বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

ছাড়পত্র ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

 রাত দুটো বাজলে এই হাসপাতালটা মরা বাড়ির মতো চুপ হয়ে যায়। করিডোরের লাইট আধখানা নিভিয়ে দেয়। নার্সরা ফিসফিস করে কথা বলে। তখন আমি ফোন করি রাশেদকে। আমার বর ঘুমায় কেবিনের সোফায়। আর আমি কাঁথার নিচে মুখ ঢুকিয়ে কথা বলি সেই মানুষটার সাথে, যার সাথে এগারো বছর আগে আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।

শুনতে খারাপ লাগছে? লাগুক। যে মানুষ মরে যাচ্ছে, ভালোমন্দের হিসাব করার সময় তার হাতে নেই।
আমার নাম নীলা। বয়স পঁয়ত্রিশ। ব্রেস্ট ক্যান্সার, স্টেজ ফোর। রোগটা এখন আর শুধু বুকে নেই। লিভারে গেছে, হাড়ে গেছে। ডাক্তারি ভাষায় মেটাস্টেসিস। ডাক্তাররা এখন আর সারানোর কথা বলে না। বলে প্যালিয়েটিভ কেয়ার। কথাটার মানে খুব সোজা। যন্ত্রণাটা একটু কমিয়ে রাখা, আর অপেক্ষা করা।
শুরুটা ছিলো একটা ছোট্ট চাকার মতো শক্ত দলা। বাঁ দিকের স্তনে। ব্যথা ছিলো না। ব্যথা ছিলো না বলেই পাত্তা দিইনি। সংসার ছিলো, অফিস ছিলো। শাশুড়ির ডায়াবেটিস ছিলো। নিজের শরীরটা লিস্টের সবার শেষে ছিলো। যেদিন ডাক্তারের কাছে গেলাম, ততদিনে দলাটা তার কাজ গুছিয়ে এনেছে। বায়োপসি রিপোর্টটা আরিফ আমাকে পড়তে দেয়নি। ওর মুখ দেখেই আমি পড়ে ফেলেছিলাম।
আরিফ ভালো মানুষ। দশ বছরের সংসারে একটা দিনও খারাপ ব্যবহার করেনি। বিল দেয়, ওষুধ আনে। ডাক্তারের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে। রিপোর্টের ফাইল তারিখ ধরে ধরে সাজায়। ও ভালোবাসে দায়িত্ব দিয়ে। কিন্তু আমার তো এখন আর দায়িত্ব লাগে না। আমার এখন গল্প লাগে। পুরোনো দিনের গল্প। আরিফের সাথে আমার পুরোনো দিন মানে ফার্নিচারের কিস্তি আর ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন। আর রাশেদের সাথে আমার পুরোনো দিন মানে গোটা একটা জীবন, যেটা কোনোদিন শুরুই হলো না।
আত্মীয়রা আসে। ফলের ঝুড়ি, হরলিক্সের কৌটা আর মাপা দুঃখ নিয়ে। খালাম্মা বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো মা। ভাবি বলেন, আজকাল ক্যান্সার তো ভালোই হয়ে যায়। বলার সময় কেউ আমার চোখের দিকে তাকায় না। মিথ্যা বলার সময় মানুষ চোখের দিকে তাকাতে পারে না। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। আমার চোখ বন্ধ দেখলে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মরণাপন্ন মানুষের সাথে কী কথা বলতে হয়, এই দেশের কেউ জানে না।
হাসপাতালের রাতগুলো সবচেয়ে লম্বা। ঘুম আসে না। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হিসাব করি, আর কয়টা শ্রাবণ পাবো না, আর কয়টা শীত। আমাদের কোনো ছেলেমেয়ে হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি। এতিম বড় ভারী শব্দ।
রাশেদের সাথে বিয়ের দিন ঠিক ছিলো। কার্ড ছাপা হয়ে গিয়েছিলো। তারপর এক সকালে ওর বাবা মারা গেলেন। হার্ট অ্যাটাক। মরার পর জানা গেলো ভদ্রলোক ব্যবসার নামে মাথার ওপর সত্তর লাখ টাকার দেনা রেখে গেছেন। আমার বাবা তিন দিন চুপ করে রইলেন। চতুর্থ দিন বললেন, যে ছেলের ঘাড়ে বাপের দেনা, তার ঘাড়ে মেয়ে দেবো না। আমি কাঁদলাম। ভাত খাওয়া বন্ধ করলাম। একবার হাত কাটার কথাও ভাবলাম। তারপর যা হয়। তিন মাসের মাথায় আরিফের সাথে বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের রাতে রাশেদের একটা মেসেজ এসেছিলো। দুইটা শব্দ। ভালো থেকো। ব্যস। এগারো বছর আর কোনো কথা হয়নি।
রোগটা ধরা পড়ার পর একদিন আমি ওকে ফোন করলাম। নম্বরটা এগারো বছর মুখস্থ ছিলো। মরণাপন্ন মানুষের একটা সুবিধা আছে। তার আর লজ্জা লাগে না। ও ধরলো। আমি বললাম, রাশেদ, আমি নীলা। আমার ক্যান্সার হয়েছে। শেষ স্টেজ। মরার আগে তোমার সাথে একটু গল্প করতে চাই।
ওপাশে অনেকক্ষণ কোনো শব্দ হলো না। তারপর ও শুধু বললো, কখন ফোন করবো, বলো।
সেই থেকে রোজ রাতে আমাদের কথা হয়। ও কথা বলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে, গলা নামিয়ে। ঘরে ওর বউ ঘুমায়। আমি কথা বলি কাঁথার নিচে, ফিসফিস করে। সোফায় আমার বর ঘুমায়। ব্যাপারটাকে বাইরে থেকে দেখলে পরকীয়া ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। অথচ আমরা দুজনেই জানি, এই ফোনের ভেতর শরীর নেই, সংসার ভাঙার প্ল্যান নেই, পালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নেই। আছে শুধু একটা মেয়ে, যে মরে যাচ্ছে। আর একটা ছেলে, যে তাকে মরার আগে কয়েকটা সুন্দর রাত ধার দিচ্ছে। এই সম্পর্কের কোনো নাম বাংলা ভাষায় নেই।
আমরা কী কথা বলি? সব কথা। ক্যাম্পাসের বকুলতলা। ক্যান্টিনের পোড়া সিঙাড়া। টিএসসির চা। রিকশার হুড। আর মাঝে মাঝে এই রোগটার কথা। রাশেদ শুনতে চায় না, তবু আমি বলি। কাউকে তো বলতে হবে।
বলি, জানো, কেমো নেওয়ার সময় মনে হয় শিরার ভেতর দিয়ে কেউ গরম সিসা ঢেলে দিচ্ছে। কেমোর তিন দিন পর থেকে মুখের ভেতর ঘা হয়ে যায়। ভাত গিলতে পারি না। পানি খেলে মনে হয় লোহা খাচ্ছি। জিভে কোনো স্বাদ নেই। আমার মা মরার আগে যে হাতের রান্না খেতে চেয়েছিলাম, সেই খিচুড়িটাও এখন কেমিক্যালের মতো লাগে।
বলি, আমার চুলগুলোর কথা মনে আছে তোমার? ও চুপ করে থাকে। মনে থাকবে না কেন। কোমর পর্যন্ত চুল ছিলো আমার। ও বলতো, তোমার চুলে বৃষ্টির গন্ধ। সেই চুল প্রথম কেমোর পনেরো দিনের মাথায় বালিশে, বাথরুমের মেঝেতে, চিরুনিতে গোছা গোছা উঠে আসতে লাগলো। আমি নিজেই একদিন নরসুন্দর ডেকে মাথা কামিয়ে ফেললাম। কাঁদিনি। শুধু ভুরু দুটো যেদিন ঝরে গেলো, সেদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারিনি। কেমোথেরাপি খুব সৎ জল্লাদ। সে কিছুই বাকি রাখে না।
অপারেশনের কথাটা ওকে বলেছিলাম আরো পরে। ম্যাসটেকটমি। বাঁ দিকের স্তনটা পুরো কেটে বাদ দিতে হয়েছে। কথাটা বলার সময় আমার গলা কাঁপেনি। ওর কেঁপেছিলো।


কারণ ও জানে ওই বুকের দাম। বিয়ের তিন মাস আগে, এক শ্রাবণের দুপুরে, ওর মেসে কেউ ছিলো না। বাইরে এমন বৃষ্টি যে জানালার ওপাশে শহরটাই ছিলো না। ভেজা পর্দা উড়ছিলো। আমরা দুজন প্রথমবার কাছে এসেছিলাম। আমার তখন কী লজ্জা, কী ভয়, আর তার ভেতরে কী অসম্ভব সুখ। রাশেদ আমার বুকে মুখ রেখে বলেছিলো, এইখানে আমার দেশ। আমি ওর চুলের ভেতর আঙুল ডুবিয়ে হেসেছিলাম। সারা জীবনে ওই একটাই দুপুর। তারপর তো বিয়েই ভেঙে গেলো।
ফোনে ওকে বললাম, তোমার দেশটা আর নেই রাশেদ। কেটে ফেলে দিয়েছে একটা স্টিলের ট্রেতে। জায়গাটায় এখন একটা লম্বা কাটা দাগ। আরিফ ওই দাগের দিকে তাকায় না। দুই বছর ধরে ও আমাকে ছুঁয়েও দেখে না। ঘেন্নায় না, ভয়ে। যেন আমার শরীরটা কাচের, ছুঁলেই ভেঙে যাবো।
ওপাশে রাশেদ অনেকক্ষণ কথা বললো না। তারপর শুনলাম ও কাঁদছে। পঁয়ত্রিশ বছরের একটা পুরুষ মানুষ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে, মুখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদছে। যেন ঘরের ভেতর শব্দ না যায়।
আমার কেবিনটা ডাবল বেডের। খরচ বাঁচাতে এটাই নেওয়া। পাশের বেডে ছিলেন রাহেলা বানু। বয়স সাতষট্টি। কোলন ক্যান্সার, সাথে কিডনিও বসে যাচ্ছে। উনার তিন ছেলে। তিনজনই ঢাকায় থাকে, ভালো চাকরি করে। পালা করে একজন একজন আসতো। আধা ঘণ্টা বসে, ফোন টিপে, চলে যেতো।
বুড়ি সারাদিন আমার সাথে গল্প করতেন। গ্রামের গল্প, ছেলেদের গল্প। বলতেন, বুঝলা মা, বড় পোলাডারে ইশকুলে দিমু বইলা আমার বিয়ার কানের দুল বেচছিলাম। মেজোডার মেডিকেল কোচিংয়ের সময় ছয় মাস এক বেলা খাইছি। হেরা জানে না। মায়েরা কইতে পারে না এইসব।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, খালা, আপনার কষ্ট হয় না? উনি হাসলেন। ফোকলা মুখে অদ্ভুত মায়া। বললেন, পোলাপান হইলো ধানের মতো, মা। যত্ন কইরা বড় করবা। পাকলেই আর তোমার থাকবো না। তহন সে গোলার। আমি কথাটার মানে তখন পুরোটা বুঝিনি।
বুঝলাম বুধবার রাতে। রাত তিনটার দিকে মনিটরটা চিৎকার করে উঠলো। নার্স দৌড়ে এলো, ডাক্তার এলো। পর্দা টেনে দিলো। ভোররাতে সব শান্ত হয়ে গেলো। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, উনার মুখের ওপর সাদা চাদর টেনে দেওয়া হলো। আগের দিন সকালেই আমাকে বলেছিলেন, মা গো, আইজ শইলডা বড় হালকা লাগতাছে। হালকা লাগবেই তো। সব বোঝা তো উনি নামিয়ে রেখে যাচ্ছিলেন ছেলেদের কাঁধে।
ছেলেরা সেই বোঝা নিলো না।
সকালে তিন ভাই এলো। কান্নাকাটি না, প্রথমেই বিলিং সেকশনে গেলো। বাইশ দিনের আইসিইউ আর কেবিন মিলিয়ে বিল হয়েছে চার লাখ সাতাশ হাজার টাকা। হাসপাতালের নিয়ম পরিষ্কার। বিল ক্লিয়ার না হলে ডেথ সার্টিফিকেট দেবে না। লাশের ছাড়পত্র দেবে না। করিডোরে দাঁড়িয়ে তিন ভাইয়ের ফিসফিস তর্ক আমি কেবিনের ভেতর থেকে শুনলাম। বড়টা বলছে, গত মাসেও আশি হাজার আমি একলা দিছি। মেজোটা বলছে, আমার মেয়ের স্কুলের ভর্তি সামনে, আমি এতো পারবো না। ছোটটা ফোনে কাকে যেন বলছে, আব্বা বাইচা থাকলে এই দিন দেখা লাগতো না।
যে মানুষটা কানের দুল বেচে ওদের মানুষ করলো, তার দাম উঠলো না চার লাখ সাতাশ হাজার টাকা।
অথচ আমি জানি, শেষ কয়টা দিন উনি কাদের মুখ চেয়ে বেঁচে ছিলেন। জ্বরের ঘোরে উনি ছেলেদের ডাকতেন ছোটবেলার নামে। সেলিম, বাবু, টুনু। শেষ যেদিন জ্ঞান পরিষ্কার ছিলো, নার্সের হাত ধরে বলেছিলেন, আমার পোলাগো কইও, আমার লেইগা যেন টেনশন না করে। যে ছেলেরা পরদিন করিডোরে দাঁড়িয়ে বিল ভাগাভাগি করতে পারলো না, মা তাদের টেনশনের কথা ভেবে গেছেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। মা এমনই। ধানের গোলা লুট হয়ে যায়, মাটি টের পায় না।
সারাটা দিন লাশটা পাশের বেডে পড়ে রইলো। সাদা চাদরে ঢাকা। এসির ঠান্ডায় ঘরটা মর্গ হয়ে গেলো। সন্ধ্যায় আরিফ বাড়ি গেলো কাপড় আনতে। আয়া মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়লো। আর আমি জেগে রইলাম একটা লাশের পাশে।
সে এক ভয়ংকর রাত। বারবার মনে হচ্ছিলো চাদরটা উঠছে, নামছে। মনে হচ্ছিলো চাদরের নিচ থেকে উনি আমাকে দেখছেন। জানি সব ভুল, সব মনের বানানো। তবু। মৃত্যু জিনিসটা যতক্ষণ বইয়ের পাতায় থাকে, তাকে দার্শনিক লাগে। পাশের বেডে শুয়ে থাকলে তাকে লাগে হিম, সাদা আর অসহ্য রকমের কাছের। আজ ও, কাল আমি। মাঝখানে শুধু একটা পর্দা।
রাত আড়াইটায় রাশেদকে ফোন করলাম। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিলো না। বললাম, রাশেদ, আমার পাশের বেডে একটা লাশ শুয়ে আছে। ওর ছেলেরা ওকে নিচ্ছে না। টাকার জন্য। রাশেদ, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।
ও একটাবারও বললো না, ভয় পেয়ো না। ও জানে ওই কথায় কাজ হয় না। ও গল্প শুরু করলো। তোমার মনে আছে, ফার্স্ট ইয়ারে তুমি আমার খাতা থেকে নোট চুরি করেছিলে? মনে আছে, বকুলতলায় তোমার স্যান্ডেল ছিঁড়ে গিয়েছিলো আর তুমি খালি পায়ে হেঁটেছিলে, আমি স্যান্ডেল হাতে পেছনে? মনে আছে সেই রিকশাওয়ালা চাচা, যে আমাদের নামিয়ে দিয়ে বলেছিলো, তোমাগো দুইজনরে মানাইছে ভালা?
এইভাবে, একটা একটা করে স্মৃতি দিয়ে, ও আমাকে ভোর পর্যন্ত পার করে দিলো। ফজরের আজান যখন ভেসে এলো, আমি বললাম, রাশেদ, আমি মরতে চাই না।
কথাটা বলেই বুঝলাম, এই একটা বাক্যের জন্যই আমি এতোদিন ওকে ফোন করছি। আমি বাঁচতে চাই। কী ভীষণ, কী নির্লজ্জ রকমভাবে বাঁচতে চাই। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শাড়ি চাই না, ফ্ল্যাট চাই না, কারো ভালোবাসা পর্যন্ত চাই না। আমি শুধু আরেকটা বর্ষা চাই। ভোরবেলা চায়ের কাপে চুমুক চাই। বৃষ্টির দিনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকা শহর দেখতে চাই। মানুষ সারা জীবন কত বড় বড় জিনিস চায়। মরার সময় সে শিশু হয়ে যায়। সামান্য জিনিস চেয়ে কাঁদে। খিচুড়ি। বৃষ্টি। আরেকটা সকাল।
একদিন রাশেদ জিজ্ঞেস করলো, নীলা, তুমি কি আমাকে এখনো ভালোবাসো? আমি সত্যিটাই বললাম। বললাম, জানি না। মনে হয় আমি তোমাকে ফোন করি নিজেকে ভালোবাসি বলে। তোমার গলার ভেতর সেই তেইশ বছরের নীলাটা এখনো বেঁচে আছে। যার কোমর পর্যন্ত চুল ছিলো, আস্ত শরীর ছিলো, সামনে গোটা একটা জীবন পড়ে ছিলো। আমি রোজ রাতে ওই মেয়েটার সাথে দেখা করতে যাই। মানুষ আসলে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে নিজেকে, রাশেদ। রাহেলা খালার ছেলেরাও তাই। আমিও তাই।
ও একটু চুপ থেকে বললো, আর আমি? আমি বললাম, তুমিও। তুমি আমাকে সময় দিয়ে আসলে এগারো বছরের পুরোনো একটা কষ্ট ধুয়ে ফেলছো। ও রাগ করলো না। শান্ত গলায় বললো, ধুইতে দাও নীলা। এই ময়লাটা অনেকদিন বয়ে বেড়াচ্ছি।
তারপর সেই রাতটা এলো, যেটার ভয়ে আমি এতদিন ফোনের ওপাশের ঘরটার কথা ভাবতাম না। রিং হতেই ফোন ধরলো একটা মেয়েলি গলা। হ্যালো। আমি পাথর হয়ে গেলাম। রাশেদের বউ। গলাটা নরম করে বললো, আপা, ও ওয়াশরুমে। আপনি লাইনে থাকেন, ও আসতেছে। তারপর একটু থেমে বললো, আপা, একটা কথা। আপনি যখন খুশি ফোন দিয়েন। আমি কিছু মনে করি না। মানুষটা এগারো বছর বুকের ভেতর একটা কবর নিয়া ঘুরছে। আপনি আসার পর কবরটায় ফুল দেওয়া হইতেছে। কিছু ঋণ থাকে আপা, শোধ করতে দিতে হয়।
আমি ফোন কানে চেপে নিঃশব্দে কাঁদলাম। মানুষ কত ছোট হয় দেখেছি এই হাসপাতালে। মানুষ এত বড়ও হয়, সেটা জানলাম একটা ফোনকলে।
এখন মরফিনের ডোজ বাড়ছে। ব্যথাটা থাকে হাড়ের ভেতরে, মজ্জায়। দিন আর রাত মিশে যাচ্ছে একটা ঘোলা স্রোতে। কাল ডাক্তার আরিফকে করিডোরে ডেকে নিয়ে কী যেন বললো। আরিফ ফিরে এলো লাল চোখ নিয়ে। আমার পায়ের কাছে বসে প্রথমবারের মতো আমার হাতটা ধরলো। ক্যানোলার পাশটা এড়িয়ে, খুব সাবধানে। আমি বুঝে গেলাম। বিলিং সেকশনে না। ওপরে কোথাও, আমার ছাড়পত্র তৈরি হচ্ছে।
কাল রাতে রাশেদকে বললাম, আমাকে শেষবারের মতো সেই দুপুরটার গল্প বলো। ও বললো। ভেজা পর্দা। জানালার ওপাশে মুছে যাওয়া শহর। টিনের চালে বৃষ্টির তবলা। আমার ভেজা চুলের গন্ধ। ওর ঠোঁট, আমার লজ্জা, সেই একটা দুপুরের সমস্ত আলো। আমি চোখ বন্ধ করে শুনলাম। মরফিনের ঘোরের ভেতরেও শরীরটা একবার কেঁপে উঠলো। পুরোনো সুখ মরে না। সে শুধু ঘুমিয়ে থাকে।
গল্প শেষ হলে বললাম, রাশেদ, আমার জানাজায় এসো না। তুমি সামনে দাঁড়ালে আমার উঠে বসতে ইচ্ছা করবে।
ও হাসলো না। ফোনটাও রাখলো না। আমরা দুজন চুপ করে রইলাম। ওপাশে ওর নিঃশ্বাসের শব্দ। এপাশে স্যালাইনের ফোঁটা। টুপ। টুপ। টুপ।
পাশের বেডে আজ নতুন রোগী এসেছে। অল্পবয়সী একটা মেয়ে, চোখে ভয়। সকালে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আপা, আপনার কী হইছে? আমি হাসলাম। বললাম, তেমন কিছু না। ছুটির অপেক্ষায় আছি।
জানালার বাইরে শ্রাবণ মাস। আকাশ কালো করে আসছে। বৃষ্টিটা নামুক। বৃষ্টিটা দেখে যেতে পারলে আর কোনো আফসোস রাখবো না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন