অত্যাধুনিক যন্ত্র বা রোবটের ক্রিয়াকলাপের দুটো অংশ থাকে। সেনসর আর অ্যাকচুয়েটর। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির খবর আসে সেনসরের মাধ্যমে - আর যন্ত্র সেই খবর অনুযায়ী কাজ করে অ্যাকচুয়েটরের মাধ্যমে। জীবের কোষের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা একই।
যন্ত্রের ক্ষেত্রে তার ক্রিয়াকলাপ আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, কোষের ক্ষেত্রে পারি না। কোষের কাজকর্ম বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না তো বটেই, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেয়াড়া দেহকোষ এমন কাজকর্ম করে যাতে সংশ্লিষ্ট প্রাণীটিই বিপদে পড়ে যায়।
ক্যানসার কোষের কথাই ধরুন না - শরীরের নিজেরই একখানা কোষ এমন বিগড়ে গেল যে সে আর পাঁচটা কোষের কথা না ভেবে সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালখুশিমতো আচরণ করতে থাকল এবং কিছুতেই শরীরের বাকি অংশের কথা শুনল না। কেমন হয়, যদি তাকে কান ধরে সিধে করা যেত? ডাক্তারবাবু যেমন বলবেন, বাধ্য ছেলেটি হয়ে এমনকি ক্যানসার কোষও সেই কথা মানত?
কষ্টকল্পনা মনে হচ্ছে? একদম ঠিক ভেবেছেন। কিন্তু অপ্টোজেনেটিক্স ঠিক সেই সম্ভাবনার দরজাই খোলার চেষ্টা করছে।
অপ্টোজেনেটিক্স। অর্থাৎ অপটিক্স আর জেনেটিক্সের মেলবন্ধন।
কোষের নিউক্লিয়াসে যে ডিএনএ থাকে - কোষের ক্রিয়াকলাপ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন প্রোটিনের মাধ্যমে, কোন্ প্রোটিন তৈরী হবে সেই চিঠিটি আদতে আরএনএ এবং সেই চিঠি লেখা হয় ডিএনএ-র আদল অনুসারে - অর্থাৎ কোষের ক্রিয়াকলাপের মূল বলতে ডিএনএ - সেই ডিএনএ-র মধ্যে যদি এমন বার্তা ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, যাতে তা বিশেষ আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরী করবে, যে প্রোটিন তৈরী হওয়ার পর কোষটিকেই বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে স্রেফ আলোকরশ্মি দ্বারা? আবার নিয়ন্ত্রণ এমন নিখুঁত ও নিপুণ হবে যাতে উদ্দিষ্ট কোষটি বাদে আর কোনও কোষ, এমনকি পাশের কোষটিরও, ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না? হ্যাঁ, অপ্টোজেনেটিক্স ঠিক এই কাজটাই সম্ভব করে ফেলেছে।
শুরুটা হয়েছিল নিউরোসায়েন্স দিয়ে। কিছু নার্ভকোষের মধ্যে আলাদা করে আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরীর ব্যবস্থা করে বিশেষ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো দিয়ে সংশ্লিষ্ট কোষকে জাগিয়ে তোলা। গত শতকের শেষ দিক অব্দিও কাজটা অসম্ভব মনে হতো - কিন্তু বিগত তিন-চার দশকে মলিকিউলার বায়োলজি ও জেনেটিক্সের গবেষণা এতদূর এগিয়েছে যে এখন এ কাজ খুবই সম্ভব, ইন ফ্যাক্ট গবেষণাগারে কাজটা সম্ভব হয়ে গিয়েছে দুই দশকেরও বেশী সময় আগেই।
অপ্টোজেনেটিক্সের সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে বিপুল গবেষণা চলছে ক্যানসার-গবেষণার প্রতি ক্ষেত্রেই। ক্যানসার কীভাবে হয়, কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়ে, কীভাবে ক্যানসারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কীভাবে ক্যানসার-আক্রান্ত কোষকে আর পাঁচটা সুস্থ কোষের থেকে আলাদা করে চেনা যায়, পাশের সুস্থ কোষদের বাঁচিয়ে আক্রান্ত কোষটিকে কীভাবে ধ্বংস করা যায় - অপ্টোজেনেটিক্স প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই।
যেমন ধরুন, ক্যানসার-চিকিৎসার অত্যাধুনিক ইমিউনোথেরাপি। তার অন্যতম একটি ধরন - CAR-T Cell Therapy. বিশেষ এক প্রক্রিয়াজাত শ্বেত রক্তকণিকা দিয়ে রক্তের বিশেষ কিছু ক্যানসারের চিকিৎসা হয়। কিন্তু মুশকিল হলো, রোগাক্রান্ত কোষ মারতে গিয়ে প্রক্রিয়াজাত রক্তকণিকা যা যা নিঃসরণ ঘটায়, তা হামেশাই বিপদের কারণ হয়ে ওঠে। কেমন হয়, যদি বাইরে থেকে ওই প্রক্রিয়াজাত রক্তকণিকাটিকে প্রয়োজনমতো নিয়ন্ত্রণ করা যায়? বাড়াবাড়ি করলে যদি তাকে বলে দেওয়া যায়, বাপু হে, যথেষ্ট হয়েছে, আপাতত একটু ক্ষান্ত দাও? এই মুহূর্তে অপ্টোজেনেটিক্স সেই গবেষণা করছে!
ক্যানসারের জৈবিক লক্ষণ বা হলমার্ক বলতে যা যা, অপ্টোজেনেটিক্সের প্রয়োগের সম্ভাবনা তার সবকটি ক্ষেত্রেই আছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণা জারি আছে। ক্যানসার কোষের বাড়বাড়ন্ত নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার বেড়ে ওঠার সময় রক্তবাহী নালীর বাড়বাড়ন্ত (যা দ্রুত ক্রমবর্ধমান ক্যানসারকে পুষ্টি জোগায়) তা নিয়ন্ত্রণ, শরীরের এক জায়গা থেকে আরেক অংশে ছড়িয়ে পড়ে সেখানে গুছিয়ে বসার সময় ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, কোষের স্বাভাবিক মৃত্যুকে জয় করে ক্যানসার কোষের বাড়তি আয়ুপ্রাপ্তি তা নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার কোষের পরিপাক-বিপাক নিয়ন্ত্রণ, শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধ-ব্যবস্থাকে ধোঁকা দেওয়া ক্ষেত্রে ক্যানসার-কোষের পটুত্ব তা নিয়ন্ত্রণ - নিয়ন্ত্রণের প্রতিটি সম্ভাব্য ক্ষেত্রেই অপ্টোজেনেটিক্সের গবেষণা চলছে।
ও হ্যাঁ, আচমকা এতশত কথা কেন?
এই বছর তিন বিজ্ঞানীর ঝুলিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার এলো অপ্টোজেনেটিক্স গবেষণার সুবাদে। বিজ্ঞানীদের দুজন, পিটার হেগেম্যান ও জর্জ ন্যাগেল, জার্মানির - একজন, কার্ল ডেইজেরথ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তির হিসেবে তৃতীয়জন একেবারেই তরুণ - বয়স মাত্র চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন। তিনজনের গবেষণা, মূলত, নিউরোসায়েন্স ঘিরে - অপ্টোজেনেটিক্সের প্রাথমিক বিকাশ ও প্রয়োগ ওই ক্ষেত্রেই।
কিন্তু, আগামী দিনে, অদূর ভবিষ্যতে না হলেও অনতিদূর ভবিষ্যতে, ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে অপ্টোজেনেটিক্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। নিতেই পারে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন