শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…~ অরিজিত মুখার্জী

"কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলতো সঙ্ঘের শাখা৷ দলিতদের এলাকার সামনে একটা একলা অশ্বত্থ গাছ। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় সেই গাছের নীচে একটা কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে একটা মাদুর বিছিয়ে বসতো বছর পঁচিশের সুনীতা। সুনীতা কুমারী। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু ওকালতি করে না। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের পার্টি অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে এই গ্রামটায়। সঙ্গে কোনো পোস্টার নেই, পতাকা নেই; সুনীতার সম্বল দুই চোখ ভরা স্বপ্ন, আর কাপড়ের পার্সের ভিতরে পার্টির একটা মেম্বারশিপ কার্ড। সে এসে বসতো একটা পুরনো টিনের ট্রাঙ্ক নিয়ে — তাতে থাকত কিছু বই: ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের বই, একটা আইনের বই, একটা সংবিধানের কপি, কিছু ফর্ম, একটা খাতা আর ডটপেন। সুনীতা গ্রামের প্রান্তিক মানুষজনের কথা শুনত, তাদের সাহায্য করত — কারো ফর্ম ভরে দিয়ে, কারো পেনশন আনার জন্য প্রতিদিন বিডিওর দপ্তরে গিয়ে; গল্প বলতো — জল-জমি-জঙ্গলের অধিকারের গল্প, রুজি-রুটির লড়াইয়ের গল্প। গান শোনাতো..."হাম ভুখসে মরনেওয়ালে"। দিন কাটতো। তারপর, পাঁচ বছর পর, একদিন, পঞ্চায়েত ভোটের পরে, সেই অশ্বত্থ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, সুনীতার হাত ধরে, শপথ নিল গ্রামের প্রথম দলিত মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান..."
আমাদের কাউন্টার-হেজিমনির ভিত্তি এই গল্পটাই। গল্পটা শেষ করব পরের পর্বে, শেষ পর্বে। আজ লিখব হেজিমনি কীভাবে ভাঙা যেতে পারে তাই নিয়ে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিংটুকু। গ্রামশি আছে, সঙ্গে চার্বাকও - বকলমে পার্থ চ্যাটার্জী।
আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…
আগের দুটো পর্বে লেখার চেষ্টা করেছিলাম কীভাবে হিন্দুত্ব তার ওয়ার্ল্ডভিউকে কমন সেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে প্রায় একশো বছরের অবস্থানের যুদ্ধের মাধ্যমে - স্কুল, মিডিয়া, মন্দির, দৈনন্দিন অভ্যাসের স্পেসকে দখল করে। গ্রামশির কথা মানলে আমরা এও বুঝি যে কোনো আধিপত্যই চিরকালীন নয়। বেকারত্ব, রোজকার রুজি-রুটির লড়াই, হিন্দুত্বের ভিতরের জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক প্রতিরোধ, নানান কারণে অস্থির যুবসমাজ - অনেক ফাটল রয়েছে এই হেজিমনির মধ্যেও। তবে ফাটল রয়েছে মানেই আপনাআপনি সেই ফাটলে বিপ্লবের গাছ গজাবে, এমনটাও নয়।
গ্রামশি বলেন পাল্টা অবস্থানের যুদ্ধের কথা। চটজলদি ভোটে জেতার স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। হঠাৎ কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা আকাশ থেকে নেমে এসে মুশকিল আসান করে দেবেন - এই খোয়াব দেখেও লাভ নেই। একটা দুটো বা দশটা বিশাল মিছিলেও বিশেষ কিছু হবার নয়। বরং, অনেক ধৈর্য্য ধরে, অনেক সময় নিয়ে কিছু কাজ করে যেতে হবে, আপাতদৃষ্টিতে যেগুলো বড়ই বোরিং কাজ - যেমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে থেকেই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল তুলে আনা, সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করা, আর একদম গ্রাউন্ড-আপ একটা পাল্টা ঐতিহাসিক জোট (historic bloc) তৈরী করা…
পার্থ চ্যাটার্জীর হাত ধরে চার্বাক ফিরে এসেছেন — সেই প্রাচীন সংশয়বাদী দার্শনিক চার্বাক — যিনি এই ধারণাগুলোর একান্ত ভারতীয় রূপ তুলে ধরেন আমাদের সামনে। চার্বাকের কথা অনুযায়ী ভারত কোনো "হিন্দু রাষ্ট্র" নয়, আবার এলিট থিওরেটিকাল "বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র" বলেও ভারতকে ডিফাইন করা যায় না। ভারতের ইতিহাস, ভারতের সমাজ, সেই সমাজের মানুষজনকে দেখলে ভারত, প্রকৃত অর্থে, একটা "ফেডারেশ অফ পিপলস" — পিপলস ইন প্লুরাল, কারণ এই ভূখন্ড সত্যিই বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতি, বহু ধরণের জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। বলতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে রঙিন আর কমপ্লেক্স মেলা। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব আইডেন্টিটি; সবচেয়ে বড় কথা, নানান তফাত থাকা সত্ত্বেও এরা সকলেই একটা অভিন্ন সংবিধানের ছাতার নীচে একসাথে বসবাস করতে রাজী হয়েছে; অন্তত হয়েছিল একটা সময়। সেই সম্মতি বা সমঝোতা বাইরে থেকে ভেসে আসেনি। বেশ জটিল, অগোছালো এবং খানিক অসম্পূর্ণ আলোচনার ফসল এই সমঝোতা, যাকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বাধীনতার পর থেকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আজ তারা অনেকাংশে সফল। ফেডারেশন অফ পিপলস-এর বদলে তারা আনতে চাইছে পুরোপুরি সেন্ট্রালাইজড, মেজরিটারিয়ান, এক দেশ এক ভাষা এক আইডেন্টিটি এক পোশাক এক খাদ্যাভ্যাসের তথাকথিত হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান।
শুরুতেই এই প্রচেষ্টাকে "নো থ্যাঙ্কিউ" জানিয়ে চলুন একবার চেষ্টা করি এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধ পথ খুঁজে বের করতে। এক্ষেত্রে কাউন্টার-হেজিমনির পথ, অর্থাৎ সেই ফেডারেশন অফ পিপলস-কে আবার বাঁচিয়ে তোলার রাস্তা। শুধু "বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য"-এর এলিট স্লোগান নয়, বরং বাস্তবিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঝাঁকুনি দেওয়া ফেডারেশন যেখানে সম্পদের পুনর্বন্টন হবে, যেখানে ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্য আর স্থানীয় অঞ্চলগুলোই নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে, দিল্লীবাসী কোনো সুপ্রীম লীডার নয়।
প্রশ্ন হল – কীভাবে?
প্রথমতঃ, অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল - গ্রামশির বক্তব্য ছিল এই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে সমস্ত সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে; এমন মানুষ যাঁরা তাঁদের নিজেদের ভাষায় নিজেদের কথা বলবেন; ওপর থেকে উপদেশ দেবেন না। আরএসএস এই তত্ত্বটা ভালো বুঝেছিল। ফলে, তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই নিজেদের কথা বলার লোক তৈরী করেছিল - প্রচারক, স্কুলশিক্ষক, মন্দিরের পূজারী, আখড়ার মহন্ত, আধুনিক কালে ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার - যারা সকলেই স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় সংস্কৃতি, স্থানীয় ইমেজারি ব্যবহার করে একটা প্যান-হিন্দু আইডিয়া বেচতে পেরেছে সফলভাবে। উল্টোদিকে, সেকুলার লেফটের মধ্যে এতদিন অবধি যারা এই জায়গায় ছিল, তারা প্রায় সকলেই ইংরিজীতে শিক্ষিত, ইংরিজীতে কথা বলাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ, ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান ফিলোজফারদের উক্তি তাদের মুখে মুখে ফেরে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সংস্কৃতি তাদের কাছে ব্যাকওয়ার্ড...এক কথায় একটা "এলিট" সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষের কাছে খানিক অন্য গ্রহের বাসিন্দা টাইপ। কাউন্টার হেজিমনি এই ছকে তৈরী হবে না। যেমন ধরুন আমি, কলকাতায় জন্ম বড়-হওয়া একটা লোক যার সঙ্গে কোচবিহারের কোনো সম্পর্ক নেই, দুম করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মুখিয়া হতে গেলে কেউ মানবে না। অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে এই সমস্ত কমিউনিটি — দলিত, আদিবাসী, ওবিসি, মুসলমানদের মধ্যে থেকেই। তারা নিজেদের দাবীদাওয়া চাহিদার কথা বলবে। কথা হবে পেরিয়ারকে নিয়ে, আম্বেদকরকে নিয়ে, ভক্তি আন্দোলনের জাতপাতবিরোধী দিকগুলো নিয়ে, দ্রাবিড় মুভমেন্টের ফেডারেলিজম নিয়ে। আর এই মানুষগুলোকে উঠে দাঁড়ানোয় সাহায্য করতে থাকবে স্কলারশিপ, নাইট স্কুল, কো-অপারেটিভ লাইব্রেরি, আইনি সহায়তা, ট্রেড ইউনিয়ন - কিছু দায়িত্ব তো আপনিও নেবেন, নাকি?
দুই নম্বরে আসে কালচার ওয়ার - সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। যেখানে সংস্কৃতি কোনো জগদ্দল পাথর বা মোনোলিথ নয়। হিন্দুত্ব এই সংস্কৃতিকে মোনোলিথ বানিয়ে ফেলতে চেয়েছে, এবং অনেকাংশে তারা সফলও। কারণ, তাদের গল্পটা সোজাসাপটা। তাদের ডেফিনেশনে ভারত আদিকাল থেকেই একটা হিন্দু রাষ্ট্র; মুসলমান আর ক্রিশ্চানরা এই দেশে বহিরাগত; দেশপ্রেমিক হওয়ার একমাত্র রাস্তা হল তাদের রাগী চেহারার সিক্স প্যাকওয়ালা রামকে কুর্ণিশ করা, আর হিন্দিতে কথা বলা। হিন্দি - হিন্দু - হিন্দুস্তান। পার্থ চ্যাটার্জীর চার্বাক এই মিথকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেন। চার্বাক আমাদের জানান যে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী প্রতীক ও আখ্যান রয়েছে – সঙ্ঘ পরিবার যাকে তাদের ইচ্ছেমতো মুছে দিতে চায়: দক্ষিণে তামিল তাই, তেলগু তাল্লি, কানাড়া তায়ি, কেরলম; ঝাড়খন্ডে সিধু কানু, বীরসা মুন্ডা; মহারাষ্ট্রে শিবাজী; মণিপুরে মেইতি ইমা; পঞ্জাবে ওয়ারিস শাহ। আলাদা আইকন হলেও কোনোটাই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনা নয়, বরং ফেডারেশন অফ পিপলস-এর মূল মন্ত্র এই আঞ্চলিক সংস্কৃতি। কাউন্টার হেজিমনির জন্যে পাল্টা-সংস্কৃতির লড়াই: ওয়েব সিরিজ, সেখানে মুসলমান নার্স ইউনিয়ন তৈরী করে সহকর্মীদের জন্য লড়াই করে; দলিত কমিউনিটির জাতপাতবিরোধী লড়াইয়ের গল্প নিয়ে গ্রাফিক নভেল; আম্বানি-আদানিদের মুনাফালুটকে ব্যঙ্গ করে লোকসঙ্গীত (হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মাউন্টব্যাটন সায়েব গানটা মনে পড়ে); সঙ্ঘের ঘরের পাশে ঈদের ইফতার পার্টি আর আম্বেদকর মেলা; পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে মেয়েদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে, পণপ্রথা বিরোধী গল্প নিয়ে যাত্রা; আঞ্চলিক ধর্মীয় সিঙ্ক্রেটিজমের ট্র্যাডিশনের গল্প - সুফি-ভক্তি হেরিটেজ, সত্যপীর বা বনবিবির কথা, বাউল, ফকির, দরগা আর ক্রিসমাস ক্যারলও। বৈদিক মন্ত্র যতটা ভারতীয়, আমাদের এই ট্র্যাডিশনগুলোও ঠিক ততটাই…চাঁদ সদাগরের মণসাপুজোর মত করে লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ দিয়ে সংস্কৃতির যুদ্ধ হয় না; সংস্কৃতি ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন নয়; কমন সেন্স তৈরী করার অস্ত্র।
তিন, রোজকার জীবনের বিকল্প প্রতিষ্ঠান - প্রতিদিনের খাওয়াপরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ার। সঙ্ঘ শাখা তৈরী করেছিল, রোজ সকাল সন্ধ্যেয় তারা একসঙ্গে কিছু একটা চর্চা করত। এখনও করে। কাউন্টার-হেজিমনিকে দাঁড় করাতে এর বিকল্প প্রয়োজন। যেমন ধরুন পাড়ার লাইব্রেরি, যেখানে ছোট স্টাডি সার্কল বসবে, সাধারণ লোককে সঙ্গে নিয়ে। এলিট নাটক প্রবন্ধের চর্চা শুধু নয়, পপুলার কালচার থেকেও মেসেজ বের করে আনা সম্ভব - যেমন ধরুন মার্ভেলের সিনেমা - জেন-জি-দের পছন্দের গল্প; জয় ভীমের মত সিনেমা যেখানে জাতের লড়াইয়ের কথা রয়েছে; ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে অনুবাদ হয়ে আসা নানান প্রদেশের মানুষের গল্প; নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বাংলা অনুবাদে টিনটিনের গল্প; বাংলা ক্লাসিক - তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের...(আরো অনেক নাম আসতে পারে এখানে, বিভিন্ন ভাষায় আলাদা নাম, হরিনারায়ণ আপটে মনে পড়ছে যেমন)। প্রতি সপ্তাহের শেষে কমন সেন্স ওয়ার্কশপ — সেখানে সবাই মিলে সপ্তাহের খবরগুলো পড়ে আলোচনা করতে পারে: খবরে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সেই ঘটনায় লাভ কার? যেমন ধরুন কোথাও একটা যুদ্ধ হলে কারা লাভবান হয়? তেলের দাম বাড়লে লাভ কার, ক্ষতি কার? একটা একটা করে এরকম ওয়ার্কশপ ছড়িয়ে পড়তে থাকলে বাড়তে থাকবে এই নতুন কাউন্টার কমন সেন্স...বক্তৃতা দিয়ে নয়, বরং শেয়ার্ড এক্সিপিরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে।
চার, নতুন ঐতিহাসিক জোট বা হিস্টোরিক ব্লক। কিন্তু সমস্ত শ্রেণীগত তফাত মুছে একেবারে ফ্ল্যাট সমতল করে দিয়ে নয়। হিন্দুত্ববাদী জোটের অংশীদার উচ্চবর্ণের পুঁজিপতি ব্যবসাদার, উচ্চমধ্যবিত্ত প্রফেশনাল - আইটি ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ডাক্তার ইত্যাদি, আর অন্য পিছিয়ে-পড়া শ্রেণীর লোকজন যাদের হিন্দু হায়ারার্কিতে ওপরে ওঠার উচ্চাশা রয়েছে। এদের সকলের মধ্যে কমন সুতোটা বাস্তবে মুসলমান বিদ্বেষ — সে নানাভাবে এসে থাকতে পারে, যেমন দেশভাগের জেনারেশনাল মেমরি, বা "মুসলমানরা সব দখল করে নিল"-মার্কা হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড, এমনকী নানান অবদমিত ইচ্ছা থেকেও। কাউন্টার-হেজিমনির নতুন হিস্টোরিক ব্লক হবে একেবারেই আলাদা। এই জোটের কমন সুতো জাতিবিদ্বেষ না হয়ে হবে অভিন্ন বস্তুগত স্বার্থ, যেমন জমির অধিকার, জল জঙ্গলের অধিকার, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির অধিকার। সম্প্রদায়ের সীমানা ছাপিয়ে ইস্যুভিত্তিক প্রচার প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছবে। জল জঙ্গল জমির অধিকার জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, উঁচুনীচু, গরীব-বড়োলোক, ধার্মিক-অধার্মিক মানে না। সমস্ত জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এই জোটে, থাকবে না আদর্শগত বিশুদ্ধতার শুচিবাই। ধার্মিক হিন্দু মানেই হিন্দুত্ববাদী নয়, বুঝতে হবে এই দুটো শব্দের মানে আলাদা। আমি নাস্তিক, কাজেই আমার এই জোটে সবাইকে নাস্তিকই হতে হবে — সে জোট জন্মানোর আগেই তার গঙ্গাপ্রাপ্তি নিশ্চিত।
পাঁচ নম্বর - যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার আন্দোলন। ক্ষমতা ফিরবে রাজ্যের হাতে। শুধু বিজেপির শাসনকালেই নয়, ভারতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই। মোদির আমলে এই টেন্ডেন্সি চরম রূপ নিয়েছে, কারণ হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্যই হল ফেডারেশ অফ পিপলস-এর আইডিয়াকে মুছে দিয়ে এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম-এর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ন্যারেটিভকে ফাইনাল রূপ দেওয়া। ৩৭০ ধারার বিলোপ, হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া নানাভাবে, ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসিকে গায়ের জোরে চাপানো, পছন্দের রাজ্য সরকার না হলেই ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন-দের লেলিয়ে দেওয়া...বর্তমানে জুডিশিয়ারিকেও — সবই একটা ইউনিটারি মেজরিটারিয়ান রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে। এর পাল্টা কৌশল হল ফেডারেলিজমের পক্ষে ক্রমাগত গলা ফাটানোঃ রাজ্যের হাতে আরও ক্ষমতা; স্থানীয় সরকার, যেমন কর্পোরেশন বা পঞ্চায়ের হাতে আরও রিসোর্স; ভাষাগত আর সাংস্কৃতিক স্বশাসনের দাবী এবং সাংবিধানিক অধিকার; কেন্দ্রীয় আদিবাসী অঞ্চলগুলোকে ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা। সংবিধানে বলা যুক্তরাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী সমস্ত আইন প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাজ্যগুলোর রয়েছে, অন্ততঃ যতদিন না এই সরকার সংবিধানকেই বদলাতে পারছে — আর সেটা হতে দেওয়া যাবে না।
সবশেষে, এই লড়াইয়ের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা। গ্রামশি বলেছিলেন – যে দল গণতন্ত্র চর্চা করে না, তারা আধিপত্যের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে না। বাস্তব বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরণের মুভমেন্ট বা দলগুলোর ভিতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে এলিট উচ্চবর্ণের পুরুষদের মধ্যে। বাকিরা সেখানে ভোটব্যাঙ্ক। হ্যাঁ, একজন বামপন্থী কর্মী হয়েও লজ্জা না পেয়েই এই কথাটা বলছি, কারণ এটা বাস্তব। অধিকারের কথা বলবেন, অথচ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি থাকবে না সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় – তা তো হয় না। দরকারে অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ থাকবে; নিয়ম করে জাতিবাদ-বিরোধী, পিতৃতন্ত্র-বিরোধী প্রশিক্ষণ থাকবে দলের মধ্যেই – বিভিন্ন অফিসে যেমন প্রতি বছর নিয়ম করে POSH এর কোর্স করতে হয়। আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্বে থাকবে স্থানীয় লোক, দিল্লী থেকে নেমে আসা এলিট নেতা নয়। ইংরিজীতে একটা প্রচলিত কথা রয়েছে — “ডু হোয়াট ইউ সে”।
শুরুতেই যেমন বলেছিলাম — এই কাজগুলোর কোনোটাই গ্ল্যামারাস নয়। যন্তরমন্তরের অবস্থানে স্লোগান দেওয়ার মত উত্তেজনাপূর্ণ নয়। বোরিং কাজ যা জনসমক্ষে আসার সম্ভাবনা কম, কারণ অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে থাকা সুনীতা কুমারীকে মিডিয়া দেখাবে না। অবস্থানের যুদ্ধ এরকমই হয়। ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত। দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য্যের পরীক্ষা।
গ্রামশির কথা ধার করেই বলি: The old world is dying – কংগ্রেস স্টাইলের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান মৃতই বলা যায়। The new world – ন্যায়পরায়ণ, বহুত্ববাদী, ফেডারেল রিপাব্লিক – is not yet born. In this interregnum, a great variety of morbid symptoms – lynching, surveillance, hate speech – appear – as entertainment.
আমরা ওই ইন্টারেগনামে রয়েছি। নতুনের পথে এগিয়ে যেতে আমাদের সম্বল শুধু অসীম ধৈর্য্য আর পরিশ্রম। নতুনকে নিখুঁত গভীরতার সঙ্গে তৈরী করতে পারলে সেখান থেকেই উঠে আসবে নতুন কমন সেন্স। সঙ্ঘের অনুকরণে নয়, বরং আমাদের – সাধারণ মানুষের – নিজেদের প্রতিষ্ঠান, নিজেদের আখ্যান, নিজেদের আইন, নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে। এলিট ইংরিজীতে নয়; সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়।
চার্বাক তাঁর পান্ডুলিপির ইতি টানেন নতুন প্রজন্মকে ডাক দিয়ে: সংহতির কথা বলো; লেখো, গান গাও, বিতর্ক করো, সংগঠিত হও; নিজেদের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করো। নেতার অপেক্ষায় বসে থেকো না। এই দেশ, এই ভূখন্ড, এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষের — যদি প্রত্যেকে একসঙ্গে এই মাটিকে নিজের করে নেয়।
অশ্বত্থ গাছটার নীচে ফিরে যাও কমরেড। টিনের ট্রাঙ্কটা সঙ্গে রেখো। একজনকে পড়তে শেখাও।
।।। একটা অশ্বত্থগাছের গল্প ।।।
কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। দলিতদের ঝুপড়িগুলোর সামনে, একটু ফাঁকা জায়গায় একটা অশ্বত্থ গাছ। বুড়ো হয়েছে গাছটা, মাঝেমধ্যে দু একটা বাচ্চা ছেলে ছাড়া কেউ তার কাছাকাছি আসে না।
হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলে সঙ্ঘের শাখা৷ আশেপাশের তিনটে গ্রাম মিলিয়ে জনা পঞ্চাশ কমবয়সী ছেলে খাকি প্যান্ট পরে ব্যায়াম করে, ধুলো উড়িয়ে লাঠি খেলে, আর জয় শ্রীরাম বলে চিৎকার করে।
অশ্বত্থগাছটা একলাই দাঁড়িয়ে থাকে।


তারপর একদিন ওরা এল। ওরা মানে পার্টি। মিছিল নয়, গাদাখানেক লোকও নয়। একটা মেয়ে।
সুনীতা কুমারী। বছর পঁচিশের মত বয়স। জেলা সদরের কলেজ থেকে আইন পাশ করেছে, চাকরি করে না, ওকালতিও না। মেয়েটা পার্টির মেম্বার। সেই পার্টিটা যার কথা লোকে ভুলতে বসেছিল। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের আধভাঙা পার্টি অফিসে বসে জেলা সম্পাদক — বয়স হয়েছে তার, একটু খুঁড়িয়েও চলে — অনেকদিন আগে পুলিশের লাঠিতে পা ভেঙেছিল, আর সারেনি। একটা হাতলভাঙা চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে একদিন সে সুনীতাকে ডেকেছিল। পার্টি অফিসের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা লেনিন, ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের ছবির নীচে বসে সে বলেছিল — "আমাদের টাকাপয়সা নেই, লোকজনও কমে এসেছে। কিন্তু ওই গ্রামের অশ্বত্থগাছটা আমাদেরই। তুমি যাও — রোজ সন্ধ্যেবেলায় ওখানে বসে থাকবে। স্লোগান দেওয়ার দরকার নেই। শুধু বসে থাকো। অপেক্ষা করো"।
সুনীতা তর্ক করেনি। গ্রামে যাওয়া শুরু করল সে।
প্রথম দিন সন্ধেবেলা, একটা বাঁশের চাটাই, একটা কেরোসিনের লন্ঠন আর সেইদিনের খবরের কাগজটা নিয়ে সে বসে রইল...পাঁচটা থেকে সাতটা, ততক্ষণে গ্রামের বাইরে থেকে শেয়ালের ডাক শুরু হয়ে গেছে। একাই বসে রইল মেয়েটা, কেউ আসেনি তার কাছে। দ্বিতীয়দিন আবার গেল সে, আবারও একই ঘটনা। তিনদিনের দিন, কতগুলো বাচ্চা একটু দূর থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকে দেখে গেল। তার পরের দিন, এক মুসলমান চাষী এসে সুনীতার সামনে বসল হাঁটু মুড়ে। নাম ইউসুফ, আটষট্টি বছর বয়স, আট মাস ধরে সে চক্কর কাটছে বার্ধ্যক্য পেনশনের জন্যে। পায়নি। সুনীতা ইউসুফকে খবর পড়ে শোনাচ্ছিল — একটা নতুন সেচ প্রকল্পের খবর — নদীতে নতুন বাঁধ তৈরী হবে একটা। বুড়ো ইউসুফ পাত্তা দিল না। বললো — "জল নিয়া কী করব আমি? আমার পেনশন দ্যাও। বউ অসুস্থ। ওষুধ কিনতে পারি না। আট মাস ধরে ব্লক অফিসের চক্কর কাটতে আছি। ওরা টাকা চায়, টাকা কোত্থিকে দেব?"
সুনীতা বলে — "কাগজগুলো সব আছে তোমার কাছে"? "কাগজ, হুঁ:", বুড়ো হাসে। সুনীতা হাসে না। বরং পরের দিন একটা প্রো ফর্মা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে আসে সে। বুড়োর সঙ্গে বসে ফর্ম ভরে। তারপরের দিন সকালে বুড়ো ইউসুফকে নিয়ে ব্লক অফিসে যায়। বিডিও দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে — "বার বার আসো কেন বুড়ো? বলে দিয়েছি তো"! সুনীতা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, ফাইল হাতে। সেই দিনটা কেটে যায়। পরের দিন আবার যায় সুনীতা, আবার দাঁড়িয়ে থাকে অফিসারের সামনে। তারপরের দিন আবার। পাঁচ দিনের দিন অফিসার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলে সই করে দেয়। দুই হপ্তা পর ইউসুফের পেনশনের চিঠি এসে পৌঁছয় গ্রামের বাড়িতে।
ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু এইটুকুই। বিপ্লব নয়। একটা পেনশন মাত্র।
পার্টি কৃতিত্ব চায় না। সমাবেশও করে না এই লড়াইয়ে জিতে। শুধু সুনীতাকে পাঠাতে থাকে। রোজ। দিনের পর দিন। প্রতি সন্ধ্যেবেলা, সেই অশ্বত্থ গাছটার নীচে।
একমাস পর, বুড়ো জেলা সম্পাদক একটা টিনের ট্রাঙ্ক পাঠায় সুনীতার কাছে। ট্রাঙ্কে কয়েকটা বই — ভগৎ সিংকে নিয়ে, একটা আম্বেদরকরের লেখা, কয়েকটা আইনের বই, সংবিধানের একটা কপি, নানান ধরণের ফাঁকা কিছু অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম, একটা বাঁধানো খাতা যেখানে লোকজনের কথা লিখে রাখা যাবে, আর কয়েকটা ডটপেন আর রিফিল। সুনীতা ট্রাঙ্কটা অশ্বত্থ গাছের তলাতেই রেখে দেয়। রোজ বিকেলে পাঁচটার সময় এসে সে ট্রাঙ্কের তালাটা খোলে, আবার সাতটার সময় বন্ধ করে দেয়।
তারপর, আস্তে আস্তে আরো অনেকে আসে অশ্বত্থ গাছের তলায়। দলিত পাড়ার এক বউ — তার ছেলেকে বেধড়ক মেরেছে মহাজনের লোকেরা। ছোট জাতের কমবয়সী জোয়ান ছেলে একটা — লোন চেয়েছিল, কিন্তু ফর্ম ভরতে পারেনি; পড়তেই জানে না সে। এক বিধবা — তার রেশন কার্ড হারিয়ে গেছে। এক চাষা — বড় রাস্তা তৈরীর সময় তার জমি নিয়ে নিয়েছিল সরকার, কিন্তু সে তার প্রাপ্য টাকা পায়নি। সুনীতা তাদের সকলের সঙ্গে কথা বলে। সকলকে সাহায্য করতে থাকে। কোনো গরম গরম বক্তৃতা না দিয়েই। শুধু ফর্ম ভরে, দরকার মত কোথাও ফোন করে, আর একটা পুরনো সাইকেলে চালিয়ে ফাইলভর্তি ব্যাগ কাঁধে এই অফিস, সেই অফিস ছুটোছুটি করে...

সঙ্ঘের শাখার নজর পড়ে অশ্বত্থ গাছের দিকে। একদিন সন্ধ্যেবেলা শাখার প্রচারক এসে পৌঁছয় তর্ক করে সুনীতাকে হারিয়ে দেবে বলে; হেরে গেলে মেয়েটা বিদেয় হবে। প্রচারক অনেক চেঁচায় — লাভ জিহাদ আর হিন্দু ঐক্য নিয়ে, আর...পঁচিশ বছরের একলা মেয়ে সুনীতা সন্ধ্যেবেলা দলিত আর মুসলমানদের ঘরের পাশে কী করছে তাই নিয়েও। দপ্‌ করে জ্বলে ওঠে গাছতলায় বসে থাকা গরীব ঘরের লোকগুলো। কিন্তু সুনীতা রাগে না, চিৎকারও করে না। ঠান্ডা মাথায় শুধু জিজ্ঞেস করে — "এই বউটার রেশনকার্ডের উপায় আছে তোমার কাছে"? মেয়েটার শান্ত মুখ দেখে আর চারপাশে একটু অশান্ত লোকজনের ফিসফাস শুনে প্রচারক আর দাঁড়ায় না সেখানে। "পরে আসব" বলে চলে যায়, কিন্তু আর আসে না।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা ওদের গান শোনায় সুনীতা। শহরের পার্টি অফিসের ঘরে শেখা গান।
"আজ কমর বান্ধ তৈয়ার হোওয়ে কোটি ভাইয়োঁ,
হম ভুখসে মরনেওয়ালে, কেয়া মওতসে ডরনেওয়ালে"

গানের সঙ্গে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে গাছতলার মানুষগুলো।
ছয় মাস কেটে যায়। শহরের অফিসে পার্টি একটা মিটিং ডাকে, রাজ্যের বড় নেতাদের নিয়ে। নেতারা জিজ্ঞেস করেন: "কী পেলাম আমরা"? বুড়ো সম্পাদক বলে — "এখনও কিছুই না। তবে ওই অশ্বত্থ গাছটার নীচে এখন অনেক মানুষ আসে তাদের নানান সমস্যা নিয়ে, তাদের নিজেদের কথা বলে তারা। এটুকুও তো আমাদের ছিল না।"
পার্টি এই ছোট্ট মুভমেন্টটাকে ভিত্তি করে আরো বড় মুভমেন্ট গড়বে ঠিক করে। সকলের কাছ থেকে দুশো টাকা করে নিয়ে ওরা একটা টিনের ছাউনি কেনে। অশ্বত্থ গাছের পাশে দলিত পাড়ার মুখে ওই পাড়ার ছেলেদেরই কেটে আনা চারটে বাঁশের খুঁটির ওপর বসে সেই ছাউনি। তারপর পার্টি কেনে আরো একটা ট্রাঙ্ক। একটা ছোট লাইব্রেরি বানায় — শ দুয়েক বই, শহরের লোকজন দান করেছিল। ফসল কাটার আগে সবাই মিলে তৈরী করে শস্যের গোলা একটা। প্রতি সপ্তাহে শহরের এক রিটায়ার্ড উকিল আসতে শুরু করে অশ্বত্থতলায় — একটা লিগাল এইড ক্লিনিক বানিয়ে ফেলে সে। তারপর একটা সহজ যোগাযোগের ব্যবস্থাও বানিয়ে ফেলে নিজেরাই: একটা মিসড কল নেটওয়ার্ক। কারো কোনো জরুরী খবর দেওয়ার থাকলে — পুলিশ রেইড, নতুন সরকারী স্কিম, বাজারে ফসলের দামের বদল — মিসড কল দেবে সে সুনীতাকে। সুনীতা তখনই পালটা ফোন করে সব জেনে নিয়ে পাঁচজন ভলান্টিয়ারকে খবর দেবে, তারা আরও পাঁচজনকে জানাবে...এক ঘন্টার মধ্যে আশেপাশের গ্রামের অন্তত: একশো পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে খবরগুলো। আর, গাছের গুঁড়িতে পেরেক দিয়ে ঠোকা একটা নোটিস বোর্ডে সময়ে সময়ে আপডেট লিখে দেবে কেউ না কেউ...
এক সন্ধ্যেবেলা, কবিতা আসে অশ্বত্থ তলায়। কবিতা, অল্পবয়সী, মাহারদের ঘরের বউ। ক্ষেতে তুলো তুলে পেট চলে তার। দুই বছর আগে শ্বশুরবাড়ির লোক তার মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল জোর করে; মেয়েটা তখনো চোদ্দ বছরের মাত্র। দু বছর না ঘুরতেই বিধবা হয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। কবিতার ছেলে শহরে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করে, মাস গেলে মায়ের ঠিকানায় কিছু টাকা পাঠায়। কবিতা বলে — "আমাকে আর আমার মেয়েটাকে পড়ালিখা শেখাবে"?
শুরু হয় নাইট স্কুল। বাঁধা সিলেবাস নেই। সার্টিফিকেটও নেই। একটা বালব, একটা ব্ল্যাকবোর্ড আর মাটিতে বসা দশটা মেয়েবউ। কেউ মাহার, কেউ মুসলমান, কিন্তু সেসব নিয়ে কেউ ভাবে না। পাশাপাশি বসে তারা অক্ষর চিনতে শেখে। নিজের নাম লিখতে শেখে। তাদের রেশন কার্ডে কী লেখা আছে, পড়ে সেসব। জমির দলিল পড়তে শেখে। ওদেরই একজন হঠাৎ নজর করে যে মহাজন গ্রামের বাসিন্দাদের দুই একর জমি নিজের নামে করে নিয়েছে, এতদিন কেউ জানতোও না।
কবিতা বলে, "চলো তহশিলদারের কাছে যাই"। যায় ওরা। মহাজন তহশিলদারের খাস দোস্ত। মহাজন হা হা করে হাসে। তহশিলদার ওদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ওরা আবার যায়। তারপর আবার। পার্টি একজন উকিলকে পাঠায় জেলা সদর থেকে — চুপচাপ একটা লোক যে খুব একটা মিটিং মিছিল বক্তৃতা করে না। সেই উকিল একটা কেস ফাইল করে মহাজনের নামে। দু বছর লেগে যায় কোর্টে। হেরে যায় ওরা। তারপর আপীল করে। শেষ অবধি জিতেও যায় একদিন। জমি ফেরানো হয় গ্রামবাসীদের কাছে।
মহাজন ওদের জলের লাইন কেটে দেয়। পরের দিন সুনীতা পাশের গ্রাম থেকে একজন পুরনো ইঞ্জিনিয়ারকে ধরে আনে — লোকটাকে এক যুগ আগে বরখাস্ত করেছিল সরকার; ডিপার্টমেন্টের উপরওয়ালার দুর্নীতির ধরে ফেলেছিল সে, আজকাল টিউবওয়েল সারিয়ে পেট চালায়। সে ওদের শেখায় বোরওয়েল কী করে বসাতে হয়। ওরা নিজেরাই করে নেয় কাজটা। মহাজন ওদের থামাতে পারে না।
সেদিন রাতে আগুন জ্বালিয়ে তার চারদিকে ঘুরে নাচে ওরা; গান গায়।
"ইতনে বাজু, ইতনে সর, গিন লে দুশমন ধ্যান সে
হারেগা উও হর বাজি, যব খেলে হম জি-জান সে।"
বুড়ো একলা অশ্বত্থ গাছটা ততদিনে আর শুধু গাছ নয়। আর একলাও নয়। তার নীচে মানুষের ঢল নামে। গ্রামের উল্টোদিকে নীমগাছের পাশে সঙ্ঘের শাখা তখন রোজই চলে। কিন্তু, এখন অশ্বত্থ গাছের তলাতেও গড়ে উঠেছে পালটা জোট। ওরা সঙ্ঘের শাখার মত উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান দেয় না, বরং ওদের জোট বিকল্প হিসেবে রোজকার জীবনের চাহিদার কথা বলে। মেটিরিয়াল রিয়েলিটি। আর কোনো পেনশন আটকে থাকে না। থানার মিথ্যা মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয় ওদের ওপর থেকে। আধিপত্যবাদের কফিনে পোঁতা হয় আরও একটা পেরেক।
আরও দু বছর কাটে। পরের পঞ্চায়েত ভোটে পার্টি চমকে দেয় সকলকে। আগে কখনও এমনটা করেনি তারা। নিজেরা প্রার্থী না দিয়ে পার্টি সমর্থন করে কবিতার মেয়েকে। মাহী। সেই মেয়ে, যাকে চোদ্দ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল কবিতার শ্বশুরবাড়ির লোক৷ মাহীর বয়স আজ কুড়ি বছর; ওই অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে লিখতে পড়তে শিখেছে সে; জমির ঘটনাটা প্রথম নজরে পড়েছিল তারই; বোরওয়েলটা বসানোর সময় নিজের মাথায় করে ইঁট বয়েছিল সে। মাহী জিতে যায় বারো ভোটের ব্যবধানে।
লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করেনি মাহী। নিজেকে কমিউনিস্টও বলেনি। কিন্তু সে খেয়াল রেখেছিল যাতে গাছতলার সেই ছাউনিটা মেরামত হয়; বোরওয়েল পরিষ্কার করা হয়; আর স্কুলের বাড়িটায় একটা নতুন টয়লেট বসে।
পার্টির বুড়ো জেলা সম্পাদক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এক সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছয় অশ্বত্থতলায়। গাছের তলায় বসে সে দেখে — আশেপাশে বেশ কয়েকজন বউ মেয়েরা লন্ঠনের আলোয় পড়ছে। বুড়ো সুনীতাকে বলে — "একেই বলে অবস্থানের যুদ্ধ। বক্তৃতা নয়। মিছিলও নয়। শুধু একটা গাছতলা, একটা
টিনের ট্রাঙ্ক, আর সময়"।
সুনীতা হাসে। চোখ তুলে বলে, "আর, একটা পার্টি যে জানে কখন মুখ বুজে কাজ করে যেতে হয়"।
সেই অশ্বত্থ গাছটা আজও আছে। ট্রাঙ্কটাও। নাইট স্কুলটাও। আর আছে সেই পার্টিটাও। লাল ঝান্ডার পার্টি। আগের মত শুধু স্লোগান দেওয়া ভোটে লড়া পার্টি নয়। নতুনভাবে, ধৈর্য্য ধরে দিনের পর দিন মানুষকে নিয়ে জোট বাঁধার বোরিং কাজগুলো করে যাওয়া পার্টি। এমন একটা পার্টি যারা শুধু গলা তুলে আরো জোরে চেঁচিয়ে জেতার চেষ্টা করে না; এই পার্টিটা জেতে আম আদমির সমস্যার সমাধান ছিনিয়ে এনে — যে সমস্যার সমাধান শাসকশ্রেণী করতে চায় না। এই পার্টিটা জেতে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জোট বেঁধে।
এমনটাই হয় কাউন্টার-হেজিমনি...একমাত্র পথ যেটা কাজ করে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

আজকের ভারত ও গ্রামশির তত্ত্ব ~ অরিজিত মুখার্জী

প্রায় একশো বছর আগে, মুসোলিনীর আমলে ইটালিতে জেলে বন্দী থাকাকালীন গ্রামশি বেশ কিছু তাত্ত্বিক কথাবার্তা লিখে রেখেছিলেন। তার মধ্যে আধিপত্য বা হেজিমনি নিয়েও বেশ কিছু আলোচনা ছিল। এই ২০২৬ সালে বসে, ভাবলে অবাক লাগে কীভাবে গ্রামশির সেই তত্ত্ব মোদীর ভারত সম্পর্কে একদম খাপে খাপে বসে যায়...যেন ভদ্রলোক সেই ১৯২৬ সালে বসেই আজকের ভারতকে দেখতে পেয়েছিলেন...

হিন্দুত্ববাদ সিরিজটার কন্টিন্যুয়েশন: গ্রামশির আধিপত্যবাদের তত্ত্ব। 

এখানে একটা ডিসক্লেমার দিয়ে রাখি। আমার চেয়ে অনেক জ্ঞানীগুণী বিদ্বান লোকেরা এই নিয়ে অজস্র লেখালেখি করেছেন। আমি এই সিরিজটায় শুধুমাত্র সেগুলোকে আরো অ্যাক্সেসিবল করার চেষ্টা করছি। সহজ ভাষায়। বোর হলে স্ক্রোল করে বেরিয়ে যাবেন।

সাধারণত: আমরা বেশিরভাগ মানুষই মনে করি ক্ষমতা আসে বন্দুকের নল থেকে, বা পুলিশের উর্দি থেকে, বা আইন আদালত বিচারব্যবস্থার হাত ধরে। গ্রামশি বলেন এটা ক্ষমতার অর্ধেক মাত্র। শাসক গোষ্ঠীর হাতে এই সব শক্তি ছাড়াও থাকে সাধারণ মানুষের কনসেন্ট। একটা ছোট্ট শাসকগোষ্ঠী যখন তাদের "ওয়ার্ল্ডভিউ" বা পৃথিবী সম্পর্কে তাদের ধারণা-কে গোটা নাগরিক সমাজের "কমন সেন্স" হিসেবে খাড়া করে ফেলতে পারে, তখনই সেটা তৈরী করে পরিপূর্ণ আধিপত্য।

ভেবে দেখুন। গরীব হিন্দু নোট বাতিলের সময় ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাঙ্কে লাইন দেওয়ার পরেও কেন আম্বানি-আদানিদের চৌকিদারি করা এই সরকারটাকে সমর্থন করে? কেন দলিত আর আদিবাসীরা, লাগাতার নানারকম জাতিবিদ্বেষের মুখে পড়েও, জয় শ্রীরাম বলে বিজেপির মিছিলে যায়? কেন একজন সাধারণ দিন-আনি-দিন-খাই অটোচালকও পোশাক বা ফেজটুপির ভিত্তিকে কাউকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেয়? এদের নাকের ডগায় কেউ বন্দুক ধরেছিল? না তো! তা সত্ত্ব্বেও এই ঘটনাগুলো ঘটে। শম্ভুলাল রেগর একজন অতি সাধারণ গরীব পরিযায়ী শ্রমিককে লাভ জিহাদের নাম করে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেয়। আখলাক আহমদকে একদল একই রকমের গরীব লোক টেনে বাড়ি থেকে বের করে এনে পিটিয়ে মেরে ফেলে। খুঁজে দেখলে গত দশ বছরে লিঞ্চিং এর ঘটনা গুণে শেষ করা যাবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৩ এর মধ্যে শতাধিক লিঞ্চিং-এর ঘটনা ঘটেছে — অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিকার মুসলমান বা দলিত। এবং এই ঘটনাগুলোকে কনডেম করা তো দূরের কথা, অজস্র লোক এগুলোকে নানাভাবে সমর্থন করে এগুলোকে নর্মালাইজ করেছে।

কেন? কারণ এই সবই পাব্লিকের "কমন সেন্স" হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলের বই থেকে, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড থেকে, সারাদিন ধরে টিভিতে চলা হাই-পিচ ডিবেট থেকে, বিভিন্ন আখড়ার মহন্তদের ফরমান থেকে...

হেজিমনি মানে এমন নয় যে ক্ষমতাশালীরা আপনাকে রোজ মেরেধরে পথে এনে ফেলছে। বরং আপনার মগজের দখল ওরা ইতিমধ্যেই নিয়ে ফেলেছে। আপনার মাথার মধ্যে ওরা অলরেডি জয়ী।

গ্রামশি দুরকম যুদ্ধের কথা বলেছিলেন। এক, ওয়ার অফ ম্যানুভার, বা কৌশলের যুদ্ধ। আর দুই, ওয়ার অফ পোজিশন — অবস্থানের যুদ্ধ। প্রথমটা টিপিকালি সরাসরি লড়াই — স্ট্রাইক, লাগাতার হরতাল, ভোটের সময় কোনো একদিকে ঢলে পড়া সেন্টিমেন্টের ঢেউ। আর দ্বিতীয়টা লংটার্ম, খানিকটা ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত — ধৈর্য্যের পরীক্ষা। সময় নিয়ে আস্তে আস্তে স্কুলকলেজ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক গ্রুপ, ধর্মীয় পরিসর, বিকেলে পার্কে হাঁটতে যাওয়া "উই আর অ্যাবভ সিক্সটি" গ্রুপ বা সকালের লাফিং ক্লাব, আমার আপনার রোজকার নানান অভ্যাস — সবকিছুকে নিজেদের দখলে আনা।

সঙ্ঘ পরিবার একশো বছর ধরে এই অবস্থানের যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। শাখায় হিন্দু সংস্কৃতির গর্ব। স্কুলে বদলে যাওয়া ইতিহাস। অসংখ্য "অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল" — প্রচারক, প্রথাগতভাবে উচ্চশিক্ষিত না হলেও যারা হিন্দু সেন্টিমেন্টকে খুঁচিয়ে তুলতে পারে। মন্দির ট্রাস্টের ম্যানেজার; আখড়ার মহন্ত; শহরে গ্রামে প্রতিনিয়ত যারা হিন্দুত্বকে "কমন সেন্স" বলে চালিয়ে চলে। এর পাশাপাশি, গত দুই দশকে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এই যুদ্ধ ছড়িয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে ফেক নিউজ ভাইরাল করার ডিজিটাল সৈনিক; লাভ জিহাদ আর ঘর ওয়াপসির মত ন্যারেটিভ, চেহারা পেশা পোশাক নিয়ে মিসোজিনি ছড়িয়ে দাঁত নখ বের করা পুরুষতন্ত্রকে জিইয়ে রাখা সমাজমাধ্যম আর মিডিয়াতে বাণী দেওয়া সমাজচিন্তক; সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার যারা অনায়াসে বলে সেকুলারিজম মানে অ্যান্টি হিন্দু; ডীপ ফেক ক্রিয়েটর; সুদর্শন নিউজ বা রিপাবলিক টিভির মত অগুণতি টিভি চ্যানেলে তারস্বরে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ ছড়ানো সাংবাদিক; এসআইআরের আগে বাংলা চ্যানেলে বসে "কোটি কোটি বাংলাদেশী রোহিঙ্গা ভারতে ঢুকে পড়েছে" বলা বুদ্ধিজীবী; সরকারকে প্রশ্ন করা ছাত্র যুবক বা অন্য সাধারণ মানুষদের আরশোলা বলে দেওয়া বিচারক; কনসেন্ট আজ তৈরী হয় সেকেন্ডের মধ্যে।




আর এই যুদ্ধের পাশাপাশি এসেছে ওয়ার অফ ম্যানুভার — কৌশলগত আক্রমণ: ভোটে জিতে বুলডোজার অ্যাকশন, এসআইআর, আর্টিকল ৩৭০ — এই ম্যানুভারের প্রত্যেকটাই জনসমর্থন পেয়েছে, কারণ এর জমি তৈরী হয়েছে এতদিনের অবস্থানের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। বিরোধীদের বিরাট বড় মিছিলে বিজেপির আর কিস্যু এসে যায় না। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষক আন্দোলন চলার পরেও বিজেপি বিধানসভা ভোটে জেতে। নোটবাতিলের সময় বা কোভিডের সময় সাধারণ মানুষের চরম হেনস্থার পরেও একই ঘটনা ঘটে...

কারণ, জমি তৈরী হয়ে গেছে। ভারতের আশি শতাংশ হিন্দু, বিশ্বাস করে নিয়েছে যে ভারতের সাংস্কৃতিক শেকড় রয়েছে এক ও একমাত্র হিন্দু চেতনার মধ্যেই।

আর আছে ক্রনি ক্যাপিটালিজম — শাসক জোটের অন্য অংশটা।

গ্রামশি ক্ষমতায় আসীন এই জোটের নাম দিয়েছেন "ঐতিহাসিক জোট" (historic bloc) — ভারতে সেটা তৈরী হয়েছে হিন্দুত্ববাদ আর ক্রনি ক্যাপিটালিজমের মধ্যে। যারা একে অপরকে শক্তি যোগায়।

আম্বানি, আদানিরা হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী নেশন-বিল্ডার। হিন্দু রাষ্ট্র আর প্রাচীন ভারতের গ্লোরি ফিরিয়ে আনার নৈতিক ছাতার নীচে তাদের মুনাফা লোটার কারিকুরি চাপা পড়ে। হিন্দুত্ববাদী শাসক গোষ্ঠী পায় ফান্ডিং: ইলেক্টোরাল বন্ড, বিজ্ঞাপন, মন্দির করিডোরের জন্যে জমি — একই সাথে যেটা রিয়েল এস্টেটও বটে। আর গরীব খেটে খাওয়া মানুষ, মুটে মজুর, পরিযায়ী শ্রমিকদের বোঝানো হয় যে গরীবের পকেট কেটে সুইস ব্যাঙ্কের লকার ভরানো পুঁজিপতি বা পাব্লিক ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে দেশ ছেড়ে পালানো বেওসাদার বা গলা অবধি দুর্নীতিতে ডুবে থেকে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা রাজনীতিকরা নয়, তাদের সমস্ত সমস্যার মূলে ওই "ওরা" — মুসলমান বা ক্রীশ্চানরা। কারণ ওরা সবাই জেহাদি, ঘুসপেটিয়া ইত্যাদি।

শ্রেণীর ক্ষোভকে চাপা দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভয় দেখিয়ে।

আম্বানি বা আদানির মত পুঁজির মালিকেরা নিজেদের 'অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল' তৈরী করে — ইকোনমিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, কর্পোরেট মিডিয়া চ্যানেল, ব্যবসাবান্ধব আইনজীবী, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় "ন্যাশনালিস্ট" ইনফ্লুয়েন্সার। যখন দেখবেন কোনো টিভি চ্যানেল সরকারের নীতিকে প্রশ্ন না করে সরকারের পোষা অর্থনীতিবিদকে টকটাইম দিচ্ছে, তখন জানবেন যে কর্পোরেট স্বার্থ আর জাতীয়তাবাদ একই সুতোয় গাঁথা। যখন দেখবেন যে অজান্তে আপনিও কখন ভাবতে শুরু করেছেন আম্বানি-আদানিদের বিকল্প নেই, ওরা তো পরিশ্রম করেই অত উঁচুতে উঠেছে, তখন বুঝবেন আপনিও এই কনসেন্ট তৈরীর ফাঁদে পড়ে গেছেন।

এই হল সফিস্টিকেশনের চরম পর্যায়ে থাকা আধিপত্যবাদ বা হেজিমনি। রাষ্ট্রক্ষমতা তো ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছেই — পুলিশ, ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন, আদালত, বুলডোজার। মাঝেমধ্যে সামনেও চলে আসে — এনকাউন্টার, প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন, ইউএপিএ, ইন্টারনেট শাটডাউন, নির্বাচনের সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা। কিন্তু আসল ম্যাজিক লুকিয়ে রয়েছে আম আদমির কনসেন্টে; লক্ষ মানুষের স্বেচ্ছায় নিজেদের সরকারের দাসানুদাস মেনে নেওয়ার মধ্যে; "সরকার মাই বাপ" মানসিকতায়। কারণ একশো বছর ধরে জমি তৈরী করা হয়েছে: দেশ মানে রাষ্ট্র, সরকার; আর দেশকে ভালোবাসা মানে সমস্ত ক্ষুধার সূচক, বাচ্চা আর মেয়েদের স্বাস্থ্যের সূচক, প্রেস ফ্রীডম ইন্ডেক্স, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির দাবী, সব ভুলে গিয়ে গায়ে মাথায় মুখে জাতীয়তাবাদের রঙ মেখে তারস্বরে বন্দে মাতরম চিৎকার। রাষ্ট্রক্ষমতা আর কনসেন্টের মিশেলে তৈরী হওয়া coercive-hegemonic hybrid...

তবে কোনো হেজিমনিই চিরকালীন নয়, আশার কথা এইটুকুই। গ্রামশি লিখেছিলেন যে শাসক ততদিনই আধিপত্য বজায় রাখতে পারে যতদিন সে জনতার কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে। হিন্দুত্ব সেটাই করে: বিনামূল্যে রেশন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, দলিত/আদিবাসীদের লার্জার হিন্দু ফোল্ডে টেনে নেওয়ার অ্যাসপিরেশন। সঙ্গে "ওদের" ঢিট করার জন্যে বুলডোজার; মব লিঞ্চিং-এ ছাড়; অনলাইন ও অফলাইনে মিসোজিনির ঢালাও পারমিশন; হেজিমনি বজায় রাখতে সাহায্য করার ইন্সেন্টিভ।

কিন্তু ফাটল ঠিকই দেখা দেয়। বেকারির জ্বালা, জিনিসপত্রের দাম, শিক্ষা স্বাস্থ্যের সংকট, ডুবতে বসা অর্থনীতি, হিন্দুত্বের মধ্যে জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন প্রদেশে আঞ্চলিক প্রতিরোধ...

বিপ্লবের মুহূর্ত আসে যখন দেশজোড়া কনসেন্টে ফাটল ধরে; যখন মানুষ বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়। তখন রাষ্ট্রকে প্রকাশ্য শক্তির আশ্রয় নিতে হয়।

সেই সময় এখনো আসেনি। কিন্তু আসবে। সেই সময়কে তৈরী করা যায় — কাউন্টার হেজিমনির মাধ্যমে। সহজ নয়। খন্ড বিখন্ড চিন্তাভাবনা; আইডেন্টিটির লড়াই; স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মত মিডিয়ার অভাব; অর্থের অভাব। তবুও সময়কে তৈরী করা সম্ভব।

কীভাবে? লিখব।

#হিন্দু_খতরে_মে_হ্যায় #হিন্দুত্ববাদ #ন্যারেটিভ_বিল্ডিং

শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬

আর্য্যদের অভিবাসন তত্ত্ব ও রাখীগড়ি ~ অরিজিত মুখার্জী

শমীক ভশ্চাজ্জির একটা বক্তব্য নিয়ে অনেকেই লিখেছে দেখেছি। রাখীগড়ির ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি অমুক তমুক অনেক কিছুকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে ইত্যাদি ইউজুয়াল আগমার্ক হিন্দুত্ব হাবিজাবি। আমি একটা সহজবোধ্য প্রাইমার দেওয়ার চেষ্টা করি — কেন শমীক ভশ্চাজ্জি এই দাবীটি করতে গেল। আরো একটা উদ্দেশ্য আছে। এর আগের বার এই ভশ্চাজ্জির আরো একটা বালবাজারি নিয়ে ফেসবুকে লেখার পর জনৈক জেলখাটা "প্রিটেন্ডার" সাংবাদিক আমাকে নিয়ে আস্ত ইউটিউব এপিসোড করে ফেলেছিলেন। আশা করছি এইবারেও তিনি আরো একটা ইউটিউব এপিসোড নামাবেন। একে তো আমি সেলিব্রিটি হয়ে যাব, আর দ্বিতীয়ত: এই বালবাজারিটার ব্যাপারে যদি দুটো লোকও খোঁজ করে সত্যিটা জানতে পারে, তাতেও বড় লাভ।
 
সো, হিয়ার গোজ...
 
কী বলেছে শমীক ভশ্চাজ্জি? না, রাখীগড়ির প্রাচীন মানুষের ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি প্রমাণ করে দিয়েছে যে Aryan Invasion Theory (AIT) পুরোপুরি মিথ্যে, বামপন্থী ঐতিহাসিকরা এতদিন আমাদের সব ভুল শিখিয়েছেন।
 
শুরুতেই শমীক ভশ্চাজ্জি যে মিথ্যেটা বলেছে (মিথ্যেই বললাম, কারণ এরা যা বলে জেনেশুনেই বলে) সেটা হল এই AIT নিয়ে। সেই ১৯৫০-৬০ নাগাদই ইনভেশন থিওরিকে ক্রিটিক করেছেন ডিডি কোশাম্বি, রোমিলা থাপার বা আরএস শর্মার মত বামপন্থী ইতিহাসবিদরাই, নানান নতুন পুরাতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভাষাগত তথ্যের ভিত্তিতে। ষাটের দশক থেকেই বেশিরভাগ স্কলারদের মধ্যে যেটা চালু থিওরি সেটাকে বলা হয় Aryan Migration Theory (AMT)। সেখানে মাইগ্রেশন বা অভিবাসনের একাধিক ঢেউয়ের কথা বলা হয়। এই থিওরিটা সবার আগে একটু খোলসা করে বলা দরকার।
 
একেবারে প্রথমে আসে ইউরেশিয়ান স্তেপ অঞ্চলের (আধুনিক ইউক্রেন, দক্ষিণ পশ্চিম রাশিয়া, পশ্চিম কাজাখস্তান ইত্যাদি অঞ্চল) পশুপালক মানুষগুলোর কথা। এরাই প্রথম ঘোড়ার ওপর দখল আনে, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে, আর একদম গোড়ার প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথাবার্তা বলতে শুরু করে। তাদের অরিজিনাল বাসভূমি থেকে তারা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে — কারণ বংশবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নতুন এলাকার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, বসবাসের জন্যে, পশুপালনের জন্যে। এর মানে এই নয় যে এরা সরাসরি ভারতীয় উপমহাদেশে চলে এসেছিল। মাইগ্রেশন থিওরি বলে যে এই পশুপালকরা ধীরে ধীরে মিশতে শুরু করে একটা অন্তর্বর্তী এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে - প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় এই স্টেজিং গ্রাউন্ডের নাম Bactria-Margiana Archaeological Complex (BMAC) - আধুনিক কালের যে এলাকাগুলোকে আমরা চিনি উত্তর আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান বলে। এবং এইটা এক দুই দিন বা কয়েক মাসে বসতির ব্যাপারও নয়। স্তেপ অঞ্চলের মানুষরা এখানে যাওয়াআসা শুরু করে, এখানকার অরিজিনাল অধিবাসীদের সঙ্গে মেশে, তাদের বংশবৃদ্ধি হয় - প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরে। এবং তারপর, এই অধিবাসীদের মধ্যে থেকে একটা ইন্দো-ইরানিয়ান শাখা আলাদা হয়ে যায়; এক দল পশ্চিমে ইরানের দিকে চলে যায়, আর অন্য দলটা দক্ষিণপূর্ব দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে ঢোকে। সময়কাল হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটা খানিক এরকমঃ

খ্রীষ্টপূর্ব [২১০০-১৮০০] সিন্তাশতা সংস্কৃতি (স্তেপ অঞ্চলে ঘোড়ায় টানা গাড়ির শুরু হয় এদের হাতে) 

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [২০০০-১৫০০] স্তেপ এলাকা ক্রমাগত শুকনো হতে শুরু করে পরিবেশগত কারণে, ঘাসজমি কমতে থাকে। ফলে আরো ভালো জমির খোঁজে এই এলাকার পশুপালকের দল ভারতীয় উপমহাদেশের কাছাকাছি এসে পৌঁছয় - ব্যাক্ট্রিয়া-মারজিয়ানা অঞ্চলে, মানে আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান ইত্যাদি এলাকায়। সিন্ধু সভ্যতা সেই সময়ে ক্রমশঃ ক্ষয়ে আসতে শুরু করেছে, সেও মূলতঃ আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পাল্টে যাওয়ার জন্যেই।

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [১৫০০-১২০০] হিন্দুকুশ পেরিয়ে ইন্দো-ইরানিয়ান অভিবাসীদের প্রথম ঢেউ এসে পৌঁছয় ভারতের উত্তরপশ্চিম অঞ্চলে, বসতি স্থাপন করে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে (আধুনিক পাঞ্জাব এবং পাকিস্তানের অনেকটা জায়গা নিয়ে)। এই সময়টাকেই বলা হয় প্রারম্ভিক-বৈদিক যুগ - যে সময়ে ঋগ্বেদের জন্ম।

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [১০০০-৬০০] লোহার তৈরী যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্র হাতে এই সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের পরের দিকের প্রজন্মের মানুষেরা জঙ্গল কেটে এগিয়ে যায় গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে। যাযাবর পশুপালক থেকে তারা ক্রমশঃ চাষবাষের দিকে সরতে শুরু করে, তৈরী হতে থাকে কৃষিভিত্তিক রাজ্য। 

খুব ছোট করে এই হল আর্য্যদের অভিবাসন তত্ত্ব,
Uploaded Image
 বা এরিয়ান মাইগ্রেশন থিওরি।

এই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ কোত্থেকে এলো তাই নিয়ে থিওরি, পাল্টা থিওরির লড়াই চলেছে কয়েক দশক ধরেই। ভাষাবিজ্ঞান বা লিঙ্গুইস্টিক্স, প্রত্নতত্ত্ব আর রাজনীতির তীব্র বিতর্ক। ইনভেশন তত্ত্বকে সরিয়ে মাইগ্রেশন থিওরির পত্তন হয় লিঙ্গুইস্টিক্স এবং প্রত্নতত্ত্বের ওপর নির্ভর করেই। তা সত্ত্বেও, বিতর্ক থামেনি। আর্য্যদের উৎপত্তি ভারতেই, এখান থেকেই তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, সংস্কৃতের জন্মও ভারতেই, এবং বাকি সমস্ত ভাষাই সংস্কৃতের "সন্তান" – হিন্দুত্ববাদী রাইটউইং ন্যাশনালিজমের মূল পিলার দাঁড়িয়ে রয়েছে এই আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের তত্ত্বের ওপরেই, কারণ এতে ভারতকে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকে একটা টাইমলেস এন্টিটি বলে প্রোমোট করা যায়। খেয়াল করে দেখবেন - হিন্দুত্বের শুরু কিন্তু এই জায়গা থেকেই - যে ভারতীয় সভ্যতা একদমই ইন্ডিজেনাস, অজর অমর অক্ষয়, টাইম ইমমেমোরিয়াল থেকে এই সভ্যতা একইভাবে টিঁকে রয়েছে ইত্যাদি প্রভৃতি। অন্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষের সঙ্গে মিশ্রণের ফলেই যে এই উপমহাদেশের আদি সভ্যতা এবং সংস্কৃতির জন্ম, এইটা ফাঁস হয়ে গেলে হিন্দুত্ববাদের পিলার ওই টাইমলেস এজলেস গ্লোরিয়াস ভারতীয় নেশনের মিথটা ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। ইতিহাসে, এর আগে কে নিজেদের এরকম অরিজিনাল আর্য্য বলে দাবী করে জাতিগত সংমিশ্রণকে কাঠগড়ায় তুলে মানুষে মানুষে বিভেদের সৃষ্টি করেছিল? হাইস্কুল ইতিহাসের বইয়ে ১৯২০-১৯৪৫, এই বিশ পঁচিশ বছরের বিশ্বের ইতিহাসটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন, মনে পড়ে যাবে।   

এনিওয়ে, টপিকে ফিরি। রাখীগড়ি অবধি যাওয়ার আগে এই প্রাচীন মানুষের জেনেটিক প্রোফাইল সংক্রান্ত আইডিয়াটা একটু বলে নেওয়া দরকার। 

গত কয়েক বছরে, একটা নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মাইগ্রেশন নিয়ে এই বিতর্কের অনেকটাই অবসান ঘটেছে বলে মনে করা হয়। প্রাচীন ডিএনএ অ্যানালিসিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরী এই পদ্ধতির জনক হার্ভার্ডের এক গবেষক, ডেভিড রাইখ। হাজার হাজার বছর আগের মানুষের কঙ্কাল বা হাড়গোর থেকে ডিএনএ বের করে তার সিকোয়েন্সিং করার ব্যবস্থা করেছিলেন রাইখ। এর আগে অবধি, ডিএনএ বের করা যেত শুধু জ্যান্ত মানুষের শরীর থেকেই, এবং বৈজ্ঞানিকেরা সেখান থেকে তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে একটা আন্দাজ তৈরী করার চেষ্টা করতেন। এতে বিতর্ক তো মিটতোই না, বরং বেড়ে যেত কয়েক গুণ। রাইখ এবং তাঁর দলের গবেষকেরা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে পাওয়া প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে তাদের জিনগত প্রোফাইল তৈরী করতে পেরেছিলেন। সেই জেনেটিক প্রোফাইল স্টাডি করেই তাঁরা বলেন যে আধুনিক ভারতের প্রায় সমস্ত বাসিন্দাই মূলতঃ দুটো প্রাচীন জনগোষ্ঠীর এক অনন্য জেনেটিক মিশ্রণঃ Ancestral North Indians (ANI), যাদের জেনেটিক সম্পর্ক রয়েছে ইউরোপীয়, মধ্য এশীয় আর নিকট প্রাচ্য বা নিয়ার ইস্টের মানুষদের সঙ্গে; এবং Ancestral South Indians (ASI) - যারা এই উপমহাদেশের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে এখানকার আদি অধিবাসী হান্টার-গ্যাদারারদের (যে মানুষেরা শিকার করে বা বন্য ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে জীবনধারণ করত) নিবিড় সম্পর্ক ছিল।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এখান থেকে একটা বড় প্রশ্ন উঠে আসে - আর সেটা সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সংক্রান্ত। সিন্ধু সভ্যতা যে যথেষ্ট উন্নত ছিল তাই নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ভারতের মধ্যে লোথাল বা ধোলাভিরার প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলোতে, অথবা কপালে থাকলে পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু সভ্যতার বাকি সাইটগুলোতে গেলে চমকে যাবেন। প্রশ্নটা যেটা উঠে আসে, সেটা হল হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা এই জেনেটিক ধাঁধার মধ্যে ঠিক কোথায় ফিট করে? আর ঠিক এইটাই হল সেই "পয়েন্ট অফ কন্টেনশন" - রাজনীতি আর প্রত্নতত্ত্বের - যার কথা আগে লিখেছিলাম। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আউট-অফ-ইন্ডিয়া তত্ত্বের প্রবর্তকদের বক্তব্য হল সিন্ধু সভ্যতার মানুষরাই আদি বৈদিক আর্য্য, ঋগ্বেদ রচনা হয়েছিল এই সভ্যতার মধ্যেই, এবং এখান থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতি দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদি টাইমলাইন হিসেব করেন, তাহলে এই থিওরি অনুযায়ী ভারতীয় সংস্কৃতিকে প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০ সাল অবধি ঠেলে দেওয়া যায় (খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০-৩৩০০ সাল - এই সময়টাকে ধরা হয় প্রাক্‌-হরপ্পা যুগ হিসেবে, সিন্ধু সভ্যতার তৈরী হওয়ার সময়)। ডেভিড রাইখ তাঁর Who we are and how we got here বইয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে কীভাবে তাঁদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরী করেছিল এলাকার হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী, এমনকি আঞ্চলিক সহ-গবেষক এবং কো-অথরদের মাধ্যমেও। আগ্রহীরা চাইলে এই বইয়ের ছয় নম্বর চ্যাপ্টার (The Collision that Formed India) এর অন্তর্গত The Mixing of East and West অনুচ্ছেদটা পড়ে দেখতে পারেন। রাইখ এই অংশটা শুরু করছেন এই বলে - “The tensest twenty-four hours of my scientific career came in October 2008, when my collaborator Nick Patterson and I traveled to Hyderabad to discuss these initial results with Singh and Thangaraj” – সিং এবং থঙ্গরাজ মানে লালজী সিং, এবং কুমারস্বামী থঙ্গরাজ, দুজনেই তখন সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে কর্মরত বিজ্ঞানী। অরিজিনাল পেপারে রাইখ এবং প্যাটারসন আসলে "ওয়েস্ট ইউরেশিয়ান" শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। লালজী সিং এবং থঙ্গরাজ আপত্তি করেন কারণ ওয়েস্ট ইউরেশিয়া শব্দের ব্যবহার "পলিটিকালি এক্সপ্লোসিভ" হয়ে উঠতে পারে...এমনকি "অভিবাসন" শব্দটাই এক্ষেত্রে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কো-অথরদের আপত্তি এবং সেন্টিমেন্ট মেনে নিয়ে, পেপারটা যাতে পাবলিশ হতে পারে সেই উদ্দেশ্যে রাইখ ও তাঁর সহ-গবেষকরা খানিকটা নিউট্রাল ANI এবং ASI ব্যবহার করেন পেপারে। শব্দের ব্যাপারে খানিক কম্প্রোমাইজ করা হলেও, এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য স্পষ্টভাবেই ইউরেশীয় স্তেপ এবং পরবর্তীকালে BMAC থেকে আসা অভিবাসনের দিকেই ইঙ্গিত করে।

রাখীগড়ি এই প্রাচীন ভারতের ডিএনএ অ্যানালিসিসের লেটেস্ট চ্যাপ্টার। এই গল্পের শুরু ২০১৯ সালে, যখন বিজ্ঞানীরা হরিয়ানার হিসার জেলার অন্তর্গত রাখীগড়িতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় পাওয়া প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো একটা কঙ্কালের সফল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করেন। এই ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে দেখা যায় যে ওই মানুষটির শরীরের জিনের মধ্যে ইউরেশীয় স্তেপের জিনের কোনো মার্কার নেই, নেই কোনো মধ্য এশীয় বা ইউরোপীয় মার্কারও। অর্থাৎ, রাখীগড়ির সেই মানুষ যে জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে আন্দাজ করা যায়, তাদের সঙ্গে ইউরোপীয়, ইউরেশীয় বা পশ্চিম এশিয়ার কোনো জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ কখনো ঘটেনি। রাখীগড়ির মানুষটির জিনগত বৈশিষ্টের সঙ্গে মিল পাওয়া গিয়েছিল শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের আদি বাসিন্দা হান্টার-গ্যাদারার, এবং প্রাচীন ইরানী কৃষক-পশুপালক জনগোষ্ঠীর।

এইবার মজাটা হয় এইখানেই। শমীক ভশ্চাজ্জির মত হিন্দুত্ববাদীরা ইউরেশীয় স্তেপ জিনের অনুপস্থিতি দেখিয়ে বলেন - এইত্তো, ইউরেশীয় স্তেপ থেকে কোনো অভিবাসন কখনো হয়নি, বরং প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরাই বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটু ভাবলেই আপনি খেয়াল করতে পারবেন যে এই লজিকটা খানিক "হরপ্পায় টেলিফোনের তার পাওয়া যায়নি, কাজেই তখন ওয়্যারলেস ছিল" বলার সামিল…

কেন? কারণটা খুব সাধারণ বায়োলজির নিয়ম - যার ফলে হরপ্পায়-টেলিফোনের-তার-পাওয়া-যায়নি-কাজেই-সেখানে-ওয়্যারলেস-ছিল মার্কা বালবাজারি লজিকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সহজ বায়োলজির নিয়মে আপনার আমার মধ্যে পূর্বপুরুষের জিন থাকে, উল্টোটা নয়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরা যদি আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের মাধ্যমে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া, ইউরোপ এবং অন্যত্র ছড়িয়ে থাকত, তাহলে সেখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া কঙ্কালের ডিএনএর মধ্যে রাখীগড়ির দেহাবশেষে পাওয়া ইউনিক সাউথ এশিয়ান জিনের চিহ্ন থাকত। কিন্তু ডেভিড রাইখ ও নরসিংহন সহ অনেকের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০-১০০০ সালের মানুষের হাড়গোরের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় হান্টার-গ্যাদারার জিনের কোনো চিহ্ন নেই। উল্টো, ভারতে পরবর্তীকালীন নমুনাগুলিতে স্তেপের জিনের উপস্থিতি স্পষ্ট। অর্থাৎ, সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে ইউরোপ বা মধ্য এশিয়ার জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ হওয়া বায়োলজিকালি অসম্ভব। এর সঙ্গে আরো বলা যায় যে মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ নাগাদ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আচমকাই স্তেপ জিন এসে হাজির হওয়ার অনেক আগেই, মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০-২৫০০ সালের সময়কার কঙ্কাল যা সাইবেরিয়া এবং ইউক্রেনের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছিল, সেগুলোর মধ্যে এই স্তেপ জিনের মার্কার পাওয়া গেছে। মানে, এই জেনেটিক ট্রাফিক বেসিকালি একটা ওয়ান-ওয়ে রাস্তা, যেটা ভারতে ঢোকে; উল্টোটা নয়।            
                    
রাখীগড়ির ফাইন্ডিংস এই কারণেই মাইগ্রেশন থিওরিকেই আরো পোক্ত করে তুলেছে, শমীক ভশ্চাজ্জির কথামত বাতিল করেনি। কারণ, এই পেপারটা থেকে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর উদ্ভবের একটা স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরাই যদি আদি সংস্কৃতজ্ঞ আর্য্য হত - হিন্দুত্ব থিওরি অনুযায়ী যাদের সংস্কৃতি বয়ে এসেছে আজকের উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে (যারা নিজেদের তথাকথিত আর্য্য জনগোষ্ঠী হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে), তাহলে এই আধুনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা স্তেপ জিনের দু চার ফোঁটা তো থাকার কথা ছিল সিন্ধু সভ্যতার গ্লোরির শিখরে থাকা মানুষদের মধ্যে? যেহেতু আধুনিক উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনুপাতে স্তেপ জিন রয়েছে, কাজেই স্বাভাবিক বায়োলজি বলে যে রাখীগড়ির সময়কালের অনেক পরেই স্তেপ মাইগ্রেশন ঘটেছিল...অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার শেষের দিকে, খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ সাল নাগাদ…

যেটা চরম ইন্টারেস্টিং, সেটা হল প্রাচীন ডিএনএ সিকোয়েন্সিং থেকে পাওয়া টাইমলাইনের সঙ্গে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকের দেওয়া যুক্তি এবং টাইমলাইন হুবহু মিলে যায়। ডেভিড অ্যান্থনির লেখা The Horse, the Wheel, and Language নামের একটা ল্যান্ডমার্ক বই থেকে আন্দাজ পাওয়া যায় কীভাবে গবেষকরা সমস্ত প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে প্রচলিত শব্দের অ্যানালিসিস থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ছড়িয়ে পড়ার একটা ছবি তৈরী করেছেন। লিঙ্গুইস্টদের অ্যানালিসিস প্রমাণ করে যে প্রথম দিকের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে (যাদের মধ্যে সংস্কৃতও পড়ে), ব্রোঞ্জ যুগে স্তেপ অঞ্চলে আবিষ্কৃত বিভিন্ন টেকনোলজি সংক্রান্ত শব্দ গেঁথে রয়েছে - যেমন ঘোড়াকে পোষ মানানো, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো রথ, উন্নত মেটালওয়ার্কস…পাশাপাশি, প্রত্নতাত্ত্বিকেরাও আগেই দেখিয়েছেন যে সিন্ধু সভ্যতার স্বর্ণযুগে এরকম পোষ মানানো ঘোড়া বা চাকাওয়ালা রথের অস্তিত্বের প্রমাণ নেই। রাখীগড়ির পেপার এই সবের মধ্যেকার মিসিং লিঙ্কটা সামনে এনে দিয়েছে - একটা জৈবিক প্রমাণঃ ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের পশুপালকেরা যখন খ্রীষ্টপূর্ব ১৭০০ সাল নাগাদ ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছেছিল, তাদের জিনের পাশাপাশি এসেছিল তাদের ঘোড়া, চাকাওয়ালা রথ আর একদম শুরুর দিকের ইন্দো-এরিয়ান ভাষাসমূহ - সংস্কৃতের উৎপত্তি সেই ভাষাসমূহ থেকেই, ভারতীয় সভ্যতার নকশিকাঁথা বোনার শুরুও সেই সময়েই...           

শেষ একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। শমীক ভশ্চাজ্জি এই ভুলভাল কথাটা অত স্টাইল করে বল্ল কেন? দিন কয়েক আগে লেখা হিন্দুত্ববাদীদের ইতিহাস পাল্টানোর নমুনা মনে করে দেখবেন একটু - কীভাবে জনসমক্ষে আবোলতাবোল দাবী করে উদ্ভট ইতিহাস তৈরী করার চেষ্টা করা হয়। সেই লেখাটা থেকেই অল্প একটু অংশ কোট করি।

“আরএসএসের "মার্গদর্শক' লজ্জা রাম তোমর গম্ভীরভাবে আউড়ে গেলেন - আলোর গতিবেগ নির্ণয় করা হয়েছিল ঋগ্বেদেই; ব্রিটিশরা নাগপুর দখল করার পর টানা ছ'মাস ধরে সেখানে নদীগুলোতে জলের সঙ্গে বয়ে গেছিল গলা সোনা; প্যারিসে তৈরী হয়েছে মনু-র মূর্তি এবং তার নীচে ফলকে লেখা রয়েছে "বিশ্বের প্রথম আইনপ্রণেতা'; শুধুমাত্র পবিত্র অশ্বত্থ গাছ আর তুলসীগাছই অক্সিজেন উৎপন্ন করে; নাসার বিজ্ঞানীরা সূর্যের মুখ থেকে "ওম' শব্দ শুনতে পেয়েছেন।"

লজ্জারাম তোমরের তুলনায় ব্যারিটোন ভয়েসে সুললিত গদ্য বাংলায় কথা বলা, অ্যাপারেন্টলি শক্তি চাটুজ্জে পড়া শমীক ভশ্চাজ্জি ফ্যাসিস্টদের নরম মুখ। এরকম সংস্কৃতিবান মানুষ যে কাঁচা মিথ্যে বলবেন সেটা তো আপনি ভাবতেই পারবেন না, তাই না? অথচ উনি বল্লেন, এবং কনফিডেন্টলি বল্লেন। কারণ, উনি জানেন যে এই মিথ্যেটা ধরে ফেলতে যে লজিকাল অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করার দরকার পড়বে, সেটা আপনি মোস্ট লাইকলি করবেন না। ভারতীয় সভ্যতা যে এজলেস, টাইমলেস এবং চিরকালই একইরকম গ্লোরিয়াস একটা ব্যাপার ছিল, সেটা তো ওরা অলরেডি আপনাকে বিশ্বাস করিয়েই ফেলেছে...  

একটা ছোট কথা দিয়ে শেষ করি। বিজ্ঞান তথ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে। ইতিহাসও নির্ভর করে তথ্যপ্রমাণ — এক্ষেত্রে লিঙ্গুইস্টিকস, প্রত্নতত্ত্ব, এবং আজকাল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর ওপরেও। কিন্তু, এই চর্চায় যেটা আসল সেটা হল প্রশ্ন করতে পারা, চ্যালেঞ্জ করতে পারা, কোনো কিছুকেই অ্যাবসোলিউট ট্রুথ মেনে না নেওয়া। যেমন রোমিলা থাপারেরা AIT কে খারিজ করতে পেরেছিলেন। আপনাকে কেউ বল্ল যে আর্য্যরা সিন্ধু সভ্যতারই অংশ, আপনি সব তথ্যপ্রমাণ ছেড়ে দিয়ে সেইটাকেই সত্যি বলে মেনে নিলেন..."সব সত্যি...মহিষাসুর সত্যি...হনুমান সত্যি...ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি...টারজান সত্যি...অরণ্যদেব সত্যি..."

আপনি কি এখনও রুকুবাবুই আছেন? একটুও বড় হননি?

সূত্রঃ

(১) প্রাগিতিহাস, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, গাংচিল
(২) Who we are and how we got here – Ancient DNA and the new science of the Human Past, David Reich, Pantheon
(৩) Early Indians: The Story of Our Ancestors and Where We Came From, Tony Joseph, Juggernaut
(৪) The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, David W. Anthony, Princeton University Press
(৫) An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers, Vasant Shinde et al, Cell, Volume 179, Issue 3, 17 October 2019, Pages 729-735.e10, https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0092867419309675

#হিন্দু_খতরে_মে_হ্যায় #হিন্দুত্ববাদ #ন্যারেটিভ_বিল্ডিং

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬

বাংলা ভাগ ও উদ্বাস্তু ~ অর্ক ভাদুড়ী

বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। পার্টিশনের পরেই বিপুল সংখ্যক হিন্দু উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য হন৷ সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জাতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো বড় নাম৷ স্বাভাবিকভাবেই বিভাজিত বাংলায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তা হয়নি৷ ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ১৫০ আসন৷ বামপন্থী জোট পেয়েছিল ৪০+ আসন৷ কমিউনিস্ট পার্টি একাই পেয়েছিল ২৮ আসন। ফরওয়ার্ড ব্লকের মার্কসবাদী অংশটি ১১ আসনে জিতেছিল৷ এর বাইরেও জয়নগর থেকে এসইউসির সুবোধ ব্যানার্জি খাতায় কলমে নির্দল প্রার্থী হিসাবে জিতেছিলেন৷ ফরওয়ার্ড ব্লকের আরেকটি অংশ খান দুয়েক আসন জিতেছিল৷ তৎকালীন কৃষক মজদুর প্রজা পার্টি, যারা ওই '৫২ সালেই সোস্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টি গঠন করবে, তারা পেয়েছিল ১৫ আসন৷ হিন্দুত্ববাদীরা পেয়েছিলেন মাত্র ১৩টি আসন। জনসংঘ ৯, হিন্দু মহাসভা ৪। যদিও বামপন্থীদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের ভোট শতাংশে খুব ফারাক ছিল না।

১৯৫৩ সালে শ্যামাপ্রসাদ মারা গেলেন৷ বাংলার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল৷ যে কলকাতা দক্ষিণ পূর্ব লোকসভা কেন্দ্রে ১৯৫২ সালের নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ ৪৫% ভোট পেয়ে জিতেছিলেন (কংগ্রেসের ভোট ছিল ৩০%+, কমিউনিস্ট পার্টির ২২%+), তাঁর মৃত্যুর পর সেই আসনেই কমিউনিস্ট পার্টি জিতে গেল ৫৮%+ ভোট পেয়ে। জনসংঘের ভোট ৪৫% থেকে হু হু করে কমে নেমে এল ৫ শতাংশে। এক বছরের মধ্যে।

১৯৫৭ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস ক্ষমতায় এল ১৫২ আসন পেয়ে। বামপন্থীদেরও বিপুল উত্থান হল৷ তাঁরা প্রায় ৮০টি আসন জিতলেন৷ হিন্দুত্ববাদীরা শূন্য হয়ে গেলেন৷ না জনসংঘ, না হিন্দু মহাসভা- কেউ কোনও আসন পেল না। স্বাধীনতা/দেশভাগের ১০ বছরের মধ্যে বাংলার সংসদীয় রাজনীতি থেকে হিন্দুত্ববাদীরা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেলেন। ১৯৭৭ সালে লোকসভায় (এবং বিধানসভাতেও খুব সামান্য) 'জনতা-ঝড়' তাঁদের কিঞ্চিৎ সুবিধা করে দিয়েছিল বটে, কিন্তু বামপন্থী রাজনীতির বিপুল উত্থানের সামনে তা কিছুই নয়৷ তারপর থেকে বহু বহু বছর তাঁদের সংসদীয় পরিসরে বলার মতো সাফল্য কিছুই ছিল না৷ ১৯৯২ পরবর্তী সময়েও তাঁরা বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু আরএসএস নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছে। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জি জোট করলেন বিজেপির সঙ্গে। ১৯৯৯ সালের লোকসভায় দমদম কেন্দ্রে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীর চিত্তাকর্ষক পরাজয় ঘটল বিজেপির তপন শিকদারের কাছে৷ কৃষ্ণনগরেও জুলুবাবু জিতলেন। শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় সংসদীয় পরিসরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পুর্নবাসন ঘটল৷ তবে তৃণমূলের জুনিয়র পার্টনার হিসাবে৷ এর পরের গুরুত্বপূর্ণ কালপর্ব ২০১৪ থেকে৷ কেন্দ্রে মোদী সরকার আসার পর। সে অন্য আলোচনা।

পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ হিন্দু উদ্বাস্ত কেন জনসংঘ বা হিন্দু মহাসভাকে ভোট দিলেন না? এমনকি, ১৯৫২ সালের নির্বাচনেও হিন্দুত্ববাদীরা যে সব আসনে জিতেছিলেন, সেগুলি রাজ্যের পশ্চিমপ্রান্তে৷ বাঁকুড়ায়, জঙ্গলমহলে। সেগুলি মোটেই দেশভাগের দগদগে ক্ষত বুকে নিয়ে চলে আসা উদ্বাস্তু মেজরিটি আসন নয়৷ এর কারণ কী? শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু একটা বড় কারণ নিশ্চয়৷ তাঁর মৃত্যুর পরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বড় মুখ তেমন কেউ ছিলেন না, যিনি জ্যোতি বসুকে টেক্কা দিতে পারেন৷ কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ তো মারা গিয়েছিলেন '৫৩ সালে। তার আগের ৬ বছর তিনি সক্রিয় ছিলেন৷ কিন্তু বিশেষ কিছু করতে পারেননি।

একটা সহজ, জনপ্রিয় (এবং আমার পছন্দের) ব্যাখ্যা এমন হতে পারে, উদ্বাস্তু জনগণের পাশে বুকটান করে দাঁড়িয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি-সহ বামপন্থীরা। ইউসিআরসি গড়ে উঠেছিল। ফলে তাঁদের বড় অংশের সমর্থন বামপন্থীরা পেয়েছিলেন৷ জনসংঘ বা হিন্দু মহাসভার তেমন সংগঠন ছিল না৷ ফলে তাঁরা এঁটে উঠতে পারেননি।

এই সহজ ব্যাখ্যার মূলস্রোতের আড়ালে কি আরও কিছু ব্যাখ্যার সুযোগ আছে? বামপন্থী রাজনীতির ভিতরমহলে কি চারের দশক থেকে ক্ষমতাকেন্দ্রের সরণ ঘটছিল? যদি ঘটে থাকে, তাহলে কি তাকে আরেকটু তলিয়ে, অন্য কোনও লেন্সে পাঠ করার সুযোগ আছে? বামপন্থার কথা থাক। একটু ফুটবলের কথায় আসি৷ তিনের দশক, চারের দশকে কলকাতা ময়দান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহামেডান স্পোর্টিং। পর পর লিগ জিতছে। কমিউনিস্ট রাজনীতিতেও তখন সোমনাথ লাহিড়ীদের পাশাপাশি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো অবস্থান করছেন কমরেড হালিম, কমরেড কাকাবাবু। ময়দানে চারের দশক থেকে প্রবল উত্থান ঘটছে ইস্টবেঙ্গলের। পূর্বঙ্গের হিন্দু বাঙালির দল৷ স্বাধীনতার পর থেকে আস্তে আস্তে প্রভাব কমছে মহামেডানের৷ ময়দানে মোহনবাগানের প্রতিপক্ষ ইস্টবেঙ্গল। বাংলার কমিউনিস্ট রাজনীতিও ততদিনে পেয়ে গিয়েছে এমন দুই দুর্দান্ত চরিত্রকে, যাঁরা আগামী অনেকগুলো বছর নেতৃত্ব দেবেন বামপন্থী আন্দোলনকে- জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত।

বিজেপি বাংলার সরকারে চলে এসেছে। বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চলবে। কিন্তু আমরা একসঙ্গে মিলে আমাদের ঐতিহাসিক ফল্টলাইনগুলির খোঁজ করব না? ঝগড়াঝাঁটি না করে, একে অন্যের উপর রাগ না করে, শান্ত হয়ে ইতিহাসের গল্প করলে কিন্তু আখেরে ক্ষতি হবে না।

বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

উডবার্ন  ~ শুভাশীষ মোদক চৌধুরী 

পোড়াকাঠ বিভাগটা পুরোপুরি নিঃশব্দ আজ,
বেড নম্বর সাত চেয়ে আছে দরজার দিকে।
কেউ কি আসবে না আর, থাকতে কদিন?
ভীষণ মনমরা ফ্রিজ, টিভি, এসিরাও।

অথচ দুদিন আগেই কোর্ট ডাক দিলে
অ্যাম্বুলেন্সে এনে দিত গণতন্ত্রের জ্বর।
ডাক্তারবাবু খসখস করে লিখতেন - "অবস্থা সঙ্গীন”,
আর টিভির বুমগুলো গুঁজে যেত পিছন পিছন। 

Uploaded Image

এখন ওনারা প্রাক্তন, হাজতে কড়িকাঠ গুনছেন...
ঘাঁটি গেড়েছেন কেউ বেসরকারি ঠিকানায়।  
পোড়াকাঠ চিরকাল নাক উঁচু, হেঁজিপেঁজিদের নাগালে আসেনা।
তবু, ঘরগুলো নিজেরাই অসুস্থ হয়ে গেল বলে!

'ওনাদের উডবার্ন নেই, বার্নল আছে।'

সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন ~ সৌপর্ন অধিকারী

Uploaded Image
Uploaded Image
Uploaded Image
Uploaded Image
সত্যিই কি পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে একাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে, নাকি মিথ্যা প্রচার দিয়ে সত্য চাপা দেওয়া হচ্ছে? 

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্র থেকে একে একে মুছে গেছে ডানলপ, হিন্দুস্তান মোটরস, জেসপ, এমএএমসি (MAMC) বা দুর্গাপুর সার কারখানার মতো বিশালাকৃতি একাধিক প্রতিষ্ঠান। সাধারণ প্রচারের ভাষায় এই সবকিছুর দায় শ্রমিকদের 'জঙ্গি আন্দোলনের' ওপর চাপানো হলেও, বাস্তব তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুল সরকারি নীতি, প্রযুক্তির অভাব এবং মালিকপক্ষের অতি-মুনাফা লোটার কৌশলই ছিল এই বিপর্যয়ের মূল কারিগর। তার কয়েকটি নমুনা নিচে দিলাম।

 রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার পরিকল্পিত মৃত্যু ও কেন্দ্রের নীতি:

দুর্গাপুরের এমএএমসি (MAMC) বা হিন্দুস্তান ফার্টিলাইজার (HFCL)-এর মতো সংস্থাগুলো বন্ধ হওয়ার পেছনে কোনো শ্রমিক আন্দোলন দায়ী ছিল না। মূলত নব্বইয়ের দশকের পর কেন্দ্রীয় সরকারের বিলগ্নীকরণ নীতিই ছিল এর প্রধান কারণ। দুর্গাপুর সার কারখানাটি বন্ধের কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল—প্রাকৃতিক গ্যাসের অভাব ও ন্যাপথা-ভিত্তিক প্রযুক্তির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়ে লোকসান হচ্ছে। আসলে এই কারখানা বন্ধের পিছনে ছিল অন্য গল্প— বেসরকারি কোম্পানিদের জায়গা করে দেওয়া। এমএএমসি (MAMC) বন্ধের পিছনেও এই একই কারণ ছিল।

কারখানা চালু রাখার দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন (MAMC-র দৃষ্টান্ত):

দুর্গাপুরের MAMC কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়ার বিপক্ষে দীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলন অনেকের জানা, অনেকের মতো সেই আন্দোলনের আমিও এক সাথী। কেন্দ্রীয় সরকার লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে এই বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং সংস্থাটিকে বন্ধ করার তোড়জোড় শুরু করে, তার প্রতিবাদে শ্রমিকরা আন্দোলনে নামে। কারখানাটি সচল রাখার দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই গড়ে তোলে এবং বিকল্প প্রস্তাব দেয় যাতে খনি শিল্পের আধুনিক যন্ত্রপাতির দেশীয় চাহিদা মেটাতে এই পরিকাঠামোকে কাজে লাগানো হোক। সরকার শ্রমিকদের দাবি পাত্তা না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেয়।

আসানসোলের হিন্দুস্তান কেবলস, রূপনারায়ণপুরের কেবল কারখানা বা আসানসোলের সাইকেল কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (Sen-Raleigh)-এর মতো কারখানাগুলো বন্ধের মূলে ছিল প্রযুক্তির বিবর্তন। পৃথিবী যখন ফাইবার অপটিক্সের দিকে এগোচ্ছিল বা আধুনিক ডিজাইনের সাইকেলের চাহিদা বাড়চ্ছিল, তখন এই কারখানাগুলো পুরনো প্রযুক্তিতে আটকে ছিল। ম্যানেজমেন্ট বা সরকার সময়মতো আধুনিক মেশিনে বিনিয়োগ না করায় কারখানাগুলো প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। শ্রমিকরা এখানে কাজ করতে চাইলেও তাদের হাতে দেওয়ার মতো কাজ ছিল না, অথচ প্রচার করা হয় শ্রমিক আন্দোলনের কারণেই এগুলো রুগ্ন হয়েছে।

খনি ও রেলের বেসরকারিকরণ—রাষ্ট্রের দায়বদল:

বর্তমানে খনি ও রেলের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে যে বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া চলছে, তা কোনো আন্দোলনের ফল নয়, বরং সুচিন্তিত সরকারি নীতি। ইসিএল (ECL)-এর বিভিন্ন খনি বা আসানসোল-রানিগঞ্জ অঞ্চলের কোল ব্লকগুলো ‘এমডিও’ (MDO) বা রাজস্ব ভাগাভাগি মডেলে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে রেলের উৎপাদন ইউনিট ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বেসরকারিকরণ করার ফলে স্থায়ী কর্মসংস্থান কমছে। এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যখনই শ্রমিকরা প্রতিবাদ করছেন, তখন তাকে "উগ্র আন্দোলন" বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে যাতে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ হস্তান্তরের কাজ নির্বিশেষে চলে এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলো মুনাফার বাজার দখল করতে পারে।

হিন্দমোটর: 

হুগলির উত্তরপাড়ায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী হিন্দুস্তান মোটরস (হিন্দমোটর) ২০১৪ সালে পাকাপাকিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা না মিটিয়ে। মালিক পক্ষ আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ না করে এই ঐতিহ্যবাহী কারখানাটিকে রুগ্‌ণ করে তোলে। মাসের পর মাস শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রাখার প্রতিবাদে শ্রমিকরা আন্দোলন করলে, মালিক পক্ষে অশান্তির গল্প ফেঁদে নিজের দায় আড়াল করে। পরবর্তী সময়ে কারখানা পুনরুজ্জীবিত করার বদলে সেখানকার কয়েকশ একর জমি আবাসন প্রকল্পের জন্য শ্রীরাম গ্র্যান্ড সিটি কোম্পানিকে বেচে দেয়। যদিও ওই জমি শিল্প ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার ছিল বেআইনি। 

 কাঁচামাল ও বাজারের সমস্যা (চট ও বস্ত্র শিল্প):

হাওড়া ও হুগলির চটকল (Jute Mills) এবং মোহিনী মিলস, বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস-এর মতো বস্ত্র কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে মূলত সিন্থেটিক ফাইবারের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে এবং তুলোর জোগান ব্যাহত হওয়ায়। কাঁচামালের সংকটের সময় যখন মালিকপক্ষ লে-অফ ঘোষণা করেছে, তখন শ্রমিকরা কেবল তাদের ন্যায্য মজুরির দাবি জানিয়েছিল। সেই দাবিকে "উৎপাদন বিরোধী আন্দোলন" বলে চালিয়ে দিয়ে মালিকপক্ষ দায় এড়িয়েছে।

মুনাফা লোটার কৌশল ও অন্য রাজ্যে স্থানান্তর:

অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মালিকপক্ষ পশ্চিমবঙ্গের কারখানাটি বন্ধ করে অন্য রাজ্যে উৎপাদন শুরু করেছে। ডানলপ (Dunlop)-এর সাহাগঞ্জ কারখানা বন্ধ থাকলেও পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় তাদের উৎপাদন চলছে। অতি সম্প্রতি তারাতলার ব্রিটানিয়া কারখানাটি "পুরনো" তকমা দিয়ে বন্ধ করা হলেও কোম্পানিটি মহারাষ্ট্র সহ অন্য রাজ্যে তাদের আধুনিক ইউনিটে উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছে। এর আসল কারণ শ্রমিক আন্দোলন নয়, বরং অন্য রাজ্যে নতুন সরকারি ভর্তুকি (Subsidy) ও কর ছাড়ের সুবিধা নিয়ে অধিক মুনাফা করা।

রিয়েল এস্টেট সিন্ডিকেট ও জমির বাণিজ্যিকীকরণ:

কলকাতার উষা ফ্যাক্টরি, বেঙ্গল ল্যাম্প বা শহরতলির অনেক চটকল ও বস্ত্র কারখানার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কারখানার জমির দাম উৎপাদনের চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারখানায় অচলাবস্থা তৈরি করেছে যাতে শ্রমিকদের নাম দিয়ে কারখানাটি বন্ধ (Lock-out) করে দেওয়া যায় এবং পরে সেই বিশাল জমিতে আবাসন বা শপিং মল তৈরি করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লোটা যায়। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন বা পিএফ-এর ন্যায্য দাবিকে এখানে "জঙ্গি আন্দোলন" বলে অপপ্রচার করা করা হচ্ছে।

মালিকপক্ষের পলায়ন:

জেসপ (Jessop) বা উত্তরপাড়ার হিন্দুস্তান মোটরস-এর মতো কারখানার ক্ষেত্রে দেখা গেছে মালিকপক্ষ ব্যাংকের ঋণ বা শ্রমিকদের পাওনা না দিয়ে কারখানা ছেড়ে পালিয়েছে। যখনই শ্রমিকরা উপযুক্ত বেতনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে, মালিকপক্ষ তাকেই "শ্রমিক অসন্তোষ" হিসেবে চিহ্নিত করে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। অথচ আসল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া।

পশ্চিমবঙ্গে কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ হিসেবে শ্রমিক আন্দোলনকে দায়ী করা আসলে একটি সুকৌশলী প্রচার। এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের ব্যর্থতা এবং মালিকপক্ষের মুনাফালোভী মানসিকতাকে আড়াল করা হয়। প্রকৃত তথ্য বলছে— রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার যে বৃহত্তর নীল নকশা, তা-ই ছিল এই শিল্প পতনের প্রধান কারণ। শ্রমিকদের প্রতিবাদ ছিল কেবল তাদের অস্তিত্ব ও উপযুক্ত মজুরি রক্ষার শেষ লড়াই।

উদ্বৃত্ত মূল্য ও শোষণ: মালিক কারখানা খোলেন জনসেবা বা চাকরি দেওয়ার জন্য নয়, বরং মুনাফা কামানোর জন্য। শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে যে সম্পদ উৎপাদন করে (Value), মালিক তাকে তার চেয়ে অনেক কম মজুরি দেয়। এই দুটির মধ্যে যে পার্থক্য, তাকেই বলা হয় উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value)। এই উদ্বৃত্ত মূল্যই মালিকের মুনাফা, যা আদতে শ্রমিকের শ্রমেরই অংশ।

মুনাফার শর্ত: যদি একজন শ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্যের পুরো মূল্যই মজুরি হিসেবে পেয়ে যেত, তবে মালিকের হাতে কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা 'লাভ' থাকত না। লাভ না থাকলে মালিক পুঁজি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতেন না। অর্থাৎ, পুঁজিবাদের কাঠামোই দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিকের শ্রমের একটি অংশ মালিকের পকেটে যাওয়ার ওপর।

 দায় চাপানোর কৌশল: যেহেতু মুনাফাই মালিকের আসল লক্ষ্য, তাই যখনই সেই মুনাফায় টান পড়ে (বাজারের মন্দা, প্রযুক্তির পরিবর্তন বা কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে), মালিক পক্ষ তা মেনে নিতে পারে না। তখন তারা হয় কারখানা বন্ধ করার ছুতো খোঁজে, অথবা শ্রমিকদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। আর এই প্রক্রিয়ায় শ্রমিকরা যখন নিজেদের হকের প্রতিবাদ করে, তখন সেই প্রতিবাদকেই "কারখানা বন্ধের কারণ" হিসেবে প্রচার করা হয়।

মালিকের 'ইচ্ছা' বনাম শ্রমিকের 'অধিকার': কারখানা বন্ধ করে অন্য রাজ্যে চলে যাওয়া বা জমি বিক্রি করে দেওয়া আসলে মালিকের সেই মুনাফা বাড়ানোরই একটি রূপ। যখন অন্য রাজ্যে কম মজুরিতে বা বেশি সরকারি সুবিধায় শ্রমিক পাওয়া যায়, তখন মালিকের "ইচ্ছা" সেখানেই চলে যায়। শিল্পের সংকট আসলে কোনো আন্দোলনের সংকট নয়, বরং এটি পুঁজির চরিত্রের সংকট। যেখানে মানুষের শ্রমের চেয়ে মালিকের মুনাফাই বড় হয়ে ওঠে।

শিল্পায়নের নামে এ রাজ্যে লুটের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৯০-এর দশকের পরে রাজ্যে অসংখ্য স্পঞ্জ আয়রন কারখানা গড়ে উঠেছিল, যার মধ্যে অনেকগুলি কিছুদিন পরেই আবার বন্ধ হয়ে যায়। এই কারখানাগুলো কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনের জেরে বন্ধ হয়নি। মূলত সরকারি ভর্তুকি, সস্তা বিদ্যুৎ ও খনি বরাদ্দের সুবিধা নিয়ে কারখানা গড়ে মালিকরা মুনাফা লুটে চম্পট দিয়েছে। ফলে না থাকল স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, না থাকল চাষযোগ্য জমি বা সুস্থ পরিবেশ। দুর্গাপুর ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চল এই 'লুটেরা শিল্পায়নের' বড় উদাহরণ। 

অন্য দুটি বিষয়
আইটি ও সিঙ্গুর নিয়ে দু-একটি কথা:

শিল্পের প্রসারে কেবল "সদিচ্ছা" থাকা বা বিরোধিতার অভাবই যথেষ্ট ছিল না, বরং বাজারের চাহিদা এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল। নব্বইয়ের দশকে যখন আইটি বিপ্লব শুরু হয়, তখন বিশ্ববাজারের প্রয়োজন মেটাতে কয়েক লক্ষ দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারই যথেষ্ট ছিল। ব্যাঙ্গালোর বা হায়দ্রাবাদের মতো গুটিকয়েক শহর থেকেই মালিকরা সস্তায় এবং সহজে প্রয়োজনীয় মেধার জোগান পেয়ে যাচ্ছিলেন। যেহেতু সীমিত সংখ্যক কর্মীর মাধ্যমেই কাজ উঠে যাচ্ছিল, তাই মালিকদের নতুন জায়গায় গিয়ে পরিকাঠামো তৈরির বাড়তি খরচ করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

বর্তমানে 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' বা ইন্টারনেটের উন্নতির ফলে যখন দেখা যাচ্ছে বড় বড় অফিস মেইনটেইন করার চেয়ে বাড়ি থেকে কাজ করালে কোম্পানির খরচ আরও কমছে এবং মুনাফা বাড়ছে, তখনই কেবল কাজগুলো অন্য রাজ্যে বা ছোট শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। অর্থাৎ, আইটি হাব গুটিকয়েক শহরে সীমাবদ্ধ থাকা বা এখন তা ছড়িয়ে পড়া—দুটোই শ্রমিকের কর্মসংস্থানের চেয়ে মালিকের খরচ কমানো এবং উদ্বৃত্ত মুনাফা বাড়ানোর লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছে। মুনাফার এই অসম লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ ছাত্ররা; আইটিতে চাকরি পাওয়ার আশায় বাবা-মায়ের লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ডিগ্রি অর্জন করেও তারা আজ বাজারের চাহিদা না থাকায় বেকারের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। মালিকপক্ষের সীমিত নিয়োগের এই কৌশলে একদিকে যেমন উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি তৈরি হচ্ছে, তেমনি সস্তা শ্রমের বাজারে বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে মালিকরা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করছেন।

প্রসঙ্গ-সিঙ্গুর

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোটেই টাটা-বিরোধী নন, বরং তিনি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো টাটা-প্রেমী ও মালিকদরদি। টাটা গোষ্ঠী সিঙ্গুর ছাড়া অন্য কোথাও কারখানা করতে চায়নি, আর সিঙ্গুরের কৃষকরাও তাদের সোনার ফসল ভরা জমি ছাড়তে চাননি। উন্নয়নের গল্প ফেঁদে টাটার মুনাফার স্বার্থে কৃষক ও খেতমজুরদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ অন্যায় হতে যাবে কেন? তাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ ন্যায্য ছিল। সিঙ্গুরে মূলত এই জমি অধিগ্রহণ নিয়েই বিরোধ বাঁধে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূল কংগ্রেস কৃষকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে নিপুণভাবে সরকারি ক্ষমতা দখলে ব্যবহার করে।

যারা বলেন টাটা চলে যাওয়ায় কয়েক হাজার কর্মসংস্থান মার খেয়েছে, তারা সম্ভবত জানেন না যে টাটা থাকলে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ ভিটেমাটি ও জীবিকা হারাতেন। উচ্ছেদ হতো হাজার হাজার পরিবার, ধ্বংস হতো উর্বর চার-ফসলি জমি। আসলে সিঙ্গুরে টাটার কারখানা গড়ার পেছনে অন্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল। সেই প্রসঙ্গ এখন থাক। সিঙ্গুর থেকে টাটার কারখানা শেষ পর্যন্ত গুজরাটে গেল ঠিকই, কিন্তু সেখানেও মূল প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

স্বাস্থ্যসাথী নাকি আয়ুষ্মান ভারত ~ রোহিণী ধর্মপাল

ওরা আমরা ভাগাভাগি মোটামুটি শেষ। ভদ্র বাঙালির বৃহদংশ যা চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন। কী পেয়েছেন ক্যাশ ও কাইন্ড তাঁরা গুণে গেঁথে নেবেন, তাতে সন্দেহ কিছু নেই। কাল যিনি গ্যাস ডেলিভারি করতে এলেন, তিনি দরজা খুলতেই প্রায় প্রাণ বাঁচানোর মতন করে জয় শ্রীরাম বলে উঠলেন। চেনা লোক, এলে দুটো সুখ দুঃখের কথা হয়। কেমন আছেন, কী চলছে সব প্রশ্নের জবাব ওই জয় শ্রীরাম। তারপর সিলিন্ডার চেক করতে করতে দেখলাম ভারি নিচু গলায় বলছেন “স্বাস্থ্যসাথী আর মনে হয় না দেবে”।

বয়স্ক বাঙালি মেহনতি লোক, বলছেন স্বাস্থ্যসাথী আর মনে হয় না দেবে। বললাম, “ভাবছেন কেন? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আয়ুষ্মান ভারত করবেন।” ভদ্রলোক কী বুঝলেন কে জানে, আর এই নিয়ে কিছু বললেন না। শুকনো মুখে চলে গেলেন। ভাবলাম একটু লেখাপড়া করি।

স্বাস্থ্যসাথী নিয়ে এই একটা গুজগুজ চলছে। আয়ুষ্মান ভব আশীর্বাদ এসেছে। লোকজন স্বাস্থ্যসাথী পাচ্ছেন না, ফিরে আসছেন। আয়ুষ্মান ভারত আসছে, রাস্তায় আছে। 

আয়ুষ্মান ভারতের কথা একটু শোনা যাক। এই স্কিমের মাপকাঠি খুব উচ্চ পর্যায়ের। সে কাঠি তৈরি হয়েছে ২০১১ সালের ইউপিএ সরকারের Socio-Economic Caste Census, সংক্ষেপে SECC জরিপের ওপর ভিত্তি করে। 

গ্রামে থাকা পরিবারের জন্য ছয়টা “বঞ্চনার মাপকাঠি”:
কাঁচা দেওয়াল, কাঁচা ছাদের একটা ঘরে বাস
পরিবারে ১৬ থেকে ৫৯ বছরের কোনো সদস্যই নেই
১৬ থেকে ৫৯ বছরের কোনো পুরুষ সদস্য নেই
 পরিবারে অক্ষম সদস্য আছেন, কিন্তু সক্ষম কেউ নেই
তফসিলি জাতি বা উপজাতি পরিবার
ভূমিহীন, যাদের আয়ের বড় অংশ আসে দিনমজুরি থেকে

শহরের জন্য ১১টা পেশাভিত্তিক মাপকাঠি — রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ঘরের কাজের লোক, ফেরিওয়ালা ইত্যাদি।

এই তালিকায় নাম থাকলে আয়ুষ্মান ভারত পাবেন। না থাকলে পাবেন না। ওকে? এবারে কয়টি কথা। 

এই যোগ্য তালিকা ২০১১ সালে তৈরি হয়েছিল। মাঝের পনের বছরে কেউ গরিব হয়ে গেলে, গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে এসে অসংগঠিত শ্রমিক হয়ে গেলে, বিধবা হয়ে একা সংসার সামলাতে গেলে — তার নাম এই তালিকায় নেই, থাকার কোনো উপায়ও নেই। কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই সংসদে জানিয়েছে, এই তালিকায় নতুন পরিবার যোগ করার কোনো প্রস্তাব নেই।

কপাল যাবে সঙ্গে, আসুন তবে বঙ্গে।

পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। তখন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৪২ লক্ষ পরিবার, যাদের মধ্যে SECC-ভিত্তিক পরিবারও ছিল, RSBY (পুরনো কেন্দ্রীয় প্রকল্প) থেকে আসা পরিবারও ছিল, এবং রাজ্য সরকারের নিজস্ব তালিকার পরিবারও ছিল। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সার্বজনীন ঘোষণার পর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২.৫ কোটি পরিবারে — মোটামুটি ১০-১২ কোটি মানুষ, পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ।

তাহলে, আয়ুষ্মান ভারতের SECC মাপকাঠিতে বাংলায় কতজন পড়বেন?

আয়ুষ্মান ভারত SECC-যোগ্য: ১.১২ কোটি পরিবার আছেন পশ্চিমবঙ্গে। তাহলে বাদ পড়বেন প্রায় ১.৩ কোটি পরিবার, অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথীর প্রায় অর্ধেক।

যারা বাদ পড়লেন তারা কারা? এনারা ঠিক “গরিব” নন SECC-র সংজ্ঞায়। তাইলে কি এনারা “মধ্যবিত্ত”? বেসরকারি বিমা নিচ্ছেন? নাকি NITI Aayog যাদের বলে “missing middle” মাঝখানের সেই গর্তে পড়ে যাওয়া মানুষ।

এবারে একটু মেয়েমানুষ নিয়ে কথা হোক? 

স্বাস্থ্যসাথীর সরকারি রিপোর্ট (জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত) থেকে একটা চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় উপভোক্তা ছিলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা SHG-র সদস্যরা। ৮ লক্ষ ৬৬ হাজারেরও বেশি অ্যাডমিশন, ৮৯৩ কোটি টাকার ক্লেম মোট কভারেজের বিশাল অংশ।

এরা কারা? গ্রামীণ ও মফস্বলের মহিলারা, যারা ১০-২০ জন মিলে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। নিজেদের মধ্যে সামান্য টাকা জমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ নেন, ছোট ব্যবসা করেন। গরিব, কিন্তু SECC-র সংজ্ঞায় “যথেষ্ট গরিব” নন হয়তো, কারণ তাদের বাড়ি হয়তো পাকা, হয়তো পরিবারে একজন পুরুষ সদস্য আছেন।

পশ্চিমবঙ্গে SHG-র সংখ্যা সারা দেশে সবচেয়ে বেশি। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলায় DAY-NRLM-এর অধীনে ১১.৯২ লক্ষ SHG আছে, যা কিনা সারা দেশে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে বিহার (১০.৯৭ লক্ষ), তারপর অন্ধ্রপ্রদেশ (৮.৫৫ লক্ষ)। মহারাষ্ট্রে আছে ৬.৪০ লক্ষ SHG। প্রতিটা SHG-তে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য ধরলে, বাংলায় শুধু NRLM-ভুক্ত SHG সদস্যের সংখ্যাই ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৭৫ লক্ষের মধ্যে — এবং এর বাইরেও রাজ্য সরকারের নিজস্ব SHG কাঠামো আছে।
এই মহিলাদের বড় অংশ SECC তালিকায় নেই। কারণ SECC করা হয়েছিল ২০১১ সালে, SHG তার পরেও বিস্তৃত হয়েছে। এবং SECC-র মাপকাঠি মেলেনি অনেকের, পাকা বাড়ি আছে, স্বামী আছেন, জমি আছে অল্প। কিন্তু বড় অসুখে হাসপাতালে ভর্তি হলে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকি একই।
স্বাস্থ্যসাথী এই মহিলাদের আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, কারণ রাজ্য সরকারের কাছে তাদের তালিকা ছিল। আয়ুষ্মান ভারতে এই ক্যাটাগরির কোনো জায়গা নেই। সেই গর্তে পড়ে যাওয়া মেয়েমানুষ। 

এবার একটু ডবল ইঞ্জিন মহারাষ্ট্র দেখি। তারা যা করেছে, বাংলা যা করেনি। তুলনাটা দরকারি। 

মহারাষ্ট্রেও আয়ুষ্মান ভারত চালু আছে, কিন্তু সেখানে রাজ্য সরকার নিজের প্রকল্প — Mahatma Jyotirao Phule Jan Arogya Yojana বা MJPJAY বন্ধ করেনি। বরং দুটোকে একসাথে চালিয়েছে। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে মহারাষ্ট্রের সব পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় — SECC তালিকায় থাকুক বা না থাকুক। SECC-যোগ্যরা পাচ্ছেন MJPJAY + PMJAY মিলিয়ে ৫ লক্ষ। বাকি সবাই পাচ্ছেন শুধু MJPJAY-এ ১.৫ লক্ষ।
অর্থাৎ মহারাষ্ট্র “missing middle”-এর ওই গর্তে পড়ে যাওয়া মানুষদের সমস্যাটা স্বীকার করেছে, এবং রাজ্যের নিজস্ব খরচে আংশিক কভারেজ হলেও দিয়েছে।

বাংলায় কী হবে? রাজ্য বিধানসভায় জানা গিয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ২.৪৪ কোটি পরিবার-এ ৮.৭২ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসাথীতে এনরোল করেছেন।

স্বাস্থ্যসাথী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আয়ুষ্মান ভারত আসছে। রাজ্য সরকারের নিজস্ব কোনো পরিপূরক প্রকল্প থাকবে কিনা সেটা এখনও অস্পষ্ট। নতুন BJP সরকার ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যদফতরে নির্দেশ পাঠিয়েছে শুধু আয়ুষ্মান ভারত চালু করতে।

দূর দূর। এত নম্বর কপচিয়ে কী লাভ? এইসা উন্নয়ন হবে যে ঘরে ঘরে সবাই এলিট কর্পোরেট বাঙালি হয়ে সুইগি দিয়ে পবিত্র হিন্দু বিরিয়ানি হাঁকাবেন, চিন্তা কীসের?

তাহলে এই Zomato, Blinkit, Ola, Uber-এর হয়ে কাজ করেন যে ডেলিভারি কর্মী, চালক, সেই গিগ কর্মীদের কী হবে?
SECC তালিকায় এনারা নেই, কারণ ২০১১ সালে এই পেশাই ছিল না। ESI বা PF-এ নেই, কারণ তাঁরা “কর্মচারী” নন কোম্পানির দৃষ্টিতে, তাঁরা “পার্টনার”। ২০২৫ সালের বাজেটে ঘোষণা হয়েছে এদের আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় আনা হবে। বেশ। কেমন হয়েছে সেসব?

e-Shram পোর্টালে এখন পর্যন্ত সারা দেশে কার্যকরভাবে রেজিস্টার্ড হয়েছেন মাত্র প্রায় ৩ লক্ষ গিগ ওয়ার্কার। এ দেশের আনুমানিক ১ কোটি গিগ ওয়ার্কারের মধ্যে ৩ লক্ষ, অর্থাৎ ৩ শতাংশ। Aggregator-দের থেকে তথ্য সংগ্রহের কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেই, Social Security Fund-এ কোনো টাকা জমেনি। প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকাঠামো নেই।

NITI Aayog নিজেই বলছে, এরা “missing middle” — না গরিব, না মধ্যবিত্ত, কোথাও পড়েন না। গর্ত মশাই, গর্ত।

গাড়ি জনগণ ডেকেছেন। জনগণ ইঞ্জিন বেঁধেছেন। রাস্তার গর্তের দায় জনগণের কপালের মশাই, কপালের। নয়ত সরকারি রবীন্দ্র জয়ন্তী না হতে পারা নিয়ে হাহাকার চলছে, মিম মেটেরিয়াল নিয়ে হোহো হাহা চলছে, এই নিয়ে কেউ আর কপচায়? 

সিটবেল্ট বেঁধে বসুন, সামনে মিসিং মিডলের গর্ত থৈ থৈ করছে। 

তথ্যসূত্র: 
Swasthya Sathi Official Report (January 2021), 
Lok Sabha Unstarred Question No. 1524 (February 2023), 
DAY-NRLM Lok Sabha Q. No. 2884 (March 2025), 
PIB Press Release PRID 2039162, 
Maharashtra MJPJAY Government Resolution (July 2023), 
NITI Aayog Gig Economy Report (2022)

শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

রবীন্দ্রনাথ ~ অমিতাভ প্রামাণিক

১৯০৯ সালের শেষদিক। অগ্নিগর্ভ বাংলার আকাশ-বাতাস। আলিপুর বোমার মামলায় দুজনের ফাঁসির আদেশ শুনিয়েছে ব্রিটিশ বিচারক, সঙ্গে সাতজনের দ্বীপান্তর। কংগ্রেস লড়ে যাচ্ছে ভারতবর্ষের শাসনবিধি সংস্কারের উদ্দেশ্যে। ১৯০৬ সালে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে লিবারাল পার্টি। সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া হিসাবে ভারতে এসেছেন সেই পার্টির জন মর্লে। জন মর্লে ও ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর মর্লে-মিন্টো সংস্কারের ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় পরোক্ষ ভারতীয় প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হল, লর্ড সত্যপ্রসন্ন সিংহ নির্বাচিত হলেন প্রথম প্রতিনিধি। 

শীতের বিকেল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ইন্সটিট্যুট হলে আয়োজিত হয়েছে এক সঙ্গীতসভা। সেখানে সেতার বাজাবেন বিখ্যাত শিল্পী ইমদাদ আলি খাঁ, তাঁর বয়স একষট্টি। পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজপুত, পরে তারা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেন। ইমদাদের জন্ম আগ্রায়, ছোটবেলা কেটেছে এটাওয়ায়। বাবা শাহাবদাদ খাঁ খেয়াল গাইতেন, ছিলেন শখের সেতারশিল্পীও। বাবার কাছেই সেতারের প্রাথমিক পাঠ ইমদাদের, পরে বিখ্যাত বীণকার বন্দে আলি খাঁর কাছে তালিম নিয়ে এটাওয়ায় দীর্ঘ বারো বছর লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে একা একা সারস্বতসাধনা করে তৈরি করেছেন নিজস্ব বাদনরীতি। অন্যান্যরা যেখানে শাস্ত্রীয়বাদ্যে ধ্রুপদ ছাড়া ভাবতেই পারে না, তিনি সেখানে তাঁর শৈলিতে নিয়ে এসেছেন খেয়ালের বিচিত্র গুণাবলি। এই রীতিই পরে ইমদাদখানি ঘরানা নামে প্রতিষ্ঠিত হবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাকে বয়ে নিয়ে যাবে পুত্র এনায়েৎ খাঁ, পৌত্র বিলায়েৎ খাঁ ও অন্যান্যরা।   

সভাগৃহ পরিপূর্ণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর ছাত্রের সমাবেশ। এ সভায় সভাপতিত্ব করছেন আটচল্লিশ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ। প্রাথমিক ভাষণে তিনি অল্পকথায় শিল্পীর পরিচয় ও তাঁর বাদনরীতি সম্বন্ধে কিছু বললেন। এও বললেন যে, এদিনে এই কাজটুকুই তাঁর কর্তব্য। সভাস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে রেখে এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে সেতার পরিবেশন করলেন উস্তাদ ইমদাদ আলি খাঁ। 

নিয়ম অনুযায়ী এর পরই সভা ভেঙে যাওয়ার কথা। সভাপতি রবীন্দ্রনাথ মঞ্চে উঠে সভা-অন্তের ঘোষণা করতেই শুরু হল সভাস্থ ছাত্রসহ অনেকের দাবি, তারা রবিবাবুর গান শুনতে চায়। রবি আপত্তি জানালেন। তিনি সুস্থ নন, গলার স্বরও বসা। তাছাড়া তার মন এই মুহূর্তে ঠিক সঙ্গীতজগতে নেই। পুত্র রথীন্দ্রনাথ ফিরে এসেছে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করে, তিনি চান শান্তিনিকেতনে সেই-সংক্রান্ত নতুন কিছু শুরু করা। এই শাস্ত্রীয় সভায় ইমদাদ আলির মত শিল্পীর বাজনার পর তিনি কিছুতেই তার গান গাইতে রাজি নন। এই দুই সঙ্গীতের মেজাজও আলাদা। 

একদম সামনের সারিতে বসে ছিলেন বর্ষীয়ান স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় ভাইস-চ্যান্সেলর। তিনি রীতিমত জিদ করছিলেন রবি যেন একটা গান শোনান। রবির প্রত্যাখ্যান শুনে তিনি আহত হলেন, চেঁচিয়েই বললেন, ভাল গান করেন বলে আপনার এত অহঙ্কার। পাছে সেই অহঙ্কারে ঘা লাগে, তাই গাইতে চাইছেন না। 

স্যার গুরুদাস শুধু একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিই নন, বয়সেও তিনি রবির সেজদা হেমেন্দ্রনাথের বয়সী, রবির চেয়ে প্রায় সতের বছরের বড়। হেমেন্দ্র অবশ্য বহুকাল আগেই মারা গেছেন অকালে। এই তিরস্কারের পর গুরুদাসকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। 

মঞ্চে তখনও উপবিষ্ট উস্তাদজি। রবি প্রথমে একটা হারমোনিয়াম নিয়ে খানিকক্ষণ প্যাঁ-পোঁ করলেন। বোধহয় ঠিক করতে পারছিলেন না কী গাইবেন। তারপর উস্তাদজির দিকে দৃষ্টি যেতেই হারমোনিয়াম সরিয়ে খালি গলায় গাইতে শুরু করলেন – তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি ... 

সে সুরের আলো ভুবন ছেয়ে ফেলল, সে সুরের হাওয়া ছুটে চলল গগন বেয়ে। কোনো সঙ্গত নেই, সভাভঙ্গের নির্দেশও দেওয়া হয়ে গেছিল পূর্বেই, তবু সমস্ত শ্রোতারা এই গান শেষ হওয়া পর্যন্ত বসে রইল চিত্রার্পিতের মত। 

অমিতাভ প্রামাণিক
পঁচিশে বৈশাখ, ১৪২৬

---++---++---------++---------------++--------------++--------
বাংলা তেরোশো আটচল্লিশ সালের তেইশে বৈশাখ। আরও একটা জন্মদিন আসতে চলেছে। যেমন তেমন নয়, আশিতম জন্মদিন। শান্তিনিকেতনে নিজের ঘরে বসে রোগাক্রান্ত, অশক্ত রবি চঞ্চল হয়ে উঠলেন। সেই কত বছর আগে শুরু হয়েছিল তার জন্মদিন ঘিরে উৎসব। পরিবার ছাড়িয়ে সে অনুষ্ঠান ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠেছে। ব্রাহ্ম রবি মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী নন, শান্তিনিকেতনের আনাচে কানাচে কোথাও মহর্ষির একটা ছবি পর্যন্ত নেই, কিন্তু রবি তার জন্মদিন ঘিরে যে উচ্ছ্বাসের ঘনঘটা তৈরী হয় সেটা খুব উপভোগ করেন। নিজেই তৈরী করে নেন তার আবহ।

তার যখন সাতাশ বছর বয়স তখন ভাগ্নী সরলা প্রথম পঁচিশে বৈশাখের এক আনমনা ভোরে উপহার সহ তার পাদবন্দনা করে শুরু করেছিল এই ঘরানা। মেজোবৌঠান বিদেশ থেকে বিদেশী আচার অনুষ্ঠান ঘরে তুলে আনলে কী হয়, তিনি বা বিবি নয়, এ ব্যাপারে টেক্কা দিয়েছিল ন’দিদির মেয়েটা। পরের বছর থেকে এর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন ধর্মপত্নী মৃণালিনী। কত বছরই বা সে এসব করে যেতে পারল? 

নিজের জন্মদিনে রবি প্রথম গান লিখেছিলেন যখন তাঁর বয়স আটতিরিশ। তেরোশো ছয় সালের পঁচিশে বৈশাখে তিনি নিজের রচনা নিজেই গেয়েছিলেন – ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও হে। বিয়াল্লিশ বছর পেরিয়ে গেল তার পর, এর পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই নিজের জন্মদিন উপলক্ষে রবি কবিতা বা গান রচনা করেছেন, আবৃত্তি করেছেন, নিজে গেয়েছেন, অন্যকে শিখিয়ে দিয়ে গাইয়েছেন। আর কতদিন তা করে যেতে পারবেন, তা নিয়ে প্রবল সংশয় দেখা দিয়েছে এখন। শরীর চলতে চায় না। দর্শনধারীদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না, তারা দরজা থেকে ফিরে যায়। লেখালিখি করার মত শক্তিও নেই প্রায়। ব্যক্তিগত সচিব অনিলের স্ত্রী রাণী তাঁর পরিচর্যা করেন, তিনি মাঝে মাঝে রাণীকে মুখে মুখে কবিতা বলে যান, রাণী তা খাতায় লিখে নেয়, পড়ে শোনায়। রবি বলে ওঠেন, না না রাণী, ঐ জায়গাটা ঠিক হল না, এই শব্দটা বদলে দিয়ে এটা লেখো তো। আবার শোনাও। আশি বছর বয়সেও তাঁর নিজের লেখা নিয়ে খুঁতখুঁতুনি গেল না। 

দরজায় টোকা পড়ল। ভাবলেন রাণী এসেছে বুঝি। না, এ তো শান্তিদেব। গরমের ছুটি থেকে সদ্য ফিরেছে শান্তিনিকেতনে একত্রিশ বছরের তরুণ। দেখা করতে গেছে গুরুদেবের কাছে। প্রণাম সেরে শরীরের কুশল নেবার জন্য জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই রবি বললেন, শান্তি, আর একটা পঁচিশে বৈশাখ এসে গেল। তোরা এবার কিছু করবি না? 

শান্তিদেব বললেন, ও মা, করব না কেন? অন্যবার যা যা করা হয়, সবই করব। আমি তো ছিলাম না, এই এসে পৌঁছালাম, দেখি খবর নিই।

শান্তিদেবেরও জন্মদিনও পঁচিশে বৈশাখেই!

পরদিন সকালে শান্তিদেব এসে অনুযোগ করলেন, আপনি এবার কোনো গান লেখেননি? 
রবি বললেন, গান? তুই তো এক অদ্ভুত ফরমাশ এনে হাজির করলি রে, শান্তি। আমার জন্মদিনে আমি নিজে গান লিখব, সুর দেব, গাইব, লোকে শুনলে বলবে কী? বুড়োটা নিজের ঢাক পিটিয়ে যাচ্ছে! 
শান্তিদেব বললেন, না, না, তা কেন বলবে?
রবি বললেন, বলে না বুঝি? তুই এক কাজ কর। এখানে এত বড় বড় কবি সুরকাররা সব রয়েছে, ওদের বল না লিখতে, সুর দিতে।

শান্তিদেব চুপ করে রইলেন, বোঝাই গেল প্রস্তাবটা তার মনঃপূত হল না। 
রবি আবার বললেন, কেন, তুই কি ভাবিস এরা কবিতা লিখতে পারে না? গানে সুর দিতে পারে না? যা না, চা না গিয়ে ওদের কাছে –
শান্তিদেব বললেন, আপনি থাকতে অন্যদের কাছে যাব, এ হয় নাকি? কেন, এতদিন ধরে আপনি যে নিজের জন্মদিনে কবিতা লিখলেন, গান বানালেন, কেউ কি আপনার দোষ ধরেছে? ওসব হবে না, আপনাকেই করতে হবে। 

রবি হাসতে লাগলেন। ভক্তের অর্ঘ্য নিতে তার কার্পণ্য নেই। এরা তাঁর নিজের ছাত্রই, পুত্রসম। এরা আবদার করবে না তো কারা করবে? বললেন, এক কাজ কর তবে শান্তি, এখন আর নতুন কবিতা লেখার শক্তি নেই। সময়ই বা কোথায়? তুই যা, দপ্তর থেকে আমার পুরনো কবিতাগুলো নিয়ে আয় দেখি, যেগুলো আগের জন্মদিনে লেখা। অনিল জানে, ও সব গুছিয়ে রেখেছে নিশ্চয়। ওকে গিয়ে বলগে।

এসে গেল আগের জন্মদিনগুলোতে লেখা কবিতার রাশি। রবি একটার পর একটা উলটে যেতে লাগলেন। স্থির হলেন যে কবিতাটায় গিয়ে, সেটা লিখেছিলেন তেরোশো ঊনত্রিশ সালে, উনিশ বছর আগে। 'পূরবী' নামে তার কবিতার বইটাতে এই কবিতাটা স্থান পেয়েছে, রবি এর নাম দিয়েছিলেন ‘পঁচিশে বৈশাখ’। তার শুরুটা এমন – 

রাত্রি হল ভোর। 
আজি মোর
জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,
প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি
হাতে করে আনি
দ্বারে আসি দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।  

নিজের লেখা পড়তে পড়তে রবি আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। শেষের স্তবকে লিখেছিলেন – 

হে নূতন,
তোমার প্রকাশ হোক কুজ্ঝটিকা করি উদ্‌ঘাটন
সূর্যের মতন।
বসন্তের জয়ধ্বজা ধরি
শূন্য শাখে কিশলয় মুহূর্তে অরণ্য দেয় ভরি –
সেই মতো, হে নূতন,
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
ব্যক্ত হোক তোমা-মাঝে অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়।
উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।
মোর চিত্তমাঝে
চির-নূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।

থমকে গেলেন রবি। বললেন, এই কটা লাইন একটা আলাদা কাগজে লিখে দে তো। সেই নকলের ওপর নিজে এবার কলম চালাতে লাগলেন। 'কুজ্ঝটিকা' কেটে লিখলেন 'কুহেলিকা'। কেটে দিলেন পরের তিনটে লাইন। হে নূতন-এর পর কবিতাটার আগের স্তবক থেকে একটা লাইন তুলে লিখলেন কাঁপা কাঁপা হাতে – দেখা দিক আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ। 'অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়' কেটে লিখলেন 'অসীমের চিরবিস্ময়'। উদয়দিগন্তের পর ‘ওই’টা কুচিকুচি করে কেটে দিলেন। কাটাকুটির মধ্যেই চলতে লাগলো নিজের মনে গুনগুনানি। সুর বসছে কলিতে, ভৈরবীতে। শান্তিদেবকে বললেন, নে নে শান্তি, স্বরলিপি করে ফেল এক্ষুনি। কখন আবার ভুলে যাব, মনে থাকে না আজকাল আর কিচ্ছু।

সে এক সময় ছিল, ডাকারও দরকার হত না, ছুটে আসত বিবি, সরলা, দিনু। আজ কাছেপিঠে তারা কেউ নেই। রবির গানের স্বরলিপি লিখে নিলেন শান্তিদেব। 

পরদিন প্রভাতে আশ্রমের কলকাকলি ভেদ করে বেজে উঠলো আশ্রমিকদের গলায় রবির জন্মদিনের গান –

হে নূতন,
               দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।।
               তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদ্‌ঘাটন 
                              সূর্যের মতন।
               রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
                        ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
               ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।
               উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে, মোর চিত্তমাঝে
                       চিরনূতনেরে দিল ডাক 
                             পঁচিশে বৈশাখ।।

এটাই রবির সুর দেওয়া শেষ গান। এর সুর দেওয়ার ঠিক তিন মাস পরে এক ঝরো ঝরো বাদলের শ্রাবণদিনে জোড়াসাঁকোয় তাঁর নিজস্ব বাসভবনে শরীরে অস্ত্রোপচারোত্তর ব্যাধিতে কাতর রবি অমর্ত্যলোকে যাত্রা করেন। পেছনে পড়ে থাকে সুদীর্ঘ তেষট্টি বছর ধরে লেখা আর সুর দেওয়া তার দু’হাজার গানের গীতবিতান। 

কান পাতলে শোনা যেত, সে দিনের অবিরল বারিধারা ছাপিয়ে কোথায় বেজে উঠছে অসহ বিরহের গান। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে লিখেছিলেন রবি, সুর দিয়েছিলেন তার পাঁচ বছর পরে – তবু মনে রেখো, যদি দূরে যাই চলে ...

পঁচিশে বৈশাখ, ১৪২২