বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০১৪

“প্রেম”!! বাপরে বাপ! বহুত চাপ!... - সাগর চক্রবর্তী


বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ- নীচের লেখাটি পড়া আদি অকৃত্রিম নিখাদ প্রেমে উন্মত্ত যুগলের পক্ষ্যে বিপদজনক। নিজেদের দায়িত্বে ঝুঁকি নিয়ে পড়ুন!!

“প্রেম”!! বাপরে বাপ! বহুত চাপ!...

         *****************
হায় হায়!! কথায় বলে, “আশায় বাঁচে চাষা”। এতদিন হল আমাদের রিলেশন, রোজই মনে হয়, এই বুঝি আজ থেকে বেগার খাটা বন্ধ হবে। কিন্তু কোথায় কি! শুধু বেগার খেটে যাও। তাও শুধু ওর জন্য হলে মানতাম। ওর ছোটভাই-মাসির ছেলে-থুত্থুড়ে ঠাম্মা-সবার জন্য খেটে মরতে হবে। “এই তুমি আজ সন্ধায় ফ্রি তো, তাতাই কে একটু ফিজিক্স টা দেখিয়ে দিও।” ব্যস, পাড়ার রকের আড্ডা জলে। সোনামুখ নিয়ে একটা হাফ-বাঁদরকে পড়াতে বোসো। ঠাকুমার বুক ধড়ফড়, অ্যাপয়েন্টমেন্ট তো বটেই, ডাক্তারখানায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ, অবশ্যই ট্যাক্সিতে। ভাড়াটাও তুমিই গুনবে হে গৌরী সেনের নাতজামাই। “বাঁকুড়া থেকে ন’পিসিরা এসেছে, নেটে ৪ টে টিকিট কেটে দাও না সোনা।” উঁহু! নো দাঁতচাপা খিস্তিয়াল কমেন্টস! এখন ডেবিট কার্ডে খরচা তো কি, ও দিকে যে ক্রেডিট (প্রেম) জমছে। বোঝো ঠ্যালা!!
                    *****************
মাঝেমধ্যে মনে হয়, প্রতি উইকেন্ডেই নতুন চাকরির ইন্টার্ভিউতে বসছি। তখন মনকে বোঝাই, না, প্রেম করছি। কিন্তু মন মানতে চায় না। সত্যিই মনে হয়, কেন রে বাবা, প্রেমই তো করছি, তা হলে প্রতি শনিবার বিকেলে অমন ধোপদুরস্ত ধড়াচুড়ো পরে ডিও বাগিয়ে হাঁচিকাশি চেপে প্রেজেন্ট প্লিজ কেন দিতে হবে? রোজ চোখ কুঁচকে, “ম্যাগো, কী মুটচ্ছো রে বাবা! দেখি, বেল্টের ফুটো ফের এক ঘাট বেড়েছে?” বলি, প্রেম করছি না পি.টি. টিচারের কাছে দশ আঙুলের নখ পরিষ্কার কি না দেখাচ্ছি! “এ কি, পাঞ্জাবি পরেছ, এ দিকে পায়ে স্নিকার?” আড়াই দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়িমুখ, সামনে গেলে চাঁদবদনী হাড়িমুখ। “খবরদার চুমু খাবে না এই জঙ্গুলে মুখ নিয়ে!” এতদিনে বুঝেছি, প্রেমিক=২৪*৭ মডেল-লুক। প্রেম করতে গিয়ে আমি ফ্যাশন শিখে ফেলেছি। বোঝো ঠ্যালা!!
                     *****************
মাঠে ঘাটে বসলে পিঁপড়ে-লোফার-ভিখিরি-পলিউসন, তাই রোজ রেস্তরাঁ। টানা হপ্তাদুই বিরিয়ানি, পোলাও, মাটনকসা, চিলিচিকেনের পর, যা হওয়ার তাই। সারা রাত বাথরুমে বসে তার কথা ভাবা। মুশকিলটা হচ্ছে, প্রেমিকের কখনও আমাশা হতে পারে না। তাই ফুটো লিভার-থ্যাতলা প্যানক্রিয়াস আর ছদ্মসুখী মুখ নিয়ে ফের শ্যামবাজার গোলাবাড়িতে হানা দেওয়া, জমিয়ে রেশমি কাবাব আর রোগান জোশ! ক্রমে প্রেম জম্পেশ, আলসার-ও। বেশীরভাগ সময় প্রনয়ী ছেড়ে যায়, পেটব্যথা ছাড়ে না। ধুত্তোর!!
*****************
মুখে চোর চোর ভাব। হাত ধরাধরি করে সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটতে গিয়েও তিনশো ষাট ডিগ্রি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুন্ডুর ব্যায়াম। যদি ২-এক পিস চেনা থোবড়া বেরিয়ে পড়ে! আচ্ছা, সামনের সিটের ভদ্রলোকের টাকটা ঠিক মেসমশাইয়ের মতো চকচক করছে না! গাছের আড়াল থেকে অবিকল ছোট কাকার স্টাইলে ধোঁয়ার রিংগুলো বেরিয়ে আসছে না! পার্কের ঝোপে চুমু খেতে গিয়েও বুক ধড়াস ধড়াস। যদি ঘাড়ে এসে পড়ে পুলিশের থাবা! আত্মীয়ঘন পরিবেশে বেমক্কা মোবাইলে ওর ডাক এলে বেইজ্জতির ভয়, দুম করে কেটে দিলে ওর রাগের ভয়, প্রেমের কথা বাড়ীতে চেপে রাখতে ভয়, উগরে দিলে তুমুল অশান্তির ভয়। পঁচিশের আগেই ব্লাডপ্রেশার, ই.বি.এস. (ইরিটেটিং বাওয়াল সিনড্রোম)! বোঝো ঠ্যালা!!
*****************
যেন প্রেম করতে গেলে অসামাজিক হতেই হবে! প্রথমেই বেস্ট ফ্রেন্ডদের নামে চুগলি করে করে তাদের সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেবে। বন্ধুরা যখন ফ্রিক আউট করছে, আমায় পার্কে ওর চোখে চোখ রেখে মশার কামড় খেতে হবে! বন্ধুরা গ্রুপে মন্দারমণি গিয়ে মস্তি করছে, কিন্তু ঐ গ্রুপে ২ টো ছেলে আছে বলে ও আমাকে যেতে দেবে না! কলেজের টিচারের বিয়েতে নেমন্তন্ন। ও কোনও এক অজানা কারণে, এক ঘন্টা আগে সেখানে পৌঁছে আমাকে বের করে আনবে। এই যে আমরা গোটা পৃথিবীটাকে দু’ভাগ করে ফেললাম, এক প্রান্তে আমরা ‘দো জিসম এক জান’ আর অন্য প্রান্তে না জানি কেন ‘দুশমন জমানা’, বলতে নেই কোনও কারণে যদি ‘সাধের প্রেম’টাই ভ্যানিশ হয়ে যায়, তো এই ব্যর্থ প্রেমের আবর্জনা পোড়াতে আসবেটা কে? সেই বন্ধুবান্ধব আত্মীয়রা? যাদের একসময় ২ জনে মিলে ‘হাম কো জমানে সে কেয়া’ বলে ফুটিয়ে দিয়েছিলাম? ইল্লে??
*****************
সবচেয়ে বড় অসুবিধা, প্রেম অন=খিস্তি অফ। ওর সঙ্গে থাকলে, পেট ফুলে গেলেও খিস্তি করা যাবে না। অটোতে ২ জন যাচ্ছি, সিগনালে কেতাবাজ বাইকবাহন ওর দিকে তাকিয়ে স্যাট করে নিজের ঠোঁটে কদর্য জিভ বুলিয়ে নিলেও না! প্রিন্সেপ ঘাটের সিঁড়িতে জোড়ায় বসে আছি, ঠিক সামনেটায় কেউ ছিরিক করে গুটখার পিক ফেললেও না। রাগে অন্ধ, তবু খিস্তি বন্ধ। মাইরি বলছি, আলজিভ নিশপিশিয়ে ভোকেবুলারি উঠে আসে, কিন্তু কেন জানি না ও সামনে থাকলে মুখ দিয়ে পলিটিকালি কারেক্ট ‘অসভ্য! অশিক্ষিত!’ই বেরিয়ে আসে, যাতে ওর মনে হয়, আহা! ‘প্রেমিক’ যে একেবারে গোলাপ পবিত্র, চার অক্ষর বলতে ও শুধু ‘ভালবাসা’ই বোঝে! বোঝো ঠ্যালা!!
*****************
গোড়াতেই নিজের কাছে নিজে শপথ নিতে হয়, ‘যাহা বলিব মিথ্যা বলিব, মিথ্যা বই সত্য বলিব না’।  ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া টি২০ ম্যাচের নাটকীয় মুহূর্তে প্রেমিকার ফোন এলে অম্লান বদনে বলতে হয় ‘এই তো তোমার কথাই এতক্ষণ ভাবছিলাম’। সাজের বহর দেখে রাগে গা জ্বলে গেলেও মুখে একটুকরো হাসি লাগিয়ে বলতে হয়-‘ফাটাফাটি!’ বুক ফাটলেও মুখ দিয়ে বেরোবে না ‘ওরে মড়া, আমি এখন পাশবালিশ আঁকড়ে স্বপ্নে সানি লিওন-এর সাথে মরিশাস-এ বেড়াতে যেতে চাই, তোমার সঙ্গে গঙ্গার পাড়ে নয়!’ কিংবা, ‘এর আগে আরও ১৪টা মেয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তুমি ১৫তম।’ প্রেমের রাজ্যে পৃথিবী মিথ্যেময়। আর অভিমান বোঝাতে নিজের চোখের কোনায় নখ দিয়ে খুচিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার ফ্যাকড়া তো আছেই! ধুত্তোর!!
*****************
বাস্তব ডকে উঠে যায়। পুরোটাই ভবিষ্যৎ কাল, পুরোটাই ওয়ান্ডারল্যান্ড। কত্ত সুন্দর একটা বাড়ী হবে আমাদের, গুল্লু গুল্লু ২টো ছানা, বছরে একবার ফরেন ট্যুর, আমরা কিন্তু একদম ঝগড়া করবো না, কেমন? ঘুন্টুপুচু, এখন একটু কষ্ট করে ঝালমুড়িতে মন দাও। এই তো, মাইনে একবার বাড়লেই ফি হপ্তায় দু’বার মোক্যাম্বো থেকে মেনল্যান্ড চায়না। প্রমিস। এই দুনিয়ায় আর্থিক মন্দা নেই, ইএমআই নেই, আগুন বাজার নেই, হু হু করে ডলার পতন নেই... কিন্তু ফ্যান্টাসির ফানুস ফুলতে ফুলতে এক দিন ফটাস! আর, তার পর সোজা প্লুটো থেকে পৃথিবীতে আছাড়। গায়ের ব্যথা মারতে নেক্সট প্রেমের অপেক্ষায় বসে থাকা...!!!
*****************
প্রেম সফল হলে বিয়ে হয়ে যায়! যে জিনিসের লাস্ট সিনে এমন সাংঘাতিক সর্বনাশ অপেক্ষা করে আছে, সে কি ভদ্র কান্ড হতে পারে? ভুলিয়েভালিয়ে লজেঞ্চুস দেব বলে ফুটন্ত কড়ায় এনে ফেলা যার অভ্যাস, সেই প্রেমকে তোল্লাই দেয় যারা, সকলে মিলে তাদের চিহ্নিত করুন এবং সর্বসমক্ষে ‘রদ্দা মারুন’!!
----------

সোমবার, ২৮ জুলাই, ২০১৪

মদন - সিদ্ধার্থ দে

ইংরিজি “স্ল্যাং” শব্দটির সঠিক অনুবাদ কঠিন এবং তর্কসাপেক্ষ | অপভাষা বা কুবচন বলা যেতে পারে | ব্যবহৃত হতে হতে অনেক স্ল্যাং আবার গৃহীত ভাষ্যের অন্তর্গত হয়ে যায় | অভিধান ঘাঁটলে এই সব শব্দের ব্যুৎপত্তি বিষয়েও প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করা কঠিন নয় | আজকের যুগ বিশেষীকরনের – অনেক পুস্তক বিক্রেতা আজকাল স্ল্যাংএর অভিধান-ও রাখছেন |

ইন্টারনেট বন্ধুবান্ধবীদের মধ্যে আজকাল বয়স কোন বাধা নয় | সেই একটি গানের কলি আছে না – “তুমি আমারও বন্ধু, বাপেরও বন্ধু” – সাইবার সম্পর্কগুলো সেই জাতীয় আর কি | চোখ আর মনের দরজা খোলা রাখলে চলতি ভাষার ওপর দিব্যি দখল এসে যায় | এই যেমন স্ত্রী কি একটা বিষয়ে নালিশ জানাচ্ছিল সেদিন – আমি সাবলীল ভাবে বললাম “একদম চাপ নিও না !”

শেখার কোন বয়স নাই | আমার মন এখনো যথেষ্ট অনুসন্ধিৎসু – কোন শব্দের মানে না জানলে বৈদ্যুতিক শব্দকোষ খুলে জানার চেষ্টা করি | সমস্যা হল- কিছু বহু প্রচলিত কথা অভিধানে নেই – থাকলেও সেগুলির সংজ্ঞা প্রচলিত অর্থের সঙ্গে একেবারেই বেমানান | গুগুলানুসন্ধান করেও খুব একটা বেশি আলোকপ্রাপ্তি হয়না |

আজ শুধু এমন একটি শব্দের কথাই লিখব | প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে পরশপাথর খোঁজার মত কথাটির অর্থ বোঝার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছি |

বাঙালী পরিবারে আমাদের সময়ে আত্মীয় বন্ধুদের আড়ালে কোন বিশেষ নামে অভিহিত করা হত | হয়ত এখনো হয় | উদাহরণস্বরূপ – এক প্রবাসী আত্মীয় বৎসরান্তে দেশে এলে উন্মত্তের মত কলকাতা তথা অন্যান্য শহরে চষে বেড়াতেন | আমি তাঁর নাম দিয়েছিলাম “চরকিবাজি” | স্বভাব এবং নামকরণের এমন সঙ্গতির ফলে অচিরেই তা সাদরে গৃহীত হয়েছিল | ( গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তৎকালীন এক রাজনীতিবিদ শ্রী চন্দ্রভানু গুপ্তার নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে তাঁকে CB Gupta বলে ডাকা হত ) কিঞ্চিৎ অন্যধরণের কণ্ঠস্বরের জন্য আর এক কিছুটা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ার নাম হয়েছিল হাঁড়িচাঁচা | পরিণত বয়সে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই – নামটি খুব একটা রুচিপূর্ণ ছিল না| বলা বাহুল্য, এগুলি ঠিক ডাকনাম বলতে যা বোঝায় তা ছিল না – কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতিতে নামগুলি কখনই ব্যবহৃত হত না অনভিপ্রেত প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় |

উপরের দুই ক্ষেত্রেই নামের মানে এবং ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন ছিল না | কিন্তু সমস্যা হল যখন আমার দাদা এক ঘনিষ্ট আত্মীয়ের নাম দিলেন ” মদন ” | রবি ঠাকুরের এক গীতিনাট্য ( চিত্রাঙ্গদা ) শুনে ধারণা হয়েছে তিনি প্রেমের দেবতা – যখন তখন পছন্দমত মানুষকে প্রেমাভিলাস পূরণের বর দিয়ে থাকেন | আর একটু বড় হয়ে জেনেছি তাঁর আর এক নাম কামদেব | এই আত্মীয়ের সঙ্গে সেই দেবতার কোন যোগসূত্র অনেক ভেবেও খুঁজে পাইনি |

তাছাড়া অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির নাম-ও মদন | যেমন ভারতের এক ক্রিকেটার মদনলাল যিনি একবার ইডেন উদ্যানে প্রায় তিরিশ গজ দৌড়ে এতো আস্তে বল নিক্ষেপ করেছিলেন যে ভিভ রিচার্ডস থতমত খেয়ে আগে ব্যাট চালিয়ে লোপ্পা ক্যাচ তুলে আউট হয়ে যান – আমার নিজের চোখে দেখা | আর একজন অভিনেতা মদন পুরী বোম্বাইয়ের বিখ্যাত খলনায়ক – পর্দায় যাঁর চোখেমুখে ক্রুরতা ঝরে পড়ত | তৃতীয় জন পশিম বঙ্গের এক মন্ত্রী মদন মিত্র, যিনি নিজের অনেক কীর্তির ছাপ অল্পদিনেই রেখে ফেলেছেন | সব শেষে বহু কালজয়ী গানের ( যেমন “নায়না বরসে রিম ঝিম”) স্রষ্টা মদন মোহন-ও আছেন |এঁদের কারোর সঙ্গেই আমাদের ভালোমানুষ, শান্ত স্বভাবের আত্মীয়ের বিশেষ মিল নেই| কলকাতায় মদন স্ট্রিট ( প্রচলিত উচ্চারণ যদিও ম্যাডান স্ট্রিট ) নামে একটা রাস্তাও আছে বৌবাজারের কাছে – অবশ্য সবাই জানে, বৌবাজারে যেমন বৌপ্রাপ্তি হয়না, ওই রাস্তাও দুনিয়ার মদনদের কেন্দ্র নয়|

তবে হ্যাঁ, তবে আমাদের মদনের কিছু প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট ছিল বটে – মনে হয় সেটা তাঁর সারল্য থেকে উদ্ভূত | যেমন, কোন নিমন্ত্রণে একটা সুস্পষ্ট নতুন পাতলুনের সঙ্গে একটা ইস্তিরি না করা তাপ্পিমারা বেমানান রঙের শার্ট পড়ে হাজির হলেন| বা কোন জমায়েতে এমন একটা মন্তব্য করে বসলেন যা উপস্থিত ব্যক্তিদের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত | একবার তো যৌবনচ্ছাস প্রসূত অনেক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করা একটি খাতা বাড়ির অতি কৌতুহলী বড়দের বিনোদনের জন্য অসাবধানে ফেলে রেখেছিলেন| ( বলে রাখি, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার ফলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সম্পর্কে আমার মনোভাবের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে – এক সদ্য যুবকের বিষয়ে কিছু আলোড়ন জাগানো “স্কুপ” নিয়ে হাসিঠাট্টা করাটা অত্যন্ত অন্যায় এবং অসমীচীন ছিল – তবে মনে রাখতে হবে ঘটনাকাল প্রায় ৫০ বছর পূর্বের ) |একবার একটি ছোটখাটো অন্যায় ঢাকার জন্য এমন সব দুর্বল অজুহাত দিয়েছিলেন যা সবার দীর্ঘদিনের হাসির খোরাক হয়েছিল | নামটা এতই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে যে সেদিন নাকি আমার ভ্রাতুস্পুত্রবধু টেলিফোনে তাঁকে প্রায় মদন আঙ্কেল বলে ডেকে ফেলেছিল | ( আসলে আঙ্কেল বলেনি – ইংরিজিতে আঙ্কেল অর্থে মামা, কাকা, জ্যেঠা , পিসে, মেসো অনেক কিছুই বোঝায় – সম্পর্কটি গোপন রাখতে শব্দটি ব্যবহার করলাম)

আজ সেই নামের সুবর্ণজয়ন্তী প্রাপ্তির বেশ কয়েক বছর পরেও আমি সেই এক-ই তিমিরে | মদনের আসল সংজ্ঞা আজও আমার কাছে ধোঁয়াটে | এই মদন নামক ব্যক্তি নয়ন সুমুখে নেই, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের নানা পরিস্থিতিতে আমাদের মাঝখানে ঘন ঘন আবির্ভূত হন ভিন্ন ভিন্ন রূপে | তিনি এলে চিনতে পারি, তবে যথাযত ভাবে বর্ণনা করতে পারিনা |

এই লেখা শেষ করব ফেসবুক বন্ধুগোষ্ঠীতে মদনের সঙ্গে পরিচিত আমার আত্মীয়দের একটা অনুরোধ জানিয়ে | দয়া করে এমন কোন মন্তব্য করবেন না যাতে মদনের পরিচিতি প্রকাশ পায় | তিনি ফেসবুকে সক্রিয় নন এই তথ্যের ভিত্তিতেই এই লেখার সিদ্বান্ত নিয়েছি | তাঁকে নিয়ে এই ধরনের ইয়ার্কি চলছে জানতে পারলে খুবই দু:খ পাবেন | জানিয়ে রাখি, ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর কাছে নানাভাবে ঋণী | তাঁকে কোনভাবে অপদস্ত করার অভিপ্রায় আমার নেই – এ লেখা নিছকই এক লঘু স্মৃতিচারণ |

বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই, ২০১৪

প্রজ্ঞা থাপার ছোট্ট জীবন ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

প্রজ্ঞা থাপা ক্লাস টেনের ছাত্রী। স্কুলে খেলাধুলোয় রীতিমত নাম আছে তার। পড়াশোনাতেও প্রজ্ঞা পেছিয়ে নেই সে কোনো ভাবে। বাবা থাকেন দেশের বাইরে, বাহরিনে। প্রজ্ঞা দেশের বাড়িতে মা কল্পনা থাপা আর দাদুর সঙ্গে থাকে আর ইটাহারির স্থানীয় মর্নিং স্টার স্কুলে পড়ে। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার, তেমন অস্বাচ্ছন্দ কিছুই নেই। এই মেয়েটি ২০১৪ সালের ৯ই জুলাই খবরের শিরোনামে চলে এলো।

রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত লিখেছিলেন "ফুটবল"। একটা নাটক। সে নাটক কতজন দেখেছেন জানিনা, কিন্তু সে নাটকে দেখানো হয়েছিলো এক দায়িত্বজ্ঞানহীন এক হিংস্র আক্রমন। সে নাটকের সমসাময়িক ঘটনা ১৯৮০ সালের ১৬ই আগস্ট, যেদিন ইডেনে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল খেলায় দাঙ্গায় ১৬ জন মারা গিয়েছিলেন। তার পরে সামান্য কিছু হইচই হয়েছিলো। দু দলের সমর্থক দের খেলার সময় আলাদা আলাদা বসানোর ব্যবস্থা হয়েছিলো। সে ব্যবস্থা এখনো আছে। লিগের প্রথম বড় খেলায় এখনো লোকে জিজ্ঞেস করে – "আমাদের কি ১ নম্বর আর ২ নম্বর? নাকি তিন চার দিয়েছে আমাদের?"। অনেকটা তফাত করে বসানো। ঘেটোর মত। মাঝখানে কাঁটাতার, অস্ত্র নিয়ে পুলিশ। ১৯৯৮ সালে দুই বন্ধু অফিসে একসঙ্গে ঢপ মেরে আইএফএ শিল্ডের ফাইনাল দেখতে গেছি একই ট্যাক্সিতে চড়ে, ভাড়া ভাগাভাগি করে। কিন্তু মাঠে পৌঁছে ও গেলো ওদিকে, আর আমি গেলাম এদিকে। এক সঙ্গে বসে খেলা দেখা গেলো না, কারন দু জন দু দল কে ভালোবাসি। এসব তো থাকবেই। মাঠে ঢোকার আগে, দুজনে দুজনকে "অল দ্য বেস্ট" জানাতেও ভুলিনি।

ফুটবল ভালোবাসি বলেই না দলকে ভালোবাসি, ফুটবলে উৎসাহ না থাকলে আর এ দল, ও দলের প্রশ্নই আসবে কেন? মনে আছে, আরো অনেক ছোটো বেলায়, বাবার হাত ধরে সন্ধের মুখে মিস্টির দোকানে যাচ্ছি মিস্টি কিনতে। বড় খেলায় জিতলে বাবা এক হাঁড়ি গরম রসগোল্লা কিনে খাওয়াতো লোকজন কে। আর এটাকে বলতো মধুরেন সমাপয়েৎ। সেদিন পাড়ার আর একটি ছেলেকে দেখে, খেলায় হারা নিয়ে একটা টিটকিরি মেরেছিলাম দোকানের সামনে। আমি তখন ক্লাস থ্রী কি বড়জোর ফোর। কান থেকে ঠোঁট ঝন্‌ঝন্‌ করে উঠেছিলো বিরাশি সিক্কা থাপ্পড়ে। মিস্টির ফরমায়েশ তদ্দন্ডেই বাতিল। কানের কাছে গম্ভীর স্বর শুনেছিলাম বাবার – "নিজেকে কখনো মোহনবাগান সমর্থক বলে পরিচয় দিওনা"। সারা জীবন অসম্ভব ফুটবল পাগল একজন মানুষের কাছে ধীরে ধীরে শিখেছি, খেলাকে কি ভাবে ভালোবাসতে হয়। প্রতিপক্ষকে কি ভাবে সন্মান দিতে হয়। খেলায় জয় মানে নির্মল আনন্দ। অহংকার বা জীঘাংসা নয়। পরাজিত পক্ষ, কেবলমাত্র প্রতিপক্ষ, কখনই আজকের খবরের কাগজের ভাষায় শত্রুপক্ষ নয়। আজকে জিতলে, কালকে হারতেই হবে তার কাছে। এটাই খেলা। আর হেরে যাবার স্বাদ, আপনার প্রতিপক্ষের চেয়ে ভাল আর কেউ জানবেনা, কেননা খেলায় সকলকেই হারতে হয়েছে। আমাদের অফিসে আমরা একটা প্রথা চালু করেছিলাম। যাদের দল খেলায় জিতবে, তারা অন্যদের খাওয়াবে। এই খাওয়ানোর মধ্যে দিয়ে দেখতাম জেতার ঝুঠো অহংবোধ আর হারের ঝুঠো গ্লানির পরিসমাপ্তি হতো। ২০০৬-০৭ পর্য্যন্ত এটা চলতে দেখেছি।

গতকাল একটি ছেলের প্রশ্ন – "আমি কি তাহলে গায়ে পতাকা জড়িয়ে আগুন দিয়ে পুড়ে মরব? ব্রাজিলের খেলা ভালো লাগাটা কি আমার অপরাধ? কেন আমার ওপর এই হিংস্র আক্রমন? এর পর তো বাড়িতে ঢুকে মারবে"। না, বাংলার রাজনীতি নয়, ভোট নয়, সমাজবিরোধী আক্রমন বা সাম্প্রদায়ীক সন্ত্রাস নয়। একটা খেলার ফলাফল, এবং তৎপরবর্তী কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছেলেটিকে এই ভাবে মানসিক অত্যাচার সয়ে সকলের চোখের আড়ালে লুকিয়ে গুটিয়ে থাকতে হচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায়, অফিসে, স্কুল কলেজে সর্বত্র এই হিংস্র আক্রমন। তবে বোধহয় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে ফেসবুক , হোয়াট্‌স্‌অ্যাপ জাতীয় সামাজিক মেলামেশার জায়গা গুলো। আমাদের দেশে শুনি ক্রিকেট হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। সে নিয়ে আমার নিজের কোনো সন্দেহ নেই। কিছু দিন আগে আইপিএল শেষ হলো। গোটা দেশ সেই নিয়ে মেতে ছিলো। ক্রিকেটের বিশ্বকাপ যখন হয়, তখন দেখেছি, কি চরম উৎসাহ, উন্মাদনা, উত্তেজনা। কিন্তু যেটা দেখিনি সেটা হলো এই হিংস্রতা। সত্যি দেখিনি। বরং অন্য দলের খেলোয়াড় ভালো খেললে তার প্রশংসা শুনেছি। খেলায় হার জিত নিয়ে টিটকিরি দেখেছি, উল্লাস দেখেছি, স্বপ্নভঙ্গ দেখেছি। কিন্তু কোথাও শুনিনি, কেউ এই ভাবে অন্যজনের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটা অন্য খেলায় হয় না।

আমাদের পাড়ায় বিশ্বকাপের ঠিক আগে থেকে দেখলাম বড় বড় রঙিন পতাকা ঝুলছে। কতগুলো নীল সাদা, সে গুলো আর্জেন্তিনার, আর কতগুলো হলুদ সবুজ সে গুলো ব্রাজিলের। দেখে খুব ভালো লাগলো, যে আমাদের এখানে ফুটবলের নামে লোকজন কতটা মেতে উঠেছে। ব্রাজিল বা আর্জেন্তিনা খেলায় জেতার পর মাঝরাতে পটকা ফাটা শুনেও ভালো লাগছিলো, কিন্তু সেই সঙ্গে খারাপ লাগছিলো, যে এই যে বিশ্বকাপে ক্যামেরুন খেলছে, গত বছর দিল্লিতে যখন এই ক্যামেরুনকে হারালো ভারত, তখন একটাও পটকা ফাটলো না। একটাও তেরঙ্গা ঝান্ডা উড়লো না। ফেসবুক হোয়াটস্‌অ্যাপ ছয়লাপ হয়ে গেলো না সুনিল ছেত্রি বা সুব্রত পালের ছবিতে। পেছিয়ে থেকেও সমতা ফিরিয়ে এনে ভারত হারালো বিশ্ব ফুটবলের এক সাড়া জাগানো শক্তিকে, কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি, যাঁরা এই লেখা পড়ছেন, তাঁদের সিংহভাগ ভারতেই এই সাফল্যের কথা জানেনই না। আমি নিচে লিঙ্ক দিলাম, গোটা খেলা, এবং টাইব্রেকারের।
প্রথমার্ধ – https://www.youtube.com/watch?v=qM7DK0pwYVw
দ্বিতীয়ার্ধ – https://www.youtube.com/watch?v=mZXFJFp5b0k
টাইব্রেকার - https://www.youtube.com/watch?v=MZ6O-7yRkTo

আবার অন্যদিকে এই বছরের গোড়ায় কাঠমান্ডুতে যখন ভারত নেপালের কাছে ১-২ গোলে হেরে গেলো, সেদিন সন্ধ্যায় অফিসে বসে মনে হচ্ছিলো অনেক অনেক অনেক কিছু যেন হারিয়ে গেল। অনেক স্বপ্ন আবার গোড়া থেকে দেখতে শুরু করতে হবে। পেছিয়ে গেলাম যেন আমরা। রাত্রে কিছু খেতে পারিনি সেদিন বাড়ি গিয়ে। আমি এবারেও নিশ্চিত, এ লেখা যাঁরা পড়ছেন, তাঁদের সিংহভাগ এ খেলার খবর ও রাখেন না।

তাহলে ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নিয়ে এই সাংঘাতিক রেশারেশির উৎস কোথায়? দয়া করে এটা বলবেন না যে এই দুটো দেশের কিছু ইশ্বরতুল্য খেলোয়াড়ের জন্যই এই রেশারেশি। খেলোয়াড়ের খেলা ভালো লাগলে তিনি যে দলের জার্সিই পরুন, তাঁর খেলা ভালো লাগতে বাধ্য। সেখানে ব্রাজিল আর্জেন্তিনা আসেনা। আর তা ছাড়া এই দু দেশ বাদে অন্য দেশে তেমন কোন খেলোয়াড় নেই, এটাও মানতে পারছিনা। আমার দেখা এই উত্তেজনা তৈরির নেপথ্যে সংবাদ মাধ্যম। আমাদের দেশের এবং গোটা উপমহাদেশেরই সংবাদ মাধ্যম ব্রিটিশ মিডিয়ার লেজ ধরে চলে। সেই নোংরা মিডিয়াকে অনুসরন করেই এরা কৃত্ত্রিম উন্মাদনা তৈরি করছে। লোকের উন্মাদনা যত জাগবে (পড়ুন লোকে যত "খাবে") ততই বিজ্ঞাপন আর ততই বিদেশ ভ্রমন, পত্রিকার বিক্রি। বাকি দায়......নেই। আমার যতদুর মনে পড়ছে এই জিনিষের শুরু ১৯৮৬ থেকে আজকাল পত্রিকার হাত ধরে। আর ১৯৯০ আর ৯৪ সালে কুৎসিত আর পরিকল্পিত ভাবে উন্মাদনা ছড়ানো হয় আমাদের এখানে।

বিদেশি ফুটবল সারা বছর দেখা যায় টিভিতে। তার কতটুকু নিয়ে লোকে এখানে মাতামাতি করে? কিছু উচ্চমধ্যবিত্ত কিশোর তরুন হয় ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড, বার্সিলোনা নাহলে রিয়েল মাদ্রিদের সাপোর্টার বলে দাবী ও করে নিজেদের। ওই পর্যন্তই। রেশারেশি বা হিংশ্র উন্মাদনা দেখিনি, যা দেখি ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নিয়ে। ফুটবল ভালোবাসলে এনারা নিশ্চিত নিজের দেশের খবরটুকু রাখতেন। ভালো খেলোয়াড়দের ভালোবাসলে নিশ্চিত ভাবেই মেসি বা নেইমার দুজনের খেলাই এনাদের ভালো লাগতো। পেলে আর মারাদোনা নিয়ে ঝগড়া না করে তাঁদের পাশে রিভেলিনো , দি স্তেফানো বা পুসকাসের ছবিও লাগাতেন। মারাদোনার সম্পর্কে একটা কথা বলি, গোটা পৃথিবীর কয়েকশো কোটি মারাদোনা ভক্তের মধ্যে আমিও একজন। আর নিজের অন্তর থেকে মারাদোনা খেলাকে শ্রদ্ধা করি। তাই সেই ৮৬ সালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে খেলার পরের দিন সকালে প্রচন্ড অভিমান করেছিলাম মারাদোনার ওপর। হ্যান্ডবল তো সবাই করে। তুমি সেটা গৌরবান্বিত করতে চাইলে কেন মারাদোনা? তুমি তো ওরকম গোল আরো দিতে পারো। বলনা ভুল হয়ে গেছে। তুমি তো রক্ত মাংসের মানুষ। ১৯৯৪ তে মারাদোনার ডোপ টেস্টে ধরা পড়ার পর মনে হয়েছিলো মাটি সরে যাচ্ছে পায়ের নিচে থেকে আমার। আমার কাছে ভগবানের মত এই লোকটা কেন ড্রাগ নেবে? আমাদের মত ভক্তদের চিৎকার কি কানে পৌঁছয়না তোমার মারাদোনা? কেন অন্য উত্তেজনা লাগে? উঠতে বসতে শুনতে হয়েছে তখন, ওইতো তোদের মারাদোনা, ড্রাগ নেয়। আমি আজও মারাদোনার ফুটবলের সেই ভক্তই আছি। সেই যাদুতেই আচ্ছন্ন আছি। শুধু মানুষ মারাদোনার ভক্ত আর নেই।

ব্রাজিল আর্জেন্তিনার রেশারেশিও আমার মাথায় ঢোকেনা। ব্যক্তিগত ভাবে আমি লাতিন আমেরিকান ঘরানার ফুটবলের ভক্ত। ছোটো ছোটো পাস, বুদ্ধিদীপ্ত আক্রমনাত্মক ফুটবল। গতি পরিবর্তন হয়ে চলেছে সব সময়। বল দখলে রাখার অসাধারন মুন্সিয়ানা। আর ভালো লাগে দলগত খেলা। ব্যক্তি নির্ভর হলে আমার ভালো লাগে না। শুধু ব্রাজিল আর্জেন্তিনা নয়, আমার ভালো লাগে চিলি, কলম্বিয়া এমনকি মেক্সিকোর খেলাও। উরুগুয়ে কে কেমন মনে হয় যেন কিছুটা ইয়োরোপ ঘেঁসা খেলা। যেমন স্পেন ও পর্তুগালের খেলায় আবার লাতিন আমেরিকান ঘরানা অনেকটা কাজ করে। আমার তো এই দুই দেশ জিতলেই ভালো লাগে। রেশারেশিটা সত্যিই মাথায় ঢোকেনা আজও। এখানে দেখি, মেসি ভালো মানেই নেইমার খারাপ, সে খেলার অভিনয় করে। মারাদোনা কোকেন নিয়ে ৯৪ সালে বিশ্বকাপ থেকে নির্বাসিত মানেই পেলে ও ড্রাগের ব্যবসা করে। এই ধরনের বিতন্ডা। খেলা নিয়ে ঘরানা নিয়ে, দক্ষতা নিয়ে কখনো কোনো আলোচনা দেখতে পেলাম না। আমাকে ফোন করে একজন জানতে চাইলো গত পরশু আমি ব্রাজিল না আর্জেন্তিনা। কারন আমার ফেসবুকের পোস্ট থেকে নাকি সে ঠিক বুঝতে পারছে না আমি আসলে কি। আমি বললাম আমি মোহনবাগান আর ভারত। ঠিক বুঝতে পারল বলে মনে হলো না।


নেপালের প্রজ্ঞা থাপা ক্লাস টেনের ছাত্রী। স্কুলে খেলাধুলোয় রীতিমত নাম আছে তার। পড়াশোনাতেও প্রজ্ঞা পেছিয়ে নেই সে কোনো ভাবে। চাকরির কারনে তার বাবা থাকেন দেশের বাইরে, বাহরিনে। প্রজ্ঞা দেশের বাড়িতে মা কল্পনা থাপা আর দাদুর সঙ্গে থাকে আর ইটাহারির স্থানীয় মর্নিং স্টার স্কুলে পড়ে। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার, তেমন অস্বাচ্ছন্দ কিছুই নেই। এই মেয়েটি ২০১৪ সালের ৯ই জুন খবরের শিরোনামে চলে এলো। ব্রাজিল হেরে যাবার পর, সকাল বেলা মেয়েটি ঘরের মধ্যে ঢুকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করলো। প্রজ্ঞা নিজের ছোট্ট জীবন শেষ করে দিয়ে এমন এক জগতে চলে গেলো, যেখানে সম্ভবতঃ ব্রাজিল আর্জেন্তিনার রেশারেশি নেই। মেসি না নেইমার এই তর্ক নেই। ফুটবলই নেই। কিন্তু বাহরিনে কর্মরত প্রজ্ঞার বাবা আর তার মা, নিজের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর জন্য নিজেদের কি ভাবে স্বান্তনা দেবেন? দিতে পারবেন কি? এই মৃত্যু, এই চলে যাওয়ার কি মানে থাকতে পারে? কারা দায়ী এর পেছনে? ফুটবল দায়ী? ব্রাজিল দায়ী হেরে যাবার জন্যে? জার্মানি দায়ী হারাবার জন্যে? আর্জেন্তিনা দায়ী রেশারেশির জন্যে? নাকি এই অর্থহীন রেশারেশি যারা তৈরি করলো ব্যবসার স্বার্থে তারা দায়ী? ও জোগো বোনিতো - এই সুন্দর খেলা। একে অসুন্দর করবার কোনো অধিকার দেওয়া হয়নি কাউকে। যাঁরা জেতা হারা মানেন না। যাঁরা খেলার সৌন্দর্য্য না দেখে অন্য পক্ষের ওপরে অর্থহীন নোংরা আক্রমন করেন তাঁদের অপরাধ বন্ধ হওয়া দরকার। তার জন্যে দরকার, সত্যিকারের ফুটবল যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁদের এগিয়ে এসে আমাদের এখানে একটা ফুটবল সংস্কৃতি তৈরি করা। বিদেশের মাঠে, দু দলের সমর্থক পাশাপাশি দু দলের জার্সি পরে খেলা দেখতে পারেন যদি, তো এখানে আমাদের এই হিংস্রতার অর্থ কি? আর কোনো প্রজ্ঞা যেন অকালে ঝরে না যায়। আসুন, ফুটবলকে ভালোবাসি। হলুদ সবুজ সাদা নীল এসব যেন ফুটবলকে ভালোবাসার পথে বাধা না হতে পারে। আর প্রানপনে সমর্থন করতেই হয় যদি, সমর্থন করুন নীল জার্সির ভারতকে। আজ যদি ভারতীয় ফুটবল তেমন কিছু করতে না পেরে থাকে, তাহলে আসুন, কিছু করি, যাতে করে এক দিন নীল জার্সি পরে হাতে তেরঙা নিয়ে আমরাও গ্যালারি মাতাতে পারি। 

বুধবার, ৯ জুলাই, ২০১৪

ফুলেকা - ২০১৪ ~ রাজ সাহা

​চোখ ফুটতেই খেলাধুলা শুরু। খেলনাবাটি, গাড়িগাড়ি আরও কতো কি। তারপর জানলাম আরেকটা খেলা আছে ফুটবল। বল নিয়ে খেলা। মাথা দিয়ে ভাবতে হয়, চোখ দিয়ে দেখতে হয়, হাত না লাগিয়ে দৌড়ে গিয়ে গোলে মারতে হয় অন্যদলকে কাটিয়ে। খেলতাম আমরাও। তারপর জানলাম এটাই নাকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা। আর পুরো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফুটবল-দল ব্রাজিল। তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড় হলো পেলে। যিনি নাকি বিশ্বকাপেও হ্যাট্রিক করেছেন।

আমাদের ক্লাবের মাঠের বড় পর্দায় দেখলাম জায়ান্টস অফ ব্রাজিল। একেবারে সিনেমা। মারপিট আছে, চোট্টামি আছে আমাদের মতো, তারচেয়েও বড় কথা ড্রিবল আছে, শিল্প আছে, স্বপ্ন আছে। সে দেশের সমর্থকেরা গোলা ফাটানোর জন্যে ঘরবাড়ি বিক্রি করে মহাদেশ পার করে জাহাজে করে অন্য দেশে পাড়ি দেন। হেরে যাবার পর তাঁদের হাতে থাকে স্রেফ ভিক্ষার ঝুলি, কান্নাতো নিত্যদিনের সঙ্গী। কারন ব্রাজিল দেশটা আমাদের চেয়েও তখন নাকি গরিব।

সেইদেশও আমাদের মতো ইউরোপীয়দের দেশ ছাড়া করে স্বাধীন হয়েছে অথচ তারা গোটা বিশ্বকে অস্ত্র দিয়ে নয়, যুদ্ধ দিয়ে নয়, রাজনৈতিক কুটকচালি দিয়ে নয়, স্রেফ খেলা দিয়ে শাসন করেন। সবাই তাঁদের পেছনে দৌড়ায়, তাঁরা এগিয়ে যান খেলে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে। সেই ছাপ থাকতো তাঁদের খেলাতেও, তাঁরা ফেয়ার প্লে অর্থাৎ মারপিট না করে স্রেফ খেলার আনন্দেই খেলেন এবং জেতেন সেই সুস্থ প্রতিযোগিতায়।

ইংল্যান্ডে যেবার বিশ্বকাপ হয় সেবার তাঁরা পারেন নি। সেবার নাকি স্রেফ ইংরেজদের চোট্টামির জন্যেই অনেক ভালো দল প্রতিযোগিতা থেকে হারিয়ে যান। কিন্তু, চ্যালেঞ্জ ছিল জুলেরিমে কাপ জেতার। যে তিনবার জিতবে সেই কাপ চিরজীবনের জন্যে তাঁদের। সেই লড়াই ব্রাজিল জিতে নেয়। এবং গোটা বিশ্বে নিজের দেশের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করে নেয়। তখনো মারাদোনা তথা আর্জেন্টিনা বিশ্বফুটবলের মানচিত্রে আসেন নি।
সেই স্বপ্নে ভারতবর্ষের একটা ছোট্ট শিশু মশগুল হয়ে যাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ছিল এবং অবশ্যম্ভাবী ছিল। কারন এই খেলা ছিল দেশকাল, বর্ণ, রাজনীত, যুদ্ধ সবকিছুর উর্ধে। স্রেফ ভালবাসার অন্তিম বহিঃপ্রকাশ।

জায়ান্টস অফ ব্রাজিল দিয়ে শুরু, তারপর জিকো অর্থাৎ সাদা পেলে, এডিনহো, সক্রেটীস, কারেকা, অ্যালেমাও, ফালকাও, জুনিয়রকে দিয়ে সরাসরি দেখা ব্রাজিলের ম্যাজিক। না সেবার ব্রাজিল পারে নি জিততে। কিন্তু মন ভরিয়ে দিয়েছিল তাঁদের খেলোয়াড়ি শিল্পে। ঢেউয়ের মোট আছড়ে পড়া বিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে। এবং একেরপর এক গোলের সম্ভাবনা তৈরি করা। কোনদিনই তাঁরা ডিফেন্সে বিশ্বাসী ছিলেন না। বরং একটা গোল খেলে ৪টে গোল করার মানসিকতায় মাঠে নামতেন। আবার একই কথা বলি, খেলার আনন্দে খেলতেন ফলে তাঁদের খেলা ছিল স্বপ্নময় সুন্দর।

জেতার জন্যে কিছু দল বিধ্বংসী খেলা খেলে, যার বেশিরভাগই ইউরোপীয়। সেই দলের নাম বলে আর বিড়ম্বনা বাড়াতে চাই না। তবে তাঁরাও জেতে। কিন্ত,শুধু খেলাটুকুই জেতে। মন জিততে পারে না। কালোচামড়ার প্রতি সাদা চামড়ার শোষণের লড়াইতে চিরকাল জিতে এসেছে, সেখানে এই খেলাটুকুই হচ্ছে সান্ত্বনার জায়গা। এবং বৃহত্তর মানবিকতার লড়াই। যা গোটাবিশ্বের আপামর জনতার হয়ে লড়েছে, ব্রাজিল। এবং স্বপ্নপুরন করেছে ব্রাজিল। আমাদের কিছু না করতে পারা জীবনের এটাই ছিল একটা সান্ত্বনার জায়গা। যেখানে ব্রাজিল বলে দেয় "যে সব ক্ষেত্রেই ওরা সেরা নয়, ওঁরা যেখানে সেরা সেটাই একমাত্র মোক্ষ নয় আমাদের জীবনে"।

তাই ব্রাজিলকেই সমর্থন করে ফেলেছি অজান্তেই। ভালবেসে ফেলেছিও অজান্তেই। যথার্থই ভালবাসা বলতে বাধা নেই, কারন এখানে চাওয়াপাওয়ার হিসেবটা নেই। তবে কি কিছুই চাই নি?

চেয়েছি, বারবার চেয়েছি, প্রতিবার প্রমান করতে যে ব্রাজিলই শ্রেষ্ঠ, কিন্তু খেলার অমোঘ নিয়ম এমনই যে এই খেলায় যে কোন দুটো দলের সবসময়েই একদম ৫০-৫০ সম্ভাবনা থাকে। সামান্যতম সুবিধা কেউ আগেপরে পায় না। সেখানেই ফুটবল আলাদা। শ্রেষ্ঠ খেলা ফুটবল।

তিলতিল করে গড়ে তোলা ভালবাসার প্রাসাদ আজ চূর্ণ জার্মানির অতর্কিত আক্রমণে। আজ ব্রাজিল ৭-১ গোলে হেরে যাওয়াতে কি প্রমান হয়? আমার জ্ঞ্বান সীমিত, তবু বলতে পারি যে ৮৪বছরের বিশ্বফুটবলের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে লজ্জাজনক হার। আমার মনে প্রশ্ন উঠে আসে, যে তাহলে কি সৃষ্টিশীল ফুটবলের ধারক ও বাহকের দিন শেষ? এবার শুরু নতুন অধ্যায় যেখানে কেবলই ট্যাকটিকস ও পরিকল্পনা মাফিক খেলার জয় হবে? তাহলে সেটা কি খেলা হবে নাকি রোবটের লড়াই হবে। হয়তো কেউ কেউ বলবেন, কেন আর্জেন্টিনা, হল্যান্ড, উরুগুয়ে, চিলি, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, পেরু, ক্যামেরুন, জাপান এদের খেলায় কি শিল্প নেই? আমি বলবো আলবাত আছে। মানুষ এতবড় মূর্খ হতে পারেনা যেখানে মারাদোনা স্বয়ং আছেন। তিনিও ফুটবলে শিল্পের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় [আমার মতে]। মারাদোনা মানেই স্বপ্ন। কিন্তু সেতো শুধু মারাদোনা। তাঁর দেশ আর্জেন্টিনা আমার মনে সেইভাবে দাগ কাটেনি। মারাদোনার আবির্ভাবের আগেই আমার মনের গাঁটছড়া বাধা হয়ে গেছে ব্রাজিলের সঙ্গে, গোটাদেশটার সঙ্গে। সেখানে মারাদোনাকে আমি কুর্ণিশ করতে পারি। তাকে প্রণাম করে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে পারি। কিন্তু ভালবাসতে পারি শুধু ব্রাজিলকেই। আমার অক্ষমতা ক্ষমা করবেন আশাকরি।

আলোচনার খাতিরে ধরে নিচ্ছি, যদি ব্রাজিলের স্বপ্নের দিন শেষ। কিন্তু তাতেও অন্যান্য দলের কোন ফায়দা হচ্ছে না। একটা মহীরুহ যদি উপড়ে যায়, সেইসঙ্গে একটা গোটা ইকোসিস্টেম ধ্বংস হয়ে যায়। সেই জেতা কখনই আনন্দের হতে পারে না। বরং, লড়াই করে জেতার স্বাদই আলাদা।

আরমাডিলো-ফুলেকা আর ব্রাজিলের ফুটবল এক সাথে কাব্যিক পরিণতি দিচ্ছে এই বিশ্বকাপের খেলায়। এই অসহায়তা কাউকেই আনন্দ দিতে পারে না বোধহয়। হয়তো আর্জেন্টিনা জিতবে, কিম্বা জার্মানি, অথবা নেদারল্যান্ড। যেই জিতুক সেই দেশকে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে। যদি হয় হোক আরেক নতুন অধ্যায়ের সূচনা, ক্ষতি নেই। তাকেও সসম্মানে স্বাগত জানাই।
---------------------------------------------------------------
আর যারা গতবার স্পেনকে সাপোর্ট করেছিলেন, এবার জার্মানিকে করছেন, কিম্বা ২০০৬এ ফ্রান্সকে করেছিলেন এবার অন্য কাউকে করছেন, কিম্বা ২০০২তে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেছেন এবার হয়তো নেদারল্যান্ডকে করছেন তাঁরা হয়তো ফুটবলের অনেক কিছুই জানেন যা আমার মতো সাধারণ মানুষ জানেই না। কিন্তু তাঁদেরকেও আমি ক্ষমা করে দিলাম, ব্রাজিলের লজ্জাজনক পরাজয়ে নখ বাজাচ্ছেন আর গোটা ফেসবুক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন "তোর ব্রাজিল কি করলো রে" বলে... বেচারারা এতো কিছু জানলো, কিন্তু ভালবাসতে জানলো নে এখনো...

মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০১৪

​ওস্তাদের মার শেষ রাতে ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

তাহার পর কি হইলো তাহা বিশ্ববাসী দেখিয়াছেন। দেখিয়াছেন গগনভেদী অট্টরোল। দেখিয়াছেন লুটিয়ে পড়া খেলোয়াড় ও বাকিদের হা-হুতাশ। পরের দিন দেখিয়াছেন উল্লাস ও স্বপ্নভঙ্গ। স্মৃতিরোমন্থন ও খিস্তি খেউড়। কিন্তু কি ঘটিয়াছিলো সেখানে?

তখন শেষ রাত। জমাট অন্ধকারে টিভি নামক বৈদ্যুতিন মাধ্যমের পর্দায় চোখ বিশ্ববাসীর। বিষুব অঞ্চলের উষ্ণতায় যোগ হইয়াছে খেলার উত্তেজনা। একখানি বল ও তাহার পিছনে বাইশ জন খেলোয়াড় তিন জন রেফারি, আর কোটি কোটি মানুষের চোখ দৌড়াইতেছে। দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের দেশ কলম্বিয়া গনরাজ্যের লাল টুক্‌টুকে জার্সি পরা হুয়ান ক্যামিলো জুনিগা ও একই মহাদেশের পূর্বপ্রান্তের দেশ ব্রাজিল প্রজাতন্ত্রের দশ নম্বর জার্সিধারী এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে বল দখলের লড়াই তে প্রানপনে দৌড়াইতেছেন। খেলা তদবধি আশি মিনিটের কিছু অধিক গড়াইয়াছে। খেলোয়াড়রা ঘর্মাক্ত ও পরিশ্রান্ত। তৃষ্ণায় ছাতি ফাটে। দর্শকাসনের উন্মাদনা খেলোয়াড়দের প্রতিটি রোমকূপে প্রবেশ করিতেছে। জুনিগার দল খেলায় এক গোলে পিছাইয়া আছে।

জুনিগা আরো জোরে দৌড়াইলেন। এই মহতি সভায় পরাজিত হইয়া মাথা নিচু করিয়া দেশে ফিরিতে কে চাহিবে? সামনের ব্রাজিলীয় তরুন অতিশয় চতুর। বল দেখিতে দিতেছে না। কেবল আড়াল করিয়া আছে। জুনিগা স্টেডিয়ামের ওপরে চলিতে থাকা অতিকায় ঘড়ির দিকে চাহিলেন। টিক্‌ টিক্‌ করিয়া সময় বহিয়া যাইতেছে। এই ব্রাজিলীয় বিচ্চুর খপ্পর হইতে বল দখল করিতে হইবে। কিন্তু ধিরে ধিরে বিচ্চু বলটি কে আরো দূরে লইয়া যাইতেছে। আকাশ বাতাস কাঁপিতেছে দর্শকের গর্জনে। তা বলে কি মাথা নোয়াইতে হইবে? ইশ্বর , হে ইশ্বর, সর্বশক্তিমান, দয়াময়, তুমি কি সহায় হবে না ? এই আর্তি কি তোমার কর্ণকুহরে পৌঁছাইতেছে না? হে দয়াময়, হে পিতা, আজ এই আর্তের সহায় হও। পথ দেখাও , পথ দেখাও প্রভু। আর পারিলেন না, জুনিগা এক মুহুর্ত চোখ বন্ধ করিলেন। ইশ্বরের পায়ে নিজেকে সমর্পন করিলেন।

মুহুর্ত পরে, জুনিগা চোখ খুলিলেন জুনিগা। গগনভেদী কর্ণপটবিদারী চিৎকার কোথায় যেন মিলাইয়া গেল, আলোকোজ্জ্বল স্টেডিয়াম তাঁর চোখে পড়িলনা, ক্লান্তি শ্রান্তি তৃষ্ণা সব যেন মিথ্যা হইয়া গিয়াছে। শুধু চোখের সামনে জুনিগা দেখিতে পাইলেন ইশ্বরের নির্দেশ। তাঁর বানী। দয়াময় সর্বশক্তিমান ইশ্বর তাঁর সহায়। আর পারিলেন না, দু চোখ ফেটে আবেগের অশ্রু বেরিয়ে এলো জুনিগার। প্রতিটি রোমকূপে হর্ষ ও উত্তেজনা ফুটিয়া বাহির হইতেছে। জুনিগা দেখিলেন জ্বলজ্বলে হলুদ রঙের উপর স্পষ্ট লেখা ইশ্বরের নির্দেশ – "নে মার"। তার নিচে লেখা ১০। জুনিগা আর থাকিতে পারিলেন না। তিনি তো শুধু ক্ষুদ্র মানুষ, ইশ্বরের ইচ্ছাই সব। তিনিই সর্বনিয়ন্তা। জুনিগা হাঁটু উঠাইলেন।

১০ বার মারার নির্দেশ ছিলো। তবে কিনা ইশ্বরের মার বলে কথা। বাকি ৯ খানি প্রয়োজন হয় নাই। ওস্তাদের মার শেষ রাতে দেখিয়াছি আমরা।

শুক্রবার, ৪ জুলাই, ২০১৪

রচনাঃ বিশ্বকাপ ফুটবল ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য়

​ভূমিকাঃ বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়। নামে বিশ্বকাপ হলেও এতে ভারত সহ বিশ্বের অনেক দেশকেই খেলতে দেওয়া হয় না। তবে তার জন্য ভারতীয়দের, বিশেষ করে বাঙ্গালিদের এই খেলা দেখার উতসাহের কিছু খামতি পড়ে না। যে সব দেশের ম্যাপে অবস্থান কোথায় বা রাজধানীর নাম কী তারা জানে না, সেইসব দেশেরও অন্ততঃ তিনটে খেলোয়াড়ের নাম তারা জানে, যে গোল দেয়, যে গোল বাঁচায় আর যে বিপক্ষের খেলোয়াড়দের কামড়ায়।

খেলার নিয়মকানুনঃ খেলাগুলি গভীর রাতে হয়, যাতে সিরিয়াল দেখায় কারো কোনো বাধা না পড়ে। খেলার নিয়ম খুব সহজ, একটা বল-এ লাথি মেরে অন্য দলের গোলপোস্টে ঢোকানো। কিন্তু খেলোয়াড়রা প্রায়ই বলে লাথি না মেরে অন্য খেলোয়াড়দের লাথি মারে। মারামারি বন্ধ করবার জন্য একজন বাঁশি মুখে মাঠের ভিতরে আর দুজন পতাকাওয়ালা লাঠিহাতে মাঠের বাইরে ঘোরে। বাঁশিওয়ালার কাছে লাল-হলুদ কার্ড থাকে, মাঝে মাঝে একটা একটা করে সবাইকে দেখায়। এটা আসলে বাঙ্গালিদের সেরা ফুটবল ক্লাবকে সম্মান জানাতে। যদি কোনোবার মোহনবাগান দল লীগ বা শিল্ড জেতে, তাহলে সেইবার বিশ্বকাপে বাঁশিওয়ালারা সম্ভবতঃ সবুজ-মেরুণ কার্ড বার করে দেখাবে।

যে দল বেশীবার বল গোলপোস্টে ঢোকাতে পারে, তারা বিজয়ী হয়। অন্যের গোলপোস্টে বল ঢোকাতে না পেরে অনেক খেলোয়াড় নিজের গোলপোস্টেও বল ঢোকায়। নব্বই মিনিট খেলা হয়। যদি দু'দলের গোল সমান হয়, এবং একদল কে বিজয়ী করতেই হয়, তখন বাঁশিওয়ালা একটা দলকে পেনাল্টি দেয়। তাতেও নিষ্পত্তি না হলে তারা খেলতেই থাকে, যতক্ষণ না একটা দলের গোলসংখ্যা বেশী হয়।

পা দিয়ে মারতে না পারলে মাথা দিয়েও বল মারা যায়, তবে গোলকিপার এবং ভগবান ছাড়া হাত দিয়ে বল মারার নিয়ম নেই।

উপসংহারঃ একমাস ধরে এই হুজুগ চলে। তারপর সব দেশের খেলোয়াড়রা যে যার দেশে ফিরে যায়। যারা চ্যাম্পিয়ন হয়, তাদের একটা হলুদ ব্যাঁকাত্যাড়া লম্বাটে ফুলদানী দিয়ে বোঝানো হয় যে অটাই বিশ্বকাপ। তখন তাদের মধ্যে অনেকে রাগ করে প্রতিজ্ঞা করে যে পরের বার তারা আর খেলতে আসবেনা, বা এলেও চ্যাম্পিয়ন কিছুতেই হবেনা।

মঙ্গলবার, ২৪ জুন, ২০১৪

কিছু উপলব্ধি - মহাভারত- ১ ~ তমাল রাহা

আমি কিছুটা confused …. মহাভারত নতুন করে পড়ছিলাম । আর ভাবছিলাম আমার দেখার চোখ টাই কি বাঁকা? মহাভারত কে মানলে, এসব so called conscious ব্যপারটা বেশ স্থুলো বলেই মনে হয়। ভদ্রতা ও সদাচারে নিবদ্ধ আমরা , কিন্তু একটু সত্যের মুখোমুখি হলে কেমন লাগে? ঠিক বেঠিক এর হিসেব করে কে? সমাজ?

অর্জুনরা ততোদিনে মরে-টরে গেছে । তখন অর্জুনের ছেলের ছেলে জন্মেজয় রাজা। হঠাৎ চব্বিশ হাজার শ্লোকের বিশাল এক বই নিয়ে হাজির দ্বৈপায়ন-এর শিষ্য বৈশম্পায়ন। এসে বললেন, ¨রাজা মশাই, এই নিন। ….গুরু দ্বৈপায়ন লিখেছেন আপনার বংশের গৌরব গাথা¨। রাজা জন্মেজয় তখন খুশিতে আত্মহারা। ...বললেন ¨campaigning চালু করো, সবাই জানুক কতো বড় বংশের উত্তরাধিকারী আমি¨। সবাই জানলো , শুনলো মহাভারতের কথা। সবাই ধন্য ধন্য করে উঠলো। কিন্তু কেউ কি প্রশ্ন করলো যে এটা বীরগাথা না যথেচ্ছ যৌনাচার এর কাহিনী?

আমার কাছে মহাভারতের central character ঋষি দ্বৈপায়ন, যাকে আমরা ব্যাসদেব বলে জানি। গল্পের শুরুতেই নিজের জন্মকাহিনী ….. মহাভারতের প্রথম যৌনাচার …..নিজের মা-কে দিয়ে শুরু, তারপর ব্যাসদেব কিন্তু কাউকে ছাড়েন নি। প্রথমে ব্যাসদেব নিজে, তারপর কুন্তী, পরে দ্রৌপদী …. মাঝে প্রচুর খুচরো আর শেষে বেচারা অর্জুন …….

মৃগয়া করতে গিয়ে মহারাজ শান্তনুর সাথে আলাপ হয়েছিলো গঙ্গার। অল্পদিনের জানাশোনা।কিন্তু তাতেই কি? শর্ত ছিলো গঙ্গা কে কোনো কাজে বাধা দেওয়া যাবে না। তার বদলে রাজা শান্তনু পাবেন একটু ইয়ে-র স্বাদ।আটটি পুত্র হলো (শোনা যায় তারা শাপভ্রষ্ট অষ্টবসু)। বাচ্ছা হয়, আর গঙ্গা তাদের ভাসিয়ে দেন ( প্রমান লোপাটের চেষ্টা?)। রাজামশাই আর পারলেন না। এবার বাধা দিলেন। গঙ্গা তখন রাজা শান্তনু কে দেবব্রত (পরবর্তীকালের ভীষ্ম) নামে এক পুত্র সন্তান দিয়ে বললেন ¨একে রাখো, আমি চললাম ¨। বোঝো কান্ড !

সত্যবতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে পরাশর মুনি একবার নৌকায় সত্যবতীর সঙ্গে মিলিত (ধর্ষণ বলা যাবে না!) হয়েছিলেন। সেই মিলনের ফলে ব্যাসদেবের জন্ম হয়।যমুনা দ্বীপে জন্ম হয়েছিল বলে ব্যাসদেবের অপর নাম কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন। কিন্তু পরাশর মুনির আশীর্বাদে সত্যবতীর কুমারীত্ব নষ্ট হয় নি। 
ওদিকে গঙ্গার শোকে আবার রাজা শান্তনু বিষাদগ্রস্ত। বেশ কিছুদিনের অভ্যেস, হঠাত করে একা হয়ে যাওয়াটা ঠিক জমছিলো না। আলাপ হলো সত্যবতীর সাথে।সত্যবতীর রূপে মোহিত হয়ে মহারাজা শান্তনু তাঁকে বিয়ে করেন।শর্ত একটাই, দেবব্রত রাজা হতে পারবে না। দেবব্রত তখন বেশ বড়ো , বুঝলো বাপের জ্বালা। অগত্যা আত্মবলিদান … বাপের বিয়ে বলে কথা !

সত্যবতী ও শান্তনুর বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদ নামে দুই পুত্র হয়। ইন্দ্রিয়পরায়ণ বিচিত্রবীর্য এই দুই স্ত্রীর সাথে অপরিমিত যৌনাচারে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং অকালে নিঃসন্তান অবস্থায় যক্ষ্মারোগে মৃত্যুবরণ করেন। চিত্রাঙ্গদ ও বেশিদিন বাচলেন না। বংশ লোপ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায়, সত্যবতী ভীষ্মকে এই বিধবা'র গর্ভে সন্তান উৎপাদন (এর চেয়ে ভালোভাষায় বলার ক্ষমতা নেই, পাঠক-পাঠিকারা মাফ করবেন) জন্য অনুরোধ করলে- ভীষ্ম সত্য রক্ষার্থে সে অনুরোধ প্রত্যাখান করেন। কি করে করবেন ! শপথ করেছেন নিজেও রাজা হবেন না, সন্তান-ও বানাবেন না , কারণ তারাও রাজা হতে পারবে না। 
এরপর ভীষ্মের কাছে অনুমতি নিয়ে সত্যবতী তাঁর প্রথম পুত্র ব্যাসদেবকে ব্যাসদেবকে ডেকে বললেন ¨বাছা, বংশ রক্ষা করতে হবে। বিচিত্রবীর্য তোমার ভাই , এখন তো সে নেই, তাই ভাতৃবধুদের সাথে একটু ইয়ে করে আমায় রক্ষা করো¨। সত্যবতীর অনুরোধে ব্যাসদেব বিচিত্রবীর্যের স্ত্রী অম্বিকা আর অম্বালিকার সাথে মিলিত হন। মিলনকালে ব্যাসদেবের ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখে অম্বিকা সবসময় চোখ বন্ধ করে ছিলেন। সেই কারণের অম্বিকার গর্ভে উৎপন্ন সন্তান ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ হন। এরপর মাতৃআজ্ঞায় ব্যাসদেব আবার অম্বালিকার সাথে মিলিত হন। এবার সন্তান অন্ধ হওয়ার ভয়ে অম্বালিকা সব সময় তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু ভয়ে অম্বালিকা পাণ্ডুবর্ণ হন বলে- এর একটি পাণ্ডুবর্ণের সন্তান জন্মেছিল। এই সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল পাণ্ডু। এরপর সত্যবতী অম্বিকাকে পুনরায় ব্যাসের কাছে গমন করতে আদেশ করলে- অম্বিকা তাঁর এক রূপসী দাসীকে ব্যাসের কাছে পাঠান। ব্যাসের ঔরসে এই দাসীর গর্ভে বিদুরের জন্ম হয়। এই দাসী ব্যাসদেবের সাথে সানন্দে মিলিত হন। ফলে বিদুর হয়েছিল শারীরিকভাবে ত্রুটি মুক্ত।

সাধুপুরুষ হলে কি হবে? ব্যাসদেব তো ততোদিনে অন্য জিনিসের আস্বাদ পেয়ে গেছেন ! একবার ব্যাসদেব সুমেরু পর্বত থেকে নিজ আশ্রমে ফিরে একবার যখন হোমের আয়োজন করছিলেন, সে সময় ঘৃতাচী নামক এক অপ্সরা উপস্থিত হন। ঘৃতাচীকে দেখে ইনি অত্যন্ত কামাবিষ্ট হন। ব্যাসদেবের এরূপ অবস্থা দেখে ঘৃতাচী শূকপাখির রূপ ধরে পলায়ন করেন। কিন্তু ব্যাসদেবের প্রবল কামনার কারণে তাঁর বীর্যস্খলন হয় এবং তা অরণির উপর পতিত হয়। ব্যাসদেব উক্ত অরণি মন্থন করতে থাকলে একটি পুত্রের জন্ম হয়। ঘৃতাচী শূক পাখির রূপ ধরে পলায়ন করেছিলেন বলে- ব্যাসদেব এর নাম রাখেন শূক। 
বাজারে ধর্মের ষাঁড় ছেড়ে দেবার একটা লোকায়ত প্রথা আছে। নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভিতর এইসব ষাঁড়েরা ঋতুবতী গাভীদের নিষিক্ত করে।ব্যাসদেব কে বেশ ধর্মের ষাঁড় বলে মনে হয় না? এখনো কৃষি প্রধান এলাকার এটাই প্রচলিত প্রজনন বিদ্যা। ঋতুবতী গাভীদের ডিম্বাণুর সাথে ধর্মের ষাঁড়দের শুক্রাণুর নিষিক্ত করণের এই ক্রিয়া প্রক্রিয়াকে ঋষি ক্রিয়া বলতে পারেন। তাই সংস্কৃত ভাষায় নির্দিষ্ট গোয়ালহীন ধর্মের ষাঁড়দের ঋষভ বলা হয়। আশারাম্ বাপু দের আর দোষ দেই কি করে , ওরা তো এই ঋষি ক্রিয়া কেই এগিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন?

এবার কুন্তী …...
ছোটবেলায় (?) দুর্বাসা মুনি কুন্তিকে বর দিয়েছিলেন যে, যে-কোনও দেবতাকে আহবান করে তিনি তাঁর সন্তান ধারণ করতে পারবেন। ছোটবেলাতেই ব্যাপারটা test করে রেখেছিলেন তিনি। মানে ওই আর কি, বাজার থেকে নতুন ইনস্ট্রুমেন্ট কিনলে নেড়েচেরে নেওয়া, এই আর কি ! কুন্তী মণ্ত্রের সত্যতা পরীক্ষা করার সূর্য্যদেব কে বেছে নিলেন। ফলত, সুর্য্যবাবুর সাথে একটু আধটু ইয়ে হলো আর কি ! হলো কর্ণের জন্ম। আমরা পেলাম এক বীরপুরুষকে, কিন্তু মা কুন্তী অস্বীকার করলো ছেলেকে। এই জায়গায় বলব যে সত্যবতী বেশ সাহসী ছিলেন, ব্যাসদেব এর পরিচয় গোপন করেন নি। কুন্তী পারলেন না …… কিন্তু পরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে কর্ণ - এর কাছে গিয়ে গিয়ে বাবা-বাছা করার সময় অবশ্য লজ্জা পান নি ! 
পাণ্ডু কুন্তিভোজের পালিতা কন্যা কুন্তী ও মদ্ররাজের কন্যা মাদ্রীকে বিবাহ করেন। একবার মৃগয়াতে গিয়ে পাণ্ডু মৈথুনরত মৃগকে শরাঘাত করায় মৃত্যুমুখী মৃগ (আসলে মৃগরূপধারি কিন্দম-নামা মুনি) পাণ্ডুকে অভিশাপ দেয় যে, মৈথুনে লিপ্ত হলেই পাণ্ডুর মৃত্যু হবে। তাই পান্ডুবাবুর বিয়ে-থা হলেও জীবনে ওই ইয়ে ব্যাপারটা নিয়ে বেশ চাপ ছিলো। আবার সেই সঙ্গে বংশরক্ষার দায়-ও আছে ! কি সমস্যা ! কিন্তু ব্যাসদেব সব plan করে রেখেছিলেন।ওই যে আগেই বললাম, ছোটবেলায় পাওয়া দুর্বাসা মুনির আশীর্বাদ ! কুন্তী পাণ্ডুর ইচ্ছায় ধর্ম, পবন ও ইন্দ্রকে আহবান করে যথাক্রমে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনকে জন্ম দিলেন। পাণ্ডুর ইচ্ছায় তিনি সপত্নী মাদ্রীকে শিখিয়ে দিলেন কি করে দেবতাকে আহবান করতে হয়। বললো ¨ কার সাথে ইয়ে-টিয়ে করবি বল, ব্যবস্থ্যা করে দিচ্ছি ¨। কিন্তু ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেলো । মাদ্রী বুঝল যৌবনের যা জ্বালা তাতে একটা দিয়ে হবে না। অশ্বিনীকুমার ভাইরা ছিল জমজ। সে অশ্বিনীকুমার-দ্বয়কে আহবান করে নকুল ও সহদেবকে জন্ম দিলো।

বংশরক্ষার ব্যাপার তা তো মিটলো ! কিন্তু ওই ইয়ে ব্যাপারটা নিয়েই সমস্যা ! পান্ডু রাজা হলে কি হবে, মানুষ তো! কিছুদিন বাদে কামার্ত হয়ে অভিশাপ উপেক্ষা করে মাদ্রীর সঙ্গে মিলনকালে পাণ্ডুর মৃত্যু হয়। মাদ্রীর ছিল কম বয়েস, self control ব্যাপারটা তো আশা করা অন্যায় !

পাণ্ডবদের বাবা নিয়ে যত গোলযোগ, কর্ণ সম্বন্ধেও তত-বেশীর ভাগ, কারণ তিনি কানীন। মেরে পাস বাপ হ্যায়। তা কর্ণর কাছে বাপ ছিল না বলে সে রাজকন্যে পেল না। কি জ্বালা মাইরি ! ভীষ্মের বিয়ে করা হলো না বাপ থাকার জন্যে আর কর্ণের না থাকায় ! বেচারা বেশ দ্রৌপদী কে টার্গেট করেছিল ! কিন্তু কর্ণ কে হারিয়ে অর্জুন দিব্যি বাজী জিতে গেল ! আদতে বাকি ভাইরা দ্রৌপদীর ভাগ পেলেও, কর্ণ বেচারা সেটাও পেলো না ! আসলে পান্ডবদের legal বাবা রাজা ছিলো, কর্ণের legal বাবা তো সারথী ! তাই আইনের লড়াইটা ছিলো অসম।

এবার আসি দ্রৌপদীর কথায় ….
পুরাকালে নাকি এক সুন্দরী মেয়ে বিয়ে না হবার জন্য কান্নাকাটি করছিল, তখন মহাদেব এসে তাকে বর দিতে বলায় সে পাঁচবার বলে দেয় তার ভাল বর লাগবে। মহাদেব তো পাগলা বাবা ! পাঁচবার তথাস্তু বলে দিলো ! ব্যাস আর যায় কোথায় , বাবা মহাদেব এর বর বলে কথা ! সেই মেয়ের পাঁচজন স্বামী হয় পরবর্তী জন্মে। ঠিক ধরেছেন, সেই মেয়েই দ্রুপদ রাজের কন্যা, দ্রৌপদী। আর প্রত্যেকবার প্রতিটি স্বামীর সাথে মিলনের সময় কৃষ্ণা (দ্রৌপদীর আরেক নাম) কুমারী হয়ে যেত ব্যাসদেবের আশীর্বাদে। মানে কি সুন্দর সেটলমেন্ট ! ভাবাই যায় না। পুরুষের ভোগের জন্য একটা মেয়েকে দিয়ে যতরকম এক্সপেরিমেন্ট করা সম্ভব তাই করে গেছেন ব্যাসদেব। তবে পাঁচস্বামীর সংসার করাটা দ্রৌপদীর জন্য কতটা প্রীতিকর কিংবা ভীতিকর সেটা সেই জানতো !

পাঁচ-পাঁচটা স্বামী, কিন্তু বস্ত্রহরণে বাঁচালো কিন্তু কেষ্টবাবু ! তাহলে এই পাঁচটা লোক করতো কি ? শুধুই মস্তি ? যদিও শোনা যায় ভীমসেন কিছুটা প্রতিবাদ করতো কালেভদ্রে, কিন্তু জুয়াড়ি যুধিষ্টির এর জন্যে গর্জনটা বর্ষণে পরিনত হতে পারে নি। 
যাই হোক, কেষ্টবাবু এলেন …….
আকাশ ভরে উঠল সোর
মেঘের ঘোর জলের তোড়
মন্ত্রপড়া অন্তরাল
দিলো না তবু সাড়া
অসম্ভব দ্রৌপদীর অন্তহীন শাড়ি।(দ্রৌপদীর শাড়ি/বুদ্ধদেব বসু)

অথচ আশ্চর্য, অথচ মুক্তি পেয়েই দ্রৌপদী ধৃতরাষ্ট্রের কাছে পাশা খেলায় হেরে বন্দি হয়ে থাকা সমস্ত পাণ্ডবের মুক্তি চেয়ে নিলেন ! ব্যাস, গেলাম রমণীর 'সর্বংসহা ধরিত্রী' রূপ ! দ্রৌপদী দুর্বল ছিলেন? কিন্তু পরের পরের অধ্যায় এ দেখি দ্রৌপদীর প্রতিহিংসা। মহাভারতের যুদ্ধ , কীচক হত্যা সবই তো দ্রৌপদীর প্রতিহিংসা ! অথচ সামাজিক অন্যায় মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রৌপদী দুর্বল ! কেন ? এটা নিয়ে অন্যত্র আলোচনা করার ইচ্ছে রইলো।

দ্রৌপদীর বিয়ের ঘটনাটি মহাভারতের একটি উল্লেখযোগ্য অসাধারণ ঘটনা। পঞ্চস্বামীর স্ত্রী হওয়া এ যুগেও সম্ভব কি না, তা ভাববার বিষয়। দ্রৌপদী কি স্বেচ্ছায় এই বিয়ে মেনে নিয়েছিল? আসলে ব্যাসদেব একটা ব্যবস্থ্যা করেই রেখেছিলেন। ওই পূর্বজন্মের মহাদেব এর আশীর্বাদ এর কথা টা বলছি ! আসলে নারীর ভাগ্য শতজন্মেও দেবতার তথা পুরুষের করতলগত থেকেই যায়। দ্রৌপদী প্রথমে প্রথমে রাজি ছিলেন না। ধর্মপুত্র যুধিষ্টির তাকে জটিলা নামে এক গৌতমীর গল্প শোনালেন, যিনি একসঙ্গে সাতজন ঋষির ঘর করেছিলেন। যুধিষ্টির এর রিপুজনিত তাড়না একটা তো ছিলই ! তাই ব্যাপারটাকে justify করার চেষ্টা , এই আর কি ! দ্রৌপদী finally রাজি হলেন। মেনে নিয়েছিলেন কি ? আসলে, পৃথিবীর ইতিহাস রচনা করেছে সমাজের বা রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান পুরুষ। তাই ইতিহাসের নাম 'His story ' তথা 'History…. প্রতিভা বসু মন্তব্য করেন, দ্রৌপদী 'যেন খেলার বল। একের কাছ থেকে (যাচ্ছে) অপরের কাছে।' আসলে দ্রৌপদী তো বহুবল্লভা, নাথবতী অনাথবত-- পঞ্চপান্ডবের সম্পত্তি। দ্রৌপদীর কিন্তু স্বেচ্ছা বা স্বেচ্ছাচারের জায়গা ছিল না… একদল কামুক এবং একজন উদাসীন প্রেমিকের প্রেমে পরে সমাজাচারই তাঁকে উদাহরণের দলে এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ত্ব বানিয়ে ছেড়েছিল।

আর অর্জুন …...
অর্জুন বীরত্ব দেখিয়ে তো দ্রৌপদী কে বিয়ে করে আনলো। এদিকে কুন্তী বললেন যে যা এনেছ সব ভাইয়েরা ভাগ করে নাও! একদম ফুলটু কেস মাইরি! তখন পান্ডবেরা গোল টেবিল বৈঠকে বসে একটা ভদ্রলোকের চুক্তি করল যে দ্রৌপদী প্রতি ভাইয়ের কাছে এক বছর করে থেকে সংসার করবে। যদি সেই সময় অন্য কোন ভাই তাকে দেখে ফেলে তবে সেই ভাইকে বারো বছর ব্রম্ভচারী (এইখানে শর্ত আছে, ব্রহ্মচারী শুধু দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে, হা হা হা, মানে অনন্য রমনীতে দোষ নাই!) হয়ে বনবাসে যেতে হবে।

এই নিয়মের বলি হয়ে গেল অর্জুন (নাকি advantage নিলেন?)। গরু-চোরেরা ব্রাহ্মণ-এর গোরু নিয়ে ভাগছিল দেখে তারা অর্জুনের কাছে এসে বিচার চাইল। ওদিকে অর্জুনের অস্ত্র ছিল যুধিষ্ঠিরের ঘরে, অর্জুন রাজধর্ম পালনের জন্য সেই নিয়ম সত্ত্বেও ঘরে ঢুকে (ঘটনাচক্রে সেখানে ছিল যুধিষ্টির, সঙ্গে দ্রৌপদী ) অস্ত্র নিয়ে গরুচোর ধরতে বেরিয়ে গেল (আর কিছু দেখেও ফেলেছিলো বোধহয় !)। হলো চুক্তিভঙ্গ।

চুক্তিভঙ্গ করার দায় মাথায় নিয়ে বনবাসে চলে গেল।এখানে প্রশ্ন ওঠে অর্জুন এর এই কাজটা কি intentional ছিলো? কারণ হিসেবমত যুধিষ্ঠিরের পর ভীম তারপরে পালা ছিল অর্জুনের। মুখে না বলুক, আদতে অর্জুন তো মানুষই ছিল। দ্রৌপদী তো আসলে তারই বীরত্বের দ্বারা প্রাপ্ত। সেখানে বারোয়ারি হয়ে গেল, আর তার নম্বর আসতে লাগল দু ভাইয়ের পরে, এটা অভিমান ছিল না তো আসলে? নাকি দ্রৌপদী যখন দুভাইয়ের ঘরে থাকবে তখন ঘরছেড়ে বেরিয়ে বাইরে অন্যকিছু করার ছক ছিল? কারণ ঘরছাড়া অবস্থাতেই উলুপী, চিত্রাঙ্গদা, সুভদ্রাকে বিয়ে করে সে ….মাঝখান থেকে গালি খেলো কুকুরে …..


শুক্রবার, ৬ জুন, ২০১৪

দিদি ও বোন ~ শঙ্খ করভৌমিক

​ 
খবরে এবারের আকর্ষণ-
গলাতে ফাঁস বাঁধা দিদি ও বোন।

ওই তো, শুনে নাও কান পেতে
উড়োজাহাজ নামে ধানক্ষেতে।

নেত্রী বক্তৃতা দিলেন খুব।
শুনল মন দিয়ে মানুষ চুপ।

সবুজ-লাল-নীল হরেক দল
গাছের খেয়েদেয়ে কুড়োয় ফল

আসল মাথাব্যথা নির্বাচন
দড়িতে ঝুলে থাক দিদি ও বোন।

বুধবার, ৪ জুন, ২০১৪

বেঁচেই আছি বাবা ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

নানারকম গুজব রটেছিল…

আদৌ বেঁচে রয়েছি কি না আজও
সে'টা বুঝতে হুকুম দিল রাজা
আজ উৎসব… যেমন খুশি সাজো।

টিকিট দেবে স্থানীয় কোতোয়ালি
সবাই জড়ো রাজবাড়ির মাঠে
ভাঁড় সেজেছি… সেজেছি রাজকবি
কেউ নাচব, কারওর মাথা ফাটে।

লাঠি মেরেছে? আমরা দেখিনি তো!
কাতার দিয়ে ঢুকেছি সার্কাসে
গানের তালে কোমর দোলে… দোলে…
তথাকথিত তারকাদের পাশে।

হাসপাতালে বোকার মত শোয়া
তাদের নিয়ে কেই বা মাথা ঘামায়
রাজার স্নেহে পরিপ্লুত ভাবে…
আহা! তবু তো প্রভু ডেকেছে আমায়।

টান পড়েছে গলার বকলস-এ
যত্নে সাড়া দিয়েছি… 'ঘৌ'…' তাতে।
বেঁচে যে আছি সে'টা প্রমাণ করে
দিব্যি আছি মারে ও মৌতাতে।

রবিবার, ১ জুন, ২০১৪

প্রদীপের দৈত্য ও জনৈক ~ অনির্বাণ গঙ্গোপাধ্যায়

প্রদীপের দৈত্য: হুকুম করেন বস্, আলাদিন ঠিক মতো ইউজ করতে পারে নি।
জনৈক: আলাদিন পারে নি কেন ?
প্রদীপের দৈত্য: প্রদীপের ফেয়ার ইউসেজ পলিসির একটা ব্যাপার আছে.... কাইন্ড অফ ওয়াইম্যাক্স
জনৈক: আমি আমার ইচ্ছা বলবো ?
প্রদীপের দৈত্য: ইয়াপ
জনৈক: ভারতকে পাকিস্তান দখল করার ক্ষমতা দাও।
প্রদীপের দৈত্য: আপনি কি আলাদিনের মত গাড়ল ?
জনৈক: কেন ?
প্রদীপের দৈত্য: এই আল-ফাল চাওয়ার জন্য প্রদীপ ঘষে কেউ ?
জনৈক: ওহ, সরি...
প্রদীপের দৈত্য: দেশের উন্নতির জন্য কিছু চান....দেশপ্রেম নেই নাকি ?
জনৈক: ওকে... সবেতেই ১০০% বিদেশী বিনিয়োগ এনে দেশকে উন্নত করার শক্তি দাও....
প্রদীপের দৈত্য: ইয়ে, ভারত কবে নাগাদ পাকিস্তান দখল করলে আপনার সুবিধা বস্ ?
জনৈক: সে কি .... ১০০% বিদেশী বিনিয়োগ..উন্নত দেশ......?
প্রদীপের দৈত্য: ১০০% বিদেশী বিনিয়োগে দেশের উন্নতি আমার বাপেও পারবে না বস্ ............
...................আমি তো স্রেফ প্রদীপের দৈত্য...
জনৈক: আপনার বাপ কোনখানের দৈত্য ?
প্রদীপের দৈত্য: হারিকেনের।
জনৈক: বাহ, দাদা ?
প্রদীপের দৈত্য: হ্যাজাক বাতির। নেক্সট জেনারেশন অবশ্য অন্য পেশায় পালিয়েছে । এবার আমি পালাই ?

শনিবার, ৩১ মে, ২০১৪

রম্য রচনা ৩ - ( উন্নয়ন চলছে ,রাস্তা বন্ধ ) ~ অবিন দত্তগুপ্ত

স্বপনদার সাথে আলাপ,বছর ৪এক আগে । শুক্রবার রাতে, বেলেঘাটায় এক বন্ধুর বাড়ি গেছি কোন এক অবভিয়াস নিমন্ত্রন রক্ষার্থে । খালপাড় থেকে রিক্সায় ৫ মিনিট (বেলেঘাটা টাইমলাইন অনুযায়ী মিনিট ১২ ) । স্বপনদা রিক্সা চালাত । যে সময়ের কথা বলছি তখন অসংখ্য জায়গায়, সৈনিকরা পরাক্রান্ত ( তবুও আমার শুক্রবার বদলায়নি ) ,কিন্তু বেলেঘাটায় (রিক্সায় বসা) আমার আর (রিক্সা টানা) স্বপনদার লাল ঝান্ডা তখনো পত্‌ পত্‌ করছে । এক জায়গায় দেখি হঠাতি রাস্তা বন্ধ,কাঁটা তারের বেড়া । স্বপনদা(নাম তখনো অজানা ) , কয়েক সেকেন্ড থেমে রিক্সার মুখ ঘোরালো । দুদিন আগে এসছিলাম, হঠাৎ পরিবর্তনে অবাক হয়েই জানতে চাইলাম " এটা কবে থেকে ? কেন ? " । গম্ভির গলায় জানালেন "উন্নয়ন চলছে ,রাস্তা বন্ধ । "

অবভিয়াস নিমন্ত্রনে,অবভিয়াস ভাবেই গৃহকর্তা তখনো অনুপস্থিত । সেই সুযোগেই স্বপনদার নাম জানা । যেখানে কাঁটাতার তার অন্য পাড়ে-ই আমার স্বপ্নের ঝান্ডা উড়ছিল । স্বপনদা জানালেন, ওটাই নাকি ভবিষ্যতের ঠিকানা,ওনাদের পার্টি অফিস,এবং ওদিকেই খালপাড়,ওদের বস্তি । জানালেন , বছরের পর বছর ধরে ঐ খালপাড় উচ্চবিত্তের উলটো দিকের কোঠা বাড়িকে , সকালে ঝি, সারাদিনে রিক্সা আর রাতে মেয়েমানুষ জুগিয়েছে । ওনারা শুনেছেন, কোঠা বাড়ির মেয়েরা আজকাল বস্তি ফেসিং ফ্ল্যাট পছন্দ করেন না, কোঠা বাড়ির বাবুরা আজকাল ছোট দোকান, প্যাচপ্যাচে কাদায় বাজার করা পছন্দ করেন না । মল-মুত্র কিসব অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । তাই উন্নয়ন প্রয়োজন,অতএব রাস্তা বন্ধ।

গৃহকর্তার মিসড্‌ কল ,ততক্ষনে ওনার ফেরার খবর জানান দিয়েছে । অতএব ব্যাস্ত আমি,মধ্যবিত্ত আমি, বিরক্ত হয়েই জানতে চাইলাম " এতো কিছুর পর-ও ঐ ওদিকে, তোমাদের দিকে লাল ঝাণ্ডা ওরে কেন ? "
একগাল হেসে, বিড়িটা ধরিয়ে উত্তর দিলেন " ওইটুকুই যা আছে । তোমাদের শহর,আমার-ও--- জানিয়েছিল যে ঝান্ডা । যে ঝান্ডা কাঁধে 'আমি মানুষ' জেনেছিল আমার বাপ,সেই ঝান্ডাই ওই বন্ধ ভাঙ্গবে । " রিক্সার প্যাডেলে চাপ দিয়ে, ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতের এক ভুবনজয়ী হাসি নিয়ে স্বপনদা বলে গেছিল " যে মিছিলে তোমরা সবার আগে হাঁটো, সেই মিছিলের একদম শেষে আমরা যারা... যাদের দেখাই যায় না, মিছিলটা কিন্তু তাদের । মিছিলটা কিন্তু খালপাড়ের । কোঠাবাড়ির যারা,তারা বিভীষণের জাত। ওরা লাল ঝান্ডার নয় । ওরা ঠিক কেটে পড়বে । শেষের সেই মিছিল,আমাদের,খালপাড়ের,রিক্সার, মজুরের,বেশ্যার, মানুষের মতো মানুষের। লাল ঝান্ডা আমাদের ঝাণ্ডা । আমরা আছি,ঝান্ডা আছে । " ..

আর দেখা হয়নি ।

সোমবার, ২৬ মে, ২০১৪

রম্য রচনা -- ২ ~ অবিন দত্তগুপ্ত

( Utsav দার লেখা একটি গল্প অনুপ্রাণিত )

বহুদিন পর আজ আবার উনি আসবেন । এক বিশাল মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। রাস্তায়, ছাঁদে, জানলায় জানলায়,পুকুরের পাশে,ফুটপাথে তিল ধারনের জায়গা নেই । শেষ যখন এসেছিলেন, তখন সর্বত্র শ্মশানের নিরবতা ছিল । উনি আগুন জ্বালিয়েছিলেন। স্বপনের গান গেয়েছিলেন। সেদিন-ও এমনি ভিড় ছিল । সেদিন ভিড় পরিণত হয়েছিল লাভাস্রোতে । সেই গনগনে লাভাই,স্বপ্ন জিতেছিল । তারপর আস্তে আস্তে, উনি জনপদ থেকে হারিয়ে গিয়েছেন । পাহাড়ের উপরে এখন ওনার বাড়ি । আজ যখন সেই স্বপ্ন, বাজারে কিলোদরে বিকোচ্ছে , তখন ওনার আসার খবরে চাঞ্চল্য স্বাভাবিক ।

শেষ পর্যন্ত উনি এলেন । পাহাড় বেয়ে নেমে এসে,এক-ই ভঙ্গিতে মঞ্চে উঠলেন। বলতে শুরু করলেন । ভিড় যেন কোন কিছু খুঁজছিল। কিছু একটা,যা আগে ছিল,এখন নেই । অসহিষ্ণু ভিড় আস্তে আস্তে দেখতে শুরু করেছে ---- ওনার পোশাক এখন ভিড়ের পোশাক নয়,ওনার ভাষ্য এখন ভিড়ের কথা নয়,ওনার মন এখন আর ভিড়ের শরীরে থাকে না । আস্তে আস্তে ভিড়,নড়তে শুরু করল। পুকুর পাড়ের,ভাঙ্গা পুলের পাশে, মঞ্চে নয় মাটিতে দাঁড়িয়ে, এক যুবক অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। ভিড় তাকে ঘিরতে শুরু করল ।

মঞ্চের উপর থেকে উনি ভিড়কে দেখছেন । মনে হচ্ছে ভিড় যেন কিছু একটা হারিয়েছে।আগে ছিল, কিছু একটা ---এখন নেই । উনি আস্তে আস্তে দেখতে পেলেন--- ভিড় তার ভাষ্য শোনার কান হারিয়েছে,হারিয়েছে তার মনে নৈকট্য। হয়তবা ভিড়ের পুরনো মনটাই হারিয়ে গিয়েছে। উনি দেখতে পেলেন ভিড় তার মুখ ঘুরিয়েছে পুকুর-পাড়ে,পুলের দিকে। কেউ একজন অনর্গল কথা বলছে । চেষ্টা করলেন মানুষটাকে চিনতে,আলাদা করতে পারলেন না। ভিড়ের মানুষ ।

চশমার কাঁচটা মুছে উনি আবার দেখার চেষ্টা করলেন। এবার দেখতে পেলেন। অবাক হয়ে দেখলেন ,পুলের পাশে দাঁড়ানো বছর ২২এর যুবক তো উনি নিজেই। বিস্মৃত যৌবনের উনি । আগুন ঝড়ানো উনি। তার হারিয়ে ফেলা ---আমি ।মঞ্চের উপড়ের আজকের উনি,অতিতের নিজের সাথে লড়াই-এ জিততে গলার পর্দা চড়ালেন । তবুও ভিড় ক্রমশই সরে যেতে থাকলে, উনি চিৎকার করতে চাইলেন ।আওয়াজ বেরল না। গলা দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে । ভিতরের রক্তক্ষরণ অবশ্য শুরু হয়েছে বহুদিন । উনি জল চাইলেন । কেউ শুনতে পেল না । ভিড় তখন আগুন দেখতে --- পুলমুখি ।

রবিবার, ২৫ মে, ২০১৪

একটি শেক-উলার পদ্য ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

স্লিপ খান তিন ভাঁড়, রাম, গড, আল্লা।

চৌপর দিনভর চলে দেওয়া পাল্লা।
কঞ্চির মন্দির, মসজিদ, চার্চে,
ভক্তির ঘোমটায় ভন্ডামি বাড়ছে।
চুপ চুপ! ঐ দ্যাখ ধম্মের ষণ্ড,
দ্যায় খালি শাস্তি, কাজে অপোগন্ড!
ব্যবসাই চলছে, শাস্তর আউড়ে,
ঘোর কলি, হায় হায়, ম্যাঁয় কঁহা যাউঁ রে!!

শনিবার, ২৪ মে, ২০১৪

নজরুলের প্রতি ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

বাবুদের তালপুকুরে হাবুদের নাইতে মানা।
জাতের এই বজ্জাতি আজ কাজীরও নয় অজানা!
বাগানের গাছ মুড়িয়ে উঠবে নতুন বাড়ি,
পালালো কাঠবিড়ালি, খুকুদের সঙ্গে আড়ি!
দুর্গম গিরি্র ভয়ে (লোকে আজ চালাক ভারি)
বাড়ি থেকে বেরোয় না কেউ, হুঁশিয়ার হে কান্ডারী!
দেখবি জগতটাকে? টিভি তো আছেই ঘরে!
দে তাদের গা ধুইয়ে, মিছে যারা তক্কো করে!
কী বলিস? কামাল পাশা? ইন্ডোর গেম কি কোনও?
বিদ্রোহী, আঙ্গুল চোষো, আর আমার গপ্পো শোনো!!

অবশ্য ~ শান্তনু ভট্টাচার্য্য

আমার গ্রামে এক প্পরিবারে ২২ জন বাস করতেন। ছোটবেলায় দেখেছি তাদের বাড়ীতে কত নিয়ম কানুন ছিল। বাসি জামাকাপড় পরে তাদের বাড়ীতে ঢোকা ছিল নিষিদ্ধ। খুব ধর্মপরায়ন ছিলেন। বাড়ীর গেটের বাইরে একটা নোটিস ঝোলানো থাকত আর তাতে লেখা থাকত " জুতা বাইরে খুলে রাখুন"

ধীরে ধীরে পরিবারের এক একজন কর্মসুত্রে বাইরে যেতে শুরু করলেন। সেই যে যাওয়া শুরু হল তারপর আর কেউই ফিরে এলেন না। আগে যে বাড়ীতে রোজ গ্রামের লোকজনের যাতায়ত থাকত সেখানে লোকজনের আনাগোনাও ধীরে ধীরে কমতে থাকল।

এখন ঐ বাড়ীতে দুজন মাত্র থাকেন। তাঁদের বয়স ও অনেক হয়েছে। দুজনেই ষাটোর্দ্ধ। এখন রাস্তায় লোকজন গেলে নিজেরাই বাড়ীতে ডাকেন একটু কথা বলার জন্য। দুএকজন অবশ্য সাড়া দেন। মাঝে মাঝে আসেনও। কিন্তু আগের মত সে ভীড় আর নেই।

এরই মাঝে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম । " জুতা বাইরে খুলে রাখুন" বোর্ড টা এখনো একই ভাবে লাগানো আছে।

ভাবছি এবার গিয়ে বলব এই জুতা বাইরে খুলে রাখার নোটিশ টা যেন খুলে রাখেন। লোকজন যখন আসেইনা তো এই নিয়ম রেখে আর লাভ নেই।

অবশ্য উনারা যে লেভেলের শৃঙ্খলাপরায়ন আমার কথা শুনলে হয়।

রম্য রচনা - ১ ~ অবিন দত্তগুপ্ত

হাসপাতালের ঘর । মেয়েটা আলতো চোখ খুলেছিলো । যন্ত্রণার নিদ্রা ,ভেঙ্গেছিল একটা পরিচিত কন্ঠস্বর । অথবা হয়ত ওইটুকু সময়ের জন্যই তাকে জাগতে হত । অরিত্রি চোখ খুলে ,তার অসীমদাকে দেখল। এম এল এ অসীম-কে দুচোখ ভরে দেখে অরিত্রি একি রকম মুখে জানালো ," অসীমদা, পাঞ্জাবির রঙটা বেশ ভালো। তুমি আজকাল জর্দা খাও ? " ... অসীম জানতো,গন্ধটা ওর শরিরের নয় । নিচেই স্করপিও তে বসে দুটো চুন সুরকিওয়ালা- দেড়টা প্রোমোটার । গন্ধটা ওদের নিশ্বাসের । অসীম জানতো , গন্ধটা অরিত্রি পাবেই...হয়ত গন্ধ চেনাতেই এই শেষ আসা " ...

মনে আছে ,একটা সময় অসীমের বাড়ি ফেরা,আর শ্মশান যাত্রা ছিল সমার্থক । বাড়িতে একা মা ,টিউশানের পয়েশা জুটিয়ে,বাড়িতে খাওয়ার পউছাতো এই অরিত্রি । তখন ও ১৬-১৭ ,অসীম বোধহয় ২২ । তারপর অনেক জল বয়ে গেছে গঙ্গায়-পদ্মায় । ওদের দুজনের স্বপনের ভোর এসেছে । বিয়ে করেছে অসীম । আগুনখেকো নেতা থেকে আজ মন্ত্রী । অরিত্রি মানুষ ছাড়েনি । আজ এতো বয়েসে ,আবারো মুখোমুখি ... জল বদলেছে,আকাশ বদলেছে,বদলেছে অসীমের বেঁচে থাকার মানে । অরিত্রি এখনো ধুলো মুখেই বাড়ি ফেরে । নেকড়ের দল , অসীম জানে যাদের লোক তার নিজের স্করপিওতে...কিন্তু নিরুপায় ,তাদের -ই নখে আজ অরিত্রি বিছানায় । তাদের-ই নখে লাল পতাকা শতছিন্ন ...অসীম জানে,অরিত্রি জানে এসব কথা । তবুও অসীম জানে, জোড়া ভুরু তুলে অরিত্রি-ই একমাত্র চাইতে পারে তার দিকে,সেলাইন লাগানো শিরা বের করা হাত দুটো বাড়িয়ে দিয়ে বলতে পারে " দেখ তো হাত-টা ধরতে পার কি না ? "

মঙ্গলবার, ২০ মে, ২০১৪

হিন্দু ভারত ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য়

​তাজমহলটা ভেঙ্গে ফেলা হোক। শিবমন্দির চাই।
গোর কে প্রেমের প্রতীক বলিস, লজ্জা শরম নাই!
লাল কেল্লা বা কুতুব মিনার, সব ভেঙ্গে ফেল, আজই।
অহিন্দু কোনও স্থাপত্য আমি দেখতে নইকো রাজী।
ফোর্ট উইলি ও মনুমেন্ট। হ্যাঁ হ্যাঁ ভিক্টোরিয়ার স্মৃতি।
সৃষ্টিতে যদি হেরে যাই, তবে ধ্বংস খেলায় জিতি।
নতুন হিন্দু ভারত গড়ব, হিন্দু সিমেন্ট, বালি।
আমার চোদ্দ পুরুষের ভিটে গড়েছিল মীর আলি!

মঙ্গলবার, ৬ মে, ২০১৪

​বিদূষকের হলফনামা ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

সব অপমান অবলীলায় নিচ্ছি মেখে গায়ে।
হুকুম করা মাত্র হেঁটে দেখাচ্ছি চার পায়ে।

প্রবলতম অনিচ্ছাতে লুকিয়ে মাথা চুলকে
সঠিক বলে মানছি তোমার চূড়ান্ত সব ভুলকে।

তোমার তুলি ম্লান করে দেয় পাবলো পিকাসোকে
রটাই রোজই(ভেতর পোড়ে অনন্ত এক শোকে)।

তোমার লেখা কাব্যমালায় গল্পে এবং গানে
নোবেল গন্ধ আমিও পাই সে'টা সবাই জানে।

পাথর কেটে খোদাই করা সকল প্রতিশ্রুতিই
চিরকালীন পাথর… তবু ঘটাই না বিচ্যুতি।

ফ্রি রিংটোনে তোমার ভজন শেখালো বাধ্যতা
তিনতলা ফ্লেক্স দেখলে বুঝি, তুমিই আরাধ্য তা'।

বাঁচতেই স্রেফ এ'সব করি। আসলে মনে মনে
নিজেকে খুব ঘেন্না করি… নিজস্ব নির্জনে…

রবিবার, ৪ মে, ২০১৪

দেশ ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

মুখেই যত জগত মারে বিজেপি, কংগ্রেস,
ভোটের নামে নিলামডাকে বিকিয়ে গেছে দেশ।
তর্জনীতে কালির ফোঁটা, গর্জনী তো ফাঁকা।
'শিক্ষা হবে, শিল্প হবে, উন্নয়ন চাকা
ঘুরবে ঠিক!' ঘুরবে চাকা? ইন্ধনই তো শেষ!
পুঁজিপতির গলিঘুঁজিতে বিকিয়ে গেছে দেশ।

শনিবার, ৩ মে, ২০১৪

স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন এবং আমাদের প্রত্যাশা ~ তমাল রাহা

শুরুতেই একটা ছোট গল্প বলি। আমি যে ভদ্রলোকের কাছে স্প্যানিশ ভাষা শিখি মাদ্রিদ-এ, তিনি হঠাৎ গত বছরে একদিন এসে বললেন যে তাঁর স্ত্রী-র ব্রেস্ট ক্যান্সার হযেছে। তারপর চিকিৎসা শুরু হলো। দীর্ঘ একবছর। প্রতি ২১ দিন বাদে Herceptin বলে একটি ওষুধ আর সঙ্গে কেমোথেরাপি। মাঝে একটা অপারেশন, যাকে চিকিৎসার পরিভাষায় মাস্টেকটোমি বলা হয়। পুরোটাই ফ্রি, সরকারী হাসপাতালে। আমি ভাবছিলাম, আমাদের দেশে কারো এই সমস্যা হলে খরচ তা ঠিক কত হতো ! শুধু Herceptin এর খরচ হত ২৩ লাখ টাকা ! প্রশ্নটা ক্রয়ক্ষমতা-র, তোমার টাকা থাকলে চিকিৎসা হবে, আর না থাকলে নয়।

স্বাধীনতার পর ৬৭ বছর কেটে গেল। আমাদের দেশে এখনো আমরা একক স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করে উঠতে পারলাম না। কিছু কিছু সূচী বাস্তবায়িত হযেছে, যেমন রাজীব আরোগ্য যোজনা বা সেইরকম আরো কিছু , কিন্তু এর পুরোটাই হয়েছে ¨দাতব্য ¨ করার মানসিকতা নিয়ে, ¨স্বাস্থ্যের অধিকার¨ কে স্বীকৃতি দিতে নয় ! লোকসভা নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়েছে, আমরা ক´জন কে দেখছি ¨স্বাস্থ্যের অধিকার¨নিয়ে আলোচনা করতে ? বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, তার নির্বাচন অথচ ¨পোলিও নির্মূল¨এর মত বিক্ষিপ্ত জয়লাভ আর সাইনবোর্ড এ তার বিজ্ঞাপন ছাড়া আর কেউ কিছু নিয়ে চিন্তিত তো মনে হয় না ! স্বাস্থ্য বিশ্বের সর্বত্র একটি প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু, ভারতের দুঃখজনকভাবে এটা শুধু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তেহার-এ ক্ষণস্থায়ী উল্লেখ হিসেবেই থেকে যায়। গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা সোনার পাথরবাটি , ডাক্তার রোগীর অনুপাত স্বাভাবিক গড়ের নীচে , ৭৮% চিকিৎসার খরচ নাগরিক কে দিতে হয় নিজের পকেট থেকে, জনস্বাস্থ্যচিকিৎসা খাতে সরকারী ব্যয় GDP র ৩ শতাংশের নিচে ! ব্রাজিল এ সেটা ১০ শতাংশ, ফ্রান্স -এ ১২ শতাংশ। ভাবা যায় ! সমস্যাটা কিন্তু অনেক গভীর।

উদাহরণস্বরূপ, ভারতে মাতৃমৃত্যুর হার বিশ্বে সর্বাধিক এবং এটা কিন্তু আমরা স্বাস্থ্যসেবায় কতটা টাকা খরচ করতে পারি তার সাথে সম্পর্কহীন। প্রতি বছর ১.৪ মিলিয়ন শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিন আগে মারা যায়। দুর্ভাগ্যবশত এই মৃত্যু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য এবং কম খরচেই সেটা করা সম্ভব। বর্তমান নীতি অনুযায়ী একমাত্র বিশেষজ্ঞরাই এই কাজ করতে পারেন আর আগেই বলেছি যে এইসব বিশেষজ্ঞদের পর্যাপ্ত যোগান আমাদের দেশে নেই। দেশে আজ পর্যাপ্ত মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন যেখানে স্ত্রীরোগবিদ্যা, এবং পেডিয়াট্রিক্স মত ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা কোর্স ক´রা যাবে। গত কয়েক বছরে নার্সিংশিক্ষার কলেজ গুলিতে ভর্তির হার ৫০% এর নিচে ! কেউ কি ভেবে দেখেছে যে আগামী কয়েক বছরে দেশে নার্স একটি তীব্র ঘাটতি হবে ! কারণ টা কি ? নার্সিং এখন একটি মৃত শেষ পেশা মনে করা হয়। কারণ কেউ ভাবে না যে এই পেশায় কর্মজীবনে অগ্রগতি সম্ভব। একটু অন্যভাবে ভাবলেই হয়। নার্সের পেশাকে কি কিছুটা আকর্ষনীয় করে তোলা যায় না? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৬৭% নার্স anesthetists এর কাজ করেন। আর আমরা আমাদের দেশে ২০ বছরের ক্রিটিক্যাল কেয়ার এ কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও কোনো নার্সকে paracetamol বিধান করার অধিকারটুকু দেই না। সবসময় যে বেশী টাকার প্রয়োজন তা কিন্তু নয়! মেডিকেল শিক্ষাকে দেশের দেশের উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে ভাবতে হবে।

ভাবতে হবে যে কি করলে কলকাতা বা সিঙ্গুরে বসে একজন টাটা মেমোরিয়াল বা ভেলোরের হাসপাতালের ডাক্তারের মতামত নিতে পারবেন। ইনফরমেশন টেকনোলজি তে আমরা এতো অগ্রগতি করেছি, সরকার কি ভেবে দেখেছেন যে তার প্রয়োগ কিভাবে করা যায় ? একটি পরিকল্পিত Health eco -system এর প্রয়োজন আজ দেশে , যেখানে তথ্য-বিনিময় হবে সাবলীল। 

অভিমুখহীন গবেষণা। কোন জাতীয় গবেষণা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ? আজকে বোধহয় ভাবার সময় এসেছে। সরকার কোন গবেষণা কে আর্থিক সাহায্য দেবার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেবে সেটাও ভেবে দেখা দরকার। ভ্যাকসিন সম্পর্কিত গবেষণা না মৌলিক গবেষণা, কোনটা অগ্রাধিকার পাবে সেই নীতিটা কিন্তু সরকারের থেকেই আসা উচিত। সব জাতীয় গবেষণাই গুরুত্বপূর্ণ , কিন্তু সেখানে উচিত দেশের প্রয়োজন ও সরকারের ব্যয় এর মধ্যে একটি ভারসাম্য ।

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন UPA সার্বজনীন স্বাস্থ্যের অধিকার¨ নিয়ে অনেকদিন ধরে বললেও, কাজের কাজ খুব কি হয়েছে ? তাঁরা দাবি করেন যে National Rural Health Mission (NRHM) এর ফলে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এই দাবি সংশয়াতীত নয়। এবারের ইস্তেহার-এ তাঁরা বলেছেন যে ¨ক্ষমতায় এলে সার্বজনীন ¨স্বাস্থ্যের অধিকার¨ কে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি (GDP র ৩%) করা হবে। প্রতিটি স্কুল এবং পরিবারের জন্য প্রায়োগিক টয়লেট নিশ্চিত করা হবে। জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত মধ্যে একটি তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স চালু হবে। প্রজেক্ট ভিশন ২০২০ তে স্বাস্থ্য খাতে ৬০ লক্ষ মানুষের নতুন চাকরি হবে।¨ কিছু অত্যাধুনিক মোবাইল medical service ভ্যান এর কথা বলা আছে, যা কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান এর বিজ্ঞাপন ই মানায়, দেশের সর্ববৃহৎ (?) রাজনৈতিক দলের ম্যানিফেস্টো তে বেমানান। রাহুল গান্ধী মহাশয় তাও সভাসমিতি তে এটা নিয়ে দু-চার কথা বলছেন।

BJP ইস্তেহার-এ সরকারী-বেসরকারী যৌথ উদ্যোগের কথা বলেছে। অপ্রচলিত/বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থ্যার (যেমন হোমিওপেথী, আয়ুর্বেদ, যোগ ইত্যাদি) কথা বলা হেছে ম্যানিফেস্টো তে। সবচেয়ে ভীতিপ্রদ এখানে FDI (Foreign direct investment) বিলগ্নির ইঙ্গিত !

Aam Aadmi Party বা আপ , এম্বুলেন্স এর বাইরে বেরোতে পারেন নি এখনো। জনস্বাস্থ্যনীতি আর এম্বুলেন্স এর পার্থক্য টা এখনো বুঝে উঠতে পারেন নি ওনারা। হয়তো আরেকটু সময় লাগবে। তবে জনস্বাস্থ্য পরিষেবার সাথে দুর্নীতি-র যোগাযোগটা উল্লেখ করা আছে। এটা উপেক্ষা করার বিষয় নয়, করছিও না। তবে এই লেখাটা জনস্বাস্থ্যনীতি সম্পর্কিত বলে এব্যাপারে আর বেশি আলোচনা করছি না।

অধুনা মিডিয়ার আশীর্বাদধন্য এই রাজ্যের শাসক দলের ইস্তেহার পড়লাম। স্বাস্থ্যনীতির সর্বাঙ্গীন পরিবর্তন (comprehensive change) এর কথা বলা গেছে তাতে। কিভাবে সেটা বলা নেই। কিছু কথা আছে যা অনেকটা দাতব্য করার মানসিকতা প্রকাশ করে। আর ম্যানিফেস্টোর বাইরে এসব নিয়ে কোনো উচ্যবাচ্য তো চোখে পড়ছে না !

কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার-এ জন্যস্বাস্থ্য নীতি র ব্যাপারে অনেক বেশি সক্রিয়। কমিউনিস্ট পার্টি সার্বজনীন জন্যস্বাস্থ্য নীতি প্রয়োগের অঙ্গীকার করেছে। কমিউনিস্ট পার্টি GDP র ৫% স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করার প্রস্তাব এনেছে। পার্টি স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারিকরণ-এ বাঁধন আনার আহ্বান জানিয়েছে। এক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরী যে বিশ্বের সর্বত্র সমাদৃত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গুলি কিন্তু রাষ্ট্র আশ্রিত। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর উদাহরণ দিয়েই লেখাটা শুরু করেছিলাম, সঙ্গে যোগ করব কিউবা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, যেখানে স্বাস্থ্যের অধিকার মৌলিক অধিকারের মধ্যে পরে এবং তা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত ও সফল। ভারতবর্ষের কথা বললে বলা যায় যে প্রতি বছর ৮ কোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে যায় এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে গিয়ে যা আদতে স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারিকরণ-এর ফল । কমিউনিস্ট পার্টি এছাড়াও স্বাস্থ্য কর্মিদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা এবং বিনামূল্যে ডায়গনিস্টিক সুবিধা প্রদান, পাশাপাশি আরও জেনেরিক ওষুধ এর outlet খোলার ব্যাপারে জোর দিয়েছে। ইস্তেহার-এ আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মেডিকেল ডিভাইস ও ওষুধের দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি র ব্যাপারে জোর দেওয়া। ক্লিনিকাল ট্রায়াল এ অংশ নেওয়া রোগীদের জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণ এর কথাও বলা আছে ম্যানিফেস্টো তে।

কোথায় ফাঁক সেটা বুঝতে হবে আর তা বন্ধ করার কাজটা করতে হবে একটা সুনির্দিষ্ট নীতির ভিত্তিতে আর সেটাই আমাদের আশা এই ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন এর পরিপ্রেক্ষিতে।

শুক্রবার, ২ মে, ২০১৪

সারদা ~ তমাল রাহা

আবাল বৃদ্ধ দেশজোড়া লোক 
ভুগছে ভীষণ সমস্যায় 
প্রাণপাত, তবু জানা যাচ্ছে না 
সারদার পিছে কেয়া হায় !

বাসে ট্রামে কত জল্পনা কথা 
মাঠে ময়দানে টেন্টে ,
মদনা ব্যাটাও পেছনে আছে 
বলে ওপাড়ার নন্টে।

গৌতম দিলো হাটে হাড়ি ভেঙ্গে 
হরিশ চাটুজ্যে বত্রিশ ,
কুনাল আবার জেলে বসে বলে 
আমের মুকুলে ভরা বিষ।

সুদীপ্ত বলে ছবি কিনি নাই 
পিসির তুলিও বন্ধ,
জনগণ দেখে হতবাক সব,
যাচ্ছে না মনে সন্দ !

মোদিবাবু বলে, হলেই PM 
ঢোকাবো পিসিরে গরাদে,
অর্পিতা ভাবে পরিলাম ফাদে 
কি জানি কি আছে বরাতে!

কেষ্ট-বিষ্টু আছে তল্লাটে,
সাথে আরা বা মনিরুল,
ঘাসের ডগার ফুলটাও বলে,
সব ভুল, আজ শুধু ভুল।

বুধবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৪

প্রতিষ্ঠান্ন ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

যা যা ছিল এলিট মধ্যবিত্তের নিজস্ব অভিজ্ঞান, সবই কালের গতিতে ম্লান। ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন সে'ও তো নিভন্ত প্রায়।

তবে আদৌ সাহিত্য নিয়ে এত মধ্যবিত্ত কচকচি কেন? নতুন মধ্যবিত্তর তো রয়েছে আইপিএল, এল ক্লাসিকো। ক্লাসিক্যাল পানুচর্চা বা প্যানপেনে টিভি সিরিয়াল। এখন সব অশৈলী কাণ্ডই জিও মানে গভর্নমেন্ট অর্ডারে ঘটে নইলে এনজিওরা ঘটায়। 

এ' দু'টির যে কোনও একটি থাকতেই হবে উদ্যোগের মূলে। তথাকথিত 'প্রতিষ্ঠান'ই একমাত্র 'প্রতিষ্ঠান্ন' দেবে এ'টা নেহাত বাতিল এক বস্তাপচা ধারণা। এই ধর্মযুদ্ধে মতান্তরে এই অধর্মযুদ্ধে কেউই অপ্রতিষ্ঠান নয়। বড় পত্রিকা ছোট পত্রিকা সকলেই 'প্রতিষ্ঠান'।সব খানেই সেই প্রসাদ নামের কল্পিত উচ্ছিষ্ট পাবার উমেদারির প্রতিযোগিতার আসর। 

হ্যাঁ, পাঠকসংখ্যা একটা ব্যাপার বৈকি। সেই পাঠক নোবেল প্রাইজের কমিটিতে থাকেন না। নোবেল চুরি করেন না। আন্দাজ করি ইদানিং সাহিত্যও পড়েন না। ছাপার অক্ষরগুলি গল্পের ছদ্মবেশে, প্রবন্ধের রাজপোষাকে, খাট-সাহিত্য আর খাঁটি সাহিত্যের মাঝামাঝি কোনও এক অবস্থানে দোদুল্যমান থাকে যদিও বা, কবিতার পাতাগুলোকে স্বয়ং কবিও নিজের লেখার পাতাটি ছাড়া গ্রাহ্য করেন না। তবু ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখতে কার না ইচ্ছে করে। তাই সম্পাদককে ছাপার অক্ষরে চেতাবনি দিতে হয়, পকেটে কবিতা গুঁজে দিয়ো না কেউ… টেলিফোন তদবির নিষিদ্ধ …ইত্যাদি।

'সম্পাদক'এর কাজটুকু নিশ্চিত ভাবেই প্রাতিষ্ঠানিক। কোন লেখাটি পত্রিকার মানবর্দ্ধক, কোনটি বিজ্ঞাপন সংগ্রাহক, কোনটি পারস্পরিক পিঠ চুলকানোর আসর থেকে লব্ধ, কোন লেখাটি পঞ্চবানবিদ্ধ, এই এত সব বিবেচনা করে যে প্রতিষ্ঠান তারই নাম সম্পাদক, সে তথাকথিত 'বড়' বা পাতিরাম রিজেকটেড আতিপাতি যে কোনও পত্রিকারই হোক না কেন। ব্যবসা, যশলোভ আর পাঠকসংখ্যা ছোট বড় সবার টার্গেট।টাটা বিড়লা আম্বানি বড় তাই লড়াইহীন নরক, আর পাড়ার ঘাম ঝরানো মুদি দোকানি ক্ষুদ্র সংগ্রামী ভাই আমার, এরকম প্রলেতারিয়েত ভাবনা অলীক।

বামেদের গাঁ ছাড়া করার মহান কাজটাই তারুণ্যের প্রতীক ছিল বুঝি? তবে কেন ধন্দ লাগে যখন শুনি যে সে' কাজে ব্রতী পশুখামারের তরুণ তুর্কী ঘোড়ারা ভোটের মরশুমে খেপ খাটতে গেছে অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানের হয়ে? লিটল ম্যাগাজিনের 'নন্দীগ্রাম' সংখ্যাও কি কম দেখা গেছিল সে সময়? সবটাই প্রতিষ্ঠান আর তার দখলদারির খেলা।

তাই বলি কে প্রতিষ্ঠানের মুখ আর কে মুখোস, কার কোঁচড়ে ডলার আছে আর কার মুঠোতে ছড়ানোর যোগ্য খইটুকুও নেই, এ তর্ক স্থগিত রেখে যে যতটুকু লিখতে পারে লিখে যাক। কেউ লেখা চাইবে। কারওর দরজায় মাথা খুঁড়তে হবে। আডৌ কেউ না ছাপলেও নেট আছে। 

ও হো বলতে ভুলেছি। নেটজগতও তো অংশত প্রাতিষ্ঠানিক আজকাল। মানে ওই নেটজিনে লেখক হিসেবে প্রবেশাধিকার, ছাপা কাগজের মতই রিজার্ভড। হে যশোকামী লেখক। হিংসে করে লাভ নেই।ভেবে দেখলে সে'টাও দরকারি এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ষোলো আনার ওপর আঠার আনা।

পার্থ, ফললাভের আশা কোরো না। মুখ ও মুখোস দুই প্রতিষ্ঠানই মৃত। একমাত্র জীবিত তুমি। তুমি সব্যসাচী। অক্লান্ত দু'হাত সমানে চলতে থাকুক।

আর তোমার অস্ত্র হোক তোমার জাগ্রত অর্দ্ধজাগ্রত অথবা ঘুমন্ত কিন্তু স্বপ্নবিদ্ধ সেরিব্রাম।

এ প্রপঞ্চে ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​এবার ভোটে সবার ঠোঁটে ঝুলছে এ প্রশ্নটা,
দিদি এবার কার কপালে দেবেন যে ভাইফোঁটা!
সেটা জানবে বলে –

সেটা জানবে বলে সদলবলে টিভির রিপোর্টারে
সুযোগ পেলেই মাইক হাতে খুব জ্বালিয়ে মারে!
দিদির সময় আছে?

দিদির সময় আছে এসব গাছে এক্ষুণি জল ঢালার?
বিয়ের আগেই কেউ কখনো কাউকে পরায় মালা!
যত দুষ্ট লোকে

যত দুষ্ট লোকে তাই দুচোখে লাগিয়ে নিয়ে ঠুলি
দিনদুপুরে রাস্তাঘাটে গাইছে ব্রজবুলি!
তাতে বয়েই গেল –

তাতে বয়েই গেল! ও ভাই, হ্যালো, শখ যদি সব জানার,
লিখছো না ক্যান উন্নতি এই রাজ্যে ষোল আনা!
তোরা অন্ধ সেজে

তোরা অন্ধ সেজে হনুর লেজে লাগিয়ে তারাবাতি
এঁড়ে গরুর দুধ দু'তে চাস, ছিলিস ভালো তাঁতী!
তার রাখিস খেয়াল?

তার রাখিস খেয়াল, ভিট্‌রে শেয়াল, গেয়ে হুক্কাহুয়া
ভোটের বাজার গরম করিস উড়িয়ে দিয়ে ধুঁয়া!
সব গেলিই ভুলে

সব গেলিই ভুলে তোর মাশুলে জমিয়ে সিকি-আনি
জেলখানাতে রাখছি পুষে সুদীপ্ত-দেবযানী!
ওদের আর্ট গ্যালারি

ওদের আর্ট গ্যালারি গয়না-শাড়ি আংটি-পলা-শাঁখা
সব বিলাবো; আর্ট তো আমার, কয়েক কোটি টাকা!
তোরা সব পাবি রে

তোরা সব পাবি রে, আস্তে ধীরে, যার যত চাই খুশি –
ছিবড়ে হওয়া মাংসটা, তার হাড্ডি আমিই চুষি!
এবার ভোটের পরে

এবার ভোটের পরে বন্ধ ঘরে ডাকবে তো নিশ্চয়ই।
বলবে ডেকে, সাপোর্টটা দাও, এইখানে টিপসহি!
তখন বলব হেসে

তখন বলব হেসে, আমার দেশে লক্ষ নরনারী
আমায় শুধায় ফ্রীতে কবে চড়বে রেলের গাড়ি!
ওদের মুখটা চেয়ে

ওদের মুখটা চেয়ে অলপ্পেয়ে মন্ত্রীসভায় হানা
দিয়ে আবার বাগিয়ে নেব রেলদপ্তরখানা!
তাতে বুঝলে ভায়া

তাতে বুঝলে ভায়া এই বেহায়া রাজ্য যাবে ফুলে –
শিলান্যাসে ভরিয়ে দেবে মদন আরাবুলে!
যেমন আগেও করা!

যেমন আগেও করা বন্যা খরা তছরুপে বর্ষণে
ভাইরা আমার রেসপন্স দেয় হুমকি ও ধর্ষণে!
ওরা আমার পোষা

ওরা আমার পোষা, ফলের খোসা চিবিয়ে হাঁকে জোরে,
রাজ্যে কোথায় কী হয়েছে চৌত্রিশ বচ্ছরে!
এটাই মন্ত্র ওদের

এটাই মন্ত্র ওদের, এর জোরে ঢের বাগিয়ে নেওয়া আসন
দ্রৌপদীদের সামলে রাখে দু-চারটে দুঃশাসন!
ওরে, সব সাজানো –

ওরে সব সাজানো তোমরা জানো এই শাড়ি, নীল পাড়ে
হাওয়াই চটির সংসারখান টানছি আমি ধারে!
আমি শিল্পী মানুষ

আমি শিল্পী মানুষ চৈনিক-রুশ সব ব্যাটাদের পাতে
ছাই দিয়ে ডান্স করছি এখন শারুখ খানের সাথে!
এটা চেঞ্জ না তো কী?

এটা চেঞ্জ না তো কী, এ আমলকি, চিবাও একটু পরে
জল খেলে মুখ মিষ্টি হবেই, তদ্দিনে ঝরঝরে
তোদের ভবিষ্যৎও!

তোদের ভবিষ্যৎও আরও কত উঠবে ফুলে ফেঁপে
আমার চ্যানেল, আমার কাগজ সব দেখাবে ছেপে!
তোরা সেই বুঝে দে

তোরা সেই বুঝে দে পরম জেদে চুন চুনকে, গুণে
ভোটটা তাপস-দেব-বাইচুং শতাব্দী-মুনমুনে!
এদের গ্ল্যামার কত

এদের গ্ল্যামার কত আর উদ্ধত বুক ভেসে যায় জলে
বই বানাবো এদের নিয়ে দেখবি বসে হলে!
এদের মেকাপ দিয়ে

এদের মেকাপ দিয়ে খুব সাজিয়ে ছাড়ব এক এক জনা
চিত্ত-নিবেদিতা-বিবেক সুভাষ-রবীন্দ্রনাথ!
তখন বুঝবি তোরা

তখন বুঝবি তোরা দুষ্টু ছোঁড়া, লাগিস আমার পিছু!
কী যায় আসে কোনটা, জেনে কাঁঠাল নাকি লিচু!
ওরে, সাজানো সবকিছু ...
ওরে, সাজানো সবকিছু ...

২রা বৈশাখ ১৪২১
১৬ই এপ্রিল ২০১৪

রবিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৪

হাল্লা যখন যুদ্ধে চলেন ~ সোমনাথ রায়

হাল্লা যখন যুদ্ধে চলেন চ্যানেল জুড়ে ঢিচক্যাঁও
পোখরান আর কেওনঝোড়ে ম্যাকিনসেতে মিশ খাও
হিন্দি পাকি ক্রিকেটম্যাচে ক্ষান্তবুড়ির ঠানদি
দল ভারি হয় শব মিছিলে, স্বপ্নে ছিলেন গান্ধি
একশ ভাইয়ের কেউ ছাড়িনি খেমের রুজের পাঁচগ্রাম
অক্ষৌহিনী হত্যালীলায় বাবরি ভাঙি, রামরাম-
যুদ্ধ যখন 'হল্লা বোল'-এর, সংখ্যালঘুর ঘরদোর
সব জ্বলে যায়, বেস্টবেকারি- অউশটিশের অফশোর
ট্রোজান অশ্ব, খোঁজ আন বশ্য বক্সাইটের সম্ভার
পার করেগা সালোয়া জুদুম আব কি বারের সরকার।।

ভোটের ছড়া ~ অমিতাভ প্রামাণিক

ভোটের কুকুর ঘেউ ডেকেছে,

ভোটের বিড়াল মিউ বলে।
তাতেই কাঁপে ভোটারছানা
ভয়ভীতিতে, বিহ্বলে।

পাড়ার দাদা ডিগবাজি খায়,
আস্তে বলে বৌদিকে –
ভোট না দিলেই কেচ্ছা তোমার
ছড়িয়ে দেব চৌদিকে।

অবশ্য ঐ রোগ যে তোমার,
দিচ্ছি আমি টোটকা না?
ধাপ্পা তো নয়, চাইছি শুধু
ছাপ্পা তোমার, ভোটখানা।

ভোটটা দিলেই রাস্তা হবে,
ইস্কুল হবে, নিউ কলেজ –
তোমার বরের চাকরি হবে, 
জল আসবে গো টিউকলে।

ওদের পাটি-র সব ভুলভাল,
নিম গাছে কি শিম ফলে?
ভোটটা দিও বৌদি তুমি
আমার পাটির সিম্বলে।

ভোট পেরোলেই এসব দাদা
কোথায় হাওয়া, ফুক্কা, হুঁ!
ভোটের গরু হাম্বা ডাকে,
ভোটের শিয়াল হুক্কা-হু!

১৩ই এপ্রিল ২০১৪


দুইখান কতা ~ প্রকল্প ভট্টাচার্যয়

-দাদা, ভোট আসচে হুনলুম?
-হ্যাঁ, তাতে তোমার অসুবিধে কোথায়?
-না, মানে, যদি এই একই পোধানমন্তি থাকেন, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি নতুন কেউ হ'ন, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-নতুন কেউ ই হবেন।
-ওই একই পাটির না অন্য পাটির? যদি একই পাটির কেউ হ'ন, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি অন্য পাটির কেউ হ'ন, তা'লে দুইখান কতা আছে। 
-অন্য পার্টিই তো মনে হচ্ছে।
- তা কত্তা বিজেপি, না আপ? যদি আপ হয়, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি বিজেপি হয়, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-মনে ত হচ্ছে বিজেপিই হবে।
-ওহো, তা'লে পোধানমন্তি কে হবেন, আদবানি না মোদি? যদি আদবানি হ'ন, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি মোদি হ'ন, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-মোদিজীই তো হবেন নির্ঘাত।
-তিনি কি সত্যিই ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করতে চাইবেন? যদি চেয়ারে বসে পোতিহ্যুতি ভুলে যান, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি ভুলে না যান, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-ভুলবেন কেন! নিশ্চয়ই সেটাই চাইবেন!
-আচ্ছা, সেটা কীভাবে চাইবেন? হান্তিপূর্ণভাবে, নাকি তালিবানি কায়দায়? যদি হান্তিপূর্ণভাবে হয়, তা'লে কোনো কথা নাই। যদি তালিবানি কায়দায় হয়, তা'লে দুইখান কতা আছে।
-উনি এবং ওনার দলবল তো শান্তিপূর্ণ নয়, তালিবানি কায়দাতেই বিশ্বাসী, যা দেখছি শুনছি!
-তা'লে হালার ভোটই দিমু না!!