গল্প চলুক। এই শহরের গল্প। যে গল্পগুলোকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলে সেই গল্প - ট্রামশ্রমিকের গল্প, মেয়েদের লড়াইয়ের গল্প, কলোনির লড়াইয়ের গল্প...এই গল্পগুলো মুছে গেলে ওদের লাভ। আর আমাদের কাজ গল্পগুলোকে না ভোলা, আর ভুলতে না দেওয়া। তাই বারবার বলে যেতে হবে এই গল্পগুলো...ট্রামশ্রমিকের গল্প, মেয়েদের লড়াইয়ের গল্প, কলোনির লড়াইয়ের গল্প, খাদ্য আন্দোলনের গল্প...
সেদিন ট্রাম শ্রমিকদের গল্প বলেছিলাম, আজ বলব মেয়েদের গল্প - ভারতের প্রথমদিকের নারী সংগঠন, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি বা MARS-এর গল্প। সেই মেয়েদের গল্প যারা চল্লিশের দশকে যুদ্ধের পটভূমিতে, চরম দুর্ভিক্ষের মধ্যেও, নিজেরা জোট বেঁধেছিল; খেটেখাওয়া ঘরের আরো হাজারো মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল সকলের দাবী নিয়ে। সেই মেয়েদের গল্প বলব যাদের নিজেদের ঘরে অনেক সময় গরম ভাত না থাকলেও তারা নিজেদের ক্ষিদে চেপে রেখে অন্যকে খাইয়েছিল; সেই মেয়েদের গল্প যারা তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের সময় মুখ বুজে কালোবাজারি মেনে নেয়নি, বরং লড়াই করে চাল আদায় করেছিল সরকারের কাছ থেকে; নিজের হাতে চাল বিলি করেছিল গ্রামগঞ্জ থেকে ছুটে আসা পরিবারগুলোকে; সেই মেয়েগুলোর গল্প বলব যারা লড়ে গেছিল — লাঠি, ছুরি নিয়ে নয় — শুধু সংখ্যার জোরে, যারা দেখিয়ে দিয়েছিল যে বোলতার ঝাঁককে বাঘ সিংহও ভয় পায়...যাদের লড়াইয়ে শেষ অবধি বড়লোক ব্যবসায়ীর দল বাধ্য হয়েছিল মুনাফা লোটা বন্ধ করে গরীব মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে...বলব সেই মেয়েদের গল্প।
অনেক সময় ভাবি — সেদিনের ট্র্যাডিশনের উত্তরাধিকারীরা যদি আজ বাংলার রাস্তায় বয়স্কদের জন্যে হাজার টাকা সরকারি পেনশনের দাবী নিয়ে পথে নামত, কী হত তখন। ব্যাটন নিয়ে তেড়ে আসত পুলিশ? যাদের গল্প বলছি আজকে, তারা কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশের লাঠিকে ভয় পায়নি। তারা চাপে পড়ে মাথা নোয়ায়নি; বরং উলটে নিজেরা চাপ বজায় রেখেছিল। আজ হিন্দুত্বের গেরুয়া রঙ সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে, বাদ যায়নি বাংলাও। সেদিনের ক্রাইসিসের মধ্যে মানুষের বেঁচে থাকার গল্পগুলো মুছে যেতে বসেছে। যারা মুখ খোলে তাদের পিছনে পড়ে যায় আইটি সেলের ট্রোলবাহিনী, এমনকী নেতা মন্ত্রীরাও। এই কঠিন সময়ের জন্যে সেদিনের গল্পগুলো জরুরী। ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে তাদের ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকারকে ভুলে না যায়...
১৯৪২ সালের কথা। বিশ্বযুদ্ধের ছাপ পড়েছে কলকাতার অলিতেগলিতে। জনআন্দোলনের অ্যাক্টিভিস্টদের মাথায় ঘুরছে মেয়েদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা। এলা রীডের বাড়িতে ঘরোয়া বৈঠকে ঠিক হল মেয়েদের সংগঠনের রূপরেখা৷ সংগঠনের নাম রাখলেন রেণু চক্রবর্তী। কলোনিয়াল শাসকবিরোধী আন্দোলনের গর্ভ থেকে জন্ম নিল মহিলা আত্ম রক্ষা সমিতি বা MARS...কনভেনর হলেন এলা রীড, সংগঠনের দায়িত্বে রইলেন মণিকুন্তলা সেন, সুধা রায়, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলি, রেণু চক্রবর্তী আর সাকিনা বেগম। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে র্যাডিকাল কিছু দাবী ছিল এই সমিতির — মেয়েদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার; অর্থনৈতিক সমতা; আর সামাজিক ন্যায়বিচার। সামনে ছিলেন যাঁরা, তাঁদের কাছে স্বাধীনতা শব্দটার মানে শুধু ব্রিটিশদের দেশছাড়া করা ছিল না। তাঁদের কাছে স্বাধীনতার মানে ছিল এক নতুন সমাজ, যেখানে মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে, যেখানে এক থালা ভাতের জন্যে কোনো মেয়েকে বিক্রি হতে হবে না...
যুদ্ধ চলাকালীনই এল মন্বন্তর। মানুষের তৈরী দুর্ভিক্ষ। বাংলার দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার পরিবার এসে উঠেছিল কলকাতায় — কাজের খোঁজে, দুটি ভাতের খোঁজে, বেঁচে থাকার তাগিদে। এই পরিবারগুলো থেকে হাজারো মেয়ে আটকা পড়েছিল শরীরের বাজারেও; শহরে তখন দেশ বিদেশের সৈন্যদের আনাগোনা, শরীর বেচলে দুটো ভাত জুটত অনেকের। "সমিতি" এই বাস্তব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। এই মেয়েদের সংগঠিত করেছিল তারা, অন্ধকার গলি থেকে আলোয় বের করে এনেছিল তাদের; তাদের কন্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল সমিতিই। মণিকুন্তলা সেনের মত নেত্রীরা সশস্ত্র সৈন্যদল আর মুনাফালোভীদের শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। জন্মের এক বছরের মধ্যেই সমিতির বিভিন্ন শাখা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার বিভিন্ন জেলায় — দুর্ভিক্ষের সময়ে ত্রাণের কাজ হাতে নিয়ে। সেই অভিজ্ঞতা শিখিয়েছিলো যে বাংলায় একটা শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও গণমুখী নারী সংগঠনের বড় দরকার। ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে কলকাতায় হল MARS-এর প্রাদেশিক সম্মেলনে। ছড়িয়ে পড়তে থাকল সমিতি।
জন্মলগ্ন থেকেই সমিতির কাজ ভাগ হয়েছিল তিন মূল লক্ষ্যের ভিত্তিতে — জাতীয় প্রতিরক্ষা; রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি আর জাতীয় সরকার গঠন; এবং দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো। সামনের সারীর প্রায় সকলেই কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেও সমিতির দরজা সকলের জন্যেই খোলা ছিল, সমাজের সমস্ত স্তরের মেয়েরাই এসেছিলেন সমিতিতে। বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, যেমন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, লীলা মজুমদার এবং রানী মহলানবিশ — এঁরাও যুক্ত হয়েছিলেন সমিতির সঙ্গে। ছিলেন কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের মেয়েরাও। শিক্ষিত "ভদ্রলোক" পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে একজোট হয়ে লড়েছিলেন মিস্ত্রিপুকুর বস্তির মরিয়াম বিবি আর গুলবাহাররাও। সারা দেশ জুড়ে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগুন জ্বলছিল, ঠিক সেই সময়েই বরিশালে সমিতির দ্বিতীয় সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন হাজরা বেগম। বিভাজনের রাজনীতি যখন বাংলাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল, সেই সংকটের দিনে MARS-এর মেয়েরা বেছে নিয়েছিলেন সংহতির রাস্তা।
তারপর আসে ১৯৪৩ সালের মার্চ মাস...দুর্ভিক্ষের আগুনে বাংলা জ্বলছে, শহরের রাস্তায় অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মুখে "ফ্যান দাও" আর্তনাদ। পি.সি. যোশী কলকাতায় এসেছিলেন এই সময়ে, তিনি লিখে গেছিলেন: "I was hardly five minutes in Calcutta when I was shaken up as I have rarely been by a voice through the window 'Ma Go babure!' I had never heard such accents nor such a tone." [Who lives if Bengal dies]
চালডালের দাম বাড়তে শুরু করেছিল অস্বাভাবিকভাবে। গড়িয়াহাট বাজারে রিলিফ শপে লাইন পড়ত ভোররাত থেকে। রাত তিনটের ট্রেনে বালিগঞ্জ স্টেশনে এসে পৌঁছত ক্যানিং লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে ক্ষুধার্থ মানুষের ভিড়। মণিকুন্তলারা সেই ভিড় সামলে, সেখানে মেয়েদের সামলে, তাদের হাতে চাল তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় বাড়ি ফিরে রাতের খাবারও জোটেনি তাঁদের নিজেদেরই। মণিকুন্তলার লেখা থেকেই একটু তুলে দিই —
"চালের দাম তখনকার দিনে মণ প্রতি ২৮ টাকায় উঠেছিল। যা আগে ছিল ৪/৫ টাকা মণ। আমাদের আস্তানাতে খাবার সংস্থান করা মুশকিল হয়ে উঠল। অনেক দিনই রান্না হত না। মনোরমার দুটি বাচ্চা মেয়ে আমাদের কাছে থাকত। তাদের জন্য আমাদের ভাবতে হত। দু-একদিন ক্যানটিনে সকলের খাওয়া হয়ে গেলে সামান্য যেটুকু বাকি থাকত তাই নিয়ে এসে সকলে একটু একটু ভাগ করে ২/৪ দিন খেয়েছিলাম। কিন্তু কাজটা ভালো নয় মনে হল সকলেরই। এর চেয়ে না খাওয়াও ভালো। মাস শেষে যে যার সামান্য পয়সা ব্যয়ে যাহোক একটু কিছু কিনে নিত। একদিন রাত দশটায় একটা রুটি কিনে হাতে করে বাড়ি ফিরেছি। দেখি, মনোরমার মেয়ে দুটি জেগে বসে আছে। ওদের মা তখনও ফেরেনি। ওরা জানতে চাইল, আমি কোনও খাবার এনেছি কি না। হাতের রুটিটা ওদের হাতে দিয়ে বললাম - 'হ্যাঁ এনেছি, দুজনে ভাগ করে খাও।' ওরা ওইটুকু রুটি ভাগ করে খেল। পেট ভরে জল খেয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতন ঘুমোতে গেল। এরকম অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক দিনই হত।"
সমিতি ডাক দিল মেয়েদের — "ভুলে যাও তোমাদের ধর্মীয় আর জাতিগত পরিচয়; এই রাজপথ আমাদের; ক্ষিদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়ব আমরা"। MARS আর মুসলিম উইমেন্স সেল্ফ ডিফেন্স লীগের ডাকে নিমেষে পাঁচ হাজার মেয়ে নেমে এলো রাস্তায় — অলিগলি বস্তি থেকে, শহরতলি থেকেও — অনেকের কোলেই বাচ্চা। মিছিল চললো বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির উদ্দেশ্যে। ঘেরাও হল আইনসভা। মেয়েদের প্রথম এত বড় গণআন্দোলন। ঘোড়সওয়ার পুলিশ বাহিনী ছুটে এলো। মেয়েরা কেউ নড়লো না এক চুলও। হাতে হাত রেখে আইনসভার গেটে তৈরী হল মানবশৃঙ্খল। দাবী উঠল — কালোবাজারি বন্ধ করে অবিলম্বে গরীব পরিবারগুলোর হাতে চাল তুলে দিতে হবে। ফজলুল হক বাধ্য হলেন চালের ব্যবস্থা করতে — সেই মুহূর্তেই একশো বস্তা চাল এনে বিতরণ করা হল মেয়েদের মধ্যে, এক দিনের মধ্যে খোলা হল আরো বেশ কয়েকটা কনট্রোলড প্রাইস শপ।
এই আগুন শুধু কলকাতায় থেমে থাকেনি। আগুন ছড়িয়েছিল দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর, বদরগঞ্জ, পাবনা, বাঁকুড়াতেও। আজ না হয় দিল্লী জাতীয় প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু; কিন্তু তার বহু আগেই নারী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার লিখেছিল MARS-এর মেয়েরা। তাদের হাতে গেরুয়া পতাকা ছিল না কোনো। ছিল সাদা কাপড়ের ওপরে দুটো খুব সাধারণ দাবী — রেশনের, আর মেয়েদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করার। গেরুয়া পতাকা হাতে মেয়েদের অধিকারের কোনো দাবী ওঠেনি কখনও। সেদিনও নয়, আজও নয়।
যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ আর মার্কিনি সৈন্যদের অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরী হয়েছিল দেশ জুড়ে। আর, যা হয়ে থাকে — ক্যাম্পের আশেপাশের গ্রামের মেয়েদের ওপর নেমে আসত যৌন আক্রমণ। MARS-এর কর্মীরা এই বিপদ বুঝেছিলেন; তাঁরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে মেয়েদের বোঝাতেন যে তাদের শরীরের মালিক শুধু তারাই; কোনো অফিসার বা সৈন্যের খবরদারি করার অধিকার নেই তাদের ওপর। কোথাও থেকে কোনো অত্যাচারের খবর তাঁদের কাছে পৌঁছলেই — সে নিষিদ্ধ পল্লী হোক বা প্রত্যন্ত গ্রাম — ছুটে যেতেন সমিতির কেউ না কেউ। মেয়েদের লড়াই করে টিঁকে থাকতে শেখাতেন তাঁরা, সন্ধান দিতেন বিকল্প জীবিকার।
১৯৪৬ সালে এলো বন্যা। সমিতি আবারও রিলিফের কাজে সামনের সারীতে — জামাকাপড়, ওষুধ, খাবার পৌঁছনোর দায়িত্ব নিল তারা। বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে আত্মনির্ভরতার নীতিতে কাজ করেছিল সমিতি। ত্রাণ শিবির চালিয়েছিল, রসদের ব্যবস্থা করেছিল, তহবিলে টান পড়লে নিজেদের গয়না অবধি বিক্রি করে দিয়ে...বড়লোক তো কেউ ছিলেন না, তবুও যার যতটুকু সম্বল ছিল, সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েই...
১৯৪৫-৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কলকাতা যখন জ্বলছে, তখনও সমিতির সদস্যরা হিন্দু মুসলমান প্রতিবেশীদের মধ্যে ব্রীজ হয়ে উঠেছিলেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, অসহায় ও বিপন্ন মানুষদের সুরক্ষা দিয়েছিলেন। বম্বে আর করাচীর নৌ-বিদ্রোহ চলাকালীনও, তাঁদের রাস্তাতেই দেখা গেছে। স্বাধীনতার পর মেয়েদের অধিকারের দাবিতে যখন আইনি লড়াই শুরু হয়, তখনও লড়ে যায় MARS...মণিকুন্তলা সেনের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের টক্কর ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। আবারও "সেদিনের কথা" থেকে কিছুটা কোট করি —
"শ্যামাপ্রসাদের স্বরূপ আমরা দেখেছিলাম পূর্ব-বর্ণিত সভায়। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, গাড়ি গাড়ি মেয়ে আনা হয়েছিল পাথুরেঘাটা থেকে এবং তাদের বলা হয়েছিল সমস্ত হিন্দুকে মুসলমান করে দেবার আইন বন্ধ করার জন্য তোমাদের যেতে হবে। বেচারিরা মুসলমান হবার ভয়ে এসে হল্লা করে গেল। দুটো করে টাকাও নাকি প্রত্যেকে পেয়েছিল।
যাইহাক, এতে আমাদের বিশেষ কোনও ক্ষতি হয়নি। অনেক স্বাক্ষর সংগৃহীত হয়েছিল। ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের হাতে আমি সেগুলো তুলে দিয়েছিলাম পশ্চিম বাংলার পক্ষ থেকে পার্লামেন্টে পাঠাতে। সব রাজ্য থেকেই এরকম করা হয়েছিল।
এইভাবে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে পার্লামেন্টে হিন্দু-কোড বিল পাশ হল। পার্লামেন্টে এই বিলের বিরোধী ছিলেন অনেকেই। এমনকী কংগ্রেসের মধ্যেও তাঁদের দেখা গেল। রক্ষণশীল ও গোঁড়াপন্থীরা কেবলমাত্র হিন্দু মহাসভাতেই ছিলেন না। নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেবার জন্য এমনকী প্রধানমন্ত্রী জওহরলালকেও পার্টির হুইপ প্রয়োগ করতে হয়েছিল দলের সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে।
আমাদের অনেক দিনের অনেক সংগ্রামের ফলেই অন্তত এই একটি বিষয়ে আইনগত স্বীকৃতি পাওয়া গেল। কিন্তু শুধু আইনের স্বীকৃতিই কি মেয়েদের সমান মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে যথেষ্ট? সমিতির সেই প্রথম দিনগুলি থেকে আজকের দিনেও মেয়েদের অভিজ্ঞতা বোধ হয় এর বিপরীত সাক্ষ্য দেবে।"
পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে সমিতির আলাদা অস্তিত্ব ক্রমশ: ম্লান হয়ে আসে। কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, নতুন রাজনৈতিক লাইন – সব মিলিয়ে MARS-এর যাত্রা প্রায় থমকে দাঁড়ায়। তবে এর সদস্যরা অন্য জাতীয় নারী সংগঠনে কাজ চালিয়ে যান। MARS শেষ হয়ে গেলেও তাদের গল্প হারিয়ে যায়নি। উপমহাদেশের ইতিহাসে MARS-ই প্রথম কোনো নারী সংগঠন মেয়েদের বলতে পেরেছিল যে তাদেরও অধিকার রয়েছে — স্বাবলম্বী হওয়ার অধিকার; নিজেদের শরীরের ওপর নিজেদের মালিকানার অধিকার; শিক্ষা ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার। সমিতি আইনী সচেতনতা ছড়িয়েছিল। শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্যে লড়েছিল। MARS-কেই বলা যায় পরবর্তীকালের সর্বভারতীয় গণতান্ত্রিক মহিলা সংগঠনের পূর্বসূরী।
আজকে অধিকারের কথা বললে যখন মেয়েদের হাজারটা গালিগালাজ শুনতে হয়, ট্রোলদের সহ্য করতে হয়, ক্ষমতাশালীদের কটাক্ষ ধেয়ে আসে, তখনও এই MARS-এর আদর্শই মশাল হয়ে থাকে। মশালকে জ্বালিয়ে রাখতে হয় ভবিষ্যতের জন্যে।
তাই গল্পগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়। মানুষের গল্প। বেঁচে থাকার আর বাঁচিয়ে রাখার গল্প। আমাদের ঐতিহ্য আর উত্তরাধিকার।
সূত্র:
(১) জনজাগরণে নারীজাগরণে, মণিকুন্তলা সেন, থীমা, কলকাতা
(২) Emergence of Mahila Atma Raksha Samiti in the Forties - Calcutta Chapter, Gargi Chakravarty, in Calcutta: The Stormy Decades, ed. Tanika Sarkar and Shekhar Bandyopadhyay, Social Science Press

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন