আমার স্ত্রী রসিকতা বোঝে না। কথাটা এখন আমাদের পুরো ফ্রেন্ডসার্কেল জানে।
অথচ বছরখানেক আগেও সবাই বলতো, নিয়াজ, তোর বউয়ের মতো ডায়নামিক মেয়ে হয় না। যেকোনো পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে জানে। আমি গর্বে বুক ফুলিয়ে বলতাম, মৌরির মতো ম্যাচিওর মেয়ে লাখে একটা মেলে।
মজার ব্যাপার হলো, কনে দেখার দিন মৌরির একটা কথায় আমাদের পুরো পরিবার হেসে উঠেছিলো। ফেরার পথে আম্মা বলেছিলেন, মেয়ের মুখে খই ফোটে, বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। হয়েও ছিলো তাই।
আমি মানুষটা খারাপ না। এক যুগের সংসারে কোনোদিন মৌরির গায়ে হাত তুলিনি। প্রত্যেক ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে কিছু না কিছু গয়না দেই। বছরে কক্সবাজার নিয়ে যাই অন্তত একবার। বন্ধুরা বলে, নিয়াজের মতো বর পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। মৌরিকে আমি ভালোবাসি না, এ কথা আমার শত্রুও বলতে পারবে না। আমি শুধু একটু রসিক মানুষ। আড্ডায় আমি না থাকলে কিছু জমে না ঠিকঠাক।
আমার সবচেয়ে জনপ্রিয় জোকটা মৌরিকে নিয়ে। প্রথম বলেছিলাম বউভাতের দিন। বন্ধুরা মৌরির রূপের প্রশংসা করছিলো। আমি হেসে বললাম, বউ দেখে বিয়ে করছি রে, বুদ্ধি দেখে না। মেয়েমানুষের বুদ্ধি তো থাকে হাঁটুতে! সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। ঘোমটার ভেতর থেকে মৌরিও হাসলো।
বিয়ের প্রথম বছর মৌরি একবার রাতে বলেছিলো, জোকটা আমার ভালো লাগে না। আমি বুঝিয়ে বললাম, তুমি এতো সেনসিটিভ কেন? রসিকতা না বুঝলে লোকে ব্যাকডেটেড বলবে। মৌরি আর কোনোদিন কিছু বলেনি। বললাম না, ও ম্যাচিওর মেয়ে।
তারপর থেকে জোকটা আমার ট্রেডমার্ক হয়ে গেলো। কোনো দাওয়াতে কেউ মৌরিকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমি বলতাম, ওকে জিজ্ঞেস করে লাভ নাই, ওর বুদ্ধি তো হাঁটুতে! মৌরি হাসতো। কখনো আমার কাঁধে আলতো চাপড় দিয়ে বলতো, হ্যাঁ, সেটাই। ভাবিরা বলতো, ভাবি স্পোর্টিং মেন্টালির! একটুও রাগ করে না। কেউ কেউ ওর কানে কানে বলতো, আপনি কতো লাকি, নিয়াজ ভাই কতো হাসিখুশি মানুষ!
একবার আমার অফিসের পার্টিতে বস মৌরিকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাবি কী নিয়ে পড়াশোনা করেছেন? মৌরি মুখ খোলার আগেই আমি বললাম, স্যার, ও পড়েছে কিচেন ম্যানেজমেন্ট নিয়ে। মেজর ইন পেয়াজ-হলুদ, মাইনর ইন লবণ-মরিচ! বস হেসে কুটিকুটি ততোক্ষণে। শুধু বসের স্ত্রী হাসেননি, এক পলক মৌরির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ভদ্রমহিলা একটু গম্ভীর টাইপ।
সেই রাতে ফেসবুকে মৌরিকে নিয়ে একটা মজার পোস্টও দিলাম। হাজারখানেক হা হা পড়লো। মৌরিও একটা হা হা দিয়েছিলো।
শুনেছি মৌরি নাকি অনার্সে অঙ্কে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলো। বিয়ের সময় একটা ব্যাংকে চাকরির সাড়াও পেয়েছিলো। আম্মা চাইছিলেন বউ ঘরে থাকুক। আমি জোর করিনি, মৌরি নিজেই রাজি হলো। বললাম না, ম্যাচিওর মেয়ে।
সংসারের হিসাবটাও ও-ই রাখে। মাস শেষে একটা টাকাও এদিক ওদিক হয় না। কীভাবে মেইন্টেইন করে সব, আমি জানি না, জানার দরকারও পড়েনি। গতবার আমার ট্যাক্স রিটার্নে কনসালট্যান্ট একটা বড় ভুল করেছিলো, মৌরি কীভাবে যেন ধরে ফেললো! কপালজোরে মিলে গেছে আরকি। সত্যি বলতে, আমার মোজা জোড়া কোথায় থাকে, সেটাও মৌরি ছাড়া কেউ জানে না। বিকেলে পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চারা ওর কাছে অঙ্ক করতে আসে। আমি ঠা ঠা করে হেসে বলি, নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো!
শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও জোকটা বাদ দিতাম না। শ্বশুর সাহেব একবার গর্ব করে বলেছিলেন, আমার মেয়ে কিন্তু অঙ্কে সবসময় ফার্স্ট হতো। আমি হেসে বললাম, আব্বা, সেই অঙ্ক এখন বাজারের হিসাবে এসে ঠেকছে, সেখানেও গোলমাল! শ্বশুর সাহেব আর কিছু বলেননি। মৌরি বাবার দিকে না তাকিয়ে হাসলো।
আম্মা মাঝে মাঝে মৌরির রান্না নিয়ে খোঁটা দিতেন, এই তরকারিতে লবণ দিছো না চিনি? আমি যোগ করতাম, যার বুদ্ধি হাঁটুতে, তার জিভে আর স্বাদ থাকবে কোত্থেকে! আম্মা হাসতেন, আমি হাসতাম, মৌরিও হাসতো। আব্বাও আম্মাকে নিয়ে এমন মজা করতেন, আম্মাও হাসতেন। আমাদের বাড়িতে এটাই নিয়ম।
কিছুদিন হলো খেয়াল করছিলাম, কেউ মৌরিকে কিছু জিজ্ঞেস করলে ও আগে আমার দিকে তাকায়। তারপর বলে, আমি তো জানি না, ওকে জিজ্ঞেস করেন। আমার ভালোই লাগতো। বউ বরকে মান্য করে।
একবার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি, মৌরি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কী হইছে? ও নির্লিপ্ত সুরে বললো, কিছু না, ঘুম আসছে না। আমি পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। মেয়েদের এমন হয়।
ঝামেলাটা শুরু হলো মাসখানেক আগে, রাতের খাবারের টেবিলে। আমাদের মেয়ে আরশি সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। অঙ্ক বই খুলে বসে ছিলো। মৌরি বোঝাতে যেতেই আরশি খিলখিল করে হেসে বললো, আম্মুকে জিজ্ঞেস করে লাভ নাই, আম্মুর বুদ্ধি তো হাঁটুতে!
আমি হাসতে হাসতে প্রায় বিষম খেলাম। মেয়ে একদম বাপের মতো রসিক হয়েছে। মৌরি চামচটা প্লেটে নামিয়ে রেখে অনেকক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ভাত শেষ না করেই উঠে গেলো। আমি ভাবলাম, ওর শরীরটা হয়তো ভালো নেই। আরশি আমার কানে কানে জিজ্ঞেস করলো, বাবা, হাঁটুতে সত্যি বুদ্ধি থাকে? আমি চোখ টিপে বললাম, তোর আম্মুর থাকে! বাপ-বেটি মিলে হাসলাম আরেক দফা।
তার কয়েকদিন পর জামিলের বাসায় দাওয়াত। সোফায় গাদাগাদি করে বসে ছিলো বন্ধুরা। হাতে হাতে কোকের গ্লাস। জামিলের ছেলেটা একটা লাভ-ক্ষতির অঙ্ক নিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে ঘুরছিলো। মৌরি খাতাটা টেনে নিতেই আমি অভ্যাসমতো বললাম, ওকে দিয়ে কী হবে রে, ওর বুদ্ধি তো হাঁটুতে! ড্রইংরুমভর্তি মানুষ হেসে গড়িয়ে পড়লো। আরশিও সবার দেখাদেখি হাততালি দিয়ে হাসছিলো।
শুধু মৌরি হাসলো না, এক যুগের মাঝে এই প্রথম।
ও চুপচাপ অঙ্কটা কষে খাতাটা ছেলেটার হাতে ফিরিয়ে দিলো। তারপর আমার দিকে না তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বললো, এই কথাটায় আমি আর হাসবো না।
ঘরটা হঠাৎ এমন চুপ হয়ে গেলো যে সিলিং ফ্যানের সূক্ষ্ম শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিলো। এতো মানুষের সামনে এমন অপমান আমাকে কেউ কোনোদিন করেনি। জামিলের বউ তাড়াতাড়ি বললো, ভাবি, এটা তো জাস্ট ফান! সোহেল বললো, ভাবি আবার এতো সিরিয়াস হয়ে গেলেন কবে থেকে? আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, দেখছিস? মজাও বোঝে না! সবাই আবার হেসে উঠলো। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
পরে শুনেছি, অঙ্কটা নাকি ঠিকই হয়েছিলো। জামিলের ছেলে ক্লাসে পুরো নম্বর পেয়েছে। সেটা অবশ্য আলাদা কথা।
ফেরার পথে গাড়িতে মৌরি একটা কথাও বললো না। আরশি পেছনের সিটে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। বাসায় ঢুকে বললাম, তুমি আমাকে সবার সামনে ছোট করলে কেন? মৌরি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, আমি তো কিছু করিনি। হাসিনি কেবল। এমনভাবে বললো, যেন হেসে না ওঠাটা কোনো অপরাধই না!
শ্লেষমাখানো কন্ঠে বললাম, এক যুগ তো হাসলে, আজ হঠাৎ কী হলো? মৌরি বললো, আজ আরশি দেখছিলো। শুনে আমি হাসির দমক নিয়ন্ত্রণ করলাম। বাচ্চারা তো হাসবেই, ওরা কী বোঝে?
একটা মজাকে মৌরি তিল থেকে তাল বানিয়ে ফেললো। খবরটা আম্মার কানেও গেলো। আম্মা বললেন, বর একটু মজা করছে, তাতে এতো কী! আমরা কী কম সহ্য করছি? মৌরির মা-ও ফোনে বললেন, জামাই তো আর মারধর করে না, মা। মানিয়ে নে। সোহেল ফোন করে বললো, দোস্ত, বউরে একটু টাইট দে, নাইলে মাথায় উঠবো। অফিসের এক কলিগ বললো, আজকালকার মেয়েরা সব কথাতেই অপমান খুঁজে পায়, ভাই। বন্ধুদের স্ত্রীরা বলাবলি করলো, ভাবি নাকি আজকাল ফেমিনিস্ট হইছে, ফেসবুকে সস্তা রিলস দেইখা মাথাটা গেছে।
এরপর থেকে মৌরি আর দাওয়াতে যায় না। আমি একা যাই। সবাই জিজ্ঞেস করে, ভাবি কই? আমি বলি, উনি আজকাল খুব সেনসিটিভ, নিরীহ রসিকতা নিতে পারেন না! সবাই হাসে। কেউ কেউ বলে, তোর বউ এতো অসামাজিক হয়ে গেলো কবে রে? আমিও বুঝি না। যে মেয়ে এক যুগ ধরে সব হেসে উড়িয়ে দিলো, সে হঠাৎ এতো ইম্যাচিওর হলো কীভাবে? আপনারাই বলেন, একটা মজার জন্য কেউ এভাবে মুখ ভার করে থাকে?
মৌরি ইদানীং আবার পাড়ার একটা স্কুলে অঙ্কের ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। বন্ধুদের বললাম, যার বুদ্ধি হাঁটুতে, সে নাকি এখন অন্যের ছেলেমেয়েকে অঙ্ক শেখাবে! সবাই হাসলো প্রাণখুলে। রাতে আরশিকে ঘুম পাড়ানোর সময় মৌরি ফিসফিস করে কী যেন বলে, আমি কাছে গেলে চুপ করে যায়। একদিন শুনে ফেললাম, সে বলছে, বুদ্ধি থাকে মাথায়, মা। কেউ অন্য কিছু বললে হাসবি না। মেয়ের মাথায় এসব কী ঢুকাচ্ছে, কে জানে!

গত বৃহস্পতিবার অফিস থেকে ফিরে দেখি, ফ্ল্যাট অন্ধকার। আরশির স্কুলব্যাগটা নেই, মৌরির আলমারির একটা পাল্লা হাট করে খোলা। ফ্রিজের গায়ে আরশির আঁকা ছবিটা তখনো সাঁটানো, তিনজন মানুষ, তিনজনই হাসছে। ডাইনিং টেবিলে লবণদানির নিচে একটা চিরকুট।
গোটা গোটা অক্ষরে লেখা, আরশিকে নিয়ে গেলাম। ও যেন বড় হয়ে না শেখে, অপমান হজম করার আরেক নাম ম্যাচিওরিটি।
নিচে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা আরেকটা লাইন। তুমি তো বলতে আমার বুদ্ধি হাঁটুতে। আজ হাঁটু দুটো কাজে লাগালাম, হেঁটে চলে গেলাম।
চিরকুটটার ছবি তুলে সোহেলকে পাঠালাম। সোহেল লিখলো, হা হা হা! দোস্ত, ভাবি তো দেখি সেই লেভেলের জোক মারছে!
চেয়ারটা টেনে বসে পড়লাম। চিরকুটটা আমি অনেকবার পড়লাম। বিয়ের পর এই প্রথম মৌরি আমাকে নিয়ে একটা জোক করলো।
আমি হাসতে পারলাম না চিরাচরিত হাত-পা ছড়ানো সেই নির্ভার ভঙ্গিতে।
বেরসিক
তাইমুর মাহমুদ শমীক
৫/১০/২০২৬

