শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪

ইস্কুল, মিড ডে মিল ও তাঁর নিজস্ব অনুভব ~ সীমান্ত গুহঠাকুরতা

 

"মাস দুয়েক হল এক চরম অভাবের সংসারের কর্তা সেজে বসেছি। এ এক অদ্ভুত 'নেই-রাজ্য'। স্কুল-বাড়ি ভেঙে পড়ছে -- রক্ষণাবেক্ষণের পয়সা নেই, শিক্ষক নিয়োগ হয় না -- আংশিক সময়ের শিক্ষকের বেতন দেবার সামর্থ্য নেই,  বাচ্চারা প্রচন্ড গরমে কষ্ট পাচ্ছে -- পর্যাপ্ত পাখা কেনার ফান্ড নেই, স্কুল চত্বরে রাত্রে বহিরাগত সমাজবিরোধী ঢুকছে – নিরাপত্তা রক্ষী রাখার অনুমতি-অধিকার কোনোটাই নেই। বাচ্চাগুলো ক্ষিধেয় মুখ কালো করে ঘুরে বেড়ায় -- তাদের পাতে একটু সুখাদ্য তুলে দেবার ক্ষমতাও নেই। মাথাপিছু বরাদ্দ যা, তা দিয়ে ওই ডাল-ভাত-আলু কুমড়ো অথবা আলু-সয়াবিনের 'থোড় বড়ি খাড়া খাড়া বড়ি থোর' চালিয়ে যেতে হয় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। 

কিন্তু ভালোবাসা? সেটুকু কি আছে আমাদের? শাস্ত্রে বলেছে 'শ্রদ্ধায়া দেয়ম্‌', অর্থাৎ যাকে যেটুকু দেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবে। শ্রদ্ধা তো অনেক বড় ব্যাপার, বাচ্চাগুলোর পাতে দুপুরের অন্নটুকু তুলে দেবার সময় সামান্য দরদ বা ভালোবাসাটুকুও কি আমাদের থাকে? আমরা, পেটমোটা মধ্যবিত্তের দল আজও তো মিড-ডে মিলটাকে নিছক দয়া হিসেবেই দেখি, ভাবি রাষ্ট্রীয় খয়রাতি। আর আমার মত যারা ব্যবস্থাটার সঙ্গে জড়িত তারা তো এটাকে পড়াশুনার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটা উটকো ঝামেলা হিসেবেই গণ্য করি। তাই গ্রামের সেলফ-হেলফ গ্রুপের মহিলারা রান্না করেন, বাচ্চাগুলো থালা হাতে গিয়ে দাঁড়ায়, ভচাৎ করে এক থাবা ভাত আর এক হাতা ডাল এসে পড়ে, সেই থালা নিয়ে গিয়ে ওরা কোনো কোনায় গিয়ে বসে গপগপ করে গেলে। কেউ কোনোদিন ওদের ডেকে জিজ্ঞেসও করে না, 'কীরে, পেট ভরেছে?' কিংবা 'আরে একটু ভাত বা তরকারি নিবি?' কেউ ভুলেও জানতে চায় না, 'আজকের রান্নাটা কেমন হয়েছে রে?' 

মাঝে মাঝে পরিদর্শকরাও আসেন। তিনি রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর বা খাবার ঘর – কোথাও উঁকিটিও মারেন না। এসেই অফিসঘরে খাতা-পত্তর নিয়ে বসে যান, অর্থাৎ কাগজ-পত্রে হিসেব-নিকেশ ঠিক থাকলেই তিনি খুশি। সেই হিসেব উপর-মহলে গেলে উপর-মহলও খুশ্‌। বাচ্চাগুলো খাচ্ছে, নাকি কাগজপত্র খাচ্ছে – বোঝা দায়!! প্রতিবার পরিদর্শনের শেষে তিনি যখন প্রসন্ন চিত্তে গাড়িতে উঠে বসেন, তোতাকাহিনীর সেই নিন্দুকের মত তাঁকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে, 'মহারাজ, পাখিটাকে দেখিয়াছেন কি?' 

ছোটবেলায় দেখেছি চূড়ান্তের অভাবের সংসারে মা কচু-ঘেঁচু কত কিছু রাঁধত। কিন্তু যা-ই রাঁধুক না কেন, খাবার সময় তা থালায় করে তা সাজিয়ে দিত পরম যত্নে। মায়ের সেই ভালবাসাটুকুই তো অর্ধেক পেট ভরিয়ে দিত। আমি তাই জানি, পাতে কী তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল সেই খাবারের সঙ্গে মিশে থাকা দরদটুকু, যত্নটুকু, ভালোবাসাটুকু। 

আজ সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি। আবহাওয়া মনোরম। হুকুম দিয়েছিলাম, আজ তবে খিচুড়ি হোক। সঙ্গে ভাজাভুজি কিছু হবে না? ডোন্ট পরোয়া। খিচুড়িতেই পড়ল আলু, টমেটো আর ডিম ভুজিয়া। লোভ সামলাতে না পেরে থালা হাতে দাঁড়িয়ে গেলাম ওদের সঙ্গেই এক লাইনে। আনন্দে হইহই করে উঠল ভৈরব বাহিনী। তারপর ওদের সঙ্গেই বসে সুড়ুৎ-সুড়ুৎ করে গরম-গরম খিচুড়ি আর অঢেল গল্প। একজন বলল, 'স্যর, আজ কিন্তু খিচুড়িটা হেব্বি হয়েছে'। বললাম, 'যা, আরেকটু নিয়ে আয়'। একগাল হেসে ছেলে দৌড় মারল থালা হাতে। আরেকজন খেলার টানে অর্ধেক খেয়ে উঠে যাচ্ছিল, বাকিরা ধমক দিল, 'অ্যাই, স্যর বলেছে না, ভাত নষ্ট করতে নেই'। সে বেচারি কাচুমাচু মুখে আবার খাবারে মন দিল। 

'দেশে-বিদেশে'-তে মুজতবা আলি পাঠানদের মেহমান-নওয়াজীর বর্ণনা দিতে গিয়ে দিয়ে একটি বাক্যে লিখেছেন, 'দোস্ত/তুমহারে রোটি, হামারে গোস্ত', অর্থাৎ 'তুমি যে আমার বন্ধু এই আমার পরম সৌভাগ্য, শুধু শুকনো রুটি আছে? কুছ পরোয়া নেই, আমি আমার মাংস কেটে দেব'।"

শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০২৪

চন্দন বসু নিয়ে ~ অশোক চক্রবর্তী

ঢাকা পড়ে থাকা কিছু কথা॥ 

১৯৬৯ এ বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় ডিভিশনে পাশ করে চন্দন ভর্তি হন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৭১ তে পারিবারিক পরিচিতির সূত্রে ফারুক আবদুল্লা তাকে রাজ্যের কোটায় জম্মু কাশ্মীর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করান । ১৯৭৪ তে পড়া অসমাপ্ত রেখে তিনি কলকাতায় ফিরে এসে আবার সেন্ট জেভিয়ার্সে ভর্তি হন । 
১৯৭৭ তে বেঙ্গল ল্যাম্প এ সেলস ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি হিসেবে কাজে ঢোকেন ,  স্নিগ্ধা ওয়াহির সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে হয়। স্নিগ্ধা হলেন ইন্ডিয়া স্টিমশিপে কাজ করা শিশির ওয়াহি'র বোন। শিশির রিটায়ার করে কলকাতা ফিরে কিছু ব্যবসা করার চেষ্টা করেন। এদিকে ১৯৭৮ এ চন্দনের প্রথম কন্যা হয় এবং যেহেতু তার সংসার আলাদা ছিলো, সেও খরচ সামলানোর জন্য কিছু একটা করার কথা ভাবছিলো। 

এসময় ব্রিটানিয়া বিস্কিট মুর্শিদাবাদে  তাদের সেলস ফ্রাঞ্চাইজি খুঁজছিলো।  শিশির ও চন্দন , "ওম্কার ট্রেডিং কোম্পানী" নামে সেই ফ্রাঞ্চাইজি নেয়।  তখন বিস্কিটের বাজার ছিলো বাংলায় প্রায় ৩০ কোটির আর বৃদ্ধি ছিলো বছরে ২০ % হারে। 

শিশির চন্দন একটা বিস্কিটের নিজেদের কোম্পানী খুলতে চেয়ে ১৯৭৯ তে তৈরি করলো, নিজেদের সঞ্চয়ের ৫ লাখ ক্যাপিটালের "ইস্টার্ন বিস্কিট কোম্পানি"। Durgapur Development Authority এর কাছে ৬০ বছরের জন্য জমি লিজে পেলো,  SME হিসেবে ২ একর, একর প্রতি ৫০,০০০টাকায় ।  ৩৪,০০০ টাকা জমা দিয়ে ও বাকি টাকা ৪ টি কিস্তিতে দেবার চুক্তিতে জমির পজেসন পেলো। এসবই সরকারি নিয়মে চলছিলো। প্ল্যান্ট ডিজাইন সরকারি কর্তাদের পরামর্শ নিয়ে স্ক্রুটিণি করিয়ে জমা দেওয়া হলো আর সেভাবেই প্ল্যান্ট তৈরি এগিয়ে চললো । 

সরকারি নিয়ম মেনে WBFC এর কাছে ২৪ লাখ  ব্যাংক লোনের জন্য কোম্পানী দরখাস্ত করলো। টার্ম ক্যাপিটাল ২৯ লাখ, ওয়ার্কিং ক্যাপিটল ১২ লাখ ,  মোট ৪১ লাখ । মার্চ,  ১৯৮০ স্যাংসন হলো ১৮ লাখ, মে তে ডিসবার্স হয় ৯ লাখ। সরকারি ও ব্যাংকের নিয়মে এক SSI হিসেবে ৩,৪৫ লাখ টাকা ক্যাশ সাবসিডি ও   ৭৫ হাজার টাকা সিড মানি পাওয়ার কথা।  একেতো প্রোজেক্ট আর্থিক সহায়তা ৬৬ % কমিয়ে দিলো ব্যাংক তার উপর ৪,২০ লাখ টাকা আটকে রাখলো তারা। 

এদিকে যখন প্ল্যান্ট অনেকটাই হয়েছে,  DDA আসরে এসে জানালো প্ল্যান্ট ডিজাইনে ভুল আছে। ক্যাশ ক্রাঞ্চ এ ভুগতে থাকা একজন এন্টারপ্রেনার এর কাছে এর চেয়ে বড় দুঃসংবাদ আর হয়না । 

কিন্তু আরও বড় দুঃসংবাদ টা এলো "বিপ্লবী" যতীন ও তার সহোদর(!) সুবোধ বাবুদের দলের কাছ থেকে। আনন্দবাজার/ বর্তমান দের কাজে লাগিয়ে চন্দনের বিরুদ্ধে কুৎসা শুরু করলেন কারন তারা ভেবেছিলেন এতেই জ্যোতি বাবুকে পাঁকে নামাতে পারবেন।  

মমতা দেবীর ভাইপো , হেকিম সাহেবের মেয়ে, মাঝি সাহেবের ছেলে , কাকলী দেবীর দুই ছেলের নাম সম্প্রতি আম জনতা জানতে পেরেছে ডাক্তার বলে। এর বাইরে কতো সব ""পোতিভাবান" ছেলে মেয়ে আছে এমন নেতাদের যারা ডাক্তার হয়ে বসে আছেন। কিভাবে তারা ডাক্তার হয়েছেন তার একটা নমুনা ছিলো মাঝি সাবের ছেলের পরীক্ষা নিয়ে সংবাদ ভাষ্যে। 

এর বাইরে যারা আজ প্রকাশ্যে তাড়া তাড়া নোট নিচ্ছেন, যাদের মধ্যে আছেন অমিত শা'র ছেলে জয় শা বা মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জী ,(এমনকি মোরারজি'র ছেলে কান্তিভাই)  যাদের কড়ে আংগুল সঞ্চালনে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লুট হয়ে যায়, যেসব পার্টির খুচরো পাড়ার নেতা ঠিক করে দেন কার কপালে কতো কাটমানি জমা পড়বে  তারা ভাবতেই পারবে না সর্ব শক্তিমান মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে ২০/ ২৫ লাখ টাকার সংস্থান না করতে পারার জন্য আর DDA /WBFC স্তরের কিছু পুঁটি অফিসারের বিরোধিতার জন্য এক নবীন এন্টারপ্রেনার তার সঞ্চয় জলে ফেলে বাড়ি চলে এলো। 

জ্যোতিবাবুকে কিছু বলতে হতো না ,  শুধুই জয়কৃষ্ণ বাবু এদের কাউকে দেখে না হাসলেই যখন চন্দন হার্ডল মুক্ত হতে পারতো সেখানে সেটুকু মাত্র এঁরা করেননি।  

আনন্দবাজার/ বর্তমান এবং যতীন/সুবোধ চক্র এক নবীন এন্টারপ্রেনার কে ধংস করতে চেয়েছিলেন ।  

চন্দন তাই বলেছিলেন,  আমার অপরাধ ছিলো আমি জ্যোতি বসুর মতো এক রাজনীতিকের ছেলে হয়ে জন্মেছিলাম তাও আবার এই বাংলায়। 

জ্যোতিবাবুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাঁর ছেলেকে নিয়ে কেনো লিখলাম ? 
উপসংহার টা হলো ,  জ্যোতি বাবুর এই ঋজু ও সততাকে কোনও মতে  ঢাকা দেওয়া যাবে না  "মমতা সততা শাড়ি"র ঢক্কানিনাদে॥ জ্যোতিবাবু তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রেও সৎ জীবন কাটিয়েছেন॥ 

জ্যোতিবাবু / বুদ্ধবাবুর ব্যক্তি সততার ক্ষেত্রে পায়ের নখের যোগ্য নন তাঁদের সমালোচকেরা ॥ রাজনীতির সমালোচকরা রাজনীতির সমালোচনা করুন কিন্তু ব্যক্তিগত সততার প্রশ্নে কিছু বলার আগে নিজের দিকে তাকান ॥  

কৃতজ্ঞতা :  জ্যোতির্ময় হাজরা দা 

তিনি নেই, তাঁর ছড়িয়ে যাওয়া মণিমানিক্য গুলো আছে!❤❤

সোমবার, ১ জুলাই, ২০২৪

ডক্টরস ডে ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


চেতনার জগতের এক মহাশূন্যতা আর ভারসাম্য রক্ষা করার খেলায় নিয়োজিত দুই খেলোয়াড়, চিকিৎসক আর রুগী আর বাকি অসংখ্য মানুষ যারা সবাই স্বঘোষিত আদর্শবান রেফারি হিসেবে হুইসিল মুখে অপেক্ষমান যে চিকিৎসকদের বিন্দুমাত্র ত্রুটি বিচ্যুতি দেখলে "ফাউল" বলে ফুউউউর করে বাঁশি বাজিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষার স্বার্থে চিকিৎসক সমাজের একটা বড় অংশ নিজেদের, ঈশ্বর নই, নিছক পেশাদার" এই মডেলটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছেন। 

দার্শনিক রেনে দেকর্তে এর দ্বিত্ববাদের এই মডেল, যাতে প্রাণ ও মনকে আলাদা ভাবে দেখানো হয়েছে তার সীমাবদ্ধতা এইখানেই যে সেটা চিকিৎসককে নিরাসক্ত, নৈব্যর্তিক বিজ্ঞান-পেশাদার এর সীমাবদ্ধ ভূমিকায় আটকে রেখেছে। ওই মডেল এর বিপ্রতীপ কোনো মডেল যেখানে যুক্তিশাস্ত্র, মনস্তত্ববিদ্যা, নীতিশাস্ত্র সবকিছুই মিশে আছে,  মেডিসিন এর তেমন  দর্শনতত্ত্ব এর তত্ত্বতলাশ সামান্য একটু করে দেখা যেতে পারে। 

ডাক্তার শব্দটা শব্দতত্ব অনুযায়ী আসলে শিক্ষক থেকে এসেছে। চিকিৎসকের ঐতিয্যপূর্ণ অবয়ব ও অবস্থানের ঐতিহাসিক বস্তুগত উপাদান আছে যার ওপরে দাঁড়িয়ে রুগীর সাথে(এবং তার বাড়ির লোকের সাথে) সংলাপে তার ভূমিকাটা নিরূপিত হচ্ছে।ইন্টেলেকচুয়াল হেজিমনির আসন থেকে সরে এসে (যেমনটা রিচার্ড ফাইনম্যান বলেছিলেন), একজন চিকিৎসক রোগীকে বা তার বাড়ির লোককে ঠিক কি ধরনের যে ভাষা, শব্দ প্রয়োগ করে সংলাপে যাবেন যাতে করে সেটা অন্যদের অনুধাবনযোগ্য হয়, সেটা মস্ত একটা চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জের এটা শেষ নয়, এটা শুরু। 

বিংশ শতাব্দীর মেডিক্যাল এথিক্স এর সম্ভবতঃ সবচেয়ে পরিচিত বিশেষজ্ঞ ডাঃ এডমান্ড পেলেগ্রিনো এর ভাষায় "মেডিসিন হল বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মানবিক, শিল্পকলাগুলির মধ্যে সবচেয়ে প্রায়োগিক এবং মানবীবিদ্যাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত।" উনি লক্ষ্য করেছেন যে "মানবজীবনের সমস্ত সমস্যা - নিরাসক্তি, অনুরাগ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আত্মীয়তা, এমনকি মোক্ষলাভ অবধি মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে যে অস্তিত্ববাদী পরীক্ষণাগারে তার নাম হাসপাতাল। প্রতিটি মানবতাবাদী প্রশ্ন আরো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে যখন বস্তুগত পরিবেশে তাকে ফেলা হয়।" 

ঐতিহাসিক ও দার্শনিক প্রেক্ষিতে মেডিসিন এর বিষয়গুলি (স্বাস্থ্য, অসুস্থতা এবং অসুস্থ মানুষ) এবং মেডিসিন এর লক্ষ্যবস্তু (চিকিৎসা, হৃত স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার, অথবা স্রেফ কষ্ট যন্ত্রণার উপশম) চিহ্নিত করতে আমাদের সাহায্য করেছে কিছুদূর অবধি। পরিবেশগত, পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার জন্য যে চিকিৎসক তার অধিত বিদ্যার পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারছেন না, তার মানবতাবাদী প্রশ্নগুলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসক,  আয়োজকদের নির্মম নিরাসক্ত উদাসীনতার নিরেট পাথরের দেয়ালে মাথা কুটে মরছে, দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জের সেইখানে শুরু। ওয়ার্ডে কুকুর বিড়ালের সাথে সদ্যজাত মনুষ্য সন্তানের  শান্তি পূর্ন সহবস্থানকে একজন চিকিৎসকের পক্ষে নিরাসক্ত, নৈব্যর্তিক বিজ্ঞান-পেশাদার হিসেবে মেনে নেয়াকে আর যাই হোক, দেকার্তে মডেল বলা যায় না। 

ডাক্তার তাহলে আর ঈশ্বর রইলেন না, চিরন্তন শিক্ষক রইলেন না, নৈব্যর্তিক পেশাদার রইলেন না, তিনি নেমে আসলেন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে রুগীদের মাঝে তাঁর যাবতীয় যত্নআত্তি, সমবেদনা ও করুণা দিয়ে রুগীকে জড়িয়ে ধরতে। এই থ্রি সি মডেল (Care, compassion & Charity) অনুযায়ী রোগীকে মেডিক্যাল মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ধরে নিয়ে মেডিক্যাল দর্শন একজন চিকিৎসককে শেখায় কিভাবে সে রোগীর মধ্যে এক যন্ত্রণাকাতর সহনাগরিককে দেখতে পাবে। এইবার আসছে তৃতীয় চ্যালেঞ্জ। 

কনজ্যুমার প্রটেকশন এক্ট বা ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড এর যত যাবতীয় ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে মা উড়ালপুলের ওপর আকস্মিক হৃদ রোগে আক্রান্ত সহ নাগরিক কে সিপিয়ার প্রয়োগ করে যে চিকিৎসক বাঁচিয়ে তুললেন, জনগণের যাবতীয় জয়ধ্বনির মাঝে তিনি সেই নিঃসঙ্গ মানুষ যিনি জানেন মেডিক্যাল এপিস্টেমলজি বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞানতত্বের সীমাবদ্ধতা ঠিক কতটা। ওই রুগী বেঁচেছে বলে একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে পরবর্তী রুগী টিকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। 

কোন রোগকে নিরাময় করতে যখন একজন চিকিৎসক ব্যর্থ হ'ন তখন তার সামনে কি কি পথ খোলা থাকছে আসুন একবার দেখা যাক। মেডিক্যাল রাশিবিজ্ঞানের প্রয়োগ হয়তো বলছে ওই নির্দিষ্ট রুগীর আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা মাত্র দুই শতাংশ। এই তথ্যটি অবিকৃত, অবজেক্টিভ ভাবে রুগী বা তার বাড়ির লোকের কাছে উপস্থাপন করাই কোনো মানবিক চিকিৎসকের আদর্শ কাজ হতে পারে না। রুগীর বা তার বাড়ির লোকের সাথে সংলাপ এর সাবজেক্টিভ ভাষ্য সেই চিকিৎসককে সেই রুগীর জন্য আলাদা করে প্রস্তুত করতে হয়। প্রব্যবিলিটির থিওরি প্রয়োগ করে কোন নির্বিকল্প একাডেমিক ডিসকোর্স হচ্ছে না। একটি মানুষের বাঁচা মরা এবং অবধারিত মৃত্যু হলে তার শেষ দিনগুলোর জন্য একটা টার্মিনাল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান বা পরিকল্পনা তৈরি হয় ওই সংলাপের মধ্যে দিয়ে।

ডাক্তার যেখানে নিরাময়কারী নয়, পেশাদার গ্রিফ কাউন্সিলর মাত্র। অন্ততঃ হাজার খানেক স্টাডি আছে যেখানে রুগী বা তার বাড়ির লোক চিকিৎসকের ডিগ্রি এই সাথে তার ব্যবহার, সমবেদনার ভাষা জানানোর ক্ষমতাকে একজন 'ভালো ডাক্তার" আখ্যা পাওয়ার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে ঘোষণা করেছে। এই বার আসছে চতুর্থ চ্যালেঞ্জ। 

সমাজ সভ্যতার যে বিকৃত অগ্রগতি একই সাথে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটিয়েছে আর একই সাথে স্বাস্থ্য কে মৌলিক অধিকার থেকে রূপান্তরিত করেছে পণ্যে, সেই শীর্ষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে একজন চিকিৎসকের কতটুকু ক্ষমতা আছে সমবেদনার সেই বয়ান ভাষ্য রচনা করার। প্রিয়জনের মৃত্যু তে শোকে অধীর, সাধ্য অতিরিক্ত ব্যয় করে বাঁচাতে না পারার জ্বালা যন্ত্রণায় অস্থির ক্রুদ্ধ জনতার সামনে একজন চিকিৎসক তো অসহায় নিগ্রহের বস্তু, যার ছাল চামড়া ছাড়িয়ে না নেয়া অবধি ওই জনতার শান্তি নেই, "আমি তোমাদের লোক" বলে তাঁকে কেউ ভাবছেই না। 

এত চ্যালেঞ্জের পরেও তাহলে এই পেশায় আসে কেন কেউ? বেশ কিছু পেশা আছে, মানুষ নানা কারণে বেছে নিতে বাধ্য হয় যাতে তার ছাত্র জীবনের অধিত বিদ্যে কাজে লাগে না। ফিজিক্স অনার্স পড়ে ব্যাংক এর চাকরি, ইলেকট্রনিকস এ এম টেক হয়ে মৎস দপ্তরের আইএএস সচিব। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এম বি এ করে টুথ পেস্ট বিক্রি। সে দিক দিয়ে ডাক্তারদের বেশির ভাগই সৌভাগ্যবান। যা শিখেছে, সেটাই রোজ কাজে প্রয়োগ করতে হয়। ডাক্তারি পাস করার প্রত্যেকটা পরীক্ষা খুব ভয়াবহ হয়। প্রচুর ফেল করে, সাপ্লি পায়। এপ্রোন পড়ে ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আট ঘন্টা ধরে ভাইভা আর প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিতে হয়। যারা দিয়েছে, তারাই জানে সেই নরক যন্ত্রণা কাকে বলে। ফাইনাল পাশ করে যাওয়ার পরে মনে হয়েছিল আঃ কি আরাম, এসব থেকে মুক্তি। কেউ সেদিন বলে দেয়নি যে মুক্তি নেই, এই সবে শুরু। সারা জীবন, রোজ, অসংখ্যবার ওই পরীক্ষায় বসতে হবে।

যেমন ধরা যাক সামান্য জ্বরের রোগী (যদিও সামান্য জ্বর বলে কিছু হয় না)। ডাক্তার অনেক কিছু দেখে ভেবে ওষুধ লিখলেন। জ্বর না সারলে ফেল। সাধারণ থেকে জটিল অস্ত্রোপচার, কথাই নেই, প্রত্যাকটাই এক একটা পরীক্ষা। অসফল মানে রুগীর মৃত্যু। তবুও সারা পৃথিবী জুড়ে, ভারত জুড়ে, অসংখ্য ডাক্তার রোজ কত বার এই পরীক্ষায় বসে স্বেচ্ছায়। মার্কশিট মহাকালের হাতে। পাশ না ফেল, সেটার ওপর নির্ভর করে একটা পরিবারের ভবিষ্যৎ। সবটা জেনে বা না জেনে, এই পরীক্ষায় বসতেই হয়। সিন-আনসিন, কমন-আনকমন যে কোনো প্রশ্ন আসতে পারে। এক্সামিনেশন হল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সেই কুড়ি বছরের নার্ভাস তরুণ বা তরুণী যে ভাবে এক্সাম হলের সামনে অপেক্ষা করতো, বাঘা বাঘা সব এক্সামিনারের নানা প্রশ্ন ফেস করার আশংকায় তার হাতের তালু ঘেমে যেত, ঘন ঘন জল তেষ্টা পেত, সেই রকম নার্ভাস না হলেও, প্রতিবার একজন নতুন রুগী নামক প্রশ্নপত্রের সম্মুখীন হওয়ার সময় বুকের স্পন্দন সামান্য হলেও দ্রুত হয়, কি একটা আবেগ তিরতির করে কাজ করে। নিজের হার্টবিট এর শব্দ নিজেই শুনতে পায় সেই ডাক্তার। প্রত্যেকবার তাকে যে করেই হোক, পাশ করতেই হবে, ফেলের কোনো জায়গা নেই।

অসফল হওয়ার আশঙ্কায় ভুগে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পরার ঝুঁকি নিয়ে, সফল হওয়ার তাগিদে অসম্ভব পরিশ্রমের ফলে বয়সের আগেই বুড়িয়ে গিয়ে, ফুরিয়ে গিয়ে, বার্নট আউট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও জীবন মৃত্যুর এই খেলায় একজন চিকিৎসক জয়ী হতে চায়।  নিজের বুকে স্টেথো বসিয়ে সে নিজেই শুনে নিতে চায় তার হৃদয়ের সেই শব্দ যেটা বলে দেয় যে সে চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত, সে সুখী হতে চায় না, জয়ী হতে চায়। সুখী চিকিৎসক দিবস বলে কিছু নাই। নো হ্যাপি ডক্টরস ডে।

বুধবার, ২৬ জুন, ২০২৪

রসেবশে রসায়ন ~ অমিতাভ প্রামাণিক

ভাইরা তো ভাই-ই হয়। কিন্তু ভায়রাভাই আলাদা জিনিস। দুই ভায়ের বউরা যেমন পরস্পরের জা (বা ভাজ), দুই বোনের বররা তেমনি পরস্পরের ভায়রাভাই। পৃথিবীর অধিকাংশ জায়গাতেই পুরুষতন্ত্রের প্রাদুর্ভাবহেতু একান্নবর্তী পরিবারে বিবাহিতা মহিলাদের অনেককেই জা-র মুখঝামটা সহ্য করতে হয়, কিন্তু বিবাহিত পুরুষরা ভায়রাভাই-এর ঝামেলা থেকে সাধারণভাবে মুক্ত।
 
যারা ততটা মুক্ত ছিলেন না, তাদের একজোড়ার কথা বলা যাক।
 
এঁদের একজন জন্মসূত্রে ব্রিটিশ, একজন আইরিশ। ব্রিটিশদের সঙ্গে আইরিশদের সম্পর্ক অনেকক্ষেত্রেই আদায়-কাঁচকলায়। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেকেই আইরিশ বিপ্লবীদের দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হতেন, আমেরিকায় গদর পার্টি আইরিশ সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করত। কিন্তু ব্যবসায়ীদের ব্যাপারটা আলাদা। ব্যবসার স্বার্থে তারা জাতীয়তা-টতার মতো ক্ষুদ্রতাকে বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর মানবতার আদর্শে বিশ্বাসী। আফটার অল সবার ওপরে টাকাই, থুড়ি পাউন্ডই, সত্য, তাহার ওপরে নাই।
১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দ। বাষট্টি বছরের প্রৌঢ় আইরিশম্যান আলেকজান্ডার বেরি নরিস, তাঁর চেয়ে বয়সে দশ বছরের ছোট স্বদেশীয়া বউ ফেবকে বললেন, ছেলেমেয়েগুলো এত বড় হয়ে গেল, এরা কি বিয়ে ফিয়ে করবে না?
 
ফেব দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, সে আর আমি কী করে বলব, বলো! তুমি নিজেও তো ঠিক সময়ে বিয়েটা করোনি। আমার ভাগ্যটা যেমন! কপালে জুটল আধদামড়া পঁয়তিরিশ-ছত্তিরিশ বছর বয়সী বর। তাও যে গোটা পাঁচেক বাচ্চার জন্ম দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, সে কেবল পরম করুণাময় ঈশ্বরের করুণা।
আলেকজান্ডার এই দীর্ঘনিশ্বাসের মর্ম জানেন। বছর তিনেক আগে তাঁদের তৃতীয় সন্তান, ষোড়শী কন্যা ফেব, মারা গেছে। তার মৃত্যুর পর মেয়েদের বিয়ের চিন্তা তাঁর মাথায় আসেনি। এদিকে দেখতে দেখতে বড় মেয়ে অলিভিয়ার বয়স হয়ে গেল চব্বিশ, মেজ এলিজাবেথও বাইশ। অ্যান নামে এক ষোড়শী কন্যা ও আলেকজান্ডার নামে পনের বছর বয়সী পুত্রও আছে তাঁদের।
 
আলেকজান্ডার মোমবাতি তৈরি করে বিক্রি করেন। আয়ারল্যান্ডে এই ব্যবসা খারাপ চলছিল না, তবে খবর পেলেন ডলারের দেশ আমেরিকায় নাকি হাওয়ায় ডলার উড়ছে। তাই পাততাড়ি গুটিয়ে জমিজমা বেচেবুচে পরিবার নিয়ে জাহাজে চেপে চলে এলেন সিনসিনাটি। পুরো সিনসিনাটি গ্রাম যেন এক বিশাল কসাইখানা। এখানে বড়সড় শুয়োর-কাটার স্লটার হাউস আছে, সস্তায় অঢেল চর্বি পাওয়া যায়। এই চর্বি দিয়ে কেউ মোমবাতি তৈরি করে, কেউ তৈরি করে আলো জ্বালানোর তেল, কেউ সাবান।
মেয়েদের বিয়ের কথা ভাবলেই তো হয় না, পাত্রও খুঁজতে লাগে। সিনসিনাটি গ্রাম এমন কিছু বড় না, ব্যবসায়ী হিসাবে তাঁদের চেনাশোনার পরিধি কম না। একদিন কথায় কথায় আলেকজান্ডার বউকে বললেন, আচ্ছা, আমাদের জেমস ছোকরাটাকে তোমার কেমন লাগে?
 
ফেব বললেন, কোন জেমস? জর্জবাবুর ছেলে জেমস? সে তো সোনার টুকরো ছেলে। একেবারে আমাদের পালটি ঘর। জেমস তো শুনছি সাবানের কারখানা খুলেছে।
আলেকজান্ডার বললেন, হ্যাঁ। ওরাও আয়ারল্যান্ড থেকে এ দেশে এসেছে, তা প্রায় চোদ্দ বছর হয়ে গেল। ইলিনয় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। যাচ্ছিলেন ওহায়ো নদীতে বোটে চেপে। সেই অবস্থায় অসুস্থ বোধ করায় তাদের সিনসিনাটিতে নেমে পড়তে হয়। জর্জবাবু নার্সারি খুলেছিলেন। জেমস সাবান তৈরি শিখে এখন সাবানের কারখানা তৈরি করে ব্যবসা করবে। জেমসের বয়স তিরিশ বছর। আমাদের অলিভিয়ার সঙ্গে ওকে ভালো মানাবে না?
 
ফেব বললেন, খুব ভালো মানাবে। তুমি কথাবার্তা বলো। সামনের রোববারে ওদের ডাকো না আমাদের বাড়িতে।
 
কিন্তু ভাবলেই তো হ'ল না। দেখা গেল জেমসের প্রতি অন্য একজন অনুরক্তা। কাজেই তার সঙ্গে অলিভিয়ার বিয়ে দেওয়া সম্ভব না। সেই অন্য একজন আবার এই বাড়িরই। অলিভিয়ার বোন এলিজাবেথ। তাতেও সমস্যা নেই। এলিজাবেথের সঙ্গেই তাহলে জেমসের বিয়ে পাকা করা যেতে পারে। কিন্তু বড় বোনের আগেই কি মেজ বোনের বিয়ে দেওয়া ঠিক হবে?
 
এই সব মহান সমস্যায় যখন নরিস পরিবার বিব্রত, তখন মুশকিল আসান হয়ে দেখা দিল আর এক উদীয়মান সম্ভাবনা। এই ছেলেটি আবার তাঁর মতোই মোমবাতির ব্যবসায় আগ্রহী। মাত্র বছরখানেক আগে সে সিনসিনাটিতে এসে আস্তানা গেড়েছে। এর নাম উইলিয়াম। উইলিয়াম প্রোক্টর।
 
তবে সমস্যা নেই, তা নয়। এক তো এ হচ্ছে ইংরেজ। আর দুই, এর একবার বিয়ে হয়ে গেছে। তবে সেই বউ আর বেঁচে নেই। ছেলেটার মাথা ভালো, লেখাপড়া জানা। লন্ডনে কাপড়ের দোকান দিয়েছিল, সে দোকান লুটপাট হয়ে যায়। বাজারে অনেক দেনা, তার এক বন্ধুর পরামর্শে সে পালিয়ে আসে আমেরিকায়। নিউ ইয়র্কে এসে উঠেছিল বছর তিনেক আগে, সেখানেই শুরু করে মোমবাতি তৈরি ও বিক্রি। কিন্তু মোমবাতির কাঁচামালের জন্য নিউ ইয়র্ক মোটেই ভালো জায়গা না। তারই সন্ধানে সে যাত্রা শুরু করে পশ্চিমে, হাজির হয় সিনসিনাটিতে। এখানে পৌঁছাতেই বেচারার বউটা অকালে মারা যায়, তাই এই জায়গা ছেড়ে তার আর অন্য কোথাও যাওয়া হয়নি।
 
এক শুভদিনে একই সঙ্গে অলিভিয়া আর এলিজাবেথের বিয়ে হয়ে গেল। চব্বিশ বছর বয়সী অলিভিয়ার বর বত্তিরিশ বছরের বিপত্নীক ইংরেজ উইলিয়াম। বাইশ বছর বয়সী এলিজাবেথের বর তিরিশ বছর বয়সী আইরিশ জেমস।
 
বিয়ের পর সুখেই জীবন চলছিল তাদের। কিন্তু হঠাৎই আমেরিকায় নেমে এল ব্যবসায়িক মন্দা – ইকনমিক রিসেশন। জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য হ'তে শুরু করল। ব্যবসাপাতি চালানো মুশকিল হতে শুরু করল।
 
বৃদ্ধ আলেকজান্ডার নরিস দুই জামাইকে একসঙ্গে ডেকে পাঠালেন। বললেন, বাবাজিরা, শোনো, আমার তো বয়স কম হ'ল না, আমি অনেক বছর ধরে এখানে ব্যাবসাপাতি চালাচ্ছি। আমি জানি, এই দুর্দিন বেশিদিন চলবে না। এক সময় এ থেকে আমরা বেরিয়ে আসব। কিন্তু সেটা ঠিক কবে, তা কেউ জানে না। দুর্দিনই মানুষের চরিত্রের আসল পরীক্ষা নেয়। এ সময় যারা শিরদাঁড়া সোজা রাখতে পারে, সৎভাবে ব্যবসা করতে পারে, তারাই জীবনে উন্নতিলাভ করে। তোমরাও সে ভাবেই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে। আমি বলি কী, তোমরা দু'জনে আলাদা আলাদাভাবে ব্যবসা করার বদলে একসঙ্গে মিলে একটা ব্যবসা চালু করো। যে জিনিস থেকে মোমবাতি তৈরি হয়, তা থেকেই তৈরি হয় সাবান। সুতরাং যৌথ ব্যবসায় কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয় তোমাদের।
 
দুই ভায়রাভাই মন দিয়ে শ্বশুরের কথা শুনল। ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে শুরু হ'ল তাদের যৌথ ব্যবসা। উইলিয়ম প্রোক্টর ও জেমস গ্যাম্বলের সেই 'প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল' এখন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুর বহুজাতিক সংস্থা।

* * *
'রসেবশে রসায়ন' সিরিজের দু-নম্বরী নিবেদন 'বীকার থেকে বাজারে' আপাতত প্রস্তুতিপর্বের শেষ অধ্যায়ে। তার একটা পৃষ্ঠা হাত ফসকে মেঝেতে পড়ে গেল বলে ভাবলাম সেটা এই সুযোগে ফেসবুকে সেঁটে দেওয়া যাক।

বুধবার, ১৯ জুন, ২০২৪

টেস্ট টিউব বেবি, ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ও কিছু কুচক্রী ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

"গোড়ার কথা"---
একেবারে শুরুতেই একটি কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায় এর মৃত্যুদিনে তাকে নিয়ে অজস্র ভুলে ভরা বা অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়ে মনগড়া কাহিনীমূলক নানান লেখার রিবাটাল নয় এই লেখাটা। এটা লেখার কারণ অন্য। একটি লেখায় আহুত হয়ে মন্তব্য করেছিলাম যে "ওনার মৃত্যুতে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের একজন প্রাক্তনী হিসেবে আমি গভীরভাবে দুঃখিত, পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে, ও ভারতীয় হিসেবে, আমি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ, এবং বামপন্থী হিসেবে অত্যন্ত লজ্জিত।" এইটে পড়ে এক বন্ধু জানতে চেয়েছেন যে এমনধারা মন্তব্য করার কারণ কি। বলতে পারেন বাকি লেখাটা সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাগিদে লেখা।

"জীবন খাতার প্রতি পাতায়"---
ডা: মুখোপাধ্যায় ঠিক কি কি কারণে আত্মহনের পথ বেছে নিয়েছিলেন সেটা জানা বোঝার চেষ্টা আমরা অবশ্যই করবো। আমাদের আগেও অনেকেই জানতে বুঝতে চেয়েছেন। তাদের মতামতের মধ্যে অনেক অমিল থাকলেও একটি বিষয়ে অনেকেই একমত যে ওনার মন ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেতে পারে তাদের অন্যতম হল একটি কমিটি। এই বিখ্যাত বা কুখ্যাত কমিটির কাজকর্মের অনেক নমুনা আমরা পেশ করবো। শুরু করা যাক সেই জায়গাটা থেকে যখন তাঁর আবিষ্কারের কাহিনী শুনে সন্দেহ এর বীজ বপনটা সুকৌশলে এইভাবে ছড়ানো হয়েছিল ওই কমিটি দ্বারা যে উনি তো ফিজিওলজির শিক্ষক, টেস্ট টিউব বেবির উনি কি জানেন। মার্জনা করবেন। আমাদের আলোচনায় এই টেস্ট টিউব বেবি শব্দ গুলি ঘুরে ফিরে আসলেও প্রাজ্ঞ পাঠক জানেন যে আসলে বলতে চেয়েছি ইন ভিট্র ফার্টিলাইজেশন (সংক্ষেপে আইভিএফ) এর কথা যা চলতি ভাষায় টেস্ট টিউব বেবি (বাংলায় নলজাতক) নামে পরিচিত। 

তথ্যগত দিক থেকে ওই কমিটি সঠিক ছিল। সত্যিই তো, ৩রা অকটবর ১৯৭৮ সালে কলকাতার বেলভিউ ক্লিনিকে পৃথিবীর দ্বিতীয় এবং এশিয়া তথা ভারতের প্রথম নলজাতক কানুপ্রিয়া ওরফে দুর্গা জন্ম নেয় তখন তার মানসপিতা ডা: মুখোপাধ্যায় বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ফিজিওলজির প্রফেসর। কথায় বলে না, অর্ধসত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর। ওই কমিটি এবং কেউ কেউ সযত্নে যে তথ্যগুলো এড়িয়ে যেতে চায় তা'হল - 

এক) ডা: মুখোপাধ্যায় কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ফাইনাল এমবিবিএস পরীক্ষার গাইনকোলজি ও ধাত্রীবিদ্যার শাখায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন, "হেমাঙ্গিনী স্কলারশিপ ও কলেজ মেডেল পেয়েছিলেন। আমার জানা নেই যে বন্ধ্যাত্ব নিবারণ এর ভাবনা চিন্তা ঠিক কবে তার মাথায় এসেছিল। কিন্তু এটা অনুমান করা যায় যে ধাত্রীবিদ্যা তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয় ছিল। এই তথ্যটা আমাদের মহামান্য উইকি সাহেব আবার চেপে গেছেন কেন কে জানে। 

দুই) দু'বার পিএইচডি করা এই মানুষটি প্রথমবার উপাধিটি পান ১৯৫৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ড: সচ্চিদানন্দ ব্যানার্জির তত্ত্বাবধানে রিপ্রোডাকটিভ ফিজিওলজি নিয়ে গবেষনা করে যে গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল " দি বায়োকেমিক্যাল চেঞ্জেস ইন নর্মাল এন্ড এবনর্মাল প্রেগনেন্সি"।

তিন) এডিনবরাতে জুটিয়ে আনা দ্বিতীয় পিএইচডিটার কথা সুধী পাঠক ভুলে গেলে আরেকবার মনে করিয়ে দি, কলম্বো স্কলারশিপ পেয়ে উনি পিএইচডিটা করতে যেখানে গিয়েছিলেন সেটার নাম, "ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রিনোলজি রিসার্চ ইউনিট। ওনার গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক জন লোরেইন যিনি নিজে একজন রিপ্রোডাক্টিভ ফিজিওলজিস্ট হিসেবে পরিচিত; 

চার) নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে তাঁর সমসাময়িক স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ ডা: বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী স্মৃতিচারণে বলেছেন যে উনি উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল এ ও ডা: মুখোপাধ্যায় বাঁকুড়ায় বদলি হয়ে যাওয়ার আগেও তাঁদের মধ্যে আলাপচারিতায় ওই টেস্ট টিউব বেবি নিয়ে গবেষণার কথা উঠে আসে;

এহ বাহ্য। ডা: মুখোপাধ্যায় এমবিবিএস এর আগে ওই প্রেসিডেন্সি থেকে ফিজিওলজি নিয়ে অনার্স পাশ করেছেন এবং এডিনবরা থেকে দ্বিতীয় পিএইচডি করার পরে নীলরতন সরকার এ ফিজিওলজির লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছেন এই তথ্যই তাঁকে "ফিজিওলজির লোক" হিসেবে দেগে দেওয়া যথেষ্ট কারুর কারুর কাছে। 

"আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে"---
সত্যিই তো। কি এমন হাতিঘোড়া আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন যে তাঁকে নিয়ে মাতামাতি করতে হবে। তর্কের খাতিরে যদি মেনেও নি যে তিনিই এশিয়া তথা ভারতের প্রথম ইত্যাদি তথ্য তো এটাই যে তিনি প্রথম হতে পারেন নি, সেকেন্ড বয়। ফার্স্ট বয় তো সেই ব্রিটিশ বায়োলজিস্ট রবার্ট এডওয়ার্ডস যিনি সুভাষবাবুর ৬৭ দিন আগে ওল্ডহ্যাম, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে লুই জয় ব্রাউন এর মানসপিতা হয়েছেন ডা: স্টেপটো এর সহযোগিতায়, নোবেল পকেটে পুরেছেন। 

একবারটি দেখে নেওয়া যাক যে গোরা সাহেবের থেকে নেটিভ বাঙালিবাবু কোথায় কোথায় আলাদা। অধ্যাপক এডওয়ার্ডস এর টিম যেখানে স্বাভাবিক ঋতুচক্রের উসাইট ব্যবহার করেছিলেন, সেখানে প্রফেসর মুখার্জির টিম ব্যবহার করেছিল হিউম্যান মেনোপজাল গোনাডোট্রপিন হরমোন স্টিমুলেটেড সাইকেল।  অবাক কথা এই যে আজকাল সবাই এসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনলোজির যে পদ্ধতি অনুসরণ করে সেটা নোবেল পাওয়া এডওয়ার্ড সাহেবের ওই ন্যাচারাল সাইকেল নয়, বরঞ্চ খেলাতচন্দ্র স্কুলের বাংলার মাস্টার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর ছাত্তর ওই ভেতো বাঙালির আবিষ্কার করা স্টিমুলেটেড সাইকেল। সাহেবকে বাঙালির দেওয়া এক নম্বর গোল।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হ'ল ক্রায়ো-প্রিজারভেশন অফ হিউম্যান এমব্রাও - এডওয়ার্ডস এর টিম জরায়ুতে এমব্রাওটিকে প্রতিস্থাপিত করেছিল ওই একই ঋতুচক্রে। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর টিম মনে করেছিল যে  ইউটেরাসকে সময় দেওয়া হোক ইমপ্লান্টেশনের জন্য রেডি হতে। তাই অন্য ঋতুচক্র তে এমব্রাওটিকে প্রতিস্থাপনের আগে প্রিজার্ভ করা হয়েছিল হিমায়িত অবস্থায়  ৫৩ দিন রেখে। ওঁর টিম বিশ্বে সর্ব প্রথম এই এমব্রাও ক্রায়ো-প্রিজারভেশন টেকনিক ব্যবহার করে সফল ভাবে। এর পরে দ্বিতীয়বার এই টেকনিক ব্যবহার করে ট্রনসন ও সহযোগীরা নেচার পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন ১৯৮৩ সালে। এখন এই টেকনিকই ব্যবহার করা হয়। সাহেবকে দেওয়া বাঙ্গালির দু'নম্বর গোল। এই হিমায়িত করা বিষয়টা সুধী পাঠক মনে রাখবেন। আবার আসবে এই প্রসঙ্গ। কুখ্যাত সেই এনকোয়ারী কমিটি এটা নিয়েও ব্যঙ্গ করেছিল। তাদের প্রশ্ন ছিল ওই লোড শেডিং এর বাজারে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা গেল কি ভাবে, কারেন্ট চলে যায় নি ?

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হ'ল - ট্রান্স ভ্যাজাইন্যাল রিট্রিভাল অফ উসাইট। উসাইট সংগ্রহ করার জন্য ডা: স্টেপটো ব্যবহার করেছিলেন ঝুঁকিপূর্ণ ইনভেসিভ ট্রান্স এবডমিনাল রুট, পেট কেটে ল্যাপরোস্কপি দিয়ে, আর ডা: মুখার্জির টিম করেছিল অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মিনিমাল ইনভেসিভ ট্রান্সভ্যাজাইন্যাল রুট। ওনারা কলকাতায় বসে সেই সময়ে আল্ট্রা সোনোগ্রাফি ব্যবহারের সুযোগ পান নি তাই পোস্টিরিয়ার কল্পটমি করতে হয়েছিল। মধ্য-আশির দশক থেকে আল্ট্রা সোনোগ্রাফির সুযোগ নিয়ে ওই ট্রান্সভ্যাজাইন্যাল রুটই ব্যবহার করা শুরু হয় এবং এখন সেটাই চলছে। বাঙালির তিন নম্বর গোল। 

বৈজ্ঞানিক জার্গনের কচকচি ছেড়ে মোদ্দা কথা এটাই দাঁড়ালো যে ডা: মুখার্জীদের আবিষ্কৃত টেকনিক ওই লন্ডন স্কুলের  পদ্ধতি থেকে একেবারেই আলাদা ছিল। পরবর্তীকালে ডা: মুখার্জীর পদ্ধতিটিই মোটামুটি অনুসরণ করা হয় অন্যান্য জায়াগায় কারণ ওনাদের পদ্ধতিটি তুলনামূলক ভাবে অনেক সহজ-সরল, নিরাপদ ও সাফল্যের হার অনেক বেশি। ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে মোহনবাগানের দুই-এক গোলে হারানো নয়, এ একেবারে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে তিন-শূন্য গোলে হারানো। জিতে মোহনবাগান শিল্ড পেয়েছিল, আর ডা: মুখোপাধ্যায় কি পেয়েছিলেন ?

"কি পেয়েছি তার হিসাব মিলাতে" ---
বেঁচে থাকতে যা যা সাহায্য সহযোগিতা সন্মান পেয়েছিলেন তা নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় তাঁর স্ত্রী নমিতার কথা। ....

এর পরে বলতে হয় ১৯৬৬ এনআরএস মেডিক্যাল কলেজে তাঁর সমসাময়িক গাইনকলজি বিভাগের এসিস্টেন্ট প্রফেসর বৈদ্যনাথ চক্রবর্তীর কথা। অধ্যাপক চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী তিনি ও তাঁর বন্ধু ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়, দুজনেরই আনকমন সাবজেক্ট নিয়ে গবেষণার ঝোঁক ছিল ও সেই সময়ে সুভাষবাবু এন্ডোক্রিনোলজি নিয়ে কাজ করছেন। সেই সময়ে দুজনেই বয়েস মধ্য চল্লিশ। নিজেদের মধ্যে প্রচুর আইডিয়া ও উৎসাহের আদান-প্রদান হ'ত।

কালক্রম অনুসারে এর পরে আসবে ওনার রিচার্চ টিমের অন্য দুই সদস্যের কথা। টেস্ট টিউব বেবি সংক্রান্ত গবেষণায় ওনার সহযোগী ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের গাইনকোলজি বিভাগের প্রফেসর ডা: সরোজকান্তি ভট্টাচার্য এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড টেকনোলজি ও বায়োকেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর সুনীত মুখার্জি। উইকিবাবা আবার ভুল করে এনাকে "ক্রায়ো-বায়োলজিস্ট" বানিয়ে ছেড়েছে। ডা: মুখোপাধ্যায় এর সহযোগী ও আজীবন তাঁর একনিষ্ঠ অনুগামী এই ইঞ্জিনিয়ার মানুষটির কথায় আমরা আবার ফিরে আসবো। আপাততঃ এটুকু বলে রাখি যে সুনীতবাবু .. এর সহযোগিতায় "ডা: সুভাষ মুখোপাধ্যায় মেমোরিয়াল রিপ্রোডাক্টিভ বায়লজি রিসার্চ সেন্টার" গড়ে তোলেন। 

এছাড়াও সহযোগিতার একটি বিচিত্র নমুনা পেশ করা যাক। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর গবেষণার জন্য প্রয়োজন "এনিম্যাল হাউস"। অর্থবরাদ্দে কলেজের প্রিন্সিপাল রাজি তবে তার জন্য বিনিময়প্রথায় আসতে হবে। ওনাকে হোস্টেল সুপারের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হবে। গবেষণারত এক বিজ্ঞানীর কাছে সময়ের মূল্য অপরিসীম। সেই মূল্যবান সময়ের কিছুটা খরচ হবে হোস্টেলের পেছনে। তাই হোক, অন্য উপায় কি। অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় রাজি হয়ে গেলেন। পেলেন ইঁদুর, বাঁদর, গিনিপিগ ওয়ালা এনিম্যাল হাউস। আরেকটা লাভ হয়েছিল, তাঁর গুণমুগ্ধ ছাত্র-ছাত্রীদের তালিকায় যুক্ত হল ওই হোস্টেলের আবাসিকবৃন্দ।

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর মৃত্যুর পরে বিশেষকরে তাঁর মরণোত্তর খ্যাতিলাভের পরে তাঁর একসময়ের সহকর্মীদের একাংশ নিজেদের গুণমুগ্ধ বলে দাবি করেছিলেন কিন্তু ওনার বিপদের দিনে তাঁদের আচার-আচরণ তাঁদের বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তাঁদের মরাল সাপোর্টের অভাব ইত্যাদি দেখেশুনে তাঁদের ওই গুণমুগ্ধতার দাবি ঠিক ধোপে টিঁকছে না।

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর চাওয়া-পাওয়ার তালিকায় সর্বশেষ ও সম্ভবত সর্ববৃহৎ অবদান যাঁর, যিনি প্রায় একক প্রচেষ্টায় অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর ভাবমূর্তিকে একজন টিপিক্যাল ট্র্যাজিক বাঙালি হিরো থেকে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীতে রূপান্তরিত করেছেন তিনি কোনও বাঙালিই নন, তিনি নিজে প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ও আইসিএমআর এর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রিপ্রোডাক্টিভ হেল্থ এর প্রাক্তন ডিরেক্টর ডা: তিরুচিলাপল্লি চেলভারাজ আনন্দকুমার। তাঁর আরেকটি পরিচয় যে তিনি ও তাঁর সহযোগী ডা: ইন্দিরা হিন্দুজা ও তাঁদের টিম ১৯৮৬ সালের ১৬ই আগস্ট ভারতের প্রথম "সায়েন্টিফিক্যালি ডকুমেন্টেড" টেস্ট টিউব বেবির জন্ম দেয়। ওনার এই কাজ ১৯৮৬ সালে আইসিএমআর বুলেটিনে প্রকাশিত হয় এবং  ১৯৮৮ সালে "জার্নাল অফ ইন ভিটরো ফার্টিলাইজেশন এন্ড এমব্রাও ট্রান্সফার" এ প্রকাশিত হয়।

অধ্যাপক সুনীত মুখার্জি ১৯৮৩ সালে ডা: কুমারকে সুভাষ মুখার্জি মেমোরিয়াল বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ডা: কুমার আসতে পারেন নি। পরে ১৯৯৭ সালে কলকাতায় এআরটি এর তৃতীয় জাতীয় কনফারেন্স এ এসে উনি ডা: সুভাষ মুখার্জী মেমোরিয়াল লেকচার দিতে আসেন। এই সময়ে সুনীতবাবু ডা: কুমারের হাতে তাঁর কাছে সযত্নে রাখা অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর গবেষণার বেশ কিছু কাগজপত্র ও হাতে লেখা নোটস তুলে দেন এবং অনুরোধ করেন সেগুলি উল্টে পাল্টে দেখতে। 

স্বভাবসিদ্ধ চালে ডা: কুমার ওই কাগজপত্র ও নোটসগুলি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন এবং স্তম্ভিত হয়ে যান। ততদিনে ভারতের প্রথম নলজাতক এর আবিষ্কারক হিসেবে তাঁর ভুবন জোড়া খ্যাতি লাভ হয়ে গেছে। তবুও তিনি অসীম সাহস ও উদার্যের পরিচয় দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি নন, ডা: মুখোপাধ্যায়ই ভারতের প্রথম টেস্ট টিউব বেবির জনক। তিনি কেবলমাত্র "সায়েন্টিফিক্যালি ডকুমেন্টেড ফার্স্ট টেস্ট টিউব বেবি" এর জনক। তাঁর এই দাবি প্রমাণ করার জন্য তিনি ডা: মুখোপাধ্যায় এর এতাবৎকাল প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গবেষণা কাজের ওপর ভিত্তি করে  একটি নিবন্ধ লেখেন এবং সেটি "দি আর্কিটেক্ট অফ ইন্ডিয়াজ ফার্স্ট টেস্ট টিউব বেবি - ডা: সুভাষ মুখার্জি" এই শিরোনামে কারেন্ট সায়েন্স পত্রিকায় ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। 

কলকাতার কনফারেন্সে যখন ডা: আনন্দ কুমার স্বেচ্ছায় তাঁর প্রথম আসনটি ত্যাগ করে দ্বর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন যে, "লেট মি টেল ইউ দ্যাট সুভাষ মুখার্জি মাস্ট বি গিভেন ক্রেডিট ফর দ্যা ফার্স্ট টেস্ট-টিউব বেবি" এবং "অল আদার এচিভমেন্টস ডোয়ারফ ইন কম্পরাইজন টু হোয়াট হি এচিভড" তখন যথারীতি গণমাধ্যম লুফে নেয় এই চনমনে খবরটি। বন্যায় জলের মতো একের পর এক খবরের কাগজে টিভিতে খবর প্রকাশিত হয়। 

"জীবনে যারে তুমি দাও নি মালা"---
অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর মৃত্যুর পরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যে যে উদ্যোগগুলি গ্রহণ করা হয়েছিল তার কয়েকটি উল্লেখ না করলে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে বাধ্য। কালক্রম অনুযায়ী:-

১৯৮২ সালে ইন্ডিয়ান ক্রায়োজেনিক্স কাউন্সিল শুরু করেন "ডা: সুভাষ মুখার্জি মেমোরিয়াল অরেশন"। ১৯৮৫ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ান ক্রায়োজেনিক্স কাউন্সিল এবং বেহালা বালানন্দ ব্রহ্মচারী হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে বেহালায় তৈরি হয় 'ডা: সুভাষ মুখার্জি মেমোরিয়াল রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজি রিসার্চ সেন্টার"। 

এর পরে স্মৃতি রক্ষার কাজকর্মে ভাঁটা পরে কিছুদিন। তাতে আবার জোয়ার আসে ডা: আনন্দ কুমারের প্রবন্ধের পরে। 

২০০২ সালে, তাঁর মৃত্যুর ২১ বছর পরে আইসিএমআর তাঁর বিষয় নিয়ে চর্চার জন্য একটি বারো সদস্যের কমিটি গঠন করেন। কমিটি শব্দটি দেখে সুধী পাঠক আঁতকে উঠবেন না। দিনের শেষে আইসিএমআরও একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র বাদ দিয়ে চলতে পারে না। তবে এবারের অভিজ্ঞতা সুখকর। শেষ অবধি ২০০৩ সালে অধ্যাপক মুখার্জির কাজ স্বীকৃতি পায়। এবং ২০০৮ সালে তাতে সরকারি সিলমোহর পরে।

১৯শে ২০০৬ সালে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের একাডেমিক বিল্ডিং এ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের স্বীকৃতি হিসেবে একটি স্মৃতিফলক বসে যার আবরণ উন্মোচন করেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা: সূর্যকান্ত মিশ্র।

২০০৭ সালে মেডিক্যাল সায়েন্সের জগতে মার্গদর্শনের কাজ করে গেছেন এমন ১১০০ জন বিজ্ঞানীকে নিয়ে ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন একটি "ডিকশনারী অফ মেডিক্যাল বায়োগ্রাফি" প্রকাশ করে। তাতে জায়গা পান অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়। 

আইভিএফ এর ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৭ সালের ৭ই নভেম্বর ব্রাজিলীয় মেডিক্যাল সোসাইটি একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এবং তারা 'ডা: সুভাষ মুখার্জি মেমোরিয়াল রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজি রিসার্চ সেন্টার" কে একটি ট্রফি প্রদান করে।

২০১২ সালে এসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনলোজি, রিপ্রোডাক্টিভ বায়োলজি এন্ড এনডোক্রিনলোজির জগতে অসামান্য অবদানের জন্য আইসিএমআর চালু করে "ডা: সুভাষ মুখার্জি পুরস্কার"। 

গণমাধ্যমে ও জনপ্রিয় মাধ্যমে অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে নানান "চনমনে" চর্চার পাশাপাশি কয়েকটি অবদান আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। 

প্রখ্যাত কথাশিল্পী রমাপদ চৌধুরী অধ্যাপক মুখোপাধ্যায়ের জীবনী অবলম্বনে ১৯৮২ সালে লেখেন 'অভিমন্যু' উপন্যাসটি। ১৯৯১ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে প্রকাশ পায় তপন সিনহা পরিচালিত ছায়াছবি "এক ডক্টর কি মৌত"। ২০১৯ সালে তাঁর মৃত্যুকে নিয়ে রাজীব সরকার ডকুমেন্টারি ফিল্ম "ব্লাড স্টেইনস নেভার ফেড" মুক্তি পায়। ছবিটি ইউ টিউবে উপলব্ধ। আগ্রহী পাঠক দেখতে পারেন।

একাডেমিক জগতে মেডিক্যাল সায়েন্সের নানান জার্নালে লেখাপত্র এর পাশাপাশি দুটি লেখা অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার। ডন নামের পিয়ার-রিভিউড জার্নালে ২০১১ সালের ১১ নং সংখ্যায় প্রকাশিত হয় " লাইফ এন্ড ওয়ার্কস অফ ডা: সুভাষ মুখার্জি" প্রবন্ধটি।

হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সান্দ্রা বার্নাথর তাঁর পিএইচডির থিসিস হিসেবে রচনা করেন "দ্যা হিস্ট্রি অফ আইভিএফ ইন ইন্ডিয়া" যেখানে তিনি অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর অবদানকে বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন।

অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর জীবন ও কাজকর্ম নিয়ে আগ্রহ তৈরি করার উদ্দেশ্যে আইসিএমআর এর অর্থসাহায্যে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স একাডেমি একটি প্রজেক্ট নেয়। তার ফলশ্রুতিতে ড: শ্রাবনী মুখার্জি ও ড: রাজভী মেহতা একটি পুস্তিকা লেখেন যেটি নাম, "ডা: সুভাষ মুখার্জি - এ ভিশনারী এন্ড পাইয়নিয়ার অফ আইভিএফ" নামে ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইটি অন্তর্জাল জগতে পিডিএফ ফরম্যাটে পাওয়া যায়। 

ওপরে উল্লেখিত বেশ কিছু রচনা এই প্রবন্ধ লেখার তথ্য সূত্র হিসেবে কাজ করেছে। একটি বইকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে যাতে বায়াসনেস এর অভিযোগ না ওঠে। বইটি হল সুনীত মুখার্জি রচিত "সুভাষ-নমিতা-সুনীতের উপকথা। আগ্রহী পাঠক চাইলে পড়ে দেখতে পারেন।

"এ কাকে দিয়েছ রাজার পার্ট"---
ভালো কথা অনেক হল এবার খারাপ কথা বলার পালা। সেই এনকোয়ারী কমিটি নিয়ে আরো একটু কথা বলা যাক যেটি "দাশগুপ্ত কমিটি" নামেও পরিচিত। কমিটির সদস্যরা হলেন: ডা: মৃণালকান্তি দাশগুপ্ত, রেডিও ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স; ডা: ডি এন কুন্ডু, ডিরেক্টর, সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স, ডা: জে সি চট্টোপাধ্যায় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ; ডা: কৃপা মিনা, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক অজিত মাইতি, নিউরোফিজিওলজি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়; অধ্যাপক অচিন্ত্য মুখোপাধ্যায়, প্রেসিডেন্সি কলেজ।

কোনও গবেষণামূলক কাজের পিয়ার রিভিউ একটি অতি প্রচলিত পদ্ধতি। ওই এক্সপার্ট কমিটি কিছুটা পিয়ার রিভিউ টেকনিক অবলম্বন করে থাকবেন এটা আমরা ধরে নিতে পারতাম। মুশকিলটা এখানেই যে পিয়ার রিভিউয়ার হতে গেলে কিছু যোগ্যতা লাগে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা লাগে- সেটা যে এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে বহুল পরিমানে অনুপস্থিত ছিল তা কমিটির প্রশ্নোত্তর পর্বগুলি খুঁটিয়ে দেখলে ধরা পরবে। শুধু এই লেখক নয়, ডা:আনন্দ কুমার এর মতো বিজ্ঞানীও ওই আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, "নান অফ দিজ কমিটি মেম্বার্স কুড হ্যাভ হ্যাড এনি ব্যাকগ্রাউন্ড অর ইনসাইট ইনটু মর্ডান রিপ্রোডাক্টিভ টেকনলোজি, এ সাবজেক্ট আপঅন হুইচ দে ওয়ার টু হোল্ড এন এনকোয়ারী"। 

দু'একটি নমুনা পেশ করা যাক, এক সদস্য বই পড়ে সবজান্তাভাব দেখিয়ে ওভাম নেগেটিভলি চার্জড এর সমস্যা নিয়ে কূটপ্রশ্ন তুলে ডা: মুখার্জিকে বিব্রত করতে চাইলেন যেটা আদৌ এই কাজের সাথে সম্পর্ক যুক্ত নয়। সেই সদস্যকে ডা: মুখার্জীর পাল্টা প্রশ্ন ছিল, "আপনি জীবনে কোনোদিন ওভাম দেখেছেন ? দেখেন নি।"

ভ্রূণ হিমায়ণ প্রসঙ্গে এক সদস্য প্রশ্ন করেছিলেন যে এই লোডশেডিং এর বাজারে উনি ফ্রীজে রেখে ঠান্ডা করাটা বজায় রাখলেন কি করে। হ্যাঁ এটা সত্যি যে সেই সময়ে প্রচুর লোডশেডিং হত। এমন প্রশ্ন কোনো সাধারণ মানুষ করলে তাকে মানতো কিন্তু তাই বলে একজন বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য জানবেন না, তাঁর এই নূন্যতম পড়াশোনাটুকু থাকবে না যে ক্রায়োপ্রিজার্ভেশন এর জন্য বাড়ির ডোমেস্টিক ফ্রিজ নয়, লিকুইড নাইট্রোজেন ব্যবহার করা হয়। 

আরেকটি প্রশ্নের নমুনা এই রকম। এম্পিউলসগুলি হিট সিল করা হয়েছিল জানার পরে এক সদস্যের প্রশ্ন, আচ্ছা, ওই  সময় তাপ লেগে গোটা মিশ্রণটা গলে গেল না কেন। তাকে কে বোঝাবে যে হাজার লক্ষ ওষুধের এম্পিউলস হিট সিলই করা হয় আর কাচ তাপের অত্যন্ত কূপরিবাহী। সেজন্যই অন্য মেটেরিয়াল এর বদলে কাচ ব্যবহার করা হয়। 

আর নমুনা দিয়ে পাঠকদের ধৈর্য্যচুতি ঘটাবো না। মোদ্দা কথা এই যে, ক্রমাগত প্রশ্নকর্তাদের এই ধরনের অপরিসীম অজ্ঞতা মিশ্রিত ঔদ্ধত্যমূলক প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হতে  উত্তরদাতার উত্তরের মধ্যেও ফুটে উঠতে থাকে একধরণের করুণা মিশ্রিত তাচ্ছিল্য। 

এই কমিটি কি রায় দিতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আমরা এবার একটু জানা বোঝার চেষ্টা করবো যে এই তথাকথিত এক্সপার্ট কমিটির এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কেন। কারণ অধ্যাপক মুখার্জিকে নিয়ে সামান্য চর্চার পরে এই প্রবন্ধ লেখকের এটাই মনে হয়েছে যে কেবলমাত্র খ্যাতি উদ্ভূত ঈর্ষা বা প্রফেশনাল জেলাসি বা তথাকথিত কাঁকড়া মনোবৃত্তি দিয়েই এটা ব্যাখ্যা করা অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে।  

সমসাময়িক বিজ্ঞানের জগৎ থেকে অনেকটা এগিয়ে থাকা মানুষের চিন্তাভাবনার নাগাল পাওয়া অন্যদের পক্ষে প্রায়ই সম্ভব হয় নি- এই ঘটনা বিজ্ঞানের ইতিহাসের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে অজানা নয়। নাগাল না পাওয়ার ফলে নতুন কোনও আবিষ্কারকে গড়পড়তা মানুষতো বটেই, এমনকি গড়পড়তা চিকিৎসক বিজ্ঞানীর কাছেও "অবিশ্বাস্য" ঠেকতে পারে। অধ্যাপক মুখার্জি যে তার সময়ের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন  এটা তার সমস্ত আলোচকদের কথায় বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। ডা: আনন্দ কুমারের ভাষায় "পাইয়নিয়ারিং ওয়ার্ক"।

অধ্যাপক মুখার্জি গণমাধ্যমেতো বটেই এমনকি  পেশাদার সহকর্মীদের সাথেও তাঁর গবেষণার বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করেন নি, বৈজ্ঞানিক জার্নালে ধারাবাহিক এমন কোনও নিবন্ধ প্রকাশ করেননি যা থেকে ওয়াকিবহাল মহলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে উনি একটা বড়সড় ব্রেক থ্রু এর সামনে আছেন। তাই ওনার সাফল্য সংবাদটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। খবরটা প্রকাশিত হওয়ার পরে প্রচন্ড বিস্ময়বোধের জন্ম দিয়েছিল। এই বিস্ময়বোধ কিন্ত প্রকারান্তরে ওই অবিশ্বাসকেই বাড়িয়ে তুলেছে, বিশ্বাসকে নয়।এই অপরিচিত অচিন্তনীয় পদ্ধতিটি নিয়ে অবিশ্বাস ও সন্দেহ এর মাত্রা উত্তরোত্তর বেড়েছে। 

এর সাথে যে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটি যোগ করতে হবে, সেটি হ'ল আমাদের, ভারতীয়দের কলোনিয়াল হ্যাংওভার। সাহেবরা এতকিছু টেকনোলজি ও ফান্ডের সাপোর্ট পেয়ে কিছু করতে পারলো না আর আমাদের ঘরের ছেলে সুভাষ একটা "ডোমেস্টিক" ফ্রিজ নিয়েই কামাল করে দিলো - এ হতেই পারে না। একথা সত্যি যে আজকালকার দিনে সাইনিটিফিক রিসার্চ এর সাফল্যলাভের সম্ভাবনার এর সাথে ওই অত্যাধুনিক টেকনোলজি ও প্রভূত ফান্ডিং যোগসূত্রটি চিহ্নিত এবং সেই কারণে আমাদের মননে স্মরনে গ্রথিত ও প্রোথিত তাই অবিশ্বাসটা খুব আনকমন নয়। 

ভারতীয় তথা বাঙালির আরেকটি বৈশিষ্ট্য এর কথাও না বললেই নয়। কুপমণ্ডূকতা। বিজ্ঞানের জগৎ এ নিজেকে ওয়াকিবহাল রাখতে আপটুডেট রাখতে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জার্নাল পত্রপত্রিকা পড়ে যেতে হয় নৈলে পিছিয়ে পরতে হয় - যে অভ্যাসটি অনেকে বিজ্ঞানীই ত্যাগ করে থাকেন বিশেষ করে তার যদি মাস গেলে একটা ভদ্রস্থ মাইনের বন্দোবস্ত থাকে। এই কমিটির কারুর মধ্যে যে এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা, জাতীয়/ আন্তর্জাতিক স্তরের গবেষনা সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল - তার প্রমাণ অন্ততঃ তাদের প্রশ্নোত্তরে ধরা পরেনি। 

"দোষ কারো নয় গো মা"---
আমরা এবার ফিরে আসছি অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় এর জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টিতে। কি এমন ঘটলো যে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার বদলে মানুষটি আত্মহত্যা করলেন। 

সিজার করে দুর্গা জন্ম নেয় ৩রা অক্টোবর ১৯৭৮ সালে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে। তার জন্মের খবর অর্থাৎ সে যে নলজাতক সেটি সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়। অধুনালুপ্ত অমৃতবাজার পত্রিকায় খবরটি প্রকাশিত হয় ৬ই অক্টোবর। 

সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার যার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ননী ভট্টাচার্য। স্বাস্থ্য অধিকর্তার পদে ডা: মনিকুমার ছেত্রী। স্বাস্থ্য অধিকর্তাই তখন স্বাস্থ্য দপ্তরের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য-প্রশাসক, তখনও এখনকার মতো আলাদা মেডিক্যাল এডুকেশন ডাইরেকটরেট তৈরি হয় নি। তাঁর নির্দেশে ১৯৭৮ সালের ১৯শে অক্টোবর অধ্যাপক মুখার্জি একটি রিপোর্ট জমা দেন। নানান কারণে রিপোর্টটি সংক্ষিপ্ত ছিল। কেন ছিল এ বিষয়ে অধ্যাপক মুখার্জি স্বাস্থ্য অধিকর্তাকে তাঁর লেখা ১লা ডিসেম্বরের চিঠিতে পরে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।

ওই রিপোর্ট এর ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্যদপ্তর অধ্যাপক মুখার্জির দাবির সত্যাসত্য জানার জন্য ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন ও বেঙ্গল অবসটেট্রিক্স এন্ড গাইনকোলজি এসোসিয়েশনের অধীনে একটি "এক্সপার্ট" কমিটি তৈরি করেন। 

১৭ই নভেম্বর, ১৯৭৮ সালে ইনস্টিটিউট অফ রেডিও ফিজিক্স এন্ড ইলেকট্রনিক্স এর সভাঘরে বিশদ আলোচনার পরে কমিটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এবং ঘোষণা করে যে "দ্যা ওয়ার্ক অফ ড: সুভাষ মুখার্জি এন্ড হিজ টিম এজ ইমপ্লজিবল এবং বোগাস।

তদন্ত কমিটির এই রায় সামনে আসার পরে 
অধ্যাপক মুখার্জি ১লা ডিসেম্বরের সেই চিঠিটি লেখেন। তাতে তিনি জানান যে তাঁর প্রাথমিক রিপোর্টটি তৈরি করার জন্য তিনি বিশেষ সময় পান নি। তাকে আরেকটু সময় দেওয়া হোক। আগের সংক্ষিপ্ত রিপোর্টে বেশ কিছু তথ্য হাজির না করার কারণ হিসেবে তিনি জানান যে তার ইচ্ছে ছিল যে "ওই এক্সপেরিমেন্ট এর রিপ্রোডিউসেবিলিটি সম্পর্কে মোটামুটি আশ্বস্ত হয়ে সেটি কোনো স্বীকৃত মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশ করার।"। 

তিনি ওই চিঠিতে তদন্ত কমিটির তোলা একটি বিশেষ পয়েন্ট - তাঁর আবিষ্কৃত হিমায়ণ এর পদ্ধতি ও ডিএমএসও নামের উপাদানের বিস্তারিত তথ্য তিনি জনসমক্ষে আনতে চাননি বলেই ইচ্ছে করেই উল্লেখ করা থেকে বাদ দিয়েছেন কারণ, তাঁর ভাষায়, "আই হ্যাড টু বি কেয়ারফুল টু গার্ড আওয়ার আনপাবলিশড ডাটা বিকজ বাই দ্যাট টাইম আই বিকেম এওয়ার অফ দ্যা পেনিট্রেটিং এফিসিয়েন্সি অফ দ্যা টেনটাকলস অফ দি মাস মিডিয়া।"

ডা: আনন্দ কুমার এই চিঠির বয়ানকে অর্থাৎ ডাটা গোপন রাখার সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। বৈজ্ঞানিক গবেষনা ও তার ফলাফল প্রকাশ সম্পর্কে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণা আছে তারাও ডা: কুমারের সাথে একমত হবেন। অন্যের গবেষণার ফল চুরি করে নিজে নামী হওয়া (এবং কিছু ক্ষেত্রে দামী) এর ঘটনা আকছার ঘটে।

গবেষণাপত্র প্রকাশের তাগিদে নিয়োগকর্তার কাছে তথ্য গোপন করার এই "অপরাধ" এর জন্য অধ্যাপক মুখার্জিকে কি নিদারুণভাবে শাস্তি পেতে হয়েছে সেটা আমরা পরে দেখবো। ওই শাস্তি ওনাকে পেতে হয়েছে কারণ দিনের শেষে তিনি অধ্যাপক, বিজ্ঞানী ফিজ্ঞানী কিস্যু নন, তিনি স্রেফ সরকারি চাকুরী করা একজন ডাক্তার। 

একটি তথ্যসূত্র মোতাবেক কেবল এনকোয়ারী কমিটি নয়, কেবল আমলাতন্ত্রও নয়, "সাম প্রফেসনাল বডিজ অলসো হেকেলড হিম ইন সাম মিটিংস", অর্থাৎ ডাক্তারদের কিছু পেশাদারি সংগঠনও কিছু সভায় তাঁকে হেনস্থা করে।  

আমরা আমাদের গোটা আলোচনায় একটি প্রসঙ্গ প্রায় এড়িয়ে গেলাম -সেটা হল, বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ কর্মসূচির অর্থকরী দিকটি। এড়ানো হল এই কারণে নয় যে অর্থ এই লেখকের একটি ব্যক্তিগত অপ্রীতিকর বিষয়, এই কারণেই এড়ানো হল যে এ বিষয়ে পাথুরে প্রমান ও তথ্যের অভাব। 

এসিস্টেড রিপ্রোডাকটিভ টেকনোলজিতে পাইয়নিয়ার হিসেবে বিখ্যাত একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ যিনি পরবর্তীকালে এই ফিল্ডে সুনাম ও অর্থ দুই কুড়িয়েছেন, তিনি ডা: মুখার্জির সাথে বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে থিসিস চুরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। ওনার স্ত্রী যেহেতু নামটি নিতে চান নি তাই সেটি অপ্রকাশিতই রয়ে গেল। 

এনকোয়ারী কমিটি, আমলাতন্ত্র, সহকর্মী, প্রফেশনাল বডি - কাকে বাদ রাখবো ! সাধে কি আর রমাপদ চৌধুরী মশাই তাঁর উপন্যাসের নাম রেখেছিলেন "অভিমন্যু"। পুরানের অভিমন্যু বাঁচে নি। আমাদের অভিমন্যুরও বাঁচার কথা ছিল না।

"যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা"-
ওই তথাকথিত এক্সপার্ট কমিটির সমালোচনা এবং মাস মিডিয়া সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশিত নানান খবর পড়ে কোনো পাঠকের মনে হতে পারে যে অধ্যাপক মুখার্জি তাঁর গবেষণার কাজের ডকুমেন্টেশন এ অবহেলা করেছিলেন, স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম অনুযায়ী পিয়ার রিভিউ জার্নালে তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন নি। প্রকৃত পক্ষে এর কোনোটাই সত্যি নয়। 

তিনি জার্নালে অনেক পেপার পাবলিশ করেছেন, সাইন্টিফিক কনফারেন্স এ বক্তৃতা দিয়েছেন। কয়েকটি উল্লেখ করা হল। হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন এর উৎস সম্পর্কে তাঁর গবেষণা ১৮৭০ সালের হাইপোথিসিসকে ভুল প্রমাণিত করে। ফিমেল ইনফার্টিলিটি নিয়ে টেস্টস্টেরণ এর প্রয়োগ নিয়েও তাঁর গবেষণা ছিল। ফিমেল ইনফার্টিলিটি এর কারণ এর মানসিক চাপ এর যোগাযোগ আছে এনিয়ে তিনি ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে প্যারিসে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে পেপার হাজির করেন।

১৯৭৮ সালের ১৭ই আগস্ট বেলুড় রোটারি ক্লাবে টেস্ট টিউব বেবি নিয়ে বক্তব্য রাখেন। ১৯৭৮ সালের ৩রা অক্টোবর তাঁর টেস্ট টিউব বেবির জন্ম হয়। তিনি তাঁর গবেষণার কিছুটা অংশ ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ক্রায়োজেনিক্স এ প্রকাশ করেন এবং ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি মাসে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসে হাজির করেন।

তিনি তার গবেষণা নিয়ে নয়া দিল্লিতে ১৯৭৮ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ফিফথ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন হরমোনাল স্টেরয়েড এ আলোচনা করেন। তিনি এ বিষয়টি নিয়ে হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ল্যাবরেটরি অফ হিউম্যান রিপ্রোডাকশন এর অধ্যাপক জন ব্রিগস এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক সাক্সেনার সাথে আলোচনা করেন। 

তিনি বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি দ্বারা আমন্ত্রিত হন এমব্রাও ট্রান্সফার নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তিনি গৌহাটি ও এন্ড জি সোসাইটি দ্বারা আয়োজিত কনফারেন্সে বক্তব্য রাখেন ও একটি মানপত্র দ্বারা সম্মানিত হন। 

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ  অভিযোগ ছিল অধ্যাপক মুখার্জির টিমের বিরুদ্ধে। মিডিয়া একটা সময় সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয় যে অধ্যাপক মুখার্জির সবচেয়ে বড় অসুবিধের জায়গা ছিল তাঁর দাবির সপক্ষে ফিজিক্যাল এভিডেন্স হিসেবে নলজাতককে হাজির করতে না পারা। ১৯৭৮ সালে দুর্গার মা-বাবা প্রভাতকুমার ও বেলা আগরওয়াল তাদের কন্যার জন্মের বিশদ বিবরণ লোকসমক্ষে আনার অনুমতি দেন নি অধ্যাপক মুখার্জিকে।  লোকলজ্জা, রক্ষণশীল মাড়ওয়ারিসমাজে একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয় - কারণটা সুধী পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারেন। যদিও পরবর্তী কালে এক সাক্ষাতকারে দুর্গার বাবা প্রভাতবাবু দাবি করেছেন যে ভয় নয়, মিডিয়া হাইপ ও এটেনশনে তিনি অস্বস্তি বোধ করেন তাই তার ওই সিদ্ধান্ত। এই প্রসঙ্গে ডা: আনন্দ কুমারের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বারবার সেই বিশেষ "ইন্ডিয়ান সাইকি" এর কথা বলেছেন যা সন্তান উৎপাদন হীনতা কে, "বাঁজা" হওয়াকে একটা অভিশাপ বলে মনে করে।

একথা মনে করার কারণ নেই যে সশরীরে ওই শিশু দুর্গা ও তার বাবা-মাকে উপস্থিত করলেই সব ঝামেলা মিতে যেত। অধ্যাপক মুখার্জিকে এমন প্রশ্নও শুনতে হয়েছে যে ওই সদ্যজাতক যে  'ইন ভিভো' ফার্টিলাইজেশন অর্থাৎ স্বাভাবিক জনন ক্রিয়ার উৎপাদন নয়, ওনার দাবি মতো 'ইন ভিট্রো' ফার্টিলাইজেশন (আইভিএফ) এর ফসল অর্থাৎ 'টেস্ট টিউব বেবি'- তার কি প্রমাণ আছে। শিশুটির মা বেলা দেবীর ঋতুচক্র স্বাভাবিক থাকলেও তার ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্ষতিগ্রস্থ ছিল, স্বাভাবিক পদ্ধতি মেনে ওই মা কোনোদিনই সন্তান ধারণ করতে পারার কথা নয়। ডাক্তারি পরিভাষায় প্রাইমারি ইনফার্টিলিটি। অন্য এক চিকিৎসক তার কেসটা ডা: মুখার্জিকে রেফার করে। তিনি ওই দম্পত্তিকে একটি অভুতপূর্ব পদ্ধতি অবলম্বন করার প্রস্তাব দেন। সেই সময় তিনি ওদের আরো জানিয়ে দেন যে এটি একটি পরীক্ষামূলক পদ্ধতি, এতে সাফল্যের কোনো গ্যারান্টি নেই। দম্পত্তি রাজি হয়ে যায়। 

এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয় অধ্যাপক মুখার্জির নেতৃত্বে, তিনি তখন বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে পোস্টেড, সপ্তাহ অন্তে বাড়ি আসতেন। উসাইট সংগ্রহ করার আগে ওভারিকে স্টিমুলেট করার জন্য গোনাডোট্রপিন ব্যবহার করা হয়। ট্রান্স ভ্যাজাইন্যাল রুটে ফ্লুইড এসপিরেট করা হয়। শেষ পর্যায়ে এমব্রাওকে লিকুইড নাইট্রোজেন ব্যবহার করে হিমায়িত করা হয়। এই কাজে ডাইমিথাইল সালফক্সাইড (ডিএমএসও) যৌগটিকে ক্রায়োপ্রটেকট্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ৫৩ দিন বাদে ভ্রূণ কে হিমায়িত অবস্থা থেকে বের করে ৩৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ১ ঘন্টার জন্য ইনকিউবেটরে দিয়ে গলানো হয় এবং তারপরে মায়ের জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। ১৯৭৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বেলা দেবীর প্রেগনেন্সি রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এ সবই ডকুমেন্টেড ছিল। 

সর্বোপরি অধ্যাপক মুখার্জির টিমের অন্যতম সদস্য সুনীত বাবুর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দম্পত্তিকে এক্সপেরিমেন্ট চলাকালীন যৌনমিলন থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছিল এবং ওরা সেই পরামর্শ মেনে চলেছিলেন। 

ওই দম্পত্তিকে যেহেতু সশরীরে হাজির করা যায় নি সেহেতু অধ্যাপক মুখার্জির কাছে বিশেষ কোনো অপশন ছিল না। তিনি প্রকৃত বিজ্ঞানীর মতোই সুনির্দিষ্টভাবে বলেছিলেন যে এই মুহূর্তে তিনি আইভিএফ এর সপক্ষে কোনো সুনিশ্চিত প্রমাণ দাখিল করতে পারছেন না কিন্তু কোনো জেনেটিক মার্কার তাঁর হাতে থাকলে এটা প্রমাণ করা যেত। সেই সত্তর দশকের শেষের দিকে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে এর বেশি কিছু বলা তিনি কেন, অন্য কোনও বিজ্ঞানীর পক্ষেও সম্ভব ছিল না। 

"উটের পিঠে শেষ খড়ের টুকরো"---
তাঁর নিজের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা করার জন্য অধ্যাপক মুখার্জি ১৯৭৯ সালের ২৫শে জানুয়ারি জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইমেট রিসার্চ সেন্টার আয়োজিত একটি বৈঠকে যোগদানের আমন্ত্রণ পান। খরচ ওদের। তিনি নিয়ম মেনে বিদেশযাত্রার অনুমতি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) চেয়ে আবেদন করেন। তখনও স্বাস্থ্য ভবন তৈরি হয় নি, রাজ্য স্বাস্থ্যদপ্তরের ঠিকানা রাইটার্স বিলিডিং। তাঁর আবেদনপত্রের ফাইলে রাইটার্স এর কনিষ্ঠ রাইটার বাবু বা বরিষ্ঠ মন্ত্রী কি নোট দিয়েছিলেন তা জানা নেই (একদিন জানার ইচ্ছে আছে)। স্বাস্থ্য অধিকর্তার সই করা চিঠি গেল চটপট তাঁর কাছে। ১৬ই ফেব্রুয়ারি তারিখের ওই চিঠিতে স্বাস্থ্য অধিকর্তা অশেষ দুঃখের সাথে জানালেন যে তাঁর আবেদন নামঞ্জুর। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে তিনি যেন সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে দেশত্যাগ না করেন। ভাবুন একবার, অধ্যাপক মুখার্জি যেন কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানী-গবেষক নন, তিনি যেন কোনও কুখ্যাত অপরাধী যে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ধান্দায় আছে।

এই পর্যন্ত পড়ে যারা ভাবছেন যে যাক নিশ্চিত হওয়া গেল, এই গল্পের হিরো কে সেতো জানাই ছিল, এইবার ভিলেন কে সেটাও জানা গেল - তাদের জন্য তথ্য হিসেবে দু'একটা কথা। কারণ এই উপাখ্যানটি কোনো রগরগে বাজার চলতি তৃতীয় শ্রেণীর হিন্দি সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। এতে সম্পুর্ন সাদা বা সম্পূর্ণ কালো কোনো চরিত্র নেই। সবাই ডিফারেন্ট সেডস অফ গ্রে - ধূসর। স্বাস্থ্য অধিকর্তা ডা: ছেত্রী নিজগুনে একজন প্রোথিতযশা চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ১৯৭৬ সালে, বাম সরকারের আগের সরকারের আমলে নিযুক্ত হলেও বাম সরকারের যথেষ্ট আস্থাভাজন ছিলেন এর ভুরি ভুরি প্রমাণ আছে। 

উল্টোদিকে তদানীংতন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ননী ভট্টাচার্য  ডুয়ার্স-তরাই অঞ্চলের পরিচিত ট্রেড ইউনিয়ন নেতা থেকে মন্ত্রীর আসনে বসেছিলেন। প্রয়াত এই মানুষটির অতিবড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও স্বীকার করবেন যে এককথায় তিনি স্বজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। অধ্যাপক মুখার্জির এই হেনস্থার জন্য তিনি ডা: ছেত্রীর সাথে বা অন্যকারুর সাথে হাত মিলিয়ে ষড়যন্ত্র রচনা করেছিলেন এটা ভাবা কষ্টকর। কিন্তু হেনস্থাতো হয়েছিল। তাই তার মন্ত্রকের নৈতিক দায়িত্ব তিনি এড়াতে পারেন না, যেমন পারেন না ডা: ছেত্রী। 

উটের কথায় ফিরে আসা যাক। বিদেশ যাত্রা প্রত্যাখ্যান এর ওই ঘটনার অল্প কিছুদিন পরে অধ্যাপক মুখার্জির হার্ট এটাক হয়। সুধী পাঠক, আপনি কি বলবেন জানি না, "দুষ্টজনে" বলে থাকে যে ওই বিদেশযাত্রা প্রত্যাখ্যান আর হার্ট এটাকের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে। অসুস্থ অধ্যাপক মুখার্জি দুটি আবেদন করেন স্বাস্থ্য অধিকর্তার কাছে। স্পেশাল লিভ এবং বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজ থেকে বাড়ির কাছে বদলি। স্বাস্থ্য অধিকর্তা প্রথমটি নামঞ্জুর করলেও দ্বিতীয়টি মঞ্জুর করেন। তাঁকে ১৯৮১ সালের ৫ই জুন বদলি করা হয় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ অপথ্যালমোলজিতে "ইলেক্ট্রফিজিওলজি" বিভাগের প্রফেসর হিসেবে। এমন একটি বিভাগ যে বিষয়ে তার কোনও অভিজ্ঞতাই নেই।

এটাই বোধহয় ছিল সেই প্রবাদবাক্যের উটের পিঠে শেষ খড়ের টুকরো। সরকার তাঁকে বিজ্ঞান-সম্মেলনে গিয়ে নিজের গবেষনাপত্র হাজির করার সুযোগ দেবে না, গবেষণার ফলাফল গুছিয়ে লেখার জন্য সময় বের করার ছুটি দেবে না, সহকর্মীরা করবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ। উট আর বইতে পারে নি। ক্লান্ত শ্রান্ত ন্যুব্জ পিঠ ভেঙে গেছিল। তাঁর বদলির আদেশনামা বেরোনোর ৪৪ দিন পরে ১৯শে জুলাই, ১৯৮১ অধ্যাপক মুখার্জি আত্মহননের রাস্তা বেছে নেন। সুইসাইড নোটে লিখেছিলেন,"প্রত্যেক দিন হার্ট এটাক হওয়ার চেয়ে একবার হওয়া ভালো"।  নোটের এই "হার্ট" শব্দটা বেছে নিয়ে তাঁর এক নিকট আত্নীয় আবেদন করেছিলেন আমাদের কাছে, "দোহাই আপনাদের, দয়া করে ওই হার্ট শব্দটার বাংলা তর্জমা করার সময় "হৃদযন্ত্র" আনবেন না, জানেন তো হার্ট এর আরেকটা বাংলা 'হৃদয়' ?"

"তোমার মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে দেয় চে"---
ফিজিওলজি বা বিজ্ঞানের কোনো শাখায় কোনো বাঙালি নোবেল পান নি আজ অবধি।অধ্যাপক মুখার্জির আবিষ্কার বোধহয় সবচেয়ে কাছাকাছি সুযোগ ছিল। 

কয়েকদিন আগে পিতৃদিবসে অনেকেই তাঁর বাবাকে নিয়ে তাদের ভালোবাসা শ্রদ্ধার কাহিনী শুনিয়েছেন। আমার অদেখা এই মানুষটি কে আজ স্মরণ করলাম যিনি ডা: আনন্দ কুমারের ভাষায় ছিলেন ভারতের তথা এশিয়া মহাদেশের প্রথম নলজাতকের "সাইন্টিফিক ফাদার"। গবেষণা পাগল নিঃসন্তান এই মানুষটি আমাদের জন্য যে লিগ্যাসি রেখে গেছেন তা হল এই যে আমরা বাঙালিরা, ভারতীয়রাও পারি। 

তার জীবন কেবল কতগুলি কুচক্রী মানুষের হাতে এক প্রতিভাবান এর মৃত্যুর উপাখ্যান নয়। বাঙালি তথা ভারতীয়রাও যে চেষ্টা করলে বিজ্ঞানেও নোবেল পেতে পারে সেই আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার জন্যই তাঁর জীবনের কাছে ফিরে যেতে হবে। ফিরে যাবো বার বার দু হাত জড়ো করে তাঁর আশীর্বাদ পেতে।

বুধবার, ১২ জুন, ২০২৪

জলছবিতে ছায়াপথ ~ মলয় চ্যাটার্জী

"আবার নিজের খেয়ালে ডুবে যায় সুমিতা। মানিকের কথা ফেলতেও পারছে না, আবার মেনে নিতেও বাধছে ওর। সুমিতা নিজে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। সেই যাদবপুর, যেখানকার ছাত্র ছিল কবি তিমিরবরণ সিংহ। সব ছেড়ে গ্রামে গিয়েছিলো কৃষকদের সংগঠিত করতে। ৭১-এর ২৪শে ফেব্রুয়ারি বহরমপুর জেলে পুলিশ গুলি করে মেরেছে তাকে। আর শুধু কি তিমিরবরণ? পুলিশের গুলিতে তো আরও তিন কবি খুন হয়ে গেছে। কবি দ্রোণাচার্য ঘোষ, অমিয় চট্টোপাধ্যায় আর মুরারি মুখোপাধ্যায়। এদের মাঝে অমিয় চট্টোপাধ্যায় তো বেহালা পৌরসভার কাউন্সিলরও ছিলেন। পুরুলিয়ার গ্রামে 'সাগর' নাম নিয়ে কৃষকদের মাঝে কাজ শুরু করেছিলেন। তাকেও গ্রেপ্তার করে জেলের মধ্যেই হত্যা করে পুলিশ। হুগলি জেলায় চারু মজুমদারের ভাবনাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো দ্রোণ। পুলিশের হাতে ধরা পরে ঠাঁই হয় হুগলী জেলেই। সেখানেই পুলিশ পিটিয়ে মারে তাকে। আর মুরারি ছিল সত্যিই লড়াকু। গ্রেপ্তার হওয়ার পড়েও জেল থেকে তার মাকে চিঠিতে লিখেছিলো, "ওরা আমাদের জেলে ঢোকাচ্ছে, হত্যা করছে, কিন্তু মূর্খ ওরা। তুমিই বলো মা, হাত দিয়ে কি সূর্যের আলোকে আটকানো যায়?" সেই মুরারিকেও হাজারীবাগ সেন্ট্রাল জেলে হত্যা করে পুলিশ।
আর এই তো গতবছরের সেপ্টেম্বর মাসে, মনে করলে যেন এখনও সেদিন মনে হয় সুমিতার, পুলিশ গুলি করে মারলো অনিল চক্রবর্তী কে।
নাম অনিল চক্রবর্তী, কিন্তু বেহালার আপামর জনসাধারণের কাছে পরিচিত শুধুই নীল নামে। প্রথমে সিপিআই(এম) করলেও ঊনসত্তরের সিপিআই(এমএল)-এর একেবারে শুরুর দিন থেকেই সে পার্টিতে যোগ দিয়েছিলো নীল। সুমিতা এবং আরও অনেকের প্রিয় নীলদা।
মনে আছে সুমিতার, ও তখন সবে ঢুকেছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে, সে সময়েই একদিন গিয়েছিলো বেহালা হরিসভার কাছে ওর বন্ধু পিউয়ের সাথে তার মাসির বাড়িতে। বিকালে সে বাড়িতে পৌঁছে আধঘন্টা কাটিয়ে যখন বেরিয়েছিল, তখন ওই পিউ দেখিয়েছিলো এক বছর ছাব্বিশ সাতাশের ছেলেকে। পেটানো চেহারার ছেলেটাকে দেখিয়ে পিউ শুধু বলেছিল সুমিতাকে...
-- এই সুমি, দেখে রাখ, ওটাই নীলদা।
-- দেখলাম, কিন্তু তুই দেখাচ্ছিস কেন বুঝলাম না।
-- আরে ওর সঙ্গেই তো আমার মাসতুতো দিদির...হি হি হি...
-- মানে তোর ভবিষ্যতের জামাইবাবু বল।
এবার উদাস হয়েছিল পিউ...
-- সেটা জানিনা রে...
-- জানিসনা! কেন?
-- তুই জানিস না? নীলদা তো নকশাল। আর শুধু নকশাল, ও তো পুরো লিডার এখানকার।
সেই পিউয়ের থেকেই শুনেছিলো সুমিতা যে নীলদা নাকি বক্সিং করতো বেহালা ক্লাবে, আর ভালোবাসতো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান গুনগুন করে গাইতে। তবে এলাকায় দাপট এতটাই ছিল যে বেহালার একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মেয়েরাও রাত বিরেতে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে আর ভয় পেতো না। তারা জেনেই গিয়েছিলো যে, তাদের কারও হাত ধরে টানা তো দূর, যদি কেউ একটা বাজে কথাও বলে আর সেটা তাদের নীলদার কানে যায় তো নির্ঘাৎ দলবল নিয়ে এসে যে ওসব বলার সাহস দেখাবে, মেরে তার হাড়গোড় ভেঙ্গে দেবে।
তবে সব থেকে আশ্চর্য্য হয়েছিল এর কিছুদিন পর, যখন শুনেছিলো যে অজন্তা সিনেমা হলের সামনে নাকি টিকিট ব্ল্যাক করা বন্ধ হয়ে গেছে। আর ওই অঞ্চলেরই আশেপাশে লোহার ছাঁটের যে বিশাল কালোবাজার আর তাকে ঘিরে কংগ্রেসি গুন্ডাদের দাপাদাপি, সেটাও হঠাৎ করেই থেমে গেছে। আর এই সবকিছুর পিছনেই নাকি আছে নীলদা। সে নাকি সাফ বলে দিয়েছে এদেরকে যে রাস্তার ধারে বসে সবজি বিক্রি করলেও কিছু বলবে না, কিন্তু এলাকায় কোনও তোলাবাজি ও বরদাস্ত করবে না কিছুতেই।
আর নীলদার মারা যাওয়ার ঘটনাও পরে শুনেছে ওর পুলিশে কাজ করা মেসোর থেকে। সে সময় নাকি বর্ধমানের গোপন কোনও আস্তানায় ছিল নীলদা। সেখান থেকেই দলের নির্দেশ দিয়েছিলো দলের কিছু সাথীকে। ওই বর্ধমানেরই এক জোতদার বাড়িতে মজুত করে রাখা দুটো বন্দুক লুঠ করে আনতে। যারা গিয়েছিলো সেই নির্দেশ পালন করতে, তারা বন্দুকের সাথে সাথে বাড়ির মেয়েদের গয়নাও নিয়ে এসেছিলো লুঠ করে। যা দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হয় নীলদা। পরিষ্কার বলে দেয় যে এটা পার্টির কর্মসূচির মধ্যে পড়েনা। আরও বলে যে পরের রাত্রে ও নিজেই গিয়ে সে বাড়ির মেয়েদের গয়না ফেরৎ দিয়ে আসবে। আর তার সাথে নিজের পার্টি কমরেডদের করা গর্হিত কাজের জন্য ক্ষমাও চেয়ে আসবে সে বাড়ির মহিলাদের কাছে। পুলিশ ইনফর্মারের কাজ করে এই খবরটাই কাছের থানাকে জানিয়ে দিয়েছিলো নীলদারই এক বিশ্বস্ত সঙ্গী। পরের রাতে সে বাড়িতে গিয়ে গয়না ফেরৎ দিয়ে যখন বেরিয়ে আসছে তখনই পুলিশ চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে এরেস্ট করে নীলদাকে। এমনকি নিজের কোমর থেকে আগ্নেয়াস্ত্রটা বার করার সময়ও পায়নি সে। সেই রাতেই খবর পাঠানো হয় বেহালা থানাকে। একেবারে সকালেই বর্ধমান পৌঁছে অনিল চক্রবর্তী, এলিয়াস নীলকে শনাক্ত করে বেহালা থানার পুলিশ। দেরি না করে সেদিনই নিয়ে আসা হয় তাকে বেহালা থানায়। বেহালা থানার দায়িত্বে তখন নকশাল দমনের জন্য বিশেষভাবে নিয়োগ করা ওসি সুবীর ঘোষ। তিনি অবশ্য সে দায়িত্বে এখনও আছেন। পুলিশের ওপর নির্দেশ ছিল যে এনকাউন্টার দেখিয়ে নীলকে গুলি করে মারার। কিন্তু মেসোর কাছে শুনেছে সুমিতা , বেহালা থানার পুলিশরাই নাকি বেঁকে বসেছিল। তারা নাকি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলো যে নীলের মতো ছেলেকে গুলি করা তো দূর, ওর গায়ে হাত দিতেও পারবে না তারা। কিন্তু কংগ্রেসের কোনও এক অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতার নির্দেশেই নাকি, লালবাজার থেকে ফোর্স নিয়ে এসে পরদিন কাকভোরে হাতকড়া পরানো নীলকে পুলিশ ভ্যানে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় চোঙার বনের পেয়ারাবাগান অঞ্চলে। সেখানেই ভ্যান থেকে নামিয়ে একেবারে পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি করা হয় নীলকে।
নীলের মৃতদেহ যখন নিয়ে আসা হয়েছিল বেহালা থানায়, তারপর তার বাড়িতে খবর দিয়ে ডেকে আনা হয়েছিল ওর মাকে। দূর থেকে শুধু একবার ছেলের মৃতদেহ দেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ওনাকে। স্থানীয় এক ডাক্তারকে দিয়ে লেখানো হয়েছিল ডেথ সার্টিফিকেট। কোনও পোস্ট মর্টেম হয়ইনি। সোজা নীলের মৃতদেহ নিয়ে কালীঘাট শ্মশানের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখন পুলিশ।
সত্যজিৎ রায়ের সীমাবদ্ধ রিলিজ করেছে ঠিক তার আগের দিন। অজন্তা সিনেমা হলেও এসেছে সে চলচ্চিত্র। আর বেহালার প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ জড়ো হয়ে গিয়েছিলো বেহালা থানার সামনে। তাদের দাবী, নীলের মৃতদেহ তুলে দিতে হবে তাদের হাতে। সবাইকে অবাক করে সে মানুষদের সাথে মিশে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিল অজন্তা সিনেমাহলের সামনে একসময় টিকিট ব্ল্যাক করা ব্ল্যাকাররাও। যাদের টিকিট ব্ল্যাক করা বন্ধ করে দিয়েছিলো নীল একসময়, সেই ব্ল্যাকাররা। অবশেষে লালবাজার থেকে বিশাল পুলিশবাহিনী এসে সেদিন উত্তেজিত জনতাকে স্রেফ লাঠিচার্জ করেই হঠাতে পেরেছিলো।"
---------------------
ওপরের অংশটুকু নেওয়া হয়েছে এই অধমেরই লেখা "ছায়াপথ" উপন্যাস থেকে। কিন্তু সে উপন্যাস লিখতে গিয়ে যে সব তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম আমি, যত মানুষের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছিল, যত জায়গায় ঘুরেছি, তার মনে হয় সিকিভাগও লিখতে পারিনি উপন্যাসে। আর তা ছাড়া নিজেই তো ভেবেছি বহুবার যে গণহত্যা কী আদৌ কোনো দলীয় লাইন হতে পারে? না হওয়া উচিত?
আজ সেই দুমলাটের বাইরে থাকা কিছু কথা জানাই বরং। এই সব কথাই আমি সংগ্রহ করেছিলাম একেবারে ব্যক্তিগত কিছু সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে।
বেহালা অঞ্চলের ডাকাবুকো নকশাল নেতা নীল চক্রবর্তীর সম্মন্ধে তথ্য সংগ্রহ করার সময় সত্যিই পড়েছিলাম ঝামেলায়। নিজে থাকি বেহালায়। বেহালার ওঠাপড়া অনেক কিছুরই সাক্ষী আমি। কিন্তু নীলের বাড়ি আর কিছুতেই পাই না খুঁজে।
ধরলাম বেহালার আরেক পুরোনো নকশাল নেতা পরিতোষ ভট্টাচার্যকে। বর্তমানে নামের আগায় চন্দ্রবিন্দু বসে গেলেও ইনি ছিলেন বেহালার আর এক ডাকাবুকো নকশাল নেতা আশুতোষ ভট্টাচার্যের ছোটভাই। এবং এই দুই ভাই মিলেই বেহালা রবীন্দ্রনগরে স্থাপনা করেছেন চারু মজুমদার এবং সরোজ দত্ত'র আবক্ষ মূর্তি। পরিতোষ ভট্টাচার্য আমাকে যার সন্ধান দিলেন তিনি নীল চক্রবর্তীর একদা সহযোগী। তিনি অবশ্য সহযোদ্ধা বলেই করলেন সম্বোধন। ওঁর নাম? নাম ধরুন...ধরুন...ধরুন বুড়ো। আমি যদিও প্রথম সাক্ষাতেই ডেকে বসলাম বুড়ো'দা বলেই।
এবার প্রথম সাক্ষাতেই প্রশ্ন করে বসলেন এই বুড়ো'দা।
-- নকশাল নিয়ে লিখে কত লেখক তো বিখ্যাত হয়ে গেল। কিন্তু কাউকে দেখলাম না আসল কিছু ঘটনা লিখতে। সে বুঝি যে অনেকে জানেই না সব কিছু তো লিখবে কী? কিন্তু তুমি হঠাৎ এতদিন পর খোঁজ করছো নীলের? কেন বলো তো?
বললাম আমার উদ্দেশ্য ও বিধেয় সব। শুনে তিনি বললেন যে তুমি এক কাজ কর। তুমি সামনের সপ্তাহে এস। ততদিন আমি একটু মনে করে রাখি বরং।
গেলাম অগত্যা পরের সপ্তাহেই। আবার হাজির হলাম বুড়ো'দার ভাঙাচোরা ঘরে। এবার প্রথমেই তিনি বললেন যে শুধুমাত্র একটা কারণেই আমায় কিছু খোঁজ খবর দেবেন। কারণ উনি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন যে শুধু বেহালা নয়, গোটা রাজ্যেই এই প্রথম কেউ নীলের সম্মন্ধে কিছু লিখতে চাইছে।
বুড়ো'দা এখনো বর্তমান। বয়স আশি ছাড়িয়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালে ওঁর বয়স সম্ভবত ছিল তিয়াত্তর কী চুয়াত্তর। ওই বয়সেও ছ'ফুটের ওপর লম্বা মানুষটা বেঁকে যাননি একটুও। ঘরে থাকলে প্রায় সময়ই পরনে থাকে একটা লুঙ্গি। আর ঊর্ধাঙ্গ থাকে অনাবৃত। এবং দিনে মোটামুটি প্যাকেট দেড়েক বিড়ি তো লাগেই। সেই বিড়িই এবার আয়েশ করে ধরালেন একটা। তারপর শুরু করলেন বলতে।
-- বুঝলে, যদি এককথায় জানতে চাও তাহলে বলব যে নীল ওয়াজ আ জেম। আ আনকাট জেম।
-- এককথায় তো জানতে চাইছি না দাদা। আপনি বরং কথাগুলোকে বিস্তৃত করুন।
-- নীল ছিল হারা চক্রবর্তীর ভাই। এই অঞ্চলে তখন হারা'দা ছিল সিপিএম-এর একনিষ্ঠ কর্মী। নীল নিজেও আগে ওই সিপিএম পার্টি দিয়েই শুরু করেছিল জীবন। রাধিকাদা খুব ভালোবাসত নীলকে। ওর বয়স যখন কুড়ি হল, তখন ওই রাধিকাদাই ওকে ঢুকিয়ে দেয় ব্রিটানিয়ায়। সেটা মনে হয় '৬৬ সাল হবে। সিপিএম করার সময় নীলকে একবার ধরেওছিল দেবী রায়ের পুলিশ। ওই রাধিকাদাই ছাড়ায় তখন ওকে।
এবার আমি পড়ি ধন্দে। এই রাধিকাদা'টি আবার কে। ব্রিটানিয়া বিস্কুট কোম্পানির কোনো হোমরা চোমড়া নাকি। সে কথা শুধাতে উত্তর এল -- রাধিকা'দা মানে সিপিএমের রাধিকা রঞ্জন ব্যানার্জী। কামারহাটির এমএলএ ছিলেন।
নিভতে বসা বিড়িতে আবার দুটো টান দিয়ে শুরু করলেন বুড়ো'দা।
-- বিশালাক্ষীতলার যে খালপাড়ের বস্তিটা আছে, ওই বস্তিতেই জন্মেছিল নীল। ওখানেই ছিল ওদের ঘর। চারদিকের ওই খিস্তি খেউড় আর মদ গাঁজার চাষের মধ্যে থেকেও ও ছেলে জীবনে কোনোদিন কোনো নেশাও করেনি আর ওর মুখে কেউ কোনোদিন একটা নোংরা কথাও শোনেনি। ব্রিটানিয়াতে চাকরি করতে করতেই ওর মোহভঙ্গ হয় পার্টির প্রতি। ও চলে আসে এদিকে। অ্যাই তুমি তো বাইক নিয়ে এসেছ তাই না?
কোন কথা থেকে কোন কথা! হচ্ছিল নীল চক্রবর্তীর কথা। সেখানে আমার সাধের বাইকটা এল কোথা দিয়ে সেটাই এবার মিনমিন করে জিজ্ঞাসা করলাম আমি। ওদিকে বুড়ো'দা দেখি ততক্ষণে গায়ে একটা ফতুয়া পরে নিয়েছেন।
-- চল চল...তোমায় একটা জিনিস দেখিয়ে নিয়ে আসি।
বের হলাম অগত্যা। বাইক স্টার্ট দিয়ে দেখি বুড়ো'দা ওই লুঙ্গি পরিহিত অবস্থাতেই একদিকে পা দিয়ে উঠে বসলেন বাইকের পিছনে। ওঁর দেখানো রাস্তাতেই এবার ছুটল বাইক। এসে পৌঁছলাম বিশালাক্ষীতলার খালপাড়ের সেই বস্তিতে। আগে ছোট থাকলেও খালের জমি জবরদখলের কারণে বস্তি এখন কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকটাই। বস্তিতে ঢোকার মুখেই বড় রাস্তায় একটা বেশ বড় ধরনের স্কুলও আছে। তকমায় সে স্কুল হায়ার সেকেন্ডারি। স্কুলবাড়ির গায়ে দিব্যি পরেছে নীল সাদা রঙের পোঁচ। আর বস্তির ভিতরে ছোট্ট একটি বাড়ির সামনে নিয়ে এসে দাঁড় করালেন বুড়ো'দা। সে বাড়ি দেখিয়ে এবার বললেন...
-- এই যে বাড়িটা দেখছ, এই বাড়িটায় একসময় ছিল প্রাইমারী স্কুল। আর এটা বলতে গেলে একাই তৈরি করেছিল নীল। ওদের ঘর ওই বাঁদিক দিয়ে গেলে পড়বে। এই জমিটা তখন ছিল খালি। সঙ্গে আরও দু'চারজন ছেলে জুটিয়ে এ জমিতে বাঁশ পুঁতেছিল ও। তার পরদিন এখানেই দরমা আর টালি দিয়ে তিনটে ঘরও ফেলল বানিয়ে। আর বলে দিল যে বস্তির বাচ্চারা এখন থেকে এখানে এসে পড়ালেখা করবে। তখন কতই বা বয়স ছিল ওর? ওই আঠারো উনিশ হবে মনে হয়।
দেখলাম সেই বাড়ি। সে বাড়ির দশাও একেবারে তথৈবচ। সেটাই বললাম এবার। শুনে দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন বুড়ো'দা...
-- এখন এই বাড়ির আর সে পরিচয় নেই ভাই। চল, এবার ফিরে যাই আমরা।
সেদিনের কথার সেখানেই ইতি টানা হলেও পরদিন আবার আমি হাজির বুড়ো'দার ঘরে। আজ বুড়ো'দা পরেছেন ফতুয়া এবং পাজামা। এবার বাইকে বসে দিকনির্দেশ করলেন তিনি। আর বাইক চালিয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম বনমালী নস্কর রোডের সমান্তরাল এক ছোট্ট রাস্তায়। এ রাস্তাতেও দেশলাই বাক্সের মত বেশ কিছু ফ্ল্যাটবাড়ী মাথা তুললেও একটি বাড়ি যেন আজও রয়েছে রংচটা মলিন অবস্থাতেই। সে বাড়ির সামনে এসে হাঁক পারলেন বুড়ো'দা...
-- গৌরা আছিস নাকি রে?
ভাঙ্গা লোহার দরজা খুলে যিনি বের হলেন তিনিও বুড়ো'দার সমবয়সীই হবেন। তবে উচ্চতায় অনেক কম। ডেকে নিয়ে গেলেন বাড়ির ভিতরে। সে বাড়িতে ঢুকেই ডানহাতের একটি ঘরে এসে বসলাম আমরা। এ ঘরে আছে একটি তক্তপোষ আর একটি মাত্র চেয়ার। আমি বসলাম সেই চেয়ারেই। বুড়োদা বসলেন তক্তপোষে। সে ভদ্রলোকের দিকে দেখিয়ে বললেন...
-- দেখে রাখো। এ হচ্ছে গৌর। আর এই হচ্ছে সেই ঘর।
দেখলাম, এবং কিছুই বুঝলাম না। আমার অবস্থা বুঝেই এবার আবার বললেন তিনি...
-- এই গৌরের বাড়িতে, এই ঘরেই হয়েছিল সিপিআই( এম এল) - এর ফার্স্ট পার্টি প্লেনাম।
এমন একটা কথা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না আমি। শুনে কেমন জানি একটা ঘোর লেগে গেল আমার। শুধু বলতে পারলাম...
-- এই ঘরে???
-- হ্যাঁ ভাই। এত লোক তো লেখে নকশালদের নিয়ে। কিন্তু ক'জন জানে এই কথা?
-- বুড়ো'দা, ফার্স্ট পার্টি প্লেনাম মানে তো তখন সিপিআই(এম এল)-এর সব প্রথমসারির নেতাই এসেছিলেন?
-- হ্যাঁ, এসেছিলেন তো। কে আসেননি সেদিন? সিএম তো ছিলেনই...
-- সিএম মানে?
-- চারু বাবু। তোমরা যাকে চারু মজুমদার নামেই চেন। ওঁর নাম আর পদবীর আদ্যক্ষর নিয়েই ওই সিএম তৈরি হয়। পার্টিতে উনি সিএম নামেই পরিচিত ছিলেন।
-- বুঝলাম। আর কে কে ছিলেন দাদা?
-- কে ছিলেন না সেটা বলো? সিএম নিজে ছিলেন। এ ছাড়া সরোজ দত্ত, সুশীতল রায়চৌধুরী, কানু স্যানাল, কাকা...মানে অসীম চ্যাটার্জী, মেদিনীপুর থেকে বাবলু মজুমদার, ওড়িশা থেকে আপ্পাসুহৃৎ পট্টনায়েক, জঙ্গল সাঁওতাল...সবাই ছিলেন সেদিন।
এবার একটু থেমে আবার শুরু করলেন তিনি।
-- সিএম, সুশীতল রায়চৌধুরী আর কানু স্যানালকে নিয়ে আসা হয়েছিল হাইড রোড দিয়ে। জিনজিরার পোল টপকে পর্নশ্রীর ঝোপ ঝাড় আর খাল পার করে সে ট্যাক্সি এসেছিল এখানে। কাকার সঙ্গে এসেছিল বাবলু মজুমদার আর আপ্পাসুহৃৎ পট্টনায়েক। আর জঙ্গল সাঁওতালকে সেন্ট্রাল অ্যাভেন্যুর এক ডেরা থেকে নিয়ে এসেছিলাম আমি নিজে। এই বেহালার থেকে সেদিন উপস্থিত ছিল নীল, আশু ভটচাজ আর গণেশ ঘোষাল।
-- কিন্তু বুড়ো'দা, চারু মজুমদারের ট্যাক্সি রাস্তা চিনে এ বাড়িতে এল কীভাবে?
এবার হাসলেন বুড়ো'দা। হেসে বললেন -- ও ট্যাক্সির সামনে বসেছিল নীল নিজে। তবে সবচেয়ে মজা হয়েছিল সরোজ দত্তের বেলা।
-- মজা?
-- তবে আর বলছি কী। '৬৯ এর ২২শে এপ্রিল লেনিনের জন্মদিনের দিন তৈরি হল পার্টি। ১লা মে প্রথম মিটিং হল ময়দানে। ওইদিনই সবাই জানলো পার্টির নাম। সরোজ দত্তের ওপর সেদিন থেকেই পুলিশ রাখছিল নজর। জুন মাসে হয়েছিল প্লেনাম।এবার প্লেনামের দিন সকালে সরোজ দত্ত বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন যে নিউ আলিপুরের বুড়ো শিবতলায় এক পরিচিতর বাড়িতে আসবেন সন্ধ্যাবেলায়। সেই মতো বেরও হলেন বাড়ি থেকে। কবি মানুষ। গায়ে সাদা পাঞ্জাবির ওপর কাঁধে ঝোলানো একটা শান্তিনিকেতনি ব্যাগ। সবাই জানে যে ও ব্যাগের ভিতর কবিতার খাতা ছাড়া আর কিছুই নেই। কিন্তু সেই ব্যাগে একটা খদ্দরের পাঞ্জাবিও নিয়েছেন তিনি।
-- বুঝেছি। মানে রাস্তাতেই ওই পাঞ্জাবি বদল করে...
-- উঁহু অতটা সোজা নয় গো। উনি আসলেন সেই পরিচিতর বাড়ি। ওদিকে পুলিশের ফেউ পিছন পিছন এসে অপেক্ষা করতে থাকল রাস্তায়। আর উনি পাঞ্জাবি পাল্টে সে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা চলে এলেন এখানে সুচিত্রা সিনেমার পিছনের রাস্তায়। তখন বেহালা থানাটা ছিল বনমালী নস্কর রোডে ঢুকে বাঁদিকে। উনি একে তাকে জিজ্ঞাসা করে যেন কিছুই জানেন না এমন ভাবে আর্য সমিতির পাশের গলি দিয়ে হেঁটে আসলেন হরিসভার সামনে। ওখান থেকে দলের ছেলেরা নিয়ে আসলো এই বাড়িতে।
কোনো ক্রাইম থ্রিলারের চেয়ে কম নয় এই কাহিনী। আমি শুনছি আর কুড়িয়ে নিয়ে জমানোর চেষ্টা করছি সেদিনের সব ঘটনাবলী। বুড়ো'দা খানিক হাসলেন এবার। একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করলেন...
-- এ ঘরে ওই জানালার ধার ঘেঁষে বসেছিলেন চারুবাবু। দুপাশে বসেছিলেন কানু স্যানাল এবং সরোজ দত্ত। এই ঘরে সেদিন পার্টির ফার্স্ট প্লেনামের সাথে সাথেই তৈরি হয়েছিল বি আর এস এফ।
-- সেটা আবার কী দাদা?
-- বেহালা রিজিওনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন। আসলে প্রথমে ঠিক হয়েছিল যে এই প্লেনাম হবে যাদবপুরের কোথাও। কিন্তু আশুদা বলে পাঠালো যে যাদবপুরের প্রায় প্রতিটা ঘরের দিকেই নজর রেখেছে পুলিশ। নীল শুনে বলল যে তাহলে আমরা ব্যবস্থা করি।
-- আশুদা মানে...
-- আরে আশু মজুমদার। আমাদের বেহালার সঙ্গে তখন যাদবপুরের যোগাযোগ থাকত শুধু হাবুলের মাধ্যমেই। এটা যদিও ওর আসল নাম নয়। এটা ছিল পার্টির ভিতরের নাম। আর জানো তো, এই হাবুলকে কিন্তু কোনোদিন ধরতে পারেনি পুলিশ।
-- এ তো পুরো গুপ্তচর দাদা।
-- তবে আর বলছি কী। এমনিতেও হাবুল কাজ করত ভবানীপুরের একটা ট্রান্সপোর্ট অফিসে। আর নেশার মধ্যে ছিল তাস খেলা আর পান খাওয়া। পুলিশ কোনো সন্দেহই করেনি কোনোদিন।
-- কেন দাদা?
-- আরে সন্দেহ করবে কী? একে তো হাবুলের চেহারা ছিল একদম সাদামাটা। তার ওপর ওই পান জর্দার নেশা।
-- কিচ্ছু বুঝলাম না দাদা।
-- শোনো, তুমি ক'জন পার্টির লোককে দেখেছ বলো তো যাদের পান জর্দার নেশা আছে? প্রায় নেই বললেই চলে। পার্টির ছেলেরা করতো বিড়ির নেশা। অতএব...
কথা এগোনোর সাথে এবার ঘরে ঢুকলেন গৃহকর্তা গৌরদা নিজে। পিছনে একটি বাচ্চা মেয়ে। এ মেয়েটি গৌরদার নাতনি। সে বয়ে নিয়ে এসেছে চায়ের কাপ আর বিস্কুট সমেত একখানা ট্রে। বিস্কুট সহযোগে সেই চা খেতে খেতেই শুনলাম এবার অনিল চক্রবর্তী ওরফে নীলের কাহিনী। দুজনেই বললেন নিজেদের মতো করে। কথাপৃষ্ঠেই বললেন বুড়ো'দা...
-- বর্ধমান থেকে ধরে নিয়ে এসে আলিপুর জেলে রাখা হয়েছিল নীলকে। সেখান থেকেই সিআরপি আর বেহালা থানার পুলিশ বের করে আনে নীলকে। কোনো কোর্টের অনুমতি ছাড়াই সেদিন এ কাজ করেছিল পুলিশ।
আমি নিশ্চুপ হয়ে শুনে চলেছি সেদিনের সেই ঘটনার কথা। গৌর'দা এবং বুড়ো'দা দুজনে মিলেই একসাথে জানালেন এবার...
"চোঙারবনে ভ্যান থেকে নামিয়ে নীলের পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি চালিয়েছিল অবশ্য বেহালা থানারই দুজন। তারা হল..."
না, সে নাম সেদিন শুনলেও প্রকাশ করতে অপারগ আমি। কারণ শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছুই লেখা উচিত নয়। কিন্তু এরপর যা শুনলাম তাতে মাথাটা আমার কেমন জানি ঘুরেই গেল এবার।
-- শুধু কি পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি? মৃত্যু নিশ্চিত করতে এবার রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে কেটে দেওয়া হয় নীলের গোড়ালির ওপর দু'পায়ের শিরা।
এরপরই নীল চক্রবর্তীর প্রাণহীন নিথর দেহ নিয়ে পুলিশের কালো ভ্যান এসে পৌঁছায় বিশালাক্ষীতলার বস্তির সামনে। সকাল তখন সবে সাত কী সাড়ে সাত হবে। নীলের মা'কে ডেকে নিয়ে এসে দেখানো হয় ছেলের মৃতদেহ। এরপরই ভ্যান ঘুরিয়ে চলে যায় আবার বেহালা থানার উদ্দেশে। সে ভ্যানের সামনে থাকা জিপে তখন ড্রাইভারের পাশের আসনে বসে আছেন বেহালা থানার ওসি সুবীর ঘোষ। কড়া হাতে নকশাল দমন করার জন্য যাকে বিশেষ ভাবে নিযুক্ত করেছিলেন ডিসি ডিডি দেবী রায় নিজে।
যদিও থানায় সে ভ্যান ফিরে যাওয়ার আগে দাঁড়িয়েছিল আরো একবার। বনমালী নস্কর রোড সংলগ্ন এক গলির সামনে দাঁড়িয়েছিল সেই ভ্যান। সামনের জিপ থেকে নেমে গলিতে ঢুকেছিলেন ওসি সুবীর ঘোষ। সে গলির ভিতরের এক বাড়ির থেকে টেনে বের করা হয়েছিল বছর বাইশ তেইশের এক তরুণীকে। জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে তাকে দেখানো হয়েছিল নীলের রক্তাক্ত মৃতদেহ। সে তরুণীর অপরাধ? অপরাধ একটিই। সে ছিল নীলের প্রেমিকা। সে তরুণীর নাম? নাম ধরে নিন না মহুয়া...মৌপিয়া...মহানন্দা...অথবা...মন্দাক্রান্তা।
শেকসপিয়র তো কবেই বলে গেছেন...নামে কী এসে যায়।
চা শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। আয়েশ করে বুড়ো'দা এবার নিজে একটা বিড়ি ধরিয়ে গৌরদাকেও এগিয়ে বিড়ির প্যাকেট। দুজনে মিলে একসাথে বিড়ি টানবার ফাঁকেই আবার বললেন বুড়ো'দা...
-- বেলা ওই দুটো আড়াইটে নাগাদ নীলের বডি যখন নিয়ে আসা হয়েছিল ক্যাওড়াতলায়, আমরা তখন হাজির হয়েছিলাম খালের উল্টো দিকে কটা কালীর চায়ের দোকানের সামনে। অনেকেই ছিলাম বুঝলে। আমি, পল্টু, বাবু দত্ত, দ্বারকা, কান্ত, কানু, মন্টু সবাই ছিলাম সেদিন ওখানে। ওখান থেকেই স্লোগান দিচ্ছিলাম আমরা কমরেড নীল চক্রবর্তী অমর রহে।
-- সেকি বুড়োদা! পুলিশ তাড়া করেনি আপনাদের।
-- আরে খালের ওপার থেকে সবই দেখছিল পুলিশ। কিন্তু কিছু বলতে করতে পারছিল না। আসলে আমাদের সেদিন গার্ড দিয়ে রেখেছিল ভীমের ছেলেরা।
-- ভীম মানে...?
-- ভীম মানে চেতলার ভীম। ও নিজে ছিল কংগ্রেসের। কিন্তু নীলের থেকে ওর গোটা ফ্যমিলি আর চেতলার অনেক ছেলে এত উপকার পেয়েছিল যে ও বলেছিল --"তোরা খালের এ পাড়ে দাঁড়া। গোটা চেতলার ছেলেরা আজ তোদের সঙ্গে আছে। আজ পুলিসকে খাল পোল টপকাতে দেব না কিছুতেই।"
অনেকক্ষণ বসলাম গৌরদার এই বাড়িতে। এবার ওঠার পালা। বুড়োদাকে আবার ছেড়ে দিয়ে আসবো বাড়িতে। ওঠবার মুখেই কেমন জানি হতাশ মুখেই বললেন এবার তিনি...
-- আসলে কী জানো? মরতে নীল'কে হতই। হয় দলের ভিতরের কেউ মারতো। আর নয়তো বাইরের কেউ। পুলিশ শুধু সেদিন গুলি করেছিল।
-- সে কি বুড়ো'দা? এত কিছুর পর এখন আপনি বলছেন এই কথা?
-- বলব না? আজকাল তো কথায় কথায় তোমরা ব্যবহার করো সোশ্যাল রিফর্মার কথাটা। কিন্তু আদতে ক'জন হয় বলো তো ওই সোশ্যাল রিফর্মার? নীল ছিল সেই সত্যিকারের সমাজ সংস্কারকদের একজন।
-- কেন বলছেন দাদা এই কথাটা?
-- ভেবে দেখো। একটা ছেলের মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে জীবনটা শেষ হয়ে গেল। আর ওই বয়সের মধ্যেই ও নিজের বস্তিতে একটা প্রাইমারী স্কুল চালু করেছিল। ওই তারাতলার ওপারটা ছিল মন্টুর, আর এপারটা ছিল মোটুর দখলে। শঙ্কর পাইক ওই মোটুর দলেই ছিল। পরে তো মোটুকে মেরে নিজেই...। সে হোক, ওদের ওই লোহার ছাঁটের ব্ল্যাক মার্কেট আর তা নিয়ে খুনোখুনি মারামারি বন্ধ করে দিয়েছিল নীল। অজন্তা সিনেমার টিকিট ব্ল্যাক বন্ধ করে দিল। এখন তো ক্রেডিট নিতে অনেকেই আসে। কিন্তু ওই ব্ল্যাকারদের ও নিজে বসিয়ে দিয়েছিল ঘোলসাহাপুর বাজারে। বলেছিল এখানে বসে সবজি বিক্রি কর সবাই, কিন্তু টিকিট ব্ল্যাক চলবে না। তা ছাড়া গোটা এলাকার মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে শুরু করেছিল ও দলের ছেলেদের নিয়ে। সেই দলেরই অনেকের চক্ষুশূল হয়ে গেল ও।
-- কেন বুড়ো'দা?
-- কেন আবার? Mass Annihilation এর বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেছিল। বলতে শুরু করেছিল যে গণহত্যা কোনো দলের লাইন হতে পারে না। বাইরে শত্রু, দলে শত্রু। প্রচুর শত্রু বানিয়ে ফেলেছিল বুঝলে। সমাজের সংস্কার চেয়েছিল। সেই সমাজই শেষে ওকে মারলো।
বাইক চালিয়ে আবার এলাম বুড়ো'দার বাড়ির সামনে। ফেরার আগে শুধু কৌতূহলবশতঃই বলে বসলাম আমি।
-- ও বুড়ো'দা...একটা কথা বলব?
-- হ্যাঁ, বলো না।
-- মানে একটা আবদার আর কি।
-- আরে শুনিই না।
-- বলছি যে ওই মহিলার সঙ্গে দেখা করা যায় একবার?
-- কোন মহিলা গো?
-- ওই যে... নীল চক্রবর্তীর বান্ধবী।
-- অ্যাই...যাও তো তুমি। আমার মেলা কাজ আছে এখন।
ঘরে ঢুকে যান বুড়ো'দা। কিন্তু একটা জেদের বশেই আবার পরদিন হাজির হই ওঁর বাড়িতে। অনুরোধ আবদার সব ওই একটাই। দেখি সেটা পূরণ হয় কিনা।
বহুক্ষণ ধরে বুড়ো'দাকে বোঝানোর পর রাজি হলেন তিনি। ঠিক হলো পরের সপ্তাহে যাব সেই মহিলার বাড়ি। তবে পইপই করে বলেও দিলেন বুড়ো'দা যে আমি যেন বাড়তি কথা একেবারেই না বলি সেখানে। কারণ জিজ্ঞাসা করায় জানালেন যে শুধুমাত্র নীল চক্রবর্তীর বান্ধবী হওয়ার কারণেই তাকে একসময় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পাঁচ বছর জেলে থেকে '৭৭ সালে আর সবার সঙ্গেই ছাড়া পান তিনি। বুড়ো'দা নিজেও জেল থেকে ছাড়া পান ওই সময়ই। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার কয়েক মাস পর দলেরই অন্য এক কমরেডের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। কারণ নিজের বাড়িরই কেউ আর ঠাঁই দিতে রাজি হয়নি ওঁকে। বিয়েটা বলতে গেলে এই বুড়ো'দাদের গ্রুপেরই সবাই মিলে বুঝিয়ে রাজি করিয়েছিলেন দুজনকে। বিয়ে হয়েছে। কিন্তু মহিলা থেকে গেছেন নিঃসন্তান হয়েই। কারণ? কারণ অতি সামান্যই। গ্রেপ্তারের পর তখনকার মত পুলিশি অত্যাচার সামলে নিলেও সন্তান ধারণের ক্ষমতাই আর ছিল না ওঁর।
প্রায় দু'সপ্তাহ পর বুড়ো'দা আমায় নিয়ে চলেছেন শহরের উপকন্ঠের এক বাড়িতে। সেখানেই থাকেন তিনি। স্বামী মারা গেছেন কয়েক বছর হল। এখন একাই থাকেন। স্বামী কাজ করতেন এক প্রাইভেট কোম্পানীতে। সেখানে কাজ করেই যেটুকু জমাতে পেরেছেন, সেই জমানো টাকার সামান্য সুদেই এখন জীবন নির্বাহ করেন তিনি।
আজ আর বাইক নয়। আজ উবের বুক করেই চলেছি দু'জনে। যেখানে এসে থামলাম তার সামনেই ইট বাঁধানো রাস্তার ওপর ছোট্ট একটি দেড়তলা বাড়ি। দরজা খুললেন সেই মহিলাই। এবং প্রথম দর্শনেই মনে হল যে জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন যেন বয়সটা খানিক বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সামনে। দরজা খুলেই ডাক দিলেন তিনি...
-- আয় বুড়ো'দা। এস ভাই। ভিতরে এসে বসো।
ভিতরে ঢুকে বসলাম সে বাড়ির দুটি ঘরের একটিতে রাখা চেয়ারে। তিনি গেলেন অন্য ঘরে। খানিক পর দুটো থালায় চারটে করে রুটি আর খানিকটা তরকারি নিয়ে এসে দাড়ালেন তিনি।
-- বুড়োদা, এই রাত আটটায় এসেছিস। এখান থেকেই খেয়ে যা। নাও ভাই, তুমিও খাও।
ঠিক বুঝতেই পারছি না যে কী করব? কী করা উচিত? এই সত্তরোর্ধ্ব মহিলা এমন ভাবে কথা বলছেন যেন আমিও কতকালের চেনা। বুড়ো'দা দেখলাম বিনা বাক্যব্যয়ে শুরু করে দিলেন খাওয়া। ইশারায় বললেন যে আমিও যেন শুরু করেই দিই।
খাওয়া শেষে আবার সামনে এসে বসলেন তিনি। এবার ঝকঝকে একটা হাসি হেসে বলে উঠলেন...
-- তুমি নাকি আমাকে দেখতে চেয়েছো? কেন বলো তো? এই বুড়িকে দেখে তোমার কী কোনো আনন্দ হবে?
খুবই আমতা আমতা করে বললাম এবার আমার উদ্দেশ্য। উত্তরে তিনি জানালেন যে শুধুমাত্র একটি কারণেই তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছেন। কারণ এতদিন পরে হলেও কেউ তো অন্তত দুকলম লিখতে চায় নীল চক্রবর্তীর সম্মন্ধে।
ওঁর পিতৃগৃহের ফটো আগেই তুলেছিলাম মোবাইলে। সেটাই এবার দেখালাম। ফটোটা দেখতে দেখতে খুবই মৃদু স্বর শোনা গেল সেই কন্ঠ থেকে।
-- '৭৮ সালে বিয়ের পর থেকেই আর যাইনি ও বাড়িতে। কেন যাব? যেখানে কেউ চায় না আমায়, যেখানে সবাই আমায় মনে করে অবাঞ্ছিত, সেখানে আর যাবই বা কেন আমি?
এবার তিনি মুখ ঘোরালেন বুড়ো'দার দিকে।
-- বাড়িটা সেই একই রকম রয়ে গেছে। তাই না রে বুড়ো'দা?
বুড়ো'দা নিশ্চুপ। মহিলা এবার বাড়ির ছবিটার সামনে এক জায়গায় আঙুল রেখে আমায় উদ্দেশ করে বললেন...
-- এই জায়গা...বর্ধমান যাওয়ার আগে ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়েই বলে গিয়েছিল সে -- আসি রে। ভাবিস না, ঠিক ফিরে আসব আমি।
ঘরের আবহাওয়া কেমন জানি গুমোট হয়ে উঠেছে এখন। রাতও হয়েছে। বাড়ির দিকে ফিরতে হবে এবার। ওঠার আগে সামনের টেবিলে রাখা একটা খাম নিয়ে আমার হাতে দিলেন তিনি।
-- তুমি এটা রাখো। ওর মনে হয় আর কোনো ফটোই নেই। ব্রিটানিয়ার কয়েকজন মিলে ঘুরতে গিয়েছিল আগ্রায় তাজমহল দেখবে বলে। তখনই শখ করে তুলেছিল এই ফটোটা।
আমি পুরো বিহ্বল এইবারে।
-- সেকি!!! এ ছবি তো আপনার সম্পত্তি। আমায় দিচ্ছেন কেন?
-- না ভাই। এতদিন তো কাছেই রেখে দিয়েছিলাম। এখন তুমি রাখো। লেখো সেই মানুষটার কথা। যে কিনা একদিন দিন বদলের স্বপ্ন দেখেছিল।
শুধু জিজ্ঞাসা করতে পেরেছিলাম সেদিন যে -- আপনার রাগ হয় না? কষ্ট হয় না এখন?
হেসেই উত্তর দিলেন তিনি...
-- কষ্ট তো একটু হয়ই। তবে রাগ হয় না। আমি সবাইকেই ক্ষমা করে দিয়েছি এখন। এখন বুঝি যে রাগ হিংসা দ্বেষ এগুলো শুধু ক্ষতিই করে আমাদের। আর সত্যিই তো, হত্যা বা গণহত্যা, মানুষ মেনে নেয় না কোনোটাই।
ফিরে আসলাম সেদিন।
আর মনের মাঝে যেন গুমরে উঠতে থাকল কবি আরণ্যক বসুর মনে থাকবে- র কতকগুলো লাইন...
....
আমার অনেক কথা ছিল
এ জন্মে তা যায়না বলা
বুকে অনেক শব্দ ছিল__
সাজিয়ে গুছিয়ে তবুও ঠিক
কাব্য করে বলা গেল না!
এ জন্ম তো কেটেই গেল অসম্ভবের অসঙ্গতে
পরের জন্মে মানুষ হবো
তোমার ভালোবাসা পেলে
মানুষ হবোই__ মিলিয়ে নিও!পরের জন্মে তোমায় নিয়ে…
বলতে ভীষণ লজ্জা করছে
ভীষণ ভীষণ লজ্জা করছে
পরের জন্মে তোমায় নিয়ে…
মনে থাকবে?
সেদিন ফিরে আসার এতদিন বাদে লিখলাম সেই মানুষের কথা। সেই নীল চক্রবর্তী এবং তার কর্মকাণ্ডের কথা।
ওপরের ছবিতে তাজমহলের সামনে বসে থাকা নীল চক্রবর্তী।

শুক্রবার, ৭ জুন, ২০২৪

দ্বারকানাথ ঠাকুর কি সত্যিই বৌ-বাজারের ৪৩ টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন? ~ স্বপনকুমার ঘোষ

দ্বারকানাথ ঠাকুর বৌবাজারের ৪৩টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন বলে একজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন।
তার প্রতি উত্তরে আমার সংগ্রহে থাকা এই লেখাটি ছিল l
আমি পোস্ট করতে চাইনি কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে সেই প্রাইমারীস্কুল জীবন থেকে আজও শুনে আসছি।
♦♦যারা এগুলো করে তাদের একটা নিজস্ব মাইন্ডসেট আছে।
♦💥যতই প্রতি উত্তর দেয়া হোক তারা তাদের বিশ্বাস বা মনোভাব বদলাবে না।
♦তবুও পোস্ট দিলাম মূলতঃ বদিউদ্দীন নাজির ভাইয়ের পরামর্শে।
নাজির ভাইয়ের সাথে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই।
ফেসবুকেই যোগাযোগ।
এই যোগাযোগের মাধ্যমে ওনাকে যতটুকু জেনেছি তাতেই আমার মনে হল তাঁর পরামর্শ আমার মেনে নেওয়া উচিট।
♦লেখকের নাম ও যে গ্রুপ থেকে এ লেখাটি সংগ্রহ করেছি তা যথাযথভাবে উল্লেখ করেছি।
রোহিত সেনঃ মলাটগ্রুপ :-
♦দ্বারকানাথ ঠাকুর কি সত্যিই বৌ-বাজারের ৪৩ টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন ?
♦সেই পতিতা পল্লীর উপার্জনের টাকাতেই কি বোল বোলাও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তথা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ?
♦নাকি পুরোটা কাহিনীই একশ্রেণীর তথাকথিত গবেষকদের দ্বারা রবীন্দ্রনাথকে নিচে নামানোর প্রচেষ্টা ??
♦গবেষকের ভ্রান্তি : দ্বারকানাথ ঠাকুরের পতিতাপল্লী l
শ্রদ্ধেয় লেখক : কৃষাণু নস্কর l
♦এই লেখার মূল উদ্দেশ্য একটি l
♦দ্বারকানাথ ঠাকুর বিষয়ক একটি তথ্যের যাথার্থ বিচার।
♦প্রয়োজনীয় বইপত্র যা ব্যবহার করা হয়েছে সব গুলোই উল্লেখ করা হলো।
♦প্রথমেই এটা দেওয়ার কারণ লেখার মধ্যে যাতে সহজেই reference দিতে পারি।
কোনো তথ্যের পরে reference রূপে দুটো সংখ্যা থাকবে যার প্রথমটি নীচের তালিকায় থাকা বই বা পত্রিকার ক্রমিক আর দ্বিতীয়টি সেই বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা।
যেমন (৩, ১২৩) হলে তৃতীয় সূত্রে উল্লিখিত বইয়ের ১২৩ পৃষ্ঠা দেখতে হবে।
১) ডার্লিং ডোয়ার্কি – রঞ্জন বন্দোপ্যাধায় (প্রকাশক - শংকর মণ্ডল ২০১৮)
২) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা - ১৮৪৮ শক (1926)
৩) UNDER THE RAJ : PROSTITUTION IN COLONIAL BENGAL by SUMANTA BANERJEE (Monthly review press, 1988)
৪) Calcutta: Myths and History -
S.N. Mukherjee ( Subarnarekha 1977)
৫) Essays in Urban History - S.N. Mukherjee ( Subarnarekha 1993)
৬) সমকালীন ষষ্ঠ বর্ষ (১৩৬৫)
৭) রবিজীবনী ১ম খণ্ড - প্রশান্তকুমার পাল (ভুর্জপত্র)
৮) Modern History Of The Indian Chiefs Raja and Zamindar Part 2 - Loke Nath Ghosh (Calcutta 1881)
♦রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা দ্বারকানাথ ঠাকুর সেকালের কলকাতা তথা বঙ্গদেশের একজন প্রধান ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তি ছিলেন তা আমরা অনেকেই জানি।
বিভিন্ন রকমের ব্যবসা ছিল তাঁর।
♦ কিন্তু এই বিভিন্ন ব্যবসার মধ্যে একটি ব্যবসা কি ছিল পতিতালয়ের ব্যবসা ?
♦তিনি কি কলকাতা শহরের মধ্যেই একটি পতিতালয়ের মালিক ছিলেন বা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ?
♦প্রশ্নটা উঠছে কারণ বর্তমানে বেশ কিছু স্বনামধন্য ব্যক্তি এমন অভিযোগ করেছেন।
♦এবং এই সূত্র ধরে কিছু স্বঘোষিত রবীন্দ্র গবেষক (?) অভিযোগ করেন যে ঠাকুর পরিবারের একসময় রোজগারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এই বাঈজী ও বেশ্যাদের নিয়ে, যে টাকায় ঠাকুর বাড়ির সব সদস্যদের মতন রবীন্দ্রনাথও পরজীবীর মতন খেয়ে পরে দিনাতিপাত করেছেন আজীবন!!
♦সত্যিই তো, এমন ভয়ংকর অপরাধ যিনি করেছেন তাঁকেই কিনা আমরা "কবিগুরু" বলে সম্মান করি!!🥺
♦সুতরাং এ অভিযোগের সারবত্তা খতিয়ে দেখা জরুরি মনে হলো।
♦এই অভিযোগটির উৎস খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল ছিল কারণ বর্তমানে Google এ "দ্বারকানাথের বেশ্যালয়" শব্দবন্ধ উল্লেখ করে search করলেই উঠে আসে প্রচুর ব্লগের আন্তর্জাল ঠিকানা যেখানে এই কথাটি লেখা আছে এভাবে, "দ্বারকানাথঠাকুর কলকাতার একটি এলাকায় প্রায় তেতাল্লিশটি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন।
" বা এভাবে " রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকানাথের কলকাতা নগরীতে ৪৩টা বেশ্যালয় ছিলো।"
♦তো এ সব লেখার তথ্যসূত্র কি ?
♦দু- তিনটি সূত্র দেখা যায় ঘুরে ফিরে সব জায়গায় দেয়া।
♦সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, ১৯৬২, পৃ.৩৫৮-৬০ , এ এক অন্য ইতিহাস,অধ্যায় : অসাধারণ দ্বারকানাথ, লেখক: গোলাম আহমদ মর্তুজা পৃষ্ঠা: ১৪১,কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকা,২৮শে কার্তিক,১৪০৬,রঞ্জনবন্দ্যোপাধ্যায় l
♦এরমধ্যে শেষ দুটি সূত্র আসলে একই সূত্র কারণ গোলাম আহমদ তথ্যসূত্ররূপে দেখিয়েছেন ঐ রঞ্জন বন্দ্যোর: প্রবন্ধটিকে- ই।
♦রঞ্জন বন্দোপধ্যায়ের প্রবন্ধটি অবশ্য আমি হাতে পাইনি তাই জানিনা তিনি কেমন তথ্যসূত্র দিয়েছেন।
♦অবশ্য নিজের রচনাকে তথ্য সূত্রের ভারে ভারাক্রান্ত করার বদভ্যাস তাঁর আছে এমন দুর্নাম তাঁর অতিবড় শত্রু ও দেবে না।
💥কপোলকল্পিত উপন্যাস রচনায় তাঁর দক্ষতা অনস্বীকার্য।
♦কিন্তু সেই উপন্যাসগুলিতে প্রদত্ত তথ্যগুলিকে পরম সত্য বলে ভেবে নেওয়াতে আমার অন্তত ঘোরতর আপত্তি আছে।
♦২০১৫সালে প্রকাশিত "ঠাকুরবাড়ীর গোপনকথা: দ্বারকা নাথ থেকে রবীন্দ্রনাথ " গ্রন্থটিতে যদিও দ্বারকানাথের পতিতাপল্লীর ব্যবসা বিষয়ে কোনো কথা নেই ♦কিন্তু ২০১৮ সালে প্রকাশিত উপন্যাস "ডার্লিং ডোয়ার্কি" - তে পুনরায় একথা বলা হয়েছে যে "ফ্লেশট্রেড" করতেন দ্বারকানাথ, "নিষিদ্ধপাড়ায় তাঁর বাড়ী ছিল " (১, ১২৯)।
♦যদিও নিজের সুনামের প্রতি লক্ষ্য রেখে এখানেও ঐ তথ্য দেওয়া হয়েছে কোনো সূত্র বা reference ব্যতিরেকেই।
♦আচ্ছা তাহলে এ তথ্য টি কি ঐ ১ম সূত্রে উল্লিখিত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্ম জীবনীতে আছে? না নেই।
৩৫৮-৬০ পৃষ্ঠায় আছে "ঋণশোধ বিষয়ে দেবেন্দ্রনাথের সাধুতা" নামক অধ্যায়টি এবং সেখানে এমন কোনো তথ্যের সন্ধান আমি পেলাম না।
এবং হ্যাঁ আমি ঐ ১৯৬২ সালের সংস্করণটিই দেখেছি।
ঐ বইটির ৩৫৬ পৃষ্ঠায় "১৮৪০ সালে দ্বারকানাথের জমিদারী ও কারবার " নামে একটি ক্ষুদ্র অধ্যায় আছে কিন্তু সেখানেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্যনেই।
♦তাহলে শ্রী বন্দোপাধ্যায় কোথায় পেলেন এ তথ্য ?
💥শ্রীসতীশচন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয় "দ্বারকানাথের বিষয়সম্পত্তি"নামে এক টি প্রবন্ধ লিখেছেন যা ১৮৪৮ শক অর্থাৎ 1926 সালের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার কার্তিক ও অগ্রহায়ণ সংখ্যায় দুই পর্বে প্রকাশিত হয় (২,১৮৮-১৯২ ও২০৬-২১১) সেখানে ও দ্বারকানাথের এই বিশেষ ব্যবসাটির কোনো উল্লেখ নেই।
♦ব্লেয়ার বি কিং, কিশোরীচাঁদ মিত্র, ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কৃষ্ণ কৃপালনী প্রমুখ দ্বারকানাথের কোনো জীবনীকার যে এর কথা লেখেননি তা বলাই বাহুল্য।
♦এমনকি শুধুমাত্র দ্বারকানাথের ব্যবসা ও জমিদারী বিষয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন সেই রঞ্জিত চক্রবর্তী (দ্বারকানাথ ঠাকুর : ঐতিহাসিক সমীক্ষা) বা সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ( ভারতের শিল্পবিপ্লব : রামমোহন ও দ্বারকানাথ) ও নয়।
♦তাহলে এই তথ্যের উৎস কোথায় ?
♦অনেক খোঁজার পর সুমন্ত ব্যানার্জীর লেখায় পেলাম, " The old records showed up a 'brothel in 235 and 236 Bow Bazar Street, owned by a member of Dwarkanath Tagore's family. It had 43 rooms for prostitutes. . .' " (৩, ৭২)
♦এখানে তথ্যসূত্রের উল্লেখ্য আছে সেটি হলো "Essays in Urban History "by S.N.Mukherjee. S,N,Mukherjee বা সৌমেন্দ্রনাথ মুখার্জী Urban History বিষয়ে একজন গবেষক এবং গত শতকের সত্তরেরদশকে ইনি কলকাতা শহরের গড়েওঠা বিষয়ে কিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখেন যার মধ্যে একটি প্রবন্ধ আমাদের আগ্রহের বিষয় যার নাম " Calcutta in 1806: An essay in urban history and computer ".
এ প্রবন্ধটি 1993 সালে উপরোক্ত বইটি তে সংকলিত হয় যদিও তার আগেই 1977 সালে "Calcutta: Myths and History " নামক একটিবইতে সংকলিত হয়ে ছিল।
দুটি বইয়েরই প্রকাশক সুবর্ণরেখা।
♦উক্ত প্রবন্ধে তৎকালীন কলকাতার বাড়ি ঘর এর ধরন, মালিকানা, ভাড়া ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য সংকলিত হয়েছে।
♦লেখকের বক্তব্য অনুসারে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছেন কলকাতা কর্পোরেশনের ১৮০৬ সালের House Assessment Book (HAB) থেকে।
♦ইনি জানাচ্ছেন, "Notice the salient feature of our research: the major part of our time was absorbed in disaggregating and rearranging the data prior to the application of the Computer.
We analysed HABS withthe aid of non quantitative sources and applied the Computer to read, to identify, to count to classify and co-relate our variables.
The Computer is asked to do the tedious job of counting, but decisions about the data are made by the researcher.
His power is however limited by the very nature of the Computer program.
Many individual characteristics of our variables cannot be quantified and are lost in the IBM Punch Cards.
To save some of this interesting information we have used a system of comment cards. --------
For instance we have been able to retain some information about a prostitute called Moynah Tackooraney who owned two lots in Moonshy Suderuddy's Lane in which there were 14 straw huts, one upper roomed house and a mosque.
We do not know who were her clients and whether they prayed in her mosque.
The comment cards also preserved such information as that of a brothel in 235 and 236 Bow Bazar St., owned by a member of Dwarkanath Tagore's family.
It had 43 rooms for prostitutes and its rental value was 140." (৪, ১০০-১), (৫, ১২-৩)
এখানে লক্ষণীয় ঐ শেষ বাক্যটি "....a brothel in 235 and 236 Bow Bazar St., owned by a member of Dwarkanath Tagore's family.
It had 43 rooms for prostitutes and its rental value was140."
এটিই তাহলে ঐ তথ্যের উৎস যে দ্বারকানাথ ৪৩ (তেতাল্লিশ) টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন ?
♦আচ্ছা ভালো করে দেখুন তো বাক্যটি দ্বারকানাথ মালিক ছিলেন ঐ বেশ্যালয়গুলির এমন কথা কি বলা হয়েছে আদৌ ?
বলা হয়েছে দ্বারকানাথের পরিবারের কোনো সদস্য"।
♦তার মানে কি বকলমে দ্বারকা নাথ হতে পারেন না ?
♦না,পারেন না কারণ তথ্যটা ১৮০৬ সালের।
দ্বারকানাথ তখন ১১-১২ বছরের বালক মাত্র।
♦কোনো রকম আর্থিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি যুক্ত নন সে সময়ে।
দ্বারকানাথ উপার্জন করতে আরম্ভ করেন ষোলো বছর বয়সে অর্থাৎ আরও চারপাঁচ বছর পরে।
♦এমন তো হতেই পারে, যে ঐপতিতা পল্লীটি ছিল দ্বারকানাথের পালক পিতা , যিনি , তাঁকে দত্তক নিয়ে ছিলেন সেই রামলোচন ঠাকুরের।
♦পরবর্তীকালে দ্বারকানাথই এর মালিক হন এবং ব্যবসাটি পরিচালনা করতে শুরু করেন বয়ঃপ্রাপ্তির পরে ?
♦বিশেষত রামলোচন ঠাকুরের মৃত্যু হয় ১৮০৭ সালে এবং তাঁর সম্পত্তি সব দ্বারকানাথই পান।
♦সেক্ষেত্রে দেখা যাক, রামলোচনের থেকে দ্বারকানাথ উত্তরাধিকারসূত্রে কী কী পেয়েছেন।
♦রামলোচন মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে একটি will বা ইচ্ছাপত্র মারফৎ দ্বারকা নাথ কে নিজের সব সম্পত্তির উত্তরাধিকার দিয়ে যান।
♦সেই ইচ্ছাপত্রটি দেখে নেওয়া যেতে পারে
"আপন জ্ঞানপূর্ব্বক ও সেই উইল করিতেছি আমার পৈতৃক দৌলত নাই।
শ্রীশ্রী ঠাকুর ও জায়গা ও বাটী ও এলবাস পোষাক তাঁরা পিতল কাঁসার ও রূপা সোণার বাসনদিগর সেওয়ায় গহনা পৈত্রিক যা কিছু আছে ইহার তিন অংশের এক অংশ আমি পাইব দুই অংশ ভায়ারা পাইবেন পৈত্রিক ও আমার দত্ত সোনা রূপার গহনার অংশ হইবেক না, জাহির থাকে যে চিহ্ণিত আছে সে তাহারই থাকিবে।
আর সংসারের খরচ ও ধর্মতলার বাটীদিগর বানাতে মবল গহায় আমার নিজ ঢাকা বিং খাতা রোকড় ভায়াদিগের স্থানে আমার পাওনা আছে এবং অন্য অন্য লোকের স্থানেও যে পাওনা আছে আমার দেনা নাই এই সকল পাওনা ও পৈত্রিক হিস্যা ও আমার স্বোপার্জ্জিত দৌলত, সোনা রূপার বাসন ও এলবাস পোষাক ও জেলা যশোহরের মোতালক পরগণে বিরাহিমপুর জমিদারী ও সহর কলিকাতার মধ্যের খরিদা জায়গা ওগায়রহ সেওয়ায় রতন রাড়ের দরুন বাটী আমার সোপার্জ্জিত ও পৈত্রিক হিস্যা যাহা কিছু, সব তোমাকে দিলাম রতন রাড়ের দরুন বাটী খরিদ করিয়া তৎকালীন তোমার মাতাকে দিয়াছি এবং সন ১২১৩ সালে তোমার মাতার পূণ্যক্রিয়া অর্থে আমি তুষ্ট হইইয়া সিক্কা ১০,০০০ দশ হাজার টাকা দিয়াছি এ টাকা এবং রতন রাড়ের দরূণ বাটী ইহার সহিত তোমার এলাকা নাই ইহার দান বিতরণ এক্তার তোমার মাতার।
এখনও তুমি নাবালক একারণ এই জমিদারি ও গায়রহ জে কিছু বিষয় তোমাকে দিলাম ইহার কর্ম্মকার্য যাবৎ আমি বর্ত্তমান থাকিব তাবৎ আমিই করিব আমার অবর্তমানে যাবৎ তুমি বয়সপ্রাপ্ত না হও তাবৎ পরগণাদিগর এ সকল বিষয়ের কৰ্ম্মকাৰ্য্য ও সহী দস্তখত ও বন্দবস্ত ও হুকুম হাকাম সকলি তোমার মাতা করিবেন তুমি প্রাপ্ত বয়স হইলে জমিদারিদিগর আপন নামে হজর লেখাইয়া এবং আপন এক্তারে আনিয়া জমিদারির ও সংসারের কর্ম্ম কার্য ও জমিদারির বন্দবস্ত ও খরচপত্র ও গায়রহ মাতার অনুমতি পরামর্শে তুমি করিবা এবং জাবত তোমার মাতা বর্ত্তমান থাকিবেন ভাবত পরগণার মুনাফা ও গায়রাহ যাহা কিছু, আমদানির তহবিল তোমার মাতার নিকট যেমন আমি রাখিতাম তুমিও সেই মতো রাখিবা।
আমি ও তোমার মাতা যাবৎ বর্ত্তমান ও বর্ত্তমানা থাকিবেন ও থাকিব তাবত আমারদিগর পণ্য ক্রিয়া আদি যে কিছু, খরচপত্র এই দৌলাত হইতে পাইব।
আমার সোপার্জিত জায়গার কবালা ও বরনামা ও গায়রহ আমার স্থানে ছিল!
নিস্তীমতো তোমাকে দিলাম পৈত্রিক জায়গা ও বাটীদিগরের কবালা ও পাট্টা ও গায়রহ কাগজ রামমণি বাবুর স্থানে আছে জায়গা হিস্যা চিহ্ণিত মতো বুঝিয়া লইবা এতদৰ্থে উইলপত্র লিখিয়া দিলাম।" (৬, ৫৪৯) l
ঐ ইচ্ছাপত্রের সঙ্গে উল্লিখিত সম্পত্তির একটি তালিকাও ছিল যেটি এই প্রকার l --------
"জায় জায়গা সোপার্জ্জিত জমিদারি পরগণে বিরাহিম- -পুর মোতালকে , জেলা জসোহর - ১
সহর কলিকাতার মধ্যে ডোম পিদুরু সাহেবের দরুন জায়গা – ১ l
বামদেব বাইতির দঃ জায়গা – ১
কৃষ্ণচন্দ্র রায় কবিরাজের দঃ জায়গা-
তিলক বসাকের দঃ জায়গা – ১
শঙ্কর মুখোপাধ্যায় দঃ বাটী-১
রামকিশোর মিস্ত্রীর দঃ জায়গা – ১
রামনিধি সাহার দঃ বাটী – ১
রতনরাড়ের দঃবাটী- এবাটী তোমারমাতাকে দিয়াছি–১
পৈত্রিক --- নিজবাটী- ১, ধর্ম্মতলার বাটী - ১,
বড়বাজারের বটতলার বাটী - ১
জানবাজারের হাড়িটোলার জায়গা – ১
ডোমটোলার জায়গা - ১ , মাহুতের দঃ জায়গা- ১,
কলিঙ্গা ব্রহ্মচারীর দঃ জায়গা - ১
পরগণে মাগুরা মৌজে ফতেপুর ব্রহ্মত্তর জমি - ১
মৌজে কপিলেশ্বর ব্রহ্মত্তর জমি - ১ "
(৭, ৮)এখানে কি বৌবাজারের২৩৫ ও২৩৬ নং premises অর্থাৎ জাগা বা বাড়ির কোনো উল্লেখ পেলেন ?
♦তাহলে কিসের ভিত্তিতে বলা যায় যে দ্বারকানাথ ঐ পতিতাপল্লীর প্রতিষ্ঠাতা বা মালিক বা লভ্যাংশ ভোগী ?
💥শুধু ঐ "দ্বারকানাথের পরিবারের কোনো সদস্য এর মালিক " কথাটি আছে বলে দ্বারকানাথ পতিতাপল্লী চালাতেন, তিনি এর মালিক এমনকি রবীন্দ্রনাথ এর টাকায় পরজীবীর মতন খেয়ে পরে দিনাতিপাত করেছেন এমন সব অপপ্রচার করা যায় ?
♦দ্বারকানাথের পরিবার অর্থাৎ ঠাকুর পরিবারের ছোট তরফ যাকে বলা হয় সেখানে কি দ্বারকানাথ ছাড়া আর কোনো সদস্য ছিলেন না ?
♦মনে রাখতে হবে, রামলোচন ঠাকুররা ছিলেন পাঁচ ভাই (কারু কারুর মতে অবশ্য তিন ভাই এক মবোন)। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল অনেক সুতরাং তাদের মধ্যে যে কেউ ঐ বৌবাজারের সম্পত্তিটির মালিক হতে পারেন।
♦দ্বারকানাথের মাথায় এই দায়টা চাপানোর কারণ কি ?
♦আচ্ছা দ্বারকানাথের সঙ্গে যদি এর কোনো সম্পর্ক নাই থাকবে তাহলে ঐ গবেষণাপত্রে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছে কেন ?
কারণটা জানা যায় ঐ গবেষণাপত্রটি খুঁটিয়ে পড়লে যেখানে বলা হচ্ছে....... ,
"A list of 'famous families' was made on the basis of our studies of the lists found in the Foreign Miscellanous Series, National Archives of India, in L. N. Ghose's work and in the proceedings and reports of public meetings and associations as reported in the newspapers. When we made our list we took into account the political and social allegiance of a particular kinsgroup, hence we have two Tagore families and two Deb families. On the other hand there were leading men like Rev. KrishnaMohun Banerjee whohad no families With the aid of L. N. Ghose, Sambandha Nirnay'- and N. N. Basu's Banger Jatiya Itihas, genealogies of most of these 'famous families' were made. Each 'family' was given a number ; all 'family' members whose names appear in the family genealogy and who lived between c. 1800 and 1870, received a family number. For instance no. 3 refers to all members of Gopimohun Deb's family. " (৪, ৯৯-১০০)
অর্থাৎ কিনা, বিখ্যাত পরিবারগুলির তালিকা তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন সূত্র থেকে যাদের মধ্যে অন্যতম হলো L. N. Ghosh বা লোকনাথ ঘোষ রচিত Modern History Of The Indian Chiefs Raja &Zamindar Part 2. পূর্বোক্ত সূত্রে উল্লিখিত পৃষ্ঠার পাদটীকা দ্রষ্টব্য l
এবার ঐ বইটির পাতা ওল্টালেই দেখা যাবে ঠাকুর বংশের বড় তরফ অর্থাৎ দর্পনারায়ণের পরিবারের প্রধান রূপে প্রথম (দর্পনারায়ণ বিষয়ে সংক্ষিপ্তাকারে বলার পর) বলা হয়েছে গোপীমোহন ঠাকুরের বিষয়ে।
(৮, ১৬৩) আর ছোট তরফ অর্থাৎ নীলমণির পরিবারের প্রধান পুরুষ রূপে বর্ণনা (নীলমণি ঠাকুরের সন্তানদের নামোল্লেখের পর) করা হয়েছে দ্বারকানাথকে (৮,২১৫)।
💥দেবেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সেখানে অন্তিমে অত্যন্ত সংক্ষেপে উল্লিখিত। ♦রবীন্দ্রনাথের নামই নেই।
💥সুতরাং ১৮০৬ সালের বিখ্যাত পরিবারগুলির তালিকা প্রণয়ন কালে কেন গবেষক সৌমেন্দ্র নাথ মুখার্জী (S.N. Mukherjee) ঠাকুর পরিবারের বড় তরফকে গোপীমোহন ঠাকুরের ও ছোট তরফকে দ্বারকানাথের পরিবার বলছেন তা আশা করি বোঝা যাচ্ছে।
💥যদিও উল্লিখিত সময় দ্বারকা নাথ বালক মাত্র এবং কোনো ব্যবসার সঙ্গেই তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।
💥এর সঙ্গেই আরো একটা বিষয় লক্ষণীয় যে কর্পোরেশনের House Assessment Book এ ঐ বিশেষ সম্পত্তির মালিকের নাম থাকবে না তা তো হতে পারে না তাহলে গবেষক সেই নামটি উল্লেখ না করে দ্বারকানাথের পরিবারের সদস্য বলছেন কেন ?
♦ সম্ভবত নামটি এমনই অকিঞ্চিৎ কর কোনো ব্যক্তির যাঁর নামোল্লেখে তাঁকে'কেউ চিনবেন না বা ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক কেউ বুঝতে পারবেননা।
সে কারণে পরিবারের সর্বাপেক্ষা নামজাদা ব্যক্তিটির নামোল্লেখ করা হয়েছে পরিবার টিকে চিহ্নিত করার জন্য। এবং সর্বাপেক্ষা নামজাদা ব্যক্তিটিকে কেমন করে নির্বাচন করা হয়েছে তা আগেই বলা হয়েছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, দ্বারকানাথ পতিতাপল্লী চালাতেন এই অভিযোগের আদৌ কোনো প্রামাণ্য সূত্র বা reference নেই। প্রত্যক্ষ প্রমাণ তো নেই-ই এমনকি পরোক্ষ কোনো প্রমাণও নেই। তবুও এই অপপ্রচার চলছে এবং বিভিন্ন অপ্রামাণ্য সূত্র, secondary এমনকি tertiary সূত্র উল্লেখ করে তথাকথিত গবেষণাগ্রন্থ পর্যন্ত লেখাও ছাপানোহচ্ছে। কিছু স্বঘোষিত গবেষক নিজেদের কপোলকল্পনাকে সত্য বলে দাবী করে শুধু দ্বারকানাথ নন এমনকি রবীন্দ্রনাথের নামও টেনে আনছেন এমন একটি ঘৃণ্য ব্যবসায় যার সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্কই ছিল না।
প্রকৃত গবেষণা যাঁরা করতে চান তাঁদের উচিত ঐ ১৮০৬ সালের House Assessment Book থেকে প্রকৃত নামটা উদ্ধার করে এই বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের অবসান ঘটানো।
যথেষ্ট সময় সুযোগ পেলে এ প্রবন্ধের লেখকও সে কাজে আত্মনিয়োগ করবে।
যদি ঐ বিশেষ তথ্য টি উদ্ধার করতে পারি তাহলে অবশ্যই সকলকে জানাব।
সকল রেফারেন্স মিলিয়ে দেখার অনুরোধ রইল।আশা করি যারা কনফিউ- -শনে ছিলেন তারা উত্তর পেয়েছেন।
♦সত্যমেব জয়তে। ♦
অগ্নিবীর নামক গ্রুপ থেকে প্রাপ্ত।
Courtesy. Abdul Latif.