শ্যামা আমাকে কোনোদিন নাম ধরে ডাকেনি। ডাকতো, ও মাঝি। প্রায় ষোলো বছর ধরে ওই দুইটা শব্দই ছিলো আমার নাম। আর আমি অন্য কোনো নামের কথা ভাবতেও পারতাম না। জীবনে মোটে একবার সে আমার আসল নামটা মুখে এনেছিলো। সেই রাতের পর ওপারের সঙ্গে আমার আর কোনোদিন দেখা হয়নি।
আমার নাম আফসার। টাকির ঘাটে নৌকা বাইতাম। এখন আর বাই না। নৌকাটাও নেই। ঘরের কোণে শুধু বৈঠাটা দাঁড় করানো আছে। তেল চিটচিটে, হাতলের কাছে কাঠটা একটু বসে যাওয়া। ওইখানে একসময় একটা নাম লেখা ছিলো।
আমাদের ইছামতী তখন কারো ছিলো না। এপারে টাকি, ওপারে দেবহাটা। এপারে টাকি, ওপারে দেবহাটা, আর মাঝখানের জল দিনে দুইবার মন বদলাতো। জোয়ারে নদী ফুলেফেঁপে দুই পাড়ের ঘাসে এসে চুমু খেতো, আর ভাটায় নেমে গিয়ে মাঝবরাবর জাগিয়ে দিতো একটা চর। লম্বাটে একফালি জমি। ঘাসে ঢাকা, বর্ষায় ডুবে যেতো আবার হেমন্তে ফিরে আসতো। আমরা ওটাকে ডাকতাম মাঝির চর। পৃথিবীর কোনো কাগজে ওই চরের নাম নেই। অথচ আমার গোটা জীবনটা ওই এক ফালি ঘাসের ওপরেই কেটে গেছে।
বাপের সঙ্গে বৈঠা ধরতে শিখেছি বারো বছর বয়সে। প্রতি হাটবারে ওপার থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে আসতো টাকির হাটে। হরিপদ কাকা আসতেন ঝাঁকা ভরা পারশে আর ভেটকি নিয়ে। সঙ্গে তার মেয়ে। মেয়েটা নৌকার গলুইয়ে বসে জলের ভেতর হাত ডুবিয়ে রাখতো। আঙুলের ফাঁক দিয়ে স্রোত কেটে যাওয়ার শব্দ শুনতো। আমি বলতাম, হাত তোলো, কামট আছে। সে ঘাড় না ঘুরিয়েই বলতো, কামটে আমাগো কামড়ায় না। আমরা জাইলা।
ওর নাম শ্যামা।
নদীটা তখন বেয়াড়া ছিলো। ভাটার টানের বিপরীতে নৌকা বাওয়া যেতো না, গায়ে যতো জোরই থাকুক। তখন নৌকা চরে ঠেকিয়ে বসে থাকতে হতো জোয়ার ফিরবার অপেক্ষায়। ছয় ঘণ্টা পরপর নদী মন বদলায়। এই ছয় ঘণ্টার সময়টুকুই ছিলো আমাদের। বাপেরা হাটে দরদাম করতো। আর আমরা দুজন চরের ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে থাকতাম। ওপারে কার ঘরে কার বিয়ে হচ্ছে সেই গল্প করতাম। আর থেকে থেকে জলের দিকে তাকাতাম। জোয়ার এলে আমার বুকটা শুকিয়ে যেতো। কারণ জোয়ার মানেই নৌকা ছাড়া, আর নৌকা ছাড়া মানেই আরো সাতটা দিন।
কবে যে শ্যামার দিকে তাকানোটা অভ্যাস থেকে অসুখ হয়ে গেলো, বলতে পারবো না। একটা দিনের কথা মনে আছে। অঘ্রানের রোদ, চরের ঘাস শুকিয়ে সোনালি। সে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে ছিঁড়ে আঙুলে পাকিয়ে একটা আংটি বানাচ্ছিলো। বানিয়ে আমার দিকে না তাকিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলো। আমি নিলাম না, চেয়ে রইলাম। রোদটা তখন ওর ঘাড়ের কাছে এসে ভাঙছে। সে অনেকক্ষণ হাত বাড়িয়ে রেখে শেষে বললো, নিবা না? না নিলে গাঙে ফালাইয়া দিমু।
আমি হাত পাতলাম। ঘাসের আংটিটা বিকেলের মধ্যেই শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ওই হাত বাড়িয়ে রাখাটুকু আমার আঙুলের ভেতর সারাজীবন রয়ে গেছে।
শ্যামা লিখতে জানতো। পাঠশালায় তিন ক্লাস পড়েছিলো। আমি নিরক্ষর। জাল আর দাঁড় ছাড়া কিছু চিনতাম না। এক বিকেলে সে ভেজা বালিতে আঙুল দিয়ে আমার নামটা লিখলো। বললো- দেখো, তোমার নামটা কতো ছোট। তারপর জোয়ার এসে লেখাটা ধুয়ে নিয়ে গেলো। সে হেসে বললো, বালিতে লিখলে হয় না। কাঠে লিখতে হয়।
মাছ ছাড়ানোর ছোট বঁটিটা দিয়ে সে আমার বৈঠার হাতলে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিজের নামটা লিখলো। শক্ত কাঠ। তার আঙুল কেটে রক্ত পড়লো। তবু থামলো না। লেখা শেষ করে গামছায় হাত মুছে বললো, এইবার বাও দেখি। রোজ বাইবা, রোজ আমার নাম হাতে লাগবো।
নামটা আমি পড়তে পারতাম না। কিন্তু আঙুল বোলালে চিনতে পারতাম। পৃথিবীতে ওই একটা লেখাই আমি চিনেছি।
হাটবার ছিলো সপ্তাহে একদিন। বাকি ছয়টা দিন আমি কী করতাম? জাল বুনতাম, নৌকার তক্তায় আলকাতরা দিতাম, আর মনে মনে হিসাব কষতাম আর কয়টা রাত বাকি। মাঝে মাঝে বিনা কারণে নৌকা নিয়ে মাঝনদীতে গিয়ে বসে থাকতাম। ওপারের ঘাটটা দেখা যায় কিনা দেখতে। দেখা যেতো না। তবু বসে থাকতাম।
এক হাটবারে আমার যাওয়া হলো না। বাপের জ্বর আর নৌকার তলায় ফাটল, দুইটা একসঙ্গে। পরের হাটবারে গিয়ে দেখি সে চরে বসে আছে ঠিক আগের জায়গাটায়, হাঁটুতে থুতনি রেখে। কাছে গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ সে কোনো কথা বললো না। তারপর জলের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো, গত হাটবারে আমি ভাটা পুরা সময় এইখানে বইসা আছিলাম। জোয়ার আওনের আগ পর্যন্ত। বাপে ডাকে, আমি কই আরেকটু।
আমি বললাম, খবর দিতে পারি নাই।
সে বললো, খবর দিতে হইবো না। খালি আইসো।
তারপর প্রথমবারের মতো সে আমার হাতটা ধরলো। জেলের মেয়ের হাত। আঁশটে গন্ধ, তালুতে দড়ির দাগ। জোয়ার আসা পর্যন্ত আমি ওই হাত ছাড়িনি।
তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের বছর নদীর দুই পারে মানুষ না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরলো। ঘাটে রোজ সকালে দুই তিনটা লাশ পড়ে থাকতো। কেউ দাবি করতো না। ওই বছর শ্যামারা তিন মাস কচু আর কলার মোচা খেয়ে বেঁচেছিলো। আমি লুকিয়ে ওদের নৌকায় চাল দিয়ে আসতাম। হরিপদ কাকা দেখেও দেখতেন না। যে মানুষ সত্যি সত্যি না খেয়ে আছে, সে জিজ্ঞেস করে না চালটা কার হাত দিয়ে এলো।
সেই দুর্ভিক্ষেরই এক সন্ধ্যায় চরে বসে শ্যামা আমাকে একটা গল্প বলেছিলো। তার ঠাকুমার কাছে শোনা।
বহুকাল আগে… তখনো এই গাঙের নাম হয়নি। এপারে থাকতো এক জেলের মেয়ে আর ওপারে থাকতো এক রাখাল ছেলে। দুজনের দেখা হতো কেবল ভাটার সময়, যখন মাঝখানে চর জাগে। জোয়ার এলে চর ডুবে যেতো, দুজনে দুই দিকে ফিরে যেতো। মেয়েটা একদিন গাঙকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে বসলো, তুমি আমারে রোজ ওপারে দিয়া আইসো। গাঙ বললো, দিতে পারি। কিন্তু রাখতে পারুম না। আমার নিয়ম হইলো, যারে নিয়া যাই তারে ফিরাইয়া আনতে হয়। মেয়েটা তাতেই রাজি হলো। সেই থেকে দিনে দুইবার জল ওপারে যায়, আর দিনে দুইবার ফিরে আসে। ওইটাই জোয়ার, ওইটাই ভাটা। আর মেয়েটা যাওয়ার সময় কাঁদে, ফেরার সময়ও কাঁদে।
গল্প শেষ করে শ্যামা বললো, বুঝলা ও মাঝি? হেই কারণেই গাঙের জল নোনা।
আমি হেসে বলেছিলাম গাঙের জল নোনা, কারণ সাগর কাছে।
সে চোখ পাকিয়ে বলেছিলো, তুমি একটা আস্ত বেরসিক মাঝি।
আমাদের একটা পরিকল্পনা ছিলো কলকাতা পাড়ি জমানোর। ওই শহরে নাকি কেউ কারো পদবি জিজ্ঞেস করে না। খিদিরপুরের ঘাটে নাকি মাঝিদের কাজ পাওয়া যায়। নৌকার খোলের নিচে আমার একটা বিস্কুটের টিন লুকানো ছিলো। তাতে প্রতি হাটবারে চার আনা আট আনা করে জমতো। শ্যামা টিনটা ঝাঁকিয়ে শব্দ শুনতো আর ভুরু কুঁচকে হিসাব কষতো। বলতো, টিন ভরলে আমারে খবর দিবা। ঘরের চাল টিনের হইবো। বৃষ্টি পড়লে শব্দ হইবো। আর একটা লাল চিরুনি কিনা দিবা, ভুইলো না।
আমি বলতাম, ভরবো ভরবো।
আসলে আমি ইচ্ছে করে দেরি করতাম। টিনটা ভরে গেলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তখন এই ছয় ঘণ্টার অপেক্ষাগুলো ফুরিয়ে যাবে। আমি বোকা ছিলাম। ভেবেছিলাম সময় জিনিসটা আমার পক্ষে আছে, আর অপেক্ষা জিনিসটা আমাদের নিজের সম্পত্তি।
পঁয়তাল্লিশের এক আষাঢ়ে বিকেলে এমন বৃষ্টি নামলো যে নদীর ওপারটা বেশ কিছুটা সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমরা চরে আটকা পড়লাম। ছৈয়ের নিচে দুজনে ঢুকে বসলাম। কাপড় ভেজা, বাতাসে হি হি করে কাঁপুনি। শ্যামা খোঁপা খুলে ভেজা চুল ছড়িয়ে দিলো আর ছোট্ট ছাউনিটা ভরে গেলো নদীর মন কেমন করা গন্ধে। মাথার ঠিক এক বিঘত ওপরে তালপাতার ছৈয়ে তখন বৃষ্টির একটানা একটানা নূপুরনিক্বণ। সে আমার কাঁধে মাথা রাখলো। ভেজা চুল থেকে জল গড়িয়ে আমার হাতের ওপর পড়ছিলো। আর আমি নড়তে পারছিলাম না। পাছে সে সরে যায়। ওই সন্ধ্যায় আমি প্রথম জানলাম, মানুষের নিঃশ্বাসেরও একটা শব্দ আছে। আর সেই শব্দটা মুখস্থ হয়ে যায়।
অনেকক্ষণ পর ঠান্ডা হাতটা আমার বুকের ওপর রেখে সে বললো, ভয় লাগতেছে।
আমি বললাম, বৃষ্টির?
সে বললো, না। মানুষের।
মেয়েটা আমার চেয়ে অনেক আগে টের পেয়েছিলো।
তার এক বছর পর কলকাতা থেকে খবর এলো। শহরে তিনদিন ধরে মানুষ মানুষকে ফালি ফালি করে কেটেছে। যারা কাজে গিয়েছিলো তারা পালিয়ে গ্রামে ফিরলো। চোখেমুখে অশনীসংকেতের মতো এমন একটা কিছু নিয়ে ফিরলো যা আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। তারপর নোয়াখালীর খবর এলো। আমাদের গ্রাম কলকাতা থেকে বহুদূর। নোয়াখালী থেকে আরো দূর। কিন্তু বিষের তো পা লাগে না, হাওয়ায় ভর করেই ছড়িয়ে পড়ে।
হাটটা আগে বদলালো। যে বামুন এতোদিন হরিপদ কাকার হাত থেকে মাছ নিতেন, তিনি এখন ঝুড়ি থেকে সরাসরি তুলে নেন। এক শীতের রাতে জাল তুলতে গিয়ে দেখি আমাদের চরে হ্যারিকেন জ্বলছে। এপারের হেকমত আলী আর ওপারের নিবারণ সাহা পাশাপাশি বসে একটা হুঁকো ভাগ করে টানছে। আর ভিটেবাড়ি কেনাবেচার দর কষছে। এই দুইজন লোকই দিনের বেলায় দুই পারে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে বলতো, হিন্দু আর মুসলমান কোনোদিন এক থাকতে পারে না। আমি নৌকা ঘুরিয়ে চলে এসেছিলাম। ওদের নিয়ে ভাববার সময় আমার ছিলো না। আমার তখন একটা টিন ভরাবার তাড়া।
সাতচল্লিশের আগস্টে উৎসবের আলো জ্বললো নদীর দুই পারেই। চোদ্দ তারিখে ওপারে, পনেরো তারিখে এপারে। কেউ জানতো না বিভাজনের দাগটা কোথায় পড়েছে। কেউ জানতো না সে কোন দেশের লোক। ওই দুইটা রাতে আমি নৌকা নিয়ে ওপারে গেলাম। কারণ তখনো কেউ কাউকে আটকাচ্ছে না। শ্যামাকে নিয়ে চরে বসলাম। দুই পারের বাজির আলো জলের ওপর পড়ে কাঁপছিলো।
সে বললো, আমরা এখন কোন দেশে বইসা আছি?
আমি বললাম, জানি না।
সে হেসে বললো, না জানাই ভালো।
সতেরো তারিখে শোনা গেলো, দাগটা পড়েছে ইছামতীর ঠিক মাঝ বরাবর। মাঝনদী দিয়ে। অর্থাৎ আমাদের চরটা কোন দেশে পড়লো, তা কেউ বলতে পারলো না। যে জিনিস জোয়ারে ডোবে আর ভাটায় ভাসে, তার দেশ ঠিক করবে কে।
প্রথম কয়েক বছর বাইরে থেকে তেমন কিছুই বদলালো না। নৌকা চলতো, হাট বসতো। শুধু নদীটা আর আগের মতো রইলো না। যে জলটা এতোকাল আমাদের জুড়ে রাখতো, সেটাই এখন আমাদের আলাদা করে রাখে। এই কথাটা একবার মাথায় ঢুকে গেলে চোখের সামনের সবকিছু পাল্টে যায়। ওপারে যাওয়া কমে এলো। কমতে কমতে বছরে তিন চারবারে ঠেকলো। প্রতিবার ফেরার সময় মনে হতো, নদীটা আগের চেয়ে একটু চওড়া হয়ে গেছে।
শ্যামার সাথে শেষ দেখাটা হয়েছিলো বাহান্ন সালের বর্ষায়।
সেদিন সে চুপচাপ ছিলো। অনেকক্ষণ পরে বললো, বাপে সম্বন্ধ আনছে। কালীগঞ্জে। আমি না করছি। কিন্তু আর কতোদিন পারুম গো মাঝি? ঘরে ডাগর মাইয়া রাখা এখন আর আগের মতো সহজ না।
আমি বললাম, দুইটা মাস দাও। টিন প্রায় ভরছে।
জোয়ার এসে গিয়েছিলো। নৌকা ছাড়তে হবে। সে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির কোঁচড় ঝাড়িয়। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকালো আমার দিকে । ষোলো বছরে ওই প্রথম সে আমাকে মাঝি বললো না।
আফসার। দেরি কইরো না।
কী আশ্চর্য! নিজের নামটা নিজের কানে শুনতে যে এতো ভালো লাগে, আমি এতোদিন জানতামই না।
তার কিছুদিন পরেই ঘোষণাটা এলো। পনেরোই অক্টোবরের পর ওপারে যেতে হলে পাসপোর্ট লাগবে, কাগজ লাগবে, ছবি লাগবে, অফিসের সিল লাগবে। যে মানুষ দশ মিনিটে নৌকায় ওপারে যেতো, তার সামনে হঠাৎ একটা দরজা তৈরি হলো। আর সেই দরজার গায়ে তারিখ লেখা হলো। দুই পারে হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো। ঘাটে ঘাটে মানুষ পুঁটলি নিয়ে বসে রইলো।
আমি হেকমত আলীর কাছে গেলাম। সীমান্তে তার লোক ছিলো। দারোগা থেকে চৌকিদার সবাই তার টাকা খেতো। বিস্কুটের টিনটা তার সামনে উপুড় করে ঢেলে দিলাম। নয় বছরের জমানো দুইশো ছেচল্লিশ টাকা। কম পড়লো। বাপ ততদিনে নাই। নৌকাটাই ছিলো তার রেখে যাওয়া একমাত্র জিনিস। সেটা বেচে দিলাম দুইশো টাকায়। সব মিলিয়ে চারশো ছেচল্লিশ টাকা হেকমত আলীর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, মেয়েটাকে আইনা দেন। বাকি জীবন আপনার নৌকা বাইবো।
সে টাকাটা দুইবার গুনলো। তারপর গামছায় ঘাড় মুছে বললো, চোদ্দ তারিখ রাইতে চরে থাকিস।
চোদ্দ তারিখ রাতে আমি চরে ছিলাম। কুয়াশা পড়েছিলো। জোয়ার এসে চরের কিনারা ভিজিয়ে দিলো। তারপর ভাটা নামলো, তারপর আবার জোয়ার। সারারাত বৈঠাটা কোলে নিয়ে বসে রইলাম আর তাকিয়ে রইলাম ওপারে। ভোরের আলো ফুটলে দেখলাম, সামনে শুধু নদী। শ্যামা নেই।
অনেক পরে জেনেছিলাম, ওই রাতের আগেই শ্যামার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। তার বাপ ভয় পেয়ে পূজার আগেই মেয়ের বিয়ের পাট চুকিয়ে দিয়েছিলেন। হেকমত আলী তবু জেনেশুনেই আমার টাকাটা নিয়েছিলো জেনেশুনেই জানিয়েছিলো তারিখটা। মানুষ মারার জন্য অস্ত্র লাগে না, একটা মিথ্যা আশাই যথেষ্ট।
তবু ওই লোকটাকে আমি আজ আর দোষ দিই না। দোষটা আমার। যতোবার কথাটা মনে পড়ে, ততোবার কানের ভেতর একটা কথাই বাজে। দেরি কইরো না। সারাটা জীবন আমি ওই অপেক্ষাটাকে আদর করে জমিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম ওটা আমার সম্পত্তি। জানতাম না, অপেক্ষা জিনিসটা ধার করা। আর তার সুদ বড় চড়া।
একাত্তরে যখন যুদ্ধ লাগলো, ওপার থেকে মানুষ দলে দলে এপারে আসতে লাগলো। রিলিফ কমিটির নৌকায় সাত মাস আমি বিনা পয়সায় বৈঠা টেনেছি। রাতের পর রাত। প্রত্যেকটা নৌকায় আমি মেয়েদের মুখের দিকে তাকাতাম। উনিশ বছর পেরিয়ে গেছে। চেহারা বদলে যায়, তবু আমি তাকাতাম। যদি কোনো একটা মেয়ে শ্যামার হয়!
এখন আমার বয়স পঁচাশি। মাঝির চরটা আর নেই। ষাটের দশকের কোনো এক বর্ষায় স্রোত ওটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। যে জায়গাটায় আমরা ছয় ঘণ্টা করে জোয়ারের অপেক্ষা করতাম, সেখানে এখন শুধু জল। জলের ওপর টানটান করে বাঁধা একটা দড়ি। আর দুই দেশের বন্দুকওয়ালাদের নৌকা।
তবু বছরে একটা দিন আছে। দশমীর দিন দুই পারের মানুষ ঠাকুর নিয়ে নদীতে নামে। শয়ে শয়ে নৌকা। শয়ে শয়ে নৌকা। দুই পারে দুই দেশের পতাকা, ঢাকের শব্দ, সিঁদুর, ধোঁয়া। নৌকাগুলো দড়ির দুই পাশে এসে ঠেকে থাকে। আর মানুষ গলা ফাটিয়ে ওপারের অচেনা মানুষকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায়।
আমি মুসলমান মানুষ। পূজার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। তবু বাহান্ন সালের পর থেকে প্রত্যেক দশমীতে আমি একটা নৌকা ধার করে ওই ভিড়ের ভেতর গিয়ে বসে থাকি।
বৈঠার হাতলে এখন আর কোনো অক্ষর নেই। আমার হাতের ঘষায় নামটা ক্ষয়ে গেছে। প্রথমে শেষের অক্ষর, তারপর মাঝেরটা। তারপর পুরোটাই। এখন সেখানে কেবল একটা মসৃণ গর্ত, ঠিক বুড়ো আঙুলের মাপে।
ওই গর্তে আঙুলটা বসিয়ে আমি সারা বিকেল কান পেতে বসে থাকি। হাজার মানুষের চিৎকার, ঢাক, বাঁশি, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। আমি ওই সবকিছুর ভেতর থেকে একটা মাত্র শব্দ শোনার জন্য বসে থাকি। কেউ আমার নাম ধরে ডাকে না।
তারপর ভাটা নামে। জল ওপার থেকে নেমে এপারে আসে। আমার নৌকার গা ছুঁয়ে চলে যায়। ছয় ঘণ্টা পর আবার ওপারে ফিরে যায়। দিনে দুইবার। রোজ। একদিনও এই নিয়মের নড়চড় হয় না।
আমি আঁজলা ভরে সেই জল তুলে মুখে দিই।
নোনা।
ঠাকুমার গল্পটা তাহলে মিথ্যা ছিলো না।
১৩/৮/২০২৬


