ইলা মিত্র (১৮ অক্টোবর ১৯২৫ – ১৩ অক্টোবর ২০০২)। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।
বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে বাংলার একাউন্টেন্ট জেনারেল। ১৯৪৫ সালে ইলা সেন-র বিয়ে হয় দেশকর্মী, কমিউনিস্ট পার্টির নেতা রমেন্দ্র নাথ মিত্রের সঙ্গে। রমেন্দ্র নাথ মিত্র রামচন্দ্রপুর হাটের জমিদার মহিমচন্দ্র মিত্রের ছোটো ছেলে। তিনি জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য ত্যাগ করে কৃষকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
জমিদারি বাড়িতে ইলা মিত্র যেন হাঁপিয়ে উঠলেন। সেই সময়ে রমেন্দ্র নাথ মিত্রের বন্ধু আলতাফ মিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ির কাছেই কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাটে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল খোলা হল। গ্রামের মানুষের নিরক্ষর মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এলেন ইলা মিত্র—বৃহত্তর সমাজ সেবার কাজের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন এলাকার রানীমা।
১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর নাচোল-এ তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব ছিলেন রমেন্দ্র নাথ মিত্র এবং ইলা মিত্র। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পর ইলা মিত্ররা রাজশাহীতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেশ ভাগ ও স্বাধীনতার পরেও পূর্ব পাকিস্তানে তেভাগা আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন হয়ে কঠোর হাতে এই আন্দোলন দমন করে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রোহনপুরে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে ইলা মিত্র বর্বর পুলিশের ভয়াবহ মধ্যযুগীয় নির্যাতনের শিকার হন।
ইলা মিত্র কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নির্যাতনের যে বিবৃতি দিয়েছেন, তার একটি ছোটো অংশ তুলে দিলাম—
‘সেলের মধ্যে আবার এসআই সিপাইদেরকে গরম সিদ্ধ ডিম আনতে হুকুম দিল এবং বললো ‘এবার সে কথা বলবে’। তারপর চার পাঁচজন সিপাই আমাকে জোরপূর্বক ধরে চিৎ করে শুইয়ে রাখল। একজন আমার যৌনাঙ্গের মধ্যে একটি গরম সিদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দিল। …পরদিন ১০/১/৫০ তারিখে যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন আমি দেখলাম, আমার দেহ থেকে দারুণভাবে রক্ত ঝরছে, আর আমার কাপড়-চোপড় রক্তে সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছে।’
ইলা মিত্র পরবর্তী সময়ে কলকাতাতে চলে আসেন। মৌলবাদী মুসলিম লীগ সরকার তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
তাঁকে সামগ্রিকভাবে বাঙালি ভুলে গেছে। তাঁর মতো অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিভিন্ন আন্দোলনের অগ্রণী নেতৃত্বকে আমরা ভুলে গেছি।
বাংলাদেশ শেষ কয়েক বছরে মৌলবাদের খপ্পরে বেশি করে পড়েছে। ২০২৩ সালে নিজে গিয়েও বুঝতে পেরেছি ওয়াহাবি/সালাফি প্রভাবে বাংলাদেশ আচ্ছন্ন, আর ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরে কিছু বাংলাদেশী ফেসবুক বন্ধু তাঁদের মুখোশ সরিয়ে মুখ বার করেছেন, সেই মুখে লেগে রয়েছে ধর্মীয় মৌলবাদের ছায়া। অনেকে হয়তো খেয়ালও করছেন না, তাঁদের বক্তব্য অন্য ধর্মের মানুষকে কতটা আঘাত করছে।
তবে এটুকুই কি শেষ? এরপরে কি কোনো কথাই আর নেই?
আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, এদিকে তিনি বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেলেও এখনও বাংলাদেশের নাচোলে ইলা মিত্রকে নিয়ে এই সময়ে সাত দিন ধরে মেলা হয়, তাঁকে শ্রদ্ধায় নত শিরে স্মরণ করা হয়। এই মেলার আয়োজন করে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ মিলন অভিলাষী মানুষ।
শেষ পর্যন্ত কট্টরপন্থা, অন্ধবিশ্বাস সবচাইতে ক্ষতি করে ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল শক্তিকে, এই ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিতে যেমন থাকেন বিশ্বাসী মানুষ, স্পিরিচুয়াল মানুষ তেমন সামিল হতে পারেন অবিশ্বাসী মানুষ। এই শক্তি সারা পৃথিবীতেই, নিজের ধর্মের উর্ধে উঠে, ব্যক্তিগত ক্ষতি স্বীকার করেন, মানবতার কথা বলেন। ধর্মান্ধদের কাছে এরাই মূল প্রতিপক্ষ।
শাস্ত্রবাদী, উগ্রবাদীদের কাছে ব্যক্তি ধর্মের থেকেও মূল প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় স্বাধীন স্বর।
তাই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু মানুষের উপরে আক্রমণ যেমন হয়, খেয়াল করে দেখবেন মূল আক্রমণ হয় ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের উপরে।
আমাদের সকলের—এই বাংলাতে, ওই বাংলাতে আত্মবিশ্লেষণ করা দরকার। কোনো ত্রুটি হয়ে যাচ্ছে না-তো! এমন ত্রুটি যা পরবর্তী প্রজন্মকে পিছিয়ে দেবে! এমন জায়গায় নিয়ে যাবে যেখান থেকে উঠে আসা বড়ো কঠিন।
বীণা দাশ, ইলা মিত্র, কল্পনা দত্ত, ফুলরেণু গুহ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদাররা চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও মানবিক ও প্রগতিশীল মতবাদ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেননি। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনমত ও সমর্থন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ইলা মিত্র বা বীণা দাশ ভূমিকা রেখেছিলেন।
কেন?
কারণ যখন সমাজ কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের মুক্তচিন্তা, সংস্কৃতি এবং বিজ্ঞানমনস্কতা। তাঁরা জানতেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরুর ভিন্নতা প্রোথিত করা হয় ব্যক্তির মননে, তবে পিছনে থাকে রাজনীতি। সেই নীতি আমাদের একত্রিত করে না। উন্নত করে না। আর তাই এই নীতি নিয়ে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন, বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আজকে উদার মানবতার বিশ্বাস পশ্চিমবঙ্গেও অনেকের কাছে গুরুত্ব হারায়, যেমন হারিয়েছে বাংলাদেশে, যেমন হারিয়েছে উপমহাদেশে। এসে দাঁড়ায়—ওরা ও আমরাতে। এই ওরাতে চলে যায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষ, ধর্ম নিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল মানুষ, ভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের মানুষ, ভিন্ন ভাষার মানুষ..।
আমার থেকে ভিন্ন মানুষ।
ধর্ম কখনোই মানুষের প্রথম পরিচয় হতে পারে না, তা সে সংখ্যাগুরু হোক বা সংখ্যালঘু।
প্রথম পরিচয় আমরা সকলে একবিংশ শতকের পৃথিবীর মানুষ, যারা সকলে চাই নিজের সন্ততিকে আজকের ‘বৈশ্বিক উত্তরে’র (Global North) মানুষের মতো জীবন দিতে। একদিকে আমরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, প্রযুক্তি এবং উন্নত জীবনযাত্রা চাই, অথচ অন্যদিকে মানসিকভাবে পড়ে থাকতে চাই মধ্যযুগীয় ধর্মীয় বা জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদের অহংকারে। এই বৈপরীত্য নিয়ে কখনো একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠন সম্ভব নয়।
দুটো একসঙ্গে হয় না, হবে না। 'উত্তরে' পালিয়ে গেলেও হবে না। সেই উন্নত সমাজগুলোর ভিত্তিমূলেও রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং পরমতসহিষ্ণুতা।
Madhusree Bandyopadhyay
13/10/2026
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন