শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

সুর ~ উদয় রহমান

আমার দাদির একটা নিয়ম ছিল। রাত বারোটার পর গান বাজানো যাবে না।
কেন জিজ্ঞেস করলে বলতেন, “জ্বিন আসে।” আমরা হাসতাম। দাদি রাগ করতেন না। শুধু
বলতেন, “হাসনের জিনিসই ভাবো। খালি বারোটার পরে গান বাজাইয়া নাচন দিও না।”
দাদি মারা গেছেন দশ বছর হলো। আমি এখন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। নিকেতনে একটা স্টুডিওতে বসে সারাদিন অন্যের গান মেশা‌ই, মুভি, নাটক বিজ্ঞাপনের গানের সুর বসাই, ভোকাল মিক্স করি। সুরই আমার পেশা, সুরই আমার ভাত। এবং আজ, এই লেখাটা লিখতে বসছি, কারণ দাদি হয়তো ঠিকই বলতেন।
আমার মায়ের একটা হারমোনিয়াম ছিল। কলকাতার দ্বারকিন কোম্পানির, হারমোনিয়ামটা আমার মায়ের দাদার আমলের। জিনিসটা বহু বছর খাটের নিচে পড়ে ছিল। গত বছর বের করে দেখি বেলো ফাটা, তিনটা রিড বসে গেছে। স্টুডিওর এক বংশীবাদক ঠিকানা দিয়ে বললেন,

"নবাবপুরের গলিতে যান। সুর ঘর। করিম ওস্তাদরে খুঁইজা বাইর করেন। তয় একটা কথা,” বংশীবাদক একটু থামলেন,

“ওস্তাদের কথাবার্তা একটু অন্যরকম। যা কয়, সব বিশ্বাস কইরেন না। আবার সব অবিশ্বাসও কইরেন না।”
নবাবপুরের সেই গলিটা এত সরু যে রিকশা ঢোকে না। ইলেকট্রিকের দোকান, তালা চাবির দোকান, তার ফাঁকে একটা দরজা, ওপরে রঙিন কালিতে হাতে লেখা সাইনবোর্ড। "সুর ঘর" প্রোপ্রাইটর: মোঃ হাসন রাজা। সাইনবোর্ডের নিচে ছোট করে লেখা: এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়।
"সব কিছু? শুধু বাদ্যযন্ত্র না। সব কিছু।" মনে মনে ভাবলাম হাসন রাজা গান বাজনা, জমিদারি সব বাদ দিয়ে এখন বাদ্যযন্ত্র রিপায়ারের দোকান দিলো!"
ভেতরে ঢুকে মনে হলো একটা বাদ্যযন্ত্রের পঙ্গু হাসপাতালে ঢুকেছি। দেয়াল জুড়ে ঝুলছে তার ছেড়া বেহালা, দোতারা, ভাঙা সেতার, কোনায় ময়লা জমা জীর্ন এক তানপুরা। আর মেঝেতে, জলচৌকির ওপর, সাদা লুঙ্গি আর বাসন্তী ফতুয়া পড়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। ধবধবে সাদা দাড়ি, চোখে পুরু চশমা, কানে একটা হিয়ারিং এইড। ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। যে মানুষের ব্যবসাই শব্দ, তার কানে যন্ত্র।
আমার মনের কথা পড়ে ফেলার মতো করে উনি বললেন, “অবাক হইতেছো? সারা জীবন সুর শুনতে শুনতে কান দুইটা শেষ। ডাক্তার কয় আর বছর দুয়েক। তারপর পুরা নীরবতা।” উনি হাসলেন। “আমি চিন্তিত না। কান বন্ধ হইলে ক্ষতি নাই। আসল শোনাটা কানে হয় না।”
“তাহলে কীসে হয়?”
“শিরায় শিরায়।” উনি নিজের বুকে টোকা দিলেন। “শব্দ জিনিসটারে তুমি কী মনে করো? শুধু কান দিয়া শোনার জিনিস! শব্দ হইলো কাঁপন। তুমি সাউন্ডের কাজ করো, তুমি দেখো না, কনসার্টে বেইজ বাজলে বুকের মইধ্যে কেমন ধুম ধুম করে? ওইটা কানে শোনো, না বুকে গিয়ে লাগে?”
আমি হারমোনিয়ামটা নামিয়ে রাখলাম। উনি ঢাকনা খুলে ভেতরে হাত দিলেন, চোখ বন্ধ করে রিডগুলিতে আঙুল বুলালেন, যেভাবে ডাক্তার রোগীর নাড়ি চেক করে। তারপর বললেন, “আহারে। কতদিন কেউ বাজায় না।”
“ঠিক করা যাবে?”
“যাবে।” উনি মুখ তুললেন। “তয় একটা কথা। আমি বান্ধুম চাইরশো বত্রিশে। তোমাগো স্টুডিওর চাইরশো চল্লিশে না। রাজি থাকলে রাইখা যাও।”
আমি ভুরু কোঁচকালাম। “চার শো বত্রিশ মানে? এ ফোর ইকুয়ালস ফোর থার্টি টু? ওস্তাদ, সারা পৃথিবীর সব বাদ্যযন্ত্রের স্ট্যান্ডার্ড টিউনিং ফোর ফরটি হার্টজে। ইন্টারন্যাশনাল…”
“জানি।” উনি হাত তুললেন। “উনিশশো উনচল্লিশ সাল থেইকা স্ট্যান্ডার্ড। তার আগে কী আছিল জানো?”
জানতাম না। স্বীকার করলাম।
“বত্রিশ। হাজার বছর ধইরা ৪৩২। গ্রিকরা বত্রিশে বানত, মিশরিরা বত্রিশে বানত, আমাগো ওস্তাদরা, লালন ফকিররা বত্রিশে বানত। তারপর ১৯৩৯ সালে, ঠিক যখন হিটলার দুনিয়াত আগুন দিতাছে, তখন কারা জানি ঠিক করল, না, আইজ থেইকা দুনিয়ার সব গান আট নম্বর উপরে বাজবো। হইয়া গেলো তোমাগো স্ট্যান্ডার্ড চাইরশো চল্লিশ।” উনি আমার দিকে ঝুঁকলেন। “তুমি সুরের মানুষ। তুমিই কও। যুদ্ধের মইধ্যে দুনিয়ার মানুষের এত জরুরি কাম পড়ল কেন সুর বদলানির?”
“হয়তো টেকনিক্যাল কারণ…”
“হইতে পারে।” উনি মাথা নাড়লেন। “আমি মূর্খ মানুষ, ষড়যন্ত্র বুঝি না। আমি খালি একটা জিনিস বুঝি। আট নম্বরের ফারাকটা খালি কানে ধরা পড়ে না, কিন্তু শইলে ধরা পড়ে। বত্রিশের গান শুনলে মনে হয় নদীর পাড়ে বইসা আছি। বৃষ্টির ঝুমঝুম, চারশো চল্লিশের গান শুনলে মনে হয় কিসের জানি তাড়া। কীসের তাড়া, জানি না, খালি তাড়া। তুমি ভাইবা দেখো, আশি বছর ধইরা গোটা দুনিয়ার মানুষ ওই তাড়ার মইধ্যে গান শুনতাছে। মোবাইলে, বড় সাউন্ড বক্সে, দোকানে, অনুষ্ঠানে সব জাগায়। সবাই খালি কয়, অস্থির লাগে, অস্থির লাগে। কেউ জিগায় না, কেন এত অস্থিরতা!”
আমি বললাম, “কিন্তু বদলাইলো কারা? কেন?”
“হুনছি অনেক কথা।” উনি রিডটা আলোয় ঘুরাতে ঘুরাতে বললেন। “ইতালির এক মস্ত ওস্তাদ আছিলেন, ভার্দি সাব। অপেরার বাদশা। উনি জান লড়াইয়া গেছিলেন চারশো বত্রিশ হার্টজ বাঁচানের লাইগা। চিঠি লেখছেন, দরবার করছেন। পারেন নাই। আর এক গবেষক সাহেব বই লেখছেন, কামডা নাকি করছে হিটলারের প্রচারমন্ত্রী আর আমেরিকার এক বড়লোকের ফাউন্ডেশন, মিলামিশা কইরা। মতলব আছিল মানুষরে ভিতরে ভিতরে অস্থির কইরা রাখা। অস্থির মানুষ চালানো সোজা। সত্য মিথ্যা আল্লায় জানে। আমি খালি একটা জিনিস দেখছি। যুদ্ধ থামছে আশি বছর, মানুষের ভিতরের যুদ্ধ থামে নাই। আর সেই যুদ্ধের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা বাজতেছে চাইরশো চল্লিশে।”
উনি হারমোনিয়ামের রিডটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে ফিরলেন। “টেসলা সাবের নাম হুনছো না? গাড়ি না, যেই লোকে দুনিয়ারে বিজলি দিছে? সেই সাব কইয়া গেছেন, মহাবিশ্বের রহস্য বুঝতে হইলে শক্তি, কাঁপন আর ঢেউয়ের ভাষায় ভাবতে হবে। দুনিয়ার সব থেইকা ছোড যেই কণা, সেইটাও নাকি আসলে একটা কাঁপতে থাকা সুতার মত। বোঝলা কথাডা? পাথর, মাটি, তোমার হাড্ডি, এমনকি তোমার চিন্তাডাও, সবই কাঁপন। তাইলে দুনিয়াডারে কী বলা যায়?” উনি হাসলেন।
“দুনিয়াডা একটা তানপুরা। খোদার তানপুরা। আর আমরা সবাই ওই তানপুরার এক একটা তার। এখন কও, তারের কাম কী? তারের কাম সুরে থাকা, টিউনে থাইকা বাজা। বেসুরা তার বাজতে থাকলে দুনিয়ায় শান্তি কেমনে আসবো, অশান্তি ছাড়া আর কিছু থাকবে?”
আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লোকটার কথা আধপাগলের মতো, অথচ ফেলে দিতে পারছি না। পেশাগত জীবনে আমি নিজে কতবার খেয়াল করেছি, কিছু মিক্স শুনলে অকারণে ক্লান্ত লাগে।
“পৃথিবীরও একটা সুর আছে, জানো?” ওস্তাদ বলে চললেন। “জার্মান এক সাহেব মাইপা বাইর করছে। মাটি আর আসমানের মাঝখানে একটা কাঁপন সারাক্ষণ চলতাছে।"
"জ্বী এই ব্যপারে আমার জানা আছে। এটাকে বলে শুমান রেজোন্যান্স।"
"আমার ওস্তাদ কইতেন অন্য নাম।”
উনি একটু থামলেন। "কইতেন, এইটা দুনিয়ার জিকির। সব কিছু জিকির করে, বুঝলা। পাথর করে, গাছ করে, পশুপাখি করে, আকাশ সাগর সবেই করে। খালি মানুষ নিজের কানে শুনতে পায় না।”
“আপনি শুনেছেন?”
উনি উত্তর দিলেন না। হারমোনিয়ামের একটা রিড খুলে আলোর দিকে ধরে পরীক্ষা করতে লাগলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, “সাতদিন পরে আইসো। জিনিস রেডি থাকবো।”
সাতদিন পর গিয়ে দেখি হারমোনিয়াম নতুন যৌবন পেয়েছে। ওস্তাদ বললেন, “শুনো।”
উনি একটা চেনা সুর ধরলেন, কিন্তু গানের কথা মনে এলো না। এবং আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারব না কী হলো। শব্দটা কানে ঢুকল না। শব্দটা বুকে ঢুকল। মনে হলো কেউ আমার পাঁজরের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে খুব পুরনো একটা তালা খুলে দিল। আমার চোখ ভিজে উঠছিল, অকারণে, এবং সেটা লুকানোর জন্য আমি মাথা নিচু করে রইলাম। জানালার কার্নিশে দুইটা চড়ুই এসে বসল। গলির কুকুরটা দরজায় এসে চুপ করে বসে পড়ল। উনি থামার পরেও ঘরটা কয়েক সেকেন্ড ধরে বাজতে থাকল।
“বুঝলা কিছু?” ওস্তাদ নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
“এটা… এটা কী হলো?”
“কিছুই হয় নাই। খালি যন্ত্রটারে তার নিজের সুরে ফেরত দিছি।” উনি আমার দিকে তাকালেন। “তোমারে ফেরত দিছি। মানুষের শইলের সত্তর ভাগ পানি। আর পানি কাঁপনের কথা শোনে। জাপানি ডাক্তার সাব পরীক্ষা কইরা দেখছেন। পানিরে সুন্দর সুর শুনাইয়া বরফ করলে বরফের ফুলের নকশা বানালে তা হয় নিখুঁত সুন্দর। আর বিকট শব্দ, গালাগালি শুনাইয়া বরফ করলে ফুলডা হয় ভাঙা, তুবড়ানো, লন্ডভন্ড।
এইবার হিসাবডা করো। তোমার ভিতরে সত্তর ভাগ পানি, আর তুমি সকাল থেইকা রাইত পর্যন্ত কানে কী ঢালতেছ এই ঢাকা শহরে? হর্ন, ঝগড়া, মিটিংয়ের চিল্লানি, ব্রেকিং নিউজ, মিটিং, মিছিল। ভিতরে রোজ কী জমতেছে, সুন্দর নকশা না ভাঙন? তুমি এতক্ষণ সঠিক সুরে কাঁপলা। এই প্রথম, হয়তো বহু বছরে। এইজন্যই চোখে পানি আইছে। পানি পানিরে চিনছে।”
এরপর থেকে আমি প্রায়ই যেতাম। কাজ থাকুক না থাকুক। ওস্তাদ চা খাওয়াতেন আর কথা বলতেন। সেই কথাগুলি আমি লিখে রাখতাম, রাতে, মনে করে করে।
সুরাইয়ার সাথে দেখা হলো তৃতীয় সপ্তাহে।
সেদিন দোকানে ঢুকে দেখি জলচৌকিতে ওস্তাদ নেই। বসে আছে এক তরুণী, কোলে একটা বেহালা। চোখ বন্ধ, কাধ বেহালার গায়ে ঠেকানো, কি সে মলিন বিষন্ন সুন্দর সুর তাতে বাজছে সে বুঝাতে পারবো না। আমি ঢুকতেই চোখ না খুলে বললো, “বসেন। দাদাজান ওষুধ আনতে গেছেন।”
আমি বসলাম। মেয়েটা আরও মিনিট দুয়েক তার বন্ধ চোখে সুরের সাধনা চালালো। তারপর চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনিই সেই সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার? দাদাজান আপনার কথা বলেন। কয়, পোলাডার কান আছে, খালি কানের ব্যবহার জানে না।”
“মানে?”
সে উত্তর না দিয়ে বেহালায় পরপর দুইটা টান দিল। “ফারাক কি, বলেন তো।”
আমি শুনলাম। মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। “একই তো লাগল।”
“এই জন্যই দাদাজান ওই কথা কয়।” সে বেহালা নামিয়ে রাখল। “প্রথমটা চাইরশো চল্লিশ, পরেরটা বত্রিশ। আপনে সারাদিন যেইটা বেচেন, আর যেইটা হারাইয়া ফেলছেন।”
মেয়েটার নাম সুরাইয়া। ওস্তাদের নাতনি, স্কুলে গান শেখায়, আর ওস্তাদের চোদ্দ পুরুষের বিদ্যার একমাত্র ওয়ারিশ।
কথার মাঝখানে গলিতে একটা রিকশা বেল বাজাতে বাজাতে গেল। সুরাইয়া এমনভাবে মুখ কোঁচকাল “শুনছেন?
বেলটা গত সপ্তাহ থেইকা বেসুরা। কমা খানিক নাইমা গেছে। রোজ শুনি আর রোজ মেজাজ খারাপ হয়।”
“রিকশার বেলেরও সুর থাকে?”
“সব কিছুর সুর থাকে।”
সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল। “সাইনবোর্ড পড়েন নাই?”
যাওয়ার সময় সে বললো, “একটা কথা।
দাদাজানের সব কথা বিশ্বাস কইরেন না।”
আমি বললাম, “আবার সব অবিশ্বাসও করব না?”
সুরাইয়া প্রথমবারের মতো হাসল। বলল, “ভালই তো চিনছেন তারে।”
এরপর থেকে সুর ঘরে আমার যাওয়ার কারণ দুইটা হয়ে গেল। এই তথ্যটা আমি ওস্তাদকে কোনোদিন বলিনি। বলার দরকারও ছিল না। বুড়া জানে না, বুঝে না এমন কিছুই মনে হয় নাই।
সুরাইয়ার সাথে আমার সবচেয়ে বড় তর্কটা হয়েছিল এক সন্ধ্যায়, দোকানে, ওস্তাদ তখন মসজিদে। ও হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আপনি স্টুডিওতে কী কী বানান?”
আমি গর্ব করে বললাম, বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড, আইটেম গান।
সুরাইয়া অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আপনি জানেন আপনি আসলে কী বানান? আপনি হিপনোটিস্ট, সুরকার সাহেব। মানুষের অজান্তে মানুষের মন চালানোর যন্ত্র বানান। খালি জানেন না।”

“বাড়ায়া বলতেছো।”
“একটা দুঃখের গান ছাড়েন, তারপর নিজেরে খেয়াল কইরেন। পাঁচ মিনিট পরে দেখবেন কাঁধটা কখন নুইয়া গেছে, মুখের হাসিটা কখন মিলাইছে, আপনি নিজেও টের পান নাই। কেউ আপনারে কয় নাই দুঃখী হন। এইটারে কী কয়? হুকুম মানা।”
"মস্তিষ্কে ডোপামিন বইলা একটা জিনিস আছে, আনন্দের কেমিক্যাল। মাপজোক কইরা দেখা গেছে, প্রিয় গান শুনলে মগজ ঠিক ততটুকু ডোপামিন ছাড়ে যতটুকু ছাড়ে প্রেমে পড়লে। বোঝলেন? আপনার হাতের মিক্সিং কনসোলটা মানুষের মগজের কেমিস্ট্রি বদলানোর মেশিন।”
“ভালো কথা। তাতে ক্ষতিটা কী?”
“ক্ষতি?” সুরাইয়ার গলা নেমে গেল।
“আমেরিকায় এক কনসার্টে দশটা মানুষ মারা গেছে, পায়ের নিচে চাপা পইড়া, শুনছেন? সবাই কয় ভিড়ের দুর্ঘটনা। ভিড়টা বানাইলো কে? হাজার হাজার মানুষ এক বিটে মাথা নাড়তেছিল, এক কাঁপনে শরীর দুলাইতেছিল। হার্টের তালটারে টাইনা নিজের তালে নেয়। তখন মানুষের যুক্তিবুদ্ধি কমে, নিজের উপর দখল কমে, ভিড়ের লগে মিশা যাওয়ার টান বাড়ে। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না, ঢেউ হয়া যায়। আর ঢেউয়ের কোনো বিবেক নাই।” ও থামল।
“হিটলার যুদ্ধের সময় এই বিদ্যা জানতো। মশাল, এক ছন্দের স্লোগান, এক কাঁপনে লাখ মানুষের গলা। ওই কাঁপন মানুষরে ব্যক্তি থেইকা দল বানাইতো। আর দল তখন যা করছে, একলা মানুষ জীবনেও করত না। ইতিহাস পড়েন নাই?"
"আপনার মত সবজান্তা দাদা তো আমার নাই। আমি কেমনে জানবো এগুলা।"
সুরাইয়া বলেই যাচ্ছে, দাদা নাতনির একই স্বভাব, লেকচার শুরু করলে সহজে থামে না,
"শব্দ দিয়া মানুষরে এক করা যায়, আবার শব্দ দিয়াই মানুষ ভাঙা যায়। যে জাতিরে শেষ করতে চাও, আগে তার গান নষ্ট করো। গান হইলো জাতির সবচেয়ে গভীরের শিরা।”
আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ আমার মনে পড়ছিল, স্টুডিওতে ক্লায়েন্ট প্রায়ই বলে, ভাই, বিটটা আরও অ্যাগ্রেসিভ করেন, মানুষ যেন বইসা থাকতে না পারে।
“তাইলে করণীয় কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “কানে তুলা দিয়া ঘুরবো?”
“না।” সুরাইয়া হাসল। “বাছবেন। মানুষ মুখে কী ঢুকাইবো দশবার দেখে, আর কানে সারাদিন যা আসে তা-ই ঢালে। পচা খাবারে পেট খারাপ হয় একদিনে, টের পাওয়া যায়। পচা শব্দে মন খারাপ হয়, সহজে টেরও পাওয়া যায় না। যেই গান শোনার পরে আপনার ভিতরটা অস্থির লাগে, রাগ রাগ লাগে, ওই গান আপনার খাদ্য না, ওইটা বিষ, যত মিঠাই লাগুক। আর যেই শব্দ শোনার পরে ভিতরটা শান্তি পায়, ওইটা ওষুধ।”
“প্রকৃতির শব্দগুলো।” ও জানালার দিকে তাকাল। “বৃষ্টির শব্দে ঘুম আসে ক্যান জানেন? ওই কাঁপন মগজরে কয়, বিপদ নাই, শুইয়া পড়ো। বৃষ্টির রাইতে বাঘও শিকারে বাইর হয় না। পাখির ডাকে সকালে মন ফুরফুরা লাগে, কারণ পাখি ডাকে খালি নিরাপদ ভোরে, মগজ এইটা লাখ বছর ধইরা জানে। আর সাগরের ঢেউয়ের শব্দ মানুষরে মনে করাইয়া দেয়, সে নিজের চাইতে বড় কিছুর অংশ। খেয়াল করছেন কোনোদিন, বন, নদী, বৃষ্টি, পাখি, প্রকৃতির সব শব্দ ওই চারশো বত্রিশের ঘরের আশেপাশে? আর আমরা থাকি সারাদিন চল্লিশে বান্ধা শহরের ভিতরে। পাহাড়ে গেলে মনে হয় এতদিনে শ্বাস নিতে পারতেছি, সাগরপাড়ে গেলে মনে হয় কতদিন পরে নিজেরে খুঁইজা পাইলাম। আসলে আমরা কিছু খুঁইজা পাই না।”
আমরা ফিরা যাই। যেই কাঁপনে আমরা বানানো, সেই কাঁপনে।”
সেই সন্ধ্যার পর থেকে আমার কাজ করার হাতটা বদলে গেল। কনসোলে বসলেই মনে হতো, সুরাইয়া আর তার দাদা আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। সুরের টিউন ৪৩২ এ নামিয়ে দিতাম। ক্লায়েন্ট টের পেত না।
ওস্তাদ একদিন বললেন, “আজান শুনলে বুকে টান লাগে ক্যান জানো? ওই শব্দ তুমি শুনছ জন্মের পর থেইকা, দিনে পাঁচবার। শব্দ বারবার শুনলে সে মগজের ভিতরে রাস্তা কাইটা নেয়। যত শুনবা, রাস্তা তত গভীর। সুরা ফাতিহা রোজ প্রতি নামাজে পড়ায় ক্যান? বিপদের দিন যখন মাথা কাম করবো না, তখন ওই রাস্তা দিয়াই শব্দ নিজে নিজে বাইর হয়া আসবো। আর মুসলমানের ঘরে বাচ্চা জন্মাইলে সবার আগে ডাইন কানে আজান দেয় ক্যান, কোনোদিন ভাবছ? দুনিয়ায় আইসা বাচ্চাটা পয়লা যেই শব্দ শুনবো, সেইটা যাতে ঠিক সুরে বান্ধা থাকে। মানুষের টিউনিং শুরু হয় জন্মের পয়লা মিনিটে। আরেকটা জিনিস কই, বিজ্ঞানীরা মাইপা দেখছে। বুকের ভিতর দিয়া একটা লম্বা রগ নামছে, কইলজা ছুঁইয়া, পেট পর্যন্ত। আরবি মাখরাজের কাঁপন, ধীরলয়ে তিলাওয়াতের গুনগুন, ওই রগটারে জাগাইয়া দেয়। আর ওই রগ জাগলে বুক ধীর হয়, পেট শান্ত হয়। দোয়া পড়লে বুকটা হালকা লাগে ক্যান, এতদিনে বুঝলা? এইটা খালি সওয়াব না রে ভাই। এইটা শরীর। খোদা মানুষের শইলের ভিতরেই তার নিজের কমান্ডের লাইন বসাইয়া রাখছেন।”
এই পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হতে পারে, ভালোই তো, এক জ্ঞানী বুড়ার সাথে এক যুবকের আলাপের গল্প। মনে হওয়ারই কথা। আসল গল্পটা আমি ইচ্ছা করে শেষের জন্য রেখেছি।
এক বিকালে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ওস্তাদ, আপনার সাইনবোর্ডে লেখা, এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়। সব কিছু মানে কী?”
ওস্তাদ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর উঠে ভেতরের ঘর থেকে একটা পুরনো টিনের বাক্স আনলেন। বাক্সের ভেতরে কাপড়ে মোড়া একটা বাঁশের বাঁশি। কালো হয়ে যাওয়া, মাথায় রুপার কাজ।

“আমার ওস্তাদের ওস্তাদের ওস্তাদের… হিসাব রাখি নাই কত পুরুষ। এই বাঁশি বাজে না। মানে, আমরা বাজাই না।” উনি বাঁশিটা ছুঁলেনও না, শুধু তাকিয়ে রইলেন। “জার্মানিতে একটা শহর আছে। হ্যামেলিন। সাতশো বছর আগে ওই শহরে এক বাঁশিওয়ালা আসছিলো। প্রথমে এক সুর বাজাইলো, শহরের সব ইন্দুর নদীতে গিয়া ডুবল। শহরের লোকেরা তারে ওয়াদামত টাকা দিলো না। সে তখন আরেক নতুন সুর বাজাইলো। এইবার বাইর হয়া আসলো শহরের একশো তিরিশটা বাচ্চা। ঘুমঘুম চোখে, মা বাপের ডাক, নিষেধ কিছুই কানে যায় না, খালি সুরটাই কানে যায়। পাহাড়ের ভিতরে ঢুইকা গেল। আর ফিরে নাই। মানুষ কয় রূপকথা। ওই শহরের পুরানা দলিলে ঘটনাটা লেখা আছে, তারিখসহ। এই জিনিস যে আইজও চলতেছে না তুমি কেমনে জানবা?”
উনি আমার দিকে তাকালেন। “এইবার আসল কথাটা শোনো। এক বাঁশি। ইন্দুরের লাইগা এক সুর, মানুষের লাইগা আরেক সুর। মানে বোঝো? প্রত্যেক জিনিসের একটা নিজের কাঁপন আছে, আর ওই কাঁপনটা খুঁইজা পাইলে জিনিসটারে যেদিকে ইচ্ছা টানা যায়। সাপুড়ের বীণ সাপরে টানে। মাজারের জিকির মানুষরে ঘোরায়। প্রশ্ন হইলো, সবচেয়ে উপরের সুরটা কী? যেই সুরে সব বান্ধা?”
আমি চুপ করে রইলাম।
“আল্লাহ দুনিয়া বানাইছেন ক্যামনে, কোরানে আছে। কুন ফায়াকুন। হও, আর হইয়া গেল। খেয়াল কইরো, উনি হাত দিয়া বানান নাই, মাটি দিয়া শুরু করেন নাই। শুরু করছেন একটা শব্দ দিয়া। আর শেষটা হইবো ক্যামনে তাও তো জানো? সেইটাও শব্দ। ইস্রাফিল ফেরেশতা সৃষ্টির পয়লা দিন থেইকা শিঙা ঠোঁটে লাগাইয়া খাড়াইয়া আছেন। এক ফুঁয়ের অপেক্ষায়। চিন্তা কইরা দেখো ব্যাপারটা। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বাদক, অনন্তকাল ধইরা রেডি হইয়া আছেন, খালি হুকুম আসে নাই বইলা বাজান নাই। তাইলে দুনিয়াটা কী দাঁড়াইলো? দুই নোটের মাঝখানের একটা গান। পয়লা নোটটা বাইজা গেছে, শেষ নোটটা এখনো বাজে নাই। আমরা সবাই ওই মাঝখানের সুরটার তালেই দুলতে থাকি। এইবার বুঝলা, সাইনবোর্ডে ক্যান লেখছি এখানে সব কিছু সুরে বাঁধা হয়? সব কিছু আসলেই সুরে বান্ধা। শুরু থেইকা শেষ পর্যন্ত। এখন চিন্তা করো, ওই পয়লা শব্দটার কাঁপন কত আছিল?”
আমি শুধুই হা হয়ে শুনছি ওনার কথাবার্তা।
ওস্তাদের গলা নেমে ফিসফিসে ঠেকল। “আমার ওস্তাদ মরনের আগে একবার, খালি একবার, ওই সুরের ষোলো ভাগের এক ভাগ খুজে পাইছিলেন। তার নিজের গলায়, বাদ্যযন্ত্রে না। আমি পাশে বসা। আমি তোমারে কসম কইরা কইতাছি, ঘরের বাতাস ভারি হয়া গেছিল, দেয়ালের চুন ঝরছিল, আর আমার মনে হইছিল আমি জন্মের আগের কোনো জায়গার কথা মনে করতে পারতাছি। তারপর ওস্তাদ থাইমা গেলেন। কইলেন, বাকিটা বাজাইলে ফেরত আসন যাইবো না।”

“ফেরত আসা যাবে না মানে?”
“মানে ওই বাচ্চাগুলার মতো।” উনি হামেলিনের দিকে ইশারা করলেন, যেন শহরটা পাশের ঘরে। “সুর যখন ডাকে, তখন যাইতে হয়। যেই সুর আমরা মানা করতে পারি না। রাইত বারোটার পরে দুনিয়া চুপ হয়া নিজের জিকিরে ফিরা যায়। তখন তুমি যেই সুর বাজাইবা, সেই সুর বহুদূর যায়। এবং,” উনি থামলেন, “সব কান দুনিয়ার না।”
“জ্বীন?”
“নাম দিয়া কী করবা।” ওস্তাদ বাক্সটা বন্ধ করলেন। “যে শোনে, সে শোনে। আর যে শোনে, সে মাঝে মাঝে কাছেও আসে।”
এই ঘটনার মাস দুয়েক পরের কথা। বৃহস্পতিবার রাত। স্টুডিওতে কাজ শেষ হতে হতে অনেক দেরি হয়ে গেল। বাসায় ফেরার পথে মনে পড়ল, ওস্তাদ আমার জন্য একটা পুরনো মান্ডোলিন ঠিক করে রেখেছেন, নিতে বলেছিলেন। ঘড়িতে তখন বারোটা বেজে দশ।
গলিতে ঢুকে আমি থমকে গেলাম।
গলিটা নিস্তব্ধ। শুধু নিস্তব্ধ না, অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। ঢাকা শহর রাত বারোটায়ও এতটা চুপ হয় না। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে, কি যে অপূর্ব বিষন্ন সুর ঘরের বন্ধ দরজার ফাঁক গলে ভেসে আসছিলো।
এবং সুরটা একা ছিল না। একটা যন্ত্র বাজছিল, বাঁশির মতো, অথচ বাঁশি না। আর তার সাথে, খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসের মতো, একটা মানুষের গলা মিশে ছিল। মেয়েলি মোলায়েম গলা। খুব চেনা ধাঁচের, অথচ ধরতে পারছিলাম না কার।
আমি জীবনে বহু গান শুনেছি। পেশাই আমার শোনা। ওই সুরের সাথে কোনো কিছুর তুলনা আমি দিতে পারব না। শুধু বলতে পারি, সুরটা শুনে আমার একইসাথে মনে হচ্ছিল মায়ের কথা, মনে হচ্ছিল দাদির কথা, মনে হচ্ছিল এমন সব জায়গার কথা যেখানে আমি কোনোদিন যাইনি অথচ চিনি। আমার পা মাটিতে গেঁথে গিয়েছিল। এবং তখন আমি জিনিসটা দেখলাম।
গলির ইঁদুরগুলি। ড্রেনের ধার থেকে, ডাস্টবিনের পাশ থেকে, ওরা বেরিয়ে এসেছে। কেউ দৌড়াচ্ছে না। ওরা বসে আছে। সার বেঁধে, চুপ করে, সুর ঘরের দরজার দিকে মুখ করে, যেভাবে মসজিদে মানুষ সারি বেধে বসে।
সুরটা থেমে গেল।
Uploaded Image
কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলল। ওস্তাদ দাঁড়িয়ে। ওনার মুখ দেখে আমার বুক ধক করে উঠল। উনি কাঁদছিলেন, এবং একইসাথে ওনার মুখে এমন একটা আলো, যেটার কোনো নাম আমি জানি না।
উনি আমাকে দেখে চমকালেন না। শুধু বললেন, “শুনছো?”
আমি মাথা নাড়লাম। “কতখানি শুনছো?”
“গলির মাথা থেকে।”
উনি কী যেন হিসাব করলেন মনে মনে। তারপর বললেন, “যাও। বাড়িত যাও। দৌড়ায়া যাইবা না, হাঁইটা যাইবা, তয় পিছে ফিরবা না।” আমি ঘুরে হাঁটা দিতেই পেছন থেকে ডাকলেন, “শোনো।” আমি থামলাম, ফিরলাম না। উনি বললেন, “তোমার দাদি ঠিক আছিলেন। মুরুব্বিগো কথা ফালাইও না।”
ওইটাই শেষ কথা।
পরের শুক্রবার গিয়ে দেখি সুর ঘর তালাবন্ধ। তার পরের শুক্রবারও। পাশের দোকানদার বলল, “ওস্তাদের খবর জানি না ভাই। তয় একটা জিনিস আপনের লাইগা রাইখা গেছে।” সে ভেতর থেকে আমার সেই মান্ডোলিনটা আনলো, সাথে একটা ভাঁজ করা কাগজ।
কাগজে কাঁপা হাতে লেখা:
“সুরটা এতদিন আমি খুঁজতাম। কয়দিন ধইরা টের পাইতেছিলাম, সেই সুরটাও আমারে খুঁজে। বৃহস্পতিবার রাইতে আমরা দুইজন দুইজনরে পাইছি। চিন্তা কইরো না। যেই সুরের ডাকে হামেলিনের বাচ্চারা হাসতে হাসতে গেছিলো, সেই ডাক খারাপ কিছু হইতে পারে না। খালি আফসোস, তোমারে পুরাটা শোনাইতে পারলাম না। তোমার হারমোনিয়াম, মান্ডোলিন চারশো বত্রিশে বান্ধা। ওইটারে কোনোদিন চল্লিশে তুইলো না। রোজ বাজাইও, দুনিয়া তোমারে সারাদিন যেই সুরে বান্ধে, রাইতে ঘরে ফিরা নিজেরে নিজের সুরে টিউনে ফিরাইয়া নিও।”

সুর ঘর অবশ্য বেশিদিন বন্ধ থাকেনি।
মাস খানেক পর গলি দিয়ে যাচ্ছি, দেখি দরজা খোলা। ভেতরে জলচৌকিতে বসে আছে সুরাইয়া। দাদার জায়গায়, দাদার ভঙ্গিতে। আমাকে দেখে মুখ তুলল। চোখ দুটো লাল, তবে শান্ত।
“দোকান তো বন্ধ করা যাইবো না,” সে বলল, যেন আমি প্রশ্ন করেছি। “শহর ভরা বেসুরা জিনিস। কেউরে তো সুরে বান্ধন লাগবো।”
আমি অনেকদিন কথাটা জিজ্ঞেস করব করব করে করিনি। সেদিন করলাম। “সুরাইয়া। ওই রাতে যন্ত্রের সাথে একটা গলাও ছিল। মেয়ের গলা। তুমি ছিলা?”
সে বেহালার ধুলা মুছছিল। হাতটা থেমে গেল। অনেকক্ষণ পর বলল, “আমি ওই রাইতে চিটাগাংয়ে। খালার বাসায়।”
“তাহলে গলাটা কার?”
“দাদাজান একটা কথা কইতেন।” সুরাইয়া মুখ তুলল না। “সুরটা যখন কাউরে নিতে আসে, একলা আসে না। চেনা গলা ধইরা আসে। যেই গলা শুনলে মানুষ আর না কইতে পারে না। দাদাজানের কাছে মনে হয় গেছিল ওনার মায়ের গলায়। দাদাজানের মা গান গাইতেন, জানেন তো।”
তারপর সে মুখ তুলল, এবং আমার সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার কাছে যেদিন আসবো, কার গলায় আসবো, ভাবছেন কোনোদিন?”

গলির ভেতর দিয়ে একটা রিকশা বেল বাজিয়ে গেল। সেই বেসুরা বেল। আমরা দুজনেই চমকে উঠলাম, তারপর দুজনেই হেসে ফেললাম। ভয়ের পরের হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি হাসি।
এই গল্পের বাকি অংশে একটা বিয়ে আছে। সুরাইয়ার সাথে আমার। প্রেমের অংশটুকু আমি ইচ্ছা করে বাদ দিলাম। কিছু সুর সবাইকে শোনাতে নেই।

শুধু এটুকু বলি, কাবিনের দিন সুরাইয়া তার দাদার সেই টিনের বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলো, “এইটা এখন আমাদের সংসারের জিনিস। শর্ত একটাই। ঢাকনা খোলা যাইবো না।” আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কোনোদিনই না?” সে বলেছিল, “যেদিন খোলার দিন আসবো, সেদিন আপনারে জিগানো লাগবো না। বাক্স নিজেই জানান দিবো।”
এরপর দুই বছর কেটে গেছে। আমি এখনো স্টুডিওতে সারাদিন চার শো চল্লিশে অন্যের গান বাঁধি। পেট চালাতে হয়। কিন্তু রোজ রাতে বাসায় ফিরে মায়ের হারমোনিয়ামটা বাজাই। সুরাইয়া পাশে বসে গলা মেলায়। দুনিয়া আমাদের সারাদিন যে সুরে চালায়, রাতে আমরা নিজেদের নিজেদের টিউনে ফিরিয়ে নিই।
আর গত মাসে আমাদের মেয়ে হয়েছে।
হাসপাতালের কেবিনে, নিয়ম মতো, আমি ওর ডান কানে আজান দিলাম। এবং একটা আশ্চর্য জিনিস হলো। আজানের প্রথম শব্দে বাচ্চাটার কান্না থেমে গেল। এক সেকেন্ডে। নার্স হেসে বলল, “মাশাল্লাহ, কী শান্ত বাচ্চা।” সুরাইয়া আমার দিকে তাকাল, আমি সুরাইয়ার দিকে।
বাচ্চাটা শান্ত হয়নি। বাচ্চাটা শুনছিল। মন দিয়ে, পেশাদার কানে শুনছিল। ওর টিউনিং হচ্ছিল, জীবনের প্রথম মিনিটে, ওর বড়দাদার ওস্তাদের কথামতো।
মেয়ের নাম রেখেছি আয়াত।
কাল রাতের কথা। শহর একদম চুপ হয়ে গিয়েছিল এবং সেই নীরবতার ভেতরে মায়ের হারমোনিয়ামের রিডটা কেঁপে উঠল। সাথে সেই বক্সে রাখা বাদ্যযন্ত্র।
আর বিছানায়, ঘুমের ভেতরে, আমার এক মাসের মেয়ে সেই একই সুরে গুনগুন করে উঠল। এক চুল এদিক ওদিক না। সুরাইয়ার হাত অন্ধকারে আমার হাত খুঁজে নিল। ও ফিসফিস করে বলল, “শুনছো?” আমি বললাম, “হুঁ।” ও বলল, “ভয় পাইছ?” আমি অনেকক্ষণ ভেবে সত্যি উত্তরটা দিলাম। “না।”
সত্যিই ভয় পাইনি। কারণ ততদিনে আমি ব্যাপারটা বুঝে গেছি।
এই সব জানার পর থেকে আমার একটাই অভ্যাস বদলেছে। আমি এখন শব্দ বাছি। যেভাবে মানুষ খাবার বাছে। আপনি পেটে কী ঢালেন তার হিসাব রাখেন, ক্যালরি গোনেন, ভেজাল দেখেন। কানে সারাদিন কী ঢালছেন, তার হিসাব শেষ কবে করেছেন? যেই শব্দ শুনে ভেতরটা তেতে ওঠে, সেটা বিনোদন না, সেটা ডোজ। আর যেই শব্দ শুনে ভেতরটা শান্ত হয়, বৃষ্টি, তিলাওয়াত, মায়ের গলা, ভালো একটা গান, সেটার দাম ওষুধের চেয়ে বেশি। মহাবিশ্ব সবসময়ই কথা বলছে, সুরে চালাচ্ছে, ওস্তাদ বলতেন। প্রশ্ন হলো আমরা কী শুনছি, আর কারটা শুনছি।
তবে দাদির নিয়মটা আমি এখনো মানি। রাত বারোটার পর আমাদের বাসায় কেউ গান বাজায় না।

সমস্যা একটাই।
মাঝে মাঝে, খুব গভীর রাতে, সুর নিজেই আমাদের বাসায় বেজে ওঠে।
ওইটা তো আর আমার হাতে না।

মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

বীণা দাস আমার ছোটদিদু ~ সুব্রতা দাসগুপ্ত

গত বেশ কয়েকবছর ধরে ফেসবুকের পাতায় এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কোনও এক ইতিহাসের অধ্যাপকের একটি কাল্পনিক লেখা ঘোরাফেরা করছে। সমাজমাধ্যমে এইধরনের অনেক লেখা ঘোরাফেরা করে, সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া কর্মহীনের পক্ষেই সম্ভব, আপাতত তাই যথাসম্ভব উপেক্ষাই করি। বীণা দাসকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্পটিকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি কারণ বীণা দাস আমার ছোটোদিদু। আমি নিজে তাঁকে ছোটবেলায় অল্পস্বল্প দেখেছি। তার চেয়েও বড় কথা আমার মা, এবং অন্যান্য মাসীদের জীবনযাত্রায় ওপর ওঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব থেকে বুঝেছি, গোটা পরিবারের কাছেই তিনি কতটা শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত করে আছেন। সমাজমাধ্যমে প্রচলিত গল্পের উত্তরটিও সমাজমাধ্যমে, মানে ফেসবুকের জন্যেই লিখেছিলাম। পড়ে অনেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কেউ কেউ দুঃখিতও হয়েছেন। কিন্তু এতদিন পরে আবার ‘উৎস মানুষ’ সম্পাদক মহাশয় আমায় অনুরোধ করলেন বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত আকারে লিখতে। আমি সম্পাদক মহাশয়কে অনুরোধ করব ওই লেখাদুটি অবিকৃত অবস্থাতেই প্রকাশ করতে। এই লেখাটি থাক সংযোজন হিসেবেই। 

‘বিস্তৃত আকারে’ কিছু লেখা অবশ্য মুশকিল। কারণ আগেই বলেছি, আমার ছোটদিদুকে আমি দেখেছি মাত্রই কয়েকবার। সেও ছোটবেলায় ওঁদের আনোয়ার শা রোডের সরকারি আবাসনে। আমরা বেশ অনেকে মিলেই সেখানে যেতাম। উনি যে ছোটদের দেখে বিশেষ খুশি হতেন সেটা বুঝতে পারতাম ওখানে গিয়ে। এ ছাড়াও ওঁর সঙ্গে দেখা হত আমার নিজের দিদু, বীণা দাসের সেজদিদি পুণ্যপ্রভা বসু (দাস)-এর বাড়িতে। বড়মাসী ধীরা ধরের বাড়ি ছিল, সেন্ট্রাল পার্কে, সেখানেও ওঁরা খুব আসতেন। আমি সেখানেও দেখেছি বেশ কয়েকবার। সেন্ট্রাল পার্কে বড়মাসীর বাড়ি আসতেন আরেকজনও। কল্যাণী ভট্টাচার্য-বীণা দাসের ছুটুদিদি-ছাত্রী সংঘের প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীনতা সংগ্রামী, এবং অক্লান্ত সমাজসেবী। বীণা, কল্যাণী, পুণ্যপ্রভা-দের মায়ের স্মৃতিতে সরলা পুণ্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা ছাড়াও আরও কত ধরনের সমাজসেবামূলক কাজে যে কল্যাণী ভট্টাচার্য অর্থ, শ্রম ও নেতৃত্ব দিয়ে অংশ নিয়েছেন তারও কোনও যথাযথ ডকুমেন্টেশন হয়নি। কল্যাণী ভট্টাচার্যের স্বামী দিল্লীতে খুবই উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন, তাঁর জীবনযাত্রা, পোষাক আশাক বা আদব কায়দার মধ্যে একধরনের পারিপাট্য ছিল। কিন্তু কল্যাণী ভট্টাচার্য ছিলেন একেবারে বিপরীত। এত আত্মবিস্মৃত কর্মী মানুষ আমি আর দেখিনি বললেই চলে।

আমার মা ইন্দিরা, বড়মাসী ধীরা এবং মেজমাসি ইরা-এঁরা তিনজনেই আবার কল্যাণী ও বীণার বিশেষ ভক্ত ছিলেন। কল্যাণী ভট্টাচার্যের লেখা ‘জীবন অধ্যয়ন’ বইটিতে পাওয়া যাচ্ছে ধীরা তাঁর মাসির সঙ্গে বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশে দুর্ভিক্ষের সময় চট্টগ্রামে চলে যাচ্ছেন সমাজসেবার কাজে। পরবর্তী সময় বীণা দাসের পরামর্শেই সম্ভবত, এই বোনেরা কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টির সঙ্গে কাজ করেছেন। চটকল শ্রমিক পরিবারের মেয়েদের মধ্যে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি আছে অধ্যাপক শমিতা সেন-এর লেখাতেও। এই ধীরা গত হয়েছেন অল্প কিছুদিন আগে, প্রায় একশ বছর বয়েসে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে পর্যন্তও রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ থেকে শুরু করে সুনীল গাঙ্গুলী পর্যন্ত বিভিন্ন লেখকের লেখার অনুবাদ করে গিয়েছেন শুধুমাত্র বাংলার বাইরে বা দেশের বাইরে বড় হওয়া বঙ্গসন্তানদের জন্য, যারা কোনও না কোনও কারণে বাংলা ভাষায় সাহিত্যের রসাস্বাদনে সক্ষম হয়ে ওঠেনি। 

এই লেখা বীণা দাসের জন্যই। কিন্তু আগেই বললাম বীণা দাসকে আমি চিনেছি শৈশবের চোখে, সেই চেনা সমৃদ্ধ ও পূর্ণতর হয়ে উঠেছে যাঁদের সংযোগে তাঁরা হলেন এই ধীরা, ইরা ইন্দিরা প্রভৃতি আমার মা মাসীরা। তাঁরা নিজেরাই যথেষ্ট সমীহ-সম্ভ্রম উদ্রেককারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন কিন্তু বীণা দাসের প্রতি আবার তাঁদের যে আনুগত্য, সম্ভ্রম, এবং অনুরাগ দেখেছি, তা থেকে বীণা দাসের ব্যক্তিত্বের মহত্ব আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দিদি কল্যাণীর মতো একদমই আলুথালু প্রকৃতির ছিলেন না ছোটদিদু। তিনি দীর্ঘাঙ্গী, অত্যন্ত সুন্দরী এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্না ছিলেন। আমরা ছোটরা তাঁর কাছে প্রবল প্রশ্রয় পেলেও নিজের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য বড়দের নানা পরামর্শ বা অনুযোগকে তিনি এমন তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষার সঙ্গে প্রত্যাখান করতেন যে, তা দ্বিতীয়বার বলার সাহস কারও হত না। তিনি যা করবেন না সেটা তাঁকে দিয়ে করানো অথবা তিনি যা করবেন স্থির করেছেন সেটা থেকে তাঁকে নিরস্ত করা, দুইই অসম্ভব ছিল। 

কল্যাণী ভট্টাচার্য নিজের ছোটবোন সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণা করেছেন। প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় তার থেকে কয়েকলাইন তুলে দিচ্ছি। বীণা দাস সেই বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে পুরী বেড়াতে গিয়েছিলেন। কল্যাণীও ছিলেন। ওঁদের সঙ্গেই গিয়েছিলেন এক বিধবা মামী এবং তাঁর একমাত্র মেয়ে অনু। সম্ভবত সেও সেইবছর ম্যাট্রিক দিয়েছিল বীণার সঙ্গেই। স্নান করার সময় নুলিয়ার সঙ্গে অনু এবং বীণা সমুদ্রের অনেক ভিতরে চলে গিয়েছিলেন। একটা সময় মনে হয়েছিল, তাঁরা বুঝি ফিরতে পারবেন না। নুলিয়াও ওঁদের দুজনকে নিয়ে ফিরতে পারছিলেন না। বীণা তখন নুলিয়ার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলেছিলেন দুজনকে বাঁচানো সম্ভব নয়। যদি একজন বাঁচে তা হলে ওই বাঁচুক। ওকে নিয়ে তীরে চলে যাও। বীণা এরপর ভেসেই যাচ্ছিলেন, ফেরা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু এইসময় অন্য নুলিয়ারা দেখতে পেয়ে বীণাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। আরেকটি জায়গায় কল্যাণী লিখছেন, স্ট্যানলি জ্যাকসনের ওপর গুলি চালানোর পর বীণার সঙ্গে তাঁর বাবা বেণীমাধব দাস ও মা সরলা দাস-এর দেখা করানো হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘দেখুন আপনার ধরা পড়ার খবরে আপনার বাবা মায়ের কী অবস্থা হয়েছে। আপনি শুধু বলে দিন এই রিভলভার আপনি কার কাছ থেকে পেয়েছেন, আমরা আপনাকে ছেড়ে দেব।‘ বীণা নাকি একটু হেসে বলেছিলেন, “আমার বাবা এমন শিক্ষা দেননি আমায় যাতে আমি বিশ্বাসঘাতকের কাজ করব।” এরপর বীণাকে নানাধরনের অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে পুলিশ হেফাজতে। ফাঁসির ভয় তো ছিলই। কিন্তু কোনও ভয় বা প্রলোভনেই তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য এতটুকু অমর্যাদার কাজ করতে রাজি হননি। তখনও না। পরবর্তী সময়েও না। এইজন্যই বীণা দাস তাঁর পেনসনের জন্য ডি আই এর কাছে কাকুতিমিনতি করছেন এই দৃশ্যটি এত করুণার সঞ্চার করে- বীণা দাসের প্রতি নয়, ওই গল্পলেখকের প্রতি। কারণ বীণা দাসের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা বা প্রতিবেশীরা, যাঁদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, তাঁরা কেউই বীণা দাসের অর্থাভাবের কথা কখনও বলেননি বা লেখেননি। বরং সরকারি আর্থিক অনুদানগুলিকে তিনি এড়িয়ে চলতেন বলেই আমরা জানি। ১৯৬০ সালে সমাজসেবার জন্য তিনি পদ্মশ্রী পেয়েছিলেন। 

Uploaded Image বীণা দাসের শেষ জীবন সম্পর্কে যে সমস্ত তথ্য পাওয়া যায় তা এইরকম। ১৯৮৬ সালের ১৯ নভেম্বর রাত্রে তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বামী, সরকারি কলেজের অধ্যাপক জ্যোতিষ ভৌমিক মারা যান। বীণা দাসের প্রতিবেশী কল্পনা দাস বলছেন, এই সময় তাঁদের শুভানুধ্যায়ীরা খুব বেশি বেশি ওঁর কাছে আসতে থাকেন। কিন্তু এই ধরনের সহানুভুতিসিক্ত জীবন বীণার সহ্য হচ্ছিল না। তিনি বারবারই এসময়ে বলেছেন তাঁকে একটু একা থাকতে দেওয়া হোক। বলেছেন তিনি বাইরে কোথাও চলে যেতে চান। আত্মীয়বন্ধুরা প্রতিবেশীরা সকলেই আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু, ওঁর ব্যক্তিত্ব, তেজস্বিতা, এবং অগ্নিকন্যা বীণা হিসেবে তাঁর যে গরিমা ও মানসিক দৃঢ়তা-তার সঙ্গে কেউই যুঝে উঠতে পারেননি। তিরিশে নভেম্বর জ্যোতিষ ভৌমিকের স্মরণসভা ছিল। তিনি সেইরাত্রের দুন এক্সপ্রেসের টিকিট কেটে রেখেছিলেন বেনারস যাবেন বলে। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর বিকেলবেলাই তিনি এক ঘনিষ্ট প্রতিবেশীকে বলেছিলেন, এক্ষুণি হাওড়া স্টেশন চলে যাওয়া দরকার, নয়ত আবার কেউ এসে পড়বে, যাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটবে। এইভাবে তিনি বারাণসী পৌঁছন। সেখানেই কিছুদিন ছিলেন। এইসময়েও তিনি কলকাতায় চিঠি লিখে পৌঁছ সংবাদ দিয়েছেন ভাইয়ের ছেলেকে এমনকি প্রতিবেশীদেরও। প্রয়োজনমতো টাকাও চেয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ১৭ ডিসেম্বরের পর তাঁর আর কোনও চিঠি আসেনি। এমনকি পাঠানো টাকাও ফেরত আসে। তিনি উঠেছিলেন উপবন নামের একটি গেস্ট হাউসে। তারা জানায় তিনি হৃষিকেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। এরপর সকলেই খোঁজ করতে হৃষিকেশে পৌঁছন। সেখানেই পুলিশের কাছ থেকে জানা যায় ২৫ ডিসেম্বর ওখানকার একটি হসপিটালে তাঁকে ভর্তি করতে হয়েছিল এবং পরের দিন, অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বর সেখানেই তিনি মারা যান। 

এক হিসেবে দেখলে বুদ্ধ থেকে বীণা দাস পর্যন্ত কোনও মহাপুরুষের জীবনই একশ শতাংশ সফল নয়। কারণ এই পৃথিবীর কুশ্রীতা, ভীরুতা আর নীচতাকে কেউই তো পারলেন সম্পূর্ণ দূর করতে। এই ব্যর্থতার ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি বীণা দাসকে গরিয়সী মূর্তিতে পূজার বেদিতে স্থাপন করার ছলে কেউ কেউ আসলে তাঁকে অবজ্ঞা করছেন, তাঁর জীবন তাঁর শিক্ষা, তাঁর বাণী এগুলোকে অস্বীকার করছেন আর তাঁকে পরিণত করেছেন এক করুণার পাত্রে। অগ্নিকন্যা বীণার জীবনদীপের আগুনে এই সমস্ত মিথ্যা প্রচারের চির অবসান হোক, এই কামনা করি।


পূর্ব প্রকাশিত - উৎস মানুষ

শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

জামাই ষষ্ঠী ~ কৌশিক মজুমদার

সে অনেকদিনে আগের কথা। এক পরিবারে দুটি বউ ছিল ৷ ছোট বউ ছিল খুব লোভী ৷ বাড়ির মাছ বা অন্যান্য ভাল খাবার রান্না হলেই সে লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়ে নিত আর শাশু ড়ির কাছে অভিযোগ করত ‘সব কালো বেড়ালে খেয়ে নিয়েছে ’৷ বেড়াল মা ষষ্ঠীর বাহন ৷ তাই বেড়াল, মা ষষ্ঠীর কাছে অভিযোগ জানাল ৷ মা ষষ্ঠী রেগে গেলেন ৷ যার জেরে ছোট বউ-এর একটি করে সন্তান হয় আর মা ষষ্ঠী তার প্রাণ হরণ করেন ৷ এইভাবে ছোট বউয়ের সাত পুত্র ও এক কন্যাকে মা ষষ্ঠী ফিরিয়ে নেন ৷ ফলে স্বামী, শাশুড়ি ও অন্যান্যরা মিলে তাকে ‘অলক্ষণা’ বলে গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় ৷ অথচ বড় বউ পুত্রকন্যাদের নিয়ে সুখে ঘর করতে থাকে ৷

ছোট বউ মনের দুঃখে বনে চলে যান ও একাকী কাঁদতে থাকেন ৷ শেষে মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার কাছে এসে কান্নার কারণ জানতে চান ৷ সে তার দুঃখের কথা বলে ৷ তখন মা ষষ্ঠী তার পূর্বের অন্যায় আচরণের কথা বললে সে মাফ চায় ৷ ষষ্ঠী তাকে ক্ষমা করেন | এরপর বলেন — ভক্তিভরে ষষ্ঠীর পুজো করলে সাতপুত্র ও এক কন্যার জীবন ফিরে পাবে ৷ তখন ছোট বউ সংসারে ফিরে এসে ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পুজো করে ও ক্রমে ক্রমে তার পুত্র কন্যাদের ফিরে পায় ৷ এর থেকে দিকে দিকে ষষ্ঠী পুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে ৷

এদিকে বৌয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁকে বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাঁর মা-বাবা দিনের পর দিন মেয়ের মুখ দেখতে পান না। শেষে মেয়েকে দেখতে উন্মুখ মা-বাবা একবার ষষ্ঠীপূজার দিন শ্বশুরবাড়িতে আসার জন্য জামাইকে সাদরে নিমন্ত্রণ জানান। এ নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করার সাধ্যি জামাইয়ের ছিল না। ষষ্ঠী পূজার দিন শ্বশুরবাড়িতে জামাই সস্ত্রীক উপস্থিত হলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

ষষ্ঠীপূজা রূপান্তরিত হয় জামাইষষ্ঠীতে।

আসল ঘটনা একটু অন্যরকম। ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় সংস্কার ছিল কন্যা যতদিন না পুত্রবতী হয় ততদিন কন্যার পিতা বা মাতা কন্যাগৃহে পদার্পণ করবেন না ৷ এই ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিল —সন্তানধারণে সমস্যা হলে বা সন্তান মৃত্যুর (শিশুমৃত্যু তখন প্রচুর হত) ফলে কন্যার পিতামাতাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হত কন্যার বাড়ি যাওয়ার জন্য ৷ সেক্ষেত্রে বিবাহিত কন্যার মুখদর্শন কীভাবে ঘটে? তাই সমাজের বিধানদাতা জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নিলেন জামাই ষষ্ঠী হিসাবে ৷ যেখানে মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে সমাদর করা হবে ও কন্যার মুখ দর্শন করা যাবে ৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই নিয়ম একটু এদিক ওদিক করে এখনও চলছে একইভাবে...

মিষ্টির সঙ্গে জামাইদের বহুকালের সম্পর্ক। দ্বারকানাথ বিদ্যারত্ন তাঁর কবিতাকুসুমাঞ্জলি বইয়ের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন বিয়েতে কে কী চায়? তাতে বলা হচ্ছে, কন্যা চায় বরের রূপ, মাতা চান জামাইয়ের ধন, পিতা চান পাত্রের জ্ঞান, বান্ধবরা দেখেন পাত্রের কুল আর জনগণ মিষ্টি পেয়েই খুশি, মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ। 

সূর্য মোদকের জলভরা সন্দেশের গল্প সবাই জানেন। তবু একবার বলেই দি। তখন ১৮১৮ সাল। বাংলায় তখন ইংরেজ শাসন চালু হলেও আনাচেকানাচে দু-চারটে জমিদারি তখনও টিকে আছে বহাল তবিয়তে। আয় যেমনই হোক, আদবকায়দায়, ঠাটেবাটে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা পুরোপুরি বর্তমান। এমনই এক জমিদার ছিলেন ভদ্রেশ্বরের তেলিনীপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। বাড়ির মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরে মেয়ে এসেছে বাপের বাড়ি জামাই নিয়ে জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে। তখন আবার জামাইঠকানো বা বউঠকানো বহু প্রথা চালু ছিল। এখন সেগুলো বোকা বোকা মনে হলেও তখন এইসব প্রথা রমরম করে চলত। সে যাই হোক, জামাইকে ঠকাতে হবে। কী করা যায়? ঠকানোও হল আবার জামাই বাবাজীবন রাগও করতে পারলেন না, এমন কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। 
অনেক ভেবে তেলিনীপাড়ার জমিদারবাড়িতে তলব হল এলাকার নামকরা ময়রা সূর্যকুমার মোদকের। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হল এমন একটা মিষ্টি বানাতে হবে যা দিয়ে জামাই ঠকানো যাবে অথচ তাঁর মানসম্মান যেন কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়। বহু ভাবনাচিন্তা করার পর মোদক মহাশয় একটা বিশাল আকারের মিষ্টি বানালেন, যার ভেতরে জল ভরা থাকে, অথচ বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনও উপায়ই নেই। সেই মিষ্টি দেওয়া হল জামাইয়ের পাতে। মিষ্টিতে মাতোয়ারা জামাই সেই মিষ্টি হাতে নিয়ে দিলেন বিশাল এক কামড়। আর যেই না কামড়ানো, মিষ্টির ভেতরের লুকোনো জল বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিল জামাইয়ের সাধের গরদের পাঞ্জাবি। জামাই অপ্রস্তুত। হো হো করে হেসে উঠলেন শালা-শালিদের দল। ঘোমটার আড়ালে হাসিতে ভরে উঠল শাশুড়িদের মুখ আর জমিদারবাবু গোঁফে দিলেন তা। জন্ম হল জলভরার। 

ধর্মচর্চার পীঠস্থান হওয়ার জন্য গুপ্তিপাড়াকে 'গুপ্ত বৃন্দাবন' বলা হত। ক্রমে 'গুপ্ত বৃন্দাবন পল্লী', তার থেকে 'গুপ্ত পল্লী' এবং পরিশেষে গুপ্তিপাড়া নাম হয়। কথিত আছে যে গুপ্তিপাড়াতেই সন্দেশের জন্ম। এখানেই প্রথম তৈরি হয় সন্দেশের মিশ্রণ, যা মাখা সন্দেশ নামে পরিচিত। পরে সেই মাখা সন্দেশকেই আকার দিয়ে তৈরি হয় গুপো সন্দেশ। এই সন্দেশ জনপ্রিয় হলে তা 'গুপ্তিপাড়ার সন্দেশ' বা সংক্ষেপে 'গুপো সন্দেশ' বলে পরিচিতি লাভ করে। অপর মতে অবশ্য সন্দেশটি খাওয়ার সময় গোঁফে লেগে যায় বলে তার নাম হয়েছে গুঁফো সন্দেশ। 

এখানে এর একটা অন্য গল্প বলি বরং... 

মেয়েরা দুঃখ করে বলেন "বউমা কখনই মেয়ে হয় না"। 
শাশুড়ী মুখে যাই বলুন, নিজের মেয়ে আর পরের মেয়ের তফাত নাকি ঠারেঠোরে, কথার চিমটিতে ঠিক বুঝিয়ে দেন। শ্বশুর অবশ্য একটু সেফসাইডে "উনি আবার বলবেন কি? মেনিমুখো মানুষ। বউয়ের আঁচলের তলায় শুয়ে থাকে। ছেলেটাকেও বানিয়েছে তেমনি। এক আঙ্গুলে উঠায় আর বসায়। নেহাত আমি আসার পর থেকে..." 
যাক গে যাক! এসব অভিযোগ সত্যি কি মিথ্যে, সে তর্কে যাব না। কিন্তু বেচারা জামাইদের অবস্থা আরো খারাপ। সিরিয়াসলি। 

বউদেরবেলায় ভিতরে ভিতরে চোরা স্রোত যাই থাক না কেন, বাইরে একটা আবরণ থাকে। জামাইদের বেলা সেটুকুও নেই। খুল্লম খুল্লা যাতা বলা হচ্ছে সেই কবে থেকে। খেয়াল করতে গিয়ে ব্যোমকে গেলাম মাইরি!! বাংলায় জামাইদের নিয়ে যে কটা প্রবাদ প্রবচন আছে খেয়াল করে দেখুন, একটাও সুখকর না। সুখকর কি বলি, রীতিমত অপমানজনক। একটা একটা করে বলা যাক-
শুরুতেই "যম, জামাই ভাগ্না/ তিন না হয় আপনা"। জাস্ট ভাবুন, জামাইয়ের সঙ্গে যমের তুলনা। যমদুয়ারে তাও কাঁটা বিছানোর মন্ত্র আছে, কিন্তু জামাই ঠেকাই কি দিয়ে? কেউ কেউ যমকে আবার জন দিয়ে রিপ্লেস-ও করেন। একই ফ্লেভারের এর একটা আছে 'মামা ভাগনে জামাই শালা, আর পোষ্য পুত / ঘরে ঘরে বিরাজ করে, এই পাঁচটি ভূত'।   
পরেরটা আরো খতরনাক "'জামাই হারামখোর, আর বেড়াল হারামখোর'। কি আর বলি। এসবে ব্যাখ্যা হয় না। 

Uploaded Image আসি তিন নম্বরে। বাংলা না সংস্কৃত শ্লোক। তাতে বলা হচ্ছে "জামাত্রর্থং স্রপিতস্য সূপাদেরতিথ্যুপকারকত্বম" সোজা বাংলায় 'জামাইয়ের জন্য মারে হাঁস, গুষ্টিশুদ্ধ খায় মাস'। মানে এক জামাইষষ্ঠীর যা খরচ, তাতে গোটা পরিবারের একমাস চলে যায়। এতেই শেষ নয়। আরো একটা বলি "'সদা বক্রঃ সদা ক্রূরঃ সদা মানধনাপহঃ। কন্যারাশিস্থিতো নিত্যং জামাতা দশমো গ্রহঃ'। মানে কুটিল, বক্র, ধন মান সব হরণকারী জামাতা নবগ্রহের পর দশম গ্রহ। এবং সেই গ্রহ অবশ্যই কুগ্রহ। এই কুগ্রহকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি খুব একটা বদার-ও করেন না। না হলে "খেয়ে বাঁচলে কামাই/ মেয়ে বাঁচলে জামাই" প্রবাদটাই বা আসবে কেন? এমনকি কখনও কখনও দেখি জামাইয়ের উপরে উপকারের এক্সপেক্টেশনটুকুও নেই "গতর কুশলে থাক, করে খাব কামাই / বিস্তর করলে পেটের পুত, কি করবে জামাই"। সোজা কথা জামাই আর তার খাই মেটানো প্রায় অসম্ভব। জামাই তো খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কোনো জিনিসেই মন ভরেনা তাঁর। তাই বলা হয় "পাঁচ ব্যন্নন দুধ রুটি / তবু জামাইয়ের ভিরকুটি"।




শুধু জামাইদের সেলফ এস্টিম কত কম, তা ভেবে দেখুন। এত কথার পরেও যেই না জামাইষষ্ঠী এল, জামাই চললেন হাতে আম কাঁঠালের ব্যাগ নিয়ে। 'খাওয়া দাওয়ার গন্ধে / জামাই আসে আনন্দে'। তখন তার যত্ন আত্তি না করে উপায় কী! 'জামাই এলো কামাই ক'রে, বসতে দাও গো পিঁড়ে / জলপান করতে দাও গো সরু ধানের চিঁড়ে'। আর এতেই শেষ না, 'রুইয়ের মুড়ো, কেটো মুড়ো, দাও আমার পাতে / আড়ের মুড়ো, ঘিয়ের মুড়ো, দাও জামাইয়ের পাতে'। এই উপলক্ষে 'জামাই গেলে শ্বশুরবাড়ি, তিনদিন আদর বাড়াবাড়ি'। 

এতো গেল নর্মাল জামাই। ঘরজামাইদের নিয়ে যা যা লেখা আছে, তা যত কম বলা যায় ততই ভাল। ব্যাখ্যা ছাড়া। একটাই বলি। এতেই গোটা অ্যাটিটিউডটা বোঝা যাবে

দূর জামাইয়ের কাঁধে ছাতি / ঘর জামাইয়ের মুখে লাথি'

শেষ করি জামাইদের প্রকারভেদ দিয়ে। আজ রাস্তাঘাটে বেরুলে মূলতঃ চার রকম জামাই দেখতে পাবেন।

১। সদ্য বিবাহিত জামাই- এদের প্রথম কি দ্বিতীয় জামাইষষ্ঠী। বউমা সুন্দর পাটভাঙা শাড়িতে চকচকে। বরের টকটকে লাল পাঞ্জাবিতে সাদা কলকা। বউ ঘামলেই বর মুছিয়ে দিচ্ছেন। হাতের ব্যাগে আম, মিষ্টি আর লিচুর ডালপালা উঁকি দিচ্ছে। দুজনেই ফিসফাস করছেন আর হেসে উঠছেন। বর আপ্রাণ চেষ্টায় আছেন অন্যজনের কষ্ট না হয়। বেশ মাখোমাখো ব্যাপার। 

২। সদ্য সন্তানপ্রাপ্ত জামাই- গরমে বাচ্চা তেড়ে চিল্লাচ্ছে। বউ মেজাজ গরম করছে"একটু ধরতেও ও পারো" ধরলে বাচ্চা আরও রেগে লাল হয়ে যাচ্ছে। মুশকিল হল পাশেই দুই একজন মহিলা টিপ্পনি কাটছেন "আমার মনা তো বাসে উঠলেই ঘুমিয়ে পড়ত। কোনদিন জ্বালায় নি। ও ঘুমাচ্ছে না কেন?" বাবার পাঞ্জাবি আর মায়ের শাড়ি দুমড়ে গেছে। বাচ্চা এখনো কেঁদে যাচ্ছে।

৩। একটু বড় বাচ্চাযুক্ত জামাই- পুরোনো শার্ট আর প্যান্ট পড়া। মুখ ভয়ানক গম্ভীর। হাতে ছোট একটা থলে। সঙ্গে বউ আর ক্লাস ওয়ান আর ক্লাস ফোরে পড়া দুই ছেলে মেয়ে। বাবা বাসে উঠে কোণ দেখে বসে মোবাইলে রবীশ কুমার দেখতে লাগলেন। বাচ্চাদুটো কে জানলার ধারে বসবে নিয়ে ঝগড়া করতে লাগল। মা ছোটটাকে কোলে নিয়ে বড়টাকে জানলায় বসিয়ে ঝগড়া মেটালেন

৪। প্রাচীন জামাই- আমার মত জামাই। যারা আজকের দিনেও অফিস করছি আর তাদের বড় বড় ছেলেমেয়েরা স্কুলে গিয়ে ক্লাস করছে।
এর বাইরেও অনেক রকম আছেন। 

আজ জামাইষষ্ঠীর পুণ্য প্রভাতে সব জামাইকে অভিনন্দন। সমস্ত সমবেদনা নিয়েই বলছি, যুগে যুগে এইসব বাঁকা কথা অগ্রাহ্য করে যেভাবে আপনারা পদের পর পদ সাঁটিয়েছেন, সেই ধারা অক্ষুন্ন থাক। 
সবচেয়ে বড় কথা সেই কবে কিশোরকুমার বলে গেছেন-"কুছ তো লোগ কহেঙ্গে/ লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা"

(সঙ্গের ছবিটি শিল্পী দেবাশীষ দেবের অরিজিনাল পেন এন্ড ইংক আর্টওয়ার্ক থেকে। কাল্ট হয়ে যাওয়া এই ছবির আসলটা এখন আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে)...

শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের জন্মবৃত্তান্ত ও শ্যামাপ্রসাদ ~ অরিজিত মুখার্জী

(আরেকরকম পুজোসংখ্যায় প্রকাশিত )
(১)
"শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিমবঙ্গের জনক" বা "শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে রয়ে গেছে" এই মিথদুটোর বয়স বেশ কয়েকবছর হল। ফি বছর হিন্দুত্ববাদীরা এই নিয়ে প্রচার করে, তার পালটা লেখাও তৈরী হয়, আবার তার পরের বছর একই ঘটনা ঘটে। তবে দুটো মিথকেই সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় কিছু তথ্য আর ম্যাপ দিয়ে। এই লেখার উদ্দেশ্য সেইটাই। যদিও তার আগে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতটা একটু দেখে নেওয়া প্রয়োজন - তার জন্যে খানিক গৌরচন্দ্রিকা…
তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড নামেও ইতিহাসে পরিচিত) আর বেঙ্গল টেনেন্সী অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট - মূলত: এই দুটো ঘটনা, আর গ্রামের দিকে বাড়তে থাকা কৃষক আন্দোলন - এই সবকিছুর জেরে ভদ্রলোক হিন্দুরা কংগ্রেসের দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করে। বিশেষ করে যে জমিদার আর হিন্দু ব্যবসায়ীদের চাঁদার ওপর কংগ্রেস ভালোমত নির্ভরশীল ছিল, তারা বিমুখ হওয়ায় কংগ্রেস বেশ চাপে পড়ে যায়। ১৯৩৬-৩৭-এর প্রাদেশিক ভোটে আশিটা সাধারণ আসনের মাত্র আটচল্লিশটা আর বিশেষ সংরক্ষিত হিন্দু আসনের মাত্র চারটে জেতে কংগ্রেস। নির্দল হিন্দু প্রার্থীরা জেতে সাঁইত্রিশটা আসনে, হিন্দু মহাসভা দুটো আসনে।
হিন্দু এবং হিন্দুধর্মকে রক্ষার দাবী নিয়ে ততদিনে হিন্দু ভদ্রলোক আইডেন্টিটি তৈরী হয়ে গেছে - মূলত: শিক্ষিত সমাজকে ঘিরে, যাদের বেশিরভাগের গ্রামের দিকে জমিজমা, বাড়ি আর শহরে চাকরি ছিল - অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ক্ষমতাশালী উচ্চবিত্ত, বা মধ্যবিত্তের ক্রীমি অংশ। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে প্রান্তিক গোষ্ঠীর লোকজনকেও এই বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অংশ হিসেবে টেনে আনার চেষ্টা শুরু হয়। জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসবগুলো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র, ফলে গ্রাম বা ছোট মফস্বল শহরের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যেও এই প্রবল হিন্দু আইডেন্টিটি ছড়াতে শুরু করে।
১৯৩৬-৩৭ এর ভোটের ফলাফলের পর কংগ্রেসও আর এর বাইরে থাকার কথা ভাবেনি। কমতে থাকা ফান্ড আর সরতে থাকা "ভদ্রলোক সাপোর্টের" ধাক্কায় কংগ্রেসও উঠেপড়ে লেগেছিল হিন্দু প্রোফাইল তৈরী করতে। প্রথম পদক্ষেপ ছিল সুভাষ-শরতের আমলে কংগ্রেস ছেড়ে চলে যাওয়া হিন্দু জমিদারদের খুব কাছের লোক নলিনীরঞ্জন সরকারকে আবার বড় দায়িত্ব দিয়ে ফিরিয়ে আনা। তারপর ক্রমশ: কৃষক আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে উলটে জমিদারদের পক্ষ নেওয়া, সুভাষ-শরতকে একঘরে করে দেওয়া এবং শেষপর্যন্ত সরিয়েই দেওয়া – সবটাই ঘটেছিল বাংলা কংগ্রেসকে ফের ভদ্রলোকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে। জয়া চ্যাটার্জী তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে রীতিমত তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই সময়ে, মানে সুভাষ আর শরৎ বসুকে বের করে দেওয়ার পর, হিন্দু মহাসভা আর বাংলা কংগ্রেসের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাৎ সাধারণ চোখে ধরাই পড়তো না।
১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে হাতেনাতে ফল পায় কংগ্রেস এই আইডেন্টিটি পরিবর্তনের - বাংলার হিন্দুরা একজোটে কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দেয় - একাত্তরটা সাধারণ আসন আর পনেরোটা বিশেষ হিন্দু আসন জেতে কংগ্রেস, তার মধ্যে বেশ কয়েকটা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা। হিন্দু মহাসভা ছাব্বিশটা আসনে কংগ্রেসের বিপক্ষে লড়ে পায় মোটে ২.৭৩% ভোট। একটা মাত্র আসনে - বিশেষ ইউনিভার্সিটি আসন – সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জেতেন শ্যামাপ্রসাদ। খুব স্পষ্টভাবে, ভদ্রলোক হিন্দুদের রায় ছিল কংগ্রেসের পক্ষেই। অন্যদিকে, সংরক্ষিত তফশিলী আসনের ৮০% জেতে কংগ্রেস, ৩৬-৩৭ সালে যেটা ২৫%-এরও কম ছিল। সব মিলিয়ে মোটামুটি ৯০% হিন্দু ভোটার মনে করেছিল যে কংগ্রেসই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা - ধনী ব্যবসায়ী, জমিদার - যাদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা তিরিশের দ্বিতীয়ভাগ থেকে ক্রমশ: শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তাদেরও বিপুল সমর্থন পেয়েছিল কংগ্রেস - এই নতুন পাওয়া হিন্দু আইডেন্টিটির জোরে [১]।
আলাদা হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্যের দাবীও ওঠে এই সময় থেকেই। ১৯৪৬-এর ভোটে সুরাহওয়র্দীর মন্ত্রীসভার ক্ষমতায় আসা, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের সময়ে যে সুরাহওয়র্দীকে নিয়ে প্রবল ক্ষোভ ছিল হিন্দুদের মধ্যে, ছেচল্লিশের কুখ্যাত দাঙ্গা, এবং সেই সময়ে কলকাতার রাস্তায় ঘটে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সামলাতে না পারা - সব মিলিয়ে বাংলার হিন্দুদের বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়ে যায় যে "মুসলমানদের সরকার" থাকলে বাংলার পাকিস্তান হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না, হিন্দুদের থেকে যেতে হবে মুসলমানদের অধীনে। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদের হাতে লেখা ছেচল্লিশ সালের একটা নোট [২] পাওয়া যায় এই মর্মে, যার মূল বক্তব্য ছিল – “বাংলা যদি পাকিস্তান হয়ে যায়, বাঙালী হিন্দুদের যদি পাকাপাকি মুসলমান শাসনে থাকতে হয়, তাহলে সেটা হবে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির শেষ অধ্যায়…নীচু জাতের কিছু হিন্দু যারা মুসলমান হয়েছে, তাদের খুশী করতে হিন্দু সংস্কারকে বলি দেওয়া…”
একসময় "অবিভক্ত বাংলা"-র সমর্থক শ্যামাপ্রসাদ সেই সময়েই কিন্তু বাংলা ভাগের পক্ষে চলে গিয়েছিলেন। আর, ব্রিটিশ রাজের শেষ দুটো বছরে, বাংলার হিন্দু ভদ্রলোকদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা বস্তুত: কংগ্রেসের সেকেন্ড ফিডল হিসেবেই থেকে গিয়েছিল।
(২)
ছেচল্লিশের দাঙ্গায় দোষী কে সেই প্রসঙ্গে যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। হাজারো লেখা আছে, বই আছে - পড়ে দেখতে পারেন। যেটা বাস্তব, সেটা হল ১৯৪৭ সালে দেশভাগই যে একমাত্র পথ সেইটা মোটামুটি সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বই মেনে নিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর ৮ই মার্চ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও জানিয়ে দেয় যে দেশভাগ যদি হতেই হয়, তাহলে মুসলমান-প্রধান বাংলা আর পাঞ্জাবকেও ভাগ করতে হবে। ৩রা জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে দশ সপ্তাহের মধ্যে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাবে। ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের দুই উত্তরসুরীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হবে। দুই মুসলমান প্রধান রাজ্য, বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করে মুসলমান অধ্যুষিত পাশাপাশি জেলাগুলো দেওয়া হবে পাকিস্তানকে, আর অ-মুসলমানপ্রধান বাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে।
মানে, ওই দশ সপ্তাহের মধ্যে বাংলার সব হিন্দু রাজনৈতিক নেতা (কংগ্রেস ও মহাসভা মিলিয়ে) - যাঁরা আগের কয়েক বছর ধরে নিরন্তর রাজ্যভাগের কথা বলে এসেছিলেন - তাঁদের সকলকেও এবার দেশভাগের জমাখরচের হিসেব কষতে হবে…
দেশভাগের অধিকাংশ ইতিহাস জানায় যে স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ তাঁর মর্জিমত কলমের আঁচরে ভারত আর পাকিস্তানকে আলাদা করেছিলেন। তড়িঘড়ি করে করা এই কাজে ভারত আর পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ছিল দাবার বোড়ে মাত্র। বাস্তবে যদিও, যে রাজনীতিকরা দেশভাগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই নতুন রাজ্যের বর্ডার কী হবে সেইটা স্থির করার কাজ করে গিয়েছিলেন।
কাজটা অবশ্যই সহজ ছিল না। ৩রা জুন থেকে ১৭ই আগস্ট - এই অল্প কয়েকটা দিনের মধ্যেই শুধু যে দুই দেশের সীমা নির্ধারণ করতে হবে তা নয়, ভাগ করতে হবে আরো অনেক কিছুই - নদীনালা, রাস্তা, ব্রিজ, রেলপথ, গুদামে থাকা জিনিসপত্র, মায় সরকারি কর্মচারীদেরও। আর, এমনও নয় যে এর কোন ব্লুপ্রিন্ট কোথাও ছিল, যাতে সেটা দেখে দেখে কাজটা সহজেই করে ফেলা যায়। বেসিক গ্রাউন্ডরুল লন্ডন ও দিল্লী থেকেই বলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু রাজ্যের কোন অঞ্চল কীভাবে ভাগ হবে - সেটা ছাড়া হয়েছিল রাজ্যের ওপরেই। এই গ্রাউন্ডরুল অনুযায়ী বাংলার আইনসভাকে দুটো ভাগে ভাগ করা হবে - মুসলমান আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা ভাগ, আর হিন্দু আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আরেকটা ভাগ - দুটো ভাগেই আলাদা করে দেশভাগের ওপর ভোট নেওয়া হবে আর, কোনো একটা ভাগে পার্টিশনের পক্ষে ভোট হলেই ভাগ করা হবে রাজ্যকে। ২০শে জুন ১৯৪৭ - যে দিনটাকে হিন্দুত্ববাদীরা পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করা শুরু করেছে - সেই দিন, বাংলার আইনসভায় এই দুটো ভাগ তৈরী করে ভোট হয়। সেই ঐতিহাসিক ভোটে, একেবারে প্রত্যাশিতভাবেই হিন্দু অংশ ভোট দেয় বাংলা ভাগের পক্ষে আর মুসলমান অংশ ভোট দেয় বিপক্ষে। বাংলার রাজ্যপাল ফ্রেডেরিক বারোওজ টেলেক্স করে মাউন্টব্যাটেনকে জানান -

Separate meetings of members West repeat West Bengal Legislative Assembly this afternoon decided under paragraph six of H.M.G.’s statement by 58 votes to 21 votes that Province should be partitioned; and under paragraph eight of statement by 58 votes to 21 votes again that West Bengal should join existing Constituent Assembly. Separate meeting of members East repeat East Bengal Legislative Assembly this afternoon decided under paragraph six of statement by 106 votes to 35 votes that Province should not repeat not be partitioned; under paragraph eight of statement by 107 votes to 34 that East Bengal should join new Constituent Assembly; and under paragraph thirteen of statement by 105 votes to 34 votes that East Bengal would agree to amalgamation of Sylhet. [৩, ৪]
এখানে যেটা দেখার, সেটা হল বাংলা ভাগের পক্ষে রাজ্যের হিন্দু প্রতিনিধিরা একজোট হয়েই ভোট দিয়েছিলেন, আর সেই সময়ে আইনসভায় হিন্দু মহাসভার তরফে ছিলেন একজনই - শ্যামাপ্রসাদ নিজে। কাজেই, খুব সাধারণ অঙ্কের হিসেবেও ৫৮টা ভোটকেই শ্যামাপ্রসাদ হিসেবে ধরা যায় না (সে ইদানীংকালে কেউ কেউ ২৯৪ আসনে তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে বললেও)...
মানে, আগে যে ধারণার কথা লিখেছিলাম - বাংলার অধিকাংশ হিন্দু রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাজ্যভাগের প্রশ্নে একমত ছিলেন - আইনসভাতে হিন্দু অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত সেই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। আর এই হিন্দু প্রতিনিধিদের প্রায় সকলেই বাংলা কংগ্রেস থেকে আসা। পশ্চিমবঙ্গের গঠনের পিছনে হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদের আলাদা কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং বলা ভালো কোনো কৃতিত্বই নেই।
[আদৌ কাউকেই এই কৃতিত্ব দেওয়া যায় কিনা সে সম্পূর্ণ আলাদা প্রসঙ্গ, আলাদাভাবে লেখা প্রয়োজন তাই নিয়ে। শুধু এইটুকু বলি - দেশভাগের হিউম্যান কস্ট আর দুটো দেশেরই ক্ষয়ক্ষতি, বিশেষ করে রিসোর্সের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বিচার করলে কৃতিত্ব শব্দটাই এখানে বেমানান। দেশভাগ বাঙালীর কাছে একটা যন্ত্রণার ঘটনা, এবং পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে এমন একটা ধাক্কা যেখান থেকে এই রাজ্যটা কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই, অত্যন্ত নোংরা খুনে মানসিকতার লোক না হলে ২০শে জুন তারিখটা নিয়ে উৎসব কেউ করবে না।]
(৩)
এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গটায় - কলকাতার পশ্চিমবঙ্গে থাকা বা না-থাকা নিয়ে…তার জন্যে আমাদের যেতে হবে ২০শে জুন ১৯৪৭-এর পরের কয়েক সপ্তাহে, ঢুকতে হবে বাউন্ডারি কমিশনের ভিতরে...যার কাজ শুরু হয়েছিল তুমুল অনিশ্চয়তার মধ্যে। বাংলা আর পাঞ্জাব, দুই জায়গাতেই চারজন বিচারককে নিয়ে তৈরী হয়েছিল বাউন্ডারি কমিশন, দুই কমিশনেই চেয়ারপার্সন ছিলেন সিরিল র্যাডক্লিফ। আর চারজন বিচারককে মনোনীত করেছিল কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ। বাংলা কংগ্রেসের তরফে এই কমিশনে ছিলেন জাস্টিস বি.কে. মুখার্জী এবং জাস্টিস সি.সি. বিশ্বাস। মুসলিম লীগের মনোনীত সদস্য ছিলেন জাস্টিস আবু সালেহ মহম্মদ আক্রম, এবং জাস্টিস এস.এ. রহমান। এবং স্বাভাবিকভাবে সকলেই রীতিমত অনুগতভাবে নিজের নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং দলগত নীতির প্রতিনিধিত্ব করে গেছিলেন পুরো সময়টা জুড়ে। মাসখানেক ধরে ৩৬জন উকিল ৩৬টা আবেদন এই কমিশনের সামনে হাজির করলেও (সময়াভাবে আরো ৭১টা আবেদন পেশই করা যায়নি) র্যাডক্লিফ পুরো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শুধুমাত্র কমিশনের চার সদস্যের আনা দাবী আর পাল্টা-দাবীর ওপর ভিত্তি করে - মানে বাস্তবে কংগ্রেসের "সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি" আর মুসলিম লীগের পেশ করা বক্তব্যের ওপরেই [৫]।
এই পুরো পর্বটা জুড়েই কংগ্রেস হাইকম্যান্ড বাউন্ডারি কমিশন থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছিল, রাজ্যের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিয়ে। এই নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। স্বয়ং বাবাসাহেব আম্বেদকর কংগ্রেসের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন - তাঁর বক্তব্য ছিল এই সীমানা নির্ধারণ রাজ্যের নয়, দেশের সরকারের দায়িত্ব হওয়ার কথা, এবং এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বদলে সেনাবাহিনীর লোকজনের থাকা প্রয়োজন, কারণ শেষ অবধি, সীমানার দেখভালের দায়িত্ব তাদেরই। অবশ্যই আম্বেদকরের এই কথায় বিশেষ কেউ কান দেয়নি - না কংগ্রেস হাইকম্যান্ড, না ব্রিটিশ রাজ, না প্রতিরক্ষা দপ্তরের কেউ (ওই দপ্তর থেকে কেউ বাউন্ডারি কমিশনের সামনে হাজির পর্যন্ত হননি)।
সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটিটা ছিল খানিক খিচুরি সংগঠন - বারো সদস্যের এই কমিটিতে দুজন ছিলেন বাংলা কংগ্রেস থেকে (এই দুজনের একজন ব্যারিস্টার অতুল চন্দ্র গুপ্ত - কমিটির চেয়ারম্যান), বাকি দশজন ছিলেন হিন্দু মহাসভা, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের তরফে। বারোজনের মধ্যে দশজন দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী - স্পষ্টতই যাকে বলা যায় "বিপর্যয়ের রেসিপি"।
এবার, পার্টিশনের গ্রাউন্ড রুল - যেটা লন্ডন থেকে বলে দেওয়া হয়েছিল - সেটা ছোট করে বুঝে নেওয়া দরকার। লন্ডনের তরফে ৩রা জুনের স্টেটমেন্টটা যদি একবার দেখি -
For the immediate purpose of deciding on the issue of partition, the members of the legislative assemblies of Bengal and the Punjab will sit in two parts according to Muslim majority districts (as laid down in the Appendix) and non-Muslim majority districts. This is only a preliminary step of a purely temporary nature as it is evident that for the purposes of final partition of these provinces a detailed investigation of boundary question will be needed; and as soon as a decision involving partition has been taken for either province a boundary commission will be set up by the Governor-General, the membership and terms of reference of which will be settled in consultation with those concerned. It will be instructed to demarcate the boundaries of the two parts of the Punjab on the basis of ascertaining the contiguous majority areas of Muslims and non-Muslims. It will also be instructed to take into account other factors. Similar instructions will be given to the Bengal Boundary Commission. Until the report of a boundary commission has been put into effect, the provisional boundaries indicated in the Appendix will be used. [৬]
পাশাপাশি অবস্থিত মুসলমানপ্রধান জেলাগুলো যাবে পাকিস্তানে, আর বাদবাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে - শুধু এই নিয়মের ভিত্তিতে যদি বাংলা ভাগ করা হয়, তাহলে ভাগীরথী-হুগলীর পূর্বদিকের প্রায় পুরো অঞ্চলই বাদ দিতে হয়, বাদ দিতে হয় গঙ্গার উত্তরের একটা বড় অংশও। ভদ্রলোক হিন্দু বাঙালি পার্টিশন চেয়েছিল কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সঙ্গে একসাথে থাকতে চায়নি, ক্ষমতার ভাগাভাগি চায়নি। সেক্ষেত্রে মুসলমান প্রধান জেলাগুলোকে বাদ দিয়ে দিলে পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়ে থাকে দক্ষিণবঙ্গের অর্ধেক - শুধু বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া, কলকাতা, ২৪ পরগণা, বাঁকুড়া, বীরভূম, আর মেদিনীপুর - মানে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো - ঠিক যে যে জেলায় পার্টিশনের পক্ষে সবচেয়ে বেশি প্রচার চলেছিল...[প্রথম ছবি: Map 1]














অক্ষরে অক্ষরে নিয়ম মেনে চললে এ বড় কঠিন বাস্তব। যে পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভদ্রলোক হিন্দু এতদিন লড়ে এলো, বা যে পাকিস্তানের জন্যে মুসলিম লীগ, সেই সবই যদি এরকম পোকায় কাটা অর্ধেক রাজ্য হয়ে যায়, তাহলে সেই রাজ্য কি আদৌ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে? যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নিয়ে এত কথা, এই অর্ধেক রাজ্যে সেই ক্ষমতার কতটুকুই বা বাকি থাকবে?
কাজেই, ওই বেঁধে দেওয়া গ্রাউন্ডরুলের মধ্যে একটা বাক্যের আশ্রয় নিতে হয়েছিল কো-অর্ডিনেশন কমিটি আর লীগকে - “It will also be instructed to take into account other factors" - দুই পক্ষই এই "আদার ফ্যাক্টরস"-কে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে তাদের ভাগের অংশকে বাড়ানোর চেষ্টা করে গেছিল ক্রমাগত। তবে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট হল যে এই "আদার ফ্যাক্টরস" শব্দবন্ধকে ব্যবহার করে কতটা জমি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হবে, তাই নিয়ে কো-অর্ডিনেশন কমিটির মধ্যেই বড়সড় মতভেদ ছিল, আর সেটা একেবারে শুরুতেই সামনে আসে।
এই মতবিরোধটাই এই প্রসঙ্গে আপাতত জরুরী। শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল কিনা সেটা যাচাই করতে আমাদের ঠিক এই জায়গাতেই যেতে হবে...
(৪)
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল পশ্চিমবঙ্গ কত বড় হলে রাজ্যভাগের রাজনীতির আঙিনার চরিত্ররা সন্তুষ্ট হবেন, আর এই নতুন রাজ্যটাও অর্থনৈতিকভাবে কার্য্যকর হবে। আর এই প্রশ্নে সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের সম্পূর্ণ উলটো মেরুতে বসে ছিলেন। একদল ছিলেন রাজ্যের কলেবর যতটা সম্ভব বাড়ানোর পক্ষে, আরেকদল ছিলেন ছোট কমপ্যাক্ট রাজ্যের পক্ষে - যা শাসন করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আর, এই বিভেদ ছিল একেবারে পার্টি লাইন বরাবর। ছোট দলগুলোর দাবী ছিল আকাশপ্রমাণ। হিন্দু মহাসভা আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন চেয়েছিল যতটা সম্ভব এলাকা দাবী করতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই "আদার ফ্যাক্টরস" শব্দবন্ধকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অসম্ভব বাড়িয়ে তুলে। এগারোটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা (বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, হাওড়া, হুগলী, কলকাতা, ২৪ পরগণা, খুলনা, দার্জিলিং আর জলপাইগুড়ি) ছাড়াও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অনেক অংশও এদের দাবীর মধ্যে ছিল - যেমন নদীয়ার বড় অংশ, ফরিদপুর, দিনাজপুর, এবং রংপুর আর রাজশাহীর বেশ কিছু অঞ্চল। মহাসভা আর নিউ বেঙ্গলের দাবী মানলে পশ্চিমবঙ্গে আসতো অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের প্রায় তিন ভাগ [দ্বিতীয় ছবি - Map 2][৭]
















উল্টোদিকে, অতুল চন্দ্র গুপ্তর নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্যাম্পের দাবী তুলনামূলকভাবে অনেক নিচু স্কেলে বাঁধা ছিল। তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন যে অহেতুক অযৌক্তিক দাবীর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত দাবীই লঘু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলগুলোর প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাব নাকচ করলে অতুল চন্দ্র গুপ্ত স্ট্র্যাটেজি বদলে দুটো প্রস্তাব রাখেন - একটা "কংগ্রেস স্কিম", যেখানে অনেক বড় আকারে দাবী পেশ করা হয়েছিল - মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অংশ জুড়ে (যদিও সেটাও মহাসভার দাবীর চেয়ে কমই ছিল), আর দ্বিতীয়টা "কংগ্রেস প্ল্যান", যেখানে প্রথম স্কিমের চেয়ে কম এলাকা চাওয়া হলেও সেটা মোটামুটিভাবে ওই মৌলিক তত্ত্ব মেনেই, অর্থাৎ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোকেই নিয়ে। "আদার ফ্যাক্টরস" হিসেবে অল্প কিছু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল চাওয়া হয়েছিল এই প্ল্যানে। তৃতীয় ছবি, অর্থাৎ Map 3 খেয়াল করে দেখলে দেখতে পাবেন কংগ্রেস স্কিম আর কংগ্রেস প্ল্যান - দুটোর ক্ষেত্রেই প্রস্তাবিত এলাকা দাগ দিয়ে বোঝানো রয়েছে। এবং, দুটো ম্যাপেই কলকাতা কিন্তু প্রস্তাবিত পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই রয়েছে। হিন্দু মহাসভা এই প্রস্তাবও মানেনি। শেষ অবধি তারা আলাদাভাবে পিটিশন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। Map 2 তারই ফসল।
মোদ্দা কথা হল, যে কয়েকটা পিটিশন জমা পড়েছিল কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার তরফে, তার প্রতিটাতেই কলকাতা ছিল পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই। অর্থাৎ, হিন্দুত্ববাদীদের দ্বিতীয় দাবী, যে শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছে, সেই দাবীটিকেও এই ম্যাপের দৌলতে সহজেই নস্যাৎ করে দেওয়া যায়।
Uploaded Image (৫) এই লেখাটা এইখানেই শেষ করে দেওয়া যেত। কিন্তু মনে হল সম্পূর্ণতার খাতিরে আরো কিছু তথ্য জুড়ে দেওয়া দরকার। উদ্দেশ্য শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভা, এবং আজকের বিজেপি – উগ্র দক্ষিণপন্থার আসল মানসিকতাটা চিনে নেওয়া…
চল্লিশের দশকের রাজ্যভাগের রাজনীতির সঙ্গীদের থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্যে অনেক কম এলাকা দাবী করে কংগ্রেস বেশ বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছিল। যেহেতু দেশভাগের পর তারাই সরকারে বসবে, অর্থাৎ তারাই হবে ব্রিটিশ রাজের উত্তরাধিকারী, সেহেতু, তাদের বিরুদ্ধে “বাংলার জন্মগত অধিকার খর্ব করা” বা “ভারতের নিজস্ব ভৌগলিক এলাকা শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া” জাতীয় অভিযোগ তোলা সহজেই সম্ভব। কংগ্রেসের যুক্তিটা এখানে কংগ্রেসেরই দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে - তাদের লক্ষ্য ছিল এই নতুন রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা, শুধু উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, তার পরেও। এবং তার জন্যে যদি এই অভিযোগের জবাব দিতে হয়, তাহলে সেটাই এই ক্ষমতা ধরে রাখার দাম। এবং হিন্দু মহাসভাও এইটা ভালোমতনই বুঝে গেছিল।
হিন্দু কো-অর্ডিনেশন কমিটি পাকাপাকি ভেঙে যাওয়ার পর হিন্দু মহাসভা আর তাদের সঙ্গীরা বুঝে যায় যে তাদের আর হারানোর কিছু নেই, এবং তারা চাইলে নির্বিচারে আরো যুক্তিহীন দাবীও তুলতে পারে। এবং দক্ষিণপন্থী হিন্দুদের সামনে এই দেখনদারি চেঁচামেচিতে বরং তাদের লাভ হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায় (যেটা আজ একেবারে ১০০% বাস্তব)। চরম দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলো আরো চমকপ্রদ দাবী তুলতে থাকে মহাসভার উস্কানিতে...যেমন আর্য্য রাষ্ট্র সংঘ (হয়তো হাতে গোনা একশোটা লোক ছিল এতে) অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের চারভাগ চেয়ে বসে, সঙ্গে বাংলার প্রত্যেকটা শহরও, কারণ বাংলার শহরাঞ্চলে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি…
মহাসভা এই নতুন জন্মানো রাজ্যের সীমানা নিয়ে ক্রমশঃ আরো উদ্ভট দাবী করতে শুরু করে কারণ তারা পুরোপুরি বুঝে গিয়েছিল যে এই নতুন রাজ্যে তাদের কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। কাজেই, পাশাপাশি জেলার তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়ে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কোনো জেলাকেই তারা পশ্চিমবঙ্গে ঢোকানোর কথা বলে ওই "আদার ফ্যাক্টরস"-এর হিসেবে। যেমন, গোটা নদীয়া চেয়ে বসে শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থান হিসেবে, রাজশাহী চেয়ে বসে সেখানে বারেন্দ্র রিসার্চ সেন্টার রয়েছে বলে, এবং বরিশাল - সেখানকার হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্যে। মহাসভা জানতো যে তাদের এই দাবীগুলো কোথাওই কোনো গুরুত্ব পাবে না, তা সত্ত্বেও নিজেদের "হিন্দুস্বার্থ রক্ষার সৈন্য" হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় খামতি রাখেনি। দুইদিকেই লাভ - একদিকে হিন্দুস্বার্থ রক্ষার একনিষ্ঠ সৈনিকের খ্যাতি - যদি দাবীগুলোর একটাও বাস্তবে সত্যি না হয়; অন্যদিকে কংগ্রেসের প্ল্যানের বাইরে সামান্য এলাকাও পশ্চিমবঙ্গে এলে তার কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ...একই সঙ্গে ভবিষ্যতের ইলেকশন যুদ্ধে নিজেদের জায়গা পোক্ত করা। বস্তুতঃ প্রোপাগান্ডাই ছিল মহাসভার মূল উদ্দেশ্য। সেদিনও যা ছিল, আজও তাই।
উল্টোদিকে কংগ্রেসের হাতে এই কল্পনাবিলাসের সুযোগ ছিল না। নতুন যে রাজ্য তৈরী হবে, তাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, আর তাদের প্রতি পদক্ষেপ ছিল সেই লক্ষ্যে। অতুল গুপ্তের তত্ত্বাবধানে কংগ্রেসের কমিটি রাজ্যের প্রতিটা থানার জনসংখ্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব করেছিল সেন্সাস রিপোর্টের সাহায্য নিয়ে [চতুর্থ ছবি - Map 4]। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেখলে, কংগ্রেস প্ল্যানে অনেক সমস্যা চোখে পড়লেও, কংগ্রেসের প্ল্যানাররা মোটামুটিভাবে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির কথা ভেবেই সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন। দার্জিলিং এর চা-বাগান এলাকা, ভাগিরথী-হুগলীর নদীপথ, এবং কলকাতা বন্দরের কথা ভেবে মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদীয়া - এগুলো সব তাঁদের প্ল্যানে ধরা ছিল - “this territory has been included in West Bengal for the most compelling factor of essential necessity for requirements and preservation of the Port of Calcutta. The life of the Province of West Bengal is mostly dependent on Calcutta, and with the partition it will become wholly so dependent” [৮] - অর্থাৎ, এখানেও কলকাতাকে বাদ দিয়ে কোনো প্ল্যানই ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্ল্যান তৈরী হয়েছিল কলকাতাকে তার কেন্দ্রে রেখেই।
আরো অনেক হিসেবনিকেশ ছিল কংগ্রেস প্ল্যানে। সেই হিসেবগুলো যে ঠিক, সে কথা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বলা যায় না। এও ভাবতে আশ্চর্য্য লাগে যে এই প্ল্যানের মধ্যে বেশ কিছু এমন "অনুমান" ছিল, যেগুলো রেট্রোস্পেক্টে দেখলে ধৃষ্টতা মনে হয়। পিছন ফিরে তাকিয়ে এও মনে হয় যে সেই সময়ে গণপরিষদে বাংলার প্রতিনিধিদের সমস্ত পদক্ষেপই ছিল যেনতেনপ্রকারেণ এই নতুন রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখার দিকে তাকিয়ে। কংগ্রেসের নিজের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল এই প্ল্যান নিয়ে। অতুল্য ঘোষ এবং তাঁর গোষ্ঠীর তরফে আরো সংক্ষিপ্ত রাজ্যের একটা প্ল্যান দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র দক্ষিণবঙ্গের হিন্দুপ্রধান জেলাগুলোকে নিয়ে (যদিও কংগ্রেস সেই প্ল্যান জমা দেয়নি) - যেখানে অতুল্য ঘোষের মূল উদ্দেশ্য সম্ভবত: ছিল নতুন রাজ্যে তাঁর গোষ্ঠীর (মানে হুগলী-বর্ধমান জেলার) নেতাদের ক্ষমতা সুরক্ষিত করা। এত কিছু সত্ত্বেও, বিশেষ করে দূরদর্শিতার অভাব থাকলেও, এইটুকু বলাই যায় যে বাউন্ডারি কমিশনের সামনে জমা দেওয়া প্ল্যানের মধ্যে প্রোপাগান্ডা ছিল না, জনতাকে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে দেখনদারি ছিল না। এইটাই আসল কথা - আর এই বাস্তবটা ওই সময়ের কিছু ডকুমেন্ট খুঁটিয়ে দেখলেই জানা যায়। Uploaded Image
শেষ অবধি, সিরিল র্যাডক্লিফ যে পার্টিশন লাইনটা টানেন, সেটা মোটামুটিভাবে কংগ্রেস প্ল্যানের সঙ্গেই মিলে গিয়েছিল। শুধু খুলনার বদলে পশ্চিমবঙ্গে আসে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ - গঙ্গা-ভাগিরথী রিভার সিস্টেমকে অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে।
আজ এই অবধি থাক। অন্য কোনোদিন চেষ্টা করবো পার্টিশনের জমাখরচ নিয়ে লিখতে। বারবার শুধু এইটাই বলার – হিন্দুত্ববাদীরা সেদিনও প্রোপাগান্ডাকেই তাদের অস্ত্র করেছিল, আজও তাই। ফ্যাসিবাদী শক্তি তার জন্মলগ্ন থেকে এই কাজই করে এসেছে। ভারতের এই নয়া ফ্যাসিস্টরা তাদের রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু গোয়েবলসের শিক্ষাই মেনে চলেছে – সেদিনও, আর আজও।
তথ্যসূত্র -
[১] Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947, Joya Chatterji, Cambridge University Press
[২] Shyama Prasad Mookerjee Papers, II-IV Instalment, File No. 75/1945-46
[৩] The Spoils of Partition: Bengal and India 1947-1967, Joya Chatterji, Cambridge University Press
[৪] Constitutional Relations between Britain and India: Transfer of Power, 1942-7, Volume XI The Mountbatten Viceroyalty, Announcement and Reception of the 3 June Plan, 31 May – 7 July 1947, ed: Nicholas Mansergh, Penderel Moon
[৫] The Fashioning of a Frontier: The Radcliffe Line and Bengal’s Border Landscape, 1947-52, Joya Chatterji, Modern Asian Studies / Cambridge University Press
[৬] Statement by His Majesty’s Government, dated the 3rd June 1947, PP I, p. 2
[৭] Memorandum for the Bengal Boundary Commission. Submitted by the Bengal Provincial Hindu Mahasabha and the New Bengal Association, Shyama Prasad Mookerjee Papers, 1st Instalment, Printed Material, File No. 17 (Serial No. 8.
[৮] Memorandum on the partition of Bengal presented on behalf of the Indian National Congress before the Boundary Commission, p. 7.
(সমস্ত ছবির সোর্স: জয়া চ্যাটার্জীর "স্পয়েলস অফ পার্টিশন")