পিরিয়ড হ্যাকস নিয়ে একটা ভিডিও দেখেছিলাম একদিন। ঐখানে একটা হ্যাক দেখায় প্যাড খোলার 'এম্ব্যারেসিং' আওয়াজকে ঢাকার জন্যে কী করতে হবে।
মাইয়া মানুষ হওয়াটা বিরাট এক সমস্যা। কোনো একটা বিষয়ে সমস্যা না থাকলেও জোর করে সমস্যা বানায়ে মেয়েদের মাথায় পুশ করা হয় এটা লজ্জাজনক একটা সমস্যা, দেখো আমরা এটার সলিউশন দিচ্ছি।
এটার ১০০/১০০ উদাহরণ হইতে পারে মেয়েদের বডি হেয়ার নিয়ে জিলেটের কারসাজিটা। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জিলেট প্রথম সেফটি রেজর আনার পর পুরুষদের বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর সাথে জিলেটের চুক্তি হয়। প্রতিটি সোলজার কিটের সাথে জিলেটের সেফটি রেজর আর ব্লেড দেয়া হতো। জিলেটের তো তখন রমরমা ব্যবসা। সামরিক বাহিনীর কাছে বাল্ক অর্ডার চলে যাচ্ছে। যুদ্ধের ঐ বছরগুলোয় জিলেট প্রচুর অঙ্কের মুনাফা করেছিলো।
কিন্তু যুদ্ধ তো কখনো শেষ হবে। আর যুদ্ধ শেষ হলে এই বাল্ক অর্ডার পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। আর সেনাবাহিনী ছাড়ার পর পুরুষদের সবসময় ক্লিন শেভড থাকার প্রয়োজনীয়তাও এতটা থাকবেনা। সুতরাং মুনাফা কিছুটা হলেও কমে আসবে।
জিলেটের তখন চোখ পড়লো বাকি অর্ধেক জনগোষ্ঠীর ওপর। কিন্তু নারীদের তো দাড়ি শেইভ করার ঝামেলা নাই। তাদের সমস্যার সলিউশন হিসেবে তাহলে জিলেটের প্রোডাক্টকে কীভাবে প্রেজেন্ট করা যায়?
উত্তর হলো, নতুন একটা সমস্যা তৈরী করে।
'পার্ফেক্ট নারী' হওয়ার জন্যে সোশ্যাল যেই প্রেশার নারীদের ওপর আছে, জিলেট ঠিক করলো সেটাকে ইউটিলাইজ করবে। ১৯১৫ সালে 'হার্পারস বাজারস' ম্যাগাজিনে একটা বিজ্ঞাপন ছাপা হয় যার মূল বক্তব্য ছিলো তাদের হেয়ার রিমুভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে সমুদ্রে যাওয়ার সময় শরীরের লোম নিয়ে মেয়েদের আর লজ্জা পেতে হবেনা। বিজ্ঞাপনের শিরোনাম ছিলো 'You need not be embarrassed!'। অথচ হাস্যকর বিষয় হলো, বডি হেয়ারের মতো স্বাভাবিক ব্যাপার নিয়ে তখন মেয়েদের অতোটা মাথা ব্যথা ছিলো না। পুঁজিবাদ ও বিজ্ঞাপন শুধুমাত্র নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে এই বিষয়টিকে করে তুললো নারীদের জন্যে লজ্জার, অস্বাস্থ্যকর ও আনফেমিনিন।
জিলেটসহ ঐ সময়ের আরো নামী কিছু কোম্পানি এক ধরনের সাইকোলজিক্যাল মার্কেটিং শুরু করে। তারা নারীদের প্রেজেন্ট করতে শুরু করলো অত্যন্ত কমনীয়ভাবে, প্রকৃত নারীদের ত্বক হতে হবে 'স্মুথ অ্যাজ সিল্ক', শরীরের ভিজিবল অংশে কোনো লোম থাকলে সেটা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ও আনস্যানিটারি। সাধারণ নারীরা বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও বিজ্ঞাপনে এসব দেখে হীনমন্যতায় ভোগা শুরু করে এবং নিজেদের শরীরের স্বাভাবিক বিষয়গুলোকে ত্রুটি হিসেবে দেখতে থাকে। আস্তে আস্তে কয়েক জেনারেশনের নারীরা এতেই অভ্যস্ত হতে থাকে ও এই হেয়ার রিমুভাল প্রোডাক্ট ব্যবহার করাটাকে জীবনের অংশ হিসেবে ধরে নেয়। অর্থাৎ, জিলেটসহ অন্যান্য কোম্পানিগুলো ১০০বছর আগে এমন এক সাইকোলজিক্যাল চক্র তৈরী করে যাতে পা দেয় আমার মতো পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন নারীরা। আমাদের ইনসিকিউরিটিকে কাজে লাগিয়ে, নিজের কাছে নিজের শরীরকে অস্বাভাবিক অনুভব করিয়ে মাল্টিমিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি তৈরী হয়ে গেলো। আর আমরা খুশিমনে তাদের খেলায় দাবার গুটি হয়ে রয়ে গেলাম একশো বছর ধরেই।
_পুঁজিবাদের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ: লোমহীনতার রাজনীতি
আনুশা মেহরিন
০২.০৮.২৬
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন