শনিবার, ২ মে, ২০২৬

হিন্দুত্ববাদ ন্যারেটিভ বিল্ডিং ~ অরিজিৎ মুখার্জী

ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, একটা বিষয় স্পষ্ট —  একটা ক্রিটিকাল সময় আসতে চলেছে। বিজেপি যেভাবে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলা দখলে নেমেছিল তাতে এটা স্পষ্ট যে ফাইনাল লড়াইয়ের সময় আগতপ্রায়। এই লড়াইটা আমাদেরই লড়তে হবে, আর এখানে লড়তে গেলে, কার বিপক্ষে, কীসের বিপক্ষে লড়ছি সেটাও তো জানা দরকার। কাজেই, আবার একটু ইতিহাসের জ্ঞান...যদিও এগুলো কোনোটাই বিশেষ অজানা কথা নয়। একটু চোখকান খোলা রাখলে, একটু বইপত্র পড়লে এগুলো জানা এবং বোঝার কথা। তাও ডকুমেন্ট করে রাখছি, শুধুমাত্র স্কেলটা বোঝানোর জন্যে।

"হিন্দু খতরে মে হ্যায়" - এই কথাটা তো কয়েক লক্ষ বার শুনে ফেলেছেন। অথচ, ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী (দুঃখিত, ২০১১ সালই ধরতে হবে, কারণ মোদী সরকার তার পরের সেন্সাস করেই উঠতে পারেনি) ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা জনসংখ্যার ৭৯.৮%, মুসলমানের সংখ্যা ১৪.২%, ক্রিশ্চান ২.৩%, শিখ ১.৭%, বৌদ্ধ ০.৭%, জৈন ০.৪% আর অন্যান্য ০.৯% মতন। অর্থাৎ, এদের দাবী অনুযায়ী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও হিন্দু বিপদে। শুধু আজ নয়, আরএসএসের জন্মলগ্ন থেকেই।
তো, আপনার কখনও মনে হয়নি যে এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্যশালী জনগোষ্ঠী এমন নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের মত বায়নাক্কা করে কেন?
ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলটের লেখায় একটা স্টিগমাটাইজেশন/এমুলেশন ফ্রেমওয়ার্কের কথা পেয়েছিলাম এবং লিখেওছিলাম - আগে যারা 'অপর', তাদের আচার আচরণের তুমুল নিন্দা করে সেগুলোকে স্টিগমাটাইজ করতে হবে, সেই লোকগুলোকে শয়তানের অবতার বলে দাগিয়ে দিতে হবে, আর তারপর তাদের কাউন্টার করতে সেই একই পদ্ধতিগুলোকে আপন করে নিতে হবে। কিন্তু এই ব্যাপারটা আসে আগে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ এসট্যাবলিশ হওয়ার পরে। সেটার কারণ খুঁজতে গিয়ে তনিকা সরকারের লেখায় কিছু পয়েন্টার পেলাম।
(ডিঃ আমি তনিকা ম্যাডামের পাক্কা ফ্যান হয়ে গেছি, শুরুর দিকে কষ্ট করে বুঝতে হলেও, এরকম ক্ল্যারিটি খুব কম লোকের লেখায় পাই)
এই পার্সিকিউটেড মানসিকতাটা কোনও ম্যাজিক ট্রিক নয়। বরং, রাইট উইং হিন্দুত্বের নেতৃস্থানীয় লোকজনের জেনুইন সাইকোলজিক্যাল ও পলিটিকাল রিয়েলিটি...
প্রথম ধাপ — আরএসএস এবং বিজেপি-বজরঙ্গ দল-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতৃত্ব আর ফুট সোলজারদের আলাদা করে দেখতে হবে। এই ফুট সোলজার আর ভোটারদের পপুলেশনটা যথেষ্ট ডাইভার্স। এদের মধ্যে তথাকথিত নীচু জাতের লোকজন, দলিত, এবং গরীব মানুষও রয়েছে। এই গোষ্ঠীটা কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। এবার দেখুন সঙ্ঘ পরিবারের অ্যাক্টিভিস্টদের (প্রচারক বা নেতৃত্বকে) - মূলতঃ উঁচু জাতের লোক, মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত। এই ছোট অথচ শক্তিশালী গোষ্ঠীটাই সঙ্ঘের মতাদর্শের পরিচালক। কাজেই, বাস্তব হল, সঙ্ঘ পরিবারের মাথায় বসে থাকা লোকগুলো গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই একটা ছোট্ট অংশ, সংখ্যার বিচারে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি নয়। এরা যখন সেন্সাসের ডেটার দিকে তাকায়, তখন এদের চোখে ৮০ শতাংশ হিন্দু ধরা পড়ে না, বরং এরা ভাবে যে তাদের নির্দিষ্ট সম্প্রদায়টা খুবই ছোট, আর তাই, তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বড়ই নড়বড়ে...
এরপর দ্বিতীয় ধাপ। শক্তি আর দুর্বলতার চরম স্ববিরোধী পার্সেপশন - যেটা হিন্দুত্ববাদীদের থিওরির মূল পিলার। এরা একদিকে ভাবে - "আমরা রাষ্ট্রশক্তি, অর্থনীতি, এবং পাবলিক ডিসকোর্স নিয়ন্ত্রণ করি। সংখ্যায় আমরা নগণ্য"। আবার এরাই আরেকদিকে ভাবে - "আমরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করি, আমাদের অন্যরা (নীচু জাত, দলিত, মুসলমান) ঘিরে ফেলছে"। ইয়ার্কি নয়, ইল্যুশন নয়, এইটাই একটা সংখ্যায় নগণ্য আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা - এমন একটা গোষ্ঠী যাদের হাতে সমস্ত ধরণের মেটিরিয়াল পাওয়ার (সম্পদ, শিক্ষা, মিডিয়া) থাকলেও তারা একটা ডেমোগ্রাফিক অ্যাংজাইটিতে ভোগে - পাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ (গরীব, নীচু জাত, দলিত) তাদের গিলে খেয়ে ফেলে...
তৃতীয় ধাপে ঘটে সবকিছুকে মনোলিথিক স্ট্রাকচার দিয়ে বাকি সমস্ত ন্যারেটিভকে উধাও করে দেওয়ার খেলা - রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এইটাই আসল ধাপ। হিন্দুত্ববাদীরা মনে করে যে সমস্ত হিন্দুই একটা অখণ্ড গোষ্ঠী এবং তারাই এই গোষ্ঠীর প্রতিনিধি, কাজেই এই জায়গা থেকেই আসে রাম, হনুমান, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান, এক ভাষা-এক ধর্ম-এক খাদ্যাভ্যাস-এক পোশাক ইত্যাদির ইউনিফর্মিটির দাবিদাওয়া। খুব সুনির্দিষ্টভাবে সমস্ত বৈচিত্রকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া। কারা এই রাজনৈতিক ন্যারেটিভ থেকে উধাও হয়ে যায়? গরীব মানুষ, কারণ রুটিরুজির সমস্যার জায়গা নেয় সাংস্কৃতিক ইস্যুগুলো; নীচু জাত আর দলিত জনগোষ্ঠী, কারণ উঁচুজাতের সমস্ত অত্যাচারের কাহিনী মুছে ফেলা হয়; এলজিবিটি বা ক্যুইয়ার মানুষ, কারণ এই চিন্তাভাবনাটাই "বহিরাগত", পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করা; আদিবাসী আর বাস্তুচ্যুত মানুষ, কারণ তাদের ভূমির অধিকার চাপা পড়ে যায় জাতীয় উন্নতির ন্যারেটিভের নীচে। আর, এত রকমের মানুষকে মুছে দিয়ে তাদের জায়গা নেয় "নিপীড়িত হিন্দু" - দলিতদের ওপর উঁচুজাতের অত্যাচারের ন্যারেটিভ বদলে গিয়ে তৈরী হয় "মুসলমানদের চারটে বিয়ে আর দশটা বাচ্চা, ওরা হিন্দুদের ঘিরে ফেলছে; আর, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির হাতে হিন্দুরা আক্রান্ত"...
এই ন্যারেটিভ হিন্দুত্ববাদী দলের কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে চার নম্বর ধাপে। কর্মী বা অ্যাক্টিভিস্টরা বেশিরভাগই উচ্চবর্ণের। তাদের কাছে ওপরের এই ন্যারেটিভটা বলা যায় "লিভড এক্সপিরিয়েন্স" বা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। এরা ভাবে - "আমি শিক্ষিত ব্রাহ্মণ, কিন্তু ভারতের জনসংখ্যার মোটে ৪ শতাংশের মধ্যে পড়ি। নীচু জাত আর দলিতেরা যদি মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেলে, আমি আমার সর্বস্ব হারাব"। হিন্দুত্ববাদী দলের নেতৃত্ব তাকে বলে - "তুমি মোটেও প্রিভিলেজড শোষক নও, বরং তুমি একজন বীর হিন্দু যোদ্ধা, তোমার হাতেই হিন্দু সভ্যতার রক্ষার ভার রয়েছে"। শ্রেণী বা জাতিগত প্রিভিলেজ হয়ে ওঠে জাতীয় বা ধর্মীয় কর্তব্য।
একদম সহজ ভাষায় উদাহরণ দিয়ে বলি। মনে করুন কোনও এক শহরে, কয়েকটা অত্যন্ত ধনী উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী পরিবার থাকে। শহরটা মূলতঃ হিন্দু অধ্যুষিত, ধরা যাক ৮০ শতাংশ মানুষই হিন্দু। আর ওই উচ্চবর্ণের অভিজাত পরিবারগুলো সেই জনসংখ্যার মোটে ১৫ শতাংশ। শহরের সমস্ত ব্যবসাবাণিজ্য, খবরের কাগজ ইত্যাদির মালিকানা রয়েছে এই কয়েকটা পরিবারের হাতেই, তারাই চালায় শহরের মিউনিসিপাল কাউন্সিল। অর্থাৎ, তাদের হাতেই রয়েছে সমস্ত ক্ষমতা। কিন্তু, তারা এও জানে, যে শহরবাসীরা যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া না করে একজোট হয়ে যায়, আর বুঝে ফেলে যে ওরা সংখ্যায় এই ক্ষমতা ধরে রাখা লোকগুলোর চেয়ে প্রায় নয় গুণ বেশি, তাহলে অচিরেই তাদের হাত থেকে ক্ষমতা সরে যাবে, তাদের নিজেদের অস্তিত্বই টিঁকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। সুতরাং, তাদের অবভিয়াস রাজনৈতিক চাল হল "বহিরাগত তত্ত্ব" আমদানি করা - যেমন, পাশের গ্রামের লোকগুলো আমাদের জল চুরি করে নিতে চাইছে, বা বাইরের শহর থেকে লোকজন এসে আমাদের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে...শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের নজর এইদিকে আটকে রেখে তাদের ভুলিয়ে দেওয়া যে শহরের আসল ক্ষমতা রয়েছে মুষ্টিমেয় কয়েকটা লোকের হাতেই। আর মজার ব্যাপার হল, এই মুষ্টিমেয় ক্ষমতাবান সত্যিই বিশ্বাস করে যে তারা দুর্বল ও বিপন্ন।
ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময় হার্মান গোয়েরিং একটা কথা বলেছিলেন - "Voice or no voice, the people can always be brought to the bidding of the leaders. That is easy. All you have to do is tell them they are being attacked, and denounce the pacifists for lack of patriotism and exposing the country to danger. It works the same in any country."
হিন্দুত্ববাদী চালচলন সবই নাৎসিদের সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় - শুধু বর্ণ (caste) বদলে যায় জাতিতে (race)। এক্ষেত্রেও কোনও অন্যথা হয়নি...
▪️এইদিকে সমস্ত ক্ষমতা আর ডিসকোর্স নিয়ন্ত্রণ করা অভিজাত উচ্চবর্ণ; ওইদিকে অসন্তুষ্ট পেটি-বুর্জোয়া এবং "ভোল্কিশ' বুদ্ধিজীবী।
▪️এইদিকে ভারতীয় সভ্যতার বিশালত্ব এবং হিন্দু খতরে মে হ্যায়; ওইদিকে জার্মানি হল "হেরেনভোক' (মাস্টার রেস), একই সঙ্গে জার্মানি "উমভোক্ট' (স্লাভিক বা ইহুদীদের দ্বারা দূষিত)।
▪️এইদিকে হিন্দু ঐক্য আর অখণ্ড ভারতের আড়ালে শ্রেণী ও বর্ণসংঘাত চাপা দেওয়া; ওইদিকে "ভোক্‌সগেমাইনশাফট' (জাতিগত সম্প্রদায়)-এর আড়ালে শ্রেণী সংঘাত (শ্রমিক বনাম পুঁজিপতি) চাপা দেওয়া।
▪️এইদিকে দুর্বলতার উৎস হল আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা (সেকুলারিজম, নাস্তিকতা, কমিউনিজম), আর তার সঙ্গে বাইরের আক্রমণ (ইসলাম); ওইদিকেও আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা (জুডিও-বলশেভিজম) আর বাইরের আক্রমণ (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স)।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে হিন্দুত্ববাদীদের বক্তব্যগুলো শুনে নিন - দেখবেন খাপে খাপ মিলে যাবে। শুধু, এরা এতটাই অশিক্ষিত যে একইসঙ্গে বলে ফেলে যে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ হয়ে যাবে, আর পশ্চিমবঙ্গের ভাষা হয়ে যাবে ঊর্দু...এদের বাবা, স্বয়ং অ্যাডলফবাবু অবধি, এসব বলদমার্কা কথা শুনলে মিলিটারি বুট ছুঁড়ে মারতেন।
"হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ কীভাবে তৈরী হয় সেইটা নিয়ে গতকাল লিখেছিলাম। সঙ্ঘপরিবারের নেতৃত্ব ও কর্মী - যারা প্রায় সকলেই উচ্চবর্ণের - গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই ছোট একটা অংশ হওয়ার জন্যে তাদের নিজেদের ডেমোগ্রাফিক অ্যাংজাইটি এবং বাদবাকি নীচু জাত আর দলিতদের কাছে ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকে আসে এই রাজনৈতিক কৌশল, যেখানে অন্য কাউকে (যেমন ধরুন সেকুলার, কমিউনিস্ট, মুসলমান) ভিলেন খাড়া করে বাকি হিন্দু সম্প্রদায়ের টার্গেট বদলে দেওয়া হয়...
স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে যে এইটা তো উচ্চবর্ণের অ্যাক্টিভিস্টদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সঙ্ঘপরিবারের ফুট সোলজার যারা, বা ভোটার যারা - তাদের ডেমোগ্রাফিক কম্পোজিশন তো অনেক ডাইভার্স - সেখানে নীচু জাত আছে, ওবিসি আছে, দলিত আছে, আদিবাসী সম্প্রদায় আছে। তাদের ক্ষেত্রে এই "লিভড এক্সপিরিয়েন্স" তত্ত্ব খাটছে কী করে? বরং তারা তো সেই উচ্চবর্ণের হাতেই নানাভাবে এক্সপ্লয়েটেড। বা, অবহেলিত। সঙ্ঘপরিবারের বিভিন্ন নেতা পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য রাজ্যে গিয়ে ঘটা করে কোনও দলিত বা আদিবাসী পরিবারের দাওয়ায় বসে পাত পেড়ে খেয়ে ফটোসেশন করেন, তারপর ভুলে যান। সেই পরিবারকে তাদের প্রতিদিনের সমস্যাগুলো মেনে নিয়েই চলতে হয় একদিন অমিত শাহ বা মোহন ভাগবত বা শমীক ভট্টাচার্য্যের "সেবা" করার মত গুরুদায়িত্ব পেয়েও...এসবের পরেও তারা সঙ্ঘের আদর্শকে সাপোর্ট করে কেন, বা বিজেপিকে ভোট দেয় কেন?
খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন। এবং এর উত্তরও আছে। আজকে সেইটা লিখব।
ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাস্তবে চারটে ফ্যাক্টরের ওপর কাজ করে, আর এগুলোর কোনটার জন্যেই আগে লেখা উচ্চবর্ণের উদ্বেগ বা শঙ্কাকে অনুভব করার দরকার পড়ে না।
(১) সঙ্ঘ খুব সফলভাবে সমস্ত ভার্টিকাল কনফ্লিক্ট - যেমন দলিতদের ওপর উঁচু জাতের অত্যাচার - মুছে দিয়ে একটা হরাইজন্টাল কনফ্লিক্টের গল্প ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। একজন দলিতের নিজের জীবনে হয়ত গ্রামের ঠাকুর তার ওপর অত্যাচার করে, তাকে বিনা মজুরিতে খাটায়, গ্রামের কুয়ো থেকে তার জল তোলা মানা। হিন্দু রাইট উইং তাকে বোঝায় - "তোমার ঘরে জলের অভাব কারণ মুসলমানের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, আর ওরা তোমার ভাগে থাবা বসাচ্ছে। তোমার অপমানের আসল কারণ হল হাজার বছর ধরে চলা ইসলামী আগ্রাসন - তোমার আত্মসম্মানবোধ ভেঙে চূর্ণ করে দিয়েছে মুসলমান শাসকেরা। তোমাকে আগে তোমার হিন্দুত্বের গর্ব ফিরিয়ে আনতে হবে"। দলিত লোকটার কাছে এটা একটা সাইকোলজিক্যাল প্রশ্ন। সে ভারতের জাতপাতের কাঠামোর একেবারে নীচের তলায় পড়ে আছে। অথচ একজন হিন্দু হিসেবে সে নিজেকে এক গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার অঙ্গ হিসেবে দেখতে পারে। এই সাময়িক আপলিফটমেন্ট খানিকটা মরফিনের মত তাকে বর্ণাশ্রমের দাসত্বের যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়।
(২) আজকের দিনে, ভোট ব্যাপারটা পুরোপুরিই ট্রাঞ্জ্যাকশনাল - পাওনাগণ্ডা বুঝে নেওয়া। অনেক ভোটারের কাছে এই গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতা বা জাতপাতের টেনশন ইত্যাদি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই, সময়ও নেই। কাজেই এখানে একটা অলিখিত চুক্তি কাজ করে - "আমি আপনাকে ভোট দেব - এই কারণে নয় যে আমি মনে করি মুসলমানেরা আমাদের দেশ দখল করে ফেলবে বা আমি হিন্দু ধর্মের বীর যোদ্ধা ইত্যাদি। আমি ভোট দেব যদি আপনি আমাকে একটা বেশি গ্যাসের কানেকশন করিয়ে দেন। আপনার মন্দিরের রাজনীতি আমি মেনে নেব যদি আপনি আমার জন্যে বিশুদ্ধ জল বা শৌচাগারের ব্যবস্থা করে দেন"। এই হিসেবটা সবচেয়ে সহজ কারণ এখানে আদর্শ, উদ্বেগ ইত্যাদি কঠিন কথাবার্তার কোনও জায়গাই নেই। শুনতে খারাপ লাগলেও এই বাস্তবটাকে এড়ানো কঠিন।
(৩) রাষ্ট্রের করা Sanskritization - অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী (ওবিসি) এবং দলিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সবচেয়ে সংগঠিত অংশের জন্য হিন্দু রাইট উইং প্রচলিত বর্ণপ্রথার স্টিগমা এড়ানোর একটা রাস্তা দেখায়, আর সেটা হল ইকোনমিক ন্যাশনালিজম আর ইউনিফর্মিটি। অনেক ওবিসি বা দলিত ভাবে - "পুরনো কংগ্রেস/দলিত দলগুলো চায় আমি ভিক্টিম হয়ে থাকি, সংরক্ষণের মাধ্যমে যেটুকু পাওয়া যায় তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি"। হিন্দুত্ববাদীরা বোঝায় – "তুমি আসলে দেশপ্রেমিক হিন্দু। তুমিও বড় ব্যবসায়ী হতে পারো, মালিক হতে পারো, তোমাকে আমাদের সঙ্গে আসতে হবে"। ফলাফল - সামাজিকভাবে আপওয়ার্ডলি মোবাইল হওয়ার চক্করে উচ্চবর্ণের কাস্টম, ট্র্যাডিশনকে আপন করে নেওয়া - উগ্র ধার্মিকতা, নিরামিষাশী হয়ে যাওয়া, মুসলমানবিরোধী হয়ে যাওয়া...মাথায় একটা সিগন্যাল পৌঁছয় – "আমি আর শুধু একটা বর্ণ নই, আমিও সেই গৌরবোজ্বল হিন্দু সভ্যতার অঙ্গ, হিন্দু জাতি (নেশন)"।
(৪) এর বাইরে একটা বাস্তব সমস্যা থেকে যায়। কাস্ট-সংক্রান্ত বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পের অভাব। ভোটার তার রাজ্যের বিকল্পগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে সেগুলো প্রায়ই কোনও একটা প্রভাবশালী যাদব বা কুর্মি পরিবারের মৌরসিপাট্টা - অধিকাংশ সুযোগ সুবিধা সেই সম্প্রদায়ের মধ্যেই কুক্ষিগত হয়ে থাকে। সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনজাতি বা দলিতরা উপেক্ষিতই থেকে যায়। আর এইসব দেখে শেষ অবধি সে ভাবতে শুরু করে যে এই উঁচুজাতের দলটা তো অন্তত আমাকে হিন্দু মনে করছে...ওই ওবিসিদের দলটা তো আমার দিকে ফিরেই তাকায় না...
আজকের এই হিন্দুত্ববাদী ডিসকোর্স গোটা আলোচনার পরিসরকেই গিলে ফেলে গরীব প্রান্তিক মানুষের সামনে দুটো পথ খোলা রাখে—
হয় হিন্দু ঐক্যের আবহে নিজেদের অস্তিত্বহীন করে তোলো, আর নয়তো জাতি-ভিত্তিক রাজনীতির গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে খণ্ড খণ্ড ও ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ো।
সাধারণ ভোটারের কাছে প্রথমটাই কম ঝুঁকির; উচ্চবর্ণের শর্তাধীনে হলেও সে কোনোভাবে ক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছনোর স্বপ্ন দেখতে পারে।

একটা প্রিল্যুড দিয়ে রাখি। কিছু অংশে আলাদা করে নজরটান দেওয়া রইলো। ঘটনাটা ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের, যেদিন নৌবিদ্রোহের সমর্থনে কলকাতা উত্তাল হয়েছিল। সামনের সারিতে ছিল ইউনিফর্ম পরিহিত ট্রাম শ্রমিকেরা। নৌবিদ্রোহ নিয়ে বিজেপি নেতারা আজকাল খুব লাফায় শুনি...
The 𝗖𝗼𝗻𝗴𝗿𝗲𝘀𝘀 𝗮𝗻𝗱 𝘁𝗵𝗲 𝗠𝘂𝘀𝗹𝗶𝗺 𝗟𝗲𝗮𝗴𝘂𝗲 𝗱𝗶𝗱 𝗻𝗼𝘁 𝘀𝘂𝗽𝗽𝗼𝗿𝘁 the strike call, giving much relief to the government. It was stated in a government report that '𝘀𝘂𝗯𝘃𝗲𝗿𝘀𝗶𝘃𝗲 𝗲𝗹𝗲𝗺𝗲𝗻𝘁𝘀' 𝗹𝗶𝗸𝗲 𝘁𝗵𝗲 𝗖𝗼𝗺𝗺𝘂𝗻𝗶𝘀𝘁𝘀 𝘄𝗲𝗿𝗲 𝗿𝗲𝘀𝗽𝗼𝗻𝘀𝗶𝗯𝗹𝗲 𝗳𝗼𝗿 𝗳𝗼𝗺𝗲𝗻𝘁𝗶𝗻𝗴 𝘁𝗿𝗼𝘂𝗯𝗹𝗲 and the incidents in Bombay and Karachi found 𝗹𝗶𝘁𝘁𝗹𝗲 𝘀𝘆𝗺𝗽𝗮𝘁𝗵𝘆 𝗳𝗿𝗼𝗺 𝘁𝗵𝗲 '𝗹𝗮𝗿𝗴𝗲 𝗽𝗮𝗿𝘁𝗶𝗲𝘀 𝗹𝗶𝗸𝗲 𝗖𝗼𝗻𝗴𝗿𝗲𝘀𝘀, 𝗠𝘂𝘀𝗹𝗶𝗺 𝗟𝗲𝗮𝗴𝘂𝗲 𝗮𝗻𝗱 𝗛𝗶𝗻𝗱𝘂 𝗠𝗮𝗵𝗮𝘀𝗮𝗯𝗵𝗮'. The same report branded the Calcutta tramwaymen as the 'most effective trouble-makers' because of their pro-CPI leanings.

বিষয়: আরএসএস-এর স্কুল — যাকে ওরা শিক্ষার মন্দির বলে, সেগুলো কেন আসলে ঘৃণার মন্দির। Saffron Temples of Hate.

সরস্বতী শিশু মন্দিরের দিকে একবার তাকালে দেখতে পাবেন বাচ্চারা প্রার্থনা করছে, গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, বন্দে মাতরম গাইছে। কী মনে হয়? একদম নিষ্পাপ শাশ্বত ভারতীয় সংস্কৃতি, তাই না? আজ্ঞে না। বাস্তবে এই সরস্বতী শিশু মন্দির হিন্দুরাষ্ট্রের কারখানা; একটা প্রোজেক্ট যেটা বহু বছর ধরে নি:শব্দে চলে এসেছে। ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিন (দশমীর সিগনিফিকেন্সটা মাথায় রাখবেন — রামের হাতে রাবণের মৃত্যু) এক মারাঠি ব্রাহ্মণ, কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার, ওরফে ডক্টরজী, প্রতিষ্ঠা করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের। ঘোর কলোনিয়াল শাসনের সময় হলেও হেডগেওয়ারের লক্ষ্য ছিল ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় আর তাঁর চোখে সবচেয়ে বড় সামাজিক ব্যাধি — হিন্দু-মুসলমান ঐক্য। হেডগেওয়ারের উত্তরাধিকারী, মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর, আরেক মারাঠি ব্রাহ্মণ, একাধিকবার হিটলারের জার্মানির প্রশংসাও করেছিলেন — বিশেষ করে জার্মানি যেভাবে সেমিটিক (এক্ষেত্রে ইহুদী) সম্প্রদায়ের মানুষদের দেশ থেকে তাড়িয়েছিল, তার। গোলওয়ালকরের লেখায় (We or Our Nationhood Defined) এমনও ঘোষণা পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলছেন অহিন্দুরা ভারতে থাকতে চাইলে তাদের হিন্দুদের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে হবে, এবং তাদের নাগরিক অধিকার বলে কিছু থাকবে না। আরএসএস আজ অবধি হেডগেওয়ার এবং গোলওয়ালকরের কথাকে অস্বীকার করেনি। পঞ্চাশের দশক থেকে তৈরী হয়ে আসা সঙ্ঘের কয়েক হাজার স্কুলে এই মুহূর্তে পড়াশোনা করা চল্লিশ লক্ষের কাছাকাছি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এই ধারণাই বয়ে চলেছে। আজও।

আরএসএস স্কুল বলে না। বলে মন্দির। এখানে উদ্দেশ্য স্বাক্ষরতা বা শিক্ষা নয়। উদ্দেশ্য হিন্দু রাষ্ট্রের পুজো করতে শেখানো — এমন রাষ্ট্র যেখানে মুসলমান, ক্রিশ্চান আর দলিতরা হয় শত্রু, নয় ভৃত্য। স্কুলের মধ্যে বা পাশেই মন্দির একটা থাকবেই। স্কুলের ভিতরে দেওয়ালে ঝুলবে রাম, রাণা প্রতাপ, শিবাজীর ছবি — বিদেশী, বিশেষ করে মুসলমানদের খতম করা বীর যোদ্ধা হিসেবে। থাকবে হেডগেওয়ার আর গোলওয়ালকরের ছবিও। ভারতের ম্যাপের বদলে ঝুলবে অখন্ড ভারতের ম্যাপ, আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার অবধি বিস্তৃত ভূখন্ডের ছবি যেখানে বিরাজ করেন ভারতমাতা। স্কুলে আলাদা করে অযোধ্যার রামজন্মভূমি নিয়ে বক্তৃতা হবে; কোনো স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা গর্ব করে বলবেন কীভাবে সেই বক্তৃতা শুনে ক্লাস ফাইভের ছেলেমেয়েরা রাগে, প্রতিশোধের স্পৃহায় হাত মুঠো করে ফেলেছিল। আরেক প্রধানশিক্ষক বলবেন কীভাবে তাঁর স্কুলের ছাত্ররা ১৯৯০ সালে করসেবায় যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গী হয়েছিল। সরকারি আইনরক্ষকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের কথা স্মরণ করা হবে স্কুল অ্যাসেম্বলিতে।

ইতিহাস শেখানো হবে না। ইতিহাসকে ওয়েপনাইজ করা হবে। বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হবে "ভারতীয় সংস্কৃতি" বলে একটা আলাদা বিষয়। সেখানে বাচ্চারা শিখবে মুসলমান মানে আক্রমণকারী, ধর্ষক, যারা মন্দির ভাঙে, যারা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে এসেছে চিরকাল। হিন্দুরা চিরকেলে নির্যাতিত, কাজেই তার বদলা নিতে হিংসার আশ্রয় নেওয়া জায়েজ। আজকের সাধারণ মুসলমান নাগরিক আর মধ্যযুগের মুসলমান শাসক একই। মহাকাব্য, মাইথোলজি আর ইতিহাসের বাউন্ডারি আবছা করে দেওয়া হবে এমনভাবে যাতে নায়কের রোলে মানুষ আর দেবতার মধ্যে বিশেষ ফারাক না থাকে, আর খলনায়কের চরিত্রে অসুর, কলোনিয়াল শাসক আর মুসলমানকেও একই খোপে ফেলে দেওয়া যায়। নায়করা সকলকে অবশ্যই হিন্দু এবং অবশ্যই উচ্চবর্ণের হতে হবে। মেয়েদের দেখানো হবে "সতী" হিসেবে — যারা সম্ভ্রম বাঁচাতে আগুনে পুড়ে মরতেও পিছপা হয় না। ক্লাস ফোরের টেক্সটবইয়ে থাকবে ১৯৯০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙতে গিয়ে "শহীদ" হওয়া করসেবকদের ছবি। শেখানো হবে সমস্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আসল উৎস সুমহান ভারতের প্রাচীন হিন্দু স্ক্রিপচারেই। বাচ্চাদের ক্যুইজের প্রশ্ন করা হবে: "কোন অত্যাচারী শাসক গুরু গোবিন্দ সিংহের ছেলেদের জীবন্ত কবর দিয়েছিল"? তারা উত্তর মুখস্থ করবে: "ঔরঙ্গজেব"। প্রেক্ষাপটহীন জ্ঞানের মোড়কে বিক্রি হবে ঘৃণা।

শুধু শরীর তৈরী হবে। মানবিকতা নয়। যোগাসন বাধ্যতামূলক হবে বাচ্চাদের হিন্দুরাষ্ট্রের যোগ্য সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। লাঠি, তরোয়াল, বর্শার ব্যবহার শেখানো হবে — আধুনিক যুদ্ধে লড়বার জন্যে নয়, বরং নিরস্ত্র গরীব মুসলমান সহনাগরিকদের পিটিয়ে খুঁচিয়ে মারার জন্যে। বাচ্চাদের জন্মদিন পালন হবে পবিত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে, সংস্কৃত মন্ত্রের উচ্চারণে আর ক্যাসেটে ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী গান বাজিয়ে; কেক কেটে নয়, কারণ সেটা পশ্চিমী সংস্কৃতি, যতই জনপ্রিয় হোক না কেন। বাচ্চাটাকে মালা পরানো হবে, সাজানো হবে দেবতার সাজে। ব্যক্তিগত আনন্দের জায়গা নেবে সমষ্টিগত আচার। আরএসএসের নিজস্ব ম্যানুয়ালে লেখে — "Without a suitable technique no ideal can be realized. We have evolved a technique, an emblem, a mantra, a code of discipline" — সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার সর্বগ্রাসী মনোভাব; ময়ূরকে আফিম খাইয়ে পোষ মানানোর মতন, যেখানে দশ-বারো-চোদ্দ বছরের বাচ্চারাও এই হিন্দুরাষ্ট্রকে দেশ ভেবে দেশপ্রেমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে।

নজরদারি চলবে পরিবারের ভিতরেও। স্কুলের শিক্ষকরা নিয়মিত পৌঁছে যাবেন ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতেও; সম্পর্ক গড়ে তুলবেন বাবা-মা, পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে। আরএসএসের বর্ধিত শাখার অংশ হয়ে উঠবে স্কুল। পরিবার সঙ্ঘের আদর্শে আপত্তি করলে ছাত্র বা ছাত্রীকে বলা হবে অপেক্ষা করতে; আস্তে আস্তে ভিতর থেকে পরিবারকে বদলাতে; এই কাজে সাহায্য করবেন শিক্ষকেরা। পেরেন্ট-টিচার মিটিং বাচ্চার পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়ে হবে না; হবে সংস্কার নিয়ে — কীভাবে বাচ্চার মধ্যে হিন্দু সংস্কার গড়ে তুলতে হবে — বশ্যতা, আনুগত্য, শ্রদ্ধা আর "ওদের" প্রতি ঘৃণা। "ওরা" মানে মুসলমান বা ক্রিশ্চান বা দলিত নীচু জাতের মানুষ। সঙ্ঘের মহিলা শাখা — রাষ্ট্রসেবিকা সমিতি — মেয়েদের মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেয়, কিন্তু শেখায়: "হাম ঘর তোড়নেওয়ালে নেহি হ্যায়"। স্কুলের মেয়েরা বড় হলে, বিয়ের পর পারিবারিক অত্যাচারের মুখে পড়লে, আইনি সহায়তা থাকে না, পণপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকে না, বিচ্ছেদের সুযোগ থাকে না। থাকে শুধু একটা গেরুয়া খাঁচা।

বিপদটা শুধু সাম্প্রদায়িকই নয়, ভয়ানকভাবে গণতন্ত্রবিরোধীও। সরকারি স্কুলগুলোর পরেই, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্কুল চেইন চালায় বিদ্যা ভারতী, গোটা দেশে প্রায় পঞ্চাশ হাজার; লক্ষ্য ভারতের প্রতিটি ব্লকে অন্তত: একটা করে স্কুল তৈরী। সেখানে বাচ্চারা গণতন্ত্র শেখে না। "গুরুজী" গোলওয়ালকর তো কবেই গণতন্ত্রকে বিষ বলে দিয়েছেন। সঙ্ঘের আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা হল উচ্চবর্ণের শিক্ষকদের নিয়ে তৈরী গুরুসভা — যাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে ৩০টা ভোট, যারা ছাপিয়ে যাবে লোকসভার ক্ষমতাকেও। এখানে জাতিভেদের সমালোচনা হবে না, "জাতিবাদসে আজাদী" স্লোগানকে বলা হবে দেশবিরোধী। হিন্দুধর্মের এই জাতিভেদপ্রথার কট্টর সমালোচক হিসেবে আম্বেদকরের ভূমিকা ভুলিয়ে দেওয়া হবে। দলিতদের বলা হবে "অজ্ঞ শিশু" — যাদের অধিকার নয়, বরং এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়েই ভুলিয়ে দেওয়া যাবে। মেয়েরা বাচ্চাবয়স থেকেই শিখবে যে অধিকারের ধারণা আসলে একটা করাপ্ট পাশ্চাত্য ধারণা; তারা জানবে যে তাদের ভবিতব্য, তাদের লক্ষ্য, শুধুমাত্র একজন "আদর্শ মা" হয়ে ওঠা, যিনি কখনো অভিযোগ করেন না, অধিকারের দাবী করেন না, তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না; পরিবারের মঙ্গলই তাঁর একমাত্র আশা আকাঙ্খা কর্তব্য।

একে কি শিক্ষা বলব? নাকি ফ্যাসিবাদী ভবিষ্যতের মতাদর্শের দীক্ষা বলা উচিত? আরএসএসের স্কুলে পড়া বাচ্চাদের সরাসরি মিথ্যা শেখানো হচ্ছে না, বরং দেশপ্রেমের মোড়কে অর্ধসত্য শেখানো হচ্ছে — যা আরো ভয়ঙ্কর। তারা বড় হচ্ছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে গরীব নিরস্ত্র মুসলমান সহনাগরিককে পিটিয়ে মারা বা বাস্তুচ্যুত করা আসলে আত্মরক্ষা; শিখছে যে গণতন্ত্র আসলে দুর্বল এবং করাপ্ট পশ্চিমী ধারণা; শিখছে নারীর অধিকার আসলে সনাতনী পরিবারকে ধ্বংস করে; আর জানছে যে তাদের সাবর্ণ হওয়ার সমস্ত সুযোগ সুবিধা আসলেই ডিভাইন রাইট। ঈশ্বরপ্রদত্ত। আরএসএসের পরিকল্পনা ছিল যে এরাই একদিন বড় হবে। নাগরিক হিসেবে ভোট দেবে। আইনরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। আদালতে বিচার করবে। আইনসভায় আইন পাশ করবে।

আর, ঠিক এইটাই হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সঙ্ঘের স্কুলে এই শিক্ষা পেয়ে বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা আজকে কেউ পুলিশ, কেউ বিচারক, কেউ উকিল...তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রে এই শিক্ষার ছাপ তারা ক্রমাগত রেখে চলেছে। বিশ্বাস না হলে আপনার কাছাকাছি সরস্বতী শিশু মন্দির বা বিদ্যাভারতী স্কুলে গিয়ে ক্লাস ফাইভের সংস্কৃতি বইটা চেয়ে হাতে নিয়ে দেখে নিতে পারেন, বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করুন তারা ইতিহাস বলে কী শিখছে। আর তারপর একবার টিভি চালিয়ে দেখে নিন গণতন্ত্রের প্রথম তিনটে পিলারের মানুষজন কোন ভাষায় কথা বলছে আর চতুর্থ পিলার মিডিয়াই বা কোন সুরে গাইছে...

তারপর সিদ্ধান্ত নিন...

Uploaded Image This is the army standing against us. This is a battle we have to win. Whatever it takes...



#হিন্দু_খতরে_মে_হ্যায় #হিন্দুত্ববাদ #ন্যারেটিভ_বিল্ডিং

সূত্র:
▪️Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
▪️Khaki Shorts & Saffron Flags - a Critique of the Hindu Right, Tapan Basu et al, Orient Blackswan

সাবির হকার কবিতা ~ নয়না ও অঙ্কিতা

Uploaded Image সাবির হকা। ইরানের একজন কবি ও নির্মাণ শ্রমিক। জন্ম ১৯৮৬ সালে, ইরানের পশ্চিম প্রান্তের কেরমানশাহতে। উনি এখন তেহরানে থাকেন এবং ইমারত বানানোর কাজে মজদুরী করেন। সাবির বলেছেন, তেহরানে ঘুমোবার মতো তাঁর কোনও জায়গা নেই। কখনও সারা রাত হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। অনেকের মতো তাঁরও কোন সামাজিক সুরক্ষা নেই। দারিদ্রকে আলাদা করে তাঁকে চিনতে হয়নি। জীবনের গোড়া থেকেই দারিদ্রের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম ছিল, আজও তা অব্যাহত। এক সাক্ষাৎকারে সাবির বলেছিলেন, “আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। অপরিসীম ক্লান্তি আমার! আমার জন্মের আগে থেকেই ক্লান্ত আমি। আমার মা আমাকে গর্ভে লালন করার সময় লাগাতার মজদুরী করেছিলেন, আমি সেই সময় থেকেই মজদুরে রূপান্তরিত। আমি আমার মায়ের ক্লান্তি অনুভব করি। ওনার ক্লান্তি যেন এখনো আমার শরীরে লেগে আছে।” 

ইতিমধ্যে সাবির হকার দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। একটি প্রতিযোগিতায় ২০১৩ সালে ইরানের শ্রমিক-কবি হিসাবে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। অঙ্কিতা ও নয়নার অনুবাদে সাবিরের কিছু কবিতা ‘আয়নানগর’ বইমেলা সংখ্যা ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখান থেকেই রইল কবিতারা—

তুঁতফল 
“আপনি কি কখনো তুঁতফল দেখেছেন?
যেখানে পড়ে, সেইটুকু মাটির ওপর
ওর লাল রসের দাগ হয়ে যায়
পড়ে যাবার মতো যন্ত্রণাদায়ক আর কিছু নেই
আমি কত মজদুরকে দেখেছি
বড় বড় ইমারত থেকে পড়ে যেতে…
আর পড়ে গিয়ে,
ঠিক তুঁতফল হয়ে যেতে….”

.
সরকার
পুলিশ আমাকে খুঁজছে …
আমি কাউকে খুন করিনি
এমনকি সরকারবিরোধী কোনো লেখাও লিখিনি!
শুধু তুমি জানো আমার প্রিয়তমা
জনতার পক্ষে কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে,
যদি সরকার শুধু এই জন্যে ভয় পায় আমাকে
যে আমি একজন মজদুর!
যদি আমি বিপ্লবী বা বিদ্রোহী হতাম, তাহলে?
কি করতো এরা তাহলে?
তবুও বলি, সেই বাচ্চাটার জন্যে
পৃথিবীটা আজও খুব একটা বদলায়নি
যে স্কুলের প্রত্যেকটা বই এর প্রচ্ছদে
নিজের ছবি দেখতে চেয়েছিল…
.
ঈশ্বর
ঈশ্বরও নিশ্চয় একজন মজদুর!
ঈশ্বর যেন সর্বশ্রেষ্ঠ ঝালাই মিস্ত্রী
গোধূলি-আলোতে ঈশ্বরের চোখ লাল হয়ে ওঠে,
যেন জ্বলন্ত কয়লা
আর রাত্রি পর্যন্ত শতছিদ্র হয়ে যায় তাঁর জোব্বা!
.
ঘর
তোমরা যদি বলো, সারা দুনিয়াকে আমি ওই নামে ডাকতে পারি!
দুনিয়ার সব দেশ, সব গ্রামকেও ডাকতে পারি ওই নামে।
আর আকাশ? হ্যাঁ তাকেও দিতে পারি ওই নাম!
সারা ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুকে ওই নাম ধরে ডাকতে,
এক মুহূর্তও দ্বিধা করবো না আমি!
কিন্তু দোহাই তোমাদের!
তেহরান এর ভাড়া করা জানলাবিহীন এই কালকুঠরীকে
তোমরা ওই নামে ডাকতে বোলো না !
আমি একে ঘর বলে কিছুতেই ডাকতে পারবো না!
.
বন্দুক
ওরা যদি বন্দুক আবিষ্কার না করতো
কত মানুষ বেঁচে থাকতো আজ!
যাদেরকে দূর থেকেই মেরে ফেলতে পারলো ওরা!
শুধু তাই নয়, আমার মনে হয়,
আরও অনেককিছুই অনেক সহজ হতো।
মজদুরের যে আসলে কতটা শক্তি,
তাও ওদেরকে বোঝানো  সহজ হতো!
যদি বন্দুকের আবিষ্কার না হতো…….
.
কেরিয়ার নির্বাচন
ব্যাঙ্কের সাধারণ একজন কর্মচারি হওয়া আমার দ্বারা হত না
খাবার দাবার ফেরি করা সেলসম্যানও না
কোন পার্টির নেতা হওয়াও আমার কম্ম নয়
ট্যাক্সি ড্রাইভার তো নয়ই
প্রচারে লেগে থাকা মার্কেটিং এর বান্দাও আমি নই
আমি শুধু চাইতাম
শহরের সবথেকে উঁচু জায়গাটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব
নিচের ঝলমলে বাড়িগুলোর মধ্যে কেমন দেখায় ওই মেয়ের ঘর
যাকে আমি ভালবেসেছি
তাই শেষমেশ ঢালাইয়ের মজদুর হয়ে গেলাম…
.
আমার বাবা
বাবার ব্যাপারে কিছু বলার সাহস যদি করে উঠতে পারি
তাহলে বিশ্বাস করুন,
বাবার জীবনে আনন্দ বলে কখনোই তেমন কিছু ছিল না
এই লোকের জীবন নিজের পরিবারের জন্য নিবেদিত ছিল
পরিবারের ঘাটতি যাতে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে
সেজন্য নিজের জীবনকে কঠিন, বন্ধুর বানাতে দ্বিধা করেননি তিনি
আর আজ
যখন আমার কবিতা ছাপা হয়ে বেরোয়
শুধু একটা কথা ভাবলেই মাথা হেঁট হয়ে যায় লজ্জায় –
বাবা আমার পড়তে পারেন না।
.
আস্থা
আমার বাবা শ্রমিক ছিলেন
আস্থাবান, নিষ্ঠাবান শ্রমিক
যখনি উনি নামাজ পড়তে বসতেন
(আল্লাহ) ওঁর হাতদুটো দেখে লজ্জিত হতেন
.
মৃত্যু
এক রাতে মা বলল
সে নাকি জানে মৃত্যুকে কেমন দেখতে
তার নাকি ইয়াব্বড় ঘন গোঁফ
আর চওড়া সুগঠিত কাঁধ, যেন কোন বডিবিল্ডার
সেই রাত থেকে আমার নিষ্পাপ নিরীহ মা’কে
আমি সন্দেহের চোখে দেখি
.
বন্ধুত্ব
আমার সাথে (ঈশ্বরের) বন্ধুত্ব হয়ে ওঠেনি
তার কারণ একটাই
বহুদিন আগে ঘটা একটা ঘটনা;
তখন আমাদের ছয় জনের পরিবার
একটা ছোট্ট কামরায় কোনমতে চাপাচাপি করে থাকত
অথচ (ঈশ্বর) থাকত একটা বিশাল বাড়িতে
একেবারে একা।
.
বর্ডার
কাফন যেমন লাশকে ঢেকে রাখে
বরফও অনেক কিছুকে ঢেকে দেয়।
ইট কাঠের কংকাল বেরিয়ে পড়া বাড়ি,
গাছ, কবর সবকিছুকেই সাদা চাদরে ঢেকে দেয় বরফ
শুধু বরফই পারে
দুনিয়ার সকল বর্ডারকে সাদা রঙে রাঙিয়ে দিতে।
.
একমাত্রভয়
যখন আমি মারা যাবো,
সঙ্গে নিজের সব প্রিয় বই নিয়ে যাবো আমি!
আমার কবর-বাড়ি ভরে দেব তাদের ছবি দিয়ে,
যাদের আমি সীমাহীন ভালোবাসি।
ভবিষ্যতের কোনো দুশ্চিন্তাই আমার সেই নতুন বাড়িতে থাকতে পাবে না!
আমি শুয়ে থাকবো বেফিকির,
সিগারেটের পর সিগারেট জ্বালাবো
আর ফুঁপিয়ে উঠবো তাদের কথা ভেবে,
যে সব মেয়েদের আমি কখনো ভালোবেসেছিলাম,
আর যাদের জড়িয়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম!
এই সমস্ত সুন্দর ভাবনার ভেতরেও শুধু একটা মাত্র ভয় থেকে যাবে কোথাও!
যদি কোনো এক দিন, ভোর না হতেই,
কেউ আমার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে উঠিয়ে আমায় আবার বলে,
“চল রে সাবির! কাজে বেরোতে হবে!”



Image courtesy: The Quest

শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা... ~ মানস দাস

Uploaded Image

শ্রমজীবী মানুষের প্রাণের উৎসব আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস উদযাপন। শ্রমজীবী মানুষের শোষণ যন্ত্রণা থেকে মুক্তির শপথ নেওয়ার দিন আন্তর্জাতিক মে দিবস । শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ।
১৪০ বছর ধরে শ্রমজীবি মানুষের মুক্তির লড়াই চলছে।

এই সময়ে আমাদের রাজ্যে একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম চলছে ,নির্বাচনী সংগ্রামে শ্রমজীবী মানুষের অংশ হিসেবে আমরাও ছিলাম তার অংশ।আর ৩-৪ দিন পর তার ফলাফল প্রকাশ হবে, আমরা সবাই তার প্রতীক্ষায় আছি।

প্রথমত একটা কথা প্রথমেই বলা ভাল, প্রত্যেকে অবাধে নিজের ভোট দিয়েছে , সাথে একথাটা আমাদের উচ্চারিত করতে হবে বারবার যে আমাদের সহ নাগরিকের একটি অংশ শাসককুলের চক্রান্তে মতদান দেওয়ার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। রাষ্ট্র নিজের পিঠ চাপড়ে বলে যাচ্ছে,’ দেখলে কেমন নিরপেক্ষতার সাথে ভোট করালাম। “ আমরা শ্রমজীবিরা এই প্রচারে এই ভেবে আত্মতৃপ্ত হতে কখনও পারি না, যেখানে একদিকে কোটি কোটি টাকা নির্বাচনে খরচ , নির্বাচনী বন্ডে মনোপলির ইনভেস্টমেন্ট ভবিষ্যতে আরো শোষণের রাষ্ট্রীয় লাইসেন্স পাওয়ার জন্য, মিডিয়ার একপেশে সংবাদ - অন্যদিকে কুড়িয়ে, বাঁচিয়ে শ্রমজীবিদের ঘাম ঝড়ানো উপার্জনের খড়কুটো কখনো নিরপেক্ষ সম লড়াই হতে পারে না। এই ব্যবস্থায় নির্বাচনী লড়াই অসম। সবাই নিজের ভোট দিলেও অসম লড়াই। নির্বাচনে শ্রমজীবিরা জিতলেও লড়াই অসম ।

  নির্বাচনকে আমরা আমাদের মুক্তির লড়াইয়ের পথে আল্টিমেট ভেবে নেওয়া যায় না, এই নির্বাচনে মানুষ নিজের ভোটাধিকার দিয়ে দিয়েছে , মানে গণতন্ত্র ,সমানাধিকার এর সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গেছি , এটা সর্বৈব মিথ্যে। এই ব্যবস্থায় নির্বাচন সবসময়ই শ্রমজীবীদের স্বার্থের পক্ষে অসম লড়াই । আর গোটা সমাজকুল শ্রমজীবীদের ধোঁকা দিয়ে প্রমাণ করতে চায় যে গনতন্ত্রের এক্সারসাইজ করা হলো এসো তাতে সবাই ডুবে থাকি । আর তাতে যদি আমরা ভেসে থাকি তো তবে দাশু রায় এর লেখা সখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা / দোষ কারো নয় গো মা- ই আমাদের ভবিষ্যত।

ছোটদের একটা বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে হয় , বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ। 

 তেমনি নির্বাচনী ব্যবস্থার দুটো দিক আছে ।নির্বাচনকে আমরা শ্রমজীবীরা কি চোখে দেখি? আমাদের কাছে নির্বাচন একটা শুধু সুযোগ যাতে আমাদের সমস্যার কথা , সমাধানের পথ আমরা মানুষের কাছে , অসংখ্য শ্রমজীবীদের কাছে তুলে ধরতে পারি।

যেমন আমাদের সামনে আমাদের কথা সমস্যা তুলে ধরার সুযোগ এনে দেয় অন্যদিকে যেহেতু এই শোষণ ব্যবস্থা বদলায় না, নির্বাচনের পর শ্রমজীবী মানুষের ওপর আক্রমণ বাড়ে শাসক এর পক্ষ থেকে । জিতলেও এই আক্রমণ শেষ হয়ে যাবে না, কারণ মনোপলি তার ইনভেস্টের রিটার্ণ দ্রুত চায়। আক্রমণ নতুন ভাবে শুরু হয়ে গেছে ।নয়ডায় আক্রমণ ও লড়াই আমাদের বার্তা দিচ্ছে।দাবী কি ছিল? অস্বাভাবিক গ্যাসের দাম সহ মূল্যবৃদ্ধির বৃদ্ধির ফলে জীবনযাপনের খরচ ওঠে না মজুরী বাড়াও, শ্রমের দাম লুঠের বিন্দু ফেরত দাও আর তা পাল্টা রাষ্ট্রের পুলিশের হিংস্র আচরণ একদম কর্পোরেটের বিনাবেতনের গুন্ডার মত , শিকাগো থেকে নয়ডা এই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।শিকাগো থেকে নয়ডা ১৪০ বছর ধরে সারা পৃথিবীর মেহনতি মানুষকে লড়তে হচ্ছে , এ লড়াই লড়ে হবে , আজকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবসে এই শপথ আমাদের নিতে হবে।কী কী আক্রমণের সম্মুখীন আমরা হবো? 

গতকালই বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম ১০০০ টাকার মত বাড়িয়েছে। সমস্ত ছোট ব্যবসায়ী যারা ফুটপাতে চপ বা চা বেচে সংসার চালায় তাদের ওপর সরাসরি আঘাত! কোনো প্রাক্তন চা ওয়ালা এর থেকে মুক্তি দিতে পারবে না , মূল্যবৃদ্ধির সমস্ত বোঝা চাপবে গরিব মধ্যবিত্তের ওপর। কেন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ফলে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া আর আমাদের দেশের মানুষের ওপর বোঝা বেড়ে যাওয়ার যখন হচ্ছে তখন কেন দেশের মানুষের স্বার্থের উল্টোদিকে সেই সাম্রাজ্যবাদের পদলেহন কোনো নির্বাচনি ফলে স্বীকৃত হয়ে যাবে না। আরও চেষ্টা হবে শ্রম কোড এ রাজ্যে লাঘু করার, এ রাজ্যে তা আমরা লাঘু হতে দেব না, গোটা দেশে একে ছুড়ে ফেলার লড়াইয়ে আমরা থাকবো। বিধিবদ্ধ পেনশন প্রকল্প এ রাজ্যে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে সর্বশক্তি দিয়ে লড়বো। সরকারী ক্ষেত্রে শূণ্যপদে নিয়োগ পুঁজি চায় না আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে লড়তে নিয়োগ করার দাবিতে। চুক্তিবদ্ধ কর্মচারী বন্ধুদের নিয়মিত কর্মচারীদের মত সুযোগ সুবিধা দেওয়ার আমাদের ঘোষিত দাবী অর্জনের লড়াই আমাদের চালিয়ে যেতে হবে, এবং আর্থিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে এই লড়াই আমাদের চলবে । আপনি নির্বাচনে জিতলেও এই আক্রমণ বন্ধ হবে না এটা নিশ্চিত। ভারতবর্ষের বাস্তবতা এখন এটাই যে এই লড়াই লড়তে শ্রমজীবি মানুষ শিখছে যে এই ব্যবস্থা না পাল্টালে এর আক্রমণসমূহ থেকে চিরকালীন মুক্তি নেই।

এটা নিশ্চিত যতদিন এই শ্রেণীবিভক্ত সমাজ ব্যবস্থা থাকবে ততদিন আন্তর্জাতিক মে দিবসে আমাদের নতুন নতুন আক্রমণ ও তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পন্থা শ্রমজীবী মানুষকে অন্বেষণ করে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস জিন্দাবাদ।


Uploaded Image

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলা নববর্ষ ~ রণজিৎ গুহ

১ বৈশাখ বাংলা নববর্ষ।  ১লা বৈশাখ নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছরের সুচনাদিন হিসাবে পালিত হয় আসাম,  কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরাতেও। প্রতিবেশী বাংলাদেশেও যথেষ্ট উদ্যোগ উদ্দিপনায় ১ বৈশাখ উদযাপিত হয়।বিশ্বজুড়ে ১ বৈশাখ ১৪ এপ্রিল পালিত হলেও এবছর পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নববর্ষ পালিত হবে ১৫ এপ্রিল। ১৪৩৩ বছর আগে রাজা শশাঙ্কর আমলে  বাংলা সন যখন প্রবর্তিত হয় তখন  ১লা বৈশাখ  হত  আজকের ইংরেজি ক্যালেন্ডার মতে ২১/২২ মার্চ। ২১শে মার্চ  দিনটি খুবই তাৎপর্য্যপুর্ণ।দিনটাকে বাসন্তী বিষুব বা মহাবিষুব বলে। ওইদিন সারা পৃথিবীতে দিনরাত্রি সমান সমান। ১২ ঘন্টা দিন ১২ ঘন্টা রাত।সূর্য ওইদিন ক্রান্তিবৃত্তের মহাবিষুব বিন্দুতে।  একই হিসাবে ১ মাঘ সেই সময়ে হতো ২১/২২ ডিসেম্বর।  এক ভুল হিসাবের খেসারত দিতে দিতে গড়িয়ে গড়িয়ে এখন ১ বৈশাখ  ১৫ এপ্রিলে এসে দাঁড়িয়েছে । 

Uploaded Image এই যেমন রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন বাংলা ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ।গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮৬১ সালের ৬ মে মধ্যরাতে। এখন ২৫ বৈশাখ পালিত হয় ৯ মে।৬০০ বছর পরে রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালিত হবে একইসাথে  শিলচর ভাষা শহিদ দিবস ১৯ মে তারিখে ।আর ৯০০ বছর পরে ১ বৈশাখ পালিত হবে শ্রমিক দিবস ১ মে তারিখে।  এমনটা হল কেন?   আর্যভট্টের ছাত্র লাটদেব রচিত  চতুর্থ / পঞ্চম শতাব্দীর  প্রাচীন সূর্য্যসিদ্ধান্তানুযায়ী বাংলা সন তারিখ গননা হয়। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথিবীর একবার সুর্য্য প্রদক্ষিণে সময় লাগে ৩৬৫.২৫৮৭৫৬ দিন।আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে সূর্য প্রদক্ষিণে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫.২৪২২ দিন।অর্থাৎ বাংলা পঞ্জিকায় একবছর প্রকৃত একবছরের চেয়ে ৩৬৫.২৫৮৭৫৬-৩৬৫.২৪২২=০.০১৬৫৫৬ দিন বা ২৩ মিনিট ৫০.৪৩৮৪ সেকেন্ড এগিয়ে চলছে। বাংলা সন ঐ প্রায় ২৪ মিনিট এগিয়ে থাকার ফলে মোটামুটি  প্রতি ৬০ বছরে ইংরেজি ক্যালেন্ডারে একদিন বেড়ে যায়।পড়শী বাংলাদেশে এই সহস্রাব্দের শুরুতেই  বাংলা ক্যালেন্ডার  সংস্কার করে আন্তর্জাতিক ভাবে মান্য গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছরে   ১৪ই এপ্রিলই ১লা বৈশাখ হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এ বঙ্গে এ সব নিয়ে কে মাথা ঘামায়?


১৯৫৩ সালে  জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে মেঘনাদ সাহা র সভাপতিত্বে 'ক্যালেণ্ডার রিফর্ম কমিটি' গঠিত হয়।  এই কমিটি প্রতিটি বাংলা  মাসের দিন সংখ্যা  নির্দিষ্ট ক'রে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।  বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র প্রত্যেকটি ৩১ দিন; আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ ও ফাল্গুন  প্রত্যেকটি ৩০ দিন; চৈত্র মাস ৩০ দিন, অধিবর্ষে ৩১ দিন। এবং গ্রেগরীয় নিয়মে ৪০০ বছরে ৯৭টা অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার।বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা কার্যকরী করায় আমাদের প্রবল অনিহা। দশ বছর পর ১৯৬৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার   নির্ভুল পঞ্জিকা প্রণয়নের জন্য রাজ্য এলম্যানাক কমিটি  গঠন করেন। ওই বছর ২৯শে মে বিধানসভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী   বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি ১৯৬৪ সালের ১৫ই জুন রিপোর্ট পেশ করে। তারপর কত সহনশীল  প্রগতিশীল প্রতিক্রিয়াশীল সরকার এলো গেলো।আজও সূর্যকে  পৃথিবীর প্রদক্ষিণ করার  সঠিক সময় নির্ধারণ করে পঞ্জিকা সংশোধন হলো না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার  আজও অসংস্কৃত, অদৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা অনুযায়ী ছুটির দিন ঘোষণা ক'রে চলেছে। আমাদের কীই-বা যায় আসে?

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস ~ কৌশিক মজুমদার

বাংলা নববর্ষ একেবারে হাল আমলের উৎসব। বরং তাঁর আগের দিন চৈত্র সংক্রান্তিই এককালে মহা ধূমধাম করে পালিত হত। মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখছেন "আগেকার দিনে চৈত্রমাস পড়িলেই গাজনে সন্ন্যাসীদের বড় হুড়োহুড়ি পড়িত। গাজনের দিন তাহারা ঢাক বাজাইয়া রাস্তা দিয়া যাইত। সেই সময় পাড়ার দুষ্ট ছেলেরা রাস্তার ধূলায় কাঠি দিয়া একটা দাগ টানিয়া দিত। তারপর লোকে প্রশ্ন করিত যথা-

"শুনরে সন্ন্যাসী ভাই আমার বাখান
উত্তর দিয়া তুমি যাও অন্যস্থান।
এরণ্ড আর থাম খুঁটি, ভেরেণ্ডার বেড়া,
তার মাঝেতে পড়ে আছে মস্ত এক নোড়া।
বাটনা বাটিতে শিবের পুটকি হল ক্ষয়
সেই শিবকে গড় করলে কি পুণ্য হয়?"

Uploaded Image প্রশ্নের উত্তর দিলে দাগ মুছিয়া যাইতে দেওয়া হইত। চড়কের দিন ছাতুবাবুর মাঠে মস্ত মেলা বসিত। সেখানে বটিঝাপ, ঝুল ঝাঁপ, কাঁটা ঝাঁপ দেখিতে বিকেল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভীড় থাকিত। চৈত্রের শেষ দিনে এ পূজা শুরু হয় আর বৈশাখের প্রথম দু-তিন দিনব্যাপী চড়ক পূজার উৎসব চলে। চড়কের দিনই লোহাপটি থেকে বার হত বারোয়ারি সং। কোলকাতার গলি ও রাজপথের বাড়ির বারান্দায়, ছাদে ও জানালায় আবালবৃদ্ধবনিতা সঙের শোভাযাত্রা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। কলকাতা হয়ে উঠত মিলন মেলার নামান্তর। গৃহস্থঘরে অতিথির জন্য তৈরি হত শরবত। থাকত পান তামাকের ব্যবস্থা। দর্শকের জন্য পথের উপর সামিয়ানা টাঙানো হত। বরং পরের দিন তেমন কিছু হত না। হুতোম লিখছেন “বাঙ্গালিরা বছরটী ভাল রকমেই যাক আর খারাবেই শেষ হক্‌, সজ্‌নে খাড়া চিবিয়ে ঢাকের বাদ্দি আর রাস্তার ধূলো দিয়ে পুরাণকে বিদায় দ্যান। কেবল কল্‌সি উচ্ছুগ্‌গু কর্ত্তারা আর নতুন খাতাওয়ালারাই নতুন বৎসরের মান রাখেন।’‌


আকবরের আমল থেকেই নাকি পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। যদিও অনেকে তা ভুল বলেন। তার অনেক আগে থেকেই এই বাংলায় শস্য বৎসরের শুরু আর শেষের মাঝের দিনটিকে পুন্নাহ বা পুনাহ বলা হত।আকবরের অনেক আগেই মৌসুম শুরুর দিনটিতে কোন রকম ধর্মের বাঁধনে বাঁধা না পড়ে হিন্দু মুসলমান সবাই মিলে এই দিনকে নতুন আর শুভর সূচনা হিসেবে পালন করতেন। আজ সে সব তর্কে যাচ্ছিই না। 

বরং একটু অন্য দিকে নজর দেওয়া যাক। ১৮৭৮ সালে মহেশচন্দ্র দাস দে ‘‌প্রণয় পরীক্ষা’‌ প্রহসনে দেখতে পাই বাবু আর দোকানীর কথোপকথন চলছে। বাবু চাইছেন আরও ধার নিতে। দোকানী তা দিতে নারাজ। 

‘ধারীবাবু। ধার ধার ধার!‌ ধারে দুনিয়া চলিতেছে। আপনি না ধার দিলে অপর দোকান খোলা, হাঁকিতেছে, হাতছানি দিতেছে। চলিয়া যাইবার সমস্ত পথ খোলা।
দোকানীবাবু।— ধারও দিব মিষ্টান্নও খাওয়াইব!‌ আপনি প্রণয়িনী আমার। টাকা না দিলে এ বিবাহ ভাঙিয়া দিব। আগে ধার মিটান, তাহার পর জবান ফুটান।’‌ পাশাপাশি দোকানীকে খুশি করে মিঠাই খাবার উদাহরণও আছে। হরিমোহন পালের লেখা রসিক নাটক-এ দেখি- 
‘গদীবাবু।— খালি পেটে আপনি কয়টি মনোহরা খাইতে পারিবেন?
পেটুক।— খালি পেটে মহাশয় একটি মাত্র মনোহরা ভক্ষণ সম্ভব। তাহার পর একশতটী।
গদীবাবু।— হে–‌হে। আপনি বুদ্ধিমান বটে। আজি হালখাতার দিনে যতগুলি ইচ্ছা তথা একশতটী মনোহরা খান!‌

এই সবকিছুর বাইরে একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালীর জীবনেও নতুন বছর এসে পৌঁছাত ধীর পায়ে। অজিতকুমার গুহ তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখছেন— ‘...চৈত্রের সংক্রান্তি আসার কয়েক দিন আগে থেকেই আমাদের ঢেঁকিঘরটা মুখর হয়ে উঠতো। নববর্ষের প্রথম দিন ছেলেমেয়েদের হাতে নাড়ু-মোয়া, ছানার মুড়কি ও সরভাজা দিতে হবে; তারই আয়োজন চলতে থাকতো। বাড়ি থেকে অনেক দূরে শহরের এক প্রান্তে আমাদের ছিল মস্ত একটা খামারবাড়ি। সেখান থেকে বাড়ির বাইরে গোলাবাড়িতে চৈতালী ফসল উঠতো। আর আঙিনার প্রান্তে তৈরি হতো বড় বড় খড়ের গাদা। উঠানের একধারে বড় দুটো কনকচাঁপার গাছ। এই শেষ বসন্তেই তাতে ফুল ধরতো। আর এলোমেলো বাতাসে তারই গন্ধ বাড়িময় ঘুরে বেড়াতো। কোনো কোনো দিন কালবোশেখি আসত প্রলয় রূপ নিয়ে। সারাদিন রৌদ্র দাবদাহে প্রতপ্ত মাটিকে ভিজিয়ে দিত। কচি কচি আমগুলো গাছ থেকে উঠানের চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো আর ভেজা মাটি থেকে একটা সোঁদা গন্ধ নাকে এসে লাগতো। তারপর পুরনো বছরের জীর্ণ-ক্লান্ত রাত্রি কেটে গিয়ে নতুন বছরের সূর্যের অভ্যুদয় ঘটতো...। ’ সে সময়কার বৈশাখী মেলায় আরও পাওয়া যেত, তিলের নাড়ু, চিনার নাড়ু, ঢ্যাপের নাড়ু, নারকেলের নাড়-, চিড়ার নাড়ু, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, কদমা-খাগড়াই, হাওয়াই মিঠাইসহ মজার মজার দারুণ সব ছেলেভোলানো খাবার। ছাঁচে তৈরি মিষ্টান্নের মধ্যে ছিল গজা, হাতি, ঘোড়া, হরিণ, পাখি, আম, কাঁঠাল, প্রার্থণালয় বা বসতবাড়ির আকৃতি, সন্দেশ চমচম।

দীনেন্দ্রকুমার রায় ‘পল্লীচিত্র’ বইতে লিখছেন — ‘উনুন জ্বলিতেছে। তাহার উপর বৃহৎ কড়াইয়ে রসগোল্লার পাক চড়িয়াছে। একটা কুকুর অদূরে বসিয়া জিহ্বা বাহির করিয়া সন্দেশের দিকে চাহিয়া আছে। দোকান পশারীও কম আসে নাই…। দোকানদারেরা সারি সারি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অস্থায়ী চালা তুলিয়া তাহার মধ্যে দোকান খুলিয়া বসিয়াছে। ...এক এক রকম জিনিসের দোকান এক এক দিকে। কোথাও কাপড়ের দোকান, কোথাও বাসনের, কোথাও নানাবিধ মনিহারি দ্রব্যের দোকান। এত রকম সুন্দর পিতল-কাঁসার বাসন আমদানি হইয়াছে যে, দেখিলে চক্ষু জুড়ায়। কৃষ্ণনগর হইতে মাটির পুতুলের দোকান আসিয়াছে; নানা রকম সুন্দর সুন্দর পুতুল...। জুতার দোকানে চাষীর ভয়ঙ্কর ভিড়। কাপড়ের দোকানে অনেক দেখিলাম। ...লোহালক্কড় হইতে ক্যাচকেচের পাটী পর্যন্ত কত জিনিসের দোকান দেখিলাম…। এসব মেলায় সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের আনাগোনা। পুতুল, কাঠের ঘোড়া, টিনের জাহাজ, মুড়ি-মুড়কি, খই-বাতাসা, কদমা-খাগরাই, জিলিপি-রসগোল্লা। সবই চাই।...’ শুধু মিষ্টি তৈরির বর্ণনাই নয়, হালখাতার অনুষ্ঠানের জলযোগের তালিকা দিতেও ভুল করেনি তিনি, ‘রাত্রি অধিক হইলে নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ চন্দ্রবাবুর দোকানে জলযোগ করিতে বসিলেন। বেলের শরবত, মুগের ডাল ভিজে, নোনা, পেঁপে, ডাব প্রভৃতি ফল-ফুলুরি হইতে লুচি, কচুরি, ছানা, ঘি কিছুই বাদ গেল না। এমনকি চন্দ্রবাবু যথেষ্ট আয়াস স্বীকারপূর্বক অল্প পরিমাণ পাকা আম-কাঁঠাল সংগ্রহ করিয়াছিলেন...।’

মুসলমান সমাজেও নতুন বছর আসতো একই রকম আনন্দে। আহমদ ছফা লিখছেন, ‘...আমরা ছোটবেলায় দেখেছি বেলা আট-নয়টা বাজার সাথে সাথে বাড়িতে আচার্য বামুন আসতেন। তিনি পাঁজি খুলে অনেকটা আবৃত্তির ঢঙে বলে যেতেন, এই বছরের রাজা কোন গ্রহ, মন্ত্রী কোন গ্রহ, এ বছরে কত বৃষ্টি হবে, কত ভাগ সাগরে আর কত ভাগ স্থলে পড়বে, পোকামাকড়, মশা-মাছির বাড় বৃদ্ধি কত। তারপর আমাদের কোষ্ঠী দেখে দেখে গণকঠাকুর বলে যেতেন। এ বছরটি কার কেমন যাবে। সমস্ত মুসলিম বাড়িতে কোষ্ঠী রাখা হতো না— সব বাড়িতে গণকঠাকুরও আসতেন না...আমাদের পরিবারের সঙ্গে যেসব হিন্দু পরিবারের সুসম্পর্ক ছিল সেসব বাড়ি থেকে মুড়ি-মুড়কি, মোয়া, নাড়ু এগুলোর হাঁড়ি আসতো। এ হাঁড়িগুলো ছিল চিত্রিত। আমাদের গ্রামে এগুলোকে বলা হতো ‘সিগ্যাইছা পাতিল’। আমার মা এ হাঁড়িগুলো যত্ন করে ছাদের ওপর রেখে দিতেন। আমরা সুযোগ পেলেই চুরি করে খেতাম।... কৃপণ সাধু ময়রা পর্যন্ত সেদিন দাম না নিয়ে দু-একটা কদমা অথবা দু-চারখানা গজা অম্লান বদনে খাইয়ে দিত। তখন এইটুকু সৌভাগ্যের জন্যেই পয়লা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা হয়নি…৩১ চৈত্র, যেদিন বছরের শেষ, রাতে খাওয়ার সময় সকলে সামান্য পরিমাণে হলেও তিতা খাবার খেয়ে থাকেন। এই তিতা খাবারের মধ্যে একটা প্রতীকী ব্যাপার রয়েছে। যে বছরটি পার হয়ে এলাম, সে বছরের ব্যথা-বেদনা-দুঃখ-শোক সবকিছুই বিসর্জন দিয়ে নতুন একটা বছরে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে যাচ্ছি। তিতা খাওয়া হচ্ছে সে দুঃখ-বেদনা ধুয়ে ফেলার প্রতীক। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, ৩১ চৈত্র পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা হত এবং পহেলা বৈশাখে খাওয়ার জন্য মাছ রান্না করে রাখা হত।’ অধুনা পূর্ব বাংলায় শুরু থেকে আজ অবধি পান্তা খেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। অনেকে আবার এঁকে পশুতি ভাতও বলে থাকেন। তবে সঙ্গের ইলিশ মাছ নেহাত আশির দশকের আমদানি। গরীব বা মধ্যবিত্ত ঘরে নতুন বছর পালনের আর এক প্রথা ছিল, যা এখন প্রায় উঠেই গেছে। চৈত্র মাসের শেষ দিনের সন্ধ্যায় গৃহিণীরা এক হাঁড়ি জলে স্বল্প পরিমাণ চাল ছেড়ে দিয়ে সারা রাত ভিজতে দিয়ে তার মধ্যে একটি কচি আমের ডাল বসিয়ে রেখে দিতেন। পয়লা বৈশাখের ভোর বেলায় সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠে তাঁরা সেই ভেজা চাল ঘরের সবাইকে খেতে দিতেন। ঘরের সবাই মিলে একে একে তা খেত আর তখন তিনি হাঁড়িতে ডোবা আমের শাখা দিয়ে সবার গায়ে সেই জল ছিটাতেন। এই চাল ধোয়া জলের নাম আমানি। তাঁদের ধারণা ছিল এতে গৃহে নতুন বছরের শান্তি নেমে আসবে”।

মোটা কার্টিস কাগজের কার্ডের ধারে ডাইকাট করা নকশা আর অ্যামব্লোজ। খাম সর্বদা সাদা। হিন্দু ব্যবসায়ী হলে তাতে সিদ্ধিদাতা গণেশের ছবি, এক চিমটি সিঁদুর আর হলুদের মাঙ্গলিক ছোঁয়া। চিঠির শুরুতে "ওঁ গণেশায় নমঃ" আর শেষে "সামান্য মিষ্টান্ন ভোগের আয়োজনের কথা। মুসলিম পক্ষ হলে সেটাই বদলে যেত "কিঞ্চিত তায়ামে ইলাহির আঞ্জাম"-এ। অতিথিদের বসার জন্য চাঁদোয়া বা সামিয়ানা। তলে পাটি বিছিয়ে পাত পেড়ে খাওয়া। কাচের গেলাসে জল আর পদ্ম পাতায় লুচি, লাবরা, রসগোল্লা, পান্তুয়া, জিলাপি। ঝাল কিছু নেই বলেই চলে। দূরে ছাদনাতলায় মাটিতে ডেসক পেতে বসে আছেন প্রতিষ্ঠানের সরকার মশাই। সেখানেই বৎসরকার হিসেব নিকেশ হয়ে বকেয়া শোধ কিংবা অগ্রিম জমা নিয়ে নতুন হিসেব। লাল শালু মোড়া সেই খাতার নাম হাত চিঠি। সন্ধ্যে হতে না হতে জ্বলে উঠত সেজবাতি কিংবা পেট্রোম্যাক্স কোম্পানির হ্যাজাক। সরকারের ফরাসের সামনে বিরাট এক বগি থালায় পান, সুপারি, খয়ের, তবক, জর্দা আর চুন। খাওয়া শেষে অতিথিরা মুখে পান গুঁজে হাসি মুখে বিদায় নিতেন। গিলে করা পাঞ্জাবি পরা প্রতিষ্ঠানের মালিক হাত জোড় করে বলতেন “আবার আসবেন”। 

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব বদলেছে। হুতোম যাদের আমোদগেঁড়ে বাঙালী বলেছিলেন তারাও এখন বারো মাসের তেরো নম্বর পার্বণ হিসেবে এই বাংলা নিউ ইয়ারকে মেনে নিয়ে ভোর হতেই হ্যাপি বাংলা নিউ ইয়ার উইশ করছেন। এখন নববর্ষ মানে শুধু নতুন পঞ্জিকার ফিনফিনে পাতার গন্ধ, লাল খেরোর খাতায় সিঁদুরমাখা টাকার ছোঁয়া, সকালে উঠে সাততাড়াতাড়ি স্নান সেরে গুরুজনদের প্রণাম, পত্রিকার রঙিন ক্রোড়পত্র, অনেকদিন বাদে মেজো পিসীর ফোন, দুপুরে খাবার পাতে নানা চব্য-চোষ্যর ভিড়, ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপে মিঠে খুনসুটি, সন্ধে হলেই চেনা দোকানে হালখাতার নেমন্তন্ন।

এভাবেই বাঙালী জীবনে আরও একটা নববর্ষ আসে আর তারপরেই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।

নতুন বছরে ভাল থাকবেন সবাই ❤

বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

ধরনা মঞ্চ ~ ডাঃ বিষান বসু

"ধরনা মঞ্চ" আজ সন্ধের পর উঠে গেল, বঙ্গজীবনে এর তুল্য দুঃসংবাদ, সাম্প্রতিককালে, খুব একটা আসেনি।

রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ভাষণ নিয়ে বেশী কিছু বলার থাকে না, তাই বলছি না। নইলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘিরে-ধরলে-এক-সেকেন্ডে-বারোটা-বাজিয়ে-দেওয়া নিয়ে অনেক কথা বলা যেত। কিংবা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগমথিত ভাষণ। অথবা নব-আনন্দে উদ্ভাসিত প্রতিকুর-এর বক্তব্য পরিবেশন (যার ব্যাকগ্রাউন্ডে ফ্যাতাড়ুর সেই অবিস্মরণীয় লাইনগুলো সুর করে বাজালে দারুণ লাগত, ওই যে... "ছিলাম চোদু, হলাম সাধু/ হতেই দেখি আজব বাঁx/ হিপ পকেটে বুক পকেটে/ ফাকিং ফরেন নোটের তাড়া"), অথবা ঋতব্রতর কোটেশন-বহুল বক্তব্যের মাঝে মাননীয়ার "থাক থাক, এখন অতো সংস্কৃতি করতে হবে না, পয়েন্টে এসো"...  এর যেকোনোটিই আলাদা করে আস্ত একখানা লেখা দাবি করে, কিন্তু কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।



তবে যেটা বিশেষ করে নজর টানল, তা হলো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য পরিবেশন। কবীর সুমনকে হিসেবের মধ্যে ধরছি না - উনি দলীয় সাংসদ ছিলেন, সুতরাং সাংস্কৃতিক অতীতের পাশাপাশি ওঁর দলীয় আনুগত্যের দিকটাও থাকা প্রত্যাশিত। জয় গোস্বামীও নতুন করে অবাক করেন না। কবি হিসেবে তিনি যে মহান তা নিয়ে, অন্তত আমার মনে, সন্দেহের অবকাশই নেই, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর স্থান বাঁধা - কিন্তু একনিষ্ঠ চাটুকার হিসেবে তিনি আরও বড়মাপের কিনা সে নিয়ে তর্ক করাই যায়।

এঁদের মধ্যে সত্যিই চমকে দিয়েছেন রাজ চক্রবর্তী। তিনি তৃণমূলের বিধায়ক। সুতরাং তাঁর কথা যাকে বলে ইনসাইডার-এর কথা। রাখঢাক না করে তিনি স্পষ্ট জানালেন, তৃণমূল ঠিক করে নিয়েছে যে বিজেপিকে পঞ্চাশটা আসন দেবে (একে কি আসন-সমঝোতা বলা যাবে?) - অবশ্য বিজেপি যদি লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকে, তবেই। নইলে কিন্তু তাঁর দল (তৃণমূল) বিজেপি-কে তিরিশের নীচে নামিয়ে দেবে। সুতরাং... 

কিন্তু, যে যা-ই বলুক, সত্যিকারের শো-স্টপার ছিলেন আবুল বাশার। তাঁকে প্রতিভাবান বলে জানতাম, কিন্তু জিনিয়াস বলে বুঝিনি। 'সেদিন চৈত্রমাস' ছবির চিরঞ্জিৎ যেমন বলতেন - " আমি ভুল করেও ভুল করি না" - প্রায় তেমন করেই বাশার-সাহেব বললেন, 'আমি ভেবে দেখেছি, আমার খুব একটা ভুল হয় না'। মফস্বলে বসে তিনি ষোল বছর বয়সে (খুব সম্ভবত তাঁর নিজের ষোল বছর বয়স, জীবনানন্দের নয়) জীবনানন্দকে আবিষ্কার করেছিলেন (জীবনানন্দের পক্ষে এ এক মস্ত বড় সম্মান, নিঃসন্দেহে) - আর এমন করে আবিষ্কার করতে করতে অবশেষে... ইয়ে কাঁহা আ গ্যায়ে হাম... পৌঁছেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে, যিনি কবি হিসেবে অত্যুত্তম, গীতিকার হিসেবে অতুলনীয়া... বাশার-সাহেব জানালেন, মাননীয়া যখন থাকবেন না তখন বাংলার ঘরে ঘরে তাঁর লেখা গান বাজবে!

তো আশার কথা বাশার-মশাই-ই (অনুপ্রাস অনিচ্ছাকৃত) শোনালেন। বললেন, রবীন্দ্রনাথ যেমন, জীবনানন্দ যেমন, মাইকেল যেমন - মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তেমনই - এ পৃথিবী একবারই পায় তারে, পায়নাকো আর! আর এইখানেই আকবর বাদশা, থুড়ি জয় গোস্বামী আবুল বাশার ও আমা-হেন হরিপদ কেরাণী এক হয়ে যায় - ধর্নামঞ্চের ভাষণ থেকে জানা গেল, পিতৃদেবের অনুপ্রেরণায় (অনুপ্রেরণা জোগাতে তখনও মাননীয়া জীবনে আসেননি, নিশ্চিত) জয়বাবু সাত বছর বয়স থেকে রাজনীতি-সচেতন সংবাদপত্র-পাঠক, কিন্তু তিনি মাননীয়ার মতো মুখ্যমন্ত্রী দেখেননি - বাশার-সাহেব কখনও ভুল করেন না, তিনি জানেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ইয়ে (মানে, অলৌকিক প্রতিভা) আর দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করবেন না - আর, এঁদের সঙ্গে একই অনুচ্ছেদে নিজের নামোচ্চারণে একটু আত্মপ্রচার হয়ে যাচ্ছে জানি, তবু বলি, মাননীয়ার সুস্থসবল জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করার পর আমিও আশায় আশায় আছি, যাতে মাননীয়ার মতো মুখ্যমন্ত্রী বাংলাকে আর না দেখতে হয় এবং এমন রাজনীতিক যেন বারবার না আসেন!

মোদ্দা কথা হলো, ষাট লক্ষ মানুষ এখনও বিচারাধীন। আজ নাকি সর্বোচ্চ আদালত সে নিয়ে যা বলার বলেছেন, কিন্তু তাতে এঁদের ভাগ্যবদলের আশা কিছু দেখতে পাইনি।

বামদলগুলো এই নাম-কাটা এসআইআর-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে - কিন্তু টিভি দেখলে আপনি তার খবর পাবেন না। মাননীয়ার পুলিশ তৃণমূল-সাংসদ রাজীব কুমারকে স্যালুট ঠুকছে আর বাম-আন্দোলনকারীদের বেধড়ক ঠ্যাঙাচ্ছে, কেস দিচ্ছে - টিভি খুললে আপনি সেগুলোও জানতে পারবেন না।

জ্ঞানেশবাবু এদিক-ওদিক পুজো দিচ্ছেন, হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছেন - মাঝেমধ্যে আমলা চমকাচ্ছেন। টিভিতে সেসব থাকছে।

ধর্না উঠে গেল। আজ। নইলে ধর্না-বিষয়ক যাবতীয় আপডেট দু'বেলাই টিভিতে থাকছিল।

তবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে ধর্নামঞ্চে বাংলার সংস্কৃতিজগতের বিভিন্ন সেলিব্রিটি প্রতিদিন যেমন করে নিজেদের ন্যাংটো করে চলছিলেন, তা দেখতে পাওয়ার সুযোগ থেকে, আপাতত, আপামর বাঙালি বঞ্চিত হবেন।  

অবশ্য বাঙালি বলতে কে? মহুয়া মৈত্র তো বলেইছেন, তৃণমূল নামক অলীক কুনাট্যরঙ্গে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত হতে না পারলে আপনি বাঙালিই নন! সুতরাং...

সুতরাং, শূন্য ধর্নামঞ্চের বাঁশ খোলা দেখতে দেখতে গল্পের সেই পোস্টমাস্টারের মতোই ভাবুন - "পৃথিবীতে কে কাহার!"

(সঙ্গের ছবির শিল্পীর নাম বলাই বাহুল্য। ধর্নামঞ্চে উচ্চস্তরের সংস্কৃতিচর্চা চলছিল পুরো সময় জুড়েই। সেই চর্চার স্থায়ী ফসল হিসেবে এটি রইল।)

শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

কলকাতার বাগান ~ কৌশিক মজুমদার

১৬২২ সালের জুন মাস। পারস্যের সম্রাট শা আব্বাস কান্দাহারের দুর্গ মুঘলদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেন। শাহজাহান তক্কে তক্কে ছিলেন। শা আব্বাসের এক মীরজাফর ছিল (কিংবা বিভীষণ)। তাঁর নাম শা আলি মরদান। শাহজাহান তাঁকে পটিয়ে পাটিয়ে বিনাযুদ্ধে আবার দুর্গের দখল নেন। এই শা আলি মরদান দারুন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। সিভিল আর আর্কিটেকচার। এমন লোককে কাজে লাগাতেই হবে। সম্রাট তাই তাঁকে দিয়ে কাশ্মীর আর লাহোরে দু'খানি দারুণ বাগান বানালেন। শা আলি মারের নামে সেই দুই বাগানের নাম হল "শালিমার বাগ"। 

সে তো হল। কিন্তু আমাদের এই বাংলায় শা আলি এলেন কেমন করে? চলে আসি দুশো বছর পর। কলকাতায় ইংরেজরা করেকম্মে খাচ্চে, কর্নেল রবার্ট কিড নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচা করে বোটানিক্যাল গার্ডেনের উত্তরে এক বাগান বানালেন। সেখানে বউ আর আন্ডা-বাচ্চা নিয়ে গুষ্টিসুখ উপলব্ধি করবেন। তিনি নাকি এদেশে থেকে দিব্বি দেশি হয়ে গেছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন এক মুসলমান রমণী। কথা বলতেন চোস্ত উর্দুতে। নিজেকে নিষ্ঠাবান মুসলমান ভেবে তিন রোজ নামাজও পড়তেন। তাঁর বাগানের নাম তাই যে শাহজাহানের বাগানের নামে শালিমার গার্ডেন হবে তাতে আশ্চর্য কি? তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে ওই বাগানেই মাটি দেওয়া হয়, মুসলমান মতে। সে বাগান আর নেই। রয়ে গেছে গঙ্গার ধারে সেই বাগানের শেষ চিহ্ন "শালিমার পয়েন্ট" নামে… শালিমার পেইন্ট, শালিমার রোপ ওয়ার্কের ঘিঞ্জি বসতি আর রোজ শয়ে শয়ে ভিড় জমানো ক্যাপ্টেন কিডের নামটুকু না জানা যাত্রীরা…। 




এভাবেই সেকালের কলকাতার বহু বাগান শুধু প্রাচীন স্মৃতিকথা আর গল্প কাহিনিতেই রয়ে গেছে। লোয়ার সার্কুলার রোডে কলকাতার সবচেয়ে ধনী পার্সি সদাগর রুস্তমজি কাওয়াসজি বানাজি এক বিরাট বাগান বানিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকার মতো বাড়ি। গৃহপ্রবেশের দিন বল নাচ, বাই নাচ হয়েছিল। এসেছিলেন স্বয়ং বড়লাট লর্ড অকল্যান্ড। এই বাগানবাড়িতেই ১৮৫২ সালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর পর বড় ছেলে মানেকজি রুস্তমজি এই বাড়ি থেকেই ব্যবসা চালাতেন। ১৮৭৪ সালে তাঁকে কলকাতার শেরিফ করা হল। তিনিও এই বাড়ি, এই বাগান ছেড়ে উঠে এলেন সাহেবপাড়ায়। সেই বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে হিন্দুমেলার আয়োজন শুরু হল। ১৮৭৬ সালে পটলডাঙার বসুমল্লিক পরিবারের দীননাথ এই বাগান কিনে নেন। কিন্তু আগের মালিকের নাম অনুসারে 'পার্সিবাগান' নামটুকু রয়ে যায়। আর আশেপাশের এলাকা মানেকজির নামে মানিকতলা নামে ডাকা হত। বসুমল্লিকরা এই বাগান ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর দুই ছেলে নগেন্দ্র আর যোগেন্দ্র মিলে এই বাগান যখন কালীকৃষ্ণ ঠাকুরকে বিক্রি করেন তখনই এর মৃতপ্রায় দশা। ১৮৯৮ সালেই ইন্দিরা দেবী প্রমথ চৌধুরীকে চিঠিতে লেখেন– 

কাল ওঁরা একদল… একটা কি প্রকাণ্ড বাড়ি দেখতে গিয়েছিলেন – পার্সিবাগান – নামটা অনেকদিন থেকে শুনে আসছি, কিন্তু কখনো দেখিনি। শুনলুম খুব জাঁকালো মস্ত ব্যাপার, যদিও অযত্নে পড়ে আছে ঘরের অবধি নেই, সর্বত্র মার্বেল পাথর বসানো, কেতাদুরক্ত বাগান, ফোয়ারা, ফুলের গাছ ইত্যাদি যেমন বাদশাহী কাণ্ড হতে হয়।

ধীরে ধীরে এই বাগান নষ্ট হয়ে বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যায়। প্রায় দশ বারো বছর এর নাম কেউ শুনল না। আচমকা ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠার দিন আদর্শের বিরোধে তারকনাথ পালিত মশাই কারিগরী শিক্ষার জন্য এক আলাদা সংস্থার প্রস্তাব দিলেন। ভোটাভুটি হল। তিনি তাঁর সমর্থকদের নিয়ে আলাদা 'বেঙ্গল টেকনিক্যাল স্কুল' খুলবেন বলে ঠিক করলেন। করলেন তো বটে, কিন্তু খুলবেন কোথায়? সেই কাজেই ৩০০ টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে পার্সিবাগানের পড়ে থাকা বাগানবাড়ি ভাড়া করা হল। ১৯১২ সালের শেষের দিকে এটি পঞ্চবটি ভিলায় চলে গেলে আশুতোষ মুখুজ্জের সহায়তায় পার্সিবাগানের জমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়। সেখানে স্থাপন করা হয় সায়েন্স কলেজ। আর সেই টেকনিক্যাল স্কুলের কি হল? ১৯২৪ সালে সেটি স্থানান্তরিত হল যাদবপুরে, নাম হল কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলোজি। স্বাধীনতার পরে সেটাই আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

যাদবপুরের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সূচনা হয়েছিল পার্সিবাগানে
মানিকতলায় আরও এক হারিয়ে যাওয়া বাগানের কথা পাই রবি ঠাকুরের জীবনস্মৃতি-তে। সে এক মজার বিবরণ।পুরোটা উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারা গেল না-

রবিবারে রবিবারে জ্যোতিদাদা দলবল লইয়া শিকার করিতে বাহির হইতেন। রবাহূত অনাহূত যাহারা আমাদের দলে আসিয়া জুটিত তাহাদের অধিকাংশকেই আমরা চিনিতাম না। তাহাদের মধ্যে ছুতার কামার প্রভৃতি সকল শ্রেণীর লোক ছিল। এই শিকারে রক্তপাতটাই সবচেয়ে নগণ্য ছিল, অন্তত সেরূপ ঘটনা আমার তো মনে পড়ে না। শিকারের অন্য সমস্ত অনুষ্ঠানই বেশ ভরপুরমাত্রায় ছিল— আমরা হত-আহত পশুপক্ষীর অতিতুচ্ছ অভাব কিছুমাত্র অনুভব করিতাম না। প্রাতঃকালেই বাহির হইতাম। বউঠাকুরানী রাশীকৃত লুচি তরকারী প্রস্তুত করিয়া আমাদের সঙ্গে দিতেন। ঐ জিনিসটাকে শিকার করিয়া সংগ্রহ করিতে হইত না বলিয়াই, একদিনও আমাদিগকে উপবাস করিতে হয় নাই।

মানিকতলায় পোড়াবাগানের অভাব নাই। আমরা যে-কোনো একটা বাগানে ঢুকিয়া পড়িতাম। পুকুরে বাঁধানো ঘাটে বসিয়া বসিয়া উচ্চনীচনির্বিচারে সকলে একত্র মিলিয়া লুচির উপরে পড়িয়া মুহূর্তের মধ্যে কেবল পাত্রটাকে মাত্র বাকি রাখিতাম।

ব্রজবাবুও আমাদের অহিংস্রক শিকারিদের মধ্যে একজন প্রধান উৎসাহী। ইনি মেট্রোপলিটান কলেজের সুপারিণ্টেণ্ডেণ্ট এবং কিছুকাল আমাদের ঘরের শিক্ষক ছিলেন। ইনি একদিন শিকার হইতে ফিরিবার পথে একটা বাগানে ঢুকিয়াই মালিকে ডাকিয়া কহিলেন, "ওরে, ইতিমধ্যে মামা কি বাগানে আসিয়াছিলেন।" মালি তাহাকে শশব্যস্ত হইয়া প্রণাম করিয়া কহিল, "আজ্ঞা না, বাবু তো আসে নাই।" ব্রজবাবু কহিলেন, "আচ্ছা, ডাব পাড়িয়া আন্‌।" সেদিন লুচির অন্তে পানীয়ের অভাব হয় নাই। আমাদের দলের মধ্যে একটি মধ্যবিত্ত জমিদার ছিলেন। তিনি নিষ্ঠাবান হিন্দু। তাঁহার গঙ্গার ধারে একটি বাগান ছিল। সেখানে গিয়া আমরা সকল সভ্য একদিন জাতিবর্ণনির্বিচারে আহার করিলাম। অপরাহ্নে বিষম ঝড়। সেই ঝড়ে আমরা গঙ্গার ঘাটে দাঁড়াইয়া চীৎকার শব্দে গান জুড়িয়া দিলাম। রাজনারায়ণবাবুর কণ্ঠে সাতটা সুর যে বেশ বিশুদ্ধভাবে খেলিত তাহা নহে কিন্তু তিনিও গলা ছাড়িয়া দিলেন, এবং সূত্রের চেয়ে ভাষ্য যেমন অনেক বেশি হয় তেমনি তাহাঁর উৎসাহের তুমুল হাতনাড়া তাঁহার ক্ষীণকণ্ঠকে বহুদূরে ছাড়াইয়া গেল; তালের ঝোঁকে মাথা নাড়িতে লাগিলেন এবং তাঁহার পাকা দাড়ির মধ্যে ঝড়ের হাওয়া মাতামাতি করিতে লাগিল। অনেক রাত্রে গাড়ি করিয়া বাড়ি ফিরিলাম। তখন ঝড়বাদল থামিয়া তারা ফুটিয়াছে। অন্ধকার নিবিড়, আকাশ নিস্তব্ধ, পাড়াগাঁয়ের পথ নির্জন, কেবল দুইধারের বনশ্রেণীর মধ্যে দলে দলে জোনাকি যেন নিঃশব্দে মুঠা মুঠা আগুনের হরির লুট ছড়াইতেছে।

এ-ঘটনা ঘটেছিল মানিকতলার কোন বাগানে? রাধারমণ মিত্র এই নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে সিদ্ধান্তে এসেছেন "মনে রাখতে হবে ফেরবার পথে সকলে এই বাগানে ঢুকেছিলেন। সুতরাং এ-বাগান থাকার কথা মানিকতলা মেন রোডের পূর্বপ্রান্তে নয়, পশ্চিমপ্রান্তে, কলকাতার কাছাকাছি। এখন এই বাগানের নাম 'মল্লিক লজ'। প্রকাণ্ড বাগান। ম্যাকিনটস বার্ন-এর তৈরি বাড়ি। এঁরা চিৎপুরের বিখ্যাত ঘড়িওয়ালা বাড়ির মল্লিকের, অর্থাৎ বৈষ্ণবদাস মল্লিকের বংশ।" 

পার্সিবাগানের মতো আরও এক জমকালো বাগান ছিল দেওয়ান মানিকচাঁদের বাগান। বেহালায় ডায়মন্ডহারববার রোডে তাঁর বাগানবাড়ির কথা রেভারেন্ড লং সাহেব নিজে লিখে গেছেন। সিরাজদ্দৌলা বাংলার নবাব হলে ইনি ঢাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। ১৭৫৬ সালের জুন মাসে নবাব সিরাজদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করে দখল করার পর রাজা মানিকচাঁদকে কলকাতার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে তিনি মুর্শিদাবাদে ফিরে যান। মানিকচাঁদ সিরাজদ্দৌলার সৈন্যবাহিনীতে সেনাপতি হয়ে এসেছিলেন। ১৭৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসন মাদ্রাজ থেকে এসে কলকাতা পুনর্দখল করেন। সেই পর্যন্ত রাজা মানিকচাঁদ কলকাতায় শাসনকর্তা ছিলেন, কিন্তু তিনি কখনও কলকাতা শহরের ভেতরে থাকেননি। থাকতেন কলকাতার উপকণ্ঠে বেহালায়– ডায়মন্ড হারবার রোডের উপর অবস্থিত চতুর্দিকে পরিখাবেষ্টিত এক প্রকাণ্ড বাগানবাড়িতে। সেই বাগানবাড়ি অনেক পরিবর্তিত হয়ে এখনও বর্তমান আছে। এইটিকেই লোকে দেওয়ান বা রাজা মানিকচাঁদের বাগান বলে।

কলকাতার এক হারিয়ে যাওয়া বাগানের সঙ্গে বিবেকানন্দের একটা সম্পর্ক আছে। নবাব মিরকাশিমের সেনাপতি গুর্গিনের বংশধর এক মহিলা এখনকার নারকেলডাঙার কাছেই বিরাট এক বাগানবাড়িতে থাকতেন। সেই বাড়ির নাম ছিল মোগলবাগান। বাড়ির আইনি সব কাজকর্ম করে দিতেন অ্যাটর্নি বিশ্বনাথ দত্ত। অনেক পরে এই বাগানের উপর দিয়ে বালিগঞ্জ- দমদম রেললাইন চলে গিয়ে এই বাগান নষ্ট হয়ে যায়। তবে নামটুকু রয়ে গেছে। 

দমদমের ক্লাইভ হাউসের পাশেই বিরাট বাগান ছিল আনন্দমোহন বসুর। র‍্যাংলার হলো গণিতশাস্ত্রের ওপর প্রদত্ত সর্বোচ্চ উপাধি, যা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া হয়। আর এই র‍্যাংলার উপাধি পান কিশোরগঞ্জের আনন্দমোহন বসু। তিনিই প্রথম এবং একমাত্র 'র‍্যাংলার' উপাধি পাওয়া ভারতীয়। এই আনন্দমোহন বসু ৭০ বিঘে জমি-সমেত এক বাগানবাড়ি কেনেন। সেই বাগানবাড়ির নাম রাখলেন 'ফেয়ারি হল।' ১৮৪৮ সালে এই বাড়ি ছিল ওয়ারেন হেস্টিংস লেসলি ফ্রিথ নামে এক সাহেবের। এই বাড়িতে আগে সিন্ধু দেশের হায়দ্রাবাদ, খয়েরপুর ও মীরপুরের তিন আমিরকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ১৮৪৩ সালে তাঁদের গদিচ্যুত করা হয়। একতলার একটি ঘরে লোহার গরাদে দেওয়া একটি ঘেরা জায়গা ছিল। সেখানে আমিরদের চিতাবাঘ বাঁধা থাকত। ১৯২০ সালের গোড়ার দিক থেকে এই বাগানবাড়ি ব্রিটিশ অ্যালুমিনিয়ম কর্পোরেশন লিমিটেডের সম্পত্তি হয়ে যায়। বাগানের আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। 

গঙ্গার ধারের বন্দর-বাগান থেকেই নাম হল 'গার্ডেনরিচ'
ওয়াজিদ আলি অযোধ্যা হারালেন ৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬। লখনউ ছাড়লেন সে বছরেরই ১৩ মার্চ, কলকাতা এলেন ৬ মে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই জ্বলে উঠল মহাবিদ্রোহের আগুন।  কিন্তু কলকাতায় এসেও সেখানেই ছোট এক লখনৌ বানিয়ে নিয়েছিলেন ওয়াজিদ আলি শাহ। ছিল বিরাট এক বাগান, আর সেই বাগানে অদ্ভুত এক চিড়িয়াখানা। আবদুল হলিম শররের লেখায় একেবারে জীবন্ত হয়ে হয়ে উঠেছে তার কথা। সেখানে "বিচরণ করত শত শত চিতা, হরিণ ইত্যাদি, অরণ্য পশুর দল ঠিক মাঝখানে, শ্বেত-পাথরে একটা পুকুর, সর্বদা ভরাভর্তি তার মধ্যে দেওয়া হয়েছিল শুতুরমুর্গ, কিশোরী, ফীলমুর্গ, সারশ, কায়া, বগলা, করকর, চকোর, ময়ূর, হাঁস নানান জাতের পাখি কচ্ছপ পুকুরের এক ধারে খাঁচায় থাকত বাঘ। চরণভূমির পাশে, লোহার রেলিংঘেরা জাতের এবং কোথাকার বাঁদর এনে রাখা হয়েছিল। এদের জলাধারের স্থানে পোষা হত। ইশারা করলেই জড়ো হত; খাবার নেচে কুঁদে বাহার দেখাত। শাহানশাহ মঞ্জিলের দীর্ঘ গভীর জলাশয়; পিছলা করে নেওয়া; ঠিক মাঝখানে সামনের দিকে ঝোঁকানো একটা কৃত্রিম পাহাড়। পাহাড়ের সংখ্যাহীন নালী; জলস্রোত বইয়ে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার সাপ। দু'গজ তিন বড়ো বড়ো সাপ চব্বিশ দৌড়ত, ঘুরত, কিলবিল করত; পাহাড়ের উঠত, ব্যাঙ হলে দৌড়ে ধরত। পাহাড়ের আশেপাশে খালের মতো নালা; তার মধ্যেও সাপেরা এঁকেবেঁকে ছুটত, ব্যাঙের পিছু নিত; লোকেরা পাশে দেখত। পাহাড়ের দুটো খাঁচা, তাতে থাকত বড় বড় চিতা। এমনিতে চুপচাপ কিন্তু দেওয়া হত লাফ দিয়ে ধরে গোটাটাই ফেলত। সাপ পোষার ব্যবস্থা আগে কোথাও হয়নি। এটা ওয়াজিদ আলি আবিষ্কার। য়োরোপের পর্যটক অবাক হয়ে ছবি এঁকে ও যেত। এই জানোয়ার ছাড়া হাজার হাজার পাখি ছিল। তারা থাকত খাশ সুলতানখানার অন্দরে, পিতল-পিঞ্জরে লোহার জাল সুরক্ষিত গোটাকুড়ি বড় বড় ঘর ছিল, 'গঞ্জ'। তার নানাধরনের অসংখ্য পাখি। বাদশাহর পশুপাখির যতো জাতি আছে, এখানে করবেন এবং এমন এক সম্পূর্ণ জীবন্ত চিড়িয়াখানা বানিয়ে যাবেন, দুনিয়ার কোথাও তার জুড়ি নেই। এদের সংগ্রহের তিনি বেপরোয়া অর্থব্যয়ও করেছেন। কেউ কোন পাখি বা আনলে যে চাইত যেত। শোনা যায়, বাদশাহ একজোড়া 'রেশমপাখা' পায়রা চব্বিশ হাজার টাকায় এবং এক ময়ূর এগারো টাকায় কিনেছিলেন। আফ্রিকার জিরাফও দুটো। কোহানের দুটো বাগদাদী উটও—যা হিন্দুস্থানের আর কোথাও চোখে পড়েনি কোনও জানোয়ারই যাতে বাদ না বাদশাহ সেজন্য গাধাও রেখেছিলেন চিড়িয়াখানায় তাঁর পায়রাই নাকি ছিল চব্বিশ পঁচিশ হাজারের মত"। 

ভাবা যায়! নবাবের মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই বাগান আর মিনেজারি একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। যেহেতু বাগানই আলোচনার প্রধান, তাই এই আলোচনায় বাদ গেল বেশ কয়েকটি বিখ্যাত বাড়ি, যেখানে বাগানের স্থান নেহাত ফেলে দেবার মতো ছিল না। কিন্তু সেগুলোতে বাড়িই মুখ্য। তাই বাদ গেল ডিরোজিওর বাড়ি, রাজনারায়ণ বসুর বেনেটোলার বাড়ি, ব্রাহ্ম সমাজের শাঁখারিটোলার বাড়ি, পাথুরেঘাটার গোপীমোহন ঠাকুরের বাড়ি, মরকত কুঞ্জ এবং অবশ্যই যার নাম না করলেই নয়, দ্বারকানাথের বেলগাছিয়া ভিলা আর নৈহাটির পাটের ব্যবসায়ী প্রিয়নাথ মিত্রের মোহনবাগান ভিলা, যার বিস্তীর্ণ মাঠে খেলতে খেলতে একটা ক্লাবেরই জন্ম হয়ে গেল, মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব। কিন্তু সে সব আলোচনা অন্যত্র করা যাবে।

বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬

ভানুবাবু ~ কৌশিক মজুমদার

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনটে দোষ ছিল।

তিনি নিজেই বলেছেন সাংবাদিক রবি বসুর কাছে। এক, তিনি টাকা ধার দিয়ে ফেরত চাইতে পারতেন না। দুই, নিজের জন্য কিছু চাইতে পারতেন না। আর তিন, সেটাই সবচেয়ে ঝামেলার, তিনি কারও অন্যায় কথাবার্তা সহ্য করতে পারতেন না। আর এই শেষেরটার জন্য কত মানুষের অপ্রিয় হয়েছেন কতবার।



সেই সেবার এক ইন্টালেকচুয়াল স্টার থিয়েটারে বসে একমনে মহাশ্বেতা দেবীর কুৎসা গাইতে ব্যস্ত। কেন তিনি বিজন ভট্টাচার্য্যকে ছেড়ে অজিত গুপ্তকে বিয়ে করলেন তা নিয়ে রসিয়ে চারটি গপ্পো করছিলেন। বোঝেন নি ভিতরেই ভানুবাবু আছেন। আচমকা বাইরে এসে তিনি জিজ্ঞেস করলেন "আচ্ছা মশাই আপ্নের পিতৃদেব এই বৎসর কত বিঘা জমিতে ধান চাষ দিছেন?"
ভদ্রলোক অবাক। "আমার বাবা ধান চাষ করবেন কেন? তিনি তো দেহ রেখেছেন অনেকদিন হল"
"বেশ। তবে বাঁইচা গেছেন। জীবিত থাকলে জিগাইতাম মহাশ্বেতা দেবী আপনের কয় বিঘা জমির পাকা ধানে মই দিসে যে আপনের ইন্টালেকচুয়াল পুত্তুর তারে লইয়া প্যাচাল পাড়তাসে? জন্মের সময় এমন পোলারে নুন দিয়ে মাইরা ফেলেন নাই ক্যান?"

আবার এই ভানুই যখন জানতে পারেন এইচ এম ভি নতুন কমেডিয়ান সুশীল চক্রবর্তীকে ভাগিয়ে দিয়েছে, বলেছে ভানু ছাড়া কারও রেকর্ড করবে না, তখন তিনিই ফোন করে শর্ত রাখেন "সুশীলের রেকর্ড করলেই আমি রেকর্ড করুম। নয়তো গুডবাই"। এইচ এম ভি মেনে নিতে বাধ্য হয় তার কথা।

আমরা দুর্ভাগা এখনও আশিতে আসিও না, মাসিমা মালপোয়া খামু, ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট কিংবা ওরা থাকে ওধারে-র "অরে আর ঢুকতেই দিমু না" কিংবা কমেডি স্কিটে ইনি আর গীতা দে-র সেই সব অসামান্য নাটকের বাইরেও যে এক সিরিয়াস ভানু আছে, তা আমরা মানতে নারাজ। কমেডিয়ানদের সমস্যা হয়তো এটাই। কেউ মানতেই চায় না কমেডি ইজ এ সিরিয়াস বিজনেস।
সেই সৌমিত্রবাবুর গল্পটা মনে পড়ে। তখন আর্টিস্ট ফোরাম আর শিল্পী সংসদ নিয়ে চরম দোলাচল। ভানু এসেছেন সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে আলোচনায়। গাড়িতে বসে কথা হচ্ছে। এমনসময় প্রায় ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে এক ফাজিল জিজ্ঞেস করলে "কেমন আছেন ভানুবাবু?"। ভানু একটু বিরক্ত। বললেন "আগে যেমন ছিলাম" বলে আবার আলোচনা শুরু করলেন।
সে থামবার পাত্র নয় । রস করে বললে "আগে কেমন ছিলেন সেটাও ত জানি না"
ভানু এবার চার অক্ষরের এক গালি দিয়ে বললেন "সেটা যদি নাই জানো, এখন কেমন আছি জাইন্যা কি করবা?"

মাত্র ১২ বছর বয়সেই বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন ভানু। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও বিপ্লবী অনন্ত সিংহকে গুরু মানতেন৷ তাঁদের কাছেই সংগ্রামের প্রথম পাঠ । এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় রিভলভার পাচারও করেছেন বহুবার। সত্যেন বসুর প্রিয় ছাত্র এই মানুষটি তরুনকুমারকে একবার দেখা করাতে নিয়ে গেছিলেন বিজ্ঞানীর সঙ্গে। সে গল্প কে না জানে? অবশ্য তাঁর কাছে তিনি ভানু নন। সাম্যময়। বাংলা সিনেমায় বাঙাল বা পুব বঙ্গের কমেডিকে প্রায় একার কাঁধে বয়েছেন এককালে। ঠিক যেমন আশিতে আসিও না ছবিতে নায়িকা রুমাকে বইতে দেখেছি।

আজ তাঁর মৃত্যুদিন। প্রণাম রইল।

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

একুশে ফেব্রুয়ারি কম্যুনিস্ট ইশতেহার ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

"ভুখা মানুষ, ধরো বই, ওটা তোমার হাতিয়ার"

মার্কসবাদ লেনিনবাদকে আক্রমণ করার, তাকে খাটো করার তাকে উপহাস করার অসংখ্য টেমপ্লেট বাজারে আছে। ।সবচেয়ে মারাত্মক টেমপ্লেট যেটা সেটা আজ একটু বলবার চেষ্টা করছি। এটা করা হয় বামপন্থার মুখোশধারীদের দিয়ে কারণ দক্ষিণপন্থী দের আক্রমনগুলি প্রকৃত বামপন্থীরা সহজেই ধরে ফেলতে পারেন। এটার শুরু হয় লেনিনবাদ কে প্রথমে বৌদ্ধিক স্তরে আক্রমণ করে। এবং এটা অবধারিত ভাবে শুরু হয় স্টালিন কে ঘিরে কারণ উনি ফাউন্ডেশন অফ লেনিনিজম এর রচয়িতা। যেনতেন ভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে স্টালিন আদলে মার্কসবাদ লেমিনবাদ কিছুই বুঝতেন না, বরঞ্চ ট্রটস্কি বুঝতেন। একই ভাবে লেনিন ও মার্কসবাদ এর প্রকৃত অনুগামী ছিলেন না বলে অপপ্রচার করা হয় লেনিন এর বিপ্রতীপ এ কখনও রোজা লুক্সেমবার্গ কে বা কখনও গ্রামসিকে খাড়া করে। শেষমেষ পরে রইলেন মার্কস। তাকেও ম্যালাইন করার এক অত্যশ্চর্য টুল আবিষ্কার করেছেন এই ছদ্ম বামেরা। রিয়াজননভ এর মেগা (Marx-Engels-Gesamtausgabe) 
প্রজেক্ট এর দৌলতে  মার্কস এর অল্প বয়সের কিছু লেখা আবিষ্কার করে এরা পরিণত বয়েসের মার্কসকে তার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চান। 



মার্কস এর দেখানো পথে লেনিন যেদিন একটা ছোট্ট কিন্তু বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে পৃথিবীর দ্বিতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করে ফেললেন সেদিন থেকেই আসলে শাসক শ্রেণীর ভয়ে ঘুম উড়ে গেছে। এটা মনে রাখতে হবে ঠিকঠাক ভাবে একটা দেশের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম লেনিনই তৈরি করেন, মার্কস নয়। কিন্তু মার্কস (এবং অবশ্যই) এঙ্গেলস ) এর অবদান হল যে তারাই সবার প্রথমে একটা নতুন ধরনের পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। 

যার জন্ম এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে সেই পার্টির ইশতেহার লেখার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই মার্ক্স ব্যস্ত হয়ে পড়েন ব্রাসেলস এ।  কমিউনিস্ট লীগ ২৬ শে জানুয়ারি মার্ক্সকে চরমপত্র পাঠিয়ে বলে যে পয়লা ফেব্রুয়ারির মধ্যে পাণ্ডুলিপি পাঠাতে হবে। মার্ক্স তাড়াহুড়ো করে লিখে পাঠালেন। মার্ক্স এমনিতেই লিখতেন ঝড়ের বেগে, খুদে অক্ষর, প্রায় সর্টহ্যান্ড এর ঢঙ্গে। প্রায় গোটা পাতা জুড়ে, একটুও জায়গা নষ্ট না করে। নিষিদ্ধ সেই ইশতেহার চললো তারপরে গোপন পথে লন্ডনে। 

আদি পাণ্ডুলিপির প্রায় সবটাই হারিয়ে গেছে। একটা পাতা খালি বেঁচে। এডুয়ার্ড বার্নস্টাইনকে ১২ই জুন, ১৮৮৩ এ লেখা একটা চিঠির সাথে আটকে ছিল ওই পাতাটা। পাতাটির ওপর লেখা এঙ্গেলসের নোট, "Mscript Karl Marx: Erster Entwurf z. Comm Manifesta" ম্যানুষ্ক্রিপ্ট কার্ল মার্ক্স: ফার্স্ট ড্রাফট অফ কম. ম্যানিফেস্ট.।

বাইবেলের পরেই যে বইটার সবচেয়ে বেশি বিক্রি সেই বই কম্যুনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশিত হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৮ সাল। ২৩ পাতার চটিবই। কালচে সবুজ মলাট। নিছক পরিসংখ্যানের বিচারে ভাববাদীদের বাইবেল এর কাছে এখনো হেরে আছে বস্তুবাদীদের বাইবেল। কিন্তু এমন দিন আসবে বস্তুবাদীদের  বাইবেল জিতবেই জিতবে। 

আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি আবার। আজ আন্তর্জাতিক লাল বই দিবস। 

পু: এই পাতার লাস্ট লাইনটা হল সেই বিখ্যাত লাইন "শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিক শ্রেণীর হারাবার কিছু নেই , জয় করার জন্য পড়ে আছে সারা দুনিয়া।

মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

'প্রতীক উর' প্রশ্ন ~ বিভাস সাহা

গতকাল ১৬ই ফেব্রুয়ারি বেশ একটা ঝড় বয়ে গেল। সকালে যা ছিল একটা চাপা ফিসফাস বিকেলে তা হয়ে দাঁড়ালো 'পাক্কা খবর' । অনেক চ্যানেল দীর্ঘ বিশ্লেষণ দিল যেখানে বলা হল 'মহম্মদ সেলিম এবং তাঁকে ঘিরে এক দুষ্টচক্র সি পি  এম চালাচ্ছে' এবং প্রতীক উর তৃণমূলে এসে গেছেন -- শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। 

আজ প্রতীকের  একটি সাক্ষাতকার শুনলাম। সেখানে উনি পরিষ্কার বললেন, যে চিঠিটা বাজারে ঘুরছে, সেটি উনি লেখেনইনি। উনি একটি দলীয় ফর্ম পূরণ করে ওনার মতামত যথার্থ জায়গায় জানিয়েছেন, এবং অপেক্ষা করছেন দল কী উত্তর দেয়। 

 এসব শুনে কয়েকটি জিনিস মাথায় এল, তাই এই লেখা। 

প্রথমত, প্রতীক অত্যন্ত জনপ্রিয়, লড়াকু, এবং সৎ নেতা হিসেবে জনমানসে একটি ভাবমূর্তি রাখতে পেরেছেন। তাঁকে টিভির পরদায় দেখা যায় না। তিনি যে অঞ্চলে রাজনীতি করেন সেখানে চোখে পড়ার মত দলীয় শক্তি নেই।  সর্বোপরি ওই অঞ্চলে ভাইপো ব্যানার্জীর  পোষা বাহুবলীরা সর্বক্ষণ দাপাদাপি করে। 

এসব সত্ত্বেও তিনি রাজ্যস্তরে একটি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তার মানে রাজনীতিতে এখনও  সততা এবং নীতির একটা জায়গা আছে। এটা খুবই আশার জায়গা। প্রতীক উরের মত নেতা আরও চাই এবং বাজারের খবর যাইই হোক না কেন, এইরকম নেতাদের জন্য বামদলই যথার্থ জায়গা।

দ্বিতীয়ত, প্রতীক উর যে রাজ্য নেতাদের কাছে তাঁর সদস্যপদ ছাড়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন, এই খবর উপরের স্তরের কোন নেতাই মিডিয়াকে জানিয়েছেন এবং ঠিক হিসাব করে তা কূণাল ঘোষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ব্যাপার। প্রতীক উরকে  যাতে  দল বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়, এবং তারপর তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীল, চটিচাটা ইত্যাদি বলে আক্রমণ করা যায় -- এই কুমতলব তাঁদের আছে। এটা পরিষ্কার। এরা যদি সি পি এমের শীর্ষস্তরে থাকেন, তাহলে  ভোটে যে দল খারাপ ফল করবে তার সম্ভাবনা বেড়ে গেল। 

তৃতীয়ত, সি পি এম দলটির কিছু সাংগঠনিক সংস্কার দরকার। দলের মধ্যে সদস্যদের ভিন্ন মত প্রকাশের একটা জায়গা দেওয়া উচিত। এই ভিন্নমতের  প্রশ্ন এলেই সঙ্গে সঙ্গে পার্টির গঠনতন্ত্র, সংবিধান, শৃঙ্খলা ইত্যাদি তুলে চুপ করিয়ে রাখা হয়। এটি আধুনিক যুগে একেবারেই বেমানান। তার উপর বিধানসভায় শূন্য হয়ে গেলে আরও বেমানান।  

চতুর্থত, দলের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম একটা মহাজোট করার চেষ্টা করছেন, সেটা বোঝা যায়। শুধু  ভোটের জন্য হুমায়ন কবীর ও নওশাদ সিদ্দিকি নয়, বৃহত্তর বাম ঐক্যের কথা মাথায় রেখে  উনি অনেক অতি বাম, বা বিশিষ্ট নিরপেক্ষ বাম বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে সাক্ষাত বা যোগাযোগ করে তাঁদের মতামত নিয়েছেন (এ খবর আমি জানি)। এর মধ্যে অনেক উদারতা এবং বাস্তববুদ্ধির একটা প্রকাশ রয়েছে। 

কিন্তু একই সঙ্গে দলের কর্মীদের কাছে এবং জনমানসে কী বার্তা দিতে হবে সে  বিষয়ে কোন পরিষ্কার হিসাব দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ নিজস্ব দলীয় নীতি এবং ভোটের রণনীতি ও কৌশল এই দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হবে, এবং সেটা মানুষকে এবং দলের দ্বিতীয় স্তরের নেতাদেরকে বুঝিয়ে তাঁদের সঙ্গে নিয়েই করতে হবে। 

এই কাজটা যে হয়নি, তা এই প্রতীক উর কাণ্ড থেকে বোঝা গেল। এর পাশাপাশি বিরুদ্ধ দলগুলি ও তাদের মিডিয়া থেকে যে 'সেলিম ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরছেন' এই ন্যারেটিভ ছড়ানো হয়েছে, তার কোন পাল্টা ন্যারেটিভ সি পি এম দিতে পারেনি। বরং ব্যাকফুটে খেলে চলেছে। 

আমার নিজের মূল্যায়ন, ভোট বাড়াতে গেলে এই ২০২৬-এ সি পি এমকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে তাকাতেই হবে। সেখানে হুমায়ুন কবীর যে হই চই ফেলেছেন তাতে তার সঙ্গে কথা বলার অবশ্যই একটা বড়ো যুক্তি আছে।    প্রশ্ন হচ্ছে, মুর্শিদাবাদের বাইরে হুমায়ুনের প্রভাব অন্যান্য জেলায় কতদূর এবং তার সূত্রে ভোট সি পি  এমে আসতে  পারে কিনা, এর কোন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানি না। অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের বাইরে কোন লাভ যদি না থাকে তাহলে হুমায়ুনের সঙ্গে কথা বলায় বিশেষ কোন লাভ নেই।  

হুমায়ুন-নওশাদ বিষয়টি রণকৌশলের ব্যাপার, নীতির নয়। কিন্তু বিষয়টি সি পি এম নেতৃত্ব সেভাবে প্রজেক্ট করছেন না। ফলে দলের ভিতর অনেক বিভ্রান্তি হচ্ছে।

পঞ্চমত, বিভ্রান্তি ছাড়াও সি পি এম দলের মাঝারি স্তরে (যাকে চর্বিযুক্ত মধ্যপ্রদেশ বলা যেতে পারে) একটা উদ্ধত/অশিক্ষিত কালচার আছে। (এই রোগ অন্যান্য বাম দলেও আছে।) সেখানে  সুযোগ পেলেই মার্ক্সবাদ, বিপ্লব, পুঁজিবাদ ইত্যাদি নিয়ে লেকচার দেওয়ার  প্রবণতা আছে, এবং  নিজের দলের  সমর্থক না হলে তাকে নানা বিশেষণে গালিগালাজ করা হয়। এদের নতুন কিছু শেখার বা নতুন ভাবে ভাবার কোন আগ্রহ নেই। 

এই কালচারটি বৃহত্তর বাম ঐক্যের পরিপন্থী। অতি সম্প্রতি 'মার্ক্সবাদী পথ' গোষ্ঠীর উদ্যোগে মৈত্রীশ ঘটকের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালের মধ্যে একটি অসাধারণ অনুষ্ঠান। মৈত্রীশ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অত্যন্ত সহজ ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির আপেক্ষিক অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেছেন, এবং শেষ দিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ নানা সরকারি অনুদানের বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর মতামত দিয়েছেন এবং যথার্থ সমালোচনা করেছেন । 

কিন্তু তাঁর সমালোচনা তীব্র নয় বলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে চটিচাটা বলে আক্রমণ করছেন (মৈত্রীশের ফেসবুক পেজে দেখলাম)। এগুলি অত্যন্ত রুচিহীন ব্যাপার। এই নিন্দা যদি কোন সি পি এম সমর্থক করে থাকেন, তা আরও গর্হিত। 

পরিশেষে, প্রতীক উর রহমানের কথা ফিরে আসি। প্রতীক উর দলে থাকছেন কি যাচ্ছেন, বা গেলে কোন্ দলে যাবেন, সেটা তাঁর ব্যাপার। কিন্তু তাঁকে বৃহত্তর বাম আন্দোলনে দরকার। যদি তিনি এই বাম আন্দোলন ছেড়ে তৃণমূলে  যান তাহলে তা খুবই  দুর্ভাগ্যজনক হবে। 

বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেশ কঠিন ব্যাপার।

বিভাস সাহা 
(অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়) 

সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশে নির্বাচন ও বামপন্থী ~ শুভ বসু

বাংলাদেশে বামপন্থীরা কেন খুব একটা ভালো করতে পারেনি? অনেকেই এই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করে এবং একটি বিভ্রান্তিকর উত্তর দেয়। ইসলাম কমিউনিজমের সাথে ভালো যায় না। কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে অন্ধ ব্যক্তিরা এমন একটি ভাসাভাসা উত্তর দিতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে, এম এন রায় এবং অবনী মুখার্জি ছাড়া, বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার সময় সকল সদস্যই ছিলেন মুসলমান। এর মধ্যে ছিলেন মুজাফফর আহমেদ, যিনি পরে কাকাবাবু নামে পরিচিত; কুতুবউদ্দিন আহমেদ; আব্দুল হালিম; আবদুর রেজ্জাক খান; এবং সম্ভবত আব্দুল মোমিন। "কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল" গানের প্রথম অনুবাদ করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি মুজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এই সকল নেতা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের প্রসার, শ্রমিক ও কৃষক দল প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে হিন্দু বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীদের কমিউনিজমের দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে, কমিউনিস্টরা কলকাতায় পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিংবদন্তি ইতিহাসের অধ্যাপক সুশোভন সরকার পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান প্রশ্নে মুসলিম লীগের সাথে একটি সমঝোতা করে এবং "আজাদ হিন্দুস্তান  মে  আজাদ পাকিস্তান" স্লোগান উত্থাপন করে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে, বিজয়ের স্থপতি আবুল হাশিম সমাজতন্ত্রের ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম লীগের ইশতেহার তৈরি করেন। তার দুই ভাগ্নে, সহিদুল্লাহ এবং মনসুর হাবিবুল্লাহ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা ছিলেন। সামগ্রিকভাবে, প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন বেশ কয়েকজন উর্দু লেখককে আকৃষ্ট করেছিল, যার মধ্যে সাজ্জাদ জহির, কাইফে আজমি, ইসমত চুগতাই এবং সাদাত হোসেন মান্টো ছিলেন।

পূর্ব বাংলায়, মনি সিং সুসং দুর্গাপুরে দলীয় সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষক প্রতিরোধের পথিকৃৎ ছিলেন। দিনাজপুরে, সুশীল সেন, বিভূতি গুহ এবং হাজী দানেশ তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলেন। বরিশালে, মনোরোমা বসু এবং গোলাম কিবরিয়া কৃষকদের নেতৃত্ব দেন। সিলেটে   টঙ্ক আন্দোলনের সময়, সামন্ততন্ত্রের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। মজার বিষয় হলো , পূর্ববঙ্গে বেশিরভাগ কমিউনিস্ট কর্মী হিন্দু থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই ছিলেন মুসলিম, যেমন আবদুল্লাহ রসুল, মুহাম্মদ ইসমাইল, মুহাম্মদ ইলিয়াস, মনসুর হাবিবুল্লাহ, সহিদুল্লাহ এবং আরও অনেকে। অবশ্যই, কিংবদন্তি কাকাবাবু ছিলেন অগ্রণী।

১৯৪৮ সালে দেশভাগের পর, সিপিআই বি.টি. রনদিভের নেতৃত্বে একটি তাৎক্ষণিক বিপ্লব লাইন গ্রহণ করে। পূর্ববঙ্গে কমিউনিস্ট কর্মীরা বিদ্রোহে লিপ্ত হয়। এর ফলে মূলত দলিত আদিবাসী এবং পাহাড়িদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সাঁওতাল, গারো এবং নমশুদ্র জনগোষ্ঠী বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল একটি দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। এই সময়েই ইলা মিত্রকে নাচোল থেকে বন্দী করা হয় এবং কারাগারে নির্যাতন করা হয়। ১৯৫০ সালে, যখন বাংলার উভয় প্রান্তে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, তখন প্রায় ১৫,০০০ কমিউনিস্ট কর্মী সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেন, কারণ তাদের বেশিরভাগই হিন্দু ছিলেন। এর ফলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে। 

দেশভাগের পর, দল সংগঠিত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক মুসলিম কমিউনিস্টকে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তারা পরে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন, যাদের মধ্যে মনসুর হাবিবুল্লাহও ছিলেন। তবে, হিন্দু কমিউনিস্টরা সেখানেই থেকে যান এবং মনি সিং এবং খোকা রায় তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যেমন মোহাম্মদ ফরহাদ, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ, মুহাম্মদ তোয়াহা এবং পরে তরুণ বদরুদ্দিন ওমর। তারা একটি ছাত্র আন্দোলন এবং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। লেখকদের মধ্যে সত্যেন সেন বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন। বাংলায়, মুসলমানদের মধ্যে কৃষক আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। মাওলানা ভাসানী সেই ঐতিহ্য থেকে এসেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে, তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং একজন সহযাত্রী হয়ে ওঠেন। কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন ফ্রন্টাল পার্টির মাধ্যমে পরিচালিত হত, যার মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক দল, এবং পরে, ১৯৫৭ সালে, যখন ভাসানী ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন দলটি ন্যাপের আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনে জড়িত হয়।

এটি ছিল শীতল যুদ্ধের যুগ, এবং মাওলানা ভাসানী একজন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যোদ্ধা হয়ে ওঠেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সুয়েজ যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি বিশ্ব শান্তি পরিষদ (WPC) কর্তৃক আয়োজিত শান্তি সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি চীনে যান এবং মাও এবং ঝৌ-এর সাথে দেখা করেন। তিনি হাভানায় ত্রি-মহাদেশীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের মাওবাদীদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তোহা, কাজী জাফর, আলাউদ্দিন , হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ শিষ্য। বৃহত্তম প্রচারিত সংবাদপত্রগুলির মধ্যে একটি, সংবাদ তখন বামপন্থী ছিল। ন্যাপ ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। ১৯৬৭-৬৮ সালে, দলটি বিভক্ত হয়ে যায় এবং তারপরে অতি-মার্কসবাদের ফলে তোহা ভাসানীর ইসলামী সমাজতন্ত্রের ধারণার কারণে ভাসানীর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তির ফলে শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে মূল স্রোতের রাজনীতিকে পরিচালিত করেন . মনি সিং, ফরহাদ এবং মুজাফফর আহমেদের মতো সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্টদের একটি দল তার সাথেই ছিল। কিন্তু মাওবাদীরা বেশ কয়েকটি দলে বিভক্ত ছিল। সিরাজ সিকদারের নিজস্ব একটি দল ছিল যারা আওয়ামী লীগের আগে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম ঘোষণা করেছিল। ইপিসিপি (এমএল) মুক্তি সংগ্রামের প্রতি বিরূপ ছিল। রাশেদ খান মেনন, কাজী জাফর এবং রনো স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং শিবপুরে একটি মুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
স্বাধীনতার পরে, চীন-সোভিয়েত সংঘাত চরমে পৌঁছানোর ফলে , মাওবাদীরা শেখ মুজিবের বিরোধী ছিলেন। মণি সিং, ফরহাদ এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে, তাজউদ্দিন এবং আবদুস সামাদ আজাদ সোভিয়েতপন্থী লাইন অনুসরণ করেছিলেন এবং সিপিবি এমনকি বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন, যা সিপিবির জন্য সম্পূর্ণ বিপর্যয়কর পদক্ষেপ ছিল। 

শেখ মুজিবের ছাত্র লীগের বৃহত্তর অংশ তাকে ত্যাগ করে জেএসডি গঠন করে, আরেকটি মার্কসবাদী রাজনৈতিক দল, যেখান থেকে বিএসডির ( বাংলদেশ সমাজতন্ত্রী দল) উদ্ভব হয়েছিল। জেনারেল জিয়া বিএনপি প্রতিষ্ঠা করার পর, অনেক প্রাক্তন মাওবাদী এবং ভাসানীর সমর্থকরা নতুন দলে যোগ দেন। তারা ভারতবিরোধী এবং চীনপন্থী ছিল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সিপিবি তার জনপ্রিয়তা ফিরে পায়। ১৯৯১ সালে, তারা আজকের এনসিপির মতো পাঁচটি আসন জিতেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, সিপিবি দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে যায় এবং একটি উপদলে দল ভেঙে দেয় । এর ফলে সিপিবি ভেঙে যায়। কাজী জাফর এবং হায়দার আকবর খান রনো একটি শ্রমিক দল ( Workers' Party)গঠন করেন। তারা শেখ হাসিনার সাথে জোটবদ্ধ ছিলেন এবং রাশেদ খান মেনন কারাগারে আছেন। রনো পরে সিপিবিতে ফিরে আসেন। জাসদ বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ছিল হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে, যিনি আওয়ামী লীগের সাথেই ছিলেন এবং এখন সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। জাসদের একটি শাখা বাংলদেশ সমাজতন্ত্রী দল সক্রিয় ছিল।

সুতরাং, বাংলাদেশে কমিউনিস্টদের পতন ধর্মের সাথে খুব একটা সম্পর্ক রাখেনি; বরং, এটি একটি ঐক্যফ্রন্ট এবং রাজনৈতিক কৌশলের উপর একমত হতে না পারার কারণেই হয়েছিল। নতুন প্রজন্ম তৃণমূল স্তর থেকে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সংগঠিত করতে পারে যা বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং জামাতের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। আমি এটি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।