শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুভেন্দুর হালচাল ~ অরিত্র হালদার

দার্শনিক জাক লাকান ফ্রয়েডের সুপার ইগো নামক থিওরেটিক্যাল কনস্ট্রাক্টের এক্সটেনশন হিসেবে একটি কাউন্টার ইন্টুইটিভ, প্রায় অযৌক্তিক এবং স্যাডো-ম্যাসোকিস্টিক সত্তার কথা বলেন। এই সত্তা যেমন একাধারে কর্তব্যের প্রতি চরম সত্যনিষ্ঠ আনুগত্যের দাবি করে (ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব), একই ভাবে সে সেই কর্তব্যপালনে কেউ ব্যর্থ হলে তাকে শাস্তি প্রদান করে এক বিকৃত আনন্দ লাভ করে। 

এই পার্ভার্সিটি অফ অর্ডারলি বিহেভিয়ারকেই দার্শনিক স্লাভোজ জিজেক আবার রাজনৈতিক স্তরে এনে উল্টে পাল্টে নিয়েছেন। কেন? কারণ জিজেক মনে করেন প্রতিটা সরকারের লিখিত, আনুষ্ঠানিক ব্যবহারের আড়ালে একটা অলিখিত, বিকৃত ট্রানসগ্রেশন থাকে। এই ট্রানসগ্রেশনই হলো ইলেক্টোরাল ডেমোক্রেসিতে ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণের মূল হাতিয়ার। উনি এই সত্ত্বার নাম দিয়েছেন the obscene superego supplement (OSS) অথবা the paraphillic superego। 

একটু সরলীকরণ করতে হলে ব্যাপারটাকে এভাবে দেখতে হবে: কেন শুভেন্দু অধিকারী এবং তার মন্ত্রিসভা এই মুহূর্তে এক অদ্ভূত অশ্লীল এবং অপরিশীলিত কায়দায় দুর্গাপুজো, বাগেশ্বর, ইসকন, যাদবপুর ইত্যাদি বিষয়ে ভাষণবাজি, ব্যক্তি আক্রমণ, একপেশে মিথ্যে স্ল্যান্ডার এবং গেরুয়া যাত্রা বা নাগা সাধু মিছিলের নামে রাজনৈতিক কুরঙ্গ করে বেড়াচ্ছেন? কেন তাদের বিহেভিওরাল প্যাটার্নে এক আশ্চর্য রকমের low-intellect, goonish ট্রেইট ফুটে উঠছে? বিশেষতঃ যখন তারা এক বিপুল সংখ্যক জনগণের decisive mandate নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছেন? 

এর উত্তর নিহিত আছে জিজেকের OSS থিওরিতে। ওনার মতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শুধু বস্তুনিষ্ঠ আইনানুগ নিয়মাবলীর সুষ্ঠু পালনই একমাত্র পথ নয়। বিশেষতঃ যখন সরকার একটি totalitarian regime দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সেই রেজিমের প্রয়োজন একটি কাউন্টার পয়েন্টের। এবং এই কাউন্টারপয়েন্ট সাধারণতঃ আইন ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের বিপরীতমুখী এক পারভাসনের মাধ্যমে রেজিমের অনুগামীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। প্রকৃত অনুগামীদের সংহতি তৈরি করতে, তাদের আসল সমর্থন লভ্যার্থে সরকারকে এর কদর্য অন্ধকার দিকটিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। 

অর্থাৎ সরকারের অনুগত মানুষের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে যেতে গেলে ঠিক যে যে জিনিসগুলো কাগজে কলমে বেআইনি বা অনৈতিক বা বিকৃত রুচির বলে ধার্য করা আছে, সরকার সেই কাজগুলোই খোলাখুলি ভাবে করতে থাকবে। এই যে নৈতিকতার ট্রান্সগ্রেশন, এটাই মর্ষকামী মানুষকে তার পছন্দের রাজনৈতিক দলের সাথে একাত্ম হতে সহায়তা করে। এতে করে এক অদ্ভূত shared guilt এবং তৎপরবর্তী এক obscene pleasure এরা অনুভব করতে শুরু করে। তাত্ত্বিক ভাষায় লাকান এই প্যারাডক্সিক্যাল অপরাধবোধ এবং আনন্দানুভূতিকে Jouissance নামে অভিহিত করেছেন। 

এই jouissance এর জন্যই যখন নাগা সাধুরা পশ্চাদ্দেশ উন্মোচন করে যাদবপুরের সামনে গিয়ে "প্রতিবাদ" উদযাপন করেন, বা শুভেন্দু খোলা বাজারে ছাত্র শিক্ষক নির্বিশেষে সবাইকে থ্রেট দিয়ে বেড়ান, বিজাতীয় গুটখা খেকো ঊনমানবের দল বাঙালিকে সংস্কৃতির পাঠ দেয়, শিক্ষক - অধ্যাপকদের গণশত্রু হিসেবে দেগে দেওয়া যায় আর বুলডোজার এসে গুঁড়িয়ে দিয়ে যায় গরিবের ঘরবাড়ি আর ভবিষ্যতের সম্বলগুলো তখন এসব দেখে এক শ্রেণির জনতা সোল্লাসে সরকারের জয়ধ্বনি দিয়ে ওঠে। 

শুভেন্দুরা এটা জানেন যে তাঁদের ক্যাপটিভ ভোট ব্যাংক গুড গভর্নেন্স বা অর্থনৈতিক পালাবদলের জন্য এই সরকারকে ক্ষমতার মসনদে বসায়নি। তারা এটাও জানেন যে একটা বিরাট অংশের মানুষ মিথ্যে প্রোপাগান্ডার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আজকে এরাজ্যের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার ছাত্র শিক্ষকদের ঘৃণা করতে শিখেছে। তারা জানেন যে তৃণমূলের দুর্নীতিতে অতিষ্ট হয়ে বহু অ-বিজেপি মানুষ তাদের ভোট দিয়েছেন এবং সেই মানুষরা তাদের ক্যাপটিভ ভোটব্যাঙ্ক নন। তারা জানেন যে বাঙালি আজকে একটি ক্লীব, আত্মবিস্মৃত, হৃতগৌরব জাতিগোষ্ঠীতে পর্যবসিত হয়েছে। এতটাই যে বিজাতীয় শকুনরা এসে বাংলার আইকনদের অপমান করে পার পেয়ে যায় কিন্তু সেই বিজাতীয় শকুনদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে কিছু বাঙালি অ্যাপোলজিয়া নামিয়ে ফেলে এবং সেই প্রতিবাদীকে জেলে পুরে দিতেও এরা পিছপা হয় না। ফলে এই সরকার প্রতিনিয়ত সেই রাষ্ট্রধর্মের বিকৃত ট্রান্সগ্রেশন করতে থাকবে। কারণ এই প্রতিটা সাবভারসন তাদেরকে তাদের ক্যাপটিভ ভোট ব্যাংকের চোখে লেজিটিমেসি দিয়ে চলেছে। আর এইভাবেই এরাজ্যে বিজেপির ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ হতে থাকবে। এটাই জিজেকের obscene superego supplement! 

মুশকিল হলো শুভেন্দু নিজে আদি বিজেপি না হওয়ার দরুন এবং নিজের তৃণমূলী অতীতকে জনমানস থেকে মেটাতে না পেরে, সারাক্ষণ হীনমন্যতায় ভোগেন এবং নিজের হিন্দু কট্টরপন্থী স্ট্যান্ড প্রমাণ করতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রয়াসে সচেষ্ট থাকেন—যাতে বিজাতীয় প্রভুরা তাঁকে তাদের সাথে সমাসনে বসান। এতে না ওনার অথেন্টিসিটি ফুটে ওঠে, না ওনাকে বিপক্ষের মানুষজন সিরিয়াসলি নেন। ওনার দুর্ভাগ্য উনি জানেন না যে সংঘের স্ট্রাকচারাল কনফিগারেশনে উনি বা ওনার মতো রাজনৈতিক অ্যাসপিরেন্টরা চিরকাল এক্সপেনডেবল হয়ে থেকে যাবেন। যেদিন ওনার প্রয়োজন ফুরাবে, সেদিন ওনার নটে গাছটিও মুরোবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন