সার্ধ-শত-বর্ষে;
বঙ্গ মজিলো মমতা-মায়ায়,
"অভূত-পূর্ব" হর্ষে।
পরম শ্রদ্ধা - শহীদ-উৎসবে,
সাংস্কৃতিক প্লাবন,
"হ্যাপি বাড্ডে টু কবিগুরু",
কামিং বাইশে শ্রাবন!
বল্লে নাকি হুল দিবস। সেরেচে, সে আবার কি গো? মেরে মুক পরোটা করে দেবে বল্লে, শুনিচি। কিলিয়ে কাঁটাল পাকাবে, সে ও নাহয় দেকিচি। তাই বলে ভাই হুল ফোঁটাবে? তুমি কি ভাই মৌমাচি? দেকে তো মানুষ বলেই ঠাওর হচ্চে। বেশ তেল চুকচুকে, পাকা সোনা বরন। একখানা নেয়াপাতি ইয়ে ও আচে দেকচি। গায়ে কি একটা মেকেচো বলোতো? পার্ক অ্যাভেনিউ কি? না কি কি ওই যে যেটা মাকলে কয়েকটা ধিঙ্গি মতো মেয়ে দৌড়ে আসে, সেইটে? না না, হুল টুল বড্ডো খারাপ কতা। সে ছিলো মেজোতরফের লাটু কত্তা। খেঁটে একগাছা লাঠি নিয়ে কত্ত পিটিয়েচে এককালে। গনা গুন্ডাকে তো সেবার হেদো পার করে দিয়ে এলো ওই লাঠি পেটা করে। তা সে লাটু কত্তাও হুল টুল নিয়ে কাজ কারবার করেনিকো।
কি বল্লে? সাঁওতালদের হুল? ও বাবা। ওদের হুল আচে নাকি? অ সেই হুল নেই বলচো? ওরা খেপে গেচিলো গোরাদের ওপর? তা সে তো আমাদের বটঠাকুদ্দাও গোরাদের ওপর খেপেগেছিলো। খেপে গিয়ে স্বদেশী হয়ে গেল। দেশের স্বাধীনতা এনেচে। এক গোরা সায়েব বটঠাকুদ্দা কে - ইউ ইস্টুপিড বলেছিলো। সে কি রাগ। রেগে মেগে ঠাকুদ্দা চরকা কিনে আনলো স্বদেশী মেলা থেকে। সুতো কাটলো, তাই দিয়ে গামচা বুনেও ফেল্লো। সেই গামচা একটু ফাঁকফাঁক বলে অনেক কিচু দেকা যেত, কিন্তু কে শুনবে সে কতা। ওই গামচা পরেই বটঠাকুদ্দা রোজ সক্কাল বেলা পায়...।
পিটিয়েচিলো? গোরাদের? ওই সাঁওতালরা? ও বাবা। পুলিস ধরবে তো? ফাটকে দেবে। আর সে কি যে সে ফাটক? গোরাদের জেলে কেউ ঢুকলে আর বেরোয়? ভয় ডর নেই গা? তা কেন গেল এমন খেপে? ইস্টুপিড বলেচিলো নাকি? কেনো মারামারি করে বাপু বুঝিনা। চরকা কেটেও তো স্বদেশী হয়। সেটা করলেই হতো। আর গোরাদের খেপানো কি সোজা কতা? গোরার মার সইতে পারবে? পারেনি? মরে গেচিল? অনেক লোক? তা তো যাবেই। যেমন কম্ম তেমনি ফল। বেশ হয়েচে। ও, হয়নি? ওই মারামারিটাই হুল? ওইটার দিবস? তা ভালো। চাঁদা চাই? বেশি দিতে পারবোনাকো। এই সেদিন দিয়েচি। ভোটে জিতে ফিস্টি কল্লে ছেলে গুলো। বল্লে কাকু ২ কিলো রেওয়াজি মাল আর এক খাম্বা বিলিতির দাম ফেলে দিন, আর আসবোনা। তা দিলাম। আবার চাই? বেশি দিতে পারবোনাকো বলে রাকলুম হ্যাঁ।
অ, চাঁদা চাই না? তা চাই টা কি? তুমি, মানে আপনি সরকারি আপিসার? ওরে বাবা। বলেন কি স্যার ? বসুন বসুন। কি খাবেন বলুন। একটু চা বলি? খাবেন না? তাহলে একটু ঠান্ডা? আর চাচা থেকে দু খানা কাটলেট আনাই? ওরে... কে আচিস? না না স্যার, না বল্লে শুনচি না। এ বাড়ি থেকে শুদু মুকে কেউ কখনো যায়নি। আগে একটু ঠান্ডা হোন। ওরে, ও জহর, পাকা টা জোরে করে দে না বাবা। দেকচিস নে, স্যারের মুক খানা লাল হয়ে গেচে গরমে। এ পাকা টা স্যার আমার জ্যাটামশায় কিনেচিলেন অকশনে। খাঁটি বিলিতি। কেবল একটু অয়েলিং করানো হয়নি অনেক দিন। আপনি ভালো করে উঠে বসুন স্যার। পা তুলে দিন।
ও কে ডাকবো? জহর কে? ও তো আমার চাকর। বহুকাল আচে এবাড়ি। ওর বাপ দাদারাও ছিলো। বাড়ি? তা থাকে তো এখানেই। মানে, দেশ আচে একটা। ওই পুরুলিয়ার ওদিকে কোতায় যেন। কিচু পবলেম নাকি স্যার? আমি ছাপোষা গেরস্ত মানুষ। ধনেপ্রানে মারা যাবো স্যার। না মানে, ওর নাম ই তো জহর। ডহর? না না, ডহর না স্যার। পদবি? ওর পদবি কি আর মনে রেকিচি আমি স্যার? ও মামনি, দেখ না মা, জহরের পদবি কি? স্যার জিজ্ঞেস করচেন। কি বললি? দাস? জহর দাস? ও, তা হবে। ডহর? না স্যার ডহর বলে তো কাউকে চিনি না। শুনিনি। ওই হুল এর একটা সাঁওতাল নেতা? একটা না? তিনটে নেতা? সিদো, কানহো আর ডহর? তিনজনেই শহিদ হয়েচিলো? বলেন কি স্যার? সে তো আমাদের বিনয় বাদল দিনেশের মতো ব্যাপার। ভারি সাহস তো। ও আপনি সেই ডহর বাবুর পরিবারের লোকজন কে খুঁজছেন? তারা কি স্যার কিচু পাবে সরকারের থেকে? আমাদের জহরের পদবি টা দাস কিনা একটু দেকে বলবো স্যার। বলা তো জায়না, হয়তো ও ই ডহর। যদি হয় , একটু মনে রাকবেন স্যার। আমার নামটা, ওই যে ওকেনে দরজায় লেকা। খাঁটি পেতলের নেমপ্লেট স্যার।
এখন তো ছোট পরিবার স্যার। আমার গিন্নি আচেন, আর এই টি আমার কন্যা। নাম বলো মা। কি বললে মামনি? ডহর মানে রাস্তা? না না, শুনলে না স্যার কি বলচেন? ডহর একজন মহাবীর শহীদ। হুল করেচেন। ওই যে শোন, স্যার কি বলচেন। আমাদের মুক্কুমন্ত্রী ও বলেচেন। ডহরের কতা। তাই তো আমাদের স্যারের মতো সরকারি আপিসার রা ডহর বাবুর পরিবার কে খুঁজচেন। না না স্যার। ওর কতায় কান দেবেন না। বাচ্চা মেয়ে, কি বলতে কি বলেচে, তার ঠিক নেই। বলে কিনা, সিদো কানহোর নামে রাস্তা বলে ওটার নাম সিদো কানহো ডহর। ডহর মানে নাকি রাস্তা। আজকাল ইস্কুলে কিচ্চু সেকায় না স্যার। আমাদের শিক্কা-দিক্কা শেষ করে দিয়ে গেচে সব। আপনি ভাববেন না স্যার।ডহর বাবুর কোনো খবর পেলেই আপনাকে দিয়ে আসবো আমি নিজে গিয়ে। শুদু যদি কোন পুরস্কারের ব্যাপার থাকে, একটু দেকবেন স্যার।
ঢাকের বাদ্যি বাজতে এখনো অনেক দেরি। সবে জষ্টি মাসের শেষ। বঙ্গে পরিবর্তনের বায়ু বেশ দ্রুতগতিতেই বইছেন (এবং চারমূর্তির সেই ভাল্লুকের মতন টপাটপ মানুষ ও গিলছেন)। বাংলায় ভোটপর্ব চুকতে, আমরা আইপিএল নিয়ে কয়েকদিন লাফালাফি করলাম। কিন্তু কোলকাতার দল ইয়ের মতো পরপর দু খানা খেলায় হেরে প্রতিযোগিতার বাইরে চলে গেল। কয়েক দিন হাসপাতাল সুপার এর বরখাস্ত, অস্ত্র উদ্ধার, রেজ্জাক মোল্লার গোলা বর্ষন, রামদেব নিয়ে হইচই করলাম। কিন্তু কোনটাই ঠিক জমলো না। অগত্যা উত্তেজনায় ইতি। ওদিকে দার্জিলিং সমস্যার ও সমাধান হয়ে গেল একটা সই দিয়ে। মাওবাদীরাও শুনছি নাকি দন্ডকারন্যে ফিরে গেছে। কিষেনজির টিআরপি পড়তির দিকে।
তেমন জমকালো ব্রেকিং নিউজ না থাকলে যা হয়, লোকে বাধ্য হয়ে খবরের কাগজে প্রথম পাতায় "ভারতে সর্বাধিক প্রচারিত প্রথম শ্রেনীর বাংলা দৈনিক" থেকে শেষ "প্রফুল্ল সরকার স্ট্রীট থেকে অভিক কুমার সরকার দ্বারা প্রকাশিত" অবধি পড়ে। পড়তে গিয়ে দেখি, ব্রেকিং নিউজ ছাড়াও দেশে অনেক কিছু ঘটে। বিভিন্ন রাজ্যে চাষি রা কেমন মারমুখি হয়ে উঠেছে। উত্তর প্রদেশে তো মার মার – কাট কাট হয়ে গেল, মায় আমাদের বীরভূমে পর্যন্ত দেখলাম চাষিরা জমির দখল নিয়েছে। হ্যাঁ, এই পরিবর্তনের হাওয়াতেও। তা এমন করলে তো মহা মুশকিল। কাগজ পড়তে গিয়ে চোখে পড়লো যে সেজ বা এস ই জেড (মার্কিনি এস ই জি) থেকে এবারে আর এক ধাপ এগিয়ে এন আই এম জেড তৈরি করা হবে। সেটা কি?
একটা মৌচাক বলতে পারেন। অনেক গুলো এস ই জেড একটা ঘেরাটোপের মধ্যে গড়ে তোলা হবে। সেখানে থাকবে উৎপাদনের জায়গা, শ্রমিক আবাসন, স্কুল, হাসপাতাল, রাস্তা ঘাট বাজার দোকান সমেত একখানা গোটা শহর। শুধু তফাত হলো, শহরের মতো থাকবে না কোন পৌরসভা। সবকিছুই থাকবে সেখানে যে সব কর্পোরেট সংস্থা থাকবেন, তাঁদের হাতে। তাঁরাই পরিষেবা দেবেন, রাস্তা ঘাট তৈরি করে দেবেন, স্কুল কলেজ বানিয়ে দেবেন। পড়ে বেশ লাগলো। নো পৌরসভা, নো ঘুঘুর বাসা, নো দুর্নীতি। কিছু লাগলে কর্পোরেট গুলো তৈরি করে দেবে। ঠিক সেই রোবোকপ ছবির মতো। রোবোকপ দেখেছেন তো? একটা বিরাট বড় কোম্পানি, ডেট্রয়েট শহর কে কিনে নিলো। পরিকল্পনা হলো, পুরনো শহরটা ভেঙ্গেচুরে নতুন আধুনিক একটা শহর তৈরি করবে তারা। নাম হবে ডেল্টা সিটি। সেই শহরের পুরো পরিচালন ব্যবস্থাই তাদের হাতে। এমন কি পুলিশ পর্যন্ত। লোকজনের বাড়ি ভেঙেচুরে তারা উদবাস্তু দের ব্যারাক বাড়িতে ঢোকালো। অনেক টা নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মত ব্যাবস্থা পত্র সেখানে। লোকে প্রতিবাদ করতে গেলো, খেলো গুলি। অবশ্য শেষে রোবোকপ (রোবট পুলিস, একটা মানবিক হৃদয় সমেত, সে ই এই গল্পের সুপার হিরো ) সমেত পুলিশ বাহিনি বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে কর্পোরেট এর কত্তা দের পিটিয়ে তক্তা করে দিলো। হ্যাপি এনড।
এক কর্পোরেট কত্তা বলেছেন, টেরিটোরিয়াল আর্মি গুলোকেও কর্পোরেটের হাতে তুলে দিতে। রনবীর সেনা, সানলাইট সেনা রা এবারে কর্পোরেট পালিশ পাবে, আধুনিক অস্ত্র শস্ত্র ও সরকারি অনুমোদন সমেত। এস ই জেড এর ভেতরে এমনিতেই সরকারি শ্রম আইন চলেনা। এন আই এম জেডের ভেতরেও চলবে এমন কোনো লক্ষন তো দেখছি না। সেখানে, কর্পোরেট কত্তারা যা বলবেন সেটাই আইন। শুনতে হবে এনাদের কথা। না শুনলে উড়ে পুলিস এসে একুশ দফা হাঁচিয়ে মারতে পারে। তবে সব পুলিস তো উড়ে নয়। তারা কি ভাবে মারবে তার নিশ্চয়তা নেই। গোটা দেশে টুকরো টুকরো এন আই এম জেড। খন্ড বিখন্ড ভারতবর্ষে কর্পোরেট হাউসের নিজস্ব খাশতালুক। সেখানে আইন চলেনা দেশের। মানুষের হাতে ক্ষমতা নেই সেখানে। মানুষের কন্ঠস্বর নেই। আছে শুধু কর্পোরেটের অঙুলিহেলন, আর আছে লক্ষ লক্ষ মূক সেবাদাস। দেশের মানুষ লড়াই করে নিজের হাতে ক্ষমতা এনেছে। পঞ্চায়েত হয়েছে, নগরপালিকা এসেছে। আজ সেই সব কিছুকে বেচে দেওয়া হচ্ছে বানিয়ার হাতে। আবার সেই বনিকের মানদন্ড। সাধু সাবধান।
দেশকে টুকরো টুকরো করে বেচে দেওয়ার পরিকল্পনা। সংসদে বিল পাশ করিয়ে, আরো বেশি করে দেশের দরজা বানিয়াদের কাছে খুলে দিতে গেলে এখনো কিছু বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। সংখ্যায় খুব কমে গেলেও লাল ঝান্ডাধারীরা এখনো প্রানপনে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। বাংলায় তো তাদের কাবু করাই গেছে দিদিমনি কে দিয়ে। কিন্তু তার পরেও নয়ডার প্রতিরোধ হচ্ছে। বীরভুমে চাষীরা বেয়াড়া হয়ে উঠছে। তাই, টুকরো করে বেচো। মানুষ কে ভাগ করে দাও। একদল পরিনত হোক কর্পোরেটের ঘেরাটোপের মধ্যে থাকা সেবাদাসে। যদি বেয়াড়াপনা করে, তার জন্য কর্পোরেট সানলাইট সেনারা তো রয়েইছে। আর রোবোকপ? সিনেমায় সে ছিলো। আর ছিলো তার বিবেক। বাস্তবে কি সে থাকবে? আর অন্য দল পড়ে থাক মাঠে ময়দানে। বেওয়ারিশের মত। বেওয়ারিশ, কারন তারা নিজের অর্জিত অধিকার কে রক্ষা করার , সেই জন্য লড়াইয়ের উত্তরাধিকার কে বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি। তাই বেওয়ারিশ। হয়ত বেওয়ারিশ কুকুর ধরা গাড়ির মত একদিন বেওয়ারিশ মানুষ ধরা গাড়ি ও আসবে। যেমন নাৎসিরা আনতো। তবে এখনো হয়ত অল্প সময় বাকি আছে। প্রতিবাদ নয়, প্রতিরোধের সময় এটা। প্রতিরোধ করুন এদের। না হলে একদিন ওই মূক সেবাদাস অথবা বেওয়ারিশ হবার জন্য তৈরি হোন।
ঘটনা ১ : বাঁকুড়া সন্মিলনি মেডিকেল কলেজের মর্গ-এর উল্টো দিকের চা'য়ের দোকান। বহুদিন পর হঠাৎ দেখা এক কমরেড-এর সাথে। চিৎকার করে ডাকি- আরে কমরেড, কি খবর? এখানে? সেই চেনা হাসি ছড়িয়ে দিয়ে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। মুখটা একটু শুকনো। মনটা খচখচ করে উঠল। তাহলে কি কোন আত্মীয়-স্বজন…
অদ্ভুত ক্ষমতা এদের অন্যের মনের কথা বোঝার। হাতটা চেপে ধরে বললেন, বাড়িতে সব ভালই। পার্টী থেকে দায়িত্ব দিয়েছে মর্গ সামলানোর। সারেঙ্গা বা বাঁকুড়া জেলা লাগোয়া অঞ্চলে প্রায় রোজই কমরেডরা খুন হচ্ছেন। 'বডি'গুলো এখানেই আসছে। আমরা সাহায্য না করলে গ্রামের মানুষ আরও বিপদে পরবে। তাই…
শহুরে মধ্যবিত্ত - অবাক চোখে আকাশটাকে আঁকড়ে ধরে পালাতে চায়। পারেনা। আবার সামাল দেয় সেই কমরেড। পকেট থেকে একটা কালো সুতোর বিড়ি বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ছাড়ো ওসব। মুহূর্তে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলি, এখনও কতো এসেছে? উনি বললেন- প্রথম প্রথম হিসেব থাকতো। এখন আর থাকেনা। তবে জান কমরেড, একটা ঘটনা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছিনা। রাতে শুতে গেলেই মনে পড়ে। ঘুমাতে পারিনা। সেপ্টেম্বর- এর ১০ তারিখ। সারেঙ্গাতে খুন হন ৭১ বছরের প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক কৃষ্ণ কুণ্ডু। পরের পরের দিন, মানে ১২ তারিখ ওনার ছেলে এসেছে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ছেলেটা আমার পাশে। খেয়াল করিনি, কখন আমার কাঁধে মাথাটা রেখেছে। 'বডিটা' বের করা হচ্ছে। আমি এগিয়ে যাচ্ছি লাল পতাকাটা নিয়ে। ঢেকে দিতে হবে। হঠাৎ ছেলেটা বলে উঠল- 'কাকু, বাবার মুখটা একটু পরিষ্কার করে দেবে? এত রক্ত, ভাল করে দেখাই যাচ্ছে না।' বিশ্বাস করো কমরেড, ঘুমোতে গেলেই কথাটা কানে বাজে। মনে হয় ছুটে যাই জঙ্গল মহলে। দেখি একবার ওদের কত শক্তি। পার্টী হাত বেঁধে রেখেছে, আমাদের কিচ্ছু করার নেই।
ঘটনা-২ : ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। নির্বাচনের আগে বামফ্রন্টের শেষ সমাবেশ। একটু আগে লালগড়ের বিনপুর জোনাল কমিটির মিছিল এসে ঢুকেছে। উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সহযোদ্ধাদের স্বাগত জানিয়েছে মাঠ। ওঁরা বসলেন মাঠের এক কোণে। মঞ্চে বুদ্ধদেব ভাষণ দিচ্ছেন। আমি থাকতে না পেরে চলে গেলাম ওদের কাছে। বললাম- 'লাল সেলাম কমরেড, দারুণ লড়ছেন আপনারা'। প্রত্যুত্তরে হাতের মুঠি শক্ত করে লাল সেলাম জানালেন। কিন্তু মুখে কোন কথা নেই। আবার অবাক হই। ভাবি তাহলে কি আমার পোশাক বাধা হ'য়ে দাঁড়াল? আমাকে কি কমরেড ভাবতে পারছেন না? বসে পরি ওদের পাশেই।
বক্তৃতা শেষ করলেন বুদ্ধদেব। পাশের মানুষগুলো উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলেন। বছর পঁচিশের এক যুবক শূন্যে হাতটাকে ছুঁড়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন- 'ই ই ই ইনকিলাব', চারপাশ কাঁপিয়ে আওয়াজ উঠলো 'জি ই ই ই ন্দা বা আ আ দ'।
এক মাঝবয়সী কমরেড এবার তাকালেন আমার দিকে। জানতে চাইলেন আমি সাংবাদিক কিনা। বললাম না না তেমন কিছু না। এবার তাকালেন সোজা। বললেন, লেখেন নিশ্চয়ই? কিছু জানতে চান? আমতা আমতা করে বললাম- 'ইয়ে মানে পেপার পড়েতো সব ঠিকমতো জানা যায় না। আপনাদের মুখেই তাই শুনতে এসেছি আপনাদের অভিজ্ঞতার কথা'।
-আপনারা শহরের লোক, পারবেন শুনতে ওসব? আমার বাড়ী শালবনী। ২০০৯ সালের জুন মাসে, ১০ জন কমরেড কে ধরে নিয়ে গেছিল ওরা। দীনবন্ধু সরেন, প্রবীর মাহাত, মলয় মাহাত, সঞ্জয় মাহাত, কেশবচন্দ্র মানা, ধীরজ মানা, মোহন সিং, দেবব্রত সরেন, অসিত সামন্ত আর নাড়ু সামন্ত। হাত-পা বেঁধে রোদের মধ্যে ফেলে রেখেছিল সারাদিন। প্রচন্ড তেষ্টায় জল চাইলে মুখে পেচ্ছাব করে দিয়েছিল মাওবাদীর দল। তারপর একটা ছোটো ঘরে লঙ্কার বস্তায় আগুন ধরিয়ে সেখানে সবাইকে ঢুকিয়ে দম বন্ধ করে মেরে লাশগুলো গায়েব করে দিয়েছে। শালবনী হাইস্কুলের মাষ্টার মশাই, একমাত্র ছেলে মলয় মাহাত-র ছবি নিয়ে আজো জনে জনে জিজ্ঞেস করে তার ছেলের কথা। মা-বাবা দুজনেই আজ সন্তান শোকে পাগল।
বৈতার স্নেহাশীষ দাস। ওর বৌটার সেদিন 'সাধ'। ভজালি দিয়ে গলাটা কেটে আনন্দে চীৎকার করেছিল ওরা। পাগল বৌটার একমাস বাদে একটা মেয়ে হয়েছিল।
কানাই দিগনায়েক। বৌ-ভাতের দিন ঘর থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে গাছে বেঁধে গুলি করে মারে। সদ্য বিয়ে আর একই সাথে বিধবা হওয়া বৌটা এখন শুধু তাকিয়ে থাকে। কথা বলেনা।
আকাশ বেজ আর তাপস মণ্ডল। গুঁড়ি গ্রামে বাড়ি। মকর সংক্রান্তির নতুন জামা কাপড় কিনতে গেছিল ছেলে-মেয়েদের জন্য বিনপুর হাটে। গুলি করে মেরে দেয় ওরা।
বেলাটিকরি অঞ্চলের জামদা হাইস্কুলের শিক্ষক কার্ত্তিক মাহাত। পড়াচ্ছিল। ছাত্রদের সামনেই গুলি করে মারে। দুজন ছাত্র তারপর থেকে ভয়ে বোবা হয়ে যায়।
আমার ভেতরটা গুলিয়ে ওঠে। থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করি, এর পরেও লড়ছেন, ভয় করেনা? অদ্ভুত হাসি হেসে ওঠেন উনি। হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করেন- 'একটু আগে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কি বলল শুনলেন? এভাবে আমাদের শেষ করা যায় না। জয় আমাদের হবেই'।
গোটা দলটা উঠে দাঁড়ায়। এবার ওদের ফিরতে হবে। মরার জন্য, নাকি অনেককে বাঁচাতে? উত্তরটা অজানাই থেকে যায়।
ঘটনা ৩ : সন্ধ্যে ৭টার প্রেস ক্লাব। কোণের TV তে প্রাক্তন নকশাল নেতা কতিপয় বুদ্ধিজীবী পরিবেষ্টিত হ'য়ে 'রেজিমেন্টেড পার্টী-র' বাপান্ত করছেন। একটু আগেই বামফ্রন্টের আসন্ন পরাজয়-এর সম্ভাব্য কারণ বিশ্লেষন করে আসা ক্লান্ত সাংবাদিক কেরাম-এর বোর্ড থেকে ঘার ঘুরিয়ে এক ঝলক সেটা দেখে নিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন 'শালা রেড-বুকটাও পড়েনি। শংকর দুটো লার্জ বিপি আর সোডা দিস্'।।
************
সাত্রে'র নাটকটা মনে পড়ে? কিভাবে একজন সাংবাদিক একটু একটু করে Pathological liar-এ পরিণত হয়? যদিও তারা জানে, তারা যা লিখছে তা আসলে মিথ্যে। একসময় তারাই সেটাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
এই মুহুর্তে আমরাই বা কম যাই কিসে? আপাদমস্তক মিথ্যেয় মোড়া অর্ধশিক্ষিত এক ছিটেল মহিলার পেছনে মনে মনে একবারো কি দৌড়াইনি? একবারও কি মনে হয়নি, জঙ্গলে রক্ত ঝরছে কারন অনুন্নয়ন? যেন শ'খানেক গরিব মানুষ মরলেই ওখানে উন্নয়নের বন্যা বয়ে যাবে? একবারও কি মনে হয়নি, যাক না একবার বামফ্রন্ট সরকারটা বছর খানেকের জন্য? সেই মুহুর্তে মনে হয়েছিল কি, গোটা রাজ্যটাই জঙ্গলমহল বানিয়ে দিতে পারে ওরা? সপাটে নিজের গালে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে হয় কি তার জন্য?
এখনও সময় আছে। অথবা এই তো সময়। লাল পতাকাটাকে আরো উঁচুতে তুলে ধরুন। এ লড়াই জিততেই হবে।
বামফ্রন্ট সরকার আর পশ্চিমবঙ্গে মা-বোনেরা
ক্ষমতায়নে অগ্রাধিকার
l রাজনৈতিক ক্ষমতায়নই মানুষকে সমাজ পরিচালন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেয়। ভারতের মধ্যে পঞ্চায়েতে ও পৌরসভায় পশ্চিমবঙ্গের মহিলারাই এই ক্ষমতা প্রথম পেয়েছেন। পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলিতে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ কেন্দ্রীয় সরকার করার পরে বামফ্রন্ট সরকার এই রাজ্যে সেটি সর্বপ্রথম প্রয়োগ করে।
l ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতে সব আসন মিলিয়ে হিসেব করলে ৩৮.৪৮% সদস্যই মহিলা। অর্থাৎ, সংরক্ষিত আসনের চেয়ে অনেক বেশি।
l রাজ্যের ১৮টি জেলার মধ্যে ৯টি জেলায় সভাধিপতি মহিলা।
l গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে ৪১.৭৩% প্রধান মহিলা।
l পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পদে ৩৯.৬৯% মহিলা।
l সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েতের সব স্তরেই মহিলাদের জন্য ৫০% আসন এবং পদ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে।
l পৌরসভাতেও মহিলাদের জন্য ৫০% সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে নিয়েছে রাজ্য সরকার।
l এই রাজ্যের বিধানসভায় মহিলাদের সংখ্যা ৩৭ জন। শতাংশের হারে ১২ শতাংশের বেশি।
মহিলা কমিশন
l ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কমিশন।
শিক্ষায় অগ্রাধিকার
l মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীদের সংখ্যা এখন বেশি। ২০১০ সালে ৪ লক্ষ ৬৫ হাজার ছিলো ছাত্র। ছাত্রীর সংখ্যা ছিলো ৪ লক্ষ ৮৩ হাজার ১৫৮ জন। চলতি বছরেও রাজ্যের ১০লক্ষ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছাত্রী।
l উচ্চমাধ্যমিকে ২০১০-র পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের ৪৪.৫৬% ছিলেন ছাত্রী।
l এম এস কে-গুলিতে পড়ুয়াদের ৫৪.২৭% ছাত্রী এবং এস এস কে-র পড়ুয়াদের ৫০.১৬% ছাত্রী।
l মাদ্রাসার পড়ুয়াদের ৬৫% ছাত্রী।
l উচ্চশিক্ষায় স্নাতকস্তরে (উচ্চশিক্ষা দপ্তর অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হিসেব) ছাত্রীর সংখ্যা শতকরা ৪০.১৭ ভাগ। স্নাতকোত্তর স্তরে শতকরা ৪৫.২২ ভাগ।
l অনগ্রসর সম্প্রদায় কল্যাণ বিভাগ কর্তৃক পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত তফসিলী জাতি ও আদিবাসী ছাত্রীদের মেধা বৃত্তি প্রদান।
চার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য
l প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, সিদো-কানু-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যপদে এখন মহিলারাই।
বিদ্যালয় শিক্ষিকা
l ২০০৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশন নিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে ৪১.১০ শতাংশই শিক্ষিকা।
সংখ্যালঘু ছাত্রীদের সাহায্যে
l সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক মাদ্রাসার পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণীর সকল ছাত্রীদের পোশাক বিতরণ, অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রীদের বছরে ১২০০ টাকা উৎসাহভাতা প্রদান, ছাত্রছাত্রীদের বই কেনার জন্য বছরে ২৫০ টাকা অর্থপ্রদান।
l স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে গরিব সংখ্যালঘু পরিবারের ছাত্রীদের উৎসাহ ভাতা দেওয়া শুরু করেছে রাজ্য সরকার এ বছরই। ৪০% নম্বর পেলেই এই ভাতা পাওয়া যাবে। স্নাতকস্তরের ছাত্রীরা পান বছরে ৯০০০ টাকা। স্নাতকোত্তর স্তরে বছরে ১৪৪০০ টাকা।
l সংখ্যালঘু ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে একগুচ্ছ বৃত্তি। প্রাক্ মাধ্যমিক (উপকৃত হবেন ৫ লক্ষ), মাধ্যমিকোত্তর (উপকৃত হবেন ৯০ হাজার), মেধাসঙ্গতি বৃত্তি (উপকৃত হবেন ৪ হাজার), বিশেষ মেধা বৃত্তি, হাজী মহঃ মহসীন বৃত্তি (উপকৃত হবেন ১০ হাজার) এছাড়া আছে শিক্ষাঋণ। এই বৃত্তি প্রাপকদের শতকরা ৩০জনই ছাত্রী। এছাড়া দুঃস্থ ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের ছেলেমেয়েদের বৃত্তি দেওয়া হয়।
l মুসলিম ছাত্রীদের জন্য ১১টি হস্টেল রয়েছে। আরও ১১টি ছাত্রী হস্টেলের কাজ চলছে। পার্ক সার্কাসের দিলখুশা স্ট্রিটে কর্মরতা মহিলাদের জন্য একটি হস্টেল তৈরি করা হচ্ছে।
l আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ভোকেশনাল স্টাডিজ একগুচ্ছ বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের কোর্স চালু করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি কোর্স মূলত সংখ্যালঘু মহিলাদের জন্যই। যেমন— জরির কাজ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রভৃতি। প্রশিক্ষণের জন্য যে টাকা লাগে তার ৯০% দেয় রাজ্য সরকার। মাত্র ১০% টাকা দেয় প্রশিক্ষণ প্রার্থীরা। ১১০৮ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সংখ্যালঘু মহিলা ক্ষমতায়ন কর্মসূচী
l সংখ্যালঘু মহিলা ক্ষমতায়ন কর্মসূচী সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের অসামান্য উদ্যোগ। স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে সাহায্য করা ছাড়াও নানা ধরনের কর্মসূচী রূপায়ণ করা হচ্ছে এই প্রকল্পের আওতায়।
l পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আর কোথাও সংখ্যালঘু মহিলাদের স্বনির্ভরগোষ্ঠীকে ৫০% ভরতুকি দেওয়া হয় না।
l বয়স ২০-৪৫ বছরের মধ্যে হলে ব্যক্তিগতভাবে ও অন্ততপক্ষে ছ'জন সংখ্যালঘু মহিলাকে নিয়ে গঠিত স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে ঋণ দেওয়া হয়। সুদ বার্ষিক মাত্র ৩% হারে।
l পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের মাধ্যমের বিভিন্ন ধরনের ঋণদান প্রকল্পে এযাবৎ ৫১,৩৮৩ জন মহিলাকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে ৯৯ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে।
l সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত দরিদ্র মহিলাদের বিশেষত বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত ও বিপন্ন অবস্থায় যাঁরা রয়েছেন তাঁদের জন্য আবাসন, প্রশিক্ষণ, ছেলেমেয়েদের বৃত্তি প্রদানের কাজ শুরু হচ্ছে। ২০১০-১১ সালে এ জন্য ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া বিধবা ও বার্ধক্য ভাতা দেওয়া হয়।
l রোকেয়া গ্যাস ওভেন প্রকল্প : সংখ্যালঘু মহিলাদের পরিবেশ দূষণ থেকে রক্ষা এবং স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধার দিকে নজর দিতে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের মাধ্যমে প্রায় ৪ হাজার মহিলাকে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা প্রদান করে গ্যাস উনুন দেবার ব্যবস্থা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষায় অগ্রাধিকার
l বালিকা সমৃদ্ধি যোজনায় কন্যা সন্তানের পরিচর্যায় বিশেষ নজর, দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনায় অনুদানের ব্যবস্থা এবং এককালীন ৫০০ টাকা সহায়তা যা ব্যাঙ্কে জমা রাখা হয়।
l পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন বিভাগ, সমাজকল্যাণ বিভাগ, অনগ্রসর সম্প্রদায় কল্যাণ বিভাগ, মৎস্য বিভাগ, কৃষি বিভাগ, ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোগ এবং বস্ত্রদপ্তর কর্তৃক বার্ধক্যভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে মহলিাদের প্রতি বিশেষ নজর।
l রাজ্যের সমাজকল্যাণ বিভাগ বিধবা ভাতা দেয় দীর্ঘদিন যাবৎ। দুঃস্থ বিধবাদের জন্য এই ভাতা চলতি আর্থিকবর্ষ থেকে মাথাপিছু মাসে ১০০০ টাকা করা হয়েছে।
l জাতীয় বিধবা পেনশন প্রকল্প : ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় বিধবা ভাতা প্রকল্প রাজ্যে দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী ৪০-৬৪ বছর বয়সী বিধবা মহিলাদের জন্য। মাসে ৪০০ (চারশত) টাকা পেনশন পাওয়া যায়। ২০০ টাকা দেয় রাজ্য সরকার, বাকি ২০০ টাকা কেন্দ্রীয় সরকার।
l ইন্দিরা আবাস যোজনায় গৃহনির্মাণে পুরুষ ও মহিলাদের যৌথ মালিকানা প্রদান।
জমির পাট্টা
l রাজ্যে ভূমিসংস্কারের মারফত বণ্টিত জমির প্রায় ৩০% পেয়েছেন মহিলারাই।
l নারী পুরুষ যৌথ পাট্টা ৬ লক্ষ ১৪ হাজারের বেশি।
l শুধুমাত্র মহিলাদের পাট্টা ১ লক্ষ ৬১হাজারেরও বেশি।
কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার
l একশো দিনের কাজে মহিলা অংশগ্রহণ ২০০৮-০৯ সালে ছিলো ২৬.৫%। ২০০৯-১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৪২%।
l ১২লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ১ কোটি ২০ লক্ষ সদস্যের ৯০ শতাংশই মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে ব্যাঙ্কঋণ শোধে ভরতুকি দিচ্ছে রাজ্য।
l বাংলা স্বনির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্পে ১৫.৭৮% উদ্যোগপতি মহিলা।
l প্রধানমন্ত্রী রোজগার যোজনা প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গে উদ্যোগীদের ২৫% মহিলা (২০০৯-১০ অর্থবর্ষ)। প্রকল্প রূপায়ণ করে ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোগ এবং বস্ত্রদপ্তর।
l স্বর্ণজয়ন্তী শহরী রোজগার যোজনায় এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার ক্ষুদ্র সঞ্চয় ঋণদান গোষ্ঠী তৈরি করা হয়েছে। এই প্রকল্পে উপকৃত শহর এলাকার প্রায় ৪ লক্ষ ৬৫ হাজার বি পি এল পরিবারভুক্ত। ৮১,৭০৪ জন কারিগরি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
l আদিবাসী মহিলা স্বশক্তিকরণ যোজনা: অনগ্রসর শ্রেণী বিভাগের অধীন পশ্চিমবঙ্গ তফসিলী ও আদিবাসী উন্নয়ন বিত্ত নিগম পরিচালিত এই প্রকল্পে আদিবাসী মহিলারা সর্বাধিক ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতে পারেন। সুদের শতকরা হার ৩ টাকা। চলতি আর্থিকবর্ষে ২৫০০ জনকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
l পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণী উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের প্রতিষ্ঠা ১৯৯৫ সালে। ও বি সি সম্প্রদায়ভুক্ত মহিলাদের জন্য মহিলা সমৃদ্ধি যোজনা রূপায়ণ করা ছাড়াও মেয়াদী ঋণ দেয় এই নিগম। দেয় শিক্ষাঋণ।
l রাজ্যের গ্রাম উন্নয়ন সমিতিগুলিকে বছরে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। প্রতি ১০০০ জন পিছু ১ জন মহিলা (আশা) এখন প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং স্বাস্থ্যচেতনার মৌলিক বার্তাগুলো তাঁদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এখনও পর্যন্ত ২১ হাজার ৭৬৩ জন প্রশিক্ষণ পেয়ে এই কাজ শুরু করেছেন। ১৭টি জেলার ২৩৫টি ব্লকে এই কর্মসূচী রূপায়ণের কাজ চলছে।
l মৎস্য বিভাগ কর্তৃক জাল বোনা ও হাঁস পালনের জন্য প্রকল্প।
l প্রাণী সম্পদ বিকাশ বিভাগ কর্তৃক মহিলাদের পশুপালন ও হাঁস-মুরগী পালনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী।
l রেশম পালন বিভাগ কর্তৃক মহিলাদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচী। যৌথ বনসংরক্ষণ কমিটিগুলির প্রায় অর্ধেক সদস্যই মহিলা।
l স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে (এস জি এস ওয়াই) দেখভাল করার জন্য প্রতি গ্রাম পঞ্চায়েতে দুজন করে সম্পদকর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। এই দায়িত্বে মহিলাদেরই নিয়োগ করা হয়, মূলত স্বনির্ভর গোষ্ঠী থেকেই। মাসে ভাতা ৫০০টাকা। গ্রেডে পাস করার পর ৭৫০ টাকা।
l স্বনির্ভর প্রকল্পের সদস্যাদের মাধ্যমেই সহায় প্রকল্পে অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দেবার কাজ হয়। এর ফলেও একটি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আইনী ব্যবস্থা
l কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সম্ভ্রম ও মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ আইনের প্রয়োগ। নারীপাচার রোধে ব্যবস্থা গ্রহণে রাজ্য সরকার বিশেষভাবে সক্রিয় রয়েছে।
স্বাস্থ্যরক্ষায় অগ্রাধিকার
l মা ও শিশুর স্বাস্থ্যরক্ষায় বিশেষ নজর দিতে সুসংহত শিশু বিকাশ প্রকল্প (আই সি ডি এস)-এর রূপায়ণ। পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত সুসংহত শিশু বিকাশ প্রকল্পের সংখ্যা ৪১৪ এবং অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সংখ্যা ১, ১০,৭০০। এই কেন্দ্রগুলি থেকে ৬৩ লক্ষ ৬ বছরের নিচে শিশু, এবং ১১, ২০,০০০ গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের একগুচ্ছ পরিষেবা দেওয়া হয়ে থাকে।
l জননী সুরক্ষা যোজনা রূপায়ণ। এই যোজনার মূল উদ্দেশ্য প্রতিটি শিশু যাতে হাসপাতালে জন্মায় তা সুনিশ্চিত করা এবং মায়েদের প্রসবকালীন মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা। প্রকল্পে গর্ভবতী মায়েদের কমপক্ষে তিনবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার বিধি রয়েছে। এই প্রকল্পে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মায়েদের এককালীন ৫০০ টাকা এবং শিশু হাসপাতালে জন্মালে আরও ২০০টাকা এবং প্রসবের জন্য হাসপাতালে যাতায়াতের যাবতীয় খরচ দেওয়া হয়।
l কন্যা ভ্রণ নষ্ট রোধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
l জানেন কি গড় আয়ু, জন্মহার, মৃত্যুহার এবং প্রসূতি মৃত্যুর হারে পশ্চিমবঙ্গ জাতীয় হারের চেয়েও অনেক এগিয়ে। গড় আয়ু জাতীয় স্তরের ক্ষেত্রে মহিলা ৬৮.১ বছর কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মহিলা ৭০.৯ বছর। প্রসূতি মৃত্যুর হার জাতীয়স্তরের ক্ষেত্রে প্রতি লক্ষে ২৫৪জন; তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে ১৪১জন। শিশু মৃত্যুর হার জাতীয়স্তরের ক্ষেত্রে প্রতি হাজারে ৫৩জন; তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে ৩৫জন। (রাজ্যের স্থান চতুর্থ) । নারী:পুরুষ অনুপাত জাতীয় স্তরের চেয়ে ভালো।
l শহরাঞ্চলে রয়েছে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জনস্বাস্থ্য প্রকল্প। শহরাঞ্চলে বস্তিবাসী ও গরিব শহরবাসীদের মধ্যে একাজে যুক্ত আছেন ১৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যকর্মী। বেতন হেলথ ওয়ার্কাররা পাবে মাসে আড়াই হাজার টাকা এবং সুপারভাইজার ২৬৪০ টাকা মাসে।
l প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার বেড়ে ৬৯.৫% হয়েছে।
l শিশুদের টীকাদান প্রকল্পে হার বেড়ে ৭৫.৮% হয়েছে।