বিয়ের আগের রাতে পুরোনো অ্যালবামটা খুঁজতে আপুর আলমারি খুলেছিলাম। অ্যালবামের আগে হাতে উঠলো শাড়িটা। আম্মার কিনে দেওয়া কাতান, প্যাকেটের ভেতর তখনো দোকানের ভাঁজে রাখা। সাথের ব্লাউজ পিসটায় কাঁচি পড়েনি।
কাল আমার বিয়ে। আজ রাতে দুনিয়ার কোনো দর্জি কারও ব্লাউজ বানিয়ে দেবে না। হিসাবটা যেকোনো মেয়ে এক পলকে বুঝবে। আপু আমার বিয়েতে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেইনি।
অথচ এই বিয়ের সবকিছু আপুর হাতে গড়া। তারিখ ঠিক হওয়ার পর থেকে ও রাত জেগে এই আয়োজনের কাজ করেছে। কমিউনিটি সেন্টার ঠিক করা থেকে শুরু করে মেনুতে বোরহানি থাকবে কি না, স্টেজে কোন ফুল বসবে, সব ওর ডায়েরিতে লেখা। কে কোন গাড়িতে যাবে, সেই তালিকাও ওর করা। তালিকাটা আমি দেখেছিলাম। খেয়াল করিনি, কোনো গাড়িতেই আপুর নাম নেই।
শাড়িটা আম্মা কিনেছিলেন লুকিয়ে, মিরপুরের বেনারসি পল্লী থেকে। কারণ সেদিন আপু নিজের জন্য কিছুই কেনেনি।
কেনাকাটার দিন আমাদের পুরো দলটা দোকানে দোকানে ঘুরলো। দোকানিরা একটার পর একটা শাড়ি মেলে ধরছিলো। আপু আঙুলে জরির কাজ ছুঁয়ে বলে দিচ্ছিলো কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল। সবার শাড়ি ও-ই বাছলো। আমার বিয়ের লাল কাতানটা আমার কাঁধে ফেলে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে দেখলো, তারপর মুগ্ধ গলায় বললো, এইটাই! আপুর চোখ কখনো ভুল করে না।
কিন্তু দোকানদার যেই ওর দিকে একটা শাড়ি মেলে ধরলো, আপু হাত নেড়ে বললো, আমার তো আছে। খালা পাশ থেকে ফোড়ন কাটলেন, তোর তো সবই কালো, নিশি। কালো পরলে মোটা কম লাগে, না রে?
দোকানটার চারদিকে আয়না। খেয়াল করলাম, আপু এমনভাবে সরে সরে দাঁড়াচ্ছে যেন কোনো আয়নায় ওর মুখ না পড়ে। যে চোখ সবার জন্য ঠিক শাড়িটা এক নজরে চিনে নেয়, সেই চোখ নিজের দিকে আর তাকায় না।
আম্মা আপুর পিঠে আলতো করে হাত রেখে বললেন, মন খারাপ করিস না, মা। তোর জন্যও আল্লাহ কাউরে রাখছে। আপু হাসলো, যেভাবে মানুষ ভুল ঠিকানায় আসা চিঠি ফেরত দেয়।
পাত্রপক্ষ আসা অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। শেষের দিকে ওরা ছবি দেখেই খবর পাঠাতো, কিছু মনে করবেন না, মেয়ে একটু বেশি স্বাস্থ্যবতী। আম্মা ধরে নিয়েছিলেন, আপুর সব কষ্ট ওখানেই। আমিও তাই ধরে নিয়েছিলাম। ধরে নেওয়াটা সহজ ছিলো।
অ্যালবামটা পেলাম আলমারির নিচের তাকে। বান্ধবীরা বিয়ের দিনের জন্য একটা ভিডিও বানাচ্ছে, ওদের দুই বোনের ছবি চাই। মেঝেতে বসে পাতা ওল্টাতে লাগলাম।
প্রথম দিকের ছবিগুলোতে আপু সবার সামনে। কোমর ছোঁয়া চুল, হাসলে গালে টোল পড়ে। কোনোটায় কলেজের অনুষ্ঠানে স্টেজে দাঁড়িয়ে গান গাইছে, কোনোটায় আম্মার সেলাই মেশিনে ঝুঁকে আছে। কলেজে পড়ার সময় আপু নিজের ব্লাউজ নিজেই বানাতো। দেখে কেউ বিশ্বাস করতো না যে ওগুলো দর্জির হাতের না।
একটা ছবিতে আপু আমার ছোট্ট হাতে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছে। ঈদের আগের রাতে ও বলতো, তোর বিয়েতে এমন মেহেদি দিবো, জামাই সারারাত খুঁজেও নিজের নাম পাবে না! অথচ কাল হলুদে আমার হাতে মেহেদি দিলো পার্লারের একটা মেয়ে। আপু সারাটা সন্ধ্যা রান্নাঘরে ডেকচির পাশে দাঁড়িয়ে থাকলো। স্টেজে একবারও উঠলো না।
অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আপু ক্রমশ সরে যেতে লাগলো। প্রথমে ও সরে গেলো ছবির কিনারে, ওড়নাটা পেটের ওপর টেনে দেওয়া। তারপর চলে গেলো কারও কাঁধের আড়ালে। একটা ছবিতে ওর শুধু একটা হাত দেখা যায়। তারপর আর কোথাও নেই।
ফোনের গ্যালারিতেও একই অবস্থা। ঈদ, জন্মদিন, আমার এনগেজমেন্ট, কোনোকিছুর ছবিই বাদ নেই। শুধু আপু নেই। কারণ গত কয়েক বছরের সবগুলো ছবি আপুরই তোলা। ভিডিওগুলোতে আপুকে দেখা যায় না, শুধু ওর গলা শোনা যায়, আরেকটু বাঁয়ে সর, টুনি! হাসি থামাবি না! ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। আমার বিয়ের পুরো আয়োজনটা যে মানুষটা সামলাচ্ছে, সে-ই আমার এখনকার জীবনের কোনো ছবিতে নেই।
অথচ সবকিছু ঘটেছে আমার চোখের সামনেই। কলেজ পেরোনোর কিছুদিন পর থেকে আপুর শরীরটা যেন অন্য কারও হয়ে যেতে লাগলো। আত্মীয়রা গায়ে পড়ে উপদেশ দিতো। প্রত্যেকের কাছে ছিলো ওজন কমানোর একটা করে টোটকা। আপু সবগুলো চেষ্টা করলো। ভাত ছাড়লো, চিনি ছাড়লো, খালি পেটে লেবু, মধু আর মেথি ভেজানো পানি খেলো। ছাদে হাঁটলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ডাক্তারও বদলালো বারবার। কেউ কেউ বলতেন, ওজন কমান, সব ঠিক হয়ে যাবে। যেন কথাটা আপু আগে কখনো শোনেনি! ওষুধের খালি পাতায় ড্রয়ার ভরে গেলো। আপু সব ছাড়লো, শুধু খাঁটি ভালোবাসার মতো ওজনটা ওকে ছাড়লো না।
গোসলখানার ঝাঁঝরিতে দলা পাকানো চুল জমতো। আপুর সিঁথিটা একটু একটু করে চওড়া হচ্ছিলো। ঘাড়ে একটা কালচে দাগ পড়লো। আম্মা ভাবলেন ময়লা। লেবু আর সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে ঘাড় লাল করে ফেলতেন, দাগ তবু যেতো না।
একদিন ভুল করে বাথরুমের দরজা খুলে ফেলেছিলাম। আপু চিমটা দিয়ে থুতনির লোম তুলছিলো। আমাকে দেখে এমনভাবে আয়না থেকে মুখ ফেরালো, যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
রাতে ওর ঘুম আসতো না। এলেও দম আটকে ধড়ফড় করে উঠে বসতো।
শেষ যে দাওয়াতে আপু গিয়েছিলো, সেটা ফুপাতো বোনের বিয়ে। কনভেনশন হলের গেট দিয়ে ঢুকতেই এক চাচি গলা চড়িয়ে বললেন, ওমা, নিশি নাকি! তোরে তো চেনাই যায় না! আশেপাশের সবাই ঘুরে তাকালো। আপু সেদিন কিছু না খেয়েই ফিরে এসেছিলো। তারপর আর কোনো দাওয়াতে যায়নি।
স্কুলের বান্ধবীরা রিইউনিয়নের ছবি দিয়ে ক্যাপশনে লিখতো, মিস ইউ নিশি। আপু গ্রুপটা মিউট করে রাখলো। অফিস থেকে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে যেতো, রাতের খাবারও প্লেটে করে নিয়ে যেতো ঘরে। শামুকের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিলো।
শেষবার দর্জির দোকানে গিয়েছিলো গত ঈদে। দর্জি গলায় ফিতা ঝুলিয়ে জোরে জোরে মাপ বলছিলো। সে মুহূর্তে পাশে বসা মহিলারা হাসছিলো মুখ টিপে। তারপর আপু আর কোনো নতুন জামা বানায়নি। তার কিছুদিন পর দেখলাম, ওর ঘরের আয়নাটা একটা পুরোনো ওড়নায় ঢাকা।
অ্যালবামটা বুকে চেপে আপুর ঘরে গেলাম। ঘরের বাতি নেভানো ছিলো। আপু খাটে বসে ফোন দেখছিলো, মুখে ফোনের নীলচে আলো। রুমের এক কোণায় ওড়না ঢাকা আয়নাটা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলো অন্ধকারে ঘোমটা দেওয়া একজন মানুষের মতো।
নরম গলায় বললাম, তোমার ব্লাউজ পিস কাটা হয়নি।
আপু ফোন থেকে চোখ সরালো না। কণ্ঠে কৃত্রিম অনাগ্রহ ফুটিয়ে বললো, বিয়ের দিন বাসা খালি রাখা যায় না। কাউকে তো থাকতে হবে।
আমার গলা কেঁপে গেলো। সবার ছবি তুমি তোলো, হলুদে সবার খাবার তুমি বাড়ো, এখন বাসা পাহারাও তুমি দেবে?
আপু অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। অভ্যাসমতো একটা হাত উঠে গেলো ঘাড়ের দাগটার ওপর। তারপর খুব আস্তে বললো, তোর বিয়ের ছবি সারাজীবন থাকবে, টুনি। আমি চাই না বহু বছর পর কেউ অ্যালবাম খুলে জিজ্ঞেস করুক, পাশের মোটা মহিলাটা কে?
এসব তোমার দোষ না, আপু। এটা তো অসুখ।
জানি। ডাক্তারও খটোমটো নাম শুনিয়েছে, পিসিওএস। কিন্তু লোকে তো রিপোর্ট দেখে না রে, শরীর দেখে। রাস্তায় অচেনা মহিলা জিজ্ঞেস করে, কয় মাস চলছে? অথচ ডাক্তার বলেছে, বাচ্চা হতেও ঝামেলা হতে পারে। যে শরীরে বাচ্চা আসবে কি না ঠিক নেই, লোকে সেই শরীর দেখে বাচ্চার খবর নেয়।
আপু ফোনটা বালিশের পাশে উপুড় করে রাখলো। ক্লান্ত গলায় বললো, রোজ সকালে নিজের শরীরের সাথে একটা যুদ্ধ হয় রে। রোজ আমি হারি। হারার পর কেউ স্টেজে উঠে দাঁড়ায়, বল? প্রথমে ভাবতাম, একটু শুকালেই আবার সবার সামনে যাবো। শুধু এই দাওয়াতটা বাদ দিই, শুধু এই ছবিটা। ওজন কমলো না। কিন্তু বাদ দেওয়াটা অভ্যাস হয়ে গেলো। বাদ দিতে দিতে একদিন দেখি, নিজেকেই বাদ দিয়ে ফেলেছি। আম্মা ভাবে আমার কষ্ট বিয়ে নিয়ে। বিয়ে তো অনেক পরের কথা রে। আমি তো নিজের সাথেই থাকতে পারি না।
অথচ এই কষ্টে আমাদের হাতও কম নেই। আমার এনগেজমেন্টের দিন ফোনটা আমি নিজেই ওর হাতে দিয়ে বলেছিলাম, তুমি তোলো, তোমার ছবি তোলার হাত ভালো। আপু হেসে ফোনটা নিয়েছিলো। আমরা সবাই মিলে ওকে ক্যামেরার পেছনে দাঁড় করিয়েছি, তারপর ভুলে গেছি যে ও ছবিতে নেই।
আমি মেঝেতে বসে ছোটবেলার মতো আপুর হাঁটুতে মাথা রাখলাম। আপুর আঙুলগুলো আলগোছে আমার চুলে নামলো। ফিসফিস করে বললো, কাল তোকে খুব সুন্দর লাগবে, টুনি।
শাড়িটা ওর কোলের ওপর রেখে বললাম, জোর করবো না, আপু। শুধু একটা কথা বলি। তুমি না থাকলে আমার বিয়ের ছবিগুলো হয়তো সুন্দর হবে। কিন্তু সত্যি হবে না।
আপু কিছু বললো না। শুধু শাড়ির জরির পাড়ে একবার আঙুল বোলালো। আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম।
বিয়ের আগের রাতে কোনো মেয়ের ঘুম আসে না। আমারও এলো না। অনেক রাতে আপুর দরজা খোলার শব্দ পেলাম। কেউ পা টিপে টিপে স্টোররুমের দিকে গেলো। পুরোনো কপাটটা ক্যাঁচ করে উঠলো।
ফজরের আজানের একটু আগে পাশের ঘর থেকে শব্দটা ভেসে এলো। আম্মার পুরোনো সেলাই মেশিনটা চলছে। আমি উঠে দেখতে গেলাম না।
মেশিনটা মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিলো। তারপর আবার চলছিলো।
খুঁত
তাইমুর মাহমুদ শমীক
২৯/৯/২০২৬
