রবিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৯

আটকথা ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

-"বুঝলেন মিত্তিরবাবু, আজ আমি যাকে বলে, একেবারে আহ্লাদে আটখানা!" বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতে লালমোহনবাবু জানালেন। 
সকাল থেকেই ফেলুদা আজ অন্যমনস্ক, কী যেন চিন্তা করছে। মুখ না ঘুরিয়েই উত্তর দিল, "আটখানা কেন বলে, লালমোহনবাবু? সাত বা নয়খানা নয় কেন?" 
লালমোহনবাবু হতভম্ব হয়ে তপসের দিকে তাকালেন। তপসে হেসে বললো, "আপনি বসুন। সকাল থেকে ফেলুদাকে আটে পেয়েছে।" 
-আর্ট? মানে, মডার্ণ আর্ট, নাকি মার্শাল...
-আরে না না, আট সংখ্যাটা। আচ্ছা, আজ কী উৎসব বলুন তো?
এবার লালমোহনবাবু একগাল হেসে বললেন, "এটা নিশ্চিত জানি। আজ হলো গিয়ে জন্মাষ্টমী!" 
-ঠিক। শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন। কিন্তু উনি বেছে বেছে অষ্টমী তিথিতেই জন্মালেন কেন, বলতে পারেন? 
এবার তপসে ধুয়ো ধরলো, "মাসটাও কিন্তু অগস্ট, মানে আট নম্বর!" 
-সেটা বোধহয় গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে আর কিছু মিল পাচ্ছিস কি, আট আর কৃষ্ণের মধ্যে? 
-কৃষ্ণ ছিলেন দেবকীর গর্ভের অষ্টম সন্তান... 
-রাইট। আর কিছু?
কিছুক্ষণ দু'জনেই চুপচাপ। ফেলুদাই বলল "কৃষ্ণের বদলে কংস কাকে হত্যা করতে গেছিলেন, মনে পড়ে?"
তপসে বলে উঠল "মহামায়া! আট হাতের দেবী!"
-ভেরি গুড। আর কৃষ্ণের জন্মদাতা কে ছিলেন?
-বসুদেব! আরে, অষ্টবসু ছিলেন না!
-কানেকশন থাকতেই পারে! আচ্ছা, কৃষ্ণ বললেই আর কোন নামটা মনে পড়ে?
এবার লালমোহনবাবু লাফিয়ে উঠে বললেন, "এটা আমি জানি! রাধা!"
ফেলুদা হেসে বলল, "ঠিক। রে, আর ধা। দ্বিতীয় সুর, ষষ্ঠ সুর। দুইয়ে মিলে কতো হয় বলুন তো?"
দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলো, "আট!" 
ফেলুদা হেসে বলল, "আর কৃষ্ণ কে যদি বলি কৃ, সা, নি, তাহলে? সা হলো প্রথম সুর, নি হলো সপ্তম। দুইয়ে মিলে?" 
লালমোহনবাবু ধপ করে সোফায় বসে পড়লেন। "এ তো সাঙ্ঘাতিক কানেকশন মশাই! যাকে বলে, যাকে বলে..."
-"আটার কোইন্সিডেন্স্‌, তাই তো? আসলে কী জানেন, আমার বিশ্বাস, এই সব পুরাণের গল্পগুলো আসলে প্রতীকী। কিন্তু কিসের প্রতীক? আট সংখ্যাটা বারবার এসে কী বোঝাতে চেয়েছে? আমরা যে সাষ্টাঙ্গে, মানে স অষ্ট অঙ্গে প্রণাম করি, তার সঙ্গে কোন সম্পর্ক আছে কি?" 
একটু দম নিয়ে লালমোহনবাবু বললেন, "আহা, আমি আমার পরের উপন্যাসের নাম পেয়ে গেছি!" 
ফেলুদা হেসে বলল, "কী নাম, আটেতে আটকালি?" 
-"নো স্যার, অষ্টের কষ্ট!!" 
হা-হা করে হেসে উঠলো তিনজনেই!

শুক্রবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৯

আমাজনে আগুন ~ সংগ্রাম চ্যাটার্জী

বোলতার চাকে ঢিলটা মেরে কথাটা ইতোমধ্যেই এসে গেছে যে— গত ক'দিন ধরে জ্বলতে থাকা আমাজন জঙ্গলের আগুন একটা সামগ্রিক চক্রান্তের পরিণতি, এবং এর পিছনে থাকতেই পারে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত NGO গুলো!
আরে! শুধু ঐ NGO গুলোই কর্পোরেটের নিয়ন্ত্রণে আছে! রাষ্ট্র নেই!? মানে একের পর এক দেশের শাসক শ্রেণী কর্পোরেট দ্বারা পরিচালিত নয়?!?

যাই হোক্, পরিবেশ! যে কিনা বর্তমান ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সামাজিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্র!
এক আমাজন রেইন ফরেস্ট গোটা দুনিয়ার এক পঞ্চমাংশ অক্সিজেন সাপ্লাই দেয়। এ' যদি ধ্বংস হয় তাহলে গোটা পৃথিবীর ইক্যুইলিব্রিয়াম টলে যাবে!
তো? সমস্যা কার? যারা ঘটাচ্ছে?
নাহ্! সব্বার আগে মরবে গরীবস্য গরীব মানুষগুলো। পড়ে থাকবে পৃথিবীর ধ্বংসাবশেষ! আর যারা নিজের হাতে ধ্বংস করছে এই ব্যবস্থা, তারা আরও অনেক অনেক মুনাফা নিয়ে আরও আরামের জীবনের দিকে পা বাড়াবে।

ভারত। আমার দেশ। 
গত পাঁচ বছর ধরে আমার দেশে রাষ্ট্রের সরাসরি মদতে পরিবেশকে কুচলে মারার কাজটা কার্যত 'বুলেট ট্রেন'-এর গতিতে চলছে!!
মধ্যভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পাহাড়-জঙ্গলের ওপর পড়ছে একের পর এক কোপ! পশ্চিমঘাট থেকে শুরু করে আরাবল্লী, বিন্ধ্য— সর্বত্র জল-জমিন-জঙ্গলকে কর্পোরেটকে বেচে দেওয়া অথবা সরাসরি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে ধ্বংস করার কাজটা চলছে! চলেই যাচ্ছে! সাথে এই বনাঞ্চলকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা হাজারো-লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ আজ একটা বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে!!

চাই মুনাফা! শুধুমাত্র অতিরিক্ত মুনাফা!
মহারাষ্ট্রের বিরাট বনাঞ্চল জ্বালিয়ে দেওয়া হল, মধ্যপ্রদেশের হাজার হাজার একর জঙ্গল কেটে সাফ করে দেওয়া হল! বুলেট ট্রেনের নাম করে হাজার হাজার একর ম্যানগ্রোভ অরণ্য ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা হচ্ছে! উত্তরাখণ্ডে প্রায় প্রতি বছর পরিকল্পিত দাবানল হচ্ছে!! হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে এলাকার পর এলাকা বেচে দেওয়া হচ্ছে কর্পোরেটকে! আরাবল্লী পাহাড় কেটে সাফ করে দেওয়া হচ্ছে!!
পরিবেশ, বর্তমান ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্র!

"একটা গাছ—একটা প্রাণ"! এই স্লোগানে গলা মিলিয়ে ঘরে ঘরে গাছ লাগিয়ে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। কারণ... 
কারণ, আপনি-আমি চাই বা না চাই এই সমস্যাটা একান্তই একটি মূলগত রাজনৈতিক সমস্যা। রাজনৈতিক ভাবে এর মোকাবিলা না করে এবং রাজনৈতিক ভাবে এর শত্রুদের কোণঠাসা না করলে এই লড়াইটা জেতা যাবে না। আর, এই লড়াইটা লড়তে হবে জেতার জন্যেই।
(গাছ লাগানোর বিরোধিতা করছি— আমার এই কথা থেকে এই মানে তৈরি করবেন না দয়া করে)

সমস্যাটা যে আমার অস্তিত্বকেই নাড়া দিচ্ছে এখন— এটা আমাজন রেইন ফরেস্টের লাগাতার আগুন আরেকবার— হ্যাঁ, আরেকবার চোখে আঙুল দিয়ে just দেখিয়ে দিল।

আবারও লিখি— পরিবেশ, বর্তমান ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্র!

ছবিতে জ্বলন্ত আমাজন রেইন ফরেস্ট

অশনিসংকেত ~ প্রসূন আচার্য্য

প্রিয় বন্ধুরা, 
মনে হয় আপনারা এখনো শোভন-বৈশাখী আর কাশ্মীরে 370 ধারা তুলে দেওয়া নিয়েই পড়ে আছেন। শোভনের আধ-বোলে মমতা-মা এর সমালোচনা, রং-মিলন্তি পোশাক, বৈশাখীর প্রসাধন করা মুখ, হাতে আটটি আংটি, আর ওরা কি একসঙ্গেই থাকে ? এই আলোচনায় বাঙালি মশগুল। একটু পিছিয়ে কিন্তু দ্বিতীয় আলোচনার বিষয়বস্তু কাশ্মীর। যাই বলো গুরু, মোদী আর অমিত শাহ বাপ কা বেটা। পাকিস্তানকে দেখিয়ে দিল। জঙ্গিদের ঘরে ঢুকিয়ে দিল। যাক এত দিনে শ্যামাপ্রসাদের আত্মা শান্তি পেল। আর তৃতীয় আলোচনার বিষয়? দিদিকে বলো। প্রশান্ত কিশোর। 2021 আর ক'মাস?

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি এবার একটু চোখ তুলে তাকান। তৃণমূলের কিছু নেতা বা কর্মীর দুর্নীতি, সুবোধ থেকে শ্রীজাতদের নব্য-দলদাস হওয়া, মমতার অন্ধ ভাইপো স্নেহের থেকে অনেক বড় বিপদ আজ আমাদের দোর গোড়ায়। আমরা এক ভয়ংকর আর্থিক মন্দার মধ্যে দ্রুত প্রবেশ করেছি। কোনও বাংলা বড় সংবাদমাধ্যম এ কথা বলছে না। ভয়। দিল্লির বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাবে। ঠিক যেমন দিদির পুলিশ রাতের অন্ধকারে আলো নিভিয়ে মহিলা পার্শ্বশিক্ষিকাদের উপর মধ্যযুগীয় কায়দায় লাঠিপেটা করে তাঁদের ব্লাউজ ছিঁড়ে দিলেও মিডিয়া চুপ করে থাকে, ঠিক তেমনি।  আমি প্রথম শ্রেণীর মিডিয়ায় চাকরি করেও বলছি, শাসকের কাছে এমন নতজানু মিডিয়া আমি 31 বছর সাংবাদিকতা জীবনে কোনোদিন দেখিনি। অবশ্য সর্বভারতীয় ক্ষেত্রেও একই ছবি।

বিশ্বাস করুন, মোদী-শাহ- নির্মলা সীতারামন তিনজনেই জানেন, সরকারের হাতে টাকা নেই। আজই স্টেট ব্যাংক বলেছে, এটিএম কার্ড বন্ধ করে দেবে। নতুন এপ্স নিয়ে আসবে। কেন ? আসল কারণ, লোকজনের ব্যাংক থেকে টাকা তোলা বন্ধ করতে। অবস্থা কতটা খারাপ একটা উদাহরণ দিই। আপনার হকের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা সরকারের কাছে থাকে। প্রতি বছর 1 এপ্রিল সুদের টাকা জমা হয়। এ বছর হয়নি। নাকি সার্ভার খারাপ। আরে ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় 6 মাসে সার্ভার ঠিক হলো না? গত বছরও একই যুক্তি ছিল। পিএফের টাকা সরকার ধার নেয়। বিভিন্ন খাতে খাটায়। তারপর সুদ সমেত ফেতৎ দেয়। এটাই নিয়ম। এই বছর আজও গত বছরের টাকা ফেরত দেয়নি। দিলে খাতা কলমে এক লাখ কোটি টাকা শুধু সুদ দিতে হবে। সরকারের কাছে সেই টাকা নেই। জিএসটি থেকে আয় হলে দেবে। 

আপনারা ভাসা ভাসা জানেন বিএসএনএল এর অবস্থা খারাপ। জানেন কি, শুধু কলকাতায় যাঁরা লাইন-ম্যান হিসেবে কাজ করেন, সেই 4800 কর্মচারী গত জানুয়ারির পর কোনো বেতন বা টাকা পায়নি। সাত মাস ধরে কী করে তাঁদের পরিবার চলছে তাঁরাই জানেন। অনাহারে অসুস্থ হয়ে ইতিমধ্যে 7 জন মারা গেছেন। কলকাতায় এই মুহূর্তে 25 হাজার ল্যান্ড লাইন খারাপ। দিন দিন সংখ্যা বাড়ছে। কাজ করার লোক নেই। ভাবছেন জিও তো ব্রড ব্যান্ড নিয়ে আসছে। চিন্তা কি! এই মুহূর্তে বিএসএনএল এর জন্য সরকারকে দিতে হবে মাত্র 14 হাজার কোটি টাকা। তাহলেই 1 লাখ 75 হাজার কর্মী সেইসঙ্গে ঠিকাদার ও শ্রমিক মিলে 5 লাখ পরিবার বাঁচবে। মাত্র 14 হাজার কোটি কেন বললাম ? রিলায়েন্স এর ব্যাংকের কাছে ধার প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা! সিংহভাগ জি ওর জন্য। বুঝছেন ব্যাপার টা? এয়ারটেল এর ধার এক লাখ কোটির ওপর।

লোকের হাতে টাকা নেই। ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে না। এই মুহূর্তে দেশের 30 টি বড় শহরে 12 লাখ 80 হাজার তৈরি ফ্ল্যাট পড়ে আছে। কেনার লোক নেই। শুধু কলকাতায় 20 হাজারের উপর ফ্ল্যাট অবিক্রিত।

গাড়ি বিক্রি এতই কমে গেছে নয়ডার মারুতি গাড়ির কারখানা থেকে শুরু করে জামসেদপুরের টাটা মোটর এর উৎপাদন ক'দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কর্মী ছাঁটাই শুরু হচ্ছে। একই অবস্থা বাজাজ এবং হিরো কোম্পানির। কয়েকশো গাড়ির শোরুম ঝাঁপ ফেলে ব্যাংকে জানিয়ে দিয়েছে, আমরা আর এখন টাকা শোধ করতে পারব না। কম্পিউটার এর জন্য অনুসঙ্গ বানানো কোম্পানি mosar বিয়ার এর মালিক আজই দেনার দায়ে গ্রেফতার হয়েছে। ভিডিওকন আগেই বন্ধ। মালিক বেনুগোপাল ধুত আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের দেনা তার পক্ষে শোধ করা সম্ভব নয়। বেশ কিছু সিমেন্ট কারখানা বন্ধ। ঝাড়খণ্ডের জয় বালাজি স্টিল কোম্পানি দু দিন হল উৎপাদন বন্ধ করেছে। কারণ ইস্পাত এর বাজার নেই। টাটা স্টিল ও ওই পথ নিতে পারে। গত দুই মাসে শুধু ঝাড়খণ্ড এ বেকার হয়েছে 3 লাখ শ্রমিক। লোকের হাতে টাকা না থাকায় বা থাকলেও খরচ করতে ভয় পাওয়ার ফলে হোটেলে খাওয়া কমেছে। সাবান থেকে বিস্কুট সব কিছুর বিক্রি কমছে। অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আয়ের যে অন্যতম উৎস GST সেখানেই বিপুল ঘাটতি দেখা দিতে চলেছে। কী ভাবে এই অবস্থা সামাল দেবে মোদী এন্ড কোং তা জানেন না। 

আজই কাপড় কলের মালিকরা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছেন, বস্ত্র শিল্পের অবস্থা খুব খারাপ। বাজার নেই। কাপড় কলের মধ্যে তিনভাগের একভাগ এই বছরই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। লোকসান করায় মিল মালিকরা ব্যাংকের টাকা শোধ করতে পারছে না। ওদের হিসেবেই তুলো চাষিদের নিয়ে কয়েক কোটি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে খেয়ে পরে বাঁচে। তাঁদের ভবিষ্যৎ কী কেউ জানে না। বিদেশে রফতানিও কমেছে দ্রুত। তার থেকেও বড় কথা ক মাস বাদেই নতুন তুলো উঠবে। তার বাজার মূল্য 80 হাজার কোটি টাকা। বিক্রির বাজার না থাকলে মিল মালিকরা তা কিনবে কেন? কিংবা আরও সস্তায় কিনবে। ফলে তুলো চাষিদের আত্মহত্যা আরও বাড়বে। এই বছরই আবার ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানার ভোট। রাজনৈতিক দল গুলো তার জন্যে টাকা তুলবে! 

গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো কাশ্মীর। সেখানে কাশ্মীরি জনগণের মৌলিক অধিকার বন্দুকের বেয়নেট এর জোরে কেড়ে নিতে প্রায় 6 লাখ সেনা নিয়োগ করতে হয়েছে। তার বিপুল খরচ। কোনো যুদ্ধের থেকে খুব কম নয়। তা কিন্তু জোগাতে হবে। কারণ কাশ্মীর আগ্নেয়গিরির মত ফুটছে। ফ্যাসিস্টদের পরিয়ে দেওয়া কাজলে আমরা এতটাই অন্ধ, তা দেখতে পাচ্ছি না। আর মোদী-ভক্ত দালাল মিডিয়া দেখাচ্ছে, সব স্বাভাবিক।

পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে একটাই পথ সরকারি সম্পত্তি বিক্রি। লাভের মুখ দেখা বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি সব বিক্রি করে দাও। রেলের টিকেট বিক্রি থেকে IRCTC সব বেসরকারি হাতে তুলে দাও। আরে কিনবে কে? পরিষেবা দেবে কে ? তা জানি না। তিন বার দরপত্র হাঁকার পর  আজ অব্দি কেউ air India কিনলো না!

প্রতিবাদ করলেই UAPA  আছে। আপনাকে দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া হবে। কংগ্রেস কার্যত ভোকাট্টা। দুর্নীতিগ্রস্থ বিরোধীদের জন্যে  ED, CBI, IT আছে। তারাও মুখ বুঁজে আছে। অন্য ধান্দা করছে।

এ রাজ্যে আমাদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য মমতা আছেন। যিনি গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত বিরোধী পক্ষ মানেন না। আট বছর ধরে মানুষ তাই দেখছেন। সিপিএম, কংগ্রেস এতদিন তাই বলছিল। এখন মুকুল থেকে শোভন, তাঁর তৈরি সাধের তৃণমূলের একদা ডান ও বাম হাত আজ বিজেপিতে গিয়ে একই কথা বলছেন। আর আছে কাট মানি। আর আছে দিদিকে বলো। 

বাঙালি, চোখ বন্ধ করে থাকলে কিন্তু প্রলয় বন্ধ হবে না।

প্রসূন আচার্য। সাংবাদিক ও সমাজকর্মী।

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯

প্রসঙ্গ চিদাম্বরম, গণতন্ত্রের কালো দিন ~ বাসব রায়

এফআইআর-এ নাম ছিল না, প্রাথমিকভাবে তিনি অভিযুক্তও ছিলেন না, তবু জঙ্গিদের বিরুদ্ধে যেভাবে অভিযান করে সেনাবাহিনী কতকটা সেই ঢঙেই চিদাম্বরমকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে সিবিআই। আইএনএক্স মিডিয়া মামলায়।
গতকাল দিল্লি হাইকোর্টে চিদাম্বরমের পূর্ববর্তী জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এর প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টে জামিনের আবেদন করলে, শুক্রবার সেই শুনানি হবে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পরই সুপ্রিম কোর্টে শুনানির ফলাফল এসে যেত। তবু চিদাম্বরমকে গ্রেফতার করতে সিবিআই এত তাড়াহুড়ো করল কেন?
এমন তো নয়, যে মামলায় চিদাম্বরমকে সিবিআই হেফাজতে নিল, স্বাধীন থাকলে চিদাম্বরম তাতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারতেন। কেননা ঘটনাটা অনেক পুরনো। তিনি এখন আর মন্ত্রী নন যে সরকারের কোনো সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটাতে পারবেন। ৪৮ ঘণ্টা পর তাঁকে হেফাজতে নিলে কী অসুবিধে হত সিবিআইয়ের?
এবং এই প্রশ্নের মধ্যেই চিদাম্বরমকে হেফাজতে নেওয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে। আইএনএক্স মিডিয়া মামলার এফআইআর-এ চিদাম্বরমের নাম ছিল না, সেই মামলার কোনো চার্জশিট এখন পর্যন্ত সিবিআই দিতে পারেনি, তারপরও তাঁকে গ্রেফতারের দাবি হয়তো সুপ্রিম কোর্টে খারিজ হয়ে যেত। আর এটাই হতে দিল না সিবিআই। 
ঘটনা হল, সিবিআইয়ের আইএনএক্স মিডিয়া মামলার পাশাপাশি ইডিও একটি মামলায় চিদাম্বরমকে জড়িয়েছে। সেটা হল এয়ারবাস কেনার মামলা। তাই একবার সিবিআই একবার ইডি, এই চক্কর কাটতে হবে চিদাম্বরমকে। তারপর কিছুদিন থাকতে হবে জেলে। জামিন পাওয়া এত সহজ হবে না তাঁর, বেশ কিছুদিন তাঁর কথাবার্তা আমরা শুনতে পারব না।  
আইএনএক্স মিডিয়া মামলায় ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় নাম করেছেন চিদাম্বরমের। সম্ভবত তিনি ওই মামলায় অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী হবেন। মজার ব্যাপার হল, চিদাম্বরমকে যাঁর কথার ভিত্তিতে আজ সিবিআই হেফাজতে নিয়েছে, তিনি হলেন সহ-অভিযুক্ত, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিজের কন্যাকে হত্যা করার। এখন তাঁকেই সিবিআই বিশ্বাস করছে। শুধু একটা কথা, চিদাম্বরম ছিলেন ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমান সরকারের কোনো চুক্তি যদি পরে প্রমাণ হয় অনৈতিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে, আমরা কি এমন দেখব যে এই সরকারের বড় বড় মন্ত্রীকে আজকের মতোই সিবিআই গ্রেফতার করছে!
বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন চিদাম্বরম, সে ৩৭০ ধারা বিলোপ কিংবা দেশের বেহাল অর্থনীতি, প্রসঙ্গ যাই হোক না কেন। 
তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষিদ্ধকরণ, ৩৭০ ধারা বিলোপ, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিধিভঙ্গের হুমকি, গরু-রক্ষা, মুসলমান-ত্রাস, এনআরসি, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল... এই সব ঢেউ একদিন থেমে যাবে, রাজনীতি হবে নিস্তরঙ্গ। তখন উঠে আসবে জগতের আদি ও অনন্ত চাহিদা – খিদে। আর তখন মানুষ প্রশ্ন করবে... 
বিশ্বাস করুন, মোদী-শাহ-নির্মলা সীতারামন তিনজনেই জানেন, সরকারের হাতে টাকা নেই। আজই স্টেট ব্যাংক বলেছে, এটিএম কার্ড বন্ধ করে দেবে। নতুন অ্যাপ নিয়ে আসবে। কেন? আসল কারণ, লোকজনের ব্যাংক থেকে টাকা তোলা বন্ধ করতে। অবস্থা কতটা খারাপ একটা উদাহরণ দিই। আপনার হকের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা সরকারের কাছে থাকে। প্রতি বছর 1 এপ্রিল সুদের টাকা জমা হয়। এ বছর হয়নি। নাকি সার্ভার খারাপ। আরে ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় 6 মাসে সার্ভার ঠিক হলো না? গত বছরও একই যুক্তি ছিল। পিএফের টাকা সরকার ধার নেয়। বিভিন্ন খাতে খাটায়। তারপর সুদ সমেত ফেরত দেয়। এটাই নিয়ম। এই বছর আজও গত বছরের টাকা ফেরত দেয়নি। দিলে খাতা কলমে এক লাখ কোটি টাকা শুধু সুদ দিতে হবে। সরকারের কাছে সেই টাকা নেই। জিএসটি থেকে আয় হলে দেবে।
আপনারা ভাসা ভাসা জানেন বিএসএনএল এর অবস্থা খারাপ। জানেন কি, শুধু কলকাতায় যাঁরা লাইন-ম্যান হিসেবে কাজ করেন, সেই 4800 কর্মচারী গত জানুয়ারির পর কোনো বেতন বা টাকা পায়নি। সাত মাস ধরে কী করে তাঁদের পরিবার চলছে তাঁরাই জানেন। অনাহারে অসুস্থ হয়ে ইতিমধ্যে 7 জন মারা গেছেন। কলকাতায় এই মুহূর্তে 25 হাজার ল্যান্ড লাইন খারাপ। দিন দিন সংখ্যা বাড়ছে। কাজ করার লোক নেই। ভাবছেন জিও তো ব্রড ব্যান্ড নিয়ে আসছে। চিন্তা কী! এই মুহূর্তে বিএসএনএল এর জন্য সরকারকে দিতে হবে মাত্র 14 হাজার কোটি টাকা। তাহলেই 1 লাখ 75 হাজার কর্মী সেইসঙ্গে ঠিকাদার ও শ্রমিক মিলে 5 লাখ পরিবার বাঁচবে। মাত্র 14 হাজার কোটি কেন বললাম? রিলায়েন্স এর ব্যাংকের কাছে ধার প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা! সিংহভাগ জি ওর জন্য। বুঝছেন ব্যাপার টা? এয়ারটেল এর ধার এক লাখ কোটির ওপর।
লোকের হাতে টাকা নেই। ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে না। এই মুহূর্তে দেশের 30 টি বড় শহরে 12 লাখ 80 হাজার তৈরি ফ্ল্যাট পড়ে আছে। কেনার লোক নেই। শুধু কলকাতায় 20 হাজারের উপর ফ্ল্যাট অবিক্রীত।
গাড়ি বিক্রি এতই কমে গেছে নয়ডার মারুতি গাড়ির কারখানা থেকে শুরু করে জামসেদপুরের টাটা মোটরের উৎপাদন ক'দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কর্মী ছাঁটাই শুরু হচ্ছে। একই অবস্থা বাজাজ এবং হিরো কোম্পানির। কয়েকশো গাড়ির শোরুম ঝাঁপ ফেলে ব্যাংকে জানিয়ে দিয়েছে, আমরা আর এখন টাকা শোধ করতে পারব না। কম্পিউটার এর জন্য অনুসঙ্গ বানানো কোম্পানি mosar বিয়ার এর মালিক আজই দেনার দায়ে গ্রেফতার হয়েছে। ভিডিওকন আগেই বন্ধ। মালিক বেনুগোপাল ধুত আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, হাজার কোটি টাকা ব্যাংকের দেনা তার পক্ষে শোধ করা সম্ভব নয়। বেশ কিছু সিমেন্ট কারখানা বন্ধ। ঝাড়খণ্ডের জয় বালাজি স্টিল কোম্পানি দু দিন হল উৎপাদন বন্ধ করেছে। কারণ ইস্পাত এর বাজার নেই। টাটা স্টিল ও ওই পথ নিতে পারে। গত দুই মাসে শুধু ঝাড়খণ্ড এ বেকার হয়েছে 3 লাখ শ্রমিক। লোকের হাতে টাকা না থাকায় বা থাকলেও খরচ করতে ভয় পাওয়ার ফলে হোটেলে খাওয়া কমেছে। সাবান থেকে বিস্কুট সব কিছুর বিক্রি কমছে। অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আয়ের যে অন্যতম উৎস GST সেখানেই বিপুল ঘাটতি দেখা দিতে চলেছে। কী ভাবে এই অবস্থা সামাল দেবে মোদী অ্যাল্ড কোং তা জানেন না।
আজই কাপড় কলের মালিকরা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছেন, বস্ত্র শিল্পের অবস্থা খুব খারাপ। বাজার নেই। কাপড় কলের মধ্যে তিনভাগের একভাগ এই বছরই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। লোকসান করায় মিল মালিকরা ব্যাংকের টাকা শোধ করতে পারছে না। ওদের হিসেবেই তুলো চাষিদের নিয়ে কয়েক কোটি মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে খেয়ে পরে বাঁচে। তাঁদের ভবিষ্যৎ কী কেউ জানে না। বিদেশে রফতানিও কমেছে দ্রুত। তার থেকেও বড় কথা ক মাস বাদেই নতুন তুলো উঠবে। তার বাজার মূল্য 80 হাজার কোটি টাকা। বিক্রির বাজার না থাকলে মিল মালিকরা তা কিনবে কেন? কিংবা আরও সস্তায় কিনবে। ফলে তুলো চাষিদের আত্মহত্যা আরও বাড়বে। এই বছরই আবার ঝাড়খণ্ড, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানার ভোট। রাজনৈতিক দল গুলো তার জন্যে টাকা তুলবে!
গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো কাশ্মীর। সেখানে কাশ্মীরি জনগণের মৌলিক অধিকার বন্দুকের বেয়নেট এর জোরে কেড়ে নিতে প্রায় 6 লাখ সেনা নিয়োগ করতে হয়েছে। তার বিপুল খরচ। কোনো যুদ্ধের থেকে খুব কম নয়। তা কিন্তু জোগাতে হবে। কারণ কাশ্মীর আগ্নেয়গিরির মত ফুটছে। ফ্যাসিস্টদের পরিয়ে দেওয়া কাজলে আমরা এতটাই অন্ধ, তা দেখতে পাচ্ছি না। আর মোদী-ভক্ত দালাল মিডিয়া দেখাচ্ছে, সব স্বাভাবিক।
পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে একটাই পথ সরকারি সম্পত্তি বিক্রি। লাভের মুখ দেখা বেঙ্গল কেমিক্যাল থেকে অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি সব বিক্রি করে দাও। রেলের টিকেট বিক্রি থেকে IRCTC সব বেসরকারি হাতে তুলে দাও। আরে কিনবে কে? পরিষেবা দেবে কে ? তা জানি না। তিনবার দরপত্র হাঁকার পর আজ অব্দি কেউ air India কিনলো না!
প্রতিবাদ করলেই UAPA আছে। আপনাকে দেশদ্রোহী বলে দেগে দেওয়া হবে। কংগ্রেস কার্যত ভোকাট্টা। দুর্নীতিগ্রস্ত বিরোধীদের জন্যে ED, CBI, IT আছে। তারাও মুখ বুজে আছে। অন্য ধান্দা করছে।
চিদাম্বরমরা এইসব প্রশ্ন করেছেন, করতে চেয়েছেন, করে চলেছেন। আর তাই, তাঁকে এবং তাঁদের যেভাবেই হোক লোহার শিকের ওপারে রাখতেই হবে। 

(সাংবাদিক ও সমাজকর্মী প্রসূন আচার্যের লেখা থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে)

সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯

মাইকেল ও উৎপল ~ অরিজিৎ গুহ

ম্যাডান থিয়েটার ও নিউ থিয়েটার্সের বহু ও নির্বাক সবাক সিনেমার বিখ্যাত পরিচালক ছিলেন মধু বসু। বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকে হিমাংশু রায়ের সাথে জার্মানি গিয়ে বিখ্যাত এমেলকা স্টুডিওতে ক্যামেরার কাজ শিখে দেশে ফিরে এসে বহু নির্বাক ও হিন্দি ও বাংলা দ্বিভাষিক সবাক ছবি পরিচালনা করেছিলেন। বিখ্যাত আলিবাবা সিনেমার পরিচালক ছিলেন উনি। মর্জিনার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তাঁর স্ত্রী সাধনা বসু। এছাড়াও তাঁর নিজের ব্যালের গ্রুপ ছিল 'ক্যালকাটা আর্ট প্লেয়ার্স। ক্যালকাটা আর্ট প্লেয়ার্সই প্রথম ক্ষিরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের আলিবাবা মঞ্চস্থ করে, পরে সেটাই সিনেমা হিসেবে পরিচালনা করেন মধু বসু। 
    মধু বসুর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন বিখ্যাত কবি সুধীন দত্ত। সুধীন দত্তের ভাঁড়ারে প্রচুর বই ছিল। তাঁর বাবা ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক হীরেন দত্ত। লাইব্রেরির অধিকাংশ বই পিতার সূত্রেই পাওয়া। একদিন মধু বসু সুধীন দত্তের রাসেল স্ট্রীটের ফ্ল্যাটে গিয়ে আড্ডা মারছেন, কথায় কথায় সুধীন দত্ত বলে উঠলেন, মধু তুমি মাইকেলের জীবনী পড়েছ? মধু বসু বললেন পুরো জীবনী পড়া হয় নি, অল্প কিছু কিছু জানি। তখন সুধীন দত্ত নিজের লাইব্রেরি থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনীর ওপর দুটো বই নিয়ে এসে মধু বসুকে পড়তে দিলেন। বন্ধুদের মধ্যে বই এর আদান প্রদান হয়েই থাকে। 
   বাড়িতে এসে বই পড়া শুরু করলেন। যতই পড়তে থাকেন ততই চমকিত হতে থাকেন। এত নাটকীয় সঙ্ঘাত মূলক জীবনী আর কারো নেই। মনের মধ্যে মাইকেলের জীবনীর চিত্ররূপ দেওয়ার ইচ্ছে জেগে উঠল। পুরো পড়ার পর মাইকেলের জীবনীর চিত্রনাট্যের খসরা লিখতে শুরু করে দিলেন। 
    হাতে সেই সময়ে কোনো কাজ নেই। মাইকেলের জীবনীর জন্য প্রোডিউসারের খোঁজ করতে লাগলেন। কদিনের মধ্যেই প্রোডিউসার পাওয়া গেল। বাংলা ছবি নরেশ মিত্র'র পরিচালনায় 'স্বয়ংসিদ্ধা' তখন খুব হিট করেছিল। সেই ছবির প্রযোজক মণি গুহ মধু বসুকে দিয়ে ছবি করাতে চান। মধু বসু বললেন গল্প একটা আছে, তার চিত্রনাট্যের খসরাও তৈরি আছে, একবার শুনে নিন। মণি গুহ শুনে বললেন, 'সবই ঠিক আছে, কিন্তু জীবনী কি আমাদের দেশে লোকে নেবে?' মধু বসু বললেন 'দেখাই যাক না'।
   শুরু হয়ে গেল মাইকেল ছবির নির্মাণের কাজ। সাল ১৯৪৯। চিত্রনাট্যের খসরা থেকে সম্পূর্ণ চিত্রনাট্য লিখতে হবে। কবি বিমল ঘোষকে ঠিক করা হল চিত্রনাট্য লেখার জন্য। মাইকেলের বাবার ভূমিকায় অহীন্দ্র চৌধুরি এবং মায়ের ভূমিকার সাড়ে চুয়াত্তর খ্যাত মলিনা দেবীকে মনোনিত করা হল। স্ত্রী হেনরিয়েটার ভূমিকায় ঊষা বলে নতুন একটি মেয়েকে নেওয়া হল। বিদ্যাসাগরের ভূমিকায় অবিনাশ দাস, রেভারেন্ড কে এম ব্যানার্জির ভূমিকায় হরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরি নামে দুজন নতুন শিল্পীকে নেওয়া হল। আস্তে আস্তে রঙ্গলাল, গৌর বসাক, রাজনারায়ন বসু, কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রভৃতির জন্যও অভিনেতা অভিনেত্রী পাওয়া গেল, কিন্তু পাওয়া গেল না মাইকেলকে। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হল, কিন্তু কাউকেই পছন্দ হয় না। সেট ডিজাইন করা হয়ে গেছে, ক্যালকাটা মুভিটোনে শুটিং হবে তার জন্য স্টুডিওর ডেটও নেওয়া হয়ে গেছে, অথচ মাইকেলকে পাওয়া যাচ্ছে না। শেষমেশ প্রযোজক মণি গুহ মধু বসুকে বললেন, মধু বাবু, কাউকেই যখন পাওয়া যাচ্ছে না তখন একবার শিশির বাবুকে বললে হয় না?'
মধু বসু অবাক হয়ে তাকালেন মণি গুহ'র দিকে। বললেন, 'কি বলছেন! শিশির ভাদুড়ি এই বয়সে এসে করবেন মাইকেলে অভিনয়? আমি মাইকেলকে দেখাব হিন্দু স্কুলের ছাত্র, শিশির বাবুকে কিভাবে ওই ভূমিকায় মানাবে? মঞ্চে যা মানায় সিনেমায় তা মানায় না। আমি এখনো হাল ছাড়ি নি, ঠিক পেয়ে যাব কাউকে না কাউকে।'
    এর কদিন বাদে একটি ছেলে দেখা করতে এল মধু বসুর সাথে। ছেলেটির নাম জ্যোতি সেন। ইচ্ছে মাইকেলে কোনো একটা ভূমিকায় অভিনয় করার। জ্যোতি সেনের সাথে আরেকটি ছেলে এসে দাঁড়িয়েছিল মধু বসুর সামনে। ছেলেটির চোখমুখ, ব্যক্তিত্ব, চলাফেরা সহজেই আকৃষ্ট করল মধু বসুকে। ছেলেটি মধু বসুকে নমষ্কার করে পরিষ্কার ইংরিজিতে বলে উঠল মাফ করবেন মিঃ বোস, আমি আপনার খুব বড় একজন ভক্ত। সেন যখন বলল আপনার কাছে আসছে তখন আমি আপনার সাথে আলাপ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমি নিজেও অভিনয় করি থিয়েটারে, তবে সে সবই ইংরিজি থিয়েটার। মূলত শেক্সপিয়ারের নাটকই করে থাকি।
   মধু বসু কথা বলার সাথে সাথে আকৃষ্ট হচ্ছিলেন বেশি বেশি করে। ইংরিজির উচ্চারণ এত স্পষ্ট যা সাধারণত কোনও বাঙালি ছেলেদের মধ্যে পাওয়া যায় না। কথায় কথায় আরো জানা গেল ছেলেটি সম্প্রতি কলেজ ছেড়ে স্টেটসম্যান পত্রিকার এডিটোরিয়ালে জয়েন করেছে। মধু বসু জিজ্ঞাসা করলেন তুমি বাঙালির ছেলে অথচ ইংরিজিতে কথা বলো? বাংলা যা কয়েকটা বলছ তাও ভাঙা ভাঙা, জড়তা রয়েছে তার মধ্যে। ছেলেটি তখন বলল কলেজে যখন ছিলাম তখন আমার বন্ধুবান্ধব সবাই ছিল অবাঙালি। ওদের সাথেই মঞ্চে নাটক করেছি মূলত ইংরিজি নাটক আর কলেজ থেকে বেরিয়েও ওদের সাথেই রয়েছি। তাই বাংলাটা আমার ঠিক বলা হয়ে ওঠে না। ছেলেটি তার নিজের ইচ্ছেপ্রকাশ করে জানাল যে মঞ্চে অভিনয় করলেও তার একবার সিনেমার পর্দায় অভিনয় করার ইচ্ছে রয়েছে। সে নিজেকে পরীক্ষা করে দেখতে চায় তার মধ্যে ক্যামেরা কনসাসনেস আছে কিনা।
   মধু বসু বুঝলেন, হলে একে দিয়েই হবে। ছেলেটির নাক চোখ মুখের ঔজ্জ্বল্য আর ইংরিজি উচ্চারণ যা তাতে ছেলেটি মাইকেলের ভূমিকায় একদম যেন পার্ফেক্ট। কিন্তু একটাই খটকা। ছেলেটির বাংলা উচ্চারণ। তাও মধু বসু তাকে বললেন পরদিন আসতে।
     পরদিন আসার পর মধু বসু তাকে বললেন, 'তোমাকে আমি মাইকেলের ভূমিকা দিতে চাই।' ছেলেটি অবাক হয়ে বলল কিন্তু শুটিং তো আর মাত্র পনেরো দিন বাদে শুরু হবে! এর মাঝে সংলাপ যা বেশিরভাগই অমিত্রাক্ষর ছন্দে তা কি আমি পারব? মধু বসু বললেন আমার ওপর ছেড়ে দাও ব্যাপারটা। তুমি শুধু অভিনয়ের ওপর জোর দাও।
   এরপর থেকে শুরু হল রিহার্সাল। দৈনিক ৫-৬ ঘন্টা ধরে চলত রিহার্সাল। স্টেটসম্যানের অফিস ছুটি হওয়ার পর বিকেল ৫ টা থেকে শুরু করে কোনো কোনোদিন রাত বারোটা একটাও বেজে যেত রিহার্সাল করতে গিয়ে। শুটিং শুরু হওয়ার দু একদিন আগেই ছেলেটি পুরোপুরি তুলে নিল মাইকেলের সংলাপ অমিত্রাক্ষর ছন্দ সহ।
  শুটিং শুরু হওয়ার পর ছেলেটিকে পরীক্ষা করার জন্য মধু বসু তার প্রথম দিনের শুটিং ফেললেন তখনকার দিনের নামকরা অভিনেত্রী মলিনা দেবীর সাথে যিনি মাইকেলে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। অবাক হয়ে মধু বসু লক্ষ্য করলেন নামকরা অভিনেত্রীর উলটোদিকে দাপটের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে গেল ছেলেটি। সেটের সবাই নবাগতকে দেখে তার অভিনয় দেখে খুবই খুশি। 
   এরপরে কোনো একদিন শুটিং এ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মাইকেল জ্বরে পড়ে আছেন আর জ্বরের ঘোরে উত্তেজিতভাবে আবৃত্তি করে চলেছেন, স্ত্রী হেনরিয়েটা মাইকেলের ঘাড়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সংলাপ বলছেন। একটা বড় দৃশ্য যেখানে মাইকেল জ্বরের ঘোরে কথা বলে যাবেন। দৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে দেখলেন সেট আলো সব রেডি, ক্যামেরাম্যান ক্যামেরা নিয়েও তৈরি, কিন্তু মাইকেলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ খোঁজ শুরু হল, মেক আপ রুম, ক্যান্টিন, বাথরুম কোথাও নেই। শেষে অন্য একটা ফ্লোরের এক কোণায় পাওয়া গেল সে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে রয়েছে। মিধু বসু তার কাছে গিয়ে বললেন, কি ব্যাপার? এখানে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছ? তোমার শরীর খারাপ নাকি? তাহলে শুটিং প্যাক আপ করে দিচ্ছি। ছেলেটি তখন তাড়াতাড়ি খাট ছেড়ে উঠে বলল, না না, আসলে জ্বরের ঘোরের দৃশ্যের শুটিং তো, তাই একটু মুডে আসার চেষ্টা করছিলাম।
   মধু বসু স্বগোতক্তি করলেন, শুটিং এর বাকি সবাই যখন হাসি ঠাট্টায় মেতে রয়েছে, তখন কাজের প্রতি কতটা নিষ্ঠা থাকলে নিজের চরিত্রের মধ্যে সব সময় ডুবে থাকা যায় তা একে দেখে শিখতে পারে সবাই। সেদিন থেকেই উনি বুঝে গেছিলেন ছেলেটি একদিন বিরাট বড় শিল্পী হবে।
    মাইকেল যথারীতি রিলিজ করল। দর্শকদের মন জিতে নিল মাইকেলের ভূমিকায় প্রথমবার সিনেমায় অভিনয় করা উৎপল দত্ত।

     নিজেকে উনি বলতেন আমি শিল্পী নই, প্রোপাগান্ডিস্ট। কিন্তু প্রোপাগান্ডিস্ট হওয়ার জন্যও শিল্পকে গভীরভাবে আত্তীকরণ করতে হয়। শিল্পের মধ্যে থাকতে হয়। যেটা উনি পেরেছিলেন। ১৯ শে আগস্ট তাঁর ছাব্বিশ তম প্রয়াণ বার্ষিকী।

রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯

এক যে ছিল ফেরিওয়ালা ~ শ্যমলেন্দু সিনহা

তখন সবে গ্রাজুয়েট হয়েছি। না না রেজাল্ট বেরোয় নি তখনো। সে কালে অনেকদেরী করে বেরোতো রেজাল্ট। কিন্তু আমার তো অত দেরী করার উপায় নেই। তখনই আমার তিন বছরের পুরোনো প্রেমটা পেকে গেছে ফোঁড়ার মত। টনটনে ব্যাথা। যে কোনো দিন একটু অসতর্ক হলেই ফেটে যাবে ব্যথার চূড়োটা। মানে সানাই বাজিয়ে কোনো গোঁফ ওয়ালা দামড়া সেরে ফেলবে ফুলশয্যা আমার ফোঁড়ার, না না প্রেমিকার সাথে। যে কোনো একটা চাকরী চাই তখন।
যাতে ওই রহস্যময়ী, বাড়ীতে বলতে পারে আর একটু অপেক্ষা করতে চাই আমরা। বেকার প্রেমিক অনেকটা তখনকার দিনে, আজকালকার দিনের এইচ আই ভি পজিটিভের মত। কোনো চারিত্রিক দোষ নাও থাকতে পারে, তবে মেয়ের বাবার চোখে, কোনো রকম সন্দেহেরই উর্দ্ধে নয়। ওই পেঁয়াজ খাওয়া থেকে শুরু করে, আর কি....। একটা ৫০০ টাকার চাকরী করলেও, লড়াকু, সভ্য, ভদ্র, আর কিছু না হোক, ধর্মের ষাড় তো নয়। এইসব সাতপাঁচ ভেবেই পরীক্ষা দিয়েই খুঁজছিলাম কিছু। তখনই এক পাড়ার জেঠামশাই বললেন, সেলসের কাজ করবি? ওঁনাদের কলকাতায় একটা চালু ওষুধের দোকান ছিল। বললেন মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ এর কাজ। এক সেকেন্ডেরও কম সময়েই দিলাম উত্তর, করবো।

সব্যসাচী সেদিন ওর ডাক্তারী জীবনের প্রথম দিকের কথা লিখেছে। পড়তে পঢতেই মনে পড়ে গেল আমার চাকরী জীবনের প্রথম দিকের এই গল্পটা। ওরটা ভদ্রসভ্য গ্ল্যামারাস ডাক্তারী, আর আমারটা ডাক্তারদের সাধাসাধি করে তাঁদের দিয়ে ওষুধ বিক্রি করতে চাওয়া, এক নবীন ফেরিওয়ালার গল্প। হোকগে তা লজ্জার রঙে লাল। অপমানের ব্যথায় নীল। ঘামে আর বৃষ্টিতে ভেজা এক যুবকের গল্প। জীবনের রানওয়েতে উড়ানের মৃদুগতির যাত্রাশুরু। তবুও বলতেই হবে, পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, আজকের আমার বুকের গভীরে লুকিয়ে আছে, সদ্য কৈশোর পেরোনো প্রেমিক ফেরিওয়ালাটাও। লাজুক, মুখচোরা মফস্বলের একটা ছেলের রাত্রির অন্ধকারের গল্প। থ্যাঙ্ক ইউ সব্য, আমার নিদ্রাবেলাকে জাগিয়ে দেওয়ার জন্য।
পরেরদিনই চলে গেলাম কলকাতা, জেঠামশাই এর ওষুধের দোকানে। ওখান থেকে বাগরী মার্কেটের গলির গলি, তস্য গলির শেষে একটা ঘরে। বাগরী মার্কেটের ওই বাড়ীটায় যাদের যাতায়াত আছে তাঁরা জানেন, ওটা লক্ষ্ণৌ এর ভুলভুলাইয়ার ছোটভাই এটা। এই বাড়ীর একটা ঘরেই ওষুধের কোম্পানী। দুটো তাঁদের ওষুধ। কাশির আর হজমের। সিরাপ। কোনো ট্রেনিং নেই। মালিক বসেই ছিলেন ঘরে। আর আমার মত কিছু ধর্মের ষাড় না হতে চাওয়া ছেলে। কে জানে ওদেরও একটা ভয় আছে নাকি, অন্য লোকের দুঃস্বপ্নের ফুলশয্যার! তা দেখলাম মালিক খুব অমায়িক লোক। বললেন দেখুন দুটো ওষুধ আমরা বানাই। বাঙ্গালীর প্রিয় রোগ কাশির আর হজমের গন্ডোগোলের। ডাক্তারদের একদম জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। ওরা কাশী আর হজম নিয়ে মোটা মোটা বই পড়েছে। আপনার কাজ ওষুধ বেচা। সোজাসুজি বেচা না। ডাক্তার আপনার ওষুধের নাম প্রেসক্রিপশনে লিখবে, রোগী দোকানে গিয়ে আমাদের ওষুধ কিনবে। আমার লাভ হবে। আপনি মাইনে পাবেন। আপনার কাজ প্রথম কদিন এলাকায় ঘুরে ঘুরে ডাক্তারের নাম যোগাড় করা, যাদের বেশী রুগী। তারপর দেখা সেই রুগীরা কোন দোকান থেকে ওষুধ কেনে। সেই ওষুধের দোকানে আমাদের ওষুধ রাখতে হবে। ডাক্তার লিখলে দোকানদারের বাপও আমাদের ওষুধ রাখবে। আমাদের করণীয় নাকি খুব সহজ!!! ডাক্তারকে দিয়ে আমার ওষুধটা প্রেসক্রাইব করানো। নিজেকে প্রেমিক হিসেবে প্রমাণ দেওয়ার জন্য এটুকু তো করতেই হবে।

তবে এটুকু যে কেমন কাজ, টের পেলাম ধীরে ধীরে। বুঝলাম জীবনটা শালা কেবল মান্না দের গান আর সুনীল গাঙ্গুলীর কবিতা না। এই দুটো প্রিয় লোক আমার পরম শত্রু হয়ে দাঁড়ালো। এই দুটো লোকের জন্যই আমার জঘন্য রেজাল্ট। এঁদের জন্যই আমি এঁচোড়ে পাকা। এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি?  মাঝখানে নদীরূপী জীবনে, হাবুডুবু খায় কেরিয়ার। ডাক্তাররা কত পড়াশুনো করে ডাক্তারীতে চান্স পেয়েছে। তারপর রুগী তাঁদের পয়সা দিয়ে দেখায়। ভালো ওষুধ দিয়ে তাড়াতাড়ি সুস্থ করাই তাঁদের কাজ।গতকাল গজানো "জগাছা ফার্মাসিউটিকালস" এর কাশির আর হজমের ওষুধ তাঁরা প্রেসক্রিপশনে লিখবে কেনো? এটা তাঁদের ক্যারিয়ারের প্রশ্ন। রোগীর স্বাস্থ্যের প্রশ্ন। তিনি তো সবসময় ভালো কোম্পানির পরীক্ষীত ওষুধটাই খেতে বলবেন রোগীকে। তবে, এসব তো অনেক পরের কথা। প্রথম দিন ভারী চামড়ার ব্যাগটা নিয়ে বেড়িয়েছি সকালে। ধোপদুরস্ত জামা কাপড় পরে। আর দেখতেও তখন এমন জলহস্তীর মত ছিলাম না। কিন্তু আমার ঠাঁটবাট দেখে কোনো শালা জানতেই পারেনি, আমার মাইনে কেবল আড়াইশো টাকা। কোনো যাতায়াত ভাড়া নেই। চকচকে ব্যাগটাই দেখছে সবাই। কাচের বোতলে ভরা কাশির আর হজমের সিরাপের বোতলের ভারে আমার কাঁধ যে ব্যথা করে রাতে জানেই না কেউ। আমি খান্নার মোড় থেকে হেঁটে শিয়ালদা, বেলেঘাটা ঘুরে ফিরে আসি, ফ্যানহীন মেঝের পাতলা বিছানায় শুই জানেই না কেউ। রিক্সাওয়ালা আর ঠেলাওয়ালাদের পাশে বসে বড়রাস্তার ধারে একটা ছোট ঘরে বসে আমি চারটে রুটি খাই আাচার দিয়ে, একটাকায়। আমার উপার্জনের ডিনার। সকালে চিড়ে আর চিনি জল দিয়ে মেখে খাই। দুপুরে চারটাকায় ভাত ডাল তরকারী। রাত্তিরে শুই পরেশনাথের মন্দিরের পাশে  অনুকুল ঠাকুরের মন্দির আছে, পাঁচতলা বাড়ী। তার উপরের তলার একটা হলঘরে। সাত আটজন পাশাপাশি । বিনাপয়সায় থাকা। এক ভক্তদাদা খুঁজে দিয়েছিল ডেরা। তবে বিশ্বাস করুন আমি একটুও মহান সাজার জন্য বলিনি এসব। আদতে এগুলো যে কোনো কষ্ট বা জীবনযুদ্ধ জানতামই না। আমার খালি মনে হ'ত ভালো কিছু চাকরী পাওয়ার আগের দিনগুলোও বেকার থাকা যাবে না। আর মফস্বলের বাড়ী থেকে রোজ দুবেলা এসে তো ফেরিওয়ালার কাজ করা যায় না। একটা কথা মনে পড়ে কেবল। প্রথম পূজোয় এক মাসের মাইনের কিছু বেশীটাকা বোনাস পেয়েছিলাম প্রথম বছর। একটা মায়ের জন্য শাড়ী আর একটা প্রেমিকার। মায়ের শাড়ীটাও প্রেমিকাই দিল পছন্দ করে। ১৭০ টাকা দাম। নিজেরটা ১৬০ টাকা। আর ভাইয়ের একটা জামার কাপড়। সব টাকা শেষ। এত ভালো পুজোর বাজার আর করিনি জীবনে। আজ প্রায় চল্লিশ বছর পেরিয়ে শুনি বউয়ের মুখে, অত ভালো শাড়ী নাকি আর সে পায়নি কখনো। আজ জানি আমি টাকা কত কিছু পারে। আজ এও জানি আমি টাকা সবকিছু পারেনা কখনো।

গুমোট গরমে ঘুম ভেঙ্গে যায় কোনো কোনো দিন মাঝরাতে। আমার শত্রুর কবিতা মনে পড়ে যায়। যার পাগলামীতে আমর লেখাপড়াই হ'ল না ভালো। সেই সুনীল গাঙ্গুলীর কবিতা। 

"নীরা তুমি অমন সুন্দর মুখে তিনশো জানলা
খুলে হেসেছিলে, দিগন্তের মত কালো বাঁকা টিপ,
চোখে কাজল ছিল কি? না ছিল না
বাসস্টপে তিনমিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ...."

মাঝরাতে বৃষ্টি নামতো কোনো কোনো দিন, বৃষ্টির ছাঁটে ঘুম ভেঙ্গে যেত বারোয়ারী ঘরে। খানিক গুজগুজ ফিসফাস নড়াচড়া সেরে আমার এপাশ ওপাশের প্রতিবেশীরা আবার ঘুমাতো। আমার চোখের নীচে জলন্ত বৃষ্টির ফোঁটা আমায় ঘুমাতে দিত না। বহুদূরে থাকা একজনের জন্য মনে আসত..... মনে পড়তো কয়েকটা লাইন, 

"তুমি ভয় পেয়ো না, তুমি ঘুমোও, আমি বহুদূরে আছি
আমার ভয়ঙ্কর হাত তোমাকে ছোঁবে না, এই মধ্যরাত্রে
আমার অসম্ভব জেগে ওঠা, উষ্ণতা, তীব্র আকাঙ্খা ও
চাপা আর্তরব তোমাকে ভয় দেখাবে না,
আমার সম্পূর্ণ আবেগ
শুধু মোমবাতির আলোর মত ভদ্র হীম,
শব্দ ও অক্ষরের কবিতায়
তোমার শিয়রের কাছে যাবে।  '

একদিন গেছি, এক ডাক্তারের চেম্বারে, খুব ভীড়, বসে আছি তো বসেই আছি, খিদেও পেয়েছে বেজায়। আমার আবার ছোটবেলা থেকেই খিদে পেলে অভিমানী হয়ে যাই। সে যাক, অবশেষে ডাক্তারবাবুর ঘরে গেলাম। অসীম অবজ্ঞায় আমার সিরাপ দুটো দেখলেন। আমি বললাম যদি কয়েকটা প্রেসক্রাইব করেন ভালো হয়। রেগে গেলেন। বললেন কেন লিখবো? আপনার এই এক্সপেকটোরেন্টার দাম ছ'টাকা পঞ্চাশ। বেনাড্রিলের দাম ছটাকা। নামী কোম্পানিরটা না লিখে আপনারটা কেন লিখবো? এখানে ভিজিট দিয়ে যারা দেখাতে আসে আমি তাদের নামী কোম্পানীর ওষুধই প্রেসক্রাইব করবো। আমার বোধহয় খিদেতে মাথার ঠিক ছিল না। বললাম স্যার আপনারা প্রেসক্রাইব করেই তো বেনাড্রিলকে বা তাঁর কোম্পানীকে বিখ্যাত করেছেন। কে জানে ওনারও বোধহয় খিদে পেয়েছিল। মুখঝামটা দিয়ে বের করে দিলেন ঘর থেকে। কত ধাক্কা যে খেয়েছি সে সময়। মনখারাপ হ'ত। শনিবারে বাগড়ী মার্কেটে মালিকের সাথে মিটিং। মাখন মাখানো পাউরুটি, কলা, আর মিষ্টি ছিল বাঁধা টিফিন। আর সাথে মালিকের হুল ফোটানো কথা। আমরা সব অকর্মণ্য, ফাঁকিবাজ ইত্যাদি। সব টিফিন বিস্বাদ হয়ে যেত।

কিছু ডাক্তার খুব ভালো ব্যবহার করতেন। বাড়ীর গল্প করতেন সময় থাকলে। আর এই একবছরের কিছু বেশী সময় ধরে যা শিখেছিলাম, তা অমূল্য। ফেরিওয়ালা হওয়ার মত বিশ্ববিদ্যালয় আর নেই। আপনি অপমানিত হচ্ছেন, ধাক্কা খাচ্ছেন, আবার আশায় বুক বেঁধে, আপনার পশরার বোঝাটাকে ক্লান্ত কাঁধে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, পথ হাঁটছেন। সব ব্যথা বুকে চেপে পরের দোকানদারের কাছে গিয়ে হাসিমুখে দাঁড়াচ্ছেন। এটা যে কি থ্রিলিং, কি চ্যালেঞ্জিং, বোঝানো অসম্ভব। নিজের ভাঙ্গাচোরা টুকরোগুলোকে জোড়া লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়া। আজ মনে হয় ফিরিই তো করছি আমরা সবাই। বুকে পিঠে বাঁধা অদৃশ্য পিটারা। হয়ত জ্ঞানের, অথবা প্রতিভার, খুব দামী পশরা হয় যদি। কেবল কিছু মানুষের ঝুড়িটা দেখা যায়, এটাই তফাত। 

আর এই যে বারবার নিজেকে মেলে ধরা ক্রেতার সামনে সোজাসুজি। এক শিক্ষা দিয়ে যায় জীবনের। নিরহংকার হও, নত হও, হেরেও যাও বারবার যদি, হেরো হোয়ো না। হয়ত এর পরের মানুষ, অথবা তার পরের মানুষ, কিম্বা নিশ্চিত তার পরের মানুষটা তোমায় খুশীর খবর দেবে। আলো আছে, নিশ্চই আছে, সুড়ঙ্গের শেষে।

আজ বহুবছর বাদে, আমার টেবিলের ওপারে ওরা এসে বসে। ঘামে বা বৃষ্টিতে ভেজা নবীন যুবক। ওরা বেচতে বেড়িয়েছে। অফিসের নানা দরকারী জিনিস। আমি ওদের চোখে, ভাষায়, ওদের ক্লান্তিতে, হতাশায়, শুকনো হাসিতে,  অবিরাম হেঁটে চলা পায়ের ব্যথায় আর বোঝাটানা কাঁধের ব্যথায়, আমাকেই খুঁজে পাই। যদি কিনতে নাও পারি কিছু, জলের বোতল আর চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে, ছু্ঁতে চাই ওদের লড়াই। ওদেরও বুকের গভীরে হয়ত জেগে আছে নিজস্ব 'নীরা'রা ।

ওদের ফিরে যাওয়া শরীরের দিকে চেয়ে অস্ফুটে বলি। প্রতিটা পদক্ষেপে তোরা অজান্তেই পেরোচ্ছিস অন্ধকার। আলোটা আসছে এগিয়ে ধীরে আর নিশ্চিতভাবে। আজকের এই ব্যথা এই অপমান, তোদের হৃদয়ে বাঁচবে, কোহিনূর হয়ে, সারাজীবন ধরে।

তারপর ভালোবাসার এই মায়াবী পৃথিবীতে, বহুবছর বাদে, পাশে বসে তার, বলিস শেষ পংক্তি দুটো,

"নীরা শুধু তোমার কাছে এসেই বুঝি
সময় আজো থেমে আছে"


বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৯

স্বাধীনতা ও নৌবিদ্রোহ ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

২৩শে ফেব্রুয়ারি, সকাল ৬টায় বিদ্রোহী নৌসেনারা তুললেন শান্তির সাদা পতাকা, আত্মসমর্পণ এর পতাকা। তাদের চোখে জল, বুকে আগুন। সেই পতাকা তোলার সাথে শেষ হয়ে গেল ইন্ডিয়ান রোয়াল নেভি এর সেই বীরত্বপূর্ণ অভ্যুত্থানের ইতিহাস। 

বোম্বে থেকে করাচি, বাহারিন থেকে সিঙ্গাপুর, ২০,০০০ নৌসেনা, ৭৮ খানা জাহাজ এর যে বিদ্রোহ কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত, তাদের সাথে জাতি কি করেছিল ? সেই ভারতের সর্ববৃহৎ তিনটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস, মুসলিম লীগ  ও কম্যুনিস্ট পার্টির মধ্যে প্রথম দুটি দল তাদের পাশে দাঁড়ায় নি। দাঁড়িয়েছিল কেবল কম্যুনিস্ট পার্টি। 

৩০০ এর বেশি শহীদদের স্মৃতিতে কেবল বেদী বানিয়ে জাতি কৃতজ্ঞতা সেরেছে। ওই বিদ্রোহী নৌসেনাদের ঠাঁই হয়নি স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তানের বাহিনীতে। সেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক যে লর্ড মাউন্টব্যাটেন। 

সারা রাত তর্কবিতর্ক এর পরে প্রস্তুত হয়েছিল সেই বিদ্রোহী সেনাদের আত্মসমর্পণ এর দলিল। আজ স্বাধীনতা দিবসের দিনে আত্মবিস্মৃত জাতি আরেকবার স্মরণ করুক সেই দলিলের শেষ ক'টি লাইন:-

আমাদের ধর্মঘট ছিল জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই প্রথমবার একই কারণে সেমবাহিনীর রক্তের সাথে সাধারণ মানুষের রক্ত বয়ে গেল। আমরা ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ করিনি, করেছি আমাদের নিজেদের জনগণের কাছে"

১৯৪৬ এর ফেব্রুয়ারির ১৮ থেকে ২২ এই ভারত কাঁপানো পাঁচদিনের একটু কথা হোক আজ স্বাধীনতা দিবসে। বোম্বের রাজপথে লরিভর্তি বিদ্রোহীরা আজাদীর স্লোগান দিতে দিতে শহর পরিক্রমা করছে, তাদের একহাতে লেনিন এর ছবি, আর অন্যহাতে নেতাজির। বিদ্রোহী জাহাজ গুলোর মাস্তুল থেকে পতপত করে ওড়া তেরঙ্গা পতাকা, মুসলিম লীগের পতাকার পাশাপাশি সগৌরবে উড়ছে লাল পতাকা।

দেশের স্বাধীনতা এমনি এমনি আসেনি।

সোমবার, ১২ আগস্ট, ২০১৯

কাশ্মীর নিয়ে বামেদের অবস্থান ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

বর্তমানে কাশ্মীর নিয়ে বামেদের অবস্থান নানান বিতর্ক তৈরি হয়েছে,বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলি বামেদের দেশদ্রোহী পর্যন্ত আখ্যা দিয়েছে।কিন্তু একটু ইতিহাসের পাতা ঘাটলেই বামেদের অবস্থান পরিষ্কার হবে যা অখন্ড ভারতের পক্ষ নিয়েই জোর সওয়াল ও কর্মসূচি নিয়েছে লাগাতার।তৎকালীন কাশ্মীর সংকটের সময় কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান কতটা বাস্তব ধর্মী তা সেই সময়ের লেখনী থেকেই স্পষ্ট হয়।

শেখ আবদুল্লার পদচ্যুতির পর কাশ্মীর পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির
পলিট ব্যুরাের বিবৃতি (১৬ই আগষ্ট, ১৯৫৩ সালে 'ক্রসরােড সে' মুদ্রিত ):-

"এডলাই স্টিভেনসনের পরিদর্শনের পর কাশ্মীরের সাম্প্রতিক ঘটনাচক্রের চরম পরিণতি হল সর্দার-ই-রিয়াসৎ কর্তৃক শেখ আবদুল্লার পদচ্যুতি ও কাশ্মীরে নতুন সরকার গঠন,মার্কিন চক্রান্তকারীদের সুরে সুর মিলিয়ে শেখ আবদুল্লা জাতিসংঘ অর্থাৎ আমেরিকার গ্যারান্টিপ্রাপ্ত স্বাধীন কাশ্মীর রাষ্ট্রের আওয়াজ তুলেছিলেন। মন্ত্রিসভা এবং ন্যাশনাল কনফারেন্সের ওয়ার্কিং কমিটির বেশির ভাগ সদস্য এই নীতিকে কাশ্মীরের জনসাধারণের পক্ষে ক্ষতিকারক বলে বিরুদ্ধতা করেছেন। স্বতন্ত্র মর্যাদা এবং ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সহায়তায়
কাশ্মীরকে গণতন্ত্রে রূপায়িত করবার সব চাইতে বড় গ্যারান্টি 'সীমাবদ্ধ অন্তভুক্তি ও দিল্লী-চুক্তির শর্তানুসারে তারা ভারতের সঙ্গে অব্যাহত ঐক্য- সম্পর্ক রক্ষা করতে চান।কাশ্মীরের জনসাধারণের মধ্যে যথেষ্ট বিভ্রান্তি দেখা দেবে। পাকিস্তান-পক্ষীগণ এবং মার্কিন গুপ্তচরেরা, প্রয়ােজন হলে এমন কি সাম্প্রদায়িক মনােভাব জাগিয়ে তুলেও ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীরী জনসাধারণকে উত্তেজিত
করবার সুযােগ গ্রহণ করবে। এই উদ্দেশ্যে প্রতিটি দুর্বলতা, সরকারের প্রতিটি দুর্নীতি এবং জনগণের প্রতিটি আর্থিক অসন্তোষের সুযােগ গ্রহণ করবে তারা।গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের দায়িত্ব হল সতর্ক হয়ে সরকারের জনস্বার্থ-বিরােধী প্রতিটি নীতি ও কর্মের বিরুদ্ধে উদ্যোগ নিয়ে জনগণের স্বার্থের সংরক্ষক হওয়া এবং মার্কিনপন্থী সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখােস খুলে দেওয়া।

তাদের বিশেষ ভাবে অবহিত থাকতে হবে যাতে কৃষিসংস্কারগুলি ব্যর্থ হয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি ছিনিয়ে না নেওয়া হয়। আরও বেশি সংস্কারের জন্য তাদের দাবি তুলতে হবে।
কাশ্মীরে যে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন তারা হয়েছে তার গুরুত্ব ভারত সরকারকে বুঝতে হবে। তারা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কৌশলে পড়ে জাতিসংঘে কাশ্মীর সমস্যা উপস্থাপিত করে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের কাশ্মীর সমস্যায় হস্তক্ষেপ করবার সুযােগ করে দিয়েছেন।

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকের নামে তারা বিপুল সংখ্যক আমেরিকানকে কাশ্মীর থেকে দীর্ঘ ছয় বৎসর ধরে জঘন্য কাজ কারবার চালিয়ে যেতে দিয়েছেন।কাশ্মীর থেকে মার্কিন গুপ্তচরদের হঠিয়ে দেবার কঠিন কর্মনীতি গ্রহণ করবার মত সাহস কি ভারত সরকারের হবে ? ভারত সরকার কি ঘােষণা করবেন যে কাশ্মীরের জনগণই কাশ্মীরের ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র অধিকারী–তাই জাতিসংঘের মুখােস পরে কোন রকম বৃটিশ অথবা মার্কিন হস্তক্ষেপই
তারা সহ্য করবেন না ?

রাজপ্রমুখ, নিজাম অথবা সর্দার-ই-রিয়াসং ইত্যাদি নামে যে স্বেচ্ছাচার চলে তাকে খতম করে ভারত সরকার কি কৃষক এবং শ্রমজীবী জনসাধারণকে গণতান্ত্রিক সরকার, জমি ও খাদ্যের প্রতিশ্রুতি দেবেন?

কাশ্মীরের জনগণ যদি দেখেন যে ভারত সরকার এবং ভারতের গণ-আন্দোলন তাদের দুঃসহ অর্থনৈতিক অসুবিধা দূর করতে চেষ্টার ত্রুটি করছেন এবং তাদের স্বতন্ত্র মর্যাদাকে শ্রদ্ধা করছেন তবেই তারা ভারতের সঙ্গে অব্যাহত সম্পর্ক রাখবেন।ইতিমধ্যেই হিন্দুমহাসভা এবং জনসংঘের মত সাম্প্রদায়িক কায়েমী স্বার্থসম্পন্ন প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি জম্মু ও ভারতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা
ছড়িয়ে এবং ভারতে কাশ্মীরের পুর্ণ অন্তভুক্তির দাবি তুলে কাশ্মীর উপত্যকায় সাম্প্রদায়িকতাবাদী এবং পাকিস্তান-পন্থীদের হাত শক্তিশালী করে তুলেছে।
তারা দাবি করছে যে শেখ আবদুলা সরকারের পদচ্যুতি তাদের জয়লাভ ,কাশ্মীরের পূর্ণ ভারতভুক্তি নিয়ে তারা হৈচৈ শুরু করে দিয়েছে।

এর চাইতে বড় আত্মঘাতী আওয়াজ আর নেই। কাশ্মীরে পাকিস্তান-পন্থীদের এবং মার্কিন অনুচরদের পরাজিত করবার জন্য এবং বিশেষ করে ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বাঁচাবার জন্য ভারতের গণতান্ত্রিক শক্তি-সমূহকে জাগ্রত হয়ে শতগুণ বেশি শক্তি নিয়ে লড়াই করে সাম্প্রদায়িক প্রতি- ক্রিয়াপন্থী এবং তাদের আওয়াজ ও কাজকে উৎখাত করতে হবে।

জম্মু ও কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক জনগণ, বিশেষ করে ন্যাশনাল কনফারেন্সের কর্মীদের প্রতি কমিউনিস্ট পার্টি আবেদন করছে "স্বাধীন কাশ্মীর উপত্যকা" আওয়াজের আড়ালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আপনাদের প্রিয় কাশ্মীর উপত্যকার উপর যে থাবা বিস্তার করেছে তার গুরুত্ব আপনারা অনুভব করুন। গত দুই যুগ ধরে মহারাজার স্বেচ্ছাচারী শাসন এবং সামন্ততন্ত্রকে খতম করে নতুন গণতান্ত্রিক কাশ্মীরের জন্য আপনারা যে গৌরবময় সংগ্রাম করেছেন তার কথা আপনার স্মরণ রাখবেন।

১৯৪৭ সালে যে হানাদারেরা কাশ্মীর অধিকার করতে চেয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে আপনাদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরােধের ইতিহাস আপনারা ভুলবেন না।যারা আপনাদের মার্কিন আধিপত্যের কবলে নিতে চায় আর যারা পূর্ণ অন্তর্ভুক্তির দাবি তুলে যে-স্বাতন্ত্র্য আপনারা পেয়েছেন তাকে ধ্বংস করতে চায় তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় হয়ে দাড়িয়ে আপনারা সংগ্রাম করুন।এই সংগ্রাম সফল করবার জন্য ব্যাপক ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক এক আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তুলুন আপনারা।"

শনিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৯

ক্রিমিয়া থেকে কলকাতা ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

সাত সকালে ঘুম ভেঙে গেল ফোনের আওয়াজে। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটা নাম আর আরেকটা শব্দ। নামটা না হয় নাই লিখলাম। ধরে নিন ফুলেশ্বরী, ফিরোজা বা ফ্রান্সেসকা। নামে কি বা এসে যায়। নামের পরের শব্দটাই আসল। ওটা দেখেই ফোনটা তুলে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে বলে ফেললাম, "বলুন দিদি, কেমন আছেন?" 

রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গ বেয়ে উত্তর আসার আগে মনের তরঙ্গে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে। কোথায় শেষ দেখা হয়েছিল। পালস পোলিও করতে গিয়ে সেই যেই বার ধূলিয়ান এ ঘেরাও হয়ে গেছিলাম ? নাগড়াকাটার চা বাগানের টিলার ওপরে সেই হাতির পালের ভেঙে দেওয়া সাব সেন্টার এর ঘর দেখতে গিয়ে ? পাথরপ্রতিমায় গৃহ সমীক্ষায় খুঁজে পাওয়া কুষ্ঠ রোগী দেখতে গিয়ে নদীর ফেরিঘাটে অপেক্ষায় ? পাঁশকুড়ার ইটভাটায় ম্যালেরিয়া মৃত্যুর অডিট করতে গিয়ে ? কোথায় দেখা হয়েছিল ওই ANM দিদির সাথে ?

ANM শব্দটার সাথে অনেকেই পরিচিত নন। আসুন একটু পরিচয় হোক। অক্সিলিয়ারী নার্স কাম মিড ওয়াইফ। নার্স বলতে হাসপাতালে সাদা ইউনিফর্ম এ যাদের চিরকাল দেখে এসেছেন তাদের থেকে একটু আলাদা। এদের ইউনিফর্ম গোলাপি অথবা হলুদ।

এরা  দেড় বছরের প্রশিক্ষণ শেষে কাজে যোগ দেন। কাজটা মূলতঃ জনস্বাস্থ্যের। প্রতি ৫০০০ লোক পিছু একজন, সেটা বাড়তে বাড়তে কোথাও ১০,০০০ হয়ে গেছে। গ্রামীন এলাকায় এদের একটা সাব সেন্টার বা উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকে। কোনোটা নিজস্ব পাকা বাড়িতে, কোনোটা আবার ভাড়া করা এক বা দু'কামরার চালা ঘরে।

সপ্তাহে পাঁচদিন সেখানে ক্লিনিক খোলা হয়। মূলতঃ মা ও বাচ্চারাই আসে ওই ক্লিনিকে। বাচ্চাদের বিভিন্ন রকম টিকা দেওয়া হয়। প্রসূতি মা'র গর্ভাবস্থার চেক আপ হয়, আয়রন ফলিফার বড়ি দেওয়া হয়। হয় রক্তচাপ মাপা থেকে শুরু করে ছোটখাটো পরীক্ষা যেমন হিমোগ্লোবিন, সুগার, এলবুমিন মাপা। একটু বড় বাচ্চাদের দেওয়া হয় ভিটামিন A সিরাপ, কৃমির ওষুধ। পরানো হয় কপার টি জাতীয় গর্ভ নিরোধক। 

নিয়মিত ওষুধ নিতে আসেন টিবি রুগী, কুষ্ঠ রুগীরা। সামনে বসে ওষুধ খাওয়ানো হয়। ম্যালেরিয়ার রোগ নির্ণয় আর ওষুধ বিতরণ ও হয়। দেশের ড্রাগ এন্ড কসমেটিক আইন অনুযায়ী ডাক্তার ছাড়া কেবলমাত্র এই এ এন এম দিদিরাই ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারেন। বাচ্চাদের পেট খারাপ এ ও আর এস, সর্দি কাশি, নিউমোনিয়াতে এন্টিবায়োটিক, ম্যালেরিয়া তে ওষুধ।

ক্লিনিক এর বাইরে গ্রামের বাড়ি বাড়ি ঘুরেও নানা কাজ। জন্ম মৃত্যুর রেজিশট্রেশন, বিভিন্ন রোগের সমীক্ষা, সদ্যোজাত আর তার মায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ছানি রুগী, জ্বরের রুগী খুঁজে বের করা, আর স্বাস্থ্য নিয়ে লাগাতার প্রচার। গর্ভনিরোধক বড়ি থেকে শুরু করে হ্যালাজন ট্যাবলেট বিতরণ। 

ক্লিনিক খোলা থাকে বছরভর। বছরে মাত্র আট দিন বন্ধ। গ্রামে ঘুরে বিরামহীন, লাগাতার কাজ। রোদ, জল, ঝড়, বৃষ্টি সব মাথায় নিয়ে। বন্যা হলেও ছুটি নেই। বরং কাজ বেড়ে যায়। 

গোটা চাকরি জীবন জুড়ে নিতে হয় অসংখ্য প্রশিক্ষণ। জমা দিতে হয় দিস্তা দিস্তা রিপোর্ট, প্রতি সপ্তাহে, প্রতি মাসে। এভাবেই চলে। পদোন্নতির সুযোগ সামান্য। চাকরি জীবনের শেষ দিকে এসে সুপারভাইজার। সেই মাঠে আর ক্লিনিকে। 

সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্তম্ভ হিসেবে, ফ্রন্ট লাইন কর্মী হিসেবে এই দিদিরা সকলের কাছে দায়বদ্ধ। পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে ব্লক এর মেডিক্যাল অফিসার, সবার নজরদারি আর খবরদারি। কাজে গাফিলতি হলে বকুনি। এভাবেই দিন কেটে যায়।

কবির ভাষায়: "ওরা চিরকাল/ ধরে থাকে হাল/ওরা কাজ করে/ নগরে, প্রান্তরে"।

মুঠো ফোনের ও ধার থেকে দিদির গলার আওয়াজ এ সম্বিৎ ফেরে আমার। "স্যার খুব বিপদে পড়ে ফোন করছি। আপনি আমাদের ট্রেনিং দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ওষুধ খেলে টিবি সেরে যায়। আমার স্যার নিজের টিবি হয়েছে। MDR টিবি। ভালো হয়ে যাবো তো স্যার ?"

দিনের পর দিন টিবি রুগীর পরিচর্যা করতে গিয়ে রোগ হয়ে যাওয়াটা কিছু অস্বাভাবিক নয়। যতই সতর্কতা নেওয়া হোক। কিন্তু MDR টিবি ? মানে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিবি। প্রথম সারির ওষুধ আর কাজ করবে না। দ্বিতীয় সারির আরো কড়া ওষুধ দিতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে দিদি কে। 

পেশাগত ঝুঁকি। ফোনের এপার থেকে স্বান্তনা দেওয়া ছাড়া আর কি বা করতে পারি। "দিদি, ভয় পাবেন না। ঠিক ভালো হয়ে যাবেন, দেখবেন। আমরা তো আছি।"

সত্যিই কি আমরা আছি ? ওদের সাথে, ওদের পাশে ? এক শুভ্র বসনা মহিয়সী সেবিকার জন্মদিন উপলক্ষে কয়েকদিন আগেই সারা পৃথিবী জুড়ে পালন হয়েছে আন্তর্জাতিক সেবিকা দিবস, ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে। প্রজ্বলিত প্রদীপ হাতে এক নারী। ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।

নাই বা থাকলো সাদা শাড়ি, নাই বা থাকলো হাসপাতালে যন্ত্রণাকাতর রুগীর মাথায় সেবার হাতের চিরন্তন ছবি। আমার কাছে আমার ANM দিদি, নামটা যাই হোক, ফুলেশ্বরী, ফিরোজা কিংবা ফ্রান্সেসকা, সেই তো জ্বালিয়ে তুলেছে হাজার হাজার প্রদীপ। 

গতকাল থেকে এই দিদিরা তাদের পদোন্নতির সুযোগ সহ চাকুরিগত কিছু দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। এখনো অবধি কেবল লাঞ্ছনা আর ঘাড় ধাক্কা জুটেছে এটাই জানলাম। বেশি কয়েজনকে থানায় ধরেও নিয়ে গেছে।

দিন গড়িয়ে রাত। আবার আঁধার নামছে। আঁধার এর মোকাবিলায় দিদিরা নিজেরাই জ্বালিয়েছেন হাজার হাজার আলো খোলা আকাশের নীচে। সেই আকাশের থেকে এবার কি ফ্লোরেন্স এর আশীর্বাদ ঝরে পড়বে অস্নাত, অভুক্ত, নিদ্রাহীন এইসব গোলাপি শাড়ি পড়া দিদিমনিদের ওপর ?

তারাও তো "লেডি উইথ এ ল্যাম্প"। আমার, আমাদের ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।


শুক্রবার, ৯ আগস্ট, ২০১৯

ছিলো গরু ~ সুজাত্ৰ ব্যানার্জী

বেজায় দুর্গন্ধ। গাছতলায় দিব্যি ছায়ার মধ্যে চুপচাপ শুয়ে আছি, তবু গোবরের গন্ধে অস্থির। ঘাসের উপর গরুটা হাগছিল, তাড়ানোর জন্য যেই হ্যাট করতে গিয়েছি, অমনি গরুটা বলল, 'জ্যায় শ্রীরাম!' কি আপদ! গরুটা রামনাম করে কেন?
চেয়ে দেখি গরু তো আর গরু নেই, দিব্যি মোটা সোটা গেরুয়া পরা একটা লোক গোঁফ ফুলিয়ে প্যাট্‌ প্যাট্‌ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি বললাম, 'কি মুশকিল! ছিল গরু, হয়ে গেল একটা চাড্ডি।'
অমনি লোকটা বলে উঠল, 'মুশকিল আবার কী? ছিল একটা রাজ্য, হয়ে গেল দিব্যি একটা বিধানসভা-বিহীন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। এ তো হামেশাই হচ্ছে।'

আমি খানিক ভেবে বললাম, 'তাহলে তোমায় এখন কী বলে ডাকব? তুমি তো সত্যিকারের মানুষ নও, আসলে তুমি হচ্ছ গরু।'
লোকটা বলল, 'মানুষও বলতে পার, গরুও বলতে পার, হনুমানও বলতে পার।' আমি বললাম, 'হনুমান কেন?'
লোকটা বলল, 'তাও জানো না?' ব'লে এক চোখ বুজে ফ্যাঁচ্‌ ফ্যাঁচ্‌ করে বিশ্রী রকম হাসতে লাগল। আমি ভারি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। মনে হল, ঐ হনুমানের কথাটা নিশ্চই আমার বোঝা উচিৎ ছিল। তাই থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, 'ও হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।'
লোকটা খুশি হয়ে বলল, 'হ্যাঁ, এ তো বোঝাই যাচ্ছে- হনুমানের আ, গরুর র, আর মানুষের দন্ত্য স- হল আরেসেস। কেমন, হল তো?'

আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না, কিন্তু পাছে লোকটা আবার সেই রকম বিশ্রী করে হেসে ওঠে, তাই সঙ্গে সঙ্গে হুঁ হুঁ করে গেলাম। তারপর লোকটা খানিকক্ষণ গোবরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল, 'দুর্গন্ধ লাগে তো পাকিস্তানে গেলেই পার।' আমি বললাম, কিন্তু বললেই তো আর যাওয়া যায় না?'
লোকটা বলল, 'কেন? সে আর মুশকিল কী?'
আমি বললাম, 'কী করে যেতে হয় তুমি জানো?'
লোকটা একগাল হেসে বলল, 'তা আর জানিনে? কলকেতা, ডায়মন্ড হারবার, রানাঘাট, পাকিস্তান- ব্যাস্‌! সিধে রাস্তা, সওয়াঘণ্টার পথ, গেলেই হল ।'
আমি বললাম, 'তাহলে রাস্তাটা আমায় বাতলে দিতে পার?'
শুনে লোকটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেল । তারপর মাথা নেড়ে বলল, 'উহুঁ সে আমার কর্ম নয়। আমার নমোদাদা যদি থাকত, তাহলে সে ঠিক বলতে পারত।'
আমি বললাম, 'নমো দাদা কে? তিনি থাকেন কোথায়?'
লোকটা বলল, 'নমো দাদা আবার কোথায় থাকবে? এখানেই থাকে।'
আমি বললাম, 'কোথায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়?'
লোকটা খুব জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, 'সেটি হচ্ছে না, সে হবার যো নেই।'
আমি বললাম, 'কী রকম ?'
লোকটা বলল, 'সে কী রকম জানো? মনে কর, তুমি যখন যাবে দিল্লীতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, তখন তিনি থাকবেন টোকিয়োতে। যদি টোকিয়ো যাও, তাহলে শুনবে তিনি আছেন বার্লিনে। আবার সেখানে গেলে দেখবে তিনি গেলেন জেরুসালেম। কিছুতেই দেখা হবার যো নেই।'
আমি বললাম, তাহলে তোমরা কী করে দেখা কর?'
লোকটা বলল, 'সে অনেক হাঙ্গামা। আগে হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় নেই; তারপর হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় থাকতে পারে; তারপর দেখতে হবে, দাদা এখন কোথায় আছে। তারপর দেখতে হবে, সেই হিসেব মতো যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছব, তখন দাদা কোথায় থাকবে। তারপর দেখতে হবে-'
আমি তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললাম, 'সে কী রকম হিসেব?'
লোকটা বলল, 'সে ভারি শক্ত। দেখবে কী রকম?' এই বলে সে একটা কাঠি দিয়ে ঘাসের উপর লম্বা আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর নমোদাদা।' বলেই খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে চুপ করে বসে রইল।
তারপর আবার ঠিক তেমনি আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর তুমি,' বলে ঘাড় বেঁকিয়ে চুপ করে রইল।
তারপর হঠাৎ আবার একটা আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর অমিত শাহ।' এমনি করে খানিকক্ষণ কি ভাবে আর একটা করে লম্বা আঁচড় কাটে, আর বলে, 'এই মনে কর পুলওয়ামা'- 'এই মনে কর গৌরী লঙ্কেশ গুলি খেল'- 'এই মনে কর দিলীপ ঘোষ বর্ণপরিচয় পড়ছে'
এই রকম শুনতে শুনতে শেষটায় আমার কেমন রাগ ধরে গেল । আমি বললাম, 'দূর ছাই! কী সব আবোল-তাবোল বকছ, একটুও ভালো লাগে না।'
লোকটা বলল, 'আচ্ছা তাহলে আর একটু সহজ করে বলছি। চোখ বোজ, আমি যা বলব, মনে মনে তার হিসেব কর।' আমি চোখ বুজলাম।
চোখ বুজেই আছি, বুজেই আছি, লোকটার আর কোন সাড়া-শব্দ নেই। হঠাৎ কেমন সন্দেহ হল, চোখ চেয়ে দেখি লোকটা 'পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক' লেখা একটা ইয়া বড় ব্যাগ নিয়ে বাগানের বেড়া টপকিয়ে পালাচ্ছে আর ক্রমাগত ফ্যাঁচ্‌ ফ্যাঁচ্‌ করে হাসছে।

কী আর করি, গাছ তলায় একটা পাথরের উপর বসে পড়লাম। বসতেই কে যেন ভাঙা মোটা গলায় বলে উঠল, 'এগারো হাজার চারশো কোটিতে মোট কতগুলো শূন্য?'

বৃহস্পতিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৯

কাশ্মীর ও দীন নাথ ~ সমুদ্র সেনগুপ্ত

"১৯৩২ সালে আমি কাশ্মীরি পন্ডিত আন্দোলনের সাথে যুক্ত হই। ভগত সিং আমাকে খুব প্রভাবিত করেছিলেন। ওনাকে যখন হত্যা করা হয়, শোকে দুঃখে আমরা বেশ কয়েকদিন কোনো খাবার মুখে তুলতে পারিনি। এক টুকরো কাগজে লেনিন এর নামে উচ্ছসিত প্রশংসা করে কয়েকটি লাইন লিখে কাগজটা একটি বোতল বোমার ভেতরে ঢুকিয়ে দি। বোতল বোমাটা এস পি কলেজের লাইব্রেরির বাইরে রাখা ছিল। কয়েকজন ছাত্র সেটা দেখতে পেয়ে হল্লা শুরু করে যদিও বোমাটা ফাটেনি। মিস্টার ম্যাকডারমট, প্রিন্সিপাল পুলিশে খবর দেন"

সেদিনের সেই কাশ্মীরি পন্ডিত বিপ্লবী ছাত্র দিন নাথ পরবর্তী কালে নাদিম ছদ্মনামে কবিতা লিখতে শুরু করে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। (১৯১৬-১৯৮৮)। বাম শিক্ষক সংগঠনের নেতৃত্ব দেন উপত্যকার মাটিতে।

সাহিত্য একাডেমি পুরষ্কার প্রাপ্ত এই কবি ও লেখক এর একটি প্রাসঙ্গিক কবিতা আজ এই অদ্ভুত সময়ে - 

bi g'avi ni az su nagmi kanh 
ti k'azi az - ti k'azi az 
be vayi jayi jayi tapi krayi zan 
b'ehi zag h'ath 
karan chi ayi grayi yuth tsalan 
yi m'on bag h'ath...

I will not sing today, 
I will not sing 
of roses and of bulbuls 
of irises and hyacinths 
I will not sing 
Those drunken and ravishing 
Dulcet and sleepy-eyed songs. 
No more such songs for me ! 
I will not sing those songs today. 
Dust clouds of war have robbed the 
iris of her hue, 
The bulbul lies silenced by the 
thunderous roar of guns, 
Chains are all a-jingle in the 
haunts of hyacinths. 
A haze has blinded lightning's eyes, 
Hill and mountain lie crouched in fear, 
And black death 
Holds all cloud tops in its embrace,
I will not sing today 
For the wily warmonger with loins girt 
Lies in ambush for my land.

"আজ আর গাইবো না,
আজ আর গাইবো না গোলাপ আর বুলবুলের গান।
বন্দুকের গর্জনে বুলবুলের গান স্তব্ধ।
......
কোমর বন্ধ শক্ত করে এঁটে যুদ্ধবাজ রা আমার দেশের মাটিতে ওত পেতে বসেছে।
আজ আর গাইবো না।"

কবিরা সত্যদ্রষ্টা হ'ন।

শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৯

কলকাতার অমীমাংসিত খুনের মামলা ~ পি বিশ্বাস

ব্রিটিশ পুলিশের ইনস্পেকটর নৃপেন ঘোষ ছিল বিপ্লবী মহলে কুখ্যাত। তার অত্যাচারে বাঙালি বিপ্লবীরা অতিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। অনুশীলন সমিতির সদস্য নির্মলকান্ত রায়ের ওপর ভার পড়ে নৃপেনকে চিরকালের জন্য ধরাধাম থেকে সরিয়ে দেওয়ার।

১৯১৪ এর ১৯ জানুয়ারি, চিৎপুর রোড আর শোভাবাজার স্ট্রীট ক্রসিং এ ট্রাম থেকে নামার সময় নৃপেনকে লক্ষ্য করে ফায়ার করলেন নির্মল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন। তাজ্জব কি বাত, গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ল নৃপেন! মাথায় একটা ও শরীরে দুটো গুলি। এলাকা রীতিমতো জনবহুল। নির্মলকে ফায়ার করতে দেখা গেছে ফলতঃ তাকেই ধরার জন্য পাহারারত পুলিশ ও জনতা সমবেতভাবে তেড়ে গেল। সবার আগে ছুটছে অতি উৎসাহী অনন্ত তেলী। ধরতে পারলে পুরষ্কার জুটবে।
পুরষ্কার সাথে সাথেই জুটল।
পেছনপাকা অনন্তর বুকে এসে ঢোকে আরেকটি বুলেট। সেও অক্কা পেল।

নির্মলকান্ত ধরা পড়লেন পাঁচঘরা একখানি রিভলভার সমেত। অনুশীলন সমিতির আরেক বিপ্লবী প্রিয়নাথ ব্যানার্জীও এরেস্ট হলেন অকুস্থলে৷ পুলিশের অসামান্য কর্মতৎপরতায় ধন্য ধন্য পড়ে গেল। উচ্ছ্বসিত সরকারি প্রশংসায় ভেসে গেল লালবাজার। Statesman পত্রিকা নৃপেনের মৃত্যু ও অপরাধী ধরা পড়ায় যুগপৎভাবে ভারি মর্মাহত ও খুশি হয়ে লিখল:
The unfortunate Inspector was an able and honest officer whose sole fault was his faithful discharge of his duty, and his reward is to be shot down in a crowded street where any man might suppose himself to be safe. Happily, his assassin has been caught.

হাইকোর্ট জাস্টিস স্টিফেনের এজলাসে Emperor vs Nirmal Kanta মামলার শুনানী হয়। ব্যালাস্টিক এক্সপার্ট নিশ্চিতভাবে জানালেন নিহত নৃপেনের দেহে প্রাপ্ত তিনটি বুলেটের একটিও নির্মলকান্তের রিভলভার হতে নির্গত হয়নি। অনন্ত তেলিকেও সে মারেনি। বহুজনসমক্ষে অনুষ্ঠিত হত্যাকান্ডে নির্মলকান্ত হাতে নাতে গ্রেপ্তার হলেও তার গুলিতে যে দুজনের কেউ খুন হয় এ নিঃসন্দেহ। প্রিয়নাথের কাছে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিলনা।
তাহলে হত্যাকারী কে!
ভৌতিক ব্যাপার নাকি?

এই রহস্যের মীমাংসা করতে পারেনি পুলিশ।
১ এপ্রিল ১৯১৪, জুরি ৭-২ সংখ্যাধিক্যের মতে আদালত নির্মলকান্তকে খালাস দিলেন। মুক্তি পেলেন প্রিয়নাথ ব্যানার্জি। নির্মল গুলি চালিয়েছিলেন, চালাবার চেষ্টা করেছেন কিছুই প্রমান করা যায়নি। জনতা তাকে খুনী মনে করেছে, তাড়া করে ধরেছে, সবই ঠিক। কিন্তু মেঘের আড়ালে মেঘনাদ কে ছিলেন অজানাই রয়ে গেল।

স্বাধীনতার অনেক পরে জানা যায় সেদিন ভিড়ের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অনুশীলন সমিতির আরেক সদস্য খগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী। নির্মলকে ব্যর্থ হতে দেখে তিনি গুলি চালান। অব্যর্থ লক্ষ্যে ফেলে দেন প্রথমে নৃপেন ও পরে অনন্ত তেলীকে এবং ভিড়ে মিশে যান। 

খাতায় কলমে নৃপেন ঘোষ ও অনন্ত তেলীর খুনী আজো অধরা!!

শুক্রবার, ২৬ জুলাই, ২০১৯

সোশ্যাল মিডিয়া ও নির্বাচন ~ সাগ্নিক দাস

২০১৯ এ এসে আমরা অনেকেই বিজেপি সোশ্যাল মিডিয়াকে কিভাবে ব্যবহার করছে সেই নিয়ে চিন্তিত হচ্ছি। সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক জনমত বা মতাদর্শ তৈরি করা বেশ কিছুদিন আগেই শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকটি নির্বাচনের সাথে সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সোশ্যাল মিডিয়ার পেছনে খরচ বেড়েই চলেছে। 

সোশ্যাল মিডিয়াকে রাজনৈতিক ভাবে বর্তমান দুনিয়াতে কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই নিয়ে নেটফলিক্সে একটি তথ্যচিত্র এসেছে। নাম "The Great Hack"। ব্রিটিশ সংস্থা "Cambridge Analytica" বেআইনি ভাবে ফেসবুক ড্যাটা নিয়ে  ২০১৬ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ও ব্রিটেনে ব্রেক্সিট রেফ্রেন্ডউমকে কিভাবে প্রভাবিত করেছিল সেই নিয়ে এই তথ্যচিত্র। 

"Cambridge Analytica" ফেসবুক থেকে ৭ কোটি মার্কিন নাগরিকের ফেসবুক একাউন্ট থেকে, মাথাপিছু ৫০০০ ডেটা পয়েন্ট জোগাড় করে। এই ৭ কোটি মানুষের ড্যাটা এনালিসিস করে এরা বেছে নেয় সেইসব ভোটারদের, যাদের বিহেভিয়ার অন্যালিসিস করে বোঝা গেছে যে এনারা দোদুল্যমান ভোটার। তাই এই প্রত্যেকের ৫০০০ ডেটা পয়েন্ট নিয়ে প্রত্যেকের জন্য আলাদা ভাবে প্রোপাগ্যান্ডা মেটিরিয়াল তৈরি করে। ভাবুন, প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা। অর্থাৎ আপনার চিন্তাধারার সাথে খাপ খাইয়ে প্রোপাগ্যান্ডা। যেই যেই রাজ্যে দোদুল্যমান ভোটার বেশি, প্রায় প্রত্যেকটা রাজ্যে নির্বাচনে বিজয়ী হয় ট্রাম্প।

এরা কিভাবে কাজ করে, তার একটি ছোট্ট উদাহরণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ত্রিনিদাদ আইল্যান্ডে দুটি প্রধান দল। একটি দল মূলত কৃষ্ণাঙ্গদের, অন্যটি ভারতীয়দের। ভারতীয়দের রাজনৈতিক দলটি "Cambridge Analytica" কে ভাড়া করে। "Cambridge Analytica" নির্বাচনের আগে সোশ্যাল মিডিয়াতে একটি ক্যাম্পেন শুরু করে, নাম দেয় "Do So Campaign"। এটি কোন রাজনৈতিক ক্যাম্পেন নয়, সোশ্যাল ক্যাম্পেন। যুবক যুবতীদের লক্ষ্য করে এই ক্যাম্পেন। নির্বাচনের আগে এই ক্যাম্পেনটিকে রাজনৈতিক বানিয়ে দেওয়া হয়। যুব সমাজকে বলা হয় সব রাজনৈতিক দল চোর, জোচ্চোর, কেউ মানুষের কথা ভাবে না।, তাই ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। কিন্তু ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে সাঙ্গাস্কৃতিক তফাৎ থাকায় এরা জানতো, যে একজন ভারতীয় যুবক বা যুবতীর গুরুজনরা তাদের কে ভোটের দিন ভোট দিতে যেতে বললে তারা চলে যাবে, কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ যুবক, যুবতীরা যাবে না।নির্বাচনে অল্পবয়েসী ভোটারদের মধ্যে, ৪০% কৃষ্ণাঙ্গ যুব, কম ভোট দেয় ভারতীয় যুবদের তুলনায়।এর ফলে ভোটে ৬% সুইং হয়ে, ভারতীয়দের রাজনৈতিক দলটি নির্বাচনে জিতে যায়। 

সোশ্যাল মিডিয়া কিভাবে একটি লাগামহীন দানবে পরিণত হয়েছে ও সেই দানবকে পৃথিবীর সব জায়গায় কিভাবে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, পুরোটা জানতে এই তথ্যচিত্রটি দেখুন। এসবের মধ্যে দুটি সব চাইতে দুঃখয়ের বিষয়। 

১) মানুষ হিসেবে আমরা সম্পূর্ণ অসহায়। আমাদের নাগালের মধ্যে কিচ্ছু নেই। আমরা কিছু বদলাতে পারবো না। কিছু মানুষ চেষ্টা করছেন সোশ্যাল মিডিয়া ড্যাটাকে মানবাধিকার আখ্যা দেবার, কিন্তু এখনো অবধি তারা বিফল।

২) এই সোশ্যাল মিডিয়ার দানোবিক দিকটা দক্ষিণপন্তীরা সম্পূর্ন নিজেদের নাগালের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে সারা পৃথিবী জুড়ে। আমেরিকা থেকে ব্রিটেন, ব্রাজিল থেকে ভারত।

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৯

শিক্ষামন্ত্রীর কুভাষা ~ শতাব্দী দাস

আজ মিউচুয়াল ট্রান্সফারের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে  নজরুল মঞ্চে এক সভায় মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, 'শিক্ষিকাদের এত স্ত্রী রোগ কেন হয়, তা ভেবে আমি অবাক।' 

তা মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহাশয়কে জানানো হোক, নারী-শরীর নিয়ে জন্মালে কিছু নারী-অঙ্গ থাকে। তাদের ঘিরে কিছু ঝঞ্ঝাট থাকে। তাদের মধ্যে প্রধানগুলি হল-

1.Dysmenorrhea ( painful menstruation)
2.Amenorrhea ( absence of period)
3.Polycystic ovarian syndrome (PCOS)
4.Fibroids
5.Endometriosis
6.Pelvic inflammatory disease
7.Vaginitis
8.Menopause
9.Cervical infection
10.Pain during sex
11.Leucorrhea (excess white vaginal discharge)

শখানেক রোগের মধ্যে কয়েকটির মাত্র নাম বললাম। এছাড়া সন্তানধারণ তো আছেই, যাকে একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা বলা হয়, কিন্তু প্রাকৃতিক হলেও যা আসলে কম ঝক্কির নয়। বরং সিজারিয়ান সেকশন ও প্রাকৃতিক উপায়ে সন্তানের জন্ম, দুটোই আলাদা আলাদা ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিমাসের মাসিক সংক্রান্ত হ্যাপাও আছে। 

তাঁকে আরও অবগত করা হোক, অস্টিওপরোসিস,  অস্টিও আর্থারাইটিস, এনিমিয়া  মহিলাদের মধ্যে মহামারীসম। পরবর্তী কথাটা তিনি আরোই বুঝবেন না, তাও তাঁকে বলা হোক, শহুরে, চাকুরীজীবী, তথাকথিত ঘর-বার সামলানো মেয়েদের মধ্যে ডিপ্রেশনও এক কালব্যাধি।

এখনও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না, কিন্তু দ্য ওয়াল-এ প্রকাশিত খবর যদি সত্যি হয় তবে তিনি একথা বলেছেন। এবং সভায় উপস্থিত কিছু মানুষ তাতে হাততালিও দিয়েছেন।  এতটাই  অসংবেদী পিতৃতান্ত্রিক আমাদের মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর মন্ত্রক ও মন্ত্রীর তাঁবেদাররা!

মহিলা পাঠকদের কাছে  অনুরোধ, তথাকথিত 'স্ত্রী-রোগ' বিষয়ে আরও মুখর হোন বরং৷ 'স্ত্রী-রোগ' বলে কোনো রোগ হয় না৷ ওটা একটা জেনেরিক নাম।  প্রকাশ্যে একদম খোলাখুলি বলুন, বলতে থাকুন,  আপনি কখন ঠিক কীরকম শারীরিক কষ্টে ভোগেন।  গোপনীয় কিছু তো  নয়!  এই যেমন, মহিলা সহকর্মীর দিকে চোখ না মটকে, সবার সামনে বলুন, 'পিরিয়ডের ব্যথা উঠেছে, কাল মনে হয় আসতে পারব না৷' এইরকম আর কী! আসলে আপনার যে এসব রোগভোগ থাকতে পারে, তা আপনি রেখে দিচ্ছেন এঁদের পঞ্চেন্দ্রিয়-গ্রাহ্যতার বাইরে। আপনাকে শেখানো হয়েছে, এগুলো 'মেয়েলি ব্যাপার', এ নিয়ে শুধু মেয়েদের মধ্যেই আলোচনা চলে। আর দেখুন, এঁরা 'মেয়েলি' রোগ দেখা-শোনায় অভ্যস্ত না হওয়ার ফলে  তাকে প্রায় 'নেই' বানিয়ে দিয়েছেন। 

এর পরেও তাঁকে আমি 'মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী' বলেই সম্বোধন করলাম লেখায়, শুধুমাত্র  নিজের পেশার মান রাখতে৷ শিক্ষক তো আর মন্ত্রীটন্ত্রী নন, যাঁদের দেখে সৎ বাবামা সন্তানকে শেখান, 'অমনটা হোয়ো না।' শিক্ষক কুভাষা প্রয়োগ করলে ছাত্র-ছাত্রী শিখবে কী?

বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০১৯

লুচি ~ অনিন্দ্য

লুচি হলো  মশাই বাঙ্গালীর হেঁশেলের সুচিত্রা সেন । যতই মাধবী , সাবিত্রীর ধারালো অভিনয় , সুপ্রিয়ার চাপা যৌনতা , অপর্ণা সেনের আদ্যন্ত শহুরে বুদ্ধিদীপ্ত  ম্যানারিজম , গঙ্গা গার্ল সন্ধ্যা রায়ের গ্রাম্য সারল্য , বা অরুন্ধতি দেবীর রাবীন্দ্রিক সফিস্টিকেশনের কথা বলুন না কেন , দিনের শেষে ঘাড়টা বেঁকিয়ে , কাজল – কালো দীঘল চোখে উদ্ধত ভাবে বলা " ও আমাকে টাচ করতে পারবে না"--- এটাই বাঙ্গালী রোম্যান্টিসিজমের শেষ কথা । উফ ! কি তাকানো ! একটা ছুরি যেন বুকের এদিক দিয়ে ঢুকে ওদিক দিয়ে বেরিয়ে গেলো । মনে মনে  কল্পনা করুনতো রবিবারের সকাল , আপনার পাতে এসে পড়লো চারটি থেকে ছয়টি গরম লুচি , সাথে কালোজিরে , কাঁচালঙ্কা দেওয়া সাদা আলুচচ্চড়ি , বা চারটি বেগুনভাজা , নরম পান্তুয়ার মতো যার ওপরটা গাঢ় ব্রাউন , আর ভিতরের শাঁসটা নরম আর শাদাটে । আর সাথে অবশ্যই থাকবে একবাটি ঘিয়ে জবজবে মোহনভোগ , ভিতরে কাজুবাদাম আর কিশমিশে ঠাসা । আপনি আঙ্গুল দিয়ে গরম লুচির ওপরটায় আলতো ভাবে একটা টোকা দেবেন , যেন সপ্তপদীর কৃষ্ণেন্দু পরম মমতায় রীণা ব্রাউনের গালে হাত বোলাচ্ছে । এরপর ভিতর থেকে ফুস করে একটু ধোঁয়া বেরিয়ে এলো , যেন শঁপাঞের  ( বানান কার্টসি মানিকবাবু)বোতলের কর্কটা  খোলার পর সামান্য ভুড়ভুড়ি , আপনি তিনকোণা করে আঙ্গুল দিয়ে একটা টুকরো ছিঁড়লেন , চচ্চড়িটা বা বেগুনভাজাটা মাঝখানে দিয়ে গালে ফেললেন , এবার  চোখটা বুজে  আস্তে আস্তে চিবোন , মাইরি বলছি , আপনার অতিপরিচিত খাণ্ডার অর্ধাঙ্গীনিকেও সাত পাকে বাঁধায় গুণ্ডা ভেবে বসা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে মাসতুতো ভাইয়ের বাড়িতে কলেজের প্রফেসর হিসাবে আবিষ্কার করে  লজ্জিত সুচিত্রা সেনের মতো লাগবে । 

                   বাংলা ছবির সুপ্রতিষ্ঠিত নায়িকাটির মতো লুচিও তার সহযোগী নির্বাচনের  বিষয়েও অত্যন্ত খুঁতখুঁতে । এতো আর একথালা ভাত নয় যে যেমন তেমন করে গবগবিয়ে খেয়ে নেবেন , লুচি হলো গিয়ে বাঙ্গালির ভোজন সংস্কৃতির চুড়ান্ত রোম্যান্টিক স্বপ্নবিলাস । যদি হয় কোন নেমন্তন্ন বাড়ি তাহলে লুচির সঙ্গে আপনাকে রাখতেই হবে লম্বা করে কাটা বেগুনভাজা , ডাঁটিশুদ্ধ  লম্বমান , তার পরেই আসবে আলুর দম, শুকনো শাদা , কড়াইশুঁটি মাখানো ,আর ঘন , গাঢ়  ছোলার ডাল, যার  ভিতরে নারকোল কুচি আর কিশমিশের স্বাদে আপনি সদ্য বিবাহিত জামাইবাবুর প্রতি রহস্যময়ী  অবিবাহিতা শ্যালিকার দুষ্টুমির স্পর্শ পাবেন ।  আবার প্রাতরাশ হলে আগেই বলেছি এর সঙ্গে অবশ্যই থাকবে শাদা আলুচচ্চড়ি ,  স্বয়ং মহানায়ক উত্তমকুমারও নাকি এই দেবভোগ্য বস্তুটির একান্ত অনুরাগী ছিলেন ( বেণুদি উবাচ ) । আপনার নিশ্চয়ই এতক্ষণে মনে পড়ে গেছে  নিশিপদ্ম ছবিটার কথা , অনঙ্গবাবু ( উত্তম কুমার ) লুচি আলু চচ্চড়ি খাওয়ার আবদার করছেন পুষ্প ( সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়) এর কাছে , কাটলেট ভেজে খাওয়ানোর আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে । গরম লুচির সাথে যদি তরকারি বা বেগুনভাজা তেমনই ঠাণ্ডা লুচির সঙ্গে মিষ্টি জাতীয় খাবারের সঙ্গতটাই ভালো । হেমন্তকালের কোজাগরী লক্ষীপুজোর ঘন সরপড়া পায়েসের সাথে ঘিয়ে ভাজা মিইয়ে যাওয়া লুচি ----- যেন ইন্দ্রাণী ছবিতে উত্তম সুচিত্রার লিপে হেমন্ত মুখুজ্জে – গীতা দত্তের ডুয়েট "  নীঢ় ছোট ক্ষতি নেই আকাশতো বড়" । আবার ধরুন গিয়ে মিয়োনো লুচির  ওপরের চামড়াটা  আলতো করে তুলে নিয়ে তলার মোটা অংশটা দিয়ে লালচে রঙের মিষ্টি দই ---- যেন দীপ জ্বেলে চাই বা মেঘ কালো ছবিতে বসন্ত চৌধুরীর দৃপ্ত পৌরুষের সঙ্গে মিসেস সেনের অনাবিল ন্যাকামি । আবার একটু বেশী ময়াম দেওয়া খড়খড়ে লুচির সঙ্গে আপনাকে খেতেই হবে সেন মহাশয়ের দোকানের ঘিয়ে ভাজা সীতাভোগ আর মিহিদানার মিশ্রণ , সাদা আর হলুদে মাখোমাখো , মাঝে মাঝে রম্বসাকৃতি রসে ভেজানো ছানার মুড়কির দ্রঢ়িমা । ঠিক যেন অসিত সেনের জীবন তৃষ্ণা , রুক্ষ অহংকারী , উত্তম কুমারের সঙ্গে ব্যক্তিত্বময়ী সুচিত্রা সেনের দুষ্টুমিষ্টি সংঘাতের মধ্যে দিয়ে প্রণয়ের ইতিহাস । 

                              আমাদের আম বাঙ্গালীর প্রাত্যহিক যাপনের সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে আছে লুচি । ষষ্ঠিপদ চট্টোপাধ্যায়ের পাণ্ডব গোয়েন্দা বা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের অঘটনঘটন পটীয়সী মিতিনমাসির ভ্যাবলা স্বামী পার্থ , লুচি সবারই  হট ফেভারিট । বেড়াতে গেলে টিফিন ক্যারিয়ারে চারটি লুচি- আলুর দম , বাক্সভর্তি কড়াপাকের সন্দেশ , জলের বোতলে  জল , আর পেল্লায় সবুজ রঙের হোল্ডল ----  বাঙ্গালীর বেড়াতে যাওয়ার অনিবার্য অনুষঙ্গ ছিলো – এই প্রজন্ম যদিও তার খবর রাখে না ।  ভাবুনতো আপনার কোথাও যাবার তাড়া আছে , পরিবারের কর্ত্রী যদি " চট করে কটা লুচি ভেজে দিই" বলার পরিবর্তে বলে " কটা রুটি সেঁকে দিই" , আপনি কি একটু ইনসিকিওর্ড বোধ করবেন না ।  এমনকি  বাঙ্গালীর আল্টিমেট পরকীয়ার সাথেও কিন্তু লুচির অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে । কিরণময়ী যদি রান্নাঘরে লুচি ভাজতে ভাজতে উপেন্দ্রকে নিজের মনের কথাটা না বলতো , চরিত্রহীন উপন্যাসের ট্র্যাজেডিটা দাঁড়াতো কি ! 

                                অবশ্য একথা ঠিক সবার হাতে লুচি ঠিক ফোলে না । ফুলকো লুচি ভাজা , থোড় , মোচা আর ডুমুর কোটা , আর তিলের নাড়ুর সঠিক পাক দেওয়া ---- এই তিনটে হলো গিয়ে বাঙ্গালী গৃহিণীর সুরন্ধনকারীনি হওয়ার লিটমাস টেস্ট । মনে করুনতো পারমিতার একদিন ছবিটার কথা , সনকা ( অপর্ণা সেন)  টিভিতে আদর্শ হিন্দু হোটেল সিরিয়াল দেখছেন , দুই পুত্রবধু লুচি ভাজছে , স্বামী দুলাল লাহিড়ী খেঁকিয়ে উঠলেন লুচির  গুণমান নিয়ে । বিরক্ত সনকা উঠে লুচি ভাজতে বসলো , আর আমরা পর্দায় ফুলকো লুচি দেখলাম --- ছবিটির জন্য প্রয়োজনীয় উত্তর কলকাতার মধ্যবিত্ত জীবনের আবহটি কেমন তৈরি হয়ে গেলো । আসলে লুচি ফোলানোর একটি মেধাবী টেকনিক আছে , সেটি হলো খুব গরম তেলে লুচির লেচি ছেড়ে দিয়ে খুন্তি দিয়ে লেচির ধারটা আলতো করে চাপ দিতে হয় , তবেই লুচি ফোলে । 

                        আজ বাঙ্গালী আন্তর্জাতিক হয়েছে , তার বিবাহ অনুষ্ঠান থেকে লুচি ব্রাত্য হয়ে গেছে , এই প্রজন্মও বোধ করি জাঙ্ক ফুডের আকর্ষণে এই সব আটপৌরে খাবারের স্বাদ প্রায় ভুলতে বসেছে । আজ কষ্ট হয় সেইসব ছেলেমেয়েদের জন্য , যারা কে এফ সি , ম্যাকডোনাল্ডস , ডোমিনোজের পাঁউরুটি চিনলো কিন্তু ঘরোয়া হেঁশেলের লুচি – তরকারির অনুপম স্বাদ জানলো না ।

(লেখা ও ছবি সংগৃহীত)

মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৯

মোদীজি কথা রাখেননি ~ অর্জুন দাশগুপ্ত

লোকপাল বিল মনে আছে। মনমোহন সিং সরকারের সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে লোকপাল একটা জোরালো অস্ত্র মনে করা হয়েছিলো। আন্না হাজারে অনশন করলেন। সাথে কিরণ বেদী, ভি কে সিং। 
তারপর মোদীজি ক্ষমতায় এলেন। কিরণ বেদী, ভি কে সিং বিজেপিতে চলে গেলেন। 
আর লোকপাল বিল ?? বিশ বাঁও জলে।

হুইসেল ব্লোয়ার আইন।
যখন কোনো ছোটো অফিসার বা কেরানি উচ্চপর্যায় দুর্নীতির সন্ধান পায়, এবং নিজের চাকরি, পরিবার, জীবন বাজি রেখে তা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করে তখন তাকে আইন করে সমাজের হায়না, কুকুরদের হাত থেকে রক্ষা করা সরকারের কর্তব্য। 
আমাদের দেশে এমন একটি আইন হয়েছিল ২০১৪ সালে। মোদিবাবু ৫ বছরে এখনো তা প্রণয়ন করতে পারেন নি।

তথ্যের অধিকার বা রাইট টু ইনফরমেশন আইন, দেশের সাধারণ গরীব লোকেদের হাতে এক শক্তিশালী অস্ত্র । সরকার তোমাকে জানাতে বাধ্য।কোন খাতে কত খরচ, আর বাবুদের নিয়ম দেখিয়ে  চেপে যাওয়া যাবে না।
কাল সংসদে এই আইনটির দাঁত নখ ভেঙে দিলেন মোদি সরকার। 

তিনটি আইন, গরিব মধ্যবিত্তদের হাতে জোরালো তিনটি অস্ত্র। সমাজের পচন আটকানোর তিনটি জীবনদায়ী ওষুধ, নষ্ট করে দেওয়া হলো।

ঠিক কাকে কাকে আড়াল করতে চাইছেন মোদীজি?

শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০১৯

মা দুগ্গার বর ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

কাল রাত দু'টো নাগাদ বারান্দায় ফুল দেখতে গেছি, হঠাৎ দেখি একেবারে সামনে সাক্ষাৎ জগৎ জননী মা দুগ্গা দাঁড়িয়ে! হেব্বি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলাম কারণ, দেখি দিব্যি দু'খানা মাত্র হাত। বাকি আটটা হাত কোন অজুহাতে কোথায় রেখে এসেছেন জিগানোর আগেই একেবারে খ্যাক খ্যাক করে উঠলেন, 

-- এত রাত অবধি জেগে থাকিস। বাদুড়ের মত ঘুরঘুর করিস সারা বাড়িময়, লজ্জা করে না? নির্ঘাৎ সিঁধেল চোর ছিলি আগের জন্মে... চিত্রগুপ্ত-কে শুধোলেই জানা যাবে... 😡

-- অপরাধ নিও না, মা। এই বেগমবাহার গাছে কুঁড়ি এসেছে, তা, দেখতে এসেছিলাম যে ফোটা'র কাজ কদ্দূর এগোলো। সব শা... ইয়ে মানে শান্তি নেই, জানো তো 😟 গাছগুলো পর্যন্ত তাড়া না লাগালে ঠিকঠাক কাজ করে না...(রাতদুপুরে উনি রোঁদে বেরিয়েছেন কেন, জিজ্ঞেস করা'র ইচ্ছে থাকলেও সাহস পেলাম না)

-- (কিঞ্চিৎ নরম হয়ে) গাছ-ফাছ লাগিয়েছিস ভাল কথা। ঠিকমত দেখভাল করবি। যা অবস্থা করে রেখেছিস দেশটা'র! 

বাই দ্য ওয়ে, ভাবছিস আমি কেন এত রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তাই তো?  শোন রে অর্বাচীন, আমি মাঝেমাঝেই হারুন-অল-রশিদ-এর মত নিজের রাজ্যপাট ঘুরে ঘুরে দেখি। সামনেই তো তোদের মোচ্ছব আসছে আমায় নিয়ে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে ঘোড়াড্ডিমের প্যান্ডেল করবি কিন্তু ভুলেও ক'টা পুকুর কাটবিনা বা গাছ লাগাবিনা। ওই সব ইয়ের (খুব সন্দেহ হল বাল বলতে গেছিলেন :( ) প্যান্ডেল আমি দেখতেও যাইনা, বুঝলি? 

-- বুঝেছি, মা। ইয়ের প্যান্ডেল দেখতে আমিও যাইনা বেশ কয়েক বছর হল। তেঢ্যাঙা একটা কিম্ভূত টাইপ করে তোমাকে বানিয়েছিল একবার...ক্কি বলবো মা, সেলফিতে সেলফিতে ফেসবুক ভরে গেছিল গো... সেবার পর্যন্ত আমি যাইনি! এইসব প্যান্ডেল যারা বানায়, তাদের মাথায় চাম-উকুন দাও, মা... লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি, অর্বুদ নির্বুদ চাম-উকুন.... চুলকিয়ে মরুক বোকাইয়ের দল! 😠😠

-- এমনি উকুন দিলে কাজ হবেনা বলছিস? (একটু চিন্তিত দেখায় মা-কে) 

-- আহা! হবেনা কেন, কিন্তু টেকো যারা? তারা তো মজাসে পার পেয়ে যাবে, না?  চাম-উকুন বেস্ট। চাই কী মাথা-পেট-গুহ্যদ্বার .... সব জায়গায় দাও...😊

-- হুঁ। ঠিক বলেছিস। তোর ওপর আমি বেশ খুশি হয়েছি। বর নিবি? 

-- (আঁতকে উঠে)  নান্নান্নান্নান্না!!😢😢😢😢 তুমি এসো গিয়ে!!!!

-- আরে, দূর পাগলী, এ বর সে বর নয়। ইচ্ছেপূরণ বলছি... 

-- (কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হয়ে) ওঃ! 

তাহলে, মা, (আহ্লাদী আদুরে স্বরে) আমার কত্তদিনের শখ একটা আসলি মসলিন-এর উপর, ওই যেগুলো নাকি আংটি দিয়ে গ'লে যেত, বুঝলে তো, ওই মসলিন, ১৮ ক্যারাট সোনার জরি দিয়ে ইন্ট্রিকেটলি এমব্রয়ডারি করা শাড়ি, সব্যসাচী এক্সক্লুসিভলি আমার-ই জন্য বানাবে...😍😍 প্লিজ, মা, প্লিজ...

-- (ভেংচি কেটে) আমারই জন্য বানাবে! ইঃ! শখ দ্যাখো! ন্যাতা জাম্বুবানি এসেছেন আমার!!  ঠিকঠাক কিছু চাওয়ার থাকলে, বল। 

-- (গোঁ গোঁ করে) এক কাজ করো তাহলে। বর দাও যে, সারাদিনে একটিমাত্র ঘন্টা রোজ আমার নিজের জন্য বরাদ্দ হবে। ওই এক ঘন্টা কেউ যেন আমায় ডিস্টার্ব করতে না পারে। নো অফিশিয়াল ফোন কল, নো মা আমার জিন্স কোথায়, নো বৌদি আজ কী রান্না হবে, নো মা'র ব্লাড সুগার রিপোর্ট আনতে হবে, নো এই যে বাজারটা রাখো, নো একি বাথরুমের কল কে ঠিকমতন বন্ধ করেনি, নো....

আবেগের বশে বেগ এসে গেছিল, বলেই যাচ্ছিলাম। এন্ডলেস লিস্ট। কিন্তু এই অবধি শুনেই কী হল কে জানে 😢 মা হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠে "তুই একটা পাষণ্ড, নরাধম... যা আমার নিজের নেই, তা তোকে আমি কী করে দেব রে...উফ! মনে করিয়ে দিল সব...!!!" বলতে বলতে সাঁত করে মিলিয়ে গেলেন। 

ভগ্ন হৃদয়ে বসে রইলাম 😟😟

শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০১৯

ইস্কনকে ৭০০ একর জমি ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

এটা করবেন না, প্লিজ। একটা ধর্ম নিরপেক্ষ দেশে এটা করবেন না। এটা করা যায় না। এখনো আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় লেখা আছে, ভারত এক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ।

নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে এটা করবেন না। 
এখনো এই দেশের অধিকাংশ মানুষ বুঝে, না বুঝে মেনে চলেন সোয়া দুই হাজার বছর আগের অশোকের শিলালিপির মহান সত্যকে। সভ্যতার প্রথম দার্শনিক পদক্ষেপকে।
There should not be honour of one's own (religious) sect and condemnation of others without any grounds — Ashoka, Rock Edicts XII, about 250 BCE.

সেই দেশের এক নাগরিকের, সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারীর অনুরোধ - এটা করবেন না।

কোন প্রয়োজন নেই শ্মশান-ব্রাহ্মণদের ভাতা দেবার। ওদের প্রতি কিন্তু কোন অসূয়া নেই। তবে প্রশ্ন, কেন এক সেক্যুলার দেশে ওরা সরকারি ভাতা পাবেন। কি ভিত্তিতে এই সরকারি বদান্যতা ঠিক হলো! ওদের থেকে গরিব মানুষ কি নেই এই রাজ্যে, এই শহরে! 

কেন ধর্মের ভিত্তিতে, বর্ণের ভিত্তিতে একবিংশ শতকে এই কলকাতা শহরে গুটিকয় মানুষ সরকারি ভাতা পাবেন! শুধু তারা হিন্দু ব্রাহ্মণ বলে!
যেই রকম অনিষ্ট হয়েছে মৌলবী ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা দিয়ে, ঠিক তেমনই অমঙ্গল হবে এই শ্মশান ব্রাহ্মণদের ভাতায়। 

এই ক্ষতি একদিনে বোঝা যাবে না, এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি। যেমন বোঝা যায় নি মৌলবীদের ভাতায় ও অন্য বহু অনুষাঙ্গিকে।

এতে মানুষের সাথে মানুষের ব্যবধান শুধু বাড়বে, কমবে না।

ইস্কনের প্রেক্ষাপট অনেকের জানা; ওদের নিজেদের ধর্ম প্রচারের যথেষ্ট অর্থ আছে। সেই ইস্কনে গিয়ে ঘোষণা হলো সরকার ওদের ৭০০ একর জমি দেবে। কেন? ওরা ধর্ম প্রচার করছেন দীর্ঘদিন ধরে। অসুবিধা তো হয় নি। কেন ওরা সরকারি জমির সুবিধা পাবে! 

বরং সেই জমিতে শিল্প হলে বহু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি লাভ হবে। সরকারি প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে।

ওদের জমি দিলে আরো যত হিন্দু, মুসলমান, শিখ, বিভিন্ন আদিবাসী উপগোষ্ঠী আছে - তারা কেন পাবে না?  এই দাবি আজকে না হলেও কালকে যে উঠবে। 

সবচাইতে বড় কথা সরকারের কাজ কি? ধর্মের ভিত্তিতে জমি, ভাতা দেওয়া নাকি রাজ্যের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন করা!

ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাইবার বদ অভ্যাস অনেকদিনের, তবু দুঃখের সাথে বলি, স্বাধীনতা পরবর্তী কালে এই রাজ্যে এ জিনিস আগে দেখি নি। ধর্মের, তার বর্ণের, তার মুরুব্বিদের সরকারি ভাতা আসলে দীর্ঘদিনের বিভেদের শক্তির সরাসরি সরকারি বিধিবদ্ধ তোষণ। এর সাথে সাধারণ মানুষের, তাদের ধর্মাচারণের সম্পর্ক নেই।

আর, একটা ভুল দিয়ে আগের ভুলকে শুদ্ধ করা যায় না। 

ইস্কনে ৭০০ একর জমি ও কলকাতা শহরে শ্মশান-ব্রাহ্মণদের ভাতা দিয়ে রামের বিরুদ্ধে লড়াই চলে না। ধর্ম দিয়ে ধর্মের লড়াই হয়েছে মধ্য যুগে, ক্রুসেডে। কংগ্রেস সেই নরম হিন্দুত্ব প্রচেষ্টা নিয়েছে, হেরে ভুড্ডু হয়ে গেছে।

সে পথ পরিত্যক্ত। 

বড় বড় বক্তৃতায় গাল  ভরবে না, ভাতাতে খাঁই মিটবে না, জমিতে অসন্তোষ প্রশমিত হবে না, ভাষার আবেগ কাজ করবে না।

মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের অসম্মানের প্রচেষ্টার লড়াই দীর্ঘমেয়াদি। 

তার জন্য দরকার ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, রাজ্য ব্যতিরেকে মানুষকে একজোট করা, মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা।

আম্বেদকর  বলেছিলেন,  Democracy is not merely a form of government. .. It is essentially an attitude of respect and reverence towards fellow men.

সেই সম্মান হারিয়ে যাচ্ছে। সেই মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। তাকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সকলের। 


সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৯

চিকিৎসক দিবস ~ ড: রেজাউল করীম

আজ চিকিৎসক দিবস। চিকিৎসকদের উপর লাগাতর নিগ্রহের বিরুদ্ধে আজকের দিন পালন করা হচ্ছে। গতকাল একজন সাংবাদিকের কাছে শুনলাম, কলকাতার হাসপাতালে নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে। শুনে ভালই লাগছে,  তবে আশঙ্কা আছে ষোল আনা। সেই অধুনা বিখ্যাত সভার পর ও প্রায় তিনটি ভাঙচুরের ঘটনা এই এত দূরে থেকেও আমি জানতে পারলাম, জানিনা হয়তো আরো বেশি ঘটেছে। যাক, আশা করি অবস্থার পরিবর্তন হবে। সারা দেশে চিকিৎসকদের সম্প্রদায় হিসেবে আক্রমনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। যে পারস্পরিক ঘৃণা সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানুষের অসহায়তা, ক্ষোভ আর হতাশা বাড়ছে প্রতিদিন আর সে তার সব দুর্ভাগ্যের কারণ হিসেবে একটা অদৃশ্য প্রতিপক্ষ খাড়া করে সুখ খোঁজার চেষ্টা করছে। আমার দুর্ভাগ্যের জন্য আমি দায়ী নই, রাম-শ্যাম-হাসিম শেখরা দায়ী।
অনেক দুর্ভাগ্যের ইতিহাস রচিত হয়েছে পৃথিবীতে। আরো হবে কেননা অন্ধ ক্রোধ তার লেলিহান আগুনে সবাইকে জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরী হয়ে আছে। সেসব কথা কার্পেটের তলায় ঠেলে দিয়ে বরং ভাল ডাক্তার হওয়ার চেষ্টা করা যাক। দেশ, জাতি, পৃথিবী, জল-সঙ্কট, ধর্মীয় উন্মাদনা নিয়ে বাকিরা মাথা ঘামাক, আমরা ডাক্তার, ওগুলো নিয়ে বিশ্ব মাথা খুঁড়লেও আমাদের দরকার নেই!!!!

যাঁর জন্মদিন আজ পালন করছি, তিনি তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ওয়েলিংটন থেকে রাইটার্স যেতেন। সকালে বেলা হাতে গোনা কয়েকটি রোগী দেখতেন। আগে থেকে নাম লেখাতে হতো। একটা লোক রোজ এসে দাঁড়িয়ে থাকে, নাম লেখানো নেই, তাই দেখাতে পারে না। রায়বাবু দু চারদিন লোকটিকে খেয়াল করে শেষে একদিন বিরক্ত হয়ে ডেকে পাঠালেন।"কিহে, রোজ রোজ এসে দাঁড়িয়ে থাকো! ব্যাপার কি?:
-আজ্ঞে, আপনাকে দিয়ে চিকিচ্চে করাতে চাই।
-তা রোগীটি কে হে?
-আজ্ঞে, আমি।
বিধানবাবু, একবার তাকিয়ে ভাল করে দেখলেন তাকে তারপর বললেনঃ না হে, এ রোগ সারার নয়। তাছাড়া, আমার আজ সময় ও নেই। তুমি বরং কাল এসো গিয়ে।
পরদিন লোকটি আসতেই তার হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললেনঃ এটা নিয়ে রাইটার্সে যাও, আমার সেক্রেটারির সাথে দেখা করো। দারিদ্র কি আর ওষুধ দিয়ে সারে?
 এই গল্পটি আমি তাঁর একজন রোগীর কাছে আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে শুনেছিলাম। তবে, ঘটনাটা মনে হয় বানানো নয়, কারণ বিমল মিত্র  মহাশয় ও প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনা লিখেছেন।
এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের মূল যে সব মারণ রোগ নিয়ে  চিন্তা করার দরকার, আর সরকার যে সব রোগের জন্য পয়সা খরচা করতে চান, তার মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। সরকার অপুষ্ট, নিরক্ত, অভুক্ত মানুষের কাছে চাকচিক্য খচিত নীল সাদা বাড়ি দিয়েছেন, তাতে ঘুঘু চরলেও কিছু যায় আসে না, ভোটের হিসেব আর মানুষের দুর্দশা দূর করা পরস্পরের ব্যস্তানুপাতিক। যে সীমাহীন শৈথিল্য টিকাকরণ কর্মসূচিতে দেখানো হচ্ছে, সব শিশুঘাতী মারণরোগ ফিরে আসলেও অবাক হবো না। 
এক পুরোপুরি নিরাপত্তাহীন জাতির চিকিৎসকের নিরাপত্তার জন্য ঢাল, তলোয়ারহীন কয়েকটা সেপাই আর যারা লুটেপুটে দেশটাকে ছিবড়ে করে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তাদের জন্য কমাণ্ডো!!!

তবু, চিকিৎসক দিবস এসেছে। সবাই মিলে তাকে সফল করতে হবে। গুরুদেব বলেছেনঃ
"আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
 তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥" 
মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কি অট্টালিকা বানাই না!  তাই, কি বলে, আজকের এই পুণ্যলগ্নে যে ভালবাসার রস ফেসবুক আর হোয়াটসাপ বাহিত অমৃতের চাঙড় নিয়ে আসছে, তাকে স্বাগত জানিয়ে শুরু হোক আজকের দিন।

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৯

পুকুর-চোর ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

বাংলার  তাল-পুকুরে
সিপিএম ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাড়া।

তোমাদের সবার চেনা
চিটফান্ড গাছ আছে না
হোথাতে আস্তে গিয়ে
বিকট এক চিত্র নিয়ে
দুই কোটি যেই বেচেছি
কী বিকট চেঁচামেচি 

সততার প্রতীক ওড়ে
পঁচিশ আর পচাত্তরে
আমি চোর? সব্বাই চোর।
কী উপায়? প্রশান্ত্-কিশোর!

অ্যাডভাইস উচ্চ ফি'তে
কিনে, হয় মেনেই নিতে।
রটালাম... কাটমানি খায়
ওরা সব নীচের তলায়,
পুর আর পঞ্চায়েতে।
শুনে সব উঠল তেতে।

ভোটার তো ভারি নচ্ছার
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিতে চায় কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি।
মানি আর নাই বা মানি
আমি তো চুরির রাণী। 
কী ভাবে ভাইপোটাকে
বাঁচাব? চিন্তা থাকে...

ব্রাত্যর ফালতু বকা
ডোন্ট মাইন্ড... সুজন সখা
দরকার মান্নানেরও!
এসো আজ, এদিক ফেরো...

তোমাদের অফিস-টফিস
ফেরাব। চাইছ ক'পিস?

সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
ভোটারের পিটুনিগুলা!
কি বলিস ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা…!

সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৯

বিপ্লবী গণেশ ঘোষ ~ অরিজিৎ গুহ

কলকাতার কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট। প্রচুর স্বদেশী আন্দোলনের বিপ্লবীদের হত্যা এবং তাঁদের ওপর বীভৎস অত্যাচারের এক মূর্ত প্রতীক। এই চার্লস টেগার্টের ওপর ১৯৩০ সালে ডালহৌসি স্কোয়ারে আক্রমণ চালাল বিপ্লবীদের একটি গোষ্ঠী। তার গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করা হল। অত্যাচারী পুলিশ কমিশনার হলেও যে গুণটা তাঁর ছিল, সেটা হচ্ছে মস্ত ডাকাবুকো ছিলেন উনি। এর আগেও বহুবার তাঁর ওপর আক্রমণ হয়েছে, কিন্তু কোনোবারই ভয় পেয়ে নিজের দায়িত্ব হতে সরে আসেন নি। ওড়িশার বালাসোরে বাঘা যতীনের গ্রুপের সাথে সরাসরি অ্যাকশন করেছেন। 
  ডালহৌসি স্কোয়ারে তাঁর গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করার পরও তিনি প্রাণে বেঁচে যান এবং যে বোমা ছুড়েছিল সেই তরুণ বিপ্লবী অনুজা সেনকে গুলি করতে সক্ষম হন। ধাওয়া করে ধরে ফেলা হয় আরেক তরুণ বিপ্লবী দীনেশ মজুমদারকে। এরপরই সারা কলকাতা জুড়ে শুরু হয় ধরপাকড়। মহামান্য ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ কমিশনারের গাড়িতে বোমা মারার অপরাধ কম অপরাধ নয়। সেই সূত্রেই গ্রেপ্তার হন মেডিকাল কলেজের ডাক্তার নারায়ণ রায়। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেল বোমা তৈরি করার মশলা, বোমা বানানোর নক্সা। ক্যালকাটা বম্ব কেসে গ্রেপ্তার হলেন ডক্টর নারায়ণ রায়। প্রথমে আলিপুর জেলে এরপর সেখান থেকে পাঠানো হল বোম্বের যারবেদা জেলে। সেখান থেকে কয়েক বছর পর আবার নিয়ে আসা হল আলিপুর জেলে। এবার আরো বড় প্রোমোশন দিয়ে পাঠানো হবে আন্দামানের সেলুলার জেলে। তারই প্রস্তুতি হিসেবে ১৯৩৩ সালে দ্বিতীয়বার স্থানান্তরিত করা হল আলিপুর জেলে। বোম্বের যারবেদা জেলে নারায়ণ রায়কে রাখা হয়েছিল এক নির্জন কক্ষে। সেখানেই সারাদিন ধরে পড়াশোনা করতেন। সেখানেই শেষ করলেন মার্ক্সের ক্যাপিটাল আর লেনিন রচনাসমগ্র। এরপর যখন আলিপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হল তখন যে কদিন ছিলেন সেই কদিনের মধ্যেই জেলে তৈরি করে ফেললেন মার্ক্সিস্ট স্টাডি গ্রুপ। ইতিমধ্যে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে হাজারিবাগ জেল থেকে সতীশ পাকড়াশী আর বোম্বের রত্নগিরি জেল থেকে নিরঞ্জন সেনকে। এই দুজনকেও পাঠানো হবে আন্দামানের সেলুলার জেলে। আলিপুর জেলে বসেই তিনজনে মিলে ঠিক করে ফেললেন আন্দামানে প্রচুর মার্ক্সিস্ট সাহিত্য নিয়ে যাওয়া হবে। সেরকম ব্যবস্থা করেই দু ট্রাঙ্ক ভর্তি বই নিয়ে তিনজনে মিলে চড়ে বসলেন আন্দামানগামী জাহাজে।
    সেলুলার জেলে এসে ছোট্ট একটা গ্রুপ নিয়ে নারায়ণ রায়রা তৈরি করলেন মার্ক্সিস্ট স্টাডি সার্কেল। প্রতিদিন নিয়ম করে সেখানে বিপ্লবী তৈরি করার পাঠচক্র বসতে থাকল। আস্তে আস্তে সেই গ্রুও বড় হতে শুরু করল। তাঁরা নিজেরা একটা হাতে লেখা পত্রিকাও বের করলেন। স্টাডি সার্কেলের অধ্যক্ষ হয়ে উঠলেন নারায়ণ রায়।
    সেলুলার জেলে আসার পর থেকেই নারায়ণ রায় দেখতেন দু তিনজনের একটা ছোট্ট গ্রুপ তারা নিজেদের মতই থাকত। খুব একটা নারায়ণ রায়দের কাছে ঘেঁষত না। ওদের মধ্যে একটা লম্বা কালো মত ছেলে নারায়ণ রায়কে আকৃষ্ট করল। দূর থেকে ছেলেটা ওদের স্টাডি সার্কেলকে লক্ষ্য করত, কিন্তু কখনো কাছে আসত না। ওদের আসলে নিজেদের অন্য মত ছিল। ওই গ্রুপের বক্তব্য ছিল মসি চালনার থেকে অসি চালনাই আসল কাজ। অর্থাৎ পড়াশোনা করার থেকে হাতে তরোয়াল তুলে নেওয়াটাই সঠিক পদক্ষেপ। নারায়ণ রায় বুঝতে পেরেছিলেন ছেলেটি কঞ্চি নয়। শক্ত বাঁশ। কঞ্চিকে সহজে নোয়ানো যায়। বাঁশকে নোয়ানো সহজ নয়, কিন্তু একবার নোয়াতে পারলে শক্তিশালি অস্ত্র তৈরি হবে।
   এই ঘটনার আগে একটু পূর্বকথন রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারকে জোরদার ধাক্কা দেওয়ার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম শহরে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবীর চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠন ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ব্রিটিশ সামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মত পরিস্থিতি যে একদল অকুতোভয় বিপ্লবী সৃষ্টি করতে পারে সেটা ভারতবাসী জেনে গেছে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন এক নতুন আদর্শের জন্ম দিয়েছে। যদিও সেই অপারেশনের প্রত্যেকেই ধরা পড়েছে এবং বিচারে সবাইকে সেলুলার জেলে কারাবন্দী করা হয়েছে নারায়ণ রায়রা জেলে এসে পৌঁছানোর বছর খানেক আগেই। চট্টগ্রামের সেই গ্রুপটাই নিজেদের আলাদা করে রাখত বাকিদের থেকে। তারা তখনো চট্টগ্রামের ধাঁচে বৃহৎ পরিকল্পনা রচনা করতে সচেষ্ট ছিলেন। যদিও তাদের মধ্যে রণধীর দাশগুপ্ত ও আনন্দ গুপ্ত ইতিমধ্যেই স্টাডি সার্কেলে নাম লিখিয়েছিলেন। 
   সেই কালো লম্বা মত ছেলেটা অবশ্য মাঝেমাঝে নারায়ণ রায়দের স্টাডি সার্কেলের ছেলেদের সাথে রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা করত। কখনো কখনো ঐক্যমতে পৌঁছাত, কখনো বা আবার তাদের মতের সাথে বিরুদ্ধমত প্রকাশ করত। আস্তে আস্তে স্টাডি সার্কেলের গ্রুপের সাথে বন্ধুত্ব বাড়তে লাগল। ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করল নারায়ণ রায়েরও। ইতিমধ্যে কলকাতার আলিপুর জেল থেকে গোপনে আব্দুল হালিম যোগাযোগ করতে সমর্থ হয়েছেন সেলুলার জেলের নারায়ণ রায় সতীশ পাকড়াশীদের সাথে। আব্দুল হালিম তখন কলকাতা জেলার ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। গাড়োয়ান আর মেথরদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়ে জেলে গেছেন। আব্দুল হালিম ওঁদের সাথে যোগাযোগ করে জানালেন এবার সরাসরি আন্দামান জেলে কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারের কাজ করতে হবে। কারণ সারা দেশজুড়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে জোয়ার এসেছে। পার্টি এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইছে। এর জন্য জেলে তৈরি হল কমিউনিস্ট কনসলিডেশন। নারায়ণ রায় সরাসরি ছেলেটিকে বললেন কমিউনিস্ট কনসলিডেশনে জয়েন করতে। 
   দু বার ভাবে নি সেই ছেলেটি কমিউনিস্ট গ্রুপে জয়েন করতে। কারণ আর আগেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সেনানীরা প্রায় প্রত্যেকেই নারায়ণ রায়দের সংস্পর্শে এসে কমিউনিস্ট হয়ে গেছে। বাকি ছিল তাদের কমান্ডার ইন চিফই একমাত্র। নারায়ণ রায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেলুলার জেলেই কমিউনিস্ট পার্টিতে হাতেখড়ি হল সেই লম্বা কালো মত ছেলেটির। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের কমান্ডার ইন চিফ গণেশ ঘোষের।
   ১৯৩৭-৩৮ এ প্রবল জনবিক্ষোভের চাপে আন্দামানে বন্দী সব বিপ্লবীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হল ব্রিটিশ সরকার। গণেশ ঘোষকে প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পরে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়। ৪৬ সালের ভয়ঙ্কর দাঙ্গার পরপরই মুক্তি পান গণেশ ঘোষ। ডেকার্স লেনের কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে সংবর্ধনা দেওয়া হল তাঁকে। সেদিনই তিনি ঘোষণা করলেন তিনি পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে কাজ করতে চান। 
    ৪৮ এ পার্টি যখন বে আইনি ঘোষিত হল তখন গণেশ ঘোষকে চলে যেতে হল আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেই সময়ে যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের কথানুযায়ী চট্টগ্রাম বিপ্লবের একফোঁটা আভিজাত্যবোধ তাঁর মধ্যে ছিল না। মনে রাখতে হবে দেশ তখন সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। যারা ব্রিটিশ পুলিশ দ্বারা একদিনের জন্যও জেলবন্দী হয়েছে তারাও তখন সমাজের চোখে হিরো। সেই জায়গায় চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের কমান্ডার ইন চিফকে মানুষ মাথায় করে রাখত। সারা জীবন কংগ্রেস সরকারের দয়া দাক্ষিণ্যে আরামের জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু সেই জীবন না বেছে তিনি বেছে নিয়েছিলেন চিরাচরিত বিপ্লবী জীবন। পার্টির নির্দেশে ঘুরেছেন জেলায় জেলায়। আন্দামানের বন্দী হিসেবে যখন ভারত সরকার তাঁকে পেনশন আর স্বাধীনতা সংগ্রামীর তাম্রপত্র দিতে চান, ভারত সরকারকে বিনয়ের সাথে উনি জানান, 'আমার পেনশন আর সরকারী স্বীকৃতির দরকার নেই। আমার পার্টি সিপিআই(এম) ই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাকে দেখবে।'

গনেশ ঘোষকে গণেশ ঘোষ করার পিছনে যেমন মাস্টারদা রয়েছেন, ঠিক তেমনই ডাক্তার নারায়ণ রায়দের মত শিক্ষকরাও রয়েছেন। নারায়ণ রায়ের গল্প আবার পরে কোন একদিন বলা যাবে নাহয়।

ঠিক দুদিন আগে ২২শে জুন চলে গেল এই মহান বিপ্লবীর জন্মদিন।

মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯

আন্দোলনের চাওয়া-পাওয়া : চিকিৎসক-সংবাদমাধ্যম দ্বৈরথ ~ বিষাণ বসু

গতকাল কারা জিতলেন, আর কারা হারলেন, সেই বিচার করা মুশকিল। কিন্তু, যে লড়াইটা চিকিৎসক বনাম প্রশাসন ছিল, যে লড়াইটা একইসাথে চিকিৎসাপ্রার্থীরও হওয়ার কথা ছিল, প্রশাসনের বিরুদ্ধে - সেই লড়াইটা ঘুরে যাচ্ছিল চিকিৎসক বনাম রোগীপরিজন তথা আমজনতায়। আপাতত, তা হতে পারল না।

বৃহস্পতিবার যে মুখ্যমন্ত্রী চূড়ান্ত তাচ্ছিল্য ও বিরক্তির সুরে কথা বলেছিলেন, তাঁরই সুর বদলে গেল সোমবার। আন্দোলনকারীদের পক্ষে এ এক বড় জয়। আবার, প্রয়োজনমত, এবং জরুরী পরিস্থিতিতে, যিনি নমনীয়তা দেখাতে পারেন, তাঁর, অর্থাৎ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ম্যাচিওরিটিও প্রশংসনীয়। সেক্ষেত্রে, একপাক্ষিক জয়ের প্রশ্ন নেই।

জুনিয়র ডাক্তারেরা নিজেদের দাবীদাওয়া তুলে ধরেছেন। সেজন্যে তাঁদেরকে টুপি খুলে কুর্নিশ।  আবার অনেক কিছু তুলে ধরতে পারেন নি। নিরাপত্তার প্রশ্নটি গুরুত্ব পেয়েছে, কিন্তু ঠিক কোন পথে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান আসতে পারে, সেটি আলোচনায় আসে নি। পরিকাঠামোর উন্নতি, পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ - এসব না হলে জুনিয়র ডাক্তারদের অমানুষিক চাপ নিয়েই কাজ করে চলতে হবে, চাপের মধ্যে তাঁরা ধৈর্য হারাতেই থাকবেন, মৃত রোগীর পরিজনের পিঠে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার সময়-সুযোগ বা মানসিকতা কোনোটাই থাকবে না। অন্যদিকে পরিকাঠামোহীন পরিস্থিতিতে ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যু হলে, পরিজন ক্ষুব্ধ হবেন - এবং ভাববেন, অমুক ডাক্তার দৌড়ে এলেই রোগীর প্রাণ বাঁচত।

দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের প্রশ্ন না ওঠায় মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে দাবীদাওয়াগুলো মেনে নিতে অসুবিধে হয়নি। কোলাপ্সেবেল গেট লাগানো বা পাব্লিক রিলেশন্স অফিসার - কোনোটাতেই প্রশাসনের আপত্তি থাকার কথা নয়। অর্থাৎ, আমাদের এখানে সবই ছিল, শুধু বোঝানোর অসুবিধে - এই বার্তা দেওয়া গেলে প্রশাসন খুশীই হতে পারেন। একটু-আধটু অভিযোগ থাকলে, আসতে পারবেন গ্রীভান্স সেলে। তিনটি ভাষায় জ্বলজ্বল করবে সেই অভিযোগ জানানোর কাউন্টার।

চিকিৎসার খরচ নিয়ে আলোচনা হলেই, অনেকেই বলেন, এত ভাঙচুর সরকারি হাসপাতালে - যেখানে সবই মেলে বিনামূল্যে - অর্থাৎ, চিকিৎসার খরচ মানুষ মেনেই নেন, কিন্তু চিকিৎসা না পেলে ক্ষোভ হবেই, সেইখানে খরচের প্রশ্ন ওঠে না। এইখানে কিছুটা অতিসরলীকরণ আছে। 

চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে সুস্পষ্ট শ্রেণীবিভাজন, তা দুদশক আগেও তেমনভাবে ছিল না। মোটামুটিভাবে, মধ্যবিত্ত বা তার উপরের শ্রেণীর জন্যে বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান - এর নীচে থাকলে সরকারি। হিসেব খুব সরল। এইখানে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে, এবং সেখানে চিকিৎসা পেতে যাঁরা আসেন, তাঁদেরকে সেকেন্ড ক্লাস হিসেবে ভাবার খেলা আছে। দুর্বল পরিকাঠামোর সুবাদে স্বজন-হারানো পরিজনের মধ্যে একটা বাড়তি হতাশা রয়ে যায় - যদি টাকার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এমনভাবে….. 

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর নেক্সট-ইন-কম্যান্ড ভাইপো বা তাঁদের মেজসেজ নেতারা - চিকিৎসা করাতে কেউই সরকারি পরিকাঠামোর মুখাপেক্ষী নন। সরকারি পরিকাঠামোর উন্নয়নের জন্যে, বেশী কিছু নয়, স্রেফ একটি নিয়মই যথেষ্ট - সরকারী আধিকারিক ও নেতানেত্রী, এঁদের চিকিৎসা, বাধ্যতামূলকভাবেই, হতে হবে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে।       

সরকার স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করেন যৎসামান্য - যেটুকু করেন, তারও বড় অংশ সাইফনিং হয়ে যেতে চলেছে বীমাব্যবসায়ী ও বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের হাতে - সে প্রকল্পের নাম স্বাস্থ্যসাথী বা আয়ুষ্মান ভারত যা-ই হোক না কেন। এর পর পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রশ্নটি আরো দূরে সরে যাবে।

গতকালকের আলোচনায় এইসব প্রসঙ্গ ওঠেনি। জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে এই ম্যাচিওরিটি বা সমস্যার মূলে পৌঁছে যাওয়া সবসময় সম্ভব নয়। সেই পরিণতিবোধ তো অভিজ্ঞতার সাথে আসে। তবু, মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুকে ঝানু আমলা-পুলিশ শীর্ষকর্তাদের সামনে বসে, অবচেতনে মিডিয়ার ক্যামেরা - এই অ্যাওয়ে ম্যাচে তাঁদের পারফর্ম্যান্স প্রশংসনীয়।      

অন্তত আরো একটি ক্ষেত্রে জুনিয়র ভাইবোনেদের এই ম্যাচিওরিটির অভাব স্পষ্ট। চিকিৎসক-প্রশাসনের এই দ্বৈরথ - অন্তত আংশিকভাবে চিকিৎসক-সাংবাদিকের দ্বৈরথে পর্যবসিত হচ্ছে। আন্দোলন চলাকালীন জুনিয়র ডাক্তারদের এক বড় অংশ সাংবাদিকদের সাথে বিবাদে জড়িয়েছেন। গতকালকের পর, বেশ কিছু সাংবাদিক, সোশ্যাল মিডিয়ায় গায়ের ঝাল উগড়ে দিচ্ছেন - চিকিৎসকেরাও ছেড়ে কথা বলছেন না।

এই পরিস্থিতি দুর্ভাগ্যজনক। কেননা, সংবাদমাধ্যমের  অন্তত একাংশ পাশে না থাকলে এই আন্দোলন সমাজের একটা বড় অংশকে যেভাবে পাশে পেয়েছে, তা সম্ভব হত না - শুক্রবারের মিছিল মহামিছিলে পরিণত হওয়া বা মুখ্যমন্ত্রীর সুর নরম, কোনোটাই এমনভাবে হতে পারত না। ইলেকট্রনিক মিডিয়াশাসিত এই সময়ে, যেকোনো আন্দোলনেই মিডিয়ার সদর্থক সহযোগিতা জরুরী। পরবর্তীকালেও, আর কিছু নয়, স্রেফ নিরাপত্তার কথা ভাবলেও, মিডিয়ার সহযোগিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

যেকোনো ঘটনার প্রেক্ষিতেই, শাশ্বত নিরপেক্ষ সত্য বলে তো কিছু হয় না। রোগী মারা গেলে পরিজন ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হন। তাঁর মনে হয়, চিকিৎসক যদি আরেকটু চেষ্টা করতেন, যদি দৌড়ে আসতেন। চিকিৎসক হয়ত জানেন - সম্ভবত নির্ভুলভাবেই জানেন - এই রোগীকে এই পরিকাঠামোয় বাঁচানো সম্ভব ছিল না। মিডিয়া ঠিক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটা জানাবেন, সেইটা তাঁর স্বাধীনতা। সেকথা চিকিৎসকের পছন্দ না-ই হতে পারে, কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক অধিকার মেনে নিতেই হয়। এর মধ্যে কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতার প্রশ্ন আসে না।

দ্বিতীয়ত, সংবাদ পরিবেশক বা মাঠেঘাটে খবর সংগ্রহ করা সাংবাদিক, দুজনেই বেতনভুক কর্মচারী মাত্র। মালিকের, এমনকি মুখ্য সম্পাদকের তুল্য স্বাধীনতা তাঁদের কারোরই নেই। ঠিক যেমনভাবে, সিনিয়র ডাক্তারের ভাবনার অনুসারেই চিকিৎসা হয়, যেখানে সেই চিকিৎসা অপছন্দ হলেও জুনিয়র ডাক্তারবাবুকে সিনিয়রের চিকিৎসাভাবনাই কার্যকরী করতে হয় (এমার্জেন্সি পরিস্থিতির প্রশ্ন আলাদা) - সাংবাদিকের ক্ষেত্রেই তা-ই।

তৃতীয়ত, অন্তত দুতিনজন সাংবাদিককে চিনি, যাঁদের মেধা ও পড়াশোনার ব্যাপ্তি আমাকে নিয়ত ঈর্ষান্বিত করে। কাজেই, স্রেফ জয়েন্টে চান্স পান নি বলেই এইসব ফ্রাস্টু পাব্লিক ডাক্তারদের পেছনে কাঠি করছে - এবম্বিধ উন্নাসিকতা হাস্যকর।    

প্লাস, এইটুকু মাথায় রাখতে হবে, অসামরিক পেশার মধ্যে বিশ্বে সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা স্বীকৃত। যেকোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেই সাংবাদিকেরা মারধর খেয়ে থাকেন - খিস্তিহীন দিন, সম্ভবত, ছুটিছাটা বাদ দিলে, দেখেনই না। এরাজ্যের চিকিৎসকরা অন্তত এই পরিস্থিতির সাথে নিজেদের রিলেট করতে পারবেন। এই অবস্থায়, দুপক্ষের মধ্যে বিবাদ নয়, সহমর্মিতার বোধই প্রত্যাশিত।    

অন্যদিকে, যেসব সাংবাদিক বন্ধুরা, গতকালকের জুনিয়র ডাক্তারদের নম্রসুরে কথা বলাকে নিয়ে খিল্লি করছেন, শ্লেষাত্মক মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছেন, এমনকি গালিও পাড়ছেন, তাঁদেরকে শুধু একটিই কথা বলার রইল।

অন্তত এই রাজ্যে, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, রাজনীতির নেতাদের যেটুকু ইন্টারভিউ সম্প্রচারিত হতে দেখি, সেখানে সাক্ষাতকার যিনি নিচ্ছেন, তাঁকে গদগদ বাদ দিয়ে অন্য কোনো বিশেষণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিবিসির হার্ড টক তো ছেড়েই দিন, করণ থাপারের ঢঙে ইন্টারভিউ করার কথা এই রাজ্যে কেউ কল্পনা করতে পারেন?? মুখ্যমন্ত্রীর কথা বাদই দিন, এমনকি মেজসেজ নেতাদের সাক্ষাৎকার নিতে গেলেও?

গতকাল কিন্তু এক জুনিয়র ডাক্তার বলতে পেরেছে, উইথ ডিউ রেসপেক্ট, ম্যাডাম, আমরা কিন্তু সারনেম দেখে চিকিৎসা করি না।

আপনারা পারবেন? পেরেছেন? উইথ ডিউ রেসপেক্ট-ই প্রশ্নটা করলাম।