শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০

সব'ই মায়া ~ অমিতাভ প্রামাণিক

'আমি কে' এই প্রশ্নের উত্তর মানুষ খুঁজে ফিরেছে আদ্যিকাল থেকে। সে রকম গোছানো উত্তর না পেয়ে 'সোঽহম' টাইপের দুর্বোধ্য জিনিস লিখে রেখেছে উপনিষদের পাতায়। তৈরি করেছে মাণ্ডূক্য উপনিষদের সপ্তম শ্লোকের মত 'তূরীয়' ধাঁধা। এর ফলে কূপমণ্ডূক পৃথিবীতে মহা অশান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ভাগ্যিস বিজ্ঞান বলে হালে একটা জিনিস এসেছে, না এলে পৃথিবীটা এর চাপেই এতদিনে শেষ হয়ে যেত। 

উপনিষদ-টুপনিষদ টাইপের সাম্প্রদায়িক বইপত্তর পড়ে বিবেকানন্দ আমেরিকায় ব্রেনওয়াশ করে এসেছিলেন আর রবীন্দ্রনাথ ভুলভাল অনেক গান লিখে গেছিলেন। 'বিপুল তরঙ্গ রে, বিপুল তরঙ্গ রে'। হাহ্‌। আগেকার দিনে মূর্খ মুনিরা ভাবত এলিমেন্ট নাকি পাঁচখানা – ক্ষিতি অপ্‌ তেজ মরুৎ ব্যোম্‌। এই ব্যোম্‌ নিয়ে তাদের যত মাথাব্যথা। কিছুই বোঝেনি এর, তাই এইসব তরঙ্গ ফরঙ্গ বলে চালিয়ে দিয়েছে। সায়েন্স সকলের বোঝার জিনিস হলে তো হয়েই যেত! 

তখনও রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত দাড়িবাবা হননি, তাও গানটার পরের লাইনে লিখে ফেললেন – 'সব গগন উদ্‌বেলিয়া মগন করি' অতীত অনাগত আলোকে-উজ্জ্বল জীবনে-চঞ্চল এ কী আনন্দ-তরঙ্গ! বিপুল তরঙ্গ রে, বিপুল তরঙ্গ রে!' মানে ঐ ঢপের তরঙ্গকেই কখনও বিপুল তরঙ্গ, কখনও আনন্দ-তরঙ্গ এইসব অ্যাডজেক্টিভ লাগানো কথার প্যাঁচে জনগণকে বুদ্ধু বানানো আর-কি! মেহনতি মানুষের চাই রোটি-কাপড়া-মকান, চাই ইস্কুল-কলেজ-হাসপাতাল, চাই চাকরি-ইকনমি-জিডিপি, চাই স্মার্টফোন-ল্যাপটপ-আন্দোলন। এসব থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে এইসব তরঙ্গ-ফরঙ্গ আমদানি হল! 

১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন এই কমিউনাল গানখানা লিখলেন, তার ছ' বছর আগে বিবেকানন্দ মারা গেছেন, যাওয়ার আগে রামকৃষ্ণ মিশন নামে মন্দির বানিয়ে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ পুঁতে গেছেন। আশপাশের এলাকার খবর হচ্ছে ক্ষুদিরাম বসু নামে এক ষোল বছরের বালককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, আলিপুর বোমার মামলার বিচার শুরু হচ্ছে, কাঠগড়ায় আর এক কমিউনাল কবি অরবিন্দ ঘোষ। তিনিও কিছুদিন পরে সামহাউ বেঁচে গিয়ে তরঙ্গের খোঁজে ব্রিটিশদের কাছ থেকে পালিয়ে যাবেন ফ্রেঞ্চ কলোনি পন্ডিচেরিতে। সেখানে উনিও আশ্রম নামের মন্দির বানিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করবেন। 

ব্রিটেনে তখন সায়েন্স চলছে রমরমিয়ে। আর্নেস্ট রাদারফোর্ড নামে এক সাঁইত্রিশ বছর বয়সী যুবক ক্যানাডা থেকে সদ্য জয়েন করেছেন ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রফেসর আর্থার সুস্টার নামে এক পদার্থবিদ সেখান থেকে রিটায়ার করেছেন, তার জায়গায়। সুস্টারের কাছে পোস্টডক করছিলেন হান্স গাইগার নামে ছাব্বিশ বছর বয়সী এক জার্মান ছাত্র। তিনি আর আর্নেস্ট মার্সডেন নামে স্থানীয় এক উনিশ বছর বয়সী ছাত্র একদিন পাতলা একটা সোনার পাতের ওপর আলফা-কণার বুলেট মেরে এমন সব রেজাল্ট পেলেন, যাতে পরমাণুর গঠন সম্বন্ধে মানুষের ধারণাই বদলে গেল। 

বিবেকানন্দ শিকাগোতে বক্তৃতা দিয়ে যখন একগাদা ভক্ত জোগাড় করছিলেন, তখন থেকেই ইওরোপে এইসব জিনিস নিয়ে নাড়াচাড়া হচ্ছে। রন্টজেন নামে একজন বিজ্ঞানী দুর্দান্ত প্ল্যান-ট্যান করে এক্স-রে আবিষ্কার করে ফেললেন। হেনরি বেকারেল চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন ইউরেনিয়ামের কম্পাউন্ড থেকে এমনিই 'রে' বেরোয়, তিনি তাকে বললেন ইউরেনিক রে। ফ্রান্সে পি এইচ ডি করতে এসেছে একটা ইয়াং মেয়ে, মেরি স্ক্লোডস্কা, তাকে ডিপার্টমেন্টের হেড বললেন, এই ইউরেনিয়ামের কেসটা বেশ ইন্টারেস্টিং, এটা একটু দেখো তো। মেরি সেটা নিয়ে যে লড়বে, তার চাই একটা যন্ত্র, যা দিয়ে অল্প পরিমাণ কারেন্ট মাপা যায়। ল্যাবের এক কোণে পড়ে ছিল চোদ্দ-বছর আগে ওখানেই তৈরি এক ইলেক্ট্রোমিটার, বানিয়েছিলেন ওখানকার ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পিয়ের কুরি। মেরি গিয়ে তাকে ধরল, তোমার ঐ মেশিনটা একটু ঝেড়েঝুড়ে চালু করে দাও না। সেই নিয়ে লড়তে লড়তে মেরি পিয়েরের প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করেই ফেললেন না শুধু, আবিষ্কার করে ফেললেন দু-খানা নতুন এলিমেন্টও। ইউরেনিক রে-র ব্যাপারটার তিনি নামকরণ করলেন রেডিও-অ্যাক্টিভিটি। আলফা রে, বিটা রে, গামা রে নামের সব অদ্ভুত রশ্মি বেরোয় সেই সব এলিমেন্ট থেকে। পুরনো আমলের মাইকের চোঙার মত শঙ্কু-আকৃতির এক ভ্যাকুয়াম টিউবে – ক্রুকস টিউবে – ইলেকট্রিক ডিসচার্জ ঘটিয়ে আগে ক্যাথোড রে নামের এক জিনিস পাওয়া গেছিল। ১৮৯৭ সালে জে জে থমসন দেখালেন এই রশ্মি আসলে ঋণাত্মক তড়িৎবাহী এক কণা, তিনি তার নাম দিলেন ইলেকট্রন। পরমাণুর মধ্যে এই ইলেকট্রন কীভাবে থাকে, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লর্ড কেলভিন বললেন, নিশ্চয় পরমাণু হচ্ছে একটা তরমুজ, আর ইলেকট্রন থাকে যেমন তরমুজে থাকে কালো কালো বিচি। এই থিওরি অবশ্য খুব বেশি লোকের পছন্দ হল না। ইলেকট্রনের চার্জ নেগেটিভ। তাহলে পজিটিভ জিনিসটা কই? পরমাণু তো নিউট্রাল। 

গাইগার-মার্সডেনের রেজাল্ট হাতে পেয়ে রাদারফোর্ড ব্যাখ্যা করলেন কেলভিনের ঐ তরমুজ স্ট্রাকচার ঠিক না। পরমাণুর মধ্যে ব্যাপক জায়গা ফাঁকা, তরমুজের মত রসালো শাঁস দিয়ে ভর্তি না। মধ্যে এক ছোট্ট জায়গায় এর যাবতীয় ভর সন্নিহিত, তিনি তাকে বললেন নিউক্লিয়াস। এই নিউক্লিয়াসের চারদিকে অনেক দূর দিয়ে ঘুরছে ইলেকট্রন, নিউক্লিয়াসের তুলনায় তার ভর প্রায় কিছুই না। ইলেকট্রন নেগেটিভ মানে নিউক্লিয়াস পজিটিভ। বছর দশ-বারো পরে তিনি সেই নিউক্লিয়াসের মধ্যের কণাগুলোর নামকরণ করলেন প্রোটন। 

কিন্তু এ তো অনেক পরের ব্যাপার। এর মধ্যে অনেক ঝামেলা হয়ে গেছে। গাইগারদের ঐ পরীক্ষার বছর তিনেক আগেই পর পর দুখানা ইকুয়েশন বাজারে নামিয়েছেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক আর অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। একজন বললেন ই ইজুকাল্টু এইচ নিউ। ই মানে এনার্জি, নিউ মানে ফ্রিকুয়েন্সি, এইচ হচ্ছে একটা কনস্ট্যান্ট, তার নামানুসারে সেটা হয়ে গেল প্ল্যাঙ্ক কনস্ট্যান্ট। আইনস্টাইন বললেন ই ইজুকাল্টু এম সি-স্কয়ার। এম হচ্ছে মাস, সি হচ্ছে ভ্যাকুয়ামে আলোর অর্থাৎ ফোটনের গতিবেগ, যেটা একটা কনস্ট্যান্ট। 

ডি ব্রগলি নামে এক করিৎকর্মা তরুণ এই দুটো ইকুয়েশন দেখেই এইচ নিউ ইজুকাল্টু এম সি-স্কয়ার করে নিউ আর এম-এর একটা সম্পর্ক বের করে বললেন – এই দ্যাখো, জনগণ, এম মানে মাস, যা থাকে পার্টিকেলের; নিউ মানে ফ্রিকুয়েন্সি, যা থাকে তরঙ্গের। সুতরাং প্রত্যেক পার্টিকেলের ওয়েভও আছে। মাস বেশি হলে এই ওয়েভ হয়ত সেভাবে বুঝতে পারবে না, কিন্তু মাস যদি ছোট হয়, যেমন কিনা পরমাণু বা তার মধ্যের জিনিসপত্র, তবে তার ওয়েভ-নেচারও থাকবে। 'বিপুল তরঙ্গ রে, বিপুল তরঙ্গ রে!'

যাহাই পার্টিকেল, তাহাই ওয়েভ – এই তত্ত্বের নাম হয়ে গেল ওয়েভ-পার্টিকল ডুয়ালিটি। আইনস্টাইনের ইকুয়েশন অনেকে বুঝল না, বলতে লাগল মাস ক্যান বি কনভার্টেড টু এনার্জি। আরে ধুর, উনি থোড়াই মাসকে কনভার্ট করার কথা বলছিলেন – মাসই এনার্জি। দুটো রাশি যদি কনস্ট্যান্ট দিয়ে জোড়া হয়, তবে তারা একই জিনিস। এক কিলোমিটার ইজুকাল্টু এক হাজার মিটার মানে কিলোমিটার আর মিটার বলতে একই জিনিস বোঝায়, সেটা দূরত্ব। সেই রকম ই আর এম একই জিনিস, মাসকে আলোর গতিবেগের বর্গ দিয়ে গুণ করলে ই পাওয়া যায়। 

রাদারফোর্ডের পরমাণুর গঠনও সমালোচনার মুখে পড়ল। একটা পজিটিভ চার্জের জিনিসের চারদিকে একটা নেগেটিভ চার্জের জিনিস ঘুরবে কী করে? মুখ থুবড়ে পড়বে না ওর ওপরে? পজিটিভ-নেগেটিভ নিউট্রালাইজ হয়ে যাবে না? একে একে এগিয়ে এলেন নীলস বোর, সমারফিল্ড আরও তাবড় তাবড় সব বিজ্ঞানীরা। বললেন, না, তা হত যদি ইলেকট্রনকে যেমন-তেমন ঘুরতে দিতে। কিন্তু এরা যদি কিছু নির্দিষ্ট কক্ষপথে নির্দিষ্টভাবে ঘুরতে থাকে, তাহলে তেমন হবে না। শ্রডিঙ্গার ঝোলা থেকে বের করলেন অদ্ভুত বেড়াল। তৈরি হতে লাগল কোয়ান্টাম তত্ত্ব। 

ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে গেলে তো কথাই থাকত না। কিন্তু এর ফলে আরও গুচ্ছ গুচ্ছ প্রশ্ন তৈরি হল। এর মধ্যে নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সঙ্গে নিউট্রন নামে এক ধর্ম- থুড়ি, তড়িৎ-নিরপেক্ষ কণারও সন্ধান পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, নিউক্লিয়াসে আছে প্রোটন আর নিউট্রন, খুব অল্প জায়গা জুড়ে। পরমাণুর ভর প্রায় পুরোটাই সেখানে থাকে। তাদের চারদিকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বিভিন্ন কক্ষপথে ঘুরে বেড়ায় ইলেকট্রনরা। হাইড্রোজেন পরমাণুতে নিউট্রন নেই, তাই সিম্পল স্ট্রাকচার, একটা প্রোটনকে বেষ্টন করে বৃত্তাকার পথে ঘোরে একটা ইলেকট্রন। এই ইলেক্ট্রনের স্পিড আলোর স্পিডের দশভাগের একভাগের কিছু কম, প্রতি সেকেন্ডে নিউক্লিয়াসের চারদিকে সাড়ে ছয় কোয়াড্রিলিয়নবার ঘুরে (একের পর পনেরটা শূন্য মানে এক কোয়াড্রিলিয়ন) সেই একলা ইলেকট্রন নাকি ২২০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। 

তো এর পর প্রশ্ন উঠল, একাধিক পজিটিভ চার্জওয়ালা প্রোটন অত্যন্ত ঘনসন্নিবিষ্ট অবস্থায় নিউক্লিয়াসে কী করে থাকে? হাইড্রোজেন পেরোলেই হিলিয়াম থেকে সমস্ত পরমাণুতে একাধিক প্রোটন থাকে। তারা কী করে থাকে? একা রামে রক্ষা নেই, তাদের সঙ্গে সুগ্রীব দোসরের মত লেপ্টে থাকে নিউট্রনও। 

কাজেই প্রোটন এবং সেই সঙ্গে নিউট্রনকেও আর ফান্ডামেন্টাল পার্টিকল বলা গেল না। তাদের স্টেবিলিটি ব্যাখ্যা করার জন্যে এসে গেল আরও জটিল তত্ত্ব, অধিকাংশটাই অঙ্ক। 

আমি যেহেতু অঙ্ক বলতে যোগ বিয়োগ গুণ ভাগের ওপরে কিছু বুঝি না, তাই এ সব বোঝার আগে ফিরে গেলাম 'আমি কে' – এই প্রশ্নে। ধরে নিলাম, আমি সত্তর কেজি ভরের এক বস্তু, যার অধিকাংশটাই জল আর কেমিস্ট্রি খানিকটা পড়েছিলাম বলে পিরিয়ডিক টেবিলের মালপত্তরগুলো মুখস্থ করেছিলাম। তো আমার এই সত্তর কেজির কম্পোজিশন মোটামুটি এই রকম – 
৬৫% অক্সিজেন, ১৮.৫% কার্বন, ৯.৫% হাইড্রোজেন, ৩.২% নাইট্রোজেন, ১.৫% ক্যালশিয়াম, ১% ফসফরাস, ০.৪% পটাশিয়াম, ০.৩% সালফার, ০.২% সোডিয়াম, ০.২% ক্লোরিন, ০.১% ম্যাগনেশিয়াম আর বাদবাকি অতি সামান্য অংশ অন্যান্য গোটা পঁচিশেক এলিমেন্ট দিয়ে। এর প্রত্যেকটার মধ্যে কটা করে ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন আছে, তা আমার জানা। একটা ইলেকট্রনের তুলনায় একটা প্রোটন প্রায় ১৮৩৬ গুণ আর নিউট্রন প্রায় ১৮৩৮ গুণ ভারী। কাজেই আমার সত্তর কেজির শরীর এইসব জটিল পাটিগণিত কষে দাঁড়াল – ৩৮.৪২১ কেজি প্রোটন, ৩১.৫৫৮ কেজি নিউট্রন এবং ২১ গ্রাম ইলেকট্রন। এই কেলেঙ্কারিয়াস ক্যালকুলেশন আর কেউ করেছে কিনা আমি জানি না, মনে হয় আমিই প্রথম।  

কিন্তু দাঁড়ান। ওই যে বললাম, প্রোটন আর নিউট্রন এখন আর ফান্ডামেন্টাল পার্টিকল না, কেননা একাধিক ইলেকট্রোপজিটিভ প্রোটন এক জায়গায় চেপেচুপে থাকতে পারে না। এর ব্যাখ্যায় প্রতিটি প্রোটন তৈরি হয়েছে তিনখানা কোয়ার্ক নামের পার্টিকল দিয়ে, দুটো আপ-কোয়ার্ক যাদের প্রত্যেকটার চার্জ ২/৩ই (এই ই হচ্ছে ইলেকট্রনের চার্জ, এখানে পজিটিভ) করে মোট ৪/৩ই, আর একটা ডাউন-কোয়ার্ক, যার চার্জ নেগেটিভ ১/৩ই, তাহলে তিনে মিলে প্লাস-ই। তেমনি নিউট্রনও তৈরি তিনখানা কোয়ার্ক দিয়ে, একটা আপ-কোয়ার্ক যার চার্জ ২/৩ই, দুখানা ডাউন-কোয়ার্ক, এক একটা নেগেটিভ ১/৩ ই করে মোট নেগেটিভ ২/৩ই, ফলে মোটমাট শূন্য। 

চার্জ মিলে গেল, এবার মাস। এখানেই আসল খেল। তিনখানা কোয়ার্ক মিলে যা ভর, তা প্রোটন বা নিউট্রনের ভরের অতি সামান্য অংশ, প্রায় ১% মত। বাকি ৯৯% ভর কোত্থেকে আসছে? এদের ব্যাখ্যা দিতে তৈরি হল বিশেষ থিওরি – এই ভর হচ্ছে কোয়ার্কদের বেঁধে রাখার জন্যে গ্লুয়ন নামে এক ফিল্ডে কোয়ান্টাম ক্রোমোডায়নামিক বাইন্ডিং এনার্জির জন্যে, যার মধ্যে আছে এই কোয়ার্কগুলোর বীভৎস স্পিডে ঘূর্ণনে উৎপন্ন গতিশক্তিও। ঐ যে আইনস্টাইন বলে গেছেন মাসই এনার্জি, এ হচ্ছে সেই এনার্জি। অ্যাটম বোম-টোম থেকে আমরা যে শক্তি পাই, তা এর কাছে কিছুই না। কেননা তাতে একটা বড় নিউক্লিয়াস ভেঙে দু-টুকরো হয় মাত্র। যে কোনো পরিমাণের বস্তু থেকে তার সমতুল আইনস্টাইনীয় এনার্জি সম্ভবত পাওয়া যাবে যদি তার প্রত্যেকটা ফান্ডামেন্টাল পার্টিকলকে আলাদা করে ফেলা যায়। 

সে যাই হোক, এ সবের মানে হচ্ছে আমার এই সত্তর কেজির শরীরে ঐ ২১ গ্রাম ইলেকট্রন ছাড়া বাকি যে ভর, তার নিরানব্বই শতাংশই হচ্ছে অঙ্ক। আপ-ডাউন কোয়ার্ক গ্লুয়ন ফিল্ডে পাঁই পাঁই করে ঘুরছে বলে সেই ভর নাকি তৈরি হয়েছে। বিপুল তরঙ্গ রে, বিপুল এ রঙ্গ রে!

আপাতত বলা যায়, এই ব্যাপারটাও নিঃসন্দেহ নয়। মানে এই অঙ্কের মধ্যেও অনেক ঘাপলা আছে, যে জন্যে জানা যায়নি অনেক গূঢ় প্রশ্নের উত্তরও। নিউট্রনের যেমন একলা থাকার উপায় নেই, তাকে আলাদা করে রাখলে ১৫ মিনিটেই সে একটা প্রোটন ও একটা ইলেকট্রনে পরিণত হয়ে যায়। প্রোটন কি পুরো স্টেবল? সে যদি গ্লুয়ন-ফিল্ডে কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি, তবে প্রোটনের স্পিন কী করে ব্যাখ্যা করা যায়? 

সেই যে কারা যেন বলে গেছিলেন, সবই মায়া, হয়ত আল্টিমেটলি সেখানেই পৌঁছে যাওয়া যাবে এক সময়। এখনও অবধি কোয়ার্কে ১% ভর রেখে কিছুটা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে। এর পর কোয়ার্কগুলো ভরশূন্য কী দিয়ে তৈরি হয়া সম্ভব, যার ফলে এখনকার অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে, সে সব তত্ত্ব কবে আসবে, কে জানে। 

আপাতত আধুনিক বিজ্ঞান বলছে আমাদের ভরের ৯৯% হচ্ছে কোয়ার্কের গতি। 

আগে বলা হল মাস যার থাকে সেই পার্টিকল, এখন মাস ব্যাপারটাই ধোঁয়া হয়ে গেল! তাহলে পার্টিকল জিনিসটা আসলে কী? আলোকের কণাকে বলা হয় ফোটন, যা কিনা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন। ইলেকট্রিক আর ম্যাগনেটিক ফিল্ড মিলে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের ব্যাপার আমরা জানি। যে-কোনো ফিল্ডের এক্সাইটেড স্টেটকে বলা হয় পার্টিকল। পাতি বাংলায় হয়ত তুলনা করা যেতে পারে এই রকম - আমাদের মাথার মধ্যে অহরহ বিচিত্র ভাবনা চলছে, যা আমরা টেরও পাই না। তাকে যদি আমরা ধরে নিই একটা ফিল্ড, হঠাৎ যখন তাতে একটা আইডিয়া এসে যায় (যে জন্যে আমি এই লেখাটা লিখছি, ধরা যাক সেই আইডিয়াটাই), সেটা আসে এই ফিল্ডের একটা মোমেন্টারি এক্সাইটমেন্ট থেকেই। এই ইউরেকা-মার্কা আইডিয়া হচ্ছে ঐ ফিল্ডে উৎপন্ন পার্টিকলের সমতুল।

ভেবে দেখুন, এই যে জটিল সব ফান্ডামেন্টাল পার্টিকল, এর আদ্ধেকের ব্যাপারটা অঙ্ক কষে বলে গেছিলেন আমাদের সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তাঁর নামেই বোসন কণা, যারা বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিক্স মানে, যেমন ফোটন, গ্লুয়ন এই ভরহীন জটিল বস্তুগুলো। বাকিরা মানে ফার্মি-ডিরাক স্ট্যাটিস্টিক্স, তাদের নাম ফার্মিয়ন, যেমন ইলেকট্রন, আপ-ডাউন কোয়ার্ক, এটসেট্রা।

তাহলে আল্টিমেটলি কী দাঁড়াল? দিন দিন আধুনিক বিজ্ঞানও ভয়ঙ্করভাবে সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে। বলছে বস্তু মানে গতি, মানে সবই মায়া! সত্তর কেজির মালে হিসেব পাওয়া যাচ্ছে মাত্র সাতশো একুশ গ্রামের! জিডিপির বারোটা বাজবে না তো কী হবে?

