বুধবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৩

নিরীহাসুরের খিক্স ~ ডাঃ সব্যসাচী সেনগুপ্ত

ইমারজেন্সি নাইট ডিউটি চলছিল সেদিন। রাত পৌনে বারোটা-র মতো বাজে। হুড়মুড় করে পেশেন্টের পর পেশেন্ট আসার আর বিরাম নেই। এসেই যাচ্ছে তো এ-সে-ই যাচ্ছে। নাগাড়ে। কাতরাতে কাতরাতে। ঝাঁপাতে লাফাতে। এবং...অতি অবশ্যই–খিস্তাতে খিস্তাতে! হুঁ হুঁ বাওয়া, যে সে দিন তো আর নয়! 'অমৃৎ মহোৎসব'-ওয়ালা স্বাধীনতা দিবস বলে কথা। বন্যার স্রোতের মতো রোগী যে আসবেই, এ কথা তো জানাই ছিল আগেভাগেই। 
                         অন্তত পঞ্চাশ জনকে ভর্তি করে ফেলেছি এলরেডি। মদ খেয়ে হুড়ুম বাইক চালিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন করতে গিয়েছিল বেটা-বিটিরা। ওই সেই তারাই এসে যাচ্ছে। নাগাড়ে। কারো খুলি ফেটে দুই ভাগ, কেউ লেংচে, কারোর ডান হাতখানি আবার ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়ে লটপট করছে পতাকার মতোই। নারী পুরুষের বিভেদ নেই। 
        হ্যাঁ, স্বাধীন আমরা হতে পেরেছি বটে– এ কথা বোঝা যাচ্ছিল বেশ রকম। আর... তারই মাঝে, ওই যে বললাম, রাত তখন পৌনে বারোটা মতো হবে, উর্ধস্বসে উর্ধ্বশ্বাসে রোগী দেখে চলেছি আমি। 

এক্ষণে, আপাতত,  আমার সামনে চারটে ট্রলি পরপর দাঁড়িয়ে। একটিকে পরীক্ষা করছি পেট টিপে টুপে। সম্ভবত গল ব্লাডারে পাথর হয়েছে তার। বিশেষ স্থানে একটু চাপ দিতেই হাউ মাউ করে চিল্লাছে বিকট। পিছনের অপেক্ষমান ট্রলিগুলির একটিতে হাঁফানি, বাকি দুইখানি বাইক দুর্ঘটনা ঘ্রিয়াওঁ। বাতাসে বাতাসে তখন আমার ম ম করছে মদের গন্ধ ফুরফুরিয়ে। 

এমত সসেমিরা অবস্থায় হঠাৎ খেয়াল হলো, কাঁধে টুকটুক করে টোকা মারছে কেউ একজন। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই – টলটলায়মান এক ছোকরা। আঙুল উঁচিয়ে কি যেন একটা বলার চেষ্টা করছে চোখ মুখ কুঁচকে। বাম কানের স্টেথোর ইয়ার পিস সরিয়ে ঠাহর করলাম সেকেন্ড খানিক।টলটলায়মান যুবকটির বক্তব্য। শোনার পরেও, বুঝতে সময় লাগলো আরো সেকেন্ড খানিক। ছেলেটি যা বলছে স্খলিত ভাষ্যে, তার অর্থ হলো– "দশ সেকেন্ড"। 
হ্যাঁ ওই একটি কথাই সে বলে যাচ্ছে নাগাড়ে–, দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড। 

খানিকটা ভ্যাবলার মতোই জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম তাই –" কী হয়েছে ভাই? কী দশ সেকেন্ড?" 
ফলাফল হলো ভয়াবহ। নিজের বাম হাতের তর্জনীটি দেখিয়ে বললো যুবক–" দেখতে পাচ্ছিস, পা-চ্ছি-স? হারামি?"

খিস্তি আমরা, স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক শুনেছি। সেসব কথা এখন বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে বেমালুম। তবুও, জীবনের প্রথম খিস্তি শোনার গল্পটা নাহয় বলেই যাই খানিক।

এ ঘটনা বছর বিশেক আগেকার। ইন্টার্নশিপ চলছে তখন আমার। বিদেশ ফেরত এক প্রফেসর পড়াতে এলেন আমাদের সার্জারি ওয়ার্ডে। সকালের রাউন্ড চলছে, আর স্যারের পিছু পিছু ঘুরছি আমরা। গন্ডগোলটা বাঁধলো এক্কেবারে শুরুয়াতি পেসেন্টেই। রোগীটি গতরাতেই ভর্তি হয়েছে। আঘাত পেয়ে, রক্ত জমেছে মস্তিষ্কে। ফ্রন্টাল লোব। আর তাই, হাত পা তার বেঁধে রাখা হয়েছে দড়ি দিয়ে। 
যখন পৌঁছেছি সদলবলে আমরা রাউন্ড দিতে, রোগী তখন সেই বাঁধা হাতই টেনেটুনে চোখের উপর রেখে ঘুমাচ্ছে বিন্দাস। সিনিয়র পি.জি.টি ( পোস্ট গ্রাজুয়েট ট্রেইনি), অভ্যাস মাফিক বলতে গেলো তড়বড়িয়ে–" স্যার, ইটস আ কেস অফ ফ্রন্টাল লোব হেমাটোমা। একটু সামলে হ্যান্ডেল করতে হবে। হ্যাঁ... এই...এই যে ভাই... তাকাও তো...।" 
                      বিলেত ফেরত স্যার ক্ষেপে গেলেন দুম করে– " হোয়াট ননসেন্স ইজ গোয়িং অন! হাত বেঁধে রেখেছো? হোয়াট এবাউট হিউম্যান রাইটস! ছিঃ! আর তোমরা কি পেশেন্ট এক্সামিনেসন প্রশিজিওর টুকুও ভুলে গেছো ভাই? ইউ হ্যাভ টু গ্রিট দা পেশেন্ট ফার্স্ট। লেট মি ডেমনস্ট্রেট। দ্যাখো, কি ভাবে করতে হয় এসব।"  
              এই ব'লে ট'লে, ভদ্রলোক টাই গুছিয়ে পেসেন্টের কানের পাশে গেলেন ধীরে ধীরে। তারপর রোগীর চোখে ঢাকা কনুইটি ধরে, তুমুল ভালোবাসা ঝরিয়ে বললেন– " হেক্সকিউজ মি স্যার, ক্ষমা করবেন । মাই সেলফ...আমি... আপনার ডক্টর। একটু দেখব আপনাকে। আপনার হাতটা সরাতে হচ্ছে আমাকে, ক্ষমা করবেন। পিউপিল এক্সামিন করব। স্যার... শুনছেন... স্যার...এলাউ মি প্লিজ।" 
                      উত্তরে, পেশেন্টটি এক ঝটকায় হাত সরিয়ে বলেছিল– "এই কোন খানকির বাচ্চা ঘুম ভাঙালি রে গাঁড়মারানি?"
                      স্যার, সভয়ে ছিটকে গিয়েছিলেন। আমরা ফ্যাকফ্যাক করে হেসেছিলাম। আর পি জি টি বলেছিল– "স্যার বললাম না? ফ্রন্টাল লোব? ফ্রন্টাল লোব ড্যামেজ হলে তো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না স্যার। "
                     

 তো ওই। ওই শুরু আমার খিস্তি শোনার। কখনো রোগের উপসর্গের কারণে। কখনো আবার দাদা কিংবা দিদির আশীর্বাদ ধন্য বলে। মোটমাট কথা এই যে, বাবা এবং মা ধর্মী খিস্তি, আমাদের রোজকার বরাদ্দ। অবাক হই না তাই আর। ফলত,  সেদিন ইমারজেন্সিতে টলটলায়মানের মুখে 
"হারামি" শুনেও তাই ঘাবড়ে যাইনি এতটুকুও। বরং একটু  অবাক হয়েই দেখেছিলাম, ছেলেটির বাম তর্জনীতে এট্টুসখানিক খেটে গেছে। আর তাই নিয়েই সে তড়পে যাচ্ছে–" দশ সেকেন্ড। দশ সেকেন্ডের মধ্যে মাই টিটমেন্ট না হলে,মাডার করে দেব তোকে বাঁড়া।" 

নিজের কষ্টটা সব্বার কাছেই সবচাইতে বেশি 'কষ্ট', একথা যদিও অনস্বীকার্য। ঠিক তেমনই এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে 'ট্রায়াজ' নামক একটি বিষয় আমাদের পড়তে হয়েছে পাঠ্যক্রমে। যে ' ট্রায়াজ'-এর মোদ্দা কথা হলো– যদি জরুরি বিভাগে তোমার সামনে একসাথে একাধিক রোগী এসে উপস্থিত হয়, তবে সব্বার আগে তাকেই দেখবে, যার অবস্থা সবচাইতে সঙ্গীন।

ট্রায়াজ বোঝাবো, এমন স্বাধীনতা আমরা ছিল না। ছেলেটি ততক্ষণে কলারে হাত দিয়েছে,– " দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড বাঞ্চত...দশ সেকেন্ড দিলাম তোকে। "

হিসাব মাফিক এ সময়ে সিকিউরিটি অথবা পুলিশের কথাই মনে আসা উচিত প্রথমে। কিন্তু... আসে না। আমাদের। আমাদের মানে, আমরা যারা সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী, তাদের। পুলিশ বা হোমগার্ড যদিও একজন থাকেন বটে। তবে তাঁদের উপর অলক্ষ্যে নির্দেশ থাকে– ঝামেলা করতে যাবেন না। যা হচ্ছে হতে দিন। 
বিডিওর রুমের বাইরে দণ্ডায়মান সান্ত্রী কিংবা ব্যাংকের ম্যানেজারের কেবিনের বাইরের নিরাপত্তা যতখানি, যে সবখানে স্রেফ প্রবেশ করতে হলেও রক্তচক্ষু দেখতে হবে তুমুল, তার দশ ভাগের এক ভাগও পাওয়া যাবে না সরকারি হাসপাতালে হুলিগ্যান তান্ডব চললেও। অথচ, পদাধিকার বলে, উপরিউক্ত আমরা সক্কলেই  'গ্রূপ A' অফিসার। অথচ, সবটাই সরকারি পরিকাঠামোর অফিস। 

যাক গে যাক। যাক সে কথা। তর্ক করব না। সে রুচিও নেই।  মোটমাট বিষয় এই যে, পুলিশের ভারী বয়ে গেছে আমাকে কলার ধরে কেউ 'বাঞ্চত' বললে। এ তো আমাদের, স্বাস্থ্যকর্মীদের জানা কথাই। আর তাই আমাদের ইন্ডিজেনাস পদ্ধতিতে ভরসা করতে হয় সর্বদা। অধুনা যার নাম- জুগাড়। 
          এবং সেই 'জুগাড়'ই করলাম। খুব শান্ত ভাবে বললাম–" ইউ টক ইংলিশ? ওকে! আই টক ইংলিশ টু। ওয়ান থেকে দশ কাউন্ট করুন তো স্যার। যদি তার মধ্যে আপনাকে না দেখি, দেন লাথ মারুন আমাকে। ফাক মি।  কই! কী হলো? শুরু করুন, কাউন্ট। ওয়ান টু...। করুন। করুন।"

                ব্যাস! তারপর আর কি! আমি ট্রলিতে শায়িত ওই চারজনকে তো দেখলামই। তারপরেও আরো জনা চার পাঁচ জনকে দেখে ফেললাম বিন্দাস। এবং শেষমেশ ফাঁকা হলাম যখন, তখন ছোকরার সামনে এসে বললাম এক গাল হেসে–
" দেখলেন তো? দাদা? দশ সেকেন্ডও লাগলো না?"
ছোকরা তখনও পাখি পড়ার মতো বলে যাচ্ছে– 
" পাঁ-চ! পাঁচ। বাঁড়া পাঁচের পর কী? এই সঞ্জয়? বোকচোদ? পাঁচের পর কী বাঁড়া?...ফাইভ...
সি– হিক্স। হিক্স।"

যাওয়ার আগে রীতিমত আমার পা ছুঁয়ে গিয়েছিল ব্যাটা। বলেছিল–" দশ সেকেন্ডও লাগলো না বস তোমার। তুমি...শুওয়ের বাচ্চা গড বাঁড়া। ভগবান। হিক্স। "

এবং আরো একবার বেঁচে বর্তে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম আমি। খিক্স।

শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৩

ভানু বন্দ্যোাধ্যায় ~ কৌশিক মজুমদার

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনটে দোষ ছিল। 

তিনি নিজেই বলেছেন সাংবাদিক রবি বসুর কাছে। এক, তিনি টাকা ধার দিয়ে ফেরত চাইতে পারতেন না। দুই, নিজের জন্য কিছু চাইতে পারতেন না। আর তিন, সেটাই সবচেয়ে ঝামেলার, তিনি কারও অন্যায় কথাবার্তা সহ্য করতে পারতেন না। আর এই শেষেরটার জন্য কত মানুষের অপ্রিয় হয়েছেন কতবার। 

সেই সেবার এক ইন্টালেকচুয়াল স্টার থিয়েটারে বসে একমনে মহাশ্বেতা দেবীর কুৎসা গাইতে ব্যস্ত। কেন তিনি বিজন ভট্টাচার্য্যকে ছেড়ে অজিত গুপ্তকে বিয়ে করলেন তা নিয়ে রসিয়ে চারটি গপ্পো করছিলেন। বোঝেন নি ভিতরেই ভানুবাবু আছেন। আচমকা বাইরে এসে তিনি জিজ্ঞেস করলেন "আচ্ছা মশাই আপ্নের পিতৃদেব এই বৎসর কত বিঘা জমিতে ধান চাষ দিছেন?"
ভদ্রলোক অবাক। "আমার বাবা ধান চাষ করবেন কেন? তিনি তো দেহ রেখেছেন অনেকদিন হল"
"বেশ। তবে বাঁইচা গেছেন। জীবিত থাকলে জিগাইতাম মহাশ্বেতা দেবী আপনের কয় বিঘা জমির পাকা ধানে মই দিসে যে আপনের ইন্টালেকচুয়াল পুত্তুর তারে লইয়া প্যাচাল পাড়তাসে? জন্মের সময় এমন পোলারে নুন দিয়ে মাইরা ফেলেন নাই ক্যান?" 

আবার এই ভানুই যখন জানতে পারেন এইচ এম ভি নতুন কমেডিয়ান সুশীল চক্রবর্তীকে ভাগিয়ে দিয়েছে, বলেছে ভানু ছাড়া কারও রেকর্ড করবে না, তখন তিনিই ফোন করে শর্ত রাখেন "সুশীলের রেকর্ড করলেই আমি রেকর্ড করুম। নয়তো গুডবাই"। এইচ এম ভি মেনে নিতে বাধ্য হয় তার কথা। 

আমরা দুর্ভাগা এখনও আশিতে আসিও না, মাসিমা মালপোয়া খামু, ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট কিংবা ওরা থাকে ওধারে-র "অরে আর ঢুকতেই দিমু না" কিংবা কমেডি স্কিটে ইনি আর গীতা দে-র সেই সব অসামান্য নাটকের বাইরেও যে এক সিরিয়াস ভানু আছে, তা আমরা মানতে নারাজ। কমেডিয়ানদের সমস্যা হয়তো এটাই। কেউ মানতেই চায় না কমেদি ইজ এ সিরিয়াস বিজনেস। সেই সৌমিত্রবাবুর গল্পটা মনে পড়ে। তখন আর্টিস্ট ফোরাম আর শিল্পী সংসদ নিয়ে চরম দোলাচল। ভানু এসেছেন সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে আলোচনায়। গাড়িতে বসে কথা হচ্ছে। এমনসময় প্রায় ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে এক ফাজিল জিজ্ঞেস করলে "কেমন আছেন ভানুবাবু?"। ভানু একটু বিরক্ত। বললেন "আগে যেমন ছিলাম" বলে আবার আলোচনা শুরু করলেন। 
সে থামবার পাত্র নয় । রস করে বললে "আগে কেমন ছিলেন সেটাও ত জানি না"
ভানু এবার চার অক্ষরের এক গালি দিয়ে বললেন "সেটা যদি নাই জানো, এখন কেমন আছি জাইন্যা কি করবা?"  

মাত্র ১২ বছর বয়সেই বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন ভানু। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও বিপ্লবী অনন্ত সিংহকে গুরু মানতেন৷ তাঁদের কাছেই সংগ্রামের প্রথম পাঠ । এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় রিভলভার পাচারও করেছেন বহুবার। সত্যেন বসুর প্রিয় এই মানুষটি তরুনকুমারকে একবার দেখা করাতে নিয়ে গেছিলেন বিজ্ঞানীর সঙ্গে। সে গল্প কে না জানে? অবশ্য তাঁর কাছে তিনি ভানু নন। সাম্যময়। বাংলা সিনেমায় বাঙাল বা পুব বঙ্গের কমেডিকে প্রায় একার কাঁধে বয়েছেন এককালে। ঠিক যেমন এই ছবিতে নায়িকা রুমাকে বইছেন।  

আজ তাঁর জন্মদিন। প্রণাম রইল।

শুক্রবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৩

যাদবপুরের গল্প ~ কৌশিক মজুমদার

লোয়ার সার্কুলার রোডে কলকাতার সবচেয়ে ধনী পার্সি সদাগর রুস্তমজী কাওয়াসজী বানাজী এক বিরাট বাগান বানিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকার মত বাড়ি। গৃহ প্রবেশের দিন বল নাচ, বাই নাচ হয়েছিল। এসেছিলেন স্বয়ং বড়লাট লর্ড অকল্যান্ড। এই বাগানবাড়িতেই ১৮৫২ সালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর পর বড় ছেলে মানেকজী রুস্তমজী এই বাড়ি থেকেই ব্যবসা চালাতেন। ১৮৭৪ সালে তাঁকে কলকাতার শেরিফ করা হল। তিনিও এই বাড়ি, এই বাগান ছেড়ে উঠে এলেন সাহেবপাড়ায়। সেই বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে হিন্দুমেলার আয়োজন শুরু হল। ১৮৭৬ সালে পটলডাঙ্গার বসুমল্লিক পরিবারের দীননাথ এই বাগান কিনে নেন। কিন্তু আগের মালিকের নাম অনুসারে পার্সিবাগান নামটুকু রয়ে যায়। আর আশেপাশের এলাকা মানেকজির নামে মানিকতলা নামে ডাকা হত। 

বসুমল্লিকরা এই বাগান ধরে রাখতে পারেন নি। তাঁর দুই ছেলে নগেন্দ্র আর যোগেন্দ্র মিলে এই বাগান যখন কালীকৃষ্ণ ঠাকুরকে বিক্রি করেন তখনই এর মৃতপ্রায় দশা। ১৮৯৮ সালেই ইন্দিরা দেবীর প্রমথ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে লেখেন-

কাল ওঁরা একদল... একটা কি প্রকাণ্ড বাড়ি দেখতে গিয়েছিলেন – পার্সিবাগান - নামটা অনেকদিন থেকে শুনে আসছি, কিন্তু কখনো দেখিনি। শুনলুম খুব জাঁকালো মস্ত ব্যাপার, যদিও অযত্নে পড়ে আছে ঘরের অবধি নেই, সর্বত্র মার্বেল পাথর বসানো, কেতাদুরক্ত বাগান, ফোয়ারা, ফুলের গাছ ইত্যাদি যেমন বাদশাহী কাণ্ড হতে হয়।
ধীরে ধীরে এই বাগান নষ্ট হয়ে বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যায়। প্রায় দশ বারো বছর এর নাম কেউ শুনল না। 

আচমকা ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠার দিন আদর্শের বিরোধে তারকনাথ পালিত মশাই কারিগরী শিক্ষার জন্য এক আলাদা সংস্থার প্রস্তাব দিলেন। ভোটাভুটি হল। তিনি তাঁর সমর্থকদের নিয়ে আলাদা বেঙ্গল টেকনিক্যাল স্কুল খুলবেন বলে ঠিক করলেন। করলেন তো বটে, কিন্তু খুলবেন কোথায়? সেই কাজেই ৩০০ টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে পার্সিবাগানের পড়ে থাকা বাগানবাড়ি ভাড়া করা হল। ১৯১২ সালের শেষের দিকে এটি পঞ্চবটি ভিলায় চলে গেলে আশুতোষ মুখুজ্জের সহায়তায় পার্সিবাগানের জমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়। সেখানে স্থাপন করা হয় সায়েন্স কলেজ। 

আর সেই টেকনিক্যাল স্কুলের কি হল? ১৯২৪ সালে সেটি স্থানান্তরিত হল যাদবপুরে। এই যাদবপুর আবার সোনারপুরের জমিদার যাদবচন্দ্র সরকারের নামে।

কিন্তু যাদবপুরেই কেন? আসলে আধার প্রস্তুত ছিল আগেই। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার এখানেই  প্রতিষ্ঠা করেন  Indian Association For The Cultivation Of Science , ১৯০৬ তে রাজা সুবোধ চন্দ্র মল্লিক , ব্রজেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী ও অন্যান্যদের বদান্যতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয় । যে যাই হোক, নতুন কলেজের নাম হল কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলোজি। স্বাধীনতার পরে  সেটাই আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

সঙ্গে রইল সরকারী আদেশনামার প্রথম পাতা।

মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০২৩

প্রসঙ্গ CCTV ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


এ নিয়ে হাজার একটা কথার ফুলঝুরি হয়ে যাওয়ার পরেও দুটো লাইন লিখতে ইচ্ছে হল। কারণ একটাই। বহুবার দেখেছি যে নাকের ডগায় বুম আর মুখে তাগ করে জুম এই অবস্থায় দুম করে বলে দেওয়া কথাবার্তার ওপরে দাড়িয়েই আজকাল জনমত তৈরি এর চেষ্টা চলছে এবং সেটা সফলও হচ্ছে। চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, ওসব অবকাশ নেই, দু মিনিট ইনস্ট্যান্ট ম্যাগীর মতো ইনস্ট্যান্ট সব সমাধান চলে আসছে আমাদের সামনে আর আমরাও অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা না করেই সেগুলো টপাটপ গিলে ফেলেছি। অথচ একটু তলিয়ে ভাবলে আমরা কি দেখতে পাবো ?
যে সব কলেজ বা বিশ্ব বিদ্যালয় তে যথেষ্ট সংখ্যক সিসিটিভি আছে সেগুলোর সব কটা তে ragging বন্ধ হয়ে গেছে ? উত্তরটা হল, না বন্ধ হয় নি। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিতে ragging বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলির সবকটিতে সিসিটিভি বসানো আছে। এর ও উত্তর হল না, বসানো নেই। Ragging বন্ধে সিসিটিভি এর অনস্বীকার্য কোনো ভূমিকা তাই আদৌ প্রতিষ্ঠিত নয়। এবার যারা প্রবল ভাবে চাইছেন যে সিসিটিভি দিয়ে যাদবপুর মুড়ে ফেলা হোক, প্রতিটি কোনায়, প্রতিটি ইঞ্চিতে তাদের দাবির যথার্থতা মেনে নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়। আচ্ছা, সিসিটিভি বসালে ঠিক কি সুবিধে হবে ragging আটকানোর ? আজ্ঞে না, এটা বোকার মতো প্রশ্ন নয়, সত্যি করেই বলুন না কি কি সুবিধে হবে। অনেকেই বলবেন, কেন, এতে ওই দুষ্কৃতি ধরা পড়বে, দেখতে পাওয়া যাবে কে বা কারা ওই অপকর্ম করছে, মানুষের চোখ কে ফাঁকি দেয়া যায়, ক্যামেরার চোখ কে নয়। ঠিকই তো। এই বার আসছে দ্বিতীয় প্রশ্ন।
যারা নজরদারি চালাবেন সেই কর্তপক্ষের চোখে ধরুন ধরে নিলাম যে ওই অপকর্মের খল নায়ক এরা ধরা পড়লো (যদিও তার সম্ভাবনা খুবই কম কারণ ওই অপকর্মের বেশিরভাগ টাই হয় হোস্টেলে বন্ধ দরজার আড়ালে যেখানে সিসিটিভি এর চোখ নেই)। তারপর ? আপনি আমি কি শিওর যে তারপরে কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে ? আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কি বলে ?
যে কিশোর ছাত্রটি মারা গেল, তার হোস্টেলে একজন সুপার ছিলেন, মনে পড়ে ? হোক সামান্য বেতনভুক কর্মচারী, ছিলেন তো একজন। তাঁর অভিজ্ঞতা কি ? তিনি খোলাখুলি স্বীকার করছেন j তিনি হোস্টেলের বারান্দা ঘর কোনো কিছুতেই টহল দিতেন না, নজরদারি চালাতেন না, বলা ভালো, পারতেন না ভয়ের চোটে। হোস্টেলের গেটে সিকিউরিটি কর্মীরা মোতায়েন ছিলেন। হতে পারে তারা আরো সামান্য বেতনের নগন্য কর্মচারী, তবুও ছিলেন তো। তাদের সামনে দিয়ে বহিরাগত দের অবাধ আনাগোনা, নিষিদ্ধ মাদকের চালান, কোনো কিছুই বাদ যায় নি। তারা আটকানোর চেষ্টাই করেন নি, বা পারেন নি, ভয়ের চোটে।
দিনের শেষে মোদ্দা কথা এটাই দাড়ায় যে অনৈতিক, অসামাজিক এবং অপরাধমূলক কাজকর্ম বন্ধ করতে সিসিটিভি কোনো জাদুমন্ত্র হতে পারে না যেমনটা আমাদের বোঝানোর চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বা অব্যবহার বা অপব্যবহার নয়, শেষ কথা বলে কর্তৃপক্ষের, প্রশাসকের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, এবং সাহস। কোন কর্তৃপক্ষের, কোন প্রশাসকের, এবং তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক দেশের কোন শাসক দলের মধ্যে আমি আপনি সেই সদিচ্ছা, সেই আন্তরিকতা সেই সাহস দেখেছি ? ঘটনার নৈতিক দায় নিয়ে ওই দ্বায়িত্বে থাকা মানুষজনের একজনও পদত্যাগ করেছেন ?
রাজনীতির ঘোলা জলে মাছ ধরতে যাওয়ার নামে, লাশের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে যাদবপুরের মাটিতে নিজেদের দলের একটু জমি শক্ত করার কুৎসিত প্রতিযোগিতা ছাড়া তাদের কাছ থেকে আমরা কি উপহার পেয়েছি ? একটি কিশোরের অকাল মৃত্যুতে ব্যথিত, বিচলিত, ক্রুদ্ধ জনতা যাতে এই অস্বস্তিকর প্রশ্ন না তুলতে পারে তার জন্যই তার মুখে ওই সিসিটিভি এর ললিপপ গুঁজে দেয়ার এত তোড়জোড়। প্রশ্ন করিস না বাপ। সিসিটিভি চুষে খা। খা সিসিটিভি।

বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৩

সত্যি ভূতের গল্প ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত



একটা ভূত তখন তারক জিডিএ এর সঙ্গে থাকে। প্রাইমারি হেল্থ সেন্টারের পুকুর পাড়ের পেছল পথ ধরে তারক যখন বর্ষার রাতে ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার থেকে একহাতে ছাতা আর অন্য হাতে কলবুক নিয়ে ডাকতে যায় ভূতটা তখন সঙ্গে থাকে। তারকের পাশে পাশে হাঁটে। আশেপাশের ঘাস জঙ্গলের বনে, ভেঙে পড়া পাম্প হাউসের ইটের পাঁজায় বসে থাকা দাঁড়াশ আর কালাচগুলোকে ভূতটা আঙ্গুল তুলে শাসানি দেয়। খবরদার তারকের কাছে আসিস না।

আরেকটা ভূত তখন নীলিমা সিস্টারের সঙ্গে থাকে। মাঝরাতে এপিএইচ ব্লিডিং এর পরে ক্লান্ত ফ্যাকাসে মায়ের ঠান্ডা হয়ে আসা হাতটা ধরে লেবার রুমের আলোয় চ্যানেল করার জন্য ভেন খুঁজতে গিয়ে হয়রান নীলিমার মাথার ওপর দিয়ে ভূতটা উঁকি দেয়, স্পট ল্যাম্পটা একটু বাঁকিয়ে ফোকাস ফেলে হাতের ওপর। এই তো অনায়াসে শিরার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে জেলকোর সরু সূচ।

আরেকটা ভূত তখন অয়ন ডাক্তারের সঙ্গে থাকে। ভোর রাতে সাপে কাটা বাচ্ছা ছেলেটার শরীর থেকে নেয়া রক্ত টোয়েন্টি ডাবলুবিসিটির টেস্ট টিউবে ঢেলে দিয়ে অয়ন যখন ইমারজেন্সি ঘরে কুড়িজন পেশেন্ট পার্টির তৈরি করা চক্রব্যূহে অভিমন্যুর মতো অপেক্ষা করে তখন ওই ভূতটাইতো অয়নের কাঁধে বসে ভরসা দেয়। কানে কানে বলে আরে কিচ্ছু হবে না, এরা ভালো লোক, রুগী মরে গেলেও তোর গায়ে হাত দেবে না। অয়ন ভরসা পেয়ে সিরিঞ্জ ঢোকায় এভিএস এর শিশিতে। 

তারক রিটায়ার করে যায়। নীলিমা বদলি সুপার স্পেশালিটিতে। অয়ন নিট পিজিতে চান্স পেয়ে পড়তে। হেল্থ সেন্টারে রাতে আর রুগী আসে না। লোকে ভূতের বাড়ি বলে বদনাম দেয়। ভূতগুলো খালি এমনি এমনি হেল্থ সেন্টারের এঘর ও ঘর ঘুরে বেড়ায়। 

নীলিমার যত্ন করে লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে বাঁধানো রেজিস্টারগুলোতে ওরা হাত বোলায়। তারকের গজ থান কাটার কাঁচিটা সযত্নে কাচ ভাঙা আলমারিতে তুলে রাখে। অয়ন এর নিজের পয়সায় কেনা চা খাওয়ার সেই ইলেকট্রিক কেটলির জল ফেলে মুছে দেয়। ওরা আশায় থাকে। আরেকটা তারক, আরেকটা নীলিমা, আরেকটা অয়ন কবে আসবে আবার। ওদের বড় একা লাগে। ওদের মন খারাপ হয়। ভূত বলে কি ওরা মানুষ নয় ?

ব্লকের নতুন বড় ডাক্তারবাবু আসে। পিএইচসির এ ঘর, ও ঘর ঘুরে দেখে। ভূত গুলো খবর পেয়ে শেওড়া গাছ থেকে সুরুৎ করে নেবে আসে। খুব খটোমটো নাম, সুহৃদ না সুরহিত কি একটা। ওদের চোখে চোখে কথা হয়। এ কি পারবে হাল ফেরাতে ? অভিজ্ঞ ভূতেরা মাথা নেড়ে কচিগুলোকে স্বান্তনা দেয়, দেখছিস না, এক্কেবারে ছেলেমানুষ বিএমওএইচ, গোঁফ ওঠেনি ভালো করে, মনে তো হয় পারবে না। তবে চোখ দুটো খুব জ্বলজ্বলে। কচিগুলো মাথা নেড়ে সায় দেয়, পারবে না, পারবে না। গাছের পাতাগুলো সায় দেয়। 

সুহৃদ না সুরহিত ডাক্তার বোধহয় শুনতে পায়, চোখ দুটো সত্যিই জ্বলে ওঠে। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, রকে  বসে আড্ডা দেয়া, মাস্তানি করা সবই তো এই গ্রামে। পারবে না মানে। ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি।  জামার হাতা দুটো গুটিয়ে নিয়ে কাজে নামে। এখান থেকে দুটো টাকা জোগাড় করে ওখানে একটু চুনকাম, সেখান থেকে তিনটে টাকা যোগাড় করে ইলেকট্রিকের নতুন একটা লাইন। ডেপুটি সিএমওএইচ তিন এর কাছ থেকে ভিক্ষে করে চারটে নতুন লোক। ধেড়ে ভূতগুলো দেখে আর বড় বড় নিশ্বাস ফেলে, হচ্ছে টা কি বাপু, বাপের জন্মেও দেখিনি। 

দিন নেই, রাত নেই মোটর সাইকেল দাবড়ে সুহৃদ না সুরহীত ডাক্তার পি এইচ সি থেকে ঢোকে আর বেরোও। নীলিমা সিস্টারের জায়গায় মায়া, ছায়া, আরো চারজন নতুন সিস্টার। তারা তাদের স্যার কে দেখায়, ঐখানে একটা বেসিন লাগবে স্যার, আর এইখানে অটোক্লেভ এর প্লাগ পয়েন্ট। সব লেগে যায় একে একে।  কিচ্ছুটি চুরি হয় না, ভেঙ্গে যায় না। কচি ভূতেরা পাহারায় আছে যে। 

ডেপুটি সিএমওএইচ এক এর লোকেরা সাদা হাতি করে নামিয়ে দিয়ে যায় স্যালাইন এর পেটি। ডেপুটি সিএমও এইচ দুই পাঠায় এন্টি স্নেক ভেনম সিরাম। তারকের জায়গায় কাজে আসা নতুন জিডিএ চন্দন, নন্দনরা ফটাফট নামিয়ে ফেলে সে সব। ভূতগুলোও হাত লাগায়। ফার্মাসিস্ট বিপুল কোথায় কোনটা রাখবে ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে চুমুক দিয়ে ফেলে ঠাণ্ডা চায়ের কাপে। একটা ছোকরা ভূতকে ধমক দিয়ে গরম চা নিয়ে আসতে বলে। সুরহিদ ডাক্তার দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করে।  ইটের পাজায় পাশাপাশি বসে দাঁড়াশ আর কালাচ দুটো দেখে চোখ মেলে।

আবার গুটি পায়ে একটি দুটি রুগী আসে সন্ধ্যে বেলায়, মাঝরাতে। ভর্তি হয়, স্যালাইন চলে, মুখে গোঁজা হয় থার্মোমিটার, পেটে পড়ে প্যারাসিটামল। ভূত গুলো জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। ছায়া সিস্টার ভাবে বাতাসে উড়ে গেল পর্দা বুঝি।

কচি ভূতগুলো ধেড়েদের দু য় দেয়, তবে যে বলেছিলে পারবে না, পারবে না। তোমরা বুড়োরা হেরে ভূত। এই শুনে ধেড়েগুলো হাসে। কচিগুলোও। হাসতে হাসতে কেঁদেও ফেলে। বাইরে তখন শ্রাবণ মাসের অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ভূতদের চোখের নোনা জল মিশে যায় উত্তর চব্বিশ পরগনার মধ্যমগ্রামের, উত্তমগ্রামের, অধমগ্রামের মাটিতে। ভূত বলে কি আনন্দে কাঁদতে নেই ?

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৩

স্বাধীনতা ৭৫ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষন দেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা। সেটা প্রচার করে সরকারি গণমাধ্যম। ক্ষমতায় না থাকা মানুষজনের সে ক্ষমতা নেই। তারা কেবল আপনাদের কিছু শোনাতে পারে এই মাধ্যমে। ভাষণ নয়, গল্প, গল্পও ঠিক নয়, সত্যকাহিনী। শুনতে চাইলে এগিয়ে যান। 

প্রথম কাহিনী ১৯৩২ সাল:-
ওই সময় সবে পরীক্ষা দিয়ে উঠেছে ওই কিশোর, সায়েন্স প্র্যাকটিক্যাল তখনো বাকি। ভগত সিং এর প্রথম শহিদ বার্ষিকী পালনের কথা হচ্ছে। গর্ভনর এর সেদিন জলন্ধর থেকে ৪০ কিমি দূরে হোসিয়ারপুর দেখতে আসার কথা। জেলা কংগ্রেস কমিটি ঘোষণা করলো যে সেদিন জেলা আদালত প্রাঙ্গনে ইউনিয়ান জ্যাক এর বদলে ত্রিবর্ন পতাকা ওড়ানো হবে। এই কর্মসূচি বানচাল করার জন্য জেলা শাসক আর্মি মোতায়েন করেন আর কেউ পতাকা তোলার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করার আদেশ জারি করেন। 



সেদিন হোসিয়ারপুর পোঁছে মন খারাপ কিশোরের। শুনলো পতাকা তোলার কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। কংগ্রেস অফিস সম্পাদক হনুমানজির কাছে কিশোর দাবি করলো, কেন বাতিল হল। উনি প্রশ্ন করলেন, গুলি চালানোর আদেশ এর কথা ঐ কিশোর জানে কি না। তাই শুনে খেপে গিয়ে কিশোর পাল্টা বললো, "গুলি খাওয়ার ভয়ে আপনারা হাল ছেড়ে দিলেন ? এত জাতির প্রতি অপমান!" উনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বসেন," এতই যদি তোমার সাহস, তাহলে তুমিই পতাকা তুলে দেখাও।"

কিশোরটি অফিসের একটি ডান্ডায় লাগানো পতাকা খুলে নিয়ে কোর্টের দিকে দৌড় দিল, সেই আদালত যাকে সেই সময়ে ব্রিটিশ শক্তির একটা নিদর্শন হিসেবে ধরা হতো। কর্মসূচির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়াতে তখন পুলিশ আর সেনাবাহিনীর মধ্যে একটু ঢিলেঢালা ভাব। তার সুযোগ নিয়ে সিঁড়ি টপকে ছাদে উঠলো কিশোর, ইউনিয়ন জ্যাক খুলে নামিয়ে দিল, লাগিয়ে দিল ত্রিবর্ন পতাকা। তাই দেখার পরে গুলি চালানো শুরু হয়। দুটো গুলি কিশোরের কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়, গায়ে লাগেনি। ডেপুটি কমিশনার বাখলে বেরিয়ে আসেন। কিশোরটিকে বাচ্চা ছেলে দেখে তিনি গুলি চালানো বন্ধ করার আদেশ দেন। কিশোর স্লোগান দিতে শুরু করে। তার কাছে কোনো অস্ত্র নেই,সে নিরস্ত্র এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে সেনারা সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে যায়।

পরের দিন বিচার শুরু হয়। ম্যাজিস্ট্রেট নাম জিজ্ঞেস করলে কিশোর বলে, "আমার নাম লন্ডন তোড় সিং।" আসল নাম কিছুতেই বের করতে পারেনি। যা করেছে তার দায় স্বীকার করে কিশোর, ভগত সিং এর অনুপ্রেরণার কথা বলে। ওর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়। "মাত্র এক বছর ?" ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বাড়িয়ে চার বছর কারাবাস এর আদেশ দেন।" 

সেদিন জাতীয় পতাকা তোলার জন্য প্রাণ তুচ্ছ করে এগিয়ে আসা কিশোরের আসল নাম হরকিসেন সিংহ সুরজিৎ। ডান্ডা বেড়ি পরে অকথ্য পরিবেশে হাজতবাস করা সেদিনের সেই কিশোর পরবর্তীকালে ভারতের মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির প্রথম পলিটব্যুরোর নবরত্ন এর একজন এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় কাহিনী, এবার ১৯৪২ সাল:-
"ভারত ছাড়ো" আন্দোলনে যোগ দিয়েছে এক ছাত্রী। ১৫ আগস্ট জেলে বন্দী অবস্থায় মারা গেলেন গান্ধীজির সচিব মহাদেব দেশাই। অহল্যার নেতৃত্বে ছাত্রীরা পথে নামলো প্রতিবাদে। মিছিল। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হল ছাত্রীটি, হল তিনমাসের জেল, পুণের ইয়েরওয়াড়ায়। জেলের মধ্যে থাকাকালীন আবার অবাধ্যতার জন্য শাস্তি হয় ছাত্রীটির, বন্ধু ইন্দুতাই কেরকারের সাথে সাত দিনের সলিটারী। 

সেই ছাত্রীটির নেতৃত্বে ঠিক হয় ইয়েরওয়াড়া জেলের উঁচু পাঁচিল সাজানো হবে জাতীয় পতাকায় যাতে দূর দূর থেকে লোক দেখতে পারে। প্রথমে মহিলা বন্দীদের কাছ থেকে শাড়ি সংগ্রহ করা হয়। তার পরে সেগুলির কাপড় থেকে সেলাই করে তৈরি হয় জাতীয় পতাকা। এবার ওড়ানো হবে সেই পতাকা। কিন্তু কি ভাবে ? মহারাষ্ট্রে ছেলেরা একজন আরেকজনের পিঠে কাঁধে চড়ে হিউম্যান পিরামিড তৈরিতে ওস্তাদ। সেই আইডিয়া ধার করে মেয়েদের দিয়ে তৈরি হয় হিউম্যান পিরামিড। জেলের প্রাচীরের ওপরে পৌঁছে গিয়ে তোলা হয় জাতীয় পতাকা। ছাত্রীটির মুঠি বাঁধা হাত তখন আকাশের দিকে। 

ছাত্রীটির নাম অহল্যা রঙ্গনেকর যার জঙ্গী মনোভাব দেখে পদবি পাল্টে ডাকা হত অহল্যা "রণরঙ্গিনী" বলে। ছাড়া পাওয়ার পরে মহিলা সংগঠনের নেত্রী, মুম্বাই এর কর্পোরেটর, সাংসদ, সিআইটিইউ এই ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্য।

এবার তৃতীয় ও শেষ কাহিনী, ১৯৪৭ সাল:-
শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে এই কমরেড প্রথমে কংগ্রেসে তার পরে কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টিতে। তার পরে মোহ ভঙ্গ হয়ে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। স্বাধীনতার আগেই অসংখ্যবার কারাবরণ, অত্যাচার সহ্য করা আবার আরেকদিকে প্রথম শ্রেণীর বন্দীর আরাম আয়েশ অগ্রাহ্য করে জেল ভেঙে বেরিয়ে আসা। কালিকট এ ১৯৪৬ সালে পার্টির প্রার্থী। কংগ্রেস এর হাতে হেরে যাওয়া। গণ আন্দোলনে আবার ঝাঁপ পুনাপ্রা ভায়ালার, বিড়ি শ্রমিক ধর্মঘট, চিড়াক্কল কৃষক বিদ্রোহ। 

মাদ্রাজে তখন প্রকাসম মন্ত্রিসভা। কমরেডকে আবার জেলে ভরা হল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের সেই রাতে কুন্নুর জেলের সলিটারী সেলের গারদ ভেদ করে ভেসে আসছে আওয়াজ, "মহাত্মা গাঁধীজি কি জয়, ভারতমাতা কি জয়।"। কমরেড এর নিজের জবানিতে, "গোটা দেশ অপেক্ষায় আছে কাল সকালের সূর্যোদয়ের, তার পরেই শুরু হবে উৎসব। কতজন কত বছর ধরে অপেক্ষা করছে, সংগ্রামে আত্মত্যাগ করেছে। আমিও ওই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আনন্দিত যার জন্য আমি জীবন-যৌবনকে উৎসর্গ করেছিলাম।" কমরেড বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন কংগ্রেস এর হাতে বন্দী হয়ে, আর তারই এককালের সহকর্মী তখন বিশ্বের সামনে ভাষণ দিচ্ছেন "নিয়তির সাথে অভিসার"।

পরের দিন সকাল। একটা তেরঙা পতাকা জোগাড় করে সেটা তুলে জেল চৌহদ্দির পরিধি বরাবর হাঁটলেন কমরেড। তারপর জেলের ছাদে তোলা হল সেই পতাকা। সব বন্দীরা তার সামনে জড়ো। কমরেড তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তাদের বুঝিয়ে বললেন দিনটির তাৎপর্য। নেমে এসে আবার সলিটারী সেল। জেলার এর বদান্যতার  কয়েক ঘন্টার মেয়াদ শেষ। 

কমরেড এর নাম এ কে গোপালন। ছাড়া পাওয়ার পরে পাঁচ বার সাংসদ। ভারতের মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির এর প্রথম পলিটব্যুরোর নবরত্ন এর একজন। 


পোকায় খাওয়া একটা দেশ লাভের ৭৫ বছরের বেশি বুড়িয়ে যাওয়া অগ্রাহ্য করে কাল আবার সেই জাতীয় পতাকা উঠবে দেশের কোনায় কোনায়। আসুন, একবার, সেই পুরোনো রংচটা তিনটে পতাকার কথা মনে করে একটু রং লাগাই। হোসিয়ারপুর আদালতের মাথায়, ইয়েরওয়াড়া জেলের প্রাঙ্গনে, কুন্নুর জেলের পাঁচিলের ওপর পতপত করে উড়তে থাকা সেই পতাকা, আমার আপনার প্রিয় তেরঙ্গা।

মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০২৩

২২শে শ্রাবণ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

আজকের দিনে যে মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি আমাদের মধ্যে কতটা জড়িয়ে ছিলেন তার ব্যাপ্তি হিসেবে চারটে ছোট্ট গল্প শোনাবো। 

ঘটনা এক। সুদূর বিদেশের। "ঘটনাটা ঘটেছিল পোল্যান্ডের বুকে। ১৯৪২ সাল, পোল্যান্ড তখন পুরোপুরি নাৎসি সেনাদের দখলে। ৩৫ লক্ষ ইহুদি জানেন না আদৌ এই সময় পেরিয়ে যেতে পারবেন কিনা। ধরে ধরে মানুষকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। হয় তাঁদের ক্রীতদাসের মতো খাটানো হচ্ছে, আর নয়তো মেরে ফেলা হচ্ছে। সেইসময় পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরের বুকে একটি অনাথ-আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন ইয়ানুস কোরচাক নামে এক ব্যক্তি। তাঁর আশ্রমের প্রায় ২০০ বালক-বালিকার সকলেই ইহুদি। তাদের জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ইহুদি ঘেটোতে। ঘেটো মানে বিরাট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা জেলখানা। সেই সময়েও শিশুদের হাত ছেড়ে দেননি কোরচাক। তিনিও আশ্রয় নিলেন সেই ঘেটোর মধ্যেই। সেখান থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ত্রেবলিনকা মৃত্যুকূপে। কাউকে আবার প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। তাঁদের একমাত্র অপরাধ তাঁরা ইহুদি। মৃত্যু আর বেশি দেরি নেই। এই সত্যিটা বুঝতে সময় লাগেনি। আর এই মৃত্যুচেতনার মধ্যে সেদিন আবারও আশ্রয় দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কবি নিজে ততদিনে পাড়ি দিয়েছেন সেই পাঁচমুড়ো পাহাড়ের নিচে, শ্যামলী নদীর ধারে – আর এই অসহায় শিশুদের গন্তব্যও সেখানেই। খুব শিগগিরি। নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন কোরচাক। কিন্তু এই শিশুরা! এদের তিনি প্রস্তুত করবেন কীভাবে? ঠিক করলেন সেই ইহুদি ঘেটোর মধ্যেই একটি নাটক অভিনয় করাবেন শিশুদের দিয়ে। কী সেই নাটক? নাটকের নাম 'পোচতা'। পোলিস ভাষায় যার অর্থ 'ডাকঘর'। হ্যাঁ, ১৮ জুলাই ১৯৪২, রবীন্দ্রনাথের সেই অমল আর দইওয়ালার কথোপকথনের সাক্ষী ছিল সেদিন ঘেটোর মধ্যে মৃত্যুর জন্য দিন গুনতে থাকা অসংখ্য মানুষ। যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী অমল তার নিশ্চিত ভবিষ্যতকে গ্রহণ করেছে আবিষ্কারের আগ্রহে। নাটকে অবশ্য অমল তার কাঙ্খিত রাজার চিঠি হাতে পায়নি। কিন্তু ইহুদি ঘেটোর সেই শিশুরা শমন পেল কিছুদিনের মধ্যেই। ৬ আগস্ট ১৯৪২, অর্থাৎ নাটকের অভিনয়ের ঠিক আড়াই সপ্তাহ পর কোরচাক, তাঁর সমস্ত সহকর্মী এবং ১৯৫ জন অনাথ বালক-বালিকাকে চলে যেতে হয় ত্রেবলিনকায়।অদ্ভুত এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিল সেদিন নাৎসি বাহিনী। কোরচাকের পিছনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে সমস্ত বালক বালিকা। একে একে তারা এগিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুকূপের দিকে। কারোর চোখেমুখে কোনো ভয় বা আতঙ্ক নেই। মৃত্যুকে তারা গ্রহণ করেছে সহজ ভাবেই। আর সেই নির্ভীক দৃষ্টি যেন আবারও রবীন্দ্রনাথের সেই কথাই মনে পড়িয়ে দেয়, 'আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়।"

ঘটনা দুই। ঘরের কাছে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ এর সময় নিউইয়র্ক এর পাকিস্তান রাষ্ট্রদূত দপ্তরের কর্মচারীরা দোটানায় পড়েছিলেন। কোনদিকে থাকবেন, একদিকে ফরেন সার্ভিসের উঁচু লোভনীয় পদ, পোস্টিং অন্যদিকে চালচুলোহীন নবীন রাষ্ট্র তৈরি হলেও হতে পারে। মন্ত্রী এনায়েত করিমকে তার বন্ধু কথা সাহিত্যিক ও কবি শওকত ওসমান মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আহবান জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি পাঠ করে করিম সাহেব ও আরো চোদ্দজন বাঙালি রাজপুরুষ মনস্থির করে পদত্যাগ এর পরে যোগ দেন মুক্তি সংগ্রামে। পরে ওরা বলেছিলেন যে ওসমান এর চিঠির শেষ চারটে লাইন তাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। সেই লাইন গুলি ছিল: "জমা হয়েছিল আরামের লোভে/ দুর্বলতার রাশি,// লাগুক তাহাতে লাগুক আগুন,/ ভস্মে ফেলুক গ্রাসি।" 

ঘটনা তিন। নিজের দেশের মাটিতে।।"..জেলার সাহেব আমাদের নারায়নদা ও নিরঞ্জনদা (ডা নারায়ণ রায় ও নিরঞ্জন সেন সেলুলার জেলে বন্দী দুই বিপ্লবী ও পরে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের নেতা)কে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বললেন, দুঃখের বিষয় মোহন, মোহিত ও মহাবীর (১৯৩৩ সালের অনশন ধর্মঘটের তিন শহীদ মোহনকিশোর নমদাস, মোহিত মৈত্র ও মহাবীর সিং) তিন জনেই মারা গেছে। সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হল। বন্দীদের মুখে কোনো কথা নেই। নীরব প্রতিজ্ঞার মাঝে শুধু অশ্রু ঝরছে। এর পর থেকে অনশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর 'সেল' খোলে নি। ২৪ ঘন্টা সেল বন্ধ। এই আবদ্ধ অবস্থায় সেল থেকে সেলে চিৎকার করে জানিয়ে দেওয়া হল - আরো বেশিদিন টিঁকে থাকতে হবে, চালিয়ে যেতে হবে। বন্ধুরা গান ধরল: "নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার"। 

ঘটনা চার। হৃদয়ের আরো কাছাকাছি। "১৯৩৮ সাল। রানীগঞ্জের কাছে বল্লভপুর পেপার মিলে শ্রমিক ধর্মঘট – তাতে পিকেটিং জোরদার করতে হবে।কর্মীরা সবাই জড় হয়েছে। ইউনিয়নের তরুণ নেতা কমিউনিস্ট কর্মী সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুদিন মাত্র বিয়ে  করেছেন। নববধূ মিনতি করে চিঠি লিখেছিলেন সংগ্রামের আগে একবার দেখা করে যেতে। সুকুমার যেতে পারেন নি -আসন্ন কঠিন সংগ্রামের প্রস্তুতির কাজে। কর্মীরা সবাই জড়ো হয়েছেন। একজন হটাৎ বললেন, "সুকুমার, আজ একটা গান করুন না। কাল থেকে তো আর নিশ্বাস ফেলার সময় পাওয়া যাবে না।" উচ্চবাচ্য না করে হাতের চায়ের পেয়ালা এক চুমুকে শেষ করেই গান ধরলেন, "যাও,যাও,যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও।" সবাই অবাক হয়েছিল, কি মিষ্ঠি গলা। প্রাণ ঢেলে গাইলেন। গান থামতেই সবাই সমস্বরে বলে উঠল - "আর একটি"।।বিনয় নম্র হেসে গলা ছেড়ে ধরলেন -"ওগো সুন্দর"। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনলে। সে গানের আওয়াজ কি গিয়ে পৌঁছল সেই বিশেষ ব্যাকুল হৃদয়ের কাছে। এর কয়েকদিন পরেই পিকেটার সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর দেহ নিষ্পিষ্ট হয়ে গেল মালিকের লরির চাকার তলায়। পুলিশের সাহায্যে ধর্মঘট ভাঙার জন্য লরিতে করে মালিক লোক আনছিল বাইরে থেকে।"

এই মানুষটি আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবেন? আমরাই  বা কোথায় যাবো তাঁকে ছেড়ে? আমাদের ঠাকুর তো একটাই। রবি ঠাকুর।

"বিদায় করেছ যারে নয়ন-জলে,
এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে?"