সেই পার্টিশনের পর থেকেই এই রাজ্যে এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বাঙাল উদ্বাস্তুরা আসছে। এই রাজ্যে তো রীতিমতন আন্দোলন করে, সংগ্রাম করে তারা জমি, কাজের অধিকার পেয়েছে। আস্তে আস্তে কাগজ পেয়েছে, ভোটাধিকার পেয়েছে। ভোটাধিকার মানেই নাগরিক, এমনটাই আপনি জানবেন, কারন সংবিধানেই লেখা আছে একমাত্র নাগরিকদের নামই ভোটার তালিকায় উঠবে। এমতবস্থায় ২০০৩ এ বিজেপি সরকার নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী এনে বলবে এবার থেকে 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী'র সংজ্ঞা তৈরি হলো। যারাই সঠিক প্রনালী বা সঠিক কাগজ ছাড়া এই দেশে ঢুকবে, তারাই 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী'। এই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরা আর কখনো কোন উপায় দেশের নাগরিকত্ব পাবে না। শুধু তাই নয়, কারুর বাবা বা মা যদি 'অবৈধ অনুপ্রবেশকারী' হয়, সেও নাগরিকত্ব পাবে না।
এর ফলে কি হবে? এতদিন যেই জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় এই দেশে এসেছে উদ্বাস্তু হয়ে, এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই সময়ের সাথে সাথে রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, আধার কার্ড পেয়েছে, ২০০৩ এর এই আইনি সংশোধনীর পর তাদের এবার নাগরিকত্ব পাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ। 

আপ ক্রনোলজি সমঝিয়ে। 

২০০৩ থেকে ২০১৪, বিজেপি বলছে আহা রে, এই উদ্বাস্তুদ্বের নাগরিকত্ব পাওয়া আরও সহজ করতে চাই আমরা, তাই তো আমরা ক্যা এনেছি। চলো ভাইসকল উদ্বাস্তু, তোমাদের আমরা আসাম থেকে তাড়িয়েছি, ২০০৩ এ নাগরিকত্ব পাওয়া আটকে দিয়েছি, এবার আমরা ক্যা আনছি বলে আমাদের ভগবান মেনে লাইনে দাড়িয়ে প্রথমে নিজেদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করো, তারপর আমাদের কাছে  নাগরিকত্ব ভিক্ষা চাও। আজ থেকে ১০ বছর পর আবার তখন আমরা সব বেয়াদবকে প্রশ্ন করবো - বাঙালি হিন্দুদের সমস্যার সময় আপনারা কি করছিলেন? 

আপ ক্রনোলজি সমঝিয়ে। 

এই ভাবেই এক হাত থেকে অন্য হাতে কয়েন চালান দেওয়ার ম্যাজিক দেখতে দেখতে আপনার চোখে যখন ঝিলিমিলি লেগে গেছে, সেই সময়কালে বাজপেয়ী আর যশবন্ত সিনহা বিলগ্নিকরণ মন্ত্রক খুলে ফেলবে, আর তাদের যোগ্য উত্তরসূরি নির্মলা সিতারমণ চুপিচুপি ঘোষণা করে দেবে, ভারতকে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি করবার লক্ষ্যে সমস্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ঝটপট বেচে ফেলতে হবে।

আপ ক্রনোলজি সমঝিয়ে।

রবিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২০

এন-আর-সি যদি ১০০ বছর আগে হত ~ নির্মাল্য সেনগুপ্ত

ভারতে এন-আর-সি যদি ১০০ বছর আগে হত তাহলে সেই সময়কার বিখ্যাত লেখকরা তাদের গল্পে কিভাবে ব্যবহার করতেন? 

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ

ধু ধু করিতেছে সেতুপুরের মাঠ। সোনালী বালির উপর চিকিচিকি দেখিয়া অপু ভাবিল, বাহ দিদিকে ডাকিয়া আনিলে ভাল হইত৷ দুর্গা এ যাবৎ অনেকবার তাহাকে বলিয়াছে যে সোনারঙা বালির খোঁজ লইয়া আনিলে অপুকে সে তাহার সঞ্চয় থেকে দুইখানি কড়ি দেবে৷ ওই কড়ির উপর অপুর বড়ই লোভ। সে একখানি গাছের ডাল ভাঙিয়া লইয়া বালির উপর নকশা কাটিতে ব্যস্ত হইল৷ হরিহর কখন আসিবে সে জানে না৷ অপেক্ষা করা ছাড়া এখন উপায়ও নাই৷ দলিল সম্মন্ধে অপু মা'কে জিজ্ঞেস করিয়া উত্তর মেলে নাই কোনও৷ সর্বজয়ার মুখে সে শুনিয়াছে সুদূর দিল্লী নামক কোনও এক গ্রামে নরেন্দ্র মোদী নামক এক রাজা আছেন৷ তিনি প্রজাদের দলিল দেখিতে চান, নহিলে সবাইকে দেশছাড়া করিবে৷ অপু দিদিকে জিজ্ঞেস করিয়াছিল, "দিদি, তবে কি আমাদের নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যেতে হবে? সতুদারাও যাবে?" দুর্গাও এর উত্তর দিতে পারে নাই৷ 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 

বৃষ্টি থামার কোনও নাম নেই আজ দুপুর থেকেই৷ ডাঁই করা ঘাসের উপর, চাল থেকে চুঁইয়ে টপ টপ করিয়া জলের ফোঁটা পড়িয়া পচা গন্ধ বাহির হইয়াছে বেশ৷ ঘরের ভিতর আদুড় গায়ে শুইয়া আছে মালতী৷ ঘরের ভিতরেও যে সুবাস ছড়াইতেছে তা বলিতে পারি না৷ মালতীর পায়ের কাছে ঘায়ের উপর মাছি ঘুরিতেছে ভনভন৷ সনাতন পাগলের মত ঘরের আনাচে কানাচে খুঁজিয়া যাইতেছে কিছু। মালতী ড্যাবড্যাব করে তাকিয়া রইয়াছে সনাতনের দিকে৷ তাহার পিঠের পেশী ওঠানামা করিতেছে জোরে জোরে। চোখেমুখে ভয়ের ছাপ৷ ঠোঁটের কাছে অল্প বিস্কুটের গুঁড়ো লাগিয়া আছে এখনও৷ সনাতন বলিল, "কাগজ না পেলে ভিটেমাটি চাটি হবে বুঝেচ? অমন করে দেখচ কী? তোমার ভয় লাগে না?" 
মালতী খিলখিলিয়া হাসিয়া ওঠে। বলে, "যেখানেই যাই, যাব তো তোমার সঙ্গেই৷ আমাকে একা ফেলে পালাবে ভেবেচ নাকি? তা হবে না বাপু..." 

জীবনানন্দ দাশঃ 

একটা চুরুট জ্বালিয়ে মাল্যবান চেয়ারে বসে জানলার দিকে তাকাল। মিহি কোনও সুর ভেসে আসে ওই বাড়ি থেকে৷ সে সুরে কোনও কথা নেই, আকুতি নেই, আলো নেই। আলো কোনওদিন নিজের জীবনে চায়ওনি মাল্যবান। উৎপলা কি চেয়েছে? এই দুর্দিনেও উৎপলা শুয়ে থাকে৷ কেবল শুয়ে থাকে৷ জঙ্গলে আগুন লাগলেও যেমন সজারুর দল ভুলে যায় নদীর দিকে ছুটে চলার কথা। ঝাঁক ঝাঁক শকুন উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করে পোড়া মাংসের গন্ধ নাকে আসার, সেই তীব্র মোদ্দাফরাসের ন্যায় কিছু হিংস্র হায়না দাপিয়ে বেড়ায় হলুদ ফুলের মধ্য দিয়ে। বাতাসে বাতাসে ছাইয়ের সঙ্গে ফুলকি সখা পাতায় কখনও সখনো৷ মাল্যবান ভাবে৷ মিহি সেই সুরের তালে তালে তার চোখের সামনে কোনও কাগজের অবয়ব ফুটে ওঠে। অমিত শাহ কি জানে তার কথা? তার এই অন্ধকার ঘরের ভিতর উৎপলার এক মুহূর্তের ভালবাসার আখাঙখা, অথবা ভালবাসা নয়, শুধু বেঁচে থাকা। একটা অন্ধকার ঘরের ভিতর, সামান্য বেঁচে থাকা ইচ্ছে। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরঃ 

আমি ভাবিতাম, দেশছাড়া হওয়ার আশঙ্কা বুঝি শুধু আমার। আর কারও হৃদয়গহ্বরে তেমন কোনও উৎকণ্ঠার কারণ, তাহাদের উতলা করিতে পারে নাই আজও৷ তবু আজ এত লোকের সমবেত কণ্ঠস্বর আমাকে সামান্য একটু বল দিল৷ শুস্তা নদীটির উপলমুখরিত পথে নর্তকীর ন্যায় জলবারি, নৃত্য করিয়া চলিয়া যাইতেছে ক্রমাগত। নদীর কিনারে শৈলপদমূলে জড়ো হইয়াছে প্রায় দেড়শত লোক। গগনভেদী কণ্ঠে তাহারা সোচ্চারিত হইতেছে "হাম ছিনকে লেঙ্গে আজাদী..." 

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ 

ব্যোমকেশ সযত্নে খবরের কাগজটি পাট করিয়া টেবিলে রাখিল। একটি সিগারেট জ্বালাইয়া অন্যমনস্ক ভাবে তাকাইয়া রহিল কাগজটির দিকে৷ 

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, "কী হল? নতুন কোনও কেস পেলে?" 

বাইরে হ্যারিসন রোডের উপর নবোদবুদ্ধ নগরীর পথে মানুষের ঢল৷ আমাদের এই বসিবার ঘরটির গবাক্ষপথে রাস্তার কিয়দংশ দেখা যায়। কাতারে কাতারে মানুষ নাগরিক আইনের বিরুদ্ধে মিছিলে পথ হাঁটিতেছে। 

ব্যোমকেশ আমার প্রশ্নে সজোরে মাথা নাড়াইয়া কহিল, "আমি একটি পণ করেছি অজিত। যতদিন না সরকার এই আইন ফিরিয়ে নিচ্ছে, সরকারের কোনও কেসে ব্যোমকেশ বক্সী মাথা ঘামাবে না।" 

সত্যজিত রায়ঃ 

লালমোহনবাবু উত্তেজিত স্বরে বললেন, "বলেন কী মশাই! এই এন.আর.পি আইন সত্যিই লাঘু হবে নাকি?" 

আমি আড়চোখে ফেলুদার দিকে তাকালাম৷  রাস্তায় এত যানজট এর আগে আমরা দেখিনি৷ লালমোহনবাবুর সাম্প্রতিক উপন্যাসটা প্রায় ২০০০ কপি বিক্রি হওয়ায় তিনি আমাদের চাঙোয়া নিয়ে চলেছেন। সামনের লরিটা থেকে বেরোনো কালো ধোঁয়া মাঝেমধ্যেই গাড়ির উইন্ডস্ক্রীন কালো করে দিচ্ছে। 

"ওটা এন-আর-সি। এন-আর-পি নয় লালমোহনবাবু। আর হ্যাঁ, লাঘু হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ করতে দেবে না৷" 

"সেটাই তো।" লালমোহনবাবু উত্তেজিত হয়ে সিটের পিছনে একটা পেল্লাই ঘুষি চালিয়ে বললেন, "একি ইয়ার্কি নাকি মশাই। আমার ভোটার আইডি আছে, ভোট দিয়েছি, এখন বলছে সেটা আমার প্রমাণপত্র নয়? ভাই তপেশ, তুমিই বল, এ কী সম্ভব?" 

শিবরাম চক্রবর্তীঃ 
বাড়ি থেকে বেরিয়েই হর্ষবর্ধন ভাবিত হন। ভাইকে ডেকে বলেন, "হ্যাঁ রে গোবরা, ধর আমাদের ধরে ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দিল। তারপরে কলকাতা ফিরতে পারব তো আবার?" 

গোবর্ধন বললে, "অত ভেব না তুমি৷ আসামে আমাদের সবাই চেনে৷ তোমারও গোটা আসাম নখদর্পনে৷ একটা কাগজ তুমি জোগাড় করতে পারবে না?"
"তা চেনে বইকি। যুদ্ধেও তো গিয়েছি আমি। যাইনি নাকি? এবার বলবে যে ডিটেনশন ক্যাম্পে যাও? এমন টেনশনে কি ফেলতে পারবে আমাদের?" 

" না না।" তুমি ভয় পেও না দাদা। বাড়ির দলিলের বন্দোবস্ত করে আমরা আমাদের বস্তিতে ফিরে আসব৷ চিন্তা হয় শিব্রামবাবুকে নিয়ে।" 

"তাকে নিয়ে আবার কিসের চিন্তা?" হর্ষবর্ধন মাথা নেড়ে বলেন, "তার আবার চিন্তা কী? তার পিছুটান বলতে তো বোন আর ভাইপোরা। সম্পত্তি বলতে তার আছে কী? ওই বইগুলো? সে নাহয় বই নিয়েই উনি বাংলাদেশে ফিরে যাবেন। এমনিও এখানে কেউ পড়ে না৷" 

"এমন বোল না৷ বন্ধু হয় কিনা আমাদের? তার জন্যেও নাহয় একটা কাগজ বের করে ফেলি আমরা। বলব, উনি হলেন বৌদির ভাই। কেমন হয়?"
"মন্দ বলিসনি তা। তবে এইসব ঝক্কি আমার পোষায় না বাপু। এইসব বন্ধ করলেই ভাল হয় সবথেকে৷ মোদীর জন্যে আমোদই করতে পারছি না শান্তিতে৷" 

"ঠিক বলেছ দাদা। তোমার সর্বধর্ম সমন্বয়ের পরিবর্তে এই ধর্মসর্বস্ব ঝঞ্ঝাট। এ কি ভাল লাগে বল?"

শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২০

ফ্যাসিজম সম্পর্কে দুটো একটা কথা যা আমি জানি ~ বিষাণ বসু

১. সর্বত্রই, ফ্যাসিস্টরা শাসনক্ষমতায় আসেন বিপুল জনসমর্থন নিয়ে - অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভোটে জিতে বা তেমনই কোনো "গণতান্ত্রিক" পদ্ধতিতে। জনসমর্থন আদায়ের পরেই সেই সমর্থন যে কোনো দলের পক্ষে নয়, স্রেফ একজন শাসকের প্রতি - যিনি সমর্থনকে একটি বিশেষ আইডিওলজির প্রতি সমর্থন ও ফ্যাসিস্ট লীডার ব্যক্তিটি যে সেই আইডিওলজির সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি - এই ভাবনার নির্মাণপ্রক্রিয়ার শুরু হয়।  

২. "গণতান্ত্রিক" পদ্ধতিতে নির্বাচিত হলেও, ফ্যাসিবাদী সরকার যত দ্রুত সম্ভব গণতন্ত্রের পরিসরটি সঙ্কুচিত করে ফেলেন। 

৩. ক্ষমতায় আসার সময় তো বটেই, ক্ষমতায় থাকাকালীনও, দেশের একটা বড়ো অংশের মানুষ ফ্যাসিবাদী সরকারকে সমর্থন করেন।

৪. এই সমর্থকদের বেশীর ভাগই সরকার যে ফ্যাসিস্ট, সেইটা চিনে উঠতে পারেন না - তাঁদের সমর্থনের যুক্তি থাকে বিভিন্নধরনের - এইভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বিভিন্ন যুক্তিক্রম নিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের সমর্থনে থাকেন, অনেকসময় নিজের অজ্ঞাতেই। তাছাড়া, ফ্যাসিস্ট শাসকমাত্রেই বহুরূপীর দক্ষতায় প্রয়োজন অনুসারে "যখন-যেমন-তখন-তেমন যাকে-যেমন-তাকে-তেমন" ধাঁচে নিজেদের মুখ্য এজেন্ডাকে লুকিয়ে উপযোগী পছন্দসই এজেন্ডা খাড়া করতে পারেন।

৫. এইসব সমর্থকেরা যুক্তিতর্ক বা আলোচনার পথ ধরে নিজেদের ভ্রান্তি সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন, এমন নজির নেই। যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজেরাই ফ্যাসিবাদী আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, ততক্ষণ সমর্থন জারি থাকে। 

৬. একমাত্র ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর এঁদের সামনে পুরো ছবিটা স্পষ্ট হয় - এবং তখন এঁদের সম্বিত ফেরে - এই সমস্ত অপকর্মের সাথে নিজেদের সমর্থন জড়িত ছিল ভেবে যারপরনাই লজ্জিত হন - কিন্তু, সে অনেক পরের কথা।

৭. দেশপ্রেম আর ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয় - যদিও, দ্বিতীয়টি দাঁড় করানোর জন্যে প্রথমটির যুক্তি ব্যবহৃত হয়।

৮. ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদের রেটোরিক যেহেতু ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছাড়া দাঁড়াতে পারে না, কাজেই শত্রুর নির্মাণ অনিবার্য - সে শত্রু, সাধারণত, দেশের বাইরের। কিন্তু, দেশের মধ্যেকার ঘৃণা আর বিভাজন ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্যসিদ্ধির মুখ্য উপায়। তাহলে? সমাধান, দেশের একটি বড় অংশকে দাগিয়ে দেওয়া হয় বিদেশী শত্রুর সহকারী হিসেবে। এইটা একটা উপায়।

৯. স্বচ্ছলতার মুহূর্তে ফ্যাসিবাদের উত্থান হয় না - হয়, আর্থিক সঙ্কটের পরিস্থিতিতে। সেই সঙ্কটের পরিত্রাণের পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় দেশের একটা অংশের মানুষকে শায়েস্তা করা - দেশের মধ্যে ঘৃণা আর বিদ্বেষ জিইয়ে রাখার এ আরেক পথ।

১১. ফ্যাসিবাদী প্রবণতার প্রতিবাদ করতে গেলেই অতীত টেনে উদাহরণ দেওয়া ফ্যাসিস্ট শাসক ও তার সমর্থকদের বড় অস্ত্র - সে উদাহরণ প্রায়শই কাল্পনিক, অতীত প্রায়শই নির্মিত - বর্তমানের ভয়াবহতা ভোলাতে শোনানো হয় দেশবিদেশের ততোধিক ভয়াবহতার গল্প - শাসক সবসময়ই নিশ্চিত থাকেন, জনগণের স্মৃতি বেশীদিন টেকে না - আর সমর্থকদের কথার সুর দেখে সেই নিশ্চয়তা যে কতোখানি বাস্তবসম্মত, তার প্রমাণ মেলে।

১২. ইতিহাস তো বটেই, একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, এমনকি আর্থসামাজিক পরিসংখ্যান বা তথ্যও এমন সুচতুর দক্ষতার সাথে নির্মিত হয় - নিতান্ত গভীর অনুসন্ধানের মানসিকতা ব্যতীত বাস্তব পরিস্থিতির আন্দাজ পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। আর, অর্থনৈতিক দুরবস্থা নেহাতই প্রকট হয়ে গেলে, অতীত রাজনীতি বা নির্মিত শত্রুকে দায়ী করার পথ তো থাকেই। 

১৩. ফ্যাসিজমের প্রতিবাদ মানেই দেশের বিরুদ্ধে যাওয়া - প্রতিবাদী মাত্রেই রাষ্ট্রদ্রোহী - রাজনৈতিক বিরোধী মানেই দেশের শত্রুর এজেন্ট - ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানেই দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার না দেওয়া - এই সব প্রচারই ফ্যাসিবাদের সনাতন কার্যপ্রণালী ও বহুপরীক্ষিত অস্ত্র।  

১৪. শিক্ষিত ও চিন্তাশীল মানুষদের একাংশ ফ্যাসিস্ট শাসকদের পাশে থাকলেও, তাঁদের গরিষ্ঠ অংশই দাঁড়ান বিপরীতে। অতএব, উচ্চশিক্ষিত ও চিন্তাশীল মানুষেরা যে আদতে দেশের কাজে আসেন না, সেই বার্তা বিভিন্ন পথে আমজনতার মনে ঢোকাতেই হয় - কায়িক শ্রমই দেশের উন্নতির চাবিকাঠি ও মানসিক শ্রম বা বিদ্যাচর্চা অলস সময়যাপন মাত্র - এই এজেন্ডা ফ্যাসিস্ট শাসকের বড় অস্ত্র।

১৫. দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের বৃহদংশ শাসকের পাশে থাকেন - সংবাদমাধ্যম বা তদনুসারী পথ তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন ও শাসকের পক্ষে প্রচার জারি রাখেন - অন্তত ততোদিন পর্যন্ত, যতোদিন না দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন তলানিতে ঠেকছে যাতে তাঁদের ব্যবসার বাজার সঙ্কুচিত হতে হতে একেবারে শেষ দশায় পৌঁছায়।  

আপাতত, এই ক'টা পয়েন্ট নিয়ে ভাবতে থাকুন।

মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২০

বর্গী এলো দেশে ~ অনির্বাণ অনিক

চাইর দিকে লোক পলাঞ ঠাঞি ঠাঞি।
ছর্ত্তিস বর্ণের লোক পলাএ তার অন্ত নাঞি।।
এইমত সব লোক পলাইয়া জাইতে।
আচম্বিত বরগি ঘেরিল আইসা সাথে।।
মাঠে ঘেরিয়া বরগী দেয় তবে সাড়া।
সোনা রুপা লুটে নেএ আর সব ছাড়া।।
কারূ হাত কাটে কারূ নাক কান।
একি চোটে কারূ বধএ পরাণ।।
ভাল ভাল স্ত্রীলোক জত ধইরা লইআ জাএ।
আঙ্গুষ্ঠে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলাএ।।
একজনে ছাড়ে তারে আর জনা ধরে।
রমনের ভরে ত্রাহি শব্দ করে ।।'

কার লেখা জানেন? কোন ঘটনার বর্ণনা জানেন? পলাশী যুদ্ধের বহু বছর আগে এক বাঙালি কবি গঙ্গারামের লেখা। "হিন্দু পাদ পাদশাহী" অর্থাৎ হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ার নামে মারাঠা ভাস্কর পণ্ডিত এবং তার দলবলের বর্গী আক্রমণে সেদিন সমগ্র  বাংলাদেশ  ও বাঙালি ছারখার হয়ে গিয়েছিল। বার বার বাংলা আক্রমণ করে কত বাঙালিকে যে খুন করেছিল, কত বাঙালি নারীকে যে ধর্ষণ করেছিল, কত লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ লুঠ করেছিল তার ইয়ত্তা নেই। একবার না , বার বার। বাংলার গ্রামে গ্রামে, মাঠে প্রান্তরে বছরের পর বছর তাদের আক্রমণে  নেমে এসেছিল শ্মশানের স্তব্ধতা। ৪ লক্ষ বাঙালির খুনে সেদিন লাল হয়ে গিয়েছিল বাংলার প্রান্তর। কয়েক সহস্র বাঙালি মহিলাকে লুঠ করে "হিন্দু পাদ পাদশাহীর" যোদ্ধারা যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করেছিল। সেদিনের বাঙালি কবি গঙ্গারামের বর্ণনায় প্রতিফলিত হয়েছে সেদিনের নির্মম বাস্তবতা।  "খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এল দেশে/বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কিসে" গানে মায়ের আকুতিতে ধরা পড়েছে সেদিনের বাঙালির অসহায়তা। 

অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই, বিদেশী আক্রমণকারীর ধর্ম দেখে "মুসলিম" বিচার করে নির্মমতার যে বিবরণ জনমানসে খাড়া করা হয় তার ১% শিহরণের ন্যারেটিভ "হিন্দু পাদ পাদশাহীর" নির্মমতার ক্ষেত্রে কোনদিন তৈরী করা হয়নি। 

শনিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২০

প্রোটোকল ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য


দিল্লির  রাজা,সঙ্গে পেয়াদা সাথে সভাসদবর্গ
হবিদা বলেন আপনি তো স্যার ভারতবাসীর গর্ব।
এগোচ্ছে দেশ হইহই করে আপনি একাই একশো 
আরে রামরাম সিপিএম বাম হারামির হাতবাক্স।
দিলুদা হবিদা করে খুনসুটি ধনকর পান দুঃখ 
ভাবেন এসব ইনসাল্টিং কাঁটা বেধে অতি সূক্ষ্ম। 
ওদিকে তখন কিছু তিনোমূল গড়িয়াহাটার মঞ্চে
রাজাজি হাঠাও স্লোগান তুলেছে বিরিয়ানি খেয়ে লাঞ্চে।
রাজাজি শুধালো হাকিম সাহেব এসব যা শুনি সত্যি
হবিদা বলেন এসব গুজব নিউজ পেপার ভর্তি।
আছে সি বি আই, সাথে দেশি গাই দিলুদার মুখে স্বস্তি 
বিরোধীরা পাজি অপবাদ দেয় এসব সেটিং দোস্তি।
কত গ্যাড়াকল সাথে প্রোটোকল রাজভবনের কক্ষে
বাবু বলিলেন বুঝেছ উপেন পানি এসে যায় চক্ষে।।

সব চরিত্র কাল্পনিক 😐

দিল্লী পুলিশ ~ সমীক মুখোপাধ্যায়

প্রফেটের কাছে ক্ষমা চেয়ে - 

(যদি) দিল্লি পুলিশ নাচে-
খবরদার এসো না কেউ হেড আপিসের কাছে ;
চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে চাইবে নাকো পাছে ;
চার পা তুলে থাকবে ঝুলে পদ্মফুলের গাছে !

      (যদি) দিল্লি পুলিশ আসে-
      খবরদার! খবরদার! গ্রন্থাগারের পাশে
      টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটবে, লাঠির বাড়ি কাঁধে ;
      দু হাত তুলে বলতে হবে, 'জয় শ্রীরাম' আর 'রাধে' !

(যদি) দিল্লি পুলিশ হাঁচে -
আনুগত্যের ছাপ পড়বে হস্টেলের ঐ কাচে ;
মুখের ওপর রুমাল বেঁধে আসবে এবিভিপি ;
মাথার খুলি দু-ফাঁক হলেও উদাস দিল্লি-সিপি।

      (যদি) দিল্লি পুলিশ ছোটে-
      সবাই যেন তড়বড়িয়ে জানলা বেয়ে ওঠে ;
      ভাবলে কথা শাহীন বাগের চলবে নাকো মোটে;
      ভবিষ্যতের গাঁড় মারবে এফআইআরের চোটে !

 
(যদি) দিল্লি পুলিশ ডাকে-
সবাই যেন জগ্‌গু ভিসির পায়ের নিচে থাকে ;
দেশপ্রেমের ঘণ্ট বেটে মাথায় মলম মাখে ;
গরম চাটু ঘষতে থাকে অমিত শাহের নাকে !

      তুচ্ছ ভেবে এ-সব কথা করছে যারা হেলা,
      দিল্লি পুলিশ জানতে পেলে বুঝবে তখন ঠেলা ।
      দেখবে তখন কোন্‌ কথাটি কেমন করে ফলে,
      আমায় তখন দোষ দিওনা, আগেই রাখি বলে ।

হিন্দু রাষ্ট্র ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

আমি চাই না ভারতবর্ষ হিন্দু রাষ্ট্র হোক। 

আমি চাই না ভারতবর্ষ হিন্দু রাষ্ট্র হোক, কারণ আমি এই দেশকে ভালবাসি। 

আমি ভালবাসি এই দেশের প্রাচীন দর্শন, তার ইতিহাস, তার প্রাগিতিহাস। ভারতবর্ষের ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম, জাতি, জ্ঞান - কোনকিছু একমুখী নয়। একরূপ নয়।

ধর্মে সে একেশ্বর, নিরীশ্বর, বহু-ঈশ্বরবাদী। বৈদিক উপনিষদ ও বেদ-বিরোধী বৌদ্ধধর্ম, দুই দর্শনেরই জন্ম ভারতবর্ষ। 

আর হরপ্পার মূর্তিপূজা মিশ্রিত হয়ে গেছে মূর্তিপূজাহীন বৈদিক দর্শনের সাথে। তার সাথে এসেছে চার্বাকপন্থী লোকায়ত দর্শন।

যখন এই দেশে জ্ঞানচর্চার পথ ছিল সুগম তখন আরও বিভিন্ন চিন্তার সমাবেশ হয়েছে। তারা শুধু বিশ্বাস করত না। তারা গভীর জ্ঞান অর্জন করতে চাইত। জানতে চাইত, উত্তর খুঁজত পৃথিবীর প্রাচীনতম, জটিলতম প্রশ্নগুলির। 

মানুষ তখন জীবনে ইচ্ছামত ধর্ম পরিবর্তন করতে পারত। এই দেশের প্রথম রাজারা বারেবারে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। অশোক করেছে, তার বাবা করেছে, তার ঠাকুরদা করেছে। 

ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মারবার দুই হাজার বছর আগে এই দেশে এক মহাপুরুষ উচ্চারণ করেছেন, 'এই মহাবিশ্ব এক continuum, আগে ছিল, এখনো আছে।' তার জন্য তাকে কেউ পুড়িয়ে মারে নি। 

এই দেশে কোন কিছু একমুখী নয়, পড়তের উপরে আছে পড়ত। 

এদের সবাইকে নিয়ে ভারতবর্ষ টিঁকে আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বন্ধ হলে, আলোচনা ও চর্চা বন্ধ হলে সেই দেশ শুকিয়ে যাবে। 

ভারতবর্ষের মানুষের শরীরে আছে আফ্রিকান শিকারী-সংগ্রাহক, ইরানীয় শিকারী-সংগ্রাহক, ইন্দো-ইউরোপীয় পশুপালক, অস্ট্রো-এশিয়াটিক কৃষিজীবী, তিব্বতী-বর্মী মাতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠীর জীন।
এই উপমহাদেশ ছাড়া এতো মিশ্রণ পৃথিবীর কোন দেশে, কোন অঞ্চলে নেই। 

এই দেশের মানুষ কথা বলে আদিম প্রোটো -জারোয়া, প্রাচীন দ্রাবিড়ীয়, সুললিত বৈদিক সংস্কৃত, অস্ট্রো-এশিয়াটিক, সিনো-তিব্বতী ভাষায়।

প্রশ্ন চাই, প্রশ্ন বন্ধ করা যায় না।

জাবালি প্রশ্ন করেছেন, বুদ্ধ করেছেন, মহাবীর, চার্বাক ও আজীবিক মতবাদ প্রশ্ন করেছে। যেই দেশ, যেই জীবনচর্চা, যে ধর্ম, যে জাতি প্রশ্ন করে না, শুধু মেনে নেয়, শুধু বিশ্বাস করে তার ধ্বংস অনিবার্য। আজ না হয় কাল।

হিন্দু রাষ্ট্র, ধর্ম রাষ্ট্র ভারতবর্ষকে করে তুলবে মৌলবাদী, এক মুখী। তখন প্রশ্ন উঠবে নারীদের নিয়ে, জ্ঞানের চর্চা নিয়ে, জাত নিয়ে, খাদ্যাখাদ্য নিয়ে। আমি সেই ভারত চাই না।

আমি ভারতবর্ষের ধ্বংস চাই না। 

আমি ভারতবর্ষের সাথে পাকিস্তানের তুলনা চাই না। পাকিস্তান এক দুর্ভাগা দেশ। তার দুই নোবেল লরিয়েটকে সে দেশ থেকে তাড়িয়েছে। তার মা-বোনেরা কাপড়ের আড়ালে বন্দী। আমি তাদের প্রতি গভীর সহানুভূতিশীল। আমি চাই না আমার দেশের মেয়েরা ধর্মের নামে বন্দী হোক।

উল্লেখ করছি নবম শতকের জৈন দার্শনিক জীনসেনের উক্তি, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাজাগতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান তার গ্রন্থ কসমসে এটি উল্লেখ করেছেন -

" Some foolish men declare that a creator made the world. The doctrine that the world was created is ill-advised, and should be rejected. If god created the world, where was he before creation? If you say he was transcendent then, and needed no support, where is he now? "

নবম শতকের ভারতীয় দার্শনিক যিনি প্রচলিত মতবাদ, গতেধরা চিন্তার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, আমেরিকান জ্যোতির্বিদ বিংশ শতকে বই লিখেছেন তার উক্তি স্মরণ করে, কোন ইউরোপীয়র নয়। 

এটাই ভারতের শক্তি; যেদিন থেকে সে ধর্ম রাষ্ট্র হবে সেদিন থেকে সে পিছন  দিকে হাঁটতে থাকবে। 
যেমন এখন হাঁটছে, প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান - কত আশা জাগানো আতার্তুকের তুরস্ক।  

সকল মানুষকে প্রশ্ন করতে হবে - রাষ্ট্রকে, অবিজ্ঞানকে আর সবচাইতে বেশি করে করতে হবে নিজেকে।

Madhusree Bandyopadhyay
11/01/2020

রবিবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২০

এনারসি ~ ডঃ কৌশিক দত্ত

সাগরমেলার আগে বাবুঘাটে একটা  ক্যাম্প হয় সন্ন্যাসী আর তীর্থযাত্রীদের জন্য। সেখানে আমি যাই সুযোগ পেলে। আগে যেতাম ভারত চিনতে। এখন তার সঙ্গে অন্য কিছু আকর্ষণও থাকে। সেখানে বাবাজি আসেন প্রায় প্রতিবছর। আমার যে গণিতজ্ঞ বন্ধুটি তাঁর বিশেষ অনুরক্ত, তিনি খবর দেন, "বাবাজি এসে গেছেন।" মানুষটির সারল্য এবং সদানন্দ ভাব আমাদের টানে। ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো চুল, এলোমেলো দাড়ি। গায়ে ময়লা চাদর। ক্যাম্পের ভেতরে যেখানে আরামদায়ক তাঁবু হয়, সেখানে থাকেন না। ক্যাম্পের ঠিক বাইরে একটা গাছতলায় খড় বিছিয়ে ধ্যানাসনে বসে থাকেন। সেখানেই রাত্রিবাস। মনকে স্থির করার জন্য এনার গঞ্জিকা প্রয়োজন হয় না, যোগের মাধ্যমেই পারেন। মেলার ক্যাম্পে তীর্থযাত্রীদের জন্য খাবারের বন্দোবস্ত থাকে। কেউ রুটি তরকারি এনে দিলে খান মাঝেমাঝে। অন্য কোনো সামগ্রী গ্রহণ করতে দেখিনি। একবার একজন একটা কম্বল দিয়েছিল লাল রঙের ফুল আঁকা। শীতের রাতে তিনি সেটা আমাকে দিয়েছিলেন। গায়ে দিয়ে বাড়ি চলে যাও, পরে অন্য কাউকে দিয়ে দিয়ো। এই ছিল নির্দেশ। আমি কম্বল গায়ে মেট্রোয় চড়েছি সেই একবারই। বাবাজি কথা বলেন খুব কম লোকের সঙ্গে৷ ঘটনাচক্রে আমাদের সঙ্গে বলেন। কথাগুলো সাধারণ্যে আলোচ্য নয়। 

এন আর সি হলে বাবাজির নাম উঠবে না, কারণ তাঁর কোনো কাগজই নেই। গোবর্ধন অঞ্চলে একসময় একটি আশ্রম কুটির বানিয়েছিলেন। সেটা ঝড়ে ভেঙে যাবার পর ওঁর মনে হল কৃষ্ণ বলছেন, এসব ঘরদোর ভালো না। প্রকৃত গৃহত্যাগী সন্ন্যাসীকে নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র দেবার হিম্মত রাষ্ট্রের এখনো হয়নি। কিন্তু তাঁর দেশ, মাটি, আকাশ কেড়ে নেবার ক্ষমতা অবশ্যই আছে। এন আর সি হলে বাবাজি কয়েদ হবেন। "সি এ এ", যা নাকি হিন্দুদের রক্ষাকবচ, তা এই হিন্দু সন্ন্যাসীর কাজে আসবে না, কারণ তিনি বাঙলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসেননি। তিনি জন্মসূত্রে ভারতীয়। 

"তাহলে কী হবে বাবাজি?" 

"কিষণ ভগবান জানে।" হাসেন বাবাজি। "আরে বো কানহাইয়া বড়া অটোমেটিক হ্যায়। সব জান লেতা হ্যায়।"

বোঝা গেল। সন্ন্যাসীর প্রাণে ভয় নেই, কারণ সেখানে কৃষ্ণ আছেন। হয়ত কারাগারেই তিনি কৃষ্ণের সাক্ষাৎ পাবেন, যেমন পেয়েছিলেন দেবকী-বসুদেব। কারাগারটি যে আদতে কংসের, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকবে না। কারাগারে কৃষ্ণ আবির্ভূত হলে কংসের কী গতি হয়, তাও আমরা জানি। তবু আমরা সামান্য মানুষ। বাবাজির জন্য চিন্তা হয়। যদি দেখি এন আর সি-র পর আর তিনি সাগরমেলায় আসছেন না… 

ও হরি! তখন আর কেই বা আসবে মেলায়? তীর্থযাত্রীদের যা দেখেছি এত বছর ধরে, কটা কাঠকুটো বস্তায় নিয়ে গঙ্গা মাঈয়ার ভরসায় বেরিয়ে পড়েছে রাজস্থানের গ্রাম থেকে… কীভাবে ফিরবে জানে না, কাগজপত্র না থাকায় এরা অনেকেই পাকিস্তানি বলে চিহ্নিত হবে। সন্ন্যাসীদের কথা তো ছেড়েই দিলাম। নিরঞ্জনী আখড়া, জুনা আখড়া, ভোলা গিরির আশ্রম উজাড় হয়ে যাবে। হৃষিকেশ, বদ্রিনাথ, নর্মদার তীর থেকে পুলিশ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবে সহস্র সন্ন্যাসীকে। থাকবে শুধু মোদী-আম্বানি-আদানি-শাহী। আমেরিকা, সৌদি আরব থেকে তাঁরা আমদানি করবেন শকুন। রপ্তানি করবেন ভারতবর্ষ।