খবর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
খবর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

তুরতুরি টি এস্টেট ~ শৈবাল বিষ্ণু

সে প্রায় আশি বছর হতে চলল। দুূর দুরান্ত থেকে স্বাধীনতার হালকা আভাস ভেসে আসছে। দেশের রাজনীতি প্রচণ্ড উত্তাল। ঢেউ ভাঙছে, কারা টুটছে। কিন্তু অতদূর পর্যন্ত সে ঢেউ, সে আভাস পুরোপুরি পৌঁছয়নি। হালকা অন্ধকার। রাস্তার দুপাশের উঁচু উঁচু গাছের ডালপালা গুলো নিজেদের মধ্যে জড়াজুড়ি করে আছে, বিকেলের রোদ্দুর রাস্তায় পড়তে পারছেনা। তাই এখানে অন্ধকারটা আরেকটু বেশী। 

আবার ওদিকে ঘড়িতে চারটে বাজে, শীতকালের বিকেল, অন্ধকার হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। আলিপুরদুয়ার থেকে তেইশ মাইল মত। বড়জোর এক ঘণ্টার রাস্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোতর পৃথিবী। মিলিটারির থেকে কেনা সেকেন্ড হ্যান্ড বিএসএ মোটর সাইকেলের ঘুভ ঘুভ গম্ভীর আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত দুপাশের জঙ্গল চিরে বুকের মধ্যে একটা ভয় ধরাচ্ছে প্রাণীকুলের। তারা রাস্তা থেকে সর সর আওয়াজ তুলে দূরে চলে যাচ্ছে, যতটা পারে, আবার কৌতূহলও রয়েছে তাদের, তাই একটু দূর থেকে লক্ষ্য রাখছে রাস্তা দিয়ে কে যায়, একটু লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা যাক! ওদের চোখের ওপর লাইট পড়তেই কৌতূহলী চোখগুলো জ্বলতে থাকছে। 

সেনবাবু প্রতি সোমবার আর শুক্রবার আলিপুরদুয়ার গিয়ে বাজার করে আনেন। ওনার এই বাহনকে সবাই চেনে, পুরো তেইশ মাইলের দুপাশের মানুষ। এবং অন্যন্য প্রাণীরাও। এড়িয়ে চলে তারা। অবশ্য মানুষরা দুপাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। শিশু মানুষরা চোখ বড় বড় করে দেখে। জঙ্গলের  শিশু প্রাণিরা শুধুই শোনে। হয়তো কেউ কেউ দূর থেকে দেখেও নেয়। 

আজ মোটর সাইকেলের পেছনে বসে আছে সেনবাবুর দোকানের কর্মচারী গদাই। দুই ব্যাগ মালপত্র ধরে আছে। আজ শুক্রবার, রোববারে অনেক বিক্রী বাটা হবে। মাস তিনেক আগেই এই রাস্তায় ফিরতে গিয়ে রাস্তায় একটা চিতাবাঘ এসে গেছিল। মোটর সাইকেলের হেডল্যাম্পের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল বেচারার। কোনোরকমে মাত্র কুড়ি ফিট দূরত্বে দাঁড় করাতে পেরেছিলেন মোটর সাইকেল। সেই চিতাবাঘ ঘুভ ঘুভ আওয়াজে ঘাবড়ে গিয়ে ছুটতে ছুটতে পালিয়ে গেছিল ওই জয়ন্তীর দিকে জঙ্গলে। তাই তার পর থেকে গদাই সাথে আসে। কিন্তু সেই গদাই এর জন্যেই যে আজ একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে, কেই বা জানত।

শামুকতলা থেকে বাঁ দিকের রাস্তা নিয়েছেন সেন বাবু। কোহিনূর চা বাগান ডাইনে রেখে এগোচ্ছেন। শীতকালের বিকেল, তাড়াতাড়িই সন্ধে হয়ে এসেছে। আজ আলিপুরদুয়ার থেকে বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেছিল। লোকনাথপুরও পেরিয়ে গেছেন। সামনে ঘন জঙ্গল। ডাইনে রায়ডাক বাগান। বাঁ দিকের জঙ্গল বেশ ঘন, বক্সার জঙ্গলে বাঘ আছে। আর এই সময়টায় ওনারা শিকারে বেরোন। লোকনাথপুরের রাস্তায় অনেকগুলো বাইসন, ওই যাদের পায়ে সাদা মোজা, সেই ভারতীয় গৌড় এক পাল রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ওদের জন্যেই দেরী হয়ে গেল আরও বেশ খানিকটা। 

আর মাত্র মাইল পাঁচেক বাকি তুরতুরি চাবাগান পৌঁছতে। ডানদিকে রায়ডাক বাগানে যাওয়ার রাস্তা পেরিয়ে গেলেন। তুরতুরি চা বাগানের ম্যানেজার ওনার জামাইবাবু। এইটাই এই এলাকার একমাত্র চা বাগান যার ম্যানেজার বাঙালী, অনেক সম্মান ওনার। আশে পাশের সব বাগানের ম্যানেজারই সাহেব, একমাত্র জামাইবাবু ছাড়া।

তুরতুরি চা বাগানের মধ্যেই সেনবাবুর দোকান। সব ধরনের জিনিসপত্র রাখেন। কুমারগ্রামে সোমবার করে একটা হাট বসে ঠিকই, কিন্তু রোজকার দোকান বাজারের জন্যে সবাই সেন বাবুর দোকানকেই ভরসা করে। কুলিদের সে আর্থিক ক্ষমতা নেই। তাদের ওই হাটবারই একমাত্র ভরসা।

Uploaded Image শুধু তুরতুরিই নয়, চারিপাশে মাইল পনেরোর মধ্যে কোহিনূর, রায়ডাক, ধউলাঝোড়া, কার্তিক এমনকি জয়ন্তী চা বাগানের সব বাবুদেরই সেনবাবুর দোকানই একমাত্র ভরসা।

ওদিকে সারে চারটে বাজতে না বাজতেই সন্ধের অন্ধকারটা যেন ঝপ করে চারিপাশ ঘিরে ফেলল। ঘুভ ঘুভ শব্দে চারিপাশের সব প্রাণীদের প্রাণ তটস্থ করে সেন বাবুর মোটর সাইকেল এগিয়ে চলেছে দুপাশের ঘন জঙ্গলের মাঝে সামান্য এক ফালি রাস্তা দিয়ে। পিচের রাস্তা সব আলো শুষে নিচ্ছে। প্রায় সব প্রাণীই বিচলিত, শুধু একজন ছাড়া।

সেনবাবু হঠাৎ দেখলেন সামনের অন্ধকারটা যেন একটু বেশীই কালো। 

একলা হাতি মানেই পাগলা হাতি, সেনবাবু বিলক্ষণ জানেন। উনি দাঁড় করিয়ে দিলেন মোটর সাইকেল। তাঁর পাহাড় প্রমাণ সাইজ, তিনি পঁচিশ তিরিশ ফিট দূরে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। মোটেই তিনি বিচলিত নন, একটুও ভয় পাননি। প্রচণ্ড কৌতহল নিয়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন। 

হাতিটি আসতে আসতে এগিয়ে এসে একটু দূর থেকে শুর দিয়ে সামনের চাকাটা আলতো করে আদর করতেই  মোটর সাইকেলের পেছন থেকে গদাই লাফ দিয়ে নেমে পড়েছে। সেই ধাক্কায় সেনবাবুও পড়ে গেলেন। মোটর সাইকেলের স্টার্ট বন্ধ হয়নি। তারপরের ঘটনাটুকু গদাইএর কাছ থেকেই শোনা যাক। গদাই দেখলো হাতিটি সামনের পা'টা তুলেছে ঠিক সেনবাবুর মাথার ওপরে। গদাই এরপর এক মুহুর্তও দেরী না করে এক ছুটটে গিয়ে সোজা তুরতুরি বাগানের ম্যানেজারকে পুরো ঘটনা বিস্তারিত বলতেই ম্যানেজার তাঁর শ্যালককে খুঁজতে গাড়ি নিয়ে, বন্দুক কাঁধে বেরোবার তোরজোর করতে শুরু করে দিলেন। বাড়ির ভিতরে ওদিকে কান্নার রোল। সেনবাবুর দিদি নিজেকে সামলাতে পারছেন না।

তুরতুরি চা বাগানের ম্যানেজারবাবু সবে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছেন, দেখেন মোটর সাইকেল চেপে ওনার শ্যালক, সেন বাবু বাগানের গেট পেরিয়ে ভিতরে আসছেন। শুধু ব্যাগ গুলো নেই পেছনে, গদাই ওখানেই ফেলে এসেছিল।

বাকিটা সেনবাবুর মুখেই শোনা যাক। 

আমি তো ভাবলাম আজ মরেই গেছি। হঠাৎ হাতিটা কি ভাবলো। সামনের পা'টা আমার মাথার ওপর থেকে সরিয়ে নিল। আর এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো রাস্তায় পড়ে থাকা, মোটর সাইকেলের ঘুরন্ত চাকার দিকে। মন দিয়ে শুনল ঘুভ ঘুভ শব্দ। অবাক হয়ে দেখল বন বন করে ঘুরছে পেছনের চাকা। তারপর যেন বেশ খুশী মনে হেলতে দুলতে আবার বক্সার জঙ্গলের দিকে জয়ন্তীর রাস্তায় চলে গেল।

রাস্তা থেকে উঠে, গা হাত পা ঝেড়ে মোটর সাইকেল তুলে, সোজা চলে এলাম।

দেশ আশি বছর এগিয়ে গেছে। কিন্তু সেদিনের সেই কুলিদের আজও আর্থিক ক্ষমতা নেই। কারণ তাদের বোনাস নেই, তাই পুজোতে জামা কাপর কেনার, আনন্দ করার আর্থিক সঙ্গতি কোথায়? পুজো এলো, তুরতুরি চাবাগানের কুলিরা সে আনন্দ থেকে বাদ।



বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কাল্ট তৈরী ~ অরিজিত মুখার্জী

কাল্ট তৈরীর গল্প। চলছে কয়েক বছর ধরেই। কখনো ভারতের সব সেলিব্রিটিদের ফরমায়েশ (বকলমে অনুরোধ) করা হয়েছে "মাই মোদী স্টোরি" হ্যাশট্যাগ দিয়ে প্রশস্তি লিখতে। কখনো সিবিএসইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ২রা অক্টোবর অবধি মোদীর ছোটবেলা নিয়ে সিনেমা দেখাতে। ভারতীয় যাদুঘরে মোদীর জীবনপথ নিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে। এইবার স্কুল কলেজে প্রদীপ জ্বালানোর ফতোয়া এসেছে, আর নাটক মঞ্চস্থ করারও।

বছর কয়েক আগে এরকমই সময় লিখেছিলাম। পড়ে দেখুন কোনো মহান আত্মার সঙ্গে মিল পান কিনা।

১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে, হিটলারের ৪৪তম জন্মদিনের কিছুদিন আগে মানহাইমের এক পরিবার থেকে একটা চিঠি এসে পৌঁছয় হিটলারের দপ্তরে। তাতে লেখা - "আমাদের ছোট্ট রিটা তার প্রিয় ফ্যুরারকে সম্মান জানাতে চায় হাইল হিটলার বলে। সেই জন্যে আমরা তার একটা ছবি পাঠালাম জার্মান স্যালুট করা অবস্থায়। রিটার বয়স দশ মাস, আমাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। ওকে যখনই আমরা প্রিয় অ্যাডল্ফকাকুর ছবি দেখাই, ও স্যালুট করে।"
Uploaded Image

ভোল্কার উলরিখের দু খন্ডের হিটলার বায়োগ্রাফির প্রথম খন্ডে একটা চ্যাপ্টার আছে, নাম - "কাল্ট অ্যান্ড কমিউনিটি"...ওপরের এই অংশটা সেই চ্যাপ্টার থেকে নেওয়া। কীভাবে হিটলারের পিছনে জার্মানির জনসংখ্যার বড় অংশটাই এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই আখ্যান।

১৯শে আগস্ট, ১৯৩৪ এর গণভোটের সময়ে এক জার্মান নাগরিকের পর্যবেক্ষণ - "সমস্ত বিলবোর্ডে হিটলার। প্রতিটা দোকানের জানলায় হিটলার। দোকান কেন, যত জানলা রয়েছে জার্মানিতে - ট্রাম, ট্রেন, গাড়ি, বাড়ি - প্রত্যেকটা জানলা দিয়ে হিটলার তাকিয়ে..."

বহু জার্মান নাগরিক চ্যান্সেলারির সামনে লাইন দিত তাদের প্রিয় ফ্যুরারের ছবিতে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্যে। ১৯৩৪ এর আগস্টে, হিমলার যখন তাঁর বাবামায়ের উদ্দেশ্যে হিটলারের ব্যক্তিগত বার্তা লেখা ছবি যোগাড় করে মিউনিখের বাড়িতে পাঠান, হিমলারের বড় ভাইয়ের কথা থেকে জানা যায় যে তাঁদের মা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন...

উইডম্যানের লেখায় জানা যায়, হামবুর্গে একজন জার্মান নাগরিক ভিড়ের মধ্যে কোনোভাবে হিটলারের হাতে হাত ছোঁয়াতে পেরে আত্মহারা হয়ে "আমি ওঁকে ছুঁতে পেরেছি, ওঁকে ছুঁতে পেরেছি" বলে রাস্তায় পাগলের মত নাচতে শুরু করেছিল। উইডম্যানের ভাষায়, লোকটা যদি একবারও বলতো যে সে বাস্তবে খোঁড়া ছিল, আর হিটলারের ছোঁয়ায় সেরে উঠেছে, জনতা সেই কথাও বিশ্বাস করতো...

কাল্ট এইভাবেই তৈরী করা হয়...

আজকের ভারতেও বদল কিছুই হয়নি। রাস্তাঘাটে, বিলবোর্ডে, পেট্রল পাম্পে, ভ্যাক্সিন সার্টিফিকেটে, এয়ারপোর্টের ডিজিযাত্রার গেটে, ট্রেনে, স্টেশনে...প্রায় প্রতিটা দেওয়ালে একজনেরই মুখ। জন্মদিনে দিল্লীর মেট্রো চড়ে বেড়াতে বেরিয়ে খুব কনভিনিয়েন্টলি এমন একজনের দেখা পাওয়া যায় যে কিনা স্বত:প্রণোদিতভাবে সংস্কৃতে সেই একজনের বন্দনা করে ফেলতে পারে। সেই একজনকে কখনো একত্রে হাঁস-মুরগী-হরিণ-ম্যাকবুক-ক্যামেরা-বই সহযোগে দেখা যায় - মানুষে বিশ্বাস করে। কখনো ফাঁকা সমুদ্রতটে বোতল কুড়োতে দেখা যায় - মানুষে বিশ্বাস করে। কখনো কেদারনাথের গুহায় ধ্যানস্থ অবস্থায় দেখা যায় - ফটোগ্রাফার ছবি তুলে আনে - মানুষ তাও বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করে। জি২০ সম্মেলন জুড়ে একজনেরই প্রচার হয় বিশ্বগুরু হিসেবে। আমাদের বোঝানো হয় যে ভারতের অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে। আমরা সেই সবকিছুই মেনে নিই বিনা প্রশ্নে।

কারণ, কাল্ট এইভাবেই তৈরী হয়।

চ্যালা গুরুর পথেই চলবে তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবে, গুরুর আমলে সেই দেশে বাস্তবিকই বেশ কিছুটা অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরের দশকের তুলনায়। লোকের হাতে চাকরি ছিল - সে অস্ত্র তৈরীর কারখানায় হলেও। পরবর্তীকালে যদিও প্রমাণিত হয় যে সেই উন্নতির চোটে জার্মান অর্থনীতিকে আসলে মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়তে হয়েছিল (Was there a National Socialist economic miracle?, Wehler), তবুও সেই সময়ে একেবারে অর্থনৈতিকভাবে নীচুতলার মানুষগুলোও হাতে কাজ পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল। এখানে সেসব কিছুই হয় না। পুরোটাই ফাঁপা তর্জনগর্জন...আর দেখনদারি, একটা আপাদমস্তক জোকারকে নিয়ে। পাব্লিক রিলেশনসের জমানায় হয়তো এটাই হওয়ার কথা...

কাল্ট তৈরী।

সংযোজন: আশার কথা এইটাই যে পরের একটা জেনারেশন অন্তত: এই ঠগ জোচ্চোরটাকে চিনে ফেলেছে। আল্টিমেটলি ওই "ছপ্পন ইঞ্চকা ছোটা..."

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয় কি অমূলক ? ~ অরিজিত মুখার্জী

খবরের কাগজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছেন হয়তো — ওপেনএআই আজ অবধি সলভ না হওয়া অঙ্কের প্রব্লেম সলভ করে দিয়েছে; বা অ্যান্থ্রোপিকের এআই গিটহাবের সিকিউরিটি বাইপাস করে কোথায় কী সব ফোরামের সব ডেটা মুছে দিয়েছে...ইত্যাদি প্রভৃতি।

ক্রমশ: একটা ধারণা তৈরী হচ্ছে সুপারহিউম্যান ইন্টেলিজেন্স — সিনেমার ভাষায় বললে টার্মিনেটর বা স্কাইনেট — আগতপ্রায়।  মানুষ নামের প্রজাতিটা খুব শিগগিরিই মুছে যাবে। তাই, দয়াপরবশ হয়ে টেকব্রো-রা তাঁদের নিজেদেরই শুরু করা এআই রেসের উন্মত্ত দৌড়ের গতি কমাতে চাইছেন।

Uploaded Image
সমস্যা হল, এই সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবীদাওয়াগুলো সবই সেই ওপেনএআই বা অ্যান্থ্রোপিকের মত এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে থেকেই আসছে, এবং সেখান থেকে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় হাইলাইট করা হচ্ছে। আমরা ভাবছি যে এরা তো এইসব নিয়েই কাজ করছে, কাজেই যা বলছে সেগুলো সবই ঘোর বাস্তব, স্কাইনেট এলো বলে। অথচ, এই দাবীগুলোর পিছনে এখনও সেরকম সায়েন্টিফিক ব্যাকিং নেই, কোনো বেঞ্চমার্কিং বা কোনো প্রপার স্টাডি নেই, শুধুমাত্র কিছু ছুঁড়ে দেওয়া তথ্য ছাড়া।

উল্টোদিকে, এমআইটির গবেষকরা রিসেন্টলি একটা পেপার পাব্লিশ করেছেন, যার নাম "পোটেমকিন আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলস" — লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল মানে চ্যাটজিপিটি, ক্লড ইত্যাদি। এই গবেষকদের বক্তব্য হল সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবীদাওয়াগুলো সম্পর্কে সাবধান হওয়া দরকার। পোটেমকিন আন্ডারস্ট্যান্ডিং শব্দবন্ধটা এঁরা ধার করেছেন ঐতিহাসিক "পোটেমকিন ভিলেজ"-এর কনসেপ্ট থেকে, যেখানে ফাঁকা জমির চারপাশে সুন্দর বাঁশের বেড়া আর চালা বা কার্ডবোর্ডের তৈরী বাড়ির দেওয়াল বসিয়ে গ্রাম বা লোকালয়ের চেহারা দেওয়া হয় শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যে। এঁদের বক্তব্য হল, আধুনিক এআই ঠিক একইভাবে বুদ্ধিমত্তার ফাসাড (মুখোশ) তৈরী করতে সক্ষম। বলা ভালো পারদর্শী, কারণ সেইভাবেই এগুলো তৈরী। আধুনিক এআই যে কোনো প্রফেশনাল পরীক্ষায় ৯০% স্কোর করে দেবে; বা কমপ্লেক্স থিওরি বা ডেফিনেশন লিখে দেবে নিখুঁতভাবে৷  কিন্তু সেই বাস্তব জীবনের কোনো কাজে সেই থিওরি প্রয়োগ করতে বলুন, বা তার নিজের লেখার মধ্যে কনট্রাডিকশন খুঁজে বের করতে বলুন — পারবে না, বা ছড়িয়ে ফেলবে। কারণ মানুষ যেভাবে ধারণা তৈরী করে, বা বুঝতে শেখে, এআই সেভাবে চলে না। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া বা অ্যান্থ্রোপিকের মত হাজার হাজার বইয়ের পাতা ছিঁড়ে স্ক্যান করে সেই সমস্ত বই ধ্বংস করে পাওয়া বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে আয়ত্ত করা প্যাটার্ন ম্যাচিং-ই এআইয়ের শেখার আর উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি।

এখনো অবধি আনসলভড ম্যাথস প্রব্লেমও যখন এআই সলভ করে, বা গিটহাবের সিকিউরিটি বাইপাস করে ফোরামের তথ্য মুছে দেয় — যা দেখিয়ে সুপার ইন্টেলিজেন্সের তত্ত্ব আমদানি করা হয় — সেক্ষত্রেও এআই তার আগে দেখা/চেনা প্যাটার্নের ওপর ভিত্তি করে খুব সফিসটিকেটেড অনুমান বা গেসওয়ার্ক চালায়। যেহেতু কম্পিউটিং ক্ষমতা বেশি, তাই ট্রায়াল অ্যান্ড এরর ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি করতে পারে। তবুও দিনের শেষে সেটা সেই প্যাটার্ন নির্ভর গেসওয়ার্ক। আপনি সেই ম্যাথস প্রব্লেমের নিয়ম বদলে দিন, বা গিটহাবের সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্কের নিয়ম বদলে দিন — যা আগে দেখা নয় — দেখবেন এই সুপার ইন্টেলিজেন্স সম্পন্ন এআই বাজেভাবে ছড়াচ্ছে, যেখানে একটা মানুষ অল্প চেষ্টায় অ্যাডাপ্ট করতে পারত।

যে কথাটা আমরা প্রায় রোজই বলি — এই হাইপ তৈরীর পিছনে আদতে রয়েছে একটা কম্পিটিশন — প্রযুক্তির পাবলিক লীডারবোর্ডে কে ওপরে থাকবে, আর তার ভিত্তিতে কে কত ফান্ডিং টানতে পারবে। কারণ সুপার ইন্টেলিজেন্সের গল্প বিকোয় ভালো। স্কাইনেট বা মেট্রিক্স টাইপের সেন্টিয়েন্ট এআই দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয় দেখানো যায়। ভয়ও বিকোয় ভালো।

আসল বিপদটা এআই মানুষের মত বুদ্ধিমান হয়ে গিয়ে মানুষকে মেরে ফেলবে সেটা নয়। বরং আসল বিপদ হল আমরা বাইরের সাফল্যে বেশি মুগ্ধ হয়ে গিয়ে, বাস্তব জগতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এমন যন্ত্রের হাতে তুলে দেব যার মধ্যে নমনীয় বোধশক্তির অভাব রয়েছে। এআই নিজে থেকে ভেবেচিন্তে আপনাকে মারবে না, মারবে কোনো ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে (ধরুন অটোনোমাস গাড়ি) এআইয়ের করা একটা মাত্র ভুল...

আরো একটা বাস্তব সমস্যা রয়েছে। আমরা যা কাজ করি — অফিসে, স্কুলে, কলেজে, কোর্টকাছারিতে — তার মধ্যে একটা বড় অংশই প্যাটার্ন নির্ভর। একই প্যাটার্নে হয়ে চলে। গল্প, কবিতা, সিনেমা, নাটক — সবই বলতে পারেন নানান আগে দেখা প্যাটার্নের রিমিক্স। এই সমস্ত কাজই হয়তো এআই করে দেবে একসময়, আর কর্পোরেট বা অন্য সংস্থাগুলো সেটা মেনে নেবে, রাদার এনকারেজ করবে। কারণ এআই ছুটি চায় না, মাইনে বাড়াতে বলে না, তার অসুখ করে না, সে ইউনিয়ন বানায় না...

এমআইটির আরো একদল গবেষক আরো কিছু ভয়ানক তথ্য সামনে এনেছেন নিজেদের ইনস্টিট্যুটের ভিতর থেকে। জানা যাচ্ছে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছে, এবং তাদের মধ্যেই মেজরিটি এও মনে করছে যে এর ফলে তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে...তারা ক্রমশ: এআই নির্ভর হয়ে পড়ছে। এমআইটি তাই তাদের শিক্ষণপদ্ধতির বদল করার কথাও ভাবছে...

পোটেমকিন পেপারটার লিঙ্ক নিচে দেওয়া রইল। চাইলে পড়তে পারেন।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এআই কি সত্যিই বিপজ্জনক ~ অনির্বাণ অনিক

দুদিন ধরে প্রযুক্তির দুনিয়ায় এক নতুন নাটকের মহড়া চলছে। সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই এবং ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান হঠাৎ খুব চিন্তিত মুখে ঘোষণা করেছেন, "এআই খুব বিপজ্জনক গতিতে এগোচ্ছে, আমাদের এখনই এর গতি কমানো উচিত!" 

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে তারা মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু খেয়াল করে দেখেছেন, "এআই-এর গতি কমাও" বলে সবথেকে জোর গলায় চিৎকার সেই একই সিইও-রা করছেন, যাঁরা নিজেরাই নতুন ডেটা সেন্টারে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালছেন? অ্যানথ্রোপিকের সিইও দারিও আমোদেই সম্প্রতি "উই মাস্ট পেস দ্য ফ্রন্টিয়ার" নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করে অনিয়ন্ত্রিত 'সুপারইন্টেলিজেন্স' বা অতি-বুদ্ধিমত্তার বিষয়ে সতর্ক করেছেন, আর স্যাম অল্টম্যানও তড়িঘড়ি তাঁর সমর্থনে সুর মিলিয়েছেন। 

আমি এই টেক ব্রোদের ১০% দাবীকেও বিশ্বাস করিনা। আমার ধারণা এটা "ডুমার অ্যাজ বুস্টার" নামের এক চরম কর্পোরেট মার্কেটিং চাতুরী। এই ধরনের কাল্পনিক ধ্বংসের গল্প ফাঁপিয়ে তোলার মূল উদ্দেশ্যই হলো কাস্টমারদের পরোক্ষভাবে বোঝানো যে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি। 

ওপেনএআই ২০২৫ সালে প্রায় ১,৩০৭ কোটি ডলার আয় করলেও তাদের পরিচালন ব্যয় ছিল প্রায় ৩,৪০০ কোটি ডলার, অর্থাৎ কেবল এক বছরেই অপারেটিং ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,০৯২ কোটি ডলারে এবং ইনফারেন্স খরচের পেছনেই ব্যয় হয়েছে ৮৪০ কোটি ডলার। যখন মূল উপার্জনের খতিয়ান শক্ত থাকে না, তখন এই কেয়ামতের মতো বিপর্যয়ের হেডলাইন তৈরি করে রাখলে বাজার আর বিনিয়োগকারীদের নজর আসল আয়-ব্যয়ের বাস্তব হিসেব ছেড়ে ওই কাল্পনিক 'সুপারইন্টেলিজেন্স'-এর দিকেই বুঁদ হয়ে থাকে।

Uploaded Image সুরক্ষানীতির অজুহাতে এই কোম্পানিগুলো মডেলের ওয়েট বা ওপেন-সোর্স অ্যাক্সেস বন্ধ রাখার পরামর্শ দিচ্ছে, যাতে জনসুরক্ষার কথা বলে মূল প্রযুক্তির চাবিকাঠিটা সিলিকন ভ্যালির বোর্ডরুমের ভেতরেই কুক্ষিগত করে রাখা যায়। অন্যদিকে, সুরক্ষার অজুহাতে পাবলিক লিস্টিং বা আইপিও পিছিয়ে দেওয়াটা শেয়ার বাজারের প্রকাশ্য নজরদারি এড়িয়ে নিজেদের আয় গুছিয়ে নেওয়ার সুন্দর সুযোগ করে দেয়।



তদুপরি এরা বলে চলেছেন - "চীন তো এআই বানানো থামাচ্ছে না, তাই আমাদেরও থামা চলবে না"। এই অজুহাতটা স্রেফ একটা ঢাল। যাতে থামার কোনো প্রশ্ন না তুলে একের পর এক নতুন সিস্টেম বাজারে আনা যায় এবং নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য (Monopoly) ধরে রাখা যায়।

বিষয়টা আসলে দুমুখো কৌশল। একদিকে এই সিইও-রা বিশাল সব ডেটা সেন্টার বানানোর জন্য সরকার আর সাধারণ করদাতাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি ও ফান্ড দাবি করেন, আর অন্যদিকে ছোট বা দেশীয় প্রতিযোগীরা যাতে বাজারে উঠে আসতে না পারে, সে জন্য সরকারি নিয়ামক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আইনি সুরক্ষার কড়াকড়ি বা নিজেদের মতো নিয়ম বানিয়ে নেওয়ার সুবিধা চান।

এর সাথে যোগ করুন ভবিষ্যতের এআই পরিকাঠামো তৈরির জন্য টেক কোম্পানিগুলোর কোটি কোটি টাকা ইনভেস্টমেন্ট। এআই নিজে কোড লিখে মানুষের চাকরি যতটা না কাড়ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে টেক-কোম্পানিগুলোর এআই পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য কস্ট-সেভিং করতে গিয়ে হাজার হাজার কর্মীর ছাঁটাই'এর কারণে। কোড লেখা কোনদিনই কগনিটিভ লোড বা মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করত না। সময় লাগত, যেটা এআই এসে কমিয়েছে। কিন্তু কগনিটিভ লোড হ্রাস করেনি। বরং ছাঁটাই'এর ফলে কোম্পানিগুলোতে পড়ে থাকা কর্মচারীদের মধ্যে কগনিটিভ লোড ১০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এই টেক ব্রো'রা মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে সত্যিই এত চিন্তিত হলে কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত হত। তা তো হয়না। মানুষের সুরক্ষা নিয়ে এত চিন্তিত হওয়াটা স্রেফ এঁদের ধ্যাস্টামি!

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

কোথাও মানুষ ভালো রয়ে গেছে ~ সুব্রত ঘোষ

১৯৯১ সাল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ল। তীব্র সংকটে পড়ে গেল কিউবা। পেট্রোল নেই, রাসায়নিক সার নেই, ট্রাক চলে না। ৮০% খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল যে দেশ নতুন পরিস্থিতিতে সেই দেশে খাবারের জন্য হাহাকার শুরু হল শহরে শহরে।

তখনই কিউবার মানুষ বেছে নিল এক অভিনব পথ: “Organopónicos”। গ্রীনহাউস স্টাইলে চাষ পদ্ধতির সূচনা হল দেশে। কৃষিমন্ত্রক অনুমোদন দিতেই তারা শহরের পরিত্যক্ত জায়গা, রাস্তার পাশে, পার্কে , ছাদে, ব্যালকনিতে শুরু করল জৈব চাষ। নাম দিল “Organopónicos.”

Uploaded Image পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ শহরভিত্তিক জৈব কৃষি আন্দোলন এভাবেই শুরু হয় হাভানার বুকে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই উৎপন্ন হচ্ছিল শাকসবজি। স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেরাই শ্রম দিচ্ছিল, নিজেরাই খাচ্ছিল।পরিবেশ বান্ধব চাষবাসই হয়ে ওঠে শহরের খাদ্যনির্ভরতার ভরসা। সমাজতান্ত্রিক মডেলে উৎপাদিত খাবার সমানভাবে ভাগ হয়ে পৌঁছাত সাধারণ মানুষের ঘরে। 



ডন আলফ্রেডো, হাভানার এক শহরতলিতে নিজের বাড়ির পাশে ফাঁকা জায়গায় উদ্যোগ নিয়ে একখণ্ড জমি তৈরি করেন। এখন এই ২০২৫তে তার চাষ করা পালংশাক পৌঁছে যায় ৬০টি পরিবারের প্লেটে।

 কিউবার এই urban organic farming revolution—এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী, এবং সাধারণ জনগণের একত্রে গড়ে তোলা এক বিকল্প পথের ইতিহাস। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবায় শুরু হয় "Special Period in Time of Peace" —এই সময়েই কিউবার রাষ্ট্র নেতৃত্ব ঘোষণা করে “আমরা স্থানীয় উৎপাদনেই খাদ্যনির্ভরতা গড়ব”। কিউবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান INIFAT (Instituto de Investigaciones Fundamentales en Agricultura Tropical) জৈব সার, কম্পোস্টিং, প্রাকৃতিক কীটনাশক ইত্যাদির ব্যবহার করে কেমন করে শহরে চাষ করা যায়— সে বিষয়ে সরকারকে নীতিগত পরামর্শ দেয়।

পাড়াভিত্তিক সংগঠনগুলো খাদ্য উৎপাদনে স্থানীয় মানুষদের একত্র করে, স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাগান তৈরি করে, এবং খাদ্য বণ্টনের দায়িত্বও নেয়। হাভানার বাসিন্দা মারিয়া গঞ্জালেজ, যিনি সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাদে বাগান তৈরি শুরু করেন, তিনি এক পাড়া ক্লাব গড়ে তোলেন— যেখানে শিশুদের নিয়ে কৃষিকাজ শেখানো হতো। হাভানার প্রতিটি পৌর এলাকায় অন্তত একটি করে urban farm থাকতেই হবে— এ ছিল সরকারি নিয়ম। "Local food, zero transport, no chemicals" ছিল মূল শ্লোগান।

২০০৩ সালের মধ্যেই কিউবার শহরগুলোতে প্রায় ৩৫,০০০ হেক্টর জমি শহুরে জৈব চাষে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ঐ বছর দেশের কৃষি উন্নয়ন সম্মেলনে ফিদেল কাস্ত্রো বলেন "জৈব চাষ করছেন মানে আপনি পিছিয়ে পড়ছেন না। এই পদ্ধতি আমাদের বাস্তবকে স্বীকার করে নিতে শেখায়। এই নতুন পরিস্থিতিতে আমরা শিখেছি যে অসাধারণ কিছু করা যায় বিষ বা পেট্রোলিয়াম ছাড়াই।" যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এই স্বনির্ভর কৃষি আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শহরের মানুষ যদি নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করে, তাহলে সাম্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সচেতনতা — সব একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। তিনি বললেন "Con la tierra y el sudor, no hay dictadura que gane.” মাটি আর ঘামের সঙ্গে থাকলে কোনো একনায়কতন্ত্রই জিততে পারে না।

২০০৬ সালে জাতিসংঘের FAO (Food and Agriculture Organization) কিউবার শহরভিত্তিক কৃষিকে “একটি বৈশ্বিক মডেল” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। হাভানায় Urban Agriculture International Congress এ ২০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি কিউবার অভিজ্ঞতা শোনেন। নেপালে ২০১৫-র ভূমিকম্পের পরে, কিছু NGO কিউবার মডেল অনুসরণ করে শহরে চট, বাঁশ ও প্লাস্টিক ব্যাগে অর্গানিক খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ শুরু করে। 


বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

মিডিয়া তে ছাঁটাই ~ অনির্বাণ মাইতি

ভারতের বেশ কয়েকটি বড় মিডিয়া সংস্থা যেমন ABP Group, Network18, HT Media, Times Group, Aaj Tak সম্প্রতি এদের কর্মী ছাঁটাই বা পুনর্গঠনের খবরের শিরোনামে এসেছে।

 সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে Aaj Tak-এর হিন্দি ওয়েব টিমে। এছাড়া ক্যামেরা, ভিডিও এডিটিং, গ্রাফিক্স, ফ্যাক্ট-চেকিং, Data Intelligence Unit, Aaj Tak Radio এবং India Today-এর ইংরেজি ডিজিটাল টিমের কিছু কর্মীও ছাঁটাইয়ের আওতায় এসেছেন। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১২০ জন কর্মীকে একসঙ্গে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কর্মীদের দাবি অনুযায়ী, অনেককে হঠাৎ জানানো হয় যে সেদিনই তাদের শেষ কর্মদিবস।
Uploaded Image


কেন এই ছাঁটাই?

মিডিয়া বিশ্লেষকদের মতে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে:

* টিভি ও প্রিন্টের বিজ্ঞাপনের আয় কমে যাওয়া।
* ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দর্শক ও বিজ্ঞাপন সরে যাওয়া।
* AI ও অটোমেশন ব্যবহার করে কম জনবল দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা।
* বিভিন্ন মিডিয়া হাউসের ব্যয়সংকোচন (cost rationalisation)।

এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক সংকট নয়। ভারতীয় মূলধারার টিভি নিউজ ইন্ডাস্ট্রি একসঙ্গে তিনটি বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে।

১. ব্যবসায়িক মডেল ভেঙে পড়ছে

এক সময় টিভি নিউজের মূল আয় ছিল বিজ্ঞাপন। এখন সেই বিজ্ঞাপনের বড় অংশ Google, Meta, YouTube এবং OTT প্ল্যাটফর্মে চলে যাচ্ছে। দর্শকের সময়ও টিভি থেকে মোবাইলে সরে গেছে। ফলে নিউজ চ্যানেলগুলোর আয় কমছে, কিন্তু স্টুডিও, স্যাটেলাইট, রিপোর্টিং নেটওয়ার্কের খরচ প্রায় একই রয়ে গেছে।

ফলত প্রথমে বেতন বৃদ্ধি বন্ধ, তারপর নিয়োগ কমানো, শেষে ছাঁটাই।

২. বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট

এটি আরও গভীর সমস্যা।

সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সময় বহু মূলধারার টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকদের “গোদি মিডিয়া” বলে বিক্ষোভকারীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই ঘটনা দেখায় যে সমাজের একটি বড় অংশ মূলধারার টিভি সংবাদকে আর নিরপেক্ষ মনে করছে না। 

একটি সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস দুর্বল হলে দর্শক বিকল্প খোঁজে—YouTube সাংবাদিক, স্বাধীন ডিজিটাল পোর্টাল, নিউজলেটার বা সোশ্যাল মিডিয়ায়।

৩. AI, এটি তর্কসাপেক্ষ , মূল কারণ নয়

অনেকে বলেন, “AI চাকরি খেয়ে ফেলছে।”

আংশিক সত্য।

বাস্তবে AI এমন কাজগুলো দ্রুত করছে যেগুলো আগে জুনিয়র কর্মীরা করতেন—ট্রান্সক্রিপশন, অনুবাদ, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ভিডিও ক্লিপিং, প্রাথমিক স্ক্রিপ্ট লেখা, থাম্বনেইল ইত্যাদি। তাই যেসব প্রতিষ্ঠানের আয় আগেই কমছিল, তারা AI ব্যবহার করে আরও কম লোক নিয়ে কাজ চালাতে পারছে। বিশ্বজুড়েই কর্পোরেট সংস্থাগুলো AI-নির্ভর পুনর্গঠন করছে। 

সাংবাদিক বন্ধুরা সতর্ক হন। সরকারের তৈরী করা ন্যারেটিভ আপনাদের প্রচার করতে হয়, পেটের তাগিদে। এটা কেউ বোঝে না তা নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে সরকার বিরোধী হাওয়া প্রবল বইছে ভারত ও বঙ্গপসাগর উপকূলে। সুতরাং সরকারের ধামাধারী হওয়াও আপনার ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করবে না। যারা চাকরি হারিয়েছেন ভেঙে না পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের সামাজিক দায়িত্ব এবার পালন করুন। সবাই মিলে হাত লাগিয়ে ধাক্কা দিলে বিশ্বাস রাখুন এই জগদ্দল পাহাড় নড়ে যাবে, যাবেই।

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

দিল্লি ডাইরি: যন্তর মন্তরের ইন্ডিয়া ~ শময়িতা চক্রবর্তী

দিল্লি ডাইরি: যন্তর মন্তরের ইন্ডিয়া

না লিখে রাখলে ভুলে যাব, তাই...

সোমবার, ২০ জুলাই: প্রথম টিয়ার গ্যাস জনপথে। প্রেস কার্ড সঙ্গে থাকলে পুলিশের লাঠি থেকে বাঁচা যায়। টিয়ার গ্যাস আবার প্রেস কার্ড বোঝে না। দম যখন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে, একটা বাচ্চা মেয়ে (২২-২৪ বছর হবে) তার ওড়না খুলে অর্দ্ধেকটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, নাক মুখ চেপে রাখো। চোখ খুলো না। বাকি হাফ দিয়ে নিজের নাকে জড়িয়ে রাখল। ব্যাগ থেকে ছোট জলের বোতল বের করে খানিকটা নিজের চোখে দিল। বাকিটা আমার মুখে ছেটাল। ধোঁয়া কমলো, মিষ্টি হেসে ভিজে ওড়না উড়িয়ে চলে গেল।

পরের টিয়ার গ্যাস। আরেকজন বাচ্চা ছেলে হাত ধরে দৌড়ে নিয়ে গেল রাস্তার পাশে রাখা জলের ট্যাঙ্কে। বলল, 'জিতনা হোসাকে পানি দিজিয়ে।' চোখ খুলে দেখলাম, সে হাওয়া।

জনপথে যখন অটো চলতে শুরু করলো, তখন অফিস যাওয়ার তাগিদ হল। পাঁচজন অটোওয়ালা রিফিউজ করার পরে একজন রাজি হলেন। বললেন, 'যারা আজ মিছিলে এসেছে তাদের জন্যই আজ অটো বের করেছি। নাহলে বাড়ি থাকতাম।"

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই: কেরালা হাউসের সামনে থেকে আমি আর ক্যামেরাপারসন অভিরাজ (সবাই পার্থ হয়না, কেউ কেউ অভিরাজ হয়। একই রকম হার না মানা, অভিরাজ) যন্তর মন্তরের মঞ্চের দিকে এগোচ্ছি। ব্যারিকেডে ব্যারিকেডে ছয়লাপ। আগের দিন পুলিশের সঙ্গে ওই সাংঘাতিক যুদ্ধ যেন আগুনে ঘি দিয়েছে। ভিড় বেড়েছে বহুগুণ। মঞ্চের দিক থেকে স্লোগান জোরদার হচ্ছে। একটু কাছে গিয়ে শুনলাম, 'গোদি মিডিয়া হায় হায়।' চোখের সামনে দেখলাম, এক হিন্দি ন্যাশানাল চ্যানেলের সংবাদ প্রতিনিধি এবং তার সহকর্মী ক্যামেরাপারসেনকে ব্যারিকেডের বাইরে বের করে দেওয়া হল। বলা হল, বাইরে থেকে রিপোর্টিং করতে। অভিরাজের ক্যামেরা সাক্ষী। একই সঙ্গে আমাদের ঢুকিয়ে নেওয়া হল। স্বাভাবিক ভাবেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী হল? কেন এটা করলে? রিপোর্টার তার চাকরি করতে এসেছে। এই বৈষম্য ভাল না, ইত্যাদি। হাঁটুর বয়সী ভলান্টিয়ার বলল, 'এদের গত ৩০ দিনের প্রতিবেদন দেখে এসো। তার পর তোমার কথা শুনব।' এর পরেও এই নিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। বুঝলাম, মূলধারার মিডিয়ার উপর এদের যতটা রাগ, তা সরকার বিরোধী ক্ষোভের থেকে কোনো অংশে কম না। এদের বক্তব্য, যে মিডিয়া ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেই মিডিয়া অপ্রাসঙ্গিক।  

এদিন সন্ধেয় যখন বেরলাম তখন আরেক কাণ্ড। কনট প্লেসের দিকের রাস্তায় পিটিসি দিচ্ছি। ভুল হচ্ছে যেমন হয়। আবার দিচ্ছি। এমন সময় হা রে রে রে রে রে... আবার পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে দৌড়চ্ছে। আবার জনতা ছুটছে। আবার টিয়ার গ্যাসের ওয়াগন ধেয়ে আসছে। আবার ক্যামেরাপারসন অভিরাজ ক্যামেরা নিয়ে ছুটছে। সঙ্গে ছুটছি আমিও। এমন সময় ইট বৃষ্টি। কনট প্লেসের দোকান বন্ধ হয়ে গেল ঝপাঝপ। আমি, অভিরাজ অন্যদের সঙ্গে মাথা বাঁচিয়ে সেই খণ্ডযুদ্ধ দেখে গেলাম। পরে শুনলাম, বাইরের লোক ইট পাথর মারছে। এদিন যে অঘটন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের। 

বুধবার, ২২ জুলাই: সকাল থেকে ছাত্র নেতাদের ইন্টারভিউ করছি। এদিন একা। সব শেষে আবার যন্তর মন্তর যাব। সঙ্গী হলেন এক ছোট আইসা কর্মী। তার আবার দুই পায়ে দুই রকম চটি। আগের দিন পুলিশের সঙ্গে ঝামেলায় এক পাটি হারিয়েছিল। তার পর যা পেয়েছে তাই পরে কাজ চালাচ্ছে। আজ টলস্টয় মার্গ দিয়ে ঢোকা। সেই কর্মী আমাকে তার চেনা রাস্তা চেনাচ্ছে। দেখলাম, ভিড় এড়াতে প্রতিদিনের কর্মীরা কত রাস্তা চেনেন। কীভাবে যেন সব ভিড় এড়িয়ে সরু গলি পেড়িয়ে চারটে গেট টোপকে মঞ্চের সামনে পৌঁছে গেলাম। একদম হ্যারি পটারের ম্যাজিক। এর পর আর কোনোদিন ওই রাস্তা চিনতে পারব কিনা জানি না।

Uploaded Imageআরো মজা হলো বেরোনোর সময়। এক অল্পবয়সী উকিলের সঙ্গে দেখা। একটা বাইট নেব। তার চোখ আমার জুতোয়। বলে, এটা তো থিয়েটারের জুতো। ওরা ফালতু দাম নেয়। তুমি বরং অমুক অমুক জায়গায় জুতো দেখো। স্টাইলের জুতো। কম দাম। বাইট এবং জুতোর দোকানের সন্ধান, এক ঢিলে দুই পাখি মারা হল আমার। 

প্রসঙ্গত, এদিন রাতেও খণ্ডযুদ্ধ আটকানো যায়নি।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই: আমার ফেরার কথা। হয়নি। টিকিট ক্যানসেল করতে হয়েছে। এদিন উত্তেজনা শুরু দুপুর থেকে। দুপুরে কনট প্লেস চত্বরে সমস্ত দোকান বন্ধের নির্দেশ আসে। আমরা চত্বরে পৌঁছতেই দেখই পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। অন্যান্য দিনের তুলনায় ২০ গুন বেশি পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী। সকলেই যুদ্ধসাজে রেডি। মাথায় হেলমেট, গায়ে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, হাতে শিল্ড। সাংবাদিকদের আলোচনায় তখন অফিস থেকে হেলমেট আর জ্যাকেট আনার পরিকল্পনা। সহকর্মী অন্য শহর থেকে ফোনে বলছেন ব্যাগে তোয়ালে আর জলের বোতল রাখতে। ছাত্রনেতারা মোটামুটি রেডি। সারা রাত যন্তর মন্তর পাহারা দিতে। বন্ধুবান্ধবদের থেকে ক্রিকেটের হেলমেট জোগাড় করে রাখছে। একজন বলল, শুধু মাথাটাই বাঁচাতে চেষ্টা করব। রাবার বুলেট বাঁচাতে পিঠে ব্যাগ থাকবে। জল, তোয়ালে, এই সব তো আছেই।

প্রথম অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স, দিল্লি পুলিশ পরিষ্কার জানালো, আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর অন্তত এদিন রাতে কোনো 'ক্র্যাকডাউন' হবে না। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই অনশন ভাঙলেন ওয়াংচুক। একেবারে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে জল।

শুক্রবার, ২৪ জুলাই: ফেরার দিন। তার আগে পর্যন্ত যন্তরেই। আজও ভিড়। একই রকম। বরং বেশি। অভিজিত দিপকের জ্বর। তখনও টাইফয়েডের রিপোর্ট আসেনি। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন। ভিড় ঠেকে ঢুকতে গিয়ে আমি অল্পের জন্য মিস করেছি। ব্যাস। সে মঞ্চের মাঝে চলে গেছে। তখন জেদ, একটা বাইট পেতেই হবে। ফাইনালি বলল, 'সোনামজি অনশন ভেঙেছেন। ভালো হয়েছে। ওনার প্রাণের দাম অনেক বেশি। তবে আমরা আন্দোলন চালাব যতদিন না ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন।' জেদ জিতেছে, এই টুকুই। 

এর পরেও যা যা মনে রাখার, তা হল, যন্তর মন্তরের অনেকখানি জুড়ে জ্যামার লাগানো থাকায়, এবং আমার ভি-এর এর নেটওয়র্ক থাকায় খুব ঝামেলা হয়েছে। অনেক দূর গিয়ে স্টোরি, বাইট, পিটুসি পাঠিয়ে আবার ফিরতে হয়েছে।

এসব কিছুর পরেও যা থেকে গেল: যন্তর মন্তর জুড়ে এই পাঁচদিনে যা দেখেছি তা আমার বেড়ে ওঠার ভারতের সঙ্গে মিলে যায়। গুরুদ্বোয়ারা থেকে খাবার, মসজিদের থেকে জল, এনআরআইদের ফুড ডেলিভারি, বৃষ্টি পড়লে প্লাস্টিকের রেনকোট, না পড়লে অচেনাদের হাতপাখার হাওয়া, জলের বোতল, স্যানিটারি প্যাড, হিন্দু, মুসলিম, শিখ, বিদেশি, দেশি স্বেচ্ছাসেবক, গান, ডাফলি, নাচ, স্লোগান, ডাক্তারদের ক্যাম্প, ক্যালপল, ওআরএস, স্ট্রিট প্লে , কস প্লে, কস্টিউম স্পাইডারম্যান, এভেরিথিং এভরিহোয়ার অল অ্যাট ওয়ান্স -- আমার স্বপ্নের দেশ।

যন্তর মন্তর যেন একটা ছোট ভারতবর্ষ হয়ে গেল এই কয়েকদিনে।




মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

'প্রতীক উর' প্রশ্ন ~ বিভাস সাহা

গতকাল ১৬ই ফেব্রুয়ারি বেশ একটা ঝড় বয়ে গেল। সকালে যা ছিল একটা চাপা ফিসফাস বিকেলে তা হয়ে দাঁড়ালো 'পাক্কা খবর' । অনেক চ্যানেল দীর্ঘ বিশ্লেষণ দিল যেখানে বলা হল 'মহম্মদ সেলিম এবং তাঁকে ঘিরে এক দুষ্টচক্র সি পি  এম চালাচ্ছে' এবং প্রতীক উর তৃণমূলে এসে গেছেন -- শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। 

আজ প্রতীকের  একটি সাক্ষাতকার শুনলাম। সেখানে উনি পরিষ্কার বললেন, যে চিঠিটা বাজারে ঘুরছে, সেটি উনি লেখেনইনি। উনি একটি দলীয় ফর্ম পূরণ করে ওনার মতামত যথার্থ জায়গায় জানিয়েছেন, এবং অপেক্ষা করছেন দল কী উত্তর দেয়। 

 এসব শুনে কয়েকটি জিনিস মাথায় এল, তাই এই লেখা। 

প্রথমত, প্রতীক অত্যন্ত জনপ্রিয়, লড়াকু, এবং সৎ নেতা হিসেবে জনমানসে একটি ভাবমূর্তি রাখতে পেরেছেন। তাঁকে টিভির পরদায় দেখা যায় না। তিনি যে অঞ্চলে রাজনীতি করেন সেখানে চোখে পড়ার মত দলীয় শক্তি নেই।  সর্বোপরি ওই অঞ্চলে ভাইপো ব্যানার্জীর  পোষা বাহুবলীরা সর্বক্ষণ দাপাদাপি করে। 

এসব সত্ত্বেও তিনি রাজ্যস্তরে একটি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তার মানে রাজনীতিতে এখনও  সততা এবং নীতির একটা জায়গা আছে। এটা খুবই আশার জায়গা। প্রতীক উরের মত নেতা আরও চাই এবং বাজারের খবর যাইই হোক না কেন, এইরকম নেতাদের জন্য বামদলই যথার্থ জায়গা।

দ্বিতীয়ত, প্রতীক উর যে রাজ্য নেতাদের কাছে তাঁর সদস্যপদ ছাড়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন, এই খবর উপরের স্তরের কোন নেতাই মিডিয়াকে জানিয়েছেন এবং ঠিক হিসাব করে তা কূণাল ঘোষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ব্যাপার। প্রতীক উরকে  যাতে  দল বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়, এবং তারপর তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীল, চটিচাটা ইত্যাদি বলে আক্রমণ করা যায় -- এই কুমতলব তাঁদের আছে। এটা পরিষ্কার। এরা যদি সি পি এমের শীর্ষস্তরে থাকেন, তাহলে  ভোটে যে দল খারাপ ফল করবে তার সম্ভাবনা বেড়ে গেল। 

তৃতীয়ত, সি পি এম দলটির কিছু সাংগঠনিক সংস্কার দরকার। দলের মধ্যে সদস্যদের ভিন্ন মত প্রকাশের একটা জায়গা দেওয়া উচিত। এই ভিন্নমতের  প্রশ্ন এলেই সঙ্গে সঙ্গে পার্টির গঠনতন্ত্র, সংবিধান, শৃঙ্খলা ইত্যাদি তুলে চুপ করিয়ে রাখা হয়। এটি আধুনিক যুগে একেবারেই বেমানান। তার উপর বিধানসভায় শূন্য হয়ে গেলে আরও বেমানান।  

চতুর্থত, দলের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম একটা মহাজোট করার চেষ্টা করছেন, সেটা বোঝা যায়। শুধু  ভোটের জন্য হুমায়ন কবীর ও নওশাদ সিদ্দিকি নয়, বৃহত্তর বাম ঐক্যের কথা মাথায় রেখে  উনি অনেক অতি বাম, বা বিশিষ্ট নিরপেক্ষ বাম বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে সাক্ষাত বা যোগাযোগ করে তাঁদের মতামত নিয়েছেন (এ খবর আমি জানি)। এর মধ্যে অনেক উদারতা এবং বাস্তববুদ্ধির একটা প্রকাশ রয়েছে। 

কিন্তু একই সঙ্গে দলের কর্মীদের কাছে এবং জনমানসে কী বার্তা দিতে হবে সে  বিষয়ে কোন পরিষ্কার হিসাব দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ নিজস্ব দলীয় নীতি এবং ভোটের রণনীতি ও কৌশল এই দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হবে, এবং সেটা মানুষকে এবং দলের দ্বিতীয় স্তরের নেতাদেরকে বুঝিয়ে তাঁদের সঙ্গে নিয়েই করতে হবে। 

এই কাজটা যে হয়নি, তা এই প্রতীক উর কাণ্ড থেকে বোঝা গেল। এর পাশাপাশি বিরুদ্ধ দলগুলি ও তাদের মিডিয়া থেকে যে 'সেলিম ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরছেন' এই ন্যারেটিভ ছড়ানো হয়েছে, তার কোন পাল্টা ন্যারেটিভ সি পি এম দিতে পারেনি। বরং ব্যাকফুটে খেলে চলেছে। 

আমার নিজের মূল্যায়ন, ভোট বাড়াতে গেলে এই ২০২৬-এ সি পি এমকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে তাকাতেই হবে। সেখানে হুমায়ুন কবীর যে হই চই ফেলেছেন তাতে তার সঙ্গে কথা বলার অবশ্যই একটা বড়ো যুক্তি আছে।    প্রশ্ন হচ্ছে, মুর্শিদাবাদের বাইরে হুমায়ুনের প্রভাব অন্যান্য জেলায় কতদূর এবং তার সূত্রে ভোট সি পি  এমে আসতে  পারে কিনা, এর কোন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানি না। অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের বাইরে কোন লাভ যদি না থাকে তাহলে হুমায়ুনের সঙ্গে কথা বলায় বিশেষ কোন লাভ নেই।  

হুমায়ুন-নওশাদ বিষয়টি রণকৌশলের ব্যাপার, নীতির নয়। কিন্তু বিষয়টি সি পি এম নেতৃত্ব সেভাবে প্রজেক্ট করছেন না। ফলে দলের ভিতর অনেক বিভ্রান্তি হচ্ছে।

পঞ্চমত, বিভ্রান্তি ছাড়াও সি পি এম দলের মাঝারি স্তরে (যাকে চর্বিযুক্ত মধ্যপ্রদেশ বলা যেতে পারে) একটা উদ্ধত/অশিক্ষিত কালচার আছে। (এই রোগ অন্যান্য বাম দলেও আছে।) সেখানে  সুযোগ পেলেই মার্ক্সবাদ, বিপ্লব, পুঁজিবাদ ইত্যাদি নিয়ে লেকচার দেওয়ার  প্রবণতা আছে, এবং  নিজের দলের  সমর্থক না হলে তাকে নানা বিশেষণে গালিগালাজ করা হয়। এদের নতুন কিছু শেখার বা নতুন ভাবে ভাবার কোন আগ্রহ নেই। 

এই কালচারটি বৃহত্তর বাম ঐক্যের পরিপন্থী। অতি সম্প্রতি 'মার্ক্সবাদী পথ' গোষ্ঠীর উদ্যোগে মৈত্রীশ ঘটকের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালের মধ্যে একটি অসাধারণ অনুষ্ঠান। মৈত্রীশ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অত্যন্ত সহজ ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির আপেক্ষিক অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেছেন, এবং শেষ দিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ নানা সরকারি অনুদানের বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর মতামত দিয়েছেন এবং যথার্থ সমালোচনা করেছেন । 

কিন্তু তাঁর সমালোচনা তীব্র নয় বলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে চটিচাটা বলে আক্রমণ করছেন (মৈত্রীশের ফেসবুক পেজে দেখলাম)। এগুলি অত্যন্ত রুচিহীন ব্যাপার। এই নিন্দা যদি কোন সি পি এম সমর্থক করে থাকেন, তা আরও গর্হিত। 

পরিশেষে, প্রতীক উর রহমানের কথা ফিরে আসি। প্রতীক উর দলে থাকছেন কি যাচ্ছেন, বা গেলে কোন্ দলে যাবেন, সেটা তাঁর ব্যাপার। কিন্তু তাঁকে বৃহত্তর বাম আন্দোলনে দরকার। যদি তিনি এই বাম আন্দোলন ছেড়ে তৃণমূলে  যান তাহলে তা খুবই  দুর্ভাগ্যজনক হবে। 

বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেশ কঠিন ব্যাপার।

বিভাস সাহা 
(অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়) 

রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

এসআইআর নিয়ে প্রতিবাদ ~ অবীন দত্তগুপ্ত

এস আই আর প্রসঙ্গে এক শ্রেনীর বামপন্থীর মতামত হলো, সি পি আই এম ভোটার হেল্পডেস্ক করে ঠিক করে নি। তাতে নাকি আদতে এস আই আর, যা বিজেপির মানুষকে ডিস ফ্র‍্যাঞ্চাইজ করার একটি নক্কার জনক প্ল্যান, তাকে লেজিটিমাইজ করা হয়। 

এই একি লোকজন এস আই আর এর বিরুদ্ধে তৃণমুলের প্রথম মিছিলকে বাহবা জানালেও,এইটা কোথাও লিখছেন না যে 

১. বাংলায় এস আই আর হেল্পডেস্ক সবচেয়ে বেশি চালিয়েছে তৃণমুল এবং 

২. এস আই আর প্রগ্রেসন দেখে তারা সারা রাজ্যে ইয়েস স্যার নামক ফ্লেক্সে মুড়ে দেয়। 

এবার আসা যাক এস আই আর হেল্পডেস্ক এর কথায়। বাংলায় একমাত্র একটি দল ভোটার হেল্পডেস্ক চালায় নি। সেটা বিজেপি। সি পি আই এম ব্যাপক ভাবে চালিয়েছে, তৃণমুল চালিয়েছে আরো বেশি, কংগ্রেস - আই এস এফ প্রত্যেকে চালিয়েছে। কেন চালিয়েছে?  এবং ভোটার হেল্পডেস্ক চালানো মানেই সি পি আই এম এস আই আর সমর্থন করছেন এ কথা যারা বলছেন,তারা তৃণমুলের নাম মুখে আনছেন না কেন?  তৃণমুল আপনাদের ভাসুরঠাকুর হয়?  

তৃণমুল কেন করেছে আমি জানি না। আমাদের হেল্পডেস্ক কেন চলেছে আমরা জানি। সি পি আই এম হেল্পডেস্ক চালিয়েছে, যাতে একজন  বৈধ ভোটারের নাম-ও ডকুমেন্টাল মিসম্যাচের কারণে বিজেপির ইলেকশন কমিশন না কাটতে পারে৷ এবং একি সাথে ভুয়া ভোটার (ডেড সিফটেড ডুপ্লিকেট) যাতে সরানো সম্ভব হয়।(আমাদের তথাকথিত প্রবল বামেদের এতে অসুবিধে আছে। কেন ভুয়া ভোটার কমবে?)   তৃণমুল কিছুদিনেই বুঝে যায় যে এই একি কাজ তাদের ও করতে হবে, এবং রীতিমতো এপ নামিয়ে এই কাজ করে। তো তার ফলস্রুতিতে ৫৮ লাখ ভুয়া নাম বাদ যায়, যার মধ্যে বেশির ভাগ অ বাঙালি। 
এই পুরো হেল্পডেস্ক প্রসেসে সি পি আই এম এস আই আর নিয়ে তাদের বিরোধিতা বজায় রাখে, এবং হেল্পডেস্ক ব্যবহার করে মানুষকে জানাতে কেন বিরোধিতা করা প্রয়োজন। 

মনে রাখবেন, এই অবস্থা পর্যন্ত, মানুষের বেশির ভাগ এস আই আর নিয়ে কোন অভিযোগ ছিল না। সং্খ্যালঘু অঞ্চলে প্রায় ১০০% ম্যাপিং ছিল।  এই পর্যায়ের পরে বিজেপি যখন দেখলো দেড় কোটি রোহিঙ্গার ফানুস ফেটে গেছে, যখন দেখল মতুয়ারা (যাদের সি এ এ র গাজর দেখানো হয়েছিল) তারাই সবচেয়ে বেশি এফেক্টেড, যখন দেখল ডুপ্লিকেট ভোটারের মধ্যে অবাংালি বিজেপির ভোটার বেশি, তখন তারা স্ট্র‍্যাটেজি পাল্টালো। 

২০০২ এর সাথে ম্যাপিং থাকলে কাউকে হিয়ারিং এ ডাকা হবে না, নিজেদের এই স্টেটমেন্ট কে নাল এন্ড ভয়েড করে দিয়ে, লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির নাম লাখ লাখ মানুষকে আক্রমণ করা শুরু করলো। মূলত সং্খ্যালঘু মানুষ টার্গেট হলেও, সংখ্যাগুরুরাও আক্রান্ত হলেন। এবং একটা প্যাটার্ন ফলো হলে। যেখানে বিজেপি নেই সেই বুথে ভোটার কমাও।  এবার প্রতিটা দল-ই গিয়ার চেঞ্জ করল। এতদিন ডেপূটেশন, বক্তব্য,লিফ্লেট দিয়ে যে বিরোধিতা ছিল তা আক্রমনাত্মক হলো। সি পি আই এম একের পর এক বিডিও অফিস ঘেরাও করতে আরম্ভ করলো। 

এইবার সেইসব 'বামপন্থীরা' লাইন নামালেন,সি পি আই এম প্রথম থেকে বিরোধিতা করলো না কেন? এই ক্রনোলজি তাদের বোঝার জন্য। পিট সিগারের একটা গান আছে ,যার মূল কথা 'দেয়ার ইজ আ টাইম ফর এভ্রিথিং '।  আ টাইম ফর লাভ এন্ড আ টাইম ফর হেট। সি পি আই এম প্রথম থেকেই এস আই আরের বিরধিতা করেছিল।  সেন্সাস ছাড়া এস আই আরের প্রসঙ্গ, ভোটার লিস্টের সাথে নাগরিকত্ব জুড়ে ঘুর পথে এন আর সির প্রচেষ্টা, কারা কারা বিপদে পড়বে - সবটাই। কিন্তু এগসিস্টিং ফ্রেমওয়ার্ককে ব্যবহার করে আক্রমণ ভোতা করে দিতে পেরেছিল। মানুষের মধ্যে এস আই আর নিয়ে অসন্তোষ না থাকলে তো আন্দোলনের পারদ বাড়বে না। যখন আক্রমণ বেড়েছে তখন প্রতিরোধ ও বেড়েছে। 



না বোঝার মতো কঠিন কিছু নয়।

শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫

হরিয়ানা ও একটি মেয়ে ~ সমীক মুখোপাধ্যায়

আপনি সুপ্রতিষ্ঠিত। সারাজীবন অনেক রোজগার করেছেন। রোজগারের টাকায় একগুচ্ছ প্রপার্টি কিনেছেন। সেই সমস্ত প্রপার্টি থেকে এখন আপনার মাস গেলে সতেরো লাখ টাকা ইনকাম হয়। ঘরে বসে। 

আপনার মেয়েকে টেনিস খেলতে প্রথম উৎসাহ দিয়েছিলেন আপনিই। সেই মেয়ের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সমস্ত প্রতিযোগিতায় নিয়ে যাওয়া, সবকিছুতে আপনিই ছিলেন তার প্রথম অনুপ্রেরণা। নিজের চাকরি ছেড়ে দেন মেয়ের ট্রেনিংয়ের জন্য সময় বের করতে। দু লাখ টাকা দিয়ে দামি র‌্যাকেট কিনে আনেন মেয়ের জন্য। 

আপনার প্রশ্রয়ে আর নিজের পরিশ্রমে মেয়ে ধীরে ধীরে স্টেট লেভেল চ্যাম্পিয়ন হয়। মাত্র চব্বিশ বছর বয়েসের মধ্যেই সাতান্নটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরের টেনিস টুর্নামেন্টে খেলে আঠেরোটি সোনার মেডেল নিয়ে আসে সে। 

মেয়েটি একটি টেনিস অ্যাকাডেমি খোলে। যে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা সে আপনার কাছ থেকে পেয়ে এতদূর অবধি এসেছে, সে চায় সেই অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে পড়ুক নতুন প্রজন্মের মাধ্যেও। 

আপনি দুধ আনতে যান পাড়ার দোকানে। সেখানে আপনার পাড়াপ্রতিবেশিরা আপনাকে টন্ট করে, কী তাউজি, লউন্ডির কামানো পয়সায় খাচ্ছো পরছো? 

আপনি জানেন, ওরা সত্যি বলছে না। আপনার জীবনধারণের জন্য আপনার মেয়ের টেনিস অ্যাকাডেমি থেকে রোজগার করা টাকার ওপর নির্ভর করতে হয় না। আপনিও জানেন, তারাও জানে। সম্ভবত ওরা আপনার পেছনে লাগে। এমনিই। 

আপনার খারাপ লাগে। রাগ হয়। হরিয়ানভি রক্ত টগবগিয়ে ফোটে। একটা জুৎসই জবাব দিতে মন চায়। 

আপনি কী করবেন? প্রতিবেশিদের সাথে তুমুল ঝগড়া করবেন? তাদের মুখ দেখা বন্ধ করে দেবেন? 

তা কী করে হয়? টাকায় কারুর নাম লেখা থাকে না। আপনার মাসিক আয় সতেরো লাখ টাকার সাথে ঐ মেয়ের রোজগার করা এক দেড় লাখ টাকাও তো মিশছে। যে রুটি আপনি খাচ্ছেন, সেই রুটির আটার দু এক দানায় যে ঐ মেয়ের কামানো টাকার ভাগ নেই, তা কি আপনি বলতে পারেন? 

মেয়ের পয়সায় খাওয়া? লজ্জায় মরে যাওয়া উচিত! 

কিন্তু নিজের মরে যাওয়া তো অতটা সহজ নয়। হরিয়ানাতে খুব সহজ নিজের মেয়েকে মেরে ফেলা। 

মেয়ে সফল টেনিস খেলোয়াড়, টেনিস অ্যাকাডেমি নিয়ে মেতে থাকলেও ঘরের কাজ সে উপেক্ষা করে নি। সে যে মেয়ে, মেয়েদের ঘরের কাজ তো করতেই হয়। 

আপনার চব্বিশ বছরের মেয়ে তখন রান্নাঘরে আপনারই জন্য ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছিল, যখন আপনি রান্নাঘরে ঢোকেন আপনার লাইসেন্সড পিস্তল নিয়ে।


বুধবার, ৫ জুন, ২০১৩

ভোট ~ অমিতাভ প্রামাণিক

হাওড়ার এক উপনির্বাচনের ফল বেরোল। শুরু হয়ে গেল তরজা।

একপক্ষ – আগে জোট করে তোদের হারিয়েছি, এখন একাই হারালাম। ফোট!
অপরপক্ষ – আগে ব্যবধান ছিল দেড় লাখ, এখন মাত্র ক'হাজার। দাঁড়া, নেক্স্‌ট্‌ ভোট আসুক!

অর্থাৎ চরিত্র কিছুই বদলায়নি।

আমি জিতেছি, মানে মাথা কিনে নিয়েছি। যারা ভোট দিয়েছিস আমাদের, তারা তো আমাদেরই। যারা দিসনি, এবার দাঁড়া তোদের কেমন টাইট দি! জিতেছি, মানে যা খুশি করব। মানুষ আমাদের জিতিয়েছে, মানে বাংলাদেশের বর্ডারে পাকিস্তান। মাই জার্মান ফ্রেণ্ড, টাটাদের তাড়িয়েছি, পকেট গড়ের মাঠ, আপনারা ইনভেস্ট করছেন তো? জাপানী বন্ধু, কথা বলছেন না যে, হাঁপানি হল নাকি? বাংলা জানেন না তো বাংলায় কী করতে এসেছেন?

আমি হেরেছি, তাতে কী! গ্যাপ কমে গেছে। আর একটু এদিক সেদিক করতে পারলেই নেক্স্‌ট্‌ টাইমে, বলা যায় না ... আবার গদিতে। সেই পুরনো মসনদ, সেই লাল খাতার আস্ফালন, সেই ক্ষমতার চর্বিত-চর্বণ।

জনতা, কে জিতছে? তুমি তো হেরেই চলেছ হে! আর কদ্দিন?

শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১১

এ এম আর আই ~ উৎসব

আজ আমরি অগ্নিকান্ডের ঘটনার ব্যাপারে একটু খোজখবর নিলাম। অনেক দুঃখ, ক্ষোভ, দোষারোপ, ক্রোধের মধ্যে দিয়ে যা জানতে পারলাম - প্রাথমিক উদ্ধারকার্জ চালিয়েছেন পঞ্চাননতলা বসি আর রেললাইন কলোনির লোকজন। প্রথম যখন আগুন লাগে তখন এই বস্তির লোকজনই ছুটে আসে, গার্ডরা গেট বন্ধ করে দেয়। অনুরোধ করা হয় গেট খুলে দিতে যাতে কিছু লোককে বাচানো যায়। কিন্তু হাসপাতালের যন্ত্রপাতি চুরি করে নেবে ( বস্তির গরীব লোক তো), এই জন্যে ওদের কে ঢুকতে দেয় না হাসপাতাল কতৃপক্ষ। শেষে কতৃপক্ষ পালায়, গার্ডরা পালায়, ডাক্তাররা (মানে আমাদের ট্যাক্সের টাকায় পাশ করা ডাক্তাররা) পালায় - আর এই বস্তির লোকগুলো জোর করে ঢুকে কয়েকজনকে উদ্ধার করে।

মনুষ্যজাতির কলঙ্ক কিছু শিক্ষিত চকচকে শুয়োরের বাচ্চার সাথে এক সারি তে দাঁড়িয়ে আমরা শাইনিং ইন্ডিয়ানরা শপিং মল, রাস্তা, কফি শপের নতুন মেকওভারের কলকাতাবাসী যখন বস্তিবাসীদের দিকে তাকিয়ে নাক সিঁটকোই, বস্তি উচ্ছেদ হলে নোংরা ঝেটানোর সম আনন্দ লাভ করি, তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ওরা। আজ কয়েকটি দগ্ধ মৃতদেহের জ্বলন্ত আভায় শাইনিং কলকাতার মধ্যে বেমানান গাঁজা, পাতা, ডেন্ড্রাইটের ঠেক পঞ্চাননতলার বস্তি, আর তার বস্তিবাসীদের লাল সেলাম!





কেননা তুমি তো ফেটে পড়ছো না রাগে
এখনো তোমার ভন্ডামি ভালো লাগে
ভন্ডামি কিছু আমারও মজ্জাগত
শ্রেনীর সুবাদে আমিও তোমার মত
কেননা তুমি তো ইচ্ছে করেই অন্ধ
চেয়েছ বলেই তোমার দুচোখ বন্ধ
আমিও অন্ধ তোমার মতন সখা
শ্রেনীর সুবাদে তোমারই মতন বোকা
অথবা চালাক সেয়ানে সেয়ানে দুই
তুমি আর আমি এসো পাশাপাশি শুই
সুবিধের খাটে আমাদের খুনসুটি
শ্রেনীর সুবাদে সমঝোতা লুটোপুটি
চুলোয় যাকগে যা আছে চুলোয় যাবার
আমাদের আছে অঢেল খাবারদাবার
কেননা তুমি তো ফেটে পড়ছো না রাগে
এখনো তোমার ভন্ডামি ভালো লাগে
ভন্ডামি কিছু আমারও মজ্জাগত
শ্রেনীর সুবাদে আমিও তোমার মত

~ কবীর সুমন 

রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১১

অতি সংক্ষিপ্ত সংবাদ ও স্বাধিনতা


প্রাসাদ গাত্রে মুতিব, ভাঙিব আইন
ফরসা ধুতির গাড়ি দেখিলে, সমুখে পাতিব দুপিস মাইন
নকু বলিয়া সকলে মিলিয়া, দিদির পিছনে মারিব লাইন
প্রণামান্তে 
- আকাশ গাইন
- বাতাস বাইন
স্বাধিনতা দিবসের প্রাক্কালে ঠিক সন্ধে সাতটা বেজে চুয়ান্ন মিনিটে এই মর্মে শেষ ইস্তেহারটি লেখা হয়ে  গেল। ভাঙাভাঙি ভাগাভাগির খেলা সেই ১৯৭২ সাল থেকে চলছিল, আপাতত খেলা শেষের বাঁশি বেজে গেছে। কংকাল বাবুদের মহান নেতা জেলে গেছেন, তাত্ত্বিক নাড়ুদাকে লাইবাড়িতে ফাঁসানোটা শুধুই সময়ের অপেক্ষা এখন। বাকিরা নাটক লিখবেন অথবা রিটায়ার করবেন। তাই সামনে মেকি বিপ্লবের ধ্বজাধারিরা হাওয়া হাওয়া, তাই আজ খুশির দিন কারণ বিপ্লব এবারে হবেই, আজ নাহোক কাল, বিপ্লবের মূল শত্রু  খতম, খতমের তালিকা প্রকাশের ইতি হোল অবশেষে। এই আনন্দঘণ পরিবেশে একটু রবীন্দ্রসঙ্গীত তারস্বরে পাড়ার মোড়ে  বাজানো হোক। মানে বাজাতে হবে। মানে ওটাই আজকের আইন। যেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজবে, সে  জায়গাতে  সাধারন মানুষ থাকেন, যেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত তারস্বরে বাজছে না, সেখানেই কংকাল অথবা অস্ত্র পাওয়ার সম্ভাবনা। 
ইতিমধ্যে ভারতের রাষ্ট্রের ঋণের বোঝা কমে গেছে। এত অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে এই কয়েক  মাসে যে সামনের দশ বছরে আর নতুন অস্ত্রের বরাত  দিতে হবে না কাউকে, তা নিয়ে ঘ্যাম  চাচা একটু ক্ষার খেয়ছে    যদিও শত্তুরের বিনাশে তিনিও খুশি। ঘ্যাম চাচাকে আনবিক চুক্তি দিয়ে ঠান্ডা করা গেছে, আর ইস খুসি মে দিদিও নেমন্তন্ন পেয়েছেন। শুধু জানা যায়নি দিদি জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন কিনা। খবরে প্রকাশ,  হনু সিং ঘ্যাম চাচা কে বরাত দিয়েছে ওদেশে জর্জিয়া নামক এক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে, যারা দিদিকে অনারারি ডাক্তারএর শংসাপত্র প্রদান করবে। তাই নিয়ে ঘ্যামচাচার দেশে বিতর্ক শুরু হয়েছে, এই কাজটা কোন দেশকে আউটসোর্স করা যায়। 
এদিকে বন্যার তোড়ে ঘর বাড়ি ভেসে গিয়ে, বাপ মা ভাই বোন হারিয়ে ন্যাংটা ছেলেটা স্বাধিনতা দিবসের সকালে  গান ধরেছেঃ
দিদিমনি যায়
লাল সুতো
নীল সুতো
হলুদ সুতো
সবুজ সুতো 
নেই  তার গায়ে
আসলে হয়ত ন্যাংটা ছেলের ন্যাংটাকে ন্যাংটা বলতে ভয় করে না। 
পাগলু ড্যান্স! 
   

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১১

রক্তে ভেজা কোলাজ ~ সদানন্দ কারিগর

রক্তে ভেজা কোলাজ

-সদানন্দ কারিগর

ঘটনা ১ : বাঁকুড়া সন্মিলনি মেডিকেল কলেজের মর্গ-এর উল্টো দিকের চা'য়ের দোকান। বহুদিন পর হঠাৎ দেখা এক কমরেড-এর সাথে। চিৎকার করে ডাকি- আরে কমরেড, কি খবর? এখানে? সেই চেনা হাসি ছড়িয়ে দিয়ে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। মুখটা একটু শুকনো। মনটা খচখচ করে উঠল। তাহলে কি কোন আত্মীয়-স্বজন…


অদ্ভুত ক্ষমতা এদের অন্যের মনের কথা বোঝার। হাতটা চেপে ধরে বললেন, বাড়িতে সব ভালই। পার্টী থেকে দায়িত্ব দিয়েছে মর্গ সামলানোর। সারেঙ্গা বা বাঁকুড়া জেলা লাগোয়া অঞ্চলে প্রায় রোজই কমরেডরা খুন হচ্ছেন। 'বডি'গুলো এখানেই আসছে। আমরা সাহায্য না করলে গ্রামের মানুষ আরও বিপদে পরবে। তাই…


শহুরে মধ্যবিত্ত - অবাক চোখে আকাশটাকে আঁকড়ে ধরে পালাতে চায়। পারেনা। আবার সামাল দেয় সেই কমরেড। পকেট থেকে একটা কালো সুতোর বিড়ি বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ছাড়ো ওসব। মুহূর্তে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলি, এখনও কতো এসেছে? উনি বললেন- প্রথম প্রথম হিসেব থাকতো। এখন আর থাকেনা। তবে জান কমরেড, একটা ঘটনা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছিনা। রাতে শুতে গেলেই মনে পড়ে। ঘুমাতে পারিনা। সেপ্টেম্বর- এর ১০ তারিখ। সারেঙ্গাতে খুন হন ৭১ বছরের প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক কৃষ্ণ কুণ্ডু। পরের পরের দিন, মানে ১২ তারিখ ওনার ছেলে এসেছে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ছেলেটা আমার পাশে। খেয়াল করিনি, কখন আমার কাঁধে মাথাটা রেখেছে। 'বডিটা' বের করা হচ্ছে। আমি এগিয়ে যাচ্ছি লাল পতাকাটা নিয়ে। ঢেকে দিতে হবে। হঠাৎ ছেলেটা বলে উঠল- 'কাকু, বাবার মুখটা একটু পরিষ্কার করে দেবে? এত রক্ত, ভাল করে দেখাই যাচ্ছে না।' বিশ্বাস করো কমরেড, ঘুমোতে গেলেই কথাটা কানে বাজে। মনে হয় ছুটে যাই জঙ্গল মহলে। দেখি একবার ওদের কত শক্তি। পার্টী হাত বেঁধে রেখেছে, আমাদের কিচ্ছু করার নেই। 

 

ঘটনা-২ : ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। নির্বাচনের আগে বামফ্রন্টের শেষ সমাবেশ। একটু আগে লালগড়ের বিনপুর জোনাল কমিটির মিছিল এসে ঢুকেছে। উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সহযোদ্ধাদের স্বাগত জানিয়েছে মাঠ। ওঁরা বসলেন মাঠের এক কোণে। মঞ্চে বুদ্ধদেব ভাষণ দিচ্ছেন। আমি থাকতে না পেরে চলে গেলাম ওদের কাছে। বললাম- 'লাল সেলাম কমরেড, দারুণ লড়ছেন আপনারা'। প্রত্যুত্তরে হাতের মুঠি শক্ত করে লাল সেলাম জানালেন। কিন্তু মুখে কোন কথা নেই। আবার অবাক হই। ভাবি তাহলে কি আমার পোশাক বাধা হ'য়ে দাঁড়াল? আমাকে কি কমরেড ভাবতে পারছেন না? বসে পরি ওদের পাশেই।

বক্তৃতা শেষ করলেন বুদ্ধদেব। পাশের মানুষগুলো উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলেন। বছর পঁচিশের এক যুবক শূন্যে হাতটাকে ছুঁড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন- 'ই ই ই ইনকিলাব', চারপাশ কাঁপিয়ে আওয়াজ উঠলো 'জি ই ই ই ন্দা বা আ আ দ'। 


এক মাঝবয়সী কমরেড এবার তাকালেন আমার দিকে। জানতে চাইলেন আমি সাংবাদিক কিনা। বললাম না না তেমন কিছু না। এবার তাকালেন সোজা। বললেন, লেখেন নিশ্চয়ই? কিছু জানতে চান? আমতা আমতা করে বললাম- 'ইয়ে মানে পেপার পড়েতো সব ঠিকমতো জানা যায় না। আপনাদের মুখেই তাই শুনতে এসেছি আপনাদের অভিজ্ঞতার কথা'।

-আপনারা শহরের লোক, পারবেন শুনতে ওসব? আমার বাড়ী শালবনী। ২০০৯ সালের জুন মাসে, ১০ জন কমরেড কে ধরে নিয়ে গেছিল ওরা।  দীনবন্ধু সরেন, প্রবীর মাহাত, মলয় মাহাত, সঞ্জয় মাহাত, কেশবচন্দ্র মানা, ধীরজ মানা, মোহন সিং, দেবব্রত সরেন, অসিত সামন্ত আর নাড়ু সামন্ত। হাত-পা বেঁধে রোদের মধ্যে ফেলে রেখেছিল সারাদিন। প্রচন্ড তেষ্টায় জল চাইলে মুখে পেচ্ছাব করে দিয়েছিল মাওবাদীর দল। তারপর একটা ছোটো ঘরে লঙ্কার বস্তায় আগুন ধরিয়ে সেখানে সবাইকে ঢুকিয়ে দম বন্ধ করে মেরে লাশগুলো গায়েব করে দিয়েছে। শালবনী হাইস্কুলের মাষ্টার মশাই, একমাত্র ছেলে মলয় মাহাত-র ছবি নিয়ে আজো জনে জনে জিজ্ঞেস করে তার ছেলের কথা। মা-বাবা দুজনেই আজ সন্তান শোকে পাগল।


বৈতার স্নেহাশীষ দাস। ওর বৌটার সেদিন 'সাধ'। ভজালি দিয়ে গলাটা কেটে আনন্দে চীৎকার করেছিল ওরা। পাগল বৌটার একমাস বাদে একটা মেয়ে হয়েছিল।


কানাই দিগনায়েক। বৌ-ভাতের দিন ঘর থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে গাছে বেঁধে গুলি করে মারে। সদ্য বিয়ে আর একই সাথে বিধবা হওয়া বৌটা এখন শুধু তাকিয়ে থাকে। কথা বলেনা।


আকাশ বেজ আর তাপস মণ্ডল। গুঁড়ি গ্রামে বাড়ি। মকর সংক্রান্তির নতুন জামা কাপড় কিনতে গেছিল ছেলে-মেয়েদের জন্য বিনপুর হাটে। গুলি করে মেরে দেয় ওরা।


বেলাটিকরি অঞ্চলের জামদা হাইস্কুলের শিক্ষক কার্ত্তিক মাহাত। পড়াচ্ছিল। ছাত্রদের সামনেই গুলি করে মারে। দুজন ছাত্র তারপর থেকে ভয়ে বোবা হয়ে যায়।


আমার ভেতরটা গুলিয়ে ওঠে। থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করি, এর পরেও লড়ছেন, ভয় করেনা? অদ্ভুত হাসি হেসে ওঠেন উনি। হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করেন- 'একটু আগে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কি বলল শুনলেন? এভাবে আমাদের শেষ করা যায় না। জয় আমাদের হবেই'।


গোটা দলটা উঠে দাঁড়ায়। এবার ওদের ফিরতে হবে। মরার জন্য, নাকি অনেককে বাঁচাতে? উত্তরটা অজানাই থেকে যায়।


ঘটনা ৩ : সন্ধ্যে ৭টার প্রেস ক্লাব। কোণের TV তে প্রাক্তন নকশাল নেতা কতিপয় বুদ্ধিজীবী পরিবেষ্টিত হ'য়ে 'রেজিমেন্টেড পার্টী-র' বাপান্ত করছেন। একটু আগেই বামফ্রন্টের আসন্ন পরাজয়-এর সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষন করে আসা ক্লান্ত সাংবাদিক কেরাম-এর বোর্ড থেকে ঘার ঘুরিয়ে এক ঝলক সেটা দেখে নিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন 'শালা রেড-বুকটাও পড়েনি। শংকর দুটো লার্জ বিপি আর সোডা দিস্‌'।।   


************


সাত্রে'র নাটকটা মনে পড়ে? কিভাবে একজন সাংবাদিক একটু একটু করে Pathological liar-এ পরিণত হয়? যদিও তারা জানে, তারা যা লিখছে তা আসলে মিথ্যে। একসময় তারাই সেটাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।


এই মুহুর্তে আমরাই বা কম যাই কিসে? আপাদমস্তক মিথ্যেয় মোড়া অর্ধশিক্ষিত এক ছিটেল মহিলার পেছনে মনে মনে একবারো কি দৌড়াইনি? একবারও কি মনে হয়নি, জঙ্গলে রক্ত ঝরছে কারন অনুন্নয়ন? যেন শ'খানেক গরিব মানুষ মরলেই ওখানে উন্নয়নের বন্যা বয়ে যাবে? একবারও কি মনে হয়নি, যাক না একবার বামফ্রন্ট সরকারটা বছর খানেকের জন্য? সেই মুহুর্তে মনে হয়েছিল কি, গোটা রাজ্যটাই জঙ্গলমহল বানিয়ে দিতে পারে ওরা? সপাটে নিজের গালে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে হয় কি তার জন্য?


এখনও সময় আছে। অথবা এই তো সময়। লাল পতাকাটাকে আরো উঁচুতে তুলে ধরুন। এ লড়াই জিততেই হবে।

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০০৯

সুজনকে নিয়ে মিথ্যা-লিখন মুছল প্রশাসন

আজকাল, ২৪শে এপ্রিল, ২০০৯ থেকে -

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে তৃণমূলের লেখা মিথ্যা দেওয়াল লিখন মুছে দিল প্রশাসন। একটা দুটো নয়, মিথ্যা প্রচারের এরকম প্রায় ১০০ দেওয়াল লিখন মুছে দেওয়া হয়েছে। আরও দেওয়াল মোছার কাজ চলছে। বারুইপুর ব্লকের অধীন সাউথ গড়িয়ায় বৃহস্পতিবার এই দেওয়াল মোছার কাজ করেন বিডিও-র কর্মীরা। সঙ্গে ছিলো বারুইপুর থানার পুলিশ। যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ সুজন চক্রবর্তী তাঁর সাংসদ তহবিলের টাকা খরচ করতে পারেননি, ৭ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা ফেরত গেছে বলে তৃণমূল যাদবপুর কেন্দ্রের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রচার-লিখন চালায়। সুজন চক্রবর্তী যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী। প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের কাছে মিথ্যা লিখনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান। তদন্তে প্রমাণ হয়, সুজন সাংসদ কোটার প্রায় সব টাকাই যথাযথ সময়ের মধ্যেই খরচ করেছেন। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সম্পাদক মুকুল রায়কে এক নির্দেশে ওই মিথ্যা প্রচারের দেওয়াল মুছে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। তৃণমূল গড়িমসি করায় শেষে জেলা প্রশাসনই দেওয়াল মুছল।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে ডঃ সুজন চক্রবর্তীর website থেকে নেওয়া তথ্য অনুযায়ীঃ

The actual figure of MPLAD Fund expenditure of Dr. Sujan Chakraborty is varying with Loksabha website and MPLAD website www.mplad.nic.in.


This is to be noted the in the website www.mplad.nic.in the MPLAD Fund expenditure mentioned is a consolidated report since 1993.

The mentioned unspent amount of Rs. 4.71 Crore is not in the part of Dr. Sujan Chakraborty during his tenure as MP of Jadavpur. The figure is a carry forwarded figure from past MPs’ of Jadavpur Constituency.

There is no flaw in the figure of expenditure of Dr. Sujan Chakraborty as mentioned in the website www.sujan.info as certified by the District Development and Planning Department, South 24 Parganas District. Only an amount of Rs. 10 Lac is not included in that certificate as it was released centrally for Bihar Flood Relief Fund.

Actual Figures of MPLAD Fund of Dr. Sujan Chakraborty is as follows:

Total approved Scheme: Rs. 10 Crore 50 Lac

Total Released Amount: Rs. 8 Crore 52 Lacs

Details here: http://sujan.info/mplad_tab.html