বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

খুঁত ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

 বিয়ের আগের রাতে পুরোনো অ্যালবামটা খুঁজতে আপুর আলমারি খুলেছিলাম। অ্যালবামের আগে হাতে উঠলো শাড়িটা। আম্মার কিনে দেওয়া কাতান, প্যাকেটের ভেতর তখনো দোকানের ভাঁজে রাখা। সাথের ব্লাউজ পিসটায় কাঁচি পড়েনি।

কাল আমার বিয়ে। আজ রাতে দুনিয়ার কোনো দর্জি কারও ব্লাউজ বানিয়ে দেবে না। হিসাবটা যেকোনো মেয়ে এক পলকে বুঝবে। আপু আমার বিয়েতে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেইনি।
অথচ এই বিয়ের সবকিছু আপুর হাতে গড়া। তারিখ ঠিক হওয়ার পর থেকে ও রাত জেগে এই আয়োজনের কাজ করেছে। কমিউনিটি সেন্টার ঠিক করা থেকে শুরু করে মেনুতে বোরহানি থাকবে কি না, স্টেজে কোন ফুল বসবে, সব ওর ডায়েরিতে লেখা। কে কোন গাড়িতে যাবে, সেই তালিকাও ওর করা। তালিকাটা আমি দেখেছিলাম। খেয়াল করিনি, কোনো গাড়িতেই আপুর নাম নেই।
শাড়িটা আম্মা কিনেছিলেন লুকিয়ে, মিরপুরের বেনারসি পল্লী থেকে। কারণ সেদিন আপু নিজের জন্য কিছুই কেনেনি।
কেনাকাটার দিন আমাদের পুরো দলটা দোকানে দোকানে ঘুরলো। দোকানিরা একটার পর একটা শাড়ি মেলে ধরছিলো। আপু আঙুলে জরির কাজ ছুঁয়ে বলে দিচ্ছিলো কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল। সবার শাড়ি ও-ই বাছলো। আমার বিয়ের লাল কাতানটা আমার কাঁধে ফেলে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে দেখলো, তারপর মুগ্ধ গলায় বললো, এইটাই! আপুর চোখ কখনো ভুল করে না।
কিন্তু দোকানদার যেই ওর দিকে একটা শাড়ি মেলে ধরলো, আপু হাত নেড়ে বললো, আমার তো আছে। খালা পাশ থেকে ফোড়ন কাটলেন, তোর তো সবই কালো, নিশি। কালো পরলে মোটা কম লাগে, না রে?
দোকানটার চারদিকে আয়না। খেয়াল করলাম, আপু এমনভাবে সরে সরে দাঁড়াচ্ছে যেন কোনো আয়নায় ওর মুখ না পড়ে। যে চোখ সবার জন্য ঠিক শাড়িটা এক নজরে চিনে নেয়, সেই চোখ নিজের দিকে আর তাকায় না।
আম্মা আপুর পিঠে আলতো করে হাত রেখে বললেন, মন খারাপ করিস না, মা। তোর জন্যও আল্লাহ কাউরে রাখছে। আপু হাসলো, যেভাবে মানুষ ভুল ঠিকানায় আসা চিঠি ফেরত দেয়।
পাত্রপক্ষ আসা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। শেষের দিকে ওরা ছবি দেখেই খবর পাঠাতো, কিছু মনে করবেন না, মেয়ে একটু বেশি স্বাস্থ্যবতী। আম্মা ধরে নিয়েছিলেন, আপুর সব কষ্ট ওখানেই। আমিও তাই ধরে নিয়েছিলাম। ধরে নেওয়াটা সহজ ছিলো।
অ্যালবামটা পেলাম আলমারির নিচের তাকে। বান্ধবীরা বিয়ের দিনের জন্য একটা ভিডিও বানাচ্ছে, ওদের দুই বোনের ছবি চাই। মেঝেতে বসে পাতা ওল্টাতে লাগলাম।
প্রথম দিকের ছবিগুলোতে আপু সবার সামনে। কোমর ছোঁয়া চুল, হাসলে গালে টোল পড়ে। কোনোটায় কলেজের অনুষ্ঠানে স্টেজে দাঁড়িয়ে গান গাইছে, কোনোটায় আম্মার সেলাই মেশিনে ঝুঁকে আছে। কলেজে পড়ার সময় আপু নিজের ব্লাউজ নিজেই বানাতো। দেখে কেউ বিশ্বাস করতো না যে ওগুলো দর্জির হাতের না।
একটা ছবিতে আপু আমার ছোট্ট হাতে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। ঈদের আগের রাতে ও বলতো, তোর বিয়েতে এমন মেহেদি দিবো, জামাই সারারাত খুঁজেও নিজের নাম পাবে না! অথচ কাল হলুদে আমার হাতে মেহেদি দিলো পার্লারের একটা মেয়ে। আপু সারাটা সন্ধ্যা রান্নাঘরে ডেকচির পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। স্টেজে একবারও উঠলো না।
অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আপু ক্রমশ সরে যেতে লাগলো। প্রথমে ও সরে গেলো ছবির কিনারে, ওড়নাটা পেটের ওপর টেনে দেওয়া। তারপর চলে গেলো কারও কাঁধের আড়ালে। একটা ছবিতে ওর শুধু একটা হাত দেখা যায়। তারপর আর কোথাও নেই।
ফোনের গ্যালারিতেও একই অবস্থা। ঈদ, জন্মদিন, আমার এনগেজমেন্ট, কোনোকিছুর ছবিই বাদ নেই। শুধু আপু নেই। কারণ গত কয়েক বছরের সবগুলো ছবি আপুরই তোলা। ভিডিওগুলোতে আপুকে দেখা যায় না, শুধু ওর গলা শোনা যায়, আরেকটু বাঁয়ে সর, টুনি! হাসি থামাবি না! ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। আমার বিয়ের পুরো আয়োজনটা যে মানুষটা সামলাচ্ছে, সে-ই আমার এখনকার জীবনের কোনো ছবিতে নেই।
অথচ সবকিছু ঘটেছে আমার চোখের সামনেই। কলেজ পেরোনোর কিছুদিন পর থেকে আপুর শরীরটা যেন অন্য কারও হয়ে যেতে লাগলো। আত্মীয়রা গায়ে পড়ে উপদেশ দিতো। প্রত্যেকের কাছে ছিলো ওজন কমানোর একটা করে টোটকা। আপু সবগুলো চেষ্টা করলো। ভাত ছাড়লো, চিনি ছাড়লো, খালি পেটে লেবু, মধু আর মেথি ভেজানো পানি খেলো। ছাদে হাঁটলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ডাক্তারও বদলালো বারবার। কেউ কেউ বলতেন, ওজন কমান, সব ঠিক হয়ে যাবে। যেন কথাটা আপু আগে কখনো শোনেনি! ওষুধের খালি পাতায় ড্রয়ার ভরে গেলো। আপু সব ছাড়লো, শুধু খাঁটি ভালোবাসার মতো ওজনটা ওকে ছাড়লো না।
গোসলখানার ঝাঁঝরিতে দলা পাকানো চুল জমতো। আপুর সিঁথিটা একটু একটু করে চওড়া হচ্ছিলো। ঘাড়ে একটা কালচে দাগ পড়লো। আম্মা ভাবলেন ময়লা। লেবু আর সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ঘাড় লাল করে ফেলতেন, দাগ তবু যেতো না।
একদিন ভুল করে বাথরুমের দরজা খুলে ফেলেছিলাম। আপু চিমটা দিয়ে থুতনির লোম তুলছিলো। আমাকে দেখে এমনভাবে আয়না থেকে মুখ ফেরালো, যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
রাতে ওর ঘুম আসতো না। এলেও দম আটকে ধড়ফড় করে উঠে বসতো।
শেষ যে দাওয়াতে আপু গিয়েছিলো, সেটা ফুপাতো বোনের বিয়ে। কনভেনশন হলের গেট দিয়ে ঢুকতেই এক চাচি গলা চড়িয়ে বললেন, ওমা, নিশি নাকি! তোরে তো চেনাই যায় না! আশেপাশের সবাই ঘুরে তাকালো। আপু সেদিন কিছু না খেয়েই ফিরে এসেছিলো। তারপর আর কোনো দাওয়াতে যায়নি।
স্কুলের বান্ধবীরা রিইউনিয়নের ছবি দিয়ে ক্যাপশনে লিখতো, মিস ইউ নিশি। আপু গ্রুপটা মিউট করে রাখলো। অফিস থেকে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে যেতো, রাতের খাবারও প্লেটে করে নিয়ে যেতো ঘরে। শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলো।
শেষবার দর্জির দোকানে গিয়েছিলো গত ঈদে। দর্জি গলায় ফিতা ঝুলিয়ে জোরে জোরে মাপ বলছিলো। সে মুহূর্তে পাশে বসা মহিলারা হাসছিলো মুখ টিপে। তারপর আপু আর কোনো নতুন জামা বানায়নি। তার কিছুদিন পর দেখলাম, ওর ঘরের আয়নাটা একটা পুরোনো ওড়নায় ঢাকা।
অ্যালবামটা বুকে চেপে আপুর ঘরে গেলাম। ঘরের বাতি নেভানো ছিলো। আপু খাটে বসে ফোন দেখছিলো, মুখে ফোনের নীলচে আলো। রুমের এক কোণায় ওড়না ঢাকা আয়নাটা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো অন্ধকারে ঘোমটা দেওয়া একজন মানুষের মতো।
নরম গলায় বললাম, তোমার ব্লাউজ পিস কাটা হয়নি।
আপু ফোন থেকে চোখ সরালো না। কণ্ঠে কৃত্রিম অনাগ্রহ ফুটিয়ে বললো, বিয়ের দিন বাসা খালি রাখা যায় না। কাউকে তো থাকতে হবে।
আমার গলা কেঁপে গেলো। সবার ছবি তুমি তোলো, হলুদে সবার খাবার তুমি বাড়ো, এখন বাসা পাহারাও তুমি দেবে?
আপু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। অভ্যাসমতো একটা হাত উঠে গেলো ঘাড়ের দাগটার ওপর। তারপর খুব আস্তে বললো, তোর বিয়ের ছবি সারাজীবন থাকবে, টুনি। আমি চাই না বহু বছর পর কেউ অ্যালবাম খুলে জিজ্ঞেস করুক, পাশের মোটা মহিলাটা কে?
এসব তোমার দোষ না, আপু। এটা তো অসুখ।
জানি। ডাক্তারও খটোমটো নাম শুনিয়েছে, পিসিওএস। কিন্তু লোকে তো রিপোর্ট দেখে না রে, শরীর দেখে। রাস্তায় অচেনা মহিলা জিজ্ঞেস করে, কয় মাস চলছে? অথচ ডাক্তার বলেছে, বাচ্চা হতেও ঝামেলা হতে পারে। যে শরীরে বাচ্চা আসবে কি না ঠিক নেই, লোকে সেই শরীর দেখে বাচ্চার খবর নেয়।
আপু ফোনটা বালিশের পাশে উপুড় করে রাখলো। ক্লান্ত গলায় বললো, রোজ সকালে নিজের শরীরের সাথে একটা যুদ্ধ হয় রে। রোজ আমি হারি। হারার পর কেউ স্টেজে উঠে দাঁড়ায়, বল? প্রথমে ভাবতাম, একটু শুকালেই আবার সবার সামনে যাবো। শুধু এই দাওয়াতটা বাদ দিই, শুধু এই ছবিটা। ওজন কমলো না। কিন্তু বাদ দেওয়াটা অভ্যাস হয়ে গেলো। বাদ দিতে দিতে একদিন দেখি, নিজেকেই বাদ দিয়ে ফেলেছি। আম্মা ভাবে আমার কষ্ট বিয়ে নিয়ে। বিয়ে তো অনেক পরের কথা রে। আমি তো নিজের সাথেই থাকতে পারি না।
আমি অ্যালবামটা আরও শক্ত করে বুকে চেপে ধরলাম।


অথচ এই কষ্টে আমাদের হাতও কম নেই। আমার এনগেজমেন্টের দিন ফোনটা আমি নিজেই ওর হাতে দিয়ে বলেছিলাম, তুমি তোলো, তোমার ছবি তোলার হাত ভালো। আপু হেসে ফোনটা নিয়েছিলো। আমরা সবাই মিলে ওকে ক্যামেরার পেছনে দাঁড় করিয়েছি, তারপর ভুলে গেছি যে ও ছবিতে নেই।
আমি মেঝেতে বসে ছোটবেলার মতো আপুর হাঁটুতে মাথা রাখলাম। আপুর আঙুলগুলো আলগোছে আমার চুলে নামলো। ফিসফিস করে বললো, কাল তোকে খুব সুন্দর লাগবে, টুনি।
শাড়িটা ওর কোলের ওপর রেখে বললাম, জোর করবো না, আপু। শুধু একটা কথা বলি। তুমি না থাকলে আমার বিয়ের ছবিগুলো হয়তো সুন্দর হবে। কিন্তু সত্যি হবে না।
আপু কিছু বললো না। শুধু শাড়ির জরির পাড়ে একবার আঙুল বোলালো। আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম।
বিয়ের আগের রাতে কোনো মেয়ের ঘুম আসে না। আমারও এলো না। অনেক রাতে আপুর দরজা খোলার শব্দ পেলাম। কেউ পা টিপে টিপে স্টোররুমের দিকে গেলো। পুরোনো কপাটটা ক্যাঁচ করে উঠলো।
ফজরের আজানের একটু আগে পাশের ঘর থেকে শব্দটা ভেসে এলো। আম্মার পুরোনো সেলাই মেশিনটা চলছে। আমি উঠে দেখতে গেলাম না।
মেশিনটা মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিলো। তারপর আবার চলছিলো।
খুঁত
তাইমুর মাহমুদ শমীক
২৯/৯/২০২৬

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিজেপির হয়ে প্রমোশন ভিডিও ~ সুমনা চৌধূরী

সমস্যাটা আসলে কী?

সমস্যা এটা নয় যে প্রমোশন করা হয়েছে। যে কোনো মানুষ তার পছন্দের রাজনৈতিক দলের প্রমোশন করতে পারেন। পক্ষে-বিপক্ষে বলতে পারেন। এটা তার সংবিধানপ্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার। পয়সা নিয়ে অথবা না নিয়ে--- দুইভাবেই করতে পারেন। 

সমস্যাটা হলো টাকা নিয়ে তৈরি রাজনৈতিক কনটেন্টকে দর্শক বা ফলোয়ারদের কাছে স্বাধীন, নিরপেক্ষ বা ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো : 

প্রথমত, যে ভিডিওগুলো করা হয়েছিল এবং এখন যখন জানা যাচ্ছে সেগুলো লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে করা হয়েছিল, সেই ভিডিওগুলোতে পেইড প্রমোশন বা কোলাবরেশনের ডিসক্লেমার দেওয়া ছিল কীনা? 

দুঃখের বিষয় কনটেন্ট ক্রিয়েটররা টাকার বিনিময়ে যে ভিডিওগুলো তৈরী করেছিলেন সেগুলোতে এরকম কোনো ডিসক্লেইমার-ই ছিল না। এগুলো স্বাধীন মতামত হিসেবে-ই পোস্ট করা হয়েছিল। 

এবারে টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক ভিডিও বা কনটেন্ট করার নিয়ম হলো ভিডিওতে ---- Uploaded Image

১. টাকা নেওয়ার কথা গোপন করা যাবে না। কোনো স্বাধীন ক্রিয়েটর যে কোনো রাজনৈতিক দলের থেকে টাকা নিয়ে কনটেন্ট তৈরী করলে বিজ্ঞাপন হিসেবে, তাতে ডিসক্লোজার থাকা বাধ্যতামূলক। 

২. মেটা-র এ সংক্রান্ত পলিসি হলো ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম-এ যথাযথ পেইড পার্টনারশিপ / পেইড-কনটেন্ট ডিসক্লোজার দিতে হবে। মেটাতে সেই ডিসক্লোজারের ব্যবস্থাও রয়েছে।  
কোনও ক্রিয়েটর যদি রাজনৈতিক দলের হয়ে পেইড ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে কনটেন্ট তৈরি করে থাকেন, তাহলে সেই কনটেন্ট কীভাবে মেটা প্ল্যাটফর্মে ক্লাসিফাইড ও ডিসক্লোজ হয়েছিল সেটিও দেখা দরকার। 

৩. ASCI বলছে --- টাকা, উপহার বা অন্য সুবিধার বিনিময়ে কনটেন্ট তৈরি হলে সেটি ASCI-র এডভার্টাইজিং / কমার্শিয়াল কমিউনিকেশনের আওতায় পড়ে এবং ক্রিয়েটরকে স্পষ্টভাবে জানাতে হয় যে এটি পেইড বা স্পনসর্ড কনটেন্ট। শুধু নিজের মতামত বলে উপস্থাপন করলেই ডিসক্লোজার-এর প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। এবং ডিসক্লোজারটি এমনভাবে দিতে হয় যাতে দর্শকের চোখ এড়িয়ে না যায়। স্পষ্ট করে এটাও বলা আছে, শুধু ক্যাপশনের একেবারে শেষে বা হ্যাশট্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রাখাও যথেষ্ট নয়।

৪. ECI/MCMC-এর নিয়ম বলছে --- কোনও কনটেন্ট যদি আসলে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন হয়, তাহলে সোশাল মিডিয়াও ইলেকট্রনিক মিডিয়া হিসেবে ধরা হয়। ইলেকশন কমিশন ২০ মার্চ ২০২৬-এ একটি নির্দেশনায় বলেছে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে MCMC-এর প্রি-সার্টিফিকেশনের প্রয়োজন।  

যে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এখন নিজেদের জাস্টিফাই করছেন এই বলে যে তারা বিজ্ঞাপন করেছেন এবং বেশ করেছেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে বিজ্ঞাপন করা তাদের কাজ, তাদের কাছে মূল প্রশ্ন থাকে যে ----

ক. কোন ভিডিও/পোস্টের জন্য টাকা নিয়েছেন?

খ. সেই ভিডিও বা পোস্টে পেইড/স্পনসর্ড ডিসক্লোজার ছিল কীনা? 

গ. সেই ভিডিওগুলোর MCPC-এর প্রি-সার্টিফিকেশন ছিল কীনা? 

ঘ. এবং পেইড রাজনৈতিক ভিডিওগুলোর কনটেন্টে RPA/MCC/ECI এর গাইডলাইন মানা হয়েছিল কীনা? কেননা ভিডিওগুলো নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পরে করা হচ্ছে। এবং তা পেইড বিজ্ঞাপন। ভোটের আগের ৪৮ ঘণ্টার নিয়মও আছে এবং সোশাল মিডিয়াও ইলেকশন কমিশনের 'ইলেকশন রিলেটেড ইলেকট্রনিক মিডিয়া ফ্রেমওয়ার্কে'র মধ্যে রয়েছে।

যদি তা না হয়, তবে 'বেশ করেছি টাকা নিয়ে বিজ্ঞাপন করেছি' যুক্তি মানায় না। কেননা আপনারা বেশ করেননি। আপনারা রাজনৈতিক দলের থেকে টাকা নিয়ে বানানো কনটেন্টকে আপনাদের স্বাধীন মতামত দেখিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করছেন। পেইড প্রমোশনের যে ডিসক্লেমার দেওয়ার বেসিক নিয়ম, সেটা ভায়োলেট করেছেন। কোনো রাজনৈতিক ভিডিওতে একবারও উচ্চারণ করেননি যে আপনারা পেইড প্রমোশন করছেন। বরং স্বাধীন মতামত এবং প্রতিবাদীর অভিনয় করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে নিজেদের পকেট ভরেছেন। এবারে গুটকা বা নেলপলিশের বিজ্ঞাপন আর পলিটিক্যাল ক্যাম্পেইনের পার্থক্য আছে। আর এই পার্থক্য ভারতীয় আইন সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। 

তাই কনটেন্ট ক্রিয়েটর যারা টাকা নিয়ে রাজনৈতিক দলের হয়ে পেইড প্রমোশন করেছেন কোনো ডিসক্লোজার ছাড়া অথবা স্বাধীন মতামত হিসেবে, তারা যে শুধু তাদের ফলোয়ারদের দিনদুপুরে ঠকিয়েছেন--- বিষয়টা তার বাইরেও আরো বড়ো কিছু। 

দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, যা নিয়ে আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিত, তা হলো কনটেন্ট। যদি অলিপাবের ঘটনা পেইড হয়ে থাকে (কেননা ওই ক্রিয়েটর এখনো সঠিকভাবে দেখাতে পারেন নি ঠিক কোন কোন ভিডিওগুলোর জন্য তিনি আড়াই লক্ষ টাকা পেয়েছেন) তাহলে এটাতে সমস্ত মানুষের কনসার্নড হওয়া উচিত এখনই। কেননা এটা যদি ট্রেন্ড বা নিয়ম হয়ে যায়, তাহলে কাল আপনি-আমি যে কেউ যেকোনো কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পয়সা রোজগারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারি। বাসে ট্রেনে অফিসে আদালতে বাজারে যে কেউ যে কোনো ইস্যু তৈরী করতে আমাদের হ্যারাস ম্যালাইন এবং আইনি জটিলতায় ফাঁসানোর পাশাপাশি সমাজে দেশে বিভেদ-বিভাজন ও বড়ো আকারের দাঙ্গা-হাঙ্গামা-অশান্তি ছড়াতে পারে।

অতএব এই সামগ্রিক বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অতি আবশ্যক। এবং কেন পেইড বা স্পনসর্ড ভিডিও স্বাধীন মতামত বলে প্রকাশ করা হলো---সেটাও। কারণ কেউ টাকা নিয়ে রাজনৈতিক প্রচার করছেন অথবা স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছায় রাজনৈতিক প্রচার করছেন — এক বিষয়; আর টাকা নিয়ে তৈরি রাজনৈতিক প্রচারকে দর্শকের কাছে স্বাধীন ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উপস্থাপন করা—সম্পূর্ণ আলাদা। 

সমস্ত বিষয়গুলোরই নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া তাই ভীষণ প্রয়োজন—কে টাকা নিলেন বা নিলেন না, এসব প্রশ্ন বাদেও সেই টাকা দিয়ে ঠিক কী ধরণের কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছিল এবং সেটি কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল---- এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনসার্ন হওয়া উচিত আমাদের। 

এটুকুই বলার।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিদ্যাসাগর তো মিলিট্যান্ট নাস্তিক ~ কণিষ্ক ভট্টাচার্য 

“বিদ্যাসাগর তো মিলিট্যান্ট নাস্তিক। ওর কথা শুনবো কেন!’

বাংলা ভাষার সম্বোধনে, ‘তুই-তুমি-আপনি’ ভেদ আছে, যা ব্যক্তি সম্পর্কের পারস্পরিক নৈকট্য বা সম্মান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। যদিও অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালিও সম্বোধনে ‘ওর আর ওঁর’ এই সম্মান বা আপনি সূচক চন্দ্রবিন্দুটির ব্যবহার জানেন না, কিন্তু কথ্য ভাষার অনুসারে তারা ‘ওনার’ লেখে। অল্পশিক্ষিত বা আঞ্চলিকতাদুষ্ট বাংলায় ‘ইনার’ও দেখা যায়। সেই প্রতিবন্ধকতাও অন্তত বোঝায় যে ‘আপনি’ সূচক সম্বোধনে লিখতে চাওয়া হয়েছিল! অন্তত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ইচ্ছাকৃত অপমান বা তুচ্ছতার লক্ষ্যে নয়। 

কিন্তু ‘ওর’--- অর্থাৎ ‘তুই’ সম্বোধনে! বাঙালি লিখছে! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে! জনসমক্ষে! সমাজমাধ্যমে!  

আজ থেকে আট বছর আগে এক বঙ্গসন্তান আমার পোস্টে লিখেছিল– “‘ওর’ কথা শুনব কেন!” 

বাক্যটি খুবই ইন্টারেস্টিং– ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা যে শুনবে না তার মতে, বিদ্যাসাগর ‘মিলিট্যান্ট নাস্তিক’ বলে-- সেই বঙ্গসন্তান তথাকথিত অর্থে উচ্চশিক্ষিত কলকাতাবাসী। ফলে দুটি সিদ্ধান্তে আসা যায়, প্রথমত, বিদ্যাসাগর সম্পর্কে ‘ওর’ সম্বোধন ইচ্ছাকৃত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তুচ্ছার্থে বা অপমানের উদ্দেশ্যে। এবং দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিটি ‘হিন্দু’ ধর্ম বিশ্বাসী (তখনও সনাতনী শব্দটি বাঙালির কাছে লব্জ হয়নি) বলে ‘নাস্তিক’ (!) বিদ্যাসাগরকে তার সম্মানের প্রয়োজন নেই। 

আমার পিতার কল্যাণে যে প্রভূত পরিমাণ বইয়ের মধ্যে বড়ো হয়েছি তার মধ্যে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত তিন খণ্ডের বিদ্যাসাগর রচনাবলী ছিল। যতদূর বুঝেছি বিদ্যাসাগরকে বলা যায় অজ্ঞেয়বাদী। 

সহজ কথায় বলা যায়, তিনি ‘ধর্ম-নির্লিপ্ত’। মনে রাখতে হবে বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালে— আজ থেকে ২০৬ বছর আগে। এই ‘ধর্ম-নির্লিপ্ত’ অবস্থানকে আজকের ভাষায় ‘সেকুলার’ বলা যায় – যা অধুনা নিওনাজির মতো করে গড়ে ওঠা নব্যহিন্দুত্ববাদীদের কাছে একটি গালাগালি, যদিচ ভারতের সংবিধানে দেশটি ‘সেকুলার’ হিসেবেই গড়ে উঠেছিল। তদুপরি বিদ্যাসাগর যদি নাস্তিকও হন তাহলেই বা কী যায় আসে! বেদের অপৌরুষেয়ত্বে অবিশ্বাসী অর্থেও যদি তিনি নাস্তিক না হন, যদি ‘এথেইস্ট’ অর্থেও তিনি নাস্তিক হন তাহলেও বা কি যায়-আসে! 

ধর্মকে যদি শাস্ত্রধৃত ধারণা বলে গ্রহণ করি, তাহলেও এই আ'পামর' নব্যহিন্দুত্ববাদীদের মিলিত সর্বমোট শাস্ত্রজ্ঞান, বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রজ্ঞানের দশমিকের পর দশটি শূন্য পরবর্তী সংখ্যাতেও তুলনীয় তো নয়ই এবং কেবল ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রজ্ঞান দিয়ে বিদ্যাসাগরকে পরিমাপ করতে যাওয়ার মুর্খামি বোধহয় কেবল ভারতীয় নব্যহিন্দুত্ববাদীদের পক্ষেই সম্ভব! 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন তাঁর অগ্রজ বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ নামক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, তৎকালীন হুগলীর বীরসিংহ থেকে পিতা ঠাকুরদাস ঈশ্বরচন্দ্রকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন ‘হের্‌ সাহেবের স্কুলে’ ভর্তি করবেন বলে – এই ‘হের্‌ সাহেব’ হলেন ডেভিড হেয়ার আর স্কুলটি হল হেয়ার স্কুল। বিদ্যাসাগরের জন্মের দুবছর আগে ১৮১৮ সালে এই বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। সেখানে আজ থেকে ২০৮ বছর আগে হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকল ধর্মের শিক্ষার্থীর প্রবেশাধিকার ছিল।

যে অর্বাচীন নব্যগোময়বাদী আমার পোস্টে প্রথম বাক্যটি লিখেছিল। সে-ও আমারই মতো ‘হের্‌ সাহেবের স্কুল’ এর প্রাক্তনী। কী আশ্চর্য নিষ্ঠুর পরিহাস! আমি তাকে বলেছিলাম, বাংলা ভাষায় যে এটুকু লিখতে পারলে তাও বিদ্যাসাগরের জন্য। 

বিদ্যাসাগর কেবল বাংলা বর্ণমালার সংস্কারসাধক ভাষাতাত্ত্বিক নন, শাস্ত্রজ্ঞপণ্ডিত, যুক্তিবাদী, উদার, বাস্তববাদী সমাজ সংস্কারক। কালিক সীমাবদ্ধতা তাঁকে মানতে হয়েছে ওই বাস্তবতার নিরিখেই। 

টেলিভিশন দেখি না, তবে একাধিক খবরের কাগজ নিয়ম করে পড়ি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া খবর দেখি (তাৎক্ষণিকতার নিরিখে এদানী জরুরি)-- কিন্তু সামগ্রিকভাবে হতাশ হই, ডিপ্রেসড লাগে, কোনোরকম কাজের মানসিক স্থিতি নষ্ট হয়। 

দেখি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়া আর না-পাওয়া বাঙালির মধ্যে মূলগত ভেদ উঠে গেছে। দুজনেই সমান অযুক্তিবাদী… নির্বোধ… আত্মধ্বংসী… ব্রেনরট্ জোম্বি...

দেখি, জাতি-রাজনীতিতে যারা নিম্নবর্ণ, যারা অস্পৃশ্য, অচ্ছুত তাদেরকেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে… তারা প্রবল ক্ষমতাশালী এবং প্রবল বিভেদমূলক ব্রাহ্মণ্যবাদের পক্ষে কথা বলে ‘বিধর্মী’ তাড়াতে উদ্যত… অথচ রামমোহন বিদ্যাসাগর না থাকলে বাংলাও গোবলয়ের অস্পৃশ্যতার রাজনীতির অংশ হত… 

ঘরে যিশুর ছবি থাকলেও তারা আক্রমণ করে, দেয়ালে কালীর ছবি থাকলেও… 

দেখি রামমোহন, ডেভিড হেয়ার, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, বেথুন, রবীন্দ্রনাথ, রোকেয়ার বাংলায় স্কুল কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পড়ুয়ার অভাবে খালি হয়ে যায়… সরকার তুলে দেয়… 

মাঝেমধ্যে মনে হয়, ঠিকই হচ্ছে! এই পড়াশোনার কী বা মূল্য! 

যখন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত ইউরোপ / আমেরিকা প্রবাসিনী আইআইটিতে আত্মহত্যা করা নিম্নবর্ণের ছেলেটিকে– কোনও তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই 'নকল করছিল' বলে দেন! এমনকি প্রতিষ্ঠান এমন গুজব অস্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও ‘উচ্চশিক্ষিত’ অনড়… কী বা মূল্য আছে এ শিক্ষার! এমনকি আদৌ কী বা প্রয়োজন আছে এই শিক্ষার…

যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুজন শিক্ষকের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় এই নির্যাস নির্গত হয় যে, এদেশে হিন্দুদের দুর্দশার কারণ ‘উওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট’ – নারী ক্ষমতায়ন। মেয়েরা লেখাপড়া শেখা আর চাকরি করার জন্য হিন্দুদের সন্তানধারণ কমে গেছে… 

এরা যে জাতির শিক্ষকতার পেশায় থাকে সে জাতির সমস্ত স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যত তাড়াতাড়ি বন্ধ হয় ততই মঙ্গল। 

Uploaded Image মনে হয়, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে নেহাতই একটা দুর্ঘটনা।

এই অচিকিৎস্য আরোগ্যহীন বাঙালি জাতির শীঘ্রতম মৃত্যু কামনা করি আমি… শীঘ্রতম বিলুপ্তি… 

মনে হয়, আমার সন্তানের কাছে ক্ষমা চাই তাকে জন্ম দেওয়ায় জন্য… বাঙালি জাতির উজ্জ্বল ইতিহাস জানানোর জন্য… 

বিদ্যাসাগরের জন্মদিন আগামীকাল। তাঁর মৃতদেহের ছবি দিলাম। আমরাই তাঁকে খুন করেছি। 
করছি… রোজ… প্রতিদিন… 

ফেসবুকে আপাতত কম থাকতে চাই। নতুন লেখা বেরোলে না হয় জানানো যাবে। আপাতত আমার মানসিক স্থিতি প্রয়োজন।

© কণিষ্ক ভট্টাচার্য 


বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কাল্ট তৈরী ~ অরিজিত মুখার্জী

কাল্ট তৈরীর গল্প। চলছে কয়েক বছর ধরেই। কখনো ভারতের সব সেলিব্রিটিদের ফরমায়েশ (বকলমে অনুরোধ) করা হয়েছে "মাই মোদী স্টোরি" হ্যাশট্যাগ দিয়ে প্রশস্তি লিখতে। কখনো সিবিএসইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ২রা অক্টোবর অবধি মোদীর ছোটবেলা নিয়ে সিনেমা দেখাতে। ভারতীয় যাদুঘরে মোদীর জীবনপথ নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে। এইবার স্কুল কলেজে প্রদীপ জ্বালানোর ফতোয়া এসেছে, আর নাটক মঞ্চস্থ করারও।

বছর কয়েক আগে এরকমই সময় লিখেছিলাম। পড়ে দেখুন কোনো মহান আত্মার সঙ্গে মিল পান কিনা।

১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে, হিটলারের ৪৪তম জন্মদিনের কিছুদিন আগে মানহাইমের এক পরিবার থেকে একটা চিঠি এসে পৌঁছয় হিটলারের দপ্তরে। তাতে লেখা - "আমাদের ছোট্ট রিটা তার প্রিয় ফ্যুরারকে সম্মান জানাতে চায় হাইল হিটলার বলে। সেই জন্যে আমরা তার একটা ছবি পাঠালাম জার্মান স্যালুট করা অবস্থায়। রিটার বয়স দশ মাস, আমাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ওকে যখনই আমরা প্রিয় অ্যাডল্ফকাকুর ছবি দেখাই, ও স্যালুট করে।"
Uploaded Image

ভোল্কার উলরিখের দু খন্ডের হিটলার বায়োগ্রাফির প্রথম খন্ডে একটা চ্যাপ্টার আছে, নাম - "কাল্ট অ্যান্ড কমিউনিটি"...ওপরের এই অংশটা সেই চ্যাপ্টার থেকে নেওয়া। কীভাবে হিটলারের পিছনে জার্মানির জনসংখ্যার বড় অংশটাই এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই আখ্যান।

১৯শে আগস্ট, ১৯৩৪ এর গণভোটের সময়ে এক জার্মান নাগরিকের পর্যবেক্ষণ - "সমস্ত বিলবোর্ডে হিটলার। প্রতিটা দোকানের জানলায় হিটলার। দোকান কেন, যত জানলা রয়েছে জার্মানিতে - ট্রাম, ট্রেন, গাড়ি, বাড়ি - প্রত্যেকটা জানলা দিয়ে হিটলার তাকিয়ে..."

বহু জার্মান নাগরিক চ্যান্সেলারির সামনে লাইন দিত তাদের প্রিয় ফ্যুরারের ছবিতে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্যে। ১৯৩৪ এর আগস্টে, হিমলার যখন তাঁর বাবামায়ের উদ্দেশ্যে হিটলারের ব্যক্তিগত বার্তা লেখা ছবি যোগাড় করে মিউনিখের বাড়িতে পাঠান, হিমলারের বড় ভাইয়ের কথা থেকে জানা যায় যে তাঁদের মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন...

উইডম্যানের লেখায় জানা যায়, হামবুর্গে একজন জার্মান নাগরিক ভিড়ের মধ্যে কোনোভাবে হিটলারের হাতে হাত ছোঁয়াতে পেরে আত্মহারা হয়ে "আমি ওঁকে ছুঁতে পেরেছি, ওঁকে ছুঁতে পেরেছি" বলে রাস্তায় পাগলের মত নাচতে শুরু করেছিল। উইডম্যানের ভাষায়, লোকটা যদি একবারও বলতো যে সে বাস্তবে খোঁড়া ছিল, আর হিটলারের ছোঁয়ায় সেরে উঠেছে, জনতা সেই কথাও বিশ্বাস করতো...

কাল্ট এইভাবেই তৈরী করা হয়...

আজকের ভারতেও বদল কিছুই হয়নি। রাস্তাঘাটে, বিলবোর্ডে, পেট্রল পাম্পে, ভ্যাক্সিন সার্টিফিকেটে, এয়ারপোর্টের ডিজিযাত্রার গেটে, ট্রেনে, স্টেশনে...প্রায় প্রতিটা দেওয়ালে একজনেরই মুখ। জন্মদিনে দিল্লীর মেট্রো চড়ে বেড়াতে বেরিয়ে খুব কনভিনিয়েন্টলি এমন একজনের দেখা পাওয়া যায় যে কিনা স্বত:প্রণোদিতভাবে সংস্কৃতে সেই একজনের বন্দনা করে ফেলতে পারে। সেই একজনকে কখনো একত্রে হাঁস-মুরগী-হরিণ-ম্যাকবুক-ক্যামেরা-বই সহযোগে দেখা যায় - মানুষে বিশ্বাস করে। কখনো ফাঁকা সমুদ্রতটে বোতল কুড়োতে দেখা যায় - মানুষে বিশ্বাস করে। কখনো কেদারনাথের গুহায় ধ্যানস্থ অবস্থায় দেখা যায় - ফটোগ্রাফার ছবি তুলে আনে - মানুষ তাও বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করে। জি২০ সম্মেলন জুড়ে একজনেরই প্রচার হয় বিশ্বগুরু হিসেবে। আমাদের বোঝানো হয় যে ভারতের অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে। আমরা সেই সবকিছুই মেনে নিই বিনা প্রশ্নে।

কারণ, কাল্ট এইভাবেই তৈরী হয়।

চ্যালা গুরুর পথেই চলবে তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবে, গুরুর আমলে সেই দেশে বাস্তবিকই বেশ কিছুটা অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের দশকের তুলনায়। লোকের হাতে চাকরি ছিল - সে অস্ত্র তৈরীর কারখানায় হলেও। পরবর্তীকালে যদিও প্রমাণিত হয় যে সেই উন্নতির চোটে জার্মান অর্থনীতিকে আসলে মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছিল (Was there a National Socialist economic miracle?, Wehler), তবুও সেই সময়ে একেবারে অর্থনৈতিকভাবে নীচুতলার মানুষগুলোও হাতে কাজ পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল। এখানে সেসব কিছুই হয় না। পুরোটাই ফাঁপা তর্জনগর্জন...আর দেখনদারি, একটা আপাদমস্তক জোকারকে নিয়ে। পাব্লিক রিলেশনসের জমানায় হয়তো এটাই হওয়ার কথা...

কাল্ট তৈরী।

সংযোজন: আশার কথা এইটাই যে পরের একটা জেনারেশন অন্তত: এই ঠগ জোচ্চোরটাকে চিনে ফেলেছে। আল্টিমেটলি ওই "ছপ্পন ইঞ্চকা ছোটা..."

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয় কি অমূলক ? ~ অরিজিত মুখার্জী

খবরের কাগজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছেন হয়তো — ওপেনএআই আজ অবধি সলভ না হওয়া অঙ্কের প্রব্লেম সলভ করে দিয়েছে; বা অ্যান্থ্রোপিকের এআই গিটহাবের সিকিউরিটি বাইপাস করে কোথায় কী সব ফোরামের সব ডেটা মুছে দিয়েছে...ইত্যাদি প্রভৃতি।

ক্রমশ: একটা ধারণা তৈরী হচ্ছে সুপারহিউম্যান ইন্টেলিজেন্স — সিনেমার ভাষায় বললে টার্মিনেটর বা স্কাইনেট — আগতপ্রায়।  মানুষ নামের প্রজাতিটা খুব শিগগিরিই মুছে যাবে। তাই, দয়াপরবশ হয়ে টেকব্রো-রা তাঁদের নিজেদেরই শুরু করা এআই রেসের উন্মত্ত দৌড়ের গতি কমাতে চাইছেন।

Uploaded Image
সমস্যা হল, এই সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবীদাওয়াগুলো সবই সেই ওপেনএআই বা অ্যান্থ্রোপিকের মত এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে থেকেই আসছে, এবং সেখান থেকে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় হাইলাইট করা হচ্ছে। আমরা ভাবছি যে এরা তো এইসব নিয়েই কাজ করছে, কাজেই যা বলছে সেগুলো সবই ঘোর বাস্তব, স্কাইনেট এলো বলে। অথচ, এই দাবীগুলোর পিছনে এখনও সেরকম সায়েন্টিফিক ব্যাকিং নেই, কোনো বেঞ্চমার্কিং বা কোনো প্রপার স্টাডি নেই, শুধুমাত্র কিছু ছুঁড়ে দেওয়া তথ্য ছাড়া।

উল্টোদিকে, এমআইটির গবেষকরা রিসেন্টলি একটা পেপার পাব্লিশ করেছেন, যার নাম "পোটেমকিন আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলস" — লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল মানে চ্যাটজিপিটি, ক্লড ইত্যাদি। এই গবেষকদের বক্তব্য হল সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবীদাওয়াগুলো সম্পর্কে সাবধান হওয়া দরকার। পোটেমকিন আন্ডারস্ট্যান্ডিং শব্দবন্ধটা এঁরা ধার করেছেন ঐতিহাসিক "পোটেমকিন ভিলেজ"-এর কনসেপ্ট থেকে, যেখানে ফাঁকা জমির চারপাশে সুন্দর বাঁশের বেড়া আর চালা বা কার্ডবোর্ডের তৈরী বাড়ির দেওয়াল বসিয়ে গ্রাম বা লোকালয়ের চেহারা দেওয়া হয় শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যে। এঁদের বক্তব্য হল, আধুনিক এআই ঠিক একইভাবে বুদ্ধিমত্তার ফাসাড (মুখোশ) তৈরী করতে সক্ষম। বলা ভালো পারদর্শী, কারণ সেইভাবেই এগুলো তৈরী। আধুনিক এআই যে কোনো প্রফেশনাল পরীক্ষায় ৯০% স্কোর করে দেবে; বা কমপ্লেক্স থিওরি বা ডেফিনেশন লিখে দেবে নিখুঁতভাবে৷  কিন্তু সেই বাস্তব জীবনের কোনো কাজে সেই থিওরি প্রয়োগ করতে বলুন, বা তার নিজের লেখার মধ্যে কনট্রাডিকশন খুঁজে বের করতে বলুন — পারবে না, বা ছড়িয়ে ফেলবে। কারণ মানুষ যেভাবে ধারণা তৈরী করে, বা বুঝতে শেখে, এআই সেভাবে চলে না। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া বা অ্যান্থ্রোপিকের মত হাজার হাজার বইয়ের পাতা ছিঁড়ে স্ক্যান করে সেই সমস্ত বই ধ্বংস করে পাওয়া বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে আয়ত্ত করা প্যাটার্ন ম্যাচিং-ই এআইয়ের শেখার আর উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি।

এখনো অবধি আনসলভড ম্যাথস প্রব্লেমও যখন এআই সলভ করে, বা গিটহাবের সিকিউরিটি বাইপাস করে ফোরামের তথ্য মুছে দেয় — যা দেখিয়ে সুপার ইন্টেলিজেন্সের তত্ত্ব আমদানি করা হয় — সেক্ষত্রেও এআই তার আগে দেখা/চেনা প্যাটার্নের ওপর ভিত্তি করে খুব সফিসটিকেটেড অনুমান বা গেসওয়ার্ক চালায়। যেহেতু কম্পিউটিং ক্ষমতা বেশি, তাই ট্রায়াল অ্যান্ড এরর ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি করতে পারে। তবুও দিনের শেষে সেটা সেই প্যাটার্ন নির্ভর গেসওয়ার্ক। আপনি সেই ম্যাথস প্রব্লেমের নিয়ম বদলে দিন, বা গিটহাবের সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্কের নিয়ম বদলে দিন — যা আগে দেখা নয় — দেখবেন এই সুপার ইন্টেলিজেন্স সম্পন্ন এআই বাজেভাবে ছড়াচ্ছে, যেখানে একটা মানুষ অল্প চেষ্টায় অ্যাডাপ্ট করতে পারত।

যে কথাটা আমরা প্রায় রোজই বলি — এই হাইপ তৈরীর পিছনে আদতে রয়েছে একটা কম্পিটিশন — প্রযুক্তির পাবলিক লীডারবোর্ডে কে ওপরে থাকবে, আর তার ভিত্তিতে কে কত ফান্ডিং টানতে পারবে। কারণ সুপার ইন্টেলিজেন্সের গল্প বিকোয় ভালো। স্কাইনেট বা মেট্রিক্স টাইপের সেন্টিয়েন্ট এআই দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয় দেখানো যায়। ভয়ও বিকোয় ভালো।

আসল বিপদটা এআই মানুষের মত বুদ্ধিমান হয়ে গিয়ে মানুষকে মেরে ফেলবে সেটা নয়। বরং আসল বিপদ হল আমরা বাইরের সাফল্যে বেশি মুগ্ধ হয়ে গিয়ে, বাস্তব জগতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এমন যন্ত্রের হাতে তুলে দেব যার মধ্যে নমনীয় বোধশক্তির অভাব রয়েছে। এআই নিজে থেকে ভেবেচিন্তে আপনাকে মারবে না, মারবে কোনো ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে (ধরুন অটোনোমাস গাড়ি) এআইয়ের করা একটা মাত্র ভুল...

আরো একটা বাস্তব সমস্যা রয়েছে। আমরা যা কাজ করি — অফিসে, স্কুলে, কলেজে, কোর্টকাছারিতে — তার মধ্যে একটা বড় অংশই প্যাটার্ন নির্ভর। একই প্যাটার্নে হয়ে চলে। গল্প, কবিতা, সিনেমা, নাটক — সবই বলতে পারেন নানান আগে দেখা প্যাটার্নের রিমিক্স। এই সমস্ত কাজই হয়তো এআই করে দেবে একসময়, আর কর্পোরেট বা অন্য সংস্থাগুলো সেটা মেনে নেবে, রাদার এনকারেজ করবে। কারণ এআই ছুটি চায় না, মাইনে বাড়াতে বলে না, তার অসুখ করে না, সে ইউনিয়ন বানায় না...

এমআইটির আরো একদল গবেষক আরো কিছু ভয়ানক তথ্য সামনে এনেছেন নিজেদের ইনস্টিট্যুটের ভিতর থেকে। জানা যাচ্ছে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছে, এবং তাদের মধ্যেই মেজরিটি এও মনে করছে যে এর ফলে তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে...তারা ক্রমশ: এআই নির্ভর হয়ে পড়ছে। এমআইটি তাই তাদের শিক্ষণপদ্ধতির বদল করার কথাও ভাবছে...

পোটেমকিন পেপারটার লিঙ্ক নিচে দেওয়া রইল। চাইলে পড়তে পারেন।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এআই কি সত্যিই বিপজ্জনক ~ অনির্বাণ অনিক

দুদিন ধরে প্রযুক্তির দুনিয়ায় এক নতুন নাটকের মহড়া চলছে। সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই এবং ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান হঠাৎ খুব চিন্তিত মুখে ঘোষণা করেছেন, "এআই খুব বিপজ্জনক গতিতে এগোচ্ছে, আমাদের এখনই এর গতি কমানো উচিত!" 

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে তারা মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছেন, "এআই-এর গতি কমাও" বলে সবথেকে জোর গলায় চিৎকার সেই একই সিইও-রা করছেন, যাঁরা নিজেরাই নতুন ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালছেন? অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই সম্প্রতি "উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার" নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করে অনিয়ন্ত্রিত 'সুপারইন্টেলিজেন্স' বা অতি-বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে সতর্ক করেছেন, আর স্যাম অল্টম্যানও তড়িঘড়ি তাঁর সমর্থনে সুর মিলিয়েছেন। 

আমি এই টেক ব্রোদের ১০% দাবীকেও বিশ্বাস করিনা। আমার ধারণা এটা "ডুমার অ্যাজ বুস্টার" নামের এক চরম কর্পোরেট মার্কেটিং চাতুরী। এই ধরনের কাল্পনিক ধ্বংসের গল্প ফাঁপিয়ে তোলার মূল উদ্দেশ্যই হলো কাস্টমারদের পরোক্ষভাবে বোঝানো যে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি। 

ওপেনএআই ২০২৫ সালে প্রায় ১,৩০৭ কোটি ডলার আয় করলেও তাদের পরিচালন ব্যয় ছিল প্রায় ৩,৪০০ কোটি ডলার, অর্থাৎ কেবল এক বছরেই অপারেটিং ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,০৯২ কোটি ডলারে এবং ইনফারেন্স খরচের পেছনেই ব্যয় হয়েছে ৮৪০ কোটি ডলার। যখন মূল উপার্জনের খতিয়ান শক্ত থাকে না, তখন এই কেয়ামতের মতো বিপর্যয়ের হেডলাইন তৈরি করে রাখলে বাজার আর বিনিয়োগকারীদের নজর আসল আয়-ব্যয়ের বাস্তব হিসেব ছেড়ে ওই কাল্পনিক 'সুপারইন্টেলিজেন্স'-এর দিকেই বুঁদ হয়ে থাকে।

Uploaded Image সুরক্ষানীতির অজুহাতে এই কোম্পানিগুলো মডেলের ওয়েট বা ওপেন-সোর্স অ্যাক্সেস বন্ধ রাখার পরামর্শ দিচ্ছে, যাতে জনসুরক্ষার কথা বলে মূল প্রযুক্তির চাবিকাঠিটা সিলিকন ভ্যালির বোর্ডরুমের ভেতরেই কুক্ষিগত করে রাখা যায়। অন্যদিকে, সুরক্ষার অজুহাতে পাবলিক লিস্টিং বা আইপিও পিছিয়ে দেওয়াটা শেয়ার বাজারের প্রকাশ্য নজরদারি এড়িয়ে নিজেদের আয় গুছিয়ে নেওয়ার সুন্দর সুযোগ করে দেয়।



তদুপরি এরা বলে চলেছেন - "চীন তো এআই বানানো থামাচ্ছে না, তাই আমাদেরও থামা চলবে না"। এই অজুহাতটা স্রেফ একটা ঢাল। যাতে থামার কোনো প্রশ্ন না তুলে একের পর এক নতুন সিস্টেম বাজারে আনা যায় এবং নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য (Monopoly) ধরে রাখা যায়।

বিষয়টা আসলে দুমুখো কৌশল। একদিকে এই সিইও-রা বিশাল সব ডেটা সেন্টার বানানোর জন্য সরকার আর সাধারণ করদাতাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি ও ফান্ড দাবি করেন, আর অন্যদিকে ছোট বা দেশীয় প্রতিযোগীরা যাতে বাজারে উঠে আসতে না পারে, সে জন্য সরকারি নিয়ামক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আইনি সুরক্ষার কড়াকড়ি বা নিজেদের মতো নিয়ম বানিয়ে নেওয়ার সুবিধা চান।

এর সাথে যোগ করুন ভবিষ্যতের এআই পরিকাঠামো তৈরির জন্য টেক কোম্পানিগুলোর কোটি কোটি টাকা ইনভেস্টমেন্ট। এআই নিজে কোড লিখে মানুষের চাকরি যতটা না কাড়ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে টেক-কোম্পানিগুলোর এআই পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য কস্ট-সেভিং করতে গিয়ে হাজার হাজার কর্মীর ছাঁটাই'এর কারণে। কোড লেখা কোনদিনই কগনিটিভ লোড বা মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করত না। সময় লাগত, যেটা এআই এসে কমিয়েছে। কিন্তু কগনিটিভ লোড হ্রাস করেনি। বরং ছাঁটাই'এর ফলে কোম্পানিগুলোতে পড়ে থাকা কর্মচারীদের মধ্যে কগনিটিভ লোড ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এই টেক ব্রো'রা মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে সত্যিই এত চিন্তিত হলে কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত হত। তা তো হয়না। মানুষের সুরক্ষা নিয়ে এত চিন্তিত হওয়াটা স্রেফ এঁদের ধ্যাস্টামি!

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুভেন্দুর হালচাল ~ অরিত্র হালদার

দার্শনিক জাক লাকান ফ্রয়েডের সুপার ইগো নামক থিওরেটিক্যাল কনস্ট্রাক্টের এক্সটেনশন হিসেবে একটি কাউন্টার ইন্টুইটিভ, প্রায় অযৌক্তিক এবং স্যাডো-ম্যাসোকিস্টিক সত্তার কথা বলেন। এই সত্তা যেমন একাধারে কর্তব্যের প্রতি চরম সত্যনিষ্ঠ আনুগত্যের দাবি করে (ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব), একই ভাবে সে সেই কর্তব্যপালনে কেউ ব্যর্থ হলে তাকে শাস্তি প্রদান করে এক বিকৃত আনন্দ লাভ করে। 

এই পার্ভার্সিটি অফ অর্ডারলি বিহেভিয়ারকেই দার্শনিক স্লাভোজ জিজেক আবার রাজনৈতিক স্তরে এনে উল্টে পাল্টে নিয়েছেন। কেন? কারণ জিজেক মনে করেন প্রতিটা সরকারের লিখিত, আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের আড়ালে একটা অলিখিত, বিকৃত ট্রানসগ্রেশন থাকে। এই ট্রানসগ্রেশনই হলো ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসিতে ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণের মূল হাতিয়ার। উনি এই সত্ত্বার নাম দিয়েছেন the obscene superego supplement (OSS) অথবা the paraphillic superego। 

একটু সরলীকরণ করতে হলে ব্যাপারটাকে এভাবে দেখতে হবে: কেন শুভেন্দু অধিকারী এবং তার মন্ত্রিসভা এই মুহূর্তে এক অদ্ভূত অশ্লীল এবং অপরিশীলিত কায়দায় দুর্গাপুজো, বাগেশ্বর, ইসকন, যাদবপুর ইত্যাদি বিষয়ে ভাষণবাজি, ব্যক্তি আক্রমণ, একপেশে মিথ্যে স্ল্যান্ডার এবং গেরুয়া যাত্রা বা নাগা সাধু মিছিলের নামে রাজনৈতিক কুরঙ্গ করে বেড়াচ্ছেন? কেন তাদের বিহেভিওরাল প্যাটার্নে এক আশ্চর্য রকমের low-intellect, goonish ট্রেইট ফুটে উঠছে? বিশেষতঃ যখন তারা এক বিপুল সংখ্যক জনগণের decisive mandate নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছেন? 

এর উত্তর নিহিত আছে জিজেকের OSS থিওরিতে। ওনার মতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধু বস্তুনিষ্ঠ আইনানুগ নিয়মাবলীর সুষ্ঠু পালনই একমাত্র পথ নয়। বিশেষতঃ যখন সরকার একটি totalitarian regime দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সেই রেজিমের প্রয়োজন একটি কাউন্টার পয়েন্টের। এবং এই কাউন্টারপয়েন্ট সাধারণতঃ আইন ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের বিপরীতমুখী এক পারভাসনের মাধ্যমে রেজিমের অনুগামীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। প্রকৃত অনুগামীদের সংহতি তৈরি করতে, তাদের আসল সমর্থন লভ্যার্থে সরকারকে এর কদর্য অন্ধকার দিকটিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। 

অর্থাৎ সরকারের অনুগত মানুষের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে যেতে গেলে ঠিক যে যে জিনিসগুলো কাগজে কলমে বেআইনি বা অনৈতিক বা বিকৃত রুচির বলে ধার্য করা আছে, সরকার সেই কাজগুলোই খোলাখুলি ভাবে করতে থাকবে। এই যে নৈতিকতার ট্রান্সগ্রেশন, এটাই মর্ষকামী মানুষকে তার পছন্দের রাজনৈতিক দলের সাথে একাত্ম হতে সহায়তা করে। এতে করে এক অদ্ভূত shared guilt এবং তৎপরবর্তী এক obscene pleasure এরা অনুভব করতে শুরু করে। তাত্ত্বিক ভাষায় লাকান এই প্যারাডক্সিক্যাল অপরাধবোধ এবং আনন্দানুভূতিকে Jouissance নামে অভিহিত করেছেন। 

এই jouissance এর জন্যই যখন নাগা সাধুরা পশ্চাদ্দেশ উন্মোচন করে যাদবপুরের সামনে গিয়ে "প্রতিবাদ" উদযাপন করেন, বা শুভেন্দু খোলা বাজারে ছাত্র শিক্ষক নির্বিশেষে সবাইকে থ্রেট দিয়ে বেড়ান, বিজাতীয় গুটখা খেকো ঊনমানবের দল বাঙালিকে সংস্কৃতির পাঠ দেয়, শিক্ষক - অধ্যাপকদের গণশত্রু হিসেবে দেগে দেওয়া যায় আর বুলডোজার এসে গুঁড়িয়ে দিয়ে যায় গরিবের ঘরবাড়ি আর ভবিষ্যতের সম্বলগুলো তখন এসব দেখে এক শ্রেণির জনতা সোল্লাসে সরকারের জয়ধ্বনি দিয়ে ওঠে। 

শুভেন্দুরা এটা জানেন যে তাঁদের ক্যাপটিভ ভোট ব্যাংক গুড গভর্নেন্স বা অর্থনৈতিক পালাবদলের জন্য এই সরকারকে ক্ষমতার মসনদে বসায়নি। তারা এটাও জানেন যে একটা বিরাট অংশের মানুষ মিথ্যে প্রোপাগান্ডার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আজকে এরাজ্যের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার ছাত্র শিক্ষকদের ঘৃণা করতে শিখেছে। তারা জানেন যে তৃণমূলের দুর্নীতিতে অতিষ্ট হয়ে বহু অ-বিজেপি মানুষ তাদের ভোট দিয়েছেন এবং সেই মানুষরা তাদের ক্যাপটিভ ভোটব্যাঙ্ক নন। তারা জানেন যে বাঙালি আজকে একটি ক্লীব, আত্মবিস্মৃত, হৃতগৌরব জাতিগোষ্ঠীতে পর্যবসিত হয়েছে। এতটাই যে বিজাতীয় শকুনরা এসে বাংলার আইকনদের অপমান করে পার পেয়ে যায় কিন্তু সেই বিজাতীয় শকুনদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে কিছু বাঙালি অ্যাপোলজিয়া নামিয়ে ফেলে এবং সেই প্রতিবাদীকে জেলে পুরে দিতেও এরা পিছপা হয় না। ফলে এই সরকার প্রতিনিয়ত সেই রাষ্ট্রধর্মের বিকৃত ট্রান্সগ্রেশন করতে থাকবে। কারণ এই প্রতিটা সাবভারসন তাদেরকে তাদের ক্যাপটিভ ভোট ব্যাংকের চোখে লেজিটিমেসি দিয়ে চলেছে। আর এইভাবেই এরাজ্যে বিজেপির ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ হতে থাকবে। এটাই জিজেকের obscene superego supplement! 

মুশকিল হলো শুভেন্দু নিজে আদি বিজেপি না হওয়ার দরুন এবং নিজের তৃণমূলী অতীতকে জনমানস থেকে মেটাতে না পেরে, সারাক্ষণ হীনমন্যতায় ভোগেন এবং নিজের হিন্দু কট্টরপন্থী স্ট্যান্ড প্রমাণ করতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রয়াসে সচেষ্ট থাকেন—যাতে বিজাতীয় প্রভুরা তাঁকে তাদের সাথে সমাসনে বসান। এতে না ওনার অথেন্টিসিটি ফুটে ওঠে, না ওনাকে বিপক্ষের মানুষজন সিরিয়াসলি নেন। ওনার দুর্ভাগ্য উনি জানেন না যে সংঘের স্ট্রাকচারাল কনফিগারেশনে উনি বা ওনার মতো রাজনৈতিক অ্যাসপিরেন্টরা চিরকাল এক্সপেনডেবল হয়ে থেকে যাবেন। যেদিন ওনার প্রয়োজন ফুরাবে, সেদিন ওনার নটে গাছটিও মুরোবে।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এন্ট্রি নম্বর পঁচিশ ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

ছয় বছর ধরে আমি বেওয়ারিশ লাশের ছবি ফাইলে তুলি। গত মঙ্গলবার একটা পুরনো ফাইল খুলে আমি নিজের মুখটা দেখলাম!
ছবিটা পঁচিশ বছর আগের।
আমার নাম শিরিন। বয়স সাতাশ বছর। তেজগাঁও থানার রেকর্ড শাখায় কাজ করি। পদটা বড় কিছু না, অফিস সহায়ক। কাজ হলো কাগজ গোছানো, ফাইল নাম্বার তোলা আর অজ্ঞাত লাশের ছবি ও তথ্য সংরক্ষণ করা।
চাকরিটা আমি পেয়েছিলাম আব্বার সূত্রে। আব্বার নাম আজিজুল হক। এই থানারই কনস্টেবল ছিলেন। বাহাত্তর সালের পরে জয়েন করেছিলেন। অবসর নিয়েছেন বারো বছর আগে। আম্মা মারা গেছেন আমার এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়টায়।
কাজটা শুনতে যতোটা ভয়ংকর লাগে, ততোটা আসলে না। ছয় বছর পর এইটা আর দশটা অফিসের কাজের মতোই হয়ে যায়। ছবি তোলো, নম্বর বসাও, তারিখ বসাও। পরিচয়ের ঘরে লিখো অজ্ঞাতনামা।
শুধু একটা অভ্যাস আমি ছাড়তে পারিনি। ফাইল বন্ধ করার আগে প্রত্যেকটা মুখ আমি একবার করে দেখি। মানুষটা কে ছিলো, কোন ঘরে কে অপেক্ষা করেছিলো ওর জন্য, এইসব ভাবি। তারপর ফাইলটা তাকে তুলে রাখি।
আমাদের রেকর্ড রুমে সাতশোর বেশি মানুষ আছে, যাদের নাম কেউ জানে না।
মিরপুরে আমাদের দুই রুমের ফ্ল্যাট। আব্বা এখন আর বেশি হাঁটতে পারেন না। হাঁটুতে সমস্যা, চোখেও কম দেখেন। সারাদিন বসে থাকেন বারান্দায়।
আমি অফিস থেকে ফিরলে উনি জিজ্ঞেস করেন, আজকে কয়টা ফাইল হইলো মা?
আমি কখনো দশটা বলি, কখনো বলি বারোটা। উনি মাথা নাড়েন বিজ্ঞের মতো। এই এক কথার মঞ্চায়ন ছয় বছর ধরে চলছে।
মানুষটা সারা জীবনে আমার গায়ে একদিনও হাত তোলেননি। আমার এসএসসির রেজাল্টের দিন থানার সামনের দোকান থেকে মিষ্টি কিনে সবাইকে খাইয়েছিলেন।
আমাদের ছিলো তিনজনের ছিমছাম সাজানোগোছানো পরিবার। এখন দুটি মাত্র মানুষ।
গত বছর থানায় নতুন একটা সফটওয়্যার বসানো হলো। মুখ দেখে মানুষ চেনার সফটওয়্যার। আমারসহ হাজিরার জন্য থানার সব স্টাফের মুখ ওই সফওয়্যারে তোলা হয়েছে।
সেই সাথে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, পঁচিশ বছরের পুরনো অজ্ঞাত লাশের হার্ডকপির ফাইলগুলো স্ক্যান করে সিস্টেমে তুলতে হবে। প্রায় ন'শো ফাইল। রোজ অফিস শেষে দুই ঘণ্টা করে বাড়তি সময় দিতাম।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমি উনিশশো নিরানব্বই সালের একটা ব্যাচ আপলোড করছিলাম। হঠাৎ স্ক্রিনে রেড সিগন্যালের সাথে একটা বার্তা এলো। সিস্টেম বলছে, আপলোড করা একটা ছবির সাথে বিরানব্বই শতাংশ মিল পাওয়া গেছে থানার একজন কর্মচারীর!
কর্মচারীর নাম শিরিন আক্তার।
আমি ফাইলটা খুললাম।
স্টিলের অটোপসি টেবিলে একজন মহিলার লাশ। বয়স আন্দাজমতে ছাব্বিশ বছর। চোখ দুইটা আধখোলা। চুল কপালের উপর লেপ্টে আছে।
মুখটা আমার।


আমি অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ঘরে তখন আমি ছাড়া কেউ ছিলো না। এসিটা বন্ধ ছিলো, তবু আমার হাত ঠান্ডা হয়ে আসছিলো।
ফাইলে লেখা, উনিশশো নিরানব্বই সালের নয়ই মার্চ। তেজগাঁওয়ের একটা বাসা থেকে দুইটা লাশ উদ্ধার। একজন পুরুষ, বয়স আন্দাজ তিরিশ। একজন মহিলা, বয়স আন্দাজ ছাব্বিশ। দুইজনেরই পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। মামলা নম্বর দেওয়া আছে। তদন্তের অগ্রগতির ঘরে লেখা, নথিভুক্ত।
নথিভুক্ত মানে ফাইল বন্ধ। কেউ কিছু করেনি।
সেই রাতে বাসায় ফিরে আমি আলমারির উপর থেকে পুরনো অ্যালবামটা নামালাম।
আমার সবচেয়ে ছোটবেলার যেই ছবিটা আছে, ওইটাতে আমার বয়স তিন কি সাড়ে তিন। স্টুডিওতে তোলা, ব্যাকগ্রাউন্ডে নীল পর্দা।
এর আগের কোনো ছবি নাই। একটাও না।
ছোটবেলায় একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এ বিষয়ে। আম্মা বলেছিলেন, তোর একদম ছোটবেলার ছবিগুলা বন্যার পানিতে নষ্ট হইয়া গেছিলো।
কথাটা আমি বিশ্বাস করেছিলাম। পঁচিশ বছর ধরে বিশ্বাস করে এসেছি।
পরদিন আমি আমার সহকর্মী রফিক ভাইকে ব্যাপারটা দেখালাম। উনি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন।
আশ্বস্ত করার কণ্ঠে বললেন, এইটা সফটওয়্যারের পুরনো সমস্যা, শিরিন। আত্মীয়দের মুখ গুলায়া ফেলে। মা-মেয়ে, বাপ-ছেলে, এইগুলাতে প্রায়ই ভুল মিল দেখায়। তুমি এইটা নিয়া মাথা ঘামায়ো না।
কথাটা উনি হালকা করে বললেন যদিও। আমার মাথা থেকে আর নামলো না।
তিন দিন পর নতুন একটা লাশ এলো।
ফার্মগেটের বাস কাউন্টারের পাশে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। ভোরবেলা লোকজন দেখতে পায়। কাছে কোনো কাগজপত্র, মোবাইল কিংবা টাকাপয়সা ছিলো না। বয়স আনুমানিক আটাত্তর বছর।
আমাকে ডাকা হলো ছবি তুলে ফাইল খোলার জন্য।
মর্গের বাইরের ঘরে ঢুকে ওনার মুখটা দেখে আমার হাত থেমে গেলো।
মানুষটাকে আমি চিনি।
উনি প্রতি বছর থানায় আসতেন। মানুষটার মুখভর্তি সাদা দাড়ি, কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ, হাতে পুরনো কাগজের বান্ডিল। ডিউটি অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা বলতেন। তারপর বেরিয়ে যেতেন।
আমি ওনাকে ছয় বছরে অন্তত চারবার দেখেছি। দুইবার পানি খেতে দিয়েছি নিজ হাতে।
গত বছর উনি আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলেন। আমি ভেবেছিলাম চোখে কম দেখেন। যাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মা, তোমার নামটা কী?
আমি বলেছিলাম, শিরিন।
উনি মাথা নেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
সেদিন বিকালে আমি রেকর্ড রুমে ঢুকলাম। থানার পুরনো সাক্ষাৎ রেজিস্টারগুলো তাকের সবচেয়ে উপরে থাকে। ধুলায় ভরা, বাঁধাই খুলে যাওয়া।
আমি নয়ই মার্চের পাতাগুলো খুঁজতে লাগলাম।
রেজিস্টারগুলো সাল ধরে সাজানো। প্রতিটা খাতা আধা হাত পুরু। একটা করে নামাই। নয়ই মার্চের পাতাটা বের করি, তারপর আবার তুলে রাখি।
দুই হাজার সালের খাতায় প্রথম নামটা পেলাম। তারপর দুই হাজার এক। তারপর দুই হাজার দুই।
ছয় নম্বরটার পর আমার হৃৎস্পন্দন গেলো থেমে। হাত কাঁপা শুরু হলো।
চব্বিশটা এন্ট্রি পেলাম।
প্রতি বছর নয়ই মার্চ। একই নাম, আব্দুল বারেক। একই ঠিকানা, নরসিংদী। বিষয়ের ঘরে কথা পর্যন্ত এক, মামলা নম্বর ৪৭/৯৯ সংক্রান্ত খোঁজ।
আর শেষ ঘরে, যেখানে অফিসারের মন্তব্য লেখার কথা, প্রতিবার ঘুরেফিরে তিনটা মাত্র শব্দ। কোনো তথ্য নাই।
শেষ ছয়টা এন্ট্রি আমার নিজের হাতের লেখা।
রাতে বাসায় ফিরে আমি আব্বার সামনে গিয়ে বসলাম। হাতে ফাইলের প্রিন্ট কপি।
যথাসম্ভব কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললাম, আব্বা, নিরানব্বই সালের নয়ই মার্চ তেজগাঁওয়ে যেই কেসটা হইছিলো, আপনি ওইদিন ডিউটিতে ছিলেন?
আব্বা কাগজটার দিকে তাকালেন। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
আমি ভেবেছিলাম উনি জিজ্ঞেস করবেন, এইটা কী? কিংবা বলবেন মনে নাই। উনি কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম গলায় বললেন, বসো।
তারপরের কথাটুকু আমি ওনার ভাষ্যমতেই লিখছি।
আমরা তিনজন গেছিলাম। সকাল সাতটার দিকে খবর আসছিলো। ঘরে দুইটা লাশ। ভিক্টিম স্বামী-স্ত্রী। কে মারছে, ক্যান মারছে, আজ পর্যন্ত কেউ জানে না।
তিনটা ঘর আমরা খুঁজছি। কিছু পাই নাই। শেষে গিয়া পাইলাম খাটের নিচে।
একটা ফুটফুটে বাচ্চা মাইয়া। বয়স দুই কি আড়াই। খাটের নিচে বইসা আছিলো। কান্দে নাই, শব্দও করে নাই। মুখ জুইড়া ভয়ের ছাপ। আমারে দেইখা ছোট্ট হাতটা বাড়াইয়া দিছিলো।
আমি একটু থেমে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর?
তোর মায়ের কোল এগারো বছর খালি আছিলো, শিরিন। ডাক্তার দেখাইছি, পীরের কাছে গেছি, কিচ্ছুতে কোনো কাজ হয় নাই।
আমি বাচ্চাটারে কোলে নিয়া গাড়িতে উঠছি। রিপোর্টে লিখছি, ঘরে জীবিত কাউরে পাওয়া যায় নাই।
ঘরে তখন কোনো শব্দ ছিলো না। বারান্দার দরজাটা খোলা ছিলো। বাইরে থেকে গাড়ির হর্নের শব্দ আসছিলো থেমে থেমে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি জানতেন যে একটা লোক প্রতি বছর থানায় আসতো?
আব্বা হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লেন।
তারপর বললেন, প্রথম দশ বছর আমি নয়ই মার্চ তারিখে ছুটি নিতাম।
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। জিজ্ঞেস করার মতো কিছু বাকি ছিলো না।
আব্দুল বারেক ছিলেন আমার নানা। ছবির ওই মহিলা আমার মা।
লোকটা পঁচিশ বছর ধরে নরসিংদী থেকে বাসে করে ঢাকা আসতেন শুধু একটা প্রশ্ন করার জন্য। মেয়ে আর জামাইয়ের লাশ উনি পেয়েছিলেন। নাতনির লাশ পাননি। রিপোর্টে যেহেতু লেখা ছিলো ঘরে জীবিত কেউ ছিলো না, উনি ধরে নিয়েছিলেন বাচ্চাটাও মরে গেছে।
উনি আসলে সারাজীবন একটা লাশ খুঁজতে এসেছেন। যেই লাশটা কোনোদিন ছিলোই না।
ওনার লাশ আঞ্জুমানের গাড়ি নিয়ে গেছে। আমি কিছু দাবি করিনি। করার মতো কোনো কাগজ আমার হাতে নাই। ডিএনএ পরীক্ষা করাতে গেলে আব্বার নামে মামলা হবে। মানুষটার বয়স তিয়াত্তর বছর। হাঁটুর ব্যথায় হাঁটতে পারে না।
আমি জানি এইটা কোনো যুক্তি না। তবু চুপ করে আছি।
সেদিন রাতে থানা খালি হয়ে গেলে আমি রেজিস্টার খাতাটা টেবিলে রাখলাম।
পঁচিশ নম্বর এন্ট্রিটা এবার লিখলাম নিজের হাতে।
তারিখ লিখে নামটা লিখলাম যত্ন করে, আব্দুল বারেক। ঠিকানা, নরসিংদী। বিষয়ের ঘরে লিখলাম, নাতনির খোঁজ।
আর শেষ ঘরে, যেখানে চব্বিশবার লেখা হয়েছিলো কোনো তথ্য নাই, সেখানে লিখলাম, পাওয়া গেছে।
আমার সরকারি কাগজে যেই নামটা লেখা, ওইটা আমার না। আমার আসল নামটা পুরনো একটা জিডির কপিতে লেখা আছে, নূরজাহান। বাসায় সবাই নাকি নূরী ডাকতো।
পঁচিশ বছরে এই নামটা একজন মানুষই মনে রেখেছিলো।
গত বছর উনি আমার দিকে আর্দ্র চোখে তাকিয়ে নামটা জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি ভাগ্যের ফেরে ভুল নামটা বলেছিলাম। তারপর ওনাকে বিদায় করেছিলাম এক গ্লাস পানি খাইয়ে।
এন্ট্রি নম্বর পঁচিশ
তাইমুর মাহমুদ শমীক

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেহদান, শব ব্যবচ্ছেদ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী ~ ডাঃ অমিত পান

আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে কারণেই হোক, ভেবে কিংবা না ভেবে, একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে এনেছেন। বাস্তবিক পক্ষে, এটা ঠিক একটা নয় তিনটে ভাগে বিভক্ত। ১) মারা যাওয়ার পর দেহ/শব দান, ২) অঙ্গ দান আর ৩) অঙ্গের মধ্যে পড়লেও যার আলাদা কিছু গুরুত্ব আছে তা হলো নেত্রদান। আমার অগ্রজ ডাঃ সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী বলেছেন, চক্ষুদানের অন্য মানে আছে তাই নেত্রদান বলাই ভালো। 

Uploaded Image এর মধ্যে পরিবারের সম্মতিক্রমে মৃতদেহ দান কতটা জরুরি সেটা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সত্যিই কি এর উপযোগিতা আছে, না আমরা প্রগতিশীল ধ্যানধারণার বশবর্তী হয়ে মৃত্যুর পরেও কিছু একটা করে যাওয়ার অদম্য উৎসাহেই এই পথের শরিক হবার প্রয়াসী হই? সত্যিই কি কোনো 'মেডিকেল রিসার্চে' এই শরীর কাজে লাগে? 



আসলে, বর্তমান মেডিকেল শিক্ষার ক্যারিকুলামে অ্যানাটমি শিক্ষাদানে কিছু পার্থক্য হয়েছে, আমাদের বা পুরোনো সময়ের থেকে। আমরা কয়েকজন করে একটা 'বডি' ডিসেকসন করতাম নিজেরাই। শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে হলেও ডিসেকসন নিজেদেরই করতে হতো। তখন অ্যানাটমি পড়া হতো দু বছর ধরে। এখন, অ্যানাটমি শিক্ষার সময়সীমা কমেছে, আর তার ফলে কোপ পড়েছে অনেক সময় নিয়ে ডিসেকসনের উপর। এখন, মূলত শিক্ষকরাই ডিসেকসন করেন এবং ছাত্রছাত্রীরা তা দেখে জ্ঞানলাভের চেষ্টা করে। ফলে, ডিসেকসনের জন্য কলেজ পিছু 'বডি' তুলনামূলকভাবে কম লাগে। তবে, আমাদের সময়ে রাজ্যে মেডিকেল কলেজ ছিল সাতটি, আর এখন সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে তা একচল্লিশ। সুতরাং, সব মিলিয়ে চাহিদা অন্তত কম থাকার কথা নয়।
এ ছাড়াও, বর্তমান পদ্ধতি যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কিনা সে প্রশ্নও আছে। ভালোভাবে ডিসেকসনের অভ্যাস ছাড়াই পরবর্তী কালে শল্যচিকিৎসায় অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা কতটা সঠিক হচ্ছে এবং এটাই মেনে চলা উচিত কিনা, সে প্রশ্নও রয়েছে।

ডিসেকসন ছাড়াও cadaver বা শব যে কাজে লাগে তা হলো হাতেকলমে অভ্যাস কোনো জটিল বা নতুন পদ্ধতিতে অপারেশন করার আগে। ডাঃ সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী জানাচ্ছেন, মেডিকেল কলেজে heart transplant অপারেশন সাফল্যের সঙ্গে করার আগে বহুবার মহড়া দিতে হয়েছে শবদেহের উপরে। আর এই সফল মহড়ার পরেই মেলে মেডিকেল কলেজে রোগীর উপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের ছাড়পত্র বা প্রয়োজনীয় 'লাইসেন্স'।
অর্থোপেডিক বা সার্জিকাল অপারেশনেও কোনো নতুন পদ্ধতি কতটা বাস্তবে সম্ভবপর, তা অন্তত প্রাথমিক ভাবে দেখার সর্বোত্তম ক্ষেত্র হলো শবদেহ।
আর, ডাক্তারি পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় bone, skeleton ও viscera এর উৎস তো এই শবদেহই.....

আমাদের সময়ে মেডিকেল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে প্রথম দিনে সমস্ত department ঘুরিয়ে দেখানো হতো। জানিনা এখন হয় কিনা। 
অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টে প্রফেসর সমর মিত্র সকলকেই তিনটি জিনিস বলতেন, ১) ওনার ঘরে একটি ছবি ছিল যেখানে একটি কঙ্কাল আলিঙ্গন করতে উদ্যত এক সুন্দরী রমণীকে আর একজন সাদা অ্যাপ্রন পড়া মানুষ চেষ্টা করছে তাকে ঠেকাতে। স্যার জিগ্যেস করতেন এর মানে কী, তারপর নিজেই বলতেন, "যত সুন্দরই হোক, মৃত্যু তাকে গ্রাস করবেই, ডাক্তারের কাজ সেটা যতটা সম্ভব ঠেকিয়ে রাখা"।

২) উনি অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টের হলে একটি ঘড়ির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন যাতে লেখা আছে, 'Whatever thy hand findeth to do, do it at once.' এটার বিশদ ব্যাখ্যা প্রয়োজন নেই। তবে, একটু সংশয় আছে, শেষের শব্দ দুটি নিয়ে। 'at once' ছিল বলেইতো মনে হচ্ছে, যদিও বাইবেলের বাণী 'do it with thy might'.

৩) পরিশেষে জিগ্যেস করতেন, "Who will teach you the anatomy?" আমার মনে আছে, আমি যে ব্যাচে ছিলাম, সেই ব্যাচে ছিল বীরভূমের তপন মণ্ডল। সে বলে ফেললো, "স্যার আপনি"। অননুকরণীয় 'টোনে' স্যারের উত্তর, "No, dead body will teach you the anatomy." সেই অমোঘ বাক্য যা মানব দেহ সম্পর্কে মানুষের এতো দিনের লব্ধ জ্ঞানের মূল সূত্র!!

কিন্তু মানবদেহ সম্পর্কে জ্ঞানলাভের এই সহজ রাস্তা কোনোদিনই সহজ ছিল না। মৃতদেহ নিয়ে সংস্কার-আচার, প্রচলিত রীতিনীতি, ধর্মীয় অনুশাসন চিরকালই দুর্লঙ্ঘ‍্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শব ব‍্যবচ্ছেদের। যেখানে যেটুকু হয়েছে, তাও অপরাধীদের মৃত‍্যুদণ্ড কার্যকর করার পরে।
প্রথম শব ব‍্যবচ্ছেদ কে করেন বলা শক্ত। ভারতবর্ষে সুশ্রুত কি শব ব‍্যবচ্ছেদ করেছিলেন? 'সুশ্রুত সংহিতা'য় নাকি উল্লেখ আছে শবদেহের ব্যবচ্ছেদ ছাড়া মানবদেহ সম্পর্কে জ্ঞানলাভ সম্ভব নয়,এই কারণে কী করে শবদেহ প্রস্তুত করতে হবে তাও উল্লেখিত আছে। কিন্তু, সরাসরি শব ব্যবচ্ছেদের বর্ণনা নেই। আসলে সুশ্রুতের আনুমানিক সময়কাল ও তার নামে প্রাপ্ত সর্বাধিক পুরাতন লিপি/পুঁথির ব্যবধান হাজার বছরেরও বেশি। বিভিন্ন সময়ের পর্ব, ধর্মীয় অনুশাসন এসব পেরিয়ে মূল ভাষ্য কতটা ও কী পরিমাণ রক্ষিত হয়েছে, বলা কঠিন। তাছাড়া, অনেক শতাব্দী ধরে ভারতে চিকিৎসাশাস্ত্র, বিজ্ঞান, গণিত, দর্শনের পুরোনো পুঁথি ও জ্ঞানের ভান্ডার রক্ষিত থাকতো বৌদ্ধ মঠ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। সেগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় হারিয়ে গেছে বিশাল ঐতিহ্য। জানা সত্যিই সম্ভব নয় বিভিন্ন বিভাগে তৎকালীন ভারতবর্ষ বিশ্ব জ্ঞানসম্পদে ঠিক কোন অবস্থানে ছিল।

অবাক ব্যাপার প্রায় দেড় হাজার বছরের বেশি সময় ধরে চিকিৎসাবিদ্যা চলে এসেছিলো পুঁথিগত শিক্ষা ও মানবতর মানে পাখি, বাঁদর, শুকর ইত্যাদির দেহ ব্যবচ্ছেদের উপর। আলেকজান্দ্রিয়ায় গ্রীক চিকিৎসক হিরোফিলাস ও তার সাথী ইরাসিস্ট্রেটাসের খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মানবদেহ ব্যবচ্ছেদের ইতিহাস থাকলেও তার কোনো নথি নেই, কারণ তা সবই ভস্মীভূত হয়েছিলো আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরির অগ্নিকাণ্ডে। এর পরে যার কথা প্রায় ধ্রুব সত্য হিসাবে গণ্য করা হয়েছে তিনি হলেন রোমের গ্রীক চিকিৎসক ক্লডিয়াস গ্যালেন। গ‍্যালেনের মানবদেহ সরাসরি দেখার যথেষ্ট সুযোগ ছিল, কারণ তিনি ছিলেন গ্ল‍্যাডিয়েটরদের চিকিৎসক। কিন্তু তার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ রয়েছে এক ধরণের বাঁদর ও শুয়োরের উপর। তার ধারণা ছিল, এদের শরীরের আভ‍্যন্তরীণ গঠন মানবদেহেরই সমান। বস্তুত, প্রায় এক হাজার বছর ধরে গ‍্যালেনের পর্যবেক্ষণ ছিল ধ্রুব সত‍্য। প্রথম প্রশ্ন তোলেন আরব চিকিৎসক ইবন্-আল নাফিস ও পরবর্তী কালে ইবন্ সিনা, যদিও ধর্মীয় বিধিনিষেধ এড়িয়ে এরা কেউ নিজে শব ব‍্যবচ্ছেদ করেছিলেন, এ রকম কোনো তথ‍্য নেই। যদিও তাদের বর্ণনা অনেক ক্ষেত্রেই এতটা বাস্তবানুগ যা কারুর না কারুর পর্যবেক্ষণ ছাড়া সম্ভব নয়।

ইউরোপে প্রকাশ‍্যে মানবদেহ ব‍্যবচ্ছেদ করা হয় চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমে ইতালির বোলোগনাতে। মৃত‍্যুদণ্ড প্রাপ্ত অপরাধীর মৃত‍্যুর পরে তার শব ব‍্যবচ্ছেদ করেন মনডিনো ডি লিজজি। ধর্মীয় বিরোধিতা সত্ত্বেও সম্রাট ফ্রেডেরিক দ্বিতীয়র অনুজ্ঞা ও স্থানীয় বিচারকের উৎসাহ তার রক্ষাকবচ হয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে রেনেশাঁর প্রাণকেন্দ্র হিসাবে পরিচিত ইতালির পাদুয়ার শিক্ষক চিকিৎসক আন্দ্রেআস ভেসালিউস মানবদেহের অভ‍্যন্তরের অসাধারণ সব চার্ট তৈরি করেন, যা অ‍্যানাটমি জগতের অমূল‍্য সম্পদ হিসাবেই গণ‍্য হয়। শুধু চিকিৎসকরাই নয় শিল্পীরাও তাদের শিল্পকে বাস্তবানুগ ও জীবন্ত করার উদ্দেশ‍্যে শব ব‍্যবচ্ছেদের সাহায‍্য নেন। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি নাকি একাই ত্রিশটির বেশি শব ব‍্যবচ্ছেদ করেন।আনতোনিও দেল পোলাইউলো ও তার ভাই, মাইকেলেঞ্জেলো এরাও কেউ পিছিয়ে ছিলেন না।

তবে, ভাবার কোনো কারণ নেই, চার্চ ও তার ধর্মীয় অনুশাসন এই সমস্ত কার্যকলাপকে প্রশ্রয় দিয়েছিল। বরং ঠিক উল্টো। 

স্পেনীয় চিকিৎসক মাইকেল সার্ভেটাস প্রথম 'পালমোনারি সারকুলেশন' এর সঠিক তথ‍্য প্রতিষ্ঠিত করেন (যদিও এ বিষয়ে গ‍্যালেনের ভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা আগেই করেছিলেন আরব চিকিসকরা)। সার্ভেটাসের কাজের পদ্ধতিতে ধর্মীয় সংস্থা এমনিতেই ক্ষুব্ধ ছিল, তার উপর আবার সার্ভেটাস প্রচলিত কিছু ধর্মীয় ধ‍্যানধারণা বিশেষত doctrine of trinity(ঈশ্বরের তিন রূপ, পরম পিতা-পুত্র যীশু-holy spirit) নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ফল হয় অতি মারাত্মক। প্রোটেস্টান্ট জন ক‍্যালভিনের নির্দেশে/অনুমতিক্রমে জেনেভায় তাকে জ‍্যান্ত পোড়ানো হয় heresy এর অভিযোগে, অন‍্যদিকে ফ্রান্সের ক‍্যাথলিকরাও তাকে মৃত‍্যুদণ্ড দেয় আর তাকে না পেয়ে, বহ্নুৎসব করে তার বইএর, প্রায় একই সময়ে। বস্তত তার সমস্ত বই এর সব কপি আগুনে দগ্ধ করা হয়। 'পালমোনারি সারকুলেশন' নিয়ে তার লেখা অবশিষ্ট ছিল গোপনে তিন বা চারটি লাইব্রেরিতে। সার্ভেটাস যীশুকে Eternal son of God হিসাবে স্বীকার না করে বলেন, Son of eternal God......
এর পঞ্চাশ বছরের মধ‍্যেই জীবন্ত দগ্ধ হন জিয়োরদিনো ব্রুনো, এবার সরাসরি পোপের এলাকায় ও নির্দেশে।

শব ব‍্যবচ্ছেদ কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি, ধর্মীয় অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও। যদিও পাদুয়া, প‍্যারিস ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ‍্যালয়ে শব ব‍্যবচ্ছেদ চালু রাখতে নানা কৌশল করতে হয়। কখনো মৃত‍্যুদণ্ডের পর অপরাধীর দেহ সংগ্রহ করে, কখনো গরীব মানুষকে তার নিকট আত্মীয়ের funeral এর সমস্ত খরচ বহন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে, আরও পরে স্রেফ কবর থেকে চুরি করে বা কবরচোরের কাছ থেকে দেহ ক্রয় করে, ব‍্যবচ্ছেদের ব‍্যবস্থা করা হতো। এডিনবার্গে দুজন আইরিশ তো আরও এক ধাপ এগিয়ে মানুষ খুন করে দেহ বিক্রি করতে আরম্ভ করে। তাতে নাকি পরিশ্রম অনেক কম ছিল। বিচারে দুজনের একজন উইলিয়াম বার্কের মৃত্যুদণ্ডের সঙ্গে শবদেহ প্রকাশ্যে ব্যবচ্ছেদের আদেশ হয়(১৮২৯)। অবশ‍্য এর আগেই ১৭৫২ সালে ব্রিটেনে 'মার্ডার অ‍্যাক্টে' খুনের শাস্তি হিসাবে মৃত‍্যুদণ্ড ও দেহ ব‍্যবচ্ছেদের নিদান দেওয়া হয়, যাতে খুনীদের যথাযথ funeral না হয়। ধরে নেওয়া হয়েছিলো এতে খুনীরা ভয় পাবে !! বার্কের কঙ্কাল এখনো রক্ষিত আছে এডিনবার্গ মেডিকেল স্কুলে, আর তার ডাইরি তারই চামড়াতে বাঁধানো অবস্থায় রয়েছে 'সার্জেন হল মিউসিয়ামে'। 

এর আগে ব্রিটেনে তো বহুদিন শব ব‍্যবচ্ছেদ নিষিদ্ধ ছিল। আবার ব্রিটিশ চিকিৎসক উইলিয়াম হার্ভে যিনি পাদুয়া থেকে পাশ করে কেমব্রিজে যোগদান দেন এবং মানবদেহে রক্তসঞ্চালনের সামগ্রিক সত‍্যকে প্রতিষ্ঠা করেন, তিনি নাকি নিজের পিতা ও ভগিনীর মৃত‍্যুর পর শব ব‍্যবচ্ছেদ করেন। 
অবশেষে ১৮৩২ সালে, ব্রিটেনে unclaimed bodyকে শব ব‍্যবচ্ছেদের জন‍্য ব‍্যবহার করার আইন পাশ হয়(Anatomy Act 1832)। নিকট জনের মৃতদেহ শব ব্যবচ্ছেদের জন্য দানকেও স্বীকৃতি দেয় এই আইন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই আইন পাশ হয় ১লা আগষ্ট। তার দু মাস আগেই মৃত‍্যুর পরে নিজের দেহের শব ব‍্যবচ্ছেদের নির্দেশ দিয়ে যান বিখ‍্যাত দার্শনিক ও জুরিষ্ট জেরেমি বেনথাম। তাঁর আরও একটা নির্দেশ বা অনুরোধ ছিল, সেটা হলো ব‍্যবচ্ছেদের পর যেন তাঁর স্মারক বা memorial তৈরি হয় তাঁরই দেহকে auto-icon হিসাবে ব্যবহার করে। University College London(UCL) এ স্টুডেন্টস্ সেন্টারের প্রবেশ পথে একটি কাঁচের সো-কেসে জামা-প‍্যান্ট-টুপি সজ্জিত তাঁর কঙ্কাল এখনো বসে আছে তাঁরই নিজস্ব চেয়ারে, হাতে তাঁর প্রিয় লাঠি।

অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্ট একটা নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলো। ১৮৩৬ সালের ১০ই জানুয়ারিতে মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি হলে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদ করেন মধুসূদন গুপ্ত, সাহায্যে রাজকৃষ্ণ দে, উমাচরণ শেঠ,দ্বারকানাথ গুপ্তু,নবীনচন্দ্র মিত্র।

দেহটা অবশ্যই ছিল কোনো unclaimed body..

এর একশো বছরেরও পরে, বিংশ শতাব্দীর ষাট - সত্তরের দশক থেকে মরণোত্তর দেহদানের রেওয়াজ শুরু হয় দুনিয়া জুড়ে, যা আমাদের দেশে গতিশীল হয় বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে। ২০১২ সালে IFAA(International Federation of Associations of Anatomists) মূলতঃ তিনটি recommendation করে, ১) First person voluntary body donation should be the only ethical primary source for anatomical dissection 
২)explicitly denounce practice of use of unclaimed bodies or executed criminals.
যুক্তিটা ছিল এরা কেউ মৃত্যুর আগে নিজের দেহকে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়ে যায়নি।
৩) it allowed institutions to charge nominal fees strictly to cover operational costs only, as for example preparation, maintenance and transport cost.
মানবদেহ বা কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেনা বেচা কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়।
তিন নম্বর অধ্যায়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পৃথিবীতে বেশ কয়েকটি দেশ আছে, যাদের ডাক্তারি শবব্যবচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় body import করতে হয়। ঠিক কী কী শর্তে তারা import করে, নিশ্চয়ই তথ্য খুব পরিষ্কার নয়।

কয়েক বছর আগে ১৬৫ দেশে যেখানে মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, তাদের কাছে তথ্য চাওয়া হয় অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টে শবব্যবচ্ছেদ ও দেহের জোগানের উৎস জানতে। ৭১টি দেশ তথ্য পাঠায়, তার মধ্যে ৬৮টি দেশে মেডিকেল কলেজ/স্কুলে শবব্যবচ্ছেদ হয়। ২২টি দেশে পুরোটাই এবং ৬ টি দেশে বেশির ভাগ donated body দিয়ে, ২১টি দেশে পুরোটা ও ১৮টি দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে unclaimed body ব্যবহার করা হয়, একটিকে other source দেখানো হয়েছে। (Acad Med, 2018 Mar 20, Bodies for Anatomy Education in Medical Schools: An overview of the Sources of Cadavers Worldwide) তথ্য বহু দেশ পাঠায় নি, সুতরাং other sources এর সংখ্যাটা নিশ্চয়ই বাড়বে।
Uploaded Image


ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে ৪৫০টি সরকারি ও ৩৭৩টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে, বেসরকারিতে আসন সংখ্যা সরকারির থেকে দশ হাজারেরও বেশি। সব মিলিয়ে এই বছরে ভর্তি হতে চলেছে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার ছাত্রছাত্রী।এই তথ্যগুলি সামনে আসা ভীষণ জরুরি যে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজগুলো বিশেষ করে বেসরকারি কলেজগুলো ডিসেকশনের শবদেহ কীভাবে জোগাড় করে বা কতটা জোগাড় করতে পারে। ভারতবর্ষ কিন্তু মোটেই donated bodyতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। Demand ও supply এর মধ্যে ফারাক যথেষ্ট। NMC এর নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছরে ভর্তি হওয়া দশজন ছাত্র পিছু dissection এর জন্য একটি করে body লাগবে, অন্য প্রয়োজন তো ছেড়েই দিলাম। বাস্তবিক ক্ষেত্রে যে ভাবে মেডিকেল কলেজ বিশেষত বেসরকারি কলেজ বাড়ছে, তাতে বহু কলেজে ২০ বা ৩০ নয়, 'বডি' পিছু ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ৪০-৫০ এও চলে যাচ্ছে। যে কোনো সময়ে এদের 'স্বীকৃতি' প্রত‍্যাহিত হয়ে যেতে পারে। সত্যি করে বলতে গেলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কলেজ ও আসন সংখ্যা বাড়িয়ে একটা চূড়ান্ত অরাজকতা তৈরি করা হয়েছে মেডিকেল শিক্ষা জগতে। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে কে বোঝালো জানিনা voluntary body donation এর আর সেভাবে প্রয়োজন নেই। পশ্চিমবঙ্গে শুধু অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টে ডিসেকশনের জন্যই এই বছরে 'বডি' লাগবে ৭১৫টি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য পরে কিছুটা damage control এর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু একটা সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। বস্তুত, প্রায় দু হাজার বছর ধরে এই শবদেহ ব্যবচ্ছেদকে বাধা দিয়ে এসেছে সংস্কার, প্রচলিত রীতিনীতি ও সর্বোপরি ধর্মীয় অনুশাসন। 
উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন‍্যায‍্য ধর্মীয় অনুশাসন ও সংস্কারের বিরুদ্ধে যে গণজাগরণ তৈরি হয়েছিলো, তা আবার নতুন করে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে কিছু মানুষের মধ্যে সংস্কার ও ধর্মীয় ধ্যানধারণার মূলে(fundamental) ফেরত যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টার ফলে। শুধু voluntary body donation নয়, যে কোনো বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই মৌলবাদ অবশ্যই একটা চ্যালেঞ্জ। 
সুশ্রুতের সময়ের পর ভারতে শল্যচিকিৎসা এগোনো দূরের কথা, আস্তে আস্তে হারিয়েই গেলো। নতুন করে শিখতে হলো ইউরোপীয়দের কাছে। কিন্তু, কেন? নিশ্চয়ই তৎকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় ব্যবস্থা ও পরিবেশ যথেষ্ট অনুকূল ছিল না বিজ্ঞানের অগ্রগতির পক্ষে।
 আজকের দিনেও কিন্তু সেটাই সব থেকে বড় আশঙ্কা।

সর্বশেষে, আর জি কর আন্দোলনের সময় অভিযোগ ছিল প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষ নাকি body বিক্রি করতো anatomy department বা মর্গ থেকে। এই নিয়ে পরে কোনো অনুসন্ধান হয়েছে কিনা জানা নেই। আর অনুসন্ধান কে করবে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছাড়া বাকি পুরো স্বাস্থ্যদপ্তর তো একই আছে, untouched.. সন্দীপ ঘোষ বোধহয় এখনো জেলে আছে, জানিনা কতো দিন থাকবে!!

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একান্ত অনুরোধ, তিনি যখন বিষয়টি উত্থাপন করেছেন, তখন পুরোটা দেখুন, চালু করুন Audit of cadavers specially the donated bodies, এটাকে আলাদা একটা কমিশন/বিভাগের অধীনে নিয়ে আসুন। প্রিয়জনের দেহ যারা দিয়ে আসছেন, তাদেরও তো জানার অধিকার আছে, সেই দেহ কী কাজে লাগলো বা আদৌ লাগলো কিনা।
এই স্বচ্ছতাটা তো নিশ্চয়ই আশা করা যেতেই পারে।
আর তার সঙ্গে চালু করুন দেহ/অঙ্গ দানের জন্য একটি কেন্দ্রীয় যোগাযোগের ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ সরাসরি contact করতে পারে যে কোনো দিন যে কোনো সময়ে.......

পশ্চিমবঙ্গে বহু দিন কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন বোঝাই যেতোনা। এখন ভালোই বোঝা যাচ্ছে, তবে আশা করবো কথার থেকে তার কাজের পরিচয় আরও অনেক ফলপ্রসূ হবে, সর্ব অর্থেই........