রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিজেপির হয়ে প্রমোশন ভিডিও ~ সুমনা চৌধূরী

সমস্যাটা আসলে কী?

সমস্যা এটা নয় যে প্রমোশন করা হয়েছে। যে কোনো মানুষ তার পছন্দের রাজনৈতিক দলের প্রমোশন করতে পারেন। পক্ষে-বিপক্ষে বলতে পারেন। এটা তার সংবিধানপ্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার। পয়সা নিয়ে অথবা না নিয়ে--- দুইভাবেই করতে পারেন। 

সমস্যাটা হলো টাকা নিয়ে তৈরি রাজনৈতিক কনটেন্টকে দর্শক বা ফলোয়ারদের কাছে স্বাধীন, নিরপেক্ষ বা ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

Uploaded Image


আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো : 

প্রথমত, যে ভিডিওগুলো করা হয়েছিল এবং এখন যখন জানা যাচ্ছে সেগুলো লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে করা হয়েছিল, সেই ভিডিওগুলোতে পেইড প্রমোশন বা কোলাবরেশনের ডিসক্লেমার দেওয়া ছিল কীনা? 

দুঃখের বিষয় কনটেন্ট ক্রিয়েটররা টাকার বিনিময়ে যে ভিডিওগুলো তৈরী করেছিলেন সেগুলোতে এরকম কোনো ডিসক্লেইমার-ই ছিল না। এগুলো স্বাধীন মতামত হিসেবে-ই পোস্ট করা হয়েছিল। 

এবারে টাকার বিনিময়ে রাজনৈতিক ভিডিও বা কনটেন্ট করার নিয়ম হলো ভিডিওতে ----

১. টাকা নেওয়ার কথা গোপন করা যাবে না। কোনো স্বাধীন ক্রিয়েটর যে কোনো রাজনৈতিক দলের থেকে টাকা নিয়ে কনটেন্ট তৈরী করলে বিজ্ঞাপন হিসেবে, তাতে ডিসক্লোজার থাকা বাধ্যতামূলক। 

২. মেটা-র এ সংক্রান্ত পলিসি হলো ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম-এ যথাযথ পেইড পার্টনারশিপ / পেইড-কনটেন্ট ডিসক্লোজার দিতে হবে। মেটাতে সেই ডিসক্লোজারের ব্যবস্থাও রয়েছে।  
কোনও ক্রিয়েটর যদি রাজনৈতিক দলের হয়ে পেইড ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে কনটেন্ট তৈরি করে থাকেন, তাহলে সেই কনটেন্ট কীভাবে মেটা প্ল্যাটফর্মে ক্লাসিফাইড ও ডিসক্লোজ হয়েছিল সেটিও দেখা দরকার। 

৩. ASCI বলছে --- টাকা, উপহার বা অন্য সুবিধার বিনিময়ে কনটেন্ট তৈরি হলে সেটি ASCI-র এডভার্টাইজিং / কমার্শিয়াল কমিউনিকেশনের আওতায় পড়ে এবং ক্রিয়েটরকে স্পষ্টভাবে জানাতে হয় যে এটি পেইড বা স্পনসর্ড কনটেন্ট। শুধু নিজের মতামত বলে উপস্থাপন করলেই ডিসক্লোজার-এর প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় না। এবং ডিসক্লোজারটি এমনভাবে দিতে হয় যাতে দর্শকের চোখ এড়িয়ে না যায়। স্পষ্ট করে এটাও বলা আছে, শুধু ক্যাপশনের একেবারে শেষে বা হ্যাশট্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রাখাও যথেষ্ট নয়।

৪. ECI/MCMC-এর নিয়ম বলছে --- কোনও কনটেন্ট যদি আসলে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন হয়, তাহলে সোশাল মিডিয়াও ইলেকট্রনিক মিডিয়া হিসেবে ধরা হয়। ইলেকশন কমিশন ২০ মার্চ ২০২৬-এ একটি নির্দেশনায় বলেছে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে MCMC-এর প্রি-সার্টিফিকেশনের প্রয়োজন।  

যে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এখন নিজেদের জাস্টিফাই করছেন এই বলে যে তারা বিজ্ঞাপন করেছেন এবং বেশ করেছেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে বিজ্ঞাপন করা তাদের কাজ, তাদের কাছে মূল প্রশ্ন থাকে যে ----

ক. কোন ভিডিও/পোস্টের জন্য টাকা নিয়েছেন?

খ. সেই ভিডিও বা পোস্টে পেইড/স্পনসর্ড ডিসক্লোজার ছিল কীনা? 

গ. সেই ভিডিওগুলোর MCPC-এর প্রি-সার্টিফিকেশন ছিল কীনা? 

ঘ. এবং পেইড রাজনৈতিক ভিডিওগুলোর কনটেন্টে RPA/MCC/ECI এর গাইডলাইন মানা হয়েছিল কীনা? কেননা ভিডিওগুলো নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পরে করা হচ্ছে। এবং তা পেইড বিজ্ঞাপন। ভোটের আগের ৪৮ ঘণ্টার নিয়মও আছে এবং সোশাল মিডিয়াও ইলেকশন কমিশনের 'ইলেকশন রিলেটেড ইলেকট্রনিক মিডিয়া ফ্রেমওয়ার্কে'র মধ্যে রয়েছে।

যদি তা না হয়, তবে 'বেশ করেছি টাকা নিয়ে বিজ্ঞাপন করেছি' যুক্তি মানায় না। কেননা আপনারা বেশ করেননি। আপনারা রাজনৈতিক দলের থেকে টাকা নিয়ে বানানো কনটেন্টকে আপনাদের স্বাধীন মতামত দেখিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করছেন। পেইড প্রমোশনের যে ডিসক্লেমার দেওয়ার বেসিক নিয়ম, সেটা ভায়োলেট করেছেন। কোনো রাজনৈতিক ভিডিওতে একবারও উচ্চারণ করেননি যে আপনারা পেইড প্রমোশন করছেন। বরং স্বাধীন মতামত এবং প্রতিবাদীর অভিনয় করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে নিজেদের পকেট ভরেছেন। এবারে গুটকা বা নেলপলিশের বিজ্ঞাপন আর পলিটিক্যাল ক্যাম্পেইনের পার্থক্য আছে। আর এই পার্থক্য ভারতীয় আইন সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। 

তাই কনটেন্ট ক্রিয়েটর যারা টাকা নিয়ে রাজনৈতিক দলের হয়ে পেইড প্রমোশন করেছেন কোনো ডিসক্লোজার ছাড়া অথবা স্বাধীন মতামত হিসেবে, তারা যে শুধু তাদের ফলোয়ারদের দিনদুপুরে ঠকিয়েছেন--- বিষয়টা তার বাইরেও আরো বড়ো কিছু। 

দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা, যা নিয়ে আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিত, তা হলো কনটেন্ট। যদি অলিপাবের ঘটনা পেইড হয়ে থাকে (কেননা ওই ক্রিয়েটর এখনো সঠিকভাবে দেখাতে পারেন নি ঠিক কোন কোন ভিডিওগুলোর জন্য তিনি আড়াই লক্ষ টাকা পেয়েছেন) তাহলে এটাতে সমস্ত মানুষের কনসার্নড হওয়া উচিত এখনই। কেননা এটা যদি ট্রেন্ড বা নিয়ম হয়ে যায়, তাহলে কাল আপনি-আমি যে কেউ যেকোনো কনটেন্ট ক্রিয়েটরের পয়সা রোজগারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারি। বাসে ট্রেনে অফিসে আদালতে বাজারে যে কেউ যে কোনো ইস্যু তৈরী করতে আমাদের হ্যারাস ম্যালাইন এবং আইনি জটিলতায় ফাঁসানোর পাশাপাশি সমাজে দেশে বিভেদ-বিভাজন ও বড়ো আকারের দাঙ্গা-হাঙ্গামা-অশান্তি ছড়াতে পারে।

অতএব এই সামগ্রিক বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অতি আবশ্যক। এবং কেন পেইড বা স্পনসর্ড ভিডিও স্বাধীন মতামত বলে প্রকাশ করা হলো---সেটাও। কারণ কেউ টাকা নিয়ে রাজনৈতিক প্রচার করছেন অথবা স্বাধীনভাবে নিজের ইচ্ছায় রাজনৈতিক প্রচার করছেন — এক বিষয়; আর টাকা নিয়ে তৈরি রাজনৈতিক প্রচারকে দর্শকের কাছে স্বাধীন ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে উপস্থাপন করা—সম্পূর্ণ আলাদা। 

সমস্ত বিষয়গুলোরই নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া তাই ভীষণ প্রয়োজন—কে টাকা নিলেন বা নিলেন না, এসব প্রশ্ন বাদেও সেই টাকা দিয়ে ঠিক কী ধরণের কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছিল এবং সেটি কীভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল---- এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনসার্ন হওয়া উচিত আমাদের। 

এটুকুই বলার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন