গল্প বলব। খেটে খাওয়া মানুষের গল্প। সেই মানুষগুলোর গল্প, যারা নিজেদের রুজিরুটির জন্যে ব্রিটিশ মালিকের বিরুদ্ধে লড়েছিল। আবার এই শহর - যাকে সেদিন বস্তির শহর বলে দিল এক গুজরাটি তড়িপার - সেই শহরের মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিল ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে; লড়েছিল আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের বিচারের নামে প্রহসনের বিরুদ্ধে; লড়েছিল সাম্প্রদায়িক বিষ থেকে শহরের মানুষকে বাঁচাতে...
বলব কলকাতার ট্রাম শ্রমিকদের গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সেইসব দামাল দিনগুলোয় কলকাতা যখন হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের বড় কেন্দ্র, সেই সময়ের গল্প। ১৯৪৫-৪৬ সালের গল্প। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ছায়ায় থাকা ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়নের গল্প, যাদের পোশাকি নাম Calcutta Tramways Workers Union (CTWU)...
তার আগের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কলোনিয়াল ট্রাম কোম্পানির বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করে বেশ শক্ত জায়গায় পৌঁছেছিল তারা। কলকাতার লাইফলাইন ছিল ট্রাম, কাজেই এই মানুষগুলোর হাতে অস্ত্র ছিল গোটা শহর অচল করে দেওয়ার; আর সেই অস্ত্র তারা ব্যবহারও করেছিল সরকারের বিরুদ্ধে; কখনো মজুরি বাড়ানোর দাবীতে, কখনও বা মন্বন্তরের সময় রেশনের দাবীতে, আবার কখনো অন্যায়ভাবে ছাঁটাই হওয়া সহকর্মীকে কাজে ফেরানোর দাবীতে; সফলও হয়েছিল। পরিবহণ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে ভয় করত ব্রিটিশরা, কারণ তাদের রোজকার কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যেত; ক্ষেপে উঠতো সাধারণ মানুষ, কিন্তু ট্রাম শ্রমিকদের ওপর সহানুভূতি হারাত না।
বলব সেই ট্রাম শ্রমিকদের গল্প। ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের গল্প। আর, সাম্প্রদায়িক বিষ যখন কলকাতাকে ছিঁড়ে খেতে উদ্যত, তখন সেই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে তাদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প।
প্রথম গল্পের সময়কাল ১৯৪৫ সালের শেষ থেকে ১৯৪৬ এর শুরু অবধি। ব্রিটিশরা তখন আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যদের বিচার শুরু করেছে; আর গোটা দেশকে দৃষ্টান্ত দেখাতে সেই বিচারকে তারা নিয়ে গেছে লাল কেল্লায়, পাবলিক ট্রায়াল হিসেবে। দেশ ক্ষেপে উঠল। সারা দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ। কলকাতাও বাদ যায়নি। নভেম্বরে মিছিল ডাকে ফরোয়ার্ড ব্লক আর ছাত্র ফেডারেশন, সঙ্গে ইসমাইলি কলেজের ছাত্ররা। মিছিলে হামলা করে পুলিশ, মারা যায় ৩৩ জন মানুষ। ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরো একবার ফেটে পড়ে কলকাতা - ক্যাপ্টেন আবদুর রশিদ আলীকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে। শুরুতে জনসমর্থন বেশি না থাকলেও সিপিআইয়ের ডাকে পথে নামে শ্রমিক আর ছাত্ররা; ক্রমশঃ ব্যাপক আকার নেয় এই গণআন্দোলন। ১১ই ফেব্রুয়ারি সিপিআই আর বামপন্থী ছাত্র ফেডারেশন এক মিছিলের ডাক দেয় - ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল ঢুকে যায় সেক্রেটারিয়েট এলাকায় - বিক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল ট্রাম শ্রমিকেরা। পুলিশ নৃশংস আক্রমণ চালায় ছাত্র আর শ্রমিকদের ওপর। উল্টে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে বিক্ষোভ। পুলিশী হিংস্রতার প্রতিবাদে ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন ধর্মঘটের ডাক দেয় পরের দিন। সেদিন, মানে ১২ই ফেব্রুয়ারি, খাকি ইউনিফর্ম পরা ট্রাম শ্রমিকদের ব্যারিকেডে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায় কলকাতার পরিবহণ। ট্রাম শ্রমিকদের ডাকে পথে নেমে আসে সাধারণ মানুষ। একের পর এক সংঘর্ষের পর বাধ্য হয়ে ব্রিটিশরা সেনা নামায়, গুলিতে মারা যায় ৩৮ জন। লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন এই আন্দোলনে, এবং রশিদ আলী দিবস (১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬) অমর হয়ে থেকে যায় তাঁর উপন্যাস "চিহ্ন"-এ - যার নায়ক ওসমান এক ট্রাম শ্রমিক।
কিছুদিনের মধ্যেই আবারও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে কলকাতা। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের বিচার চলাকালীনই বম্বে আর করাচীর ডকে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে, শুরু হয় নৌবিদ্রোহ। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান নিশ্চয় আপনারা ভুলে যাননি...
সেদিন ছেচল্লিশের শীতের কুয়াশা / ভেদী গোলামীর ঘোর অমানিশা //
চূর্ণ করি কংসের কারাগার / সচকিত সাইরেনে নব অঙ্গীকার //
আরব সাগরবাহী অতলান্তজয়ী / বোম্বাই বন্দরে বিদ্রোহী খাইবার //
ভিড়িল বিদ্রোহী খাইবার
হাঁকে শার্দুল সিং গফুর, / বীর শার্দুল সিং গফুর, //
কে আছ বাহাদুর / কামান গর্জনে / কামগার ময়দানে //
রাজপথে ব্যারিকেডে সশস্ত্র মজদুর / দাঁড়ালো সশস্ত্র মজদুর।
দরিয়ার ডাকে, দিল সাড়া / মহাভারতের জনতা //
উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে কল্লোলিত মহানগর কলকাতা"
২৩শে ফেব্রুয়ারি সিপিআই ডাক দিল সাধারণ ধর্মঘটের। ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে শ্রমিক আর ছাত্রদের মিছিল এগিয়ে গেল ওয়েলিংটন স্কোয়্যারের দিকে। একদম সামনের সারিতে ইউনিফর্ম পরা ট্রামশ্রমিকেরা - শৃঙ্খলা, সমন্বয় আর খেটে খাওয়া মানুষের নেতৃত্বের প্রতীক। ওয়েলিংটনের সভায় ঝোড়ো বক্তব্য রাখলেন সোমনাথ লাহিড়ী আর চতুর আলীর মত সিপিআই নেতারা। নৌবিদ্রোহকে তুলে ধরলেন কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে আরও বড় লড়াইয়ের অংশ হিসেবে; সোমনাথ লাহিড়ীর ভাষায়, স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের ড্রেস রিহার্সাল। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে লেখা হল যে এই ট্রাম শ্রমিকরাই সবচেয়ে ঝামেলার প্রতিবাদী। জঙ্গি তো বটেই, তার ওপর মানুষকে একত্রিত করতে এদের তুলনা নেই...
শুধু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানের কথাটুকু বললে ট্রাম শ্রমিকদের অবদানকে ছোট করা হয়। যে গুণটা এই শ্রমিকদের আলাদা করে রেখেছিল সেটা হল সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবল প্রচেষ্টার মধ্যেও এদের একজোট হয়ে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। চারদিকে তখন বয়ে চলেছে হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লীগের ছড়িয়ে দেওয়া বিষের নদী — খেটে খাওয়া মানুষের অনেকেই সেই বিষে আক্রান্ত — তখনও সটান দাঁড়িয়ে ট্রাম শ্রমিকেরা। আকস্মিক ঘটনা নয়; এই ঐক্যের শেকড় ছিল জোট বাঁধা রাজনীতির ভিতরে। ব্রিটিশ মালিকেরা বহু চেষ্টা করেছিল হিন্দু মুসলমান বিভেদকে খুঁচিয়ে ট্রাম শ্রমিকদের ভাঙতে। পারেনি। যেমন, ঈদের বোনাস কাটিয়ে দিয়ে একবার কোম্পানি পুজোর বোনাস ঘোষণা করে দিল, উদ্দেশ্যে হিন্দু মুসলমানকে আলাদা করে দেওয়া। কিন্তু পারেনি। ট্রাম শ্রমিকদের একজনও বোনাস নেয়নি সেবার। উলটে, ওদের ধর্মঘটে গুটিয়ে গিয়ে কোম্পানি বাধ্য হয়েছিল সবাইকে সমান বোনাস দিতে। ওয়ার্কপ্লেস সলিডারিটি একেই বলে।
১৯৪৬ এর ভয়ঙ্কর সময়ে এই ট্রাম শ্রমিকেরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন খেটেখাওয়া মানুষের জেদ কেমন হয়। ষোলোই আগস্ট — মুসলিম লীগের ডাকা ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে — ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল যে কমিউনাল মোবিলাইজেশন তারা হতে দেবে না। ডাক দিল হরতালের। সেদিন চারদিকে হিংসার আগুনের মধ্যে ট্রাম শ্রমিকেরা বেরিয়ে এসেছিলেন শান্তি রক্ষায়। ভিক্টোরিয়া কলেজে আক্রমণ করতে পারে গুন্ডারা — এই খবর শুনেই রাজাবাজার ট্রামডিপোর শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসেন পথে। হিন্দু মুসলমান, এমনকী কয়েকজন মুসলিম লীগ সদস্যও। সামনে মহম্মদ ইসমাইল, ট্রাম শ্রমিকদের অবিস্মরণীয় নেতা, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ট্রাম শ্রমিকদের ইঁট পাথরের ঘায়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছিল সশস্ত্র গুন্ডার দল। কলেজের মেয়েদের সুরক্ষিতভাবে বের করে আনা অবধি এলাকা ঘিরে রেখেছিলেন মহম্মদ ইসমাইল ও তাঁর কমরেডরা। শহরের অন্য অনেক জায়গায়, বিভিন্ন ট্রামডিপোর শ্রমিকেরা, বেরিয়ে এসেছিলেন এলাকা পাহারা দিতে — যেখানে যেখানে সেই এলাকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিপদে পড়েছিল, তারা পাশে পেয়েছিল ট্রাম শ্রমিকদের। তাদের খাকি ইউনিফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক ধরণের মরাল অথরিটি। মানুষের বিশ্বাস এতটাই ছিল এই শ্রমিকদের ধর্মনিরপেক্ষতার, যে গরীব মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই এদের ওপরেই নির্ভর করেছিল সুরক্ষার জন্যে...
দাঙ্গা বন্ধ হতে ট্রাম ফের চালু হওয়ার পরেও ট্রাম শ্রমিকেরা সজাগ ছিলেন। ট্রামের ভিতরে কোনো ধরণের সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করলেই কন্ডাক্টররা সোচ্চার প্রতিবাদ করতেন, ট্রাম থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জনপরিসর যাতে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্র না হয়ে ওঠে, তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন এঁরাই; ১৯৪৭ সাল অবধি চলেছিল এইভাবেই। সেই সময়ে — দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘটের ফলে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও, বুকে ধর্মঘটের ব্যাজ লাগিয়ে ট্রামকর্মীরা টহল দিতেন দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায়, জল ঢালতেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুনে। ব্রিটিশ পুলিশের দমনপীড়ন ছাড়াও চরম দারিদ্র ছিল এঁদের নিত্যসঙ্গী। তা সত্ত্বেও মহম্মদ ইসমাইলের মত কমরেডরা শ্রেণী-ঐক্য ভেঙে বেরোননি, খেটে খাওয়া মানুষের জোটকে অক্ষত রেখেছিলেন...
শ্রেণীর রাজনীতির আদর্শ তুলে ধরেছিল সেই ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন — দেশপ্রেম, ধর্মনিরপেক্ষতা আর শ্রেণী-সংহতি প্রতিযোগীর বদলে হয়ে উঠেছিল পরিপূরক। কলকাতা দেখেছিল চরম ক্রাইসিসের মুহূর্তেও খেটেখাওয়া মানুষ একজোট হলে কী করতে পারে...আজকে বিজেপি আর আরএসএস যখন ইতিহাস লেখে, তখন এই গল্পগুলোকে তারা মুছে দিতে চায়। কারণ এই গল্পগুলো তাদের ন্যারেটিভের সঙ্গে খাপ খায় না। ট্রাম শ্রমিকদের গল্প দেখিয়ে দেয় যে হিন্দু-মুসলমান একসাথে লড়তে পারে, শ্রেণীর স্বার্থ ধর্মের স্বার্থের চেয়ে বড়, আর গণতন্ত্র শুধু ব্যালটে নয়, গড়ে ওঠে রাজপথে আর কারখানায়।
সেদিন ঐতিহ্যের কথা বলছিলাম না? কমিউনিস্ট পার্টি এই মহম্মদ ইসমাইল আর তাঁর কমরেডদের লড়াইয়ের ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলে। ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকার। হামেশা।
সূত্র: Protest and Politics: Story of Calcutta Tram Workers 1940-47, Siddhartha Guha Ray, in Calcutta: The Stormy Decades, ed. Tanika Sarkar and Shekhar Bandyopadhyay
সেদিন ছেচল্লিশের শীতের কুয়াশা / ভেদী গোলামীর ঘোর অমানিশা //
চূর্ণ করি কংসের কারাগার / সচকিত সাইরেনে নব অঙ্গীকার //
আরব সাগরবাহী অতলান্তজয়ী / বোম্বাই বন্দরে বিদ্রোহী খাইবার //
ভিড়িল বিদ্রোহী খাইবার
হাঁকে শার্দুল সিং গফুর, / বীর শার্দুল সিং গফুর, //
কে আছ বাহাদুর / কামান গর্জনে / কামগার ময়দানে //
রাজপথে ব্যারিকেডে সশস্ত্র মজদুর / দাঁড়ালো সশস্ত্র মজদুর।
দরিয়ার ডাকে, দিল সাড়া / মহাভারতের জনতা //
উত্তাল ঢেউয়ে ঢেউয়ে কল্লোলিত মহানগর কলকাতা"
২৩শে ফেব্রুয়ারি সিপিআই ডাক দিল সাধারণ ধর্মঘটের। ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে শ্রমিক আর ছাত্রদের মিছিল এগিয়ে গেল ওয়েলিংটন স্কোয়্যারের দিকে। একদম সামনের সারিতে ইউনিফর্ম পরা ট্রামশ্রমিকেরা - শৃঙ্খলা, সমন্বয় আর খেটে খাওয়া মানুষের নেতৃত্বের প্রতীক। ওয়েলিংটনের সভায় ঝোড়ো বক্তব্য রাখলেন সোমনাথ লাহিড়ী আর চতুর আলীর মত সিপিআই নেতারা। নৌবিদ্রোহকে তুলে ধরলেন কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে আরও বড় লড়াইয়ের অংশ হিসেবে; সোমনাথ লাহিড়ীর ভাষায়, স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াইয়ের ড্রেস রিহার্সাল। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টে লেখা হল যে এই ট্রাম শ্রমিকরাই সবচেয়ে ঝামেলার প্রতিবাদী। জঙ্গি তো বটেই, তার ওপর মানুষকে একত্রিত করতে এদের তুলনা নেই...
শুধু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানের কথাটুকু বললে ট্রাম শ্রমিকদের অবদানকে ছোট করা হয়। যে গুণটা এই শ্রমিকদের আলাদা করে রেখেছিল সেটা হল সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবল প্রচেষ্টার মধ্যেও এদের একজোট হয়ে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। চারদিকে তখন বয়ে চলেছে হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লীগের ছড়িয়ে দেওয়া বিষের নদী — খেটে খাওয়া মানুষের অনেকেই সেই বিষে আক্রান্ত — তখনও সটান দাঁড়িয়ে ট্রাম শ্রমিকেরা। আকস্মিক ঘটনা নয়; এই ঐক্যের শেকড় ছিল জোট বাঁধা রাজনীতির ভিতরে। ব্রিটিশ মালিকেরা বহু চেষ্টা করেছিল হিন্দু মুসলমান বিভেদকে খুঁচিয়ে ট্রাম শ্রমিকদের ভাঙতে। পারেনি। যেমন, ঈদের বোনাস কাটিয়ে দিয়ে একবার কোম্পানি পুজোর বোনাস ঘোষণা করে দিল, উদ্দেশ্যে হিন্দু মুসলমানকে আলাদা করে দেওয়া। কিন্তু পারেনি। ট্রাম শ্রমিকদের একজনও বোনাস নেয়নি সেবার। উলটে, ওদের ধর্মঘটে গুটিয়ে গিয়ে কোম্পানি বাধ্য হয়েছিল সবাইকে সমান বোনাস দিতে। ওয়ার্কপ্লেস সলিডারিটি একেই বলে।
১৯৪৬ এর ভয়ঙ্কর সময়ে এই ট্রাম শ্রমিকেরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন খেটেখাওয়া মানুষের জেদ কেমন হয়। ষোলোই আগস্ট — মুসলিম লীগের ডাকা ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে — ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিল যে কমিউনাল মোবিলাইজেশন তারা হতে দেবে না। ডাক দিল হরতালের। সেদিন চারদিকে হিংসার আগুনের মধ্যে ট্রাম শ্রমিকেরা বেরিয়ে এসেছিলেন শান্তি রক্ষায়। ভিক্টোরিয়া কলেজে আক্রমণ করতে পারে গুন্ডারা — এই খবর শুনেই রাজাবাজার ট্রামডিপোর শ্রমিকেরা বেরিয়ে আসেন পথে। হিন্দু মুসলমান, এমনকী কয়েকজন মুসলিম লীগ সদস্যও। সামনে মহম্মদ ইসমাইল, ট্রাম শ্রমিকদের অবিস্মরণীয় নেতা, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ট্রাম শ্রমিকদের ইঁট পাথরের ঘায়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেছিল সশস্ত্র গুন্ডার দল। কলেজের মেয়েদের সুরক্ষিতভাবে বের করে আনা অবধি এলাকা ঘিরে রেখেছিলেন মহম্মদ ইসমাইল ও তাঁর কমরেডরা। শহরের অন্য অনেক জায়গায়, বিভিন্ন ট্রামডিপোর শ্রমিকেরা, বেরিয়ে এসেছিলেন এলাকা পাহারা দিতে — যেখানে যেখানে সেই এলাকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিপদে পড়েছিল, তারা পাশে পেয়েছিল ট্রাম শ্রমিকদের। তাদের খাকি ইউনিফর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক ধরণের মরাল অথরিটি। মানুষের বিশ্বাস এতটাই ছিল এই শ্রমিকদের ধর্মনিরপেক্ষতার, যে গরীব মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই এদের ওপরেই নির্ভর করেছিল সুরক্ষার জন্যে...
দাঙ্গা বন্ধ হতে ট্রাম ফের চালু হওয়ার পরেও ট্রাম শ্রমিকেরা সজাগ ছিলেন। ট্রামের ভিতরে কোনো ধরণের সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করলেই কন্ডাক্টররা সোচ্চার প্রতিবাদ করতেন, ট্রাম থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। জনপরিসর যাতে নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্র না হয়ে ওঠে, তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন এঁরাই; ১৯৪৭ সাল অবধি চলেছিল এইভাবেই। সেই সময়ে — দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘটের ফলে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও, বুকে ধর্মঘটের ব্যাজ লাগিয়ে ট্রামকর্মীরা টহল দিতেন দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায়, জল ঢালতেন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের আগুনে। ব্রিটিশ পুলিশের দমনপীড়ন ছাড়াও চরম দারিদ্র ছিল এঁদের নিত্যসঙ্গী। তা সত্ত্বেও মহম্মদ ইসমাইলের মত কমরেডরা শ্রেণী-ঐক্য ভেঙে বেরোননি, খেটে খাওয়া মানুষের জোটকে অক্ষত রেখেছিলেন...
শ্রেণীর রাজনীতির আদর্শ তুলে ধরেছিল সেই ট্রাম শ্রমিক ইউনিয়ন — দেশপ্রেম, ধর্মনিরপেক্ষতা আর শ্রেণী-সংহতি প্রতিযোগীর বদলে হয়ে উঠেছিল পরিপূরক। কলকাতা দেখেছিল চরম ক্রাইসিসের মুহূর্তেও খেটেখাওয়া মানুষ একজোট হলে কী করতে পারে...আজকে বিজেপি আর আরএসএস যখন ইতিহাস লেখে, তখন এই গল্পগুলোকে তারা মুছে দিতে চায়। কারণ এই গল্পগুলো তাদের ন্যারেটিভের সঙ্গে খাপ খায় না। ট্রাম শ্রমিকদের গল্প দেখিয়ে দেয় যে হিন্দু-মুসলমান একসাথে লড়তে পারে, শ্রেণীর স্বার্থ ধর্মের স্বার্থের চেয়ে বড়, আর গণতন্ত্র শুধু ব্যালটে নয়, গড়ে ওঠে রাজপথে আর কারখানায়।
সেদিন ঐতিহ্যের কথা বলছিলাম না? কমিউনিস্ট পার্টি এই মহম্মদ ইসমাইল আর তাঁর কমরেডদের লড়াইয়ের ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলে। ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকার। হামেশা।
সূত্র: Protest and Politics: Story of Calcutta Tram Workers 1940-47, Siddhartha Guha Ray, in Calcutta: The Stormy Decades, ed. Tanika Sarkar and Shekhar Bandyopadhyay

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন