সোমবার, ২ মে, ২০২২

বিজন সেতু গণহত্যা ~ সমুদ্র সেনগুপ্ত

Purulia Arms Drop Anandamargi
পুরুলিয়া অস্ত্র বৃষ্টি 
বিজন সেতু গণহত্যা: প্রকাশ্য দিবালোকে মহানগরীর এক কলঙ্কের ইতিহাস
প্রথম ভাগ: সংগঠন ও তার কার্যকলাপ:
১৯৫৫ সালের ৯ই জানুয়ারি জামালপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপের একজন একাউনটেন্ট প্রভাত রঞ্জন সরকার একটি "সোসিও-স্পিরিচুয়াল" সংগঠন গড়ে তোলেন এবং নিজের নামকরণ করেন "শ্রী শ্রী আনন্দমুর্তিজি"।
বিভিন্ন মাধ্যমে প্রভাত সরকারের শিব দর্শন, শৈশবে বাঘের পিঠে জঙ্গল ভ্রমণের অলৌকিক সব কাহিনী প্রচারিত হয়। আনন্দমার্গ'র সর্বক্ষণের কর্মী হতে দীক্ষা লাগে। পোশাকি নাম পড়ল 'অবধূত'। [সূত্র: সুশোভন পাত্র]
১৯৫৯ সালে পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের বিকল্প হিসেবে আনন্দমার্গ তাদের "প্রোগ্রেসিভ ইউটিলাইজেশন থিওরি" বা প্রাউট তত্ত্ব কে খাড়া করে। মার্গের রাজনৈতিক কর্মসূচী পরিচালনার জন্য তৈরি হয় 'প্রাউটিস্ট ব্লক অফ ইন্ডিয়া'। তাদের মুখপত্র 'প্রাউট' থেকে এদের বিভিন্ন বিচারধারা জানা যায়। যেমন, "অহিংসা উপর ভিত্তি করে আধ্যাত্মিকতা মানবতার কোন উপকারেই আসবে না", "ভারতবর্ষের গণতন্ত্রে নিরক্ষর ও অশিক্ষিতদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত", "কমিউনিজম মানুষ কে জন্তুতে পরিণত করে" ইত্যাদি।
১৯৬০ এর শেষের দিকে মার্গ ও তার দর্শন বেশ কিছু অনুগামীকে আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। এর সাথে যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং গুপ্ত ধর্মীয় ব্যঞ্জনার ফলে তদানীংতন যুক্তফ্রন্ট ও পরবর্তীতে বামফ্রন্টের সাথে সরাসরি আদর্শগত সংঘাত বাধে।
এই অনুগামীদের মধ্যে বেশ কিছু ধনী ও প্রভাবশালী ভক্ত ছিলেন। যাদের একজন, রাজস্থানের গড় এর মহারাজা পুরুলিয়াতে ৫০০ একর জমি দান করে যেখানে আনন্দনগর নামে হেড কোয়ার্টার তৈরি হয়। এই নগর কে ঘিরে শুরু থেকেই সন্দেহ দানা বাঁধে যে আধ্যাত্মিক কাজকর্মের আড়ালে কোনো ক্রিমিনাল কাজকর্ম চলছে কিনা। আশ্রমের বিপুল ধন সম্পত্তির আসল উৎস হিসেবে অস্ত্র স্মাগলিং কে সন্দেহ করা হয় তখন থেকেই। পরবর্তীতে কিম ডেভি দ্রষ্টব্য। [আউটলুক, ৩১শে আগস্ট, ২০১৭]
মতাদর্শগত সমস্যা ছাড়াও বামফ্রন্ট সরকার এই বিতর্কিত ধর্মীয় সম্প্রদায় কে তার সদস্যদের "সশস্ত্র" প্রশিক্ষণের দায়ে অভিযুক্ত করে এবং তাদের বার্ষিক "তান্ডব" মিছিলের ওপর ধরপাকড় করে। প বঙ্গ ও বিহারে রক্তবস্ত্র পরিহিত লাঠি, তরোয়াল ও নরমুন্ড সজ্জিত মার্গদের সাথে মার্ক্সবাদী ক্যাডারদের ঘন ঘন সংঘর্ষ হয়। ১৯৬৭ সালের ৫ই মার্চ পুরুলিয়ার আনন্দনগরে, হেড কোয়ার্টার এ পাঁচ জন মার্গ মারা যায়।
১৯৭০ সালের ৩১শে মার্চ পাটনা স্টেশনে দিল্লি এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে নামার পরেই জ্যোতি বসুর ওপরে গুলি চালানো হয়। সেই গুলি বিদ্ধ হয়ে মারা যান তার সাথে হাত মেলানো পার্টিকর্মী আলী ইমাম। সন্দেহের তীর আনন্দমার্গীদের দিকে।
প্রভাত সরকার ওরফে আনন্দমূর্তি তার এক শিষ্য অবধুত কে খুনের দায়ে ১৯৭১ সালে গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু তাকে ১৯৭৮ সালে মুক্তি দেওয়া হয়। ওই বছরে "সিডনি হিলটন বোমা বিস্ফোরণ" এর ফলে তিন জন মারা যান এবং ইভান পেডেরিক নামের একজন মার্গ তার অপরাধ স্বীকার করে।
১৯৭১'এ কলকাতার 'ধর্ম মহাচক্র'র পর 'আনন্দমূর্তি'র স্ত্রী উমা সরকার ও প্রাক্তন অবধূত, 'প্রাউটের' অর্থসচিব নওল কিশোর ফাঁস করে দেন যে "গুরুর বিরুদ্ধে জেহাদের অপরাধে ৩৬ জন আনন্দমার্গী কে ছোটনাগপুরের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে পেট চিরে, চোখ উপড়ে হত্যা করা হয়।" পরে ঐ মামলায় অভিযুক্ত অন্য এক অবধূত মাধবানন্দ'ও আদালতে জানান 'গুরুর নির্দেশে তিনি নিজেই ১৮ জন অবধূত কে হত্যা করেছেন।' [নওল কিশোর তাঁর 'আনন্দমার্গঃ সয়েলিং দি সাফরন রোব' ]
১৯৭৩ সালের ২৫শে এপ্রিল নয়াদিল্লির আচার্য দিনেস্বরানন্দ নামে এক অবধুত গায়ে আগুন লেগে মারা যান। তার সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে এটি প্রতিবাদের আত্মহুতি, আনন্দ মূর্তির গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে। দিল্লি পুলিশের বয়ান অনুযায়ী এটি হত্যাকান্ড এবং সেই অভিযোগে দু জন বিদেশি মার্গীকে গ্রেপ্তার করে যারা আগুন লাগিয়ে ওই অবধুত কে পুড়িয়ে মেরেছে বলে অভিযোগ।
[নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৬শে এপ্রিল, ১৯৭৩]
১৯৭৫ সালে রেলওয়ে মন্ত্রী ললিত নারায়ণ মিশ্র কে বোমা মেরে খুনের দায়ে চারজন মার্গ কে সাজা দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজন বাদে বাকিরা আবার তদানীংতন চিফ জাস্টিস এ এন রায় কে হত্যার চেষ্টায় অভিযুক্ত। এদের সতেরো বছর সশ্রম কারাদণ্ডের সাজা হয়।
এই সংগঠনের চরিত্র বোঝার জন্য একটি ঘটনার উল্লেখ প্রয়োজন। ১৯৮৩ সালে কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে এক অবধুত একটি রিট পিটিশন দাখিল করে বলেন যে প্রকাশ্যে ছুরি, ত্রিশূল ও করোটি নিয়ে "তান্ডব নৃত্য" করার ওপরে জারি করা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে হবে কারণ এটি তাদের (আনন্দ মার্গীদের) ধর্মীয় আচরণ করার অধিকারে হস্তক্ষেপ।
সুপ্রিম কোর্ট এই আবেদন বাতিল করে ঘোষণা করে যে মার্গের প্রতিষ্ঠাতার রচনাপত্র লিখিত হয়েছে মূলত হিন্দু দর্শনকে আধার করে এবং আনন্দমার্গীদের "শৈব" বলে বিবেচনা করতে হবে যা আসলে হিন্দু ধর্মের একটি সম্প্রদায়। এটি কোনো পৃথক ধর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে না। [ল, কলোনিয়ালিজম এন্ড রিলিজিয়াস প্লেস ইন ইন্ডিয়া- গীতাঞ্জলি শ্রীকান্তন]
১৯৭৮ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি ফিলিপিন্স এর ম্যানিলায় ভারতীয় দূতাবাসের কর্মচারী জ্যোতি স্বরূপ বৈদ্য কে খুন করার চেষ্টার অপরাধে স্টিভেন মাইকেল ডায়ার (কানসাস) ও ভিকটোরিয়া সেফার্ড (মেরিল্যান্ড) নামের দুই মার্কিন আনন্দ মার্গীকে ১৭ বছরের কারাবাসের দন্ড হয়। এফবিআই আনন্দ মার্গ কে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে।
[এফবিআই ফাইল নম্বর ১০৫-২৮৯৪২০]
১৯৯০ সালের ১৪ই এপ্রিল অমৃত্সরে পাক-ভারত সীমান্তে বিএসএফ এর হাতে দুজন আনন্দ মার্গী ধরা পড়ে, অটোম্যাটিক অস্ত্র ও গুলি সহ। "মানব মুক্তি মঞ্চ" নামে মার্গীদের একটি শাখা সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পাকিস্তান থেকে এসব অস্ত্র আমদানি হচ্ছিল মার্গীদের প্রশিক্ষণের জন্য। [১৯৯০ সালের ১৮ই এপ্রিল লোকসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি]
ভারত সরকার আনন্দমার্গ কে একটি রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী জঙ্গি, ছদ্ম-ধর্মীয় সংগঠন বলে বর্ণনা করেন যারা প্রায়শই হিংসার পথ নেয় এবং স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতি দাদাগিরি ফলায়। [প্রাগুক্ত বিবৃতি]
পুরুলিয়া ও বিহার সীমান্তে জয়পুর ও ঝালদা ২ নং ব্লকের আদিবাসী, সরকারী ও রায়তি জমি মিলিয়ে হাজার একর জমি বেআইনি ভাবে দখল করতে উদ্ধ্যত হয় এই মার্গীরা। পুরুলিয়ার বাঁশগড়ের জঙ্গলে বিদেশ থেকে আমদানি করা বে-আইনি অস্ত্র মজুতের দায়ে অভিযুক্ত [প্রাগুক্ত বিবৃতি]
১৯৯৫ সালে ১৭ই ডিসেম্বর পুরুলিয়ায় একটি এএন-২৬ বিমান থেকে কয়েকশ একে-৪৭ রাইফেল ও হাজার রাউন্ড গুলি ফেলা হয়। কিম ডেভি ধরা পড়ে। অভিযোগ ওঠে যে ওই অস্ত্রবর্ষণ এর গ্রাহক ছিল আনন্দমার্গীরা।
জরুরি অবস্থার সময় এই সংগঠনকে ভারত সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৭৭ সালে জনতা সরকার ক্ষমতায় আসার পরে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
পৃথিবীর ১৮০ টি দেশে এদের প্রায় ২০ লাখ সদস্য আছে। ভারতে প্রায় সাত হাজার শাখা আছে যার মধ্যে প বঙ্গে প্রায় তিন হাজার। এরা স্কুল, কলেজ, অনাথ আশ্রম ও হাসপাতাল চালায়। [ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ১৪ই ডিসেম্বর, ২০১১]
দ্বিতীয় ভাগ: বিজন সেতু গণহত্যা ও বিচার:
১৯৮২ সালের ৩০শে এপ্রিল দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জ রেল স্টেশন, বিজন সেতু ও বন্ডেল গেট সংলগ্ন এলাকায় আনন্দ মার্গের সাথে যুক্ত ব্রহ্মচারী ও ব্রহ্মচারিণী দের ওপরে আক্রমন ও নিগ্রহের এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে যার ফলে ১৭ জন মারা যান
[কান্তি গাঙ্গুলি বনাম রাজ্য সরকার ও অন্যান্য: রিট পিটিশন নং ৯৯০৯ এর প্রেক্ষিতে জাস্টিস দীপঙ্কর দত্ত এর রায়, ৮ই জুলাই, ২০১৬]
জনস্বার্থে তাৎপর্যপূর্ণ এই ঘটনার তদন্তের জন্য রাজ্য সরকার ১৯৮২ সালের ১২ই মে কলকাতা হাইকোর্টের জাস্টিস সমরেন্দ্র চন্দ্র দেব কে নিয়ে গঠিত এক সদস্যের একটি তদন্ড কমিশন গঠন করেন। ওই কমিশনের টার্মস অফ রেফারেন্স ছিল:
(১) ১৭ জন মানুষ নিহত ও আরো মানুষ আহত হওয়ার সময় কি পরিস্থিতি ছিল ও ঘটনাক্রম ছিল; (২) আক্রমণ ও নিগ্রহ এর পেছনে কি কারণ ছিল নার ফলে ১৭ জন আনন্দমার্গী নিহত ও অন্যান্যরা আহত হয়েছিলেন; (৩) আনন্দমার্গীদের মৃত্যুর কি তাৎক্ষণিক কারণ ছিল; (৪) ঘটনাস্থলে পুলিশের পৌঁছতে দেরি হয়েছিল কি না; (৫) অন্যান্য যে কোনও অনুসন্ধানের বিষয় যা তদন্ত কমিশন প্রাসঙ্গিক মনে করবে; (৬) ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনা এড়ানোর জন্য সুপারিশ।
প্রাপ্ত নথিপত্র থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে দেব কমিশনের রিপোর্ট জমা দেওয়ার তারিখ ১২ই জানুয়ারি, ১৯৮২ অবধি বাড়ানো হয় ও পরে ১৩ই সেপ্টেম্বর, ১৯৮৩ অবধি। দেব কমিশন এর পরে রিপোর্ট জমা দিয়েছেন কিনা তার সপক্ষে কোনও নথি পাওয়া যাচ্ছে না।
২০১১ সালে বামফ্রন্ট কে পরাস্ত করে টিএমসি সরকার ক্ষমতায় আসে। বিজন সেতুর ঘটনাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে আনন্দ মার্গীদের গণহত্যার অনুসন্ধানের জন্য ২০১২ সালের ১৪ই মার্চ জাস্টিস সন্তোষ কুমার ফৌজদার কে নিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়। পরে মেয়াদকাল আরও ছয় মাস বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
এর পরে ২০১৩ সালের ৯ই এপ্রিল এলাহাবাদ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জাস্টিস অমিতাভ লালা কে নিয়ে এক সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠিত হয় জাস্টিস ফৌজদারের জায়গায়।
রিপোর্ট জমা দেওয়ার মেয়াদ ২রা মে, ২০১৩ থেকে আরো ছয় মাস বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পরে ২০১৫ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর আরো এক বছরের জন্য লালা কমিশনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
কান্তি গাঙ্গুলি নামে সিপিআইএম এর এক রাজনৈতিক নেতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। মূলত তিনটি বক্তব্য তুলে ধরেন।
(১) এই ধরনের ঘটনায় এক বার কমিশন গড়া হলে সেটিকে অবৈধ ঘোষণা না-করা পর্যন্ত দ্বিতীয় কোনও কমিশন গঠন করা যায় না। এ ক্ষেত্রে জ্যোতি বসুর আমলের দেব কমিশনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি।
(২) সিআইডি ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট পেশ করেছিল। নিম্ন আদালতে সাজাও হয়েছিল কয়েক জন অভিযুক্তের। সিআইডি নিম্ন আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেনি। আপিল করা হয়নি আনন্দমার্গীদের পক্ষ থেকেও।
(৩) এই অবস্থায় নতুন তদন্ত কমিশনে ডেকে তাঁদের মক্কেলকে সিআইডি বা আনন্দমার্গীদের তরফে জেরা করার কোনও আইনি অধিকার নেই বলে দাবি করেন কান্তিবাবুর আইনজীবীরা। তাঁদের অভিযোগ, কান্তিবাবু নতুন কমিশনে যান। কিন্তু কমিশনের চেয়ারম্যানের বদলে তাঁকে জেরা করেন সিআইডি এবং আনন্দমার্গীদের আইনজীবীরা। এটা আইনবিরুদ্ধ।
এই পিটিশনের বিচার শেষে জাস্টিস দীপঙ্কর দত্তের রায়ে জানানো হয় যে বিজন সেতুতে আনন্দ মার্গী হত্যার তদন্তে গঠিত অমিতাভ লালা কমিশন বৈধ। ফলে তদন্তে স্বার্থে সিপিএম নেতা কান্তি গাঙ্গুলিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে কমিশন। তবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া না দেওয়ার স্বাধীনতা থাকছে কান্তি গাঙ্গুলির। সিআইডিও তাঁকে জেরা করতে পারবে না।
[প্রাগুক্ত রায়]
সর্বশেষ পাওয়া খবরের ভিত্তিতে বলা যায় এখন পর্যন্ত লালা কমিশনের পেছনে খরচ হয়েছে ৩.২ কোটি টাকা।
কমিশন এ পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্য নিয়েছেন। বেশ কিছু সাক্ষী মারা গেছে। কমিশনের মেয়াদ ২০১৯ সালের ১লা এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত হয়েছে। এর মাঝে কমিশনের সচিবের পদ বহুদিন শূন্য ছিল। বিচারপতি লালা কমিশনের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে নারাজ [এই সময়, ২রা সেপ্টেম্বর, ২০১৮]
ইতোমধ্যে সংবাদপত্রের এক অংশে এই ঘটনার জন্য অর্থাৎ আনন্দ মার্গীদের পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে অপহরণ (ট্যাক্সি থেকে নামিয়ে), গায়ে আগুন ঢেলে পুড়িয়ে মারার দায়ে সিপিআইএম এর ছোট মাঝারি নেতাদের নামে অভিযোগ চালু আছে। সিপিএম বিধায়ক শচিন সেন, কান্তি গাঙ্গুলি প্রমুখের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়, বিচারও শুরু হয়।
স্বভাবতই ওই দলের পক্ষ থেকে পাল্টা অস্বীকার করাও চালু আছে। একটি থিওরি অনুযায়ী ছেলেধরা সন্দেহে উত্তেজিত জনগণ এই কাজ করেছিল।
যতদিন না লালা কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়বে ততদিন এই চাপ ও পাল্টা চাপ চলতে থাকবে।
বিজন সেতুতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ১৭ জন মার্গী মারা যাওয়ার ঘটনা ন্যক্কারজনক। 'ছোট্ট' , 'সাজানো ঘটনা' বা 'বিরোধীদের চক্রান্ত' নয় বরং ৪ঠা মে, সিপিএম রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত জানান "আনন্দমার্গীর ঘটনাতে আমরা গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। প্রকৃত ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক" [সূত্র: Sushovan Patra]
আজ আবার ৩০শে এপ্রিল। বাম আমলে দুই যুগ, আর এই আমলে অর্ধযুগ কেটে গেল। প্রয়াত দাসগুপ্তর মতো আমিও চাই প্রকৃত দোষীদের শাস্তি হোক। অবিলম্বে চাই।
(কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিবিশেষ কে আঘাত দেওয়া এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়)

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০২২

সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসকের রাজনীতি সচেতনতা ~ বিষাণ বসু

কথাটা হলো, রাজনীতি ব্যাপারটাই খুব খারাপ। রাজনীতির লোকেরা তোয়ালে মুড়ে পয়সা নেন (আরও উচ্চপর্যায়ের লোকেরা তোয়ালে না মুড়েও নেন এবং সামান্য তোয়ালেতে ধরবে না এত বেশি টাকা নেন), পুলিশকে বোম মারতে বলেন, পুলিশকে না মারা হলেও পাব্লিকের উপর তো সে বোম পড়েই, ধর্মের নামে ঘেন্না ছড়িয়ে মানুষকে খুন করান, যতজন খুন হয় তার কয়েক হাজার গুণ মানুষ আতঙ্কে কাঠ হয়ে বাঁচেন- অর্থাৎ কিনা, রাজনীতি একটা নোংরা ব্যাপার, ভদ্রঘরের লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েদের ওদিকে পা না বাড়ানোই ভালো। এমনকি, লেখাপড়া জানা আপাতদৃষ্টিতে ভদ্রঘরের লোকজন যখন রাজনীতি করত, তখনও, আপনি জানেন, বা না জানলেও বারবার একই কথা শুনতে শুনতে আজকাল নিশ্চিত মানেন, সুজলা-সুফলা রাজ্যের শিল্পসম্ভাবনা শেষ করে দিয়েছে ওই পলিটিক্স-ই। আজও যখন মিটিং-মিছিলের কারণে - বনধ হলে তো কথা-ই নেই - আপনাকে রাস্তায় আটকে যেতে হলে দাঁতে দাঁত ঘষটে বলেন, সেই পলিটিক্স করে করে রাজ্যটা শেষ হয়ে গেল, তাতেও শিক্ষা নেই…

অতএব, নিজের সন্তানদের পলিটিক্স থেকে দূরে রাখেন তো বটেই, আপনি নিজেও রাজনীতি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেন। তাছাড়া আপনি চিকিৎসক। মহান পেশা। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে মানুষকে সুস্থ করে তোলার নিরন্তর দায় আপনার 'পরে ন্যস্ত। সেখানে রাজনীতির ক্ষুদ্রতা কি আপনাকে সাজে!!

কিন্তু কী গেরো দেখুন, বহুশ্রুত কমলি-র মতোই, আপনি রাজনীতি এড়িয়ে থাকতে চাইলেও, রাজনীতি কিছুতেই আপনাকে ছাড়তে চায় না। কীভাবে? আপনি হয়ত উত্তরটা ভাবছেন এভাবে - অমুক নেতাকে ম্যানেজ করে ডা. তমুক ঘরের কাছে বহাল তবিয়তে পোস্টিং পেল, কিন্তু আমাকে গত চোদ্দ বছর ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে পড়ে থাকতে হচ্ছে! অথবা, তমুক লোকাল নেতা প্রায়শই হাসপাতালে এসে ঝামেলা করেন, কিন্তু হাসপাতালের দরকারের সময় তাঁর টিকির ডগাটি মেলে না। কিংবা… নাহ্, ফর্দ বাড়ানোর দরকার নেই, ব্যাপারটা আপনি জানেন, সুতরাং একগাদা উদাহরণ নিষ্প্রয়োজন।

অথচ, শুধু নিজের কর্মক্ষেত্রটির কথাও যদি ভাবতে চান, তাহলেও ক্ষুদ্র দলীয় রাজনীতি বা তার অপপ্রয়োগের বাড়বাড়ন্তের পিছনে আসল রাজনীতিটা আপনার চিনতে পারা জরুরি। রাজনীতি করুন বা না করুন, রাজনৈতিক সচেতনতা খুব দরকার। আপনি যদি চিকিৎসক হিসেবে গর্ব বোধ করতে চান, রাজনীতি সচেতনতা বাদ দিয়ে তেমন আত্মশ্লাঘা একেবারেই অবান্তর। কিন্তু কেন?

আপনি যদি অনেক বছর ধরে চাকরি করে থাকেন, তাহলে নিশ্চিত লক্ষ করেছেন, অন্তত শহরাঞ্চলে তো বটেই, সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্রে কারা পরিষেবা গ্রহণ করেন, সে ব্যাপারে প্রায় মৌলিক শ্রেণীপরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। উচ্চমধ্যবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তও আর সরকারি হাসপাতালে আসেন না। ইদানীং নিম্ন-মধ্যবিত্তও যথাসাধ্য না আসার চেষ্টা করছেন। সরকারি স্বাস্থ্যক্ষেত্র প্রায় পুরোপুরিভাবে নিম্নবিত্ত রোগীদের চিকিৎসা কেন্দ্র। সে হোক গে, তাতে কী-ই বা যায় আসে!! তাই না? না, বিশ্বাস করুন, যায় আসে। আমাদের গরীব দেশে, দেশের অধিকাংশ মানুষই নিম্নবিত্ত, এমনকি হতদরিদ্র। গণতন্ত্রের বিচারে তাঁরা অনিবার্যভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু কণ্ঠের বিচারে যদি বলেন, বা কণ্ঠ শুনতে পাওয়ার বিচারে যদি ভাবেন, তাহলে সবচাইতে উচ্চকিত কণ্ঠ মধ্যবিত্তের। তাতে কী? হ্যাঁ, তাতে অনেক কিছু। ক্রমবর্ধমান আত্মকেন্দ্রিকতার বাজারে নিজের গায়ে আঁচ আসা অব্দি মানুষ কিছুই বলে না। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যেহেতু মধ্যবিত্ত নিজের চিকিৎসা করান না, তাই সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও মধ্যবিত্তর কিছু যায় আসে না। বরং তাঁরা অনেক বেশি বিচলিত পাঁচতারা কর্পোরেট হাসপাতালের বাড়তি বিল নিয়ে - সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা, সরকার যাতে সেদিকে কড়া নজর রাখেন ও উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন - সেই প্রত্যাশার ব্যাপারে সরকারও সচেতন, অতএব নিয়মিতভাবে ঘোষণা হয়, কর্পোরেট হাসপাতালে লাগামছাড়া খরচের বিরুদ্ধে সরকার উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন। এই সব হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে কেউ প্রশ্নই করে না, সরকারের তো নিজের হাতেই একখানা স্বাস্থ্য-পরিকাঠামো রয়েছে; পড়শির (অর্থাৎ বেসরকারি হাসপাতালের) ঘরের হ্যাপা দেখার পাশাপাশি সরকার বাহাদুর নিজস্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি কেমন সামলাচ্ছেন? হ্যাঁ, আপনার কর্মক্ষেত্র, অর্থাৎ সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি নিয়ে সরকার তো ভাবিত ননই, সেই ব্যবস্থার অব্যবস্থা বা খামতি নিয়ে আজকাল কেউ প্রশ্নই করে না। ভয়টা সেখানেই। বিশ্বাস করুন, আপনি রাজনীতিকে যতই ঘেন্না করুন, রাজনীতি না বুঝলে আপনি এই সমস্যার আসল চেহারাটা ধরতে পারবেন না।

তবে কি সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কথা একেবারেই হয় না? সরকারের কি এদিকে নজর একেবারেই নেই? না না, বালাই ষাট, অবশ্যই আছে। মধ্যবিত্ত নিজেদের চিকিৎসা করাতে সরকারি হাসপাতালে না আসুক, অন্য কারণে আসে তো। ড্রাইভারের পা ভাঙলে, কাজের মাসি অসুস্থ হয়ে পড়লে, এমন ইতিউতি দরকারে আসতে তো হয়ই। এসে তাঁরা দেখেন, হাসপাতালে নতুন বিল্ডিং হচ্ছে, বিল্ডিং-এ নতুন রঙ পড়েছে, মস্ত উঁচু আলোয় ভরা গেট হয়েছে - দেখেটেখে তাঁরা খুশি, অন্তত অখুশির কারণ তো নেই। অবশ্য চিকিৎসা করাতে গেলে…

হ্যাঁ, চিকিৎসা করাতে গেলে তাঁরা জানতে পারতেন, হাসপাতালে প্রায় সর্বস্তরে নিয়োগ সঙ্কুচিত। গত এক দশকে দন্ত-চিকিৎসক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও রীতিমতো কম। মেডিকেল অফিসার বলতে অনেকাংশে কন্ট্র‍্যাকচুয়াল ডাক্তার, বা সদ্য এমডি/এমএস পাস করে বন্ডে থাকা ডাক্তার। পরিকাঠামোর কথা বলতে, গত এক দশক ধরে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ডায়াগনস্টিক সার্ভিস অংশটা প্রায় পুরোপুরিভাবে প্রাইভেট সেন্টারের হাতে - পাব্লিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ ওরফে পিপিপি মডেলের দৌলতে। বহুলপ্রচারিত 'সব ওষুধ ফ্রি'-ও এখন হাস্যকর কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এতশত কথা আর কে-ই বা শুনছে!!

বড়লোক থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণী, তাঁদের চিকিৎসার জন্য কর্পোরেট হাসপাতাল - আর গরীবের চিকিৎসা হবে সরকারি হাসপাতালে। ব্যবস্থাটা দিব্যি ছিল। কিন্তু মুশকিল হলো, চিকিৎসা ব্যাপারটা এমনই সেনসিটিভ আর বিজ্ঞাপনের রমরমার সুবাদে পাঁচতারা হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারাটা এমনই "অ্যাস্পিরেশনাল" হয়ে গিয়েছে, যে, এতখানি অসাম্য দীর্ঘদিন চলতে পারে না। ক্ষোভ অবশ্যম্ভাবী। আপনি যদি দীর্ঘদিন সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই লক্ষ করে থাকবেন, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মুখাপেক্ষী যাঁরা, তাঁদের অধিকাংশের বডি ল্যাঙ্গুয়েজে পরিষ্কার যে তাঁরা নিরুপায় হয়েই এই হাসপাতালে এসেছেন। অর্থাৎ আসাটা "বাই চয়েস" নয়, আসা "বাই কম্পালসান"!! এমতাবস্থায়, আশানুরূপ ফল না পেলেই - কথাটা আরেকবার পড়ুল, আশানুরূপ চিকিৎসা নয়, চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল না পেলেই - হাসপাতালে ভাঙচুর বা স্বাস্থ্যকর্মীদের মারধর অবশ্যম্ভাবী। সেরকম ঘটনা যে ঘটেছে, তা আপনিও জানেন। কিন্তু আপনি তো ঘটনাগুলোকে বৃহত্তর রাজনীতির প্রেক্ষাপটে চিনতে চাননি। চানও না। তাই তো?

তা বেশ। এসবেরই মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী খ্যাতিমান গায়িকাকে "বেটার ট্রিটমেন্ট"-এর জন্য রাজ্যের সেরা সরকারি হাসপাতাল থেকে কর্পোরেট হাসপাতালে সরানোর তোড়জোড় করবেন, পাড়ার ছুটকো নেতা থেকে মন্ত্রীসান্ত্রী, সবাই চিকিৎসা করাবেন বেসরকারি হাসপাতালে (ব্যতিক্রম - যদি না তাদের পুলিশ ধরতে আসে), স্বাস্থ্যসাথী কার্ড চালু করার সময় ঘোষণা হবে, এবার থেকে সবাই "বেস্ট ট্রিটমেন্ট" করাতে পারবেন - অর্থাৎ জনসাধারণের চোখে পাঁচতারা হাসপাতাল যে সত্যিই স্বপ্নের মায়াপুরী, সে নিয়ে তিলমাত্র সন্দেহ থাকবে না - আর সরকার আপনাকে বলবেন, সরকারি হাসপাতালে যাতে "স্বাস্থ্যসাথী কেস" বাড়ে, সে দিকটায় নজর দিতে, যদিও সরকারি হাসপাতালে তো সব চিকিৎসাই ফ্রি, সেখানে আবার কার্ডের প্রশ্ন আসছে কেন!!

অতএব, আপনার "রাজনীতি খুব নোংরা ব্যাপার" বুকনির মাঝেই আপনার কর্মক্ষেত্রটির মান - গুণগত ও সম্মান, উভয়ার্থেই - তলানিতে এসে ঠেকেছে। এবং সেই সঙ্গে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে আপনার সম্মানও। আমার এক অগ্রজপ্রতিম শিক্ষকের স্কুলপড়ুয়া সন্তান বাবাকে বলেছিল - জানো তো, আগে লোকে বলত, যাদের কোত্থাও যাওয়ার উপায় নেই, তারাই সরকারি হাসপাতালে যায়, এই কথাটা আগে পেশেন্ট নিয়ে বলত, এখন ডাক্তারদের নিয়েও বলে। মানে, যে ডাক্তাররা অন্য কোথাও কাজ পান না, তাঁরাই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যোগ দেন। তার পর থেকে সেই চিকিৎসক-শিক্ষক কোথায় কর্মরত এই প্রশ্নের জবাবে সরকারি মেডিকেল কলেজের নামটি গোপন রেখে যে প্রাইভেট হাসপাতালে তিনি ভিজিটিং কনসালট্যান্ট, সেই হাসপাতালের নামটি বলে থাকেন।

তবে ঘটনাটা শুধু ওঁর ক্ষেত্রে সত্যি, এমন নয়। আজকাল সবাইকেই বলতে শুনি, আমি চাকরির উপর ডিপেন্ড্যান্ট নই, আমার প্র‍্যাক্টিস আছে। খুবই ভালো কথা। কিন্তু, প্লিজ, অন্যভাবে ভাবতে শুরু করুন। জোর গলায় বলুন, হ্যাঁ, আমি সরকারি চাকরি করি। এই চাকরির মাইনেয় আমার সংসার চলে। এই ব্যবস্থাটার ভালোমন্দের সঙ্গে আমার ব্যক্তিজীবনের ভালোমন্দ জড়িয়ে। অতএব, বৃহত্তর স্বার্থেই বলুন বা ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে - সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি যেন মজবুত হয়, সে ব্যাপারে গলা তুলুন।

হয়ত আপনিই ঠিক। রাজনীতি হয়ত খুবই নোংরা ব্যাপার। কিন্তু রাজনীতি সচেতন না হলে সঙ্কটের রূপ আপনি বুঝে উঠতে পারবেন না। এও হয়ত ঠিক, যে, আপনি একা সচেতন হয়ে কিছুই করে উঠতে পারবেন না। কিন্তু শিশু যখন প্রথম পা ফেলে, প্রথম ইশকুলে যায় - সে বহুদূর যেতে পারবেই এমন নিশ্চয়তা থাকে না। তবে অনেকেই যায় শেষমেশ। অনেকে পারে না, সেও ঠিক। তবু, পা-টা ফেলতেই হয়। ওটাই শুরু। ওটা না হলে কিছুই হয় না।
একা একা না পারলেও অনেকে মিলে অনেকটাই হয়। অনেক কিছুই করা যায়। তাই বলি, রাজনীতি সচেতন হোন। ব্যক্তিগতভাবে। গোষ্ঠীবদ্ধভাবেও। এটুকু হতে না পারলে কিছুই এগোনো যাবে না।

জাহাঙ্গীরপুরীতে 'অবৈধ' উচ্ছেদ ~ অর্ক ভাদুড়ী


পেটের দায়ে যে গরীব মানুষ ভিন্ রাজ্যে কাজ করতে যান, তাঁর মাথাগোঁজার ঠাঁইকে কোনও বামপন্থী 'অবৈধ' বলতে পারেন না। 'সরকারি জমিতে বেআইনি বস্তি' গড়ে উঠেছে এবং আগামীতেও উঠবে। যতদিন না রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য সুস্থভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, ততদিন তাড়া খাওয়া মানুষ, পেট চালাতে ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষ রাস্তার ধারে, ফুটপাথে, সরকারি জায়গায় নিজের মাথা গোঁজার জায়গা নিজেই করে নেবেন। রাষ্ট্র যখন উচ্ছেদ করতে আসবে, তখন প্রতিরোধ করবেন।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে অসংখ্য মানুষ কাজ করতে দিল্লিতে যান। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ জোগাড়ে, কেউ অন্য কিছু। তাঁদের অনেকেই মুসলিম। এই মানুষগুলোকে 'অবৈধ বাংলাদেশি' বা 'রোহিঙ্গা' বলে দাগিয়ে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্র হলে প্রতিরোধ না করে উপায় নেই।
হনুমানজয়ন্তীর মিছিল থেকে যদি হামলা হয়- একবার নয়, পর পর দু'বার যদি হামলা হয়, তাহলে তৃতীয়বারে স্থানীয় মানুষজনকে রুখে দাঁড়াতেই হয়। উচ্ছেদই যেখানে একমাত্র সত্য, সেখানে কার আইন, কীসের আইন? নিজের সবটুকু শক্তি জড়ো করে রুখে না দাঁড়ালে তো তাঁদের উপায় নেই!
আমাদের মতো অসংখ্য পরিবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে উচ্ছেদ হয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল। থাকার জায়গা ছিল না। করে নিতে হয়েছিল। সে-সবও ছিল বেআইনি বসত। সেই বসত গড়ার সাহস জুগিয়েছিল ইউসিআরসি, সাহস জুগিয়েছিল বামপন্থীরা, কমিউনিস্ট পার্টি।
জাহাঙ্গীরপুরীতে যাঁরা নিজেদের বসত বাঁচাতে লড়ছেন, তাঁরা জেনে হোক বা না জেনে, এই ঐতিহ্যের ধারক। তাঁদের প্রতিরোধেই বাংলার মর্যাদা বাড়ছে।
জাহাঙ্গীরপুরীর মানুষগুলো চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ওখানে আছেন। কেউ মাছ বিক্রি করেন, কেউ কাগজ কুড়োন, কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ অন্য কোনও পেশায়। তাঁদের বসত বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে বিজেপির প্রশাসন। ওই বুলডোজারের পক্ষে যিনি সরাসরি বা পরোক্ষে কথা বলবেন, যিনি কথা বলবেন উচ্ছেদ হওয়া মানুষের বিরুদ্ধে, তিনি বিজেপির মিত্র, তিনি রাষ্ট্রের দালাল।
বামপন্থীরা জাহাঙ্গীরপুরীর উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের রিপোর্ট স্পষ্ট বলছে এই উচ্ছেদ সংখ্যালঘুদের ভিটেমাটি কাড়ার চেষ্টা। বুলডোজারের সামনে প্রতিবাদী মানুষের কাতারে দাঁড়িয়েছেন শীর্ষ বামপন্থী নেতৃত্ব। আম আদমি পার্টি দাঁড়ায়নি, কংগ্রেস দাঁড়ায়নি, কমিউনিস্টরা দাঁড়িয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও যখন বুলডোজার চলছে, তখন কমিউনিস্ট নেতৃত্ব তার গতিরোধ করেছেন। আর যাঁরা সরাসরি বা পরোক্ষে উচ্ছেদ সমর্থন করছেন, হনুমানজয়ন্তীর মিছিল থেকে সংগঠিত হিংসা দেখতে পাচ্ছেন না, তাঁরা বামপন্থী নন, বাম পোশাক পরা রাষ্ট্রশক্তির পোষা দালাল।

শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২২

পয়লা বৈশাখের অঙ্ক ~ অমিতাভ প্রামাণিক

শুভ নববর্ষ ১৪২৯। 

প্রসঙ্গত বলা যাক, ১৪২৯ একটা মৌলিক সংখ্যা। আজ থেকে দু'বছর আগের সালটাও মৌলিক ছিল, আজ থেকে চার বছর পরের সালটাও মৌলিক হবে। 

এই সালটা আমরা যেভাবে লিখি, অর্থাৎ ১, ৪, ২, ৯ পাশাপাশি বসিয়ে (এ আর এমন কী!), এই রীতি ছ'-সাতশো বছর আগেও ইওরোপে অজানা ছিল, আমেরিকা মহাদেশের তো অস্তিত্বই অজানা ছিল প্রায়। রোমানরা ১৪২৯ লিখত এইভাবে - MCDXXIX. 

এইভাবে দুটো সংখ্যা যোগ করাই দায়, গুণ-ভাগ-বর্গমূল-গসাগু-লসাগু তো অনেক দূরের কথা। অথচ তারা নাকি সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের আবিষ্কারক! চোর কি আর গাছে ফলে! 

যাক সে কথা। ভারতীয় পঞ্জিকা সূর্যসিদ্ধান্তমতে সূর্য আকাশের প্রেক্ষাপটে যেদিন মেষরাশিতে প্রবেশ করে, সেদিন থেকেই নতুন বছর শুরু, সেটাই পয়লা বৈশাখ আমাদের। মেষ ছেড়ে যেদিন বৃষতে প্রবেশ করবে সূর্য, আসবে দ্বিতীয় মাস জ্যৈষ্ঠ। দক্ষিণ ভারতে কিছু রাজ্যে যুগাদি ও গুডি পড়োয়া নামে বর্ষবরণ শুরু হয় এর ঠিক আগের অমাবস্যাশেষে, চান্দ্রসৌরমতে।

গুচ্ছ-গুচ্ছ রিফর্মের শেষে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার এখন দুনিয়ার মানুষ অনুসরণ করে, তার নববর্ষ পয়লা জানুয়ারি। পয়লা জানুয়ারির বৈশিষ্ট্য কী, সেদিন জাগতিক কোন্ ব্যাপারটা ঘটে? কিছুই না। পুরো আরবিট্রেরি দিন একটা। 

গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার আর সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী বছরের দৈর্ঘ্য সমান নয়, কুড়ি মিনিটের পার্থক্য আছে (এই কারণেই গ্রেগোরিয়ান নিয়ম অনুসরণ করে বাংলাদেশে গতকাল নববর্ষ পালিত হয়েছে)। এর কারণ আহ্নিক ও বার্ষিক গতি ছাড়াও পৃথিবীর তৃতীয় গতি, যার নাম অয়নচলন (লাট্টু ঘোরালে যেমন তার মাথাটা ঘোরে, যার ইংরাজি নাম প্রিসিশন)। অয়নচলন বিষয়ে ভারতীয় গণিতজ্ঞরা আদৌ অজ্ঞ ছিলেন না, তাঁরা ঠিক করে নিয়েছিলেন আকাশের রাশিমণ্ডলের একটাতে (এক্ষেত্রে মেষ) প্রবেশের সময় থেকে পরবর্তী প্রবেশের সময়কালই এক বছর। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারে তেমন নয়, এক ইকুইনক্স (ইক্যুয়াল নাইট, যে দিন দিনরাত্রি সমান) থেকে পরবর্তী ইক্যুইভ্যালেন্ট ইকুইনক্সের মধ্যবর্তী সময় হচ্ছে এক বছর। কিন্তু তাতে বছরের প্রথম দিনটা একেবারে আরবিট্রেরি, কেননা এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইস্টারের দিন ফিক্স করা (যা যিশুর রেজারেকশন-সংক্রান্ত, ধর্মীয় ও আধুনিক বিজ্ঞানমতে গাঁজাখুরি; এবং সেই উদ্দেশ্যও অসফল, কেননা ইস্টারের তারিখ ফিক্সড হয় না)। 

অনেককে লিখতে দেখি, সূর্যসিদ্ধান্তের গণনা ভুল ইত্যাদি, গ্রেগোরিয়ান কারেক্ট। সেটা সত্যি না। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে এই গ্রেগোরি কে, তিনি কীভাবে ঠিকটা জানলেন, তার ইতিহাস দেখতে গেলে দেখা যাবে, এটা টোকা জিনিস এবং যাঁদের জ্ঞানলব্ধ বস্তু থেকে টোকা, তাঁরা কেরালার 'আর্যভট গণিতবিদ্যালয়'-এর সদস্য ছিলেন। কেরালার সঙ্গমগ্রামের আচার্য মাধব এই বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। জ্যেষ্ঠদেব, নীলকণ্ঠ, শঙ্কর ইত্যাদি নামের শিষ্যবৃন্দ সেই বিদ্যালয়ের গৌরব বৃদ্ধি করেছিলেন। ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো ডা গামার কালিকটে আগমন ও তার পরবর্তী উদ্ভূত স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয় সম্ভবত এই বিদ্যালয়, যদিও গ্রেগোরিয়ান রিফর্ম তার অনেক পরের ঘটনা। ততদিনে প্রাচ্যদেশের জ্ঞান চুরি করার জন্যে বহুস্থানে গজিয়ে গেছে বহু গির্জা, স্থাপিত হয়েছে বহু মিশন। 

সে সব গল্প অন্যদিন হবে। আজ বছরের প্রথম দিন। আপনারা সবাই ভালো থাকবেন। নতুন বছর সকলের জন্যে আনন্দময় হোক, খুশির হোক, সুখের হোক - এই প্রার্থনা।

বৃহস্পতিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২২

ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ~ অমিতাভ প্রামাণিক

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ বা ইকনমিস্ট শুনলেই যে নামগুলো গড়গড় করে মাথায় আসে, তা হচ্ছে অমর্ত্য সেন, অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জী, মনমোহন সিং, সুব্রহ্মণ্যম স্বামী, কৌশিক বসু, প্রণব মুখার্জী, অসীম দাশগুপ্ত, অমিত মিত্র প্রমুখ। অথচ মৌলিক ধারণা ও ভারতীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাবে সমুজ্জ্বল এক রত্নের জন্মদিন আজ, অর্থনীতিবিদ হিসাবে তাঁর নাম শোনা যায় না বিশেষ। 

তিনি ভারতের সংবিধানের রূপকার – ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। 

১৮৯১ সালের ১৪ই এপ্রিল মহারাষ্ট্রের এক অন্ত্যজ (অস্পৃশ্য!) মাহার পরিবারের চোদ্দ নম্বর সন্তান হিসাবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ভীমরাও। পিতৃপুরুষেরা ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীচুতলার সৈনিক। খুব অল্পবয়সে মাকে হারান তিনি, মানুষ হয়েছিলেন পিসির কাছে। চোদ্দজন ভাইবোনের মাত্র পাঁচজন যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন। স্কুলে যেতেন চটের ব্যাগ নিয়ে, তাতেই বসতে হত অন্যদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে। জলতেষ্টা পেলে স্কুলের (উচ্চবর্ণের) পিওন দূরত্ব বজায় রেখে জল ঢেলে দিত, সেই জল আঁজলা ভরে পান করতে হত। যেদিন পিওন স্কুলে আসত না, সেদিন জল পাওয়া যেত না। 

পরিবারের পদবি ছিল সকপাল, কিন্তু রত্নগিরির অম্বাদাবে গ্রাম থেকে এসেছিলেন বলে বাবা তাঁকে স্কুলে ভর্তি করেছিলেন অম্বাদাবেকর নামে। ভীমরাওয়ের পড়াশুনা ও আচরণে সন্তুষ্ট শিক্ষক উচ্চবর্ণীয় কৃষ্ণজি কেশব আম্বেদকর স্কুল রেজিস্টারে তাঁর পদবি পরিবর্তন করে আম্বেদকর করে দেন। 

ষোল বছর বয়সে বোম্বে ইউনিভার্সিটির অধীনস্থ এলফিনস্টোন কলেজ থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি – মাহার কমিউনিটির মধ্যে প্রথম। তার আগের বছরেই তার বিয়ে হয়ে গেছে। ম্যাট্রিকের পাঁচ বছর পরে তিনি অর্থনীতি ও পলিটিক্যাল সায়েন্সে বোম্বে ইউনিভার্সিটি থেকে বিএ পাশ করে বরোদা রাজ্যে চাকরি করতে যান। বরোদারাজ সয়াজিরাও গায়কোয়াড়ের আনুকূল্যে তাঁর কপালে মাসে সাড়ে এগারো পাউন্ডের স্টেট স্কলারশিপ জুটে যায় তিন বছরের জন্যে, উচ্চশিক্ষার জন্যে তিনি চেপে বসেন আমেরিকাগামী জাহাজে। নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার জন্যে এই স্কলারশিপ। 

এই তিন বছরে আম্বেদকর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ২৯টা, ইতিহাসে ১১টা, সোশিওলজিতে ৬টা, দর্শনে ৫টা, নৃতত্ত্বে ৪টে, রাজনীতিতে ৩টে এবং ফ্রেঞ্চ ও জার্মান ভাষায় ১টা করে কোর্স করেছিলেন। ১৯১৫ সালে তিনি এম এ ডিগ্রি লাভ করেন, তার দু-বছর পরে ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডক্টরেট ডিগ্রি পান। অর্থনীতিতে তিনি ভারতের প্রথম ডক্টরেট এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ডবল-ডক্টরেট, একটা ডিগ্রি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, দ্বিতীয়টা লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি একটা এম এসসি ডিগ্রিও পেয়েছিলেন! তাঁর সময়ে তাঁর সমতুল্য ডিগ্রিধারী ব্যক্তি ভারতে সম্ভবত আর কেউ ছিলেন না। 

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবমিট করা তাঁর থিসিস ও পেপারগুলো প্রত্যেকটাই মৌলিক ধারণায় এক একটি আকরগ্রন্থ। এগুলোর শীর্ষক – 'Ancient Indian Commerce', 'Castes in India – their Mechanisms, Genesis and Development', 'National Dividend of India - A History and Analytical Study'. 

লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে তিনি এম এসসি পান 'Provincial Decentralization of Imperial finance in British India' শীর্ষক থিসিসের জন্য। ডি এস সি-র থিসিস শীর্ষক 'The Problem of the Rupee – Its Origin and Its Solution'. এর কাজ করার মাঝপথেই ১৯১৭ সালের জুন মাসে বরোদারাজ-প্রদত্ত স্কলারশিপ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে বাড়ি ফেরার জাহাজ ধরতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয় চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে থিসিস জমা দিতে। আম্বেদকর আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে কেনা তাঁর সমস্ত বইপত্র আলাদা এক জাহাজে পাঠিয়ে দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাজার তখন, সেই জাহাজ টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দেয় জার্মান সাবমেরিন। 

বরোদারাজের সঙ্গে চুক্তিমতো তাদের 'মিলিটারি সেক্রেটারি'-র চাকরি নিতে বাধ্য হন আম্বেদকর, যদিও ব্যাপারটা সুখকর ছিল না। বরোদায় পৌঁছানোর খরচা তাঁকেই বহন করতে হয়েছিল। জাহাজডুবির জন্যে থমাস কুক তাঁকে যে ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল, তা চলে যায় এই খরচা মেটাতে। 

পরে প্রথম সুযোগেই তিনি লন্ডনে ফিরে গবেষণার কাজ শেষ করেন ও ডি এসসি ডিগ্রি পান। রয়্যাল কমিশন অন ইন্ডিয়ান কারেন্সি অ্যান্ড ফিনান্সে (হিল্টন ইয়াং কমিশন) জমা দেওয়া তাঁর থিসিসে তাঁর অনুমোদনসমূহ – যাতে তিনি মুদ্রাস্ফীতি ও ভারতীয় মুদ্রার ক্রমাগত পতন এড়াতে এর 'জেনারেল পার্চেজিং পাওয়ার' নির্দিষ্ট মাত্রায় বেঁধে দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন – থেকে জন্ম নেয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-র ধারণা। 

সমস্ত ভারতবাসীর সমান অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, নারীর অধিকার ইত্যাদি সমস্ত বিষয়ে আম্বেদকরের চেয়ে বেশি সরব কেউ ছিলেন না। গান্ধীর প্রকাশ্য সমালোচনা করে তিনি বলেন, ইংরেজদের কাছে নিজেকে প্রোগ্রেসিভ প্রতিপন্ন করতে যে গান্ধী ইংরাজি ভাষায় দলিত হরিজনদের ওপর উচ্চবর্ণের অত্যাচারের কথা বলেন, সেই একই গান্ধী গুজরাতি ভাষায় লেখা তাঁর প্রবন্ধগুলিতে বর্ণভেদের একনিষ্ঠ প্রচারক। ১৯৩০ সালে গান্ধীর প্রবল-প্রচারিত ডান্ডি মার্চের তিন বছর আগে আম্বেদকর মাহার অন্ত্যজদের নিয়ে সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেছিলেন চাওদার তালাও থেকে বঞ্চিত তাদের জলপান করিয়ে। ভাইসরয় এগজিকিউটিভ কাউন্সিলের উল্লেখযোগ্য সদস্য (লেবার মিনিস্টার) হিসাবে আম্বেদকরই কারখানার শ্রমিকদের দিনে বারো ঘন্টার বদলে আটঘন্টা কাজের এবং ডি এ, ছুটির অধিকার, বীমা, মেডিক্যাল লীভ, পে-স্কেল ইত্যাদি আধুনিক ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন।

দেশের জল ও বিদ্যুৎ নীতি রূপায়ণে (দামোদর ভ্যালি, ভাকরা নাঙ্গাল, হিরাকুদ ইত্যাদি বাঁধ প্রকল্পে এবং সেন্ট্রাল টেকনিক্যাল পাওয়ার বোর্ড, সেন্ট্রাল ইলেকট্রিক্যাল অথরিটি স্থাপনে) তাঁর ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রদেশ ও বিহারের মত বড় রাজ্যকে ভাগ করে দেওয়ার কথা লিখে গেছিলেন তাঁর Thoughts on Linguistic States বইতে, যা রূপায়িত হতে লেগে গেল ৪০-৪৫ বছর। ১৯৫১ সালে তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় ফিনান্স কমিশনের। কাশ্মীর-সংক্রান্ত সংবিধানের ধারা ৩৭০ এবং রিজার্ভেশন-সংক্রান্ত নীতির প্রবল বিরোধী ছিলেন আম্বেদকর। হিন্দু নারীর অধিকার প্রসঙ্গে তাঁর আনা বিল – যাতে ছিল বিবাহিতা নারীরা পিতার সম্পত্তির অধিকারিণী হবে, ডাইভোর্সে পুরুষ-নারীর সমান অধিকার থাকবে, বিধবা ও ডাইভোর্সিদের পুনর্বিবাহে অধিকার থাকবে, পলিগ্যামি বে-আইনি ঘোষিত হবে, ইত্যাদি – সংসদে গৃহীত না হলে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর পদ থেকে তিনি ইস্তফা দেন।  

মাহার জাতের একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর তাঁর সম্মানে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, সেখানে কিশোর ভীমরাওকে দাদা কেলুস্কর নামে একজন লেখক বুদ্ধের জীবনীগ্রন্থ উপহার দিয়েছিলেন। আম্বেদকর সেই বই পড়ে প্রভাবিত হয়ে বুদ্ধের শরণ নিতে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ভারতের বর্ণাশ্রম প্রথার উদ্ভব বিষয়ে তাঁর প্রচুর লেখালিখি, যাতে তিনি আর্য-অভিযান তত্ত্বকে নস্যাৎ করে শূদ্রজাতির উদ্ভব বিষয়ে তাঁর মত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

মধুমেহ রোগে হীনস্বাস্থ্য হয়ে ১৯৫৬ সালের ৬ই ডিসেম্বর মৃত্যু হয় এই স্পষ্টবাদী মনীষীর।  

১৪ই এপ্রিল ২০২১

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২২

"রেফার রোগ"~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

রেফার রোগ অর্থাৎ আননেসেসারি রেফারাল এর সর্বজনগ্রাহ্য কারণ খুঁজতে সিস্টেম এনালিসিস করে প্রথমেই যেটা মাথায় আসে তা হল - উপযুক্ত সংখ্যায় উপযুক্ত ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীর অভাব। সংখ্যার বিষয়টা পরে আসছি। আগে এই উপযুক্ত ডাক্তার শব্দটা নিয়ে নাড়াচাড়া করা যাক। বিশেষজ্ঞ ছেড়ে অ বিশেষজ্ঞ বা সাধারণ ডাক্তারের কথা আগে, সরকারি পরিভাষায় যাদের নাম জেনারেল ডিউটি এম ও। ধরুন একটি ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র। তাতে নিয়ম অনুযায়ী যত জন GDMO থাকার কথা তাই আছে। তাহলে কি অপ্রয়জনীয় রেফারাল আটকানো যাবে ? যাবে না। এক এক করে আসুন। 

নলেজ এর ঘাটতি। সাপের কামড় গত বারের পরীক্ষায় এসেছিল তাই এবারে সেটা না পড়েই পরীক্ষা দিতে যাওয়া ও এমবিবিএস পাশ করে যাওয়া সম্ভব। ফলে সেই ডাক্তার ডিউটিতে থাকলে সাপে কাটা রুগী রেফার হবেই। স্কিল এ ঘাটতি। এপিসিওটমি রিপেয়ার করতে জানে না, নরমাল ডেলিভারি নিজের হাতে কোনোদিন করায় নি এমন জিডিএমও দেখেছি। পোস্টিরিয়ার ন্যাজাল প্যাকিং দিতে পারে না, ছোট বাচ্চাদের ফ্লুইড চালাতে পারে না এমন ডাক্তারও দেখেছি। সেই ডাক্তার ডিউটিতে থাকলে ওই সব কেস রেফার হতে বাধ্য। দোষটা তার নয়, সিস্টেম এর দোষ। সিস্টেম তাকে সুযোগ দিয়েছে এই ভাবে বেড়ে ওঠার। 

এবারে আসুন নেক্সট পয়েন্টে। এক্সপেরিয়েন্স এ ঘাটতি। ডার্মাটোলজি এর ইন্টার্নশিপ এর সময় কোনো কুষ্ঠ রুগী দেখেনি। অগত্যা সাসপেক্ট কেস এলেই রেফার। একজন ডাক্তার কেস ডায়াগনসিস করতে পারছে না অভিজ্ঞতার ঘাটতির জন্য সে জীবনে জলাতঙ্ক রোগীই দেখেনি। কিন্তু তার সহকর্মী দেখেছে। তার সাথে কনসালটেশন এর কোনো চল নেই। জেলাস্তর থেকে তার নিচের হাসপাতালে কোনো ক্লিনিক্যাল মিটিং, ক্লিনিক্যাল অডিট এর চল নেই, প্যাথলজিক্যাল অটপসি এর ব্যবস্থা নেই। বেশ বোঝা যাচ্ছে যে স্রেফ উপযুক্ত সংখ্যায় ডাক্তার দিলেই রেফার আটকানো যাবে না। নলেজ, স্কিল, এক্সপেরিয়েন্স এর ঘাটতি মেটাতে মেডিক্যাল এডুকেশন, ট্রেনিং, পরীক্ষা পাস, পাস করার পরে continuing Medical Education বা CME - এই গোটা সিস্টেমটা নিয়েই ভাবতে হবে। জেলা স্তরে ক্লিনিক্যাল বিষয় যেমন ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট, বা পয়জনিং এর ট্রেনিং এ ও দেখেছি ২০- ২৫% অনুপস্থিত থাকেন। অতএব মেকানিক্যালি CME কথাটা উচ্চারণ করলেই সমস্যা মিটবে না। সরকারি চাকরিতে ঢোকার পরে উপযুক্ত সময় ধরে সবার ইনডাকশন ট্রেনিং হোক, নিয়ম কানুনের পাশাপাশি এসেন্সিয়াল SOP গুলোও আলোচনা হবে। IAS দের ট্রেনি থাকতে হয় কত দিন ? 

এবার আসুন।  এটিচুড এর ঘাটতি। একই কেস একই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন দেখে দিচ্ছে আর অন্য জন রেফার করছে। দুজনের যোগ্যতা একই এমনটাও দেখেছি। যে রেফার করছে তার দৃষ্টিভংগী কিঞ্চিৎ ভিন্ন। সে হয়তো ঝুঁকি নিতে চায় না, কেস কিছুটা খারাপ , মরে গেলে রুগীর বাড়ির লোকের হাতে মারধর, বা CPA ইত্যাদি। এই দৃষ্টিভঙ্গি কি ভাবে পাল্টানো যাবে সে মস্ত প্রশ্ন। গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলিতে নিরাপত্তার নূন্যতম ব্যবস্থা না করে বা আধা শহরের মহকুমা / জেলা হাসপাতালগুলিতে প্রশিক্ষণ বিহীন নিরাপত্তা কর্মীদের দিয়ে নাম কা ওয়াস্তে ব্যবস্থা করে কি ভাবে ডাক্তার সহ অন্যান্য কর্মীদের মনে নিরাপত্তার ভাব জাগানো যায় সেটা মস্ত চ্যালেঞ্জ। 

ধরা যাক কোনো এক যাদু মন্ত্র বলে ওপরের বর্ণিত ওই ঘাটতি গুলি মেটানো গেল। এবারেও কি রেফার আটকানো যাবে ? ডাক্তার একদম ঠিকথাক, কিন্তু ধরুন যদি উপযুক্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার সুবিধে না থাকে ? ছোট গ্রামীণ হাসপাতালের কথা ছেড়েই দিন। কটা জেলা হাসপাতালে ২৪ x ৭ এক্স রে ইসিজি, প্যাথলজি, বায়কেমিস্ট্রি এর ব্যবস্থা থাকে ?  হয় মেশিন নেই, অথবা টেকনিশিয়ান/ টেকনোলজিস্ট নেই অথবা রিয়েজেন্ট নেই, মেশিন আছে, কিন্তু সেটা বিকল। বিকল মেশিনকে তাড়াতাড়ি সচল করার কোনো ফুলপ্রুফ সিস্টেম এদ্দিন এও তৈরি করা গেল না। কেন গেল না ? উপযুক্ত সংখ্যায় ডাক্তার না পাওয়ার একটা যুক্তি আছে। কিন্তু প্যারামেডিকেল বা নার্সিং স্টাফ না পাওয়ার কি যুক্তি আছে। একটিবার খোঁজ করে দেখুন তো শেষ কবে MT lab বা MT opto রিক্রুটমেন্ট হয়েছে ? 

আর এই উপযুক্ত সংখ্যা কথাটাই তো ভীষন গোলমেলে। সরকার এর ম্যানপাওয়ার নর্ম হল ১৯৯১ সালের establishment table নামের একটি বস্তু। তার পরে গঙ্গা তিস্তা দিয়ে কত জল গড়িয়ে গেল, Indian Public health standards, quality assurance কত কি ম্যান পাওয়ার নর্ম এলো গেল কিন্তু সেই ৯১ এর টেবল এর কোনো রিফর্ম হল না। রিফর্ম বাদ দিন। ওই টেবিল অনুযায়ী কটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, মহকুমা হাসপাতালে কর্মী নিযুক্ত আছে ? সব ধরনের কর্মীর অপ্রতুলতা। এমন কি কেরানিদের ও। আপনি বলবেন রেফার আটকাতে কেরানীর কি ভূমিকা ? আরে বাবা, একটা চিঠি, ধরুন যন্ত্র খারাপ সেটা লিখতে বা ডাক্তারদের ছুটির হিসেব রাখতেও তো ডিলিং এসিস্ট্যান্ট লাগে। PsC বাদ দিয়ে নিজস্ব হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড তৈরি হয়েছিল এসব এর জন্য। তারা করে টা কি ? ডোম এর পোস্ট ফাঁকা। তাদের জন্য একটা সঠিক TOR তৈরি করা গেল না ? PhD ক্যান্ডিডেট এপ্লাই করছে আর লোকে হাসছে।  

আর অভাবের সংসারে সবচেয়ে বেশি লাগে প্ল্যানিং। আমাদের ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিং এর নমুনা ? রুগী মৃত্যুর পরে কাগজ পড়ে জানা গেল যে জেলা হাসপাতালে ছয় জন অর্থোপেডিক সার্জেন ছিল। আর এদিকে অন্য জেলা হাসপাতালে একজন মাত্র। এই posting কে করলো কিভাবে করলো, কেন তাকে শো কজ করা হবে না ? দোষ কেবল ক্লিনিশিয়ানদের ? সেই স্বাস্থ্য প্রশাসকদের নয় ?

সব শেষে আসুন রেফার এর সবচেয়ে বাজে কারণটাতে। ফাঁকিবাজি। আপনি যদি দিনের পর দিন দেখেন যে আপনার ফাঁকিবাজ সহকর্মী আর আর আপনি মাসের শেষে একই মাইনে পান, বছর শেষে একই ইনক্রিমেন্ট তাহলে আপনিই বা "বোকা" এর মতো খাটতে যাবেন কেন। পারফরমেন্স বেসড ইনসেনটিভ বলে কিছু নেই। না মানিটারি, না নন-মানিটারি। এর উল্টো দিকে শাস্তি ? দূরে বদলির ভয় ? অর্ধেক তো চাকরিই ছেড়ে দেয়। আর বদলি হতে হবে জেনে শুনে যারা চাকরিতে আসে তাদের মনে ওই ভয় কতটা কাজ করে বলে আপনার মনে হয় ? আর যাদের ভয় আছে তাদের জন্য তো ইউনিয়ন আছে। 

আর কাজের পরিবেশ ? কষ্ট করে লেখা পড়া শিখে আই এর মাইক্রো সার্জারি শিখে আসা সার্জেনকে দিয়ে মেডিকো লিগ্যাল পোস্ট মর্টেম করিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করে এই সিস্টেম। নিত্য ঝামেলার জন্য হাসপাতাল সুপার এর পোস্ট এখন স্বাস্থ্য প্রশাসকদের কাছে বিভীষিকা। সবাই প্রোগ্রাম অফিসার হতে চায়। আর ক'জন সুপার এর হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট এর ডিগ্রি ডিপ্লোমা আছে ? বড়জোর DPH বা MPH এই তো।  ক'জন সিএমওএইচ এর বড় হাসপাতাল চালানোর অভিজ্ঞতা আছে ? প্রমোশন পলিসিতেও গন্ডগোল। 

আর আমাদের প্ল্যানিং এর নমুনা ? কোটি টাকা ব্যয় করে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল তৈরি হল তাতে কোনো অফিস কমপ্লেক্স ঘর নেই। সুপার কি রাস্তায় বসে অফিস চালাবে ? তাই সই। আরো আজব ব্যপার হল তাতে ছ টা OT আছে কিন্তু কোনো ফার্মেসি স্টোর নেই। এত ওষুধ পত্র যন্ত্রপাতি, লিনেন রাখবে কোথায়। হেন হাসপাতাল নেই যে খানে প্রায় প্রতিমাসে আদেশ আসে ওপর থেকে অমুক ক্লিনিক খুলতে হবে, তমুক OPD খুলতে হবে। আজ জেরিয়াট্রিক তো কাল টেলিমেডিসিন। সুপার জায়গা বের করবে কি করে সে নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই ওপরওয়ালাদের। ফলে সংকুচিত হয় সেই ইনডোর ইনডোর এর করিডোর, বারান্দা। ফলে বেড নেই, ফলে রেফার। এ ভাবে কোনো সভ্য দেশে হসপিটাল সিস্টেম চলে না। 

সবটা মিলিয়ে খুব জটিল অপ্রীতিকর একটা পরিস্থিতির মধ্যে স্বাস্থ্যকর্তারা রেফার রোগের মোকাবিলায় নেমেছেন। দুটো হাসপাতাল সারপ্রাইজ ভিজিট করে (এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে ভিজিট করে কেন জানতে হবে কোথায় "বেশি" ডাক্তার সেটা বোধগম্য নয়, ডাটাবেস কি হল তাহলে?) সেই রোগ সারানো যাবে না। হ্যাঁ কিছু লোক খেপিয়ে তোলা যাবে। ইন্দ্ধন যোগানোর জন্য সবজান্তা সংবাদ মাধ্যম তো আছেই। 

রেফার রোগ সারাতে গেলে সঠিক তথ্য সংগ্রহ (তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার) করা দরকার সবার প্রথমে। তার সাথে সঠিক যুগোপযোগী চিন্তাভাবনা যুক্ত করে সঠিক পরিকল্পনা করার দরকার। প্রচুর খাটতে হবে, সিস্টেম এর খোল নলচে পাল্টে রিফর্ম করতে হবে। দেশ বিদেশের বেস্ট প্রাকটিস মডেলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে আর প্রতিপদে সঠিক চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট টেকনিক এর প্রয়োগ করে সব স্টেকহোল্ডারদের এই রিফর্ম এ সামিল করতে হবে। একা কোনো সুপার বা সিএমওএইচ ধমকে চমকে এটা করতে পারবে না। 

সাধারণ মানুষের হয়রানি যাতে কমে (শূন্য করা সম্ভব নয়), গরীব মানুষ যাতে আরও গরীব না হয়ে যায় তার জন্য তার বাড়ির কাছের (ডোর স্টেপ) সরকারি ছোট বড় হাসপাতালে যতটা সম্ভব চিকিৎসা দেয়াটা আমাদের দায়িত্ত্ব কর্তব্য এ নিয়ে কোনো বিতর্কই চলতে পারে না। কিন্তু এই সীমিত বাজেট নিয়ে স্রেফ ধমকে চমকে সেই কর্তব্য পালিত হবে কিভাবে - সেই সুস্থ বিতর্ক চলতে থাকুক যতক্ষণ না বাস্তব সম্মত সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসে। স্রেফ ডাক্তার নয়, চিকিৎসাকর্মী নয়, সাধারণ মানুষও এই বিতর্কে অংশ নিন। 

সব শেষে বলবো আমাদের আশাবাদী হতেই হবে। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এই সিস্টেমটা খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার নিরিখে বলতে পারি, ডাক্তার সহ অধিকাংশ কর্মচারীরা বেসিক্যালি ফাঁকিবাজ নন, তারা কাজ করতে চান। উপযুক্ত কাজের পরিবেশ চান শুধু, সঙ্গে একটু ঠিকমতো ব্যাকআপ সাপোর্ট সিস্টেম। কোভিড এর সময় এই সহকর্মীদের নিয়ে মিরাকল দেখিয়েছি আমরা। সব্বাই ভয়ে পালিয়ে গেছে। তাবড় দাপুটে নেতা মন্ত্রীসান্ত্রিরা হাসপাতালের ৫০০ মিটারের মধ্যে আসেন নি। স্রেফ ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মী - এরাই বুক দিয়ে আগলিয়েছে সরকারি হাসপাতালের সিস্টেম। ধমকে চমকে এ জিনিস হয় নি। আমাদের ওপর ভরসা রাখুন আমাদের পাশে দাঁড়ান সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে। আমরা নিরাশ করবো না।

মঙ্গলবার, ১২ এপ্রিল, ২০২২

মমতার অপসারণ ~ ডাঃ বিষান বসু

অনেকেই দেখছি দীর্ঘশ্বাস ফেলেটেলে বলছেন, অনেক আশা নিয়ে আপনাকে এনেছিলাম। শেষমেশ এই! ঠিক আছে, এনেছিলাম আমরা, ছুঁড়ে ফেলবও আমরাই।

প্রেমে দাগা খাওয়া যৌবনের অনুরূপ ভাষায় অনেকে এমনও বলছেন, এই জন্য, হায়, এই জন্য আপনাকে ক্ষমতায় রেখে দিলাম! ফ্যাসিবাদের বিপদ রুখতে গিয়ে শেষমেশ এই! মনে রাখবেন, আপনার পতনও আসন্ন।

সৎ আবেগ তাঁদের। সম্মান জানানোই উচিত। বিশেষ করে উত্তর মেরুর পেঙ্গুইনের পুনর্বাসন প্রসঙ্গে কমরেড ট্রটস্কি কী বলেছিলেন বা হনলুলুর বিপ্লব সম্ভাবনা প্রসঙ্গে দিমিত্রভের অন্তর্ভেদী মতামত, এসবের কোনোটাই যখন জানা নেই, তখন তাঁদের গভীর চিন্তনের প্রতি শ্রদ্ধাবনত সম্মতিই শ্রেয়।

তবু অশিক্ষিত কাণ্ডজ্ঞানশূন্যতার সুবাদে দুটো কথা বলে বসার লোভ সামলাতে পারছি না।

প্রথমত, "জননেত্রী"-কে ক্ষমতায় বসানো। হ্যাঁ, চৌঁত্রিশ বছরের ক্ষমতার শ্যাওলা এক ভয়ানক অভ্যাস। নিয়মিত ঘষামাজার মাধ্যমে সে শ্যাওলা তুলে না ফেললে পাথরটি যে একসময় লালরঙা ছিল, বুঝে ওঠা মুশকিল। "পরিবর্তন" হতোই - সেদিন না হলে তার পরের দিন। কিন্তু আপনাদের "বিপ্লব" কিছু সস্তা ছিল না - মানে একদম টাকাপয়সার অঙ্কের প্রসঙ্গেই কথাটা বলছি। 

মাননীয়ার ছবি কোটি টাকায় বিক্কিরি হওয়াই বলুন বা "পরিবর্তন"-এর ঠিক মুখেই দশ-বিশটা মিডিয়া একলপ্তে হাতবদল হওয়া - টাকা উড়ছিল বাতাসে। আপনারা টাকা খেয়েছিলেন, এমন অপবাদ দিচ্ছি না - কেননা, আমি সত্যিসত্যিই আপনাদের ব্যক্তিগত সততায় বিশ্বাস করি - কিন্তু বিপ্লবের গনগনে আগুনে কাঠকয়লায় জোগানটি ঠিক কোত্থেকে আসছিল, বিপ্লবের গরমাগরম অতিরঞ্জিত খবরগুলো ঠিক কাদের হাত ধরে "জনগণ"-এর কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল, আপনারা বুঝতে পারেননি। বা বিপ্লবের আত্মপ্রসাদের চোটে চিনতেই পারেননি। চিটফাণ্ডের মালিকের চ্যানেল বাম-বিপ্লবের সমর্থক হয়ে বিপ্লবের বার্তা দিকে দিকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন - আমি নিশ্চিত, লেনিন কিংবা গ্রামশি এর'ম সম্ভাবনার কথা কোথাও না কোথাও লিখে গিয়েছেন - আমরা যারা অবোধ অজ্ঞান তাদের চোখে ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত ঠেকেছিল অবশ্য, কিন্তু তাতে কী!!!

দ্বিতীয়ত, ফ্যাসিবাদ রুখতে ইয়ে। অর্থাৎ মাননীয়াকে ক্ষমতায় গেঁড়ে বসতে সাহায্য করা। খরচা সেখানেও কম হয়নি। ভাজপা-র ঢালাও টাকা ওড়ানোর তুলনায় অতি নগণ্য হলেও কম নয়। বেশি না, নির্বাচনের আগে মাত্র আটত্রিশ হাজার কোটি টাকা। হ্যাঁ, বাকি সব খরচা বাদই দিন, কিন্তু এই টাকাটা রাজ্য সরকার দিয়েছিলেন বিভিন্ন এনজিও ও "অন্যান্য"-দের। ভোটের আগে। হ্যাঁ, দুস্থ দেনাগস্ত এই রাজ্য সরকারই।

আবারও বলছি, আপনি সেই পয়সার ভাগ পেয়েছিলেন, এমন আমি বলছি না। কেননা আপনার ব্যক্তিগত সততার ব্যাপারে আমি নিঃসংশয়। কিন্তু আপনাদের প্রোগ্রাম ইত্যাদিতে পোস্টার-প্ল্যাকার্ড রঙচঙে ফেস্টুন তার খরচ ঠিক কোন পথে আসছিল, তা জানতে পারেননি। বা ওই যে বললাম, বিপ্লবের আত্মপ্রসাদের চোটে চিনতেই পারেননি। বা ভাবছিলেন, ফ্যাসিবাদের বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের চেতনা জাগ্রত হয়ে উঠলে এমনই হয়। অথবা, দিমিত্রভ তো বলেইছেন... আসলে দিমিত্রভ তো শুধু পড়ার ব্যাপার নয়, ওসব গীতা-উপনিষদের শ্লোকের মতো উপলব্ধির ব্যাপার - এবং টেক্সটের চাইতে কনটেক্সচুয়াল ইন্টারপ্রেটেনশনটাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ, তাই না, বলুন?

সে যাক গে, বলেইছি তো, অশিক্ষিত অবোধ ও অজ্ঞান আমি। ভুল বললে মাফ করে দেবেন, প্লিজ।

মোদ্দা কথাটা হলো, আপনাদের দুই দফার বিপ্লবের পেছনে খরচা কম পড়েনি। সাত মণ তেল পুড়িয়ে রাধা নেচেছেন ঠিকই (এটি প্রবাদবাক্য, লিঙ্গভেদে কৃষ্ণ বাঁশি বাজিয়েছেন বলেও পড়তে পারেন), কিন্তু সেই নাচ শেষমেশ এই। তার পূর্বানুমান আপনারা পাননি, সেটুকু ভ্রান্তি নিয়ে দোষারোপের মানে হয় না।

কিন্তু, সেই সাত মণ তেলের জোগান এলো কোত্থেকে, এটুকু জানতে না চাওয়াটা তো...

প্রথম দফায়, বাকি সব সন্দেহজনক উৎস বাদ দিলেও যে উৎসটি সন্দেহাতীত, তা হল চিটফান্ডের টাকা। অর্থাৎ, হাতবদল হওয়া আমজনতার টাকা, এই রাজ্যেরই সাধারণ মানুষের টাকা।

দ্বিতীয় দফায়, রাজ্য সরকারের টাকা। আইপ্যাকের হাত দিয়ে তৃণমূলের তোলাবাজির টাকাও। অর্থাৎ, আবারও, হাতবদল হওয়া আমজনতার টাকা, এই রাজ্যেরই সাধারণ মানুষের টাকা।

মুশকিল হলো, এই দফায় "রাজ্য জুড়ে অনাচারের প্রতিবাদ"-ই বলুন বা অন্য কিছু - ক্ষমতা থেকে সরানো, বা আপনাদের প্রিয় লব্জ অনুসারে "ছুঁড়ে ফেলা", এবম্বিধ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে স্পনসর পাওয়া চাপ।

প্রথম দফায় কাজটা কঠিন ছিল। শুধু টাকার জোরে করা সম্ভব হয়েছিল, এমন নয়। মানুষের জোর না থাকলে হতো না।

দ্বিতীয় দফায়ও কাজটা কম কঠিন ছিল না। মানুষকে বিভ্রান্ত করার আগে নিজেকেও ভুল বোঝাতে পারা - মানে, ভুলটাকেই সঠিক বলে নিজেকে বোঝাতে পারা - সহজ তো নয়। 

এবার অবশ্য কাজটা সত্যিই কঠিন। প্রতিহিংসাপরায়ণ ও হিংস্র সরকার। বিপদ অনেক। ঝামেলা আরও বেশি। আর, ওই যে বললাম, হাজার চাইলেও প্রয়াসটি যথাযথ প্রচার পাবে না, কেননা স্পনসর নেই। অতএব, পেরে উঠবেন বলে মনে হয় না। তবে বেশি পারার চেষ্টা না করাই ভালো। সেটিই রাজ্যবাসীর পক্ষে সুখকর ও স্বস্তিপ্রদ।

কাজেই বড় বড় বাকতাল্লা ছাড়ুন। আপাতত শুধু এটুকু স্বীকার করে নিন, এই প্রতিটি ধর্ষণ, এই প্রতিটি খুন, এই প্রতিটি অশ্রুবিন্দু, এই সবের পেছনে রইল আপনার অংশীদারি - প্লিজ, এটুকু দায়িত্ব নিন। 

ট্রটস্কি বা দিমিত্রভ এ প্রসঙ্গে কী বলে গেছেন জানি না, কিন্তু মাইরি বলছি, দায়দায়িত্বহীন বিপ্লব যে বড় ভয়ানক জিনিস, সে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

মঙ্গলবার, ৫ এপ্রিল, ২০২২

ইলিয়াস সাহেব ~ নরেশ

এবিপি ও টেলিগ্রাফের প্রাক্তন সাংবাদিক নরেশ বাবু লিখেছেন । এই লেখাটা শেয়ার করা এবং পড়া উচিৎ । 

ইলিয়াস সাহেব, আপনার সঙ্গে আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। তখনও আপনি নন্দীগ্রামে থাকতে পারছিলেন। ততদিনে অবশ্য হলদি নদীর এপারে শঙ্কর সামন্তকে পুড়িয়ে মারা হয়ে গেছে আর ওপারে গঙ্গামোড়ে ডিআইবি ইন্সপেক্টর সাধুচরণ চট্টোপাধ্যায়ের ঘাড় ভাঙা লাশ শেষ অবধি উদ্ধার হয়েছে হলদির গর্ভ থেকে। এক জোড়া পাথর বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল লাশটা। নন্দীগ্রামে ততদিনে সিপিএম 'ফিনিস।' ৭ই জানুয়ারির মধ্যেই নন্দীগ্রামের সমস্ত রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে। ৭নম্বর জলপাই গ্রামের ৬৫ বছরের মাখন বাবুকে তাই রিকশা ভ্যানে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেনি ছেলে সুখদেব। বাড়িতে রাখা দু'টো ইনহেলারই শেষ। অতগুলো হাঁদল কাটা রাস্তা পের করতে করতেই রাস্তাতেই মরে গেছেন ৬৫ বছরের মাখন বাবু।  ততক্ষনে পুড়ে গেছে শ'দুয়েক বাড়ি আর লুট হয়েছে শ'পাঁচেক বাড়ি। 'সিপিএম' আর থাকে কোন সাহসে?


তালপাটি খালের ওপারে ভাঙাবেড়ায় সিপিএম আর সিপিআই সমর্থক পরিবারগুলির আশ্রয় শিবির উপচে পড়ছে। শেষ দলটি সোনাচূড়া থেকে পালিয়ে এসেছে দিন চার দিন আগে। এই দলটি মন্ডল পরিবারের। মাওবাদী নেতা তেলেগু দীপক, মধুসূদন মন্ডলরা তাঁদের বেসক্যাম্প পেয়ে গেছে তৃনমূলের অন্দরে। সিদ্দিকুল্লা ততদিনে মহম্মদ ইলিয়াসকে মানে আপনাকে 'হারাম' বলে দেগে দিয়েছেন। খালি কংগ্রেসের সবুজ প্রধান তখনও বুঝে উঠতে পারেননি খেলাটা। ভাবছেন, নিপাট কৃষি জমি রক্ষার আন্দোলন একটা। তিনিও ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটিতে কিন্তু তাঁকে আড়াল করেই নন্দীগ্রামে নীল নকশা বুনে যাচ্ছে শুভেন্দু অধিকারী, সেক সুফিয়ান, তেলেগু দীপক, সিদ্দিকুল্লারা। 'আ্যকশন বাহিনী' গড়ে নিজেদেরই দুটো দল গড়ে খালের এপার ওপার বোমাবর্ষণ আর গুলির মহড়া চলছে। রাতের নন্দীগ্রাম বোমার আওয়াজে কাঁপছে আর হার্মাদ জুজু বোনা হচ্ছে। জুজু এই কারনেই বলা যে সেই 'হার্মাদ' তখনও নন্দীগ্রামে আসেনি। 

সবুজ তো বলেই ফেললেন, ' একটা মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। 'হার্মাদ' মনে করে আমাদের বাহিনীর লোকেরাই গুলি করে মেরে ফেলেছে আমাদেরই কয়েকজনকে।' আসলে খেলাটা বুঝতে পারেননি সবুজ, গ্রামবাসীদের ক্ষেপানোর জন্য আর 'হার্মাদ' গল্প ফাঁদার জন্য মাওবাদীদের লাশের দরকার তাই 'হার্মাদ' ঠেকানোর রাত পাহারায় থাকা ভরত মন্ডল, বিশ্বজিৎ মাইতি আর শেখ সেলিমের লাশের দরকার হয়ে পড়েছিল। সবুজ প্রধানের মত ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতারা তখনও বুঝতে পারেননি, কালিচরনপুর হাইস্কুলের পাশেই ডেরা বেঁধে আছে প্রশিক্ষিত মাওবাদীদের একটি দল। রাতে এরাই নিশিকান্ত মন্ডলের জিম্মায় থাকা অস্ত্র নিয়ে লড়াই লড়াই খেলে আর চমকে ওঠে নন্দীগ্রাম। ৭তারিখ মধ্যরাতে মাওবাদীদের গুলিতে মরলেন ভরত, সেলিম, বিশ্বজিৎ আর সেটাকেই হার্মাদ বলে চালিয়ে দিয়ে শঙ্কর সামন্তর বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে মারা হল শঙ্কর সামন্তকে।

ইলিয়াস সাহেব আপনার সঙ্গে দেখা হল গাঙড়ায়। সাইকেলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, দেখে মনে হল পদ্মা নদীর মাঝি। হলদিতে বৈঠা বাইতে বাইতে এই মাত্তর উঠে এলেন আমার ডাকে। সবুজ প্রধান বলেছিলেন, মানুষটা বড় ভালো। আমি বলেছিলাম, কিন্তু ওঁর সঙ্গে দেখা করব কী করে? সবুজ বললেন, 'আমি বললেই আসবেন।' আসলে আমার কিছুই করার ছিলনা । ৩রা জানুয়ারি নন্দীগ্রাম ঢুকতে ব্যর্থ হয়েছি। থানার মধ্যেই বসে রয়েছি সারাদিন। যে বাছাই করা কয়েকজন রিপোর্টারের নন্দীগ্রাম ঢোকা বারণ তাদের মধ্যে আমিও একজন। এর আগে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির নেতা সেক সুফিয়ানের কাছে দরবার করেছিলাম, তিনি সোজা হাঁকিয়ে দিয়ে বললেন, 'ভেতরে ঢোকার কী দরকার? নন্দীগ্রাম থানায় বসে থাকুন। বর্তমান, একদিনের রিপোর্টাররা তো খবর আনবে তাদের কাছ থেকেই আপডেট নিয়ে নেবেন। তাছাড়া রাস্তা ফাস্তা সব কাটা আছে।' আমি জানি রানা, দয়াল, পাবকরা ততদিনে খবর খাওয়াচ্ছে, লড়াইয়ের গল্প শোনাচ্ছে, হাড় হিম সন্ত্রাসের।

 সবুজকে বললাম। সবুজ বললেন, আপনাকে সোনাচূড়া অবধি আসতেই হবে, বাকিটা আমরা ম্যানেজ করে নেব। আমি ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আরেক নেতা আবু তাহেরকে পাকড়াও করলাম। থানার একটু দূরে তাঁর এতিমখানায় দাঁড়ালাম। এসে বললেন, ' আপনার বন্ধুরাই তো বাগড়া দিচ্ছে দাদা। বলছে ওই লোকটাকে কোনও ভাবেই নন্দীগ্রামের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া যাবেনা। সব ফাঁস করে দেবে।' আমি বললাম, কিন্তু ফাঁস করার আছেটা কী?' আবু বললেন, না, তেমন কিছুই নেই। আচ্ছা দাঁড়ান। কাউকে একটা ফোন করলেন। তারপর বললেন, 'বাইকে করে একজন আপনাকে সোনাচূড়া বাজার অবধি নিয়ে যাবে কিন্তু ওই পর্যন্ত। আর ওপাশে যাবেননা পরের জায়গাটা হার্মাদদের দখলে! আর তেলের দামটা দিয়ে দেবেন। ' আমি বললাম, তাই সই। আবু যে ছেলেটিকে দিয়েছিলেন, তার ফোন নম্বর নিয়েছিলাম। এরপর তাকেই ফোন করে নিতাম। দিনটা সম্ভবতঃ ১২ই ফেব্রুয়ারি, দুদিন আগেই হলদির গর্ভ থেকে ডিআইবি ইন্সপেক্টর সাধুচরণ চট্টোপাধ্যায়ের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মাত্র কয়েকমাস ছিল অবসর নিতে। ঈশ্বরদহ উত্তরপল্লীতে ভাবনীপুর থানার পুলিশের সঙ্গে একটা তদন্তে এসে নিখোঁজ হয়ে গেছিলেন সাধু। 

যাইহোক সবুজকে ফোন লাগলাম, 'সোনাচূড়ায় যাচ্ছি।' ততদিনে চৌরঙ্গী বাজার, হাজরাকাটা, গড়চক্রবেড়িয়া থেকে সোনাচূড়া অবধি সাত আটটা জায়গায় রাস্তাকাটা হয়ে গেছে। বাকি রাস্তায় কাঠের মিল থেকে নিয়ে আসা লম্বা লম্বা লগ ফেলে রাস্তা সঙ্কীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের গাড়ি যাতে না ঢুকতে পারে। প্রতিটি রাস্তা কাটা জায়গায় চার পাঁচজন দাঁড়িয়ে থাকে। ওই বাইক চালকের ইশারায় তারা কাটা রাস্তার ওপর মোটা তক্তা বিছিয়ে দেয়। বাইক পেরুতে পেরুতে সোনাচূড়া বাজার। বেলা দেড়টা। সবুজ এলেন। সবুজই কথা বলে রেখেছিলেন, এলেন নিশিকান্ত মন্ডল। ছিপছিপে লুঙ্গি পরা মানুষটিই তখন সোনাচূড়ার নেতা। রাতে এঁর বাড়ি থেকেই পরিচালনা হয় 'আ্যকশন বাহিনী'। তেলেগু দীপক, মধুসূদন মন্ডলরা নাকি এর বাড়িতেই ডেরা গাড়েন। অনেক পরে খুন হয়েছিলেন নিশিকান্ত মন্ডল। মাওবাদীরাই গুলি করে মেরেছিল তাঁকে। এক মাওবাদী নেতা পরে আমার কাছে আফসোস করে বলেছিলেন, নিশিকান্ত মন্ডলকে মারা ভুল হয়েছিল। ওনার কাছে আমাদের যে অস্ত্রগুলি ছিল তা উনি ফেরৎ দিতে অস্বীকার করেছিলেন বলেই ওনাকে মারা হয়। কিন্তু পরে আমরা জানতে পারি এটা উনি ওনার এক শীর্ষ নেতার নির্দেশেই করেছিলেন। মাওবাদী সেই নেতাতো সরাসরি  অধিকারী বাবুর নাম নিয়েছিলেন।

সোনাচূড়া বাজারের একটা চায়ের দোকানে বসে কথা হল নিশিকান্ত মন্ডল, সবুজ প্রধান, খোকন শীটের সঙ্গে। এরইমধ্যে সবুজ কথা বলে নিয়েছিলেন মহম্মদ ইলিয়াসের সাথে। আমাকে বললেন, উনি গাঙড়া পর্যন্ত আসতে পারবেন। কিন্তু আপনি যাবেন কী করে? আমি বললাম, কেন বাইকে? সবুজ বললেন, মাথা খারাপ ওরা আমাদের বাহিনীর ছেলে। নন্দীগ্রামের বাম বিধায়কের কাছে আপনি বাহিনীর বাইকে যাবেন? এদিকে বাইক চালকও ততক্ষনে অধৈর্য্য হয়ে উঠছে আর উশখুশ করছে। ওকে বললাম, ভাই আপনি চলে যান। তেলের টাকা দিয়ে দিলাম। ছেলেটি খুশি মনে চলে গেল। সোনাচূড়া থেকে গাঙড়া প্রায় তিন কিলোমিটার। চড়া রোদ, মাথা ঝিমঝিম করছে। পরনের হাফ সোয়েটার খুলে মাথায় চাপালাম। সবুজের কথায় খোকন আমাকে গাঙড়ার মুখে নামিয়ে দিয়ে বললেন, বাকিটা হেঁটে চলে যান। বাকিটা হেঁটেই আপনার কাছে গেলাম। রাস্তার ওপর একটা কার্লভাটে বসলাম দু'জন। কার্লভাটটার তলা দিয়ে তখন কুলকুল করে জল ঢুকছে পূর্ব থেকে পশ্চিমে। আমি সেদিকে তাকাতেই আপনি বললেন, হলদিতে জোয়ারের জল ঢুকছে।

দিনটা আমার এই কারনেই মনে আছে যে, নন্দীগ্রামের এই অংশ থেকে শেষ সিপিএম সমর্থক পরিবার চলে গেছে কয়েকদিন আগেই ঠিক যেদিন নদীর ওপাড়ে গঙ্গামোড়ের কাছে ঈশ্বরদহ থেকে নিখোঁজ হয়েছেন সাধুচরণ চট্টোপাধ্যায়। এপারে সেই দিনই ক্লাশ নাইনের ছাত্রী সুমিতা মন্ডলের লাশ উদ্ধার হয়েছে। অনেক অশান্তির মধ্যেই থেকে গিয়েছিল সুমিতার পরিবার। সুমিতার বাবা নন্দীগ্রামে হলদিয়ার মতই শিল্প চেয়ে মিছিল করেছিলেন। দিনে দুপুরেই ১৬বছরের সুমিতাকে ধর্ষণ করার পর মেরে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে তার বাড়ির সামনেই একটা গাছে। এরপরও আপনি নন্দীগ্রামে থাকতে পারছেন? প্রশ্ন করেছিলাম। আপনি বললেন, আছি। তবে কতদিন থাকতে পারব জানিনা। পরে বুঝেছি আপনার দলও ততদিনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর বিরুদ্ধে নরম গরম বক্তব্য রাখছে। অশোক ঘোষ, ক্ষিতি গোস্বামীর মতই মঞ্জুকুমার মজুমদাররাও বলতে শুরু করেছেন, এর পুরো দায় সিপিএমকেই নিতে হবে। আপনাদের সমর্থক পরিবারগুলো ততদিনে ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। তাঁদের রুটিন মত মিছিল মিটিংয়ে হাঁটছে। আপনি বললেন, ' মানুষ ভুল বুজছে কিন্তু আশাকরি সত্যটা বুঝতে পারবে। তেরপেখ্যা সেতুটা হলেই....' আপনাকে বড় বিষন্ন লাগছিল। প্রথমবার ৫ই জানুয়ারি আপনার চৌরঙ্গীর বাড়িতে দেখা সেই আপনি তখন মারাত্মক বিষন্ন, হতাশা গ্রাস করেছে আপনাকে।

ওই বছররই ৫ ডিসেম্বর খবরটা ভেসে উঠল টিভিতে। নন্দীগ্রাম বিধায়ক ইলিয়াস মহম্মদ ঘুষ নিতে গিয়ে ধরা পড়েছে! কোন ইলিয়াস? ১৯৯৩ আর ১৯৯৮  নন্দীগ্রাম-১-এর পঞ্চায়েত সমিতির সহকারী সভাপতি? ২০০১ আর ২০০৬ সালে নন্দীগ্রামের বিধায়ক। পলেস্তারা খসে পড়া একতলা বাড়ির মালিক? দলের নির্দেশে সরকারি চাকরি ছেড়ে বিধায়ক হওয়া ইলিয়াস মহম্মদ। দু'টো বেকার ছেলের কোথাও গছাতে না পারা অপদার্থ বাপ  ইলিয়াস মহম্মদ ? আপনি এতটাই ভোলে ভালা যে সংবাদিক রূপী তৃনমূল কর্মীটিকে চিনতে পারলেননা।

ততদিনে আপনার বাড়িতেও হামলা হয়ে গেছে। আপনি এমএলএ হোস্টেলে। সাংবাদিক সাজা তৃনমূল কর্মী শঙ্কুদেব পণ্ডা নন্দীগ্রামের 'উন্নয়নে'র জন্য কাজ করতে চাওয়া এক এনজিওর হয়ে বিধায়কের শংসাপত্র নিতে গেছিল আপনার কাছে। আমার ফোনটা ধরেই কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, " নন্দীগ্রামে উন্নয়নের কাজ হবে শুনেই শংসাপত্র দিয়েছিলাম। ও আমার পকেটে একটা নোটের বান্ডিল গুঁজে দিল। আমি টাকাটা বের করে ওর হাতে দিয়ে বললাম, ' এইভাবে  দলের ফান্ডে টাকা নেইনা আমরা।' আমি টাকাটা ফেরৎ দিলাম। সেটাই ওরা ছবি করে দেখিয়ে দিল!' আপনার বিরুদ্ধে সেই অভিযোগ শেষ অবধি ধোপে টেকেনি বরং বিধানসভায় চিৎকার করে আপনাকে চোর বলে যিনি স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ এনেছিলেন সেই সৌগত রায়কে নারদ মামলায় ঘুষ নিতে দেখেছে সবাই। আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা শঙ্কুদেবও ধরা পড়েছেন নারদ ঘুষকান্ডে। আপনি নির্দোষ প্রমাণিত কিন্তু তাঁরা এখনও অবধি নন।
 
৪ঠা এপ্রিল ২০২২, আপনার এন্তেকাল! শুনলাম স্ট্রোক হওয়ার পর জমি জায়গা বেচে গত ২বছর আপনার চিকিৎসা হচ্ছিল। আর নন্দীগ্রামে এখন কৃষিজমি খুঁড়ে মাছের ভেড়ি হচ্ছে, সিঙুরের মতই। হলদিয়া শহরের প্রতিটি জনপদে ঝুপড়ির পর ঝুপড়ি বাড়াচ্ছে নন্দীগ্রাম। নন্দীগ্রামের শিক্ষিত যৌবন ছুটেছে বেঙ্গালুরু, আহমেদাবাদ, হায়দ্রাবাদ। আপনার এন্তেকাল হয়েছে আজই, আপনি সব দেখতে পাবেন। দেখে আসুন হলদিয়ার বাবাজীবাসার কোনে যে ছেলেটা সবজি দোকান করে, সে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনীয়ার, আপনারই নন্দীগ্রামে বাড়ি। আর ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধকারী সেই মহান মানুষটির এখন জাহাজ প্রমান বাড়ি!

সোমবার, ৪ এপ্রিল, ২০২২

চলে গেলেন মহম্মদ ইলিয়াস ~ শতদ্রু দাস ও সাহেবুল হক

কমরেড মহম্মদ ইলিয়াস। নন্দীগ্রামের প্রাক্তন বাম বিধায়ক মহম্মদ ইলিয়াস।

কুলাঙ্গার শঙ্কুদেব পান্ডাকে মনে আছে? তৎকালীন তৃণমূল নেতা, দামাল ছেলে৷ নন্দীগ্রামের বাম বিধায়ক কমরেড ইলিয়াসকে ঘুষের অভিযোগে ফাঁসিয়ে দেয়। যদিও পরবর্তী সময়ে ইলিয়াস নির্দোষ প্রমাণিত হন। কিন্তু নির্দোষ প্রমাণ হতে হতে ইলিয়াসের জীবনে চলে আসে বড়সড় পরিবর্তন।

পরিকল্পনা করে বিধায়কের পকেটে ১০ হাজার টাকা গুঁজে দেয় শঙ্কু। সেই অবস্থায় ছবি তুলে নেয়৷ যদিও ছবিতে দেখা গিয়েছিল প্রথমে ইলিয়াস বাধা দিয়েছিলেন। বিধানসভায় স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ তোলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে। বিধায়ক পদ, এমনকী দলের সদস্য পদও ছেড়ে দিতে হয় ইলিয়াস মহম্মদকে।

'ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।' ইলিয়াসকে যারা চক্রান্ত করে ফাঁসাতে চেয়েছিল সেই মূল মাথা শঙ্কুদেব পাণ্ডা চিটফান্ড মামলায় গ্রেফতার হয়৷ নারদা স্টিং অপারেশনে তাকে ক্যামেরার সামনে টাকা নিতে দেখা যায়। শেষপর্যন্ত জেল খাটার ভয়ে বিজেপিতে ভিড়ে যেতে বাধ্য হয় শঙ্কু। সেই গোয়ালঘরই এখন তার বর্তমান ঠিকানা৷

নন্দীগ্রামের বাসিন্দা ইলিয়াস মেধাবি ছাত্র ছিলেন। গণিতে অনার্স নিয়ে স্নাতক পাশ করেন। সমাজসেবার ইচ্ছে থেকেই রাজনীতিতে পা দেন। মেদিনীপুরের মানুষের জনসমর্থন পেয়ে বাম জমানায় ২০০১ সালে এবং ২০০৬ সালে নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক হন।

অনেক অভিমান নিয়ে কমরেড ইলিয়াস চলে গেলেন৷ চলে গেল একটা সংগ্রামী জীবন৷ তৃণমূলের একদা প্রভাবশালী নেতা নন্দীগ্রামের আবু সুফিয়ানদের প্রাসাদের মতো বাড়িঘর৷ ইলিয়াস সেই ফুলে ফেঁপে ওঠা জীবন চাননি। শঙ্কুদেবের টাকার প্রলোভন তাঁকে ভোলাতে পারেনি৷ ক্যামেরার সামনে তোয়ালে মুড়ে টাকা নেওয়া নেতাদের মতো ছিলেন না ইলিয়াস৷ আমৃত্যু সরল-সাধারণ জীবন অতিবাহিত করেছেন৷ এমন মানুষ উন্নয়নের জমানায় বিরল।

চলে যাওয়ার দিনে লোকটার কথা তেমন কাউকে লিখতে দেখলাম না। শোকজ্ঞাপনের তেমন তোড়জোড় চোখে পড়ল না৷ মনে হল লেখা উচিত।

***********************

মহম্মদ ইলিয়াসের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো তথাকথিত "সংখ্যালঘুদের মসিহা", কোনো "সাবল্টার্ন"-এর প্রতিনিধি, কোনো "দলিত অ্যাক্টিভিস্ট"-কে বলতে শুনেছেন? 

সব উপাদান কিন্তু ছিল। ইলিয়াসবাবু গরিব খেটে খাওয়া সংখ্যালঘু, যারা তাকে ফাঁসিয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে বিধানসভায় প্রস্তাব এনেছিল সেই শঙ্কু পণ্ডা, সৌগত রায়, বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার, অধিকারী পরিবার – সবাই উচ্চবর্ণ হিন্দু। যারা চোরকে চোর বললে আজকাল চোরের ধর্ম আর বর্ণ টেনে এনে "উচ্চবর্ণের ষড়যন্ত্র" দেখে, তাদের কাউকে দেখেছেন কখনো কিছু বলতে? যারা ফাঁসিয়েছিল তাদের প্রত্যেককে টিভির পর্দায় এক্সপার্টের মত ঘুষ খেতে দেখেছেন, সৌগতবাবু ঠোঁটের গোড়ায় সিগারেট ঝুলিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়ে ঘুষদাতাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ঘুষদাতার সংস্থার নামটা। মনে পড়ে? 

কেউ কোর্টে দোষী সাব্যস্ত হয়নি। বিজেপি এ টিম এবং বিজেপি বি টিম করে দিব্য সকলেই আজ রাজনীতিতে করে কম্মে খাচ্ছে, কোনো লজ্জা শরম তাদের বা তাদের দলের কারুর নেই। কিন্তু কোনো সংখ্যালঘুদের মসিহা, কোনো "রিকশাচালক সাহিত্যিক দলিত নেতা", কোনো "ছোট প্রকাশনা" কাউকে দেখিনি বলতে যে মহাম্মদ ইলিয়াস এক দল বরাহ শাবকের ঘৃণ্য চক্রান্তের শিকার হয়েছিলেন।

[ সেখ সাহেবুল হক ] [ Purandar Bhat ]

রবিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২২

উব্যর ও মার্ক্স ~ অর্ক রাজপন্ডিত

মার্কস কি কখনো লন্ডনের রাস্তায় উবের চেপেছেন? বা মার্কস চুরুট আনিয়েছেন ফ্লিপকার্টে অর্ডার করে, অথবা এঙ্গেলসকে কোন বই উপহার দিয়েছেন অ্যামাজনে অর্ডার করে? 

তাহলে কিভাবে লিখে ফেলতে পারলেন পিস ওয়েজ (টুকরো মজুরি,  নির্দিষ্ট একটিই কাজের ভিত্তিতে মজুরি)  হল টাইম ওয়েজ (সময় মজুরি)র ই পরিবর্তিত রূপ। আর সময় মজুরি হল শ্রম শক্তির মূল্যের পরিবর্তিত রূপ।

দেড়শো বছরেরও বেশি সময় আগে লেখা ক্যাপিটাল এর প্রথম ভলিউম এর  ২১ নম্বর চ্যাপ্টারে মার্কস ঠিক এই লেখা দিয়েই শুরু করেছেন! পিস ওয়েজ থিওরিতে মার্কস লিখেছেন একই শিল্পে পিস ওয়েজ অর্থাৎ টুকরো মজুরি আর টাইম ওয়েজ বা সময় মজুরি, এই দুই ধরনের মজুরিই মজুরি একই সঙ্গে সমান্তরালে চলতে পারে।


মার্কস উদাহরণ দিয়েছেন লণ্ডনের একটি ঘোড়ার জিনের সরঞ্জাম এর দোকানে দেখা যাবে ব্রিটিশ মজুরদের পিস ওয়েজ দেওয়া হচ্ছে আবার ফরাসি মজুরদের টাইম ওয়েজ দেওয়া হচ্ছে।

'পিস ওয়েজ '  থিওরি নির্মাণে দেড়শো বছর আগে মার্কস লিখে গেছেন ক্যাপিটালে ' পিস ওয়েজ সিস্টেম শ্রমিক শ্রেণীর জন্য নতুন যুগ চিত্রিত করেছে '।

কলকাতার রাস্তায় ধরা যাক নবমীর রাতে উবের এর চড়া চাহিদা,ভাড়া বেশি। উবের চালক ধরা যাক, তাঁর মালিক এর থেকে ভাড়া নেওয়া গাড়ি,  তিনি দেখলেন যে এই বর্ধিত উবের রাইড এর চাহিদা ও বর্ধিত ভাড়ার কারনে তিনি কমিশন ও খানিক বাড়তি পাবেন, টানা সারা রাত গাড়ি চালালেন বাড়তি আয় এর জন্য।

এই প্রবনতা নতুন নয়, আজ যা দেখছি দেড়শো বছরেরও বেশি আগে লিখে গেছেন মার্কস "পিস ওয়েজ" থিওরিতে। মার্কস লিখছেন, পিস ওয়েজ ওয়ার্কারদের প্রবনতা হল অতিরিক্ত কাজ করা, অতিরিক্ত সময় কাজ করা, যাতে তারা বাড়তি মজুরি পেতে পারে।

উবের, আমাজন, ফ্লিপকার্ট এর মত ড্রাইভার,ডেলিভারি বয় নির্দিষ্ট ভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এ গিগ ওয়ার্ক অর্থাৎ নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দিষ্ট মজুরির যে অর্থনীতি,গিগ ইকোনমি বুঝতে হলে, অ্যাপ শ্রমিকদের দুর্দশা,বঞ্চনা বুঝতে হলে মার্কস এর " পিস ওয়েজ থিওরি" র আলোয় বুঝতে হবে।

গিগ অর্থনীতির মূলত তিনটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রথমত, শ্রমিকরা যে টুকরো মজুরি " পিস ওয়েজ" পান, তা ঠিক হয় তাঁর কাজের সংখ্যার ওপরে, যেমন একজন উবের চালক দিনে কতবার রাইড চালালেন। দ্বিতীয়ত, গ্রাহকদের কাছে থাকে পণ্য ও পরিষেবা কেনার নানান সুযোগ, বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে তিনি পছন্দ করতে পারেন। তৃতীয়ত, পণ্য বা পরিষেবার উৎপাদনের সঙ্গে এই ধরনের অ্যাপ কোম্পানিগুলো যুক্ত নয়, তারা শুধু মাত্র বাংলা ভাষায় দালালির কাজ করে।

যেমন আমাজন ময়দা তৈরি করে না বা বই ছাপায় না বা মোগলাই পরোটা তৈরি করে না, সে শুধু মাত্র মোগলাই বা বই বা ময়দা গ্রাহকের কাছে পৌঁছনোর জন্য একজন মজুর নিয়োগ করে দালালির কাজ করে।

ক্যাপিটালিজম সব সময়ই শ্রমিককে বাড়তি খাটিয়ে তার অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করে। গিগ এর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়, ধরা যাক উবের চালককে রাইড পিছু উবের ৫০ শতাংশ কমিশন দেয়, এর অর্থ হল বাকি ৫০ শতাংশ এর কোন মজুরি ই সে পায় না। কেউ যদি দিনে বারো ঘণ্টা গাড়ি চালায় কমিশন বাবদ তার মোট শ্রম সময়ের অর্ধেক সে পায়, তাই দিয়েই সে জ্বালানি ভরে, গাড়ি সারায়,এসির গ্যাস ভরে, পরিবারের যাবতীয় খরচ চালায় ইত্যাদি ইত্যাদি।

এবার একটা অদ্ভুত মজা মানে একেবারে সাংঘাতিক বিভৎস মজা আছে! 

আপনি একজন আদপে শ্রমিক, একটু ভালো মাইনের শ্রমিক, হয়তো আপনি গাড়ি ফ্ল্যাট ও হাঁকাতে পারেন এবারে আপনি ভাবতে শুরু করলেন আপনি 'মিডল ক্লাশ' বরং আপনার নিজেকে ভাবা উচিত ছিল, দেখা উচিত ছিল ' মিডল ইনকাম ওয়ার্কিং ক্লাশ' হিসেবে। 

আপনি একজন ঘোষিত বামপন্থী, লেবার - ক্যাপিটাল দ্বন্দ্বে আপনি বিশ্বাস রাখেন, আপনি চান মজুরি দাসত্বের অবসান হোক। কি মজা দেখুন সেই আপনি উবরে এসি চলেনি, ড্রাইভার ফোন ধরেনি,গাড়িতে সিগারেট খেতে দেয়নি, জোমাটোর ছেলেটা চিকেন রোল দেরিতে এনেছে এসব নানাবিধ কারণে দিলেন নেগেটিভ রিভিউ।

এবার মজাটা কোথায়? আপনার রিভিউ এর ওপর তার মজুরিতে, তার আয় এ আক্রমন হচ্ছে। যেটা " পিস ওয়েজ" এ অনিবার্য। মার্কস লিখেছেন " পিস ওয়েজে শ্রমের মান ও মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে সে যে কাজটা করছে সেটা,  সেটা তখনই ভালো হতে পারে যখন পিস প্রাইস অর্থাৎ টুকরো কাজের জন্য পুরো মজুরি দেওয়া হচ্ছে '।

এবার আপনার মত বামপন্থী গ্রাহকের বা ' মিডল ইনকাম ওয়ার্কিং ক্লাশ ' গ্রাহকের  নেগেটিভ রিভিউ কি করলো? উবের চালককে কাজ দিল না, এমন কি তার আই ডি পর্যন্ত ব্লক করে দিল!  মার্কস লিখেছেন " পিস ওয়েজ মজুরি ছাঁটাই বাড়িয়ে তোলেএবং ক্যাপিটালিষ্টদের আরো প্রতারণার  শক্তি যোগায়"।

গিগ এর মত " পিস ওয়েজ" কাজে শ্রমিকদের স্বাভাবিক প্রবনতা থাকে বাড়তি মজুরির জন্য বাড়তি শ্রম দেওয়া। টানা হয়তো কুড়ি ঘণ্টা উবের চালানো, বা সকাল থেকে সন্ধ্যা টানা ডেলিভারি করে যাওয়া। পুঁজিপতিরাও এই সব পিস ওয়ার্ক এর জন্য পিস মজুরি দেওয়ার আগে সারা ক্ষণ মজুরদের তদারকিতে রাখে। কে কখন গাড়ি চালাচ্ছে, কে কটা ডেলিভারী দিল, রাস্তায় বাইকের টায়ার হয়তো পাংচার হল তাই ডেলিভারী দিতে দেরি হল, সবই দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ করা যায় অ্যাপ এর মাধ্যমে, টায়ার পাংচার এর জন্য সারাই ও করতে হবে শ্রমিক কে আবার দেরির জন্য মজুরিতেও কোপ বসবে!

মার্কস লিখেছেন " যেহেতু এই ধরনের কাজ এর মান ও মাত্রা নিয়ন্ত্রন করে এহেন পিস ওয়েজ এর টুকরো কাজ, পুঁজিপতিদের শ্রম এর ওপর তদারকি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যা অতিরিক্ত অবাঞ্ছিত"।

একই সঙ্গে গিগ অর্থনীতি জন্ম দিচ্ছে পুঁজিবাদের অনিবার্যতায় পরজীবী মুনাফাখোরদের। উৎপাদক আর গ্রাহকদের মধ্যে যেমন পরজীবী দালাল আমাজন ওলা উবের, তেমনি উবের আর চালক এর মধ্যেও জন্ম নিচ্ছে দালালরা যারা উবের চালানোর গাড়ি বা বাইক পর্যন্ত ভাড়ায় ধার দেয়! মার্কস লিখেছেন " পুঁজিপতি ও শ্রমিকদের মাঝে প্যারাসাইটদের প্রবেশ আরো সহজ করে দেয় পিস ওয়েজ, ফলত পুঁজিপতিদের যেমন মুনাফা আরো বাড়ে, শ্রমিকের শোষণ আরও বাড়ে"।

পরজীবী অর্থনীতির গর্ভে জন্ম নেয় পরজীবী ফাঁপা দর্শন, যা আমাদের অবলীলায় শত্রু ভাবতে শেখায় কখনো কখনো উবের ওলা চালকদের, ডেলিভারি বয়দের। 

আমি আপনি শ্রমজীবীদের দার্শনিক অভিধার অংশ, তাই আমাকে আপনাকেই দায়িত্ব নিতে হবে অনিশ্চিত জীবনের এই গিগ ওয়ার্কারদের শোষন চিনিয়ে দেওয়ার, আমিও আপনিও যাতে বুঝতে ভুল না করি আমার আপনার অভিন্ন লড়াইতে কে শত্রু,কে মিত্র। আমাদের একাজ পারতেই হবে, আমি আপনি ইতিহাসের প্রশ্রয় পাওয়া মানুষ।

এনজিও দের এক লক্ষ কোটি টাকা ~ শতদ্রু দাস

সেদিন একটা খুব অদ্ভুত তথ্য পড়লাম। কম্পট্রলার অডিটর জেনারেল (সিএজি) আমাদের রাজ্যের বাজেটের অডিট করতে গিয়ে পেয়েছে যে ২০১৬-২০২০ এই পাঁচ বছরে, রাজ্য সরকার মোট ১ লক্ষ কোটি টাকা নিজেদের বাজেট থেকে এনজিও দের বরাদ্দ করেছে। সবই আপনার আমার কষ্টার্জিত রোজগারের টাকা, এবং গরিব মানুষের হকের টাকা কারণ টাকাগুলো আমরা কর হিসেবে দি গরিব মানুষের ওপর খরচ হবে ভেবেই, চার আনার কবি সাহিত্যিকের মেয়ের চালানো এনজিও বা ঘুরপথে ৬ আনার প্রকাশনার পেছনে খরচ হবে জানলে এই কর কেউই দিতে চাইবে না। কিন্তু তথ্যটা চমকপ্রদ শুধুই টাকার অংকের জন্য না, অন্য কারণে। সেটা হলো এই যে এই খরচের পরিমাণ রাজ্য সরকারের তরফ থেকে পঞ্চায়েতগুলো এবং পৌরসভাগুলোকে দেয় অর্থের চেয়ে বেশি। ২০২০ সালে পঞ্চায়েত এবং পুরসভাগুলোকে রাজ্য সরকার দিয়েছে মোট ১৭ হাজার কোটি টাকা, অথচ এনজিওগুলোকে দিয়েছে ২৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ওই বছর রাজ্য সরকার যদি এনজিওকে টাকা না দিয়ে সবাইকে হাতে হাতে টাকা দিয়ে দিত, তাহলে রাজ্যের প্রতিটা মানুষ প্রায় ২৬০০ টাকা করে পেতেন। পাঁচ জনের পরিবার ধরলে পরিবার পিছু ১২ হাজার টাকা করে পেত। হকের ১২ হাজার টাকা, আমাদের টাকা। সিএজি তাদের রিপোর্টে বিষ্ময় প্রকাশ করেছে যে কেন এত টাকা এনজিওদের দেওয়া হচ্ছে, এনজিওরা সরকারের অংশ নয়, তাদের খরচাপাতির হিসেব সরকারি সংস্থা করতে পারে না, তারা বাধ্যও নয় সরকারকে খরচের হিসেব দিতে, তাহলে কেন এত টাকা তাদের দেওয়া হলো? অন্তত পঞ্চায়েত বা পৌরসভার হাতে টাকা গেলে সেই খরচাপাতির হিসেব চাওয়া যায় আইনত, আরটিআই করলে সেই হিসেব দিতে বাধ্য। তাহলে তাদের মাধ্যমে খরচ না করে এনজিওদের মাধ্যমে কেন? এই প্রশ্নটাই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এবং এর উত্তরের ভেতরেই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং বগটুই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত আছে বলে আমার ধারণা। যদি এই অবধি পড়ে আপনাদের মনে হয় যে  এ সবই কল্পনা তাহলে পুরোটা পড়ার অনুরোধ করবো।


আমার ধারণা যে পুরসভা পঞ্চায়েতের মত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এড়িয়ে, এনজিওর মাধ্যমে এত টাকা খরচ করবার উদ্দেশ্য হলো দুটো। প্রথমত, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের নিজেদেরর দলের নিচু তলার নেতা কর্মীদের ওপর বিশেষ ভরসা নেই। তাঁরা জানেন যে পঞ্চায়েত পুরসভায় আসা টাকা নিয়ে কিরকম কামড়াকামড়ি মারামারি হয়, কিরকম চুরি হয়। এই চুরি এবং তাকে কেন্দ্র করে হওয়া গোষ্ঠীদ্বন্দ কমাতে সরকার পঞ্চায়েত পুরসভাগুলোর ওপর ভরসা না করে, করেছে এনজিওগুলোর ওপর। তাদের মনে হয়েছে যে এনজিওর মাধ্যমে উন্নয়নের কাজ করলে অন্তত কিছু টাকা আসল জায়গায় পৌঁছবে, নিজেদের নির্বাচিত পঞ্চায়েত বা পুরসভার হাতে দিলে সেটুকুও মানুষের কাছে পৌঁছবে না। তাই পঞ্চায়েত পুরসভার টাকা কমাও, এনজিওদের দাও। দ্বিতীয়ত, এইসব এনজিওগুলোর মাধ্যমে সুশীল সমাজকে হাতে রাখা যাবে। এসব এনজিওর অনেকগুলোরই মাথায় বসে আছে কবি, সাহিত্যিক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, ডিএম, ডিএসপি, উকিল জজদের ছেলে, মেয়ে বা স্ত্রীরা। শুধুই তারা নন, নানা প্রকাশনা, থিয়েটার, অভিনেতা অভিনেত্রীরাও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এরকম হাজারো এনজিও সংস্থার সাথে যুক্ত।  তাই এসব এনজিওদের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করলে অন্তত তার কিছু প্রসাদ এদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এমন কিন্তু নয় যে সবাইকে সরাসরি টাকা দিচ্ছে, এটা একটা ইকোসিস্টেম। আপনাকে একটা কাল্পনিক উদাহরণ দিচ্ছি। ধরা যাক এক প্রখ্যাত সরকারি কবির মেয়ের কোনো একটা এনজিও আছে। সরকার সেই এনজিওকে কোনো একটা বরাত দিলো। সেই কবি খুশ। সেই কবি এবার কিছু কবিতা লিখে একটা ছোট প্রকাশকের মাধ্যমে ছাপালেন, বড় প্রকাশকের মাধ্যমে ছাপাতেই পারতেন কিন্তু সরকারি দলের কেউ হয়ত বলে দিল যে "ওদেরও কিছু মালকড়ির ব্যবস্থা করে দিন, কত আর কামাবেন?" বড় কবির মেয়ে এনজিওর মাধ্যমে অলরেডি কামিয়েছে, তাই তিনি এই 'অনুরোধ" শুনবেন বই কি। এবার সেই ছোট প্রকাশকও বড় কবির বই পেয়ে দু পয়সা রোজগার করলো। এভাবেই এই টাকা ক্রমশ রিসার্চ সেমিনার, কবিতা পাঠ, রিসার্চ কনফারেন্স ইত্যাদিতে নিজের উদ্দেশ্য খুঁজে পেল। আমাদের টাকায়। আর পশ্চিমবঙ্গ যে তিমিরে ছিল সেখানেই রয়ে গেল।

এর একটা অন্য দিক হলো যে পঞ্চায়েত পুরসভায় টাকা কমে যাওয়ায় অনারুল লালন ভাদুদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরো তীব্র হলো। পঞ্চায়েতে কমে যাওয়া টাকাকে কম্পেনসেট করতে ভেরী, বালি, খাদান, তোলাবাজি বাড়াতে হলো। শুধু নিজের জন্য নয়, এঁদের এক একজনের ওপর কয়েক ডজন পরিবার নির্ভর করে, পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিক ভাবে গোটা দেশে শেষ সারিতে চলে গেলে কী হবে, এঁরা তৃণমূলের হয়ে খুন জখম ভোট লুঠ করেছে, তার বদলে তো এদের কিছু দিতে হবে। অতএব ক্রমশ ছোট হতে থাকে টাকার থলি নিয়ে মারামারি, খুনোখুনি। ক্রমশ বগটুই। ক্রমশ শিশু মহিলাদের পুড়ে শেষ হয়ে যাওয়া। 

একটা রাজনৈতিক  দল তৈরিই হয়েছে অর্থনৈতিক ইনসেন্টিভের ওপর, যে দল করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সেই দল রাজ্যকে যে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজ্যের একটা ক্ষুদ্র অংশ এই ব্যবস্থায় বিরাট ফুলে ফেঁপে উঠেছে। এবং রাজ্যের একটা বড় অংশ তাদের দেখে ভাবছে যে তারাও যদি তৃণমূলের নেক নজরে থাকতে পারে তারাও ওই ক্ষুদ্র অংশে জায়গা পাবে, বাকি রাজ্য *** যাক।

বৃহস্পতিবার, ২৪ মার্চ, ২০২২

লুম্পেন পুঁজি ~ অবীন দত্তগুপ্ত

সহজ টিকা - লুম্পেন পুঁজি বলতে বেআইনি অর্থ লগ্নি কারবারের টাকাকে বোঝায়, অর্থাৎ সারদা-নারদা, ঘুষ, ১০০ দিনের কাজের টাকা মারা ,চালচুরি , বালি খাদান - পাথর খাদানের উপর কাটমানি , তোলাবাজি ইত্যাদি। সনাতন পুঁজি উৎপাদনের মাধ্যমে উদ্বৃত্তমূল্য আহরণ করে ক্রমে স্ফীত হয়ে ভার্টিকাল বা উল্লম্ব বৃদ্ধি ঘটায়, লুম্পেন পুঁজির ক্ষেত্রে উৎপাদনের গল্প নেই, প্রতারণা বা জবরদস্তির ক্ষেত্র বাড়িয়ে তা আহৃত হয়। এর বিস্তার হরাইজন্টাল বা অনুভূমিক, মেলা-খেলা-উৎসব-মোচ্ছবেই এর উপযোগ।

এই উপরের টিকাটা দেওয়ার কারন ,আমি নিজেও এই শব্দের একটা মোটামুটি আভিধানিক মানে খুজছিলাম ,আমার অন্য কাজের ফাঁকে । এবার পয়েন্টে আসা যাক । 

আজকে রাত ৮টা নাগাদ নদিয়ার এক পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামীর মাথায় গুলি লেগেছে । উনি বোধহয় বাঁচবেন না । এই প্রসঙ্গে দুইটা কথা আমার বলার আছে ।

১। এখন মোটামুটি আপনারা বুঝতে পারছেন রামপুরহাট কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় । ২০১৫র পুরসভা নির্বাচন থেকে যা শুরু , তা ২০১৮-র বিরোধী শূন্য পঞ্চায়েত ভোট দিয়ে পূর্ণতা লাভ করে ।  ২০২১র কোলকাতা সহ সমস্ত মিউনিসিপালিটির সমস্ত ওয়ার্ড জিততে চাওয়া সেই ঝোঁকের-ই আরো জোরালো রূপ । এরপর আসছে পঞ্চায়েতের নির্বাচন । মূল কথা হল , পশ্চিমবঙ্গ এই মুহূর্তে মমতা ব্যানার্জী শাসন করছেন না । শাসন করছে লুম্পেন পুঁজি ( যার টিকা টা উপরে দিলাম ) । এই লুম্পেন পুঁজির Horizontal growth -এর জন্যই , সব কটা ওয়ার্ড ,সব কটা গ্রাম পঞ্চায়েত দরকার । তবেই লুঠ বাড়ানো সম্ভব । কেন বাড়াতে হবে ? কারন কর্মহীন মানুষ বাড়ছে । লুম্পেন প্রলেতরিয়েতের সংখ্যা বাড়ছে । তাদের ভাড়া খাটাতে চাই আরো টাকা । আরো টাকা খাটালে চাই আরো মুনাফা । এই যে দ্বন্দ্ব দেখছি আমরা ,এই যে খুন ওটা এই লুম্পেন পুঁজির অন্তর্দ্বন্দ্ব । যত বেশী এলাকা দখল তত বেশী Horizontal growth । 
এ একটা টাইম বোম্ব । অনেক দিন ধরে সলতে পাকাচ্ছিল । এখন ফাটছে । আরো ভয়ানক বিস্ফোরণ ,এবং ক্রমাগত বিস্ফোরণ হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না । মমতা এ বিষয় কিছুই করতে পারবেন না ,কারন ওনার দলটা তৈরি হয়েছে স্রেফ এর ভিত্তিতেই । এটা ভাঙতে গেলে তৃনমুল ভাঙতে হবে । 

মাঝখান থেকে মরে যাবে অনেক সাধারণ মানুষ । কলেটারেল ড্যামেজ । 

২। এই যে পঞ্চায়েত প্রধানের স্বামী গুলি খেল , পঞ্চায়েত প্রধান গুলি খেল না কেন ? তারও কারন বামফ্রন্ট এর স্বপ্নের পঞ্চায়েতের চরিত্র বদল । পঞ্চায়েত ছিল গ্রামের মানুষের নিজের সরকার । প্রান্তিক মানুষের স্বনির্ভর হওয়ার জায়গা । প্রান্তিক মানুষ মানে শুধুই ক্ষেতমজুর বা জাতি ধর্ম নয় , প্রান্তিক মানুষ মানে নারীও বটে । আমাদের সমাজে ,যে সমাজে পঞ্চায়েত এসেছিল ,সে সমাজে অবশ্যই । একজন মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান মানে নারীর ক্ষমতায়ন । এই তো আইডিয়া । 

এখন মহিলা সংরক্ষিত সিটে যিনি বসছেন ,তিনি পুতুল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ,পঞ্চায়েত চালান বাবা,ভাই বা স্বামী । পুরো ইউ পি-বিহার-রাজস্থান হয়ে গেছি এই ফিল্ডে । একেকটা পঞ্চায়েত এ খরচ হচ্ছে ৮-১০ লাখ টাকা । ৫ বছরে তুলতে হবে কয়েক কোটি । এই তো সহজ হিসেব ।