শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২০

কোরোনা ও সরকার ~ ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী

কত্তা, একটু রোসেন। কিছুতেই যে কথাটা ফাইজলামি করে বোঝানো যাচ্ছে না সেটা একটু ঘুরিয়ে কই। ঠাকুর বলেছিলেন পথ দুটো ।একটা ভক্তির আর একটা তর্কের। আমার মতো অনেকেরই পথটা তর্কের। কিন্তু তাতে করে আপনার ভক্তির পথ নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। কাজেই আমার প্রশ্ন করার অভ্যাস নিয়ে আপনার রেগে যাওয়ার কিছু হয়নি। আমি ওভাবেই বুঝি। যেমন আপনি বোঝেন , মোদিজী যখন বলেছেন তখন নিশ্চই কিছু একটা ভেবেই বলেছেন। নিশ্চই মঙ্গলের দ, চাঁদের প, আর ৯এর ছ মিশিয়ে কিছু একটা দারুন হবে। ছোটবেলা ক্লাসে মনে নেই? কয়েকজন প্রশ্ন করতো আর বাকিরা মুখস্ত করতো এই ভেবে যে বইতে যখন লেখা আছে নিশ্চই ঠিকই হবে। এখন তারা ঠিক সেই অভ্যেসটা whatsapp এও চালু রেখেছেন। ওতেও সমস্যার কিছু নেই। আমি প্রশ্ন করতে করতে বুঝবো, আপনিও একদিন বিশ্বাস করতে করতেই বুঝবেন। । সেই সম্ভাবনা খোলা থাক। কালকেই পৃথিবী শেষ হচ্ছে না। প্রশ্নের কোনো ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাও নেই। প্রশ্ন প্রশ্নই। যেমন ভক্তি ভক্তিই। নাড়ু কেন আমার বাড়ির দেওয়ালে হিসি করলো এই নিয়ে প্রশ্ন করলে আপনি বলতে পারেন না নাড়ুর বাপ জাঙ্গিয়া না পরে পাতলা লুঙ্গি জড়িয়ে যখন বাজারে যেত তখন তুমি কোথায় ছিলে? ঠিক যেমন আমি আপনাকে জিগাই না, তোমার এত ভক্তি এখন, আদবানি যখন একটা রাম লেখা ইঁট বানাতে বলেছিল… সেই ইঁট তোমার বাপ বানিয়েছিল? নাড়ু বা আপনার বাপ কারো দায় আমাদের নয়। আমরা এখন নিয়ে কথা বলছি, অতীত নিয়েও। কিন্তু তখন তুমি কোথায় ছিলে বল্লে খেলব না। তখন আমি নাক খুঁটছিলাম, আপনি ছোঁচাচ্ছিলেন। কাজেই শোধবোধ হেগো পোঁদ। বাদ দিন।
ঠাকুরে আসি। ঠাকুর ভক্ত হতে বলেছিলেন। দাস হতে একবারও বলেননি। দাস আর ভক্তের বিস্তর ফারাক। একজন মাইনে পায় একজন ফ্রিতে খাটে। এইটা ঠাকুর বলেননি।কারন ঠাকুর আপনাকে দেখেননি। আপনার মত জীব দেশে তখন খুব কম ছিল। যে কটা ছিল তাদের জন্যে যা বলার নরেনই বলে গেছেন। একটু ভক্তিভরে ওর জীবনী পরবেন… গোসেবক নিয়ে ওনার মতামত খুব পষ্ট। মুশকিল হল আপনি গোসেবক আর হিঁদু গুলিয়ে ফেলেছেন whatsapp পড়ে। আপনার তালগোল পাকিয়ে গেছে। ঠিক যেমন আপনি সরকার আর জনগণে গুলিয়ে ফেলছেন।
সরকার পরিকল্পনা করে।তার কাছে সাধারন মানুষের থেকে অনেক বেশি তথ্য থাকে। সেগুলি সে সমন্বয় করে। তার থেকে নীতি তৈরি হয়। ভবিষ্যতের দিশা দেয়। দুর্বলের পাশে এসে দাঁড়ায়। না পারলে তার যুক্তি দেয়।খতিয়ান দেয়। এগুলি বইতে লেখা ছিল মনে আছে? তখন না বুঝে দুলে দুলে মুখস্ত করেছিলেন বলে ভুলে গেছেন। এগুলো সরকারের কাজ। সেই জন্য সরকারকে মানুষ নির্বাচিত করে। এটাও বইতে লেখা ছিল। তার জন্য আপনার আমার পকেট থেকে অনেক অনেক টাকা খসে।এইবার একটু খেয়াল করুন এই সরকার এই করোনা  নিয়ে কি কি করেছে? ( রাহুল গান্ধী রাহুল গান্ধী করবেন না।ও টুইট করে আর থাইল্যান্ড যায়… নিজের পার্টি ছাড়া কারুর ভিটে মাটি চাঁটি আপাতত ও করছে না)। সরকার দুমাস আগাম সময় পেয়েছিল।সরকার পাড়ার ছেলু গয়লা নয়। তার বহু মাইনে করা ইয়াব্বড় শলাহকার আছে। তারা Whatsapp এর ডিগ্রীধারি নয়।তারা কি বলেছিল আর সরকার কি বুঝেছিল আমাদের কেউ জানায়নি। এই রোগ আমদানিকৃত। অনেক আগে বর্ডার সীল করলে আজ হয়ত আপনি আমি কেউ বাড়ি বসে নেই। যখন WHO বলেছিল গ্লোবাল হেলথ এমার্জেন্সি, সরকার বলেছিল তেমন ভয়ের কিছু নেই। সরকার তখন ব্যাস্ত ছিল। ট্রাম্পের নধর নিতম্ব, শাহীনবাগের কারেন্ট, শালাদের গুলি আর মধ্যপ্রদেশের এমএলএ দের খুলি নিয়ে। এগুলো আপনিও দেখেছেন। এই দুই মাসে টেস্টিং, PPE, মাস্ক, ভেণ্টিলেটর কিচ্ছুটির কিছু হয়নি। রাজ্যগুলি অনেক আগে মাঠে নেমেছিল। তারা কেন্দ্রের থেকে বেটার নয়।তাদের মানুষের খিস্তি ডাইরেক্ট খেতে হয় তাই। কিন্তু তারা GSTর হাজার হাজার কোটি প্রাপ্য টাকা পায়নি মাসের পর মাস। কেরালা সরকার হাইকোর্টে গিয়ে মানুষ যাতে নেক্সট তিন মাস কোনো ট্যাক্স না দেয় তার রায় নিয়ে এসেছিল। কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সেটা ক্যান্সেল করিয়ে এসেছে। 
তারপর প্রথম বার্তা সরকারবাহাদুর দিলেন একটা চুকিতকিত কার্ফুর আর থালা বাজানোর। তার জন্য টাইম দিলেন চার দিন। দ্বিতীয়বার এসে ২১ দিনের লকডাউন। সময় দিলেন চার ঘন্টার। এর ফলে কি হয়েছে আপনি গুহায় না বাস করলে জানেন। এর মধ্যে আপনিও দেখেছেন সরকার যে প্যাকেজ ঘোষনা করেছে তার আর্ধেক NREGA আর পিএম কিষানের পুর্ব ঘোষিত টাকা। সেটাকে প্যাকেজে জুড়ে দিয়ে মালটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে। আপনি হাফিইয়ারলির ইতিহাসের নম্বরটা ফাইনালের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে পাশের বাড়ির ঘোঁতনকে ঢপ দিলে সেও এটা একদিন ধরে ফেলতো। ঘোঁতন যদি আপনার ভক্ত না হয়। যারা ভক্ত নয় তারাও তাই করেছে। আপনি ভক্ত বলে বাকিরা ঢপটা গিলবে কেন? যে গালভরা ইএমাই মকুব হয়েছে সেটা না দিলে সুদ সমেত সেটাও আপনাকে পরে শুধতে হবে সেটাও সরকার আপনাকে পরিষ্কার করে একবারো বলেনি।আপনার একবারো মনে হয়নি এটা সরকার বললো না কেন? সরকার কি জনগণের ভাসুর? এত আকার ইঙ্গিতে কথা বলার কি প্রয়োজন? 
 যে লক্ষ কোটি টাকা সরকার তেলের জন্য বাঁচাচ্ছে তার এক পয়সাও মানুষ কে ট্রানফার করছে না। একটা সরকারি পিএম রিলিফ ফান্ড থাকতে সরকার একটা ট্রাস্ট খুলে মানুষের থেকে টাকা তুলছে। একটু দুলে দুলে মোদি মোদি না করলেই দেখবেন আপনি ক্লাস টু এর ফাইনালের আগে যেটুকু হোমওয়ার্ক করতেন সেটুকুও এই গরমেন্ট করেনি। এই অবস্থায় সে এসে আপনাকে বলছে একটু পদিপ জ্বালাবি ভাই? আমরা সবাই দেখবি কেমন মনে বল পাব!
আপনি দুবার ফেল করে আপনার বাপকে যদি বলতেন একটু রেহমানিয়ার বিরিয়ানি খাওয়াবে বাবা? তাহলে এই কঠিন সময় আমি একটু মনে বল পাই। কি হত? নিজের বাপের মুখটা একটু মনে করুন। মালুম পাবেন। আমাদেরো না ঠিক এইরকম লাগছে।
আপনি গুলিয়ে ফেলেছেন কাকু। সারা পৃথিবীতে মানুষ নিজের উদ্যোগে ঘন্টা বাজায়, গান গায়, কবিতা পড়ে, মোমবাতি জ্বালায়। সরকার তাকে কিছু বলে না। সরকার ত্রাণ দেয়, খাবার দেয়। চিকিৎসা দেয়।এখানে সাধারন মানুষ (that includes স্বাস্থ্যকর্মী) ত্রাণ, খাবার, চিকিৎসার প্রাণপণ চেষ্টা করছে আর সরকার মন দিয়ে ধুপ, কাঁসর, প্রদীপ, ন মিনিট এসব করে যাচ্ছে। উলটে গেছে পুরোটা। মানুষের দ্বায়িত্ব নিজেকে বাঁচানো। সরকার শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দেবে।
উলটে গেলে ভীষন বিপদ জানেন। মানুষের দেহে ব্রেন আর রেক্টাম খুব কাজের জিনিস। কিন্তু এরা জায়গা পাল্টালে ঘোর দুর্দিন। ভাবুন তো কি বিপদ? 
তাই আমরা প্রদীপ টদীপ জ্বালাবো না বুইলেন। আপনি জ্বালান। আপনার মঙ্গল হোক। আমরা তো একই সুতোয় বাঁধা। তাই আপনার হলে আমাদেরো হবে। চিন্তা করবেন না।
পুঃ পাছে কমিউনিস্ট জেহাদি টেহাদি ভাবেন তাই আবার ঠাকুর দিয়েই শেষ করি। ঠাকুর ভক্ত হতে বলেছিলেন ঠিক। কিন্তু মার। বা গুরুর । বা আরাধ্য যা কিছুর।রাজার ভক্ত হতে একবারো বলেননি। আপনি রাজার ভক্ত হয়েছেন। রাজা খুব ডেঞ্জার জিনিস। সে রাজা হিন্দু হোক বা খ্রিশটান বা মোছলমান বা কমিউনিস্ট। রাজা শুধু নৈবেদ্যি বোঝে। আর বোঝে লাঠি, তেল ও গুহ্যদ্বার। আর গুহ্যদ্বারের হিঁদু মোছলমান হয়না।

বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২০

করোনা ও মানুষ ~ বিষাণ বসু

এই শালা মাইগ্র‍্যান্ট ওয়ার্কারদের জন্যে দেশে করোনা এবার মহামারী হয়ে যাবে। 

ঠিকই। একেবারে ১০০% সহমত।

দেখেছেন? দেখেছেন শালাদের গাদাগাদি করে বাসস্ট্যান্ডে ভিড় জমাতে? লকডাউন ফেইল করবে না এরপরেও? বাস নেই, তো হেঁটে হেঁটে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাচ্ছে - কে ট্র‍্যাক করবে এদের? কে টেস্ট করবে? মিনিমাম সচেতনতা না থাকলে…

একদম ঠিক জায়গাটা ধরেছেন, সিরিয়াসলি। আমি তো আরেকটু আগের কথা বলছি। এই ধরুন, বিলেত-আমেরিকার ডলার-পাউন্ডের মাইগ্র‍্যান্ট বাবুরা যদি এমন করে তাঁদের ফেলে যাওয়া দেশটিতে  না ফিরতে থাকতেন, ফেরার পর তাঁদের যদি এমন করে বাজারে ছেড়ে না দেওয়া হত, কে জানে, লকডাউন না করেই হয়ত আমরা বেঁচে যেতাম, তাই না? আরেকটু আগেই যদি মাইগ্র‍্যান্ট ওয়ার্কারদের দেশে ফেরার ঢল বন্ধ করতে প্লেনগুলো আটকানো যেত? প্লেনে চেপে যাঁরা ফিরলেন, তাঁদের সবাইকে  যদি কোয়ার‍্যান্টাইন করে টেস্ট হত, তাহলে??    

এই হচ্ছে আপনাদের প্রবলেম। রাজনীতি বাদ দিয়ে কথা বলতে শেখেন নি।

ঠিকই। কাদের মাইগ্র‍্যান্ট ওয়ার্কার বলা হবে আর কাদের নয়, এটা তো একেবারেই রাজনীতির সিলেবাসের বাইরে, তাই না? উন্নত দেশে বসে চাকরি করে মাসে কয়েক লাখ কামালে তাঁকে তো আর ওয়ার্কার বলা যাবে না, তাই তো? ভালো আয়ের সুযোগ বুঝে এদেশ থেকে ওদেশে পাড়ি জমালে, বিপাকে পড়ে ওদেশ থেকে এদেশে ফিরে এলে, তাকে মাইগ্রেশন বলাও নেহাত অনুচিত। মাইগ্র‍্যান্ট ওয়ার্কার মানে শুধুই তারা যারা দিনমজুরির কাজ হারিয়ে মাথায় হাঁড়িকুঁড়ি চাপিয়ে ঠা ঠা রোদ্দুরে হেঁটে চলেছেন। এবং, এই সংজ্ঞায় রাজনীতি নেই। তাই না??

আরে, তারা আর এরা?? এদের মধ্যে কোনো কনশাসনেস আছে??

সে তো বটেই। করোনার সংস্পর্শ জেনেও লন্ডন থেকে ফিরে যিনি বাজার-শপিং মলে ঘুরে বেড়ালেন, বিদেশ থেকে ফিরে যাঁরা মস্ত পার্টিতে হুল্লোড় করলেন, এমনকি যাঁরা বিদেশ থেকে ফিরেই স্রেফ গাঢাকা দিয়ে হাওয়া হয়ে গেলেন, হয়ে গেলেন ননট্রেসেবল - তাঁরা সাঙ্ঘাতিক সচেতন নাগরিক বই কি!!

দেখুন, আপনার এই সব কথাতেই সো-কলড গরীবের ছুতো দেওয়া বন্ধ করবেন, প্লীজ??

বেশ, বন্ধ করলাম। মধ্যবিত্তদের কথা বলি তাহলে? আচ্ছা, ফ্ল্যাটে যেসব বুড়োবুড়িরা থাকেন, তাদের অবস্থাটা ভেবেছেন?? তাঁরা কিন্তু কাজের লোক রান্নার লোকের উপর খুব নির্ভরশীল। এই বাজারে তাঁরা কেমন আছেন, জানেন?? এঁরা খাবার পাচ্ছেন কিনা, কী খেয়ে থাকছেন, জানার চেষ্টা করেছেন? ওষুধের দোকানের সামনে লাইনটা দেখেছেন? হয়ত খবর রাখেন না, নিখিল বিশ্বে করোনা-ই এক এবং একমাত্র অসুখ নয়। আপনি যখন মধ্যবিত্তদের কথা ভাবছেন, এটুকু নিশ্চয়ই জানেন, এইসব বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের অধিকাংশই দিনে চারপাঁচটা ওষুধ খান - সুগার-প্রেসার ইত্যাদি। সে ওষুধ বন্ধ করার জো নেই। এনারা যদি ওষুধের দোকানে লাইন দিয়ে করোনা বাধিয়ে বসেন - জানেন তো, করোনায় মরার ভয় মেইনলি এঁদেরই।           

হুমমমমম…. 

আর হ্যাঁ, মাথায় রাখুন, এঁদের অনেকেই নির্ভর করেন সঞ্চয়ের টাকার উপর যে মাসিক সুদটুকু মেলে, তার উপরে। সরকার যে আচমকা সুদ কমিয়ে দিল - আমার-আপনার সঞ্চয়ে যে সুদ কমলো, তার থেকেও কিছুটা বেশী করে কমে গেল বয়স্কদের সঞ্চয়ে - এনাদের দিন চলবে কী করে, ভেবেছেন?? হ্যাঁ, এঁরা কিন্তু আমার-আপনার মতোই মধ্যবিত্ত - মানে, সেরকমই ছিলেন - করোনার দিনগুলো কাটলে, এবং বেঁচে থাকলে, এঁরা হয়ত নিম্ববিত্তের জীবনযাত্রায় নতুন করে অভ্যস্ত হবেন। নাঃ, থাক - আপনি তো আবার রাজনীতির কথা পছন্দ করেন না!!

© বিষাণ বসু

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

কোরোনা ভাইরাস ও কিউবা ~ সুশোভন পাত্র

ধরুন, লকডাউনে আপনি ঘরবন্দী। খাচ্ছেন-দাচ্ছেন-ঘুমোচ্ছেন। হয়ত অ্যামাজন প্রাইমে প্যারাসাইট দেখছেন কিম্বা নেটফ্লিক্সে মানি হেইস্ট রিভাইজ দিচ্ছেন। এমন সময় কেউ আপনার দরজায় কড়া নাড়ল। 'অসময়ে আবার কে?' -বলে ব্যাজার মুখে দরজা খুলে দেখলেন দাঁড়িয়ে আছে পাড়ার সরকারী মেডিক্যাল টিম। একজন ডাক্তার, একজন নার্স আর দু-জন মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। তাঁরা আপনার গত কয়েকদিনের মেডিক্যাল হিস্ট্রি নোট করলেন। COVID-19-এ আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ আছে কিনা টেস্ট করলেন। যদি টেস্ট নেগেটিভ হয় তাহলে 'থ্যাঙ্কু, গুড বাই' বলে, আপনাকে আবার নেটফ্লিক্স-অ্যামাজন প্রাইমের দুনিয়ায় ছেড়ে আপনার প্রতিবেশীর ঘরে চলে গেলেন। 
কিন্তু ধরুন, আপনার জ্বর, কাশি, সর্দি, শ্বাসকষ্টের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেলো। তখন ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আপনার দুয়ারে অপেক্ষা করবে অ্যাম্বুলেন্স। আপনার পরিবারের সকলকে আবশ্যিক কোয়ারেন্টাইনে পৌঁছে দিতে আর আপনাকে নিকটবর্তী পলিক্লিনিকে নিয়ে যেতে। পলিক্লিনিক মানে, অত্যাধুনিক প্যাথলজি, এক্স-রে, আলট্রাসাউন্ড, অপ্টোমেট্রি, এন্ডোস্কোপি, ম্যাটনারনাল চাইল্ড কেয়ার, ডায়াবেটিক, প্যাডিয়াট্রিক্স, গাইনকোলজি, কার্ডিওলজি সহ ২২টি জরুরী পরিষেবা যুক্ত সরকারী স্বাস্থ্য-পরিষেবার দ্বিতীয় স্তর। পলিক্লিনিকে জরুরী পরীক্ষায় যদি দেখা যায় আপনার সংক্রমণ গুরুতর এবং অচিরেই ভেন্টিলেশেনের প্রয়োজন পড়তে পারে তাহলে আপনাকে স্থানান্তরিত করা হবে সরকারী স্বাস্থ্য-পরিষেবার তৃতীয় কিম্বা চতুর্থ স্তরে। অর্থাৎ হসপিটালে কিম্বা মেডিক্যাল স্কুলে। না হলে আপনি বিন্দাস রইলেন পলিক্লিনিকে। আইসোলেশেনে আর অবজারভেশেনে¹। 
কি ভাবছেন স্বপ্ন দেখছি? ঘরে বসে খেয়ালি পোলাও রান্না করছি? বাড়ি বাড়ি ঘুরে মেডিক্যাল টিমের এভাবে রোগ নির্ণয় সম্ভব নাকি? সম্ভব! হচ্ছেও! তবে সেটা কিউবা তে। আসলে কমিউনিটি ক্লিনিক-পলিক্লিনিক-হসপিটাল-মেডিক্যাল স্কুল, কিউবার স্বাস্থ্য-পরিষেবার এই পিরামিড প্যান্ডেমিকের মোকাবিলায় ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা কোন স্ট্রাকচার নয় বরং গত ৫০ বছরের ধারাবাহিক সরকারী স্বাস্থ্য নীতির ফসল। 'Alma-Ata'; WHO যখন প্রাথমিক স্বাস্থ্য-পরিষেবা কে গোটা বিশ্বে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে সার্বজনীন করার ডাক দিয়েছিল ১৯৭৮-এ, কিউবার এই প্রজেক্ট তারও আগের, ১৯৭০-র²। 
সেই প্রজেক্টের হাতধরেই কিউবা জুড়ে গড়ে ওঠে সরকারী স্বাস্থ্য-পরিষেবার নিউক্লিয়াস 'কমিউনিটি ক্লিনিক'। নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বৃত্তে প্রতি ১৫০টি পরিবার পিছু গড়ে একটি। ডাক্তার, নার্স ছাড়াও মেডিক্যাল স্টুডেন্টদের তিন বছর দেশের কোন একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে কাজ করা কিউবায় বাধ্যতামূলক। বছরের প্রতিদিন সকালে কমিউনিটি ক্লিনিকে বসে আউটডোর। বিকেলে ঐ ভৌগোলিক বৃত্তে মেডিক্যাল টিমের ফিল্ড ভিজিট, ক্রনিক রুগীদের চেক-আপ। আর সপ্তাহান্তে কমিউনিটি ক্লিনিকের জরুরী রুগীদের নিয়ে মেডিক্যাল টিম যায় পলিক্লিনিকে।দেশের মোট ৪৯৮টি পলিক্লিনিকের ঘাড়ে গড়ে ২০-৪০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের রোগীদের সেকেন্ডারি স্বাস্থ্য-পরিষেবার গুরু দায়িত্ব ন্যস্ত। মোটামুটি কিউবার ৯৫% চিকিৎসা কমিউনিটি ক্লিনিক কিম্বা পলিক্লিনিকেই সীমায়িত³। বাকি ৫%-র জন্য আছে ১৫০টি ন্যাশনাল হসপিটাল। ১৪টি মেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার। এবং অবশ্যই দুনিয়ার বৃহত্তম মেডিক্যাল স্কুল ELAM। যেখানে পড়াশোনা করে ১১০টি দেশের ২০,০০০ স্টুডেন্ট। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, স্ট্রাইপেন সহ⁴। 
অবশ্য শুধু পড়াশুনা না, কিউবার স্বাস্থ্য-পরিষেবার আলপিন টু এলিফ্যান্ট সবটাই সরকারী এবং বিনামূল্যে। ওষুধও বিনামূল্যে কিম্বা ভর্তুকিতে⁵। উন্নয়নশীল দেশ তো ছেড়েই দিন, এমনকি উন্নত দেশের তুলনাতেও স্বাস্থ্য-পরিষেবার সূচকে কয়েক ক্রোশ এগিয়ে কিউবা। প্রতি ১০০০ জনে কিউবা তে ডাক্তার ৮.২। আমেরিকায় ২.৬, ভারতে ০.৮⁶। নাগরিকদের গড় আয়ু ৭৯। আমেরিকায় ৭৮, ভারতে ৬৮⁷। স্কিল্ড তত্ত্বাবধানে প্রসব কিউবায় ১০০%। আমেরিকায় ৯৯%, ভারতে মেরে কেটে ৮১%⁸। কিউবা তে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির ১২.১৯%, ভারতে ১.২% ⁹ ¹⁰। এমনকি শুনলে অবাক হবেন যে উত্তাল আটলান্টিকের কোলে বসেও শেষ ১৭টি ঘূর্ণি ঝড়ে কিউবা তে মারা গেছেন মাত্র ৩৫জন। আর শুধু ২০০৮-র ঘূর্ণিঝড়ে আমেরিকা তে মারা গিয়েছিল ১৮০০জন¹¹।  
'বেসরকারি হলে পরিষেবা ভালো হবে' বলে পাড়া মাথায় তোলা দাদা-বৌদিরা রাগ করবেন না প্লিজ। ক্যাপিটালিজমের পা চাটা দালালরা বিরক্ত হবেনা না প্লিজ। কারণ উপরের তথ্য গুলো চে গেভেরার 'মোটরসাইকেল ডাইরিজ'-এ নেই বরং আছে WHO-র ওয়েবসাইটে। তাই আজকে যে শুনছেন কিউবার অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ Interferon Alfa-2B করোনার চিকিৎসাতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে¹², আজকে যে শুনছেন বিশ্বের ৪৫টি দেশে কিউবার ডাক্তাররা করোনা ভাইরাসের আক্রান্তদের চিকিৎসা করছে¹³, আজকে যে শুনছেন করোনা আক্রান্ত যাত্রীসহ জাহাজ কে বিশ্বের তাবড় দেশ নোঙর ফেলতে না দিলেও কিউবা বুকে টেনে নিচ্ছে, -এর কোনটাই ফ্লুক কিম্বা পিসি সরকারের ম্যাজিক নয়¹⁴।
আসলে, হোক না কিউবা বহু দেশের তুলনায় অর্থনীতি তে চুনোপুঁটি, থাক না যতই বিপ্লব পরবর্তী ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে আমেরিকার অর্থনৈতিক বয়কট, হলেই বা ডাক্তার, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের পারিশ্রমিক কম; তবুও লড়াইয়ে হার মানতে, বশ্যতা স্বীকার করতে জানেনা একরত্তির ঐ কিউবা। স্বাস্থ্য-পরিষেবা নিয়ে ব্যবসা করেনা কিউবা। মানুষের জীবন কে প্রফিট মেকিং-র পণ্য করে ফি-বাজারে বিক্রি করেনা কিউবা। ফিদেল কাস্ত্রো বলতেন কিউবার ডাক্তাররা কেবল ডাক্তার না, তারা 'সাদা পোশাকের সৈনিক'¹⁵। 
আমাদের দেশেও তাই! করোনা প্যান্ডেমিকে দেশের মানুষ কে বাঁচাতে প্রতিদিন যে অসংখ্য ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্য কর্মীরা অবিশ্বাস্য নিষ্ঠায় প্রাণপাত পরিশ্রম করছেন তারাও আমাদের দেশের 'সাদা পোশাকের সৈনিক'। আমরা জানি যে দেশে গড়ে হসপিটাল বেড ১টি/১,৮২৬জন, ডাক্তার ১টি/১১,৬৬০জন, আইশোলেশেন বেড ১টি/৮৪,০০০জন আর ভেন্টিলেটর ১টি/৩,৩৩,৩৩৩জন -সে দেশের 'সাদা পোশাকের সৈনিক'দের জন্য যুদ্ধটা আরও কঠিন¹⁶। আমরা জানি রাতারাতি আমাদের দেশের স্বাস্থ্য-পরিষেবা কিউবার মত হয়ে যাবে না। কিন্তু সরকারী পলিসি মেকিং-র অগ্রাধিকার তো বদলাতে পারে। তাই ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্য-পরিষেবার কঙ্কালসার চিত্রের বদল চাইলে, আমাদের 'সাদা পোশাকের সৈনিক'দের ঢাল তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার বানানো বন্ধ করার স্বার্থে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে কি "এই সময় রাজনীতি করবেন না" বলে হুমকি দেবেন?
দিলে দেবেন! কিন্তু প্রশ্ন আমরা করবই! প্রশ্ন করব যে প্যান্ডেমিকের প্রাদুর্ভাবে দেশ যখন জর্জরিত তখন সরকার কেন ৮৮০কোটি দিয়ে ইজরাইল থেকে ১৬,৪৭৯টি মেশিনগান কিনছে¹⁷? যেখানে ঐ একই পরিমাণ টাকায় এই মুহূর্তে দেশে ১৬,০০০ নতুন ভেন্টিলেটর বানানো যেত¹⁸। প্রশ্ন করব যে প্যান্ডেমিকের প্রাদুর্ভাবে সরকার কেন আপনার-আমার ট্যাক্সের ২০হাজার কোটি খরচা করে সেন্ট্রাল দিল্লি ও পার্লামেন্টে কে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা করছে¹⁹? যখন করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য-খাতে মাত্র ১৫ হাজার কোটি বরাদ্দ হয়েছে। প্রশ্ন করব যে সরকার স্রেফ কলমের খোঁচায় ৭.২৭লক্ষ কোটির কর্পোরেট ট্যাক্স মকুব করতে পারছে²⁰, সেই সরকার কেন নতুন বোতলে পুরনো মদ ভরে, মাত্র ১.৭লক্ষ কোটির আর্থিক প্যাকেজে আই-অয়াশ করছে? সরকার কে ছাড়ুন, আপনিই না হয় বলুন। এখন কোনটা বেশি জরুরী মেশিনগান না ভেন্টিলেটরর? পার্লামেন্টে সাজানো না পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপদে ঘরে ফেরানো? কর্পোরেট ট্যাক্স মকুব না স্বাস্থ্য-কর্মীদের মাস্ক, কিট? 
কিউবা না হয় নাইবা হলেন, ট্রাম্পের নমক খেয়ে ফিদেলের প্রশংসা না হয় নাইবা করলেন, সমাজতন্ত্র না হয় নাইবা চাইলেন, কমিউনিস্টদের না হয় ঘেন্নাই করলেন; কিন্তু মানবিক তো হতেই পারেন। সুলভ স্বাস্থ্য-পরিষেবার দাবীতে আওয়াজ তো তুলতেই পারেন। মানুষের জীবন কে পণ্য করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তো করতেই পারেন। না ক্যাপিটালিজমের আফিমে বুঁদ হয়ে 'প্রফিট'র অঙ্ক কষলে অমানবিক হতেই হয়?



সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২০

কারোনা ভাইরাস প্রতিরোধ ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

কারোনা ভাইরাস প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সং স্থার প্রধান নির্দেশ হল, টেস্ট টেস্ট টেস্ট, মানে অসুস্থ বা আপাত সুস্থ মানুষ এই ভাইরাস আক্রান্ত কিনা তা টেস্ট মানে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া আর সাথে সাথে তাকে কোয়ারেন্টাইন কর আর চিকিৎসা কর। এই পরীক্ষা কিভাবে করতে হবে সে সম্পর্কেও তারা জানিয়ে দিয়েছেন। এবার টেস্ট করতে কিছু সরঞ্জাম লাগবে যাকে আমরা কিট বলছি, তবে এ কিট প্রেগ্নেন্সি কিটের মত সহজ সরল নয়, মানে এক ড্রপ ইউরিন ফেলে রঙ পাল্টে গেলেই পজিটিভ। এ কিট ব্যাবহার করতে একটা যন্ত্রও লাগে আর সম্পূর্ণ টেস্ট করতে কিছু দক্ষতা লাগে যা শিখতে হয়।

প্রধানমন্ত্রীর একটি সাইন্টিফিক এডভাইসরি বোর্ড আছে সে এখন আমরা জেনে গেছি( যার প্রধান বিজয় রাঘবন) যারা করোনা প্রতিরোধে কি কি করা উচিৎ সে টেস্ট বল, চিকিৎসা বল বা লকডাউন বল সাজেস্ট করেন আর সেই অনুসারে তা কার্যকর করা হয়। এই যে টেস্ট ব্যাপারটা কত বেশি কত দ্রুত করা যায় তার একটা ব্লু প্রিন্ট তারা বানিয়েছেন। দেশের প্রায় ১০০ টি গবেষণা কেন্দ্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই পরীক্ষা পদ্ধতি বিভিন্ন হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রকে হাতে কলমে শেখাতে যাতে তারা কিছুদিনের মধ্যে স্বয়ংসম্পুর্ন হয়ে ওঠে।

এবার দেখা যাক এ পরীক্ষা পদ্ধতি কেমন, স্যাম্পল বা নমুনা হিসেবে নেওয়া হয় সন্দেহভাজন ব্যক্তির লালারস।সেই লালারসে থাকে ভাইরাস, মানুষের অন্য কোষ (cell) এর সাথে।এই কোরোনা ভাইরাস  RNA গোত্রের( জিনোম), মানে সেই নাইন টেনে পড়া ডিএনএ আরএনএ, বেশ মেয়েদের চুলের বিনুনির মত দেখতে। এই লালারসকে প্রথমে নিষ্ক্রিয় করা হয় কিছু রাসায়নিক দিয়ে, যাতে ভাইরাস গুলো মরে যায়, তারপর এই নিষ্ক্রিয় নমুনা থেকে আরএনএ আলাদা করা হয়। মুশকিল হল আরএনএ তো আরএনএ ই, মানে এই যে আলাদা করা হল এতে মানুষের আর ভাইরাস দু রকমের আরএনএ-ই থাকে।এবার এই আলাদা করা আরএনএ কে প্রথমে complementary DNA (cDNA) তে পরিনত করে নেওয়া হয়, আর এ কাজে যে এনজাইম লাগে তার নাম রিভার্স ট্রান্সক্রিপ্টেজ এনজাইম( reverse transcriptase enzyme) সাথে লাগে প্রাইমার আর সেই নাইনে পড়া এডিনিন, গুয়ানিন, থাইমিন আর সাইটসিন deoxyribonucleotide triphosphates(dNTP)। 
বোঝা গেল এতদূর, জলের মত। হ্যাঁ একটা কথা ভাইরাসের যে আরএনএ তারা উচ্চঘর, কংসরাজের বংশধর, তাতে সেই A T G C, দিয়ে যেন ছন্দ কবিতা লেখা থাকে। এবার ওই যে প্রাইমার যোগ করা হয়েছিল, সে আরএনএ এর ওপর বেশ আয়েস করে বসতে পারে, সেই আইসক্রিমের ওপর চেরি যেমন, তবে সে ভাইরাস আরএনএ এর ওপর বসবে না মানুষের আরএনএ এর ওপর বসবে তা নির্ভর করে তার ক্রমের(sequence) ওপর( মানে ধরা যাক সেই ছন্দ), মানে তা ভাইরাসের আরএনএ ছন্দর সাথে ভাল যাবে না মানুষের আরএনএ এর ছন্দের সাথে। আর যদি ভাইরাস আরএনএ এর ওপর বসে যায়( মানে সেই খাপে খাপ মন্টুর বাপ), সেই যে রিভার্স ট্রান্সকিপ্টেজ এনজাইম বলেছিলাম না, তা dNTP       
গুলোকে জুড়ে জুড়ে ভাইরাস আরএনএ এর ক্রমানুসারে( মানে as per sequence) cDNA বানাতে থাকবে, (মানে করোনা ভাইরাস আরএনএ না থাকলে এই cDNA ও তৈরি হতে থাকবে না)। এক বার cDNA তৈরি হয়ে গেলে , আর একটা শক্তপোক্ত robust ( আগের এনজাইমের তুলনায় শক্তিশালী ) TAQ পলিমারেজ নামে এনজাইম টাকে  আরও বেশ কয়েক বার কপি করে দেয়। এই এমপ্লিফায়েড কপিগুলো ডাই এর সাথে জুড়ে বিশেষ রঙ মানে কালার ইন্ডিকেশন দেয় যাতে বোঝা যায় সেই লালারসে কারোনা ভাইরাস ছিল কিনা! এই কপি বানানো যাকে বলছি এমপ্লিফিকেশন, যে মেশিনে করা হয় তা হল, RT-PCR (Real Time Polymerase Chain Reaction) machine. মোদ্দা কথা অনেকটা সেই ছেলেবেলার জলছবির মত, কাগজের ওপর জলছবি রেখে পয়সা দিয়ে জলছবি ঘষলে আস্তে আস্তে সেই ছবির অবয়ব কাগজের ওপর স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে থাকে। এখানেই অনেকটা তাই, যদি লালারসে সেই ভাইরাস থাকে সেটা ওই দুই এনজাইমের উপস্তিতিতে জানান দেয় সে আছে, মানে পজিটিভ।
এই সমস্ত উপাদান , প্রাইমার আর উপযুক্ত বিক্রিয়া মাধ্যম- এই সব মিলিয়ে বলা হয় কিট। 

এই যন্ত্র আগে তো তেমন দরকার ছিল না মূলত কিছু গবেষণাগারে আর বড় মেডিক্যাল কলেজে থাকত, প্রধানত বিদেশী, এখন দেশেও তৈরি হচ্ছে। ছোট আর বড় দু ধরনের যন্ত্রে যথাক্রমে ৯৬ আর ৩৮৪ খানা নমুনা এক এক বারে পরীক্ষা করা যায়। এই পরীক্ষা এক একটা সাইকেল চার ঘণ্টা লাগে, মানে দিনে কমবেশি চারবার চালাতে পারলে ১৫০০ নমুনা পরীক্ষা করা যায়। আর কিট এখন অনেক সংস্থা বানাচ্ছে এ দেশেই।

মানে ১০০ টা যন্ত্রে দিনে প্রায় দেড় লক্ষ নমুনা পরীক্ষা করতে পারবে। সেই অনুসারে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে (ICMR এ অনুমতি দিচ্ছে), তারা তৈরি হচ্ছে অনেকে শুরুও করে দিয়েছে।ন্যাশনাল ইন্সটিটুট অফ ভাইরলজি ( NIV pune) আর  NCDC Delhi প্রথমে নতুন তৈরি করা কিট গুলো পরীক্ষা করে দেখে, পাস করলে ছাড়পত্র দেয় আর সেই সংস্থা কিটের বানিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।  

আমি গরিব আদমি আছি, এসব বিজ্ঞান টিজ্ঞান বড় ভয়, বুঝিও না, আমি ওপর ওপর( ভেতরে ঢুকলে কিছুই বুঝব না সেজন্য)  কিছু বুঝি উচ্চশিক্কিত বন্ধুদের জ্ঞানের বিচ্ছুরণ থেকে! আমাদের অনুজ সৌভিক আর দেবজ্যোতি, দিল্লীর এমন একটা গবেষণাগারের দলবলের সদস্য। সেই দল এই ট্রেনিং তত্বাবধান করছে গত ১৫ দিন ধরে, সে অনেক দৌড়াদৌড়ি, মাঠে নেমে কাজ, ভলেন্টিয়ার  তৈরি করা, হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ রাখা, ল্যাবরেটরির তত্ত্বাবধান করা, ওদিকে ওপর মহলের  অফিসে আপডেট দেওয়া, মাল মসলার ( মানে ইনগ্র্যাডিয়েন্ট, কিটের) অর্ডার দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

এনিওয়ে জাস্ট জানিয়ে রাখলাম আর কি, চলুন আমরা ফেসবুক, টুইটার কি হোয়াতে জুজু জুজু খেলি, সংখ্যা নিয়ে খেলি( বাজারে এত আই এস আই ফেরত বি স্টাট, এম স্টাট ঘুরঘুর করছে, ফটাস করে লাল নীল উঁচু নিচু সব গ্রাফ এক তুড়িতে এক্স আর ওয়াই অক্ষ বরাবর প্লট করে বলে দিচ্ছে আগামী পরশু কেরলে কজনের টেস্ট পজিটিভ হবে!!!  ),তর্ক করি ( মানে ফেসবুক ফ্রম হোম)।

সবাই সাবধানে থাকুক,যারা মাঠে নেমে কাজ করছেন স্যালুট তাদের আর যথাসম্ভব সাবধানে কাজ করুন। উই শ্যাল ওভারকাম।

শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২০

দ্য ওয়ার্ল্ড আফটার করোনা ভাইরাস ~ ইউভ্যাল নোহা হারারি

বিশ্বব্যাপী সঙ্কটের মুখোমুখি মানবসমাজ। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সঙ্কট। সামনের কয়েকটা সপ্তাহে সাধারণ মানুষ আর সরকারগুলো যা যা সিদ্ধান্ত নেবে, তা সম্ভবত আগামী বেশ কয়েকটা বছর ধরে সারা পৃথিবীকে প্রভাবিত করবে। শুধু স্বাস্থ্য-পরিসেবা নয়, গভীর ভাবে প্রভাবিত হবে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, এমনকি সংস্কৃতিও। যা করার, তা দ্রুত করতে হবে। ডিসিসিভলি করতে হবে। আজকে আমরা যা করবো, আগামীদিনে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব থেকে যাবে। শুধু অল্টারনেটিভ বেছে নেওয়া নয়, নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই ঝড়-ঝাপটা কেটে গেলে ঠিক কি রকম পৃথিবীকে আপনি দেখতে চান। হ্যাঁ, যে ঝড়টা এসেছে সেটা কেটে যাবে, মানবসমাজ উঠে দাঁড়াবে, এমনকি আমি-আপনি সহ আমাদের মধ্যে বেশীরভাগ মানুষ বেঁচে-বর্তেও থাকবে ... তবে সেটা এক নতুন পৃথিবীতে!  
   
আজকে যেগুলো আপনি 'শর্ট-টার্ম এমারজেন্সি পদক্ষেপ' হিসাবে দেখছেন, তার অনেকগুলোই কিন্তু ভবিষ্যতে থেকে যাবে। 'এমারজেন্সি'-র মজাই তাই। এই পদক্ষেপগুলো ইতিহাসের চাকাকে ঝপ্‌ করে অনেকটা এগিয়ে দেয়। নর্মাল সময়ে যে ডিসিশন-গুলো নিতে বছরের পর বছর লেগে যায়, সমাজ জুড়ে তর্ক-বিতর্ক চলে, এমারজেন্সি-সিচুয়েশনে সেই ডিসিশন-গুলো নিয়ে ফেলাটা জাস্ট কয়েক ঘন্টার মামলা। ইম্‌ম্যাচিওর, এমনকি ভয়ঙ্কর কিছু টেকনোলজিকেও এই সময় আমরা ছাড়পত্র দিয়ে ফেলি, কারন হাত-পা গুটিয়ে কিছু না করে বসে থাকার বিপদ তার চেয়েও বেশী। তখনকার মতো আস্ত একটা দেশ হয়ে ওঠে লার্জ স্কেল সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ মাত্র। কেমন হবে, সমস্ত ক্ষেত্রে যদি 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' চালু হয়? কিংবা ধরুন দূর থেকে কম্যুনিকেট করাটাই যদি নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়? কেমন হবে, যদি সমস্ত স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিগুলোকে অনলাইন করে দেওয়া হয়? নর্মাল সময়ে সরকার, এডুকেশনাল বোর্ড অথবা ব্যবসায়ীরা এ'সব কথা ভুলেও ভাববে না। কিন্তু এটা নর্মাল সময় নয়। এই সঙ্কট-মুহূর্তে দুটো ক্ষেত্রে আমাদের অপশন বেছে না নিয়ে উপায় নেই। প্রথমটা হলো 'সর্বগ্রাসী নজরদারি' এবং 'নাগরিক ক্ষমতায়নের' মধ্যে। দ্বিতীয়টা হলো 'জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা' ও 'বিশ্বব্যাপী সংহতির' মধ্যে। 
    
*চামড়ার নীচে নজরদারি*  
আজকের মহামারী রুখতে গেলে, সবাইকেই নির্দিষ্ট একটা গাইডলাইন বাধ্যতামূলক ভাবে মেনে চলতে হবে। দু'ভাবে এটা করা যায়। তার মধ্যে একটা হলো, সরকার সর্বত্র নজরদারি করুক এবং নিয়ম ভাঙলেই কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করুক। মানব-ইতিহাসে এই প্রথম টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে সেটা সম্ভবও বটে। মাত্র ৫০ বছর আগেও কে.জি.বি-র পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের ২৪০ মিলিয়ন নাগরিকের ওপর ২৪ ঘন্টা ধরে নজরদারি চালানো সম্ভব ছিলো না। সমস্ত নাগরিকদের সম্পর্কে গাদা গাদা ইনফর্মেশন জোগাড় করে সেই বিপুল তথ্যকে প্রসেস করাটা তো ছিলো কল্পনারও অতীত। এই কাজগুলো করার জন্য কে.জি.বি-কে তখন কিছু চর তথা অ্যানালিস্টের ওপরেই ডিপেন্ড করতে হয়েছিল। আর এটাও ঠিক, যে দেশের সবগুলো মানুষের পেছনে একটা করে চর লাগানোটা জাস্ট অসম্ভব ছিলো। কিন্তু আজকের দিনের সরকারগুলো ঠিক এই কাজটাই নিঃশব্দে করে ফেলতে পারে সর্বব্যাপী সেন্সর আর শক্তিশালী অ্যালগোরিদমকে কাজে লাগিয়ে। নাঃ, একটাও রক্ত-মাংসের মানুষ লাগবে না!  

করোনা-ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু দেশের সরকার এই রাস্তায় হাঁটছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো চীন। সাধারণ মানুষের স্মার্টফোনে নিবিড় নজরদারি চালিয়ে, কোটি কোটি ফেস-রেকগনাইজিং ক্যামেরাকে কাজে লাগিয়ে, এবং মানুষকে তাদের শরীরের তাপমাত্রা থেকে শুরু করে অন্যান্য মেডিকেল-রিপোর্ট দিতে বাধ্য করে সরকার অত্যন্ত দ্রুত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত লোকজনকে চিহ্নিত করতে পেরেছে। তাদের গতিবিধিকে ট্র্যাক করতে পেরেছে। কারা কারা তাদের সংস্পর্শে আসছে, সেটাও ঝপ্‌ করে আইডেন্টিফাই করে ফেলতে পেরেছে। মোবাইল অ্যাপেই নাগরিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে একজন করোনা-ইনফেক্টেড মানুষের থেকে তিনি কতোটা দূরত্বে আছেন।

এই ধরনের টেকনোলজির ব্যবহার আজ কেবল পুর্ব-এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি করোনা-আক্রান্তদের চিহ্নিত করতে সে'দেশের সিকিউরিটি এজেন্সিকে এমন একটি নজরদারি-প্রযুক্তি ব্যবহার করার অনুমোদন দিয়েছেন, যা সাধারনত টেররিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। কিছু পার্লামেন্ট সদস্য এই নিয়ে আপত্তি জানালে তিনি পত্রপাঠ 'এমারজেন্সি-ডিক্রি' জারি করে ব্যাপারটি চালু করে দেন। 

আপনি বলতেই পারেন, এ আর এমন নতুন কথা কি? আজকালকার দিনে সরকার এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলি এর চেয়েও শক্তিশালী প্রযুক্তি ব্যাবহার করছে মানুষকে ট্র্যাক করার জন্যে, নজরে রাখার জন্যে, ম্যানিপুলেট করার জন্যে। কিন্তু তবুও বলবো, আমরা যদি সতর্ক না হই, তাহলে অচিরেই এই মহামারীটি 'মানুষের ওপর নজরদারি চালানোর' ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠবে। কারন, দু'দিন আগেও যাঁরা রাষ্ট্রের এই নজরদারি-ব্যবস্থাটির সোচ্চার বিরোধিতা করতেন, অ্যাবনর্মাল সিচুয়েশনে পড়ে তাঁরাও আজ নিজের থেকেই ব্যাপারটি নিপাট ভালো মানুষের মতো মেনে নিয়েছেন। তার চেয়েও বড় কথা হলো, সমগ্র নজরদারি-ব্যবস্থাটি 'চামড়ার ওপর' থেকে তার দৃষ্টিকে গেঁথে দিচ্ছে আরও গভীরে, 'চামড়ার ভেতরে'! এর আগে পর্যন্ত, আপনার আঙুলটি একটি মোবাইল ফোনের স্ক্রিন টাচ্‌ করলে অথবা কোনও লিঙ্কে ক্লিক করলে সরকার বড়জোর জানতে পারতো যে আপনি কোন্‌ লিঙ্কে ক্লিক করেছেন। এখন সরকার আপনার আঙুলের তাপমাত্রা এবং চামড়ার নীচের ব্লাড-প্রেশারও জানতে পারবে। ড্রামাটিক চেঞ্জই বটে!  

*এমারজেন্সি পুডিং*
মুশকিল হলো, আজকের নজরদারি-ব্যবস্থায় আমরা কেউই জানি না যে ঠিক কিভাবে আমাদের জরীপ করা হচ্ছে, অথবা আগামী দিনেই বা ঠিক কি কি ঘটতে চলেছে। নজরদারি-প্রযুক্তি সাংঘাতিক দ্রুতবেগে ডেভালপ করছে। ১০ বছর আগেও যেগুলো কল্পবিজ্ঞানের গপ্প মনে হতো, আজ সেগুলো নিছকই প্রস্তর-যুগের প্রযুক্তি বলে মনে হয়। কল্পনার খাতিরে, মনে করুন সরকার বললো যে প্রত্যেক নাগরিককে একটা করে 'বায়োমেট্রিক-ব্রেসলেট' পরতে হবে, যা ২৪ ঘন্টা ধরে আপনার ব্লাড-প্রেসার এবং শরীরের তাপমাত্রা মাপবে। সেই তথ্যগুলো তারপর অ্যালগোরিদমে ফেলে সরকার খতিয়ে দেখবে। আপনি অসুস্থ কিনা, সেটা আপনি নিজে টের পাওয়ার আগেই অ্যালগোরিদমগুলি ব্যাপারটা বুঝে ফেলবে। আপনি কোথায় কোথায় ছিলেন, কার কার সাথে দ্যাখা করেছেন, সেটাও সরকার পরিষ্কার বুঝতে পারবে। ইনফেকশনের চেন-কে এই পদ্ধতিতে ছোট করে আনা, এমনকি একেবারে কেটে ফেলাও সম্ভব। এই ধরনের একটা সিস্টেম মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই করোনার মতো মহামারী রুখে দিতে পারে। ফাটাফাটি ব্যাপার, তাই না? 

কিন্তু সমস্যাটা হলো, এটাই আবার একটা ভয়াবহ নজরদারি-ব্যবস্থাকেও সমাজে বৈধতা দেবে। এদ্দিন পর্যন্ত আমি মোবাইলে 'ফক্স নিউজের' একটি ভিডিও লিঙ্কে ক্লিক করেছি, নাকি 'সি.এন.এন'-এর, তা থেকে আপনি বড়জোর আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বুঝতে পারতেন, কিংবা খুব বেশী হলে আমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে। কিন্তু এবার আপনি তার সাথে সাথে আমার হার্ট-রেট, ব্লাড-প্রেসার অথবা বডি-টেম্পারেচার দেখে এটাও বুঝতে পারবেন যে ওই ভিডিওটি দেখে আমি হাসলাম, কাঁদলাম, নাকি প্রচন্ড রেগে গেলাম!    

মাথায় রাখতে ভুলবেন না, রাগ – আনন্দ – একঘেঁয়েমি – ভালোবাসা হলো জ্বর অথবা কাশির মতোই জৈবিক ক্রিয়াকলাপ। কাশি-শনাক্তকারী একই প্রযুক্তি হাসিকেও চিহ্নিত করতে পারে। কর্পোরেট সংস্থা অথবা সরকারগুলি যদি পাইকারি রেটে আমাদের এই বায়োমেট্রিক-ডেটা অ্যানালাইসিস করে, তাহলে আমাদের নিজেদের চেয়েও ভালোভাবে ওরা আমাদের বুঝতে পারবে। ওরা কেবল আমাদের অনুভুতিগুলির পূর্বাভাসই পাবে না, চাই কি সেগুলোকে ম্যানিপুলেটও করতে পারবে। এবং সর্বোপরি সেই পদ্ধতিতে ওরা আমাদের কাছে যা ইচ্ছে তাই বেচে দিতে পারে, সেটা একটা পণ্যই হোক, অথবা একটা বিশেষ রাজনীতি। বায়োমেট্রিক নজরদারির কাছে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার ডেটা-হ্যাকিং কৌশলও জাস্ট শিশু। ২০৩০ সালের উত্তর কোরিয়ার একটি সিচুয়েশন কল্পনা করুন। আপনার কব্জিতে বায়োমেট্রিক-ব্রেসলেট লাগানো রয়েছে। আপনি রাষ্ট্র-নায়কের ভাষণ শুনতে শুনতে ভীষণ রেগে উঠছেন। ওমনি বায়োমেট্রিক-ব্রেসলেট সেটা ধরে ফেললো। আপ্‌ তো গ্যায়া!  

এমারজেন্সি পরিস্থিতিতে একটি 'অস্থায়ী ব্যবস্থা' হিসাবে বায়োমেট্রিক-নজরদারিকে আপনি অবশ্যই অ্যালাউ করতে পারেন। কিন্তু এই 'অস্থায়ী ব্যবস্থা'গুলির একটা খারাপ স্বভাব হলো এমারজেন্সি কেটে গেলেও এরা বহাল তবিয়তে থেকে যেতে চায়। কারন, দেশে নিত্য-নতুন এমারজেন্সি পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার তো আর বিরাম নেই! আমার স্বদেশ ইজরায়েলে ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই রকম জরুরী অবস্থা জারি হয়েছিলো। তাতে প্রেস-সেন্সরশিপ থেকে শুরু করে জমি বাজেয়াপ্তকরন হয়ে পুডিং তৈরির পদ্ধতির ওপরেও (আমি একদম ইয়ার্কি মারছি না) কিছু 'অস্থায়ী বিধি-নিষেধ' আরোপিত হয়েছিলো। বহুদিন হয়ে গেলো স্বাধীনতা যুদ্ধে ইজরায়েল জিতেছে। তারপর থেকে আর কখনও জরুরী অবস্থা জারিও করেনি। কিন্তু ১৯৪৮ সালে জারি হওয়া সেই 'অস্থায়ী বিধি-নিষেধ'গুলোর মধ্যে বেশ কিছু পরবর্তীতে দিব্যি স্থায়ী ভাবেই রয়ে যায় (মাত্র এই সেদিন, ২০১১ সালে, সেদিনের সেই জরুরী 'পুডিং-ডিক্রি'টি সরকার দয়া করে বাতিল করলো)!   

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ থেমে গেলেও বেশ কিছু দেশের তথ্য-লোভী সরকার বায়োমেট্রিক নজরদারি চালিয়েই যেতে চাইবে। তখন তাদের অজুহাত হবে, করোনা-সংক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ আসতে চলেছে ... অথবা মধ্য আফ্রিকায় একটি নতুন ইবোলা ভাইরাস ধরা পড়েছে ... অথবা অন্য কিছু। ব্যাপারটা নিজেই বুঝে নিন। আমাদের প্রাইভেসি বজায় রাখতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটা বড় লড়াই চারদিকে শুরু হয়েছে। করোনা-সঙ্কট সেই লড়াইয়ে একটা টিপিং-পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে। 'প্রাইভেসি' আর 'হেলথ'-এর মধ্যে মানুষকে কোনও একটা বেছে নিতে বললে স্বাভাবিক ভাবে সে 'হেলথ'-কেই বেছে নেবে। 

*সাবান পুলিশ* 
কিন্তু মানুষকে 'প্রাইভেসি' আর 'হেলথ'-এর মধ্যে কোনও একটাকে বেছে নিতে বলাটাই বিরাট গোলমেলে ব্যাপার। এটা কি 'বেছে নেওয়ার' মতো কোনও বিষয় নাকি? 'প্রাইভেসি' আর 'হেলথ', এই দুটোই তো আমার চয়েস। এই দুটো জিনিসের ওপরেই তো আমার অধিকার থাকা উচিৎ। আমাদের স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত রাখতে এবং করোনা-সংক্রমণকে আটকাতে আমরা 'সর্বব্যাপী নজরদারি ব্যবস্থা'র বদলে 'নাগরিক ক্ষমতায়ন'কেও বেছে নিতে পারি। দক্ষিন কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং তাইওয়ান এই পদ্ধতিতে করোনা-সংক্রমণ রুখতে দুর্দান্ত সাফল্য পেয়েছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে কিছু কিছু 'নজরদারি ব্যবস্থা' ওরাও নিয়েছিলো। কিন্তু মূলত ওরা নির্ভর করেছিলো ব্যাপক টেস্টিং-এর ওপর, ওয়েল-ইনফর্মড নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত রিপোর্টিং এবং সহযোগিতার ওপর। 

কেন্দ্রীয় নজরদারি এবং কঠোর শাস্তির সাহায্যেই কেবল মানুষকে দিয়ে কার্যকারী-গাইডলাইন মানিয়ে চলানো যায়, এটা ভুল ধারনা। সরকার যদি নিষ্ঠার সাথে মানুষের কাছে বৈজ্ঞানিক ভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরে, মানুষের কাছে সরকারের যদি বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়, তাহলে ঘাড়ের ওপর সর্বক্ষণ কোনও 'বিগ ব্রাদার' নিঃশ্বাস না ফেললেও মানুষ গাইড-লাইন মেনে চলে। নিজের থেকেই। সাধারণ ভাবে বলতে গেলে একটি স্বতঃপ্রানিত এবং সচেতন জনগোষ্ঠী, পুলিশের ডান্ডার ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা অজ্ঞ একটি জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশী কার্যকরী।   

'সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার' বিষয়টাকেই দেখুন। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে এটা একটা যুগান্তকারী ব্যাপার ছিলো। ছোট্ট এই পদক্ষেপটা আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে চলেছে। অথচ সেভাবে দেখলে মাত্র এই সেদিন, ১৯শতকে বিজ্ঞানীরা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তার আগে এমনকি ডাক্তার-নার্সরাও হাত-টাত না ধুয়েই একটার পর একটা অপরেশন করতেন। আজকে যে কোটি-কোটি মানুষ নিজের থেকেই রোজ সাবান দিয়ে হাত ধোয়, তার পিছনে কি কোনও 'সাবান-পুলিশের' চোখরাঙানি আছে? একদম নয়। বরং তারা সহজ-সরল একটা বৈজ্ঞানিক সত্যকে বুঝতে পেরেছে। আমি সাবান দিয়ে হাত ধুই, কারন আমি জানি যে ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসের মতো ক্ষতিকর জীবানুগুলো সাবান দিয়ে হাত ধুলে নষ্ট হয়ে যায়। সিম্পল। 

তবে গণ-সম্মতি এবং সহযোগিতার এ'রকম একটি স্তরে পৌঁছতে গেলে একটা বিষয় লাগবেই, সেটা হলো 'বিশ্বাস'। মানুষকে বিজ্ঞানের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, সরকারি কর্তৃপক্ষের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, মিডিয়ার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। বিগত কয়েকটা বছর ধরে দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে, সরকারি কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসযোগ্যতাকে এবং মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন। এখন সেই দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকগুলোই আরও কর্তৃত্ববাদের রাস্তায় দেশকে নিয়ে যেতে পারে এই যুক্তিতে, যে, 'সঠিক রাস্তায় চলতে গেলে আম-পাবলিকের কথা শুনলে চলে না'!  

সাধারণভাবে, বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে নষ্ট হয়ে যাওয়া বিশ্বাস রাতারাতি ফিরে আসে না। তবে এটাও ঠিক যে এখন নর্মাল সময় নয়। সঙ্কটকালীন মুহূর্তে মনেরও দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। আপনি বছরের পর বছর ধরে আপনার ভাই-বোনদের সাথে তিক্ত তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু পরিবারে একটা সঙ্কট আসুক। ওমনি দেখবেন পারস্পরিক আস্থা আর ভালোবাসার বন্ধন আপনাদেরকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সর্বব্যাপী নজরদারি-ব্যবস্থার বদলে বিজ্ঞান, সরকারী কর্তৃপক্ষ এবং মিডিয়ার ওপর মানুষের বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ করতেও আবার খুব বেশি দেরি হয় না। আমাদের অবশ্যই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত, তবে এই প্রযুক্তিগুলো যেন নাগরিকদের ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করে। আমি অবশ্যই আমার শরীরের তাপমাত্রা এবং রক্তচাপ মনিটারিং-এর পক্ষে, তবে সেই ডেটা যেন কোনভাবেই একটা 'সর্বশক্তিমান সরকার' গঠনের জন্য ব্যবহার করা না হয়। বরং সেই ডেটা যাতে আমাকে আরও ওয়েল-ইনফর্মড একজন নাগরিক হিসাবে আমার চয়েস বেছে নিতে সাহায্য করে, এবং সরকারকেও তার পদক্ষেপের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। 

আমি যদি ২৪ঘন্টা আমার মেডিকেল-কন্ডিশন ট্র্যাক করতে পারি, তাহলে অন্যের জন্য আমি বিপদের কারন হয়ে উঠছি কিনা সেটা যেমন বুঝতে পারবো, তেমনি নিজের ভালোটাও একই সাথে খেয়াল করতে পারবো। আমি যদি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য তথ্য অ্যাক্‌কেস করতে পারি, অ্যানালাইসিস করতে পারি, তাহলে সরকার এই সংক্রমণ রুখতে ঠিক কি কি করছে, সেটাও আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। মনে রাখবেন, যে প্রযুক্তি দিয়ে সরকার আমাদের ওপর নজরদারি করে, সেই একই প্রযুক্তি দিয়ে চাইলে আমরাও সরকারের ওপর নজরদারি চালাতে পারি।

করোনা-মহামারী, সেই হিসাবে নাগরিকত্ব-কেও একটা বড় পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আসুন আমরা নির্ভর করি কেবলমাত্র বিজ্ঞান-সম্মত তথ্য এবং স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞদের ওপর, কোনও মতেই ভিত্তিহীন 'কন্সপিরেসি-থিওরি' অথবা স্বার্থপর রাজনৈতিক নেতাদের ওপর নয়। সঠিক চয়েসটা বেছে নিতে না পারলে হয়তো আমরা আমাদের পরম প্রিয় ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়ে ফেলবো স্রেফ এটা ভেবে, যে নিজের শরীর-স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে এ'ছাড়া আমার আর অন্য কিছুই করার ছিলো না। 

*আমাদের একটা গ্লোবাল-প্ল্যান দরকার*
এবার আসা যাক দ্বিতীয় চয়েসটি প্রসঙ্গে। 'জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা' ও 'বিশ্বব্যাপী সংহতির' মধ্যে কোনটিকে আমরা বেছে নেবো? করোনা-সংক্রমণ এবং তজ্জনিত অর্থনৈতিক সঙ্কট, দুটোই হলো গ্লোবাল-ক্রাইসিস। দুনিয়া জোড়া সঙ্কট। কাজেই বিশ্বব্যাপী সহযোগিতার মাধ্যমেই একমাত্র এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। 

করোনা-সংক্রমণকে আটকাতে সবার আগে দরকার দুনিয়া জুড়ে তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান। এই জায়গাটায় আমরা, মানুষরা, করোনা ভাইরাসের তুলনায় এগিয়ে। মানুষকে আক্রমণ করার ব্যাপারে চীনের একটি করোনা ভাইরাস, আমেরিকার একটি করোনা ভাইরাসকে কার্যকরী টিপ্‌স দিতে অক্ষম। কিন্তু চীনের মানুষ আমেরিকার মানুষকে করোনা-সংক্রমণ রোখার ব্যাপারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ টিপ্‌স দিতে পারে। একজন ইতালিয়ান ডাক্তার সকালবেলায় মিলান শহরে বসে যা আবিষ্কার করলেন, তা সন্ধ্যের মধ্যেই তেহ্‌রানে অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পারে। যখন ইংল্যান্ডের সরকার অনেকগুলি আর্জেন্ট স্টেপের মধ্যে কোন্‌টি আগে নেওয়া উচিৎ তাই নিয়ে কনফিউশনে পড়ে, তখন কোরিয়া তাকে দারুণ ভাবে সাহায্য করতে পারে, যারা হয়তো মাসখানেক আগেই ওই একই সমস্যায় পড়েছিলো। এ'সব কিছুই অসম্ভব নয়, তবে তার জন্য সবার আগে আমাদের মধ্যে বিশ্ব-ব্যাপী সহযোগিতা ও বিশ্বাসের মনোভাব গড়ে তোলা দরকার। 

দেশগুলোকে নিজেদের মধ্যে ইনফর্মেশন শেয়ার করার ব্যাপারে মুক্ত মনে এগিয়ে আসতে হবে। নম্র ভাবে অন্য দেশের কাছে পরামর্শ চাইতে হবে। অন্য দেশের দেওয়া তথ্য এবং বিশ্লেষণগুলোকে খোলা মনে গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে। টেস্টিং কিট এবং রেস্পিরেটরি মেশিনের মতো অত্যাবশ্যক মেডিকেল-ইক্যুইপমেন্টগুলি তৈরি করা এবং ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যও আমাদের একটা গ্লোবাল উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি দেশ আলাদা আলাদা করে এই কাজটি নিজের চৌহদ্দিতে করার বদলে যদি একটি গ্লোবাল উদ্যোগকে ঠিক ভাবে কোঅর্ডিনেট করা যায়, তাহলে জীবনদায়ী যন্ত্রগুলির আরও ব্যাপক উৎপাদন ও প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলির বিতরন সম্ভব। একটি যুদ্ধের সময় দেশগুলি যেমন মূল শিল্পগুলিকে 'জাতীয়করণ' করে, তেমনি করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানব-যুদ্ধের সময় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন-লাইনকে 'মানবিক' করার প্রয়োজন হতে পারে। 'ন্যাশনালাইজ' করার বদলে দরকার হতে পারে 'হিউম্যানাইজ' করা। অল্প কিছু করোনা-আক্রান্ত রোগী আছে, এমন কোনও ধনী দেশকে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে বহুমূল্য সরঞ্জাম পাঠিয়ে দিতে হবে সেই সব গরীব দেশে, যেখানে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা অনেক। সেই ধনী দেশকে এটা বিশ্বাস করতে হবে যে প্রয়োজনে সে-ও একই রকমের সাহায্য পাবে অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে। 

চিকিৎসকদের একজোট করার জন্যও আমরা এ'রকম একটা গ্লোবাল-উদ্যোগ নিতে পারি। কম আক্রান্ত দেশগুলো তাদের চিকিৎসকদের পাঠাতে পারে বেশী আক্রান্ত দেশগুলোতে। তাতে, প্রয়োজনীয় সাহায্য করাও হবে, আবার সেই চিকিৎসকরা অমূল্য অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিজের দেশে ফেরার পর সেটা কাজেও লাগাতে পারবেন। মহামারীর ভরকেন্দ্র উল্টে গেলে, সাহায্যের গতিমুখকেও উল্টে দিতে হবে।     

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এই একই রকমের গ্লোবাল-সহযোগিতা প্রয়োজন। গ্লোবাল-ইকোনমির যুগে প্রতিটি দেশের সরকার যদি অন্যের স্বার্থকে উপেক্ষা করে খালি নিজের স্বার্থ দেখে, তাহলে সামগ্রিক ভাবে ক্যাওস বাড়বে বৈ কমবে না; দুনিয়া জোড়া অর্থনৈতিক সঙ্কট আরও গভীরই হতে থাকবে। আমাদের একটা গ্লোবাল-প্ল্যান-অফ্‌-অ্যাকশন চাই। এবং সেটা এক্ষুনি।

আরও একটা জিনিস দরকার। সেটা হলো পৃথিবীর এ'প্রান্ত থেকে ও'প্রান্তে যাতায়াত করার জন্য একটি গ্লোবাল-বোঝাপড়া। মাসের পর মাস ধরে আন্তর্জাতিক যাতায়াত বন্ধ করে রাখলে তা পরিস্থিতিকে আরও বিগড়ে দেবে। করোনা-সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই তাতে আখেরে দূর্বলই হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের একটি লিস্ট বানিয়ে তাঁদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করার ব্যাপারে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করুক, এটাই কাঙ্খিত। একটা কমন বোঝাপড়ার ভিত্তিতে প্রথমে প্রতিটা দেশ তার নিজের দেশের এই ধরনের মানুষদের স্বাস্থ্য-পরীক্ষা করুক, যাঁরা অন্য দেশে যাবেন। আপনি যখন নিশ্চিত হবেন যে ভালো ভাবে পরীক্ষা করা একদল নীরোগ, সুস্থ-সবল কাজের মানুষই কেবল প্লেনে করে আপনার দেশে আসছে, দেখবেন আপনার টেনশনও কমবে। আপনিও তাতে উৎসাহীই হবেন। 

দুঃখের বিষয়, বর্তমানে খুব কম দেশই এ'সব নিয়ে ভাবছে। আন্তর্জাতিক ভাবেই আমরা প্যারালাইসড হয়ে পড়ছি। মনে হচ্ছে একটা বদ্ধ ঘরে কিছু বাচ্চা আটকে পড়েছে, যেখানে বড়রা কেউ নেই। গত সপ্তাহে সারা পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্রনায়কদের একটা এমারজেন্সি মিটিং হবে বলে মনে হয়েছিলো, যাতে করে অন্তত একটা কমন প্ল্যান বানানো যায়। এই সপ্তাহে জি-সেভেনের নেতারা কোনোক্রমে একটা ভিডিও-কনফারেন্স করেছেন বটে, কিন্তু কাজের কাজ কিস্যুই হয়নি। 

অতীতে এই ধরনের সঙ্কটকালীন পরিস্থিতিতে, যেমন ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কটই হোক অথবা ২০১৪ সালের ইবোলা-মহামারী, আমেরিকা একটা বিশ্ব-নেতৃত্বসুলভ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলো। এবারে নেতার ভূমিকা থেকে সে পরিষ্কার ইস্তফা দিয়ে দিয়েছে। মার্কিন-মহত্ত্বকে আঁকড়ে ধরাই এখন তার কাছে প্রায়োরিটি, বিশ্ব-মানবতার ভবিষ্যতের চেয়েও। 

এই মার্কিন প্রশাসন এমনকি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরও ত্যাগ করেছে। ইউরোপিয়ন ইউনিয়ন থেকে আমেরিকায় ঢোকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার আগে এরা একবার বিষয়টা আগাম জানানোর পর্যন্ত প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি। জার্মানির একটি ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাকে ১বিলয়ন ডলার দিয়ে করোনা ভাইরাসের ভ্যাক্সিনের একচেটিয়া অধিকার কিনতে চেয়ে এরা জার্মানিকেও কলঙ্কিত করেছে। এমনকি এই মার্কিন প্রশাসন আজ যদি হঠাৎ ভোল পালটে কোনও গ্লোবাল-প্ল্যান নেয়ও বা, তাহলেও খুব কম দেশই তাকে নেতা বলে মানবে, যে নেতা আবার কখনোই কোনও দায়িত্ব নেয় না, যে নেতা কখনোই নিজের ভুল স্বীকার করে না এবং যে নেতা সবসময়েই অন্যের ঘাড়ে সমস্ত দোষ চাপিয়ে ক্রেডিটের পুরোটা নিজে মেরে দেয়। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ফেলে যাওয়া শূন্যস্থানকে যদি দ্রুত অন্য দেশগুলি পূরণ করতে না পারে, তাহলে বর্তমান মহামারীটিকে সামলানো তো কঠিন হবেই, তার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলোও আগামী দিনে আরও বিষিয়ে উঠবে। প্রতিটি সঙ্কট তবু একটি সুযোগকেও সামনে আনে। আমরা আশা করবো করোনা-মহামারী, পৃথিবীর দেশে-দেশে বর্তমান বিভেদের সাংঘাতিক বিপদটা সম্পর্কে মানবজাতিকে সতর্ক করবে।

বিশ্ব-মানবতার সামনে আজ দুটো রাস্তা খোলা। যে কোনও একটা বেছে নিতে হবে। আমরা কি বিভেদ-বৈষম্যের সঙ্কীর্ণ পথেই পা বাড়াবো? নাকি বিশ্ব-সংহতির পথে? যদি আমরা অনৈক্যের পথ বেছে নিই, তাহলে তা শুধু এখনকার সঙ্কটকেই দীর্ঘায়িত করবে না, ভবিষ্যতে এর চেয়েও আরও খারাপ সঙ্কটকে ডেকে আনবে। আর আমরা যদি বিশ্ব-ব্যাপী সংহতি তথা সৌভ্রাতৃত্বের পথকে বেছে নিই, তাহলে তা শুধু করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধেই নয়, ভবিষ্যতের সমস্ত মহামারী তথা সঙ্কটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের জয়কে নিশ্চিত করবে। একবিংশ শতাব্দীতে গভীর ভাবে প্রভাবিত হবে গোটা মানব জাতি।

**********************************************

ইউভাল নোহা হারারি একজন ইজরায়েলি ঐতিহাসিক। "সাপিয়েন্স" গ্রন্থটির জন্য মূলত বিশ্ব ওনাকে চিনেছে। সম্প্রতি উনি The world after corona virus শীর্ষক একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেন। আর্টিকেলটির বঙ্গানুবাদ করেছেন বিশ্বজিৎ হাজরা। বঙ্গানুবাদ এবং আর্টিকেল লিঙ্ক দুটোই দিলাম আগ্রহীরা পড়তে পারেন।

~ অনির্বান মাইতি

শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২০

ভাইরাস ও মানবজাতি ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

সেদিন ছিল ঘোর অমাবস্যা। চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের পরামর্শে সেদিন ১৩৪ কোটি মানুষের সম্পূর্ণ সঙ্গরোধে থাকবার নির্দেশ এসেছে। সম্ভবত আমরা তৈরী করতে চলেছি পৃথিবীতে সর্ববৃহৎ সঙ্গরোধের ইতিহাস।

কালকে জানালা দিয়ে দ্বিতীয়ার একফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, ধীরে ধীরে একদিন আসবে পূর্ণিমা। সেদিন কি চাঁদের সাথে পৃথিবীও একটু হাসবে? নাকি আরেক অমাবস্যার প্রতীক্ষায় তাকে ঘরে বন্দী হয়ে থাকতে হবে?

যে দিন মানুষ আবার হাসবে সেদিন কি সে মনে রাখবে এই দিনগুলোর কথা? সেদিন কি খবরের কাগজে প্রথম পাতায় জায়গা হবে আজকের বিজ্ঞানী, ডাক্তারদের? জায়গা হবে অসংখ্য সাধারণ মানুষের যারা এই অবস্থায় ঢাল তলোয়ারহীন হয়ে লড়ে যাচ্ছেন তাদের? নাকি আমরা হয়ে যাব 'পুনর্মূষিক ভব'!

যে বিজ্ঞানীরা লেবোরেটরিতে থেকে জনগণেশের তোয়াক্কা না করে ৭৮০ কোটি মানুষকে বাঁচাতে নিরন্তর সাধনা করে চলেছেন সেদিনের চাঁদের আলোয় কি বিজ্ঞানে উৎসর্গীকৃত এই মৌন সাধকদের কথা আমরা জানতে পারব? 
একবার তাদের জন্য সারা পৃথিবী উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট করব?

নাকি ফিরে যাব স্টারডম, ভোটের কারসাজি, ধর্মীয় জিগির দেওয়া বিভেদসৃষ্টিকারী গুরুদের ফাঁপা কথায় !

যে সাধকরা আমাদের আয়ু বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুন করে তাদের কথা কাগজে পাবেন না। বিজ্ঞান থাকে না খবরের কাগজে। ওগুলো ঠিক সমসাময়িক নয়, ওই খবরগুলো ভীষণ ক্লান্তিকর, আমাদের জিভে লালা ঝরান উত্তেজনা আনে না। 

আমরা ৯৯.৯৯% সময়ে ব্যস্ত থাকি নায়ক ও নায়িকাদের জীবনের গুপ্ত কথা জানতে, নেতা ও নেত্রীদের দলবাজিতে গা ভাসাতে, অবৈজ্ঞানিক ধর্মীয় গুরুদের জিগির শুনতে।

তাই শেষ পর্যন্ত কিছু 'জনপ্রিয়' মানুষ পাঁচ পুরুষের জন্য সংস্থান করে যায়, আর বিজ্ঞানের কথা মনে আসে এই ক্রান্তিকালে।

আমরা হয়ত শিক্ষা নেব। 

ভাবতে ভাল লাগে একমাস বাদে পরের অমাবস্যায় পৃথিবী থেকে হয়ত কালো অন্ধকার কিছুটা ঘুচে যাবে। প্রতিপদের চাঁদের আলোয় নতুন পৃথিবী উদ্ভাসিত হবে। হয়ত সেই সময়ে অতি ক্ষুদ্র মানুষ বুঝবে আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, শিক্ষায় অধিক অর্থ বরাদ্দ করা।

হয়ত সেই সময়ে রচিত হবে The Plague-এর মত আরেকটা মহাকাব্যিক রচনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ৭০ বছর আগে উত্তর আফ্রিকার একটি শহরে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পরে আলবেয়ার ক্যামু লিখেছিলেন এক রূপকধর্মী উপন্যাস।

মৃত্যুর প্রতীক্ষায় মানুষের প্রতিক্রিয়া। 

কারণ এই শেষ নয়, আমরা যদি নিজেদের না পাল্টাতে পারি আবার আসবে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ভাইরাস; তারা বুঝবে না রাজপুত্র ও ভিখারির তফাৎ, জানবে না ষ্টার গায়িকা ও রেলের সাধারণ যাত্রীর পার্থক্য - ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে। 

এইবার অনেক দুঃখ, অনেক মৃত্যুর বিনিময়ে আমরা মুক্তি পাব। 

তবে পূর্ণ মুক্তি আসবে তখনই, যখন মানবজাতির রক্ষাকার্যে সকলে মিলে নিয়োজিত হব। সম্মান দেব আমাদের প্রকৃত রক্ষাকর্তাদের। অগ্রাধিকার দেব মানুষের একত্রিত যাত্রায়, বেঁচে থাকার  জন্য প্রকৃত প্রয়োজনে।

ভাইরাসকে আটকাতে সমাজের ভাইরাসদের সমূলে উৎপাটিত করতে হবে।

Madhusree Bandyopadhyay
27/03/2020

বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২০

করোনা ভাইরাস ও চীন ~ সুশোভন পাত্র

ভাবুন আপনি আছেন চিনের Wuhan শহরে। করোনা ভাইরাস প্যান্ডেমিকের আঁতুড়ঘরে! 
না, আমি জানি আপনি টুনি বাল্ব থেকে মোবাইল, সস্তার টর্চ থেকে মেয়ের খেলনা –যে কোন জিনিসের শীঘ্রপতনেই 'চায়না মাল' বলে খিল্লি করেন, কালীপূজায় হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির কৃতী ছাত্র হিসেবে 'চাইনিজ বাজি' বর্জন করে বেজিং-র অর্থনীতি কে হেব্বি ধাক্কা দিয়ে দু-পেগ রাম সেবন করেন; তাহলে কোন দুঃখে আপনি চিনের Wuhan শহরে থাকতে যাবেন? সুপারপাওয়ার না ছাই! 
তবুও একটু কষ্ট করেই না হয় ভাবুন, আপনি আছেন চিনের Wuhan শহরে! আপনি আছেন করোনা ভাইরাস প্যান্ডেমিকের এক্কেরে আঁতুড়ঘরে! 
প্যান্ডেমিকের সতর্কতায় Wuhan-এ 'কমপ্লিট লকডাউন'। এমনিতে 'কমপ্লিট লকডাউন' শব্দটায় থ্রিলিং একটা ব্যাপার আছে! কিন্তু মুশকিল হল, 'কমপ্লিট লকডাউন' বিষয়টা এক্সিকিউট করার ক্ষেত্রে তার থেকে অনেক বেশি চাপ আছে। কারণ 'কমপ্লিট লকডাউনে' মানুষ ঘরে বসে থাকে, কর্পূরের মত উবে তো আর যায় না! তাঁরা স্নান করে, গান শোনে, প্রেম করে, খাবার খায়, এমনকি তাঁদের আমাশাও হয়। তাই 'কমপ্লিট লক ডাউনে'ও Wuhan-এ নাগরিক জীবন স্বাভাবিক রাখতে চিন সরকার ঘোষণা করেছে, মাসিক বিল বকেয়া থাকলেও নাগরিকদের ইলেকট্রিক, জল, ইন্টারনেট, টেলিফোন সহ কোন জরুরী পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কিন্তু তা হলেই বা! এসবে কি মানুষের পেট ভরে? এমনিতে যে সুইগি-জোমেটোর যুগে ঘরে বসেই যে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য খাওয়াই যায় সেটা আমার ৩ বছরের মেয়েও জানে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল অনলাইন ফুড ডেলিভারির বিশালতা। 'কমপ্লিট লকডাউন'-র সময় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১কোটি ৫০লক্ষ মানুষ Wuhan-এ অনলাইন খাবার অর্ডার করেছেন এবং ডেলিভারি পেয়েছেন¹।   
সে না হয় হল! কিন্তু খেয়ে আবার আমাশা হলে কি হবে? কারও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রয়োজন হলে কি করবে? দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না বুঝেই প্রাথমিক চিকিৎসার ৫০%-ই অনলাইন করেছে চিন। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট থেকে প্রেসক্রিপশন, এমনকি ওষুধ ডেলিভারি –সবটাই অনলাইনে। প্যান্ডেমিকের আতঙ্কে বিশ্বের তাবড় শহরে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের হাহাকার। লন্ডনের শপিং মলে মামুলি টয়লেট পেপার নিয়ে হাতাহাতি হচ্ছে। ইতালির সুপার মার্কেটে গ্রোসারি জাস্ট ছবি হয়ে যাচ্ছে। খোদ কলকাতায় স্যানেটাইজার খুঁজতে আপনার প্যান্টালুন হলুদ হয়ে যাচ্ছে। আর চিন সমস্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার সমস্ত কাজ থামিয়ে, জরুরী ভিত্তিতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনে নিয়োগ করেছে। আলপিন থেকে এলিফ্যান্ট চিনে পাওয়া যাচ্ছে সবই, সুলভে²! 
এসবই তো গেলো সতর্কতা। ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় কি ম্যাজিক দেখাচ্ছে চিন? ম্যাজিকই বটে! ২০০২-র সার্স ফ্লু-র সময় গোটা দেশে যে অসংখ্য 'ফিভার ক্লিনিক' বানিয়েছিল চিন, সেই ফিভার ক্লিনিকই এখন চিকিৎসার প্রাথমিক স্তর। ফিভার ক্লিনিকের পরীক্ষায় যদি COVID19-র কোন লক্ষণ দেখা যায় তাহলে হচ্ছে বাকায়দা সিটি স্ক্যান! কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে এক্স-রে নয়, COVID19 আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসফুসের 'গ্রাউন্ড-গ্লাস-অপাসিটিস' কার্যকরী ভাবে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে সিটি স্ক্যানেই। দিনে ২০০টা সিটি স্ক্যান করছে চিনের প্রতিটি মেশিন। আপনার ধারেপাশে খোঁজ নিয়ে দেখুন, সংখ্যাটা ৫০ পেরুবে না। সিটি স্ক্যানেও যদি COVID19-র লক্ষণ থাকে তখন পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে আক্রান্ত কে ক্যাটাগোরাইজেশন করা হচ্ছে -মাইল্ড, সিভিয়ার, কিম্বা ক্রিটিক্যাল। মাইল্ড আক্রান্তদের জন্য অপেক্ষা করছে চিনের স্টেডিয়াম, জিমনাসিয়াম, স্কুল, কমিউনিটি হল দখল করে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা অসংখ্য আইসোলেশন সেন্টার। আর সিভিয়ার বা ক্রিটিক্যালদের জন্য হাসপাতাল। 
করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষান করেছে চিন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪০,০০০ মেডিক্যাল কর্মী পৌঁছে গেছে Wuhan-এ³। কালকে যিনি ছিলেন হোটেলের রিসেপসনিস্ট আজ তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে জ্বর মাপছেন। পরশু যিনি নির্মাণ কর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন আজ তিনি সিচুয়ানের প্রত্যন্ত গ্রামে স্বাস্থ্য শিবির করছেন। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৬লক্ষ টেস্ট করার মেডিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার বানিয়েছে চিন। ১০দিনে ৬৪৫,০০০ স্কয়ার ফুটের হাসপাতালে দাঁড় করিয়েছে চিন⁴। আক্রান্তদের মোবাইল ডেটা-স্যাম্পল থেকে 'কন্টাক্ট পয়েন্ট' ট্রেস করে রুগীর সংস্পর্শে আসা সকলকে আইসোললেট করার চেষ্টা করেছে চিন⁵। আর তাই, ডিসেম্বরও আক্রান্ত কাউকে চিহ্নিত করে চিকিৎসা শুরু করতে যেখানে ১৫ দিন সময় লাগছিল চিনের, এখন সেটা কমে গড়ে ২দিন। ডিসেম্বরও যেখানে প্রতিদিন ৪৬,০০০ সন্দেহভাজন কেস আসছিল চিনে এখন সেটা কমে ৫-১০। 
কি ভাবছেন 'চিনের দালাল'? 'চিনের প্রেসিডেন্ট আমার প্রেসিডেন্ট'? রেড আর্মির পুরনো পাপী? আরে চাপ নেবেন না! কারণ উপরের এই তথ্য গুলো মাও সে তুং বলেননি কিম্বা লি শাও চি লিখে যাননি। বলছে খোদ WHO-র যে টিম ফেব্রুয়ারি তে চিনে গিয়েছিল সেই টিমের লিডার; পোলিও, এবোলার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের লড়াই'র ক্রুসেডর ডঃ ব্রুস আইলওয়ার্ড। নিউইয়র্ক টাইমসের সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন "চিন সরকার COVID19 আক্রান্তদের টেস্ট এবং চিকিৎসার সমস্ত খরচা বহন করছে। আর এখানেই চিন দৃষ্টান্তমূলক। চিনের অভাবনীয় লড়াইর জন্যই গোটা বিশ্ব নিজেদের প্রস্তুত করতে কমপক্ষে ২সপ্তাহ সময় হাতে পেয়েছে।" 
আর অন্যদিকে প্যান্ডেমিকে ক্যাপিটালিজমের পিতামহ ভীষ্ম, আমেরিকার অবস্থা লেজে গোবরে⁶। ২০১৮তে ট্রাম্প সরকারী স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থায় ৮০% বরাদ্দ ছাঁটাই করে, শূন্য পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে আমেরিকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কে ঠেলে দিয়েছিলেন আরও বেসরকারিকরণের পথে⁷। প্যান্ডেমিকের প্রাদুর্ভাবে তারই মাশুল গুনছেন সাধারণ নাগরিকরা। সাধারণ ডাক্তার ভিজিটের খরচা ১৪৯-১১৫১ ডলারে ঘোরাফেরা করছে⁸। বেসরকারি ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসের টেস্ট করাতে  ৩,২৭০ ডলার খরচা হচ্ছে⁹। কিছু প্রভিন্সে নামমাত্র সরকারি ভর্তুকির ঘোষণা করলেও গোটা আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের টেস্ট এবং চিকিৎসা মূলত বেসরকারি এবং ব্যাপক খরচা সাপেক্ষ। গোদের উপর বিষফোঁড়া ৩কোটি আমেরিকানদের কোন মেডিক্যাল ইনস্যুরেন্সই নেই, আরও ৪কোটির ইনস্যুরেন্স থাকলেও ব্যাপক খরচা কভার করতে অপর্যাপ্ত¹⁰। তাই চিনে যেখানে প্রতি ১০লক্ষ মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাসের টেস্ট হচ্ছে গড়ে ২,৮২০জনের, আমেরিকায় সেটা মাত্র ২৩জনের¹¹। আমেরিকায় তীব্রতর হচ্ছে প্যানিক। মুডি অ্যানালেটিক্সের অনুমান প্যান্ডেমিকে ক্যাসকেডিং এফেক্টে কর্মহীন হতে পারেন ৮ কোটি মানুষ¹²।   
বিশেষজ্ঞদের মতে সামনের কয়েক সপ্তাহে অগ্নিপরীক্ষা ভারতের। জানি, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রাতারাতি বদলাবে না। কিন্তু সরকারের পলিসি মেকিং-র প্রায়োরিটি তো বদলাতে পারে। হাতে গরম উদাহরণ তো রইলোই। একদিকে ক্যাপিটালিস্ট আমেরিকা। যারা স্বাস্থ্য পরিষেবা কে প্রফিটের জন্য বাজারের উপর ছেড়ে, সেনসেক্স আর নিফটি সূচকে বড়লোক শিল্পপতিদের পকেট ভরাতে, শ্রমিকদের পেড সিক লিভের আবেদন বাতিল করে¹³, ভাইরাসের 'কমিউনিটি স্প্রেড' আটকাতে 'কমপ্লিট লকডাউন' না করে সাধারণ মানুষ কে ঠেলে দিচ্ছে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। আরেকদিকে রইলো সমাজতান্ত্রিক চিন, যারা সেনসেক্স-নিফটি-প্রফিট কে গুলি মেরে, 'কমিউনিটি স্প্রেড' আটকাতে তৎক্ষণাৎ 'কমপ্লিট লকডাউন' করে, নাগরিক জীবন সচল রাখতে বকেয়া বিল মকুব করে, শ্রমিকদের পেড সিক লিভ মঞ্জুর করে, পুরো রাষ্ট্রশক্তি কে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে লাগিয়ে দিতে পারে, চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচা বহন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। হাতে গরম উদাহরণ তো রইলোই। একদিকে ক্যাপিটালিজম, যেখানে প্রফিট আগে, পরে মানুষ। একদিকে সমাজতন্ত্র, যেখানে মানুষ আগে, অন্য সবকিছু পরে। চয়েস ইস ইয়োর্স!













সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২০

করোনা ভাইরাস ~ স্বপন ভট্টাচার্য

নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে একজন মাইক্রোবায়োলজির মাস্টার হয়ে ফেবুতে কিছু না বললে ইজ্জত থাকে না। সুতরাং দু চার কথা আমি যা জানি আর যেভাবে বলতে ভালবাসি সেভাবে বলি। উৎসাহ না থাকলে এখানেই পাঠক ছেড়ে যেতে পারেন এই লেখা, কেন না কোনোদিক থেকেই বিশেষজ্ঞ হবার দাবি আমি করছি না।

নভেল করোনাভাইরাস নভেল কেন? কেন না করোনাভাইরাসের চলতি প্রকরণগুলির থেকে এটা কিছুটা আলাদা বা ব্যতিক্রমী তাই নভেল।
সাধারন করোনাভাইরাস তো তেমন মারাত্মক নয়, এটা এমন হল কি করে? এটা একটা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার গল্প। এমনিতে আমাদের শরীর অন্ততপক্ষে ১০০০০০০০০০০০০ রকমের সংক্রমনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম , কিন্তু তার একটা পুর্বশর্ত আছে। শরীরকে তার সাথে পরিচিত হওয়া দরকার। টীকাদান এরকম একটা পরিচিতি ঘটানোর উদাহরণ। মারক সংক্রমণের হাত থেকে তাতে বাঁচা যায় কেন না মানবশরীরের নিজস্ব একটা 'স্মৃতি' আছে। একবার পরিচিতি ঘটে গেলে সে দাঙ্গাকারী যতদিন পরেই আবার আসুক না কেন,শরীর তাকে স্মৃতি থেকে চিনে নিয়ে আটকে দেয়। ফলে ব্যারিকেডের ওধারে থাকা হামলাকারী সংক্রমণকে ঢুকতে হয় ট্রয়ের ঘোড়ার মত আপাতনির্বিষ হয়ে। নভেল করোনা হল ওই বহুদিন বেকার বসে থাকা গ্রীক সেনার মত প্রায় বেকার ভাইরাস যারা নিজেদের গঠণ একটু আধটু আড়াল করে ঢুকে পড়ছে শরীরে। এই প্রথম তার বদলানো রূপের সঙ্গে 'পরিচিত' হচ্ছে শরীর। এর কিছু প্রতিক্রিয়া আছে। যেমন বি সি জি নিলে বাচ্চার হয়,যেমন পোলিও প্রথমবার নিলে হয় ,তেমন এই চেনা পরিচিতির ফলস্বরূপ জ্বর, শ্বাসজনিত সমস্যা এসব হয়। মুশকিল আরো বাড়ে যখন এই অপরিচিত শত্রুর মোকাবিলায় ব্যস্ত শরীরকে আক্রমণ করে বসে অন্যান্য জীবাণু। সুতরাং নভেল করোনায় আক্রান্ত মানুষ ততদিন ভুগতে থাকবে যতদিন না শরীর এই চেনা পরিচিতিটা সম্পন্ন করে যথোচিত ব্যবস্থা নিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলবে। এই সময়টা দিতে হবে আক্রান্ত শরীরকে।
নভেল করোনা বয়স্কদের ক্ষেত্রেই মারাত্মক হয়ে উঠছে অথচ বাচ্চাদের মধ্যে তো মৃত্যুহার অতটা নয়। এটা কেন? আমার মনে হয় গত দশ পনের বছরে যে সব ইম্যুনাইজেশন প্রোটোকল WHO দ্বারা আবশ্যিক করা হয়েছে তা কিছুটা হলেও প্রোটেকশন দিতে পারছে বাচ্চাদের হয়তো অপ্রত্যক্ষভাবে, কিন্তু দিচ্ছে,সেটা MMR বা যার জন্যই হোক না কেন । নয়তো, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ফলাফল মারাত্মক হবার কথা। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক মানুষেরা, যাদের এইসব আধুনিক ইম্যুনাইজেশন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় নি তাদের শরীরকে এই পরিচিতি ঘটানোর ধকলটা নিতে হচ্ছে অনেক বেশি করে। যারা সেটা পারছে না তারা সহজেই অন্যান্য জীবাণুরও শিকার হয়ে পড়ছে এবং মারা যাচ্ছে।

এর শেষ কোথায়? শরীর শত্রুকে ভালোভাবে চিনতে প্রথমবার যদি সময় নেয় ১৫ দিন তো দ্বিতীয়বার তা হয়ত হবে ১৫ ঘন্টায়।অর্থাৎ, নভেল ততদিনই নভেল যতদিন শরীরের চেনা না সম্পূর্ণ হচ্ছে। এই সময়টা সংক্রামিত শরীরকে দিতে হবে। যেহেতু চীন থেকে সংক্রমণ শুরু হয়েছে সেহেতু চীনের মানুষ সেরে উঠবে সবচেয়ে আগে,তারপর ইরান, ইটালী এই ক্রমে যদি না নতুন নতুন মানুষ আক্রান্ত হয়। সুতরাং দেশে দেশে প্রতিক্রিয়া বাড়াবাড়ি রকমের মনে হলেও যে কোন প্যানডেমিকের জন্য প্রতিক্রিয়ার বাড়াবাড়ি আদতে সবার জন্যই ভালো।
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন? যারা ইমুনোসাপ্রেসিভ ওষুধ খান, কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে, অটো ইম্যুউন ডিজিজে ভোগেন তারা বাড়তি সতর্ক থাকবেন। ভাইরাস শরীরে ঢুকলে কিছু খেল দেখাবেই কেন না ওষুধ দিয়ে তাকে মারা যায় না। সে তখন আপনার শরীরের মালিক এবং যতদিন না শরীর সক্রিয়তা দেখাতে পারছে ততদিন জানবেন, আপনার সংক্রামিত কোষকলা তার দাসমাত্র, তার অর্ডারেই তারা চলবে,আপনি অসহায়। তবে আশার কথা, কোটিতে গুটিক ছাড়া বাকীরা সময় নিলেও ঠিক শত্রুকে সীমান্ত পার করে তাড়িয়ে ছাড়বে। অযথা আতঙ্কিত হলে তাড়াতাড়ি সেরে উঠবেন না, বরং শত্রু বুদ্ধিমান হলে তাকে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।বুঝুন, একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা যেটাকে পুরোপুরি জীবিত পদার্থই বলা যায় না তাকে মানুষ হয়ে 'বুদ্ধিমান' বলছি! এখন 'বুদ্ধি' জিনিষটাকে যদি মস্তিষ্ক নামক একদলা বাটার জাতীয় পদার্থ ছাড়া অন্যভাবে ভাবা যায় তাহলে খুব ভুল বললাম কী?

  

মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২০

ধর্ম ও মানুষ ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

তিন লক্ষ বছরের মানুষের ইতিহাসে অধিকাংশ সময় অধিকাংশ মানুষ থাকত ক্ষুধার্ত হয়ে। রাতে শিশুরা ঘুমাতে যেত খিদে নিয়ে।

১৮০০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মোটমাট ১০০ কোটি। 
দু'শ বছর আগেও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ খাদ্যের জন্য হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেও দুই বেলা পেট ভরাতে পারেনি। 
দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধা ছিল অধিকাংশ মানুষের জীবনের অংশ। 

তাই, বিগত দুই শতক ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেছেন অধিকাংশ মানুষকে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে বার করে আনতে। খাদ্য উৎপাদন ও বন্টনে জন্য বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক নতুন তত্ত্ব দিয়েছেন। সেই সব তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগের প্রচেষ্টা নিয়েছে রাষ্ট্র।

একইসাথে বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নিয়েছেন বিভিন্ন বিজ্ঞানী। এমনকি সেই প্রচেষ্টা স্বীকৃতি পেয়েছে নোবেল পুরস্কার প্রদানে। খাদ্যের উৎপাদনের দ্রুত বৃদ্ধির সাথে বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছিল বন্টন ব্যবস্থায় বিপ্লব।
শেষ দুইশ বছরে ভ্যাক্সিনেসন, আ্যন্টিবায়োটিক ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য পৃথিবীর জনসংখ্যা লাফ দিয়ে ১০০ কোটি থেকে হয়েছে প্রায় ৭৮০ কোটি।

১৯৭০ সালে পৃথিবীর ৩০% মানুষ থাকত ক্ষুধার্ত হয়ে। ভয়ানক জনসংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও ২০১৮ সালে প্রায় ১০% মানুষ খিদে নিয়ে ঘুমাতে যায়। এই সংখ্যা ফেলে দেবার মত নয়। বোঝা যায় খাদ্য উৎপাদন ও বন্টনের যে প্রক্রিয়া বিগত শতাব্দীতে বিভিন্ন দেশে নেওয়া হয়েছিল, তার অনেকটা সাফল্য বিভিন্ন দেশে এসেছে। 
সত্যি কথা বলতে দূর্ভিক্ষের যে ছবি পৃথিবীতে ১০০ বছর আগেও দেখা যেত এখন তা কমে গেছে। 

নিশ্চিত আগামী একশ বছরের মধ্যে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা কমে যাবে। তবে বৈষম্য সম্ভবত কমবে না।

মানুষ অধিকাংশ সময়ে শুধু খাদ্য অন্বেষণ করেছে, খাদ্যের জন্য অন্যকে সংহার করেছে, খাদ্য প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করবার জন্য ধর্মের জন্ম দিয়েছে। 

পরবর্তীকালে সেই ধর্ম মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করল। শেষ আড়াই হাজর বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও তার বিভেদ রাষ্ট্রের হাতিয়ার হয়ে গেল। 

লক্ষ্য করে দেখবেন, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ৯০% মানুষ একটাই ধর্ম পালন করেন। এই একরূপতা এসেছে অনেক রক্তের বিনিময়ে। আর একরূপ সমাজে ধর্মের প্রভাবে জীবন যাপন, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক হয়ে গেছে বৈচিত্র্যহীন।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে সাথে নিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে সহজ হয়েছে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা।
আমেরিকা, ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এর বাইরে নয়। 

ধর্মই জীবন, ধর্মই মরণ। তাই ধর্ম এত শক্তিশালী।

তবে বিগত অন্তত ২০০ বছরে পৃথিবীতে ধর্মের বাইরে গিয়ে বহু মানুষ চিন্তা করছেন। তারা সামগ্রিকভাবে মানুষকে নিয়ে ভাবছেন। বিংশ শতকে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বাদ দেবার প্রচেষ্টা শুরু হয়। 
রাষ্ট্র ধর্মের থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সুবিধা হল বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘু ও নিরীশ্বরবাদীরা নিরাপদে থাকতে পারেন। ধর্মের অধিকারের বদলে মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হয়। তাই রোমান ক্যাথলিক পোপকেও বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান মানুষকে রক্ষা করতে সেকুলারিজমের কথা বলতে হয়। 

সেকুলারিজমের কথা সকলকে সৎভাবে ভাবতে হবে, বলতে হবে। 
আমি ভারতবর্ষ হিন্দুদের দেশ চাইব, বাংলাদেশ মুসলমানের জন্য চাইব আর ইউরোপে দেশান্তরী হয়ে সেকুলার হব - এই ভাবে চলে না, চলতে পারে না।

নিশ্চিত একদিন এই খাঁচাগুলি ভাঙবে। 

মানুষ নিজের স্বার্থেই ধর্মের উপরে স্থান দেবে মানবধর্মকে। সে এই কাজ করতে বাধ্য হবে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। কারণ যতদিন যাচ্ছে, দলবদ্ধভাবে নয়, এককভাবে মানুষ দেশান্তরে যাচ্ছে। শুধু ধনী নয়; কর্ম, শিক্ষা, বিবাহ উপলক্ষে বহু মানুষ অন্য দেশে যাচ্ছে। অন্যদের সাথে মিশছে। নিজের স্বার্থে সে বাধ্য হবে শান্তি ও সেকুলারিজমের কথা বলতে।

আমরা এক ক্রান্তি-কালে আছি। ট্রান্সিশন পিরিয়ড। পরিবর্তন আসবে।

Madhusree Bandyopadhyay
03/03/2020

রবিবার, ১ মার্চ, ২০২০

ভয়ের গল্প ~ আর্যতীর্থ

বাসটা লেট করে সর্বনাশ করে দিলো সৌরভের। মাঝরাত্তির ছুঁই ছুঁই সময়ে মনসাপোতা বাসস্টপে  নামালো, তখন পথঘাট শুনশান। সব দোকানে ঝাঁপ পড়ে গেছে। অবশ্য দোকান বলতে তো দুটো চা দোকান, একখানা মনিহারি কাম মুদি,
একটা পাইসহোটেল আর একটা নাপিতের দোকান।দিনের বেলায় রাস্তার ধারে আনাজপাতি বসে। এটাকেই এখানকার লোক মার্কেট বলে। 
মনসাপোতার নাম জানি কেউ শোনোনি। বর্ধমান থেকে বাঁকুড়ার দিকে যেতে গেলে এক মিনিটের জন্য বাস থামে এখানে। কোনোকালে নাকি কেউ মাটি খুঁড়ে মা মনসার মূর্তি পেয়েছিলো, সেই জন্য এই নাম। সে মায়ের মন্দির এখন পোড়ো, মা মনসার চেলাচামুন্ডাদের বাস, ওই যে গো, রাত্তিরে যাদের লতা বলতে হয়।
 এই পান্ডববর্জিত জায়গায় সখ করে যে আসেনি , বলাই বাহুল্য।গ্রামটির নামও মনসাপোতা, এখানে নেমে লোকে ওই একটা জায়গাতেই যায় সাধারনত, যদিও আশেপাশে ছোটোখাটো আরো কয়েকটা গাঁ আছে। সৌরভের প্রিয়তম পুরুষ ও নারীটি এই গাঁয়েই বাস করেন, মানে তার দাদা আর নাম্মা। দাদা পঁচাশি পেরিয়ে আজও সটান, নাম্মা আটাত্তরে একটু সুগারে কাবু হলেও,দিব্যি সচল আছেন।গ্রামের বাড়ি ছেড়ে থাকেননা, তবে দেখাশোনার দু তিনজন আছে। দিন কয়েক আগে নাতিকে অনেকদিন দেখেন নি বলে মোবাইলে করা অভিমানহেতু চমক দিতে আজকে সৌরভের মনসাপোতা অভিযান। কিন্তু আটটায় পৌঁছনোর বাস যে ঝুলিয়ে এরকম সাড়ে দশটা করবে, বোঝেনি ও। অন্যসময় হলে তবু ভ্যানগাড়ি থাকে একটা দুটো।কিন্তু এখন....
  এখনকার কথা মনে করেই শিরদাঁড়া বেয়ে হিম নামলো সৌরভের। গত ছয়মাসে পাঁচজন খুন হয়েছে এই অঞ্চলে,
সকলেই গভীর রাতে। খুব সম্ভব লোকাল কোনো ডাকাতের গ্যাং। সৌরভ শুনেছে রাত্রে সবাই দল বেঁধে চলা ফেরা করে। খুব বোকার মতো কাজ হয়েছে এই সময়ে একলা এসে পড়ে।
 কি করবে এখন? হেঁটে গেলে পাক্কা পয়তাল্লিশ মিনিট, তার বেশির ভাগটাই আলো নেই। একশো দিনের কাজের দৌলতে  খানাখন্দ নেই ঠিকই, কিন্তু  দুধারে ঝোপ, ওখানে ওত পেতে কেউ বসে থাকলে বোঝার উপায় নেই।
ক্রিং ক্রিং! রিকশার বেলের শব্দটা যেন জমাট অন্ধকার চিরে আছড়ে পড়লো সৌরভের কানে। অন্ধকার ফুঁড়ে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ধরা দিলো একটু বাদেই। সৌরভকে দেখে একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলো চালক, ' যাবেন?'। এ লাইনের রিকশা সব ওই মনসাপোতার আশেপাশেই যায়, সুতরাং কোথায় জানার খুব একটা দরকার নেই।
চালকটি সৌরভেরই বয়েসী হবে। হাঁফ ছেড়ে রিকশায় উঠে পড়তে বললো, ' বাঁচালেন! একা একা ফিরতে হবে ভেবে খুব চিন্তায় ছিলাম' 
' আমিও তাই রে ভাই। দুজন হলে একটু ভরসা পাওয়া যায়। নাম কি তোমার?'
 ' আজ্ঞে, রানা। আপনি মনসাপোতাতেই নামবেন তো? আমারও ঘর ওদিকপানেই।'।
 ' হ্যাঁ, সেনবাড়ি চেনো? ওখানেই যাবো। না চিনলে কাছাকাছি এলে চিনিয়ে দিতে পারি'
   ' আজ্ঞে খুব চিনি। কদিন আগেই সেনদাদুকে নিয়ে হাটে গেছিলাম তো । আপনি ওবাড়ির ছেলে ?'
   ' একদম। সম্বিত সেন আমার দাদু। '
বলতে বলতে ওরা আলোর বৃত্ত পেরিয়ে অন্ধকারের আয়ত্ত্বে চলে এসেছে। চাঁদের আলোয় দেখতে খুব অসুবিধে নেই, তবে গা ছমছম ভাবটা এড়ানো মুশকিল। সুবিধা এটাই, রানার রিকশাতে আলো রয়েছে, গ্রামদেশে প্রায়শই টর্চ দিয়ে এ কান্ডটা করা হয়। গোরুর গাড়ির হেডলাইট মোটেই হাসির বস্তু না, রীতিমতো বাস্তব।
 ভটভট .. ভটভট.. হঠাৎই দূর থেকে আরেকটা আলো রিকশার ওপরে। একটা মোটরসাইকেল। অনেকটা পেছন থেকে এলেও, পাশ দিয়ে হুট করে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। 
কিন্তু এখানে কিছু গণ্ডগোল দেখা যাচ্ছে। কেউ যেন অসম্ভব ধীরে রিকশাটার পেছন পেছন আসছে। রাস্তার বাঁক এলে আলো সরে যাচ্ছে, কিন্তু তারপরই আবার। রিকশার সাথে মোটামুটি সত্তর আশি ফুট দূরত্ত্বে চলেছে বাইকটা। দু চারবার ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছে সৌরভ আরোহীকে। আবছা হেলমেট পরা অবয়ব, তার বেশি কিছু দৃশ্যমন নয়।এসব দিকে দিনের বেলাতেই হেলমেটের বালাই থাকে না! তবে কি..?
   রানা চাপাস্বরে বলে, 'বাবু ভালো বুঝছি না। নির্ঘাত কোনো মতলবে আছে ওই বাইকটা।'
    'কি করা যায় বলো তো?  থেমে দেখবো কাছে আসে কিনা?'
 'না বাবু, আমরা যা ভাবছি তা ঠিক হলে ওর কাছে হাতিয়ার থাকবে। সামনেই বটতলার মাঠ। ওখান থেকে একটা শর্ট কাট  করা যাবে। ও রাস্তাটা সবাই জানেনা।'
  'কিন্তু, এটা যদি সেই খুনীটাই হবে, ও এখনো এগিয়ে আসছে না কেন? '
   'বোধহয় দুজন আছি বলে। কিংবা সামনে কোনো স্যাঙাৎ আছে ওর। ধরে বসুন বাবু।'
    বটতলার মাঠের সামনে গোত্তা খেয়ে রানা রিকশাটাকে আচমকা পাশের পাতলা জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিলো। বাঁক থাকায় বাইকটা তখনও এসে পৌঁছায় নি। এখানে পথ এবড়োখেবড়ো, মাঝে মাঝেই গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে গাছের ছুটকো ডাল। রানা প্রাণপণ চালাচ্ছে, অঘটনের আশঙ্কা মানুষের জোর বাড়িয়ে দেয়।একটু নিশ্চিন্তের শ্বাস ফেলছিলো সৌরভ,
বাইকটাকে ছাড়িয়ে, হঠাৎই তার মনে তিরের মতো এক সন্দেহ বিঁধে গেলো।
     ব্যাপারটা প্ল্যান নয়তো?  রানা আর ওই বাইক, একই গ্যাংয়ের অংশ নয় তো? হঠাৎ রিকশার উদয়, ভাড়া নিয়ে দর না কষেই রাজী হওয়া, আর তার পরেই বাইক, যেটা আবার ঠিক পেছন পেছন, সবই কি কাকতালীয়? মূল রাস্তা থেকে এখন সে সরে এসেছে, এখানে কেটে ফেললেও টের পেতে লোকের এক দুদিন লাগবে। 
      বলতে বলতে একটা ঝাঁকুনি খেয়ে রিকশাটা দাঁড়ালো। হিসহিসে গলায় রানা বললো, 'চেন পড়ে গেছে। অন্ধকারে একটু সময় লাগবে বাবু।' হেডলাইট বনা টর্চ নিয়ে সে উবু হয়ে বসে পড়লো। টর্চের আধাআলো পড়ে রানার মুখটা কেমন ভয়ানক দেখাচ্ছিলো, গালের কাটা দাগ, চোয়াড়ে মুখে না কাটা দাড়ি, পুরু নিচেক ঠোঁট  সৌরভের মনে  একটা চেনা চেনা ছবির কথা তুলে আনছিলো। কোথায় দেখেছে, কোথায় দেখেছে..
    বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়লো, ক'মাস আগেই এই মুখ সে দেখেছে আনন্দবাজারের প্রথম পৃষ্ঠায়। রঞ্জিত! সাতটা খুন, গোটা পনেরো ডাকাতি। তিনটে পুলিশকে জখম করে আদালতের থেকে ফেরার, সেটাও ওই ছয়মাস আগেই। দাড়ি বাদ দিলে অবিকল সেই মুখ। হিম বয়ে যায় সৌরভের বুকে ।এই ভয়ঙ্কর অপরাধীর সামনে তো ও নস্যি। এমন সময় আবার .. ভট ভট ভট ভট.. দূরে সেই বাইক। ওদের ওপর আলো পড়তেই দাঁডিয়ে পড়লো দূরত্ব রেখে। 
   তক্ষুণি রানা অথবা রঞ্জিত চেন ঠিক করে উঠে প্যাডেলে উদ্দাম চাপ দিলো। শুরুর আগে একবার সৌরভের দিকে তাকালো, সেই তাকানোয় আর যাই থাক, আন্তরিকতা ছিলো না। রিকশা চলছে, পেছনে বাইক, আর একটু বাদেই নির্ঘাত ঝাঁপিয়ে পড়বে দুজনে সৌরভের ওপর। অদূরে একচিলতে আলো, কিছু লোকের নড়াচড়া, সৌরভকে ওরা নিয়ে আসছে ডাকাতদের বধ্যভূমিতে.. মা বাবা দাদু নাম্মা....
   দুম করে রিকশাটা মনসাপোতার প্রথম বাড়িটা পেরোলো। রানা রিকশাটা থামিয়ে বললো ' দাঁড়ান দেখি, বাইকটার সাথে বোঝাপড়া করে নিই।' কটা বাড়ি পেরোলেই সেনবাড়ি, চেনা জায়গায় ফিরে এসেছে সৌরভ। দেখতে দেখতে পাশে এসে দাঁড়ালো বাইকটা। হেলমেট খুলে ফেললো মাঝবয়েসী লোকটা। একগাল হেসে বললো, 'কি ভয়ই পেয়েছিলাম! এত রাত্রে রিকশা, ভাবলাম আপনারা নির্ঘাত ওই খুনীর দল, পেরোতে গেলেই কোনোভাবে ঝাঁপাবেন।'রানা খিকখিক করে হেসে বললো, ' আমি তো ভাবছিলাম এই বাবু আর আপনি ষড় করে আমাকে মারবেন, আজ নিঘঘাত গেছি।'
 সৌরভ হাসলো শুধু। সে কি ভাবছিলো সেটা আর খোলসা করলো না। এখন তার দাদু নাম্মার সাথে দেখা করার তাড়া।

পুঃ:  গল্পের রিকশাওয়ালাটিকে দলিত, সৌরভকে হিন্দু এবং বাইকচালককে মুসলিম ভাবলে আমাদের দেশের গল্পটা পেয়ে যাবেন হয়তো। খুনী কিন্তু এখনো অধরা...


রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

অতিভক্তি ~ অনীক চক্রবর্তী

তারপর সেই ভয়ানক দিন আসিয়া পড়িল। চন্দ্রবিন্দু কে তলব করা হইল 'আমার ভিনদেশী তারা' গানটি গাওয়ার অপরাধে। স্পষ্টতই ভিনদেশী বলিয়া কোনও শব্দ যে নাই এবং থাকিলেও তাকে আমার বলিয়া সম্বোধনের অপরাধ যে ক্ষমার অযোগ্য, তাহা বুঝাইয়া দিয়া হইল। চন্দ্রিল তাহার শেষ দু ছক্কা পাঁচ এ লিখিলেন, 'আমরা সক্কলে আ-মোদিত। সরকার চন্দ্রবিন্দু প্রাপ্ত হইয়াছে।' এতে চটিয়া গিয়া এক পাব্লিক চন্দ্রিলকে উদ্দেশ্য করিয়া একটি কড়া চিঠি লিখিল আনন্দবাজারে। তার শুরুটা হইল, 'আপনার মত আঁতেল যে ভিনদেশকে আমার বলিবেন এতে আর আশ্চর্য কী? আপনি এদেশের কলঙ্ক, কোনোদিনই বুঝা যায় নাই আপনি কোনদিকে, তাই আপনি দেশদ্রোহী হইতে বাধ্য। অতএব আপনার মা ও বোনকে...' ইত্যাদি ইত্যাদি

একইভাবে 'পরদেশী পরদেশী যানা নেহি' গানটির লিরিসিস্ট ও সুরকারের তলব পড়িল। তারা সমস্বরে বলিল, 'আমরা কিছু জানি না, আমির জানে'। ব্যাপার স্পষ্ট হইল। আমিরকে আগেও একবার চেতাবনি দিয়া হইয়াছিল, লাস্ট ওয়ার্নিং আর কি। ফলে এবার ঝটিতি 'শালা দেশ ছাড়, পাকিস্তান যা' বলিয়া দেশের লোক ট্যুইটারে লাফাইয়া পড়িল। আমির মুচকি হাসিয়া দেশ ছাড়িলেন- তবে পাকিস্তান নয়, আমেরিকা চলিয়া গেলেন। দু বছর পরে সেখেনে তারান্তিনোর পরবর্তী ছবিতে লিড রোল করিয়া অস্কার তুলিলেন। দেশের লোক ঝটিতি 'আমির আমাদের গর্ব' বলিয়া আবেগমথিত হইয়া কাঁদিয়া কাটিয়া ট্যুইটার ভাসাইয়া দিল। আমির মুচকি হাসিয়া শুধু বলিলেন, 'শালা'

তারপর তো আরেক কান্ড। সমস্ত 'কড়াপাক' মিষ্টি নিষিদ্ধ হইল। লোকে বলিল তাই তো, যে মিষ্টির নামেই 'কড়াপাক' সে ভারতীয় হয় কি করিয়া। বাঙালিরা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলিতে লাগিল, তবে মুখে বলিল 'হ্যাঁ, বটেই তো। কেমন ডায়াবিটিস বাধাইয়াছিলাম বাবা, খাইতেই চাইতাম না, তবু টানিত। এ মিষ্টি শত্তুর না হইয়া যায় না'। বাবা রামদেব সক্কলকে আশ্বস্ত করিয়া পতঞ্জলির 'কড়াদেশি মিষ্টি' আনিলেন মার্কেটে, খাইলে সুগার হয় না। একমাসে হু হু সেল-- বাবা আরেকটি আইল্যান্ড কিনিয়া তাতে প্রাচীন ভারতীয় 'কপালভাতি নাচ' করিতে লাগিলেন।
ক্রমে লোকে আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে চুলকুনি, বাচ্চা উৎপাদন, আয়ুর্বেদিক বিড়ি পান হইতে ট্যাক্স প্রদান- সবই করিতে লাগিল। ট্যাক্সের টাকা গুলি পাব্লিকের দিকে ফিরিয়া মুচকি হাসিয়া বলিল, 'শালা'।

সারাদেশ জুড়িয়া ক্রমে প্রবল আলোড়ন উঠিল। পাব্লিক বাচ্চা পকেটমারকে ধরিয়া আর পিটাইলো না। ল্যাম্পপোস্টে শক্ত করিয়া বাঁধিয়া বন্দেমাতরম ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত করিয়া দিল। মেট্রোতে জিন্স পরা মেয়ে দেখিয়া জ্যেঠুদের লাল পড়িল না, গেরুয়া পড়িতে লাগিল। প্রসঙ্গত, লাল যে চৈনিক জিনিস এ কথা এখন সবাই জানেন। মোবাইল- টিভি- হেডফোন- সাউন্ড সিস্টেম- জাঙিয়া ঘড়ি জুতো বডি স্প্রে সাবান-- জাস্ট এইকটি ছাড়া দেশের মানুষ আর কোনও চৈনিক প্রোডাক্ট ব্যবহার করেন না। টোটাল অসহযোগ। অরিজিতের 'লাল ইশক' গানটিও ব্যান হইল। কমিউনিজম যে একটি ভয়ানক রোগ- অর্ণবের অনুষ্ঠানে আসিয়া সাধ্বী প্রাচী তা বলিয়া গেলেন। এর বিরুদ্ধে 'দেশভ্যাক- টি' নামের যে ভ্যাকসিনটি আবিষ্কৃত হইয়াছে তাহাও জানাইতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু অর্ণব 'নেশন ওয়ান্টস টু নো, নেশন ওয়ান্টস টু নো' বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিলে উহা আর শুনা গেল না। অর্ণবের বিভূষণ এক বছর পিছাইয়া গেল-- কারা যেন ইহাকে 'ঐতিহাসিক চিৎকার' বলিয়া চিহ্নিত করিল।

অতঃপর 'মা মা' ডাকে স্বর্গ-মর্ত্য-পার্লামেন্ট ভরিয়া উঠিল। ছেলে 'মা, মাগোও' বলিয়া ছলোছলো চক্ষে মাকে বৃদ্ধাশ্রমের গেটে ড্রপ করিয়া গেল। কড়া এক্সটারনাল আসিয়া ভাইভা টেবিলে যখন টুঁটি চাপিয়া ধরিয়াছে তখন ছাত্র চোখ টিপিয়া শুধু বলিল 'মায়ের দিব্যি, আমি সব পড়িয়াছি', সে হায়েস্ট নম্বর পাইয়া সবাইকে চমকাইয়া দিল। দুষ্টু ছেলে পুলিশকে 'মা, মা' বলিলে তারা ভারী খুশি হইয়া তাকে তিনশ বিরানব্বইয়ের চারের এ ধারা অনুসারে একটি গোলাপ ফুল গিফট করিল। পান্নালাল ভট্টাচার্যকে জাতীয় গায়ক এবং চিরঞ্জিত কে জাতীয় নায়কের সম্মান দেওয়া হইল। তৃণমূলের কে একজন নেতা বলিল, আমাদের ক্যাচলাইনে তিনখানা মা-- মা তেও মা, মাটিতেও মা, মানুষেও মা-- আমরা দেশের সবচেয়ে জাতীয়তাবাদী দল। উপরমহল থেকে 'অ্যাই চোওপ, একদম চোপ, আমরা সেকুলার' বলিয়া তাকে খুব কড়কাইয়া দেওয়া হইল আর ব্যাটা ইলেকশানে টিকিট মিস করিল। বেচারা ঘরে আসিয়া ডিকশনারিতে বহু খুঁজিল, কিন্তু সেকুলার শব্দটি খুঁজিয়া পাইল না।

এবং তলে তলে গুটিকত লোক দেশকে পঞ্চাশ- ষাট গ্রামের ছোট ছোট পিস করিয়া দাঁড়িপাল্লায় চাপাইয়া একশ চল্লিশ টাকা কেজিতে বেস্পতিবারের হাটে বিক্রি করিতে লাগিল। সে হাটে পাবলিক যেতে পারে না, খোঁজও নাই কারোর কাছে। সে হাটের খবর, বেচাকেনার খবর যারা রাখিত লোকে তাদের আঁতেল, সিপিয়েম, দেশদ্রোহী ইত্যাদি বলিয়া কিছু জনকে খুন করিয়াছে, কিছুজন কে ভাগাইয়া দিয়াছে দেশ থেকে। আর যারা বাঁচিয়া আছে তারা এমনিতেই চুপ করিয়া গিয়াছে। এমনি করিয়া বেশ কয় বচ্ছর কাটিল। তখন কারো কারো সন্দেহ হইল। আরে চাকরি নাই, খাবার নাই, টাকাকড়ি শান্তিফান্তি নাই শুধু মা ডাকিয়া আর জওয়ানের ছবি শেয়ার করিয়া দিন চলে কেমনে! কেস কী? খোঁজ, খোঁজ। অবশেষে খুঁজিয়া দেখে শুধু বাউন্ডারিখানা পড়িয়া আছে, দেশখানা আর নাই।
শুনা যায়, তখন অনেকে চিৎকার করিতে চাহিয়াছিল। কিন্তু ম্যাট্রিক্সের শুরুতে মিস্টার অ্যান্ডারসন তার হকের দাবী জানাইবার পর নিজের মুখটিকে যেভাবে খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন, তাহারাও নিজের মুখ সেইরকম চামড়া ও মাংস দিয়া আটকানো দেখিতে পাইয়াছিলেন। বলা বাহুল্য, তখন আর কোথাও মরফিয়াস তার লাল এবং নীল পিল দুটি লইয়া অপেক্ষারত ছিলেন না।

বোবা শান্তিতে সেদিন চরাচর ভরিয়া গিয়াছিল...


শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

গল্পের গল্প ~ আর্কাদি গাইদার

ওদের দলটা সেদিন রাতের মতন বিশাল স্তেপভূমির এক কোনে আস্তানা গেড়েছিলো। এখন যেখানে কাজাকস্তানের বেরেল শহর, সেই সময় সেখানে ছিলো এক বিশাল হৃদ আর ধুধু ঘাসজমির প্রান্তর। বেশ কয়েকদিন ধরে এই অঞ্চলটাতেই ঘুরছিলো ওদের গোটা দলটা। এখানে শিকার করবার সুযোগ প্রচুর, হৃদে মাছ ধরা যায়, আর তার সাথে সাথে এদিক ওদিকে মাটির ওপর একধরনের খাটো গাছে একধরনের ফল হয়, যা দিয়ে খিদে মেটে। 

ওদের দলের একটাই সমস্যা, এই জায়গাটায় একটা বিশাল খড়্গ-দন্ত বাঘের উৎপাত। ইতিমধ্যেই দুজন তার পেটে গেছে। দিনের আলোতে ওরা খাবার আর শিকারের সন্ধানে দলবদ্ধ হয়ে থাকে, ওদের নিজেদের তৈরি অস্ত্রও সাথে থাকে, কিন্তু অন্ধকার নামতেই ওদের ভয় শুরু হয়। অন্ধকার ওদের শত্রু, আর বাঘের বন্ধু। কখন যে একদম ঘাড়ের ওপর থাবা এসে আছড়ে পড়বে, বোঝা যাবে না, হয়তো অন্তিম মুহুর্তে এক ফালি চাঁদের আলোয় শুধু ঝলসে উঠবে সাদা দুটো দাঁত। আর তাই, সূর্য ডুবলেই একটুকরো আগুনের পাশে জড়সড়ো হয়ে বসে ওরা ঝিমোতে থাকে, আগুনের শিখা যেটুকু জায়গায় আলো দিচ্ছে, সেই সীমানার বাইরেই বিশাল অন্ধকার যেন ওত পেতে থাকে ওদের গ্রাস করতে। আগুনের নাচানাচির সাথে সাথে আগুপিছু করতে থাকে অন্ধকার নামের ভয়ানক দানবটা, যেন ওদের সাথে খেলা করে, আর মাঝেমধ্যেই সেই জমাট কালোর মধ্যে থেকে ভেসে ভেসে আসে বাঘের ডাক। ওদের মধ্যে সবচেয়ে বুড়ো যে, তার চারপাশে তখন জোনাকির মতন ঘুরঘুর করে অনেক গল্প, সে তখন গল্প বলতে চায়, বলতে চায় কিভাবে বহুদিন আগে, যখন ওদের দলটা আরো উত্তর দিকে বরফঢাকা উপত্যকার মধ্যে বিচরণ করতো, সেইসময় ওদের দলের সবচেয়ে শক্তিশালী দুজন মিলে অনেকগুলো গাছের গুড়ির মাথা ঘষে ঘষে ছুচলোঁ বল্লম বানিয়েছিলো, আর তাই দিয়ে একসাথে একটি খড়্গ-দন্ত বাঘকে মেরেছিলো। বুড়োটা ভাবে, এই গল্পটা বলতে পারলেই অন্ধকার ওদের দিকে এগিয়ে আসতে ভয় পাবে। বুড়োটা চায়, সারারাত এরকম অনেক অনেক গল্প বলতে, যাতে কালো ভয়টা দুরেই থাকে। কিন্তু পারে না। কারন ওদের তো ভাষা নেই। শব্দ নেই। ওদের কারুর নামও নেই। বুড়োটা চেষ্টা করে অঙ্গভঙ্গি করে গল্প বলতে, কিন্তু সবাই বোঝে না। এরকম ভাবেই রোজ চেষ্টা করতে করতে কয়েকদিন পর বুড়ো এক নতুন কায়দা আবিষ্কার করে। আগুনের পাশে যেখানে মাটির ওপর আলো পড়েছে, সেখানে আঙুল দিয়ে সে প্রথমে একটা বাঘ আঁকে। সময় নিয়ে তার দাঁতগুলো বড় বড় করে আঁকে। তারপর আঁকে শক্তিশালী দুই মানুষকে। বাকিরা অবাক হয়ে বুড়োকে ঘিরে বসে আঁকা দেখে। মানুষগুলোর হাতে বল্লম আঁকে বুড়ো। শিখার আলো ছবিটার ওপর লাফাতে লাফাতে তাকে জীবন্ত করে তোলে। ওদের সবার চোখ চকচক করে, আর ওদের চারপাশের ভয়মিশ্রিত অন্ধকারটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু পিছিয়ে যায়।

এরকমভাবে সারারাত ধরে একের পর এক গল্প আঁকে বুড়ো। কখনও কখনও বাকিরা ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু বুড়ো এঁকেই চলে। একটা করে গল্প আঁকে, আবার মুছে ফেলে, আবার আঁকে। সারারাত ধরে গল্প আর অন্ধকারের মধ্যে চলে অবিরাম লড়াই। আর ওদের দলটা এরপর যেখানেই যায়, তাদের সাথে বস্তাবন্দি হয়ে সঙ্গী হিসেবে গল্পেরাও থাকে। তারপর কোন একদিন নদী পার হওয়ার সময় চোরাস্রোতে ভেসে যায় নামহীন বুড়োটা।

এরও বহুদিন পরে, যখন ওদের বংশধররা কয়েকটা শব্দ শিখেছে, হয়তো আদিম কিছু আওয়াজকে জীব দিয়ে খেলাতে শিখেছে, যখন ওদের দল সংখ্যায় বেড়েছে, তখনো অন্ধকার হলে ওরা আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে, আর আবার শুরু হয় গল্প বনাম কালোর লড়াই। ভাঙা ভাঙা শব্দ দিয়ে, হাত পা ছুড়ে, কখনো মাটিতে কিছু অবয়ব এঁকে, কখনো শিকার করা জন্তুর চামড়ার ওপর খোদাই করে, ওরা পালা করে গল্প বলতে থাকে, আর কুস্তি চলতে থাকে অন্ধকারের সাথে। আর তার মধ্যে অতি অবশ্যই থাকে বুড়োর সেই বাঘের গল্প, যা সময়ের সাথে সাথে ফুলেফেঁপে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, আর সেই গল্পটা বললেই অন্ধকার নামের রাক্ষসটা ভয়ে গুটিসুটি মেরে পিছিয়ে যেতে থাকে, আর সেই নিরেট কালোর পেট চিরে নিষ্ফল ক্রোধে গর্জন করতে থাকে ক্ষুদার্ত খড়্গ-দন্ত বাঘ।

হাজার হাজার বছর পরেও, বহু পথ পেরিয়ে এসে যখন ওদেরই কোন বংশধর মাটির ঘরে বাসা বাঁধে নদীর পারে, জঙ্গলের একদম সীমানায়, তখনো রাত হলে বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে সে, আর হাতমুঠো করে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পাশে রাখা বল্লমকে, আর গাছের পাতা দিয়ে তৈরি পলকা দরজার দিকে মুখ করে বসে। ঘরের এক কোনে জ্বলতে থাকে পুঁচকে একটা আগুন। বাইরে শিকারের আশায় ঠোঁট চাটতে চাটতে পায়চারি শুরু করে ডোরাকাটা বাঘ। আর  বাচ্চাটাকে বুকের কাছে এনে কানে কানে সে বলতে থাকে বুড়োর সেই বাঘের গল্প। গল্প আর অন্ধকারের অন্তহীন লড়াই আবার হয় শুরু।

লীলা মজুমদার বলেছিলেন, গল্প মোটে চার রকমের হয়।
ভূতের গল্প। 
চোরের গল্প।
প্রেমের গল্প। 
বাঘের গল্প। 
আর এই চাররকমের গল্প বলতে আমাদের রয়েছে ছয় হাজারেরও বেশি ভাষা। ভাষা দিবসের কসম, আমরা যেন গল্প বলা না থামাই। আমরা যেন অন্ধকারকে জিততে না দিই।

মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

যত গপ্পো জুতো নিয়ে ~ যূথিকা আচার্য্য

আমাদের শরীরের যত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে তাদের পায়ের পাতাদুটো হলো সবচাইতে বেশী লো মেইনটেনান্স। পা চাটা,পায়ের জুতো,পায়ের তলা এই শব্দগুলির প্রত্যেকটাই নেগেটিভিটি বহন করে। অথচ বলুন দেখি, এতে পা দুটোর কী দোষ? পুরো শরীরটাকে বয়ে নিয়ে বেড়ায় তারা সর্বক্ষণ। কোনো দাবী-দাওয়া নেই। আদর যত্নের বালাই নেই। মাথা ব্যথা হলে হাজারখানা দাবাই আছে,কিন্তু পা ব্যথা হলে আমরা বলি "ও কিছু না,সেরে যাবে!"

    আমাদের পায়ের পাতা দুটো হল সমাজের ওই অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষগুলোর মতো। যারা বড় কিছু দাবী করে না, শুধু একটু পেট ভরে খাওয়া। দুটো রুটি, বা একটুকরো পেঁয়াজ সহযোগে একথালা পান্তা খেতে পেলেই তারা ঐরাবতের মতো মহাতেজা হয়ে ওঠে । রোগভোগের বালাই নেই। অথচ আমাদের মতো লোকগুলোর অবস্থা দেখুন। দিনরাত গন্ডেপিন্ডে ভালোমন্দ গিলছি কিন্তু আজ অম্বল, কাল আমাশা, পরশু আর্থারাইটিস আমাদের লেগেই রয়েছে। 

     চরণকমলদুখানা বাদ দিলে দেখবেন শরীরের বাকী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গদের হাজারটা বায়নাক্কা। মুখের কথা তো ছেড়েই দিন। রকমারী রূপটানের দায় মিটোতে জেরবার হয়না এমন মানুষ নেই। 

কী বললেন, পুরুষদের সেসব বালাই নেই !

ও মশাই থামুন দিকি। বলি আছেন কোথায়? 

  আফটার শেভ, শেভিং ক্রীম, কোলন, মেনস্ ফেস ওয়াস এগুলো কী? এমনি এমনি এই কোম্পানীগুলো মিলিয়ন ডলারের বিজনেস করছে নাকি! 

তারপর গলা বা হাতের কথাই ধরুন। মালা-চুড়ি-নেকলেস-ব্রেসলেট-কড়া-আংটি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। গয়নাগাটির লম্বা লিস্টি শুরু হলে শেষ কবে হবে তা বলা মুশকিল। সেই তুলনায় নিজের পদযুগলের কথা একবার ভাবুন তো। নারী হলে নূপুর বা তোড়ার অলঙ্করণ জুটলেও জুটতে পারে,পুরুষ হলে বাপু জুতোটুকুই সার। মোটের উপর দেখবেন,পাদুটো বেশী বায়না করে না,দুপাটি আরামদায়ক পাঢাকনি অর্থাৎ জুতো পেলেই তারা দিব্যি খুশি!

   তাই এহেন নির্বাক সেবকদের প্রতি অবহেলা আসে খুব সহজে। পা দুখানা যত্নের দাবী করে না, অতএব তার যত্ন করে কী লাভ। এমতাবস্থায় যিনি পাদুটোকে যত্নআত্তি করে,ভালোবেসে রাখেন তিনি প্রকৃত অর্থেই তার নিজের শরীরের মর্যাদা দিতে জানেন,তার আভিজাত্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাটা বোকামো।

     জুতো নিয়ে গপ্পো হলেই সিরাজদৌল্লার কাহিনী মনে পড়ে। বাংলার শেষ নবাব সিরাজ যখন ছদ্মবেশ ধারণ করে, স্ত্রী লুৎফা ও কন্যা কে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি জুতোটি পরিবর্তন করতে ভুলে গিয়েছিলেন আর সেই জুতো দেখেই এক পীর তাকে চিনে ফেলছিল এবং ধরিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য গোরার দল বিশ্বাসঘাতকতা মাফ করেনি। সিরাজের মৃত্যুর পর সেই পীরকেও প্রাণদন্ডে পুরস্কৃত করা হয়েছিলো। যেমন কর্ম তেমন ফল!
    
     মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত জুতো জোড়াও ইতিহাস রচনা করেছিল। ব্যাপারটা মোটামুটি হয়েছিল এমন যে,শোভাবাজারের রাজবাড়িতে জলসা হবে, বিরাট আয়োজন। শহরের অর্ধেক লোক জমা হবে সেখানে; যত বড়ো বড়ো লোক, রাজরাজড়া সকলের নেমন্তন্ন হয়েছে। তখন ঠাকুরবাড়ির বিষয়সম্পত্তির অবস্থা বড়ো খারাপ। পিতা দ্বারকানাথের দেনা মেটানোর পর পুত্র দেবেন্দ্রনাথের হাত একবারেই শূন্য।  বড়ো বড়ো লোকেরা মজা দেখার অপেক্ষায় রইলেন। সবার মনে একই প্রশ্ন,ঠাকুরবাড়ির দিন গেছে, প্রিন্স দ্বারকানাথের ছেলে কী ভাবে নিজের মানরক্ষা করবেন? এবারে দেবেন্দ্রনাথ কী সাজে আসবেন নেমন্তন্ন রক্ষা করতে যাতে সাপও মরে এবং লাঠিও না ভাঙে! 

   এসব কথা বোধহয়  দেবেন্দ্রনাথের কানেও এসেছিল। তিনি বাড়ির দেওয়ানকে দিয়ে করমচাঁদ জহুরীকে বৈঠকখানায় ডাকিয়ে আনালেন। করমচাঁদ জহুরী সেকালের খুব পুরোনো জহুরী। ঠাকুরবাড়ির "বাবামশায়"-এর পছন্দ তার বেশ জানা ছিল। 
  দেবেন্দ্রনাথ তাকে বললেন, একজোড়া মখমলের জুতোয় আগাগোড়া মুক্তো দিয়ে কাজ করে আনতে। সেই আদেশমতো করমচাঁদ জহুরী দানা দানা মুক্তো সেলাই করে সাজানো সুন্দর একজোড়া মখমলের জুতো তৈরি করে এনে দিলেন। 

  জুতোর ঝামেলা তো মিটলো। এবার চিন্তা, কেমন জামা,কেমনই বা সাজপোশাক হবে ? রাজবাড়িতে নেমন্তন্ন বলে কথা, যেমন তেমন পোশাকে কী যাওয়া যায় ? সবাই ভাবছে তোষাখানা থেকে কাশ্মিরী পশমিনা শাল বের করবে, না রেশমের জোব্বা। দেবেন্দ্রনাথ হুকুম দিলেন,

"ও সব কিছুই নয়! আমি সাদা কাপড়ে যাব।" 

জলসার দিন তিনি পরলেন ধবধবে সাদা আচকানজোড়া। মাথার মোড়াসা পাগড়িটি অবধি সাদা, কোথাও জরি,কিংখাব বা জরোয়ার নামগন্ধ নেই। আগাগোড়া সাদা। পায়ে কেবল সেই মুক্তো বসানো মখমলের জুতোজোড়াটি।

    ভাবুন একবার অবস্থাখানা! রাজবাড়ির সভাস্থলে সবাই বসে রয়েছেন কিংখাব-জড়ি-মখমলের পোশাক পরে,হীরেমোতি-চুনিপান্না গলায় ঝুলিয়ে। এমন সময়ে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সেখানে প্রবেশ। সভাস্থলে সবাই নিস্তব্ধ। একখানা সূঁচ পড়লেও বুঝি আওয়াজ শোনা যাবে। দেবেন্দ্রনাথ কৌচে বসলেন পা-দুখানি একটু বের করে। সবাই চুপচাপ। শোভাবাজারের রাজামশাই ছিলেন তার বন্ধু। তিনি তখন ওনার পায়ের দিকে ইশারা করে হইহই করে উঠলেন,

 "ওরে দেখ, দেখ, তোরা দেখ, একবার চেয়ে দেখ এ দিকে, একেই বলে আভিজাত্য। আমরা ঝুলিয়েছি গলায়, মাথায়, আর ইনি তা পায়ে রেখেছেন।"

এই দুখানা গল্প বললাম বাঙলার ইতিহাসের পাতা থেকে। এবার একখানা বিদেশী গপ্পো শোনাই। এই গল্পটা আমার বন্ধু পিট টেয়লরের মুখে শোনা। পিটের প্রেমিকা পামেলা জুতোর ব্যাপারে বড় খুঁতখুতে। মানে জামা-টুপি-ব্যাগ এদিক ওদিক হলেও চলবে কিন্তু জুতোর ব্যাপারে এতটুকুও নড়চড় হওয়ার উপায় নেই। তো সে যাকগে, ওদের নেমন্তন্ন ছিল প্রতিবেশী মিস্টার তাকাশাকির বাড়িতে। তাকাশাকিমশাই জাপানের মানুষ, একটু বয়স্ক এবং আদ্যোপান্ত পুরাতন জাপানী রীতিনীতিতে বিশ্বাসী। সেই হিসেবমতো পিট ও পামেলা দুজনেই হাল্কা, সুতির ঢিলেঢালা পোশাক পরলো, যাতে তাকাশাকি মশাইয়ের বাড়ির পরিবেশে তা বেশ মানানসই হয়। কিন্তু গোল বাঁধলো জুতো নিয়ে। প্যামির ইচ্ছে একটু দামী হাই হিল পরে, ওদিকে পিটের তা নিয়ে আপত্তি, প্যামির জামার সঙ্গে নাকি ফ্ল্যাট চটিজোড়া পরলেই বেশী মানাবে। আসল ব্যাপারটা আমরা জানি, পিট বেচারার হাইটটা একটু কম, সেই কারণে প্রেমিকা হাই হিল পরে তার সঙ্গে ঘুরলে সে ইনসিকিউরিটিতে ভোগে।  ঝগড়া শুরু হয়েছিল বেশ খাদের সুরে"ডার্লিং-হানি" এসব বলে, কিছুক্ষণ পরেই থার্মোমিটারের পারা চড়তে চড়তে বিবাদের সুর সপ্তকে পহুছিল। শেষকালে পিটের এনগেজমেন্ট প্রায় ভেঙে যায় যায় দশা।

    এতকিছু ঝামেলা করে পিট ও পামেলা দুজনে তাকাশাকিমশায়ের বাড়িতে গিয়ে পৌছল পার্টি শুরু হওয়ার ঘন্টাদেড়েক পর। পামেলা নিজে হীলস্ তো পরেছেই তার ওপর পিটারকেও হাই হীলড্ ফর্ম্যাল শ্যুজ পরিয়েছে ( হুঁ হুঁ বাওয়া, দেশী হোক বা বিদেশী,বৌ ইজ বৌ!) কিন্তু তাকাশাকি ভবনের দোরগোড়ায় পৌছতেই জোর কা ঝটকা লাগলো ধীরেসে ! সুসজ্জিতা ম্যাডাম তাকাশাকি ভারী মিষ্টিসুরে জানালেন, 

" দয়া করে জুতো খুলে ভেতরে আসবেন। জুতো জিনিসটা বাইরের, ওটাকে আমরা ঘরের ভেতর স্থান দিই না।" 

এই ঘটনার পর  পিটের প্রেমিকা নাকি তিনদিন তার সঙ্গে কথা কননি। রাগে না অনুরাগে তা অবশ্য জানা হয়নি। 

      সিন্ডেরেলা আর তার কাঁচের জুতোর গল্প সবাই জানে। রাত বারোটার সময় সিন্ডেরেলা প্রিন্স চার্মিংয়ের পার্টি থেকে ছুটে বেরিয়ে যান। যাওয়ার পথে তার পা থেকে একপাটি কাঁচের জুতো খুলে পড়ে যায়। পরে সেই জুতোর সাহায্যে রাজকুমার সিন্ডেরেলাকে খুঁজে পান অ্যান্ড দে লিভড্ হ্যাপিলি এভার আফটার! মোটের উপর এই হচ্ছে গল্পখানা। কিন্তু গল্প পড়ে একটু ভাবলেই বুঝবেন যে জুতো খুলে যাওয়া ব্যাপারটার মধ্যে যথেষ্ট ফাঁক রয়েছে। চমৎকার মাপে মাপে পায়ে বসে যাওয়া জুতো অমনি অমনি পা থেকে খুললো কী করে? বারোটা অবধি হইহুল্লোর নাচগান করা অবধি জুতো দিব্যি ঠিক ছিলো, ঠিক দৌড়ে পালানোর সময়ই তাকে খুলে পড়তে হল ! সিন্ডেরেলা কী তবে ইচ্ছে করেই জুতোখানা ওখানে ফেলে রেখে এসেছিল যাতে তাকে খুঁজে পেতে রাজকুমারের অসুবিধে না হয়! একটু ভাবুন, ভাবলেই বুঝবেন সিন্ডেরেলাকে আমি আপনি  যতটা সোজা সরল ভেবেছিলাম, ততটা ইনোসেন্ট সে মোটেই নয়। সিন্ডেরেলা যথেষ্ট সেয়ানা মেয়ে।

   আমার এক বাংলাদেশী বন্ধুর মুখে শোনা মোহাম্মদ নাসির আলির লেখা জুতো নিয়ে আরেকখানা গল্প দিয়ে শেষ করি।  গল্পের নাম "অলক্ষুণে জুতো।" গল্পখানা এমন, আলি আবু বাগদাদ শহরের অত্যন্ত ধনী অথচ কৃপণ লোক। তার কৃপণতার শ্রেষ্ঠ পরিচয় তার জুতো। তিনি বহু বছর ধরে জুতো বদলাননি। বছরের পর বছর সেলাই করিয়ে, পেরেক লাগিয়ে, তালি লাগিয়ে একই নাগরাই জুতা পরতেন। সময়ে এমন হল যে, আলি আবুকে সবাই তার জুতোর নামে চেনে। 
তা একদিন হল কী, একদিন আলি আবুর বন্ধু তার জুতো নিয়ে মজাক করলেন তার সঙ্গে। আবু এবং তার বন্ধু দুজনেই তখন হামামে। গোসল করছেন। বন্ধুটি সুযোগ বুঝে তার ছেঁড়াখোঁড়া, তালি মারা নাগরা জোড়া লুকিয়ে রাখলেন অন্য জায়গায়। মতলবখানা এই যে, জুতো হারিয়ে আবুর দশা কেমন হয়! 
  
     এদিকে আলি আবু তো এসব কিছুই জানেন না। তিনি গোসলখানা থেকে বেড়িয়ে দেখলেন তার জুতোর জায়গায় অন্য একটি কারুকাজময় সুন্দর,নতুন জুতো রাখা আছে। তিনি ভাবলেন এই জুতোজোড়া নিশ্চয় তার বন্ধু তার জন্যই রেখে গেছে। তিনি বিনি পয়সায় নতুন জুতো পেয়ে আল্লাহ্তালা কে সুক্রিয়া জানিয়ে, নতুন জুতো পরে ফিরে এলেন বাড়িতে।

   কিন্তু আসলে সেই নতুন জুতোটি ছিল কাজিসাহেবের। কাজিসাহেব বের হয়ে দেখলেন তার জুতোজোড়া গায়েব। অনেক খুঁজে দেখা গেল শুধু আবুর জুতোজোড়া পড়ে রয়েছে সেখানে। ব্যস আর কী, কাজিসাহেব ভেবে নিলেন আলি আবুই তার জুতো নিয়ে গেছেন।
এর জন্য জুতো চোর হিসেবে আবু আলির শাস্তি হয়। রাগে দুঃখে আলী আবু জুতো নদীতে ফেলে দেন। সেখানে এক জেলে জুতোটি পায়। সে আবুর জুতোজোড়া ঠিক চিনতে পারে এবং সরলমনে সে ভাবে হয়ত আবুর জুতোটি হারিয়ে গেছে। কারণ সবাই জানত এই জুতোজোড়া আবুর বড়ই প্রিয়। ভেবেচিন্তে পুরস্কারের লোভে জেলে বেচারা জুতোটি নিয়ে আসে আবুর বাড়িতে। আবু তখন বাড়িতে ছিলেন না। অনেক হাঁকডাক করে বিরক্ত হয়ে জেলে আবুর বাড়ির জানালা দিয়ে ছুঁড়ে দেয় জুতো জোড়া। জুতো ভেতরে গিয়ে পড়ে আতরের বোতলে। এই বোতলগুলোর ভেতরে খাস আতর ছিল আবু বড়ই পেয়ারের। সব নষ্ট হয়।

বাড়িতে ফিরে সবকিছু দেখেশুনে রাগে দিশাহারা হন আলি আবু। তিনি সেই রাতেই জুতোজোড়া কে দফন করার জন্য গর্ত খুঁড়তে শুরু করেন প্রতিবেশীর দেয়ালের ধারে। কিছু লোক তাঁকে সেই অবস্থায় দেখে ভাবে তিনি হয়ত সিঁদ কেটে চুরি করতে যাচ্ছেন। অতএব আবার তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া  হয় কাজির কাছে। কাজিসাহেব শুধোলে আলি বলেন তিনি জুতোজোড়া মাটি চাপা দিচ্ছিলেন। কিন্তু কে আর সেকথা বিশ্বাস করবে! প্রাণের চেয়েও প্রিয় জুতো তিনি দফন করবেন, একথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বইকি! ফলস্বরূপ পুনরায় শাস্তি পেতে হয় তাকে।
এরপর আবু জুতো ছুঁড়ে ফেলে দেন। ঘটনাক্রমে তা গিয়ে পড়ে এক ছেলের ঘাড়ে। সে অজ্ঞান হয়ে যায়। লোকেরা আবুর নাগরাই জুতা চিনতে পারে। তারা বিচার নিয়ে যায় কাজির কাছে। আলি আবার শাস্তি পান।

    আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় "অলক্ষুণে জুতো"গল্পটির সারাংশ হল অত্যধিক কৃপণতা ভালো নয়, কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝবেন আসল কথা তা নয়। গল্পটি রূপকধর্মী। আমাদের মধ্যে অনেকেরই এই  অভ্যাস রয়েছে, যে আমরা সচেতনভাবে বা অবচেতনে কিছু বস্তুকে নিজের পরিচয়ের অংশ করে তুলি। যেমন এই গল্পের ক্ষেত্রে, গল্পের নায়ক আলি আবু তার ছেঁড়া জুতোজোড়াকে নিজের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছিলেন। ফলস্বরূপ জুতোর গুরুত্ব একসময় তার মালিককেও ছাড়িয়ে যায়। সাধারণ অবস্থাতেও মানুষ যেসব দুর্দশায় পড়েন তার বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কারণ কিন্তু তুচ্ছ বস্তু অথবা অপদার্থ পরিজনের ওপর অনর্থক বিশ্বাস এবং নির্ভরশীলতা। তাই সাধু সাবধান! তুচ্ছ বস্তু, খারাপ অভ্যাস এবং অযোগ্য মানুষ (সে আপনার যত প্রিয়ই হোক না কেন) এই তিনের সম্পর্কে সদা সতর্ক থাকবেন। এই ত্রয়ীর যে কোনো একটি যদি আপনার পরিচয়ের সর্বাধিক শক্তিশালী অংশ হয়ে ওঠে তাহলে খারাপ সময়ে তা আপনার অস্তিত্ব‍ ও স্বাধীনতা দুয়েরই বারোটা বাজাবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

সর্বজনীন স্যার ডঃ শংকর সেন ~ দেবেশ দাস

ব্রিটিশ ভারতে ছাত্রাবস্হা থেকেই দেশপ্রেমে অবিচল। এক বিকেলে একটা বাড়ী থেকে গ্রেফতার হয়ে গেল দুই স্কুল ছাত্র। পরের দিনের সকালের ধর্মঘটে তাদের রেলে নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা ছিল, সেই উদ্দেশ্যেই উঠেছিল ওখানে। স্যার বললেন, গ্রেফতার হতাম না জানো, যে বাড়ীতে উঠেছিলাম, বন্ধুর বোন পাড়ায় গল্প করেছিল যে বাইরে থেকে দাদার বন্ধুরা এসেছে, ব্যস খবরটা পুলিসের কানে পৌঁছল। সেই ছাত্রই শংকর  সেন। স্কুলশিক্ষা শেষে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া, অধ্যাপনায় ঢোকা। ইংল্যান্ডে বিশ্ববিখ্যাত এক অধ্যাপক এম জি সে এর কাছে পিএইচডি। 
কলেজে চলছে বার্ষিক পরীক্ষা, তারই অংশ হিসাবেই প্রত্যেককে মৌখিক পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। সেই সময়ে করিডোরে ডঃ শংকর  সেন দেখলেন একটি ছাত্রকে। 'এই তোমার পরীক্ষা না? এখানে ঘুরছ কেন?' ছাত্রটি বলল, মৌখিক পরীক্ষা দিতে তার প্রথমেই ডাক পড়েছিল, যা প্রশ্ন করেছিল কিছু পারেনি, স্যার ঘর থেকে বার করে দিয়েছেন, বলেছে, একদম শেষে এসো, সবার শেষে তোমায় আবার ধরবো। ছাত্রটিকে বললেন, শিগগিরি তার ঘরে যেতে, ঘরে গিয়ে কী কী প্রশ্ন তাকে করা হয়েছিল শুনলেন, তারপর সেটাই ছাত্রটিকে দীর্ঘক্ষন ধরে বোঝালেন। সবার শেষে ছাত্রটির যখন আবার ডাক পড়লো, সেই একই প্রশ্নে ছাত্রটি সফল, প্রশ্নকর্তা অবাক।



শুধু পড়াশোনা না, যে কোনও ছাত্রকে যে কোনও সাহায্য করার জন্য সবসময় মুখিয়ে থাকতেন স্যার। 'ছাত্র' শব্দটাতেই এক অদ্ভুত দুর্বলতা। কখনো কোনও একটা প্রোগ্রামে হয়তো যেতে চাইছেন না, বকাবকি করছেন, একটা মোক্ষম অস্ত্র ছিল, 'ছাত্রকে আপনি সাহায্য করবেন না?' ব্যস কাত হয়ে যেতেন। তার মৃত্যুর দিনে তাই অগণিত ছাত্রদের ভীড়, সকলেই তার সরাসরি ছাত্র না, কিন্তু তাও প্রত্যেকেই এই সার্বজনীন শিক্ষকের ছাত্রই, কোনও না কোনও ভাবে তার কাছে চলার পথে সাহায্য পেয়েছে, জীবনের উপদেশ পেয়েছে। মেধাবী ছাত্র, গবেষক, অধ্যাপক, উপাচার্য, মন্ত্রী, সব কিছু ছাপিয়েই তার মূল পরিচয় তিনি অগণিত ছাত্রদের স্যার।
মন্ত্রিত্বের পর অবসর জীবনে এক বিখ্যাত তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানি তাকে বলেছিল পাওয়ার প্লান্ট পরিচালনার ব্যাপারে একটা সফটওয়্যার বানাতে তাদের সাহায্য করতে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রয়োগের ব্যাপার, সাথে সাথে রাজী হয়েছিলেন, তবে দুটি শর্তে। এক, যেদিন কোম্পানিতে যাবেন তাকে গাড়ী দিতে হবে, আর যতক্ষন থাকবেন, তাকে সামান্য কিছু খেতে দিতে হবে। না, কোনও কনসালটেন্সী ফি তিনি নেবেন না। কোম্পানিটি অবাক। অথচ, তার খুব স্বচ্ছল অবস্হা ছিল না। দীর্ঘদিন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ানো, তারপর কয়েকবছর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, পেনশন পাওয়ার সময়ে যে কোনও কারণেই হোক তার শিবপুর ও যাদবপুরের সার্ভিস পিরিয়ডের সংযোগ না হওয়ায় পেনশন যা পাওয়ার কথা তার থেকে বেশ কম পেতেন। তাই নিয়েই চালাতেন।     
চিরকাল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো, তা নিয়ে বই লেখা, অথচ স্কুল শিক্ষা উন্নত করার জন্য বিশেষ ভাবিত ছিলেন। কখনো হয়তো কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক এসেছে তাকে সমাবর্তনে ভাষণ দেওয়ার জন্য, তিনি রাজী হননি, বলেছেন তিনি এখন স্কুলশিক্ষা নিয়ে বেশী চিন্তিত। সপ্তম বামফ্রন্ট মন্ত্রীসভায় তথ্যপ্রযুক্তি দফতরের স্কুলে স্লাইড সহযোগে পড়ানোর উদ্যোগে খুবই সক্রিয় হয়েছিলেন। মন্ত্রিত্বের পরেও বামফ্রন্ট মন্ত্রীসভার কোনও কোনও দফতরকে সাহায্য করেছেন।
রাজ্য সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি দফতরের কাজে একদিন তাকে গাড়ী পাঠানো হয়েছে। যাতায়াতের পথে সেই গাড়ী নিয়ে তিনি ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন। যেহেতু ব্যক্তিগত কাজে সরকারী গাড়ী ব্যবহার করছেন, তাই সরকারী দফতরে হিসেব করে তার জন্য টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সরকারী অফিসার তো হতবাক, মন্ত্রীকে ধরলেন, এই টাকা কিভাবে নেওয়া হবে? মন্ত্রী বললেন, নিতেই হবে, এই টাকা ফেরত নিতে তার স্যারকে বলার সাহস নেই। উপাচার্য থাকার সময়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ী নিয়ে বিয়েবাড়িতে গেলে গাড়ীর ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। কলকাতার একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটা কাজে দু-একবার যাওয়ার সময়ে, প্রতিষ্ঠানটি তাকে একটা বড়ো গাড়ী পাঠিয়ে দিত, তাতে তার কি সংকোচ!
পার্টির সদস্য ছিলেন না। কিন্তু শৃঙ্খলা পরায়ণায় ঘাটতি ছিল না। কত রথী-মহারথী  তো পার্টির সাথে বিচ্ছিন্ন হওযার পর নানা কথা বলেছেন। তার সাথে কোনও না কোনও মতবিরোধেই তো তিনি বামফ্রন্ট মন্ত্রীসভা ছেড়েছিলেন, কিন্তু একটা কথা তার মুখ দিয়ে কেউ বার করতে পারেনি। না, শত একান্ত আলোচনাতেও আমরা ছাত্ররাও এ ব্যাপারে কোনদিন কিছু জানতে পারিনি। জ্যোতি বসুর প্রতি ছিল অগাধ আস্হা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা। মৃত্যুর আগে জ্যোতি বসু যখন দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিলেন, তখন হাসপাতালের চারপাশে বহু লোক রোজ জড়ো হতেন। স্যারও একদিন গিয়েছিলেন, বহু লোকের সাথে বাইরে দাড়িয়ে চলে এসেছিলেন। 
মেয়েদের প্রতি দারুন সম্ভ্রম দেখিয়ে গেছেন চিরকাল। মন্ত্রী থাকাকালীনও তার সাথে দেখা করতে আসা ব্যক্তিদের সাথে কোনও মহিলা এলে সাথে সাথে উঠে দাড়াতেন। অবসর জীবনে নানা জায়গায় যেতেন। মানুষের সাথে কথা বলতেন। একবার কোনও এক জায়গায় খুব সাধারণ মহিলারা তাকে একটা প্রশ্ন করেন, মহিলা বিধবা হলে তার মাছ-মাংস খাওয়া বারণ, কিন্তু পুরুষ বিপত্নীক হলে তো সে সব খায়, এটা কেন চলবে? স্যারের তখন কয়েক বছর হল স্ত্রী মারা গেছেন, ট্রেনে ফিরতে ফিরতে তার মনে হল, এদেশের মেয়েদের ভীষন বঞ্চনা করা হচ্ছে, বাড়ী ফিরে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। 
জীবনে স্ত্রীর অবদানের কথা সোচ্চারে বলতেন।  তাঁর ছাত্র বাৎসল্যকে মদত দিতে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন একেবারে উদারহস্ত, আর অসহায় মানুষের প্রতি স্যারের মতোই আন্তরিক। স্যারের কাছেই গল্প শুনেছিলাম, একবার কোন একটা জায়গায় স্যারের সাথে গিয়ে মানুষের দারিদ্র্য দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। একবার একটা প্রোগ্রামে স্যারের যাওয়ার কথা হচ্ছিল, কিন্তু কিছুতেই কেন যেতে চাইছেন না বুঝতে পারছিলাম না। পরে বললেন, ঐদিন তাদের বিবাহবার্ষিকী, ওদিন তিনি একা থাকবেন, কোথাও যাবেন না, তাঁর স্ত্রী তখন ১০-১২ বছর মারা গেছেন।  
স্যারের সম্বন্ধে বলতে গেলে নানা গল্প আর শেষ হবে না। গত কয়েক দশকে অনেক বুদ্ধিজীবি তো রাজ্যে দেখা গেল। কেন জানিনা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির লোকদের কেউ বুদ্ধিজীবির পর্যায়ে ফেলে না। দেশপ্রেম, শিক্ষাঅনুরাগ, সমাজবোধ, সমাজ-সচেতনতা, মূল্যবোধ, প্রগতিশীল চিন্তা, মানুষের প্রতি দরদ, সব কিছুতেই স্যার একবাক্যে অনন্য। আজীবন প্রচারবিমুখ আদর্শের প্রতিমূর্তি মানুষটি নীরবেই চলে গেলেন।

আপের জয় ও এইরাজ্যের বাজেট ~ বিষাণ বসু

দিল্লিতে আপের জয়জয়কারে আপনার মতো আমিও খুশী - উচ্ছ্বসিত। আদার ব্যাপারী - তাই রাজধানীর খবর তেমন একটা পাই না -  তবে হাইএন্ড বন্ধুদের মুখে শুনেছি, সেখানকার সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা আর সরকারি ইশকুলের ভোল বদলে দিয়েছেন কেজরিওয়ালের সরকার - মহল্লা ক্লিনিকের কথা শুনেছি - কাগজেই পড়েছি, পরীক্ষাটরীক্ষায় দিল্লিতে বড়লোকি প্রাইভেট ইশকুলের চাইতে ভালো রেজাল্ট করছে সরকারি ইশকুল।  

গেরস্ত মধ্যবিত্ত মানুষ - দাঙ্গাহাঙ্গামায় বড় ভয় পাই। কাজেই, এরাজ্যেও বিজেপি না আসুক, এমনটাই চাই। প্লাস, ওই মধ্যবিত্ত বলেই, স্বাস্থ্য আর শিক্ষা নিয়ে খুব চিন্তায় থাকি - ভাবি, ওই পথেই উন্নতি-টুন্নতির আশা।

এইরাজ্যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র - তিনি খুবই হাইফাই অর্থনীতির লোক, শুনেছি।

রাজ্যের বাজেটের খোঁজ আজকাল কেউ রাখে না - খুব একটা খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ কেউ করেন, এমনও দেখিনি। তবু, আমার মতো আনাড়ির চোখে একটু কেমন কেমন ঠেকল -      

গতবছরের রাজ্য বাজেটে -

স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়বরাদ্দ - ৯৫৫৬ কোটি টাকা
স্কুল শিক্ষায় - ২৭৫৪০ কোটি টাকা
উচ্চশিক্ষায় - ৩৯৬৪ কোটি টাকা
বৃত্তিমূলক শিক্ষায় - ১১০৬ কোটি টাকা

এবছরের বাজেট -

স্বাস্থ্যখাতে - ৪৬০৮ কোটি টাকা (গতবছরের আটচল্লিশ শতাংশ - অর্ধেকেরও কম) 
স্কুল শিক্ষায় - ৮৭৫০ কোটি টাকা (গতবছরের একতিরিশ শতাংশ - এক-তৃতীয়াংশেরও কম)
উচ্চশিক্ষা - ৭০০ কোটি টাকা (গতবছরের সতের শতাংশ - ছয় ভাগের এক ভাগ) 
বৃত্তিমূলক শিক্ষায় - ৯০০ কোটি টাকা (গতবছরের আশি শতাংশ) 

এসব নিয়ে কেউ হইচই করছেন, এমন খবর দেখিনি। মিডিয়াতেও শোরগোল চলছে, এমনও দেখিনি। আপনি কিছু খবর পেলে জানাবেন, প্লীজ।

হ্যাঁ, খুশীর খবরও কি নেই? আছে তো!! জাতপাতের ভিত্তিতে পেনশন চালু হবে এরকম অনেক খবরই আছে।

তা, এই পথেই বিভাজন আর জাতপাত আর হানাহানির রাজনীতি প্রতিহত হবে? শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ছেড়ে পাইয়ে-দেওয়ার রাজনীতি দিয়ে ঘৃণা-বিদ্বেষের বয়ানের মোকাবিলা হতে পারবে? 

প্রসঙ্গত, দুই রাজ্যেই নাকি কর্ণধারদের স্ট্র‍্যাটেজি সাজিয়ে দিচ্ছেন প্রশান্ত কিশোর। তাহলে? আমরা, এই রাজ্যের নাগরিক তথা ভোটারেরা কি এমনই অর্বাচীন যে চুষিকাঠির বাইরে ভাবতে শিখিনি?? শিক্ষা-স্বাস্থ্য আমাদের অগ্রাধিকার নয়??? 

আপনি কী বলেন??

(তথ্যসূত্র - মাননীয় শ্রী অমিত মিত্র মহাশয়ের ২০১৯ ও ২০২০ সালের বাজেট বক্তৃতা)