ছয় বছর ধরে আমি বেওয়ারিশ লাশের ছবি ফাইলে তুলি। গত মঙ্গলবার একটা পুরনো ফাইল খুলে আমি নিজের মুখটা দেখলাম!
ছবিটা পঁচিশ বছর আগের।
আমার নাম শিরিন। বয়স সাতাশ বছর। তেজগাঁও থানার রেকর্ড শাখায় কাজ করি। পদটা বড় কিছু না, অফিস সহায়ক। কাজ হলো কাগজ গোছানো, ফাইল নাম্বার তোলা আর অজ্ঞাত লাশের ছবি ও তথ্য সংরক্ষণ করা।
চাকরিটা আমি পেয়েছিলাম আব্বার সূত্রে। আব্বার নাম আজিজুল হক। এই থানারই কনস্টেবল ছিলেন। বাহাত্তর সালের পরে জয়েন করেছিলেন। অবসর নিয়েছেন বারো বছর আগে। আম্মা মারা গেছেন আমার এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়টায়।
কাজটা শুনতে যতোটা ভয়ংকর লাগে, ততোটা আসলে না। ছয় বছর পর এইটা আর দশটা অফিসের কাজের মতোই হয়ে যায়। ছবি তোলো, নম্বর বসাও, তারিখ বসাও। পরিচয়ের ঘরে লিখো অজ্ঞাতনামা।
শুধু একটা অভ্যাস আমি ছাড়তে পারিনি। ফাইল বন্ধ করার আগে প্রত্যেকটা মুখ আমি একবার করে দেখি। মানুষটা কে ছিলো, কোন ঘরে কে অপেক্ষা করেছিলো ওর জন্য, এইসব ভাবি। তারপর ফাইলটা তাকে তুলে রাখি।
আমাদের রেকর্ড রুমে সাতশোর বেশি মানুষ আছে, যাদের নাম কেউ জানে না।
মিরপুরে আমাদের দুই রুমের ফ্ল্যাট। আব্বা এখন আর বেশি হাঁটতে পারেন না। হাঁটুতে সমস্যা, চোখেও কম দেখেন। সারাদিন বসে থাকেন বারান্দায়।
আমি অফিস থেকে ফিরলে উনি জিজ্ঞেস করেন, আজকে কয়টা ফাইল হইলো মা?
আমি কখনো দশটা বলি, কখনো বলি বারোটা। উনি মাথা নাড়েন বিজ্ঞের মতো। এই এক কথার মঞ্চায়ন ছয় বছর ধরে চলছে।
মানুষটা সারা জীবনে আমার গায়ে একদিনও হাত তোলেননি। আমার এসএসসির রেজাল্টের দিন থানার সামনের দোকান থেকে মিষ্টি কিনে সবাইকে খাইয়েছিলেন।
আমাদের ছিলো তিনজনের ছিমছাম সাজানোগোছানো পরিবার। এখন দুটি মাত্র মানুষ।
গত বছর থানায় নতুন একটা সফটওয়্যার বসানো হলো। মুখ দেখে মানুষ চেনার সফটওয়্যার। আমারসহ হাজিরার জন্য থানার সব স্টাফের মুখ ওই সফওয়্যারে তোলা হয়েছে।
সেই সাথে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, পঁচিশ বছরের পুরনো অজ্ঞাত লাশের হার্ডকপির ফাইলগুলো স্ক্যান করে সিস্টেমে তুলতে হবে। প্রায় ন'শো ফাইল। রোজ অফিস শেষে দুই ঘণ্টা করে বাড়তি সময় দিতাম।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমি উনিশশো নিরানব্বই সালের একটা ব্যাচ আপলোড করছিলাম। হঠাৎ স্ক্রিনে রেড সিগন্যালের সাথে একটা বার্তা এলো। সিস্টেম বলছে, আপলোড করা একটা ছবির সাথে বিরানব্বই শতাংশ মিল পাওয়া গেছে থানার একজন কর্মচারীর!
কর্মচারীর নাম শিরিন আক্তার।
আমি ফাইলটা খুললাম।
স্টিলের অটোপসি টেবিলে একজন মহিলার লাশ। বয়স আন্দাজমতে ছাব্বিশ বছর। চোখ দুইটা আধখোলা। চুল কপালের উপর লেপ্টে আছে।
আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ঘরে তখন আমি ছাড়া কেউ ছিলো না। এসিটা বন্ধ ছিলো, তবু আমার হাত ঠান্ডা হয়ে আসছিলো।
ফাইলে লেখা, উনিশশো নিরানব্বই সালের নয়ই মার্চ। তেজগাঁওয়ের একটা বাসা থেকে দুইটা লাশ উদ্ধার। একজন পুরুষ, বয়স আন্দাজ তিরিশ। একজন মহিলা, বয়স আন্দাজ ছাব্বিশ। দুইজনেরই পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। মামলা নম্বর দেওয়া আছে। তদন্তের অগ্রগতির ঘরে লেখা, নথিভুক্ত।
নথিভুক্ত মানে ফাইল বন্ধ। কেউ কিছু করেনি।
সেই রাতে বাসায় ফিরে আমি আলমারির উপর থেকে পুরনো অ্যালবামটা নামালাম।
আমার সবচেয়ে ছোটবেলার যেই ছবিটা আছে, ওইটাতে আমার বয়স তিন কি সাড়ে তিন। স্টুডিওতে তোলা, ব্যাকগ্রাউন্ডে নীল পর্দা।
এর আগের কোনো ছবি নাই। একটাও না।
ছোটবেলায় একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এ বিষয়ে। আম্মা বলেছিলেন, তোর একদম ছোটবেলার ছবিগুলা বন্যার পানিতে নষ্ট হইয়া গেছিলো।
কথাটা আমি বিশ্বাস করেছিলাম। পঁচিশ বছর ধরে বিশ্বাস করে এসেছি।
পরদিন আমি আমার সহকর্মী রফিক ভাইকে ব্যাপারটা দেখালাম। উনি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন।
আশ্বস্ত করার কণ্ঠে বললেন, এইটা সফটওয়্যারের পুরনো সমস্যা, শিরিন। আত্মীয়দের মুখ গুলায়া ফেলে। মা-মেয়ে, বাপ-ছেলে, এইগুলাতে প্রায়ই ভুল মিল দেখায়। তুমি এইটা নিয়া মাথা ঘামায়ো না।
কথাটা উনি হালকা করে বললেন যদিও। আমার মাথা থেকে আর নামলো না।
তিন দিন পর নতুন একটা লাশ এলো।
ফার্মগেটের বাস কাউন্টারের পাশে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। ভোরবেলা লোকজন দেখতে পায়। কাছে কোনো কাগজপত্র, মোবাইল কিংবা টাকাপয়সা ছিলো না। বয়স আনুমানিক আটাত্তর বছর।
আমাকে ডাকা হলো ছবি তুলে ফাইল খোলার জন্য।
মর্গের বাইরের ঘরে ঢুকে ওনার মুখটা দেখে আমার হাত থেমে গেলো।
মানুষটাকে আমি চিনি।
উনি প্রতি বছর থানায় আসতেন। মানুষটার মুখভর্তি সাদা দাড়ি, কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ, হাতে পুরনো কাগজের বান্ডিল। ডিউটি অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা বলতেন। তারপর বেরিয়ে যেতেন।
আমি ওনাকে ছয় বছরে অন্তত চারবার দেখেছি। দুইবার পানি খেতে দিয়েছি নিজ হাতে।
গত বছর উনি আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। আমি ভেবেছিলাম চোখে কম দেখেন। যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মা, তোমার নামটা কী?
আমি বলেছিলাম, শিরিন।
উনি মাথা নেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
সেদিন বিকালে আমি রেকর্ড রুমে ঢুকলাম। থানার পুরনো সাক্ষাৎ রেজিস্টারগুলো তাকের সবচেয়ে উপরে থাকে। ধুলায় ভরা, বাঁধাই খুলে যাওয়া।
আমি নয়ই মার্চের পাতাগুলো খুঁজতে লাগলাম।
রেজিস্টারগুলো সাল ধরে সাজানো। প্রতিটা খাতা আধা হাত পুরু। একটা করে নামাই। নয়ই মার্চের পাতাটা বের করি, তারপর আবার তুলে রাখি।
দুই হাজার সালের খাতায় প্রথম নামটা পেলাম। তারপর দুই হাজার এক। তারপর দুই হাজার দুই।
ছয় নম্বরটার পর আমার হৃৎস্পন্দন গেলো থেমে। হাত কাঁপা শুরু হলো।
চব্বিশটা এন্ট্রি পেলাম।
প্রতি বছর নয়ই মার্চ। একই নাম, আব্দুল বারেক। একই ঠিকানা, নরসিংদী। বিষয়ের ঘরে কথা পর্যন্ত এক, মামলা নম্বর ৪৭/৯৯ সংক্রান্ত খোঁজ।
আর শেষ ঘরে, যেখানে অফিসারের মন্তব্য লেখার কথা, প্রতিবার ঘুরেফিরে তিনটা মাত্র শব্দ। কোনো তথ্য নাই।
শেষ ছয়টা এন্ট্রি আমার নিজের হাতের লেখা।
রাতে বাসায় ফিরে আমি আব্বার সামনে গিয়ে বসলাম। হাতে ফাইলের প্রিন্ট কপি।
যথাসম্ভব কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললাম, আব্বা, নিরানব্বই সালের নয়ই মার্চ তেজগাঁওয়ে যেই কেসটা হইছিলো, আপনি ওইদিন ডিউটিতে ছিলেন?
আব্বা কাগজটার দিকে তাকালেন। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
আমি ভেবেছিলাম উনি জিজ্ঞেস করবেন, এইটা কী? কিংবা বলবেন মনে নাই। উনি কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় বললেন, বসো।
তারপরের কথাটুকু আমি ওনার ভাষ্যমতেই লিখছি।
আমরা তিনজন গেছিলাম। সকাল সাতটার দিকে খবর আসছিলো। ঘরে দুইটা লাশ। ভিক্টিম স্বামী-স্ত্রী। কে মারছে, ক্যান মারছে, আজ পর্যন্ত কেউ জানে না।
তিনটা ঘর আমরা খুঁজছি। কিছু পাই নাই। শেষে গিয়া পাইলাম খাটের নিচে।
একটা ফুটফুটে বাচ্চা মাইয়া। বয়স দুই কি আড়াই। খাটের নিচে বইসা আছিলো। কান্দে নাই, শব্দও করে নাই। মুখ জুইড়া ভয়ের ছাপ। আমারে দেইখা ছোট্ট হাতটা বাড়াইয়া দিছিলো।
আমি একটু থেমে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর?
তোর মায়ের কোল এগারো বছর খালি আছিলো, শিরিন। ডাক্তার দেখাইছি, পীরের কাছে গেছি, কিচ্ছুতে কোনো কাজ হয় নাই।
আমি বাচ্চাটারে কোলে নিয়া গাড়িতে উঠছি। রিপোর্টে লিখছি, ঘরে জীবিত কাউরে পাওয়া যায় নাই।
ঘরে তখন কোনো শব্দ ছিলো না। বারান্দার দরজাটা খোলা ছিলো। বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ আসছিলো থেমে থেমে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি জানতেন যে একটা লোক প্রতি বছর থানায় আসতো?
আব্বা হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লেন।
তারপর বললেন, প্রথম দশ বছর আমি নয়ই মার্চ তারিখে ছুটি নিতাম।
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। জিজ্ঞেস করার মতো কিছু বাকি ছিলো না।
আব্দুল বারেক ছিলেন আমার নানা। ছবির ওই মহিলা আমার মা।
লোকটা পঁচিশ বছর ধরে নরসিংদী থেকে বাসে করে ঢাকা আসতেন শুধু একটা প্রশ্ন করার জন্য। মেয়ে আর জামাইয়ের লাশ উনি পেয়েছিলেন। নাতনির লাশ পাননি। রিপোর্টে যেহেতু লেখা ছিলো ঘরে জীবিত কেউ ছিলো না, উনি ধরে নিয়েছিলেন বাচ্চাটাও মরে গেছে।
উনি আসলে সারাজীবন একটা লাশ খুঁজতে এসেছেন। যেই লাশটা কোনোদিন ছিলোই না।
ওনার লাশ আঞ্জুমানের গাড়ি নিয়ে গেছে। আমি কিছু দাবি করিনি। করার মতো কোনো কাগজ আমার হাতে নাই। ডিএনএ পরীক্ষা করাতে গেলে আব্বার নামে মামলা হবে। মানুষটার বয়স তিয়াত্তর বছর। হাঁটুর ব্যথায় হাঁটতে পারে না।
আমি জানি এইটা কোনো যুক্তি না। তবু চুপ করে আছি।
সেদিন রাতে থানা খালি হয়ে গেলে আমি রেজিস্টার খাতাটা টেবিলে রাখলাম।
পঁচিশ নম্বর এন্ট্রিটা এবার লিখলাম নিজের হাতে।
তারিখ লিখে নামটা লিখলাম যত্ন করে, আব্দুল বারেক। ঠিকানা, নরসিংদী। বিষয়ের ঘরে লিখলাম, নাতনির খোঁজ।
আর শেষ ঘরে, যেখানে চব্বিশবার লেখা হয়েছিলো কোনো তথ্য নাই, সেখানে লিখলাম, পাওয়া গেছে।
আমার সরকারি কাগজে যেই নামটা লেখা, ওইটা আমার না। আমার আসল নামটা পুরনো একটা জিডির কপিতে লেখা আছে, নূরজাহান। বাসায় সবাই নাকি নূরী ডাকতো।
পঁচিশ বছরে এই নামটা একজন মানুষই মনে রেখেছিলো।
গত বছর উনি আমার দিকে আর্দ্র চোখে তাকিয়ে নামটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি ভাগ্যের ফেরে ভুল নামটা বলেছিলাম। তারপর ওনাকে বিদায় করেছিলাম এক গ্লাস পানি খাইয়ে।
এন্ট্রি নম্বর পঁচিশ
তাইমুর মাহমুদ শমীক


