রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

দিল্লি ডাইরি: যন্তর মন্তরের ইন্ডিয়া ~শময়িতা চক্রবর্তী

দিল্লি ডাইরি: যন্তর মন্তরের ইন্ডিয়া

না লিখে রাখলে ভুলে যাব, তাই...

সোমবার, ২০ জুলাই: প্রথম টিয়ার গ্যাস জনপথে। প্রেস কার্ড সঙ্গে থাকলে পুলিশের লাঠি থেকে বাঁচা যায়। টিয়ার গ্যাস আবার প্রেস কার্ড বোঝে না। দম যখন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছে, একটা বাচ্চা মেয়ে (২২-২৪ বছর হবে) তার ওড়না খুলে অর্দ্ধেকটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, নাক মুখ চেপে রাখো। চোখ খুলো না। বাকি হাফ দিয়ে নিজের নাকে জড়িয়ে রাখল। ব্যাগ থেকে ছোট জলের বোতল বের করে খানিকটা নিজের চোখে দিল। বাকিটা আমার মুখে ছেটাল। ধোঁয়া কমলো, মিষ্টি হেসে ভিজে ওড়না উড়িয়ে চলে গেল।

পরের টিয়ার গ্যাস। আরেকজন বাচ্চা ছেলে হাত ধরে দৌড়ে নিয়ে গেল রাস্তার পাশে রাখা জলের ট্যাঙ্কে। বলল, 'জিতনা হোসাকে পানি দিজিয়ে।' চোখ খুলে দেখলাম, সে হাওয়া।

জনপথে যখন অটো চলতে শুরু করলো, তখন অফিস যাওয়ার তাগিদ হল। পাঁচজন অটোওয়ালা রিফিউজ করার পরে একজন রাজি হলেন। বললেন, 'যারা আজ মিছিলে এসেছে তাদের জন্যই আজ অটো বের করেছি। নাহলে বাড়ি থাকতাম।"

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই: কেরালা হাউসের সামনে থেকে আমি আর ক্যামেরাপারসন অভিরাজ (সবাই পার্থ হয়না, কেউ কেউ অভিরাজ হয়। একই রকম হার না মানা, অভিরাজ) যন্তর মন্তরের মঞ্চের দিকে এগোচ্ছি। ব্যারিকেডে ব্যারিকেডে ছয়লাপ। আগের দিন পুলিশের সঙ্গে ওই সাংঘাতিক যুদ্ধ যেন আগুনে ঘি দিয়েছে। ভিড় বেড়েছে বহুগুণ। মঞ্চের দিক থেকে স্লোগান জোরদার হচ্ছে। একটু কাছে গিয়ে শুনলাম, 'গোদি মিডিয়া হায় হায়।' চোখের সামনে দেখলাম, এক হিন্দি ন্যাশানাল চ্যানেলের সংবাদ প্রতিনিধি এবং তার সহকর্মী ক্যামেরাপারসেনকে ব্যারিকেডের বাইরে বের করে দেওয়া হল। বলা হল, বাইরে থেকে রিপোর্টিং করতে। অভিরাজের ক্যামেরা সাক্ষী। একই সঙ্গে আমাদের ঢুকিয়ে নেওয়া হল। স্বাভাবিক ভাবেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী হল? কেন এটা করলে? রিপোর্টার তার চাকরি করতে এসেছে। এই বৈষম্য ভাল না, ইত্যাদি। হাঁটুর বয়সী ভলান্টিয়ার বলল, 'এদের গত ৩০ দিনের প্রতিবেদন দেখে এসো। তার পর তোমার কথা শুনব।' এর পরেও এই নিয়ে অনেকের সঙ্গে কথা বললাম। বুঝলাম, মূলধারার মিডিয়ার উপর এদের যতটা রাগ, তা সরকার বিরোধী ক্ষোভের থেকে কোনো অংশে কম না। এদের বক্তব্য, যে মিডিয়া ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেই মিডিয়া অপ্রাসঙ্গিক।  

এদিন সন্ধেয় যখন বেরলাম তখন আরেক কাণ্ড। কনট প্লেসের দিকের রাস্তায় পিটিসি দিচ্ছি। ভুল হচ্ছে যেমন হয়। আবার দিচ্ছি। এমন সময় হা রে রে রে রে রে... আবার পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে দৌড়চ্ছে। আবার জনতা ছুটছে। আবার টিয়ার গ্যাসের ওয়াগন ধেয়ে আসছে। আবার ক্যামেরাপারসন অভিরাজ ক্যামেরা নিয়ে ছুটছে। সঙ্গে ছুটছি আমিও। এমন সময় ইট বৃষ্টি। কনট প্লেসের দোকান বন্ধ হয়ে গেল ঝপাঝপ। আমি, অভিরাজ অন্যদের সঙ্গে মাথা বাঁচিয়ে সেই খণ্ডযুদ্ধ দেখে গেলাম। পরে শুনলাম, বাইরের লোক ইট পাথর মারছে। এদিন যে অঘটন ঘটেনি সেটাই আশ্চর্যের। 

বুধবার, ২২ জুলাই: সকাল থেকে ছাত্র নেতাদের ইন্টারভিউ করছি। এদিন একা। সব শেষে আবার যন্তর মন্তর যাব। সঙ্গী হলেন এক ছোট আইসা কর্মী। তার আবার দুই পায়ে দুই রকম চটি। আগের দিন পুলিশের সঙ্গে ঝামেলায় এক পাটি হারিয়েছিল। তার পর যা পেয়েছে তাই পরে কাজ চালাচ্ছে। আজ টলস্টয় মার্গ দিয়ে ঢোকা। সেই কর্মী আমাকে তার চেনা রাস্তা চেনাচ্ছে। দেখলাম, ভিড় এড়াতে প্রতিদিনের কর্মীরা কত রাস্তা চেনেন। কীভাবে যেন সব ভিড় এড়িয়ে সরু গলি পেড়িয়ে চারটে গেট টোপকে মঞ্চের সামনে পৌঁছে গেলাম। একদম হ্যারি পটারের ম্যাজিক। এর পর আর কোনোদিন ওই রাস্তা চিনতে পারব কিনা জানি না।

আরো মজা হলো বেরোনোর সময়। এক অল্পবয়সী উকিলের সঙ্গে দেখা। একটা বাইট নেব। তার চোখ আমার জুতোয়। বলে, এটা তো থিয়েটারের জুতো। ওরা ফালতু দাম নেয়। তুমি বরং অমুক অমুক জায়গায় জুতো দেখো। স্টাইলের জুতো। কম দাম। বাইট এবং জুতোর দোকানের সন্ধান, এক ঢিলে দুই পাখি মারা হল আমার। 

প্রসঙ্গত, এদিন রাতেও খণ্ডযুদ্ধ আটকানো যায়নি।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই: আমার ফেরার কথা। হয়নি। টিকিট ক্যানসেল করতে হয়েছে। এদিন উত্তেজনা শুরু দুপুর থেকে। দুপুরে কনট প্লেস চত্বরে সমস্ত দোকান বন্ধের নির্দেশ আসে। আমরা চত্বরে পৌঁছতেই দেখই পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। অন্যান্য দিনের তুলনায় ২০ গুন বেশি পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী। সকলেই যুদ্ধসাজে রেডি। মাথায় হেলমেট, গায়ে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, হাতে শিল্ড। সাংবাদিকদের আলোচনায় তখন অফিস থেকে হেলমেট আর জ্যাকেট আনার পরিকল্পনা। সহকর্মী অন্য শহর থেকে ফোনে বলছেন ব্যাগে তোয়ালে আর জলের বোতল রাখতে। ছাত্রনেতারা মোটামুটি রেডি। সারা রাত যন্তর মন্তর পাহারা দিতে। বন্ধুবান্ধবদের থেকে ক্রিকেটের হেলমেট জোগাড় করে রাখছে। একজন বলল, শুধু মাথাটাই বাঁচাতে চেষ্টা করব। রাবার বুলেট বাঁচাতে পিঠে ব্যাগ থাকবে। জল, তোয়ালে, এই সব তো আছেই।

প্রথম অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স, দিল্লি পুলিশ পরিষ্কার জানালো, আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর অন্তত এদিন রাতে কোনো 'ক্র্যাকডাউন' হবে না। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই অনশন ভাঙলেন ওয়াংচুক। একেবারে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে জল।

শুক্রবার, ২৪ জুলাই: ফেরার দিন। তার আগে পর্যন্ত যন্তরেই। আজও ভিড়। একই রকম। বরং বেশি। অভিজিত দিপকের জ্বর। তখনও টাইফয়েডের রিপোর্ট আসেনি। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন। ভিড় ঠেকে ঢুকতে গিয়ে আমি অল্পের জন্য মিস করেছি। ব্যাস। সে মঞ্চের মাঝে চলে গেছে। তখন জেদ, একটা বাইট পেতেই হবে। ফাইনালি বলল, 'সোনামজি অনশন ভেঙেছেন। ভালো হয়েছে। ওনার প্রাণের দাম অনেক বেশি। তবে আমরা আন্দোলন চালাব যতদিন না ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন।' জেদ জিতেছে, এই টুকুই। 

এর পরেও যা যা মনে রাখার, তা হল, যন্তর মন্তরের অনেকখানি জুড়ে জ্যামার লাগানো থাকায়, এবং আমার ভি-এর এর নেটওয়র্ক থাকায় খুব ঝামেলা হয়েছে। অনেক দূর গিয়ে স্টোরি, বাইট, পিটুসি পাঠিয়ে আবার ফিরতে হয়েছে।

এসব কিছুর পরেও যা থেকে গেল: যন্তর মন্তর জুড়ে এই পাঁচদিনে যা দেখেছি তা আমার বেড়ে ওঠার ভারতের সঙ্গে মিলে যায়। গুরুদ্বোয়ারা থেকে খাবার, মসজিদের থেকে জল, এনআরআইদের ফুড ডেলিভারি, বৃষ্টি পড়লে প্লাস্টিকের রেনকোট, না পড়লে অচেনাদের হাতপাখার হাওয়া, জলের বোতল, স্যানিটারি প্যাড, হিন্দু, মুসলিম, শিখ, বিদেশি, দেশি স্বেচ্ছাসেবক, গান, ডাফলি, নাচ, স্লোগান, ডাক্তারদের ক্যাম্প, ক্যালপল, ওআরএস, স্ট্রিট প্লে , কস প্লে, কস্টিউম স্পাইডারম্যান, এভেরিথিং এভরিহোয়ার অল অ্যাট ওয়ান্স -- আমার স্বপ্নের দেশ।

যন্তর মন্তর যেন একটা ছোট ভারতবর্ষ হয়ে গেল এই কয়েকদিনে।


Uploaded Image

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন