“বিদ্যাসাগর তো মিলিট্যান্ট নাস্তিক। ওর কথা শুনবো কেন!’
বাংলা ভাষার সম্বোধনে, ‘তুই-তুমি-আপনি’ ভেদ আছে, যা ব্যক্তি সম্পর্কের পারস্পরিক নৈকট্য বা সম্মান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। যদিও অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালিও সম্বোধনে ‘ওর আর ওঁর’ এই সম্মান বা আপনি সূচক চন্দ্রবিন্দুটির ব্যবহার জানেন না, কিন্তু কথ্য ভাষার অনুসারে তারা ‘ওনার’ লেখে। অল্পশিক্ষিত বা আঞ্চলিকতাদুষ্ট বাংলায় ‘ইনার’ও দেখা যায়। সেই প্রতিবন্ধকতাও অন্তত বোঝায় যে ‘আপনি’ সূচক সম্বোধনে লিখতে চাওয়া হয়েছিল! অন্তত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ইচ্ছাকৃত অপমান বা তুচ্ছতার লক্ষ্যে নয়।
কিন্তু ‘ওর’--- অর্থাৎ ‘তুই’ সম্বোধনে! বাঙালি লিখছে! ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে! জনসমক্ষে! সমাজমাধ্যমে!
আজ থেকে আট বছর আগে এক বঙ্গসন্তান আমার পোস্টে লিখেছিল– “‘ওর’ কথা শুনব কেন!”
বাক্যটি খুবই ইন্টারেস্টিং– ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা যে শুনবে না তার মতে, বিদ্যাসাগর ‘মিলিট্যান্ট নাস্তিক’ বলে-- সেই বঙ্গসন্তান তথাকথিত অর্থে উচ্চশিক্ষিত কলকাতাবাসী। ফলে দুটি সিদ্ধান্তে আসা যায়, প্রথমত, বিদ্যাসাগর সম্পর্কে ‘ওর’ সম্বোধন ইচ্ছাকৃত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তুচ্ছার্থে বা অপমানের উদ্দেশ্যে। এবং দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিটি ‘হিন্দু’ ধর্ম বিশ্বাসী (তখনও সনাতনী শব্দটি বাঙালির কাছে লব্জ হয়নি) বলে ‘নাস্তিক’ (!) বিদ্যাসাগরকে তার সম্মানের প্রয়োজন নেই।
আমার পিতার কল্যাণে যে প্রভূত পরিমাণ বইয়ের মধ্যে বড়ো হয়েছি তার মধ্যে বঙ্গীয় সাক্ষরতা প্রসার সমিতি বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত তিন খণ্ডের বিদ্যাসাগর রচনাবলী ছিল। যতদূর বুঝেছি বিদ্যাসাগরকে বলা যায় অজ্ঞেয়বাদী।
সহজ কথায় বলা যায়, তিনি ‘ধর্ম-নির্লিপ্ত’। মনে রাখতে হবে বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালে— আজ থেকে ২০৬ বছর আগে। এই ‘ধর্ম-নির্লিপ্ত’ অবস্থানকে আজকের ভাষায় ‘সেকুলার’ বলা যায় – যা অধুনা নিওনাজির মতো করে গড়ে ওঠা নব্যহিন্দুত্ববাদীদের কাছে একটি গালাগালি, যদিচ ভারতের সংবিধানে দেশটি ‘সেকুলার’ হিসেবেই গড়ে উঠেছিল। তদুপরি বিদ্যাসাগর যদি নাস্তিকও হন তাহলেই বা কী যায় আসে! বেদের অপৌরুষেয়ত্বে অবিশ্বাসী অর্থেও যদি তিনি নাস্তিক না হন, যদি ‘এথেইস্ট’ অর্থেও তিনি নাস্তিক হন তাহলেও বা কি যায়-আসে!
ধর্মকে যদি শাস্ত্রধৃত ধারণা বলে গ্রহণ করি, তাহলেও এই আ'পামর' নব্যহিন্দুত্ববাদীদের মিলিত সর্বমোট শাস্ত্রজ্ঞান, বিদ্যাসাগরের শাস্ত্রজ্ঞানের দশমিকের পর দশটি শূন্য পরবর্তী সংখ্যাতেও তুলনীয় তো নয়ই এবং কেবল ব্রাহ্মণ্যবাদী শাস্ত্রজ্ঞান দিয়ে বিদ্যাসাগরকে পরিমাপ করতে যাওয়ার মুর্খামি বোধহয় কেবল ভারতীয় নব্যহিন্দুত্ববাদীদের পক্ষেই সম্ভব!
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন তাঁর অগ্রজ বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর পর ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ নামক স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, তৎকালীন হুগলীর বীরসিংহ থেকে পিতা ঠাকুরদাস ঈশ্বরচন্দ্রকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন ‘হের্ সাহেবের স্কুলে’ ভর্তি করবেন বলে – এই ‘হের্ সাহেব’ হলেন ডেভিড হেয়ার আর স্কুলটি হল হেয়ার স্কুল। বিদ্যাসাগরের জন্মের দুবছর আগে ১৮১৮ সালে এই বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। সেখানে আজ থেকে ২০৮ বছর আগে হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকল ধর্মের শিক্ষার্থীর প্রবেশাধিকার ছিল।
যে অর্বাচীন নব্যগোময়বাদী আমার পোস্টে প্রথম বাক্যটি লিখেছিল। সে-ও আমারই মতো ‘হের্ সাহেবের স্কুল’ এর প্রাক্তনী। কী আশ্চর্য নিষ্ঠুর পরিহাস! আমি তাকে বলেছিলাম, বাংলা ভাষায় যে এটুকু লিখতে পারলে তাও বিদ্যাসাগরের জন্য।
বিদ্যাসাগর কেবল বাংলা বর্ণমালার সংস্কারসাধক ভাষাতাত্ত্বিক নন, শাস্ত্রজ্ঞপণ্ডিত, যুক্তিবাদী, উদার, বাস্তববাদী সমাজ সংস্কারক। কালিক সীমাবদ্ধতা তাঁকে মানতে হয়েছে ওই বাস্তবতার নিরিখেই।
টেলিভিশন দেখি না, তবে একাধিক খবরের কাগজ নিয়ম করে পড়ি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া খবর দেখি (তাৎক্ষণিকতার নিরিখে এদানী জরুরি)-- কিন্তু সামগ্রিকভাবে হতাশ হই, ডিপ্রেসড লাগে, কোনোরকম কাজের মানসিক স্থিতি নষ্ট হয়।
দেখি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়া আর না-পাওয়া বাঙালির মধ্যে মূলগত ভেদ উঠে গেছে। দুজনেই সমান অযুক্তিবাদী… নির্বোধ… আত্মধ্বংসী… ব্রেনরট্ জোম্বি...
দেখি, জাতি-রাজনীতিতে যারা নিম্নবর্ণ, যারা অস্পৃশ্য, অচ্ছুত তাদেরকেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে… তারা প্রবল ক্ষমতাশালী এবং প্রবল বিভেদমূলক ব্রাহ্মণ্যবাদের পক্ষে কথা বলে ‘বিধর্মী’ তাড়াতে উদ্যত… অথচ রামমোহন বিদ্যাসাগর না থাকলে বাংলাও গোবলয়ের অস্পৃশ্যতার রাজনীতির অংশ হত…
ঘরে যিশুর ছবি থাকলেও তারা আক্রমণ করে, দেয়ালে কালীর ছবি থাকলেও…
দেখি রামমোহন, ডেভিড হেয়ার, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, বেথুন, রবীন্দ্রনাথ, রোকেয়ার বাংলায় স্কুল কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পড়ুয়ার অভাবে খালি হয়ে যায়… সরকার তুলে দেয়…
মাঝেমধ্যে মনে হয়, ঠিকই হচ্ছে! এই পড়াশোনার কী বা মূল্য!
যখন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত ইউরোপ / আমেরিকা প্রবাসিনী আইআইটিতে আত্মহত্যা করা নিম্নবর্ণের ছেলেটিকে– কোনও তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই 'নকল করছিল' বলে দেন! এমনকি প্রতিষ্ঠান এমন গুজব অস্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও ‘উচ্চশিক্ষিত’ অনড়… কী বা মূল্য আছে এ শিক্ষার! এমনকি আদৌ কী বা প্রয়োজন আছে এই শিক্ষার…
যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুজন শিক্ষকের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনায় এই নির্যাস নির্গত হয় যে, এদেশে হিন্দুদের দুর্দশার কারণ ‘উওম্যান এমপাওয়ারমেন্ট’ – নারী ক্ষমতায়ন। মেয়েরা লেখাপড়া শেখা আর চাকরি করার জন্য হিন্দুদের সন্তানধারণ কমে গেছে…
এরা যে জাতির শিক্ষকতার পেশায় থাকে সে জাতির সমস্ত স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যত তাড়াতাড়ি বন্ধ হয় ততই মঙ্গল।
মনে হয়, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে নেহাতই একটা দুর্ঘটনা।
এই অচিকিৎস্য আরোগ্যহীন বাঙালি জাতির শীঘ্রতম মৃত্যু কামনা করি আমি… শীঘ্রতম বিলুপ্তি…
মনে হয়, আমার সন্তানের কাছে ক্ষমা চাই তাকে জন্ম দেওয়ায় জন্য… বাঙালি জাতির উজ্জ্বল ইতিহাস জানানোর জন্য…
করছি… রোজ… প্রতিদিন…
ফেসবুকে আপাতত কম থাকতে চাই। নতুন লেখা বেরোলে না হয় জানানো যাবে। আপাতত আমার মানসিক স্থিতি প্রয়োজন।
© কণিষ্ক ভট্টাচার্য
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন