কাল্ট তৈরীর গল্প। চলছে কয়েক বছর ধরেই। কখনো ভারতের সব সেলিব্রিটিদের ফরমায়েশ (বকলমে অনুরোধ) করা হয়েছে "মাই মোদী স্টোরি" হ্যাশট্যাগ দিয়ে প্রশস্তি লিখতে। কখনো সিবিএসইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ২রা অক্টোবর অবধি মোদীর ছোটবেলা নিয়ে সিনেমা দেখাতে। ভারতীয় যাদুঘরে মোদীর জীবনপথ নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে। এইবার স্কুল কলেজে প্রদীপ জ্বালানোর ফতোয়া এসেছে, আর নাটক মঞ্চস্থ করারও।
১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে, হিটলারের ৪৪তম জন্মদিনের কিছুদিন আগে মানহাইমের এক পরিবার থেকে একটা চিঠি এসে পৌঁছয় হিটলারের দপ্তরে। তাতে লেখা - "আমাদের ছোট্ট রিটা তার প্রিয় ফ্যুরারকে সম্মান জানাতে চায় হাইল হিটলার বলে। সেই জন্যে আমরা তার একটা ছবি পাঠালাম জার্মান স্যালুট করা অবস্থায়। রিটার বয়স দশ মাস, আমাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ওকে যখনই আমরা প্রিয় অ্যাডল্ফকাকুর ছবি দেখাই, ও স্যালুট করে।"
বছর কয়েক আগে এরকমই সময় লিখেছিলাম। পড়ে দেখুন কোনো মহান আত্মার সঙ্গে মিল পান কিনা।
১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে, হিটলারের ৪৪তম জন্মদিনের কিছুদিন আগে মানহাইমের এক পরিবার থেকে একটা চিঠি এসে পৌঁছয় হিটলারের দপ্তরে। তাতে লেখা - "আমাদের ছোট্ট রিটা তার প্রিয় ফ্যুরারকে সম্মান জানাতে চায় হাইল হিটলার বলে। সেই জন্যে আমরা তার একটা ছবি পাঠালাম জার্মান স্যালুট করা অবস্থায়। রিটার বয়স দশ মাস, আমাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ওকে যখনই আমরা প্রিয় অ্যাডল্ফকাকুর ছবি দেখাই, ও স্যালুট করে।"
ভোল্কার উলরিখের দু খন্ডের হিটলার বায়োগ্রাফির প্রথম খন্ডে একটা চ্যাপ্টার আছে, নাম - "কাল্ট অ্যান্ড কমিউনিটি"...ওপরের এই অংশটা সেই চ্যাপ্টার থেকে নেওয়া। কীভাবে হিটলারের পিছনে জার্মানির জনসংখ্যার বড় অংশটাই এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই আখ্যান।
১৯শে আগস্ট, ১৯৩৪ এর গণভোটের সময়ে এক জার্মান নাগরিকের পর্যবেক্ষণ - "সমস্ত বিলবোর্ডে হিটলার। প্রতিটা দোকানের জানলায় হিটলার। দোকান কেন, যত জানলা রয়েছে জার্মানিতে - ট্রাম, ট্রেন, গাড়ি, বাড়ি - প্রত্যেকটা জানলা দিয়ে হিটলার তাকিয়ে..."
বহু জার্মান নাগরিক চ্যান্সেলারির সামনে লাইন দিত তাদের প্রিয় ফ্যুরারের ছবিতে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্যে। ১৯৩৪ এর আগস্টে, হিমলার যখন তাঁর বাবামায়ের উদ্দেশ্যে হিটলারের ব্যক্তিগত বার্তা লেখা ছবি যোগাড় করে মিউনিখের বাড়িতে পাঠান, হিমলারের বড় ভাইয়ের কথা থেকে জানা যায় যে তাঁদের মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন...
উইডম্যানের লেখায় জানা যায়, হামবুর্গে একজন জার্মান নাগরিক ভিড়ের মধ্যে কোনোভাবে হিটলারের হাতে হাত ছোঁয়াতে পেরে আত্মহারা হয়ে "আমি ওঁকে ছুঁতে পেরেছি, ওঁকে ছুঁতে পেরেছি" বলে রাস্তায় পাগলের মত নাচতে শুরু করেছিল। উইডম্যানের ভাষায়, লোকটা যদি একবারও বলতো যে সে বাস্তবে খোঁড়া ছিল, আর হিটলারের ছোঁয়ায় সেরে উঠেছে, জনতা সেই কথাও বিশ্বাস করতো...
কাল্ট এইভাবেই তৈরী করা হয়...
আজকের ভারতেও বদল কিছুই হয়নি। রাস্তাঘাটে, বিলবোর্ডে, পেট্রল পাম্পে, ভ্যাক্সিন সার্টিফিকেটে, এয়ারপোর্টের ডিজিযাত্রার গেটে, ট্রেনে, স্টেশনে...প্রায় প্রতিটা দেওয়ালে একজনেরই মুখ। জন্মদিনে দিল্লীর মেট্রো চড়ে বেড়াতে বেরিয়ে খুব কনভিনিয়েন্টলি এমন একজনের দেখা পাওয়া যায় যে কিনা স্বত:প্রণোদিতভাবে সংস্কৃতে সেই একজনের বন্দনা করে ফেলতে পারে। সেই একজনকে কখনো একত্রে হাঁস-মুরগী-হরিণ-ম্যাকবুক-ক্যামেরা-বই সহযোগে দেখা যায় - মানুষে বিশ্বাস করে। কখনো ফাঁকা সমুদ্রতটে বোতল কুড়োতে দেখা যায় - মানুষে বিশ্বাস করে। কখনো কেদারনাথের গুহায় ধ্যানস্থ অবস্থায় দেখা যায় - ফটোগ্রাফার ছবি তুলে আনে - মানুষ তাও বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করে। জি২০ সম্মেলন জুড়ে একজনেরই প্রচার হয় বিশ্বগুরু হিসেবে। আমাদের বোঝানো হয় যে ভারতের অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে। আমরা সেই সবকিছুই মেনে নিই বিনা প্রশ্নে।
কারণ, কাল্ট এইভাবেই তৈরী হয়।
চ্যালা গুরুর পথেই চলবে তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবে, গুরুর আমলে সেই দেশে বাস্তবিকই বেশ কিছুটা অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের দশকের তুলনায়। লোকের হাতে চাকরি ছিল - সে অস্ত্র তৈরীর কারখানায় হলেও। পরবর্তীকালে যদিও প্রমাণিত হয় যে সেই উন্নতির চোটে জার্মান অর্থনীতিকে আসলে মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছিল (Was there a National Socialist economic miracle?, Wehler), তবুও সেই সময়ে একেবারে অর্থনৈতিকভাবে নীচুতলার মানুষগুলোও হাতে কাজ পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল। এখানে সেসব কিছুই হয় না। পুরোটাই ফাঁপা তর্জনগর্জন...আর দেখনদারি, একটা আপাদমস্তক জোকারকে নিয়ে। পাব্লিক রিলেশনসের জমানায় হয়তো এটাই হওয়ার কথা...
কাল্ট তৈরী।
সংযোজন: আশার কথা এইটাই যে পরের একটা জেনারেশন অন্তত: এই ঠগ জোচ্চোরটাকে চিনে ফেলেছে। আল্টিমেটলি ওই "ছপ্পন ইঞ্চকা ছোটা..."
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন