মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর, ২০০৯
তুমি গুরু ~ তুলি দত্ত
আমরা হাতিমতাই...
পদ্য লেখ তুমি -
আমি চাটনি চেটে খাই,
কী-বোর্ড তোমার মেশিন-গান,
আর বুলেট তোমার হাতে,
পদ্য শেষে ছদ্মবেশে,
পায়রা ওড়ে ছাতে -
পাগলা তুমি চুলকে নিলেই,
আসবে নোবেল দেশে,
বঙ্গ যখন জর্জরিত
সি.বি.আইয়ের কেস-এ।
রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০০৯
রক্তে ভেজা মাষ্টারমশাই কে... ~ সাস্বতী
দুধ জোটেনি, কাঁদছে ছেলে, হাজারটা বিভ্রাট
তেলের চালের আগুনে দাম, নুন খাই না পান্তা
বরটা বলে নীতির কথা, হয়েছে সবজান্তা"
সংসারের এই টানাপোড়েন লক্ষী ভাবে বসে
জীবনটা তো গেল ভেসে, শুধুই কপাল দোষে
লক্ষীর বর ভুবন তখন ব্যাস্ত অন্য কাজে
দিনবদলের স্বপ্ন দেখেন স্কুলপড়ুয়াদের মাঝে
ইতিহাসের বইয়ের ভাঁজে, ভবিষ্যতের পাতায়
ছেলের দল বিভোর তখন ভুবন স্যারের কথায়
হঠাৎ তুমুল রে রে আওয়াজ, ক্লাস ঘরেতে হইচই
"সিপিএমের দালাল শালা ভুবন স্যারটা কই?"
ছেলের দল মূক ও বধির, অচেনা এই ছবি
যা না লেখার কবিতাতে, লিখছি সেই সবই
রক্তে ভাসেন ভুবন বাবু, রক্তে ভাসে যুক্তি
মাওবাদী দল মানুষ মেরেই আনবে নাকি মুক্তি
মানুষ মারা মুক্তি দিয়েই বদলে দেবে গান?
হেই সামালো! হও হুশিয়ার! অসত্য খান খান
দিনবদলের স্বপ্ন দেখা আগুনটা জ্বলবেই
শেষ কথাটা খেটে খাওয়া মানুষ বলবেই
টুকলি-fied ~ সমিত গুপ্ত
করজোরে কহেন- ‘শুন সিদ্ধার্থ-মনি-
তুমি মহাগুরু Boss তুমিই শংকর
তুমিই এখন আপন, বাকি সব পর।
তুমি গুরু করেছিলে ফ্যাসিস্ট-সৃজন,
তোমার মহিমা আর কি করি বর্ণন?
পেশায় তুমি যে ওঝা, কভু বিষধর-
তব দংশনে ‘মাকু’ যাইত যমঘর।
কেমনে করিতে উহা কহ কৃপা করি..”
জিজ্ঞাসে কাতরকন্ঠে মমসুন্দরী।
তাঁর ব্যাকুলতা দেখি কহেন চূড়ামনি-
“শুন কথা মন দিয়া, শুন হে নাগিনী।
তোমা সমা বিষধর, কেহ নাহি বঙ্গে-
সততার Cold Cream মাখি রেখো অঙ্গে।
ঢেলো বিষ মাপ করি উনিশ বা বিশ;
তাহলেই ‘লালী’-রা হইবে finish.
গাছে তুলি মই কাড়ার habit রাখিও
সুব্রত-সুদীপ হেরী বাকীটা শিখিও।
সুযোগে যত পারো Committee গড়ো
ছত্র-মাওবাদীরে কহ হার্মাদ মারো।
স্নৃতি কম জনতার, মনে রাখেনা কিছু
চালাও সন্ত্রাসরাজ, চাহিও না পিছু।
সুশীল –স্বজন যত, আছে তব সাথে-
তাহাদেরও রাখিও দুধে আর ভাতে।"
একথা কহিয়া তিনি করিলেন গমন-
দিদি-র মুখেতে খেলে গুল-বাহারেঁ-চমন।
লাল নিশান ~ তুলি দত্ত
নীথর দেহের উপর ডুকরে মেয়ে,
দোষের মধ্যে কাস্তের সাথে তারা,
সীসের বুলেটে বিপ্লব এলো ধেয়ে।
দুইপাশে জমি মাঝখানে আলপথ,
কতগুলো ছায়া নিঃশ্চুপে পথ চলে;
জোনাকি আলোয় চিবুক যে টানটান,
সাম্যের কথা এই ছেলেগুলো বলে।
রাত কেটে গিয়ে আকাশের মুখ আলো-
ফাঁকা আলপথ - দুপাশের জমি ফাঁকা
এক ক্রোশ দূরে ছোট গ্রামটার হাটে,
সেই ছেলেগুলো কাফন দিয়েই ঢাকা।
নামজাদা নেতা মঞ্চ কাঁপান গানে,
খবরে শোনেন কবর খোঁড়ার কথা;
উড়লে নিশান কাস্তে - হাতুরি - তারা -
নেতা মোড়াবেন গনতন্ত্রের মাথা।
আসছে সেদিন, যেদিন সুর্য্য লাল-
কাস্তে-হাতুরি মানুষের হাতিয়ার-
ঐ আলপথে গর্জে উঠবে ধ্বনি,
আকাশের বুকে উড়বে লাল নিশান।
লাশ ~ জ্যোতির্ময় দত্ত
কোথা থেকে একটা দমকা বাতাস
অনেক যত্নে বোনা স্বপ্ন গুলো,
সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে, এলোমেলো করে দিল
নতুন করে সংসার পাতবে
নিপাট করে ঘর গোছাবে,
সন্ধ্যা বেলা তুলসী তলায় আলো জ্বালবে,
আর অপেক্ষা করে থাকবে তার আসার
ক্লান্ত হয়ে যখন ফিরবে সে
প্রথমে হাত মুখ ধোবার জল ,
তার পর দুধ মুড়ির বাটি,
অনেক যত্নে বোনা স্বপ্ন গুলো
অনেক পড়ে, অনেক খেটে
একটা চাকরি, হোক না পুলিশের
কথা ছিল সামনের মাঘে
নিয়ে যাবে নিজের ঘরে
কোথা থেকে দমকা একটা বাতাস
সব উলটে দিল , পালটে দিল
পরিবর্তনের হাওয়া, সব কেড়ে নিল
অনেক যত্নে বোনা স্বপ্ন গুলো
মাত্র একটা গুলি
জলজান্ত মানুষ টা এখন লাশ
গরীবের, সবে চাকরি পাওয়া ছেলেটা
এখন শ্রেনীশত্রু, একটা লাশ
মহান (!) বিপ্লবীদের শ্রেনীশত্রু
জলজান্ত মানুষ টা এখন লাশ
সাঁকরাইওলের থানায় গড়ায়
সবে চাকরি পাওয়া ছেলেটার লাশ
পরিবর্তনের হাওয়া, সব কেড়ে নিল
সব উলটে দিল , পালটে দিল
অনেক যত্নে বোনা স্বপ্ন গুলো,
মহান (!) বিপ্লবীদের গুলিতে একটা লাশ
সাঁকরাইওলের থানায় গড়ায়, সবে চাকরি পাওয়া ছেলেটার লাশ
সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০০৯
বিপ্লবীরা কি সরকারে থাকে? ~ জ্যোতির্ময় দত্ত
২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসবে কি না সেটা সময় বলবে। এখনো অনেক সময় বাকি। এখনও অনেক জল গড়ানো বাকি গঙ্গা দিয়ে। ২০০৬ সালে কোন সি পি আই এম সমর্থক ভাবে নি বামফ্রন্ট ২৩৫ টা আসন পাবে আর মেদিনীপুরে সাংবাদিকদের দুই আঙুলে ভি দেখানো দিদিমিণি মাত্র ৩০ টা আসন পাবে। কিন্তু সরকারে থাকলে বিপ্লবী চরিত্র চলে যায়, নানা রোগ দেখা দেয় অতএব বিপ্লবী থাকা ভাল , তাতে সরকারে না থাকলেই ভাল এই চিন্তা যাদের মধ্যে আসছে তাই নিয়ে আজ কিছু কথা।
সত্যিই তো ৩২ বছর একটা রাজ্যে সরকার চালানো সি পি আই এম কি বিপ্লবী ? আসলে বিপ্লবী শব্দটা শুনলেই মনের মধ্যে ভেসে ওঠে কিউবা কিম্বা বলিভিয়ার জঙ্গলে এক মুখ দাড়ি মুখে কাধে বন্দুক হাতে চে গুয়েভরা, না হলে লালফৌজ এর সামনে লং মার্চ করা মাও সে তুং। কোথায় একটা বিপ্লবী ভাব তা না ৩২ বছর ধরে রাইট্রাস বিল্ডিং এ বসে সরকার চালানো না হলে বিগ্রেডের মাঠে জনসমাবেশে ভাষন ।সরকার চালাতে গেলে কি বিপ্লবী হওয়া যায়? প্রশ্ন গুলো মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া স্বাভাবিক।
সরকার পরিচালনা করা কি বিপ্লবী কাজ ? সি পি আই এম তার কর্মসূচীর অংশ হিসাবে এই কাজ পরিচালনা করছে। সি পি আই এম তার পার্টি কর্মসূচীতে পরিষ্কার করে ব্যাখা করেছে কি ভাবে তারা ভারতবর্ষে বিপ্লব করতে চায়, আসুন দেখি সেই কথা গুলি।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষের রাষ্ট্রচরিত্র বিশ্লেষন করতে গিয়ে সি পি আই এম তার কর্মসূচীর ৫.১ ধারাতে বলেছে “ বর্তমান ভারত রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের ও জমিদারদের শ্রেনীগত শাসনের যন্ত্র এর নেতৃত্বে আছে বৃহৎ বুর্জোয়ারা – ধনতান্ত্রিক বিকাশ সাধনের উদ্দেশ্যে যারা ক্রমেই বেশি বেশি করে ফিন্সাস মূলধনের সঙ্গে সহযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। দেশের জীবনে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও কর্যাবলী এই শ্রেনী চরিত্রের দ্বারাই নির্ধারিত হয়ে থাকে।”
সি পি আই এম কমিউনিষ্ট পার্টি হিসাবে তার চরম লক্ষ্য কমিউনিজিম এই কথা সোচ্চারে ঘোষণা করে , তার পাশাপাশি সে মনে করে এই লক্ষ্যে যেতে হলে সমাজতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসমাপ্ত তাই তাকে শেষ না করে এক লাফে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পৌচ্ছান সম্ভব নয়। আমাদের দেশে বিভিন্ন তথাকথিত বিপ্লবী দল রাষ্ট্রের শ্রেনীচরিত্র ও বিপ্লবের স্তর নির্বাচন এই দুটি ক্ষেত্রে চরম ভুল করে।
লেনিন বিপ্লবের দুটি স্তরের কথা বলেছিলেন। কিন্তু মহান নভেম্বর বিপ্লবের পর উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশ এর মুক্তির সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে দেখা গেল এই সমস্ত উপনিবেশের বুর্জোয়ারা গনতান্ত্রিক বিপ্লব অসমাপ্ত রেখে মাঝপথে সামাজ্যবাদের সঙ্গে আপস করে নিজেদের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। তাই এই অসমাপ্ত গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কাজ শ্রমিকশ্রেনীকেই সমাপ্ত করতে হয়। আমাদের দেশে ঠিক এই ঘটনা ঘটেছে। প্রথম স্তরে ভারতবর্ষে সামাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ( আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন) সাধারণ যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব যেহেতু কমিউনিষ্ট পার্টি দিতে পারে নি , এই দেশে শাসকশ্রেনী আপস করেছে,গণতান্ত্রিক বিপ্লব শেষ করে নি । তাই বিপ্লবের দ্বিতীয় স্তর হিসাবে আগে গণতান্ত্রিক বিপ্লব শেষ করতে হবে। তার পর তৃতীয় স্তর হিসাবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে হবে।
যেহেতু শ্রমিকশ্রেনীর পার্টি হিসাবে সি পি আই এম এই গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে কিন্তু একা শ্রমিকশ্রেনী এই বিপ্লব করতে পারে না, তাই তৈরি করতে হবে জণগনতান্ত্রিক মোর্চা ।এই মোর্চার মূল মিত্র হবে কৃষি মজুর ও গরিব কৃষক, বিশ্বস্ত মিত্র হবে মধ্যবিত্ত শ্রেনী ও মাঝারী কৃষক, দোদুল্যমান মিত্র হবে ধনী কৃষক ও অবৃহৎ পূঁজিপতি। এই জণগনতান্ত্রিক বিপ্লবের ( শ্রমিকশ্রেনীর নেতৃত্ব জণগনতান্ত্রিক মোর্চা নিয়ে গণতান্ত্রিক বিপ্লব) প্রধান কাজ হবে সামান্ততন্ত্র বিরোধী , সামাজ্যবাদ বিরোধী এবং বৃহৎ পূঁজিপতি বিরোধী।
সুতরাং এই বিপ্লবের কাজ হল সকল প্রকার জমিদারদের সমস্ত জমি বিনা ক্ষতিপূরনে কেড়ে নিয়ে তা কৃষকদের মধ্যে বন্টন করা, সমস্ত রকম সামাজ্যবাদী ও বৃহৎ পুঁজির শোষণ বন্ধ করার জন্য তাদের পুঁজি বাজেয়াপ্ত করা।
জণগনতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধা করার জন্য জণগনতান্ত্রিক মোর্চা গঠন একটি জটিল কাজ। এই সংগ্রাম একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া , এই কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে যদি কোন রাজ্যে বা কেন্দ্রে ( কেন্দ্র শব্দটি সময়োপযোগী পার্টি কর্মসূচীতে ৭.১৭নং ধারা তে নতুন করে সংযোজন) সরকার পরিচালনার সুযোগ আসে তবে সেই সুযোগ গ্রহন করার কথাও সি পি আই এম কর্মসূচীতে লিখিত ভাবে রেখেছে।
কিন্তু কেন, কেন বিপ্লবীরা একটি বুর্জোয়া পার্লামেন্টে অংশগ্রহন করবে? সি পি আই এম এর কর্মসূচীতে যা আছে তার আগে দেখে নি একবার এই প্রসঙ্গে কমরেড লেনিন কি বলেছেন। তৃতীয় আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় অধিবেশন চলার সময় অষ্ট্রিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টি তাদের দেশের পার্লামেন্ট বয়কট করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। লেনিন তাঁদের ভুল সংশোধন করে চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে লেনিন লিখেছিলেন :
“ বুর্জোয়া পার্লামেন্টকে ভেঙে দেবার শক্তির অভাব যতদিন আমাদের থাকবে ততদিন এই পার্লামেন্টের বিরুদ্ধেই আমাদের কাজ করতে হবে বাইরে থেকে এবং ভিতর থেকে। শ্রমিকদের প্রতারিত করার জন্য বুর্জোয়ারা যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক হাতিয়ার ব্যবহার করছে সেই হাতিয়ার সম্পর্কে মেহনতী জনগনের বেশ উল্লেখযোগ্য অংশের যতোদিন পর্যন্ত আস্থা থাকবে ততোদিন পর্যন্ত এই প্রতারণাকে ব্যাখা করতে হবে সেই প্ল্যাটফরম থেকেই ….. '' ( লেনিন রচনাবলী ৩১ খন্ড, পৃষ্ঠা ২৬৮ ) ।
তৃতীয় আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় অধিবেশনে পার্লামেন্টারি সংগ্রামে অংশগ্রহন করাকে যাঁরা সময়ের অপচয় বলে মনে করেন তাঁদের বিরুদ্ধে খুব কড়াভাবে লেনিন বলেন “ পার্লামেন্টারি সংগ্রামে অংশগ্রহন করাটা আদৌ সময়ের অপচয় নয়। সমাজের সবশ্রেনীই পার্লামেন্টের কাজ কর্মে আগ্রহশীল। পার্লামেন্টেই শ্রেনীস্বার্থ ও শ্রেনীবিরোধ প্রতিফলিত হয় বলেই সব শ্রেনীই পার্লামেন্টারি সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে। এক আঘাতে পুঁজিবাদের উচ্ছেদ করার জন্য সর্বত্র এবং অবিলম্বে একটা চূড়ান্ত সাধারণ ধর্মঘট বাস্তবায়িত করা সম্ভব হত তা হলে ইতি মধ্যেই বহু দেশেই এই বিপ্লব ঘটানো যেতো। কিন্তু ঘটনা যা তাই আমাদের বিশ্লেষন করতে হবে এবং পার্লামেন্ট হচ্ছে শ্রেনী সংগ্রামেরই একটি ক্ষেত্র বিশেষ।” (লেনিন রচনাবলী ৩১ খন্ড, পৃষ্ঠা ২৫৫-২৫৬ )
এইবার আসুন দেখি সি পি আই এম তাদের কর্মসূচীতে যা লিখেছে “ দ্রুত পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাহিদা অনুসারে পার্টিকে নানান ধরনের অন্তর্বতীকালীন স্লোগান স্পষ্টতই হাজির করতে হবে। বর্তমান শাসকশ্রেনীগুলিকে ক্ষমতাচ্যুত করে শ্রমিক কৃষকের দৃঢ় মৈত্রীর উপরে প্রতিষ্ঠিত এক নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট ও সরকার স্থাপনের কর্তব্যকে জণগনের সামনে অবিচল রেখেও যদি তেমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে, জণগনের সমস্যাবলী প্রশমনের এক কর্মসূচীতে অঙ্গীকারবদ্ধ কোন সরকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ আছে, তা হলে পার্টি সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে ও বর্তমান সীমাবদ্ধতার মধ্যে জনগনকে রিলিফ দেওয়ার এবং বিকল্প নীতি গুলি তুলে ধরার ও প্রয়োগ করার চেষ্টা করবে । এই ধরনের সরকার গঠনের ফলে শ্রমজীবী জণগনের বৈপ্লবিক আন্দোলন শক্তিশালী হবে, জনগণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠনের প্রক্রিয়াকে তা সাহায্য করবে। অবশ্য এই ধরনের সরকারগুলি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্যসাবলীর মৌলিক সমাধান কোন ভাবেই করবে না। তাই পার্টি সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী রাজ্যগুলি অথবা কেন্দ্রে এই ধরনের সরকার গঠনের সুযোগ গ্রহণ করেও বুর্জোয়া -জমিদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান রাষ্ট্র ও সরকারের অপসারনের আবশ্যকতা সম্পর্কে ব্যাপকতম জণসাধারণকে শিক্ষিত করতে থাকবে এবং এর দ্বারা গণ – আন্দোলনকে শক্তিশালী করবে '' ( সময়োপযোগী পার্টি কর্মসূচীতে ৭.১৭নং ধারা)
এই বিশ্লেষনের উপর দাঁড়িয়ে সি পি আই এম সরকারে অংশগ্রহন করে। এই মুহুর্তে জঙ্গলে নয়, রাইফেল কাধে লংমার্চে নয় , পঞ্চায়েতে ,পৌরসভাতে , রাইট্রাস বিল্ডিং এ মানুষ কে রিলিফ দেওয়ার কাজ যারা করছেন এবং সেই কাজ করতে গিয়ে মানুষের কাছে এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথাও তারা তুলে ধরছেন( সব সময় সঠিক ভাবে না হলেও)। কারণ এই ব্যবস্থা মানুষের মৌলিক সম্যসাবলীর সমাধান করতে পারে না। তবুও পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতবর্ষের মানুষের চেতনায় এই পার্লামেন্টিয় গণতন্ত্র সম্পর্কে এখনো ভরসা আছে। ফলে দেশের মানুষের চেতনা যে স্তরে থাকে তাকে বাদ দিয়ে কোন বিপ্লবী দল তার কর্মকান্ড চালাতে পারে না। জণগনতান্ত্রিক বিপ্লবের মোর্চা গঠনের কাজ করতে করতে এবং এই পার্লামেন্টিয় ব্যবস্থার অসারতা প্রমান করতে প্রকৃত বিপ্লবী পার্টিকে তাই পার্লামেন্টিয় কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করতে হয়। তাই এই কাজে যারা অংশগ্রহন করছেন , তাঁরা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে চলার কাজ করে চলেছেন।
তবে পার্লামেন্ট সমন্ধে মোহ সৃষ্টি করা নয় , যেখানে সম্ভব সেখানে পার্লামেন্ট কে ব্যবহার করতে হবে শ্রমিকশ্রেনীর সংগ্রামকে শক্তিশালী করার কাজে, পার্লামেন্টারি কাজকে মূল আন্দোলনের নীচে স্থান দিয়ে তাকে সংগ্রামের সহায়ক হিসবে ব্যবহার করতে হবে, তা না করলে মারাত্বক ভুল হবে। লেনিনের কথায় “ কোন অবস্থায়ই পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা ও কাজকে এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সমস্ত স্বাধীনতাকে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা চলবে না। সেগুলিকে প্রলেতারিয়েতের বিপ্লবী শ্রেনী সংগ্রামের উপজাত হিসাবে দেখতে হবে” ( লেনিন সিলেকটেড ওয়ার্কস, ১০ খন্ড, পৃষ্ঠা ৪৫)
তাই বিপ্লবী কমিউনিষ্ট পার্টি সংসদীয় পথে যায় না, বা সরকারে অংশগ্রহন করলে পার্টি আর বিপ্লবী থাকে না এই ধারনা একেবারেই সঠিক নয়। বিপ্লবী কাজে যেমন ভুল ভ্রান্তি থাকে, তাকে যেমন মতার্দশের উপর দাঁড়িয়ে ঠিক করতে হয় তেমনি সরকার পরিচালনা করতে গিয়ে যদি পার্টিতে ভুল চিন্তা অনুপ্রবেশ ঘটে তবে মতার্দশের উপর দাঁড়িয়েই তাকে সঠিক করতে হবে, সরকারে যোগদান থেকে বিরত থেকে নয়।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার “ প্রসঙ্গ সময়োপযোগী পার্টি কর্মসূচি “ ….......সুধাংশু দাশগুপ্ত
রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০০৯
স্থিতাবস্থা ~ অনামিকা মিত্র
টের পাইনি কখন যেন নিতান্ত অলক্ষ্যে
একটু একটু মেঘ জমেছে, জমতে জমতে বেশি,
অভিমানের টুকরো আকাশ, ছাইল এলোকেশী।
একটু ভুলে আমার আকাশ আস্তে আস্তে ওর।
স্থিতির মধ্যে আবছা হল স্মৃতির একাত্তর।
আমরা কোথাও যাবার কথা দিয়েও, চলে যাইনি ...
প্রাসাদচুড়োর প্রসাদগুঁড়ো যেটুকু পাই তাই নিই
বছর গুনে লড়াইগুলো পালটে নিলাম সখ্যে,
আমরা যারা স্থিতাবস্থার পক্ষে!
আমরা যারা স্থিতাবস্থার পক্ষে,
প্রাণপনে সেই অলীক স্থিতি আঁকড়ে ধরি বক্ষে।
এইযে স্থিতি রীতি মেনেই লোভের দিশা মাপে
নীতি পিছোয় ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির চাপে
জমি মাপার দড়ির পাশে জমতে থাকে পাপ
দক্ষ ঠোঁটে উথলে ওঠে উদ্ধত সংলাপ
কখনও তা আমার এবং কখনও ওর গলায়
মন চায়না, আড়াইটা যুগ আমায় দিয়ে বলায়
মেনে নিয়েছি, মাফিয়াদের দন্ত এবং নখকে
আমরা যারা স্থিতাবস্থার পক্ষে!
আমরা যারা স্থিতাবস্থার পক্ষে ...
সুগ্রীবই আজ দোসর, কারণ রাম করেনি রক্ষে।
মাসকাবারি বেতনজীবি খোঁজেন অতিরিক্ত
অফিস পুলিশ বিচারসভা লোভের লালায় সিক্ত।
ওষ্ঠাগত জীবন জ্বেলে সে যজ্ঞে দিই যোগান
রুটিনমাপা মিছিল ... আমার ভাঙ্গা গলার স্লোগান ...
মেধার জোরে বাঁচাই রোজই, মাথা এবং পিঠকে।
দুইএকখানা নির্বোধ সেই রুটিন থেকে ছিটকে,
অবাক করা কিছু আগুন, যখন জমায় বক্ষে ...
চমকে উঠি ...
আমরা যারা স্থিতাবস্থার পক্ষে!
পরিবর্তন ~ তুলি দত্ত
হোর্ডিং-ফোর্ডিং পড়ছে,
দিদি করছেন হিল্লি - দিল্লি,
গণতন্ত্রের টাটকা খিল্লি,
রাজ্য জুড়ে একশো "বিল্লি"
কামড়া-কামড়ি করছে।
মাটির মানুষ খুঁজছে মা,
শিল্পায়নের গলায় পা,
ছোটলোক সব তফাৎ যা,
"পরিবর্তন" আসছে।
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০০৯
ফিরে আসা ~ অনির্বাণ ঘটক
গুটি গুটি হেঁটে চলা সেই দিকে,
যে দিকে শ্রেনিশত্রুর ভীড়,
বেয়নেট এ ভয় ছিল না সেদিন,
ভয় নেই আজও।
শুধু মাঝখানের কয়েক দফা গুটিয়ে থাকা শিউলি-আম-বসন্ত-মহামারী,
আজ আবার, সব ভুলে,
মিছিলের হাতেই তুলে নেওয়া লাল,
পুলিশে তো ভয় ছিল না সেদিন,
ভয় নেই আজও।
সেইদিন ডেকে নিয়েছিলাম সাত্যকি কে,
চোখের দিকে তাকাতে পারিনি ওর,
ঝোপের পিছনে পড়ে থাকা বাকিটার দিকেও না,
রক্ততে তো ভয় ছিল না সেদিন,
ভয় নেই আজও।
কিন্তু,
আজ যখন,
দুঃসময়,
দীর্ঘ দিন,
ক্লান্ত শ্বাস,
আজ যখন,
টুকরো লাল,
জিভ শানায়,
রক্তপাত,
আজ যখন,
জীর্ণ বুক,
ভাঙ্গছে রোজ,
ভুল বোঝায়,
আজ যখন,
দিক ভুলে,
খেলছে যুগ,
সর্বনাশ,
আজ যখন,
মৃত্যুবাণ,
লক্ষ্য এই,
কলজেটাই...
তখন ধীর পায়ে হেঁটে চলা সেই দিকে,
যেদিকে শ্রেণীশত্রুর ভীড়,
যাদের কলজের বিনিময়ে
আজ আমি আশ্চর্য গৃহপালিত,
আজ আমি অদ্ভুত দৈনন্দিন
ক্ষমা চাইতে সেদিনও ভয় পেতাম,
ভয় পাই আজও।
সেদিন ছিলো ৩ রা এপ্রিল, ১৯৭০ ... উৎসব
১৭ ওই সকাল থেকেই (আগেই প্রস্তুতি ছিলো) সারা পশ্চিম বঙ্গ তে অন্ধকারের জিবরা নখ , দাঁত বার করেছিল আর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সি পি আই এম কর্মিদের ওপর। সেদিন সকাল থেকেই শুরু হয় আক্রমণ , চারিদিকে আহত এবং নিহত হতে থাকেন কমরেড গন। নৈহাটির গৌরিপুর জুট মিলের গেটে পিকেট করতে গিয়ে গুলি খান কর্মিরা, শ্রমিকেরা, কয়েকজনের প্রানহানিও হয়। টুকরো টুকরো অনেক ঘটনা ঘটে যায় সারা বাংলাতে। এরই মধ্যে কুন্তিঘাট স্টেশনে কমরেড ননী দেবনাথ কে মেরে টানতে টান্তে নিয়ে গিয়ে কেশরাম রেয়নের বয়লারে ফেলে দেওয়া হয়। এর পর থেকে নেমে আসে আঘাতের পর আঘাত। এলাকার পর এলাকাতে শুরু হয় গুন্ডাদের সাথে পূলিসের ঘোরা-ঘুরি, আরেস্ট, মিথ্যা মামলাতে জড়িয়ে দেওয়া, মারধর আর খুন। কিন্ত সব থেকে উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনা ঘটে বর্ধমানে, আমাদের একটা মিছিল যাচ্ছিল বন্ধের সমর্থনে সকাল ৮ টা - ৯ টার সময়ে। পাশ দিয়ে এ কটা মৃতদেহ নিয়ে কয়েকজন যেতে চান।, পথ ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা মিছিলের সামনে গিয়ে মড়ার খাটিয়াটা নামিয়ে রাখে, মড়ার ওপরের ঢাকা সরিয়ে রেখে দিয়ে বোম লাঠি এসব কাজে লাগানো হয়, প্রথম আহত হয় গৌরি রায়, তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু সেখানে তাকে আরেস্ট করা হয়। গৌর হরি যখন আহত হয়ে ভর্তি হয় তখন সাঁইবাডি তে কিছু ঘটে নি!
এরপর সাঁবাড়ির (কাছেই ছিলো তখন) ওপর থেকে গরম তেল আর জল (আগের থেকেই প্রস্তুতি ছিল, জড় হয়েছিলো সমাজবিরোধিরাও) ঢালা হয় মিছিলের ওপর, ভেতর থেকেই ইট আর বোম ফেলা হয়। এর পর মিছিলকে আটকানো সম্ভব ছিলো না, সেরকমও কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতাও ছিলেন না ওই মিছিলে। মিছিল ঢোকে বাড়িতে আর বাড়ির লোকেদের ওপর হামলা করে। সংঘর্ষে ২- ৩ জন মারা যান। রাত থেকে ই শুরু হয় আরেস্ট এর ওপারেসন আর ঘন্টায় ঘন্টায় ক্রমবর্ধমান তালিকা সম্বলিত এফ আই আর! রোজই নাম বাড়তে থাকে আর নতুন নতুন ওয়ারেন্ট বেরোতে থাকে। শুধু শহর নয়, সংলগ্ন গ্রামগুলিও চলে যায় পূলিসের বুটের তলায়। এই ঘটনার পর ব্রিগেড এর সভাতে কমঃ হরেকিষান কোঙ্গার বলেছিলেন “ আমি গর্বিত বর্ধমানের ছেলেদের জন্যে, তারা মারের মুখে ছুটে পালায় নি, তারা প্রতিরোধ করেছে আর সেই প্রতিরোধ করতে গিয়ে কিছু ঘটে থাকলে তা আইন এ স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার প্রতিষ্টা করা” ( ভাষা টা এক নাও হতে পারে তবে এটা ছিলো তাঁর বক্তব্য) ।
এই সন্ত্রাস কবলিত বর্ধমান শহরে ৩ রা এপ্রিল মিটিং হয়, বিশাল, সেখানে অভূতপূর্ব ভাবে বক্তা ছিলেন কমরেড প্রমোদ দাসগুপ্ত, জ্যোতি বসু আর হরেকিষান কোঙ্গার একই মঞ্চে। সেই বক্তৃতা তি আর্কাইভ করবার ব্যাবস্থা করেছিলেন কমরেড রা, দিকে দিকে সংগ্রামী জনগন এর কাছে ছড়িয়ে দিতে।
হরেকৃষ্ণ কোঙারের একটি বক্তৃতার লিংক - http://www.esnips.com/web/
প্রচারমাধ্যম তার উপযুক্ত ভূমিকা পালন করেছিল মিথ্যা কাহিনী আর নাটকীয় ছবি সাজিয়ে সি পি আই এম কে খুনির দল হিসাবে দেখানো, ক্লান্তিহীন ভাবে কাজ করে গেছে এই বাজারই কাগজগুলি। আনন্দবাজারে একটা ছবি বেরিয়েছিল, ঘটনার পরের দিন, নবকুমার সাঁই মৃতদের দাদা বোধহয়, তার চোখে ব্যান্ডেরজ, ঘটনার পরের দিন, তার চোখ নাকি খুবলে তুলে নিয়েছে সি পি আই এম এর খুনিরা আর চোখে এইয়াসিড ঢালা হয়েছে। ১৫ দিন পর আবার আনন্দবাজারেই ছবি সমেত ওই নবকুমারের চিত্রের একটা মিটিং এ বক্তৃতা দেওয়ার খবর ছাপা হয়েছিলো, কোথাও কোনো ব্যান্ডেজ ছিলো না !!! রাজ্যপাল গিয়েছিলেন কনভয় আর সংবাদমাধ্যম নিয়ে নাকি-কাঁদতে, প্রেসের সামনে তিনি অনেক নাটক করেছিলেন। এর পরের দিন থেকে শুরু হয়েছিলো গ্রামে গ্রামে খাস জমি পূনর্দখল, যেগুলো জোতদার দের হাথ থেকে কেড়ে নিয়ে ভূমিহীন দের বিলি করা হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে ( যা ছিল আমাদের ওপর আক্রমণের সবথেকে বড় কারণ)। তারপরের ৭ বছরের লম্বা- নিদারূণ ইতিহাসের কাহিনি সবারই যানা। সেইগুলো আরেকবার বলার কোনো কারণ নেই আপাতত। একদম শেষের দিকে আসি।
১৯৭৭ এ ইন্দিরা হারার পর কেন্দ্রে অ-কংগ্রসী সরকার হয়েছিল, কিন্তু তখনও এখানে সিদ্ধার্থ- সরকার! আমি (বাড়ি-ছাড়া) সাউথ সিথিতে থাকি। আমরা কেউ ই যেখানে থাকতুম সেখানে কোনো রাজনৈতিক কাজকর্ম দেখাতুম না, আর ওখানে ছিলই না।। একদিন মাঝ রাতে বোমের আওয়াজ়ে ঘুম ভাঙ্গে, দেখলাম রাস্তায় একটা বাচ্চা ছেলে চকলেট বোম ফাটাচ্ছে, জিজ্ঞ্যাস করাতে বললে, যানেন একটু আগে ফল বেরোলো, ইন্দিরা আর সঞ্জয় দুটোই হেরে গেছে, ওকে শুধু বললাম ঘরে ঢুকে পড়ো, বলে শুয়ে পড়লাম। পরের দিন সকালে সব পরিষ্কার হলো, কংগ্রেস হেরেছে, মানে জরুরি অবস্থার অবসান, মানে তাহলে আমরা কি বাড়ি ফিরবো? এর আগে (জুলাই ‘ ১৯৭১ থেকে) এটা ভাবতেও পারছিলুম না। কয়েদিন বাদে একটা ছেলে এল, পাড়াতে দেখেছি ওকে, মাঝে মাঝে, বললে আপনার নামে চিঠি আছে, নিলুম, দেখি পার্টির নামে একটা চিঠি, আমাকে লেখা, যে অমুক তারিখে নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়াম যেতে হবে, মিটিং আছে, আমি ওকে বললুম, এসব কেনো, আমি তো তোমাদের পার্টি করিনা ( তখন আমাদের ওপর নির্দেশ আছে খোলাখুলি পার্টির পরিচিতি না জানাতে)। আর এসব কোরছো, প্রাণ ভয় নেই? সে বললে, না নেই। আপনি যাবেন। আমি তারিখ আর সময়টা দেখে ওটা ফেলে দিলুম, ভাবলুম এরকম কি করে হয়? আমাকে কে চেনালো? পরে জানলুম, পার্টির কর্মিরা সমূর্ণভাবে পাড়া ছাড়া ছিলো, কিন্তু লোকালে মানে এল সি তে হিসাব ছিলো, কে কে অন্য জায়গা থেকে পালিয়ে এসে এখানে আছে, যদিও তারা সব ক্ষেত্রে এটা জানতেন না যে কে কোন যায়গা থেকে এসেছেন। কি ব্যবস্থাপনা, কি নেটওয়ার্ক!!! গেলুম ইন্ডোরের মিটিং এ। দুই জন বক্তা, প্রমোদ দাসগুপ্ত আর জ্যোতি বসু। মোট মিটিং হ্ল তিরিশ থেকে চল্লিশ মিনিটের! দুইজন একই কথা বললেন
- “গত ৫ বছরে কংগ্রেস এখানকার মানুষকে অনেক অশান্তির আর রক্তপাত দেখিয়েছে, তাঁরা যেনো আর কষ্ট না পান। কোনো প্রতিশোধ নেওয়া চলবে না। মাথা নিচু করে যান মানুষের কাছে, ভেঙ্গে যাওয়া সংগঠন ঠিক করুন, সামনে বিধান সবার নির্বাচণ আসছে, আমাদেরও অ-কংগ্রেসী সরকার প্রতিষ্টা করতে ই হবে।” এর দুই দিন পর বাড়ি ফিরলুম, স্টেশন থেকে নেমে আমি আর আমার দাদা স্কুলে গিয়ে শিক্ষক দের সাথে দেখা করলুম, বাড়ি গেলুম, জঙ্গল চারদিকে, বাড়ির অনেক কিছুই ভেঙ্গে নিয়ে গেছে!! আর বিকালে দেখলুম রাস্তায় বেরলে লোক-জন আমাদের কাউকে দেখলে রাস্তার উলটো দিক দিয়ে পালাচ্ছে!! পাছে কথা বললে খুন হতে হয়! এবং যাদের জন্যে পাড়া ছাড়া হতে হয়েছিলো, তাদেরকেও দেখলাম। অনেক মিইয়ে গেছে যদিও। মানে সেই খুনিদের সামনে দেখেও আমরা কিছুই করি নি, ক্ষমতা প্রথম দিকে ছিল না, পরে এল, কিন্তু তারা নিরাপদেই থাকলো এলাকাতেই!! (পার্টি এরকমই নির্দেশ দিয়েছিল)।
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০০৯
কলকাতা জ্বালিয়ে দিতাম ….........এক তৃণমূলী ভাইয়ের জবানবন্দী ~ জ্যোতির্ময়
লিখে লিখে শোনা তো তাই ভুল থাকতে পারে তবু পড়ে দেখুন ভাল লাগবে
কলকাতা জ্বালিয়ে দিতাম ….........
আবার শালা আমাদের দিদি কে মারতে আসা। আলিমুদ্দিনে বসে এই সব শালা বুদ্ধদেবের ছক। সল্টলেকে যেখান দিয়ে দিদির গাড়ী যাচ্ছে সেখান গুলো সায়িন্টিফিক লোডশেডিং করার ছক করেছে শালা বুদ্ধদেব, সব জায়গায় আলো আছে আর দিদি যেখানে যাচ্ছে সেখানে আলো নেই ভাবুন একবার কি ছক। শালা রিপোটার সেজে ছত্রধরকে ধরেছে বলে, রিপোটার সেজে দিদি কে মারার ছক, কি সাহস। সবে দিদি নচিকেতার সাথে আড্ডা দিয়ে গাড়ীতে উঠেছে আর তার পর থেকে দিদি কে ফলো করা কি সাহস। নেহাত শালা কাল দু পাত্রর বেশি হয়ে গিয়েছিল না হলে কাল রাতেই কলকাতা জ্বালিয়ে দিতাম , বাংলা বনধ করতাম , আমাদের দিদিকে মারতে আসা সাহস তো কম নয়। আপনাদের মনে আছে তো বেদিভবনে দিদি কে পুলিশ যখন দিদিকে গুলি করার ছক করেছিল, আর দিদির শাড়ীটা গেটে লেগে ছিঁড়ে গেল, সি পি এমের চক্রান্ত ছিল সব আমরা শালা ১৪ টা বাস পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, ট্রেন আটকে দিয়েছিলাম । কাল রাতেই কলকাতা জ্বালিয়ে দিতাম নেহাত শালা কাল দু পাত্রর বেশি হয়ে গিয়েছিল। আর সেবার নন্দীগ্রামে দিদির পায়ের কাছে গুলির খোল, শালা সি পি এক এর সায়েন্টিফিক গুলি, খোল শুদ্ধু বন্দুক থেকে বের হয়, যে গুলি ছোঁড়ে তার কাছে পড়ে না । তাই দিয়ে দিদিকে মারতে আসা , আমরা শালা সেদিন ই নন্দীগ্রাম জ্বালিয়ে দিতাম , কিন্তু তখন তো কোন সি পি এম ছিল না ওখানে কি লাভ হত।
আবার দিদি কে মারার ছক, শালা আলিমুদ্দিনে বসে এই সব শালা বুদ্ধদেবের ছক।আর এবার তো বুদ্ধদেবের বাপের চ্যানেল ২৪ ঘন্টা রিপোটার সেজে সুপারি কিলার পাঠালো। শুভপ্রসন্ন দা আবার সুপারি কিলার কে বলেছেন ওর বাপ মার শিক্ষা নেই, দোলা দি ওর মুখ চেপে ধরেছিল, ধুস এরা কিছু কাজের নয় আমরা থাকলে সুনীতা বানিয়ে দিতাম , সল্টলেকে তো গাছ আছে নাকি …...। সোমা না কি যেন নাম সুপারি কিলারটার ওকে আবার দিদি ভালোবেসে ডাইরি দিয়েছিল। মুকুল দা কোন কাজের নয় থানাতে নিয়ে যায় কেউ। ও তো শালা বুদ্ধদেবের বাপের থানা আমরা থাকলে সুনীতা বানিয়ে দিতাম নেহাত শালা কাল দু পাত্রর বেশি হয়ে গিয়েছিল। মুকুল দা একটা যা তা বলে কিনা স্বরাষ্ট মন্ত্রী কে ফোন করেছে, আরে শালা ও তো কংগ্রেসের স্বরাষ্টমন্ত্রী আর তাপস দা তো বলেই দিয়েছে , কংগ্রেস হলো সি পি এম এর পা চাটা কুকুর। তাদের কাছে বলে কি হবে। শালা দিদি এতবার বলছে মাওবাদীরা ভাল কি পটাপট সি পি এম মারছে ওদের বিরুদ্ধে কিনা মিলিটারী পাঠাচ্ছে কংগ্রেস। শালা দিদির কথার একটা দাম নেই , সব শালা সি পি এম এর বি টিম। শালা শিলিগুড়ি দেখেও শিক্ষা হল না । থাকত মদন দা দেখতো তা হলে এক দুই তিন গুণতো শুধু , তার মধ্যে সোমা না কি নাম যেন সুনীতা করে দেওয়া যেত, নেহাত শালা কাল দু পাত্রর বেশি হয়ে গিয়েছিল।
শালা মাওবাদী মাওবাদী করে যত ফালতু কথা, ছত্রধর কে ধরলো , কি সার্ভিস দিচ্ছিল ছত্রধর প্রায় প্রতিদিন একটা করে মাকু খালাস আর তাকে কিনা মাওবাদী বলে ধরা , শালা সি পি এম হল আসল মাওবাদী , দিদি ঠিক বলেছে দেখলেন না কি রকম বুদ্ধদেবের বাপের চ্যানেল সুপারি কিলার পাঠিয়ে দিদিকে মারতে এলো ।নেহাত শালা কাল দু পাত্রর বেশি হয়ে গিয়েছিল না হলে কলকাতা জ্বালিয়ে দিতাম ।
রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০০৯
বিজ্ঞাপণের মোড়কে ঢাকা রেল পরিষেবা... আসলে রেলের যাত্রী পরিষেবার করুণ কাহিনী ~ জ্যোতির্ময়
রেলকে বেসরকারী করার গল্প আজ থাক, সে হবে আরেক দিন।
যবে থেকে দিদি মন্ত্রী হয়েছেন তবে থেকে শোনা যাচ্ছে আজ মহিলা রেলগাড়ী তো কাল নতুন গাড়ী পরশু নতুন লাইন , আর উদ্বোধন হচ্ছে রোজ কিছু না কিছু । মেট্রোরেল তো দু মাসে হয়ে গেল, এতদিনে হয় নি। নাই বা সব স্টেশানে টিকিটের গেট বসল, নাই বা নতুন রেক এলো, নাই বা নতুন কর্মী নিয়োগ হলো মেট্রো দুই মাসে চালু করা দিদি ছাড়া সম্ভব ছিল কারুর। আমার বাড়ির সামনে দিয়ে মেট্রো যাচ্ছে কি আনন্দ, আহা সত্যি কি আনন্দ । লোকসভা ভোটের আগে থেকে মেট্রো চলছিল পরীক্ষামূলক ভাবে, স্টেশান তৈরি ছিল তাতে কি দিদি না হলে দুই মাসে মেট্রো চালু হতো ? ছবি তোলার নেশাতে আমার সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে লোকসভা ভোটের ঠিক পরে ২৪ মে ২০০৯ কুঁদঘাট থুঁড়ি নেতাজী স্টেশানে উঠেছিলাম সিড়ি দিয়ে , আমার ছেলে বলল বাবা বসার সিট গুলো কোথায়? ওর চোখে তখন কুঁদঘাট স্টেশানে শুধু সিট লাগানো বাকি। আর বাকি ছিল চলমান সিড়ি গুলো চালু করা। তাতে কি দিদি না রেলমন্ত্রী হলে দুমাসে মেট্রো চালু হতো কি ? আর স্টেশানের এই রকম নামকরণ দিদি ছাড়া কারুর মাথা থেকে আসবে ? এতদিন ধরে রেল স্টেশানের নামকরণ হচ্ছে কেউ পেরেছে ইতিহাস আর ভূগোল কে গুলিয়ে দিতে ? দিদি সব পারে। জয়দেব বসু আপনি যদি মেট্রো করে টালিগজ্ঞে যেতে একটা উত্তমকুমার দিন বলতে না পারেন তাতে কি, আপনি সি পি এম তাই এসব বুঝবেন না , রাজ্যপাল পারলেন আর আপনি কিনা পারবেন না যতসব।
আর উদ্বোধন এর ঘটা দেখেছেন, একে বলে চাঁদের হাট সমস্ত সুশীল এক মঞ্চে হাজির আর রাজ্যপাল, সঙ্গে মদন অরুপ পার্থের ডাকে হাজার হাজার তৃণমূলী ভাই পতাকা নিয়ে। তবে না তৃণমূলের রেলমন্ত্রী ভারতের নয় তো । সরকারী অনুষ্ঠান না তৃণমূলের মিটিং বোঝার দরকার কি ? স্বাধীনতা দিবসে রেল স্টেশানে তৃণমূলের পতাকা তোলা হতে পারে আর সরকারী অনুষ্ঠানে তৃণমূলের পতাকা নিয়ে দিদির ভাইয়েরা থাকতে পারে না ? মাঝখান থেকে রাজ্যসরকার এর মন্ত্রী নেই এই সব সি পি এম মার্কা প্রশ্ন তুলে রসভঙ্গ করার কোন মানে হয়। রাজ্যসরকার না হয় মেট্রোরেলের সম্প্রসারণের ৩৩ শতাংশ টাকা দিয়েছে তাতে কি , তা বলে ওরা কেন উদ্বোধনে আসবে। আর উদ্বোধনের টাকা খরচ নিয়ে প্রশ্ন করে লাভ কি ওটা ভারতের জনগণ নামক গৌরী সেনের টাকা ওটা নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই।
যাক ধান ভাঙতে শিবের গীত অনেক হলো। এবার বলি পূজোর সময় বাগ একস্প্রেস করে হাওড়া থেকে কাঠগুদাম অবধি যাওয়ার কথা , আর উপাসনা করে বেরিলি থেকে হাওড়া ফেরার কথা। রির্জাভ কামরা কথাটা বোধহয় একটা ঠাট্টা , আপনি যদি রির্জাভেশান করে যান সেটা আপনার ব্যাপার। ওয়েটিং লিষ্ট এ নাম থাকলেও আপনি কামরা তে যাবেন, সাধারণ টিকিট কেটে ফাইন দিয়ে বা টি টি'র পকেটা কিছু গুজে দিয়ে আপনি সহজেই যেতে পারেন । ঘুষ দেওয়ার কথা যদি বাদ দি তা হলে ফাইন দিয়ে আর ওয়েটিং লিষ্টে নাম থাকলে আইন সিদ্ধ ভাবে আপনি যেতে পারবেন। বসবেন কোথায় , শোবেন কোথায় সেটা আপনার ব্যাপার , আপনার দল ভারী হলে আপনি গেট বন্ধ করে , একদিকের বাথরুম বন্ধ করে রির্জাভেশান করে যাওয়া যাত্রীদের পিন্ডি চটকে আইন সিদ্ধভাবে যেতে পারবেন।
এতটা উন্নত পরিষেবা ভাবা যায় না। উপসনা তে করে বেরিলি থেকে ফেরার সময় টি টি কে ধরে নিজেদের রির্জাভ করা সিটে কোনমতে বসে এই উন্নত পরিষেবার খবর পেলাম , টি টি জানালেন সেদিন ওয়েটিং লিষ্টে যাত্রীর সংখ্যা ৫১২ জন তার মধ্যে ৪০০ জনের মত এই ভাবেই যাচ্ছেন, তবু বগি বাড়ানো হবে না , এটাই নাকি পূজোর সময় প্রতিদিনের অবস্থা। শুনে অবাক হবেন না উপসনার বগির সংখ্যা মাত্র ১০। আগের রেলমন্ত্রীর সময় বহু গাড়ী ছিল ২৫ বগির ।তাতে কি উন্নত পরিষেবা পাবেন কি করে বগি বাড়িয়ে যাত্রী সুবিধা দেখলে। আর প্রতি স্টেশানে সাধারণ যাত্রী ওঠার কথা ছেড়েই দিলাম ওটা তো পরিষেবার ফাউ ব্যাপার। আপনার মালের দায়িত্ব আপনার নিজের, রেল এর এই সব নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। আর বাথরুমের কাছে করিডোর বা ভ্যেস্টিবিউওল হলো নানা মাল বহন করার জন্য। যাওয়ার সময় বাগ একস্প্রেসে এক ট্রাভেলিং এজেন্সি মাছ নিয়ে চলল দারুন সুবাস ছড়াতে ছড়াতে, তবে নানা স্টেশানে কিছু টাকা খসল তাদের পুলিশ কে সন্তুষ্ট করতে।
উন্নত পরিষেবার আরেক নমুনা হল বাথরুমের জল, অত্যাধিক যাত্রীর চাপে বা ভাঙ্গা কলের জন্য জল সব সময় থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই , বাথরুমের ভিতরে কোন হুক বা হ্যাঙ্গার পেলে আপনি নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পারেন, বাগ এক্সপ্রেসে দু রাত থাকবেন আপনি স্নান করার কথা যদি ভাবেন তা হলে দড়ি নিয়ে বাথরুমে যান আর না হলে দু দিন গরমে কাটিয়ে দিন শুভপ্রসন্ন বাবুর কথা ভেবে ,তিনি আপনার সাচ্ছন্দ দেখার জন্য রেলে চাকরী পেয়েছেন। কুপের ভিতরে সব আলো জলবে আশা করবেন না বেশির ভাগ খারাপ থাকাটাই একটা রোমাঞ্চকর ব্যাপার আপনার অসুবিধা হলে কি আর করা যাবে। জানালায় যদি সবকটা ছিটকিনি পেয়ে যান তা হলে আপনি সৌভাগ্যবান, না হলে সাবধানে থাকবেন আপনার হাতে জানলা পড়লে কিন্তু দিদির মত কেউ ডাক্তারী করে ট্রেনে সারিয়ে দেবে না। ( ভোটের আগে স্টার আনন্দ দেখেন নি তো দিদির ডাক্তারী তে কি ভাবে শোভনবাবু হাতে জানলা পড়েও রক্ষা পেলেন তাই জানেন না।) আসলে রেলের কোচ গুলো সব বাতিল হয়ে গেছে তাও চালানো হচ্ছে, উদ্বোধনের চোটে বাতিল কোচ দিয়ে রেল চলছে। একটু মানিয়ে তো নিতে হবে।
রেলের ক্যাটারিং বহু দিন হলো বেসরকারী হাতে, কিন্তু তার মান যে এত নেমেছে না খেলে বিশ্বাস হবে না, দিদির জনতা মিল নামক গাল ভরা নামের পুরি সবজির থেকে স্টেশানের বানানো পুরি সবজি সস্তা আর টাটকা, কিন্তু সে তো ট্রেন যদি স্টেশানে থামে তবে। উপসনার মত ১৬ টা স্টপেজের ট্রেন যদি হয় আপনার ট্রেনের রেল অনুমোদিত বেসরকারী ক্যাটারিং এর উপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় কি। আর তার খাবারের মান ! মুখে না দিলে বোঝান সম্ভব নয় কি ভাবে মানুষের সাথে প্রতারণা করছে এই বেসরকারী রেল অনুমোদিত ক্যাটারিং সংস্থা।
আসলে পশ্চিমবঙ্গের এই রেলমন্ত্রীর বিজ্ঞাপনের মোড়কে খুব কাজের লোক হিসাবে যতই গগন ফাটাক স্টার আনন্দ সি এন এন- আই বি এন চ্যানেলে ইউ পি এ সরকারের ১০০ দিনের কাজের যে মূল্যায়ন বার হয়েছে। দেশের ১০০ জন প্রবীণ অগ্রণী সাংবাদিক ও সম্পাদক রা ভোট দিয়ে এই মূল্যায়ন করেছেন তাতে রেল মন্ত্রক পেয়েছে সব থেকে কম নম্বর , মাত্র ৩৪ শতাংশ। সোজা কথায় ফেল করেছেন আমাদের রেলমন্ত্রী। কিন্তু বিজ্ঞাপনের চমকের মত মোড়কে হাজির তিনি। পরিষেবার এই করুণ হাল এই জন্যই। দিদি একটা কমিটি করেছেন , তার পোষা সুশীলবাবুদের নিয়ে। যাক রেলে আর কারুর চাকরি হোক বা না হোক ওদের তো হলো। অনেক তোষামোদ করে তবে দিদির গুডবুকে ওরা। কিন্তু সাধারণ মানুষের রেল পরিষেবার কি হবে ? বিজ্ঞাপনের প্রচারে পরিষেবা হবে সে প্রশ্নের উত্তর দেবে কে ?
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
রেশন ব্যবস্থা ও আমরা মধ্যবিত্তরা ~ জ্যোতির্ময়
আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গে থাকি, আমরা রেশন দোকানে যাই কি ? যদি না যাই তা হলে কষ্ট হলেও কয়েক সপ্তাহ একটু যাই না। লোকসভা ভোটে হারার পর থেকে নানা মুনি নানা ভাবে বামফ্রন্ট সরকার আর সি পি আই এম পার্টির নানা খুত খুঁজেই চলেছেন। কেউ সত্যি কিছু দেখাচ্ছেন, আর বেশির ভাগ ঝাল মেটাচ্ছেন পার্টিটার গুষ্ঠি উদ্ধার করে। এটা আমার মত যাঁরা মানেন না , মাথার দিব্যি দিয়ে মানাতেও চাই না। তাঁরা থাকুন তাদের মত নিয়ে।
জিনিসের দাম এখন আকাশছোঁয়া, নিম্নবিত্ত দূরে থাক মধ্যবিত্তের ও পেটে টান পড়েছে , রোজ যা খেতেন ২ বছর আগে এখন বাজারে গেলে অনেক কিছু ছেঁটে ফেলছেন বা পরিমাণে কমাচ্ছেন তাঁরা। এই বাজার দরের জন্য সরাসরি দায়ী কেন্দ্রীয় সরকার, কিন্তু মিডিয়ার কল্যাণে মানুষ তা মনে করছেন না। কেন দায়ী কেন্দ্রীয় সরকার জানেন বোধহয় সকলে তাও এক দুই করে লিখি।
এক নম্বর দেখুন পেট্রোল, ডিজেলের দামের কি অবস্থা, বিদেশের বাজারে অপরিশোধিত তেল এখন ৭৪ ডলার প্রতি ব্যারেল। এক ব্যারেল মানে ১৭৬ লিটার , এক ডলার মানে ৪৮ টাকা, আর অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে এক লিটারে খরচা ২২ পয়সা। সব মিলিয়ে দাম পড়ে ২২ টাকার কাছে আর তা বিক্রি করছে কেন্দ্রীয় সরকার ৫৫ টাকার কাছাকাছি। তেলের দাম বেশি হলে সব জিনিসের দাম বাড়ে , নির্বাচনের পর থেকে তৃণমূলের মুখে আর তেলের দাম বাড়ার গল্প নেই , আমাদের আছে তো ?
দ্বিতীয় হল আগাম বাণিজ্য নীতি , বামপন্থীদের চাপে খাদ্যে ওটা চালু ছিল না , তৃণমুল সমর্থিত কেন্দ্রীয় সরকার খাদ্য দ্রব্যের উপর সেটা চালু করেছে। চিনি , গম, ডাল সব এখন আগাম বাণিজ্যের কবলে। ক্ষেত থেকে ফসল ওঠার আগে চুক্তি হয়ে গেছে , উৎপন্ন খাদ্য চলে যাবে বিদেশি কম্পানির গোডাউনে। আর কি চাই যে দিন চিনি আর, ডাল আগাম বাণিজ্যে ঢুকলো সেদিন থেকে চিনি আর ডালের দাম আকাশছোঁয়া। কাগজ তো লিখবে না কে বলবে এসব সাধারণ মানুষের কাছে আমরা ছাড়া?
তৃতীয় কারণটা আরও মারাত্বক, দিদিমণি তখন এন ডি এ জামানায় মন্ত্রী ছিলেন, তখন থেকে অত্যাবশকীয় পণ্য আইন কে নখ দাঁতহীন করে হল। মজুতদারী করলে কোন শাস্তি নেই, রাজ্য সরকার কিছু করতে পারে না আইন নেই। আলুর ক্ষেত্রে দেখুন কি করুণ হাল রাজ্য সরকারের। দিদিমণির কথা শুনে অনেকে বলেন আলুর দাম বাড়ানোর জন্য রাজ্য সরকার দায়ী কেন্দ্র সরকার কি করবে? আসল কারণ ঃ- ধসা রোগে আলুর ফলন কম, তবু রাজ্যের ৪৫০ টা হিমঘরে যে আলু আছে তাই দিয়ে নতুন আলু ওঠার আগে তিন মাস পশ্চিমবঙ্গে আলুর যা দরকার তা জোটান যেত। কিন্তু অত্যাবশকীয় পণ্য আইন না থাকায় রাজ্য সরকার কে কাঁচকলা দেখিয়ে আলু হিমঘরে রেখে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে দাম বাড়িয়ে রেখেছে হিমঘরের মালিকরা।
এই তিনটে কারণ থেকে যে ব্যবস্থা কিছুটা হলেও মানুষ কে বাঁচাতে পারে তা হল গণবন্টণ ব্যবস্থা, মানে রেশন , কিন্তু সেখানেও কেন্দ্রীয় সরকার বাধা দিয়ে রেখেছে, পারলে রেশন ব্যবস্থাটা তুলে দেয়। এমনিতে বি পি এল ছাড়া কারুর রেশন নেই তার উপর খাদ্য নিরাপত্তা বিল এর নাম করে ওরা বিপিএল নির্ধারণ করার অধিকার নিজেদের হাতে নিতে চাইছে। যেহেতু অর্জুন সেনগুপ্তের রির্পোটে আছে দেশের ৮০ ভাগ মানুষের দৈনিক আয় ২০ টাকার নিচে তাই বিপিএল এর নতুন মাপকাঠি করছে কেন্দ্রীয় সরকার গ্রামে ১১ টাকা আর শহরে ১৮ টাকা আয় যারা করেন তাঁরাই খালি বিপিএল থাকবেন। তার মানে রেশন ব্যবস্থাটা আর কিছু থাকবে না । এর মধ্যে আবার আশিয়ান চুক্তি সই করা হয়ে গেছে ফলে ৩০০০ মাল বিনা শুল্কে আমাদের বাজারে ঢুকবে, কৃষি পন্য আছে তার মধ্যে, ফলে কৃষকের বেঁচে থাকার যে রাস্তা ছিল সেটাও বন্ধ হল। wto এর দোহা রাউন্ড এর নতুন করে সমঝোতার লাইন বার হচ্ছে , আর কি ভর্তুকি দেওয়া যাবে না । কৃষি পণ্যের দাম যা হবে তাতে আর বাজার করে খেতে হবে না। কে বলবে সাধারণ মানুষ কে এই কথাগুলি আনন্দবাজার বা স্টার আনন্দ নিশ্চয়ই নয়। পশ্চিমবঙ্গের ট্রেড ইউনিয়ান গুলি রাস্তায় নামতে শুরু করেছে, ১৬ সেপ্টেম্বার ১০ দফা দাবির প্রথম দাবি মূল্যবৃদ্ধি কমাতে হবে। আমরা কি করব? সর্বশক্তি দিয়ে এই নিয়ে প্রচার করব না কি?
আর বামফ্রন্ট সরকার ? এত যার পিন্ডি চটকানো, বন্ধু শত্রু কেউ তো ছেড়ে কথা বলছে না এখন। তারা কি করছে। সীমাবদ্ধ আর্থিক ক্ষমতা নিয়েই রেশন ব্যবস্থাটাকে চালানোর চেষ্টা করছে, চিনি ও ডাল দেবার ব্যবস্থা করেছে, চাল, গম কম দামে দেওয়া চালু ছিল আগে থেকেই। আলুর মজুতদার কে চাপে ফেলার জন্য আইন না থাকয় রেশনের মাধ্যমে পাজ্ঞাব থেকে আলু এনে ১৩ টাকায় পরিবার প্রতি ২ কেজি দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা যারা এখানে তর্ক করি সবাই এপিএল, তাই রেশন দোকানে যাই না, আমাদের মাল টা সরকারের ভরতুকি দেওয়া রেটে রেশন ডিলার কেনে আর খোলা বাজারে বেঁচে দেয়। আমাদের কি কিছুই করার নেই? বামফ্রন্ট সরকারের বিকল্প নীতি প্রচার করা ছাড়া , রেশন দোকানে সাপ্তাহিক মাল কেনার উপস্থিতি দূর্নীতি রুখতে সাহায্য করবে। প্রশ্ন হল যাব কি ? মাল খারাপ, সময় নেই প্রভৃতি নানা কারন থাকবে । ডি ওয়াই এফ আই বা সি পি আই এম একদিন ডেপুটেশান দিলে সমস্যা মিটবে না। আপনারা যারা পশ্চিমবঙ্গে থাকেন আপনাদের কাছে বিনীত আবেদন মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ প্রচারের পাশাপাশি একটু বামফ্রন্টের বিকল্প নীতির প্রচার করুন, আর রেশন দোকানে নিয়মিত যান, খোঁজ রাখুন দূর্নীতি থাকলে খবর দিন।
যারা সি পি আই এম এর কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচনের পর্যালোচনা পড়েছেন দেখবেন ভোটে পরাজয়ের কারণ গুলির মধ্যে রেশন ব্যবস্থার ব্যর্থতা কে একটি অন্যতম কারণ বলে সি পি আই এম মনে করেছে।
রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৯
মেঝেন ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়
অই ধান্যের মাঠ্যের শেষ্যা
অই যে সেই শাল পিয়ালের বন্যে
লজ্জ্যা পেয়্যা মুখ লুকাঁইছিল্যি
ভুল্যে গেছিস কেনে?
মারাংবুরুর থানে, রাতের বেল্যা
মাদল বাজাঁইছিলাম
তোরা নাচতেছিলি, ফসল কাটার পর্যেয়
নারান কিস্কু ধর্যে ছিল হাত
মুখটি মুই ছিলাম চুপটি কর্যেয
সায় দেছিলি ঘাড় হেলায়েঁ
মন্যে আছে, জল্যে মোর
চোখটি ছিল্য ভরে
পঞ্চায়েতের ঘর্যে তখ্যন
নারান উঠতি নেত্যা
লাল পার্টির আঞ্চলিকের
লতুন সভ্যাপত্যি
মোরে শুধু ডাক দেছিল সেদিন
ঝান্ডা নিয়্যা মিছিল কর্যালর ঠেঙ্গে
দিন গুলান কুথায় যেছে চল্যে
তর কাল্য চুল্যে সাদ্যা রঙের ছাপ
মোর মুখ্যের কাটাকুটির দাগ
বয়স খানা দেছে মোর বল্যে
গাঁয়ে এখন কার্যা যেন আস্যে
রাতের বেল্যা চুপিসাড়ে
ফিসফিসিয়ে শলা করে কত
নারান এখ্যন প্রধান হইঁছে
মোটোর গাড়ি চাপ্যে
নারান এখ্যন ঝান্ডা উড়ায়
তেরঙ্গা - ফুল ছাপ্যে
মোর নামে হুলিয়া দেছে
লাল পার্টির সনে
হাঁটলে পরে নারান কিন্তু
খবর দেব্যে বনে
শালকো সরেন, ফাগু বাস্কে
শোন্যেনি কথা, মান্যেনি
লাশ হয়েঁ যেঁছে
তর খোঁপায় গোঁজা লাল পলাশ ফুল
মেঝেন, মুই পলাশ রঙে আছি
বল্যিস গিয়ে নারান কে তুই
লাল পার্টির নিশান ধরি
য্যে কট্যা দিন বাঁচি
স্বাধিনতা তুমি কার? ~ আবিন দত্তগুপ্ত
জাতিয়তাবাদিদের মতে নিজের ঘরের অথবা বৃহদর্থে দেশের এক খন্ড জমি বাঁচাতেই কিশোরের এই বলিদান। আমরা আন্তর্জাতিকরা বলি “ না, সার্বিক মুক্তির জন্যেই এই লড়াই , দুই মুঠো খাবার , ভাতের জন্যে, বহুদিন মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেবার জন্যেই, অস্তিত্ব বাঁচানর এই লড়াই। রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে চলা যুদ্ধযান “ইসরাইলি” না “হামাসের” তাতে সাধারণ দিন আনতে দিন খাওয়া মানুষের কি বা এসে যায়? মানুষ প্রতিরোধ করে তখনই, যখন সেই মারণযন্ত্র তাদের সার্বিক স্বাধিনতা ক্ষুন্ন করে, বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিতে চায়, আর তখন যুদ্ধযন্ত্রি জারি হোক না কেনো, স্বদেশীয় বা বিদেশী, তার ওপর কোন ও না কোনো বৃদ্ধ-যুবা-কিশোর বা শিশুর ছোড়া পাথর পড়তে বাধ্য।
জাতিয়তাবাদিরা বলতেই পারেন উপরোক্ত কথা গুলো তো শুধুই মনে হওয়া, রেটরিক ও বটে...... এর সপক্ষে প্রমান কি? প্রমান ইতিহাস। বাংলা দেশ থেকেই শুরু করা যাক। সিরাজদৌলার বাংলাকে আক্রমণ করলেন লর্ড ক্লাইভ-- ইংরেজ। যুদ্ধ হলো। পলাশীর যুদ্ধে নবাব পরাজিত হলেন। বাংলা কোম্পানীর হলো। লক্ষ্যনীয়, যুদ্ধ করলেন শুধুমাত্র মাইনে পাওয়া সৈনিকরা ও নবাবের বিশ্বস্ত অনুচর বৃন্দ। ইতিহাসের কোথাও এই যুদ্ধে সাধারণ মানুষের অংশীদ্বারিত্বের খবর খুঁজে পাওয়া যায় না।
আসলে নবাব থেকে কোম্পানী- এই ক্ষমতা বদলের অর্থ, এক নিষ্পেশকের হাথ থেকে শাসনভার আর এক নিষ্পেষকের হাথে যাওয়া। সাধারণ মানুষ নবাবেও বঞ্চিত, কোম্পানীতেও। এবার আসি সম্পূর্ণ বিপরিত এক যুদ্ধচিত্রে। স্তালীনগ্রাদের যুদ্ধ। আগ্রাসনকারী প্রচন্ড শক্তিশালী হিটলারের নাৎসীবাহিনি। বৎসর খানেকের বেশী চলা সেই যুদ্ধ, লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ মারা গিয়েছিলো যুদ্ধে। কেমন ছিলো সেই যুদ্ধ? কেমন ভাবে জয়লাভ করেছিলো আপাত দূর্বল সমাজতান্ত্রীক সোভিয়েত? জয় এসেছিলো শুধুমাত্র সোভিয়েত জনগনের অদ্ভূত- অপূর্ব আত্মত্যাগে। প্রতি রাস্তায়, প্রতিটি ঘরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো সাধারণ মানুষ। কারখানায় ট্যাঙ্ক তৈরি হচ্ছে, শ্রমিকরাই সেই ট্যাঙ্কে চেপে যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাচ্ছেন। লক্ষ্যাধিক সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ সেদিন শুধুমাত্র তাদের পিতৃভূমি কে রক্ষা করেনি, রক্ষা করেছিলো সমগ্র বিশ্বকে। সেদিন সোভিয়েতের মানুষ লড়াই করেছিলেন তাদের সার্বিক মুক্তির অধিকার কে বজায় রাখতে, লড়াই ছিলো অস্তিত্বের। আরো কিছুদিন আগের ঘটনা---- ১৯৩৫-৩৬ এর স্পেন। গনতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষনা করল দক্ষিন-পন্থী-জাতিয়তাবাদী - মৌলবাদী এক জোট। মুলত বামপন্থী সেই সরকার ছিলো যুগ-যুগ ধরে বঞ্ছিত- খুদার্ত স্পেনের দরিদ্র মানুষের সরকার- পরে বাংলাতে যেমন অপারেশন বর্গা হয়েছিলো, কৃষকের কোমরের জোরে, বামফ্রণ্ট সরকারের হাথ ধরে, এমনি প্রথম বামপন্থী সরকার ও জোতদার - জমিদারের হাথ থেকে জমি কেড়ে নিয়ে বিলিয়ে দিতে আরম্ভ করেছিলো জমিতে লাঙ্গল চষা চাষীদের মধ্যে। স্বাবাভিক ভাবেই এই বামপন্থী “অনাচার” সমাজের ওপরতলার কায়েমি-স্বার্থের মূল ভিত্তিতে আঘাত করেছিলো। সুতরাং বামপন্থীদের ক্ষমতাচূত করাও আবশ্যিক হয়ে পড়লো। আজকের ভারতবর্ষে বামপন্থী- দমনে বিদেশী হাথ যেমন সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার, সেদিন স্পেনে সেই ভূমিকায় অবতীর্ন ফ্যাসিস্ত হিটলার- মুসলিনীরা। সেইবারই পৃথিবী প্রথম দেখেছিলো আন্তজার্তিক গনফৌজকে, নেতৃত্বে সোভিয়েত। আন্তর্জার্তিক সৈন্যবাহিনীর সাথে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে জাতিয়তাবাদিদের (যাদের মূল স্লোগান ছিলো “God, Country and king”) বিরুদ্ধে লড়েছেন সাধারণ না খেতে পাওয়া মানুষ। তারা সেইদিন লড়াই করেছিলেন তাদের সার্বিক মুক্তির ফেরিওয়ালা বামপন্থী সরকারকে রক্ষা করার প্রাণের আকুতি নিয়ে । জাতিয়তাবাদীরা এদের কি বিশেষনে ভূষিত করবেন? বিশ্বাসঘাতক? ঠিক তাই। ফ্যাসিস্তরা অবশ্য তাই বলেছিলো। এরকম হাজারো উদাহারণ আছে ইতিহাসে। ইতিহাস শিক্ষক আমরা শেখার চেষ্টা করছি মাত্র।
স্বাধিনতা দিবস পালন। আপনার বাড়ির পাশে বস্তি টা, তার কোনো একটা ঘরে ঢুকে যান। দেখবেন উলংগ বাচ্ছা তিনটে ধূলো মেখে রাস্তায় বসে । হাথে জাতিয় পতাকা-- পেটে খাবার নেই- চোখে খুদাপীড়নের প্রতিচ্ছবি-- অশ্রু। ১৯৪৭ এর আগে দেশ পরাধীন, ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের মুখাপেক্ষী, ৪৭ এর পরে দেশ স্বাধিন, এবং সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল। এই দুই অর্ধেই ওই গাল ভাঙ্গা পোকা মাকড়ের মতন দেখতে সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ খুদার্থ, আর দুই অর্ধেই তাদের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিয়েছে ওপরের তলার মানুষ। স্বাধিনতার পূর্বে যাদের মাথায় জমিদারি পাগড়ি, স্বাধিনতার পরে পাগড়ির জায়গা নিয়েছে “সাম্রাজ্যবাদী দালাল” প্রতিক “গান্ধী টুপি” ধারী “সেবাদল” বৃন্দ। সীমান্ত যুদ্ধ এই সব উপরতলার বড়মানুষদের অর্থাৎ খমতার অধিকারী- অধিকারীনিদের একটা পলায়নের রাস্তা। দেশের নিরক্ষর, নীপিড়িত , বুভূক্ষু হাড় জিরজিরে জনতা যে সময়তে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে- তখনই যুদ্ধ, মহান দেশপ্রেমের দেশী মদে (পড়ুন চোলাইয়ে) অশীক্ষিত মানুষকে মাতাল করে দিয়ে, মুহূর্তের জন্যে তাদের দুক্ষ্য-দূর্দশা কে ভূলিয়ে দেবার প্রচেষ্টা মাত্র। স্বদেশী কথায় মানুষ মোহগ্রস্ত , নিস্তেজ হলো। মাথার ওপর তোলা মুষ্টি বদ্ধ হাথ শিথিল হলো, রাজার আসন টলতে গিয়েও , টললো না। ৬৭ এর যুদ্ধ, ৭১ এর যুদ্ধ, কার্গিল--- প্রতিটা যুদ্ধের “প্রেলিউড” সেই একই গপ্প। যুদ্ধ শেষ, দেশ বাসীর প্রাপ্তির খাতায় গোটা চারেক সিনেমা, গোটা দশেক দেশ্মাত্ববোধক গান এবং আরেকটু বেশী ঘন হয়ে যাওয়া গরিব মানুষের মৃত্যুমিছিল।
তাই আজ, জাতিয়তাবাদী স্বাধিনতার ৬২ বছর পর প্রশ্ন জাগে? স্বাধিনতা তুমি কার? স্বাধিনতা , তুমি কিসের জন্যে? এ কেমন স্বাধিনতা?
বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০০৯
প্রচারমাধ্যম, ভোগবাদ ও মূল্যবোধ ~ পারিজাত ভট্টাচার্য্য
প্রচারমাধ্যম ও এন জি ও দের ভূমিকা
সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের প্রধান হাতিয়ার তাই কমিউনিষ্ট এবং শান্তিকামী গনসংঘঠন গুলি র বিরুদ্ধে ‘ঘৃণাজর্জ্রিত প্রচার-অভিযান ’ জারি রাখা এবং এর জন্যে খোলা হয়েছে দেশী - বিদেশী প্রচুর প্রচারমাধ্যমে, চ্যানেল, ওয়েবসাইট, ব্লগ ইত্যাদি। বিশ্বায়নের মানবিক মুখ বা “Globalization with a Human Face” বা “Millennium Goal “ এর দর্শন প্রচার করতে ব্যাঙ্গের ছাতার মতন জন্ম নিচ্ছে এক গুচ্ছ এন জি ও। এদের কাজই হচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ নীপিড়িত, বিশ্বায়নের দ্বারা শোষিত শ্রেনীর ক্রোধ প্রশমণ করা এবং শ্রেণী সংগ্রাম ও বিক্ষোভ হতে এদের বিমুখ ও ভ্রান্ত করা। এরা দ্বায়িত্ব সহকারে প্রচার করছে যে মানুষের দুঃখ্য, কষ্ট প্রশমন করতে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের প্রবক্তারা কতোটা উদগ্রীব এবং তাই অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সংগ্রামে গিয়ে কোনো লাভ নেই । মানুষের কষ্ট , দুঃখ্য লাঘব করতে পারে একমাত্র এই এন জি ও গুলি। বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থা (উজ্জ্বল উদাহারণ হিসেবে বিল গেটস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট) তাদের শোষিত লাভ্যংশের একটি ছোট অংশ এই এন জি ও মারফত কিছু -মিছু খরচা করে প্রমাণ করতে চাইছে যে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের ত্বত্ত্ব কতটা মহার্ঘ এবং তাদের সৃষ্ট প্রচার মাধ্যম কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ্য। শ্রেনী বিভক্ত সমাজে কেউ শ্রেনী নিরপেক্ষ্য নয়। এই নিরপেক্ষ্যতার মুখোশের আড়ালে এই “স্বাধীন” প্রচারমাধ্যম সাথে এন জি ও গুলি অন্তরিক্ষে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করছে এবং প্রভুত সম্পত্তি লুন্ঠন করছে । শ্রমজীবি সর্বসাধারণকে তাদের শ্রেনী সংগ্রাম থেকে বিমূখ করার প্রচেষ্টা। এই “স্বাধীন” ও “নিরপেক্ষ্য” প্রচারমাধ্যমের আরেকটি কাজ হলো নানান দেশের আভ্যন্তরীন রাষ্ট্র ব্যাবস্থায় নাক গলানো। সম্প্রতি চিনের সিংজিয়াং প্রদেশে হান এবং উইঘুর সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দাতা হিসেবে এই প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা মারাত্মক রকমের গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ওনাদের দেশের একটি তথাকথিত “গনতান্ত্রীক” সংস্থা (NED National Endowment for Democracy) মাধ্যমে দেশে দেশে “গনতন্ত্র” প্রতিষ্টায় পরিত্রাতা হয়ে অবতরণ করেছেন। এই নেড আমেরিকান উইঘুর কংগ্রেসের সভাপতি রেবিয়া কাদির কে যথেষ্ট উস্কানী এবং মদত দিয়ে সিংজিয়াং প্রদেশ কে চিন থেকে আলাদা করার চেষ্টা করছে। অন্তরিক্ষে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সি আই এ যথেষ্ট তৎপর। উদ্দেশ্য একটাই সিংজিয়াং প্রদেশকে আলাদা রাস্ট্র করে , চিন কে অর্থনৈতিক ভাবে দূর্বল করা। এবং কাজাখাস্তান, তুর্ক্মেনিস্থান ক্রিমিয়া ইত্যাদি রাষ্ট্র থেকে তেলের দখল কায়েম করা। এই হচ্ছে প্রচারমাধ্যমের নিরপেক্ষ্যতার উদাহারণ। ঠিক এরকমই এন জি ও ও প্রচার মাধ্যমের “হেট ক্যাম্পেনের” মাধ্যমে মার্চ ২০০৮ সালে লাসা তে “ক্রিমসন” বিপ্লব, বার্মা- মায়ান্মারে “গেরুয়া বিপ্লব” , যুগোস্লাভিয়ায় ‘বুলডোজার- বিপ্লব’ , জর্জিয়ায় ‘গোলাপ- বিপ্লব’ , ২০০৪-০৫ সালে ইউক্রেনে কমলা বিপ্লব, ২০০৫ সালে কির্গিস্তানে ‘টিউলিপ - বিপ্লব’ ইত্যাদি নামে ষড়যন্ত্র হয়েছে। নানাবিধ প্রতিক্রিয়াশীল , বিভেদকারী রঙ্গীন বিপ্লবকে অন্তরিক্ষে প্ররোচণা দেওয়া এবং সাম্রাজ্যবাদী দর্শনে দেশে গুলির সার্বভৌমত্ব কে ভেঙ্গে দিয়ে আর্থনৈতিক, তেলের, প্রাকৃতিক গ্যাস লুন্ঠন কে ত্বরান্বিত করা। আমাদের দেশ থুড়ি আমাদের রাজ্যে “মোমবাতি” বিপ্লব কেও এর একটা ছোট উদাহারণ হিসেবে পেশ করা যেতে পারে। আশির দশকে নিকারাগুয়েতে অর্তেগার সরকারকে ফেলে দেবার উদ্দেশ্যে এবং মার্কিন পুতুল সরকার প্রতিষ্টার উদ্দেশ্য রেগানের ইরান-কন্ট্রা ষড়যন্ত্র প্রায় সকলেরই জানা। বর্তমানে ইরানে গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকার কে বে-আইনি সাব্যস্ত করতে প্রচারমাধ্যম ঊঠে পড়ে লেগেছে। এই সব বিপ্লবের তাই অনেক পোষাকই নাম দিয়ে বিশ্বের মানুষকে বিভ্রান্ত করে দেশে দেশে মার্কিন প্রভূত্ব বজায় রাখাই এই প্রচারমাধ্যমের প্রধান লক্ষ্য।
আমাদের দেশে ও রাজ্যে প্রচারমাধ্যম ও বিজ্ঞাপন
আমাদের দেশে বা পশ্চিমবঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী মদতে প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা যে সব পাপাচার- খুন, কমিউনিষ্ট বিরোধী প্রোপাগাণ্ডা চলছে তা প্রত্যন্ত ভিন্ন ঘটনা নয়, এসব দেখে আশ্চর্য্য হবার মনে হয় কোনো কারণ নেই। ইতিহাসের পাতা এবং প্রকৃত তথ্য অনুধাবন করলে জানা যায় যে কমিউনিষ্ট দের হত্যা করার লিষ্ট তৈরি করা হয়েছিলো আগেও, হিটলার এবং তাঁর প্রচারসচিব গোয়াবেলস এই কার্য্যে বিপুল পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। ব্রিটিশ দ্বীপপূঞ্জে ওনার তথাকথিত প্রস্তাবিত এবং কল্পিত “গেস্টাপো” রাজ্য তার সাক্ষ্য বহন করে। কমিউনিষ্ট দের হত্যা করা জন্যে লিস্ট তৈরি করা হয়েছিলো। শুধু জনমত তৈরি করে । সত্য মহার্ঘ শিল্প। জনমত তৈরি করার। কত মানুষেরই উপকারে না লেগেছিলো। কমিঊনিস্ট নিধন যজ্ঞ শুরু হয়েছিলো মানুষকে ভ্রান্ত করে ক্ষেপিয়ে এবং পরবর্তি কালে আক্রমন নেমে এসেছিলো প্রগতিশীল, সৃজনশীল, যুক্তিবাদী , ত্বাত্তিক এবং সাধারণ শান্তি কামী মানুষের ওপর ও। বাদ যায় নি সংবাদমাধ্যম ও। সংবাদমাধ্যমের এই স্বাধীনতা হরণ আমাদের দেশে ও নতুন নয়। আনন্দবাবুদের ও জানার কথা যে একসময় ৭২ থেকে ৭৭ এর জরুরি অবস্থান কালে, তাদের সংস্থার কর্মকর্তাদের ও হাজত বাস করতে হয়েছিলো। সেই সময় তো সব সংবাদমাধ্যম কে , পরের দিনের খবর এর প্রীন্ট বা বিষয়বস্তু রাইটার্স ছুইয়ে আনতে হতো। ইংরাজি তে যাকে বলে “Vetting”। ওনারা ভোলেননি। কারণ মানুষকে ভোলাবার “সাধু “ দ্বায়ীত্ব নিয়ে বাজারে নামলেও, ওনাদের তো পেছনে আছে বৃহৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। উৎস বৃহৎ কর্পোরেট মহল এর বিপূল পূঁজি । তাদের সাথে মানূষ পারবে কিভাবে ? তাই ওনাদের তাৎক্ষনিক দর্শন, সমকালীন, সময়োপযোগী ঘটনাতে মন নিবিষ্ঠ রাখতে হবে, না হলে পিছিয়ে পড়তে হবে। ওনাদের সাংবাদিক যখন মাওবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হন, তখন ওনারা চুপ থাকেন। কারণ পেছণে আছেন ওনাদের ব্রান্ড মিডিয়ামেড “সর্বেশ্বরী”। খেপে গেলেই চাকরি যাবে। বূর্জুয়া-জমিদার শ্রেণীর বেতনভোগী সেবাদাস কলমচীদের চাকরী যাবে। বেচারা রেলদপ্তরের অফিসার টির করুণ দশা নিশ্চয় এনাদের মনে থাকার কথা। আনন্দবাবু দের আনন্দ চিরকালের জন্যে ঘুচে যাবে। সাংবাদীকতার মতন একটী সাধু পেশার কি অবমূল্যায়ন! স্বাধীনতার আগেও সর্বশ্রেনী মানুষের ব্যাপক দেশ স্বাধীন করার স্পৃহা সাথে অর্থনৈতিক সংগ্রামকে ওনারা পাত্তা দিতে চাননি। এখন বাজারী সংবাদমাধ্যম “বামপন্থার” মুখোশ পরতে চায়। সুভাষ বাবুকে “জ়নগনের” নেতা বলে, “ঊচিতবক্তা”, “পার্টি লাইনের বিপরিত ধর্মী” বলে, পার্টী থেকে বিছিন্ন করতে চায় । সত্য সাধু উদ্দেশ্য। ওনার শ্মশান যাত্রায় এতো লোক হয় কি করে? কালীঘাট হেডকোর্টারের, দিল্লী র আর সাদা বাড়ীর যাবতীয় রাজনৈতিক হিসেব তো গুলিয়ে যাচ্ছে। অতহেব নেমে পড়। ওনাকে পার্টী থেকে বিচ্ছিন্ন করো। পার্টির বিরুদ্ধে “হেট” ক্যাম্পেনিং চালু করার এই তো সুযোগ। ওনার ব্যাক্তি জীবনে জনদরদী চরিত্র, জনকল্যানকামী সদিচ্ছার নানান প্রয়াস কে পার্টির আদর্শ থেকে পৃথক করতে হবে । জো হুজুর দিদি। অথচ প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি তে ব্যাক্তি সুভাষ থেকে কমরেড সুভাষ চক্রবর্তীর ছাত্র আন্দোলনে, শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন সংগ্রামে , কমিউণিষ্ট পার্টি, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ এর দর্শনে সমৃদ্ধ চিন্তা, চেতনা বিকাশের তীক্ষ্ণতা কে পরিলক্ষিত করার প্রয়াস কোথাও নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই নেই। একজন প্রকৃত কমিউনিষ্ট হলেই এতো জনসমর্থন পাওয়া যায়। ব্যাতিক্রমী ছিলেন না কমরেড রতণলাল ব্রাম্মীন, কমরেড পি সুন্দরাইয়া, কমরেড মুজফফর আহমেদ এবং আরো অনেকেই । সাংবাদিকতার স্বাধীনতার নির্লজ্জ অপব্যাবহার । মেকি বামপন্থার মুখোশ পরে বেশী দিন বামপন্থী হওয়া যায় না। মজুরশ্রেনী স্বার্থবিরোধী, পূজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যাবস্থার সাথে গোপনে সমঝোতা , স্বার্থান্বেষী মানষিকতা থাকলে, সেই মুখোশ খুলে, কদর্য রুপ বেরিয়ে পড়বেই। আসলে অবাক হবার কিছু নেই। এদের তো কাজই এটা। কমিউনিষ্ট পার্টির এবং তার সদস্য দের নজর বন্দি করে রাখার। অন্য সব রাজনৈতিক দল এর আন্ত- সাঙ্ঘঠনিক অবস্থা দেখার দরকার নেই, কারণ এনারা তো শ্রেনী সমঝোতার রাস্তায় চলেন। এদের নিয়ে অতো ভয় নেই। এদের বলতে এই বাজারী প্রচার মাধ্যমদের ওপর আঙ্কেল শ্যাম দের কড়া নির্দেশ। এক্কেবারে ফেউ হয়ে লেগে থাকো কমিউনিষ্ট পার্টির সভ্যদের পেছনে। সাথে আছে এদের মদতদাতা “মেকি” , “সজ্জন” এমনকি তথাকথিত উগ্র বামপন্থীরাও। কথা, বার্তায়, আচার, আচরনে আতলামি তে ভরপূর। এনাদের আতলামী ছাড়া বাজারে এনাদের নাকি market value কমে যাবে। কমিউনিষ্ঠ বিদ্বেষ , এটাই তো হালের ফ্যাশন। এই ফ্যাশণ টাকে প্রচারের যাবতিয় দ্বায়-দ্বায়ীত্ব এনাদের হাতেই । এনাদের একটাই স্লোগান “তবু আমি আঁতেল হবো, এটাই আমার আম্বিশন”, লোকদেখানো সেই আম্বিশন গ্রহণ না করলে তো এনাদের ‘সেল ভ্যালু” কমে যাবে। সেটা এনারা বিলক্ষণ জানেন বোধহয়। পার্টির আভ্যন্তরের কি চলছে, সবসময় তা জানার জন্যে ডিগবাজী চলছে। কত দরদ, কুমিরাশ্রু, দরদে এক্কেবারে প্রান উথলে উঠছে। ইসসস, সুভাষ কে পার্টি যোগ্য সন্মান দিলো না। যেমন এখন জ্যোতি বাবু কে বলছেন। ওনার নাকি আশীর্বাদ পুষ্ঠ সুভাষ । এই জ্যোতি বাবু এখন এনাদের কাছে ভগবান বা তার উর্ধেও কিছু। অথচ এদেরই ভাষায় একসময় তে তিনি ছিলেন স্বৈরাচারী শাসক। ঠিক ওনাকেও পার্টি থেকে আলাদা করার চেষ্টা। ত্রিপুরার একজন সদস্য অপসারিত হবার পর, যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছিলো, ফুলের স্তবক নিয়ে তাকে সাদর আমন্ত্রণ, রবিন্দ্রসংগীত, ইত্যাদি। সোমনাথ চ্যাটার্জি সদস্য পদ থেকে অপসারিত হবার পর, প্রচারমাধ্যমের কি দরদ। এমন ভাবে ওনার জন্মদিন পালন ইত্যাদি। বড় বড় নেতা- নেত্রী এক্কেবারে হাজির, শুভেচ্ছা, ফুলের স্তবক নিয়ে, যেন এটা ওনার প্রথম জন্মদিন। সেই একই প্রয়াস, পার্টি থেকে বিছিন্ন করার। ২০০১ সাল, নির্বাচনের পর এনাদের ভির্মি খাবার জোগাড়। এ কি হয়ে গেলো। কিন্ত তাতেও ওনাদের স্বস্তি নেই। চললো প্রচার, ব্র্যান্ড বুদ্ধ। প্রয়াস, সেই বুদ্ধবাবু ইমেজ টাকে আলাদা করার, পার্টি থেকে।
শুনে রাখুন আপনাদের তৈরি বুদ্ধিজীবি , সুশীল সমাজ বা সজ্জন গোষ্টির বাইরেও একটা বুদ্ধিজীবিরা আছেন। যাদের মস্তিষ্ক এখনো বিকিয়ে যায়নি । যাদের পেটে যতটুকু বিদ্যে আছে , তাই দিয়ে তাঁরা সামাজিক ভাবে দায়বদ্ধ, যারা তাদের নিজ বিচার-বুদ্ধি বাজারের কাছে বিকিয়ে দেয়নি । আর পার্টির জন্যে আপনাদের অত দরদ দরকার নেই। অন্য পার্টির মতন অত নেতা-নেত্রীর সমাগম কমিউনিস্ট পার্টির দরকার নেই। এখানে সমষ্টিগত ভাবে কাজ , চিন্তাভাবনা এবং আলাপ আলোচনা করা হয়। সে শাখা থেকে ওপরের স্তর অবধি। এখানে সবাই দ্বায়িত্ব ভাগ করে নেয়। এখানে সবার মধ্যে বন্ধুত্ব, ভাতৃত্বের সম্পর্ক। এখানে সবাই সবাই কে কমরেড বলে। তার অর্থ সাথী। শ্রমজীবিদের সাথে সংগ্রামী আন্দোলনের সাথী। এটা বাজারী প্রচারমাধ্যম জেনে রাখুন।। ইতিহাস প্রমান করে যে এরকমই মেকী বামপন্থার মুখোশ পরেছিলেন হিটলার। জার্মান দেশের শ্রমজীবি, সর্বসাধারণের কাছে, নিজের তৈরি প্রচারমাধ্যমের “যাদু” তে নিজেকে জাতীয় পরিত্রাতা , শ্রমজ়ীবি সর্বসাধারনের বন্ধু হিসেবে নিজেকে উপস্থীত করেছিলেন। সেই মেকি বামপন্থার মুখোশ পরে মানুষকে সাময়িক বিভ্রান্ত করেন হিটলার এবং মানুষকে এই ওপিনিয়ান ম্যানুফ্যাকচারিং এর শিকার বানান। পরে মানুষ তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতে হিটলার আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। মানুষ সচেতন হয়ে শাস্তি দেন মুসোলিনি কেও । ভারত চিন যুদ্ধের সময়তেও দেশের মার্কসবাদী কমিউনিস্টদের, সংবাদমাধ্যম এবং তৎকালীন কংগ্রেস জনমত তৈরি করে , কাঠগড়ায় দাড় করায়। ভারতীয় মার্কসবাদী কমিউনিস্টদের তখন বলা হতো চিনের দালাল বা পরবর্তিকালে পাকিস্তানের দালাল। সাথে ইন্ধন যুগিয়েছিলো সংশোধনবাদী দক্ষিন পন্থী কমিউনিষ্টরা।
দিক-ভ্রান্ত করার প্রয়াস
পুজিবাদী বিশ্বায়ন বা সাম্রাজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠির মূল দর্শন হলো মুনাফা, আরো লাভ। সেই লাভ করার বিজয় রথ তাদের চালিয়ে নিয়ে যেতেই হবে। সে করেই হোক। যেকোনো দেশের শ্রমজীবি, মজুর শ্রেনী এই পূজিবাদী ব্যাবস্থাতে সবথেকে অর্থনৈতিক স্তরে নিষ্পেসিত , মারাত্মক রকম শোষিত। কিন্ত সেই লাভের ফানুস ফোলাবার জন্যে দরকার এই নীচু শ্রেনীর মানুষের ওপর আরো নীপিড়ন। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন এর এই মূল দর্শন কে প্রচার করার জন্যে দরকার তাই নানান সংবাদমাধ্যম, প্রচার, প্রীন্ট মিডিয়া, দূরদর্শন, ইন্টারনেট, ব্লগ ইত্যাদি। উৎপাদন উপায়ের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো হয়, সাথে ঘটানো হয় তথ্য -প্রযুক্তিতে মারাত্মক বা একভাবে বলতে গেলে “ধ্বংসাত্বক” অগ্রগতি। ধ্বংসাত্বক কেন? কারণ এই তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটানো হয়, পূজিবাদী অর্থনীতির অভ্যন্তরে অবস্থীত সঙ্কট থেকে মুক্তি পাবার জন্যে। এই অগ্রগতি সৃজনশীল কখনই নয়। কারন তা ব্যাবহারিত হয় আরো তীব্র শোষন এর তাগিদে। আরো মুনাফার তাগিদে। এই মুনাফার করার রথ স্তব্ধ হয়ে গেলে, পূজিবাদী ব্যবস্থার সাথে তার মালিকবৃন্দের পতন ও ধ্বংস অবধারিত। এই তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটাতে গিয়ে এবং ঘটাবার পর, চলে প্রকৃতি যার এক অংশ মানুষ, তার ওপর চলে নির্মম শোষন। প্রকৃতির সম্পদ গুলিকে নির্দয় ভাবে নিংড়ে নিয়ে তাকে পরিবর্তন করা হয় ডলারে। প্রাকৃতিক নিয়ম বা ব্যাবস্থা নানান দিক দিয়ে সঙ্কটে পড়ে এই ভারসাম্যহীন শোষণে । প্রাকৃতিক নিয়ম গুলি বিগড়ে যায়। চলতে থাকে মারাত্মক রকম প্রাকৃতিক বিপর্যয়। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের মুল দর্শন মুনাফা এবং আরও মুনাফা কে তাই সুনিশ্চিত করার জন্যে অবলম্বন করা হয় উন্নত তথ্য-প্রযুক্তির সাহায্য উন্নত ও শক্তিশালী প্রচারমাধ্যমের ভূমিকা যে কোনো দেশের সীমানা মানে না, লগ্নি পূজির অবাধ চলাচলের সাথে এই প্রচারমাধ্যমের অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অবাধ চলাচলের তাই দরকার হয়ে পড়ে, তা সে ছাপানো নিউজ প্রিন্ট হোক বা ইন্টারনেট , ব্লগ বা টিভি চ্যানেল গুলি। এই মাধ্যম গুলির ঘাড়ে দেওয়া থাকে সবরকমই গুরুদ্বায়িত্ব। তা সে যেকোনো রাজনৈতিক বিষয়ে ওপিনিয়ান তৈরি করে মানুষের সামনে পরিবেশন করা অথবা নানান বস্তুসামগ্রী বিপননের তাগিদে বিজ্ঞ্যাপন(কুরুচিকর হলে আরো ভালো-- চিন্তা নেই তার জন্যে মুখ খুলে বসে আছে সহায়ক বহুজাতিক এয়াড এজেন্সী) মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মোহ সৃষ্ঠি করা অথবা চরম কুরুচিকর , হিংস্র বা ইতিহাস বিকৃত করে সাম্রাজ্যবাদী (মার্কিন দেবদূত বা এয়াকসান হিরো ইত্যাদি) আমেরিকার প্রয়াসে “শয়তান “ কমিউনিষ্ট নিধনের গল্পাকারে চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষের মনের সুন্দর প্রাকৃতিক গঠন কে স-মূলে ধ্বংস করা।, মানুষকে বিভ্রান্ত করা। নব্য- গোয়েবেলসীয় কায়দায় মানুষের হৃদয়ে , মস্তিষ্কে, চিন্তায়, মননে তখন গেথে দেবার আপ্রান চেষ্টা চলে যে শয়তান রাষ্ট্র বা কমিউনিস্ট রাস্ট্র কে দমন করার জন্যে এবং সারা বিশ্বে “গনতন্ত্র(?)” বিস্তারের জন্যে মার্কিন প্রভুরা সবসময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আছেন। কিন্তু তার ফলে সমাজের সর্বস্তর ছেয়ে ফেলে জঘন্য দূর্নীতি, অনায়াসে খুনোখুনি, যৌনতা ইত্যাদি মানুষের অন্ধকারতম পাপাচারগুলি। ইদানিং কালে এই সব বিজ্ঞ্যাপনে কিন্ত দেখা যায় এক অদ্ভূত বিভেদাকারী বা সমাজ জীবনে নিজেদের মধ্যে হিংস্র, স্বার্থপরতা অবলম্বন করার জন্যে দ্যার্থহীন আবেদন। আগে যেমন বিজ্ঞ্যাপন গুলি তে দেখা যেত সাধারন মানুষের দ্বারা ব্যাবহৃত পন্যসামগ্রী যথা লন্ঠন, ঝাড়ু, লুংগি, গেঞ্জী ইত্যাদি। আজকাল অবশ্য বিজ্ঞ্যাপনী মানসিকতা গরিব বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত্ব ব্যাবহার্য্য পন্য সামগ্রী পরিত্যাগ করেছে। এখন টি ভি কিনতে হবে। যেখানে লেখা থাকবে “Neighbors envy, owners pride”। গাড়ী, দামী আসবাব, দামী মোবাইল দামী পোষাক- আসাক আর কি। একটা গাড়ির বিজ্ঞ্যাপন, কোম্পানীর নাম বোধহয় ভোলক্সওয়াগন, গাড়ী আস্তেআস্তে এলো , হোটেল সামনে দাঁড়ানো বেয়ারা যেন হেট হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যেন সাধারন এক নির্জীব বস্তু হয়েও গাড়ি টি তার প্রভু বা মালিক। এই হচ্ছে বহুজাতিক ভোগবাদী মানসিকতার নিদর্শন। অঙ্কুরেই বিষ ঢোকানো হচ্ছে। সাথে আছে নারী দেহ প্রদর্শনের যেন এক দূর্নিবার প্রতিযোগিতা। অর্থের লোলুপতা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে। এই হচ্ছে পূজিবাদী অর্থনীতির প্রবাহমানতার সাথে একনিষ্ট হয়ে চলা প্রকাশ্য যৌনাচারের ব্যাবসা। নারী জাতির অসন্মান। গরিব মানুষের সীমাবদ্ধতার , দৈনন্দিন জীবনযাপনের যন্ত্রনার তাৎক্ষনিক ঔষধ। তাকে দেহ ব্যাবসায় নামানো। এই অবৈধ ব্যাবসার চিত্র রুপে দেশে দেশে, বিশেষ করে আমাদের দেশের ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার এটাও শোনা যায় যে এইসব ওয়েবসাইট কোম্পানী গুলি সদর্পে দিনে -দূপুরে দেহ ব্যাবসার দালাল চক্র হয়ে কোটি কোটি অর্থ লুঠছে। সীমাহীন অর্থলোলুপতা মানুষের মূল্যবোধ , প্রকৃতি সৃষ্ট সংস্কৃতি কোন পথে যাচ্ছে? আর সোপ-সিরিয়াল গুলোর তো কোনো কথাই নেই। রাত নটা বাজলেই বাড়ির গৃহীনি, মেয়ে, বৌদের ভীড় লেগে যায়। আজকাল কি সব সিরিয়াল হয়েছে না, কিঁউকি.........। ইত্যাদি, সব সিরিয়াল গুলোতেই সেই এক পরিবার, বিশাল উচ্চবিত্ত মানসিকতা, বূর্জুয়া মানসিকতার, দর্শনের প্রদর্শন এবং শিক্ষা। একটা অনুষ্ঠানেও অন্তত সাধারণ , গরিব পরিবারের দিন যাপনের, জীবন যাপনের কাহিনি পাওয়া যায় না। সবাই কে, এমনকি নিম্ন শ্রেনীর মানুষকেও মোহে আটকে রাখা হয়। আর তার সাথে থাকে পালা করে গুরূ-- শিক্ষা বর্ষণের ২৪/৭ এর সমাপ্তিহীন ডু লুপ। অমুক বাবা এই বলেছেন, তমুক বাবা এই ওষুধ বাতলেছেন, অমুক বাবা তমুক অসুখ হলে অমুখ ব্যায়ম বাতলেছেন। চলতেই থাকে, বেদ, উপনিষদ কে নিয়ে মার্কেটিং। এই বাবা বাহিনীর চারিদিকে ঘিরে থাকে রইস ঘরানার স্ত্রী - পুরুষ দের। লক্ষ্য লক্ষ্য, কোটি কোটি টাকা দান, ডোনেশন। বিজ্ঞ্যান যেন মরে গেছে। কোনো বাবা আবার শোনা যায় রাজনীতি তে দাঁড়াবে। বাঃ সবই এই প্রচারমাধ্যমের কৃপা।
পূঁজিবাদী বিশ্বায়নের এই মুনাফালোলুপতা বা অর্থলোলুপতা এক প্রবল জোয়ার সৃষ্টি করে দেশে দেশে আরো চাপ সৃষ্টি করছে তাদের পন্যের বাজারের চাহিদা এবং বিক্রয় আরো সুনির্দিষ্ট করার জন্যে । এরো আবার প্রধান ভূমিকা, রাস্ট্রসমূহের ভ্রান্ত নীতির এবং রাষ্ট্রের আর্থনৈতিক শক্তির অপব্যাবহার কারি প্রচন্ড প্রতাপশালী সংবাদমাধ্যম । রাস্ট্রের যুবসমাজ বা তরুন সমাজ বা ছাত্র সমাজের কাছে পরিবেশিত হচ্ছে দামী দামী বৈদ্যুতিন গেজেট, সামগ্রী। আই-পড, আই ফোন, ল্যাপ্টপ, এল - সি ডি ইত্যাদি। এই প্রলোভনের ফাঁদে ধরা পড়ে ছাত্র, বেকার সহ চাকরী রত মধ্যবিত্ত মানুষ ও শ্রমজীবি শ্রেনী। ডলার বা টাকা না থাকলে ক্ষতি কি? বহুজাতিক কোম্পানী তো আছেই ক্রেডীট কার্ড এর পরিষেবার জন্যে। কিনুন, আরো কিনুন। লোভ তো থাকবেই। এখন ভোগ করা যাবে না তো কবে? অর্থ শোধ দেবার ক্ষমতা না থাকলে সেই অর্থ পরিষোধের জন্যে আরো ক্রেডিট কার্ডের ব্যাবস্থা করা যাবে। এই করে কারুর কারুর কাছে ১০ থেকে ১২ টা ক্রেডিট কার্ড জমে যায়। এক টা শোধ না করতে পারলে আর এক টা । এই করে সর্বসাধারণকে দেনার দায়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ তো আবার আত্মহত্যার পথ ও বেছে নিয়েছে। আর যাদের ঋণ দেবার ক্ষমতা আছে, তাদের কাছ থেকে নানান ছল, চাতুরি এবং শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করে, এগ্রিমেন্টের অর্থের থেকে দ্বিগূন বা তিনগুন পরিমান নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মানুষের বহু কষ্টার্জিত সঞ্চয় রাতারাতি, মানুষের অজান্তে তার কাছ থেকে আত্মসাৎ করে নিয়ে যাচ্ছে। এই হলো বহুজাতিক ভোগবাদের মহার্ঘতা। বহুজাতিক ভোগবাদ থেকে জন্ম নেয় স্বার্থন্ধতা ও আত্ম-সর্বস্বতা। মানুষ হারিয়ে ফেলে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত মানবিক মূল্যবোধ এবং মানব সমসষ্টিকে এই আরো অর্থলোলুপতা করে দিচ্ছে আরো আরো অমানুবিক, পাশবিক। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন এবং তার সাথে ভোগবাদ প্রযুক্তির এই অসাধারণ প্রগতির যুগে টি ভি, ইন্টারনেট ইত্যাদি মাধ্যমে যে সংস্কৃতি প্রচার করা হচ্ছে তা হচ্ছে এক অর্থলোভী স্বার্থ সর্বস্ব ও যৌনতা সর্বস্ব সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি মানুষকে তার পরিবার , সমাজ বহির্ভূত জীবে পরিবর্তন করছে। তার ভোগ-লালসা মেটাবার জন্যে মানুষ উদয়-অস্ত পরিশ্রম করছে। তার চাকরি ক্ষেত্রে এবং বহু বি পি ও গুলিতে তাকে মগজধোলাই হয় যে সে একজন সমাজের এলিট শ্রেণী তে পড়ে এবং তাই সে সমাজ কে ভিন্ন হিসেবে, নিজের থেকে আলাদা হিসেবে দেখতে শেখে।
পুজিবাদী ভোগবাদী দর্শনের পরিনাম খুন, জখম, যত্রতত্র বলাৎকার,সব কিছুর পন্যায়ন ইত্যাদি । এই অবক্ষয়ী সংস্কৃতি মানবজাতির প্রগতির পথে, জীবনের প্রকৃতিক সুস্থ্য,সবল সংগ্রামের পথে এক দারূন বাঁধা সৃষ্টি করে। তাই বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে লড়াই কেবলমাত্র আর্থনৈতিক , রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, এই সংগ্রাম কে বিকশিত করতে হয় তাই সাংস্কৃতিক স্তরেও, যাতে প্রকৃতির নিয়মে তৈরি হওয়া সমাজের যা কিছু সুন্দর, সুস্থ্য, স্বাভাবিক এবং মানবিকতা যাতে ধ্বংস না হয়ে যায়। এই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম কে বিকশিত করতে হবে নানান গনতন্ত্র প্রিয় মানুষ, ছাত্র, যুব সমাজ কে এবং শ্রমজীবি শ্রেনী কে সঙ্ঘঠিত করে, যাতে একটি সুন্দর , হিংসাহীন, আপসহীন সমাজব্যাবস্থা নির্মান করা যেতে পারে। এই সমাজব্যাবস্থা তৈরির দ্বায়িত্ব সাধারণ মানুষকেই নিতে হবে এবং ইতিহাস থেকে প্রমানিত যে বর্তমান সমাজে মানুষের এই চেতনার বিকাশ ঘটানোর দ্বায়িত্ব এবং সাংস্কৃতিক স্তরে এই সুন্দর, নির্মল এবং হিংসাহীন সমাজ ব্যাবস্থা গঠনের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষকে নীতি আদর্শে সঙ্ঘঠিত করার দ্বায়িত্ব কমিউনিষ্ট দেরই নিতে হয়।
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০০৯
হুল ~ পারিজাত ভট্টাচার্য্য
৩১ আগস্ট, ১৯৫৯ সালে, শহীদ মিনার ময়দানে, খাদ্যের দাবীতে এবং খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের অপসারণের দাবিতে প্রায় তিন লক্ষ্যাধিক ছাত্র, যুব, শ্রমজীবি মানুষের জমায়েত হয়েছিলো। এবং সরকারের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধ সেই জমায়েতই মিছিল এর ওপর পুলিস নারকিয় অত্যাচার করেছিলো। পুলিস সেই মিছিলের ওপর গুলি চালায়। পরের দিন অর্থাৎ ১ লা সেপ্টেম্বর সেই পুলিসী অত্যাচারের প্রতিবাদে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটি ছাত্রদের ওপরেও পুলিস গুলি চালায় , এবং পরবর্তি পর্যায়ে সরকার কলকাতা এবং শহর তলিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছিলো এবং ২ রা সেপ্টেম্বর থেকে কলকাতা এবং হাওড়া তে সেনা নামানো হয়। পুলিস এবং সেনা-আধাসামরিক বাহিনীর অত্যাচারে ৮০ জন শহীদ হন এবং অন্তত ২০০ জন মানুষ নিখোঁজ হন। ২৯ শে সেপ্টেম্বর বিধানসভাতে খাদ্য আন্দোলনের শহীদের প্রতি ১ মিনিট নিরবতা পালন করতেও বিরোধিতা করেছিল কংগ্রেস এবং তার সঙ্গিরা। ২২ শে সেপ্টেম্বর থেকে জেলায় জেলায় ছাত্ররা আইন অমান্য শুরু করেন। ২৬ শে সেপ্টেম্বর সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে খাদ্য আন্দোলনের শহীদদের স্বরণে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়।
উল্লেখ্য ২৮ শে সেপ্টেমবর ১৯৫৯ সোমবার রাজ্য বিধানসভাতে বিধান রায়ের মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে কমরেড জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে অনাস্থা প্রস্তাব রাখা হয়। কমরেড জ্যোতি বসু তার ভাষনে সরকার পক্ষ্যকে জুক্তি-তর্কে ধরাশায়ী করে ফেলেন। বস্তুত, এই ঘটনা হবার অন্তত ২ বৎসর আগের থেকে রাজ্যে এই খাদ্য সঙ্কটের বিরুদ্ধে সি পি আই এম সাধারণ মানুষ কে পাশে নিয়ে আন্দোলন, সংগ্রাম সঙ্ঘঠিত করে আসছিলো এবং সরকারকে বার বার সচেতন করা সদিচ্ছা নিয়ে শ্রী বসু সরকারের এর ভ্রান্ত এবং একপেশে পূজিবাদী ব্যাবস্থার তোষণমূলক নীতি বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। রাজ্যেরর আইনসভাতে রাজ্যের মন্ত্রীদের স্বৈরাচারী ভূমিকা এবং নানান ছল-চাতুরি-ধুর্ততা-কপটতা- দুর্নীতি, তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য সেই সময়, মানে কংগ্রেস সরকারের রাজ্যে দ্বিতিয়বার মন্তৃত্বের সময়্কালে , রাজ্য মন্ত্রীমন্ডলির বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ এনে আইন ও বিচারমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় পদত্যাগ করেছিলেন। ওই সময়ে এবং অন্তত তার পরে, ২৭ শে মার্চ , ১৯৫৮ সালে রাজ্যের বিধাসভার মন্ত্রীমন্ডলীর বিরুদ্ধে বিরোধীদের পক্ষ্য থেকে অনাস্থা প্রস্তাব রাখেন শ্রী বসু। ১৯৫৮ সাল, চারিদিকে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। বিধানসভাতে বিরোধীদের প্রশ্নবাণে খাদ্যমন্ত্রী দিশেহারা। প্রশ্নোত্তরে স্পস্টভাষায় তিনি বলছেন যে কন্ট্রোল অর্ডারের ২২/২৩ টাকা দরে বিক্রি হয়, এর থেকে বেশী কি করে হয়, তা তিনি জানেন না। এমনকি তিনি এটাও স্বীকার করলেন যে তিনি খাতাপত্র বা হিসাবপ্ত্র দেখার প্রয়োজনিতা মনে করেন না, এবং হোলসেলের উপর সরকারের অধিকার থকলেও রিটেল বিক্রির ওপর সরকারের কিছু করনীয় নেই। অনেকটা সুরাবর্দী সরকারের আমলে যে দুর্ভিক্ষ্য হয়েছিলো, সরকারের সেই নিরপেক্ষ্য নিরুপায় হবার প্রবৃত্বি, তখন কংগ্রেসীরা প্রাদেশীক সভাতে চুপ থাকতেন। ১৯৫৮-১৯৫৯ সালের এই দুর্ভিক্ষের ভয়ানক অবস্থানকালে, বামপন্থীরা বা বিরোধিরা সরকারকে বারবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন খাদ্যসামগ্রির উঁচু-নীচু দর বেধে দিতে কিন্তু প্রফুল্লবাবু বলেছিলেন যে এখানে সরকারের কিছু ক্ষমতা নেই। কমিউনিস্টরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে যখন নতুন চাল উঠেছিল, সেই চাল কিনে নিয়ে সমস্ত জেলায় গুদামজাত করে রাখার জন্যে, কিন্তু সরকার তা না করায়, কালোবাজারী শুরু হয়ে যায় এবং তখনই চালের দাম, ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। সরকার পক্ষ্য থেকে বলা হয় যে এই খাদ্যসঙ্কটের সময়তে কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দেবে না। এবং সরকার ৭৫ ভাগ মিল মালিকদের হাথে খাদ্যসামগ্রী ছেড়ে দিয়েছিলেন ফ্রী মার্কেটিং এর নাম করে। ফলে চালের দাম হয় আগুন। লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ যখন অনাহারে- অর্ধাহারে তখন এই আর্থনৈতিক পান্ডিত্যের আড়ালে ছিলো সুকল্পিত এক পরিকল্পনা। সিদ্ধার্থবাবু একে বলেছিলেন ইন্স্যানিটি কিন্তু শ্রী বসু বলেছিলেন যে “দেয়ার ইস এ মেথড ইন দিস ম্যাডনেস”। এই সব মিলমালিকদের হাথে যে খাদ্য সামগ্রী ছেড়ে দেওয়া হয় এর পেছনে ছিলো নির্বাচনী তৎপরতা। কংগ্রেস সরকার কে টিকিয়ে রাখার জন্যে বিপরিতে লক্ষ্য লক্ষ্য টাকা পার্টি ফাণ্ডে দান। দেশের বা বাংলার সার্বভৌমত্ব্যকে বিসর্জন দিয়ে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমানো এবং কিছু কিছু “আশীর্বাপূষ্ঠ” মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি। এই বাংলার কংগ্রেস প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে বলেছিলেন, শিল্পের ক্ষেত্রে তারা কিছু করবেন কিন্তু প্রথম বার তারা ব্যার্থ। দ্বিতিয়বার আসার সময়তে একই প্রতিশ্রুতি, তাতে নিট ফল, একটা কোক ওভেন প্ল্যান্ট এবং তিনটি স্পিনিং মিল। এই ছিলো তাদের শিল্পের প্রতিশ্রুতি। শিল্পের ব্যাপারে তারা এগোতে পারলেন না , আর সেখানে প্রাইভেট সেক্টর শতকরা ৯৯ ভাগ শিল্প দখল করে বসে আছেন। তাঁরা বড়লোক থেকে বড়লোক হচ্ছেন আর দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে, অথচ এদের অপর সরকার হস্তক্ষেপ করেনি। গ্রামের কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। কামার, কুমোর তাঁতী সকলে ধ্বংসপ্রাপ্ত। অজয় মুখার্জি তার সেচ ব্যাবস্থা নিয়ে বড় বড় ভাষণ দিতেন কিন্তু তার তথ্য ছিলো ভুলে ভরা। প্রথম টার্গেট প্ল্যান অনুযায়ী ১১ লক্ষ্য একর এবং সাথে আরো ৬ লক্ষ্য একর সেচ ব্যাবস্থা করার। কিন্তু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে দেখা গেলো মাত্র ২ লক্ষ্য একর জমিতে করা হয়েছে। খাদ্যে হাওড়াকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্যে প্রস্তাবিত কেন্দুয়া খাল , ব্রীটিশ আমল থেকেই প্রস্তাবিত রয়ে যায়, সে আর বাস্তবায়িত হয় না। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে খাদ্যে ওনারা বাংলাদেশকে , ভারতবর্ষকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবেন। অর্থাৎ খাদ্যের প্রয়োজনে দেশ থেকে টাকা বাইরে না যায়। অথচ প্রকৃত ভূমিসংস্কার “জমিদার বা জোতদার “ দের জন্যে । জমি বা ল্যান্ড রিফর্মের কথা আর না বলাই ভালো। সরকার থেকে বলা হলো যে কৃষকদের জমির মালিক করার জন্যে ৬ লক্ষ্য জমির ব্যাবস্থা করা হবে। তা কমতে কমতে সেই প্রতিশ্রুতি১ লক্ষ্যে তে এসে ঠেকলো। পরে নাকি তাঁরা ৪৮ হাজার বিঘা পেয়েছেন। যে লক্ষ্য লক্ষ্য কৃষক তাদের বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে যে জমি চাষ করতেন, তাঁরা যখন জমি থেকে বিতাড়িত হয়েছিলো তখন তাদের জন্যে সরকারের প্রতিশ্রুতি তাদের নির্বাচন ইস্তেহারের আস্তাকুডেই রয়ে গেলো। সেই বছরেই অর্থাৎ ১৯৫৮ তেই সরকার মানে বাংলা সরকার চালের ব্যাপারে একটা নাকি জোনাল সিস্টেম করে ফেললেন। কানোরিয়া ২ লক্ষ্য মণ চাল আনবার ব্যাবস্থা করেছিলেন শ্রী প্রফুল্ল সেনের সাথে। কারণ তিনিই চালের ব্যাবসাদার। বাইরে থেকে কৃষকরা তো আর নির্বাচনী কাজে চাঁদা দিতে পারবেন না, তাই কানোরিয়ার সাথে ওই ব্যাবস্থা। পান্নালাল সারোগি, ইনি প্রফুল্ল সেনের বেনামদার। কংগেসী ফান্ডে আগের বার নির্বাচনে ১ লক্ষ্য ৫০ হাজার টাকা এনার দান। কংগ্রেস ভবন বোধহয় যেটা থেকে তৈরি হলো। তুলসীরাম রাইস মিল, বীরভূম--- সাড়ে পাঁচ হাজার মণ চাল, এটা শ্রী গোপিকাবিলাস সেন ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলেন। সরস্বতী রাইস মিল বীরভূম, তিন হাজার মণ, ইত্যাদি। রানী অব হেতমপুর- ইনি চালের ব্যাবসাদার নন, ওনাকেও পারমিট দেওয়া হয়। সবই গত ইলেকসনের সমঝতা আর কি। সত্যি ভোট বড় বালাই। ১৯৫৬-৫৭ সালে সাড়ে ছয় কোটি টাকা ফেমিন বাজ়েটে ধরা হয়েছিলো এবং তখন ঘাটতি ছিলো ৩ লক্ষ্য টন খাদ্যশস্য, কিন্তু অবাক ব্যাপার, ১৯৫৮-৫৯ সালে যখন রাজ্যে খাদ্য ঘাটতি সাড়ে সাত লক্ষ্য টন, তখন বাজ়েটে টাকা বরাদ্দ্য মাত্র ৫ কোটি ১৪ লক্ষ্য ৪০ হাজার টাকা। সেবার আবার যদি নির্বাচণী বছর হতো তাহলে বোধহয়, রাজ্য সরকার ১০ বা ২০ কোটি বরাদ্দ করতেন। তারা ব লতেন না যে টাকা নেই বা কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দিচ্ছেন না। আগেও বলা হয়েছে যে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে কংগ্রেস বলেছিলেন যে দেশ কে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ন করবো এবং বাইরে থেকে খাদ্য আমদানি করা হবে না। কিন্তু তার পর বলা হলো, ১২ লক্ষ্য টন প্রতি বছর খাদ্য আমদানী করতে হবে প্রতি বছর এবং ৬০ লক্ষ্য টন দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে সারা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে। তারপর আবার শোনা গেলো, যে প্লানিং কমিশন নাকি বলছে, প্রতি বছর ১২ এর জায়গায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ্য টন খাদ্য আমদানি করতে হবে। ১৩৩ কোটি টাকার মেশিনারী পাইভেট সেক্টরে আনতে দেওয়া হয়েছে, তা নাকি না আনলেও চলতো। মেশিনারী মর্ডানাইজেশন, ন্যাশানালাইজেসন এমন জায়গায় করতে যাওয়া হয়েছে তা নাকি না করলেও চলতো। এইবার সরকার বলতে থাকলো তাঁদের নাকি ফরেন এক্সচেঞ্জ কমে যাচ্ছে তাই লোক ছাঁটাই করো এবং লোক ছাটাই করতে হয়েছে দেশকে নষ্ঠ করে, সরকারের দূরদর্শিতার , সদিচ্ছার অভাবে এবং জনবিরোধী নীতির দরূন। কৃষি ব্যাবস্থা সাথে খাদ্যের নিরাপত্তার ব্যাবস্থা, খাদ্য সঞ্চয়ের ব্যাবস্থায়ে সরকারের দূরদর্শিতার অভাব দরূন এই টার্গেট তৈরি করা মূর্খামী এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রনোদিত। পরবর্তিকালে আরো আর্থনৈতিক সঙ্কটের বোঝা তারা চাপিয়েছেন সাধারণ মানুষের ঘাড়ে, পরোক্ষ্য ট্যাক্সের মাধ্যমে, জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে, ইনফ্লেশন করেছেন, মূদ্রাস্ফীতি হয়েছে, মাল উৎপাদনের হিসেব না করে নোট ছাপিয়ে গেছেন এবং ফলত পরিকল্পনা খাতে হিসেব আরও ৯৫০ কোটি টাকা বেড়ে যায়। সেই সময়তে মানে ১৯৫৩-৫৪ সালে একটি নতুন বই, প্রফেসর পাল এয়ন্ড বার্ট আমেরিকান একোনোমিস্ট বলেছেন- দি পলিটিকাল একোনমি অফ গ্রোথ করতে that fifteen per cent of national income could be invested without any reduction in mass consumption. আরো লেখা- “ what is required for this purpose is fullest attainable mobilization of the economic surplus that is currently generated by the country’s economic resources. This is to be found in the more than twenty five percent of Indian’s national income which that poverty-ridden society places at the disposal of its unproductive strata. এর মতে টাকা কোথায় পাওয়া যাবে না টাকা পাওয়া যাবে সেই সব আনপ্রোডাকটিভ স্ট্রাটা থেকে অর্থাৎ তখনকার সোসাইটিতে যাঁরা পূজিপতি, ধনী, যাদের টাকা কোনো প্রোডাক্টিভ কাজে নিয়োগ হয়না এবং যাদের হাথে জাতিয়ো আয়ের শতকরা ২৫ ভাগ। ১৯৫৩-৫৪ সালের জাতিয় আয়ে ন্যাশনাল ইনকাম ওয়েজেস এয়ান্ড স্যালারিজে আছে ২৮৯০ কোটি টাকা, অথচ প্রফিট এয়ান্ড ইন্টারেস্ট এতে ৩০২০ কোটি টাকা মধ্যে ১৫৮৫ কোটি টাকা আসছে এগ্রিকালচারাল প্রপার্টি বড়ো বড়ো জোতদার, জমিদার থেকে তাদের মধ্যে এই টাকা থাকছে। অথচ ঐ ২৮৯০ কোটি টাকা এভাবে জাতিয়ো আয় যেগুলি বাড়তো সেগুলি যদি জনসাধারণের বা জন হিতে , খাদ্যের মধ্যে ভর্তুকি ইত্যসদির মধ্যে বা তাদের জন্যে ব্যায়িত হতো তাহলে হয়তো সেই প্রোডাকটিভ স্রাটার উন্নতি সাধন করা সম্বব হতো এবং এই প্রক্রিয়ায় জাতিয় অর্থনীতিতে স্বচ্ছলতা অবশ্যই আসতো। সেই বিপথের দিনে , দেশের বা রাস্ট্র নায়কেরা ক্যাপিটালিস্ট সিস্টেমের মধ্যে প্রথিত চরম অব্যাবস্থা এবং সঙ্কট পরিলক্ষিত করতে পারেন নি, এবং বিগত উন্নত দেশগুলি থেকে আর্থনোইতিক মন্দার করাল ছায়ায় অনিবার্য ফল থেকেও শিক্ষালাভ করতে পারেনি। ১৯৫৮ সালের কংগ্রেস সরকারের দ্যার্থ ভাষায় প্রচার ও অভিমত। গ্রামের নাকি উন্নতি সাধন হয়েছে, মানে গ্রামীন অর্থনীতিতে। কৃষির ব্যাপারে কথা ছিলো যে তাঁরা ৯ লক্ষ্য ৩২ হাজার টন উৎপাদন করবেন, কিন্তু ১৯৫৬ - ৫৭ সালে ওয়েস্টবেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্ল্যানিং কমিশনের কাছে যে রিপোর্ট দিয়েছেন তাতে তাঁরা বলেছেন যে ৮৪ হাজার টন করতে পেরেছেন এবং ১৯৫৭-৫৮ সালে তাঁরা করতে পেরেছেন ১ লক্ষ্য ২৭ হাজার টন বেশী । কোথায় ৯ আর কোথায় ১ আর এই ভাবেই নাকি ওনারা পরিকল্পনাকে স্বার্থক করেছেন । ১৯৫৪ সালে কিছু সারপ্লাস হয়েছিলো কিন্তু সেই সারপ্লাস টা হয়েছিলো প্রয়োজনমতন এবং সময় মতন বৃষ্টিপাত। তার মধ্যে কোনো পরিকল্পনা-টরিকল্পোনা ছিলো না আর সেবার ৭ লক্ষ্য টন বাড়তি হয়েছিলো কিন্তু ১৯৫৮ সালে দেখা যায় যে তখন রাজ্যে সাড়ে সাত লক্ষ্য টন ঘাটতি! এই ভাবেই দেখা যায় ১৯৫৭ সালে ঘাটতি ৪ লক্ষ্য টন, ১৯৫৫ এতে ৫ লক্ষ্য ৪০ হাজার টন, ১৯৫৩ তে ২ লক্ষ্য ৪২ হাজার টন এবং ১৯৫২ তে ৫ লক্ষ্য ৮২ হাজার টন। অন্তত ৯ লক্ষ্য একরে সেচ ব্যাবস্থা সুনিশ্চিত করার কথা ছিলো কিন্তু ১৯৫৮ সাল অবধি মাত্র সাডে তিন লক্ষ্য একর জমিতে সেচ ব্যাবস্থায় জল দিতে পারা গেছে। ময়ূরাক্ষী থেকে ৬ লক্ষ্য একর জমিতে জল দেবার কথা ছিলো কিন্তু ৬ লক্ষ্যের টার্গেট ১৯৫৮ তে ৪ লক্ষ্যে নেমে এসেছে। এই তো ছিল তখনকার পরিকল্পিত গ্রামের উন্নতি এবং দেশ কে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবার ব্যাবস্থা। তখনকার কংগ্রেস সরকারের প্রচারিত সায়ন্টেফিক কৃষিব্যাবস্থা প্রনোয়নের দাবী দেখলে অদ্ভূত লাগে। ১৯৩৭-৩৮ সালে প্রতি একরে ১২.১৮ ফসল হতো, ১৯৫৩-৫৪ সালে হয়েছে ১৩.৪৮, ১৯৫৪-৫৫ সালে হয়েছে ১০.৪০, ১৯৫৫-৫৬ সালে ১১.১১, অর্থাৎ ১৯৩৭-৩৮ সালে যা ছিলো ফলন তাও ১০ বছরের রাজ্ব্যত্বে কংগ্রেসের চমৎকার কৃষি অর্থনীতিতে “অর্ধগত”। তৎকালিন পশ্চিমবঙ্গে ১ কোটি ১৯ লক্ষ্য একর জমিতে ফসল হতো তার মধ্যে ১৮ লক্ষ্য একর জমিতে দুই ফসল হতো এবং ১ কোটি একর জমিতে খালি একফসল হতো তার বেশী কিছু হতো না। যখন সরকার বলছিলো ইস্টবেঙ্গল থেকে লোক আসছে, তখন কিন্তু সেই জমিগুলিকে সরকার উদ্যোগ নিয়ে দো-ফসলি করতে পারতেন, এপার-ওপার সবাইকে তারা খাওয়াতে পারতেন। এমোনিয়া সালফেট সার তখন ৪০ হাজার টন প্রয়োজন পশ্চিমবাংলায়, ১৮ হাজার টনের বেশী ব্যাবস্থা করতে পারেনি সরকার। প্রকৃত ভূমিসংস্কার তো দূর অস্ত, নেই অল্প সুদে কো-অপারেটিভ ব্যাবস্থায়, দীর্ঘমেয়াদী ঋণ। কংগ্রেস সরকারেরই ফোর্থ ইভ্যালুয়েসন রিপোর্ট কি বলে - “The major portion among the under – privileged groups is constituted by the agricultural labourers and no improvement is noticed in their economic or social conditions. There has been no activity in the C.D.P movement for the specific benefit of the people. On the contrary the gradual rise in the prices of essential commodities has aggravated their economic condition and they feel also that some rich people who get project contracts and the big cultivators have become richer as a result of making profits in contracts and the increase in the yield of agricultural produce due to the availability of irrigation water from the Mayurakshi Project and a rise in agricultural prices.” মুখ্যমন্ত্রীর এবং তার সরকারের বড় বড় আশ্বাস, সি ডি পি এবং ই এস ব্লক করে দেশের মধ্যে একটা রিভলিউশন নিয়ে আসবেন। দশ বছর ধরে তখন ওনারা রাজ্বত্য করেছেন, দেশের কি রকম রিভলিউশন হয়েছে খাদ্যের বা অন্য জনকল্যানমুলক কাজে। হ্যাঁ , রিভলিউশন ওনারা সত্যি করতে পেরেছিলেন, সংসদীয় গনতন্ত্রের গলা টিপে, তাকে নিষ্পেশন করে, কারণ সংসদীয় গনতন্ত্রের সঙ্কটের জন্যে কখনো জনগনের পক্ষ্য দায়ী নন, দায়ী সবসময় শাসক গোষ্টি , ইতিহাস অন্তত তাই প্রমান করে। বিধানসভাতে কমিউনিষ্টরা ২৮ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৯ সালে তাই সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব রেখেছিলেন । সরকার জনগনের ওপর অত্যাচার করেছিলো, নীপিডন করেছিলো, সরকার যাদের সেই পচা চাল খাইয়েছিলো, বাধ্য করেছিলো তাদের ১৯ টাকা কন্ট্রোল দরে চাল কিনতে যে চালের দাম হয়ে গিয়েছিলো ৩২ টাকা, তাদের কন্ট্রোল ওর্ডারের ফলে। জনগন তাই সঙ্ঘঠীত হয়েছিলো সবরকম গনতান্ত্রীক শক্তির নেত্রত্বে। এবং সাথে সাথ দিয়েছিলো কমিউনিষ্ঠ পার্টী। সরকার বহুরকম দমননীতি চালিয়েছিলো, এই খাদ্য আন্দোলন কে ধ্বংস করতে। সরকার নানারকম কারণ দেখিয়ে তাদের পক্ষের সমর্থন আদায় করতে চেষ্টা করলো, যথা অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, উদবাস্তুদের আগমন, পাট চাষ বেশী হাওয়ায় ধানের উৎপাদনে জমির পরিমান কমে যাচ্ছে ইত্যাদি কিন্ত তাদের নানান রকম বাহানা, জনগনের কাছে ধোপা টিকলো না। কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে বারো বছরের বেশী রাজত্ব করছিলেন, কিন্তু তাদের আট বছর পরিকল্পনাতে শতকরা তিন ভাগের বেশী জলসেচের ব্যাবস্থা করতে সরকার ব্যার্থ। শতকরা আটাশ ভাগ জমিতে এক ফসল হয়, দুই ফসল হয় না। গড়পড়তা বিঘা প্রতি সাড়ে তিন মন ধান উৎপাদন হচ্ছে। এই অঙ্ক থেকে তাই বোঝা যায় যে যুদ্ধের আগে ১৯৩৯ সালে যা অবস্থা ছিল, উৎপাদনের ব্যাপারে কংগ্রেস আমলে তা গড়পড়তা কমে গেছে। এইসব তথ্য উন্মোচন করতে না দিয়ে সরকার নানান রকম বাহানা অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, উদ্বাস্তু আগমন ইত্যাদি বলে নিজের দোষ ঢাকতে চাইছিলো যা জনগনের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। সরকারের অপদার্থতা, চরম ব্যার্থতা, চরম গাফিলতি এবং দুর্নীতি মানুষের চক্ষুগোচরে প্রতিয়মান হয়েছিলো। রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিবৃতিতে কোনোরকম সামঞ্জস্য ছিলো না। পন্ডিত নেহেরু, শ্রী জৈন, শ্রী পাতিল ই ত্যাদি, এঁনারা বলেছিলেন যে খাদ্য সঙ্কট অন্য ব্যাপার, খাদ্যের যথেষ্ট উৎপাদন হয়েছে, দেশের কোথাও খাদ্য সঙ্কট নেই, পশ্চিমবঙ্গ যা সাহায্য চেয়েছিলো তার অতিরিক্ত পেয়েছে, তাহলে কে সত্যি কথা বলছে, রাজ্য সরকার না তাদের রাজনৈতিক মদতপূষ্ট কেন্দ্রীয় সরকার? কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিলো আর ঘাটতি নেই, তাহলে কেনো তখন ৩৪-৩৫ টাকা মন চাল কিনতে হয়েছিলো। আসলে ব্ল্যাক মার্কেটে অনেক খাদ্যসামগ্রী চলে গেছে, ইলেকশন ফান্ড কে সুনীশ্চিত করা দরূন। সাধারণ মানুষ সেটা বুঝেছিলেন। তারা প্রতিবাদ করবেন না, আন্দোলন করবেন না, তাহলে কি তারা নতজানু হয়ে সরকারকে প্রনাম করবেন ?
পশ্চিমবঙ্গে একর প্রতি ধানের ফলন গত ১৪ বছরে বাড়েনি এবং মোট আবাদী জমির সেচপ্রযুক্ত গত দুই পরিকল্পনাতে শতকরা ২০-২১ ভাগ থেকে শতকরা ২৪-২৬ ভাগ হয়েছিলো মাত্র। পুরানো জমিদারী প্রথার অবসান হয়েছিলো ঠিকই কিন্ত খুব কম সংখ্যক কৃষক জমির মালিকানা পেয়েছিলেন এবং হাজার হাজার কৃষক জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলেন। বেশীর ভাগ জমিদার জোতদারেরা নিজেদের বা নিজ আত্মীস্বজনের নামে জমি লিখিয়ে নিয়েছিলো এবং অনেক জমি বেনামে করে নিয়েছিলো, সেখানকার কৃষকদের লেঠেলবাহীনি এবং কংগ্রেসের পূলিসবাহীনি দ্বারা উচ্ছেদ করে। পশ্চিমবঙ্গের গনতনন্ত্র প্রিয়মানুষ, সংগ্রামের মহান ইতিহাসে স্মৃতিতে গর্বিত সর্বাসাধারন , এই তঞ্চকতা ধরে ফেলেছিলেন, গর্জে উঠেছিলেন তাঁরা, সরকারের নানা দমননীতি প্রয়োগ স্বত্ত্বেও , তাঁরা গনসংগ্রামের পথ নিয়েছিলেন। সংসদীয় গনতন্ত্রে তাঁদের যতটুকু সীমাবদ্ধতা ছিল, তার মধ্যে থেকেই তারা ১৯৬৭ সাল এবং তার পরেও জয়যুক্ত করেছিলেন গরীব, শ্রমজ়ীবি মানুষের শ্রেনীবন্ধু কমিউনিষ্ঠ পার্টি এবং তাদের বামপন্থী জ়োটকে। কংগ্রেসীরা নানান ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেই যুক্তফ্রন্ট সরকারকে দুই বার , অসংবিধানিক ভাবে, অগনতান্ত্রীক ভাবে অপসারিত করেছিলো, কমিউনিষ্ট এবং তাদের জোট সঙ্গীদের মধ্যে ভাঙ্গন ধরিয়ে, কিন্তু ছাই দিয়ে আগুন চাপা রাখা যায়নি। সংগ্রাম, প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিলো, প্রতিবাদের আগুন দাবানল হয়ে হায়নাদের ষড়যন্ত্র জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিলো। ১৯৭৭ সালে আসলো মানুষের বহুপ্রতিক্ষিত বামফ্রন্ট সরকার, মানুষের দুঃখ্য নিবারণের জন্যে এবং এখনো আমরা, এই রাজ্যের মানুষ, শ্রমজীবি মানুষ, কৃষক ভাইয়েরা, ছাত্র, যুব , মহিলা এই সুসংঘঠিত সরকারের সদিচ্ছায়, সুপরিকল্পনায় (নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও)৩ ২ বছরের বেশী শাসনে , গর্বিত, সন্তুষ্ট এবং সমৃদ্ধ।
এই প্রবন্ধের কিচ্ছু তথ্য কমরেড জ্যোতি বসুর সেইসময়কার রাজ্যে বিধানসভাতে প্রতিবাদী ভাষণ এবং অনাস্থা প্রস্তবের ভাষণ থেকে সংগৃহিত ।