আর মাত্র একদিন। তারপরে গোটা এক বছরের অপেক্ষা। একালের মত সেকালেও কলকেতায় নবমীর দিন যে যতটা পারে আনন্দ করে নিতো। মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখছেন ""নবমীর দিন বিশেষ আমোদের ছিল নীল মাখান কোরা কাপড় পরে ঢুলীদের বাজনার সঙ্গে ছেলেদের নাচা। তখনকার দিনে নীল রং মাখান কোরা তাঁতের কাপড়ই ছেলেদের ভিতর বেশী প্রচলিত ছিল। "কাঁইনানা, কাঁইনানা, গিজদা গিজোর, গিজোর গিজোর"-আর ছোট ছেলেরা দু'পাছা চাপড়াইয়া নাচিত। তারপর ঢুলিদের আর একটা বোল ছিল-"দাদাগো দিদিগো গাবতলাতে গরু; দেখ সে গরু, গরু গরু গরু তার দেখব কি আর।" তখনকার দিনে দুর্গাপুজা হলে দশজনকে পাত পাড়াতে হত। শাক্ত ব্রাহ্মণ হইলে মাছ চলিত, কায়স্থের বাটিতে লুচি চলিত। যাহোক সাদামাটা খাওয়ান হইলেও সকলকে খাওয়ান চাই। দুর্গাপূজার সময় সকলকে মিষ্টি মুখ করান হত।“
শুধু কি তাই?
নবমীর দিন বাই নাচ চরমে উঠত।দীনবন্ধু মিত্র তাঁর "সুরধুনী কাব্য"-তে শোভাবাজার রাজবাড়িতে নবমীর রাতের দারুণ সুন্দর এক ছবি এঁকেছেন-
বসিয়াছে বাবুগণ করি রম্য বেশ
মাতায় জড়ির টুপি, কাঁপাইয়া কেশ
বসেছে সাহেব ধরি চুরুট বদনে
মেয়াম ঢাকিছে ওষ্ঠ মোহন ব্যাজনে,
নাচিছে নর্তকী দুটি কাঁপাইয়া কর
মধুর সারং বাজে কল মনোহর....
সাহেবদের খুশি করতে কত কী না করতে হত। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত জানিয়েছেন " কালীশঙ্কর ঘোষের বাটীর গুরু পুরোহিত কর্তা প্রভৃতি পুরুষ, অন্দরে গৃহিণী এবং সমস্ত পুরনারী মায় দাসদাসীদের সুরাপান করিতে হইত।" একদিন মাতাল কালীশঙ্করের পা টিপছে এক মাতাল চাকর। হঠাৎ সে ডুকরে কেঁদে উঠল। " বাবু বলিলেন, তুই কাঁদিতেছিস কেন রে? উত্তর হইল, কর্তা আপনার একখানা পা খুঁজিয়া পাইতেছি, আর একখানা বোধ হয় হারাইয়া ফেলিয়াছি, খুঁজিয়া পাইতেছি না।
বাবু হাসিয়া কহিলেন, তা চিন্তা কি বোধ হয় জল খাবারের জায়গায় ফেলিয়া আসিয়াছি। যা বাটীর ভিতর হইতে লইয়া আয়।"
সাবেক কলকেতার সেরা তিন পুজো ছিল দাঁ বাড়ি, মিত্র বাড়ি আর স' বাজারের রাজবাড়ি। প্রচলিত কথাই ছিল " মা আসিয়া গহনা পরেন শিবকৃষ্ণ দাঁ -র বাটী, ভোজন করেন কুমারটুলির অভয়চরণ মিত্রের বাটী আর রাত জাগরণ করিয়া বাইনাচ দেখেন স' বাজারের রাজবাটীতে।"
প্রাণকৃষ্ণ দত্ত আরও লিখেছেন " নবমীর বলিদানের আমোদ আরও অদ্ভুত। কেবল মহিষ মেষ ছাগ কুষ্মাণ্ড ও আখ বলি নহে, তাহার পর আমোদ করিয়া গোধিকা, কপোত, মাগুরমাছ, লেবু, সুপারি এমনকি গোলমরিচ অবধি বলিদান হইত। বলিদান শেষ হইলেই শুরু হইত নৃত্য। সেই রক্তপ্লাবিত প্রাঙ্গণে মোষের মুণ্ড, আখ, লেবু , নারিকেল লইয়া কাড়াকাড়ি আর রক্তে গড়াগড়ি দেওয়া হইত।"
এই রকম এক নবমীর দিন হুতোম মানে বাবু কালীপ্রসন্ন সিঙ্ঘের এক গল্প বলি। শোভাবাজার রাজবাড়িতে এসে বসেছেন তিনি। আড়ম্বরের চূড়ান্ত। হঠাৎ তিনি দাঁড়িয়ে সবাইকে শুনিয়ে বললেন " রাজার বাড়ি- দুগগো পুজো- নেমন্তন্নে আসা গেচে- সেপাই খাও, শান্ত্রী খাও-গোরা কনেস্টেবল খাও-ফরাস তাকিয়া কউচ খাও, ঝাড় সেজ দেলগিরি বেল লন্ঠন যত পার খাও, বাইজীর সেঁইয়া বেঁইয়া খাও, কিন্তু লুচি সন্দেশের প্রত্যাশা যদি কর তো সরে পড়"। আসলে সব উদ্যোগ ছিল কিন্তু অতিথিদের খাবার কোন ব্যবস্থা করেন নি কর্তা হরেন্দ্রকৃষ্ণ দেব।

তিনি বললেন "দেখছেন তো কত কান্ড! তার মধ্যে আবার খাওয়া দাওয়ার উদ্যোগ করলে সামলাব কেমন করে?"
"তা তো বটেই, তা তো বটেই" বলে উঠে পড়লেন কালীপ্রসন্ন।
পরের বছর থেকে নিজেরবাড়ির দুর্গাপুজোয় "রাস্তার দুধারে বাঁধা রোশনাই, বাড়িতে উৎকৃষ্ট তয়ফার মজলিস করে আর হাজার হাজার লোককে নিমন্ত্রণ করে পরিতোষকপূর্বক ঐশ্বর্য্যের আয়োজনে ভূড়িভোজন করিয়েছিলেন"। লোকে বলেছিল কালীপ্রসন্ন রাজার রাজা।
আর এই সব দেখেই কবি ঈশ্বর গুপ্ত লেখেন
ধন্য ধন্য কলিকাতা ধরেছে কলির ছাতা
ধন্য তব নব ব্যবহার।
হইতেছে কত রঙ্গ নাহি মাত্র তালভঙ্গ
বঙ্গদেশ পদে নমস্কার।।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন