রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

লোভে লাভ ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য

তারপর একসাথে অনেকগুলো সোনার ডিম পাবে ভেবে লোকটা তো হাঁসের পেটটা ফেলল কেটে। কোথায় কী! মাঝ থেকে হাঁসটা গেল মরে।
'লোকটা' আবার কি! তার তো একটা নাম তো থাকা উচিৎ! আচ্ছা, ধরা যাক তার নাম ছিল ভুতো।

ভুল কাজ করবার পর যা হয়, মাথা চাপড়ানি, হায় হায়। কথামালার গল্পের সারমর্ম, উপদেশ। সে সব চুকে গেলে মাথায় চাপল শয়তানি।
পাড়ার হাবু অনেকবার তার কাছ থেকে হাঁসটা কিনতে চেয়েছিল। এই সুযোগ। ভুতো মুখচোখ মুছে ভালমানুষটি হয়ে হাবুর বাড়ি গিয়ে বলল, 'ভাই রে, হঠাত কিছু টাকার দরকার, ভাবছি ঐ সোনার ডিমপাড়া হাঁসটা বেচে দিই। তাই তোর কাছে এলুম। হাজার পাঁচেক টাকা হলেই আমার চলবে। তুই যদি রাজী না হোস, তাহলে ও পাড়ার বঙ্কুর কাছে যাই।'
হাবুর তো হাতে স্বর্গ! পাঁচ হাজার টাকায় এস ডি পি এইচ! (মানে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। আজকাল আবার সব শর্টে শাঠ্যং তো!) তক্ষুণি সে এটিএম থেকে টাকা তুলে এনে ভুতোকে বলল, 'আমিই কিনব। কিন্তু হাঁসটা কই?'

-'সঙ্গে আনিনি, যদি তুই রাজী না হোস। আমার বাড়ীতেই আছে, গিয়ে নিয়ে নে! আমি একটু জরুরি কাজে চললুম। আসি ভাই?' 

আর আসে! হাতে টাকা পেয়ে ভুতো সঙ্গে সঙ্গে সামনের পগারটা পার হয়ে সেই যে গেল, আর পাক্কা একটা বছর গ্রাম মুখো হল না। 

লোভে পাপ হল, পাপে লাভ। গপ্পোটা কিন্তু এখানেও শেষ নয়।

বছর ঘুরলে ভুতোর মনটা খচখচ করতে লাগল। মরা হাঁস কিনে হাবু ঠিক কেমন মুরগি হলো? তার নামে মামলা ঠুকেছে কি? নিদেনপক্ষে ফেসবুকে আপডেট? শেষমেষ যা থাকে কপালে ভেবে সে চলল গ্রামে ফিরে।

হবি তো হ', রাস্তাতেই হাবুর সংগে দেখা। ভুতোকে দেখে সে তার বাইক থামিয়ে দৌড়ে এল। মারবে নাকি! না না, 'ওরে ভুতো রে, কতদিন দেখা হয় নি!' বলে জড়িয়ে ধরে, টেনে নিয়ে গেল পাশের রেস্টুরেন্টে। চা, মামলেট অর্ডার দিল। দিব্যি খোশমেজাজ! ভুতো তো হতভম্ব, পাঁচ হাজার টাকার শোকে হাবুর মাথাটাই বিগড়েছে নাকি!

-তারপর, কী খবর তোর! জরুরি কাজ বলে সেই যে চলে গেলি...
-হ্যাঁরে, তোর মনে আছে, সেই হাঁসটা...
-মনে থাকবেনা কেন! কিনলুম তো তোর কাছ থেকে! আর তার জন্যেই তো আমার এত উন্নতি!

-কী বলছিস! ওটা তো মরে গেছিল!
-হ্যাঁ তো। তোর বাড়ী পৌঁছেই বুঝলুম যে ঠকে গেছি। তখন আর কান্নাকাটি করে কী লাভ! ভেবেচিন্তে পেপারে একটা অ্যাড দিলুম, একশো টাকার লটারি, ফার্স্ট প্রাইজ এস ডি পি এইচ!
-তারপর? টিকিট বিক্রি হলো?
-হবে না আবার! দু-তিনটে গ্রাম মিলিয়ে পাঁচশো টিকিট বিক্রি! নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা এল হাতে!
-সেকিরে! লটারির দিন কী করলি?
-কী আবার করব! লটারি করলুম! নাম উঠল নবগ্রামের পঞ্চার!
-পঞ্চা কে কী বললি?
-বলার কী আছে! লটারি জিতেছে, বললুম হাঁসটা নিয়ে যা!
-মরা তো!
-হ্যাঁ, পঞ্চাও বলল, হাঁসটা মরা তো! বললুম, আমি তো বলিনি জ্যান্ত!
-পঞ্চা রাগ করে নি?
-কেন করবে! ও মরা হাঁস নিতে রাজী হলো না দেখে ওর একশো টাকা ওকে ফিরিয়ে দিলুম, আর সেদিন আমাদের বাড়ি ডাক রোস্ট হলো!! হ্যাঁ, তুই কিন্তু আজ দুপুরে আমার বাড়ি খাবি! তোরই জন্যে তো সব পেলুম!! 

(সারমর্মঃ  লোভ, পাপ, অন্যায়, এ কলিতে সবই মায়া...
সত্য কেবল মার্কেটিং, মার্কেটিং, আর মার্কেটিং, ভায়া!!)

শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

একুশে ফেব্রুয়ারি, দু হাজার তেরো ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​(আমি) বাংলায় হাঁটি পথ
(টানি) বাংলার জয়রথ
(ভুল) হলে ক্ষমা চাই বাংলায়, দিই বাংলায় নাকখৎ -
বাংলা আমার উদাসী বাউল
মনের ভাব প্রকাশ
(আমি) যেখানেই থাকি, সেখানেই করি শুধু বাংলায় বাস।

(আমি) বাংলায় করি চাষ
(দেখি) উদাত্ত নীলাকাশ
বাংলার নদীপাড় ঘেঁসে আমি ফুটে হই সাদা কাশ।

(আমি) বাংলার সিঁদুরে রাঙাই সিঁথি
বাংলায় বাঁধি চুল
(আমি) হাঁচি-কাশি সব বাংলায়, থাকি বাংলায় মশগুল।
বাংলা আমার সন্ধ্যা-আজান
প্রভাতী পুজোর ঢাক
শুভস্বপ্নের মত দুই বাংলাও এক হয়ে মিশে যাক।

মঙ্গলবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

সি বি আই –এর চার্জশিট ও কিছু (বদ)বুদ্ধিজীবী - সদানন্দ কারিগর

কোথায়? তালপাটি-র খালের জলে মুণ্ডু কেটে ভাসিয়ে দেওয়ার দিবা স্বপ্ন দেখা দেড়েল কবি আজ কোথায়? বুদ্ধদেবের ছবির ঠোঁটে রক্তের রঙ লাগিয়ে নরেন্দ্র মোদীর সাথে তুলনা করা কাক আঁকিয়ে কে দেখছিনা যে! হাজার হাজার বাচ্চার পা চিড়ে খালের জলে ভাসিয়ে দেওয়ার গল্প বলিয়ে স্বঘোষিত দিদি আজ চুপ কেন? গণহত্যার গল্প ফাঁদা গণমাধ্যম আর দাসানুদাস পরিবর্তন প্রিয় (বদ)বুদ্ধিজীবীরাই বা কোথায়?  

চুপ আরও কেউ কেউ। ৩৪ বছরের আন্দোলন বিমুখতায় মেদ সর্বস্ব কোনও কোনও বাম নেতাও চুপ। ‘লজ্জায় মাথা কেটে যাওয়া’ গোঁসাই মশাই ও চুপ।   

ফলে গলার রগ ফুলিয়ে, মাথা ঝাঁকিয়ে চ্যাঁচামেচিটা আমাদেরই করতে হবে। করতেই হবে কেননা, স্বজন হারানো ভিটে মাটি ছাড়া ক্যাম্পে থাকা এক মা-এর কোলে জন্ম নেওয়া ফুটফুটে একরত্তির ‘সন্ত্রাস’ (বাচ্চাটার নাম)-এর হাত ধরে কথা দিয়েছিলাম যে। বুড়ো মেনাজ দা-কে ওর ভাঙ্গা ক্ল্যারিওনেট এর দোহাই দিয়েছিলাম যে। কেননা, খুন হয়ে যাওয়া আমার কমরেড-দের চিতার আগুনে নিজেদেরও পোড়াতে পোড়াতে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে। ‘ক’ টাকে ‘ক’ বলার অপরাধে আমরাও সেদিন ‘হার্মাদ’ হয়েছিলাম যে।
অতএব লড়াই চলবে। লড়াই এর নিয়মেই সেদিন দু’পা পিছিয়ে এসেছিলাম। আজ আবার এগোনোর শুরু। আবার নতুন করে বলব সেদিনের কথা। বলব, ‘কোন জমি অধিগ্রহণ হবেনা’- তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেবের প্রতিশ্রুতি স্বত্বেও, নন্দীগ্রাম কে রাস্তা কেটে বিচ্ছিন্ন করে রাখাটা তৃণমূল তথা ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির ভুল নয়, ছিল গণ্ডগোল বাঁধানোর পরিকল্পিত প্রয়াস। সাউদাখালি-র বিশ্বজিৎ মাইতি, সোনাচুরার ভুদেব মণ্ডল, সুদেব মণ্ডল, রবিন ভুঁইয়া, তালডাংরার শঙ্কর সামন্ত কে খুন করাটা ওদের এলাকার মানুষদের সন্ত্রস্ত করে রাখার পরিকল্পিত ছক ছিল। তাই পরিবারের লোকের সামনে, ভুদেব মণ্ডলকে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে অথবা শঙ্কর সামন্ত কে তলোয়ার দিয়ে চিরে জ্বলন্ত খড়ের গাদায় ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার বীভৎসতা। সাধুচড়ন চট্টোপাধ্যায় এর পচে ফুলে ওঠা চোখ বেড়িয়ে যাওয়া বিকৃত দেহটা যদিও  (বদ)বুদ্ধিজীবীদের ‘হাড় হিম’ করেনি, নন্দীগ্রাম-এর মানুষদের করেছিল।  সিঙ্গুরের তাপসী মালিক বা সোনাচুরার  সুনিতা মণ্ডল –কে ধর্ষণ করে খুন করাটা ছিল পলিটিকাল অ্যাজেন্ডা। কামদুনি থেকে লাভপুর- সেই ট্র্যাডিশন সমানে  চলেছে। বেশি ট্যাঁ ফুঁ করেছ কি বাড়ির মেয়েরা ধর্ষিতা হয়ে যাবে। ‘গুণ্ডা পোষা’ নেত্রীর গুণ্ডা কর্মীর সগর্ব হুঙ্কার- ‘কামদুনি করে দেব’। বাচ্চা- মহিলাদের সামনে এগিয়ে সশস্ত্র কাপুরুষের দল পেছনে থেকে ১৪ই মার্চ ২০০৭ এ যে ‘প্রতিরোধ’ গড়েছিল, তা ‘কি প্রতিরোধ করতে?’- জানা নেই। কিন্তু সি বি আই এর চার্জশিট-এ পরিষ্কার, নেপথ্যে কারা ছিল। অভিযুক্ত ১২৯ জনের বেশীর ভাগই তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী। আর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া বি ডি ও, নীতিশ কুমার দাস এখন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব এর ব্যক্তিগত সচিব। কারা মন্ত্রীর  ব্যক্তিগত সচিব হয়? কেনই বা দময়ন্তী সেন-দের বদলি হতে হয় সুদূর দার্জিলিং-এ? উত্তরের অপেক্ষা রাখে না।   

সবে সি বি আই এর চার্জশিট বেরিয়েছে। সিঙ্গুর কৃষিজমি রক্ষা আন্দোলন-এর নামে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ৫৬ টা সংগঠন বা তার থেকে বাছাই করা পশ্চিমবঙ্গ কৃষিজমি রক্ষা কমিটি- র ১৯টা সংগঠন আর তাদের মাথা তৃনমূল কংগ্রেস তো আর চুপ করে বসে থাকবেনা। চুপ করে বসে থাকবেনা আমেরিকান কনসোল জেনারেল হেনরি জার্ডিন আর তার চেলা চামুণ্ডারা। সামনে লোকসভা নির্বাচন। কারা সরকার গড়বে জানা নেই। ফলে, এই চার্জশিট এর পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটবে কিনা, সেটাও অজানা। শুধু কিছু প্রশ্ন, উত্তর খুঁজে বেড়াবে। আর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত জারি থাকবে আমাদের লড়াই।   
   
তোষামুদে (বদ)বুদ্ধিজীবীরা নাটুকেপনায় পটু হবেই। হাওয়া মোরগের দল ততক্ষণ দুলবে, যতক্ষণ না তাদের কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার পাচ্ছে। সবাই তো আর তা না। সাময়িক ভুল বোঝাবুঝিতে যারা তাৎক্ষণিক পরিবর্তন পিয়াসি হয়েছিলেন, শোনা যায়, আজ তাদের অনেকেই হাত কামড়াচ্ছেন। নিজেকে রক্তাক্ত না করে, আর একবার রাস্তায় নামবেন কি তারা? সেটাও সময় বলবে।  


আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল লড়াই-এ পাশে থাকার। লড়ে যাওয়ার। লড়াই- সম্মিলিত আক্রমণের বিরুদ্ধে। মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে। মতাদর্শের জগতে হামলার বিরুদ্ধে। আজও ঘোষণা করতে দ্বিধা নেই, পাশেই আছি। আমরা যে সময়-এর সারথি। লাল ঝাণ্ডার কসম, আজও বেঁচে আছি, আরও একটা সূর্যোদয়-এর প্রতীক্ষায়।।   

রবিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

মাইন হ্বাইডারস্টান্ড এবং অন্য তালিকা - লালমোহন গাঙ্গুলী

জার্মান শব্দের সঠিক উচ্চারন বাংলায় লেখা খুব কঠিন। আলি সাহেব হলে হয়ত পারতেন। আমার সে দুঃসাহস কোথায়? কাজেই “Mein Widerstand” এই শব্দরূপকে কোনক্রমে খাড়া করেছি। এটা একটা বইয়ের নাম, এবং বলাই বাহুল্য, লেখক জার্মান। এক সময় ওপার বাংলার ছিন্নমূল মানুষকে “জার্মান” বলে মজা করে ডাকা হতো। অবশ্য সে মজার মধ্যে নেহাত মজাই ছিলো, কোন ভাবে ছোট করার প্রয়াস ছিলোনা। বাঙাল আর জার্মান, দুজনেরই নাকি একই রকম গোঁয়ার। কিছু করবো ভাবলে করেই ছাড়ে। যাই হোক, এই বিদঘুটে নামওয়ালা বইয়ের লেখক ফ্রিডরিষ কেলনার ছিলেন জার্মান সরকারের মাঝারি গোছের কেরানি। লিনৎস্‌ আর লাউবাখ অঞ্চলে প্রধানত সরকারি আইন দফতরে কাজ করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের একটা বড় অংশই কাটে হিটলারের শাষনাধীন জার্মানীতে। তাঁর লেখা বইয়ের নামের বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় – “আমার বিরোধীতা”। আসলে বই লিখবেন বলে লেখেননি। বলা চলে এ হলো একটা নোটবই। প্রথম পাতায় কেলনার লিখেছেন – “ওদের ক্ষমতা প্রচুর, ওরা আমার কন্ঠস্বর রোধ করে দেবে, বর্তমান সময়ে নাৎসিদের সঙ্গে আমি লড়তে পারবো না। তাই ঠিক করেছি, আমি ওদের সঙ্গে ভবিষ্যত সময়ে লড়বো। আমার চোখে দেখা ওদের বর্বরোচিত সবকিছুকে লিপীবদ্ধ করে রাখছি, আর ওদের থামাবার উপায় ও লিখে রাখছি”। কেলনার সাহেব জাত জার্মান, লড়াইয়ের গোঁ তিনি ছাড়েননি, কেলনার সাহেব জাত জার্মান, তাই বুদ্ধিদীপ্ত ভঙ্গিতে নিজের এবং প্রতিপক্ষের ক্ষমতা যাচাই করে লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি স্থির করেছেন। তাঁর নোটবইতে কেলনার সাহেব নিজের চোখে দেখা ও শোনা প্রতিটি অপরাধ লিপীবদ্ধ করেছেন, তার প্রামানিক খবরের কাগজের কাটিং সেঁটে রেখেছেন, আর কিছু ক্ষেত্রে, যে টুকু পেরেছেন, প্রামানিক অন্য নথিপত্রও নোটবই তে রেখে দিয়েছেন। নিখুঁত পেশাদার কাজ। ধাপে ধাপে সাজানো। আইনের দফতরের কর্মী বলে, আইনকানুন সম্পর্কে পরিস্কার ধারনা ছিলো তাঁর। কোন প্রমান গ্রাহ্য হবে, কোনটা হবেনা, নিশ্চিত ভাবেই জানতেন। ন্যুরেমবার্গের বিচার হয়েছিলো নাৎসি মাথাদের। কিন্তু এমনটা মনে করা উচিত নয়, এনারাই সব। প্রতিটি মহল্লায় , জনপদে অসংখ্য অপরাধ ঘটেছে। যুদ্ধ শেষের জার্মানিতে এই সব জল্লাদ শয়তানদের খোঁজ-তল্লাস ও সাখ্যপ্রমান মোটেই সোজা ছিলো না। কেলনার সাহেব তাঁর সমস্ত প্রমান সমেত নোটবইটি তুলে দেন আদালতের হাতে। বহু ঘাঘু নাৎসি শয়তানকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয়। এমনকি বহু বছর পরে ধরা পড়া কিছু নাৎসিকেও শাস্তি দেওয়া যায় এই সাখ্যপ্রমান থেকে। ১৯৬৮ সালে এই নোটবই ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়। অতি সম্প্রতি, ২০১১ সালে এই নোটবই, আস্ত একখানা বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে।

অনেক দুরের দেশ জার্মানি। তবু কেন জানি আজকে ফ্রিডরিষ কেলনার আর তাঁর এই বিরোধিতার কথা বড্ড মনে পড়ছে। শাষক বহুগুনে শক্তিশালী, সামনাসামনি বিরোধিতা করতে যাওয়াতে বীরত্বের পরিচয় আছে, কিন্তু ফল কতটা হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অযথা রক্তক্ষয় আর লাশের রাজনীতি কখনো কোন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল করতে পারে না। আজ, ৯ই ফেব্রুয়ারী ২০১৪ সাল, দুপুর বেলা লাখ লাখ মানুষের সামনে বিমান বসু একটা খুব কাজের কথা বলেছেন। মমতা ব্যানার্জি কয়েক দিন আগে বলেছিলেন, এলাকায় এলাকায় তালিকা তৈরি করতে। যাঁরা এখনো তৃনমূল কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করছেন না, বা কাজের বিরোধীতা করছেন, তাঁদের নামের তালিকা। আজ দুপুরে, মধ্যাহ্নের সূর্য্যকে আর সামনে হাজির লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ আর শ-খানেক টিভি ক্যামেরাকে সাক্ষ্যী সামনে বিমান বসু বললেন – তালিকা এদিকেও তৈরি হচ্ছে, এবং কাজের হিসেব রাখা হচ্ছে। যারা জনগনের শত্রু, যারা মা বোনের ইজ্জত লুটছে, যারা দিনের পর দিন মনুষ্যত্বের অপমান করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, তাদের তালিকা। ক্ষমা করা হবে না কাউকে। একজনকেও নয়। লেনিন বলেছিলেন – “A man in power is more powerful than a powerful man”। বামপন্থি মানুষ দুর্বল , তাঁদের মনের জোর নেই, তাঁরা লড়তে জানেন না, এরকম কেউ বলছেনা। বা বললেও আমরা শুনছি না। হঠকারী পদক্ষেপ নয়। চাই সংঘবদ্ধতার শক্তি। সাংগঠনিক শক্তি। বিমান বসু যখন বললেন – আগামী দিনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে, লড়াইয়ের শপথ নিতে, আজকের ব্রিগেডের লক্ষ লক্ষ গলা আকাশ কাঁপিয়ে সেই শপথ নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে গেলো। যারা অবরোধ এড়িয়ে, হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে, হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে এসেছে, তাদের ঘৃনা, প্রতিস্পর্ধা আর ক্রোধের হুঙ্কারে কেঁপে গেছে কেউ কেউ। তাই পরে দেখেলাম টিভি তে কোন নেতা বলছেন দিশাহীন ব্রিগেড, কেউ বলছেন নীতিহীন বাম। কিন্তু সবার চেয়ে সরল ভাষায় টিভি ক্যামেরার সামনে বলে গেলেন এক গ্রাম্য তরুন। বললেন, তিনটে বিধায়ক গেছে, ওরা যাওয়াই ভালো। কিন্তু বামফ্রন্ট আমরা, এই সাধারন মানুষ। আমরা আছি, থাকবো।


বিরোধিতা, আর প্রতিরোধ, সেটা গাড়ির বনেটে নেচে, বা রাস্তায় বসে পড়ে হবে না। হবে মনের ভেতর , বুকের ভেতর, আর হাতে হাত রেখে। কোন রকম বড় প্রচার, ফেস্টুন ব্যানার আর দামি ফ্লেক্স ছাড়াই আজ সাধারন মানুষ যে বিরোধিতা দেখালেন, তাকে সেলাম জানাই। আর হ্যাঁ, তালিকা প্রস্তুত করবো। আজ থেকে। শক্তিশালী শাষকের সঙ্গে রাস্তায় নেমে লড়াই নয়। তার বন্দুকের গুলি খেয়ে অকালে ঝরে যাওয়া নয়। বরং সংঘবদ্ধ হওয়া, আর নিরবে মনের ভেতরে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আজ বাদে কাল আমাদের দিন আসবেই। নেতারা নয়, সাধারন মানুষের বামফ্রন্ট। আজকের ব্রিগেড সেকথাই প্রমান করে গেলো। আগামী কাল, বামফ্রন্টের বিজয় সমাবেশে এই মানুষ গুলোই আসবেন। ততদিন, তালিকা তৈরি রাখুন। কেউ যেন বাদ না পড়ে।

শনিবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

​সেদিন প্রভাতে ~ অমিতাভ প্রামাণিক

গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরছি। হাতে একটা মাঝারি সাইজের ট্রলিব্যাগ, চাকা লাগানো। তবে রাস্তার অবস্থা তো এমন নয় যে তার ওপর দিয়ে সেই ব্যাগ টেনে নিয়ে হাঁটা যাবে। চাকাগুলো একটা গর্তে ঢুকলে আর বেরোবে না। তবে ব্যাগে বিশেষ কিছু নেই। শীতকাল হলে মা বড়ি আর পাটালি ভরে দেয়, এখন গরম, সে সবের সময় নয়। যদিও বলছিল, কটা নারকোল ছাড়িয়ে নিয়ে যা। হুঁ, মাজদিয়া থেকে টেনে টেনে ব্যাঙ্গালোরে নারকেল আমি বয়ে নিয়ে যাব আর কী!

গ্রামের সমস্ত প্রভাতে অনিবার্যভাবে একটা পবিত্রতার গন্ধ লেগে থাকে। উঠোনে গোবরছড়া দেয় কাকিমারা, ফুল তুলে বেতের সাজিতে ভরে পাশের বাড়ির মেয়েটি, কাঁসার বালতিতে গরুর দুধ দোয়াতে আসে ও পাড়ার বৌটা, এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে অনিচ্ছুক শিশুকণ্ঠে ভেসে আসে ইমনের সুরে – ধনধন মূরত কৃষ্ণমুরারী। আমার অবশ্য এ সবের সৌন্দর্য উপভোগ করার উপায় নেই, মন ভারাক্রান্ত। মা কান্নাকাটি করে। বাবা নিস্পৃহ, প্রণাম করলে সবাইকে প্রতিনমস্কার করা তাঁর স্বভাব। ইদানিং তার সাথে যোগ হয়েছে – আবার যখন আসবি, আমার সাথে যে দেখা হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। আমার হঠাৎ তখন নিজেকে খুব অসহায় লাগে। মনে হয়, দূর, আত্মীয়-পরিজন ফেলে কী যে হাতিঘোড়া করছি, এখানে থাকলেই তো হয়। ধুপ করে বসে পড়ি তক্তাপোষে। বাবাই তাড়া লাগায়, ওঠ, যা, দেরি হলে ট্রেন চলে যাবে।

বাড়ি থেকে স্টেশন অলসভাবেও হেঁটে গেলে বড়জোর দশ মিনিট। আমি আমাদের গলিটা থেকে বড়রাস্তায় উঠেছি কি উঠিনি, পেছনে ভটভটি নিয়ে হাজির খোনে। ওর ভাল নাম প্রকাশ, ডাকনাম ক্ষৌণীশ থেকে খোনে। আমাদের লাগোয়া বাড়ির বাল্যবন্ধু, একসঙ্গে আমরা স্কুলে পড়েছি বারো ক্লাশ অবধি। এখনো সূর্য ওঠার কিছুটা বাকি, তবে ওর চোখে এখনই কালো রোদচশমা। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক মেরে আমাকে বলল, মিঠু! চলে যাচ্ছিস? কখন এলি?

আমি বললাম, আমার তো জানিসই। কাল রাত্রে।
- হুম, তোর তো এই রকমই ব্যাপার। তো আমাকে ডাকবি তো। আমি থাকতে একা একা হেঁটে হেঁটে তুই এতটা রাস্তা যাবি? তুই শহুরে মানুষ, তোর কি হাঁটাহাঁটি অব্যেস আছে?

খোনে জানে না আমি সওয়া দু ঘন্টায় হাফ ম্যারাথন দৌড়াতে পারি, ওটা দু ঘন্টায় নামানোর জন্যে লড়ছি। আমি বিনা বাক্যব্যয়ে ওর মোটর সাইকেলের সওয়ারি হয়ে যাই। অ্যাক্সিলেটরে চাপ দিয়ে খোনে বলে, তো এখনো সেই ব্যাঙ্গালোরেই আছিস তো, না কী? তোদের ব্যাঙ্গালোরে একবার যাব, বুঝলি? গিয়ে দেখে আসব কেমন সেই স্বপ্নের দেশ।

ও এখন কী করছে সেটা জিজ্ঞেস করতে জানলাম খোনে এবার পঞ্চায়েত ইলেকশনে কংগ্রেস প্রার্থী। এর আগে সিপিএম থেকেও ও লড়েছে, এবং হেরেছে। এবারেও খোনের ভোটে হারা একেবারে নিশ্চিত, জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়াও বিচিত্র না, তবে ও নিঃসন্দেহ যে ওই জিতবে। আমাকে বলল, এরা তো ভোটের স্ট্র্যাটেজি ব্যাপারটা জানে না, কংগ্রেস হল ন্যাশনালিস্ট পার্টি। আমাদের সব হাইকম্যান্ড থেকে নির্দেশ আসে। সনিয়া গান্ধী বলে দেবে কী কী করতে হবে। এদের মত উঁচাটে পাড়ার দাদাগিরি আমাদের পার্টির উদ্দেশ্য না। দেড়শো বছরের ঐতিহ্য এই পার্টির। গান্ধীজী শুরু করে গেছিল, সে কী আজকের কথা!

খোনের ভটভটি ঢুকে গেল একেবারে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। কাকে হঠাৎ নজরে পড়তে চেঁচিয়ে উঠল, এই মদনা, শালাচ্ছেলে একেনে কী কচ্চিস? মাঠে যাসনি আজ? শোন, এদিকে আয়।

মদন নামের যুবকটি কাছে আসতেই খোনে বলল, যা একটা টিকিট কেটে নিয়ায় তো। মিঠু কি শিয়ালদা অবদি যাবি, না দমদম? একই ভাড়া অবশ্য, যা যা একটা শিয়ালদার টিকিট কেটে নিয়ায়। এই নে টাকা।

খোনে নিজের পকেট থেকে টাকা বের করতে যাচ্ছে দেখে আমি ফট করে মানিব্যাগ বার করে মদনের হাতে একটা একশো টাকার নোট এগিয়ে দি। আমাদেরটা ডাউন প্ল্যাটফর্ম, টিকিটঘর আপের দিকে। মদন প্ল্যাটফর্ম থেকে লাইনে লাফিয়ে পড়ে ওদিকে চলে যায়।

- চ, চা খাবি চ।
- আমার চা খাওয়ার তেমন অব্যেস নেই রে খোনে।
- ও এখনো ধরিসনি? তুই সেই একই রকম থেকে গেলি। এখনও কি আঙুল দিয়ে হাওয়ায় এবিসিডি লিখিস? ঘুমানোর সময় মাথা নাড়াস? চ, সামনের দিকে চ। তুই না খাস, আমি একটু চা খাই।
- কিন্তু মদনা?
- আরে ও ঠিক খুঁজে নেবে। ব্যস্ত হচ্চিস কেন?

প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানের পাশেই একজন বিরাট একটা মাটির জালায় জল ভরে তাতে একটা শিশি থেকে ঢেলে সবুজ রং মেশাচ্ছিল। তার পাশে পাঁচ ছটা চটের বস্তায় পটল ভর্তি। এ রকম নধর পটল আমাদের ওদিকে দেখাই যায় না প্রায়। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সে বলল, যাচ্চিস?
আমি বললাম, হুঁ।

কিন্তু কে এ? আমাকে চেনে, অথচ আমি চিনতে পারছি না! নাকি আমাকে অন্য কারও সাথে গুলিয়ে ফেলেছে?

চায়ের দোকানে খোনে লেবু চা অর্ডার করতেই আমি বললাম, আমার জন্যেও একটা বলে দে। ততক্ষণে মদনও টিকিট এনে সেখানে হাজির। খোনে ওর হাত থেকে টিকিটটা নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখল। ফেরত টাকাগুলো এক এক করে গুণলো। শিয়ালদার পঁচিশ টাকা ভাড়া। সাতটা দশটাকার নোট আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে পাঁচটাকার কয়েনটা নিয়ে মদনের হাতে দিয়ে বলল, যা ভাগ। বিকেলে হাটখোলার মাঠে আসিস।

আমি খোনেকে বললাম, ওখানে পটলে রং মেশাচ্ছে লোকটা কে রে? আমাকে চেনে মনে হল!
- ওমা, তুই ওকে চিনতে পাল্লি নে? আমাদের বাদলা। তোদের বাড়ি এসে পড়ে গেছে স্যারের কাচে। সংস্কৃত ক্লাসে একবার নন্দবাবুর কাছে বেধড়ক ক্যালানি খেল, মনে নেই?
- ঘোষপাড়ার বাদলা?
- হ্যাঁ, বাদলা আবার কটা স্যারের কাচে পড়তে আসত? ওই।
- এখন কী করে?
- কী আবার করবে? কাঁচামালের ভ্যান্ডারি করে। ছটা চব্বিশের ট্রেনে ওর মাল যাবে, এটায় না।

ধোঁয়াওঠা কাঁচের গ্লাসে লেবু চার স্বাদ মন্দ না। আমি গ্লাস হাতে এগিয়ে গেলাম বাদলার দিকে। পেছন পেছন খোনেও। ওই শুরু করল, এই দ্যাখ বাদলা, শহরে গেলে বাবুদের হাল কী হয়। তোকে চিনতেই পারছে না।
বাদলা বলল, ধুস, মিঠু আমায় চিনবে না? হতেই পারে না। কাকিমার সাথে আমার ডেলি দেখা হয়। মিঠু, মাকে জিগ্যেস করে দেকিস, গতবার যে বড়ি দিল আড়াই কেজির, তার পাকা চালকুমড়ো জুগাড় করে দিল কে? এই তো কদিন আগে একটা কাঁঠাল দিয়ে এলাম কাকিমাকে। স্যার দেখলাম বসে বসে টিভি দেখছেন।

আমি হাসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, পটলে কী মেশাচ্ছিস?
- রং। এসব তো বাবুদের পেটেই যাবে, কলকাতার বাবুদের। তারা একটু বেশি সবুজ পছন্দ করেন। তাই আর একটু সবুজ করে দিই।
- কিন্তু বাদলা, তোর পটল তো এমনিতেই দারুণ সবুজ রে। আমারই ইচ্ছে করছে ক কেজি বয়ে নিয়ে যেতে ব্যাঙ্গালোরে।
- তো নে না। যতখুশি নে।
- কিন্তু তুই যে কী কালার মেশাচ্ছিস।
- তাতে কী? সবাই মেশায়।
- এগুলো ভাল জিনিস না রে বাদলা। এই রংগুলো
- ভাল জিনিস না মানে?
- মানে এগুলো সব এক একটা পয়জন বলতে পারিস।
- পয়জন, মানে বিষ? বলিস কী! একেনে সবাই এই মাল পটলে দ্যায়।
- হুম, বিষই। এমন বিষ না যে খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মরে যাবে। তবে শরীরের পক্ষে খুব খারাপ। আগে সবুজ করার জন্যে তুঁতে দিত। তুঁতে জানিস তো, ঠাকুমা দিদিমারা মুখে রাখত দাঁত শুলোলে। তুঁতের জীবাণু মারার ক্ষমতা আছে, যদিও বেশি পেটে গেলে সেও বিষ। এখন এই যে শিশিতে দেখছি, এটা তুঁতে না। এ একধরণের অর্গ্যানিক ডাই, এটা সম্ভবত ম্যালাকাইট গ্রীন। বিষাক্ত জিনিস। আগে অন্যদেশে খাবারে সবুজ রং করতে ইউজ হত, কিন্তু এখন সব জায়গায় ব্যান্‌ড্‌।
- তাই?
- হ্যাঁ। ভেবে দেখ, একটা মা তার আদরের বাচ্চাটাকে তোর এই পটলের তরকারি খাওয়াচ্ছে। আর তার ছোট্ট শরীরে সবার অজান্তে জমা হচ্ছে বিন্দু বিন্দু বিষ। বাচ্চাটার মাঝে মাঝে পেটব্যথা হয়, ডাক্তারবদ্যি কেউ ধরতে পারে না কী রোগ। সেগুলো এই সব থেকে হতে পারে।

সবুজ শিশিটা ছুঁড়ে দূরে এক ঝোপের মধ্যে ফেলে দিল বাদলা। বলল, আমরা কী এসব জানি? লেখাপড়া শিখতে পারিনি। ভাগ্যিস তুই বললি। অকারণে পাপের ভাগী হতে চাইনে আর।

প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকছিল। ওদের হাত নাড়িয়ে আমার ট্রলিব্যাগ হাতে আমি ট্রেনে উঠে পড়লাম।

পয়লা ফেব্রুয়ারি ২০১৪

শুক্রবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৪

​ব্রিগ্রেড বচন ~ রকল্প ভট্টাচার্য

আজকের সমাবেশে ২৫ লক্ষ মানুষ এসেছেন।(যাঁরা বলছেন আড়াই লাখ, তাঁরা আমাদের প্রতিটি রাবণের একটিমাত্র মাথাই গুনেছেন।)

নন্দীগ্রামে কাণ্ডে সিবিআই কংগ্রেসের এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছে। (সাধে কি আমি সারদা কান্ডেও সিবিআই তদন্ত চাইনি? যারাই আমার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পাবে, তারাই...)

আমাকে মানবাধিকার শেখাবেন না।(ওই অধিকার কেবল মানবদেরই শিক্ষণীয়।)

কেন্দ্রে পরিবর্তন আনতে হবে। গ্রামে গিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে সাক্ষর নিন। (আর না দিলে, হ্যাঁরে অনু, কী যেন বললি, গাড়িচাপা না কি?)

কেন্দ্র সব টাকা কেটে নিয়ে না-গেলে বছরে ১০ লক্ষ বেকারদের চাকরি দিতাম।(এই তো, আজই পঁচিশ লক্ষ কে রাহাখরচ হাতখরচ দিয়ে... আর এরকম 'বিগ্রেড' তো আমার লেগেই থাকে...)

মেয়েদের পাশে আমরা পরিপূর্ণ ভাবে আছি। কড়া অ্যাকশান আমরা নিই, নেব। (পার্ক স্ট্রীট কান্ডের পর দময়ন্তী কে বদলি করে দিই নি? কামদুনি-র মূল অভিযুক্তা মৌসুমি কয়ালকে শাস্তি দেওয়াই নি? পাশে আমরা আছি। সামনে আসিনা, পুলিশকেও বারণ করে দিয়েছি সামনে আসতে।)

বিরোধীরা কথায় কথায় কোর্টে যাচ্ছে। সিপিআইএম, কংগ্রেস, বিজেপি এক হয়েছে।(আমি জীবনে আদালতে যাইনি, আমার বিরুদ্ধে, দলের কোনও একজনের বিরুদ্ধে কোনোদিন একটাও কেস উঠেছে? সাহস হয়েছে কারও?)

চিটফান্ডের জনক সিপিআইএম। তৃণমূল চিটফান্ডের টাকায় চলে না।(এই তো, সরদা-র সব টাকা লুটেপুটে সাফ, সুদীপ্তও জেলে। তাই বলে কি আমাদের পার্টি চলছে না?)

তৃণমূল আজ দেশের বিকল্প।(তাই হয় তৃণমূলে যোগ দে, নয়তো দেশ ছাড়।)

বাংলার বাইরে লোকসভার প্রচারে যাব। দিল্লিতে সংহতির সরকার চাই।(নেহাত আমার ইংরাজীটা গরমেন্ট বোঝেনা, না হলে...)

আমি চেয়ার চাই না, মানুষের ভাল চাই।(আমার পেটো মানুষগুলোর ভাল হলে চেয়ার আপসে আসবে, জানি।)

কালো টাকা দেশে ফেরাতে হবে।(আমাদের দিক থেকে সমস্ত চেষ্টা জারি রয়েছে। পার্টি ফান্ডে জমা দিন, হিসাব কেন, কারোকে জানতে দেবোই না।)

বৃহস্পতিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৪

পিএম করো ~ অনামিকা

​ব্যর্থ টেট-এর আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে
ব্রিগেড ভরো… ব্রিগেড ভরো…
লোকসভা ভোট নাড়ছে কড়া,
আমায় পিএম করো… পিএম করো

ভারতবর্ষ দখল করার স্বপ্ন দেখি
নন্দীগ্রামের মিথ গুলোকে…
সবাই ভাবছে মেকি!

ফালতু ও'সব উড়িয়ে দেবে
গ্রাম শহরও…
আমায় পিএম করো… পিএম করো


সোমবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৪

​আপেল সংক্রান্ত ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

আদি পিতা আপেল খেলেন
সেই পাপে আজও
সামান্য রুটির খোঁজে
সময়ের অনন্ত ঢালে গড়িয়ে চলেছি।

রুটির দুঃস্বপ্ন ভুলে, কী আশ্চর্য
আপেলও খুঁজেছি মাঝে মাঝে
এসো পাপ … দয়া করো… আমাকেও ছোঁও

আপেল দূরের কথা
রুটি আজও পাইনি তেমন

রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৪

খুকুর জীবন ~ সংগীতা দাশগুপ্তরায়

তখন -
বেরোনোর আগে ঠাকুরকে প্রণাম করে বেরিও ... দিদু বলতেন। 
জল খেয়ে বেরোস ... বলত বড়মা
ছাতা নিতে ভুলিস না ... মামিমা মনে করিয়ে দিত
ছাতা নিচ্ছ নাও, হারিয়ে এস না ... মায়ের সাবধানবাণী 
মউ-দির থেকে অঙ্ক খাতাটা ফেরত আনিস দিদিভাই ... বোনের পিছুডাক 

এখন -
বেরোনোর আগে দেখে নিস ছুরি আর পেপার স্প্রে ব্যাগে ঢুকিয়েছিস নাকি... 
আর কেউ গায়ে হাত দিলে, জানিসই তো, গান আনলক করাই আছে। সোজা ফুঁড়ে দিস । হাসপাতালে শুয়ে তিল তিল করে মরা বা গায়ে আগুন দিয়ে মরার থেকে অনেক ভাল জেলে গিয়ে জীবনকাটানো । 
গারদের ওপারটুকু বোধহয় এপারের তুলনায় সেফ...... সমাজ

আধখানা আকাশ ~ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়

বাইরে নাচে অমানুষের দল,
মনের ঘরেও পিশাচেরই বাস,
কন্যা এবার যাবি কোথায় তুই?
হারালো তোর অর্ধেক আকাশ। 

ঠিকদুপুরে দশ দিক নিঃঝুম,
ভাল্লাগে না পুতুল পুতুল খেলা,
মন চলে যায় গোল্লাছুটের মাঠে।
ক্যামনে যাবি? এখন দুপুরবেলা।

মাঠে যখন দৌড়োদৌড়ি করিস
হাত টেনে মা ফেরত নিয়ে আসে,
মায়ের চোখে এতো কিসের ভয়?
সূয্যি ডোবে, আঁধার চারিপাশে।

দিদি গেছে কবেই বাড়ী ছেড়ে,
নামও নেই কারো চোখে মুখে।
মা বলে, সে বেজাত হয়ে গেছে,
কেমন আছে? আছে কি সে সুখে?

পাশের বাড়ীর পিয়া গেলো কাজে,
তারপরে আর নেইকো দেখা তার,
থানা থেকে পুলিশ এসেছিলো,
পিয়া তো নেই, পুলিশই বার বার -

কাগজ খুলে বাবা রোজই বলে
চলছে দেশে নরকের উল্লাস,
দিদি শুধু আধেক চেয়েছিলো,
তুই কি পাবি একটুকু আকাশ?

শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৪

লোড়সেরিঙ ~ অবিন দত্তগুপ্ত


টেবিলের উল্টো দিকে বসা চিতাবাঘকে,কোলকাতা সম্পর্কিত মধ্যবিত্ত ভালোবাসা ব্যক্ত করার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছিলাম। ট্রাম-বাস,ভিক্টোরিয়ার বাদামভাজা,নিওন আলো, মেট্রো বার,মিছিল ইত্যাদি বহু ব্যবহৃত (এবং ব্যবহার হতে হতে ক্লান্ত)উদাহরণে না গিয়ে,একটু  subtle হওয়ার চেষ্টায় অন্ধকার হাতড়াতে হলো । অর্থাৎ অন্ধকারেরই হাত ধরতে হলো । কিন্তু উনি চিতা, জাতে  বাঘ..শান্ত স্বরে জানালেন তার বাড়ি যে অরন্যে,সেখানে অন্ধকার একটা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার । আমার মতো শহুরে ছোঁড়ার কাছে ব্যাপারটা যতই রোম্যান্টিক হোক না কেন,ওনার কাছে অন্ধকার গা-সওয়া..প্রতিদিন সূর্য ওঠার মতো আর কি !! মেনে নিলাম। উনি বাঘ... আমি নেহাত মানুষ,তায় কোলকাত্তাইয়া(তাও আবার দক্ষিনের)....এটুকু তফাৎ থাকাই স্বাভাবিক । বাঘের চোখে চোখ রেখে তর্ক অনর্থক,অতএব খাতা-পেন্সিল ভরসা ।

                                     আমার বাড়ি যে অঞ্চলে,সেখানে কাঠ বাঙালের বাস । প্রায় সব-ই উদবাস্তু পরিবার ।  ছোটবেলার সেই বাসস্থানগুলি মূলত অস্থায়ী,মধ্যবিত্ত জবানিতে জবরদখ্‌লি । তা ঐ অঞ্চলের লোকজনের এক স্বভাবিক দোষ এবং গুণ ছিল । তারা প্রায় সকলেই,প্রচণ্ড তাড়াতাড়ি রেগে যেতেন,এবং ততোধিক তাড়াতাড়ি ভুলেও যেতেন. ৯০এর গোড়ার দিকের এক গ্রীষ্মের রাতে,এমনি এক রাগি বাঁজখাই গলার "জ্যোতিবাবু চলে গেলেন",আমাকে প্রথম অন্ধকার উৎসুক করেছিলো । এই বক্তব্য এবং তারপরের জটলা, গভীর আলোচনা,চিল-চিৎকার,খিস্তি ইত্যাদির কোনকিছুরই কারণ বুঝতে না পারলেও,"আলো  বা জ্যোতি চলে যাওয়া" বিষয়ক একটা one liner-এর এই বিপুল ক্ষমতা আমাকে অবাক করেছিলো । চটজলদি বাঙাল উচ্চারণে, সেদিনই প্রথম
লোড়সেরিঙের সাথে পরিচয়। এবং হ্যা ব্যাঘ্রকুল নন্দিনি( অথবা পাঠিকার চাহিদায় রঞ্জন ),আপনার অরণ্যের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের সাথে হঠাৎ বিদ্যুৎহীন শহরের শরীরের,লোড়সেরিঙের কোলকাতার শরীরের একটা তফাৎ আছে বইকি ।

                                     ছোটবেলার পড়ার সময় ছিল লোড়সেরিঙের সন্ধ্যাগুলি ।  লন্ঠনের আলোয় সাদা পাতাগুলি আগুন আগুন ঠেকত।কালো কালো অক্ষরেরা আগুনে খেলে বেড়াত. সেই রহস্যময় অক্ষরের তানেই,আমার লন্ঠনময় পড়াশুনা ।  অন্য রহস্যরা আস্তেও আস্তে বাড়তে শুরু করলো যখন,যখন  লোড়সেরিঙের যাতায়াত অনিয়মিত হয়ে পড়ল,তখন নিরুপায় হয়েই ওই অভ্যাসটি আমায় বিদায় জানিয়েছিল।

                                    লোড়সেরিঙের ছেলেবেলার আরেকটা স্মৃতি মাঝে মাঝেই ফিরে আসে ।  যে কোন প্রাণের মিছিলেই ফিরে ফিরে আসে ।  প্রথম মিছিল দেখা -মায়ের কোলে চেপে, অমনই এক শরীরি অন্ধকার রাতে. ঘরের ভেতরের লন্ঠন ঠিকরানো চার-আনা হাল্কা আলোয় দেখা প্রথম প্রাণের মিছিল......অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা দৃপ্ত কণ্ঠস্বর "হাতে হাতে কমরেড ।" হাজার মূস্থিবদ্ধ হাত অন্ধকার আকাশ ছুচ্ছে ।আজ জানি প্রতিবার হাতে এক চিলতে আকাশ ধরা পড়ে...সেদিন জানতাম না। সেদিন মিছিলের শব্দ শুনেছিলাম,সেদিন-ই প্রথম দেখা তার পেশীবহুল শরীর । ঠিক যেন, টি.ভি তে দেখা আফ্রিকান বক্সার। অন্ধকার গ্রেনাইটে গড়া পেশী বেয়ে,চুয়ে চুয়ে পড়ছে তাজা রক্তবিন্দু...প্রতি বিন্দুতে নতুন লড়াইয়ের অঙ্গিকার । সেই দিন অন্য এক শরীরী অন্ধকারের সাথে দেখা হয়েছিলো । এখানে উল্লেখ করা ভালো, প্রথম রাতের "জ্যোতি হারানো" ভদ্রলোক তখন barricade গড়ার শপথ গলায় নিয়ে,মিছিলের মধ্যভাগে । 

                                    আচ্ছা আপনার অরণ্যে শব্দের তো একটা কন্টিনুইটি আছে। মানে ঠিক যেমনটা থাকার কথা,ভয় ধরানো সুন্দর... কিন্তু একঘেয়ে । ইট-কাঠ- কংক্রিটের  জঙ্গলে, হঠাৎ নৈশব্দের বাজনা  কি তার থেকে একটু আলাদা নয় ? আপনাকে বলেছিলাম,সেলিমপুর থেকে যোধপুর পার্ক হয়ে আমার পুরনো পাড়ার রাস্তাটা,আমার প্রিয় ... পৃথিবীর অন্য যে কোন লোড়সেরিঙের রাতের রাস্তা, যার ধারে কাছে আসে না । এর কারণও হঠাৎ নৈশব্দ । ধরুন আপনি গড়িয়াহাট পেরিয়ে,ঢাকুরিয়া পেরিয়ে,ভয়ঙ্কর ভিড় ঊষাগেটের মিনি থেকে সেলিমপুরে নামলেন । হঠাত-ই  লোড়সেরিঙের সঙ্গে দেখা । আপনি জানতেনি না,সেদিন পূর্ণিমা । মুহূর্তে আপনার সামনের রাস্তা বদলে গেলো । অনেকক্ষণ ধরে আশে-পাশে ঘাপটি মেরে থাকা ঝিঁঝিঁরা, হঠাৎ পাওয়া নৈশব্দের সুযোগে তাদের উপস্থিতি জানান দিলো । হঠাৎ দুধ-সাদা মাটিতে ঘন ছায়া দেখে, আপনি চোখ তুললেন....দেখলেন ঝাঁকড়া চুলের দারুণ সুপুরুষ এক গাছ ।  হঠাৎ করে আশে-পাশে থাকা সুন্দর, অন্ধকারের বোর্খা পড়ে ,আপনার সম্পূর্ণ অজান্তে, আপনার পাশে এসে দাঁড়ালো....চোখে চোখ রাখলো । এই ভালো লাগাটা যেহেতু আকস্মিক,তাই তার রেশটাও দীর্ঘস্থায়ী । শব্দের-নৈশব্দের এবং  চোখের ভাষার এই ঝটিকা আক্রমনে,আপনি যথেস্ট পটু।  সুতরাং এবিষয়ে আপনাকে জ্ঞ্যান দেওয়া, মোটামুটি বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানোর সমগোত্রীয় হবে । এখানে আমি ধরে নিচ্ছি দক্ষিনবঙ্গের বাঘ যখন,তখন আপনি বাঙাল বাঘ-ই হবেন।  

                                   আপনাদের বাঘেদের মধ্যে প্রেমপত্র দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপারটা এখনো আছে কিনা জানি না ! আমাদের  শহুরে মানুষদের  মধ্যে ব্যাপারটা প্রায় উঠেই গেছে । সে জায়গায় গুড়ি মেরে ঢুকে পরেছে  sms,watsapp ইত্যাদি বিবিধ রতন । আপনি যেমন  মোনোসিলেবিক-বাইসিলেবিক হালুম-হুলুমের মধ্যে দিয়ে আপনার ভালোলাগা-খারাপলাগা ইত্যাদি প্রকাশ করেন,আমরাও তেমনি ইদানিং :),:-P,:,:<3 ইত্যাদি সংকেত মারফৎ আমাদের ভাললাগা,খুনসুটি ও ভালবাসার জানান দিয়ে থাকি। তো, লোড়সেরিঙ সেই সময়ের চরিত্র যখন এইসব সঙ্কেতবাহি যন্ত্রগুলো সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা ছিল না। সুতরাং, সংকেতগুলোরও কোন অস্তিত্ব ছিল না। হ্যাঁ,বাড়িতে ফোন অবশ্যি ছিল,কিন্তু যা বলার যখন বলার,তা কি আর তৎক্ষণাৎ গলা থেকে কবিতা হয়ে ঝরে-পড়ে ? সুতরাং কাগজ-পেন্সিল তার প্রয়জনিয়তা হারায়নি। সেই সব দুর্ধর্ষ নিষিদ্ধ ইস্তেহারের হাত বদল হওয়ার আদর্শ সঙ্গী ছিল লোড়সেরিঙ। সে, তার উপস্থিতি জানান দেওয়া মাত্র,চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ত। কোথাও কাজলা দিদির ঘরের জানলায়,খোকন মামার টর্চের ইশারা । কোথাও বা তিনতলার খুকি,মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিলেন প্রাণের বার্তা। অন্ধকারে নীচে দাঁড়িয়ে খ্যাদার সেই আকাশবাণী খিমচে ধরার সে কি অদ্ভুত উত্তেজনা। বয়েসে কাঁচা হওয়ায়,আমরা তখন মূলত দূতের কাজ করতাম। আমাদের উত্তেজনাও কিছু কম ছিল না। প্রতিটা চিঠি পৌঁছে দেওয়ার পর সুন্দরি দিদিদের হাতে গাল টেপা,অথবা পাড়ার নায়কদের পিঠ চাপড়ানি...সেই তখন পরম পাওয়া। মাঝেসাঝে আকাশবার্তা নায়ক হৃদয় উতফুল্ল করে দিলে,এক-আধটা কোকা-কোলাও জুটে যেত। এই সবই হতো দুরন্ত গতিতে। অসংখ্য হাত বদলের, ছুঁয়ে জাওয়ার,নিঃশব্দ ইশারার,উত্তেজনার,মন খারাপের, চাপা কান্নার একমাত্র নিরব সাক্ষী লোড়সেরিঙের কোলকাতা। 

ওঃ,সময় হয়ে এলো । লাস্ট মেট্রো ছেড়ে যাবে। আপনার মবাইল নম্বরটাই নেওয়া হয় নি....ফেসবুকে আছেন তো ?

বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৪

কেষ্টার চেষ্টা ~ নয়না চৌধুরী

​সবকিছু ফেল, হয়ে যাবে জেল
তবু ও ছাড়িনা চেষ্টা
কাঁদোকাঁদো হয়ে প্রানপনে হেঁকে
তোলপাড় করি দেশটা!

এতো চেষ্টার ভার কে যে বয় ?
সেই পুরাতন কেষ্টা ?
রাত দিন ধোঁকে, বসন্তে মরে
তবু বয়ে যায় চেষ্টা !

ম'রবে তো ম'র, যা ক'রবে ক'র
ছাড়ব না আমি চেষ্টা
কেষ্টার বানী আমি খুব ই মানি
দেখেই ছাড়ব শেষটা

বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৪

​কমরেড কমরেডকে মারতে পারে কি ~ অবিন দত্তগুপ্ত

আমার সমস্ত ছোটো গল্পের জন্য আমি চার জনের কাছে ঋণী । প্রথম সত্যজিত,দ্বিতীয় স্বপ্নময়,তৃতীয় ইলিয়াস হলে শেষ জন দেবু দত্তগুপ্ত। এই গল্পটা শেষ জনের থেকে পাওয়া। ভাগ করে নিলাম। এটা মূল দ্বন্দের গল্প নয়। চলতি মারক্সিস্ট পরিভাষায় পার্শিক দ্বন্দের(secondary contradiction)এর গল্প। নিজের মতো করে বলি,কারণ আমারও পেন আছে।

গল্পটা তেভাগার । সজনেখালির কোন এক গ্রাম। প্রভাস রায়-যতীন মাইতিরা গেছেন এক কর্মীসভায়। তা পুরো গ্রাম ভেঙ্গে পড়েছে। যতীন জানালেন, কৃষকসভা পরবর্তী সংগ্রামের জন্য প্রতিটা ঘর থেকে একটা মরদ, একটা লাঠি আর একটা টাকা চাইছে (মানে মধ্যবিত্ত জবানিতে ঐ কৌটো নাড়াচ্ছে আর কি ।) যে সমস্ত জায়গায় সংগঠন দুর্বল,সেখানে সবল অঞ্চল থেকে শক্তি বিকেন্দ্রীভূত হবে।

নেতৃত্বের ভাবনার সাথে অব্যর্থ কো-অরডিনেশানে এক বৃদ্ধ,হাজার বছর পড়ে পড়ে মার খাওয়া, শিরিঙ্গে চাষি হাত তুললেন। জানতে চাইলেন "মরদরাই যদি না থাকলো ,তবে ঘাটি আগলাবে কারা ?" । উত্তুত্তর মিনিট খানেকের নিস্তব্ধতা। উত্তর দিল ভিড়। এ ভিড় অনেক বেশি ঘন, অমাবস্যার অর্ধেক আকাশের মতো মায়ের ভিড় উত্তর দিল " কেন ? ফসলের মরশুমে আমাদের কাস্তে কি মরদের চেয়ে আস্তে চলে। যে কাস্তেতে ফসল কাটি, সেই কাস্তে ধরতে শেখায় কোন মরদে। আমরাই আমাদের গ্রাম রক্ষা করতে পারবো " । এই বক্তব্যে

একটু নড়ে উঠে,প্রভাস বাবু বললেন " হ্যা, তোরাও তো আমাদের কমরেড । মরদরা যা পারে,তোরা আরও ভালো পারবি। আমি এই প্রস্তাব সম্পূর্ণ সমর্থন করছি।" কেমন যেন একটা বিদ্যুৎ খেলে গেলো দলা পাকানো অর্ধেক অন্ধকারে। অমন একটা মানুষ,দুই জেলার পুলিশ যাকে ছুঁতে পারে না, জোতদারের ধুতি ভেজে যার নামে, এই অরণ্যের আসলি বাপ তাদের কমরেড বলেছে। অন্ধকার ঘন হয়। এদিক-ওদিক ঠেলা-ঠেলির মধ্যেই এক দলা অন্ধকারে ছিটকে বেরিয়ে আসে। অর্ধেক আকাশ তার সদ্য কমরেড প্রভাস-যতীন কে প্রশ্ন করে " আচ্ছা, একজন কমরেড কি আরেকজন কমরেডকে মারতে পারে?"। নেরিত্বেন
স্বভাবতই,মাটি চেনা নেতৃত্ব এই প্রশ্নের উৎস বুঝতে পারে। যতীনদের সম্মতি সূচক নিস্তব্ধতার নিড়েন দেওয়া জমিতে,ফসল ফোটাতে শুরু করে যুগ যুগ ধরে বোবা হয়ে থাকা এক চিরপ্রাচীন-নিষ্পেষিত শক্তি।" আমার মরদ,রোজ জন খাটে। মহাজনে মারে,টাকা দেয় না। যা পায়,তার অর্ধেক যায় সাহা বাবুর চোলাইয়ের ঠেকে। বাড়ি ফিরে আমায় বেদম মারে। আচ্ছা দাদা,তুই তো বললি আমি তোর কমরেড। আমার মরদ-ও তোর কমরেড। তাহলে তো আমি আর আমার মরদ কমরেড। এবার বল, কমরেড কমরেডকে মারতে পারে কি ?"
যুগ যুগ ধরে চাপা পড়ে থাকা ভয়ঙ্কর অগ্নি শিখায়,তখন অন্য অর্ধেক আকাশ জলছিল। এক অন্য আগুনে পুরে ইস্পাত হচ্ছিল নিশ্ছিদ্র চাঁদহিন আকাশ। এক শ্রেণি যুদ্ধ যখন, অন্য এক অজানা দ্বন্দের মুখ চেনাচ্ছে, মানুষ সিদ্ধান্ত নিলো "আজ রাতেই ভাঙ্গবে সাহার চোলাইয়ের ঠেক"।

রবিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৪

ক্যাডার ~ অবিন দত্তগুপ্ত

দৃশ্য এক


         সত্তরের কোনো এক গ্রীষ্মের দুপুর। গড়িয়া চৌমাথার মোড় । এখন যেখানে রাষ্ট্রীয় পরিবহনের বাস গুমটি,ঠিক তার উল্টো দিকে দাড়িয়ে অর্ক দরদর করে ঘামছে। কালো সস্তা কাপড়ের প্যান্ট আর সাদা চেক-চেক জামা গায়ে অর্ক সেদিন নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। লুকিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা তার নতুন নয় । গত সাত মাস সে লুকিয়েই ছিল,কিন্তু এবার সম্পূর্ণ অপরিচিত এলাকায়। ৮ নম্বর রেল বস্তির ঘুপচি আস্তানার আশেপাশে সব কিছুই সে হাতের তালুর মতো চিনতো। কিন্তু পার্টি জানিয়েছে,কোনো কিছু পরিচিতই এখন আর নিরাপদ নয় । পার্টি-ই তার সন্তানকে বলেছে ১০ই মে ১৯৭১ বেলা আরাইটের সময় গড়িয়া চৌমাথার মোড়ে,ঠিক এই জায়গায় দাঁড়াতে। আর বলেছে,নিল লুঙ্গি-সাদা ফতুয়া-লাল গামছা পরিহিত কোনো একজন অর্ককে তার নতুন আস্তানা দেখাবে।


        আশেপাশে দুটো কালো ভ্যান, মাছির মতো ভনভন করছে। কিছুদিন আগেই সি আর পি আর কংগ্রেসি গুণ্ডারা বেধড়ক মার খেয়েছে কামাড়পাড়ায়ে,দক্ষিন কলকাতার স্তালিনগ্রাদে। এখনো সেই ঘা শুকায়নি । তাই,পাগল কুকুরের মতো জোয়ান ছেলে-মেয়েদের গায়ে বামপন্থি গন্ধ খুজছে। অতএব,অভ্যাসবসত পকেট থেকে রুমাল বার করে অর্ক নাকে চাপা দিল, যদিও সে জানে তার চোখ দুটোই তাকে ধরিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেস্ট। কুকুরগুলো যখন প্রায় ঘাড়ের উপর,ঠিক তখনি উল্টোদিকের ভিড় ফুঁড়ে এক ক্ষয়াটে লোক রাস্তায় এসে পড়ল। পরনে নিল লুঙ্গি-সাদা ফতুয়া। ঘাম মুছে লাল গামছাটা কাধে ফেলতেই অর্ক পথপ্রদর্শককে চিনে নিলো । ভিড়ের মানুষটি অনায়াসে ভিড়ে মিশে এগিয়ে চললেন। ঠিক দশ পা পেছনেই অর্ক। এগলি-ওগলি-তস্যগলি ঘুরে অর্ক তার নতুন আস্তানায় পৌঁছল। পথপ্রদর্শক একটা কথাও বলেননি। অর্ক আজ-ও তার নাম জানে না।


                                                                     দৃশ্য দুই 


         ১৯৮২ সাল। অর্ক এখন এক সরকারি ব্যাঙ্কে কেরানির কাজ করে। পরিক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়ার পরদিনই সে ব্যাঙ্কের বামপন্থি ইউনিয়ানের খোজ নিয়েছিলো। পুরানো ইউনিয়ানে পচন ধরায়,সবে তৈরি হয়েছে নতুন শিশু গনসঙ্গঠন। ডেকার্স লেনে পোস্টার মারার কাজ চলছে। বেশির ভাগ লোকজনেরই অনভ্যস্ত হাত। পোস্টার মারতে দেরি হচ্ছে। হঠাৎ এক গালভাঙ্গা,উষ্কখুষ্ক চুলের মানুষ অর্কের পাশে এসে উপস্থিত। কোন ভুমিকা ছাড়াই বলল "সাহায্য করতে পারি?" প্রচলিত অর্থে,ভদ্রলোকের চেহারা নয়, অর্কর চিনে নিতে ভুল হল না। একটু সরে জায়গা করে দিতে ভদ্রলোক প্রথমেই বালতি ভর্তি আঠার মধ্যে খানিক জল মিশিয়ে নিলেন। তারপর অদ্ভুত কায়দায়,দু-বগলে পোস্টার চেপে ধরে,মই বেয়ে তরতর করে উপরে উঠে গেলেন। যুদ্ধকালীন তৎপরতায়  চার-চারটি দেওয়াল একঘণ্টার মধ্যে পোষ্টারে ভরে গেল। কর্মসূচী শেষ। চা-মুড়ি খাওয়া চলছে। গোগ্রাসে মুরি গেলা লোকটার পাশে এসে অর্ক জিজ্ঞেস করলো " আপনি কে ?"  ভদ্রলোক উত্তর দিলেন, "আমি আপনাদের লোক, এটুকুই কি যথেস্ট নয়?"


অর্ক - " আপনি কি এই অঞ্চলের ?"

অপরিচিত- "মেটিয়াবুরুজ"

অর্ক-"এখানে ?"

অপরিচিত-" যেখানে লড়াই সেখানেই তো আমাদের থাকার কথা!" 

 অর্ক- "আপনার নামটা?"

অপরিচিত (মুচকি হেসে) - "ক্যাডার"


        মেটিয়াবুরুজে, অর্কর এক কলেজের কমরেডের বাড়ি। বহুদিন দেখা-সাক্ষাত নেই। এই ঘটনার প্রায় দশ বছর পরে অর্ক সেই কমরেডকে ব্রিগেডে দেখেছিল। দশ বছর আগের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেওয়ার পর অর্কর কমরেডের মুখে মেঘ ঘনিয়েছিল। মাটির দিকে তাকিয়ে সে জানিয়েছিল "শামিম আর পার্টিতে নেই"।  

                                                               

                                                                     দৃশ্য তিন


        ২০১১। অনেক কিছুই ভেঙ্গেচুরে গেছে। শরির ভেঙ্গেছে ,সম্পর্ক ভেঙ্গেছে,মন ভেঙ্গেছে,স্বপ্নগুলো ভেঙ্গেছে বেশ অনেকদিন হল।

শেষ ভাঙ্গাটা,মানে অর্কের মতে প্রয়োজনীয় ভাঙ্গাটা শেষ হয়েছে কয়েকদিন আগে। ষাট ছুঁইছুঁই অর্ক জানে ভিত শক্ত করে নতুন স্বপ্ন গড়তে হলে, পুরনো জরাজীর্ণ অস্তিত্ব ভেঙ্গে পড়াই ভালো। তবুও, কোথাও যেন একটা কাঁটা খচখচ করে। যাই হোক,এতো ভাঙ্গনের মধ্যেও নিজের মনের মতো করে সে তার সন্তানকে গড়েছে। ভবিষ্যতের নরকে লড়াই করতে অপু মোটামুটি প্রস্তুত। অর্ক এখন অনেকটাই ঝারা হাত-পা। 

    

বহুদিন পরে সে আজ বালিতে এসেছে তার অভিন্নহৃদয় বন্ধু কল্যানের সাথে দেখা করতে। বালিহল্ট স্টেশান থেকে রিক্সায়ে ঘোষপাড়া বাজার। কল্যানের বাড়ির সামনে রিক্সা থামিয়ে অর্ক রিকশাচালককে ১০টাকার নোট বাড়িয়ে দিল। "লাগবেনি বাবু",রিক্সাওলার খ্যানখ্যানে গলা ভাবনার অতল থেকে অর্ককে আকস্মিক কান ধরে টেনে হিঁচড়ে বাস্তবে আনল। তার বিরক্তির উত্তরে ফোকলা হাসি ফেরত দিলেন চালক। "সমীরদা,তুমি আবার ভাড়া নেবে না বলে জিদ ধরেছ ?",কল্যান যে কখন এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে অর্ক খেয়ালি করেনি। সমিরের হাতে দশটাকার নোট গুজে দিয়ে অর্ক হেসে বলল "বিনে পয়সায় কারো ঘাম কিনতে আমার বাপ শেখায়েনি।" ডাইনোসরের যুগের রিক্সাটা আস্তে আস্তে দূরে মিলিয়ে গেলো। 


   ঘরে বসে একটা নেভিকাট ধরিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই,কল্যান হেসে ফেললো। "পুরানো মানুষ,সত্তরের কমরেড"।  


পুরানো নোনতা স্বাদটা জিভে হঠাৎ ফিরে পাওয়ায়ে, অর্ক সোজা হয়ে বসল । কল্যাণ স্মৃতি হাতড়াচ্ছে,"এই সমীরদার জন্যই বার চারেক খুন হতে হতে বাঁচা। কোনো রাস্তার মোড়ে বিপদ দেখলেই , ঐ হরিদার চায়ের দোকানের সামনে দাড়িয়ে পাঁচবার পর পর হর্ন বাজাতো। কাছে গেলেই বলে দিত,কোন রাস্তায় বিপদ,কোন রাস্তা ফাঁকা। এক ছেলে -এক মেয়ে। মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে এস এফ আই করত,বদলের পর থেকে নিখোজ।প্রতিসন্ধায়ে এল.সি তে বসে নেতাদের গল্প শোনে। চা-বিড়ি এনে দেয়। নিজেও খায়। আর সব মিছিলে রিক্সা চালিয়ে সবার আগে আগে যায়। অর্ক হাসে। নিজেই বোঝে হাসিটায় একটা "আমি তো এই পার্টিটাই করি "গোছের প্রচ্ছন্ন গর্ববোধ আছে। হঠাৎ কল্যানের গলার শব্দে ভাবনার উড়ান থমকে যায়। 


"তোকে হাসতে দেখে সমীরদাকে নিয়ে একটা মজার গল্প মনে পড়ে গেলো।এই সেদিন ভোটের আগে,এখানে একটা পার্টির জনসভা ছিল। মঞ্চের সামনে শতরঞ্জি পাতা। তারপর চেয়ার,তারপর দাড়ানোর জায়গা। তা সমিরদা,তার ঢাউস ঝাণ্ডা নিয়ে শতরঞ্জিতে  বসেছে। হঠাৎ ঝামেলা।। পেছনের লোকজন পতাকায় ঢেকে যাওয়া নেতাদের দেখতে পারছেন না। বুড়োকে অনেকে মিলে বোঝানর চেষ্টা করল,গালি দিল,কিন্তু কিছুতেই সে পতাকা নামাবে না। ঘাড় ত্যারা করে তার সেই এক যুক্তি,লাল ঝাণ্ডা মাটিতে রাখবো না। পুরো মিটিঙে ঝাণ্ডা মাটি ছোয়ে নি।"


         সেই সুন্দর দুপুরের ঠিক এক সপ্তাহ পড়ে অর্কর মবাইলে কল্যানের নাম ভেসে উঠেছিল। কল্যাণ জানিয়েছিল ,নয়া ফ্যাসিস্টরা বুড়ো সমীরকে মিছিলে যাওয়ার অপরাধে বেধড়ক মেরেছে। রিক্সা ভেঙ্গে দিয়েছে। সমিরদা এখন, ঘরছাড়াদের ভিড়ের একজন। 


                                                              শেষ দৃশ্য


          আজ সন্ধ্যা। আজকে রানী রাসমনি রোডে পার্টির জনসভা ছিল। অভ্যাসবশত এদিনও অর্ক একদম শেষের সাড়িতে দাঁড়িয়ে। দু চোখ ভরে কালো মাথার ভিড় দেখছে। পরিচিত,মাফলার জড়ানো একটা মুখ দৃষ্টিপথ আড়াল করলো। এক গাল হাসি নিয়ে, পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে,অর্কের সেই মেটিয়াবুরুজের কমরেড খবর দিলেন "শামিমকে পার্টিতে ফেরানো হয়েছে। ও কোন প্রশ্ন করেনি। আগের মতই যুদ্ধ খোঁজে এখনো।" অর্ক মনে মনে বলল "আমরাও কি খুঁজি না ?"


          দুতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে,অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে অর্ক শামিমদের দেখতে পেল। আকাশ ভরা মিছিলে শামিম হাটছে,ঢাউস পতাকা হাতে সমীরদা,রহিমস্তাগর রোডের সুফল, যোধপুরপার্কে গনশক্তি বেচতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া তাপস হাঁটছে দৃপ্ত ভঙ্গিতে। হাটছেন,মিছিলে দেখা নাম না জানা কতো মানুষ। হাঁটছেন, নিল লুঙ্গি-সাদা ফতুয়া কাধে ফেলা লাল গামছায় সত্তরের আপনজন। হাঁটছে স্মৃতি।  আজ দুপুরে অর্ক যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, তার অনতিদুরেই কালো মাথার ভিড়ে সে অপুকে দেখেছে। নিজের কমরেডদের সাথে অপু ব্যাচ আর পিন আটকে দিচ্ছে সকলের বুকের বা-দিকে। আবার আকাশের দিকে মুখ তুললো অর্ক  এবারের মিছিলের শেষে,মানুষের ভিড়ে সে তার অপুকে খুজে পেলো। আর কিছু না পারুক, অর্ক জানে,সে ভবিষ্যতের এক মানুষকে গড়ে তুলেছে। মানুষের আন্দলনের ঋজু সৈনিক।  ক্যাডার বাপের ক্যাডার সন্তান। 

শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৪

গগন ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে এক জমজমাট দুপুর। বাড়িতে অতিথি হয়ে এসেছেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট দ্বিজেন্দ্রলাল। উনি জমিদারের বন্ধু, ওঁর তদারকিতে ব্যস্ত সব মানুষজন।

এসব আতিথ্যে গানবাজনা তো আছেই। দ্বিজুবাবুকে দুবার অনুরোধ করতে হয় না। হাসির ছড়া, নাটক আর গান তার কলমের নিবেই বাস করে, কাগজ পেতে বসলেই হয়। হারমোনিয়াম বাজিয়ে তিনি বেশ রসিয়ে রসিয়ে পরিবেশন করলেন – বাহবা, বাহবা নন্দলাল। সকলেই বাহবা, বাহবা করতে লাগল।

জমিদারমশাইয়ের গলায় আজ অল্প ব্যথা। তিনি বন্ধুবরকে বললেন, আমার গান তো শুনেছেন অনেক, আজ এর গান শুনুন। ফরাসের ওপর সঙ্কুচিত হয়ে বসে থাকা এক রোগা-প্যাংলা মানুষের দিকে নির্দেশ করতে সে আরো কাঁচুমাচু হয়ে গেল। ভাবটা যেন, সত্যি আমাকে ডাকছেন?

একে এলাকার সবাই চেনে। দ্বিজুবাবুকে এর পরিচয় দেওয়া হল, এখানকার ডাকঘরের ডাক হরকরা, এর নাম গগন। আপনারা লালন ফকিরের গান তো শুনেছেন নিশ্চয়, এবার এর গান শুনুন।

গগনের দিকে একবার তাকিয়ে কার উদ্দেশে নমস্কার ঠুকে গগন গান ধরল, আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে ...

উদাত্ত কণ্ঠের গান, প্রাণের গান, এই মাটির গান। শেষ হলে অনেকক্ষণ কারো মুখ দিয়েই কথা বেরোলো না।

অনুষ্ঠান ও খাওয়া দাওয়া শেষে দ্বিজুবাবুকে নিয়ে চারপাশটা একটু ঘুরতে যাওয়া হল। দ্বিজুবাবু পন্ডিত মানুষ, বিদেশ থেকে চাষবাস নিয়ে পড়াশুনা করে এসেছেন। বন্ধুকে বললেন, নদীর চরে এখানে এত উর্বর পলির জমি, কচু-ঘেঁচু হয়ে জঙ্গল হয়ে আছে। এসব পরিস্কার করে এখানে আলুর চাষ করুন। আমি ভাল আলুর বীজ পাঠিয়ে দেব, দেখবেন খুব সুন্দর আলু হবে এখানে।

জমিদারমশাই ঘাড় নেড়ে তাকে সমর্থন জানাতেই কোত্থেকে একপাল লোক এসে সেই মানকচুর জঙ্গল সাফ করতে লেগে গেল।

বিদায় নেবার সময় অন্যান্য কিছু স্মারক উপহারের সঙ্গে প্রত্যেক অতিথিদের দেওয়া হল সেই মানকচু। জমিদারমশাই বললেন, এ আমাদের অতি প্রাচীন খাদ্য, আলু অবশ্য চাষ করব এখানে, তবে একে অবহেলা করা অন্যায় হবে। কত রকম যে সুখাদ্য এ থেকে প্রস্তুত করা যায়, আপনারা চেষ্টা করে দেখুন।

জমিদারপত্নী আড়াল থেকে শুনে মৃদু হাস্য করলেন। কিছুদিন আগেই নাছোড়বান্দা পতির নির্দেশে তাকে মানকচুর জিলিপি বানাতে হয়েছিল। সে পরীক্ষায় তিনি সসম্মানে উত্তীর্ণও হয়েছিলেন।

কয়েক সপ্তাহ পরে আবার সেই গৃহে জলসা। দ্বিজেন্দ্রলাল-গগন-পাড়ার মোড়ল-পোস্টমাস্টার সবাই এসেছেন। দ্বিজেন্দ্রলালের স্ত্রী রান্না করে এনেছেন মানকচুর কালিয়া। মানকচুর কোপ্তা বানিয়ে এনেছে মোড়লগিন্নী।

আজ আর রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করতে হল না। কেউ কিছু বলার আগেই তিনি গান ধরলেন, রাজা সবারে দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান ...

18 January 2014

সোমবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৪

পঞ্চানন কর্মকার ~ রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য

কোলকাতার নন্দনে চলছে- ক্ষুদ্র পত্রিকা মেলা,২০১৪ । চারিদিকে আলো, হইহই, হরিপদর চা, সারি সারি ষ্টলে শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকা । লোকজনের আনাগোনা ।

একটু খোলামেলা জায়গায় এসে বসলাম, একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ।

হঠাৎ মনে হলো, চারিদিকে অন্ধকার হয়ে এলো । সব আলো, হইহই নিমেষে উধাও।
শুধু সামনে, কয়েকটা চেয়ার পড়ে আছে । বুঝতে পারছি না, কি হচ্ছে ?

আমি কি অসুস্থ বোধ করছি, নাকি মরে যাচ্ছি !!!!!!!

এমন সময়ে একজন, মলিন ধূতি / কামিজ পরা এক আধা বয়েসী ভদ্রলোক সামনের চেয়ারে এসে বসলেন ।

বাঁ হাতে, যেভাবে ইলিশ মাছ দড়ি দিয়ে ঝোলায়, ঠিক সেই ভাবে দুটো লম্বা পাবদা মাছ আছে আর বড় বড় দুটো পেঁয়াজ কলি ।

চিনতে না পেরে, অবাক হয়ে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম ।

মনের ভাবটা বুঝতে পারলেন বোধহয় ভদ্রলোক ।

- আমাকে তো দেখো নি হে তাই চিনতে পারছো না !!! দেখবেই বা কি করে !! সেই ইংরেজি ১৮০৪ সালে মারা গেছিলাম ।
- আপনার নামটা বলবেন কি দয়া করে ?
- নাম বললে, চিনবে কি !!!! আজকাল তো কেউ চেনেই না !!! অথচ এই যে মেলা হচ্ছে, তার জন্য আমার কিছু অবদান আছে বৈকি !!
- আহা, নামটা বলুন না, তারপর দেখা যাক, চিনতে পারি কিনা !
- আমার নাম, পঞ্চানন কর্মকার ।
- নামটা শোনা শোনা লাগছে !!! আপনার নিবাস ?
- হুগলী জেলার ত্রিবেণীতে। আমার পূর্বপুরুষ পেশায় ছিলেন কর্মকার বা লৌহজীবি। কিন্তু বেশ কয়েক পুরুষ আগে আমরা ছিলাম লিপিকার। তামার পাতে, অস্ত্রশস্ত্রে অলঙ্করণ বা নামাঙ্কনের কাজে পূর্বপুরুষরা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। আমিও পূর্বপুরুষদের এই শিল্পবৃত্তির গুনপনা পাই। পূর্বপুরুষেরা প্রথমে ছিলেন হুগলী জেলার জিরাট বলাগড়ের অধিবাসী, পরে ত্রিবেণীতে গিয়ে বসবাস শুরু।
- বাপরে !!! এতো লম্বা ইতিহাস ? তাও ঠিক বুঝতে পারছি না, আপনার সঠিক পরিচয় ।
- ওই যে বললুম, আমাদের আর কে চেনে ? বলি, উইলিয়াম কেরীর নাম শুনেছো?
- শুনবো না !!! কি যে বলেন !
- সায়েবের নাম বলাতে চিনলে ? আমি সেই পঞ্চানন কর্মকার, যে...
- যে ?
- ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে চার্লস উইলকিন্স যখন হুগলীতে নাথানিয়াল ব্রাসি হ্যালহেডের লেখা এ গ্রামার অব দ্যা বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ বইটি মুদ্রণের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তখন আমিই প্রথম আমার প্রযুক্তি জ্ঞান নিয়ে বাংলা হরফ প্রস্তুতের কাজে উইলকিন্স কে সাহায্য করতে এগিয়ে আসি। 
- আচ্ছা, আচ্ছা- মনে পড়েছে !!! দিন দিন, পায়ের ধুলো দিন !
- থাক! আর আদিখ্যেতা করতে হবে না !! ঢের হয়েছে ।
- আরে রাগ করেন কেন ? আপনি না থাকলে এই সব কখনও হতো ?

- ছাপার জন্য ছেনিকাটা, ঢালাই করা চলনশীল বা বিচল যে ধাতব হরফ ব্যবহার করা হয়, তা উইলকিন্স এবং আমার যৌথ প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছিলো। 
১৭৭৯ সালে তদানীন্তন গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের উৎসাহে উইলকিন্সের পরিচালনাধীনে কলিকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ছাপাখানায় আমি কাজ শুরু করি। 

১৭৮৫ সালে পুরোদমে এই সরকারি ছাপাখানা চালু ছিল,আমি সেখানে কাজ করতাম। হরফ নির্মাণের কলাকৌশল আমি না থাকলে সায়েবরা করতেই পারতো না। 
আমি মারা যাবার আগে, জামাই মনোহর কর্মকারকে সমস্ত জ্ঞান ও কলাকৌশল শিখিয়ে যাই । 

- হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে । তা, এই খানে কেন আপনি ?

- একটা কথা বলতে এলাম । আমার শ্রীরামপুরের বাড়ীটা ভেঙ্গে একটা রাজার প্রাসাদ তৈরী করেছে । তোমরা যাকে এখন ফ্ল্যাট বাড়ী বলো । ওটা ঠিক নিউ গেট ষ্ট্রীটে পঞ্চানন সিঙ্গির বাড়ীর উল্টোদিকে ।

এই ব্যাপারে তোমরা একটু প্রচার করো বাপু । এই বসত বাড়ীটা অনেক কষ্টে তৈরি করেছিলাম ।

- নিশ্চয়ই বলবো !!! কাজ হবে কিনা জানি না !

- ঠিক আছে, ভাই আমি চলি এখন । মনোহর এয়েচে । ও আবার পেঁয়াজকলি দিয়ে পাবদা মাছ ভালো বাসে । বৌ রাঁধবে বলে বসে আছে ।

আঁধার চলে গেল । হরিপদ বলল – লেবু না দুধ চা ?

রবিবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১৪

শকুন-তলা ~ অনামিকা মিত্র

'বেল ভিউ'-এর উঠোনে ঘোরে পেটুক শকুন পাখি।
কাজ কর্ম নেই কি কোনও? বলি ব্যাপারটা কী?

'মৈত্র' মশাই খবর দিতে ব্যস্ত সকাল সন্ধ্যে। 
শকুনটি নট নড়নচরন আগাম পাওয়া গন্ধে।

সাকসেস রেট ঈর্ষনীয়। বুক ভরে যায় গর্বে।
তেরচা নজর দিলেই রোগী ভেন্টিলেটর চড়বে।

হাত পাকানোর খবর জানা, অনেক বছর থেকে।
দখল করে পুড়িয়ে দেওয়া, সুভাষ মুখুজ্জেকে।

মান্না দে খুব অভদ্রলোক, ভীষণ রকম বাজে।
ডেড বডিটা দেবেন না যে, আসেই নি আন্দাজে।

নীললোহিতের জবর দখল, দেখেছিলাম তা'ও।
সুচিত্রা সেন? ওঁকেও, হুঁ হুঁ! একটু সময় দাও।

এমনি ভাবে সব্বাইকেই! সব ক'টা নাম ভেবো।
শকুন-তলার লিস্টে আছেন 'প্রসেনজিৎ' আর 'দেব'ও।

ও কিছু না ~ দেবাশিস লাহা

 "আয় তোকে আদর করি "
এই বলে মেয়েটার পিছু নিল এক হাজার দাঁত আর নখ !

ছূট ! ছুট! ছূট !
ছূটতে ছুটতে মাটি চিরে ফেললো মেয়েটার পা 
বললো -- আমায় ফিরিয়ে নাও !
মাটি বললো না !
মেঘ ছুঁয়ে ফেললো ওড়না!
বললো -- "আমায় উড়িয়ে দাও "
মেঘ বললো না !
সূর্য ছুঁয়ে ফেলল চোখ 
বললো "আমায় পুড়িয়ে দাও "
সূর্য বললো না !
বাতাস জড়িয়ে ধরলো ঠোঁট 
বললো "আমায় কুড়িয়ে নাও "
বাতাস বললো না ! 

তবু ছুটতে থাকল মেয়েটা
ঘাসের উপর ছিটকে পড়ল স্কুল ব্যাগ! 
সকাল ফুরিয়ে দুপুর , দুপুর ফুরিয়ে বিকেল !
তবু পিছু ছাড়ল না থাবা ! 
শিশিরের মতো মিলিয়ে গেল দূরত্ব, 
এক দিন মেয়েটাকে ধরেই ফেললো ওরা

তারপর শুধু মট মট শব্দ !
এত কিছু ভাঙা যায় কে জানতো !
প্রথমে চুড়ি,
তারপর আঙুল আর হাত ,
তারপর পা !
সব কিছু ভাঙতে ভাঙতে আরও 
এগিয়ে এলো ওদের থাবা,
ঝনঝনিয়ে ভেঙে গেলো পুতুল বাড়ি,
টেডি বিয়ার, 
সদ্য ফোটা গোলাপ, 
তারপর আরও কত কি! 

বাবার মুখ, ছোট্ট ভাই বিনুর চোখ ,
মামা বাড়ির নদী, পাশের বাড়ির ছাদ ,
এমন কি ইস্কুলের জানালা দিয়ে দেখা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি ! 
তাও ভেঙে ফেলল ওরা ! 

তবু ওড়ার চেষ্টা করলো মেয়েটা
পারলো না ! 
ধুলো উড়িয়ে থেমে গেল ডানা !

ঠিক তখনই নেমে এলো অন্ধকার, 
এক বুক জোনাকি নিয়ে জড়িয়ে ধরলো ওকে 

"তোর নাম কি রে ? " ফিসফিসিয়ে জানতে চাইল মেয়েটা,

"কেন , চিনলি না আমায়? আমি যে তোর নীল পরী "

"ওহ, তাই বুঝি এত দেরি করে এলে ? "

টুপ করে একটা শব্দ, 
ও কিছু না ! 
ঘাসের উপর গড়িয়ে পড়লো আরেক ফোঁটা রক্ত

ফ্রেন্ড লিষ্ট ~ দেবাশিস লাহা

বন্ধু কজন জানতে চাস? 
ছাড়িয়ে গেছে হাজার
বন্ধু দিয়ে শহর গড়ি
বন্ধু দিয়ে বাজার 

তোর বুঝি মেরেকেটে
ডজন খানেক হলো ?
আমায় দ্যাখ হাজার দুয়েক
করছে শুধু ফলো !

বন্ধু করার কায়দা তুই
আমার কাছে শেখ 
কেমন করে বন্ধু বাড়ে
তাকিয়ে শুধু দ্যাখ ! 

এই বলে সেই মেয়েটা
মাউস দিলো টিপে
খুলে গেলো ফ্রেন্ড লিষ্ট
ইয়াব্বড়া পিপে 

মাইল মাইল পড়ে আছে
বন্ধু শুধু বন্ধু
বন্ধু দিয়ে ভরছে আকাশ
বন্ধু দিয়ে সিন্ধু 

বলরে মেয়ে সত্যি করে
কজন কে চিনিস 
জানিস কি তুই ভাল করে
বন্ধু কি জিনিষ ?

বন্ধু দিয়ে স্টেটাস বাড়াস
বন্ধু দিয়ে পুকুর
বন্ধু যেন খানদানি 
এলশেসিয়ান কুকুর !

কার মনে মেঘ করেছে
কার চোখে জল
কার পাতে শুধুই বিষ
অযুত হলাহল 

কোন ছেলেটা মোমবাতি
যাচ্ছে শুধু ক্ষয়ে
কোন ছেলেটা নদীর জলে
ভাসছে খড় হয়ে

এসবের তুই রাখিস খবর
সোনার বরণ মেয়ে ?
মাউস টিপে বন্ধু বাড়াস
রবি ঠাকুর গেয়ে !

মানুষ সে তো গাছের মতো
বাইরে থেকে দেখা 
মাটির নিচেই আছে তার 
কান্নাকাটি রাখা 

আসলে তুই ভীষণ একা
কান্না নিয়ে থাকিস
মাটির তলার শেকড় বাকর 
স্টেটাস দিয়ে ঢাকিস

শনিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৪

শীতঘুম ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

সেই ক্রিসমাস থেকে চুপচাপ শীতঘুমে আছি
বিকেলের বেলা কমল বয়সের ব্যস্ত অনুপাতে
ক্লান্ত পরিযায়ী পাখি… বুঝে যায় ওড়া নেই ধাতে
তুষার বাতাস এসে খেলে গেছে ভুল কানামাছি।

প্রগাঢ় অন্ধকারে কুণ্ডলিত সময়ের ধাঁধাঁ
শুয়ে আছে। মাথার মণিটি যত্নে পাশে রাখা তার।
সে'সব সরিয়ে যদি আলগোছে চুমু রাখি ঠোঁটে,
যাবতীয় বিষদাঁত কলগেটে মেজে সেজে ওঠে।

আরও কারা এসেছিল? বল দেখি এসেছিল কে কে?
বিষাদগন্ধ মাখা আমাদের এ' মায়াশহরে
প্রশ্নটুকু করলেই বিস্মৃতির স্বপ্নে চোখ রেখে
প্রেম হেসে ওঠে তার নিশিলাগা বিকারের ঘোরে।

কবিতা আসেনা কোনও। মাঝে মাঝে জেগে ওঠে ক্ষুধা
শীত রাতে ভস্ম হই। পুড়ে যায় সমগ্র বসুধা।

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৪

​বাৎ শরিক ~ অমিতাভ প্রামাণিক

মেয়েটা মাত্র ষোল বছরের, বাড়ি মধ্যমগ্রাম -
মুদ্রাস্ফীতি, তবুও এদেরই সবচেয়ে কম দাম।

সে এবং তার মত আর যারা বেড়ে উঠছে গোকুলে,
পথ চলা বড় কষ্ট তাদের, কে কোথায় নেবে তুলে!
কাগজে লিখছে পৃথিবী খুলছে, ওরা দেখে বন্ধ –
আকাশে উড়ছে চিল শকুনেরা, কখন মারবে ছোঁ।
ওদের কোথাও যাবার আছে কি? আশ্রয় আছে আইনে?
শেয়ালে শকুনে ফের ঠোকরায়, ফেলে রাখে রেললাইনে।
তুলসীপ্রদীপ জ্বালার আগেই ছেড়ে যেতে হয় গাঁ,
এ দেহটা ওরা ছুঁয়ে দিয়েছে যে, এ দেহে হাজার ঘা!

এ পাড়াতে থ্রেট, অপমান, খোঁজো অন্য আর এক কলোনি –
দূষিত বাতাস সেখানেও ছোটে, বলে, এসব তো বলো নি!
তাকে নিয়ে ফের কাটাছেঁড়া করে পাড়ার টাইমকল;
বাড়িওলা বলে, এই মেয়েদের রাখা যায় নাকি, বল!
কোথায় যাবে সে, কোনখানে মেলে এতটুকু আশ্রয়?
শেয়াল-শকুন, নাকি প্রতিবেশী, কোনটাকে কম ভয়?
কী ভুল করেছে, এ বিষ ছড়ানো, এ সব কাদের পাপ?
আগুনও এদের চেয়ে আরও বেশি ছাড়ে নাকি উত্তাপ!

মেয়েটা মাত্র ষোল বছরের, বাড়ি মধ্যমগ্রাম,
নতুন বছর দেখতে পেলো না, মুছে গেল তার নাম।

৩ জানুয়ারি ২০১৪

প্রশাসন ~ অনামিকা

ধৃতরাষ্ট্র আদেশিল, হে মিত্র সঞ্জয়
প্রেস ডেকে ব্রিফ করো, করো মন জয়।
ক্ষমতায় অন্ধ আমি বক্তৃতাতে দড়
যা হুকুম করি সে'টা মন দিয়ে করো।
সচিব মুখ্য তুমি। তোমারই একার
এ'কঠিন কার্য। তর্ক কোরো না বেকার।
কঠিন কুরুক্ষেত্রে মজাদার গদি
ভোগে যাবে তুমি এবে বেঁকে বস যদি।
ডেড বডি রাজনীতি, তাপসী মালিক
খুবই যে মন্দ ছিল কোরো না তা' লিক।
নিজে যা করেছি… মেতে ছিলাম যা নিয়ে
সেই রাজনীতি মন্দ বল তা' বানিয়ে।
আইএএস মুখ খুললে মিডিয়া তা শোনে
তুমি প্রশাসন, যাও অনৃত ভাষণে।
ঠিকঠাক কাজে জেনো পুরস্কার মেলে।
অবসর নিলে হবে এমপি বা এমএলএ।

বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৪

উল্লাস ~ কৌশিক সেনগুপ্ত

মধ্যমগ্রামের হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির প্রতিঃ



বর্ষ শেষের রাত,
একটু পরেই নতুন বছর দরজায় সাক্ষাৎ,
রঙ্গিন জল আর গানের তালে তালে,
নানান প্রান্তে শরীরগুলো ক্রমশ উঠেছে দুলে।
সেই শহরের হাস্পাতালের ভিতর,
তোমার শরীর ধীরে ধীরে ঠিক তখনই হচ্ছে নিথর।
নতুন বছর পাওয়ার লোভে ঘুরেছে কাঁটাও ঘড়ির,
চোখের সামনে ভেসেছে ততই তোমার দগ্ধ শরীর।
প্রশ্ন তুলেছে তোমার শোয়ানো লাশ,
বাইরে কিসের বাজির শব্দ, কিসের এত উল্লাস?
তোমায় ছাড়াই পেরিয়ে গেলাম পুরানো বছর সদ্য,
বলতে গিয়েছি, বলতে পারিনি, শুভ দুহাজার চোদ্দ।
মুছে গেছে সব, শুধু রয়ে গেছে তোমার প্রতিবাদ,
চেষ্টা করেও ঢাকতে পারেনি,
বর্ষ শেষের রাত।

বুধবার, ১ জানুয়ারি, ২০১৪

স্বীকারোক্তি ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য

পিশাচেরা আজও রক্তই চায়, আঁটে শোষণের ফন্দি।
আমাদের হাতে চুষিকাঠি দিয়ে ব'লে যেন কাজে মন দিই।
এভাবেই যদি বেঁচে থাকি, তবে
আগামী হত্যা আমাদেরই হবে।

স্বীকারোক্তির প্রশ্ন ওঠেনা, আমার জবান বন্দী।

রবিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৩

কবি 'দিনেশ দাস'এর জন্ম-শতবার্ষিকীতে ~ অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

নতুন চাঁদের বাঁকা ফালিটি,
তুমি বুঝি খুব ভালবাসতে?
চুপ! কাস্তের কথা আর নয়!
অসময়। কথা বল আস্তে।

শতক পাল্টে গেছে যদিও
ইতিহাস ঘোরে চেনা বৃত্তে
কালাশনিকভে নেই বেয়নেট
তবু তুমি পারছনা জিততে

অজ্ঞাতবাসকাল পেরিয়ে
নিজে নিজে হয়ে গেছ ত্রস্ত
কী করে ভুলেছ তুমি বলোতো
কোন শমীডালে ছিল অস্ত্র?

এখানে ওখানে কিছু ছিটিয়ে…
জং ধরা তার অধিকাংশ
তোমার নিজের প্রিয় আয়ুধে
লেগে মৃত সময়ের মাংস।

স্মৃতি ফিরে পাও। ছিঁড়ে ফেল সব
ছদ্মবেশের ভুল ধারণা।
চাঁদের আদলে প্রিয় কাস্তে
তোমারই তা'। জেনো, আর কারও না।

শনিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৩

জীবন ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য

​এই তো রে, বেশ ভালোই আছি... দিব্যি!
ছুটকো ছাটকা, ও কিছু নয়, ঝঞ্ঝাট।
মোটের ওপর পৃথিবী খুব সুন্দর।
জীবন মানেই তাপ্পিমারা প্যান্ট শার্ট!
এই তো, কেমন হাসছি তোদের সঙ্গে!
কেউ কখনো দেখলি আমার কান্না?
চোখের জলে নাকের জলে ভাসতে?
নালিশ সালিশ অনেক হলো, আর না।
এই তো, আমি কক্ষণো নই দুঃখী।
পাইনি খানিক, পেয়েওছি তো একঝাঁক!
সব হিসেবের নিকেশ হবে শিগগির,
এই তো ক'দিন, মন, ততদিন চুপ থাক!

মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৩

নদী, আমি, ওরা ... ~ অমিতাভ প্রামাণিক

আমাদের সবই ছিল, আদিগন্ত তীব্র শ্যামলিমা,
ধানী জমি, ফল-ফুল, শতাব্দীপ্রাচীন মহীরুহ।
তিন তিনখানা নদী জুড়ে ছিল শৈশবগরিমা,
অথচ কাদের পাপে সবই হয়ে গেল চক্রব্যূহ!

চঞ্চলা ইছামতী, তার ছিল মহিমা অপার –
কবে হল জরাগ্রস্তা, ভুলে গেল যৌবনবারতা।
কখনো নদীর ঘাটে বসে কি শুনেছ হাহাকার?
এপার-ওপার খেয়া বন্ধ হলে মাঝি যাবে কোথা?

আমাদের বাল্যকাল ধোয়া ছিল যার নদীজলে,
শুধু অবহেলা পেয়ে সে শুকিয়ে গেল সহজেই।
ওপারে সর্বসুখ যারা বলে, তারা ভুল বলে,
আমি জানি, ওপারেও ওরা আজ খুব ভালো নেই।

ওরাও তো আমরাই, জানতো তা নদী-মাঝি-খেয়া।
কখন যে 'ওরা' হল, শুভদিন ফিরলো না সে আর!

১৭ ডিসেম্বর ২০১৩

মঙ্গলবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৩

অমল ও বইওয়ালা (নো অফেন্স মেন্ট!) ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য়

​বইওআলা। বই -- বই -- ভালো বই!

অমল। বইওআলা, বইওআলা, ও বইওআলা!

বইওআলা। ডাকছ কেন? বই কিনবে?

অমল। কেন কিনব! আমি তো ই-বুক পড়ি।

বইওআলা। কেমন ছেলে তুমি। কিনবে না তো আমার বেলা বইয়ে দাও কেন?

অমল। আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতুম তো অন্য ব্যবসা করতুম।

বইওআলা। অন্য ব্যবসা!

অমল। হাঁ। তুমি যে কত হাঁক পেড়েও কিছু বিক্রী করতে পারছ না তা দেখে আমার মন খারাপ লাগছে।

বইওআলা। (বইর ব্যাগ নামাইয়া) বাবা, তুমি কি বিজনেস কনসাল্ট্যান্ট?

অমল। আমি তো ফেসবুকের ওপর ডক্টরেট করছি তাই আমি সারাদিন ল্যাপটপ খুলেই বসে থাকি।

বইওআলা। আহা, বাছা তোমার কী হয়েছে?

অমল। আমি বড় হয়েছি। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শিখেছি। বইওআলা, তুমি কোথা থেকে আসছ?

বইওআলা। আমাদের গ্রাম থেকে আসছি।

অমল। তোমাদের গ্রাম? অনে--ক দূরে তোমাদের গ্রাম?

বইওআলা। আমাদের গ্রাম সেই পাঁচমুড়া পাহাড়ের তলায়। শামলী নদীর ধারে।

অমল। পাঁচমুড়া পাহাড় -- শামলী নদী -- কী জানি,হয়তো গুগল ম্যাপে তোমাদের গ্রাম দেখেছি -- কবে সে আমার মনে পড়ে না।

বইওআলা। তুমি দেখেছ? পাহাড়তলায় কোনোদিন গিয়েছিলে নাকি?

অমল। না, কোনোদিন যাই নি। কিন্তু আমি ছবি দেখেছি। অনেক পুরোনোকালের খুব বড়ো বড়ো গাছের তলায় তোমাদের গ্রাম -- একটি লাল রঙের রাস্তার ধারে। না?

বইওআলা। ঠিক বলেছ বাবা।

অমল। সেখানে পাহাড়ের গায়ে সব গোরু চরে বেড়াচ্ছে।

বইওআলা। কী আশ্চর্য! ঠিক বলছ। আমাদের গ্রামে গোরু চরে বই কি, খুব চরে।

অমল। মেয়েরা সব নদী থেকে জল তুলে মাথায় কলসী করে নিয়ে যায় -- তাদের লাল শাড়ি পরা।

বইওআলা। বা! বা! ঠিক কথা। আমাদের সব গয়লাপাড়ার মেয়েরা নদী থেকে জল তুলে তো নিয়ে যায়ই। তবে কিনা তারা সবাই যে লাল শাড়ি পরে তা নয় -- কিন্তু বাবা, তুমি নিশ্চয় কোনোদিন সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলে!

অমল। সত্যি বলছি বইওআলা, আমি একদিনও যাই নি। ঘরে বসেই যদি সব জানা যায় তাহলে কী দরকার গিয়ে তোমাদের গ্রামে?

বইওআলা। ঠিক কথা বাবা, খুব সত্যি কথা!

অমল। আমি বরং তোমায় অনলাইন বই বেচতে শিখিয়ে দেব। ঐরকম ব্যাগ কাঁধে নিয়ে -- ঐরকম খুব দূরের রাস্তা দিয়ে আর তোমাকে ঘুরে বেড়াতে হবে না।

বইওআলা। মরে যাই! বই বেচতে যাব কেন বাবা। আমি আর তুমি মিলে বরং ও এল এক্স এর মতো কিছু সাইট খুলব।

অমল। না, না, আমি কক্‌খনো অনলাইনে ব্যবসা করব না। আমি একটা বিজনেস কন্সাল্টেন্সি ফার্ম খুলব। একে ওকে শুধু উপদেশ দেব, প্রয়োজনে ট্রেনিং ও দেব।

বইওআলা। হায় পোড়াকপাল! এ কেরিয়ার ও কি কোনো কেরিয়ার হল!

অমল। না, না, এ আমার অনেক দিনের স্বপ্ন। ওয়াই ফাই খুব স্ট্রং হলে যেমন অনেক দূর থেকে নেট কানেক্ট করা যায় -- তেমনি ঐ রাস্তার মোড় থেকে ঐ গাছের সারির মধ্যে দিয়ে যখন তোমার ডাক আসছিল, আমার মনে হচ্ছিল – ফেসবুকে ডক্টরেট করা হয়ে গেলে আমাকে কন্সাল্টেন্সি ফার্ম খুলতেই হবে!

বইওআলা। বাবা, এই এক ব্যাগ বই তুমি রাখো।

অমল। আমার তো বাজেট অ্যালোকেটেড নেই।

বইওআলা। না না না না -- বাজেটের কথা বোলো না। আমার বইগুলো বিদেয় হলে আমি কত খুশি হব।

অমল। তোমার কি অনেক দেরি হয়ে গেল?

বইওআলা। কিচ্ছু দেরি হয় নি বাবা, আমার কোনো লোকসান হয় নি। বই বেচা যে কত ওয়েস্ট অফ টাইম সে তোমার কাছে শিখে নিলুম।

সোমবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৩

গেছো দাদার পপাত চ ~ অনির্বান সরকার

​বেজায় পেট গরম। AC চালিয়ে চুপচাপ শুয়ে আছি, তবু ঘেমে অস্থির।।কাল আবার ডার্বি। ..আবার হার?| টেবিলের উপর রুমালটা ছিল, ঘাম মুছবার জন্য যেই সেটা তুলতে গিয়েছি অমনি রুমালটা বলল ``মাচা !'' কি আপদ! রুমালটা মাচা মাচা করে কেন?
চেয়ে দেখি রুমাল তো আর রুমাল নেই, দিব্যি মোটা-সোটা লাল টক্‌টকে একটা বেড়াল গোঁফ ফুলিয়ে প্যাট্ প্যাট্ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!
আমি বললাম, ``কি মুশকিল! ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল।''
অমনি বেড়ালটা বলে উঠল, ``মুশকিল অবার কি? ছিল একটা পোকা , হয়ে গেল দিব্যি একটা মাছ । এ তো হামেশাই হচ্ছে।''
আমি খানিক ভেবে বললাম, ``তা হলে তোমায় এখন কি বলে ডাকব? তুমি তো সত্যিকারের বেড়াল নও, আসলে তুমি হচ্ছ রুমাল।''
বেড়াল বলল, ``বেড়ালও বলতে পার, রুমালও বলতে পার, অবনমন ও বলতে পার।'' আমি বললাম, ``অবনমন কেন?''
শুনে বেড়ালটা ``তাও জানো না?'' বলে এক চোখ বুজে ফ্যাচ্‌ফ্যাচ্ করে বিশ্রীরকম হাসতে লাগল। আমি ভারি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। মনে হল, ঐ অবনমন এর কথাটা নিশ্চয় আমার বোঝা উচিত ছিল। তাই থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, ``ও হ্যাঁ-হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।''
বেড়ালটা খুশি হয়ে বলল, ``হ্যাঁ, এ তো বোঝাই যাচ্ছে--- অবনমন এর মা , বেড়ালের চন্দ্রবিন্দু, রুমালের চা --- হল মাঁচা । কেমন, হল তো?''
আমি বললাম, ``চন্দ্রবিন্দু কেন?' বেড়ালটা আবার হাসলো -- "এটাও বুঝতে পারছ না ভায়া?"
আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না, কিন্তু পাছে বেড়ালটা আবার সেইরকম বিশ্রী করে হেসে ওঠে, তাই সঙ্গে সঙ্গে হুঁ-হুঁ করে গেলাম। তার পর বেড়ালটা খানিকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাত্‍‌ বলে উঠল, ``গরম লাগে তো সেকেন্ড ডিভিশন এও তো খেলতে পারো।''
আমি বললাম, ``বলা ভারি সহজ, কিন্তু বললেই তো আর সেটা করা যায় না?''
বেড়াল বলল, ``কেন, সে আর মুশকিল কি?''
আমি বললাম, `পাবলিক এর ভয় , সমর্থকেরা কি বলবে? তুমি কোনো উপায় জানো? তাহলে বাতলে দাও ''
বেড়াল একগাল হেসে বলল, ``তা আর জানি নে? কলকাতা , ডায়মন্ডহারবার, রানাঘাট, তিব্বত, ব্যাস্! সিধে রাস্তা, সওয়া ঘণ্টার পথ, তারপর শীর্ষাসন , কঠিন অনুশীলন , no ফাকিবাজি। মাঝে মাঝে প্রাণায়াম ও করতে পারো তো , খুব কাজের জিনিস ।''
আমি বললাম 'প্রাণায়াম করলেই জিতে যাবো?'
বেড়াল রেগে গিয়ে বলল 'সেটা আমি কখন বললাম ।ওটা করলে ধৈর্য বাড়বে । হার টাকে sportingly মেনে নিতে পারবে '
আমি বললাম, ``'তা হলে দায়িত্ব টা তুমি নিতে পার?''
শুনে বেড়ালটা হঠাত্‍‌কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। তার পর মাথা নেড়ে বলল, ``উঁহু, সে আমার কর্ম নয়। আমার গেছোদাদা যদি থাকত, তা হলে সে ঠিক-ঠিক বলতে পারত।''
আমি বললাম, ``গেছোদাদা কে? তিনি থাকেন কোথায়?''
বেড়াল বলল, ``গেছোদাদা আবার কোথায় থাকবে? Austrelia''
আমি বললাম, ``কোথায় গেলে তাঁর সাথে দেখা হয়?''
বেড়াল খুব জোরে মাথা নেড়ে বলল, সেটি হচ্ছে না, সে হবার জো নেই।''
আমি বললাম, ``কিরকম?''
বেড়াল বলল, ``সে কিরকম জানো? মনে কর, তুমি যখন যাবে উলুবেড়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, তখন তিনি থাকবেন মতিহারি গাঁজার ঠেকে। যদি মতিহারি যাও, তা হলে শুনবে তিনি আছেন রামকিষ্টপুর দুগ্গা পুজোর ভাসানে। আবার সেখানে গেলে দেখবে তিনি গেছেন কাশিমবজার ছট পুজো কমিটির মিটিং attend করতে । কিছুতেই দেখা হবার জো নেই।''
আমি বললাম, ``তা হলে তোমরা কি করে দেখা কর?''
বেড়াল বলল, ``সে অনেক হাঙ্গাম। আগে হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় নেই; তার পর হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় থাকতে পারে; তার পর দেখতে হবে, দাদা এখন কোথায় আছে। তার পর দেখতে হবে, সেই হিসেব মতো যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে, তখন দাদা কোথায় থাকবে। তার পর দেখতে হবে---''
আমি তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললাম, ``সে কিরকম হিসেব?''
বেড়াল বলল, ``সে ভারি শক্ত। জ্যামিতি ছিল ছোটোবেলায়?'' এই বলে সে একটা কাঠি দিয়ে ঘাসের উপর লম্বা আঁচড় কেটে বলল, ``এই মনে কর গেছোদাদা ।'' বলেই খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে চুপ করে বসে রইল।
তার পর আবার ঠিক তেমনি একটা আঁচড় কেটে বলল, ``এই মনে কর তুমি,'' বলে আবার ঘাড় বাঁকিয়ে চুপ করে রইল।
তার পর হঠাত্‍‌ আবার একটা আঁচড় কেটে বলল, ``এই মনে কর চন্দ্রবিন্দু।'' এমনি করে খানিকক্ষণ কি ভাবে আর একটা করে লম্বা আঁচড় কাটে, আর বলে, ``এই মনে কর তিব্বত---'' ``এই মনে কর গেছোবৌদি ইলিশ রান্না করছে---'' ``এই মনে কর গাছের গায়ে একটা ফুটো---ইলিশ ভাপা ,ইলিশ পাতুরি, দৈ ইলিশ ... ''

এইরকম শুনতে-শুনতে শেষটায় আমার কেমন রাগ ধরে গেল। আমি বললাম, ``দূর ছাই! কি সব আবোল তাবোল বকছে, একটুও ভালো লাগে না .... ক্ষিদে পাচ্ছে''
বেড়াল বলল, ``ও আচ্ছা, তোমার তো আবার পেট গরম ..ইলিশ হজম হবে না ।'' আমি চোখ বুজলাম।
চোখ বুজেই আছি, বুজেই আছি, বেড়ালের আর কোনো সাড়া-শব্দ নেই। হঠাত্‍‌ কেমন সন্দেহ হল, চোখ চেয়ে দেখি বেড়ালটা ল্যাজ খাড়া করে বাগানের বেড়া টপকিয়ে পালাচ্ছে আর ক্রমাগত ফ্যাচ্‌ফ্যাচ্ করে হাসছে।
কি আর করি, ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে ব্যলকনিতে গিয়ে বসলাম । বসতেই কে যেন ভাঙা-ভাঙা মোটা গলায় বলে উঠল, ``লাস্ট কবে বড় ট্রফি হাতে নিয়েছ খোকা ?''
আমি ভাবলাম, এ আবার কে রে? এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, এমন সময় আবার সেই আওয়াজ হল, ``কই জবাব দিচ্ছ না যে? শেষ কবে জিতেছ?'' তখন উপর দিকে তাকিয়ে দেখি, একটা দাঁড়কাক শ্লেট পেনসিল দিয়ে কি যেন লিখছে, আর এক-একবার ঘাড় বাঁকিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে।
আমি বললাম, ``২০১২ ''
কাকটা অমনি দুলে-দুলে মাথা নেড়ে বলল, ``হয় নি, হয় নি, ফেল্।''
আমার ভয়ানক রাগ হল। বললাম, ``নিশ্চয় হয়েছে। ২০১২ কলকাতা ফুটবল লীগ।''
কাকটা কিছু জবাব দিল না, খালি পেনসিল মুখে দিয়ে খানিকক্ষণ কি যেন ভাবল। তার পর বলল, ``দু হাজার বারোর নামে হরিবল , হাতে রইল কাচকলা , ঘন্টার মাথা !''
আমি বললাম, ``তবে যে বলছিলে ২০১২ তে পাই নি ? এখন কেন?''
কাক বলল, ``কাচকলা কোনো ট্রফির নাম নয় । তুমি যখন বলেছিলে, তখনো পুরো ট্রফি হয় নি। ওটা ছিল, রানার্স ট্রফি । আমি যদি ঠিক সময় বুঝে ধরে না ফেলতাম, তা হলে এতক্ষণে ওটাকেই বড় ট্রফি বলে চালিয়ে দিতে ।''
আমি বললাম, ``এমন আনাড়ি কথা তো কখনো শুনি নি। ট্রফি মানে ট্রফি , তা সে বড় হোক ছোটো হোক অথবা পুচকে । তা সে পাড়ার খেলা হলেও ট্রফি আবার স্বান্তনা পুরস্কার হলেও ।''
কাকটা ভারি অবাক হয়ে বলল, ``তোমাদের ক্লাবে winners ট্রফির কোনো দাম নেই বুঝি?''
আমি বললাম, ``winners ট্রফি!! সেটা কিরকম?''
কাক বলল, ``পাসের ক্লাবে কদিন থাকতে, তা হলে বুঝতে।ওদের তো ট্রফি রাখার আর জায়গাই নেই ।প্রতি বছর এত্তগুলো করে । এই তো কদিন খেটেখুটে খানিকটে সময় জমিয়েছিলাম, তাও তোমার সঙ্গে তর্ক করতে অর্ধেক খরচ হয়ে গেল।'' বলে সে আবার হিসেব করতে লাগল। আমি অপ্রস্তুত হয়ে বসে রইলাম।
এমন সময়ে হঠাত্‍‌গাছের একটা ফোকর থেকে কি যেন একটা সুড়ুত্‍‌ করে পিছলিয়ে মাটিতে নামল। চেয়ে দেখি, দেড় হাত লম্বা এক বুড়ো, তার পা পর্যন্ত সবুজ রঙের দাড়ি, হাতে একটা হুঁকো তাতে কলকে-টলকে কিচ্ছু নেই, আর মাথা ভরা টাক। টাকের উপর খড়ি দিয়ে কে যেন কি-সব লিখেছে।
বুড়ো এসেই খুব ব্যস্ত হয়ে হুঁকোতে দু-এক টান দিয়েই জিজ্ঞাসা করল, ``কই হিসেবটা হল?কবে শেষ বার ট্রফি পেয়েছিল''
কাক খানিক এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, এই হল বলে।''
বুড়ো বলল, ``কি আশ্চর্য! উনিশ দিন পার হয়ে গেল, এখনো হিসেবটা হয়ে উঠল না?''
কাক দু-চার মিনিট খুব গম্ভীর হয়ে পেনসিল চুষল তার পর জিজ্ঞাসা করল, ``কতদিন বললে উনিশ ?তা সে লাগবে না সে কি আজকের কথা -- stone age ছিল তখন ''
কাক অমনি গলা উঁচিয়ে হেঁকে বলল, ``লাগ্ লাগ্ লাগ্ দু হাজার বারো ।''
বুড়ো বলল, ``এগারো ।'' কাক বলল, ``দশ ।'' বুড়ো বলল, ``নয় ।'' ঠিক যেন নিলেম ডাকছে।
ডাকতে-ডাকতে কাকটা হঠাত্‍‌ আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ``তুমি ডাকছ না যে?''
আমি বললাম, ``খামকা ডাকতে যাব কেন? আমি তো জানি ২০০৯ সুপার কাপ ''
বুড়ো এতক্ষণ আমায় দেখে নি, হঠাত্‍‌আমার আওয়াজ শুনেই সে বন্‌বন্ করে আট দশ পাক ঘুরে আমার দিকে ফিরে দাঁড়াল।
তার পরে হুঁকোটাকে দূরবীনের মতো করে চোখের সামনে ধরে অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার পর পকেট থেকে কয়েকখানা রঙিন কাঁচ বের করে তাই দিয়ে আমায় বার বার দেখতে লাগল। তার পর কোত্থেকে একটা পুরনো দরজির ফিতে এনে সে আমার মাপ নিতে শুরু করল, আর হাঁকতে লাগল, ``I League (ন্যাশনাল ফুটবল League) এ ১৩-১০ ,ফেডারেশন কাপে ৮-৫,Calcutta ফুটবল লীগ এ ৪৮-৪৩ , I.F.A. শিল্ড এ ২০-৭,ডুরান্ড কাপে ৮-৬, রোভার্স কাপে ৪-৪, এয়ারলাইন্স ট্রফি তে ৭-১ -- আর পারছি না আমি হিসেব করতে ।সর্ব সাকুল্যে ১১৫-৮৫।''
আমি ভয়ানক আপত্তি করে বললাম, ``এ হতেই পারে না। বুকের মাপও ছাব্বিশ ইঞ্চি, গলাও ছাব্বিশ ইঞ্চি? আমি কি ইলতুতমিস? নিশ্চই রেফারির কারসাজি । ব্যাটাদের বিশ্বাস নেই ''
বুড়ো বলল, ``বিশ্বাস না হয়, wikipedia দেখ।''
দেখলাম ফিতের লেখা-টেখা সব উঠে গিয়েছে, খালি ২৬ লেখাটা একটু পড়া যাচ্ছে, তাই বুড়ো যা কিছু মাপে সবই ছাব্বিশ ইঞ্চি হয়ে যায়।
তার পর বুড়ো জিজ্ঞাসা করল, ``ওজন কত?''
আমি বললাম, ``জানি না!''
বুড়ো তার দুটো আঙুল দিয়ে আমায় একটুখানি টিপে-টিপে বলল, `থাক অনেক হয়েছে ওটা সবাই জানে।২-৩ তো হবেই চোখ বুজে `।''
আমি বললাম, ``সেকি, পটল টার ওজনই তো একুশ সের, সে আমার চাইতে দেড় বছরের ছোটো।''
কাকটা অমনি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ``সে তোমাদের হিসেব অন্যরকম।''
বুড়ো বলল, ``তা হলে লিখে নাও--- ওজন আড়াই সের, বয়েস একশ চব্বিশ।''
আমি বললাম, ``দূত্‍‌!আমার বয়স হল আট বছর তিনমাস, বলে কিনা একশ চব্বিশ।''
বুড়ো খানিকক্ষণ কি যেন ভেবে জিজ্ঞাসা করল, ``বাড়তি না কমতি?'' কাক মাথা নিচু করে বলল , 'পড়তি । আবার ঝরতি ও বলতে পারো।'
আমি বললাম, ``সে আবার কি?''
বুড়ো বলল, ``বলি বয়েসটা এখন বাড়ছে না কমছে?''
আমি বললাম, ``বয়েস আবার কমবে কি? তবে লাস্ট ৫-৬ বছর ধরে কোনো হিসেব কাজ করছে না''
বুড়ো বলল, ``তা নয় তো কেবলই বেড়ে চলবে নাকি? তা হলেই তো গেছি! কোনদিন দেখব বয়েস বাড়তে বাড়তে একেবারে ষাট সত্তর আশি বছর পার হয়ে গেছে। শেষটায় ঝাপি বন্ধ হয়ে যায় আর কি ! যা দিন কাল লোকের ক্ষোভ ক্রমশ যে হারে বাড়ছে নতুন ফর্মুলা আবিস্কার না হয়ে যায় আবার ।আর ওদের ই বা দোষ কিসের এইটুকু আপদার তো থাকতেই পারে ।কষ্ট হয় দেখলে ''
আমি বললাম, ``তা তো হবেই। আশি বছর বয়েস হলে মানুষ বুড়ো হবে না!''
বুড়ো বলল, ``তোমার যেমন বুদ্ধি! আশি বছর বয়েস হবে কেন? সেবার তো অবনমন ছিল, এক কম হবে''।.ঠিক কি না ?. শুনে আমার গা পিত্তি জ্বলে গেলো।
কাক বলল, ``তোমরা একটু আস্তে আস্তে কথা কও, আমার হিসেবটা চট্‌পট্ সেরে নি।

(সুকুমার রায়ের আশ্রয় নিলাম)

মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৩

কুমিরডাঙা ~ অনামিকা মিত্র

খাল কেটেছি, কুমির এল তার কিছুটা পরে
আসুন হুজুর বসুন হুজুর চেঁচাই সমস্বরে
কুমির হাসেন বসব কি রে, সামনে অনেক কাজ যে!
সবকিছুতেই গিঁট বেধেছে তোদের পোড়া রাজ্যে।
আমার আবার কাজ ছাড়া আর ভাল্লাগে না কিচ্ছু।
অ্যাদ্দিন সব চলছে যা তা। আমলারা সব বিচ্ছু।
সবটা আমিই সামলে দেব। আমরা শুধোই, কবে? 
সয় না সবুর, দেশ ভরে যায় উৎসবে উৎসবে।
উৎসব কি একরকমের? হাজার রকম বায়না।
স্বদেশ থেকে ব্যাঘ্রকে চাই, বিদেশ থেকে হায়না।
বাঘ হায়নার পরেও আছেন নানান রকম জন্তু
সবার জন্য উত্তরীয়, রত্ন অধিকন্তু। 
দানছত্রেই ফুরোয় যদি কষ্টে জোগাড় অর্থ,
হতাশ বলি, উৎসবই কি এই যজ্ঞের শর্ত?
উৎসবে আর নিভছে না যে দগ্ধ পেটের অগ্নি
কুমির বলেন ঠিক বুঝেছিস প্রাজ্ঞ ভ্রাতা ভগ্নী
এই কথাটাই আজ না বুঝে বুঝতি যদি কালকে
আমার আসার আশায় থেকে কাটতি না এই খালকে।
কান্নাকাটি ঢাকতে এ'বার বাজুক কাঁসর বাদ্য।
আমারও খুব পাচ্ছে খিদে, তোরাই তো সেই খাদ্য।

শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৩

বাজার অর্থনীতি ~ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়

শুনতে পেলাম বাজার গিয়ে
পেঁয়াজ না কি বড্ড ইয়ে,
ওমলেট-টার আশা ছেড়ে,
থলি হাতে লেজটা নেড়ে -
গুটিগুটি আলুর দিকে,
"দাম কতো?" শুধোই হেঁকে
জবাব আসে, "কিলোয় ষাট।"
ঘোরে বনবন বাজার হাট।
ভাবি একবার - "খাবো শাক।"
মাছের গন্ধ মাতায় নাক।
থাক না কেন, পকেট ঢিলে,
ভাবলে মাথা নেবেই চিলে।
নড়েই গেল বুদ্ধির গোড়া,
রাতে ভাতে কচুপোড়া।
 

শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৩

​ভবসাগর-কারণ ~ অমিতাভ প্রামাণিক

সংসারে আর মন টেঁকেনা, এ ঘরখানায় দশ ফুটে
বন্দী থাকি আর কতকাল, তাই বলে যাই অস্ফুটে
হাড্ডাহাড্ডি লড়বো না, ঘাম ঝরাবো না, কি রক্ত –
এবার আমি বেরিয়ে যাব, কী লাভ, হয়ে বিরক্ত?
খুব ভয়ে রোজ বাজারে যাই সকাল বেলা দশটাতে,
এদিক ওদিক খুঁজে বেড়াই কে দিচ্ছে কী সস্তাতে।
মাছ কিনতুম যার কাছে, আজ সমঝে গেছি, বজ্জাত এ –
কী অপমান করছে দাদা, যাচ্ছিনে তাই লজ্জাতে।
সবজি বাজার? হাল একই তার, কী দাম, কী দাম, জঘন্য!
কেজি না আজ, আড়াইশো গ্রাম, পকেটের হাল নগণ্য।
ফিরলে বাড়ি গিন্নী চ্যাঁচান, আসেন তেড়ে বাঁশ তুলে;
ভাবছি এবার জাহাজঘাটায় পাল তুলে দি মাস্তুলে।
এতদিন তো কাটলো জীবন, করে পরের দাসত্ব –
এবার একাই বেরিয়ে যাব, তাই লিখে যাই, যা সত্য।
ভুল গাছে রোজ জল দিয়েছি, একটা ফলও না ফললো,
ঐ ফেলুদা সব পেয়েছে, এই ফেলুর কী সাফল্য?
বিয়ের আগে ভেবেছিলেম, যে মেয়েটা লাবণ্য,
দু তিনটে যুগ ঘর করে আজ দেখছি তাকে, কী বন্য!

ভাবছ আমি ফ্রাস্টু খেয়ে লিখছি বসে যা সত্যি?
ভীমরতি তো একটু হবেই বয়স হলে বাষট্টি!

৯ নভেম্বর ২০১৩

শুক্রবার, ৮ নভেম্বর, ২০১৩

ছাগলের সেজ ছানার গল্প ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরি


সিরিজ খবর জানবি পরে, প্রথম খেলার খসরা নে।
তিনদিনে ম্যাচ জিতলি বটে, ঈশ্বর আউট দশ রানে।

এ'সব কথায় ঘাবড়াব না, থাকবে লেখা সব বইয়ে,
ঠিক কতটা উল্লসিত ছিলাম একশ' নব্বইএ।

অফিস কেটে… মুখোস পড়ে… হল্লাবাজির দৃশ্য ঢের। 
হেডলাইনের টেল লাইনের, সকল ছবিই ঈশ্বরের।

ঠান্ডা ঘরে টিভির ভেতর চলুক খেলার বিশ্লেষণ।
তার মধ্যেই বিজ্ঞাপনের নানান রঙিন বিষ লেসন। 

আলুর আকাল… বাংলা নাকাল, ও'সব ভাবার দিক ছাড়ো।
পাগড়ি পড়াও ইনাম সাজাও তার সাথে দাও পিকচারও। 

এরপরে কি? দিন যাপনের দুঃখ ভোলায় বল্ কে আর।
চিন্তাটি নট। আসছে বিকট… দুঃখহরণ ফিল্মফেয়ার।

​নভেম্বর মাস এলে ~ অনামিকা মিত্র

নভেম্বর মাস এলে তার কথা মনে পড়ে যায়
মনে পড়ে ইতিহাসে আমাদের লেখা ছিল নাম
নভেম্বর মাস এল। ছিঁড়ে যাওয়া লাল পতাকায়
আবার নিজেকে লিখে গর্বে আকাশে ওড়ালাম।

বিপ্লব মানে কোনও বুথজ্যাম ভোটবাজী নয়
বিপ্লব নয় কোনও সরকারি আলু বা পেঁয়াজ।
সারদার টাকা গাপ, ওয়াকফ ফান্ড নয়ছয়,
বিপ্লব নয় কোনও অভিনয়… মৌলবাদী ভাঁজ।

সময় সমস্ত খায়, প্রতিজ্ঞা প্রতিভা ও মেধা।
মধ্যবিত্ত সময়ের প্যাঁচে পড়ে কেউ পাচু রায়।
তবুও বিপ্লব থাকে মগজের মাঝখানে বেঁধা।
বিপ্লবের স্বপ্ন ছাড়া বাঁচবার থাকে না উপায়!

সভ্যতা বিক্রি করে ঝানু যত দাসব্যবসায়ী।
নষ্ট হয়ে যাই রোজ। ভুল স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে বাঁচি।
বিপ্লব আসেনি আজও। তার জন্য আমি একা দায়ী।
আমিই চাইনি তাকে। খেলে গেছি ভুল কানামাছি।

আবর্তিত হতে থাকে এ'গ্রহের ভূত ভবিষ্যৎ।
আমাদের চেতনায় জেগে থাকে বাঁচার প্রয়াস।
ভাঙা পথে ঘরে ফেরে আমাদের হারানো শপথ
বারবার ফিরে আসে বিপ্লবের নভেম্বর মাস।

মঙ্গলবার, ৫ নভেম্বর, ২০১৩

ভ্রাতৃদ্বিতীয়া ~ অমিতাভ প্রামাণিক


বিবস্বতমুনির পুত্র নরকরাজ যমদেবের বোন যমুনা। বিয়ের পর যমুনা ভাই যমরাজকে নেমন্তন্ন করলেও নরকে পাপীতাপীদের নিয়ে হাজারটা কাজে ব্যস্ত থাকায় যম বোনের শ্বশুরবাড়ি আসার সময় পায়না। অবশেষে কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় যম চিত্রগুপ্তকে চার্জ বুঝিয়ে কোনোরকমে একদিন ছুটি নিয়ে যমুনার বাড়ি গেল। যমুনা তো ভাইকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। নিজের হাতে ভাইয়ের কপালে সুগন্ধী চন্দনের ফোঁটা দিলো, রান্না করে ভাইকে খাওয়ালো ভালোমন্দ এটাসেটা। যমের অরুচি গেল কেটে। যমরাজ অত্যন্ত খুশি হয়ে ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে যমুনাকে বলল, বল, কী বর চাই তোর? যমুনা বলল, বরই যদি দিস দাদা, এমন বর দে যেন আজকের দিনে যে ভাই বোনের হাতে ফোঁটা নেবে সে কোনদিন নরকদর্শন করবে না, সে অমর হবে, তার হবে অখণ্ড পরমায়ু। 

বোনের যত্ন-আত্তি পেয়ে আর পেটপুরে খেয়ে যমরাজ খুশিই ছিল। বললো, তথাস্তু।

এই তো, গল্পটা? এ রকম আরো আছে, একাধিক। নরকাসুরকে বধ করে কৃষ্ণ ফিরে গেল দ্বারকায়, সেখানে ক্লান্ত কৃষ্ণকে বোন সুভদ্রা প্রদীপ জ্বালিয়ে ওয়েলকাম করলো, পিঁড়ি পেতে খেতে দিল মণ্ডা-মিঠাই। ভাই যেন পুনর্জন্ম পেল, হয়ে গেল দ্বিজ, তাই শুরু হল ভাই-দ্বিজ, অপভ্রংশে ভাইদুজ।

পাতালরাজ দানবীর বলির তপস্যায় খুশি হয়ে ভগবান বামদেব বিষ্ণুরূপে তার গৃহে এসে বর দিতে চাইলে বলি বললেন, ভগবন্‌, আপনি এখানেই দ্বারপাল হিসাবে থাকুন, যাতে আসতে যেতে আপনার দেখা পাই। বিষ্ণুর রাজী না হয়ে উপায় ছিল না। এদিকে লক্ষ্মী পড়েছেন ফ্যাসাদে, ঘরের মানুষের দেখা নেই। নারদের মুখে খবর পেয়ে লক্ষ্মী গরীর ভিখারিনী সেজে শাড়ি ছিঁড়ে গিঁট মেরে অজন্তা হাওয়াই ফটফট করতে করতে বলির কাছে গিয়ে ভিক্ষে চাইল। কপালে ফোঁটা দিয়ে বলল, আমার ভাই নেই, তুমি আমার ভাই। দানবীর বলির দানের অহঙ্কার, বললো, বোনটি আমার, তোর যা চাই তাই পাবি। লক্ষ্মী বলল, আমার কর্তাকে আটকে রেখেছ, প্লীজ ছেড়ে দাও। ব্যাস, বলির হাওয়া নিকলে গেল।

মহামতি চাণক্য এই নিয়ে পরে শোলোক বেঁধেছেন – অতিদর্পে হতা লঙ্কা অতিমানে চ কৌরবাঃ। অতিদানে বলির্বদ্ধঃ সর্বমত্যন্তম্‌ গর্হিতম্‌। মানে বলে দিতে চাইলে নিশ্চয় বলবে, বেশি বেশি কোরনা!

রাজা নন্দীবর্ধন বহুদিন ভাইকে না দেখে মনোকষ্টে ভুগছে। ভাই মহাবীর তপস্যায় নির্বাণলাভ করে জৈনধর্ম প্রচার করে বেড়াচ্ছে। নন্দীবর্ধনের কষ্ট লাঘবের জন্যে বোন সুদর্শনা কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় ভায়ের বাড়ি এসে তার সেবা করতে লাগল। 

তারপর সেই গল্পটা! অনেক আগে জঙ্গলের ধারে এক বাড়িতে থাকত এক পরিবার। দিদির যখন বিয়ে হয়ে যায়, ভাই তখন খুব ছোট। বড় হয়ে দিদির মুখ মনেও পড়ে না তার। অন্যদের দেখে মাকে জিজ্ঞেস করে, মা, আমারও তো দিদি আছে তুমি বলো, সে কেন আসে না? মা বলে, ওরে, তার যে শ্বশুরবাড়ি অনেক দূর, পরে পড়ে জঙ্গল, খরস্রোতা নদী, সে কী করে আসবে বল? 

ছেলেটা বলল, আমি দিদির শ্বশুরবাড়ি যাব। মা যত বিপদের কথা বলে, নাছোড়োবান্দা ছেলের তত জেদ বেড়ে যায়। শেষে মা পুজো-আচ্চা করে মাথায় চুমো টুমো খেয়ে যেতে দিল ছেলেকে।

জঙ্গলের পথে হাঁটছে ছেলে, ধেয়ে এল সাপ। ছেলে বলল, জানো, আমি আমার দিদির কাছে যাচ্ছি, কতদিন তাকে দেখিনি, এখন আমাকে কেটো না, প্লীজ, ফেরার পথে যা খুশি কোরো। সাপ বলল, ঠিক আছে। ছুটে এল বাঘ, তাকেও একই কথা বলল সে। পাহাড় শুরু করল তার ওপর পাথর ফেলতে, সে মিনতি করল, এখন আমায় মেরো না দয়া করে। ওরা মেনে নিল।

নদী পার হতে গিয়ে দেখে প্রবল স্রোত, ভেসে যাবার উপক্রম। নদীর কাছেও সে চাইল তাকে যেন অনওয়ার্ড জার্নিতে ডুবিয়ে দেওয়া না হয়। নদী তাকে ডলফিন-টলফিন দিয়ে পার করে দিল।

ভাইকে পেয়ে তো দিদির আনন্দের শেষ নেই। খাওয়া-দাওয়া ফোঁটা-টোঁটা তো হলই, কত গল্পগুজব, খুনসুটি, কত কী! অনেক দিন সেখানে থেকে ফেরার যখন সময় হল, দিদি বলল, আবার আসিস ভাই। ভাই বলল, জানিস দিদি, আমাদের আর দেখা হবে না। আসার সময় যা যা কাণ্ড হয়েছিল, সব দিদিকে বলল সে।

দিদি বলল, কী, আমার ভাইকে মেরে ফেলবে এরা? রসো, মজা দ্যাখাচ্ছি। সেও পোঁটলা নিয়ে রেডি হয়ে গেল, বলল, চ' আমিও তোর সাথে যাব।

নদীকে খুশি করতে পুজো দিল সে, নদী ছেড়ে দিল। বাঘ হালুম করে তেড়ে আসতেই পোঁটলা খুলে তার দিকে ছুঁড়ে দিল রান্না করা মাংসের চাঁপ-রেজালা-দোপিঁয়াজা। বাঘ তাই খেয়ে ফুটে গেল। সাপকে দুধকলা দিয়ে আর পাহাড়কে সোনা-রূপো ঘুষ দিয়ে বশ করে ফেলল সে। ভাইয়ের সব অনিষ্ট দূর হয়ে গেল।

এই গল্পটা আরো বড়, কিন্তু সেসব থাক। মূল কথা এটাই। ভাইদের মঙ্গলের জন্যে বোন বা দিদিরা পারে না, হেন কাজ নেই।

আজ সেই পরম মঙ্গলময় দিন। আজ কাকডাকা ভোরে বোনেরা ঘুম থেকে উঠে ঘাসের ডগা থেকে শিশিরকণা সংগ্রহ করে তাই দিয়ে চন্দন বেঁটে ভাইয়ের জন্যে বাঁ হাতের অনামিকায় তুলে নেয় যে ফোঁটা, প্রদীপ জ্বালিয়ে মাথায় ধানদূর্বা দিয়ে মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়ে সেই ফোঁটা এঁকে দেয় ভায়ের কপালে, তার তুল্য পবিত্র অনুষ্ঠান জগতসংসারে নেই। 

ভ্রাতস্তব ললাটে হি দদামি তিলকং শুভ। অতঃপরং যমদ্বারে ময়া দত্তং হি কন্টকম্। ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।

এরপর ভাইকে ভূরিভোজ করানো। ভ্রাতস্তবাগ্রজাতাহং (বয়সে ছোট অর্থাৎ অনুজ হলে ভ্রাতস্তবানুজাতাহং) ভুক্ষ্ব ভক্তমিদং শুভম। প্রীতয়ে যমরাজস্য যমুনায়া বিশেষতঃ। আর ভাইয়ের কাজ বসে বসে সেগুলো সাঁটানো। তত্র যম পূজা দিকমঙ্গ্ ভগিনী হস্তাদ্ ভোজনং প্রধানং কর্ম।

আজ রাতের আকাশে শুক্লা দ্বিতীয়ার প্রায়-অদৃশ্য একফালি চাঁদ। কিন্তু এর কাছে ভাই-বোনের মধুর-সম্পর্কজনিত অপর তিথি রাখীপূর্ণিমার পূর্ণচাঁদও যেন ম্লান মনে হয়। 

দিদিরা, আমার প্রণাম নিও। বোনেরা, অনেক ভালবাসা। ঘরের দেয়ালে একটা এক্সট্রা ফোঁটা কেটে রেখ তোমরা আমার জন্যে। মিষ্টির প্লেট আর গিফ্‌ট্‌ কি ক্যুরিয়ারে পাঠাবে?

ভ্রাতৃদ্বিতীয়া। ৫ই নভেম্বর ২০১৩