শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

লো কার্বহাইড্রেট ~ পার্থ সারথী আইন

যতই দিন যাচ্ছে ততোই বুঝছি যে ৩৩ বছর আগে ডাক্তারী পড়ার শেষে যা যা শিখেছিলাম বা যেভাবে শিখেছিলাম সবই আজ প্রায় unlearn করতে হচ্ছে বিজ্ঞানের উন্নতির কৃপায়। যে biochemistry বা physiology র বিষয় গুলো মুখস্থ করে পাশ করে গেছি সেগুলোর গুরুত্বই বুঝিনি তখন বা শিক্ষকেরাও জানতেন না বলে বোঝাতেও পারেননি, আর আজকের মহামারী মেটাবোলিক সিনড্রোম এবং ক্যান্সার এর মহামারী ও তখন ছিলো না।। আজও সেই যুগ পুরাতন শিক্ষা চলছে - যদিও একজন সচেতন বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার সীমিত সাধ্যের মধ্যেই ছাত্র দের সেগুলোর বিষয় চোখ ফোটানোর চেষ্টা করছি, স্বাস্থ্য নিয়ে নানান ভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করে চলেছি।

বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তা চেতনায় আমাদের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো আমরা মানুষরা আদতেই অন্তর থেকে পরিবর্তন বিরোধী, একটা নতুন কিছু শেখার বা জানার আগ্রহ ভীষণ কম এবং যদিও বা শেখা গেলো তবুও আমাদের পুরানো চিন্তা বা mindset এর জাল কেটে বেরিয়ে সেই নতুন সত্য কে মেনে নেওয়া বা প্রয়োগ করার মানসিকতাও অত্যন্ত বিরল। রাজনীতিতেও একথা কিন্তু সু প্রযোজ্য। চিকিৎসক ও সাধারণ রোগীদের একটা বিরাট অংশের ক্ষেত্রেও আমি দেখছি এই অনড় মানসিকতা, যেটা তাদের সুস্থতা অর্জনের পক্ষে এক বিশাল বাধা বলেই আমার মনে হয়। 

এরকমই এক বিষয় হলো কোষে কোষে চলতে থাকা পলিওল পথ (Polyol pathway) ও ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদনের বিষয়টি – যেটা কোনদিন মন দিয়ে পড়তামই না সেটা আজ আমাদের মেটাবোলিক অসুস্থতার একটি বড়ো উপায় হয়ে দেখা দিয়েছে, এটা চিকিৎসক দেরও যেমন বুঝতে হবে তেমনি এযুগের স্টুডেন্টস দের ও তেমনি মাথায় ঢোকাতে হবে। তাই এ প্রসঙ্গের অবতারণা করতে বসেছি - সহজ, সরল ভাষায় সব্বার জন্যে। বিজ্ঞানের দ্রুত বদলে যাওয়া দিগন্তের সাথে আমাদের ও পুরানো mindset, পুরানো শিক্ষার খোলস পাল্টাতেই হবে - না হলে ওষুধস্য কৃপা হি কেবলম বলতে বলতেই শ্মশানে পৌঁছে যাবো তাড়াতাড়িই।

একজন শিক্ষকের অন্তর্দৃষ্টি থেকে বুঝি যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের টেক্সটবই বা পুরনো কারিকুলাম প্রায়শই আমাদের রোগ নির্ণয় ও ওষুধ প্রেসক্রাইব করার "প্রোটোকল" শেখায়, কিন্তু তার পেছনের মূল বায়োকেমিস্ট্রি বা মেটাবলিক মেকানিজম (মেটাবলিক শারীরবৃত্ত) কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—তা অনেক সময়ই বাদ পড়ে যায়। তাই মুসুর ডাল, টোম্যাটো, খাসীর মাংস খাওয়া যে ইউরিক অ্যাসিড বাড় বাড়ন্তের আসল কারণ নয়, গাদা গাদা ভাত, রুটি খেতে থাকলে যে পলিওল পাথওয়ে দ্রুত গতিতে চলে এবং ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন বাড়ে - এসব সাম্প্রতিক গবেষণা র ফলাফল আমাদের জানতেই হবে, অন্যকে জানাতেও হবে। এসব তথ্য আপনার কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব যাদের তারা চুপ করে বসে আছি, প্রাচীন চিন্তার গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে ভেসে দিন নির্বাহ করার জন্য আর উল্টোদিকে বৃহত্তর অংশের মানুষ ক্রমেই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে - এর চাইতে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে? অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞানী / শিক্ষকরাই যখন এই ধরনের পুরনো মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে শিক্ষার্থীদের চোখ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন, তখনই চিকিৎসার প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় এবং মানুষ তার সুস্বাস্থ্যের অধিকার ফিরে পেতে শুরু করেন ওষুধ নির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে।

পলিয়ল পাথওয়ে (Polyol Pathway) কী এবং কেন এটি জানা দরকার?

সহজ কথায়, পলিয়ল পাথওয়ে হলো শরীরের কোষ গুলির মধ্যে ঘটে চলা একটি বিকল্প মেটাবলিক পথ, যার মাধ্যমে আমাদের শরীর গ্লুকোজকে (Glucose) সরবিটলে (Sorbitol) এবং পরবর্তীতে ফ্রুক্টোজে (Fructose) রূপান্তরিত করে।
Uploaded Image


স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের রক্তে থাকা গ্লুকোজের ৯৫% বা তার বেশি ব্যবহৃত হয় শক্তি তৈরির কাজে (Glycolysis ও Krebs Cycle-এর মাধ্যমে)। পলিয়ল পাথওয়েতে স্বাভাবিক অবস্থায় মাত্র ৩-৫% গ্লুকোজ প্রবেশ করে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ (Hyperglycemia) থাকে কিংবা শরীরে প্রচুর পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত ফ্রুক্টোজ প্রবেশ করে।

   (অতিরিক্ত গ্লুকোজ) 
       │
       ▼ (Aldose Reductase এনজাইম - NADPH খরচ করে)
    (সরবিটল (Sorbitol)) ───► (কোষে আটকে যায় ও টিস্যু ড্যামেজ করে)
       │
       ▼ (Sorbitol Dehydrogenase এনজাইম)
   (ফ্রুক্টোজ (Fructose)) ───► (ফ্যাটি লিভার ও মেটাবলিক সিন্ড্রোম বাড়ায়)

কেন এটি মেটাবলিক অসুস্থতার মূল "খলনায়ক"?

বহু বছর ধরে বায়োকেমিস্ট্রিতে পলিয়ল পাথওয়েকে শুধু ডায়াবেটিসের কিছু জটিলতার (যেমন: ছানি পড়া বা নিউরোপ্যাথি) কারণ হিসেবে একটি একঘেয়ে চক্র মনে করে মুখস্থ করানো হতো। কিন্তু আধুনিক মেটাবলিক সায়েন্স দেখাচ্ছে—এটি আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার মারাত্মক রোগের মূল চালিকাশক্তি:

১. সেলুলার অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খালি হওয়া: গ্লুকোজকে সরবিটলে ভাঙতে শরীরের NADPH নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অণু খরচ হয়। এই NADPH-এর কাজ হলো আমাদের শরীরের সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট Glutathione (গ্লুটাথিয়ন)-কে পুনরায় সক্রিয় রাখা।
Uploaded Image


পলিয়ল পাথওয়ে অতিরিক্ত সক্রিয় হলে শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কভার শেষ হয়ে যায়। ফলে কোষে প্রাবল্য পায় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, যা ভাস্কুলার ড্যামেজ, ইনফ্ল্যামেশন এবং দ্রুত বার্ধক্যের দিকে নিয়ে যায়।

২. সরবিটলের "অসমোটিক ট্র্যাপ" (Osmotic Trapping)

সরবিটল এমন এক যৌগ যা সহজে কোষের পর্দা (Cell Membrane) পার হয়ে বাইরে বের হতে পারে না। ফলে এটি কোষের ভেতরে জমতে থাকে এবং জল টেনে নেয় (অসমোসিস)।

চোখে: চোখের লেন্সের ভেতরের কোষ ফুলে যায়, ফলে প্রাক-প্রৌঢ়ত্বেই ছানি (Cataract) পড়ে।

স্নায়ুতে: নার্ভ সেল ড্যামেজ হয়ে নিউরোপ্যাথি (পায়ে জ্বালা-যন্ত্রণা, অনুভূতিহীনতা) তৈরি হয়।

৩. এনডোজেনাস বা শরীরের ভেতরে ফ্রুক্টোজ প্রোডাকশন ও ফ্যাটি লিভার
আমরা ভাবি ফ্রুক্টোজ শুধু কোল্ড ড্রিঙ্কস বা মিষ্টি খেলেই শরীরে ঢোকে। কিন্তু রক্তে গ্লুকোজ বেশি থাকলে পলিয়ল পাথওয়ের মাধ্যমে শরীর নিজের ভেতরেই ফ্রুক্টোজ তৈরি করতে শুরু করে (Endogenous Fructose Production)। এই ভেতরে তৈরি হওয়া ফ্রুক্টোজ লিভারে গিয়ে সরাসরি ফ্যাটি লিভার (NAFLD/MASLD), ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ইউরিক এসিড বৃদ্ধি এবং উচ্চ রক্তচাপ ঘটায়।

Uploaded Image

তাহলে পলিয়ল পাথওয়ে আপনার শরীরে জেগে উঠেছে কিনা সেটা বুঝতে কোন টেস্ট করা ভালো - Fasting বা খালিপেটে সুগার নাকি ইউরিক অ্যাসিড টেস্ট?

ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS) আমাদের শরীরে গ্লুকোজের উপস্থিতির একটি স্থির চিত্র (static snapshot) প্রদান করে, কিন্তু এটি প্রায়শই পলিয়ল পাথওয়ের (polyol pathway) অতি-সক্রিয়তা (hyperactivation) শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

প্রথমত, উপরে দেওয়া Flow chart টি দেখলে ভালো বুঝবেন, অ্যালডোজ রিডাক্টেজ শান্টিং (aldose reductase shunting) প্রক্রিয়াটা প্রধানত খাবার খাওয়ার পরের গ্লুকোজ স্পাইক বা পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল গ্লুকোজ বৃদ্ধির (>১৪০–১৮০ mg/dL) কারণে ঘটে। 

এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ হেক্সোকাইনেজ (hexokinase) এনজাইম বা উৎসেচক কে সমপৃক্ত (saturate) করে ফেলে, ফলে normal Glucose metabolism এর রাস্তা উপচে পড়ে বাড়তি glucose হু হু করে aldose reductase shunting প্রক্রিয়া নামের bypass রাস্তায় ঢুকে পড়ে, আর excess Fructose এবং Uric acid production কে বাড়িয়ে কোষের খেল খতম করতে থাকে —এমনকি যেসব লোকেদের সকালের ফাস্টিং গ্লুকোজ স্বাভাবিক বা সামান্য বেশী (১০০–১১০ mg/dL), তাদের ক্ষেত্রেও এটি ঘটে। (নীচের ছবি দেখুন )

দ্বিতীয়ত, FBS কোষের ভেতরের মেটাবলিক স্ট্রেস পরিমাপ করতে পারে না। অন্যদিকে ইউরিক এসিড কোষের ভেতরের ATP নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, ফ্রুক্টোলাইসিস (fructolysis) এবং Xanthine Oxido Reductase উৎসেচকের -মধ্যস্থতায় তৈরী ROS (রিয়্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস) – এগুলোর দ্বারা ঘটতে থাকা মেটাবলিক ক্ষতির মাত্রা সরাসরি নির্ধারণ করে যথেষ্ট ভালোভাবে।

তৃতীয়ত, যেহেতু ইউরিক এসিড সক্রিয়ভাবে অ্যালডোজ রিডাক্টেজকে upregulate বা ত্বরান্বিত করে, তাই সিরাম ইউরিক এসিডের উচ্চ মাত্রা নির্দেশ করে যে পলিয়ল পাথওয়েটি প্রাইজড (primed) এবং অতি-সক্রিয় হয়ে উঠেছে। 

ফলস্বরূপ, শুধুমাত্র FBS-এর তুলনায় সিরাম ইউরিক এসিডকে পলিয়ল পাথওয়ের প্রাথমিক অতি-সক্রিয়তা এবং এনডোজেনাস ফ্রুক্টোজ-জনিত মেটাবলিক সমস্যা শনাক্ত করার জন্য একটি অনেক উৎকৃষ্ট ও কার্যকর মার্কার (functional marker) হিসেবে গণ্য করা হয়।

Uploaded Image

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং সামগ্রিক এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ সৃষ্টি পথের গতিশীলতা
পলিয়ল পাথওয়ের অতি-সক্রিয়তার খারাপ প্রভাব বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং সামগ্রিক পূর্ব ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর জিনগত ও মেটাবলিক প্রবণতা (susceptibility) অনেক বেশি দেখা যায়।

জিনোমিক পর্যায়ে বদলের ফলে অ্যালডোজ রিডাক্টেজের mRNA এক্সপ্রেশন এবং লোহিত রক্তকণিকায় এই এনজাইমের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এপিডেমিওলজিক্যাল বা মহামারী সংক্রান্ত সমীক্ষায় দেখা গেছে যে পূর্ব এশীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই জেনেটিক উস্কানিদাতা র প্রাদুর্ভাব বেশ বেশি।

যাদের মধ্যে CT বা TT জেনোটাইপ রয়েছে, তাদের শরীরে এনজাইমের এই উচ্চমাত্রার উপস্থিতির কারণে পলিয়ল শান্টিং শুরু হওয়ার জন্য গ্লুকোজের প্রয়োজনীয় থ্রেশহোল্ড (threshold) কমে যায়। এর ফলে ফাস্টিং গ্লুকোজের মাত্রা ১০০–১১০ mg/dL-এর মতো কম থাকলেও অ্যালডোজ রিডাক্টেজ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, এশীয় জনগোষ্ঠীর যেসব ব্যক্তির মধ্যে এই -106T অ্যালিল রয়েছে, তাদের মাইক্রোভাস্কুলার জটিলতা—যেমন প্রোলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, ডায়াবেটিক কিডনি ডিজিজ এবং পেরিফেরাল পলিনিউরোপ্যাথির ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়।

এই জিনগত সংবেদনশীলতা এশীয়দের নির্দিষ্ট এশিয়ান মেটাবলিক ফেনোটাইপ -এর সাথে সম্মিলিতভাবে কাজ করে। এই ফেনোটাইপের বৈশিষ্ট্য হলো—কম BMI থাকা সত্ত্বেও (>২৩ kg/m²) শরীরে ভিসেরাল ফ্যাটের (পেটের মেদ) উচ্চ শতাংশ, প্রাথমিক ধাপে ইনসুলিন নিঃসরণের অক্ষমতা এবং খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের দ্রুত ও অত্যাধিক ওঠানামা (postprandial glucose variability)।

উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত রিফাইন বা প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় (>১৮০ mg/dL), যা হেক্সোকাইনেজ এনজাইমকে সংপৃক্ত করে ফেলে। ফলে সকালের ফাস্টিং গ্লুকোজ সামান্য বেশি থাকলেও বারবার পলিয়ল শান্টিং ঘটতে থাকে। এর সাথে স্থানীয় হাইপারইউরিসেমিয়া (উচ্চ ইউরিক এসিড) এবং ফ্যাটি লিভারের (NAFLD/MASLD) উচ্চ হার যুক্ত হয়ে এমন এক মেটাবলিক পরিবেশ তৈরি করে, যা পলিয়ল পাথওয়েকে ক্রমাগত সক্রিয় রাখতে ইন্ধন জোগায়।

জিন এবং পরিবেশের এই মিথস্ক্রিয়া (gene-environment interaction) বিভিন্ন ক্লিনিকাল ট্রায়ালে চিকিৎসাগত কার্যকারিতার পার্থক্যের একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে। যেমন, অ্যালডোজ রিডাক্টেজ ইনহিবিটর (ARIs)—ইপালরেস্ট্যাট (epalrestat)— ওষুধটি জাপানি, চীনা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ডায়াবেটিস রোগীদের মাইক্রোভাস্কুলার রোগবালাই বিলম্বিত করতে ধারাবাহিকভাবে চমৎকার ক্লিনিকাল সুবিধা দেখিয়েছে কিন্তু আবার অন্যদিকে, ককেশীয় বা শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর করা ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলোতে এর কার্যকারিতা খুবই সীমিত পাওয়া গেছে—কারণ তাদের মধ্যে এই -106T জেনেটিক ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি কম এবং তাদের মেটাবলিক সিন্ড্রোম প্রধানত ম্যাক্রোভাস্কুলার ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ দ্বারা পরিচালিত হয়।

কীভাবে এই পাথওয়েকে শান্ত রাখা সম্ভব?

বিজ্ঞানের এই আপডেট আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে, শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে আসল কারণ দূর করতে হবে:

রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট ও চিনি বর্জন: লাইফস্টাইল থেকে অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমালে রক্তে গ্লুকোজের অতিরিক্ত বৃদ্ধি থামে, ফলে পলিয়ল পাথওয়ে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায় না।

প্রসেসড ফ্রুক্টোজ এড়ানো: সফট ড্রিঙ্কস, প্যাকেটজাত জুস এবং হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাফ বন্ধ করা।
টাইম-রেস্ট্রিক্টেড ইটিং / ফাস্টিং: শরীরকে গ্লুকোজ ও ইনসুলিন স্পাইক থেকে বিরতি দেওয়া, যাতে কোষগুলো নিজেকে মেরামত (Autophagy) করতে পারে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপোর্টিং ফুড: যা শরীরের Glutathione এবং NADPH লেভেল ধরে রাখতে সাহায্য করে।

নীচের ছবি গুলো ভালো করে দেখুন / পড়ুন : মূল কথা যা মনে রাখুন,গাদা গাদা ভাত, রুটি খাবেন না। চিঁড়ে, মুড়ি, বিস্কুট, চাউমিন, ময়দা র খাবার এড়িয়ে চলারই চেষ্টা করুন। Low carbohyrate - high fat - moderate protein diet এ যতো তাড়াতাড়ি পারেন ঢুকে পড়ুন, মাছ, মাংস, ডিম ( কিডনির শেষ দশা না হলে রোজ ৬টা করে ডিম খাওয়া দিয়ে শুরু করুন ), ঘি, নারকেল তেল প্রাণ ভরে খান। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে সপ্তাহে কাঁচা রান্না করা অবস্থায় প্রায় ৩৫০–৫০০ গ্রাম) খাসীর মাংস খাওয়া নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবে এটা আপনি স্বাভাবিক শর্করা ডায়েটে আছেন ধরে নিয়ে, কিন্তু যদি আপনি আমার মতো low carbohydrate ডায়েট এ অভ্যস্ত হন তাহলে আরামসে সপ্তাহে ৭০০-৮০০ গ্রাম খাসীর মাংস( দৈনিক গড়: এটি গড়ে দিনে প্রায় ১০০ গ্রাম-এর মতো পড়ে) খেতে পারবেন, সাথে ডিম, মাছ ও। লাভ কী হবে এতে? ইউরিক অ্যাসিড কমবে, ট্রাইগ্লাইসেরাইড কমবে, সুগারও নিয়ন্ত্রণে আসবে, কারণ আপনি পলিওল pathway কে বন্ধ করে ফেলেছেন এভাবে। তাহলে খাবারের বিজ্ঞান টা কি বোঝা গেলো?

মনে রাখবেন আপনার রক্তের ইউরিক অ্যাসিড ৪. ৫ এর ওপরে থাকা মানেই লাল সিগন্যাল - এর মানে আপনার খাবারে বাড়তি শর্করা ঢুকছে এবং তা পলিওল পথে shunt হয়ে যাচ্ছে - তাই তখনই কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণ কমিয়ে মাছ, মাংস ডিম বাড়িয়ে দিতে হবে।

আশা করি আমার এই সামান্য প্রচেষ্টা এবং চিন্তাভাবনা আমার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও মেটাবলিক স্বাস্থ্যের প্রকৃত রহস্য বুঝতে সাহায্য করবে।

শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

ফুলের মানুষ ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার প্রকাশক বলেন, আপনার লেখায় আজকাল প্রাণ নাই।

আমি বলি, প্রাণ কই কিনতে পাওয়া যায় বলেন, নিয়া আসি।

উনি হাসেন না। রয়্যালটির চেক লিখতে লিখতে গম্ভীর মুখে তিনটা পরামর্শ দেন। প্রেমে পড়েন। নেশা ছাড়েন। ভোরবেলা হাঁটেন। তিনটার একটাও আমাকে দিয়ে হবে না জেনেও আমি বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ি।

বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। দুইটা উপন্যাস, একটা গল্পের বই, আর ড্রয়ার ভর্তি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমার সংসার। মহল্লার লোকে জানে আমি লেখক। ঘনিষ্ঠরা জানে আমি মা তা ল। আর আমি জানি, আমি আসলে একটা দীর্ঘ অপেক্ষা। কীসের অপেক্ষা, জানি না। জানলে তো গল্পই শেষ হয়ে যেতো।

তানভীর আমার একমাত্র বন্ধু, যে এখনো আমাকে মানুষ মনে করে। ডকুমেন্টারি বানায়। এক সন্ধ্যায় আমার ফ্ল্যাটে এসে গ্লাসে চুমুক না দিয়েই বলল, শ্রীমঙ্গল ছাড়াইয়া পাহাড়ের ভিতরে একটা জায়গা আছে। নাম মেঘমাটি। জনা ত্রিশেক মানুষ থাকে। টাকা চলে না, ঘড়ি চলে না, মোবাইলের নেটওয়ার্ক ঢুকতে পারে না। নিজেরা ফলায়, নিজেরা খায়, রাইতে আগুন জ্বালাইয়া গান গায়। যাবি?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিদ্যুৎ আছে?

সে বলল, চাঁদ আছে।

উত্তরটা আমার পছন্দ হলো। নতুন উপন্যাসের মালমশলা হবে ভেবে ব্যাগে দুইটা শার্ট আর একটা বোতল ভরে রওনা দিলাম। যাওয়ার সময় আমি জানতাম, আমি যাচ্ছি একদল পলাতক অলস মানুষ দেখতে, যারা জীবনের পরীক্ষায় ফেল করে পাহাড়ে পালিয়েছে। ফেরার সময় জানলাম, পলাতক আসলে আমি। পালানোর সাহসটাও নাই বলে ঢাকায় বসে ছিলাম এতকাল।

মেয়েটাকে প্রথম দেখি ঝর্নার পাড়ে। ভেজা পাথরে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে চুলে জংলি ফুল গুঁজছে। পরনে আলখাল্লা ধরনের একটা জামা, হাতে রঙ লেগে থাকা আঙুল, আর মুখে এমন একটা নির্ভার ভাব, যেটা আমি ঢাকা শহরে বিশ বছরে একবারও দেখিনি। কারো মুখে না। আয়নায় তো নাই ই।

তানভীর পরিচয় করিয়ে দিলো, ইনি বিখ্যাত লেখক। মেয়েটা হাত মেলালো না, মাথাও নোয়ালো না। শুধু বলল, এইখানে কেউ বিখ্যাত না। খিদা লাগলে রান্নাঘরে খিচুড়ি আছে।

নাম জিজ্ঞেস করলে বললো, রোদ।

আসল নাম?

যেইটা কইলাম, সেইটাই আসল। বাপ মায়ের দেওয়াটা পুরান ঠিকানার মতো। চিঠি আর ওইখানে যায় না।

আমি হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, ফাঁ প র। শহরে এই বয়সী মেয়েরা কর্পোরেট চাকরি করে, আর এরা ফুল গুঁজে দর্শন কপচায়। রাতে খাওয়ার পর উঠানে আগুন জ্বলল। কেউ দোতারা আনলো, কেউ মাটির খোল। আমি একটু দূরে বসে নিজের বোতল খুললাম। কেউ আড়চোখে তাকালো না, কেউ বাহবাও দিলো না। এই প্রথম টের পেলাম, আমি এমন এক জায়গায় আসছি যেখানে আমার নেশাটাও কারো কাছে খবর না। ব্যাপারটায় আরাম পাবো না অপমানিত হবো, বুঝলাম না।

রোদ আগুনের ওপাশ থেকে উঠে এসে আমার পাশে বসল। বলল, আপনে সারাক্ষণ সবাইরে মাপতেছেন ক্যান?

মানে?

আসার পর থেইকা দেখতেছি। চোখ দিয়া সবার দাম ঠিক করতেছেন। এইটা শহরের রোগ। ওইখানে মানুষ দেখলেই আগে হিসাব করে, এর কাছ থেইকা কী পাওয়া যাইবো, একে কতটুকু বিশ্বাস করা যাইবো। আমরা এই হিসাবটা ছাইড়া দিছি। ছাড়ার পর দেখি, দিনে চাইর পাঁচ ঘণ্টা সময় বাঁইচা যায়।

আমি বললাম, এই যে তোমরা সমাজ ছাইড়া পালাইলা, এইটা কি এক ধরনের হার না?

রোদ আগুনের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর যেটা বলল, সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।


উনিশশো সাতষট্টি সাল। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরের হেইট অ্যাশবেরি নামের এক পাড়ায় এক লাখ তরুণ তরুণী জড়ো হইছিলো এক গ্রীষ্মে। ইতিহাসে ওই গ্রীষ্মের নাম সামার অব লাভ। ভালোবাসার গ্রীষ্ম। এরা কারা? এরা ওই দেশের সবচেয়ে ভাগ্যবান পোলাপান। সবচেয়ে ধনী দেশের, সবচেয়ে সুখী সময়ের সন্তান। বাপের গাড়ি আছে, ভবিষ্যতে ব্যাংকের চাকরি আছে। সব ফালাইয়া এরা রাস্তায় নামলো ক্যান, কন তো?
জানি না।

কারণ সরকার তাগো ভাইদের ধইরা ধইরা ভিয়েতনামের যুদ্ধে পাঠাইতেছিলো। মরতে। যেই যুদ্ধের মানে কেউ জানে না। পোলাপানগুলা বুঝলো, যেই সিস্টেম আমারে গাড়ি বাড়ি দিতেছে, সেই একই সিস্টেম আমার ভাইরে কফিনে ভইরা ফেরত পাঠাইতেছে। তখন তারা ঠিক করলো, এই খেলায় আমরা নাই। তারা বন্দুকের নলের ভিতরে ফুল ঢুকাইয়া দিলো। মিছিলে সৈন্যের বেয়নেটের সামনে খাড়াইয়া এক মেয়ে ফুল ধরলো, সেই ছবি সারা দুনিয়ায় ছড়ায়া গেলো। মানুষ তাগো নাম দিলো ফ্লাওয়ার চিলড্রেন। ফুলের মানুষ। এখন আপনেই কন, বন্দুকের সামনে ফুল নিয়া খাড়ানি হাইরা যাওয়া, নাকি বন্দুকের লাইনে চুপচাপ খাড়ায়া থাকা হাইরা যাওয়া?

আমি উত্তর দিতে পারলাম না। বোতলে আরেকটা চুমুক দিলাম। রোদ উঠে গিয়ে আবার গানের দলে মিশে গেলো। আর আমি টের পেলাম, আমার ভিতরে কোথায় যেন একটা পুরনো দেয়ালে চিড় ধরার শব্দ হলো।

পরদিন থেকে আমি রোদের পিছে পিছে ঘুরতে লাগলাম। লেখক হিসেবে নোট নিচ্ছি, এই অজুহাতে। রোদ সবজি বাগানে কাজ করে, আমি পাশে বসে থাকি। রোদ বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখায়, আমি দূর থেকে দেখি। নিজেকে বোঝাই, এইটা রিসার্চ। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গেলে বুঝি, চল্লিশ বছর বয়সে এই প্রথম আমার রিসার্চের বিষয়ের গলার স্বর না শুনলে বুক খালি খালি লাগে। শরীরে মদ না পড়লে যেমন লাগে, তার চেয়েও খারাপ। এই তুলনাটা যে করতে পারলাম, এতেই বোঝেন অবস্থা কই গেছে। আমি প্রেমে পড়ছি। পাগলের মতো, কিশোরের মতো, হাবুডুবু খেয়ে।

রোদের কাছ থেকেই জানলাম, ও অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা মেয়ে। মাল্টিন্যাশনালে চাকরি করতো। একদিন অফিসের চেয়ারে বসে হিসাব করে দেখলো, বেতনের টাকায় সে যা যা কিনতেছে, তার সবগুলাই আসলে ওই চাকরিটা করার ক্ষতিপূরণ। দামি জামা কিনতেছে অফিসে পরার জন্য। দামি রেস্টুরেন্টে খাইতেছে অফিসের ক্লান্তি ভুলতে। দামি ছুটিতে যাইতেছে অফিস থেইকা পালাইতে। ও বলল, বুঝলেন, আমি বেতন দিয়া আসলে ওষুধ কিনতেছিলাম, আর অসুখটার নাম ওই বেতন।

এই মেয়ের সাথে তর্কে পারা মুশকিল। আমি তবু চেষ্টা করতাম। একদিন বললাম, তোমাদের এই হিপ্পি ব্যাপারটা তো পুরাটাই বিদেশি জিনিস। আমদানি করা দর্শন।

রোদ এমনভাবে হাসলো, যেন আমি খুব মজার একটা ভুল করছি। বলল, উল্টা। জিনিসটা ওরাই আমাগো কাছ থেইকা নিছে। ষাটের দশকে অ্যালেন গিন্সবার্গ নামে এক আমেরিকান কবি বছর দেড়েক পইড়া ছিলেন কলকাতা আর বেনারসে। বাউল ফকিরগো লগে ঘুরছেন, শ্মশানে রাইত কাটাইছেন। দেশে ফিরা উনি আর উনার বন্ধুরাই হিপ্পিগো গুরু হইলেন। বিটলসের কথা তো জানেনই, আটষট্টি সালে পুরা ব্যান্ড ভারতে আইসা ঋষিকেশে আশ্রমে উঠলো, ধ্যান শিখতে। আর লন্ডন থেইকা ইস্তাম্বুল, তেহরান, কাবুল হইয়া কাঠমান্ডু পর্যন্ত একটা রাস্তা চালু হইলো, রঙচঙা বাসে কইরা হাজার হাজার তরুণ তরুণী পূবের দিকে আসতো। ইতিহাসে ওই রাস্তার নাম হিপ্পি ট্রেইল। কাঠমান্ডুতে যেই গলিতে তারা থাকতো, সেই গলির নাম হয়া গেলো ফ্রিক স্ট্রিট। পাগলগো রাস্তা। ভাইবা দেখেন, দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী দেশগুলার পোলাপান সব ছাইড়া ছুইড়া আমাগো এই গরিব পূব দিকে আসতো। কী খুঁজতে আসতো? যেই জিনিস ডলারে কিনতে পাওয়া যায় না, সেইটা।

আর সবচেয়ে বড় কথাটা কী জানেন? রোদের গলা নরম হয়ে এলো। একাত্তরে যখন আমরা মরতেছি, শরণার্থী হয়া ভাসতেছি, তখন দুনিয়ার কোন মানুষগুলা সবার আগে আগায়া আসছিলো? এই হিপ্পিরাই। গিন্সবার্গ নিজে যশোর রোডে আইসা শরণার্থীগো লাইন দেইখা কবিতা লেখলেন, সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। আর জর্জ হ্যারিসন, রবিশঙ্করের ডাকে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট করলেন, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। ইতিহাসের প্রথম বড় চ্যারিটি কনসার্ট, আর সেইটা হইছিলো আমাগো নামে। চল্লিশ হাজার মানুষ টিকেট কাটছিলো আমাগো শরণার্থীগো জন্য। যেই ফুলের মানুষগুলারে আপনে অলস কন, আমাগো সবচেয়ে খারাপ দিনে তারাই আমাগো নাম দুনিয়ারে চিনাইছিলো।

আমি চুপ করে রইলাম। আমার লজ্জা লাগছিলো। লেখক মানুষ, অথচ এই ইতিহাস আমি এইভাবে কোনোদিন ভাবিনি।

আরেকদিন জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, লালন ফকিরের নাম তো তোমরা খুব নেও। উনার সাথে এইসবের সম্পর্ক কী?

রোদ বললো, সম্পর্ক না, উনিই তো আদি। হিপ্পিরা যা করছে ষাট সালে, আমাগো বাউল ফকিররা তা করছে তারও দুইশো বছর আগে। জাত মানে না, সম্পত্তি জমায় না, একতারা নিয়া পথে পথে ঘোরে, আখড়ায় দল বাইন্ধা থাকে, আর গানরে বানাইছে প্রতিবাদের ভাষা। সমাজ তাগো পাগল কইছে, ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়া ভাঙছে, তবু তারা থামে নাই। উডস্টকের কথা শুনছেন? উনসত্তর সালে এক খামারে পাঁচ লাখ মানুষ তিনদিন ধইরা গান শুনছিলো, বৃষ্টিতে ভিজা, কাদায় মাখামাখি হইয়া, একটাও মারামারি হয় নাই। সবাই কয় অলৌকিক ঘটনা। আর আমাগো কুষ্টিয়ায় দেড়শো বছর ধইরা দোলপূর্ণিমায় লাখ মানুষের সাধুসঙ্গ হয়, কেউ খবরও রাখে না। আসলে কী জানেন, দুনিয়ার সব জায়গায়, সব যুগে, কিছু মানুষ থাকে যারা দৌড়াইতে রাজি না। তারা হাঁটে। আর হাঁটে বইলা তারাই একমাত্র রাস্তার ফুলগুলা দেখতে পায়।

এইসব শুনতে শুনতে আমার দিন কাটতে লাগলো। বোতলটার কথা মাঝে মাঝে মনেই থাকতো না। ব্যাপারটা আমি রোদকে বলিনি। বললে বলতো, দেখছেন, নেশা জিনিসটা আসলে শূন্যস্থান পূরণ। জায়গা ভরা থাকলে নেশার জায়গা হয় না। এই মেয়ের সমস্যা হলো, ওর সব কথাই ঠিক হয়। আর যেই মানুষের সব কথা ঠিক হয়, তার প্রেমে না পইড়া উপায় থাকে না।

পূর্ণিমার রাতে ওদের বড় আসর বসলো। মশাল, দোতারা, খোল, আর গলায় গলায় লালন। আমি সেই রাতে একটা অদ্ভুত জিনিস টের পেলাম। গানের মাঝখানে হঠাৎ মনে হলো, সময় জিনিসটা থেমে গেছে। ঘড়ি নাই বলে না। ভিতরের যেই ঘড়িটা সারাক্ষণ বলে, দেরি হয়া যাইতেছে, দৌড়া, সেই ঘড়িটা থেমে গেছে। আমার মনে হলো, আমি আমার মৃত মায়ের রান্নাঘরে বসে আছি। মনে হলো, আমি ক্লাস সেভেনের সেই দুপুরে ফিরে গেছি, যেদিন প্রথম কবিতা লিখে মনে হয়েছিলো, আমার হাতে জাদু আছে। আমার চোখ ভিজে উঠলো, এবং লুকানোর জন্য আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চাঁদটাও কেমন টলটল করছিলো। ঘোর। শব্দটার মানে আমি সেই রাতে প্রথম বুঝলাম। নেশায় যেই ঘোর হয়, এইটা সেই ঘোর না। ওইটা ভুলে থাকার ঘোর, এইটা মনে পড়ার।

সেই রাতেই, আসর ভাঙার পর, ঝর্নার পাড়ে আমি রোদকে বললাম কথাটা। চল্লিশ বছর বয়সী মানুষ, দুই হাত কাঁপছে কিশোরের মতো। বললাম, আমার সাথে ঢাকা চলো। বিয়া করি। তুমি ছবি আঁকবা, আমি লেখবো।

রোদ অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওর চোখে করুণা না, বিরক্তি না, অন্য কিছু একটা। তারপর বলল, আপনে আমারে ভালোবাসেন, না আমার এই থাকাটারে ভালোবাসেন?
মানে?

আপনে ঢাকায় আমারে নিতে চান ক্যান জানেন? যেমনে মানুষ পাহাড় থেইকা ঝর্নার পানি বোতলে ভইরা নিয়া যায়। বাসায় গিয়া খুইলা দেখে, এইটা তো সাধারণ পানি। ঝর্নাটা আসলে পানি না। ঝর্নাটা হইলো পাহাড়, গাছ, পাথর, আর নামতে থাকা। আমারে এই জায়গা থেইকা তুইলা নিলে যেইটা পড়ে থাকবো, সেইটা আমি না।

আমি বললাম, তাইলে আমিই এইখানে থাইকা যাই?

সে মাথা নাড়লো। আপনেও পারবেন না। আপনের নেশা খালি বোতলে না, আপনের নেশা দুঃখে। আপনে দুঃখ দিয়া লেখেন। এইখানে থাকলে আপনের দুঃখগুলা শুকায়া যাইবো, আর আপনে আমারে দোষ দিবেন। ভালোবাসা মুঠায় ধরার জিনিস না, লেখক সাহেব। বাতাস মুঠায় ধরলে হাতে কী থাকে? ঘাম।

তারপর সে যা বললো, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বললো, আমি পরশু রওনা দিতেছি। পুরানা রাস্তাটায়। বাসে কইরা, ট্রাকে কইরা, হাঁইটা। নেপাল, কাঠমান্ডু, ফ্রিক স্ট্রিট। যেই রাস্তায় পঞ্চাশ বছর আগে ফুলের মানুষরা হাঁটছে, আমি উল্টাদিক থেইকা হাঁটুম। দেখতে চাই, রাস্তাটার ফুল এখনো ফোটে কি না।

যাওয়ার দিন ভোরে সে আমার হাতে একটা শুকনা ফুল দিলো। চুলে গোঁজা ফুলগুলার একটা। বলল, মন খারাপ কইরেন না। হিপ্পিগো একটা কথা আছে। যারে ভালোবাসো, তারে ছাইড়া দাও। ফিরা আসলে বুঝবা সে তোমারই আছিলো।

আর ফিরা না আসলে?

রোদ হাসলো। সেই নির্ভার হাসি। বলল, না ফিরলে বুঝবেন, সে আসলে একটা রাস্তা আছিলো, ঠিকানা না। রাস্তার কাম পৌঁছানো না, হাঁটানো।

আমি ঢাকায় ফিরলাম। জ্যামে বসে থাকি, মিটিং করি, মাস শেষে বিল দেই। সবই আগের মতো। খালি একটা জিনিস বদলাইছে। আমি এখন লিখি। রোজ ভোরে উঠে লিখি। ছয় মাসে যেই উপন্যাসটা দাঁড়ালো, প্রকাশক পড়ে ফোন দিয়ে বললেন, এইবার হইছে। প্রাণ আইছে। কই পাইলেন?

আমি বললাম, কিনি নাই। একজন এমনি দিছে।

বোতলটা এখনো আছে। মাঝে মাঝে খুলি। তবে আগের মতো শূন্যস্থান ভরতে না, পুরান বন্ধুর সাথে দেখা করার মতো করে। আর আমার লেখার টেবিলে, বইয়ের ভাঁজে, সেই শুকনা ফুলটা রাখা। মাঝে মাঝে রাত জেগে লিখতে লিখতে মনে হয়, ঘরে বুনো ফুলের গন্ধ। জানি, শুকনা ফুলের গন্ধ থাকে না। তবু পাই।

গত সপ্তাহে ডাকবাক্সে একটা পোস্টকার্ড পাইলাম। কাঠমান্ডুর ছবি। প্রেরকের নাম নাই, ঠিকানা নাই। পিছনে খালি এক লাইন লেখা।

রাস্তার ফুল এখনো ফোটে।

আমি পোস্টকার্ডটা বুকপকেটে নিয়ে সারাদিন অফিস করলাম। কেউ টের পাইলো না, জ্যামে আটকা পড়া এই শহরের ভিতর দিয়ে একটা লোক সারাদিন হেঁটে বেড়াইলো কাঠমান্ডুর রাস্তায়, চুলে ফুল গুঁজে।  

 
১৮/৭/২০২৬

পানকৌড়ি ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

যেদিন আমি মরে গেলাম, সেদিন ভোরে মিতু ভাত খেতে চেয়েছিল।
ভাত ছিল না। আগের রাতের দুইটা শক্ত রুটি ছিল। পানিতে ভিজিয়ে নরম করে দিলাম। ও খেলো। খেয়ে জিজ্ঞেস করল, মা, তুমি খাবা না?
বললাম, আমার পেট ভরা।
মায়েদের পেট কীভাবে ভরে, এই রহস্য মিতু বড় হয়ে বুঝবে। এখন ওর বয়স পাঁচ।
আমার বয়স উনত্রিশ। এই বয়সেই আমি একবার বউ হয়েছি, একবার মা হয়েছি, একবার ডিভোর্সি হয়েছি। আর একবার মরে গেছি। সবগুলোর গল্প আজ বলব। ধৈর্য ধরে শোনেন।
উনিশ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্টও তখন বের হয়নি। বাবা বলেছিলেন, মাইয়া মানুষের রেজাল্ট দিয়া কী হইব! ঘর হইলেই হইল। পাত্র রাশেদ। ইলেকট্রিকের দোকান আছে নবাবপুরে। ফর্সা, লম্বা। দেখতে আসার দিন আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। ওই একটা হাসি দেখে আমি ভেবেছিলাম, মানুষটা ভালো।
উনিশ বছর বয়সে মেয়েরা হাসি দেখে মানুষ চেনে। চিনতে ভুল করে।
প্রথম প্রথম রাশেদ ভালোই ছিল। রাতে ঘরে ফিরে আমার ভেজা চুলের গন্ধ নিত। বলত, তোর চুলে নদীর গন্ধ। আমি লজ্জা পেতাম। কুপির আলোয় আমাদের ছায়া এক হয়ে যেত দেয়ালে। ওর বুকের ভেতর আমি টের পেতাম একটা নদী, জোয়ারে ফুলে উঠছে। আমার শরীর তখন পলিমাটি। যা বুনে দেওয়া হতো, তাই ফলাতে চাইত।
মিতু এলো দুই বছরের মাথায়।
মেয়ে হয়েছে শুনে রাশেদ হাসপাতালে আসেনি। এসেছিল তার মা। নাক কুঁচকে বলেছিলেন, প্রথমটাই মাইয়া। কপাল।
সেদিন থেকেই সংসারটা বদলাতে শুরু করল। নাকি রাশেদ বদলাল। নাকি ও এরকমই ছিল, শুধু আমার চোখে পড়েনি।
রাশেদের বাবাকে আমি দেখেছি মাত্র কয়েকবার। মুখ ভর্তি পান, চোখে সবসময় একটা বিরক্তি। শাশুড়ি বাঁ কানে উনি কম শুনতেন। কেন, সেটা একদিন ননদের কাছে শুনেছি। রাশেদের বয়স যখন সাত, ওর বাবা ভাত ঠান্ডা হওয়ার অপরাধে ওর মাকে কানের ওপর মেরেছিলেন। ছেলেরা দেখেছে। কেউ কাঁদেনি। কাঁদলে বাপ বলতেন, মাইয়াগো লাহান কান্দস ক্যা?
রাশেদ বড় হয়েছে এই পাঠশালায়। ওর কাছে সংসার মানে একটা দোকান। বউ মানে কর্মচারী। বেতনের বদলে ভাত পায়। আর ভুল করলে হাত ওঠে। আমি ওকে এখন আর পুরোপুরি দোষ দিই না। মানুষ যা দেখে বড় হয়, তাই হয়ে ওঠে। কিন্তু দোষ না দেওয়া এক কথা আর মাফ করা আরেক কথা। মাফ আমি করিনি।
প্রথম চড়টা খেয়েছিলাম মিতুর ছয় মাস বয়সে। তরকারিতে লবণ বেশি হয়েছিল। চড় খেয়ে আমি এতই অবাক হয়েছিলাম যে কাঁদতেও ভুলে গেছি। রাশেদ ভাত খেতে খেতে বলল, মায়ে ঠিকই কইছিল। শিক্ষিত মাইয়া আনলে সংসার হয় না।
তারপর চড় ব্যাপারটা লবণের মতোই রোজকার অভ্যাসে পরিণত হলো।
বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনতে বলত। বাবা রিটায়ার্ড মানুষ, কোথায় পাবে? না আনলে বলত, খানকির ঘরের খানকি, বইসা বইসা আমার ভাত গিলস, বাপের কাছ থেইকা দুইটা টাকা আনতে পারস না? আমি মিতুর কান চেপে ধরতাম। যেন গালিটা মেয়েটার ভেতরে ঢুকতে না পারে। এখন বুঝি, লাভ হয়নি। এই দেশে মেয়েদের কানে এসব ঢোকে বাতাসের সাথে।
শেষ দিনটার কথা বলি।
মিতুর তখন সাড়ে তিন বছর। রাশেদ সেদিন দোকানের ক্যাশ থেকে টাকা হারিয়ে ফিরেছে। রাগটা ঝাড়ল আমার চুলে। মুঠি পেঁচিয়ে ধরে টানতে টানতে বলল, ক, টাকা তোর বাপে নিছে? আমার সেই চুল, যাতে ও একদিন নদীর গন্ধ পেত। মিতু দৌড়ে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরল। রাশেদ এক ঝটকায় মেয়েটাকে ছুড়ে ফেলল। মিতুর কপাল গিয়ে লাগল চৌকির কোনায়।
রক্ত আমি অনেক দেখেছি। নিজের ঠোঁটের। নিজের নাকের। কিন্তু মেয়ের কপালের রক্ত দেখে আমার ভেতরে কী যেন ছিঁড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। রাশেদের চোখে চোখ রেখে বললাম, আর না।
কাবিননামার আঠারো নম্বর ঘরে আমার তালাকের অধিকার লেখা ছিল। বিয়ের রাতে কাজি সাহেব পড়ে শুনিয়েছিলেন। কেউ শোনেনি। আমি শুনেছিলাম। ওই এক লাইনের জোরে আমি বের হয়ে এলাম। রাশেদ ভাবেনি আমি পারব। মহল্লার কেউ ভাবেনি। আমি নিজেও কি ভেবেছিলাম?
লোকে বলে ডিভোর্স দিলে মেয়েদের সব শেষ। মিথ্যা কথা। ডিভোর্সের পর মেয়েদের সব শুরু। যুদ্ধটা শুরু।
প্রথমে গেলাম বাপের বাড়ি। মা দরজা খুলে প্রথম যে কথাটা বললেন, তা হলো, মাইনষে কী কইব?
মানুষ। এই দেশে মায়ের চেয়ে মানুষ বড়, মেয়ের চেয়ে মানুষ বড়।
ভাইয়ের সংসার তখন টানাটানির। ভাবি খারাপ মানুষ না, কিন্তু চার কেজি চালের হাঁড়িতে ছয়জনের ভাত হয় না। আমি বুঝতাম। রাতে শুনতাম ভাবি ভাইকে বলছে, বইনরে কিছু কও না ক্যা? বাবা সারাদিন উঠানে বসে থাকতেন। আমার দিকে তাকাতেন না। ওনার চোখে আমি মেয়ে না, আমি একটা প্রশ্ন। পাড়ার লোকে যে প্রশ্নটা করে, ওই মাইয়া ঘরে বইয়া রইছে ক্যা?
দুই মাসের মাথায় মা একটা সম্বন্ধ আনলেন। পঞ্চান্ন বছরের এক ব্যবসায়ী। আগের বউ মরেছ। চার ছেলেমেয়ে। মা বললেন, মাইয়া লইয়া সংসার করব। রাজি হইছে। এর চাইতে ভালো আর কী পাবি?
আমি সেই রাতে মিতুকে বুকে নিয়ে ভাবলাম। আমার দাম চুকিয়ে দিয়েছে এই সমাজ। ডিভোর্সি, এক বাচ্চার মা। বাজারে আমার দর পঞ্চান্ন বছরের দোজবরে। আমি রাজি হলাম না। মা কাঁদলেন। গালি দিলেন। আবার কাঁদলেন। আমি মিতুর হাত ধরে ঢাকায় চলে এলাম। সঙ্গে একটা টিনের বাক্স আর কানের দুল জোড়া।
মা-বাবাকে আমি ঘেন্না করি না। ওনারা নিষ্ঠুর না, ওনারা ভীতু। এই সমাজে গরিবের ভয়টাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। ওইটা দিয়েই তারা বেঁচে থাকে।
ঢাকা শহর একলা মেয়েদের জন্য একটা পরীক্ষার হল। প্রশ্ন কমন পড়ে না। আর পাস করলেও কেউ সার্টিফিকেট দেয় না।
বাসা ভাড়া নিতে গেলাম। বাড়িওয়ালা প্রথম প্রশ্ন করল, সাথে পুরুষ মানুষ কে আছে? বললাম, কেউ না। মুখের ওপর বলে দিল, একলা মাইয়া মানুষরে ভাড়া দিই না। ঝামেলা হয়। তিন বাড়ি ঘুরে চতুর্থ বাড়িওয়ালা রাজি হলো। ভাড়া পাঁচশো বেশি। একলা মেয়ের ট্যাক্স।
চাকরি নিলাম একটা কাপড়ের শোরুমে, সেলসগার্ল। ম্যানেজার সাহেব মাসের পনেরো তারিখে বেতনের অ্যাডভান্স দিতে চাইতেন। শুধু আমাকেই। টাকাটা হাতে দেওয়ার সময় আমার হাতের ওপর এমনভাবে রাখতেন, যাতে আঙুলগুলোর স্পর্শ একটু বেশিক্ষণ থাকে। আমি অ্যাডভান্স নেওয়া ছেড়ে দিলাম। বদলে খবর পেলাম, ম্যানেজার সাব নালিশ করেছেন, মেয়েটার ব্যবহার ভালো না।
বাসে অফিস যেতাম। ভিড়ের মধ্যে পেছন থেকে ভেসে আসা হাতগুলোর কোনো চেহারা থাকে না। ঘুরে তাকালে প্রতিটি মুখই দেবদূতের মতো নিরীহ। একদিন একটা হাত শক্ত করে মুচড়ে ধরেছিলাম। লোকটা উল্টো চেঁচিয়ে উঠল, "কী খারাপ মহিলা রে বাবা!" বাসশুদ্ধ মানুষ তখন আমার দিকেই তাকিয়ে দেখল। খারাপ মহিলা। যে মেয়ে প্রতিবাদ করে, তার নামই খারাপ মহিলা।
মিতুকে স্কুলে ভর্তি করাতে গেলাম। ফর্মে লেখা, পিতার নাম, পিতার পেশা, পিতার স্বাক্ষর। মায়ের জন্য বরাদ্দ মোটে আধখানা লাইন। অফিসের লোকটা বলল, বাপ ছাড়া ভর্তি হইব না, গার্জিয়ান লাগব। আমি বললাম, আমি গার্জিয়ান। লোকটা এমনভাবে হাসল, যেন আমি সস্তা রসিকতা করছি।
পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রলো। বয়স চল্লিশের আশেপাশে। বউ থাকে গ্রামে। রাত এগারোটায় দরজায় টোকা দিতেন। ভাবি, একটু ম্যাচটা দিয়েন তো। ম্যাচ, লবণ, মোবাইলের চার্জার। একলা মেয়ের ঘর মানে মহল্লার মিনি মুদি দোকান, যখন খুশি টোকা দাও। একদিন দরজা না খুলে বললাম, দোকান বন্ধ। এরপর উনি রটিয়ে দিলেন, মহিলার চরিত্র ভালো না। রাইতে ঘরে পুরুষ ঢোকে।
চরিত্র। এই শব্দটা এই দেশে শুধু মেয়েদের শরীরে গজায়।
এর মধ্যে রাশেদ দুইবার এসেছিল। প্রথমবার এসে বলল, ভুল হইছে। ফিরা আয়। আমি বললাম, মিতুর খরচ পাঠাও, দেনমোহর দাও। ফিরতে বোলো না। দ্বিতীয়বার এসে আর নরম গলার মানুষটা রইল না। হিংস্র চোখে দাঁত চেপে বলল, “একলা থাকস, দুই পয়সা কামাই করস দেইখা নিজেকে অনেক বড় নবাবজাদী ভাবস, না? দুই দিন পরে ফুটপাতে বইসা ভিক্ষা করবি, মাগী। তখন দেখুম তোর কত দেমাগ!”
আমি দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। দেমাগ শব্দটা আমার ভালো লেগেছিল। গরিব একলা মেয়ের আত্মসম্মানকে এই দেশে দেমাগ বলে ডাকা হয়।
মিতু রাতে ঘুমানোর আগে গল্প শুনতে চায়। আমি ওকে আমার নানির গল্পটা বলি। নানি বলতেন পানকৌড়ির গল্প।
এক ছিল পানকৌড়ি পাখি। কালো, রোগা, গলা লম্বা। হাঁসেরা তাকে দেখে হাসত। বলত, তোর তো তেলই নাই পাখায়, তুই ভিজস, তুই ডুবস। একদিন বড় ঝড় উঠল বিলে। হাঁসেরা পাড়ে উঠে গেল। পানকৌড়ি ডুব দিল। এক ডুব, দুই ডুব। অনেকক্ষণ আর উঠল না। সবাই বলল, মরছে। শোল মাছটা পর্যন্ত বলল, মরছে। কিন্তু নানি এই জায়গায় এসে থামতেন। বলতেন, শোন, পানকৌড়ি ডুবে না। পানকৌড়ি ডুব দেয়। ডুব আর ডুবার মধ্যে ফারাক আছে। যে ডুব দেয়, সে ভেসে ওঠার জন্যই ডুব দেয়।
মিতু জিজ্ঞেস করে, তারপর?
তারপর ঝড় থামল। পানকৌড়ি ভেসে উঠল। ঠোঁটে একটা মাছ।
এই গল্পটা আমি মিতুকে শোনাতাম। আসলে নিজেকে শোনাতাম।
তারপর এলো সেই মাস। যে মাসে আমি মরে গেলাম।
মিতুর টাইফয়েড ধরা পড়ল। ডাক্তার, টেস্ট, ওষুধ। জমানো টাকা গেল। শোরুম থেকে ছুটি নিতে হলো বলে বেতন কাটা গেল। মাসের দশ তারিখে বাড়িওয়ালা এসে দাঁড়াল, ভাড়া না দিলে ঘর ছাড়েন। স্কুলে ভর্তির শেষ তারিখ পনেরো তারিখ, লাগবে তিন হাজার টাকা। আমার হাতে তখন সাতশো বিশ টাকা।
রাশেদকে ফোন দিলাম। জীবনে প্রথমবার নিজে থেকে। মেয়ের অসুখের কথা বললাম। ও শুনল। তারপর শান্ত গলায় বলল, টাকা লাগলে ঘরে ফিরা আয়। পায়ে ধইরা মাফ চাবি, টাকাও পাবি, ঘরও পাবি। আমি ফোন কেটে দিলাম। ওর কাছে আমার দরকারটাই ছিল শেষ জুয়ার দান। মেয়ের অসুখ দিয়ে ও বাজি ধরল।
মাকে ফোন দিলাম। মা লুকিয়ে বিকাশে দুইশো টাকা পাঠালেন। সাথে একটা কথা, তোর বাপরে কইস না। দুইশো টাকা আর একটা নিষেধ। আমার মায়ের সাধ্য এইটুকুই।
চৌদ্দ তারিখ রাতে মিতুর জ্বরটা নামল। মেয়েটা ঘুমাল। আমি বারান্দায় বসে রইলাম। হিসাব মেলালাম। ভাড়া, ভর্তি, ওষুধ, দোকানের বাকি। সব যোগ করলে যা হয়, আমার সারা শরীর বেচলেও তা হয় না। মাথার ভেতর রাশেদের গলা, ফুটপাতে বইসা ভিক্ষা করবি। বাড়িওয়ালার গলা, ঘর ছাড়েন। ম্যানেজারের আঙুল। বাসের হাত। ফর্মের লেখা, পিতার নাম।
আমি মিতুকে পাশের ঘরের রিনা ভাবির কাছে রেখে বের হলাম। বললাম, একটু আসতেছি। রাত তখন এগারোটা।
হাঁটতে হাঁটতে বুড়িগঙ্গার ঘাটে চলে গেলাম। কেন গেলাম, জিজ্ঞেস করবেন না। ওই রাতে আমার ভেতরে যুক্তি বলে কিছু ছিল না। ছিল শুধু ক্লান্তি। এমন ক্লান্তি, যা ঘুমে যায় না। আমি ঘাটের সিঁড়িতে বসলাম। নদীটা ডাকছিল। অন্ধকার পানি বড় নরম গলায় ডাকে। বলে, আয়, আর হিসাব মেলাতে হবে না।
আমার স্যান্ডেল জোড়া সিঁড়িতেই খুলে রেখেছিলাম। এক পা, দুই পা করে পানিতে নেমেছিলাম। এইটুকুই বলব। এর বেশি বলার সাহস আমার আজও নেই।
শুধু বলি, ঠিক তখন নানির গলাটা শুনলাম। পানকৌড়ি ডুবে না। পানকৌড়ি ডুব দেয়।
আর শুনলাম মিতুর নিঃশ্বাস। জ্বর ছাড়ার পর মেয়েটা যখন ঘুমায়, ওর নিঃশ্বাসে একটা শব্দ হয়। খুব মিহি। ওই শব্দটা আমি নদীর ডাকের ভেতরেও শুনতে পেলাম। মায়ের কান বলে কথা।
আমি উঠে এলাম। ভেজা শাড়িতে সারারাত হাঁটলাম। শহরটাকে ওই প্রথম দেখলাম ভয় ছাড়া। ভোরের আজানের পর চাঁদনি চকের পেছনের গলিতে গেলাম। ওখানে চুল কেনে। মেয়েদের লম্বা চুল, পরচুলার কারবারিরা ওজন দরে নেয়।`


আমার চুল ছিল কোমর ছাড়ানো। যে চুলে রাশেদ নদীর গন্ধ পেত। যে চুল মুঠি পেঁচিয়ে ও আমাকে শিখিয়েছিল, ভালোবাসা আর দখলদারি এক জিনিস না। কারবারি কাঁচি চালানোর আগে জিজ্ঞেস করল, মন খারাপ হইব না তো আফা? আমি বললাম, কাটেন। মাথাটা হালকা হইলে বাঁচি।
কাঁচির শব্দটা আমার কানে আজও লেগে আছে। মুক্তির শব্দ কারো কাছে শিকল ভাঙার, আমার কাছে কাঁচির।
চুল বেচে পেলাম চার হাজার দুইশো টাকা।
ফিরে দেখি বাসার সামনে ভিড়। রিনা ভাবি উঠানে বসে বিলাপ করছে। ঘাটে নাকি আমার স্যান্ডেল পাওয়া গেছে। কে যেন রাতে আমাকে নদীর দিকে যেতে দেখেছে। মহল্লা রায় দিয়ে ফেলেছে, ডিভোর্সি মাইয়া। আর কত সহ্য করব। গলায় দড়ি না দিয়া পানিতেই গেছে। খবর পেয়ে রাশেদও এসে হাজির। উঠানে দাঁড়িয়ে গলা কাঁপিয়ে বলছে, আহারে, কতবার কইছি ফিরা আয়। শোকটা ওর মুখে মানাচ্ছিল না। মরা বউয়ের জন্য কাঁদলে সমাজে দর বাড়ে, ও জানে।
আমি ভিড় ঠেলে ঢুকলাম। খালি পা, ভেজা শাড়ি, ছেলেদের মতো ছোট চুল, হাতে খামে মোড়ানো কিছু টাকা।
সবাই এমনভাবে তাকাল, যেন ভূত দেখছে। ঠিকই দেখছিল। যে শিউলি কাল রাতে ঘাটে গিয়েছিল, সে তো আর ফেরেনি। ফিরেছি আমি। এই আমাকে ওরা চেনে না।
রিনা ভাবি কেঁদে জড়িয়ে ধরল। মিতু দৌড়ে এসে আমার ছোট চুলে হাত বুলিয়ে বলল, মা, তোমারে পাখির মতো লাগতেছে।
আমি বললাম, হ রে মা। পানকৌড়ি।
রাশেদ আগায় আসছিল। আমি হাত তুলে থামালাম। সারা মহল্লার সামনে শুধু বললাম, আমার মেয়ের জন্য কাঁদার লোক আছে। তুমি আসতে পারো।
ও চলে গেল। মানুষটা গালির জবাব দিতে জানে, শান্ত গলার জবাব ওর জানা নেই।
পনেরো তারিখে মিতুকে স্কুলে ভর্তি করালাম। ফর্মের পিতার নামের ঘরটা ফাঁকা রেখে নিচে বড় করে লিখলাম নিজের নাম। অফিসের লোকটা কী যেন বলতে চাইল। আমি চোখ তুলে তাকালাম। লোকটা সিল মেরে দিল। শিখেছি, এই দেশে একলা মেয়ের সবচেয়ে বড় দলিল তার চোখের ভাষা।
বাড়িওয়ালার ভাড়া মিটিয়েছি। শোরুমের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি, ম্যানেজারের আঙুলের স্পর্শসহ। এখন দুই বাসায় রান্না করি। রাতে ব্লাউজ পেটিকোট সেলাই করি। মেশিনটা কিস্তিতে কেনা। আয় বেশি না। তবে এই টাকায় কারো আঙুলের দাগ নেই। গরিবি আমার কাটেনি। হয়তো কাটবেও না। কিন্তু গরিবি আর ভিক্ষা এক কথা না। রাশেদের কথাটা মিথ্যা হয়ে গেছে। আমি ফুটপাতে বসিনি। আমি উঠে দাঁড়িয়েছি।
চুল আবার বড় হচ্ছে। কাঁধ ছুঁয়েছে। এবার এই চুলের গন্ধ শুধু আমার।
শুক্রবার বিকালে মিতুকে নিয়ে সেই ঘাটে যাই। যে নদী আমাকে ডেকেছিল, তার সাথে এখন আমার অন্য সম্পর্ক। পাড়ের কাছে অল্প পানিতে নেমে আমি মেয়েকে সাঁতার শেখাই। নিজেও শিখি। উনত্রিশ বছর বয়সে শিখছি, ডোবা আর ডুব দেওয়ার ফারাক।
মিতু পানিতে হাত পা ছুড়ে হাসে। বলে, মা দেখো, আমি ভাসতেছি!
আমি ওর পিঠের নিচে হাত রাখি। বলি, ভয় নাই রে মা। ডুব দিবি, ভাসবি। তুই পানকৌড়ির মেয়ে।
লোকে এখনো মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, "ওই রাতে ঘাটে কী হইছিল আফা?" আমি হাসি। বলি, "কী আর হইব। একজন মরছে, একজন বাঁচছে। কোনজন কে, সেই হিসাব নদী জানে।"

শাঁখা ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার পকেটে একটা ভাঙা শাঁখা থাকে। সাদা, আধখানা, ধার উঠে যাওয়া। মাঝে মাঝে হাত ঢুকিয়ে ছুঁই। আঙুলে বিঁধে যায়। ব্যথাটা নিই ইচ্ছে করেই।
 
আমি রাশেদ। পাটুয়াটুলীতে মামার ওষুধের দোকানে বসতাম। প্রেশারের ট্যাবলেট, গ্যাসের ওষুধ, বাচ্চাদের সর্দির সিরাপ। এর বাইরে আমার কোনো পরিচয় ছিলো না। কবিতা লিখিনি কোনোদিন। গানও জানি না। ক্যাশবাক্স আর রাতের ভাত, এই নিয়ে আমার জীবন চলতো।

অপর্ণা প্রথম এসেছিলো আষাঢ় মাসে। বাবার প্রেশারের ওষুধ নিতে। শাঁখারীবাজারের মেয়ে। ভেজা ছাতা ভাঁজ করতে করতে বললো, "এমলোডিপিন ফাইভ আছে?"
ওষুধ দিলাম। পাঁচ টাকা ভাংতি ছিলো না। সে বললো, "কাল দিয়া যামু।"
কাল মানে যে সত্যিই কাল, তা জানতাম না। পরদিন ঠিক এল। পাঁচ টাকা কাউন্টারে রেখে চলে গেলো। আমি অনেকক্ষণ টাকাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মানুষের মন কীসে আটকায়, আগে জানতাম না। এখন জানি। মন আটকায় তুচ্ছ জিনিসে। একটা ফেরত দেওয়া ভাংতিতে। একটা ভেজা ছাতায়।

তারপর মাসে মাসে ওষুধ। এমলোডিপিন ফাইভ থেকে টেন হলো। তার বাবার শরীর নামছিলো। আর আমাদের বাড়ছিলো কথা। কোন কথা? কিছুই না। বৃষ্টি, লোডশেডিং, সদরঘাটের ভিড়। অথচ সেই কিছু না কথাগুলোর জন্য আমি সারাটা মাস অপেক্ষা করতাম। মাসের শেষ বৃহস্পতিবার এলে সকাল থেকে আয়নায় নিজেকে দেখতাম। সাধারণ একটা মুখ। এই মুখ নিয়ে কেউ স্বপ্ন দেখে না। তবু দেখতাম।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, "আপনাদের ওখানে সবাই শাঁখা বানায়?"
সে হাসলো। "বানাইতো। এখন অল্প কয় ঘর। আমার কাকায় বানায়। শাঁখারিগো একটা গল্প আছে, জানেন?"

গল্পটা সে বলেছিলো সেই বর্ষায়, দোকানের শেডের নিচে দাঁড়িয়ে। দক্ষিণের ঘাটে এক শাঁখারি এসেছিলো। পার্বতী তখন গরিব ঘরের বউয়ের ছদ্মবেশে। শাঁখারি তার হাতে শাঁখা পরিয়ে দিলো। দাম চাইলো না। বললো, তোমার স্বামী দেবে। মেয়েটির স্বামী শিব। ভিখারি শিব দাম দেবে কোথা থেকে? পরে জানা গেলো, শাঁখারি শিব নিজেই। নিজের মানুষকে শাঁখা পরাতে এসেছিলো। অন্য জাত সেজে।

"বুঝলেন?" অপর্ণা বলল। "ঠাকুরেরও নিজের মানুষের কাছে যাইতে ছদ্মবেশ লাগে।"
আমি কিছু বলিনি। শুধু বুঝেছিলাম, আমিও ছদ্মবেশে আছি। ক্রেতা আর দোকানদারের ছদ্মবেশ। এর আড়ালে যা আছে, তার নাম মুখে আনা যায় না। আনলে পাটুয়াটুলী থেকে শাঁখারীবাজার পর্যন্ত আগুন লেগে যাবে।

পূজার সময় সে নাড়ু আনতো কাগজে মুড়ে, চুপিচুপি। ঈদের পরদিন এসে বলতো, "সেমাই খাওয়াইলেন না?" আমি লজ্জা পেতাম। লজ্জাটাও ভালো লাগতো।
এভাবে এক বছর গেল। সে ওষুধ নিতে এসে দেরি করতো। স্ট্রিপগুলো একটা একটা করে গুনতো। যেন গোনার আর শেষ নেই। আমি ইচ্ছে করে ভাংতি রাখতাম না। যাতে আরেকবার আসতে হয়। দুজনেই জানতাম দুজনের চালাকি। কেউ ধরিয়ে দিতাম না। ভালোবাসার প্রথম ভাষাই বোধহয় এই। মুখে কিছু না বলে সময় চুরি করা।
সদরঘাটে এক ফকির বসতো। একতারা নিয়ে। লালনের গান গাইতো। এক সন্ধ্যায় আমরা দুজন অপরিচিত মানুষের মতো ভিড়ের মধ্যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শুনেছিলাম, "সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।" ফকির গাইছিলো আর হাসছিলো। যেন জাত জিনিসটা একটা পুরোনো ঠাট্টা, যেটা শুধু সে-ই ধরতে পেরেছে। অপর্ণা স্বগতোক্তি করলো, "জাতের চিহ্ন তো শরীরে নাই। তাইলে জাত থাকে কই?"
"মানুষের মুখে," আমি বললাম। "মানুষ ছাড়লে জাতও ছাড়ে।"

মানুষ ছাড়ে না। মানুষ নিজের অভ্যাসের বাইরে কিছু মানতে পারে না। যে যেভাবে ভাত খেয়ে বড় হয়েছে, সে ভাবে ওটাই ভাত খাওয়ার একমাত্র নিয়ম। ধর্ম নিয়ে মানুষের যতো না বিশ্বাস, তার চেয়ে বেশি অভ্যাস। আর অভ্যাসে টান পড়লে মানুষ খুনও করতে পারে।

বিমল কাকার সঙ্গে প্রথম দেখা সেবার পূজার মুখে। অপর্ণার সঙ্গেই দোকানে পা রেখেছিলেন। পাথরে খোদাই করা গম্ভীর মুখ আর কাঠের কাজে বাঁকা হয়ে যাওয়া হাতের আঙুল। আমার দিকে তার চাহনিটা ছিল অদ্ভুত। ঠিক যেন তিনি কোনো ওষুধের দোকানে আসেননি। এসেছেন বিষের কারবারির মুখোমুখি হতে।

বিমল কাকার জীবনের গল্পটা আমি শুনেছিলাম অপর্ণার মুখে। একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চের কালরাতে যখন শাঁখারীবাজারে মিলিটারি ঢোকে, কাকার বয়স তখন সাত বছরের বেশি না। দরজার ফাঁক দিয়ে কাকা নিজের চোখে দেখেছিলেন, গলির মুখে ঠাকুরদাকে গুলি করে কীভাবে ফেলে রেখে গেছে ওরা। তিন দিন ধরে লাশটা ওভাবেই পড়ে ছিলো। স্পর্শ করার মতো কেউ ছিলো না। সেই সাত বছর বয়সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখা দৃশ্যটাই লোকটার ভেতর থেকে আর কাউকে বিশ্বাস করার ক্ষমতাটা কেড়ে নেয়। বছর কয়েকের মাথায় বউটাও চলে গেলো। এখন হাতজোড়া শাঁখার করাত আর বুকের ভেতর পুষে রাখা তীব্র ঘৃণা, এই দুটো সম্বল করেই লোকটা টিকে আছে।
ঘৃণাকে দোষ দিই কী করে? ঘৃণারও মা-বাপ থাকে। কাকারটার জন্ম দিয়েছিল মিলিটারি। তারও আগে জন্ম দিয়েছিল সাহেবরা। ঠাকুরদা বলত, ইংরেজ যাওয়ার আগে জমি ভাগ করে গেছে, আর ভাগ করে গেছে মন। শাসন সোজা, যদি প্রজারা দুই ভাগ হয়ে নিজেদের মধ্যে লড়ে। এক দড়িতে দুই গরু বেঁধে দাও। যে যার দিকে টানবে, আর দড়িটা বসবে দুজনেরই গলায়।

আমরা ধরা পড়লাম মাঘ মাসে। বাদামতলীর ঘাটে বসে ছিলাম দুজনে। মাঝখানে এক হাতের ব্যবধান রেখে। ওই এক হাতটুকুই ছিল আমাদের সমাজ, আমাদের সীমানা। কাকার এক লোক দেখে ফেলেছিলো। সন্ধ্যায় বিমল কাকা দোকানে এলেন। কাউন্টারে শাঁখা কাটার করাতটা রাখলেন শব্দ করে। সরু, চকচকে আর ধারালো।


"মাইয়াটার দিকে আর তাকাবি না।" গলা নিচু, শান্ত। শান্ত গলাই সবচেয়ে ভয়ের। "শাঁখারীবাজারের মাইয়া ঘরের বাইরে গেলে জাত যায় না রে, জান যায়। আমার বাপেরে নিছস তরা। মাইয়াটারে নিতে পারবি না।"
"আমি তো কিছু নিই নাই," বললাম।

কাকা হাসলো। মরা হাসি। "তুই নিবি না। তর জাতে নিব। জাত জিনিসটা তুই না রে। জাত একটা হাঙর। আগে লেজ দেখায়, পরে দাঁত।"
সেই রাতে মা ভাত বেড়ে বসে ছিলো। মায়েরা কীভাবে যেন সব টের পায়। বলল, "বাজান, মাইয়া ভালা, মানলাম। কিন্তু সমাজ? মরলে জানাজা পড়াইব না, জানোস? লোকে কী কইব?"

“লোকে কী বলবে”, এই তিনটা শব্দ মানুষের কাছে খোদার চেয়েও বড়। খোদা ক্ষমা করেন বলে শুনেছি। মানুষ তা করে না।

অপর্ণার বাড়িতেও একই আগুন। তার মা কেঁদে বলেছে, তোর বাবা প্রেশারের রোগী। শুনলে মরবে। কাকা বলেছে, আগে ওই ছেলেকে কাটবে। পরে নিজেকে। পরিবার বড় না প্রেম বড়, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না। যেদিকেই যাও, নিজের একটা হাত কেটে রেখে যেতে হয়। দুই মাস আমরা ও পথ মাড়াইনি। ভেবেছিলাম ভুলে যাবো। অভ্যাস তো। কিন্তু মন তো দোকানের হিসাবের খাতা নয়। যত কাটাকাটি করি, দাগগুলো তত স্পষ্টভাবে থেকে যায়।

ফাল্গুনে সে এলো। ওষুধ নিতে। বাবার জন্য না। নিজের জন্য। ঘুমের ওষুধ চাইলো একগাদা। আমি দিলাম না। সে কাউন্টারে মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর বললো, "বেহুলার কিচ্ছা জানেন? বাসররাইতে লখিন্দররে সাপে কাটলো। সবাই কইলো, ভাসাইয়া দে। বেহুলা মরা স্বামী লইয়া ভেলায় উঠলো। ছয় মাস ভাসলো। গাঙের পচা পানি, লাশের গন্ধ। তাও নামে নাই। ছোটবেলায় ভাবতাম, বেহুলা বোকা। এখন বুঝি, বেহুলার কিছু করার আছিলো না। ভালোবাসা মানুষরে ভেলায় তুইলা দেয়। তারপর গাঙ যেদিকে নেয়।"

আমি কাকার করাতের ভয় ভুলে গেলাম। মায়ের ভাতের থালা ভুলে গেলাম। বললাম, "উঠবা ভেলায়?"

উকিলের চেম্বার নীলক্ষেতে। তিনতলার ওপর। উকিল সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন। "সোজা কথা কই। এই দেশে মুসলমান পোলা আর হিন্দু মাইয়ার সরাসরি বিয়ার কোনো আইন নাই। মুসলমানের আইন আলাদা, হিন্দুর আইন আলাদা। আছে খালি স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট, আঠারোশো বাহাত্তর সাল। ইংরেজের বানানো। তাতে বিয়া হইবো। তয় দুইজনরেই ঘোষণা দিতে হইবো, তোমরা কোনো ধর্মের না। নাইলে একজনরে ধর্ম বদলাইতে হইবো।" চশমা খুলে মুছলেন। "সাহেবরা দেশ ভাগ কইরা গেছে, আইনও ভাগ কইরা গেছে। মাঝখানে খালি মানুষের কোনো আইন রাখে নাই।"
অপর্ণা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর সই করলো। যে মেয়ে রোজ সন্ধ্যায় তুলসীতলায় প্রদীপ দিতো, সে কাগজে লিখে দিলো, তার কোনো ধর্ম নেই। কলম ধরা হাতটা কাঁপছিলো। আমি জানি, ওই সইয়ে তার ধর্ম যায়নি। গেছে বাড়ি। ধর্ম কাগজে থাকে না। থাকে মায়ের হাতের নাড়ুতে, কাকার করাতের শব্দে, তুলসীতলার সন্ধ্যাপ্রদীপে।

আমরা উঠলাম কড়াইল বস্তিতে। মহাখালীর লেকের ওপারে। টিনের ঘর, আট ফুট বাই আট ফুট। মামা দোকান থেকে বের করে দিয়েছে। মা বাড়ি থেকে। কড়াইল আমাদের কিছু জিজ্ঞেস করেনি। বস্তি জিজ্ঞেস করে না। ওখানে সবাই কোথাও না কোথাও থেকে পালিয়ে আসা। নদীভাঙা মানুষ, ভিটেহারা মানুষ, মামলার আসামি। এক কলে তিনশো ঘর, পানির লাইনে দুই ঘণ্টা। মাথার ওপর কারেন্টের তার মাকড়সার জালের মতো। প্রতি চোতমাসে কোথাও না কোথাও আগুন লাগে। আর লোকে বলে, এইবার বুঝি উঠিয়েই দেবে। সিটি কর্পোরেশনের লোক মাপঝোঁক করে যায়। বস্তি জানে, শহর তাকে দিয়ে কাপড় ধোয়ায়, রান্না করায়, ইট টানায়। শুধু পাশে বসায় না।

আমি রিকশার গ্যারেজে খাতা লেখার কাজ নিলাম। অপর্ণা ছুটা বুয়ার কাজ। বনানীর দুই বাসায়। এক বাসায় সে আয়েশা, আরেক বাসায় অপর্ণা। যে বাসার মালিক যেটা শুনলে খুশি হয়। ফিরে এসে হাসতো, "দুই নামে দুই বেতন। মন্দ কী।" হাসিটার গহীনে যে কী ছিলো, আমি জানতাম। মানুষ নিজের পছন্দের বাইরে একটা নামও সহ্য করতে পারে না। নাম শুনেই ঠিক করে ফেলে, কে আপন, কে পর।

বিয়ের রাতে আমাদের ছিল একটা হারিকেন আর টিনের চালে বৃষ্টি। সে খুলে রেখেছিল সব, শুধু হাতের শাঁখাজোড়া খোলেনি। হারিকেনের আলোয় তার শরীর ছিল গাঙের চরের মতো। জলে ধোয়া, নরম, আনকোরা। আমি সেই চরে নেমেছিলাম ভাটির মাঝির মতো। ধীরে, ডুবতে ডুবতে। টিনের চালে বৃষ্টি বাড়ছিলো। তার নিঃশ্বাস সেই শব্দকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল চারপাশে। আর আমার পিঠের ওপর বেজে উঠছিল শাঁখার রিনরিন শব্দ। ওই শব্দটুকুই তো ছিল তার না ছাড়তে পারা ধর্ম, যা সে সঁপে দিয়েছিলো আমার বুকের ওপর।

পরে সে বলেছিলো, "শাঁখা খুলুম না। এই জোড়া কাকায় নিজ হাতে বানাইছিলো।"
"খুলবা কেন," বলেছিলাম আমি। "যে হাতে ভাত বাড়ো, সেই হাতের আবার জাত কী।"
ছয় মাস আমরা রাজা-রানি ছিলাম। আট ফুট বাই আট ফুটের রাজ্য। শুক্রবারে লেকের পারে হাঁটতাম। একদিন বাজার থেকে একটা আয়না কিনে আনলাম। ত্রিশ টাকা। সে দেয়ালে টাঙিয়ে বললো, "এইবার সংসার পুরা হইলো।" টিনের কৌটায় মাটি ভরে চুপিচুপি একটা তুলসীর চারা পুঁতেছিলো। আমি দেখেও দেখিনি। সন্ধ্যায় সেই কৌটার সামনে সে চোখ বুজে দাঁড়াতো আধ মিনিট। আমি নামাজে দাঁড়ালে সে পাখাটা টেনে দিতো। আমাদের ঘরে দুই ঈশ্বর অল্প জায়গায় মিলেমিশে থাকতেন। মানুষের যা পারে না, ঈশ্বর তা পারেন অবলীলায়।
 
এক রাতে পাশের ব্লকে আগুন লাগলো। শর্ট সার্কিট। টিনের ঘর পোড়ে কাগজের মতো। আমরা যে যা পারি নিয়ে গলিতে দাঁড়ালাম। অপর্ণার এক হাতে সেই ত্রিশ টাকার আয়না, আরেক হাতে তুলসীর কৌটা। আগুনের আলোয় তার মুখ দেখে বুঝলাম, সংসার আসলে এইটুকুই। যা হাতে করে পালানো যায়। ভোরে আগুন নিভলো। এগারোটা ঘর ছাই। কেউ মরেনি বলে পত্রিকায় খবরও হলো না। বস্তির দুঃখ খবর হয় না, খবর হয় শুধু বস্তির যাবতীয় অপরাধ।

দুই ঘর পরে থাকত সোনা মিয়া ফকির। একতারা বাজিয়ে ভিক্ষা করতো। রাতে গাইতো, "খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়।" অপর্ণা রাঁধতে রাঁধতে গুনগুন করতো। ফকির বলতো, "মা, লালন সাঁই কইছে, জাত হাতের ময়লা। ধুইলেই যায়। খালি মানুষ ধুইতে চায় না। ময়লাটারেই সোনা ভাইবা বুকে কইরা রাখে।"

আশ্বিন মাসে দেশ জ্বললো। এক মণ্ডপে কে যেন রাতের অন্ধকারে কোরান শরিফ রেখে এসেছিল। সকালে ছবি উঠলো। ফেসবুকে আগুন ধরলো। যে দেখেনি সেও শেয়ার দিল। মিছিল বেরোলো। মণ্ডপ ভাঙল, মন্দির ভাঙল, দূরের জেলায় মানুষ মরলো। দুইশো বছর আগে সাহেবরা যে দড়ি গলায় পরিয়ে গিয়েছিলো, সেটায় টান পড়লো আবার।

বস্তিতেও কথা উঠলো। কার ঘরে কে থাকে। কার বউয়ের হাতে শাঁখা। গ্যারেজের এক ছেলে জিজ্ঞেস করলো, "ভাবি নাকি হিন্দু আছিলো?" বললাম, "আছিলো।" সে থুতু ফেললো। "আছিলো বইলা কিছু নাই ভাই। সাপ খোলস ছাড়লেও সাপ।"

সেই রাতে মিছিল ঢুকলো বস্তির গলিতে। মশাল আর লাঠি। কী চায়, ওরা নিজেরাও জানতো না। ভাঙার জন্য কিছু একটা চাই, এইটুকুই। অপর্ণা পানির লাইনে গিয়েছিলো। ফিরছিলো কলসি কাঁখে। মিছিলের মুখে পড়লো। ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ তার হাতের শাঁখা চিনলো। চিৎকার উঠলো।

আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম। যতটুকু দেখেছি, ততটুকু বলার ভাষা আমার নেই। মানুষ বলতে যা বুঝি, ওরা তখন তা ছিলো না। ওরা ছিলো দুইশো বছরের টান খাওয়া একটা দড়ি। আগে ভাঙলো কলসি। তারপর শাঁখা। তারপর যা ভাঙলো, তা আর জোড়া লাগে না। আমি ঠেকাতে গিয়ে দেদারসে লাঠির বাড়ি খেলাম। গুনিওনি। কাদার মধ্যে বসেই তাকে বুকে জড়িয়ে নিলাম। মাথাটা ফেটে গেছে। ঠোঁট দুটি কেবল একটু নড়ছিলো। কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনলাম। ভাঙা, অস্ফুট গলায় সে একটাই কথা আকড়ে ছিলো, 'নামুম না... ভেলা থেইকা... নামুম না...

গাঙ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি বেহুলার মতো বসে ছিলাম। বেহুলা তবু দেবতার সভায় পৌঁছেছিলো। নেচে গেয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে এনেছিলো। কিন্তু আমি কার সভায় যাব? যে দেবতা জাত মানে, সে তো লখিন্দর ফেরত দেয় না।
পুলিশ এলো পরদিন। মামলা হলো। অজ্ঞাতনামা চারশো জন। অজ্ঞাতনামা মানে তো সবাই, আর দিনশেষে কেউ না।

সকালে বস্তি আবার আগের মতো। পানির লাইনে ভিড়, চুলায় ভাত, গ্যারেজে হাতুড়ির শব্দ। যারা আগের রাতে মিছিলে ছিলো, তারাও লাইনে দাঁড়িয়ে হাই তুলছে। মানুষ এমনই। রাতে হাঙর, সকালে গরু। আমার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সবাই চোখ নামিয়ে হাঁটে। চোখ নামানোটাই এই দেশের শোক।

আমি অপর্ণাকে নিয়ে গেলাম শাঁখারীবাজারে। ওদের ধর্মে দাহ করতে হয়। আমার আপত্তি ছিলো না। তার ধর্ম তো ছিলো হাতের শাঁখায়, আগুনে আর কী যাবে।
বিমল কাকা দরজা খুললো। আমার মুখ দেখলো। খাটিয়ার দিকে তাকালো। এক পাও নড়লো না। কাঁদলোও না। কাকার কান্না একাত্তরেই ফুরিয়ে গেছে। শুধু বললো, "ভিতরে আন্। আমার মাইয়া আমি সাজামু।"

দাহের আগে কাকা তার হাত থেকে ভাঙা শাঁখাটা খুলে আমার হাতে দিয়ে বললো, "রাখ। শাঁখারির জিনিস শাঁখারিই চিনে। তুই অরে শাঁখা পরাইতে পারস নাই। কিন্তু ওই কিচ্ছার শাঁখারির লাহান তুইও জাত ভাইঙ্গা আইছিলি। দোষ তর না রে। দোষ ওই দড়িটার।"

শ্মশানে যখন আগুন জ্বললো, বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে তখন আজান ভেসে আসছিলো। আগুন আর আজান, কেউ কাউকে বাধা দিলো না। যত বিরোধ, সব মানুষে মানুষে।
আমি এখনো পাটুয়াটুলীতে ওষুধ বেচি। অন্য এক দোকানে। মাসের শেষে কেউ এমলোডিপিন কিনতে এলে হাতটা একটু কাঁপে। পকেটে হাত ঢোকাই। ভাঙা শাঁখাটা আঙুলে বিঁধে।

সেদিন সদরঘাটে সোনা মিয়া ফকিরের সঙ্গে দেখা। জিজ্ঞেস করলাম, "ফকির সাব, জাত জিনিসটা তাইলে কী?" ফকির একতারায় টান দিল। "সাঁইজি কইয়া গেছে বাজান। জাত গেলো জাত গেলো বইলা, এ কী আজব কারখানা। আসবার কালে কী জাত আছিলা? যাইবার কালে কী জাত লইয়া যাইবা?"

তারপর গান ধরলো। আমি গাঙের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ভাটির টানে একটা ভেলা ভেসে যাচ্ছিলো। খালি ভেলা। কেউ নাই।  

খোলস ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক 

ছবি আঁকা শিখেছি চারুকলায়। আর দেখতে শিখেছি এক বেদেনীর কাছে।দুইটা যে এক জিনিস না, এই সহজ কথাটা বুঝতে আমার লেগেছে পঁয়ত্রিশ বছর।

আমাদের বাড়িতে তিনজন মানুষ থাকতো। ঠিকানা এক, জগত তিনটা। বাবা থাকতেন অফিসে আর ভবিষ্যতের হিসাবে। মা বলতেন, তোর বাবা খারাপ মানুষ না, উনি খালি এই বাড়িতে থাকেন না। আর মা নিজে থাকতেন অন্য কোথাও। কোথায়, জিজ্ঞেস করার সাহস আমাদের কারো ছিলো না।

চারুকলায় চান্স পাওয়ার খবরে বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। ওটা তার প্রত্যাশার হিসাবে তালগোল পাকাবার জন্য। আমার জন্য না।

ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে টের পেতাম, আমি আসলে শিখছি মানুষের দিকে না তাকিয়ে বাঁচার কৌশল। ক্যানভাস প্রশ্ন করে না। কৈফিয়ত চায় না। দরজা খুলতে দেরি করে না।

সেকেন্ড ইয়ারে আমার প্রিয় রং ছিলো নীল। শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, কেন? আমি সবজান্তার মতো বললাম, স্যার, দুনিয়ার সবচেয়ে দামি রং। রেনেসাঁর আলট্রামেরিন বানানো হতো ল্যাপিস লাজুলি পাথর গুঁড়িয়ে। পাথর আসতো আফগানিস্তানের খনি থেকে। উটের পিঠে, জাহাজের খোলে, ভেনিস ঘুরে। ওজন দরে সোনার চেয়ে দামি। মিকেলাঞ্জেলো ওই নীল কিনতে না পেরে আস্ত ছবি অসমাপ্ত ফেলে রেখেছিলেন। ভার্মিয়ার কিনতেন ধারদেনা করে। মরার সময় রেখে গেলেন এগারোটা সন্তান আর রুটিওয়ালার দেনা।

শিক্ষক আমার স্কেচখাতা উল্টেপাল্টে দেখলেন। বললেন, মুখস্থ বুলি আওড়ে ছবি হয় না রে বোকা ছেলে! 

কথাটার মানে সেদিন বুঝিনি। বুঝেছি অনেক পরে, বংশী নদীর এক ঘাটে।

দ্বিতীয় প্রদর্শনীর তারিখ ঠিক। আর আমার হাত বন্ধ। মাসের পর মাস সাদা ক্যানভাস। তুলি ডোবাই, তুলে রাখি। ডকুমেন্টারি বানিয়ে হাত পাকানো বন্ধু কামরুল ফোন দিয়ে বললো, সাভার যাচ্ছি, বংশীতে বেদের বহর নামছে। চল্। সাপ দেখলে যদি তোর হাত খোলে।

গেলাম। ঘাটে গিয়ে প্রথম যা চোখে পড়লো তা সাপ না, নৌকা। সরু, লম্বা, কালচে খোল। ছইয়ের নিচে একেকটা আস্ত সংসার। মাটির চুলা, হাঁড়িকুড়ি, দড়িতে শাড়ি, গলুইয়ে বাঁধা মোরগ। জলের ওপর একটা ভাসমান গ্রাম। কামরুল ক্যামেরা তুলতেই ছেলেপুলেরা ঘিরে ধরলো। আর মেয়েরা মুখ ফিরিয়ে নিলো। যাদের ছবি লোকে না জিজ্ঞেস করে তোলে, ক্যামেরা দেখলে তারা মুখ ফেরায়।

পদ্মাকে প্রথম দেখি ঘাটের সিঁড়িতে। কাঁধে বেতের ঝাঁপি, রোদে পোড়া তামাটে রং, হাত ভর্তি রুপালি চুড়ি। চোখে এমন সটান ভঙ্গি, যেন পৃথিবীর কারো কাছে তার কোনো দেনা নেই। কাছে এসে ঝাঁপি নামিয়ে বললো, ভাইজান, তাবিজ লাগবো? সাপের নজর, বিছার কামড়, ব্যবসায় মন্দা, বউয়ের মন উদাস?

বললাম, আমার বউ নাই।

সে চোখও তুললো না। বললো, ওই দুঃখের তাবিজ আমরা বানাই না।
কামরুল হেসে ফেললো। আমি পারলাম না। আমি তখন মেয়েটার হাত দেখছি। ঝাঁপির ঢাকনায় রাখা স্থির, লম্বা আঙুলের হাত। সাপ ধরা হাতের একটা নিজস্ব স্থিরতা থাকে। আমার হাতে ওই স্থিরতা নেই। ছয় মাস ধরে নেই।

দুপুরে ঘাটের পাশে খেলা বসলো। পদ্মা ডুগডুগি বাজায়। ঝাঁপি থেকে ফণা তোলে গোখরা। ভিড় জমে, পয়সা পড়ে। খেলা শেষে একটা লোক দশ টাকার নোট এমনভাবে ছুড়লো যে নোটটা গিয়ে পড়লো ধুলায়। পদ্মা নোটটা তুললো। ধুলা ঝাড়লো। ট্যাঁকে গুঁজলো। মুখের একটা রেখাও কাঁপলো না। আমি কামরুলকে বললাম, দেখলি? সে বললো, কী? বললাম, কিছু না। কিছু জিনিস ক্যামেরায় ওঠে না।

বিকেলে দূর থেকে ওর একটা স্কেচ করলাম। কীভাবে যেন টের পেয়ে গেলো। সটান হেঁটে এসে খাতাটা টেনে নিলো। অনেকক্ষণ দেখলো। তারপর রায় দিলো, সাপটা মরা।

মানে?

আপনে সাপ আঁকছেন ডরাইয়া। ডর দিয়া সাপ হয় না, হয় দড়ি।

চারুকলার শিক্ষক যে কথা পনেরো বছরে বোঝাতে পারেননি, নিরক্ষর এক বেদেনী তা বুঝিয়ে দিলো এক বাক্যে। সেই সন্ধ্যায় আমি ঢাকায় ফিরলাম না। পরের সন্ধ্যায়ও না। কামরুল ফুটেজ নিয়ে ফিরে গেলো। আমি বাজারে এক ডেকোরেটরের দোকানের ওপরের টিনশেড ভাড়া নিলাম।

বহরের সবচেয়ে পুরনো মানুষ পদ্মার দাদি। উনার নৌকার ছইয়ে আমার দিন কাটতে লাগলো। শুনলাম, ওদের নিজেদের ভাষা আছে। নাম ঠার। হরফ নেই, ব্যাকরণ নেই। মুখে মুখে বেঁচে আছে শত শত বছর। ডাঙার লোক কাছে এলে ওরা ঠারে চলে যায়। দাদি বললেন, জমিজমা তো নাই বাজান। ভাষাটাই আমাগো শেষ ভিটা। ওই ভিটায় কেউ ঢুকবার পারে না।

শুনলাম ওদের আসার গল্প। সন ধরে বলে ওরা, ষোলোশো আটত্রিশ। আরাকানের রাজা বল্লালের সঙ্গে পূর্বপুরুষ এসেছিলো বিক্রমপুরে। রাজা হারালো রাজত্ব, ওরা হারালো ডাঙা। সেই থেকে জলে জলে। ইতিহাস না কিংবদন্তি, জানি না। তবে যে জাতির ঘর নেই, তার একটা পুরনো তারিখ লাগে। নোঙরের মতো। মাটিতে না হোক, সময়ের গায়ে তো বাঁধা থাকা যায়।

ওদের ঘরের নিয়মও উল্টো। মেয়েরা ভোরে ঝাঁপি নিয়ে গ্রামে গ্রামে যায়। সিঙা লাগায়, দাঁতের পোকা ফেলে, তাবিজ বেচে, সাপ খেলায়। পুরুষরা নৌকা সামলায়, জাল ফেলে, সাপ ধরে। পদ্মা বললো, আপনেগো ঘরে মাইয়ারা ভাত রান্ধে। আমাগো ঘরে মাইয়ারা ভাত জোগায়। কথায় অহংকার নেই, অভিযোগও নেই। মানুষ যেভাবে নদী দেখিয়ে বলে, এইটা নদী।

সন্ধ্যায় দাদি বিড়ি ধরিয়ে বেহুলার গল্প বলেন। ওরা মুসলমান, নামাজ রোজার খবর রাখে। অথচ সাপের মন্ত্রে আজও বিষহরির নাম। লোহার বাসরঘরে সুচের মতো ছিদ্র। লখিন্দরের নীল শরীর। ভেলায় গাঙুড় পেরোনো এক নববধূ। দাদি বলেন, সাপের বিষের অষুধ আছে রে বাজান। কপালের বিষের অষুধ নাই। বেহুলা হেই কপাল লইয়া ভাসছিলো। আমরাও হেই থিকা ভাসতেছি।

পদ্মা নামটাও মনসারই আরেক নাম। পদ্মাবতী। জেনে চমকে গেলাম। বললাম, দেবীর নামে নাম, অথচ তুমি সাপ ধরো। ভয় করে না? সে হাসলো। দেবীর লগে ঘর করলে ডর কিসের। ডর তো আপনেগো, যারা দেবীরেও দেয়ালে বান্ধা রাখেন।

এই মেয়ের সঙ্গে তর্কে পারা যায় না। আমি চাইতামও না। হেরে যাওয়ার লোভেই প্রশ্ন করতাম।

আমার হাত ততদিনে খুলে গেছে। খাতার পর খাতা ভরে ওঠে। নৌকার গলুই, ঝাঁপির বেত, ভাটির টানে হেলে থাকা লগি, ধোঁয়ার ভেতর রান্না করা কিশোরী। আর প্রতিটা খাতার মার্জিনে, বারবার, একই মুখ। আঁকি, কেটে দিই, আবার আঁকি। ভার্মিয়ারের নীলের কথা মনে পড়ে। কিছু রং মানুষ দেনা করে কেনে।

একদিন দুপুরে পদ্মা আমার সামনে ঝাঁপি খুলে বসলো। বললো, হাত পাতেন।

কী?

হাত পাতেন। আপনের হাত কাঁপে, দেখছি আমি। যেই হাত কাঁপে, হেই হাতে তুলি চলে কেমনে?

ঝাঁপি থেকে যেটা বের হলো সেটা দাঁড়াশ। বিষ নেই। কিন্তু আমার শরীর সে খবর জানে না। ঠান্ডা, মসৃণ, জ্যান্ত একটা ভার নামলো দুই হাতের ওপর। আমি পাথর। পদ্মা নিচু গলায় বললো, মুঠ কইরেন না। সাপরে চাইপা ধরলে হে পলাইতে চায়। ভার রাখতে দিলে থাকে। মানুষও তাই।

শেষ কথাটা সে সাপের দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, নাকি আমার দিকে, আজও জানি না। শুধু জানি, ওই দুপুরের পর আমার হাত আর কাঁপেনি।

ভালোবাসা কীভাবে হলো, হিসাব দিতে পারবো না। ওই হিসাব প্রেমিকরা রাখে না। শুধু জানি, আমি ওর কাছে রং শিখতে শুরু করলাম। চারুকলার পাঁচ বছরে যা শিখিনি। ও চেনালো শঙ্খিনীর হলুদ, কালো জমিনে যে হলুদ জ্বলে হ্যাজাক বাতির মতো। চেনালো ঢোঁড়ার পিঠের জলপাই, ভরা বর্ষার ঘোলা জল। আর এক গোধূলিতে চেনালো গোখরার ফণার ভেতরের দিক। মরা আলোয় ধূসর, বাদামি, তার সঙ্গে এমন এক আভা, যার পাশে আমার সব টিউবের রং জোলো। তিন সপ্তাহ ওই রং বানানোর চেষ্টা করলাম। প্যালেটে ঝুঁকে থাকি, মেশাই, মুছি। হয় না। পদ্মা হাসে। বলে, ওই রঙের নাম আছে আমাগো ঠার ভাষায়।

বলো।

না।

কেন?

যেই ভাষার হরফ নাই, হেই ভাষার শব্দ ধার দিলে আর ফেরত পাওয়া যায় না। আপনেরা নিয়া যান, তারপর নিজের নামে চালান।

আমি চুপ করে গেলাম। কথাটা ভুল না।


এক সন্ধ্যায় ওকে ভ্যান গঘের গল্প শোনালাম। সূর্যমুখীর সেই বিখ্যাত হলুদ, ক্রোম ইয়েলো, ছিলো কারখানার সস্তা রং। দেড়শো বছর আলো খেতে খেতে সেই হলুদ এখন জাদুঘরের দেয়ালে কালচে হয়ে যাচ্ছে। ফেরানোর উপায় নেই। পদ্মা মন দিয়ে শুনলো। বললো, রংও তাইলে মরে। বললাম, মরে। সে ঝাঁপির দিকে তাকিয়ে বললো, খালি সাপে জানে বাঁচনের কায়দা। চামড়া পুরান হইলে খোলস ছাইড়া দেয়। জানেন, খোলস ছাড়তে না পারলে সাপ কানা হইয়া যায়? চোখের পর্দাটাও তো খোলসের লগেই যায়। পুরানটা না ছাড়লে নতুন চোখ ফোটে না।

সেই রাতে ঘুম হলো না। বারবার মনে হলো, আমি পঁয়ত্রিশ বছর ধরে একটা পুরনো খোলসের ভেতরে বসে আছি। আর আস্তে আস্তে কানা হয়ে যাচ্ছি।

মায়ের কথাটা পদ্মাকেই প্রথম বললাম। কাউকে বলিনি কোনোদিন। বাবাকেও না। ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। স্কুল থেকে ফিরে অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর মা দরজা খুললেন। ঠোঁটে তাড়াহুড়ায় মোছা লিপস্টিক, কপালের টিপ সামান্য বাঁকা। ভেতরের ঘরে অচেনা সিগারেটের গন্ধ। বাবা সিগারেট খেতেন না। আর সে সপ্তাহে তিনি চট্টগ্রামে। মা আমার হাতে চব্বিশ শেডের একটা রংপেন্সিলের বাক্স দিয়ে বললেন, কাউকে বলিস না বাবা। তুই তো আমার লক্ষ্মী ছেলে।

সেদিনই প্রথম টের পেয়েছিলাম, রঙের একটা দাম আছে। আর সে দাম সবসময় টাকায় শোধ হয় না।

পদ্মা সব শুনে অনেকক্ষণ চুপ। তারপর জিজ্ঞেস করলো, আপনের মায়েরে আপনে আঁকছেন কোনোদিন?

না।

ক্যান? ডরান?

উত্তর দিতে পারলাম না। সে নিজেই বললো, আপনের মায়ের কথা শুইনা আমার ঘিন্না লাগলো না। মায়া লাগলো। মানুষটা ভুল ঘরে আছিলো। বাইর হওনের সাহস পায় নাই। খাঁচার পাখি আর ঝাঁপির সাপ, দুইটার কষ্ট এক না। সাপ জানে, ঢাকনা খুললেই হে যাইতে পারবো। পাখি জানে, দুয়ার খুইলা দিলেও তার ডানায় আর জোর নাই।

এত সহজ ক্ষমা আমি জীবনে দেখিনি। যেটা আমি পঁচিশ বছরে পারিনি, বাইরের একটা মেয়ে করে দিলো দুই মিনিটে। সম্ভবত ওই মুহূর্তেই ঠিক করে ফেললাম, এই মেয়েকে ছাড়া আমার চলবে না।

কিন্তু গল্পটা এখানে আর আমার একার থাকলো না।

ঘাটের ইজারা সে বছর নতুন হাতে গেছে। হাশেম ব্যাপারী। ধবধবে পাঞ্জাবি, কড়া আতর, বালুর ব্যবসা। আর হাসিমুখে কথা বলার অসামান্য ক্ষমতা। চায়ের দোকানে আমাকে দেখলেই ডেকে বসান। শহরের শিল্পী বলে আলাদা খাতির। একদিন চায়ে চুমুক দিয়ে খুব নরম গলায় বললেন, ভাই, একখান কথা কই, কিছু মনে নিয়েন না। ভদ্রঘরের পোলা আপনে। বাইদ্যাগো লগে এত মিশা ভালা না। অগো মাইয়ারা বাণ মারতে জানে। কত ভালা পোলা শেষ হইয়া গেলো।

হেসে বললাম, আমার শেষ হওয়ার কিছু নাই।

উনি হাসিটা ধরে রাখলেন। কিন্তু চোখটা এক মুহূর্তের জন্য অন্যরকম হয়ে গেলো। ওই চোখ আমি পরে বহুবার আঁকার চেষ্টা করেছি। পারিনি। ঘৃণা আঁকা সহজ। ওটা ঠিক ঘৃণা ছিলো না।

উত্তরটা পেলাম দাদির কাছে। হাশেম ব্যাপারীর নাম শুনে বুড়ি অনেকক্ষণ চুপ। তারপর বললেন, ওর দাদিরে চিনতাম। ফুলবানু। আমাগো বহরেরই মাইয়া। ডাঙার এক গিরস্তের লগে ভাইগা গিয়া সংসার পাতছিলো। পোলাপানরা বড় হইয়া মায়ের জাত লুকাইলো। হুনছি, হাশেমরে ছোটবেলায় ইস্কুলে খেপাইতো। বাইদানির নাতি, বাইদানির নাতি। বুড়ি বিড়িতে লম্বা টান দিলেন। বললেন, মানুষ সবচাইতে বেশি ঘিন্না করে হেই জিনিস, যেইটা তার নিজের রক্তে থাকে। সাপ খোলস ছাইড়া পিছনে ফিরাও চায় না। মানুষ পারে না। মানুষ রোজ রাইতে তার পুরান খোলসের কাছে ফিরা যায়। আর ডরায়।

সেদিন বুঝলাম, এই ঘাটের সমস্যা বালুর না। হাশেম ব্যাপারীর বৈঠকখানার জানালা দিয়ে রোজ সকালে বহরটা দেখা যায়। ওই বহর তার আয়না। আয়না কেউ পাশের বাড়িতে সহ্য করে না।

শুরুটা হলো খুব নিরীহভাবে। প্রথমে সাইনবোর্ড। ঘাট সংস্কার হবে, উন্নয়ন। তারপর প্রস্তাব। খাসজমিতে পুনর্বাসন, টিনের ঘর, প্রশিক্ষণ। বহরের মোড়ল হাতজোড় করে বললো, আমরা জলের মানুষ। ডাঙায় আমাগো ঘুম হয় না। হাশেম ব্যাপারী হাসিমুখে ফিরে গেলেন। রাগ করলেন না। যারা গভীরভাবে ক্ষতি করতে জানে, তারা রাগে না।

তারপর বাজারে গুজব নামলো। কে ছড়ালো কেউ জানে না। বেদেরা নাকি বাচ্চা ধরে। শহরে বেচে। কোন গ্রামের কোন খালার বোনের দেবরের ছেলে নাকি হারিয়েছে ঘাটের কাছে। গুজবের এই এক স্বভাব। তার বাপ মায়ের পরিচয় লাগে না, খালি মামা লাগে। আর মামার নামটা কেউ মুখে আনে না। শুধু চায়ের দোকানদার একদিন ফিসফিস করে বললো, ভাইজান, যেই মুখগুলা কথাডি রটাইতেছে, হেগো চা বিলের খাতা কিন্তু একটাই।

এক রাতে থানার লোক এলো। বন্যপ্রাণী আইন, দুই হাজার বারো সাল। সাপ ধরা নিষেধ, পোষা নিষেধ, খেলা দেখানো নিষেধ। তিনটা ঝাঁপি নিয়ে গেলো। সঙ্গে দুইজন পুরুষ। আইনটা মিথ্যা না। আর ওইটাই এই চালের সবচেয়ে মজবুত জায়গা। দাদি সেই রাতে বললেন, আগে সাপের বিষে মানুষ মরতো। অখন আইনের বিষে বহর মরে। যেই দ্যাশে সাপ বাঁচানির আইন আছে, হেই দ্যাশে সাপুইড়া বাঁচানির আইন নাই।

তারপর এক হাটবারের রাতে ঘাটের অন্ধকারে জ্বলে উঠলো মশাল। গুজব তখন টনটনে পাকা ফোঁড়া, খালি খোঁচার অপেক্ষা। কারা যেন খোঁচাটা দিলো। শ দেড়েক লোক, লাঠি, টর্চ, চিৎকার। ভাঙচুর হলো। দুইটা নৌকায় আগুন। মানুষ মরেনি, এইটুকুই। ভোরে পুলিশ এসে দুই পক্ষকে শান্ত থাকতে বলে গেলো। যে পক্ষের ঘর পুড়েছে, তাকেও।

খবর পেয়ে ছুটে গেলাম। পদ্মা পোড়া নৌকাটার সামনে দাঁড়িয়ে। কাঁদছে না। মুখে সেই দশ টাকার নোট তোলার দিনের ভঙ্গি। আমাকে দেখে শুধু বললো, দ্যাখেন, আগুনের কতগুলা রং। এই রংগুলা আপনের বাক্সে আছে?

আমি ওর হাত ধরলাম। বললাম, চলো। ঢাকায় চলো। বিয়ে করবো। ঝাঁপি ছাড়তে হবে না। কিছু ছাড়তে হবে না। কিন্তু এখানে আর না।

পদ্মা অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর খুব ধীরে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। বললো, আপনে অহনো বোঝেন নাই। দোষ আপনের না। ঝাঁপির ভিতরে সাপ যতোদিন, খেলা ততোদিন। ঝাঁপি ঘরে সাজাইয়া রাখলে ওইটা হয় শোপিস। আমি আপনের ঘরে গিয়া শোপিস হইতে পারুম না। আর বহর বিপদে থাকলে বহরের মাইয়া বহর ছাড়ে না। এই নিয়ম ভাঙলে আমি আর আমি থাকি না। আপনে তো আমারেই চান, নাকি?

শেষ প্রশ্নটার উত্তর হয় না। দিলে মিথ্যা। না দিলে বিদায়।

বহর নোঙর তুললো তিন দিন পরে। শেষরাতে, ভাটার টানে। আমাকে কেউ খবর দেয়নি। ভাসমান মানুষের প্রতিবাদের ভাষা একটাই। নোঙর তোলা। সকালে ঘাটে গিয়ে দেখি ধু ধু জল, পোড়া নৌকার কালো কঙ্কাল। আর কিছু নেই। কোথায় গেছে, কেউ জানে না। যাদের ঠিকানা নেই, তাদের নতুন ঠিকানাও থাকে না।

শুধু ঘাটের বাঁশের খুঁটিতে লাল সুতায় বাঁধা একটা জিনিস। সাপের খোলস। আস্ত, স্বচ্ছ, দাঁড়াশের। যে ভয়টা সে আমার হাত থেকে তুলে নিয়েছিলো, এইটা বোধহয় তার রসিদ।

হাশেম ব্যাপারীর সঙ্গে শেষ দেখা চায়ের দোকানে। উনিই ডাকলেন। চা খাওয়ালেন। আফসোস করলেন, দেখলেন তো ভাই, পাবলিকরে বিশ্বাস নাই। কত কইলাম শান্ত থাকতে। যাউকগা, ঘাটটা অহন ভালা কামে লাগবো ইনশাল্লাহ। উনার পাঞ্জাবি থেকে আসছিলো কড়া আতরের গন্ধ। আতরের একটা গুণ আছে। অনেক কিছুর গন্ধ চাপা দিতে জানে। কেরোসিনেরও পারে কি না, জানি না। গন্ধের সাক্ষ্য আদালতে চলে না। কাপটা নামিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দুই পা গিয়ে ফিরে তাকালাম। ব্যাপারী সাহেব, ফুলবানু নামটা কিন্তু সুন্দর।

মানুষটার মুখ থেকে হাসি মুছে যেতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো। ওই কয়েক সেকেন্ডই আমার প্রতিশোধ। এর বেশি ক্ষমতা শিল্পীর নেই। আমরা বড়জোর মানুষের খোলসের গায়ে আঙুল রাখতে পারি।

ঢাকায় ফিরে ছয় মাসে ছবিগুলো আঁকলাম। প্রদর্শনীর নাম, খোলস। উনিশটা ক্যানভাস। জলের ওপর ভাসমান গ্রাম। ঝাঁপির অন্ধকারে জেগে থাকা একজোড়া চোখ। ধুলায় পড়ে থাকা দশ টাকার নোট। পোড়া গলুই। আর ফণার ভেতরের সেই রং। বুড়ো সমালোচক এলেন, ঘুরলেন, একেকটা ছবির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। যাওয়ার আগে কাঁধে হাত রেখে বললেন, এইবার ঘামের গন্ধ পাইতেছি। এক ক্রেতা জানতে চাইলেন, সাত নম্বর ছবির প্রধান রংটার নাম ক্যাটালগে নেই কেন। বললাম, রংটার নাম এমন এক ভাষায়, যে ভাষার হরফ নাই। ভদ্রলোক ভাবলেন রসিকতা করছি। ছবিটা উনিই কিনলেন।

বিশ নম্বর ক্যানভাসটা প্রদর্শনীতে ছিলো না। ওটা আমার ঘরে, দেয়ালের দিকে মুখ করানো। মায়ের মুখ, ক্লাস ফোরের সেই দুপুরের। বাঁকা টিপ, তাড়াহুড়ায় মোছা লিপস্টিক। আর চোখে সেই জিনিস, যা দেখতে আমার পঁচিশ বছর লেগেছে। ঘৃণা না, ছলনা না। নিজের খোলসে আটকা পড়া একটা মানুষের ক্লান্তি। খাঁচার পাখির চোখ।

মা বেঁচে আছেন। বাবাও। এখনো এক ঠিকানায় তিনটা আলাদা জগত। ছবিটা মাকে দেখাইনি। দেখাবোও না হয়তো। কিছু ছবি দেখানোর জন্য আঁকা হয় না। আঁকা হয় ক্ষমা করার জন্য।

খোলসটা রেখেছি সেই চব্বিশ শেডের টিনের বাক্সে। রংপেন্সিলগুলো ক্ষয়ে গেছে কবে। বাক্সটা রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে খোলসটা বের করে জানালার আলোয় ধরি। শুকনা, ওজনহীন, স্বচ্ছ। ভেতরে সাপ নেই। তবু ফণার ভঙ্গিটা রয়ে গেছে।

পদ্মা বলতো, পুরান খোলস না ছাড়লে নতুন চোখ ফোটে না।

আমার নতুন চোখ ফুটেছে। সমস্যা একটাই। এই চোখ এখন যেদিকে তাকায়, জল দেখে। আর প্রতিটা জলের ওপর খোঁজে সরু, লম্বা, কালচে খোলের কয়েকটা নৌকা। ছইয়ের নিচে সংসার। গলুইয়ে বাঁধা মোরগ। আর ঝাঁপির অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে ধৈর্যশীল, প্রাচীন, ঘরহীন এক দেবী।


২০/৭/২০২৬

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

মিডিয়া তে ছাঁটাই ~ অনির্বাণ মাইতি

ভারতের বেশ কয়েকটি বড় মিডিয়া সংস্থা যেমন ABP Group, Network18, HT Media, Times Group, Aaj Tak সম্প্রতি এদের কর্মী ছাঁটাই বা পুনর্গঠনের খবরের শিরোনামে এসেছে।

 সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে Aaj Tak-এর হিন্দি ওয়েব টিমে। এছাড়া ক্যামেরা, ভিডিও এডিটিং, গ্রাফিক্স, ফ্যাক্ট-চেকিং, Data Intelligence Unit, Aaj Tak Radio এবং India Today-এর ইংরেজি ডিজিটাল টিমের কিছু কর্মীও ছাঁটাইয়ের আওতায় এসেছেন। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১২০ জন কর্মীকে একসঙ্গে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের দাবি অনুযায়ী, অনেককে হঠাৎ জানানো হয় যে সেদিনই তাদের শেষ কর্মদিবস।

Uploaded Image

কেন এই ছাঁটাই?

মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে:

* টিভি ও প্রিন্টের বিজ্ঞাপনের আয় কমে যাওয়া।
* ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দর্শক ও বিজ্ঞাপন সরে যাওয়া।
* AI ও অটোমেশন ব্যবহার করে কম জনবল দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা।
* বিভিন্ন মিডিয়া হাউসের ব্যয়সংকোচন (cost rationalisation)।

এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সংকট নয়। ভারতীয় মূলধারার টিভি নিউজ ইন্ডাস্ট্রি একসঙ্গে তিনটি বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে।

১. ব্যবসায়িক মডেল ভেঙে পড়ছে

এক সময় টিভি নিউজের মূল আয় ছিল বিজ্ঞাপন। এখন সেই বিজ্ঞাপনের বড় অংশ Google, Meta, YouTube এবং OTT প্ল্যাটফর্মে চলে যাচ্ছে। দর্শকের সময়ও টিভি থেকে মোবাইলে সরে গেছে। ফলে নিউজ চ্যানেলগুলোর আয় কমছে, কিন্তু স্টুডিও, স্যাটেলাইট, রিপোর্টিং নেটওয়ার্কের খরচ প্রায় একই রয়ে গেছে।

ফলত প্রথমে বেতন বৃদ্ধি বন্ধ, তারপর নিয়োগ কমানো, শেষে ছাঁটাই।

২. বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

এটি আরও গভীর সমস্যা।

সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময় বহু মূলধারার টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকদের “গোদি মিডিয়া” বলে বিক্ষোভকারীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই ঘটনা দেখায় যে সমাজের একটি বড় অংশ মূলধারার টিভি সংবাদকে আর নিরপেক্ষ মনে করছে না। 

একটি সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস দুর্বল হলে দর্শক বিকল্প খোঁজে—YouTube সাংবাদিক, স্বাধীন ডিজিটাল পোর্টাল, নিউজলেটার বা সোশ্যাল মিডিয়ায়।

৩. AI, এটি তর্কসাপেক্ষ , মূল কারণ নয়

অনেকে বলেন, “AI চাকরি খেয়ে ফেলছে।”

আংশিক সত্য।

বাস্তবে AI এমন কাজগুলো দ্রুত করছে যেগুলো আগে জুনিয়র কর্মীরা করতেন—ট্রান্সক্রিপশন, অনুবাদ, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ভিডিও ক্লিপিং, প্রাথমিক স্ক্রিপ্ট লেখা, থাম্বনেইল ইত্যাদি। তাই যেসব প্রতিষ্ঠানের আয় আগেই কমছিল, তারা AI ব্যবহার করে আরও কম লোক নিয়ে কাজ চালাতে পারছে। বিশ্বজুড়েই কর্পোরেট সংস্থাগুলো AI-নির্ভর পুনর্গঠন করছে। 

সাংবাদিক বন্ধুরা সতর্ক হন। সরকারের তৈরী করা ন্যারেটিভ আপনাদের প্রচার করতে হয়, পেটের তাগিদে। এটা কেউ বোঝে না তা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে সরকার বিরোধী হাওয়া প্রবল বইছে ভারত ও বঙ্গপসাগর উপকূলে। সুতরাং সরকারের ধামাধারী হওয়াও আপনার ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করবে না। যারা চাকরি হারিয়েছেন ভেঙে না পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের সামাজিক দায়িত্ব এবার পালন করুন। সবাই মিলে হাত লাগিয়ে ধাক্কা দিলে বিশ্বাস রাখুন এই জগদ্দল পাহাড় নড়ে যাবে, যাবেই।

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

বাঘ দিবস ~ কৌশিক মজুমদার

লীলা মজুমদার একবার লিখেছিলেন, গপ্পো হিসেবে নাকি তিনটি বিষয় একেবারে অব্যর্থ। এদের নিয়ে গল্প বাঁধলে সে-গল্প জমতে বাধ্য। এক, ভূত; দুই, চোর; আর তিন, বাঘ। একেবারে আচমকা এই মন্তব্য করেননি লীলা দেবী। বাংলায় সাহিত্যের ধারাকে নিবিড় ভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রায় প্রথম থেকেই যে-পশুটি প্রায় একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে রয়েছে, সে কিন্তু পশুরাজ সিংহ নয়— বাঘ। এর অবশ্য কারণও অনুমান করা স্বাভাবিক। আফ্রিকার রাজা সিংহকে দেখার জায়গা দুটি— চিড়িয়াখানা অথবা দুর্গা ঠাকুরের বাহন হিসেবে। কিন্তু বাঘের বেলায় সে অসুবিধা নেই। জল জংলার দেশ এ বাংলায় রাত-বিরেতে দু-একটা বাঘ দেখতে পাওয়া তখন খুব একটা আশ্চর্য ঘটনা ছিল না। রাতে বন্ধ দরজার ওপারে কতবার শোনা যেত বাঘের গর্জন। মাঝরাতে প্রকৃতির টানে বাইরে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরত না কত নারী পুরুষ। আর তাই অচেনা পশুর চেয়ে চেনা বাঘই লোককথা-উপকথার অংশ হয়ে উঠতে থাকে। বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির সময়ও তাই বাঘকে নিয়ে রচিত হতে লাগল নানা সত্যি-মিথ্যে গল্প।

Uploaded Image কাহিনিতে এলেও বাংলা বইতে অলংকৃত প্রথম বন্য পশু কিন্তু বাঘ নয়— সিংহ। তখন বাংলায় সবে ছাপাখানা এসেছে। ১৮১৬-তে কলকাতার ফেরিস অ্যান্ড কোম্পানি-র ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়েছে বাংলার প্রথম সচিত্র গ্রন্থ অন্নদামঙ্গল। সেই বছরই বিলেত থেকে কাঠখোদাই ও ধাতুখোদাই বিশেষজ্ঞ জন লসন কলকাতায় আসেন ও ধাতব ব্লক এবং অক্ষর নির্মাণে মন দেন। ১৮১৯-এ সাহেবদের বাংলা শেখানোর জন্য তাঁর খোদাই করা সিংহের ছবিসহ ‘সিংহের বিবরণ’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’। লেখার ম্যাটার জোগাড় করেছিলেন লসন, আর তার অনুবাদ করেছিলেন পিয়ার্সসাহেব। এই সিংহের ছবিটি ছাত্রমহলে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। ছাত্রদের অনেকের বিশ্বাস ছিল যে জগতে সিংহ মাত্র একটিই। ছাপানো ছবি দেখে তাঁদের ধারণা হয়েছিল সেই সিংহটিই সশরীরে এখানে উপস্থিত হয়েছে। তাঁরা নাকি এতটাই ভয় পেয়ে যায় যে মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত স্কুল ফাঁকা হয়ে যায়। এর জনপ্রিয়তায় উৎসাহিত হয়ে স্কুল বুক সোসাইটি ১৮২২-এর ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিমাসে কোনো একটি প্রাণীর সচিত্র বিবরণ পুস্তিকা আকারে ‘পশ্বাবলী’ নামে প্রকাশ করতে থাকেন। এই সিরিজেই একে-একে শৃগাল, ভালুক, হাতি, গণ্ডার, হিপ্পপটমস্‌ ও শৃগালের পর প্রকাশিত হয় ‘ব্যাঘ্রের বিবরণ’ (সচিত্র, ১০১-১২২)। অন্য সংখ্যাগুলোর মতো এতেও শুরুতেই লসনকৃত একটি বাঘের চমৎকার খোদাইচিত্র রয়েছে। বাংলা বইতে এই বাঘটিই খুব সম্ভব প্রথম বাঘের ছবি।



তারপরই অবশ্য বেশ কয়েক বছর বাংলা সাহিত্যের অলংকরণ থেকে বাঘেরা হারিয়ে গেল। আসলে ক্রমাগত সচিত্র ধর্মগ্রন্থের চাপে বাঘ পালাবার পথ পেল না। বাংলা অলংকরণে আবার বাঘের আমদানি হয় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। ১৮৯২-এ তাঁর রচিত ‘কঙ্কাবতী’ বইতে সিংহ, ভালুক, কুকুরসহ বাঘকে নিয়েও কাহিনি বর্ণিত আছে। এর প্রথম সংস্করণে প্রচুর কাঠখোদাই ছবি আছে। এঁকেছেন হরিদাস সেন। এতেই আছে সেই বিখ্যাত দৃশ্য যেখানে বাঘের পিঠে চেপে বনের মধ্যে দিয়ে কঙ্কাবতী চলেছে অট্টালিকার উদ্দেশে। তবে বাংলা সাহিত্যে একেবারে হুড়মুড়িয়ে যিনি বাঘকে নিয়ে এলেন, তিনি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। ১৯১০ সালে কান্তিক প্রেস থেকে মুদ্রিত হল তাঁর রচিত ‘টুনটুনির বই’। ‘সুকুমার পাঠক-পাঠিকাদের’ জন্য রচিত এই বইটির ‘২৭টি গল্প, ৩০ খানি ছোটো ছবি’-র অনেকগুলিই ছিল ‘বাঘের ছবি আর বাঘের গল্প’। বইটির চতুর্থ গল্প ‘নরহরি দাস’-এই প্রথম বাঘের প্রবেশ। গল্পের শেষে লেজে বাঁধা শিয়ালকে নিয়ে বাঘের সেই ‘পঁচিশ হাত লম্বা এক এক লাফ দিয়ে পালাবার’ দৃশ্য বাংলাসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। পরের গল্পই ‘বাঘ মামা আর শিয়াল ভাগ্নে’— যার দুটি ছবি, ‘বাঘ কুয়োর ভিতর পড়ে যাচ্ছে’ ও ‘কুমির বাঘকে কামড়ে ধরেছে’। এরপর ‘চড়াই আর বাঘের কথা’-তেও তিনটি ছবির দুটিতে বাঘ উপস্থিত, ‘বাঘ পিঠে গড়বার জিনিষ নিয়ে আসছে’ ও ‘হাঁড়ি ভাঙার শব্দে বাঘ পালাচ্ছে’। পরের গল্প ‘দুষ্টু বাঘ’-এ প্রথমে বাঘ ও বামুনের ছবি এবং তার পরে শিয়ালের বাঘকে খাঁচায় বন্ধ করে দেবার দৃশ্য। ঠিক পরের গল্প ‘বাঘ বর’ যাতে বোকা বাঘকে কুয়োতে ফেলে গরম তেল ঢেলে মেরে ফেলা হয়।

এ গল্পে পায়ে নাগড়াই, গায়ে জোব্বা, মাথায় টুপি পরা বরবেশী বাঘের চেহারা যে বেশ খোলতাই হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। ‘বাঘের উপর টাগ’ গল্পে চোখ-বাঁধা বাঘের পিঠে বসা জেলের ছবি কিংবা বুদ্ধুর বাপের মুগুর দিয়ে ধাঁই ধাঁই করে বাঘ মারা কিংবা খ্যাঁচ করে বাঘের লেজ কাটার দৃশ্য এখনও ছেলেবেলার নস্টালজিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সব ছবির মধ্যে আমার ব্যক্তিগতভাবে প্রিয় ‘বোকা বাঘ’ গল্পের খোঁটায় বাঁধা বাঘটি। বাঘটির বিবাহের ইচ্ছা আর গ্রামের লোক মারতে আসাতেও হাসিহাসি মুখ এক অদ্ভুত কৌতুককর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। সঙ্গে ক্যাপশানটিও খাসা ‘বাঘ বললে, হীঃ হীঃ, হিহি, হিহি।’

এ হেন উপেন্দ্রকিশোর যখন সন্দেশ-এর মতো পত্রিকা প্রকাশ করেন, তাতে বাঘ থাকবে না, তা-কি হয়! সন্দেশ প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা (আষাঢ়, ১৩২০)-তেই ছিল ‘বাঘের গল্প’— যদিও সঙ্গে কোনো ছবি ছিল না। পরের সংখ্যা থেকেই শুরু হল প্রমদারঞ্জন রায়ের লেখা বনের খবর— যার প্রথম কিস্তিতেই বাঘের তাড়া খেয়ে সুচিৎ নামে চাকরটির প্রাণপণ দৌড়ের কাহিনি, আর সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের আঁকা ছবি। বাঘের লাফ আর সুচিৎ-এর খাড়া টিকি এক অদ্ভুত স্ল্যাপস্টিক কমেডির ভাব সৃষ্টি করেছে। উপেন্দ্রকিশোরের পুত্র সুকুমার অবশ্য তাঁর সাহিত্যজীবনে বাঘকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। কে জানে, বাবা এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলেই হয়তো! তাঁর লেখায় বরং বাঘের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একমাত্র তাঁর ‘গল্প’ নামের গল্পে দেখি লেখা আছে—

“বড়মামা একটা গল্প বল না”
“গল্প? এক ছিল গ, এক ছিল ল, আর এক ছিল প—”
“না- ও গল্পটা না। ওটা বিচ্ছিরি গল্প— একটা বাঘের গল্প বল”
“আচ্ছা। যেখানে মস্ত নদী থাকে আর তার ধারে প্রকান্ড জঙ্গল থাকে— সেইখানে একটা মস্ত বাঘ ছিল আর ছিল একটা শেয়াল।”
“না— শেয়াল তো বলি নি— বাঘের গল্প।”
“আচ্ছা, বাঘ ছিল, শেয়াল টেয়াল কিছু ছিল না। একদিন সেই বাঘ করেছে কি একটা ছোট্ট হরিণের ছানার ঘাড়ে হাল্লুম করে কামড়ে ধরেছে—”

পরে একমাত্র ‘সেকালের বাঘ’ প্রবন্ধে খড়্গদন্ত বাঘ নিয়ে তাঁর ছোট একটা প্রবন্ধ পড়তে পাই।“এবার যে জানোয়ারের কথা বলছি ইংরাজিতে তাকে বলে Sabre-toothed Tiger (অর্থাৎ খড়্গদন্ত বাঘ)। এর কঙ্কাল ইউরোপে, আমেরিকায়, আমাদের দেশে এবং আরও নানা জায়গায় পাওয়া গিয়াছে। এই খড়্গের মতো দাঁত দুটিতে তার কি কাজ হত, সে কথা বলা বড় শক্ত। অত লম্বা দাঁত দিয়ে কামড়াবার সুবিধা হয় না; তাছাড়া, এই বাঘের চোয়ালের হাড় আজকালকার বাঘের মতো মজবুত নয়, সুতরাং তার কামড়ের জোরও কম ছিল। দাঁত দুটি প্রায় ছয় ইঞ্চি করে লম্বা, তার গায়ে ছুরির মতো ধার—হয়ত তা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শিকারের মাংস ছাড়াবার সুবিধা হত।” ব্যাস এইটুকুই।

নাতি সত্যজিৎ অবশ্য বাঘের ব্যাপারে ঠাকুরদাদারই অনুগামী। অবশ্য তাঁর ছোটোবেলার স্মৃতির সঙ্গেও এক বাঘের ছবি জড়িয়ে আছে। ছেলেবেলায় শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসু একবার তাঁকে একটা ডোরাকাটা বাঘ এঁকে দিয়েছিলেন। বাঘের লেজে একটা কালো ছোপ। কারণ জিজ্ঞেস করায় নন্দলাল নাকি বলেছিলেন বাঘটা এক বাড়ির রান্নাঘরে মাংস চুরি করে খেতে ঢুকেছিল, তখনই ল্যাজের ডগাটা ঢুকে যায় জ্বলন্ত উনুনের ভেতর। সন্দেশ পত্রিকা যখন নবরূপে প্রকাশিত হল সত্যজিতের হাত ধরে (মে ১৯৬১) তার প্রথম সংখ্যার ফ্রন্টিসপিসেই ছাপা হয়েছিল নন্দলাল অঙ্কিত সেই বাঘের রঙিন ছবি। সেই শুরু। তারপর বহুবার বাঘ এসেছে সত্যজিতের লেখায়-রেখায়। আর এই নন্দলালই তো বাঙালি শিশুর চিরকালীন প্রাইমার সহজ পাঠ-এ এঁকেছিলেন জলের ধারে বনের মাঝে সেই বাঘের ছবি। সঙ্গে রবি ঠাকুরের লেখা, ‘বনে থাকে বাঘ / গাছে থাকে পাখি / জলে থাকে মাছ / জলে থাকে ফল...’। সত্যজিতের সিগনেট-দিনের প্রচ্ছদে বার তিনেক বাঘের আবির্ভাব ঘটেছে। ১৯৫৫ সালে টুনটুনির বই-এর মলাটে পেপার কাটিং স্টাইলে বাঘকে আঁকা হয়েছে। পরের বছরই প্রমদারঞ্জন রায়ের ‘বনের খবর’ সিগনেট থেকে প্রকাশিত হলে তার প্রচ্ছদে কালো পশ্চাদপটে তীব্র জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে বাঘের মুখ। উপরে সবুজ রঙে হাতে লেখা বনের খবর। তবে বাঘ নিয়ে সত্যজিতের সেরা মলাট ১৯৫৩-এ প্রকাশিত ‘কুমায়ুনের মানুষখেকো বাঘ’-এর প্রচ্ছদ। এমন প্রচ্ছদ বাংলা তথা ভারতীয় কোনো বইতে এর আগে করা হয়েছে কিনা সন্দেহ। দু’-মলাট জোড়া কালো আর হলদে বাঘের ছাল যেন ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। নিচের দিকে গুলির গর্ত যা পিছনের দিকে ফুঁড়ে চলে গেছে। গুলি ঢোকার সময় ফুটো ছোটো হয়। ফুঁড়ে বেরোবার সময় চ্যাপ্টা ও বড়ো হয়। সেটাও প্রচ্ছদ তৈরির সময় মাথায় রেখেছেন সত্যজিত। বাঘছাল অবশ্য অনেক আগেও এঁকেছেন তিনি। ডি. জে. কিমারের যুগে প্যালুড্রিনের বিজ্ঞাপনের একটিতে মেঝেতে পাতা একটি বাঘছাল ঘরের গাম্ভীর্য ও বনেদিয়ানাকে ফুটিয়ে তুলেছে। এই বাঘছাল আবার আগে ‘সোনার কেল্লা’ ছবির জন্য প্যাস্টেলে আঁকা সেট ডিজাইনে কিংবা শঙ্কুর অভিযান আশ্চর্য জন্তু-র ইন্টেরিয়র ডেকরেশন। ‘সন্দেশ’-এর জন্য ধাঁধা-র এর বাড়াবাড়ি, কিংবা ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ কাহিনিতে মেঝেতে থেবড়ে বসা পুতুল হাতে বিবির আসন হিসেবে ব্যবহৃত বাঘছাল সত্যজিতের অলংকরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

১৯৮১ এবং ১৯৮২--পরপর এই দুই বছর প্রকাশিত হয় দুটি ফেলুদা-কাহিনি। যথাক্রমে—‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ ও ‘রয়াল বেঙ্গল রহস্য’। প্রথমটিতে সবুজ জমিনে গ্রেট ম্যাজেস্টিক সার্কাসের পালানো বাঘ সুলতান গোঁফ উচিয়ে দাঁড়িয়ে রিং মাস্টারের সামনে। তার দ্বিতীয়টির খয়েরি জমিনের প্রায় গোটা অংশ জুড়ে সবুজ রঙে বাঘের চোখমুখ আর অরণ্যের গাছপালা। নামলিপিতেও যেন বাঘের গায়ের রঙের ছোঁয়া। ১৯৮৭-তে প্রকাশিত ‘ব্রাজিলের কালো বাঘ ও অন্যান্য’-র প্রচ্ছদে গাঢ় হলুদের উপর নিকষ কালোতে ছাপা ব্রাজিলিয়ান ক্যাটের ভয়াবহ মুখ। তাঁর মুখে রক্তের দাগ। ১৯৬১-তে প্রকাশিত হয় অদ্ভুত এক ত্রিমাত্রিক ছবির বই, নাম ‘The zoo springs to the life’। ভিতরের ছবি তুলেছিলেন নিমাই ঘোষ ও প্রচ্ছদশিল্পী সত্যজিত রায়। প্রচ্ছদেই ছিল খাঁচার ভিতর থেকে বাঘ লাফিয়ে বেরিয়ে আসছে। বাঘের কিছু অংশ গরাদের ভিতর, কিছু অংশ বাইরে।

সন্দেশ পত্রিকার মলাটেও বাঘ এসেছে বহুবার। প্রথমবার অবশ্য সুকুমার রায়ের হাত ধরে। গাছের তলায় টাক মাথা টিকিওয়ালা এক ছেলে সন্দেশ পড়ছে আর পিছনে হাসিমুখ এক বাঘ আর বাঘের পিঠে বক, এমনই ছিল সেই অদ্ভুত প্রচ্ছদ। সত্যজিতের আমলে ১৯৬৯-এর নবম বর্ষের সন্দেশ পত্রিকার প্রচ্ছদে ছোটো-ছোটো চৌকো খোপের মধ্যে অনেক কিছুর মধ্যে বাঘও ছিল। তবে বাঘই প্রধান চরিত্রের রূপ নিল ১৯৮২-র শ্রাবণ সংখ্যার প্রচ্ছদে। গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে বাঘের সন্দেশ পড়ার দারুণ আগ্রহ এখনও পাঠক-পাঠিকাদের মনের মণিকোঠায় সঞ্চিত আছে।

সন্দেশ-এ অলংকরণে বহুবার বাঘ আঁকলেও দু’-মলাটের ভিতরে সব থেকে বেশি সংখ্যক বিভিন্ন ধরণের বাঘ সত্যজিত এঁকেছেন সেরা সন্দেশ বইতে। কী নেই তাতে? মিষ্টি বাঘ, মজার বাঘ, রাগি বাঘ, শিকারি বাঘ। সদানন্দ স্বদেশলাল গল্পে হাসিহাসি মুখের ঘুমন্ত বাঘিনির পায়ে আলতা পরানোর দৃশ্য, গাছের নাম বাঘশাল-এর মিষ্টি বাঘ কিংবা এই বাঘটাই সেই বাঘটা-র মজার বাঘের পাশেই একেবারে সিরিয়াস ঢঙে আঁকেন দুগ্যো সদ্দার কিংবা মানুষখেকোর অন্তিম অনুরোধ-এর বাঘকে। মহাশ্বেতা দেবীর বিরে ডাকাত ছিরে ডাকাত-এর বাঘের সাথে নন্দলালের বনে থাকে বাঘ-এর আশ্চর্য মিল। সত্যজিতের হেডপিসেও বাঘ ফিরে ফিরে আসে। শুটিং-এর গল্প বাঘের খেলা-য় হেডপিস বাঘের গায়ের ডোরাকাটা ফিতে দিয়ে। বাণী রায়ের বিপ্রদাস বা গৌরী ধর্মপালের বাঘা-তে একটানে আঁকা বাঘের কথা কে ভুলতে পেরেছে! সুখেন্দু দত্তের হালুম্বা-তে শুরু বাঘের হাঁ-করা মুখ আর লেজ--মাঝে অসামান্য লেটারিং-এ গল্পের নাম যেন বাঘের গোটা দেহকেই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

সবমিলিয়ে তিন প্রজন্মে একটা প্রাণীরই চোখ ইজ জ্বলজ্বলিং। আর সে হল বাঘ।

বাঘ দিবসের শুভকামনা সবাইকে।