বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

কোথাও মানুষ ভালো রয়ে গেছে ~ সুব্রত ঘোষ

১৯৯১ সাল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ল। তীব্র সংকটে পড়ে গেল কিউবা। পেট্রোল নেই, রাসায়নিক সার নেই, ট্রাক চলে না। ৮০% খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল যে দেশ নতুন পরিস্থিতিতে সেই দেশে খাবারের জন্য হাহাকার শুরু হল শহরে শহরে।

তখনই কিউবার মানুষ বেছে নিল এক অভিনব পথ: “Organopónicos”। গ্রীনহাউস স্টাইলে চাষ পদ্ধতির সূচনা হল দেশে। কৃষিমন্ত্রক অনুমোদন দিতেই তারা শহরের পরিত্যক্ত জায়গা, রাস্তার পাশে, পার্কে , ছাদে, ব্যালকনিতে শুরু করল জৈব চাষ। নাম দিল “Organopónicos.”

Uploaded Image পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ শহরভিত্তিক জৈব কৃষি আন্দোলন এভাবেই শুরু হয় হাভানার বুকে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই উৎপন্ন হচ্ছিল শাকসবজি। স্থানীয় সম্প্রদায় নিজেরাই শ্রম দিচ্ছিল, নিজেরাই খাচ্ছিল।পরিবেশ বান্ধব চাষবাসই হয়ে ওঠে শহরের খাদ্যনির্ভরতার ভরসা। সমাজতান্ত্রিক মডেলে উৎপাদিত খাবার সমানভাবে ভাগ হয়ে পৌঁছাত সাধারণ মানুষের ঘরে। 



ডন আলফ্রেডো, হাভানার এক শহরতলিতে নিজের বাড়ির পাশে ফাঁকা জায়গায় উদ্যোগ নিয়ে একখণ্ড জমি তৈরি করেন। এখন এই ২০২৫তে তার চাষ করা পালংশাক পৌঁছে যায় ৬০টি পরিবারের প্লেটে।

 কিউবার এই urban organic farming revolution—এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র, বিজ্ঞানী, এবং সাধারণ জনগণের একত্রে গড়ে তোলা এক বিকল্প পথের ইতিহাস। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিউবায় শুরু হয় "Special Period in Time of Peace" —এই সময়েই কিউবার রাষ্ট্র নেতৃত্ব ঘোষণা করে “আমরা স্থানীয় উৎপাদনেই খাদ্যনির্ভরতা গড়ব”। কিউবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান INIFAT (Instituto de Investigaciones Fundamentales en Agricultura Tropical) জৈব সার, কম্পোস্টিং, প্রাকৃতিক কীটনাশক ইত্যাদির ব্যবহার করে কেমন করে শহরে চাষ করা যায়— সে বিষয়ে সরকারকে নীতিগত পরামর্শ দেয়।

পাড়াভিত্তিক সংগঠনগুলো খাদ্য উৎপাদনে স্থানীয় মানুষদের একত্র করে, স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাগান তৈরি করে, এবং খাদ্য বণ্টনের দায়িত্বও নেয়। হাভানার বাসিন্দা মারিয়া গঞ্জালেজ, যিনি সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে ছাদে বাগান তৈরি শুরু করেন, তিনি এক পাড়া ক্লাব গড়ে তোলেন— যেখানে শিশুদের নিয়ে কৃষিকাজ শেখানো হতো। হাভানার প্রতিটি পৌর এলাকায় অন্তত একটি করে urban farm থাকতেই হবে— এ ছিল সরকারি নিয়ম। "Local food, zero transport, no chemicals" ছিল মূল শ্লোগান।

২০০৩ সালের মধ্যেই কিউবার শহরগুলোতে প্রায় ৩৫,০০০ হেক্টর জমি শহুরে জৈব চাষে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ঐ বছর দেশের কৃষি উন্নয়ন সম্মেলনে ফিদেল কাস্ত্রো বলেন "জৈব চাষ করছেন মানে আপনি পিছিয়ে পড়ছেন না। এই পদ্ধতি আমাদের বাস্তবকে স্বীকার করে নিতে শেখায়। এই নতুন পরিস্থিতিতে আমরা শিখেছি যে অসাধারণ কিছু করা যায় বিষ বা পেট্রোলিয়াম ছাড়াই।" যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এই স্বনির্ভর কৃষি আন্দোলনকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শহরের মানুষ যদি নিজের খাদ্য নিজে উৎপাদন করে, তাহলে সাম্য, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সচেতনতা — সব একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। তিনি বললেন "Con la tierra y el sudor, no hay dictadura que gane.” মাটি আর ঘামের সঙ্গে থাকলে কোনো একনায়কতন্ত্রই জিততে পারে না।

২০০৬ সালে জাতিসংঘের FAO (Food and Agriculture Organization) কিউবার শহরভিত্তিক কৃষিকে “একটি বৈশ্বিক মডেল” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। হাভানায় Urban Agriculture International Congress এ ২০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি কিউবার অভিজ্ঞতা শোনেন। নেপালে ২০১৫-র ভূমিকম্পের পরে, কিছু NGO কিউবার মডেল অনুসরণ করে শহরে চট, বাঁশ ও প্লাস্টিক ব্যাগে অর্গানিক খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ শুরু করে। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন