শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দশক: কলকাতার ট্রাম শ্রমিকদের গল্প ~ অরিজিত মুখার্জী

 গল্প বলব। খেটে খাওয়া মানুষের গল্প। সেই মানুষগুলোর গল্প, যারা নিজেদের রুজিরুটির জন্যে ব্রিটিশ মালিকের বিরুদ্ধে লড়েছিল। আবার এই শহর - যাকে সেদিন বস্তির শহর বলে দিল এক গুজরাটি তড়িপার - সেই শহরের মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে; লড়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের বিচারের নামে প্রহসনের বিরুদ্ধে; লড়েছিল সাম্প্রদায়িক বিষ থেকে শহরের মানুষকে বাঁচাতে...


বলব কলকাতার ট্রাম শ্রমিকদের গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সেইসব দামাল দিনগুলোয় কলকাতা যখন হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের বড় কেন্দ্র, সেই সময়ের গল্প। ১৯৪৫-৪৬ সালের গল্প। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ছায়ায় থাকা ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়নের গল্প, যাদের পোশাকি নাম Calcutta Tramways Workers Union (CTWU)...

তার আগের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কলোনিয়াল ট্রাম কোম্পানির বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করে বেশ শক্ত জায়গায় পৌঁছেছিল তারা। কলকাতার লাইফলাইন ছিল ট্রাম, কাজেই এই মানুষগুলোর হাতে অস্ত্র ছিল গোটা শহর অচল করে দেওয়ার; আর সেই অস্ত্র তারা ব্যবহারও করেছিল সরকারের বিরুদ্ধে; কখনো মজুরি বাড়ানোর দাবীতে, কখনও বা মন্বন্তরের সময় রেশনের দাবীতে, আবার কখনো অন্যায়ভাবে ছাঁটাই হওয়া সহকর্মীকে কাজে ফেরানোর দাবীতে; সফলও হয়েছিল। পরিবহণ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে ভয় করত ব্রিটিশরা, কারণ তাদের রোজকার কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যেত; ক্ষেপে উঠতো সাধারণ মানুষ, কিন্তু ট্রাম শ্রমিকদের ওপর সহানুভূতি হারাত না।

বলব সেই ট্রাম শ্রমিকদের গল্প। ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের গল্প। আর, সাম্প্রদায়িক বিষ যখন কলকাতাকে ছিঁড়ে খেতে উদ্যত, তখন সেই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে তাদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প।

প্রথম গল্পের সময়কাল ১৯৪৫ সালের শেষ থেকে ১৯৪৬ এর শুরু অবধি। ব্রিটিশরা তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের বিচার শুরু করেছে; আর গোটা দেশকে দৃষ্টান্ত দেখাতে সেই বিচারকে তারা নিয়ে গেছে লাল কেল্লায়, পাবলিক ট্রায়াল হিসেবে। দেশ ক্ষেপে উঠল। সারা দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ। কলকাতাও বাদ যায়নি। নভেম্বরে মিছিল ডাকে ফরোয়ার্ড ব্লক আর ছাত্র ফেডারেশন, সঙ্গে ইসমাইলি কলেজের ছাত্ররা। মিছিলে হামলা করে পুলিশ, মারা যায় ৩৩ জন মানুষ। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরো একবার ফেটে পড়ে কলকাতা - ক্যাপ্টেন আবদুর রশিদ আলীকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে। শুরুতে জনসমর্থন বেশি না থাকলেও সিপিআইয়ের ডাকে পথে নামে শ্রমিক আর ছাত্ররা; ক্রমশঃ ব্যাপক আকার নেয় এই গণআন্দোলন। ১১ই ফেব্রুয়ারি সিপিআই আর বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশন এক মিছিলের ডাক দেয় - ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল ঢুকে যায় সেক্রেটারিয়েট এলাকায় - বিক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল ট্রাম শ্রমিকেরা। পুলিশ নৃশংস আক্রমণ চালায় ছাত্র আর শ্রমিকদের ওপর। উল্টে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে বিক্ষোভ। পুলিশী হিংস্রতার প্রতিবাদে ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন ধর্মঘটের ডাক দেয় পরের দিন। সেদিন, মানে ১২ই ফেব্রুয়ারি, খাকি ইউনিফর্ম পরা ট্রাম শ্রমিকদের ব্যারিকেডে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় কলকাতার পরিবহণ। ট্রাম শ্রমিকদের ডাকে পথে নেমে আসে সাধারণ মানুষ। একের পর এক সংঘর্ষের পর বাধ্য হয়ে ব্রিটিশরা সেনা নামায়, গুলিতে মারা যায় ৩৮ জন। লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন এই আন্দোলনে, এবং রশিদ আলী দিবস (১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬) অমর হয়ে থেকে যায় তাঁর উপন্যাস "চিহ্ন"-এ - যার নায়ক ওসমান এক ট্রাম শ্রমিক।

কিছুদিনের মধ্যেই আবারও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে কলকাতা। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের বিচার চলাকালীনই বম্বে আর করাচীর ডকে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, শুরু হয় নৌবিদ্রোহ। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান নিশ্চয় আপনারা ভুলে যাননি...

সেদিন ছেচল্লিশের শীতের কুয়াশা / ভেদী গোলামীর ঘোর অমানিশা //
চূর্ণ করি কংসের কারাগার / সচকিত সাইরেনে নব অঙ্গীকার //
আরব সাগরবাহী অতলান্তজয়ী / বোম্বাই বন্দরে বিদ্রোহী খাইবার //
ভিড়িল বিদ্রোহী খাইবার

হাঁকে শার্দুল সিং গফুর, / বীর শার্দুল সিং গফুর, //
কে আছ বাহাদুর / কামান গর্জনে / কামগার ময়দানে //
রাজপথে ব্যারিকেডে সশস্ত্র মজদুর / দাঁড়ালো সশস্ত্র মজদুর।

দরিয়ার ডাকে, দিল সাড়া / মহাভারতের জনতা //
উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে কল্লোলিত মহানগর কলকাতা"

২৩শে ফেব্রুয়ারি সিপিআই ডাক দিল সাধারণ ধর্মঘটের। ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে শ্রমিক আর ছাত্রদের মিছিল এগিয়ে গেল ওয়েলিংটন স্কোয়্যারের দিকে। একদম সামনের সারিতে ইউনিফর্ম পরা ট্রামশ্রমিকেরা - শৃঙ্খলা, সমন্বয় আর খেটে খাওয়া মানুষের নেতৃত্বের প্রতীক। ওয়েলিংটনের সভায় ঝোড়ো বক্তব্য রাখলেন সোমনাথ লাহিড়ী আর চতুর আলীর মত সিপিআই নেতারা। নৌবিদ্রোহকে তুলে ধরলেন কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে আরও বড় লড়াইয়ের অংশ হিসেবে; সোমনাথ লাহিড়ীর ভাষায়, স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের ড্রেস রিহার্সাল। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে লেখা হল যে এই ট্রাম শ্রমিকরাই সবচেয়ে ঝামেলার প্রতিবাদী। জঙ্গি তো বটেই, তার ওপর মানুষকে একত্রিত করতে এদের তুলনা নেই...

শুধু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানের কথাটুকু বললে ট্রাম শ্রমিকদের অবদানকে ছোট করা হয়। যে গুণটা এই শ্রমিকদের আলাদা করে রেখেছিল সেটা হল সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবল প্রচেষ্টার মধ্যেও এদের একজোট হয়ে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। চারদিকে তখন বয়ে চলেছে হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লীগের ছড়িয়ে দেওয়া বিষের নদী — খেটে খাওয়া মানুষের অনেকেই সেই বিষে আক্রান্ত — তখনও সটান দাঁড়িয়ে ট্রাম শ্রমিকেরা। আকস্মিক ঘটনা নয়; এই ঐক্যের শেকড় ছিল জোট বাঁধা রাজনীতির ভিতরে। ব্রিটিশ মালিকেরা বহু চেষ্টা করেছিল হিন্দু মুসলমান বিভেদকে খুঁচিয়ে ট্রাম শ্রমিকদের ভাঙতে। পারেনি। যেমন, ঈদের বোনাস কাটিয়ে দিয়ে একবার কোম্পানি পুজোর বোনাস ঘোষণা করে দিল, উদ্দেশ্যে হিন্দু মুসলমানকে আলাদা করে দেওয়া। কিন্তু পারেনি। ট্রাম শ্রমিকদের একজনও বোনাস নেয়নি সেবার। উলটে, ওদের ধর্মঘটে গুটিয়ে গিয়ে কোম্পানি বাধ্য হয়েছিল সবাইকে সমান বোনাস দিতে। ওয়ার্কপ্লেস সলিডারিটি একেই বলে।

১৯৪৬ এর ভয়ঙ্কর সময়ে এই ট্রাম শ্রমিকেরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন খেটেখাওয়া মানুষের জেদ কেমন হয়। ষোলোই আগস্ট — মুসলিম লীগের ডাকা ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে — ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল যে কমিউনাল মোবিলাইজেশন তারা হতে দেবে না। ডাক দিল হরতালের। সেদিন চারদিকে হিংসার আগুনের মধ্যে ট্রাম শ্রমিকেরা বেরিয়ে এসেছিলেন শান্তি রক্ষায়। ভিক্টোরিয়া কলেজে আক্রমণ করতে পারে গুন্ডারা — এই খবর শুনেই রাজাবাজার ট্রামডিপোর শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসেন পথে। হিন্দু মুসলমান, এমনকী কয়েকজন মুসলিম লীগ সদস্যও। সামনে মহম্মদ ইসমাইল, ট্রাম শ্রমিকদের অবিস্মরণীয় নেতা, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ট্রাম শ্রমিকদের ইঁট পাথরের ঘায়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছিল সশস্ত্র গুন্ডার দল। কলেজের মেয়েদের সুরক্ষিতভাবে বের করে আনা অবধি এলাকা ঘিরে রেখেছিলেন মহম্মদ ইসমাইল ও তাঁর কমরেডরা। শহরের অন্য অনেক জায়গায়, বিভিন্ন ট্রামডিপোর শ্রমিকেরা, বেরিয়ে এসেছিলেন এলাকা পাহারা দিতে — যেখানে যেখানে সেই এলাকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিপদে পড়েছিল, তারা পাশে পেয়েছিল ট্রাম শ্রমিকদের। তাদের খাকি ইউনিফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক ধরণের মরাল অথরিটি। মানুষের বিশ্বাস এতটাই ছিল এই শ্রমিকদের ধর্মনিরপেক্ষতার, যে গরীব মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই এদের ওপরেই নির্ভর করেছিল সুরক্ষার জন্যে...

দাঙ্গা বন্ধ হতে ট্রাম ফের চালু হওয়ার পরেও ট্রাম শ্রমিকেরা সজাগ ছিলেন। ট্রামের ভিতরে কোনো ধরণের সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করলেই কন্ডাক্টররা সোচ্চার প্রতিবাদ করতেন, ট্রাম থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জনপরিসর যাতে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্র না হয়ে ওঠে, তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন এঁরাই; ১৯৪৭ সাল অবধি চলেছিল এইভাবেই। সেই সময়ে — দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘটের ফলে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও, বুকে ধর্মঘটের ব্যাজ লাগিয়ে ট্রামকর্মীরা টহল দিতেন দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায়, জল ঢালতেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুনে। ব্রিটিশ পুলিশের দমনপীড়ন ছাড়াও চরম দারিদ্র ছিল এঁদের নিত্যসঙ্গী। তা সত্ত্বেও মহম্মদ ইসমাইলের মত কমরেডরা শ্রেণী-ঐক্য ভেঙে বেরোননি, খেটে খাওয়া মানুষের জোটকে অক্ষত রেখেছিলেন...

শ্রেণীর রাজনীতির আদর্শ তুলে ধরেছিল সেই ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন — দেশপ্রেম, ধর্মনিরপেক্ষতা আর শ্রেণী-সংহতি প্রতিযোগীর বদলে হয়ে উঠেছিল পরিপূরক। কলকাতা দেখেছিল চরম ক্রাইসিসের মুহূর্তেও খেটেখাওয়া মানুষ একজোট হলে কী করতে পারে...আজকে বিজেপি আর আরএসএস যখন ইতিহাস লেখে, তখন এই গল্পগুলোকে তারা মুছে দিতে চায়। কারণ এই গল্পগুলো তাদের ন্যারেটিভের সঙ্গে খাপ খায় না। ট্রাম শ্রমিকদের গল্প দেখিয়ে দেয় যে হিন্দু-মুসলমান একসাথে লড়তে পারে, শ্রেণীর স্বার্থ ধর্মের স্বার্থের চেয়ে বড়, আর গণতন্ত্র শুধু ব্যালটে নয়, গড়ে ওঠে রাজপথে আর কারখানায়।

সেদিন ঐতিহ্যের কথা বলছিলাম না? কমিউনিস্ট পার্টি এই মহম্মদ ইসমাইল আর তাঁর কমরেডদের লড়াইয়ের ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলে। ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকার। হামেশা।

সূত্র: Protest and Politics: Story of Calcutta Tram Workers 1940-47, Siddhartha Guha Ray, in Calcutta: The Stormy Decades, ed. Tanika Sarkar and Shekhar Bandyopadhyay

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দশক: সম্মুখসারিতে নারীরা মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির ইতিবৃত্ত ~ অরিজিত মুখার্জী

গল্প চলুক। এই শহরের গল্প। যে গল্পগুলোকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলে সেই গল্প - ট্রামশ্রমিকের গল্প, মেয়েদের লড়াইয়ের গল্প, কলোনির লড়াইয়ের গল্প...এই গল্পগুলো মুছে গেলে ওদের লাভ। আর আমাদের কাজ গল্পগুলোকে না ভোলা, আর ভুলতে না দেওয়া। তাই বারবার বলে যেতে হবে এই গল্পগুলো...ট্রামশ্রমিকের গল্প, মেয়েদের লড়াইয়ের গল্প, কলোনির লড়াইয়ের গল্প, খাদ্য আন্দোলনের গল্প...
সেদিন ট্রাম শ্রমিকদের গল্প বলেছিলাম, আজ বলব মেয়েদের গল্প - ভারতের প্রথমদিকের নারী সংগঠন, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি বা MARS-এর গল্প। সেই মেয়েদের গল্প যারা চল্লিশের দশকে যুদ্ধের পটভূমিতে, চরম দুর্ভিক্ষের মধ্যেও, নিজেরা জোট বেঁধেছিল; খেটেখাওয়া ঘরের আরো হাজারো মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল সকলের দাবী নিয়ে। সেই মেয়েদের গল্প বলব যাদের নিজেদের ঘরে অনেক সময় গরম ভাত না থাকলেও তারা নিজেদের ক্ষিদে চেপে রেখে অন্যকে খাইয়েছিল; সেই মেয়েদের গল্প যারা তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় মুখ বুজে কালোবাজারি মেনে নেয়নি, বরং লড়াই করে চাল আদায় করেছিল সরকারের কাছ থেকে; নিজের হাতে চাল বিলি করেছিল গ্রামগঞ্জ থেকে ছুটে আসা পরিবারগুলোকে; সেই মেয়েগুলোর গল্প বলব যারা লড়ে গেছিল — লাঠি, ছুরি নিয়ে নয় — শুধু সংখ্যার জোরে, যারা দেখিয়ে দিয়েছিল যে বোলতার ঝাঁককে বাঘ সিংহও ভয় পায়...যাদের লড়াইয়ে শেষ অবধি বড়লোক ব্যবসায়ীর দল বাধ্য হয়েছিল মুনাফা লোটা বন্ধ করে গরীব মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে...বলব সেই মেয়েদের গল্প।
অনেক সময় ভাবি — সেদিনের ট্র্যাডিশনের উত্তরাধিকারীরা যদি আজ বাংলার রাস্তায় বয়স্কদের জন্যে হাজার টাকা সরকারি পেনশনের দাবী নিয়ে পথে নামত, কী হত তখন। ব্যাটন নিয়ে তেড়ে আসত পুলিশ? যাদের গল্প বলছি আজকে, তারা কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশের লাঠিকে ভয় পায়নি। তারা চাপে পড়ে মাথা নোয়ায়নি; বরং উলটে নিজেরা চাপ বজায় রেখেছিল। আজ হিন্দুত্বের গেরুয়া রঙ সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে, বাদ যায়নি বাংলাও। সেদিনের ক্রাইসিসের মধ্যে মানুষের বেঁচে থাকার গল্পগুলো মুছে যেতে বসেছে। যারা মুখ খোলে তাদের পিছনে পড়ে যায় আইটি সেলের ট্রোলবাহিনী, এমনকী নেতা মন্ত্রীরাও। এই কঠিন সময়ের জন্যে সেদিনের গল্পগুলো জরুরী। ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে তাদের ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকারকে ভুলে না যায়...
Uploaded Image
১৯৪২ সালের কথা। বিশ্বযুদ্ধের ছাপ পড়েছে কলকাতার অলিতেগলিতে। জনআন্দোলনের অ্যাক্টিভিস্টদের মাথায় ঘুরছে মেয়েদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা। এলা রীডের বাড়িতে ঘরোয়া বৈঠকে ঠিক হল মেয়েদের সংগঠনের রূপরেখা৷ সংগঠনের নাম রাখলেন রেণু চক্রবর্তী। কলোনিয়াল শাসকবিরোধী আন্দোলনের গর্ভ থেকে জন্ম নিল মহিলা আত্ম রক্ষা সমিতি বা MARS...কনভেনর হলেন এলা রীড, সংগঠনের দায়িত্বে রইলেন মণিকুন্তলা সেন, সুধা রায়, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলি, রেণু চক্রবর্তী আর সাকিনা বেগম। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে র্যাডিকাল কিছু দাবী ছিল এই সমিতির — মেয়েদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার; অর্থনৈতিক সমতা; আর সামাজিক ন্যায়বিচার। সামনে ছিলেন যাঁরা, তাঁদের কাছে স্বাধীনতা শব্দটার মানে শুধু ব্রিটিশদের দেশছাড়া করা ছিল না। তাঁদের কাছে স্বাধীনতার মানে ছিল এক নতুন সমাজ, যেখানে মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে, যেখানে এক থালা ভাতের জন্যে কোনো মেয়েকে বিক্রি হতে হবে না...
যুদ্ধ চলাকালীনই এল মন্বন্তর। মানুষের তৈরী দুর্ভিক্ষ। বাংলার দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পরিবার এসে উঠেছিল কলকাতায় — কাজের খোঁজে, দুটি ভাতের খোঁজে, বেঁচে থাকার তাগিদে। এই পরিবারগুলো থেকে হাজারো মেয়ে আটকা পড়েছিল শরীরের বাজারেও; শহরে তখন দেশ বিদেশের সৈন্যদের আনাগোনা, শরীর বেচলে দুটো ভাত জুটত অনেকের। "সমিতি" এই বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। এই মেয়েদের সংগঠিত করেছিল তারা, অন্ধকার গলি থেকে আলোয় বের করে এনেছিল তাদের; তাদের কন্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল সমিতিই। মণিকুন্তলা সেনের মত নেত্রীরা সশস্ত্র সৈন্যদল আর মুনাফালোভীদের শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। জন্মের এক বছরের মধ্যেই সমিতির বিভিন্ন শাখা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার বিভিন্ন জেলায় — দুর্ভিক্ষের সময়ে ত্রাণের কাজ হাতে নিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা শিখিয়েছিলো যে বাংলায় একটা শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও গণমুখী নারী সংগঠনের বড় দরকার। ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে কলকাতায় হল MARS-এর প্রাদেশিক সম্মেলনে। ছড়িয়ে পড়তে থাকল সমিতি।
জন্মলগ্ন থেকেই সমিতির কাজ ভাগ হয়েছিল তিন মূল লক্ষ্যের ভিত্তিতে — জাতীয় প্রতিরক্ষা; রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি আর জাতীয় সরকার গঠন; এবং দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো। সামনের সারীর প্রায় সকলেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেও সমিতির দরজা সকলের জন্যেই খোলা ছিল, সমাজের সমস্ত স্তরের মেয়েরাই এসেছিলেন সমিতিতে। বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, যেমন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, লীলা মজুমদার এবং রানী মহলানবিশ — এঁরাও যুক্ত হয়েছিলেন সমিতির সঙ্গে। ছিলেন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের মেয়েরাও। শিক্ষিত "ভদ্রলোক" পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে একজোট হয়ে লড়েছিলেন মিস্ত্রিপুকুর বস্তির মরিয়াম বিবি আর গুলবাহাররাও। সারা দেশ জুড়ে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলছিল, ঠিক সেই সময়েই বরিশালে সমিতির দ্বিতীয় সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন হাজরা বেগম। বিভাজনের রাজনীতি যখন বাংলাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল, সেই সংকটের দিনে MARS-এর মেয়েরা বেছে নিয়েছিলেন সংহতির রাস্তা।
তারপর আসে ১৯৪৩ সালের মার্চ মাস...দুর্ভিক্ষের আগুনে বাংলা জ্বলছে, শহরের রাস্তায় অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মুখে "ফ্যান দাও" আর্তনাদ। পি.সি. যোশী কলকাতায় এসেছিলেন এই সময়ে, তিনি লিখে গেছিলেন: "I was hardly five minutes in Calcutta when I was shaken up as I have rarely been by a voice through the window 'Ma Go babure!' I had never heard such accents nor such a tone." [Who lives if Bengal dies]
চালডালের দাম বাড়তে শুরু করেছিল অস্বাভাবিকভাবে। গড়িয়াহাট বাজারে রিলিফ শপে লাইন পড়ত ভোররাত থেকে। রাত তিনটের ট্রেনে বালিগঞ্জ স্টেশনে এসে পৌঁছত ক্যানিং লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে ক্ষুধার্থ মানুষের ভিড়। মণিকুন্তলারা সেই ভিড় সামলে, সেখানে মেয়েদের সামলে, তাদের হাতে চাল তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় বাড়ি ফিরে রাতের খাবারও জোটেনি তাঁদের নিজেদেরই। মণিকুন্তলার লেখা থেকেই একটু তুলে দিই —
"চালের দাম তখনকার দিনে মণ প্রতি ২৮ টাকায় উঠেছিল। যা আগে ছিল ৪/৫ টাকা মণ। আমাদের আস্তানাতে খাবার সংস্থান করা মুশকিল হয়ে উঠল। অনেক দিনই রান্না হত না। মনোরমার দুটি বাচ্চা মেয়ে আমাদের কাছে থাকত। তাদের জন্য আমাদের ভাবতে হত। দু-একদিন ক্যানটিনে সকলের খাওয়া হয়ে গেলে সামান্য যেটুকু বাকি থাকত তাই নিয়ে এসে সকলে একটু একটু ভাগ করে ২/৪ দিন খেয়েছিলাম। কিন্তু কাজটা ভালো নয় মনে হল সকলেরই। এর চেয়ে না খাওয়াও ভালো। মাস শেষে যে যার সামান্য পয়সা ব্যয়ে যাহোক একটু কিছু কিনে নিত। একদিন রাত দশটায় একটা রুটি কিনে হাতে করে বাড়ি ফিরেছি। দেখি, মনোরমার মেয়ে দুটি জেগে বসে আছে। ওদের মা তখনও ফেরেনি। ওরা জানতে চাইল, আমি কোনও খাবার এনেছি কি না। হাতের রুটিটা ওদের হাতে দিয়ে বললাম - 'হ্যাঁ এনেছি, দুজনে ভাগ করে খাও।' ওরা ওইটুকু রুটি ভাগ করে খেল। পেট ভরে জল খেয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতন ঘুমোতে গেল। এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক দিনই হত।"
সমিতি ডাক দিল মেয়েদের — "ভুলে যাও তোমাদের ধর্মীয় আর জাতিগত পরিচয়; এই রাজপথ আমাদের; ক্ষিদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়ব আমরা"। MARS আর মুসলিম উইমেন্স সেল্ফ ডিফেন্স লীগের ডাকে নিমেষে পাঁচ হাজার মেয়ে নেমে এলো রাস্তায় — অলিগলি বস্তি থেকে, শহরতলি থেকেও — অনেকের কোলেই বাচ্চা। মিছিল চললো বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির উদ্দেশ্যে। ঘেরাও হল আইনসভা। মেয়েদের প্রথম এত বড় গণআন্দোলন। ঘোড়সওয়ার পুলিশ বাহিনী ছুটে এলো। মেয়েরা কেউ নড়লো না এক চুলও। হাতে হাত রেখে আইনসভার গেটে তৈরী হল মানবশৃঙ্খল। দাবী উঠল — কালোবাজারি বন্ধ করে অবিলম্বে গরীব পরিবারগুলোর হাতে চাল তুলে দিতে হবে। ফজলুল হক বাধ্য হলেন চালের ব্যবস্থা করতে — সেই মুহূর্তেই একশো বস্তা চাল এনে বিতরণ করা হল মেয়েদের মধ্যে, এক দিনের মধ্যে খোলা হল আরো বেশ কয়েকটা কনট্রোলড প্রাইস শপ।
এই আগুন শুধু কলকাতায় থেমে থাকেনি। আগুন ছড়িয়েছিল দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর, বদরগঞ্জ, পাবনা, বাঁকুড়াতেও। আজ না হয় দিল্লী জাতীয় প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু; কিন্তু তার বহু আগেই নারী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার লিখেছিল MARS-এর মেয়েরা। তাদের হাতে গেরুয়া পতাকা ছিল না কোনো। ছিল সাদা কাপড়ের ওপরে দুটো খুব সাধারণ দাবী — রেশনের, আর মেয়েদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করার। গেরুয়া পতাকা হাতে মেয়েদের অধিকারের কোনো দাবী ওঠেনি কখনও। সেদিনও নয়, আজও নয়।
যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ আর মার্কিনি সৈন্যদের অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরী হয়েছিল দেশ জুড়ে। আর, যা হয়ে থাকে — ক্যাম্পের আশেপাশের গ্রামের মেয়েদের ওপর নেমে আসত যৌন আক্রমণ। MARS-এর কর্মীরা এই বিপদ বুঝেছিলেন; তাঁরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মেয়েদের বোঝাতেন যে তাদের শরীরের মালিক শুধু তারাই; কোনো অফিসার বা সৈন্যের খবরদারি করার অধিকার নেই তাদের ওপর। কোথাও থেকে কোনো অত্যাচারের খবর তাঁদের কাছে পৌঁছলেই — সে নিষিদ্ধ পল্লী হোক বা প্রত্যন্ত গ্রাম — ছুটে যেতেন সমিতির কেউ না কেউ। মেয়েদের লড়াই করে টিঁকে থাকতে শেখাতেন তাঁরা, সন্ধান দিতেন বিকল্প জীবিকার।
১৯৪৬ সালে এলো বন্যা। সমিতি আবারও রিলিফের কাজে সামনের সারীতে — জামাকাপড়, ওষুধ, খাবার পৌঁছনোর দায়িত্ব নিল তারা। বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে আত্মনির্ভরতার নীতিতে কাজ করেছিল সমিতি। ত্রাণ শিবির চালিয়েছিল, রসদের ব্যবস্থা করেছিল, তহবিলে টান পড়লে নিজেদের গয়না অবধি বিক্রি করে দিয়ে...বড়লোক তো কেউ ছিলেন না, তবুও যার যতটুকু সম্বল ছিল, সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েই...
১৯৪৫-৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কলকাতা যখন জ্বলছে, তখনও সমিতির সদস্যরা হিন্দু মুসলমান প্রতিবেশীদের মধ্যে ব্রীজ হয়ে উঠেছিলেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, অসহায় ও বিপন্ন মানুষদের সুরক্ষা দিয়েছিলেন। বম্বে আর করাচীর নৌ-বিদ্রোহ চলাকালীনও, তাঁদের রাস্তাতেই দেখা গেছে। স্বাধীনতার পর মেয়েদের অধিকারের দাবিতে যখন আইনি লড়াই শুরু হয়, তখনও লড়ে যায় MARS...মণিকুন্তলা সেনের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের টক্কর ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। আবারও "সেদিনের কথা" থেকে কিছুটা কোট করি —
"শ্যামাপ্রসাদের স্বরূপ আমরা দেখেছিলাম পূর্ব-বর্ণিত সভায়। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, গাড়ি গাড়ি মেয়ে আনা হয়েছিল পাথুরেঘাটা থেকে এবং তাদের বলা হয়েছিল সমস্ত হিন্দুকে মুসলমান করে দেবার আইন বন্ধ করার জন্য তোমাদের যেতে হবে। বেচারিরা মুসলমান হবার ভয়ে এসে হল্লা করে গেল। দুটো করে টাকাও নাকি প্রত্যেকে পেয়েছিল।
যাইহাক, এতে আমাদের বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি। অনেক স্বাক্ষর সংগৃহীত হয়েছিল। ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের হাতে আমি সেগুলো তুলে দিয়েছিলাম পশ্চিম বাংলার পক্ষ থেকে পার্লামেন্টে পাঠাতে। সব রাজ্য থেকেই এরকম করা হয়েছিল।
এইভাবে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে পার্লামেন্টে হিন্দু-কোড বিল পাশ হল। পার্লামেন্টে এই বিলের বিরোধী ছিলেন অনেকেই। এমনকী কংগ্রেসের মধ্যেও তাঁদের দেখা গেল। রক্ষণশীল ও গোঁড়াপন্থীরা কেবলমাত্র হিন্দু মহাসভাতেই ছিলেন না। নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেবার জন্য এমনকী প্রধানমন্ত্রী জওহরলালকেও পার্টির হুইপ প্রয়োগ করতে হয়েছিল দলের সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে।
আমাদের অনেক দিনের অনেক সংগ্রামের ফলেই অন্তত এই একটি বিষয়ে আইনগত স্বীকৃতি পাওয়া গেল। কিন্তু শুধু আইনের স্বীকৃতিই কি মেয়েদের সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে যথেষ্ট? সমিতির সেই প্রথম দিনগুলি থেকে আজকের দিনেও মেয়েদের অভিজ্ঞতা বোধ হয় এর বিপরীত সাক্ষ্য দেবে।"
পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে সমিতির আলাদা অস্তিত্ব ক্রমশ: ম্লান হয়ে আসে। কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নতুন রাজনৈতিক লাইন – সব মিলিয়ে MARS-এর যাত্রা প্রায় থমকে দাঁড়ায়। তবে এর সদস্যরা অন্য জাতীয় নারী সংগঠনে কাজ চালিয়ে যান। MARS শেষ হয়ে গেলেও তাদের গল্প হারিয়ে যায়নি। উপমহাদেশের ইতিহাসে MARS-ই প্রথম কোনো নারী সংগঠন মেয়েদের বলতে পেরেছিল যে তাদেরও অধিকার রয়েছে — স্বাবলম্বী হওয়ার অধিকার; নিজেদের শরীরের ওপর নিজেদের মালিকানার অধিকার; শিক্ষা ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার। সমিতি আইনী সচেতনতা ছড়িয়েছিল। শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্যে লড়েছিল। MARS-কেই বলা যায় পরবর্তীকালের সর্বভারতীয় গণতান্ত্রিক মহিলা সংগঠনের পূর্বসূরী।

আজকে অধিকারের কথা বললে যখন মেয়েদের হাজারটা গালিগালাজ শুনতে হয়, ট্রোলদের সহ্য করতে হয়, ক্ষমতাশালীদের কটাক্ষ ধেয়ে আসে, তখনও এই MARS-এর আদর্শই মশাল হয়ে থাকে। মশালকে জ্বালিয়ে রাখতে হয় ভবিষ্যতের জন্যে।

তাই গল্পগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়। মানুষের গল্প। বেঁচে থাকার আর বাঁচিয়ে রাখার গল্প। আমাদের ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকার।
সূত্র: (১) জনজাগরণে নারীজাগরণে, মণিকুন্তলা সেন, থীমা, কলকাতা
(২) Emergence of Mahila Atma Raksha Samiti in the Forties - Calcutta Chapter, Gargi Chakravarty, in Calcutta: The Stormy Decades, ed. Tanika Sarkar and Shekhar Bandyopadhyay, Social Science Press

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

মাঝনদী ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

শ্যামা আমাকে কোনোদিন নাম ধরে ডাকেনি। ডাকতো, ও মাঝি। প্রায় ষোলো বছর ধরে ওই দুইটা শব্দই ছিলো আমার নাম। আর আমি অন্য কোনো নামের কথা ভাবতেও পারতাম না। জীবনে মোটে একবার সে আমার আসল নামটা মুখে এনেছিলো। সেই রাতের পর ওপারের সঙ্গে আমার আর কোনোদিন দেখা হয়নি।

আমার নাম আফসার। টাকির ঘাটে নৌকা বাইতাম। এখন আর বাই না। নৌকাটাও নেই। ঘরের কোণে শুধু বৈঠাটা দাঁড় করানো আছে। তেল চিটচিটে, হাতলের কাছে কাঠটা একটু বসে যাওয়া। ওইখানে একসময় একটা নাম লেখা ছিলো। 

আমাদের ইছামতী তখন কারো ছিলো না। এপারে টাকি, ওপারে দেবহাটা। এপারে টাকি, ওপারে দেবহাটা, আর মাঝখানের জল দিনে দুইবার মন বদলাতো। জোয়ারে নদী ফুলেফেঁপে দুই পাড়ের ঘাসে এসে চুমু খেতো, আর ভাটায় নেমে গিয়ে মাঝবরাবর জাগিয়ে দিতো একটা চর। লম্বাটে একফালি জমি। ঘাসে ঢাকা, বর্ষায় ডুবে যেতো আবার হেমন্তে ফিরে আসতো। আমরা ওটাকে ডাকতাম মাঝির চর। পৃথিবীর কোনো কাগজে ওই চরের নাম নেই। অথচ আমার গোটা জীবনটা ওই এক ফালি ঘাসের ওপরেই কেটে গেছে।

বাপের সঙ্গে বৈঠা ধরতে শিখেছি বারো বছর বয়সে। প্রতি হাটবারে ওপার থেকে জেলেরা মাছ নিয়ে আসতো টাকির হাটে। হরিপদ কাকা আসতেন ঝাঁকা ভরা পারশে আর ভেটকি নিয়ে। সঙ্গে তার মেয়ে। মেয়েটা নৌকার গলুইয়ে বসে জলের ভেতর হাত ডুবিয়ে রাখতো। আঙুলের ফাঁক দিয়ে স্রোত কেটে যাওয়ার শব্দ শুনতো। আমি বলতাম, হাত তোলো, কামট আছে। সে ঘাড় না ঘুরিয়েই বলতো, কামটে আমাগো কামড়ায় না। আমরা জাইলা।

ওর নাম শ্যামা।

নদীটা তখন বেয়াড়া ছিলো। ভাটার টানের বিপরীতে নৌকা বাওয়া যেতো না, গায়ে যতো জোরই থাকুক। তখন নৌকা চরে ঠেকিয়ে বসে থাকতে হতো জোয়ার ফিরবার অপেক্ষায়। ছয় ঘণ্টা পরপর নদী মন বদলায়। এই ছয় ঘণ্টার সময়টুকুই ছিলো আমাদের। বাপেরা হাটে দরদাম করতো। আর আমরা দুজন চরের ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে থাকতাম। ওপারে কার ঘরে কার বিয়ে হচ্ছে সেই গল্প করতাম। আর থেকে থেকে জলের দিকে তাকাতাম। জোয়ার এলে আমার বুকটা শুকিয়ে যেতো। কারণ জোয়ার মানেই নৌকা ছাড়া, আর নৌকা ছাড়া মানেই আরো সাতটা দিন।


কবে যে শ্যামার দিকে তাকানোটা অভ্যাস থেকে অসুখ হয়ে গেলো, বলতে পারবো না। একটা দিনের কথা মনে আছে। অঘ্রানের রোদ, চরের ঘাস শুকিয়ে সোনালি। সে ঘাসের ডগা ছিঁড়ে ছিঁড়ে আঙুলে পাকিয়ে একটা আংটি বানাচ্ছিলো। বানিয়ে আমার দিকে না তাকিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিলো। আমি নিলাম না, চেয়ে রইলাম। রোদটা তখন ওর ঘাড়ের কাছে এসে ভাঙছে। সে অনেকক্ষণ হাত বাড়িয়ে রেখে শেষে বললো, নিবা না? না নিলে গাঙে ফালাইয়া দিমু।

আমি হাত পাতলাম। ঘাসের আংটিটা বিকেলের মধ্যেই শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু ওই হাত বাড়িয়ে রাখাটুকু আমার আঙুলের ভেতর সারাজীবন রয়ে গেছে।  

শ্যামা লিখতে জানতো। পাঠশালায় তিন ক্লাস পড়েছিলো। আমি নিরক্ষর। জাল আর দাঁড় ছাড়া কিছু চিনতাম না। এক বিকেলে সে ভেজা বালিতে আঙুল দিয়ে আমার নামটা লিখলো। বললো- দেখো, তোমার নামটা কতো ছোট। তারপর জোয়ার এসে লেখাটা ধুয়ে নিয়ে গেলো। সে হেসে বললো, বালিতে লিখলে হয় না। কাঠে লিখতে হয়।  

মাছ ছাড়ানোর ছোট বঁটিটা দিয়ে সে আমার বৈঠার হাতলে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিজের নামটা লিখলো। শক্ত কাঠ। তার আঙুল কেটে রক্ত পড়লো। তবু থামলো না। লেখা শেষ করে গামছায় হাত মুছে বললো, এইবার বাও দেখি। রোজ বাইবা, রোজ আমার নাম হাতে লাগবো।

নামটা আমি পড়তে পারতাম না। কিন্তু আঙুল বোলালে চিনতে পারতাম। পৃথিবীতে ওই একটা লেখাই আমি চিনেছি।

হাটবার ছিলো সপ্তাহে একদিন। বাকি ছয়টা দিন আমি কী করতাম? জাল বুনতাম, নৌকার তক্তায় আলকাতরা দিতাম, আর মনে মনে হিসাব কষতাম আর কয়টা রাত বাকি। মাঝে মাঝে বিনা কারণে নৌকা নিয়ে মাঝনদীতে গিয়ে বসে থাকতাম। ওপারের ঘাটটা দেখা যায় কিনা দেখতে। দেখা যেতো না। তবু বসে থাকতাম।

এক হাটবারে আমার যাওয়া হলো না। বাপের জ্বর আর নৌকার তলায় ফাটল, দুইটা একসঙ্গে। পরের হাটবারে গিয়ে দেখি সে চরে বসে আছে ঠিক আগের জায়গাটায়, হাঁটুতে থুতনি রেখে। কাছে গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ সে কোনো কথা বললো না। তারপর জলের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো, গত হাটবারে আমি ভাটা পুরা সময় এইখানে বইসা আছিলাম। জোয়ার আওনের আগ পর্যন্ত। বাপে ডাকে, আমি কই আরেকটু।

আমি বললাম, খবর দিতে পারি নাই।

সে বললো, খবর দিতে হইবো না। খালি আইসো।

তারপর প্রথমবারের মতো সে আমার হাতটা ধরলো। জেলের মেয়ের হাত। আঁশটে গন্ধ, তালুতে দড়ির দাগ। জোয়ার আসা পর্যন্ত আমি ওই হাত ছাড়িনি।

তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের বছর নদীর দুই পারে মানুষ না খেতে পেয়ে শুকিয়ে মরলো। ঘাটে রোজ সকালে দুই তিনটা লাশ পড়ে থাকতো। কেউ দাবি করতো না। ওই বছর শ্যামারা তিন মাস কচু আর কলার মোচা খেয়ে বেঁচেছিলো। আমি লুকিয়ে ওদের নৌকায় চাল দিয়ে আসতাম। হরিপদ কাকা দেখেও দেখতেন না। যে মানুষ সত্যি সত্যি না খেয়ে আছে, সে জিজ্ঞেস করে না চালটা কার হাত দিয়ে এলো।

সেই দুর্ভিক্ষেরই এক সন্ধ্যায় চরে বসে শ্যামা আমাকে একটা গল্প বলেছিলো। তার ঠাকুমার কাছে শোনা।

বহুকাল আগে… তখনো এই গাঙের নাম হয়নি। এপারে থাকতো এক জেলের মেয়ে আর ওপারে থাকতো এক রাখাল ছেলে। দুজনের দেখা হতো কেবল ভাটার সময়, যখন মাঝখানে চর জাগে। জোয়ার এলে চর ডুবে যেতো, দুজনে দুই দিকে ফিরে যেতো। মেয়েটা একদিন গাঙকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে বসলো, তুমি আমারে রোজ ওপারে দিয়া আইসো। গাঙ বললো, দিতে পারি। কিন্তু রাখতে পারুম না। আমার নিয়ম হইলো, যারে নিয়া যাই তারে ফিরাইয়া আনতে হয়। মেয়েটা তাতেই রাজি হলো। সেই থেকে দিনে দুইবার জল ওপারে যায়, আর দিনে দুইবার ফিরে আসে। ওইটাই জোয়ার, ওইটাই ভাটা। আর মেয়েটা যাওয়ার সময় কাঁদে, ফেরার সময়ও কাঁদে।

গল্প শেষ করে শ্যামা বললো, বুঝলা ও মাঝি? হেই কারণেই গাঙের জল নোনা।

আমি হেসে বলেছিলাম গাঙের জল নোনা, কারণ সাগর কাছে।

সে চোখ পাকিয়ে বলেছিলো, তুমি একটা আস্ত বেরসিক মাঝি।

আমাদের একটা পরিকল্পনা ছিলো কলকাতা পাড়ি জমানোর। ওই শহরে নাকি কেউ কারো পদবি জিজ্ঞেস করে না। খিদিরপুরের ঘাটে নাকি মাঝিদের কাজ পাওয়া যায়। নৌকার খোলের নিচে আমার একটা বিস্কুটের টিন লুকানো ছিলো। তাতে প্রতি হাটবারে চার আনা আট আনা করে জমতো। শ্যামা টিনটা ঝাঁকিয়ে শব্দ শুনতো আর ভুরু কুঁচকে হিসাব কষতো। বলতো, টিন ভরলে আমারে খবর দিবা। ঘরের চাল টিনের হইবো। বৃষ্টি পড়লে শব্দ হইবো। আর একটা লাল চিরুনি কিনা দিবা, ভুইলো না।

আমি বলতাম, ভরবো ভরবো। 

আসলে আমি ইচ্ছে করে দেরি করতাম। টিনটা ভরে গেলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে। আর তখন এই ছয় ঘণ্টার অপেক্ষাগুলো ফুরিয়ে যাবে। আমি বোকা ছিলাম। ভেবেছিলাম সময় জিনিসটা আমার পক্ষে আছে, আর অপেক্ষা জিনিসটা আমাদের নিজের সম্পত্তি। 

পঁয়তাল্লিশের এক আষাঢ়ে বিকেলে এমন বৃষ্টি নামলো যে নদীর ওপারটা বেশ কিছুটা সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমরা চরে আটকা পড়লাম। ছৈয়ের নিচে দুজনে ঢুকে বসলাম। কাপড় ভেজা, বাতাসে হি হি করে কাঁপুনি। শ্যামা খোঁপা খুলে ভেজা চুল ছড়িয়ে দিলো আর ছোট্ট ছাউনিটা ভরে গেলো নদীর মন কেমন করা গন্ধে। মাথার ঠিক এক বিঘত ওপরে তালপাতার ছৈয়ে তখন বৃষ্টির একটানা একটানা নূপুরনিক্বণ। সে আমার কাঁধে মাথা রাখলো। ভেজা চুল থেকে জল গড়িয়ে আমার হাতের ওপর পড়ছিলো। আর আমি নড়তে পারছিলাম না। পাছে সে সরে যায়। ওই সন্ধ্যায় আমি প্রথম জানলাম, মানুষের নিঃশ্বাসেরও একটা শব্দ আছে। আর সেই শব্দটা মুখস্থ হয়ে যায়।    

অনেকক্ষণ পর ঠান্ডা হাতটা আমার বুকের ওপর রেখে সে বললো, ভয় লাগতেছে।

আমি বললাম, বৃষ্টির?

সে বললো, না। মানুষের।

মেয়েটা আমার চেয়ে অনেক আগে টের পেয়েছিলো।

তার এক বছর পর কলকাতা থেকে খবর এলো। শহরে তিনদিন ধরে মানুষ মানুষকে ফালি ফালি করে কেটেছে। যারা কাজে গিয়েছিলো তারা পালিয়ে গ্রামে ফিরলো। চোখেমুখে অশনীসংকেতের মতো এমন একটা কিছু নিয়ে ফিরলো যা আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। তারপর নোয়াখালীর খবর এলো। আমাদের গ্রাম কলকাতা থেকে বহুদূর। নোয়াখালী থেকে আরো দূর। কিন্তু বিষের তো পা লাগে না, হাওয়ায় ভর করেই ছড়িয়ে পড়ে। 

হাটটা আগে বদলালো। যে বামুন এতোদিন হরিপদ কাকার হাত থেকে মাছ নিতেন, তিনি এখন ঝুড়ি থেকে সরাসরি তুলে নেন। এক শীতের রাতে জাল তুলতে গিয়ে দেখি আমাদের চরে হ্যারিকেন জ্বলছে। এপারের হেকমত আলী আর ওপারের নিবারণ সাহা পাশাপাশি বসে একটা হুঁকো ভাগ করে টানছে। আর ভিটেবাড়ি কেনাবেচার দর কষছে। এই দুইজন লোকই দিনের বেলায় দুই পারে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে বলতো, হিন্দু আর মুসলমান কোনোদিন এক থাকতে পারে না। আমি নৌকা ঘুরিয়ে চলে এসেছিলাম। ওদের নিয়ে ভাববার সময় আমার ছিলো না। আমার তখন একটা টিন ভরাবার তাড়া।

সাতচল্লিশের আগস্টে উৎসবের আলো জ্বললো নদীর দুই পারেই। চোদ্দ তারিখে ওপারে, পনেরো তারিখে এপারে। কেউ জানতো না বিভাজনের দাগটা কোথায় পড়েছে। কেউ জানতো না সে কোন দেশের লোক। ওই দুইটা রাতে আমি নৌকা নিয়ে ওপারে গেলাম। কারণ তখনো কেউ কাউকে আটকাচ্ছে না। শ্যামাকে নিয়ে চরে বসলাম। দুই পারের বাজির আলো জলের ওপর পড়ে কাঁপছিলো।  

সে বললো, আমরা এখন কোন দেশে বইসা আছি?

আমি বললাম, জানি না।

সে হেসে বললো, না জানাই ভালো।

সতেরো তারিখে শোনা গেলো, দাগটা পড়েছে ইছামতীর ঠিক মাঝ বরাবর। মাঝনদী দিয়ে। অর্থাৎ আমাদের চরটা কোন দেশে পড়লো, তা কেউ বলতে পারলো না। যে জিনিস জোয়ারে ডোবে আর ভাটায় ভাসে, তার দেশ ঠিক করবে কে।

প্রথম কয়েক বছর বাইরে থেকে তেমন কিছুই বদলালো না। নৌকা চলতো, হাট বসতো। শুধু নদীটা আর আগের মতো রইলো না। যে জলটা এতোকাল আমাদের জুড়ে রাখতো, সেটাই এখন আমাদের আলাদা করে রাখে। এই কথাটা একবার মাথায় ঢুকে গেলে চোখের সামনের সবকিছু পাল্টে যায়। ওপারে যাওয়া কমে এলো। কমতে কমতে বছরে তিন চারবারে ঠেকলো। প্রতিবার ফেরার সময় মনে হতো, নদীটা আগের চেয়ে একটু চওড়া হয়ে গেছে।

শ্যামার সাথে শেষ দেখাটা হয়েছিলো বাহান্ন সালের বর্ষায়।

সেদিন সে চুপচাপ ছিলো। অনেকক্ষণ পরে বললো, বাপে সম্বন্ধ আনছে। কালীগঞ্জে। আমি না করছি। কিন্তু আর কতোদিন পারুম গো মাঝি? ঘরে ডাগর মাইয়া রাখা এখন আর আগের মতো সহজ না।

আমি বললাম, দুইটা মাস দাও। টিন প্রায় ভরছে।

জোয়ার এসে গিয়েছিলো। নৌকা ছাড়তে হবে। সে উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির কোঁচড় ঝাড়িয়। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকালো আমার দিকে । ষোলো বছরে ওই প্রথম সে আমাকে মাঝি বললো না। 

আফসার। দেরি কইরো না।

কী আশ্চর্য! নিজের নামটা নিজের কানে শুনতে যে এতো ভালো লাগে, আমি এতোদিন জানতামই না।

তার কিছুদিন পরেই ঘোষণাটা এলো। পনেরোই অক্টোবরের পর ওপারে যেতে হলে পাসপোর্ট লাগবে, কাগজ লাগবে, ছবি লাগবে, অফিসের সিল লাগবে। যে মানুষ দশ মিনিটে নৌকায় ওপারে যেতো, তার সামনে হঠাৎ একটা দরজা তৈরি হলো। আর সেই দরজার গায়ে তারিখ লেখা হলো। দুই পারে হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো। ঘাটে ঘাটে মানুষ পুঁটলি নিয়ে বসে রইলো।

আমি হেকমত আলীর কাছে গেলাম। সীমান্তে তার লোক ছিলো। দারোগা থেকে চৌকিদার সবাই তার টাকা খেতো। বিস্কুটের টিনটা তার সামনে উপুড় করে ঢেলে দিলাম। নয় বছরের জমানো দুইশো ছেচল্লিশ টাকা। কম পড়লো। বাপ ততদিনে নাই। নৌকাটাই ছিলো তার রেখে যাওয়া একমাত্র জিনিস। সেটা বেচে দিলাম দুইশো টাকায়। সব মিলিয়ে চারশো ছেচল্লিশ টাকা হেকমত আলীর হাতে তুলে দিয়ে বললাম, মেয়েটাকে আইনা দেন। বাকি জীবন আপনার নৌকা বাইবো।

সে টাকাটা দুইবার গুনলো। তারপর গামছায় ঘাড় মুছে বললো, চোদ্দ তারিখ রাইতে চরে থাকিস।

চোদ্দ তারিখ রাতে আমি চরে ছিলাম। কুয়াশা পড়েছিলো। জোয়ার এসে চরের কিনারা ভিজিয়ে দিলো। তারপর ভাটা নামলো, তারপর আবার জোয়ার। সারারাত বৈঠাটা কোলে নিয়ে বসে রইলাম আর তাকিয়ে রইলাম ওপারে। ভোরের আলো ফুটলে দেখলাম, সামনে শুধু নদী। শ্যামা নেই।

অনেক পরে জেনেছিলাম, ওই রাতের আগেই শ্যামার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো। তার বাপ ভয় পেয়ে পূজার আগেই মেয়ের বিয়ের পাট চুকিয়ে দিয়েছিলেন। হেকমত আলী তবু জেনেশুনেই আমার টাকাটা নিয়েছিলো জেনেশুনেই জানিয়েছিলো তারিখটা। মানুষ মারার জন্য অস্ত্র লাগে না, একটা মিথ্যা আশাই যথেষ্ট।

তবু ওই লোকটাকে আমি আজ আর দোষ দিই না। দোষটা আমার। যতোবার কথাটা মনে পড়ে, ততোবার কানের ভেতর একটা কথাই বাজে। দেরি কইরো না। সারাটা জীবন আমি ওই অপেক্ষাটাকে আদর করে জমিয়ে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম ওটা আমার সম্পত্তি। জানতাম না, অপেক্ষা জিনিসটা ধার করা। আর তার সুদ বড় চড়া।

একাত্তরে যখন যুদ্ধ লাগলো, ওপার থেকে মানুষ দলে দলে এপারে আসতে লাগলো। রিলিফ কমিটির নৌকায় সাত মাস আমি বিনা পয়সায় বৈঠা টেনেছি। রাতের পর রাত। প্রত্যেকটা নৌকায় আমি মেয়েদের মুখের দিকে তাকাতাম। উনিশ বছর পেরিয়ে গেছে। চেহারা বদলে যায়, তবু আমি তাকাতাম। যদি কোনো একটা মেয়ে শ্যামার হয়! 

এখন আমার বয়স পঁচাশি। মাঝির চরটা আর নেই। ষাটের দশকের কোনো এক বর্ষায় স্রোত ওটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। যে জায়গাটায় আমরা ছয় ঘণ্টা করে জোয়ারের অপেক্ষা করতাম, সেখানে এখন শুধু জল। জলের ওপর টানটান করে বাঁধা একটা দড়ি। আর দুই দেশের বন্দুকওয়ালাদের নৌকা।

তবু বছরে একটা দিন আছে। দশমীর দিন দুই পারের মানুষ ঠাকুর নিয়ে নদীতে নামে। শয়ে শয়ে নৌকা। শয়ে শয়ে নৌকা। দুই পারে দুই দেশের পতাকা, ঢাকের শব্দ, সিঁদুর, ধোঁয়া। নৌকাগুলো দড়ির দুই পাশে এসে ঠেকে থাকে। আর মানুষ গলা ফাটিয়ে ওপারের অচেনা মানুষকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায়।

আমি মুসলমান মানুষ। পূজার সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই। তবু বাহান্ন সালের পর থেকে প্রত্যেক দশমীতে আমি একটা নৌকা ধার করে ওই ভিড়ের ভেতর গিয়ে বসে থাকি।

বৈঠার হাতলে এখন আর কোনো অক্ষর নেই। আমার হাতের ঘষায় নামটা ক্ষয়ে গেছে। প্রথমে শেষের অক্ষর, তারপর মাঝেরটা। তারপর পুরোটাই। এখন সেখানে কেবল একটা মসৃণ গর্ত, ঠিক বুড়ো আঙুলের মাপে। 

ওই গর্তে আঙুলটা বসিয়ে আমি সারা বিকেল কান পেতে বসে থাকি। হাজার মানুষের চিৎকার, ঢাক, বাঁশি, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। আমি ওই সবকিছুর ভেতর থেকে একটা মাত্র শব্দ শোনার জন্য বসে থাকি। কেউ আমার নাম ধরে ডাকে না।

তারপর ভাটা নামে। জল ওপার থেকে নেমে এপারে আসে। আমার নৌকার গা ছুঁয়ে চলে যায়। ছয় ঘণ্টা পর আবার ওপারে ফিরে যায়। দিনে দুইবার। রোজ। একদিনও এই নিয়মের নড়চড় হয় না।

আমি আঁজলা ভরে সেই জল তুলে মুখে দিই।

নোনা।

ঠাকুমার গল্পটা তাহলে মিথ্যা ছিলো না।  

১৩/৮/২০২৬

কোথাও মানুষ ভালো রয়ে গেছে ~ সুব্রত ঘোষ

১৯৯১ সাল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ল। তীব্র সংকটে পড়ে গেল কিউবা। পেট্রোল নেই, রাসায়নিক সার নেই, ট্রাক চলে না। ৮০% খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল যে দেশ নতুন পরিস্থিতিতে সেই দেশে খাবারের জন্য হাহাকার শুরু হল শহরে শহরে।

তখনই কিউবার মানুষ বেছে নিল এক অভিনব পথ: “Organopónicos”। গ্রীনহাউস স্টাইলে চাষ পদ্ধতির সূচনা হল দেশে। কৃষিমন্ত্রক অনুমোদন দিতেই তারা শহরের পরিত্যক্ত জায়গা, রাস্তার পাশে, পার্কে , ছাদে, ব্যালকনিতে শুরু করল জৈব চাষ। নাম দিল “Organopónicos.”

Uploaded Image পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ শহরভিত্তিক জৈব কৃষি আন্দোলন এভাবেই শুরু হয় হাভানার বুকে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই উৎপন্ন হচ্ছিল শাকসবজি। স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেরাই শ্রম দিচ্ছিল, নিজেরাই খাচ্ছিল।পরিবেশ বান্ধব চাষবাসই হয়ে ওঠে শহরের খাদ্যনির্ভরতার ভরসা। সমাজতান্ত্রিক মডেলে উৎপাদিত খাবার সমানভাবে ভাগ হয়ে পৌঁছাত সাধারণ মানুষের ঘরে। 



ডন আলফ্রেডো, হাভানার এক শহরতলিতে নিজের বাড়ির পাশে ফাঁকা জায়গায় উদ্যোগ নিয়ে একখণ্ড জমি তৈরি করেন। এখন এই ২০২৫তে তার চাষ করা পালংশাক পৌঁছে যায় ৬০টি পরিবারের প্লেটে।

 কিউবার এই urban organic farming revolution—এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী, এবং সাধারণ জনগণের একত্রে গড়ে তোলা এক বিকল্প পথের ইতিহাস। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবায় শুরু হয় "Special Period in Time of Peace" —এই সময়েই কিউবার রাষ্ট্র নেতৃত্ব ঘোষণা করে “আমরা স্থানীয় উৎপাদনেই খাদ্যনির্ভরতা গড়ব”। কিউবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান INIFAT (Instituto de Investigaciones Fundamentales en Agricultura Tropical) জৈব সার, কম্পোস্টিং, প্রাকৃতিক কীটনাশক ইত্যাদির ব্যবহার করে কেমন করে শহরে চাষ করা যায়— সে বিষয়ে সরকারকে নীতিগত পরামর্শ দেয়।

পাড়াভিত্তিক সংগঠনগুলো খাদ্য উৎপাদনে স্থানীয় মানুষদের একত্র করে, স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাগান তৈরি করে, এবং খাদ্য বণ্টনের দায়িত্বও নেয়। হাভানার বাসিন্দা মারিয়া গঞ্জালেজ, যিনি সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাদে বাগান তৈরি শুরু করেন, তিনি এক পাড়া ক্লাব গড়ে তোলেন— যেখানে শিশুদের নিয়ে কৃষিকাজ শেখানো হতো। হাভানার প্রতিটি পৌর এলাকায় অন্তত একটি করে urban farm থাকতেই হবে— এ ছিল সরকারি নিয়ম। "Local food, zero transport, no chemicals" ছিল মূল শ্লোগান।

২০০৩ সালের মধ্যেই কিউবার শহরগুলোতে প্রায় ৩৫,০০০ হেক্টর জমি শহুরে জৈব চাষে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ঐ বছর দেশের কৃষি উন্নয়ন সম্মেলনে ফিদেল কাস্ত্রো বলেন "জৈব চাষ করছেন মানে আপনি পিছিয়ে পড়ছেন না। এই পদ্ধতি আমাদের বাস্তবকে স্বীকার করে নিতে শেখায়। এই নতুন পরিস্থিতিতে আমরা শিখেছি যে অসাধারণ কিছু করা যায় বিষ বা পেট্রোলিয়াম ছাড়াই।" যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এই স্বনির্ভর কৃষি আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শহরের মানুষ যদি নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করে, তাহলে সাম্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সচেতনতা — সব একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। তিনি বললেন "Con la tierra y el sudor, no hay dictadura que gane.” মাটি আর ঘামের সঙ্গে থাকলে কোনো একনায়কতন্ত্রই জিততে পারে না।

২০০৬ সালে জাতিসংঘের FAO (Food and Agriculture Organization) কিউবার শহরভিত্তিক কৃষিকে “একটি বৈশ্বিক মডেল” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। হাভানায় Urban Agriculture International Congress এ ২০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি কিউবার অভিজ্ঞতা শোনেন। নেপালে ২০১৫-র ভূমিকম্পের পরে, কিছু NGO কিউবার মডেল অনুসরণ করে শহরে চট, বাঁশ ও প্লাস্টিক ব্যাগে অর্গানিক খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ শুরু করে। 


বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

পুঁজিবাদের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ: লোমহীনতার রাজনীতি ~ আনুশা মেহরিন

পিরিয়ড হ্যাকস নিয়ে একটা ভিডিও দেখেছিলাম একদিন। ঐখানে একটা হ্যাক দেখায় প্যাড খোলার 'এম্ব্যারেসিং' আওয়াজকে ঢাকার জন্যে কী করতে হবে।
 মাইয়া মানুষ হওয়াটা বিরাট এক সমস্যা। কোনো একটা বিষয়ে সমস্যা না থাকলেও জোর করে সমস্যা বানায়ে মেয়েদের মাথায় পুশ করা হয় এটা লজ্জাজনক একটা সমস্যা, দেখো আমরা এটার সলিউশন দিচ্ছি। 

এটার ১০০/১০০ উদাহরণ হইতে পারে মেয়েদের বডি হেয়ার নিয়ে জিলেটের কারসাজিটা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জিলেট প্রথম সেফটি রেজর আনার পর  পুরুষদের বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর সাথে জিলেটের চুক্তি হয়। প্রতিটি সোলজার কিটের সাথে জিলেটের সেফটি রেজর আর ব্লেড দেয়া হতো। জিলেটের তো তখন রমরমা ব্যবসা। সামরিক বাহিনীর কাছে বাল্ক অর্ডার চলে যাচ্ছে। যুদ্ধের ঐ বছরগুলোয় জিলেট প্রচুর অঙ্কের মুনাফা করেছিলো।  
কিন্তু যুদ্ধ তো কখনো শেষ হবে। আর যুদ্ধ শেষ হলে এই বাল্ক অর্ডার পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেনাবাহিনী ছাড়ার পর পুরুষদের সবসময় ক্লিন শেভড থাকার প্রয়োজনীয়তাও এতটা থাকবেনা। সুতরাং মুনাফা কিছুটা হলেও কমে আসবে।  

জিলেটের তখন চোখ পড়লো বাকি অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ওপর। কিন্তু নারীদের তো দাড়ি শেইভ করার ঝামেলা নাই। তাদের সমস্যার সলিউশন হিসেবে তাহলে জিলেটের প্রোডাক্টকে কীভাবে প্রেজেন্ট করা যায়? 


উত্তর হলো, নতুন একটা সমস্যা তৈরী করে। 
'পার্ফেক্ট নারী' হওয়ার জন্যে সোশ্যাল যেই প্রেশার নারীদের ওপর আছে, জিলেট ঠিক করলো সেটাকে ইউটিলাইজ করবে। ১৯১৫ সালে 'হার্পারস বাজারস' ম্যাগাজিনে একটা বিজ্ঞাপন ছাপা হয় যার মূল বক্তব্য ছিলো তাদের হেয়ার রিমুভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে সমুদ্রে যাওয়ার সময় শরীরের লোম নিয়ে মেয়েদের আর লজ্জা পেতে হবেনা। বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিলো 'You need not be embarrassed!'। অথচ হাস্যকর বিষয় হলো, বডি হেয়ারের মতো স্বাভাবিক ব্যাপার নিয়ে তখন মেয়েদের অতোটা মাথা ব্যথা ছিলো না। পুঁজিবাদ ও বিজ্ঞাপন শুধুমাত্র নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে এই বিষয়টিকে করে তুললো নারীদের জন্যে লজ্জার, অস্বাস্থ্যকর ও আনফেমিনিন। 
জিলেটসহ ঐ সময়ের আরো নামী কিছু কোম্পানি এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল মার্কেটিং শুরু করে। তারা নারীদের প্রেজেন্ট করতে শুরু করলো অত্যন্ত কমনীয়ভাবে, প্রকৃত নারীদের ত্বক হতে হবে 'স্মুথ অ্যাজ সিল্ক', শরীরের ভিজিবল অংশে কোনো লোম থাকলে সেটা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ও আনস্যানিটারি।  সাধারণ নারীরা বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও বিজ্ঞাপনে এসব দেখে হীনমন্যতায় ভোগা শুরু করে এবং নিজেদের শরীরের স্বাভাবিক বিষয়গুলোকে ত্রুটি হিসেবে দেখতে থাকে। আস্তে আস্তে কয়েক জেনারেশনের নারীরা এতেই অভ্যস্ত হতে থাকে ও এই হেয়ার রিমুভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করাটাকে জীবনের অংশ হিসেবে ধরে নেয়। অর্থাৎ, জিলেটসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলো ১০০বছর আগে এমন এক সাইকোলজিক্যাল চক্র তৈরী করে যাতে পা দেয় আমার মতো পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন নারীরা। আমাদের ইনসিকিউরিটিকে কাজে লাগিয়ে, নিজের কাছে নিজের শরীরকে অস্বাভাবিক অনুভব করিয়ে মাল্টিমিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি তৈরী হয়ে গেলো। আর আমরা খুশিমনে তাদের খেলায় দাবার গুটি হয়ে রয়ে গেলাম একশো বছর ধরেই। 

_পুঁজিবাদের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ:  লোমহীনতার রাজনীতি 

আনুশা মেহরিন
০২.০৮.২৬

ছাড়পত্র ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

 রাত দুটো বাজলে এই হাসপাতালটা মরা বাড়ির মতো চুপ হয়ে যায়। করিডোরের লাইট আধখানা নিভিয়ে দেয়। নার্সরা ফিসফিস করে কথা বলে। তখন আমি ফোন করি রাশেদকে। আমার বর ঘুমায় কেবিনের সোফায়। আর আমি কাঁথার নিচে মুখ ঢুকিয়ে কথা বলি সেই মানুষটার সাথে, যার সাথে এগারো বছর আগে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।

শুনতে খারাপ লাগছে? লাগুক। যে মানুষ মরে যাচ্ছে, ভালোমন্দের হিসাব করার সময় তার হাতে নেই।
আমার নাম নীলা। বয়স পঁয়ত্রিশ। ব্রেস্ট ক্যান্সার, স্টেজ ফোর। রোগটা এখন আর শুধু বুকে নেই। লিভারে গেছে, হাড়ে গেছে। ডাক্তারি ভাষায় মেটাস্টেসিস। ডাক্তাররা এখন আর সারানোর কথা বলে না। বলে প্যালিয়েটিভ কেয়ার। কথাটার মানে খুব সোজা। যন্ত্রণাটা একটু কমিয়ে রাখা, আর অপেক্ষা করা।
শুরুটা ছিলো একটা ছোট্ট চাকার মতো শক্ত দলা। বাঁ দিকের স্তনে। ব্যথা ছিলো না। ব্যথা ছিলো না বলেই পাত্তা দিইনি। সংসার ছিলো, অফিস ছিলো। শাশুড়ির ডায়াবেটিস ছিলো। নিজের শরীরটা লিস্টের সবার শেষে ছিলো। যেদিন ডাক্তারের কাছে গেলাম, ততদিনে দলাটা তার কাজ গুছিয়ে এনেছে। বায়োপসি রিপোর্টটা আরিফ আমাকে পড়তে দেয়নি। ওর মুখ দেখেই আমি পড়ে ফেলেছিলাম।
আরিফ ভালো মানুষ। দশ বছরের সংসারে একটা দিনও খারাপ ব্যবহার করেনি। বিল দেয়, ওষুধ আনে। ডাক্তারের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে। রিপোর্টের ফাইল তারিখ ধরে ধরে সাজায়। ও ভালোবাসে দায়িত্ব দিয়ে। কিন্তু আমার তো এখন আর দায়িত্ব লাগে না। আমার এখন গল্প লাগে। পুরোনো দিনের গল্প। আরিফের সাথে আমার পুরোনো দিন মানে ফার্নিচারের কিস্তি আর ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন। আর রাশেদের সাথে আমার পুরোনো দিন মানে গোটা একটা জীবন, যেটা কোনোদিন শুরুই হলো না।
আত্মীয়রা আসে। ফলের ঝুড়ি, হরলিক্সের কৌটা আর মাপা দুঃখ নিয়ে। খালাম্মা বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো মা। ভাবি বলেন, আজকাল ক্যান্সার তো ভালোই হয়ে যায়। বলার সময় কেউ আমার চোখের দিকে তাকায় না। মিথ্যা বলার সময় মানুষ চোখের দিকে তাকাতে পারে না। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। আমার চোখ বন্ধ দেখলে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মরণাপন্ন মানুষের সাথে কী কথা বলতে হয়, এই দেশের কেউ জানে না।
হাসপাতালের রাতগুলো সবচেয়ে লম্বা। ঘুম আসে না। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হিসাব করি, আর কয়টা শ্রাবণ পাবো না, আর কয়টা শীত। আমাদের কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি। এতিম বড় ভারী শব্দ।
রাশেদের সাথে বিয়ের দিন ঠিক ছিলো। কার্ড ছাপা হয়ে গিয়েছিলো। তারপর এক সকালে ওর বাবা মারা গেলেন। হার্ট অ্যাটাক। মরার পর জানা গেলো ভদ্রলোক ব্যবসার নামে মাথার ওপর সত্তর লাখ টাকার দেনা রেখে গেছেন। আমার বাবা তিন দিন চুপ করে রইলেন। চতুর্থ দিন বললেন, যে ছেলের ঘাড়ে বাপের দেনা, তার ঘাড়ে মেয়ে দেবো না। আমি কাঁদলাম। ভাত খাওয়া বন্ধ করলাম। একবার হাত কাটার কথাও ভাবলাম। তারপর যা হয়। তিন মাসের মাথায় আরিফের সাথে বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের রাতে রাশেদের একটা মেসেজ এসেছিলো। দুইটা শব্দ। ভালো থেকো। ব্যস। এগারো বছর আর কোনো কথা হয়নি।
রোগটা ধরা পড়ার পর একদিন আমি ওকে ফোন করলাম। নম্বরটা এগারো বছর মুখস্থ ছিলো। মরণাপন্ন মানুষের একটা সুবিধা আছে। তার আর লজ্জা লাগে না। ও ধরলো। আমি বললাম, রাশেদ, আমি নীলা। আমার ক্যান্সার হয়েছে। শেষ স্টেজ। মরার আগে তোমার সাথে একটু গল্প করতে চাই।
ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ হলো না। তারপর ও শুধু বললো, কখন ফোন করবো, বলো।
সেই থেকে রোজ রাতে আমাদের কথা হয়। ও কথা বলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে, গলা নামিয়ে। ঘরে ওর বউ ঘুমায়। আমি কথা বলি কাঁথার নিচে, ফিসফিস করে। সোফায় আমার বর ঘুমায়। ব্যাপারটাকে বাইরে থেকে দেখলে পরকীয়া ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। অথচ আমরা দুজনেই জানি, এই ফোনের ভেতর শরীর নেই, সংসার ভাঙার প্ল্যান নেই, পালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নেই। আছে শুধু একটা মেয়ে, যে মরে যাচ্ছে। আর একটা ছেলে, যে তাকে মরার আগে কয়েকটা সুন্দর রাত ধার দিচ্ছে। এই সম্পর্কের কোনো নাম বাংলা ভাষায় নেই।
আমরা কী কথা বলি? সব কথা। ক্যাম্পাসের বকুলতলা। ক্যান্টিনের পোড়া সিঙাড়া। টিএসসির চা। রিকশার হুড। আর মাঝে মাঝে এই রোগটার কথা। রাশেদ শুনতে চায় না, তবু আমি বলি। কাউকে তো বলতে হবে।
বলি, জানো, কেমো নেওয়ার সময় মনে হয় শিরার ভেতর দিয়ে কেউ গরম সিসা ঢেলে দিচ্ছে। কেমোর তিন দিন পর থেকে মুখের ভেতর ঘা হয়ে যায়। ভাত গিলতে পারি না। পানি খেলে মনে হয় লোহা খাচ্ছি। জিভে কোনো স্বাদ নেই। আমার মা মরার আগে যে হাতের রান্না খেতে চেয়েছিলাম, সেই খিচুড়িটাও এখন কেমিক্যালের মতো লাগে।
বলি, আমার চুলগুলোর কথা মনে আছে তোমার? ও চুপ করে থাকে। মনে থাকবে না কেন। কোমর পর্যন্ত চুল ছিলো আমার। ও বলতো, তোমার চুলে বৃষ্টির গন্ধ। সেই চুল প্রথম কেমোর পনেরো দিনের মাথায় বালিশে, বাথরুমের মেঝেতে, চিরুনিতে গোছা গোছা উঠে আসতে লাগলো। আমি নিজেই একদিন নরসুন্দর ডেকে মাথা কামিয়ে ফেললাম। কাঁদিনি। শুধু ভুরু দুটো যেদিন ঝরে গেলো, সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারিনি। কেমোথেরাপি খুব সৎ জল্লাদ। সে কিছুই বাকি রাখে না।
অপারেশনের কথাটা ওকে বলেছিলাম আরো পরে। ম্যাসটেকটমি। বাঁ দিকের স্তনটা পুরো কেটে বাদ দিতে হয়েছে। কথাটা বলার সময় আমার গলা কাঁপেনি। ওর কেঁপেছিলো।


কারণ ও জানে ওই বুকের দাম। বিয়ের তিন মাস আগে, এক শ্রাবণের দুপুরে, ওর মেসে কেউ ছিলো না। বাইরে এমন বৃষ্টি যে জানালার ওপাশে শহরটাই ছিলো না। ভেজা পর্দা উড়ছিলো। আমরা দুজন প্রথমবার কাছে এসেছিলাম। আমার তখন কী লজ্জা, কী ভয়, আর তার ভেতরে কী অসম্ভব সুখ। রাশেদ আমার বুকে মুখ রেখে বলেছিলো, এইখানে আমার দেশ। আমি ওর চুলের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে হেসেছিলাম। সারা জীবনে ওই একটাই দুপুর। তারপর তো বিয়েই ভেঙে গেলো।
ফোনে ওকে বললাম, তোমার দেশটা আর নেই রাশেদ। কেটে ফেলে দিয়েছে একটা স্টিলের ট্রেতে। জায়গাটায় এখন একটা লম্বা কাটা দাগ। আরিফ ওই দাগের দিকে তাকায় না। দুই বছর ধরে ও আমাকে ছুঁয়েও দেখে না। ঘেন্নায় না, ভয়ে। যেন আমার শরীরটা কাচের, ছুঁলেই ভেঙে যাবো।
ওপাশে রাশেদ অনেকক্ষণ কথা বললো না। তারপর শুনলাম ও কাঁদছে। পঁয়ত্রিশ বছরের একটা পুরুষ মানুষ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে, মুখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদছে। যেন ঘরের ভেতর শব্দ না যায়।
আমার কেবিনটা ডাবল বেডের। খরচ বাঁচাতে এটাই নেওয়া। পাশের বেডে ছিলেন রাহেলা বানু। বয়স সাতষট্টি। কোলন ক্যান্সার, সাথে কিডনিও বসে যাচ্ছে। উনার তিন ছেলে। তিনজনই ঢাকায় থাকে, ভালো চাকরি করে। পালা করে একজন একজন আসতো। আধা ঘণ্টা বসে, ফোন টিপে, চলে যেতো।
বুড়ি সারাদিন আমার সাথে গল্প করতেন। গ্রামের গল্প, ছেলেদের গল্প। বলতেন, বুঝলা মা, বড় পোলাডারে ইশকুলে দিমু বইলা আমার বিয়ার কানের দুল বেচছিলাম। মেজোডার মেডিকেল কোচিংয়ের সময় ছয় মাস এক বেলা খাইছি। হেরা জানে না। মায়েরা কইতে পারে না এইসব।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, খালা, আপনার কষ্ট হয় না? উনি হাসলেন। ফোকলা মুখে অদ্ভুত মায়া। বললেন, পোলাপান হইলো ধানের মতো, মা। যত্ন কইরা বড় করবা। পাকলেই আর তোমার থাকবো না। তহন সে গোলার। আমি কথাটার মানে তখন পুরোটা বুঝিনি।
বুঝলাম বুধবার রাতে। রাত তিনটার দিকে মনিটরটা চিৎকার করে উঠলো। নার্স দৌড়ে এলো, ডাক্তার এলো। পর্দা টেনে দিলো। ভোররাতে সব শান্ত হয়ে গেলো। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, উনার মুখের ওপর সাদা চাদর টেনে দেওয়া হলো। আগের দিন সকালেই আমাকে বলেছিলেন, মা গো, আইজ শইলডা বড় হালকা লাগতাছে। হালকা লাগবেই তো। সব বোঝা তো উনি নামিয়ে রেখে যাচ্ছিলেন ছেলেদের কাঁধে।
ছেলেরা সেই বোঝা নিলো না।
সকালে তিন ভাই এলো। কান্নাকাটি না, প্রথমেই বিলিং সেকশনে গেলো। বাইশ দিনের আইসিইউ আর কেবিন মিলিয়ে বিল হয়েছে চার লাখ সাতাশ হাজার টাকা। হাসপাতালের নিয়ম পরিষ্কার। বিল ক্লিয়ার না হলে ডেথ সার্টিফিকেট দেবে না। লাশের ছাড়পত্র দেবে না। করিডোরে দাঁড়িয়ে তিন ভাইয়ের ফিসফিস তর্ক আমি কেবিনের ভেতর থেকে শুনলাম। বড়টা বলছে, গত মাসেও আশি হাজার আমি একলা দিছি। মেজোটা বলছে, আমার মেয়ের স্কুলের ভর্তি সামনে, আমি এতো পারবো না। ছোটটা ফোনে কাকে যেন বলছে, আব্বা বাইচা থাকলে এই দিন দেখা লাগতো না।
যে মানুষটা কানের দুল বেচে ওদের মানুষ করলো, তার দাম উঠলো না চার লাখ সাতাশ হাজার টাকা।
অথচ আমি জানি, শেষ কয়টা দিন উনি কাদের মুখ চেয়ে বেঁচে ছিলেন। জ্বরের ঘোরে উনি ছেলেদের ডাকতেন ছোটবেলার নামে। সেলিম, বাবু, টুনু। শেষ যেদিন জ্ঞান পরিষ্কার ছিলো, নার্সের হাত ধরে বলেছিলেন, আমার পোলাগো কইও, আমার লেইগা যেন টেনশন না করে। যে ছেলেরা পরদিন করিডোরে দাঁড়িয়ে বিল ভাগাভাগি করতে পারলো না, মা তাদের টেনশনের কথা ভেবে গেছেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। মা এমনই। ধানের গোলা লুট হয়ে যায়, মাটি টের পায় না।
সারাটা দিন লাশটা পাশের বেডে পড়ে রইলো। সাদা চাদরে ঢাকা। এসির ঠান্ডায় ঘরটা মর্গ হয়ে গেলো। সন্ধ্যায় আরিফ বাড়ি গেলো কাপড় আনতে। আয়া মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়লো। আর আমি জেগে রইলাম একটা লাশের পাশে।
সে এক ভয়ংকর রাত। বারবার মনে হচ্ছিলো চাদরটা উঠছে, নামছে। মনে হচ্ছিলো চাদরের নিচ থেকে উনি আমাকে দেখছেন। জানি সব ভুল, সব মনের বানানো। তবু। মৃত্যু জিনিসটা যতক্ষণ বইয়ের পাতায় থাকে, তাকে দার্শনিক লাগে। পাশের বেডে শুয়ে থাকলে তাকে লাগে হিম, সাদা আর অসহ্য রকমের কাছের। আজ ও, কাল আমি। মাঝখানে শুধু একটা পর্দা।
রাত আড়াইটায় রাশেদকে ফোন করলাম। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিলো না। বললাম, রাশেদ, আমার পাশের বেডে একটা লাশ শুয়ে আছে। ওর ছেলেরা ওকে নিচ্ছে না। টাকার জন্য। রাশেদ, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।
ও একটাবারও বললো না, ভয় পেয়ো না। ও জানে ওই কথায় কাজ হয় না। ও গল্প শুরু করলো। তোমার মনে আছে, ফার্স্ট ইয়ারে তুমি আমার খাতা থেকে নোট চুরি করেছিলে? মনে আছে, বকুলতলায় তোমার স্যান্ডেল ছিঁড়ে গিয়েছিলো আর তুমি খালি পায়ে হেঁটেছিলে, আমি স্যান্ডেল হাতে পেছনে? মনে আছে সেই রিকশাওয়ালা চাচা, যে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বলেছিলো, তোমাগো দুইজনরে মানাইছে ভালা?
এইভাবে, একটা একটা করে স্মৃতি দিয়ে, ও আমাকে ভোর পর্যন্ত পার করে দিলো। ফজরের আজান যখন ভেসে এলো, আমি বললাম, রাশেদ, আমি মরতে চাই না।
কথাটা বলেই বুঝলাম, এই একটা বাক্যের জন্যই আমি এতোদিন ওকে ফোন করছি। আমি বাঁচতে চাই। কী ভীষণ, কী নির্লজ্জ রকমভাবে বাঁচতে চাই। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শাড়ি চাই না, ফ্ল্যাট চাই না, কারো ভালোবাসা পর্যন্ত চাই না। আমি শুধু আরেকটা বর্ষা চাই। ভোরবেলা চায়ের কাপে চুমুক চাই। বৃষ্টির দিনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকা শহর দেখতে চাই। মানুষ সারা জীবন কত বড় বড় জিনিস চায়। মরার সময় সে শিশু হয়ে যায়। সামান্য জিনিস চেয়ে কাঁদে। খিচুড়ি। বৃষ্টি। আরেকটা সকাল।
একদিন রাশেদ জিজ্ঞেস করলো, নীলা, তুমি কি আমাকে এখনো ভালোবাসো? আমি সত্যিটাই বললাম। বললাম, জানি না। মনে হয় আমি তোমাকে ফোন করি নিজেকে ভালোবাসি বলে। তোমার গলার ভেতর সেই তেইশ বছরের নীলাটা এখনো বেঁচে আছে। যার কোমর পর্যন্ত চুল ছিলো, আস্ত শরীর ছিলো, সামনে গোটা একটা জীবন পড়ে ছিলো। আমি রোজ রাতে ওই মেয়েটার সাথে দেখা করতে যাই। মানুষ আসলে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে নিজেকে, রাশেদ। রাহেলা খালার ছেলেরাও তাই। আমিও তাই।
ও একটু চুপ থেকে বললো, আর আমি? আমি বললাম, তুমিও। তুমি আমাকে সময় দিয়ে আসলে এগারো বছরের পুরোনো একটা কষ্ট ধুয়ে ফেলছো। ও রাগ করলো না। শান্ত গলায় বললো, ধুইতে দাও নীলা। এই ময়লাটা অনেকদিন বয়ে বেড়াচ্ছি।
তারপর সেই রাতটা এলো, যেটার ভয়ে আমি এতদিন ফোনের ওপাশের ঘরটার কথা ভাবতাম না। রিং হতেই ফোন ধরলো একটা মেয়েলি গলা। হ্যালো। আমি পাথর হয়ে গেলাম। রাশেদের বউ। গলাটা নরম করে বললো, আপা, ও ওয়াশরুমে। আপনি লাইনে থাকেন, ও আসতেছে। তারপর একটু থেমে বললো, আপা, একটা কথা। আপনি যখন খুশি ফোন দিয়েন। আমি কিছু মনে করি না। মানুষটা এগারো বছর বুকের ভেতর একটা কবর নিয়া ঘুরছে। আপনি আসার পর কবরটায় ফুল দেওয়া হইতেছে। কিছু ঋণ থাকে আপা, শোধ করতে দিতে হয়।
আমি ফোন কানে চেপে নিঃশব্দে কাঁদলাম। মানুষ কত ছোট হয় দেখেছি এই হাসপাতালে। মানুষ এত বড়ও হয়, সেটা জানলাম একটা ফোনকলে।
এখন মরফিনের ডোজ বাড়ছে। ব্যথাটা থাকে হাড়ের ভেতরে, মজ্জায়। দিন আর রাত মিশে যাচ্ছে একটা ঘোলা স্রোতে। কাল ডাক্তার আরিফকে করিডোরে ডেকে নিয়ে কী যেন বললো। আরিফ ফিরে এলো লাল চোখ নিয়ে। আমার পায়ের কাছে বসে প্রথমবারের মতো আমার হাতটা ধরলো। ক্যানোলার পাশটা এড়িয়ে, খুব সাবধানে। আমি বুঝে গেলাম। বিলিং সেকশনে না। ওপরে কোথাও, আমার ছাড়পত্র তৈরি হচ্ছে।
কাল রাতে রাশেদকে বললাম, আমাকে শেষবারের মতো সেই দুপুরটার গল্প বলো। ও বললো। ভেজা পর্দা। জানালার ওপাশে মুছে যাওয়া শহর। টিনের চালে বৃষ্টির তবলা। আমার ভেজা চুলের গন্ধ। ওর ঠোঁট, আমার লজ্জা, সেই একটা দুপুরের সমস্ত আলো। আমি চোখ বন্ধ করে শুনলাম। মরফিনের ঘোরের ভেতরেও শরীরটা একবার কেঁপে উঠলো। পুরোনো সুখ মরে না। সে শুধু ঘুমিয়ে থাকে।
গল্প শেষ হলে বললাম, রাশেদ, আমার জানাজায় এসো না। তুমি সামনে দাঁড়ালে আমার উঠে বসতে ইচ্ছা করবে।
ও হাসলো না। ফোনটাও রাখলো না। আমরা দুজন চুপ করে রইলাম। ওপাশে ওর নিঃশ্বাসের শব্দ। এপাশে স্যালাইনের ফোঁটা। টুপ। টুপ। টুপ।
পাশের বেডে আজ নতুন রোগী এসেছে। অল্পবয়সী একটা মেয়ে, চোখে ভয়। সকালে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপা, আপনার কী হইছে? আমি হাসলাম। বললাম, তেমন কিছু না। ছুটির অপেক্ষায় আছি।
জানালার বাইরে শ্রাবণ মাস। আকাশ কালো করে আসছে। বৃষ্টিটা নামুক। বৃষ্টিটা দেখে যেতে পারলে আর কোনো আফসোস রাখবো না।

বাবা ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

আমার বাবা দুইজন। একজন আমার সাথে আর কথা বলে না। আরেকজনকে আমি পকেটে নিয়ে ঘুরি।
দ্বিতীয়জন একটা গোলাপি ট্যাবলেট। সাইজে বুটের দানার মতো। গায়ে ইংরেজিতে দুইটা অক্ষর খোদাই করা। রাস্তায় ওর অনেক নাম। গুটি, মাল। তবে সবচেয়ে চালু নামটা শুনলে আপনার গা শিউরে উঠবে। বাবা। হ্যাঁ, এই দেশের লাখ লাখ ছেলে ওই গোলাপি জিনিসটাকে বাবা বলে ডাকে। কেন ডাকে, সেটা বুঝতে আমার চব্বিশ বছর লেগে গেলো। বাবার মতোই ও আপনাকে আগলে রাখবে, ভরসা দেবে। আর একদিন দেখবেন ওকে ছাড়া আপনি কিছুই না।
আমার নাম রাফি। মিরপুরের ছেলে। এই গল্পটা আমি লিখছি না, কনফেস করছি। কারণ আমার আর হারানোর কিছু নেই।
তেইশ সালের কথা। আমি তখন একুশ। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে সিএসই পড়ি। রাত জেগে ভ্যালোরেন্ট, ডিসকর্ডে আড্ডা, ফাইভারে টুকটাক লোগো ডিজাইন। মাথার ভেতর সারাক্ষণ উনিশটা ট্যাব খোলা। সিজিপিএ, ক্লায়েন্ট, কানাডার স্বপ্ন, বাবার প্রেশারের ওষুধ, ছোটবোন তিন্নির টিউশনের বেতন। আমাদের জেনারেশনটাই এমন। সবকিছুর সাথে কানেক্টেড। অথচ কারো সাথে কানেক্টেড না। বুকের ভেতর সারাক্ষণ একটা লো ব্যাটারি সাইন জ্বলে।
আর আমরা সবাই পালাই। কেউ রিলসে, কেউ গেমে, কেউ হাসতে হাসতে ডিপ্রেশনের মিম বানায়। বড়রা বলে আমরা অলস। আমরা অকৃতজ্ঞ। তারা বোঝে না, চল্লিশ লাখ বেকারের লাইনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে ঠিক কী দেখা যায়। আমরা কেউ ভালো নেই। আমি শুধু পালানোর সবচেয়ে খারাপ দরজাটা বেছে নিয়েছিলাম, এই যা তফাত।
ওই ঝাপসা জীবনে একটাই স্বস্তির ব্যাপার ছিলো। অথৈ। আমার ক্লাসমেট। টিএসসিতে না। আমাদের প্রেম হতো ইউনিভার্সিটির সিঁড়িতে আর মেট্রোরেলে। ও টিফিন বক্সে নুডলস আনতো দুইজনের জন্য। প্ল্যান ছিলো, গ্র্যাজুয়েশনের পর দুজনে আইইএলটিএস দেবো। কানাডা যাবো। স্নো দেখবো। অথৈ বলতো, তুই খালি পাশটা কর রাফি। বাকিটা আমি সামলাবো। কেউ আমার দায়িত্ব নিতে চাইছে, এই ফিলিংসটাই আমার জীবনের সেরা নেশা ছিলো। তখনো জানতাম না।
অথৈর একটা পাগলামি ছিলো। মন ভালো থাকলে ও আমার হাতের তালুতে আঙুল দিয়ে কী যেন লিখতো। জিজ্ঞেস করলে বলতো না। শুধু বলতো, তুই পাশ করে বের হ, সেদিন বলবো। আমি হাত মুঠো করে রাখতাম, যেন লেখাটা পড়ে না যায়।
সেমিস্টার ফাইনালের আগের সপ্তাহে ঘটনাটা ঘটলো। তিন রাত ঘুমাইনি। দুইটা ব্যাকলগ, ক্লায়েন্টের ডেডলাইন। আদনান বললো, ওর বাসায় গ্রুপ স্টাডি হবে। গিয়ে দেখি স্টাডি না। টেবিলের ওপর সিগারেটের ফয়েল, একটা লাইটার আর ছোট্ট একটা গোলাপি দানা। আদনান হাসলো। বললো, টেনশন নিস না মামা। এইটা খেলে এক রাতে পুরা সিলেবাস শেষ। সবাই খায়। আর্মির পোলাপান খায়, বিসিএস ক্যাডাররাও খায়।
আমি না করেছিলাম। সত্যি বলছি, প্রথমে না করেছিলাম। তারপর ভোর চারটায়, যখন চোখ জ্বলছে আর সিলেবাসের অর্ধেক বাকি, আদনান ফয়েলটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো। বললো, একবার। জাস্ট একবার।
পৃথিবীর সব সর্বনাশ এই শব্দটা দিয়ে শুরু হয়। একবার।
প্রথম টানটার কথা আমি কবরে গিয়েও ভুলবো না। পোড়া মিষ্টি একটা ধোঁয়া গলা দিয়ে নামলো। আর দশ সেকেন্ডের মাথায় মনে হলো মাথার ভেতরের উনিশটা ট্যাব একসাথে বন্ধ হয়ে গেলো। প্রথমবারের মতো, জীবনে প্রথমবারের মতো, সব শান্ত। ক্লান্তি নেই, ভয় নেই, খিদা নেই, ঘুম নেই। শুধু বিদ্যুতের মতো একটা শিহরণ শিরদাঁড়া বেয়ে উঠছে আর নামছে। মনে হলো আমি চাইলে আজ রাতে গোটা সিলেবাস না, গোটা পৃথিবী মুখস্থ করে ফেলতে পারবো। মনে হলো আমার মতো সুখী কেউ কোনোদিন জন্মায়নি। এই যে ফিলিংটা, এইটাই ফাঁদ। স্বর্গ দেখিয়ে ও আপনার নাম, ঠিকানা লিখে নেয়।
সেই রাতে আমি সত্যিই পুরো সিলেবাস শেষ করেছিলাম। পরীক্ষাও ভালো হলো। কিন্তু স্বর্গের ভাড়া আছে। দুইদিন পর নামলো ক্র্যাশ। মনে হলো কেউ আমার শরীর থেকে ব্যাটারিটা খুলে নিয়ে গেছে। টানা ষোলো ঘণ্টা ঘুমালাম। ঘুম ভেঙে দেখি পৃথিবীর রংটাই বদলে গেছে। সব ধূসর। সব বিস্বাদ। সবাই বিরক্তিকর। আর মাথার ভেতর মশার মতো একটা সূক্ষ্ম চিন্তা ঘুরছে। আরেকটা হলেই সব ঠিক হয়ে যায়। ব্রেইনের ভেতর হিসাবটা এভাবেই বসে গেলো। প্রেশার মানেই গোলাপি দানা। প্রথম মাসে সপ্তাহে একটা। পরের মাসে দুইটা। তিন মাসের মাথায় দিনে একটা লাগে। না হলে হাত কাঁপে। মেজাজ সপ্তমে চড়ে। মনে হয় খুলি খুলে ব্রেইনটা চুলকাই।

তারপর টাকার খেলা শুরু। একেকটা দানার দাম তিনশো টাকা। ফাইভারের ইনকাম গেলো। টিউশনের বেতন গেলো। সেমিস্টার ফির সত্তর হাজার টাকা বাবার কাছ থেকে নিয়ে ভার্সিটিতে জমা দিলাম না। বাসায় একটার পর একটা মিথ্যা। ল্যাব ফি লাগবে। প্রজেক্টের জন্য হার্ডডিস্ক লাগবে। বন্ধু বিপদে পড়ছে। নেশাখোরের প্রতিভা জানেন? মিথ্যা বলার সময় আমাদের গলা কাঁপে না। কাঁপে শুধু হাত, দানাটা ফয়েলে বসানোর সময়।
আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতাম না। ছয় মাসে ওজন কমলো তেরো কেজি। গালে দুইটা গর্ত। মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে। দুইটা দাঁত নড়ে ওঠে প্রায়ই। রাতে ঘুম নেই, দিনে মরার মতো পড়ে থাকি। আর মাথার ভেতর ফিসফিসানি। মনে হতো দেয়ালের ওপাশে কেউ আমার নামে কথা বলছে। মনে হতো মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে কেউ দেখছে। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম মেথ সাইকোসিস। আমার ভাষায়, দোজখের ট্রেইলার।
অথৈর কথা বলি। যেটা বলতে আমার সবচেয়ে কষ্ট হয়।
নেশার প্রথম দিকে ইয়াবা শরীরটাকে জানোয়ার বানিয়ে দেয়। ভেতরে একটা খিদা জাগে। যেটা প্রেম না, ক্ষুধা। একদিন হাই অবস্থায় অথৈকে এমন আক্রোশে কাছে টেনেছিলাম যে ওর হাতের চুড়ি ভেঙে হাত কেটে গেলো। ও ছিটকে সরে গিয়ে যেভাবে আমার দিকে তাকালো, ওই দৃষ্টিটা আমি এখনো স্বপ্নে দেখি। ভয়। আমার অথৈ আমাকে ভয় পাচ্ছে। ও কাঁপা গলায় বলেছিলো, তুই আমাকে দেখছিস না রাফি। তুই আমার শরীর দিয়ে অন্যকিছু খাচ্ছিস।
ও ঠিক বলেছিলো। আর সবচেয়ে নোংরা সত্যিটা কী জানেন? কিছুদিন পর ওই ক্ষুধাটাও মরে গেলো। ইয়াবা প্রথমে শরীর জাগায়। তারপর শরীরটাই মেরে ফেলে। শেষদিকে অথৈ পাশে বসলে আমার কিছুই হতো না। কিচ্ছু না। একটা চব্বিশ বছরের ছেলের ভেতরে ভালোবাসার মানুষ ছুঁয়ে দিলে যদি কিছু না জাগে, তার চেয়ে নির্মম প্রহসন আর নেই। আমার সব অনুভূতির একটাই দরজা তখন। গোলাপি।
অথৈ তাও ছাড়েনি। ও আমার নেশার কথা জানতো। বাসায় জানায়নি। নিজের টিউশনির টাকায় আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেছে। ওষুধ কিনে দিছে। শেষবার ও আমার হাত ধরে বলেছিলো, রাফি, আমি তোর নেশার সাথে আর পারতেছি না। হয় ওইটা, নয় আমি। এক মাস টাইম। আমি কসম কেটেছিলাম। সতেরো দিনের মাথায় ও আদনানের ফ্ল্যাটে এসে আমাকে পেলো ফয়েল হাতে।
ও চিৎকার করলে বাঁচতাম। থাপ্পড় মারলে বাঁচতাম। ও কিছুই করলো না। দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলো। তারপর খুব আস্তে বললো, ভালো থাকিস। ব্যস। ভালোবাসা যখন মরে যায়, কোনো চিৎকার চেঁচামেচি হয় না জানেন। কেবল নিঃশব্দে একটা দরজা বন্ধ হয়ে যায়। যাওয়ার সময় ও একবারও আমার হাতের দিকে তাকালো না। হাতের তালুর ওই লেখাটা আমার আর জানা হলো না। কোনোদিন হবেও না।
এরপরের অধ্যায়গুলো দ্রুত বলি। কারণ নেশার গল্পের মাঝের পার্টটুকু সব দেশে, সব ঘরে একই। টাকার জন্য মায়ের কানের দুল বেচলাম। তিন্নির ল্যাপটপের জমানো টাকা সরালাম। ভার্সিটি থেকে নাম কাটা গেলো। আর টাকা যখন কোথাও নেই, তখন শাকিল ভাই হাত বাড়ালো। এলাকার বড় ভাই। বললো, মামা, মাল টানবি টাকা লাগবো না। খালি দুই এক জায়গায় পৌঁছায় দিবি।
আমি ক্যারিয়ার হয়ে গেলাম। মিরপুর থেকে ফার্মগেট। পুরিয়া পৌঁছে দেই। বিনিময়ে আমার ভাগ। শাকিল ভাই নিজে জীবনে একটা দানাও মুখে দেয়নি। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই আপনি খান না? সে হেসে বলেছিলো, পাগল নাকি। মাল হইলো কাস্টমারের লেইগা। বেপারীর লেইগা না। ওই হাসিটা মনে পড়লে আমার এখনো খুন করতে ইচ্ছা করে। আমাদের মতো ছেলেদের জ্যান্ত সমাধি বানিয়ে ওরা প্রাসাদ তোলে।
ধরা খেলাম এক বৃহস্পতিবার রাতে, টেকনিক্যাল মোড়ের চেকপোস্টে। পকেটে বাইশটা দানা। থানায় যা হলো সেটা লিখতে হাত কাঁপছে। ওসির রুমের পাশের ঘরে নিয়ে দুইজন কনস্টেবল লাঠি দিয়ে পায়ের তালুতে মারলো। মুখে যা আসে তাই বলে গালি দিলো। খানকির পোলা, তোর বাপেরে ডাক। ভোরবেলা বাবা সত্যিই এলেন। শিক্ষক মানুষ। সারাজীবন কলার উঁচু করে হেঁটেছেন। ছেলের হাতে হাতকড়া দেখে উনি দারোগার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমার সব সহ্য হয়, বাবার ওই জোড়হাত সহ্য হয় না।
মাদক আইনে মামলা হলো। তেইশ দিন কেরানীগঞ্জ কারাগারে ছিলাম। জানতে চান জেলখানা কেমন? মেঝেতে ঘুমানো একশো লোকের ওয়ার্ডে সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিসটার নাম কী শুনবেন? বাবা। জ্বি। যে জিনিসের জন্য জেলে ঢুকলাম, জেলের ভেতর সে দ্বিগুণ দামে হাজির। এই দেশে চেইনটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, ওই তেইশ দিনে আমি বুঝে গেছি। আর বুঝেছি বলেই বলি, ঘৃণা করলে আমাকে কইরেন না। ঘৃণা করেন ওদের, যারা চালানটা ঢোকায়। যারা মাসোহারা খেয়ে চোখ বোজে। যারা স্কুলগেটে বাচ্চাদের হাতে ফ্রি স্যাম্পল ধরায়া দেয়।
বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে উকিল ধরলেন। জামিন হলো। তারপর আমাকে পাঠানো হলো রিহ্যাবে। সাভারের দিকে একটা প্রাইভেট নিরাময় কেন্দ্র। মাসে পঁচিশ হাজার। ভর্তির দিন মোবাইল কেড়ে নিলো। মাথা ন্যাড়া করলো, বেল্ট খুলে নিলো। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম, এইটা হাসপাতাল না, খোঁয়াড়। চল্লিশজন ছেলে দুইটা ঘরে। ভোর পাঁচটায় ঠান্ডা পানিতে গোসল। খাবারে মাছি মরে লেপ্টে থাকে। উইথড্রয়ালের যন্ত্রণায় কেউ চিৎকার করলে ট্রিটমেন্ট একটাই, পিভিসি পাইপ। ওরা এটাকে বলতো মোটিভেশন। যে স্টাফরা মোটিভেশন দিতো, তারা নিজেরাই এক্স অ্যাডিক্ট। ডাক্তার সাইকোলজিস্ট কিছুই না। সাইনবোর্ডে লেখা ছিলো, ভালোবাসাই মাদকমুক্তির পথ। পাইপের বাড়ি পিঠে পড়লে ওই সাইনবোর্ডটা পড়তাম আর হাসতাম। এক রাতে পাশের ওয়ার্ডের একটা ছেলে পালাতে গিয়ে ধরা পড়লো। ওকে যেভাবে মারা হলো, পরদিন অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয়েছিলো। খবরে মাঝে মাঝে দেখেন না, রিহ্যাবে রোগীর মৃত্যু? বিশ্বাস করেন, ওগুলা দুর্ঘটনা না।
মাসে একদিন ফ্যামিলি ডে ছিলো। মা আসতেন। গ্রিলের এপাশ থেকে আমার ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর কাঁদতেন। যাওয়ার সময় স্টাফদের হাতে পাঁচশো টাকা গুঁজে দিয়ে বলতেন, আমার ছেলেটারে একটু দেইখেন ভাই। ওরা টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে রাতে আমাকে পাইপ দিয়ে পেটাতো। আর সপ্তাহে একদিন হতো কাউন্সেলিং। চল্লিশজনকে এক ঘরে বসিয়ে প্রজেক্টরে একটা মোটিভেশনাল ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হতো। এই দেশে মাদকের চিকিৎসার বাজেট এইটুকুই।
ওই খোঁয়াড়ে আমি সেন্টু ভাইকে পেয়েছিলাম। বয়স তেতাল্লিশ। নয় নম্বর বারের মতো রিহ্যাবে। একসময় ব্যাংকে চাকরি করতো। গুলশানে পোস্টিং ছিলো। ইয়াবা তার চাকরি খেয়েছে, ফ্ল্যাট খেয়েছে। সবশেষে বউ আর সইতে না পেরে ছেলেকে নিয়ে চলে গেছে অস্ট্রেলিয়া। বালিশের নিচে ছেলের একটা ছবি রাখতো। পাঁচ বছরের বাচ্চা। এখন সতেরো। সেন্টু ভাই রাতে ছবিটার সাথে কথা বলতো। আমাকে একদিন বললো, বুঝলি রাফি, রিহ্যাব নেশা ছাড়ায় না। নেশাটারে খালি পজ করায়। প্লে বাটনটা থাকে গেটের ঠিক ওপাশে, রাস্তায়। আমি নয়বার প্রমাণ পাইছি।
সেন্টু ভাইয়ের অষ্টমবারের গল্প শুনে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম। সেবার বের হয়ে সে এগারো মাস ক্লিন ছিলো। একটা কুরিয়ার কোম্পানিতে চাকরিও জুটিয়েছিলো। সপ্তাহে একদিন ছেলের সাথে ভিডিও কল হতো। তারপর এক ঈদের সকালে, ফাঁকা ঢাকায়, ফাঁকা মেসে, একলা ঘরে বসে তার মনে হলো, এতগুলা দিন ভালো থাকলাম, আজ একটু সেলিব্রেট করলে কী হয়। এগারো মাসের সাধনা ভাঙতে এগারো মিনিট লাগেনি। সেন্টু ভাই বলতো, নেশা হইলো কুমিরের মতো রে রাফি। সে তোরে তাড়া করবো না। ঘাটে চুপ কইরা বইসা থাকবো। সে জানে, তোর তেষ্টা একদিন পাইবোই।
চার মাস পর বের হলাম। ওজন বাড়লো, চোখের নিচের গর্ত ভরলো। বাসায় ফিরে তিন মাস সত্যিই ক্লিন ছিলাম। তারপর এক বিকেলে ফেসবুক খুলে দেখি অথৈর বিয়ে। গায়ে হলুদের ছবি। হলুদ শাড়িতে ও হাসছে, যে হাসিটা একসময় আমার জন্য বরাদ্দ ছিলো। ক্যাপশনে লেখা, অ্যান্ড সো দ্য নিউ চ্যাপ্টার বিগিনস। ওই রাতেই আমি শাকিল ভাইয়ের নম্বরে কল দিলাম। সেন্টু ভাই ঠিক বলেছিলো। প্লে বাটনটা রাস্তায়ই ছিলো।
এরপর যে কাজটা করলাম, তার কোনো ক্ষমা হয় না। কোনো অজুহাতও হয় না। টাকার জন্য ঘরে হাত দিলাম আবার। মায়ের শেষ সম্বল, নানির দেওয়া বালা জোড়া। মা হাতেনাতে ধরলেন।
চিৎকার করলেন না। শুধু বালাটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, নে বাবা, বেইচা খা। তাও চুরি করিস না। বাবা সেই রাতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আশ্চর্যরকম শান্ত গলায় বললেন, আজ থেকে তুই আমার কাছে মরা। এই বাড়িতে তোর জায়গা নাই। তিন্নি দরজার আড়াল থেকে দেখছিলো। আমার লক্ষ্মী বোনটা। যে ছোটবেলায় আমার প্লেট থেকে ভাত খেতো, সে আর আমার চোখের দিকে তাকায় না।
এখন আমি একটা মেসে থাকি। শাকিল ভাই এখন আর মহল্লায় দাঁড়ায় না। কালো একটা গাড়িতে ঘোরে। কাউন্সিলরের প্রোগ্রামে মালা পরে। তার পুরোনো কাস্টমারদের মধ্যে দুইজন গত বছর মরে গেছে। একজন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। আরেকজন আদনান। হ্যাঁ, সেই আদনান, যে আমাকে প্রথম ফয়েলটা এগিয়ে দিয়েছিলো। চব্বিশ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে হার্ট বন্ধ হয়ে গেলো। ডাক্তার বললো, মেথ বহুদিন ধরে হার্টটাকে খেয়ে ফেলছিলো। ওর জানাজায় লোক হয়েছিলো এগারোজন। ফেসবুকে তিন দিন শোক। তারপর সবাই ভুলে গেছে। আমাদের জেনারেশন মরলে নিউজফিডে একটা রেস্ট ইন পিস হয়। এই যা!
মা এখনো লুকিয়ে দেখা করেন। মাসে এক দুইবার, বাসার নিচের গলিতে। বাটিতে করে ভাত তরকারি নিয়ে আসেন। কিছু বলেন না, শুধু খাওয়া দেখেন। পৃথিবীর সবাই নেশাখোরকে ত্যাগ করতে পারে। মা পারে না। মায়েদের ওই ক্ষমতাটাই নাই।
আজ আমার ক্লিন থাকার চার মাস তেরো দিন চলছে। রিকভারি মিটিংয়ে যাই। দিন গুনি। ডায়েরি লিখি। ডাক্তার বলছে সম্ভব, অনেকেই ফিরে আসে। আমি বিশ্বাস করার চেষ্টা করি। কিন্তু আপনাদের একটা সত্যি কথা বলি, যেটা কোনো ডাক্তারের সামনে বলিনি।
আমার পকেটে একটা গোলাপি ট্যাবলেট আছে। বহুদিন ধরে। খাইনি, ছুঁইওনি। শুধু রাখি। রাতে যখন হাড়ের ভেতরটা চিনচিন করে, হাত দিয়ে পকেটের ওপর থেকে ওকে অনুভব করি। কী করবো বলেন। মানুষের তো বাবার কাছেই ফিরতে ইচ্ছা করে। আমার এক বাবা আমাকে মৃত ঘোষণা করেছে। আরেক বাবা প্রতি রাতে ফিসফিস করে ডাকে।
আপনারা দোয়া কইরেন, আমি যেন প্রথমজনের কাছে ফিরতে পারি।