বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

আজকের ভারত ও গ্রামশির তত্ত্ব ~ অরিজিত মুখার্জী

প্রায় একশো বছর আগে, মুসোলিনীর আমলে ইটালিতে জেলে বন্দী থাকাকালীন গ্রামশি বেশ কিছু তাত্ত্বিক কথাবার্তা লিখে রেখেছিলেন। তার মধ্যে আধিপত্য বা হেজিমনি নিয়েও বেশ কিছু আলোচনা ছিল। এই ২০২৬ সালে বসে, ভাবলে অবাক লাগে কীভাবে গ্রামশির সেই তত্ত্ব মোদীর ভারত সম্পর্কে একদম খাপে খাপে বসে যায়...যেন ভদ্রলোক সেই ১৯২৬ সালে বসেই আজকের ভারতকে দেখতে পেয়েছিলেন...

হিন্দুত্ববাদ সিরিজটার কন্টিন্যুয়েশন: গ্রামশির আধিপত্যবাদের তত্ত্ব। 

এখানে একটা ডিসক্লেমার দিয়ে রাখি। আমার চেয়ে অনেক জ্ঞানীগুণী বিদ্বান লোকেরা এই নিয়ে অজস্র লেখালেখি করেছেন। আমি এই সিরিজটায় শুধুমাত্র সেগুলোকে আরো অ্যাক্সেসিবল করার চেষ্টা করছি। সহজ ভাষায়। বোর হলে স্ক্রোল করে বেরিয়ে যাবেন।

সাধারণত: আমরা বেশিরভাগ মানুষই মনে করি ক্ষমতা আসে বন্দুকের নল থেকে, বা পুলিশের উর্দি থেকে, বা আইন আদালত বিচারব্যবস্থার হাত ধরে। গ্রামশি বলেন এটা ক্ষমতার অর্ধেক মাত্র। শাসক গোষ্ঠীর হাতে এই সব শক্তি ছাড়াও থাকে সাধারণ মানুষের কনসেন্ট। একটা ছোট্ট শাসকগোষ্ঠী যখন তাদের "ওয়ার্ল্ডভিউ" বা পৃথিবী সম্পর্কে তাদের ধারণা-কে গোটা নাগরিক সমাজের "কমন সেন্স" হিসেবে খাড়া করে ফেলতে পারে, তখনই সেটা তৈরী করে পরিপূর্ণ আধিপত্য।

ভেবে দেখুন। গরীব হিন্দু নোট বাতিলের সময় ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাঙ্কে লাইন দেওয়ার পরেও কেন আম্বানি-আদানিদের চৌকিদারি করা এই সরকারটাকে সমর্থন করে? কেন দলিত আর আদিবাসীরা, লাগাতার নানারকম জাতিবিদ্বেষের মুখে পড়েও, জয় শ্রীরাম বলে বিজেপির মিছিলে যায়? কেন একজন সাধারণ দিন-আনি-দিন-খাই অটোচালকও পোশাক বা ফেজটুপির ভিত্তিকে কাউকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেয়? এদের নাকের ডগায় কেউ বন্দুক ধরেছিল? না তো! তা সত্ত্ব্বেও এই ঘটনাগুলো ঘটে। শম্ভুলাল রেগর একজন অতি সাধারণ গরীব পরিযায়ী শ্রমিককে লাভ জিহাদের নাম করে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেয়। আখলাক আহমদকে একদল একই রকমের গরীব লোক টেনে বাড়ি থেকে বের করে এনে পিটিয়ে মেরে ফেলে। খুঁজে দেখলে গত দশ বছরে লিঞ্চিং এর ঘটনা গুণে শেষ করা যাবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৩ এর মধ্যে শতাধিক লিঞ্চিং-এর ঘটনা ঘটেছে — অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিকার মুসলমান বা দলিত। এবং এই ঘটনাগুলোকে কনডেম করা তো দূরের কথা, অজস্র লোক এগুলোকে নানাভাবে সমর্থন করে এগুলোকে নর্মালাইজ করেছে।

কেন? কারণ এই সবই পাব্লিকের "কমন সেন্স" হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলের বই থেকে, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড থেকে, সারাদিন ধরে টিভিতে চলা হাই-পিচ ডিবেট থেকে, বিভিন্ন আখড়ার মহন্তদের ফরমান থেকে...

হেজিমনি মানে এমন নয় যে ক্ষমতাশালীরা আপনাকে রোজ মেরেধরে পথে এনে ফেলছে। বরং আপনার মগজের দখল ওরা ইতিমধ্যেই নিয়ে ফেলেছে। আপনার মাথার মধ্যে ওরা অলরেডি জয়ী।

গ্রামশি দুরকম যুদ্ধের কথা বলেছিলেন। এক, ওয়ার অফ ম্যানুভার, বা কৌশলের যুদ্ধ। আর দুই, ওয়ার অফ পোজিশন — অবস্থানের যুদ্ধ। প্রথমটা টিপিকালি সরাসরি লড়াই — স্ট্রাইক, লাগাতার হরতাল, ভোটের সময় কোনো একদিকে ঢলে পড়া সেন্টিমেন্টের ঢেউ। আর দ্বিতীয়টা লংটার্ম, খানিকটা ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত — ধৈর্য্যের পরীক্ষা। সময় নিয়ে আস্তে আস্তে স্কুলকলেজ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক গ্রুপ, ধর্মীয় পরিসর, বিকেলে পার্কে হাঁটতে যাওয়া "উই আর অ্যাবভ সিক্সটি" গ্রুপ বা সকালের লাফিং ক্লাব, আমার আপনার রোজকার নানান অভ্যাস — সবকিছুকে নিজেদের দখলে আনা।

সঙ্ঘ পরিবার একশো বছর ধরে এই অবস্থানের যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। শাখায় হিন্দু সংস্কৃতির গর্ব। স্কুলে বদলে যাওয়া ইতিহাস। অসংখ্য "অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল" — প্রচারক, প্রথাগতভাবে উচ্চশিক্ষিত না হলেও যারা হিন্দু সেন্টিমেন্টকে খুঁচিয়ে তুলতে পারে। মন্দির ট্রাস্টের ম্যানেজার; আখড়ার মহন্ত; শহরে গ্রামে প্রতিনিয়ত যারা হিন্দুত্বকে "কমন সেন্স" বলে চালিয়ে চলে। এর পাশাপাশি, গত দুই দশকে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এই যুদ্ধ ছড়িয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে ফেক নিউজ ভাইরাল করার ডিজিটাল সৈনিক; লাভ জিহাদ আর ঘর ওয়াপসির মত ন্যারেটিভ, চেহারা পেশা পোশাক নিয়ে মিসোজিনি ছড়িয়ে দাঁত নখ বের করা পুরুষতন্ত্রকে জিইয়ে রাখা সমাজমাধ্যম আর মিডিয়াতে বাণী দেওয়া সমাজচিন্তক; সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার যারা অনায়াসে বলে সেকুলারিজম মানে অ্যান্টি হিন্দু; ডীপ ফেক ক্রিয়েটর; সুদর্শন নিউজ বা রিপাবলিক টিভির মত অগুণতি টিভি চ্যানেলে তারস্বরে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ ছড়ানো সাংবাদিক; এসআইআরের আগে বাংলা চ্যানেলে বসে "কোটি কোটি বাংলাদেশী রোহিঙ্গা ভারতে ঢুকে পড়েছে" বলা বুদ্ধিজীবী; সরকারকে প্রশ্ন করা ছাত্র যুবক বা অন্য সাধারণ মানুষদের আরশোলা বলে দেওয়া বিচারক; কনসেন্ট আজ তৈরী হয় সেকেন্ডের মধ্যে।




আর এই যুদ্ধের পাশাপাশি এসেছে ওয়ার অফ ম্যানুভার — কৌশলগত আক্রমণ: ভোটে জিতে বুলডোজার অ্যাকশন, এসআইআর, আর্টিকল ৩৭০ — এই ম্যানুভারের প্রত্যেকটাই জনসমর্থন পেয়েছে, কারণ এর জমি তৈরী হয়েছে এতদিনের অবস্থানের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। বিরোধীদের বিরাট বড় মিছিলে বিজেপির আর কিস্যু এসে যায় না। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষক আন্দোলন চলার পরেও বিজেপি বিধানসভা ভোটে জেতে। নোটবাতিলের সময় বা কোভিডের সময় সাধারণ মানুষের চরম হেনস্থার পরেও একই ঘটনা ঘটে...

কারণ, জমি তৈরী হয়ে গেছে। ভারতের আশি শতাংশ হিন্দু, বিশ্বাস করে নিয়েছে যে ভারতের সাংস্কৃতিক শেকড় রয়েছে এক ও একমাত্র হিন্দু চেতনার মধ্যেই।

আর আছে ক্রনি ক্যাপিটালিজম — শাসক জোটের অন্য অংশটা।

গ্রামশি ক্ষমতায় আসীন এই জোটের নাম দিয়েছেন "ঐতিহাসিক জোট" (historic bloc) — ভারতে সেটা তৈরী হয়েছে হিন্দুত্ববাদ আর ক্রনি ক্যাপিটালিজমের মধ্যে। যারা একে অপরকে শক্তি যোগায়।

আম্বানি, আদানিরা হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী নেশন-বিল্ডার। হিন্দু রাষ্ট্র আর প্রাচীন ভারতের গ্লোরি ফিরিয়ে আনার নৈতিক ছাতার নীচে তাদের মুনাফা লোটার কারিকুরি চাপা পড়ে। হিন্দুত্ববাদী শাসক গোষ্ঠী পায় ফান্ডিং: ইলেক্টোরাল বন্ড, বিজ্ঞাপন, মন্দির করিডোরের জন্যে জমি — একই সাথে যেটা রিয়েল এস্টেটও বটে। আর গরীব খেটে খাওয়া মানুষ, মুটে মজুর, পরিযায়ী শ্রমিকদের বোঝানো হয় যে গরীবের পকেট কেটে সুইস ব্যাঙ্কের লকার ভরানো পুঁজিপতি বা পাব্লিক ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে দেশ ছেড়ে পালানো বেওসাদার বা গলা অবধি দুর্নীতিতে ডুবে থেকে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা রাজনীতিকরা নয়, তাদের সমস্ত সমস্যার মূলে ওই "ওরা" — মুসলমান বা ক্রীশ্চানরা। কারণ ওরা সবাই জেহাদি, ঘুসপেটিয়া ইত্যাদি।

শ্রেণীর ক্ষোভকে চাপা দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভয় দেখিয়ে।

আম্বানি বা আদানির মত পুঁজির মালিকেরা নিজেদের 'অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল' তৈরী করে — ইকোনমিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, কর্পোরেট মিডিয়া চ্যানেল, ব্যবসাবান্ধব আইনজীবী, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় "ন্যাশনালিস্ট" ইনফ্লুয়েন্সার। যখন দেখবেন কোনো টিভি চ্যানেল সরকারের নীতিকে প্রশ্ন না করে সরকারের পোষা অর্থনীতিবিদকে টকটাইম দিচ্ছে, তখন জানবেন যে কর্পোরেট স্বার্থ আর জাতীয়তাবাদ একই সুতোয় গাঁথা। যখন দেখবেন যে অজান্তে আপনিও কখন ভাবতে শুরু করেছেন আম্বানি-আদানিদের বিকল্প নেই, ওরা তো পরিশ্রম করেই অত উঁচুতে উঠেছে, তখন বুঝবেন আপনিও এই কনসেন্ট তৈরীর ফাঁদে পড়ে গেছেন।

এই হল সফিস্টিকেশনের চরম পর্যায়ে থাকা আধিপত্যবাদ বা হেজিমনি। রাষ্ট্রক্ষমতা তো ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছেই — পুলিশ, ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন, আদালত, বুলডোজার। মাঝেমধ্যে সামনেও চলে আসে — এনকাউন্টার, প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন, ইউএপিএ, ইন্টারনেট শাটডাউন, নির্বাচনের সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা। কিন্তু আসল ম্যাজিক লুকিয়ে রয়েছে আম আদমির কনসেন্টে; লক্ষ মানুষের স্বেচ্ছায় নিজেদের সরকারের দাসানুদাস মেনে নেওয়ার মধ্যে; "সরকার মাই বাপ" মানসিকতায়। কারণ একশো বছর ধরে জমি তৈরী করা হয়েছে: দেশ মানে রাষ্ট্র, সরকার; আর দেশকে ভালোবাসা মানে সমস্ত ক্ষুধার সূচক, বাচ্চা আর মেয়েদের স্বাস্থ্যের সূচক, প্রেস ফ্রীডম ইন্ডেক্স, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির দাবী, সব ভুলে গিয়ে গায়ে মাথায় মুখে জাতীয়তাবাদের রঙ মেখে তারস্বরে বন্দে মাতরম চিৎকার। রাষ্ট্রক্ষমতা আর কনসেন্টের মিশেলে তৈরী হওয়া coercive-hegemonic hybrid...

তবে কোনো হেজিমনিই চিরকালীন নয়, আশার কথা এইটুকুই। গ্রামশি লিখেছিলেন যে শাসক ততদিনই আধিপত্য বজায় রাখতে পারে যতদিন সে জনতার কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে। হিন্দুত্ব সেটাই করে: বিনামূল্যে রেশন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, দলিত/আদিবাসীদের লার্জার হিন্দু ফোল্ডে টেনে নেওয়ার অ্যাসপিরেশন। সঙ্গে "ওদের" ঢিট করার জন্যে বুলডোজার; মব লিঞ্চিং-এ ছাড়; অনলাইন ও অফলাইনে মিসোজিনির ঢালাও পারমিশন; হেজিমনি বজায় রাখতে সাহায্য করার ইন্সেন্টিভ।

কিন্তু ফাটল ঠিকই দেখা দেয়। বেকারির জ্বালা, জিনিসপত্রের দাম, শিক্ষা স্বাস্থ্যের সংকট, ডুবতে বসা অর্থনীতি, হিন্দুত্বের মধ্যে জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন প্রদেশে আঞ্চলিক প্রতিরোধ...

বিপ্লবের মুহূর্ত আসে যখন দেশজোড়া কনসেন্টে ফাটল ধরে; যখন মানুষ বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়। তখন রাষ্ট্রকে প্রকাশ্য শক্তির আশ্রয় নিতে হয়।

সেই সময় এখনো আসেনি। কিন্তু আসবে। সেই সময়কে তৈরী করা যায় — কাউন্টার হেজিমনির মাধ্যমে। সহজ নয়। খন্ড বিখন্ড চিন্তাভাবনা; আইডেন্টিটির লড়াই; স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মত মিডিয়ার অভাব; অর্থের অভাব। তবুও সময়কে তৈরী করা সম্ভব।

কীভাবে? লিখব।

#হিন্দু_খতরে_মে_হ্যায় #হিন্দুত্ববাদ #ন্যারেটিভ_বিল্ডিং

শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬

আর্য্যদের অভিবাসন তত্ত্ব ও রাখীগড়ি ~ অরিজিত মুখার্জী

শমীক ভশ্চাজ্জির একটা বক্তব্য নিয়ে অনেকেই লিখেছে দেখেছি। রাখীগড়ির ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি অমুক তমুক অনেক কিছুকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে ইত্যাদি ইউজুয়াল আগমার্ক হিন্দুত্ব হাবিজাবি। আমি একটা সহজবোধ্য প্রাইমার দেওয়ার চেষ্টা করি — কেন শমীক ভশ্চাজ্জি এই দাবীটি করতে গেল। আরো একটা উদ্দেশ্য আছে। এর আগের বার এই ভশ্চাজ্জির আরো একটা বালবাজারি নিয়ে ফেসবুকে লেখার পর জনৈক জেলখাটা "প্রিটেন্ডার" সাংবাদিক আমাকে নিয়ে আস্ত ইউটিউব এপিসোড করে ফেলেছিলেন। আশা করছি এইবারেও তিনি আরো একটা ইউটিউব এপিসোড নামাবেন। একে তো আমি সেলিব্রিটি হয়ে যাব, আর দ্বিতীয়ত: এই বালবাজারিটার ব্যাপারে যদি দুটো লোকও খোঁজ করে সত্যিটা জানতে পারে, তাতেও বড় লাভ।
 
সো, হিয়ার গোজ...
 
কী বলেছে শমীক ভশ্চাজ্জি? না, রাখীগড়ির প্রাচীন মানুষের ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি প্রমাণ করে দিয়েছে যে Aryan Invasion Theory (AIT) পুরোপুরি মিথ্যে, বামপন্থী ঐতিহাসিকরা এতদিন আমাদের সব ভুল শিখিয়েছেন।
 
শুরুতেই শমীক ভশ্চাজ্জি যে মিথ্যেটা বলেছে (মিথ্যেই বললাম, কারণ এরা যা বলে জেনেশুনেই বলে) সেটা হল এই AIT নিয়ে। সেই ১৯৫০-৬০ নাগাদই ইনভেশন থিওরিকে ক্রিটিক করেছেন ডিডি কোশাম্বি, রোমিলা থাপার বা আরএস শর্মার মত বামপন্থী ইতিহাসবিদরাই, নানান নতুন পুরাতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভাষাগত তথ্যের ভিত্তিতে। ষাটের দশক থেকেই বেশিরভাগ স্কলারদের মধ্যে যেটা চালু থিওরি সেটাকে বলা হয় Aryan Migration Theory (AMT)। সেখানে মাইগ্রেশন বা অভিবাসনের একাধিক ঢেউয়ের কথা বলা হয়। এই থিওরিটা সবার আগে একটু খোলসা করে বলা দরকার।
 
একেবারে প্রথমে আসে ইউরেশিয়ান স্তেপ অঞ্চলের (আধুনিক ইউক্রেন, দক্ষিণ পশ্চিম রাশিয়া, পশ্চিম কাজাখস্তান ইত্যাদি অঞ্চল) পশুপালক মানুষগুলোর কথা। এরাই প্রথম ঘোড়ার ওপর দখল আনে, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে, আর একদম গোড়ার প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথাবার্তা বলতে শুরু করে। তাদের অরিজিনাল বাসভূমি থেকে তারা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে — কারণ বংশবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নতুন এলাকার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, বসবাসের জন্যে, পশুপালনের জন্যে। এর মানে এই নয় যে এরা সরাসরি ভারতীয় উপমহাদেশে চলে এসেছিল। মাইগ্রেশন থিওরি বলে যে এই পশুপালকরা ধীরে ধীরে মিশতে শুরু করে একটা অন্তর্বর্তী এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে - প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় এই স্টেজিং গ্রাউন্ডের নাম Bactria-Margiana Archaeological Complex (BMAC) - আধুনিক কালের যে এলাকাগুলোকে আমরা চিনি উত্তর আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান বলে। এবং এইটা এক দুই দিন বা কয়েক মাসে বসতির ব্যাপারও নয়। স্তেপ অঞ্চলের মানুষরা এখানে যাওয়াআসা শুরু করে, এখানকার অরিজিনাল অধিবাসীদের সঙ্গে মেশে, তাদের বংশবৃদ্ধি হয় - প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরে। এবং তারপর, এই অধিবাসীদের মধ্যে থেকে একটা ইন্দো-ইরানিয়ান শাখা আলাদা হয়ে যায়; এক দল পশ্চিমে ইরানের দিকে চলে যায়, আর অন্য দলটা দক্ষিণপূর্ব দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে ঢোকে। সময়কাল হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটা খানিক এরকমঃ

খ্রীষ্টপূর্ব [২১০০-১৮০০] সিন্তাশতা সংস্কৃতি (স্তেপ অঞ্চলে ঘোড়ায় টানা গাড়ির শুরু হয় এদের হাতে) 

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [২০০০-১৫০০] স্তেপ এলাকা ক্রমাগত শুকনো হতে শুরু করে পরিবেশগত কারণে, ঘাসজমি কমতে থাকে। ফলে আরো ভালো জমির খোঁজে এই এলাকার পশুপালকের দল ভারতীয় উপমহাদেশের কাছাকাছি এসে পৌঁছয় - ব্যাক্ট্রিয়া-মারজিয়ানা অঞ্চলে, মানে আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান ইত্যাদি এলাকায়। সিন্ধু সভ্যতা সেই সময়ে ক্রমশঃ ক্ষয়ে আসতে শুরু করেছে, সেও মূলতঃ আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পাল্টে যাওয়ার জন্যেই।

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [১৫০০-১২০০] হিন্দুকুশ পেরিয়ে ইন্দো-ইরানিয়ান অভিবাসীদের প্রথম ঢেউ এসে পৌঁছয় ভারতের উত্তরপশ্চিম অঞ্চলে, বসতি স্থাপন করে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে (আধুনিক পাঞ্জাব এবং পাকিস্তানের অনেকটা জায়গা নিয়ে)। এই সময়টাকেই বলা হয় প্রারম্ভিক-বৈদিক যুগ - যে সময়ে ঋগ্বেদের জন্ম।

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [১০০০-৬০০] লোহার তৈরী যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্র হাতে এই সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের পরের দিকের প্রজন্মের মানুষেরা জঙ্গল কেটে এগিয়ে যায় গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে। যাযাবর পশুপালক থেকে তারা ক্রমশঃ চাষবাষের দিকে সরতে শুরু করে, তৈরী হতে থাকে কৃষিভিত্তিক রাজ্য। 

খুব ছোট করে এই হল আর্য্যদের অভিবাসন তত্ত্ব,
Uploaded Image
 বা এরিয়ান মাইগ্রেশন থিওরি।

এই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ কোত্থেকে এলো তাই নিয়ে থিওরি, পাল্টা থিওরির লড়াই চলেছে কয়েক দশক ধরেই। ভাষাবিজ্ঞান বা লিঙ্গুইস্টিক্স, প্রত্নতত্ত্ব আর রাজনীতির তীব্র বিতর্ক। ইনভেশন তত্ত্বকে সরিয়ে মাইগ্রেশন থিওরির পত্তন হয় লিঙ্গুইস্টিক্স এবং প্রত্নতত্ত্বের ওপর নির্ভর করেই। তা সত্ত্বেও, বিতর্ক থামেনি। আর্য্যদের উৎপত্তি ভারতেই, এখান থেকেই তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, সংস্কৃতের জন্মও ভারতেই, এবং বাকি সমস্ত ভাষাই সংস্কৃতের "সন্তান" – হিন্দুত্ববাদী রাইটউইং ন্যাশনালিজমের মূল পিলার দাঁড়িয়ে রয়েছে এই আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের তত্ত্বের ওপরেই, কারণ এতে ভারতকে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকে একটা টাইমলেস এন্টিটি বলে প্রোমোট করা যায়। খেয়াল করে দেখবেন - হিন্দুত্বের শুরু কিন্তু এই জায়গা থেকেই - যে ভারতীয় সভ্যতা একদমই ইন্ডিজেনাস, অজর অমর অক্ষয়, টাইম ইমমেমোরিয়াল থেকে এই সভ্যতা একইভাবে টিঁকে রয়েছে ইত্যাদি প্রভৃতি। অন্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষের সঙ্গে মিশ্রণের ফলেই যে এই উপমহাদেশের আদি সভ্যতা এবং সংস্কৃতির জন্ম, এইটা ফাঁস হয়ে গেলে হিন্দুত্ববাদের পিলার ওই টাইমলেস এজলেস গ্লোরিয়াস ভারতীয় নেশনের মিথটা ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। ইতিহাসে, এর আগে কে নিজেদের এরকম অরিজিনাল আর্য্য বলে দাবী করে জাতিগত সংমিশ্রণকে কাঠগড়ায় তুলে মানুষে মানুষে বিভেদের সৃষ্টি করেছিল? হাইস্কুল ইতিহাসের বইয়ে ১৯২০-১৯৪৫, এই বিশ পঁচিশ বছরের বিশ্বের ইতিহাসটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন, মনে পড়ে যাবে।   

এনিওয়ে, টপিকে ফিরি। রাখীগড়ি অবধি যাওয়ার আগে এই প্রাচীন মানুষের জেনেটিক প্রোফাইল সংক্রান্ত আইডিয়াটা একটু বলে নেওয়া দরকার। 

গত কয়েক বছরে, একটা নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মাইগ্রেশন নিয়ে এই বিতর্কের অনেকটাই অবসান ঘটেছে বলে মনে করা হয়। প্রাচীন ডিএনএ অ্যানালিসিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরী এই পদ্ধতির জনক হার্ভার্ডের এক গবেষক, ডেভিড রাইখ। হাজার হাজার বছর আগের মানুষের কঙ্কাল বা হাড়গোর থেকে ডিএনএ বের করে তার সিকোয়েন্সিং করার ব্যবস্থা করেছিলেন রাইখ। এর আগে অবধি, ডিএনএ বের করা যেত শুধু জ্যান্ত মানুষের শরীর থেকেই, এবং বৈজ্ঞানিকেরা সেখান থেকে তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে একটা আন্দাজ তৈরী করার চেষ্টা করতেন। এতে বিতর্ক তো মিটতোই না, বরং বেড়ে যেত কয়েক গুণ। রাইখ এবং তাঁর দলের গবেষকেরা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে পাওয়া প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে তাদের জিনগত প্রোফাইল তৈরী করতে পেরেছিলেন। সেই জেনেটিক প্রোফাইল স্টাডি করেই তাঁরা বলেন যে আধুনিক ভারতের প্রায় সমস্ত বাসিন্দাই মূলতঃ দুটো প্রাচীন জনগোষ্ঠীর এক অনন্য জেনেটিক মিশ্রণঃ Ancestral North Indians (ANI), যাদের জেনেটিক সম্পর্ক রয়েছে ইউরোপীয়, মধ্য এশীয় আর নিকট প্রাচ্য বা নিয়ার ইস্টের মানুষদের সঙ্গে; এবং Ancestral South Indians (ASI) - যারা এই উপমহাদেশের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে এখানকার আদি অধিবাসী হান্টার-গ্যাদারারদের (যে মানুষেরা শিকার করে বা বন্য ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে জীবনধারণ করত) নিবিড় সম্পর্ক ছিল।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এখান থেকে একটা বড় প্রশ্ন উঠে আসে - আর সেটা সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সংক্রান্ত। সিন্ধু সভ্যতা যে যথেষ্ট উন্নত ছিল তাই নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ভারতের মধ্যে লোথাল বা ধোলাভিরার প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলোতে, অথবা কপালে থাকলে পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু সভ্যতার বাকি সাইটগুলোতে গেলে চমকে যাবেন। প্রশ্নটা যেটা উঠে আসে, সেটা হল হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা এই জেনেটিক ধাঁধার মধ্যে ঠিক কোথায় ফিট করে? আর ঠিক এইটাই হল সেই "পয়েন্ট অফ কন্টেনশন" - রাজনীতি আর প্রত্নতত্ত্বের - যার কথা আগে লিখেছিলাম। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আউট-অফ-ইন্ডিয়া তত্ত্বের প্রবর্তকদের বক্তব্য হল সিন্ধু সভ্যতার মানুষরাই আদি বৈদিক আর্য্য, ঋগ্বেদ রচনা হয়েছিল এই সভ্যতার মধ্যেই, এবং এখান থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতি দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদি টাইমলাইন হিসেব করেন, তাহলে এই থিওরি অনুযায়ী ভারতীয় সংস্কৃতিকে প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০ সাল অবধি ঠেলে দেওয়া যায় (খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০-৩৩০০ সাল - এই সময়টাকে ধরা হয় প্রাক্‌-হরপ্পা যুগ হিসেবে, সিন্ধু সভ্যতার তৈরী হওয়ার সময়)। ডেভিড রাইখ তাঁর Who we are and how we got here বইয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে কীভাবে তাঁদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরী করেছিল এলাকার হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী, এমনকি আঞ্চলিক সহ-গবেষক এবং কো-অথরদের মাধ্যমেও। আগ্রহীরা চাইলে এই বইয়ের ছয় নম্বর চ্যাপ্টার (The Collision that Formed India) এর অন্তর্গত The Mixing of East and West অনুচ্ছেদটা পড়ে দেখতে পারেন। রাইখ এই অংশটা শুরু করছেন এই বলে - “The tensest twenty-four hours of my scientific career came in October 2008, when my collaborator Nick Patterson and I traveled to Hyderabad to discuss these initial results with Singh and Thangaraj” – সিং এবং থঙ্গরাজ মানে লালজী সিং, এবং কুমারস্বামী থঙ্গরাজ, দুজনেই তখন সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে কর্মরত বিজ্ঞানী। অরিজিনাল পেপারে রাইখ এবং প্যাটারসন আসলে "ওয়েস্ট ইউরেশিয়ান" শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। লালজী সিং এবং থঙ্গরাজ আপত্তি করেন কারণ ওয়েস্ট ইউরেশিয়া শব্দের ব্যবহার "পলিটিকালি এক্সপ্লোসিভ" হয়ে উঠতে পারে...এমনকি "অভিবাসন" শব্দটাই এক্ষেত্রে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কো-অথরদের আপত্তি এবং সেন্টিমেন্ট মেনে নিয়ে, পেপারটা যাতে পাবলিশ হতে পারে সেই উদ্দেশ্যে রাইখ ও তাঁর সহ-গবেষকরা খানিকটা নিউট্রাল ANI এবং ASI ব্যবহার করেন পেপারে। শব্দের ব্যাপারে খানিক কম্প্রোমাইজ করা হলেও, এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য স্পষ্টভাবেই ইউরেশীয় স্তেপ এবং পরবর্তীকালে BMAC থেকে আসা অভিবাসনের দিকেই ইঙ্গিত করে।

রাখীগড়ি এই প্রাচীন ভারতের ডিএনএ অ্যানালিসিসের লেটেস্ট চ্যাপ্টার। এই গল্পের শুরু ২০১৯ সালে, যখন বিজ্ঞানীরা হরিয়ানার হিসার জেলার অন্তর্গত রাখীগড়িতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় পাওয়া প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো একটা কঙ্কালের সফল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করেন। এই ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে দেখা যায় যে ওই মানুষটির শরীরের জিনের মধ্যে ইউরেশীয় স্তেপের জিনের কোনো মার্কার নেই, নেই কোনো মধ্য এশীয় বা ইউরোপীয় মার্কারও। অর্থাৎ, রাখীগড়ির সেই মানুষ যে জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে আন্দাজ করা যায়, তাদের সঙ্গে ইউরোপীয়, ইউরেশীয় বা পশ্চিম এশিয়ার কোনো জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ কখনো ঘটেনি। রাখীগড়ির মানুষটির জিনগত বৈশিষ্টের সঙ্গে মিল পাওয়া গিয়েছিল শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের আদি বাসিন্দা হান্টার-গ্যাদারার, এবং প্রাচীন ইরানী কৃষক-পশুপালক জনগোষ্ঠীর।

এইবার মজাটা হয় এইখানেই। শমীক ভশ্চাজ্জির মত হিন্দুত্ববাদীরা ইউরেশীয় স্তেপ জিনের অনুপস্থিতি দেখিয়ে বলেন - এইত্তো, ইউরেশীয় স্তেপ থেকে কোনো অভিবাসন কখনো হয়নি, বরং প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরাই বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটু ভাবলেই আপনি খেয়াল করতে পারবেন যে এই লজিকটা খানিক "হরপ্পায় টেলিফোনের তার পাওয়া যায়নি, কাজেই তখন ওয়্যারলেস ছিল" বলার সামিল…

কেন? কারণটা খুব সাধারণ বায়োলজির নিয়ম - যার ফলে হরপ্পায়-টেলিফোনের-তার-পাওয়া-যায়নি-কাজেই-সেখানে-ওয়্যারলেস-ছিল মার্কা বালবাজারি লজিকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সহজ বায়োলজির নিয়মে আপনার আমার মধ্যে পূর্বপুরুষের জিন থাকে, উল্টোটা নয়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরা যদি আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের মাধ্যমে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া, ইউরোপ এবং অন্যত্র ছড়িয়ে থাকত, তাহলে সেখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া কঙ্কালের ডিএনএর মধ্যে রাখীগড়ির দেহাবশেষে পাওয়া ইউনিক সাউথ এশিয়ান জিনের চিহ্ন থাকত। কিন্তু ডেভিড রাইখ ও নরসিংহন সহ অনেকের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০-১০০০ সালের মানুষের হাড়গোরের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় হান্টার-গ্যাদারার জিনের কোনো চিহ্ন নেই। উল্টো, ভারতে পরবর্তীকালীন নমুনাগুলিতে স্তেপের জিনের উপস্থিতি স্পষ্ট। অর্থাৎ, সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে ইউরোপ বা মধ্য এশিয়ার জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ হওয়া বায়োলজিকালি অসম্ভব। এর সঙ্গে আরো বলা যায় যে মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ নাগাদ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আচমকাই স্তেপ জিন এসে হাজির হওয়ার অনেক আগেই, মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০-২৫০০ সালের সময়কার কঙ্কাল যা সাইবেরিয়া এবং ইউক্রেনের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছিল, সেগুলোর মধ্যে এই স্তেপ জিনের মার্কার পাওয়া গেছে। মানে, এই জেনেটিক ট্রাফিক বেসিকালি একটা ওয়ান-ওয়ে রাস্তা, যেটা ভারতে ঢোকে; উল্টোটা নয়।            
                    
রাখীগড়ির ফাইন্ডিংস এই কারণেই মাইগ্রেশন থিওরিকেই আরো পোক্ত করে তুলেছে, শমীক ভশ্চাজ্জির কথামত বাতিল করেনি। কারণ, এই পেপারটা থেকে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর উদ্ভবের একটা স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরাই যদি আদি সংস্কৃতজ্ঞ আর্য্য হত - হিন্দুত্ব থিওরি অনুযায়ী যাদের সংস্কৃতি বয়ে এসেছে আজকের উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে (যারা নিজেদের তথাকথিত আর্য্য জনগোষ্ঠী হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে), তাহলে এই আধুনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা স্তেপ জিনের দু চার ফোঁটা তো থাকার কথা ছিল সিন্ধু সভ্যতার গ্লোরির শিখরে থাকা মানুষদের মধ্যে? যেহেতু আধুনিক উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনুপাতে স্তেপ জিন রয়েছে, কাজেই স্বাভাবিক বায়োলজি বলে যে রাখীগড়ির সময়কালের অনেক পরেই স্তেপ মাইগ্রেশন ঘটেছিল...অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার শেষের দিকে, খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ সাল নাগাদ…

যেটা চরম ইন্টারেস্টিং, সেটা হল প্রাচীন ডিএনএ সিকোয়েন্সিং থেকে পাওয়া টাইমলাইনের সঙ্গে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকের দেওয়া যুক্তি এবং টাইমলাইন হুবহু মিলে যায়। ডেভিড অ্যান্থনির লেখা The Horse, the Wheel, and Language নামের একটা ল্যান্ডমার্ক বই থেকে আন্দাজ পাওয়া যায় কীভাবে গবেষকরা সমস্ত প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে প্রচলিত শব্দের অ্যানালিসিস থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ছড়িয়ে পড়ার একটা ছবি তৈরী করেছেন। লিঙ্গুইস্টদের অ্যানালিসিস প্রমাণ করে যে প্রথম দিকের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে (যাদের মধ্যে সংস্কৃতও পড়ে), ব্রোঞ্জ যুগে স্তেপ অঞ্চলে আবিষ্কৃত বিভিন্ন টেকনোলজি সংক্রান্ত শব্দ গেঁথে রয়েছে - যেমন ঘোড়াকে পোষ মানানো, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো রথ, উন্নত মেটালওয়ার্কস…পাশাপাশি, প্রত্নতাত্ত্বিকেরাও আগেই দেখিয়েছেন যে সিন্ধু সভ্যতার স্বর্ণযুগে এরকম পোষ মানানো ঘোড়া বা চাকাওয়ালা রথের অস্তিত্বের প্রমাণ নেই। রাখীগড়ির পেপার এই সবের মধ্যেকার মিসিং লিঙ্কটা সামনে এনে দিয়েছে - একটা জৈবিক প্রমাণঃ ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের পশুপালকেরা যখন খ্রীষ্টপূর্ব ১৭০০ সাল নাগাদ ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছেছিল, তাদের জিনের পাশাপাশি এসেছিল তাদের ঘোড়া, চাকাওয়ালা রথ আর একদম শুরুর দিকের ইন্দো-এরিয়ান ভাষাসমূহ - সংস্কৃতের উৎপত্তি সেই ভাষাসমূহ থেকেই, ভারতীয় সভ্যতার নকশিকাঁথা বোনার শুরুও সেই সময়েই...           

শেষ একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। শমীক ভশ্চাজ্জি এই ভুলভাল কথাটা অত স্টাইল করে বল্ল কেন? দিন কয়েক আগে লেখা হিন্দুত্ববাদীদের ইতিহাস পাল্টানোর নমুনা মনে করে দেখবেন একটু - কীভাবে জনসমক্ষে আবোলতাবোল দাবী করে উদ্ভট ইতিহাস তৈরী করার চেষ্টা করা হয়। সেই লেখাটা থেকেই অল্প একটু অংশ কোট করি।

“আরএসএসের "মার্গদর্শক' লজ্জা রাম তোমর গম্ভীরভাবে আউড়ে গেলেন - আলোর গতিবেগ নির্ণয় করা হয়েছিল ঋগ্বেদেই; ব্রিটিশরা নাগপুর দখল করার পর টানা ছ'মাস ধরে সেখানে নদীগুলোতে জলের সঙ্গে বয়ে গেছিল গলা সোনা; প্যারিসে তৈরী হয়েছে মনু-র মূর্তি এবং তার নীচে ফলকে লেখা রয়েছে "বিশ্বের প্রথম আইনপ্রণেতা'; শুধুমাত্র পবিত্র অশ্বত্থ গাছ আর তুলসীগাছই অক্সিজেন উৎপন্ন করে; নাসার বিজ্ঞানীরা সূর্যের মুখ থেকে "ওম' শব্দ শুনতে পেয়েছেন।"

লজ্জারাম তোমরের তুলনায় ব্যারিটোন ভয়েসে সুললিত গদ্য বাংলায় কথা বলা, অ্যাপারেন্টলি শক্তি চাটুজ্জে পড়া শমীক ভশ্চাজ্জি ফ্যাসিস্টদের নরম মুখ। এরকম সংস্কৃতিবান মানুষ যে কাঁচা মিথ্যে বলবেন সেটা তো আপনি ভাবতেই পারবেন না, তাই না? অথচ উনি বল্লেন, এবং কনফিডেন্টলি বল্লেন। কারণ, উনি জানেন যে এই মিথ্যেটা ধরে ফেলতে যে লজিকাল অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করার দরকার পড়বে, সেটা আপনি মোস্ট লাইকলি করবেন না। ভারতীয় সভ্যতা যে এজলেস, টাইমলেস এবং চিরকালই একইরকম গ্লোরিয়াস একটা ব্যাপার ছিল, সেটা তো ওরা অলরেডি আপনাকে বিশ্বাস করিয়েই ফেলেছে...  

একটা ছোট কথা দিয়ে শেষ করি। বিজ্ঞান তথ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে। ইতিহাসও নির্ভর করে তথ্যপ্রমাণ — এক্ষেত্রে লিঙ্গুইস্টিকস, প্রত্নতত্ত্ব, এবং আজকাল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর ওপরেও। কিন্তু, এই চর্চায় যেটা আসল সেটা হল প্রশ্ন করতে পারা, চ্যালেঞ্জ করতে পারা, কোনো কিছুকেই অ্যাবসোলিউট ট্রুথ মেনে না নেওয়া। যেমন রোমিলা থাপারেরা AIT কে খারিজ করতে পেরেছিলেন। আপনাকে কেউ বল্ল যে আর্য্যরা সিন্ধু সভ্যতারই অংশ, আপনি সব তথ্যপ্রমাণ ছেড়ে দিয়ে সেইটাকেই সত্যি বলে মেনে নিলেন..."সব সত্যি...মহিষাসুর সত্যি...হনুমান সত্যি...ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি...টারজান সত্যি...অরণ্যদেব সত্যি..."

আপনি কি এখনও রুকুবাবুই আছেন? একটুও বড় হননি?

সূত্রঃ

(১) প্রাগিতিহাস, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, গাংচিল
(২) Who we are and how we got here – Ancient DNA and the new science of the Human Past, David Reich, Pantheon
(৩) Early Indians: The Story of Our Ancestors and Where We Came From, Tony Joseph, Juggernaut
(৪) The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, David W. Anthony, Princeton University Press
(৫) An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers, Vasant Shinde et al, Cell, Volume 179, Issue 3, 17 October 2019, Pages 729-735.e10, https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0092867419309675

#হিন্দু_খতরে_মে_হ্যায় #হিন্দুত্ববাদ #ন্যারেটিভ_বিল্ডিং

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

বাংলা ভাগ ও উদ্বাস্তু ~ অর্ক ভাদুড়ী

বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। পার্টিশনের পরেই বিপুল সংখ্যক হিন্দু উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য হন৷ সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জাতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো বড় নাম৷ স্বাভাবিকভাবেই বিভাজিত বাংলায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তা হয়নি৷ ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ১৫০ আসন৷ বামপন্থী জোট পেয়েছিল ৪০+ আসন৷ কমিউনিস্ট পার্টি একাই পেয়েছিল ২৮ আসন। ফরওয়ার্ড ব্লকের মার্কসবাদী অংশটি ১১ আসনে জিতেছিল৷ এর বাইরেও জয়নগর থেকে এসইউসির সুবোধ ব্যানার্জি খাতায় কলমে নির্দল প্রার্থী হিসাবে জিতেছিলেন৷ ফরওয়ার্ড ব্লকের আরেকটি অংশ খান দুয়েক আসন জিতেছিল৷ তৎকালীন কৃষক মজদুর প্রজা পার্টি, যারা ওই '৫২ সালেই সোস্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টি গঠন করবে, তারা পেয়েছিল ১৫ আসন৷ হিন্দুত্ববাদীরা পেয়েছিলেন মাত্র ১৩টি আসন। জনসংঘ ৯, হিন্দু মহাসভা ৪। যদিও বামপন্থীদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের ভোট শতাংশে খুব ফারাক ছিল না।

১৯৫৩ সালে শ্যামাপ্রসাদ মারা গেলেন৷ বাংলার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল৷ যে কলকাতা দক্ষিণ পূর্ব লোকসভা কেন্দ্রে ১৯৫২ সালের নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ ৪৫% ভোট পেয়ে জিতেছিলেন (কংগ্রেসের ভোট ছিল ৩০%+, কমিউনিস্ট পার্টির ২২%+), তাঁর মৃত্যুর পর সেই আসনেই কমিউনিস্ট পার্টি জিতে গেল ৫৮%+ ভোট পেয়ে। জনসংঘের ভোট ৪৫% থেকে হু হু করে কমে নেমে এল ৫ শতাংশে। এক বছরের মধ্যে।

১৯৫৭ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস ক্ষমতায় এল ১৫২ আসন পেয়ে। বামপন্থীদেরও বিপুল উত্থান হল৷ তাঁরা প্রায় ৮০টি আসন জিতলেন৷ হিন্দুত্ববাদীরা শূন্য হয়ে গেলেন৷ না জনসংঘ, না হিন্দু মহাসভা- কেউ কোনও আসন পেল না। স্বাধীনতা/দেশভাগের ১০ বছরের মধ্যে বাংলার সংসদীয় রাজনীতি থেকে হিন্দুত্ববাদীরা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেলেন। ১৯৭৭ সালে লোকসভায় (এবং বিধানসভাতেও খুব সামান্য) 'জনতা-ঝড়' তাঁদের কিঞ্চিৎ সুবিধা করে দিয়েছিল বটে, কিন্তু বামপন্থী রাজনীতির বিপুল উত্থানের সামনে তা কিছুই নয়৷ তারপর থেকে বহু বহু বছর তাঁদের সংসদীয় পরিসরে বলার মতো সাফল্য কিছুই ছিল না৷ ১৯৯২ পরবর্তী সময়েও তাঁরা বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু আরএসএস নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছে। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জি জোট করলেন বিজেপির সঙ্গে। ১৯৯৯ সালের লোকসভায় দমদম কেন্দ্রে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীর চিত্তাকর্ষক পরাজয় ঘটল বিজেপির তপন শিকদারের কাছে৷ কৃষ্ণনগরেও জুলুবাবু জিতলেন। শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় সংসদীয় পরিসরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পুর্নবাসন ঘটল৷ তবে তৃণমূলের জুনিয়র পার্টনার হিসাবে৷ এর পরের গুরুত্বপূর্ণ কালপর্ব ২০১৪ থেকে৷ কেন্দ্রে মোদী সরকার আসার পর। সে অন্য আলোচনা।

পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ হিন্দু উদ্বাস্ত কেন জনসংঘ বা হিন্দু মহাসভাকে ভোট দিলেন না? এমনকি, ১৯৫২ সালের নির্বাচনেও হিন্দুত্ববাদীরা যে সব আসনে জিতেছিলেন, সেগুলি রাজ্যের পশ্চিমপ্রান্তে৷ বাঁকুড়ায়, জঙ্গলমহলে। সেগুলি মোটেই দেশভাগের দগদগে ক্ষত বুকে নিয়ে চলে আসা উদ্বাস্তু মেজরিটি আসন নয়৷ এর কারণ কী? শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু একটা বড় কারণ নিশ্চয়৷ তাঁর মৃত্যুর পরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বড় মুখ তেমন কেউ ছিলেন না, যিনি জ্যোতি বসুকে টেক্কা দিতে পারেন৷ কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ তো মারা গিয়েছিলেন '৫৩ সালে। তার আগের ৬ বছর তিনি সক্রিয় ছিলেন৷ কিন্তু বিশেষ কিছু করতে পারেননি।

একটা সহজ, জনপ্রিয় (এবং আমার পছন্দের) ব্যাখ্যা এমন হতে পারে, উদ্বাস্তু জনগণের পাশে বুকটান করে দাঁড়িয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি-সহ বামপন্থীরা। ইউসিআরসি গড়ে উঠেছিল। ফলে তাঁদের বড় অংশের সমর্থন বামপন্থীরা পেয়েছিলেন৷ জনসংঘ বা হিন্দু মহাসভার তেমন সংগঠন ছিল না৷ ফলে তাঁরা এঁটে উঠতে পারেননি।

এই সহজ ব্যাখ্যার মূলস্রোতের আড়ালে কি আরও কিছু ব্যাখ্যার সুযোগ আছে? বামপন্থী রাজনীতির ভিতরমহলে কি চারের দশক থেকে ক্ষমতাকেন্দ্রের সরণ ঘটছিল? যদি ঘটে থাকে, তাহলে কি তাকে আরেকটু তলিয়ে, অন্য কোনও লেন্সে পাঠ করার সুযোগ আছে? বামপন্থার কথা থাক। একটু ফুটবলের কথায় আসি৷ তিনের দশক, চারের দশকে কলকাতা ময়দান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহামেডান স্পোর্টিং। পর পর লিগ জিতছে। কমিউনিস্ট রাজনীতিতেও তখন সোমনাথ লাহিড়ীদের পাশাপাশি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো অবস্থান করছেন কমরেড হালিম, কমরেড কাকাবাবু। ময়দানে চারের দশক থেকে প্রবল উত্থান ঘটছে ইস্টবেঙ্গলের। পূর্বঙ্গের হিন্দু বাঙালির দল৷ স্বাধীনতার পর থেকে আস্তে আস্তে প্রভাব কমছে মহামেডানের৷ ময়দানে মোহনবাগানের প্রতিপক্ষ ইস্টবেঙ্গল। বাংলার কমিউনিস্ট রাজনীতিও ততদিনে পেয়ে গিয়েছে এমন দুই দুর্দান্ত চরিত্রকে, যাঁরা আগামী অনেকগুলো বছর নেতৃত্ব দেবেন বামপন্থী আন্দোলনকে- জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত।

বিজেপি বাংলার সরকারে চলে এসেছে। বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চলবে। কিন্তু আমরা একসঙ্গে মিলে আমাদের ঐতিহাসিক ফল্টলাইনগুলির খোঁজ করব না? ঝগড়াঝাঁটি না করে, একে অন্যের উপর রাগ না করে, শান্ত হয়ে ইতিহাসের গল্প করলে কিন্তু আখেরে ক্ষতি হবে না।

বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

উডবার্ন  ~ শুভাশীষ মোদক চৌধুরী 

পোড়াকাঠ বিভাগটা পুরোপুরি নিঃশব্দ আজ,
বেড নম্বর সাত চেয়ে আছে দরজার দিকে।
কেউ কি আসবে না আর, থাকতে কদিন?
ভীষণ মনমরা ফ্রিজ, টিভি, এসিরাও।

অথচ দুদিন আগেই কোর্ট ডাক দিলে
অ্যাম্বুলেন্সে এনে দিত গণতন্ত্রের জ্বর।
ডাক্তারবাবু খসখস করে লিখতেন - "অবস্থা সঙ্গীন”,
আর টিভির বুমগুলো গুঁজে যেত পিছন পিছন। 

Uploaded Image

এখন ওনারা প্রাক্তন, হাজতে কড়িকাঠ গুনছেন...
ঘাঁটি গেড়েছেন কেউ বেসরকারি ঠিকানায়।  
পোড়াকাঠ চিরকাল নাক উঁচু, হেঁজিপেঁজিদের নাগালে আসেনা।
তবু, ঘরগুলো নিজেরাই অসুস্থ হয়ে গেল বলে!

'ওনাদের উডবার্ন নেই, বার্নল আছে।'

সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন ~ সৌপর্ন অধিকারী

Uploaded Image
Uploaded Image
Uploaded Image
Uploaded Image
সত্যিই কি পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে একাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে, নাকি মিথ্যা প্রচার দিয়ে সত্য চাপা দেওয়া হচ্ছে? 

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্র থেকে একে একে মুছে গেছে ডানলপ, হিন্দুস্তান মোটরস, জেসপ, এমএএমসি (MAMC) বা দুর্গাপুর সার কারখানার মতো বিশালাকৃতি একাধিক প্রতিষ্ঠান। সাধারণ প্রচারের ভাষায় এই সবকিছুর দায় শ্রমিকদের 'জঙ্গি আন্দোলনের' ওপর চাপানো হলেও, বাস্তব তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল সরকারি নীতি, প্রযুক্তির অভাব এবং মালিকপক্ষের অতি-মুনাফা লোটার কৌশলই ছিল এই বিপর্যয়ের মূল কারিগর। তার কয়েকটি নমুনা নিচে দিলাম।

 রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার পরিকল্পিত মৃত্যু ও কেন্দ্রের নীতি:

দুর্গাপুরের এমএএমসি (MAMC) বা হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজার (HFCL)-এর মতো সংস্থাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে কোনো শ্রমিক আন্দোলন দায়ী ছিল না। মূলত নব্বইয়ের দশকের পর কেন্দ্রীয় সরকারের বিলগ্নীকরণ নীতিই ছিল এর প্রধান কারণ। দুর্গাপুর সার কারখানাটি বন্ধের কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল—প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাব ও ন্যাপথা-ভিত্তিক প্রযুক্তির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়ে লোকসান হচ্ছে। আসলে এই কারখানা বন্ধের পিছনে ছিল অন্য গল্প— বেসরকারি কোম্পানিদের জায়গা করে দেওয়া। এমএএমসি (MAMC) বন্ধের পিছনেও এই একই কারণ ছিল।

কারখানা চালু রাখার দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন (MAMC-র দৃষ্টান্ত):

দুর্গাপুরের MAMC কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়ার বিপক্ষে দীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলন অনেকের জানা, অনেকের মতো সেই আন্দোলনের আমিও এক সাথী। কেন্দ্রীয় সরকার লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে এই বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থাটিকে বন্ধ করার তোড়জোড় শুরু করে, তার প্রতিবাদে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামে। কারখানাটি সচল রাখার দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই গড়ে তোলে এবং বিকল্প প্রস্তাব দেয় যাতে খনি শিল্পের আধুনিক যন্ত্রপাতির দেশীয় চাহিদা মেটাতে এই পরিকাঠামোকে কাজে লাগানো হোক। সরকার শ্রমিকদের দাবি পাত্তা না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়।

আসানসোলের হিন্দুস্তান কেবলস, রূপনারায়ণপুরের কেবল কারখানা বা আসানসোলের সাইকেল কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (Sen-Raleigh)-এর মতো কারখানাগুলো বন্ধের মূলে ছিল প্রযুক্তির বিবর্তন। পৃথিবী যখন ফাইবার অপটিক্সের দিকে এগোচ্ছিল বা আধুনিক ডিজাইনের সাইকেলের চাহিদা বাড়চ্ছিল, তখন এই কারখানাগুলো পুরনো প্রযুক্তিতে আটকে ছিল। ম্যানেজমেন্ট বা সরকার সময়মতো আধুনিক মেশিনে বিনিয়োগ না করায় কারখানাগুলো প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। শ্রমিকরা এখানে কাজ করতে চাইলেও তাদের হাতে দেওয়ার মতো কাজ ছিল না, অথচ প্রচার করা হয় শ্রমিক আন্দোলনের কারণেই এগুলো রুগ্ন হয়েছে।

খনি ও রেলের বেসরকারিকরণ—রাষ্ট্রের দায়বদল:

বর্তমানে খনি ও রেলের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে যে বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া চলছে, তা কোনো আন্দোলনের ফল নয়, বরং সুচিন্তিত সরকারি নীতি। ইসিএল (ECL)-এর বিভিন্ন খনি বা আসানসোল-রানিগঞ্জ অঞ্চলের কোল ব্লকগুলো ‘এমডিও’ (MDO) বা রাজস্ব ভাগাভাগি মডেলে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে রেলের উৎপাদন ইউনিট ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বেসরকারিকরণ করার ফলে স্থায়ী কর্মসংস্থান কমছে। এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যখনই শ্রমিকরা প্রতিবাদ করছেন, তখন তাকে "উগ্র আন্দোলন" বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ হস্তান্তরের কাজ নির্বিশেষে চলে এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলো মুনাফার বাজার দখল করতে পারে।

হিন্দমোটর: 

হুগলির উত্তরপাড়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী হিন্দুস্তান মোটরস (হিন্দমোটর) ২০১৪ সালে পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা না মিটিয়ে। মালিক পক্ষ আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ না করে এই ঐতিহ্যবাহী কারখানাটিকে রুগ্‌ণ করে তোলে। মাসের পর মাস শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রাখার প্রতিবাদে শ্রমিকরা আন্দোলন করলে, মালিক পক্ষে অশান্তির গল্প ফেঁদে নিজের দায় আড়াল করে। পরবর্তী সময়ে কারখানা পুনরুজ্জীবিত করার বদলে সেখানকার কয়েকশ একর জমি আবাসন প্রকল্পের জন্য শ্রীরাম গ্র্যান্ড সিটি কোম্পানিকে বেচে দেয়। যদিও ওই জমি শিল্প ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার ছিল বেআইনি। 

 কাঁচামাল ও বাজারের সমস্যা (চট ও বস্ত্র শিল্প):

হাওড়া ও হুগলির চটকল (Jute Mills) এবং মোহিনী মিলস, বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস-এর মতো বস্ত্র কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে মূলত সিন্থেটিক ফাইবারের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে এবং তুলোর জোগান ব্যাহত হওয়ায়। কাঁচামালের সংকটের সময় যখন মালিকপক্ষ লে-অফ ঘোষণা করেছে, তখন শ্রমিকরা কেবল তাদের ন্যায্য মজুরির দাবি জানিয়েছিল। সেই দাবিকে "উৎপাদন বিরোধী আন্দোলন" বলে চালিয়ে দিয়ে মালিকপক্ষ দায় এড়িয়েছে।

মুনাফা লোটার কৌশল ও অন্য রাজ্যে স্থানান্তর:

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মালিকপক্ষ পশ্চিমবঙ্গের কারখানাটি বন্ধ করে অন্য রাজ্যে উৎপাদন শুরু করেছে। ডানলপ (Dunlop)-এর সাহাগঞ্জ কারখানা বন্ধ থাকলেও পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় তাদের উৎপাদন চলছে। অতি সম্প্রতি তারাতলার ব্রিটানিয়া কারখানাটি "পুরনো" তকমা দিয়ে বন্ধ করা হলেও কোম্পানিটি মহারাষ্ট্র সহ অন্য রাজ্যে তাদের আধুনিক ইউনিটে উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছে। এর আসল কারণ শ্রমিক আন্দোলন নয়, বরং অন্য রাজ্যে নতুন সরকারি ভর্তুকি (Subsidy) ও কর ছাড়ের সুবিধা নিয়ে অধিক মুনাফা করা।

রিয়েল এস্টেট সিন্ডিকেট ও জমির বাণিজ্যিকীকরণ:

কলকাতার উষা ফ্যাক্টরি, বেঙ্গল ল্যাম্প বা শহরতলির অনেক চটকল ও বস্ত্র কারখানার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কারখানার জমির দাম উৎপাদনের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারখানায় অচলাবস্থা তৈরি করেছে যাতে শ্রমিকদের নাম দিয়ে কারখানাটি বন্ধ (Lock-out) করে দেওয়া যায় এবং পরে সেই বিশাল জমিতে আবাসন বা শপিং মল তৈরি করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লোটা যায়। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন বা পিএফ-এর ন্যায্য দাবিকে এখানে "জঙ্গি আন্দোলন" বলে অপপ্রচার করা করা হচ্ছে।

মালিকপক্ষের পলায়ন:

জেসপ (Jessop) বা উত্তরপাড়ার হিন্দুস্তান মোটরস-এর মতো কারখানার ক্ষেত্রে দেখা গেছে মালিকপক্ষ ব্যাংকের ঋণ বা শ্রমিকদের পাওনা না দিয়ে কারখানা ছেড়ে পালিয়েছে। যখনই শ্রমিকরা উপযুক্ত বেতনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে, মালিকপক্ষ তাকেই "শ্রমিক অসন্তোষ" হিসেবে চিহ্নিত করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। অথচ আসল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া।

পশ্চিমবঙ্গে কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে শ্রমিক আন্দোলনকে দায়ী করা আসলে একটি সুকৌশলী প্রচার। এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতা এবং মালিকপক্ষের মুনাফালোভী মানসিকতাকে আড়াল করা হয়। প্রকৃত তথ্য বলছে— রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার যে বৃহত্তর নীল নকশা, তা-ই ছিল এই শিল্প পতনের প্রধান কারণ। শ্রমিকদের প্রতিবাদ ছিল কেবল তাদের অস্তিত্ব ও উপযুক্ত মজুরি রক্ষার শেষ লড়াই।

উদ্বৃত্ত মূল্য ও শোষণ: মালিক কারখানা খোলেন জনসেবা বা চাকরি দেওয়ার জন্য নয়, বরং মুনাফা কামানোর জন্য। শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে যে সম্পদ উৎপাদন করে (Value), মালিক তাকে তার চেয়ে অনেক কম মজুরি দেয়। এই দুটির মধ্যে যে পার্থক্য, তাকেই বলা হয় উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value)। এই উদ্বৃত্ত মূল্যই মালিকের মুনাফা, যা আদতে শ্রমিকের শ্রমেরই অংশ।

মুনাফার শর্ত: যদি একজন শ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্যের পুরো মূল্যই মজুরি হিসেবে পেয়ে যেত, তবে মালিকের হাতে কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা 'লাভ' থাকত না। লাভ না থাকলে মালিক পুঁজি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতেন না। অর্থাৎ, পুঁজিবাদের কাঠামোই দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিকের শ্রমের একটি অংশ মালিকের পকেটে যাওয়ার ওপর।

 দায় চাপানোর কৌশল: যেহেতু মুনাফাই মালিকের আসল লক্ষ্য, তাই যখনই সেই মুনাফায় টান পড়ে (বাজারের মন্দা, প্রযুক্তির পরিবর্তন বা কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে), মালিক পক্ষ তা মেনে নিতে পারে না। তখন তারা হয় কারখানা বন্ধ করার ছুতো খোঁজে, অথবা শ্রমিকদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। আর এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা যখন নিজেদের হকের প্রতিবাদ করে, তখন সেই প্রতিবাদকেই "কারখানা বন্ধের কারণ" হিসেবে প্রচার করা হয়।

মালিকের 'ইচ্ছা' বনাম শ্রমিকের 'অধিকার': কারখানা বন্ধ করে অন্য রাজ্যে চলে যাওয়া বা জমি বিক্রি করে দেওয়া আসলে মালিকের সেই মুনাফা বাড়ানোরই একটি রূপ। যখন অন্য রাজ্যে কম মজুরিতে বা বেশি সরকারি সুবিধায় শ্রমিক পাওয়া যায়, তখন মালিকের "ইচ্ছা" সেখানেই চলে যায়। শিল্পের সংকট আসলে কোনো আন্দোলনের সংকট নয়, বরং এটি পুঁজির চরিত্রের সংকট। যেখানে মানুষের শ্রমের চেয়ে মালিকের মুনাফাই বড় হয়ে ওঠে।

শিল্পায়নের নামে এ রাজ্যে লুটের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৯০-এর দশকের পরে রাজ্যে অসংখ্য স্পঞ্জ আয়রন কারখানা গড়ে উঠেছিল, যার মধ্যে অনেকগুলি কিছুদিন পরেই আবার বন্ধ হয়ে যায়। এই কারখানাগুলো কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনের জেরে বন্ধ হয়নি। মূলত সরকারি ভর্তুকি, সস্তা বিদ্যুৎ ও খনি বরাদ্দের সুবিধা নিয়ে কারখানা গড়ে মালিকরা মুনাফা লুটে চম্পট দিয়েছে। ফলে না থাকল স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, না থাকল চাষযোগ্য জমি বা সুস্থ পরিবেশ। দুর্গাপুর ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চল এই 'লুটেরা শিল্পায়নের' বড় উদাহরণ। 

অন্য দুটি বিষয়
আইটি ও সিঙ্গুর নিয়ে দু-একটি কথা:

শিল্পের প্রসারে কেবল "সদিচ্ছা" থাকা বা বিরোধিতার অভাবই যথেষ্ট ছিল না, বরং বাজারের চাহিদা এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। নব্বইয়ের দশকে যখন আইটি বিপ্লব শুরু হয়, তখন বিশ্ববাজারের প্রয়োজন মেটাতে কয়েক লক্ষ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারই যথেষ্ট ছিল। ব্যাঙ্গালোর বা হায়দ্রাবাদের মতো গুটিকয়েক শহর থেকেই মালিকরা সস্তায় এবং সহজে প্রয়োজনীয় মেধার জোগান পেয়ে যাচ্ছিলেন। যেহেতু সীমিত সংখ্যক কর্মীর মাধ্যমেই কাজ উঠে যাচ্ছিল, তাই মালিকদের নতুন জায়গায় গিয়ে পরিকাঠামো তৈরির বাড়তি খরচ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

বর্তমানে 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' বা ইন্টারনেটের উন্নতির ফলে যখন দেখা যাচ্ছে বড় বড় অফিস মেইনটেইন করার চেয়ে বাড়ি থেকে কাজ করালে কোম্পানির খরচ আরও কমছে এবং মুনাফা বাড়ছে, তখনই কেবল কাজগুলো অন্য রাজ্যে বা ছোট শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। অর্থাৎ, আইটি হাব গুটিকয়েক শহরে সীমাবদ্ধ থাকা বা এখন তা ছড়িয়ে পড়া—দুটোই শ্রমিকের কর্মসংস্থানের চেয়ে মালিকের খরচ কমানো এবং উদ্বৃত্ত মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছে। মুনাফার এই অসম লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ ছাত্ররা; আইটিতে চাকরি পাওয়ার আশায় বাবা-মায়ের লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ডিগ্রি অর্জন করেও তারা আজ বাজারের চাহিদা না থাকায় বেকারের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। মালিকপক্ষের সীমিত নিয়োগের এই কৌশলে একদিকে যেমন উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি তৈরি হচ্ছে, তেমনি সস্তা শ্রমের বাজারে বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে মালিকরা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করছেন।

প্রসঙ্গ-সিঙ্গুর

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোটেই টাটা-বিরোধী নন, বরং তিনি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো টাটা-প্রেমী ও মালিকদরদি। টাটা গোষ্ঠী সিঙ্গুর ছাড়া অন্য কোথাও কারখানা করতে চায়নি, আর সিঙ্গুরের কৃষকরাও তাদের সোনার ফসল ভরা জমি ছাড়তে চাননি। উন্নয়নের গল্প ফেঁদে টাটার মুনাফার স্বার্থে কৃষক ও খেতমজুরদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ অন্যায় হতে যাবে কেন? তাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ ন্যায্য ছিল। সিঙ্গুরে মূলত এই জমি অধিগ্রহণ নিয়েই বিরোধ বাঁধে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূল কংগ্রেস কৃষকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে নিপুণভাবে সরকারি ক্ষমতা দখলে ব্যবহার করে।

যারা বলেন টাটা চলে যাওয়ায় কয়েক হাজার কর্মসংস্থান মার খেয়েছে, তারা সম্ভবত জানেন না যে টাটা থাকলে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ ভিটেমাটি ও জীবিকা হারাতেন। উচ্ছেদ হতো হাজার হাজার পরিবার, ধ্বংস হতো উর্বর চার-ফসলি জমি। আসলে সিঙ্গুরে টাটার কারখানা গড়ার পেছনে অন্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল। সেই প্রসঙ্গ এখন থাক। সিঙ্গুর থেকে টাটার কারখানা শেষ পর্যন্ত গুজরাটে গেল ঠিকই, কিন্তু সেখানেও মূল প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

স্বাস্থ্যসাথী নাকি আয়ুষ্মান ভারত ~ রোহিণী ধর্মপাল

ওরা আমরা ভাগাভাগি মোটামুটি শেষ। ভদ্র বাঙালির বৃহদংশ যা চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন। কী পেয়েছেন ক্যাশ ও কাইন্ড তাঁরা গুণে গেঁথে নেবেন, তাতে সন্দেহ কিছু নেই। কাল যিনি গ্যাস ডেলিভারি করতে এলেন, তিনি দরজা খুলতেই প্রায় প্রাণ বাঁচানোর মতন করে জয় শ্রীরাম বলে উঠলেন। চেনা লোক, এলে দুটো সুখ দুঃখের কথা হয়। কেমন আছেন, কী চলছে সব প্রশ্নের জবাব ওই জয় শ্রীরাম। তারপর সিলিন্ডার চেক করতে করতে দেখলাম ভারি নিচু গলায় বলছেন “স্বাস্থ্যসাথী আর মনে হয় না দেবে”।

বয়স্ক বাঙালি মেহনতি লোক, বলছেন স্বাস্থ্যসাথী আর মনে হয় না দেবে। বললাম, “ভাবছেন কেন? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আয়ুষ্মান ভারত করবেন।” ভদ্রলোক কী বুঝলেন কে জানে, আর এই নিয়ে কিছু বললেন না। শুকনো মুখে চলে গেলেন। ভাবলাম একটু লেখাপড়া করি।

স্বাস্থ্যসাথী নিয়ে এই একটা গুজগুজ চলছে। আয়ুষ্মান ভব আশীর্বাদ এসেছে। লোকজন স্বাস্থ্যসাথী পাচ্ছেন না, ফিরে আসছেন। আয়ুষ্মান ভারত আসছে, রাস্তায় আছে। 

আয়ুষ্মান ভারতের কথা একটু শোনা যাক। এই স্কিমের মাপকাঠি খুব উচ্চ পর্যায়ের। সে কাঠি তৈরি হয়েছে ২০১১ সালের ইউপিএ সরকারের Socio-Economic Caste Census, সংক্ষেপে SECC জরিপের ওপর ভিত্তি করে। 

গ্রামে থাকা পরিবারের জন্য ছয়টা “বঞ্চনার মাপকাঠি”:
কাঁচা দেওয়াল, কাঁচা ছাদের একটা ঘরে বাস
পরিবারে ১৬ থেকে ৫৯ বছরের কোনো সদস্যই নেই
১৬ থেকে ৫৯ বছরের কোনো পুরুষ সদস্য নেই
 পরিবারে অক্ষম সদস্য আছেন, কিন্তু সক্ষম কেউ নেই
তফসিলি জাতি বা উপজাতি পরিবার
ভূমিহীন, যাদের আয়ের বড় অংশ আসে দিনমজুরি থেকে

শহরের জন্য ১১টা পেশাভিত্তিক মাপকাঠি — রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ঘরের কাজের লোক, ফেরিওয়ালা ইত্যাদি।

এই তালিকায় নাম থাকলে আয়ুষ্মান ভারত পাবেন। না থাকলে পাবেন না। ওকে? এবারে কয়টি কথা। 

এই যোগ্য তালিকা ২০১১ সালে তৈরি হয়েছিল। মাঝের পনের বছরে কেউ গরিব হয়ে গেলে, গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে এসে অসংগঠিত শ্রমিক হয়ে গেলে, বিধবা হয়ে একা সংসার সামলাতে গেলে — তার নাম এই তালিকায় নেই, থাকার কোনো উপায়ও নেই। কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই সংসদে জানিয়েছে, এই তালিকায় নতুন পরিবার যোগ করার কোনো প্রস্তাব নেই।

কপাল যাবে সঙ্গে, আসুন তবে বঙ্গে।

পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। তখন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৪২ লক্ষ পরিবার, যাদের মধ্যে SECC-ভিত্তিক পরিবারও ছিল, RSBY (পুরনো কেন্দ্রীয় প্রকল্প) থেকে আসা পরিবারও ছিল, এবং রাজ্য সরকারের নিজস্ব তালিকার পরিবারও ছিল। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সার্বজনীন ঘোষণার পর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২.৫ কোটি পরিবারে — মোটামুটি ১০-১২ কোটি মানুষ, পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ।

তাহলে, আয়ুষ্মান ভারতের SECC মাপকাঠিতে বাংলায় কতজন পড়বেন?

আয়ুষ্মান ভারত SECC-যোগ্য: ১.১২ কোটি পরিবার আছেন পশ্চিমবঙ্গে। তাহলে বাদ পড়বেন প্রায় ১.৩ কোটি পরিবার, অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথীর প্রায় অর্ধেক।

যারা বাদ পড়লেন তারা কারা? এনারা ঠিক “গরিব” নন SECC-র সংজ্ঞায়। তাইলে কি এনারা “মধ্যবিত্ত”? বেসরকারি বিমা নিচ্ছেন? নাকি NITI Aayog যাদের বলে “missing middle” মাঝখানের সেই গর্তে পড়ে যাওয়া মানুষ।

এবারে একটু মেয়েমানুষ নিয়ে কথা হোক? 

স্বাস্থ্যসাথীর সরকারি রিপোর্ট (জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত) থেকে একটা চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় উপভোক্তা ছিলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা SHG-র সদস্যরা। ৮ লক্ষ ৬৬ হাজারেরও বেশি অ্যাডমিশন, ৮৯৩ কোটি টাকার ক্লেম মোট কভারেজের বিশাল অংশ।

এরা কারা? গ্রামীণ ও মফস্বলের মহিলারা, যারা ১০-২০ জন মিলে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। নিজেদের মধ্যে সামান্য টাকা জমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ নেন, ছোট ব্যবসা করেন। গরিব, কিন্তু SECC-র সংজ্ঞায় “যথেষ্ট গরিব” নন হয়তো, কারণ তাদের বাড়ি হয়তো পাকা, হয়তো পরিবারে একজন পুরুষ সদস্য আছেন।

পশ্চিমবঙ্গে SHG-র সংখ্যা সারা দেশে সবচেয়ে বেশি। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলায় DAY-NRLM-এর অধীনে ১১.৯২ লক্ষ SHG আছে, যা কিনা সারা দেশে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে বিহার (১০.৯৭ লক্ষ), তারপর অন্ধ্রপ্রদেশ (৮.৫৫ লক্ষ)। মহারাষ্ট্রে আছে ৬.৪০ লক্ষ SHG। প্রতিটা SHG-তে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য ধরলে, বাংলায় শুধু NRLM-ভুক্ত SHG সদস্যের সংখ্যাই ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৭৫ লক্ষের মধ্যে — এবং এর বাইরেও রাজ্য সরকারের নিজস্ব SHG কাঠামো আছে।
এই মহিলাদের বড় অংশ SECC তালিকায় নেই। কারণ SECC করা হয়েছিল ২০১১ সালে, SHG তার পরেও বিস্তৃত হয়েছে। এবং SECC-র মাপকাঠি মেলেনি অনেকের, পাকা বাড়ি আছে, স্বামী আছেন, জমি আছে অল্প। কিন্তু বড় অসুখে হাসপাতালে ভর্তি হলে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকি একই।
স্বাস্থ্যসাথী এই মহিলাদের আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, কারণ রাজ্য সরকারের কাছে তাদের তালিকা ছিল। আয়ুষ্মান ভারতে এই ক্যাটাগরির কোনো জায়গা নেই। সেই গর্তে পড়ে যাওয়া মেয়েমানুষ। 

এবার একটু ডবল ইঞ্জিন মহারাষ্ট্র দেখি। তারা যা করেছে, বাংলা যা করেনি। তুলনাটা দরকারি। 

মহারাষ্ট্রেও আয়ুষ্মান ভারত চালু আছে, কিন্তু সেখানে রাজ্য সরকার নিজের প্রকল্প — Mahatma Jyotirao Phule Jan Arogya Yojana বা MJPJAY বন্ধ করেনি। বরং দুটোকে একসাথে চালিয়েছে। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে মহারাষ্ট্রের সব পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় — SECC তালিকায় থাকুক বা না থাকুক। SECC-যোগ্যরা পাচ্ছেন MJPJAY + PMJAY মিলিয়ে ৫ লক্ষ। বাকি সবাই পাচ্ছেন শুধু MJPJAY-এ ১.৫ লক্ষ।
অর্থাৎ মহারাষ্ট্র “missing middle”-এর ওই গর্তে পড়ে যাওয়া মানুষদের সমস্যাটা স্বীকার করেছে, এবং রাজ্যের নিজস্ব খরচে আংশিক কভারেজ হলেও দিয়েছে।

বাংলায় কী হবে? রাজ্য বিধানসভায় জানা গিয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ২.৪৪ কোটি পরিবার-এ ৮.৭২ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসাথীতে এনরোল করেছেন।

স্বাস্থ্যসাথী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আয়ুষ্মান ভারত আসছে। রাজ্য সরকারের নিজস্ব কোনো পরিপূরক প্রকল্প থাকবে কিনা সেটা এখনও অস্পষ্ট। নতুন BJP সরকার ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যদফতরে নির্দেশ পাঠিয়েছে শুধু আয়ুষ্মান ভারত চালু করতে।

দূর দূর। এত নম্বর কপচিয়ে কী লাভ? এইসা উন্নয়ন হবে যে ঘরে ঘরে সবাই এলিট কর্পোরেট বাঙালি হয়ে সুইগি দিয়ে পবিত্র হিন্দু বিরিয়ানি হাঁকাবেন, চিন্তা কীসের?

তাহলে এই Zomato, Blinkit, Ola, Uber-এর হয়ে কাজ করেন যে ডেলিভারি কর্মী, চালক, সেই গিগ কর্মীদের কী হবে?
SECC তালিকায় এনারা নেই, কারণ ২০১১ সালে এই পেশাই ছিল না। ESI বা PF-এ নেই, কারণ তাঁরা “কর্মচারী” নন কোম্পানির দৃষ্টিতে, তাঁরা “পার্টনার”। ২০২৫ সালের বাজেটে ঘোষণা হয়েছে এদের আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় আনা হবে। বেশ। কেমন হয়েছে সেসব?

e-Shram পোর্টালে এখন পর্যন্ত সারা দেশে কার্যকরভাবে রেজিস্টার্ড হয়েছেন মাত্র প্রায় ৩ লক্ষ গিগ ওয়ার্কার। এ দেশের আনুমানিক ১ কোটি গিগ ওয়ার্কারের মধ্যে ৩ লক্ষ, অর্থাৎ ৩ শতাংশ। Aggregator-দের থেকে তথ্য সংগ্রহের কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেই, Social Security Fund-এ কোনো টাকা জমেনি। প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকাঠামো নেই।

NITI Aayog নিজেই বলছে, এরা “missing middle” — না গরিব, না মধ্যবিত্ত, কোথাও পড়েন না। গর্ত মশাই, গর্ত।

গাড়ি জনগণ ডেকেছেন। জনগণ ইঞ্জিন বেঁধেছেন। রাস্তার গর্তের দায় জনগণের কপালের মশাই, কপালের। নয়ত সরকারি রবীন্দ্র জয়ন্তী না হতে পারা নিয়ে হাহাকার চলছে, মিম মেটেরিয়াল নিয়ে হোহো হাহা চলছে, এই নিয়ে কেউ আর কপচায়? 

সিটবেল্ট বেঁধে বসুন, সামনে মিসিং মিডলের গর্ত থৈ থৈ করছে। 

তথ্যসূত্র: 
Swasthya Sathi Official Report (January 2021), 
Lok Sabha Unstarred Question No. 1524 (February 2023), 
DAY-NRLM Lok Sabha Q. No. 2884 (March 2025), 
PIB Press Release PRID 2039162, 
Maharashtra MJPJAY Government Resolution (July 2023), 
NITI Aayog Gig Economy Report (2022)

শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

রবীন্দ্রনাথ ~ অমিতাভ প্রামাণিক

১৯০৯ সালের শেষদিক। অগ্নিগর্ভ বাংলার আকাশ-বাতাস। আলিপুর বোমার মামলায় দুজনের ফাঁসির আদেশ শুনিয়েছে ব্রিটিশ বিচারক, সঙ্গে সাতজনের দ্বীপান্তর। কংগ্রেস লড়ে যাচ্ছে ভারতবর্ষের শাসনবিধি সংস্কারের উদ্দেশ্যে। ১৯০৬ সালে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে লিবারাল পার্টি। সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া হিসাবে ভারতে এসেছেন সেই পার্টির জন মর্লে। জন মর্লে ও ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর মর্লে-মিন্টো সংস্কারের ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় পরোক্ষ ভারতীয় প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হল, লর্ড সত্যপ্রসন্ন সিংহ নির্বাচিত হলেন প্রথম প্রতিনিধি। 

শীতের বিকেল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ইন্সটিট্যুট হলে আয়োজিত হয়েছে এক সঙ্গীতসভা। সেখানে সেতার বাজাবেন বিখ্যাত শিল্পী ইমদাদ আলি খাঁ, তাঁর বয়স একষট্টি। পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজপুত, পরে তারা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেন। ইমদাদের জন্ম আগ্রায়, ছোটবেলা কেটেছে এটাওয়ায়। বাবা শাহাবদাদ খাঁ খেয়াল গাইতেন, ছিলেন শখের সেতারশিল্পীও। বাবার কাছেই সেতারের প্রাথমিক পাঠ ইমদাদের, পরে বিখ্যাত বীণকার বন্দে আলি খাঁর কাছে তালিম নিয়ে এটাওয়ায় দীর্ঘ বারো বছর লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে একা একা সারস্বতসাধনা করে তৈরি করেছেন নিজস্ব বাদনরীতি। অন্যান্যরা যেখানে শাস্ত্রীয়বাদ্যে ধ্রুপদ ছাড়া ভাবতেই পারে না, তিনি সেখানে তাঁর শৈলিতে নিয়ে এসেছেন খেয়ালের বিচিত্র গুণাবলি। এই রীতিই পরে ইমদাদখানি ঘরানা নামে প্রতিষ্ঠিত হবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাকে বয়ে নিয়ে যাবে পুত্র এনায়েৎ খাঁ, পৌত্র বিলায়েৎ খাঁ ও অন্যান্যরা।   

সভাগৃহ পরিপূর্ণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর ছাত্রের সমাবেশ। এ সভায় সভাপতিত্ব করছেন আটচল্লিশ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ। প্রাথমিক ভাষণে তিনি অল্পকথায় শিল্পীর পরিচয় ও তাঁর বাদনরীতি সম্বন্ধে কিছু বললেন। এও বললেন যে, এদিনে এই কাজটুকুই তাঁর কর্তব্য। সভাস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে রেখে এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে সেতার পরিবেশন করলেন উস্তাদ ইমদাদ আলি খাঁ। 

নিয়ম অনুযায়ী এর পরই সভা ভেঙে যাওয়ার কথা। সভাপতি রবীন্দ্রনাথ মঞ্চে উঠে সভা-অন্তের ঘোষণা করতেই শুরু হল সভাস্থ ছাত্রসহ অনেকের দাবি, তারা রবিবাবুর গান শুনতে চায়। রবি আপত্তি জানালেন। তিনি সুস্থ নন, গলার স্বরও বসা। তাছাড়া তার মন এই মুহূর্তে ঠিক সঙ্গীতজগতে নেই। পুত্র রথীন্দ্রনাথ ফিরে এসেছে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করে, তিনি চান শান্তিনিকেতনে সেই-সংক্রান্ত নতুন কিছু শুরু করা। এই শাস্ত্রীয় সভায় ইমদাদ আলির মত শিল্পীর বাজনার পর তিনি কিছুতেই তার গান গাইতে রাজি নন। এই দুই সঙ্গীতের মেজাজও আলাদা। 

একদম সামনের সারিতে বসে ছিলেন বর্ষীয়ান স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় ভাইস-চ্যান্সেলর। তিনি রীতিমত জিদ করছিলেন রবি যেন একটা গান শোনান। রবির প্রত্যাখ্যান শুনে তিনি আহত হলেন, চেঁচিয়েই বললেন, ভাল গান করেন বলে আপনার এত অহঙ্কার। পাছে সেই অহঙ্কারে ঘা লাগে, তাই গাইতে চাইছেন না। 

স্যার গুরুদাস শুধু একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিই নন, বয়সেও তিনি রবির সেজদা হেমেন্দ্রনাথের বয়সী, রবির চেয়ে প্রায় সতের বছরের বড়। হেমেন্দ্র অবশ্য বহুকাল আগেই মারা গেছেন অকালে। এই তিরস্কারের পর গুরুদাসকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। 

মঞ্চে তখনও উপবিষ্ট উস্তাদজি। রবি প্রথমে একটা হারমোনিয়াম নিয়ে খানিকক্ষণ প্যাঁ-পোঁ করলেন। বোধহয় ঠিক করতে পারছিলেন না কী গাইবেন। তারপর উস্তাদজির দিকে দৃষ্টি যেতেই হারমোনিয়াম সরিয়ে খালি গলায় গাইতে শুরু করলেন – তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি ... 

সে সুরের আলো ভুবন ছেয়ে ফেলল, সে সুরের হাওয়া ছুটে চলল গগন বেয়ে। কোনো সঙ্গত নেই, সভাভঙ্গের নির্দেশও দেওয়া হয়ে গেছিল পূর্বেই, তবু সমস্ত শ্রোতারা এই গান শেষ হওয়া পর্যন্ত বসে রইল চিত্রার্পিতের মত। 

অমিতাভ প্রামাণিক
পঁচিশে বৈশাখ, ১৪২৬

---++---++---------++---------------++--------------++--------
বাংলা তেরোশো আটচল্লিশ সালের তেইশে বৈশাখ। আরও একটা জন্মদিন আসতে চলেছে। যেমন তেমন নয়, আশিতম জন্মদিন। শান্তিনিকেতনে নিজের ঘরে বসে রোগাক্রান্ত, অশক্ত রবি চঞ্চল হয়ে উঠলেন। সেই কত বছর আগে শুরু হয়েছিল তার জন্মদিন ঘিরে উৎসব। পরিবার ছাড়িয়ে সে অনুষ্ঠান ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠেছে। ব্রাহ্ম রবি মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী নন, শান্তিনিকেতনের আনাচে কানাচে কোথাও মহর্ষির একটা ছবি পর্যন্ত নেই, কিন্তু রবি তার জন্মদিন ঘিরে যে উচ্ছ্বাসের ঘনঘটা তৈরী হয় সেটা খুব উপভোগ করেন। নিজেই তৈরী করে নেন তার আবহ।

তার যখন সাতাশ বছর বয়স তখন ভাগ্নী সরলা প্রথম পঁচিশে বৈশাখের এক আনমনা ভোরে উপহার সহ তার পাদবন্দনা করে শুরু করেছিল এই ঘরানা। মেজোবৌঠান বিদেশ থেকে বিদেশী আচার অনুষ্ঠান ঘরে তুলে আনলে কী হয়, তিনি বা বিবি নয়, এ ব্যাপারে টেক্কা দিয়েছিল ন’দিদির মেয়েটা। পরের বছর থেকে এর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন ধর্মপত্নী মৃণালিনী। কত বছরই বা সে এসব করে যেতে পারল? 

নিজের জন্মদিনে রবি প্রথম গান লিখেছিলেন যখন তাঁর বয়স আটতিরিশ। তেরোশো ছয় সালের পঁচিশে বৈশাখে তিনি নিজের রচনা নিজেই গেয়েছিলেন – ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও হে। বিয়াল্লিশ বছর পেরিয়ে গেল তার পর, এর পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই নিজের জন্মদিন উপলক্ষে রবি কবিতা বা গান রচনা করেছেন, আবৃত্তি করেছেন, নিজে গেয়েছেন, অন্যকে শিখিয়ে দিয়ে গাইয়েছেন। আর কতদিন তা করে যেতে পারবেন, তা নিয়ে প্রবল সংশয় দেখা দিয়েছে এখন। শরীর চলতে চায় না। দর্শনধারীদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না, তারা দরজা থেকে ফিরে যায়। লেখালিখি করার মত শক্তিও নেই প্রায়। ব্যক্তিগত সচিব অনিলের স্ত্রী রাণী তাঁর পরিচর্যা করেন, তিনি মাঝে মাঝে রাণীকে মুখে মুখে কবিতা বলে যান, রাণী তা খাতায় লিখে নেয়, পড়ে শোনায়। রবি বলে ওঠেন, না না রাণী, ঐ জায়গাটা ঠিক হল না, এই শব্দটা বদলে দিয়ে এটা লেখো তো। আবার শোনাও। আশি বছর বয়সেও তাঁর নিজের লেখা নিয়ে খুঁতখুঁতুনি গেল না। 

দরজায় টোকা পড়ল। ভাবলেন রাণী এসেছে বুঝি। না, এ তো শান্তিদেব। গরমের ছুটি থেকে সদ্য ফিরেছে শান্তিনিকেতনে একত্রিশ বছরের তরুণ। দেখা করতে গেছে গুরুদেবের কাছে। প্রণাম সেরে শরীরের কুশল নেবার জন্য জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই রবি বললেন, শান্তি, আর একটা পঁচিশে বৈশাখ এসে গেল। তোরা এবার কিছু করবি না? 

শান্তিদেব বললেন, ও মা, করব না কেন? অন্যবার যা যা করা হয়, সবই করব। আমি তো ছিলাম না, এই এসে পৌঁছালাম, দেখি খবর নিই।

শান্তিদেবেরও জন্মদিনও পঁচিশে বৈশাখেই!

পরদিন সকালে শান্তিদেব এসে অনুযোগ করলেন, আপনি এবার কোনো গান লেখেননি? 
রবি বললেন, গান? তুই তো এক অদ্ভুত ফরমাশ এনে হাজির করলি রে, শান্তি। আমার জন্মদিনে আমি নিজে গান লিখব, সুর দেব, গাইব, লোকে শুনলে বলবে কী? বুড়োটা নিজের ঢাক পিটিয়ে যাচ্ছে! 
শান্তিদেব বললেন, না, না, তা কেন বলবে?
রবি বললেন, বলে না বুঝি? তুই এক কাজ কর। এখানে এত বড় বড় কবি সুরকাররা সব রয়েছে, ওদের বল না লিখতে, সুর দিতে।

শান্তিদেব চুপ করে রইলেন, বোঝাই গেল প্রস্তাবটা তার মনঃপূত হল না। 
রবি আবার বললেন, কেন, তুই কি ভাবিস এরা কবিতা লিখতে পারে না? গানে সুর দিতে পারে না? যা না, চা না গিয়ে ওদের কাছে –
শান্তিদেব বললেন, আপনি থাকতে অন্যদের কাছে যাব, এ হয় নাকি? কেন, এতদিন ধরে আপনি যে নিজের জন্মদিনে কবিতা লিখলেন, গান বানালেন, কেউ কি আপনার দোষ ধরেছে? ওসব হবে না, আপনাকেই করতে হবে। 

রবি হাসতে লাগলেন। ভক্তের অর্ঘ্য নিতে তার কার্পণ্য নেই। এরা তাঁর নিজের ছাত্রই, পুত্রসম। এরা আবদার করবে না তো কারা করবে? বললেন, এক কাজ কর তবে শান্তি, এখন আর নতুন কবিতা লেখার শক্তি নেই। সময়ই বা কোথায়? তুই যা, দপ্তর থেকে আমার পুরনো কবিতাগুলো নিয়ে আয় দেখি, যেগুলো আগের জন্মদিনে লেখা। অনিল জানে, ও সব গুছিয়ে রেখেছে নিশ্চয়। ওকে গিয়ে বলগে।

এসে গেল আগের জন্মদিনগুলোতে লেখা কবিতার রাশি। রবি একটার পর একটা উলটে যেতে লাগলেন। স্থির হলেন যে কবিতাটায় গিয়ে, সেটা লিখেছিলেন তেরোশো ঊনত্রিশ সালে, উনিশ বছর আগে। 'পূরবী' নামে তার কবিতার বইটাতে এই কবিতাটা স্থান পেয়েছে, রবি এর নাম দিয়েছিলেন ‘পঁচিশে বৈশাখ’। তার শুরুটা এমন – 

রাত্রি হল ভোর। 
আজি মোর
জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,
প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি
হাতে করে আনি
দ্বারে আসি দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।  

নিজের লেখা পড়তে পড়তে রবি আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। শেষের স্তবকে লিখেছিলেন – 

হে নূতন,
তোমার প্রকাশ হোক কুজ্ঝটিকা করি উদ্‌ঘাটন
সূর্যের মতন।
বসন্তের জয়ধ্বজা ধরি
শূন্য শাখে কিশলয় মুহূর্তে অরণ্য দেয় ভরি –
সেই মতো, হে নূতন,
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
ব্যক্ত হোক তোমা-মাঝে অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়।
উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।
মোর চিত্তমাঝে
চির-নূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।

থমকে গেলেন রবি। বললেন, এই কটা লাইন একটা আলাদা কাগজে লিখে দে তো। সেই নকলের ওপর নিজে এবার কলম চালাতে লাগলেন। 'কুজ্ঝটিকা' কেটে লিখলেন 'কুহেলিকা'। কেটে দিলেন পরের তিনটে লাইন। হে নূতন-এর পর কবিতাটার আগের স্তবক থেকে একটা লাইন তুলে লিখলেন কাঁপা কাঁপা হাতে – দেখা দিক আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ। 'অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়' কেটে লিখলেন 'অসীমের চিরবিস্ময়'। উদয়দিগন্তের পর ‘ওই’টা কুচিকুচি করে কেটে দিলেন। কাটাকুটির মধ্যেই চলতে লাগলো নিজের মনে গুনগুনানি। সুর বসছে কলিতে, ভৈরবীতে। শান্তিদেবকে বললেন, নে নে শান্তি, স্বরলিপি করে ফেল এক্ষুনি। কখন আবার ভুলে যাব, মনে থাকে না আজকাল আর কিচ্ছু।

সে এক সময় ছিল, ডাকারও দরকার হত না, ছুটে আসত বিবি, সরলা, দিনু। আজ কাছেপিঠে তারা কেউ নেই। রবির গানের স্বরলিপি লিখে নিলেন শান্তিদেব। 

পরদিন প্রভাতে আশ্রমের কলকাকলি ভেদ করে বেজে উঠলো আশ্রমিকদের গলায় রবির জন্মদিনের গান –

হে নূতন,
               দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।।
               তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদ্‌ঘাটন 
                              সূর্যের মতন।
               রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
                        ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
               ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।
               উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে, মোর চিত্তমাঝে
                       চিরনূতনেরে দিল ডাক 
                             পঁচিশে বৈশাখ।।

এটাই রবির সুর দেওয়া শেষ গান। এর সুর দেওয়ার ঠিক তিন মাস পরে এক ঝরো ঝরো বাদলের শ্রাবণদিনে জোড়াসাঁকোয় তাঁর নিজস্ব বাসভবনে শরীরে অস্ত্রোপচারোত্তর ব্যাধিতে কাতর রবি অমর্ত্যলোকে যাত্রা করেন। পেছনে পড়ে থাকে সুদীর্ঘ তেষট্টি বছর ধরে লেখা আর সুর দেওয়া তার দু’হাজার গানের গীতবিতান। 

কান পাতলে শোনা যেত, সে দিনের অবিরল বারিধারা ছাপিয়ে কোথায় বেজে উঠছে অসহ বিরহের গান। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে লিখেছিলেন রবি, সুর দিয়েছিলেন তার পাঁচ বছর পরে – তবু মনে রেখো, যদি দূরে যাই চলে ...

পঁচিশে বৈশাখ, ১৪২২

শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

নির্বাচনের পাঁচালি ~ শুভাশীষ মোদক চৌধুরী

।। নির্বাচনের পাঁচালি ।।
শুভাশীষ মোদক চৌধুরী 

আমি চুরি করি মাথা উঁচু করে,
তোদেরকে ডাকি - ভিক্ষে নে!
কালি দিতে পারি সাদা বস্তরে... 
বলি - কোনো কিছু শিখতে নেই!

DA বা কয়লা, নারদা, সারদা,
গরু বা ত্রিপল, চালের রেট
বাঁধা আছে সব। জনগণ গাধা -
আমি কবি, আমি ডক্টরেট!

ঢাক পিটি - আমি সততার মাথা,
আর তুই ভাজ আলুর চপ। 
উন্নয়নের কোটি কোটি টাকা 
বিছানার নিচে? অসম্ভব!

আমি ভিকটিম, ভিকটিম আমি!
যদিও বাচ্চা মেয়েটা খুন...
চাকরি বিক্রি? রেপ? কাটমানি?
বারো-আনা পেলে সব মকুব।

ছাত্ররা মরে মিছিলেতে গিয়ে,
ডাক্তার মরে, সে ছিল সৎ ...
শিক্ষক ঝোলে কড়িকাঠ থেকে - 
পোড়ে মজদুর, সেও আপদ।

আমি সুখে আছি, তোরাও বাঁচবি
চপ ভেজে ভেজে, চটি চেটে।
মোচ্ছব পাবি, আড়ালে বেচবি
মেরুদন্ডটা - নেড়ে ঘেঁটে।

সোনার রাজ্যে বিষ ঢেলে ঢেলে
বানিয়েছি এক মহাশ্মশান।
চুনোপুঁটিগুলো যেতে পারে জেলে,
আমাকেই তোরা আবার আন ।।

Uploaded Image

বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

আর এস এসের ইতিহাস নির্মাণ ~ অরিজিৎ মুখার্জী

এই হিন্দুত্ব কখনওই সম্পূর্ণ হবে না যতক্ষণ না ইতিহাসকে নতুন করে লেখা হবে। একশো কোটি হিন্দুকে টুপি পরাতে গেলে তো সেইটা লাগবে, হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে যে ইতিহাস পড়ানো হবে, প্রমোট করা হবে...তো সেইটা একটু বলা দরকার।

আরএসএসের কাছে ইতিহাস প্রমাণ বা যুক্তিনির্ভর বিষয় নয়। কোনোদিনই ছিল না। ইতিহাস ওদের অস্ত্র, আর এটা শুধু আরএসএস বলে নয়, পৃথিবীর যে কোনও স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির ক্ষেত্রেই সত্যি। অরওয়েলের ১৯৮৪ যদি পড়ে থাকেন (না পড়ে থাকলে অবশ্যই পড়বেন) সেখানে দেখবেন একটা কথা রয়েছে - "Who controls the past controls the future. Who controls the present controls the past" - স্বৈরতন্ত্রের কনটেক্সটে এই কথাটার মানে বোঝা অত্যন্ত জরুরী। ইতিহাসকে ওয়েপনাইজ করা গেলে অতীতের সেই ওয়েপনাইজড ন্যারেটিভকে ব্যবহার করে আপনি ভবিষ্যতের ন্যারেটিভ নির্মাণ করতে পারবেন, আপনার চাহিদামাফিক। আর, অতীতকে বদলে লিখতে গেলে, আপনার হাতে বর্তমানে ক্ষমতা থাকা চাই। আর ঠিক এইটাই এখন অফিশিয়ালি হচ্ছে। প্রায় একশো বছর ধরে যার পরিকল্পনা ছকা হয়েছে আরএসএসের দপ্তরে। আমরা যখন ফুটনোট আর ইতিহাসের বিভিন্ন পিরিয়ড ভাগ করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, সেই সময়ে সঙ্ঘ ইতিহাস তৈরী করার একটা প্যারালাল কাঠামো বানিয়ে ফেলেছিল - সরস্বতী শিশু মন্দির, বিদ্যাভারতী, আরএসএসের শাখা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মন্দিরের চৌহদ্দি পেরিয়ে এসে সেই কাঠামো এখন গিলে ফেলেছে আমার আপনার স্মার্টফোনকেও। উদ্দেশ্য - অতীতকে বোঝা নয়, বরং একটা "হিন্দু কমন সেন্স" তৈরী করা যেটা একশো কোটি হিন্দুর মাথায় এমনভাবে গেঁথে যাবে যাতে কোনও যুক্তি, দলিল, নথি বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও তাকে নড়াতে পারবে না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, এই টেকনিকটা দিব্যি কাজ করছে। প্রমাণ পাওয়া যায় সমাজমাধ্যম আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে থাকা জঞ্জালের মধ্যে...যেগুলোকে ইতিমধ্যেই "ইতিহাস" বলে নর্মালাইজ করা হয়ে গেছে।

বছরকয়েক আগে, এরকমই একটা অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলাম – পরিচিত একজন, বাস্তবে উচ্চশিক্ষিত, যথেষ্ট সিন্সিয়ার গবেষক - অথচ সাই দীপকের ইউটিউব ভিডিও "হিস্টরি, আইডেন্টিটি, ইন্ডিয়া" আর সঞ্জীব সান্যালের ইউটিউব ভিডিও "হাউ মাচ অফ ইন্ডিয়ান হিস্টরি ইজ রিয়েলি ট্রু" দেখেই সে মেনে নিয়েছে ভারতের ইতিহাস আমরা যা জানি, যা বলি, সব মিথ্যে, এই দুজনই নাকি আসল "ঐতিহাসিক"। সাই দীপক পরিচিত আরএসএস অ্যাক্টিভিস্ট, সুপ্রীম কোর্টের উকিল, যিনি শবরীমালায় মেয়েদের ঢুকতে দেওয়ার বিরুদ্ধে মামলা লড়েন। সঞ্জীব সান্যাল অর্থনীতিবিদ, ভারত সরকারের কী একটা উপদেষ্টা, তাঁর একমাত্র ক্রেডিবিলিটি এইটুকুই যে তিনি শচীন্দ্রনাথ সান্যালের বংশধর, আর শচীন্দ্রনাথ সান্যাল বিপ্লবী ছিলেন, আন্দামানে বন্দীও ছিলেন। একজন গবেষকের যে মানসিকতায় সে স্টেট অফ দি আর্টের পেপার খুঁজে পড়ে, ইতিহাসে ক্ষেত্রে কিন্তু সে সেই প্রশ্ন করার মানসিকতা ব্যবহার করেনি। রিসার্চের ভাষায় বলতে গেলে, ডীপ লার্নিং নিয়ে গুগলের ডীপ মাইন্ড বা স্ট্যানফোর্ড থেকে NeurIPS বা IJCAI-এ বের হওয়া পেপার ছেড়ে অ্যামিটি আর লাভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটির সন্দেহজনক প্রিডেটরি জার্নালে পাব্লিশ করা পেপারের ওপর ভরসা করেছে। কারণ এদের দাবীগুলোর সাথে নিজের সাবকনশাসে থাকা ধ্যানধারণা মিলে গেছে। নিজের অপূর্ণ কিছু ইচ্ছে বা না পাওয়ার হতাশার জন্যে কাউকে দায়ী করার জন্যে লোক খুঁজে পেয়ে গেছে। নিজেকে ভিক্টিম হিসেবে ভাবছে আর সেইটাই দেখানোর চেষ্টা করছে। এইটাই সঙ্ঘের ইতিহাস নিয়ে পরিকল্পনার সাফল্য।

এই ইতিহাস তৈরীর কিছু নমুনা দিলেই বুঝতে পারবেন কী বলতে চাইছি; সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঠিক কী কী ঘোরে ইতিহাসের নামে...স্কুল ও কলেজ শিক্ষকদের, এবং তাঁদের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের ঠিক কী শেখানো হয়, তারও...

সরকারের পয়সায়, দিল্লী ইউনিভার্সিটিতে কলেজ শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন কোর্সে, আরএসএসের "মার্গদর্শক" লজ্জা রাম তোমর গম্ভীরভাবে আউড়ে গেলেন [১] - আলোর গতিবেগ নির্ণয় করা হয়েছিল ঋগ্বেদেই; ব্রিটিশরা নাগপুর দখল করার পর টানা ছ'মাস ধরে সেখানে নদীগুলোতে জলের সঙ্গে বয়ে গেছিল গলা সোনা; প্যারিসে তৈরী হয়েছে মনু-র মূর্তি এবং তার নীচে ফলকে লেখা রয়েছে "বিশ্বের প্রথম আইনপ্রণেতা"; শুধুমাত্র পবিত্র অশ্বত্থ গাছ আর তুলসীগাছই অক্সিজেন উৎপন্ন করে; নাসার বিজ্ঞানীরা সূর্যের মুখ থেকে "ওম" শব্দ শুনতে পেয়েছেন।

সার্কাস নয়, স্ট্যান্ড আপ কমেডিও নয়। একদম সরকারি পয়সায় আয়োজিত রাষ্ট্রপোষিত অ্যাকাডেমিক ইভেন্ট। এক্সপেকটেশন হল হবু কলেজ শিক্ষকরা এইগুলোকেই ইতিহাসের শিক্ষা বলে আত্মস্থ করে নেবেন। বিশ্ব বিজ্ঞান সম্মেলনে গণেশের মাথাকে আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারির নমুনা হিসেবে দেখানো এই কর্মকান্ডেরই ফসল।

১৯৭৩ সালে আরএসএস-এর তৈরী অখিল ভারতীয় ইতিহাস সংকলন যোজনা (ABISY) নামের এক বিশেষ ঐতিহাসিক গবেষণা শাখার পত্রিকা "ইতিহাস দর্পণ" নিজেকে ফুটনোট, রেফারেন্স আর চকচকে ম্যাপওয়ালা সিরিয়াস স্কলারলি জার্নাল হিসেবে দেখায়। কিন্তু এর যে কোনও একটা সংখ্যা খুললেই আপনি ঢুকে যাবেন পুরাণ ও কল্পনার জগতে। প্রথম পাতায় হেডগেওয়ার আর গোলওয়ালকরের ছবি। পাশে গণেশের লোগো। প্রবন্ধগুলো প্রায় সবই এমন লোকজনের লেখা যাদের সঙ্গে কোনও বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনও যোগাযোগ নেই। এবং সম্পূর্ণ র‍্যান্ডম দাবিদাওয়া ভর্তি সব লেখা। ইংরিজীতে লেখা প্রবন্ধে নানান অ্যাকাডেমিক প্রচেষ্টা দেখানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সবই ফাঁকা বুলি। যেমন, ২০১৬ সালের এপ্রিলে, কোনও এক মহাবীর প্রসাদ জৈনের প্রবন্ধ, A Brief Survey of the Politics of Indian Historiography-তে রেফারেন্স হিসেবে লেখা রয়েছে - "a large number of articles available on various websites" - সমস্যা হল, এই সাইটেশনের কোনও মূল্যই নেই ইতিহাসের চর্চায় [২]। আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে ইতিহাস দর্পণের প্রতিটি সংখ্যায়। যেমন, জনৈক অরুণ কুমার লেখেন যে আধুনিক বিজ্ঞানের উৎস বেদ। রেফারেন্স? নেই [৩]। যেমন, জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে মনুস্মৃতি প্রতিনিয়ত বাস্তবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া উপকারী "সামাজিক বিধান"; কিন্তু সজ্ঞানে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে যে সেই মনুস্মৃতিই বেদপাঠ শুনে ফেলা শূদ্রের মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়, বা মেয়েদের চিরদাসীত্বের বিধান দেয় [৪]।

ইতিহাস নয়। কালাজ্বরের মত "গেরুয়াজ্বর"-এর ঘোরে দেখা স্বপ্ন।

সবচেয়ে বীভৎস বিকৃতিগুলো বরাদ্দ রাখা হয়েছে মুসলমানদের জন্যই। সাভারকার - সঙ্ঘের আদর্শের উৎস - লিখেছিলেন যে, মুসলমান আক্রমণকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে উগ্র এবং পৈশাচিক ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষাই বেশি ছিলঃ "a fierce religious ambition many times more diabolic than their political one" - যদিও, ইতিহাসে এমন কোনও প্রমাণ নেই যা দিয়ে বলা যায় যে মধ্যযুগে আক্রমণকারী মুসলমানদের মধ্যে শুধুই ধর্মীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাই, রাজ্য বা এলাকা দখল এবং তার ফলে রাজস্ব বাড়ানোর কোনও আকাঙ্ক্ষা ছিল না। "সিক্স গ্লোরিয়াস ইপক্‌স" বইয়ে সাভারকর খোলাখুলিভাবে মুসলমানদের মোকাবিলায় তাদের মেয়েদের অপহরণ ও ধর্শণের নিদানও দিয়ে রেখেছেন; সাভারকরের কথা অনুযায়ী শিবাজির উচিত ছিল শিভালরি না দেখিয়ে ঠিক এই কাজটিই করা। না, এগুলো কোনও অখ্যাত বইয়ের ফুটনোট নয়; সাভারকর - যাঁকে আরএসএস "বীর সাভারকর" বলে অভিহিত করে, যাঁর মূর্তি বিভিন্ন স্কুলে শোভা পায়, যাঁর নামে সেলুলার জেলের নতুন নামকরণ করা হয় (সে তিনি খান পাঁচেকবার ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যে মুচলেকা লিখে থাকলেও), যাঁর আদর্শ আরএসএসের শাখায় শেখানো হয় - এই কথাগুলো সেই সাভারকরের নিজের লেখা। আরএসএস আজ অবধি এই কথাগুলোর একটাকেও রিফিউট করেনি।
Uploaded Image


আরএসএসের এই ইতিহাসকে নতুন করে লেখার প্রসেসটা খুবই সরল। আগে সমস্ত জটিলতা মুছে ফেলো, সূক্ষ্ম ফারাকগুলোকে এড়িয়ে যাও, আর সমস্ত অ্যানালিসিসকে বদলে দাও বিদ্বেষের মুখস্থ বুলি দিয়ে। বিদ্যাভারতীর স্কুলে বাচ্চারা ইতিহাস শেখে না; বরং ক্যুইজের ধাঁচের কিছু উত্তর মুখস্থ করে, যাকে ভারতীয় ঐতিহ্য হিসেবে চালানো হয়। যেমন, "কোন স্বৈরাচারী শাসক গুরু গোবিন্দ সিংহের দুই ছেলেকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন"? উত্তর হল, "ঔরঙ্গজেব"। এখানে মুঘল রাজনীতির প্রেক্ষাপট নেই, শিখ আর মুঘলদের সংঘাতের আলোচনা নেই, এবং বইয়ে এও লেখা নেই যে সেই নরপিশাচ ঔরঙ্গজেবই তাঁর আগের যে কোনও শাসকের তুলনায় অনেক বেশি হিন্দুকে নিজের প্রশাসনের উঁচু পর্যায়ে নিয়োগ করেছিলেন। ইতিহাস যে শুধুমাত্র সাদায় কালোয় কিছু ঘটনা নয়, বাইনারি সিস্টেম নয়, তার মধ্যে অনেক জটিলতা, অনেক নুয়ান্স লুকিয়ে থাকে, সেসব ভুলে গিয়ে আর ভুলিয়ে দিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের মাথায় গেঁথে দেওয়া হয় যে ঔরঙ্গজেব আসলে এক ভিলেন, প্রায় দানব, যাতে সেই নামটা শুনলেই বাচ্চাদের মনে কিছু জানার ইচ্ছের বদলে শুধুমাত্র একটা তীব্র ঘৃণা তৈরী হয়। বিদ্বেষের চাষ হয় এইভাবেই - একটার পর একটা বিচ্ছিন্ন কনটেক্সটবিহীন তথ্যের মাধ্যমে।

ভারতকে সেই প্রাচীন স্বর্ণযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আরএসএস ঐতিহাসিক টাইমলাইনকে পিছিয়ে দেয়। আসলে যাঁরা আর্কিওলজিস্ট, তাঁদের পরিচিত কোনও পদ্ধতি ছাড়াই আরএসএস "প্রমাণ" করে দেয় যে হারিয়ে যাওয়া সরস্বতী নদী বাস্তবে সত্যিই ছিল, আর তাই বেদও ঐতিহাসিকভাবে একবারে সঠিক। বাস্তবে, বিভিন্ন আধুনিক উপায়ে (স্যাটেলাইট ইমেজিং ইত্যাদি) ঘগ্‌গর-হাকরা নামের এক বহুপ্রাচীন নদীখাতের সন্ধান পাওয়া গেছে - কিন্তু ঐতিহাসিক এবং আর্কিওলজিস্টদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে যে সেই নদীখাতই বেদবর্ণিত সরস্বতী কিনা। ব্রিটিশ ওরিয়েন্টালিস্টদের আনা Aryan Invasion Theory ষাটের দশক থেকেই বদলে গেছে Aryan Migration Theory-তে, এবং এটা হয়েছে নতুন করে খুঁজে পাওয়া ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতেই। এবং খুব রিসেন্টলিই, আধুনিক পদ্ধতিতে প্রাচীন মানুষের শরীরের ডিএনএ অ্যানালিসিস প্রমাণ করেছে যে এই ডিএনএ নির্ভর অ্যানালিসিসের দেওয়া মাইগ্রেশনের সময়কাল আর আগেকার ভাষাভিত্তিক অ্যানালিসিসের ভিত্তিতে দেওয়া মাইগ্রেশনের সময়কাল প্রায় মিলে যায়, এবং সেদিক থেকে দেখলে মাইগ্রেশন (স্পেসিফিকালি, একাধিক মাইগ্রেশনের ওয়েভ) থিওরিই সঠিক [৫,৬,৭]। আরএসএস পোষিত ঐতিহাসিক এবং আর্কিওলজিস্টরা ঠিক এর উল্টোটাই প্রমাণ করতে চান - যে আর্য্যদের উৎপত্তি ভারতে, এবং ভারত থেকেই এই জনগোষ্ঠী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছিল, এবং এর জন্যে বৈজ্ঞানিক দলিলের ভুল ইন্টারপ্রিটেশন দিতেও এঁদের আটকায় না। 

আরএসএস মহাভারত, শঙ্করাচার্য্য, এমনকী বুদ্ধের সময়কালকেও এমন একটা অসম্ভব অতীতে ঠেলে দিয়েছে যেটা যে কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের সময়েরও অনেক আগের। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে এরা আনতে চায় "কলিযুগাব্দ" বা কলিযুগ-ভিত্তিক ক্যালেন্ডার - পুরাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক কাল্পনিক ক্যালেন্ডার। ভারতের ইতিহাস নিয়ে আরএসএসের যে বহুখন্ডের বইয়ের কাজ চলছে, সেখানে পুরাণে বর্ণিত বংশতালিকাকেই প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ধরে নিয়েছে। মুছে দিয়েছে পৌরাণিক উপকথা আর আসল ইতিহাসের মধ্যের সীমারেখা। এমনভাবে, সজ্ঞানে, যাতে এই ইতিহাস যারা পড়বে তাদের কাছে উপকথা আর ইতিহাসের তফাত থাকবে না, মধ্যযুগের যে কোনও অহিন্দু তার কাছে হয়ে উঠবে পৌরাণিক কাহিনীর দানব, রাম-রাবণের যুদ্ধকে সে দেখবে মধ্যযুগের কোনও সুলতানের আক্রমণ হিসেবে।

বৌদ্ধধর্মও ছাড় পায়নি সঙ্ঘের সর্বগ্রাসী ঘৃণার হাত থেকে। সাভারকরের বয়ানে, বৌদ্ধরা কোনও মহৎ ঐতিহ্যের ধারক নয়, বরং তারা ছিল হিন্দু ধর্মের মধ্যে এক "পঞ্চম বাহিনী" - হিন্দু জাতিকে দুর্বল এবং নপুংসক করে দেওয়ার দায় তাদেরই। সম্রাট অশোকের ধর্মান্তর সাভারকরের ভাষায় হিন্দুদের জন্যে মহাবিপর্যয়; বরং বৌদ্ধদের ওপর চরম অত্যাচার চালানো পুষ্যমিত্র শুঙ্গ সাভারকরের প্রশংসার পাত্র, কারণ সেই অত্যাচার সাভারকরের মতে ছিল "গুরুতর রাষ্ট্রদ্রোহের উপযুক্ত শাস্তি"। আর এই চলমান ঘৃণার নিদর্শন পাওয়া যায় আধুনিক যুগেও, ২০১৭ সালে বিজেপির তৎকালীন মন্ত্রী অনন্তকুমার হেগড়ের টুইটেঃ "If not for Buddhism, we would have had an Akhand Bharat" [৮]। সঙ্ঘের ডিকশনারিতে শান্তি মানে দুর্বলতা, করুণা মানে রাষ্ট্রদ্রোহ। একমাত্র মনে রাখার মত ইতিহাস হল যুদ্ধের ইতিহাস, যেখানে হিন্দুরাজার যুদ্ধে জেতার কথা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আরএসএস শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকেই থেমে নেই। ক্রমশঃ ইতিহাসের গবেষণার একদম সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানেও ঢুকে গেছে এই ভয়ানক ভাইরাস। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চকে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে আরএসএসের কর্মকর্তাদের দিয়ে। ২০১৪ সালেই চেয়ারপার্সন করা হয় ABISY প্রধান সুদর্শন রাওকে, তারপর থেকে আরএসএস ঘনিষ্ঠদেরই বসানো হয়েছে এই পদে। এখন সরকারি এজেন্ডা হল ইতিহাসের "ভারতীয়করণ" - ইতিহাসে শুধু থাকবে হিন্দু অতীতকে মহিমান্বিত করা ঘটনাসমূহ, বাকি সব মুছে ফেলা হবে। দরকারে, আবিষ্কৃত হবে নতুন নতুন "হিন্দু শেকড়"। দিল্লী থেকে দূরে, হিমাচল বা উত্তরাখণ্ডের আদিবাসী এলাকার গ্রামে, ABISY-এর লোকজন স্থানীয় লোককথা খুঁজে বের করে সেগুলোকে কো-অপ্ট করে হিন্দুত্বের মধ্যে। হিমাচল প্রদেশের কুলু-তে, আরএসএস সমর্থক এবং এককালের রাজাসাহেব দেবেন্দ্র সিং আদিবাসীদের উপকথা লিপিবদ্ধ করেন। ABISY সেই সমস্ত "ঐশ্বরিক গল্পগুলোকে" ব্রাহ্মণ্যবাদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ হিসেবে হাজির করে, যেমন গণেশ পুরাণের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয় আঠারোটা সাপ নিয়ে এক আদিবাসী কাহিনীকে। যেমন, উত্তরাখণ্ডের আঞ্চলিক দেবী নন্দাকে কো-অপ্ট করে দেখানো হয়েছে দুর্গার রূপ হিসেবে। হিন্দুত্বের নামে ক্রমশঃ লৌকিক দেবদেবীকে তাদের ভক্তদের হিন্দুত্বের ছাতার তলায় আনার জন্যে। উদ্দেশ্য সেই একই - হিন্দুধর্মের বিভিন্ন ডাইভার্স সুতোকে মুছে দিয়ে সবাইকে এক মনোলিথিক ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের নীচে এনে ফেলা...

ইন্টেলেকচুয়াল কলোনিয়ালিজম বলতে পারি একে? আদিবাসী কনশাসনেস মুছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে?

এবারে একটু গালি দেবো আমাদের শিক্ষিত সেকুলার ঐতিহাসিকদেরও। তাঁরা কী করেছেন? অ্যাকাডেমিক ইংরিজীতে লেখা উজ্জ্বল, সূক্ষ্ম এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণাকর্ম উপহার দিয়েছেন। জার্নালে ছাপা হয়েছে, বই হিসেবে বেরিয়েছে। কিন্তু পড়েছে বা বুঝেছে খুব ছোট একটা এলিট গোষ্ঠী। উল্টোদিকে, আরএসএস তার বই থেকে শুরু করে গানের ক্যাসেট - যা কিছু বের করেছে, সবই হিন্দিতে বা স্থানীয় ভাষায়। সেই বই, প্যামফ্লেট, ক্যাসেট ছড়িয়ে গেছে শাখায়, মন্দিরে, স্কুলে। আর, প্রায় হাজার পঞ্চাশেক স্কুলে পড়তে থাকা চল্লিশ লক্ষের কাছাকাছি বাচ্চার বাড়িতে। সেকুলার অ্যাকাডেমিকরা যখন ইতিহাসের পিরিয়ডাইজেশন নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, আরএসএস এমন একটা ন্যারেটিভ বানিয়েছে যেটা পাঁচ বছরের বাচ্চাও বুঝতে পারে, বা একজন আশি বছরের বুড়ী ঠাকুমাও অবলীলায় মন থেকে বলে যেতে পারেন। সেই পলিটিকাল রাইট-লেফট আর সোশ্যাল রাইটের গল্প, যেটা দিন কয়েক আগে লিখেছিলাম...আমাদেরই অবহেলার ফসল আমরা ঘরে তুলেছি।

পরের বার, সঙ্ঘের কেউ যখন "আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত" নিয়ে ভাষণ দেবেন, পারলে একবার জিজ্ঞেস করবেন তো - কার অতীত? সঙ্ঘের ইতিহাসে প্রত্যেকটা মুসলমান তো আক্রমণকারী শয়তান। মুসলমান জোলা বা তাঁতির কথা আছে তাদের ইতিহাসে? যে তাঁতিরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের বস্ত্রশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন? তাদের ইতিহাসে সেই দলিত কবির ঠাঁই হয়েছে, যিনি পেতের খিদে আর জাতের নামে বজ্জাতির কথা লিখে গেছেন তাঁর কবিতায়? মেয়েদের শিক্ষার লড়াই, অধিকারের লড়াইয়ের কথা আছে তাদের ইতিহাসে? সাবিত্রীবাঈ ফুলে বা রোকেয়া বেগম জায়গা পান সঙ্ঘের ইতিহাসে? না, বরং সঙ্ঘের ইতিহাস একটা ফ্ল্যাট বোরিং গেরুয়া মরুভূমি, যার ওপারে রয়েছে একটা কাল্পনিক সোনালী যুগ। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মাথা ভরিয়ে দিচ্ছি সেই ইউজলেস বালি দিয়ে, একটার পর একটা ভিত্তিহীন আজগুবি দাবীর খপ্পরে পড়ে। এর বিকল্প বহুত্ববাদী তথ্যনির্ভর এবং সহজবোধ্য ইতিহাস না লেখা হলে, এখনই না লেখা হলে, অন্তত শুরুটুকুও না হলে, শেষ অবধি ওই ফ্ল্যাট বোরিং মরুভূমিই পড়ে থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে...

শুরু করেছিলাম অরওয়েলের একটা কথা দিয়ে। শেষও করব অরওয়েলেরই আরেকটা কথা দিয়ে, ১৯৮৪ থেকেই - 

"The past was erased, the erasure was forgotten, the lie became truth."

সূত্রঃ 

[১] India: RSS Schools and the Hindu Nationalist Education Project by Akshay Bakaya, 21 April 2009, https://www.sacw.net/article852.html
[২] Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
[৩] Param Shiv ka Shrishti: Vigyan Aur Ved, Itihas Darpan, October 2013
[৪] Itihas Darpan, October 2016
[৫] Who We Are and How We Got Here: Ancient DNA and the New Science of Human Past, David Reich, Pantheon, USA
[৬] EARLY INDIANS : The Story of Our Ancestors and Where We Came From, Tony Joseph, Juggernaut, India
[৭] The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, David W. Anthony, Princeton University Press, USA
[৮] Newly sworn Minister Anantkumar Hegde’s Twitter account gives a peek into his mindset, Pratik Sinha, https://www.altnews.in/newly-sworn-minister-anantkumar-hegdes-twitter-account-gives-peek-mindset/

#হিন্দু_খতরে_মে_হ্যায় #হিন্দুত্ববাদ #ন্যারেটিভ_বিল্ডিং

রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

সঙ্ঘ পরিবারের চোখে নারী ~ অরিজিৎ মুখার্জী

কাল ভোটের ফল বেরোবে। কী হবে, আমরা কেউ জানি না, এগজিট পোল যাই বলুক না কেন। তবে যে কথাটা কালও বলেছিলাম — ফাইনাল লড়াইয়ের সময় এসে গেছে। সেখানে আপনাকে জানতে হবে আপনার শত্রু কে।

আরএসএসের মতাদর্শ নিয়ে কথা বলব, অথচ মেয়েদের সম্পর্কে মনুবাদী সঙ্ঘ পরিবারের ধ্যানধারণার কথা বলব না তা তো হয় না। বিশেষ করে রেপিস্টদের ফুল মালা দিয়ে বরণ করার পরে যখন বিজেপি অভয়ার বিচার নিয়ে গলা তোলে, তখন বাস্তবটা সামনে আনতেই হয়। তো তাই, হিন্দুত্ব ন্যারেটিভ বিল্ডিং সিরিজে এবারে রইলো —

সঙ্ঘ পরিবারের নারীপ্রতিমার কিস্‌সা

খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়, কাজেই আপনাদের মনে থাকবে — ভারতের সেরা মহিলা কুস্তিগীরদের কথা, কেউ অলিম্পিকে পদকজয়ী, কেউ বা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন — তারা দিল্লীর রাজপথে ধর্ণায় বসেছিল বিচার চেয়ে। সকলেরই অভিযোগ ছিল ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের কর্তা, বিজেপির বাহুবলী সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিং এর নামে। যৌন হেনস্থার অভিযোগ। দেশ উত্তাল হয়েছিল। কিন্তু মেয়েগুলো কী পেয়েছিল? তাদেরই ফেডারেশন তাদের দাগিয়ে দিয়েছিল মিথ্যেবাদী বলে। এক মন্ত্রী তাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিল রাজনৈতিক যাত্রাপালা বলে। সঙ্ঘ পরিবারের ট্রোল বাহিনী আর পোষা মিডিয়া তাদের বিদেশী এজেন্ট, দেশদ্রোহী, পাকিস্তানের পুতুল ইত্যাদি কিছুই বলতে বাকি রাখেনি। এক কুস্তিগীরকে বলা হয়েছিল "খারাপ মা"। আরেকজনকে বলা হয়েছিল যে সে নাকি পৃথিবীর সামনে দেশের নাম ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। এই মেয়েগুলোর জিতে আনা মেডেল, তাদের চোখের জল, তাদের পরিশ্রম আর সাহস — কিছুরই দাম দেয়নি  তাদেরই দেশের একটা বড় অংশের মানুষ। কারণ, এই মানুষগুলোর কাছে, এদের হিন্দুত্বের আদর্শের সামনে, যে মেয়েটা তার অধিকারের কথা বলে গলা তুলে, সে ভিক্টিম নয়। সে একটা জলজ্যান্ত সমস্যা, যাকে চুপ করানো দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা মেয়েকে অধিকারের কথা বলতে দেখলে, কনসেন্টের কথা বলতে দেখলে, এমনকি চুলে রঙ বা হাতে ট্যাটু করা ছবি পোস্ট করতে দেখলেও এই একই লোকগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে - মেয়েটাকে চুপ করাতে। তার চেহারা, গায়ের রঙ, চুলের স্টাইল, পোশাক, তার পরিবার, ব্যাকগ্রাউন্ড — কিছুই বাদ যায় না এদের কুৎসিত আক্রমণ থেকে...সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অভিজ্ঞতা কমবেশী প্রায় প্রতিটা মেয়েরই আছে।

একে শুধুমাত্র মিসোজিনি বলা ভুল হবে। কারণ, এর কোনো কিছুই র‍্যান্ডম নয়। পুরোটাই একটা সিস্টেমের অংশ। যে সিস্টেমের ম্যানুয়াল লেখা হয়েছে অনেক বছর আগে। যে সিস্টেম শেখায় মনুবাদী পিতৃতন্ত্র আর বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে কথা বলবে, তাকে চুপ করাতে হবে।

কাজেই, সেই সঙ্ঘ পরিবার যখন নারী সুরক্ষার কথা বলে, উন্নাও-হাথরস-কাঠুয়া-মণিপুর-বিলকিস বানুর ধর্ষকদের মুখে অভয়ার বিচারে দাবী শুনে যখন আপনি বিশ্বাসও করে ফেলেন, তখন এই সিস্টেমের শেকড়ের দিকে একবার ফিরে তাকানো জরুরী হয়ে ওঠে। "হিন্দুত্ব ন্যারেটিভ" তৈরীর ইতিহাসের এই দিকটায় আজকে তাকাবো একবার। 

এই লেখাটা মূলত: তনিকা সরকারের লেখা "Hindu Nationalism in India" বইটার তৃতীয় চ্যাপ্টার "Pragmatics of the Hindu Right: The Politics of Women’s Organisations" আর ঊর্বশী বুতালিয়া এবং তনিকা সরকার সম্পাদিত "Women and the Hindu Right" নামের প্রবন্ধ কালেকশনের বিভিন্ন রচনার ওপর ভিত্তি করে তৈরী।

Uploaded Image


আদর্শগত শেকড়: সাভারকর ও ধর্ষণের লেজিটিমাইজেশন
======================================

হিন্দুত্বের এই দর্শনের ভিত খুঁজে পাওয়া যায় সাভারকরের লেখায়। পুরুষোত্তম আগরওয়াল লিখছেন যে "দ্য সিক্স গ্লোরিয়াস ইপকস অফ ইন্ডিয়ান হিস্টরি" বইয়ে সাভারকর শিবাজীর কড়া সমালোচনা করেছিলেন এই বলে যে "he had a perverse notion of virtue in respecting the chastity of even the Muslim women", এবং সাভারকরের মত অনুযায়ী শিবাজীর উচিত ছিল বন্দিনী মুসলমান মহিলাদের ধর্ষণ করে হাজার বছরের মুসলমানী অত্যাচারের প্রতিশোধ নেওয়া: "The souls of those millions of aggrieved [Hindu] women," Savarkar imagined, would have pleaded with Shivaji: "Do not forget the unutterable atrocities and outrage committed on us... Let the future Muslim conquerors never dare to think of such molestation of Hindu women." 

সাভারকর এই প্রসঙ্গ শেষ করছেন এই বলে যে মেয়েদের প্রতি হিন্দুদের আত্মঘাতী "শৌর্য্যবীর্য্যের ধারণা"-ই মুসলমান মেয়েদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল। নইলে, সাভারকরের মতে ধর্ষণ অপরাধ নয়, বরং মুসলমানদের বিরুদ্ধে হাজার বছরব্যাপী যুদ্ধে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অস্ত্র।

[ইনসিডেন্টালি, এই আইডিয়াটা যে শুধু হিন্দুত্বের একচেটিয়া, এমনটা নয়। সংখ্যাগুরু তার ক্ষমতার আস্ফালনের জন্যে মেয়েদের শরীরকেই বেছে নিয়েছে এমন নিদর্শন ইতিহাসে অগুণতি। সে ধর্মের জন্যেই হোক বা জাতিগত হিংসার কারণেই হোক। পার্টিশনের ওরাল হিস্টরি যদি পড়েন — ঊর্বশী বুতালিয়ার "দি আদার সাইড অফ সাইলেন্স" বা রীতু মেনন এবং কমলা ভাসিনের "বর্ডারস অ্যান্ড বাউন্ডারিজ", বা অন্যান্য জাতিগত হিংসার ইতিহাস, প্যালেস্টাইন বলুন নাৎসিদের ইতিহাস — বেসিক থিওরিটা সেই একই থেকে গেছে। মেয়েদের শরীরই সংখ্যাগুরুর ক্ষমতার আস্ফালন আর বদলার ক্ষেত্র। ভারতে সঙ্ঘ, পাকিস্তান বা বাংলাদেশে জামাত, আফগানিস্তানে তালিবান।]

যা লিখলাম ওপরে, তার কোনোটাই প্রাচীন ইতিহাস নয়। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে এই আদর্শের প্র‍্যাক্টিকাল পরীক্ষা হয়েছিল সুরাটের রাস্তায় — ফ্লাডলাইটের আলোয় মুসলমান মেয়েদের গণধর্ষণের মাধ্যমে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মহিলা নেত্রী কৃষ্ণা শর্মার ভাষায় — "হিন্দুদের এমন অবস্থা তৈরী করতে হবে যাতে বাকিরা ভয় পেতে শুরু করে। আমাদের নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিতে হবে। ওরা যদি আমাদের দশ বা পনেরোজনকে ধর্ষণ করে, আমাদেরও ওদের মহিলাদের ওপর একই কাজ করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে আমরাও কম যাই না"। কৃষ্ণা শর্মা এই কথাগুলো বলেছিলেন কলেজের কিছু ছাত্রীর সামনেই...

সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগাটের মত যে কুস্তিগিররা পথে নেমেছিলেন, তাঁরা কেউ সেদিন সাম্প্রদায়িক হিংসার কথা বলেননি, তাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁদেরই জগতের এক প্রভাবশালী কর্তার বিরুদ্ধে — যিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদী একটা দলের প্রতিনিধি। আর, সেদিন আমাদের সিস্টেম ঠিক একইভাবে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল — ঘটনা অস্বীকার করে, প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে, আর মেয়েগুলোকে মিথ্যাবাদী, নাটুকে বা "খারাপ মা" বলে দাগিয়ে দিয়ে...ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সকলেই ছিল এতে, কারণ সাভারকরের ওই কথাগুলো হিন্দুত্ব সিস্টেমের সমস্ত স্তরে ছড়িয়ে আছে, এমনকী মেয়েদের সংগঠন রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির মধ্যেও...

ঘৃণার জন্যে ক্ষমতায়ন, ঘরে নির্বাক দাসত্ব
===========================

তনিকা সরকার একটা সময়ে বড়সড় ফিল্ড ওয়ার্ক করেছিলেন আরএসএসের মহিলা সংগঠন রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির ওপরে। ১৯৯৯ সালে, আরএসএসের এক মহিলা নেত্রী এই ফিল্ড ওয়ার্কের সময়েই এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন — "আমরা মেয়েদের শেখাই আত্মত্যাগ করতে, যাতে পরিবার এক সুতোয় বাঁধা থাকে। অধিকারের কথা থিওরি হিসেবেই শুনতে ঠিক লাগে; অধিকারের দাবীতে লড়াই ভুল।"

পদ্ধতিটা খেয়াল করবেন একবার। সমিতি মেয়েদের ফিজিকাল ট্রেনিং দেয় - মার্শাল আর্ট, যোগাসন, তরোয়াল চালানো, জুডো, এমনকি বন্দুক চালানোতেও। সমিতির প্রকাশনায় লেখা আছে — "স্বসংরক্ষণক্ষম নারী কি সমাজমে অধিক প্রতিষ্ঠা হোতি হ্যায়", মানে "আত্মরক্ষায় সক্ষম নারীর সামাজিক প্রতিষ্ঠা বেশি"। কিন্তু আত্মরক্ষা কার থেকে? পণের দাবী করা লোভী বউপেটানো স্বামীর হাত থেকে নয়। নিজের সম্প্রদায়ের ধর্ষকের হাত থেকেও নয়। এই প্রশিক্ষণের এক ও একমাত্র লক্ষ্য হল মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই। যুদ্ধ। দিল্লীর রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির সংগঠক আশা শর্মার নিজের মুখেই স্বীকার করেন যে যুদ্ধ বলতে তাঁরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের কথাই বলতে চান।

সমিতির উৎপত্তির গল্পটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। অফিশিয়াল ভার্সনে বলা হয় যে সমিতি তৈরী করা হয়েছিল হিন্দুত্বের আদর্শকে জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে। কথিত ইতিহাস — সমিতির প্রচারিকাদের মুখে যেটা শোনা যায়, সেটা সামান্য আলাদা। তাঁরা বলেন যে সমিতির প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মীবাঈ কেলকার, এক অল্পবয়সী মেয়েকে তার নির্বিকার হিন্দু স্বামীর সামনেই হিন্দু গুন্ডাদের হাতে ধর্ষিতা হতে দেখে ঠিক করেছিলেন যে হিন্দু পুরুষরা যেহেতু তাদের পরিবারের মেয়েদের রক্ষার দায়িত্ব নিতে অক্ষম, তাই মেয়েদেরই আত্মরক্ষার ভার নিতে হবে। লক্ষ্মীবাঈ কেলকারের হাতে সমিতির শুরু এর পরেই। কিন্তু, হিন্দু পুরুষদের হিংস্রতার এই অকপট স্বীকারোক্তি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়। সমিতি প্রকাশ্যে কখনোই হিন্দু পুরুষের সমালোচনা করে না। সমস্ত রাগ এবং আক্রোশের লক্ষ্য শুধুই মুসলমান সম্প্রদায়।

আজও আমরা ঠিক একই ঘটনা দেখি। টার্গেট বদলে দেওয়া। সাক্ষী বা ভিনেশরা যখন এক বাহুবলী হিন্দু পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, তখন হিন্দুত্বের নেতানেত্রীরা বা ট্রোল বাহিনী পুরুষতন্ত্রকে খালাস দিয়ে অভিযোগকারিনীদেরই রাষ্ট্রবিরোধী পাকিস্তানপ্রেমী বানিয়ে দেয়। হিন্দুত্বের সংজ্ঞায় শত্রু কখনোই পরিবারের ভিতরে থাকে না; সে সর্বদাই বাইরের শক্তি; আর সে থাকে মুসলমানের বেশে।

গেরুয়া শাড়ির আড়ালে নখদাঁত বের করা পিতৃতন্ত্র
=================================

এবার বলি সঙ্ঘের এই "এমপাওয়ার্ড" মহিলারা অ্যাকচুয়ালি কীসে বিশ্বাস করেন। তনিকা সরকারের ফিল্ডওয়ার্কের সময় বিজেপি মহিলা মোর্চা নেত্রীরা আর রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির প্রচারিকারা যা বলেছিলেন, তার জিস্ট:

▪️সতী সম্পর্কে: আশা শর্মার বক্তব্য ছিল — সতী আসলে নিজের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে মেয়েদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ইচ্ছা। রূপ কানোয়ারের ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন যে সেটা স্বেচ্ছায় সতী হওয়ার ঘটনা ছিল না, এবং এই জন্যেই সঙ্ঘ মেয়েদের শারীরিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেয়। ঘুরিয়ে বললে এর মানে দাঁড়ায় যে খাঁটি হিন্দু মহিলা অন্য কারো কথায় নয়, বরং স্বেচ্ছায় সতী হওয়াকে গর্বের মনে করেন।
▪️বধূ নির্যাতন সম্পর্কে: মেয়েদের উদ্দেশ্যে ভিএইচপির নেত্রী কৃষ্ণা শর্মার উপদেশ ছিল যে তাদের শিখতে হবে কীভাবে নিজের গলার আওয়াজকে, নিজের চিৎকারকে নিজের গলার মধ্যেই চেপে রাখতে হয়, যাতে ব্যাপারটা ঘরের চৌহদ্দির মধ্যেই থেকে যায়। মারধোর চলতেই থাকলে সেই মেয়েটির উচিত নিজের "বিরাদরি", মানে সম্প্রদায়ের গুরুজনদের সঙ্গে কথা বলা। আইনী ব্যবস্থা একদম শেষ পন্থা। ডিভোর্স হিন্দু মহিলার কাছে বাস্তবোচিত নয় কারণ একজন নারী একা থাকতে পারে না, আর স্বামীও বদল করতে পারে না।
▪️মেয়েদের শিক্ষা বনাম ছেলেদের শিক্ষা সম্পর্কে: কৃষ্ণা শর্মাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে পরিবার যদি মাত্র একজনেরই শিক্ষার খরচ বইতে সমর্থ হয়, তাহলে কাকে স্কুলে পাঠানো উচিত, ছেলেকে না মেয়েকে? কৃষ্ণা শর্মা উত্তরে বলেন যে চাকরি করে পরিবার চালানো পুরুষেরই দায়িত্ব, কাজেই এক্ষেত্রে ছেলের শিক্ষাই বেশি জরুরী।
▪️ম্যারিটাল রেপ প্রসঙ্গে: কৃষ্ণা শর্মা এই আইডিয়াটাকেই পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছিলেন "এলিয়েন কালচার" বলে। আরো বলেছিলেন যে মেয়েটি যদি শারীরিক এবং মানসিকভাবে শক্ত হয়, তাহলে তার নিজের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার কথা। বেসিকালি, গেরুয়ার ছদ্মবেশে ভিক্টিম ব্লেমিং।
▪️ভিন্ন সম্প্রদায়ে প্রেম বা বিয়ে প্রসঙ্গে: সঙ্ঘের যে নেতারা মুসলমান মেয়েদের মুক্ত করার স্বার্থে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের নামে মুখে রক্ত তোলেন, তাঁরাই আবার বলেন হিন্দু মেয়েদের বাপমায়ের কথাই শোনা উচিত, তাঁরাই ভালো বোঝেন, এবং তাঁদের কথার প্রতিবাদ করা মানে অশান্তি ডেকে আনা।

একে নারীর ক্ষমতায়ন বলবেন? নাকি গেরুয়া পতাকায় সাজানো খাঁচায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড বলবেন?

এই কনট্রাডিকশনের আরো উদাহরণ পাওয়া যায় সঙ্ঘের মহিলা নেত্রীদের কথাবার্তায়। অমৃতা বসু, তাঁর "ফেমিনিজম ইনভার্টেড" লেখায় এইধরণের কনট্রাডিকশনের বেশ কয়েকটা চোখধাঁধানো উদাহরণ দিয়েছেন। সঙ্ঘের সবচেয়ে খ্যাতনামা মহিলা নেত্রীরা — উমা ভারতী, সাধ্বী ঋতম্ভরা, বিজয়রাজে সিন্ধিয়া — প্রত্যেকেই সঙ্ঘের ভাষায় ব্রহ্মচারিণী। ঋতম্ভরা আর উমা ভারতী দুজনেই সন্ন্যাসিনী (সাধ্বী আর সন্ন্যাসিনীর মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও এখানে একার্থে ব্যবহার করলে বিশেষ তারতম্য হবে না), আর বিজয়রাজে সিন্ধিয়া বিধবা। এঁদের এই ত্যাগের জীবন বা রিনান্সিয়েশন থেকে এঁদের মধ্যে একধরণের মরাল অথরিটি আসে, যার ফলে এঁরা নিজেদের কথার মধ্যে তীব্র আক্রোশ বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেন স্বচ্ছন্দে। আবার যে ভাষায় এঁরা কথা বলেন, সেই একই ভাষা ব্যবহার করলে একজন সাধারণ মেয়েকে অনায়াসেই "মন্দ মেয়ে" বলা হত।

কিন্তু এই ক'জনা এক্সেপশন। ব্যতিক্রম। এঁদের উগ্র, আক্রমণাত্মক এমনকি অশালীন ভাষা ব্যবহার করারও ছাড় রয়েছে। কারণ? তথাকথিত ত্যাগের সূত্রে পাওয়া ওই মরাল অথরিটি। কিন্তু সাধারণ হিন্দু মেয়ের কাছে সঙ্ঘের এক্সপেক্টেশন আবার আলাদা। বিশেষ করে সেই মেয়েরা যদি কোনো ঘরের বউ হয় বা ছেলেমেয়ের মা হয়। সেক্ষেত্রে সঙ্ঘ তাকে শেখায় মানিয়ে চলতে, আপোষ করতে, নিজেদের চিৎকারকে বুকের ভিতরে চেপে রাখতে। নেতৃত্বে যাঁরা থাকেন তাঁরা ব্রহ্মচারী; সাধারণ কর্মীরা একান্ত অনুগত সৈনিক। এই সিস্টেমটাকে সফলভাবে চালাতে অল্প কয়েকজনই আগ্রাসী নারীমূর্তির দরকার পড়ে — যাঁরা দরকারে জনতাকে উত্তেজিত করে তুলতে পারবেন; বাকি বিশাল সংখ্যক সাধারণ মেয়েরা থাকবে শান্তশিষ্ট অনুগত গোবেচারা গৃহপালিত প্রাণীর মত...

এই ডুয়ালিজম বা হিপোক্রিসিটা খেয়াল করবেন...একদিকে বিজেপি মেয়েদের ভোটে দাঁড় করায়। লকেট চ্যাটার্জী, পাপিয়া অধিকারী, অগ্নিমিত্রা পল, বিহারে মৈথিলী ঠাকুর ইত্যাদি। কিন্তু মেয়েদের নিত্যদিনের সমস্যা নিয়ে এদের গলা তুলতে দেখবেন না কখনো। সমকাজে সমবেতন, কনসেন্ট, গার্হ্যস্থ হিংসা, ম্যারিটাল রেপ, প্রজননের চয়েজ — এই নিয়ে তাঁরা উচ্চবাচ্য করেন না। গ্রাসরুট মহিলা সংগঠনকে ঠেলে দেওয়া হয় ঘরোয়া আচার অনুষ্ঠানের গন্ডির মধ্যে। কড়ওয়া চওথ, গোপালের পরিচর্যা, শিবরাত্রি, আরো হাজারো ব্রত...স্বামী, সন্তান, পরিবারের মঙ্গলকামনার নানান উপাচার।

মঞ্চে থাকেন নারী নেত্রীরা। মঞ্চের আড়ালে নিয়ন্ত্রিত হয় নারী শরীর।

নারীর অধিকার আর নারীসুরক্ষার ফাঁকা স্লোগান
=================================

একদিকে আমরা দেখি বিজেপি অভয়ার বিচার চেয়ে চিৎকার করে গলা ফাটায়। আবার অন্যদিকে দেখি উন্নাও-কাঠুয়া-হাথরসের ঘটনা। দেখি বিলকিস বানুর ধর্ষকদের ছেড়ে দিতে চায় বিজেপির সরকার। দেখি ধর্ষণে অভিযুক্তকে মালা পরিয়ে স্টেজে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেখি বাস্তবে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা মেয়েদের ওপর অকথ্য ভাষায় আক্রমণ। দেখি মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে জঘন্য একটা মীম।

তখন সিরিয়াসলি আপনাদের একবারও মনে হয় না যে এই দক্ষিণপন্থী নেতানেত্রীরা যখন মেয়েদের সুরক্ষার দাবীতে বা ক্ষমতায়নের দাবীতে স্লোগান দেয়, তখন পাল্টা প্রশ্ন করি — যে ক্ষমতায়ন কোন কাজটা করার জন্য?

আরএসএসের নিজস্ব প্লেবুক অনুযায়ী, 
▪️মেয়েরা আত্মরক্ষার টেকনিক শিখতে পারে — তবে শুধু মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করার জন্যে, নিজের ঘরে তার ওপর হওয়া অত্যাচার ঠেকাতে নয়।
▪️মেয়েরা চাকরি করতে পারে — তবে শুধুমাত্র পরিবারের যদি একান্তই দরকার পড়ে, তবেই; নইলে সেটা বিলাসিতা।
▪️একটা মেয়ে পাব্লিকলি গলা তুলে কথা বলতেই পারে — তবে সেটা বিদ্বেষ ছড়িয়ে লোককে উত্তেজিত করতে, ইক্যুয়াল মাইনে বা রিপ্রোডাক্টিভ চয়েজের অধিকার চেয়ে নয়। সেগুলো অবাধ্যতা। ভারতীয় সংস্কৃতি নয়।
▪️ধর্ষণ আলোচিত হতেই পারে — তবে কেবল পশ্চিমী সংস্কৃতি আর অশ্লীল গণমাধ্যমকে দোষারোপ করার জন্য, আর নয়তো "ওদের" বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে, প্রতিশোধে উস্কানি দিতে। হিন্দু পরিবারের অন্দরে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্যে কখনোই নয়।

লাভ জিহাদ আর মুসলমান ধর্ষকদের নিয়ে গলা ফাটান যে নেতানেত্রীরা, তাঁরাই আবার নিজের দলের সাংসদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনা মেয়েদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। হিন্দু মেয়েদের সুরক্ষার দাবী করে যে অনলাইন ট্রোলরা, তারাই আবার নিজস্ব মতামত প্রকাশের দায়ে মহিলা কুস্তিগির, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের ওপর চড়াও হয়।

ফ্লাভিয়া অ্যাগ্নেস — একজন আইনজীবী এবং ফেমিনিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট, তাঁর একটা লেখায় লিখেছেন যে "হাম ভারত কি নারী হ্যায়, ফুল নহি চিঙ্গারি হ্যায়" বলে নারী আন্দোলনের যে স্লোগান আমরা শুনে অভ্যস্ত, সেই স্লোগানকে আত্মসাৎ করে শিবসেনা আর বিজেপির মহিলা শাখাগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে রণহুঙ্কারে বদলে নিয়েছে। পণপ্রথা, যৌতুক, বৈবাহিক হিংসা বা বৈবাহিক ধর্ষণের বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ভারতের নারী আন্দোলন সংগঠনগুলো দশকের পর দশক ধরে যে চেষ্টা চালিয়েছিল — চিঙ্গারি হ্যায়ের মত স্লোগান সেই নারী আন্দোলনেরই প্রতীক। নারী আন্দোলনের স্লোগানগুলোকে চুরি করে নিয়ে তাদের ভিতরের আসল নারীবাদী অংশ মুছে ফেলে হিন্দুত্ববাদীরা সেগুলোকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অস্ত্রে পরিণত করেছে।

উপসংহার
=======

তনিকা সরকারের লেখা শেষ হচ্ছে একটা ওয়ার্নিং দিয়ে। সেটা ভার্বাটিম তুলে দিই। 

"The point is not that these women are being conned into belief, for the same applies to men. The point is to assess the nature of the issues they assent to."

একটা কথা মাথায় রাখা দরকার — হিন্দু দক্ষিণপন্থার ভেতরের মেয়েদের সিম্পলি "false consciousness" বলে খারিজ করে দেওয়া যায় না। এই মেয়েরা ওই রিগ্রেসিভ পরিবেশের মধ্যেও একটা সীমিত ক্ষমতায়ন খুঁজে পেয়েছে — শারীরিক শিক্ষা, জনপরিসরে ভূমিকা - সে মাউথপীস হিসেবে হলেও — এগুলো এদের কাছে দামী। এদের সঙ্ঘের রিগ্রেসিভ আদর্শ থেকে বের করে আনতে গেলে আরো শক্তিশালী আদর্শের প্রয়োজন। শুধু আইনি অধিকার নয়, বরং ইক্যুইটি এবং ইক্যুয়ালিটি — যাতে একটা অল্প বয়সী মেয়ে গর্বের সঙ্গে তার জবরদস্তি-করা স্বামীর চাহিদা খারিজ করে দিতে পারে একটা মাত্র শব্দে; এমন একটা সিস্টেম যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সংবিধানে লেখা একটা শব্দ হয়ে থাকবে না, বরং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সঙ্গী হয়ে উঠবে — স্কুলে, কলেজে, কলে, কারখানায়, অফিসে, বাড়িতে, মহল্লায়...

তবে এই হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে তার পাওনাগন্ডা বুঝিয়ে দিতেই হবে। সাভারকরের রেপ-অ্যাপোলজিয়া জাস্ট একটা কথার কথা নয়; যে লোকগুলো নিজেদের হিন্দু মেয়েদের একমাত্র রক্ষক বলে দাবী করে, তাদের ফিলোজফি এইটা।

সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগাটদের মত কুস্তিগীর, বা অন্য যারা গলা তুলেছে — অভিনেত্রী, রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মী, সাংবাদিক, আমার আপনার পরিচিত অনেক মেয়ে যারা সমাজ মাধ্যমে নিজের কথা বলার চেষ্টা করেছে — এদের প্রত্যেককে যে বিজেপি নেতারা নানান কুকথায় চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, যে ট্রোলেরা অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করে, তারা সকলেই হিন্দুত্বের এই ট্র‍্যাডিশনেরই ফলোয়ার যার শেকড়ের শুরু আগের শতকে। নাগপুরে লেখা ম্যানুয়াল মেনে একই ঘটনা ঘটে চলেছে বছরের পর বছর। 

যারা পালটা জবাব দেয়, এই সিস্টেম দাঁতনখ বের করে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমন উদাহরণ ক'টা দেখতে চান?