আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আমি প্রথম শুনেছিলাম একটা টং দোকানে।
নওগাঁর বদলগাছীতে।
"আইজ কত সাল কও তো?"
প্রশ্নটা করেছিলেন হক স্যার।
ডক্টর এনামুল হক।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রিটায়ার্ড ডেপুটি ডিরেক্টর।
পাহাড়পুরের ধ্বংসাবশেষ যাদের হাতের তালুর মতো চেনা, তাদের ভিতর সবার উপরে উনার নাম।
আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললাম, "দুই হাজার তেইশ, স্যার।"
স্যার হাসলেন। সেই হাসিটা আমি পরে অনেকবার দেখেছি।
যেন একটা বাচ্চা খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভুল উত্তর দিয়েছে, আর তার শিক্ষক জানে বাচ্চাটার কোনো দোষ নাই। দোষ বইয়ের।
"তুমি জানো দুই হাজার তেইশ। কারণ ক্যালেন্ডারে লেখা। ক্যালেন্ডার কে বানাইছে?"
"পোপ গ্রেগরি, স্যার। ১৫৮২ সালে।"
"আর তার আগে?"
"জুলিয়াস সিজার।"
"সাবাশ।" স্যার কাপটা নামিয়ে রাখলেন।
"এইবার একটা অংক করো। সিজারের ক্যালেন্ডার প্রতি বছর এগারো মিনিট বেশি গুনত। দেড় হাজার বছরে সেই এগারো মিনিট জমতে জমতে কত দিন হয়?"
আমি মোবাইলে হিসাব করলাম। "তেরো দিনের মতো, স্যার।"
"আর পোপ গ্রেগরি ক্যালেন্ডার ঠিক করার সময় কয় দিন কাটছিল?"
"দশ দিন।"
স্যার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টং দোকানের টিনের চালে ঝমঝম শব্দ।
"তাইলে বাকি তিন দিন গেলো কই, শুভ্র? তিন দিন মানে তিনশো বছরের হিসাব। তিনশো বছর মানুষ গুনছে, কিন্তু আকাশ গুনে নাই।"
সেইদিন আমি প্রথমবার টের পেলাম, মাটির নিচে যত কিছু চাপা পড়ে থাকে, তার সবচেয়ে ভারী জিনিসটা ইট-পাথর না। সময়।
২.
আমার নাম শুভ্র।
একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্নতত্ত্বে মাস্টার্স করে দুই বছর বেকার ছিলাম।
বেকারত্বের দুই বছরে মানুষ দুই জিনিস শেখে।
এক, আত্মীয়স্বজনের দাওয়াতে কীভাবে প্রশ্ন এড়াতে হয়।
আর দুই, কীভাবে নিজের ভিতর থেকে আত্মসম্মান নামের জিনিসটা আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যায়।
তারপর হঠাৎ একটা প্রজেক্টে চাকরি হয়ে গেল।
পাহাড়পুরে নতুন খনন।
প্রজেক্টের লিড হক স্যার।
রিটায়ার করার পরেও সরকার তাকে ডেকে এনেছে, কারণ পাহাড়পুর নিয়ে উনার চেয়ে বেশি কেউ জানে না।
পাহাড়পুর।
সোমপুর মহাবিহার।
পাল রাজা ধর্মপাল বানিয়েছিলেন অষ্টম শতকের শেষ দিকে।
হিমালয়ের দক্ষিণে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার। ই
উনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ।
স্কুলের বইয়ে পড়েছি, বিসিএসের জন্য মুখস্থ করেছি, পাঠ্যবইয়ের মলাটে ছবি দেখেছি।
প্রথম দিন যখন বিহারের মাঝখানের সেই বিশাল মন্দিরটার সামনে দাঁড়ালাম, আমার মনে হলো আমি একটা জাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
লাল ইটের জাহাজ। বারোশো বছর ধরে মাটির সাগরে ভাসছে।
বারোশো বছর। অন্তত তাই জানতাম।
৩.
নিতুর সাথে আমার দেখা খননের তৃতীয় সপ্তাহে।
সাভারের পরমাণু শক্তি কমিশনের ল্যাব থেকে এসেছিল।
রেডিওকার্বন ডেটিংয়ের স্যাম্পল নিতে। কাঠকয়লা, হাড়, পোড়া বীজ, যা পাওয়া যায়। সি-ফোর্টিন। জীবিত জিনিস মরে যাওয়ার পর তার ভিতরের কার্বন একটা নির্দিষ্ট হারে কমতে থাকে। কতটুকু বাকি আছে মাপলেই বলে দেয়া যায় জিনিসটা কত আগে মরেছে।
প্রকৃতির নিজের ঘড়ি। এই ঘড়ি কোনো পোপ বানায় নাই, কোনো সম্রাটও না।
নিতু খুব কম কথা বলে। গ্লাভস পরা হাতে চিমটা দিয়ে কাঠকয়লার টুকরো তুলে ছোট্ট কাচের শিশিতে রাখে।
তারপর শিশির গায়ে লেবেল লাগায়, এত যত্ন করে যেন কাউকে চিঠি লিখছে।
আমি প্রথম দিন ওর পাশে দাঁড়িয়ে বকবক করছিলাম।
পাল রাজবংশ, অতীশ দীপঙ্কর, তিব্বত, আরও কত কী। ও একটা কথারও উত্তর দেয় নাই। শেষে শিশিটা বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, "আপনি অনেক জানেন। কিন্তু আপনি যা জানেন সব কেউ না কেউ আপনাকে বলছে। এই কাঠকয়লাটা কাউরে কিছু বলে নাই। ও খালি জানে ও কবে মরছে।"
তারপর একটু হেসে বলেছিল, "আমি ওর কথা বেশি বিশ্বাস করি।"
সেইদিন আমার মনে হয়েছিল, এই মেয়েটার প্রেমে পড়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হবে। আর সেই ভুলটা আমি করেই ফেলব।
দুইটাই সত্যি হয়েছিল।
৪.
প্রথম রেজাল্ট এলো দেড় মাস পর।
তখন আমাদের সম্পর্ক অনেকটা এগিয়েছে। মানে প্রেম না।
প্রেমের আগের সেই বিপজ্জনক সময়টা, যখন দুইজনই জানে কী হচ্ছে, কিন্তু কেউ নাম দেয় না। প্রতি বৃহস্পতিবার নিতু সাভার থেকে আসত।
আমরা বিহারের দেয়ালে বসে সূর্যাস্ত দেখতাম।
ও ঝালমুড়ি খেত না, বলত পেট খারাপ হয়। তারপর আমারটা থেকে অর্ধেক খেয়ে ফেলত।
সেইদিন ও এলো বৃহস্পতিবার না, মঙ্গলবার।
কোনো খবর না দিয়ে। হাতে একটা ফাইল। মুখ ফ্যাকাশে।
"শুভ্র, হক স্যার কই?"
স্যারের তাঁবুতে তিনজন বসলাম। নিতু ফাইলটা খুলল।
মন্দিরের ভিত্তির নিচের স্তর থেকে বারোটা স্যাম্পল। ধর্মপালের আমলের হলে সবগুলোর বয়স আসার কথা সাতশো আশি থেকে আটশো দশ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।
এসেছে এক হাজার পঞ্চাশ থেকে এক হাজার নব্বই।
"মেশিনের সমস্যা?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।
"তিনবার চালাইছি। দুইটা আলাদা মেশিনে। একটা স্যাম্পল আমি নিজে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাইছি, আমার পিএইচডির সুপারভাইজারের কাছে। একই রেজাল্ট।"
হক স্যার কিছু বললেন না। অনেকক্ষণ ফাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর তাঁবুর একটা ট্রাংক খুলে পুরোনো একটা বই বের করলেন। জার্মান ভাষায় লেখা। মলাটে একটা নাম, হেরিবার্ট ইলিগ।
“Das erfundene Mittelalter। বানোয়াট মধ্যযুগ।” স্যার বইটা টেবিলে রাখলেন। "উনিশশো ছিয়ানব্বই সালে বের হইছিল। জার্মানির এই ভদ্রলোক বলছিলেন, ৬১৪ থেকে ৯১১ খ্রিস্টাব্দ, মোটামুটি তিনশো বছর, ইতিহাসে আসলে কোনোদিন ঘটে নাই। পুরাটা বানানো।"
"বানাইলো কে?" নিতু জিজ্ঞেস করল।
"হাজার সালের দিকে রোমান সম্রাট তৃতীয় অটো আর পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার।
ওনারা চাইছিলেন তাদের রাজত্বটা ঠিক হাজার সালে পড়ুক।
খ্রিস্টের জন্মের হাজার বছর পূর্তি।
একটা মহাকালের মুহূর্ত। তাই ক্যালেন্ডারে তিনশো বছর ঢুকাইয়া দিলেন।
তারপর সেই তিনশো বছর ভরানোর জন্য দলিল বানাইলেন, রাজা বানাইলেন, যুদ্ধ বানাইলেন। শার্লেমেন, ইউরোপের সবচেয়ে বড় সম্রাট, ইলিগের মতে উনি একটা গল্পের চরিত্র। রবিনহুডের মতো।"
"কিন্তু স্যার, ওইটা তো ইউরোপের ব্যাপার। আমাদের পাল রাজারা..."
স্যার আমাকে থামিয়ে দিলেন। "শুভ্র, আমরা আমাদের ইতিহাস লিখছি কার ক্যালেন্ডারে?"
আমি চুপ করে গেলাম।
"পাহাড়পুরের ডেট আমরা পাইছি একটা তাম্রলিপি থেকে। সেই তাম্রলিপির সাল মিলাইছে ব্রিটিশরা। ব্রিটিশরা মিলাইছে তিব্বতি নথির সাথে।
তিব্বতি নথি মিলাইছে চীনা নথির সাথে। আর পুরা দুনিয়ার সব নথি শেষ পর্যন্ত গিয়া মিলছে একটা জায়গায়। রোমের ক্যালেন্ডার।" স্যার একটু থামলেন। "একটা সুতা যদি ভুল জায়গায় বান্ধা থাকে, তাইলে পুরা জালটাই ভুল জায়গায় ঝুলে।"
তাঁবুর বাইরে সন্ধ্যা নামছে। দূরে কোথাও মাগরিবের আজান হচ্ছে।
নিতু খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে স্যার, আজকে আসলে কত সাল?"
স্যার হাসলেন। সেই হাসিটা।
"সেইটা যদি আমি জানতাম, মা, তাইলে আমারে কেউ এখানে কাম করতে দিত না।"
৫.
এর পরের তিন মাস আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর তিন মাস।
সুন্দর কারণ এক, আমি এমন একটা জিনিসের পেছনে দৌড়াচ্ছিলাম যেটা সত্যি হলে পৃথিবীর সব ইতিহাস বই আবার লিখতে হবে। আর দুই, যার সাথে দৌড়াচ্ছিলাম, তার হাত ধরতে আমার আর সংকোচ লাগত না।
আমরা তিনজন মিলে কাজ করছিলাম।
স্যার পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটতেন। নিতু স্যাম্পল চালাত।
আর আমি মাটি খুঁড়তাম। আক্ষরিক অর্থেই।
আর যত খুঁড়ছিলাম, তত অদ্ভুত জিনিস বের হচ্ছিল।
পাল আমলের স্তর আর তার পরের সেন আমলের স্তরের মাঝখানে যে মাটি থাকার কথা, যে মাটি জমতে তিনশো বছর লাগে, সেই মাটি নাই। মাত্র কয়েক ইঞ্চি।
এক প্রজন্মের ধুলা। যেন ধর্মপাল ঘুমিয়েছিলেন, আর ঘুম ভেঙে দেখেছেন সেন রাজারা দরজায় দাঁড়িয়ে।
এক রাতে বিহারের দক্ষিণ দেয়ালে বসে নিতু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "তুমি ভয় পাও না?"
"কিসের ভয়?"
"যদি সত্যি হয়?
যদি আমরা প্রমাণ কইরা ফেলি যে আজকে দুই হাজার তেইশ না, সতেরোশো কিছু? তখন কী হইবো? মানুষের জন্মদিন, বিয়ের তারিখ, স্বাধীনতা দিবস, সব কি মিথ্যা হইয়া যাইবো?"
আমি অনেকক্ষণ ভেবে বলেছিলাম, "না। দিনগুলো তো সত্যি। খালি সংখ্যাগুলো ভুল।"
ও আমার কাঁধে মাথা রেখেছিল। প্রথমবার।
"তাইলে আজকের দিনটাও সত্যি তো?"
"হ্যাঁ।"
"সংখ্যা যাই হোক?"
"সংখ্যা যাই হোক।"
সেই রাতে আকাশে প্রচুর তারা ছিল।
নিতু বলেছিল, তারার আলোও তো আসলে পুরোনো। আমরা যে তারাটা দেখি, হয়তো সেটা হাজার বছর আগে মরে গেছে। আমরা দেখি তার স্মৃতি।
"ইতিহাসও এমন," ও বলেছিল। "আমরা দেখি স্মৃতি।
কার স্মৃতি, সেইটা কেউ জিগায় না।"
৬.
তাঁবুর ভিতর। ঘুমের মধ্যে।
ডাক্তার বললেন হার্ট অ্যাটাক। তিয়াত্তর বছর বয়স, ডায়াবেটিস, প্রেশার। কেউ অবাক হলো না।
আমি অবাক হয়েছিলাম অন্য একটা কারণে।
স্যারের ট্রাংকটা খালি ছিল। ইলিগের বই নাই, স্যারের হাতে লেখা নোট নাই, তিন মাসের সব কাগজপত্র নাই। আর পরের দিন ঢাকা থেকে একটা চিঠি এলো। প্রজেক্ট বন্ধ। ফান্ডিং শেষ। সব স্যাম্পল সাভারে ফেরত পাঠাতে হবে।
আমি নিতুকে ফোন দিলাম। বন্ধ।
পরের দিনও বন্ধ।
তিন দিন পর আমি সাভারে গেলাম।
রিসেপশনে বসা ভদ্রলোক কম্পিউটারে কিছুক্ষণ খুঁজে বললেন, "নিতু নামে তো আমাদের কোনো সায়েন্টিস্ট নাই, ভাই।"
"আছে। ডক্টর নুসরাত জাহান নিতু। রেডিওকার্বন ল্যাব।"
উনি আবার খুঁজলেন। মাথা নাড়লেন। "ভাই, রেডিওকার্বন ল্যাব আমাদের এখানে উনিশশো আটানব্বই সাল থেকে বন্ধ।"
আমি বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। কতক্ষণ জানি না।
আমার পকেটে তখনও ওর দেয়া একটা কাচের শিশি। কাঠকয়লার টুকরো। লেবেলে ওর গোটা গোটা হাতের লেখা: “PHP-07। ভিত্তি স্তর। সংগ্রহকারী: শুভ্র।”
ও মজা করে লেবেলে আমার নাম লিখেছিল। বলেছিল, "এইটা তোমার প্রথম আবিষ্কার। বাঁধাই কইরা রাখবা।"
একটা মানুষ যদি কোথাও না থাকে, তাহলে তার হাতের লেখা আমার পকেটে আসে কী করে?
সেইদিন আমি প্রথমবার বুঝলাম, ইতিহাস থেকে তিনশো বছর মুছে ফেলা যদি সম্ভব হয়, তাহলে একটা মানুষকে মুছে ফেলা কোনো ব্যাপারই না।
৭.
তিন বছর কেটে গেল।
আমি এখন একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস পড়াই।
ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েদের। প্রাচীন বাংলা। পাল রাজবংশ। ধর্মপাল, দেবপাল, সোমপুর মহাবিহার। সাতশো আশি খ্রিস্টাব্দ।
প্রতিবার বোর্ডে সালটা লেখার সময় আমার হাত একটু থামে। ছাত্ররা টের পায় না।
নিতুকে আর খুঁজি নাই। প্রথম বছর খুঁজেছিলাম। ফেসবুক, লিংকডইন, ওর ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ার সেই সুপারভাইজার।
সুপারভাইজার ইমেইলের উত্তরে লিখেছিলেন, উনার কোনো বাংলাদেশি পিএইচডি স্টুডেন্ট কোনোদিন ছিল না।
তারপর একদিন খোঁজা বন্ধ করে দিলাম। মানুষ সব জিনিস খুঁজতে খুঁজতে একসময় ক্লান্ত হয়, শুধু একটা জিনিস ছাড়া। আমি সেই একটা জিনিস হতে চাই নাই।
সেই বছর ডিসেম্বরে একটা পোস্টকার্ড এলো।
কোনো ফেরত ঠিকানা নাই। ডাকঘরের সিল অস্পষ্ট। সামনে পাহাড়পুরের ছবি। পেছনে একটা লাইন, সেই গোটা গোটা হাতের লেখায়:
"দিনগুলো সত্যি ছিল। খালি সংখ্যাগুলো ভুল।"
নিচে কোনো নাম নাই। শুধু একটা তারিখ।
আমি তারিখটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
২৯ ডিসেম্বর, ১৭২৬।
৮.
এই গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। হলো না।
গত মাসে পাহাড়পুরে গিয়েছিলাম। ছাত্রদের নিয়ে ট্যুর। ওরা যখন মন্দিরের সামনে সেলফি তুলছিল, আমি একা একা দক্ষিণ দেয়ালের দিকে হাঁটলাম। যেখানে এক রাতে একজন আমার কাঁধে মাথা রেখেছিল।
দেয়ালের ইটে কেউ একটা জিনিস খোদাই করে রেখেছে। খুব ছোট। খুব পুরোনো। বৃষ্টি আর রোদে প্রায় মুছে গেছে। কেউ খেয়াল করবে না, যদি না সে জানে কোথায় তাকাতে হবে।
দুইটা অক্ষর। একটা প্লাস চিহ্ন।
শু + নি।
আমি আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম। খোদাইয়ের খাঁজে শ্যাওলা জমেছে। লাইকেন। আমি প্রত্নতত্ত্ব পড়েছি। আমি জানি এই লাইকেন জমতে কত সময় লাগে।
অন্তত দুইশো বছর।
সেই রাতে আমরা কিছুই খোদাই করি নাই। আমার স্পষ্ট মনে আছে।
অথবা হয়তো করেছিলাম। কোনো একটা রাতে। কোনো একটা সালে। যে সালটা কোনো ক্যালেন্ডারে নাই।
আমি দেয়ালে হেলান দিয়ে বসলাম। ছাত্ররা দূরে হাসাহাসি করছে। সূর্য ডুবছে বিহারের পেছনে। লাল ইটের জাহাজটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
একটা ছেলে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করল, "স্যার, বাস ছাড়বে কয়টায়? আর একটা প্রশ্ন ছিল। পাহাড়পুর কত সালে বানানো হইছে, এক্সামে কী লিখব?"
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
তারপর বললাম, "সাতশো আশি লিখো।"
ছেলেটা চলে গেল। আমি বসে রইলাম।
সাতশো আশি লিখো। কারণ বইয়ে তাই লেখা। কারণ দুনিয়ার সবাই তাই বিশ্বাস করে। কারণ কেউ একজন, কোনো একদিন, ঠিক করে দিয়েছিল কোন সংখ্যাটা সত্যি হবে।
আর কিছু কিছু সত্যি সংখ্যার মধ্যে থাকে না।
থাকে একটা দেয়ালে। দুইটা অক্ষরে। একটা প্লাস চিহ্নে।
আর দুইশো বছরের শ্যাওলায়।
"সময়"
আবির
২৭/১০/২৬

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন