শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

খিস্তি ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

"খিস্তি” শব্দটির ভিতরেই কীরকম একটি অনেক না-বলা ব্যঞ্জনা রহিয়াছে। খানিক নিষিদ্ধতা, খানিক ভীতি, খানিক ক্রোধ এবং যৎপরোনাস্তি ঘৃণা―এই সমস্ত কিছু মিলিত হইয়াই বোধহয় একেকটি বিশেষ শব্দ অসাধারণ অর্থবহ হইয়া উঠে এবং যেকোন মানুষের কর্ণপটহে তথা মানসসাগরে নিদারুণ যাতনা সৃষ্টি করিতে সমর্থ হয়। কিন্তু সত্যই কি তাই? নাকি সময়, অবস্থান, মানসিকতা এবং ব্যক্তিবিশেষে কোন একটি শব্দের অর্থের তারতম্য ঘটে?

সর্বাগ্রে এই আমার কথাই ধরি। 


Uploaded Image

শিশুকাল হইতেই “বইপোকা” হইবার সুবাদে তথাকথিত বড়দের, অতি-বড়দের বই-ও পড়িয়া ফেলিয়াছিলাম। পীতাভ, শুভ্র বা নীলাভ, বই পড়িবার ক্ষেত্রে কোনরূপ বর্ণবৈষম্য না থাকার ফলে আমি জাগতিক প্রায় সমস্ত রকম চলতি অশ্রাব্য গালিগালাজ সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করিয়া ফেলিয়াছিলাম অল্প বয়সেই। তথাপি মুশকিল ছিল যে কিছুতেই একটি অশালীন শব্দ ও আমার মুখ গহ্বর হইতে নির্গত হইতে চাহিত না। মনে মনে ভাবিতাম, বলিব, এই বার ঠিক বলিব, তথাপি কার্যকাল উপস্থিত হইলে কোন্‌ বারাঙ্গনার সন্তান যে আমার কণ্ঠরোধ করিয়া ফেলিত তাহা ভাবিয়া পাইতাম না। শুধু যে বলিবার সমস্যা ছিল তাহা নহে, কেহ কু-বাক্য উচ্চারণ করিলেও রীতিমতন শিহরিয়া উঠিতাম। এমতবস্থায়, এক সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায় এক বালক-বন্ধু ইতিহাসে পঁচিশে পাঁচ পাইল এবং সমস্ত সম্পর্কের মাতা-ভগিনী করিয়া শিক্ষিকাকে 'শ্যালিকা' সম্বোধন করিয়া বসিল। আমি যথারীতি চমকাইয়া উঠিয়া তাহাকে নিরস্ত করিবার চেষ্টা করিতেই বিকট মুখব্যাদান করিয়া আমাকে ভ্যাংচাইয়া আমার প্রাপ্ত পূর্ণমানের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনপূর্বক সে আমাকে জানাইল যে এরূপ সম্বোধনই শিক্ষিকার প্রাপ্য, এবং যেহেতু ইহাতে আমার একটিও যৌনকেশ উৎপাটিত হইতেছে না সেহেতু নীরবতা পালনই আমার পক্ষে শ্রেয়!

অদ্যপি সকলেই জ্ঞাত আছেন যে বাঙালী নারী কদাচ এরূপ বাচালতা সহ্য করে না। সুতরাং আমিও ক্রোধে অন্ধ হইয়া, সমস্তরকম শিষ্টতা বিসর্জন দিয়া ‘মূর্খ -সঙ্গমকারী’ বলিয়া তাহার হাত মোচড়াইয়া দিয়া দ্রুতপদে সেই স্থান ত্যাগ করিলাম। বালক-বন্ধুটি বিস্ময়াহত হইয়া স্থাণুবৎ হইয়া রহিল। “আমি তখন নবম শ্রেণী”।

সেই শুরু।

তাহার পর কলিকাতার রাজপথ দিয়া বহু মল প্রবাহিত হইয়াছে। আমিও প্রচুর বসন্ত পার হইয়া আসিয়াছি। মাতা ঠাকুরানী যাহা ছিলেন এবং মাতা ঠাকুরানী যাহা হইয়াছেন― তাহার মধ্যে সহস্র যোজন ব্যবধান। অদ্য নানাবিধ কু-বাক্য অনায়াসে উচ্চারণ করিতে পারি এবং কী আশ্চর্যের ব্যাপার, এতটুকু পাপবোধ হয় না। 
শুধুমাত্র তাহাই নহে, উপরোক্ত শব্দাবলী আর তদ্রূপ অশালীন বলিয়াও বোধ হয় না। অবশ্য বহু ব্যবহারে তরবারির শাণিত ফলা'র তীক্ষ্ণতাও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, আর ইহা তো নিতান্তই আমার নিজস্ব শালীনতা বোধ!

যাহা হউক, এক্ষণে গৌরচন্দ্রিকা যথেষ্ট হইয়াছে, পূর্বোক্ত আলোচনায় ফিরি। “খিস্তি”, এক অর্থে প্রকৃত সাম্যবাদের প্রবক্তা। যে খিস্তিসকল তথাকথিত নগণ্য রিক্‌শাওয়ালা, স্বেদবিন্দু মুছিতে মুছিতে দিয়া থাকেন, সেই একই ভাষা আপনি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রকোষ্ঠে বসিয়া আপনার ঊর্ধতন কর্মচারীর প্রতি প্রয়োগ করেন। 
বলাই বাহুল্য, যে catharsis-ও অভিন্ন দুই ক্ষেত্রেই। 
আবার, সামান্য দুইটাকা খুচরা না দিতে পারার হেতু অটো ওয়ালা যে মুহূর্তে আপনার চৌদ্দ গুষ্টির গুহ্যদ্বারের একশত আট করিতে থাকেন, তখন যেরূপ মনোবেদনা বোধ করেন, সেই একই বাক্য যখন কোন বন্ধুবর প্রয়োগ করে তখন সেরূপ প্রবল প্রসববেদনা হয় না। ইহার কারণ প্রথমেই উল্লেখ করিয়াছি, ব্যক্তি ও স্থানবিশেষে একই খিস্তির বিভিন্ন অর্থ হইয়া থাকে এবং মনোজগতে তার প্রভাবও ভিন্ন।

একটি উদাহরণ রাখিতেছি; আমার পরম পূজনীয় পতিদেবের এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধু, যিনি উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে অতি সম্মাননীয়, তাঁহার একটি মহৎ দোষ হইল যে হলাহল-সম আসব সামান্য অধিক পরিমাণে পান করিবার পর তিনি কিঞ্চিৎ অস্থির হইয়া পড়েন এবং তখন তাঁহার বাক্যাবলীর মধ্যে পুরুষের প্রধান অঙ্গটির (অধিকাংশ পুরুষের মতানু্যায়ী উহাই তাহাদের প্রধান অঙ্গ, মস্তিষ্ক নহে ) একটি চলিত রূপের প্রয়োগ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাইয়া থাকে।

অপর এক বন্ধুর নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে কয়েক বৎসর পূর্বে আমার পতিদেব, এবং উল্লিখিত বন্ধুটি তাঁহার গৃহে গমন করেন। উষ্ণ পানীয় সমাপনান্তে যেক্ষণে সকলেই আহারাদিতে ব্যস্ত এবং বন্ধুর মাতৃদেবী স্বয়ং তদারকিতে, সেক্ষণে ইনি হঠাৎ বিগলিত হইয়া গদ্গদ কন্ঠে বলিয়া উঠিয়াছিলেন, (পাঠকের বোধের সুবিধার্থে হুবহু প্রতিলিপি দেওয়া হইল) ,”মাসিমা, বাঁআ, মাংসটা যা বানিয়েছেন বাঁআ, ওঃ, বহুদিন পরে বাঁআ এমন মাংস খেলাম”।

ইহা শ্রবণ করিয়াও ‘মাসিমা’ র হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যে সহসা স্তব্ধ হইয়া যায় নাই, ইহাতেই প্রমাণ হয় যে এই কলিকালেও ভগবান আধা-জাগ্রত অবস্থায় বিরাজমান। ইহাতে আরো প্রমাণ হয় যে কথার মাত্রা হিসেবে, শুধুমাত্র নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশের নিমিত্তও কোন কোন সময় খিস্তি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যাঁহারা এরূপ করিয়া থাকেন, কাহাকেও মানসিক আঘাত দিবার জন্য নহে, শুধুমাত্র অভ্যাসের বশেই বলিয়া ফেলেন।

যাহা হউক, আরো একটি ব্যাপার হইল যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার কারণে নারীজাতির অবমাননা করা হয় খিস্তির মাধ্যমে। 
ইহার তেমন কোনো উপশম নাই। কারণ সামাজিকভাবে নারী আজও বেশিরভাগক্ষেত্রেই দুর্বল (সোশ্যাল মিডিয়ার চমকধমক দেখিয়া বাড় ভক্ষণ করিবেন না; উহা শোরুম। আমি গোডাউনের কথা বলিতেছি) হিসেবে পরিগণিত। 
আর, দুর্বলের উপর সবলের আধিপত্য, সে তো ব্যাদ-কোরআন-বাইবেল সর্বত্র।

(পূর্ব প্রকাশিত)

মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

বেরসিক ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার স্ত্রী রসিকতা বোঝে না। কথাটা এখন আমাদের পুরো ফ্রেন্ডসার্কেল জানে।

অথচ বছরখানেক আগেও সবাই বলতো, নিয়াজ, তোর বউয়ের মতো ডায়নামিক মেয়ে হয় না। যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে জানে। আমি গর্বে বুক ফুলিয়ে বলতাম, মৌরির মতো ম্যাচিওর মেয়ে লাখে একটা মেলে।

মজার ব্যাপার হলো, কনে দেখার দিন মৌরির একটা কথায় আমাদের পুরো পরিবার হেসে উঠেছিলো। ফেরার পথে আম্মা বলেছিলেন, মেয়ের মুখে খই ফোটে, বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। হয়েও ছিলো তাই। 

আমি মানুষটা খারাপ না। এক যুগের সংসারে কোনোদিন মৌরির গায়ে হাত তুলিনি। প্রত্যেক ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে কিছু না কিছু গয়না দেই। বছরে কক্সবাজার নিয়ে যাই অন্তত একবার। বন্ধুরা বলে, নিয়াজের মতো বর পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। মৌরিকে আমি ভালোবাসি না, এ কথা আমার শত্রুও বলতে পারবে না। আমি শুধু একটু রসিক মানুষ। আড্ডায় আমি না থাকলে কিছু জমে না ঠিকঠাক। 

আমার সবচেয়ে জনপ্রিয় জোকটা মৌরিকে নিয়ে। প্রথম বলেছিলাম বউভাতের দিন। বন্ধুরা মৌরির রূপের প্রশংসা করছিলো। আমি হেসে বললাম, বউ দেখে বিয়ে করছি রে, বুদ্ধি দেখে না। মেয়েমানুষের বুদ্ধি তো থাকে হাঁটুতে! সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। ঘোমটার ভেতর থেকে মৌরিও হাসলো।

বিয়ের প্রথম বছর মৌরি একবার রাতে বলেছিলো, জোকটা আমার ভালো লাগে না। আমি বুঝিয়ে বললাম, তুমি এতো সেনসিটিভ কেন? রসিকতা না বুঝলে লোকে ব্যাকডেটেড বলবে। মৌরি আর কোনোদিন কিছু বলেনি। বললাম না, ও ম্যাচিওর মেয়ে।  

তারপর থেকে জোকটা আমার ট্রেডমার্ক হয়ে গেলো। কোনো দাওয়াতে কেউ মৌরিকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমি বলতাম, ওকে জিজ্ঞেস করে লাভ নাই, ওর বুদ্ধি তো হাঁটুতে! মৌরি হাসতো। কখনো আমার কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে বলতো, হ্যাঁ, সেটাই। ভাবিরা বলতো, ভাবি স্পোর্টিং মেন্টালির! একটুও রাগ করে না। কেউ কেউ ওর কানে কানে বলতো, আপনি কতো লাকি, নিয়াজ ভাই কতো হাসিখুশি মানুষ!

একবার আমার অফিসের পার্টিতে বস মৌরিকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাবি কী নিয়ে পড়াশোনা করেছেন? মৌরি মুখ খোলার আগেই আমি বললাম, স্যার, ও পড়েছে কিচেন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। মেজর ইন পেয়াজ-হলুদ, মাইনর ইন লবণ-মরিচ! বস হেসে কুটিকুটি ততোক্ষণে। শুধু বসের স্ত্রী হাসেননি, এক পলক মৌরির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ভদ্রমহিলা একটু গম্ভীর টাইপ।

সেই রাতে ফেসবুকে মৌরিকে নিয়ে একটা মজার পোস্টও দিলাম। হাজারখানেক হা হা পড়লো। মৌরিও একটা হা হা দিয়েছিলো।

শুনেছি মৌরি নাকি অনার্সে অঙ্কে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলো। বিয়ের সময় একটা ব্যাংকে চাকরির সাড়াও পেয়েছিলো। আম্মা চাইছিলেন বউ ঘরে থাকুক। আমি জোর করিনি, মৌরি নিজেই রাজি হলো। বললাম না, ম্যাচিওর মেয়ে।

সংসারের হিসাবটাও ও-ই রাখে। মাস শেষে একটা টাকাও এদিক ওদিক হয় না। কীভাবে মেইন্টেইন করে সব, আমি জানি না, জানার দরকারও পড়েনি। গতবার আমার ট্যাক্স রিটার্নে কনসালট্যান্ট একটা বড় ভুল করেছিলো, মৌরি কীভাবে যেন ধরে ফেললো! কপালজোরে মিলে গেছে আরকি। সত্যি বলতে, আমার মোজা জোড়া কোথায় থাকে, সেটাও মৌরি ছাড়া কেউ জানে না। বিকেলে পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চারা ওর কাছে অঙ্ক করতে আসে। আমি ঠা ঠা করে হেসে বলি, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো! 

শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও জোকটা বাদ দিতাম না। শ্বশুর সাহেব একবার গর্ব করে বলেছিলেন, আমার মেয়ে কিন্তু অঙ্কে সবসময় ফার্স্ট হতো। আমি হেসে বললাম, আব্বা, সেই অঙ্ক এখন বাজারের হিসাবে এসে ঠেকছে, সেখানেও গোলমাল! শ্বশুর সাহেব আর কিছু বলেননি। মৌরি বাবার দিকে না তাকিয়ে হাসলো।

আম্মা মাঝে মাঝে মৌরির রান্না নিয়ে খোঁটা দিতেন, এই তরকারিতে লবণ দিছো না চিনি? আমি যোগ করতাম, যার বুদ্ধি হাঁটুতে, তার জিভে আর স্বাদ থাকবে কোত্থেকে! আম্মা হাসতেন, আমি হাসতাম, মৌরিও হাসতো। আব্বাও আম্মাকে নিয়ে এমন মজা করতেন, আম্মাও হাসতেন। আমাদের বাড়িতে এটাই নিয়ম।

কিছুদিন হলো খেয়াল করছিলাম, কেউ মৌরিকে কিছু জিজ্ঞেস করলে ও আগে আমার দিকে তাকায়। তারপর বলে, আমি তো জানি না, ওকে জিজ্ঞেস করেন। আমার ভালোই লাগতো। বউ বরকে মান্য করে।

একবার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি, মৌরি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কী হইছে? ও নির্লিপ্ত সুরে বললো, কিছু না, ঘুম আসছে না। আমি পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। মেয়েদের এমন হয়।

ঝামেলাটা শুরু হলো মাসখানেক আগে, রাতের খাবারের টেবিলে। আমাদের মেয়ে আরশি সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। অঙ্ক বই খুলে বসে ছিলো। মৌরি বোঝাতে যেতেই আরশি খিলখিল করে হেসে বললো, আম্মুকে জিজ্ঞেস করে লাভ নাই, আম্মুর বুদ্ধি তো হাঁটুতে!

আমি হাসতে হাসতে প্রায় বিষম খেলাম। মেয়ে একদম বাপের মতো রসিক হয়েছে। মৌরি চামচটা প্লেটে নামিয়ে রেখে অনেকক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ভাত শেষ না করেই উঠে গেলো। আমি ভাবলাম, ওর শরীরটা হয়তো ভালো নেই। আরশি আমার কানে কানে জিজ্ঞেস করলো, বাবা, হাঁটুতে সত্যি বুদ্ধি থাকে? আমি চোখ টিপে বললাম, তোর আম্মুর থাকে! বাপ-বেটি মিলে হাসলাম আরেক দফা। 

তার কয়েকদিন পর জামিলের বাসায় দাওয়াত। সোফায় গাদাগাদি করে বসে ছিলো বন্ধুরা। হাতে হাতে কোকের গ্লাস। জামিলের ছেলেটা একটা লাভ-ক্ষতির অঙ্ক নিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে ঘুরছিলো। মৌরি খাতাটা টেনে নিতেই আমি অভ্যাসমতো বললাম, ওকে দিয়ে কী হবে রে, ওর বুদ্ধি তো হাঁটুতে! ড্রইংরুমভর্তি মানুষ হেসে গড়িয়ে পড়লো। আরশিও সবার দেখাদেখি হাততালি দিয়ে হাসছিলো।

শুধু মৌরি হাসলো না, এক যুগের মাঝে এই প্রথম।

ও চুপচাপ অঙ্কটা কষে খাতাটা ছেলেটার হাতে ফিরিয়ে দিলো। তারপর আমার দিকে না তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললো, এই কথাটায় আমি আর হাসবো না।

ঘরটা হঠাৎ এমন চুপ হয়ে গেলো যে সিলিং ফ্যানের সূক্ষ্ম শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিলো। এতো মানুষের সামনে এমন অপমান আমাকে কেউ কোনোদিন করেনি। জামিলের বউ তাড়াতাড়ি বললো, ভাবি, এটা তো জাস্ট ফান! সোহেল বললো, ভাবি আবার এতো সিরিয়াস হয়ে গেলেন কবে থেকে? আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, দেখছিস? মজাও বোঝে না! সবাই আবার হেসে উঠলো। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

পরে শুনেছি, অঙ্কটা নাকি ঠিকই হয়েছিলো। জামিলের ছেলে ক্লাসে পুরো নম্বর পেয়েছে। সেটা অবশ্য আলাদা কথা।

ফেরার পথে গাড়িতে মৌরি একটা কথাও বললো না। আরশি পেছনের সিটে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। বাসায় ঢুকে বললাম, তুমি আমাকে সবার সামনে ছোট করলে কেন? মৌরি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, আমি তো কিছু করিনি। হাসিনি কেবল। এমনভাবে বললো, যেন হেসে না ওঠাটা কোনো অপরাধই না! 

শ্লেষমাখানো কন্ঠে বললাম, এক যুগ তো হাসলে, আজ হঠাৎ কী হলো? মৌরি বললো, আজ আরশি দেখছিলো। শুনে আমি হাসির দমক নিয়ন্ত্রণ করলাম। বাচ্চারা তো হাসবেই, ওরা কী বোঝে?

একটা মজাকে মৌরি তিল থেকে তাল বানিয়ে ফেললো। খবরটা আম্মার কানেও গেলো। আম্মা বললেন, বর একটু মজা করছে, তাতে এতো কী! আমরা কী কম সহ্য করছি? মৌরির মা-ও ফোনে বললেন, জামাই তো আর মারধর করে না, মা। মানিয়ে নে। সোহেল ফোন করে বললো, দোস্ত, বউরে একটু টাইট দে, নাইলে মাথায় উঠবো। অফিসের এক কলিগ বললো, আজকালকার মেয়েরা সব কথাতেই অপমান খুঁজে পায়, ভাই। বন্ধুদের স্ত্রীরা বলাবলি করলো, ভাবি নাকি আজকাল ফেমিনিস্ট হইছে, ফেসবুকে সস্তা রিলস দেইখা মাথাটা গেছে।

এরপর থেকে মৌরি আর দাওয়াতে যায় না। আমি একা যাই। সবাই জিজ্ঞেস করে, ভাবি কই? আমি বলি, উনি আজকাল খুব সেনসিটিভ, নিরীহ রসিকতা নিতে পারেন না! সবাই হাসে। কেউ কেউ বলে, তোর বউ এতো অসামাজিক হয়ে গেলো কবে রে? আমিও বুঝি না। যে মেয়ে এক যুগ ধরে সব হেসে উড়িয়ে দিলো, সে হঠাৎ এতো ইম্যাচিওর হলো কীভাবে? আপনারাই বলেন, একটা মজার জন্য কেউ এভাবে মুখ ভার করে থাকে?

মৌরি ইদানীং আবার পাড়ার একটা স্কুলে অঙ্কের ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। বন্ধুদের বললাম, যার বুদ্ধি হাঁটুতে, সে নাকি এখন অন্যের ছেলেমেয়েকে অঙ্ক শেখাবে! সবাই হাসলো প্রাণখুলে। রাতে আরশিকে ঘুম পাড়ানোর সময় মৌরি ফিসফিস করে কী যেন বলে, আমি কাছে গেলে চুপ করে যায়। একদিন শুনে ফেললাম, সে বলছে, বুদ্ধি থাকে মাথায়, মা। কেউ অন্য কিছু বললে হাসবি না। মেয়ের মাথায় এসব কী ঢুকাচ্ছে, কে জানে! Uploaded Image

গত বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ফিরে দেখি, ফ্ল্যাট অন্ধকার। আরশির স্কুলব্যাগটা নেই, মৌরির আলমারির একটা পাল্লা হাট করে খোলা। ফ্রিজের গায়ে আরশির আঁকা ছবিটা তখনো সাঁটানো, তিনজন মানুষ, তিনজনই হাসছে। ডাইনিং টেবিলে লবণদানির নিচে একটা চিরকুট।

গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, আরশিকে নিয়ে গেলাম। ও যেন বড় হয়ে না শেখে, অপমান হজম করার আরেক নাম ম্যাচিওরিটি।

নিচে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আরেকটা লাইন। তুমি তো বলতে আমার বুদ্ধি হাঁটুতে। আজ হাঁটু দুটো কাজে লাগালাম, হেঁটে চলে গেলাম।

চিরকুটটার ছবি তুলে সোহেলকে পাঠালাম। সোহেল লিখলো, হা হা হা! দোস্ত, ভাবি তো দেখি সেই লেভেলের জোক মারছে!

চেয়ারটা টেনে বসে পড়লাম। চিরকুটটা আমি অনেকবার পড়লাম। বিয়ের পর এই প্রথম মৌরি আমাকে নিয়ে একটা জোক করলো।

আমি হাসতে পারলাম না চিরাচরিত হাত-পা ছড়ানো সেই নির্ভার ভঙ্গিতে। 

বেরসিক  
তাইমুর মাহমুদ শমীক 
৫/১০/২০২৬

সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

অপটোজেনেটিক্স ~ ডাঃ বিষান বসু

অত্যাধুনিক যন্ত্র বা রোবটের ক্রিয়াকলাপের দুটো অংশ থাকে। সেনসর আর অ্যাকচুয়েটর। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির খবর আসে সেনসরের মাধ্যমে - আর যন্ত্র সেই খবর অনুযায়ী কাজ করে অ্যাকচুয়েটরের মাধ্যমে। জীবের কোষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা একই।

যন্ত্রের ক্ষেত্রে তার ক্রিয়াকলাপ আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, কোষের ক্ষেত্রে পারি না। কোষের কাজকর্ম বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তো বটেই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেয়াড়া দেহকোষ এমন কাজকর্ম করে যাতে সংশ্লিষ্ট প্রাণীটিই বিপদে পড়ে যায়। 

ক্যানসার কোষের কথাই ধরুন না - শরীরের নিজেরই একখানা কোষ এমন বিগড়ে গেল যে সে আর পাঁচটা কোষের কথা না ভেবে সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালখুশিমতো আচরণ করতে থাকল এবং কিছুতেই শরীরের বাকি অংশের কথা শুনল না। কেমন হয়, যদি তাকে কান ধরে সিধে করা যেত? ডাক্তারবাবু যেমন বলবেন, বাধ্য ছেলেটি হয়ে এমনকি ক্যানসার কোষও সেই কথা মানত?

কষ্টকল্পনা মনে হচ্ছে? একদম ঠিক ভেবেছেন। কিন্তু অপ্টোজেনেটিক্স ঠিক সেই সম্ভাবনার দরজাই খোলার চেষ্টা করছে। 

অপ্টোজেনেটিক্স। অর্থাৎ অপটিক্স আর জেনেটিক্সের মেলবন্ধন।

কোষের নিউক্লিয়াসে যে ডিএনএ থাকে - কোষের ক্রিয়াকলাপ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন প্রোটিনের মাধ্যমে, কোন্‌ প্রোটিন তৈরী হবে সেই চিঠিটি আদতে আরএনএ এবং সেই চিঠি লেখা হয় ডিএনএ-র আদল অনুসারে - অর্থাৎ কোষের ক্রিয়াকলাপের মূল বলতে ডিএনএ - সেই ডিএনএ-র মধ্যে যদি এমন বার্তা ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, যাতে তা বিশেষ আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরী করবে, যে প্রোটিন তৈরী হওয়ার পর কোষটিকেই বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে স্রেফ আলোকরশ্মি দ্বারা? আবার নিয়ন্ত্রণ এমন নিখুঁত ও নিপুণ হবে যাতে উদ্দিষ্ট কোষটি বাদে আর কোনও কোষ, এমনকি পাশের কোষটিরও, ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না? হ্যাঁ, অপ্টোজেনেটিক্স ঠিক এই কাজটাই সম্ভব করে ফেলেছে।

শুরুটা হয়েছিল নিউরোসায়েন্স দিয়ে। কিছু নার্ভকোষের মধ্যে আলাদা করে আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরীর ব্যবস্থা করে বিশেষ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো দিয়ে সংশ্লিষ্ট কোষকে জাগিয়ে তোলা। গত শতকের শেষ দিক অব্দিও কাজটা অসম্ভব মনে হতো - কিন্তু বিগত তিন-চার দশকে মলিকিউলার বায়োলজি ও জেনেটিক্সের গবেষণা এতদূর এগিয়েছে যে এখন এ কাজ খুবই সম্ভব, ইন ফ্যাক্ট গবেষণাগারে কাজটা সম্ভব হয়ে গিয়েছে দুই দশকেরও বেশী সময় আগেই।

অপ্টোজেনেটিক্সের সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে বিপুল গবেষণা চলছে ক্যানসার-গবেষণার প্রতি ক্ষেত্রেই। ক্যানসার কীভাবে হয়, কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়ে, কীভাবে ক্যানসারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কীভাবে ক্যানসার-আক্রান্ত কোষকে আর পাঁচটা সুস্থ কোষের থেকে আলাদা করে চেনা যায়, পাশের সুস্থ কোষদের বাঁচিয়ে আক্রান্ত কোষটিকে কীভাবে ধ্বংস করা যায় - অপ্টোজেনেটিক্স প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই।

যেমন ধরুন, ক্যানসার-চিকিৎসার অত্যাধুনিক ইমিউনোথেরাপি। তার অন্যতম একটি ধরন - CAR-T Cell Therapy. বিশেষ এক প্রক্রিয়াজাত শ্বেত রক্তকণিকা দিয়ে রক্তের বিশেষ কিছু ক্যানসারের চিকিৎসা হয়। কিন্তু মুশকিল হলো, রোগাক্রান্ত কোষ মারতে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত রক্তকণিকা যা যা নিঃসরণ ঘটায়, তা হামেশাই বিপদের কারণ হয়ে ওঠে। কেমন হয়, যদি বাইরে থেকে ওই প্রক্রিয়াজাত রক্তকণিকাটিকে প্রয়োজনমতো নিয়ন্ত্রণ করা যায়? বাড়াবাড়ি করলে যদি তাকে বলে দেওয়া যায়, বাপু হে, যথেষ্ট হয়েছে, আপাতত একটু ক্ষান্ত দাও? এই মুহূর্তে অপ্টোজেনেটিক্স সেই গবেষণা করছে!

ক্যানসারের জৈবিক লক্ষণ বা হলমার্ক বলতে যা যা, অপ্টোজেনেটিক্সের প্রয়োগের সম্ভাবনা তার সবকটি ক্ষেত্রেই আছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণা জারি আছে। ক্যানসার কোষের বাড়বাড়ন্ত নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার বেড়ে ওঠার সময় রক্তবাহী নালীর বাড়বাড়ন্ত (যা দ্রুত ক্রমবর্ধমান ক্যানসারকে পুষ্টি জোগায়) তা নিয়ন্ত্রণ, শরীরের এক জায়গা থেকে আরেক অংশে ছড়িয়ে পড়ে সেখানে গুছিয়ে বসার সময় ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কোষের স্বাভাবিক মৃত্যুকে জয় করে ক্যানসার কোষের বাড়তি আয়ুপ্রাপ্তি তা নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার কোষের পরিপাক-বিপাক নিয়ন্ত্রণ, শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ-ব্যবস্থাকে ধোঁকা দেওয়া ক্ষেত্রে ক্যানসার-কোষের পটুত্ব তা নিয়ন্ত্রণ - নিয়ন্ত্রণের প্রতিটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রেই অপ্টোজেনেটিক্সের গবেষণা চলছে।

ও হ্যাঁ, আচমকা এতশত কথা কেন?

Uploaded Image এই বছর তিন বিজ্ঞানীর ঝুলিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার এলো অপ্টোজেনেটিক্স গবেষণার সুবাদে। বিজ্ঞানীদের দুজন, পিটার হেগেম্যান ও জর্জ ন্যাগেল, জার্মানির - একজন, কার্ল ডেইজেরথ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তির হিসেবে তৃতীয়জন একেবারেই তরুণ - বয়স মাত্র চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন। তিনজনের গবেষণা, মূলত, নিউরোসায়েন্স ঘিরে - অপ্টোজেনেটিক্সের প্রাথমিক বিকাশ ও প্রয়োগ ওই ক্ষেত্রেই।

কিন্তু, আগামী দিনে, অদূর ভবিষ্যতে না হলেও অনতিদূর ভবিষ্যতে, ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অপ্টোজেনেটিক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। নিতেই পারে।

বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

খুঁত ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

 বিয়ের আগের রাতে পুরোনো অ্যালবামটা খুঁজতে আপুর আলমারি খুলেছিলাম। অ্যালবামের আগে হাতে উঠলো শাড়িটা। আম্মার কিনে দেওয়া কাতান, প্যাকেটের ভেতর তখনো দোকানের ভাঁজে রাখা। সাথের ব্লাউজ পিসটায় কাঁচি পড়েনি।

কাল আমার বিয়ে। আজ রাতে দুনিয়ার কোনো দর্জি কারও ব্লাউজ বানিয়ে দেবে না। হিসাবটা যেকোনো মেয়ে এক পলকে বুঝবে। আপু আমার বিয়েতে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেইনি।
অথচ এই বিয়ের সবকিছু আপুর হাতে গড়া। তারিখ ঠিক হওয়ার পর থেকে ও রাত জেগে এই আয়োজনের কাজ করেছে। কমিউনিটি সেন্টার ঠিক করা থেকে শুরু করে মেনুতে বোরহানি থাকবে কি না, স্টেজে কোন ফুল বসবে, সব ওর ডায়েরিতে লেখা। কে কোন গাড়িতে যাবে, সেই তালিকাও ওর করা। তালিকাটা আমি দেখেছিলাম। খেয়াল করিনি, কোনো গাড়িতেই আপুর নাম নেই।
শাড়িটা আম্মা কিনেছিলেন লুকিয়ে, মিরপুরের বেনারসি পল্লী থেকে। কারণ সেদিন আপু নিজের জন্য কিছুই কেনেনি।
কেনাকাটার দিন আমাদের পুরো দলটা দোকানে দোকানে ঘুরলো। দোকানিরা একটার পর একটা শাড়ি মেলে ধরছিলো। আপু আঙুলে জরির কাজ ছুঁয়ে বলে দিচ্ছিলো কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল। সবার শাড়ি ও-ই বাছলো। আমার বিয়ের লাল কাতানটা আমার কাঁধে ফেলে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে দেখলো, তারপর মুগ্ধ গলায় বললো, এইটাই! আপুর চোখ কখনো ভুল করে না।
কিন্তু দোকানদার যেই ওর দিকে একটা শাড়ি মেলে ধরলো, আপু হাত নেড়ে বললো, আমার তো আছে। খালা পাশ থেকে ফোড়ন কাটলেন, তোর তো সবই কালো, নিশি। কালো পরলে মোটা কম লাগে, না রে?
দোকানটার চারদিকে আয়না। খেয়াল করলাম, আপু এমনভাবে সরে সরে দাঁড়াচ্ছে যেন কোনো আয়নায় ওর মুখ না পড়ে। যে চোখ সবার জন্য ঠিক শাড়িটা এক নজরে চিনে নেয়, সেই চোখ নিজের দিকে আর তাকায় না।
আম্মা আপুর পিঠে আলতো করে হাত রেখে বললেন, মন খারাপ করিস না, মা। তোর জন্যও আল্লাহ কাউরে রাখছে। আপু হাসলো, যেভাবে মানুষ ভুল ঠিকানায় আসা চিঠি ফেরত দেয়।
পাত্রপক্ষ আসা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। শেষের দিকে ওরা ছবি দেখেই খবর পাঠাতো, কিছু মনে করবেন না, মেয়ে একটু বেশি স্বাস্থ্যবতী। আম্মা ধরে নিয়েছিলেন, আপুর সব কষ্ট ওখানেই। আমিও তাই ধরে নিয়েছিলাম। ধরে নেওয়াটা সহজ ছিলো।
অ্যালবামটা পেলাম আলমারির নিচের তাকে। বান্ধবীরা বিয়ের দিনের জন্য একটা ভিডিও বানাচ্ছে, ওদের দুই বোনের ছবি চাই। মেঝেতে বসে পাতা ওল্টাতে লাগলাম।
প্রথম দিকের ছবিগুলোতে আপু সবার সামনে। কোমর ছোঁয়া চুল, হাসলে গালে টোল পড়ে। কোনোটায় কলেজের অনুষ্ঠানে স্টেজে দাঁড়িয়ে গান গাইছে, কোনোটায় আম্মার সেলাই মেশিনে ঝুঁকে আছে। কলেজে পড়ার সময় আপু নিজের ব্লাউজ নিজেই বানাতো। দেখে কেউ বিশ্বাস করতো না যে ওগুলো দর্জির হাতের না।
একটা ছবিতে আপু আমার ছোট্ট হাতে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। ঈদের আগের রাতে ও বলতো, তোর বিয়েতে এমন মেহেদি দিবো, জামাই সারারাত খুঁজেও নিজের নাম পাবে না! অথচ কাল হলুদে আমার হাতে মেহেদি দিলো পার্লারের একটা মেয়ে। আপু সারাটা সন্ধ্যা রান্নাঘরে ডেকচির পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। স্টেজে একবারও উঠলো না।
অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আপু ক্রমশ সরে যেতে লাগলো। প্রথমে ও সরে গেলো ছবির কিনারে, ওড়নাটা পেটের ওপর টেনে দেওয়া। তারপর চলে গেলো কারও কাঁধের আড়ালে। একটা ছবিতে ওর শুধু একটা হাত দেখা যায়। তারপর আর কোথাও নেই।
ফোনের গ্যালারিতেও একই অবস্থা। ঈদ, জন্মদিন, আমার এনগেজমেন্ট, কোনোকিছুর ছবিই বাদ নেই। শুধু আপু নেই। কারণ গত কয়েক বছরের সবগুলো ছবি আপুরই তোলা। ভিডিওগুলোতে আপুকে দেখা যায় না, শুধু ওর গলা শোনা যায়, আরেকটু বাঁয়ে সর, টুনি! হাসি থামাবি না! ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। আমার বিয়ের পুরো আয়োজনটা যে মানুষটা সামলাচ্ছে, সে-ই আমার এখনকার জীবনের কোনো ছবিতে নেই।
অথচ সবকিছু ঘটেছে আমার চোখের সামনেই। কলেজ পেরোনোর কিছুদিন পর থেকে আপুর শরীরটা যেন অন্য কারও হয়ে যেতে লাগলো। আত্মীয়রা গায়ে পড়ে উপদেশ দিতো। প্রত্যেকের কাছে ছিলো ওজন কমানোর একটা করে টোটকা। আপু সবগুলো চেষ্টা করলো। ভাত ছাড়লো, চিনি ছাড়লো, খালি পেটে লেবু, মধু আর মেথি ভেজানো পানি খেলো। ছাদে হাঁটলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ডাক্তারও বদলালো বারবার। কেউ কেউ বলতেন, ওজন কমান, সব ঠিক হয়ে যাবে। যেন কথাটা আপু আগে কখনো শোনেনি! ওষুধের খালি পাতায় ড্রয়ার ভরে গেলো। আপু সব ছাড়লো, শুধু খাঁটি ভালোবাসার মতো ওজনটা ওকে ছাড়লো না।
গোসলখানার ঝাঁঝরিতে দলা পাকানো চুল জমতো। আপুর সিঁথিটা একটু একটু করে চওড়া হচ্ছিলো। ঘাড়ে একটা কালচে দাগ পড়লো। আম্মা ভাবলেন ময়লা। লেবু আর সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ঘাড় লাল করে ফেলতেন, দাগ তবু যেতো না।
একদিন ভুল করে বাথরুমের দরজা খুলে ফেলেছিলাম। আপু চিমটা দিয়ে থুতনির লোম তুলছিলো। আমাকে দেখে এমনভাবে আয়না থেকে মুখ ফেরালো, যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
রাতে ওর ঘুম আসতো না। এলেও দম আটকে ধড়ফড় করে উঠে বসতো।
শেষ যে দাওয়াতে আপু গিয়েছিলো, সেটা ফুপাতো বোনের বিয়ে। কনভেনশন হলের গেট দিয়ে ঢুকতেই এক চাচি গলা চড়িয়ে বললেন, ওমা, নিশি নাকি! তোরে তো চেনাই যায় না! আশেপাশের সবাই ঘুরে তাকালো। আপু সেদিন কিছু না খেয়েই ফিরে এসেছিলো। তারপর আর কোনো দাওয়াতে যায়নি।
স্কুলের বান্ধবীরা রিইউনিয়নের ছবি দিয়ে ক্যাপশনে লিখতো, মিস ইউ নিশি। আপু গ্রুপটা মিউট করে রাখলো। অফিস থেকে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে যেতো, রাতের খাবারও প্লেটে করে নিয়ে যেতো ঘরে। শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলো।
শেষবার দর্জির দোকানে গিয়েছিলো গত ঈদে। দর্জি গলায় ফিতা ঝুলিয়ে জোরে জোরে মাপ বলছিলো। সে মুহূর্তে পাশে বসা মহিলারা হাসছিলো মুখ টিপে। তারপর আপু আর কোনো নতুন জামা বানায়নি। তার কিছুদিন পর দেখলাম, ওর ঘরের আয়নাটা একটা পুরোনো ওড়নায় ঢাকা।
অ্যালবামটা বুকে চেপে আপুর ঘরে গেলাম। ঘরের বাতি নেভানো ছিলো। আপু খাটে বসে ফোন দেখছিলো, মুখে ফোনের নীলচে আলো। রুমের এক কোণায় ওড়না ঢাকা আয়নাটা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো অন্ধকারে ঘোমটা দেওয়া একজন মানুষের মতো।
নরম গলায় বললাম, তোমার ব্লাউজ পিস কাটা হয়নি।
আপু ফোন থেকে চোখ সরালো না। কণ্ঠে কৃত্রিম অনাগ্রহ ফুটিয়ে বললো, বিয়ের দিন বাসা খালি রাখা যায় না। কাউকে তো থাকতে হবে।
আমার গলা কেঁপে গেলো। সবার ছবি তুমি তোলো, হলুদে সবার খাবার তুমি বাড়ো, এখন বাসা পাহারাও তুমি দেবে?
আপু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। অভ্যাসমতো একটা হাত উঠে গেলো ঘাড়ের দাগটার ওপর। তারপর খুব আস্তে বললো, তোর বিয়ের ছবি সারাজীবন থাকবে, টুনি। আমি চাই না বহু বছর পর কেউ অ্যালবাম খুলে জিজ্ঞেস করুক, পাশের মোটা মহিলাটা কে?
এসব তোমার দোষ না, আপু। এটা তো অসুখ।
জানি। ডাক্তারও খটোমটো নাম শুনিয়েছে, পিসিওএস। কিন্তু লোকে তো রিপোর্ট দেখে না রে, শরীর দেখে। রাস্তায় অচেনা মহিলা জিজ্ঞেস করে, কয় মাস চলছে? অথচ ডাক্তার বলেছে, বাচ্চা হতেও ঝামেলা হতে পারে। যে শরীরে বাচ্চা আসবে কি না ঠিক নেই, লোকে সেই শরীর দেখে বাচ্চার খবর নেয়।
আপু ফোনটা বালিশের পাশে উপুড় করে রাখলো। ক্লান্ত গলায় বললো, রোজ সকালে নিজের শরীরের সাথে একটা যুদ্ধ হয় রে। রোজ আমি হারি। হারার পর কেউ স্টেজে উঠে দাঁড়ায়, বল? প্রথমে ভাবতাম, একটু শুকালেই আবার সবার সামনে যাবো। শুধু এই দাওয়াতটা বাদ দিই, শুধু এই ছবিটা। ওজন কমলো না। কিন্তু বাদ দেওয়াটা অভ্যাস হয়ে গেলো। বাদ দিতে দিতে একদিন দেখি, নিজেকেই বাদ দিয়ে ফেলেছি। আম্মা ভাবে আমার কষ্ট বিয়ে নিয়ে। বিয়ে তো অনেক পরের কথা রে। আমি তো নিজের সাথেই থাকতে পারি না।
আমি অ্যালবামটা আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরলাম।


অথচ এই কষ্টে আমাদের হাতও কম নেই। আমার এনগেজমেন্টের দিন ফোনটা আমি নিজেই ওর হাতে দিয়ে বলেছিলাম, তুমি তোলো, তোমার ছবি তোলার হাত ভালো। আপু হেসে ফোনটা নিয়েছিলো। আমরা সবাই মিলে ওকে ক্যামেরার পেছনে দাঁড় করিয়েছি, তারপর ভুলে গেছি যে ও ছবিতে নেই।
আমি মেঝেতে বসে ছোটবেলার মতো আপুর হাঁটুতে মাথা রাখলাম। আপুর আঙুলগুলো আলগোছে আমার চুলে নামলো। ফিসফিস করে বললো, কাল তোকে খুব সুন্দর লাগবে, টুনি।
শাড়িটা ওর কোলের ওপর রেখে বললাম, জোর করবো না, আপু। শুধু একটা কথা বলি। তুমি না থাকলে আমার বিয়ের ছবিগুলো হয়তো সুন্দর হবে। কিন্তু সত্যি হবে না।
আপু কিছু বললো না। শুধু শাড়ির জরির পাড়ে একবার আঙুল বোলালো। আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম।
বিয়ের আগের রাতে কোনো মেয়ের ঘুম আসে না। আমারও এলো না। অনেক রাতে আপুর দরজা খোলার শব্দ পেলাম। কেউ পা টিপে টিপে স্টোররুমের দিকে গেলো। পুরোনো কপাটটা ক্যাঁচ করে উঠলো।
ফজরের আজানের একটু আগে পাশের ঘর থেকে শব্দটা ভেসে এলো। আম্মার পুরোনো সেলাই মেশিনটা চলছে। আমি উঠে দেখতে গেলাম না।
মেশিনটা মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিলো। তারপর আবার চলছিলো।
খুঁত
তাইমুর মাহমুদ শমীক
২৯/৯/২০২৬

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিজেপির হয়ে প্রমোশন ভিডিও ~ সুমনা চৌধূরী

সমস্যাটা আসলে কী?

সমস্যা এটা নয় যে প্রমোশন করা হয়েছে। যে কোনো মানুষ তার পছন্দের রাজনৈতিক দলের প্রমোশন করতে পারেন। পক্ষে-বিপক্ষে বলতে পারেন। এটা তার সংবিধানপ্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার। পয়সা নিয়ে অথবা না নিয়ে--- দুইভাবেই করতে পারেন। 

সমস্যাটা হলো টাকা নিয়ে তৈরি রাজনৈতিক কনটেন্টকে দর্শক বা ফলোয়ারদের কাছে স্বাধীন, নিরপেক্ষ বা ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো : 

প্রথমত, যে ভিডিওগুলো করা হয়েছিল এবং এখন যখন জানা যাচ্ছে সেগুলো লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে করা হয়েছিল, সেই ভিডিওগুলোতে পেইড প্রমোশন বা কোলাবরেশনের ডিসক্লেমার দেওয়া ছিল কীনা? 

দুঃখের বিষয় কনটেন্ট ক্রিয়েটররা টাকার বিনিময়ে যে ভিডিওগুলো তৈরী করেছিলেন সেগুলোতে এরকম কোনো ডিসক্লেইমার-ই ছিল না। এগুলো স্বাধীন মতামত হিসেবে-ই পোস্ট করা হয়েছিল। 

এবারে টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক ভিডিও বা কনটেন্ট করার নিয়ম হলো ভিডিওতে ---- Uploaded Image

১. টাকা নেওয়ার কথা গোপন করা যাবে না। কোনো স্বাধীন ক্রিয়েটর যে কোনো রাজনৈতিক দলের থেকে টাকা নিয়ে কনটেন্ট তৈরী করলে বিজ্ঞাপন হিসেবে, তাতে ডিসক্লোজার থাকা বাধ্যতামূলক। 

২. মেটা-র এ সংক্রান্ত পলিসি হলো ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম-এ যথাযথ পেইড পার্টনারশিপ / পেইড-কনটেন্ট ডিসক্লোজার দিতে হবে। মেটাতে সেই ডিসক্লোজারের ব্যবস্থাও রয়েছে।  
কোনও ক্রিয়েটর যদি রাজনৈতিক দলের হয়ে পেইড ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে কনটেন্ট তৈরি করে থাকেন, তাহলে সেই কনটেন্ট কীভাবে মেটা প্ল্যাটফর্মে ক্লাসিফাইড ও ডিসক্লোজ হয়েছিল সেটিও দেখা দরকার। 

৩. ASCI বলছে --- টাকা, উপহার বা অন্য সুবিধার বিনিময়ে কনটেন্ট তৈরি হলে সেটি ASCI-র এডভার্টাইজিং / কমার্শিয়াল কমিউনিকেশনের আওতায় পড়ে এবং ক্রিয়েটরকে স্পষ্টভাবে জানাতে হয় যে এটি পেইড বা স্পনসর্ড কনটেন্ট। শুধু নিজের মতামত বলে উপস্থাপন করলেই ডিসক্লোজার-এর প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। এবং ডিসক্লোজারটি এমনভাবে দিতে হয় যাতে দর্শকের চোখ এড়িয়ে না যায়। স্পষ্ট করে এটাও বলা আছে, শুধু ক্যাপশনের একেবারে শেষে বা হ্যাশট্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রাখাও যথেষ্ট নয়।

৪. ECI/MCMC-এর নিয়ম বলছে --- কোনও কনটেন্ট যদি আসলে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন হয়, তাহলে সোশাল মিডিয়াও ইলেকট্রনিক মিডিয়া হিসেবে ধরা হয়। ইলেকশন কমিশন ২০ মার্চ ২০২৬-এ একটি নির্দেশনায় বলেছে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে MCMC-এর প্রি-সার্টিফিকেশনের প্রয়োজন।  

যে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এখন নিজেদের জাস্টিফাই করছেন এই বলে যে তারা বিজ্ঞাপন করেছেন এবং বেশ করেছেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে বিজ্ঞাপন করা তাদের কাজ, তাদের কাছে মূল প্রশ্ন থাকে যে ----

ক. কোন ভিডিও/পোস্টের জন্য টাকা নিয়েছেন?

খ. সেই ভিডিও বা পোস্টে পেইড/স্পনসর্ড ডিসক্লোজার ছিল কীনা? 

গ. সেই ভিডিওগুলোর MCPC-এর প্রি-সার্টিফিকেশন ছিল কীনা? 

ঘ. এবং পেইড রাজনৈতিক ভিডিওগুলোর কনটেন্টে RPA/MCC/ECI এর গাইডলাইন মানা হয়েছিল কীনা? কেননা ভিডিওগুলো নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পরে করা হচ্ছে। এবং তা পেইড বিজ্ঞাপন। ভোটের আগের ৪৮ ঘণ্টার নিয়মও আছে এবং সোশাল মিডিয়াও ইলেকশন কমিশনের 'ইলেকশন রিলেটেড ইলেকট্রনিক মিডিয়া ফ্রেমওয়ার্কে'র মধ্যে রয়েছে।

যদি তা না হয়, তবে 'বেশ করেছি টাকা নিয়ে বিজ্ঞাপন করেছি' যুক্তি মানায় না। কেননা আপনারা বেশ করেননি। আপনারা রাজনৈতিক দলের থেকে টাকা নিয়ে বানানো কনটেন্টকে আপনাদের স্বাধীন মতামত দেখিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করছেন। পেইড প্রমোশনের যে ডিসক্লেমার দেওয়ার বেসিক নিয়ম, সেটা ভায়োলেট করেছেন। কোনো রাজনৈতিক ভিডিওতে একবারও উচ্চারণ করেননি যে আপনারা পেইড প্রমোশন করছেন। বরং স্বাধীন মতামত এবং প্রতিবাদীর অভিনয় করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে নিজেদের পকেট ভরেছেন। এবারে গুটকা বা নেলপলিশের বিজ্ঞাপন আর পলিটিক্যাল ক্যাম্পেইনের পার্থক্য আছে। আর এই পার্থক্য ভারতীয় আইন সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। 

তাই কনটেন্ট ক্রিয়েটর যারা টাকা নিয়ে রাজনৈতিক দলের হয়ে পেইড প্রমোশন করেছেন কোনো ডিসক্লোজার ছাড়া অথবা স্বাধীন মতামত হিসেবে, তারা যে শুধু তাদের ফলোয়ারদের দিনদুপুরে ঠকিয়েছেন--- বিষয়টা তার বাইরেও আরো বড়ো কিছু। 

দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, যা নিয়ে আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিত, তা হলো কনটেন্ট। যদি অলিপাবের ঘটনা পেইড হয়ে থাকে (কেননা ওই ক্রিয়েটর এখনো সঠিকভাবে দেখাতে পারেন নি ঠিক কোন কোন ভিডিওগুলোর জন্য তিনি আড়াই লক্ষ টাকা পেয়েছেন) তাহলে এটাতে সমস্ত মানুষের কনসার্নড হওয়া উচিত এখনই। কেননা এটা যদি ট্রেন্ড বা নিয়ম হয়ে যায়, তাহলে কাল আপনি-আমি যে কেউ যেকোনো কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পয়সা রোজগারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারি। বাসে ট্রেনে অফিসে আদালতে বাজারে যে কেউ যে কোনো ইস্যু তৈরী করতে আমাদের হ্যারাস ম্যালাইন এবং আইনি জটিলতায় ফাঁসানোর পাশাপাশি সমাজে দেশে বিভেদ-বিভাজন ও বড়ো আকারের দাঙ্গা-হাঙ্গামা-অশান্তি ছড়াতে পারে।

অতএব এই সামগ্রিক বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অতি আবশ্যক। এবং কেন পেইড বা স্পনসর্ড ভিডিও স্বাধীন মতামত বলে প্রকাশ করা হলো---সেটাও। কারণ কেউ টাকা নিয়ে রাজনৈতিক প্রচার করছেন অথবা স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছায় রাজনৈতিক প্রচার করছেন — এক বিষয়; আর টাকা নিয়ে তৈরি রাজনৈতিক প্রচারকে দর্শকের কাছে স্বাধীন ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উপস্থাপন করা—সম্পূর্ণ আলাদা। 

সমস্ত বিষয়গুলোরই নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া তাই ভীষণ প্রয়োজন—কে টাকা নিলেন বা নিলেন না, এসব প্রশ্ন বাদেও সেই টাকা দিয়ে ঠিক কী ধরণের কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছিল এবং সেটি কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল---- এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনসার্ন হওয়া উচিত আমাদের। 

এটুকুই বলার।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিদ্যাসাগর তো মিলিট্যান্ট নাস্তিক ~ কণিষ্ক ভট্টাচার্য 

“বিদ্যাসাগর তো মিলিট্যান্ট নাস্তিক। ওর কথা শুনবো কেন!’

বাংলা ভাষার সম্বোধনে, ‘তুই-তুমি-আপনি’ ভেদ আছে, যা ব্যক্তি সম্পর্কের পারস্পরিক নৈকট্য বা সম্মান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। যদিও অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালিও সম্বোধনে ‘ওর আর ওঁর’ এই সম্মান বা আপনি সূচক চন্দ্রবিন্দুটির ব্যবহার জানেন না, কিন্তু কথ্য ভাষার অনুসারে তারা ‘ওনার’ লেখে। অল্পশিক্ষিত বা আঞ্চলিকতাদুষ্ট বাংলায় ‘ইনার’ও দেখা যায়। সেই প্রতিবন্ধকতাও অন্তত বোঝায় যে ‘আপনি’ সূচক সম্বোধনে লিখতে চাওয়া হয়েছিল! অন্তত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ইচ্ছাকৃত অপমান বা তুচ্ছতার লক্ষ্যে নয়। 

কিন্তু ‘ওর’--- অর্থাৎ ‘তুই’ সম্বোধনে! বাঙালি লিখছে! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে! জনসমক্ষে! সমাজমাধ্যমে!  

আজ থেকে আট বছর আগে এক বঙ্গসন্তান আমার পোস্টে লিখেছিল– “‘ওর’ কথা শুনব কেন!” 

বাক্যটি খুবই ইন্টারেস্টিং– ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা যে শুনবে না তার মতে, বিদ্যাসাগর ‘মিলিট্যান্ট নাস্তিক’ বলে-- সেই বঙ্গসন্তান তথাকথিত অর্থে উচ্চশিক্ষিত কলকাতাবাসী। ফলে দুটি সিদ্ধান্তে আসা যায়, প্রথমত, বিদ্যাসাগর সম্পর্কে ‘ওর’ সম্বোধন ইচ্ছাকৃত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তুচ্ছার্থে বা অপমানের উদ্দেশ্যে। এবং দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিটি ‘হিন্দু’ ধর্ম বিশ্বাসী (তখনও সনাতনী শব্দটি বাঙালির কাছে লব্জ হয়নি) বলে ‘নাস্তিক’ (!) বিদ্যাসাগরকে তার সম্মানের প্রয়োজন নেই। 

আমার পিতার কল্যাণে যে প্রভূত পরিমাণ বইয়ের মধ্যে বড়ো হয়েছি তার মধ্যে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত তিন খণ্ডের বিদ্যাসাগর রচনাবলী ছিল। যতদূর বুঝেছি বিদ্যাসাগরকে বলা যায় অজ্ঞেয়বাদী। 

সহজ কথায় বলা যায়, তিনি ‘ধর্ম-নির্লিপ্ত’। মনে রাখতে হবে বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালে— আজ থেকে ২০৬ বছর আগে। এই ‘ধর্ম-নির্লিপ্ত’ অবস্থানকে আজকের ভাষায় ‘সেকুলার’ বলা যায় – যা অধুনা নিওনাজির মতো করে গড়ে ওঠা নব্যহিন্দুত্ববাদীদের কাছে একটি গালাগালি, যদিচ ভারতের সংবিধানে দেশটি ‘সেকুলার’ হিসেবেই গড়ে উঠেছিল। তদুপরি বিদ্যাসাগর যদি নাস্তিকও হন তাহলেই বা কী যায় আসে! বেদের অপৌরুষেয়ত্বে অবিশ্বাসী অর্থেও যদি তিনি নাস্তিক না হন, যদি ‘এথেইস্ট’ অর্থেও তিনি নাস্তিক হন তাহলেও বা কি যায়-আসে! 

ধর্মকে যদি শাস্ত্রধৃত ধারণা বলে গ্রহণ করি, তাহলেও এই আ'পামর' নব্যহিন্দুত্ববাদীদের মিলিত সর্বমোট শাস্ত্রজ্ঞান, বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রজ্ঞানের দশমিকের পর দশটি শূন্য পরবর্তী সংখ্যাতেও তুলনীয় তো নয়ই এবং কেবল ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রজ্ঞান দিয়ে বিদ্যাসাগরকে পরিমাপ করতে যাওয়ার মুর্খামি বোধহয় কেবল ভারতীয় নব্যহিন্দুত্ববাদীদের পক্ষেই সম্ভব! 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন তাঁর অগ্রজ বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ নামক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, তৎকালীন হুগলীর বীরসিংহ থেকে পিতা ঠাকুরদাস ঈশ্বরচন্দ্রকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন ‘হের্‌ সাহেবের স্কুলে’ ভর্তি করবেন বলে – এই ‘হের্‌ সাহেব’ হলেন ডেভিড হেয়ার আর স্কুলটি হল হেয়ার স্কুল। বিদ্যাসাগরের জন্মের দুবছর আগে ১৮১৮ সালে এই বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। সেখানে আজ থেকে ২০৮ বছর আগে হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকল ধর্মের শিক্ষার্থীর প্রবেশাধিকার ছিল।

যে অর্বাচীন নব্যগোময়বাদী আমার পোস্টে প্রথম বাক্যটি লিখেছিল। সে-ও আমারই মতো ‘হের্‌ সাহেবের স্কুল’ এর প্রাক্তনী। কী আশ্চর্য নিষ্ঠুর পরিহাস! আমি তাকে বলেছিলাম, বাংলা ভাষায় যে এটুকু লিখতে পারলে তাও বিদ্যাসাগরের জন্য। 

বিদ্যাসাগর কেবল বাংলা বর্ণমালার সংস্কারসাধক ভাষাতাত্ত্বিক নন, শাস্ত্রজ্ঞপণ্ডিত, যুক্তিবাদী, উদার, বাস্তববাদী সমাজ সংস্কারক। কালিক সীমাবদ্ধতা তাঁকে মানতে হয়েছে ওই বাস্তবতার নিরিখেই। 

টেলিভিশন দেখি না, তবে একাধিক খবরের কাগজ নিয়ম করে পড়ি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া খবর দেখি (তাৎক্ষণিকতার নিরিখে এদানী জরুরি)-- কিন্তু সামগ্রিকভাবে হতাশ হই, ডিপ্রেসড লাগে, কোনোরকম কাজের মানসিক স্থিতি নষ্ট হয়। 

দেখি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়া আর না-পাওয়া বাঙালির মধ্যে মূলগত ভেদ উঠে গেছে। দুজনেই সমান অযুক্তিবাদী… নির্বোধ… আত্মধ্বংসী… ব্রেনরট্ জোম্বি...

দেখি, জাতি-রাজনীতিতে যারা নিম্নবর্ণ, যারা অস্পৃশ্য, অচ্ছুত তাদেরকেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে… তারা প্রবল ক্ষমতাশালী এবং প্রবল বিভেদমূলক ব্রাহ্মণ্যবাদের পক্ষে কথা বলে ‘বিধর্মী’ তাড়াতে উদ্যত… অথচ রামমোহন বিদ্যাসাগর না থাকলে বাংলাও গোবলয়ের অস্পৃশ্যতার রাজনীতির অংশ হত… 

ঘরে যিশুর ছবি থাকলেও তারা আক্রমণ করে, দেয়ালে কালীর ছবি থাকলেও… 

দেখি রামমোহন, ডেভিড হেয়ার, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, বেথুন, রবীন্দ্রনাথ, রোকেয়ার বাংলায় স্কুল কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পড়ুয়ার অভাবে খালি হয়ে যায়… সরকার তুলে দেয়… 

মাঝেমধ্যে মনে হয়, ঠিকই হচ্ছে! এই পড়াশোনার কী বা মূল্য! 

যখন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত ইউরোপ / আমেরিকা প্রবাসিনী আইআইটিতে আত্মহত্যা করা নিম্নবর্ণের ছেলেটিকে– কোনও তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই 'নকল করছিল' বলে দেন! এমনকি প্রতিষ্ঠান এমন গুজব অস্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও ‘উচ্চশিক্ষিত’ অনড়… কী বা মূল্য আছে এ শিক্ষার! এমনকি আদৌ কী বা প্রয়োজন আছে এই শিক্ষার…

যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুজন শিক্ষকের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় এই নির্যাস নির্গত হয় যে, এদেশে হিন্দুদের দুর্দশার কারণ ‘উওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট’ – নারী ক্ষমতায়ন। মেয়েরা লেখাপড়া শেখা আর চাকরি করার জন্য হিন্দুদের সন্তানধারণ কমে গেছে… 

এরা যে জাতির শিক্ষকতার পেশায় থাকে সে জাতির সমস্ত স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যত তাড়াতাড়ি বন্ধ হয় ততই মঙ্গল। 

Uploaded Image মনে হয়, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে নেহাতই একটা দুর্ঘটনা।

এই অচিকিৎস্য আরোগ্যহীন বাঙালি জাতির শীঘ্রতম মৃত্যু কামনা করি আমি… শীঘ্রতম বিলুপ্তি… 

মনে হয়, আমার সন্তানের কাছে ক্ষমা চাই তাকে জন্ম দেওয়ায় জন্য… বাঙালি জাতির উজ্জ্বল ইতিহাস জানানোর জন্য… 

বিদ্যাসাগরের জন্মদিন আগামীকাল। তাঁর মৃতদেহের ছবি দিলাম। আমরাই তাঁকে খুন করেছি। 
করছি… রোজ… প্রতিদিন… 

ফেসবুকে আপাতত কম থাকতে চাই। নতুন লেখা বেরোলে না হয় জানানো যাবে। আপাতত আমার মানসিক স্থিতি প্রয়োজন।

© কণিষ্ক ভট্টাচার্য 


বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কাল্ট তৈরী ~ অরিজিত মুখার্জী

কাল্ট তৈরীর গল্প। চলছে কয়েক বছর ধরেই। কখনো ভারতের সব সেলিব্রিটিদের ফরমায়েশ (বকলমে অনুরোধ) করা হয়েছে "মাই মোদী স্টোরি" হ্যাশট্যাগ দিয়ে প্রশস্তি লিখতে। কখনো সিবিএসইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ২রা অক্টোবর অবধি মোদীর ছোটবেলা নিয়ে সিনেমা দেখাতে। ভারতীয় যাদুঘরে মোদীর জীবনপথ নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে। এইবার স্কুল কলেজে প্রদীপ জ্বালানোর ফতোয়া এসেছে, আর নাটক মঞ্চস্থ করারও।

বছর কয়েক আগে এরকমই সময় লিখেছিলাম। পড়ে দেখুন কোনো মহান আত্মার সঙ্গে মিল পান কিনা।

১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে, হিটলারের ৪৪তম জন্মদিনের কিছুদিন আগে মানহাইমের এক পরিবার থেকে একটা চিঠি এসে পৌঁছয় হিটলারের দপ্তরে। তাতে লেখা - "আমাদের ছোট্ট রিটা তার প্রিয় ফ্যুরারকে সম্মান জানাতে চায় হাইল হিটলার বলে। সেই জন্যে আমরা তার একটা ছবি পাঠালাম জার্মান স্যালুট করা অবস্থায়। রিটার বয়স দশ মাস, আমাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ওকে যখনই আমরা প্রিয় অ্যাডল্ফকাকুর ছবি দেখাই, ও স্যালুট করে।"
Uploaded Image

ভোল্কার উলরিখের দু খন্ডের হিটলার বায়োগ্রাফির প্রথম খন্ডে একটা চ্যাপ্টার আছে, নাম - "কাল্ট অ্যান্ড কমিউনিটি"...ওপরের এই অংশটা সেই চ্যাপ্টার থেকে নেওয়া। কীভাবে হিটলারের পিছনে জার্মানির জনসংখ্যার বড় অংশটাই এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই আখ্যান।

১৯শে আগস্ট, ১৯৩৪ এর গণভোটের সময়ে এক জার্মান নাগরিকের পর্যবেক্ষণ - "সমস্ত বিলবোর্ডে হিটলার। প্রতিটা দোকানের জানলায় হিটলার। দোকান কেন, যত জানলা রয়েছে জার্মানিতে - ট্রাম, ট্রেন, গাড়ি, বাড়ি - প্রত্যেকটা জানলা দিয়ে হিটলার তাকিয়ে..."

বহু জার্মান নাগরিক চ্যান্সেলারির সামনে লাইন দিত তাদের প্রিয় ফ্যুরারের ছবিতে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্যে। ১৯৩৪ এর আগস্টে, হিমলার যখন তাঁর বাবামায়ের উদ্দেশ্যে হিটলারের ব্যক্তিগত বার্তা লেখা ছবি যোগাড় করে মিউনিখের বাড়িতে পাঠান, হিমলারের বড় ভাইয়ের কথা থেকে জানা যায় যে তাঁদের মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন...

উইডম্যানের লেখায় জানা যায়, হামবুর্গে একজন জার্মান নাগরিক ভিড়ের মধ্যে কোনোভাবে হিটলারের হাতে হাত ছোঁয়াতে পেরে আত্মহারা হয়ে "আমি ওঁকে ছুঁতে পেরেছি, ওঁকে ছুঁতে পেরেছি" বলে রাস্তায় পাগলের মত নাচতে শুরু করেছিল। উইডম্যানের ভাষায়, লোকটা যদি একবারও বলতো যে সে বাস্তবে খোঁড়া ছিল, আর হিটলারের ছোঁয়ায় সেরে উঠেছে, জনতা সেই কথাও বিশ্বাস করতো...

কাল্ট এইভাবেই তৈরী করা হয়...

আজকের ভারতেও বদল কিছুই হয়নি। রাস্তাঘাটে, বিলবোর্ডে, পেট্রল পাম্পে, ভ্যাক্সিন সার্টিফিকেটে, এয়ারপোর্টের ডিজিযাত্রার গেটে, ট্রেনে, স্টেশনে...প্রায় প্রতিটা দেওয়ালে একজনেরই মুখ। জন্মদিনে দিল্লীর মেট্রো চড়ে বেড়াতে বেরিয়ে খুব কনভিনিয়েন্টলি এমন একজনের দেখা পাওয়া যায় যে কিনা স্বত:প্রণোদিতভাবে সংস্কৃতে সেই একজনের বন্দনা করে ফেলতে পারে। সেই একজনকে কখনো একত্রে হাঁস-মুরগী-হরিণ-ম্যাকবুক-ক্যামেরা-বই সহযোগে দেখা যায় - মানুষে বিশ্বাস করে। কখনো ফাঁকা সমুদ্রতটে বোতল কুড়োতে দেখা যায় - মানুষে বিশ্বাস করে। কখনো কেদারনাথের গুহায় ধ্যানস্থ অবস্থায় দেখা যায় - ফটোগ্রাফার ছবি তুলে আনে - মানুষ তাও বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করে। জি২০ সম্মেলন জুড়ে একজনেরই প্রচার হয় বিশ্বগুরু হিসেবে। আমাদের বোঝানো হয় যে ভারতের অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে। আমরা সেই সবকিছুই মেনে নিই বিনা প্রশ্নে।

কারণ, কাল্ট এইভাবেই তৈরী হয়।

চ্যালা গুরুর পথেই চলবে তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবে, গুরুর আমলে সেই দেশে বাস্তবিকই বেশ কিছুটা অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের দশকের তুলনায়। লোকের হাতে চাকরি ছিল - সে অস্ত্র তৈরীর কারখানায় হলেও। পরবর্তীকালে যদিও প্রমাণিত হয় যে সেই উন্নতির চোটে জার্মান অর্থনীতিকে আসলে মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছিল (Was there a National Socialist economic miracle?, Wehler), তবুও সেই সময়ে একেবারে অর্থনৈতিকভাবে নীচুতলার মানুষগুলোও হাতে কাজ পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল। এখানে সেসব কিছুই হয় না। পুরোটাই ফাঁপা তর্জনগর্জন...আর দেখনদারি, একটা আপাদমস্তক জোকারকে নিয়ে। পাব্লিক রিলেশনসের জমানায় হয়তো এটাই হওয়ার কথা...

কাল্ট তৈরী।

সংযোজন: আশার কথা এইটাই যে পরের একটা জেনারেশন অন্তত: এই ঠগ জোচ্চোরটাকে চিনে ফেলেছে। আল্টিমেটলি ওই "ছপ্পন ইঞ্চকা ছোটা..."

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয় কি অমূলক ? ~ অরিজিত মুখার্জী

খবরের কাগজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছেন হয়তো — ওপেনএআই আজ অবধি সলভ না হওয়া অঙ্কের প্রব্লেম সলভ করে দিয়েছে; বা অ্যান্থ্রোপিকের এআই গিটহাবের সিকিউরিটি বাইপাস করে কোথায় কী সব ফোরামের সব ডেটা মুছে দিয়েছে...ইত্যাদি প্রভৃতি।

ক্রমশ: একটা ধারণা তৈরী হচ্ছে সুপারহিউম্যান ইন্টেলিজেন্স — সিনেমার ভাষায় বললে টার্মিনেটর বা স্কাইনেট — আগতপ্রায়।  মানুষ নামের প্রজাতিটা খুব শিগগিরিই মুছে যাবে। তাই, দয়াপরবশ হয়ে টেকব্রো-রা তাঁদের নিজেদেরই শুরু করা এআই রেসের উন্মত্ত দৌড়ের গতি কমাতে চাইছেন।

Uploaded Image
সমস্যা হল, এই সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবীদাওয়াগুলো সবই সেই ওপেনএআই বা অ্যান্থ্রোপিকের মত এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে থেকেই আসছে, এবং সেখান থেকে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় হাইলাইট করা হচ্ছে। আমরা ভাবছি যে এরা তো এইসব নিয়েই কাজ করছে, কাজেই যা বলছে সেগুলো সবই ঘোর বাস্তব, স্কাইনেট এলো বলে। অথচ, এই দাবীগুলোর পিছনে এখনও সেরকম সায়েন্টিফিক ব্যাকিং নেই, কোনো বেঞ্চমার্কিং বা কোনো প্রপার স্টাডি নেই, শুধুমাত্র কিছু ছুঁড়ে দেওয়া তথ্য ছাড়া।

উল্টোদিকে, এমআইটির গবেষকরা রিসেন্টলি একটা পেপার পাব্লিশ করেছেন, যার নাম "পোটেমকিন আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলস" — লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল মানে চ্যাটজিপিটি, ক্লড ইত্যাদি। এই গবেষকদের বক্তব্য হল সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবীদাওয়াগুলো সম্পর্কে সাবধান হওয়া দরকার। পোটেমকিন আন্ডারস্ট্যান্ডিং শব্দবন্ধটা এঁরা ধার করেছেন ঐতিহাসিক "পোটেমকিন ভিলেজ"-এর কনসেপ্ট থেকে, যেখানে ফাঁকা জমির চারপাশে সুন্দর বাঁশের বেড়া আর চালা বা কার্ডবোর্ডের তৈরী বাড়ির দেওয়াল বসিয়ে গ্রাম বা লোকালয়ের চেহারা দেওয়া হয় শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যে। এঁদের বক্তব্য হল, আধুনিক এআই ঠিক একইভাবে বুদ্ধিমত্তার ফাসাড (মুখোশ) তৈরী করতে সক্ষম। বলা ভালো পারদর্শী, কারণ সেইভাবেই এগুলো তৈরী। আধুনিক এআই যে কোনো প্রফেশনাল পরীক্ষায় ৯০% স্কোর করে দেবে; বা কমপ্লেক্স থিওরি বা ডেফিনেশন লিখে দেবে নিখুঁতভাবে৷  কিন্তু সেই বাস্তব জীবনের কোনো কাজে সেই থিওরি প্রয়োগ করতে বলুন, বা তার নিজের লেখার মধ্যে কনট্রাডিকশন খুঁজে বের করতে বলুন — পারবে না, বা ছড়িয়ে ফেলবে। কারণ মানুষ যেভাবে ধারণা তৈরী করে, বা বুঝতে শেখে, এআই সেভাবে চলে না। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া বা অ্যান্থ্রোপিকের মত হাজার হাজার বইয়ের পাতা ছিঁড়ে স্ক্যান করে সেই সমস্ত বই ধ্বংস করে পাওয়া বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে আয়ত্ত করা প্যাটার্ন ম্যাচিং-ই এআইয়ের শেখার আর উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি।

এখনো অবধি আনসলভড ম্যাথস প্রব্লেমও যখন এআই সলভ করে, বা গিটহাবের সিকিউরিটি বাইপাস করে ফোরামের তথ্য মুছে দেয় — যা দেখিয়ে সুপার ইন্টেলিজেন্সের তত্ত্ব আমদানি করা হয় — সেক্ষত্রেও এআই তার আগে দেখা/চেনা প্যাটার্নের ওপর ভিত্তি করে খুব সফিসটিকেটেড অনুমান বা গেসওয়ার্ক চালায়। যেহেতু কম্পিউটিং ক্ষমতা বেশি, তাই ট্রায়াল অ্যান্ড এরর ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি করতে পারে। তবুও দিনের শেষে সেটা সেই প্যাটার্ন নির্ভর গেসওয়ার্ক। আপনি সেই ম্যাথস প্রব্লেমের নিয়ম বদলে দিন, বা গিটহাবের সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্কের নিয়ম বদলে দিন — যা আগে দেখা নয় — দেখবেন এই সুপার ইন্টেলিজেন্স সম্পন্ন এআই বাজেভাবে ছড়াচ্ছে, যেখানে একটা মানুষ অল্প চেষ্টায় অ্যাডাপ্ট করতে পারত।

যে কথাটা আমরা প্রায় রোজই বলি — এই হাইপ তৈরীর পিছনে আদতে রয়েছে একটা কম্পিটিশন — প্রযুক্তির পাবলিক লীডারবোর্ডে কে ওপরে থাকবে, আর তার ভিত্তিতে কে কত ফান্ডিং টানতে পারবে। কারণ সুপার ইন্টেলিজেন্সের গল্প বিকোয় ভালো। স্কাইনেট বা মেট্রিক্স টাইপের সেন্টিয়েন্ট এআই দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয় দেখানো যায়। ভয়ও বিকোয় ভালো।

আসল বিপদটা এআই মানুষের মত বুদ্ধিমান হয়ে গিয়ে মানুষকে মেরে ফেলবে সেটা নয়। বরং আসল বিপদ হল আমরা বাইরের সাফল্যে বেশি মুগ্ধ হয়ে গিয়ে, বাস্তব জগতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এমন যন্ত্রের হাতে তুলে দেব যার মধ্যে নমনীয় বোধশক্তির অভাব রয়েছে। এআই নিজে থেকে ভেবেচিন্তে আপনাকে মারবে না, মারবে কোনো ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে (ধরুন অটোনোমাস গাড়ি) এআইয়ের করা একটা মাত্র ভুল...

আরো একটা বাস্তব সমস্যা রয়েছে। আমরা যা কাজ করি — অফিসে, স্কুলে, কলেজে, কোর্টকাছারিতে — তার মধ্যে একটা বড় অংশই প্যাটার্ন নির্ভর। একই প্যাটার্নে হয়ে চলে। গল্প, কবিতা, সিনেমা, নাটক — সবই বলতে পারেন নানান আগে দেখা প্যাটার্নের রিমিক্স। এই সমস্ত কাজই হয়তো এআই করে দেবে একসময়, আর কর্পোরেট বা অন্য সংস্থাগুলো সেটা মেনে নেবে, রাদার এনকারেজ করবে। কারণ এআই ছুটি চায় না, মাইনে বাড়াতে বলে না, তার অসুখ করে না, সে ইউনিয়ন বানায় না...

এমআইটির আরো একদল গবেষক আরো কিছু ভয়ানক তথ্য সামনে এনেছেন নিজেদের ইনস্টিট্যুটের ভিতর থেকে। জানা যাচ্ছে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছে, এবং তাদের মধ্যেই মেজরিটি এও মনে করছে যে এর ফলে তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে...তারা ক্রমশ: এআই নির্ভর হয়ে পড়ছে। এমআইটি তাই তাদের শিক্ষণপদ্ধতির বদল করার কথাও ভাবছে...

পোটেমকিন পেপারটার লিঙ্ক নিচে দেওয়া রইল। চাইলে পড়তে পারেন।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এআই কি সত্যিই বিপজ্জনক ~ অনির্বাণ অনিক

দুদিন ধরে প্রযুক্তির দুনিয়ায় এক নতুন নাটকের মহড়া চলছে। সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই এবং ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান হঠাৎ খুব চিন্তিত মুখে ঘোষণা করেছেন, "এআই খুব বিপজ্জনক গতিতে এগোচ্ছে, আমাদের এখনই এর গতি কমানো উচিত!" 

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে তারা মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছেন, "এআই-এর গতি কমাও" বলে সবথেকে জোর গলায় চিৎকার সেই একই সিইও-রা করছেন, যাঁরা নিজেরাই নতুন ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালছেন? অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই সম্প্রতি "উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার" নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করে অনিয়ন্ত্রিত 'সুপারইন্টেলিজেন্স' বা অতি-বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে সতর্ক করেছেন, আর স্যাম অল্টম্যানও তড়িঘড়ি তাঁর সমর্থনে সুর মিলিয়েছেন। 

আমি এই টেক ব্রোদের ১০% দাবীকেও বিশ্বাস করিনা। আমার ধারণা এটা "ডুমার অ্যাজ বুস্টার" নামের এক চরম কর্পোরেট মার্কেটিং চাতুরী। এই ধরনের কাল্পনিক ধ্বংসের গল্প ফাঁপিয়ে তোলার মূল উদ্দেশ্যই হলো কাস্টমারদের পরোক্ষভাবে বোঝানো যে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি। 

ওপেনএআই ২০২৫ সালে প্রায় ১,৩০৭ কোটি ডলার আয় করলেও তাদের পরিচালন ব্যয় ছিল প্রায় ৩,৪০০ কোটি ডলার, অর্থাৎ কেবল এক বছরেই অপারেটিং ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,০৯২ কোটি ডলারে এবং ইনফারেন্স খরচের পেছনেই ব্যয় হয়েছে ৮৪০ কোটি ডলার। যখন মূল উপার্জনের খতিয়ান শক্ত থাকে না, তখন এই কেয়ামতের মতো বিপর্যয়ের হেডলাইন তৈরি করে রাখলে বাজার আর বিনিয়োগকারীদের নজর আসল আয়-ব্যয়ের বাস্তব হিসেব ছেড়ে ওই কাল্পনিক 'সুপারইন্টেলিজেন্স'-এর দিকেই বুঁদ হয়ে থাকে।

Uploaded Image সুরক্ষানীতির অজুহাতে এই কোম্পানিগুলো মডেলের ওয়েট বা ওপেন-সোর্স অ্যাক্সেস বন্ধ রাখার পরামর্শ দিচ্ছে, যাতে জনসুরক্ষার কথা বলে মূল প্রযুক্তির চাবিকাঠিটা সিলিকন ভ্যালির বোর্ডরুমের ভেতরেই কুক্ষিগত করে রাখা যায়। অন্যদিকে, সুরক্ষার অজুহাতে পাবলিক লিস্টিং বা আইপিও পিছিয়ে দেওয়াটা শেয়ার বাজারের প্রকাশ্য নজরদারি এড়িয়ে নিজেদের আয় গুছিয়ে নেওয়ার সুন্দর সুযোগ করে দেয়।



তদুপরি এরা বলে চলেছেন - "চীন তো এআই বানানো থামাচ্ছে না, তাই আমাদেরও থামা চলবে না"। এই অজুহাতটা স্রেফ একটা ঢাল। যাতে থামার কোনো প্রশ্ন না তুলে একের পর এক নতুন সিস্টেম বাজারে আনা যায় এবং নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য (Monopoly) ধরে রাখা যায়।

বিষয়টা আসলে দুমুখো কৌশল। একদিকে এই সিইও-রা বিশাল সব ডেটা সেন্টার বানানোর জন্য সরকার আর সাধারণ করদাতাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি ও ফান্ড দাবি করেন, আর অন্যদিকে ছোট বা দেশীয় প্রতিযোগীরা যাতে বাজারে উঠে আসতে না পারে, সে জন্য সরকারি নিয়ামক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আইনি সুরক্ষার কড়াকড়ি বা নিজেদের মতো নিয়ম বানিয়ে নেওয়ার সুবিধা চান।

এর সাথে যোগ করুন ভবিষ্যতের এআই পরিকাঠামো তৈরির জন্য টেক কোম্পানিগুলোর কোটি কোটি টাকা ইনভেস্টমেন্ট। এআই নিজে কোড লিখে মানুষের চাকরি যতটা না কাড়ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে টেক-কোম্পানিগুলোর এআই পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য কস্ট-সেভিং করতে গিয়ে হাজার হাজার কর্মীর ছাঁটাই'এর কারণে। কোড লেখা কোনদিনই কগনিটিভ লোড বা মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করত না। সময় লাগত, যেটা এআই এসে কমিয়েছে। কিন্তু কগনিটিভ লোড হ্রাস করেনি। বরং ছাঁটাই'এর ফলে কোম্পানিগুলোতে পড়ে থাকা কর্মচারীদের মধ্যে কগনিটিভ লোড ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এই টেক ব্রো'রা মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে সত্যিই এত চিন্তিত হলে কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত হত। তা তো হয়না। মানুষের সুরক্ষা নিয়ে এত চিন্তিত হওয়াটা স্রেফ এঁদের ধ্যাস্টামি!

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুভেন্দুর হালচাল ~ অরিত্র হালদার

দার্শনিক জাক লাকান ফ্রয়েডের সুপার ইগো নামক থিওরেটিক্যাল কনস্ট্রাক্টের এক্সটেনশন হিসেবে একটি কাউন্টার ইন্টুইটিভ, প্রায় অযৌক্তিক এবং স্যাডো-ম্যাসোকিস্টিক সত্তার কথা বলেন। এই সত্তা যেমন একাধারে কর্তব্যের প্রতি চরম সত্যনিষ্ঠ আনুগত্যের দাবি করে (ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব), একই ভাবে সে সেই কর্তব্যপালনে কেউ ব্যর্থ হলে তাকে শাস্তি প্রদান করে এক বিকৃত আনন্দ লাভ করে। 

এই পার্ভার্সিটি অফ অর্ডারলি বিহেভিয়ারকেই দার্শনিক স্লাভোজ জিজেক আবার রাজনৈতিক স্তরে এনে উল্টে পাল্টে নিয়েছেন। কেন? কারণ জিজেক মনে করেন প্রতিটা সরকারের লিখিত, আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের আড়ালে একটা অলিখিত, বিকৃত ট্রানসগ্রেশন থাকে। এই ট্রানসগ্রেশনই হলো ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসিতে ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণের মূল হাতিয়ার। উনি এই সত্ত্বার নাম দিয়েছেন the obscene superego supplement (OSS) অথবা the paraphillic superego। 

একটু সরলীকরণ করতে হলে ব্যাপারটাকে এভাবে দেখতে হবে: কেন শুভেন্দু অধিকারী এবং তার মন্ত্রিসভা এই মুহূর্তে এক অদ্ভূত অশ্লীল এবং অপরিশীলিত কায়দায় দুর্গাপুজো, বাগেশ্বর, ইসকন, যাদবপুর ইত্যাদি বিষয়ে ভাষণবাজি, ব্যক্তি আক্রমণ, একপেশে মিথ্যে স্ল্যান্ডার এবং গেরুয়া যাত্রা বা নাগা সাধু মিছিলের নামে রাজনৈতিক কুরঙ্গ করে বেড়াচ্ছেন? কেন তাদের বিহেভিওরাল প্যাটার্নে এক আশ্চর্য রকমের low-intellect, goonish ট্রেইট ফুটে উঠছে? বিশেষতঃ যখন তারা এক বিপুল সংখ্যক জনগণের decisive mandate নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছেন? 

এর উত্তর নিহিত আছে জিজেকের OSS থিওরিতে। ওনার মতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধু বস্তুনিষ্ঠ আইনানুগ নিয়মাবলীর সুষ্ঠু পালনই একমাত্র পথ নয়। বিশেষতঃ যখন সরকার একটি totalitarian regime দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সেই রেজিমের প্রয়োজন একটি কাউন্টার পয়েন্টের। এবং এই কাউন্টারপয়েন্ট সাধারণতঃ আইন ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের বিপরীতমুখী এক পারভাসনের মাধ্যমে রেজিমের অনুগামীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। প্রকৃত অনুগামীদের সংহতি তৈরি করতে, তাদের আসল সমর্থন লভ্যার্থে সরকারকে এর কদর্য অন্ধকার দিকটিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। 

অর্থাৎ সরকারের অনুগত মানুষের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে যেতে গেলে ঠিক যে যে জিনিসগুলো কাগজে কলমে বেআইনি বা অনৈতিক বা বিকৃত রুচির বলে ধার্য করা আছে, সরকার সেই কাজগুলোই খোলাখুলি ভাবে করতে থাকবে। এই যে নৈতিকতার ট্রান্সগ্রেশন, এটাই মর্ষকামী মানুষকে তার পছন্দের রাজনৈতিক দলের সাথে একাত্ম হতে সহায়তা করে। এতে করে এক অদ্ভূত shared guilt এবং তৎপরবর্তী এক obscene pleasure এরা অনুভব করতে শুরু করে। তাত্ত্বিক ভাষায় লাকান এই প্যারাডক্সিক্যাল অপরাধবোধ এবং আনন্দানুভূতিকে Jouissance নামে অভিহিত করেছেন। 

এই jouissance এর জন্যই যখন নাগা সাধুরা পশ্চাদ্দেশ উন্মোচন করে যাদবপুরের সামনে গিয়ে "প্রতিবাদ" উদযাপন করেন, বা শুভেন্দু খোলা বাজারে ছাত্র শিক্ষক নির্বিশেষে সবাইকে থ্রেট দিয়ে বেড়ান, বিজাতীয় গুটখা খেকো ঊনমানবের দল বাঙালিকে সংস্কৃতির পাঠ দেয়, শিক্ষক - অধ্যাপকদের গণশত্রু হিসেবে দেগে দেওয়া যায় আর বুলডোজার এসে গুঁড়িয়ে দিয়ে যায় গরিবের ঘরবাড়ি আর ভবিষ্যতের সম্বলগুলো তখন এসব দেখে এক শ্রেণির জনতা সোল্লাসে সরকারের জয়ধ্বনি দিয়ে ওঠে। 

শুভেন্দুরা এটা জানেন যে তাঁদের ক্যাপটিভ ভোট ব্যাংক গুড গভর্নেন্স বা অর্থনৈতিক পালাবদলের জন্য এই সরকারকে ক্ষমতার মসনদে বসায়নি। তারা এটাও জানেন যে একটা বিরাট অংশের মানুষ মিথ্যে প্রোপাগান্ডার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আজকে এরাজ্যের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার ছাত্র শিক্ষকদের ঘৃণা করতে শিখেছে। তারা জানেন যে তৃণমূলের দুর্নীতিতে অতিষ্ট হয়ে বহু অ-বিজেপি মানুষ তাদের ভোট দিয়েছেন এবং সেই মানুষরা তাদের ক্যাপটিভ ভোটব্যাঙ্ক নন। তারা জানেন যে বাঙালি আজকে একটি ক্লীব, আত্মবিস্মৃত, হৃতগৌরব জাতিগোষ্ঠীতে পর্যবসিত হয়েছে। এতটাই যে বিজাতীয় শকুনরা এসে বাংলার আইকনদের অপমান করে পার পেয়ে যায় কিন্তু সেই বিজাতীয় শকুনদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে কিছু বাঙালি অ্যাপোলজিয়া নামিয়ে ফেলে এবং সেই প্রতিবাদীকে জেলে পুরে দিতেও এরা পিছপা হয় না। ফলে এই সরকার প্রতিনিয়ত সেই রাষ্ট্রধর্মের বিকৃত ট্রান্সগ্রেশন করতে থাকবে। কারণ এই প্রতিটা সাবভারসন তাদেরকে তাদের ক্যাপটিভ ভোট ব্যাংকের চোখে লেজিটিমেসি দিয়ে চলেছে। আর এইভাবেই এরাজ্যে বিজেপির ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ হতে থাকবে। এটাই জিজেকের obscene superego supplement! 

মুশকিল হলো শুভেন্দু নিজে আদি বিজেপি না হওয়ার দরুন এবং নিজের তৃণমূলী অতীতকে জনমানস থেকে মেটাতে না পেরে, সারাক্ষণ হীনমন্যতায় ভোগেন এবং নিজের হিন্দু কট্টরপন্থী স্ট্যান্ড প্রমাণ করতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রয়াসে সচেষ্ট থাকেন—যাতে বিজাতীয় প্রভুরা তাঁকে তাদের সাথে সমাসনে বসান। এতে না ওনার অথেন্টিসিটি ফুটে ওঠে, না ওনাকে বিপক্ষের মানুষজন সিরিয়াসলি নেন। ওনার দুর্ভাগ্য উনি জানেন না যে সংঘের স্ট্রাকচারাল কনফিগারেশনে উনি বা ওনার মতো রাজনৈতিক অ্যাসপিরেন্টরা চিরকাল এক্সপেনডেবল হয়ে থেকে যাবেন। যেদিন ওনার প্রয়োজন ফুরাবে, সেদিন ওনার নটে গাছটিও মুরোবে।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এন্ট্রি নম্বর পঁচিশ ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

ছয় বছর ধরে আমি বেওয়ারিশ লাশের ছবি ফাইলে তুলি। গত মঙ্গলবার একটা পুরনো ফাইল খুলে আমি নিজের মুখটা দেখলাম!
ছবিটা পঁচিশ বছর আগের।
আমার নাম শিরিন। বয়স সাতাশ বছর। তেজগাঁও থানার রেকর্ড শাখায় কাজ করি। পদটা বড় কিছু না, অফিস সহায়ক। কাজ হলো কাগজ গোছানো, ফাইল নাম্বার তোলা আর অজ্ঞাত লাশের ছবি ও তথ্য সংরক্ষণ করা।
চাকরিটা আমি পেয়েছিলাম আব্বার সূত্রে। আব্বার নাম আজিজুল হক। এই থানারই কনস্টেবল ছিলেন। বাহাত্তর সালের পরে জয়েন করেছিলেন। অবসর নিয়েছেন বারো বছর আগে। আম্মা মারা গেছেন আমার এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়টায়।
কাজটা শুনতে যতোটা ভয়ংকর লাগে, ততোটা আসলে না। ছয় বছর পর এইটা আর দশটা অফিসের কাজের মতোই হয়ে যায়। ছবি তোলো, নম্বর বসাও, তারিখ বসাও। পরিচয়ের ঘরে লিখো অজ্ঞাতনামা।
শুধু একটা অভ্যাস আমি ছাড়তে পারিনি। ফাইল বন্ধ করার আগে প্রত্যেকটা মুখ আমি একবার করে দেখি। মানুষটা কে ছিলো, কোন ঘরে কে অপেক্ষা করেছিলো ওর জন্য, এইসব ভাবি। তারপর ফাইলটা তাকে তুলে রাখি।
আমাদের রেকর্ড রুমে সাতশোর বেশি মানুষ আছে, যাদের নাম কেউ জানে না।
মিরপুরে আমাদের দুই রুমের ফ্ল্যাট। আব্বা এখন আর বেশি হাঁটতে পারেন না। হাঁটুতে সমস্যা, চোখেও কম দেখেন। সারাদিন বসে থাকেন বারান্দায়।
আমি অফিস থেকে ফিরলে উনি জিজ্ঞেস করেন, আজকে কয়টা ফাইল হইলো মা?
আমি কখনো দশটা বলি, কখনো বলি বারোটা। উনি মাথা নাড়েন বিজ্ঞের মতো। এই এক কথার মঞ্চায়ন ছয় বছর ধরে চলছে।
মানুষটা সারা জীবনে আমার গায়ে একদিনও হাত তোলেননি। আমার এসএসসির রেজাল্টের দিন থানার সামনের দোকান থেকে মিষ্টি কিনে সবাইকে খাইয়েছিলেন।
আমাদের ছিলো তিনজনের ছিমছাম সাজানোগোছানো পরিবার। এখন দুটি মাত্র মানুষ।
গত বছর থানায় নতুন একটা সফটওয়্যার বসানো হলো। মুখ দেখে মানুষ চেনার সফটওয়্যার। আমারসহ হাজিরার জন্য থানার সব স্টাফের মুখ ওই সফওয়্যারে তোলা হয়েছে।
সেই সাথে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, পঁচিশ বছরের পুরনো অজ্ঞাত লাশের হার্ডকপির ফাইলগুলো স্ক্যান করে সিস্টেমে তুলতে হবে। প্রায় ন'শো ফাইল। রোজ অফিস শেষে দুই ঘণ্টা করে বাড়তি সময় দিতাম।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমি উনিশশো নিরানব্বই সালের একটা ব্যাচ আপলোড করছিলাম। হঠাৎ স্ক্রিনে রেড সিগন্যালের সাথে একটা বার্তা এলো। সিস্টেম বলছে, আপলোড করা একটা ছবির সাথে বিরানব্বই শতাংশ মিল পাওয়া গেছে থানার একজন কর্মচারীর!
কর্মচারীর নাম শিরিন আক্তার।
আমি ফাইলটা খুললাম।
স্টিলের অটোপসি টেবিলে একজন মহিলার লাশ। বয়স আন্দাজমতে ছাব্বিশ বছর। চোখ দুইটা আধখোলা। চুল কপালের উপর লেপ্টে আছে।
মুখটা আমার।


আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ঘরে তখন আমি ছাড়া কেউ ছিলো না। এসিটা বন্ধ ছিলো, তবু আমার হাত ঠান্ডা হয়ে আসছিলো।
ফাইলে লেখা, উনিশশো নিরানব্বই সালের নয়ই মার্চ। তেজগাঁওয়ের একটা বাসা থেকে দুইটা লাশ উদ্ধার। একজন পুরুষ, বয়স আন্দাজ তিরিশ। একজন মহিলা, বয়স আন্দাজ ছাব্বিশ। দুইজনেরই পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। মামলা নম্বর দেওয়া আছে। তদন্তের অগ্রগতির ঘরে লেখা, নথিভুক্ত।
নথিভুক্ত মানে ফাইল বন্ধ। কেউ কিছু করেনি।
সেই রাতে বাসায় ফিরে আমি আলমারির উপর থেকে পুরনো অ্যালবামটা নামালাম।
আমার সবচেয়ে ছোটবেলার যেই ছবিটা আছে, ওইটাতে আমার বয়স তিন কি সাড়ে তিন। স্টুডিওতে তোলা, ব্যাকগ্রাউন্ডে নীল পর্দা।
এর আগের কোনো ছবি নাই। একটাও না।
ছোটবেলায় একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এ বিষয়ে। আম্মা বলেছিলেন, তোর একদম ছোটবেলার ছবিগুলা বন্যার পানিতে নষ্ট হইয়া গেছিলো।
কথাটা আমি বিশ্বাস করেছিলাম। পঁচিশ বছর ধরে বিশ্বাস করে এসেছি।
পরদিন আমি আমার সহকর্মী রফিক ভাইকে ব্যাপারটা দেখালাম। উনি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন।
আশ্বস্ত করার কণ্ঠে বললেন, এইটা সফটওয়্যারের পুরনো সমস্যা, শিরিন। আত্মীয়দের মুখ গুলায়া ফেলে। মা-মেয়ে, বাপ-ছেলে, এইগুলাতে প্রায়ই ভুল মিল দেখায়। তুমি এইটা নিয়া মাথা ঘামায়ো না।
কথাটা উনি হালকা করে বললেন যদিও। আমার মাথা থেকে আর নামলো না।
তিন দিন পর নতুন একটা লাশ এলো।
ফার্মগেটের বাস কাউন্টারের পাশে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। ভোরবেলা লোকজন দেখতে পায়। কাছে কোনো কাগজপত্র, মোবাইল কিংবা টাকাপয়সা ছিলো না। বয়স আনুমানিক আটাত্তর বছর।
আমাকে ডাকা হলো ছবি তুলে ফাইল খোলার জন্য।
মর্গের বাইরের ঘরে ঢুকে ওনার মুখটা দেখে আমার হাত থেমে গেলো।
মানুষটাকে আমি চিনি।
উনি প্রতি বছর থানায় আসতেন। মানুষটার মুখভর্তি সাদা দাড়ি, কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ, হাতে পুরনো কাগজের বান্ডিল। ডিউটি অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা বলতেন। তারপর বেরিয়ে যেতেন।
আমি ওনাকে ছয় বছরে অন্তত চারবার দেখেছি। দুইবার পানি খেতে দিয়েছি নিজ হাতে।
গত বছর উনি আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। আমি ভেবেছিলাম চোখে কম দেখেন। যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মা, তোমার নামটা কী?
আমি বলেছিলাম, শিরিন।
উনি মাথা নেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
সেদিন বিকালে আমি রেকর্ড রুমে ঢুকলাম। থানার পুরনো সাক্ষাৎ রেজিস্টারগুলো তাকের সবচেয়ে উপরে থাকে। ধুলায় ভরা, বাঁধাই খুলে যাওয়া।
আমি নয়ই মার্চের পাতাগুলো খুঁজতে লাগলাম।
রেজিস্টারগুলো সাল ধরে সাজানো। প্রতিটা খাতা আধা হাত পুরু। একটা করে নামাই। নয়ই মার্চের পাতাটা বের করি, তারপর আবার তুলে রাখি।
দুই হাজার সালের খাতায় প্রথম নামটা পেলাম। তারপর দুই হাজার এক। তারপর দুই হাজার দুই।
ছয় নম্বরটার পর আমার হৃৎস্পন্দন গেলো থেমে। হাত কাঁপা শুরু হলো।
চব্বিশটা এন্ট্রি পেলাম।
প্রতি বছর নয়ই মার্চ। একই নাম, আব্দুল বারেক। একই ঠিকানা, নরসিংদী। বিষয়ের ঘরে কথা পর্যন্ত এক, মামলা নম্বর ৪৭/৯৯ সংক্রান্ত খোঁজ।
আর শেষ ঘরে, যেখানে অফিসারের মন্তব্য লেখার কথা, প্রতিবার ঘুরেফিরে তিনটা মাত্র শব্দ। কোনো তথ্য নাই।
শেষ ছয়টা এন্ট্রি আমার নিজের হাতের লেখা।
রাতে বাসায় ফিরে আমি আব্বার সামনে গিয়ে বসলাম। হাতে ফাইলের প্রিন্ট কপি।
যথাসম্ভব কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললাম, আব্বা, নিরানব্বই সালের নয়ই মার্চ তেজগাঁওয়ে যেই কেসটা হইছিলো, আপনি ওইদিন ডিউটিতে ছিলেন?
আব্বা কাগজটার দিকে তাকালেন। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
আমি ভেবেছিলাম উনি জিজ্ঞেস করবেন, এইটা কী? কিংবা বলবেন মনে নাই। উনি কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় বললেন, বসো।
তারপরের কথাটুকু আমি ওনার ভাষ্যমতেই লিখছি।
আমরা তিনজন গেছিলাম। সকাল সাতটার দিকে খবর আসছিলো। ঘরে দুইটা লাশ। ভিক্টিম স্বামী-স্ত্রী। কে মারছে, ক্যান মারছে, আজ পর্যন্ত কেউ জানে না।
তিনটা ঘর আমরা খুঁজছি। কিছু পাই নাই। শেষে গিয়া পাইলাম খাটের নিচে।
একটা ফুটফুটে বাচ্চা মাইয়া। বয়স দুই কি আড়াই। খাটের নিচে বইসা আছিলো। কান্দে নাই, শব্দও করে নাই। মুখ জুইড়া ভয়ের ছাপ। আমারে দেইখা ছোট্ট হাতটা বাড়াইয়া দিছিলো।
আমি একটু থেমে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর?
তোর মায়ের কোল এগারো বছর খালি আছিলো, শিরিন। ডাক্তার দেখাইছি, পীরের কাছে গেছি, কিচ্ছুতে কোনো কাজ হয় নাই।
আমি বাচ্চাটারে কোলে নিয়া গাড়িতে উঠছি। রিপোর্টে লিখছি, ঘরে জীবিত কাউরে পাওয়া যায় নাই।
ঘরে তখন কোনো শব্দ ছিলো না। বারান্দার দরজাটা খোলা ছিলো। বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ আসছিলো থেমে থেমে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি জানতেন যে একটা লোক প্রতি বছর থানায় আসতো?
আব্বা হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লেন।
তারপর বললেন, প্রথম দশ বছর আমি নয়ই মার্চ তারিখে ছুটি নিতাম।
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। জিজ্ঞেস করার মতো কিছু বাকি ছিলো না।
আব্দুল বারেক ছিলেন আমার নানা। ছবির ওই মহিলা আমার মা।
লোকটা পঁচিশ বছর ধরে নরসিংদী থেকে বাসে করে ঢাকা আসতেন শুধু একটা প্রশ্ন করার জন্য। মেয়ে আর জামাইয়ের লাশ উনি পেয়েছিলেন। নাতনির লাশ পাননি। রিপোর্টে যেহেতু লেখা ছিলো ঘরে জীবিত কেউ ছিলো না, উনি ধরে নিয়েছিলেন বাচ্চাটাও মরে গেছে।
উনি আসলে সারাজীবন একটা লাশ খুঁজতে এসেছেন। যেই লাশটা কোনোদিন ছিলোই না।
ওনার লাশ আঞ্জুমানের গাড়ি নিয়ে গেছে। আমি কিছু দাবি করিনি। করার মতো কোনো কাগজ আমার হাতে নাই। ডিএনএ পরীক্ষা করাতে গেলে আব্বার নামে মামলা হবে। মানুষটার বয়স তিয়াত্তর বছর। হাঁটুর ব্যথায় হাঁটতে পারে না।
আমি জানি এইটা কোনো যুক্তি না। তবু চুপ করে আছি।
সেদিন রাতে থানা খালি হয়ে গেলে আমি রেজিস্টার খাতাটা টেবিলে রাখলাম।
পঁচিশ নম্বর এন্ট্রিটা এবার লিখলাম নিজের হাতে।
তারিখ লিখে নামটা লিখলাম যত্ন করে, আব্দুল বারেক। ঠিকানা, নরসিংদী। বিষয়ের ঘরে লিখলাম, নাতনির খোঁজ।
আর শেষ ঘরে, যেখানে চব্বিশবার লেখা হয়েছিলো কোনো তথ্য নাই, সেখানে লিখলাম, পাওয়া গেছে।
আমার সরকারি কাগজে যেই নামটা লেখা, ওইটা আমার না। আমার আসল নামটা পুরনো একটা জিডির কপিতে লেখা আছে, নূরজাহান। বাসায় সবাই নাকি নূরী ডাকতো।
পঁচিশ বছরে এই নামটা একজন মানুষই মনে রেখেছিলো।
গত বছর উনি আমার দিকে আর্দ্র চোখে তাকিয়ে নামটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি ভাগ্যের ফেরে ভুল নামটা বলেছিলাম। তারপর ওনাকে বিদায় করেছিলাম এক গ্লাস পানি খাইয়ে।
এন্ট্রি নম্বর পঁচিশ
তাইমুর মাহমুদ শমীক