সে প্রায় আশি বছর হতে চলল। দুূর দুরান্ত থেকে স্বাধীনতার হালকা আভাস ভেসে আসছে। দেশের রাজনীতি প্রচণ্ড উত্তাল। ঢেউ ভাঙছে, কারা টুটছে। কিন্তু অতদূর পর্যন্ত সে ঢেউ, সে আভাস পুরোপুরি পৌঁছয়নি। হালকা অন্ধকার। রাস্তার দুপাশের উঁচু উঁচু গাছের ডালপালা গুলো নিজেদের মধ্যে জড়াজুড়ি করে আছে, বিকেলের রোদ্দুর রাস্তায় পড়তে পারছেনা। তাই এখানে অন্ধকারটা আরেকটু বেশী।
শুধু তুরতুরিই নয়, চারিপাশে মাইল পনেরোর মধ্যে কোহিনূর, রায়ডাক, ধউলাঝোড়া, কার্তিক এমনকি জয়ন্তী চা বাগানের সব বাবুদেরই সেনবাবুর দোকানই একমাত্র ভরসা।
আবার ওদিকে ঘড়িতে চারটে বাজে, শীতকালের বিকেল, অন্ধকার হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আলিপুরদুয়ার থেকে তেইশ মাইল মত। বড়জোর এক ঘণ্টার রাস্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোতর পৃথিবী। মিলিটারির থেকে কেনা সেকেন্ড হ্যান্ড বিএসএ মোটর সাইকেলের ঘুভ ঘুভ গম্ভীর আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত দুপাশের জঙ্গল চিরে বুকের মধ্যে একটা ভয় ধরাচ্ছে প্রাণীকুলের। তারা রাস্তা থেকে সর সর আওয়াজ তুলে দূরে চলে যাচ্ছে, যতটা পারে, আবার কৌতূহলও রয়েছে তাদের, তাই একটু দূর থেকে লক্ষ্য রাখছে রাস্তা দিয়ে কে যায়, একটু লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা যাক! ওদের চোখের ওপর লাইট পড়তেই কৌতূহলী চোখগুলো জ্বলতে থাকছে।
সেনবাবু প্রতি সোমবার আর শুক্রবার আলিপুরদুয়ার গিয়ে বাজার করে আনেন। ওনার এই বাহনকে সবাই চেনে, পুরো তেইশ মাইলের দুপাশের মানুষ। এবং অন্যন্য প্রাণীরাও। এড়িয়ে চলে তারা। অবশ্য মানুষরা দুপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। শিশু মানুষরা চোখ বড় বড় করে দেখে। জঙ্গলের শিশু প্রাণিরা শুধুই শোনে। হয়তো কেউ কেউ দূর থেকে দেখেও নেয়।
আজ মোটর সাইকেলের পেছনে বসে আছে সেনবাবুর দোকানের কর্মচারী গদাই। দুই ব্যাগ মালপত্র ধরে আছে। আজ শুক্রবার, রোববারে অনেক বিক্রী বাটা হবে। মাস তিনেক আগেই এই রাস্তায় ফিরতে গিয়ে রাস্তায় একটা চিতাবাঘ এসে গেছিল। মোটর সাইকেলের হেডল্যাম্পের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল বেচারার। কোনোরকমে মাত্র কুড়ি ফিট দূরত্বে দাঁড় করাতে পেরেছিলেন মোটর সাইকেল। সেই চিতাবাঘ ঘুভ ঘুভ আওয়াজে ঘাবড়ে গিয়ে ছুটতে ছুটতে পালিয়ে গেছিল ওই জয়ন্তীর দিকে জঙ্গলে। তাই তার পর থেকে গদাই সাথে আসে। কিন্তু সেই গদাই এর জন্যেই যে আজ একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, কেই বা জানত।
শামুকতলা থেকে বাঁ দিকের রাস্তা নিয়েছেন সেন বাবু। কোহিনূর চা বাগান ডাইনে রেখে এগোচ্ছেন। শীতকালের বিকেল, তাড়াতাড়িই সন্ধে হয়ে এসেছে। আজ আলিপুরদুয়ার থেকে বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেছিল। লোকনাথপুরও পেরিয়ে গেছেন। সামনে ঘন জঙ্গল। ডাইনে রায়ডাক বাগান। বাঁ দিকের জঙ্গল বেশ ঘন, বক্সার জঙ্গলে বাঘ আছে। আর এই সময়টায় ওনারা শিকারে বেরোন। লোকনাথপুরের রাস্তায় অনেকগুলো বাইসন, ওই যাদের পায়ে সাদা মোজা, সেই ভারতীয় গৌড় এক পাল রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ওদের জন্যেই দেরী হয়ে গেল আরও বেশ খানিকটা।
আর মাত্র মাইল পাঁচেক বাকি তুরতুরি চাবাগান পৌঁছতে। ডানদিকে রায়ডাক বাগানে যাওয়ার রাস্তা পেরিয়ে গেলেন। তুরতুরি চা বাগানের ম্যানেজার ওনার জামাইবাবু। এইটাই এই এলাকার একমাত্র চা বাগান যার ম্যানেজার বাঙালী, অনেক সম্মান ওনার। আশে পাশের সব বাগানের ম্যানেজারই সাহেব, একমাত্র জামাইবাবু ছাড়া।
তুরতুরি চা বাগানের মধ্যেই সেনবাবুর দোকান। সব ধরনের জিনিসপত্র রাখেন। কুমারগ্রামে সোমবার করে একটা হাট বসে ঠিকই, কিন্তু রোজকার দোকান বাজারের জন্যে সবাই সেন বাবুর দোকানকেই ভরসা করে। কুলিদের সে আর্থিক ক্ষমতা নেই। তাদের ওই হাটবারই একমাত্র ভরসা।
ওদিকে সারে চারটে বাজতে না বাজতেই সন্ধের অন্ধকারটা যেন ঝপ করে চারিপাশ ঘিরে ফেলল। ঘুভ ঘুভ শব্দে চারিপাশের সব প্রাণীদের প্রাণ তটস্থ করে সেন বাবুর মোটর সাইকেল এগিয়ে চলেছে দুপাশের ঘন জঙ্গলের মাঝে সামান্য এক ফালি রাস্তা দিয়ে। পিচের রাস্তা সব আলো শুষে নিচ্ছে। প্রায় সব প্রাণীই বিচলিত, শুধু একজন ছাড়া।
সেনবাবু হঠাৎ দেখলেন সামনের অন্ধকারটা যেন একটু বেশীই কালো।
একলা হাতি মানেই পাগলা হাতি, সেনবাবু বিলক্ষণ জানেন। উনি দাঁড় করিয়ে দিলেন মোটর সাইকেল। তাঁর পাহাড় প্রমাণ সাইজ, তিনি পঁচিশ তিরিশ ফিট দূরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। মোটেই তিনি বিচলিত নন, একটুও ভয় পাননি। প্রচণ্ড কৌতহল নিয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন।
হাতিটি আসতে আসতে এগিয়ে এসে একটু দূর থেকে শুর দিয়ে সামনের চাকাটা আলতো করে আদর করতেই মোটর সাইকেলের পেছন থেকে গদাই লাফ দিয়ে নেমে পড়েছে। সেই ধাক্কায় সেনবাবুও পড়ে গেলেন। মোটর সাইকেলের স্টার্ট বন্ধ হয়নি। তারপরের ঘটনাটুকু গদাইএর কাছ থেকেই শোনা যাক। গদাই দেখলো হাতিটি সামনের পা'টা তুলেছে ঠিক সেনবাবুর মাথার ওপরে। গদাই এরপর এক মুহুর্তও দেরী না করে এক ছুটটে গিয়ে সোজা তুরতুরি বাগানের ম্যানেজারকে পুরো ঘটনা বিস্তারিত বলতেই ম্যানেজার তাঁর শ্যালককে খুঁজতে গাড়ি নিয়ে, বন্দুক কাঁধে বেরোবার তোরজোর করতে শুরু করে দিলেন। বাড়ির ভিতরে ওদিকে কান্নার রোল। সেনবাবুর দিদি নিজেকে সামলাতে পারছেন না।
তুরতুরি চা বাগানের ম্যানেজারবাবু সবে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছেন, দেখেন মোটর সাইকেল চেপে ওনার শ্যালক, সেন বাবু বাগানের গেট পেরিয়ে ভিতরে আসছেন। শুধু ব্যাগ গুলো নেই পেছনে, গদাই ওখানেই ফেলে এসেছিল।
আমি তো ভাবলাম আজ মরেই গেছি। হঠাৎ হাতিটা কি ভাবলো। সামনের পা'টা আমার মাথার ওপর থেকে সরিয়ে নিল। আর এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো রাস্তায় পড়ে থাকা, মোটর সাইকেলের ঘুরন্ত চাকার দিকে। মন দিয়ে শুনল ঘুভ ঘুভ শব্দ। অবাক হয়ে দেখল বন বন করে ঘুরছে পেছনের চাকা। তারপর যেন বেশ খুশী মনে হেলতে দুলতে আবার বক্সার জঙ্গলের দিকে জয়ন্তীর রাস্তায় চলে গেল।
রাস্তা থেকে উঠে, গা হাত পা ঝেড়ে মোটর সাইকেল তুলে, সোজা চলে এলাম।
দেশ আশি বছর এগিয়ে গেছে। কিন্তু সেদিনের সেই কুলিদের আজও আর্থিক ক্ষমতা নেই। কারণ তাদের বোনাস নেই, তাই পুজোতে জামা কাপর কেনার, আনন্দ করার আর্থিক সঙ্গতি কোথায়? পুজো এলো, তুরতুরি চাবাগানের কুলিরা সে আনন্দ থেকে বাদ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন