বন্দেমাতরম্ গানের ঐতিহাসিক ভূমিকা যাই হোক – এবং এর প্রথম স্তবক এতদিন ধরে ন্যাশনাল সং-এর মর্যাদা পেয়ে এসেছে, তা সত্ত্বেও – এর সম্পূর্ণ অংশটা আমাদের দেশের অবশ্যগেয় সংগীত হতে পারে না।
জনগণমন-অধিনায়ক গীতিও পাঁচ স্তবকের গান। সমস্ত স্তবকের একই সুর যদিও, তাদের প্রত্যেকটার ‘লিরিক্যাল ভ্যালু’ অসাধারণ। ‘দারুণ বিপ্লব মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে, সঙ্কটদুঃখত্রাতা’ অথবা ‘রাত্রি প্রভাতিল উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব-উদয়গিরিভালে / গাহে বিহঙ্গম, পুণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে / তব করুণারুণরাগে নিদ্রিত ভারত জাগে, তব চরণে নত মাথা’ ইত্যাদি সুর করে গাইলে এক অন্য ধরনের উন্মাদনা জাগে। তথাপি এর প্রথম স্তবকটাই জাতীয় সংগীত।
জনগণমন বাংলা গান। এতে তৎসম শব্দের বাহুল্য আছে বটে, তবে ক্রিয়াপদের রূপ বাংলার। জাগে, মাগে, গাহে – সব বাংলা। পরবর্তী স্তবকগুলোতেও শুনি, আসে, হয়, বাজে, ছিল, করিলে, প্রভাতিল (নামধাতু), উদিল, ঢালে – ইত্যাদি অকৃত্রিম বাংলা। এগুলো ছাড়া বাকি অংশ অনেকটা সংস্কৃতানুগ, কিন্তু বাংলায় সম্পূর্ণ অর্থবহ।
বন্দেমাতরম্ তেমন নয়। বন্দে বা মাতরম্ কোনোটাই বাংলা নয়, সংস্কৃত। সুজলাং, সুফলাং ইত্যাদি বিশুদ্ধ বিভক্তিযুক্ত সংস্কৃত শব্দ। যে অংশটুকু এতদিন ন্যাশনাল সং হিসাবে গাওয়া হয়ে এসেছে, অর্থাৎ সুখদাং বরদাং মাতরম্ অবধি গানটা পুরোটাই সংস্কৃত। সুতরাং এ নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই।
কিন্তু এর পরেই ঝামেলার শুরু।
সপ্তকোটিকণ্ঠ ইত্যাদি নিয়ে লাইনটা সংস্কৃত, দ্বিসপ্তকোটিভুজৈঃ ইত্যাদিও তাই, তার পরের লাইনের দুটো রূপ দেখা যায়, যা হচ্ছে ‘অবলা কেন মা এত বলে’ অথবা ‘কে বলে মা তুমি অবলে’ – এরা তো সংস্কৃত নয়, বাংলা! তারপরে আবার বহুবলধারিণীং ইত্যাদি নিয়ে স্তবকের বাকি অংশ সংস্কৃত! তাহলে ওখানে এক লাইন বাংলা ঢোকানোর কী দরকার ছিল? বঙ্কিমবাবু তা আমাদের জানিয়ে যাননি। ফলে স্তবকটা খিচুড়ি ভাষা হয়ে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ অন্য এক কবিতায় লিখেছেন – সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি। খেয়াল করে দেখুন, এখানে বাঙালির সংখ্যা ‘সাত কোটি’। কাজেই বঙ্কিমের ‘সপ্তকোটিকণ্ঠ…’ বা ‘দ্বিসপ্তকোটি’ ভুজ যে এই সাত কোটিরই গলা বা হাত, তাতে বিশেষ সন্দেহ নেই। অর্থাৎ তা বাঙালির গলা ও হাত! ভারতের জনসংখ্যা সাত কোটি ছিল না বঙ্কিমের কালে! অর্থাৎ এই গান বাংলাকে জাগানোর গান, ভারতকে নয়। বন্দে মাতরম্ বলতে ভারতমাতা নয়, বঙ্গমাতা বুঝিয়েছেন তিনি। গোটা ভারত কখনই সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা শস্যশ্যামলা ছিল না। তাহলে গানের এই অংশটা কি সমগ্র ভারতের গান হতে পারে?
সংস্কৃতে আমার ব্যুৎপত্তি নেই। আমার এক বিশেষ সন্দেহ আছে ‘সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালে’ অংশটা নিয়ে। সমাসবদ্ধ লম্বা এই শব্দের অর্থ কী? শেষের ওই ‘করালে’ দেখে সন্দেহ হয় উনি এক নারীকে সম্বোধন করছেন ‘হে সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালা’ বলে। করাল পুংলিঙ্গ শব্দ, যার স্ত্রীলিঙ্গ তো করালী! তাহলে এটা ‘সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালি’ হওয়া উচিত ছিল না? নাকি আমি সম্পূর্ণ ভুল বুঝেছি?
যাই হোক, এর পরেই চলে আসে ‘তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম, তুমি হৃদি, তুমি মর্ম’ ইত্যাদি আদ্যোপান্ত বাংলা গীতি। এবং সঙ্গে সঙ্গেই বিশুদ্ধ সংস্কৃত ‘ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে’! আবার বাংলায় ‘বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি, তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে’ ইত্যাদি পুরোটা বাংলা। বাকিটা আবার পুরোটা সংস্কৃত! এই জগাখিচুড়ি ভাষার গান দেশের গান হওয়া কতখানি সঙ্গত বলে আপনাদের মনে হয়?
বন্দে মাতরম্ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রভূত ভূমিকা রেখেছিল, এ কথা যেমন সত্য, সেই আন্দোলনের পটভূমিও প্রধানত বাংলাই ছিল। বঙ্কিম এই গান বাংলা মায়ের বন্দনার জন্যই রচনা করেছিলেন। এর অর্থও সে দিকই ইঙ্গিত করে। প্রথম অংশটার পর থেকে ভারতের গান হওয়ার মতো সুচারু গীতি এতে নেই বলেই আমার মনে হয়েছে।
এর সঙ্গে জনগণমন-অধিনায়ক গানের সুর ও গীতির কোনো তুলনাই চলে না।