শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

সময় ~ আবির

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আমি প্রথম শুনেছিলাম একটা টং দোকানে।
নওগাঁর বদলগাছীতে।
"আইজ কত সাল কও তো?"
প্রশ্নটা করেছিলেন হক স্যার।
ডক্টর এনামুল হক।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রিটায়ার্ড ডেপুটি ডিরেক্টর।
পাহাড়পুরের ধ্বংসাবশেষ যাদের হাতের তালুর মতো চেনা, তাদের ভিতর সবার উপরে উনার নাম।
আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললাম, "দুই হাজার তেইশ, স্যার।"
স্যার হাসলেন। সেই হাসিটা আমি পরে অনেকবার দেখেছি।
যেন একটা বাচ্চা খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভুল উত্তর দিয়েছে, আর তার শিক্ষক জানে বাচ্চাটার কোনো দোষ নাই। দোষ বইয়ের।
"তুমি জানো দুই হাজার তেইশ। কারণ ক্যালেন্ডারে লেখা। ক্যালেন্ডার কে বানাইছে?"
"পোপ গ্রেগরি, স্যার। ১৫৮২ সালে।"
"আর তার আগে?"
"জুলিয়াস সিজার।"
"সাবাশ।" স্যার কাপটা নামিয়ে রাখলেন।
"এইবার একটা অংক করো। সিজারের ক্যালেন্ডার প্রতি বছর এগারো মিনিট বেশি গুনত। দেড় হাজার বছরে সেই এগারো মিনিট জমতে জমতে কত দিন হয়?"
আমি মোবাইলে হিসাব করলাম। "তেরো দিনের মতো, স্যার।"
"আর পোপ গ্রেগরি ক্যালেন্ডার ঠিক করার সময় কয় দিন কাটছিল?"
"দশ দিন।"
স্যার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টং দোকানের টিনের চালে ঝমঝম শব্দ।
"তাইলে বাকি তিন দিন গেলো কই, শুভ্র? তিন দিন মানে তিনশো বছরের হিসাব। তিনশো বছর মানুষ গুনছে, কিন্তু আকাশ গুনে নাই।"
সেইদিন আমি প্রথমবার টের পেলাম, মাটির নিচে যত কিছু চাপা পড়ে থাকে, তার সবচেয়ে ভারী জিনিসটা ইট-পাথর না। সময়।
২.
আমার নাম শুভ্র।
একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্নতত্ত্বে মাস্টার্স করে দুই বছর বেকার ছিলাম।
বেকারত্বের দুই বছরে মানুষ দুই জিনিস শেখে।
এক, আত্মীয়স্বজনের দাওয়াতে কীভাবে প্রশ্ন এড়াতে হয়।
আর দুই, কীভাবে নিজের ভিতর থেকে আত্মসম্মান নামের জিনিসটা আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যায়।
তারপর হঠাৎ একটা প্রজেক্টে চাকরি হয়ে গেল।
পাহাড়পুরে নতুন খনন।
প্রজেক্টের লিড হক স্যার।
রিটায়ার করার পরেও সরকার তাকে ডেকে এনেছে, কারণ পাহাড়পুর নিয়ে উনার চেয়ে বেশি কেউ জানে না।
পাহাড়পুর।
সোমপুর মহাবিহার।
পাল রাজা ধর্মপাল বানিয়েছিলেন অষ্টম শতকের শেষ দিকে।
হিমালয়ের দক্ষিণে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার। ই
উনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ।
স্কুলের বইয়ে পড়েছি, বিসিএসের জন্য মুখস্থ করেছি, পাঠ্যবইয়ের মলাটে ছবি দেখেছি।
প্রথম দিন যখন বিহারের মাঝখানের সেই বিশাল মন্দিরটার সামনে দাঁড়ালাম, আমার মনে হলো আমি একটা জাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
লাল ইটের জাহাজ। বারোশো বছর ধরে মাটির সাগরে ভাসছে।
বারোশো বছর। অন্তত তাই জানতাম।
৩.
নিতুর সাথে আমার দেখা খননের তৃতীয় সপ্তাহে।
সাভারের পরমাণু শক্তি কমিশনের ল্যাব থেকে এসেছিল।
রেডিওকার্বন ডেটিংয়ের স্যাম্পল নিতে। কাঠকয়লা, হাড়, পোড়া বীজ, যা পাওয়া যায়। সি-ফোর্টিন। জীবিত জিনিস মরে যাওয়ার পর তার ভিতরের কার্বন একটা নির্দিষ্ট হারে কমতে থাকে। কতটুকু বাকি আছে মাপলেই বলে দেয়া যায় জিনিসটা কত আগে মরেছে।
প্রকৃতির নিজের ঘড়ি। এই ঘড়ি কোনো পোপ বানায় নাই, কোনো সম্রাটও না।
নিতু খুব কম কথা বলে। গ্লাভস পরা হাতে চিমটা দিয়ে কাঠকয়লার টুকরো তুলে ছোট্ট কাচের শিশিতে রাখে।
তারপর শিশির গায়ে লেবেল লাগায়, এত যত্ন করে যেন কাউকে চিঠি লিখছে।
আমি প্রথম দিন ওর পাশে দাঁড়িয়ে বকবক করছিলাম।
পাল রাজবংশ, অতীশ দীপঙ্কর, তিব্বত, আরও কত কী। ও একটা কথারও উত্তর দেয় নাই। শেষে শিশিটা বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "আপনি অনেক জানেন। কিন্তু আপনি যা জানেন সব কেউ না কেউ আপনাকে বলছে। এই কাঠকয়লাটা কাউরে কিছু বলে নাই। ও খালি জানে ও কবে মরছে।"
তারপর একটু হেসে বলেছিল, "আমি ওর কথা বেশি বিশ্বাস করি।"
সেইদিন আমার মনে হয়েছিল, এই মেয়েটার প্রেমে পড়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হবে। আর সেই ভুলটা আমি করেই ফেলব।
দুইটাই সত্যি হয়েছিল।
৪.
প্রথম রেজাল্ট এলো দেড় মাস পর।
তখন আমাদের সম্পর্ক অনেকটা এগিয়েছে। মানে প্রেম না।
প্রেমের আগের সেই বিপজ্জনক সময়টা, যখন দুইজনই জানে কী হচ্ছে, কিন্তু কেউ নাম দেয় না। প্রতি বৃহস্পতিবার নিতু সাভার থেকে আসত।
আমরা বিহারের দেয়ালে বসে সূর্যাস্ত দেখতাম।
ও ঝালমুড়ি খেত না, বলত পেট খারাপ হয়। তারপর আমারটা থেকে অর্ধেক খেয়ে ফেলত।
সেইদিন ও এলো বৃহস্পতিবার না, মঙ্গলবার।
কোনো খবর না দিয়ে। হাতে একটা ফাইল। মুখ ফ্যাকাশে।
"শুভ্র, হক স্যার কই?"
স্যারের তাঁবুতে তিনজন বসলাম। নিতু ফাইলটা খুলল।
মন্দিরের ভিত্তির নিচের স্তর থেকে বারোটা স্যাম্পল। ধর্মপালের আমলের হলে সবগুলোর বয়স আসার কথা সাতশো আশি থেকে আটশো দশ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।
এসেছে এক হাজার পঞ্চাশ থেকে এক হাজার নব্বই।
"মেশিনের সমস্যা?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"তিনবার চালাইছি। দুইটা আলাদা মেশিনে। একটা স্যাম্পল আমি নিজে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাইছি, আমার পিএইচডির সুপারভাইজারের কাছে। একই রেজাল্ট।"
হক স্যার কিছু বললেন না। অনেকক্ষণ ফাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর তাঁবুর একটা ট্রাংক খুলে পুরোনো একটা বই বের করলেন। জার্মান ভাষায় লেখা। মলাটে একটা নাম, হেরিবার্ট ইলিগ।
“Das erfundene Mittelalter। বানোয়াট মধ্যযুগ।” স্যার বইটা টেবিলে রাখলেন। "উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে বের হইছিল। জার্মানির এই ভদ্রলোক বলছিলেন, ৬১৪ থেকে ৯১১ খ্রিস্টাব্দ, মোটামুটি তিনশো বছর, ইতিহাসে আসলে কোনোদিন ঘটে নাই। পুরাটা বানানো।"
"বানাইলো কে?" নিতু জিজ্ঞেস করল।
"হাজার সালের দিকে রোমান সম্রাট তৃতীয় অটো আর পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার।
ওনারা চাইছিলেন তাদের রাজত্বটা ঠিক হাজার সালে পড়ুক।
খ্রিস্টের জন্মের হাজার বছর পূর্তি।
একটা মহাকালের মুহূর্ত। তাই ক্যালেন্ডারে তিনশো বছর ঢুকাইয়া দিলেন।
তারপর সেই তিনশো বছর ভরানোর জন্য দলিল বানাইলেন, রাজা বানাইলেন, যুদ্ধ বানাইলেন। শার্লেমেন, ইউরোপের সবচেয়ে বড় সম্রাট, ইলিগের মতে উনি একটা গল্পের চরিত্র। রবিনহুডের মতো।"
"কিন্তু স্যার, ওইটা তো ইউরোপের ব্যাপার। আমাদের পাল রাজারা..."
স্যার আমাকে থামিয়ে দিলেন। "শুভ্র, আমরা আমাদের ইতিহাস লিখছি কার ক্যালেন্ডারে?"
আমি চুপ করে গেলাম।
"পাহাড়পুরের ডেট আমরা পাইছি একটা তাম্রলিপি থেকে। সেই তাম্রলিপির সাল মিলাইছে ব্রিটিশরা। ব্রিটিশরা মিলাইছে তিব্বতি নথির সাথে।
তিব্বতি নথি মিলাইছে চীনা নথির সাথে। আর পুরা দুনিয়ার সব নথি শেষ পর্যন্ত গিয়া মিলছে একটা জায়গায়। রোমের ক্যালেন্ডার।" স্যার একটু থামলেন। "একটা সুতা যদি ভুল জায়গায় বান্ধা থাকে, তাইলে পুরা জালটাই ভুল জায়গায় ঝুলে।"
তাঁবুর বাইরে সন্ধ্যা নামছে। দূরে কোথাও মাগরিবের আজান হচ্ছে।
নিতু খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে স্যার, আজকে আসলে কত সাল?"
স্যার হাসলেন। সেই হাসিটা।
"সেইটা যদি আমি জানতাম, মা, তাইলে আমারে কেউ এখানে কাম করতে দিত না।"
৫.
এর পরের তিন মাস আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর তিন মাস।
সুন্দর কারণ এক, আমি এমন একটা জিনিসের পেছনে দৌড়াচ্ছিলাম যেটা সত্যি হলে পৃথিবীর সব ইতিহাস বই আবার লিখতে হবে। আর দুই, যার সাথে দৌড়াচ্ছিলাম, তার হাত ধরতে আমার আর সংকোচ লাগত না।
আমরা তিনজন মিলে কাজ করছিলাম।
স্যার পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটতেন। নিতু স্যাম্পল চালাত।
আর আমি মাটি খুঁড়তাম। আক্ষরিক অর্থেই।
আর যত খুঁড়ছিলাম, তত অদ্ভুত জিনিস বের হচ্ছিল।
পাল আমলের স্তর আর তার পরের সেন আমলের স্তরের মাঝখানে যে মাটি থাকার কথা, যে মাটি জমতে তিনশো বছর লাগে, সেই মাটি নাই। মাত্র কয়েক ইঞ্চি।
এক প্রজন্মের ধুলা। যেন ধর্মপাল ঘুমিয়েছিলেন, আর ঘুম ভেঙে দেখেছেন সেন রাজারা দরজায় দাঁড়িয়ে।
এক রাতে বিহারের দক্ষিণ দেয়ালে বসে নিতু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "তুমি ভয় পাও না?"
"কিসের ভয়?"
"যদি সত্যি হয়?
যদি আমরা প্রমাণ কইরা ফেলি যে আজকে দুই হাজার তেইশ না, সতেরোশো কিছু? তখন কী হইবো? মানুষের জন্মদিন, বিয়ের তারিখ, স্বাধীনতা দিবস, সব কি মিথ্যা হইয়া যাইবো?"
আমি অনেকক্ষণ ভেবে বলেছিলাম, "না। দিনগুলো তো সত্যি। খালি সংখ্যাগুলো ভুল।"
ও আমার কাঁধে মাথা রেখেছিল। প্রথমবার।
"তাইলে আজকের দিনটাও সত্যি তো?"
"হ্যাঁ।"
"সংখ্যা যাই হোক?"
"সংখ্যা যাই হোক।"
সেই রাতে আকাশে প্রচুর তারা ছিল।
নিতু বলেছিল, তারার আলোও তো আসলে পুরোনো। আমরা যে তারাটা দেখি, হয়তো সেটা হাজার বছর আগে মরে গেছে। আমরা দেখি তার স্মৃতি।
"ইতিহাসও এমন," ও বলেছিল। "আমরা দেখি স্মৃতি।
কার স্মৃতি, সেইটা কেউ জিগায় না।"
৬.
হক স্যার মারা গেলেন অক্টোবরের এক রাতে।

তাঁবুর ভিতর। ঘুমের মধ্যে।
ডাক্তার বললেন হার্ট অ্যাটাক। তিয়াত্তর বছর বয়স, ডায়াবেটিস, প্রেশার। কেউ অবাক হলো না।
আমি অবাক হয়েছিলাম অন্য একটা কারণে।
স্যারের ট্রাংকটা খালি ছিল। ইলিগের বই নাই, স্যারের হাতে লেখা নোট নাই, তিন মাসের সব কাগজপত্র নাই। আর পরের দিন ঢাকা থেকে একটা চিঠি এলো। প্রজেক্ট বন্ধ। ফান্ডিং শেষ। সব স্যাম্পল সাভারে ফেরত পাঠাতে হবে।
আমি নিতুকে ফোন দিলাম। বন্ধ।
পরের দিনও বন্ধ।
তিন দিন পর আমি সাভারে গেলাম।
রিসেপশনে বসা ভদ্রলোক কম্পিউটারে কিছুক্ষণ খুঁজে বললেন, "নিতু নামে তো আমাদের কোনো সায়েন্টিস্ট নাই, ভাই।"
"আছে। ডক্টর নুসরাত জাহান নিতু। রেডিওকার্বন ল্যাব।"
উনি আবার খুঁজলেন। মাথা নাড়লেন। "ভাই, রেডিওকার্বন ল্যাব আমাদের এখানে উনিশশো আটানব্বই সাল থেকে বন্ধ।"
আমি বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। কতক্ষণ জানি না।
আমার পকেটে তখনও ওর দেয়া একটা কাচের শিশি। কাঠকয়লার টুকরো। লেবেলে ওর গোটা গোটা হাতের লেখা: “PHP-07। ভিত্তি স্তর। সংগ্রহকারী: শুভ্র।”
ও মজা করে লেবেলে আমার নাম লিখেছিল। বলেছিল, "এইটা তোমার প্রথম আবিষ্কার। বাঁধাই কইরা রাখবা।"
একটা মানুষ যদি কোথাও না থাকে, তাহলে তার হাতের লেখা আমার পকেটে আসে কী করে?
সেইদিন আমি প্রথমবার বুঝলাম, ইতিহাস থেকে তিনশো বছর মুছে ফেলা যদি সম্ভব হয়, তাহলে একটা মানুষকে মুছে ফেলা কোনো ব্যাপারই না।
৭.
তিন বছর কেটে গেল।
আমি এখন একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস পড়াই।
ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েদের। প্রাচীন বাংলা। পাল রাজবংশ। ধর্মপাল, দেবপাল, সোমপুর মহাবিহার। সাতশো আশি খ্রিস্টাব্দ।
প্রতিবার বোর্ডে সালটা লেখার সময় আমার হাত একটু থামে। ছাত্ররা টের পায় না।
নিতুকে আর খুঁজি নাই। প্রথম বছর খুঁজেছিলাম। ফেসবুক, লিংকডইন, ওর ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ার সেই সুপারভাইজার।
সুপারভাইজার ইমেইলের উত্তরে লিখেছিলেন, উনার কোনো বাংলাদেশি পিএইচডি স্টুডেন্ট কোনোদিন ছিল না।
তারপর একদিন খোঁজা বন্ধ করে দিলাম। মানুষ সব জিনিস খুঁজতে খুঁজতে একসময় ক্লান্ত হয়, শুধু একটা জিনিস ছাড়া। আমি সেই একটা জিনিস হতে চাই নাই।
সেই বছর ডিসেম্বরে একটা পোস্টকার্ড এলো।
কোনো ফেরত ঠিকানা নাই। ডাকঘরের সিল অস্পষ্ট। সামনে পাহাড়পুরের ছবি। পেছনে একটা লাইন, সেই গোটা গোটা হাতের লেখায়:
"দিনগুলো সত্যি ছিল। খালি সংখ্যাগুলো ভুল।"
নিচে কোনো নাম নাই। শুধু একটা তারিখ।
আমি তারিখটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
২৯ ডিসেম্বর, ১৭২৬।
৮.
এই গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। হলো না।
গত মাসে পাহাড়পুরে গিয়েছিলাম। ছাত্রদের নিয়ে ট্যুর। ওরা যখন মন্দিরের সামনে সেলফি তুলছিল, আমি একা একা দক্ষিণ দেয়ালের দিকে হাঁটলাম। যেখানে এক রাতে একজন আমার কাঁধে মাথা রেখেছিল।
দেয়ালের ইটে কেউ একটা জিনিস খোদাই করে রেখেছে। খুব ছোট। খুব পুরোনো। বৃষ্টি আর রোদে প্রায় মুছে গেছে। কেউ খেয়াল করবে না, যদি না সে জানে কোথায় তাকাতে হবে।
দুইটা অক্ষর। একটা প্লাস চিহ্ন।
শু + নি।
আমি আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম। খোদাইয়ের খাঁজে শ্যাওলা জমেছে। লাইকেন। আমি প্রত্নতত্ত্ব পড়েছি। আমি জানি এই লাইকেন জমতে কত সময় লাগে।
অন্তত দুইশো বছর।
সেই রাতে আমরা কিছুই খোদাই করি নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে।
অথবা হয়তো করেছিলাম। কোনো একটা রাতে। কোনো একটা সালে। যে সালটা কোনো ক্যালেন্ডারে নাই।
আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলাম। ছাত্ররা দূরে হাসাহাসি করছে। সূর্য ডুবছে বিহারের পেছনে। লাল ইটের জাহাজটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
একটা ছেলে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করল, "স্যার, বাস ছাড়বে কয়টায়? আর একটা প্রশ্ন ছিল। পাহাড়পুর কত সালে বানানো হইছে, এক্সামে কী লিখব?"
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
তারপর বললাম, "সাতশো আশি লিখো।"
ছেলেটা চলে গেল। আমি বসে রইলাম।
সাতশো আশি লিখো। কারণ বইয়ে তাই লেখা। কারণ দুনিয়ার সবাই তাই বিশ্বাস করে। কারণ কেউ একজন, কোনো একদিন, ঠিক করে দিয়েছিল কোন সংখ্যাটা সত্যি হবে।
আর কিছু কিছু সত্যি সংখ্যার মধ্যে থাকে না।
থাকে একটা দেয়ালে। দুইটা অক্ষরে। একটা প্লাস চিহ্নে।
আর দুইশো বছরের শ্যাওলায়।
"সময়"
আবির
২৭/১০/২৬

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬

কোজাগরী ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য

ভাসানের অশ্রু আর হাসানের রক্ত লাগা চাঁদ।
কে জাগে, লক্ষ্মীর নামে! হয় প্রেমী, নয় উন্মাদ!
ষোলকলা পূর্ণ হয়ে অশ্বিনীকুমারী ঋতুমতী, 
চিড়ে কুঁড়ো? তাই ঢের। ক্ষত ঢাকো, যুথিকা, মালতী!
ধান-দূর্বা, পঞ্চামৃত, পল্লবিত কথা পাঁচকানে, 
আলিম্পনে আলিঙ্গনে পদচিহ্ন নিকোনো উঠানে। 
সংকল্প করে কি কেউ? অচেনাই, যথা নাম-গোত্র।
ঘুমো রে আঁতুড় বাংলা! ঘুমো। তোর সম্পত্তি দেবত্র!

Uploaded Image

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

সরশুনা ২০২৬ ~ শুভাশীষ মোদক চৌধুরী

ওই দ্যাখো হেঁটে চলেছে বাংলা,
উলঙ্গ দেহ তিন!
জুড়ছেন 'তিনি' কলকাতা
আর মণিপুর প্রতিদিন।

নতুন স্বচ্ছ শাসনের ঝাঁঝে
কাপড় চোপড় উধাও...
"ভালো" বিরোধীরা কেয়াবাত করে,
ভক্তের দল বধাই।

মরুভূমি দেশে বর্বর কাটে 
যুগলের তাজা শির,
বঙ্গভূমির নগ্ন ত্রয়ীকে 
দ্যাখে কেঁচোদের ভিড়।

পুড়ছে গ্রন্থ, ঢুকছে রাজ্যে
গোবলয়-রীতি সদাই...
ভালো বিরোধীরা কেয়াবাত করে,
ভক্তের দল বধাই।
Uploaded Image

সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ড : কুৎসার আড়ালে ~ বাপি রায়

সাঁইবাড়ি - দক্ষিণপন্থী মিথ্যার জবাব।

১৯৭০সালের ১৬মার্চ।ভেঙে দেওয়া হলো দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। দু’টি যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে ২২মাসে বেনামি জমি দখলমুক্ত করে ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিলি করার কাজ দ্রুততার সাথে এগিয়ে ছিল । সারা বাংলায় কৃষকরা লাল ঝান্ডার নীচে শত শত বছরের বঞ্চনার জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে নতুন আত্মবিশ্বাস নিয়ে জেগে উঠছিলো। স্বাভাবিকভাবেই যারা বড় বড় জোতের মালিক তাদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল যুক্তফ্রন্ট সরকার। গ্রামের বড়লোক, জমিদার-জোতদারদের স্বার্থ রক্ষা করতে,বাংলার বুকে শ্রমিক-কৃষকের অর্জিত অধিকার ছিনিয়ে নিতে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার,দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি ও তার দল বাংলা কংগ্রেস এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের ষড়যন্ত্রে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানো হয়।সিপিআই(এম), পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির তৎকালীন সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্তর পূর্ববর্তী ঘোষণা অনুযায়ী পরের দিন,অর্থাৎ ১৭ মার্চ সারা বাংলা জুড়ে ধর্মঘট পালিত হয়।

ধর্মঘটের দিন বর্ধমান শহরে বিভিন্ন দিক থেকে লাল ঝান্ডা নিয়ে সংগ্রামী কৃষক ও জনসাধারণ মিছিল করে আসতে থাকেন। শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মঘট চলাকালীন আদিবাসী জনগণের একটি মিছিল তেলমারি রোডে এলে একটি শববাহী দল এসে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই সৌজন্যে দেখিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা শব যাত্রীদের যাওয়ার পথ করে দেয়। কিন্তু এরপর যা হয় তা রুপোলি পর্দাকে হার মানাতে পারে। আসলে ঐ শবদেহ কোন মৃত মানুষের ছিলনা,ও ছিল নকল শব, যুক্তফ্রন্টের শব। শববাহী বাঁশের খাটিয়ায় ছিল বোমার মত মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র। মিছিলের মাঝে শববাহী খাটিয়াটি ফেলে দিলে বোমাগুলি ফাটতে শুরু করে আর শবযাত্রী সেজে আসা দুষ্কৃতীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মিছিলের ওপর। চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।তবে দুষ্কৃতীদের তাণ্ডবে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে না গিয়ে ওদেরই তাড়া করে মিছিলে আসা জনতা।এবার গুন্ডার দল বর্ধমান শহরের কুখ্যাত কংগ্রেসী গুন্ডা নব সাঁই,প্রণব সাঁই, মলয় সাঁই এর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। উত্তেজিত জনতা সাঁইবাড়িতে চড়াও হলে প্রণব সাঁই ও মলয় সাঁই দুই ভাই জনরোষে নিহত হন।
এরপর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসরে নেমে পড়ে রাজ্যের তৎকালীন রাজ্যপাল এস.এস ধাওয়ান ও যাবতীয় বাম বিরোধী শক্তি। সিপিআই(এম) এর বর্ধমান জেলা কমিটির সম্পাদক সুবোধ চৌধুরী, পার্টিনেতা বিনয় কোঙার,নিরুপম সেন, মদন ঘোষ প্রমুখদের সরাসরি অভিযুক্ত করে শুরু হয় লাগামহীন কুৎসা যা এখনো চলছে। নির্বিচারে গ্রেফতার ও দমন-পীড়ন নামিয়ে আনা হয় বামপন্থী কর্মী ও সমর্থকদের ওপর,তবে প্রত্যাশিতভাবেই মিছিলে আক্রমনকারী দুষ্কৃতীদের একজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। দুস্কৃতির দল পুলিশের গাড়িতে চেপে বামপন্থী কর্মী-সমর্থকদের বাড়ি চিনিয়ে তাদের গ্রেফতার করানোর কাজ করতে থাকে।  এফআইআর-এ নতুন নতুন নাম সংযোজন হতে থাকে আর চলতে থাকে নির্বিচার দমন-পীড়ন। স্কুলের প্রধানশিক্ষক থেকে শুরু করে সরকারি কর্মচারী, সাধারণ গৃহস্থ কেউই বাদ পড়েনি ওদের তাণ্ডব থেকে।

সাঁইবাড়ি হত্যাকান্ড নিয়ে প্রাক্তন বিচারপতি তারাপদ রায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। বাম বিরোধী কুৎসার স্বরূপ উন্মোচন হয়ে যায় বর্ধমান টাউন হলে এই কমিশনের শুনানি চলা কালীন। যে ব্যক্তি সাঁইবাড়ি ঘটনায় সিপিআই(এম) নেতাকর্মীদের নামে এফআইআর করেছিলেন তিনি নিজে কমিশনের সামনে এসে বলেন যে কংগ্রেস নেতাদের চাপে তিনি এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। যাবতীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণের পর এই রিপোর্ট তৎকালীন সরকারের কাছে জমা পড়ে।কিন্তু সেই রিপোর্টে যেহেতু সিপিআই(এম) নেতাদের অভিযুক্ত করা হয়নি তাই সেই রিপোর্ট সিদ্ধার্থশংকর রায়ের সরকার বিধানসভায় পেশও করেনি। অথচ আজও “আপন মনের মাধুরী মিশায়ে” সাঁইবাড়ি কাণ্ড নিয়ে মিথ্যাচার চলছে।

এখনো যারা সাঁইবাড়ি কান্ডে সিপিআইএমকে অভিযুক্ত করেন ও  চরম নৃশংসতার অভিযোগ আনেন তাদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন:

১। সাঁইবাড়ি কাণ্ড নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট বিধানসভার লাইব্রেরীতে এখনো আছে। যে কেউ পড়ে নিয়ে দেখতে পারেন যে সেখানে সিপিআই(এম) নেতাদের ষড়যন্ত্রকারী ও আক্রমনকারী বলে অভিযুক্ত করা আছে কিনা। সেই সহজ কাজটি না করে খবরের কাগজে,টেলিভিশন চ্যানেলে আর সোস্যাল মিডিয়ায় কুৎসার বেসাতি কেন?

২। ২০১২সালে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার সাঁইবাড়ি নিয়ে আবারএকটি তদন্ত কমিশন বসিয়েছিল। সেই মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট ২০১৭সালে জমা পড়েছে। এখনও তা রাজ্য বিধানসভায় পেশ হয়নি কেন? সেখানেও সিপিআই(এম)কে অভিযুক্ত করা যায়নি বলে?


৩। নিহত প্রণব সাঁই এর পরিচয় নিয়ে “সাঁইবাড়ি বিশেষজ্ঞ”রা নীরব কেন?আসলে এনার পরিচয় দেওয়ার মতো নয় কারণ ইনি কংগ্রেসী আমলেই পি ডি অ্যাক্টে গুণ্ডা বলে চিহ্নিত ছিলেন। জামিন পেলেও প্রণব সাঁই এর বর্ধমান শহরে ঢোকা নিষেধ ছিল। ইতিমধ্যে আউসগ্রাম থানা চোরাচালানের কেসে প্রণব সাঁই এর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এরকম গুণধর ব্যক্তি পুলিশের নজর এড়িয়ে শহরে ঢুকে দুষ্কৃতীদের মদত দিল কি করে?

৪| আত্মরক্ষার অধিকার গণতান্ত্রিক অধিকার। আক্রান্ত মানুষ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুললে যদি আক্রমণকারী নিহত হয় তাহলে তার দায় কি আক্রান্তের?

যেকোনো মৃত্যুই অনভিপ্রেত, কিন্তু সাঁইবাড়ি হত্যাকান্ড ঘটবার দায় সম্পূর্ণভাবেই আক্রমনকারী দুষ্কৃতীদের। তারা শান্তিপূর্ণ মিছিলে বোমাবাজি করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত না করে তুললে এমন ঘটনা ঘটতো না। আর সিপিআই(এম) নেতৃত্বকে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করার যত চেষ্টাই হোক না কেন আদালত ও ইতিহাসের বিচারে তারা নিষ্কলঙ্ক।

সাঁইবাড়ি তে কী ঘটেছিল


শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

বই পাড়ানো ~ সোমনাথ রায়

ফুটপাথে উই ধরে কত বই পড়ে থাকে, ক্রমে
রোদে ও বৃষ্টিতে গলে যায়
বইমাত্রেই তা অপাপবিদ্ধ হবে কেন?
রেসের বুকির বই, সূচীকার্যে গাঁথা ধর্ষকাম
কাহিনির সংকলন- তাকেও কি প্রণাম করবে? 
অথবা যে বুকলেটগুলি
ঘৃণার বেসাতি করে, দাঙ্গার আহ্বান আনে
নয়তো ন্যায্যতা দেয় শোষণ বৈষম্য ও সন্ত্রাসকে
তাকে যদি ঘৃণাভরে ছিঁড়েখুরে ফেলি-
সেটাও তো রাজনীতি হতে পারে

তবুও মুদ্রিত পাতা যদি পায়ে ঠেকে
অজান্তে হলেও দেখি আঙুল কপালে রাখি আমি
কেন রাখি? কী আছে মুদ্রণে?
কী আছে কালির দাগে কিংবা সদ্য লিপি শেখা শিশুর পেনসিলে-
আমরা বুঝি না কেন এই লিপি
এক সমগ্রকে গেঁথে তোলে চোখের ওপর-
গ্রন্থের শরীরে কী বা থাকে?
এখন ভিডিও কত- কত রিল, জীবন্ত বক্তৃতাগুলি
কত অনায়াসে দুরূহ তাত্ত্বিক বস্তু কত স্পষ্ট করে তোলে
তবু কেন আমি- আমার ছাত্রছাত্রীকে
বলি- টেক্সট বই পড়ো, টেক্সট বই-
বইয়ের অন্তরে লেখকের আত্মা মিশে যায় বিষয়ের শরীরে
অনন্তের খণ্ড থেকে কোনও এক সমগ্রকে
বাঁধেন লেখক- দুই মলাটের ফাঁকে
খুব হেলাভরে হোক, অথবা অপটু হাতে
যদি ব্যাকরণে ভুল মুদ্রণে প্রমাদ থাকে তবুও সমগ্র থাকে বইয়ে
অনন্তের কোনও প্রতিরূপ
লেখক দেখেন যাকে, তারপর মরে যান তিনি
লেখকের শবের উপর আসীন বর্ণমালা
কেতাবে বিস্তার করে-
কী করিতে হইবে আর রামের সুমতি সব বই
গেরিলা যুদ্ধ অথবা ধ্যানের ভারত
অথবা ওসব নয়, অতি ক্ষীণবপু, একফর্মা-
সাধারণ প্যামফ্লেট তিনভাঁজে
এমনকি চটি বই, অশ্লীল ছবির বই
পোকাকাটা ঝুরঝুরে পাতে পুরোনো নভেল
প্রুফ রিডারের পরে তাকে কেউই পড়েনি হয়তো- সেই বই
সেখানেও সে অনন্ত জাগে

তাই যতবার ছিঁড়ে ফেলি, পা দিয়ে মাড়িয়ে ফেলি ঘেন্নাভরে
অনন্তের প্রতিরূপ ওই
আমি আরও বিচ্যুত হই- 
আমি মরে যাই লেখকের আত্মা না ছুঁয়েই!

Uploaded Image

বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

বিজয়া দশমী ~ কৌশিক মজুমদার

"দুর্গোৎসব অ্যাক বছরের মত ফুরুলো। ঢুলীরা নায়েববাড়ী বিদেয় হয়ে শুঁড়ীর দোকানে রং বাজাচ্চে। ভাড়া করা ঝাড়েরা মুটের মাথায় বাঁশে ঝুলে টুনু টুনু শব্দে বালাখানায় ফিরে যাচ্চে। জজমেনে বামুনের বাড়ীর নৈবিদ্দির আলো চাল ও পঞ্চশস্য শুকুচ্চে, ব্রাহ্মণী ছেলে কোলে করে কাটি নিয়ে কাগ তাড়াচ্চেন। সহরটা থমথমে। বাসাড়েরা আজো বাড়ী হতে ফেরেন নি, আফিস ও ইস্কুল খোলবার আরো চার পাঁচদিন বিলম্ব আছে"। 

লিখেছেন হুতোম। আজকের দিন নিয়েই। আজকের দিন বাঙালির মন খারাপের দিন। এক বছর অপেক্ষার দিন। আজ থেকে আবার দিন গোনা শুরু। 

স্বামীজির ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর কলিকাতার পুরাতন কাহিনি ও প্রথা-তে লিখছেন "বিজয়ার দিন পাড়ার বুড়ো ব্রাহ্মণদের কিঞ্চিৎ প্রণামী দিয়া প্রণাম করিতে হইত। বিজয়ার দিন নারিকেলছাবা দেওয়া হইত। বিজয়ার কোলাকুলিতে সন্দেশ বা অন্য কোন খাবার চলিত না। কিন্তু সংস্কার এমন জিনিস যে, এখন পর্যন্ত নারিকেলছাবা দেখিলে বিজয়ার রাত্রি মনে পড়ে।
তখনকার দিনে অনেক ভট্টাচার্য বামুন বার্ষিকী পাইতেন। এখন সেটা উঠিয়া গিয়াছে। বিজয়ার রাত্রে পরস্পরের বিরোধ ভুলিয়া কোলাকুলি করিতে হইত। এখন যেমন মাসে-মাসে লোকজনের টাকা চুকাইয়া দেওয়া হয় আগে তেমন ছিল না। কথায় ছিল ঢাকে-ঢোলে অর্থাৎ দুর্গাপূজায় এবং চড়কে লোকে দেনা চুকাইয়া দিত। তখন মুদীর দোকান থেকে উনো নেওয়ার প্রথা ছিল। সেটা বছরে দুবার পরিশোধ হইত। সর্ব বিষয়ে তখন দুর্গাপূজায় মহা আনন্দের ভাব ছিল। এমন কি গ্রাম্য মুসলমানরা আসিয়া প্রতিমাকে তিনবার সেলাম সেলাম সেলাম বলিয়া চলিয়া যাইত। যাহাদের বাড়ীতে প্রতিমা না আসিত, তাহারা কয়েকদিন চণ্ডীপাঠ করাইতেন। এইটা ছিল তখনকার দিনের জাতীয় উৎসব। হিন্দুমাত্রই তখন আনন্দে মাতিয়া উঠিত-এই হইল ভক্তিভাব ও জাতীয়ভাব" 

আর এক মহেন্দ্রনাথ, মহেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন রাণাঘাটের পোস্টমাস্টার। আজকের দিন নিয়ে দারুণ এক কবিতা লিখেছিলেন তিনি। যদিও তা আজ প্রায় বিস্মৃত। নাম "বিজয়া" 

নমি দুর্গে তব পদে দুর্গতিনাশিনী!
অজ্ঞানে করুণা কর কল্মষঘাতিনী ।
মর্তে তিন দিন থাকি কেন মা চঞ্চলা?
বুঝিবে অবোধ কিসে মহামায়া লীলা ।
নিখিল ব্রহ্মান্ড কর্ত্রী ব্রহ্মময়ী তুমি
তিনি জ্ঞাত তব তত্ত্ব যিনি অম্বুর্গামী ।
ভোলাকে ভুলালি মাতঃ দিয়া রাঙ্গা পদ
ভক্ত জনে দে মা তারা পদ কোকনদ ।
তিন দিন ভক্তগণ আকুল আহ্লাদে
চলিলি মা দয়াময়ি ফেলিয়া বিষাদে ।
পৰ্ব্বত তোমার পিতা, মাতাও পাষাণী
পিতামাতা যেন হয় কন্যাও তেমনি ।
তোমা ভিন্ন কোথাও এমন নাই তার
কিছুতেই জ্ঞান গম্যা না হও কাহার।

একেবারে অন্য একটা প্রসঙ্গে আসি। বন্ধু কনাদ বৈদ্যর থেকে ধার নেওয়া। বিজয়া দশমীর দিন কলকাতার বনেদি বাড়িগুলো থেকে জীবন্ত নীলকন্ঠ পাখি ওড়ানোর নিষ্ঠুর প্রথা বন্ধ হয়েছিল এক মহিলার হাত ধরে। তাঁর নাম লামিদি ওরফে ঊর্মিলা গঙ্গোপাধ্যায়। সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুতি, মানে নাতির মেয়ে। 

"... রাজা নবকৃষ্ণের আমল থেকে শোভাবাজার রাজবাড়িতে মহা ধূমধামে দুর্গাপুজো হয়। কলকাতার ওই সময়কার অনেক বনেদিবাড়িতে পুজোর সময় বিজয়া দশমীর দিন দুটি নীলকন্ঠ পাখি উড়িয়ে দেবার প্রথা আছে। একটি ওড়ানো হয় যখন ঠাকুর দালান থেকে প্রতিমা রাস্তায় বেরোন। অন্যটি বিসর্জনের আগে গঙ্গার ঘাটে। মা দুর্গা হিমালয়ে শ্বশুরবাড়ির পথে রওনা দেবার খবর নীলকন্ঠ পাখিরা আগেই 'নীলকন্ঠ' মহাদেবের কাছে পৌঁছে দেবে। 

বাড়ির মেয়ে বউদের সঙ্গে দোতলার ঝোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে লামিদি দেখত পাখিটা ঝটপট করে খাঁচা থেকে বেরিয়ে একটু উড়ে কোনও পাঁচিলে বসত। সঙ্গে সঙ্গে একদল কাক এসে তার পালক ধরে টেনে ঠোকরাতে থাকত। পরদিন সকালে দেখা যেত মরা পাখিটা রাস্তার ধারে নালায় পড়ে আছে। হিমালয়ে পৌঁছন তার আর হত না। গঙ্গার ঘাটে তো মেয়েদের যাওয়া বারণ। সে পাখিটাও মরে নিশ্চয় গঙ্গায় ভেসে হিমালয়ের ঠিক উলটো দিকে পৌঁছে যেত।
বাড়ির নতুন বউ লামিদির চোখে জল আসে। ভেতরে ছটফট করে। কিন্তু তার কথা কে শুনবে? দোর্দণ্ডপ্রতাপ রঘুপতির শাসন সেখানে তখনও ভীষনভাবে বজায় আছে।"

এর পর কেটে গেছে বহুবছর। লামিদি ফিরে এসেছে শান্তিনিকেতনে। মাঝে অনেকটা সময় কাটে ওড়িশার সিমলিপালের মায়াময় জঙ্গলে। সিমলিপালের ময়ূরভঞ্জের রাজাদের শিকারের একটা প্যালেস ছিল পাহাড়ের ওপরে। বর্তমানে ফরেস্ট বাংলো সেটা। ওখানে বসে বিকেলের পড়ন্ত রোদের আলোয় তিন-চারটে নীলকন্ঠ পাখিকে দেখে তিরিশ বছরের পুরোনো কলকাতার পুজোর কথা মনে পড়ে তার। প্রতিজ্ঞা ছিল, "রঘুপতির এই শাসন আমি বন্ধ করবই।"

"...কলকাতায় গিয়ে পুরনো নথিপত্র ঘাঁটতে থাকে। খবর সংগ্রহ করে বনেদিবাড়ির বর্ষীয়ানদের কাছে থেকে। একটা বড় তালিকা তৈরি হয়ে যায় কলকাতার যেসব বনেদি বাড়িতে এখনও দুর্গাপুজো হয়। পুজোর মধ্যেই একটা দল নিয়ে সাংবাদিক সেজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবর নেওয়া হয় কোন কোন পরিবারে এখনও নীলকন্ঠ ওড়াবার প্রথার চল আছে। 

তালিকাটা অনেক ছোট হয়ে আসে। সে তালিকায় থাকে শোভাবাজার রাজবাড়ি, এখানে দুটি পুজো হয় দু'তরফের, মানে চারটি পাখি, ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ি, চোরাবাগানের মিত্তির বাড়ি, হাটখোলার দত্ত বাড়ি, আরও অনেক। 

অপেক্ষা করতে হয় আরও এক বছর। এর মধ্যে এই তথ্যটা বেরিয়ে এসেছে যে, কোনও কোনও বাড়িতে প্রতি বছর বংশ-পরম্পরায় পাখিওয়ালা ঠিক সময় পাখি দিয়ে যায়। কোনও কোনও বাড়ি থেকে আবার পাখি কেনা হয় বাইরে থেকে কোনও জায়গা থেকে। কিন্তু কোথা থেকে কেনা হয় জানা যায় না। 

ষষ্ঠীর দিন সকালে বনদপ্তরের বন্যপ্রাণ শাখার কর্মীদের একটা বড় দল নিয়ে লামিদি পৌঁছে যায় শোভাবাজার রাজবাড়িতে। লামিদি তখন রাজ্য বন্যপ্রাণ উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য। এবার আর পরিচয় গোপন করা হয় না। সবিনয়ে বলা হয় নীলকন্ঠ ওড়ানো বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন বিরুদ্ধ কাজ ও এই সুন্দর পাখিটি অবলুপ্তির পথে। আপনারা অনুগ্রহ করে এই প্রথা বন্ধ করুন। বেশ কিছু প্রচারপত্রও দিয়ে আসা হয়। 

এরপর চলে অন্য সব বাড়িতে বিনীত আবেদন। খবর মিলে যায় ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পরিবার থেকে পাখিওয়ালাদের আস্তানার। নতুনবাজারে লোহিয়া হাসপাতালের আশেপাশে তারা লুকিয়ে পাখি বেচে। 

সপ্তমীর দিন সকাল ন'টায় গিরিশ পার্কে গিরিশবাবুর মূর্তির তলায় দলটা মিলিত হয়। আজকের অভিযান লোহিয়া হাসপাতালের কাছে। 
গাড়ি থামিয়ে মহিলা বনকর্মী নমিতাকে নিয়ে লামিদি রাস্তায় নেমে পড়ে। আর সবাই অপেক্ষা করেন গাড়িতে।খুঁজতে খুঁজতে একটা গলিতে গামছা চাপা দেওয়া তিনটে খাঁচায় পেয়ে যায় বারোটা নীলকন্ঠ। গাদাগাদি করে ছোট খাঁচায় পোরা।
--- কত করে পাখি বেঁচবে?
--- ছ'শো টাকা। 
--- একটু কমাও না বাবা। বাড়িতে পুজো। আমাদের আত্মীয়স্বজন মিলে অনেকগুলো পাখি লাগবে। 
--- ঠিক আছে দিদি। পাঁচশোই দেবেন। 
নমিতা বলে, আর পাখি নেই? আমাদের আরও কটা দরকার ছিল। 
এমন সময় হঠাৎ ছুটতে ছুটতে একটি ছেলে এসে বলে পুলিশ, পুলিশ ওদিকে আমাদের পাখি তুলে নিচ্ছে।

প্রথমটা না বুঝলেও ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হয় না। লামিদি বলে, পুলিশ! পুলিশের সাহস তো কম নয়। আজকে পুজোর দিন, পাখি তুলে নিচ্ছে? চলো তো তোমরা, দেখাচ্ছি পুলিশকে মজা। এসো নমিতা। দেখা গেল বনদপ্তরের সাদা গাড়ি, সামনে কনকবাবু। লামিদি কনকবাবুকে ইশারা করে। তার পর ধমকাতে থাকে, কী রকম মানুষ আপনারা? পুলিশ বলে হিন্দুধর্ম, আচার নিয়ম সব রসাতলে দেবেন নাকি? পাখি ছাড়া বিসর্জন হবে কি করে? শিগগির পাখি নামান গাড়ি থেকে। আমাদের বারোটা পাখির দরদাম হয়ে গেছে। চলুন, দেখবেন চলুন।

কনকবাবুও উলটে ধমকাতে থাকেন। আপনারা পাখি কিনছেন। জানেন আাইনের চোখে আপনারাও অপরাধী। আপনাদের অ্যারেস্ট করা হবে। উঠুন আমাদের ভ্যানে।
নমিতা কেঁদে ফেলে। দিদি কী হবে?
বচসা চলতেই থাকে। সবাই পৌঁছে যায় গামছা ঢাকা খাঁচাগুলোর কাছে। পিছনে আস্তে ধীরে সাদা গাড়িও পৌঁছে গেছে। 

কনকবাবু, অনুপবাবুরা আগেই বেশ কয়েকটি খাঁচা বড় রাস্তা থেকে তুলে ফেলেছেন। দর করা খাঁচাগুলোও তুলে নেওয়া হল। পিছনের দরজা খুলে কনকবাবু বললেন, আপনারা 'আন্ডার অ্যারেস্ট'। উঠুন বলছি ভ্যানে। লামিদি আর নমিতা আচলে চোখ মুছতে মুছতে ভ্যানে উঠে পড়ে। ভ্যানের দরজা বন্ধ করেই লামিদি বলে, আর এখানে নয়। সোজা সল্টলেকে বনদপ্তর রেসকিউ সেন্টারে চলুন। গাড়ি স্টার্ট নেয়।
পথে কিছু পিঁপড়ের ডিম কিনে নেওয়া হয় হাতিবাগান বাজার থেকে। সল্টলেকে পৌঁছে তাড়াতাড়ি উপোসি ২৩টি পাখিকে বড় খাঁচায় ঢুকিয়ে জল আর পিঁপড়ের ডিম দেওয়া হয়। প্রথমে ঠোঁট ডুবিয়ে অনেক জল খেয়ে টপাটপ পিঁপড়ের ডিম খেতে থাকে। আহা কতদিন জলও পায়নি, খাবারও পায়নি পাখিগুলো।

পাখিধরারা এদের ধরে আঠাকাঠি দিয়ে। ডানাগুলি থাকে আঠায় জোড়া। ধরার পর থেকে পাখিরা থাকে উপোসি। কে আর তাদের খেতে দেয়। হিমালয়ে যখন চলেই যাবে। 

এর মধ্যে দু'দিন ছুটিতে কেটে গেছে। অনেকগুলি পাখি মারা গেছে। বিজয়া দশমীর দিন লামিদি আর ক'জন বনকর্মী বাকি পাখিগুলি নিয়ে ইছামতী নদীর ধারে বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্যের দিকে রওনা হয়। পৌঁছতে রাত হয়। লামিদিকে আর খাঁচার মধ্যে নীলকন্ঠ পাখিদের নামিয়ে দিয়ে বনকর্মীদের কালো ভ্যান কলকাতায় ফিরে যায়। রাতে লামিদি একা থেকে যায় ফরেস্ট বাংলোতে। 

ভোরবেলা যখন টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। বাংলোর দোতলা থেকে খাঁচাগুলো নামায় লামিদি। একে একে খাঁচার দরজা খুলে ছেড়ে দেয় নীলকন্ঠ। কয়েকটি উড়ে ইছামতীর ওপারে গাছে বসে। বাকি সাতটি আর পারে না। লাফিয়ে লাফিয়ে আঠামাখা ডানা নিয়ে বারান্দায় উঠে বসে। বনদপ্তরের নথিতে তারা মৃত।

তাদের নিয়ে বাসে করে লামিদি কলকাতায় ফেরে। বেঁচে থাকে দুটি। এবার চলে ডানা পরিষ্কার। প্রতিটি পালক ধরে ধরে acetone দিয়ে মোছা হয়। আর আনা হয় ভীমরুলের লার্ভা। বড় খাঁচায় থাকে। ক্যাঁচোর ক্যাঁচোর ডাকে আর কপাকপ লার্ভা খায়। 

একাদশীর দিন সন্ধের খবরে টিভিতে দেখা যায় শোভাবাজার রাজবাড়ির এক প্রবীনকে। তিনি বলেন, আমরা জেনেছি এ ভাবে নীলকন্ঠ ছাড়া সরকারি আইন বিরুদ্ধ কাজ। আমরা এ বছর থেকে এই প্রথা বন্ধ করে দিলাম। আমরা মাটির নীলকন্ঠ বিসর্জন দেব ঠিক করেছি। 
কলকাতার বাকি বনেদিবাড়ির কর্তারাও নিজেদের মধ্যে মিটিং করে বন্ধ করে দিলেন নীলকন্ঠ ওড়ানো।..."

আর বাকি দুটি নীলকন্ঠকে দু্'মাস যত্ন করে খাইয়ে দাইয়ে চাঙ্গা করে একদিন লামিদি রওনা হল তাদের নিয়ে সিমলিপালের পলপলা ক্যাম্পে। গোটা অভিযানের জন্য তাঁকে কম ‘নাটক’ করতে হয়নি। ঊর্মিলাদেবীর কথায়, “বাড়ির নতুন ঘোমটা পড়া বৌয়ের পক্ষে বিষয়টা সেই সময় মোটেই সুখকর হয়নি!” তবুও লামিদি তার কথা রেখেছে। 

Uploaded Image আর মাটির নীলকন্ঠ বিসর্জন দিয়ে কিংবা শোলার তৈরী নীলকন্ঠ গ্যাসবেলুনের সাহায্যে উড়িয়ে বনেদি বাড়িগুলো এখন সেই পুরোনো রীতি বজায় রেখে চলেছে। প্রাণে বেঁচে গেছে কয়েকশো নীলকন্ঠ। 



সঙ্গে চোরবাগান আর্ট স্টুডিও-র ছবি বিজয়া। উনিশ শতকের শেষ দিকের ছাপাই।

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

নবমীর কলকাতা ~ কৌশিক মজুমদার

আর মাত্র একদিন। তারপরে গোটা এক বছরের অপেক্ষা। একালের মত সেকালেও কলকেতায় নবমীর দিন যে যতটা পারে আনন্দ করে নিতো। মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখছেন ""নবমীর দিন বিশেষ আমোদের ছিল নীল মাখান কোরা কাপড় পরে ঢুলীদের বাজনার সঙ্গে ছেলেদের নাচা। তখনকার দিনে নীল রং মাখান কোরা তাঁতের কাপড়ই  ছেলেদের ভিতর বেশী প্রচলিত ছিল। "কাঁইনানা, কাঁইনানা, গিজদা গিজোর, গিজোর গিজোর"-আর ছোট ছেলেরা দু'পাছা চাপড়াইয়া নাচিত। তারপর ঢুলিদের আর একটা বোল ছিল-"দাদাগো দিদিগো গাবতলাতে গরু; দেখ সে গরু, গরু গরু গরু তার দেখব কি আর।" তখনকার দিনে দুর্গাপুজা হলে দশজনকে পাত পাড়াতে হত। শাক্ত ব্রাহ্মণ হইলে মাছ চলিত, কায়স্থের বাটিতে লুচি চলিত। যাহোক সাদামাটা খাওয়ান হইলেও সকলকে খাওয়ান চাই। দুর্গাপূজার সময় সকলকে মিষ্টি মুখ করান হত।“ 
শুধু কি তাই? 
নবমীর দিন বাই নাচ চরমে উঠত।দীনবন্ধু মিত্র তাঁর "সুরধুনী কাব্য"-তে শোভাবাজার রাজবাড়িতে নবমীর রাতের দারুণ সুন্দর এক ছবি এঁকেছেন-
বসিয়াছে বাবুগণ করি রম্য বেশ
মাতায় জড়ির টুপি, কাঁপাইয়া কেশ
বসেছে সাহেব ধরি চুরুট বদনে
মেয়াম ঢাকিছে ওষ্ঠ মোহন ব্যাজনে,
নাচিছে নর্তকী দুটি কাঁপাইয়া কর
মধুর সারং বাজে কল মনোহর....
সাহেবদের খুশি করতে কত কী না করতে হত। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত জানিয়েছেন " কালীশঙ্কর ঘোষের বাটীর গুরু পুরোহিত কর্তা প্রভৃতি পুরুষ, অন্দরে গৃহিণী এবং সমস্ত পুরনারী মায় দাসদাসীদের সুরাপান করিতে হইত।" একদিন মাতাল কালীশঙ্করের পা টিপছে এক মাতাল চাকর। হঠাৎ সে ডুকরে কেঁদে উঠল। " বাবু বলিলেন, তুই কাঁদিতেছিস কেন রে? উত্তর হইল, কর্তা আপনার একখানা পা খুঁজিয়া পাইতেছি, আর একখানা বোধ হয় হারাইয়া ফেলিয়াছি, খুঁজিয়া পাইতেছি না।
বাবু হাসিয়া কহিলেন, তা চিন্তা কি বোধ হয় জল খাবারের জায়গায় ফেলিয়া আসিয়াছি। যা বাটীর ভিতর হইতে লইয়া আয়।"
সাবেক কলকেতার সেরা তিন পুজো ছিল দাঁ বাড়ি, মিত্র বাড়ি আর স' বাজারের রাজবাড়ি। প্রচলিত কথাই ছিল " মা আসিয়া গহনা পরেন শিবকৃষ্ণ দাঁ -র বাটী, ভোজন করেন কুমারটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাটী আর রাত জাগরণ করিয়া বাইনাচ দেখেন স' বাজারের রাজবাটীতে।"
প্রাণকৃষ্ণ দত্ত আরও লিখেছেন " নবমীর বলিদানের আমোদ আরও অদ্ভুত। কেবল মহিষ মেষ ছাগ কুষ্মাণ্ড ও আখ বলি নহে, তাহার পর আমোদ করিয়া গোধিকা, কপোত, মাগুরমাছ, লেবু, সুপারি এমনকি গোলমরিচ অবধি বলিদান হইত। বলিদান শেষ হইলেই শুরু হইত নৃত্য। সেই রক্তপ্লাবিত প্রাঙ্গণে মোষের মুণ্ড, আখ, লেবু , নারিকেল লইয়া কাড়াকাড়ি আর রক্তে গড়াগড়ি দেওয়া হইত।"
Uploaded Image এই রকম এক নবমীর দিন হুতোম মানে বাবু কালীপ্রসন্ন সিঙ্ঘের এক গল্প বলি। শোভাবাজার রাজবাড়িতে এসে বসেছেন তিনি। আড়ম্বরের চূড়ান্ত।  হঠাৎ তিনি দাঁড়িয়ে সবাইকে শুনিয়ে বললেন " রাজার বাড়ি- দুগগো পুজো- নেমন্তন্নে আসা গেচে- সেপাই খাও, শান্ত্রী খাও-গোরা কনেস্টেবল খাও-ফরাস তাকিয়া কউচ খাও, ঝাড় সেজ দেলগিরি বেল লন্ঠন যত পার খাও, বাইজীর সেঁইয়া বেঁইয়া খাও, কিন্তু লুচি  সন্দেশের প্রত্যাশা যদি কর তো সরে পড়"। আসলে সব উদ্যোগ ছিল কিন্তু অতিথিদের খাবার কোন ব্যবস্থা করেন নি কর্তা হরেন্দ্রকৃষ্ণ দেব।


তিনি বললেন "দেখছেন তো কত কান্ড! তার মধ্যে আবার খাওয়া দাওয়ার উদ্যোগ করলে সামলাব কেমন করে?"
"তা তো বটেই, তা তো বটেই" বলে উঠে পড়লেন কালীপ্রসন্ন। 
পরের বছর থেকে নিজেরবাড়ির দুর্গাপুজোয় "রাস্তার দুধারে বাঁধা রোশনাই, বাড়িতে উৎকৃষ্ট তয়ফার মজলিস করে আর হাজার হাজার লোককে নিমন্ত্রণ করে পরিতোষকপূর্বক ঐশ্বর্য্যের আয়োজনে ভূড়িভোজন করিয়েছিলেন"। লোকে বলেছিল কালীপ্রসন্ন রাজার রাজা। 
আর এই সব দেখেই কবি ঈশ্বর গুপ্ত লেখেন
ধন্য ধন্য কলিকাতা ধরেছে কলির ছাতা
ধন্য তব নব ব্যবহার।
হইতেছে কত রঙ্গ নাহি মাত্র তালভঙ্গ
বঙ্গদেশ পদে নমস্কার।।

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

তুরতুরি টি এস্টেট ~ শৈবাল বিষ্ণু

সে প্রায় আশি বছর হতে চলল। দুূর দুরান্ত থেকে স্বাধীনতার হালকা আভাস ভেসে আসছে। দেশের রাজনীতি প্রচণ্ড উত্তাল। ঢেউ ভাঙছে, কারা টুটছে। কিন্তু অতদূর পর্যন্ত সে ঢেউ, সে আভাস পুরোপুরি পৌঁছয়নি। হালকা অন্ধকার। রাস্তার দুপাশের উঁচু উঁচু গাছের ডালপালা গুলো নিজেদের মধ্যে জড়াজুড়ি করে আছে, বিকেলের রোদ্দুর রাস্তায় পড়তে পারছেনা। তাই এখানে অন্ধকারটা আরেকটু বেশী। 

আবার ওদিকে ঘড়িতে চারটে বাজে, শীতকালের বিকেল, অন্ধকার হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আলিপুরদুয়ার থেকে তেইশ মাইল মত। বড়জোর এক ঘণ্টার রাস্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোতর পৃথিবী। মিলিটারির থেকে কেনা সেকেন্ড হ্যান্ড বিএসএ মোটর সাইকেলের ঘুভ ঘুভ গম্ভীর আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত দুপাশের জঙ্গল চিরে বুকের মধ্যে একটা ভয় ধরাচ্ছে প্রাণীকুলের। তারা রাস্তা থেকে সর সর আওয়াজ তুলে দূরে চলে যাচ্ছে, যতটা পারে, আবার কৌতূহলও রয়েছে তাদের, তাই একটু দূর থেকে লক্ষ্য রাখছে রাস্তা দিয়ে কে যায়, একটু লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা যাক! ওদের চোখের ওপর লাইট পড়তেই কৌতূহলী চোখগুলো জ্বলতে থাকছে। 

সেনবাবু প্রতি সোমবার আর শুক্রবার আলিপুরদুয়ার গিয়ে বাজার করে আনেন। ওনার এই বাহনকে সবাই চেনে, পুরো তেইশ মাইলের দুপাশের মানুষ। এবং অন্যন্য প্রাণীরাও। এড়িয়ে চলে তারা। অবশ্য মানুষরা দুপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। শিশু মানুষরা চোখ বড় বড় করে দেখে। জঙ্গলের  শিশু প্রাণিরা শুধুই শোনে। হয়তো কেউ কেউ দূর থেকে দেখেও নেয়। 

আজ মোটর সাইকেলের পেছনে বসে আছে সেনবাবুর দোকানের কর্মচারী গদাই। দুই ব্যাগ মালপত্র ধরে আছে। আজ শুক্রবার, রোববারে অনেক বিক্রী বাটা হবে। মাস তিনেক আগেই এই রাস্তায় ফিরতে গিয়ে রাস্তায় একটা চিতাবাঘ এসে গেছিল। মোটর সাইকেলের হেডল্যাম্পের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল বেচারার। কোনোরকমে মাত্র কুড়ি ফিট দূরত্বে দাঁড় করাতে পেরেছিলেন মোটর সাইকেল। সেই চিতাবাঘ ঘুভ ঘুভ আওয়াজে ঘাবড়ে গিয়ে ছুটতে ছুটতে পালিয়ে গেছিল ওই জয়ন্তীর দিকে জঙ্গলে। তাই তার পর থেকে গদাই সাথে আসে। কিন্তু সেই গদাই এর জন্যেই যে আজ একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, কেই বা জানত।

শামুকতলা থেকে বাঁ দিকের রাস্তা নিয়েছেন সেন বাবু। কোহিনূর চা বাগান ডাইনে রেখে এগোচ্ছেন। শীতকালের বিকেল, তাড়াতাড়িই সন্ধে হয়ে এসেছে। আজ আলিপুরদুয়ার থেকে বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেছিল। লোকনাথপুরও পেরিয়ে গেছেন। সামনে ঘন জঙ্গল। ডাইনে রায়ডাক বাগান। বাঁ দিকের জঙ্গল বেশ ঘন, বক্সার জঙ্গলে বাঘ আছে। আর এই সময়টায় ওনারা শিকারে বেরোন। লোকনাথপুরের রাস্তায় অনেকগুলো বাইসন, ওই যাদের পায়ে সাদা মোজা, সেই ভারতীয় গৌড় এক পাল রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ওদের জন্যেই দেরী হয়ে গেল আরও বেশ খানিকটা। 

আর মাত্র মাইল পাঁচেক বাকি তুরতুরি চাবাগান পৌঁছতে। ডানদিকে রায়ডাক বাগানে যাওয়ার রাস্তা পেরিয়ে গেলেন। তুরতুরি চা বাগানের ম্যানেজার ওনার জামাইবাবু। এইটাই এই এলাকার একমাত্র চা বাগান যার ম্যানেজার বাঙালী, অনেক সম্মান ওনার। আশে পাশের সব বাগানের ম্যানেজারই সাহেব, একমাত্র জামাইবাবু ছাড়া।

তুরতুরি চা বাগানের মধ্যেই সেনবাবুর দোকান। সব ধরনের জিনিসপত্র রাখেন। কুমারগ্রামে সোমবার করে একটা হাট বসে ঠিকই, কিন্তু রোজকার দোকান বাজারের জন্যে সবাই সেন বাবুর দোকানকেই ভরসা করে। কুলিদের সে আর্থিক ক্ষমতা নেই। তাদের ওই হাটবারই একমাত্র ভরসা।

Uploaded Image শুধু তুরতুরিই নয়, চারিপাশে মাইল পনেরোর মধ্যে কোহিনূর, রায়ডাক, ধউলাঝোড়া, কার্তিক এমনকি জয়ন্তী চা বাগানের সব বাবুদেরই সেনবাবুর দোকানই একমাত্র ভরসা।

ওদিকে সারে চারটে বাজতে না বাজতেই সন্ধের অন্ধকারটা যেন ঝপ করে চারিপাশ ঘিরে ফেলল। ঘুভ ঘুভ শব্দে চারিপাশের সব প্রাণীদের প্রাণ তটস্থ করে সেন বাবুর মোটর সাইকেল এগিয়ে চলেছে দুপাশের ঘন জঙ্গলের মাঝে সামান্য এক ফালি রাস্তা দিয়ে। পিচের রাস্তা সব আলো শুষে নিচ্ছে। প্রায় সব প্রাণীই বিচলিত, শুধু একজন ছাড়া।

সেনবাবু হঠাৎ দেখলেন সামনের অন্ধকারটা যেন একটু বেশীই কালো। 

একলা হাতি মানেই পাগলা হাতি, সেনবাবু বিলক্ষণ জানেন। উনি দাঁড় করিয়ে দিলেন মোটর সাইকেল। তাঁর পাহাড় প্রমাণ সাইজ, তিনি পঁচিশ তিরিশ ফিট দূরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। মোটেই তিনি বিচলিত নন, একটুও ভয় পাননি। প্রচণ্ড কৌতহল নিয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন। 

হাতিটি আসতে আসতে এগিয়ে এসে একটু দূর থেকে শুর দিয়ে সামনের চাকাটা আলতো করে আদর করতেই  মোটর সাইকেলের পেছন থেকে গদাই লাফ দিয়ে নেমে পড়েছে। সেই ধাক্কায় সেনবাবুও পড়ে গেলেন। মোটর সাইকেলের স্টার্ট বন্ধ হয়নি। তারপরের ঘটনাটুকু গদাইএর কাছ থেকেই শোনা যাক। গদাই দেখলো হাতিটি সামনের পা'টা তুলেছে ঠিক সেনবাবুর মাথার ওপরে। গদাই এরপর এক মুহুর্তও দেরী না করে এক ছুটটে গিয়ে সোজা তুরতুরি বাগানের ম্যানেজারকে পুরো ঘটনা বিস্তারিত বলতেই ম্যানেজার তাঁর শ্যালককে খুঁজতে গাড়ি নিয়ে, বন্দুক কাঁধে বেরোবার তোরজোর করতে শুরু করে দিলেন। বাড়ির ভিতরে ওদিকে কান্নার রোল। সেনবাবুর দিদি নিজেকে সামলাতে পারছেন না।

তুরতুরি চা বাগানের ম্যানেজারবাবু সবে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছেন, দেখেন মোটর সাইকেল চেপে ওনার শ্যালক, সেন বাবু বাগানের গেট পেরিয়ে ভিতরে আসছেন। শুধু ব্যাগ গুলো নেই পেছনে, গদাই ওখানেই ফেলে এসেছিল।

বাকিটা সেনবাবুর মুখেই শোনা যাক। 

আমি তো ভাবলাম আজ মরেই গেছি। হঠাৎ হাতিটা কি ভাবলো। সামনের পা'টা আমার মাথার ওপর থেকে সরিয়ে নিল। আর এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো রাস্তায় পড়ে থাকা, মোটর সাইকেলের ঘুরন্ত চাকার দিকে। মন দিয়ে শুনল ঘুভ ঘুভ শব্দ। অবাক হয়ে দেখল বন বন করে ঘুরছে পেছনের চাকা। তারপর যেন বেশ খুশী মনে হেলতে দুলতে আবার বক্সার জঙ্গলের দিকে জয়ন্তীর রাস্তায় চলে গেল।

রাস্তা থেকে উঠে, গা হাত পা ঝেড়ে মোটর সাইকেল তুলে, সোজা চলে এলাম।

দেশ আশি বছর এগিয়ে গেছে। কিন্তু সেদিনের সেই কুলিদের আজও আর্থিক ক্ষমতা নেই। কারণ তাদের বোনাস নেই, তাই পুজোতে জামা কাপর কেনার, আনন্দ করার আর্থিক সঙ্গতি কোথায়? পুজো এলো, তুরতুরি চাবাগানের কুলিরা সে আনন্দ থেকে বাদ।



মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

ইলা মিত্র ~ মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ইলা মিত্র (১৮ অক্টোবর ১৯২৫ – ১৩ অক্টোবর ২০০২)। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।

বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে বাংলার একাউন্টেন্ট জেনারেল। ১৯৪৫ সালে ইলা সেন-র বিয়ে হয় দেশকর্মী, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রমেন্দ্র নাথ মিত্রের সঙ্গে। রমেন্দ্র নাথ মিত্র রামচন্দ্রপুর হাটের জমিদার মহিমচন্দ্র মিত্রের ছোটো ছেলে। তিনি জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য ত্যাগ করে কৃষকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
জমিদারি বাড়িতে ইলা মিত্র যেন হাঁপিয়ে উঠলেন। সেই সময়ে রমেন্দ্র নাথ মিত্রের বন্ধু আলতাফ মিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ির কাছেই কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাটে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল খোলা হল। গ্রামের মানুষের নিরক্ষর মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এলেন ইলা মিত্র—বৃহত্তর সমাজ সেবার কাজের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন এলাকার রানীমা।
১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর নাচোল-এ তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব ছিলেন রমেন্দ্র নাথ মিত্র এবং ইলা মিত্র। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পর ইলা মিত্ররা রাজশাহীতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেশ ভাগ ও স্বাধীনতার পরেও পূর্ব পাকিস্তানে তেভাগা আন্দোলন অব্যাহত থাকে।

মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন হয়ে কঠোর হাতে এই আন্দোলন দমন করে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রোহনপুরে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে ইলা মিত্র বর্বর পুলিশের ভয়াবহ মধ্যযুগীয় নির্যাতনের শিকার হন।

ইলা মিত্র কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নির্যাতনের যে বিবৃতি দিয়েছেন, তার একটি ছোটো অংশ তুলে দিলাম—
Uploaded Image
‘সেলের মধ্যে আবার এসআই সিপাইদেরকে গরম সিদ্ধ ডিম আনতে হুকুম দিল এবং বললো ‘এবার সে কথা বলবে’। তারপর চার পাঁচজন সিপাই আমাকে জোরপূর্বক ধরে চিৎ করে শুইয়ে রাখল। একজন আমার যৌনাঙ্গের মধ্যে একটি গরম সিদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দিল। …পরদিন ১০/১/৫০ তারিখে যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন আমি দেখলাম, আমার দেহ থেকে দারুণভাবে রক্ত ঝরছে, আর আমার কাপড়-চোপড় রক্তে সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছে।’

ইলা মিত্র পরবর্তী সময়ে কলকাতাতে চলে আসেন। মৌলবাদী মুসলিম লীগ সরকার তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

তাঁকে সামগ্রিকভাবে বাঙালি ভুলে গেছে। তাঁর মতো অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিভিন্ন আন্দোলনের অগ্রণী নেতৃত্বকে আমরা ভুলে গেছি। 

বাংলাদেশ শেষ কয়েক বছরে মৌলবাদের খপ্পরে বেশি করে পড়েছে। ২০২৩ সালে নিজে গিয়েও বুঝতে পেরেছি ওয়াহাবি/সালাফি প্রভাবে বাংলাদেশ আচ্ছন্ন, আর ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে কিছু বাংলাদেশী ফেসবুক বন্ধু তাঁদের মুখোশ সরিয়ে মুখ বার করেছেন, সেই মুখে লেগে রয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদের ছায়া। অনেকে হয়তো খেয়ালও করছেন না, তাঁদের বক্তব্য অন্য ধর্মের মানুষকে কতটা আঘাত করছে।

তবে এটুকুই কি শেষ? এরপরে কি কোনো কথাই আর নেই?

আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, এদিকে তিনি বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেলেও এখনও বাংলাদেশের নাচোলে ইলা মিত্রকে নিয়ে এই সময়ে সাত দিন ধরে মেলা হয়, তাঁকে শ্রদ্ধায় নত শিরে স্মরণ করা হয়। এই মেলার আয়োজন করে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মিলন অভিলাষী মানুষ।

শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থা, অন্ধবিশ্বাস সবচাইতে ক্ষতি করে ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল শক্তিকে, এই ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিতে যেমন থাকেন বিশ্বাসী মানুষ, স্পিরিচুয়াল মানুষ তেমন সামিল হতে পারেন অবিশ্বাসী মানুষ। এই শক্তি সারা পৃথিবীতেই, নিজের ধর্মের উর্ধে উঠে, ব্যক্তিগত ক্ষতি স্বীকার করেন, মানবতার কথা বলেন। ধর্মান্ধদের কাছে এরাই মূল প্রতিপক্ষ। 
শাস্ত্রবাদী, উগ্রবাদীদের কাছে ব্যক্তি ধর্মের থেকেও মূল প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীন স্বর। 

তাই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু মানুষের উপরে আক্রমণ যেমন হয়, খেয়াল করে দেখবেন মূল আক্রমণ হয় ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের উপরে।   
আমাদের সকলের—এই বাংলাতে, ওই বাংলাতে আত্মবিশ্লেষণ করা দরকার। কোনো ত্রুটি হয়ে যাচ্ছে না-তো! এমন ত্রুটি যা পরবর্তী প্রজন্মকে পিছিয়ে দেবে! এমন জায়গায় নিয়ে যাবে যেখান থেকে উঠে আসা বড়ো কঠিন। 
বীণা দাশ, ইলা মিত্র, কল্পনা দত্ত, ফুলরেণু গুহ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদাররা চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও মানবিক ও প্রগতিশীল মতবাদ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেননি। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনমত ও সমর্থন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ইলা মিত্র বা বীণা দাশ ভূমিকা রেখেছিলেন। 

কেন? 

কারণ যখন সমাজ কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের মুক্তচিন্তা, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানমনস্কতা। তাঁরা জানতেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরুর ভিন্নতা প্রোথিত করা হয় ব্যক্তির মননে, তবে পিছনে থাকে রাজনীতি। সেই নীতি আমাদের একত্রিত করে না। উন্নত করে না। আর তাই এই নীতি নিয়ে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন, বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আজকে উদার মানবতার বিশ্বাস পশ্চিমবঙ্গেও অনেকের কাছে গুরুত্ব হারায়, যেমন হারিয়েছে বাংলাদেশে, যেমন হারিয়েছে উপমহাদেশে। এসে দাঁড়ায়—ওরা ও আমরাতে। এই ওরাতে চলে যায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষ, ধর্ম নিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল মানুষ, ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের মানুষ, ভিন্ন ভাষার মানুষ..। 

আমার থেকে ভিন্ন মানুষ। 

ধর্ম কখনোই মানুষের প্রথম পরিচয় হতে পারে না, তা সে সংখ্যাগুরু হোক বা সংখ্যালঘু। 

প্রথম পরিচয় আমরা সকলে একবিংশ শতকের পৃথিবীর মানুষ, যারা সকলে চাই নিজের সন্ততিকে আজকের ‘বৈশ্বিক উত্তরে’র (Global North) মানুষের মতো জীবন দিতে। একদিকে আমরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, প্রযুক্তি এবং উন্নত জীবনযাত্রা চাই, অথচ অন্যদিকে মানসিকভাবে পড়ে থাকতে চাই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের অহংকারে। এই বৈপরীত্য নিয়ে কখনো একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠন সম্ভব নয়।

দুটো একসঙ্গে হয় না, হবে না। 'উত্তরে' পালিয়ে গেলেও হবে না। সেই উন্নত সমাজগুলোর ভিত্তিমূলেও রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং পরমতসহিষ্ণুতা।

Madhusree Bandyopadhyay
13/10/2026

শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

খিস্তি ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

"খিস্তি” শব্দটির ভিতরেই কীরকম একটি অনেক না-বলা ব্যঞ্জনা রহিয়াছে। খানিক নিষিদ্ধতা, খানিক ভীতি, খানিক ক্রোধ এবং যৎপরোনাস্তি ঘৃণা―এই সমস্ত কিছু মিলিত হইয়াই বোধহয় একেকটি বিশেষ শব্দ অসাধারণ অর্থবহ হইয়া উঠে এবং যেকোন মানুষের কর্ণপটহে তথা মানসসাগরে নিদারুণ যাতনা সৃষ্টি করিতে সমর্থ হয়। কিন্তু সত্যই কি তাই? নাকি সময়, অবস্থান, মানসিকতা এবং ব্যক্তিবিশেষে কোন একটি শব্দের অর্থের তারতম্য ঘটে?

সর্বাগ্রে এই আমার কথাই ধরি। 


শিশুকাল হইতেই “বইপোকা” হইবার সুবাদে তথাকথিত বড়দের, অতি-বড়দের বই-ও পড়িয়া ফেলিয়াছিলাম। পীতাভ, শুভ্র বা নীলাভ, বই পড়িবার ক্ষেত্রে কোনরূপ বর্ণবৈষম্য না থাকার ফলে আমি জাগতিক প্রায় সমস্ত রকম চলতি অশ্রাব্য গালিগালাজ সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করিয়া ফেলিয়াছিলাম অল্প বয়সেই। তথাপি মুশকিল ছিল যে কিছুতেই একটি অশালীন শব্দ ও আমার মুখ গহ্বর হইতে নির্গত হইতে চাহিত না। মনে মনে ভাবিতাম, বলিব, এই বার ঠিক বলিব, তথাপি কার্যকাল উপস্থিত হইলে কোন্‌ বারাঙ্গনার সন্তান যে আমার কণ্ঠরোধ করিয়া ফেলিত তাহা ভাবিয়া পাইতাম না। শুধু যে বলিবার সমস্যা ছিল তাহা নহে, কেহ কু-বাক্য উচ্চারণ করিলেও রীতিমতন শিহরিয়া উঠিতাম। এমতবস্থায়, এক সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায় এক বালক-বন্ধু ইতিহাসে পঁচিশে পাঁচ পাইল এবং সমস্ত সম্পর্কের মাতা-ভগিনী করিয়া শিক্ষিকাকে 'শ্যালিকা' সম্বোধন করিয়া বসিল। আমি যথারীতি চমকাইয়া উঠিয়া তাহাকে নিরস্ত করিবার চেষ্টা করিতেই বিকট মুখব্যাদান করিয়া আমাকে ভ্যাংচাইয়া আমার প্রাপ্ত পূর্ণমানের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনপূর্বক সে আমাকে জানাইল যে এরূপ সম্বোধনই শিক্ষিকার প্রাপ্য, এবং যেহেতু ইহাতে আমার একটিও যৌনকেশ উৎপাটিত হইতেছে না সেহেতু নীরবতা পালনই আমার পক্ষে শ্রেয়! Uploaded Image

অদ্যপি সকলেই জ্ঞাত আছেন যে বাঙালী নারী কদাচ এরূপ বাচালতা সহ্য করে না। সুতরাং আমিও ক্রোধে অন্ধ হইয়া, সমস্তরকম শিষ্টতা বিসর্জন দিয়া ‘মূর্খ -সঙ্গমকারী’ বলিয়া তাহার হাত মোচড়াইয়া দিয়া দ্রুতপদে সেই স্থান ত্যাগ করিলাম। বালক-বন্ধুটি বিস্ময়াহত হইয়া স্থাণুবৎ হইয়া রহিল। “আমি তখন নবম শ্রেণী”।

সেই শুরু।

তাহার পর কলিকাতার রাজপথ দিয়া বহু মল প্রবাহিত হইয়াছে। আমিও প্রচুর বসন্ত পার হইয়া আসিয়াছি। মাতা ঠাকুরানী যাহা ছিলেন এবং মাতা ঠাকুরানী যাহা হইয়াছেন― তাহার মধ্যে সহস্র যোজন ব্যবধান। অদ্য নানাবিধ কু-বাক্য অনায়াসে উচ্চারণ করিতে পারি এবং কী আশ্চর্যের ব্যাপার, এতটুকু পাপবোধ হয় না। 
শুধুমাত্র তাহাই নহে, উপরোক্ত শব্দাবলী আর তদ্রূপ অশালীন বলিয়াও বোধ হয় না। অবশ্য বহু ব্যবহারে তরবারির শাণিত ফলা'র তীক্ষ্ণতাও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, আর ইহা তো নিতান্তই আমার নিজস্ব শালীনতা বোধ!

যাহা হউক, এক্ষণে গৌরচন্দ্রিকা যথেষ্ট হইয়াছে, পূর্বোক্ত আলোচনায় ফিরি। “খিস্তি”, এক অর্থে প্রকৃত সাম্যবাদের প্রবক্তা। যে খিস্তিসকল তথাকথিত নগণ্য রিক্‌শাওয়ালা, স্বেদবিন্দু মুছিতে মুছিতে দিয়া থাকেন, সেই একই ভাষা আপনি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রকোষ্ঠে বসিয়া আপনার ঊর্ধতন কর্মচারীর প্রতি প্রয়োগ করেন। 

বলাই বাহুল্য, যে catharsis-ও অভিন্ন দুই ক্ষেত্রেই। 
আবার, সামান্য দুইটাকা খুচরা না দিতে পারার হেতু অটো ওয়ালা যে মুহূর্তে আপনার চৌদ্দ গুষ্টির গুহ্যদ্বারের একশত আট করিতে থাকেন, তখন যেরূপ মনোবেদনা বোধ করেন, সেই একই বাক্য যখন কোন বন্ধুবর প্রয়োগ করে তখন সেরূপ প্রবল প্রসববেদনা হয় না। ইহার কারণ প্রথমেই উল্লেখ করিয়াছি, ব্যক্তি ও স্থানবিশেষে একই খিস্তির বিভিন্ন অর্থ হইয়া থাকে এবং মনোজগতে তার প্রভাবও ভিন্ন।

একটি উদাহরণ রাখিতেছি; আমার পরম পূজনীয় পতিদেবের এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধু, যিনি উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে অতি সম্মাননীয়, তাঁহার একটি মহৎ দোষ হইল যে হলাহল-সম আসব সামান্য অধিক পরিমাণে পান করিবার পর তিনি কিঞ্চিৎ অস্থির হইয়া পড়েন এবং তখন তাঁহার বাক্যাবলীর মধ্যে পুরুষের প্রধান অঙ্গটির (অধিকাংশ পুরুষের মতানু্যায়ী উহাই তাহাদের প্রধান অঙ্গ, মস্তিষ্ক নহে ) একটি চলিত রূপের প্রয়োগ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাইয়া থাকে।

অপর এক বন্ধুর নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে কয়েক বৎসর পূর্বে আমার পতিদেব, এবং উল্লিখিত বন্ধুটি তাঁহার গৃহে গমন করেন। উষ্ণ পানীয় সমাপনান্তে যেক্ষণে সকলেই আহারাদিতে ব্যস্ত এবং বন্ধুর মাতৃদেবী স্বয়ং তদারকিতে, সেক্ষণে ইনি হঠাৎ বিগলিত হইয়া গদ্গদ কন্ঠে বলিয়া উঠিয়াছিলেন, (পাঠকের বোধের সুবিধার্থে হুবহু প্রতিলিপি দেওয়া হইল) ,”মাসিমা, বাঁআ, মাংসটা যা বানিয়েছেন বাঁআ, ওঃ, বহুদিন পরে বাঁআ এমন মাংস খেলাম”।

ইহা শ্রবণ করিয়াও ‘মাসিমা’ র হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যে সহসা স্তব্ধ হইয়া যায় নাই, ইহাতেই প্রমাণ হয় যে এই কলিকালেও ভগবান আধা-জাগ্রত অবস্থায় বিরাজমান। ইহাতে আরো প্রমাণ হয় যে কথার মাত্রা হিসেবে, শুধুমাত্র নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশের নিমিত্তও কোন কোন সময় খিস্তি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যাঁহারা এরূপ করিয়া থাকেন, কাহাকেও মানসিক আঘাত দিবার জন্য নহে, শুধুমাত্র অভ্যাসের বশেই বলিয়া ফেলেন।

যাহা হউক, আরো একটি ব্যাপার হইল যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার কারণে নারীজাতির অবমাননা করা হয় খিস্তির মাধ্যমে। 
ইহার তেমন কোনো উপশম নাই। কারণ সামাজিকভাবে নারী আজও বেশিরভাগক্ষেত্রেই দুর্বল (সোশ্যাল মিডিয়ার চমকধমক দেখিয়া বাড় ভক্ষণ করিবেন না; উহা শোরুম। আমি গোডাউনের কথা বলিতেছি) হিসেবে পরিগণিত। 
আর, দুর্বলের উপর সবলের আধিপত্য, সে তো ব্যাদ-কোরআন-বাইবেল সর্বত্র।

(পূর্ব প্রকাশিত)

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

বেরসিক ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার স্ত্রী রসিকতা বোঝে না। কথাটা এখন আমাদের পুরো ফ্রেন্ডসার্কেল জানে।

অথচ বছরখানেক আগেও সবাই বলতো, নিয়াজ, তোর বউয়ের মতো ডায়নামিক মেয়ে হয় না। যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে জানে। আমি গর্বে বুক ফুলিয়ে বলতাম, মৌরির মতো ম্যাচিওর মেয়ে লাখে একটা মেলে।

মজার ব্যাপার হলো, কনে দেখার দিন মৌরির একটা কথায় আমাদের পুরো পরিবার হেসে উঠেছিলো। ফেরার পথে আম্মা বলেছিলেন, মেয়ের মুখে খই ফোটে, বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। হয়েও ছিলো তাই। 

আমি মানুষটা খারাপ না। এক যুগের সংসারে কোনোদিন মৌরির গায়ে হাত তুলিনি। প্রত্যেক ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে কিছু না কিছু গয়না দেই। বছরে কক্সবাজার নিয়ে যাই অন্তত একবার। বন্ধুরা বলে, নিয়াজের মতো বর পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। মৌরিকে আমি ভালোবাসি না, এ কথা আমার শত্রুও বলতে পারবে না। আমি শুধু একটু রসিক মানুষ। আড্ডায় আমি না থাকলে কিছু জমে না ঠিকঠাক। 

আমার সবচেয়ে জনপ্রিয় জোকটা মৌরিকে নিয়ে। প্রথম বলেছিলাম বউভাতের দিন। বন্ধুরা মৌরির রূপের প্রশংসা করছিলো। আমি হেসে বললাম, বউ দেখে বিয়ে করছি রে, বুদ্ধি দেখে না। মেয়েমানুষের বুদ্ধি তো থাকে হাঁটুতে! সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। ঘোমটার ভেতর থেকে মৌরিও হাসলো।

বিয়ের প্রথম বছর মৌরি একবার রাতে বলেছিলো, জোকটা আমার ভালো লাগে না। আমি বুঝিয়ে বললাম, তুমি এতো সেনসিটিভ কেন? রসিকতা না বুঝলে লোকে ব্যাকডেটেড বলবে। মৌরি আর কোনোদিন কিছু বলেনি। বললাম না, ও ম্যাচিওর মেয়ে।  

তারপর থেকে জোকটা আমার ট্রেডমার্ক হয়ে গেলো। কোনো দাওয়াতে কেউ মৌরিকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমি বলতাম, ওকে জিজ্ঞেস করে লাভ নাই, ওর বুদ্ধি তো হাঁটুতে! মৌরি হাসতো। কখনো আমার কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে বলতো, হ্যাঁ, সেটাই। ভাবিরা বলতো, ভাবি স্পোর্টিং মেন্টালির! একটুও রাগ করে না। কেউ কেউ ওর কানে কানে বলতো, আপনি কতো লাকি, নিয়াজ ভাই কতো হাসিখুশি মানুষ!

একবার আমার অফিসের পার্টিতে বস মৌরিকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাবি কী নিয়ে পড়াশোনা করেছেন? মৌরি মুখ খোলার আগেই আমি বললাম, স্যার, ও পড়েছে কিচেন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। মেজর ইন পেয়াজ-হলুদ, মাইনর ইন লবণ-মরিচ! বস হেসে কুটিকুটি ততোক্ষণে। শুধু বসের স্ত্রী হাসেননি, এক পলক মৌরির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ভদ্রমহিলা একটু গম্ভীর টাইপ।

সেই রাতে ফেসবুকে মৌরিকে নিয়ে একটা মজার পোস্টও দিলাম। হাজারখানেক হা হা পড়লো। মৌরিও একটা হা হা দিয়েছিলো।

শুনেছি মৌরি নাকি অনার্সে অঙ্কে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলো। বিয়ের সময় একটা ব্যাংকে চাকরির সাড়াও পেয়েছিলো। আম্মা চাইছিলেন বউ ঘরে থাকুক। আমি জোর করিনি, মৌরি নিজেই রাজি হলো। বললাম না, ম্যাচিওর মেয়ে।

সংসারের হিসাবটাও ও-ই রাখে। মাস শেষে একটা টাকাও এদিক ওদিক হয় না। কীভাবে মেইন্টেইন করে সব, আমি জানি না, জানার দরকারও পড়েনি। গতবার আমার ট্যাক্স রিটার্নে কনসালট্যান্ট একটা বড় ভুল করেছিলো, মৌরি কীভাবে যেন ধরে ফেললো! কপালজোরে মিলে গেছে আরকি। সত্যি বলতে, আমার মোজা জোড়া কোথায় থাকে, সেটাও মৌরি ছাড়া কেউ জানে না। বিকেলে পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চারা ওর কাছে অঙ্ক করতে আসে। আমি ঠা ঠা করে হেসে বলি, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো! 

শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও জোকটা বাদ দিতাম না। শ্বশুর সাহেব একবার গর্ব করে বলেছিলেন, আমার মেয়ে কিন্তু অঙ্কে সবসময় ফার্স্ট হতো। আমি হেসে বললাম, আব্বা, সেই অঙ্ক এখন বাজারের হিসাবে এসে ঠেকছে, সেখানেও গোলমাল! শ্বশুর সাহেব আর কিছু বলেননি। মৌরি বাবার দিকে না তাকিয়ে হাসলো।

আম্মা মাঝে মাঝে মৌরির রান্না নিয়ে খোঁটা দিতেন, এই তরকারিতে লবণ দিছো না চিনি? আমি যোগ করতাম, যার বুদ্ধি হাঁটুতে, তার জিভে আর স্বাদ থাকবে কোত্থেকে! আম্মা হাসতেন, আমি হাসতাম, মৌরিও হাসতো। আব্বাও আম্মাকে নিয়ে এমন মজা করতেন, আম্মাও হাসতেন। আমাদের বাড়িতে এটাই নিয়ম।

কিছুদিন হলো খেয়াল করছিলাম, কেউ মৌরিকে কিছু জিজ্ঞেস করলে ও আগে আমার দিকে তাকায়। তারপর বলে, আমি তো জানি না, ওকে জিজ্ঞেস করেন। আমার ভালোই লাগতো। বউ বরকে মান্য করে।

একবার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি, মৌরি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কী হইছে? ও নির্লিপ্ত সুরে বললো, কিছু না, ঘুম আসছে না। আমি পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। মেয়েদের এমন হয়।

ঝামেলাটা শুরু হলো মাসখানেক আগে, রাতের খাবারের টেবিলে। আমাদের মেয়ে আরশি সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। অঙ্ক বই খুলে বসে ছিলো। মৌরি বোঝাতে যেতেই আরশি খিলখিল করে হেসে বললো, আম্মুকে জিজ্ঞেস করে লাভ নাই, আম্মুর বুদ্ধি তো হাঁটুতে!

আমি হাসতে হাসতে প্রায় বিষম খেলাম। মেয়ে একদম বাপের মতো রসিক হয়েছে। মৌরি চামচটা প্লেটে নামিয়ে রেখে অনেকক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ভাত শেষ না করেই উঠে গেলো। আমি ভাবলাম, ওর শরীরটা হয়তো ভালো নেই। আরশি আমার কানে কানে জিজ্ঞেস করলো, বাবা, হাঁটুতে সত্যি বুদ্ধি থাকে? আমি চোখ টিপে বললাম, তোর আম্মুর থাকে! বাপ-বেটি মিলে হাসলাম আরেক দফা। 

তার কয়েকদিন পর জামিলের বাসায় দাওয়াত। সোফায় গাদাগাদি করে বসে ছিলো বন্ধুরা। হাতে হাতে কোকের গ্লাস। জামিলের ছেলেটা একটা লাভ-ক্ষতির অঙ্ক নিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে ঘুরছিলো। মৌরি খাতাটা টেনে নিতেই আমি অভ্যাসমতো বললাম, ওকে দিয়ে কী হবে রে, ওর বুদ্ধি তো হাঁটুতে! ড্রইংরুমভর্তি মানুষ হেসে গড়িয়ে পড়লো। আরশিও সবার দেখাদেখি হাততালি দিয়ে হাসছিলো।

শুধু মৌরি হাসলো না, এক যুগের মাঝে এই প্রথম।

ও চুপচাপ অঙ্কটা কষে খাতাটা ছেলেটার হাতে ফিরিয়ে দিলো। তারপর আমার দিকে না তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললো, এই কথাটায় আমি আর হাসবো না।

ঘরটা হঠাৎ এমন চুপ হয়ে গেলো যে সিলিং ফ্যানের সূক্ষ্ম শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিলো। এতো মানুষের সামনে এমন অপমান আমাকে কেউ কোনোদিন করেনি। জামিলের বউ তাড়াতাড়ি বললো, ভাবি, এটা তো জাস্ট ফান! সোহেল বললো, ভাবি আবার এতো সিরিয়াস হয়ে গেলেন কবে থেকে? আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, দেখছিস? মজাও বোঝে না! সবাই আবার হেসে উঠলো। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

পরে শুনেছি, অঙ্কটা নাকি ঠিকই হয়েছিলো। জামিলের ছেলে ক্লাসে পুরো নম্বর পেয়েছে। সেটা অবশ্য আলাদা কথা।

ফেরার পথে গাড়িতে মৌরি একটা কথাও বললো না। আরশি পেছনের সিটে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। বাসায় ঢুকে বললাম, তুমি আমাকে সবার সামনে ছোট করলে কেন? মৌরি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, আমি তো কিছু করিনি। হাসিনি কেবল। এমনভাবে বললো, যেন হেসে না ওঠাটা কোনো অপরাধই না! 

শ্লেষমাখানো কন্ঠে বললাম, এক যুগ তো হাসলে, আজ হঠাৎ কী হলো? মৌরি বললো, আজ আরশি দেখছিলো। শুনে আমি হাসির দমক নিয়ন্ত্রণ করলাম। বাচ্চারা তো হাসবেই, ওরা কী বোঝে?

একটা মজাকে মৌরি তিল থেকে তাল বানিয়ে ফেললো। খবরটা আম্মার কানেও গেলো। আম্মা বললেন, বর একটু মজা করছে, তাতে এতো কী! আমরা কী কম সহ্য করছি? মৌরির মা-ও ফোনে বললেন, জামাই তো আর মারধর করে না, মা। মানিয়ে নে। সোহেল ফোন করে বললো, দোস্ত, বউরে একটু টাইট দে, নাইলে মাথায় উঠবো। অফিসের এক কলিগ বললো, আজকালকার মেয়েরা সব কথাতেই অপমান খুঁজে পায়, ভাই। বন্ধুদের স্ত্রীরা বলাবলি করলো, ভাবি নাকি আজকাল ফেমিনিস্ট হইছে, ফেসবুকে সস্তা রিলস দেইখা মাথাটা গেছে।

এরপর থেকে মৌরি আর দাওয়াতে যায় না। আমি একা যাই। সবাই জিজ্ঞেস করে, ভাবি কই? আমি বলি, উনি আজকাল খুব সেনসিটিভ, নিরীহ রসিকতা নিতে পারেন না! সবাই হাসে। কেউ কেউ বলে, তোর বউ এতো অসামাজিক হয়ে গেলো কবে রে? আমিও বুঝি না। যে মেয়ে এক যুগ ধরে সব হেসে উড়িয়ে দিলো, সে হঠাৎ এতো ইম্যাচিওর হলো কীভাবে? আপনারাই বলেন, একটা মজার জন্য কেউ এভাবে মুখ ভার করে থাকে?

মৌরি ইদানীং আবার পাড়ার একটা স্কুলে অঙ্কের ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। বন্ধুদের বললাম, যার বুদ্ধি হাঁটুতে, সে নাকি এখন অন্যের ছেলেমেয়েকে অঙ্ক শেখাবে! সবাই হাসলো প্রাণখুলে। রাতে আরশিকে ঘুম পাড়ানোর সময় মৌরি ফিসফিস করে কী যেন বলে, আমি কাছে গেলে চুপ করে যায়। একদিন শুনে ফেললাম, সে বলছে, বুদ্ধি থাকে মাথায়, মা। কেউ অন্য কিছু বললে হাসবি না। মেয়ের মাথায় এসব কী ঢুকাচ্ছে, কে জানে! Uploaded Image

গত বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ফিরে দেখি, ফ্ল্যাট অন্ধকার। আরশির স্কুলব্যাগটা নেই, মৌরির আলমারির একটা পাল্লা হাট করে খোলা। ফ্রিজের গায়ে আরশির আঁকা ছবিটা তখনো সাঁটানো, তিনজন মানুষ, তিনজনই হাসছে। ডাইনিং টেবিলে লবণদানির নিচে একটা চিরকুট।

গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, আরশিকে নিয়ে গেলাম। ও যেন বড় হয়ে না শেখে, অপমান হজম করার আরেক নাম ম্যাচিওরিটি।

নিচে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আরেকটা লাইন। তুমি তো বলতে আমার বুদ্ধি হাঁটুতে। আজ হাঁটু দুটো কাজে লাগালাম, হেঁটে চলে গেলাম।

চিরকুটটার ছবি তুলে সোহেলকে পাঠালাম। সোহেল লিখলো, হা হা হা! দোস্ত, ভাবি তো দেখি সেই লেভেলের জোক মারছে!

চেয়ারটা টেনে বসে পড়লাম। চিরকুটটা আমি অনেকবার পড়লাম। বিয়ের পর এই প্রথম মৌরি আমাকে নিয়ে একটা জোক করলো।

আমি হাসতে পারলাম না চিরাচরিত হাত-পা ছড়ানো সেই নির্ভার ভঙ্গিতে। 

বেরসিক  
তাইমুর মাহমুদ শমীক 
৫/১০/২০২৬

সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

অপটোজেনেটিক্স ~ ডাঃ বিষান বসু

অত্যাধুনিক যন্ত্র বা রোবটের ক্রিয়াকলাপের দুটো অংশ থাকে। সেনসর আর অ্যাকচুয়েটর। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির খবর আসে সেনসরের মাধ্যমে - আর যন্ত্র সেই খবর অনুযায়ী কাজ করে অ্যাকচুয়েটরের মাধ্যমে। জীবের কোষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা একই।

যন্ত্রের ক্ষেত্রে তার ক্রিয়াকলাপ আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, কোষের ক্ষেত্রে পারি না। কোষের কাজকর্ম বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তো বটেই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেয়াড়া দেহকোষ এমন কাজকর্ম করে যাতে সংশ্লিষ্ট প্রাণীটিই বিপদে পড়ে যায়। 

ক্যানসার কোষের কথাই ধরুন না - শরীরের নিজেরই একখানা কোষ এমন বিগড়ে গেল যে সে আর পাঁচটা কোষের কথা না ভেবে সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালখুশিমতো আচরণ করতে থাকল এবং কিছুতেই শরীরের বাকি অংশের কথা শুনল না। কেমন হয়, যদি তাকে কান ধরে সিধে করা যেত? ডাক্তারবাবু যেমন বলবেন, বাধ্য ছেলেটি হয়ে এমনকি ক্যানসার কোষও সেই কথা মানত?

কষ্টকল্পনা মনে হচ্ছে? একদম ঠিক ভেবেছেন। কিন্তু অপ্টোজেনেটিক্স ঠিক সেই সম্ভাবনার দরজাই খোলার চেষ্টা করছে। 

অপ্টোজেনেটিক্স। অর্থাৎ অপটিক্স আর জেনেটিক্সের মেলবন্ধন।

কোষের নিউক্লিয়াসে যে ডিএনএ থাকে - কোষের ক্রিয়াকলাপ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন প্রোটিনের মাধ্যমে, কোন্‌ প্রোটিন তৈরী হবে সেই চিঠিটি আদতে আরএনএ এবং সেই চিঠি লেখা হয় ডিএনএ-র আদল অনুসারে - অর্থাৎ কোষের ক্রিয়াকলাপের মূল বলতে ডিএনএ - সেই ডিএনএ-র মধ্যে যদি এমন বার্তা ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, যাতে তা বিশেষ আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরী করবে, যে প্রোটিন তৈরী হওয়ার পর কোষটিকেই বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে স্রেফ আলোকরশ্মি দ্বারা? আবার নিয়ন্ত্রণ এমন নিখুঁত ও নিপুণ হবে যাতে উদ্দিষ্ট কোষটি বাদে আর কোনও কোষ, এমনকি পাশের কোষটিরও, ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না? হ্যাঁ, অপ্টোজেনেটিক্স ঠিক এই কাজটাই সম্ভব করে ফেলেছে।

শুরুটা হয়েছিল নিউরোসায়েন্স দিয়ে। কিছু নার্ভকোষের মধ্যে আলাদা করে আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরীর ব্যবস্থা করে বিশেষ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো দিয়ে সংশ্লিষ্ট কোষকে জাগিয়ে তোলা। গত শতকের শেষ দিক অব্দিও কাজটা অসম্ভব মনে হতো - কিন্তু বিগত তিন-চার দশকে মলিকিউলার বায়োলজি ও জেনেটিক্সের গবেষণা এতদূর এগিয়েছে যে এখন এ কাজ খুবই সম্ভব, ইন ফ্যাক্ট গবেষণাগারে কাজটা সম্ভব হয়ে গিয়েছে দুই দশকেরও বেশী সময় আগেই।

অপ্টোজেনেটিক্সের সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে বিপুল গবেষণা চলছে ক্যানসার-গবেষণার প্রতি ক্ষেত্রেই। ক্যানসার কীভাবে হয়, কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়ে, কীভাবে ক্যানসারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কীভাবে ক্যানসার-আক্রান্ত কোষকে আর পাঁচটা সুস্থ কোষের থেকে আলাদা করে চেনা যায়, পাশের সুস্থ কোষদের বাঁচিয়ে আক্রান্ত কোষটিকে কীভাবে ধ্বংস করা যায় - অপ্টোজেনেটিক্স প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই।

যেমন ধরুন, ক্যানসার-চিকিৎসার অত্যাধুনিক ইমিউনোথেরাপি। তার অন্যতম একটি ধরন - CAR-T Cell Therapy. বিশেষ এক প্রক্রিয়াজাত শ্বেত রক্তকণিকা দিয়ে রক্তের বিশেষ কিছু ক্যানসারের চিকিৎসা হয়। কিন্তু মুশকিল হলো, রোগাক্রান্ত কোষ মারতে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত রক্তকণিকা যা যা নিঃসরণ ঘটায়, তা হামেশাই বিপদের কারণ হয়ে ওঠে। কেমন হয়, যদি বাইরে থেকে ওই প্রক্রিয়াজাত রক্তকণিকাটিকে প্রয়োজনমতো নিয়ন্ত্রণ করা যায়? বাড়াবাড়ি করলে যদি তাকে বলে দেওয়া যায়, বাপু হে, যথেষ্ট হয়েছে, আপাতত একটু ক্ষান্ত দাও? এই মুহূর্তে অপ্টোজেনেটিক্স সেই গবেষণা করছে!

ক্যানসারের জৈবিক লক্ষণ বা হলমার্ক বলতে যা যা, অপ্টোজেনেটিক্সের প্রয়োগের সম্ভাবনা তার সবকটি ক্ষেত্রেই আছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণা জারি আছে। ক্যানসার কোষের বাড়বাড়ন্ত নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার বেড়ে ওঠার সময় রক্তবাহী নালীর বাড়বাড়ন্ত (যা দ্রুত ক্রমবর্ধমান ক্যানসারকে পুষ্টি জোগায়) তা নিয়ন্ত্রণ, শরীরের এক জায়গা থেকে আরেক অংশে ছড়িয়ে পড়ে সেখানে গুছিয়ে বসার সময় ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কোষের স্বাভাবিক মৃত্যুকে জয় করে ক্যানসার কোষের বাড়তি আয়ুপ্রাপ্তি তা নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার কোষের পরিপাক-বিপাক নিয়ন্ত্রণ, শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ-ব্যবস্থাকে ধোঁকা দেওয়া ক্ষেত্রে ক্যানসার-কোষের পটুত্ব তা নিয়ন্ত্রণ - নিয়ন্ত্রণের প্রতিটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রেই অপ্টোজেনেটিক্সের গবেষণা চলছে।

ও হ্যাঁ, আচমকা এতশত কথা কেন?

Uploaded Image এই বছর তিন বিজ্ঞানীর ঝুলিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার এলো অপ্টোজেনেটিক্স গবেষণার সুবাদে। বিজ্ঞানীদের দুজন, পিটার হেগেম্যান ও জর্জ ন্যাগেল, জার্মানির - একজন, কার্ল ডেইজেরথ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তির হিসেবে তৃতীয়জন একেবারেই তরুণ - বয়স মাত্র চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন। তিনজনের গবেষণা, মূলত, নিউরোসায়েন্স ঘিরে - অপ্টোজেনেটিক্সের প্রাথমিক বিকাশ ও প্রয়োগ ওই ক্ষেত্রেই।

কিন্তু, আগামী দিনে, অদূর ভবিষ্যতে না হলেও অনতিদূর ভবিষ্যতে, ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অপ্টোজেনেটিক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। নিতেই পারে।

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

খুঁত ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

 বিয়ের আগের রাতে পুরোনো অ্যালবামটা খুঁজতে আপুর আলমারি খুলেছিলাম। অ্যালবামের আগে হাতে উঠলো শাড়িটা। আম্মার কিনে দেওয়া কাতান, প্যাকেটের ভেতর তখনো দোকানের ভাঁজে রাখা। সাথের ব্লাউজ পিসটায় কাঁচি পড়েনি।

কাল আমার বিয়ে। আজ রাতে দুনিয়ার কোনো দর্জি কারও ব্লাউজ বানিয়ে দেবে না। হিসাবটা যেকোনো মেয়ে এক পলকে বুঝবে। আপু আমার বিয়েতে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেইনি।
অথচ এই বিয়ের সবকিছু আপুর হাতে গড়া। তারিখ ঠিক হওয়ার পর থেকে ও রাত জেগে এই আয়োজনের কাজ করেছে। কমিউনিটি সেন্টার ঠিক করা থেকে শুরু করে মেনুতে বোরহানি থাকবে কি না, স্টেজে কোন ফুল বসবে, সব ওর ডায়েরিতে লেখা। কে কোন গাড়িতে যাবে, সেই তালিকাও ওর করা। তালিকাটা আমি দেখেছিলাম। খেয়াল করিনি, কোনো গাড়িতেই আপুর নাম নেই।
শাড়িটা আম্মা কিনেছিলেন লুকিয়ে, মিরপুরের বেনারসি পল্লী থেকে। কারণ সেদিন আপু নিজের জন্য কিছুই কেনেনি।
কেনাকাটার দিন আমাদের পুরো দলটা দোকানে দোকানে ঘুরলো। দোকানিরা একটার পর একটা শাড়ি মেলে ধরছিলো। আপু আঙুলে জরির কাজ ছুঁয়ে বলে দিচ্ছিলো কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল। সবার শাড়ি ও-ই বাছলো। আমার বিয়ের লাল কাতানটা আমার কাঁধে ফেলে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে দেখলো, তারপর মুগ্ধ গলায় বললো, এইটাই! আপুর চোখ কখনো ভুল করে না।
কিন্তু দোকানদার যেই ওর দিকে একটা শাড়ি মেলে ধরলো, আপু হাত নেড়ে বললো, আমার তো আছে। খালা পাশ থেকে ফোড়ন কাটলেন, তোর তো সবই কালো, নিশি। কালো পরলে মোটা কম লাগে, না রে?
দোকানটার চারদিকে আয়না। খেয়াল করলাম, আপু এমনভাবে সরে সরে দাঁড়াচ্ছে যেন কোনো আয়নায় ওর মুখ না পড়ে। যে চোখ সবার জন্য ঠিক শাড়িটা এক নজরে চিনে নেয়, সেই চোখ নিজের দিকে আর তাকায় না।
আম্মা আপুর পিঠে আলতো করে হাত রেখে বললেন, মন খারাপ করিস না, মা। তোর জন্যও আল্লাহ কাউরে রাখছে। আপু হাসলো, যেভাবে মানুষ ভুল ঠিকানায় আসা চিঠি ফেরত দেয়।
পাত্রপক্ষ আসা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। শেষের দিকে ওরা ছবি দেখেই খবর পাঠাতো, কিছু মনে করবেন না, মেয়ে একটু বেশি স্বাস্থ্যবতী। আম্মা ধরে নিয়েছিলেন, আপুর সব কষ্ট ওখানেই। আমিও তাই ধরে নিয়েছিলাম। ধরে নেওয়াটা সহজ ছিলো।
অ্যালবামটা পেলাম আলমারির নিচের তাকে। বান্ধবীরা বিয়ের দিনের জন্য একটা ভিডিও বানাচ্ছে, ওদের দুই বোনের ছবি চাই। মেঝেতে বসে পাতা ওল্টাতে লাগলাম।
প্রথম দিকের ছবিগুলোতে আপু সবার সামনে। কোমর ছোঁয়া চুল, হাসলে গালে টোল পড়ে। কোনোটায় কলেজের অনুষ্ঠানে স্টেজে দাঁড়িয়ে গান গাইছে, কোনোটায় আম্মার সেলাই মেশিনে ঝুঁকে আছে। কলেজে পড়ার সময় আপু নিজের ব্লাউজ নিজেই বানাতো। দেখে কেউ বিশ্বাস করতো না যে ওগুলো দর্জির হাতের না।
একটা ছবিতে আপু আমার ছোট্ট হাতে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। ঈদের আগের রাতে ও বলতো, তোর বিয়েতে এমন মেহেদি দিবো, জামাই সারারাত খুঁজেও নিজের নাম পাবে না! অথচ কাল হলুদে আমার হাতে মেহেদি দিলো পার্লারের একটা মেয়ে। আপু সারাটা সন্ধ্যা রান্নাঘরে ডেকচির পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। স্টেজে একবারও উঠলো না।
অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আপু ক্রমশ সরে যেতে লাগলো। প্রথমে ও সরে গেলো ছবির কিনারে, ওড়নাটা পেটের ওপর টেনে দেওয়া। তারপর চলে গেলো কারও কাঁধের আড়ালে। একটা ছবিতে ওর শুধু একটা হাত দেখা যায়। তারপর আর কোথাও নেই।
ফোনের গ্যালারিতেও একই অবস্থা। ঈদ, জন্মদিন, আমার এনগেজমেন্ট, কোনোকিছুর ছবিই বাদ নেই। শুধু আপু নেই। কারণ গত কয়েক বছরের সবগুলো ছবি আপুরই তোলা। ভিডিওগুলোতে আপুকে দেখা যায় না, শুধু ওর গলা শোনা যায়, আরেকটু বাঁয়ে সর, টুনি! হাসি থামাবি না! ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। আমার বিয়ের পুরো আয়োজনটা যে মানুষটা সামলাচ্ছে, সে-ই আমার এখনকার জীবনের কোনো ছবিতে নেই।
অথচ সবকিছু ঘটেছে আমার চোখের সামনেই। কলেজ পেরোনোর কিছুদিন পর থেকে আপুর শরীরটা যেন অন্য কারও হয়ে যেতে লাগলো। আত্মীয়রা গায়ে পড়ে উপদেশ দিতো। প্রত্যেকের কাছে ছিলো ওজন কমানোর একটা করে টোটকা। আপু সবগুলো চেষ্টা করলো। ভাত ছাড়লো, চিনি ছাড়লো, খালি পেটে লেবু, মধু আর মেথি ভেজানো পানি খেলো। ছাদে হাঁটলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ডাক্তারও বদলালো বারবার। কেউ কেউ বলতেন, ওজন কমান, সব ঠিক হয়ে যাবে। যেন কথাটা আপু আগে কখনো শোনেনি! ওষুধের খালি পাতায় ড্রয়ার ভরে গেলো। আপু সব ছাড়লো, শুধু খাঁটি ভালোবাসার মতো ওজনটা ওকে ছাড়লো না।
গোসলখানার ঝাঁঝরিতে দলা পাকানো চুল জমতো। আপুর সিঁথিটা একটু একটু করে চওড়া হচ্ছিলো। ঘাড়ে একটা কালচে দাগ পড়লো। আম্মা ভাবলেন ময়লা। লেবু আর সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ঘাড় লাল করে ফেলতেন, দাগ তবু যেতো না।
একদিন ভুল করে বাথরুমের দরজা খুলে ফেলেছিলাম। আপু চিমটা দিয়ে থুতনির লোম তুলছিলো। আমাকে দেখে এমনভাবে আয়না থেকে মুখ ফেরালো, যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
রাতে ওর ঘুম আসতো না। এলেও দম আটকে ধড়ফড় করে উঠে বসতো।
শেষ যে দাওয়াতে আপু গিয়েছিলো, সেটা ফুপাতো বোনের বিয়ে। কনভেনশন হলের গেট দিয়ে ঢুকতেই এক চাচি গলা চড়িয়ে বললেন, ওমা, নিশি নাকি! তোরে তো চেনাই যায় না! আশেপাশের সবাই ঘুরে তাকালো। আপু সেদিন কিছু না খেয়েই ফিরে এসেছিলো। তারপর আর কোনো দাওয়াতে যায়নি।
স্কুলের বান্ধবীরা রিইউনিয়নের ছবি দিয়ে ক্যাপশনে লিখতো, মিস ইউ নিশি। আপু গ্রুপটা মিউট করে রাখলো। অফিস থেকে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে যেতো, রাতের খাবারও প্লেটে করে নিয়ে যেতো ঘরে। শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলো।
শেষবার দর্জির দোকানে গিয়েছিলো গত ঈদে। দর্জি গলায় ফিতা ঝুলিয়ে জোরে জোরে মাপ বলছিলো। সে মুহূর্তে পাশে বসা মহিলারা হাসছিলো মুখ টিপে। তারপর আপু আর কোনো নতুন জামা বানায়নি। তার কিছুদিন পর দেখলাম, ওর ঘরের আয়নাটা একটা পুরোনো ওড়নায় ঢাকা।
অ্যালবামটা বুকে চেপে আপুর ঘরে গেলাম। ঘরের বাতি নেভানো ছিলো। আপু খাটে বসে ফোন দেখছিলো, মুখে ফোনের নীলচে আলো। রুমের এক কোণায় ওড়না ঢাকা আয়নাটা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো অন্ধকারে ঘোমটা দেওয়া একজন মানুষের মতো।
নরম গলায় বললাম, তোমার ব্লাউজ পিস কাটা হয়নি।
আপু ফোন থেকে চোখ সরালো না। কণ্ঠে কৃত্রিম অনাগ্রহ ফুটিয়ে বললো, বিয়ের দিন বাসা খালি রাখা যায় না। কাউকে তো থাকতে হবে।
আমার গলা কেঁপে গেলো। সবার ছবি তুমি তোলো, হলুদে সবার খাবার তুমি বাড়ো, এখন বাসা পাহারাও তুমি দেবে?
আপু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। অভ্যাসমতো একটা হাত উঠে গেলো ঘাড়ের দাগটার ওপর। তারপর খুব আস্তে বললো, তোর বিয়ের ছবি সারাজীবন থাকবে, টুনি। আমি চাই না বহু বছর পর কেউ অ্যালবাম খুলে জিজ্ঞেস করুক, পাশের মোটা মহিলাটা কে?
এসব তোমার দোষ না, আপু। এটা তো অসুখ।
জানি। ডাক্তারও খটোমটো নাম শুনিয়েছে, পিসিওএস। কিন্তু লোকে তো রিপোর্ট দেখে না রে, শরীর দেখে। রাস্তায় অচেনা মহিলা জিজ্ঞেস করে, কয় মাস চলছে? অথচ ডাক্তার বলেছে, বাচ্চা হতেও ঝামেলা হতে পারে। যে শরীরে বাচ্চা আসবে কি না ঠিক নেই, লোকে সেই শরীর দেখে বাচ্চার খবর নেয়।
আপু ফোনটা বালিশের পাশে উপুড় করে রাখলো। ক্লান্ত গলায় বললো, রোজ সকালে নিজের শরীরের সাথে একটা যুদ্ধ হয় রে। রোজ আমি হারি। হারার পর কেউ স্টেজে উঠে দাঁড়ায়, বল? প্রথমে ভাবতাম, একটু শুকালেই আবার সবার সামনে যাবো। শুধু এই দাওয়াতটা বাদ দিই, শুধু এই ছবিটা। ওজন কমলো না। কিন্তু বাদ দেওয়াটা অভ্যাস হয়ে গেলো। বাদ দিতে দিতে একদিন দেখি, নিজেকেই বাদ দিয়ে ফেলেছি। আম্মা ভাবে আমার কষ্ট বিয়ে নিয়ে। বিয়ে তো অনেক পরের কথা রে। আমি তো নিজের সাথেই থাকতে পারি না।
আমি অ্যালবামটা আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরলাম।


অথচ এই কষ্টে আমাদের হাতও কম নেই। আমার এনগেজমেন্টের দিন ফোনটা আমি নিজেই ওর হাতে দিয়ে বলেছিলাম, তুমি তোলো, তোমার ছবি তোলার হাত ভালো। আপু হেসে ফোনটা নিয়েছিলো। আমরা সবাই মিলে ওকে ক্যামেরার পেছনে দাঁড় করিয়েছি, তারপর ভুলে গেছি যে ও ছবিতে নেই।
আমি মেঝেতে বসে ছোটবেলার মতো আপুর হাঁটুতে মাথা রাখলাম। আপুর আঙুলগুলো আলগোছে আমার চুলে নামলো। ফিসফিস করে বললো, কাল তোকে খুব সুন্দর লাগবে, টুনি।
শাড়িটা ওর কোলের ওপর রেখে বললাম, জোর করবো না, আপু। শুধু একটা কথা বলি। তুমি না থাকলে আমার বিয়ের ছবিগুলো হয়তো সুন্দর হবে। কিন্তু সত্যি হবে না।
আপু কিছু বললো না। শুধু শাড়ির জরির পাড়ে একবার আঙুল বোলালো। আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম।
বিয়ের আগের রাতে কোনো মেয়ের ঘুম আসে না। আমারও এলো না। অনেক রাতে আপুর দরজা খোলার শব্দ পেলাম। কেউ পা টিপে টিপে স্টোররুমের দিকে গেলো। পুরোনো কপাটটা ক্যাঁচ করে উঠলো।
ফজরের আজানের একটু আগে পাশের ঘর থেকে শব্দটা ভেসে এলো। আম্মার পুরোনো সেলাই মেশিনটা চলছে। আমি উঠে দেখতে গেলাম না।
মেশিনটা মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিলো। তারপর আবার চলছিলো।
খুঁত
তাইমুর মাহমুদ শমীক
২৯/৯/২০২৬