রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৪

কাঙাল হরিনাথ ~ নবশ্রী চক্রবর্তী বিশ্বাস

গ্রীষ্মের অপরাহ্ন। গ্রামের কচিকাচার দল বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে গৃহে ফিরছিল। পথ প্রায় জনশূন্য ছিল এতক্ষণ। এখন শিশুদের কলকাকলিতে পথ-ঘাট-পুকুরের যেনো তন্দ্রাভঙ্গ হল। শিশুদিগের মুখে এক অপূর্ব আহ্লাদ! গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহও সেই উত্তেজনায় বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাদের গ্রীষ্ম-অবকাশের সূচনা হয়েছে যে! সেই আনন্দই তাদের চোখেমুখে প্রতীয়মান। পথপার্শ্বে চণ্ডীমণ্ডপের দক্ষিণের একটি কক্ষ থেকে কোলাহলের শব্দ শুনে কিছু শিশু থমকে দাঁড়ালো, বাকি শিশুরা নিজ নিজ বাড়ীর পথ ধরলো। 

      দুটি শিশু কোলাহলের শব্দ অনুসরণ করে খুব ধীরে পদসঞ্চারণ করে কক্ষের গবাক্ষের সমীপে এসে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তন্মধ্যে একজন শিশু কৌতুহলবশতঃ উকিঝুঁকি দিতে উদ্যত হ'লে কক্ষের অন্দর থেকে এক যুবক কণ্ঠ ভেসে এলো। যুবকটি দৃপ্তকণ্ঠে বলে উঠলো, "একটা বাউলগানের দল করলে কেমন হয়! তোমরা কি বলো!" কথাটা শেষ হতেই ঘরে এক নিস্তব্ধতার পরিবেশ সৃষ্টি হল। আরেক যুবক উত্তর দিলো, "কথাটা মন্দ বলোনি অক্ষয়। এইতো প্রাতঃকালে কালিগঙ্গা থেকে এক বাউল এসেছিলেন। শুনেছি তাঁর অনেক শিষ্য। কি যেন নাম!" পাশ থেকে আরেক যুবক উত্তর করলেন, "লালন ফকির! কি ভারী সুন্দর একখানি গান শোনালে গো!" যুবকটি সম্মতি জানিয়ে আবার বলতে শুরু করলো, "তিনি পারলে, আমরাও পারবো।" অক্ষয় বললো, "ঠিক! আজই, এখন থেকেই আমরা বাউল দল তৈরী করবো।" অপেক্ষাকৃত এক বয়স্ক ব্যক্তি বললে, "কাজটি সহজ নয় অক্ষয়। নতুন গান বাঁধতে হবে যে!" অক্ষয় বললো, "হলে হবে, আমরা ভয় করবো না। একটা কলম আর কাগজ নিয়ে আয় জলদা! আর যা যা বলছি, কাগজে লিখেনে।" জলদা নামের যুবকটি বাধ্য ছেলের মত একটা কাগজ ও কলম নিয়ে লিখতে বসে গেলো। অক্ষয় বলতে শুরু করলো -
  
"ভাব মন দিবানিশি, অবিনাশি,
                  সত্য- পথের সেই ভাবনা।
যে পথে চোর ডাকাতে, কোন মতে,
                  ছোঁবে না রে সোনা দানা । ....... "

    গানটির অনেক কলি লেখা হ'লে, অক্ষয় থামলো। মধ্যবয়সী পুরুষটি বললেন, "এতে তো হবেনা। বাউল গানের নিয়ম হলো গানের শেষে ভণিতা দিতে হবে।" তার সামনে বসা যুবকটি বললো, "আপনি পণ্ডিত মানুষ, আমাদের এইটুকু ত্রুটি নয় মার্জনা করলেন!" অক্ষয় বললো, "না লিখছি যখন, নিয়ম মেনেই লিখবো।" উত্তেজিত হয়ে জলদা বললো, "এতো চিন্তার কি আছে ভাই! চল না কাঙালের কাছে যাই। তিনিই সুন্দর ভনিতা লিখে দেবেন।" অক্ষয় বলল, "না জলদা, আমিই ভণিতা লিখবো। তাঁকে আমি অবাক করে দিতে চাই।" জলদা আবার কলম ধরল, অক্ষয় বলতে লাগলো -
    
     "ফিকিরচাঁদ ফকির কয় তাই, কি কর ভাই,
                                          মিছামিছি পর ভাবনা ।
        চল যাই সত্য পথে, কোন মতে,
                                           এ যাতনা আর রবে না।"
     
    গানের ভণিতা সমাপ্ত হলো। সকলে সমস্বরে বললো, ঠিক, এই ফিকিরচাঁদ নামটাই সঠিক। জলদা বললো, "আমাদের তো ধম্ম ভাব নেই এক চিলতে। ফিকিরে সময় কাটাবো, এটাই মুখ্য উদ্দেশ্য।" 

      গানের সুর দিলেন আরেক যুবক। সুর শেষ হতেই জলদা বললো, "চল হে, একবার কাঙালকে শুনিয়ে আসি।" এই বলে যুবকগুলি দল বেঁধে সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে অনতিদূরে পার্শ্ববর্তী এক ছোট কুটিরের উদ্দেশ্যে চললো। শিশুগুলি নিঃশব্দে এতক্ষণ তাদের কথা শুনছিল। তারা এখন যুবকদলটিকে অনুসরণ করতে লাগলো। তারা ভাবলো, এবার বুঝি খুব আমোদ হবে। উত্তেজনায় যুবকদলের কেউ শিশুগুলিকে খেয়াল করলো না। যুবকদল সেই ছোট কুটিরে প্রবেশ করলো। কুটিরের একটি কক্ষে এক মধ্যবয়সী মানুষ, একটি কাষ্ঠনির্মিত ভগ্ন আরামকেদারায় বসে কি যেন লিখছেন। তার গাত্রে ছিন্ন- পরিচ্ছন্ন -শুভ্রবস্ত্র, কেশ রুক্ষ, চোখ দুখানি আয়ত - উজ্জ্বল, মুখখানি জীবনযুদ্ধে কিছুটা ম্লান হলেও, জীবনীশক্তিতে ভরপুর। যুবকের দল একে একে এসে নিঃশব্দে তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। তাঁর ছোট কুটিরের কক্ষে আর স্থান সংকুলান হয়না! এদিকে মানুষটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি লিখেই চলেছেন আপনমনে। হঠাৎ যুবকদলের মধ্যে কারো কারো ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটলো। তাদের মধ্যে মৃদুস্বরে বাক্যালাপ শুরু হ'লে, সেই শব্দেই মানুষটি লেখা ছেড়ে যুবকদলের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। তাদের দেখে তিনি যারপরনাই তৃপ্তি পেলেন। সেই তৃপ্তি তাঁর ব্যবহারে ও কণ্ঠস্বরে প্রকাশ পেল । তিনি যুবকদের সোৎসাহে বললেন, "আরে তোরা! কি ব্যাপার! কোনো সংবাদ আছে নাকি! একেবারে দল বেঁধে!" জলদা বললো, "আছেই তো ! তাই তো এলাম। আমরা বাউলগান লিখেছি। সুর করেছি। আপনাকে শোনাতে এলাম। আপনি যদি রাজী হন, তো কাল থেকেই আমরা এই গান গেয়ে গ্রামের পথে পথে ঘুরবো।" মানুষটি হাতের কাগজটা রেখে এসে বললো, "শোনা দেখি!" তাঁর উৎসাহ দেখে যুবকদল ততোধিক উৎসাহে গান ধরলো। গান গাইতে গাইতে তারা নাচতে লাগলো। মানুষটিও তাদের সাথে যোগ দিলো। মনে হলো, কিছু বাউল মনের আনন্দে গান গাইছে আর নাচছে। শিশুর দল বড়ই আমোদ অনুভব করলো। নাচ-গান সমাপ্ত হলে শিশুর দল স্ব স্ব বাড়ীর উদ্দেশ্যে ধাবিত হল। পথে যাদের সাথেই দেখা হলো, তাদেরই বললো, "কাল এখান দিয়ে বাউল গানের দল যাবে গো।" সকলেই উৎসাহিত!

     এদিকে কক্ষ মধ্যে শোরগোল পরে গেল। যুবকের দল উত্তেজনায় ফুটতে লাগল। কাঙাল বললেন, "দ্যাখ, একটা গানে তো আর বাউলের দল হয় না। তাই ভাবছি আমিও একটা লিখবো। অক্ষয় কলম ধর!" তিনি বলতে লাগলেন -
  
    "আমি কোরব এ রাখালী কতকাল ।
      পালের ছটা গরু ছুটে,
                         করছে আমার হাল বেহাল ।
     আমি, গাদা করে নাদা পুরে রে,
    কত যত্ন ক'রে খোল বিচালী খেতে দিই ঘরে ;.....,"

     এই দুটি গান সম্বল করে পরের দিন যুবকদল সন্ধ্যাকালে বাউলের পোশাকে ও সজ্জায় সুসজ্জিত হয়ে খোল করতাল নিয়ে গ্রামের পথে বেরোলো। তাদের নগ্নপদ, গেরুয়া বসন, কারো মুখে কৃত্রিম দাড়ি, কিন্তু মুখে সকলের অনাবিল হাসি। গ্রামের মেঠো পথ ধরে "ফিকিরচাঁদ ফকিরের" দল গান গাইতে গাইতে চললো। বাউলের দলের সম্মুখে চললেন কাঙাল। তাঁকে অনুসরণ করলেন তাঁর স্নেহধন্য যুবকরা। পথের দুই ধারে মানুষের ঢল নামলো। এইভাবে একদিন-দুইদিন-তিনদিন করে প্রায় প্রতিদিনই বাউলের দল বের হয়ে গ্রামের পথে পথে গান গেয়ে বেড়ায়। ধীরে ধীরে গানের সংখ্যা বাড়তে লাগলো, সেই সাথে গানের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। আবালবৃদ্ধবনিতার মুখে মুখে ফিরতে শুরু করলো এইসব গান। এই ছোটো পরিসরে রইলো সেই ফিকিরচাঁদ ফকির দলের প্রধান কান্ডারী কাঙালের সংক্ষিপ্ত জীবনী। 
       
     ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির অন্তর্গত কুন্ডুপাড়া গ্রামে এক তিলি পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম হরিনাথ মজুমদার৷ যিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন 'কাঙাল হরিনাথ' নামে৷ তাঁর পিতার নাম হরচন্দ্র (মতান্তরে হলধর) মজুমদার ও মাতার নাম কমলিনী দেবী। 
 
       বাল্যকালেই তাঁর পিতৃমাতৃ বিয়োগ ঘটে। শৈশবে
কিছুকাল কৃষ্ণনাথ মজুমদারের ইংরেজী বিদ্যালয়ে বিদ্যালাভের সুযোগ ঘটেছিল তাঁর৷ কিন্তু নিদারুণ অর্থকষ্টে তিনি তাঁর বিদ্যাচর্চা সমাপ্ত করতে পারেননি। তিনি তাঁর জীবনীতে লিখেছিলেন, পিতাকে দাহ করে ফিরে পরনের বস্ত্রটুকু পরিবর্তনের মত বস্ত্র ও ভক্ষণের নিমিত্ত সামান্য হবিষান্নটুকুও তাঁর গৃহে ছিল না। শৈশবকালে পিতৃবিয়োগের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পড়াশোনা শেষ না করতে পারার যন্ত্রণা তিনি আজীবন বয়ে বেরিয়েছেন!
এই সময় ব্রাহ্মসমাজের প্রধান আচার্য্যদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কুমারখালি প্রদেশে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের জন্য পণ্ডিত দয়ালচাঁদ শিরোমণি মহাশয়কে প্রেরণ করেছিলেন। হরিনাথ, শিরোমণি মহাশয়ের নিকট কিছু ব্যাকরণ পাঠ করতে লাগলেন এবং তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ও তৎকালে প্রকাশিত ব্রাহ্মধর্মে কিছু গ্রন্থ অধ্যয়ণ করেছিলেন।

       শৈশবের সেই দুর্বিষহ অভাবই তাঁর জীবনে পরমপাথেয় হয়ে দাড়িয়েছিল৷ ১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি  গ্রামে একটি মাতৃভাষার বিদ্যালয় (ভার্নাকুলার স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যাপারে তিনি পাশে পেয়েছিলেন গোপাল কুণ্ডু, যাদব কুণ্ডু, গোপাল সান্যাল প্রমুখ বন্ধুদের৷ সেই বিদ্যালয়ে তিনি কিছুদিন অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করেন। তিনি তাঁর অসাধারণ প্রতিভাবলে ইংরেজী শিক্ষার পদ্ধতি অনুসরণ করে গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় সাহিত্য, ব্যাকরণ, ভূগোল, ইতিহাস, অঙ্ক প্রভৃতি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে তাঁর মাসিক বেতন হয় কুড়ি টাকা। কিন্তু এর থেকে পনের টাকা গ্রহণ করে বাকী অর্থটুকু তিনি অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। 

       নারী শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তৎকালীন সময়ে বাংলা তথা ভারতবর্ষে নারীদের অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। যে ক'জন উদারমনস্ক ও সাহসী ব্যাক্তিত্ব এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে একজন হলেন কাঙাল হরিনাথ। অর্থ ব্যতীত আর অন্য কোন বিষয়ে অপ্রতুলতা বিধাতা তাঁর মধ্যে দেননি। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে কাঙাল হরিনাথের সহায়তায় কৃষ্ণনাথ মজুমদার একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন কুমারখালিতে।
 
     তাঁর যে সকল বিষয় অধীত ছিল না, তা গৃহে তাঁর বাল্যবন্ধু মথুরামোহন মৈত্র (সাহিত্য ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার মৈত্রের পিতা) মহাশয়ের নিকট শিক্ষা ও অভ্যাস ক'রে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করতে লাগলেন। যারা বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে অসামাজিক কাজকর্মে নিযুক্ত হয়ে পড়েছিল, সেই সমস্ত ছাত্রদের নিয়ে তিনি নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করেন। এই নৈশ বিদ্যালয়ে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজী বিদ্যালয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সম্মানের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিল।

    তিনি আজীবন দুর্বিষহ দারিদ্রের সাথে লড়াই করেছেন। অর্থ উপার্জনের জন্য কুমারখালিতে তিনি কিছুদিন নীলকর সাহেবদের অধীনে চাকরী করেন। কিন্তু নীলকর সাহেবদের নীল কৃষকদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার সন্দর্শণে তিনি এই চাকরি পরিত্যাগ করে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর বাল্যবন্ধু মথুরানাথ হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকাতে লেখা শুরু করেন। তাই দেখে হরিনাথও হাতে কলম তুলে নেন। কাঙাল হরিনাথ তার আত্মজীবনীতে বলেছেন, "সাধ্য ততদূর না থাকুক, প্রজার প্রতি নীলকরদের অত্যাচার যাতে নিবারিত হয়়, তার উপায় চিন্তাকরণ আমার ও মথুরের নিত্যব্রত ছিল।" তার তথ্য-ঋদ্ধ লেখনীতে মূর্ত হয়ে উঠত কৃষকদের অসহায় পরিস্থিতি ও নির্যাতিত-লাঞ্ছনা -বঞ্চনা-যন্ত্রণাময় জীবন। প্রথমদিকে তিনি সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাতে লেখালেখি শুরু করেন। তারপর ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কুমারখালিতে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর আত্মজীবন চরিতে লিখেছেন, "ঘরে নেই এক কড়া, তবু নাচে নায় পাড়া। আমার ইচ্ছা হলো এইসময় একখানি সংবাদপত্র প্রচার করে গ্রামবাসী প্রজারা যেরূপে অত্যাচারিত হচ্ছে, তা গভর্নমেন্টের কর্ণগোচর করলে অবশ্যই তার প্রতিকার এবং তাদের নানা প্রকার উপকার সাধিত হবে। সেই ইচ্ছাতেই গ্রাম ও পল্লীবাসী প্রজার অবস্থা প্রকাশ করব বলে পত্রিকার নাম গ্রামবার্তা প্রকাশিকা রেখেছি।"

এর পাশাপাশি কবি ঈশ্বরগুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাতে তিনি  প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। তাঁর গ্রামবার্তা প্রকাশিকা কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন  এর যন্ত্রে মুদ্রিত হত, কিন্তু প্রকাশিত হতো কুমারখালী থেকে (বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাসের উপাদান -কাঙাল কুঠির ও এম এন প্রেস)।

  সংবাদপত্রের আদিযুগে একজন দরিদ্র অসহায় দীনহীন কাঙ্গাল, অতুলপ্রতিভা ও ঐশীশক্তিবলে দেশের জন্য এইরূপ বহুব্যয় সংবাদপত্রের প্রচারে ব্রতী হলেন। বিশেষত তখন নিজের বা মফস্বলের কোথাও মুদ্রাযন্ত্র ছিল না। কলকাতায় যাতায়াতের সুবিধা ছিল না, কারণ পূর্ববঙ্গের রেলপথ তখনো খোলা হয়নি। এই সময়ে কলকাতায় সংবাদপত্র মুদ্রিত করে প্রকাশ করা অসম্ভব সাহসের পরিচয়। তখন সাধারণ মানুষের সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস গঠিত হয় নি। সংবাদপত্রের মূল্য অত্যধিক থাকায় ধনী ভিন্ন সাধারণের তা গ্রহণ করার সামর্থ ছিলনা। সেই কারণে সংবাদপত্রের কথা সাধারণ মানুষ পরীজ্ঞাত ছিল না। কাঙাল হরিনাথ ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে এই দুরূহ কাজে হস্তক্ষেপ করিলেন। এই দুরূহ কার্য সম্পন্ন করার জন্য তিনি নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পরিত্যাগ করেন। বিদ্যালয়ের প্রাপ্য বেতন তার সংসারযাত্রা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন ছিল। পত্রিকায়  সেই উপায় হয় না, যার দ্বারা তিনি সংসারকার্য নির্বাহ করতে পারেন। সুতরাং অতিকষ্টে সংসারের ব্যয় নির্বাহ হতে লাগলো। তিনিই নিজেই ছিলেন একাধারে লেখক, সম্পাদক, পত্রিকা বিলিকারক এবং মূল্য আদায়কারী অর্থ সংগ্রাহক। তাঁর জীবনযন্ত্রণা তিনি লিখে গেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে, "এই দিন চৈত্রমাসের দুপ্রহরের রৌদ্রের সময় পদ্মার  তীরস্থ তাপিত বালুকাময়ী চড়া অতিক্রম করতে পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ ও রৌদ্রতাপে তাপিত হয়ে যে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেছিলাম, যদি গ্রামবার্তার প্রতি প্রেমানুরাগ সঞ্চিত না থাকতো, তবে তা তৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগের কারণ হত।"

     ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে কুমারখালিতে তিনি নিজস্ব পত্রিকা ছাপানোর জন্য ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮ বছর ধরে রাজশাহীর রানী স্বর্ণকুমারী দেবী এই ছাপাখানার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেন। হরিনাথ তাঁর গ্রামের মানুষদের অসহায়তা, দারিদ্র্য প্রতিকারের চিন্তা থেকেই এই কার্যে ব্রতী হন ('কাঙাল হরিনাথ ও ' গ্রামবার্তা প্রকাশিকা', কাঙাল হরিনাথ মজুমদার স্মারকগ্রন্থ - আবুল আহসান চৌধুরী, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৮)।

কাঙাল হরিনাথের ছাপাখানা

      গ্রামবার্তা দ্বারা এ দেশের প্রভূত উপকার সাধিত হয়। এটা যে শুধুমাত্র জমিদারের মহাজনের এবং নীলকুঠির অত্যাচার নিবারণ সাধন করেছিল তাই নয়, প্রজার প্রতি রাজার কর্তব্য সম্পর্কে যে সকল প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো, তদনুসারে কার্য করতে ইংরাজ সরকারেরও যথেষ্ট প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। বাংলা সংবাদপত্রের অনুবাদক মিঃ রবিনসন সাহেব স্বয়ং "গ্রামবার্তা" গ্রহণ করেছিলেন এবং সরকারের গোচরার্থে গ্রামবার্তা থেকে যে অনুবাদ হত, তাতে গ্রামবাসীর বিশেষ উপকার হয়েছিল। এতে করে গ্রামের নদী খাল প্রভৃতি পয়ঃপ্রণালী সংস্কারপূর্বক জলকষ্ট নিবারণ, গো-ধন রক্ষা, পুলিশ বিভাগের সংস্কার ব্যবস্থা ইত্যাদি। তৎকালে "সোমপ্রকাশ"ও "গ্রামবার্তা" ই উচ্চশ্রেণীর সাময়িক পত্র ছিল।

   কাঙাল হরিনাথ যখন বাংলা সাহিত্যের সেবায় নিযুক্ত ছিলেন, সেই সময় বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস গ্রন্থের অভাব ছিল। তখন বাহারদানেশ, চাহারদরবেশ, বিদ্যাসুন্দর, কামিনীকুমার ইত্যাদি গ্রন্থই উপন্যাসের স্থান গ্রহণ করেছিল। উপন্যাস সৃষ্টির আদিযুগে হরিনাথ "বিজয়বসন্ত" (রচনাকাল- ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দ) নামক এক উপন্যাস রচনা করে বাংলার সাহিত্যজগৎকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তিনি ইংরেজী ভাষা জানতেন না। এদিকে তৎকালীন ইংরেজীশিক্ষায় শিক্ষিত যুবকশ্রেণী বাংলার তৎকালীন  উপন্যাসসমগ্রকে উচ্চ আসনে স্থান দিতেন না। কিন্তু হরিনাথের "বিজয়বসন্ত" মৌলিকতা, মধুরতা, এবং প্রকৃত কাব্যগুনে মাতৃভাষার যথেষ্ট গৌরব বৃদ্ধি করে বহুজনের সমাদর লাভ করে।

তাঁর স্মৃতিতে নির্মিত সংগ্রহশালা
     
       তিনি আরো অনেক গ্রন্থ রচনায় বাংলাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন ৷ তার মধ্যে চারুচরিত্র (১৮৬৩), কবিতা কৌমুদী (১৮৬৬), কবিকল্প (১৮৭০), অক্রুর সংবাদ, চিত্তচপলা (১৮৭৬), ব্রহ্মান্ডবেদ প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য৷

   তাঁর প্রতিভা সর্বতোমুখী ছিল৷ তিনি ছিলেন স্বভাব কবি৷ সেই সময় কুমারখালিতে কীর্তনের বড় ধুম ছিল। অনেকেই সুললিত পদ রচনা করে বিগ্রহের পর্ব উপলক্ষে গান করতেন। হরিনাথের পদগুলি মহাজন বিরচিত পদাবলী অপেক্ষা কোন অংশে নিকৃষ্ট ছিল না। তাঁর রচিত পদ তিনি নিজেই স্বকন্ঠে গেয়ে সমবেত শ্রোতৃমন্ডলীকে মুগ্ধ করে রাখতেন। এইরূপে তিনি পূর্ববঙ্গের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার নিকটে তার বাউল সংগীতের দ্বারাই অসামান্য লোক বলে পরিচিত হয়েছিলেন। এই বাউল সংগীতের সহজ সরল প্রাণস্পর্শী কথা ও সুরে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বশ্রেণীর মানুষ উদ্বেলিত হতেন। অল্পদিনের মধ্যেই বাউলসংগীতের মধুর সুর হাটে- ঘাটে- মাঠে- নৌপথে সর্বত্রই শ্রুত হতে লাগলো -

 "হরি দিন গেলো সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে।
 তুমি পাড়ের কর্তা জেনে বার্তা ডাকি হে তোমারে।।"
 

      তিনি সাধক লালন ফকিরের একান্ত অনুরাগী ছিলেন। তিনি ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে একটি বাউল সংগীতের দল গঠন করেন। দলটি "কাঙাল ফকিরচাঁদের দল" বলে পরিচিত। তাঁর শিষ্যগণের মধ্যে ছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্র, দীনেন্দ্রনাথ রায়, জলধর সেন প্রমুখ বাংলার বিশেষ ব্যক্তিত্বরা। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে এই মহাপ্রাণের জীবনাবসান ঘটে। তিনি আমৃত্যু বঙ্গদেশের শিক্ষার প্রসার ও সর্বপ্রকার শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। বাঙালির অত্যন্ত কাছের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আজ তিনি প্রায় প্রচারের আড়ালে। বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, সংবাদিকতা ও মননে যে সুগভীর ছাপ তিনি রেখে গেছেন তা অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র :
(১) কাঙাল হরিনাথ - শ্রী জলধর সেন।
(২) কাঙাল হরিনাথ মজুমদার জীবন সাহিত্য ও সমকাল - ডঃ অশোক চট্টোপাধ্যায়।
(৩) কাঙাল হরিনাথ ( গ্রামীণ মনীষার প্রতিকৃতি) - আবুল আহসান চৌধুরী।
(৪)বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাসের উপাদান -কাঙাল কুঠির ও এম এন প্রেস।
(কলকাতা কথকথা পত্রিকায় প্রকাশিত)

মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৪

মোটা মাথার বোকা প্রশ্ন ~ নীলাঞ্জন মিশ্র

আমি অর্থনীতিবিদ নই। অর্থনীতির কিছু বুঝিও না। আর বুঝি না বলেই বোকা মাথায় কিছু সোজাসাপ্টা প্রশ্ন আসে। সেইসব প্রশ্নদের এক জায়গায় করার জন্যই এই লেখা।
আজকের লেখার বিষয় ব্যাংক কর্মী। ব্যাঙ্কে যখন প্রথম কম্পিউটার এল তখন বলা হয়েছিল যে এর ফলে দশজন লোকের কাজ একটা মেশিন করবে। ফলে, কর্মীদের ওপর কাজের চাপ কমবে। ভাল কথা। কিন্তু আদতে সেটা হল কি? ব্যংকিং সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত লোকজনের ওপর কাজের চাপ কমল কি?
আজকের দিনে যে কোনও ব্যাংক কর্মীকে জিজ্ঞেস করলেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন। বেসরকারি ব্যাংকের কথা তো ছেড়েই দিন, এমনকি সরকারি ব্যাংকেও আর দশটা পাঁচটার কাজ করলে এখন চলে না। সব জায়গাতেই দিনে আট ঘন্টার অনেক বেশি কাজ করতে হয়।
কিন্তু কেন? কম্পিউটার এসে না কাজের চাপ কমানোর কথা ছিল? তাহলে?
আসলে কম্পিউটার কাজের চাপ কমায় নি, কমিয়েছে কর্মীর সংখ্যা। আর সাথে সাথে বাড়িয়েছে একজন মানুষ কতটা কাজ করবেন সেই প্রত্যাশা। আগে যদি একজন কর্মী গড়ে দিনে দশজন গ্রাহককে সামলাতেন, এখন তাঁকে সামলাতে হয় একশজনকে।
আপনি বলবেন, সে তো হবেই। গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে, কাজের চাপ তো বাড়বেই। সেই জন্যই তো কম্পিউটার আনা।
আমার মোটা মাথা বলে, কর্মীর সংখ্যা না কমালে, কম্পিউটারের সাহায্যে সহজেই এই বাড়তি গ্রাহকদের চাপ সামলানো যেত। তাতে কর্মীদের ওপর কাজের চাপও এইভাবে বাড়ত না।
অর্থনীতিবিদরা বলবেন, কর্মীসংকোচন না করলে ব্যাংক চলবে কি করে? কি করে কম্পিটিশনে টিঁকে থাকবে? সেইজন্যই তো আর্থিক সমস্যায় পড়লেই যে কোনও সংস্থার প্রথম পদক্ষেপই হয় কর্মী ছাঁটাই। সহজেই যেন কেমন করে কালকের দক্ষ কর্মীরা আজ বাড়তি হয়ে যান। যাকে সংবাদপত্রের সুন্দর ভাষায় বলে, "বাড়তি মেদ ঝরিয়ে নতুন উড়ানের জন্য তৈরী এক্স ওয়াই জেড সংস্থা।"
আচ্ছা, তর্কের খাতিরে না হয় তাও মেনে নিলাম। আর্থিক মজবুতির জন্য এইসব "বাড়তি" কর্মীদের ছাঁটাই না করে কোনও উপায় নেই। তাহলে, এই কর্মীসংকোচের পর এখন তো ব্যাংকগুলোর লাভের মুখ দেখা উচিৎ? তা না হয়ে এখনও কেন ধুঁকে চলেছে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক? কেন উত্তরোত্তর খারাপ হয়ে চলেছে তাদের আর্থিক অবস্থা?
ঠিক কতটা খারাপ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর স্বাস্হ্য? বেশ খারাপ। শুধু গত ত্রৈমাসিকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির মিলিত ক্ষতির পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন ডলার। কতগুলো শূন্য যেন? এর মধ্যে ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ারই ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
কোথায় যাচ্ছে এত এত টাকা? যাচ্ছে অনাদায়ী ঋণে, যাকে বলা হয় নন-পারফর্মিং অ্যাসেট। এই মুহুর্তে আমাদের রাস্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ চার লক্ষ কোটি টাকা। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। চার লক্ষ কোটি। সংখ্যাটা কত বড়। একটু তুলনা করলে বুঝতে সুবিধে হবে। ইন্ডিয়ার স্বাস্থ্যখাতে বাজেট হল ষাট হাজার কোটি। অর্থাৎ, এই অনাদায়ী ঋণ দিয়ে ভারতের মত সাতটি দেশের স্বাস্হ্য বাজেট চালানো যায়। আরেকটা ছোট তথ্য। এই বছরের উনিশে ফেব্রুয়ারি ইটালিকে পেছনে ফেলে অনাদায়ী ঋণের অনুপাতে ভারত উঠে এসেছে বিশ্বের এক নম্বরে।
মজার কথা হল, এই অনাদায়ী ঋণের বোঝার পুরোটাই প্রায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাঁধে। প্রাইভেট ব্যাংকগুলির অনাদায়ী ঋণের পরিমান দশ ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ চল্লিশ হাজার কোটি।
তাহলে কি দেখলাম? একদিকে বাড়ল বেকারি, বাড়ল কর্মীদের ওপর কাজের চাপ, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো সম্মুখীন হল এক বিশাল পরিমান আর্থিক ক্ষতির।
কি হল আসলে? কোন ঝণখেলাপি পিঁপড়ে খেয়ে গেল
লাভের গুড়, আমার আপনার কষ্টার্জিত টাকা?
এ লেখার শুরুতেই বলেছি, আমি অর্থনীতি বুঝি না। তাই কত টাকা কোথায় গেল বুঝতে আমার ভরসা গুগুল। কোন ঋণখেলাপি আমার কত টাকা খেয়ে গেল সেটা গুগুল করতে গিয়ে আরেকটা মজার জিনিষ পেলাম। জানলাম, রাজ্যসভায় এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রকের ছোটমন্ত্রী শিবপ্রসাদ শুক্লা গত বছর জুলাই মাসে জানিয়েছেন, রিজার্ভ ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী ভারতবর্ষের ব্যাংকিং সেক্টরে মোট ঋণখেলাপের পরিমান মার্চ ২০১৪তে আড়াই লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে ৩১শে মার্চ ২০১৮-তে হয়ে দাঁড়িয়েছে নয় লক্ষ বাষট্টি হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ভারতের শিক্ষা বাজেটের দশগুন ও প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় তিনগুন।
মন্ত্রীমশাই আরও জানিয়েছেন, এই ঋণখেলাপি টাকার নব্বই শতাংশই গেছে বড় কর্পোরেটদের ঘরে।
তা কাদের ঘরে গেল এই টাকা? গুগল করে জানতে পারলাম, আরবিআই এই তথ্য প্রকাশে অনিচ্ছুক। তবে গোপন কথাটি তো আর সবসময় গোপন থাকে না। ক্রেডিট সুইস বলে একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক পরামর্শদাতা সংস্হার দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, ২০১৫-র মার্চ অব্দি শুধু অনিল আম্বানিরই ঋণখেলাপের পরিমাণ সওয়া লক্ষ কোটি টাকা। আদানি, এসার ও বেদান্ত গ্রুপের প্রত্যেকের ঋণখেলাপের অংক কমবেশি এক লক্ষ কোটির ঘরে। আবার একটু হিসেবের সুবিধের জন্য জানিয়ে রাখি, ভারতবর্ষের শিক্ষাখাতে ২০১৯ সালের বাজেট হল কমবেশি নব্বই হাজার কোটি টাকা।
এ পর্যন্ত পড়ে কেউ বলতেই পারেন, আহা রে, বাছাদের ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। নচেৎ কি আর এরা ধারদেনা বাকি রাখত? সে হয়ত যাচ্ছে, কিন্তু অক্সফ্যামের দেওয়া হিসেব কিন্তু অন্য কথা বলছে. এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটির দেওয়া হিসেব অনুযায়ী ২০১৬ সালের উৎপাদিত সম্পদের ৫৮ শতাংশ গেছিল ভারতবর্ষের ধনীতম এক শতাংশের হাতে। ২০১৭ সালে সেটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিয়াত্তর শতাংশে। অর্থাৎ, ভারতবর্ষে ২০১৭ সালে যদি ১০০ টাকার সম্পদ উৎপাদন হয়ে থাকে, তার মধ্যে তিয়াত্তর টাকাই ঢুকেছে একজনের পকেটে। আর দরিদ্রতম পঞ্চাশজন একসাথে পেয়েছে এক টাকা, গড়ে দু পয়সা।
এই যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসাম্য, তা কিন্তু শুধু ভারতের সমস্যা নয়, তা ঘটে চলেছে বিশ্বের কমবেশি সর্বত্র। কিন্তু আবারও আমার মোটা মাথায় খচখচ করতে থাকে, এভাবে কি চলতে পারে? কতদিন দাঁড়িয়ে থাকবে এরকম মাথা ভারী পা রোগা কাঠামো?
লেখাটা শুরু করেছিলাম ব্যাংক কর্মীদের দিয়ে, কিন্তু আসলে এই সমস্যাটা আমার আপনার সবার। একটু ভেবে বলুন তো, আজকের দিনে কোন পেশাটা আছে, যেখানে আট ঘন্টা কাজ করলে চলে? আমাদের আগের প্রজন্ম তাঁদের অফিসে যা সময় দিতেন, আমাদের সবাইকে কেন দিতে হচ্ছে তার থেকে অনেক অনেক বেশি? যন্ত্র এসে তো আমাদের জীবনকে আরও সহজ করে দেওয়ার কথা ছিল, তাই না? তাহলে আমরা চারপাশে সবাই ছুটছি কেন? ছুটছি, কেন না, আমাদের বোঝানো হয়েছে সারভাইভ্যাল অফ দা ফিটেস্ট। থ্রি ইডিয়টস সিনেমার ভাইরাসের মত আমাদের সর্বক্ষণ বোঝানো হচ্ছে, জীবন হচ্ছে একটা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। এখানে আরাম করতে হবে নিক্তি মেপে, যার পারিভাষিক নাম, ওয়ার্ক-লাইফ ব্যলান্স। আসলে কিন্তু সেই ভারসাম্য থাকছে না। কর্মী কমছে, মাথাপিছু কাজ বাড়ছে। আট ঘন্টার কাজ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে দশ বা বারো ঘন্টায়। কখনও আরো বেশি। কিছু বলার উপায় নেই। কেন না তোমার অফিসের বাইরেই অপেক্ষা করছে দশ হাজার চাকরিপ্রার্থী, তোমার ওই একটা চেয়ারের জন্য। গত বছরের একটা খবরে দেখলাম, বাষট্টিটি পিয়নের পোস্টের জন্য ইউপিতে জমা পড়েছে তিরানব্বই হাজার অ্যাপ্লিকেশন। তার মধ্যে প্রায় চারহাজার জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী।
এর ফল গিয়ে দাঁড়াচ্ছে নির্মমতায়, হিংসায়। আমাদের বোঝানো সহজ হচ্ছে যে আমার এই চাকরির সংকটের জন্য দায়ী আমার পড়শি। সে আছে, তাই চাপ বাড়ছে, তাই আমি চাকরি পাচ্ছি না। হতাশা বাড়ছে, বাড়ছে রাগ। মাথার ওপর বসে থাকা লোকেরা এই রাগটার খবর রাখেন না, এমন নয়। তারা জানেন, ওই নীচের তলার দুপয়সা ওয়ালা পঞ্চাশজন যদি একজোট হয়, তাহলে ওই তিয়াত্তরটাকা ওয়ালা একজনের সমূহ বিপদ। তাই ক্রমাগত বিভিন্ন ইস্যুতে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে- ধর্মে ধর্মে, ভাষায়-ভাষায়, গায়ের রঙ-এ, আর নাগরিকে নাগরিকে। বোঝানো হচ্ছে, যত সমস্যার মূলে ওই মেক্সিকানরা, অতএব দেয়াল তোলো।
আমরা ভুলে যাচ্ছি, আসলে আমাদের কি প্রাপ্য ছিল। সাতমহলা বাড়ির ব্যালকনি থেকে মালিক ছুঁড়ে দিচ্ছে অর্ধভুক্ত মাংসের হাড়, আর নীচে দাঁড়িয়ে আমরা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করছি কে কত উঁচুতে লাফ দিয়ে ওই ছুঁড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট লুফে নিতে পারব। যে আজকে মাংসের টুকরোটা পাচ্ছে, কাল সে লাফাতে পারছে আরেকটু বেশি। আর যে পারছে না, সে অক্ষম আক্রোশে কামড়ে ধরছে পাশের জনের ঘাড়।
যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নেই যে সার্ভাইভ্যাল অফ দ্যা ফিটেস্ট, জীবনে প্রতিযোগিতা করেই টিঁকে থাকতে হবে, কিন্তু নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাওয়া যাচ্ছে কি? প্রাইভেট এয়ারলাইন্স জেট এয়ারওয়েজ প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে দশহাজার কোটি টাকা দেনার দায়ে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে এসবিআই ও অন্যান্য সরকারি ব্যাংক শুধু সেই ঋণ মুকুবই করছে না, উপরন্তু আরও দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার বন্দোবস্ত করছে। অন্যদিকে সরকারি বিএসএনএল ছাঁটাই করতে চলেছে তাদের পঞ্চান্ন হাজার কর্মীকে। একদিকে রাফায়েল ডিল পাচ্ছে দেনায় ডুবে থাকা অনিল আম্বানি, অন্যদিকে সরকারি সংস্থা হিন্দুস্তান এরোনটিক্স লিমিটেড (হ্যাল) চলে যাচ্ছে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে। ইতিহাসে প্রথমবার কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য অন্যতম ধনী ও সফল সরকারি সংস্থা হ্যালকে বাজার থেকে ধার করতে হচ্ছে হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু কেন হ্যালের এই অবস্থা? কি করে পৌঁছল ক্যাশ রিচ হ্যাল এমন অবস্থায়?

সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪

লাল ফিতার ফাঁস ও কয়টা নিঝুম স্কুলবাড়ি ~ বিহঙ্গ দত্ত

২০১৫-১৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের আমলে এসএসসি-র সবচেয়ে বড় এক্সামটা সংগঠিত হয়। তিনটে পার্টে শিক্ষক নিয়োগ করার কথা হয়েছিল। 

১) পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পোস্ট ফর ইলেভেন টুয়েলভ 
২) অনার্স গ্র্যাজুয়েট পোস্ট ফর নাইন টেন 
৩) প্লেন গ্র্যাজুয়েট পোস্ট ফর আপার প্রাইমারি 


এর মধ্যে আপার প্রাইমারির রেজাল্ট এখনও বের করতে পারেনি রাজ্য সরকার। আশা রাখছি ২০৫০-র মধ্যে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে। 

কিন্তু বাকি দুইটো প্যানেলের রিক্রুটমেন্ট হয়। একজন পরীক্ষার্থী হিসাবে আমিও ছিলাম অগুন্তি চাকুরিপ্রার্থীর ভিড়ে। নম্বর নেহাত মন্দ পাই নাই। কিন্তু ইন্টারভিউতে ডাক আসেনি। যাদের এসেছিল তাদের মধ্যে মুড়ি মিছরি বাছতে বসা আমার কম্ম না। কিন্তু কানাঘুষায় শুনি বেশিরভাগই ১০০% উত্তর করে এসেছে। প্রশ্নটা ঠিক ১০০% করে আসার মত ইজি ছিল না। কিংবা হয়তো ছিল। মধ্যমেধার মানুষ আমরা। এ বিপুলা পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি? 

 যাই হোক, রিক্রুটমেন্ট হল। তখন তৃণমূলের দ্বিতীয় টার্ম। বিরোধীপক্ষ পর্যুদস্ত। বিজয়রথ চলতে থাকল। আবারও কানাঘুষায় শোনা গেল দরদাম করা উচিত না। কেননা এ হল লাইফ সেটলমেন্ট। বাঁধা দামে বাঁধা চাকরি হচ্ছে। স্ল্যাব নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। সঠিক মূল্যে সঠিক জিনিস কিনে সর্বমোট (গ্রূপ সি, গ্রূপ ডি চাকুরিজীবী ধরে) ২৫০০০ মতো নিয়োগ হল। কেউ বা ঘরের কাছে। কেউ বা একটু ব্যাজার মুখে খানিকটা দূরে। আমরা বসে রইলাম আরেকবারের আশায়। আমাদের থেকেও মরিয়া ছিল অনেকে। তারা কোর্টে গেল। এরপরের ইতিহাস আপনারা গত আটবছরের ব্রেকিং নিউজে দেখে আসছেন। আলাদা করে বলার কিছু নেই। 


আজ আটবছর পার হয়েছে। আবারও একটা ঐতিহাসিক রায় এসেছে। আগেও অনেকগুলা এসেছিল। এই রায়দান কিছুটা বিশেষ কেননা এখানে কোর্টও আমার জায়গায় নেমে এসেছে। মুড়ি মিছরি বাছেনি। এর আগে এই রায় একবার সুপ্রিম কোর্টে গেছিল। ফিরে এসেছে। আজ আবার বছর ঘুরে ফিরে এল একই গেরোয়। তাদের হাতে তিনটে অপশন ছিল। 

১) যেরকম চলছে সেরকম চলতে দেওয়া 
২) যোগ্য অযোগ্য প্রার্থী বাছা 
৩) পুরা প্যানেল ক্যানসেল করা 

১ আর ৩ নং অপশন গ্রহণ করা  এক মিনিটের কাজ। ২ নং কাজই কঠিন। কিন্তু সেই কাজটি করানোর জন্যই লোকে কোর্টে যায়। 
আজ বিজেপির কোনও নেতার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন যে কী করা উচিত? বলবে প্যানেল আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্থ। সবকটারে ধরে ক্যান্সেল করা। 
তৃণমূলের নেতার কাছে যান। সোজা বলবে আমরা সততার প্রতীক। যেমন চলছে সেটাকেই স্বীকৃতি দেওয়া। 
সাধারণ মানুষের কাছে যান। যেটা শুনতে পাবেন সেটা হল যোগ্য প্রার্থীদের চাকরি হোক। তাই নিয়েই আট বছরের লড়াই। 

কিন্তু কমিশন সেটা করতে দেবে না। কমিশন নিজেদের দায় এড়াবে। ঘোরাবে। যোগ্য প্রার্থীদের টেনে নামাবে অযোগ্যদের পাঁকে। ওএমআর বের না করার জন্য জান লাগিয়ে দেবে। কেননা নিজেদের মুখ পোড়াবার চাইতে, জেলের ঘানি টানার চাইতে হাজার হাজার চাকুরিজীবীকে যূপকাষ্টে তোলা অনেক বেশি সহজ। 

এত শত ঢাকাচাপা দেওয়ার পরেও ৫৫৭৩ জনের ঘাপলা ঢাকা যায়নি। তারা কেউ ফাঁকা ওএমআর দিয়ে চাকরি পেয়েছে। কেউ মেয়াদ উত্তীর্ণ প্যানেল লিস্ট থেকে সুপার নিউম্যারিক্যালি ডাক পেয়েছে। কেউ বা দারুণ বুদ্ধি খাটিয়ে পেছনের র‍্যাঙ্ক থেকে লং জাম্প মেরে ঢুকেছে মেইন লিস্টে। এদের টাকা ফেরত দিতে হবে চাকুরিজীবনের। একশোবার ভালো হয়েছে। 

কিন্তু বাকিদের অভিযোগ কি প্রমাণিত? যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই যে আরও ২০০০০ র মধ্যে ১৫০০০ ই অযোগ্য এবং ঘুরপথে ঢুকেছে তারপরেও বাকি পাঁচ হাজারকে কেন এই নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে? কেন তাদের বারবার দেখে যেতে হবে স্টে অর্ডার পড়ল কিনা? তাদের সততার দাম নেই? সমাজের চোখে তারা যে নিচু হয়ে গেল এই মুহুর্ত থেকে এর কোনও দাম নেই? 

এই প্রত্যেকটা চাকুরিপ্রার্থীর সততাকে বেচেছে কমিশন। তাদের দাঁওয়ে রেখে অযোগ্যদের আড়াল করার চেষ্টা করে গেছে এবং যাচ্ছে। 
এবং আপনি! মহামান্য হাইকোর্ট! আপনারা এতদিন সময় পেয়েও সবরকম তদন্তের স্বাধীনতা পেয়েও এই কতিপয় সৎ চাকুরিজীবীকে সিকিওর করতে পারেননি। অতটা চাপই দিতে পারেননি কমিশনকে। 

এই সব লেখার পর একটু থামতে হল। খানিক মনোবল জোগাতে লাগে। কেননা বাকি গল্পটা বড্ড করুণ। এই রায়ে আবার স্টে অর্ডার পড়বে। তারপর আবার একটা দুটো। শেষ অব্দি হয়তো চাকরি যাবে অনেকের। কিংবা কয়েকজনের। লাল ফিতার ফাঁস আরও কড়া হয়ে বেড়ি পড়াবে স্কুলশিক্ষাকে। গান্ধীমূর্তির পাদদেশের চাকুরিপ্রার্থীরা কাঁদছিলেন এক অদ্ভুত প্রতিহিংসায়। তারা জ্বলেছেন এতদিন। আজ জ্বলতে দেখছেন তাদের ভাত মারা সেইসব অযোগ্যদের। কিন্তু তারপর? বারকয়েক সাংবাদিকরা এই প্রশ্নটা করায় এক মুহূর্তে শূন্যতা নামল চোখে। প্যানেল ক্যানসেল হচ্ছে। প্যানেল ক্যানসেল? না, এতদিন যে ওএমআর পাওয়া যায়নি সেটাকে নাকি খুঁজা আনার ব্যবস্থা হচ্ছে। তাহলে এতদিন হয়নি কেন? এই রায় দিতে হল কেন? 
এরপর? এদের আর সেই বয়স নেই। সেই খাটার ক্ষমতা নেই। সেই যোগ্যরা যাবে কোথায় যারা বসে আছে? অপেক্ষা করবে আর একটা ন্যায় বিচারের? আরও কোনও ধর্ণামঞ্চে? 

আর বসে থাকবে কিছু আধফোটা মুখ। নিঝুম স্কুলবাড়িতে বিকালের ছায়া দীর্ঘ হয়ে আসবে। শিক্ষক নেই। শিক্ষক নেই বলে ছাত্র নেই। ছাত্র নেই বলে শিক্ষক নেই। এই ক্রমান্বয়ী লুপে কতগুলো পরিবারের রমেশ, আলতাফ, রাবেয়া, রোকসানারা মোট বাঁধবে পরিযায়ী হওয়ার জন্য। ফেলে রেখে যাবে পেন-পেন্সিল, পড়াশুনার বইপত্র, ঘরের আঙিনা আর প্রিয় বাংলাকে।

শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৪

পাগলা দাদু ~ রজত শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

"ইরিব্বাবা, ইরিব্বাবা," 
বলেই দাদু লাফ মারেন; 
তারপরেতেই চুলকে কনুই 
ফোঁশফোঁশিয়ে হাঁফ ছাড়েন!

ওমনি আবার ডাইনে ঘুরে 
চমকে ওঠেন কাক দেখে,
তাইতে কেমন তৃপ্ত হয়ে 
ঘুমিয়ে পড়েন নাক ডেকে!

ঘন্টা পাঁচেক ঘুমিয়ে নিয়ে 
ওঠেন হঠাৎ খাট ছেড়ে,
আনিয়ে খাবার গিলতে থাকেন 
গপ-গপিয়ে, পাত পেড়ে;

খাবার খেয়েই ঢেঁকুড় তুলে, 
বাহান্ন বার কান মলে,
ধর্মতলার রাস্তা ধরে 
হন-হনিয়ে যান চলে।

ওই যেখানে সবাই বসে 
ধর্ণা দিয়ে গান শোনে,
সেই সেখানে গিয়েই দাদু 
মুণ্ডু নাচান আনমনে;

ওমনি হঠাৎ সামনে ঝুঁকে 
উলটো হাতে কান ঘষে
এদিক সেদিক তাকিয়ে নিয়ে
দিদির পাশে যান বসে।

এ সব দেখে ভাইরা শুধোয়, 
"কি দাদু, কি ধান্দাটা?"
ক্লান্ত হেসে বলেন দাদু, 
"জানিস, আমি মান্ধাতা?

হাজার হাজার বছর ধরে 
শুনছি তোদের গুলতানি,
সবাই তোরা পানসে গরু, 
যতই সাজিস মুলতানী!

দাদার কথায়, দিদির কথায়, 
লাফিয়ে বেড়াস দিগ্‌বিদিক,
মারবে তোদের ভোজপুরী ল্যাং, 
ঠেকেই তোরা শিখবি ঠিক!

ক্যান্‌ রে তোরা দুচোখ বুজে 
ওদের কথায় চলতে চাস?
ভাবনা নিজের চুলোয় দিয়ে 
ওদের কথাই বলতে যাস?

এই দুনিয়ায় প্রশ্ন কত, 
আর কবে ভাই খুঁজবি রে?
কিছুই তোরা জানিস নে ভাই, 
আর কবে ফের বুঝবি রে?

জানিস কেন সর্ষে ইলিশ 
ভাপিয়ে খেলে ভাল্লাগে?
জানিস তোরা টক কেন কুল? 
লঙ্কা কেন ঝাল লাগে?

কক্ষণও কি দেখিস ভেবে, 
পায়রা কেন উড়তে চায়?
পতঙ্গরা আগুন দেখে 
বৃথাই কেন পুড়তে যায়?

হঠাৎ কেন ব্যর্থ প্রেমিক 
পদ্য লেখে শ্বাস ফেলে?
মুখটা কেন পেঁচিয়ে ওঠে 
চুন মাখিয়ে ঘাস খেলে?"

এই না বলে হঠাৎ দাদু 
থমকে গিয়ে, নোখ খুঁটে,
ফ্যাল-ফ্যালিয়ে তাকিয়ে দেখেন 
চতুর্দিকে, চোখ ফুটে;

ওমনি আবার 'ডুম-ডুমা-ডুম' 
বাজিয়ে নিয়ে ড্রামখানা
মালকোঁচাটা বাগিয়ে ধরে 
যান পালিয়ে নামখানা!!

বুধবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৪

পিটার হিগ্স ও ঈশ্বর কণা ~ অরিজিৎ গুহ

২০১২ সালের জুলাই মাসে সার্ন ঘোষণা করল প্রায় ৫০ বছর আগে যা ছিল অপ্রমাণিত তত্ত্ব, অথচ যা মিলিয়ে দিয়েছিল মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র কণিকাদের পারিবারিক কুণ্ডলী, তা এখন পরীক্ষালব্ধ বাস্তব। আবিষ্কার হয়েছে " হিগস বোসন " যার ডাকনাম " গড পার্টিকল"। বাংলা সংবাদ মাধ্যমে উল্কার গতিতে ছড়িয়ে গেল খবর " ঈশ্বর কণা আবিষ্কৃত"। সেই সূত্র ধরে, মনের মাধুরী মিশিয়ে চর্চা চলতে লাগল এ নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ। বিশ্বাসী মানুষ খবর কাগজ পড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন " যাক! তিনি আছেন। বিজ্ঞানকে পর্যন্ত তাঁকে স্বীকার করতেই হল।" রঙ্গে ভরা বঙ্গদেশে অনুচ্চারিতই রয়ে গেল যে " ঈশ্বর কণা" নিছকই নাম, " হতচ্ছাড়া" ( Goddamn) কে সাজিয়ে গুছিয়ে পেশ করা বৈ কিছু নয়।
যার দৌলতে " ঈশ্বর কণা " কটাদিন বাঙালির মনোজগতে তুফান তুলল সেই পিটার হিগস মারা গেলেন গত পরশু। বাংলা সংবাদমাধ্যমে কোন খবর আছে " ঈশ্বরের" আবিষ্কারককে নিয়ে? থাকার কথাও নয়। এখন তো আর " সেনসেশন " তৈরি হবে না।
যাইহোক, পিটার হিগস এবং তাঁর আবিষ্কার নিয়ে সহজ ভাষায় লিখেছেন অরিজিৎ গুহ। নিচে দিলাম লেখাটা।
~ শুভ্রদীপ ঘোষ 
******"************************************************



আত্মবিশ্বাস শব্দটার সাথে জড়িয়ে থাকে একটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব। আত্মবিশ্বাস না থাকলে সুন্দর কোনো কিছুই গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। পল ডিরাক যখন কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাথে প্রথমবার বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ যুক্ত করলেন, তখন তাঁর ইকুয়েশনের সলিউশনে একটা অদ্ভুত ফলাফল এসেছিল। দ্বিঘাত সমীকরণে x এর যেমন পজিটিভ এবং নেগেটিভ দুখানা মাণ বেরোয়, অনেকটা সেরকমই। সমীকরণটায় ইলেকট্রনের দুখানা চার্জ বেরিয়েছিল। একটা নেগেটিভ এবং একখানা পজিটিভ। নেগেটিভ চার্জ নিয়ে কারো মাথাব্যথা ছিল না। কারণ ইলেকট্রনের চার্জ নেগেটিভ হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। চিন্তার কারণ ঘটিয়েছিল পজিটিভ চার্জখানা নিয়ে। ইলেকট্রন কী করে পজিটিভ চার্জের হয়! অদ্ভুত ব্যাপার! ডিরাক নিজেও প্রথমে ঘাবড়ে গেছিলেন। ভেবেছিলেন এটা পজিটিভ প্রোটনেরই হয়ত কোনো প্রকারভেদ হবে। আবার অংক কষা শুরু করেছিলেন। পরে স্থির প্রত্যয় হয়ে ঘোষণা করেন, আমার সমীকরণ পুরোপুরি ঠিক। একফোঁটা কোনো ভুল নেই।

কিছুকাল পরে কার্ল অ্যান্ডারসন ইলেকট্রনের অ্যান্টি পার্টিকল পজিটিভ চার্জের পজিট্রন আবিষ্কার করেন ক্লাউড চেম্বারে কসমিক রে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে। ডিরাক বললেন My equations are more powerful than me. আত্মবিশ্বাস। আমিই ঠিক। এই আত্মবিশ্বাসের ফলে পাওয়া গেছিল সুন্দর একটি তত্ত্ব। অ্যান্টি পার্টিকল এর তত্ত্ব।
১৯৯৮ থেকে ২০০৮ এর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা সার্নের তত্ত্বাবধানে নয় বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটার বা পার্টিকল কোলাইডার তৈরি করা হল মহাবিশ্বের কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য যার নাম লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার। যেসব প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হচ্ছিল তার মধ্যে ছিল কণা পদার্থবিজ্ঞানের এখনো অব্দি সব থেকে সর্বজনগ্রাহ্য মত স্ট্যাণ্ডার্ড মডেল এর মান্যতা নির্ধারণ এবং স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলের সম্প্রসারিত মতবাদ সুপারসিমেট্রির সন্ধান, স্ট্রিং থিওরিতে বর্ণিত অতিরিক্ত মাত্রার সন্ধান, ডার্ক ম্যাটার যা ধরে আছে মহাবিশ্বের ৭৮ শতাংশ ভর সেই ডার্ক ম্যাটারের সন্ধান, গ্র্যাণ্ড ইউনিফাইড তত্ত্ব ইত্যাদি। তবে সব থেকে বড় যে প্রশ্নের উত্তরটা খোঁজা হচ্ছিল সেটা হচ্ছে পদার্থের ভর সংক্রান্ত।


কণা পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যাণ্ডার্ড মডেল আসলে পর্যায় সারণির মৌলের মত প্রাথমিক কণার একটা পর্যায় সারণি। এই পর্যায় সারণির প্রায় প্রতিটা কণাই নয়ের দশক নাগাদ পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটারে আবিষ্কৃত হয়ে যায়। বাকি ছিল একখানা কণার আবিষ্কার। সেই কণাটা আবিষ্কৃত হলেই এক বিরাট বড় মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ে যেত পদার্থবিদদের। প্রশ্নটা কী ছিল! একটু দেখে নেওয়া যাক।
ধরা যাক ইলেকট্রন। এটা একটা প্রাথমিক কণা এবং স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলে যে পর্যায় সারণি করা হয়েছে সেখানে এর স্থান রয়েছে লেপটন কণাদের শ্রেণীতে। বাকি লেপটন কণারা হচ্ছে মিউয়ন আর টাউ। এরা খুব হাল্কা কণা। এবার রিচার্ড ফেইনম্যান কোয়াণ্টাম তত্ত্বের মধ্যে ফিল্ড থিওরি বলে একটা তত্ত্ব এনেছিলেন যেখানে উনি দেখিয়েছিলেন প্রতিটি কণার সাথে যুক্ত থাকে একটা করে সেই কণার ফিল্ড। ফিল্ড মানে হচ্ছে যেখানে সেই কণাটার উপস্থিতি বোঝা যায়। 'পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাঙ খোড়া করে দেবে বলেছে পাড়ার দাদারা'- এই গানের মধ্যে দিয়ে অঞ্জন দত্ত পাড়ার দাদাদের ফিল্ড বুঝিয়ে দিয়েছেন। ওই পাড়াটাই হচ্ছে দাদাদের ফিল্ড। ওখানে দাদারা শক্তিশালী। সেরকমই কণাগুলোরও একেকটা ফিল্ড রয়েছে এবং এই ফিল্ডের ফ্লাকচুয়েশনই কণার অস্তিত্ত্ব প্রকাশ করে। এই ফিল্ডের মধ্যে কণাটা শক্তিশালী।

কণার অস্তিত্ত্ব তো প্রকাশ হল, কিন্তু কণা সাবালক হল কিনা কী করে বোঝা যাবে! অর্থাৎ কণাটা ভর পেল কিনা সেটা কোথা থেকে জানা যাবে! এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা পড়লেন দ্বিধায়। তাঁরা প্রস্তাব করলেন কণাগুলো জন্ম নেওয়ার সাথে সাথে একটা চ্যাটচ্যাটে আঠালো ফিল্ড যা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র, সেই ফিল্ডের মধ্যে দিয়ে যায়। এবার সেই আঠালো চ্যাটচ্যাটে ফিল্ডের সাথে অন্য কণার ফিল্ডের মিথষ্ক্রিয়া বা ইন্টার্যাকশন যখন হয় তখন কণাগুলো এমন ভাব করে যেন সুইমিং পুলের মধ্যে কণাগুলো সাঁতার কেটে জল ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সাঁতার কাটার ফলেই কণাগুলো তার ভর পাচ্ছে। ওই সুইমিং পুলটা হচ্ছে সেই আঠালো চ্যাটচ্যাটে ফিল্ড। রাশিয়ান পদার্থবিদ লেভ ল্যাণ্ডাউ এর নিম্ন তাপমাত্রায় অতিপরিবাহিতার একখানা তত্ত্ব থেকে এই চ্যাটচ্যাটে আঠালো ফিল্ডের তত্ত্ব বিজ্ঞানীরা নিয়ে আসেন। এই যে কণাগুলোর এই ফিল্ডের সাথে মিথষ্ক্রিয়া বা সাঁতার কাটার এই পদ্ধতি, সেই সংক্রান্ত কয়েকখানা পেপার ১৯৬২-৬৪ এর মধ্যে পরপর কয়েকজন বিজ্ঞানী প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রত্যেকের নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী এই মিথষ্ক্রিয়ার নাম রাখা হয় ABEGHHK'tH mechanism. যথাক্রমে Philip Anderson, Robert Brout, Francoise Englart, Gerald Guralnik, CR Hagen, Peter Higgs, Tom Kibble, Gerard tHooft এদের আদ্যাক্ষর অনুসারে। তবে এদের মধ্যে খুব স্পষ্টভাবে পিটার হিগস তাঁর পেপারে এই ফিল্ড সংক্রান্ত যে একটি কণা রয়েছে তার উল্লেখ করেন। স্বাভাবিক। ফিল্ড থাকলে সেই ফিল্ডের একটা কণাও থাকবে। সেই জন্য পরবর্তীকালে এই মেকানিজম হিগস মেকানিজম আর হিগস ফিল্ড সংক্রান্ত কণাটাকে হিগস কণা বলে উল্লেখ করা হতে থাকে। স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলের বাকি বল বা ফোর্স পরিবাহী কণাগুলো যেগুলো বোসন কণা তার সাথে এই কণাটার একটা পার্থক্য হচ্ছে বাকি ফোর্স ক্যারিয়ার কণাগুলোর ফিল্ডের একটা অভিমুখ আছে, যেহেতু ফোর্স বা বলের অভিমুখ থাকে, তাই বাকি ফোর্স ক্যারিয়ার কণাগুলো হচ্ছে ভেক্টার বোসন বা গেজ বোসন আর এই কণাটার কোনো অভিমুখ নেই তাই একে বলা হয় স্কেলার বোসন। এবং এই কণাটাই সব কণাদের ভর যোগাচ্ছে। এলএইচসি তে যদি এই কণা আবিষ্কার করা যায় তাহলে পদার্থের ভর সংক্রান্ত একটা মৌলিক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যাবে।
যখন এলএইচসি তৈরি হচ্ছে ততদিনে স্ট্যাণ্ডার্ড মডেল নিয়ে গবেষণা করে বেশ কয়েকজন নোবেল পেয়ে গেছেন। তার কারণ আগেই উল্লেখ করেছি বাকি কণাগুলো পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটারে আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। যারা যারা এইসব কণা সংক্রান্ত তত্ত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা এবং যারা কণাগুলোর আবিষ্কারে জড়িত ছিলেন, প্রত্যেকেই নোবেল পেয়ে গেছেন। সেই সময়ে পদার্থবিদদের মধ্যে একটা বিকল্প তত্ত্বও উঠে এসেছিল যা হচ্ছে হিগস মেকানিজম এবং হিগস বোসন ছাড়া পার্টিকল ফিজিক্স এর ইলেকট্রোউইক তত্ত্ব। এখানে বলা হয়েছিল কণাগুলোর কোয়ান্টাম ফিল্ডের যে গতিশক্তি সেখান থেকেই কণাগুলো নিজস্ব শক্তি থেকে ভর সৃষ্টি করে।এবং এই সংক্রান্ত ম্যাথামেটিক্সও বিকশিত হচ্ছিল ১৯৯০ থেকেই। সহজেই বোঝা যায় এই তত্ত্ব বিকশিত হলে স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলকে নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে হত এবং হিগস মেকানিজম বা হিগস ফিল্ডের আর কোনো অস্তিত্ত্বই থাকত না।
১৯৯৮ সালে এই বিকল্প তত্ত্ব নিয়েই সার্নে বক্তৃতা দিতে গেছিলেন বিকল্প তত্ত্বের উদ্ভাবক কানাডার পদার্থবিদ John W Moffat. সেই বক্তৃতার নাম ছিল Electroweak Model without a Higgs Particle. স্পষ্টতই সেই সময়ের প্রেক্ষিতে খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। এত বড় একটা প্রোজেক্ট হচ্ছে, তার আগে এমন একখানা বক্তৃতা যে বক্তৃতা পুরো প্রজেক্টটা সম্পর্কেই অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

সেই বক্তৃতার ঠিক আগে আগেই এই এলএইচসি প্রজেক্ট লঞ্চ হল। একজন সাংবাদিক তৎকালীন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসার পিটার হিগস কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন এই যে একটা নয় বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট যেখানে আপনার নামে একখানা কণা আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে, আপনি কি বিশ্বাস করেন এতে হিগস বোসন পাওয়া সম্ভব হবে? পিটার হিগস এর জবাব ছিল I am 96 percent certain that they will discover the particle.

Moffat এর বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর সার্নের থিওরেটিকাল ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় তলের সেমিনার রুম স্তব্ধ হয়ে গেছিল। এসব কি তত্ত্ব শুনছে ফিজিক্স কমিউনিটি! এই তত্ত্বের ঠিক হওয়া মানে নয় বিলিয়ন ডলার জলে চলে যাবে। সরকারের থেকে ভবিষ্যতে আর কোনো ফাণ্ড পাওয়া সম্ভব হবে না। পার্টিকল ফিজিক্স এর গবেষণা থমকে যাবে! কিন্তু ফিজিক্স তো এভাবে চলে না! সেমিনার রুমের এক বিজ্ঞানীর প্রশ্নের জবাবে Moffat বলেছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীতে যদি মিকেলসন মর্লি ইথার কে নস্যাৎ না করতেন তাহলে আইনস্টাইন এর রিলেটিভিটির জন্ম হত? সাইন্স আসলে কোনো কণা পেলাম কি পেলাম না তার ওপর নির্ভর করে থাকে না। এত বড় প্রোজেক্ট যদি ফেলও করে তাহলেও সাইন্স এগিয়ে যাবে।

অবশেষে ২০১৩ তে সার্নের এলএইচসিতে আবিষ্কৃত হয়েছিল হিগস কণা। পূর্ণতা পেয়েছিল স্ট্যাণ্ডার্ড মডেল। পিটার হিগস এর আত্মবিশ্বাস 'আমিই ঠিক' প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।
গতকাল ৯ই এপ্রিল চলে গেলেন ২০১৩ র নোবেল প্রাইজ বিজয়ী পিটার হিগস। তিনি নিজে অবশ্য হিগস বোসন এর আবিষ্কারে পুরোপুরি নিজেকে কখনই কৃতিত্ব দেন নি। হিগস মেকানিজম এর পেপারের বাকি বিজ্ঞানীদের কথাও সব সময়ে বলে গেছেন। নিজেকে অন্তরালে রাখতেই পছন্দ করতেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই প্রফেসার।