রবিবার, ৩ মার্চ, ২০১৩

আজি হতে শতবর্ষ আগে ~ অমিতাভ প্রামাণিক

এক – বাজিলো কাহার বীণা

তেরো সংখ্যাটা নাকি অশুভ। শ্বেতকায় বোদ্ধারা বলেন, আনলাকি থার্টীন। দু'হাজারের পর তেরো বসালে সেটা লাকি না আনলাকি, সেটা বছর না গেলে তো বোঝা যাবে না। তবে মিটারের কাঁটা ঘুরিয়ে দিয়ে সিনেমার মত ফ্ল্যাশব্যাকে যদি দেখি একশো বছর আগে! কেমন ছিল সেই সময়টা?

সিনেমার জগতের খবর দিয়েই শুরু হয়েছিল ঊনিশশো তেরোর প্রথম দিনটা। পয়লা জানুয়ারি ব্রিটিশ বোর্ড অফ ফিল্ম সেন্সরস্‌ পেলো সিনেমাকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত ও সেন্সর করার অধিকার। মজার ব্যাপার, এখন যেমন সেন্সর কথার মানেই হচ্ছে অতিরিক্ত শরীর প্রদর্শনের বা জঘন্য রকমের মারপিটের বিরুদ্ধে কাঁচি চালানো, এর শুরুর উদ্দেশ্য কিন্তু ছিল বেশ আলাদা। তখন আধুনিক ফিল্মের উপযোগী প্লাস্টিক রোল আবিস্কার হয়নি। তুলোর সেলুলোজের সঙ্গে নাইট্রিক অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় প্রাপ্ত নাইট্রোসেলুলোজ ছিল হোমিওপ্যাথি ডোজের বিস্ফোরক। জাপানের কোডাক কোম্পানি এই নাইট্রোসেলুলোজের সাথে কর্পূরের মিশ্রণে তৈরী করল ফটোর উপযুক্ত ফিল্ম, তার নাম হল নাইট্রেট ফিল্ম। এই নাইট্রেট ফিল্ম দিয়েই তৈরী হতে লাগল সিনেমাও। আর তখন সিনেমাহল বলেও নির্দিষ্ট কোন জায়গা ছিল না। একটা ঘুপচি দোকানঘর বা গুদামঘর বা কারও বাড়ির বেসমেন্টেও সিনেমা দেখানো যেতে পারত। কিন্তু এই নাইট্রেট ফিল্ম জাতে তো বিস্ফোরক, ঘষাঘষি হলেই এই ফিল্মে আগুন লেগে যেত, ফলে একের পর এক এই সব মেকশিফ্‌ট্‌ সিনেমাহলে দুর্ঘটনা ঘটতে লাগল। এর হাত থেকে বাঁচার উপায় হিসাবেই তৈরী হল সেন্সরশিপ, কোথায় কেমন পরিবেশে সিনেমা দেখানো যেতে পারবে, তার নিয়ম বানিয়ে। শীঘ্রই অবশ্য সিনেমার বিষয় ও তাতে যৌনতা ও ভয়াবহতাও সেন্সরশিপের আওতায় এসে যায়।

সিনেমার ব্যাপারেই আরো দুটো 'পয়লা' ঘটে গেল ব্রিটিশ ভারতেও। পয়লা মে রাওয়ালপিণ্ডি শহরে এক পাঞ্জাবী ক্ষত্রি পরিবারে জন্ম হল যুধিষ্ঠির সাহনির, আমরা যাকে পরে চিনলাম বলরাজ নামে। আর পয়লা অগাষ্ট মুম্বইয়ের শহরতলিতে কাপড়ের কলে চাকরি করা আভাজী পালব-এর ঘরে জন্মালেন ভগবান, ক্রমে সে হয়ে গেল ভগবান দাদা। 

না, শুধু ভবিষ্যৎ নায়কের জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি ভারতীয় সিনেমা। মে মাসের তিন তারিখে ভারতের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি রিলীজ হল সিনেমাহলে, তার নাম রাজা হরিশচন্দ্র, পরিচালক দাদাসাহেব ফালকে। এ ছবিটি ছিল অ-বাক, ভারতীয় ছবিতে সংলাপ শুরু হওয়া আরো পরের ঘটনা, কিন্তু সেই যুগে পরাধীন ভারতে এটাও এক অবাক কাণ্ডই বটে। 

আরও আছে। মহীশূরের উপকণ্ঠে ধারোয়ার ও হুবলি দুই পাশাপাশি শহর, যমজ ভাইয়ের মত। দাক্ষিণাত্যের কৃষ্ণমৃত্তিকা তুলোচাষের পক্ষে উৎকৃষ্ট, এ ছাড়াও লৌহসমৃদ্ধ এই মাটিতে অনেক কিছুর চাষবাস হয়। চিক্কুরাও নাদিগার নামে এক ভদ্রলোক, তার বাড়ি ধারোয়ারে, চাষবাস নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। স্ত্রী অম্বাবাঈ ভালোবাসেন গান, কর্ণাটকী ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত। দুর্ভাগ্য তার, যে পরিবারে অম্বা-র জন্ম হয়েছিল, সমাজের চোখে সেটা নীচু জাত, তাদের গান গাওয়ারই অধিকার নেই, স্টেজে পরিবেশন তো দূরের কথা। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকেন তাই অম্বাবাঈ, আর সাধনা করে যান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। হয়ত এমন দিন আসবে, যখন এই নিষ্ঠুর জাতপাতপ্রথা দূর হয়ে যাবে। তার নিজের জীবিতকালে না হলেও, হয়ত পরবর্তী প্রজন্মে।

মার্চের পাঁচ তারিখে তার কোল আলো করে এল এক কন্যাসন্তান। চিক্কুরাও তার নাম রাখলেন গাঙ্গুবাঈ। 

বিজ্ঞানের দুনিয়াতেও নিঃশব্দে বিপ্লব ঘটে যাচ্ছিল। ঊনিশশো তেরোতে নিল্‌স্‌ বোর প্রকাশ করলেন তার কোয়ান্টাম মডেল। মিলিক্যান মেপে দেখালেন ইলেকট্রনের চার্জ। পিতাপুত্র দুই ব্রাগ মিলে বের করলেন এক্স-রের জোরালো প্রতিফলন পাওয়ার শর্তাবলী। জে জে টমসন মাস স্পেক্ট্রোমেট্রি বলে এক প্রকৌশলের সন্ধান দিলেন, যা দিয়ে আয়নিত পদার্থকে পৃথক করে তাদের সম্বন্ধে বিশদ জানা সম্ভব হয়। আর বিজ্ঞানের জগতের রাজপুত্র অ্যালবার্ট আইনষ্টাইন শুরু করলেন আপেকিক্ষতাবাদের ওপর তার নতুন কাজকর্ম, প্রচলিত তত্ত্ব থেকে এটা আলাদা বোঝাতে এর নাম দিলেন স্পেশ্যাল থিওরী অফ রিলেটিভিটি। 

যদি মনে হয় এসব বেশ বোরিং তাত্ত্বিক ব্যাপার, তবে প্রযুক্তির দিকে চোখ মেলা যাক। সেই বছরের শেষের দিকে মাত্র ঊনিশ বছর বয়সী নিউ ইয়র্কের এক তরুণী মেরী ফেল্প্‌স্‌ জেকব মহিলাদের প্রথম আধুনিক বক্ষবন্ধনী ডিজাইন করে তার পেটেন্ট নেন। এর আগে ফ্যাশনদুরস্ত মহিলাদের ঊর্ধাঙ্গে অন্তর্বাস হিসাবে ব্যবহৃত পোষাক ছিল কর্সেট, তা শুরু করেছিলেন ফরাসী রাজা দ্বিতীয় হেনরির পত্নী রাণী ক্যাথেরিন। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের সরু কোমর বীভৎসভাবে আঁটসাঁট করে রাখা। তাতে ব্যবহৃত হত তিমিমাছের কাঁটা অথবা ধাতব সরু রড, মাঝে মাঝেই সেগুলো হয় শরীরে ফুটে যেত, বা পোশাক ভেদ করে দৃষ্টিকটু হয়ে শজারুর মত খাড়া হয়ে থাকত। দীর্ঘ সাড়ে তিনশো বছর ধরে ফ্যাশনের নামে মেয়েরা সহ্য করে এসেছে যে যন্ত্রণা, মেরীর এই আবিস্কার তা থেকে তাদের মুক্ত করে। দিনে দিনে এর চাহিদা বাড়তে থাকলেও মেরী এই ব্যবসা চালাতে পারেনি। মাত্র পনেরশো ডলারে সে তার পেটেন্ট বিক্রী করে দেয় ওয়ার্ণার ব্রাদার্স নামে এক কোম্পানীকে (এরা সিনেমা বানানোর ওয়ার্ণার ব্রাদার্স নয়)। পরবর্তী তিরিশ বছরে তারা দেড় কোটি ডলারের বাণিজ্য করে শুধু এই বক্ষবন্ধনীরই। ১৯১৭ সালে পুরনো কর্সেট ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বছরে প্রায় আঠাশ হাজার টন ষ্টীল অন্য কাজে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ পায়। 

রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত ঘোরালো এই সময় সমগ্র বিশ্বে। হিন্দু-মুসলমান দুই জাতিকে আলাদা করতে ঊনিশশো পাঁচে বাংলাকে কেটে দুভাগ করার জন্য ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে তীব্র বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সূচনা হয়, ঊনিশশো এগারোতে তার ফলে দ্বিখণ্ডিত বাংলা আবার জোড়া লেগে যায়। সমস্যা হল, আলাদা হওয়ার জন্য যারা কিছু অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করছিলেন, তাদের অনেকেই ছিলেন মুসলমানপ্রধান পূর্ববঙ্গে, তারা এই জোড়া দেওয়াটা মেনে নিতে পারছিলেন না। এ নিয়ে সমস্যা লেগেই ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরাজের এ নিয়ে তখন নাক গলানোর তেমন সময় নেই। কেননা তাদের নিজের ঘরের সামনে ততদিনে বিশাল আগুন লেগে গেছে। 

ইওরোপের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েক দশক ধরে অশান্তি লেগেই আছে। বুলগেরিয়া-গ্রীস-মন্টেনিগ্রো আর সার্বিয়া, যারা তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনতামুক্ত হয়ে তৈরী করেছে বলকান জোট, তারা অটোমানদের বিরুদ্ধে চোরাগোপ্তা হামলা লাগিয়েই চলছিল। গত বছরেই পুরোপুরি যুদ্ধ লেগে গেছে, ছাব্বিশে মার্চ বুলগেরিয়া ছিনিয়ে নিল আড্রিয়ানোপল। অটোমানদের অবস্থা যায় যায়, তিরিশে মে লণ্ডন চুক্তি স্বাক্ষর করে তাদের অনেক জমিজিরেত বলকানদের উপঢৌকন দিয়ে সেই যুদ্ধ শেষ হল। অবশ্যই এতে মদত জোগাল পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী রাজ্যগুলি যাদের মধ্যে ব্রিটেন এক নম্বরে। সঙ্গে জার্মানী, রাশিয়া, অষ্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, ইটালি। কিন্তু শেষ হলে কী হয়, বলকানরাও চারটে দেশ। অটোমানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া জমির বিলিবন্দোবস্ত পছন্দ হল না বুলগেরিয়ার। সার্বিয়া আর গ্রীস নিজেদের মধ্যে ম্যাসেডোনিয়ার ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছিল। ক্ষেপে গিয়ে দু সপ্তাহের মধ্যেই বুলগেরিয়া আক্রমণ করে বসল মাত্র কিছুদিন আগেই যারা তার মিত্র জোটের সদস্য ছিল, সেই সার্বিয়া আর গ্রীসকে। তারাও পালটা হানা দিল বুলগেরিয়ায়, সঙ্গে জুটে গেল রোমানিয়া। ফলে বুলগেরিয়া অটোমানদের কাছ থেকে অল্প যা কিছু পেয়েছিল, তার প্রায় সবটাই হারালো। অগাষ্টের দশ তারিখে বুখারেষ্ট চুক্তিতে সেই যুদ্ধ শেষ হল। ম্যাসেডোনিয়া পেয়ে গেল সার্বিয়া আর গ্রীস, উত্তর ইপিরাস চলে গেল আলবেনিয়ার ভাগে, দক্ষিণ ডব্রুজা কেড়ে নিল রোমানিয়াও।

এই সব অশান্তি আর তার প্রত্যক্ষ মদত সূচনা করল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রঙ্গমঞ্চ।

ভারতের রাজনীতির আকাশে উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক মোহনদাস গান্ধী সে বছর দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানে আনপড় শ্রমিকশ্রেণীর ভারতীয়দের ওপর দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের বঞ্চনার ইতিহাস অনেক পুরনো। তাদের ওপর ধার্য হয় অহেতুক কর, ভারতীয় মতে অনুষ্ঠিত বিবাহ তাদের দেশে গ্রহণযোগ্য নয়, ইংরাজীতে নাম সই না করতে পারলে সে দেশে ঢোকাও অসম্ভব। এর বিরুদ্ধে গান্ধী শুরু করলেন পদযাত্রা, চার্লসটাউন শহর থেকে। সঙ্গে ২০৩৭টি পুরুষ, ১২৭ জন মহিলা এবং ৫৭টি শিশু। সকাল ছটায় শুরু হওয়া পদযাত্রা পুলিশের কর্ডন অতিক্রম করে ফোক্সরাষ্ট বর্ডার পেরিয়ে গেল। সন্ধ্যে সাড়ে আটটায় গান্ধী গ্রেফতার হলেন পামফোর্ড রেলষ্টেশনের কাছে। ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ পুলিশের এই নীতির নিন্দা করায় গান্ধী ও দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার এক টেবলে আলোচনায় বসতে পারে। গান্ধীর সত্যাগ্রহে অনেক দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয় সরকার।

প্রচণ্ড পরিশ্রমী গান্ধী, তাঁর পায়ের নীচে সর্ষে। তাঁকে যিনি মহাত্মা বলে অভিহিত করেছেন, তাঁর পরিশ্রমও নেহাৎ কম নয়। সারাটা বছর এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরেই কেটে গেল রবীন্দ্রনাথের। এদিক ওদিক মানে আমেরিকা আর ইংল্যাণ্ডে। এর তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বছর দুই আগে। ইংল্যাণ্ড থেকে চিত্রশিল্পী রথেনষ্টাইন আর জার্মানী থেকে দার্শনিক কাউন্ট হারম্যান কিসেরলিং এসেছিলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে, তাদের সঙ্গে অনেক কথাবার্তা হয় কবির। ব্রাহ্মসমাজের বার্ষিক অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ কর্মযোগ শীর্ষক ভাষণ দিলেন। শান্তিনিকেতনে কবি ও আর একজন শিক্ষকের সহযোগিতায় আনন্দ কুমারস্বামী রবীন্দ্রনাথের শিশু কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতার ইংরাজী তর্জমা করলেন, সেগুলো ছাপা হল মডার্ন রিভিউ পত্রিকায়। পঞ্চাশ বছর বয়স হল তাঁর, মহা ধুমধাম করে সেই রৌপ্যজয়ন্তী পালন করা হল, কলকাতা থেকে তাতে যোগ দিতে এসেছিল অনেকেই, তার মধ্যে তাঁর অন্যতম ভক্ত রায়বাড়ির ছেলে সুকুমার। তাঁর লেখা রাজা নাটক মঞ্চস্থ করা হল, তিনি নিজে সাজলেন ঠাকুর্দা। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব এসে পড়ল তাঁর ঘাড়ে, লিখলেন অচলায়তন নাটক। এই সময় তাঁর বেশ অর্থকষ্টে গেছে। প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর আত্মজীবনী, জীবনস্মৃতি। শান্তিনিকেতনে শারদোৎসবে তিনি সাজলেন সন্ন্যাসী, লিখলেন ডাকঘর নাটক আর ভারতী আর প্রবাসী পত্রিকার জন্যে অনেকগুলো ছোটগল্প। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে তাঁর লেখা ও সুর দেওয়া গান জনগণমন-অধিনায়ক প্রথম গাওয়া হল এই সময়।

পরের বছরের অর্থাৎ ১৯১২র শুরুতেই বাংলার প্রায় দুশোজন বুদ্ধিজীবী কলকাতায় তাঁকে সম্বর্ধনা দিলেন, মডার্ণ রিভিউতে তা একজন ভারতীয় সাহিত্যিকের প্রতি অভূতপূর্ব সম্মানপ্রদর্শন বলে বর্ণিত হল। সাধারণ ব্রহ্মসমাজের সভায় তিনি আত্মপরিচয় বলে একটা প্রবন্ধ পাঠ করলেন। বাংলা ও অসমের সরকারী আমলারা শান্তিনিকেতনকে তাদের পরিবারের সন্তানদের পড়াশুনার অযোগ্য ঘোষণা করলেও মাইরন ফেল্প্‌স্‌ নামে এক আমেরিকান আইনজীবী শান্তিনিকেতন সফর করে এর ন্যায়নীতিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করে প্রবন্ধ লেখেন। ভারতীয় ইতিহাসের মূল্যায়নের ওপর রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার ইংরাজী তর্জমা করে যদুনাথ সরকার মডার্ণ রিভিউতে প্রকাশ করেন। তা উচ্চপ্রশংসিত হওয়ায় তাঁর বন্ধুবান্ধব তাঁকে ইংল্যাণ্ড ভ্রমণের পরামর্শ দেন। জোরজার করে টিকিট কাটা হয়ে গেলেও কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁর বিদেশযাত্রা পিছিয়ে যায়। 

ইংল্যাণ্ড যাত্রা ঠিক হয়ে আছে, ওদেশে শোনাতে হবে তাঁর নিজের লেখা, ওদের ভাষায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানগুলির ইংরাজী অনুবাদ শুরু করলেন। এ কাজটা তাঁর খুব পছন্দের নয়, কিন্তু এ ছাড়া উপায়ই বা কী? ইংল্যাণ্ডে যাওয়ার পূর্বে লেখেন যাত্রার পূর্বপত্র, তাতে বর্ণনা করেন তাঁর এই সফরের উদ্দেশ্য শান্তিনিকেতনে তাঁর শিক্ষাসংক্রান্ত কাজের সঙ্গে পশ্চিমী মহলকে অবহিত করা। যাত্রাপথেও তাঁর কবিতার অনুবাদ করতে থাকেন ইংরাজীতে। লণ্ডনে পৌঁছে সেগুলির পাণ্ডুলিপি তিনি দেন রথেনষ্টাইনকে। রথেনষ্টাইন সেগুলি টাইপ করে পড়তে দিলেন উইলিয়াম ইয়েট্‌স্‌, স্টপফোর্ড ব্রুক আর অ্যান্ড্রু ব্র্যাডলিকে। সকলেই মুগ্ধ হয়ে যান। রবীন্দ্রনাথ কেমব্রিজে গিয়ে দেখা করলেন বারট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে। রথেনষ্টাইন কবির কিছু কবিতাপাঠের আসরের আয়োজন করলেন, সেগুলো সব দারুণভাবে প্রশংসিত হল। জর্জ ক্যালডেরন তাঁর ছোটগল্প ডালিয়ার নাট্যরূপ দিলেন মহারাণী অফ আরাকান নাম দিয়ে, সেটা রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে অভিনীত হল। কবি দেখা করলেন বার্ণার্ড শ', এইচ জি ওয়েলস ও আরো অন্যান্য পণ্ডিত ব্যক্তিদের সাথে। রাজা আর ডাকঘর নাটকেরও ইংরাজী অনুবাদ হল। ১৯১২র ২৮শে অক্টোবর তিনি ইংল্যাণ্ড থেকে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। ইলিনয়ের আর্বানা শহরে আধ্যাত্মিকতার ওপরে একগুচ্ছ প্রবন্ধপাঠ করেন, যা পরে সাধনা নামে প্রকাশিত হয়। 

ইংরেজ কবি ইয়েট্‌সের উদ্যোগে গীতাঞ্জলির বেশ কিছু কবিতার ইংরাজি অনুবাদ সং অফারিংস নামে প্রকাশিত হল ইংল্যাণ্ডে, ইয়েট্‌স্‌ নিজেই তার ভূমিকা লিখে দিলেন, সেই বই ইংরেজ শিক্ষিত সমাজে অসম্ভব প্রশংসা লাভ করল। শিকাগোর পোয়েট্রি পত্রিকায় গীতাঞ্জলির ছখানা কবিতার ইংরাজী তর্জমা ছাপা হল। কবির বন্ধু অ্যান্ড্রুজ দেশে ফিরে কবির কথা ফলাও করে লিখলেন লাহোরের সিভিল অ্যাণ্ড মিলিটারি গেজেট পত্রিকায়। 

১৯১৩ সালের প্রথম দিকে আমেরিকাতে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি প্রাচীন ভারতীয় নীতির ওপর বক্তৃতা করলেন। শিকাগোতেই ইউনিটারিয়ান হলে বক্তৃতা করলেন ইভিল বা মন্দের সমস্যা নিয়ে। উদার ধর্মীয় গোষ্ঠী কংগ্রেসের অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে জাতিবৈষম্যের ওপর বক্তৃতা করলেন রচেষ্টারে। তারপর গেলেন বষ্টনে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমার্সন হলে একগুচ্ছ প্রবন্ধপাঠ করলেন। গেলেন নিউ ইয়র্কে। সেখান থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি আমেরিকা থেকে ফিরে আবার গেলেন লণ্ডন। লণ্ডনের ম্যাকমিলান অ্যাণ্ড কোম্পানী প্রকাশ করল গীতাঞ্জলীর এক পপুলার সংস্করণ। দ্য গার্ডেনার, দ্য ক্রেসেন্ট মুন আর চিত্রাও প্রকাশ করল ম্যাকমিলান। আইরিশ থিয়েটারে মঞ্চস্থ হল তাঁর নাটক দ্য পোষ্ট অফিস। ক্যাক্সটন হলেও তিনি দিলেন একগুচ্ছ বক্তৃতা। 

কম কাজ? বয়স তো কমছে না, কত আর দৌড়াদৌড়ি করবেন?

রবীন্দ্রনাথের তরুণ ভক্তদের অন্যতম, যাকে আমরা হাস্যরসের সম্রাট হিসাবে পরে জানতে পেরেছি, সেই সুকুমার রায় তখন ইংল্যাণ্ডে। রবীন্দ্রনাথের রাজর্ষি নাটকের অনুসরণে পিতা উপেন্দ্রকিশোর তার ডাকনাম রেখেছেন তাতা, দিদি সুখলতার ডাকনাম হাসি। রবীন্দ্রসাহিত্যে অনুপ্রাণিত এই যুবক ইংল্যাণ্ডের ইষ্ট অ্যাণ্ড ওয়েষ্ট সোসাইটির এক অধিবেশনে এক বক্তৃতা দিলেন, তার শীর্ষক হল 'দ্য স্পিরিট অফ রবীন্দ্রনাথ'। বক্তৃতার শুরুতে তিনি শ্রোতাদের কাছে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় দিলেন এইভাবে – In the midst of all our work and all our pleasures, we are often unconscious that we are ever carrying with us the burden of an eternal question. Very few of us indeed have anything more than a vague consciousness of its existence and most of us are satisfied with an occasional mild intellectual interest in the problem. But in some lives – and these lives are only truly great – the question has assumed an imperative form; and wherever the demand for an answer has been thus insistent, we have had one of those contributions to human thought that leave a definite impression on the ever-changing ideals of humanity.

রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্বন্ধে তিনি বললেন - Where poetry is coextensive with life itself, where art ceases to be the mere expression of an imaginative impulse, it is futile to attempt a comprehensive analysis. Rabindranath's poetry is an echo of the infinite variety of life, of the triumph of love, of the supreme unity of existence, of the joy that abides at the heart of all things. The whole development of his poetry is a sustained glorification of love. His philosophy of love is an interpretation of the mystery of existence itself. 

সেপ্টেম্বরে জাহাজে রবীন্দ্রনাথ দেশে ফিরলেন, সহযাত্রী ছিলেন সুকুমার। কিছুদিন আগেই উপেন্দ্রকিশোর সন্দেশ নামে একটা শিশুদের পত্রিকা শুরু করেছেন, তিনি চান সুকুমার দেশে ফিরে তার ভার নিক। ভারতবর্ষে মুদ্রণশিল্পে চাঞ্চল্যকর অভিনবত্ব এনেছেন উপেন্দ্র, হাফটোন মুদ্রণে তিনি সৃষ্টি করেছেন নতুন প্রযুক্তি, তাঁর প্রবন্ধ ছাপা হয় লণ্ডনের নামী পত্রিকায়। এই শাস্ত্র শিক্ষা করতেই সুকুমারের ইংল্যাণ্ডে আসা, তিনি ইতিমধ্যেই পদার্থ ও রসায়নে যুগ্ম স্নাতক। সাহিত্য রচনার ব্যাপারে অবশ্য তার এখনো কিছু উৎসাহ দেখা যায়নি। 

পুরনো লেখার অনুবাদ আর বক্তৃতা করেই চলে যাচ্ছে বছর, নতুন লেখার সময়ই হচ্ছে না, রবীন্দ্রনাথ স্বস্তি পান না। ইংল্যাণ্ড ছাড়ার আগে ২৪শে অগাষ্ট – সেদিন রবিবার – সারাদিন বসে লিখে ফেললেন কয়েকটি নতুন গান। মনে বাজছে রাগাশ্রয়ী সুর। লিখলেন ইমনকল্যাণের সুরে এ মণিহার আমায় নাহি সাজে, খাম্বাজে অসীম ধন তো আছে তোমার, তাহে সাধ না মেটে, খাম্বাজেই বাউল-অঙ্গে তোমারি নাম বলব নানা ছলে। পরদিন জন্মাষ্টমী। সেদিন লিখলেন আশাবরী-ভৈরবীতে ভোরের বেলা কখন এসে পরশ করে গেছে হেসে, ভৈরবী-রামকেলীতে প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে। তার দুদিন পরে দেশ রাগে জীবন যখন ছিল ফুলের মত। ফেরার পথে জাহাজে বসেও কয়েকটি কবিতা ও গান রচনা করলেন। বাজাও আমারে বাজাও, ভেলার মত বুকে টানি কলমখানি মন যে ভেসে চলে, রামকেলীতে কীর্তন-অঙ্গে জানি গো দিন যাবে এ দিন যাবে, ইমন রাগে বাউল-অঙ্গে নয় এ মধুর খেলা তোমায় আমায় সারাজীবন সকাল সন্ধ্যাবেলা। 

দেশে ফিরেই সোজা চলে গেলেন শান্তিনিকেতনে। বহুদিন দেশছাড়া, হাতে এখন অনেক কাজ। একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানো কি মুখের কথা? তিনি না থাকলেই অনেক কাজ পড়ে থাকে, সব কিছুর ব্যাপারেই তাঁর মতামত চাওয়া হয়। মত দিতে অসুবিধে নেই, কিন্তু তাইজন্যে কাজ পড়ে থাকবে? গীতার কর্মযোগ এদের শেখাতেই হবে। শান্তিনিকেতনে বসে তার কলম চলতে লাগল। দুর্গাপুজো পেরিয়ে গিয়ে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর শারদ পূর্ণিমায় ইমন রাগে বাউলাঙ্গের সুরে লিখলেন নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে, কয়েকদিন পর পরজ রাগে আমার যে কাছে আসে, যে যায় চলে দূরে, বাউল অঙ্গের আরেকটি গান তুই কেবল থাকিস সরে সরে। লেখালিখির পাশাপাশি শান্তিনিকেতনের পড়ে থাকা কাজ জোরকদমে শুরু করে দিলেন। 

তেরোই নভেম্বর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ অধিবেশনে কবিকে সাম্মানিক ডি লিট উপাধি দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হল। তার দুদিন পর, সেদিন বৃশ্চিক সংক্রান্তি, আগের দিন পূর্ণিমা ছিল, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পরের পূর্ণিমা, কবি বসে আছেন শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজস্ব কক্ষে। কে এসে খবর দিল পিওন এসেছে তাঁর নামে এক টেলিগ্রাম নিয়ে। প্রতিদিন গোছা গোছা চিঠি আসে কবির নামে, কিন্তু টেলিগ্রাম শুনলেই এখনও মন অস্থির হয়ে যায়। আবার কি কোন অশুভ খবর? স্ত্রী, কন্যা রাণী, কনিষ্ঠ পুত্র শমীর অকালে মৃত্যু হয়েছে। আর কত সহ্য করবেন তিনি?

বাইরে এসে সই করে টেলিগ্রাম নিলেন তিনি। মুহূর্তেই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি পালটে গেল। এ যে অভাবনীয়। টেলিগ্রামে আগের দিন অর্থাৎ চোদ্দই নভেম্বরের তারিখ। দুই লাইনের টেলিগ্রামে লেখা – সুইডিশ অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডেড ইউ নোবেল প্রাইজ লিটারেচার প্লীজ অয়্যার অ্যাক্সেপ্টেশন সুইডিশ মিনিষ্টার। 

এশিয়া মহাদেশে প্রথম কেউ এই সম্মানে সম্মানিত হতে চলেছে, তাও পরাধীন জাতির একজন হিসাবে। বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথের মন তোলপাড় হতে লাগল। এ কি সত্যি! ধীর পায়ে উঠে গেলেন তিনি নিজের ঘরে। এক অদ্ভুত আনন্দে তাঁর প্রাণমন উদ্ভাসিত হয়ে যাচ্ছে, কার সঙ্গে ভাগ করে নেবেন এই আনন্দ? আশেপাশে লোকের অভাব নেই, কিন্তু হঠাৎ যেন নিজেকে একা বোধ করতে লাগলেন। দেয়ালে একের পর এক সারি সারি তৈলচিত্র। দাদামশাই, বাবামশাই, যুবতী মায়ের ছবি, মৃণালিনী। এঁদের সবাইকে ফেলে তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন তাঁর বাল্যের খেলার সাথীর ছবির সামনে। দু চোখ বোঁজা, মনে মনে বললেন, দেখো, নতুন বৌঠান, এরা আজ আমাকে কত বড় সম্মানটা দিচ্ছে। তোমার জন্যেই তো এত কিছু। তবে কিসের অভিমানে তুমি সব ছেড়ে চলে গেলে? কেন আজ আমার এই আনন্দের দিনে তুমি নেই?

বাহান্ন বছর ধরে পৃথিবীর অনেক রূপ-রস দেখেছে তাঁর চোখ, সয়েছে অনেক অপ্রত্যাশিত দুঃসহ বেদনা। আজ এই আনন্দের দিনে সেই চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ল অঝোরে। 

(ক্রমশঃ)

[কৈফিয়ৎ - যা শুরু করি, অনেক সময় তাতে সাময়িক বিরতি দিতে হয়। গীতার অনুবাদ শুরু করেছিলাম ছড়ায়, একশো শ্লোকের অনুবাদের পর সেটা থেমে আছে। 'আপনাকে এই জানা আমার' বলে আত্মজীবনীমূলক সুলুক-সন্ধান, সেটাও গোটা আটেক এপিসোডের পর আটকে গেল। আর এই 'অনন্ত জীবন' শুরু করেই মুখ থুবড়ে পড়ল। 

পড়ুক। যে কাজটা যখন করা উচিৎ, তার আগে বা পরে করলে অনেক সময় তা অর্থহীন হয়ে যায়। যে সব মনীষীদের চরণস্পর্শ করার সৌভাগ্য হয়নি বলে স্রষ্টাকে ধমকাই, তাঁদের কিছু কথা যথাযথ সময়ে শোনানোর সুযোগ পাওয়াও তো কম ভাগ্যের নয়। যে মানুষটা জন্মেছিলেন বলে আজ আমি ও আমার মত আর পাঁচজন রসায়নের ছাত্র 'করে খাচ্ছি', সেই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের সার্ধশতবার্ষিকী চলে গেল সামনে দিয়ে, অঞ্জলি দেওয়া হয় নি। এই রকম ভুল বার বার না হয়, সে জন্যেই এ লেখাটার শুরু...]
 

রবিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

চড়ুই ~ অনির্বাণ মাইতি

ওরা ঠোঁটের ডগায় স্বপ্ন বুনতে পারে 
নরম ডানায় রোদ্দুর পিছলায়
ধুলো স্নান সেরে রোজ ফিরে ফিরে আসে 
শরীরের শেষ ক্লেদটুকু নিংড়ায় 

ওদের কাছে এসব কিছুই যেন 
সাতটি রাজার ধনএর চেয়েও দামী
জানার পরে হঠাত চেয়ে দেখি 
আমার কোলে সদ্যোজাত আমি 

হার মানে না নাছোড়বান্দা ওরা 
চিল শকুনের মিলিত সন্ত্রাস 
ঝড়ের মুখে আঁকড়ে ধরে থাকে 
শেষ কুটোটাই চূড়ান্ত আশ্বাস 

আমিও ঠিক ওদের মতই হব 
চড়ুই পাখির যেটুকু দরকার 
প্রবল শীত এ এক ফোঁটা ওম দেব 
আমৃত্যু চাই ইচ্ছেটা বাঁচবার .......

বৃহস্পতিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

ফাগুন ~ দীপ্তানুজ দাশগুপ্ত

ওগো আমার হারিয়ে যাওয়া ফাগুন-,
দাও জুড়িয়ে মাসের শেষের
বুক জ্বালানো আগুন।

(বলতো)  এমন কেন  হয় ?
রাত-বিরেতে, দিন দুপুরে একলা হওয়ার ভয় ?
কাঁপায় আমায়, কুঁকড়িয়ে যাই, শশব্যস্ত প্রাণ,-
হাতড়ে বেড়ায় – হারিয়ে যাওয়া আগুন-দিনের গান।

আগুন-দিন - ঝড়ের পাখি – মিছিল-জোড়া ঢেঊ –
সব হারিয়ে এখন আমার সঙ্গে যে নেই কেউ !

আবার যদি ইচ্ছে করি , আবার যদি যাই  -
আবার যদি পেরতে পারি চড়াই - উৎরাই ,
ফিরিয়ে দেবে ? ওগো আমার সুর্য ধোয়া মেঘ –
ভাসিয়ে দেবে মনের কোণের লুকোনো উদ্বেগ ?

ওগো আমার হারিয়ে যাওয়া ফাগুন –
দাও জ্বালিয়ে বুকের ভিতর ভালবাসার আগুন!

রবিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩

স্যাটানিক ভার্সেস ~ স্বপন দাস


সামনেই ভোট, শোন গোয়েন্দা দফতর
ভোটে জেতানোর দায় জেনে রাখ সব তোর
চুপি চুপি ছকে দিবি শুরু থেকে তার শেষ
'সিটি অব ভয়'-এ ওড়ে স্যাটানিক ভার্সেস"


উত্‌সবে যাই... হরেক মেলায়। কেউ দিয়ো না বাগড়া।
শিল্পী পাবেন শাল দোশালা, পায়ে জরির নাগরা!
উড়বে পটের ময়ূরছানা ‘বিশিষ্ট’রা খাবেন দানা।
শিল্প এটাই। দরকার নেই গুজরাত বা আগ্রা।





বুধবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৩

পাহাড়ে অট্টহাস্য ~ কৌশিক সেনগুপ্ত


ছটফট কোরো নাকো
হয়ে থাকো শান্ত,
সব ই তো গট আপ কেস
দুজনেই জানতো।

গোর্খা রাজ্য চাই
না বলিলে হায়,
পাহাড়ের সম্রাট
মাটিতে লুটায়।

না করিলে মাঝে মাঝে
এই ফোঁস ফোঁস,
ফসকাবে হাত থেকে
পাওয়া রাজকোষ।

হাসি মুখে হবে
এই ঝগড়ার ইতি ,
উৎসবে শেষদিনে
রবীন্দ্রগীতি!

শুক্রবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৩

প্রজাতন্ত্র ~ অমিতাভ প্রামাণিক

এক পেল্লায়
খাটে ঘুম যায়
রাজা। দুধ-ক্ষীর
খেয়ে রাত্তির
বেলা। আই ঢাই
সে শরীরটায়!
যত জনগণ
করে অনশন,
সব বর্বর!
করে গড়বড়
মহারাজদার
সেই স্ফীতাকার
বৃহদন্ত্র।
প্রজাতন্ত্র!

ওরা ফিসফিস
করে নির্বিষ
ভাবে দু'কথার
ঝাঁপি খোলে। তার
কোন অর্থই
নেই, নেই থৈ –
কেন তারা আজ
এই মহারাজ-
টাকে বসালো
এই শাঁসালো
পুরু গদিতে।
দুধ ও দধিতে
তিনি হয়েছেন
ফুলে জয়ঢাক।
আর নির্বাক
জনতার মুখ
যদি ভুলচুক
বলে, কেয়া বাত,
তবে নির্ঘাৎ
ষড়যন্ত্র।
প্রজাতন্ত্র!

রাজা, শুনছেন
এ কালির পেন
যার নেই নিব,
শুধু আলজিভ
শুখা তৃষ্ণায়,
কোন বিষ নাই,
সেও ক্লান্ত,
উদ্‌ভ্রান্ত।
এর আওয়াজে
বাজনা বাজে
তা কি পায় টের
তব কর্ণের
বোঁজা রন্ধ্র?
রাজা, শোন না
গত বন্যায়
আমি নিঃশেষ,
তুই দেখি বেশ
প্রাণবন্ত!
কবে আমাদের
পাতে হবে ফের
দুটো ডালভাত,
আর ঠুঁটো হাত
খুঁজে পাবে কাজ,
শোনা মহারাজ,
পতাকাতলায়
নীচে সে আশায়
ভেজা মন্ত্র।
প্রজাতন্ত্র!

বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৩

মাঝদুপুরের আলাপ ~ অনামিকা

মাঝদুপুরে হুটার দেগে জাগিয়ে দি্লাম পাড়া
মন্ত্রী পিছে সান্ত্রী আগে, সাইডে সরে দাঁড়া।

সাইডেই তো দাঁড়িয়ে বাবা ... অধিক সরে গেলে 
নর্দমাতে পড়ব, তোদের বেমক্কা আক্কেলে।

পতন মানে ভাগ্য সে'টা পারিস যদি চিনতে
ঘাসফুলেরা জ্বলছে কেমন ত্রিশূল ফলার বৃন্তে।

ঘাসফুলেরা জ্বলছে জ্বলুক, কিন্তু মাঝে মধ্যে
অনাহারের অন্ধকারে তপ্ত ভাতের রোদ দে!

এইটি তোদের বদ অভ্যেস এই যে খিদে বেজায়।
খাবার খুঁজিস! খেয়াল করিস মাঝদুপুরে কে যায়? 

তুই যাচ্ছিস পাচ্ছি মালুম, জয়ধ্বনির চোটে
ভাবছি বসে তোকেই কেন জিতিয়েছিলাম ভোটে

হাটের মাঝে পাগলু নাচন। দু'লাখ টাকা ক্লাবকে।
কিচ্ছুটি কি দিই নি তোদের? বুঝিয়ে দেব চাবকে।

তা ঠিক তা ঠিক, কিন্তু সাথে প্রাপ্য অতিরিক্ত
চাকরি দিবি শিল্প দিবি এই কথাটাও ঠিক তো?

তাও দিয়েছি। খুন জখমের শিল্প প্ররোচনা 
নীল সাদাতে রক্ত মাখিস নতুন মারাদোনা।

সোমবার, ৭ জানুয়ারি, ২০১৩

বাংলার ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা ~ অনামিকা মিত্র

বাংলার ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা
পাঁড় সিপিএম তোরা এই সব রটাচ্ছিস? রটা ...
কি বা যায় আসে?

ইস্ট জর্জিয়ার সেই সুবিখ্যাত পিএইচডি সকাশে
পণতন্ত্র ঝাপসা হয়ে ঠিক মিশে যাবে,
যে রকম ভাবে
মরীচিকা মিশে যায় দিগন্ত মরুতে
জল খাবে একই সাথে বাঘে ও গরুতে
আমাদের ঘাটে

মাধ্যমিক পাশ নয়, প্রবল বখাটে
এমন কাউকে পেলে কলেজের পরিচালনার
ভার দেব। 
সুনন্দ কৌশিকের চেঁচানোই সার 
এই কথা জেনে তবু ওরা 
টিভিতে চেঁচায় খুব... ভুল হয়ে গেছে ... বড় ভুল ...
বাংলার ভাগ্যাকাশে আরাবুল ... শুধু আরাবুল ...

এ আমার গেমপ্ল্যান 
এলোমেলো করে দাও সব
মিথ্যাচারে ভরা উৎসব
টাটা গেছে, আহা যদি অন্তত ইনফোসিসও হত
ঢেকে দিতে সেই সব ক্ষত 
অশোকেরও চেয়ে বেশি শিলালিপি পোঁতো

একশ' দিনের টাকা ঝেড়ে দাও যতখানি পারো
বলাতো যায় না কবে ব্যাকফুটে যাব যে আবারও
অতএব মাঠে থাকো বাংলার দামাল ছেলেরা
আমার মিটিং শেষ। 
ভেবো না এখনই বাড়ি ফেরা

জমানা পালটে গেছে। প্রতিদিন তাই
চায়ের দোকান করো সিডি বেচো 
না পারলে করো ছিনতাই
চাকরির গল্পগাছা ভুলে যাও। এটা রিয়্যালিটি!
আমার এক্সচেঞ্জ আর পাঠাবে না চাকরির চিঠি

আসল অ্যাজেন্ডা হল বন্ধুগণ আখের গোছাও
সময় বড়ই কম... সবই ভান ... যেদিকেই চাও
মনোমোহনকে আর কত ভাবে করি ব্ল্যাকমেল
দামাল ছেলেরা হও বেপরোয়া ... 
হোক ফাঁসি ... জেল ...

অভিনয়ে বিমোহিত... একদিন ফিরবেই হুঁশ ...
পশ্চাতে কষাবে লাথি বাংলার মা মাটি মানুষ
সকাল সন্ধ্যা আমি চিন্তায় আকুল
কী ভাবে মুনাফা দেবে আমাদের প্রিয় তৃণমূল 
বাংলার ভাগ্যাকাশে আরও আরাবুল চাই ... 
আয় আরাবুল!

শনিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১২

যে ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

যে তোমাকে জন্ম দেয় ... প্রেম দেয় ... ঢেকে রাখে শীতে ...
কত মৃত্যু দেবে তাকে? আর কত অপমান দিতে
মন চায় তোমাদের? ঠিক কোন কোন অঙ্গে তার
ঢোকাবে নিষ্ঠুর শলা, এঁকে দেবে দারুণ প্রহার?

ভ্রূণবেলা থেকে তাকে এ'মরণ খোঁজে আজতক
নিরুচ্চারে মেয়েটাকে মেরে ফেলে একুশ শতক।



আগুন ~ অনির্বান মাইতি

বুকের আগুন নিভিয়ে দেবে জলকামান?
আসলো জোয়ার দিল্লি থেকে আন্দামান
হিরকরাজা হন না যতোই বুদ্ধিমান
আম আদমি রাত পোহালেই পার্টিসান!

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১২

একলা ~ সুকন্যা ধর

ভাবতে যখন চাইছি তোমায়
এক মন জল টলোমলো,
চোখের চিলতে উঠোনকোনে
আমার আকাশ একলা হোলো।

একলা তখন আমার শহর
রাজপথ আর অন্ধগলি,
পাতায় পাতায় বিষণ্ণতা
খাতাতে নাম লেখা তোরই।

বুকের ওমে শিশির পড়ে
চেনা স্টেশন ভিজে যাওয়া,
একই খাতায় ছন্দ মেলাস্‌?
পর্দা সরায় দমকা হাওয়া।

এক এক সময় অনেক কথা
কথারও বয়স বাড়ে আবার,
চোখের পাতায় আকাশ নামে
সজল তখন উঠোন আমার।

কি রঙ ছড়ায় জানি না ঠিক
হয়তো হলুদ লালচে সবুজ,
ভিতর ভিতর আমার আকাশ
বুঝেও তবু ভীষণ অবুঝ।

বুকের মধ্যে সাদা কালো
কান্নাগুলো জিইয়ে রাখা,
প্রতিদিনই আমার আকাশ
ভীষণ একা ভীষণ একা।

মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১২

শহর ~ সুকন্যা ধর

রাত জেগেছে ঘুমের পায়ে পায়ে,
আলোকবর্ষ পেরিয়ে যাচ্ছে দুজন।
ভিতর ঘরে তবুও কড়া নাড়ে,
এবার শীতের বাতিল কথোপকথন।

ধোঁয়ার ভিতর ক্লান্ত শহর আঁকে,
দুজন থাকার ছোট্ট মাটির ঘর।
মেঘ জমে যায় ঘরের কোনে কোনে,
দুজন কোথায়? শহর নিরুত্তর।

শহর জানে রুক্ষ হাওয়া ওঠে,
শহর জানে মাটির বাসা ভাঙ্গে।
শহর জানে মলিন কথা যত,
দুজন বলে নিজের নিজের কানে।

নিজের হাতে মুখ ছুঁয়েছে দুজন,
নিজের গন্ধ রোজ শুষে নেয় ঠোঁটে।
শহর খোঁজ নেয়নি বলে দুজন,
পরস্পরের গর্ভে বেড়ে ওঠে।

বুধবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১২

কফিহাউস ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরি

কফিহাউস -১
----------------

আজ শনিবার
ওরা কি সবাই লেখে? ছবি আঁকে?
আরও কত কিছু করে প্রাণনিষ্ঠাভরে?
ওরা কি প্রতিভা আলো নাকি ওরা নিছক হুজুগ?
ওরা কি একলা না কি সবে মিলে এক?

বাতাসে ধোঁয়ায় ধোঁয়া মুঠোভরা সাদা বিষকাঠি
সামনে পানীয় কিম্বা নাও থাকতে পারে
অলীক পেয়ালা ভরা ম্লান অজুহাত
হাতে হাতে বদলায় আড় ভাঙা খাতা ম্যাগ পাণ্ডুলিপি
সূর্য না দেখা সেই বইটির কুমারী মলাট

বিষের গারদ শেষে জীবনের দেখাশোনা সেরে
ওই ওরা সদ্য কৈশোর পার যুবক যুবতী
ওই ওরা দারুণ অক্লান্ত আজও প্রৌঢ়তা পেরিয়ে
নীলকণ্ঠরা সব ফিরে গেছে পাখির বাসায়
কলকাতা সোদপুর বনগাঁ হাওড়া বা গড়িয়া
যার যার অন্ধকার অপেক্ষার কাছে

----------------------------------

কফিহাউস -২
----------------------

একপাশে বসেছেন প্রাজ্ঞ দলপতি
দশটি পাথরে মাপা রত্নগর্ভা ভাগ্যটুকু বসে আছে দুহাতে আঙুলে
প্যাসিভ স্মোকিং তাঁর অ্যাজমার ক্ষতি করছে জেনে তবু তিনি
বাধ্য ঋজু বসেছেন ধোঁয়ার সাগরে, ডান হাতে ইনহেলার বিশল্যকরণী
ডিম ভেঙে সদ্য ফোটা চার ফর্মা কবিতার ছানা
ওড়াউড়ি করছে খুব ভক্ত করতলে

নার্ভাস তরুণী কবি দু'ঘন্টায় নয়খানা সিগারেট ফুঁকে
প্রত্যেক শেষাংশগুলি বিলোলেন অর্থহীন শব্দশিকারিকে
ডায়রির ভাঁজ থেকে উঁকি মারল নবজাতকেরা
এর মাঝে তাড়া খেয়ে দু'দুবার কালো সাদা
শর্করার মাত্রা মাপা কফি ... এলো উদ্ভিজ্জ পকোড়া

এই কোলাজের মধ্যে আমি কই?
গডফাদারের বাঁ কাঁধের পেছনে চেয়ারে ওই যে সামান্য আবছা
অর্ধেক মুখ ঢাকা বোকা বোকা সংশয়ের চোখ ...
কেন আসা নিজেই জানিনা ... বসে আছি প্রসাদের দুরূহ আশায় ...
______________________________ _________________________

কফিহাউস - ৩
--------------------------------

একা তুমি... তুমি গুচ্ছ কবিতা
কারও চোখে জল মুচছো কবিতা?
কার সাথে তুমি শুচ্ছো কবিতা!
তুমি নও তত তুচ্ছ কবিতা ...

মঙ্গলবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১২

চেতনার রঙে পান না হল সবুজ ~ অমিতাভ প্রামাণিক

দুপুরে খাওয়ার পর আরামকেদারায় বসে একটা পান খান রবীন্দ্রনাথ, তার সরঞ্জাম নিয়ে মৃণালিনী পায়ের কাছে বসে পান সাজছেন। বাড়ির ঠিকে ঝি মোক্ষদা-র পুঁচকে মেয়েটা এসে বায়না ধরলো, সেও পান খাবে।
মেয়েটার বয়স বছর চারেক, সর্ষের তেলের শিশির মত গায়ের রঙ, মায়াময় চোখদুটি। সারা বাড়ি টো টো করে ঘুরে বেড়ায়, সর্বত্র তার অধিকার। কিন্তু এই বয়সেই তাকে পানাসক্ত করে তোলা কি ঠিক হবে?
রবি বললেন, তুই পান খাবি কী রে? তোকে আমি ভীমনাগের সন্দেশ খাওয়াবো। এখন ছবির খাতাটা নিয়ে আয় তো, কালারিং কর দেখি আমার সামনে বসে।
সে ছুটে গিয়ে তার ছবি রং করার খাতা এনে রবিকে দেখালো, একটাও ছবি রং হতে বাকি নেই আর। ঐ খাতারই শেষ পাতায় তাসের একটা স্পেডের আউটলাইন স্কেচ এঁকে রবি বললেন, 'নে এই পানটাতে রং দে দেখি।'

মেয়েটা আবার এক ছুটে গিয়ে নিয়ে এলো তার জলরঙের যাবতীয় কৌটো-সামগ্রী। তার কোনোটাতে রং আছে, কোনোটাতে ফুরিয়ে গিয়েছে। লাল, নীল, বেগুনী রঙের কৌটোতে কিছুটা করে রং আছে। অবন ঠাকুর তার একটা কৌটোয় কাঁচা হলুদের নির্যাস ভরে দিয়েছেন আর বলেছেন, সেইটা দিয়ে রং করা প্র্যাকটিশ করতে। একটা নতুন তুলিও দিয়েছেন। সে রবীন্দ্রনাথে
র আঁকা স্কেচটার ওপরে ঝুঁকে পড়ে তার কৌটোর তরল আর আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে রং করতে লাগলো।
এক মুহূর্ত বুঝি অন্যমনস্ক ছিলেন রবি। হঠাৎ স্ত্রীর আর্তনাদ শুনে তাকিয়ে দেখেন, মেয়েটা সেই পানের স্কেচের মধ্যে সবুজের বদলে বেগুনী রং বোলাচ্ছে। থতমত খেয়ে গেলো বাচ্চাটা, হাতে তুলে নিলো কাঁচা হলুদের কৌটোটা আর ওটা হাত ফস্কে পড়ে গেলো মৃণালিনীর হাতে ধরা চুনের ডিব্বায়। চুনের মধ্যে হলুদ পড়তেই সাদা ধবধবে চুনটা হয়ে গেলো খুনখারাপি লাল।
দুজনের মুখের হতাশ অবস্থা দেখে হেসে ফেললেন রবীন্দ্রনাথ। চার বছরের মেয়ে, সে কীই বা বোঝে! উনিই তার নাম দিয়েছেন চেতনা।
পাশে পড়ে থাকা কবিতার খাতাটা টেনে নিয়ে লিখলেন - আমারই চেতনার রঙে পান না হলো সবুজ, চুনই উঠলো রাঙা হয়ে...

শুক্রবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১২

বাল্মীকির ভুত - দেবী কুমার সাহা

আদিকবি বাল্মীকি বেশ সুখেই ছিলেন স্বর্গলোকে। সেই কবে মর্তলোকে ক্রৌঞ্চীর বিরহব্যথা তাঁর শোকোদ্বেল কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল সর্বপ্রথম কবিতার রূপে। তারপর তো জীবনভর সাধনায় লিখলেন প্রথম অনুপম মহাকাব্য রামায়ন – সে কথা কি তিনি ভুলতে পারেন? কবিতা না লেখার অতৃপ্তি তাই প্রায়শ তার স্বর্গসুখে মরচে ধরায়। সুদীর্ঘকাল স্বর্গসুখে থেকেও তাঁর সেই অতৃপ্তি গেল কই? অগত্যা একদিন ভূর্জপত্র আর লেখনী নিয়ে বসে পড়লেন কবিতা লিখতে। কিন্তু এ তো স্বর্গলোক – এখানে দুঃখ নেই, এখানে শোক নেই। তাই লেখনী কামড়ে ধরে বুঝলেন, এখানে কবিতা অসম্ভব। যন্ত্রনায় ছটফট করে উঠলো তাঁর মন, মর্তের কথা ভেবে মর্তের মায়ায় নিজেকে ফেললেন জড়িয়ে, তারপর হঠাৎ দেখলেন – মর্তের টানে মর্তেরই পানে ছুটে চলেছেন তিনি। 
কলকাতার প্রশস্ত রাজপথে আপন মনে পথ চলছিল পথচারীবৃন্দ। ছুটছিল অবিশ্রান্ত গাড়ির স্রোত। কিন্তু অকস্মাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল তা। সবাই সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল, রাজপথের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে কে এক সৌম্যদর্শন জটাজুটধারী। মুনিবর নিজেও চমকিত।

ধীরপায়ে তিনি পথের একপাশে এসে বিহ্বল চোখে তাকিয়ে রিলেন শ্রেনিবদ্ধ অশ্বহীন শকটের দিকে। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি ছিটকে গিয়ে পড়ল পথের অপর পারের আলোকজ্জ্বল গ্রন্থালয়ে। সাজানী রয়েছে সেখানে অজস্র সুদৃশ্য গ্রন্থ। সহসা তাঁর মনে প্রশ্ন উঁকি দিল, আজও কি পাঠক পড়ে তাঁর সেই অমর কাব্য রামায়ন? অদম্য কৌতুহলে তিনি সূক্ষদেহে ঢুকে পড়লেন সটান সেই গ্রন্থাগারে। খুঁজতে লাগলেন হন্যে হয়ে অমর সেই কাব্য। পেয়েও গেলেন অচিরেই। আনন্দে ডগমগ হয়ে উঠলো মন।

এমন সময় এলেন সেখানে এক তরুন কবি। গ্রন্থাগারিক নিজেও কিঞ্চিত কাব্যরসিক। দুজনে শুরু হল কিছু কথা কাব্যবিষয়ে। কবি বললেন, এ তো অতি সত্যি কথা – রবীন্দ্রনাথের ধারে কাছে কেউ নেই আজ। পাঠকের কাছে তাই রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন অন্য সব বিস্বাদ ঠেকে। সমস্ত কবিও আজ আচ্ছন্ন রবীন্দ্র প্রভাবে। এ প্রভাব এতই ব্যাপক, তা কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। অথচ পাঠকের কাছে রবীন্দ্রনাথ ও পুরনো। তাঁরা চান নতুন কিছু, নতুন স্বাদের। কিন্তু কবিকুল অসহায়। সামনে রুদ্ধ পথ। তাই আজ চাই নতুন কোনও ব্যাস বাল্মীকি কালিদাস।

সহসা নিজের নাম উচ্চারিত হতে দেখে আনন্দে শিহরিত বাল্মীকির হৃদয়। তক্ষুনি ভর করলেন তিনি তরুন কবির ওপর। আর পুলকিত হলেন ভেবে, এখনও তাঁর প্রয়োজন আছে এই মরজগতে। তাঁকে নতুন করে নতুন ঢঙে লিখতে হবে কবিতা, এই ভক্ত কবিকেই আশ্রয় করে।

এদিকে তরুন কবি অতর্কিতে হয়ে পড়লেন অপ্রকিতস্থ। তাঁর কণ্ঠ থেকে বেরোতে চাইল ছন্দবদ্ধ শ্লোক। অতিকষ্টে তিনি নিজেকে করলেন সংযমিত। মান রাখতে দ্রুত চলে গেলেন নিজের কক্ষে। খাতা কলম নিয়ে বসতেই, ঝড়ের বেগে তাঁর লেখা হয়ে গেল গুচ্ছের কবিতা। লেখা সাঙ্গ হলে সম্বিৎ ফিরে পেলেন। দেখলেন যা কিছু লিখেছেন, সবই অভিনব। এ গদ্য ও নয়, এ পদ্য ও নয় – গদ্যের মতো মিলহীন, কিন্তু পদ্যের মত কোথাও যেন রয়েছে এক অন্তর্লীন ছন্দ। উপমাগুলো হয়ে গেছে সব উদ্ভট। সমাসগুলোর অর্থের নেই কোনও সংগতি। এক পঙতির সঙ্গে অন্য পঙতির নেই কোনও ভাবগত যোগাযোগ। রসের আভাস আছে, কিন্তু ভাবের প্রকাশ নেই – এ যেন এক বিচিত্র খিচুড়ি। সব মিলে যা লেখা হল, তা কি বিষয়ে তাই বোঝা দুস্কর। সবটাই যেন হেঁইয়ালি। আবৃত্তি করতে গিয়েও খেলেন হোঁচট। হতোদ্যম হয়ে কিয়ৎক্ষন বসে রইলেন চুপচাপ।

কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হলো, এ বস্তু নতুন। হোক না এ হেঁয়ালি, হোক না দুর্বোধ্য, মহাবিশ্বের কতটুকু বুঝি, তা বলে কি তা নিরর্থক? তাছাড়া আছে এর অন্তর্লীন এক ছন্দ। আরো আছে এর কবিতার মতো আকার। তার ওপর পাঠক ও আছেন কিছু হুজুক প্রিয়। এ বস্তু হাতে পেলে তাঁরা নেচে উঠবেন দুহাত তুলে। প্রচারের গুনে সামান্য পাথর পায় পুজো, আর কাব্যের দেহ পেয়ে এ হবে উপেক্ষিত !  অতএব, বিলম্ব নয়, অচিরেই চাই এর প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সবেমাত্র যে বস্তু জন্ম নিল তার নামটি হবে কি?

পুরনোর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এ, সুতরাং এর নাম হোক, আধুনিক কবিতা। প্রথম কবিতার জন্মদাতা বাল্মীকি, জানে সর্বজনে। কিন্তু জানে না – প্রথম আধুনিক কবিতার জন্মদাতা বাল্মীকির ভূত।