স্মৃতিচারন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মৃতিচারন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৫

চুনো মাছ ও বাল্যকাল ~ অনিমেষ বৈশ্য

মাছের বাজারে গিয়ে দেখলাম, একটা বড় হাঁড়িতে হরেক কিসিমের চুনো মাছ খলবল করছে। কী নেই তাতে? খোলসে, পুঁটি, মৌরলা, চাঁদা, বেলে মাছ...। আরও কত কী! বহুদিন খোলসে (বাঙালরা বলে, খোইলসা) খাইনি। এমনকী চোখেও দেখিনি। কত মাছ যে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তার হিসেব নেই। কিংবা হয়তো আছে। আমি জানি না। 
বিদেশি দ্রব্যে বাজার ছেয়ে গেছে। কিন্তু মাছের ভুবনায়ন কি হয়েছে? মানে, ত্রিনিদাদের মাছ তেঘরিয়ায় বিক্কিরি হচ্ছে, এমন তো শোনা যায়নি। তা হলে এই চুনো মাছগুলো গেল কোথায়? কোন আঘাটায়?  জলা বুজিয়ে যে অসংখ্য ফ্ল্যাট মাথা তুলেছে, তার ধারেকাছে গেলে হয়তো  চুনোমাছের আত্মার ফিসফিসানি শোনা যাবে।
তা সেই বড় চুনো মাছের হাঁড়ির সামনে ভনভন করছে লোকজন। হেমন্তের ভোর। মাছের বাজারের জলে পায়ের পাতা ভিজে যাচ্ছে। সবাই ওই মাছ কিনতে চায়। ভিড় ঠেলে আমিও নিলাম সেরটাক। নানা জাতের মাছ আমার ঝোলায়। আজ মাছের বিয়ে। ওরা বরযাত্রী যাচ্ছে। গায়ক-অভিনেতা অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় মঞ্চে উঠে একদা মাছের বিয়ে গানটি খুব গাইতেন। এখনও গান কি না, জানি না। তবে গানটি আমার কানে লেগে আছে। গানটা শুরু হচ্ছে এই ভাবে----চ্যাং মাছে বলে মাঝিভাই/ আমাকে না মারিও মাঝিভাই/ আমাকে না মারিও...। কেন চ্যাং মাছের নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার এই কাতর আবেদন? শোনা যাক গায়ক কী গাইছেন----আরে কাইল  দারিকার হইব বিয়ারে/ আমি বইরযাত্রী যামু/ আরে ও আমারই ক্যাকুইমাসি, মেনকাদিদি, বৌভুলানি, মাথাঠেঙানি, পেছাদুলকি, ঠ্যাংদিগিলা, জটাবোগিলা...আলুকশালুক শালুক ননদি...মা হইব মৌরলা, কাইল দারিকার হইব বিয়া, আজও চান্দা না আইল রে...।
এমন অদ্ভুত দুলে দুলে গাইতেন অরিন্দম যে, দর্শকরাও দুলে উঠত। বিয়েতে মা সাজবে মৌরলা, কিন্তু বাউন্ডুলে চান্দা মাছ গেল কোথায়? সে তো এখনও এল না। সাইকেলে ঝোলাটা আটকে আমিও মন খুলে গাইতে শুরু করলাম---আরে ও আমারই ক্যাকুইমাসি, মেনকাদিদি, বৌভুলানি, মাথাঠেঙানি, পেছাদুলকি, জটাবগিলা...(ভুল লিখলে ক্ষমা প্রার্থনীয়)। দুরন্ত ছন্দের গানটি গেয়ে শিরা-ধমনি এমন চলকে উঠল, মনে হল, বাল্যকাল ফিরে পেয়েছি। আমার এই এক দুরারোগ্য রোগ। যেখানে ছিটেফোঁটা বাল্যকালের সন্ধান পাই, সেখানেই থানা গেড়ে বসে পড়ি। হেমন্তের শিরশিরে হাওয়াও কোন সুদূর থেকে বাল্যকাল ডেকে আনে। কার্তিকের জ্যোৎস্না, হিমমাখা ভোর আমাকে আছড়ে ফেলে ফসলের খেতে। 
তা যাই হোক, আমরা রোজ খাল, বিল, পুকুর বুজিয়ে ফেলছি। আসলে ঠিক খাল-বিল বুজিয়ে ফেলছি না। আত্মাকে গলা টিপে খুন করছি। আমার বাড়ির অদূরে একটি ইটখোলা ছিল। তাতে ছিল খানতিনেক গভীর পুকুর। সেই পুকুরে মাছ ধরার টিকিট বিক্কিরি হতো। টিকিট কেটে লোকজন মাছ ধরত। মাছের চারের যে কত সম্মোহনী গন্ধ থাকতে পারে, তা পুকুর ধারে না-গেলে বোঝা যেত না। কেউ কেউ উৎকৃষ্ট মানের সুরা মাছের টোপে মাখিয়ে দিতেন। মাছও যে মদ্যপ হয়, সেটা ওই পুকুর ধারে বসে জেনেছি। কয়েক হাত অন্তর ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে তাকিয়ে আছে মৎস্যশিকারিরা। উপরে সুনীল আকাশ। অদ্ভুত এক নীরব মেলা। এত মানুষ বসে আছে। কিন্তু কেউ কোনও কথা বলছে না। পাছে মাছ পালিয়ে যায়। মাছ যে গোলযোগ সইতে পারে না। তা সেই পুকুরগুলো আর নেই। সেখানে ফ্ল্যাট উঠেছে। একটি পুকুরকে সুইমিং পুল বানানো হয়েছে। কিন্তু পুকুর আর সুইমিং পুল এক জিনিস নয়। পুকুরে শালুক ফোটে, পুকুরের গভীরে ডুব দিয়ে ছেলেরা মাটি তুলে আনে, পুকুরে ঝিনুক থাকে, পুকুরের জলে সর পড়ে, পুকুরে কার্তিকের চাঁদ জ্যোৎস্না ঢেলে নিজের বাসা খোঁজে। এই পুকুরেই ছিল খোলসে, চাঁদা, পুঁটি মাছের বসত। আমরাই ওদের বাসা কেড়ে নিয়েছি। এখন কেঁদে কী হবে? মাছের বিয়ের গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফিরে মাছের ঝোলাটা রাখলাম নীচে। দু-একটা মুক্তিকামী মাছের মুখ উঁকি মারছে আমার দিকে। ওগুলো কি সত্যিই মাছের মুখ? নাহ। ওরা বাংলার মুখ। হেমন্তের ভোরে মাছের ঝোলায় খলবল করছে আমার বাংলা।
পৃথিবীর রূপ খোঁজার আর দরকার কী?

শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫

পুলিশের ডাক ~ অনিমেষ বৈশ্য

আমাদের পাড়ায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি ছিল। ফাঁড়ির উঠোনে একটি কাঁঠালগাছ। পাশে একটি ছোট শিবমন্দির। আমরা সেই মন্দিরের চাতালে বসে দিনরাত তাস পিটতাম। মাঝে-মাঝে দু-একজন পুলিশ উনুনে ভাত চাপিয়ে আমাদের সঙ্গে দু-হাত তাস খেলে নিতেন। এক বিশাল চেহারার পুলিশ থেবড়ে বসে কুটনো কুটতেন। আর একজন পুলিশের নাম মনে নেই। তাঁর বয়স ছিল কম। তিনি হেমন্তের সকালে রোদে পিঠ দিয়ে নিশ্চিন্তে উল বুনতেন। কার জন্য বুনতেন জানি না। তখনও রেডিমেড সোয়েটারের যুগ আসেনি। মা-মাসি-পিসি-দিদিমণি সবার হাতে থাকত উলের কাঁটা। কিন্তু একজন তাগড়াই চেহারার পুলিশ তাঁর কর্মস্থলে উল বুনছেন, এ দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি। শীর্ষেন্দু মুখুজ্জে জানতে পারলে ওঁকে নিয়ে একটা দারুণ গল্প লিখে ফেলতেন। আমি লিখতে পারি না বলে পাঠকরা বঞ্চিত হলেন। 
এই পুলিশ ফাঁড়ির পত্তন হয়েছিল সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। জরুরি অবস্থার আশপাশে। আমরা তখন ইস্কুলে পড়ি। নেহাতই কচিকাঁচা।

তখন থেকেই ফাঁড়ির পুলিশের সঙ্গে পাড়ার ছেলেদের নিদারুণ সদ্ভাব। এক পুলিশের নাম ছিল রাখাল। বিশাল চেহারা। তাঁর ছেলে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে পড়ত। রাখালপুলিশকে আমার এক জেঠামশাই ছোট একটু জায়গা দিয়েছিলেন। তিনি সেখানে পর্ণকুটির তৈরি করে সপুত্র বসবাস করতেন। রাখালপুলিশকে উর্দি পরা অবস্থায় কমই দেখেছি। তিনি কাছে থাকলে চোরেরা স্বস্তি পেত। চোরের মনে হতো, ইনি পুলিশ হবেন কোন দুঃখে? যেন বাড়ির লোক লক-আপে ট্যাংরা মাছ রেঁধে এনেছেন। রাখালপুলিশকে আমরা কাকু বলে ডাকতাম। তাঁর শরীর ও মনে পুলিশের অংশ ছিল সামান্যই। তিনি ছিলেন যাত্রার অভিনেতা। শিবরাত্তিরে ফাঁড়ির সামনের মাঠে হ্যাজাক জ্বেলে যাত্রা হতো। কোনও একটা পালায় দীর্ঘদেহী রাখালকাকুকে শিশুর মতো কাঁদতে দেখেছি। বোধহয় সাবিত্রী-সত্যবান পালায়। তিনি কার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, মনে নেই। সাবিত্রী হওয়াও বিচিত্র নয়। বসন্তকালে বিরহের পালা দেখে আমাদের তনুমন শিরশির করত। চৌদিকে বাতাসের হু হু আর কোকিলের কুহু। পুলিশ যে বসন্তের দূত হতে পারে, এ কথা পাঁচকান হলে পুলিশেরই চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে। কিন্তু গাঁ-গেরামের খবর পুলিশের বড় কর্তারা রাখতেন না। ফলে নিরবচ্ছিন্ন শান্তিতে পুলিশকর্মীরা কালাতিপাত করতেন। শিবরাত্রির বহু আগে যাত্রার মহড়ার হু হু হা হা শুনে তস্করেরও বুঝি বুক কেঁপে উঠত। ফাঁড়ির পিছনে ছিল আকন্দের ঝোপ। বনতুলসী, আসশেওড়া, নিসিন্দার ঝোপঝাড়ও ছিল ইতিউতি। সেই সব গহিন ঝোপঝাড়ে একটা লম্বা কালো পাখি রক্তকরবী-র রাজার মতো গম্ভীর গলায় ডেকে যেত। তাকে দেখা যেত কম। আমাদের জীবনে তখন নন্দিনী আসবে-আসবে করছে। একটু উতল হাওয়া দিলেই ঝিমধরা ভালোলাগা চৌদিকে। ফিসফিসিয়ে হাওয়াকে বলতে ইচ্ছে করত, ধীরে বও, ওগো ধীরে বও।

ফাঁড়িতে খান কতক রাইফেলও ছিল। শেষ কবে ওই রাইফেলের গুলির শব্দ শোনা গেছে, তার কোনও হিসেবনিকেশ নেই। আমরা মাঝে-মাঝে সেই রাইফেলের হিমশীতল শরীর স্পর্শ করে নিজের জীবনযৌবন সার্থক করেছি। কিছুদিন পরে দেখলাম একটা রাইফেলও নেই। কালী পুলিশ বলে একজন রাগী পুলিশ ছিলেন। একদিন দিনমানে ফাঁড়ির ভিতর থেকেই তাঁর সাইকেল চুরি যায়। এই চুরির খবর বোধহয় বড় কর্তাদের কানে পৌঁছেছিল। তার পর থেকেই ফাঁড়িতে রাইফেল রাখার আর কোনও দরকার মনে করেননি কর্তারা। রাইফেলের বদলে বাঁশি আর বেহালা হলে পালা বোধহয় আরও জমে উঠত। 

একদিন রাখালকাকুর বাড়ির সামনের মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বাঁশঝাড়ের দিক থেকে হাওয়া বইছে। শীতকাল। ধানের শীষে সোনালি রং লেগেছে। ফড়িং উড়ছে। সদ্য লাঙল দেওয়া মাটি থেকে গন্ধ আসছে ভুরভুর। কোন একটা গানের দু-লাইন গেয়ে উঠেছিলাম, মনে নেই। হঠাৎ দেখি রাখালকাকু একটা নিমের দাঁতন মুখে নিয়ে বললেন, 'কী রে কচি, পালায় গান গাইবি?' আমি তো চমকে উঠলাম। বলে কী? পালায় গান গাইব? বললাম, 'আমি তো গান গাইতে পারি না।' রাখালকাকু বললেন, 'এই যে গাইলি।' গান গাওয়া আর গান গাইতে পারা কি এককথা ? কিন্তু রাখালকাকুকে কে বোঝাবে সে-কথা। আমি দৌড় লাগালাম। রাখালকাকু বলে চলেছেন, 'আরে শোন, পালাচ্ছিস কেন? নিমাই সন্ন্যাস পালা হবে। ওই দেখো।'

আমি ছুটছি। পুলিশকাকুও ডেকে চলেছেন, 'আরে শোন। এই কচি।' আমি ছুটছি। এই প্রথম পুলিশ দেখে ভয় লাগছে। পায়ের নীচে শুকনো বাঁশপাতা। ধানগাছের হাওয়া লাগছে গায়ে। ওই তো সোনাডাঙ্গা মাঠ, ওই যে পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিল, ওই যে বীরু রায়ের বটতলা...।

মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি। চলে...চলে...এগিয়েই চলে। দূরে পুলিশের বীণ শোনা যায়।

সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

সেবার শীতকালে - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

আমার আবার বরাবরের গরম গরম বাতিক ছিল একটু গরম হলেই ছাওয়া চাই, হাওয়া চাই। হাঁসফাঁস অবস্থা। কিন্তু কি জানি কেন, বয়স বাড়ছে বলেই বোধহয়, আজকাল আর তেমন গরম করেনা। বরং শীতের কাঁপুনি প্রতি বছর একটু একটু করে বেড়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে হাতকাটা সোয়েটার পরতুম, এখন সেখান টুপি আর জ্যাকেট চাপাই। সারা রাত গায়ে কম্বল নিয়ে ঘুমোতে পারি, যেটা আগে পারতুম না এবার শীত অবিশ্যি কমসমের ওপর দিয়েই গেল। কদিন হলো “বসন্ত এসে গেছে” বলে ফোনে অনেক মেসেজ আর ছবিও পেয়ে চলেছি। তবে আমাদের এখানের শীত আর কতটুকু? যেতে হয় দার্জিলিং কি সিমলা। শীত বলে শীত? বাপরে! হাড়ের ভেতর মজ্জা পর্যন্ত জমিয়ে দেয়। আমার বাঙালি ধাতে এর চেয়ে বেশী ঠান্ডা কল্পনা করা অসম্ভব। তাই ভাবি, যেখানে শূন্যের নিচে ৩৫-৪০ ডিগ্রি নেমে যায় থার্মোমিটারের পারা, সেখানে কেমন পারা অনুভুতি হয়!

শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

পেট্রোল - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা বড় বড় পাথরের টুকরোর আড়ালে দু চার জন করে সৈনিক বসে আছে চারিদিকে চোখ ধাঁধানো সাদা। বরফের পুরু আস্তরন সব কিছুর ওপর। এই ধপধপে সাদার ওপর সূর্‍্যের রোদ পড়লে সেদিকে খালি চোখে তাকানো মুশকিল। তাই সব ফৌজির মুখেই, কপাল থেকে গাল পর্যন্ত বিশাল বড় আর  মোটা কালো চশমায় ঢাকা। একে সকলেই সাদা হাই অল্টিচিউড ফৌজি উর্দী পরে আছে। মাইনাস চল্লিস কি পঞ্চাশ ডিগ্রিতে দাড়ি গোঁফ কামানোর প্রশ্নও ওঠেনা। তার ওপর মুখের আধখানা ঢাকা বিশেষ ভাবে তৈরি রোদ চশমায়। কাজেই সকলকেই কেমন এক রকম দেখতে লাগছে। তবুও ফৌজিরা নিজেদের চিনে নেয় কোনো ভাবে। ওই যে লোকটা একবালতি বরফ নিয়ে অল্প লেংচে লেংচে আসছে গরম করে খাবার জল তৈরি করবে বলে, ও হলো হাবিলদার রামদত। অনেক উঁচু থেকে দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে পড়ে গিয়েছিল। সে আঘাত এখনো সারেনি হয়ত। তাই চলার সময় খুব ভাল করে নজর করলে ওকে হালকা ল্যাংচাতে দেখা যায়। সামনে প্যাকিং বাক্সর ওপর বসে থাকা লেফটেন্যান্ট চেঁচিয়ে রামদতকে চা চাপাতে বললেন। ইনিই বোধহয় এ চৌকির কম্যান্ডার। এ জায়গাটা বোধহয় পাকিস্তানি ফৌজের সরাসরি গুলির পাল্লার বাইরে। কারন এখানে লোকজন বাংকার বা পরিখার মধ্যে ঢুকে বসে নেই। বরং বেশ নিরাপদেই ঘুরছে। লেফটেন্যান্টের উর্দীতে নামের ট্যাগটা পড়া যাচ্ছে। রাজীব পান্ডে। আইডি আর ট্যাগ খুঁটিয়ে দেখে লেফটেন্যান্ট তাকালেন সামনের দিকে -

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০১৫

ভালোবাসার টুকরো ছবি - শুভাশিষ আচার্য্য


জীবনের কিছু মোড় আছে কিছু সিদ্ধান্ত আছে যা যে মানুষ টা নিচ্ছে তাঁর কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ সেরকমই তার চারপাশের জড়িয়ে থাকা মানুষদের কাছে তা হয়ে ওঠে প্রভাবিত করার উপকরণ। আর একটা ব্যাপার আর সবথেকে মুল ব্যাপার হল এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সিদ্ধান্ত সময়োচিত হলে তিনি সফল আর তা না হলে সেটা আর সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়না। আর একটা ব্যাপার হল আমাদের দেশ কাল সমাজ। এ এমন এক মৈত্রীমণ্ডল এমন এক ছায়া যুদ্ধ এমন এক অপরিবেশ বান্ধব যে আজ রাতে রুটির সাথে পেঁয়াজ পাতে থাকবে কিনা সে সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে থাকেনা অনেক সময়। এরকম একটা বিষম সময় হুট করে তিনি সেই ভুবনজয়ী সিদ্ধান্তটা কত অনায়াসে নিয়েছিলেন। এক জ্ঞান তিতিক্ষু মন নিয়ে মাঝ রাতে ঠিক হয়ে গেল সরকারি চাকরির দরকারি কাজ গুল ছুড়ে দিয়ে কাল সকাল থেকে হবে শুধু লেখা লেখির কাজ। ভুবনজয়ী সিদ্ধান্ত। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আর আমরা প্রভাবিত হলাম।

বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০১৫

হাপুস হুপুস - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

       - খামোখা ঝগড়া করলেএত রাগ করতে আছে? 

- আমি তো ঝগড়া করিনি, বরং একটা ভালো কথা বোঝাতে চেয়েছিলাম।

- ভারি তো বোঝানো হলো, মাঝখান থেকে রাগারাগি করে খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলে

- আমাকে এরকম করতে দেখেছো কখনো?

শনিবার, ২ মে, ২০১৫

ভরসা থাকুক - অবিন দত্তগুপ্ত

সমীরদাকে , প্রথম দেখেছি , ঢাকুরিয়া জোনাল অফিসে । আমাদের বিকল্প বায়স্কোপের মিটিং ছিল । ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি বস্তি অঞ্চলে একসাথে সিনেমা দেখানো হবে । প্রথম এক্সপেরিমেন্ট । জায়গা বাছার জন্য , সমীর মন্ডল এসছিলেন । মিটিং-এ এক মধ্যবিত্ত কমরেড বলেছিলেন , " ওরা কি এগুলো বুঝবে ? "

রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৫

দুপয়সার রবি - গোধুলি মিত্র

              
আমরা যারা রবি ঠাকুর বলি, শুনি, পড়ি বা গাই- আমাদের সাথে রবীন্দ্রনাথের প্রথম আলাপ হয় মা-বাবা, শিক্ষক কিম্বা নিছক পড়ার বইয়ের হাত ধরে। কেউ উপহার পেয়েছি, কেউ বাড়িতে পরম্পরায়, কেউ শখে ,কেউ বা লাইব্রেরীতে। যে মেয়েটার কথা এখন বলব, তার সাথে রবির আলাপ কিছুটা অন্যরকম, কিছুটা ব্যতিক্রম।

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৫

গোগ্রাস - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


পুঁচকে বলে পুঁচকে? একদম এইটুকুনটি। কোলের ছেলে অস্কার। তা বাপ-মায়ের আর দোষ কি? ছেলের চাঁদপানা মুখটি দেখে বাবা বলে বসলেন ছেলে আমার বড় হয়ে অমুক হবে। ব্যাস। ক্ষুদে ছেলে গোঁসা করে ঠিক করল আর বড় হবে না। তা একটু গোঁয়ার হয় বটে জার্মানরা। তাও আবার যেমন তেমন শহরের জার্মান নাকি? এ হলো ডানৎসিগ (Danzig)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির থেকে ছেঁটে নিয়ে যে শহরকে স্বাধীন বলে ঘোষনা করেছিল মিত্রপক্ষ সেই ডানৎসিগ। অস্কার আর বড় হয়নি। ওই তিন বছরেই আটকেছিলো। তিন বছরের জন্মদিনে বাবার দেওয়া একখানা টিনের ড্রাম পিটে পিটে তার যত ডানপিটেমো। টিন-ড্রাম উপন্যাসটি লিখেছেন গুন্টার গ্রাস। ছবিও হয়েছে এই উপন্যাস নিয়ে। অস্কারের মত গুন্টার গ্রাসের জন্মও ওই ডানৎসিগ শহরে।

ছবি এঁকেছেন, লিখেছেন, মূর্তি গড়েছেন। আরো কত কি যে করেছেন!! সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন ১৯৯৯ সালে। ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রচুর। শান্তি আন্দোলনের দূত হয়ে ভ্রমন করেছেন একের পর এক দেশ। ১৯৮৬ সাল। গায়ে সাদা ফতুয়া, পরনে নীল-সাদা চেক কাটা লুঙ্গি। মুখে বিড়ি। গ্রাস বাবু হেঁটে চলেছেন কলকাতার রাস্তায়। এ শহরে কাটিয়ে গেছেন বেশ কিছুদিন। কালীঠাকুর তাঁকে বড়ই আশ্চর্‍্য্য করেছিলো। ওই জিভ কাটা মূর্তি নিয়ে পরে লেখালিখি করেছেন গ্রাস বাবু। কলকাতায় তাঁর বেশ আপন আপন লাগত।
 

একটু বাঁয়ে হেলেই থাকতেন। যদিও সাদা কে সাদা, কালোকে কালো বলতে দ্বিধা করেননি কখনো। ইরান, ইজরায়েল, আমেরিকাই হোক, বা হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত ট্যাঙ্ক, তাঁর কলমের গ্রাসে সব্বাই পড়েছে। দুই জার্মানি এক হওয়াও তাঁর মনঃপুত হয়নি। বলেছিলেন দুজনের আলাদা রাজনৈতিক অস্তিত্ব থাক, নইলে একজন অন্যজন কে গিলে খাবে। আলাদা স্বতন্ত্র সত্বায় বিশ্বাস করতেন, কিন্তু কাঁটাতারে কখনো বিশ্বাস করেন নি। চাইতেন সারা বিশ্বের সব জাতের মানুষ এসে জার্মানিতে থাকুক। মেলামেশা হোক, নতুন মানব সমাজ গড়ে উঠুক। জীবনের প্রথম দিকে নাৎসি ওয়াফেন এসএসের সৈনিক ছিলেন। ১০ নম্বর ট্যাঙ্ক ডিভিশানে থেকে বিশ্বযুদ্ধ শেষ করেন। সে কথা লুকোন নি। কিন্তু পরবর্তিকালে ভিলি ব্রান্ডটের সোসাল ডেমোক্রাসির একনিষ্ট সমর্থক। তা সত্বেও তিনি যেন ছিলেন আধুনিক জার্মানির বিবেক।

ঝুঁপো-গুঁফো হুঁকোমুখো দেখতে বটে সাহেব কে, কিন্তু রসবোধটি মোক্ষম। জীবনের শেষ দিকে এসে, আত্মজীবনী লেখায় হাত দিলেন যখন, সে লেখার নাম দিলেন – বাইম হাউটেন ডার ৎসুইগেল, মানে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো। ভেবে দেখুন। ঝাঁঝে চোখে জল আসবে। রান্নার সময় সে খোশার খোশবাইতে পাড়া মাত হয়ে যাবে। আপনি একের পর এক ছাড়িয়েই যাবেন। কিন্তু ভেতরে? স্রেফ ফক্কা।

মানুষটা চলে গেলেন গতকাল। ৮৭ বছর বয়সে। পেঁয়াজ রেখেই গেছেন। পড়ে দেখতে পারেন। গোগ্রাসে।
 
** ছবি ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত  

বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

জে ইউ ভিসি ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​খুকুর 'পরে রাগ করেছো,
ভাংলো বলে তেলের শিশি?
মেরুদন্ড ভাংছে দেখো
ধেড়েখোকা জে ইউ ভিসি,
তার বেলা?

_________________________________________

ভিসির ঘরে ছাত্র ছিল জনা ঊনিশ-কুড়ি।
ভিসি হাঁকেন, ওরে, আমার ল্যাজ গিয়েছে চুরি!
ল্যাজ হারানো? আজব কথা! তাও কি হয় সত্যি?
ল্যাজখানা তো তেমনি আছে, চুল-টুল সব ভত্তি।
সবাই তাঁরে বুঝিয়ে বলে, শুধরে দিয়ে ভুলকে,
আসছে রাণী, ল্যাজ নেড়ে তার চরণ দিও চুলকে ...


রেগে আগুন, তেলে বেগুন, তেড়ে বলেন ভিসি,
ল্যাজ হারালো আমার, তোরা ডাকিস নিরুপিসি!
লতানো পুঁইডাঁটার মত বাঁকানো রামধনু,
এমন ল্যাজ তো রাখতো জানি রামায়ণের হনু।
এ ল্যাজ যদি আমার বলিস, উড়াবো সব খুলি।
এই না বলে ক্যাম্পাসেতে ডেকে নিলেন পুলিশ।



__________________________________________

ছাত্রনিধন-যজ্ঞ চলে, কলকাঠি তার নাড়ছেটা কে?
কোন সাপে খায় দুধকলা সেই মধ্যরাতের বিছনা ফুঁড়ে?
পালিয়ে তোরা বাঁচবি কদিন, ঢিল মেরেছিস যে মৌচাকে -
রাস্তাগুলো সব চিনে রাখ, মিলবে দেখিস যাদবপুরে।

 

মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বাঙালনামা - ২ ~ তমাল রাহা

অনেকদিন বাদে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। ফুটবল খেলা যেখানেই থাকি না কেন দেখেছি, দেখি। হয় মাঠে গিয়ে, নয় টেলিভিশন-এর পর্দায়। কিন্তু কলকাতার ফুটবল কে খুব মিস করতাম। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে আমার লাইফ পুরো ঝিঙ্গা-লালা।

বদলে গেছে অনেক কিছুই, আগে ছিল রেডিও, তারপর সাদা-কালো টেলিভিশন, আস্তে আস্তে তাতে রঙের প্রলেপ পরল। আগে সংবাদপত্রে মতি নন্দী, আর এখন ….. থাক সে কথা। আসলে প্রফেশন ব্যাপারটা কে ভালো-না-বসলে কোয়ালিটি ব্যাপারটায় কম্প্রমাইজ করতেই হয়।

দুর্গাপুরে থাকাকালীন মোহনবাগানী বন্ধু বেশি ছিল। কেন জানি না, এইসব মাচা-লোটা, এই শব্দগুলো অজানা ছিল। বাঙাল-ঘটি আর ইলিশ-চিংড়ি র মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তর্ক। বদলে গেছে সত্যি অনেক কিছুই! তখন ময়দানে দুটো কাগজ বেরোতো, মোহনবাগানের খেলার দিন 'গড়ের মাঠ' আর ইষ্টবেঙ্গলের দিন 'অলিম্পিক'। দলবদল আর ক্লাব কেচ্ছা ছাড়া .... ঐ কাগজ গ্যালারীর কাঠে পেতে বসা আর রোদ ঠেকানোর কাজ-ও হতো। আজকাল তো দেখি না আর ….
পাড়ায় একটাই টেলিভিশন, কল্যাণ-দা দের বাড়িতে। কিন্তু মোহনবাগান গোল খেলেই টেলিভিশন বন্ধ। অগত্যা ভরসা রেডিও। রেডিও তা ছিল বহুদিনের সাথী। বারাকপুর এ আসার পরেও শুরুর দিকে টেলিভিশন ছিল না। দল বেঁধে রেডিও শোনা হতো, বাড়ির উঠোনে। বারাকপুর এ আবার বাঙালের সংখ্যা বেশি। আমি, জেঠু, জেঠুর বন্ধুরা আর পড়ার অনেক পোলাপান। মাঝে মাঝে ঠাম্মা বা জেঠিমা এসে জিগ্যেস করতেন "কেডায় গোল দিসে?" ওদের আগ্রহটা ঐখানেই শুরু আর ঐখানেই শেষ। মনে আছে একবার রেডিও তে গোল শুনে শংকর-দার বাবার কি নাচ, খেয়াল-ই নেই যে পরণের লুঙ্গিটা ভুমিসজ্জা নিয়েছে!

বাংলায় ধারাভাষ্য কোনকালেই খুব একটা উচ্চমার্গের ছিল না , কিন্তু একটা অদ্ভূত ভালো লাগা ছিল।

কতকাল হয়ে গেল, বিকেল তিনটে
কাঠের রেডিও, তার নবটা পাল্টে
বন্ধ হলো সবে অনুরোধের গান,
খেলা ইস্ট বেঙ্গল আর মোহনবাগান।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ছোঁয়া আসার পরেও অনেক কে বলতে শুনেছি "ও: জংলার ফ্রি কিকটা মনে আছে (অবশ্য যে দেখেছে সে জীবনে ভুলবে না)। আমাগো বেকহ্যাম লাগতো না।" পাশ থেকে জেঠু মাথা নাড়তেন আর বলতেন সামাদ সাহেবের গপ্পো। দুবার নাকি বারপোস্ট শট লাগার পর রেফারি কে গিয়ে বলেছিলেন, "বারপোস্ট ছোট", তারপর মেপে নাকি দেখা গেল সত্যি তাই ! অব হযে শুনতুম।

আবেগপ্রবণ বাঙালি। তাই ধারাবিবরণী তে সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটত স্বাভাবিক ভাবেই। সেটা বোধহয় ২০০৬, ওয়ার্ল্ড কাপ চলছে তখন। ব্রেজিল ফ্রান্সের কাছে হেরে গেল। টিভি চ্যানেলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষন। একটি চ্যানেলে পিকে-র বক্তব্য - ... কাকা এক একটা স্ট্রেচের দৌড়ে চার-পাঁচটা ডজ, এক একটা ডজে ৬০-৭০ গজ টেনে বেরিয়ে যাচ্ছিল ... (ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্য বোধহয় ১২০-১৩০ গজ, ফ্লো-তে পিকে-র সে সব খেয়াল নেই)। প্রসুন বানার্জী কেও একবার ইস্ট-মোহন ম্যাচ এ হেমন্ত ডোরার এক অনবদ্য সেভ নিয়ে বলতে শুনেছিলাম …. 'একটি অবৈধ গোল বাঁচালেন হেমন্ত"। পিকে -কে অনেকবার দেখেছি খেলোয়ারদের সংগ্রামী মনোভাবকে ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিংহের আত্মবলিদানের সাথে তুলনা করতে। সবই বাঙালির আবেগ।

তবে এই আবেগের শুরু আরো আগে। অজয় বসু কে মনে পড়ে? কথা বলতে বলতে গলার পারদ চড়তো ক্রমশ।

...ফাউল , ফাউউউউল, ফাউউউউউউউউল ….

হ্যাঁ, আমি তিনবার বললুম বটে, তবে ফাউলটা তেমন গুরুতর কিছু ছিল না, পোর্ট ট্রাস্টের ডিফেন্ডার কৃশানুকে হাল্কা ধাক্কা দিয়েছেন যা রেফারির নজর এড়ায়নি। কিন্তু ফাউল করার সময় খেলোয়াড়দের মনে রাখতে হবে মাঠভরা দর্শকদের আবেগের কথা, মনে রাখতে হবে তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা থেকে ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, সামান্য প্ররোচনায় দর্শককূল হয়ে উঠতে পারে উন্মত্ত (গলা চড়ছে), মনে রাখতে হবে উনিশশো আশি সালের ষোলই আগস্ট (গলা আরও চড়েছে), সেদিন যে পাপ আমরা করেছি তার ক্ষমা নেই, (ব্যাকগ্রাউন্ডে তুমুল দর্শকোচ্ছ্বাস অগ্রাহ্য করে) নিরীহ নির্দোষ ফুটবলপ্রেমীদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল ইডেনের গ্যালারি (গলা এখন তারসপ্তকে) - সে রক্তের দাগ আজও আমাদের হাত থেকে মোছেনি।
(ব্যাকগ্রাউন্ড আওয়াজ কিছুটা থিতিয়ে এসেছে, গলা ফের মন্দ্রসপ্তকে) এসব বলতে বলতে বোধহয় গোল হয়ে গেল ... কে গোল করলেন সুকুমার?

সুকুমার সমাজপতি: অজয়দা, আমার ঠিক সামনে একটা থাম পড়ে যাওয়ায় আমি ঠিক দেখতে পাইনি কে গোলটা করলেন, তবে খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হল কুলজিৎ।

সুকুমার সমাজপতি আবার ৬০ এর দশকে ইষ্টবেঙ্গলে খেলে গিয়েছেন। তো, উনি যখন ভাষ্য দিতেন, কোনো একটা মুভ, আগেথেকে আঁচ করতে চাইতেন ...... ফলে ওনার ভাষ্যতে প্রচুর 'না' থাকতো ...... যেমন .....
--- প্রবীর (মজুমদার) বল ধরেছেন .... সামনে ফাঁকা জমি .... এগোবেন কি ... না .... হাবিব-কে পাস করলেন । হাবিব এবার কি করবেন .... গোলমুখে সেন্টার করবেন ? .... না না ..... সুভাষকে দিয়েছেন .....

সুকুমার সমাজপতি আবার নিজের গা থেকে ইস্টবেঙ্গল গন্ধটাও ছাড়তে পারেন নি ধারাবিবরণীর সময়েও। ওই যে বলছিলাম, বাঙাল-এর (বা বাঙালীর) আবেগ! খেলার বিবরণী দিতে দিতে হঠাত করে চলে যেতেন স্মৃতিচারণে। কথার ফ্লো তে খেয়াল নেই যে ইষ্টবেঙ্গল গোল খেয়েছে রাজস্থান-এর কাছে। গ্যালারি যথারীতি চুপ। হঠাৎ খেয়াল হতে, 'যা তেরি! এ কি কেলো! ইষ্টবেঙ্গল গোল খেয়ে গেল' । পরের দিন কাগজে কমেন্টেটর-এর পক্ষপাতদুষ্ট বিবরনী নিয়ে সমালোচনা।

তবে এব্যাপারে পিকে কে কেউ ধরতে পারবেন না। ইডেনে বড় ম্যাচ। অঝোরে বৃষ্টি নেমেছে। পি কে, প্রায় মিনিট দশেক স্মৃতি চারণের পর ... ' ... প্রশান্তর সামনে মনোরঞ্জন কতটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বুঝাতে না পারলেও, আমার সামনে একটি বিশাল থাম্বা এবং মুশলধারায় বৃষ্টি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে আবার অলিম্পিকে ফিরে যাই... যে কথা বলছিলাম, ৫৬-তে মেলবোর্নে …

আজ অনেক কথা মাথায় আসছে। আজ CFL এর নির্ধারক ম্যাচ। আমার ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগানী বাবলু ভাত্চার্জির কোচিং এ তৈরী টলিগঞ্জ অগ্রগামী।

আজ ইস্টবেঙ্গল জিতলে পর পর পাঁচ বছর CFL জয়ের হাতছানি, অবশই দারুন ব্যাপার। টলিগঞ্জ অগ্রগামী জিতলেও কলকাতার ফুটবল এর পক্ষে ভালো বিজ্ঞাপন। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান , মোহামেডান এর বাইরে কেউ জিতবে। শেষ হযেছিল ১৯৫৮ সালে। বাঘা সোম এর কোচিং এ পিকে ব্যানার্জির ইস্টার্ন রেল। যদি খেলা ড্র হয়? নেপোয় দই মেরে যাবে , মানে ভোম্বল এর মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গল জিতুক মনে প্রাণে চাই। টলিগঞ্জ অগ্রগামী জিতলে "আমি দুঃখ পেলেও, খুশি হব জেনো " ….. চাই না খেলাটা ড্র হোক আর নেপোয় মাঝখান থেকে দই মেরে যাক , আসলে আমি মনে প্রাণে বাঙাল তো !!

রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

পিছনে ফিরে তাকানো - নিলাঞ্জন গুহমজুমদার

ঠিক কোন বয়েস-এ পৌঁছে মানুষ পিছনে ফিরে তাকায়? বার্ধক্যে? না, আমার মনে হয় না। আমরা পিছন ফিরে তাকাই, জখন আমাদের সামনের চলার পথটা খুব কঠিন হয়ে আসে, অথবা আমরা কিছু হারাই, অথবা দুটোই।
...
...
সেই ইঁটপাতা গলিতে খেলা, স্নিগ্ধ বিকেল গুলোতে, আর সন্ধ্যে হলেই মা-ঠাম্মার বাড়ি ফেরার ডাক। রবিবার গুলো অন্যরকম – বাবার বাড়ি থাকা, দুপুরে খাসির মাংসের ঝোল দিয়ে অনেকটা বেশি ভাত খেয়ে ফেলা, আর তারপর একটা লম্বা ঘুম। সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ করে কারুর বাড়িতে আসা, গল্প, আড্ডা – জমজমাট সন্ধ্যে।

তারপর কৈশোর – সেই বড় হবার আনুভুতি, বাঁধন ছেঁড়ার ইচ্ছে, কিছু অন্যরকম করার উত্তেজনা। আর রোমান্টিকতা। সবকিছুতেই ভালো লাগার অনুভুতি, সেই নীল আকাশ, দুরদুরান্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ, শালিক-র কিচির মিচির, বয়ে যাওয়া হাওয়া, তিরতির করে কাঁপা পুকুরের জল, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে পর্যন্ত চলা বন্ধুদের আড্ডা, খোলা আকাশের নিচে। দলবেঁধে পড়তে যাওয়া স্যারেদের কাছে, পড়া, বাড়ি্র লোক-কে লুকিয়ে পড়া-ফেরত আড্ডা, নোটবই দেওয়া-নেওয়া, সেই সুযোগে হাত-র কিছু স্পর্শ, আড়চোখে তাকানো, অল্প লাজুক হাসি, চোখের ভাষায় কথা।

সময় এগিয়ে যায়। যৌবন আসে। দায়িত্ব শব্দটা মাঝে মাঝেই কানে এসে পৌঁছয়, নিজের অজান্তেই বড় হতে থাকি। কৈশোর-র কিছু ভালবাসা পূর্নতা পেতে থাকে, কিছু রয়ে যায় শুধু স্মৃতিতে।কলেজ, অন্য শহর – পৃথিবী-টা বড় হতে থাকে। নতুন মানুষ, নতুন জীবনের স্বাদ, কিছু পুরনো স্বপ্ন, কিছু নতুন। সময় এগিয়ে যায় হু হু করে।

হঠাৎ একদিন, খবর আসে, রোগ আর জ্বরার আমোঘ থাবার গ্রাস করার খবর, হয়েতো বা কোনো প্রিয়জন। বুঝতে পারি, পৃথিবী-টা শুধুই এগোনোর নয় – সেই প্রথম পিছন ফিরে তাকানো। কর্কট রোগ বাসা বাঁধে প্রিয়জন-র শরীরে – জীবনের লড়াই আর তার ক্ষতগুলো সামনে আসতে থাকে।

সংসার বড় হতে থাকে, আর্থিক স্বচ্ছলতাও বাড়তে থাকে। কিন্তু বড় হওয়া জীবন, বড় হওয়া সংসার, কেমন যেন মাঝে মাঝে দুলতে থাকে, ভাঙতে থাকে। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না, এগিয়ে যায়। শুধু দিনগুলো কেন যেন আরো দীর্ঘ হতে থাকে, রাতগুলো আরো নিঃশব্দ হতে থাকে।

আর একদিন, হঠাৎই, আকাশে একটা নতুন তারা জুড়ে যায়। আর হাত-টা যখন ঘুমের মধ্যে সেই চেনা আঁচল-টা খোঁজে, ঘুমটা ভেঙ্গে যায় এক ঝটকায়, জামাটা ভিজে যায় ঘামে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, খুঁজি সেই তারা-টাকে, হয়েতো খুঁজে পাই, জানি না, কিন্তু তার আলো আর ঊষ্ণতা আমাকে স্পর্শ করে না আর। বড় ঠান্ডা লাগে – অন্ধকারে।
আরো তারা জন্ম নেয় আকাশে, অন্ধকার আর ঠান্ডাও বাড়তে থাকে, ঘিরে ধরে চারিদিক থেকে।

এরপর, অনেক অনেক দিন পরে, হঠাৎ একদিন আবার সুর্য ওঠে চারিদিক আলো করে, মেঘ সরে যায়। ফিরে আসে ঊষ্ণতা, ফিরে আসে এগিয়ে চলার তাগিদ। পৃথিবী-টা আবার সেজে ওঠে, দিনগুলো আবার আলোকিত হয়, রাতগুলো হয় বর্নময়। জীবনের লড়াই-টা কেমন যেন সহজ হয়ে যায়। তরতর করে এগিয়ে যায় জীবন, সব ক্ষত কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।
সূর্য অস্ত যায়, আবার ওঠে। ঘুম আসে, ঘুম ভাঙ্গে।
একদিন – সূর্য অস্ত গেল।
...
...
খুব মেঘ করেছে। সূর্য-টা আর দেখা যাচ্ছে না।
ফিরে আসছে ঠান্ডা, ঘিরে আসছে অন্ধকার।
সামনের পথ-টা খুব অন্ধকার। কি আছে ওখানে? দুর্বার পাহাড়? অতল খাদ? নির্মম জলহীন মরুভূমি? ঘন কালো অসীম জল?

জানিনা। হারিয়ে গেছে আলো, হারিয়ে গেছে ঊষ্ণতা।
তাই, আজ আবার পিছন ফিরে তাকালাম।

শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ঝরা পাতা ~ সংগীতা দাশগুপ্তরায়

​শুকনো পাতা মাড়াই না এখন। অথচ ছোটবেলায় বাগানের পাতা মাড়িয়ে হাঁটতে দিব্যি লাগত । অনেক সময় আমগাছের গায়ে লেগে থাকা সবুজ শুঁয়োপোকা ভীষণ বেড়ে যেত বলে মা গোড়ার একটু পাশ করে অনেক পাতা জ্বালিয়ে দিত। আগুনের তাতেই বোধহয় গাছের গা থেকে সবুজ সবুজ শুঁয়োপোকা টুপ টুপ করে খসে পড়ত । ব্যাপারটা এখন একটু নৃশংস শোনালেও তখন কিন্তু তেমন কিছুই মনে হত না। বাগানে ঝরা পাতা ডাঁই করে রাখা হত শুকোলে পুড়িয়ে দেওয়া হবে ভেবেই। একবার শীতের করুন দুপুরে মা পাতায় আগুন দিয়ে দিয়েছে। মিনিট খানেকের মধ্যেই পাতার ঢিবি ফুঁড়ে লাফিয়ে বেড়িয়ে এল মিনুর খুকু। মিনু আমাদের বারয়ারী পুষি। তার খুকু যে শীতের দুপুরে ওই পাতার ডাঁইয়ের মধ্যে ঢুকে বসে আছে তা কে জানে! তবে বেরোতে বেরোতেই বেচারির পিঠ আর ল্যাজের কাছটা একটু বোধহয় পুড়ে গেছিল। সারাদিন ধরে কেঁদে গেল পুষিখুকু আর মিনু সেদিন আর পাড়া বেড়াতে গেল না। সেদিন শিখলাম না দেখে শুনে পাতায় আগুন দিতে নেই। নিচে মিনুর ছেলে মেয়ে নাতিন পুতিনরা থাকতেই পারে...

পুরোনো ব্যাগ ফেলে দেওয়ার আমরা একবার এ পকেট ও পকেট হাতড়িয়ে দেখে নিতাম। মাঝে মাঝে নীলচে মত একটাকা, লাল দুটাকার নোট বা জলতরঙ্গ খাঁজওয়ালা দশ পয়সা পাওয়া যেত। দাদু বলতেন পয়সার ব্যাগ কখনও খালি রাখতে নেই। অন্ততঃ কটা খুচরো পয়সাও থাকা উচিত। তাতে ব্যাগের অভ্যেস থাকে টাকা রাখার। কার্ডে কেনার যুগেও তাই কিছু কাগুজে টাকা বা কয়েন পার্সে রাখাটা অভ্যেসে ঢুকে গেছে। তাতে একটা সুবিধাও আছে। সবসময়েই কোন না কোন ব্যাগে কিছুমিছু টাকা থেকেই থাকে...

নীলকন্ঠ স্যারের কাছে ইংলিশ পড়তাম আমরা। সত্তরোর্ধ মাস্টারমশাইকে ভয় পেতাম না একদম, ভালবাসতাম ভীষণ । ছোট্ট ঘরটাতে ঢুকতাম বিকেলে । একটু পরে জানলার ওদিকে সন্ধ্যে নামত। এদিকে ঘরে ঘরে ধূপ আর প্রদীপের শিখা নিয়ে ঘুরে যেতেন দিদা (স্যারের স্ত্রী) । ধুনোধূপের গন্ধটা ঘরে ঘুরতে ঘুরতেই ঝপ করে লোডশেডিং। দিদা স্যারকে একটা হাতপাখা দিয়ে যেতেন আর আমাদের একটা। গোল হাতলের হাত পাখা আর সে হাতলটা ঢোকানো আর একটা সরু ফাঁপা পাইপের মত হাতলে। দিব্যি হালকা হাতে ঘোরালে তিনশো ষাট ডিগ্রিতে ঘুরত, আমরা সবাই একসঙ্গেই হাওয়া পেতাম। স্যার ওই সময় মুড়ি খেতেন নকুলদানা দিয়ে। একটা ছোট বাটিতে স্যারের মুড়ি আসত আর একটা বড় বাটিতে তেলমাখা মুড়ি আসত আমাদের তিনজনের জন্য। মাঝেসাঝে স্যার হ্যারিকেনের সলতেটা একটু নামিয়ে আমাদের গল্প বলতেন। মানুষের গল্প , মৃত্যুর পরের রহস্যময় জগতের গল্প, বিশ্বযুদ্ধের গল্প কিচ্ছু বাদ যেতনা। কারেন্ট আসার আগেই কোন কোনদিন আমরা পড়া সেরে উঠে পড়তাম । ফেরার পথে একটা বাদামী রঙ্গের ইঁট বার করা বাড়ি ছিল। সে বাড়িতে নাকি নতুন বউ বউভাতের পরদিন গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়েছিল। আমি মৌ আর রিনিদিদি নিজের নিজের পছন্দের ঠাকুরের নাম করতে করতে পেরিয়ে যেতাম বাড়িটা । একচিলতে ওই ঘর, প্রত্যেক সন্ধ্যের লোডশেডিং আর ভুতুড়ে তকমাওয়ালা বাড়ি আমায় শিখিয়েছিল হাওয়া, মুড়ি, ভয় সবই ভাগ করে নেওয়া যায়...

জীবন কত কিছু যে শিখিয়েছে তার হিসেব নেই । জীবন জুড়ে যত মানুষের আনাগোনা, তাদের সবার কাছে কিছু না কিছু শিখেছি। শুধু আজকের দিনটাই নয়। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তেই জীবনের কাছে ঋণী আমি, জীবনের সঙ্গে জুড়ে থাকা বা ছিন্ন হওয়া প্রতিটি মানুষের কাছেও...

শিক্ষক দিবসের শুভকামনা সব্বাইকে ...

বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

আমার পূজো - পারমিতা ব্যানার্জী

জানলার বাইরের নিম গাছটার  পাতার ফাঁক দিয়ে যে নরম রোদ টা আমার ঘরের প্রান্ত থেকে প্রান্ত খেলে বেড়াচ্ছে সেটা আমার খুব চেনা, এই রোদটা প্রথম জানান দেয় পুজো আসছে আমার ছোটবেলায় "পুজো আসছে " এই দুটো শব্দের অর্থ একটু অন্যরকমপুজো আসা মানে বাবার  বাড়ি ফেরা বাবা তখন চাকরিসূত্রে ভূপালে আর আমরা দুই বোন  মা এর সাথে কলকাতায় তখন এইরকম একটা নরম রোদের সাথে বাবার চিঠি আসতপুজোয় বাবার বাড়ি ফেরার চিঠি আর সেই এক টুকরো কাগজ যেন মনের মধ্যে আনন্দের একটা ফড়িং উড়িয়ে দিত বাবা আসা মানেই তো দূপুর জুড়ে দেশ বিদেশের গল্প শোনা নোয়াস আর্ক ,মোজেস এর সমুদ্র ভাগ,চাঁদের পাহাড় এর শংকর,জুলেভার্নের টাইম মেশিনের সাথে প্রথম পরিচয় আমার এই এক একটা দুপুরেইগল্পের পাশাপাশি থাকত নতুন নতুন ধাঁধার এক একটা ধাঁধার জন্য সময় ধার্য থাকত একটা দূপুর বিকেল হলেই উত্তর দিতে হত আর না পারলে বাবা বলে দেবেবাবা যদিও বা আমার না পারার লজ্জায় মুখ ভার দেখে আরো একটু চেষ্টার সুযোগ দিত কিন্তু আমার এক নম্বরের পাজি দিদিটা ঠিক উত্তর বলে দিয়ে জিভ ভেঙিয়ে পালাতো সেটা তো হতে দেওয়া যায়না তাই গল্প শোনার ফাঁকে ধাঁধাটা নিয়েও ভাবতে হত অবশ্য দিদি বা বাবা কাউকেই খুব একটা উত্তর বলে দেওয়ার সুযোগ দিতাম না আমি

"পৃথিবীটাকারবশ"-"পৃথিবী টাকার বশ",তিন অক্ষরের নাম -প্রথম অক্ষর বাদ দিলে গায়েতে পরি ,দ্বিতীয় অক্ষর বাদ দিলে জীবনের শেষ তরী,তৃতীয় অক্ষর বাদ দিলে কামড় খেয়ে মরি -বলত কী? ভাবতে হবেনা বলে দিচ্ছি  -"মশারি"এমন কত শত ধাঁধা আমার বাবার কাছে শেখা ,পুজোর ছুটি শেষ হতেই যেগুলো বন্ধুদের বলে ধাঁধাগিরির বাহবা নেওয়া গল্প আর ধাঁধা ছাড়া আর একটা কাজ বাবা ছাড়া হতই না অষ্টমীর জামা কেনা অষ্টমীর জামা মানে পুজোর সেরা জামাটা সেটা সব সময় বাবার সাথে গিয়েই কেনা হতসব দোকান ঘুরে আমার সব চেয়ে পছন্দের জামাটা বাবা আমাকে কিনে দিতজামা কিনে বাড়ি ফেরার পর মা প্রতিবার জামার রঙ ,সাইজ ,কাপড় ,দাম নিয়ে কিছু না কিছু খুঁত বার করতইআর আমরা আগে থেকেই মা কি কি খুঁত বার করতে পারে সেটা ভেবে রাখতামবাবা বলত মার মত খুঁতখুঁতে মানুষ আর হয়না ,বাবা নাকি এমন কিছু কোনদিন কেনেইনি যার কোনো খুঁত মা খুঁজে পায়নি

অফিস যাবার পথে আকাশের দিকে চোখ পরতেই দেখলাম অসংখ্য সাদা মেঘের ভেলাবাবা আমাকে শিখিয়ে ছিল ওই মেঘেদের মধ্যে থেকে হাতি, ঘোড়া,খরগোশ ,ভাল্লুক খুঁজে বার করা মিশনের মাঠে বসে বাবা মেঘেদের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করত "বলতো খরগোশ টা কোন দিকে "ওহ সে যেন পরীক্ষার প্রশ্নের চেয়েও কঠিনমেঘ গুলো তো স্থির নয়,এক মিনিট দেরী হলেই খরগোশ টা অন্য কিছু হয়ে যাবে ,তাই চোখের পলকে সারা আকাশ তোলপাড় করে খরগোশ টা খুঁজে বার করতে হতো ,আর খুঁজে পাবার পর বাবার চোখের সেই দীপ্তি যেটা বলে দিত "এই না হলে আমার মেয়ে" সেটা ছিল সব পুরষ্কারের সেরা

বাবার চিঠি আসতো মহালয়ার আগের দিন আর বাবা আসতো পঞ্চমীর দিন ভোরে মাঝের এই কটা দিন যেন কাটতেই চাইতনা আর পঞ্চমীর দিন তো সূর্য কে যেন রাহু গ্রাস করতএমনিতে কোনকালেই আমি ভোরে উঠতে পারিনা কিন্তু ওই একটা দিন কাউকে ডাকতে হতনাভোর হওয়ার অনেক আগে থেকেই জানলার ফাঁকটায় চোখ রাখতাম আলোর অপেক্ষায়একটা আলোর রেখা জানলার এপার ওপার হলেই মশারি ডিঙিয়ে দরজা খুলে সোজা ঘরের বাইরে আমাদের বাড়ির পেছন দিকে পাঁচিলের একটা ভাঙ্গা অংশ দিয়ে গলির মুখটা দেখা যেত সেখানেই প্রথম বাবার আসা টা দেখতে পেতাম আর যেই না দেখা ছুট্টে বারান্দা পেরিয়ে তুলসী মঞ্চ পেরিয়ে গেট খুলে বাইরে একবার  তো এভাবেই ছুটতে গিয়ে তুলসী মঞ্চের সামনে পা পিছলে গিয়ে সোজা নাকটা গিয়ে ঠেকলো মঞ্চের গায়ে আর অমনি দরদরিয়ে রক্ত ,বাবার আসাটা আর দেখা হলনা ,বাবা হাত থেকে সুটকেস রাখার আগেই ডাক্তার এলো ঘরে তবে সেবার পুজোটা আরো ভালো কেটেছিল সারাদিন সব কাজ ফেলে বাবা আমাকে গল্প শুনিয়েছিল
ষষ্ঠী থেকে শুরু হত আমাদের পুজো পরিক্রমা সকালের জলখাবার সেরেই বেরিয়ে পরতাম উত্তর কলকাতার ঠাকুর দেখতে এক প্যান্ডেল থেকে আরেক প্যান্ডেল যেতাম পায়ে হেঁটে নতুন জুতোয় পায়ে ফোস্কা পরে একাকার তবু উন্মাদনায় খামতি ছিলনা ঠাকুর দেখার ফাঁকেই চলত নানা রকম রাস্তার খাবার খাওয়া ওই কদিন আর কোনো বাধা নিষেধ ছিলনা

ষষ্ঠী সপ্তমী বাইরের ঠাকুর দেখে অষ্টমীতে পুজোর রুটিনে একটু রদবদল হত অষ্টমীতে মামার বাড়ি সব মামা মাসি মামাতো , মাসতুতো ভাইবোন একত্র হতাম সেজ মামার বাড়িতে,সেখানেই দিদা থাকত সেখানে সারাদিন হইচই করে দুপুরে একসাথে খেয়েদেয়ে সবাই মিলে বেড়িয়ে ঠাকুর দেখে আবার রাতের খাবার সেরে যে যার বাড়ি ফিরতাম এসবের মাঝে আমি কিন্তু থাকতাম বাবার পাশে পাশেই মামা আর মেসো দের সাথে সাহিত্য,সিনেমা ,ক্রিকেট ফুটবল ,রাজনীতি নিয়ে আলোচনা গুলো আমি কিছুটা বুঝে কিছুটা না বুঝে হা করে গিলতাম বিষয় গুলোর চেয়ে আমার নজর থাকত বাবার বাচনভঙ্গির ওপর সব বিষয়ে খুঁটিনাটি খবর রাখত বাবা ,প্রতিটা বিষয়ে বাবার গভীর জ্ঞান সবাই কে মুগ্ধ করত ,তর্কের সময় যুক্তির পর যুক্তি সাজিয়ে যেভাবে বাবা দৃপ্ত কন্ঠে নিজের মত রাখত তাতে সবাই হাসি মুখে বাবার যুক্তির কাছে হার মানত আর আমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত সেরা বাবার মেয়ে হওয়ার গৌরবে
পুজোর চারটে দিন আলোর গতিতে কেটে যেত আর তারপর একরাশ বিষন্নতাবাবার ছুটি শেষের সময় লক্ষীপুজোর পর দিন যে বাবা ফিরে যাবে লক্ষীপুজোর দিন বিকেলে যখন বাবা আলমারির মাথা থেকে সুটকেসটা নামতো আমার বুকের ভেতর তখন চাবুক পড়ছে প্রতিবার এইসময় টা চাদরমুরি দিয়ে জোর করে শুয়ে থাকতাম সুটকেস খোলার আওয়াজ টা যাতে কানে না আসে তাই কান দুটো চেপে শুয়ে থাকতাম কিন্তু আওয়াজ পেয়েই যেতামআর গলার কাছে কি যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠত আর তো মাত্র কযেকটা ঘন্টা ,তারপর তো আবার সেই ভোর বেলা,গেট পেরিয়ে ,গলির মোর পেরিয়ে বাবার চলে যাওয়াটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যাওয়া আর আবার প্রতিক্ষা আরো 'মাসের প্রতিক্ষা আবার চোদ্দটা গরমের দুপুরের গল্প শোনার,বিকেলে মিশনের মাঠে বসে বাবার লেখা কবিতা শোনার আর ফেরার পথে গোল্ডস্পট খাওয়ার

আজ প্রতিক্ষার পালা বাবার চাকরিরতা ,বিবাহিত ,তার সবচেয়ে প্রিয় ছোট মেয়ের সঙ্গে কযেক মুহূর্ত সময় কাটানোরমেয়েটা যে আজ ভিষণ ব্যস্ত চাকরি আর সংসার সামলে সপ্তাহান্তে কযেক ঘন্টার গল্পের জন্য ,কলেজস্ট্রীট ঘুরে কেনা তার নতুন বই এর কালেকশন দেখানোর জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় সারা সপ্তাহতাও কোনো কোনো সপ্তাহে মেয়ের এত তাড়া যে কোনমতে মায়ের সাথে দরকারী কথা সেরেই পালাতে হয়আবার কোনো কোনো দিন ফোন এর ওপারে মেয়ের গলায় "এই রোববার আসতে পারবনা" শুনলে বাবার দীর্ঘ অবসর আরো একটু দীর্ঘ হয়ে ওঠে


পুজোর দিনগুলো আমার এখন ভাগ হয়ে গেছেকিছুটা স্বামীর জন্যে ,কিছুটা শশুরবাড়ির জন্যে রেখে সাকুল্যে একটা দিনের অর্ধেক কাটে বাবার সাথেআর সেই অর্ধেক দিনেই বাবার তোতাপাখির মত পুজো পরিক্রমার গল্প বলা,সবটাই টি.ভি তে,আবার সেই দুই বোনে মিলে ধাঁধার সমাধান করা,নতুন লেখকের গল্পের ,নতুন রিলিজ হওয়া কোনো ভালো সিনেমার সমালোচনা ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই ছোটবেলার ফেলে আসা দিন গুলোতে বাইরে বিসর্জনের কাঁসর ঘন্টার দাপাদাপি ম্লান হয়ে যায় আমাদের বসার ঘরের চার দেওয়ালে