শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

জামাই ষষ্ঠী ~ কৌশিক মজুমদার

সে অনেকদিনে আগের কথা। এক পরিবারে দুটি বউ ছিল ৷ ছোট বউ ছিল খুব লোভী ৷ বাড়ির মাছ বা অন্যান্য ভাল খাবার রান্না হলেই সে লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়ে নিত আর শাশু ড়ির কাছে অভিযোগ করত ‘সব কালো বেড়ালে খেয়ে নিয়েছে ’৷ বেড়াল মা ষষ্ঠীর বাহন ৷ তাই বেড়াল, মা ষষ্ঠীর কাছে অভিযোগ জানাল ৷ মা ষষ্ঠী রেগে গেলেন ৷ যার জেরে ছোট বউ-এর একটি করে সন্তান হয় আর মা ষষ্ঠী তার প্রাণ হরণ করেন ৷ এইভাবে ছোট বউয়ের সাত পুত্র ও এক কন্যাকে মা ষষ্ঠী ফিরিয়ে নেন ৷ ফলে স্বামী, শাশুড়ি ও অন্যান্যরা মিলে তাকে ‘অলক্ষণা’ বলে গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় ৷ অথচ বড় বউ পুত্রকন্যাদের নিয়ে সুখে ঘর করতে থাকে ৷

ছোট বউ মনের দুঃখে বনে চলে যান ও একাকী কাঁদতে থাকেন ৷ শেষে মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার কাছে এসে কান্নার কারণ জানতে চান ৷ সে তার দুঃখের কথা বলে ৷ তখন মা ষষ্ঠী তার পূর্বের অন্যায় আচরণের কথা বললে সে মাফ চায় ৷ ষষ্ঠী তাকে ক্ষমা করেন | এরপর বলেন — ভক্তিভরে ষষ্ঠীর পুজো করলে সাতপুত্র ও এক কন্যার জীবন ফিরে পাবে ৷ তখন ছোট বউ সংসারে ফিরে এসে ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পুজো করে ও ক্রমে ক্রমে তার পুত্র কন্যাদের ফিরে পায় ৷ এর থেকে দিকে দিকে ষষ্ঠী পুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে ৷

এদিকে বৌয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁকে বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাঁর মা-বাবা দিনের পর দিন মেয়ের মুখ দেখতে পান না। শেষে মেয়েকে দেখতে উন্মুখ মা-বাবা একবার ষষ্ঠীপূজার দিন শ্বশুরবাড়িতে আসার জন্য জামাইকে সাদরে নিমন্ত্রণ জানান। এ নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করার সাধ্যি জামাইয়ের ছিল না। ষষ্ঠী পূজার দিন শ্বশুরবাড়িতে জামাই সস্ত্রীক উপস্থিত হলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

ষষ্ঠীপূজা রূপান্তরিত হয় জামাইষষ্ঠীতে।

আসল ঘটনা একটু অন্যরকম। ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় সংস্কার ছিল কন্যা যতদিন না পুত্রবতী হয় ততদিন কন্যার পিতা বা মাতা কন্যাগৃহে পদার্পণ করবেন না ৷ এই ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিল —সন্তানধারণে সমস্যা হলে বা সন্তান মৃত্যুর (শিশুমৃত্যু তখন প্রচুর হত) ফলে কন্যার পিতামাতাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হত কন্যার বাড়ি যাওয়ার জন্য ৷ সেক্ষেত্রে বিবাহিত কন্যার মুখদর্শন কীভাবে ঘটে? তাই সমাজের বিধানদাতা জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নিলেন জামাই ষষ্ঠী হিসাবে ৷ যেখানে মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে সমাদর করা হবে ও কন্যার মুখ দর্শন করা যাবে ৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই নিয়ম একটু এদিক ওদিক করে এখনও চলছে একইভাবে...

মিষ্টির সঙ্গে জামাইদের বহুকালের সম্পর্ক। দ্বারকানাথ বিদ্যারত্ন তাঁর কবিতাকুসুমাঞ্জলি বইয়ের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন বিয়েতে কে কী চায়? তাতে বলা হচ্ছে, কন্যা চায় বরের রূপ, মাতা চান জামাইয়ের ধন, পিতা চান পাত্রের জ্ঞান, বান্ধবরা দেখেন পাত্রের কুল আর জনগণ মিষ্টি পেয়েই খুশি, মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ। 

সূর্য মোদকের জলভরা সন্দেশের গল্প সবাই জানেন। তবু একবার বলেই দি। তখন ১৮১৮ সাল। বাংলায় তখন ইংরেজ শাসন চালু হলেও আনাচেকানাচে দু-চারটে জমিদারি তখনও টিকে আছে বহাল তবিয়তে। আয় যেমনই হোক, আদবকায়দায়, ঠাটেবাটে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা পুরোপুরি বর্তমান। এমনই এক জমিদার ছিলেন ভদ্রেশ্বরের তেলিনীপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। বাড়ির মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরে মেয়ে এসেছে বাপের বাড়ি জামাই নিয়ে জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে। তখন আবার জামাইঠকানো বা বউঠকানো বহু প্রথা চালু ছিল। এখন সেগুলো বোকা বোকা মনে হলেও তখন এইসব প্রথা রমরম করে চলত। সে যাই হোক, জামাইকে ঠকাতে হবে। কী করা যায়? ঠকানোও হল আবার জামাই বাবাজীবন রাগও করতে পারলেন না, এমন কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। 
অনেক ভেবে তেলিনীপাড়ার জমিদারবাড়িতে তলব হল এলাকার নামকরা ময়রা সূর্যকুমার মোদকের। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হল এমন একটা মিষ্টি বানাতে হবে যা দিয়ে জামাই ঠকানো যাবে অথচ তাঁর মানসম্মান যেন কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়। বহু ভাবনাচিন্তা করার পর মোদক মহাশয় একটা বিশাল আকারের মিষ্টি বানালেন, যার ভেতরে জল ভরা থাকে, অথচ বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনও উপায়ই নেই। সেই মিষ্টি দেওয়া হল জামাইয়ের পাতে। মিষ্টিতে মাতোয়ারা জামাই সেই মিষ্টি হাতে নিয়ে দিলেন বিশাল এক কামড়। আর যেই না কামড়ানো, মিষ্টির ভেতরের লুকোনো জল বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিল জামাইয়ের সাধের গরদের পাঞ্জাবি। জামাই অপ্রস্তুত। হো হো করে হেসে উঠলেন শালা-শালিদের দল। ঘোমটার আড়ালে হাসিতে ভরে উঠল শাশুড়িদের মুখ আর জমিদারবাবু গোঁফে দিলেন তা। জন্ম হল জলভরার। 

ধর্মচর্চার পীঠস্থান হওয়ার জন্য গুপ্তিপাড়াকে 'গুপ্ত বৃন্দাবন' বলা হত। ক্রমে 'গুপ্ত বৃন্দাবন পল্লী', তার থেকে 'গুপ্ত পল্লী' এবং পরিশেষে গুপ্তিপাড়া নাম হয়। কথিত আছে যে গুপ্তিপাড়াতেই সন্দেশের জন্ম। এখানেই প্রথম তৈরি হয় সন্দেশের মিশ্রণ, যা মাখা সন্দেশ নামে পরিচিত। পরে সেই মাখা সন্দেশকেই আকার দিয়ে তৈরি হয় গুপো সন্দেশ। এই সন্দেশ জনপ্রিয় হলে তা 'গুপ্তিপাড়ার সন্দেশ' বা সংক্ষেপে 'গুপো সন্দেশ' বলে পরিচিতি লাভ করে। অপর মতে অবশ্য সন্দেশটি খাওয়ার সময় গোঁফে লেগে যায় বলে তার নাম হয়েছে গুঁফো সন্দেশ। 

এখানে এর একটা অন্য গল্প বলি বরং... 

মেয়েরা দুঃখ করে বলেন "বউমা কখনই মেয়ে হয় না"। 
শাশুড়ী মুখে যাই বলুন, নিজের মেয়ে আর পরের মেয়ের তফাত নাকি ঠারেঠোরে, কথার চিমটিতে ঠিক বুঝিয়ে দেন। শ্বশুর অবশ্য একটু সেফসাইডে "উনি আবার বলবেন কি? মেনিমুখো মানুষ। বউয়ের আঁচলের তলায় শুয়ে থাকে। ছেলেটাকেও বানিয়েছে তেমনি। এক আঙ্গুলে উঠায় আর বসায়। নেহাত আমি আসার পর থেকে..." 
যাক গে যাক! এসব অভিযোগ সত্যি কি মিথ্যে, সে তর্কে যাব না। কিন্তু বেচারা জামাইদের অবস্থা আরো খারাপ। সিরিয়াসলি। 

বউদেরবেলায় ভিতরে ভিতরে চোরা স্রোত যাই থাক না কেন, বাইরে একটা আবরণ থাকে। জামাইদের বেলা সেটুকুও নেই। খুল্লম খুল্লা যাতা বলা হচ্ছে সেই কবে থেকে। খেয়াল করতে গিয়ে ব্যোমকে গেলাম মাইরি!! বাংলায় জামাইদের নিয়ে যে কটা প্রবাদ প্রবচন আছে খেয়াল করে দেখুন, একটাও সুখকর না। সুখকর কি বলি, রীতিমত অপমানজনক। একটা একটা করে বলা যাক-
শুরুতেই "যম, জামাই ভাগ্না/ তিন না হয় আপনা"। জাস্ট ভাবুন, জামাইয়ের সঙ্গে যমের তুলনা। যমদুয়ারে তাও কাঁটা বিছানোর মন্ত্র আছে, কিন্তু জামাই ঠেকাই কি দিয়ে? কেউ কেউ যমকে আবার জন দিয়ে রিপ্লেস-ও করেন। একই ফ্লেভারের এর একটা আছে 'মামা ভাগনে জামাই শালা, আর পোষ্য পুত / ঘরে ঘরে বিরাজ করে, এই পাঁচটি ভূত'।   
পরেরটা আরো খতরনাক "'জামাই হারামখোর, আর বেড়াল হারামখোর'। কি আর বলি। এসবে ব্যাখ্যা হয় না। 

আসি তিন নম্বরে। বাংলা না সংস্কৃত শ্লোক। তাতে বলা হচ্ছে "জামাত্রর্থং স্রপিতস্য সূপাদেরতিথ্যুপকারকত্বম" সোজা বাংলায় 'জামাইয়ের জন্য মারে হাঁস, গুষ্টিশুদ্ধ খায় মাস'। মানে এক জামাইষষ্ঠীর যা খরচ, তাতে গোটা পরিবারের একমাস চলে যায়। এতেই শেষ নয়। আরো একটা বলি "'সদা বক্রঃ সদা ক্রূরঃ সদা মানধনাপহঃ। কন্যারাশিস্থিতো নিত্যং জামাতা দশমো গ্রহঃ'। মানে কুটিল, বক্র, ধন মান সব হরণকারী জামাতা নবগ্রহের পর দশম গ্রহ। এবং সেই গ্রহ অবশ্যই কুগ্রহ। এই কুগ্রহকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি খুব একটা বদার-ও করেন না। না হলে "খেয়ে বাঁচলে কামাই/ মেয়ে বাঁচলে জামাই" প্রবাদটাই বা আসবে কেন? এমনকি কখনও কখনও দেখি জামাইয়ের উপরে উপকারের এক্সপেক্টেশনটুকুও নেই "গতর কুশলে থাক, করে খাব কামাই / বিস্তর করলে পেটের পুত, কি করবে জামাই"। সোজা কথা জামাই আর তার খাই মেটানো প্রায় অসম্ভব। জামাই তো খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কোনো জিনিসেই মন ভরেনা তাঁর। তাই বলা হয় "পাঁচ ব্যন্নন দুধ রুটি / তবু জামাইয়ের ভিরকুটি"।

Uploaded Image


শুধু জামাইদের সেলফ এস্টিম কত কম, তা ভেবে দেখুন। এত কথার পরেও যেই না জামাইষষ্ঠী এল, জামাই চললেন হাতে আম কাঁঠালের ব্যাগ নিয়ে। 'খাওয়া দাওয়ার গন্ধে / জামাই আসে আনন্দে'। তখন তার যত্ন আত্তি না করে উপায় কী! 'জামাই এলো কামাই ক'রে, বসতে দাও গো পিঁড়ে / জলপান করতে দাও গো সরু ধানের চিঁড়ে'। আর এতেই শেষ না, 'রুইয়ের মুড়ো, কেটো মুড়ো, দাও আমার পাতে / আড়ের মুড়ো, ঘিয়ের মুড়ো, দাও জামাইয়ের পাতে'। এই উপলক্ষে 'জামাই গেলে শ্বশুরবাড়ি, তিনদিন আদর বাড়াবাড়ি'। 

এতো গেল নর্মাল জামাই। ঘরজামাইদের নিয়ে যা যা লেখা আছে, তা যত কম বলা যায় ততই ভাল। ব্যাখ্যা ছাড়া। একটাই বলি। এতেই গোটা অ্যাটিটিউডটা বোঝা যাবে

দূর জামাইয়ের কাঁধে ছাতি / ঘর জামাইয়ের মুখে লাথি'

শেষ করি জামাইদের প্রকারভেদ দিয়ে। আজ রাস্তাঘাটে বেরুলে মূলতঃ চার রকম জামাই দেখতে পাবেন।

১। সদ্য বিবাহিত জামাই- এদের প্রথম কি দ্বিতীয় জামাইষষ্ঠী। বউমা সুন্দর পাটভাঙা শাড়িতে চকচকে। বরের টকটকে লাল পাঞ্জাবিতে সাদা কলকা। বউ ঘামলেই বর মুছিয়ে দিচ্ছেন। হাতের ব্যাগে আম, মিষ্টি আর লিচুর ডালপালা উঁকি দিচ্ছে। দুজনেই ফিসফাস করছেন আর হেসে উঠছেন। বর আপ্রাণ চেষ্টায় আছেন অন্যজনের কষ্ট না হয়। বেশ মাখোমাখো ব্যাপার। 

২। সদ্য সন্তানপ্রাপ্ত জামাই- গরমে বাচ্চা তেড়ে চিল্লাচ্ছে। বউ মেজাজ গরম করছে"একটু ধরতেও ও পারো" ধরলে বাচ্চা আরও রেগে লাল হয়ে যাচ্ছে। মুশকিল হল পাশেই দুই একজন মহিলা টিপ্পনি কাটছেন "আমার মনা তো বাসে উঠলেই ঘুমিয়ে পড়ত। কোনদিন জ্বালায় নি। ও ঘুমাচ্ছে না কেন?" বাবার পাঞ্জাবি আর মায়ের শাড়ি দুমড়ে গেছে। বাচ্চা এখনো কেঁদে যাচ্ছে।

৩। একটু বড় বাচ্চাযুক্ত জামাই- পুরোনো শার্ট আর প্যান্ট পড়া। মুখ ভয়ানক গম্ভীর। হাতে ছোট একটা থলে। সঙ্গে বউ আর ক্লাস ওয়ান আর ক্লাস ফোরে পড়া দুই ছেলে মেয়ে। বাবা বাসে উঠে কোণ দেখে বসে মোবাইলে রবীশ কুমার দেখতে লাগলেন। বাচ্চাদুটো কে জানলার ধারে বসবে নিয়ে ঝগড়া করতে লাগল। মা ছোটটাকে কোলে নিয়ে বড়টাকে জানলায় বসিয়ে ঝগড়া মেটালেন

৪। প্রাচীন জামাই- আমার মত জামাই। যারা আজকের দিনেও অফিস করছি আর তাদের বড় বড় ছেলেমেয়েরা স্কুলে গিয়ে ক্লাস করছে।
এর বাইরেও অনেক রকম আছেন। 

আজ জামাইষষ্ঠীর পুণ্য প্রভাতে সব জামাইকে অভিনন্দন। সমস্ত সমবেদনা নিয়েই বলছি, যুগে যুগে এইসব বাঁকা কথা অগ্রাহ্য করে যেভাবে আপনারা পদের পর পদ সাঁটিয়েছেন, সেই ধারা অক্ষুন্ন থাক। 
সবচেয়ে বড় কথা সেই কবে কিশোরকুমার বলে গেছেন-"কুছ তো লোগ কহেঙ্গে/ লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা"

(সঙ্গের ছবিটি শিল্পী দেবাশীষ দেবের অরিজিনাল পেন এন্ড ইংক আর্টওয়ার্ক থেকে। কাল্ট হয়ে যাওয়া এই ছবির আসলটা এখন আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে)...

শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের জন্মবৃত্তান্ত ও শ্যামাপ্রসাদ ~ অরিজিত মুখার্জী

(আরেকরকম পুজোসংখ্যায় প্রকাশিত )
(১)
"শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিমবঙ্গের জনক" বা "শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে রয়ে গেছে" এই মিথদুটোর বয়স বেশ কয়েকবছর হল। ফি বছর হিন্দুত্ববাদীরা এই নিয়ে প্রচার করে, তার পালটা লেখাও তৈরী হয়, আবার তার পরের বছর একই ঘটনা ঘটে। তবে দুটো মিথকেই সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় কিছু তথ্য আর ম্যাপ দিয়ে। এই লেখার উদ্দেশ্য সেইটাই। যদিও তার আগে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতটা একটু দেখে নেওয়া প্রয়োজন - তার জন্যে খানিক গৌরচন্দ্রিকা…
তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড নামেও ইতিহাসে পরিচিত) আর বেঙ্গল টেনেন্সী অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট - মূলত: এই দুটো ঘটনা, আর গ্রামের দিকে বাড়তে থাকা কৃষক আন্দোলন - এই সবকিছুর জেরে ভদ্রলোক হিন্দুরা কংগ্রেসের দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করে। বিশেষ করে যে জমিদার আর হিন্দু ব্যবসায়ীদের চাঁদার ওপর কংগ্রেস ভালোমত নির্ভরশীল ছিল, তারা বিমুখ হওয়ায় কংগ্রেস বেশ চাপে পড়ে যায়। ১৯৩৬-৩৭-এর প্রাদেশিক ভোটে আশিটা সাধারণ আসনের মাত্র আটচল্লিশটা আর বিশেষ সংরক্ষিত হিন্দু আসনের মাত্র চারটে জেতে কংগ্রেস। নির্দল হিন্দু প্রার্থীরা জেতে সাঁইত্রিশটা আসনে, হিন্দু মহাসভা দুটো আসনে।
হিন্দু এবং হিন্দুধর্মকে রক্ষার দাবী নিয়ে ততদিনে হিন্দু ভদ্রলোক আইডেন্টিটি তৈরী হয়ে গেছে - মূলত: শিক্ষিত সমাজকে ঘিরে, যাদের বেশিরভাগের গ্রামের দিকে জমিজমা, বাড়ি আর শহরে চাকরি ছিল - অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ক্ষমতাশালী উচ্চবিত্ত, বা মধ্যবিত্তের ক্রীমি অংশ। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে প্রান্তিক গোষ্ঠীর লোকজনকেও এই বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অংশ হিসেবে টেনে আনার চেষ্টা শুরু হয়। জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসবগুলো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র, ফলে গ্রাম বা ছোট মফস্বল শহরের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যেও এই প্রবল হিন্দু আইডেন্টিটি ছড়াতে শুরু করে।
১৯৩৬-৩৭ এর ভোটের ফলাফলের পর কংগ্রেসও আর এর বাইরে থাকার কথা ভাবেনি। কমতে থাকা ফান্ড আর সরতে থাকা "ভদ্রলোক সাপোর্টের" ধাক্কায় কংগ্রেসও উঠেপড়ে লেগেছিল হিন্দু প্রোফাইল তৈরী করতে। প্রথম পদক্ষেপ ছিল সুভাষ-শরতের আমলে কংগ্রেস ছেড়ে চলে যাওয়া হিন্দু জমিদারদের খুব কাছের লোক নলিনীরঞ্জন সরকারকে আবার বড় দায়িত্ব দিয়ে ফিরিয়ে আনা। তারপর ক্রমশ: কৃষক আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে উলটে জমিদারদের পক্ষ নেওয়া, সুভাষ-শরতকে একঘরে করে দেওয়া এবং শেষপর্যন্ত সরিয়েই দেওয়া – সবটাই ঘটেছিল বাংলা কংগ্রেসকে ফের ভদ্রলোকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে। জয়া চ্যাটার্জী তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে রীতিমত তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই সময়ে, মানে সুভাষ আর শরৎ বসুকে বের করে দেওয়ার পর, হিন্দু মহাসভা আর বাংলা কংগ্রেসের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাৎ সাধারণ চোখে ধরাই পড়তো না।
১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে হাতেনাতে ফল পায় কংগ্রেস এই আইডেন্টিটি পরিবর্তনের - বাংলার হিন্দুরা একজোটে কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দেয় - একাত্তরটা সাধারণ আসন আর পনেরোটা বিশেষ হিন্দু আসন জেতে কংগ্রেস, তার মধ্যে বেশ কয়েকটা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা। হিন্দু মহাসভা ছাব্বিশটা আসনে কংগ্রেসের বিপক্ষে লড়ে পায় মোটে ২.৭৩% ভোট। একটা মাত্র আসনে - বিশেষ ইউনিভার্সিটি আসন – সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জেতেন শ্যামাপ্রসাদ। খুব স্পষ্টভাবে, ভদ্রলোক হিন্দুদের রায় ছিল কংগ্রেসের পক্ষেই। অন্যদিকে, সংরক্ষিত তফশিলী আসনের ৮০% জেতে কংগ্রেস, ৩৬-৩৭ সালে যেটা ২৫%-এরও কম ছিল। সব মিলিয়ে মোটামুটি ৯০% হিন্দু ভোটার মনে করেছিল যে কংগ্রেসই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা - ধনী ব্যবসায়ী, জমিদার - যাদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা তিরিশের দ্বিতীয়ভাগ থেকে ক্রমশ: শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তাদেরও বিপুল সমর্থন পেয়েছিল কংগ্রেস - এই নতুন পাওয়া হিন্দু আইডেন্টিটির জোরে [১]।
আলাদা হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্যের দাবীও ওঠে এই সময় থেকেই। ১৯৪৬-এর ভোটে সুরাহওয়র্দীর মন্ত্রীসভার ক্ষমতায় আসা, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের সময়ে যে সুরাহওয়র্দীকে নিয়ে প্রবল ক্ষোভ ছিল হিন্দুদের মধ্যে, ছেচল্লিশের কুখ্যাত দাঙ্গা, এবং সেই সময়ে কলকাতার রাস্তায় ঘটে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সামলাতে না পারা - সব মিলিয়ে বাংলার হিন্দুদের বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়ে যায় যে "মুসলমানদের সরকার" থাকলে বাংলার পাকিস্তান হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না, হিন্দুদের থেকে যেতে হবে মুসলমানদের অধীনে। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদের হাতে লেখা ছেচল্লিশ সালের একটা নোট [২] পাওয়া যায় এই মর্মে, যার মূল বক্তব্য ছিল – “বাংলা যদি পাকিস্তান হয়ে যায়, বাঙালী হিন্দুদের যদি পাকাপাকি মুসলমান শাসনে থাকতে হয়, তাহলে সেটা হবে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির শেষ অধ্যায়…নীচু জাতের কিছু হিন্দু যারা মুসলমান হয়েছে, তাদের খুশী করতে হিন্দু সংস্কারকে বলি দেওয়া…”
একসময় "অবিভক্ত বাংলা"-র সমর্থক শ্যামাপ্রসাদ সেই সময়েই কিন্তু বাংলা ভাগের পক্ষে চলে গিয়েছিলেন। আর, ব্রিটিশ রাজের শেষ দুটো বছরে, বাংলার হিন্দু ভদ্রলোকদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা বস্তুত: কংগ্রেসের সেকেন্ড ফিডল হিসেবেই থেকে গিয়েছিল।
(২)
ছেচল্লিশের দাঙ্গায় দোষী কে সেই প্রসঙ্গে যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। হাজারো লেখা আছে, বই আছে - পড়ে দেখতে পারেন। যেটা বাস্তব, সেটা হল ১৯৪৭ সালে দেশভাগই যে একমাত্র পথ সেইটা মোটামুটি সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বই মেনে নিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর ৮ই মার্চ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও জানিয়ে দেয় যে দেশভাগ যদি হতেই হয়, তাহলে মুসলমান-প্রধান বাংলা আর পাঞ্জাবকেও ভাগ করতে হবে। ৩রা জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে দশ সপ্তাহের মধ্যে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাবে। ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের দুই উত্তরসুরীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হবে। দুই মুসলমান প্রধান রাজ্য, বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করে মুসলমান অধ্যুষিত পাশাপাশি জেলাগুলো দেওয়া হবে পাকিস্তানকে, আর অ-মুসলমানপ্রধান বাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে।
মানে, ওই দশ সপ্তাহের মধ্যে বাংলার সব হিন্দু রাজনৈতিক নেতা (কংগ্রেস ও মহাসভা মিলিয়ে) - যাঁরা আগের কয়েক বছর ধরে নিরন্তর রাজ্যভাগের কথা বলে এসেছিলেন - তাঁদের সকলকেও এবার দেশভাগের জমাখরচের হিসেব কষতে হবে…
দেশভাগের অধিকাংশ ইতিহাস জানায় যে স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ তাঁর মর্জিমত কলমের আঁচরে ভারত আর পাকিস্তানকে আলাদা করেছিলেন। তড়িঘড়ি করে করা এই কাজে ভারত আর পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ছিল দাবার বোড়ে মাত্র। বাস্তবে যদিও, যে রাজনীতিকরা দেশভাগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই নতুন রাজ্যের বর্ডার কী হবে সেইটা স্থির করার কাজ করে গিয়েছিলেন।
কাজটা অবশ্যই সহজ ছিল না। ৩রা জুন থেকে ১৭ই আগস্ট - এই অল্প কয়েকটা দিনের মধ্যেই শুধু যে দুই দেশের সীমা নির্ধারণ করতে হবে তা নয়, ভাগ করতে হবে আরো অনেক কিছুই - নদীনালা, রাস্তা, ব্রিজ, রেলপথ, গুদামে থাকা জিনিসপত্র, মায় সরকারি কর্মচারীদেরও। আর, এমনও নয় যে এর কোন ব্লুপ্রিন্ট কোথাও ছিল, যাতে সেটা দেখে দেখে কাজটা সহজেই করে ফেলা যায়। বেসিক গ্রাউন্ডরুল লন্ডন ও দিল্লী থেকেই বলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু রাজ্যের কোন অঞ্চল কীভাবে ভাগ হবে - সেটা ছাড়া হয়েছিল রাজ্যের ওপরেই। এই গ্রাউন্ডরুল অনুযায়ী বাংলার আইনসভাকে দুটো ভাগে ভাগ করা হবে - মুসলমান আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা ভাগ, আর হিন্দু আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আরেকটা ভাগ - দুটো ভাগেই আলাদা করে দেশভাগের ওপর ভোট নেওয়া হবে আর, কোনো একটা ভাগে পার্টিশনের পক্ষে ভোট হলেই ভাগ করা হবে রাজ্যকে। ২০শে জুন ১৯৪৭ - যে দিনটাকে হিন্দুত্ববাদীরা পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করা শুরু করেছে - সেই দিন, বাংলার আইনসভায় এই দুটো ভাগ তৈরী করে ভোট হয়। সেই ঐতিহাসিক ভোটে, একেবারে প্রত্যাশিতভাবেই হিন্দু অংশ ভোট দেয় বাংলা ভাগের পক্ষে আর মুসলমান অংশ ভোট দেয় বিপক্ষে। বাংলার রাজ্যপাল ফ্রেডেরিক বারোওজ টেলেক্স করে মাউন্টব্যাটেনকে জানান -

Separate meetings of members West repeat West Bengal Legislative Assembly this afternoon decided under paragraph six of H.M.G.’s statement by 58 votes to 21 votes that Province should be partitioned; and under paragraph eight of statement by 58 votes to 21 votes again that West Bengal should join existing Constituent Assembly. Separate meeting of members East repeat East Bengal Legislative Assembly this afternoon decided under paragraph six of statement by 106 votes to 35 votes that Province should not repeat not be partitioned; under paragraph eight of statement by 107 votes to 34 that East Bengal should join new Constituent Assembly; and under paragraph thirteen of statement by 105 votes to 34 votes that East Bengal would agree to amalgamation of Sylhet. [৩, ৪]
এখানে যেটা দেখার, সেটা হল বাংলা ভাগের পক্ষে রাজ্যের হিন্দু প্রতিনিধিরা একজোট হয়েই ভোট দিয়েছিলেন, আর সেই সময়ে আইনসভায় হিন্দু মহাসভার তরফে ছিলেন একজনই - শ্যামাপ্রসাদ নিজে। কাজেই, খুব সাধারণ অঙ্কের হিসেবেও ৫৮টা ভোটকেই শ্যামাপ্রসাদ হিসেবে ধরা যায় না (সে ইদানীংকালে কেউ কেউ ২৯৪ আসনে তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে বললেও)...
মানে, আগে যে ধারণার কথা লিখেছিলাম - বাংলার অধিকাংশ হিন্দু রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাজ্যভাগের প্রশ্নে একমত ছিলেন - আইনসভাতে হিন্দু অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত সেই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। আর এই হিন্দু প্রতিনিধিদের প্রায় সকলেই বাংলা কংগ্রেস থেকে আসা। পশ্চিমবঙ্গের গঠনের পিছনে হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদের আলাদা কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং বলা ভালো কোনো কৃতিত্বই নেই।
[আদৌ কাউকেই এই কৃতিত্ব দেওয়া যায় কিনা সে সম্পূর্ণ আলাদা প্রসঙ্গ, আলাদাভাবে লেখা প্রয়োজন তাই নিয়ে। শুধু এইটুকু বলি - দেশভাগের হিউম্যান কস্ট আর দুটো দেশেরই ক্ষয়ক্ষতি, বিশেষ করে রিসোর্সের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বিচার করলে কৃতিত্ব শব্দটাই এখানে বেমানান। দেশভাগ বাঙালীর কাছে একটা যন্ত্রণার ঘটনা, এবং পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে এমন একটা ধাক্কা যেখান থেকে এই রাজ্যটা কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই, অত্যন্ত নোংরা খুনে মানসিকতার লোক না হলে ২০শে জুন তারিখটা নিয়ে উৎসব কেউ করবে না।]
(৩)
এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গটায় - কলকাতার পশ্চিমবঙ্গে থাকা বা না-থাকা নিয়ে…তার জন্যে আমাদের যেতে হবে ২০শে জুন ১৯৪৭-এর পরের কয়েক সপ্তাহে, ঢুকতে হবে বাউন্ডারি কমিশনের ভিতরে...যার কাজ শুরু হয়েছিল তুমুল অনিশ্চয়তার মধ্যে। বাংলা আর পাঞ্জাব, দুই জায়গাতেই চারজন বিচারককে নিয়ে তৈরী হয়েছিল বাউন্ডারি কমিশন, দুই কমিশনেই চেয়ারপার্সন ছিলেন সিরিল র্যাডক্লিফ। আর চারজন বিচারককে মনোনীত করেছিল কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ। বাংলা কংগ্রেসের তরফে এই কমিশনে ছিলেন জাস্টিস বি.কে. মুখার্জী এবং জাস্টিস সি.সি. বিশ্বাস। মুসলিম লীগের মনোনীত সদস্য ছিলেন জাস্টিস আবু সালেহ মহম্মদ আক্রম, এবং জাস্টিস এস.এ. রহমান। এবং স্বাভাবিকভাবে সকলেই রীতিমত অনুগতভাবে নিজের নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং দলগত নীতির প্রতিনিধিত্ব করে গেছিলেন পুরো সময়টা জুড়ে। মাসখানেক ধরে ৩৬জন উকিল ৩৬টা আবেদন এই কমিশনের সামনে হাজির করলেও (সময়াভাবে আরো ৭১টা আবেদন পেশই করা যায়নি) র্যাডক্লিফ পুরো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শুধুমাত্র কমিশনের চার সদস্যের আনা দাবী আর পাল্টা-দাবীর ওপর ভিত্তি করে - মানে বাস্তবে কংগ্রেসের "সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি" আর মুসলিম লীগের পেশ করা বক্তব্যের ওপরেই [৫]।
এই পুরো পর্বটা জুড়েই কংগ্রেস হাইকম্যান্ড বাউন্ডারি কমিশন থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছিল, রাজ্যের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিয়ে। এই নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। স্বয়ং বাবাসাহেব আম্বেদকর কংগ্রেসের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন - তাঁর বক্তব্য ছিল এই সীমানা নির্ধারণ রাজ্যের নয়, দেশের সরকারের দায়িত্ব হওয়ার কথা, এবং এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বদলে সেনাবাহিনীর লোকজনের থাকা প্রয়োজন, কারণ শেষ অবধি, সীমানার দেখভালের দায়িত্ব তাদেরই। অবশ্যই আম্বেদকরের এই কথায় বিশেষ কেউ কান দেয়নি - না কংগ্রেস হাইকম্যান্ড, না ব্রিটিশ রাজ, না প্রতিরক্ষা দপ্তরের কেউ (ওই দপ্তর থেকে কেউ বাউন্ডারি কমিশনের সামনে হাজির পর্যন্ত হননি)।
সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটিটা ছিল খানিক খিচুরি সংগঠন - বারো সদস্যের এই কমিটিতে দুজন ছিলেন বাংলা কংগ্রেস থেকে (এই দুজনের একজন ব্যারিস্টার অতুল চন্দ্র গুপ্ত - কমিটির চেয়ারম্যান), বাকি দশজন ছিলেন হিন্দু মহাসভা, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের তরফে। বারোজনের মধ্যে দশজন দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী - স্পষ্টতই যাকে বলা যায় "বিপর্যয়ের রেসিপি"।
এবার, পার্টিশনের গ্রাউন্ড রুল - যেটা লন্ডন থেকে বলে দেওয়া হয়েছিল - সেটা ছোট করে বুঝে নেওয়া দরকার। লন্ডনের তরফে ৩রা জুনের স্টেটমেন্টটা যদি একবার দেখি -
For the immediate purpose of deciding on the issue of partition, the members of the legislative assemblies of Bengal and the Punjab will sit in two parts according to Muslim majority districts (as laid down in the Appendix) and non-Muslim majority districts. This is only a preliminary step of a purely temporary nature as it is evident that for the purposes of final partition of these provinces a detailed investigation of boundary question will be needed; and as soon as a decision involving partition has been taken for either province a boundary commission will be set up by the Governor-General, the membership and terms of reference of which will be settled in consultation with those concerned. It will be instructed to demarcate the boundaries of the two parts of the Punjab on the basis of ascertaining the contiguous majority areas of Muslims and non-Muslims. It will also be instructed to take into account other factors. Similar instructions will be given to the Bengal Boundary Commission. Until the report of a boundary commission has been put into effect, the provisional boundaries indicated in the Appendix will be used. [৬]
পাশাপাশি অবস্থিত মুসলমানপ্রধান জেলাগুলো যাবে পাকিস্তানে, আর বাদবাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে - শুধু এই নিয়মের ভিত্তিতে যদি বাংলা ভাগ করা হয়, তাহলে ভাগীরথী-হুগলীর পূর্বদিকের প্রায় পুরো অঞ্চলই বাদ দিতে হয়, বাদ দিতে হয় গঙ্গার উত্তরের একটা বড় অংশও। ভদ্রলোক হিন্দু বাঙালি পার্টিশন চেয়েছিল কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সঙ্গে একসাথে থাকতে চায়নি, ক্ষমতার ভাগাভাগি চায়নি। সেক্ষেত্রে মুসলমান প্রধান জেলাগুলোকে বাদ দিয়ে দিলে পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়ে থাকে দক্ষিণবঙ্গের অর্ধেক - শুধু বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া, কলকাতা, ২৪ পরগণা, বাঁকুড়া, বীরভূম, আর মেদিনীপুর - মানে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো - ঠিক যে যে জেলায় পার্টিশনের পক্ষে সবচেয়ে বেশি প্রচার চলেছিল...[প্রথম ছবি: Map 1]














অক্ষরে অক্ষরে নিয়ম মেনে চললে এ বড় কঠিন বাস্তব। যে পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভদ্রলোক হিন্দু এতদিন লড়ে এলো, বা যে পাকিস্তানের জন্যে মুসলিম লীগ, সেই সবই যদি এরকম পোকায় কাটা অর্ধেক রাজ্য হয়ে যায়, তাহলে সেই রাজ্য কি আদৌ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে? যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নিয়ে এত কথা, এই অর্ধেক রাজ্যে সেই ক্ষমতার কতটুকুই বা বাকি থাকবে?
কাজেই, ওই বেঁধে দেওয়া গ্রাউন্ডরুলের মধ্যে একটা বাক্যের আশ্রয় নিতে হয়েছিল কো-অর্ডিনেশন কমিটি আর লীগকে - “It will also be instructed to take into account other factors" - দুই পক্ষই এই "আদার ফ্যাক্টরস"-কে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে তাদের ভাগের অংশকে বাড়ানোর চেষ্টা করে গেছিল ক্রমাগত। তবে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট হল যে এই "আদার ফ্যাক্টরস" শব্দবন্ধকে ব্যবহার করে কতটা জমি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হবে, তাই নিয়ে কো-অর্ডিনেশন কমিটির মধ্যেই বড়সড় মতভেদ ছিল, আর সেটা একেবারে শুরুতেই সামনে আসে।
এই মতবিরোধটাই এই প্রসঙ্গে আপাতত জরুরী। শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল কিনা সেটা যাচাই করতে আমাদের ঠিক এই জায়গাতেই যেতে হবে...
(৪)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল পশ্চিমবঙ্গ কত বড় হলে রাজ্যভাগের রাজনীতির আঙিনার চরিত্ররা সন্তুষ্ট হবেন, আর এই নতুন রাজ্যটাও অর্থনৈতিকভাবে কার্য্যকর হবে। আর এই প্রশ্নে সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের সম্পূর্ণ উলটো মেরুতে বসে ছিলেন। একদল ছিলেন রাজ্যের কলেবর যতটা সম্ভব বাড়ানোর পক্ষে, আরেকদল ছিলেন ছোট কমপ্যাক্ট রাজ্যের পক্ষে - যা শাসন করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আর, এই বিভেদ ছিল একেবারে পার্টি লাইন বরাবর। ছোট দলগুলোর দাবী ছিল আকাশপ্রমাণ। হিন্দু মহাসভা আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন চেয়েছিল যতটা সম্ভব এলাকা দাবী করতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই "আদার ফ্যাক্টরস" শব্দবন্ধকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অসম্ভব বাড়িয়ে তুলে। এগারোটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা (বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, হাওড়া, হুগলী, কলকাতা, ২৪ পরগণা, খুলনা, দার্জিলিং আর জলপাইগুড়ি) ছাড়াও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অনেক অংশও এদের দাবীর মধ্যে ছিল - যেমন নদীয়ার বড় অংশ, ফরিদপুর, দিনাজপুর, এবং রংপুর আর রাজশাহীর বেশ কিছু অঞ্চল। মহাসভা আর নিউ বেঙ্গলের দাবী মানলে পশ্চিমবঙ্গে আসতো অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের প্রায় তিন ভাগ [দ্বিতীয় ছবি - Map 2][৭]
















উল্টোদিকে, অতুল চন্দ্র গুপ্তর নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্যাম্পের দাবী তুলনামূলকভাবে অনেক নিচু স্কেলে বাঁধা ছিল। তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন যে অহেতুক অযৌক্তিক দাবীর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত দাবীই লঘু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলগুলোর প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাব নাকচ করলে অতুল চন্দ্র গুপ্ত স্ট্র্যাটেজি বদলে দুটো প্রস্তাব রাখেন - একটা "কংগ্রেস স্কিম", যেখানে অনেক বড় আকারে দাবী পেশ করা হয়েছিল - মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অংশ জুড়ে (যদিও সেটাও মহাসভার দাবীর চেয়ে কমই ছিল), আর দ্বিতীয়টা "কংগ্রেস প্ল্যান", যেখানে প্রথম স্কিমের চেয়ে কম এলাকা চাওয়া হলেও সেটা মোটামুটিভাবে ওই মৌলিক তত্ত্ব মেনেই, অর্থাৎ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোকেই নিয়ে। "আদার ফ্যাক্টরস" হিসেবে অল্প কিছু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল চাওয়া হয়েছিল এই প্ল্যানে। তৃতীয় ছবি, অর্থাৎ Map 3 খেয়াল করে দেখলে দেখতে পাবেন কংগ্রেস স্কিম আর কংগ্রেস প্ল্যান - দুটোর ক্ষেত্রেই প্রস্তাবিত এলাকা দাগ দিয়ে বোঝানো রয়েছে। এবং, দুটো ম্যাপেই কলকাতা কিন্তু প্রস্তাবিত পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই রয়েছে। হিন্দু মহাসভা এই প্রস্তাবও মানেনি। শেষ অবধি তারা আলাদাভাবে পিটিশন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। Map 2 তারই ফসল।
মোদ্দা কথা হল, যে কয়েকটা পিটিশন জমা পড়েছিল কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার তরফে, তার প্রতিটাতেই কলকাতা ছিল পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই। অর্থাৎ, হিন্দুত্ববাদীদের দ্বিতীয় দাবী, যে শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছে, সেই দাবীটিকেও এই ম্যাপের দৌলতে সহজেই নস্যাৎ করে দেওয়া যায়।
Uploaded Image (৫) এই লেখাটা এইখানেই শেষ করে দেওয়া যেত। কিন্তু মনে হল সম্পূর্ণতার খাতিরে আরো কিছু তথ্য জুড়ে দেওয়া দরকার। উদ্দেশ্য শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভা, এবং আজকের বিজেপি – উগ্র দক্ষিণপন্থার আসল মানসিকতাটা চিনে নেওয়া…
চল্লিশের দশকের রাজ্যভাগের রাজনীতির সঙ্গীদের থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্যে অনেক কম এলাকা দাবী করে কংগ্রেস বেশ বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছিল। যেহেতু দেশভাগের পর তারাই সরকারে বসবে, অর্থাৎ তারাই হবে ব্রিটিশ রাজের উত্তরাধিকারী, সেহেতু, তাদের বিরুদ্ধে “বাংলার জন্মগত অধিকার খর্ব করা” বা “ভারতের নিজস্ব ভৌগলিক এলাকা শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া” জাতীয় অভিযোগ তোলা সহজেই সম্ভব। কংগ্রেসের যুক্তিটা এখানে কংগ্রেসেরই দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে - তাদের লক্ষ্য ছিল এই নতুন রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা, শুধু উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, তার পরেও। এবং তার জন্যে যদি এই অভিযোগের জবাব দিতে হয়, তাহলে সেটাই এই ক্ষমতা ধরে রাখার দাম। এবং হিন্দু মহাসভাও এইটা ভালোমতনই বুঝে গেছিল।
হিন্দু কো-অর্ডিনেশন কমিটি পাকাপাকি ভেঙে যাওয়ার পর হিন্দু মহাসভা আর তাদের সঙ্গীরা বুঝে যায় যে তাদের আর হারানোর কিছু নেই, এবং তারা চাইলে নির্বিচারে আরো যুক্তিহীন দাবীও তুলতে পারে। এবং দক্ষিণপন্থী হিন্দুদের সামনে এই দেখনদারি চেঁচামেচিতে বরং তাদের লাভ হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায় (যেটা আজ একেবারে ১০০% বাস্তব)। চরম দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলো আরো চমকপ্রদ দাবী তুলতে থাকে মহাসভার উস্কানিতে...যেমন আর্য্য রাষ্ট্র সংঘ (হয়তো হাতে গোনা একশোটা লোক ছিল এতে) অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের চারভাগ চেয়ে বসে, সঙ্গে বাংলার প্রত্যেকটা শহরও, কারণ বাংলার শহরাঞ্চলে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি…
মহাসভা এই নতুন জন্মানো রাজ্যের সীমানা নিয়ে ক্রমশঃ আরো উদ্ভট দাবী করতে শুরু করে কারণ তারা পুরোপুরি বুঝে গিয়েছিল যে এই নতুন রাজ্যে তাদের কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। কাজেই, পাশাপাশি জেলার তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়ে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কোনো জেলাকেই তারা পশ্চিমবঙ্গে ঢোকানোর কথা বলে ওই "আদার ফ্যাক্টরস"-এর হিসেবে। যেমন, গোটা নদীয়া চেয়ে বসে শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থান হিসেবে, রাজশাহী চেয়ে বসে সেখানে বারেন্দ্র রিসার্চ সেন্টার রয়েছে বলে, এবং বরিশাল - সেখানকার হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্যে। মহাসভা জানতো যে তাদের এই দাবীগুলো কোথাওই কোনো গুরুত্ব পাবে না, তা সত্ত্বেও নিজেদের "হিন্দুস্বার্থ রক্ষার সৈন্য" হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় খামতি রাখেনি। দুইদিকেই লাভ - একদিকে হিন্দুস্বার্থ রক্ষার একনিষ্ঠ সৈনিকের খ্যাতি - যদি দাবীগুলোর একটাও বাস্তবে সত্যি না হয়; অন্যদিকে কংগ্রেসের প্ল্যানের বাইরে সামান্য এলাকাও পশ্চিমবঙ্গে এলে তার কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ...একই সঙ্গে ভবিষ্যতের ইলেকশন যুদ্ধে নিজেদের জায়গা পোক্ত করা। বস্তুতঃ প্রোপাগান্ডাই ছিল মহাসভার মূল উদ্দেশ্য। সেদিনও যা ছিল, আজও তাই।
উল্টোদিকে কংগ্রেসের হাতে এই কল্পনাবিলাসের সুযোগ ছিল না। নতুন যে রাজ্য তৈরী হবে, তাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, আর তাদের প্রতি পদক্ষেপ ছিল সেই লক্ষ্যে। অতুল গুপ্তের তত্ত্বাবধানে কংগ্রেসের কমিটি রাজ্যের প্রতিটা থানার জনসংখ্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব করেছিল সেন্সাস রিপোর্টের সাহায্য নিয়ে [চতুর্থ ছবি - Map 4]। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেখলে, কংগ্রেস প্ল্যানে অনেক সমস্যা চোখে পড়লেও, কংগ্রেসের প্ল্যানাররা মোটামুটিভাবে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির কথা ভেবেই সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন। দার্জিলিং এর চা-বাগান এলাকা, ভাগিরথী-হুগলীর নদীপথ, এবং কলকাতা বন্দরের কথা ভেবে মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদীয়া - এগুলো সব তাঁদের প্ল্যানে ধরা ছিল - “this territory has been included in West Bengal for the most compelling factor of essential necessity for requirements and preservation of the Port of Calcutta. The life of the Province of West Bengal is mostly dependent on Calcutta, and with the partition it will become wholly so dependent” [৮] - অর্থাৎ, এখানেও কলকাতাকে বাদ দিয়ে কোনো প্ল্যানই ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্ল্যান তৈরী হয়েছিল কলকাতাকে তার কেন্দ্রে রেখেই।
আরো অনেক হিসেবনিকেশ ছিল কংগ্রেস প্ল্যানে। সেই হিসেবগুলো যে ঠিক, সে কথা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বলা যায় না। এও ভাবতে আশ্চর্য্য লাগে যে এই প্ল্যানের মধ্যে বেশ কিছু এমন "অনুমান" ছিল, যেগুলো রেট্রোস্পেক্টে দেখলে ধৃষ্টতা মনে হয়। পিছন ফিরে তাকিয়ে এও মনে হয় যে সেই সময়ে গণপরিষদে বাংলার প্রতিনিধিদের সমস্ত পদক্ষেপই ছিল যেনতেনপ্রকারেণ এই নতুন রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখার দিকে তাকিয়ে। কংগ্রেসের নিজের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল এই প্ল্যান নিয়ে। অতুল্য ঘোষ এবং তাঁর গোষ্ঠীর তরফে আরো সংক্ষিপ্ত রাজ্যের একটা প্ল্যান দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র দক্ষিণবঙ্গের হিন্দুপ্রধান জেলাগুলোকে নিয়ে (যদিও কংগ্রেস সেই প্ল্যান জমা দেয়নি) - যেখানে অতুল্য ঘোষের মূল উদ্দেশ্য সম্ভবত: ছিল নতুন রাজ্যে তাঁর গোষ্ঠীর (মানে হুগলী-বর্ধমান জেলার) নেতাদের ক্ষমতা সুরক্ষিত করা। এত কিছু সত্ত্বেও, বিশেষ করে দূরদর্শিতার অভাব থাকলেও, এইটুকু বলাই যায় যে বাউন্ডারি কমিশনের সামনে জমা দেওয়া প্ল্যানের মধ্যে প্রোপাগান্ডা ছিল না, জনতাকে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে দেখনদারি ছিল না। এইটাই আসল কথা - আর এই বাস্তবটা ওই সময়ের কিছু ডকুমেন্ট খুঁটিয়ে দেখলেই জানা যায়। Uploaded Image
শেষ অবধি, সিরিল র্যাডক্লিফ যে পার্টিশন লাইনটা টানেন, সেটা মোটামুটিভাবে কংগ্রেস প্ল্যানের সঙ্গেই মিলে গিয়েছিল। শুধু খুলনার বদলে পশ্চিমবঙ্গে আসে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ - গঙ্গা-ভাগিরথী রিভার সিস্টেমকে অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে।
আজ এই অবধি থাক। অন্য কোনোদিন চেষ্টা করবো পার্টিশনের জমাখরচ নিয়ে লিখতে। বারবার শুধু এইটাই বলার – হিন্দুত্ববাদীরা সেদিনও প্রোপাগান্ডাকেই তাদের অস্ত্র করেছিল, আজও তাই। ফ্যাসিবাদী শক্তি তার জন্মলগ্ন থেকে এই কাজই করে এসেছে। ভারতের এই নয়া ফ্যাসিস্টরা তাদের রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু গোয়েবলসের শিক্ষাই মেনে চলেছে – সেদিনও, আর আজও।
তথ্যসূত্র -
[১] Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947, Joya Chatterji, Cambridge University Press
[২] Shyama Prasad Mookerjee Papers, II-IV Instalment, File No. 75/1945-46
[৩] The Spoils of Partition: Bengal and India 1947-1967, Joya Chatterji, Cambridge University Press
[৪] Constitutional Relations between Britain and India: Transfer of Power, 1942-7, Volume XI The Mountbatten Viceroyalty, Announcement and Reception of the 3 June Plan, 31 May – 7 July 1947, ed: Nicholas Mansergh, Penderel Moon
[৫] The Fashioning of a Frontier: The Radcliffe Line and Bengal’s Border Landscape, 1947-52, Joya Chatterji, Modern Asian Studies / Cambridge University Press
[৬] Statement by His Majesty’s Government, dated the 3rd June 1947, PP I, p. 2
[৭] Memorandum for the Bengal Boundary Commission. Submitted by the Bengal Provincial Hindu Mahasabha and the New Bengal Association, Shyama Prasad Mookerjee Papers, 1st Instalment, Printed Material, File No. 17 (Serial No. 8.
[৮] Memorandum on the partition of Bengal presented on behalf of the Indian National Congress before the Boundary Commission, p. 7.
(সমস্ত ছবির সোর্স: জয়া চ্যাটার্জীর "স্পয়েলস অফ পার্টিশন")
   

রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬

প্রসঙ্গ বন্দেমাতরম্‌ ~ অমিতাভ প্রামাণিক

বন্দেমাতরম্‌ গানের ঐতিহাসিক ভূমিকা যাই হোক – এবং এর প্রথম স্তবক এতদিন ধরে ন্যাশনাল সং-এর মর্যাদা পেয়ে এসেছে, তা সত্ত্বেও – এর সম্পূর্ণ অংশটা আমাদের দেশের অবশ্যগেয় সংগীত হতে পারে না। 

জনগণমন-অধিনায়ক গীতিও পাঁচ স্তবকের গান। সমস্ত স্তবকের একই সুর যদিও, তাদের প্রত্যেকটার ‘লিরিক্যাল ভ্যালু’ অসাধারণ। ‘দারুণ বিপ্লব মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে, সঙ্কটদুঃখত্রাতা’ অথবা ‘রাত্রি প্রভাতিল উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব-উদয়গিরিভালে / গাহে বিহঙ্গম, পুণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে / তব করুণারুণরাগে নিদ্রিত ভারত জাগে, তব চরণে নত মাথা’ ইত্যাদি সুর করে গাইলে এক অন্য ধরনের উন্মাদনা জাগে। তথাপি এর প্রথম স্তবকটাই জাতীয় সংগীত। 

জনগণমন বাংলা গান। এতে তৎসম শব্দের বাহুল্য আছে বটে, তবে ক্রিয়াপদের রূপ বাংলার। জাগে, মাগে, গাহে – সব বাংলা। পরবর্তী স্তবকগুলোতেও শুনি, আসে, হয়, বাজে, ছিল, করিলে, প্রভাতিল (নামধাতু), উদিল, ঢালে – ইত্যাদি অকৃত্রিম বাংলা। এগুলো ছাড়া বাকি অংশ অনেকটা সংস্কৃতানুগ, কিন্তু বাংলায় সম্পূর্ণ অর্থবহ। 

বন্দেমাতরম্‌ তেমন নয়। বন্দে বা মাতরম্‌ কোনোটাই বাংলা নয়, সংস্কৃত। সুজলাং, সুফলাং ইত্যাদি বিশুদ্ধ বিভক্তিযুক্ত সংস্কৃত শব্দ। যে অংশটুকু এতদিন ন্যাশনাল সং হিসাবে গাওয়া হয়ে এসেছে, অর্থাৎ সুখদাং বরদাং মাতরম্‌ অবধি গানটা পুরোটাই সংস্কৃত। সুতরাং এ নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই। 

কিন্তু এর পরেই ঝামেলার শুরু। 

সপ্তকোটিকণ্ঠ ইত্যাদি নিয়ে লাইনটা সংস্কৃত, দ্বিসপ্তকোটিভুজৈঃ ইত্যাদিও তাই, তার পরের লাইনের দুটো রূপ দেখা যায়, যা হচ্ছে ‘অবলা কেন মা এত বলে’ অথবা ‘কে বলে মা তুমি অবলে’ – এরা তো সংস্কৃত নয়, বাংলা! তারপরে আবার বহুবলধারিণীং ইত্যাদি নিয়ে স্তবকের বাকি অংশ সংস্কৃত! তাহলে ওখানে এক লাইন বাংলা ঢোকানোর কী দরকার ছিল? বঙ্কিমবাবু তা আমাদের জানিয়ে যাননি। ফলে স্তবকটা খিচুড়ি ভাষা হয়ে গেছে। 

রবীন্দ্রনাথ অন্য এক কবিতায় লিখেছেন – সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি। খেয়াল করে দেখুন, এখানে বাঙালির সংখ্যা ‘সাত কোটি’। কাজেই বঙ্কিমের ‘সপ্তকোটিকণ্ঠ…’ বা ‘দ্বিসপ্তকোটি’ ভুজ যে এই সাত কোটিরই গলা বা হাত, তাতে বিশেষ সন্দেহ নেই। অর্থাৎ তা বাঙালির গলা ও হাত! ভারতের জনসংখ্যা সাত কোটি ছিল না বঙ্কিমের কালে! অর্থাৎ এই গান বাংলাকে জাগানোর গান, ভারতকে নয়। বন্দে মাতরম্‌ বলতে ভারতমাতা নয়, বঙ্গমাতা বুঝিয়েছেন তিনি। গোটা ভারত কখনই সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা শস্যশ্যামলা ছিল না। তাহলে গানের এই অংশটা কি সমগ্র ভারতের গান হতে পারে? 

সংস্কৃতে আমার ব্যুৎপত্তি নেই। আমার এক বিশেষ সন্দেহ আছে ‘সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালে’ অংশটা নিয়ে। সমাসবদ্ধ লম্বা এই শব্দের অর্থ কী? শেষের ওই ‘করালে’ দেখে সন্দেহ হয় উনি এক নারীকে সম্বোধন করছেন ‘হে সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালা’ বলে। করাল পুংলিঙ্গ শব্দ, যার স্ত্রীলিঙ্গ তো করালী! তাহলে এটা ‘সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালি’ হওয়া উচিত ছিল না? নাকি আমি সম্পূর্ণ ভুল বুঝেছি? 

যাই হোক, এর পরেই চলে আসে ‘তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম, তুমি হৃদি, তুমি মর্ম’ ইত্যাদি আদ্যোপান্ত বাংলা গীতি। এবং সঙ্গে সঙ্গেই বিশুদ্ধ সংস্কৃত ‘ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে’! আবার বাংলায় ‘বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি, তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে’ ইত্যাদি পুরোটা বাংলা। বাকিটা আবার পুরোটা সংস্কৃত! এই জগাখিচুড়ি ভাষার গান দেশের গান হওয়া কতখানি সঙ্গত বলে আপনাদের মনে হয়? 

বন্দে মাতরম্‌ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রভূত ভূমিকা রেখেছিল, এ কথা যেমন সত্য, সেই আন্দোলনের পটভূমিও প্রধানত বাংলাই ছিল। বঙ্কিম এই গান বাংলা মায়ের বন্দনার জন্যই রচনা করেছিলেন। এর অর্থও সে দিকই ইঙ্গিত করে। প্রথম অংশটার পর থেকে ভারতের গান হওয়ার মতো সুচারু গীতি এতে নেই বলেই আমার মনে হয়েছে। 

এর সঙ্গে জনগণমন-অধিনায়ক গানের সুর ও গীতির কোনো তুলনাই চলে না।

শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…~ অরিজিত মুখার্জী

"কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলতো সঙ্ঘের শাখা৷ দলিতদের এলাকার সামনে একটা একলা অশ্বত্থ গাছ। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় সেই গাছের নীচে একটা কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে একটা মাদুর বিছিয়ে বসতো বছর পঁচিশের সুনীতা। সুনীতা কুমারী। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু ওকালতি করে না। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের পার্টি অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে এই গ্রামটায়। সঙ্গে কোনো পোস্টার নেই, পতাকা নেই; সুনীতার সম্বল দুই চোখ ভরা স্বপ্ন, আর কাপড়ের পার্সের ভিতরে পার্টির একটা মেম্বারশিপ কার্ড। সে এসে বসতো একটা পুরনো টিনের ট্রাঙ্ক নিয়ে — তাতে থাকত কিছু বই: ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের বই, একটা আইনের বই, একটা সংবিধানের কপি, কিছু ফর্ম, একটা খাতা আর ডটপেন। সুনীতা গ্রামের প্রান্তিক মানুষজনের কথা শুনত, তাদের সাহায্য করত — কারো ফর্ম ভরে দিয়ে, কারো পেনশন আনার জন্য প্রতিদিন বিডিওর দপ্তরে গিয়ে; গল্প বলতো — জল-জমি-জঙ্গলের অধিকারের গল্প, রুজি-রুটির লড়াইয়ের গল্প। গান শোনাতো..."হাম ভুখসে মরনেওয়ালে"। দিন কাটতো। তারপর, পাঁচ বছর পর, একদিন, পঞ্চায়েত ভোটের পরে, সেই অশ্বত্থ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, সুনীতার হাত ধরে, শপথ নিল গ্রামের প্রথম দলিত মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান..."
আমাদের কাউন্টার-হেজিমনির ভিত্তি এই গল্পটাই। গল্পটা শেষ করব পরের পর্বে, শেষ পর্বে। আজ লিখব হেজিমনি কীভাবে ভাঙা যেতে পারে তাই নিয়ে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিংটুকু। গ্রামশি আছে, সঙ্গে চার্বাকও - বকলমে পার্থ চ্যাটার্জী।
আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…
আগের দুটো পর্বে লেখার চেষ্টা করেছিলাম কীভাবে হিন্দুত্ব তার ওয়ার্ল্ডভিউকে কমন সেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে প্রায় একশো বছরের অবস্থানের যুদ্ধের মাধ্যমে - স্কুল, মিডিয়া, মন্দির, দৈনন্দিন অভ্যাসের স্পেসকে দখল করে। গ্রামশির কথা মানলে আমরা এও বুঝি যে কোনো আধিপত্যই চিরকালীন নয়। বেকারত্ব, রোজকার রুজি-রুটির লড়াই, হিন্দুত্বের ভিতরের জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক প্রতিরোধ, নানান কারণে অস্থির যুবসমাজ - অনেক ফাটল রয়েছে এই হেজিমনির মধ্যেও। তবে ফাটল রয়েছে মানেই আপনাআপনি সেই ফাটলে বিপ্লবের গাছ গজাবে, এমনটাও নয়।
গ্রামশি বলেন পাল্টা অবস্থানের যুদ্ধের কথা। চটজলদি ভোটে জেতার স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। হঠাৎ কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা আকাশ থেকে নেমে এসে মুশকিল আসান করে দেবেন - এই খোয়াব দেখেও লাভ নেই। একটা দুটো বা দশটা বিশাল মিছিলেও বিশেষ কিছু হবার নয়। বরং, অনেক ধৈর্য্য ধরে, অনেক সময় নিয়ে কিছু কাজ করে যেতে হবে, আপাতদৃষ্টিতে যেগুলো বড়ই বোরিং কাজ - যেমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে থেকেই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল তুলে আনা, সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করা, আর একদম গ্রাউন্ড-আপ একটা পাল্টা ঐতিহাসিক জোট (historic bloc) তৈরী করা…
পার্থ চ্যাটার্জীর হাত ধরে চার্বাক ফিরে এসেছেন — সেই প্রাচীন সংশয়বাদী দার্শনিক চার্বাক — যিনি এই ধারণাগুলোর একান্ত ভারতীয় রূপ তুলে ধরেন আমাদের সামনে। চার্বাকের কথা অনুযায়ী ভারত কোনো "হিন্দু রাষ্ট্র" নয়, আবার এলিট থিওরেটিকাল "বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র" বলেও ভারতকে ডিফাইন করা যায় না। ভারতের ইতিহাস, ভারতের সমাজ, সেই সমাজের মানুষজনকে দেখলে ভারত, প্রকৃত অর্থে, একটা "ফেডারেশ অফ পিপলস" — পিপলস ইন প্লুরাল, কারণ এই ভূখন্ড সত্যিই বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতি, বহু ধরণের জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। বলতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে রঙিন আর কমপ্লেক্স মেলা। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব আইডেন্টিটি; সবচেয়ে বড় কথা, নানান তফাত থাকা সত্ত্বেও এরা সকলেই একটা অভিন্ন সংবিধানের ছাতার নীচে একসাথে বসবাস করতে রাজী হয়েছে; অন্তত হয়েছিল একটা সময়। সেই সম্মতি বা সমঝোতা বাইরে থেকে ভেসে আসেনি। বেশ জটিল, অগোছালো এবং খানিক অসম্পূর্ণ আলোচনার ফসল এই সমঝোতা, যাকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বাধীনতার পর থেকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আজ তারা অনেকাংশে সফল। ফেডারেশন অফ পিপলস-এর বদলে তারা আনতে চাইছে পুরোপুরি সেন্ট্রালাইজড, মেজরিটারিয়ান, এক দেশ এক ভাষা এক আইডেন্টিটি এক পোশাক এক খাদ্যাভ্যাসের তথাকথিত হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান।
শুরুতেই এই প্রচেষ্টাকে "নো থ্যাঙ্কিউ" জানিয়ে চলুন একবার চেষ্টা করি এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধ পথ খুঁজে বের করতে। এক্ষেত্রে কাউন্টার-হেজিমনির পথ, অর্থাৎ সেই ফেডারেশন অফ পিপলস-কে আবার বাঁচিয়ে তোলার রাস্তা। শুধু "বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য"-এর এলিট স্লোগান নয়, বরং বাস্তবিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঝাঁকুনি দেওয়া ফেডারেশন যেখানে সম্পদের পুনর্বন্টন হবে, যেখানে ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্য আর স্থানীয় অঞ্চলগুলোই নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে, দিল্লীবাসী কোনো সুপ্রীম লীডার নয়।
প্রশ্ন হল – কীভাবে?
প্রথমতঃ, অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল - গ্রামশির বক্তব্য ছিল এই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে সমস্ত সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে; এমন মানুষ যাঁরা তাঁদের নিজেদের ভাষায় নিজেদের কথা বলবেন; ওপর থেকে উপদেশ দেবেন না। আরএসএস এই তত্ত্বটা ভালো বুঝেছিল। ফলে, তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই নিজেদের কথা বলার লোক তৈরী করেছিল - প্রচারক, স্কুলশিক্ষক, মন্দিরের পূজারী, আখড়ার মহন্ত, আধুনিক কালে ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার - যারা সকলেই স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় সংস্কৃতি, স্থানীয় ইমেজারি ব্যবহার করে একটা প্যান-হিন্দু আইডিয়া বেচতে পেরেছে সফলভাবে। উল্টোদিকে, সেকুলার লেফটের মধ্যে এতদিন অবধি যারা এই জায়গায় ছিল, তারা প্রায় সকলেই ইংরিজীতে শিক্ষিত, ইংরিজীতে কথা বলাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ, ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান ফিলোজফারদের উক্তি তাদের মুখে মুখে ফেরে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সংস্কৃতি তাদের কাছে ব্যাকওয়ার্ড...এক কথায় একটা "এলিট" সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষের কাছে খানিক অন্য গ্রহের বাসিন্দা টাইপ। কাউন্টার হেজিমনি এই ছকে তৈরী হবে না। যেমন ধরুন আমি, কলকাতায় জন্ম বড়-হওয়া একটা লোক যার সঙ্গে কোচবিহারের কোনো সম্পর্ক নেই, দুম করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মুখিয়া হতে গেলে কেউ মানবে না। অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে এই সমস্ত কমিউনিটি — দলিত, আদিবাসী, ওবিসি, মুসলমানদের মধ্যে থেকেই। তারা নিজেদের দাবীদাওয়া চাহিদার কথা বলবে। কথা হবে পেরিয়ারকে নিয়ে, আম্বেদকরকে নিয়ে, ভক্তি আন্দোলনের জাতপাতবিরোধী দিকগুলো নিয়ে, দ্রাবিড় মুভমেন্টের ফেডারেলিজম নিয়ে। আর এই মানুষগুলোকে উঠে দাঁড়ানোয় সাহায্য করতে থাকবে স্কলারশিপ, নাইট স্কুল, কো-অপারেটিভ লাইব্রেরি, আইনি সহায়তা, ট্রেড ইউনিয়ন - কিছু দায়িত্ব তো আপনিও নেবেন, নাকি?
দুই নম্বরে আসে কালচার ওয়ার - সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। যেখানে সংস্কৃতি কোনো জগদ্দল পাথর বা মোনোলিথ নয়। হিন্দুত্ব এই সংস্কৃতিকে মোনোলিথ বানিয়ে ফেলতে চেয়েছে, এবং অনেকাংশে তারা সফলও। কারণ, তাদের গল্পটা সোজাসাপটা। তাদের ডেফিনেশনে ভারত আদিকাল থেকেই একটা হিন্দু রাষ্ট্র; মুসলমান আর ক্রিশ্চানরা এই দেশে বহিরাগত; দেশপ্রেমিক হওয়ার একমাত্র রাস্তা হল তাদের রাগী চেহারার সিক্স প্যাকওয়ালা রামকে কুর্ণিশ করা, আর হিন্দিতে কথা বলা। হিন্দি - হিন্দু - হিন্দুস্তান। পার্থ চ্যাটার্জীর চার্বাক এই মিথকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেন। চার্বাক আমাদের জানান যে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী প্রতীক ও আখ্যান রয়েছে – সঙ্ঘ পরিবার যাকে তাদের ইচ্ছেমতো মুছে দিতে চায়: দক্ষিণে তামিল তাই, তেলগু তাল্লি, কানাড়া তায়ি, কেরলম; ঝাড়খন্ডে সিধু কানু, বীরসা মুন্ডা; মহারাষ্ট্রে শিবাজী; মণিপুরে মেইতি ইমা; পঞ্জাবে ওয়ারিস শাহ। আলাদা আইকন হলেও কোনোটাই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনা নয়, বরং ফেডারেশন অফ পিপলস-এর মূল মন্ত্র এই আঞ্চলিক সংস্কৃতি। কাউন্টার হেজিমনির জন্যে পাল্টা-সংস্কৃতির লড়াই: ওয়েব সিরিজ, সেখানে মুসলমান নার্স ইউনিয়ন তৈরী করে সহকর্মীদের জন্য লড়াই করে; দলিত কমিউনিটির জাতপাতবিরোধী লড়াইয়ের গল্প নিয়ে গ্রাফিক নভেল; আম্বানি-আদানিদের মুনাফালুটকে ব্যঙ্গ করে লোকসঙ্গীত (হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মাউন্টব্যাটন সায়েব গানটা মনে পড়ে); সঙ্ঘের ঘরের পাশে ঈদের ইফতার পার্টি আর আম্বেদকর মেলা; পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে মেয়েদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে, পণপ্রথা বিরোধী গল্প নিয়ে যাত্রা; আঞ্চলিক ধর্মীয় সিঙ্ক্রেটিজমের ট্র্যাডিশনের গল্প - সুফি-ভক্তি হেরিটেজ, সত্যপীর বা বনবিবির কথা, বাউল, ফকির, দরগা আর ক্রিসমাস ক্যারলও। বৈদিক মন্ত্র যতটা ভারতীয়, আমাদের এই ট্র্যাডিশনগুলোও ঠিক ততটাই…চাঁদ সদাগরের মণসাপুজোর মত করে লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ দিয়ে সংস্কৃতির যুদ্ধ হয় না; সংস্কৃতি ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন নয়; কমন সেন্স তৈরী করার অস্ত্র।
তিন, রোজকার জীবনের বিকল্প প্রতিষ্ঠান - প্রতিদিনের খাওয়াপরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ার। সঙ্ঘ শাখা তৈরী করেছিল, রোজ সকাল সন্ধ্যেয় তারা একসঙ্গে কিছু একটা চর্চা করত। এখনও করে। কাউন্টার-হেজিমনিকে দাঁড় করাতে এর বিকল্প প্রয়োজন। যেমন ধরুন পাড়ার লাইব্রেরি, যেখানে ছোট স্টাডি সার্কল বসবে, সাধারণ লোককে সঙ্গে নিয়ে। এলিট নাটক প্রবন্ধের চর্চা শুধু নয়, পপুলার কালচার থেকেও মেসেজ বের করে আনা সম্ভব - যেমন ধরুন মার্ভেলের সিনেমা - জেন-জি-দের পছন্দের গল্প; জয় ভীমের মত সিনেমা যেখানে জাতের লড়াইয়ের কথা রয়েছে; ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে অনুবাদ হয়ে আসা নানান প্রদেশের মানুষের গল্প; নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বাংলা অনুবাদে টিনটিনের গল্প; বাংলা ক্লাসিক - তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের...(আরো অনেক নাম আসতে পারে এখানে, বিভিন্ন ভাষায় আলাদা নাম, হরিনারায়ণ আপটে মনে পড়ছে যেমন)। প্রতি সপ্তাহের শেষে কমন সেন্স ওয়ার্কশপ — সেখানে সবাই মিলে সপ্তাহের খবরগুলো পড়ে আলোচনা করতে পারে: খবরে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সেই ঘটনায় লাভ কার? যেমন ধরুন কোথাও একটা যুদ্ধ হলে কারা লাভবান হয়? তেলের দাম বাড়লে লাভ কার, ক্ষতি কার? একটা একটা করে এরকম ওয়ার্কশপ ছড়িয়ে পড়তে থাকলে বাড়তে থাকবে এই নতুন কাউন্টার কমন সেন্স...বক্তৃতা দিয়ে নয়, বরং শেয়ার্ড এক্সিপিরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে।
চার, নতুন ঐতিহাসিক জোট বা হিস্টোরিক ব্লক। কিন্তু সমস্ত শ্রেণীগত তফাত মুছে একেবারে ফ্ল্যাট সমতল করে দিয়ে নয়। হিন্দুত্ববাদী জোটের অংশীদার উচ্চবর্ণের পুঁজিপতি ব্যবসাদার, উচ্চমধ্যবিত্ত প্রফেশনাল - আইটি ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ডাক্তার ইত্যাদি, আর অন্য পিছিয়ে-পড়া শ্রেণীর লোকজন যাদের হিন্দু হায়ারার্কিতে ওপরে ওঠার উচ্চাশা রয়েছে। এদের সকলের মধ্যে কমন সুতোটা বাস্তবে মুসলমান বিদ্বেষ — সে নানাভাবে এসে থাকতে পারে, যেমন দেশভাগের জেনারেশনাল মেমরি, বা "মুসলমানরা সব দখল করে নিল"-মার্কা হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড, এমনকী নানান অবদমিত ইচ্ছা থেকেও। কাউন্টার-হেজিমনির নতুন হিস্টোরিক ব্লক হবে একেবারেই আলাদা। এই জোটের কমন সুতো জাতিবিদ্বেষ না হয়ে হবে অভিন্ন বস্তুগত স্বার্থ, যেমন জমির অধিকার, জল জঙ্গলের অধিকার, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির অধিকার। সম্প্রদায়ের সীমানা ছাপিয়ে ইস্যুভিত্তিক প্রচার প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছবে। জল জঙ্গল জমির অধিকার জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, উঁচুনীচু, গরীব-বড়োলোক, ধার্মিক-অধার্মিক মানে না। সমস্ত জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এই জোটে, থাকবে না আদর্শগত বিশুদ্ধতার শুচিবাই। ধার্মিক হিন্দু মানেই হিন্দুত্ববাদী নয়, বুঝতে হবে এই দুটো শব্দের মানে আলাদা। আমি নাস্তিক, কাজেই আমার এই জোটে সবাইকে নাস্তিকই হতে হবে — সে জোট জন্মানোর আগেই তার গঙ্গাপ্রাপ্তি নিশ্চিত।
পাঁচ নম্বর - যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার আন্দোলন। ক্ষমতা ফিরবে রাজ্যের হাতে। শুধু বিজেপির শাসনকালেই নয়, ভারতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই। মোদির আমলে এই টেন্ডেন্সি চরম রূপ নিয়েছে, কারণ হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্যই হল ফেডারেশ অফ পিপলস-এর আইডিয়াকে মুছে দিয়ে এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম-এর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ন্যারেটিভকে ফাইনাল রূপ দেওয়া। ৩৭০ ধারার বিলোপ, হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া নানাভাবে, ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসিকে গায়ের জোরে চাপানো, পছন্দের রাজ্য সরকার না হলেই ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন-দের লেলিয়ে দেওয়া...বর্তমানে জুডিশিয়ারিকেও — সবই একটা ইউনিটারি মেজরিটারিয়ান রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে। এর পাল্টা কৌশল হল ফেডারেলিজমের পক্ষে ক্রমাগত গলা ফাটানোঃ রাজ্যের হাতে আরও ক্ষমতা; স্থানীয় সরকার, যেমন কর্পোরেশন বা পঞ্চায়ের হাতে আরও রিসোর্স; ভাষাগত আর সাংস্কৃতিক স্বশাসনের দাবী এবং সাংবিধানিক অধিকার; কেন্দ্রীয় আদিবাসী অঞ্চলগুলোকে ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা। সংবিধানে বলা যুক্তরাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী সমস্ত আইন প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাজ্যগুলোর রয়েছে, অন্ততঃ যতদিন না এই সরকার সংবিধানকেই বদলাতে পারছে — আর সেটা হতে দেওয়া যাবে না।
সবশেষে, এই লড়াইয়ের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা। গ্রামশি বলেছিলেন – যে দল গণতন্ত্র চর্চা করে না, তারা আধিপত্যের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে না। বাস্তব বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরণের মুভমেন্ট বা দলগুলোর ভিতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে এলিট উচ্চবর্ণের পুরুষদের মধ্যে। বাকিরা সেখানে ভোটব্যাঙ্ক। হ্যাঁ, একজন বামপন্থী কর্মী হয়েও লজ্জা না পেয়েই এই কথাটা বলছি, কারণ এটা বাস্তব। অধিকারের কথা বলবেন, অথচ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি থাকবে না সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় – তা তো হয় না। দরকারে অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ থাকবে; নিয়ম করে জাতিবাদ-বিরোধী, পিতৃতন্ত্র-বিরোধী প্রশিক্ষণ থাকবে দলের মধ্যেই – বিভিন্ন অফিসে যেমন প্রতি বছর নিয়ম করে POSH এর কোর্স করতে হয়। আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্বে থাকবে স্থানীয় লোক, দিল্লী থেকে নেমে আসা এলিট নেতা নয়। ইংরিজীতে একটা প্রচলিত কথা রয়েছে — “ডু হোয়াট ইউ সে”।
শুরুতেই যেমন বলেছিলাম — এই কাজগুলোর কোনোটাই গ্ল্যামারাস নয়। যন্তরমন্তরের অবস্থানে স্লোগান দেওয়ার মত উত্তেজনাপূর্ণ নয়। বোরিং কাজ যা জনসমক্ষে আসার সম্ভাবনা কম, কারণ অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে থাকা সুনীতা কুমারীকে মিডিয়া দেখাবে না। অবস্থানের যুদ্ধ এরকমই হয়। ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত। দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য্যের পরীক্ষা।
গ্রামশির কথা ধার করেই বলি: The old world is dying – কংগ্রেস স্টাইলের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান মৃতই বলা যায়। The new world – ন্যায়পরায়ণ, বহুত্ববাদী, ফেডারেল রিপাব্লিক – is not yet born. In this interregnum, a great variety of morbid symptoms – lynching, surveillance, hate speech – appear – as entertainment.
আমরা ওই ইন্টারেগনামে রয়েছি। নতুনের পথে এগিয়ে যেতে আমাদের সম্বল শুধু অসীম ধৈর্য্য আর পরিশ্রম। নতুনকে নিখুঁত গভীরতার সঙ্গে তৈরী করতে পারলে সেখান থেকেই উঠে আসবে নতুন কমন সেন্স। সঙ্ঘের অনুকরণে নয়, বরং আমাদের – সাধারণ মানুষের – নিজেদের প্রতিষ্ঠান, নিজেদের আখ্যান, নিজেদের আইন, নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে। এলিট ইংরিজীতে নয়; সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়।
চার্বাক তাঁর পান্ডুলিপির ইতি টানেন নতুন প্রজন্মকে ডাক দিয়ে: সংহতির কথা বলো; লেখো, গান গাও, বিতর্ক করো, সংগঠিত হও; নিজেদের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করো। নেতার অপেক্ষায় বসে থেকো না। এই দেশ, এই ভূখন্ড, এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষের — যদি প্রত্যেকে একসঙ্গে এই মাটিকে নিজের করে নেয়।
অশ্বত্থ গাছটার নীচে ফিরে যাও কমরেড। টিনের ট্রাঙ্কটা সঙ্গে রেখো। একজনকে পড়তে শেখাও।
।।। একটা অশ্বত্থগাছের গল্প ।।।
কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। দলিতদের ঝুপড়িগুলোর সামনে, একটু ফাঁকা জায়গায় একটা অশ্বত্থ গাছ। বুড়ো হয়েছে গাছটা, মাঝেমধ্যে দু একটা বাচ্চা ছেলে ছাড়া কেউ তার কাছাকাছি আসে না।
হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলে সঙ্ঘের শাখা৷ আশেপাশের তিনটে গ্রাম মিলিয়ে জনা পঞ্চাশ কমবয়সী ছেলে খাকি প্যান্ট পরে ব্যায়াম করে, ধুলো উড়িয়ে লাঠি খেলে, আর জয় শ্রীরাম বলে চিৎকার করে।
অশ্বত্থগাছটা একলাই দাঁড়িয়ে থাকে।


তারপর একদিন ওরা এল। ওরা মানে পার্টি। মিছিল নয়, গাদাখানেক লোকও নয়। একটা মেয়ে।
সুনীতা কুমারী। বছর পঁচিশের মত বয়স। জেলা সদরের কলেজ থেকে আইন পাশ করেছে, চাকরি করে না, ওকালতিও না। মেয়েটা পার্টির মেম্বার। সেই পার্টিটা যার কথা লোকে ভুলতে বসেছিল। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের আধভাঙা পার্টি অফিসে বসে জেলা সম্পাদক — বয়স হয়েছে তার, একটু খুঁড়িয়েও চলে — অনেকদিন আগে পুলিশের লাঠিতে পা ভেঙেছিল, আর সারেনি। একটা হাতলভাঙা চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে একদিন সে সুনীতাকে ডেকেছিল। পার্টি অফিসের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা লেনিন, ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের ছবির নীচে বসে সে বলেছিল — "আমাদের টাকাপয়সা নেই, লোকজনও কমে এসেছে। কিন্তু ওই গ্রামের অশ্বত্থগাছটা আমাদেরই। তুমি যাও — রোজ সন্ধ্যেবেলায় ওখানে বসে থাকবে। স্লোগান দেওয়ার দরকার নেই। শুধু বসে থাকো। অপেক্ষা করো"।
সুনীতা তর্ক করেনি। গ্রামে যাওয়া শুরু করল সে।
প্রথম দিন সন্ধেবেলা, একটা বাঁশের চাটাই, একটা কেরোসিনের লন্ঠন আর সেইদিনের খবরের কাগজটা নিয়ে সে বসে রইল...পাঁচটা থেকে সাতটা, ততক্ষণে গ্রামের বাইরে থেকে শেয়ালের ডাক শুরু হয়ে গেছে। একাই বসে রইল মেয়েটা, কেউ আসেনি তার কাছে। দ্বিতীয়দিন আবার গেল সে, আবারও একই ঘটনা। তিনদিনের দিন, কতগুলো বাচ্চা একটু দূর থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকে দেখে গেল। তার পরের দিন, এক মুসলমান চাষী এসে সুনীতার সামনে বসল হাঁটু মুড়ে। নাম ইউসুফ, আটষট্টি বছর বয়স, আট মাস ধরে সে চক্কর কাটছে বার্ধ্যক্য পেনশনের জন্যে। পায়নি। সুনীতা ইউসুফকে খবর পড়ে শোনাচ্ছিল — একটা নতুন সেচ প্রকল্পের খবর — নদীতে নতুন বাঁধ তৈরী হবে একটা। বুড়ো ইউসুফ পাত্তা দিল না। বললো — "জল নিয়া কী করব আমি? আমার পেনশন দ্যাও। বউ অসুস্থ। ওষুধ কিনতে পারি না। আট মাস ধরে ব্লক অফিসের চক্কর কাটতে আছি। ওরা টাকা চায়, টাকা কোত্থিকে দেব?"
সুনীতা বলে — "কাগজগুলো সব আছে তোমার কাছে"? "কাগজ, হুঁ:", বুড়ো হাসে। সুনীতা হাসে না। বরং পরের দিন একটা প্রো ফর্মা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে আসে সে। বুড়োর সঙ্গে বসে ফর্ম ভরে। তারপরের দিন সকালে বুড়ো ইউসুফকে নিয়ে ব্লক অফিসে যায়। বিডিও দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে — "বার বার আসো কেন বুড়ো? বলে দিয়েছি তো"! সুনীতা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, ফাইল হাতে। সেই দিনটা কেটে যায়। পরের দিন আবার যায় সুনীতা, আবার দাঁড়িয়ে থাকে অফিসারের সামনে। তারপরের দিন আবার। পাঁচ দিনের দিন অফিসার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলে সই করে দেয়। দুই হপ্তা পর ইউসুফের পেনশনের চিঠি এসে পৌঁছয় গ্রামের বাড়িতে।
ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু এইটুকুই। বিপ্লব নয়। একটা পেনশন মাত্র।
পার্টি কৃতিত্ব চায় না। সমাবেশও করে না এই লড়াইয়ে জিতে। শুধু সুনীতাকে পাঠাতে থাকে। রোজ। দিনের পর দিন। প্রতি সন্ধ্যেবেলা, সেই অশ্বত্থ গাছটার নীচে।
একমাস পর, বুড়ো জেলা সম্পাদক একটা টিনের ট্রাঙ্ক পাঠায় সুনীতার কাছে। ট্রাঙ্কে কয়েকটা বই — ভগৎ সিংকে নিয়ে, একটা আম্বেদরকরের লেখা, কয়েকটা আইনের বই, সংবিধানের একটা কপি, নানান ধরণের ফাঁকা কিছু অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম, একটা বাঁধানো খাতা যেখানে লোকজনের কথা লিখে রাখা যাবে, আর কয়েকটা ডটপেন আর রিফিল। সুনীতা ট্রাঙ্কটা অশ্বত্থ গাছের তলাতেই রেখে দেয়। রোজ বিকেলে পাঁচটার সময় এসে সে ট্রাঙ্কের তালাটা খোলে, আবার সাতটার সময় বন্ধ করে দেয়।
তারপর, আস্তে আস্তে আরো অনেকে আসে অশ্বত্থ গাছের তলায়। দলিত পাড়ার এক বউ — তার ছেলেকে বেধড়ক মেরেছে মহাজনের লোকেরা। ছোট জাতের কমবয়সী জোয়ান ছেলে একটা — লোন চেয়েছিল, কিন্তু ফর্ম ভরতে পারেনি; পড়তেই জানে না সে। এক বিধবা — তার রেশন কার্ড হারিয়ে গেছে। এক চাষা — বড় রাস্তা তৈরীর সময় তার জমি নিয়ে নিয়েছিল সরকার, কিন্তু সে তার প্রাপ্য টাকা পায়নি। সুনীতা তাদের সকলের সঙ্গে কথা বলে। সকলকে সাহায্য করতে থাকে। কোনো গরম গরম বক্তৃতা না দিয়েই। শুধু ফর্ম ভরে, দরকার মত কোথাও ফোন করে, আর একটা পুরনো সাইকেলে চালিয়ে ফাইলভর্তি ব্যাগ কাঁধে এই অফিস, সেই অফিস ছুটোছুটি করে...

সঙ্ঘের শাখার নজর পড়ে অশ্বত্থ গাছের দিকে। একদিন সন্ধ্যেবেলা শাখার প্রচারক এসে পৌঁছয় তর্ক করে সুনীতাকে হারিয়ে দেবে বলে; হেরে গেলে মেয়েটা বিদেয় হবে। প্রচারক অনেক চেঁচায় — লাভ জিহাদ আর হিন্দু ঐক্য নিয়ে, আর...পঁচিশ বছরের একলা মেয়ে সুনীতা সন্ধ্যেবেলা দলিত আর মুসলমানদের ঘরের পাশে কী করছে তাই নিয়েও। দপ্‌ করে জ্বলে ওঠে গাছতলায় বসে থাকা গরীব ঘরের লোকগুলো। কিন্তু সুনীতা রাগে না, চিৎকারও করে না। ঠান্ডা মাথায় শুধু জিজ্ঞেস করে — "এই বউটার রেশনকার্ডের উপায় আছে তোমার কাছে"? মেয়েটার শান্ত মুখ দেখে আর চারপাশে একটু অশান্ত লোকজনের ফিসফাস শুনে প্রচারক আর দাঁড়ায় না সেখানে। "পরে আসব" বলে চলে যায়, কিন্তু আর আসে না।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা ওদের গান শোনায় সুনীতা। শহরের পার্টি অফিসের ঘরে শেখা গান।
"আজ কমর বান্ধ তৈয়ার হোওয়ে কোটি ভাইয়োঁ,
হম ভুখসে মরনেওয়ালে, কেয়া মওতসে ডরনেওয়ালে"

গানের সঙ্গে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে গাছতলার মানুষগুলো।
ছয় মাস কেটে যায়। শহরের অফিসে পার্টি একটা মিটিং ডাকে, রাজ্যের বড় নেতাদের নিয়ে। নেতারা জিজ্ঞেস করেন: "কী পেলাম আমরা"? বুড়ো সম্পাদক বলে — "এখনও কিছুই না। তবে ওই অশ্বত্থ গাছটার নীচে এখন অনেক মানুষ আসে তাদের নানান সমস্যা নিয়ে, তাদের নিজেদের কথা বলে তারা। এটুকুও তো আমাদের ছিল না।"
পার্টি এই ছোট্ট মুভমেন্টটাকে ভিত্তি করে আরো বড় মুভমেন্ট গড়বে ঠিক করে। সকলের কাছ থেকে দুশো টাকা করে নিয়ে ওরা একটা টিনের ছাউনি কেনে। অশ্বত্থ গাছের পাশে দলিত পাড়ার মুখে ওই পাড়ার ছেলেদেরই কেটে আনা চারটে বাঁশের খুঁটির ওপর বসে সেই ছাউনি। তারপর পার্টি কেনে আরো একটা ট্রাঙ্ক। একটা ছোট লাইব্রেরি বানায় — শ দুয়েক বই, শহরের লোকজন দান করেছিল। ফসল কাটার আগে সবাই মিলে তৈরী করে শস্যের গোলা একটা। প্রতি সপ্তাহে শহরের এক রিটায়ার্ড উকিল আসতে শুরু করে অশ্বত্থতলায় — একটা লিগাল এইড ক্লিনিক বানিয়ে ফেলে সে। তারপর একটা সহজ যোগাযোগের ব্যবস্থাও বানিয়ে ফেলে নিজেরাই: একটা মিসড কল নেটওয়ার্ক। কারো কোনো জরুরী খবর দেওয়ার থাকলে — পুলিশ রেইড, নতুন সরকারী স্কিম, বাজারে ফসলের দামের বদল — মিসড কল দেবে সে সুনীতাকে। সুনীতা তখনই পালটা ফোন করে সব জেনে নিয়ে পাঁচজন ভলান্টিয়ারকে খবর দেবে, তারা আরও পাঁচজনকে জানাবে...এক ঘন্টার মধ্যে আশেপাশের গ্রামের অন্তত: একশো পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে খবরগুলো। আর, গাছের গুঁড়িতে পেরেক দিয়ে ঠোকা একটা নোটিস বোর্ডে সময়ে সময়ে আপডেট লিখে দেবে কেউ না কেউ...
এক সন্ধ্যেবেলা, কবিতা আসে অশ্বত্থ তলায়। কবিতা, অল্পবয়সী, মাহারদের ঘরের বউ। ক্ষেতে তুলো তুলে পেট চলে তার। দুই বছর আগে শ্বশুরবাড়ির লোক তার মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল জোর করে; মেয়েটা তখনো চোদ্দ বছরের মাত্র। দু বছর না ঘুরতেই বিধবা হয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। কবিতার ছেলে শহরে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করে, মাস গেলে মায়ের ঠিকানায় কিছু টাকা পাঠায়। কবিতা বলে — "আমাকে আর আমার মেয়েটাকে পড়ালিখা শেখাবে"?
শুরু হয় নাইট স্কুল। বাঁধা সিলেবাস নেই। সার্টিফিকেটও নেই। একটা বালব, একটা ব্ল্যাকবোর্ড আর মাটিতে বসা দশটা মেয়েবউ। কেউ মাহার, কেউ মুসলমান, কিন্তু সেসব নিয়ে কেউ ভাবে না। পাশাপাশি বসে তারা অক্ষর চিনতে শেখে। নিজের নাম লিখতে শেখে। তাদের রেশন কার্ডে কী লেখা আছে, পড়ে সেসব। জমির দলিল পড়তে শেখে। ওদেরই একজন হঠাৎ নজর করে যে মহাজন গ্রামের বাসিন্দাদের দুই একর জমি নিজের নামে করে নিয়েছে, এতদিন কেউ জানতোও না।
কবিতা বলে, "চলো তহশিলদারের কাছে যাই"। যায় ওরা। মহাজন তহশিলদারের খাস দোস্ত। মহাজন হা হা করে হাসে। তহশিলদার ওদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ওরা আবার যায়। তারপর আবার। পার্টি একজন উকিলকে পাঠায় জেলা সদর থেকে — চুপচাপ একটা লোক যে খুব একটা মিটিং মিছিল বক্তৃতা করে না। সেই উকিল একটা কেস ফাইল করে মহাজনের নামে। দু বছর লেগে যায় কোর্টে। হেরে যায় ওরা। তারপর আপীল করে। শেষ অবধি জিতেও যায় একদিন। জমি ফেরানো হয় গ্রামবাসীদের কাছে।
মহাজন ওদের জলের লাইন কেটে দেয়। পরের দিন সুনীতা পাশের গ্রাম থেকে একজন পুরনো ইঞ্জিনিয়ারকে ধরে আনে — লোকটাকে এক যুগ আগে বরখাস্ত করেছিল সরকার; ডিপার্টমেন্টের উপরওয়ালার দুর্নীতির ধরে ফেলেছিল সে, আজকাল টিউবওয়েল সারিয়ে পেট চালায়। সে ওদের শেখায় বোরওয়েল কী করে বসাতে হয়। ওরা নিজেরাই করে নেয় কাজটা। মহাজন ওদের থামাতে পারে না।
সেদিন রাতে আগুন জ্বালিয়ে তার চারদিকে ঘুরে নাচে ওরা; গান গায়।
"ইতনে বাজু, ইতনে সর, গিন লে দুশমন ধ্যান সে
হারেগা উও হর বাজি, যব খেলে হম জি-জান সে।"
বুড়ো একলা অশ্বত্থ গাছটা ততদিনে আর শুধু গাছ নয়। আর একলাও নয়। তার নীচে মানুষের ঢল নামে। গ্রামের উল্টোদিকে নীমগাছের পাশে সঙ্ঘের শাখা তখন রোজই চলে। কিন্তু, এখন অশ্বত্থ গাছের তলাতেও গড়ে উঠেছে পালটা জোট। ওরা সঙ্ঘের শাখার মত উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান দেয় না, বরং ওদের জোট বিকল্প হিসেবে রোজকার জীবনের চাহিদার কথা বলে। মেটিরিয়াল রিয়েলিটি। আর কোনো পেনশন আটকে থাকে না। থানার মিথ্যা মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয় ওদের ওপর থেকে। আধিপত্যবাদের কফিনে পোঁতা হয় আরও একটা পেরেক।
আরও দু বছর কাটে। পরের পঞ্চায়েত ভোটে পার্টি চমকে দেয় সকলকে। আগে কখনও এমনটা করেনি তারা। নিজেরা প্রার্থী না দিয়ে পার্টি সমর্থন করে কবিতার মেয়েকে। মাহী। সেই মেয়ে, যাকে চোদ্দ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল কবিতার শ্বশুরবাড়ির লোক৷ মাহীর বয়স আজ কুড়ি বছর; ওই অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে লিখতে পড়তে শিখেছে সে; জমির ঘটনাটা প্রথম নজরে পড়েছিল তারই; বোরওয়েলটা বসানোর সময় নিজের মাথায় করে ইঁট বয়েছিল সে। মাহী জিতে যায় বারো ভোটের ব্যবধানে।
লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করেনি মাহী। নিজেকে কমিউনিস্টও বলেনি। কিন্তু সে খেয়াল রেখেছিল যাতে গাছতলার সেই ছাউনিটা মেরামত হয়; বোরওয়েল পরিষ্কার করা হয়; আর স্কুলের বাড়িটায় একটা নতুন টয়লেট বসে।
পার্টির বুড়ো জেলা সম্পাদক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এক সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছয় অশ্বত্থতলায়। গাছের তলায় বসে সে দেখে — আশেপাশে বেশ কয়েকজন বউ মেয়েরা লন্ঠনের আলোয় পড়ছে। বুড়ো সুনীতাকে বলে — "একেই বলে অবস্থানের যুদ্ধ। বক্তৃতা নয়। মিছিলও নয়। শুধু একটা গাছতলা, একটা
টিনের ট্রাঙ্ক, আর সময়"।
সুনীতা হাসে। চোখ তুলে বলে, "আর, একটা পার্টি যে জানে কখন মুখ বুজে কাজ করে যেতে হয়"।
সেই অশ্বত্থ গাছটা আজও আছে। ট্রাঙ্কটাও। নাইট স্কুলটাও। আর আছে সেই পার্টিটাও। লাল ঝান্ডার পার্টি। আগের মত শুধু স্লোগান দেওয়া ভোটে লড়া পার্টি নয়। নতুনভাবে, ধৈর্য্য ধরে দিনের পর দিন মানুষকে নিয়ে জোট বাঁধার বোরিং কাজগুলো করে যাওয়া পার্টি। এমন একটা পার্টি যারা শুধু গলা তুলে আরো জোরে চেঁচিয়ে জেতার চেষ্টা করে না; এই পার্টিটা জেতে আম আদমির সমস্যার সমাধান ছিনিয়ে এনে — যে সমস্যার সমাধান শাসকশ্রেণী করতে চায় না। এই পার্টিটা জেতে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জোট বেঁধে।
এমনটাই হয় কাউন্টার-হেজিমনি...একমাত্র পথ যেটা কাজ করে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬

আজকের ভারত ও গ্রামশির তত্ত্ব ~ অরিজিত মুখার্জী

প্রায় একশো বছর আগে, মুসোলিনীর আমলে ইটালিতে জেলে বন্দী থাকাকালীন গ্রামশি বেশ কিছু তাত্ত্বিক কথাবার্তা লিখে রেখেছিলেন। তার মধ্যে আধিপত্য বা হেজিমনি নিয়েও বেশ কিছু আলোচনা ছিল। এই ২০২৬ সালে বসে, ভাবলে অবাক লাগে কীভাবে গ্রামশির সেই তত্ত্ব মোদীর ভারত সম্পর্কে একদম খাপে খাপে বসে যায়...যেন ভদ্রলোক সেই ১৯২৬ সালে বসেই আজকের ভারতকে দেখতে পেয়েছিলেন...

হিন্দুত্ববাদ সিরিজটার কন্টিন্যুয়েশন: গ্রামশির আধিপত্যবাদের তত্ত্ব। 

এখানে একটা ডিসক্লেমার দিয়ে রাখি। আমার চেয়ে অনেক জ্ঞানীগুণী বিদ্বান লোকেরা এই নিয়ে অজস্র লেখালেখি করেছেন। আমি এই সিরিজটায় শুধুমাত্র সেগুলোকে আরো অ্যাক্সেসিবল করার চেষ্টা করছি। সহজ ভাষায়। বোর হলে স্ক্রোল করে বেরিয়ে যাবেন।

সাধারণত: আমরা বেশিরভাগ মানুষই মনে করি ক্ষমতা আসে বন্দুকের নল থেকে, বা পুলিশের উর্দি থেকে, বা আইন আদালত বিচারব্যবস্থার হাত ধরে। গ্রামশি বলেন এটা ক্ষমতার অর্ধেক মাত্র। শাসক গোষ্ঠীর হাতে এই সব শক্তি ছাড়াও থাকে সাধারণ মানুষের কনসেন্ট। একটা ছোট্ট শাসকগোষ্ঠী যখন তাদের "ওয়ার্ল্ডভিউ" বা পৃথিবী সম্পর্কে তাদের ধারণা-কে গোটা নাগরিক সমাজের "কমন সেন্স" হিসেবে খাড়া করে ফেলতে পারে, তখনই সেটা তৈরী করে পরিপূর্ণ আধিপত্য।

ভেবে দেখুন। গরীব হিন্দু নোট বাতিলের সময় ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাঙ্কে লাইন দেওয়ার পরেও কেন আম্বানি-আদানিদের চৌকিদারি করা এই সরকারটাকে সমর্থন করে? কেন দলিত আর আদিবাসীরা, লাগাতার নানারকম জাতিবিদ্বেষের মুখে পড়েও, জয় শ্রীরাম বলে বিজেপির মিছিলে যায়? কেন একজন সাধারণ দিন-আনি-দিন-খাই অটোচালকও পোশাক বা ফেজটুপির ভিত্তিকে কাউকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেয়? এদের নাকের ডগায় কেউ বন্দুক ধরেছিল? না তো! তা সত্ত্ব্বেও এই ঘটনাগুলো ঘটে। শম্ভুলাল রেগর একজন অতি সাধারণ গরীব পরিযায়ী শ্রমিককে লাভ জিহাদের নাম করে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেয়। আখলাক আহমদকে একদল একই রকমের গরীব লোক টেনে বাড়ি থেকে বের করে এনে পিটিয়ে মেরে ফেলে। খুঁজে দেখলে গত দশ বছরে লিঞ্চিং এর ঘটনা গুণে শেষ করা যাবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৩ এর মধ্যে শতাধিক লিঞ্চিং-এর ঘটনা ঘটেছে — অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিকার মুসলমান বা দলিত। এবং এই ঘটনাগুলোকে কনডেম করা তো দূরের কথা, অজস্র লোক এগুলোকে নানাভাবে সমর্থন করে এগুলোকে নর্মালাইজ করেছে।

কেন? কারণ এই সবই পাব্লিকের "কমন সেন্স" হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলের বই থেকে, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড থেকে, সারাদিন ধরে টিভিতে চলা হাই-পিচ ডিবেট থেকে, বিভিন্ন আখড়ার মহন্তদের ফরমান থেকে...

হেজিমনি মানে এমন নয় যে ক্ষমতাশালীরা আপনাকে রোজ মেরেধরে পথে এনে ফেলছে। বরং আপনার মগজের দখল ওরা ইতিমধ্যেই নিয়ে ফেলেছে। আপনার মাথার মধ্যে ওরা অলরেডি জয়ী।

গ্রামশি দুরকম যুদ্ধের কথা বলেছিলেন। এক, ওয়ার অফ ম্যানুভার, বা কৌশলের যুদ্ধ। আর দুই, ওয়ার অফ পোজিশন — অবস্থানের যুদ্ধ। প্রথমটা টিপিকালি সরাসরি লড়াই — স্ট্রাইক, লাগাতার হরতাল, ভোটের সময় কোনো একদিকে ঢলে পড়া সেন্টিমেন্টের ঢেউ। আর দ্বিতীয়টা লংটার্ম, খানিকটা ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত — ধৈর্য্যের পরীক্ষা। সময় নিয়ে আস্তে আস্তে স্কুলকলেজ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক গ্রুপ, ধর্মীয় পরিসর, বিকেলে পার্কে হাঁটতে যাওয়া "উই আর অ্যাবভ সিক্সটি" গ্রুপ বা সকালের লাফিং ক্লাব, আমার আপনার রোজকার নানান অভ্যাস — সবকিছুকে নিজেদের দখলে আনা।

সঙ্ঘ পরিবার একশো বছর ধরে এই অবস্থানের যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। শাখায় হিন্দু সংস্কৃতির গর্ব। স্কুলে বদলে যাওয়া ইতিহাস। অসংখ্য "অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল" — প্রচারক, প্রথাগতভাবে উচ্চশিক্ষিত না হলেও যারা হিন্দু সেন্টিমেন্টকে খুঁচিয়ে তুলতে পারে। মন্দির ট্রাস্টের ম্যানেজার; আখড়ার মহন্ত; শহরে গ্রামে প্রতিনিয়ত যারা হিন্দুত্বকে "কমন সেন্স" বলে চালিয়ে চলে। এর পাশাপাশি, গত দুই দশকে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এই যুদ্ধ ছড়িয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে ফেক নিউজ ভাইরাল করার ডিজিটাল সৈনিক; লাভ জিহাদ আর ঘর ওয়াপসির মত ন্যারেটিভ, চেহারা পেশা পোশাক নিয়ে মিসোজিনি ছড়িয়ে দাঁত নখ বের করা পুরুষতন্ত্রকে জিইয়ে রাখা সমাজমাধ্যম আর মিডিয়াতে বাণী দেওয়া সমাজচিন্তক; সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার যারা অনায়াসে বলে সেকুলারিজম মানে অ্যান্টি হিন্দু; ডীপ ফেক ক্রিয়েটর; সুদর্শন নিউজ বা রিপাবলিক টিভির মত অগুণতি টিভি চ্যানেলে তারস্বরে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ ছড়ানো সাংবাদিক; এসআইআরের আগে বাংলা চ্যানেলে বসে "কোটি কোটি বাংলাদেশী রোহিঙ্গা ভারতে ঢুকে পড়েছে" বলা বুদ্ধিজীবী; সরকারকে প্রশ্ন করা ছাত্র যুবক বা অন্য সাধারণ মানুষদের আরশোলা বলে দেওয়া বিচারক; কনসেন্ট আজ তৈরী হয় সেকেন্ডের মধ্যে।




আর এই যুদ্ধের পাশাপাশি এসেছে ওয়ার অফ ম্যানুভার — কৌশলগত আক্রমণ: ভোটে জিতে বুলডোজার অ্যাকশন, এসআইআর, আর্টিকল ৩৭০ — এই ম্যানুভারের প্রত্যেকটাই জনসমর্থন পেয়েছে, কারণ এর জমি তৈরী হয়েছে এতদিনের অবস্থানের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। বিরোধীদের বিরাট বড় মিছিলে বিজেপির আর কিস্যু এসে যায় না। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষক আন্দোলন চলার পরেও বিজেপি বিধানসভা ভোটে জেতে। নোটবাতিলের সময় বা কোভিডের সময় সাধারণ মানুষের চরম হেনস্থার পরেও একই ঘটনা ঘটে...

কারণ, জমি তৈরী হয়ে গেছে। ভারতের আশি শতাংশ হিন্দু, বিশ্বাস করে নিয়েছে যে ভারতের সাংস্কৃতিক শেকড় রয়েছে এক ও একমাত্র হিন্দু চেতনার মধ্যেই।

আর আছে ক্রনি ক্যাপিটালিজম — শাসক জোটের অন্য অংশটা।

গ্রামশি ক্ষমতায় আসীন এই জোটের নাম দিয়েছেন "ঐতিহাসিক জোট" (historic bloc) — ভারতে সেটা তৈরী হয়েছে হিন্দুত্ববাদ আর ক্রনি ক্যাপিটালিজমের মধ্যে। যারা একে অপরকে শক্তি যোগায়।

আম্বানি, আদানিরা হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী নেশন-বিল্ডার। হিন্দু রাষ্ট্র আর প্রাচীন ভারতের গ্লোরি ফিরিয়ে আনার নৈতিক ছাতার নীচে তাদের মুনাফা লোটার কারিকুরি চাপা পড়ে। হিন্দুত্ববাদী শাসক গোষ্ঠী পায় ফান্ডিং: ইলেক্টোরাল বন্ড, বিজ্ঞাপন, মন্দির করিডোরের জন্যে জমি — একই সাথে যেটা রিয়েল এস্টেটও বটে। আর গরীব খেটে খাওয়া মানুষ, মুটে মজুর, পরিযায়ী শ্রমিকদের বোঝানো হয় যে গরীবের পকেট কেটে সুইস ব্যাঙ্কের লকার ভরানো পুঁজিপতি বা পাব্লিক ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে দেশ ছেড়ে পালানো বেওসাদার বা গলা অবধি দুর্নীতিতে ডুবে থেকে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা রাজনীতিকরা নয়, তাদের সমস্ত সমস্যার মূলে ওই "ওরা" — মুসলমান বা ক্রীশ্চানরা। কারণ ওরা সবাই জেহাদি, ঘুসপেটিয়া ইত্যাদি।

শ্রেণীর ক্ষোভকে চাপা দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভয় দেখিয়ে।

আম্বানি বা আদানির মত পুঁজির মালিকেরা নিজেদের 'অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল' তৈরী করে — ইকোনমিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, কর্পোরেট মিডিয়া চ্যানেল, ব্যবসাবান্ধব আইনজীবী, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় "ন্যাশনালিস্ট" ইনফ্লুয়েন্সার। যখন দেখবেন কোনো টিভি চ্যানেল সরকারের নীতিকে প্রশ্ন না করে সরকারের পোষা অর্থনীতিবিদকে টকটাইম দিচ্ছে, তখন জানবেন যে কর্পোরেট স্বার্থ আর জাতীয়তাবাদ একই সুতোয় গাঁথা। যখন দেখবেন যে অজান্তে আপনিও কখন ভাবতে শুরু করেছেন আম্বানি-আদানিদের বিকল্প নেই, ওরা তো পরিশ্রম করেই অত উঁচুতে উঠেছে, তখন বুঝবেন আপনিও এই কনসেন্ট তৈরীর ফাঁদে পড়ে গেছেন।

এই হল সফিস্টিকেশনের চরম পর্যায়ে থাকা আধিপত্যবাদ বা হেজিমনি। রাষ্ট্রক্ষমতা তো ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছেই — পুলিশ, ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন, আদালত, বুলডোজার। মাঝেমধ্যে সামনেও চলে আসে — এনকাউন্টার, প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন, ইউএপিএ, ইন্টারনেট শাটডাউন, নির্বাচনের সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা। কিন্তু আসল ম্যাজিক লুকিয়ে রয়েছে আম আদমির কনসেন্টে; লক্ষ মানুষের স্বেচ্ছায় নিজেদের সরকারের দাসানুদাস মেনে নেওয়ার মধ্যে; "সরকার মাই বাপ" মানসিকতায়। কারণ একশো বছর ধরে জমি তৈরী করা হয়েছে: দেশ মানে রাষ্ট্র, সরকার; আর দেশকে ভালোবাসা মানে সমস্ত ক্ষুধার সূচক, বাচ্চা আর মেয়েদের স্বাস্থ্যের সূচক, প্রেস ফ্রীডম ইন্ডেক্স, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির দাবী, সব ভুলে গিয়ে গায়ে মাথায় মুখে জাতীয়তাবাদের রঙ মেখে তারস্বরে বন্দে মাতরম চিৎকার। রাষ্ট্রক্ষমতা আর কনসেন্টের মিশেলে তৈরী হওয়া coercive-hegemonic hybrid...

তবে কোনো হেজিমনিই চিরকালীন নয়, আশার কথা এইটুকুই। গ্রামশি লিখেছিলেন যে শাসক ততদিনই আধিপত্য বজায় রাখতে পারে যতদিন সে জনতার কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে। হিন্দুত্ব সেটাই করে: বিনামূল্যে রেশন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, দলিত/আদিবাসীদের লার্জার হিন্দু ফোল্ডে টেনে নেওয়ার অ্যাসপিরেশন। সঙ্গে "ওদের" ঢিট করার জন্যে বুলডোজার; মব লিঞ্চিং-এ ছাড়; অনলাইন ও অফলাইনে মিসোজিনির ঢালাও পারমিশন; হেজিমনি বজায় রাখতে সাহায্য করার ইন্সেন্টিভ।

কিন্তু ফাটল ঠিকই দেখা দেয়। বেকারির জ্বালা, জিনিসপত্রের দাম, শিক্ষা স্বাস্থ্যের সংকট, ডুবতে বসা অর্থনীতি, হিন্দুত্বের মধ্যে জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন প্রদেশে আঞ্চলিক প্রতিরোধ...

বিপ্লবের মুহূর্ত আসে যখন দেশজোড়া কনসেন্টে ফাটল ধরে; যখন মানুষ বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়। তখন রাষ্ট্রকে প্রকাশ্য শক্তির আশ্রয় নিতে হয়।

সেই সময় এখনো আসেনি। কিন্তু আসবে। সেই সময়কে তৈরী করা যায় — কাউন্টার হেজিমনির মাধ্যমে। সহজ নয়। খন্ড বিখন্ড চিন্তাভাবনা; আইডেন্টিটির লড়াই; স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মত মিডিয়ার অভাব; অর্থের অভাব। তবুও সময়কে তৈরী করা সম্ভব।

কীভাবে? লিখব।

#হিন্দু_খতরে_মে_হ্যায় #হিন্দুত্ববাদ #ন্যারেটিভ_বিল্ডিং