বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এ আই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয় কি অমূলক ? ~ অরিজিত মুখার্জী

খবরের কাগজে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছেন হয়তো — ওপেনএআই আজ অবধি সলভ না হওয়া অঙ্কের প্রব্লেম সলভ করে দিয়েছে; বা অ্যান্থ্রোপিকের এআই গিটহাবের সিকিউরিটি বাইপাস করে কোথায় কী সব ফোরামের সব ডেটা মুছে দিয়েছে...ইত্যাদি প্রভৃতি।

ক্রমশ: একটা ধারণা তৈরী হচ্ছে সুপারহিউম্যান ইন্টেলিজেন্স — সিনেমার ভাষায় বললে টার্মিনেটর বা স্কাইনেট — আগতপ্রায়।  মানুষ নামের প্রজাতিটা খুব শিগগিরিই মুছে যাবে। তাই, দয়াপরবশ হয়ে টেকব্রো-রা তাঁদের নিজেদেরই শুরু করা এআই রেসের উন্মত্ত দৌড়ের গতি কমাতে চাইছেন।

Uploaded Image
সমস্যা হল, এই সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবীদাওয়াগুলো সবই সেই ওপেনএআই বা অ্যান্থ্রোপিকের মত এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে থেকেই আসছে, এবং সেখান থেকে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায় হাইলাইট করা হচ্ছে। আমরা ভাবছি যে এরা তো এইসব নিয়েই কাজ করছে, কাজেই যা বলছে সেগুলো সবই ঘোর বাস্তব, স্কাইনেট এলো বলে। অথচ, এই দাবীগুলোর পিছনে এখনও সেরকম সায়েন্টিফিক ব্যাকিং নেই, কোনো বেঞ্চমার্কিং বা কোনো প্রপার স্টাডি নেই, শুধুমাত্র কিছু ছুঁড়ে দেওয়া তথ্য ছাড়া।

উল্টোদিকে, এমআইটির গবেষকরা রিসেন্টলি একটা পেপার পাব্লিশ করেছেন, যার নাম "পোটেমকিন আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইন লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলস" — লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল মানে চ্যাটজিপিটি, ক্লড ইত্যাদি। এই গবেষকদের বক্তব্য হল সুপার ইন্টেলিজেন্সের দাবীদাওয়াগুলো সম্পর্কে সাবধান হওয়া দরকার। পোটেমকিন আন্ডারস্ট্যান্ডিং শব্দবন্ধটা এঁরা ধার করেছেন ঐতিহাসিক "পোটেমকিন ভিলেজ"-এর কনসেপ্ট থেকে, যেখানে ফাঁকা জমির চারপাশে সুন্দর বাঁশের বেড়া আর চালা বা কার্ডবোর্ডের তৈরী বাড়ির দেওয়াল বসিয়ে গ্রাম বা লোকালয়ের চেহারা দেওয়া হয় শত্রুপক্ষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্যে। এঁদের বক্তব্য হল, আধুনিক এআই ঠিক একইভাবে বুদ্ধিমত্তার ফাসাড (মুখোশ) তৈরী করতে সক্ষম। বলা ভালো পারদর্শী, কারণ সেইভাবেই এগুলো তৈরী। আধুনিক এআই যে কোনো প্রফেশনাল পরীক্ষায় ৯০% স্কোর করে দেবে; বা কমপ্লেক্স থিওরি বা ডেফিনেশন লিখে দেবে নিখুঁতভাবে৷  কিন্তু সেই বাস্তব জীবনের কোনো কাজে সেই থিওরি প্রয়োগ করতে বলুন, বা তার নিজের লেখার মধ্যে কনট্রাডিকশন খুঁজে বের করতে বলুন — পারবে না, বা ছড়িয়ে ফেলবে। কারণ মানুষ যেভাবে ধারণা তৈরী করে, বা বুঝতে শেখে, এআই সেভাবে চলে না। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া বা অ্যান্থ্রোপিকের মত হাজার হাজার বইয়ের পাতা ছিঁড়ে স্ক্যান করে সেই সমস্ত বই ধ্বংস করে পাওয়া বিপুল পরিমাণ তথ্য থেকে আয়ত্ত করা প্যাটার্ন ম্যাচিং-ই এআইয়ের শেখার আর উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি।

এখনো অবধি আনসলভড ম্যাথস প্রব্লেমও যখন এআই সলভ করে, বা গিটহাবের সিকিউরিটি বাইপাস করে ফোরামের তথ্য মুছে দেয় — যা দেখিয়ে সুপার ইন্টেলিজেন্সের তত্ত্ব আমদানি করা হয় — সেক্ষত্রেও এআই তার আগে দেখা/চেনা প্যাটার্নের ওপর ভিত্তি করে খুব সফিসটিকেটেড অনুমান বা গেসওয়ার্ক চালায়। যেহেতু কম্পিউটিং ক্ষমতা বেশি, তাই ট্রায়াল অ্যান্ড এরর ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি করতে পারে। তবুও দিনের শেষে সেটা সেই প্যাটার্ন নির্ভর গেসওয়ার্ক। আপনি সেই ম্যাথস প্রব্লেমের নিয়ম বদলে দিন, বা গিটহাবের সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্কের নিয়ম বদলে দিন — যা আগে দেখা নয় — দেখবেন এই সুপার ইন্টেলিজেন্স সম্পন্ন এআই বাজেভাবে ছড়াচ্ছে, যেখানে একটা মানুষ অল্প চেষ্টায় অ্যাডাপ্ট করতে পারত।

যে কথাটা আমরা প্রায় রোজই বলি — এই হাইপ তৈরীর পিছনে আদতে রয়েছে একটা কম্পিটিশন — প্রযুক্তির পাবলিক লীডারবোর্ডে কে ওপরে থাকবে, আর তার ভিত্তিতে কে কত ফান্ডিং টানতে পারবে। কারণ সুপার ইন্টেলিজেন্সের গল্প বিকোয় ভালো। স্কাইনেট বা মেট্রিক্স টাইপের সেন্টিয়েন্ট এআই দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয় দেখানো যায়। ভয়ও বিকোয় ভালো।

আসল বিপদটা এআই মানুষের মত বুদ্ধিমান হয়ে গিয়ে মানুষকে মেরে ফেলবে সেটা নয়। বরং আসল বিপদ হল আমরা বাইরের সাফল্যে বেশি মুগ্ধ হয়ে গিয়ে, বাস্তব জগতের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এমন যন্ত্রের হাতে তুলে দেব যার মধ্যে নমনীয় বোধশক্তির অভাব রয়েছে। এআই নিজে থেকে ভেবেচিন্তে আপনাকে মারবে না, মারবে কোনো ক্রিটিকাল সিচুয়েশনে (ধরুন অটোনোমাস গাড়ি) এআইয়ের করা একটা মাত্র ভুল...

আরো একটা বাস্তব সমস্যা রয়েছে। আমরা যা কাজ করি — অফিসে, স্কুলে, কলেজে, কোর্টকাছারিতে — তার মধ্যে একটা বড় অংশই প্যাটার্ন নির্ভর। একই প্যাটার্নে হয়ে চলে। গল্প, কবিতা, সিনেমা, নাটক — সবই বলতে পারেন নানান আগে দেখা প্যাটার্নের রিমিক্স। এই সমস্ত কাজই হয়তো এআই করে দেবে একসময়, আর কর্পোরেট বা অন্য সংস্থাগুলো সেটা মেনে নেবে, রাদার এনকারেজ করবে। কারণ এআই ছুটি চায় না, মাইনে বাড়াতে বলে না, তার অসুখ করে না, সে ইউনিয়ন বানায় না...

এমআইটির আরো একদল গবেষক আরো কিছু ভয়ানক তথ্য সামনে এনেছেন নিজেদের ইনস্টিট্যুটের ভিতর থেকে। জানা যাচ্ছে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে এআইয়ের সাহায্য নিচ্ছে, এবং তাদের মধ্যেই মেজরিটি এও মনে করছে যে এর ফলে তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে...তারা ক্রমশ: এআই নির্ভর হয়ে পড়ছে। এমআইটি তাই তাদের শিক্ষণপদ্ধতির বদল করার কথাও ভাবছে...

পোটেমকিন পেপারটার লিঙ্ক নিচে দেওয়া রইল। চাইলে পড়তে পারেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন