বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

পুঁজিবাদের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ: লোমহীনতার রাজনীতি ~ আনুশা মেহরিন

পিরিয়ড হ্যাকস নিয়ে একটা ভিডিও দেখেছিলাম একদিন। ঐখানে একটা হ্যাক দেখায় প্যাড খোলার 'এম্ব্যারেসিং' আওয়াজকে ঢাকার জন্যে কী করতে হবে।
 মাইয়া মানুষ হওয়াটা বিরাট এক সমস্যা। কোনো একটা বিষয়ে সমস্যা না থাকলেও জোর করে সমস্যা বানায়ে মেয়েদের মাথায় পুশ করা হয় এটা লজ্জাজনক একটা সমস্যা, দেখো আমরা এটার সলিউশন দিচ্ছি। 

এটার ১০০/১০০ উদাহরণ হইতে পারে মেয়েদের বডি হেয়ার নিয়ে জিলেটের কারসাজিটা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জিলেট প্রথম সেফটি রেজর আনার পর  পুরুষদের বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর সাথে জিলেটের চুক্তি হয়। প্রতিটি সোলজার কিটের সাথে জিলেটের সেফটি রেজর আর ব্লেড দেয়া হতো। জিলেটের তো তখন রমরমা ব্যবসা। সামরিক বাহিনীর কাছে বাল্ক অর্ডার চলে যাচ্ছে। যুদ্ধের ঐ বছরগুলোয় জিলেট প্রচুর অঙ্কের মুনাফা করেছিলো।  
কিন্তু যুদ্ধ তো কখনো শেষ হবে। আর যুদ্ধ শেষ হলে এই বাল্ক অর্ডার পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেনাবাহিনী ছাড়ার পর পুরুষদের সবসময় ক্লিন শেভড থাকার প্রয়োজনীয়তাও এতটা থাকবেনা। সুতরাং মুনাফা কিছুটা হলেও কমে আসবে।  

জিলেটের তখন চোখ পড়লো বাকি অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ওপর। কিন্তু নারীদের তো দাড়ি শেইভ করার ঝামেলা নাই। তাদের সমস্যার সলিউশন হিসেবে তাহলে জিলেটের প্রোডাক্টকে কীভাবে প্রেজেন্ট করা যায়? 


উত্তর হলো, নতুন একটা সমস্যা তৈরী করে। 
'পার্ফেক্ট নারী' হওয়ার জন্যে সোশ্যাল যেই প্রেশার নারীদের ওপর আছে, জিলেট ঠিক করলো সেটাকে ইউটিলাইজ করবে। ১৯১৫ সালে 'হার্পারস বাজারস' ম্যাগাজিনে একটা বিজ্ঞাপন ছাপা হয় যার মূল বক্তব্য ছিলো তাদের হেয়ার রিমুভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে সমুদ্রে যাওয়ার সময় শরীরের লোম নিয়ে মেয়েদের আর লজ্জা পেতে হবেনা। বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিলো 'You need not be embarrassed!'। অথচ হাস্যকর বিষয় হলো, বডি হেয়ারের মতো স্বাভাবিক ব্যাপার নিয়ে তখন মেয়েদের অতোটা মাথা ব্যথা ছিলো না। পুঁজিবাদ ও বিজ্ঞাপন শুধুমাত্র নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে এই বিষয়টিকে করে তুললো নারীদের জন্যে লজ্জার, অস্বাস্থ্যকর ও আনফেমিনিন। 
জিলেটসহ ঐ সময়ের আরো নামী কিছু কোম্পানি এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল মার্কেটিং শুরু করে। তারা নারীদের প্রেজেন্ট করতে শুরু করলো অত্যন্ত কমনীয়ভাবে, প্রকৃত নারীদের ত্বক হতে হবে 'স্মুথ অ্যাজ সিল্ক', শরীরের ভিজিবল অংশে কোনো লোম থাকলে সেটা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ও আনস্যানিটারি।  সাধারণ নারীরা বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও বিজ্ঞাপনে এসব দেখে হীনমন্যতায় ভোগা শুরু করে এবং নিজেদের শরীরের স্বাভাবিক বিষয়গুলোকে ত্রুটি হিসেবে দেখতে থাকে। আস্তে আস্তে কয়েক জেনারেশনের নারীরা এতেই অভ্যস্ত হতে থাকে ও এই হেয়ার রিমুভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করাটাকে জীবনের অংশ হিসেবে ধরে নেয়। অর্থাৎ, জিলেটসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলো ১০০বছর আগে এমন এক সাইকোলজিক্যাল চক্র তৈরী করে যাতে পা দেয় আমার মতো পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন নারীরা। আমাদের ইনসিকিউরিটিকে কাজে লাগিয়ে, নিজের কাছে নিজের শরীরকে অস্বাভাবিক অনুভব করিয়ে মাল্টিমিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি তৈরী হয়ে গেলো। আর আমরা খুশিমনে তাদের খেলায় দাবার গুটি হয়ে রয়ে গেলাম একশো বছর ধরেই। 

_পুঁজিবাদের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ:  লোমহীনতার রাজনীতি 

আনুশা মেহরিন
০২.০৮.২৬

ছাড়পত্র ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

 রাত দুটো বাজলে এই হাসপাতালটা মরা বাড়ির মতো চুপ হয়ে যায়। করিডোরের লাইট আধখানা নিভিয়ে দেয়। নার্সরা ফিসফিস করে কথা বলে। তখন আমি ফোন করি রাশেদকে। আমার বর ঘুমায় কেবিনের সোফায়। আর আমি কাঁথার নিচে মুখ ঢুকিয়ে কথা বলি সেই মানুষটার সাথে, যার সাথে এগারো বছর আগে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।

শুনতে খারাপ লাগছে? লাগুক। যে মানুষ মরে যাচ্ছে, ভালোমন্দের হিসাব করার সময় তার হাতে নেই।
আমার নাম নীলা। বয়স পঁয়ত্রিশ। ব্রেস্ট ক্যান্সার, স্টেজ ফোর। রোগটা এখন আর শুধু বুকে নেই। লিভারে গেছে, হাড়ে গেছে। ডাক্তারি ভাষায় মেটাস্টেসিস। ডাক্তাররা এখন আর সারানোর কথা বলে না। বলে প্যালিয়েটিভ কেয়ার। কথাটার মানে খুব সোজা। যন্ত্রণাটা একটু কমিয়ে রাখা, আর অপেক্ষা করা।
শুরুটা ছিলো একটা ছোট্ট চাকার মতো শক্ত দলা। বাঁ দিকের স্তনে। ব্যথা ছিলো না। ব্যথা ছিলো না বলেই পাত্তা দিইনি। সংসার ছিলো, অফিস ছিলো। শাশুড়ির ডায়াবেটিস ছিলো। নিজের শরীরটা লিস্টের সবার শেষে ছিলো। যেদিন ডাক্তারের কাছে গেলাম, ততদিনে দলাটা তার কাজ গুছিয়ে এনেছে। বায়োপসি রিপোর্টটা আরিফ আমাকে পড়তে দেয়নি। ওর মুখ দেখেই আমি পড়ে ফেলেছিলাম।
আরিফ ভালো মানুষ। দশ বছরের সংসারে একটা দিনও খারাপ ব্যবহার করেনি। বিল দেয়, ওষুধ আনে। ডাক্তারের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে। রিপোর্টের ফাইল তারিখ ধরে ধরে সাজায়। ও ভালোবাসে দায়িত্ব দিয়ে। কিন্তু আমার তো এখন আর দায়িত্ব লাগে না। আমার এখন গল্প লাগে। পুরোনো দিনের গল্প। আরিফের সাথে আমার পুরোনো দিন মানে ফার্নিচারের কিস্তি আর ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন। আর রাশেদের সাথে আমার পুরোনো দিন মানে গোটা একটা জীবন, যেটা কোনোদিন শুরুই হলো না।
আত্মীয়রা আসে। ফলের ঝুড়ি, হরলিক্সের কৌটা আর মাপা দুঃখ নিয়ে। খালাম্মা বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো মা। ভাবি বলেন, আজকাল ক্যান্সার তো ভালোই হয়ে যায়। বলার সময় কেউ আমার চোখের দিকে তাকায় না। মিথ্যা বলার সময় মানুষ চোখের দিকে তাকাতে পারে না। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। আমার চোখ বন্ধ দেখলে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মরণাপন্ন মানুষের সাথে কী কথা বলতে হয়, এই দেশের কেউ জানে না।
হাসপাতালের রাতগুলো সবচেয়ে লম্বা। ঘুম আসে না। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হিসাব করি, আর কয়টা শ্রাবণ পাবো না, আর কয়টা শীত। আমাদের কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি। এতিম বড় ভারী শব্দ।
রাশেদের সাথে বিয়ের দিন ঠিক ছিলো। কার্ড ছাপা হয়ে গিয়েছিলো। তারপর এক সকালে ওর বাবা মারা গেলেন। হার্ট অ্যাটাক। মরার পর জানা গেলো ভদ্রলোক ব্যবসার নামে মাথার ওপর সত্তর লাখ টাকার দেনা রেখে গেছেন। আমার বাবা তিন দিন চুপ করে রইলেন। চতুর্থ দিন বললেন, যে ছেলের ঘাড়ে বাপের দেনা, তার ঘাড়ে মেয়ে দেবো না। আমি কাঁদলাম। ভাত খাওয়া বন্ধ করলাম। একবার হাত কাটার কথাও ভাবলাম। তারপর যা হয়। তিন মাসের মাথায় আরিফের সাথে বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের রাতে রাশেদের একটা মেসেজ এসেছিলো। দুইটা শব্দ। ভালো থেকো। ব্যস। এগারো বছর আর কোনো কথা হয়নি।
রোগটা ধরা পড়ার পর একদিন আমি ওকে ফোন করলাম। নম্বরটা এগারো বছর মুখস্থ ছিলো। মরণাপন্ন মানুষের একটা সুবিধা আছে। তার আর লজ্জা লাগে না। ও ধরলো। আমি বললাম, রাশেদ, আমি নীলা। আমার ক্যান্সার হয়েছে। শেষ স্টেজ। মরার আগে তোমার সাথে একটু গল্প করতে চাই।
ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ হলো না। তারপর ও শুধু বললো, কখন ফোন করবো, বলো।
সেই থেকে রোজ রাতে আমাদের কথা হয়। ও কথা বলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে, গলা নামিয়ে। ঘরে ওর বউ ঘুমায়। আমি কথা বলি কাঁথার নিচে, ফিসফিস করে। সোফায় আমার বর ঘুমায়। ব্যাপারটাকে বাইরে থেকে দেখলে পরকীয়া ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। অথচ আমরা দুজনেই জানি, এই ফোনের ভেতর শরীর নেই, সংসার ভাঙার প্ল্যান নেই, পালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নেই। আছে শুধু একটা মেয়ে, যে মরে যাচ্ছে। আর একটা ছেলে, যে তাকে মরার আগে কয়েকটা সুন্দর রাত ধার দিচ্ছে। এই সম্পর্কের কোনো নাম বাংলা ভাষায় নেই।
আমরা কী কথা বলি? সব কথা। ক্যাম্পাসের বকুলতলা। ক্যান্টিনের পোড়া সিঙাড়া। টিএসসির চা। রিকশার হুড। আর মাঝে মাঝে এই রোগটার কথা। রাশেদ শুনতে চায় না, তবু আমি বলি। কাউকে তো বলতে হবে।
বলি, জানো, কেমো নেওয়ার সময় মনে হয় শিরার ভেতর দিয়ে কেউ গরম সিসা ঢেলে দিচ্ছে। কেমোর তিন দিন পর থেকে মুখের ভেতর ঘা হয়ে যায়। ভাত গিলতে পারি না। পানি খেলে মনে হয় লোহা খাচ্ছি। জিভে কোনো স্বাদ নেই। আমার মা মরার আগে যে হাতের রান্না খেতে চেয়েছিলাম, সেই খিচুড়িটাও এখন কেমিক্যালের মতো লাগে।
বলি, আমার চুলগুলোর কথা মনে আছে তোমার? ও চুপ করে থাকে। মনে থাকবে না কেন। কোমর পর্যন্ত চুল ছিলো আমার। ও বলতো, তোমার চুলে বৃষ্টির গন্ধ। সেই চুল প্রথম কেমোর পনেরো দিনের মাথায় বালিশে, বাথরুমের মেঝেতে, চিরুনিতে গোছা গোছা উঠে আসতে লাগলো। আমি নিজেই একদিন নরসুন্দর ডেকে মাথা কামিয়ে ফেললাম। কাঁদিনি। শুধু ভুরু দুটো যেদিন ঝরে গেলো, সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারিনি। কেমোথেরাপি খুব সৎ জল্লাদ। সে কিছুই বাকি রাখে না।
অপারেশনের কথাটা ওকে বলেছিলাম আরো পরে। ম্যাসটেকটমি। বাঁ দিকের স্তনটা পুরো কেটে বাদ দিতে হয়েছে। কথাটা বলার সময় আমার গলা কাঁপেনি। ওর কেঁপেছিলো।


কারণ ও জানে ওই বুকের দাম। বিয়ের তিন মাস আগে, এক শ্রাবণের দুপুরে, ওর মেসে কেউ ছিলো না। বাইরে এমন বৃষ্টি যে জানালার ওপাশে শহরটাই ছিলো না। ভেজা পর্দা উড়ছিলো। আমরা দুজন প্রথমবার কাছে এসেছিলাম। আমার তখন কী লজ্জা, কী ভয়, আর তার ভেতরে কী অসম্ভব সুখ। রাশেদ আমার বুকে মুখ রেখে বলেছিলো, এইখানে আমার দেশ। আমি ওর চুলের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে হেসেছিলাম। সারা জীবনে ওই একটাই দুপুর। তারপর তো বিয়েই ভেঙে গেলো।
ফোনে ওকে বললাম, তোমার দেশটা আর নেই রাশেদ। কেটে ফেলে দিয়েছে একটা স্টিলের ট্রেতে। জায়গাটায় এখন একটা লম্বা কাটা দাগ। আরিফ ওই দাগের দিকে তাকায় না। দুই বছর ধরে ও আমাকে ছুঁয়েও দেখে না। ঘেন্নায় না, ভয়ে। যেন আমার শরীরটা কাচের, ছুঁলেই ভেঙে যাবো।
ওপাশে রাশেদ অনেকক্ষণ কথা বললো না। তারপর শুনলাম ও কাঁদছে। পঁয়ত্রিশ বছরের একটা পুরুষ মানুষ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে, মুখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদছে। যেন ঘরের ভেতর শব্দ না যায়।
আমার কেবিনটা ডাবল বেডের। খরচ বাঁচাতে এটাই নেওয়া। পাশের বেডে ছিলেন রাহেলা বানু। বয়স সাতষট্টি। কোলন ক্যান্সার, সাথে কিডনিও বসে যাচ্ছে। উনার তিন ছেলে। তিনজনই ঢাকায় থাকে, ভালো চাকরি করে। পালা করে একজন একজন আসতো। আধা ঘণ্টা বসে, ফোন টিপে, চলে যেতো।
বুড়ি সারাদিন আমার সাথে গল্প করতেন। গ্রামের গল্প, ছেলেদের গল্প। বলতেন, বুঝলা মা, বড় পোলাডারে ইশকুলে দিমু বইলা আমার বিয়ার কানের দুল বেচছিলাম। মেজোডার মেডিকেল কোচিংয়ের সময় ছয় মাস এক বেলা খাইছি। হেরা জানে না। মায়েরা কইতে পারে না এইসব।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, খালা, আপনার কষ্ট হয় না? উনি হাসলেন। ফোকলা মুখে অদ্ভুত মায়া। বললেন, পোলাপান হইলো ধানের মতো, মা। যত্ন কইরা বড় করবা। পাকলেই আর তোমার থাকবো না। তহন সে গোলার। আমি কথাটার মানে তখন পুরোটা বুঝিনি।
বুঝলাম বুধবার রাতে। রাত তিনটার দিকে মনিটরটা চিৎকার করে উঠলো। নার্স দৌড়ে এলো, ডাক্তার এলো। পর্দা টেনে দিলো। ভোররাতে সব শান্ত হয়ে গেলো। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, উনার মুখের ওপর সাদা চাদর টেনে দেওয়া হলো। আগের দিন সকালেই আমাকে বলেছিলেন, মা গো, আইজ শইলডা বড় হালকা লাগতাছে। হালকা লাগবেই তো। সব বোঝা তো উনি নামিয়ে রেখে যাচ্ছিলেন ছেলেদের কাঁধে।
ছেলেরা সেই বোঝা নিলো না।
সকালে তিন ভাই এলো। কান্নাকাটি না, প্রথমেই বিলিং সেকশনে গেলো। বাইশ দিনের আইসিইউ আর কেবিন মিলিয়ে বিল হয়েছে চার লাখ সাতাশ হাজার টাকা। হাসপাতালের নিয়ম পরিষ্কার। বিল ক্লিয়ার না হলে ডেথ সার্টিফিকেট দেবে না। লাশের ছাড়পত্র দেবে না। করিডোরে দাঁড়িয়ে তিন ভাইয়ের ফিসফিস তর্ক আমি কেবিনের ভেতর থেকে শুনলাম। বড়টা বলছে, গত মাসেও আশি হাজার আমি একলা দিছি। মেজোটা বলছে, আমার মেয়ের স্কুলের ভর্তি সামনে, আমি এতো পারবো না। ছোটটা ফোনে কাকে যেন বলছে, আব্বা বাইচা থাকলে এই দিন দেখা লাগতো না।
যে মানুষটা কানের দুল বেচে ওদের মানুষ করলো, তার দাম উঠলো না চার লাখ সাতাশ হাজার টাকা।
অথচ আমি জানি, শেষ কয়টা দিন উনি কাদের মুখ চেয়ে বেঁচে ছিলেন। জ্বরের ঘোরে উনি ছেলেদের ডাকতেন ছোটবেলার নামে। সেলিম, বাবু, টুনু। শেষ যেদিন জ্ঞান পরিষ্কার ছিলো, নার্সের হাত ধরে বলেছিলেন, আমার পোলাগো কইও, আমার লেইগা যেন টেনশন না করে। যে ছেলেরা পরদিন করিডোরে দাঁড়িয়ে বিল ভাগাভাগি করতে পারলো না, মা তাদের টেনশনের কথা ভেবে গেছেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। মা এমনই। ধানের গোলা লুট হয়ে যায়, মাটি টের পায় না।
সারাটা দিন লাশটা পাশের বেডে পড়ে রইলো। সাদা চাদরে ঢাকা। এসির ঠান্ডায় ঘরটা মর্গ হয়ে গেলো। সন্ধ্যায় আরিফ বাড়ি গেলো কাপড় আনতে। আয়া মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়লো। আর আমি জেগে রইলাম একটা লাশের পাশে।
সে এক ভয়ংকর রাত। বারবার মনে হচ্ছিলো চাদরটা উঠছে, নামছে। মনে হচ্ছিলো চাদরের নিচ থেকে উনি আমাকে দেখছেন। জানি সব ভুল, সব মনের বানানো। তবু। মৃত্যু জিনিসটা যতক্ষণ বইয়ের পাতায় থাকে, তাকে দার্শনিক লাগে। পাশের বেডে শুয়ে থাকলে তাকে লাগে হিম, সাদা আর অসহ্য রকমের কাছের। আজ ও, কাল আমি। মাঝখানে শুধু একটা পর্দা।
রাত আড়াইটায় রাশেদকে ফোন করলাম। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিলো না। বললাম, রাশেদ, আমার পাশের বেডে একটা লাশ শুয়ে আছে। ওর ছেলেরা ওকে নিচ্ছে না। টাকার জন্য। রাশেদ, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।
ও একটাবারও বললো না, ভয় পেয়ো না। ও জানে ওই কথায় কাজ হয় না। ও গল্প শুরু করলো। তোমার মনে আছে, ফার্স্ট ইয়ারে তুমি আমার খাতা থেকে নোট চুরি করেছিলে? মনে আছে, বকুলতলায় তোমার স্যান্ডেল ছিঁড়ে গিয়েছিলো আর তুমি খালি পায়ে হেঁটেছিলে, আমি স্যান্ডেল হাতে পেছনে? মনে আছে সেই রিকশাওয়ালা চাচা, যে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বলেছিলো, তোমাগো দুইজনরে মানাইছে ভালা?
এইভাবে, একটা একটা করে স্মৃতি দিয়ে, ও আমাকে ভোর পর্যন্ত পার করে দিলো। ফজরের আজান যখন ভেসে এলো, আমি বললাম, রাশেদ, আমি মরতে চাই না।
কথাটা বলেই বুঝলাম, এই একটা বাক্যের জন্যই আমি এতোদিন ওকে ফোন করছি। আমি বাঁচতে চাই। কী ভীষণ, কী নির্লজ্জ রকমভাবে বাঁচতে চাই। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শাড়ি চাই না, ফ্ল্যাট চাই না, কারো ভালোবাসা পর্যন্ত চাই না। আমি শুধু আরেকটা বর্ষা চাই। ভোরবেলা চায়ের কাপে চুমুক চাই। বৃষ্টির দিনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকা শহর দেখতে চাই। মানুষ সারা জীবন কত বড় বড় জিনিস চায়। মরার সময় সে শিশু হয়ে যায়। সামান্য জিনিস চেয়ে কাঁদে। খিচুড়ি। বৃষ্টি। আরেকটা সকাল।
একদিন রাশেদ জিজ্ঞেস করলো, নীলা, তুমি কি আমাকে এখনো ভালোবাসো? আমি সত্যিটাই বললাম। বললাম, জানি না। মনে হয় আমি তোমাকে ফোন করি নিজেকে ভালোবাসি বলে। তোমার গলার ভেতর সেই তেইশ বছরের নীলাটা এখনো বেঁচে আছে। যার কোমর পর্যন্ত চুল ছিলো, আস্ত শরীর ছিলো, সামনে গোটা একটা জীবন পড়ে ছিলো। আমি রোজ রাতে ওই মেয়েটার সাথে দেখা করতে যাই। মানুষ আসলে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে নিজেকে, রাশেদ। রাহেলা খালার ছেলেরাও তাই। আমিও তাই।
ও একটু চুপ থেকে বললো, আর আমি? আমি বললাম, তুমিও। তুমি আমাকে সময় দিয়ে আসলে এগারো বছরের পুরোনো একটা কষ্ট ধুয়ে ফেলছো। ও রাগ করলো না। শান্ত গলায় বললো, ধুইতে দাও নীলা। এই ময়লাটা অনেকদিন বয়ে বেড়াচ্ছি।
তারপর সেই রাতটা এলো, যেটার ভয়ে আমি এতদিন ফোনের ওপাশের ঘরটার কথা ভাবতাম না। রিং হতেই ফোন ধরলো একটা মেয়েলি গলা। হ্যালো। আমি পাথর হয়ে গেলাম। রাশেদের বউ। গলাটা নরম করে বললো, আপা, ও ওয়াশরুমে। আপনি লাইনে থাকেন, ও আসতেছে। তারপর একটু থেমে বললো, আপা, একটা কথা। আপনি যখন খুশি ফোন দিয়েন। আমি কিছু মনে করি না। মানুষটা এগারো বছর বুকের ভেতর একটা কবর নিয়া ঘুরছে। আপনি আসার পর কবরটায় ফুল দেওয়া হইতেছে। কিছু ঋণ থাকে আপা, শোধ করতে দিতে হয়।
আমি ফোন কানে চেপে নিঃশব্দে কাঁদলাম। মানুষ কত ছোট হয় দেখেছি এই হাসপাতালে। মানুষ এত বড়ও হয়, সেটা জানলাম একটা ফোনকলে।
এখন মরফিনের ডোজ বাড়ছে। ব্যথাটা থাকে হাড়ের ভেতরে, মজ্জায়। দিন আর রাত মিশে যাচ্ছে একটা ঘোলা স্রোতে। কাল ডাক্তার আরিফকে করিডোরে ডেকে নিয়ে কী যেন বললো। আরিফ ফিরে এলো লাল চোখ নিয়ে। আমার পায়ের কাছে বসে প্রথমবারের মতো আমার হাতটা ধরলো। ক্যানোলার পাশটা এড়িয়ে, খুব সাবধানে। আমি বুঝে গেলাম। বিলিং সেকশনে না। ওপরে কোথাও, আমার ছাড়পত্র তৈরি হচ্ছে।
কাল রাতে রাশেদকে বললাম, আমাকে শেষবারের মতো সেই দুপুরটার গল্প বলো। ও বললো। ভেজা পর্দা। জানালার ওপাশে মুছে যাওয়া শহর। টিনের চালে বৃষ্টির তবলা। আমার ভেজা চুলের গন্ধ। ওর ঠোঁট, আমার লজ্জা, সেই একটা দুপুরের সমস্ত আলো। আমি চোখ বন্ধ করে শুনলাম। মরফিনের ঘোরের ভেতরেও শরীরটা একবার কেঁপে উঠলো। পুরোনো সুখ মরে না। সে শুধু ঘুমিয়ে থাকে।
গল্প শেষ হলে বললাম, রাশেদ, আমার জানাজায় এসো না। তুমি সামনে দাঁড়ালে আমার উঠে বসতে ইচ্ছা করবে।
ও হাসলো না। ফোনটাও রাখলো না। আমরা দুজন চুপ করে রইলাম। ওপাশে ওর নিঃশ্বাসের শব্দ। এপাশে স্যালাইনের ফোঁটা। টুপ। টুপ। টুপ।
পাশের বেডে আজ নতুন রোগী এসেছে। অল্পবয়সী একটা মেয়ে, চোখে ভয়। সকালে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপা, আপনার কী হইছে? আমি হাসলাম। বললাম, তেমন কিছু না। ছুটির অপেক্ষায় আছি।
জানালার বাইরে শ্রাবণ মাস। আকাশ কালো করে আসছে। বৃষ্টিটা নামুক। বৃষ্টিটা দেখে যেতে পারলে আর কোনো আফসোস রাখবো না।

বাবা ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার বাবা দুইজন। একজন আমার সাথে আর কথা বলে না। আরেকজনকে আমি পকেটে নিয়ে ঘুরি।
দ্বিতীয়জন একটা গোলাপি ট্যাবলেট। সাইজে বুটের দানার মতো। গায়ে ইংরেজিতে দুইটা অক্ষর খোদাই করা। রাস্তায় ওর অনেক নাম। গুটি, মাল। তবে সবচেয়ে চালু নামটা শুনলে আপনার গা শিউরে উঠবে। বাবা। হ্যাঁ, এই দেশের লাখ লাখ ছেলে ওই গোলাপি জিনিসটাকে বাবা বলে ডাকে। কেন ডাকে, সেটা বুঝতে আমার চব্বিশ বছর লেগে গেলো। বাবার মতোই ও আপনাকে আগলে রাখবে, ভরসা দেবে। আর একদিন দেখবেন ওকে ছাড়া আপনি কিছুই না।
আমার নাম রাফি। মিরপুরের ছেলে। এই গল্পটা আমি লিখছি না, কনফেস করছি। কারণ আমার আর হারানোর কিছু নেই।
তেইশ সালের কথা। আমি তখন একুশ। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে সিএসই পড়ি। রাত জেগে ভ্যালোরেন্ট, ডিসকর্ডে আড্ডা, ফাইভারে টুকটাক লোগো ডিজাইন। মাথার ভেতর সারাক্ষণ উনিশটা ট্যাব খোলা। সিজিপিএ, ক্লায়েন্ট, কানাডার স্বপ্ন, বাবার প্রেশারের ওষুধ, ছোটবোন তিন্নির টিউশনের বেতন। আমাদের জেনারেশনটাই এমন। সবকিছুর সাথে কানেক্টেড। অথচ কারো সাথে কানেক্টেড না। বুকের ভেতর সারাক্ষণ একটা লো ব্যাটারি সাইন জ্বলে।
আর আমরা সবাই পালাই। কেউ রিলসে, কেউ গেমে, কেউ হাসতে হাসতে ডিপ্রেশনের মিম বানায়। বড়রা বলে আমরা অলস। আমরা অকৃতজ্ঞ। তারা বোঝে না, চল্লিশ লাখ বেকারের লাইনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে ঠিক কী দেখা যায়। আমরা কেউ ভালো নেই। আমি শুধু পালানোর সবচেয়ে খারাপ দরজাটা বেছে নিয়েছিলাম, এই যা তফাত।
ওই ঝাপসা জীবনে একটাই স্বস্তির ব্যাপার ছিলো। অথৈ। আমার ক্লাসমেট। টিএসসিতে না। আমাদের প্রেম হতো ইউনিভার্সিটির সিঁড়িতে আর মেট্রোরেলে। ও টিফিন বক্সে নুডলস আনতো দুইজনের জন্য। প্ল্যান ছিলো, গ্র্যাজুয়েশনের পর দুজনে আইইএলটিএস দেবো। কানাডা যাবো। স্নো দেখবো। অথৈ বলতো, তুই খালি পাশটা কর রাফি। বাকিটা আমি সামলাবো। কেউ আমার দায়িত্ব নিতে চাইছে, এই ফিলিংসটাই আমার জীবনের সেরা নেশা ছিলো। তখনো জানতাম না।
অথৈর একটা পাগলামি ছিলো। মন ভালো থাকলে ও আমার হাতের তালুতে আঙুল দিয়ে কী যেন লিখতো। জিজ্ঞেস করলে বলতো না। শুধু বলতো, তুই পাশ করে বের হ, সেদিন বলবো। আমি হাত মুঠো করে রাখতাম, যেন লেখাটা পড়ে না যায়।
সেমিস্টার ফাইনালের আগের সপ্তাহে ঘটনাটা ঘটলো। তিন রাত ঘুমাইনি। দুইটা ব্যাকলগ, ক্লায়েন্টের ডেডলাইন। আদনান বললো, ওর বাসায় গ্রুপ স্টাডি হবে। গিয়ে দেখি স্টাডি না। টেবিলের ওপর সিগারেটের ফয়েল, একটা লাইটার আর ছোট্ট একটা গোলাপি দানা। আদনান হাসলো। বললো, টেনশন নিস না মামা। এইটা খেলে এক রাতে পুরা সিলেবাস শেষ। সবাই খায়। আর্মির পোলাপান খায়, বিসিএস ক্যাডাররাও খায়।
আমি না করেছিলাম। সত্যি বলছি, প্রথমে না করেছিলাম। তারপর ভোর চারটায়, যখন চোখ জ্বলছে আর সিলেবাসের অর্ধেক বাকি, আদনান ফয়েলটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো। বললো, একবার। জাস্ট একবার।
পৃথিবীর সব সর্বনাশ এই শব্দটা দিয়ে শুরু হয়। একবার।
প্রথম টানটার কথা আমি কবরে গিয়েও ভুলবো না। পোড়া মিষ্টি একটা ধোঁয়া গলা দিয়ে নামলো। আর দশ সেকেন্ডের মাথায় মনে হলো মাথার ভেতরের উনিশটা ট্যাব একসাথে বন্ধ হয়ে গেলো। প্রথমবারের মতো, জীবনে প্রথমবারের মতো, সব শান্ত। ক্লান্তি নেই, ভয় নেই, খিদা নেই, ঘুম নেই। শুধু বিদ্যুতের মতো একটা শিহরণ শিরদাঁড়া বেয়ে উঠছে আর নামছে। মনে হলো আমি চাইলে আজ রাতে গোটা সিলেবাস না, গোটা পৃথিবী মুখস্থ করে ফেলতে পারবো। মনে হলো আমার মতো সুখী কেউ কোনোদিন জন্মায়নি। এই যে ফিলিংটা, এইটাই ফাঁদ। স্বর্গ দেখিয়ে ও আপনার নাম, ঠিকানা লিখে নেয়।
সেই রাতে আমি সত্যিই পুরো সিলেবাস শেষ করেছিলাম। পরীক্ষাও ভালো হলো। কিন্তু স্বর্গের ভাড়া আছে। দুইদিন পর নামলো ক্র্যাশ। মনে হলো কেউ আমার শরীর থেকে ব্যাটারিটা খুলে নিয়ে গেছে। টানা ষোলো ঘণ্টা ঘুমালাম। ঘুম ভেঙে দেখি পৃথিবীর রংটাই বদলে গেছে। সব ধূসর। সব বিস্বাদ। সবাই বিরক্তিকর। আর মাথার ভেতর মশার মতো একটা সূক্ষ্ম চিন্তা ঘুরছে। আরেকটা হলেই সব ঠিক হয়ে যায়। ব্রেইনের ভেতর হিসাবটা এভাবেই বসে গেলো। প্রেশার মানেই গোলাপি দানা। প্রথম মাসে সপ্তাহে একটা। পরের মাসে দুইটা। তিন মাসের মাথায় দিনে একটা লাগে। না হলে হাত কাঁপে। মেজাজ সপ্তমে চড়ে। মনে হয় খুলি খুলে ব্রেইনটা চুলকাই।

তারপর টাকার খেলা শুরু। একেকটা দানার দাম তিনশো টাকা। ফাইভারের ইনকাম গেলো। টিউশনের বেতন গেলো। সেমিস্টার ফির সত্তর হাজার টাকা বাবার কাছ থেকে নিয়ে ভার্সিটিতে জমা দিলাম না। বাসায় একটার পর একটা মিথ্যা। ল্যাব ফি লাগবে। প্রজেক্টের জন্য হার্ডডিস্ক লাগবে। বন্ধু বিপদে পড়ছে। নেশাখোরের প্রতিভা জানেন? মিথ্যা বলার সময় আমাদের গলা কাঁপে না। কাঁপে শুধু হাত, দানাটা ফয়েলে বসানোর সময়।
আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতাম না। ছয় মাসে ওজন কমলো তেরো কেজি। গালে দুইটা গর্ত। মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে। দুইটা দাঁত নড়ে ওঠে প্রায়ই। রাতে ঘুম নেই, দিনে মরার মতো পড়ে থাকি। আর মাথার ভেতর ফিসফিসানি। মনে হতো দেয়ালের ওপাশে কেউ আমার নামে কথা বলছে। মনে হতো মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে কেউ দেখছে। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম মেথ সাইকোসিস। আমার ভাষায়, দোজখের ট্রেইলার।
অথৈর কথা বলি। যেটা বলতে আমার সবচেয়ে কষ্ট হয়।
নেশার প্রথম দিকে ইয়াবা শরীরটাকে জানোয়ার বানিয়ে দেয়। ভেতরে একটা খিদা জাগে। যেটা প্রেম না, ক্ষুধা। একদিন হাই অবস্থায় অথৈকে এমন আক্রোশে কাছে টেনেছিলাম যে ওর হাতের চুড়ি ভেঙে হাত কেটে গেলো। ও ছিটকে সরে গিয়ে যেভাবে আমার দিকে তাকালো, ওই দৃষ্টিটা আমি এখনো স্বপ্নে দেখি। ভয়। আমার অথৈ আমাকে ভয় পাচ্ছে। ও কাঁপা গলায় বলেছিলো, তুই আমাকে দেখছিস না রাফি। তুই আমার শরীর দিয়ে অন্যকিছু খাচ্ছিস।
ও ঠিক বলেছিলো। আর সবচেয়ে নোংরা সত্যিটা কী জানেন? কিছুদিন পর ওই ক্ষুধাটাও মরে গেলো। ইয়াবা প্রথমে শরীর জাগায়। তারপর শরীরটাই মেরে ফেলে। শেষদিকে অথৈ পাশে বসলে আমার কিছুই হতো না। কিচ্ছু না। একটা চব্বিশ বছরের ছেলের ভেতরে ভালোবাসার মানুষ ছুঁয়ে দিলে যদি কিছু না জাগে, তার চেয়ে নির্মম প্রহসন আর নেই। আমার সব অনুভূতির একটাই দরজা তখন। গোলাপি।
অথৈ তাও ছাড়েনি। ও আমার নেশার কথা জানতো। বাসায় জানায়নি। নিজের টিউশনির টাকায় আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেছে। ওষুধ কিনে দিছে। শেষবার ও আমার হাত ধরে বলেছিলো, রাফি, আমি তোর নেশার সাথে আর পারতেছি না। হয় ওইটা, নয় আমি। এক মাস টাইম। আমি কসম কেটেছিলাম। সতেরো দিনের মাথায় ও আদনানের ফ্ল্যাটে এসে আমাকে পেলো ফয়েল হাতে।
ও চিৎকার করলে বাঁচতাম। থাপ্পড় মারলে বাঁচতাম। ও কিছুই করলো না। দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলো। তারপর খুব আস্তে বললো, ভালো থাকিস। ব্যস। ভালোবাসা যখন মরে যায়, কোনো চিৎকার চেঁচামেচি হয় না জানেন। কেবল নিঃশব্দে একটা দরজা বন্ধ হয়ে যায়। যাওয়ার সময় ও একবারও আমার হাতের দিকে তাকালো না। হাতের তালুর ওই লেখাটা আমার আর জানা হলো না। কোনোদিন হবেও না।
এরপরের অধ্যায়গুলো দ্রুত বলি। কারণ নেশার গল্পের মাঝের পার্টটুকু সব দেশে, সব ঘরে একই। টাকার জন্য মায়ের কানের দুল বেচলাম। তিন্নির ল্যাপটপের জমানো টাকা সরালাম। ভার্সিটি থেকে নাম কাটা গেলো। আর টাকা যখন কোথাও নেই, তখন শাকিল ভাই হাত বাড়ালো। এলাকার বড় ভাই। বললো, মামা, মাল টানবি টাকা লাগবো না। খালি দুই এক জায়গায় পৌঁছায় দিবি।
আমি ক্যারিয়ার হয়ে গেলাম। মিরপুর থেকে ফার্মগেট। পুরিয়া পৌঁছে দেই। বিনিময়ে আমার ভাগ। শাকিল ভাই নিজে জীবনে একটা দানাও মুখে দেয়নি। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই আপনি খান না? সে হেসে বলেছিলো, পাগল নাকি। মাল হইলো কাস্টমারের লেইগা। বেপারীর লেইগা না। ওই হাসিটা মনে পড়লে আমার এখনো খুন করতে ইচ্ছা করে। আমাদের মতো ছেলেদের জ্যান্ত সমাধি বানিয়ে ওরা প্রাসাদ তোলে।
ধরা খেলাম এক বৃহস্পতিবার রাতে, টেকনিক্যাল মোড়ের চেকপোস্টে। পকেটে বাইশটা দানা। থানায় যা হলো সেটা লিখতে হাত কাঁপছে। ওসির রুমের পাশের ঘরে নিয়ে দুইজন কনস্টেবল লাঠি দিয়ে পায়ের তালুতে মারলো। মুখে যা আসে তাই বলে গালি দিলো। খানকির পোলা, তোর বাপেরে ডাক। ভোরবেলা বাবা সত্যিই এলেন। শিক্ষক মানুষ। সারাজীবন কলার উঁচু করে হেঁটেছেন। ছেলের হাতে হাতকড়া দেখে উনি দারোগার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমার সব সহ্য হয়, বাবার ওই জোড়হাত সহ্য হয় না।
মাদক আইনে মামলা হলো। তেইশ দিন কেরানীগঞ্জ কারাগারে ছিলাম। জানতে চান জেলখানা কেমন? মেঝেতে ঘুমানো একশো লোকের ওয়ার্ডে সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিসটার নাম কী শুনবেন? বাবা। জ্বি। যে জিনিসের জন্য জেলে ঢুকলাম, জেলের ভেতর সে দ্বিগুণ দামে হাজির। এই দেশে চেইনটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, ওই তেইশ দিনে আমি বুঝে গেছি। আর বুঝেছি বলেই বলি, ঘৃণা করলে আমাকে কইরেন না। ঘৃণা করেন ওদের, যারা চালানটা ঢোকায়। যারা মাসোহারা খেয়ে চোখ বোজে। যারা স্কুলগেটে বাচ্চাদের হাতে ফ্রি স্যাম্পল ধরায়া দেয়।
বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে উকিল ধরলেন। জামিন হলো। তারপর আমাকে পাঠানো হলো রিহ্যাবে। সাভারের দিকে একটা প্রাইভেট নিরাময় কেন্দ্র। মাসে পঁচিশ হাজার। ভর্তির দিন মোবাইল কেড়ে নিলো। মাথা ন্যাড়া করলো, বেল্ট খুলে নিলো। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম, এইটা হাসপাতাল না, খোঁয়াড়। চল্লিশজন ছেলে দুইটা ঘরে। ভোর পাঁচটায় ঠান্ডা পানিতে গোসল। খাবারে মাছি মরে লেপ্টে থাকে। উইথড্রয়ালের যন্ত্রণায় কেউ চিৎকার করলে ট্রিটমেন্ট একটাই, পিভিসি পাইপ। ওরা এটাকে বলতো মোটিভেশন। যে স্টাফরা মোটিভেশন দিতো, তারা নিজেরাই এক্স অ্যাডিক্ট। ডাক্তার সাইকোলজিস্ট কিছুই না। সাইনবোর্ডে লেখা ছিলো, ভালোবাসাই মাদকমুক্তির পথ। পাইপের বাড়ি পিঠে পড়লে ওই সাইনবোর্ডটা পড়তাম আর হাসতাম। এক রাতে পাশের ওয়ার্ডের একটা ছেলে পালাতে গিয়ে ধরা পড়লো। ওকে যেভাবে মারা হলো, পরদিন অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয়েছিলো। খবরে মাঝে মাঝে দেখেন না, রিহ্যাবে রোগীর মৃত্যু? বিশ্বাস করেন, ওগুলা দুর্ঘটনা না।
মাসে একদিন ফ্যামিলি ডে ছিলো। মা আসতেন। গ্রিলের এপাশ থেকে আমার ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর কাঁদতেন। যাওয়ার সময় স্টাফদের হাতে পাঁচশো টাকা গুঁজে দিয়ে বলতেন, আমার ছেলেটারে একটু দেইখেন ভাই। ওরা টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে রাতে আমাকে পাইপ দিয়ে পেটাতো। আর সপ্তাহে একদিন হতো কাউন্সেলিং। চল্লিশজনকে এক ঘরে বসিয়ে প্রজেক্টরে একটা মোটিভেশনাল ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হতো। এই দেশে মাদকের চিকিৎসার বাজেট এইটুকুই।
ওই খোঁয়াড়ে আমি সেন্টু ভাইকে পেয়েছিলাম। বয়স তেতাল্লিশ। নয় নম্বর বারের মতো রিহ্যাবে। একসময় ব্যাংকে চাকরি করতো। গুলশানে পোস্টিং ছিলো। ইয়াবা তার চাকরি খেয়েছে, ফ্ল্যাট খেয়েছে। সবশেষে বউ আর সইতে না পেরে ছেলেকে নিয়ে চলে গেছে অস্ট্রেলিয়া। বালিশের নিচে ছেলের একটা ছবি রাখতো। পাঁচ বছরের বাচ্চা। এখন সতেরো। সেন্টু ভাই রাতে ছবিটার সাথে কথা বলতো। আমাকে একদিন বললো, বুঝলি রাফি, রিহ্যাব নেশা ছাড়ায় না। নেশাটারে খালি পজ করায়। প্লে বাটনটা থাকে গেটের ঠিক ওপাশে, রাস্তায়। আমি নয়বার প্রমাণ পাইছি।
সেন্টু ভাইয়ের অষ্টমবারের গল্প শুনে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম। সেবার বের হয়ে সে এগারো মাস ক্লিন ছিলো। একটা কুরিয়ার কোম্পানিতে চাকরিও জুটিয়েছিলো। সপ্তাহে একদিন ছেলের সাথে ভিডিও কল হতো। তারপর এক ঈদের সকালে, ফাঁকা ঢাকায়, ফাঁকা মেসে, একলা ঘরে বসে তার মনে হলো, এতগুলা দিন ভালো থাকলাম, আজ একটু সেলিব্রেট করলে কী হয়। এগারো মাসের সাধনা ভাঙতে এগারো মিনিট লাগেনি। সেন্টু ভাই বলতো, নেশা হইলো কুমিরের মতো রে রাফি। সে তোরে তাড়া করবো না। ঘাটে চুপ কইরা বইসা থাকবো। সে জানে, তোর তেষ্টা একদিন পাইবোই।
চার মাস পর বের হলাম। ওজন বাড়লো, চোখের নিচের গর্ত ভরলো। বাসায় ফিরে তিন মাস সত্যিই ক্লিন ছিলাম। তারপর এক বিকেলে ফেসবুক খুলে দেখি অথৈর বিয়ে। গায়ে হলুদের ছবি। হলুদ শাড়িতে ও হাসছে, যে হাসিটা একসময় আমার জন্য বরাদ্দ ছিলো। ক্যাপশনে লেখা, অ্যান্ড সো দ্য নিউ চ্যাপ্টার বিগিনস। ওই রাতেই আমি শাকিল ভাইয়ের নম্বরে কল দিলাম। সেন্টু ভাই ঠিক বলেছিলো। প্লে বাটনটা রাস্তায়ই ছিলো।
এরপর যে কাজটা করলাম, তার কোনো ক্ষমা হয় না। কোনো অজুহাতও হয় না। টাকার জন্য ঘরে হাত দিলাম আবার। মায়ের শেষ সম্বল, নানির দেওয়া বালা জোড়া। মা হাতেনাতে ধরলেন।
চিৎকার করলেন না। শুধু বালাটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, নে বাবা, বেইচা খা। তাও চুরি করিস না। বাবা সেই রাতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আশ্চর্যরকম শান্ত গলায় বললেন, আজ থেকে তুই আমার কাছে মরা। এই বাড়িতে তোর জায়গা নাই। তিন্নি দরজার আড়াল থেকে দেখছিলো। আমার লক্ষ্মী বোনটা। যে ছোটবেলায় আমার প্লেট থেকে ভাত খেতো, সে আর আমার চোখের দিকে তাকায় না।
এখন আমি একটা মেসে থাকি। শাকিল ভাই এখন আর মহল্লায় দাঁড়ায় না। কালো একটা গাড়িতে ঘোরে। কাউন্সিলরের প্রোগ্রামে মালা পরে। তার পুরোনো কাস্টমারদের মধ্যে দুইজন গত বছর মরে গেছে। একজন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। আরেকজন আদনান। হ্যাঁ, সেই আদনান, যে আমাকে প্রথম ফয়েলটা এগিয়ে দিয়েছিলো। চব্বিশ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে হার্ট বন্ধ হয়ে গেলো। ডাক্তার বললো, মেথ বহুদিন ধরে হার্টটাকে খেয়ে ফেলছিলো। ওর জানাজায় লোক হয়েছিলো এগারোজন। ফেসবুকে তিন দিন শোক। তারপর সবাই ভুলে গেছে। আমাদের জেনারেশন মরলে নিউজফিডে একটা রেস্ট ইন পিস হয়। এই যা!
মা এখনো লুকিয়ে দেখা করেন। মাসে এক দুইবার, বাসার নিচের গলিতে। বাটিতে করে ভাত তরকারি নিয়ে আসেন। কিছু বলেন না, শুধু খাওয়া দেখেন। পৃথিবীর সবাই নেশাখোরকে ত্যাগ করতে পারে। মা পারে না। মায়েদের ওই ক্ষমতাটাই নাই।
আজ আমার ক্লিন থাকার চার মাস তেরো দিন চলছে। রিকভারি মিটিংয়ে যাই। দিন গুনি। ডায়েরি লিখি। ডাক্তার বলছে সম্ভব, অনেকেই ফিরে আসে। আমি বিশ্বাস করার চেষ্টা করি। কিন্তু আপনাদের একটা সত্যি কথা বলি, যেটা কোনো ডাক্তারের সামনে বলিনি।
আমার পকেটে একটা গোলাপি ট্যাবলেট আছে। বহুদিন ধরে। খাইনি, ছুঁইওনি। শুধু রাখি। রাতে যখন হাড়ের ভেতরটা চিনচিন করে, হাত দিয়ে পকেটের ওপর থেকে ওকে অনুভব করি। কী করবো বলেন। মানুষের তো বাবার কাছেই ফিরতে ইচ্ছা করে। আমার এক বাবা আমাকে মৃত ঘোষণা করেছে। আরেক বাবা প্রতি রাতে ফিসফিস করে ডাকে।
আপনারা দোয়া কইরেন, আমি যেন প্রথমজনের কাছে ফিরতে পারি।

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

লো কার্বহাইড্রেট ~ পার্থ সারথী আইন

যতই দিন যাচ্ছে ততোই বুঝছি যে ৩৩ বছর আগে ডাক্তারী পড়ার শেষে যা যা শিখেছিলাম বা যেভাবে শিখেছিলাম সবই আজ প্রায় unlearn করতে হচ্ছে বিজ্ঞানের উন্নতির কৃপায়। যে biochemistry বা physiology র বিষয় গুলো মুখস্থ করে পাশ করে গেছি সেগুলোর গুরুত্বই বুঝিনি তখন বা শিক্ষকেরাও জানতেন না বলে বোঝাতেও পারেননি, আর আজকের মহামারী মেটাবোলিক সিনড্রোম এবং ক্যান্সার এর মহামারী ও তখন ছিলো না।। আজও সেই যুগ পুরাতন শিক্ষা চলছে - যদিও একজন সচেতন বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার সীমিত সাধ্যের মধ্যেই ছাত্র দের সেগুলোর বিষয় চোখ ফোটানোর চেষ্টা করছি, স্বাস্থ্য নিয়ে নানান ভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করে চলেছি।

বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তা চেতনায় আমাদের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হলো আমরা মানুষরা আদতেই অন্তর থেকে পরিবর্তন বিরোধী, একটা নতুন কিছু শেখার বা জানার আগ্রহ ভীষণ কম এবং যদিও বা শেখা গেলো তবুও আমাদের পুরানো চিন্তা বা mindset এর জাল কেটে বেরিয়ে সেই নতুন সত্য কে মেনে নেওয়া বা প্রয়োগ করার মানসিকতাও অত্যন্ত বিরল। রাজনীতিতেও একথা কিন্তু সু প্রযোজ্য। চিকিৎসক ও সাধারণ রোগীদের একটা বিরাট অংশের ক্ষেত্রেও আমি দেখছি এই অনড় মানসিকতা, যেটা তাদের সুস্থতা অর্জনের পক্ষে এক বিশাল বাধা বলেই আমার মনে হয়। 

এরকমই এক বিষয় হলো কোষে কোষে চলতে থাকা পলিওল পথ (Polyol pathway) ও ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদনের বিষয়টি – যেটা কোনদিন মন দিয়ে পড়তামই না সেটা আজ আমাদের মেটাবোলিক অসুস্থতার একটি বড়ো উপায় হয়ে দেখা দিয়েছে, এটা চিকিৎসক দেরও যেমন বুঝতে হবে তেমনি এযুগের স্টুডেন্টস দের ও তেমনি মাথায় ঢোকাতে হবে। তাই এ প্রসঙ্গের অবতারণা করতে বসেছি - সহজ, সরল ভাষায় সব্বার জন্যে। বিজ্ঞানের দ্রুত বদলে যাওয়া দিগন্তের সাথে আমাদের ও পুরানো mindset, পুরানো শিক্ষার খোলস পাল্টাতেই হবে - না হলে ওষুধস্য কৃপা হি কেবলম বলতে বলতেই শ্মশানে পৌঁছে যাবো তাড়াতাড়িই।

একজন শিক্ষকের অন্তর্দৃষ্টি থেকে বুঝি যে চিকিৎসা বিজ্ঞানের টেক্সটবই বা পুরনো কারিকুলাম প্রায়শই আমাদের রোগ নির্ণয় ও ওষুধ প্রেসক্রাইব করার "প্রোটোকল" শেখায়, কিন্তু তার পেছনের মূল বায়োকেমিস্ট্রি বা মেটাবলিক মেকানিজম (মেটাবলিক শারীরবৃত্ত) কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—তা অনেক সময়ই বাদ পড়ে যায়। তাই মুসুর ডাল, টোম্যাটো, খাসীর মাংস খাওয়া যে ইউরিক অ্যাসিড বাড় বাড়ন্তের আসল কারণ নয়, গাদা গাদা ভাত, রুটি খেতে থাকলে যে পলিওল পাথওয়ে দ্রুত গতিতে চলে এবং ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন বাড়ে - এসব সাম্প্রতিক গবেষণা র ফলাফল আমাদের জানতেই হবে, অন্যকে জানাতেও হবে। এসব তথ্য আপনার কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব যাদের তারা চুপ করে বসে আছি, প্রাচীন চিন্তার গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে ভেসে দিন নির্বাহ করার জন্য আর উল্টোদিকে বৃহত্তর অংশের মানুষ ক্রমেই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে - এর চাইতে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে? অনুসন্ধিৎসু বিজ্ঞানী / শিক্ষকরাই যখন এই ধরনের পুরনো মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে শিক্ষার্থীদের চোখ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন, তখনই চিকিৎসার প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় এবং মানুষ তার সুস্বাস্থ্যের অধিকার ফিরে পেতে শুরু করেন ওষুধ নির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে।

পলিয়ল পাথওয়ে (Polyol Pathway) কী এবং কেন এটি জানা দরকার?

Uploaded Image সহজ কথায়, পলিয়ল পাথওয়ে হলো শরীরের কোষ গুলির মধ্যে ঘটে চলা একটি বিকল্প মেটাবলিক পথ, যার মাধ্যমে আমাদের শরীর গ্লুকোজকে (Glucose) সরবিটলে (Sorbitol) এবং পরবর্তীতে ফ্রুক্টোজে (Fructose) রূপান্তরিত করে।



স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের রক্তে থাকা গ্লুকোজের ৯৫% বা তার বেশি ব্যবহৃত হয় শক্তি তৈরির কাজে (Glycolysis ও Krebs Cycle-এর মাধ্যমে)। পলিয়ল পাথওয়েতে স্বাভাবিক অবস্থায় মাত্র ৩-৫% গ্লুকোজ প্রবেশ করে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ (Hyperglycemia) থাকে কিংবা শরীরে প্রচুর পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত ফ্রুক্টোজ প্রবেশ করে।

   (অতিরিক্ত গ্লুকোজ) 
       │
       ▼ (Aldose Reductase এনজাইম - NADPH খরচ করে)
    (সরবিটল (Sorbitol)) ───► (কোষে আটকে যায় ও টিস্যু ড্যামেজ করে)
       │
       ▼ (Sorbitol Dehydrogenase এনজাইম)
   (ফ্রুক্টোজ (Fructose)) ───► (ফ্যাটি লিভার ও মেটাবলিক সিন্ড্রোম বাড়ায়)

কেন এটি মেটাবলিক অসুস্থতার মূল "খলনায়ক"?

বহু বছর ধরে বায়োকেমিস্ট্রিতে পলিয়ল পাথওয়েকে শুধু ডায়াবেটিসের কিছু জটিলতার (যেমন: ছানি পড়া বা নিউরোপ্যাথি) কারণ হিসেবে একটি একঘেয়ে চক্র মনে করে মুখস্থ করানো হতো। কিন্তু আধুনিক মেটাবলিক সায়েন্স দেখাচ্ছে—এটি আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রার মারাত্মক রোগের মূল চালিকাশক্তি:

Uploaded Image ১. সেলুলার অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খালি হওয়া: গ্লুকোজকে সরবিটলে ভাঙতে শরীরের NADPH নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অণু খরচ হয়। এই NADPH-এর কাজ হলো আমাদের শরীরের সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট Glutathione (গ্লুটাথিয়ন)-কে পুনরায় সক্রিয় রাখা।



পলিয়ল পাথওয়ে অতিরিক্ত সক্রিয় হলে শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কভার শেষ হয়ে যায়। ফলে কোষে প্রাবল্য পায় অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, যা ভাস্কুলার ড্যামেজ, ইনফ্ল্যামেশন এবং দ্রুত বার্ধক্যের দিকে নিয়ে যায়।

২. সরবিটলের "অসমোটিক ট্র্যাপ" (Osmotic Trapping)

সরবিটল এমন এক যৌগ যা সহজে কোষের পর্দা (Cell Membrane) পার হয়ে বাইরে বের হতে পারে না। ফলে এটি কোষের ভেতরে জমতে থাকে এবং জল টেনে নেয় (অসমোসিস)।

চোখে: চোখের লেন্সের ভেতরের কোষ ফুলে যায়, ফলে প্রাক-প্রৌঢ়ত্বেই ছানি (Cataract) পড়ে।

স্নায়ুতে: নার্ভ সেল ড্যামেজ হয়ে নিউরোপ্যাথি (পায়ে জ্বালা-যন্ত্রণা, অনুভূতিহীনতা) তৈরি হয়।

৩. এনডোজেনাস বা শরীরের ভেতরে ফ্রুক্টোজ প্রোডাকশন ও ফ্যাটি লিভার
আমরা ভাবি ফ্রুক্টোজ শুধু কোল্ড ড্রিঙ্কস বা মিষ্টি খেলেই শরীরে ঢোকে। কিন্তু রক্তে গ্লুকোজ বেশি থাকলে পলিয়ল পাথওয়ের মাধ্যমে শরীর নিজের ভেতরেই ফ্রুক্টোজ তৈরি করতে শুরু করে (Endogenous Fructose Production)। এই ভেতরে তৈরি হওয়া ফ্রুক্টোজ লিভারে গিয়ে সরাসরি ফ্যাটি লিভার (NAFLD/MASLD), ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ইউরিক এসিড বৃদ্ধি এবং উচ্চ রক্তচাপ ঘটায়।
Uploaded Image


তাহলে পলিয়ল পাথওয়ে আপনার শরীরে জেগে উঠেছে কিনা সেটা বুঝতে কোন টেস্ট করা ভালো - Fasting বা খালিপেটে সুগার নাকি ইউরিক অ্যাসিড টেস্ট?

ফাস্টিং ব্লাড সুগার (FBS) আমাদের শরীরে গ্লুকোজের উপস্থিতির একটি স্থির চিত্র (static snapshot) প্রদান করে, কিন্তু এটি প্রায়শই পলিয়ল পাথওয়ের (polyol pathway) অতি-সক্রিয়তা (hyperactivation) শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।

প্রথমত, উপরে দেওয়া Flow chart টি দেখলে ভালো বুঝবেন, অ্যালডোজ রিডাক্টেজ শান্টিং (aldose reductase shunting) প্রক্রিয়াটা প্রধানত খাবার খাওয়ার পরের গ্লুকোজ স্পাইক বা পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল গ্লুকোজ বৃদ্ধির (>১৪০–১৮০ mg/dL) কারণে ঘটে। 

এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ হেক্সোকাইনেজ (hexokinase) এনজাইম বা উৎসেচক কে সমপৃক্ত (saturate) করে ফেলে, ফলে normal Glucose metabolism এর রাস্তা উপচে পড়ে বাড়তি glucose হু হু করে aldose reductase shunting প্রক্রিয়া নামের bypass রাস্তায় ঢুকে পড়ে, আর excess Fructose এবং Uric acid production কে বাড়িয়ে কোষের খেল খতম করতে থাকে —এমনকি যেসব লোকেদের সকালের ফাস্টিং গ্লুকোজ স্বাভাবিক বা সামান্য বেশী (১০০–১১০ mg/dL), তাদের ক্ষেত্রেও এটি ঘটে। (নীচের ছবি দেখুন )

দ্বিতীয়ত, FBS কোষের ভেতরের মেটাবলিক স্ট্রেস পরিমাপ করতে পারে না। অন্যদিকে ইউরিক এসিড কোষের ভেতরের ATP নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, ফ্রুক্টোলাইসিস (fructolysis) এবং Xanthine Oxido Reductase উৎসেচকের -মধ্যস্থতায় তৈরী ROS (রিয়্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস) – এগুলোর দ্বারা ঘটতে থাকা মেটাবলিক ক্ষতির মাত্রা সরাসরি নির্ধারণ করে যথেষ্ট ভালোভাবে।

তৃতীয়ত, যেহেতু ইউরিক এসিড সক্রিয়ভাবে অ্যালডোজ রিডাক্টেজকে upregulate বা ত্বরান্বিত করে, তাই সিরাম ইউরিক এসিডের উচ্চ মাত্রা নির্দেশ করে যে পলিয়ল পাথওয়েটি প্রাইজড (primed) এবং অতি-সক্রিয় হয়ে উঠেছে। 

ফলস্বরূপ, শুধুমাত্র FBS-এর তুলনায় সিরাম ইউরিক এসিডকে পলিয়ল পাথওয়ের প্রাথমিক অতি-সক্রিয়তা এবং এনডোজেনাস ফ্রুক্টোজ-জনিত মেটাবলিক সমস্যা শনাক্ত করার জন্য একটি অনেক উৎকৃষ্ট ও কার্যকর মার্কার (functional marker) হিসেবে গণ্য করা হয়।
Uploaded Image


দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং সামগ্রিক এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগ সৃষ্টি পথের গতিশীলতা
পলিয়ল পাথওয়ের অতি-সক্রিয়তার খারাপ প্রভাব বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং সামগ্রিক পূর্ব ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর জিনগত ও মেটাবলিক প্রবণতা (susceptibility) অনেক বেশি দেখা যায়।

জিনোমিক পর্যায়ে বদলের ফলে অ্যালডোজ রিডাক্টেজের mRNA এক্সপ্রেশন এবং লোহিত রক্তকণিকায় এই এনজাইমের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এপিডেমিওলজিক্যাল বা মহামারী সংক্রান্ত সমীক্ষায় দেখা গেছে যে পূর্ব এশীয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই জেনেটিক উস্কানিদাতা র প্রাদুর্ভাব বেশ বেশি।

যাদের মধ্যে CT বা TT জেনোটাইপ রয়েছে, তাদের শরীরে এনজাইমের এই উচ্চমাত্রার উপস্থিতির কারণে পলিয়ল শান্টিং শুরু হওয়ার জন্য গ্লুকোজের প্রয়োজনীয় থ্রেশহোল্ড (threshold) কমে যায়। এর ফলে ফাস্টিং গ্লুকোজের মাত্রা ১০০–১১০ mg/dL-এর মতো কম থাকলেও অ্যালডোজ রিডাক্টেজ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, এশীয় জনগোষ্ঠীর যেসব ব্যক্তির মধ্যে এই -106T অ্যালিল রয়েছে, তাদের মাইক্রোভাস্কুলার জটিলতা—যেমন প্রোলিফারেটিভ ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, ডায়াবেটিক কিডনি ডিজিজ এবং পেরিফেরাল পলিনিউরোপ্যাথির ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়।

এই জিনগত সংবেদনশীলতা এশীয়দের নির্দিষ্ট এশিয়ান মেটাবলিক ফেনোটাইপ -এর সাথে সম্মিলিতভাবে কাজ করে। এই ফেনোটাইপের বৈশিষ্ট্য হলো—কম BMI থাকা সত্ত্বেও (>২৩ kg/m²) শরীরে ভিসেরাল ফ্যাটের (পেটের মেদ) উচ্চ শতাংশ, প্রাথমিক ধাপে ইনসুলিন নিঃসরণের অক্ষমতা এবং খাবার খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজের দ্রুত ও অত্যাধিক ওঠানামা (postprandial glucose variability)।

উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত রিফাইন বা প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার খেলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায় (>১৮০ mg/dL), যা হেক্সোকাইনেজ এনজাইমকে সংপৃক্ত করে ফেলে। ফলে সকালের ফাস্টিং গ্লুকোজ সামান্য বেশি থাকলেও বারবার পলিয়ল শান্টিং ঘটতে থাকে। এর সাথে স্থানীয় হাইপারইউরিসেমিয়া (উচ্চ ইউরিক এসিড) এবং ফ্যাটি লিভারের (NAFLD/MASLD) উচ্চ হার যুক্ত হয়ে এমন এক মেটাবলিক পরিবেশ তৈরি করে, যা পলিয়ল পাথওয়েকে ক্রমাগত সক্রিয় রাখতে ইন্ধন জোগায়।

জিন এবং পরিবেশের এই মিথস্ক্রিয়া (gene-environment interaction) বিভিন্ন ক্লিনিকাল ট্রায়ালে চিকিৎসাগত কার্যকারিতার পার্থক্যের একটি ব্যাখ্যা প্রদান করে। যেমন, অ্যালডোজ রিডাক্টেজ ইনহিবিটর (ARIs)—ইপালরেস্ট্যাট (epalrestat)— ওষুধটি জাপানি, চীনা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ডায়াবেটিস রোগীদের মাইক্রোভাস্কুলার রোগবালাই বিলম্বিত করতে ধারাবাহিকভাবে চমৎকার ক্লিনিকাল সুবিধা দেখিয়েছে কিন্তু আবার অন্যদিকে, ককেশীয় বা শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর করা ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলোতে এর কার্যকারিতা খুবই সীমিত পাওয়া গেছে—কারণ তাদের মধ্যে এই -106T জেনেটিক ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি কম এবং তাদের মেটাবলিক সিন্ড্রোম প্রধানত ম্যাক্রোভাস্কুলার ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহ দ্বারা পরিচালিত হয়।

কীভাবে এই পাথওয়েকে শান্ত রাখা সম্ভব?

বিজ্ঞানের এই আপডেট আমাদের স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে, শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর না করে আসল কারণ দূর করতে হবে:

রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট ও চিনি বর্জন: লাইফস্টাইল থেকে অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমালে রক্তে গ্লুকোজের অতিরিক্ত বৃদ্ধি থামে, ফলে পলিয়ল পাথওয়ে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায় না।

প্রসেসড ফ্রুক্টোজ এড়ানো: সফট ড্রিঙ্কস, প্যাকেটজাত জুস এবং হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাফ বন্ধ করা।
টাইম-রেস্ট্রিক্টেড ইটিং / ফাস্টিং: শরীরকে গ্লুকোজ ও ইনসুলিন স্পাইক থেকে বিরতি দেওয়া, যাতে কোষগুলো নিজেকে মেরামত (Autophagy) করতে পারে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপোর্টিং ফুড: যা শরীরের Glutathione এবং NADPH লেভেল ধরে রাখতে সাহায্য করে।

নীচের ছবি গুলো ভালো করে দেখুন / পড়ুন : মূল কথা যা মনে রাখুন,গাদা গাদা ভাত, রুটি খাবেন না। চিঁড়ে, মুড়ি, বিস্কুট, চাউমিন, ময়দা র খাবার এড়িয়ে চলারই চেষ্টা করুন। Low carbohyrate - high fat - moderate protein diet এ যতো তাড়াতাড়ি পারেন ঢুকে পড়ুন, মাছ, মাংস, ডিম ( কিডনির শেষ দশা না হলে রোজ ৬টা করে ডিম খাওয়া দিয়ে শুরু করুন ), ঘি, নারকেল তেল প্রাণ ভরে খান। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে সপ্তাহে কাঁচা রান্না করা অবস্থায় প্রায় ৩৫০–৫০০ গ্রাম) খাসীর মাংস খাওয়া নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবে এটা আপনি স্বাভাবিক শর্করা ডায়েটে আছেন ধরে নিয়ে, কিন্তু যদি আপনি আমার মতো low carbohydrate ডায়েট এ অভ্যস্ত হন তাহলে আরামসে সপ্তাহে ৭০০-৮০০ গ্রাম খাসীর মাংস( দৈনিক গড়: এটি গড়ে দিনে প্রায় ১০০ গ্রাম-এর মতো পড়ে) খেতে পারবেন, সাথে ডিম, মাছ ও। লাভ কী হবে এতে? ইউরিক অ্যাসিড কমবে, ট্রাইগ্লাইসেরাইড কমবে, সুগারও নিয়ন্ত্রণে আসবে, কারণ আপনি পলিওল pathway কে বন্ধ করে ফেলেছেন এভাবে। তাহলে খাবারের বিজ্ঞান টা কি বোঝা গেলো?

মনে রাখবেন আপনার রক্তের ইউরিক অ্যাসিড ৪. ৫ এর ওপরে থাকা মানেই লাল সিগন্যাল - এর মানে আপনার খাবারে বাড়তি শর্করা ঢুকছে এবং তা পলিওল পথে shunt হয়ে যাচ্ছে - তাই তখনই কার্বোহাইড্রেট এর পরিমাণ কমিয়ে মাছ, মাংস ডিম বাড়িয়ে দিতে হবে।

আশা করি আমার এই সামান্য প্রচেষ্টা এবং চিন্তাভাবনা আমার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও মেটাবলিক স্বাস্থ্যের প্রকৃত রহস্য বুঝতে সাহায্য করবে।

শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

ফুলের মানুষ ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার প্রকাশক বলেন, আপনার লেখায় আজকাল প্রাণ নাই।

আমি বলি, প্রাণ কই কিনতে পাওয়া যায় বলেন, নিয়া আসি।

উনি হাসেন না। রয়্যালটির চেক লিখতে লিখতে গম্ভীর মুখে তিনটা পরামর্শ দেন। প্রেমে পড়েন। নেশা ছাড়েন। ভোরবেলা হাঁটেন। তিনটার একটাও আমাকে দিয়ে হবে না জেনেও আমি বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ি।

বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। দুইটা উপন্যাস, একটা গল্পের বই, আর ড্রয়ার ভর্তি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমার সংসার। মহল্লার লোকে জানে আমি লেখক। ঘনিষ্ঠরা জানে আমি মা তা ল। আর আমি জানি, আমি আসলে একটা দীর্ঘ অপেক্ষা। কীসের অপেক্ষা, জানি না। জানলে তো গল্পই শেষ হয়ে যেতো।

তানভীর আমার একমাত্র বন্ধু, যে এখনো আমাকে মানুষ মনে করে। ডকুমেন্টারি বানায়। এক সন্ধ্যায় আমার ফ্ল্যাটে এসে গ্লাসে চুমুক না দিয়েই বলল, শ্রীমঙ্গল ছাড়াইয়া পাহাড়ের ভিতরে একটা জায়গা আছে। নাম মেঘমাটি। জনা ত্রিশেক মানুষ থাকে। টাকা চলে না, ঘড়ি চলে না, মোবাইলের নেটওয়ার্ক ঢুকতে পারে না। নিজেরা ফলায়, নিজেরা খায়, রাইতে আগুন জ্বালাইয়া গান গায়। যাবি?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিদ্যুৎ আছে?

সে বলল, চাঁদ আছে।

উত্তরটা আমার পছন্দ হলো। নতুন উপন্যাসের মালমশলা হবে ভেবে ব্যাগে দুইটা শার্ট আর একটা বোতল ভরে রওনা দিলাম। যাওয়ার সময় আমি জানতাম, আমি যাচ্ছি একদল পলাতক অলস মানুষ দেখতে, যারা জীবনের পরীক্ষায় ফেল করে পাহাড়ে পালিয়েছে। ফেরার সময় জানলাম, পলাতক আসলে আমি। পালানোর সাহসটাও নাই বলে ঢাকায় বসে ছিলাম এতকাল।

মেয়েটাকে প্রথম দেখি ঝর্নার পাড়ে। ভেজা পাথরে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে চুলে জংলি ফুল গুঁজছে। পরনে আলখাল্লা ধরনের একটা জামা, হাতে রঙ লেগে থাকা আঙুল, আর মুখে এমন একটা নির্ভার ভাব, যেটা আমি ঢাকা শহরে বিশ বছরে একবারও দেখিনি। কারো মুখে না। আয়নায় তো নাই ই।

তানভীর পরিচয় করিয়ে দিলো, ইনি বিখ্যাত লেখক। মেয়েটা হাত মেলালো না, মাথাও নোয়ালো না। শুধু বলল, এইখানে কেউ বিখ্যাত না। খিদা লাগলে রান্নাঘরে খিচুড়ি আছে।

নাম জিজ্ঞেস করলে বললো, রোদ।

আসল নাম?

যেইটা কইলাম, সেইটাই আসল। বাপ মায়ের দেওয়াটা পুরান ঠিকানার মতো। চিঠি আর ওইখানে যায় না।

আমি হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, ফাঁ প র। শহরে এই বয়সী মেয়েরা কর্পোরেট চাকরি করে, আর এরা ফুল গুঁজে দর্শন কপচায়। রাতে খাওয়ার পর উঠানে আগুন জ্বলল। কেউ দোতারা আনলো, কেউ মাটির খোল। আমি একটু দূরে বসে নিজের বোতল খুললাম। কেউ আড়চোখে তাকালো না, কেউ বাহবাও দিলো না। এই প্রথম টের পেলাম, আমি এমন এক জায়গায় আসছি যেখানে আমার নেশাটাও কারো কাছে খবর না। ব্যাপারটায় আরাম পাবো না অপমানিত হবো, বুঝলাম না।

রোদ আগুনের ওপাশ থেকে উঠে এসে আমার পাশে বসল। বলল, আপনে সারাক্ষণ সবাইরে মাপতেছেন ক্যান?

মানে?

আসার পর থেইকা দেখতেছি। চোখ দিয়া সবার দাম ঠিক করতেছেন। এইটা শহরের রোগ। ওইখানে মানুষ দেখলেই আগে হিসাব করে, এর কাছ থেইকা কী পাওয়া যাইবো, একে কতটুকু বিশ্বাস করা যাইবো। আমরা এই হিসাবটা ছাইড়া দিছি। ছাড়ার পর দেখি, দিনে চাইর পাঁচ ঘণ্টা সময় বাঁইচা যায়।

আমি বললাম, এই যে তোমরা সমাজ ছাইড়া পালাইলা, এইটা কি এক ধরনের হার না?

রোদ আগুনের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর যেটা বলল, সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।


উনিশশো সাতষট্টি সাল। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরের হেইট অ্যাশবেরি নামের এক পাড়ায় এক লাখ তরুণ তরুণী জড়ো হইছিলো এক গ্রীষ্মে। ইতিহাসে ওই গ্রীষ্মের নাম সামার অব লাভ। ভালোবাসার গ্রীষ্ম। এরা কারা? এরা ওই দেশের সবচেয়ে ভাগ্যবান পোলাপান। সবচেয়ে ধনী দেশের, সবচেয়ে সুখী সময়ের সন্তান। বাপের গাড়ি আছে, ভবিষ্যতে ব্যাংকের চাকরি আছে। সব ফালাইয়া এরা রাস্তায় নামলো ক্যান, কন তো?
জানি না।

কারণ সরকার তাগো ভাইদের ধইরা ধইরা ভিয়েতনামের যুদ্ধে পাঠাইতেছিলো। মরতে। যেই যুদ্ধের মানে কেউ জানে না। পোলাপানগুলা বুঝলো, যেই সিস্টেম আমারে গাড়ি বাড়ি দিতেছে, সেই একই সিস্টেম আমার ভাইরে কফিনে ভইরা ফেরত পাঠাইতেছে। তখন তারা ঠিক করলো, এই খেলায় আমরা নাই। তারা বন্দুকের নলের ভিতরে ফুল ঢুকাইয়া দিলো। মিছিলে সৈন্যের বেয়নেটের সামনে খাড়াইয়া এক মেয়ে ফুল ধরলো, সেই ছবি সারা দুনিয়ায় ছড়ায়া গেলো। মানুষ তাগো নাম দিলো ফ্লাওয়ার চিলড্রেন। ফুলের মানুষ। এখন আপনেই কন, বন্দুকের সামনে ফুল নিয়া খাড়ানি হাইরা যাওয়া, নাকি বন্দুকের লাইনে চুপচাপ খাড়ায়া থাকা হাইরা যাওয়া?

আমি উত্তর দিতে পারলাম না। বোতলে আরেকটা চুমুক দিলাম। রোদ উঠে গিয়ে আবার গানের দলে মিশে গেলো। আর আমি টের পেলাম, আমার ভিতরে কোথায় যেন একটা পুরনো দেয়ালে চিড় ধরার শব্দ হলো।

পরদিন থেকে আমি রোদের পিছে পিছে ঘুরতে লাগলাম। লেখক হিসেবে নোট নিচ্ছি, এই অজুহাতে। রোদ সবজি বাগানে কাজ করে, আমি পাশে বসে থাকি। রোদ বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখায়, আমি দূর থেকে দেখি। নিজেকে বোঝাই, এইটা রিসার্চ। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গেলে বুঝি, চল্লিশ বছর বয়সে এই প্রথম আমার রিসার্চের বিষয়ের গলার স্বর না শুনলে বুক খালি খালি লাগে। শরীরে মদ না পড়লে যেমন লাগে, তার চেয়েও খারাপ। এই তুলনাটা যে করতে পারলাম, এতেই বোঝেন অবস্থা কই গেছে। আমি প্রেমে পড়ছি। পাগলের মতো, কিশোরের মতো, হাবুডুবু খেয়ে।

রোদের কাছ থেকেই জানলাম, ও অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা মেয়ে। মাল্টিন্যাশনালে চাকরি করতো। একদিন অফিসের চেয়ারে বসে হিসাব করে দেখলো, বেতনের টাকায় সে যা যা কিনতেছে, তার সবগুলাই আসলে ওই চাকরিটা করার ক্ষতিপূরণ। দামি জামা কিনতেছে অফিসে পরার জন্য। দামি রেস্টুরেন্টে খাইতেছে অফিসের ক্লান্তি ভুলতে। দামি ছুটিতে যাইতেছে অফিস থেইকা পালাইতে। ও বলল, বুঝলেন, আমি বেতন দিয়া আসলে ওষুধ কিনতেছিলাম, আর অসুখটার নাম ওই বেতন।

এই মেয়ের সাথে তর্কে পারা মুশকিল। আমি তবু চেষ্টা করতাম। একদিন বললাম, তোমাদের এই হিপ্পি ব্যাপারটা তো পুরাটাই বিদেশি জিনিস। আমদানি করা দর্শন।

রোদ এমনভাবে হাসলো, যেন আমি খুব মজার একটা ভুল করছি। বলল, উল্টা। জিনিসটা ওরাই আমাগো কাছ থেইকা নিছে। ষাটের দশকে অ্যালেন গিন্সবার্গ নামে এক আমেরিকান কবি বছর দেড়েক পইড়া ছিলেন কলকাতা আর বেনারসে। বাউল ফকিরগো লগে ঘুরছেন, শ্মশানে রাইত কাটাইছেন। দেশে ফিরা উনি আর উনার বন্ধুরাই হিপ্পিগো গুরু হইলেন। বিটলসের কথা তো জানেনই, আটষট্টি সালে পুরা ব্যান্ড ভারতে আইসা ঋষিকেশে আশ্রমে উঠলো, ধ্যান শিখতে। আর লন্ডন থেইকা ইস্তাম্বুল, তেহরান, কাবুল হইয়া কাঠমান্ডু পর্যন্ত একটা রাস্তা চালু হইলো, রঙচঙা বাসে কইরা হাজার হাজার তরুণ তরুণী পূবের দিকে আসতো। ইতিহাসে ওই রাস্তার নাম হিপ্পি ট্রেইল। কাঠমান্ডুতে যেই গলিতে তারা থাকতো, সেই গলির নাম হয়া গেলো ফ্রিক স্ট্রিট। পাগলগো রাস্তা। ভাইবা দেখেন, দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী দেশগুলার পোলাপান সব ছাইড়া ছুইড়া আমাগো এই গরিব পূব দিকে আসতো। কী খুঁজতে আসতো? যেই জিনিস ডলারে কিনতে পাওয়া যায় না, সেইটা।

আর সবচেয়ে বড় কথাটা কী জানেন? রোদের গলা নরম হয়ে এলো। একাত্তরে যখন আমরা মরতেছি, শরণার্থী হয়া ভাসতেছি, তখন দুনিয়ার কোন মানুষগুলা সবার আগে আগায়া আসছিলো? এই হিপ্পিরাই। গিন্সবার্গ নিজে যশোর রোডে আইসা শরণার্থীগো লাইন দেইখা কবিতা লেখলেন, সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। আর জর্জ হ্যারিসন, রবিশঙ্করের ডাকে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট করলেন, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। ইতিহাসের প্রথম বড় চ্যারিটি কনসার্ট, আর সেইটা হইছিলো আমাগো নামে। চল্লিশ হাজার মানুষ টিকেট কাটছিলো আমাগো শরণার্থীগো জন্য। যেই ফুলের মানুষগুলারে আপনে অলস কন, আমাগো সবচেয়ে খারাপ দিনে তারাই আমাগো নাম দুনিয়ারে চিনাইছিলো।

আমি চুপ করে রইলাম। আমার লজ্জা লাগছিলো। লেখক মানুষ, অথচ এই ইতিহাস আমি এইভাবে কোনোদিন ভাবিনি।

আরেকদিন জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, লালন ফকিরের নাম তো তোমরা খুব নেও। উনার সাথে এইসবের সম্পর্ক কী?

রোদ বললো, সম্পর্ক না, উনিই তো আদি। হিপ্পিরা যা করছে ষাট সালে, আমাগো বাউল ফকিররা তা করছে তারও দুইশো বছর আগে। জাত মানে না, সম্পত্তি জমায় না, একতারা নিয়া পথে পথে ঘোরে, আখড়ায় দল বাইন্ধা থাকে, আর গানরে বানাইছে প্রতিবাদের ভাষা। সমাজ তাগো পাগল কইছে, ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়া ভাঙছে, তবু তারা থামে নাই। উডস্টকের কথা শুনছেন? উনসত্তর সালে এক খামারে পাঁচ লাখ মানুষ তিনদিন ধইরা গান শুনছিলো, বৃষ্টিতে ভিজা, কাদায় মাখামাখি হইয়া, একটাও মারামারি হয় নাই। সবাই কয় অলৌকিক ঘটনা। আর আমাগো কুষ্টিয়ায় দেড়শো বছর ধইরা দোলপূর্ণিমায় লাখ মানুষের সাধুসঙ্গ হয়, কেউ খবরও রাখে না। আসলে কী জানেন, দুনিয়ার সব জায়গায়, সব যুগে, কিছু মানুষ থাকে যারা দৌড়াইতে রাজি না। তারা হাঁটে। আর হাঁটে বইলা তারাই একমাত্র রাস্তার ফুলগুলা দেখতে পায়।

এইসব শুনতে শুনতে আমার দিন কাটতে লাগলো। বোতলটার কথা মাঝে মাঝে মনেই থাকতো না। ব্যাপারটা আমি রোদকে বলিনি। বললে বলতো, দেখছেন, নেশা জিনিসটা আসলে শূন্যস্থান পূরণ। জায়গা ভরা থাকলে নেশার জায়গা হয় না। এই মেয়ের সমস্যা হলো, ওর সব কথাই ঠিক হয়। আর যেই মানুষের সব কথা ঠিক হয়, তার প্রেমে না পইড়া উপায় থাকে না।

পূর্ণিমার রাতে ওদের বড় আসর বসলো। মশাল, দোতারা, খোল, আর গলায় গলায় লালন। আমি সেই রাতে একটা অদ্ভুত জিনিস টের পেলাম। গানের মাঝখানে হঠাৎ মনে হলো, সময় জিনিসটা থেমে গেছে। ঘড়ি নাই বলে না। ভিতরের যেই ঘড়িটা সারাক্ষণ বলে, দেরি হয়া যাইতেছে, দৌড়া, সেই ঘড়িটা থেমে গেছে। আমার মনে হলো, আমি আমার মৃত মায়ের রান্নাঘরে বসে আছি। মনে হলো, আমি ক্লাস সেভেনের সেই দুপুরে ফিরে গেছি, যেদিন প্রথম কবিতা লিখে মনে হয়েছিলো, আমার হাতে জাদু আছে। আমার চোখ ভিজে উঠলো, এবং লুকানোর জন্য আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চাঁদটাও কেমন টলটল করছিলো। ঘোর। শব্দটার মানে আমি সেই রাতে প্রথম বুঝলাম। নেশায় যেই ঘোর হয়, এইটা সেই ঘোর না। ওইটা ভুলে থাকার ঘোর, এইটা মনে পড়ার।

সেই রাতেই, আসর ভাঙার পর, ঝর্নার পাড়ে আমি রোদকে বললাম কথাটা। চল্লিশ বছর বয়সী মানুষ, দুই হাত কাঁপছে কিশোরের মতো। বললাম, আমার সাথে ঢাকা চলো। বিয়া করি। তুমি ছবি আঁকবা, আমি লেখবো।

রোদ অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওর চোখে করুণা না, বিরক্তি না, অন্য কিছু একটা। তারপর বলল, আপনে আমারে ভালোবাসেন, না আমার এই থাকাটারে ভালোবাসেন?
মানে?

আপনে ঢাকায় আমারে নিতে চান ক্যান জানেন? যেমনে মানুষ পাহাড় থেইকা ঝর্নার পানি বোতলে ভইরা নিয়া যায়। বাসায় গিয়া খুইলা দেখে, এইটা তো সাধারণ পানি। ঝর্নাটা আসলে পানি না। ঝর্নাটা হইলো পাহাড়, গাছ, পাথর, আর নামতে থাকা। আমারে এই জায়গা থেইকা তুইলা নিলে যেইটা পড়ে থাকবো, সেইটা আমি না।

আমি বললাম, তাইলে আমিই এইখানে থাইকা যাই?

সে মাথা নাড়লো। আপনেও পারবেন না। আপনের নেশা খালি বোতলে না, আপনের নেশা দুঃখে। আপনে দুঃখ দিয়া লেখেন। এইখানে থাকলে আপনের দুঃখগুলা শুকায়া যাইবো, আর আপনে আমারে দোষ দিবেন। ভালোবাসা মুঠায় ধরার জিনিস না, লেখক সাহেব। বাতাস মুঠায় ধরলে হাতে কী থাকে? ঘাম।

তারপর সে যা বললো, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বললো, আমি পরশু রওনা দিতেছি। পুরানা রাস্তাটায়। বাসে কইরা, ট্রাকে কইরা, হাঁইটা। নেপাল, কাঠমান্ডু, ফ্রিক স্ট্রিট। যেই রাস্তায় পঞ্চাশ বছর আগে ফুলের মানুষরা হাঁটছে, আমি উল্টাদিক থেইকা হাঁটুম। দেখতে চাই, রাস্তাটার ফুল এখনো ফোটে কি না।

যাওয়ার দিন ভোরে সে আমার হাতে একটা শুকনা ফুল দিলো। চুলে গোঁজা ফুলগুলার একটা। বলল, মন খারাপ কইরেন না। হিপ্পিগো একটা কথা আছে। যারে ভালোবাসো, তারে ছাইড়া দাও। ফিরা আসলে বুঝবা সে তোমারই আছিলো।

আর ফিরা না আসলে?

রোদ হাসলো। সেই নির্ভার হাসি। বলল, না ফিরলে বুঝবেন, সে আসলে একটা রাস্তা আছিলো, ঠিকানা না। রাস্তার কাম পৌঁছানো না, হাঁটানো।

আমি ঢাকায় ফিরলাম। জ্যামে বসে থাকি, মিটিং করি, মাস শেষে বিল দেই। সবই আগের মতো। খালি একটা জিনিস বদলাইছে। আমি এখন লিখি। রোজ ভোরে উঠে লিখি। ছয় মাসে যেই উপন্যাসটা দাঁড়ালো, প্রকাশক পড়ে ফোন দিয়ে বললেন, এইবার হইছে। প্রাণ আইছে। কই পাইলেন?

আমি বললাম, কিনি নাই। একজন এমনি দিছে।

বোতলটা এখনো আছে। মাঝে মাঝে খুলি। তবে আগের মতো শূন্যস্থান ভরতে না, পুরান বন্ধুর সাথে দেখা করার মতো করে। আর আমার লেখার টেবিলে, বইয়ের ভাঁজে, সেই শুকনা ফুলটা রাখা। মাঝে মাঝে রাত জেগে লিখতে লিখতে মনে হয়, ঘরে বুনো ফুলের গন্ধ। জানি, শুকনা ফুলের গন্ধ থাকে না। তবু পাই।

গত সপ্তাহে ডাকবাক্সে একটা পোস্টকার্ড পাইলাম। কাঠমান্ডুর ছবি। প্রেরকের নাম নাই, ঠিকানা নাই। পিছনে খালি এক লাইন লেখা।

রাস্তার ফুল এখনো ফোটে।

আমি পোস্টকার্ডটা বুকপকেটে নিয়ে সারাদিন অফিস করলাম। কেউ টের পাইলো না, জ্যামে আটকা পড়া এই শহরের ভিতর দিয়ে একটা লোক সারাদিন হেঁটে বেড়াইলো কাঠমান্ডুর রাস্তায়, চুলে ফুল গুঁজে।  

 
১৮/৭/২০২৬

পানকৌড়ি ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

যেদিন আমি মরে গেলাম, সেদিন ভোরে মিতু ভাত খেতে চেয়েছিল।
ভাত ছিল না। আগের রাতের দুইটা শক্ত রুটি ছিল। পানিতে ভিজিয়ে নরম করে দিলাম। ও খেলো। খেয়ে জিজ্ঞেস করল, মা, তুমি খাবা না?
বললাম, আমার পেট ভরা।
মায়েদের পেট কীভাবে ভরে, এই রহস্য মিতু বড় হয়ে বুঝবে। এখন ওর বয়স পাঁচ।
আমার বয়স উনত্রিশ। এই বয়সেই আমি একবার বউ হয়েছি, একবার মা হয়েছি, একবার ডিভোর্সি হয়েছি। আর একবার মরে গেছি। সবগুলোর গল্প আজ বলব। ধৈর্য ধরে শোনেন।
উনিশ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্টও তখন বের হয়নি। বাবা বলেছিলেন, মাইয়া মানুষের রেজাল্ট দিয়া কী হইব! ঘর হইলেই হইল। পাত্র রাশেদ। ইলেকট্রিকের দোকান আছে নবাবপুরে। ফর্সা, লম্বা। দেখতে আসার দিন আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। ওই একটা হাসি দেখে আমি ভেবেছিলাম, মানুষটা ভালো।
উনিশ বছর বয়সে মেয়েরা হাসি দেখে মানুষ চেনে। চিনতে ভুল করে।
প্রথম প্রথম রাশেদ ভালোই ছিল। রাতে ঘরে ফিরে আমার ভেজা চুলের গন্ধ নিত। বলত, তোর চুলে নদীর গন্ধ। আমি লজ্জা পেতাম। কুপির আলোয় আমাদের ছায়া এক হয়ে যেত দেয়ালে। ওর বুকের ভেতর আমি টের পেতাম একটা নদী, জোয়ারে ফুলে উঠছে। আমার শরীর তখন পলিমাটি। যা বুনে দেওয়া হতো, তাই ফলাতে চাইত।
মিতু এলো দুই বছরের মাথায়।
মেয়ে হয়েছে শুনে রাশেদ হাসপাতালে আসেনি। এসেছিল তার মা। নাক কুঁচকে বলেছিলেন, প্রথমটাই মাইয়া। কপাল।
সেদিন থেকেই সংসারটা বদলাতে শুরু করল। নাকি রাশেদ বদলাল। নাকি ও এরকমই ছিল, শুধু আমার চোখে পড়েনি।
রাশেদের বাবাকে আমি দেখেছি মাত্র কয়েকবার। মুখ ভর্তি পান, চোখে সবসময় একটা বিরক্তি। শাশুড়ি বাঁ কানে উনি কম শুনতেন। কেন, সেটা একদিন ননদের কাছে শুনেছি। রাশেদের বয়স যখন সাত, ওর বাবা ভাত ঠান্ডা হওয়ার অপরাধে ওর মাকে কানের ওপর মেরেছিলেন। ছেলেরা দেখেছে। কেউ কাঁদেনি। কাঁদলে বাপ বলতেন, মাইয়াগো লাহান কান্দস ক্যা?
রাশেদ বড় হয়েছে এই পাঠশালায়। ওর কাছে সংসার মানে একটা দোকান। বউ মানে কর্মচারী। বেতনের বদলে ভাত পায়। আর ভুল করলে হাত ওঠে। আমি ওকে এখন আর পুরোপুরি দোষ দিই না। মানুষ যা দেখে বড় হয়, তাই হয়ে ওঠে। কিন্তু দোষ না দেওয়া এক কথা আর মাফ করা আরেক কথা। মাফ আমি করিনি।
প্রথম চড়টা খেয়েছিলাম মিতুর ছয় মাস বয়সে। তরকারিতে লবণ বেশি হয়েছিল। চড় খেয়ে আমি এতই অবাক হয়েছিলাম যে কাঁদতেও ভুলে গেছি। রাশেদ ভাত খেতে খেতে বলল, মায়ে ঠিকই কইছিল। শিক্ষিত মাইয়া আনলে সংসার হয় না।
তারপর চড় ব্যাপারটা লবণের মতোই রোজকার অভ্যাসে পরিণত হলো।
বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনতে বলত। বাবা রিটায়ার্ড মানুষ, কোথায় পাবে? না আনলে বলত, খানকির ঘরের খানকি, বইসা বইসা আমার ভাত গিলস, বাপের কাছ থেইকা দুইটা টাকা আনতে পারস না? আমি মিতুর কান চেপে ধরতাম। যেন গালিটা মেয়েটার ভেতরে ঢুকতে না পারে। এখন বুঝি, লাভ হয়নি। এই দেশে মেয়েদের কানে এসব ঢোকে বাতাসের সাথে।
শেষ দিনটার কথা বলি।
মিতুর তখন সাড়ে তিন বছর। রাশেদ সেদিন দোকানের ক্যাশ থেকে টাকা হারিয়ে ফিরেছে। রাগটা ঝাড়ল আমার চুলে। মুঠি পেঁচিয়ে ধরে টানতে টানতে বলল, ক, টাকা তোর বাপে নিছে? আমার সেই চুল, যাতে ও একদিন নদীর গন্ধ পেত। মিতু দৌড়ে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরল। রাশেদ এক ঝটকায় মেয়েটাকে ছুড়ে ফেলল। মিতুর কপাল গিয়ে লাগল চৌকির কোনায়।
রক্ত আমি অনেক দেখেছি। নিজের ঠোঁটের। নিজের নাকের। কিন্তু মেয়ের কপালের রক্ত দেখে আমার ভেতরে কী যেন ছিঁড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। রাশেদের চোখে চোখ রেখে বললাম, আর না।
কাবিননামার আঠারো নম্বর ঘরে আমার তালাকের অধিকার লেখা ছিল। বিয়ের রাতে কাজি সাহেব পড়ে শুনিয়েছিলেন। কেউ শোনেনি। আমি শুনেছিলাম। ওই এক লাইনের জোরে আমি বের হয়ে এলাম। রাশেদ ভাবেনি আমি পারব। মহল্লার কেউ ভাবেনি। আমি নিজেও কি ভেবেছিলাম?
লোকে বলে ডিভোর্স দিলে মেয়েদের সব শেষ। মিথ্যা কথা। ডিভোর্সের পর মেয়েদের সব শুরু। যুদ্ধটা শুরু।
প্রথমে গেলাম বাপের বাড়ি। মা দরজা খুলে প্রথম যে কথাটা বললেন, তা হলো, মাইনষে কী কইব?
মানুষ। এই দেশে মায়ের চেয়ে মানুষ বড়, মেয়ের চেয়ে মানুষ বড়।
ভাইয়ের সংসার তখন টানাটানির। ভাবি খারাপ মানুষ না, কিন্তু চার কেজি চালের হাঁড়িতে ছয়জনের ভাত হয় না। আমি বুঝতাম। রাতে শুনতাম ভাবি ভাইকে বলছে, বইনরে কিছু কও না ক্যা? বাবা সারাদিন উঠানে বসে থাকতেন। আমার দিকে তাকাতেন না। ওনার চোখে আমি মেয়ে না, আমি একটা প্রশ্ন। পাড়ার লোকে যে প্রশ্নটা করে, ওই মাইয়া ঘরে বইয়া রইছে ক্যা?
দুই মাসের মাথায় মা একটা সম্বন্ধ আনলেন। পঞ্চান্ন বছরের এক ব্যবসায়ী। আগের বউ মরেছ। চার ছেলেমেয়ে। মা বললেন, মাইয়া লইয়া সংসার করব। রাজি হইছে। এর চাইতে ভালো আর কী পাবি?
আমি সেই রাতে মিতুকে বুকে নিয়ে ভাবলাম। আমার দাম চুকিয়ে দিয়েছে এই সমাজ। ডিভোর্সি, এক বাচ্চার মা। বাজারে আমার দর পঞ্চান্ন বছরের দোজবরে। আমি রাজি হলাম না। মা কাঁদলেন। গালি দিলেন। আবার কাঁদলেন। আমি মিতুর হাত ধরে ঢাকায় চলে এলাম। সঙ্গে একটা টিনের বাক্স আর কানের দুল জোড়া।
মা-বাবাকে আমি ঘেন্না করি না। ওনারা নিষ্ঠুর না, ওনারা ভীতু। এই সমাজে গরিবের ভয়টাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। ওইটা দিয়েই তারা বেঁচে থাকে।
ঢাকা শহর একলা মেয়েদের জন্য একটা পরীক্ষার হল। প্রশ্ন কমন পড়ে না। আর পাস করলেও কেউ সার্টিফিকেট দেয় না।
বাসা ভাড়া নিতে গেলাম। বাড়িওয়ালা প্রথম প্রশ্ন করল, সাথে পুরুষ মানুষ কে আছে? বললাম, কেউ না। মুখের ওপর বলে দিল, একলা মাইয়া মানুষরে ভাড়া দিই না। ঝামেলা হয়। তিন বাড়ি ঘুরে চতুর্থ বাড়িওয়ালা রাজি হলো। ভাড়া পাঁচশো বেশি। একলা মেয়ের ট্যাক্স।
চাকরি নিলাম একটা কাপড়ের শোরুমে, সেলসগার্ল। ম্যানেজার সাহেব মাসের পনেরো তারিখে বেতনের অ্যাডভান্স দিতে চাইতেন। শুধু আমাকেই। টাকাটা হাতে দেওয়ার সময় আমার হাতের ওপর এমনভাবে রাখতেন, যাতে আঙুলগুলোর স্পর্শ একটু বেশিক্ষণ থাকে। আমি অ্যাডভান্স নেওয়া ছেড়ে দিলাম। বদলে খবর পেলাম, ম্যানেজার সাব নালিশ করেছেন, মেয়েটার ব্যবহার ভালো না।
বাসে অফিস যেতাম। ভিড়ের মধ্যে পেছন থেকে ভেসে আসা হাতগুলোর কোনো চেহারা থাকে না। ঘুরে তাকালে প্রতিটি মুখই দেবদূতের মতো নিরীহ। একদিন একটা হাত শক্ত করে মুচড়ে ধরেছিলাম। লোকটা উল্টো চেঁচিয়ে উঠল, "কী খারাপ মহিলা রে বাবা!" বাসশুদ্ধ মানুষ তখন আমার দিকেই তাকিয়ে দেখল। খারাপ মহিলা। যে মেয়ে প্রতিবাদ করে, তার নামই খারাপ মহিলা।
মিতুকে স্কুলে ভর্তি করাতে গেলাম। ফর্মে লেখা, পিতার নাম, পিতার পেশা, পিতার স্বাক্ষর। মায়ের জন্য বরাদ্দ মোটে আধখানা লাইন। অফিসের লোকটা বলল, বাপ ছাড়া ভর্তি হইব না, গার্জিয়ান লাগব। আমি বললাম, আমি গার্জিয়ান। লোকটা এমনভাবে হাসল, যেন আমি সস্তা রসিকতা করছি।
পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রলো। বয়স চল্লিশের আশেপাশে। বউ থাকে গ্রামে। রাত এগারোটায় দরজায় টোকা দিতেন। ভাবি, একটু ম্যাচটা দিয়েন তো। ম্যাচ, লবণ, মোবাইলের চার্জার। একলা মেয়ের ঘর মানে মহল্লার মিনি মুদি দোকান, যখন খুশি টোকা দাও। একদিন দরজা না খুলে বললাম, দোকান বন্ধ। এরপর উনি রটিয়ে দিলেন, মহিলার চরিত্র ভালো না। রাইতে ঘরে পুরুষ ঢোকে।
চরিত্র। এই শব্দটা এই দেশে শুধু মেয়েদের শরীরে গজায়।
এর মধ্যে রাশেদ দুইবার এসেছিল। প্রথমবার এসে বলল, ভুল হইছে। ফিরা আয়। আমি বললাম, মিতুর খরচ পাঠাও, দেনমোহর দাও। ফিরতে বোলো না। দ্বিতীয়বার এসে আর নরম গলার মানুষটা রইল না। হিংস্র চোখে দাঁত চেপে বলল, “একলা থাকস, দুই পয়সা কামাই করস দেইখা নিজেকে অনেক বড় নবাবজাদী ভাবস, না? দুই দিন পরে ফুটপাতে বইসা ভিক্ষা করবি, মাগী। তখন দেখুম তোর কত দেমাগ!”
আমি দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। দেমাগ শব্দটা আমার ভালো লেগেছিল। গরিব একলা মেয়ের আত্মসম্মানকে এই দেশে দেমাগ বলে ডাকা হয়।
মিতু রাতে ঘুমানোর আগে গল্প শুনতে চায়। আমি ওকে আমার নানির গল্পটা বলি। নানি বলতেন পানকৌড়ির গল্প।
এক ছিল পানকৌড়ি পাখি। কালো, রোগা, গলা লম্বা। হাঁসেরা তাকে দেখে হাসত। বলত, তোর তো তেলই নাই পাখায়, তুই ভিজস, তুই ডুবস। একদিন বড় ঝড় উঠল বিলে। হাঁসেরা পাড়ে উঠে গেল। পানকৌড়ি ডুব দিল। এক ডুব, দুই ডুব। অনেকক্ষণ আর উঠল না। সবাই বলল, মরছে। শোল মাছটা পর্যন্ত বলল, মরছে। কিন্তু নানি এই জায়গায় এসে থামতেন। বলতেন, শোন, পানকৌড়ি ডুবে না। পানকৌড়ি ডুব দেয়। ডুব আর ডুবার মধ্যে ফারাক আছে। যে ডুব দেয়, সে ভেসে ওঠার জন্যই ডুব দেয়।
মিতু জিজ্ঞেস করে, তারপর?
তারপর ঝড় থামল। পানকৌড়ি ভেসে উঠল। ঠোঁটে একটা মাছ।
এই গল্পটা আমি মিতুকে শোনাতাম। আসলে নিজেকে শোনাতাম।
তারপর এলো সেই মাস। যে মাসে আমি মরে গেলাম।
মিতুর টাইফয়েড ধরা পড়ল। ডাক্তার, টেস্ট, ওষুধ। জমানো টাকা গেল। শোরুম থেকে ছুটি নিতে হলো বলে বেতন কাটা গেল। মাসের দশ তারিখে বাড়িওয়ালা এসে দাঁড়াল, ভাড়া না দিলে ঘর ছাড়েন। স্কুলে ভর্তির শেষ তারিখ পনেরো তারিখ, লাগবে তিন হাজার টাকা। আমার হাতে তখন সাতশো বিশ টাকা।
রাশেদকে ফোন দিলাম। জীবনে প্রথমবার নিজে থেকে। মেয়ের অসুখের কথা বললাম। ও শুনল। তারপর শান্ত গলায় বলল, টাকা লাগলে ঘরে ফিরা আয়। পায়ে ধইরা মাফ চাবি, টাকাও পাবি, ঘরও পাবি। আমি ফোন কেটে দিলাম। ওর কাছে আমার দরকারটাই ছিল শেষ জুয়ার দান। মেয়ের অসুখ দিয়ে ও বাজি ধরল।
মাকে ফোন দিলাম। মা লুকিয়ে বিকাশে দুইশো টাকা পাঠালেন। সাথে একটা কথা, তোর বাপরে কইস না। দুইশো টাকা আর একটা নিষেধ। আমার মায়ের সাধ্য এইটুকুই।
চৌদ্দ তারিখ রাতে মিতুর জ্বরটা নামল। মেয়েটা ঘুমাল। আমি বারান্দায় বসে রইলাম। হিসাব মেলালাম। ভাড়া, ভর্তি, ওষুধ, দোকানের বাকি। সব যোগ করলে যা হয়, আমার সারা শরীর বেচলেও তা হয় না। মাথার ভেতর রাশেদের গলা, ফুটপাতে বইসা ভিক্ষা করবি। বাড়িওয়ালার গলা, ঘর ছাড়েন। ম্যানেজারের আঙুল। বাসের হাত। ফর্মের লেখা, পিতার নাম।
আমি মিতুকে পাশের ঘরের রিনা ভাবির কাছে রেখে বের হলাম। বললাম, একটু আসতেছি। রাত তখন এগারোটা।
হাঁটতে হাঁটতে বুড়িগঙ্গার ঘাটে চলে গেলাম। কেন গেলাম, জিজ্ঞেস করবেন না। ওই রাতে আমার ভেতরে যুক্তি বলে কিছু ছিল না। ছিল শুধু ক্লান্তি। এমন ক্লান্তি, যা ঘুমে যায় না। আমি ঘাটের সিঁড়িতে বসলাম। নদীটা ডাকছিল। অন্ধকার পানি বড় নরম গলায় ডাকে। বলে, আয়, আর হিসাব মেলাতে হবে না।
আমার স্যান্ডেল জোড়া সিঁড়িতেই খুলে রেখেছিলাম। এক পা, দুই পা করে পানিতে নেমেছিলাম। এইটুকুই বলব। এর বেশি বলার সাহস আমার আজও নেই।
শুধু বলি, ঠিক তখন নানির গলাটা শুনলাম। পানকৌড়ি ডুবে না। পানকৌড়ি ডুব দেয়।
আর শুনলাম মিতুর নিঃশ্বাস। জ্বর ছাড়ার পর মেয়েটা যখন ঘুমায়, ওর নিঃশ্বাসে একটা শব্দ হয়। খুব মিহি। ওই শব্দটা আমি নদীর ডাকের ভেতরেও শুনতে পেলাম। মায়ের কান বলে কথা।
আমি উঠে এলাম। ভেজা শাড়িতে সারারাত হাঁটলাম। শহরটাকে ওই প্রথম দেখলাম ভয় ছাড়া। ভোরের আজানের পর চাঁদনি চকের পেছনের গলিতে গেলাম। ওখানে চুল কেনে। মেয়েদের লম্বা চুল, পরচুলার কারবারিরা ওজন দরে নেয়।`


আমার চুল ছিল কোমর ছাড়ানো। যে চুলে রাশেদ নদীর গন্ধ পেত। যে চুল মুঠি পেঁচিয়ে ও আমাকে শিখিয়েছিল, ভালোবাসা আর দখলদারি এক জিনিস না। কারবারি কাঁচি চালানোর আগে জিজ্ঞেস করল, মন খারাপ হইব না তো আফা? আমি বললাম, কাটেন। মাথাটা হালকা হইলে বাঁচি।
কাঁচির শব্দটা আমার কানে আজও লেগে আছে। মুক্তির শব্দ কারো কাছে শিকল ভাঙার, আমার কাছে কাঁচির।
চুল বেচে পেলাম চার হাজার দুইশো টাকা।
ফিরে দেখি বাসার সামনে ভিড়। রিনা ভাবি উঠানে বসে বিলাপ করছে। ঘাটে নাকি আমার স্যান্ডেল পাওয়া গেছে। কে যেন রাতে আমাকে নদীর দিকে যেতে দেখেছে। মহল্লা রায় দিয়ে ফেলেছে, ডিভোর্সি মাইয়া। আর কত সহ্য করব। গলায় দড়ি না দিয়া পানিতেই গেছে। খবর পেয়ে রাশেদও এসে হাজির। উঠানে দাঁড়িয়ে গলা কাঁপিয়ে বলছে, আহারে, কতবার কইছি ফিরা আয়। শোকটা ওর মুখে মানাচ্ছিল না। মরা বউয়ের জন্য কাঁদলে সমাজে দর বাড়ে, ও জানে।
আমি ভিড় ঠেলে ঢুকলাম। খালি পা, ভেজা শাড়ি, ছেলেদের মতো ছোট চুল, হাতে খামে মোড়ানো কিছু টাকা।
সবাই এমনভাবে তাকাল, যেন ভূত দেখছে। ঠিকই দেখছিল। যে শিউলি কাল রাতে ঘাটে গিয়েছিল, সে তো আর ফেরেনি। ফিরেছি আমি। এই আমাকে ওরা চেনে না।
রিনা ভাবি কেঁদে জড়িয়ে ধরল। মিতু দৌড়ে এসে আমার ছোট চুলে হাত বুলিয়ে বলল, মা, তোমারে পাখির মতো লাগতেছে।
আমি বললাম, হ রে মা। পানকৌড়ি।
রাশেদ আগায় আসছিল। আমি হাত তুলে থামালাম। সারা মহল্লার সামনে শুধু বললাম, আমার মেয়ের জন্য কাঁদার লোক আছে। তুমি আসতে পারো।
ও চলে গেল। মানুষটা গালির জবাব দিতে জানে, শান্ত গলার জবাব ওর জানা নেই।
পনেরো তারিখে মিতুকে স্কুলে ভর্তি করালাম। ফর্মের পিতার নামের ঘরটা ফাঁকা রেখে নিচে বড় করে লিখলাম নিজের নাম। অফিসের লোকটা কী যেন বলতে চাইল। আমি চোখ তুলে তাকালাম। লোকটা সিল মেরে দিল। শিখেছি, এই দেশে একলা মেয়ের সবচেয়ে বড় দলিল তার চোখের ভাষা।
বাড়িওয়ালার ভাড়া মিটিয়েছি। শোরুমের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি, ম্যানেজারের আঙুলের স্পর্শসহ। এখন দুই বাসায় রান্না করি। রাতে ব্লাউজ পেটিকোট সেলাই করি। মেশিনটা কিস্তিতে কেনা। আয় বেশি না। তবে এই টাকায় কারো আঙুলের দাগ নেই। গরিবি আমার কাটেনি। হয়তো কাটবেও না। কিন্তু গরিবি আর ভিক্ষা এক কথা না। রাশেদের কথাটা মিথ্যা হয়ে গেছে। আমি ফুটপাতে বসিনি। আমি উঠে দাঁড়িয়েছি।
চুল আবার বড় হচ্ছে। কাঁধ ছুঁয়েছে। এবার এই চুলের গন্ধ শুধু আমার।
শুক্রবার বিকালে মিতুকে নিয়ে সেই ঘাটে যাই। যে নদী আমাকে ডেকেছিল, তার সাথে এখন আমার অন্য সম্পর্ক। পাড়ের কাছে অল্প পানিতে নেমে আমি মেয়েকে সাঁতার শেখাই। নিজেও শিখি। উনত্রিশ বছর বয়সে শিখছি, ডোবা আর ডুব দেওয়ার ফারাক।
মিতু পানিতে হাত পা ছুড়ে হাসে। বলে, মা দেখো, আমি ভাসতেছি!
আমি ওর পিঠের নিচে হাত রাখি। বলি, ভয় নাই রে মা। ডুব দিবি, ভাসবি। তুই পানকৌড়ির মেয়ে।
লোকে এখনো মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, "ওই রাতে ঘাটে কী হইছিল আফা?" আমি হাসি। বলি, "কী আর হইব। একজন মরছে, একজন বাঁচছে। কোনজন কে, সেই হিসাব নদী জানে।"