বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

বাঘ দিবস ~ কৌশিক মজুমদার

লীলা মজুমদার একবার লিখেছিলেন, গপ্পো হিসেবে নাকি তিনটি বিষয় একেবারে অব্যর্থ। এদের নিয়ে গল্প বাঁধলে সে-গল্প জমতে বাধ্য। এক, ভূত; দুই, চোর; আর তিন, বাঘ। একেবারে আচমকা এই মন্তব্য করেননি লীলা দেবী। বাংলায় সাহিত্যের ধারাকে নিবিড় ভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে প্রায় প্রথম থেকেই যে-পশুটি প্রায় একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে রয়েছে, সে কিন্তু পশুরাজ সিংহ নয়— বাঘ। এর অবশ্য কারণও অনুমান করা স্বাভাবিক। আফ্রিকার রাজা সিংহকে দেখার জায়গা দুটি— চিড়িয়াখানা অথবা দুর্গা ঠাকুরের বাহন হিসেবে। কিন্তু বাঘের বেলায় সে অসুবিধা নেই। জল জংলার দেশ এ বাংলায় রাত-বিরেতে দু-একটা বাঘ দেখতে পাওয়া তখন খুব একটা আশ্চর্য ঘটনা ছিল না। রাতে বন্ধ দরজার ওপারে কতবার শোনা যেত বাঘের গর্জন। মাঝরাতে প্রকৃতির টানে বাইরে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরত না কত নারী পুরুষ। আর তাই অচেনা পশুর চেয়ে চেনা বাঘই লোককথা-উপকথার অংশ হয়ে উঠতে থাকে। বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির সময়ও তাই বাঘকে নিয়ে রচিত হতে লাগল নানা সত্যি-মিথ্যে গল্প।

Uploaded Image কাহিনিতে এলেও বাংলা বইতে অলংকৃত প্রথম বন্য পশু কিন্তু বাঘ নয়— সিংহ। তখন বাংলায় সবে ছাপাখানা এসেছে। ১৮১৬-তে কলকাতার ফেরিস অ্যান্ড কোম্পানি-র ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়েছে বাংলার প্রথম সচিত্র গ্রন্থ অন্নদামঙ্গল। সেই বছরই বিলেত থেকে কাঠখোদাই ও ধাতুখোদাই বিশেষজ্ঞ জন লসন কলকাতায় আসেন ও ধাতব ব্লক এবং অক্ষর নির্মাণে মন দেন। ১৮১৯-এ সাহেবদের বাংলা শেখানোর জন্য তাঁর খোদাই করা সিংহের ছবিসহ ‘সিংহের বিবরণ’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে ‘ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটি’। লেখার ম্যাটার জোগাড় করেছিলেন লসন, আর তার অনুবাদ করেছিলেন পিয়ার্সসাহেব। এই সিংহের ছবিটি ছাত্রমহলে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করে। ছাত্রদের অনেকের বিশ্বাস ছিল যে জগতে সিংহ মাত্র একটিই। ছাপানো ছবি দেখে তাঁদের ধারণা হয়েছিল সেই সিংহটিই সশরীরে এখানে উপস্থিত হয়েছে। তাঁরা নাকি এতটাই ভয় পেয়ে যায় যে মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত স্কুল ফাঁকা হয়ে যায়। এর জনপ্রিয়তায় উৎসাহিত হয়ে স্কুল বুক সোসাইটি ১৮২২-এর ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিমাসে কোনো একটি প্রাণীর সচিত্র বিবরণ পুস্তিকা আকারে ‘পশ্বাবলী’ নামে প্রকাশ করতে থাকেন। এই সিরিজেই একে-একে শৃগাল, ভালুক, হাতি, গণ্ডার, হিপ্পপটমস্‌ ও শৃগালের পর প্রকাশিত হয় ‘ব্যাঘ্রের বিবরণ’ (সচিত্র, ১০১-১২২)। অন্য সংখ্যাগুলোর মতো এতেও শুরুতেই লসনকৃত একটি বাঘের চমৎকার খোদাইচিত্র রয়েছে। বাংলা বইতে এই বাঘটিই খুব সম্ভব প্রথম বাঘের ছবি।



তারপরই অবশ্য বেশ কয়েক বছর বাংলা সাহিত্যের অলংকরণ থেকে বাঘেরা হারিয়ে গেল। আসলে ক্রমাগত সচিত্র ধর্মগ্রন্থের চাপে বাঘ পালাবার পথ পেল না। বাংলা অলংকরণে আবার বাঘের আমদানি হয় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। ১৮৯২-এ তাঁর রচিত ‘কঙ্কাবতী’ বইতে সিংহ, ভালুক, কুকুরসহ বাঘকে নিয়েও কাহিনি বর্ণিত আছে। এর প্রথম সংস্করণে প্রচুর কাঠখোদাই ছবি আছে। এঁকেছেন হরিদাস সেন। এতেই আছে সেই বিখ্যাত দৃশ্য যেখানে বাঘের পিঠে চেপে বনের মধ্যে দিয়ে কঙ্কাবতী চলেছে অট্টালিকার উদ্দেশে। তবে বাংলা সাহিত্যে একেবারে হুড়মুড়িয়ে যিনি বাঘকে নিয়ে এলেন, তিনি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। ১৯১০ সালে কান্তিক প্রেস থেকে মুদ্রিত হল তাঁর রচিত ‘টুনটুনির বই’। ‘সুকুমার পাঠক-পাঠিকাদের’ জন্য রচিত এই বইটির ‘২৭টি গল্প, ৩০ খানি ছোটো ছবি’-র অনেকগুলিই ছিল ‘বাঘের ছবি আর বাঘের গল্প’। বইটির চতুর্থ গল্প ‘নরহরি দাস’-এই প্রথম বাঘের প্রবেশ। গল্পের শেষে লেজে বাঁধা শিয়ালকে নিয়ে বাঘের সেই ‘পঁচিশ হাত লম্বা এক এক লাফ দিয়ে পালাবার’ দৃশ্য বাংলাসাহিত্যে অমর হয়ে আছে। পরের গল্পই ‘বাঘ মামা আর শিয়াল ভাগ্নে’— যার দুটি ছবি, ‘বাঘ কুয়োর ভিতর পড়ে যাচ্ছে’ ও ‘কুমির বাঘকে কামড়ে ধরেছে’। এরপর ‘চড়াই আর বাঘের কথা’-তেও তিনটি ছবির দুটিতে বাঘ উপস্থিত, ‘বাঘ পিঠে গড়বার জিনিষ নিয়ে আসছে’ ও ‘হাঁড়ি ভাঙার শব্দে বাঘ পালাচ্ছে’। পরের গল্প ‘দুষ্টু বাঘ’-এ প্রথমে বাঘ ও বামুনের ছবি এবং তার পরে শিয়ালের বাঘকে খাঁচায় বন্ধ করে দেবার দৃশ্য। ঠিক পরের গল্প ‘বাঘ বর’ যাতে বোকা বাঘকে কুয়োতে ফেলে গরম তেল ঢেলে মেরে ফেলা হয়।

এ গল্পে পায়ে নাগড়াই, গায়ে জোব্বা, মাথায় টুপি পরা বরবেশী বাঘের চেহারা যে বেশ খোলতাই হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। ‘বাঘের উপর টাগ’ গল্পে চোখ-বাঁধা বাঘের পিঠে বসা জেলের ছবি কিংবা বুদ্ধুর বাপের মুগুর দিয়ে ধাঁই ধাঁই করে বাঘ মারা কিংবা খ্যাঁচ করে বাঘের লেজ কাটার দৃশ্য এখনও ছেলেবেলার নস্টালজিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে সব ছবির মধ্যে আমার ব্যক্তিগতভাবে প্রিয় ‘বোকা বাঘ’ গল্পের খোঁটায় বাঁধা বাঘটি। বাঘটির বিবাহের ইচ্ছা আর গ্রামের লোক মারতে আসাতেও হাসিহাসি মুখ এক অদ্ভুত কৌতুককর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। সঙ্গে ক্যাপশানটিও খাসা ‘বাঘ বললে, হীঃ হীঃ, হিহি, হিহি।’

এ হেন উপেন্দ্রকিশোর যখন সন্দেশ-এর মতো পত্রিকা প্রকাশ করেন, তাতে বাঘ থাকবে না, তা-কি হয়! সন্দেশ প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা (আষাঢ়, ১৩২০)-তেই ছিল ‘বাঘের গল্প’— যদিও সঙ্গে কোনো ছবি ছিল না। পরের সংখ্যা থেকেই শুরু হল প্রমদারঞ্জন রায়ের লেখা বনের খবর— যার প্রথম কিস্তিতেই বাঘের তাড়া খেয়ে সুচিৎ নামে চাকরটির প্রাণপণ দৌড়ের কাহিনি, আর সঙ্গে উপেন্দ্রকিশোরের আঁকা ছবি। বাঘের লাফ আর সুচিৎ-এর খাড়া টিকি এক অদ্ভুত স্ল্যাপস্টিক কমেডির ভাব সৃষ্টি করেছে। উপেন্দ্রকিশোরের পুত্র সুকুমার অবশ্য তাঁর সাহিত্যজীবনে বাঘকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। কে জানে, বাবা এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলেই হয়তো! তাঁর লেখায় বরং বাঘের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একমাত্র তাঁর ‘গল্প’ নামের গল্পে দেখি লেখা আছে—

“বড়মামা একটা গল্প বল না”
“গল্প? এক ছিল গ, এক ছিল ল, আর এক ছিল প—”
“না- ও গল্পটা না। ওটা বিচ্ছিরি গল্প— একটা বাঘের গল্প বল”
“আচ্ছা। যেখানে মস্ত নদী থাকে আর তার ধারে প্রকান্ড জঙ্গল থাকে— সেইখানে একটা মস্ত বাঘ ছিল আর ছিল একটা শেয়াল।”
“না— শেয়াল তো বলি নি— বাঘের গল্প।”
“আচ্ছা, বাঘ ছিল, শেয়াল টেয়াল কিছু ছিল না। একদিন সেই বাঘ করেছে কি একটা ছোট্ট হরিণের ছানার ঘাড়ে হাল্লুম করে কামড়ে ধরেছে—”

পরে একমাত্র ‘সেকালের বাঘ’ প্রবন্ধে খড়্গদন্ত বাঘ নিয়ে তাঁর ছোট একটা প্রবন্ধ পড়তে পাই।“এবার যে জানোয়ারের কথা বলছি ইংরাজিতে তাকে বলে Sabre-toothed Tiger (অর্থাৎ খড়্গদন্ত বাঘ)। এর কঙ্কাল ইউরোপে, আমেরিকায়, আমাদের দেশে এবং আরও নানা জায়গায় পাওয়া গিয়াছে। এই খড়্গের মতো দাঁত দুটিতে তার কি কাজ হত, সে কথা বলা বড় শক্ত। অত লম্বা দাঁত দিয়ে কামড়াবার সুবিধা হয় না; তাছাড়া, এই বাঘের চোয়ালের হাড় আজকালকার বাঘের মতো মজবুত নয়, সুতরাং তার কামড়ের জোরও কম ছিল। দাঁত দুটি প্রায় ছয় ইঞ্চি করে লম্বা, তার গায়ে ছুরির মতো ধার—হয়ত তা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শিকারের মাংস ছাড়াবার সুবিধা হত।” ব্যাস এইটুকুই।

নাতি সত্যজিৎ অবশ্য বাঘের ব্যাপারে ঠাকুরদাদারই অনুগামী। অবশ্য তাঁর ছোটোবেলার স্মৃতির সঙ্গেও এক বাঘের ছবি জড়িয়ে আছে। ছেলেবেলায় শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসু একবার তাঁকে একটা ডোরাকাটা বাঘ এঁকে দিয়েছিলেন। বাঘের লেজে একটা কালো ছোপ। কারণ জিজ্ঞেস করায় নন্দলাল নাকি বলেছিলেন বাঘটা এক বাড়ির রান্নাঘরে মাংস চুরি করে খেতে ঢুকেছিল, তখনই ল্যাজের ডগাটা ঢুকে যায় জ্বলন্ত উনুনের ভেতর। সন্দেশ পত্রিকা যখন নবরূপে প্রকাশিত হল সত্যজিতের হাত ধরে (মে ১৯৬১) তার প্রথম সংখ্যার ফ্রন্টিসপিসেই ছাপা হয়েছিল নন্দলাল অঙ্কিত সেই বাঘের রঙিন ছবি। সেই শুরু। তারপর বহুবার বাঘ এসেছে সত্যজিতের লেখায়-রেখায়। আর এই নন্দলালই তো বাঙালি শিশুর চিরকালীন প্রাইমার সহজ পাঠ-এ এঁকেছিলেন জলের ধারে বনের মাঝে সেই বাঘের ছবি। সঙ্গে রবি ঠাকুরের লেখা, ‘বনে থাকে বাঘ / গাছে থাকে পাখি / জলে থাকে মাছ / জলে থাকে ফল...’। সত্যজিতের সিগনেট-দিনের প্রচ্ছদে বার তিনেক বাঘের আবির্ভাব ঘটেছে। ১৯৫৫ সালে টুনটুনির বই-এর মলাটে পেপার কাটিং স্টাইলে বাঘকে আঁকা হয়েছে। পরের বছরই প্রমদারঞ্জন রায়ের ‘বনের খবর’ সিগনেট থেকে প্রকাশিত হলে তার প্রচ্ছদে কালো পশ্চাদপটে তীব্র জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে বাঘের মুখ। উপরে সবুজ রঙে হাতে লেখা বনের খবর। তবে বাঘ নিয়ে সত্যজিতের সেরা মলাট ১৯৫৩-এ প্রকাশিত ‘কুমায়ুনের মানুষখেকো বাঘ’-এর প্রচ্ছদ। এমন প্রচ্ছদ বাংলা তথা ভারতীয় কোনো বইতে এর আগে করা হয়েছে কিনা সন্দেহ। দু’-মলাট জোড়া কালো আর হলদে বাঘের ছাল যেন ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। নিচের দিকে গুলির গর্ত যা পিছনের দিকে ফুঁড়ে চলে গেছে। গুলি ঢোকার সময় ফুটো ছোটো হয়। ফুঁড়ে বেরোবার সময় চ্যাপ্টা ও বড়ো হয়। সেটাও প্রচ্ছদ তৈরির সময় মাথায় রেখেছেন সত্যজিত। বাঘছাল অবশ্য অনেক আগেও এঁকেছেন তিনি। ডি. জে. কিমারের যুগে প্যালুড্রিনের বিজ্ঞাপনের একটিতে মেঝেতে পাতা একটি বাঘছাল ঘরের গাম্ভীর্য ও বনেদিয়ানাকে ফুটিয়ে তুলেছে। এই বাঘছাল আবার আগে ‘সোনার কেল্লা’ ছবির জন্য প্যাস্টেলে আঁকা সেট ডিজাইনে কিংবা শঙ্কুর অভিযান আশ্চর্য জন্তু-র ইন্টেরিয়র ডেকরেশন। ‘সন্দেশ’-এর জন্য ধাঁধা-র এর বাড়াবাড়ি, কিংবা ‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ কাহিনিতে মেঝেতে থেবড়ে বসা পুতুল হাতে বিবির আসন হিসেবে ব্যবহৃত বাঘছাল সত্যজিতের অলংকরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

১৯৮১ এবং ১৯৮২--পরপর এই দুই বছর প্রকাশিত হয় দুটি ফেলুদা-কাহিনি। যথাক্রমে—‘ছিন্নমস্তার অভিশাপ’ ও ‘রয়াল বেঙ্গল রহস্য’। প্রথমটিতে সবুজ জমিনে গ্রেট ম্যাজেস্টিক সার্কাসের পালানো বাঘ সুলতান গোঁফ উচিয়ে দাঁড়িয়ে রিং মাস্টারের সামনে। তার দ্বিতীয়টির খয়েরি জমিনের প্রায় গোটা অংশ জুড়ে সবুজ রঙে বাঘের চোখমুখ আর অরণ্যের গাছপালা। নামলিপিতেও যেন বাঘের গায়ের রঙের ছোঁয়া। ১৯৮৭-তে প্রকাশিত ‘ব্রাজিলের কালো বাঘ ও অন্যান্য’-র প্রচ্ছদে গাঢ় হলুদের উপর নিকষ কালোতে ছাপা ব্রাজিলিয়ান ক্যাটের ভয়াবহ মুখ। তাঁর মুখে রক্তের দাগ। ১৯৬১-তে প্রকাশিত হয় অদ্ভুত এক ত্রিমাত্রিক ছবির বই, নাম ‘The zoo springs to the life’। ভিতরের ছবি তুলেছিলেন নিমাই ঘোষ ও প্রচ্ছদশিল্পী সত্যজিত রায়। প্রচ্ছদেই ছিল খাঁচার ভিতর থেকে বাঘ লাফিয়ে বেরিয়ে আসছে। বাঘের কিছু অংশ গরাদের ভিতর, কিছু অংশ বাইরে।

সন্দেশ পত্রিকার মলাটেও বাঘ এসেছে বহুবার। প্রথমবার অবশ্য সুকুমার রায়ের হাত ধরে। গাছের তলায় টাক মাথা টিকিওয়ালা এক ছেলে সন্দেশ পড়ছে আর পিছনে হাসিমুখ এক বাঘ আর বাঘের পিঠে বক, এমনই ছিল সেই অদ্ভুত প্রচ্ছদ। সত্যজিতের আমলে ১৯৬৯-এর নবম বর্ষের সন্দেশ পত্রিকার প্রচ্ছদে ছোটো-ছোটো চৌকো খোপের মধ্যে অনেক কিছুর মধ্যে বাঘও ছিল। তবে বাঘই প্রধান চরিত্রের রূপ নিল ১৯৮২-র শ্রাবণ সংখ্যার প্রচ্ছদে। গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে বাঘের সন্দেশ পড়ার দারুণ আগ্রহ এখনও পাঠক-পাঠিকাদের মনের মণিকোঠায় সঞ্চিত আছে।

সন্দেশ-এ অলংকরণে বহুবার বাঘ আঁকলেও দু’-মলাটের ভিতরে সব থেকে বেশি সংখ্যক বিভিন্ন ধরণের বাঘ সত্যজিত এঁকেছেন সেরা সন্দেশ বইতে। কী নেই তাতে? মিষ্টি বাঘ, মজার বাঘ, রাগি বাঘ, শিকারি বাঘ। সদানন্দ স্বদেশলাল গল্পে হাসিহাসি মুখের ঘুমন্ত বাঘিনির পায়ে আলতা পরানোর দৃশ্য, গাছের নাম বাঘশাল-এর মিষ্টি বাঘ কিংবা এই বাঘটাই সেই বাঘটা-র মজার বাঘের পাশেই একেবারে সিরিয়াস ঢঙে আঁকেন দুগ্যো সদ্দার কিংবা মানুষখেকোর অন্তিম অনুরোধ-এর বাঘকে। মহাশ্বেতা দেবীর বিরে ডাকাত ছিরে ডাকাত-এর বাঘের সাথে নন্দলালের বনে থাকে বাঘ-এর আশ্চর্য মিল। সত্যজিতের হেডপিসেও বাঘ ফিরে ফিরে আসে। শুটিং-এর গল্প বাঘের খেলা-য় হেডপিস বাঘের গায়ের ডোরাকাটা ফিতে দিয়ে। বাণী রায়ের বিপ্রদাস বা গৌরী ধর্মপালের বাঘা-তে একটানে আঁকা বাঘের কথা কে ভুলতে পেরেছে! সুখেন্দু দত্তের হালুম্বা-তে শুরু বাঘের হাঁ-করা মুখ আর লেজ--মাঝে অসামান্য লেটারিং-এ গল্পের নাম যেন বাঘের গোটা দেহকেই নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।

সবমিলিয়ে তিন প্রজন্মে একটা প্রাণীরই চোখ ইজ জ্বলজ্বলিং। আর সে হল বাঘ।

বাঘ দিবসের শুভকামনা সবাইকে।

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

দিল্লি ডাইরি: যন্তর মন্তরের ইন্ডিয়া ~ শময়িতা চক্রবর্তী

দিল্লি ডাইরি: যন্তর মন্তরের ইন্ডিয়া

না লিখে রাখলে ভুলে যাব, তাই...

সোমবার, ২০ জুলাই: প্রথম টিয়ার গ্যাস জনপথে। প্রেস কার্ড সঙ্গে থাকলে পুলিশের লাঠি থেকে বাঁচা যায়। টিয়ার গ্যাস আবার প্রেস কার্ড বোঝে না। দম যখন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে, একটা বাচ্চা মেয়ে (২২-২৪ বছর হবে) তার ওড়না খুলে অর্দ্ধেকটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, নাক মুখ চেপে রাখো। চোখ খুলো না। বাকি হাফ দিয়ে নিজের নাকে জড়িয়ে রাখল। ব্যাগ থেকে ছোট জলের বোতল বের করে খানিকটা নিজের চোখে দিল। বাকিটা আমার মুখে ছেটাল। ধোঁয়া কমলো, মিষ্টি হেসে ভিজে ওড়না উড়িয়ে চলে গেল।

পরের টিয়ার গ্যাস। আরেকজন বাচ্চা ছেলে হাত ধরে দৌড়ে নিয়ে গেল রাস্তার পাশে রাখা জলের ট্যাঙ্কে। বলল, 'জিতনা হোসাকে পানি দিজিয়ে।' চোখ খুলে দেখলাম, সে হাওয়া।

জনপথে যখন অটো চলতে শুরু করলো, তখন অফিস যাওয়ার তাগিদ হল। পাঁচজন অটোওয়ালা রিফিউজ করার পরে একজন রাজি হলেন। বললেন, 'যারা আজ মিছিলে এসেছে তাদের জন্যই আজ অটো বের করেছি। নাহলে বাড়ি থাকতাম।"

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই: কেরালা হাউসের সামনে থেকে আমি আর ক্যামেরাপারসন অভিরাজ (সবাই পার্থ হয়না, কেউ কেউ অভিরাজ হয়। একই রকম হার না মানা, অভিরাজ) যন্তর মন্তরের মঞ্চের দিকে এগোচ্ছি। ব্যারিকেডে ব্যারিকেডে ছয়লাপ। আগের দিন পুলিশের সঙ্গে ওই সাংঘাতিক যুদ্ধ যেন আগুনে ঘি দিয়েছে। ভিড় বেড়েছে বহুগুণ। মঞ্চের দিক থেকে স্লোগান জোরদার হচ্ছে। একটু কাছে গিয়ে শুনলাম, 'গোদি মিডিয়া হায় হায়।' চোখের সামনে দেখলাম, এক হিন্দি ন্যাশানাল চ্যানেলের সংবাদ প্রতিনিধি এবং তার সহকর্মী ক্যামেরাপারসেনকে ব্যারিকেডের বাইরে বের করে দেওয়া হল। বলা হল, বাইরে থেকে রিপোর্টিং করতে। অভিরাজের ক্যামেরা সাক্ষী। একই সঙ্গে আমাদের ঢুকিয়ে নেওয়া হল। স্বাভাবিক ভাবেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী হল? কেন এটা করলে? রিপোর্টার তার চাকরি করতে এসেছে। এই বৈষম্য ভাল না, ইত্যাদি। হাঁটুর বয়সী ভলান্টিয়ার বলল, 'এদের গত ৩০ দিনের প্রতিবেদন দেখে এসো। তার পর তোমার কথা শুনব।' এর পরেও এই নিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। বুঝলাম, মূলধারার মিডিয়ার উপর এদের যতটা রাগ, তা সরকার বিরোধী ক্ষোভের থেকে কোনো অংশে কম না। এদের বক্তব্য, যে মিডিয়া ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেই মিডিয়া অপ্রাসঙ্গিক।  

এদিন সন্ধেয় যখন বেরলাম তখন আরেক কাণ্ড। কনট প্লেসের দিকের রাস্তায় পিটিসি দিচ্ছি। ভুল হচ্ছে যেমন হয়। আবার দিচ্ছি। এমন সময় হা রে রে রে রে রে... আবার পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে দৌড়চ্ছে। আবার জনতা ছুটছে। আবার টিয়ার গ্যাসের ওয়াগন ধেয়ে আসছে। আবার ক্যামেরাপারসন অভিরাজ ক্যামেরা নিয়ে ছুটছে। সঙ্গে ছুটছি আমিও। এমন সময় ইট বৃষ্টি। কনট প্লেসের দোকান বন্ধ হয়ে গেল ঝপাঝপ। আমি, অভিরাজ অন্যদের সঙ্গে মাথা বাঁচিয়ে সেই খণ্ডযুদ্ধ দেখে গেলাম। পরে শুনলাম, বাইরের লোক ইট পাথর মারছে। এদিন যে অঘটন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের। 

বুধবার, ২২ জুলাই: সকাল থেকে ছাত্র নেতাদের ইন্টারভিউ করছি। এদিন একা। সব শেষে আবার যন্তর মন্তর যাব। সঙ্গী হলেন এক ছোট আইসা কর্মী। তার আবার দুই পায়ে দুই রকম চটি। আগের দিন পুলিশের সঙ্গে ঝামেলায় এক পাটি হারিয়েছিল। তার পর যা পেয়েছে তাই পরে কাজ চালাচ্ছে। আজ টলস্টয় মার্গ দিয়ে ঢোকা। সেই কর্মী আমাকে তার চেনা রাস্তা চেনাচ্ছে। দেখলাম, ভিড় এড়াতে প্রতিদিনের কর্মীরা কত রাস্তা চেনেন। কীভাবে যেন সব ভিড় এড়িয়ে সরু গলি পেড়িয়ে চারটে গেট টোপকে মঞ্চের সামনে পৌঁছে গেলাম। একদম হ্যারি পটারের ম্যাজিক। এর পর আর কোনোদিন ওই রাস্তা চিনতে পারব কিনা জানি না।

Uploaded Imageআরো মজা হলো বেরোনোর সময়। এক অল্পবয়সী উকিলের সঙ্গে দেখা। একটা বাইট নেব। তার চোখ আমার জুতোয়। বলে, এটা তো থিয়েটারের জুতো। ওরা ফালতু দাম নেয়। তুমি বরং অমুক অমুক জায়গায় জুতো দেখো। স্টাইলের জুতো। কম দাম। বাইট এবং জুতোর দোকানের সন্ধান, এক ঢিলে দুই পাখি মারা হল আমার। 

প্রসঙ্গত, এদিন রাতেও খণ্ডযুদ্ধ আটকানো যায়নি।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই: আমার ফেরার কথা। হয়নি। টিকিট ক্যানসেল করতে হয়েছে। এদিন উত্তেজনা শুরু দুপুর থেকে। দুপুরে কনট প্লেস চত্বরে সমস্ত দোকান বন্ধের নির্দেশ আসে। আমরা চত্বরে পৌঁছতেই দেখই পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। অন্যান্য দিনের তুলনায় ২০ গুন বেশি পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী। সকলেই যুদ্ধসাজে রেডি। মাথায় হেলমেট, গায়ে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, হাতে শিল্ড। সাংবাদিকদের আলোচনায় তখন অফিস থেকে হেলমেট আর জ্যাকেট আনার পরিকল্পনা। সহকর্মী অন্য শহর থেকে ফোনে বলছেন ব্যাগে তোয়ালে আর জলের বোতল রাখতে। ছাত্রনেতারা মোটামুটি রেডি। সারা রাত যন্তর মন্তর পাহারা দিতে। বন্ধুবান্ধবদের থেকে ক্রিকেটের হেলমেট জোগাড় করে রাখছে। একজন বলল, শুধু মাথাটাই বাঁচাতে চেষ্টা করব। রাবার বুলেট বাঁচাতে পিঠে ব্যাগ থাকবে। জল, তোয়ালে, এই সব তো আছেই।

প্রথম অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স, দিল্লি পুলিশ পরিষ্কার জানালো, আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর অন্তত এদিন রাতে কোনো 'ক্র্যাকডাউন' হবে না। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই অনশন ভাঙলেন ওয়াংচুক। একেবারে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে জল।

শুক্রবার, ২৪ জুলাই: ফেরার দিন। তার আগে পর্যন্ত যন্তরেই। আজও ভিড়। একই রকম। বরং বেশি। অভিজিত দিপকের জ্বর। তখনও টাইফয়েডের রিপোর্ট আসেনি। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন। ভিড় ঠেকে ঢুকতে গিয়ে আমি অল্পের জন্য মিস করেছি। ব্যাস। সে মঞ্চের মাঝে চলে গেছে। তখন জেদ, একটা বাইট পেতেই হবে। ফাইনালি বলল, 'সোনামজি অনশন ভেঙেছেন। ভালো হয়েছে। ওনার প্রাণের দাম অনেক বেশি। তবে আমরা আন্দোলন চালাব যতদিন না ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন।' জেদ জিতেছে, এই টুকুই। 

এর পরেও যা যা মনে রাখার, তা হল, যন্তর মন্তরের অনেকখানি জুড়ে জ্যামার লাগানো থাকায়, এবং আমার ভি-এর এর নেটওয়র্ক থাকায় খুব ঝামেলা হয়েছে। অনেক দূর গিয়ে স্টোরি, বাইট, পিটুসি পাঠিয়ে আবার ফিরতে হয়েছে।

এসব কিছুর পরেও যা থেকে গেল: যন্তর মন্তর জুড়ে এই পাঁচদিনে যা দেখেছি তা আমার বেড়ে ওঠার ভারতের সঙ্গে মিলে যায়। গুরুদ্বোয়ারা থেকে খাবার, মসজিদের থেকে জল, এনআরআইদের ফুড ডেলিভারি, বৃষ্টি পড়লে প্লাস্টিকের রেনকোট, না পড়লে অচেনাদের হাতপাখার হাওয়া, জলের বোতল, স্যানিটারি প্যাড, হিন্দু, মুসলিম, শিখ, বিদেশি, দেশি স্বেচ্ছাসেবক, গান, ডাফলি, নাচ, স্লোগান, ডাক্তারদের ক্যাম্প, ক্যালপল, ওআরএস, স্ট্রিট প্লে , কস প্লে, কস্টিউম স্পাইডারম্যান, এভেরিথিং এভরিহোয়ার অল অ্যাট ওয়ান্স -- আমার স্বপ্নের দেশ।

যন্তর মন্তর যেন একটা ছোট ভারতবর্ষ হয়ে গেল এই কয়েকদিনে।




মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

হিন্দী একটি ঔপনিবেশিক ভাষা ~ কণিষ্ক ভট্টাচার্য 

সোনারকেল্লা – আরে ধোর মশাই

লালমোহন গাঙ্গুলিকে দিয়ে একটি ঐতিহাসিক কথা বলিয়ে নেন সত্যজিৎ।

আগের লেখায় লালমোহন গাঙ্গুলির গড়পাড়ের কলকাত্তাইয়া বাঙালির হিন্দিতে ‘জটায়ু’ ‘ছদমোনাম’ এর ব্যাখ্যা দেওয়ার কথা বলেছিলাম। এই অবধি ফেলুদা আর তোপসে বেশ হাসিহাসি মুখে শুনছিল। লালমোহন বাবু তাঁর রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের সাতাশ নম্বর বই ‘সাহারায় শিহরণ’ এর কপি বের করে তপেশরঞ্জনকে দেখান। কিন্তু তোপসে বাংলা পড়তে জানে দেখে লালমোহন অবাক হয়ে বলেন “কাঁহা শিখা?” লালমোহন অবাক। এমন সময়ে ফেলুদা বলে ওঠে। “আপনি হিন্দিটা চালিয়ে যেতে পারেন, বেশ লাগছে।”

গড়পাড়ের বাঙালি লালমোহন গাঙ্গুলি বলেন, “আরে ধোর! হিন্দি  কি কেউ সাধে বলে মশাই!”

না। হিন্দি কেউ সাধে বলে না। কারণ হিন্দি কোনও সহজাত ও স্বাভাবিক ভাষা নয়।

দাঁড়ান। রে রে করে উঠবেন না ভক্তকুল।

উপনিবেশ আর ভাষার সম্পর্ক জানলে আর রে রে করে উঠতেও হবে না।



Uploaded Image লালমোহনের বদলে আমরা বরং রামমোহনের কথা মনে করি। বর্ধমান জেলার রাধানগর (সেকালে রাধানগর হুগলী নয়, বর্ধমানের অন্তর্গত ছিল। যেমন বিদ্যাসাগরের জন্ম মেদিনীপুর নয় তৎকালিক হুগলীর বীরসিংহে।) গ্রামে জন্ম নেওয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পদবি এবং রায় (বস্তুত রায়রায়ান) উপাধিক শাণ্ডিল্য গোত্রের ব্রাহ্মণ সন্তান রামমোহনকে কিন্তু শৈশবে পাটনায় পাঠানো হয়েছিল, সেকালের শাসকের রাজকার্যের ভাষা আরবি ও ফারসি শিক্ষার জন্য। মনে রাখতে হবে রামমোহন বাংলায় লেখালিখির আগে ফারসি ভাষায় পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন এবং সেই ভাষাতেই লিখতেন। পত্রিকার নাম মিরাৎ-উল-আখবার! মনে রাখতে হবে এই রামমোহনই কিন্তু বাঙালির লেখা প্রথম বাংলা ব্যাকরণের রচয়িতা, তার নাম ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ।’

রামমোহনের জন্ম ১৭৭২ (মতান্তরে ১৭৭৪) অর্থাৎ আজ থেকে আড়াইশো (নির্দিষ্ট করে বললে ২৫৪) বছর আগেও এই হিন্দি বলে ভাষাটি ছিল না। ফলে আজকের তথাকথিত ‘হিন্দি হার্টল্যান্ড’ বা ‘গোবলয়ে’ যে হিন্দি আধিপত্য তারও প্রশ্ন ছিল না। স্মরণীয় বাংলা কিন্তু অষ্টম শতক থেকেই আছে।

তাহলে এই আজকের হিন্দিভাষা কোত্থেকে এলো? কেন এলো? এবং সর্বোপরি কারা, কী স্বার্থে এর জন্ম দিলো?

আগে স্বার্থটা বুঝে নেওয়া যাক। স্বার্থ দ্বিবিধ।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বাংলা উপনিবেশের অধিগত হয় আর ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের মাঝের একশো বছরে এদেশে তার বিস্তার।

উপনিবেশিক শাসনকে বাঙালি গ্রহণ করেছিল আগে। কিন্তু বাঙালি তো বাঙালি – নর্ডিক থেকে দ্রাবিড়, মোঙ্গলীয় বহুরক্ত মিশ্রণে তৈরি একটি জাতি যা বিজ্ঞান অনুসারে বুদ্ধিমান সন্তানের জন্ম দেয় জিন মিশ্রণের কারণে। ফলে বাঙালি – রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘কেরানী তৈরির ইস্কুল’ বলেছিলেন, সেই মেকলের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দুধ মেরে ক্ষীরটুকু তুলে নিল। উপনিবেশিক পড়াশোনা থেকেই যে বাঙালি প্রথম উপনিবেশকে গ্রহণ করেছিল সেই ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বাঙালিই প্রথম একটি জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলে। এবং অবশ্যম্ভাবী ভাবে সেটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কারণ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার আগে এই ভূখণ্ড কখনও কোনোদিন এক শাসনের অধীনে আসেনি। চোল রাজাদের আমলেও নয়, মুঘলদের আমলেও নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বঙ্কিমের যে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে এদানীর বিতর্ক তা কোনও ভারতমাতার জন্য নয়, নির্বিকল্পভাবে বঙ্গমাতার জন্য। একইভাবে উল্লেখ করা যায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ চিত্র – ওটিও সর্বার্থে বঙ্গমাতার চিত্র। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে হিন্দু প্রভাব বেশি, কারণ যে উপনিবেশিক শিক্ষা বাঙালি গ্রহণ করেছিল তা প্রধানত হিন্দু বাঙালি, মুসলমান বাঙালি কম। যে কারণে বন্দে মাতরম সংগীতে শাক্তদেবীর বন্দনাংশ পাওয়া যায়, যে কারণে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “সমস্ত গানটির মধ্যে হিন্দু দেবদেবীর নাম এমনভাবে জড়িত যে উহা এক বিশেষ ধর্মের স্তোত্ররূপে গণ্য হইতে বাধ্য এবং সে কারণেই উহা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য জাতীয় সংগীত হইবার অযোগ্য।” [১৯৩৭ সালের অক্টোবরে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি]। অবন ঠাকুরের আঁকা বঙ্গমাতাও বেঙ্গল স্কুল অভ আর্টের ফসল। আদপেও ভারতীয় নয়।  

উপনিবেশিক শিক্ষা গ্রহণ ভারত উপনিবেশ বিস্তারের একশো বছরে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কাছাকাছি বাঙালিকে যেভাবে পৌঁছে দিয়েছিল উত্তরভারতকে সেভাবে নয়। কিন্তু সাম্রাজ্যে বাঙালি আধিপত্য এদিকে আবার সেই বাঙালি এক জাতীয়তাবাদের নির্মাণ করে উপনিবেশের শাসকদের বিরুদ্ধেই কাজে লাগাচ্ছে সেটাই বা ব্রিটিশ শাসকদের কীভাবে সহ্য হয়! তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী ছিল কলকাতা আর প্রশাসনে বাঙালিদের আধিপত্য।

ঠিক এইখান থেকেই হিন্দি ভাষার জন্ম দেওয়া। ঔপনিবেশিক শাসকের দ্বারা, ঔপনিবেশিক শাসকের হাতে এবং ঔপনিবেশিক শাসকের স্বার্থে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভারসাম্য রক্ষা করতে হিন্দি ভাষার জন্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্থানের মাধ্যমে ব্রিটিশরা উত্তর ভারতে একটি অনুগত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছিল – যা রাজনৈতিক ভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কাউন্টার করবে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করবে। 

সমস্ত ভাষার একটা অন্তর্গত কাঠামো থাকে মানুষের শরীরে যেমন কঙ্কাল। যা ভাষার নির্দিষ্ট অবয়ব তৈরি করে। সেই বিচারে যে ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে ইন্দো ইরানীয় হয়ে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা – মধ্যভারতীয় আর্যভাষা – নব্যভারতীয় আর্যভাষা্র যে ভাষাগুলির জন্ম – যেমন পূর্ব ভারতে বাংলা ওড়িয়া অসমীয়ার অন্তর্গড়নের সঙ্গে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের দ্বারা নির্মিত ভাষা হিন্দির পার্থক্য বিস্তর। লিঙ্গ ও লিঙ্গ নির্দিষ্ট ক্রিয়াপদের দিকে দেখলে তা স্পষ্ট হয়। বস্তুত নাগরী লিপি ভিন্ন সংস্কৃতের সঙ্গে হিন্দির মিল খুব সামান্য।

হিন্দি আর নাগরীর সম্পর্কের মধ্যেও একটা জোর খাটানোর ইতিহাস আছে। বাংলার জন্য বঙ্গলিপি যেমন একটা স্বাভাবিক বিবর্তন – যা প্রাচীন বাংলার হাজার বছরের টেক্সট দেখলে সহজেই বোঝা যায় – হিন্দির ক্ষেত্রে বিষয়টা তেমন নয়। ইতিহাস সাক্ষী, হিন্দির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য, বেশিদিন নয়, মাত্র ১২৭ বছর আগে ১৮৯৩ সালে এর শুরু। ওই বছরের ১৬ই জুলাই বারাণসীর (কাশীর) ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার নামে নামাঙ্কিত কুইন্স কলেজের তিন ছাত্র— শ্যামসুন্দর দাস, রামনারায়ণ মিশ্র এবং শিবকুমার সিংয়ের উদ্যোগে “নাগরী প্রচারিণী সভা” প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী কালে ভারতেন্দু হরিশ্চন্দ্রের মতো সাহিত্যিকরা এর সঙ্গে যুক্ত হন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দপ্তর ও আদালতে আরবি ফারসি লিপির (খড়িবোলি বা হিন্দুস্তানি আগে আরবি ফারসি আগত লিপি উর্দুতে লেখা হত। প্রেমচন্দ কিন্তু শুরু থেকে উর্দু লিপিতেই হিন্দুস্তানি বা খড়িবোলি ভাষায় লিখতেন।) পাশাপাশি নাগরী লিপির সরকারি স্বীকৃতি আদায় করা এবং এই আবেদন ঔপনিবেশিক শাসকের কাছেই, সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসকের কলেজে নির্মিত হিন্দি ভাষার সাহিত্যের বিকাশ ঘটানো। হিন্দিকে একটি রাজনীতি ও মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে এদেশে ঔপনিবেশিক শাসক ব্যবহার করে শুরু থেকেই। ব্রিটিশরা ‘নাগরী প্রচারিণী সভা’র এই আন্দোলনকে উর্দুর এক্ক আধিপত্য কমানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এর ফলে উত্তর ভারতের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে হিন্দু ও মুসলিম উচ্চবিত্তের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।

কিন্তু ভাষা হিসেবে হিন্দির জন্ম কোথায় হল!

আজ্ঞে, আপনার বাংলায়। আপনার কলকাতায়। আপনার হুগলীতে।

উনিশ শতকের আগে আজকের মতো কোনও একক বা নির্দিষ্ট হিন্দি ভাষা ছিল না। উত্তর ভারতে মূলত খড়িবোলি ভাষা প্রচলিত ছিল যাকে হিন্দুস্তানিও বলা হত। তার মধ্যে আজকের ভারতের মানচিত্র অনুসারে উত্তর প্রদেশে ছিল অওয়ধী, ব্রজভাষা, ভোজপুরী, বুন্দেলী, হিন্দুস্তানি। বিহারে ছিল মৈথিলী, ভোজপুরী, মাগাহী। ঝাড়খণ্ডে ছিল সাঁওতালী, কুরুখ, সাদরি, হো এবং মুন্ডারি। ছত্তিসগড়ে ছিল ছত্তিসগড়ী। মধ্য প্রদেশে ছিল মালভি, নিমাদি, বুন্দেলী, বাঘেলী, গোন্দি। রাজস্থানে ছিল রাজস্থানি। হরিয়ানায় ছিল হরিয়ানভি। উত্তরাখণ্ডে ছিল গাড়োয়ালী, কুমায়ুনী এবং পাহাড়ি। এই ভাষা উর্দু ও নাগরী উভয় লিপিতেই লেখা হত। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কথ্য ও লিখিত রূপ হিসেবে দুটিই ব্যবহার করতেন [স্মরণীয় হিন্দু প্রেমচন্দ ও উর্দু স্ক্রিপ্ট]। তুলসীদাস রামচরিতমানস লিখেছিলেন কিন্তু হিন্দিতে নয় অবধী বা অওয়ধী ভাষায়। যার অংশ হনুমানচল্লিশা। অযোধ্যা অঞ্চলের ভাষা।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় হিন্দি ভাষার নির্মাণ হয় ইংরেজ শাসকের হাতে এবং খুব স্পষ্টভাবে সামাজিক রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক প্রভাব নির্মাণ করতে।

ভাষা হিসেবে হিন্দির জন্ম বাংলায়। কলকাতায় এবং হুগলীতে। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে [মনে করুন লিপির দাবিও রানির নামের কলেজ থেকে] এবং হুগলীর শ্রীরামপুর মিশনে। একটি নতুন ভাষার জন্ম দেওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের উপনিবেশ শাসনের জন্য। ভারতে শাসনযন্ত্র চালাতে এবং নিজেদের প্রশাসনিক কাজের সুবিধের জন্য একটি সহজ সার্বজনিক ভাষার প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে খ্রিস্টধর্ম প্রচার, বাইবেল অনুবাদ এবং নব্য ঔপনিবেশিক কর্মীবাহিনীকে দেশীয় ভাষা শেখানোর জন্য তারা উদ্যোগী হয়। ১৮০০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং হুগলীর শ্রীরামপুর মিশনের মুদ্রণ যন্ত্র এই ঔপনিবেশিক হিন্দি ভাষা নির্মাণে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসেই প্রথম নাগরী [দেব নয়, ওটি হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডা, নগরে যে লিপি প্রচলিত তাকেই নাগরী লিপি বলে] হরফে টাইপ তৈরি হয়। খড়িবোলি ভাষা থেকে হিন্দির কৃত্রিম পৃথকীকরণ হয়। কে করেন? কারা করেন? জন গিলক্রিস্ট এবং অন্যান্য ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় লল্লু লাল ও সদল মিশ্রের মতো পণ্ডিতেরা খড়িবোলি ভাষা থেকে আরবি ফারসি শব্দ বেছে বেছে বাদ দিয়ে দেন। তার বদলে সেখানে সংস্কৃত শব্দ যুক্ত করে এক নতুন গদ্যরূপের নতুন ভাষা নির্মাণ করা হয়—ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকের ঔপনিবেশিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে। সেটাই আজকের হিন্দি।

এই নতুন ঔপনিবেশিক ভাষার সাহায্যে উনিশ শতকের আগে উত্তর ভারতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে উভয় সম্প্রদায় যে খড়িবোলি ভাষায় কথা বলত তাকে বলা হত ‘গঙ্গা যমুনা তহজিব’ অর্থাৎ গঙ্গা যমুনা সংস্কৃতি। কিন্তু যৌথ ভাষাগত সংস্কৃতি থাকলে ঔপনিবেশিক ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল” চলে কী করে! তাই ব্রিটিশরা এই ঐতিহ্যে ফাটল ধরাতে হিন্দিভাষার জন্ম দেয়। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে প্রচল উর্দু ও নাগরী স্ক্রিপ্টের খড়িবোলিকে ব্রিটিশ ভাসাবিদের সহায়তায় আরবি ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে তাকে “হিন্দুদের ভাষা” (হিন্দি); এবং সংস্কৃত শব্দ বাদ দিয়ে তাকে আরবি ফারসি লিপিপ্রধান রূপকে “মুসলমানের ভাষা” (উর্দু) হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে ভাষা আর ধর্ম একাকার হয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসকের বিভাজন নীতি সফল হয়। ১৮৩৭ সালে ফারসির বদলে উর্দু ও ইংরেজিকে আদালতের সরকারি ভাষা করায় হিন্দু উচ্চবর্ণের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। ব্রিটিশরা তখন নাগরী লিপি ও নবনির্মিত হিন্দি ভাষার দাবিকে উসকে দেয়। যা সরকারি চাকরি ও সামাজিক ক্ষমতার দখল নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ও সংঘাত তৈরি করে। দেখুন, এটাই শাসকের লক্ষ্য। ভাষাভিত্তিক এই বিভাজন পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে – হিন্দি উর্দু বিতর্ক শেষ পর্যন্ত হিন্দু মুসলিম রাজনৈতিক দূরত্বকে এত বাড়িয়ে দেয় যা পরোক্ষ ভাবে দেশভাগের পটভূমি তৈরি করে।

বিভাজিত দেশের শাসকদের ভুমিকাও কম নয়! তারা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় ঠিক যে যে জায়গায় ইংরেজি ছিল ঠিক সেই সেই জায়গায় ঔপনিবেশিক শাসকের নির্মিত হিন্দিকে চাপিয়ে বসিয়ে দিতে চান।

আজকের ভারত বস্তুত এক হিন্দি আধিপত্যবাদী দেশ।

জটায়ু... থুড়ি লালমোহন বাবু... থুড়ি সত্যজিৎ ঠিক বলেছিলেন...

"হিন্দি কি কেউ সাধে বলে মশাই!"



শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

সুর ~ উদয় রহমান

আমার দাদির একটা নিয়ম ছিল। রাত বারোটার পর গান বাজানো যাবে না।
কেন জিজ্ঞেস করলে বলতেন, “জ্বিন আসে।” আমরা হাসতাম। দাদি রাগ করতেন না। শুধু
বলতেন, “হাসনের জিনিসই ভাবো। খালি বারোটার পরে গান বাজাইয়া নাচন দিও না।”
দাদি মারা গেছেন দশ বছর হলো। আমি এখন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। নিকেতনে একটা স্টুডিওতে বসে সারাদিন অন্যের গান মেশা‌ই, মুভি, নাটক বিজ্ঞাপনের গানের সুর বসাই, ভোকাল মিক্স করি। সুরই আমার পেশা, সুরই আমার ভাত। এবং আজ, এই লেখাটা লিখতে বসছি, কারণ দাদি হয়তো ঠিকই বলতেন।
আমার মায়ের একটা হারমোনিয়াম ছিল। কলকাতার দ্বারকিন কোম্পানির, হারমোনিয়ামটা আমার মায়ের দাদার আমলের। জিনিসটা বহু বছর খাটের নিচে পড়ে ছিল। গত বছর বের করে দেখি বেলো ফাটা, তিনটা রিড বসে গেছে। স্টুডিওর এক বংশীবাদক ঠিকানা দিয়ে বললেন,

"নবাবপুরের গলিতে যান। সুর ঘর। করিম ওস্তাদরে খুঁইজা বাইর করেন। তয় একটা কথা,” বংশীবাদক একটু থামলেন,

“ওস্তাদের কথাবার্তা একটু অন্যরকম। যা কয়, সব বিশ্বাস কইরেন না। আবার সব অবিশ্বাসও কইরেন না।”
নবাবপুরের সেই গলিটা এত সরু যে রিকশা ঢোকে না। ইলেকট্রিকের দোকান, তালা চাবির দোকান, তার ফাঁকে একটা দরজা, ওপরে রঙিন কালিতে হাতে লেখা সাইনবোর্ড। "সুর ঘর" প্রোপ্রাইটর: মোঃ হাসন রাজা। সাইনবোর্ডের নিচে ছোট করে লেখা: এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়।
"সব কিছু? শুধু বাদ্যযন্ত্র না। সব কিছু।" মনে মনে ভাবলাম হাসন রাজা গান বাজনা, জমিদারি সব বাদ দিয়ে এখন বাদ্যযন্ত্র রিপায়ারের দোকান দিলো!"
ভেতরে ঢুকে মনে হলো একটা বাদ্যযন্ত্রের পঙ্গু হাসপাতালে ঢুকেছি। দেয়াল জুড়ে ঝুলছে তার ছেড়া বেহালা, দোতারা, ভাঙা সেতার, কোনায় ময়লা জমা জীর্ন এক তানপুরা। আর মেঝেতে, জলচৌকির ওপর, সাদা লুঙ্গি আর বাসন্তী ফতুয়া পড়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। ধবধবে সাদা দাড়ি, চোখে পুরু চশমা, কানে একটা হিয়ারিং এইড। ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। যে মানুষের ব্যবসাই শব্দ, তার কানে যন্ত্র।
আমার মনের কথা পড়ে ফেলার মতো করে উনি বললেন, “অবাক হইতেছো? সারা জীবন সুর শুনতে শুনতে কান দুইটা শেষ। ডাক্তার কয় আর বছর দুয়েক। তারপর পুরা নীরবতা।” উনি হাসলেন। “আমি চিন্তিত না। কান বন্ধ হইলে ক্ষতি নাই। আসল শোনাটা কানে হয় না।”
“তাহলে কীসে হয়?”
“শিরায় শিরায়।” উনি নিজের বুকে টোকা দিলেন। “শব্দ জিনিসটারে তুমি কী মনে করো? শুধু কান দিয়া শোনার জিনিস! শব্দ হইলো কাঁপন। তুমি সাউন্ডের কাজ করো, তুমি দেখো না, কনসার্টে বেইজ বাজলে বুকের মইধ্যে কেমন ধুম ধুম করে? ওইটা কানে শোনো, না বুকে গিয়ে লাগে?”
আমি হারমোনিয়ামটা নামিয়ে রাখলাম। উনি ঢাকনা খুলে ভেতরে হাত দিলেন, চোখ বন্ধ করে রিডগুলিতে আঙুল বুলালেন, যেভাবে ডাক্তার রোগীর নাড়ি চেক করে। তারপর বললেন, “আহারে। কতদিন কেউ বাজায় না।”
“ঠিক করা যাবে?”
“যাবে।” উনি মুখ তুললেন। “তয় একটা কথা। আমি বান্ধুম চাইরশো বত্রিশে। তোমাগো স্টুডিওর চাইরশো চল্লিশে না। রাজি থাকলে রাইখা যাও।”
আমি ভুরু কোঁচকালাম। “চার শো বত্রিশ মানে? এ ফোর ইকুয়ালস ফোর থার্টি টু? ওস্তাদ, সারা পৃথিবীর সব বাদ্যযন্ত্রের স্ট্যান্ডার্ড টিউনিং ফোর ফরটি হার্টজে। ইন্টারন্যাশনাল…”
“জানি।” উনি হাত তুললেন। “উনিশশো উনচল্লিশ সাল থেইকা স্ট্যান্ডার্ড। তার আগে কী আছিল জানো?”
জানতাম না। স্বীকার করলাম।
“বত্রিশ। হাজার বছর ধইরা ৪৩২। গ্রিকরা বত্রিশে বানত, মিশরিরা বত্রিশে বানত, আমাগো ওস্তাদরা, লালন ফকিররা বত্রিশে বানত। তারপর ১৯৩৯ সালে, ঠিক যখন হিটলার দুনিয়াত আগুন দিতাছে, তখন কারা জানি ঠিক করল, না, আইজ থেইকা দুনিয়ার সব গান আট নম্বর উপরে বাজবো। হইয়া গেলো তোমাগো স্ট্যান্ডার্ড চাইরশো চল্লিশ।” উনি আমার দিকে ঝুঁকলেন। “তুমি সুরের মানুষ। তুমিই কও। যুদ্ধের মইধ্যে দুনিয়ার মানুষের এত জরুরি কাম পড়ল কেন সুর বদলানির?”
“হয়তো টেকনিক্যাল কারণ…”
“হইতে পারে।” উনি মাথা নাড়লেন। “আমি মূর্খ মানুষ, ষড়যন্ত্র বুঝি না। আমি খালি একটা জিনিস বুঝি। আট নম্বরের ফারাকটা খালি কানে ধরা পড়ে না, কিন্তু শইলে ধরা পড়ে। বত্রিশের গান শুনলে মনে হয় নদীর পাড়ে বইসা আছি। বৃষ্টির ঝুমঝুম, চারশো চল্লিশের গান শুনলে মনে হয় কিসের জানি তাড়া। কীসের তাড়া, জানি না, খালি তাড়া। তুমি ভাইবা দেখো, আশি বছর ধইরা গোটা দুনিয়ার মানুষ ওই তাড়ার মইধ্যে গান শুনতাছে। মোবাইলে, বড় সাউন্ড বক্সে, দোকানে, অনুষ্ঠানে সব জাগায়। সবাই খালি কয়, অস্থির লাগে, অস্থির লাগে। কেউ জিগায় না, কেন এত অস্থিরতা!”
আমি বললাম, “কিন্তু বদলাইলো কারা? কেন?”
“হুনছি অনেক কথা।” উনি রিডটা আলোয় ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন। “ইতালির এক মস্ত ওস্তাদ আছিলেন, ভার্দি সাব। অপেরার বাদশা। উনি জান লড়াইয়া গেছিলেন চারশো বত্রিশ হার্টজ বাঁচানের লাইগা। চিঠি লেখছেন, দরবার করছেন। পারেন নাই। আর এক গবেষক সাহেব বই লেখছেন, কামডা নাকি করছে হিটলারের প্রচারমন্ত্রী আর আমেরিকার এক বড়লোকের ফাউন্ডেশন, মিলামিশা কইরা। মতলব আছিল মানুষরে ভিতরে ভিতরে অস্থির কইরা রাখা। অস্থির মানুষ চালানো সোজা। সত্য মিথ্যা আল্লায় জানে। আমি খালি একটা জিনিস দেখছি। যুদ্ধ থামছে আশি বছর, মানুষের ভিতরের যুদ্ধ থামে নাই। আর সেই যুদ্ধের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা বাজতেছে চাইরশো চল্লিশে।”
উনি হারমোনিয়ামের রিডটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে ফিরলেন। “টেসলা সাবের নাম হুনছো না? গাড়ি না, যেই লোকে দুনিয়ারে বিজলি দিছে? সেই সাব কইয়া গেছেন, মহাবিশ্বের রহস্য বুঝতে হইলে শক্তি, কাঁপন আর ঢেউয়ের ভাষায় ভাবতে হবে। দুনিয়ার সব থেইকা ছোড যেই কণা, সেইটাও নাকি আসলে একটা কাঁপতে থাকা সুতার মত। বোঝলা কথাডা? পাথর, মাটি, তোমার হাড্ডি, এমনকি তোমার চিন্তাডাও, সবই কাঁপন। তাইলে দুনিয়াডারে কী বলা যায়?” উনি হাসলেন।
“দুনিয়াডা একটা তানপুরা। খোদার তানপুরা। আর আমরা সবাই ওই তানপুরার এক একটা তার। এখন কও, তারের কাম কী? তারের কাম সুরে থাকা, টিউনে থাইকা বাজা। বেসুরা তার বাজতে থাকলে দুনিয়ায় শান্তি কেমনে আসবো, অশান্তি ছাড়া আর কিছু থাকবে?”
আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লোকটার কথা আধপাগলের মতো, অথচ ফেলে দিতে পারছি না। পেশাগত জীবনে আমি নিজে কতবার খেয়াল করেছি, কিছু মিক্স শুনলে অকারণে ক্লান্ত লাগে।
“পৃথিবীরও একটা সুর আছে, জানো?” ওস্তাদ বলে চললেন। “জার্মান এক সাহেব মাইপা বাইর করছে। মাটি আর আসমানের মাঝখানে একটা কাঁপন সারাক্ষণ চলতাছে।"
"জ্বী এই ব্যপারে আমার জানা আছে। এটাকে বলে শুমান রেজোন্যান্স।"
"আমার ওস্তাদ কইতেন অন্য নাম।”
উনি একটু থামলেন। "কইতেন, এইটা দুনিয়ার জিকির। সব কিছু জিকির করে, বুঝলা। পাথর করে, গাছ করে, পশুপাখি করে, আকাশ সাগর সবেই করে। খালি মানুষ নিজের কানে শুনতে পায় না।”
“আপনি শুনেছেন?”
উনি উত্তর দিলেন না। হারমোনিয়ামের একটা রিড খুলে আলোর দিকে ধরে পরীক্ষা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “সাতদিন পরে আইসো। জিনিস রেডি থাকবো।”
সাতদিন পর গিয়ে দেখি হারমোনিয়াম নতুন যৌবন পেয়েছে। ওস্তাদ বললেন, “শুনো।”
উনি একটা চেনা সুর ধরলেন, কিন্তু গানের কথা মনে এলো না। এবং আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারব না কী হলো। শব্দটা কানে ঢুকল না। শব্দটা বুকে ঢুকল। মনে হলো কেউ আমার পাঁজরের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে খুব পুরনো একটা তালা খুলে দিল। আমার চোখ ভিজে উঠছিল, অকারণে, এবং সেটা লুকানোর জন্য আমি মাথা নিচু করে রইলাম। জানালার কার্নিশে দুইটা চড়ুই এসে বসল। গলির কুকুরটা দরজায় এসে চুপ করে বসে পড়ল। উনি থামার পরেও ঘরটা কয়েক সেকেন্ড ধরে বাজতে থাকল।
“বুঝলা কিছু?” ওস্তাদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
“এটা… এটা কী হলো?”
“কিছুই হয় নাই। খালি যন্ত্রটারে তার নিজের সুরে ফেরত দিছি।” উনি আমার দিকে তাকালেন। “তোমারে ফেরত দিছি। মানুষের শইলের সত্তর ভাগ পানি। আর পানি কাঁপনের কথা শোনে। জাপানি ডাক্তার সাব পরীক্ষা কইরা দেখছেন। পানিরে সুন্দর সুর শুনাইয়া বরফ করলে বরফের ফুলের নকশা বানালে তা হয় নিখুঁত সুন্দর। আর বিকট শব্দ, গালাগালি শুনাইয়া বরফ করলে ফুলডা হয় ভাঙা, তুবড়ানো, লন্ডভন্ড।
এইবার হিসাবডা করো। তোমার ভিতরে সত্তর ভাগ পানি, আর তুমি সকাল থেইকা রাইত পর্যন্ত কানে কী ঢালতেছ এই ঢাকা শহরে? হর্ন, ঝগড়া, মিটিংয়ের চিল্লানি, ব্রেকিং নিউজ, মিটিং, মিছিল। ভিতরে রোজ কী জমতেছে, সুন্দর নকশা না ভাঙন? তুমি এতক্ষণ সঠিক সুরে কাঁপলা। এই প্রথম, হয়তো বহু বছরে। এইজন্যই চোখে পানি আইছে। পানি পানিরে চিনছে।”
এরপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম। কাজ থাকুক না থাকুক। ওস্তাদ চা খাওয়াতেন আর কথা বলতেন। সেই কথাগুলি আমি লিখে রাখতাম, রাতে, মনে করে করে।
সুরাইয়ার সাথে দেখা হলো তৃতীয় সপ্তাহে।
সেদিন দোকানে ঢুকে দেখি জলচৌকিতে ওস্তাদ নেই। বসে আছে এক তরুণী, কোলে একটা বেহালা। চোখ বন্ধ, কাধ বেহালার গায়ে ঠেকানো, কি সে মলিন বিষন্ন সুন্দর সুর তাতে বাজছে সে বুঝাতে পারবো না। আমি ঢুকতেই চোখ না খুলে বললো, “বসেন। দাদাজান ওষুধ আনতে গেছেন।”
আমি বসলাম। মেয়েটা আরও মিনিট দুয়েক তার বন্ধ চোখে সুরের সাধনা চালালো। তারপর চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনিই সেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার? দাদাজান আপনার কথা বলেন। কয়, পোলাডার কান আছে, খালি কানের ব্যবহার জানে না।”
“মানে?”
সে উত্তর না দিয়ে বেহালায় পরপর দুইটা টান দিল। “ফারাক কি, বলেন তো।”
আমি শুনলাম। মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। “একই তো লাগল।”
“এই জন্যই দাদাজান ওই কথা কয়।” সে বেহালা নামিয়ে রাখল। “প্রথমটা চাইরশো চল্লিশ, পরেরটা বত্রিশ। আপনে সারাদিন যেইটা বেচেন, আর যেইটা হারাইয়া ফেলছেন।”
মেয়েটার নাম সুরাইয়া। ওস্তাদের নাতনি, স্কুলে গান শেখায়, আর ওস্তাদের চোদ্দ পুরুষের বিদ্যার একমাত্র ওয়ারিশ।
কথার মাঝখানে গলিতে একটা রিকশা বেল বাজাতে বাজাতে গেল। সুরাইয়া এমনভাবে মুখ কোঁচকাল “শুনছেন?
বেলটা গত সপ্তাহ থেইকা বেসুরা। কমা খানিক নাইমা গেছে। রোজ শুনি আর রোজ মেজাজ খারাপ হয়।”
“রিকশার বেলেরও সুর থাকে?”
“সব কিছুর সুর থাকে।”
সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল। “সাইনবোর্ড পড়েন নাই?”
যাওয়ার সময় সে বললো, “একটা কথা।
দাদাজানের সব কথা বিশ্বাস কইরেন না।”
আমি বললাম, “আবার সব অবিশ্বাসও করব না?”
সুরাইয়া প্রথমবারের মতো হাসল। বলল, “ভালই তো চিনছেন তারে।”
এরপর থেকে সুর ঘরে আমার যাওয়ার কারণ দুইটা হয়ে গেল। এই তথ্যটা আমি ওস্তাদকে কোনোদিন বলিনি। বলার দরকারও ছিল না। বুড়া জানে না, বুঝে না এমন কিছুই মনে হয় নাই।
সুরাইয়ার সাথে আমার সবচেয়ে বড় তর্কটা হয়েছিল এক সন্ধ্যায়, দোকানে, ওস্তাদ তখন মসজিদে। ও হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আপনি স্টুডিওতে কী কী বানান?”
আমি গর্ব করে বললাম, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড, আইটেম গান।
সুরাইয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনি জানেন আপনি আসলে কী বানান? আপনি হিপনোটিস্ট, সুরকার সাহেব। মানুষের অজান্তে মানুষের মন চালানোর যন্ত্র বানান। খালি জানেন না।”

“বাড়ায়া বলতেছো।”
“একটা দুঃখের গান ছাড়েন, তারপর নিজেরে খেয়াল কইরেন। পাঁচ মিনিট পরে দেখবেন কাঁধটা কখন নুইয়া গেছে, মুখের হাসিটা কখন মিলাইছে, আপনি নিজেও টের পান নাই। কেউ আপনারে কয় নাই দুঃখী হন। এইটারে কী কয়? হুকুম মানা।”
"মস্তিষ্কে ডোপামিন বইলা একটা জিনিস আছে, আনন্দের কেমিক্যাল। মাপজোক কইরা দেখা গেছে, প্রিয় গান শুনলে মগজ ঠিক ততটুকু ডোপামিন ছাড়ে যতটুকু ছাড়ে প্রেমে পড়লে। বোঝলেন? আপনার হাতের মিক্সিং কনসোলটা মানুষের মগজের কেমিস্ট্রি বদলানোর মেশিন।”
“ভালো কথা। তাতে ক্ষতিটা কী?”
“ক্ষতি?” সুরাইয়ার গলা নেমে গেল।
“আমেরিকায় এক কনসার্টে দশটা মানুষ মারা গেছে, পায়ের নিচে চাপা পইড়া, শুনছেন? সবাই কয় ভিড়ের দুর্ঘটনা। ভিড়টা বানাইলো কে? হাজার হাজার মানুষ এক বিটে মাথা নাড়তেছিল, এক কাঁপনে শরীর দুলাইতেছিল। হার্টের তালটারে টাইনা নিজের তালে নেয়। তখন মানুষের যুক্তিবুদ্ধি কমে, নিজের উপর দখল কমে, ভিড়ের লগে মিশা যাওয়ার টান বাড়ে। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না, ঢেউ হয়া যায়। আর ঢেউয়ের কোনো বিবেক নাই।” ও থামল।
“হিটলার যুদ্ধের সময় এই বিদ্যা জানতো। মশাল, এক ছন্দের স্লোগান, এক কাঁপনে লাখ মানুষের গলা। ওই কাঁপন মানুষরে ব্যক্তি থেইকা দল বানাইতো। আর দল তখন যা করছে, একলা মানুষ জীবনেও করত না। ইতিহাস পড়েন নাই?"
"আপনার মত সবজান্তা দাদা তো আমার নাই। আমি কেমনে জানবো এগুলা।"
সুরাইয়া বলেই যাচ্ছে, দাদা নাতনির একই স্বভাব, লেকচার শুরু করলে সহজে থামে না,
"শব্দ দিয়া মানুষরে এক করা যায়, আবার শব্দ দিয়াই মানুষ ভাঙা যায়। যে জাতিরে শেষ করতে চাও, আগে তার গান নষ্ট করো। গান হইলো জাতির সবচেয়ে গভীরের শিরা।”
আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ আমার মনে পড়ছিল, স্টুডিওতে ক্লায়েন্ট প্রায়ই বলে, ভাই, বিটটা আরও অ্যাগ্রেসিভ করেন, মানুষ যেন বইসা থাকতে না পারে।
“তাইলে করণীয় কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “কানে তুলা দিয়া ঘুরবো?”
“না।” সুরাইয়া হাসল। “বাছবেন। মানুষ মুখে কী ঢুকাইবো দশবার দেখে, আর কানে সারাদিন যা আসে তা-ই ঢালে। পচা খাবারে পেট খারাপ হয় একদিনে, টের পাওয়া যায়। পচা শব্দে মন খারাপ হয়, সহজে টেরও পাওয়া যায় না। যেই গান শোনার পরে আপনার ভিতরটা অস্থির লাগে, রাগ রাগ লাগে, ওই গান আপনার খাদ্য না, ওইটা বিষ, যত মিঠাই লাগুক। আর যেই শব্দ শোনার পরে ভিতরটা শান্তি পায়, ওইটা ওষুধ।”
“প্রকৃতির শব্দগুলো।” ও জানালার দিকে তাকাল। “বৃষ্টির শব্দে ঘুম আসে ক্যান জানেন? ওই কাঁপন মগজরে কয়, বিপদ নাই, শুইয়া পড়ো। বৃষ্টির রাইতে বাঘও শিকারে বাইর হয় না। পাখির ডাকে সকালে মন ফুরফুরা লাগে, কারণ পাখি ডাকে খালি নিরাপদ ভোরে, মগজ এইটা লাখ বছর ধইরা জানে। আর সাগরের ঢেউয়ের শব্দ মানুষরে মনে করাইয়া দেয়, সে নিজের চাইতে বড় কিছুর অংশ। খেয়াল করছেন কোনোদিন, বন, নদী, বৃষ্টি, পাখি, প্রকৃতির সব শব্দ ওই চারশো বত্রিশের ঘরের আশেপাশে? আর আমরা থাকি সারাদিন চল্লিশে বান্ধা শহরের ভিতরে। পাহাড়ে গেলে মনে হয় এতদিনে শ্বাস নিতে পারতেছি, সাগরপাড়ে গেলে মনে হয় কতদিন পরে নিজেরে খুঁইজা পাইলাম। আসলে আমরা কিছু খুঁইজা পাই না।”
আমরা ফিরা যাই। যেই কাঁপনে আমরা বানানো, সেই কাঁপনে।”
সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমার কাজ করার হাতটা বদলে গেল। কনসোলে বসলেই মনে হতো, সুরাইয়া আর তার দাদা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সুরের টিউন ৪৩২ এ নামিয়ে দিতাম। ক্লায়েন্ট টের পেত না।
ওস্তাদ একদিন বললেন, “আজান শুনলে বুকে টান লাগে ক্যান জানো? ওই শব্দ তুমি শুনছ জন্মের পর থেইকা, দিনে পাঁচবার। শব্দ বারবার শুনলে সে মগজের ভিতরে রাস্তা কাইটা নেয়। যত শুনবা, রাস্তা তত গভীর। সুরা ফাতিহা রোজ প্রতি নামাজে পড়ায় ক্যান? বিপদের দিন যখন মাথা কাম করবো না, তখন ওই রাস্তা দিয়াই শব্দ নিজে নিজে বাইর হয়া আসবো। আর মুসলমানের ঘরে বাচ্চা জন্মাইলে সবার আগে ডাইন কানে আজান দেয় ক্যান, কোনোদিন ভাবছ? দুনিয়ায় আইসা বাচ্চাটা পয়লা যেই শব্দ শুনবো, সেইটা যাতে ঠিক সুরে বান্ধা থাকে। মানুষের টিউনিং শুরু হয় জন্মের পয়লা মিনিটে। আরেকটা জিনিস কই, বিজ্ঞানীরা মাইপা দেখছে। বুকের ভিতর দিয়া একটা লম্বা রগ নামছে, কইলজা ছুঁইয়া, পেট পর্যন্ত। আরবি মাখরাজের কাঁপন, ধীরলয়ে তিলাওয়াতের গুনগুন, ওই রগটারে জাগাইয়া দেয়। আর ওই রগ জাগলে বুক ধীর হয়, পেট শান্ত হয়। দোয়া পড়লে বুকটা হালকা লাগে ক্যান, এতদিনে বুঝলা? এইটা খালি সওয়াব না রে ভাই। এইটা শরীর। খোদা মানুষের শইলের ভিতরেই তার নিজের কমান্ডের লাইন বসাইয়া রাখছেন।”
এই পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হতে পারে, ভালোই তো, এক জ্ঞানী বুড়ার সাথে এক যুবকের আলাপের গল্প। মনে হওয়ারই কথা। আসল গল্পটা আমি ইচ্ছা করে শেষের জন্য রেখেছি।
এক বিকালে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ওস্তাদ, আপনার সাইনবোর্ডে লেখা, এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়। সব কিছু মানে কী?”
ওস্তাদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর উঠে ভেতরের ঘর থেকে একটা পুরনো টিনের বাক্স আনলেন। বাক্সের ভেতরে কাপড়ে মোড়া একটা বাঁশের বাঁশি। কালো হয়ে যাওয়া, মাথায় রুপার কাজ।

“আমার ওস্তাদের ওস্তাদের ওস্তাদের… হিসাব রাখি নাই কত পুরুষ। এই বাঁশি বাজে না। মানে, আমরা বাজাই না।” উনি বাঁশিটা ছুঁলেনও না, শুধু তাকিয়ে রইলেন। “জার্মানিতে একটা শহর আছে। হ্যামেলিন। সাতশো বছর আগে ওই শহরে এক বাঁশিওয়ালা আসছিলো। প্রথমে এক সুর বাজাইলো, শহরের সব ইন্দুর নদীতে গিয়া ডুবল। শহরের লোকেরা তারে ওয়াদামত টাকা দিলো না। সে তখন আরেক নতুন সুর বাজাইলো। এইবার বাইর হয়া আসলো শহরের একশো তিরিশটা বাচ্চা। ঘুমঘুম চোখে, মা বাপের ডাক, নিষেধ কিছুই কানে যায় না, খালি সুরটাই কানে যায়। পাহাড়ের ভিতরে ঢুইকা গেল। আর ফিরে নাই। মানুষ কয় রূপকথা। ওই শহরের পুরানা দলিলে ঘটনাটা লেখা আছে, তারিখসহ। এই জিনিস যে আইজও চলতেছে না তুমি কেমনে জানবা?”
উনি আমার দিকে তাকালেন। “এইবার আসল কথাটা শোনো। এক বাঁশি। ইন্দুরের লাইগা এক সুর, মানুষের লাইগা আরেক সুর। মানে বোঝো? প্রত্যেক জিনিসের একটা নিজের কাঁপন আছে, আর ওই কাঁপনটা খুঁইজা পাইলে জিনিসটারে যেদিকে ইচ্ছা টানা যায়। সাপুড়ের বীণ সাপরে টানে। মাজারের জিকির মানুষরে ঘোরায়। প্রশ্ন হইলো, সবচেয়ে উপরের সুরটা কী? যেই সুরে সব বান্ধা?”
আমি চুপ করে রইলাম।
“আল্লাহ দুনিয়া বানাইছেন ক্যামনে, কোরানে আছে। কুন ফায়াকুন। হও, আর হইয়া গেল। খেয়াল কইরো, উনি হাত দিয়া বানান নাই, মাটি দিয়া শুরু করেন নাই। শুরু করছেন একটা শব্দ দিয়া। আর শেষটা হইবো ক্যামনে তাও তো জানো? সেইটাও শব্দ। ইস্রাফিল ফেরেশতা সৃষ্টির পয়লা দিন থেইকা শিঙা ঠোঁটে লাগাইয়া খাড়াইয়া আছেন। এক ফুঁয়ের অপেক্ষায়। চিন্তা কইরা দেখো ব্যাপারটা। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বাদক, অনন্তকাল ধইরা রেডি হইয়া আছেন, খালি হুকুম আসে নাই বইলা বাজান নাই। তাইলে দুনিয়াটা কী দাঁড়াইলো? দুই নোটের মাঝখানের একটা গান। পয়লা নোটটা বাইজা গেছে, শেষ নোটটা এখনো বাজে নাই। আমরা সবাই ওই মাঝখানের সুরটার তালেই দুলতে থাকি। এইবার বুঝলা, সাইনবোর্ডে ক্যান লেখছি এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়? সব কিছু আসলেই সুরে বান্ধা। শুরু থেইকা শেষ পর্যন্ত। এখন চিন্তা করো, ওই পয়লা শব্দটার কাঁপন কত আছিল?”
আমি শুধুই হা হয়ে শুনছি ওনার কথাবার্তা।
ওস্তাদের গলা নেমে ফিসফিসে ঠেকল। “আমার ওস্তাদ মরনের আগে একবার, খালি একবার, ওই সুরের ষোলো ভাগের এক ভাগ খুজে পাইছিলেন। তার নিজের গলায়, বাদ্যযন্ত্রে না। আমি পাশে বসা। আমি তোমারে কসম কইরা কইতাছি, ঘরের বাতাস ভারি হয়া গেছিল, দেয়ালের চুন ঝরছিল, আর আমার মনে হইছিল আমি জন্মের আগের কোনো জায়গার কথা মনে করতে পারতাছি। তারপর ওস্তাদ থাইমা গেলেন। কইলেন, বাকিটা বাজাইলে ফেরত আসন যাইবো না।”

“ফেরত আসা যাবে না মানে?”
“মানে ওই বাচ্চাগুলার মতো।” উনি হামেলিনের দিকে ইশারা করলেন, যেন শহরটা পাশের ঘরে। “সুর যখন ডাকে, তখন যাইতে হয়। যেই সুর আমরা মানা করতে পারি না। রাইত বারোটার পরে দুনিয়া চুপ হয়া নিজের জিকিরে ফিরা যায়। তখন তুমি যেই সুর বাজাইবা, সেই সুর বহুদূর যায়। এবং,” উনি থামলেন, “সব কান দুনিয়ার না।”
“জ্বীন?”
“নাম দিয়া কী করবা।” ওস্তাদ বাক্সটা বন্ধ করলেন। “যে শোনে, সে শোনে। আর যে শোনে, সে মাঝে মাঝে কাছেও আসে।”
এই ঘটনার মাস দুয়েক পরের কথা। বৃহস্পতিবার রাত। স্টুডিওতে কাজ শেষ হতে হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। বাসায় ফেরার পথে মনে পড়ল, ওস্তাদ আমার জন্য একটা পুরনো মান্ডোলিন ঠিক করে রেখেছেন, নিতে বলেছিলেন। ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে দশ।
গলিতে ঢুকে আমি থমকে গেলাম।
গলিটা নিস্তব্ধ। শুধু নিস্তব্ধ না, অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। ঢাকা শহর রাত বারোটায়ও এতটা চুপ হয় না। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে, কি যে অপূর্ব বিষন্ন সুর ঘরের বন্ধ দরজার ফাঁক গলে ভেসে আসছিলো।
এবং সুরটা একা ছিল না। একটা যন্ত্র বাজছিল, বাঁশির মতো, অথচ বাঁশি না। আর তার সাথে, খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসের মতো, একটা মানুষের গলা মিশে ছিল। মেয়েলি মোলায়েম গলা। খুব চেনা ধাঁচের, অথচ ধরতে পারছিলাম না কার।
আমি জীবনে বহু গান শুনেছি। পেশাই আমার শোনা। ওই সুরের সাথে কোনো কিছুর তুলনা আমি দিতে পারব না। শুধু বলতে পারি, সুরটা শুনে আমার একইসাথে মনে হচ্ছিল মায়ের কথা, মনে হচ্ছিল দাদির কথা, মনে হচ্ছিল এমন সব জায়গার কথা যেখানে আমি কোনোদিন যাইনি অথচ চিনি। আমার পা মাটিতে গেঁথে গিয়েছিল। এবং তখন আমি জিনিসটা দেখলাম।
গলির ইঁদুরগুলি। ড্রেনের ধার থেকে, ডাস্টবিনের পাশ থেকে, ওরা বেরিয়ে এসেছে। কেউ দৌড়াচ্ছে না। ওরা বসে আছে। সার বেঁধে, চুপ করে, সুর ঘরের দরজার দিকে মুখ করে, যেভাবে মসজিদে মানুষ সারি বেধে বসে।
সুরটা থেমে গেল।
Uploaded Image
কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলল। ওস্তাদ দাঁড়িয়ে। ওনার মুখ দেখে আমার বুক ধক করে উঠল। উনি কাঁদছিলেন, এবং একইসাথে ওনার মুখে এমন একটা আলো, যেটার কোনো নাম আমি জানি না।
উনি আমাকে দেখে চমকালেন না। শুধু বললেন, “শুনছো?”
আমি মাথা নাড়লাম। “কতখানি শুনছো?”
“গলির মাথা থেকে।”
উনি কী যেন হিসাব করলেন মনে মনে। তারপর বললেন, “যাও। বাড়িত যাও। দৌড়ায়া যাইবা না, হাঁইটা যাইবা, তয় পিছে ফিরবা না।” আমি ঘুরে হাঁটা দিতেই পেছন থেকে ডাকলেন, “শোনো।” আমি থামলাম, ফিরলাম না। উনি বললেন, “তোমার দাদি ঠিক আছিলেন। মুরুব্বিগো কথা ফালাইও না।”
ওইটাই শেষ কথা।
পরের শুক্রবার গিয়ে দেখি সুর ঘর তালাবন্ধ। তার পরের শুক্রবারও। পাশের দোকানদার বলল, “ওস্তাদের খবর জানি না ভাই। তয় একটা জিনিস আপনের লাইগা রাইখা গেছে।” সে ভেতর থেকে আমার সেই মান্ডোলিনটা আনলো, সাথে একটা ভাঁজ করা কাগজ।
কাগজে কাঁপা হাতে লেখা:
“সুরটা এতদিন আমি খুঁজতাম। কয়দিন ধইরা টের পাইতেছিলাম, সেই সুরটাও আমারে খুঁজে। বৃহস্পতিবার রাইতে আমরা দুইজন দুইজনরে পাইছি। চিন্তা কইরো না। যেই সুরের ডাকে হামেলিনের বাচ্চারা হাসতে হাসতে গেছিলো, সেই ডাক খারাপ কিছু হইতে পারে না। খালি আফসোস, তোমারে পুরাটা শোনাইতে পারলাম না। তোমার হারমোনিয়াম, মান্ডোলিন চারশো বত্রিশে বান্ধা। ওইটারে কোনোদিন চল্লিশে তুইলো না। রোজ বাজাইও, দুনিয়া তোমারে সারাদিন যেই সুরে বান্ধে, রাইতে ঘরে ফিরা নিজেরে নিজের সুরে টিউনে ফিরাইয়া নিও।”

সুর ঘর অবশ্য বেশিদিন বন্ধ থাকেনি।
মাস খানেক পর গলি দিয়ে যাচ্ছি, দেখি দরজা খোলা। ভেতরে জলচৌকিতে বসে আছে সুরাইয়া। দাদার জায়গায়, দাদার ভঙ্গিতে। আমাকে দেখে মুখ তুলল। চোখ দুটো লাল, তবে শান্ত।
“দোকান তো বন্ধ করা যাইবো না,” সে বলল, যেন আমি প্রশ্ন করেছি। “শহর ভরা বেসুরা জিনিস। কেউরে তো সুরে বান্ধন লাগবো।”
আমি অনেকদিন কথাটা জিজ্ঞেস করব করব করে করিনি। সেদিন করলাম। “সুরাইয়া। ওই রাতে যন্ত্রের সাথে একটা গলাও ছিল। মেয়ের গলা। তুমি ছিলা?”
সে বেহালার ধুলা মুছছিল। হাতটা থেমে গেল। অনেকক্ষণ পর বলল, “আমি ওই রাইতে চিটাগাংয়ে। খালার বাসায়।”
“তাহলে গলাটা কার?”
“দাদাজান একটা কথা কইতেন।” সুরাইয়া মুখ তুলল না। “সুরটা যখন কাউরে নিতে আসে, একলা আসে না। চেনা গলা ধইরা আসে। যেই গলা শুনলে মানুষ আর না কইতে পারে না। দাদাজানের কাছে মনে হয় গেছিল ওনার মায়ের গলায়। দাদাজানের মা গান গাইতেন, জানেন তো।”
তারপর সে মুখ তুলল, এবং আমার সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার কাছে যেদিন আসবো, কার গলায় আসবো, ভাবছেন কোনোদিন?”

গলির ভেতর দিয়ে একটা রিকশা বেল বাজিয়ে গেল। সেই বেসুরা বেল। আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম, তারপর দুজনেই হেসে ফেললাম। ভয়ের পরের হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি হাসি।
এই গল্পের বাকি অংশে একটা বিয়ে আছে। সুরাইয়ার সাথে আমার। প্রেমের অংশটুকু আমি ইচ্ছা করে বাদ দিলাম। কিছু সুর সবাইকে শোনাতে নেই।

শুধু এটুকু বলি, কাবিনের দিন সুরাইয়া তার দাদার সেই টিনের বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলো, “এইটা এখন আমাদের সংসারের জিনিস। শর্ত একটাই। ঢাকনা খোলা যাইবো না।” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কোনোদিনই না?” সে বলেছিল, “যেদিন খোলার দিন আসবো, সেদিন আপনারে জিগানো লাগবো না। বাক্স নিজেই জানান দিবো।”
এরপর দুই বছর কেটে গেছে। আমি এখনো স্টুডিওতে সারাদিন চার শো চল্লিশে অন্যের গান বাঁধি। পেট চালাতে হয়। কিন্তু রোজ রাতে বাসায় ফিরে মায়ের হারমোনিয়ামটা বাজাই। সুরাইয়া পাশে বসে গলা মেলায়। দুনিয়া আমাদের সারাদিন যে সুরে চালায়, রাতে আমরা নিজেদের নিজেদের টিউনে ফিরিয়ে নিই।
আর গত মাসে আমাদের মেয়ে হয়েছে।
হাসপাতালের কেবিনে, নিয়ম মতো, আমি ওর ডান কানে আজান দিলাম। এবং একটা আশ্চর্য জিনিস হলো। আজানের প্রথম শব্দে বাচ্চাটার কান্না থেমে গেল। এক সেকেন্ডে। নার্স হেসে বলল, “মাশাল্লাহ, কী শান্ত বাচ্চা।” সুরাইয়া আমার দিকে তাকাল, আমি সুরাইয়ার দিকে।
বাচ্চাটা শান্ত হয়নি। বাচ্চাটা শুনছিল। মন দিয়ে, পেশাদার কানে শুনছিল। ওর টিউনিং হচ্ছিল, জীবনের প্রথম মিনিটে, ওর বড়দাদার ওস্তাদের কথামতো।
মেয়ের নাম রেখেছি আয়াত।
কাল রাতের কথা। শহর একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল এবং সেই নীরবতার ভেতরে মায়ের হারমোনিয়ামের রিডটা কেঁপে উঠল। সাথে সেই বক্সে রাখা বাদ্যযন্ত্র।
আর বিছানায়, ঘুমের ভেতরে, আমার এক মাসের মেয়ে সেই একই সুরে গুনগুন করে উঠল। এক চুল এদিক ওদিক না। সুরাইয়ার হাত অন্ধকারে আমার হাত খুঁজে নিল। ও ফিসফিস করে বলল, “শুনছো?” আমি বললাম, “হুঁ।” ও বলল, “ভয় পাইছ?” আমি অনেকক্ষণ ভেবে সত্যি উত্তরটা দিলাম। “না।”
সত্যিই ভয় পাইনি। কারণ ততদিনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি।
এই সব জানার পর থেকে আমার একটাই অভ্যাস বদলেছে। আমি এখন শব্দ বাছি। যেভাবে মানুষ খাবার বাছে। আপনি পেটে কী ঢালেন তার হিসাব রাখেন, ক্যালরি গোনেন, ভেজাল দেখেন। কানে সারাদিন কী ঢালছেন, তার হিসাব শেষ কবে করেছেন? যেই শব্দ শুনে ভেতরটা তেতে ওঠে, সেটা বিনোদন না, সেটা ডোজ। আর যেই শব্দ শুনে ভেতরটা শান্ত হয়, বৃষ্টি, তিলাওয়াত, মায়ের গলা, ভালো একটা গান, সেটার দাম ওষুধের চেয়ে বেশি। মহাবিশ্ব সবসময়ই কথা বলছে, সুরে চালাচ্ছে, ওস্তাদ বলতেন। প্রশ্ন হলো আমরা কী শুনছি, আর কারটা শুনছি।
তবে দাদির নিয়মটা আমি এখনো মানি। রাত বারোটার পর আমাদের বাসায় কেউ গান বাজায় না।

সমস্যা একটাই।
মাঝে মাঝে, খুব গভীর রাতে, সুর নিজেই আমাদের বাসায় বেজে ওঠে।
ওইটা তো আর আমার হাতে না।

মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

বীণা দাস আমার ছোটদিদু ~ সুব্রতা দাসগুপ্ত

গত বেশ কয়েকবছর ধরে ফেসবুকের পাতায় এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কোনও এক ইতিহাসের অধ্যাপকের একটি কাল্পনিক লেখা ঘোরাফেরা করছে। সমাজমাধ্যমে এইধরনের অনেক লেখা ঘোরাফেরা করে, সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া কর্মহীনের পক্ষেই সম্ভব, আপাতত তাই যথাসম্ভব উপেক্ষাই করি। বীণা দাসকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্পটিকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি কারণ বীণা দাস আমার ছোটোদিদু। আমি নিজে তাঁকে ছোটবেলায় অল্পস্বল্প দেখেছি। তার চেয়েও বড় কথা আমার মা, এবং অন্যান্য মাসীদের জীবনযাত্রায় ওপর ওঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব থেকে বুঝেছি, গোটা পরিবারের কাছেই তিনি কতটা শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত করে আছেন। সমাজমাধ্যমে প্রচলিত গল্পের উত্তরটিও সমাজমাধ্যমে, মানে ফেসবুকের জন্যেই লিখেছিলাম। পড়ে অনেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কেউ কেউ দুঃখিতও হয়েছেন। কিন্তু এতদিন পরে আবার ‘উৎস মানুষ’ সম্পাদক মহাশয় আমায় অনুরোধ করলেন বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত আকারে লিখতে। আমি সম্পাদক মহাশয়কে অনুরোধ করব ওই লেখাদুটি অবিকৃত অবস্থাতেই প্রকাশ করতে। এই লেখাটি থাক সংযোজন হিসেবেই। 

‘বিস্তৃত আকারে’ কিছু লেখা অবশ্য মুশকিল। কারণ আগেই বলেছি, আমার ছোটদিদুকে আমি দেখেছি মাত্রই কয়েকবার। সেও ছোটবেলায় ওঁদের আনোয়ার শা রোডের সরকারি আবাসনে। আমরা বেশ অনেকে মিলেই সেখানে যেতাম। উনি যে ছোটদের দেখে বিশেষ খুশি হতেন সেটা বুঝতে পারতাম ওখানে গিয়ে। এ ছাড়াও ওঁর সঙ্গে দেখা হত আমার নিজের দিদু, বীণা দাসের সেজদিদি পুণ্যপ্রভা বসু (দাস)-এর বাড়িতে। বড়মাসী ধীরা ধরের বাড়ি ছিল, সেন্ট্রাল পার্কে, সেখানেও ওঁরা খুব আসতেন। আমি সেখানেও দেখেছি বেশ কয়েকবার। সেন্ট্রাল পার্কে বড়মাসীর বাড়ি আসতেন আরেকজনও। কল্যাণী ভট্টাচার্য-বীণা দাসের ছুটুদিদি-ছাত্রী সংঘের প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীনতা সংগ্রামী, এবং অক্লান্ত সমাজসেবী। বীণা, কল্যাণী, পুণ্যপ্রভা-দের মায়ের স্মৃতিতে সরলা পুণ্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা ছাড়াও আরও কত ধরনের সমাজসেবামূলক কাজে যে কল্যাণী ভট্টাচার্য অর্থ, শ্রম ও নেতৃত্ব দিয়ে অংশ নিয়েছেন তারও কোনও যথাযথ ডকুমেন্টেশন হয়নি। কল্যাণী ভট্টাচার্যের স্বামী দিল্লীতে খুবই উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন, তাঁর জীবনযাত্রা, পোষাক আশাক বা আদব কায়দার মধ্যে একধরনের পারিপাট্য ছিল। কিন্তু কল্যাণী ভট্টাচার্য ছিলেন একেবারে বিপরীত। এত আত্মবিস্মৃত কর্মী মানুষ আমি আর দেখিনি বললেই চলে।

আমার মা ইন্দিরা, বড়মাসী ধীরা এবং মেজমাসি ইরা-এঁরা তিনজনেই আবার কল্যাণী ও বীণার বিশেষ ভক্ত ছিলেন। কল্যাণী ভট্টাচার্যের লেখা ‘জীবন অধ্যয়ন’ বইটিতে পাওয়া যাচ্ছে ধীরা তাঁর মাসির সঙ্গে বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশে দুর্ভিক্ষের সময় চট্টগ্রামে চলে যাচ্ছেন সমাজসেবার কাজে। পরবর্তী সময় বীণা দাসের পরামর্শেই সম্ভবত, এই বোনেরা কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টির সঙ্গে কাজ করেছেন। চটকল শ্রমিক পরিবারের মেয়েদের মধ্যে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি আছে অধ্যাপক শমিতা সেন-এর লেখাতেও। এই ধীরা গত হয়েছেন অল্প কিছুদিন আগে, প্রায় একশ বছর বয়েসে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে পর্যন্তও রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ থেকে শুরু করে সুনীল গাঙ্গুলী পর্যন্ত বিভিন্ন লেখকের লেখার অনুবাদ করে গিয়েছেন শুধুমাত্র বাংলার বাইরে বা দেশের বাইরে বড় হওয়া বঙ্গসন্তানদের জন্য, যারা কোনও না কোনও কারণে বাংলা ভাষায় সাহিত্যের রসাস্বাদনে সক্ষম হয়ে ওঠেনি। 

এই লেখা বীণা দাসের জন্যই। কিন্তু আগেই বললাম বীণা দাসকে আমি চিনেছি শৈশবের চোখে, সেই চেনা সমৃদ্ধ ও পূর্ণতর হয়ে উঠেছে যাঁদের সংযোগে তাঁরা হলেন এই ধীরা, ইরা ইন্দিরা প্রভৃতি আমার মা মাসীরা। তাঁরা নিজেরাই যথেষ্ট সমীহ-সম্ভ্রম উদ্রেককারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন কিন্তু বীণা দাসের প্রতি আবার তাঁদের যে আনুগত্য, সম্ভ্রম, এবং অনুরাগ দেখেছি, তা থেকে বীণা দাসের ব্যক্তিত্বের মহত্ব আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দিদি কল্যাণীর মতো একদমই আলুথালু প্রকৃতির ছিলেন না ছোটদিদু। তিনি দীর্ঘাঙ্গী, অত্যন্ত সুন্দরী এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্না ছিলেন। আমরা ছোটরা তাঁর কাছে প্রবল প্রশ্রয় পেলেও নিজের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য বড়দের নানা পরামর্শ বা অনুযোগকে তিনি এমন তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষার সঙ্গে প্রত্যাখান করতেন যে, তা দ্বিতীয়বার বলার সাহস কারও হত না। তিনি যা করবেন না সেটা তাঁকে দিয়ে করানো অথবা তিনি যা করবেন স্থির করেছেন সেটা থেকে তাঁকে নিরস্ত করা, দুইই অসম্ভব ছিল। 

কল্যাণী ভট্টাচার্য নিজের ছোটবোন সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণা করেছেন। প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় তার থেকে কয়েকলাইন তুলে দিচ্ছি। বীণা দাস সেই বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে পুরী বেড়াতে গিয়েছিলেন। কল্যাণীও ছিলেন। ওঁদের সঙ্গেই গিয়েছিলেন এক বিধবা মামী এবং তাঁর একমাত্র মেয়ে অনু। সম্ভবত সেও সেইবছর ম্যাট্রিক দিয়েছিল বীণার সঙ্গেই। স্নান করার সময় নুলিয়ার সঙ্গে অনু এবং বীণা সমুদ্রের অনেক ভিতরে চলে গিয়েছিলেন। একটা সময় মনে হয়েছিল, তাঁরা বুঝি ফিরতে পারবেন না। নুলিয়াও ওঁদের দুজনকে নিয়ে ফিরতে পারছিলেন না। বীণা তখন নুলিয়ার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলেছিলেন দুজনকে বাঁচানো সম্ভব নয়। যদি একজন বাঁচে তা হলে ওই বাঁচুক। ওকে নিয়ে তীরে চলে যাও। বীণা এরপর ভেসেই যাচ্ছিলেন, ফেরা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু এইসময় অন্য নুলিয়ারা দেখতে পেয়ে বীণাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। আরেকটি জায়গায় কল্যাণী লিখছেন, স্ট্যানলি জ্যাকসনের ওপর গুলি চালানোর পর বীণার সঙ্গে তাঁর বাবা বেণীমাধব দাস ও মা সরলা দাস-এর দেখা করানো হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘দেখুন আপনার ধরা পড়ার খবরে আপনার বাবা মায়ের কী অবস্থা হয়েছে। আপনি শুধু বলে দিন এই রিভলভার আপনি কার কাছ থেকে পেয়েছেন, আমরা আপনাকে ছেড়ে দেব।‘ বীণা নাকি একটু হেসে বলেছিলেন, “আমার বাবা এমন শিক্ষা দেননি আমায় যাতে আমি বিশ্বাসঘাতকের কাজ করব।” এরপর বীণাকে নানাধরনের অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে পুলিশ হেফাজতে। ফাঁসির ভয় তো ছিলই। কিন্তু কোনও ভয় বা প্রলোভনেই তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য এতটুকু অমর্যাদার কাজ করতে রাজি হননি। তখনও না। পরবর্তী সময়েও না। এইজন্যই বীণা দাস তাঁর পেনসনের জন্য ডি আই এর কাছে কাকুতিমিনতি করছেন এই দৃশ্যটি এত করুণার সঞ্চার করে- বীণা দাসের প্রতি নয়, ওই গল্পলেখকের প্রতি। কারণ বীণা দাসের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা বা প্রতিবেশীরা, যাঁদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, তাঁরা কেউই বীণা দাসের অর্থাভাবের কথা কখনও বলেননি বা লেখেননি। বরং সরকারি আর্থিক অনুদানগুলিকে তিনি এড়িয়ে চলতেন বলেই আমরা জানি। ১৯৬০ সালে সমাজসেবার জন্য তিনি পদ্মশ্রী পেয়েছিলেন। 

Uploaded Image বীণা দাসের শেষ জীবন সম্পর্কে যে সমস্ত তথ্য পাওয়া যায় তা এইরকম। ১৯৮৬ সালের ১৯ নভেম্বর রাত্রে তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বামী, সরকারি কলেজের অধ্যাপক জ্যোতিষ ভৌমিক মারা যান। বীণা দাসের প্রতিবেশী কল্পনা দাস বলছেন, এই সময় তাঁদের শুভানুধ্যায়ীরা খুব বেশি বেশি ওঁর কাছে আসতে থাকেন। কিন্তু এই ধরনের সহানুভুতিসিক্ত জীবন বীণার সহ্য হচ্ছিল না। তিনি বারবারই এসময়ে বলেছেন তাঁকে একটু একা থাকতে দেওয়া হোক। বলেছেন তিনি বাইরে কোথাও চলে যেতে চান। আত্মীয়বন্ধুরা প্রতিবেশীরা সকলেই আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু, ওঁর ব্যক্তিত্ব, তেজস্বিতা, এবং অগ্নিকন্যা বীণা হিসেবে তাঁর যে গরিমা ও মানসিক দৃঢ়তা-তার সঙ্গে কেউই যুঝে উঠতে পারেননি। তিরিশে নভেম্বর জ্যোতিষ ভৌমিকের স্মরণসভা ছিল। তিনি সেইরাত্রের দুন এক্সপ্রেসের টিকিট কেটে রেখেছিলেন বেনারস যাবেন বলে। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর বিকেলবেলাই তিনি এক ঘনিষ্ট প্রতিবেশীকে বলেছিলেন, এক্ষুণি হাওড়া স্টেশন চলে যাওয়া দরকার, নয়ত আবার কেউ এসে পড়বে, যাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটবে। এইভাবে তিনি বারাণসী পৌঁছন। সেখানেই কিছুদিন ছিলেন। এইসময়েও তিনি কলকাতায় চিঠি লিখে পৌঁছ সংবাদ দিয়েছেন ভাইয়ের ছেলেকে এমনকি প্রতিবেশীদেরও। প্রয়োজনমতো টাকাও চেয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ১৭ ডিসেম্বরের পর তাঁর আর কোনও চিঠি আসেনি। এমনকি পাঠানো টাকাও ফেরত আসে। তিনি উঠেছিলেন উপবন নামের একটি গেস্ট হাউসে। তারা জানায় তিনি হৃষিকেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। এরপর সকলেই খোঁজ করতে হৃষিকেশে পৌঁছন। সেখানেই পুলিশের কাছ থেকে জানা যায় ২৫ ডিসেম্বর ওখানকার একটি হসপিটালে তাঁকে ভর্তি করতে হয়েছিল এবং পরের দিন, অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বর সেখানেই তিনি মারা যান। 

এক হিসেবে দেখলে বুদ্ধ থেকে বীণা দাস পর্যন্ত কোনও মহাপুরুষের জীবনই একশ শতাংশ সফল নয়। কারণ এই পৃথিবীর কুশ্রীতা, ভীরুতা আর নীচতাকে কেউই তো পারলেন সম্পূর্ণ দূর করতে। এই ব্যর্থতার ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি বীণা দাসকে গরিয়সী মূর্তিতে পূজার বেদিতে স্থাপন করার ছলে কেউ কেউ আসলে তাঁকে অবজ্ঞা করছেন, তাঁর জীবন তাঁর শিক্ষা, তাঁর বাণী এগুলোকে অস্বীকার করছেন আর তাঁকে পরিণত করেছেন এক করুণার পাত্রে। অগ্নিকন্যা বীণার জীবনদীপের আগুনে এই সমস্ত মিথ্যা প্রচারের চির অবসান হোক, এই কামনা করি।


পূর্ব প্রকাশিত - উৎস মানুষ

শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

জামাই ষষ্ঠী ~ কৌশিক মজুমদার

সে অনেকদিনে আগের কথা। এক পরিবারে দুটি বউ ছিল ৷ ছোট বউ ছিল খুব লোভী ৷ বাড়ির মাছ বা অন্যান্য ভাল খাবার রান্না হলেই সে লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়ে নিত আর শাশু ড়ির কাছে অভিযোগ করত ‘সব কালো বেড়ালে খেয়ে নিয়েছে ’৷ বেড়াল মা ষষ্ঠীর বাহন ৷ তাই বেড়াল, মা ষষ্ঠীর কাছে অভিযোগ জানাল ৷ মা ষষ্ঠী রেগে গেলেন ৷ যার জেরে ছোট বউ-এর একটি করে সন্তান হয় আর মা ষষ্ঠী তার প্রাণ হরণ করেন ৷ এইভাবে ছোট বউয়ের সাত পুত্র ও এক কন্যাকে মা ষষ্ঠী ফিরিয়ে নেন ৷ ফলে স্বামী, শাশুড়ি ও অন্যান্যরা মিলে তাকে ‘অলক্ষণা’ বলে গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় ৷ অথচ বড় বউ পুত্রকন্যাদের নিয়ে সুখে ঘর করতে থাকে ৷

ছোট বউ মনের দুঃখে বনে চলে যান ও একাকী কাঁদতে থাকেন ৷ শেষে মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার কাছে এসে কান্নার কারণ জানতে চান ৷ সে তার দুঃখের কথা বলে ৷ তখন মা ষষ্ঠী তার পূর্বের অন্যায় আচরণের কথা বললে সে মাফ চায় ৷ ষষ্ঠী তাকে ক্ষমা করেন | এরপর বলেন — ভক্তিভরে ষষ্ঠীর পুজো করলে সাতপুত্র ও এক কন্যার জীবন ফিরে পাবে ৷ তখন ছোট বউ সংসারে ফিরে এসে ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পুজো করে ও ক্রমে ক্রমে তার পুত্র কন্যাদের ফিরে পায় ৷ এর থেকে দিকে দিকে ষষ্ঠী পুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে ৷

এদিকে বৌয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁকে বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাঁর মা-বাবা দিনের পর দিন মেয়ের মুখ দেখতে পান না। শেষে মেয়েকে দেখতে উন্মুখ মা-বাবা একবার ষষ্ঠীপূজার দিন শ্বশুরবাড়িতে আসার জন্য জামাইকে সাদরে নিমন্ত্রণ জানান। এ নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করার সাধ্যি জামাইয়ের ছিল না। ষষ্ঠী পূজার দিন শ্বশুরবাড়িতে জামাই সস্ত্রীক উপস্থিত হলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

ষষ্ঠীপূজা রূপান্তরিত হয় জামাইষষ্ঠীতে।

আসল ঘটনা একটু অন্যরকম। ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় সংস্কার ছিল কন্যা যতদিন না পুত্রবতী হয় ততদিন কন্যার পিতা বা মাতা কন্যাগৃহে পদার্পণ করবেন না ৷ এই ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিল —সন্তানধারণে সমস্যা হলে বা সন্তান মৃত্যুর (শিশুমৃত্যু তখন প্রচুর হত) ফলে কন্যার পিতামাতাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হত কন্যার বাড়ি যাওয়ার জন্য ৷ সেক্ষেত্রে বিবাহিত কন্যার মুখদর্শন কীভাবে ঘটে? তাই সমাজের বিধানদাতা জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নিলেন জামাই ষষ্ঠী হিসাবে ৷ যেখানে মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে সমাদর করা হবে ও কন্যার মুখ দর্শন করা যাবে ৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই নিয়ম একটু এদিক ওদিক করে এখনও চলছে একইভাবে...

মিষ্টির সঙ্গে জামাইদের বহুকালের সম্পর্ক। দ্বারকানাথ বিদ্যারত্ন তাঁর কবিতাকুসুমাঞ্জলি বইয়ের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন বিয়েতে কে কী চায়? তাতে বলা হচ্ছে, কন্যা চায় বরের রূপ, মাতা চান জামাইয়ের ধন, পিতা চান পাত্রের জ্ঞান, বান্ধবরা দেখেন পাত্রের কুল আর জনগণ মিষ্টি পেয়েই খুশি, মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ। 

সূর্য মোদকের জলভরা সন্দেশের গল্প সবাই জানেন। তবু একবার বলেই দি। তখন ১৮১৮ সাল। বাংলায় তখন ইংরেজ শাসন চালু হলেও আনাচেকানাচে দু-চারটে জমিদারি তখনও টিকে আছে বহাল তবিয়তে। আয় যেমনই হোক, আদবকায়দায়, ঠাটেবাটে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা পুরোপুরি বর্তমান। এমনই এক জমিদার ছিলেন ভদ্রেশ্বরের তেলিনীপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। বাড়ির মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরে মেয়ে এসেছে বাপের বাড়ি জামাই নিয়ে জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে। তখন আবার জামাইঠকানো বা বউঠকানো বহু প্রথা চালু ছিল। এখন সেগুলো বোকা বোকা মনে হলেও তখন এইসব প্রথা রমরম করে চলত। সে যাই হোক, জামাইকে ঠকাতে হবে। কী করা যায়? ঠকানোও হল আবার জামাই বাবাজীবন রাগও করতে পারলেন না, এমন কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। 
অনেক ভেবে তেলিনীপাড়ার জমিদারবাড়িতে তলব হল এলাকার নামকরা ময়রা সূর্যকুমার মোদকের। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হল এমন একটা মিষ্টি বানাতে হবে যা দিয়ে জামাই ঠকানো যাবে অথচ তাঁর মানসম্মান যেন কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়। বহু ভাবনাচিন্তা করার পর মোদক মহাশয় একটা বিশাল আকারের মিষ্টি বানালেন, যার ভেতরে জল ভরা থাকে, অথচ বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনও উপায়ই নেই। সেই মিষ্টি দেওয়া হল জামাইয়ের পাতে। মিষ্টিতে মাতোয়ারা জামাই সেই মিষ্টি হাতে নিয়ে দিলেন বিশাল এক কামড়। আর যেই না কামড়ানো, মিষ্টির ভেতরের লুকোনো জল বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিল জামাইয়ের সাধের গরদের পাঞ্জাবি। জামাই অপ্রস্তুত। হো হো করে হেসে উঠলেন শালা-শালিদের দল। ঘোমটার আড়ালে হাসিতে ভরে উঠল শাশুড়িদের মুখ আর জমিদারবাবু গোঁফে দিলেন তা। জন্ম হল জলভরার। 

ধর্মচর্চার পীঠস্থান হওয়ার জন্য গুপ্তিপাড়াকে 'গুপ্ত বৃন্দাবন' বলা হত। ক্রমে 'গুপ্ত বৃন্দাবন পল্লী', তার থেকে 'গুপ্ত পল্লী' এবং পরিশেষে গুপ্তিপাড়া নাম হয়। কথিত আছে যে গুপ্তিপাড়াতেই সন্দেশের জন্ম। এখানেই প্রথম তৈরি হয় সন্দেশের মিশ্রণ, যা মাখা সন্দেশ নামে পরিচিত। পরে সেই মাখা সন্দেশকেই আকার দিয়ে তৈরি হয় গুপো সন্দেশ। এই সন্দেশ জনপ্রিয় হলে তা 'গুপ্তিপাড়ার সন্দেশ' বা সংক্ষেপে 'গুপো সন্দেশ' বলে পরিচিতি লাভ করে। অপর মতে অবশ্য সন্দেশটি খাওয়ার সময় গোঁফে লেগে যায় বলে তার নাম হয়েছে গুঁফো সন্দেশ। 

এখানে এর একটা অন্য গল্প বলি বরং... 

মেয়েরা দুঃখ করে বলেন "বউমা কখনই মেয়ে হয় না"। 
শাশুড়ী মুখে যাই বলুন, নিজের মেয়ে আর পরের মেয়ের তফাত নাকি ঠারেঠোরে, কথার চিমটিতে ঠিক বুঝিয়ে দেন। শ্বশুর অবশ্য একটু সেফসাইডে "উনি আবার বলবেন কি? মেনিমুখো মানুষ। বউয়ের আঁচলের তলায় শুয়ে থাকে। ছেলেটাকেও বানিয়েছে তেমনি। এক আঙ্গুলে উঠায় আর বসায়। নেহাত আমি আসার পর থেকে..." 
যাক গে যাক! এসব অভিযোগ সত্যি কি মিথ্যে, সে তর্কে যাব না। কিন্তু বেচারা জামাইদের অবস্থা আরো খারাপ। সিরিয়াসলি। 

বউদেরবেলায় ভিতরে ভিতরে চোরা স্রোত যাই থাক না কেন, বাইরে একটা আবরণ থাকে। জামাইদের বেলা সেটুকুও নেই। খুল্লম খুল্লা যাতা বলা হচ্ছে সেই কবে থেকে। খেয়াল করতে গিয়ে ব্যোমকে গেলাম মাইরি!! বাংলায় জামাইদের নিয়ে যে কটা প্রবাদ প্রবচন আছে খেয়াল করে দেখুন, একটাও সুখকর না। সুখকর কি বলি, রীতিমত অপমানজনক। একটা একটা করে বলা যাক-
শুরুতেই "যম, জামাই ভাগ্না/ তিন না হয় আপনা"। জাস্ট ভাবুন, জামাইয়ের সঙ্গে যমের তুলনা। যমদুয়ারে তাও কাঁটা বিছানোর মন্ত্র আছে, কিন্তু জামাই ঠেকাই কি দিয়ে? কেউ কেউ যমকে আবার জন দিয়ে রিপ্লেস-ও করেন। একই ফ্লেভারের এর একটা আছে 'মামা ভাগনে জামাই শালা, আর পোষ্য পুত / ঘরে ঘরে বিরাজ করে, এই পাঁচটি ভূত'।   
পরেরটা আরো খতরনাক "'জামাই হারামখোর, আর বেড়াল হারামখোর'। কি আর বলি। এসবে ব্যাখ্যা হয় না। 

Uploaded Image আসি তিন নম্বরে। বাংলা না সংস্কৃত শ্লোক। তাতে বলা হচ্ছে "জামাত্রর্থং স্রপিতস্য সূপাদেরতিথ্যুপকারকত্বম" সোজা বাংলায় 'জামাইয়ের জন্য মারে হাঁস, গুষ্টিশুদ্ধ খায় মাস'। মানে এক জামাইষষ্ঠীর যা খরচ, তাতে গোটা পরিবারের একমাস চলে যায়। এতেই শেষ নয়। আরো একটা বলি "'সদা বক্রঃ সদা ক্রূরঃ সদা মানধনাপহঃ। কন্যারাশিস্থিতো নিত্যং জামাতা দশমো গ্রহঃ'। মানে কুটিল, বক্র, ধন মান সব হরণকারী জামাতা নবগ্রহের পর দশম গ্রহ। এবং সেই গ্রহ অবশ্যই কুগ্রহ। এই কুগ্রহকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি খুব একটা বদার-ও করেন না। না হলে "খেয়ে বাঁচলে কামাই/ মেয়ে বাঁচলে জামাই" প্রবাদটাই বা আসবে কেন? এমনকি কখনও কখনও দেখি জামাইয়ের উপরে উপকারের এক্সপেক্টেশনটুকুও নেই "গতর কুশলে থাক, করে খাব কামাই / বিস্তর করলে পেটের পুত, কি করবে জামাই"। সোজা কথা জামাই আর তার খাই মেটানো প্রায় অসম্ভব। জামাই তো খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কোনো জিনিসেই মন ভরেনা তাঁর। তাই বলা হয় "পাঁচ ব্যন্নন দুধ রুটি / তবু জামাইয়ের ভিরকুটি"।




শুধু জামাইদের সেলফ এস্টিম কত কম, তা ভেবে দেখুন। এত কথার পরেও যেই না জামাইষষ্ঠী এল, জামাই চললেন হাতে আম কাঁঠালের ব্যাগ নিয়ে। 'খাওয়া দাওয়ার গন্ধে / জামাই আসে আনন্দে'। তখন তার যত্ন আত্তি না করে উপায় কী! 'জামাই এলো কামাই ক'রে, বসতে দাও গো পিঁড়ে / জলপান করতে দাও গো সরু ধানের চিঁড়ে'। আর এতেই শেষ না, 'রুইয়ের মুড়ো, কেটো মুড়ো, দাও আমার পাতে / আড়ের মুড়ো, ঘিয়ের মুড়ো, দাও জামাইয়ের পাতে'। এই উপলক্ষে 'জামাই গেলে শ্বশুরবাড়ি, তিনদিন আদর বাড়াবাড়ি'। 

এতো গেল নর্মাল জামাই। ঘরজামাইদের নিয়ে যা যা লেখা আছে, তা যত কম বলা যায় ততই ভাল। ব্যাখ্যা ছাড়া। একটাই বলি। এতেই গোটা অ্যাটিটিউডটা বোঝা যাবে

দূর জামাইয়ের কাঁধে ছাতি / ঘর জামাইয়ের মুখে লাথি'

শেষ করি জামাইদের প্রকারভেদ দিয়ে। আজ রাস্তাঘাটে বেরুলে মূলতঃ চার রকম জামাই দেখতে পাবেন।

১। সদ্য বিবাহিত জামাই- এদের প্রথম কি দ্বিতীয় জামাইষষ্ঠী। বউমা সুন্দর পাটভাঙা শাড়িতে চকচকে। বরের টকটকে লাল পাঞ্জাবিতে সাদা কলকা। বউ ঘামলেই বর মুছিয়ে দিচ্ছেন। হাতের ব্যাগে আম, মিষ্টি আর লিচুর ডালপালা উঁকি দিচ্ছে। দুজনেই ফিসফাস করছেন আর হেসে উঠছেন। বর আপ্রাণ চেষ্টায় আছেন অন্যজনের কষ্ট না হয়। বেশ মাখোমাখো ব্যাপার। 

২। সদ্য সন্তানপ্রাপ্ত জামাই- গরমে বাচ্চা তেড়ে চিল্লাচ্ছে। বউ মেজাজ গরম করছে"একটু ধরতেও ও পারো" ধরলে বাচ্চা আরও রেগে লাল হয়ে যাচ্ছে। মুশকিল হল পাশেই দুই একজন মহিলা টিপ্পনি কাটছেন "আমার মনা তো বাসে উঠলেই ঘুমিয়ে পড়ত। কোনদিন জ্বালায় নি। ও ঘুমাচ্ছে না কেন?" বাবার পাঞ্জাবি আর মায়ের শাড়ি দুমড়ে গেছে। বাচ্চা এখনো কেঁদে যাচ্ছে।

৩। একটু বড় বাচ্চাযুক্ত জামাই- পুরোনো শার্ট আর প্যান্ট পড়া। মুখ ভয়ানক গম্ভীর। হাতে ছোট একটা থলে। সঙ্গে বউ আর ক্লাস ওয়ান আর ক্লাস ফোরে পড়া দুই ছেলে মেয়ে। বাবা বাসে উঠে কোণ দেখে বসে মোবাইলে রবীশ কুমার দেখতে লাগলেন। বাচ্চাদুটো কে জানলার ধারে বসবে নিয়ে ঝগড়া করতে লাগল। মা ছোটটাকে কোলে নিয়ে বড়টাকে জানলায় বসিয়ে ঝগড়া মেটালেন

৪। প্রাচীন জামাই- আমার মত জামাই। যারা আজকের দিনেও অফিস করছি আর তাদের বড় বড় ছেলেমেয়েরা স্কুলে গিয়ে ক্লাস করছে।
এর বাইরেও অনেক রকম আছেন। 

আজ জামাইষষ্ঠীর পুণ্য প্রভাতে সব জামাইকে অভিনন্দন। সমস্ত সমবেদনা নিয়েই বলছি, যুগে যুগে এইসব বাঁকা কথা অগ্রাহ্য করে যেভাবে আপনারা পদের পর পদ সাঁটিয়েছেন, সেই ধারা অক্ষুন্ন থাক। 
সবচেয়ে বড় কথা সেই কবে কিশোরকুমার বলে গেছেন-"কুছ তো লোগ কহেঙ্গে/ লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা"

(সঙ্গের ছবিটি শিল্পী দেবাশীষ দেবের অরিজিনাল পেন এন্ড ইংক আর্টওয়ার্ক থেকে। কাল্ট হয়ে যাওয়া এই ছবির আসলটা এখন আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে)...