রবিবার, ১৩ জুন, ২০২১

সাঁইবাড়ি তে কী ঘটেছিল ~ নীল লোহিত

১২ ই মার্চ, ১৯৭১। বর্ধমান টাউন হলে কংগ্রেসের জেলা জমায়েত ছিল। চাঁদু চৌধুরী নামে এক যুবক বাসে চেপে সেহারা, কাঁটাপুকুর থেকে আসছিল। সেই বাসেই ছিল জমায়েতে যোগদানকারী বিরোধী পক্ষের পান্ডারা। বাসে ওরা চাঁদুকে দেখতে পেয়েই পকেটমার, পকেটমার চিৎকার করে ওঠে। বাস তখন সগড়াই মোড়ে। ক্ষোভে লজ্জায়, নিজের প্রাণ বাঁচাতে চাঁদু সগড়াই মোড়ে নেমে ধানক্ষেতের উপর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে। সগড়াই মোড় থেকে উদিত গ্রাম পেরিয়ে আহ্লাদিপুর। সেখানে ছিল তাঁর পিসির বাড়ি। গ্রামের মানুষ খেয়ে তখন ভাতঘুম দিচ্ছিল। এমন সময় ইশু চৌধুরীর নেতৃত্বে কংগ্রেসী গুন্ডারা চাঁদুর খোঁজে গ্রাম আক্রমণ করলো। চাঁদু তার পিসির বাড়িতে খবর দিয়েই পাশের গ্রাম উগ্রতিতে খবর দিতে চলে গেল। কংগ্রেসী গুন্ডাদের হাতে বন্দুক অন্যদিকে নিরীহ গ্রামবাসীরা। গ্রামবাসীদের সম্বল বলতে তীর ধনুক, টাঙ্গি। আহ্লাদিপুর গ্রামের পাশাপাশি উগ্রতি গ্রাম থেকে লালচাঁদ বাগদী সহ অন্যরা এসে গেছে। বিকেল চারটে সাড়ে চারটের সময় বন্দুক হাতে নব সাঁই এসে হাজির। ৭৫ বছরের আনসার মির্জাকে বলা হল গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে। আনসার মির্জা বললো আমরা তো বুড়ো মানুষ, কোথায় যাবো? টাঙ্গির এক কোপে পাশের ডোবায় আনসার মির্জার মুন্ডু পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সৈয়দ মির্জা প্রথমে পালিয়ে গেছিলো, পরে পরিবারের খবর নেওয়ার জন্য গ্রামে ফিরতেই খুন করা হল। ৬৫ বছরের শরৎ দলুই মাঠের উপর দিয়ে পালানোর সময় খুন হন। খুন হলেন কমঃ শিবু রাম। মোট ৪ জন শহীদ হলেন আহ্লাদিপুরে। গোটা গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ধানের মড়াই, গমের মড়াই সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। গ্রামের সবাই তখন পালিয়ে মাঠে বসবাস করছে।

ওমর আলির বয়স্ক বাবাকে মারধর করলো নব সাঁই এর নেতৃত্বে কংগ্রেসী গুন্ডারা। লালচাঁদের পায়ে গুলি করা হয়েছিল। লালচাঁদের পা ভেঙে যায়। ওই অবস্থায় ও নব সাঁই, ইশুকে আঁকড়ে ধরে মাটিতে ফেলে গলায় টাঙ্গির এক কোপ। মাথাটা ওদের ছিটকে গেল। রক্ত, রক্ত, রক্তে ভেসে গেল গোটা আহ্লাদিপুর গ্রাম। 

সাঁই রা ছিল অর্থ, ক্ষমতা আর বন্দুকের জোরে বর্ধমান জেলার অত্যাচার, সন্ত্রাস ও নৃশংসতার প্রতীক। 'ওই মলয়-প্রণব আসছে' গোটা বর্ধমানে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছিল সাঁইরা। মলয় সাঁই ও প্রণব সাঁই দু দফার পিভি অ্যাক্টে বন্দী ছিল। বহু খুন, জখম মামলার আসামী ছিল সাঁইরা। হরিসভার হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রাজলক্ষ্মী মুখার্জির বাড়িতে মলয় সাঁই এর নেতৃত্বে হামলা করা হয়েছিল। তাঁর মাকেও প্রহার করা হয়েছিল। আদালত থেকে জামিনের শর্তই ছিল বর্ধমান শহরের বাইরে থাকতে হবে। ওদের ভগ্নিপতিও পিভি অ্যাক্টে বন্দী ছিল। 

১৬ ই মার্চ মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি ইস্তফা দিলে যুক্তফ্রন্ট সরকার পরে যায়। অনৈতিকভাবে সরকার ভাঙার প্রতিবাদে বামফ্রন্ট ধর্মঘট ও মিছিলের ডাক দেয়। সারা রাজ্যের মত বর্ধমান শহরেও মিছিল হয়েছিল। মিছিল যখন এস বসু রোডে, প্রতাপেশ্বর শিবতলায় এসে উপস্থিত তখন সাঁইরা হাতবোমা, পাইপগান নিয়ে হামলা চালায়।সাঁইদের ছোঁড়া বোমার আঘাতে জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন গৌর সরকার। পরে এই গৌর সরকারকেই পুলিশ গ্রেফতার করে। বোমার ঘটনায় উত্তেজিত হয়ে মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা সাঁইবাড়িতে হামলা চালায়। মলয় সাঁই, প্রণব সাঁই ও জিতেন রাই মারা যান। সেদিন কিন্তু বাড়ির জামাই কিংবা নব সাঁই এর কিছু হয়নি। সাঁইদের বড়ভাই এর চোখে নাকি অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিল। রাজ্যপাল ধরমবীরের সামনে চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে মিডিয়ায় তাই বলেছিল। অথচ ১৫ দিন পর জনসভায় ভাষণ দেন তখন চোখে ব্যান্ডেজ ছিল না। ভাবা যায় অ্যাসিড ঢালার পর মাত্র কয়েকদিনে সুস্থ হয়ে গেছিলো নব সাঁই। এই নব সাঁই খুন হলেন ১২ ই জুন, রায়নার আহ্লাদিপুর গ্রামে আক্রমণ করতে গিয়ে।

সাঁই মামলায় একদিনে ৭০ জন গ্রেপ্তার হলেন। এলাকার হেডমাস্টার থেকে বহিরাগত সবাই গ্রেপ্তার হলেন। সাঁইদের সহানুভূতি দেখাতে তৎকালীন রাজ্যপাল ধরমবীর থেকে সিদ্ধার্থ শংকর রায় সবাই সাঁইবাড়ি গেছিলেন। রাজ্যপালের এই যাওয়াকে ব্যঙ্গ করে মিছিল সংগঠিত করলেন বিনয় কোঙার। এবার বিনয় কোঙার টার্গেট হয়ে গেলেন। এপ্রিলের ২/৩ তারিখে মেমারির বিধায়ক বিনয় কোঙার গ্রেপ্তার হলেন। এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামী বর্ধমান জেলা পার্টির সম্পাদক সুবোধ চৌধুরী পর্যন্ত গ্রেপ্তার হলেন। 

২৩ শে মে খুন হলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী শিবশঙ্কর চৌধুরী ওরফে কালো চৌধুরী। এহেন প্রবীণ নেতাকে ছাড় দেয়নি নব সাঁই এর নেতৃত্বে কংগ্রেসের গুন্ডাবাহিনী। মামলা লড়ার জন্য কোনও উকিল দাঁড়ায়নি। সবারই তো প্রাণের ভয় আছে। কালো চৌধুরীর এক কথাতে রাজী হয়ে গেলেন উকিল ভবদীশ রায়। বিনা অর্থে বিনয় কোঙার সহ অন্যান্য বন্দীদের হয়ে সাঁই মামলায় সওয়াল করার জন্য। ৬ ই এপ্রিল বর্ধমান শহরে খুন হলেন লক্ষ্মী নায়েক। তার কয়েকদিন পরে খুন হয়ে গেলেন উকিল ভবদীশ রায়। সকাল সাড়ে দশটায়, যখন রিকশায় চেপে মুহুরির সাথে কোর্টে যাচ্ছিলেন তখন বর্ধমান থানার পাশেই খোসবাগানে গুলি করা হল। পুলিশ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বার্তা পৌছে দেওয়া হল হত্যার সপক্ষে পুলিশ আছে। আর মে মাসে খুন হলেন কালো চৌধুরী। পার্টির কাজ সেরে ভাইপো অমিতাভের বাড়ি থেকে খেয়ে বর্ধমান শহরের নিজের ভাড়া বাড়িতে সাইকেলে করে যখন ফিরছিলেন সেই সময় রাতের অন্ধকারে গুলি করে খুন করলো কংগ্রেসী গুন্ডারা। দিনটা ছিল ২৩ শে মে, ১৯৭১। না ভবদীশ রায় না শিবশঙ্কর চৌধুরী ওরফে কালো চৌধুরীর খুনের ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার হলেন। সারা বর্ধমান জুড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব চললো।

১৯৭০ সালের ২৮শে এপ্রিল গঠিত হয় তারাপদ মুখার্জি কমিশন। তখন কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সব জেলে। টাউনহলে সেই কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দেবার মতো পরিবেশ ছিল না। শুধুমাত্র কংগ্রেসের কর্মী ও নেতারা কমিশনের কাছে সাক্ষী দেয়। সেই রিপোর্ট পেশ হয় ২৫শে এপ্রিল ১৯৭১সালে। সেখানে কমিশনের রিপোর্টে প্রকাশ- এটা কোন ষড়যন্ত্র বা সুপরিকল্পিত ঘটনা নয়। ১৯৭২সালের ১০ই মার্চ নির্বাচনে রিগিং-এর মাধ্যমে জিতে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মুখ্যমন্ত্রী হন। তখন তারাপদ মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট বিধানসভাতে কেন পেশ করা হলো না? রাষ্ট্রপতি শাসন চলাকালীন তারাপদ মুখার্জি রিপোর্ট জমা করলেও লোকসভাতে সেই কমিশনের রিপোর্ট পেশ করা হয়নি।

১৯৭০ সালের ১৭ ই মার্চ সাঁই বাড়ির ঘটনায় যারা নিহত হন তাঁদের বর্ধমান শহরে ঢোকা নিষেধ ছিল আদালতের নির্দেশে। তারা শর্তাধীনে জামিন পেয়ে বাইরে ছিলেন। কমিশন বিষ্ময় প্রকাশ করে এরা বর্ধমান শহরে ঢুকলেন কিভাবে? তারাপদ মুখার্জি কমিশন কোথাও উল্লেখ করেননি নিরুপম সেন, বিনয় কোঙারের নাম। শুধুমাত্র পুলিস ও প্রশাসনের অপদার্থতার কথায় উল্লেখ ছিল। মহকুমা শাসককে সাসপেন্ডও করা হয়। বদলি করা হয় থানার আইসি ও অতিরিক্ত জেলাশাসককে।

সাঁই কান্ডের কয়েক মাস পরেই রাষ্ট্রপতি শাসনের মধ্যে ভোট হয়েছিল। যথারীতি সেই ভোটেও জিতেছিল বাম প্রার্থী বিনয় চৌধুরী।

আগামী ১২ ই জুন অন্যান্য বছরের মতো এবছরও আহ্লাদিপুর গ্রামে নব সাঁই এর গুন্ডাবাহিনীর হাতে নিহতদের স্মরণ করা হবে সামাজিক দূরত্ব মেনে। চাইলে আপনিও উপস্থিত থাকতে পারেন।

আহ্লাদিপুর গ্রামের ঠিকানা - 
গ্রাম - আহ্লাদিপুর, পোস্টঃ শ্যামসুন্দর, পি এস - রায়না, জেলা - পূর্ব বর্ধমান, পিন কোড - ৭১৩৪২৪

শনিবার, ১২ জুন, ২০২১

ডাক্তারদের প্রতীক চিহ্ন “ক্যাডুসিয়াস” - মড়ার গাড়ির লোগো ডাক্তারদের গাড়িতে ~ ডাঃ স্বপন কুমার গোস্বামী

একটি দণ্ডের দুপাশে দুটি ডানা ছড়ান রয়েছে । আর সেই দণ্ডকে বেষ্টন করে দুটো সাপ মুখোমুখি তাকিয়ে আছে । এই প্রতীক চিহ্নটি সকলেরই পরিচিত ।

 ডাক্তারদের প্যাডে ও  গাড়িতে এই লোগো লাগান হয় । 

 ডাক্তারদের এই প্রতীকচিহ্নের  নাম " ক্যাডুসিয়াস "
- এই নামটি সকলেরই অজানা।  

এর আগে ডাক্তাররা ভুল করে তাদের চিহ্ন হিসেবে "আন্তঃর্জাতিক রেড ক্রশ সোসাইটি"র  জন্য  সংরক্ষিত প্রতীক চিহ্ন লালরঙের ক্রস ব্যবহার করতেন । আন্তর্জাতিক রেডক্রশ সোসাইটির আইনি  নিষেধাজ্ঞায়  ডাক্তারদের প্যাড বা গাড়ি থেকে রেডক্রশ প্রতীক লাগান বন্ধ হয়ে যায় ,ফলে রেডক্রশের পরিবর্তে  বর্তমানে প্রতীক চিহ্ন হিসেবে  " ক্যাডুসিয়াস" ব্যবহৃত হতে থাকে ।

 কিন্তু এই ক্যাডুসিয়াস প্রতীক কি ডাক্তারদের পক্ষে উপযুক্ত ? 

ক্যাডুসিয়াস আসলে গ্রীক পুরাণে বর্ণিত দেবতা হোমার  বা মার্কারি  বা  হারমেস এর  ব্যবহৃত  দন্ড । একে "হেরাল্ড'স স্টাফ"ও বলা হয় । এনারা কেউই চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যের দেবতা নন ।

 গ্রীক দেবতা হারমেস ক্যাডুসিয়াস দণ্ড হাতে মৃত্যুর পরে মানুষের আত্মাকে মৃত্যুপুরীতে নিয়ে যান । অর্থাৎ ক্যাডুসিয়াস যমের বাড়ি নিয়ে যাবার প্রতীক দণ্ড । হ্যারি পটারের সিনেমাতে ক্যাডুসিয়াস হাতে আত্মাকে নিয়ে যাবার দৃশ্য দেখান হয়েছে । 

গ্রীক পুরাণে ডানাওলা সাপ জড়ানো দণ্ডটি ব্যবহৃত করা হত – প্রতারণা,  ছলনা , কথার জাল বুনে লোক ঠকানো ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ প্রতীক হিসেবে । 
তারও আগে হোমারের এই ক্যাডুসিয়াস দণ্ড ছিল বাণিজ্য সংক্রান্ত আলোচনার প্রতীক । গ্রীক দেবতা হারমেস বা মার্কারি ছিলেন দস্যু ,মেষপালক ,ব্যবসায়ী ও মুসাফিরদের দেবতা । 
তাই ক্যাডুসিয়াস দণ্ড সেকালে মৃত্যুরাজের দণ্ড ছাড়াও চোর জোচ্চোর প্রতারক ব্যবসায়ী ও বণিকদের লোগো হিসেবে স্বীকৃত । 

কোন মতেই এই ক্যাডুসিয়াস দণ্ড ডাক্তারদের প্রতীকচিহ্ন হতে পারে না । 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ এবং বিংশ শতকের গোড়ার দিকে  কিছুটা ভুল ব্যাখ্যা , কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি  ও  কিছুটা সংশয় নিয়ে  এবং একজন মানুষের অদ্ভুত খেয়ালের জন্যে ক্যাডুসিয়াস প্রতীক ডাক্তারদের চিহ্ন হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়ে গেল । 

সে এক বিচিত্র ইতিহাস । 

আমেরিকার এক মেডিক্যাল বইব্যবসায়ী ও প্রকাশক ও  জন চার্চিল কোন কিছু না ভেবেই নতুনত্ব আনার জন্যে তাঁর মেডিক্যাল বইয়ের বিজ্ঞাপনে ক্যাডুসিয়াস লোগো ছাপতে শুরু করলেন  ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে । এতদিন ডাক্তারি বইয়ের বিজ্ঞাপনে কোন চিহ্ন ব্যবহার করা হত না । কিন্তু এবার চার্চিল প্রকাশনার দেখাদেখি অন্য প্রকাশকরাও তাদের মেডিক্যাল বইয়ে ক্যাডুসিয়াস লোগো ছাপতে আরম্ভ করলেন । 

আমেরিকার ডাক্তারি বইয়ে এই ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপা শুরু হলেও গ্রেট বৃটেন বা ইউরোপের কোথাও মেডিক্যাল বইয়ে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপা হত না ।

পরবর্তীকালে  আমেরিকার দেখাদেখি   ক্রমে ক্রমে সারা পৃথিবীতেই মেডিক্যাল বইতে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপা শুরু হয়ে গেল । মেডিক্যাল বইতে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপাটাই  রেওয়াজ হয়ে দাঁড়াল ।

 যদিও এই দুয়ের মধ্যে বিন্দুমাত্র  সম্পর্ক নেই । 

রাজা অষ্টম হেনরি'র ব্যাক্তিগত চিকিৎসক স্যর উইলিয়াম বাঠস এই ক্যাডুসিয়াস প্রতীকটি তাঁর  রাজকীয় মর্যাদার  স্বতন্ত্র চিহ্ন হিসেবে তাঁর নিজস্ব কাগজপত্রে ব্যবহার করা শুরু করলেন ।

 সেই প্রথম একজন চিকিৎসকের কাছে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন সমাদর লাভ করল । একজন হাই প্রোফাইল ডাক্তার ক্যাডুসিয়াস লোগো ব্যবহার করতে শুরু করলেন । 

পরবর্তীকালে  'রয়াল কলেজ অফ ফিজিসিয়ানস' এর প্রেসিডেন্ট এবং কেম্ব্রিজ কেইয়াস কলেজের প্র্তিষ্ঠাতা জন কেইয়াস  তাঁদের অধীনস্থ কলেজগুলি পরিদর্শনের সময়ে রূপোর তৈরী একটি বড় ক্যাডুসিয়াস দণ্ড সিংহাসনে  বসিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে শাখা কলেজ গুলিতে প্রবেশ করতেন । পরে  ঐ ক্যাডুসিয়াস দণ্ডটি কলেজে স্থাপন করা হত । এইভাবে মেডিক্যাল কলেজে ক্যাডুসিয়াস প্রতীক প্রবেশ করল । 

লাঠির গায়ে জোড়া সাপের বেষ্টনী যুক্ত হারমেস ,মার্কারি বা হেরাল্ডের যে ক্যাডুসিয়াস দণ্ডটি এতদিন প্রতারক, তঞ্চক , ও ব্যবসায়ীদের প্রতীক হিসেবে নির্দিষ্ট ছিল  সেটি উইলিয়াম বাঠস এবং জন কেইয়াসের পৃষ্ঠপোষকতায় দুই  নামী দামী  চিকিৎসকদের প্রতীক চিহ্নরূপে পরিচিতি লাভ করল । 

চিকিৎসা বিষয়ক ঐতিহাসিক ফিল্ডিং গ্যারিসন এর মতে ষোড়শ শতাব্দীতেও চিকিৎসাজগতের প্রতীক হিসেবে ক্যাডুসিয়াস ব্যবহার করা হত ।  ঐ শতাব্দীতে জার্মাণীর প্রকাশক জোহান্স ফ্লোবেন কিছু মেডিক্যাল বইয়ের প্রচ্ছদে ক্যাডুসিয়াস ছাপতে শুরু করেছিলেন । 

আমেরিকা ছেড়ে এবার ইংলণ্ডের  প্রকাশকরাও ডাক্তারি বইতে  ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ছাপা শুরু   করল । 

ঐতিহাসিক ফিল্ডিং গ্যারিসন এর মতের বিরোধিতা করলেন ওয়াল্টার  ফ্রিডল্যান্ডার । তাঁর মতে জন কেইয়াস  শোভাযাত্রায় যে দণ্ডটি ব্যবহার করতেন তা কোনমতেই হেরাল্ডস স্টাফ ক্যাডুসিয়াস নয় । উচ্চপদস্থ সম্ভ্রান্ত রাজপুরুষগন বনেদীয়ানার পরিচয় দিতে রূপো বাঁধান এক দণ্ড  হাতে রাজপথে  ভ্রমন করতেন ।  জন কেইয়াসও তেমনি এক রাজকীয়  দণ্ড হাতে   শৌর্যের প্রকাশ দেখিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে মেডিক্যাল  কলেজ পরিদর্শনে যেতেন , যাতে তাঁকে দেখে লোকের মনে ভয় শ্রদ্ধা ও  সম্ভ্রম জাগে । 

১৮৫৪ সালে  গ্রেটব্রিটেন ডানাযুক্ত দণ্ডের গায়ে দুটি সাপের বেষ্টনী বা  ক্যাডুসিয়াস লোগো জুয়াড়ি  প্রতারক যমদূত বা ব্যাবসায়ীদের   পেশার প্রতীক বলে ঘোষণা করলেন ।

 পক্ষান্তরে  একটি দণ্ডের গায়ে একটি সাপ জড়ানো স্বাস্থ্যের দেবতা অ্যসক্লেপিয়াসের দণ্ড " রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস" কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীকচিহ্ন বলে নির্দিষ্ট করা  হল । 
এই ভাবে  দুরকম পেশার জন্য দুরকম প্রতীক নির্দিষ্ট করে দেওয়া হল ।  

অন্যপ্রান্তে  আমেরিকার সার্জন জেনারেলও  একটি দণ্ডকে বেষ্টন করা একটি সাপ -" রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস "কে   চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ব্যবহারের নির্দেশ দিলেন।

 এখনকার  অ্যাম্বুলেন্সের  গায়ে এই চিহ্নটি দেখা যায় । 

এই বিভাজনের মধ্যেই ১৮৫৬ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হাসপাতালের স্টুয়ার্ডদের  ইউনিফর্মের  জামার  দুহাতের  পাশে ক্যাডুসিয়াস প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করতে শুরু করে দিল । 

চিকিৎসাজগতে জোড়াসাপযুক্ত দণ্ড  ক্যাডুসিয়াস চিহ্নকে এ ভাবে যুক্ত করা এক মহা ঐতিহাসিক ভুল । কিন্তু চিকিৎসার সঙ্গে কোন সম্পর্ক না থাকা সত্বেও  সেটাই সারা বিশ্বে গৃহীত হয়ে গেল । 

১৮৭১ সালে মেরিন হাসপাতালে সার্ভিস সিলমোহর হিসেবে ক্যাডুসিয়াস ছাপ ব্যবহার করা শুরু হল । ১৮৮৯ সালে এই দপ্তর ইউনাইটেড স্টেটস পাব্লিক হেলথ সার্ভিস এ রূপান্তরিত হয় । 

১৯০২ সালে ইউনাইটেড স্টেটস আর্মির মেডিক্যাল অফিসারদের ইউনিফর্মে ক্যাডুসিয়াস লোগো ব্যবহার করা শুরু হয় । 

প্রতারকদের প্রতীক , ব্যবসায়ীদের প্রতীক , মৃত্যুদূতের প্রতীক "ক্যাডুসিয়াস"কে ডাক্তারদের ইউনিফর্মে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে চিকিৎসক মহল প্রবল প্রতিবাদ জানালেন । প্রতিবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, ১৯০২ সালের ২৮ শে জুন প্রকাশিত "দি আর্মি এন্ড নেভি রেজিস্টার"এ সামরিক বাহিনীর ডাক্তারদের ইউনিফর্মে ক্যাডুসিয়াস ব্যবহারের জন্য কর্তৃপক্ষকে  কৈফিয়ত বা ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল । 

এই প্রতীকের ব্যাখ্যায় সেনাবাহিনীর তরফে  বলা হয়েছিল ক্যাডুসিয়াস প্রতীকটি কোন মতেই চিকিৎসা বিষয়ক প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয় নি । 

যে গুঢ় অর্থে ওই প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে তা হল ঃ 
১) ক্যাডুসিয়াসের মূল দণ্ডটি  ক্ষমতার প্রতীক
২) দন্ডের দুপাশে প্রসারিত ডানা – পরিশ্রম ও কর্মদক্ষতার প্রতীক 
৩) দণ্ডের গায়ে বেষ্টিত জোড়া সাপ জ্ঞানের প্রতীক 
আমেরিকার সেনাবিভাগের চিকিৎসকদের নিঃসন্দেহে উপরোক্ত গুণাবলী রয়েছে ,তাই সেনা চিকিৎসকদের পোশাকে ক্যাডুসিয়াস চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে ।
সেনা কর্তৃপক্ষ আরো জানিয়েছে যে , কোনমতেই হারমেস এর দণ্ড ক্যাডুসিয়াস চিকিৎসকদের প্রতীক নয় এমনকি  চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত কোন বিষয়ক চিহ্নও নয়  । 

আমেরিকার সেনা বিভাগ যে ব্যাখ্যাই দিক ততদিনে ক্যাডুসিয়াস চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীক চিহ্ন হিসেবে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রতীকটির আসল অর্থ না জেনেই ।

 এটা কাদের ব্যবহার করার উপযুক্ত  চিহ্ন সেটা না বুঝেই -  চিকিৎসাজগতের মানুষজন  ডাক্তারি বইয়ে বা  তাদের কাগজপত্রে ক্যাডুসিয়াস প্রতীক ব্যবহার শুরু করে দিল । 

যুক্তি সাজিয়েও আর ক্যাডুসিয়াসকে  ডাক্তারদের  কাছ থেকে স্থানচ্যুত করা গেল না । 

বেশ কিছুকাল পরে সার্জন জেনারেল অফিসের এক গ্রন্থগারিক নথিপত্র গেঁথে কর্তৃপক্ষকে জানালেন- ক্যাডুসিয়াস চিহ্নকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা এক বিরাট ঐতিহাসিক  ভুল ।

 তাই চিকিৎসকদের ব্যবহার করা এই চিহ্ন বাতিল করা হোক । 

কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এই আবেদন গ্রাহ্য না করে  প্রশাসনের তরফে  ঐ গ্রন্থাগারিকের আবেদনটাই  বাতিল করে দেওয়া হয় ।

 ফলে সেই ভুল জোড়াসাপ চিহ্ন আজও বহাল তবিয়তে চিকিৎসা জগতে  বিরাজমান। 

আমেরিকার সেনাবাহিনীর পোষাক ও প্রতীকচিহ্ন বিভাগের গবেষক ঐতিহাসিক এ মার্সন জানান ঃ ১৯২৪ সালের এপ্রিল সংখ্যায় "দি মিলিটারি সার্জন" এর "প্রেস মেডিক্যাল" বিভাগে পূর্ব প্রকাশিত এক নিবন্ধের  পুনর্মুদ্রনে বলা হয়েছিল – ক্যাডুসিয়াস চিহ্নকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতীক হিসেবে গণ্য করার কোন ঐতিহাসিক যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই । সংশয়ের অবকাশ থাকা সত্বেও এটিকে ডাক্তারদের লোগো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে । 

স্টুয়ার্ট এল টাইসন " দি সায়েন্টিফিক মান্থলি" পত্রিকায় 'দি ক্যাডুসিয়াস'  প্রবন্ধে লিখেছেন  ঃ  " বাস্তবিক পক্ষে গ্রীক দেবতা হারমেসের দণ্ডকে চিকিৎসকদের প্রতীকরুপে কখনও মেনে নেওয়া সম্ভব নয় । কারণ হারমেস হলেন চোর , মিথাবাদি , ব্যবসায়ী ও জুয়াড়িদের পৃষ্ঠপোষক – চিকিৎসকদের নয় ।

হারমেস হলেন হাইওয়ে ,রাস্তার হকার , হাট বাজার ও ধনী বণিকদের দেবতা ,  যারা কথার তুবড়ি ছুটিয়ে হয় কে নয় করতে ওস্তাদ ।

 এই দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করলে ক্যাডুসিয়াস চিহ্নটি  নেতা রাজনীতিক নেতা  বা সেলসম্যানদের পেশার সঙ্গে মানানসই , কোন ডাক্তারদের পেশার সঙ্গে নয় । 

মৃত মানুষের আত্মাকে নিয়ে যেতে যে ক্যাডুসিয়াস দণ্ড ব্যবহার করা হয় , সেই মড়ার গাড়িতে লাগাবার উপযুক্ত প্রতীক কখনো ডাক্তারের গাড়ির লোগো হতে পারে না । " 

 লিউক ভ্যান অর্ডেন  " WHERE HAVE ALL THE HEALERS GONE – A DOCTORS RECOVERY JOURNEY " প্রবন্ধে বলেছেন ঃ " আধুনিক চিকিৎসকদের সঙ্গে ভুলক্রমে ক্যাডুসিয়াস প্রতীকচিহ্ন যুক্ত হয়ে গেছে , সত্যিই কি তাই ?

 সত্যিই কি ক্যাডুসিয়াস চিকিৎসকদের পক্ষে বেমানান প্রতীক ? চিকিৎসার নামে যেভাবে রোগীদের কাছ থেকে টাকা শোষণ করা হচ্ছে , মূমুর্ষু রোগীর চিকিৎসার অজুহাতে যেভাবে বিরাট বহরের প্যাথলজি পরীক্ষার নামে অত্যাধিক টাকা আদায় করা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে প্রতারণা ,তঞ্চকতা ব্যবসার প্রতীক ক্যাডুসিয়াস চিকিৎসা ব্যবসায়ীদেরই উপযুক্ত প্রতীক ।" 

এই মন্তব্য  করেছেন কিন্তু খাস বিলেতের সমালোচক লিউক ভ্যান অর্ডেন , অনেক কাল আগেই  বিলিতি ডাক্তারদের আচার ব্যবহার দেখে । আজকের কলকাতার কর্পোরেট হাসপাতালের বা নার্সিং হোমের  পকেট  কাটা চিকিৎসা পদ্ধতি তিনি দেখেন নি । 

তাহলে ডাক্তারদের জন্য কোন প্রতীক ব্যবহার করা উচিত ? 

উইলিয়াম হাউব্রিচ এর মন্তব্যঃ  চিকিৎসকদের উপযুক্ত প্রতীক হল "রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস "- যেখানে একটি দণ্ডের গায়ে একটি সাপ জড়িয়ে আছে সেটি । গ্রীক পুরাণে অ্যাসক্লেপিয়াস স্বাস্থ্যের দেবতা অ্যানেলার পুত্র । তিনি স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও রোগ নিরাময়ের দেবতা । তাঁর হাতের দণ্ডের নাম " রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস "-সেবা শুশ্রূষার প্রতীক । অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে এই চিহ্নটিই দেখা যায় । 

সমীক্ষায় দেখা গেছে সেবাব্রতী  চিকিৎসকদের মধ্যে ৬২ % 'রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস' কেই তাদের পেশার সঙ্গে মানানসই প্রতীক হিসেবে মান্য করে । 

অন্য এক সমীক্ষায় ৭৬ % ডাক্তার ক্যাডুসিয়াস প্রতীক পছন্দ করে ।

এই সমীক্ষায় চিকিৎসকদের দু ভাগে ভাগ করা হয়েছে ।

 প্রথম দল সেবাকাজে নিযুক্ত চিকিৎসক ।

 দ্বিতীয় দলে রয়েছেন চিকিৎসা ব্যবসায়ীরা । 

যুক্তি তর্ক গপ্পো যাই হোক আজ দুটো সাপ জড়ান দণ্ড ক্যাডুসিয়াস মানেই ডাক্তারদের চিহ্ন – এই ধারণা থেকে মুক্তির উপায় নেই । 

চোর জোচ্চোর প্রতারকদের গ্রিক দেবতা হারমেস এর দন্ড আজ ডাক্তারদের লোগো ।
 
 মৃত আত্মাদের যমের বাড়ি নিয়ে যাবার প্রতীক ক্যাডুসিয়াস আজ ডাক্তারদের প্রতীক ।

মড়ার গাড়িতে লাগাবার লোগো আজ ডাক্তারদের গাড়িতে ।

স্বাস্থের দেবতা অ্যাসক্লেপিয়াসের হাতের দণ্ড "রড অফ অ্যাসক্লেপিয়াস" –যেটি ডাক্তারদের প্রকৃত প্রতীক তা উপেক্ষায় আজ অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে শোভা পাচ্ছে । 


শুক্রবার, ১১ জুন, ২০২১

শালকু সরেন ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

বুর্জোয়াদের দুটো মুখ - একটা বেশ আপাত ভদ্র সভ্য লিবারাল আর আরেকটা নখ দাঁত বের করা ক্রুড টাইপের ফ্যাসিজম। এক বিখ্যাত অতি বাম নেতার তত্ব অনুযায়ী লেসার ইভল আর গ্রেটার ইভল। টিভি ইত্যাদি দেখিনা তো লোকমুখে শুনলাম এক গ্রেটার ইভল না কি দল পাল্টে লেসার ইভল হয়েছেন তাতে ওই অতিবাম নেতা আনন্দে নৃত্য করতে পারেন যে তার সাধের ফ্যাসিবিরোধী যুক্তফ্রন্টে একজন সৈনিক বাড়ল বলে। কিন্ত আমরা যারা পাতিবাম তারা নাচতে পারছি না আজ ঠিক। না উঠোনের দোষ নয় উঠোন ঠিকই আছে। আসলে আজ দিনটা একটু অন্যরকম। আজকের দিনে ওই অতিবাম নেতাদের আরেক ঝাঁকের হাতে খুন হয়েছিল সালকু শোরেন নামের এক পাতিবাম পুঁচকে নেতা। তাকে খুন করে ওই অতিবামের দল রাস্তায় ফেলে গিয়েছিল। আমাদের পাতিবামেদের তখন সরকার ছিল, তার পুলিশ ছিল, প্রশাসন ছিল তবুও শালকুর লাশ রাস্তায় পরেছিল। সরকারে থাকা দল কিছুই করতে পারেনি। কেবল কেউ কেউ অস্ফুটে বলেছিল "প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, প্রতিশোধে কমরেড, গড়ে তোল, গড়ে তোল, গড়ে তোল ব্যারিকেড।" না ব্যারিকেড গড়ে তোলা যায় নি সেদিন। আজও যায় নি। বারবার লিবারাল, অতিডান, অতিবামদের হাতে সালকুরা খুন হয়েছে। সেদিন হয়েছে, লেসার ইভিলরা ক্ষমতায় আসার দিন খুন হয়েছে। তার পরের দিন হয়েছে। গ্রেটার ইভিলরা ক্ষমতায় আসলেও খুন হত। সরকারে না থাকা অবস্থায় খুন, সরকারে থাকা অবস্থায় খুন, সরকার থেকে চলে যাওয়ার পরেও খুন। এই নিধনযজ্ঞটাই সালকুদের মতো বামদের জন্য ধ্রুবক, অপরিবর্তনীয়। আপনি লেসার-গ্রেটার, দিমিত্রভ-রোজা লুক্সেমবার্গ, ফুকো-গ্রামশি কোনো তত্ব আউড়েই এ জিনিষ লুকোতে পারবেন না। বিপ্লব হয়নি এমন দেশে একটা কম্যুনিস্ট নাম যুক্ত পার্টির নাম করুন তো যাদের এত কমরেড খুন হয়েছে ? গ্রেটার-লেসার ইভিল তত্ত্বের প্রবক্তা বিখ্যাত দেড়েল নেতা নিজেকে যার অনুগামী বলেন সেই দাড়িহীন রোগা পাতলা কার্ডিয়াক এজমার রোগী আরেক অতিবাম নেতার একটা তত্ব ছিল, "শ্রেণী শত্রুর রক্তে যে হাত রাঙায় নি সে বিপ্লবী নয়"। এই ভোকাবুলারিরে সালকু নয়, সবচেয়ে বড় "বিপ্লবী" আজ সেই নেতা যিনি ঘরে ফিরলেন, গ্রেটার থেকে লেসার হলেন। অন্য দেড়েল অনুগামী বিপ্লবীরা তার জয়ধ্বনি করুন। আমরা কেবল অস্ফুট নয়, সোচ্চার হয়ে বলে যাবো, প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, প্রতিশোধে কমরেড, গড়ে তোল, গড়ে তোল, গড়ে তোল ব্যারিকেড। 

শালকুর পার্টি যারা করেন তারা সবসময় মনে রাখবেন যে শ্রেণীহীন সমাজ যতদিন না গড়ে উঠছে ততদিন কমিউনিস্টরা কেউ বঙ্গশ্রী, পদ্মশ্রী পুরষ্কার পাবে না, ভোটের আগে পরে কোনো বুর্জোয়া নেতা নেত্রী তাদের ধন্যবাদ জানাবে না, তারা কেবল বুর্জোয়াদের হাতে খুনের পরে রাস্তায় লাশ হয়ে পরে থাকার পুরস্কার পাবে। ইভিল মানে ইভিল, শয়তানের শয়তানির কম-বেশি হয় না - এটাই অপরিবর্তনীয় ধ্রুব সত্য -সালকু জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছে। শহীদ কমরেড সালকু শোরেন অমর রহে। কমরেড সালকু শোরেন লাল সেলাম।

সোমবার, ৭ জুন, ২০২১

শ্রোডিংগারের বিড়াল ~ সৌমিক দাশগুপ্ত

এগেইন, ছেলেটার টি এর চয়েস গুলো যত দেখছি, তত অবাক হচ্ছি। 

শ্রোডিংগারের বিড়ালের থিয়োরী যারা জানে না, তাদের জন্য দু কলম লিখি৷ 

এই থিয়োরীর মুল বক্তব্য হল সহাবস্থান। অর্থাৎ একই সাথে দুটো বিপরীত অবস্থা সম্ভব, যতক্ষণ তাকে না দেখা হচ্ছে৷ অর্থাৎ আমরা দেখি বা অবসার্ভ করি বলেই, লাল টা লাল, সবুজটা সবুজ। যতক্ষণ না তাকে দেখছি, সে সম্ভাব্য সমস্ত রকম অবস্থায় বিদ্যমান। অর্থাৎ আমার চেতনার রঙে, পান্না হল সবুজ, চুনী উঠলো রাঙা হয়ে।

ধরা যাক, একটি বিড়াল কে একটি বাক্সে বন্ধ করে রাখা হল। এবার সেখানে একটি তেজস্ক্রিয় পদার্থ রাখা হল, যার হাফ লাইফ এক ঘন্টা। (হাফ লাইফ হল, কোনো তেজস্ক্রিয় পদার্থ যতক্ষণ পর ক্ষয় হয়ে প্রাথমিক ভরের অর্ধেক ভরে পরিণত হয়)। এবার এমন একটা ব্যবস্থা করা হল, মৌলটি যেই হাফ হয়ে যাবে, একটা হাতুড়ি একটা বিষাক্ত গ্যাসে ভরা কাঁচের পাত্রে আঘাত করে তাকে ভেঙে ফেলবে। এবং গ্যাসের বিষক্রিয়ায় বিড়ালটি মারা যাবে। এরপর বাক্সটি বন্ধ করে দেওয়া হল। 

এবার এক ঘন্টা পর বাক্সটি খোলার ঠিক আগে বিড়ালটি কেমন অবস্থায় থাকবে। শ্রোডিংগার বললেন, বিড়ালটি এই মুহুর্তে জীবিত এবং মৃত, দুই অবস্থাতেই আছে। বাক্সটি খোলার পর যখন তাকে অবসার্ভ করা হবে, সেই অবসার্ভেশন ঠিক করবে, বিড়ালটি ফাইনালি কোন অবস্থায় থাকবে। 

শুনতে খুব আষাঢ়ে মনে হলেও, এই তত্ত্ব জন্ম দেয় পদার্থবিদ্যার সবচেয়ে কূট শাখার। কোয়ান্টাম ফিজিক্স। এবং সত্যিই এই অনিশ্চয়তা বিড়াল, মানুষ, ফুটবল এর মত বড় বস্তুর ক্ষেত্রে কাজ না করলেও পারমাণবিক স্তরে দেখা যায়। সুশান্তের টি শার্টের ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাসি এবং কান্না দুটোই একই সাথে বিদ্যমান। 

এই কোয়ান্টাম তত্ত্ব জন্ম দিয়েছিল মাল্টিভার্স বা প্যারালাল ইউনিভার্স থিয়োরীর। যেখানে এই মহাবিশ্বের মত অসংখ্য মহাবিশ্ব বিদ্যমান। সেই বিশ্বে আমরাও আছি, সম্ভাব্য সব রকম অবস্থা নিয়ে। 

কে বলতে পারে, সেরকমই এক সমান্তরাল মহাবিশ্বে আজও সুশান্ত হুবহু মাহির মতোই স্টেপ আউট করে ছক্কা মেরে গ্যালারির বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে সমস্ত রকমের হেরে যাওয়াকে।

আলো কি কণা না তরঙ্গ ~ সৌমিক দাশগুপ্ত


আলো বস্তুটা কী? সেই ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি, আলো নিজে অদৃশ্য, অন্য বস্তুকে দৃশ্যমান করতে সাহায্য করে। এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলেন তিনি। কিনি? আরে আদ্ধেক বৈজ্ঞানিকের নাম না মনে পড়লে, সিধে পরম পিতা নিউটনকে স্মরণ করে নিতে হয়। ভদ্রলোক জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করে গেছেন। নিউটন না হলে আইনস্টাইন। অন্তত সেভেন্টি পার্সেন্ট কেসে এই ফর্মুলা কাজে লাগবেই লাগবে। অবশ্য আদিকাল থেকে ইউক্লিড, দেকার্তে, ডেমোক্রেটাসরা এই নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। আমরা নিউটনের কাজ নিয়েই কথা বলি। 


তা নিউটন সায়েবের কাছে অত যন্ত্রপাতি ছিল না সেই সময়ে। যা ছিল, তাই দিয়ে খুটুর খাটুর করে বলে দিলেন, আলো হল এক ধরনের পার্টিকল। নিউটন বলে কথা। লোকে মেনেও নিল। কিন্তু পাবলিক অনুভব করলো, কোথায় যেন একটা লোচা থেকে যাচ্ছে। আলোর নেচার, পার্টিকল থিয়োরিকে সাপোর্ট করছে না। লোকে আপত্তি করতে শুরু করলো। 

এমনই এক ঢ্যাঁটা লোক ছিলেন হিউজেন। প্রমাণ করেই ছাড়বেন, আলো কোনো কণা নয়। তরঙ্গ মাত্র। প্রমাণ করেই দেবেন, নিউটনের কণা তত্ত্ব বা করপাসকুলার থিয়োরি আসলে ভুল। 

কিন্তু বললেই তো করা সম্ভব নয়। হুঁ হুঁ বাওয়া। ওর নাম নিউটন। হিউজেন অনেক চেষ্টা করলেন। গাদা গাদা আলফা বিটা গামা ল্যামডা লেখা থিয়োরিটিকাল থিসিসও নামালেন। কিন্তু ইহা বিজ্ঞান। হাতে কলমে প্রমাণিত না হলে উহা প্রমাণ নহে। অবশেষে ভগ্নহৃদয়ে আলোর তরঙ্গ খোঁজার কাজে ক্ষান্ত দিলেন। 

গুরুর অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে এলেন ইয়ং, হিউজেনের ছাত্র। অবশেষে এলো সেই দিন। প্রমাণিত হল, লাইট ইজ নট পার্টিকল। লাইট ইজ ওয়েভ। বিখ্যাত সেই এক্সপেরিমেন্টের নাম, ইয়ং'স ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট। 

খটোমটো লাগলেও, পরীক্ষাটি কিন্তু বেশ সহজ। একটা একরঙা আলো নিতে হবে। সাদা আলো চলবে না। কারণ সাদা মানে অনেক রঙের সমাহার। তাদের ওয়েভ লেংথ বা তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বিভিন্ন রকম। তা সেই একরঙা আলোকে একটা ধাতব পাত, যাতে দুটো ফাঁক (স্লিট) আছে, তার মধ্য দিয়ে পাঠানো হল। দেখা গেলো পেছনে রাখা পর্দায় আলোর দুটো ব্যান্ড নয়, ফুটে উঠেছে সারি সারি আলো আঁধারির ব্যান্ড। 

ধরা যাক, পুকুরে দুটো ঢিল ছোঁড়া হল। দুটো তরঙ্গ সৃষ্টি হল। দেখা যাবে, এই দুই তরঙ্গ মিলে গিয়ে কোথাও বড় তরঙ্গ সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও বা দুটো তরঙ্গই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ একই সাথে কনস্ট্রাকশন আর ডেসট্রাকশন। দুটো ওয়েভ খাপে খাপে মিলে গেলে, অর্থাৎ ক্রেস্টের সাথে ক্রেস্ট, ট্রফের সাথে ট্রফ মিলে গেলে সৃষ্টি হয় আরো বড় ওয়েভ, কিন্তু কোথাও যদি একের ক্রেস্ট অন্যের ট্রফের সাথে ধাক্কা খায়, একে অন্যকে খতম করে দেয়।

একই ভাবে আলো বিহেভ করেছিল। যেখানে কনস্ট্রাকশন, তৈরী হয়েছিল আলোর ব্যান্ড। যেখানে ডেস্ট্রাকশন, নেমে এসেছিল আঁধার। (সাথে ছবি দিলাম একটা)। প্রমাণ হল আলো একটি তরঙ্গ। পিছনে হটলো নিউটনের করপাসকুলার থিয়োরি। 

এর পর এলেন প্ল্যাংক, রাদারফোর্ড, নীলস বোরেরা। তাঁদের হাতে তখন ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্টের চাবিকাঠি এসে গেছে। ফের হল ডাবল স্লিটের পরীক্ষা। কিন্তু এবার আলোর বদলে নেওয়া হল ইলেক্ট্রন গান। যে আলোর মতোই ইলেক্ট্রনের স্রোত ছুঁড়ে দেবে ওই মেটাল পাতের মধ্য দিয়ে। ইলেক্ট্রন একটি দৃশ্যমান বস্তু। শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়। অর্থাৎ এনার্জির বদলে ম্যাটার নিয়ে শুরু হল পরীক্ষা। 

সবিস্ময়ে তাঁরা দেখলেন, ইলেকট্রন আচরণ করছে আলোর মতোই। পেছনে তৈরী হচ্ছে সেই আলো আঁধারির খেলা। কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এটা? বস্তু আচরণ করছে শক্তির মত। কণা আচরণ করছে তরঙ্গের মত। ব্যাপারটাকে আরো ভালোভাবে দেখার জন্য তাঁরা ওই স্লিটের আগে একটা অবসার্ভার লাগালেন। যে গোয়েন্দার নজরে দেখবে, কীভাবে ইলেকট্রন বদলে যাচ্ছে ওয়েভে। ঘটছে বস্তু থেকে শক্তির রূপান্তর।

চুড়ান্ত, চুড়ান্ত বেকুব বনে গেলেন তাঁরা। যেই মুহুর্তে অবসার্ভার রাখা হল, পলকে পেছনের পর্দার সেই আলো আঁধারির প্যাটার্ন পালটে গেল দুটো সমান্তরাল রেখায়। অর্থাৎ স্বাভাবিক কণার স্রোত দুটো জানলার মধ্য দিয়ে গেলে যেরকম আচরণ হওয়া উচিত, সেরকমই। নজর সরাতেই আবার সেই আলো আঁধারী। আলো আঁধারীর ব্যান্ড। নজর দিলেই স্বাভাবিক আচরণ। 

সেদিন ইতিহাস তৈরী হয়েছিল। খুলে গেছিল বিজ্ঞানের এক নতুন দুনিয়া, যার নাম কোয়ান্টাম জগৎ। এ এমন জগৎ, যা অনিশ্চয়তায় ভরপুর। প্রমাণিত হল, আমরা বাস্তবে যা যা জিনিস দেখছি, তা আসলে তরঙ্গ। একেবারে বেসিক লেভেলে পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুই তরঙ্গ। এই বস্তু সত্ত্বা আসলে এক ইল্যুশন মাত্র। আমরা দেখছি, আমরা অবসার্ভ করছি, তাই সে বস্তু। নয়ত সে আসলে ওয়েভ। এই মুহুর্তে যাকে আমি দেখছি না, তার আসলে কোনো অস্তিত্বই নেই। সে আছে তরঙ্গাকারে। আমি যখনই তাকে দেখবো, সে আমার জন্য নিজের আকার ধারণ করবে। তৈরী হল বিখ্যাত ওয়েভ পার্টিকল ডুয়ালিটি তত্ত্ব। কে তৈরী করলেন?  লেখার একদম শুরুতে নিউটনের সাথে যাঁর নাম নিয়েছিলাম, সেই ভদ্রলোক। নিউটন বিজ্ঞানের ব্রহ্মা হলে তিনি বিজ্ঞানের বিষ্ণু। আলবার্ট আইনস্টাইন। তিনি বললেন,
 "It seems as though we must use sometimes the one theory and sometimes the other, while at times we may use either. We are faced with a new kind of difficulty. We have two contradictory pictures of reality; separately neither of them fully explains the phenomena of light, but together they do."

 গোদা বাংলায় যার মানে দাঁড়ায় আলোর দুটো পরস্পর বিরোধী সত্ত্বা আছে। একই সাথে সে তরঙ্গ এবং কণা। মান রক্ষা হল নিউটনের করপাসকুলার থিয়োরির। আবিষ্কার হল আলোর কণা, 'ফোটন'।
লেখা শেষ করার আগে, মরফিউসের সেই দুর্দান্ত বক্তব্য মনে পড়ছে।
 "What is "real"? How do you define "real"? If you're talking about what you can feel, what you can smell, taste and see then "real" is simply electrical signals interpreted by your brain."

এবার শেষ করি রবীন্দ্রনাথ দিয়ে। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যায় রবীন্দ্রনাথ???  হুঁ হুঁ বাওয়া। আছো কোথায়। এ নিয়েও কবিতা লিখে গেছেন উনি। আজও হয়ত কলম চালিয়ে যাচ্ছেন, কোনো কোয়ান্টাম সমান্তরাল জগতে। 

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম "সুন্দর',
সুন্দর হল সে।

সৃষ্টির গোড়ার কথাই এই 'আমি'। আমি আছি, তাই এই পৃথিবী আছে। আমি নেই, তো কিচ্ছু নেই। আছে এক সুবিশাল অন্তহীন তরঙ্গ।