বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

মাঝনদী ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

শ্যামা আমাকে কোনোদিন নাম ধরে ডাকেনি। ডাকতো, ও মাঝি। প্রায় ষোলো বছর ধরে ওই দুইটা শব্দই ছিলো আমার নাম। আর আমি অন্য কোনো নামের কথা ভাবতেও পারতাম না। জীবনে মোটে একবার সে আমার আসল নামটা মুখে এনেছিলো। সেই রাতের পর ওপারের সঙ্গে আমার আর কোনোদিন দেখা হয়নি।

আমার নাম আফসার। টাকির ঘাটে নৌকা বাইতাম। এখন আর বাই না। নৌকাটাও নেই। ঘরের কোণে শুধু বৈঠাটা দাঁড় করানো আছে। তেল চিটচিটে, হাতলের কাছে কাঠটা একটু বসে যাওয়া। ওইখানে একসময় একটা নাম লেখা ছিলো। 

আমাদের ইছামতী তখন কারো ছিলো না। এপারে টাকি, ওপারে দেবহাটা। এপারে টাকি, ওপারে দেবহাটা, আর মাঝখানের জল দিনে দুইবার মন বদলাতো। জোয়ারে নদী ফুলেফেঁপে দুই পাড়ের ঘাসে এসে চুমু খেতো, আর ভাটায় নেমে গিয়ে মাঝবরাবর জাগিয়ে দিতো একটা চর। লম্বাটে একফালি জমি। ঘাসে ঢাকা, বর্ষায় ডুবে যেতো আবার হেমন্তে ফিরে আসতো। আমরা ওটাকে ডাকতাম মাঝির চর। পৃথিবীর কোনো কাগজে ওই চরের নাম নেই। অথচ আমার গোটা জীবনটা ওই এক ফালি ঘাসের ওপরেই কেটে গেছে।

বাপের সঙ্গে বৈঠা ধরতে শিখেছি বারো বছর বয়সে। প্রতি হাটবারে ওপার থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে আসতো টাকির হাটে। হরিপদ কাকা আসতেন ঝাঁকা ভরা পারশে আর ভেটকি নিয়ে। সঙ্গে তার মেয়ে। মেয়েটা নৌকার গলুইয়ে বসে জলের ভেতর হাত ডুবিয়ে রাখতো। আঙুলের ফাঁক দিয়ে স্রোত কেটে যাওয়ার শব্দ শুনতো। আমি বলতাম, হাত তোলো, কামট আছে। সে ঘাড় না ঘুরিয়েই বলতো, কামটে আমাগো কামড়ায় না। আমরা জাইলা।

ওর নাম শ্যামা।

নদীটা তখন বেয়াড়া ছিলো। ভাটার টানের বিপরীতে নৌকা বাওয়া যেতো না, গায়ে যতো জোরই থাকুক। তখন নৌকা চরে ঠেকিয়ে বসে থাকতে হতো জোয়ার ফিরবার অপেক্ষায়। ছয় ঘণ্টা পরপর নদী মন বদলায়। এই ছয় ঘণ্টার সময়টুকুই ছিলো আমাদের। বাপেরা হাটে দরদাম করতো। আর আমরা দুজন চরের ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে থাকতাম। ওপারে কার ঘরে কার বিয়ে হচ্ছে সেই গল্প করতাম। আর থেকে থেকে জলের দিকে তাকাতাম। জোয়ার এলে আমার বুকটা শুকিয়ে যেতো। কারণ জোয়ার মানেই নৌকা ছাড়া, আর নৌকা ছাড়া মানেই আরো সাতটা দিন।


কবে যে শ্যামার দিকে তাকানোটা অভ্যাস থেকে অসুখ হয়ে গেলো, বলতে পারবো না। একটা দিনের কথা মনে আছে। অঘ্রানের রোদ, চরের ঘাস শুকিয়ে সোনালি। সে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে ছিঁড়ে আঙুলে পাকিয়ে একটা আংটি বানাচ্ছিলো। বানিয়ে আমার দিকে না তাকিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলো। আমি নিলাম না, চেয়ে রইলাম। রোদটা তখন ওর ঘাড়ের কাছে এসে ভাঙছে। সে অনেকক্ষণ হাত বাড়িয়ে রেখে শেষে বললো, নিবা না? না নিলে গাঙে ফালাইয়া দিমু।

আমি হাত পাতলাম। ঘাসের আংটিটা বিকেলের মধ্যেই শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ওই হাত বাড়িয়ে রাখাটুকু আমার আঙুলের ভেতর সারাজীবন রয়ে গেছে।  

শ্যামা লিখতে জানতো। পাঠশালায় তিন ক্লাস পড়েছিলো। আমি নিরক্ষর। জাল আর দাঁড় ছাড়া কিছু চিনতাম না। এক বিকেলে সে ভেজা বালিতে আঙুল দিয়ে আমার নামটা লিখলো। বললো- দেখো, তোমার নামটা কতো ছোট। তারপর জোয়ার এসে লেখাটা ধুয়ে নিয়ে গেলো। সে হেসে বললো, বালিতে লিখলে হয় না। কাঠে লিখতে হয়।  

মাছ ছাড়ানোর ছোট বঁটিটা দিয়ে সে আমার বৈঠার হাতলে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিজের নামটা লিখলো। শক্ত কাঠ। তার আঙুল কেটে রক্ত পড়লো। তবু থামলো না। লেখা শেষ করে গামছায় হাত মুছে বললো, এইবার বাও দেখি। রোজ বাইবা, রোজ আমার নাম হাতে লাগবো।

নামটা আমি পড়তে পারতাম না। কিন্তু আঙুল বোলালে চিনতে পারতাম। পৃথিবীতে ওই একটা লেখাই আমি চিনেছি।

হাটবার ছিলো সপ্তাহে একদিন। বাকি ছয়টা দিন আমি কী করতাম? জাল বুনতাম, নৌকার তক্তায় আলকাতরা দিতাম, আর মনে মনে হিসাব কষতাম আর কয়টা রাত বাকি। মাঝে মাঝে বিনা কারণে নৌকা নিয়ে মাঝনদীতে গিয়ে বসে থাকতাম। ওপারের ঘাটটা দেখা যায় কিনা দেখতে। দেখা যেতো না। তবু বসে থাকতাম।

এক হাটবারে আমার যাওয়া হলো না। বাপের জ্বর আর নৌকার তলায় ফাটল, দুইটা একসঙ্গে। পরের হাটবারে গিয়ে দেখি সে চরে বসে আছে ঠিক আগের জায়গাটায়, হাঁটুতে থুতনি রেখে। কাছে গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ সে কোনো কথা বললো না। তারপর জলের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো, গত হাটবারে আমি ভাটা পুরা সময় এইখানে বইসা আছিলাম। জোয়ার আওনের আগ পর্যন্ত। বাপে ডাকে, আমি কই আরেকটু।

আমি বললাম, খবর দিতে পারি নাই।

সে বললো, খবর দিতে হইবো না। খালি আইসো।

তারপর প্রথমবারের মতো সে আমার হাতটা ধরলো। জেলের মেয়ের হাত। আঁশটে গন্ধ, তালুতে দড়ির দাগ। জোয়ার আসা পর্যন্ত আমি ওই হাত ছাড়িনি।

তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের বছর নদীর দুই পারে মানুষ না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরলো। ঘাটে রোজ সকালে দুই তিনটা লাশ পড়ে থাকতো। কেউ দাবি করতো না। ওই বছর শ্যামারা তিন মাস কচু আর কলার মোচা খেয়ে বেঁচেছিলো। আমি লুকিয়ে ওদের নৌকায় চাল দিয়ে আসতাম। হরিপদ কাকা দেখেও দেখতেন না। যে মানুষ সত্যি সত্যি না খেয়ে আছে, সে জিজ্ঞেস করে না চালটা কার হাত দিয়ে এলো।

সেই দুর্ভিক্ষেরই এক সন্ধ্যায় চরে বসে শ্যামা আমাকে একটা গল্প বলেছিলো। তার ঠাকুমার কাছে শোনা।

বহুকাল আগে… তখনো এই গাঙের নাম হয়নি। এপারে থাকতো এক জেলের মেয়ে আর ওপারে থাকতো এক রাখাল ছেলে। দুজনের দেখা হতো কেবল ভাটার সময়, যখন মাঝখানে চর জাগে। জোয়ার এলে চর ডুবে যেতো, দুজনে দুই দিকে ফিরে যেতো। মেয়েটা একদিন গাঙকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে বসলো, তুমি আমারে রোজ ওপারে দিয়া আইসো। গাঙ বললো, দিতে পারি। কিন্তু রাখতে পারুম না। আমার নিয়ম হইলো, যারে নিয়া যাই তারে ফিরাইয়া আনতে হয়। মেয়েটা তাতেই রাজি হলো। সেই থেকে দিনে দুইবার জল ওপারে যায়, আর দিনে দুইবার ফিরে আসে। ওইটাই জোয়ার, ওইটাই ভাটা। আর মেয়েটা যাওয়ার সময় কাঁদে, ফেরার সময়ও কাঁদে।

গল্প শেষ করে শ্যামা বললো, বুঝলা ও মাঝি? হেই কারণেই গাঙের জল নোনা।

আমি হেসে বলেছিলাম গাঙের জল নোনা, কারণ সাগর কাছে।

সে চোখ পাকিয়ে বলেছিলো, তুমি একটা আস্ত বেরসিক মাঝি।

আমাদের একটা পরিকল্পনা ছিলো কলকাতা পাড়ি জমানোর। ওই শহরে নাকি কেউ কারো পদবি জিজ্ঞেস করে না। খিদিরপুরের ঘাটে নাকি মাঝিদের কাজ পাওয়া যায়। নৌকার খোলের নিচে আমার একটা বিস্কুটের টিন লুকানো ছিলো। তাতে প্রতি হাটবারে চার আনা আট আনা করে জমতো। শ্যামা টিনটা ঝাঁকিয়ে শব্দ শুনতো আর ভুরু কুঁচকে হিসাব কষতো। বলতো, টিন ভরলে আমারে খবর দিবা। ঘরের চাল টিনের হইবো। বৃষ্টি পড়লে শব্দ হইবো। আর একটা লাল চিরুনি কিনা দিবা, ভুইলো না।

আমি বলতাম, ভরবো ভরবো। 

আসলে আমি ইচ্ছে করে দেরি করতাম। টিনটা ভরে গেলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তখন এই ছয় ঘণ্টার অপেক্ষাগুলো ফুরিয়ে যাবে। আমি বোকা ছিলাম। ভেবেছিলাম সময় জিনিসটা আমার পক্ষে আছে, আর অপেক্ষা জিনিসটা আমাদের নিজের সম্পত্তি। 

পঁয়তাল্লিশের এক আষাঢ়ে বিকেলে এমন বৃষ্টি নামলো যে নদীর ওপারটা বেশ কিছুটা সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমরা চরে আটকা পড়লাম। ছৈয়ের নিচে দুজনে ঢুকে বসলাম। কাপড় ভেজা, বাতাসে হি হি করে কাঁপুনি। শ্যামা খোঁপা খুলে ভেজা চুল ছড়িয়ে দিলো আর ছোট্ট ছাউনিটা ভরে গেলো নদীর মন কেমন করা গন্ধে। মাথার ঠিক এক বিঘত ওপরে তালপাতার ছৈয়ে তখন বৃষ্টির একটানা একটানা নূপুরনিক্বণ। সে আমার কাঁধে মাথা রাখলো। ভেজা চুল থেকে জল গড়িয়ে আমার হাতের ওপর পড়ছিলো। আর আমি নড়তে পারছিলাম না। পাছে সে সরে যায়। ওই সন্ধ্যায় আমি প্রথম জানলাম, মানুষের নিঃশ্বাসেরও একটা শব্দ আছে। আর সেই শব্দটা মুখস্থ হয়ে যায়।    

অনেকক্ষণ পর ঠান্ডা হাতটা আমার বুকের ওপর রেখে সে বললো, ভয় লাগতেছে।

আমি বললাম, বৃষ্টির?

সে বললো, না। মানুষের।

মেয়েটা আমার চেয়ে অনেক আগে টের পেয়েছিলো।

তার এক বছর পর কলকাতা থেকে খবর এলো। শহরে তিনদিন ধরে মানুষ মানুষকে ফালি ফালি করে কেটেছে। যারা কাজে গিয়েছিলো তারা পালিয়ে গ্রামে ফিরলো। চোখেমুখে অশনীসংকেতের মতো এমন একটা কিছু নিয়ে ফিরলো যা আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। তারপর নোয়াখালীর খবর এলো। আমাদের গ্রাম কলকাতা থেকে বহুদূর। নোয়াখালী থেকে আরো দূর। কিন্তু বিষের তো পা লাগে না, হাওয়ায় ভর করেই ছড়িয়ে পড়ে। 

হাটটা আগে বদলালো। যে বামুন এতোদিন হরিপদ কাকার হাত থেকে মাছ নিতেন, তিনি এখন ঝুড়ি থেকে সরাসরি তুলে নেন। এক শীতের রাতে জাল তুলতে গিয়ে দেখি আমাদের চরে হ্যারিকেন জ্বলছে। এপারের হেকমত আলী আর ওপারের নিবারণ সাহা পাশাপাশি বসে একটা হুঁকো ভাগ করে টানছে। আর ভিটেবাড়ি কেনাবেচার দর কষছে। এই দুইজন লোকই দিনের বেলায় দুই পারে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে বলতো, হিন্দু আর মুসলমান কোনোদিন এক থাকতে পারে না। আমি নৌকা ঘুরিয়ে চলে এসেছিলাম। ওদের নিয়ে ভাববার সময় আমার ছিলো না। আমার তখন একটা টিন ভরাবার তাড়া।

সাতচল্লিশের আগস্টে উৎসবের আলো জ্বললো নদীর দুই পারেই। চোদ্দ তারিখে ওপারে, পনেরো তারিখে এপারে। কেউ জানতো না বিভাজনের দাগটা কোথায় পড়েছে। কেউ জানতো না সে কোন দেশের লোক। ওই দুইটা রাতে আমি নৌকা নিয়ে ওপারে গেলাম। কারণ তখনো কেউ কাউকে আটকাচ্ছে না। শ্যামাকে নিয়ে চরে বসলাম। দুই পারের বাজির আলো জলের ওপর পড়ে কাঁপছিলো।  

সে বললো, আমরা এখন কোন দেশে বইসা আছি?

আমি বললাম, জানি না।

সে হেসে বললো, না জানাই ভালো।

সতেরো তারিখে শোনা গেলো, দাগটা পড়েছে ইছামতীর ঠিক মাঝ বরাবর। মাঝনদী দিয়ে। অর্থাৎ আমাদের চরটা কোন দেশে পড়লো, তা কেউ বলতে পারলো না। যে জিনিস জোয়ারে ডোবে আর ভাটায় ভাসে, তার দেশ ঠিক করবে কে।

প্রথম কয়েক বছর বাইরে থেকে তেমন কিছুই বদলালো না। নৌকা চলতো, হাট বসতো। শুধু নদীটা আর আগের মতো রইলো না। যে জলটা এতোকাল আমাদের জুড়ে রাখতো, সেটাই এখন আমাদের আলাদা করে রাখে। এই কথাটা একবার মাথায় ঢুকে গেলে চোখের সামনের সবকিছু পাল্টে যায়। ওপারে যাওয়া কমে এলো। কমতে কমতে বছরে তিন চারবারে ঠেকলো। প্রতিবার ফেরার সময় মনে হতো, নদীটা আগের চেয়ে একটু চওড়া হয়ে গেছে।

শ্যামার সাথে শেষ দেখাটা হয়েছিলো বাহান্ন সালের বর্ষায়।

সেদিন সে চুপচাপ ছিলো। অনেকক্ষণ পরে বললো, বাপে সম্বন্ধ আনছে। কালীগঞ্জে। আমি না করছি। কিন্তু আর কতোদিন পারুম গো মাঝি? ঘরে ডাগর মাইয়া রাখা এখন আর আগের মতো সহজ না।

আমি বললাম, দুইটা মাস দাও। টিন প্রায় ভরছে।

জোয়ার এসে গিয়েছিলো। নৌকা ছাড়তে হবে। সে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির কোঁচড় ঝাড়িয়। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকালো আমার দিকে । ষোলো বছরে ওই প্রথম সে আমাকে মাঝি বললো না। 

আফসার। দেরি কইরো না।

কী আশ্চর্য! নিজের নামটা নিজের কানে শুনতে যে এতো ভালো লাগে, আমি এতোদিন জানতামই না।

তার কিছুদিন পরেই ঘোষণাটা এলো। পনেরোই অক্টোবরের পর ওপারে যেতে হলে পাসপোর্ট লাগবে, কাগজ লাগবে, ছবি লাগবে, অফিসের সিল লাগবে। যে মানুষ দশ মিনিটে নৌকায় ওপারে যেতো, তার সামনে হঠাৎ একটা দরজা তৈরি হলো। আর সেই দরজার গায়ে তারিখ লেখা হলো। দুই পারে হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো। ঘাটে ঘাটে মানুষ পুঁটলি নিয়ে বসে রইলো।

আমি হেকমত আলীর কাছে গেলাম। সীমান্তে তার লোক ছিলো। দারোগা থেকে চৌকিদার সবাই তার টাকা খেতো। বিস্কুটের টিনটা তার সামনে উপুড় করে ঢেলে দিলাম। নয় বছরের জমানো দুইশো ছেচল্লিশ টাকা। কম পড়লো। বাপ ততদিনে নাই। নৌকাটাই ছিলো তার রেখে যাওয়া একমাত্র জিনিস। সেটা বেচে দিলাম দুইশো টাকায়। সব মিলিয়ে চারশো ছেচল্লিশ টাকা হেকমত আলীর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, মেয়েটাকে আইনা দেন। বাকি জীবন আপনার নৌকা বাইবো।

সে টাকাটা দুইবার গুনলো। তারপর গামছায় ঘাড় মুছে বললো, চোদ্দ তারিখ রাইতে চরে থাকিস।

চোদ্দ তারিখ রাতে আমি চরে ছিলাম। কুয়াশা পড়েছিলো। জোয়ার এসে চরের কিনারা ভিজিয়ে দিলো। তারপর ভাটা নামলো, তারপর আবার জোয়ার। সারারাত বৈঠাটা কোলে নিয়ে বসে রইলাম আর তাকিয়ে রইলাম ওপারে। ভোরের আলো ফুটলে দেখলাম, সামনে শুধু নদী। শ্যামা নেই।

অনেক পরে জেনেছিলাম, ওই রাতের আগেই শ্যামার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। তার বাপ ভয় পেয়ে পূজার আগেই মেয়ের বিয়ের পাট চুকিয়ে দিয়েছিলেন। হেকমত আলী তবু জেনেশুনেই আমার টাকাটা নিয়েছিলো জেনেশুনেই জানিয়েছিলো তারিখটা। মানুষ মারার জন্য অস্ত্র লাগে না, একটা মিথ্যা আশাই যথেষ্ট।

তবু ওই লোকটাকে আমি আজ আর দোষ দিই না। দোষটা আমার। যতোবার কথাটা মনে পড়ে, ততোবার কানের ভেতর একটা কথাই বাজে। দেরি কইরো না। সারাটা জীবন আমি ওই অপেক্ষাটাকে আদর করে জমিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম ওটা আমার সম্পত্তি। জানতাম না, অপেক্ষা জিনিসটা ধার করা। আর তার সুদ বড় চড়া।

একাত্তরে যখন যুদ্ধ লাগলো, ওপার থেকে মানুষ দলে দলে এপারে আসতে লাগলো। রিলিফ কমিটির নৌকায় সাত মাস আমি বিনা পয়সায় বৈঠা টেনেছি। রাতের পর রাত। প্রত্যেকটা নৌকায় আমি মেয়েদের মুখের দিকে তাকাতাম। উনিশ বছর পেরিয়ে গেছে। চেহারা বদলে যায়, তবু আমি তাকাতাম। যদি কোনো একটা মেয়ে শ্যামার হয়! 

এখন আমার বয়স পঁচাশি। মাঝির চরটা আর নেই। ষাটের দশকের কোনো এক বর্ষায় স্রোত ওটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। যে জায়গাটায় আমরা ছয় ঘণ্টা করে জোয়ারের অপেক্ষা করতাম, সেখানে এখন শুধু জল। জলের ওপর টানটান করে বাঁধা একটা দড়ি। আর দুই দেশের বন্দুকওয়ালাদের নৌকা।

তবু বছরে একটা দিন আছে। দশমীর দিন দুই পারের মানুষ ঠাকুর নিয়ে নদীতে নামে। শয়ে শয়ে নৌকা। শয়ে শয়ে নৌকা। দুই পারে দুই দেশের পতাকা, ঢাকের শব্দ, সিঁদুর, ধোঁয়া। নৌকাগুলো দড়ির দুই পাশে এসে ঠেকে থাকে। আর মানুষ গলা ফাটিয়ে ওপারের অচেনা মানুষকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায়।

আমি মুসলমান মানুষ। পূজার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। তবু বাহান্ন সালের পর থেকে প্রত্যেক দশমীতে আমি একটা নৌকা ধার করে ওই ভিড়ের ভেতর গিয়ে বসে থাকি।

বৈঠার হাতলে এখন আর কোনো অক্ষর নেই। আমার হাতের ঘষায় নামটা ক্ষয়ে গেছে। প্রথমে শেষের অক্ষর, তারপর মাঝেরটা। তারপর পুরোটাই। এখন সেখানে কেবল একটা মসৃণ গর্ত, ঠিক বুড়ো আঙুলের মাপে। 

ওই গর্তে আঙুলটা বসিয়ে আমি সারা বিকেল কান পেতে বসে থাকি। হাজার মানুষের চিৎকার, ঢাক, বাঁশি, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। আমি ওই সবকিছুর ভেতর থেকে একটা মাত্র শব্দ শোনার জন্য বসে থাকি। কেউ আমার নাম ধরে ডাকে না।

তারপর ভাটা নামে। জল ওপার থেকে নেমে এপারে আসে। আমার নৌকার গা ছুঁয়ে চলে যায়। ছয় ঘণ্টা পর আবার ওপারে ফিরে যায়। দিনে দুইবার। রোজ। একদিনও এই নিয়মের নড়চড় হয় না।

আমি আঁজলা ভরে সেই জল তুলে মুখে দিই।

নোনা।

ঠাকুমার গল্পটা তাহলে মিথ্যা ছিলো না।  

১৩/৮/২০২৬

কোথাও মানুষ ভালো রয়ে গেছে ~ সুব্রত ঘোষ

১৯৯১ সাল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ল। তীব্র সংকটে পড়ে গেল কিউবা। পেট্রোল নেই, রাসায়নিক সার নেই, ট্রাক চলে না। ৮০% খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল যে দেশ নতুন পরিস্থিতিতে সেই দেশে খাবারের জন্য হাহাকার শুরু হল শহরে শহরে।

তখনই কিউবার মানুষ বেছে নিল এক অভিনব পথ: “Organopónicos”। গ্রীনহাউস স্টাইলে চাষ পদ্ধতির সূচনা হল দেশে। কৃষিমন্ত্রক অনুমোদন দিতেই তারা শহরের পরিত্যক্ত জায়গা, রাস্তার পাশে, পার্কে , ছাদে, ব্যালকনিতে শুরু করল জৈব চাষ। নাম দিল “Organopónicos.”

Uploaded Image পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ শহরভিত্তিক জৈব কৃষি আন্দোলন এভাবেই শুরু হয় হাভানার বুকে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই উৎপন্ন হচ্ছিল শাকসবজি। স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেরাই শ্রম দিচ্ছিল, নিজেরাই খাচ্ছিল।পরিবেশ বান্ধব চাষবাসই হয়ে ওঠে শহরের খাদ্যনির্ভরতার ভরসা। সমাজতান্ত্রিক মডেলে উৎপাদিত খাবার সমানভাবে ভাগ হয়ে পৌঁছাত সাধারণ মানুষের ঘরে। 



ডন আলফ্রেডো, হাভানার এক শহরতলিতে নিজের বাড়ির পাশে ফাঁকা জায়গায় উদ্যোগ নিয়ে একখণ্ড জমি তৈরি করেন। এখন এই ২০২৫তে তার চাষ করা পালংশাক পৌঁছে যায় ৬০টি পরিবারের প্লেটে।

 কিউবার এই urban organic farming revolution—এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী, এবং সাধারণ জনগণের একত্রে গড়ে তোলা এক বিকল্প পথের ইতিহাস। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবায় শুরু হয় "Special Period in Time of Peace" —এই সময়েই কিউবার রাষ্ট্র নেতৃত্ব ঘোষণা করে “আমরা স্থানীয় উৎপাদনেই খাদ্যনির্ভরতা গড়ব”। কিউবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান INIFAT (Instituto de Investigaciones Fundamentales en Agricultura Tropical) জৈব সার, কম্পোস্টিং, প্রাকৃতিক কীটনাশক ইত্যাদির ব্যবহার করে কেমন করে শহরে চাষ করা যায়— সে বিষয়ে সরকারকে নীতিগত পরামর্শ দেয়।

পাড়াভিত্তিক সংগঠনগুলো খাদ্য উৎপাদনে স্থানীয় মানুষদের একত্র করে, স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাগান তৈরি করে, এবং খাদ্য বণ্টনের দায়িত্বও নেয়। হাভানার বাসিন্দা মারিয়া গঞ্জালেজ, যিনি সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাদে বাগান তৈরি শুরু করেন, তিনি এক পাড়া ক্লাব গড়ে তোলেন— যেখানে শিশুদের নিয়ে কৃষিকাজ শেখানো হতো। হাভানার প্রতিটি পৌর এলাকায় অন্তত একটি করে urban farm থাকতেই হবে— এ ছিল সরকারি নিয়ম। "Local food, zero transport, no chemicals" ছিল মূল শ্লোগান।

২০০৩ সালের মধ্যেই কিউবার শহরগুলোতে প্রায় ৩৫,০০০ হেক্টর জমি শহুরে জৈব চাষে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ঐ বছর দেশের কৃষি উন্নয়ন সম্মেলনে ফিদেল কাস্ত্রো বলেন "জৈব চাষ করছেন মানে আপনি পিছিয়ে পড়ছেন না। এই পদ্ধতি আমাদের বাস্তবকে স্বীকার করে নিতে শেখায়। এই নতুন পরিস্থিতিতে আমরা শিখেছি যে অসাধারণ কিছু করা যায় বিষ বা পেট্রোলিয়াম ছাড়াই।" যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এই স্বনির্ভর কৃষি আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শহরের মানুষ যদি নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করে, তাহলে সাম্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সচেতনতা — সব একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। তিনি বললেন "Con la tierra y el sudor, no hay dictadura que gane.” মাটি আর ঘামের সঙ্গে থাকলে কোনো একনায়কতন্ত্রই জিততে পারে না।

২০০৬ সালে জাতিসংঘের FAO (Food and Agriculture Organization) কিউবার শহরভিত্তিক কৃষিকে “একটি বৈশ্বিক মডেল” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। হাভানায় Urban Agriculture International Congress এ ২০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি কিউবার অভিজ্ঞতা শোনেন। নেপালে ২০১৫-র ভূমিকম্পের পরে, কিছু NGO কিউবার মডেল অনুসরণ করে শহরে চট, বাঁশ ও প্লাস্টিক ব্যাগে অর্গানিক খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ শুরু করে। 


বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

পুঁজিবাদের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ: লোমহীনতার রাজনীতি ~ আনুশা মেহরিন

পিরিয়ড হ্যাকস নিয়ে একটা ভিডিও দেখেছিলাম একদিন। ঐখানে একটা হ্যাক দেখায় প্যাড খোলার 'এম্ব্যারেসিং' আওয়াজকে ঢাকার জন্যে কী করতে হবে।
 মাইয়া মানুষ হওয়াটা বিরাট এক সমস্যা। কোনো একটা বিষয়ে সমস্যা না থাকলেও জোর করে সমস্যা বানায়ে মেয়েদের মাথায় পুশ করা হয় এটা লজ্জাজনক একটা সমস্যা, দেখো আমরা এটার সলিউশন দিচ্ছি। 

এটার ১০০/১০০ উদাহরণ হইতে পারে মেয়েদের বডি হেয়ার নিয়ে জিলেটের কারসাজিটা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জিলেট প্রথম সেফটি রেজর আনার পর  পুরুষদের বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর সাথে জিলেটের চুক্তি হয়। প্রতিটি সোলজার কিটের সাথে জিলেটের সেফটি রেজর আর ব্লেড দেয়া হতো। জিলেটের তো তখন রমরমা ব্যবসা। সামরিক বাহিনীর কাছে বাল্ক অর্ডার চলে যাচ্ছে। যুদ্ধের ঐ বছরগুলোয় জিলেট প্রচুর অঙ্কের মুনাফা করেছিলো।  
কিন্তু যুদ্ধ তো কখনো শেষ হবে। আর যুদ্ধ শেষ হলে এই বাল্ক অর্ডার পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেনাবাহিনী ছাড়ার পর পুরুষদের সবসময় ক্লিন শেভড থাকার প্রয়োজনীয়তাও এতটা থাকবেনা। সুতরাং মুনাফা কিছুটা হলেও কমে আসবে।  

জিলেটের তখন চোখ পড়লো বাকি অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ওপর। কিন্তু নারীদের তো দাড়ি শেইভ করার ঝামেলা নাই। তাদের সমস্যার সলিউশন হিসেবে তাহলে জিলেটের প্রোডাক্টকে কীভাবে প্রেজেন্ট করা যায়? 


উত্তর হলো, নতুন একটা সমস্যা তৈরী করে। 
'পার্ফেক্ট নারী' হওয়ার জন্যে সোশ্যাল যেই প্রেশার নারীদের ওপর আছে, জিলেট ঠিক করলো সেটাকে ইউটিলাইজ করবে। ১৯১৫ সালে 'হার্পারস বাজারস' ম্যাগাজিনে একটা বিজ্ঞাপন ছাপা হয় যার মূল বক্তব্য ছিলো তাদের হেয়ার রিমুভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে সমুদ্রে যাওয়ার সময় শরীরের লোম নিয়ে মেয়েদের আর লজ্জা পেতে হবেনা। বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিলো 'You need not be embarrassed!'। অথচ হাস্যকর বিষয় হলো, বডি হেয়ারের মতো স্বাভাবিক ব্যাপার নিয়ে তখন মেয়েদের অতোটা মাথা ব্যথা ছিলো না। পুঁজিবাদ ও বিজ্ঞাপন শুধুমাত্র নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে এই বিষয়টিকে করে তুললো নারীদের জন্যে লজ্জার, অস্বাস্থ্যকর ও আনফেমিনিন। 
জিলেটসহ ঐ সময়ের আরো নামী কিছু কোম্পানি এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল মার্কেটিং শুরু করে। তারা নারীদের প্রেজেন্ট করতে শুরু করলো অত্যন্ত কমনীয়ভাবে, প্রকৃত নারীদের ত্বক হতে হবে 'স্মুথ অ্যাজ সিল্ক', শরীরের ভিজিবল অংশে কোনো লোম থাকলে সেটা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ও আনস্যানিটারি।  সাধারণ নারীরা বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও বিজ্ঞাপনে এসব দেখে হীনমন্যতায় ভোগা শুরু করে এবং নিজেদের শরীরের স্বাভাবিক বিষয়গুলোকে ত্রুটি হিসেবে দেখতে থাকে। আস্তে আস্তে কয়েক জেনারেশনের নারীরা এতেই অভ্যস্ত হতে থাকে ও এই হেয়ার রিমুভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করাটাকে জীবনের অংশ হিসেবে ধরে নেয়। অর্থাৎ, জিলেটসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলো ১০০বছর আগে এমন এক সাইকোলজিক্যাল চক্র তৈরী করে যাতে পা দেয় আমার মতো পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন নারীরা। আমাদের ইনসিকিউরিটিকে কাজে লাগিয়ে, নিজের কাছে নিজের শরীরকে অস্বাভাবিক অনুভব করিয়ে মাল্টিমিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি তৈরী হয়ে গেলো। আর আমরা খুশিমনে তাদের খেলায় দাবার গুটি হয়ে রয়ে গেলাম একশো বছর ধরেই। 

_পুঁজিবাদের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ:  লোমহীনতার রাজনীতি 

আনুশা মেহরিন
০২.০৮.২৬

ছাড়পত্র ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

 রাত দুটো বাজলে এই হাসপাতালটা মরা বাড়ির মতো চুপ হয়ে যায়। করিডোরের লাইট আধখানা নিভিয়ে দেয়। নার্সরা ফিসফিস করে কথা বলে। তখন আমি ফোন করি রাশেদকে। আমার বর ঘুমায় কেবিনের সোফায়। আর আমি কাঁথার নিচে মুখ ঢুকিয়ে কথা বলি সেই মানুষটার সাথে, যার সাথে এগারো বছর আগে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।

শুনতে খারাপ লাগছে? লাগুক। যে মানুষ মরে যাচ্ছে, ভালোমন্দের হিসাব করার সময় তার হাতে নেই।
আমার নাম নীলা। বয়স পঁয়ত্রিশ। ব্রেস্ট ক্যান্সার, স্টেজ ফোর। রোগটা এখন আর শুধু বুকে নেই। লিভারে গেছে, হাড়ে গেছে। ডাক্তারি ভাষায় মেটাস্টেসিস। ডাক্তাররা এখন আর সারানোর কথা বলে না। বলে প্যালিয়েটিভ কেয়ার। কথাটার মানে খুব সোজা। যন্ত্রণাটা একটু কমিয়ে রাখা, আর অপেক্ষা করা।
শুরুটা ছিলো একটা ছোট্ট চাকার মতো শক্ত দলা। বাঁ দিকের স্তনে। ব্যথা ছিলো না। ব্যথা ছিলো না বলেই পাত্তা দিইনি। সংসার ছিলো, অফিস ছিলো। শাশুড়ির ডায়াবেটিস ছিলো। নিজের শরীরটা লিস্টের সবার শেষে ছিলো। যেদিন ডাক্তারের কাছে গেলাম, ততদিনে দলাটা তার কাজ গুছিয়ে এনেছে। বায়োপসি রিপোর্টটা আরিফ আমাকে পড়তে দেয়নি। ওর মুখ দেখেই আমি পড়ে ফেলেছিলাম।
আরিফ ভালো মানুষ। দশ বছরের সংসারে একটা দিনও খারাপ ব্যবহার করেনি। বিল দেয়, ওষুধ আনে। ডাক্তারের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে। রিপোর্টের ফাইল তারিখ ধরে ধরে সাজায়। ও ভালোবাসে দায়িত্ব দিয়ে। কিন্তু আমার তো এখন আর দায়িত্ব লাগে না। আমার এখন গল্প লাগে। পুরোনো দিনের গল্প। আরিফের সাথে আমার পুরোনো দিন মানে ফার্নিচারের কিস্তি আর ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন। আর রাশেদের সাথে আমার পুরোনো দিন মানে গোটা একটা জীবন, যেটা কোনোদিন শুরুই হলো না।
আত্মীয়রা আসে। ফলের ঝুড়ি, হরলিক্সের কৌটা আর মাপা দুঃখ নিয়ে। খালাম্মা বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো মা। ভাবি বলেন, আজকাল ক্যান্সার তো ভালোই হয়ে যায়। বলার সময় কেউ আমার চোখের দিকে তাকায় না। মিথ্যা বলার সময় মানুষ চোখের দিকে তাকাতে পারে না। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। আমার চোখ বন্ধ দেখলে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মরণাপন্ন মানুষের সাথে কী কথা বলতে হয়, এই দেশের কেউ জানে না।
হাসপাতালের রাতগুলো সবচেয়ে লম্বা। ঘুম আসে না। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হিসাব করি, আর কয়টা শ্রাবণ পাবো না, আর কয়টা শীত। আমাদের কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি। এতিম বড় ভারী শব্দ।
রাশেদের সাথে বিয়ের দিন ঠিক ছিলো। কার্ড ছাপা হয়ে গিয়েছিলো। তারপর এক সকালে ওর বাবা মারা গেলেন। হার্ট অ্যাটাক। মরার পর জানা গেলো ভদ্রলোক ব্যবসার নামে মাথার ওপর সত্তর লাখ টাকার দেনা রেখে গেছেন। আমার বাবা তিন দিন চুপ করে রইলেন। চতুর্থ দিন বললেন, যে ছেলের ঘাড়ে বাপের দেনা, তার ঘাড়ে মেয়ে দেবো না। আমি কাঁদলাম। ভাত খাওয়া বন্ধ করলাম। একবার হাত কাটার কথাও ভাবলাম। তারপর যা হয়। তিন মাসের মাথায় আরিফের সাথে বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের রাতে রাশেদের একটা মেসেজ এসেছিলো। দুইটা শব্দ। ভালো থেকো। ব্যস। এগারো বছর আর কোনো কথা হয়নি।
রোগটা ধরা পড়ার পর একদিন আমি ওকে ফোন করলাম। নম্বরটা এগারো বছর মুখস্থ ছিলো। মরণাপন্ন মানুষের একটা সুবিধা আছে। তার আর লজ্জা লাগে না। ও ধরলো। আমি বললাম, রাশেদ, আমি নীলা। আমার ক্যান্সার হয়েছে। শেষ স্টেজ। মরার আগে তোমার সাথে একটু গল্প করতে চাই।
ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ হলো না। তারপর ও শুধু বললো, কখন ফোন করবো, বলো।
সেই থেকে রোজ রাতে আমাদের কথা হয়। ও কথা বলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে, গলা নামিয়ে। ঘরে ওর বউ ঘুমায়। আমি কথা বলি কাঁথার নিচে, ফিসফিস করে। সোফায় আমার বর ঘুমায়। ব্যাপারটাকে বাইরে থেকে দেখলে পরকীয়া ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। অথচ আমরা দুজনেই জানি, এই ফোনের ভেতর শরীর নেই, সংসার ভাঙার প্ল্যান নেই, পালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নেই। আছে শুধু একটা মেয়ে, যে মরে যাচ্ছে। আর একটা ছেলে, যে তাকে মরার আগে কয়েকটা সুন্দর রাত ধার দিচ্ছে। এই সম্পর্কের কোনো নাম বাংলা ভাষায় নেই।
আমরা কী কথা বলি? সব কথা। ক্যাম্পাসের বকুলতলা। ক্যান্টিনের পোড়া সিঙাড়া। টিএসসির চা। রিকশার হুড। আর মাঝে মাঝে এই রোগটার কথা। রাশেদ শুনতে চায় না, তবু আমি বলি। কাউকে তো বলতে হবে।
বলি, জানো, কেমো নেওয়ার সময় মনে হয় শিরার ভেতর দিয়ে কেউ গরম সিসা ঢেলে দিচ্ছে। কেমোর তিন দিন পর থেকে মুখের ভেতর ঘা হয়ে যায়। ভাত গিলতে পারি না। পানি খেলে মনে হয় লোহা খাচ্ছি। জিভে কোনো স্বাদ নেই। আমার মা মরার আগে যে হাতের রান্না খেতে চেয়েছিলাম, সেই খিচুড়িটাও এখন কেমিক্যালের মতো লাগে।
বলি, আমার চুলগুলোর কথা মনে আছে তোমার? ও চুপ করে থাকে। মনে থাকবে না কেন। কোমর পর্যন্ত চুল ছিলো আমার। ও বলতো, তোমার চুলে বৃষ্টির গন্ধ। সেই চুল প্রথম কেমোর পনেরো দিনের মাথায় বালিশে, বাথরুমের মেঝেতে, চিরুনিতে গোছা গোছা উঠে আসতে লাগলো। আমি নিজেই একদিন নরসুন্দর ডেকে মাথা কামিয়ে ফেললাম। কাঁদিনি। শুধু ভুরু দুটো যেদিন ঝরে গেলো, সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারিনি। কেমোথেরাপি খুব সৎ জল্লাদ। সে কিছুই বাকি রাখে না।
অপারেশনের কথাটা ওকে বলেছিলাম আরো পরে। ম্যাসটেকটমি। বাঁ দিকের স্তনটা পুরো কেটে বাদ দিতে হয়েছে। কথাটা বলার সময় আমার গলা কাঁপেনি। ওর কেঁপেছিলো।


কারণ ও জানে ওই বুকের দাম। বিয়ের তিন মাস আগে, এক শ্রাবণের দুপুরে, ওর মেসে কেউ ছিলো না। বাইরে এমন বৃষ্টি যে জানালার ওপাশে শহরটাই ছিলো না। ভেজা পর্দা উড়ছিলো। আমরা দুজন প্রথমবার কাছে এসেছিলাম। আমার তখন কী লজ্জা, কী ভয়, আর তার ভেতরে কী অসম্ভব সুখ। রাশেদ আমার বুকে মুখ রেখে বলেছিলো, এইখানে আমার দেশ। আমি ওর চুলের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে হেসেছিলাম। সারা জীবনে ওই একটাই দুপুর। তারপর তো বিয়েই ভেঙে গেলো।
ফোনে ওকে বললাম, তোমার দেশটা আর নেই রাশেদ। কেটে ফেলে দিয়েছে একটা স্টিলের ট্রেতে। জায়গাটায় এখন একটা লম্বা কাটা দাগ। আরিফ ওই দাগের দিকে তাকায় না। দুই বছর ধরে ও আমাকে ছুঁয়েও দেখে না। ঘেন্নায় না, ভয়ে। যেন আমার শরীরটা কাচের, ছুঁলেই ভেঙে যাবো।
ওপাশে রাশেদ অনেকক্ষণ কথা বললো না। তারপর শুনলাম ও কাঁদছে। পঁয়ত্রিশ বছরের একটা পুরুষ মানুষ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে, মুখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদছে। যেন ঘরের ভেতর শব্দ না যায়।
আমার কেবিনটা ডাবল বেডের। খরচ বাঁচাতে এটাই নেওয়া। পাশের বেডে ছিলেন রাহেলা বানু। বয়স সাতষট্টি। কোলন ক্যান্সার, সাথে কিডনিও বসে যাচ্ছে। উনার তিন ছেলে। তিনজনই ঢাকায় থাকে, ভালো চাকরি করে। পালা করে একজন একজন আসতো। আধা ঘণ্টা বসে, ফোন টিপে, চলে যেতো।
বুড়ি সারাদিন আমার সাথে গল্প করতেন। গ্রামের গল্প, ছেলেদের গল্প। বলতেন, বুঝলা মা, বড় পোলাডারে ইশকুলে দিমু বইলা আমার বিয়ার কানের দুল বেচছিলাম। মেজোডার মেডিকেল কোচিংয়ের সময় ছয় মাস এক বেলা খাইছি। হেরা জানে না। মায়েরা কইতে পারে না এইসব।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, খালা, আপনার কষ্ট হয় না? উনি হাসলেন। ফোকলা মুখে অদ্ভুত মায়া। বললেন, পোলাপান হইলো ধানের মতো, মা। যত্ন কইরা বড় করবা। পাকলেই আর তোমার থাকবো না। তহন সে গোলার। আমি কথাটার মানে তখন পুরোটা বুঝিনি।
বুঝলাম বুধবার রাতে। রাত তিনটার দিকে মনিটরটা চিৎকার করে উঠলো। নার্স দৌড়ে এলো, ডাক্তার এলো। পর্দা টেনে দিলো। ভোররাতে সব শান্ত হয়ে গেলো। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, উনার মুখের ওপর সাদা চাদর টেনে দেওয়া হলো। আগের দিন সকালেই আমাকে বলেছিলেন, মা গো, আইজ শইলডা বড় হালকা লাগতাছে। হালকা লাগবেই তো। সব বোঝা তো উনি নামিয়ে রেখে যাচ্ছিলেন ছেলেদের কাঁধে।
ছেলেরা সেই বোঝা নিলো না।
সকালে তিন ভাই এলো। কান্নাকাটি না, প্রথমেই বিলিং সেকশনে গেলো। বাইশ দিনের আইসিইউ আর কেবিন মিলিয়ে বিল হয়েছে চার লাখ সাতাশ হাজার টাকা। হাসপাতালের নিয়ম পরিষ্কার। বিল ক্লিয়ার না হলে ডেথ সার্টিফিকেট দেবে না। লাশের ছাড়পত্র দেবে না। করিডোরে দাঁড়িয়ে তিন ভাইয়ের ফিসফিস তর্ক আমি কেবিনের ভেতর থেকে শুনলাম। বড়টা বলছে, গত মাসেও আশি হাজার আমি একলা দিছি। মেজোটা বলছে, আমার মেয়ের স্কুলের ভর্তি সামনে, আমি এতো পারবো না। ছোটটা ফোনে কাকে যেন বলছে, আব্বা বাইচা থাকলে এই দিন দেখা লাগতো না।
যে মানুষটা কানের দুল বেচে ওদের মানুষ করলো, তার দাম উঠলো না চার লাখ সাতাশ হাজার টাকা।
অথচ আমি জানি, শেষ কয়টা দিন উনি কাদের মুখ চেয়ে বেঁচে ছিলেন। জ্বরের ঘোরে উনি ছেলেদের ডাকতেন ছোটবেলার নামে। সেলিম, বাবু, টুনু। শেষ যেদিন জ্ঞান পরিষ্কার ছিলো, নার্সের হাত ধরে বলেছিলেন, আমার পোলাগো কইও, আমার লেইগা যেন টেনশন না করে। যে ছেলেরা পরদিন করিডোরে দাঁড়িয়ে বিল ভাগাভাগি করতে পারলো না, মা তাদের টেনশনের কথা ভেবে গেছেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। মা এমনই। ধানের গোলা লুট হয়ে যায়, মাটি টের পায় না।
সারাটা দিন লাশটা পাশের বেডে পড়ে রইলো। সাদা চাদরে ঢাকা। এসির ঠান্ডায় ঘরটা মর্গ হয়ে গেলো। সন্ধ্যায় আরিফ বাড়ি গেলো কাপড় আনতে। আয়া মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়লো। আর আমি জেগে রইলাম একটা লাশের পাশে।
সে এক ভয়ংকর রাত। বারবার মনে হচ্ছিলো চাদরটা উঠছে, নামছে। মনে হচ্ছিলো চাদরের নিচ থেকে উনি আমাকে দেখছেন। জানি সব ভুল, সব মনের বানানো। তবু। মৃত্যু জিনিসটা যতক্ষণ বইয়ের পাতায় থাকে, তাকে দার্শনিক লাগে। পাশের বেডে শুয়ে থাকলে তাকে লাগে হিম, সাদা আর অসহ্য রকমের কাছের। আজ ও, কাল আমি। মাঝখানে শুধু একটা পর্দা।
রাত আড়াইটায় রাশেদকে ফোন করলাম। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিলো না। বললাম, রাশেদ, আমার পাশের বেডে একটা লাশ শুয়ে আছে। ওর ছেলেরা ওকে নিচ্ছে না। টাকার জন্য। রাশেদ, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।
ও একটাবারও বললো না, ভয় পেয়ো না। ও জানে ওই কথায় কাজ হয় না। ও গল্প শুরু করলো। তোমার মনে আছে, ফার্স্ট ইয়ারে তুমি আমার খাতা থেকে নোট চুরি করেছিলে? মনে আছে, বকুলতলায় তোমার স্যান্ডেল ছিঁড়ে গিয়েছিলো আর তুমি খালি পায়ে হেঁটেছিলে, আমি স্যান্ডেল হাতে পেছনে? মনে আছে সেই রিকশাওয়ালা চাচা, যে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বলেছিলো, তোমাগো দুইজনরে মানাইছে ভালা?
এইভাবে, একটা একটা করে স্মৃতি দিয়ে, ও আমাকে ভোর পর্যন্ত পার করে দিলো। ফজরের আজান যখন ভেসে এলো, আমি বললাম, রাশেদ, আমি মরতে চাই না।
কথাটা বলেই বুঝলাম, এই একটা বাক্যের জন্যই আমি এতোদিন ওকে ফোন করছি। আমি বাঁচতে চাই। কী ভীষণ, কী নির্লজ্জ রকমভাবে বাঁচতে চাই। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শাড়ি চাই না, ফ্ল্যাট চাই না, কারো ভালোবাসা পর্যন্ত চাই না। আমি শুধু আরেকটা বর্ষা চাই। ভোরবেলা চায়ের কাপে চুমুক চাই। বৃষ্টির দিনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকা শহর দেখতে চাই। মানুষ সারা জীবন কত বড় বড় জিনিস চায়। মরার সময় সে শিশু হয়ে যায়। সামান্য জিনিস চেয়ে কাঁদে। খিচুড়ি। বৃষ্টি। আরেকটা সকাল।
একদিন রাশেদ জিজ্ঞেস করলো, নীলা, তুমি কি আমাকে এখনো ভালোবাসো? আমি সত্যিটাই বললাম। বললাম, জানি না। মনে হয় আমি তোমাকে ফোন করি নিজেকে ভালোবাসি বলে। তোমার গলার ভেতর সেই তেইশ বছরের নীলাটা এখনো বেঁচে আছে। যার কোমর পর্যন্ত চুল ছিলো, আস্ত শরীর ছিলো, সামনে গোটা একটা জীবন পড়ে ছিলো। আমি রোজ রাতে ওই মেয়েটার সাথে দেখা করতে যাই। মানুষ আসলে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে নিজেকে, রাশেদ। রাহেলা খালার ছেলেরাও তাই। আমিও তাই।
ও একটু চুপ থেকে বললো, আর আমি? আমি বললাম, তুমিও। তুমি আমাকে সময় দিয়ে আসলে এগারো বছরের পুরোনো একটা কষ্ট ধুয়ে ফেলছো। ও রাগ করলো না। শান্ত গলায় বললো, ধুইতে দাও নীলা। এই ময়লাটা অনেকদিন বয়ে বেড়াচ্ছি।
তারপর সেই রাতটা এলো, যেটার ভয়ে আমি এতদিন ফোনের ওপাশের ঘরটার কথা ভাবতাম না। রিং হতেই ফোন ধরলো একটা মেয়েলি গলা। হ্যালো। আমি পাথর হয়ে গেলাম। রাশেদের বউ। গলাটা নরম করে বললো, আপা, ও ওয়াশরুমে। আপনি লাইনে থাকেন, ও আসতেছে। তারপর একটু থেমে বললো, আপা, একটা কথা। আপনি যখন খুশি ফোন দিয়েন। আমি কিছু মনে করি না। মানুষটা এগারো বছর বুকের ভেতর একটা কবর নিয়া ঘুরছে। আপনি আসার পর কবরটায় ফুল দেওয়া হইতেছে। কিছু ঋণ থাকে আপা, শোধ করতে দিতে হয়।
আমি ফোন কানে চেপে নিঃশব্দে কাঁদলাম। মানুষ কত ছোট হয় দেখেছি এই হাসপাতালে। মানুষ এত বড়ও হয়, সেটা জানলাম একটা ফোনকলে।
এখন মরফিনের ডোজ বাড়ছে। ব্যথাটা থাকে হাড়ের ভেতরে, মজ্জায়। দিন আর রাত মিশে যাচ্ছে একটা ঘোলা স্রোতে। কাল ডাক্তার আরিফকে করিডোরে ডেকে নিয়ে কী যেন বললো। আরিফ ফিরে এলো লাল চোখ নিয়ে। আমার পায়ের কাছে বসে প্রথমবারের মতো আমার হাতটা ধরলো। ক্যানোলার পাশটা এড়িয়ে, খুব সাবধানে। আমি বুঝে গেলাম। বিলিং সেকশনে না। ওপরে কোথাও, আমার ছাড়পত্র তৈরি হচ্ছে।
কাল রাতে রাশেদকে বললাম, আমাকে শেষবারের মতো সেই দুপুরটার গল্প বলো। ও বললো। ভেজা পর্দা। জানালার ওপাশে মুছে যাওয়া শহর। টিনের চালে বৃষ্টির তবলা। আমার ভেজা চুলের গন্ধ। ওর ঠোঁট, আমার লজ্জা, সেই একটা দুপুরের সমস্ত আলো। আমি চোখ বন্ধ করে শুনলাম। মরফিনের ঘোরের ভেতরেও শরীরটা একবার কেঁপে উঠলো। পুরোনো সুখ মরে না। সে শুধু ঘুমিয়ে থাকে।
গল্প শেষ হলে বললাম, রাশেদ, আমার জানাজায় এসো না। তুমি সামনে দাঁড়ালে আমার উঠে বসতে ইচ্ছা করবে।
ও হাসলো না। ফোনটাও রাখলো না। আমরা দুজন চুপ করে রইলাম। ওপাশে ওর নিঃশ্বাসের শব্দ। এপাশে স্যালাইনের ফোঁটা। টুপ। টুপ। টুপ।
পাশের বেডে আজ নতুন রোগী এসেছে। অল্পবয়সী একটা মেয়ে, চোখে ভয়। সকালে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপা, আপনার কী হইছে? আমি হাসলাম। বললাম, তেমন কিছু না। ছুটির অপেক্ষায় আছি।
জানালার বাইরে শ্রাবণ মাস। আকাশ কালো করে আসছে। বৃষ্টিটা নামুক। বৃষ্টিটা দেখে যেতে পারলে আর কোনো আফসোস রাখবো না।

বাবা ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার বাবা দুইজন। একজন আমার সাথে আর কথা বলে না। আরেকজনকে আমি পকেটে নিয়ে ঘুরি।
দ্বিতীয়জন একটা গোলাপি ট্যাবলেট। সাইজে বুটের দানার মতো। গায়ে ইংরেজিতে দুইটা অক্ষর খোদাই করা। রাস্তায় ওর অনেক নাম। গুটি, মাল। তবে সবচেয়ে চালু নামটা শুনলে আপনার গা শিউরে উঠবে। বাবা। হ্যাঁ, এই দেশের লাখ লাখ ছেলে ওই গোলাপি জিনিসটাকে বাবা বলে ডাকে। কেন ডাকে, সেটা বুঝতে আমার চব্বিশ বছর লেগে গেলো। বাবার মতোই ও আপনাকে আগলে রাখবে, ভরসা দেবে। আর একদিন দেখবেন ওকে ছাড়া আপনি কিছুই না।
আমার নাম রাফি। মিরপুরের ছেলে। এই গল্পটা আমি লিখছি না, কনফেস করছি। কারণ আমার আর হারানোর কিছু নেই।
তেইশ সালের কথা। আমি তখন একুশ। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে সিএসই পড়ি। রাত জেগে ভ্যালোরেন্ট, ডিসকর্ডে আড্ডা, ফাইভারে টুকটাক লোগো ডিজাইন। মাথার ভেতর সারাক্ষণ উনিশটা ট্যাব খোলা। সিজিপিএ, ক্লায়েন্ট, কানাডার স্বপ্ন, বাবার প্রেশারের ওষুধ, ছোটবোন তিন্নির টিউশনের বেতন। আমাদের জেনারেশনটাই এমন। সবকিছুর সাথে কানেক্টেড। অথচ কারো সাথে কানেক্টেড না। বুকের ভেতর সারাক্ষণ একটা লো ব্যাটারি সাইন জ্বলে।
আর আমরা সবাই পালাই। কেউ রিলসে, কেউ গেমে, কেউ হাসতে হাসতে ডিপ্রেশনের মিম বানায়। বড়রা বলে আমরা অলস। আমরা অকৃতজ্ঞ। তারা বোঝে না, চল্লিশ লাখ বেকারের লাইনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে ঠিক কী দেখা যায়। আমরা কেউ ভালো নেই। আমি শুধু পালানোর সবচেয়ে খারাপ দরজাটা বেছে নিয়েছিলাম, এই যা তফাত।
ওই ঝাপসা জীবনে একটাই স্বস্তির ব্যাপার ছিলো। অথৈ। আমার ক্লাসমেট। টিএসসিতে না। আমাদের প্রেম হতো ইউনিভার্সিটির সিঁড়িতে আর মেট্রোরেলে। ও টিফিন বক্সে নুডলস আনতো দুইজনের জন্য। প্ল্যান ছিলো, গ্র্যাজুয়েশনের পর দুজনে আইইএলটিএস দেবো। কানাডা যাবো। স্নো দেখবো। অথৈ বলতো, তুই খালি পাশটা কর রাফি। বাকিটা আমি সামলাবো। কেউ আমার দায়িত্ব নিতে চাইছে, এই ফিলিংসটাই আমার জীবনের সেরা নেশা ছিলো। তখনো জানতাম না।
অথৈর একটা পাগলামি ছিলো। মন ভালো থাকলে ও আমার হাতের তালুতে আঙুল দিয়ে কী যেন লিখতো। জিজ্ঞেস করলে বলতো না। শুধু বলতো, তুই পাশ করে বের হ, সেদিন বলবো। আমি হাত মুঠো করে রাখতাম, যেন লেখাটা পড়ে না যায়।
সেমিস্টার ফাইনালের আগের সপ্তাহে ঘটনাটা ঘটলো। তিন রাত ঘুমাইনি। দুইটা ব্যাকলগ, ক্লায়েন্টের ডেডলাইন। আদনান বললো, ওর বাসায় গ্রুপ স্টাডি হবে। গিয়ে দেখি স্টাডি না। টেবিলের ওপর সিগারেটের ফয়েল, একটা লাইটার আর ছোট্ট একটা গোলাপি দানা। আদনান হাসলো। বললো, টেনশন নিস না মামা। এইটা খেলে এক রাতে পুরা সিলেবাস শেষ। সবাই খায়। আর্মির পোলাপান খায়, বিসিএস ক্যাডাররাও খায়।
আমি না করেছিলাম। সত্যি বলছি, প্রথমে না করেছিলাম। তারপর ভোর চারটায়, যখন চোখ জ্বলছে আর সিলেবাসের অর্ধেক বাকি, আদনান ফয়েলটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো। বললো, একবার। জাস্ট একবার।
পৃথিবীর সব সর্বনাশ এই শব্দটা দিয়ে শুরু হয়। একবার।
প্রথম টানটার কথা আমি কবরে গিয়েও ভুলবো না। পোড়া মিষ্টি একটা ধোঁয়া গলা দিয়ে নামলো। আর দশ সেকেন্ডের মাথায় মনে হলো মাথার ভেতরের উনিশটা ট্যাব একসাথে বন্ধ হয়ে গেলো। প্রথমবারের মতো, জীবনে প্রথমবারের মতো, সব শান্ত। ক্লান্তি নেই, ভয় নেই, খিদা নেই, ঘুম নেই। শুধু বিদ্যুতের মতো একটা শিহরণ শিরদাঁড়া বেয়ে উঠছে আর নামছে। মনে হলো আমি চাইলে আজ রাতে গোটা সিলেবাস না, গোটা পৃথিবী মুখস্থ করে ফেলতে পারবো। মনে হলো আমার মতো সুখী কেউ কোনোদিন জন্মায়নি। এই যে ফিলিংটা, এইটাই ফাঁদ। স্বর্গ দেখিয়ে ও আপনার নাম, ঠিকানা লিখে নেয়।
সেই রাতে আমি সত্যিই পুরো সিলেবাস শেষ করেছিলাম। পরীক্ষাও ভালো হলো। কিন্তু স্বর্গের ভাড়া আছে। দুইদিন পর নামলো ক্র্যাশ। মনে হলো কেউ আমার শরীর থেকে ব্যাটারিটা খুলে নিয়ে গেছে। টানা ষোলো ঘণ্টা ঘুমালাম। ঘুম ভেঙে দেখি পৃথিবীর রংটাই বদলে গেছে। সব ধূসর। সব বিস্বাদ। সবাই বিরক্তিকর। আর মাথার ভেতর মশার মতো একটা সূক্ষ্ম চিন্তা ঘুরছে। আরেকটা হলেই সব ঠিক হয়ে যায়। ব্রেইনের ভেতর হিসাবটা এভাবেই বসে গেলো। প্রেশার মানেই গোলাপি দানা। প্রথম মাসে সপ্তাহে একটা। পরের মাসে দুইটা। তিন মাসের মাথায় দিনে একটা লাগে। না হলে হাত কাঁপে। মেজাজ সপ্তমে চড়ে। মনে হয় খুলি খুলে ব্রেইনটা চুলকাই।

তারপর টাকার খেলা শুরু। একেকটা দানার দাম তিনশো টাকা। ফাইভারের ইনকাম গেলো। টিউশনের বেতন গেলো। সেমিস্টার ফির সত্তর হাজার টাকা বাবার কাছ থেকে নিয়ে ভার্সিটিতে জমা দিলাম না। বাসায় একটার পর একটা মিথ্যা। ল্যাব ফি লাগবে। প্রজেক্টের জন্য হার্ডডিস্ক লাগবে। বন্ধু বিপদে পড়ছে। নেশাখোরের প্রতিভা জানেন? মিথ্যা বলার সময় আমাদের গলা কাঁপে না। কাঁপে শুধু হাত, দানাটা ফয়েলে বসানোর সময়।
আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতাম না। ছয় মাসে ওজন কমলো তেরো কেজি। গালে দুইটা গর্ত। মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে। দুইটা দাঁত নড়ে ওঠে প্রায়ই। রাতে ঘুম নেই, দিনে মরার মতো পড়ে থাকি। আর মাথার ভেতর ফিসফিসানি। মনে হতো দেয়ালের ওপাশে কেউ আমার নামে কথা বলছে। মনে হতো মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে কেউ দেখছে। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম মেথ সাইকোসিস। আমার ভাষায়, দোজখের ট্রেইলার।
অথৈর কথা বলি। যেটা বলতে আমার সবচেয়ে কষ্ট হয়।
নেশার প্রথম দিকে ইয়াবা শরীরটাকে জানোয়ার বানিয়ে দেয়। ভেতরে একটা খিদা জাগে। যেটা প্রেম না, ক্ষুধা। একদিন হাই অবস্থায় অথৈকে এমন আক্রোশে কাছে টেনেছিলাম যে ওর হাতের চুড়ি ভেঙে হাত কেটে গেলো। ও ছিটকে সরে গিয়ে যেভাবে আমার দিকে তাকালো, ওই দৃষ্টিটা আমি এখনো স্বপ্নে দেখি। ভয়। আমার অথৈ আমাকে ভয় পাচ্ছে। ও কাঁপা গলায় বলেছিলো, তুই আমাকে দেখছিস না রাফি। তুই আমার শরীর দিয়ে অন্যকিছু খাচ্ছিস।
ও ঠিক বলেছিলো। আর সবচেয়ে নোংরা সত্যিটা কী জানেন? কিছুদিন পর ওই ক্ষুধাটাও মরে গেলো। ইয়াবা প্রথমে শরীর জাগায়। তারপর শরীরটাই মেরে ফেলে। শেষদিকে অথৈ পাশে বসলে আমার কিছুই হতো না। কিচ্ছু না। একটা চব্বিশ বছরের ছেলের ভেতরে ভালোবাসার মানুষ ছুঁয়ে দিলে যদি কিছু না জাগে, তার চেয়ে নির্মম প্রহসন আর নেই। আমার সব অনুভূতির একটাই দরজা তখন। গোলাপি।
অথৈ তাও ছাড়েনি। ও আমার নেশার কথা জানতো। বাসায় জানায়নি। নিজের টিউশনির টাকায় আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেছে। ওষুধ কিনে দিছে। শেষবার ও আমার হাত ধরে বলেছিলো, রাফি, আমি তোর নেশার সাথে আর পারতেছি না। হয় ওইটা, নয় আমি। এক মাস টাইম। আমি কসম কেটেছিলাম। সতেরো দিনের মাথায় ও আদনানের ফ্ল্যাটে এসে আমাকে পেলো ফয়েল হাতে।
ও চিৎকার করলে বাঁচতাম। থাপ্পড় মারলে বাঁচতাম। ও কিছুই করলো না। দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলো। তারপর খুব আস্তে বললো, ভালো থাকিস। ব্যস। ভালোবাসা যখন মরে যায়, কোনো চিৎকার চেঁচামেচি হয় না জানেন। কেবল নিঃশব্দে একটা দরজা বন্ধ হয়ে যায়। যাওয়ার সময় ও একবারও আমার হাতের দিকে তাকালো না। হাতের তালুর ওই লেখাটা আমার আর জানা হলো না। কোনোদিন হবেও না।
এরপরের অধ্যায়গুলো দ্রুত বলি। কারণ নেশার গল্পের মাঝের পার্টটুকু সব দেশে, সব ঘরে একই। টাকার জন্য মায়ের কানের দুল বেচলাম। তিন্নির ল্যাপটপের জমানো টাকা সরালাম। ভার্সিটি থেকে নাম কাটা গেলো। আর টাকা যখন কোথাও নেই, তখন শাকিল ভাই হাত বাড়ালো। এলাকার বড় ভাই। বললো, মামা, মাল টানবি টাকা লাগবো না। খালি দুই এক জায়গায় পৌঁছায় দিবি।
আমি ক্যারিয়ার হয়ে গেলাম। মিরপুর থেকে ফার্মগেট। পুরিয়া পৌঁছে দেই। বিনিময়ে আমার ভাগ। শাকিল ভাই নিজে জীবনে একটা দানাও মুখে দেয়নি। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই আপনি খান না? সে হেসে বলেছিলো, পাগল নাকি। মাল হইলো কাস্টমারের লেইগা। বেপারীর লেইগা না। ওই হাসিটা মনে পড়লে আমার এখনো খুন করতে ইচ্ছা করে। আমাদের মতো ছেলেদের জ্যান্ত সমাধি বানিয়ে ওরা প্রাসাদ তোলে।
ধরা খেলাম এক বৃহস্পতিবার রাতে, টেকনিক্যাল মোড়ের চেকপোস্টে। পকেটে বাইশটা দানা। থানায় যা হলো সেটা লিখতে হাত কাঁপছে। ওসির রুমের পাশের ঘরে নিয়ে দুইজন কনস্টেবল লাঠি দিয়ে পায়ের তালুতে মারলো। মুখে যা আসে তাই বলে গালি দিলো। খানকির পোলা, তোর বাপেরে ডাক। ভোরবেলা বাবা সত্যিই এলেন। শিক্ষক মানুষ। সারাজীবন কলার উঁচু করে হেঁটেছেন। ছেলের হাতে হাতকড়া দেখে উনি দারোগার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমার সব সহ্য হয়, বাবার ওই জোড়হাত সহ্য হয় না।
মাদক আইনে মামলা হলো। তেইশ দিন কেরানীগঞ্জ কারাগারে ছিলাম। জানতে চান জেলখানা কেমন? মেঝেতে ঘুমানো একশো লোকের ওয়ার্ডে সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিসটার নাম কী শুনবেন? বাবা। জ্বি। যে জিনিসের জন্য জেলে ঢুকলাম, জেলের ভেতর সে দ্বিগুণ দামে হাজির। এই দেশে চেইনটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, ওই তেইশ দিনে আমি বুঝে গেছি। আর বুঝেছি বলেই বলি, ঘৃণা করলে আমাকে কইরেন না। ঘৃণা করেন ওদের, যারা চালানটা ঢোকায়। যারা মাসোহারা খেয়ে চোখ বোজে। যারা স্কুলগেটে বাচ্চাদের হাতে ফ্রি স্যাম্পল ধরায়া দেয়।
বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে উকিল ধরলেন। জামিন হলো। তারপর আমাকে পাঠানো হলো রিহ্যাবে। সাভারের দিকে একটা প্রাইভেট নিরাময় কেন্দ্র। মাসে পঁচিশ হাজার। ভর্তির দিন মোবাইল কেড়ে নিলো। মাথা ন্যাড়া করলো, বেল্ট খুলে নিলো। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম, এইটা হাসপাতাল না, খোঁয়াড়। চল্লিশজন ছেলে দুইটা ঘরে। ভোর পাঁচটায় ঠান্ডা পানিতে গোসল। খাবারে মাছি মরে লেপ্টে থাকে। উইথড্রয়ালের যন্ত্রণায় কেউ চিৎকার করলে ট্রিটমেন্ট একটাই, পিভিসি পাইপ। ওরা এটাকে বলতো মোটিভেশন। যে স্টাফরা মোটিভেশন দিতো, তারা নিজেরাই এক্স অ্যাডিক্ট। ডাক্তার সাইকোলজিস্ট কিছুই না। সাইনবোর্ডে লেখা ছিলো, ভালোবাসাই মাদকমুক্তির পথ। পাইপের বাড়ি পিঠে পড়লে ওই সাইনবোর্ডটা পড়তাম আর হাসতাম। এক রাতে পাশের ওয়ার্ডের একটা ছেলে পালাতে গিয়ে ধরা পড়লো। ওকে যেভাবে মারা হলো, পরদিন অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয়েছিলো। খবরে মাঝে মাঝে দেখেন না, রিহ্যাবে রোগীর মৃত্যু? বিশ্বাস করেন, ওগুলা দুর্ঘটনা না।
মাসে একদিন ফ্যামিলি ডে ছিলো। মা আসতেন। গ্রিলের এপাশ থেকে আমার ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর কাঁদতেন। যাওয়ার সময় স্টাফদের হাতে পাঁচশো টাকা গুঁজে দিয়ে বলতেন, আমার ছেলেটারে একটু দেইখেন ভাই। ওরা টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে রাতে আমাকে পাইপ দিয়ে পেটাতো। আর সপ্তাহে একদিন হতো কাউন্সেলিং। চল্লিশজনকে এক ঘরে বসিয়ে প্রজেক্টরে একটা মোটিভেশনাল ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হতো। এই দেশে মাদকের চিকিৎসার বাজেট এইটুকুই।
ওই খোঁয়াড়ে আমি সেন্টু ভাইকে পেয়েছিলাম। বয়স তেতাল্লিশ। নয় নম্বর বারের মতো রিহ্যাবে। একসময় ব্যাংকে চাকরি করতো। গুলশানে পোস্টিং ছিলো। ইয়াবা তার চাকরি খেয়েছে, ফ্ল্যাট খেয়েছে। সবশেষে বউ আর সইতে না পেরে ছেলেকে নিয়ে চলে গেছে অস্ট্রেলিয়া। বালিশের নিচে ছেলের একটা ছবি রাখতো। পাঁচ বছরের বাচ্চা। এখন সতেরো। সেন্টু ভাই রাতে ছবিটার সাথে কথা বলতো। আমাকে একদিন বললো, বুঝলি রাফি, রিহ্যাব নেশা ছাড়ায় না। নেশাটারে খালি পজ করায়। প্লে বাটনটা থাকে গেটের ঠিক ওপাশে, রাস্তায়। আমি নয়বার প্রমাণ পাইছি।
সেন্টু ভাইয়ের অষ্টমবারের গল্প শুনে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম। সেবার বের হয়ে সে এগারো মাস ক্লিন ছিলো। একটা কুরিয়ার কোম্পানিতে চাকরিও জুটিয়েছিলো। সপ্তাহে একদিন ছেলের সাথে ভিডিও কল হতো। তারপর এক ঈদের সকালে, ফাঁকা ঢাকায়, ফাঁকা মেসে, একলা ঘরে বসে তার মনে হলো, এতগুলা দিন ভালো থাকলাম, আজ একটু সেলিব্রেট করলে কী হয়। এগারো মাসের সাধনা ভাঙতে এগারো মিনিট লাগেনি। সেন্টু ভাই বলতো, নেশা হইলো কুমিরের মতো রে রাফি। সে তোরে তাড়া করবো না। ঘাটে চুপ কইরা বইসা থাকবো। সে জানে, তোর তেষ্টা একদিন পাইবোই।
চার মাস পর বের হলাম। ওজন বাড়লো, চোখের নিচের গর্ত ভরলো। বাসায় ফিরে তিন মাস সত্যিই ক্লিন ছিলাম। তারপর এক বিকেলে ফেসবুক খুলে দেখি অথৈর বিয়ে। গায়ে হলুদের ছবি। হলুদ শাড়িতে ও হাসছে, যে হাসিটা একসময় আমার জন্য বরাদ্দ ছিলো। ক্যাপশনে লেখা, অ্যান্ড সো দ্য নিউ চ্যাপ্টার বিগিনস। ওই রাতেই আমি শাকিল ভাইয়ের নম্বরে কল দিলাম। সেন্টু ভাই ঠিক বলেছিলো। প্লে বাটনটা রাস্তায়ই ছিলো।
এরপর যে কাজটা করলাম, তার কোনো ক্ষমা হয় না। কোনো অজুহাতও হয় না। টাকার জন্য ঘরে হাত দিলাম আবার। মায়ের শেষ সম্বল, নানির দেওয়া বালা জোড়া। মা হাতেনাতে ধরলেন।
চিৎকার করলেন না। শুধু বালাটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, নে বাবা, বেইচা খা। তাও চুরি করিস না। বাবা সেই রাতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আশ্চর্যরকম শান্ত গলায় বললেন, আজ থেকে তুই আমার কাছে মরা। এই বাড়িতে তোর জায়গা নাই। তিন্নি দরজার আড়াল থেকে দেখছিলো। আমার লক্ষ্মী বোনটা। যে ছোটবেলায় আমার প্লেট থেকে ভাত খেতো, সে আর আমার চোখের দিকে তাকায় না।
এখন আমি একটা মেসে থাকি। শাকিল ভাই এখন আর মহল্লায় দাঁড়ায় না। কালো একটা গাড়িতে ঘোরে। কাউন্সিলরের প্রোগ্রামে মালা পরে। তার পুরোনো কাস্টমারদের মধ্যে দুইজন গত বছর মরে গেছে। একজন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। আরেকজন আদনান। হ্যাঁ, সেই আদনান, যে আমাকে প্রথম ফয়েলটা এগিয়ে দিয়েছিলো। চব্বিশ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে হার্ট বন্ধ হয়ে গেলো। ডাক্তার বললো, মেথ বহুদিন ধরে হার্টটাকে খেয়ে ফেলছিলো। ওর জানাজায় লোক হয়েছিলো এগারোজন। ফেসবুকে তিন দিন শোক। তারপর সবাই ভুলে গেছে। আমাদের জেনারেশন মরলে নিউজফিডে একটা রেস্ট ইন পিস হয়। এই যা!
মা এখনো লুকিয়ে দেখা করেন। মাসে এক দুইবার, বাসার নিচের গলিতে। বাটিতে করে ভাত তরকারি নিয়ে আসেন। কিছু বলেন না, শুধু খাওয়া দেখেন। পৃথিবীর সবাই নেশাখোরকে ত্যাগ করতে পারে। মা পারে না। মায়েদের ওই ক্ষমতাটাই নাই।
আজ আমার ক্লিন থাকার চার মাস তেরো দিন চলছে। রিকভারি মিটিংয়ে যাই। দিন গুনি। ডায়েরি লিখি। ডাক্তার বলছে সম্ভব, অনেকেই ফিরে আসে। আমি বিশ্বাস করার চেষ্টা করি। কিন্তু আপনাদের একটা সত্যি কথা বলি, যেটা কোনো ডাক্তারের সামনে বলিনি।
আমার পকেটে একটা গোলাপি ট্যাবলেট আছে। বহুদিন ধরে। খাইনি, ছুঁইওনি। শুধু রাখি। রাতে যখন হাড়ের ভেতরটা চিনচিন করে, হাত দিয়ে পকেটের ওপর থেকে ওকে অনুভব করি। কী করবো বলেন। মানুষের তো বাবার কাছেই ফিরতে ইচ্ছা করে। আমার এক বাবা আমাকে মৃত ঘোষণা করেছে। আরেক বাবা প্রতি রাতে ফিসফিস করে ডাকে।
আপনারা দোয়া কইরেন, আমি যেন প্রথমজনের কাছে ফিরতে পারি।

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

লো কার্বহাইড্রেট ~ পার্থ সারথী আইন

যতই দিন যাচ্ছে ততোই বুঝছি যে ৩৩ বছর আগে ডাক্তারী পড়ার শেষে যা যা শিখেছিলাম বা যেভাবে শিখেছিলাম সবই আজ প্রায় unlearn করতে হচ্ছে বিজ্ঞানের উন্নতির কৃপায়। যে biochemistry বা physiology র বিষয় গুলো মুখস্থ করে পাশ করে গেছি সেগুলোর গুরুত্বই বুঝিনি তখন বা শিক্ষকেরাও জানতেন না বলে বোঝাতেও পারেননি, আর আজকের মহামারী মেটাবোলিক সিনড্রোম এবং ক্যান্সার এর মহামারী ও তখন ছিলো না।। আজও সেই যুগ পুরাতন শিক্ষা চলছে - যদিও একজন সচেতন বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার সীমিত সাধ্যের মধ্যেই ছাত্র দের সেগুলোর বিষয় চোখ ফোটানোর চেষ্টা করছি, স্বাস্থ্য নিয়ে নানান ভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করে চলেছি।

বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তা চেতনায় আমাদের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো আমরা মানুষরা আদতেই অন্তর থেকে পরিবর্তন বিরোধী, একটা নতুন কিছু শেখার বা জানার আগ্রহ ভীষণ কম এবং যদিও বা শেখা গেলো তবুও আমাদের পুরানো চিন্তা বা mindset এর জাল কেটে বেরিয়ে সেই নতুন সত্য কে মেনে নেওয়া বা প্রয়োগ করার মানসিকতাও অত্যন্ত বিরল। রাজনীতিতেও একথা কিন্তু সু প্রযোজ্য। চিকিৎসক ও সাধারণ রোগীদের একটা বিরাট অংশের ক্ষেত্রেও আমি দেখছি এই অনড় মানসিকতা, যেটা তাদের সুস্থতা অর্জনের পক্ষে এক বিশাল বাধা বলেই আমার মনে হয়। 

এরকমই এক বিষয় হলো কোষে কোষে চলতে থাকা পলিওল পথ (Polyol pathway) ও ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদনের বিষয়টি – যেটা কোনদিন মন দিয়ে পড়তামই না সেটা আজ আমাদের মেটাবোলিক অসুস্থতার একটি বড়ো উপায় হয়ে দেখা দিয়েছে, এটা চিকিৎসক দেরও যেমন বুঝতে হবে তেমনি এযুগের স্টুডেন্টস দের ও তেমনি মাথায় ঢোকাতে হবে। তাই এ প্রসঙ্গের অবতারণা করতে বসেছি - সহজ, সরল ভাষায় সব্বার জন্যে। বিজ্ঞানের দ্রুত বদলে যাওয়া দিগন্তের সাথে আমাদের ও পুরানো mindset, পুরানো শিক্ষার খোলস পাল্টাতেই হবে - না হলে ওষুধস্য কৃপা হি কেবলম বলতে বলতেই শ্মশানে পৌঁছে যাবো তাড়াতাড়িই।

একজন শিক্ষকের অন্তর্দৃষ্টি থেকে বুঝি যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের টেক্সটবই বা পুরনো কারিকুলাম প্রায়শই আমাদের রোগ নির্ণয় ও ওষুধ প্রেসক্রাইব করার "প্রোটোকল" শেখায়, কিন্তু তার পেছনের মূল বায়োকেমিস্ট্রি বা মেটাবলিক মেকানিজম (মেটাবলিক শারীরবৃত্ত) কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—তা অনেক সময়ই বাদ পড়ে যায়। তাই মুসুর ডাল, টোম্যাটো, খাসীর মাংস খাওয়া যে ইউরিক অ্যাসিড বাড় বাড়ন্তের আসল কারণ নয়, গাদা গাদা ভাত, রুটি খেতে থাকলে যে পলিওল পাথওয়ে দ্রুত গতিতে চলে এবং ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন বাড়ে - এসব সাম্প্রতিক গবেষণা র ফলাফল আমাদের জানতেই হবে, অন্যকে জানাতেও হবে। এসব তথ্য আপনার কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব যাদের তারা চুপ করে বসে আছি, প্রাচীন চিন্তার গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে ভেসে দিন নির্বাহ করার জন্য আর উল্টোদিকে বৃহত্তর অংশের মানুষ ক্রমেই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে - এর চাইতে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে? অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞানী / শিক্ষকরাই যখন এই ধরনের পুরনো মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে শিক্ষার্থীদের চোখ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন, তখনই চিকিৎসার প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় এবং মানুষ তার সুস্বাস্থ্যের অধিকার ফিরে পেতে শুরু করেন ওষুধ নির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে।

পলিয়ল পাথওয়ে (Polyol Pathway) কী এবং কেন এটি জানা দরকার?

Uploaded Image সহজ কথায়, পলিয়ল পাথওয়ে হলো শরীরের কোষ গুলির মধ্যে ঘটে চলা একটি বিকল্প মেটাবলিক পথ, যার মাধ্যমে আমাদের শরীর গ্লুকোজকে (Glucose) সরবিটলে (Sorbitol) এবং পরবর্তীতে ফ্রুক্টোজে (Fructose) রূপান্তরিত করে।



স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের রক্তে থাকা গ্লুকোজের ৯৫% বা তার বেশি ব্যবহৃত হয় শক্তি তৈরির কাজে (Glycolysis ও Krebs Cycle-এর মাধ্যমে)। পলিয়ল পাথওয়েতে স্বাভাবিক অবস্থায় মাত্র ৩-৫% গ্লুকোজ প্রবেশ করে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ (Hyperglycemia) থাকে কিংবা শরীরে প্রচুর পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত ফ্রুক্টোজ প্রবেশ করে।

   (অতিরিক্ত গ্লুকোজ) 
       │
       ▼ (Aldose Reductase এনজাইম - NADPH খরচ করে)
    (সরবিটল (Sorbitol)) ───► (কোষে আটকে যায় ও টিস্যু ড্যামেজ করে)
       │
       ▼ (Sorbitol Dehydrogenase এনজাইম)
   (ফ্রুক্টোজ (Fructose)) ───► (ফ্যাটি লিভার ও মেটাবলিক সিন্ড্রোম বাড়ায়)

কেন এটি মেটাবলিক অসুস্থতার মূল "খলনায়ক"?

বহু বছর ধরে বায়োকেমিস্ট্রিতে পলিয়ল পাথওয়েকে শুধু ডায়াবেটিসের কিছু জটিলতার (যেমন: ছানি পড়া বা নিউরোপ্যাথি) কারণ হিসেবে একটি একঘেয়ে চক্র মনে করে মুখস্থ করানো হতো। কিন্তু আধুনিক মেটাবলিক সায়েন্স দেখাচ্ছে—এটি আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার মারাত্মক রোগের মূল চালিকাশক্তি:

Uploaded Image ১. সেলুলার অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খালি হওয়া: গ্লুকোজকে সরবিটলে ভাঙতে শরীরের NADPH নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অণু খরচ হয়। এই NADPH-এর কাজ হলো আমাদের শরীরের সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট Glutathione (গ্লুটাথিয়ন)-কে পুনরায় সক্রিয় রাখা।



পলিয়ল পাথওয়ে অতিরিক্ত সক্রিয় হলে শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কভার শেষ হয়ে যায়। ফলে কোষে প্রাবল্য পায় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, যা ভাস্কুলার ড্যামেজ, ইনফ্ল্যামেশন এবং দ্রুত বার্ধক্যের দিকে নিয়ে যায়।

২. সরবিটলের "অসমোটিক ট্র্যাপ" (Osmotic Trapping)

সরবিটল এমন এক যৌগ যা সহজে কোষের পর্দা (Cell Membrane) পার হয়ে বাইরে বের হতে পারে না। ফলে এটি কোষের ভেতরে জমতে থাকে এবং জল টেনে নেয় (অসমোসিস)।

চোখে: চোখের লেন্সের ভেতরের কোষ ফুলে যায়, ফলে প্রাক-প্রৌঢ়ত্বেই ছানি (Cataract) পড়ে।

স্নায়ুতে: নার্ভ সেল ড্যামেজ হয়ে নিউরোপ্যাথি (পায়ে জ্বালা-যন্ত্রণা, অনুভূতিহীনতা) তৈরি হয়।

৩. এনডোজেনাস বা শরীরের ভেতরে ফ্রুক্টোজ প্রোডাকশন ও ফ্যাটি লিভার
আমরা ভাবি ফ্রুক্টোজ শুধু কোল্ড ড্রিঙ্কস বা মিষ্টি খেলেই শরীরে ঢোকে। কিন্তু রক্তে গ্লুকোজ বেশি থাকলে পলিয়ল পাথওয়ের মাধ্যমে শরীর নিজের ভেতরেই ফ্রুক্টোজ তৈরি করতে শুরু করে (Endogenous Fructose Production)। এই ভেতরে তৈরি হওয়া ফ্রুক্টোজ লিভারে গিয়ে সরাসরি ফ্যাটি লিভার (NAFLD/MASLD), ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ইউরিক এসিড বৃদ্ধি এবং উচ্চ রক্তচাপ ঘটায়।
Uploaded Image


তাহলে পলিয়ল পাথওয়ে আপনার শরীরে জেগে উঠেছে কিনা সেটা বুঝতে কোন টেস্ট করা ভালো - Fasting বা খালিপেটে সুগার নাকি ইউরিক অ্যাসিড টেস্ট?

ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS) আমাদের শরীরে গ্লুকোজের উপস্থিতির একটি স্থির চিত্র (static snapshot) প্রদান করে, কিন্তু এটি প্রায়শই পলিয়ল পাথওয়ের (polyol pathway) অতি-সক্রিয়তা (hyperactivation) শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

প্রথমত, উপরে দেওয়া Flow chart টি দেখলে ভালো বুঝবেন, অ্যালডোজ রিডাক্টেজ শান্টিং (aldose reductase shunting) প্রক্রিয়াটা প্রধানত খাবার খাওয়ার পরের গ্লুকোজ স্পাইক বা পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল গ্লুকোজ বৃদ্ধির (>১৪০–১৮০ mg/dL) কারণে ঘটে। 

এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ হেক্সোকাইনেজ (hexokinase) এনজাইম বা উৎসেচক কে সমপৃক্ত (saturate) করে ফেলে, ফলে normal Glucose metabolism এর রাস্তা উপচে পড়ে বাড়তি glucose হু হু করে aldose reductase shunting প্রক্রিয়া নামের bypass রাস্তায় ঢুকে পড়ে, আর excess Fructose এবং Uric acid production কে বাড়িয়ে কোষের খেল খতম করতে থাকে —এমনকি যেসব লোকেদের সকালের ফাস্টিং গ্লুকোজ স্বাভাবিক বা সামান্য বেশী (১০০–১১০ mg/dL), তাদের ক্ষেত্রেও এটি ঘটে। (নীচের ছবি দেখুন )

দ্বিতীয়ত, FBS কোষের ভেতরের মেটাবলিক স্ট্রেস পরিমাপ করতে পারে না। অন্যদিকে ইউরিক এসিড কোষের ভেতরের ATP নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, ফ্রুক্টোলাইসিস (fructolysis) এবং Xanthine Oxido Reductase উৎসেচকের -মধ্যস্থতায় তৈরী ROS (রিয়্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস) – এগুলোর দ্বারা ঘটতে থাকা মেটাবলিক ক্ষতির মাত্রা সরাসরি নির্ধারণ করে যথেষ্ট ভালোভাবে।

তৃতীয়ত, যেহেতু ইউরিক এসিড সক্রিয়ভাবে অ্যালডোজ রিডাক্টেজকে upregulate বা ত্বরান্বিত করে, তাই সিরাম ইউরিক এসিডের উচ্চ মাত্রা নির্দেশ করে যে পলিয়ল পাথওয়েটি প্রাইজড (primed) এবং অতি-সক্রিয় হয়ে উঠেছে। 

ফলস্বরূপ, শুধুমাত্র FBS-এর তুলনায় সিরাম ইউরিক এসিডকে পলিয়ল পাথওয়ের প্রাথমিক অতি-সক্রিয়তা এবং এনডোজেনাস ফ্রুক্টোজ-জনিত মেটাবলিক সমস্যা শনাক্ত করার জন্য একটি অনেক উৎকৃষ্ট ও কার্যকর মার্কার (functional marker) হিসেবে গণ্য করা হয়।
Uploaded Image


দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং সামগ্রিক এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ সৃষ্টি পথের গতিশীলতা
পলিয়ল পাথওয়ের অতি-সক্রিয়তার খারাপ প্রভাব বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং সামগ্রিক পূর্ব ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর জিনগত ও মেটাবলিক প্রবণতা (susceptibility) অনেক বেশি দেখা যায়।

জিনোমিক পর্যায়ে বদলের ফলে অ্যালডোজ রিডাক্টেজের mRNA এক্সপ্রেশন এবং লোহিত রক্তকণিকায় এই এনজাইমের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এপিডেমিওলজিক্যাল বা মহামারী সংক্রান্ত সমীক্ষায় দেখা গেছে যে পূর্ব এশীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই জেনেটিক উস্কানিদাতা র প্রাদুর্ভাব বেশ বেশি।

যাদের মধ্যে CT বা TT জেনোটাইপ রয়েছে, তাদের শরীরে এনজাইমের এই উচ্চমাত্রার উপস্থিতির কারণে পলিয়ল শান্টিং শুরু হওয়ার জন্য গ্লুকোজের প্রয়োজনীয় থ্রেশহোল্ড (threshold) কমে যায়। এর ফলে ফাস্টিং গ্লুকোজের মাত্রা ১০০–১১০ mg/dL-এর মতো কম থাকলেও অ্যালডোজ রিডাক্টেজ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, এশীয় জনগোষ্ঠীর যেসব ব্যক্তির মধ্যে এই -106T অ্যালিল রয়েছে, তাদের মাইক্রোভাস্কুলার জটিলতা—যেমন প্রোলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, ডায়াবেটিক কিডনি ডিজিজ এবং পেরিফেরাল পলিনিউরোপ্যাথির ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়।

এই জিনগত সংবেদনশীলতা এশীয়দের নির্দিষ্ট এশিয়ান মেটাবলিক ফেনোটাইপ -এর সাথে সম্মিলিতভাবে কাজ করে। এই ফেনোটাইপের বৈশিষ্ট্য হলো—কম BMI থাকা সত্ত্বেও (>২৩ kg/m²) শরীরে ভিসেরাল ফ্যাটের (পেটের মেদ) উচ্চ শতাংশ, প্রাথমিক ধাপে ইনসুলিন নিঃসরণের অক্ষমতা এবং খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের দ্রুত ও অত্যাধিক ওঠানামা (postprandial glucose variability)।

উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত রিফাইন বা প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় (>১৮০ mg/dL), যা হেক্সোকাইনেজ এনজাইমকে সংপৃক্ত করে ফেলে। ফলে সকালের ফাস্টিং গ্লুকোজ সামান্য বেশি থাকলেও বারবার পলিয়ল শান্টিং ঘটতে থাকে। এর সাথে স্থানীয় হাইপারইউরিসেমিয়া (উচ্চ ইউরিক এসিড) এবং ফ্যাটি লিভারের (NAFLD/MASLD) উচ্চ হার যুক্ত হয়ে এমন এক মেটাবলিক পরিবেশ তৈরি করে, যা পলিয়ল পাথওয়েকে ক্রমাগত সক্রিয় রাখতে ইন্ধন জোগায়।

জিন এবং পরিবেশের এই মিথস্ক্রিয়া (gene-environment interaction) বিভিন্ন ক্লিনিকাল ট্রায়ালে চিকিৎসাগত কার্যকারিতার পার্থক্যের একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে। যেমন, অ্যালডোজ রিডাক্টেজ ইনহিবিটর (ARIs)—ইপালরেস্ট্যাট (epalrestat)— ওষুধটি জাপানি, চীনা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ডায়াবেটিস রোগীদের মাইক্রোভাস্কুলার রোগবালাই বিলম্বিত করতে ধারাবাহিকভাবে চমৎকার ক্লিনিকাল সুবিধা দেখিয়েছে কিন্তু আবার অন্যদিকে, ককেশীয় বা শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর করা ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলোতে এর কার্যকারিতা খুবই সীমিত পাওয়া গেছে—কারণ তাদের মধ্যে এই -106T জেনেটিক ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি কম এবং তাদের মেটাবলিক সিন্ড্রোম প্রধানত ম্যাক্রোভাস্কুলার ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ দ্বারা পরিচালিত হয়।

কীভাবে এই পাথওয়েকে শান্ত রাখা সম্ভব?

বিজ্ঞানের এই আপডেট আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে, শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে আসল কারণ দূর করতে হবে:

রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট ও চিনি বর্জন: লাইফস্টাইল থেকে অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমালে রক্তে গ্লুকোজের অতিরিক্ত বৃদ্ধি থামে, ফলে পলিয়ল পাথওয়ে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায় না।

প্রসেসড ফ্রুক্টোজ এড়ানো: সফট ড্রিঙ্কস, প্যাকেটজাত জুস এবং হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাফ বন্ধ করা।
টাইম-রেস্ট্রিক্টেড ইটিং / ফাস্টিং: শরীরকে গ্লুকোজ ও ইনসুলিন স্পাইক থেকে বিরতি দেওয়া, যাতে কোষগুলো নিজেকে মেরামত (Autophagy) করতে পারে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপোর্টিং ফুড: যা শরীরের Glutathione এবং NADPH লেভেল ধরে রাখতে সাহায্য করে।

নীচের ছবি গুলো ভালো করে দেখুন / পড়ুন : মূল কথা যা মনে রাখুন,গাদা গাদা ভাত, রুটি খাবেন না। চিঁড়ে, মুড়ি, বিস্কুট, চাউমিন, ময়দা র খাবার এড়িয়ে চলারই চেষ্টা করুন। Low carbohyrate - high fat - moderate protein diet এ যতো তাড়াতাড়ি পারেন ঢুকে পড়ুন, মাছ, মাংস, ডিম ( কিডনির শেষ দশা না হলে রোজ ৬টা করে ডিম খাওয়া দিয়ে শুরু করুন ), ঘি, নারকেল তেল প্রাণ ভরে খান। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে সপ্তাহে কাঁচা রান্না করা অবস্থায় প্রায় ৩৫০–৫০০ গ্রাম) খাসীর মাংস খাওয়া নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবে এটা আপনি স্বাভাবিক শর্করা ডায়েটে আছেন ধরে নিয়ে, কিন্তু যদি আপনি আমার মতো low carbohydrate ডায়েট এ অভ্যস্ত হন তাহলে আরামসে সপ্তাহে ৭০০-৮০০ গ্রাম খাসীর মাংস( দৈনিক গড়: এটি গড়ে দিনে প্রায় ১০০ গ্রাম-এর মতো পড়ে) খেতে পারবেন, সাথে ডিম, মাছ ও। লাভ কী হবে এতে? ইউরিক অ্যাসিড কমবে, ট্রাইগ্লাইসেরাইড কমবে, সুগারও নিয়ন্ত্রণে আসবে, কারণ আপনি পলিওল pathway কে বন্ধ করে ফেলেছেন এভাবে। তাহলে খাবারের বিজ্ঞান টা কি বোঝা গেলো?

মনে রাখবেন আপনার রক্তের ইউরিক অ্যাসিড ৪. ৫ এর ওপরে থাকা মানেই লাল সিগন্যাল - এর মানে আপনার খাবারে বাড়তি শর্করা ঢুকছে এবং তা পলিওল পথে shunt হয়ে যাচ্ছে - তাই তখনই কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণ কমিয়ে মাছ, মাংস ডিম বাড়িয়ে দিতে হবে।

আশা করি আমার এই সামান্য প্রচেষ্টা এবং চিন্তাভাবনা আমার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও মেটাবলিক স্বাস্থ্যের প্রকৃত রহস্য বুঝতে সাহায্য করবে।

শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

ফুলের মানুষ ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার প্রকাশক বলেন, আপনার লেখায় আজকাল প্রাণ নাই।

আমি বলি, প্রাণ কই কিনতে পাওয়া যায় বলেন, নিয়া আসি।

উনি হাসেন না। রয়্যালটির চেক লিখতে লিখতে গম্ভীর মুখে তিনটা পরামর্শ দেন। প্রেমে পড়েন। নেশা ছাড়েন। ভোরবেলা হাঁটেন। তিনটার একটাও আমাকে দিয়ে হবে না জেনেও আমি বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ি।

বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। দুইটা উপন্যাস, একটা গল্পের বই, আর ড্রয়ার ভর্তি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমার সংসার। মহল্লার লোকে জানে আমি লেখক। ঘনিষ্ঠরা জানে আমি মা তা ল। আর আমি জানি, আমি আসলে একটা দীর্ঘ অপেক্ষা। কীসের অপেক্ষা, জানি না। জানলে তো গল্পই শেষ হয়ে যেতো।

তানভীর আমার একমাত্র বন্ধু, যে এখনো আমাকে মানুষ মনে করে। ডকুমেন্টারি বানায়। এক সন্ধ্যায় আমার ফ্ল্যাটে এসে গ্লাসে চুমুক না দিয়েই বলল, শ্রীমঙ্গল ছাড়াইয়া পাহাড়ের ভিতরে একটা জায়গা আছে। নাম মেঘমাটি। জনা ত্রিশেক মানুষ থাকে। টাকা চলে না, ঘড়ি চলে না, মোবাইলের নেটওয়ার্ক ঢুকতে পারে না। নিজেরা ফলায়, নিজেরা খায়, রাইতে আগুন জ্বালাইয়া গান গায়। যাবি?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিদ্যুৎ আছে?

সে বলল, চাঁদ আছে।

উত্তরটা আমার পছন্দ হলো। নতুন উপন্যাসের মালমশলা হবে ভেবে ব্যাগে দুইটা শার্ট আর একটা বোতল ভরে রওনা দিলাম। যাওয়ার সময় আমি জানতাম, আমি যাচ্ছি একদল পলাতক অলস মানুষ দেখতে, যারা জীবনের পরীক্ষায় ফেল করে পাহাড়ে পালিয়েছে। ফেরার সময় জানলাম, পলাতক আসলে আমি। পালানোর সাহসটাও নাই বলে ঢাকায় বসে ছিলাম এতকাল।

মেয়েটাকে প্রথম দেখি ঝর্নার পাড়ে। ভেজা পাথরে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে চুলে জংলি ফুল গুঁজছে। পরনে আলখাল্লা ধরনের একটা জামা, হাতে রঙ লেগে থাকা আঙুল, আর মুখে এমন একটা নির্ভার ভাব, যেটা আমি ঢাকা শহরে বিশ বছরে একবারও দেখিনি। কারো মুখে না। আয়নায় তো নাই ই।

তানভীর পরিচয় করিয়ে দিলো, ইনি বিখ্যাত লেখক। মেয়েটা হাত মেলালো না, মাথাও নোয়ালো না। শুধু বলল, এইখানে কেউ বিখ্যাত না। খিদা লাগলে রান্নাঘরে খিচুড়ি আছে।

নাম জিজ্ঞেস করলে বললো, রোদ।

আসল নাম?

যেইটা কইলাম, সেইটাই আসল। বাপ মায়ের দেওয়াটা পুরান ঠিকানার মতো। চিঠি আর ওইখানে যায় না।

আমি হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, ফাঁ প র। শহরে এই বয়সী মেয়েরা কর্পোরেট চাকরি করে, আর এরা ফুল গুঁজে দর্শন কপচায়। রাতে খাওয়ার পর উঠানে আগুন জ্বলল। কেউ দোতারা আনলো, কেউ মাটির খোল। আমি একটু দূরে বসে নিজের বোতল খুললাম। কেউ আড়চোখে তাকালো না, কেউ বাহবাও দিলো না। এই প্রথম টের পেলাম, আমি এমন এক জায়গায় আসছি যেখানে আমার নেশাটাও কারো কাছে খবর না। ব্যাপারটায় আরাম পাবো না অপমানিত হবো, বুঝলাম না।

রোদ আগুনের ওপাশ থেকে উঠে এসে আমার পাশে বসল। বলল, আপনে সারাক্ষণ সবাইরে মাপতেছেন ক্যান?

মানে?

আসার পর থেইকা দেখতেছি। চোখ দিয়া সবার দাম ঠিক করতেছেন। এইটা শহরের রোগ। ওইখানে মানুষ দেখলেই আগে হিসাব করে, এর কাছ থেইকা কী পাওয়া যাইবো, একে কতটুকু বিশ্বাস করা যাইবো। আমরা এই হিসাবটা ছাইড়া দিছি। ছাড়ার পর দেখি, দিনে চাইর পাঁচ ঘণ্টা সময় বাঁইচা যায়।

আমি বললাম, এই যে তোমরা সমাজ ছাইড়া পালাইলা, এইটা কি এক ধরনের হার না?

রোদ আগুনের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর যেটা বলল, সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।


উনিশশো সাতষট্টি সাল। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরের হেইট অ্যাশবেরি নামের এক পাড়ায় এক লাখ তরুণ তরুণী জড়ো হইছিলো এক গ্রীষ্মে। ইতিহাসে ওই গ্রীষ্মের নাম সামার অব লাভ। ভালোবাসার গ্রীষ্ম। এরা কারা? এরা ওই দেশের সবচেয়ে ভাগ্যবান পোলাপান। সবচেয়ে ধনী দেশের, সবচেয়ে সুখী সময়ের সন্তান। বাপের গাড়ি আছে, ভবিষ্যতে ব্যাংকের চাকরি আছে। সব ফালাইয়া এরা রাস্তায় নামলো ক্যান, কন তো?
জানি না।

কারণ সরকার তাগো ভাইদের ধইরা ধইরা ভিয়েতনামের যুদ্ধে পাঠাইতেছিলো। মরতে। যেই যুদ্ধের মানে কেউ জানে না। পোলাপানগুলা বুঝলো, যেই সিস্টেম আমারে গাড়ি বাড়ি দিতেছে, সেই একই সিস্টেম আমার ভাইরে কফিনে ভইরা ফেরত পাঠাইতেছে। তখন তারা ঠিক করলো, এই খেলায় আমরা নাই। তারা বন্দুকের নলের ভিতরে ফুল ঢুকাইয়া দিলো। মিছিলে সৈন্যের বেয়নেটের সামনে খাড়াইয়া এক মেয়ে ফুল ধরলো, সেই ছবি সারা দুনিয়ায় ছড়ায়া গেলো। মানুষ তাগো নাম দিলো ফ্লাওয়ার চিলড্রেন। ফুলের মানুষ। এখন আপনেই কন, বন্দুকের সামনে ফুল নিয়া খাড়ানি হাইরা যাওয়া, নাকি বন্দুকের লাইনে চুপচাপ খাড়ায়া থাকা হাইরা যাওয়া?

আমি উত্তর দিতে পারলাম না। বোতলে আরেকটা চুমুক দিলাম। রোদ উঠে গিয়ে আবার গানের দলে মিশে গেলো। আর আমি টের পেলাম, আমার ভিতরে কোথায় যেন একটা পুরনো দেয়ালে চিড় ধরার শব্দ হলো।

পরদিন থেকে আমি রোদের পিছে পিছে ঘুরতে লাগলাম। লেখক হিসেবে নোট নিচ্ছি, এই অজুহাতে। রোদ সবজি বাগানে কাজ করে, আমি পাশে বসে থাকি। রোদ বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখায়, আমি দূর থেকে দেখি। নিজেকে বোঝাই, এইটা রিসার্চ। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গেলে বুঝি, চল্লিশ বছর বয়সে এই প্রথম আমার রিসার্চের বিষয়ের গলার স্বর না শুনলে বুক খালি খালি লাগে। শরীরে মদ না পড়লে যেমন লাগে, তার চেয়েও খারাপ। এই তুলনাটা যে করতে পারলাম, এতেই বোঝেন অবস্থা কই গেছে। আমি প্রেমে পড়ছি। পাগলের মতো, কিশোরের মতো, হাবুডুবু খেয়ে।

রোদের কাছ থেকেই জানলাম, ও অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা মেয়ে। মাল্টিন্যাশনালে চাকরি করতো। একদিন অফিসের চেয়ারে বসে হিসাব করে দেখলো, বেতনের টাকায় সে যা যা কিনতেছে, তার সবগুলাই আসলে ওই চাকরিটা করার ক্ষতিপূরণ। দামি জামা কিনতেছে অফিসে পরার জন্য। দামি রেস্টুরেন্টে খাইতেছে অফিসের ক্লান্তি ভুলতে। দামি ছুটিতে যাইতেছে অফিস থেইকা পালাইতে। ও বলল, বুঝলেন, আমি বেতন দিয়া আসলে ওষুধ কিনতেছিলাম, আর অসুখটার নাম ওই বেতন।

এই মেয়ের সাথে তর্কে পারা মুশকিল। আমি তবু চেষ্টা করতাম। একদিন বললাম, তোমাদের এই হিপ্পি ব্যাপারটা তো পুরাটাই বিদেশি জিনিস। আমদানি করা দর্শন।

রোদ এমনভাবে হাসলো, যেন আমি খুব মজার একটা ভুল করছি। বলল, উল্টা। জিনিসটা ওরাই আমাগো কাছ থেইকা নিছে। ষাটের দশকে অ্যালেন গিন্সবার্গ নামে এক আমেরিকান কবি বছর দেড়েক পইড়া ছিলেন কলকাতা আর বেনারসে। বাউল ফকিরগো লগে ঘুরছেন, শ্মশানে রাইত কাটাইছেন। দেশে ফিরা উনি আর উনার বন্ধুরাই হিপ্পিগো গুরু হইলেন। বিটলসের কথা তো জানেনই, আটষট্টি সালে পুরা ব্যান্ড ভারতে আইসা ঋষিকেশে আশ্রমে উঠলো, ধ্যান শিখতে। আর লন্ডন থেইকা ইস্তাম্বুল, তেহরান, কাবুল হইয়া কাঠমান্ডু পর্যন্ত একটা রাস্তা চালু হইলো, রঙচঙা বাসে কইরা হাজার হাজার তরুণ তরুণী পূবের দিকে আসতো। ইতিহাসে ওই রাস্তার নাম হিপ্পি ট্রেইল। কাঠমান্ডুতে যেই গলিতে তারা থাকতো, সেই গলির নাম হয়া গেলো ফ্রিক স্ট্রিট। পাগলগো রাস্তা। ভাইবা দেখেন, দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী দেশগুলার পোলাপান সব ছাইড়া ছুইড়া আমাগো এই গরিব পূব দিকে আসতো। কী খুঁজতে আসতো? যেই জিনিস ডলারে কিনতে পাওয়া যায় না, সেইটা।

আর সবচেয়ে বড় কথাটা কী জানেন? রোদের গলা নরম হয়ে এলো। একাত্তরে যখন আমরা মরতেছি, শরণার্থী হয়া ভাসতেছি, তখন দুনিয়ার কোন মানুষগুলা সবার আগে আগায়া আসছিলো? এই হিপ্পিরাই। গিন্সবার্গ নিজে যশোর রোডে আইসা শরণার্থীগো লাইন দেইখা কবিতা লেখলেন, সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। আর জর্জ হ্যারিসন, রবিশঙ্করের ডাকে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট করলেন, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। ইতিহাসের প্রথম বড় চ্যারিটি কনসার্ট, আর সেইটা হইছিলো আমাগো নামে। চল্লিশ হাজার মানুষ টিকেট কাটছিলো আমাগো শরণার্থীগো জন্য। যেই ফুলের মানুষগুলারে আপনে অলস কন, আমাগো সবচেয়ে খারাপ দিনে তারাই আমাগো নাম দুনিয়ারে চিনাইছিলো।

আমি চুপ করে রইলাম। আমার লজ্জা লাগছিলো। লেখক মানুষ, অথচ এই ইতিহাস আমি এইভাবে কোনোদিন ভাবিনি।

আরেকদিন জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, লালন ফকিরের নাম তো তোমরা খুব নেও। উনার সাথে এইসবের সম্পর্ক কী?

রোদ বললো, সম্পর্ক না, উনিই তো আদি। হিপ্পিরা যা করছে ষাট সালে, আমাগো বাউল ফকিররা তা করছে তারও দুইশো বছর আগে। জাত মানে না, সম্পত্তি জমায় না, একতারা নিয়া পথে পথে ঘোরে, আখড়ায় দল বাইন্ধা থাকে, আর গানরে বানাইছে প্রতিবাদের ভাষা। সমাজ তাগো পাগল কইছে, ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়া ভাঙছে, তবু তারা থামে নাই। উডস্টকের কথা শুনছেন? উনসত্তর সালে এক খামারে পাঁচ লাখ মানুষ তিনদিন ধইরা গান শুনছিলো, বৃষ্টিতে ভিজা, কাদায় মাখামাখি হইয়া, একটাও মারামারি হয় নাই। সবাই কয় অলৌকিক ঘটনা। আর আমাগো কুষ্টিয়ায় দেড়শো বছর ধইরা দোলপূর্ণিমায় লাখ মানুষের সাধুসঙ্গ হয়, কেউ খবরও রাখে না। আসলে কী জানেন, দুনিয়ার সব জায়গায়, সব যুগে, কিছু মানুষ থাকে যারা দৌড়াইতে রাজি না। তারা হাঁটে। আর হাঁটে বইলা তারাই একমাত্র রাস্তার ফুলগুলা দেখতে পায়।

এইসব শুনতে শুনতে আমার দিন কাটতে লাগলো। বোতলটার কথা মাঝে মাঝে মনেই থাকতো না। ব্যাপারটা আমি রোদকে বলিনি। বললে বলতো, দেখছেন, নেশা জিনিসটা আসলে শূন্যস্থান পূরণ। জায়গা ভরা থাকলে নেশার জায়গা হয় না। এই মেয়ের সমস্যা হলো, ওর সব কথাই ঠিক হয়। আর যেই মানুষের সব কথা ঠিক হয়, তার প্রেমে না পইড়া উপায় থাকে না।

পূর্ণিমার রাতে ওদের বড় আসর বসলো। মশাল, দোতারা, খোল, আর গলায় গলায় লালন। আমি সেই রাতে একটা অদ্ভুত জিনিস টের পেলাম। গানের মাঝখানে হঠাৎ মনে হলো, সময় জিনিসটা থেমে গেছে। ঘড়ি নাই বলে না। ভিতরের যেই ঘড়িটা সারাক্ষণ বলে, দেরি হয়া যাইতেছে, দৌড়া, সেই ঘড়িটা থেমে গেছে। আমার মনে হলো, আমি আমার মৃত মায়ের রান্নাঘরে বসে আছি। মনে হলো, আমি ক্লাস সেভেনের সেই দুপুরে ফিরে গেছি, যেদিন প্রথম কবিতা লিখে মনে হয়েছিলো, আমার হাতে জাদু আছে। আমার চোখ ভিজে উঠলো, এবং লুকানোর জন্য আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চাঁদটাও কেমন টলটল করছিলো। ঘোর। শব্দটার মানে আমি সেই রাতে প্রথম বুঝলাম। নেশায় যেই ঘোর হয়, এইটা সেই ঘোর না। ওইটা ভুলে থাকার ঘোর, এইটা মনে পড়ার।

সেই রাতেই, আসর ভাঙার পর, ঝর্নার পাড়ে আমি রোদকে বললাম কথাটা। চল্লিশ বছর বয়সী মানুষ, দুই হাত কাঁপছে কিশোরের মতো। বললাম, আমার সাথে ঢাকা চলো। বিয়া করি। তুমি ছবি আঁকবা, আমি লেখবো।

রোদ অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওর চোখে করুণা না, বিরক্তি না, অন্য কিছু একটা। তারপর বলল, আপনে আমারে ভালোবাসেন, না আমার এই থাকাটারে ভালোবাসেন?
মানে?

আপনে ঢাকায় আমারে নিতে চান ক্যান জানেন? যেমনে মানুষ পাহাড় থেইকা ঝর্নার পানি বোতলে ভইরা নিয়া যায়। বাসায় গিয়া খুইলা দেখে, এইটা তো সাধারণ পানি। ঝর্নাটা আসলে পানি না। ঝর্নাটা হইলো পাহাড়, গাছ, পাথর, আর নামতে থাকা। আমারে এই জায়গা থেইকা তুইলা নিলে যেইটা পড়ে থাকবো, সেইটা আমি না।

আমি বললাম, তাইলে আমিই এইখানে থাইকা যাই?

সে মাথা নাড়লো। আপনেও পারবেন না। আপনের নেশা খালি বোতলে না, আপনের নেশা দুঃখে। আপনে দুঃখ দিয়া লেখেন। এইখানে থাকলে আপনের দুঃখগুলা শুকায়া যাইবো, আর আপনে আমারে দোষ দিবেন। ভালোবাসা মুঠায় ধরার জিনিস না, লেখক সাহেব। বাতাস মুঠায় ধরলে হাতে কী থাকে? ঘাম।

তারপর সে যা বললো, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বললো, আমি পরশু রওনা দিতেছি। পুরানা রাস্তাটায়। বাসে কইরা, ট্রাকে কইরা, হাঁইটা। নেপাল, কাঠমান্ডু, ফ্রিক স্ট্রিট। যেই রাস্তায় পঞ্চাশ বছর আগে ফুলের মানুষরা হাঁটছে, আমি উল্টাদিক থেইকা হাঁটুম। দেখতে চাই, রাস্তাটার ফুল এখনো ফোটে কি না।

যাওয়ার দিন ভোরে সে আমার হাতে একটা শুকনা ফুল দিলো। চুলে গোঁজা ফুলগুলার একটা। বলল, মন খারাপ কইরেন না। হিপ্পিগো একটা কথা আছে। যারে ভালোবাসো, তারে ছাইড়া দাও। ফিরা আসলে বুঝবা সে তোমারই আছিলো।

আর ফিরা না আসলে?

রোদ হাসলো। সেই নির্ভার হাসি। বলল, না ফিরলে বুঝবেন, সে আসলে একটা রাস্তা আছিলো, ঠিকানা না। রাস্তার কাম পৌঁছানো না, হাঁটানো।

আমি ঢাকায় ফিরলাম। জ্যামে বসে থাকি, মিটিং করি, মাস শেষে বিল দেই। সবই আগের মতো। খালি একটা জিনিস বদলাইছে। আমি এখন লিখি। রোজ ভোরে উঠে লিখি। ছয় মাসে যেই উপন্যাসটা দাঁড়ালো, প্রকাশক পড়ে ফোন দিয়ে বললেন, এইবার হইছে। প্রাণ আইছে। কই পাইলেন?

আমি বললাম, কিনি নাই। একজন এমনি দিছে।

বোতলটা এখনো আছে। মাঝে মাঝে খুলি। তবে আগের মতো শূন্যস্থান ভরতে না, পুরান বন্ধুর সাথে দেখা করার মতো করে। আর আমার লেখার টেবিলে, বইয়ের ভাঁজে, সেই শুকনা ফুলটা রাখা। মাঝে মাঝে রাত জেগে লিখতে লিখতে মনে হয়, ঘরে বুনো ফুলের গন্ধ। জানি, শুকনা ফুলের গন্ধ থাকে না। তবু পাই।

গত সপ্তাহে ডাকবাক্সে একটা পোস্টকার্ড পাইলাম। কাঠমান্ডুর ছবি। প্রেরকের নাম নাই, ঠিকানা নাই। পিছনে খালি এক লাইন লেখা।

রাস্তার ফুল এখনো ফোটে।

আমি পোস্টকার্ডটা বুকপকেটে নিয়ে সারাদিন অফিস করলাম। কেউ টের পাইলো না, জ্যামে আটকা পড়া এই শহরের ভিতর দিয়ে একটা লোক সারাদিন হেঁটে বেড়াইলো কাঠমান্ডুর রাস্তায়, চুলে ফুল গুঁজে।  

 
১৮/৭/২০২৬