স্যার, এখন তো আর বিশ্বভারতীর খবরদারি নেই রবিঠাকুরের গানে, এখন আমরা সবাই রাজা, দারুন চর্চা হচ্ছে চারদিকে, সবাই বেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে সুরে, বেসুরে, অসুরে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাউড স্পিকারে বাজছে রবীন্দ্রসঙ্গীত- এটার একটা সুফল তো আছেই, কি বলেন স্যার?
আচ্ছা স্যার, বিশ্বভারতী আপনার রেকর্ড করবার ওপর হটাত নিষেধ জারি করেছিল কেন? ১৯৬৪ সালে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড থেকে হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানীর কাছে একটি চিঠি আসে, সে চিঠিতে আমার রেকর্ড করা দুটি গান (‘এসেছিলে তবু আস নাই’ ও ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’) সম্পর্কে মিউজিক বোর্ডের পরীক্ষকের আপত্তির কথা জানানো হয়। সেকালে রবীন্দ্রনাথের গানের রেকর্ড প্রকাশ করার আগে বিশ্বভারতী-নিয়োজিত অনুমোদকের ছাড়পত্রের প্রয়োজন হত। এক্ষেত্রে গানদুটিকে অনুমোদন করায় আপত্তির কারণ ছিল যথাক্রমে “uncalled for musical interludes…making the production awfully jarring and distorted” ও “awfully melodramatic voice productions. echo-chamber…. utterly spoiled the fine note combinations in the song”। সে যাই হোক আমি বোর্ডের কর্তা, শান্তিদেব ঘোষের কাছে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করি যে অভিযোগ গুলো সত্যি না, তারপর সেই রেকর্ডের অনুমোদন পাই। এরপর ক্রমাগত বাধা আসতে থাকে, পরে রবিঠাকুরের গান রেকর্ড করাই বন্ধ করে দি।
তবে স্যার আমার মনে হয় এই যুক্তিগুলো অধিকাংশই অযৌক্তিক ও অসংগত ছিল, গায়কীতে গতানুগতিকতার বাইরে পা রাখলে কখনো তা হয়ে ওঠে notation-ভঙ্গের অভিযোগ, কখনো বা অনুমোদিত লয় ভাঙার দোষে দুষ্ট আবার চিরাচরিত musical arrangement-(এস্রাজ, বাঁশি, সেতার, সারেঙ্গী, তানপুরা, বেহালা, দোতারা, একতারা, বাসবেহালা, অরগান, পাখোয়াজ, বাঁয়াতবলা, খোল, ঢোল ও মন্দিরা), এর বাইরে গিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করলেই তা মিউজিক বোর্ডের চোখে “excessive music accompaniment hampering sentiments of the song” হয়ে ওঠে, এ তো সেই চিরাচরিত রাজনীতি, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ চরিতার্থ করা বা আপনার চূড়ান্ত সুখ্যাতি কিছু লোক ভালো চোখে দেখেন নি।
তবে স্যার, এর ফলে আপনার জনপ্রিয়তা আরও কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়েছিল কি বলেন,
সে আর বলতে? মিডিয়া আর ভক্তদের ভালবাসায় অতিষ্ঠ হবার জোগাড়। হ্যাঁ স্যার বাবা, কাকা, মামাদের কাছে শুনেছি সে কথা, প্রেক্ষাগৃহের বাইরে হাজার ভক্তের ভিড়, টিকেটের জন্য সারারাত লাইন দিচ্ছে লোকে, তখন তো স্যার ইউ টিউব, ডাটা কার্ড, মোবাইল ছিল না, আর সামনা সামনি গান শুনবার রোমাঞ্চটাই আলাদা।
তবে স্যার আপনার গানগুলো যখন শুনি অদ্ভুত একটা অনুভুতি হয়, আমি যখন ৮-৯ বছর তখন একটা প্রায় অন্ধকার ঘরে পুরনো এক টেপ রেকর্ডারে আপনার গাওয়া সুনীল সাগরে শুনি, মামাবাড়িতে, কিছুই বুঝিনি তখন, কিন্তু গানটা আমাকে তাড়া করে বেড়াত, আসলে সেই গায়কীটা, ওই যখন আপনি গাইছেন তুলনাহীনা রে, তুলনাহীনা রে... আমি একটা ছবি দেখতে পেতাম, একটা সমুদ্রের ঢেউয়ে একটা নৌকো দুলছে, তাতে আমি বসে এক্কেবারে একা, ভয় যে করছে না তা নয়, তবে ঐযে ইমন, কেদারা, বেহাগ, বাহার আরও কত সুর, রাগ তাল একাকার হয়ে যাচ্ছে, সবার সাথে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল, আমার ভুলগুলো ওরাই ধরিয়ে দিচ্ছে, বেশ হচ্ছে আরোহণ অবরোহণ, আমার গলায় যেন ম্যাজিক।
কিংবা ধরুন সেই বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো, ওই যে আপনি আষাঢ় বললেন, সব ওলটপালট হয়ে গেল আমার, বর্ষার দিনে আমি বাদল বাউল হয়ে পথে পথে ফিরছি, আমি ভিজছি, গাছ ভিজছে, পুকুরগুলো জলে টইটম্বুর, তারপর যেই আপনি গাইলেন যে মিলনের মালাগুলি ধুলায় মিশে হল ধূলি, গন্ধ তারই ভেসে আসে, অমনি গানটা থ্রি ডায়মেনশনাল হয়ে গেল, বেল,জুই,টগর,হাসনুহানা বাতাপি ফুলের গন্ধ যেন আমার চারপাশটা ভরিয়ে দিল, রেবা নদীতীরে সেই মেঘের ঘনঘটা আর আর সাথে সেই ঝর ঝর বরিষণে বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো।
কেন চেয়ে আছো গো মা আবার সম্পূর্ণ অন্যরকম। যেই গাইলেন তুমি তো
দিতেছ, মা, যা আছে তোমারি- স্বর্ণশস্য তব, জাহ্নবীবারি, জ্ঞান ধর্ম কত পূণ্যকাহিনী সাথে সাথে মায়ের ছবিটা ফুটে উঠল, যে মা সারাজীবন সন্তানের ভালো ভেবে এসছে, তাঁর শেষ সম্বল টুকু রেখে দিয়েছে, সমর্পণ করেছে সন্তানকে, মানে স্যার সেই সম্প্রদান কারকে এ বিভক্তি, দিলে আর ফেরত নেওয়া যায় না। সেই গানটাই কি অসাধারণ ব্যবহার হয়েছে যুক্তি তক্ক গল্প ছবিতে।
কিংবা ধরুন প্রান ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরো আরো দাও প্রান গানটা, মনে হয় এক ক্লান্ত পথিক তাঁর সমস্ত কিছু পরমেশ্বরের কাছে উৎসর্গ করছে, আরও আলো আরও আলো এই নয়নে প্রভু ঢাল, এইভাবেই বোধ হয় প্রার্থনা করতে হয়, কি জানি?
এমনি করেই আপনার গানের সাথে আমার ভাব ভালোবাসা, অবশ্য এগুলো সবই রবিঠাকুরের গান, তবু আপনার গলাতেই যেন গানগুলো পূর্ণতা পায়। স্যার আপনি তো গণনাট্য আন্দোলন, বামপন্থী আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, বিজন ভট্টাচার্য্যের সাথে কাজ করেছেন, কখনো অভিনয় করেছেন রক্তকরবী তে। তবু যেন রবিঠাকুরের গানেই আপনার পূর্ণতা।
তবে স্যার আজকাল সবাই সব গান গান, রবিঠাকুরের গান তো মাস্ট, নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে তাঁর ওপর, দুমড়ে মুচড়ে সোজা উলট করে নানান কায়দা কানুন , তাঁর ভাঙ্গা গান, কীর্তনাঙ্গের গান তো ব্যাপক হিট, ওই যে সেই গানটা মাঝে মাঝে তব দেখা পাই বা দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ বা ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি, তাঁর পরেই একটা লোকগীতি বা আধুনিক বাংলা গান। কেউ পুরো গীতবিতান রেকর্ড করেছে, কপালে মস্ত টিপ, কেউবা রিমেক করছে, কেউ জিন্স পরে, গীটার হাতে মায়াবন বিহারিণী গাইছে, আর এখন তো স্যার সবই অডিও ভিসুয়াল মানে গান আছে, ব্যাকগ্রাউন্ড এ নানান ছবি, নৃত্য ইত্যাদি ইত্যাদি।
দ্যাখ, রবিঠাকুর এর গান প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বর্ণ, প্রতিটা অক্ষর তোমাকে আত্মস্বাত করে তবেই না গাইতে হবে, নইলে তো সেটা সুর করে নামতা পড়া হয়ে দাঁড়াবে। ঠিক স্যার এ সবাই পারে না, আমাদের মত মানুষ যাদের নামের প্রতি মোহ, হাততালি, পিঠ চাপড়ান বা লাইক পাবার দিকে নজর তারা আর কি করে এসব হৃদয়ঙ্গম করব বলুন দেখি?
মাঝে মাঝে আপনাকে ভীষণ শক্তিমান এক অকুতোভয় বাউল, ফকির মনে হয়, যার কাছে সত্যি, মিথ্যা, ন্যায়, অন্যায় জলের মত স্বচ্ছ, মনের আনন্দে গান গেয়ে চলেছেন, কখনো বা লালন, বব ডিলান, পিট সিগার , সুর ভেসে যাচ্ছে আকাশ বাতাসে, কখনো চৈত্র পবনে, কখনো বর্ষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে, কখনো বা যে রাতে মোর দুয়ারগুলি হয়ে।
স্যার আপনার গলায় আধুনিক গান ‘যদি কিছু আমারে শুধাও, কি যে তোমারে কব নিরবে চাহিয়া রব...।‘ শুনেছিলাম, আহা পুর ডিফারেন্ট ফ্লেবার। অনেক হল স্যার, একবার আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে গাইবেন।।এই গানটা শুনলে মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়, মনে হয় অকুতভয় এক শিল্পী মৃত্যুকে রচনা করছেন আর তখন কোন ভয়, দ্বিধা,দ্বন্দ দ্বন্ধ কাজ করছে না, জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে গানটার সাথে মিলেমিশে সব একাকার হয়ে যায়।। সত্যি রবিঠাকুর ও কি লিখে গেছেন স্যার, বলছেন এই দীনতা ক্ষমা কর প্রভু, পিছন পানে তাকাই যদি কভু, এই যে হিয়া থর থর কাঁপে আজি কেমন তর, ... ক্লান্তি আমায় ক্ষমা কর প্রভু।
কিশোরগঞ্জ ময়মনসিংহ থেকেই তো হিন্দু বন্ধুদের কাছে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে ব্রাত্য কারন গোঁড়া ব্রাহ্ম পরিবারে আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখান থেকে কলকাতা,বিশ্বভারতীর দাক্ষিণ্যে আবার সেই ‘ম্লেচ্ছ’ (western-influenced) খেতাব পেয়ে মেইনস্ট্রীম গানের আসরে গলা ছেড়ে গান গাওয়ার অধিকারটিও খুইয়ে সেই বৃত্ত যেন পূর্ণ হল। তবু কি আশ্চর্য দেখুন স্যার আজো আপনি রবীন্দ্র সঙ্গীত বেস্ট সেলার।
ভালো থাকবেন জর্জদা, একটু আশীর্বাদ করবেন।
তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।
মনোহরণ চপলচরণ সোনার হরিণ চাই॥
সে-যে চমকে
বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা।
সে-যে নাগাল পেলে পালায় ঠেলে, লাগায়
চোখে ধাঁদা।
আমি ছুটব পিছে মিছে মিছে পাই বা নাহি পাই--.
আামি আপন-মনে মাঠে বনে
উধাও হয়ে ধাই॥
দেবব্রত বিশ্বাস( ২২ অগাস্ট ১৯১১- ১৮ অগাস্ট ১৯৮০)



