গতকাল ১৬ই ফেব্রুয়ারি বেশ একটা ঝড় বয়ে গেল। সকালে যা ছিল একটা চাপা ফিসফাস বিকেলে তা হয়ে দাঁড়ালো 'পাক্কা খবর' । অনেক চ্যানেল দীর্ঘ বিশ্লেষণ দিল যেখানে বলা হল 'মহম্মদ সেলিম এবং তাঁকে ঘিরে এক দুষ্টচক্র সি পি এম চালাচ্ছে' এবং প্রতীক উর তৃণমূলে এসে গেছেন -- শুধু ঘোষণার অপেক্ষা।
আজ প্রতীকের একটি সাক্ষাতকার শুনলাম। সেখানে উনি পরিষ্কার বললেন, যে চিঠিটা বাজারে ঘুরছে, সেটি উনি লেখেনইনি। উনি একটি দলীয় ফর্ম পূরণ করে ওনার মতামত যথার্থ জায়গায় জানিয়েছেন, এবং অপেক্ষা করছেন দল কী উত্তর দেয়।
এসব শুনে কয়েকটি জিনিস মাথায় এল, তাই এই লেখা।
প্রথমত, প্রতীক অত্যন্ত জনপ্রিয়, লড়াকু, এবং সৎ নেতা হিসেবে জনমানসে একটি ভাবমূর্তি রাখতে পেরেছেন। তাঁকে টিভির পরদায় দেখা যায় না। তিনি যে অঞ্চলে রাজনীতি করেন সেখানে চোখে পড়ার মত দলীয় শক্তি নেই। সর্বোপরি ওই অঞ্চলে ভাইপো ব্যানার্জীর পোষা বাহুবলীরা সর্বক্ষণ দাপাদাপি করে।
এসব সত্ত্বেও তিনি রাজ্যস্তরে একটি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তার মানে রাজনীতিতে এখনও সততা এবং নীতির একটা জায়গা আছে। এটা খুবই আশার জায়গা। প্রতীক উরের মত নেতা আরও চাই এবং বাজারের খবর যাইই হোক না কেন, এইরকম নেতাদের জন্য বামদলই যথার্থ জায়গা।
দ্বিতীয়ত, প্রতীক উর যে রাজ্য নেতাদের কাছে তাঁর সদস্যপদ ছাড়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন, এই খবর উপরের স্তরের কোন নেতাই মিডিয়াকে জানিয়েছেন এবং ঠিক হিসাব করে তা কূণাল ঘোষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ব্যাপার। প্রতীক উরকে যাতে দল বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়, এবং তারপর তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীল, চটিচাটা ইত্যাদি বলে আক্রমণ করা যায় -- এই কুমতলব তাঁদের আছে। এটা পরিষ্কার। এরা যদি সি পি এমের শীর্ষস্তরে থাকেন, তাহলে ভোটে যে দল খারাপ ফল করবে তার সম্ভাবনা বেড়ে গেল।
তৃতীয়ত, সি পি এম দলটির কিছু সাংগঠনিক সংস্কার দরকার। দলের মধ্যে সদস্যদের ভিন্ন মত প্রকাশের একটা জায়গা দেওয়া উচিত। এই ভিন্নমতের প্রশ্ন এলেই সঙ্গে সঙ্গে পার্টির গঠনতন্ত্র, সংবিধান, শৃঙ্খলা ইত্যাদি তুলে চুপ করিয়ে রাখা হয়। এটি আধুনিক যুগে একেবারেই বেমানান। তার উপর বিধানসভায় শূন্য হয়ে গেলে আরও বেমানান।
চতুর্থত, দলের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম একটা মহাজোট করার চেষ্টা করছেন, সেটা বোঝা যায়। শুধু ভোটের জন্য হুমায়ন কবীর ও নওশাদ সিদ্দিকি নয়, বৃহত্তর বাম ঐক্যের কথা মাথায় রেখে উনি অনেক অতি বাম, বা বিশিষ্ট নিরপেক্ষ বাম বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে সাক্ষাত বা যোগাযোগ করে তাঁদের মতামত নিয়েছেন (এ খবর আমি জানি)। এর মধ্যে অনেক উদারতা এবং বাস্তববুদ্ধির একটা প্রকাশ রয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে দলের কর্মীদের কাছে এবং জনমানসে কী বার্তা দিতে হবে সে বিষয়ে কোন পরিষ্কার হিসাব দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ নিজস্ব দলীয় নীতি এবং ভোটের রণনীতি ও কৌশল এই দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হবে, এবং সেটা মানুষকে এবং দলের দ্বিতীয় স্তরের নেতাদেরকে বুঝিয়ে তাঁদের সঙ্গে নিয়েই করতে হবে।
এই কাজটা যে হয়নি, তা এই প্রতীক উর কাণ্ড থেকে বোঝা গেল। এর পাশাপাশি বিরুদ্ধ দলগুলি ও তাদের মিডিয়া থেকে যে 'সেলিম ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরছেন' এই ন্যারেটিভ ছড়ানো হয়েছে, তার কোন পাল্টা ন্যারেটিভ সি পি এম দিতে পারেনি। বরং ব্যাকফুটে খেলে চলেছে।
আমার নিজের মূল্যায়ন, ভোট বাড়াতে গেলে এই ২০২৬-এ সি পি এমকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে তাকাতেই হবে। সেখানে হুমায়ুন কবীর যে হই চই ফেলেছেন তাতে তার সঙ্গে কথা বলার অবশ্যই একটা বড়ো যুক্তি আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মুর্শিদাবাদের বাইরে হুমায়ুনের প্রভাব অন্যান্য জেলায় কতদূর এবং তার সূত্রে ভোট সি পি এমে আসতে পারে কিনা, এর কোন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানি না। অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের বাইরে কোন লাভ যদি না থাকে তাহলে হুমায়ুনের সঙ্গে কথা বলায় বিশেষ কোন লাভ নেই।
হুমায়ুন-নওশাদ বিষয়টি রণকৌশলের ব্যাপার, নীতির নয়। কিন্তু বিষয়টি সি পি এম নেতৃত্ব সেভাবে প্রজেক্ট করছেন না। ফলে দলের ভিতর অনেক বিভ্রান্তি হচ্ছে।
পঞ্চমত, বিভ্রান্তি ছাড়াও সি পি এম দলের মাঝারি স্তরে (যাকে চর্বিযুক্ত মধ্যপ্রদেশ বলা যেতে পারে) একটা উদ্ধত/অশিক্ষিত কালচার আছে। (এই রোগ অন্যান্য বাম দলেও আছে।) সেখানে সুযোগ পেলেই মার্ক্সবাদ, বিপ্লব, পুঁজিবাদ ইত্যাদি নিয়ে লেকচার দেওয়ার প্রবণতা আছে, এবং নিজের দলের সমর্থক না হলে তাকে নানা বিশেষণে গালিগালাজ করা হয়। এদের নতুন কিছু শেখার বা নতুন ভাবে ভাবার কোন আগ্রহ নেই।
এই কালচারটি বৃহত্তর বাম ঐক্যের পরিপন্থী। অতি সম্প্রতি 'মার্ক্সবাদী পথ' গোষ্ঠীর উদ্যোগে মৈত্রীশ ঘটকের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালের মধ্যে একটি অসাধারণ অনুষ্ঠান। মৈত্রীশ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অত্যন্ত সহজ ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির আপেক্ষিক অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেছেন, এবং শেষ দিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ নানা সরকারি অনুদানের বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর মতামত দিয়েছেন এবং যথার্থ সমালোচনা করেছেন ।
কিন্তু তাঁর সমালোচনা তীব্র নয় বলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে চটিচাটা বলে আক্রমণ করছেন (মৈত্রীশের ফেসবুক পেজে দেখলাম)। এগুলি অত্যন্ত রুচিহীন ব্যাপার। এই নিন্দা যদি কোন সি পি এম সমর্থক করে থাকেন, তা আরও গর্হিত।
পরিশেষে, প্রতীক উর রহমানের কথা ফিরে আসি। প্রতীক উর দলে থাকছেন কি যাচ্ছেন, বা গেলে কোন্ দলে যাবেন, সেটা তাঁর ব্যাপার। কিন্তু তাঁকে বৃহত্তর বাম আন্দোলনে দরকার। যদি তিনি এই বাম আন্দোলন ছেড়ে তৃণমূলে যান তাহলে তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক হবে।
বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেশ কঠিন ব্যাপার।
বিভাস সাহা
(অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন