উনিশশো সাতষট্টি সাল। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরের হেইট অ্যাশবেরি নামের এক পাড়ায় এক লাখ তরুণ তরুণী জড়ো হইছিলো এক গ্রীষ্মে। ইতিহাসে ওই গ্রীষ্মের নাম সামার অব লাভ। ভালোবাসার গ্রীষ্ম। এরা কারা? এরা ওই দেশের সবচেয়ে ভাগ্যবান পোলাপান। সবচেয়ে ধনী দেশের, সবচেয়ে সুখী সময়ের সন্তান। বাপের গাড়ি আছে, ভবিষ্যতে ব্যাংকের চাকরি আছে। সব ফালাইয়া এরা রাস্তায় নামলো ক্যান, কন তো?
শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬
ফুলের মানুষ ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক
উনিশশো সাতষট্টি সাল। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরের হেইট অ্যাশবেরি নামের এক পাড়ায় এক লাখ তরুণ তরুণী জড়ো হইছিলো এক গ্রীষ্মে। ইতিহাসে ওই গ্রীষ্মের নাম সামার অব লাভ। ভালোবাসার গ্রীষ্ম। এরা কারা? এরা ওই দেশের সবচেয়ে ভাগ্যবান পোলাপান। সবচেয়ে ধনী দেশের, সবচেয়ে সুখী সময়ের সন্তান। বাপের গাড়ি আছে, ভবিষ্যতে ব্যাংকের চাকরি আছে। সব ফালাইয়া এরা রাস্তায় নামলো ক্যান, কন তো?
পানকৌড়ি ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক
শাঁখা ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক
আমি রাশেদ। পাটুয়াটুলীতে মামার ওষুধের দোকানে বসতাম। প্রেশারের ট্যাবলেট, গ্যাসের ওষুধ, বাচ্চাদের সর্দির সিরাপ। এর বাইরে আমার কোনো পরিচয় ছিলো না। কবিতা লিখিনি কোনোদিন। গানও জানি না। ক্যাশবাক্স আর রাতের ভাত, এই নিয়ে আমার জীবন চলতো।
অপর্ণা প্রথম এসেছিলো আষাঢ় মাসে। বাবার প্রেশারের ওষুধ নিতে। শাঁখারীবাজারের মেয়ে। ভেজা ছাতা ভাঁজ করতে করতে বললো, "এমলোডিপিন ফাইভ আছে?"
ওষুধ দিলাম। পাঁচ টাকা ভাংতি ছিলো না। সে বললো, "কাল দিয়া যামু।"
কাল মানে যে সত্যিই কাল, তা জানতাম না। পরদিন ঠিক এল। পাঁচ টাকা কাউন্টারে রেখে চলে গেলো। আমি অনেকক্ষণ টাকাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মানুষের মন কীসে আটকায়, আগে জানতাম না। এখন জানি। মন আটকায় তুচ্ছ জিনিসে। একটা ফেরত দেওয়া ভাংতিতে। একটা ভেজা ছাতায়।
তারপর মাসে মাসে ওষুধ। এমলোডিপিন ফাইভ থেকে টেন হলো। তার বাবার শরীর নামছিলো। আর আমাদের বাড়ছিলো কথা। কোন কথা? কিছুই না। বৃষ্টি, লোডশেডিং, সদরঘাটের ভিড়। অথচ সেই কিছু না কথাগুলোর জন্য আমি সারাটা মাস অপেক্ষা করতাম। মাসের শেষ বৃহস্পতিবার এলে সকাল থেকে আয়নায় নিজেকে দেখতাম। সাধারণ একটা মুখ। এই মুখ নিয়ে কেউ স্বপ্ন দেখে না। তবু দেখতাম।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, "আপনাদের ওখানে সবাই শাঁখা বানায়?"
সে হাসলো। "বানাইতো। এখন অল্প কয় ঘর। আমার কাকায় বানায়। শাঁখারিগো একটা গল্প আছে, জানেন?"
গল্পটা সে বলেছিলো সেই বর্ষায়, দোকানের শেডের নিচে দাঁড়িয়ে। দক্ষিণের ঘাটে এক শাঁখারি এসেছিলো। পার্বতী তখন গরিব ঘরের বউয়ের ছদ্মবেশে। শাঁখারি তার হাতে শাঁখা পরিয়ে দিলো। দাম চাইলো না। বললো, তোমার স্বামী দেবে। মেয়েটির স্বামী শিব। ভিখারি শিব দাম দেবে কোথা থেকে? পরে জানা গেলো, শাঁখারি শিব নিজেই। নিজের মানুষকে শাঁখা পরাতে এসেছিলো। অন্য জাত সেজে।
"বুঝলেন?" অপর্ণা বলল। "ঠাকুরেরও নিজের মানুষের কাছে যাইতে ছদ্মবেশ লাগে।"
আমি কিছু বলিনি। শুধু বুঝেছিলাম, আমিও ছদ্মবেশে আছি। ক্রেতা আর দোকানদারের ছদ্মবেশ। এর আড়ালে যা আছে, তার নাম মুখে আনা যায় না। আনলে পাটুয়াটুলী থেকে শাঁখারীবাজার পর্যন্ত আগুন লেগে যাবে।
পূজার সময় সে নাড়ু আনতো কাগজে মুড়ে, চুপিচুপি। ঈদের পরদিন এসে বলতো, "সেমাই খাওয়াইলেন না?" আমি লজ্জা পেতাম। লজ্জাটাও ভালো লাগতো।
এভাবে এক বছর গেল। সে ওষুধ নিতে এসে দেরি করতো। স্ট্রিপগুলো একটা একটা করে গুনতো। যেন গোনার আর শেষ নেই। আমি ইচ্ছে করে ভাংতি রাখতাম না। যাতে আরেকবার আসতে হয়। দুজনেই জানতাম দুজনের চালাকি। কেউ ধরিয়ে দিতাম না। ভালোবাসার প্রথম ভাষাই বোধহয় এই। মুখে কিছু না বলে সময় চুরি করা।
সদরঘাটে এক ফকির বসতো। একতারা নিয়ে। লালনের গান গাইতো। এক সন্ধ্যায় আমরা দুজন অপরিচিত মানুষের মতো ভিড়ের মধ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম, "সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।" ফকির গাইছিলো আর হাসছিলো। যেন জাত জিনিসটা একটা পুরোনো ঠাট্টা, যেটা শুধু সে-ই ধরতে পেরেছে। অপর্ণা স্বগতোক্তি করলো, "জাতের চিহ্ন তো শরীরে নাই। তাইলে জাত থাকে কই?"
"মানুষের মুখে," আমি বললাম। "মানুষ ছাড়লে জাতও ছাড়ে।"
মানুষ ছাড়ে না। মানুষ নিজের অভ্যাসের বাইরে কিছু মানতে পারে না। যে যেভাবে ভাত খেয়ে বড় হয়েছে, সে ভাবে ওটাই ভাত খাওয়ার একমাত্র নিয়ম। ধর্ম নিয়ে মানুষের যতো না বিশ্বাস, তার চেয়ে বেশি অভ্যাস। আর অভ্যাসে টান পড়লে মানুষ খুনও করতে পারে।
বিমল কাকার সঙ্গে প্রথম দেখা সেবার পূজার মুখে। অপর্ণার সঙ্গেই দোকানে পা রেখেছিলেন। পাথরে খোদাই করা গম্ভীর মুখ আর কাঠের কাজে বাঁকা হয়ে যাওয়া হাতের আঙুল। আমার দিকে তার চাহনিটা ছিল অদ্ভুত। ঠিক যেন তিনি কোনো ওষুধের দোকানে আসেননি। এসেছেন বিষের কারবারির মুখোমুখি হতে।
বিমল কাকার জীবনের গল্পটা আমি শুনেছিলাম অপর্ণার মুখে। একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চের কালরাতে যখন শাঁখারীবাজারে মিলিটারি ঢোকে, কাকার বয়স তখন সাত বছরের বেশি না। দরজার ফাঁক দিয়ে কাকা নিজের চোখে দেখেছিলেন, গলির মুখে ঠাকুরদাকে গুলি করে কীভাবে ফেলে রেখে গেছে ওরা। তিন দিন ধরে লাশটা ওভাবেই পড়ে ছিলো। স্পর্শ করার মতো কেউ ছিলো না। সেই সাত বছর বয়সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখা দৃশ্যটাই লোকটার ভেতর থেকে আর কাউকে বিশ্বাস করার ক্ষমতাটা কেড়ে নেয়। বছর কয়েকের মাথায় বউটাও চলে গেলো। এখন হাতজোড়া শাঁখার করাত আর বুকের ভেতর পুষে রাখা তীব্র ঘৃণা, এই দুটো সম্বল করেই লোকটা টিকে আছে।
ঘৃণাকে দোষ দিই কী করে? ঘৃণারও মা-বাপ থাকে। কাকারটার জন্ম দিয়েছিল মিলিটারি। তারও আগে জন্ম দিয়েছিল সাহেবরা। ঠাকুরদা বলত, ইংরেজ যাওয়ার আগে জমি ভাগ করে গেছে, আর ভাগ করে গেছে মন। শাসন সোজা, যদি প্রজারা দুই ভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে লড়ে। এক দড়িতে দুই গরু বেঁধে দাও। যে যার দিকে টানবে, আর দড়িটা বসবে দুজনেরই গলায়।
আমরা ধরা পড়লাম মাঘ মাসে। বাদামতলীর ঘাটে বসে ছিলাম দুজনে। মাঝখানে এক হাতের ব্যবধান রেখে। ওই এক হাতটুকুই ছিল আমাদের সমাজ, আমাদের সীমানা। কাকার এক লোক দেখে ফেলেছিলো। সন্ধ্যায় বিমল কাকা দোকানে এলেন। কাউন্টারে শাঁখা কাটার করাতটা রাখলেন শব্দ করে। সরু, চকচকে আর ধারালো।
"মাইয়াটার দিকে আর তাকাবি না।" গলা নিচু, শান্ত। শান্ত গলাই সবচেয়ে ভয়ের। "শাঁখারীবাজারের মাইয়া ঘরের বাইরে গেলে জাত যায় না রে, জান যায়। আমার বাপেরে নিছস তরা। মাইয়াটারে নিতে পারবি না।"
"আমি তো কিছু নিই নাই," বললাম।
কাকা হাসলো। মরা হাসি। "তুই নিবি না। তর জাতে নিব। জাত জিনিসটা তুই না রে। জাত একটা হাঙর। আগে লেজ দেখায়, পরে দাঁত।"
সেই রাতে মা ভাত বেড়ে বসে ছিলো। মায়েরা কীভাবে যেন সব টের পায়। বলল, "বাজান, মাইয়া ভালা, মানলাম। কিন্তু সমাজ? মরলে জানাজা পড়াইব না, জানোস? লোকে কী কইব?"
“লোকে কী বলবে”, এই তিনটা শব্দ মানুষের কাছে খোদার চেয়েও বড়। খোদা ক্ষমা করেন বলে শুনেছি। মানুষ তা করে না।
অপর্ণার বাড়িতেও একই আগুন। তার মা কেঁদে বলেছে, তোর বাবা প্রেশারের রোগী। শুনলে মরবে। কাকা বলেছে, আগে ওই ছেলেকে কাটবে। পরে নিজেকে। পরিবার বড় না প্রেম বড়, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না। যেদিকেই যাও, নিজের একটা হাত কেটে রেখে যেতে হয়। দুই মাস আমরা ও পথ মাড়াইনি। ভেবেছিলাম ভুলে যাবো। অভ্যাস তো। কিন্তু মন তো দোকানের হিসাবের খাতা নয়। যত কাটাকাটি করি, দাগগুলো তত স্পষ্টভাবে থেকে যায়।
ফাল্গুনে সে এলো। ওষুধ নিতে। বাবার জন্য না। নিজের জন্য। ঘুমের ওষুধ চাইলো একগাদা। আমি দিলাম না। সে কাউন্টারে মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর বললো, "বেহুলার কিচ্ছা জানেন? বাসররাইতে লখিন্দররে সাপে কাটলো। সবাই কইলো, ভাসাইয়া দে। বেহুলা মরা স্বামী লইয়া ভেলায় উঠলো। ছয় মাস ভাসলো। গাঙের পচা পানি, লাশের গন্ধ। তাও নামে নাই। ছোটবেলায় ভাবতাম, বেহুলা বোকা। এখন বুঝি, বেহুলার কিছু করার আছিলো না। ভালোবাসা মানুষরে ভেলায় তুইলা দেয়। তারপর গাঙ যেদিকে নেয়।"
আমি কাকার করাতের ভয় ভুলে গেলাম। মায়ের ভাতের থালা ভুলে গেলাম। বললাম, "উঠবা ভেলায়?"
উকিলের চেম্বার নীলক্ষেতে। তিনতলার ওপর। উকিল সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। "সোজা কথা কই। এই দেশে মুসলমান পোলা আর হিন্দু মাইয়ার সরাসরি বিয়ার কোনো আইন নাই। মুসলমানের আইন আলাদা, হিন্দুর আইন আলাদা। আছে খালি স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট, আঠারোশো বাহাত্তর সাল। ইংরেজের বানানো। তাতে বিয়া হইবো। তয় দুইজনরেই ঘোষণা দিতে হইবো, তোমরা কোনো ধর্মের না। নাইলে একজনরে ধর্ম বদলাইতে হইবো।" চশমা খুলে মুছলেন। "সাহেবরা দেশ ভাগ কইরা গেছে, আইনও ভাগ কইরা গেছে। মাঝখানে খালি মানুষের কোনো আইন রাখে নাই।"
অপর্ণা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর সই করলো। যে মেয়ে রোজ সন্ধ্যায় তুলসীতলায় প্রদীপ দিতো, সে কাগজে লিখে দিলো, তার কোনো ধর্ম নেই। কলম ধরা হাতটা কাঁপছিলো। আমি জানি, ওই সইয়ে তার ধর্ম যায়নি। গেছে বাড়ি। ধর্ম কাগজে থাকে না। থাকে মায়ের হাতের নাড়ুতে, কাকার করাতের শব্দে, তুলসীতলার সন্ধ্যাপ্রদীপে।
আমরা উঠলাম কড়াইল বস্তিতে। মহাখালীর লেকের ওপারে। টিনের ঘর, আট ফুট বাই আট ফুট। মামা দোকান থেকে বের করে দিয়েছে। মা বাড়ি থেকে। কড়াইল আমাদের কিছু জিজ্ঞেস করেনি। বস্তি জিজ্ঞেস করে না। ওখানে সবাই কোথাও না কোথাও থেকে পালিয়ে আসা। নদীভাঙা মানুষ, ভিটেহারা মানুষ, মামলার আসামি। এক কলে তিনশো ঘর, পানির লাইনে দুই ঘণ্টা। মাথার ওপর কারেন্টের তার মাকড়সার জালের মতো। প্রতি চোতমাসে কোথাও না কোথাও আগুন লাগে। আর লোকে বলে, এইবার বুঝি উঠিয়েই দেবে। সিটি কর্পোরেশনের লোক মাপঝোঁক করে যায়। বস্তি জানে, শহর তাকে দিয়ে কাপড় ধোয়ায়, রান্না করায়, ইট টানায়। শুধু পাশে বসায় না।
আমি রিকশার গ্যারেজে খাতা লেখার কাজ নিলাম। অপর্ণা ছুটা বুয়ার কাজ। বনানীর দুই বাসায়। এক বাসায় সে আয়েশা, আরেক বাসায় অপর্ণা। যে বাসার মালিক যেটা শুনলে খুশি হয়। ফিরে এসে হাসতো, "দুই নামে দুই বেতন। মন্দ কী।" হাসিটার গহীনে যে কী ছিলো, আমি জানতাম। মানুষ নিজের পছন্দের বাইরে একটা নামও সহ্য করতে পারে না। নাম শুনেই ঠিক করে ফেলে, কে আপন, কে পর।
বিয়ের রাতে আমাদের ছিল একটা হারিকেন আর টিনের চালে বৃষ্টি। সে খুলে রেখেছিল সব, শুধু হাতের শাঁখাজোড়া খোলেনি। হারিকেনের আলোয় তার শরীর ছিল গাঙের চরের মতো। জলে ধোয়া, নরম, আনকোরা। আমি সেই চরে নেমেছিলাম ভাটির মাঝির মতো। ধীরে, ডুবতে ডুবতে। টিনের চালে বৃষ্টি বাড়ছিলো। তার নিঃশ্বাস সেই শব্দকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল চারপাশে। আর আমার পিঠের ওপর বেজে উঠছিল শাঁখার রিনরিন শব্দ। ওই শব্দটুকুই তো ছিল তার না ছাড়তে পারা ধর্ম, যা সে সঁপে দিয়েছিলো আমার বুকের ওপর।
পরে সে বলেছিলো, "শাঁখা খুলুম না। এই জোড়া কাকায় নিজ হাতে বানাইছিলো।"
"খুলবা কেন," বলেছিলাম আমি। "যে হাতে ভাত বাড়ো, সেই হাতের আবার জাত কী।"
ছয় মাস আমরা রাজা-রানি ছিলাম। আট ফুট বাই আট ফুটের রাজ্য। শুক্রবারে লেকের পারে হাঁটতাম। একদিন বাজার থেকে একটা আয়না কিনে আনলাম। ত্রিশ টাকা। সে দেয়ালে টাঙিয়ে বললো, "এইবার সংসার পুরা হইলো।" টিনের কৌটায় মাটি ভরে চুপিচুপি একটা তুলসীর চারা পুঁতেছিলো। আমি দেখেও দেখিনি। সন্ধ্যায় সেই কৌটার সামনে সে চোখ বুজে দাঁড়াতো আধ মিনিট। আমি নামাজে দাঁড়ালে সে পাখাটা টেনে দিতো। আমাদের ঘরে দুই ঈশ্বর অল্প জায়গায় মিলেমিশে থাকতেন। মানুষের যা পারে না, ঈশ্বর তা পারেন অবলীলায়।
এক রাতে পাশের ব্লকে আগুন লাগলো। শর্ট সার্কিট। টিনের ঘর পোড়ে কাগজের মতো। আমরা যে যা পারি নিয়ে গলিতে দাঁড়ালাম। অপর্ণার এক হাতে সেই ত্রিশ টাকার আয়না, আরেক হাতে তুলসীর কৌটা। আগুনের আলোয় তার মুখ দেখে বুঝলাম, সংসার আসলে এইটুকুই। যা হাতে করে পালানো যায়। ভোরে আগুন নিভলো। এগারোটা ঘর ছাই। কেউ মরেনি বলে পত্রিকায় খবরও হলো না। বস্তির দুঃখ খবর হয় না, খবর হয় শুধু বস্তির যাবতীয় অপরাধ।
দুই ঘর পরে থাকত সোনা মিয়া ফকির। একতারা বাজিয়ে ভিক্ষা করতো। রাতে গাইতো, "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়।" অপর্ণা রাঁধতে রাঁধতে গুনগুন করতো। ফকির বলতো, "মা, লালন সাঁই কইছে, জাত হাতের ময়লা। ধুইলেই যায়। খালি মানুষ ধুইতে চায় না। ময়লাটারেই সোনা ভাইবা বুকে কইরা রাখে।"
আশ্বিন মাসে দেশ জ্বললো। এক মণ্ডপে কে যেন রাতের অন্ধকারে কোরান শরিফ রেখে এসেছিল। সকালে ছবি উঠলো। ফেসবুকে আগুন ধরলো। যে দেখেনি সেও শেয়ার দিল। মিছিল বেরোলো। মণ্ডপ ভাঙল, মন্দির ভাঙল, দূরের জেলায় মানুষ মরলো। দুইশো বছর আগে সাহেবরা যে দড়ি গলায় পরিয়ে গিয়েছিলো, সেটায় টান পড়লো আবার।
বস্তিতেও কথা উঠলো। কার ঘরে কে থাকে। কার বউয়ের হাতে শাঁখা। গ্যারেজের এক ছেলে জিজ্ঞেস করলো, "ভাবি নাকি হিন্দু আছিলো?" বললাম, "আছিলো।" সে থুতু ফেললো। "আছিলো বইলা কিছু নাই ভাই। সাপ খোলস ছাড়লেও সাপ।"
সেই রাতে মিছিল ঢুকলো বস্তির গলিতে। মশাল আর লাঠি। কী চায়, ওরা নিজেরাও জানতো না। ভাঙার জন্য কিছু একটা চাই, এইটুকুই। অপর্ণা পানির লাইনে গিয়েছিলো। ফিরছিলো কলসি কাঁখে। মিছিলের মুখে পড়লো। ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ তার হাতের শাঁখা চিনলো। চিৎকার উঠলো।
আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম। যতটুকু দেখেছি, ততটুকু বলার ভাষা আমার নেই। মানুষ বলতে যা বুঝি, ওরা তখন তা ছিলো না। ওরা ছিলো দুইশো বছরের টান খাওয়া একটা দড়ি। আগে ভাঙলো কলসি। তারপর শাঁখা। তারপর যা ভাঙলো, তা আর জোড়া লাগে না। আমি ঠেকাতে গিয়ে দেদারসে লাঠির বাড়ি খেলাম। গুনিওনি। কাদার মধ্যে বসেই তাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম। মাথাটা ফেটে গেছে। ঠোঁট দুটি কেবল একটু নড়ছিলো। কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনলাম। ভাঙা, অস্ফুট গলায় সে একটাই কথা আকড়ে ছিলো, 'নামুম না... ভেলা থেইকা... নামুম না...
গাঙ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি বেহুলার মতো বসে ছিলাম। বেহুলা তবু দেবতার সভায় পৌঁছেছিলো। নেচে গেয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে এনেছিলো। কিন্তু আমি কার সভায় যাব? যে দেবতা জাত মানে, সে তো লখিন্দর ফেরত দেয় না।
পুলিশ এলো পরদিন। মামলা হলো। অজ্ঞাতনামা চারশো জন। অজ্ঞাতনামা মানে তো সবাই, আর দিনশেষে কেউ না।
সকালে বস্তি আবার আগের মতো। পানির লাইনে ভিড়, চুলায় ভাত, গ্যারেজে হাতুড়ির শব্দ। যারা আগের রাতে মিছিলে ছিলো, তারাও লাইনে দাঁড়িয়ে হাই তুলছে। মানুষ এমনই। রাতে হাঙর, সকালে গরু। আমার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সবাই চোখ নামিয়ে হাঁটে। চোখ নামানোটাই এই দেশের শোক।
আমি অপর্ণাকে নিয়ে গেলাম শাঁখারীবাজারে। ওদের ধর্মে দাহ করতে হয়। আমার আপত্তি ছিলো না। তার ধর্ম তো ছিলো হাতের শাঁখায়, আগুনে আর কী যাবে।
বিমল কাকা দরজা খুললো। আমার মুখ দেখলো। খাটিয়ার দিকে তাকালো। এক পাও নড়লো না। কাঁদলোও না। কাকার কান্না একাত্তরেই ফুরিয়ে গেছে। শুধু বললো, "ভিতরে আন্। আমার মাইয়া আমি সাজামু।"
দাহের আগে কাকা তার হাত থেকে ভাঙা শাঁখাটা খুলে আমার হাতে দিয়ে বললো, "রাখ। শাঁখারির জিনিস শাঁখারিই চিনে। তুই অরে শাঁখা পরাইতে পারস নাই। কিন্তু ওই কিচ্ছার শাঁখারির লাহান তুইও জাত ভাইঙ্গা আইছিলি। দোষ তর না রে। দোষ ওই দড়িটার।"
আমি এখনো পাটুয়াটুলীতে ওষুধ বেচি। অন্য এক দোকানে। মাসের শেষে কেউ এমলোডিপিন কিনতে এলে হাতটা একটু কাঁপে। পকেটে হাত ঢোকাই। ভাঙা শাঁখাটা আঙুলে বিঁধে।
তারপর গান ধরলো। আমি গাঙের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ভাটির টানে একটা ভেলা ভেসে যাচ্ছিলো। খালি ভেলা। কেউ নাই।
খোলস ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
মিডিয়া তে ছাঁটাই ~ অনির্বাণ মাইতি
বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
বাঘ দিবস ~ কৌশিক মজুমদার
রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬
দিল্লি ডাইরি: যন্তর মন্তরের ইন্ডিয়া ~ শময়িতা চক্রবর্তী
দিল্লি ডাইরি: যন্তর মন্তরের ইন্ডিয়া
না লিখে রাখলে ভুলে যাব, তাই...
সোমবার, ২০ জুলাই: প্রথম টিয়ার গ্যাস জনপথে। প্রেস কার্ড সঙ্গে থাকলে পুলিশের লাঠি থেকে বাঁচা যায়। টিয়ার গ্যাস আবার প্রেস কার্ড বোঝে না। দম যখন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে, একটা বাচ্চা মেয়ে (২২-২৪ বছর হবে) তার ওড়না খুলে অর্দ্ধেকটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, নাক মুখ চেপে রাখো। চোখ খুলো না। বাকি হাফ দিয়ে নিজের নাকে জড়িয়ে রাখল। ব্যাগ থেকে ছোট জলের বোতল বের করে খানিকটা নিজের চোখে দিল। বাকিটা আমার মুখে ছেটাল। ধোঁয়া কমলো, মিষ্টি হেসে ভিজে ওড়না উড়িয়ে চলে গেল।
পরের টিয়ার গ্যাস। আরেকজন বাচ্চা ছেলে হাত ধরে দৌড়ে নিয়ে গেল রাস্তার পাশে রাখা জলের ট্যাঙ্কে। বলল, 'জিতনা হোসাকে পানি দিজিয়ে।' চোখ খুলে দেখলাম, সে হাওয়া।
জনপথে যখন অটো চলতে শুরু করলো, তখন অফিস যাওয়ার তাগিদ হল। পাঁচজন অটোওয়ালা রিফিউজ করার পরে একজন রাজি হলেন। বললেন, 'যারা আজ মিছিলে এসেছে তাদের জন্যই আজ অটো বের করেছি। নাহলে বাড়ি থাকতাম।"
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই: কেরালা হাউসের সামনে থেকে আমি আর ক্যামেরাপারসন অভিরাজ (সবাই পার্থ হয়না, কেউ কেউ অভিরাজ হয়। একই রকম হার না মানা, অভিরাজ) যন্তর মন্তরের মঞ্চের দিকে এগোচ্ছি। ব্যারিকেডে ব্যারিকেডে ছয়লাপ। আগের দিন পুলিশের সঙ্গে ওই সাংঘাতিক যুদ্ধ যেন আগুনে ঘি দিয়েছে। ভিড় বেড়েছে বহুগুণ। মঞ্চের দিক থেকে স্লোগান জোরদার হচ্ছে। একটু কাছে গিয়ে শুনলাম, 'গোদি মিডিয়া হায় হায়।' চোখের সামনে দেখলাম, এক হিন্দি ন্যাশানাল চ্যানেলের সংবাদ প্রতিনিধি এবং তার সহকর্মী ক্যামেরাপারসেনকে ব্যারিকেডের বাইরে বের করে দেওয়া হল। বলা হল, বাইরে থেকে রিপোর্টিং করতে। অভিরাজের ক্যামেরা সাক্ষী। একই সঙ্গে আমাদের ঢুকিয়ে নেওয়া হল। স্বাভাবিক ভাবেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী হল? কেন এটা করলে? রিপোর্টার তার চাকরি করতে এসেছে। এই বৈষম্য ভাল না, ইত্যাদি। হাঁটুর বয়সী ভলান্টিয়ার বলল, 'এদের গত ৩০ দিনের প্রতিবেদন দেখে এসো। তার পর তোমার কথা শুনব।' এর পরেও এই নিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। বুঝলাম, মূলধারার মিডিয়ার উপর এদের যতটা রাগ, তা সরকার বিরোধী ক্ষোভের থেকে কোনো অংশে কম না। এদের বক্তব্য, যে মিডিয়া ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেই মিডিয়া অপ্রাসঙ্গিক।
এদিন সন্ধেয় যখন বেরলাম তখন আরেক কাণ্ড। কনট প্লেসের দিকের রাস্তায় পিটিসি দিচ্ছি। ভুল হচ্ছে যেমন হয়। আবার দিচ্ছি। এমন সময় হা রে রে রে রে রে... আবার পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে দৌড়চ্ছে। আবার জনতা ছুটছে। আবার টিয়ার গ্যাসের ওয়াগন ধেয়ে আসছে। আবার ক্যামেরাপারসন অভিরাজ ক্যামেরা নিয়ে ছুটছে। সঙ্গে ছুটছি আমিও। এমন সময় ইট বৃষ্টি। কনট প্লেসের দোকান বন্ধ হয়ে গেল ঝপাঝপ। আমি, অভিরাজ অন্যদের সঙ্গে মাথা বাঁচিয়ে সেই খণ্ডযুদ্ধ দেখে গেলাম। পরে শুনলাম, বাইরের লোক ইট পাথর মারছে। এদিন যে অঘটন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের।
বুধবার, ২২ জুলাই: সকাল থেকে ছাত্র নেতাদের ইন্টারভিউ করছি। এদিন একা। সব শেষে আবার যন্তর মন্তর যাব। সঙ্গী হলেন এক ছোট আইসা কর্মী। তার আবার দুই পায়ে দুই রকম চটি। আগের দিন পুলিশের সঙ্গে ঝামেলায় এক পাটি হারিয়েছিল। তার পর যা পেয়েছে তাই পরে কাজ চালাচ্ছে। আজ টলস্টয় মার্গ দিয়ে ঢোকা। সেই কর্মী আমাকে তার চেনা রাস্তা চেনাচ্ছে। দেখলাম, ভিড় এড়াতে প্রতিদিনের কর্মীরা কত রাস্তা চেনেন। কীভাবে যেন সব ভিড় এড়িয়ে সরু গলি পেড়িয়ে চারটে গেট টোপকে মঞ্চের সামনে পৌঁছে গেলাম। একদম হ্যারি পটারের ম্যাজিক। এর পর আর কোনোদিন ওই রাস্তা চিনতে পারব কিনা জানি না।
আরো মজা হলো বেরোনোর সময়। এক অল্পবয়সী উকিলের সঙ্গে দেখা। একটা বাইট নেব। তার চোখ আমার জুতোয়। বলে, এটা তো থিয়েটারের জুতো। ওরা ফালতু দাম নেয়। তুমি বরং অমুক অমুক জায়গায় জুতো দেখো। স্টাইলের জুতো। কম দাম। বাইট এবং জুতোর দোকানের সন্ধান, এক ঢিলে দুই পাখি মারা হল আমার।
প্রসঙ্গত, এদিন রাতেও খণ্ডযুদ্ধ আটকানো যায়নি।
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই: আমার ফেরার কথা। হয়নি। টিকিট ক্যানসেল করতে হয়েছে। এদিন উত্তেজনা শুরু দুপুর থেকে। দুপুরে কনট প্লেস চত্বরে সমস্ত দোকান বন্ধের নির্দেশ আসে। আমরা চত্বরে পৌঁছতেই দেখই পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। অন্যান্য দিনের তুলনায় ২০ গুন বেশি পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী। সকলেই যুদ্ধসাজে রেডি। মাথায় হেলমেট, গায়ে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, হাতে শিল্ড। সাংবাদিকদের আলোচনায় তখন অফিস থেকে হেলমেট আর জ্যাকেট আনার পরিকল্পনা। সহকর্মী অন্য শহর থেকে ফোনে বলছেন ব্যাগে তোয়ালে আর জলের বোতল রাখতে। ছাত্রনেতারা মোটামুটি রেডি। সারা রাত যন্তর মন্তর পাহারা দিতে। বন্ধুবান্ধবদের থেকে ক্রিকেটের হেলমেট জোগাড় করে রাখছে। একজন বলল, শুধু মাথাটাই বাঁচাতে চেষ্টা করব। রাবার বুলেট বাঁচাতে পিঠে ব্যাগ থাকবে। জল, তোয়ালে, এই সব তো আছেই।
প্রথম অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স, দিল্লি পুলিশ পরিষ্কার জানালো, আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর অন্তত এদিন রাতে কোনো 'ক্র্যাকডাউন' হবে না। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই অনশন ভাঙলেন ওয়াংচুক। একেবারে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে জল।
শুক্রবার, ২৪ জুলাই: ফেরার দিন। তার আগে পর্যন্ত যন্তরেই। আজও ভিড়। একই রকম। বরং বেশি। অভিজিত দিপকের জ্বর। তখনও টাইফয়েডের রিপোর্ট আসেনি। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন। ভিড় ঠেকে ঢুকতে গিয়ে আমি অল্পের জন্য মিস করেছি। ব্যাস। সে মঞ্চের মাঝে চলে গেছে। তখন জেদ, একটা বাইট পেতেই হবে। ফাইনালি বলল, 'সোনামজি অনশন ভেঙেছেন। ভালো হয়েছে। ওনার প্রাণের দাম অনেক বেশি। তবে আমরা আন্দোলন চালাব যতদিন না ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন।' জেদ জিতেছে, এই টুকুই।
এর পরেও যা যা মনে রাখার, তা হল, যন্তর মন্তরের অনেকখানি জুড়ে জ্যামার লাগানো থাকায়, এবং আমার ভি-এর এর নেটওয়র্ক থাকায় খুব ঝামেলা হয়েছে। অনেক দূর গিয়ে স্টোরি, বাইট, পিটুসি পাঠিয়ে আবার ফিরতে হয়েছে।
এসব কিছুর পরেও যা থেকে গেল: যন্তর মন্তর জুড়ে এই পাঁচদিনে যা দেখেছি তা আমার বেড়ে ওঠার ভারতের সঙ্গে মিলে যায়। গুরুদ্বোয়ারা থেকে খাবার, মসজিদের থেকে জল, এনআরআইদের ফুড ডেলিভারি, বৃষ্টি পড়লে প্লাস্টিকের রেনকোট, না পড়লে অচেনাদের হাতপাখার হাওয়া, জলের বোতল, স্যানিটারি প্যাড, হিন্দু, মুসলিম, শিখ, বিদেশি, দেশি স্বেচ্ছাসেবক, গান, ডাফলি, নাচ, স্লোগান, ডাক্তারদের ক্যাম্প, ক্যালপল, ওআরএস, স্ট্রিট প্লে , কস প্লে, কস্টিউম স্পাইডারম্যান, এভেরিথিং এভরিহোয়ার অল অ্যাট ওয়ান্স -- আমার স্বপ্নের দেশ।
যন্তর মন্তর যেন একটা ছোট ভারতবর্ষ হয়ে গেল এই কয়েকদিনে।



