শমীক ভশ্চাজ্জির একটা বক্তব্য নিয়ে অনেকেই লিখেছে দেখেছি। রাখীগড়ির ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি অমুক তমুক অনেক কিছুকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে ইত্যাদি ইউজুয়াল আগমার্ক হিন্দুত্ব হাবিজাবি। আমি একটা সহজবোধ্য প্রাইমার দেওয়ার চেষ্টা করি — কেন শমীক ভশ্চাজ্জি এই দাবীটি করতে গেল। আরো একটা উদ্দেশ্য আছে। এর আগের বার এই ভশ্চাজ্জির আরো একটা বালবাজারি নিয়ে ফেসবুকে লেখার পর জনৈক জেলখাটা "প্রিটেন্ডার" সাংবাদিক আমাকে নিয়ে আস্ত ইউটিউব এপিসোড করে ফেলেছিলেন। আশা করছি এইবারেও তিনি আরো একটা ইউটিউব এপিসোড নামাবেন। একে তো আমি সেলিব্রিটি হয়ে যাব, আর দ্বিতীয়ত: এই বালবাজারিটার ব্যাপারে যদি দুটো লোকও খোঁজ করে সত্যিটা জানতে পারে, তাতেও বড় লাভ।
সো, হিয়ার গোজ...
কী বলেছে শমীক ভশ্চাজ্জি? না, রাখীগড়ির প্রাচীন মানুষের ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি প্রমাণ করে দিয়েছে যে Aryan Invasion Theory (AIT) পুরোপুরি মিথ্যে, বামপন্থী ঐতিহাসিকরা এতদিন আমাদের সব ভুল শিখিয়েছেন।
শুরুতেই শমীক ভশ্চাজ্জি যে মিথ্যেটা বলেছে (মিথ্যেই বললাম, কারণ এরা যা বলে জেনেশুনেই বলে) সেটা হল এই AIT নিয়ে। সেই ১৯৫০-৬০ নাগাদই ইনভেশন থিওরিকে ক্রিটিক করেছেন ডিডি কোশাম্বি, রোমিলা থাপার বা আরএস শর্মার মত বামপন্থী ইতিহাসবিদরাই, নানান নতুন পুরাতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভাষাগত তথ্যের ভিত্তিতে। ষাটের দশক থেকেই বেশিরভাগ স্কলারদের মধ্যে যেটা চালু থিওরি সেটাকে বলা হয় Aryan Migration Theory (AMT)। সেখানে মাইগ্রেশন বা অভিবাসনের একাধিক ঢেউয়ের কথা বলা হয়। এই থিওরিটা সবার আগে একটু খোলসা করে বলা দরকার।
একেবারে প্রথমে আসে ইউরেশিয়ান স্তেপ অঞ্চলের (আধুনিক ইউক্রেন, দক্ষিণ পশ্চিম রাশিয়া, পশ্চিম কাজাখস্তান ইত্যাদি অঞ্চল) পশুপালক মানুষগুলোর কথা। এরাই প্রথম ঘোড়ার ওপর দখল আনে, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে, আর একদম গোড়ার প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথাবার্তা বলতে শুরু করে। তাদের অরিজিনাল বাসভূমি থেকে তারা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে — কারণ বংশবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নতুন এলাকার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, বসবাসের জন্যে, পশুপালনের জন্যে। এর মানে এই নয় যে এরা সরাসরি ভারতীয় উপমহাদেশে চলে এসেছিল। মাইগ্রেশন থিওরি বলে যে এই পশুপালকরা ধীরে ধীরে মিশতে শুরু করে একটা অন্তর্বর্তী এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে - প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় এই স্টেজিং গ্রাউন্ডের নাম Bactria-Margiana Archaeological Complex (BMAC) - আধুনিক কালের যে এলাকাগুলোকে আমরা চিনি উত্তর আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান বলে। এবং এইটা এক দুই দিন বা কয়েক মাসে বসতির ব্যাপারও নয়। স্তেপ অঞ্চলের মানুষরা এখানে যাওয়াআসা শুরু করে, এখানকার অরিজিনাল অধিবাসীদের সঙ্গে মেশে, তাদের বংশবৃদ্ধি হয় - প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরে। এবং তারপর, এই অধিবাসীদের মধ্যে থেকে একটা ইন্দো-ইরানিয়ান শাখা আলাদা হয়ে যায়; এক দল পশ্চিমে ইরানের দিকে চলে যায়, আর অন্য দলটা দক্ষিণপূর্ব দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে ঢোকে। সময়কাল হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটা খানিক এরকমঃ
খ্রীষ্টপূর্ব [২১০০-১৮০০] সিন্তাশতা সংস্কৃতি (স্তেপ অঞ্চলে ঘোড়ায় টানা গাড়ির শুরু হয় এদের হাতে)
⬇️
খ্রীষ্টপূর্ব [২০০০-১৫০০] স্তেপ এলাকা ক্রমাগত শুকনো হতে শুরু করে পরিবেশগত কারণে, ঘাসজমি কমতে থাকে। ফলে আরো ভালো জমির খোঁজে এই এলাকার পশুপালকের দল ভারতীয় উপমহাদেশের কাছাকাছি এসে পৌঁছয় - ব্যাক্ট্রিয়া-মারজিয়ানা অঞ্চলে, মানে আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান ইত্যাদি এলাকায়। সিন্ধু সভ্যতা সেই সময়ে ক্রমশঃ ক্ষয়ে আসতে শুরু করেছে, সেও মূলতঃ আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পাল্টে যাওয়ার জন্যেই।
⬇️
খ্রীষ্টপূর্ব [১৫০০-১২০০] হিন্দুকুশ পেরিয়ে ইন্দো-ইরানিয়ান অভিবাসীদের প্রথম ঢেউ এসে পৌঁছয় ভারতের উত্তরপশ্চিম অঞ্চলে, বসতি স্থাপন করে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে (আধুনিক পাঞ্জাব এবং পাকিস্তানের অনেকটা জায়গা নিয়ে)। এই সময়টাকেই বলা হয় প্রারম্ভিক-বৈদিক যুগ - যে সময়ে ঋগ্বেদের জন্ম।
⬇️
খ্রীষ্টপূর্ব [১০০০-৬০০] লোহার তৈরী যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্র হাতে এই সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের পরের দিকের প্রজন্মের মানুষেরা জঙ্গল কেটে এগিয়ে যায় গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে। যাযাবর পশুপালক থেকে তারা ক্রমশঃ চাষবাষের দিকে সরতে শুরু করে, তৈরী হতে থাকে কৃষিভিত্তিক রাজ্য।
এই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ কোত্থেকে এলো তাই নিয়ে থিওরি, পাল্টা থিওরির লড়াই চলেছে কয়েক দশক ধরেই। ভাষাবিজ্ঞান বা লিঙ্গুইস্টিক্স, প্রত্নতত্ত্ব আর রাজনীতির তীব্র বিতর্ক। ইনভেশন তত্ত্বকে সরিয়ে মাইগ্রেশন থিওরির পত্তন হয় লিঙ্গুইস্টিক্স এবং প্রত্নতত্ত্বের ওপর নির্ভর করেই। তা সত্ত্বেও, বিতর্ক থামেনি। আর্য্যদের উৎপত্তি ভারতেই, এখান থেকেই তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, সংস্কৃতের জন্মও ভারতেই, এবং বাকি সমস্ত ভাষাই সংস্কৃতের "সন্তান" – হিন্দুত্ববাদী রাইটউইং ন্যাশনালিজমের মূল পিলার দাঁড়িয়ে রয়েছে এই আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের তত্ত্বের ওপরেই, কারণ এতে ভারতকে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকে একটা টাইমলেস এন্টিটি বলে প্রোমোট করা যায়। খেয়াল করে দেখবেন - হিন্দুত্বের শুরু কিন্তু এই জায়গা থেকেই - যে ভারতীয় সভ্যতা একদমই ইন্ডিজেনাস, অজর অমর অক্ষয়, টাইম ইমমেমোরিয়াল থেকে এই সভ্যতা একইভাবে টিঁকে রয়েছে ইত্যাদি প্রভৃতি। অন্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষের সঙ্গে মিশ্রণের ফলেই যে এই উপমহাদেশের আদি সভ্যতা এবং সংস্কৃতির জন্ম, এইটা ফাঁস হয়ে গেলে হিন্দুত্ববাদের পিলার ওই টাইমলেস এজলেস গ্লোরিয়াস ভারতীয় নেশনের মিথটা ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। ইতিহাসে, এর আগে কে নিজেদের এরকম অরিজিনাল আর্য্য বলে দাবী করে জাতিগত সংমিশ্রণকে কাঠগড়ায় তুলে মানুষে মানুষে বিভেদের সৃষ্টি করেছিল? হাইস্কুল ইতিহাসের বইয়ে ১৯২০-১৯৪৫, এই বিশ পঁচিশ বছরের বিশ্বের ইতিহাসটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন, মনে পড়ে যাবে।
এনিওয়ে, টপিকে ফিরি। রাখীগড়ি অবধি যাওয়ার আগে এই প্রাচীন মানুষের জেনেটিক প্রোফাইল সংক্রান্ত আইডিয়াটা একটু বলে নেওয়া দরকার।
গত কয়েক বছরে, একটা নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মাইগ্রেশন নিয়ে এই বিতর্কের অনেকটাই অবসান ঘটেছে বলে মনে করা হয়। প্রাচীন ডিএনএ অ্যানালিসিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরী এই পদ্ধতির জনক হার্ভার্ডের এক গবেষক, ডেভিড রাইখ। হাজার হাজার বছর আগের মানুষের কঙ্কাল বা হাড়গোর থেকে ডিএনএ বের করে তার সিকোয়েন্সিং করার ব্যবস্থা করেছিলেন রাইখ। এর আগে অবধি, ডিএনএ বের করা যেত শুধু জ্যান্ত মানুষের শরীর থেকেই, এবং বৈজ্ঞানিকেরা সেখান থেকে তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে একটা আন্দাজ তৈরী করার চেষ্টা করতেন। এতে বিতর্ক তো মিটতোই না, বরং বেড়ে যেত কয়েক গুণ। রাইখ এবং তাঁর দলের গবেষকেরা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে পাওয়া প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে তাদের জিনগত প্রোফাইল তৈরী করতে পেরেছিলেন। সেই জেনেটিক প্রোফাইল স্টাডি করেই তাঁরা বলেন যে আধুনিক ভারতের প্রায় সমস্ত বাসিন্দাই মূলতঃ দুটো প্রাচীন জনগোষ্ঠীর এক অনন্য জেনেটিক মিশ্রণঃ Ancestral North Indians (ANI), যাদের জেনেটিক সম্পর্ক রয়েছে ইউরোপীয়, মধ্য এশীয় আর নিকট প্রাচ্য বা নিয়ার ইস্টের মানুষদের সঙ্গে; এবং Ancestral South Indians (ASI) - যারা এই উপমহাদেশের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে এখানকার আদি অধিবাসী হান্টার-গ্যাদারারদের (যে মানুষেরা শিকার করে বা বন্য ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে জীবনধারণ করত) নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
খুব স্বাভাবিকভাবেই এখান থেকে একটা বড় প্রশ্ন উঠে আসে - আর সেটা সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সংক্রান্ত। সিন্ধু সভ্যতা যে যথেষ্ট উন্নত ছিল তাই নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ভারতের মধ্যে লোথাল বা ধোলাভিরার প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলোতে, অথবা কপালে থাকলে পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু সভ্যতার বাকি সাইটগুলোতে গেলে চমকে যাবেন। প্রশ্নটা যেটা উঠে আসে, সেটা হল হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা এই জেনেটিক ধাঁধার মধ্যে ঠিক কোথায় ফিট করে? আর ঠিক এইটাই হল সেই "পয়েন্ট অফ কন্টেনশন" - রাজনীতি আর প্রত্নতত্ত্বের - যার কথা আগে লিখেছিলাম। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আউট-অফ-ইন্ডিয়া তত্ত্বের প্রবর্তকদের বক্তব্য হল সিন্ধু সভ্যতার মানুষরাই আদি বৈদিক আর্য্য, ঋগ্বেদ রচনা হয়েছিল এই সভ্যতার মধ্যেই, এবং এখান থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতি দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদি টাইমলাইন হিসেব করেন, তাহলে এই থিওরি অনুযায়ী ভারতীয় সংস্কৃতিকে প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০ সাল অবধি ঠেলে দেওয়া যায় (খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০-৩৩০০ সাল - এই সময়টাকে ধরা হয় প্রাক্-হরপ্পা যুগ হিসেবে, সিন্ধু সভ্যতার তৈরী হওয়ার সময়)। ডেভিড রাইখ তাঁর Who we are and how we got here বইয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে কীভাবে তাঁদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরী করেছিল এলাকার হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী, এমনকি আঞ্চলিক সহ-গবেষক এবং কো-অথরদের মাধ্যমেও। আগ্রহীরা চাইলে এই বইয়ের ছয় নম্বর চ্যাপ্টার (The Collision that Formed India) এর অন্তর্গত The Mixing of East and West অনুচ্ছেদটা পড়ে দেখতে পারেন। রাইখ এই অংশটা শুরু করছেন এই বলে - “The tensest twenty-four hours of my scientific career came in October 2008, when my collaborator Nick Patterson and I traveled to Hyderabad to discuss these initial results with Singh and Thangaraj” – সিং এবং থঙ্গরাজ মানে লালজী সিং, এবং কুমারস্বামী থঙ্গরাজ, দুজনেই তখন সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে কর্মরত বিজ্ঞানী। অরিজিনাল পেপারে রাইখ এবং প্যাটারসন আসলে "ওয়েস্ট ইউরেশিয়ান" শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। লালজী সিং এবং থঙ্গরাজ আপত্তি করেন কারণ ওয়েস্ট ইউরেশিয়া শব্দের ব্যবহার "পলিটিকালি এক্সপ্লোসিভ" হয়ে উঠতে পারে...এমনকি "অভিবাসন" শব্দটাই এক্ষেত্রে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কো-অথরদের আপত্তি এবং সেন্টিমেন্ট মেনে নিয়ে, পেপারটা যাতে পাবলিশ হতে পারে সেই উদ্দেশ্যে রাইখ ও তাঁর সহ-গবেষকরা খানিকটা নিউট্রাল ANI এবং ASI ব্যবহার করেন পেপারে। শব্দের ব্যাপারে খানিক কম্প্রোমাইজ করা হলেও, এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য স্পষ্টভাবেই ইউরেশীয় স্তেপ এবং পরবর্তীকালে BMAC থেকে আসা অভিবাসনের দিকেই ইঙ্গিত করে।
রাখীগড়ি এই প্রাচীন ভারতের ডিএনএ অ্যানালিসিসের লেটেস্ট চ্যাপ্টার। এই গল্পের শুরু ২০১৯ সালে, যখন বিজ্ঞানীরা হরিয়ানার হিসার জেলার অন্তর্গত রাখীগড়িতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় পাওয়া প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো একটা কঙ্কালের সফল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করেন। এই ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে দেখা যায় যে ওই মানুষটির শরীরের জিনের মধ্যে ইউরেশীয় স্তেপের জিনের কোনো মার্কার নেই, নেই কোনো মধ্য এশীয় বা ইউরোপীয় মার্কারও। অর্থাৎ, রাখীগড়ির সেই মানুষ যে জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে আন্দাজ করা যায়, তাদের সঙ্গে ইউরোপীয়, ইউরেশীয় বা পশ্চিম এশিয়ার কোনো জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ কখনো ঘটেনি। রাখীগড়ির মানুষটির জিনগত বৈশিষ্টের সঙ্গে মিল পাওয়া গিয়েছিল শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের আদি বাসিন্দা হান্টার-গ্যাদারার, এবং প্রাচীন ইরানী কৃষক-পশুপালক জনগোষ্ঠীর।
এইবার মজাটা হয় এইখানেই। শমীক ভশ্চাজ্জির মত হিন্দুত্ববাদীরা ইউরেশীয় স্তেপ জিনের অনুপস্থিতি দেখিয়ে বলেন - এইত্তো, ইউরেশীয় স্তেপ থেকে কোনো অভিবাসন কখনো হয়নি, বরং প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরাই বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটু ভাবলেই আপনি খেয়াল করতে পারবেন যে এই লজিকটা খানিক "হরপ্পায় টেলিফোনের তার পাওয়া যায়নি, কাজেই তখন ওয়্যারলেস ছিল" বলার সামিল…
কেন? কারণটা খুব সাধারণ বায়োলজির নিয়ম - যার ফলে হরপ্পায়-টেলিফোনের-তার-পাওয়া-যায়নি-কাজেই-সেখানে-ওয়্যারলেস-ছিল মার্কা বালবাজারি লজিকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সহজ বায়োলজির নিয়মে আপনার আমার মধ্যে পূর্বপুরুষের জিন থাকে, উল্টোটা নয়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরা যদি আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের মাধ্যমে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া, ইউরোপ এবং অন্যত্র ছড়িয়ে থাকত, তাহলে সেখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া কঙ্কালের ডিএনএর মধ্যে রাখীগড়ির দেহাবশেষে পাওয়া ইউনিক সাউথ এশিয়ান জিনের চিহ্ন থাকত। কিন্তু ডেভিড রাইখ ও নরসিংহন সহ অনেকের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০-১০০০ সালের মানুষের হাড়গোরের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় হান্টার-গ্যাদারার জিনের কোনো চিহ্ন নেই। উল্টো, ভারতে পরবর্তীকালীন নমুনাগুলিতে স্তেপের জিনের উপস্থিতি স্পষ্ট। অর্থাৎ, সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে ইউরোপ বা মধ্য এশিয়ার জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ হওয়া বায়োলজিকালি অসম্ভব। এর সঙ্গে আরো বলা যায় যে মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ নাগাদ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আচমকাই স্তেপ জিন এসে হাজির হওয়ার অনেক আগেই, মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০-২৫০০ সালের সময়কার কঙ্কাল যা সাইবেরিয়া এবং ইউক্রেনের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছিল, সেগুলোর মধ্যে এই স্তেপ জিনের মার্কার পাওয়া গেছে। মানে, এই জেনেটিক ট্রাফিক বেসিকালি একটা ওয়ান-ওয়ে রাস্তা, যেটা ভারতে ঢোকে; উল্টোটা নয়।
রাখীগড়ির ফাইন্ডিংস এই কারণেই মাইগ্রেশন থিওরিকেই আরো পোক্ত করে তুলেছে, শমীক ভশ্চাজ্জির কথামত বাতিল করেনি। কারণ, এই পেপারটা থেকে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর উদ্ভবের একটা স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরাই যদি আদি সংস্কৃতজ্ঞ আর্য্য হত - হিন্দুত্ব থিওরি অনুযায়ী যাদের সংস্কৃতি বয়ে এসেছে আজকের উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে (যারা নিজেদের তথাকথিত আর্য্য জনগোষ্ঠী হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে), তাহলে এই আধুনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা স্তেপ জিনের দু চার ফোঁটা তো থাকার কথা ছিল সিন্ধু সভ্যতার গ্লোরির শিখরে থাকা মানুষদের মধ্যে? যেহেতু আধুনিক উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনুপাতে স্তেপ জিন রয়েছে, কাজেই স্বাভাবিক বায়োলজি বলে যে রাখীগড়ির সময়কালের অনেক পরেই স্তেপ মাইগ্রেশন ঘটেছিল...অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার শেষের দিকে, খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ সাল নাগাদ…
যেটা চরম ইন্টারেস্টিং, সেটা হল প্রাচীন ডিএনএ সিকোয়েন্সিং থেকে পাওয়া টাইমলাইনের সঙ্গে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকের দেওয়া যুক্তি এবং টাইমলাইন হুবহু মিলে যায়। ডেভিড অ্যান্থনির লেখা The Horse, the Wheel, and Language নামের একটা ল্যান্ডমার্ক বই থেকে আন্দাজ পাওয়া যায় কীভাবে গবেষকরা সমস্ত প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে প্রচলিত শব্দের অ্যানালিসিস থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ছড়িয়ে পড়ার একটা ছবি তৈরী করেছেন। লিঙ্গুইস্টদের অ্যানালিসিস প্রমাণ করে যে প্রথম দিকের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে (যাদের মধ্যে সংস্কৃতও পড়ে), ব্রোঞ্জ যুগে স্তেপ অঞ্চলে আবিষ্কৃত বিভিন্ন টেকনোলজি সংক্রান্ত শব্দ গেঁথে রয়েছে - যেমন ঘোড়াকে পোষ মানানো, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো রথ, উন্নত মেটালওয়ার্কস…পাশাপাশি, প্রত্নতাত্ত্বিকেরাও আগেই দেখিয়েছেন যে সিন্ধু সভ্যতার স্বর্ণযুগে এরকম পোষ মানানো ঘোড়া বা চাকাওয়ালা রথের অস্তিত্বের প্রমাণ নেই। রাখীগড়ির পেপার এই সবের মধ্যেকার মিসিং লিঙ্কটা সামনে এনে দিয়েছে - একটা জৈবিক প্রমাণঃ ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের পশুপালকেরা যখন খ্রীষ্টপূর্ব ১৭০০ সাল নাগাদ ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছেছিল, তাদের জিনের পাশাপাশি এসেছিল তাদের ঘোড়া, চাকাওয়ালা রথ আর একদম শুরুর দিকের ইন্দো-এরিয়ান ভাষাসমূহ - সংস্কৃতের উৎপত্তি সেই ভাষাসমূহ থেকেই, ভারতীয় সভ্যতার নকশিকাঁথা বোনার শুরুও সেই সময়েই...
শেষ একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। শমীক ভশ্চাজ্জি এই ভুলভাল কথাটা অত স্টাইল করে বল্ল কেন? দিন কয়েক আগে লেখা হিন্দুত্ববাদীদের ইতিহাস পাল্টানোর নমুনা মনে করে দেখবেন একটু - কীভাবে জনসমক্ষে আবোলতাবোল দাবী করে উদ্ভট ইতিহাস তৈরী করার চেষ্টা করা হয়। সেই লেখাটা থেকেই অল্প একটু অংশ কোট করি।
“আরএসএসের "মার্গদর্শক' লজ্জা রাম তোমর গম্ভীরভাবে আউড়ে গেলেন - আলোর গতিবেগ নির্ণয় করা হয়েছিল ঋগ্বেদেই; ব্রিটিশরা নাগপুর দখল করার পর টানা ছ'মাস ধরে সেখানে নদীগুলোতে জলের সঙ্গে বয়ে গেছিল গলা সোনা; প্যারিসে তৈরী হয়েছে মনু-র মূর্তি এবং তার নীচে ফলকে লেখা রয়েছে "বিশ্বের প্রথম আইনপ্রণেতা'; শুধুমাত্র পবিত্র অশ্বত্থ গাছ আর তুলসীগাছই অক্সিজেন উৎপন্ন করে; নাসার বিজ্ঞানীরা সূর্যের মুখ থেকে "ওম' শব্দ শুনতে পেয়েছেন।"
লজ্জারাম তোমরের তুলনায় ব্যারিটোন ভয়েসে সুললিত গদ্য বাংলায় কথা বলা, অ্যাপারেন্টলি শক্তি চাটুজ্জে পড়া শমীক ভশ্চাজ্জি ফ্যাসিস্টদের নরম মুখ। এরকম সংস্কৃতিবান মানুষ যে কাঁচা মিথ্যে বলবেন সেটা তো আপনি ভাবতেই পারবেন না, তাই না? অথচ উনি বল্লেন, এবং কনফিডেন্টলি বল্লেন। কারণ, উনি জানেন যে এই মিথ্যেটা ধরে ফেলতে যে লজিকাল অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করার দরকার পড়বে, সেটা আপনি মোস্ট লাইকলি করবেন না। ভারতীয় সভ্যতা যে এজলেস, টাইমলেস এবং চিরকালই একইরকম গ্লোরিয়াস একটা ব্যাপার ছিল, সেটা তো ওরা অলরেডি আপনাকে বিশ্বাস করিয়েই ফেলেছে...
একটা ছোট কথা দিয়ে শেষ করি। বিজ্ঞান তথ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে। ইতিহাসও নির্ভর করে তথ্যপ্রমাণ — এক্ষেত্রে লিঙ্গুইস্টিকস, প্রত্নতত্ত্ব, এবং আজকাল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর ওপরেও। কিন্তু, এই চর্চায় যেটা আসল সেটা হল প্রশ্ন করতে পারা, চ্যালেঞ্জ করতে পারা, কোনো কিছুকেই অ্যাবসোলিউট ট্রুথ মেনে না নেওয়া। যেমন রোমিলা থাপারেরা AIT কে খারিজ করতে পেরেছিলেন। আপনাকে কেউ বল্ল যে আর্য্যরা সিন্ধু সভ্যতারই অংশ, আপনি সব তথ্যপ্রমাণ ছেড়ে দিয়ে সেইটাকেই সত্যি বলে মেনে নিলেন..."সব সত্যি...মহিষাসুর সত্যি...হনুমান সত্যি...ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি...টারজান সত্যি...অরণ্যদেব সত্যি..."
আপনি কি এখনও রুকুবাবুই আছেন? একটুও বড় হননি?
সূত্রঃ
(১) প্রাগিতিহাস, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, গাংচিল
(২) Who we are and how we got here – Ancient DNA and the new science of the Human Past, David Reich, Pantheon
(৩) Early Indians: The Story of Our Ancestors and Where We Came From, Tony Joseph, Juggernaut
(৪) The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, David W. Anthony, Princeton University Press
(৫) An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers, Vasant Shinde et al, Cell, Volume 179, Issue 3, 17 October 2019, Pages 729-735.e10, https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0092867419309675
#হিন্দু_খতরে_মে_হ্যায় #হিন্দুত্ববাদ #ন্যারেটিভ_বিল্ডিং



