বারো বছর ধরে আমি মর্গে কাজ করি। মরা মানুষের পকেট হাতড়ানো আমার চাকরির অংশ।
সেদিন যে লোকটার লাশ এলো, তার মানিব্যাগ খুলে আমি নিজের ছবি পেলাম।
ছবিটা পাশে পড়ে থাকা নিথর দেহের মতোই স্থির ছিলো। কাঁপছিলো আমার হাত।
আমার নাম রমজান আলী। কাগজে কলমে পদের নাম মর্গ সহকারী। মানুষ বলে, লাশকাটা ঘরের লোক। আউটসোর্সিংয়ের চাকরি। বারো বছরেও স্থায়ী হইনি। বেতন আসে ঠিকাদারের হাত ঘুরে। হাতে আসতে আসতে প্রতি মাসের চার পাঁচ তারিখ পার হয়ে যায়।
বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়িতে বলা হয়েছিলো, আমি হাসপাতালে চাকরি করি। মিথ্যা বলা হয়নি। পুরোটা বলা হয়নি, এই যা। মেয়ের ক্লাসের এক ছেলের মা গত বছর কোথা থেকে যেন জেনে গেলো। মেয়েটা সেদিন স্কুল থেকে ফিরে ভাত খায়নি। এই শহরে মানুষ মরাকে ভয় পায় না। ভয় পায় যে লোকটা মরা ধরে, তাকে।
এই কাজের একটাই নিয়ম। মুখের দিকে তাকাবে না। তাকালেই মানুষটা তোমার হয়ে যায়। বারো বছর ধরে আমি নিয়মটা মেনে এসেছি। আমি শুধু হাত দেখি, পা দেখি, কাপড় দেখি।
বারো বছরে অনেক পকেট দেখেছি। মানুষ শেষবেলায় সঙ্গে কী নিয়ে বের হয়, এই শহরে সেটা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
বাসের টিকিট। ওষুধের অর্ধেক পাতা। তিন বছর আগের ভাঁজ করা প্রেসক্রিপশন। বাচ্চার পাসপোর্ট সাইজ ছবি। দোকানের বাকির খাতা থেকে ছেঁড়া একটা পাতা। কাগজে লেখা মোবাইল নম্বর, নামের জায়গায় শুধু একটা অক্ষর। একবার এক রিকশাচালকের পকেটে পেয়েছিলাম মেয়ের স্কুলে ভর্তির ফরম। পূরণ করা। জমা দেওয়া হয়নি।
আর সবচেয়ে বেশি পাই খুচরা টাকা। মানুষ বড় নোটটা খরচ করে ফেলে। খুচরাটা থেকে যায়।
ঘটনাটা গত বুধবারের।
সকাল নয়টায় পুলিশ লাশটা নামালো। ঘটনাটা ঘটে শ্যামলীর মোড়ে ভোরের দিকে বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ধাক্কায়। লোকটা রাইড শেয়ারিং করতো। বয়স চল্লিশের নিচে। ফাটা হেলমেটটা পলিথিনে ভরা অবস্থায় সঙ্গে এসেছে। বাঁ হাতে সস্তা একটা ঘড়ি, কাচ ভাঙা। কাঁটা থেমে আছে ছয়টা চল্লিশে।
এসআই সাহেব সুরতহাল লিখতে বসলেন। বললেন, রমজান, পকেট খালি করো।
ডান পকেটে মোবাইল, স্ক্রিনের গুঁড়া। বাঁ পকেটে মানিব্যাগ। ভেতরে তিনশো চল্লিশ টাকা, এনআইডি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স। আর টাকার খোপের পেছনে ভাঁজ করা একটা ছবি। কম্পিউটারের দোকান থেকে প্রিন্ট করা। ল্যামিনেট করার পয়সা ছিল না বলে স্বচ্ছ স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো। যাতে ঘামে না গলে।
ছবিতে চারজন মানুষ। সাদা পিপিই পরা। একটা কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসা। বৃষ্টি পড়ছে।
একজনের মাথার হুড পেছনে সরানো। মুখ খোলা।
সেই মুখটা আমার।
ছবিটা উল্টে দেখলাম। পেছনে বলপয়েন্ট দিয়ে লেখা একটা তারিখ। তার নিচে তিনটা শব্দ, এই লোকটারে খুঁজতেছি।
পাশ থেকে সুবল দা বলল, কী রে, শরীর খারাপ লাগে?
বললাম, না।
বারো বছরের চাকরিজীবনে ওইটাই আমার সবচেয়ে বড় মিথ্যা।
একুশ সালের কথা বলি। যে বছর হাসপাতালে অক্সিজেন ফুরিয়ে গেলো আর কবরস্থানে জায়গা।
ওই সময় শহরের সবচেয়ে দরকারি মানুষ হয়ে গেলাম আমরা। যারা সারা বছর লাশ হাতায়, কাজটা তাদের ঘাড়েই পড়লো। হাসপাতাল থেকে বললো, দাফনের টিমে যেতে হবে। বেতন বাড়লো না এক টাকাও। শুধু দুইটা পিপিই আর একটা মাস্ক বেশি পেতাম।
সেদিনটা আমার আলাদা করে মনে আছে।
আষাঢ় মাস। লোকটার নাম আব্দুল ওয়াহাব। বয়স আটষট্টি। ওয়ার্ড থেকে খবর গেলো বাসায়। বাসায় তালা দেয়া। স্ত্রী মারা গেছেন আরও আগে। এক ছেলে, থাকে সৌদি আরবে। কফিল ছুটি দেয়নি। আর তখন টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া। পাড়ার কেউ লাশ নিতে আসেনি। ওই সময় মানুষ নিজের বাপকেও ছুঁতে ভয় পেতো। আমি দোষ দিই না। ভয়টা মানুষের হাতে ছিলো না।
ছেলেটা ইমোতে ভিডিও কল দিলো। নার্স আপা ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে বললেন, রমজান, একটু ধরো তো।
আমি কাফনের মুখটা খুলে ফোনটা নিচু করলাম।
স্ক্রিনের ওপাশে খালি গায়ে একটা ছেলে। পেছনে লোহার খাট, মেসের ঘর। সে চিৎকার করলো না। কাঁদলও না। শুধু বললো, ভাই, বাবারে একটু ডাইনে কাত কইরা দেন। বাবা সারাজীবন ডাইন কাত হইয়া ঘুমাইতো।
আমি কাত করে দিলাম।
সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো, ভাই, আপনার নামটা কী?
ঠিক তখন পেছন থেকে ডাক পড়লো। লাশ গাড়িতে তুলতে হবে। আমি ফোনটা ফেরত দিলাম। উত্তরটা দেওয়া হলো না।
বিকালে রায়েরবাজার কবরস্থান জুড়ে বৃষ্টি নামলো। জানাজায় আমরা চারজন। ইমাম সাহেব দূরে দাঁড়িয়ে পড়ালেন জানাজা। মাটি দেওয়ার সময় গড়িয়ে পড়া ঘামের ফোঁটায় চোখ জ্বলছিলো বলে হুডটা পেছনে সরিয়ে দিয়েছিলাম। বাঁশের খুঁটিতে মার্কার দিয়ে নাম লিখলাম, আব্দুল ওয়াহাব।
পত্রিকার এক ফটোগ্রাফার দূর থেকে ছবি তুলছিলেন। পরদিন ছবিটা ভেতরের পাতায় ছাপা হলো। ফেসবুকেও ঘুরলো কয়েক দিন। কেউ কেউ লিখলো, এরাই আসল হিরো। তিন দিন পর সবাই ভুলে গেলো। ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। মানুষের মনে রাখার দায় কমছে ক্রমশ।
এসআই সাহেব ততোক্ষণে এনআইডি কার্ডটা হাতে নিয়েছেন। খাতায় লিখছেন। নাম, মো. শাহজাহান। পিতা, মো. আব্দুল ওয়াহাব।
নামটা কমন। কিন্তু ওই মানিব্যাগের ভেতর যে ছবিটা ছিলো, সেটা এই দেশে একটাই।
বারো বছরে আমি কোনোদিন ভয় পাইনি। ওইদিন গ্লাভসের ভেতর আমার আঙুলগুলো ঠান্ডা হয়ে গেলো।
বিকালে মেয়েটা এলো। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। কোলে বাচ্চা, বছর দুয়েক হবে। লাশ শনাক্ত করলো। কাগজে টিপসই দিলো। তারপর মালামাল বুঝিয়ে দেওয়ার সময় মানিব্যাগটা খুললো।
ছবিটা বেরিয়ে এলো তখন।
সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর নিজের মনেই বললো, এই লোকটারে না পাইয়াই মানুষটা মইরা গেলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপা, এই ছবি উনি সঙ্গে রাখতেন কেন?
মেয়েটা বললো, ওর বাপে করোনায় মরছে। ও তখন সৌদি। আসতে পারে নাই। দেশে ফিইরা এই ছবি প্রিন্ট কইরা মানিব্যাগে ভইরা রাখছে। প্রত্যেক বছর বাপের মরার তারিখে হাসপাতালে আসতো। গেটে খাড়ায়া থাকতো। লোকজনরে ছবিটা দেখাইতো।
সে একটু থামলো।
গত বছর একবার ছবিটা ফেসবুকেও দিছিলো। লেখছিলো, এই ভাইটারে কেউ চিনেন? দুই হাজার লাইক পড়ছে। কেউ চিনায় নাই।
হাসপাতালের লোকজনও চিনাইতে পারে নাই। কেউ কয় লোকটা চাকরি ছাইড়া দিছে, কেউ কয় কোম্পানি বদল হইছে। ও কইতো লোকটারে একটা কথা জিগাইছিলাম, নামটা কী। উত্তরটা পাই নাই। বাপেরে কবরে নামানোর সময় আমি আছিলাম না। আছিলো একটা অচেনা লোক। ওই লোকটারে ধন্যবাদটা আইজও দেওয়া হয় নাই।
আমি বারো বছর ধরে চুপ থাকা মানুষ। আমার কাজে কথা বলতে হয় না। মরা মানুষ প্রশ্ন করে না। ওইদিন গলার ভেতর কী যেন একটা আটকে গেলো।
তারপর বললাম, আপা, ছবির ওই লোকটা আমি।
মেয়েটা প্রথমে বুঝলো না। ছবির দিকে তাকালো। তারপর আমার মুখের দিকে। পিপিই আবৃত একটা মুখ আর মর্গের সামনে দাঁড়ানো একটা মুখ, মিল খুঁজে পেতে সময় লাগে।
বাচ্চাটা তখন কাঁদছিলো। সে বাচ্চাটাকে কাঁধে তুলে পিঠে হাত বুলাতে বললো, চাইর বছর। চাইর বছর ধইরা...
বাকিটা আর বলতে পারলো না।
আমি বললাম, আপা, খাটিয়াটা আমি ধরি?
সে শুধু ঘাড় কাত করে সায় দিলো।
লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় আমি সামনের দিকটা ধরলাম। বারো বছরে এই কাজ আমি কোনোদিন করিনি। আমরা লাশ গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিই। এরপরের কাজটা পরিবারের।
যাওয়ার আগে মেয়েটা ছবিটা আমার হাতে দিলো। বললো, এইটা আপনার কাছেই থাক। ও তো এইটা আপনারে দেখাইতেই খুঁজতেছিলো।
অ্যাম্বুলেন্স চলে যাওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ গেটে দাঁড়িয়ে রইলাম।
চার বছর ধরে লোকটা এই গেটেই দাঁড়াতো। আর আমি রোজ এই গেট দিয়েই ঢুকতাম, রোজ এই গেট দিয়েই বের হতাম। হয়তো কোনো একদিন পাশ কাটিয়েও গেছি। মানুষ যাকে খোঁজে, কতবার তার গা ঘেঁষে হেঁটে যায়। চেনার জন্য একটা নাম লাগে। ওইটুকুই ছিলো না।
রাতে বাসায় ফিরে মেয়েকে ডাকলাম। বললাম, আয়, তোরে একটা ছবি দেখাই।
মেয়েটা অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর জিজ্ঞেস করলো, বাবা, এইটা তুমি?
বললাম, হ।
ও বললো, তোমারে তো হিরোর মতো লাগতেছে।
বারো বছরে ওই প্রথম মেয়েটার সামনে আমি আমার চাকরির নামটা বলতে পারলাম।
বারো বছরে হাজারটা পকেট আমি হাতড়েছি। শিখেছি, মানুষ শেষ পর্যন্ত পকেটে টাকা রাখে না। রাখে একটা অসমাপ্ত কাজ। কারো পকেটে থাকে না পাঠানো চিঠি। কারো পকেটে না শোধ করা ধার।
ওই লোকটার পকেটে ছিলো একটা না বলা ধন্যবাদ। আর সেই ধন্যবাদের ভেতরে জড়িয়ে ছিলাম আমি।
চার বছর ধরে আমি একটা অচেনা মানুষের পকেটে ছিলাম। জানতামও না।
ছবিটা এখন আমার পকেটে থাকে। একদিন আমার পকেটও কেউ হাতড়াবে। এইটা আমাদের চাকরি। কেউ ছাড় পায় না। সে ছবিটা বের করবে। দেখবে সাদা পিপিই পরা কয়েকটা লোক, বৃষ্টি, একটা কবর। বুঝবে না জিনিসটা কী।
আমি জানি। ওইটা একটা প্রশ্নের উত্তর। পাঁচ বছর দেরিতে দেওয়া।
ভাই, আপনার নামটা কী?
আমার নাম রমজান আলী। লাশকাটা ঘরের লোক। আপনার বাবাকে আমি ডান কাত করে শুইয়ে দিয়েছিলাম।
২৬/৮/২০২৬
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন