আমার বাবা দুইজন। একজন আমার সাথে আর কথা বলে না। আরেকজনকে আমি পকেটে নিয়ে ঘুরি।
দ্বিতীয়জন একটা গোলাপি ট্যাবলেট। সাইজে বুটের দানার মতো। গায়ে ইংরেজিতে দুইটা অক্ষর খোদাই করা। রাস্তায় ওর অনেক নাম। গুটি, মাল। তবে সবচেয়ে চালু নামটা শুনলে আপনার গা শিউরে উঠবে। বাবা। হ্যাঁ, এই দেশের লাখ লাখ ছেলে ওই গোলাপি জিনিসটাকে বাবা বলে ডাকে। কেন ডাকে, সেটা বুঝতে আমার চব্বিশ বছর লেগে গেলো। বাবার মতোই ও আপনাকে আগলে রাখবে, ভরসা দেবে। আর একদিন দেখবেন ওকে ছাড়া আপনি কিছুই না।
আমার নাম রাফি। মিরপুরের ছেলে। এই গল্পটা আমি লিখছি না, কনফেস করছি। কারণ আমার আর হারানোর কিছু নেই।
তেইশ সালের কথা। আমি তখন একুশ। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে সিএসই পড়ি। রাত জেগে ভ্যালোরেন্ট, ডিসকর্ডে আড্ডা, ফাইভারে টুকটাক লোগো ডিজাইন। মাথার ভেতর সারাক্ষণ উনিশটা ট্যাব খোলা। সিজিপিএ, ক্লায়েন্ট, কানাডার স্বপ্ন, বাবার প্রেশারের ওষুধ, ছোটবোন তিন্নির টিউশনের বেতন। আমাদের জেনারেশনটাই এমন। সবকিছুর সাথে কানেক্টেড। অথচ কারো সাথে কানেক্টেড না। বুকের ভেতর সারাক্ষণ একটা লো ব্যাটারি সাইন জ্বলে।
আর আমরা সবাই পালাই। কেউ রিলসে, কেউ গেমে, কেউ হাসতে হাসতে ডিপ্রেশনের মিম বানায়। বড়রা বলে আমরা অলস। আমরা অকৃতজ্ঞ। তারা বোঝে না, চল্লিশ লাখ বেকারের লাইনে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে ঠিক কী দেখা যায়। আমরা কেউ ভালো নেই। আমি শুধু পালানোর সবচেয়ে খারাপ দরজাটা বেছে নিয়েছিলাম, এই যা তফাত।
ওই ঝাপসা জীবনে একটাই স্বস্তির ব্যাপার ছিলো। অথৈ। আমার ক্লাসমেট। টিএসসিতে না। আমাদের প্রেম হতো ইউনিভার্সিটির সিঁড়িতে আর মেট্রোরেলে। ও টিফিন বক্সে নুডলস আনতো দুইজনের জন্য। প্ল্যান ছিলো, গ্র্যাজুয়েশনের পর দুজনে আইইএলটিএস দেবো। কানাডা যাবো। স্নো দেখবো। অথৈ বলতো, তুই খালি পাশটা কর রাফি। বাকিটা আমি সামলাবো। কেউ আমার দায়িত্ব নিতে চাইছে, এই ফিলিংসটাই আমার জীবনের সেরা নেশা ছিলো। তখনো জানতাম না।
অথৈর একটা পাগলামি ছিলো। মন ভালো থাকলে ও আমার হাতের তালুতে আঙুল দিয়ে কী যেন লিখতো। জিজ্ঞেস করলে বলতো না। শুধু বলতো, তুই পাশ করে বের হ, সেদিন বলবো। আমি হাত মুঠো করে রাখতাম, যেন লেখাটা পড়ে না যায়।
সেমিস্টার ফাইনালের আগের সপ্তাহে ঘটনাটা ঘটলো। তিন রাত ঘুমাইনি। দুইটা ব্যাকলগ, ক্লায়েন্টের ডেডলাইন। আদনান বললো, ওর বাসায় গ্রুপ স্টাডি হবে। গিয়ে দেখি স্টাডি না। টেবিলের ওপর সিগারেটের ফয়েল, একটা লাইটার আর ছোট্ট একটা গোলাপি দানা। আদনান হাসলো। বললো, টেনশন নিস না মামা। এইটা খেলে এক রাতে পুরা সিলেবাস শেষ। সবাই খায়। আর্মির পোলাপান খায়, বিসিএস ক্যাডাররাও খায়।
আমি না করেছিলাম। সত্যি বলছি, প্রথমে না করেছিলাম। তারপর ভোর চারটায়, যখন চোখ জ্বলছে আর সিলেবাসের অর্ধেক বাকি, আদনান ফয়েলটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো। বললো, একবার। জাস্ট একবার।
পৃথিবীর সব সর্বনাশ এই শব্দটা দিয়ে শুরু হয়। একবার।
প্রথম টানটার কথা আমি কবরে গিয়েও ভুলবো না। পোড়া মিষ্টি একটা ধোঁয়া গলা দিয়ে নামলো। আর দশ সেকেন্ডের মাথায় মনে হলো মাথার ভেতরের উনিশটা ট্যাব একসাথে বন্ধ হয়ে গেলো। প্রথমবারের মতো, জীবনে প্রথমবারের মতো, সব শান্ত। ক্লান্তি নেই, ভয় নেই, খিদা নেই, ঘুম নেই। শুধু বিদ্যুতের মতো একটা শিহরণ শিরদাঁড়া বেয়ে উঠছে আর নামছে। মনে হলো আমি চাইলে আজ রাতে গোটা সিলেবাস না, গোটা পৃথিবী মুখস্থ করে ফেলতে পারবো। মনে হলো আমার মতো সুখী কেউ কোনোদিন জন্মায়নি। এই যে ফিলিংটা, এইটাই ফাঁদ। স্বর্গ দেখিয়ে ও আপনার নাম, ঠিকানা লিখে নেয়।
সেই রাতে আমি সত্যিই পুরো সিলেবাস শেষ করেছিলাম। পরীক্ষাও ভালো হলো। কিন্তু স্বর্গের ভাড়া আছে। দুইদিন পর নামলো ক্র্যাশ। মনে হলো কেউ আমার শরীর থেকে ব্যাটারিটা খুলে নিয়ে গেছে। টানা ষোলো ঘণ্টা ঘুমালাম। ঘুম ভেঙে দেখি পৃথিবীর রংটাই বদলে গেছে। সব ধূসর। সব বিস্বাদ। সবাই বিরক্তিকর। আর মাথার ভেতর মশার মতো একটা সূক্ষ্ম চিন্তা ঘুরছে। আরেকটা হলেই সব ঠিক হয়ে যায়। ব্রেইনের ভেতর হিসাবটা এভাবেই বসে গেলো। প্রেশার মানেই গোলাপি দানা। প্রথম মাসে সপ্তাহে একটা। পরের মাসে দুইটা। তিন মাসের মাথায় দিনে একটা লাগে। না হলে হাত কাঁপে। মেজাজ সপ্তমে চড়ে। মনে হয় খুলি খুলে ব্রেইনটা চুলকাই।
তারপর টাকার খেলা শুরু। একেকটা দানার দাম তিনশো টাকা। ফাইভারের ইনকাম গেলো। টিউশনের বেতন গেলো। সেমিস্টার ফির সত্তর হাজার টাকা বাবার কাছ থেকে নিয়ে ভার্সিটিতে জমা দিলাম না। বাসায় একটার পর একটা মিথ্যা। ল্যাব ফি লাগবে। প্রজেক্টের জন্য হার্ডডিস্ক লাগবে। বন্ধু বিপদে পড়ছে। নেশাখোরের প্রতিভা জানেন? মিথ্যা বলার সময় আমাদের গলা কাঁপে না। কাঁপে শুধু হাত, দানাটা ফয়েলে বসানোর সময়।
আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতাম না। ছয় মাসে ওজন কমলো তেরো কেজি। গালে দুইটা গর্ত। মাড়ি থেকে রক্ত পড়ে। দুইটা দাঁত নড়ে ওঠে প্রায়ই। রাতে ঘুম নেই, দিনে মরার মতো পড়ে থাকি। আর মাথার ভেতর ফিসফিসানি। মনে হতো দেয়ালের ওপাশে কেউ আমার নামে কথা বলছে। মনে হতো মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে কেউ দেখছে। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম মেথ সাইকোসিস। আমার ভাষায়, দোজখের ট্রেইলার।
অথৈর কথা বলি। যেটা বলতে আমার সবচেয়ে কষ্ট হয়।
নেশার প্রথম দিকে ইয়াবা শরীরটাকে জানোয়ার বানিয়ে দেয়। ভেতরে একটা খিদা জাগে। যেটা প্রেম না, ক্ষুধা। একদিন হাই অবস্থায় অথৈকে এমন আক্রোশে কাছে টেনেছিলাম যে ওর হাতের চুড়ি ভেঙে হাত কেটে গেলো। ও ছিটকে সরে গিয়ে যেভাবে আমার দিকে তাকালো, ওই দৃষ্টিটা আমি এখনো স্বপ্নে দেখি। ভয়। আমার অথৈ আমাকে ভয় পাচ্ছে। ও কাঁপা গলায় বলেছিলো, তুই আমাকে দেখছিস না রাফি। তুই আমার শরীর দিয়ে অন্যকিছু খাচ্ছিস।
ও ঠিক বলেছিলো। আর সবচেয়ে নোংরা সত্যিটা কী জানেন? কিছুদিন পর ওই ক্ষুধাটাও মরে গেলো। ইয়াবা প্রথমে শরীর জাগায়। তারপর শরীরটাই মেরে ফেলে। শেষদিকে অথৈ পাশে বসলে আমার কিছুই হতো না। কিচ্ছু না। একটা চব্বিশ বছরের ছেলের ভেতরে ভালোবাসার মানুষ ছুঁয়ে দিলে যদি কিছু না জাগে, তার চেয়ে নির্মম প্রহসন আর নেই। আমার সব অনুভূতির একটাই দরজা তখন। গোলাপি।
অথৈ তাও ছাড়েনি। ও আমার নেশার কথা জানতো। বাসায় জানায়নি। নিজের টিউশনির টাকায় আমাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে গেছে। ওষুধ কিনে দিছে। শেষবার ও আমার হাত ধরে বলেছিলো, রাফি, আমি তোর নেশার সাথে আর পারতেছি না। হয় ওইটা, নয় আমি। এক মাস টাইম। আমি কসম কেটেছিলাম। সতেরো দিনের মাথায় ও আদনানের ফ্ল্যাটে এসে আমাকে পেলো ফয়েল হাতে।
ও চিৎকার করলে বাঁচতাম। থাপ্পড় মারলে বাঁচতাম। ও কিছুই করলো না। দরজায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখলো। তারপর খুব আস্তে বললো, ভালো থাকিস। ব্যস। ভালোবাসা যখন মরে যায়, কোনো চিৎকার চেঁচামেচি হয় না জানেন। কেবল নিঃশব্দে একটা দরজা বন্ধ হয়ে যায়। যাওয়ার সময় ও একবারও আমার হাতের দিকে তাকালো না। হাতের তালুর ওই লেখাটা আমার আর জানা হলো না। কোনোদিন হবেও না।
এরপরের অধ্যায়গুলো দ্রুত বলি। কারণ নেশার গল্পের মাঝের পার্টটুকু সব দেশে, সব ঘরে একই। টাকার জন্য মায়ের কানের দুল বেচলাম। তিন্নির ল্যাপটপের জমানো টাকা সরালাম। ভার্সিটি থেকে নাম কাটা গেলো। আর টাকা যখন কোথাও নেই, তখন শাকিল ভাই হাত বাড়ালো। এলাকার বড় ভাই। বললো, মামা, মাল টানবি টাকা লাগবো না। খালি দুই এক জায়গায় পৌঁছায় দিবি।
আমি ক্যারিয়ার হয়ে গেলাম। মিরপুর থেকে ফার্মগেট। পুরিয়া পৌঁছে দেই। বিনিময়ে আমার ভাগ। শাকিল ভাই নিজে জীবনে একটা দানাও মুখে দেয়নি। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই আপনি খান না? সে হেসে বলেছিলো, পাগল নাকি। মাল হইলো কাস্টমারের লেইগা। বেপারীর লেইগা না। ওই হাসিটা মনে পড়লে আমার এখনো খুন করতে ইচ্ছা করে। আমাদের মতো ছেলেদের জ্যান্ত সমাধি বানিয়ে ওরা প্রাসাদ তোলে।
ধরা খেলাম এক বৃহস্পতিবার রাতে, টেকনিক্যাল মোড়ের চেকপোস্টে। পকেটে বাইশটা দানা। থানায় যা হলো সেটা লিখতে হাত কাঁপছে। ওসির রুমের পাশের ঘরে নিয়ে দুইজন কনস্টেবল লাঠি দিয়ে পায়ের তালুতে মারলো। মুখে যা আসে তাই বলে গালি দিলো। খানকির পোলা, তোর বাপেরে ডাক। ভোরবেলা বাবা সত্যিই এলেন। শিক্ষক মানুষ। সারাজীবন কলার উঁচু করে হেঁটেছেন। ছেলের হাতে হাতকড়া দেখে উনি দারোগার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমার সব সহ্য হয়, বাবার ওই জোড়হাত সহ্য হয় না।
মাদক আইনে মামলা হলো। তেইশ দিন কেরানীগঞ্জ কারাগারে ছিলাম। জানতে চান জেলখানা কেমন? মেঝেতে ঘুমানো একশো লোকের ওয়ার্ডে সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিসটার নাম কী শুনবেন? বাবা। জ্বি। যে জিনিসের জন্য জেলে ঢুকলাম, জেলের ভেতর সে দ্বিগুণ দামে হাজির। এই দেশে চেইনটা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, ওই তেইশ দিনে আমি বুঝে গেছি। আর বুঝেছি বলেই বলি, ঘৃণা করলে আমাকে কইরেন না। ঘৃণা করেন ওদের, যারা চালানটা ঢোকায়। যারা মাসোহারা খেয়ে চোখ বোজে। যারা স্কুলগেটে বাচ্চাদের হাতে ফ্রি স্যাম্পল ধরায়া দেয়।
বাবা ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে উকিল ধরলেন। জামিন হলো। তারপর আমাকে পাঠানো হলো রিহ্যাবে। সাভারের দিকে একটা প্রাইভেট নিরাময় কেন্দ্র। মাসে পঁচিশ হাজার। ভর্তির দিন মোবাইল কেড়ে নিলো। মাথা ন্যাড়া করলো, বেল্ট খুলে নিলো। ভেতরে ঢুকে বুঝলাম, এইটা হাসপাতাল না, খোঁয়াড়। চল্লিশজন ছেলে দুইটা ঘরে। ভোর পাঁচটায় ঠান্ডা পানিতে গোসল। খাবারে মাছি মরে লেপ্টে থাকে। উইথড্রয়ালের যন্ত্রণায় কেউ চিৎকার করলে ট্রিটমেন্ট একটাই, পিভিসি পাইপ। ওরা এটাকে বলতো মোটিভেশন। যে স্টাফরা মোটিভেশন দিতো, তারা নিজেরাই এক্স অ্যাডিক্ট। ডাক্তার সাইকোলজিস্ট কিছুই না। সাইনবোর্ডে লেখা ছিলো, ভালোবাসাই মাদকমুক্তির পথ। পাইপের বাড়ি পিঠে পড়লে ওই সাইনবোর্ডটা পড়তাম আর হাসতাম। এক রাতে পাশের ওয়ার্ডের একটা ছেলে পালাতে গিয়ে ধরা পড়লো। ওকে যেভাবে মারা হলো, পরদিন অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হয়েছিলো। খবরে মাঝে মাঝে দেখেন না, রিহ্যাবে রোগীর মৃত্যু? বিশ্বাস করেন, ওগুলা দুর্ঘটনা না।
মাসে একদিন ফ্যামিলি ডে ছিলো। মা আসতেন। গ্রিলের এপাশ থেকে আমার ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর কাঁদতেন। যাওয়ার সময় স্টাফদের হাতে পাঁচশো টাকা গুঁজে দিয়ে বলতেন, আমার ছেলেটারে একটু দেইখেন ভাই। ওরা টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে রাতে আমাকে পাইপ দিয়ে পেটাতো। আর সপ্তাহে একদিন হতো কাউন্সেলিং। চল্লিশজনকে এক ঘরে বসিয়ে প্রজেক্টরে একটা মোটিভেশনাল ভিডিও ছেড়ে দেওয়া হতো। এই দেশে মাদকের চিকিৎসার বাজেট এইটুকুই।
ওই খোঁয়াড়ে আমি সেন্টু ভাইকে পেয়েছিলাম। বয়স তেতাল্লিশ। নয় নম্বর বারের মতো রিহ্যাবে। একসময় ব্যাংকে চাকরি করতো। গুলশানে পোস্টিং ছিলো। ইয়াবা তার চাকরি খেয়েছে, ফ্ল্যাট খেয়েছে। সবশেষে বউ আর সইতে না পেরে ছেলেকে নিয়ে চলে গেছে অস্ট্রেলিয়া। বালিশের নিচে ছেলের একটা ছবি রাখতো। পাঁচ বছরের বাচ্চা। এখন সতেরো। সেন্টু ভাই রাতে ছবিটার সাথে কথা বলতো। আমাকে একদিন বললো, বুঝলি রাফি, রিহ্যাব নেশা ছাড়ায় না। নেশাটারে খালি পজ করায়। প্লে বাটনটা থাকে গেটের ঠিক ওপাশে, রাস্তায়। আমি নয়বার প্রমাণ পাইছি।
সেন্টু ভাইয়ের অষ্টমবারের গল্প শুনে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম। সেবার বের হয়ে সে এগারো মাস ক্লিন ছিলো। একটা কুরিয়ার কোম্পানিতে চাকরিও জুটিয়েছিলো। সপ্তাহে একদিন ছেলের সাথে ভিডিও কল হতো। তারপর এক ঈদের সকালে, ফাঁকা ঢাকায়, ফাঁকা মেসে, একলা ঘরে বসে তার মনে হলো, এতগুলা দিন ভালো থাকলাম, আজ একটু সেলিব্রেট করলে কী হয়। এগারো মাসের সাধনা ভাঙতে এগারো মিনিট লাগেনি। সেন্টু ভাই বলতো, নেশা হইলো কুমিরের মতো রে রাফি। সে তোরে তাড়া করবো না। ঘাটে চুপ কইরা বইসা থাকবো। সে জানে, তোর তেষ্টা একদিন পাইবোই।
চার মাস পর বের হলাম। ওজন বাড়লো, চোখের নিচের গর্ত ভরলো। বাসায় ফিরে তিন মাস সত্যিই ক্লিন ছিলাম। তারপর এক বিকেলে ফেসবুক খুলে দেখি অথৈর বিয়ে। গায়ে হলুদের ছবি। হলুদ শাড়িতে ও হাসছে, যে হাসিটা একসময় আমার জন্য বরাদ্দ ছিলো। ক্যাপশনে লেখা, অ্যান্ড সো দ্য নিউ চ্যাপ্টার বিগিনস। ওই রাতেই আমি শাকিল ভাইয়ের নম্বরে কল দিলাম। সেন্টু ভাই ঠিক বলেছিলো। প্লে বাটনটা রাস্তায়ই ছিলো।
এরপর যে কাজটা করলাম, তার কোনো ক্ষমা হয় না। কোনো অজুহাতও হয় না। টাকার জন্য ঘরে হাত দিলাম আবার। মায়ের শেষ সম্বল, নানির দেওয়া বালা জোড়া। মা হাতেনাতে ধরলেন।
চিৎকার করলেন না। শুধু বালাটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, নে বাবা, বেইচা খা। তাও চুরি করিস না। বাবা সেই রাতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আশ্চর্যরকম শান্ত গলায় বললেন, আজ থেকে তুই আমার কাছে মরা। এই বাড়িতে তোর জায়গা নাই। তিন্নি দরজার আড়াল থেকে দেখছিলো। আমার লক্ষ্মী বোনটা। যে ছোটবেলায় আমার প্লেট থেকে ভাত খেতো, সে আর আমার চোখের দিকে তাকায় না।
এখন আমি একটা মেসে থাকি। শাকিল ভাই এখন আর মহল্লায় দাঁড়ায় না। কালো একটা গাড়িতে ঘোরে। কাউন্সিলরের প্রোগ্রামে মালা পরে। তার পুরোনো কাস্টমারদের মধ্যে দুইজন গত বছর মরে গেছে। একজন ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। আরেকজন আদনান। হ্যাঁ, সেই আদনান, যে আমাকে প্রথম ফয়েলটা এগিয়ে দিয়েছিলো। চব্বিশ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে হার্ট বন্ধ হয়ে গেলো। ডাক্তার বললো, মেথ বহুদিন ধরে হার্টটাকে খেয়ে ফেলছিলো। ওর জানাজায় লোক হয়েছিলো এগারোজন। ফেসবুকে তিন দিন শোক। তারপর সবাই ভুলে গেছে। আমাদের জেনারেশন মরলে নিউজফিডে একটা রেস্ট ইন পিস হয়। এই যা!
মা এখনো লুকিয়ে দেখা করেন। মাসে এক দুইবার, বাসার নিচের গলিতে। বাটিতে করে ভাত তরকারি নিয়ে আসেন। কিছু বলেন না, শুধু খাওয়া দেখেন। পৃথিবীর সবাই নেশাখোরকে ত্যাগ করতে পারে। মা পারে না। মায়েদের ওই ক্ষমতাটাই নাই।
আজ আমার ক্লিন থাকার চার মাস তেরো দিন চলছে। রিকভারি মিটিংয়ে যাই। দিন গুনি। ডায়েরি লিখি। ডাক্তার বলছে সম্ভব, অনেকেই ফিরে আসে। আমি বিশ্বাস করার চেষ্টা করি। কিন্তু আপনাদের একটা সত্যি কথা বলি, যেটা কোনো ডাক্তারের সামনে বলিনি।
আমার পকেটে একটা গোলাপি ট্যাবলেট আছে। বহুদিন ধরে। খাইনি, ছুঁইওনি। শুধু রাখি। রাতে যখন হাড়ের ভেতরটা চিনচিন করে, হাত দিয়ে পকেটের ওপর থেকে ওকে অনুভব করি। কী করবো বলেন। মানুষের তো বাবার কাছেই ফিরতে ইচ্ছা করে। আমার এক বাবা আমাকে মৃত ঘোষণা করেছে। আরেক বাবা প্রতি রাতে ফিসফিস করে ডাকে।
আপনারা দোয়া কইরেন, আমি যেন প্রথমজনের কাছে ফিরতে পারি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন