সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

কবর ~ সোহেল রানা

আমাদের উঠানে একটা কবর আছে। কবরটা কার, আমি জানি না। 
জানি না, এই কথাটা মিথ্যা। আমি জানি কার। কিন্তু নামটা বললে বিপদ হতে পারে। তাই নাম বলি না।

শুধু প্রতি বছর বর্ষার আগে কবরটার চারপাশের মাটি একটু উঁচু করে দিই। শেওলা পরিষ্কার করি। কবরের মাথায় একটা বেলগাছ আছে। বেলগাছটা আমি লাগাইনি। যে মানুষটা এখানে শুয়ে আছে, সে লাগিয়েছিল। বৃক্ষটা বড় হয়েছে। মানুষটা বড় হয়নি। মানুষের কবর বড় হয় না। শুধু চারপাশের পৃথিবীটা ছোট হতে হতে একদিন তার উপর এসে পড়ে।

১৯৫০ সালে পাবনার চাটমোহর গ্রামে আমার জন্ম। তার আগের ইতিহাস আমি বাবার মুখে শুনেছি।
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের কথা বলতে গিয়ে বাবা একদিন বলেছিলেন,
“ধান ছিল। কিন্তু মানুষের ঘরে ধান ছিল না।”

আমি বুঝিনি।

বলেছিলাম,
“ধান থাকলে মানুষ না খাইয়া মরলো কেমনে?”
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,
“সব ক্ষুধা পেটের না, তাহের।”

সেই কথাটাও তখন বুঝিনি।

দেশভাগের কথাও বাবার কাছ থেকেই শুনেছি।
তিনি বলতেন,
“মানুষের মাথার উপর দাগ টানছিল।”
আমি বলতাম,
“কোথায়?”
“মাটির উপর।”
“দাগ দেখা যাইতো?”
“না।”
“তাইলে?”
বাবা বলতেন,
“যেদিন পাশের বাড়ির মানুষটা আর পাশের বাড়ির মানুষ রইল না, সেদিন দাগ দেখা গেল।”

আমাদের পাশের বাড়িতে তখন সেন পরিবার থাকতো। হিন্দু পরিবার। বাড়িতে তিনজন মানুষ। অরুণকুমার সেন। তার স্ত্রী সরলা। তাদের মেয়ে, মাধবী। আমরা ডাকতাম মাধু। মাধু আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট। একসঙ্গে বড় হয়েছি। পুকুরে সাঁতার। আমগাছে ওঠা। বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরা।

একদিন মাধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুই বড় হইয়া কী হবি?”
আমি বলেছিলাম,
“বাবার মতো মাটি কাটবো।”
সে হেসে বলেছিল,
“মানুষ হবি না?”
আমি বলেছিলাম,
“মাটি কাটা মানুষ না?”
সে মাথা নাড়ছিল।
“মানুষ হওয়া আলাদা জিনিস।”

তখন কথাটার মানে বুঝিনি।

১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় সেই কথাটার মানে প্রথম বুঝতে শুরু করি। এক রাতে সেন পরিবার কলকাতা চলে গেল। খুব ভোরে। কোনো বিদায় ছিল না। কোনো কান্না ছিল না। শুধু কয়েকটা বস্তা। কিছু কাপড়। দুই তিনটা হাঁড়ি। আর মাধুর চোখ। যাওয়ার আগে সে আমাকে একটা ছোট কাঁসার বাটি দিয়ে বলেছিল,

“রাখিস।”
আমি বলেছিলাম,
“ক্যান?”
“আমরা আবার আসবো। তুই আর আমি এই বাটিতে আমভর্তা খাবো।”
“কবে?”
সে বলেছিল,
“জানি না।”
আমি বলেছিলাম,
“তাইলে কেমনে জানলি আসবি?”

মাধু চুপ করে ছিল। তারপর চলে গিয়েছিল। 

আমি অনেকদিন উঠানের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, আজ বুঝি ওরা আসবে। ওরা আসেনি। জীবন অবশ্য থেমে থাকেনি। জীবন জীবনের নিয়মেই চলেছে।

তারপর এলো ১৯৭১
এই গল্পের সবচেয়ে খারাপ অংশটা আমি বলতে চাই না। আমি তখন একুশ। আমাদের চাটমোহর গ্রামের অনেক তরুণ চলে গেল মুক্তিযুদ্ধে। কেউ গোপনে। কেউ প্রকাশ্যে।

চাটমোহরের পাশ ঘেঁষে বাওনডাঙ্গা আর ডেমরা গ্রামে তখন পাকিস্তানি বাহিনী আর রাজাকারদের চরম তান্ডব। পুরো এলাকার হিন্দু পরিবারগুলোকে ধরে এনে বাওনডাঙ্গার বিলে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হতো। পঁচে যাওয়া লাশগুলো ফেলে রাখা হতো খোলা মাঠে, যেখানে শকুনে খুঁটে খেতো আর কুকুরের দল লাশ নিয়ে টানাটানি করতো। মানুষের রক্তে ভিজে গিয়ে লাল হয়ে গিয়েছিল বিলের পানি।


অরুণকুমার সেন তখন কলকাতায়। তিনি মুর্শিদাবাদের লালগোলা সীমান্ত পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে তরঙ্গপুর ক্যাম্পে চলে তাঁর সামরিক প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। জলঙ্গী নদী পার হয়ে তাঁর দল রাতে ভাঙ্গুড়ার চরাঞ্চলে অপারেশন চালাতো। রাতে নৌকা চালানো, দিনে ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকা। একবার পাকিস্তানি সেনাদের একটা টহলদল খাসবাজারের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। তখন অরুণকুমার সেনের দল কাছের এক খালে লুকিয়ে ছিল। একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধার কাশি উঠেছিল। অরুণকুমার সেন তার মুখ চেপে ধরেছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। কেউ একজন বলেছিল, "ক্যা য়াঁ কোই হ্যায়?"

সেই কয়েক মিনিটে কেউ নড়েনি। পানি কোমর পর্যন্ত। জোঁক পায়ে। শ্বাস বন্ধ। তবু কেউ ওঠেনি। সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর অরুণকুমার সেন নাকি বলেছিলেন, “আজ যদি একজনের কাশি আরেকজনের জীবন নেয়, তাহলে তার কোনো অধিকার নেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার।”

আরেকবার তারা গুহগ্রামের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজে আক্রমণ চালিয়েছিল। অরুণকুমার সেনের সঙ্গে থাকা ছেলেটার মাথায় গুলি লেগে পড়ে যায়। অরুণকুমার সেন তাকে কাঁধে তুলে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসেন। কয়েক মিনিট পর ছেলেটা মারা যায়। অরুণকুমার সেন নাকি বলেছিলেন, “ওরে আমি বাড়ি নিয়ে যেতে পারলাম না। কিন্তু দেশ স্বাধীন করেই ফিরবো।”

যুদ্ধের শেষ দিকে ঈশ্বরদী-বাঘাবাড়ী রোডে এক অভিযানে অরুণকুমার সেন গুরুতর গুলিবিদ্ধ হন। বুকের নিচে গুলি। সহযোদ্ধারা তাকে চাটমোহরের সীমানা পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল। তারপর তিনি একাই যেতে চেয়েছিলেন। কারণ দল ধরা পড়লে সবাই বিপদে পড়বে। কীভাবে তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, সেটা আমি পুরো জানি না। শুধু এক বর্ষার সন্ধ্যায় আমার বাবা দরজায় এসে আমাকে বলেছিলেন, “তাহের, একজন মানুষ আইছে।”

আমি বাইরে গিয়ে দেখলাম, অরুণকুমার সেন। চেনা মুখ। কিন্তু চিনতে সময় লাগলো। দাড়ি। শুকনো মুখ। রক্তে ভেজা কাপড়। বুকের কাছে হাত চেপে ধরে আছেন।

আমি বললাম,
“অরুণ কাকা?”

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

বললেন,
“তুই তো অনেক বড় হইছিস।”

আমি কিছু বলতে পারিনি।

বাবা তাকে পেছনের ছোট ঘরে নিয়ে গেলেন। তখনও আমি জানতাম না, মানুষটার শরীরে কতটা যুদ্ধ জমে আছে। পরের দুই দিন তার জ্বর উঠলো। বাবা ক্ষত পরিষ্কার করলেন। ওষুধ জোগাড় করলেন। কিন্তু গুলিটা ভেতরে ছিল। গ্রামে ডাক্তার নেই। পাবনা শহরে নেওয়া অসম্ভব। রাস্তা তখন নিরাপদ নয়। অরুণ কাকা মাঝে মাঝে জ্ঞান হারাতেন। আবার চোখ খুলতেন।

একদিন আমাকে দেখে বললেন,
“তাহের।”
“জি।”
“মাধু কেমন আছে?”

আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠলো।

আমি বললাম,
“জানি না।”

তিনি চোখ বন্ধ করলেন।

ফিসফিস করে বললেন,
“তুই দেখিস এই দেশটা স্বাধীন হবে, হতেই হবে।”

ডেমরা আর বাওনডাঙায় দেখা নরকযন্ত্রণা অরুণ কাকাও জানতেন। রাজাকাররা সেখানে হিন্দুদের লাশ পুড়তে দিতো না, টেনে হেঁচড়ে বিকৃত করে ফেলে রাখতো। মৃতদেহও তাদের ঘৃণা থেকে রেহাই পেত না।

অরুণ কাকা খুব আস্তে বলেছিলেন,
“আমার শরীরটা যদি আগুনে দিস, দূর থেকে ধোঁয়া দেখা যাবে। যারা খুঁজতেছে, তারা বুঝবে। তোরা বিপদে পড়বি।”

তিনি একটু থামলেন।
“মাটিতে দিস।”
আমি বললাম,
“আপনার ধর্ম?”

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
“মরার পর ধর্ম দিয়ে কী করবো?”

আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি।

তৃতীয় দিনের ভোরে অরুণকুমার সেন মারা গেলেন। খুব চুপচাপ। কোনো নাটক ছিল না। কোনো শেষ চিৎকারও না। বাবা আমাকে নিয়ে উঠানের এক পাশে কবর খুঁড়লেন। হিন্দু মানুষকে মুসলমানের মতো দাফন করা আমাদের ধর্মের নিয়ম ছিল না। আমরা জানতাম। অরুণ কাকাও জানতেন। কিন্তু তখন ধর্মের নিয়মের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল লাশের নিরাপত্তা। আমরা অরুণ কাকাকে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দাফন করলাম। তার মুখ শেষবার দেখেছিলাম আমি। মনে হয়েছিল, মানুষটা ঘুমাচ্ছেন। কোনোদিন এই ঘুম ভাঙবে না।

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন।

তারপর বলেছিলেন,
“মানুষটা হিন্দু ছিল।”
আমি বললাম,
“জানি।”
“মনে রাখবি।”
“হ।”
“কিন্তু কবরের সামনে দাঁড়াইয়া ধর্মের কথা ভাববি না।”
“তাইলে কী ভাববো?”
“ভাববি, একজন মানুষ শুইয়া আছে।”

তারপর বাবা আমার চোখের দিকে তাকালেন। গলার স্বর খুব শক্ত করে বললেন,
“এই কবরের কথা কেউ জিগাইলে বলবি, আমার বাবার কবর।”

আমি অবাক বিস্ময়ে বাবার দিকে তাকালাম,
“বাবা, তুমি?”

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর বাজারের ব্যাগে একটা লুঙ্গি আর শার্ট তুলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন।

তারপর অনেকগুলো মাস কেটে গেল। বাবা ফিরলেন না। সেদিন বিকেলে অরুণ কাকার লাগানো বেলগাছটার পাশে আমি বসেছিলাম। চারিদিকে হৈহৈ রৈরৈ উঠলো। দেশ স্বাধীন হলো। ঢাকায় পতাকা টানালো। মানুষ রাস্তায় বের হলো। আমরা আনন্দ করলাম। সেই আনন্দের ভেতর একটা অদ্ভুত শূন্যতা ছিল।

কয়েক বছর পর মাধুর খবর পেলাম। সে কলকাতায় আছে। বেঁচে আছে। বিয়ে করেছে। তার নিজের সংসার হয়েছে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। জীবন আবার তার স্বাভাবিক নিষ্ঠুরতায় ফিরে গেল। কিন্তু সংসার আমাকে আর টানলো না। একা রয়ে গেলাম। ততদিনে মানুষ যুদ্ধের গল্প বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেল। নতুন প্রজন্ম জন্ম নিল। তারা জানতে চাইলো না কে কোথায় মারা গেছে। কে কার লাশ কাঁধে নিয়েছে। কার বাবা ফেরেনি। কার ভাই ফেরেনি। কার স্বামী ফেরেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানুষের প্রয়োজন ছিল বেঁচে থাকা। স্মৃতি দিয়ে ভাত রান্না হয় না।

তারপর একদিন, প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পর, দুপুরে একজন বৃদ্ধা আমাদের উঠানে এসে দাঁড়ালেন। সাদা চুল। পাতলা শরীর। চোখে মোটা চশমা। সঙ্গে আরেকজন তরুণী। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।

বৃদ্ধা বললেন,
“এই বাড়ি কি তাহেরদের?”

আমার বুকের ভেতর কিছু একটা থেমে গেল।

আমি বললাম,
“হ।”

তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,
“তুই তাহের?”

আমি আর কোনো প্রশ্ন করিনি।

শুধু বললাম,
“মাধু?”

সে হাসলো। খুব অল্প। কিন্তু আমি চিনে ফেললাম। মানুষের মুখ বদলায়। চোখ বদলায়। চুল বদলায়। কিন্তু কিছু হাসি বদলায় না।

আমি বললাম,
“তুই আসছিস?”
সে বললো,
“বাবার কবর দেখতে।”

আমি তার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। এত বছর পর সে বাবার কবর দেখতে এসেছে।

আমি বললাম,
“চল।”

সে আমার পেছনে হাঁটতে লাগলো। খুব আস্তে। উঠানের মাঝখান দিয়ে। তারপর বেলগাছটার সামনে এসে আমি থামলাম। মাধু থামলো না। আরও দুই পা এগিয়ে গেল। তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। বেলগাছটার দিকে তাকিয়ে রইল।

“এই গাছটা?”

আমি বললাম,
“তোর বাবা লাগাইছিল।”

তার ঠোঁট কাঁপলো। সে গাছটার গায়ে হাত রাখলো। অনেকক্ষণ।

তারপর বললো,
“বাবা গাছ খুব ভালোবাসতো।”
আমি বললাম,
“জানি।”
সে আমার দিকে তাকালো।

সন্ধ্যার আগে মাধু চলে গেল। যাওয়ার সময় কবরটার দিকে ফিরে তাকালো। আমি ভাবলাম, সে হয়তো কিছু বলবে। সে কিছু বললো না। শুধু দুই হাত জোড় করে প্রণাম করলো। তারপর চলে গেল। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। সেদিন প্রথম বুঝলাম, কখনো কখনো মানুষ শুধু বাবার কবর খুঁজতে বর্ডার পেরিয়ে আসে না, সে আসে নিজের ভেতরের একটা খালি জায়গা পূরণ করতে।

মাধু তার বাবাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেনি। কবরের মাটি নিতে পারেনি। কোনো হাড় নিতে পারেনি। শুধু বুকের খালি জায়গাটা পূরণ করে নিয়ে গেল।

বছর তিনেক পর কলকাতা থেকে খবর এলো। মাধু অসুস্থ।
তারপর একদিন খবর এলো, মাধু মারা গেছে। 

আমি খবরটা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। 

সন্ধ্যায় উঠানে এলাম। 
অরুণ কাকার কবরের পাশে বসে বললাম,
“কাকা।”

কোনো উত্তর এলো না। শুধু বেলগাছের পাতাগুলো নড়ছিল।

আমি আবারও বললাম,
“কাকা, মাধু মারা গেছে। সে আর কোনোদিন আসবে না।”
পরক্ষণেই আমার মনে হলো, 
“আমার বাবাও আর কোনোদিন আসবে না।”

আমি জানি না কেন, সেদিন আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল।

আজও বর্ষার আগে আমি কবরটার মাটি উঁচু করি। আমার হাত কাঁপে। কোদাল আগের মতো ওঠে না। কখনো হাঁপিয়ে যাই। তখন বেলগাছটার নিচে বসি। কবরটার দিকে তাকিয়ে থাকি। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে,

“কবরটা কার?”
আমি এখন বলি,
“একজন মুক্তিযোদ্ধার।”
সে যদি আবার জিজ্ঞেস করে,
“মুসলমান?”
আমি বলি,
“না।”
“হিন্দু?”
আমি বলি,
“হ।”

তারপর মানুষটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। কারণ সে জানে না, পৃথিবীর সব বড় বড় ইতিহাস রাজা বাদশাদের নামে লেখা থাকলেও, আসল ইতিহাস লেখা থাকে আমাদের উঠানের এই কবরটায়, যেখানে শ্মশানের আগুন আর গোরস্থানের মাটি এক হয়ে যায়, ধর্ম হেরে যায়, আর রক্ত দিয়ে কেনা একটা দেশের জন্য একজন হিন্দু বীর, একজন মুসলিম ভাইয়ের উঠানে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকে।

শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

জর্জ বিশ্বাস ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

স্যার, এখন তো আর বিশ্বভারতীর খবরদারি নেই রবিঠাকুরের গানে, এখন আমরা সবাই রাজা, দারুন চর্চা হচ্ছে চারদিকে, সবাই বেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে সুরে, বেসুরে, অসুরে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাউড স্পিকারে বাজছে রবীন্দ্রসঙ্গীত- এটার একটা সুফল তো আছেই, কি বলেন স্যার?

আচ্ছা স্যার, বিশ্বভারতী আপনার রেকর্ড করবার ওপর হটাত নিষেধ জারি করেছিল কেন? ১৯৬৪ সালে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড থেকে হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানীর কাছে একটি চিঠি আসে, সে চিঠিতে আমার রেকর্ড করা দুটি গান (‘এসেছিলে তবু আস নাই’ ও ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’) সম্পর্কে মিউজিক বোর্ডের পরীক্ষকের আপত্তির কথা জানানো হয়। সেকালে রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড প্রকাশ করার আগে বিশ্বভারতী-নিয়োজিত অনুমোদকের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হত। এক্ষেত্রে গানদুটিকে অনুমোদন করায় আপত্তির কারণ ছিল যথাক্রমে “uncalled for musical interludes…making the production awfully jarring and distorted” ও “awfully melodramatic voice productions. echo-chamber…. utterly spoiled the fine note combinations in the song”। সে যাই হোক আমি বোর্ডের কর্তা, শান্তিদেব ঘোষের কাছে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করি যে অভিযোগ গুলো সত্যি না, তারপর সেই রেকর্ডের অনুমোদন পাই। এরপর ক্রমাগত বাধা আসতে থাকে, পরে রবিঠাকুরের গান রেকর্ড করাই বন্ধ করে দি।

তবে স্যার আমার মনে হয় এই যুক্তিগুলো অধিকাংশই অযৌক্তিক ও অসংগত ছিল, গায়কীতে গতানুগতিকতার বাইরে পা রাখলে কখনো তা হয়ে ওঠে notation-ভঙ্গের অভিযোগ, কখনো বা অনুমোদিত লয় ভাঙার দোষে দুষ্ট আবার চিরাচরিত musical arrangement-(এস্রাজ, বাঁশি, সেতার, সারেঙ্গী, তানপুরা, বেহালা, দোতারা, একতারা, বাসবেহালা, অরগান, পাখোয়াজ, বাঁয়াতবলা, খোল, ঢোল ও মন্দিরা), এর বাইরে গিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করলেই তা মিউজিক বোর্ডের চোখে “excessive music accompaniment hampering sentiments of the song” হয়ে ওঠে, এ তো সেই চিরাচরিত রাজনীতি, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ চরিতার্থ করা বা আপনার চূড়ান্ত সুখ্যাতি কিছু লোক ভালো চোখে দেখেন নি।

তবে স্যার, এর ফলে আপনার জনপ্রিয়তা আরও কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়েছিল কি বলেন, 
সে আর বলতে? মিডিয়া আর ভক্তদের ভালবাসায় অতিষ্ঠ হবার জোগাড়। হ্যাঁ স্যার বাবা, কাকা, মামাদের কাছে শুনেছি সে কথা, প্রেক্ষাগৃহের বাইরে হাজার ভক্তের ভিড়, টিকেটের জন্য সারারাত লাইন দিচ্ছে লোকে, তখন তো স্যার ইউ টিউব, ডাটা কার্ড, মোবাইল ছিল না, আর সামনা সামনি গান শুনবার রোমাঞ্চটাই আলাদা। 
তবে স্যার আপনার গানগুলো যখন শুনি অদ্ভুত একটা অনুভুতি হয়, আমি যখন ৮-৯ বছর তখন একটা প্রায় অন্ধকার ঘরে পুরনো এক টেপ রেকর্ডারে আপনার গাওয়া সুনীল সাগরে শুনি, মামাবাড়িতে, কিছুই বুঝিনি তখন, কিন্তু গানটা আমাকে তাড়া করে বেড়াত, আসলে সেই গায়কীটা, ওই যখন আপনি গাইছেন তুলনাহীনা রে, তুলনাহীনা রে... আমি একটা ছবি দেখতে পেতাম, একটা সমুদ্রের ঢেউয়ে একটা নৌকো দুলছে, তাতে আমি বসে এক্কেবারে একা, ভয় যে করছে না তা নয়, তবে ঐযে ইমন, কেদারা, বেহাগ, বাহার আরও কত সুর, রাগ তাল একাকার হয়ে যাচ্ছে, সবার সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল, আমার ভুলগুলো ওরাই ধরিয়ে দিচ্ছে, বেশ হচ্ছে আরোহণ অবরোহণ, আমার গলায় যেন ম্যাজিক।
কিংবা ধরুন সেই বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো, ওই যে আপনি আষাঢ় বললেন, সব ওলটপালট হয়ে গেল আমার, বর্ষার দিনে আমি বাদল বাউল হয়ে পথে পথে ফিরছি, আমি ভিজছি, গাছ ভিজছে, পুকুরগুলো জলে টইটম্বুর, তারপর যেই আপনি গাইলেন যে মিলনের মালাগুলি ধুলায় মিশে হল ধূলি, গন্ধ তারই ভেসে আসে, অমনি গানটা থ্রি ডায়মেনশনাল হয়ে গেল, বেল,জুই,টগর,হাসনুহানা বাতাপি ফুলের গন্ধ যেন আমার চারপাশটা ভরিয়ে দিল, রেবা নদীতীরে সেই মেঘের ঘনঘটা আর আর সাথে সেই ঝর ঝর বরিষণে বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো। 

কেন চেয়ে আছো গো মা আবার সম্পূর্ণ অন্যরকম। যেই গাইলেন তুমি তো 
দিতেছ, মা, যা আছে তোমারি- স্বর্ণশস্য তব, জাহ্নবীবারি, জ্ঞান ধর্ম কত পূণ্যকাহিনী সাথে সাথে মায়ের ছবিটা ফুটে উঠল, যে মা সারাজীবন সন্তানের ভালো ভেবে এসছে, তাঁর শেষ সম্বল টুকু রেখে দিয়েছে, সমর্পণ করেছে সন্তানকে, মানে স্যার সেই সম্প্রদান কারকে এ বিভক্তি, দিলে আর ফেরত নেওয়া যায় না। সেই গানটাই কি অসাধারণ ব্যবহার হয়েছে যুক্তি তক্ক গল্প ছবিতে।

কিংবা ধরুন প্রান ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরো আরো দাও প্রান গানটা, মনে হয় এক ক্লান্ত পথিক তাঁর সমস্ত কিছু পরমেশ্বরের কাছে উৎসর্গ করছে, আরও আলো আরও আলো এই নয়নে প্রভু ঢাল, এইভাবেই বোধ হয় প্রার্থনা করতে হয়, কি জানি? 

এমনি করেই আপনার গানের সাথে আমার ভাব ভালোবাসা, অবশ্য এগুলো সবই রবিঠাকুরের গান, তবু আপনার গলাতেই যেন গানগুলো পূর্ণতা পায়। স্যার আপনি তো গণনাট্য আন্দোলন, বামপন্থী আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিজন ভট্টাচার্য্যের সাথে কাজ করেছেন, কখনো অভিনয় করেছেন রক্তকরবী তে। তবু যেন রবিঠাকুরের গানেই আপনার পূর্ণতা।
তবে স্যার আজকাল সবাই সব গান গান, রবিঠাকুরের গান তো মাস্ট, নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে তাঁর ওপর, দুমড়ে মুচড়ে সোজা উলট করে নানান কায়দা কানুন , তাঁর ভাঙ্গা গান, কীর্তনাঙ্গের গান তো ব্যাপক হিট, ওই যে সেই গানটা মাঝে মাঝে তব দেখা পাই বা দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ বা ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি, তাঁর পরেই একটা লোকগীতি বা আধুনিক বাংলা গান। কেউ পুরো গীতবিতান রেকর্ড করেছে, কপালে মস্ত টিপ, কেউবা রিমেক করছে, কেউ জিন্‌স পরে, গীটার হাতে মায়াবন বিহারিণী গাইছে, আর এখন তো স্যার সবই অডিও ভিসুয়াল মানে গান আছে, ব্যাকগ্রাউন্ড এ নানান ছবি, নৃত্য ইত্যাদি ইত্যাদি।

দ্যাখ, রবিঠাকুর এর গান প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বর্ণ, প্রতিটা অক্ষর তোমাকে আত্মস্বাত করে তবেই না গাইতে হবে, নইলে তো সেটা সুর করে নামতা পড়া হয়ে দাঁড়াবে। ঠিক স্যার এ সবাই পারে না, আমাদের মত মানুষ যাদের নামের প্রতি মোহ, হাততালি, পিঠ চাপড়ান বা লাইক পাবার দিকে নজর তারা আর কি করে এসব হৃদয়ঙ্গম করব বলুন দেখি?

মাঝে মাঝে আপনাকে ভীষণ শক্তিমান এক অকুতোভয় বাউল, ফকির মনে হয়, যার কাছে সত্যি, মিথ্যা, ন্যায়, অন্যায় জলের মত স্বচ্ছ, মনের আনন্দে গান গেয়ে চলেছেন, কখনো বা লালন, বব ডিলান, পিট সিগার , সুর ভেসে যাচ্ছে আকাশ বাতাসে, কখনো চৈত্র পবনে, কখনো বর্ষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে, কখনো বা যে রাতে মোর দুয়ারগুলি হয়ে।

স্যার আপনার গলায় আধুনিক গান ‘যদি কিছু আমারে শুধাও, কি যে তোমারে কব নিরবে চাহিয়া রব...।‘ শুনেছিলাম, আহা পুর ডিফারেন্ট ফ্লেবার। অনেক হল স্যার, একবার আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে গাইবেন।।এই গানটা শুনলে মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়, মনে হয় অকুতভয় এক শিল্পী মৃত্যুকে রচনা করছেন আর তখন কোন ভয়, দ্বিধা,দ্বন্দ দ্বন্ধ কাজ করছে না, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে গানটার সাথে মিলেমিশে সব একাকার হয়ে যায়।। সত্যি রবিঠাকুর ও কি লিখে গেছেন স্যার, বলছেন এই দীনতা ক্ষমা কর প্রভু, পিছন পানে তাকাই যদি কভু, এই যে হিয়া থর থর কাঁপে আজি কেমন তর, ... ক্লান্তি আমায় ক্ষমা কর প্রভু। 


কিশোরগঞ্জ ময়মনসিংহ থেকেই তো হিন্দু বন্ধুদের কাছে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে ব্রাত্য কারন গোঁড়া ব্রাহ্ম পরিবারে আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখান থেকে কলকাতা,বিশ্বভারতীর দাক্ষিণ্যে আবার সেই ‘ম্লেচ্ছ’ (western-influenced) খেতাব পেয়ে মেইনস্ট্রীম গানের আসরে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার অধিকারটিও খুইয়ে সেই বৃত্ত যেন পূর্ণ হল। তবু কি আশ্চর্য দেখুন স্যার আজো আপনি রবীন্দ্র সঙ্গীত বেস্ট সেলার।
ভালো থাকবেন জর্জদা, একটু আশীর্বাদ করবেন।

তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই। 
মনোহরণ চপলচরণ সোনার হরিণ চাই॥ 
সে-যে চমকে 
বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা। 
সে-যে নাগাল পেলে পালায় ঠেলে, লাগায় 
চোখে ধাঁদা। 
আমি ছুটব পিছে মিছে মিছে পাই বা নাহি পাই--.
আামি আপন-মনে মাঠে বনে 
উধাও হয়ে ধাই॥

দেবব্রত বিশ্বাস( ২২ অগাস্ট ১৯১১- ১৮ অগাস্ট ১৯৮০)


বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

ফটোগ্রাফি ডে ~ কৌশিক মজুমদার

১৮২৬ সালে নিজের ছাদ থেকে একটা ফোটো তুলতে নিপসের লেগেছিল প্রায় চার ঘণ্টা। ভাবা যায়!! 

তার কিছুদিন পরে, ১৮৩৯ সাল। ফিলাডেলফিয়ার অ্যামেচার রসায়নবিদ তথা ফটোগ্রাফার রবার্ট কর্নেলিয়াস নিজের বাড়ির মুদি দোকানের পিছনে একটা ক্যামেরা বসিয়ে, তার ঢাকনা খুলে ছবি তোলার প্ল্যান করলেন। কিন্তু কি মুশকিল! সে সময় বাড়িতে কেউ নেই। অগত্যা ঢাকনা খুলেই ক্যামেরার সামনে ঠায় এক মিনিট পাথরের মতো বসে থাকলেন তিনি। তারপর লেন্স বন্ধ করে ছবি ডেভেলপ করে দেখলেন দিব্যি এসেছে তার ছবি। দাগেরোটাইপ সেই ছবির পিছনে তিনি লিখলেন “The first light Picture ever taken. 1839.” পৃথিবীর প্রথম সেলফি। 
The first light Picture ever taken. 1839.



এই দাগেরোটাইপ ছবির আবিষ্কার করেন ফরাসি দেশের জে এম দেগারে। এই পদ্ধতিতে রুপোর প্রলেপ দেওয়া পাতের উপর ছবি তোলা হত। তাই রুপো খসে গেলে ছবিও নষ্ট হয়ে যেত। ক্যালোটাইপ পদ্ধতির আবিষ্কারক ট্যালবটের সে সমস্যা ছিল না। তাঁর নেগেটিভ থেকে ইচ্ছেমতো পজিটিভ বানানো যেত।


তখন ছবি তোলা রীতিমতো এক ঘটনা ছিল। একটুও নড়লেই ছবি খারাপ হয়ে যাবে। তাই স্ট্যান্ড থাকত, যাতে গলা মাথা সব আটকে ছবি তোলা হত। এক একটা ছবি তুলতে আধ ঘণ্টা লাগত।

বাংলায় ছবি তোলার প্রচলন মোটামুটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি। ১৮৪৮ সালের ২ নভেম্বর ইংলিশম্যান পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়-
The Englishman reports that a Mr Schranzho-fer has arrived in Calcutta and intends practising Photography upon the system invented by Mr Talbot, and to which he gave the name Calo-type. The portraits are in many particulars supe rior to those taken by the Daguerreotype, and it is asserted that a method has been invented which renders them more durable than the or ginal inventor was able to effect. Wednesday, Nov. 1.

এটিই কলকাতার প্রথম ফটো তোলার দোকান। হুজুগে বাঙালির এই নেশা ধরতে বেশি সময় লাগল না। আদীশ্বর ঘটক মল্লিক আর্ট প্রেস থেকে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ "ফটোগ্রাফি শিক্ষা" তে তখনকার ফটো তোলা নিয়ে নানা কথা লিখে গেছেন। দুই একটি বলি-

"আমরা স্কুলে পড়িবার সময় বই কিনিতে চীনাবাজারে গিয়া, ওই প্রকার একখানি গ্লাস পজিটিভ তুলিয়া আনিয়াছিলাম। যে ফটোগ্রাফার তাহা তুলিয়াছিল, সে তখন যুবাপুরুষ ছিল। তখন তাহার পোশাক-পরিচ্ছদে একটু চাকচিক্যও দেখিয়া ছিলাম। তাহার প্রায় পঁচিশ বৎসর পরে দৈবাৎ একদিন রাধাবাজারের কোণে একটি সিঁড়ির ধারে দেখিলাম যে, একজন শীর্ণকায় পক্ককেশ বৃদ্ধ একখানি গ্লাস পজিটিভ হাতে করিয়া 'ফটোগ্রাফ' 'ফটোগ্রাফ' করিয়া চেঁচাইতেছে।... আগে ছিল আট আনা ও চারি আনা, এখন হইয়াছে, চারি আনা ও দুই আনা। আমি তাহার কর্মস্থলের ছাতের উপর গিয়া নিজেরাই কয়েকখানা গ্লাস পজিটিভ উঠাইলাম। বৃদ্ধ ফোটোগ্রাফারকে কোনোমতেই বুঝিতে দিলাম না যে, আমি ফোটোগ্রফি কিছু জানি, অথবা ইহার ব্যাবসা করি" এর পরে তিনি নিজের স্টুডিও খুলে দাগারোটাইপ ও কলোটাইপ ছবি তুলতে থাকেন। নব্য ছবি তুলিয়েদের প্রতি তাঁর উপদেশ "সাধারণ চেয়ারের বদলে ঘোরবর্ণের রেশমের গদিযুক্ত চেয়ারে বসিয়ে ফোটো তুললে ভালো দেখায় ঠিকই, কিন্তু যে জাতি যেভাবে উপবেশনাদি করেন, তত্তৎ জাতীয় লোককে সেইভাবে বসাইয়া ফোটোগ্রাফ লইবে। সাহেবদের আসনে বসাইয়া এবং একটা ধাঙড়কে চেয়ারে বসাইয়া ফোটো লইলে, তাহা কেহ ভালো বলিবে না। সেই মতো অন্তঃপুরবাসিনী বাঙালি মেয়েকে চেয়ারে বসাইয়া ফোটো লইলেও তাহা অস্বাভাবিক দেখাইবে"

সিদ্ধার্থ ঘোষ তাঁর "ছবি তোলা- বাঙালির ফটোগ্রাফি চর্চা" বইতে লিখেছেন "কলকাতায় স্থাপিত কমার্শিয়াল স্টুডিয়োর মধ্যে প্রথম ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করে জে ডব্লিউ নিউল্যান্ডের 'দাগ্যারিয়ান গ্যালারি'। ১৮৫১ থেকে নিউল্যান্ড সুদীর্ঘকাল 'দাগ্যারোটাইপ' চর্চায় নিযুক্ত ছিলেন। কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একমাত্র চিত্রটি তিনি তুলেছিলেন। পাইকপাড়ার ছোটো রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহও তাঁর কাছে এই বিদ্যা শিক্ষা করেন। কলকাতায় বাঙালিদের মধ্যে নীলমাধব দে প্রথম স্টুডিয়ো স্থাপন করেন ১৮৬২-তে 'দা বেঙ্গল ফোটোগ্রাফার্স।'
১৮৫৬-র ২ জানুয়ারি কলকাতায় 'ফোটোগ্রাফিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল' প্রতিষ্ঠিত হলে, রাজেন্দ্রলাল মিত্র নিযুক্ত হন অবৈতনিক সেক্রেটারি। দ্বিতীয় বর্ষে তিনি ট্রেজারার পদ গ্রহণ করেন আর পাইকপাড়ার ছোটো রাজা অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট। কানাইলাল দে, প্রিয়নাথ শেঠ, গৌরদাস বসাক, গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ খ্যাতনামা ব্যক্তি-সহ বহু বাঙালি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন সোসাইটির সঙ্গে। কিন্তু ১৮৫৭-র ৬ এপ্রিল টাউন হলে 'ব্ল্যাক অ্যাক্ট'-এর সমর্থনে বক্তৃতাদানের 'অপরাধে' শ্বেতাঙ্গরা রাজেন্দ্রলালকে চরম অপমানজনকভাবে ও অগণতান্ত্রিক উপায়ে সোসাইটি থেকে বহিষ্কৃত করার পর থেকেই এই সোসাইটির সঙ্গে বাঙালিদের সংস্রব প্রায় সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়। প্রায় তিরিশ বছর পরে 'ফোটোগ্রাফিক সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া' নামে সংস্থাটি পুনরুজ্জীবিত হলে কয়েকজন ভারতীয় আবার তার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ত্রিপুরার বড়োঠাকুর সমরেন্দ্রচন্দ্র দেববর্মন, মহারাজ প্রদ্যোতকুমার ঠাকুর, শরৎচন্দ্র সেন, প্রভাতকুসুম রায়চৌধুরী ও আর্যকুমার চৌধুরী প্রমুখ। আর্যকুমার প্রথম ভারতীয়, যিনি সোসাইটির বার্ষিক প্রদর্শনীতে ১৯১৩-য় বেস্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।

পূর্ব ভারতে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কলকাতার বাইরে ফোটোগ্রাফিচর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা। ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যের ফোটোগ্রাফির প্রতি আসক্তি কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিল। দাগ্যারোটাইপ, ওয়েট প্লেট, ড্রাই প্লেট-ফোটোগ্রাফির আধুনিকতম পদ্ধতির সঙ্গে সংগতি রেখেই থামেননি তিনি, গ্রন্থে ফোটোগ্রাফের প্রতিচ্ছবি ছাপার জন্য হাফটোন পূর্ববর্তী যুগে রাজপ্রাসাদে ক্যালোটাইপ প্রেস স্থাপন করেছিলেন। প্রতি বছর তাঁর আমলে রাজপ্রাসাদে ফোটোগ্রাফিক প্রদর্শনী হত। মহারানি মনোমোহিনীকেও ফোটোগ্রাফি-চর্চায় উৎসাহিত করেন তিনি। মহারাজা বীরচন্দ্রের দ্বিতীয় পুত্র বড়োঠাকুর সমরেন্দ্রচন্দ্রের ফোটোগ্রাফ দেশে-বিদেশে অজস্র প্রতিযোগিতায় বারংবার পুরস্কৃত ও প্রশংসিত হয়েছে।
রয়াল ফোটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রথম ভারতীয় সদস্য মহারাজ প্রদ্যোতকুমার ঠাকুর। ১৮৯৭-এ তিনি সাধারণ সদস্য ও ১৮৯৮-এ 'ফেলো' মনোনীত হয়েছিলেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক ফাদার লাফোঁর সহযোগিতায় প্রদ্যোতকুমার ১৮৯৭ সালে কলকাতায় গভর্নর জেনারেল এলগিনের ডান হাতের এক্স-রে ছবি তুলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। প্রদ্যোতকুমারের আরেকটি কৃতিত্ব ১৮৯৯-এ 'কালার ফোটোগ্রাফি' প্রদর্শন। 'ক্রোমোস্কোপ' নামে এক প্রজেক্টরের সাহায্যেই সম্ভবত একই ছবি তিনটি রঙে যুগপৎ প্রক্ষেপ করে এই রঙিন চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল।

রয়াল ফোটোগ্রাফিক সোসাইটির দ্বিতীয় ভারতীয় সদস্য সুকুমার রায় ও তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোর উভয়েই দক্ষ ফোটোগ্রাফার। তবে ফোটোগ্রাফিতে তাঁদের মুখ্য অবদান হাফটোন-ব্লক নির্মাণের অঙ্গীভূত প্রসেস ক্যামেরা সংক্রান্ত মৌলিক গবেষণা। ইউরোপের মুদ্রণজগতে সেকালে বাইবেলরূপে উক্ত পেনরোজ অ্যানুয়েল পত্রিকায় ১৮৯৭ থেকে ১৯১১-র মধ্যে উপেন্দ্রকিশোরের ন-টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত ও উচ্চপ্রশংসিত হয়। সুকুমার রায়েরও দু-টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল এই পত্রিকায়। ফোটো-মাইক্রোগ এাফি বা অণুবীক্ষণের সাহায্যে ক্ষুদ্র বস্তু বা প্রাণীর ফোটো তোলার কাজেও উপেন্দ্রকিশোর ও সুকুমারের সাফল্যের প্রমাণ রয়েছে সন্দেশ পত্রিকার পাতায়"

চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্যাসাগরের জীবনীতে লিখছেন "পিতামাতাকে কলিকাতায় আনাইয়া [বিদ্যাসাগর] জননীকে বলিলেন-'মা। পাইকপাড়া রাজাদের বাড়িতে একজন খুব ভালো পোটো এসেছে [হডসন], তাঁহার দ্বারা তোমার একখানি ছবি তুলাইয়া লইতে চাই।' তখনকার দিনের বাংলা সাহিত্যেও বারবার ফটোগ্রাফি উঁকি দিয়েছে। সব বাদ দিলেও চোখের বালিতে-তো মহেন্দ্র বিনোদিনীর ঘনিষ্টতার শুরুই হয়েছিল ফটোগ্রাফি দিয়ে-

"হঠাৎ মহেন্দ্রের ফোটোগ্রাফ অভ্যাসের শখ চাপিল। পূর্বে সে একবার ফোটোগ্রাফি শিখিতে আরম্ভ করিয়া ছাড়িয়া দিয়াছিল। এখন আবার ক্যামেরা মেরামত করিয়া আরক কিনিয়া ছবি তুলিতে শুরু করিল। বাড়ির চাকর-বেহারাদের পর্যন্ত ছবি তুলিতে লাগিল।
আশা ধরিয়া পড়িল, চোখের বালির একটা ছবি লইতেই হইবে। ...মহেন্দ্র পা টিপিয়া টিপিয়া ক্যামেরা আনিল। কোন দিক হইতে ছবি লইলে ভালো হইবে, স্থির করিবার জন্য বিনোদিনীকে অনেকক্ষণ ধরিয়া নানাদিক হইতে বেশ করিয়া দেখিয়া লইতে হইল। এমনকী, আর্টের খাতিরে অতি সন্তর্পণে শিয়রের কাছে তাহার খোলা চুল এক জায়গায় একটু সরাইয়া দিতে হইল-পছন্দ না হওয়ায় তাহা সংশোধন করিয়া লইতে হইল।...

...অবশেষে যেই ছবি লইবার জন্য ক্যামেরার মধ্যে কাচ পুরিয়া দিল, অমনি যেন কিসের শব্দে বিনোদিনী নড়িয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া ধড়মড় করিয়া উঠিয়া বসিল" বাকিটা সবার জানা।  

প্রায় একই সময়ে ফোটোগ্রফিচর্চার প্রসার অনুপ্রাণিত একটি কৌতুক-কাহিনি ফেঁদেছিলেন 'ডমরু'-স্রষ্টা ত্রৈলোক্যনাথ:

হৃষীকেশ রায় কলকাতার আর্ট স্কুলে অধ্যয়ন করেন। এই বিদ্যালয়ের বালকেরা ছবি আঁকিতে শিক্ষা করে। ছবি আঁকা ভিন্ন হৃষীকেশ ফেটোগ্রাফ অর্থাৎ আলোকযন্ত্রের সহায়তায় মানুষের চেহারা ভুলিতে শিক্ষা করিয়াছিলেন।...

নিকটস্থ কোনো গ্রামের একজন লোক তাঁহার শিশুপুত্রের ছবি তুলিবার নিমিত্ত হৃষীকেশকে অনুরোধ করিয়াছিলেন। হৃষীকেশ চাকরের দ্বারা প্রথম চেহারা তুলিবার যন্ত্র ও ছবি আঁকিবার দ্রব্যাদি পূর্ণ বাক্স প্রভৃতি পাঠাইয়া দিলেন। তাহার পর বৈকাল বেলা নিজে বাই সাইকেলে অর্থাৎ চাকায় চড়িয়া সেই গ্রামে গমন করিলেন।

যথারীতি বালককে বসাইয়া যন্ত্রনিহিত কাচের উপর হৃষীকেশ বালকের ছায়া গ্রহণ করিলেন। কীরূপ ছবি উঠিল দেখিবার নিমিত্ত যন্ত্র হইতে কাচখানি তিনি অতি সাবধানে বাহির করিলেন। আশ্চর্য! কাচের উপর বালকের মুখশ্রী অঙ্কিত হয় নাই। কাচের উপর এক পরমাসুন্দরী বালিকার প্রতিবিম্ব পড়িয়াছে"

আর আগ বাড়াবো না। আজ বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। ডি এস এল আর থেকে সাধারণ মোবাইলে ছবি তোলা সকল ফটোগ্রাফারদের শুভকামনা।

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬

লেনিনের মূর্তি ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে ক্ষুদিরাম বসুর ছোঁড়া বোমাটা সেদিন সঠিক লক্ষ্যে লাগেনি। এক অর্থে ব্যর্থ। সেই ব্যর্থ মানুষটিকে নিয়ে লিখতে বসার কিছুতো কারণ থাকবে। সেটা জানার ইচ্ছে হলে সুধী পাঠক এই লেখাটার বাকি অংশ পড়ে দেখতে পারেন।

কে এই কিংসফোর্ড, কেন তাঁকে মারার জন্য বিপ্লবীরা তৎপর হয়েছিলেন জানতে একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক। বন্দে মাতরম পত্রিকায় রাজদ্রোহমূলক প্রবন্ধের জন্য অরবিন্দ ঘোষ অভিযুক্ত হয়েছিলেন। সেই মামলায় সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করায় বিপিন চন্দ্র পাল অভিযুক্ত হন। তার বিচারের দিন লালবাজার পুলিশ কোর্টের সামনে জমায়েত হওয়া জনতার ওপর এক ইউরোপীয় ইন্সপেক্টর লাঠি চালানোর নির্দেশ দেয়। তাতে উত্তজিত হয়ে সুশীল সেন ওই ইন্সপেক্টর এর মুখে ঘুষি চালায়। এই অপরাধে সেই ১৪ বছরের কিশোর কে ১৪ ঘা বেতের বাড়ি খেতে হয় যে বিচারকের আদেশে তার নাম ম্যাজিষ্ট্রেট কিংসফোর্ড। (হেমচন্দ্র কানুনগো: বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা)

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আলোড়ন তুলে দেওয়া ক্ষুদিরাম এর মতো মানুষরা নিজেদের জন্য বিপ্লবী, মুক্তিযোদ্ধা, দেশের জন্য বলিপ্রদত্ত, স্বাধীনতা সংগ্রামী— এই সব বিশেষণই ব্যবহার করতেন। কিন্তু এই জাতীয় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ব্রিটিশ গুপ্তচর বিভাগের অফিসাররা ‘অ্যানার্কিস্ট’, ‘টেররিস্ট’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন। ডিরেক্টর অব ইন্টেলিজেন্স সি আর মিডল্যান্ড তো এঁদের ‘পলিটিকো-ক্রিমিনাল কনস্পিরেটর’ বলে নিন্দা করেন। সশস্ত্র সংগ্রামীদের সন্ত্রাসবাদী তকমা ব্রিটিশরাই দিয়েছে। (দ্র: অনুশীলন সমিতির ইতিহাস, সম্পা: অমলেন্দু দে, পৃ ১৬-১৭)। 

কলোনিয়াল শাসক ও তাদের ধামাধরা ইতিহাসবিদদের লেখা পড়ে আমাদের পূর্বসূরী ও আমাদের প্রজন্মের অনেকেই বড় হয়েছি। ওই "সন্ত্রাসবাদী" শব্দটা আমাদের মনে শিকড় গেঁথে বসে আছে। তাই স্বাধীনতার পরে পরেই স্বাধীন ভারতের প্রধান ক্ষুদিরাম এর মূর্তি উন্মোচন করতে অস্বীকার করেন। উনি ভিন্নধারার রাজনীতিবিদ বলে নয় শুধু, উনি "পন্ডিত" মানুষ ছিলেন, জানতেন যে ক্ষুদিরাম জাতীয় মানুষরা শুধু বৃটিশ নয়, তাঁর পক্ষেও বিপদজনক। তাঁর ধারা ধরে আমাদের অনেকেই এখনো ক্ষুদিরামকে নিয়ে বলতে ইতস্ততঃ করেন। মানুষটা "টেরোরিস্ট" ছিল যে !

ক্ষুদিরাম ও তার সহযোগীরা ঠিক কি ছিলেন সেটা বুঝতে সম্পূর্ণ আলাদা দৃষ্টিকোন এর আশ্রয় নিতে হচ্ছে। তথ্য এক) বিপ্লবীদের দমনের জন্য সবচেয়ে কুখ্যাত ব্রিটিশ আইন এর নাম "রাউলাট বিল"। বিলটার পোশাকি নাম খেয়াল করুন সুধী পাঠক, "দি এনারকিক্যাল এন্ড রেভলিউশনারী ক্রাইম এক্ট"। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ লিখছে "রেভলিউশনারী"!! লিখতে বাধ্য হচ্ছে। 

তথ্য দুই) স্যার চার্লস টেগার্ট তার বক্তৃতায় বলছেন, "বিপ্লবীদের কর্মতৎপরতায় সরকারি যন্ত্র অচল হওয়ার মতো বিপদের সম্মুখীন হয়েছিল" ( টেরোরিসম ইন ইন্ডিয়া, ১লা নভেম্বর, ১৯৩২, রয়েল এম্পায়ার সোসাইটি)

১৮ বছরের একটা বাঙালি ছেলে ভুল লোককে বোমা ছুঁড়ে যদি সরকারি যন্ত্র তথা রাষ্ট্র যন্ত্রের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে তাহলে তাকে নিয়ে লেখাই যায় কি বলুন সুধী পাঠক। ১১ আগস্ট তাঁর আত্মবলিদান দিবস। তার কয়েকদিন পরেই যাদবপুরে যে কুৎসিত ঘটনা ঘটল সেটা নিয়ে লিখতে গিয়ে দুটো কথা উল্লেখ করতে হচ্ছে। 

এক) নিজের দেশে মহান "বুর্জোয়া লিবারাল গণতন্ত্রী" সাজা বৃটিশরা এভাবেই ভারতের বুকে তাদের "ব্রুট" শাসন চালিয়ে এসেছিল। তাতে সাথে পেয়েছিল এই দেশেরই কিছু অনুচর কে। কিংসফোর্ড কে হত্যার চেষ্টায় জড়িত ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকির এই কাজ কে সমর্থন করে বাল গন্ধাধর তিলক তার মারাঠি পত্রিকা কেশরী তে লিখেছিলেন যদিও তিনি ভায়োলেন্স কে সমর্থন করেন না, তবুও "The rulers who always exercise unrestrained power must remember that there is always a limit to the patience of humanity". And so, 'violence', however deplorable, became inevitable"

এই কারণে তিলক এর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ভারতীয় জুরীরা তাকে নির্দোষ বলে ঘোষণা করলেও ইউরোপীয় জুরীদের রায়ে বার্মার মান্দালয় জেলে তাঁর ছয় বছরের কারাবাসের সাজা হয়। 
Uploaded Image


দুই) সেই রায়ের খবর শুনে প্রতিক্রিয়া দিলেন কয়েক হাজার মাইল দূরে থাকা এক রাশিয়ান বিপ্লবী। জেনিভার এক ছোট্ট কুঠুরি থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড ট্রেডল মেশিন থেকে পত্রিকায় ছাপা হ'ল সেই বিখ্যাত প্রবন্ধ "বিশ্ব রাজনীতির বিস্ফোরক মালমসলা"। কি অদ্ভুত যোগাযোগ। সেই লেখকও নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত। নাম ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। কাগজের নাম প্রলেটারী। সংখ্যা তেত্রিশ।

লেনিন লিখছেন, "ব্রিটিশ খ্যাকশিয়ালরা ভারতীয় গণতন্ত্রী তিলক কে যে কুখ্যাত সাজা শুনিয়েছে" তার তীব্র সমালোচনা করে, বিপ্লবী তিলক এর অবমাননার প্রতিবাদে তথাকথিত সভ্য, নিজেদের দেশে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের চর্চা করা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ খুলে নিজের লেখনী তে উলঙ্গ করে দিলেন লেনিন লিখলেন, "In India lately, the native slaves of the “civilised” British capitalists have been a source of worry to their “masters”. There Is no end to the acts of violence and plunder which goes under the name of the British system of government in India." (লেনিন: ইনফ্লেমেবল মেটেরিয়াল ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স)

"মহান" ব্রিটিশ ন্যায়বিচার কে ব্যঙ্গ করে লেনিন আরো লেখেন, "The infamous sentence pronounced by the British jackals on the Indian democrat Tilak—he was sentenced to a long term of exile, the question in the British House of Commons the other day revealing that the Indian jurors had declared for acquittal and that the verdict had been passed by the vote of the British jurors!—this revenge against a democrat by the lackeys of the money-bag evoked street demonstrations and a strike in Bombay."

সেই লেনিনের মূর্ত্তি ভাঙার জন্য যাদবপুরে সমবেত জনতা আসলে লেনিন কে শুধু অপমান করে নি। তারা তিলককে অপমান করেছে, তারা ক্ষুদিরামকে অপমান করেছে তারা ভারত তথ্য বিশ্বের সমস্ত জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে জড়িত বিপ্লবীদের অপমান করেছে। লেনিন নিছক বিদেশি রাশিয়ান নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিশ্ব জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক। যারা স্বাধীনতার আগে ও পরে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, পুরোনো ও নিয়ে উপনিবেশবাদী শক্তির পায়ের জুতোর তলা চেটে গেলো, ভারতের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে যাদের অবদান শূন্য, তারা লেনিনের মাহাত্ম্য কি ভাবে বুঝবে ? তাই তাদের আচরণে বিস্মিত বোধ করা বহুদিন ছেড়ে দিয়েছি। আজকাল এদের কান্ড কারখানায় ক্রোধ ও আর জাগে না। এই সমাজ অচেতন, ইতিহাস অচেতন চরম অশিক্ষিত জম্বি বাহিনীর জন্য কেবল করুণা হয়। এরা বাঙালি ? এরা অমর শহীদ ক্ষুদিরাম এর দেশের লোক ? এদের সহনাগরিক বলতে লজ্জা হয়, ঘেন্না হয়।

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দশক: কলকাতার ট্রাম শ্রমিকদের গল্প ~ অরিজিত মুখার্জী

 গল্প বলব। খেটে খাওয়া মানুষের গল্প। সেই মানুষগুলোর গল্প, যারা নিজেদের রুজিরুটির জন্যে ব্রিটিশ মালিকের বিরুদ্ধে লড়েছিল। আবার এই শহর - যাকে সেদিন বস্তির শহর বলে দিল এক গুজরাটি তড়িপার - সেই শহরের মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে; লড়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের বিচারের নামে প্রহসনের বিরুদ্ধে; লড়েছিল সাম্প্রদায়িক বিষ থেকে শহরের মানুষকে বাঁচাতে...


বলব কলকাতার ট্রাম শ্রমিকদের গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সেইসব দামাল দিনগুলোয় কলকাতা যখন হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের বড় কেন্দ্র, সেই সময়ের গল্প। ১৯৪৫-৪৬ সালের গল্প। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ছায়ায় থাকা ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়নের গল্প, যাদের পোশাকি নাম Calcutta Tramways Workers Union (CTWU)...

তার আগের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কলোনিয়াল ট্রাম কোম্পানির বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করে বেশ শক্ত জায়গায় পৌঁছেছিল তারা। কলকাতার লাইফলাইন ছিল ট্রাম, কাজেই এই মানুষগুলোর হাতে অস্ত্র ছিল গোটা শহর অচল করে দেওয়ার; আর সেই অস্ত্র তারা ব্যবহারও করেছিল সরকারের বিরুদ্ধে; কখনো মজুরি বাড়ানোর দাবীতে, কখনও বা মন্বন্তরের সময় রেশনের দাবীতে, আবার কখনো অন্যায়ভাবে ছাঁটাই হওয়া সহকর্মীকে কাজে ফেরানোর দাবীতে; সফলও হয়েছিল। পরিবহণ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে ভয় করত ব্রিটিশরা, কারণ তাদের রোজকার কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যেত; ক্ষেপে উঠতো সাধারণ মানুষ, কিন্তু ট্রাম শ্রমিকদের ওপর সহানুভূতি হারাত না।

বলব সেই ট্রাম শ্রমিকদের গল্প। ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের গল্প। আর, সাম্প্রদায়িক বিষ যখন কলকাতাকে ছিঁড়ে খেতে উদ্যত, তখন সেই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে তাদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প।

প্রথম গল্পের সময়কাল ১৯৪৫ সালের শেষ থেকে ১৯৪৬ এর শুরু অবধি। ব্রিটিশরা তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের বিচার শুরু করেছে; আর গোটা দেশকে দৃষ্টান্ত দেখাতে সেই বিচারকে তারা নিয়ে গেছে লাল কেল্লায়, পাবলিক ট্রায়াল হিসেবে। দেশ ক্ষেপে উঠল। সারা দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ। কলকাতাও বাদ যায়নি। নভেম্বরে মিছিল ডাকে ফরোয়ার্ড ব্লক আর ছাত্র ফেডারেশন, সঙ্গে ইসমাইলি কলেজের ছাত্ররা। মিছিলে হামলা করে পুলিশ, মারা যায় ৩৩ জন মানুষ। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরো একবার ফেটে পড়ে কলকাতা - ক্যাপ্টেন আবদুর রশিদ আলীকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে। শুরুতে জনসমর্থন বেশি না থাকলেও সিপিআইয়ের ডাকে পথে নামে শ্রমিক আর ছাত্ররা; ক্রমশঃ ব্যাপক আকার নেয় এই গণআন্দোলন। ১১ই ফেব্রুয়ারি সিপিআই আর বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশন এক মিছিলের ডাক দেয় - ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল ঢুকে যায় সেক্রেটারিয়েট এলাকায় - বিক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল ট্রাম শ্রমিকেরা। পুলিশ নৃশংস আক্রমণ চালায় ছাত্র আর শ্রমিকদের ওপর। উল্টে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে বিক্ষোভ। পুলিশী হিংস্রতার প্রতিবাদে ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন ধর্মঘটের ডাক দেয় পরের দিন। সেদিন, মানে ১২ই ফেব্রুয়ারি, খাকি ইউনিফর্ম পরা ট্রাম শ্রমিকদের ব্যারিকেডে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় কলকাতার পরিবহণ। ট্রাম শ্রমিকদের ডাকে পথে নেমে আসে সাধারণ মানুষ। একের পর এক সংঘর্ষের পর বাধ্য হয়ে ব্রিটিশরা সেনা নামায়, গুলিতে মারা যায় ৩৮ জন। লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন এই আন্দোলনে, এবং রশিদ আলী দিবস (১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬) অমর হয়ে থেকে যায় তাঁর উপন্যাস "চিহ্ন"-এ - যার নায়ক ওসমান এক ট্রাম শ্রমিক।

কিছুদিনের মধ্যেই আবারও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে কলকাতা। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের বিচার চলাকালীনই বম্বে আর করাচীর ডকে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, শুরু হয় নৌবিদ্রোহ। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান নিশ্চয় আপনারা ভুলে যাননি...

সেদিন ছেচল্লিশের শীতের কুয়াশা / ভেদী গোলামীর ঘোর অমানিশা //
চূর্ণ করি কংসের কারাগার / সচকিত সাইরেনে নব অঙ্গীকার //
আরব সাগরবাহী অতলান্তজয়ী / বোম্বাই বন্দরে বিদ্রোহী খাইবার //
ভিড়িল বিদ্রোহী খাইবার

হাঁকে শার্দুল সিং গফুর, / বীর শার্দুল সিং গফুর, //
কে আছ বাহাদুর / কামান গর্জনে / কামগার ময়দানে //
রাজপথে ব্যারিকেডে সশস্ত্র মজদুর / দাঁড়ালো সশস্ত্র মজদুর।

দরিয়ার ডাকে, দিল সাড়া / মহাভারতের জনতা //
উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে কল্লোলিত মহানগর কলকাতা"

২৩শে ফেব্রুয়ারি সিপিআই ডাক দিল সাধারণ ধর্মঘটের। ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে শ্রমিক আর ছাত্রদের মিছিল এগিয়ে গেল ওয়েলিংটন স্কোয়্যারের দিকে। একদম সামনের সারিতে ইউনিফর্ম পরা ট্রামশ্রমিকেরা - শৃঙ্খলা, সমন্বয় আর খেটে খাওয়া মানুষের নেতৃত্বের প্রতীক। ওয়েলিংটনের সভায় ঝোড়ো বক্তব্য রাখলেন সোমনাথ লাহিড়ী আর চতুর আলীর মত সিপিআই নেতারা। নৌবিদ্রোহকে তুলে ধরলেন কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে আরও বড় লড়াইয়ের অংশ হিসেবে; সোমনাথ লাহিড়ীর ভাষায়, স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের ড্রেস রিহার্সাল। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে লেখা হল যে এই ট্রাম শ্রমিকরাই সবচেয়ে ঝামেলার প্রতিবাদী। জঙ্গি তো বটেই, তার ওপর মানুষকে একত্রিত করতে এদের তুলনা নেই...

শুধু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানের কথাটুকু বললে ট্রাম শ্রমিকদের অবদানকে ছোট করা হয়। যে গুণটা এই শ্রমিকদের আলাদা করে রেখেছিল সেটা হল সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবল প্রচেষ্টার মধ্যেও এদের একজোট হয়ে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। চারদিকে তখন বয়ে চলেছে হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লীগের ছড়িয়ে দেওয়া বিষের নদী — খেটে খাওয়া মানুষের অনেকেই সেই বিষে আক্রান্ত — তখনও সটান দাঁড়িয়ে ট্রাম শ্রমিকেরা। আকস্মিক ঘটনা নয়; এই ঐক্যের শেকড় ছিল জোট বাঁধা রাজনীতির ভিতরে। ব্রিটিশ মালিকেরা বহু চেষ্টা করেছিল হিন্দু মুসলমান বিভেদকে খুঁচিয়ে ট্রাম শ্রমিকদের ভাঙতে। পারেনি। যেমন, ঈদের বোনাস কাটিয়ে দিয়ে একবার কোম্পানি পুজোর বোনাস ঘোষণা করে দিল, উদ্দেশ্যে হিন্দু মুসলমানকে আলাদা করে দেওয়া। কিন্তু পারেনি। ট্রাম শ্রমিকদের একজনও বোনাস নেয়নি সেবার। উলটে, ওদের ধর্মঘটে গুটিয়ে গিয়ে কোম্পানি বাধ্য হয়েছিল সবাইকে সমান বোনাস দিতে। ওয়ার্কপ্লেস সলিডারিটি একেই বলে।

১৯৪৬ এর ভয়ঙ্কর সময়ে এই ট্রাম শ্রমিকেরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন খেটেখাওয়া মানুষের জেদ কেমন হয়। ষোলোই আগস্ট — মুসলিম লীগের ডাকা ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে — ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল যে কমিউনাল মোবিলাইজেশন তারা হতে দেবে না। ডাক দিল হরতালের। সেদিন চারদিকে হিংসার আগুনের মধ্যে ট্রাম শ্রমিকেরা বেরিয়ে এসেছিলেন শান্তি রক্ষায়। ভিক্টোরিয়া কলেজে আক্রমণ করতে পারে গুন্ডারা — এই খবর শুনেই রাজাবাজার ট্রামডিপোর শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসেন পথে। হিন্দু মুসলমান, এমনকী কয়েকজন মুসলিম লীগ সদস্যও। সামনে মহম্মদ ইসমাইল, ট্রাম শ্রমিকদের অবিস্মরণীয় নেতা, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ট্রাম শ্রমিকদের ইঁট পাথরের ঘায়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছিল সশস্ত্র গুন্ডার দল। কলেজের মেয়েদের সুরক্ষিতভাবে বের করে আনা অবধি এলাকা ঘিরে রেখেছিলেন মহম্মদ ইসমাইল ও তাঁর কমরেডরা। শহরের অন্য অনেক জায়গায়, বিভিন্ন ট্রামডিপোর শ্রমিকেরা, বেরিয়ে এসেছিলেন এলাকা পাহারা দিতে — যেখানে যেখানে সেই এলাকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিপদে পড়েছিল, তারা পাশে পেয়েছিল ট্রাম শ্রমিকদের। তাদের খাকি ইউনিফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক ধরণের মরাল অথরিটি। মানুষের বিশ্বাস এতটাই ছিল এই শ্রমিকদের ধর্মনিরপেক্ষতার, যে গরীব মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই এদের ওপরেই নির্ভর করেছিল সুরক্ষার জন্যে...

দাঙ্গা বন্ধ হতে ট্রাম ফের চালু হওয়ার পরেও ট্রাম শ্রমিকেরা সজাগ ছিলেন। ট্রামের ভিতরে কোনো ধরণের সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করলেই কন্ডাক্টররা সোচ্চার প্রতিবাদ করতেন, ট্রাম থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জনপরিসর যাতে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্র না হয়ে ওঠে, তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন এঁরাই; ১৯৪৭ সাল অবধি চলেছিল এইভাবেই। সেই সময়ে — দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘটের ফলে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও, বুকে ধর্মঘটের ব্যাজ লাগিয়ে ট্রামকর্মীরা টহল দিতেন দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায়, জল ঢালতেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুনে। ব্রিটিশ পুলিশের দমনপীড়ন ছাড়াও চরম দারিদ্র ছিল এঁদের নিত্যসঙ্গী। তা সত্ত্বেও মহম্মদ ইসমাইলের মত কমরেডরা শ্রেণী-ঐক্য ভেঙে বেরোননি, খেটে খাওয়া মানুষের জোটকে অক্ষত রেখেছিলেন...

শ্রেণীর রাজনীতির আদর্শ তুলে ধরেছিল সেই ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন — দেশপ্রেম, ধর্মনিরপেক্ষতা আর শ্রেণী-সংহতি প্রতিযোগীর বদলে হয়ে উঠেছিল পরিপূরক। কলকাতা দেখেছিল চরম ক্রাইসিসের মুহূর্তেও খেটেখাওয়া মানুষ একজোট হলে কী করতে পারে...আজকে বিজেপি আর আরএসএস যখন ইতিহাস লেখে, তখন এই গল্পগুলোকে তারা মুছে দিতে চায়। কারণ এই গল্পগুলো তাদের ন্যারেটিভের সঙ্গে খাপ খায় না। ট্রাম শ্রমিকদের গল্প দেখিয়ে দেয় যে হিন্দু-মুসলমান একসাথে লড়তে পারে, শ্রেণীর স্বার্থ ধর্মের স্বার্থের চেয়ে বড়, আর গণতন্ত্র শুধু ব্যালটে নয়, গড়ে ওঠে রাজপথে আর কারখানায়।

সেদিন ঐতিহ্যের কথা বলছিলাম না? কমিউনিস্ট পার্টি এই মহম্মদ ইসমাইল আর তাঁর কমরেডদের লড়াইয়ের ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলে। ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকার। হামেশা।

সূত্র: Protest and Politics: Story of Calcutta Tram Workers 1940-47, Siddhartha Guha Ray, in Calcutta: The Stormy Decades, ed. Tanika Sarkar and Shekhar Bandyopadhyay

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দশক: সম্মুখসারিতে নারীরা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির ইতিবৃত্ত ~ অরিজিত মুখার্জী

গল্প চলুক। এই শহরের গল্প। যে গল্পগুলোকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলে সেই গল্প - ট্রামশ্রমিকের গল্প, মেয়েদের লড়াইয়ের গল্প, কলোনির লড়াইয়ের গল্প...এই গল্পগুলো মুছে গেলে ওদের লাভ। আর আমাদের কাজ গল্পগুলোকে না ভোলা, আর ভুলতে না দেওয়া। তাই বারবার বলে যেতে হবে এই গল্পগুলো...ট্রামশ্রমিকের গল্প, মেয়েদের লড়াইয়ের গল্প, কলোনির লড়াইয়ের গল্প, খাদ্য আন্দোলনের গল্প...
সেদিন ট্রাম শ্রমিকদের গল্প বলেছিলাম, আজ বলব মেয়েদের গল্প - ভারতের প্রথমদিকের নারী সংগঠন, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি বা MARS-এর গল্প। সেই মেয়েদের গল্প যারা চল্লিশের দশকে যুদ্ধের পটভূমিতে, চরম দুর্ভিক্ষের মধ্যেও, নিজেরা জোট বেঁধেছিল; খেটেখাওয়া ঘরের আরো হাজারো মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল সকলের দাবী নিয়ে। সেই মেয়েদের গল্প বলব যাদের নিজেদের ঘরে অনেক সময় গরম ভাত না থাকলেও তারা নিজেদের ক্ষিদে চেপে রেখে অন্যকে খাইয়েছিল; সেই মেয়েদের গল্প যারা তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় মুখ বুজে কালোবাজারি মেনে নেয়নি, বরং লড়াই করে চাল আদায় করেছিল সরকারের কাছ থেকে; নিজের হাতে চাল বিলি করেছিল গ্রামগঞ্জ থেকে ছুটে আসা পরিবারগুলোকে; সেই মেয়েগুলোর গল্প বলব যারা লড়ে গেছিল — লাঠি, ছুরি নিয়ে নয় — শুধু সংখ্যার জোরে, যারা দেখিয়ে দিয়েছিল যে বোলতার ঝাঁককে বাঘ সিংহও ভয় পায়...যাদের লড়াইয়ে শেষ অবধি বড়লোক ব্যবসায়ীর দল বাধ্য হয়েছিল মুনাফা লোটা বন্ধ করে গরীব মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে...বলব সেই মেয়েদের গল্প।
অনেক সময় ভাবি — সেদিনের ট্র্যাডিশনের উত্তরাধিকারীরা যদি আজ বাংলার রাস্তায় বয়স্কদের জন্যে হাজার টাকা সরকারি পেনশনের দাবী নিয়ে পথে নামত, কী হত তখন। ব্যাটন নিয়ে তেড়ে আসত পুলিশ? যাদের গল্প বলছি আজকে, তারা কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশের লাঠিকে ভয় পায়নি। তারা চাপে পড়ে মাথা নোয়ায়নি; বরং উলটে নিজেরা চাপ বজায় রেখেছিল। আজ হিন্দুত্বের গেরুয়া রঙ সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে, বাদ যায়নি বাংলাও। সেদিনের ক্রাইসিসের মধ্যে মানুষের বেঁচে থাকার গল্পগুলো মুছে যেতে বসেছে। যারা মুখ খোলে তাদের পিছনে পড়ে যায় আইটি সেলের ট্রোলবাহিনী, এমনকী নেতা মন্ত্রীরাও। এই কঠিন সময়ের জন্যে সেদিনের গল্পগুলো জরুরী। ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে তাদের ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকারকে ভুলে না যায়...
Uploaded Image
১৯৪২ সালের কথা। বিশ্বযুদ্ধের ছাপ পড়েছে কলকাতার অলিতেগলিতে। জনআন্দোলনের অ্যাক্টিভিস্টদের মাথায় ঘুরছে মেয়েদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা। এলা রীডের বাড়িতে ঘরোয়া বৈঠকে ঠিক হল মেয়েদের সংগঠনের রূপরেখা৷ সংগঠনের নাম রাখলেন রেণু চক্রবর্তী। কলোনিয়াল শাসকবিরোধী আন্দোলনের গর্ভ থেকে জন্ম নিল মহিলা আত্ম রক্ষা সমিতি বা MARS...কনভেনর হলেন এলা রীড, সংগঠনের দায়িত্বে রইলেন মণিকুন্তলা সেন, সুধা রায়, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলি, রেণু চক্রবর্তী আর সাকিনা বেগম। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে র্যাডিকাল কিছু দাবী ছিল এই সমিতির — মেয়েদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার; অর্থনৈতিক সমতা; আর সামাজিক ন্যায়বিচার। সামনে ছিলেন যাঁরা, তাঁদের কাছে স্বাধীনতা শব্দটার মানে শুধু ব্রিটিশদের দেশছাড়া করা ছিল না। তাঁদের কাছে স্বাধীনতার মানে ছিল এক নতুন সমাজ, যেখানে মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে, যেখানে এক থালা ভাতের জন্যে কোনো মেয়েকে বিক্রি হতে হবে না...
যুদ্ধ চলাকালীনই এল মন্বন্তর। মানুষের তৈরী দুর্ভিক্ষ। বাংলার দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পরিবার এসে উঠেছিল কলকাতায় — কাজের খোঁজে, দুটি ভাতের খোঁজে, বেঁচে থাকার তাগিদে। এই পরিবারগুলো থেকে হাজারো মেয়ে আটকা পড়েছিল শরীরের বাজারেও; শহরে তখন দেশ বিদেশের সৈন্যদের আনাগোনা, শরীর বেচলে দুটো ভাত জুটত অনেকের। "সমিতি" এই বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। এই মেয়েদের সংগঠিত করেছিল তারা, অন্ধকার গলি থেকে আলোয় বের করে এনেছিল তাদের; তাদের কন্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল সমিতিই। মণিকুন্তলা সেনের মত নেত্রীরা সশস্ত্র সৈন্যদল আর মুনাফালোভীদের শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। জন্মের এক বছরের মধ্যেই সমিতির বিভিন্ন শাখা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার বিভিন্ন জেলায় — দুর্ভিক্ষের সময়ে ত্রাণের কাজ হাতে নিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা শিখিয়েছিলো যে বাংলায় একটা শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও গণমুখী নারী সংগঠনের বড় দরকার। ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে কলকাতায় হল MARS-এর প্রাদেশিক সম্মেলনে। ছড়িয়ে পড়তে থাকল সমিতি।
জন্মলগ্ন থেকেই সমিতির কাজ ভাগ হয়েছিল তিন মূল লক্ষ্যের ভিত্তিতে — জাতীয় প্রতিরক্ষা; রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি আর জাতীয় সরকার গঠন; এবং দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো। সামনের সারীর প্রায় সকলেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেও সমিতির দরজা সকলের জন্যেই খোলা ছিল, সমাজের সমস্ত স্তরের মেয়েরাই এসেছিলেন সমিতিতে। বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, যেমন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, লীলা মজুমদার এবং রানী মহলানবিশ — এঁরাও যুক্ত হয়েছিলেন সমিতির সঙ্গে। ছিলেন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের মেয়েরাও। শিক্ষিত "ভদ্রলোক" পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে একজোট হয়ে লড়েছিলেন মিস্ত্রিপুকুর বস্তির মরিয়াম বিবি আর গুলবাহাররাও। সারা দেশ জুড়ে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলছিল, ঠিক সেই সময়েই বরিশালে সমিতির দ্বিতীয় সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন হাজরা বেগম। বিভাজনের রাজনীতি যখন বাংলাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল, সেই সংকটের দিনে MARS-এর মেয়েরা বেছে নিয়েছিলেন সংহতির রাস্তা।
তারপর আসে ১৯৪৩ সালের মার্চ মাস...দুর্ভিক্ষের আগুনে বাংলা জ্বলছে, শহরের রাস্তায় অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মুখে "ফ্যান দাও" আর্তনাদ। পি.সি. যোশী কলকাতায় এসেছিলেন এই সময়ে, তিনি লিখে গেছিলেন: "I was hardly five minutes in Calcutta when I was shaken up as I have rarely been by a voice through the window 'Ma Go babure!' I had never heard such accents nor such a tone." [Who lives if Bengal dies]
চালডালের দাম বাড়তে শুরু করেছিল অস্বাভাবিকভাবে। গড়িয়াহাট বাজারে রিলিফ শপে লাইন পড়ত ভোররাত থেকে। রাত তিনটের ট্রেনে বালিগঞ্জ স্টেশনে এসে পৌঁছত ক্যানিং লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে ক্ষুধার্থ মানুষের ভিড়। মণিকুন্তলারা সেই ভিড় সামলে, সেখানে মেয়েদের সামলে, তাদের হাতে চাল তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় বাড়ি ফিরে রাতের খাবারও জোটেনি তাঁদের নিজেদেরই। মণিকুন্তলার লেখা থেকেই একটু তুলে দিই —
"চালের দাম তখনকার দিনে মণ প্রতি ২৮ টাকায় উঠেছিল। যা আগে ছিল ৪/৫ টাকা মণ। আমাদের আস্তানাতে খাবার সংস্থান করা মুশকিল হয়ে উঠল। অনেক দিনই রান্না হত না। মনোরমার দুটি বাচ্চা মেয়ে আমাদের কাছে থাকত। তাদের জন্য আমাদের ভাবতে হত। দু-একদিন ক্যানটিনে সকলের খাওয়া হয়ে গেলে সামান্য যেটুকু বাকি থাকত তাই নিয়ে এসে সকলে একটু একটু ভাগ করে ২/৪ দিন খেয়েছিলাম। কিন্তু কাজটা ভালো নয় মনে হল সকলেরই। এর চেয়ে না খাওয়াও ভালো। মাস শেষে যে যার সামান্য পয়সা ব্যয়ে যাহোক একটু কিছু কিনে নিত। একদিন রাত দশটায় একটা রুটি কিনে হাতে করে বাড়ি ফিরেছি। দেখি, মনোরমার মেয়ে দুটি জেগে বসে আছে। ওদের মা তখনও ফেরেনি। ওরা জানতে চাইল, আমি কোনও খাবার এনেছি কি না। হাতের রুটিটা ওদের হাতে দিয়ে বললাম - 'হ্যাঁ এনেছি, দুজনে ভাগ করে খাও।' ওরা ওইটুকু রুটি ভাগ করে খেল। পেট ভরে জল খেয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতন ঘুমোতে গেল। এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক দিনই হত।"
সমিতি ডাক দিল মেয়েদের — "ভুলে যাও তোমাদের ধর্মীয় আর জাতিগত পরিচয়; এই রাজপথ আমাদের; ক্ষিদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়ব আমরা"। MARS আর মুসলিম উইমেন্স সেল্ফ ডিফেন্স লীগের ডাকে নিমেষে পাঁচ হাজার মেয়ে নেমে এলো রাস্তায় — অলিগলি বস্তি থেকে, শহরতলি থেকেও — অনেকের কোলেই বাচ্চা। মিছিল চললো বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির উদ্দেশ্যে। ঘেরাও হল আইনসভা। মেয়েদের প্রথম এত বড় গণআন্দোলন। ঘোড়সওয়ার পুলিশ বাহিনী ছুটে এলো। মেয়েরা কেউ নড়লো না এক চুলও। হাতে হাত রেখে আইনসভার গেটে তৈরী হল মানবশৃঙ্খল। দাবী উঠল — কালোবাজারি বন্ধ করে অবিলম্বে গরীব পরিবারগুলোর হাতে চাল তুলে দিতে হবে। ফজলুল হক বাধ্য হলেন চালের ব্যবস্থা করতে — সেই মুহূর্তেই একশো বস্তা চাল এনে বিতরণ করা হল মেয়েদের মধ্যে, এক দিনের মধ্যে খোলা হল আরো বেশ কয়েকটা কনট্রোলড প্রাইস শপ।
এই আগুন শুধু কলকাতায় থেমে থাকেনি। আগুন ছড়িয়েছিল দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর, বদরগঞ্জ, পাবনা, বাঁকুড়াতেও। আজ না হয় দিল্লী জাতীয় প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু; কিন্তু তার বহু আগেই নারী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার লিখেছিল MARS-এর মেয়েরা। তাদের হাতে গেরুয়া পতাকা ছিল না কোনো। ছিল সাদা কাপড়ের ওপরে দুটো খুব সাধারণ দাবী — রেশনের, আর মেয়েদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করার। গেরুয়া পতাকা হাতে মেয়েদের অধিকারের কোনো দাবী ওঠেনি কখনও। সেদিনও নয়, আজও নয়।
যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ আর মার্কিনি সৈন্যদের অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরী হয়েছিল দেশ জুড়ে। আর, যা হয়ে থাকে — ক্যাম্পের আশেপাশের গ্রামের মেয়েদের ওপর নেমে আসত যৌন আক্রমণ। MARS-এর কর্মীরা এই বিপদ বুঝেছিলেন; তাঁরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মেয়েদের বোঝাতেন যে তাদের শরীরের মালিক শুধু তারাই; কোনো অফিসার বা সৈন্যের খবরদারি করার অধিকার নেই তাদের ওপর। কোথাও থেকে কোনো অত্যাচারের খবর তাঁদের কাছে পৌঁছলেই — সে নিষিদ্ধ পল্লী হোক বা প্রত্যন্ত গ্রাম — ছুটে যেতেন সমিতির কেউ না কেউ। মেয়েদের লড়াই করে টিঁকে থাকতে শেখাতেন তাঁরা, সন্ধান দিতেন বিকল্প জীবিকার।
১৯৪৬ সালে এলো বন্যা। সমিতি আবারও রিলিফের কাজে সামনের সারীতে — জামাকাপড়, ওষুধ, খাবার পৌঁছনোর দায়িত্ব নিল তারা। বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে আত্মনির্ভরতার নীতিতে কাজ করেছিল সমিতি। ত্রাণ শিবির চালিয়েছিল, রসদের ব্যবস্থা করেছিল, তহবিলে টান পড়লে নিজেদের গয়না অবধি বিক্রি করে দিয়ে...বড়লোক তো কেউ ছিলেন না, তবুও যার যতটুকু সম্বল ছিল, সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েই...
১৯৪৫-৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কলকাতা যখন জ্বলছে, তখনও সমিতির সদস্যরা হিন্দু মুসলমান প্রতিবেশীদের মধ্যে ব্রীজ হয়ে উঠেছিলেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, অসহায় ও বিপন্ন মানুষদের সুরক্ষা দিয়েছিলেন। বম্বে আর করাচীর নৌ-বিদ্রোহ চলাকালীনও, তাঁদের রাস্তাতেই দেখা গেছে। স্বাধীনতার পর মেয়েদের অধিকারের দাবিতে যখন আইনি লড়াই শুরু হয়, তখনও লড়ে যায় MARS...মণিকুন্তলা সেনের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের টক্কর ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। আবারও "সেদিনের কথা" থেকে কিছুটা কোট করি —
"শ্যামাপ্রসাদের স্বরূপ আমরা দেখেছিলাম পূর্ব-বর্ণিত সভায়। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, গাড়ি গাড়ি মেয়ে আনা হয়েছিল পাথুরেঘাটা থেকে এবং তাদের বলা হয়েছিল সমস্ত হিন্দুকে মুসলমান করে দেবার আইন বন্ধ করার জন্য তোমাদের যেতে হবে। বেচারিরা মুসলমান হবার ভয়ে এসে হল্লা করে গেল। দুটো করে টাকাও নাকি প্রত্যেকে পেয়েছিল।
যাইহাক, এতে আমাদের বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি। অনেক স্বাক্ষর সংগৃহীত হয়েছিল। ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের হাতে আমি সেগুলো তুলে দিয়েছিলাম পশ্চিম বাংলার পক্ষ থেকে পার্লামেন্টে পাঠাতে। সব রাজ্য থেকেই এরকম করা হয়েছিল।
এইভাবে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে পার্লামেন্টে হিন্দু-কোড বিল পাশ হল। পার্লামেন্টে এই বিলের বিরোধী ছিলেন অনেকেই। এমনকী কংগ্রেসের মধ্যেও তাঁদের দেখা গেল। রক্ষণশীল ও গোঁড়াপন্থীরা কেবলমাত্র হিন্দু মহাসভাতেই ছিলেন না। নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেবার জন্য এমনকী প্রধানমন্ত্রী জওহরলালকেও পার্টির হুইপ প্রয়োগ করতে হয়েছিল দলের সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে।
আমাদের অনেক দিনের অনেক সংগ্রামের ফলেই অন্তত এই একটি বিষয়ে আইনগত স্বীকৃতি পাওয়া গেল। কিন্তু শুধু আইনের স্বীকৃতিই কি মেয়েদের সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে যথেষ্ট? সমিতির সেই প্রথম দিনগুলি থেকে আজকের দিনেও মেয়েদের অভিজ্ঞতা বোধ হয় এর বিপরীত সাক্ষ্য দেবে।"
পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে সমিতির আলাদা অস্তিত্ব ক্রমশ: ম্লান হয়ে আসে। কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নতুন রাজনৈতিক লাইন – সব মিলিয়ে MARS-এর যাত্রা প্রায় থমকে দাঁড়ায়। তবে এর সদস্যরা অন্য জাতীয় নারী সংগঠনে কাজ চালিয়ে যান। MARS শেষ হয়ে গেলেও তাদের গল্প হারিয়ে যায়নি। উপমহাদেশের ইতিহাসে MARS-ই প্রথম কোনো নারী সংগঠন মেয়েদের বলতে পেরেছিল যে তাদেরও অধিকার রয়েছে — স্বাবলম্বী হওয়ার অধিকার; নিজেদের শরীরের ওপর নিজেদের মালিকানার অধিকার; শিক্ষা ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার। সমিতি আইনী সচেতনতা ছড়িয়েছিল। শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্যে লড়েছিল। MARS-কেই বলা যায় পরবর্তীকালের সর্বভারতীয় গণতান্ত্রিক মহিলা সংগঠনের পূর্বসূরী।

আজকে অধিকারের কথা বললে যখন মেয়েদের হাজারটা গালিগালাজ শুনতে হয়, ট্রোলদের সহ্য করতে হয়, ক্ষমতাশালীদের কটাক্ষ ধেয়ে আসে, তখনও এই MARS-এর আদর্শই মশাল হয়ে থাকে। মশালকে জ্বালিয়ে রাখতে হয় ভবিষ্যতের জন্যে।

তাই গল্পগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়। মানুষের গল্প। বেঁচে থাকার আর বাঁচিয়ে রাখার গল্প। আমাদের ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকার।
সূত্র: (১) জনজাগরণে নারীজাগরণে, মণিকুন্তলা সেন, থীমা, কলকাতা
(২) Emergence of Mahila Atma Raksha Samiti in the Forties - Calcutta Chapter, Gargi Chakravarty, in Calcutta: The Stormy Decades, ed. Tanika Sarkar and Shekhar Bandyopadhyay, Social Science Press

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

মাঝনদী ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

শ্যামা আমাকে কোনোদিন নাম ধরে ডাকেনি। ডাকতো, ও মাঝি। প্রায় ষোলো বছর ধরে ওই দুইটা শব্দই ছিলো আমার নাম। আর আমি অন্য কোনো নামের কথা ভাবতেও পারতাম না। জীবনে মোটে একবার সে আমার আসল নামটা মুখে এনেছিলো। সেই রাতের পর ওপারের সঙ্গে আমার আর কোনোদিন দেখা হয়নি।

আমার নাম আফসার। টাকির ঘাটে নৌকা বাইতাম। এখন আর বাই না। নৌকাটাও নেই। ঘরের কোণে শুধু বৈঠাটা দাঁড় করানো আছে। তেল চিটচিটে, হাতলের কাছে কাঠটা একটু বসে যাওয়া। ওইখানে একসময় একটা নাম লেখা ছিলো। 

আমাদের ইছামতী তখন কারো ছিলো না। এপারে টাকি, ওপারে দেবহাটা। এপারে টাকি, ওপারে দেবহাটা, আর মাঝখানের জল দিনে দুইবার মন বদলাতো। জোয়ারে নদী ফুলেফেঁপে দুই পাড়ের ঘাসে এসে চুমু খেতো, আর ভাটায় নেমে গিয়ে মাঝবরাবর জাগিয়ে দিতো একটা চর। লম্বাটে একফালি জমি। ঘাসে ঢাকা, বর্ষায় ডুবে যেতো আবার হেমন্তে ফিরে আসতো। আমরা ওটাকে ডাকতাম মাঝির চর। পৃথিবীর কোনো কাগজে ওই চরের নাম নেই। অথচ আমার গোটা জীবনটা ওই এক ফালি ঘাসের ওপরেই কেটে গেছে।

বাপের সঙ্গে বৈঠা ধরতে শিখেছি বারো বছর বয়সে। প্রতি হাটবারে ওপার থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে আসতো টাকির হাটে। হরিপদ কাকা আসতেন ঝাঁকা ভরা পারশে আর ভেটকি নিয়ে। সঙ্গে তার মেয়ে। মেয়েটা নৌকার গলুইয়ে বসে জলের ভেতর হাত ডুবিয়ে রাখতো। আঙুলের ফাঁক দিয়ে স্রোত কেটে যাওয়ার শব্দ শুনতো। আমি বলতাম, হাত তোলো, কামট আছে। সে ঘাড় না ঘুরিয়েই বলতো, কামটে আমাগো কামড়ায় না। আমরা জাইলা।

ওর নাম শ্যামা।

নদীটা তখন বেয়াড়া ছিলো। ভাটার টানের বিপরীতে নৌকা বাওয়া যেতো না, গায়ে যতো জোরই থাকুক। তখন নৌকা চরে ঠেকিয়ে বসে থাকতে হতো জোয়ার ফিরবার অপেক্ষায়। ছয় ঘণ্টা পরপর নদী মন বদলায়। এই ছয় ঘণ্টার সময়টুকুই ছিলো আমাদের। বাপেরা হাটে দরদাম করতো। আর আমরা দুজন চরের ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে থাকতাম। ওপারে কার ঘরে কার বিয়ে হচ্ছে সেই গল্প করতাম। আর থেকে থেকে জলের দিকে তাকাতাম। জোয়ার এলে আমার বুকটা শুকিয়ে যেতো। কারণ জোয়ার মানেই নৌকা ছাড়া, আর নৌকা ছাড়া মানেই আরো সাতটা দিন।


কবে যে শ্যামার দিকে তাকানোটা অভ্যাস থেকে অসুখ হয়ে গেলো, বলতে পারবো না। একটা দিনের কথা মনে আছে। অঘ্রানের রোদ, চরের ঘাস শুকিয়ে সোনালি। সে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে ছিঁড়ে আঙুলে পাকিয়ে একটা আংটি বানাচ্ছিলো। বানিয়ে আমার দিকে না তাকিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলো। আমি নিলাম না, চেয়ে রইলাম। রোদটা তখন ওর ঘাড়ের কাছে এসে ভাঙছে। সে অনেকক্ষণ হাত বাড়িয়ে রেখে শেষে বললো, নিবা না? না নিলে গাঙে ফালাইয়া দিমু।

আমি হাত পাতলাম। ঘাসের আংটিটা বিকেলের মধ্যেই শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ওই হাত বাড়িয়ে রাখাটুকু আমার আঙুলের ভেতর সারাজীবন রয়ে গেছে।  

শ্যামা লিখতে জানতো। পাঠশালায় তিন ক্লাস পড়েছিলো। আমি নিরক্ষর। জাল আর দাঁড় ছাড়া কিছু চিনতাম না। এক বিকেলে সে ভেজা বালিতে আঙুল দিয়ে আমার নামটা লিখলো। বললো- দেখো, তোমার নামটা কতো ছোট। তারপর জোয়ার এসে লেখাটা ধুয়ে নিয়ে গেলো। সে হেসে বললো, বালিতে লিখলে হয় না। কাঠে লিখতে হয়।  

মাছ ছাড়ানোর ছোট বঁটিটা দিয়ে সে আমার বৈঠার হাতলে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিজের নামটা লিখলো। শক্ত কাঠ। তার আঙুল কেটে রক্ত পড়লো। তবু থামলো না। লেখা শেষ করে গামছায় হাত মুছে বললো, এইবার বাও দেখি। রোজ বাইবা, রোজ আমার নাম হাতে লাগবো।

নামটা আমি পড়তে পারতাম না। কিন্তু আঙুল বোলালে চিনতে পারতাম। পৃথিবীতে ওই একটা লেখাই আমি চিনেছি।

হাটবার ছিলো সপ্তাহে একদিন। বাকি ছয়টা দিন আমি কী করতাম? জাল বুনতাম, নৌকার তক্তায় আলকাতরা দিতাম, আর মনে মনে হিসাব কষতাম আর কয়টা রাত বাকি। মাঝে মাঝে বিনা কারণে নৌকা নিয়ে মাঝনদীতে গিয়ে বসে থাকতাম। ওপারের ঘাটটা দেখা যায় কিনা দেখতে। দেখা যেতো না। তবু বসে থাকতাম।

এক হাটবারে আমার যাওয়া হলো না। বাপের জ্বর আর নৌকার তলায় ফাটল, দুইটা একসঙ্গে। পরের হাটবারে গিয়ে দেখি সে চরে বসে আছে ঠিক আগের জায়গাটায়, হাঁটুতে থুতনি রেখে। কাছে গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ সে কোনো কথা বললো না। তারপর জলের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো, গত হাটবারে আমি ভাটা পুরা সময় এইখানে বইসা আছিলাম। জোয়ার আওনের আগ পর্যন্ত। বাপে ডাকে, আমি কই আরেকটু।

আমি বললাম, খবর দিতে পারি নাই।

সে বললো, খবর দিতে হইবো না। খালি আইসো।

তারপর প্রথমবারের মতো সে আমার হাতটা ধরলো। জেলের মেয়ের হাত। আঁশটে গন্ধ, তালুতে দড়ির দাগ। জোয়ার আসা পর্যন্ত আমি ওই হাত ছাড়িনি।

তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের বছর নদীর দুই পারে মানুষ না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরলো। ঘাটে রোজ সকালে দুই তিনটা লাশ পড়ে থাকতো। কেউ দাবি করতো না। ওই বছর শ্যামারা তিন মাস কচু আর কলার মোচা খেয়ে বেঁচেছিলো। আমি লুকিয়ে ওদের নৌকায় চাল দিয়ে আসতাম। হরিপদ কাকা দেখেও দেখতেন না। যে মানুষ সত্যি সত্যি না খেয়ে আছে, সে জিজ্ঞেস করে না চালটা কার হাত দিয়ে এলো।

সেই দুর্ভিক্ষেরই এক সন্ধ্যায় চরে বসে শ্যামা আমাকে একটা গল্প বলেছিলো। তার ঠাকুমার কাছে শোনা।

বহুকাল আগে… তখনো এই গাঙের নাম হয়নি। এপারে থাকতো এক জেলের মেয়ে আর ওপারে থাকতো এক রাখাল ছেলে। দুজনের দেখা হতো কেবল ভাটার সময়, যখন মাঝখানে চর জাগে। জোয়ার এলে চর ডুবে যেতো, দুজনে দুই দিকে ফিরে যেতো। মেয়েটা একদিন গাঙকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে বসলো, তুমি আমারে রোজ ওপারে দিয়া আইসো। গাঙ বললো, দিতে পারি। কিন্তু রাখতে পারুম না। আমার নিয়ম হইলো, যারে নিয়া যাই তারে ফিরাইয়া আনতে হয়। মেয়েটা তাতেই রাজি হলো। সেই থেকে দিনে দুইবার জল ওপারে যায়, আর দিনে দুইবার ফিরে আসে। ওইটাই জোয়ার, ওইটাই ভাটা। আর মেয়েটা যাওয়ার সময় কাঁদে, ফেরার সময়ও কাঁদে।

গল্প শেষ করে শ্যামা বললো, বুঝলা ও মাঝি? হেই কারণেই গাঙের জল নোনা।

আমি হেসে বলেছিলাম গাঙের জল নোনা, কারণ সাগর কাছে।

সে চোখ পাকিয়ে বলেছিলো, তুমি একটা আস্ত বেরসিক মাঝি।

আমাদের একটা পরিকল্পনা ছিলো কলকাতা পাড়ি জমানোর। ওই শহরে নাকি কেউ কারো পদবি জিজ্ঞেস করে না। খিদিরপুরের ঘাটে নাকি মাঝিদের কাজ পাওয়া যায়। নৌকার খোলের নিচে আমার একটা বিস্কুটের টিন লুকানো ছিলো। তাতে প্রতি হাটবারে চার আনা আট আনা করে জমতো। শ্যামা টিনটা ঝাঁকিয়ে শব্দ শুনতো আর ভুরু কুঁচকে হিসাব কষতো। বলতো, টিন ভরলে আমারে খবর দিবা। ঘরের চাল টিনের হইবো। বৃষ্টি পড়লে শব্দ হইবো। আর একটা লাল চিরুনি কিনা দিবা, ভুইলো না।

আমি বলতাম, ভরবো ভরবো। 

আসলে আমি ইচ্ছে করে দেরি করতাম। টিনটা ভরে গেলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তখন এই ছয় ঘণ্টার অপেক্ষাগুলো ফুরিয়ে যাবে। আমি বোকা ছিলাম। ভেবেছিলাম সময় জিনিসটা আমার পক্ষে আছে, আর অপেক্ষা জিনিসটা আমাদের নিজের সম্পত্তি। 

পঁয়তাল্লিশের এক আষাঢ়ে বিকেলে এমন বৃষ্টি নামলো যে নদীর ওপারটা বেশ কিছুটা সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমরা চরে আটকা পড়লাম। ছৈয়ের নিচে দুজনে ঢুকে বসলাম। কাপড় ভেজা, বাতাসে হি হি করে কাঁপুনি। শ্যামা খোঁপা খুলে ভেজা চুল ছড়িয়ে দিলো আর ছোট্ট ছাউনিটা ভরে গেলো নদীর মন কেমন করা গন্ধে। মাথার ঠিক এক বিঘত ওপরে তালপাতার ছৈয়ে তখন বৃষ্টির একটানা একটানা নূপুরনিক্বণ। সে আমার কাঁধে মাথা রাখলো। ভেজা চুল থেকে জল গড়িয়ে আমার হাতের ওপর পড়ছিলো। আর আমি নড়তে পারছিলাম না। পাছে সে সরে যায়। ওই সন্ধ্যায় আমি প্রথম জানলাম, মানুষের নিঃশ্বাসেরও একটা শব্দ আছে। আর সেই শব্দটা মুখস্থ হয়ে যায়।    

অনেকক্ষণ পর ঠান্ডা হাতটা আমার বুকের ওপর রেখে সে বললো, ভয় লাগতেছে।

আমি বললাম, বৃষ্টির?

সে বললো, না। মানুষের।

মেয়েটা আমার চেয়ে অনেক আগে টের পেয়েছিলো।

তার এক বছর পর কলকাতা থেকে খবর এলো। শহরে তিনদিন ধরে মানুষ মানুষকে ফালি ফালি করে কেটেছে। যারা কাজে গিয়েছিলো তারা পালিয়ে গ্রামে ফিরলো। চোখেমুখে অশনীসংকেতের মতো এমন একটা কিছু নিয়ে ফিরলো যা আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। তারপর নোয়াখালীর খবর এলো। আমাদের গ্রাম কলকাতা থেকে বহুদূর। নোয়াখালী থেকে আরো দূর। কিন্তু বিষের তো পা লাগে না, হাওয়ায় ভর করেই ছড়িয়ে পড়ে। 

হাটটা আগে বদলালো। যে বামুন এতোদিন হরিপদ কাকার হাত থেকে মাছ নিতেন, তিনি এখন ঝুড়ি থেকে সরাসরি তুলে নেন। এক শীতের রাতে জাল তুলতে গিয়ে দেখি আমাদের চরে হ্যারিকেন জ্বলছে। এপারের হেকমত আলী আর ওপারের নিবারণ সাহা পাশাপাশি বসে একটা হুঁকো ভাগ করে টানছে। আর ভিটেবাড়ি কেনাবেচার দর কষছে। এই দুইজন লোকই দিনের বেলায় দুই পারে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে বলতো, হিন্দু আর মুসলমান কোনোদিন এক থাকতে পারে না। আমি নৌকা ঘুরিয়ে চলে এসেছিলাম। ওদের নিয়ে ভাববার সময় আমার ছিলো না। আমার তখন একটা টিন ভরাবার তাড়া।

সাতচল্লিশের আগস্টে উৎসবের আলো জ্বললো নদীর দুই পারেই। চোদ্দ তারিখে ওপারে, পনেরো তারিখে এপারে। কেউ জানতো না বিভাজনের দাগটা কোথায় পড়েছে। কেউ জানতো না সে কোন দেশের লোক। ওই দুইটা রাতে আমি নৌকা নিয়ে ওপারে গেলাম। কারণ তখনো কেউ কাউকে আটকাচ্ছে না। শ্যামাকে নিয়ে চরে বসলাম। দুই পারের বাজির আলো জলের ওপর পড়ে কাঁপছিলো।  

সে বললো, আমরা এখন কোন দেশে বইসা আছি?

আমি বললাম, জানি না।

সে হেসে বললো, না জানাই ভালো।

সতেরো তারিখে শোনা গেলো, দাগটা পড়েছে ইছামতীর ঠিক মাঝ বরাবর। মাঝনদী দিয়ে। অর্থাৎ আমাদের চরটা কোন দেশে পড়লো, তা কেউ বলতে পারলো না। যে জিনিস জোয়ারে ডোবে আর ভাটায় ভাসে, তার দেশ ঠিক করবে কে।

প্রথম কয়েক বছর বাইরে থেকে তেমন কিছুই বদলালো না। নৌকা চলতো, হাট বসতো। শুধু নদীটা আর আগের মতো রইলো না। যে জলটা এতোকাল আমাদের জুড়ে রাখতো, সেটাই এখন আমাদের আলাদা করে রাখে। এই কথাটা একবার মাথায় ঢুকে গেলে চোখের সামনের সবকিছু পাল্টে যায়। ওপারে যাওয়া কমে এলো। কমতে কমতে বছরে তিন চারবারে ঠেকলো। প্রতিবার ফেরার সময় মনে হতো, নদীটা আগের চেয়ে একটু চওড়া হয়ে গেছে।

শ্যামার সাথে শেষ দেখাটা হয়েছিলো বাহান্ন সালের বর্ষায়।

সেদিন সে চুপচাপ ছিলো। অনেকক্ষণ পরে বললো, বাপে সম্বন্ধ আনছে। কালীগঞ্জে। আমি না করছি। কিন্তু আর কতোদিন পারুম গো মাঝি? ঘরে ডাগর মাইয়া রাখা এখন আর আগের মতো সহজ না।

আমি বললাম, দুইটা মাস দাও। টিন প্রায় ভরছে।

জোয়ার এসে গিয়েছিলো। নৌকা ছাড়তে হবে। সে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির কোঁচড় ঝাড়িয়। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকালো আমার দিকে । ষোলো বছরে ওই প্রথম সে আমাকে মাঝি বললো না। 

আফসার। দেরি কইরো না।

কী আশ্চর্য! নিজের নামটা নিজের কানে শুনতে যে এতো ভালো লাগে, আমি এতোদিন জানতামই না।

তার কিছুদিন পরেই ঘোষণাটা এলো। পনেরোই অক্টোবরের পর ওপারে যেতে হলে পাসপোর্ট লাগবে, কাগজ লাগবে, ছবি লাগবে, অফিসের সিল লাগবে। যে মানুষ দশ মিনিটে নৌকায় ওপারে যেতো, তার সামনে হঠাৎ একটা দরজা তৈরি হলো। আর সেই দরজার গায়ে তারিখ লেখা হলো। দুই পারে হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো। ঘাটে ঘাটে মানুষ পুঁটলি নিয়ে বসে রইলো।

আমি হেকমত আলীর কাছে গেলাম। সীমান্তে তার লোক ছিলো। দারোগা থেকে চৌকিদার সবাই তার টাকা খেতো। বিস্কুটের টিনটা তার সামনে উপুড় করে ঢেলে দিলাম। নয় বছরের জমানো দুইশো ছেচল্লিশ টাকা। কম পড়লো। বাপ ততদিনে নাই। নৌকাটাই ছিলো তার রেখে যাওয়া একমাত্র জিনিস। সেটা বেচে দিলাম দুইশো টাকায়। সব মিলিয়ে চারশো ছেচল্লিশ টাকা হেকমত আলীর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, মেয়েটাকে আইনা দেন। বাকি জীবন আপনার নৌকা বাইবো।

সে টাকাটা দুইবার গুনলো। তারপর গামছায় ঘাড় মুছে বললো, চোদ্দ তারিখ রাইতে চরে থাকিস।

চোদ্দ তারিখ রাতে আমি চরে ছিলাম। কুয়াশা পড়েছিলো। জোয়ার এসে চরের কিনারা ভিজিয়ে দিলো। তারপর ভাটা নামলো, তারপর আবার জোয়ার। সারারাত বৈঠাটা কোলে নিয়ে বসে রইলাম আর তাকিয়ে রইলাম ওপারে। ভোরের আলো ফুটলে দেখলাম, সামনে শুধু নদী। শ্যামা নেই।

অনেক পরে জেনেছিলাম, ওই রাতের আগেই শ্যামার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। তার বাপ ভয় পেয়ে পূজার আগেই মেয়ের বিয়ের পাট চুকিয়ে দিয়েছিলেন। হেকমত আলী তবু জেনেশুনেই আমার টাকাটা নিয়েছিলো জেনেশুনেই জানিয়েছিলো তারিখটা। মানুষ মারার জন্য অস্ত্র লাগে না, একটা মিথ্যা আশাই যথেষ্ট।

তবু ওই লোকটাকে আমি আজ আর দোষ দিই না। দোষটা আমার। যতোবার কথাটা মনে পড়ে, ততোবার কানের ভেতর একটা কথাই বাজে। দেরি কইরো না। সারাটা জীবন আমি ওই অপেক্ষাটাকে আদর করে জমিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম ওটা আমার সম্পত্তি। জানতাম না, অপেক্ষা জিনিসটা ধার করা। আর তার সুদ বড় চড়া।

একাত্তরে যখন যুদ্ধ লাগলো, ওপার থেকে মানুষ দলে দলে এপারে আসতে লাগলো। রিলিফ কমিটির নৌকায় সাত মাস আমি বিনা পয়সায় বৈঠা টেনেছি। রাতের পর রাত। প্রত্যেকটা নৌকায় আমি মেয়েদের মুখের দিকে তাকাতাম। উনিশ বছর পেরিয়ে গেছে। চেহারা বদলে যায়, তবু আমি তাকাতাম। যদি কোনো একটা মেয়ে শ্যামার হয়! 

এখন আমার বয়স পঁচাশি। মাঝির চরটা আর নেই। ষাটের দশকের কোনো এক বর্ষায় স্রোত ওটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। যে জায়গাটায় আমরা ছয় ঘণ্টা করে জোয়ারের অপেক্ষা করতাম, সেখানে এখন শুধু জল। জলের ওপর টানটান করে বাঁধা একটা দড়ি। আর দুই দেশের বন্দুকওয়ালাদের নৌকা।

তবু বছরে একটা দিন আছে। দশমীর দিন দুই পারের মানুষ ঠাকুর নিয়ে নদীতে নামে। শয়ে শয়ে নৌকা। শয়ে শয়ে নৌকা। দুই পারে দুই দেশের পতাকা, ঢাকের শব্দ, সিঁদুর, ধোঁয়া। নৌকাগুলো দড়ির দুই পাশে এসে ঠেকে থাকে। আর মানুষ গলা ফাটিয়ে ওপারের অচেনা মানুষকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায়।

আমি মুসলমান মানুষ। পূজার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। তবু বাহান্ন সালের পর থেকে প্রত্যেক দশমীতে আমি একটা নৌকা ধার করে ওই ভিড়ের ভেতর গিয়ে বসে থাকি।

বৈঠার হাতলে এখন আর কোনো অক্ষর নেই। আমার হাতের ঘষায় নামটা ক্ষয়ে গেছে। প্রথমে শেষের অক্ষর, তারপর মাঝেরটা। তারপর পুরোটাই। এখন সেখানে কেবল একটা মসৃণ গর্ত, ঠিক বুড়ো আঙুলের মাপে। 

ওই গর্তে আঙুলটা বসিয়ে আমি সারা বিকেল কান পেতে বসে থাকি। হাজার মানুষের চিৎকার, ঢাক, বাঁশি, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। আমি ওই সবকিছুর ভেতর থেকে একটা মাত্র শব্দ শোনার জন্য বসে থাকি। কেউ আমার নাম ধরে ডাকে না।

তারপর ভাটা নামে। জল ওপার থেকে নেমে এপারে আসে। আমার নৌকার গা ছুঁয়ে চলে যায়। ছয় ঘণ্টা পর আবার ওপারে ফিরে যায়। দিনে দুইবার। রোজ। একদিনও এই নিয়মের নড়চড় হয় না।

আমি আঁজলা ভরে সেই জল তুলে মুখে দিই।

নোনা।

ঠাকুমার গল্পটা তাহলে মিথ্যা ছিলো না।  

১৩/৮/২০২৬

কোথাও মানুষ ভালো রয়ে গেছে ~ সুব্রত ঘোষ

১৯৯১ সাল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ল। তীব্র সংকটে পড়ে গেল কিউবা। পেট্রোল নেই, রাসায়নিক সার নেই, ট্রাক চলে না। ৮০% খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল যে দেশ নতুন পরিস্থিতিতে সেই দেশে খাবারের জন্য হাহাকার শুরু হল শহরে শহরে।

তখনই কিউবার মানুষ বেছে নিল এক অভিনব পথ: “Organopónicos”। গ্রীনহাউস স্টাইলে চাষ পদ্ধতির সূচনা হল দেশে। কৃষিমন্ত্রক অনুমোদন দিতেই তারা শহরের পরিত্যক্ত জায়গা, রাস্তার পাশে, পার্কে , ছাদে, ব্যালকনিতে শুরু করল জৈব চাষ। নাম দিল “Organopónicos.”

Uploaded Image পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ শহরভিত্তিক জৈব কৃষি আন্দোলন এভাবেই শুরু হয় হাভানার বুকে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই উৎপন্ন হচ্ছিল শাকসবজি। স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেরাই শ্রম দিচ্ছিল, নিজেরাই খাচ্ছিল।পরিবেশ বান্ধব চাষবাসই হয়ে ওঠে শহরের খাদ্যনির্ভরতার ভরসা। সমাজতান্ত্রিক মডেলে উৎপাদিত খাবার সমানভাবে ভাগ হয়ে পৌঁছাত সাধারণ মানুষের ঘরে। 



ডন আলফ্রেডো, হাভানার এক শহরতলিতে নিজের বাড়ির পাশে ফাঁকা জায়গায় উদ্যোগ নিয়ে একখণ্ড জমি তৈরি করেন। এখন এই ২০২৫তে তার চাষ করা পালংশাক পৌঁছে যায় ৬০টি পরিবারের প্লেটে।

 কিউবার এই urban organic farming revolution—এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী, এবং সাধারণ জনগণের একত্রে গড়ে তোলা এক বিকল্প পথের ইতিহাস। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবায় শুরু হয় "Special Period in Time of Peace" —এই সময়েই কিউবার রাষ্ট্র নেতৃত্ব ঘোষণা করে “আমরা স্থানীয় উৎপাদনেই খাদ্যনির্ভরতা গড়ব”। কিউবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান INIFAT (Instituto de Investigaciones Fundamentales en Agricultura Tropical) জৈব সার, কম্পোস্টিং, প্রাকৃতিক কীটনাশক ইত্যাদির ব্যবহার করে কেমন করে শহরে চাষ করা যায়— সে বিষয়ে সরকারকে নীতিগত পরামর্শ দেয়।

পাড়াভিত্তিক সংগঠনগুলো খাদ্য উৎপাদনে স্থানীয় মানুষদের একত্র করে, স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাগান তৈরি করে, এবং খাদ্য বণ্টনের দায়িত্বও নেয়। হাভানার বাসিন্দা মারিয়া গঞ্জালেজ, যিনি সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাদে বাগান তৈরি শুরু করেন, তিনি এক পাড়া ক্লাব গড়ে তোলেন— যেখানে শিশুদের নিয়ে কৃষিকাজ শেখানো হতো। হাভানার প্রতিটি পৌর এলাকায় অন্তত একটি করে urban farm থাকতেই হবে— এ ছিল সরকারি নিয়ম। "Local food, zero transport, no chemicals" ছিল মূল শ্লোগান।

২০০৩ সালের মধ্যেই কিউবার শহরগুলোতে প্রায় ৩৫,০০০ হেক্টর জমি শহুরে জৈব চাষে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ঐ বছর দেশের কৃষি উন্নয়ন সম্মেলনে ফিদেল কাস্ত্রো বলেন "জৈব চাষ করছেন মানে আপনি পিছিয়ে পড়ছেন না। এই পদ্ধতি আমাদের বাস্তবকে স্বীকার করে নিতে শেখায়। এই নতুন পরিস্থিতিতে আমরা শিখেছি যে অসাধারণ কিছু করা যায় বিষ বা পেট্রোলিয়াম ছাড়াই।" যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এই স্বনির্ভর কৃষি আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শহরের মানুষ যদি নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করে, তাহলে সাম্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সচেতনতা — সব একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। তিনি বললেন "Con la tierra y el sudor, no hay dictadura que gane.” মাটি আর ঘামের সঙ্গে থাকলে কোনো একনায়কতন্ত্রই জিততে পারে না।

২০০৬ সালে জাতিসংঘের FAO (Food and Agriculture Organization) কিউবার শহরভিত্তিক কৃষিকে “একটি বৈশ্বিক মডেল” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। হাভানায় Urban Agriculture International Congress এ ২০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি কিউবার অভিজ্ঞতা শোনেন। নেপালে ২০১৫-র ভূমিকম্পের পরে, কিছু NGO কিউবার মডেল অনুসরণ করে শহরে চট, বাঁশ ও প্লাস্টিক ব্যাগে অর্গানিক খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ শুরু করে।