ডাক্তারবাবুর মেস ~ অর্ক ভাদুরী

110 College Street

১১০ নম্বর, কলেজ স্ট্রিট।

বি বি গাঙ্গুলি মোড়ের শহীদবেদী ছাড়িয়ে একটু এগোলেই ছানাপট্টির প্রায় গা ঘেঁষে এই তিনতলা বাড়িটা। ১৯১১ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত এর তিনতলায় ছিল 'ডাক্তারবাবুর মেস'। ডাক্তারবাবু মানে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। প্রফুল্লচন্দ্র নিজে থাকতেন না বটে, কিন্তু প্রেসিডেন্সি কলেজে ক্লাস শেষ হলে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে তাঁর ঘোড়ায় টানা গাড়ি এসে দাঁড়াত এই মেসবাড়ির দরজায়। এখানে থাকতেন মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সতীশচন্দ্র সেন, ক্ষিতীশচন্দ্র সেন-সহ জনা পনেরো তরুণ। সকলেই প্রফুল্লচন্দ্রের ছাত্র বা ছাত্রস্থানীয়।

১

মেঘনাদ সাহা ১৯১১ সালে ইন্টারমিডিয়েটে থার্ড হয়ে প্রেসিডেন্সিতে পড়তে এসে প্রথমে থাকতে শুরু করেন ইডেন হিন্দু হস্টেলে। কিন্তু 'ছোট জাত' হওয়ায় সেখানে তাঁকে নানাবিধ হেনস্থা সহ্য করতে হত। একসঙ্গে খেতে চাইতেন না বাকিরা, বারান্দার এক কোণে বসে খেতে হত ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছুদিন পরে তাই তিনি উঠে এলেন ১১০ নম্বর মেসবাড়িতে। এখানে আর কোনও সমস্যা রইল না, সকলেই হাতে হাতে কাজকর্ম করতেন- রান্না করা, বাজার করা, বাটনা বাটা- সবই নিজেদের দায়িত্বে।

প্রতিদিন বিকেলে প্রফুল্লচন্দ্র তো আসতেন বটেই, সঙ্গে আসতেন বঙ্গবাসী কলেজের প্রিন্সিপাল গিরিশচন্দ্র বসু, সুরেন্দ্রনাথের সহকর্মী সত্যানন্দ বসু, জবাকুসুম তৈল প্রতিষ্ঠানের উপেন্দ্রনাথ সেন-সহ একঝাঁক দিকপাল। ছাত্রসম মেঘনাদ সাহাদের সঙ্গে নিয়ে তাঁরা চলে যেতেন ময়দানে, লর্ড রবার্টের মূর্তির (১৯৬৯ সালে অপসারিত) নিচে। সেখানে প্রায় ঘন্টা দু'য়েক ধরে চলত নির্ভেজাল আড্ডা- যুদ্ধ থেকে রাজনীতি, সংস্কৃতি থেকে ফুটবল- সবকিছু নিয়েই  প্রাণখোলা তর্কবিতর্ক, হাসিঠাট্টা। গড়ের মাঠের এই আড্ডার খবর রাখতেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধিও। তিনিই নাকি এই আড্ডার নাম দিয়েছিলেন 'ময়দান ক্লাব'। বলা বাহুল্য, আড্ডার মধ্যমণি ছিলে স্বয়ং প্রফুল্লচন্দ্র।

২

জমজমাট এই মেস-বাড়িতে আর একজনও ছিলেন নিয়মিত অতিথি। বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। বাঘা যতীন। ততদিনে তিনি গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। বিদেশ থেকে অস্ত্র এনে সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা করছেন। এর ফাঁকেই মাঝেমধ্যে হাজির হতেন বন্ধু মেঘনাদ সাহার মেসে। সময় পেলে মেঘনাদের ভাই কানাইলালকে ইংরেজিও পড়াতেন।

একদিন খবর এল মেস থেকে বেরিয়ে যতীন্দ্রনাথ আহিরিটোলায় এক পুলিশ অফিসারকে গুলি করে পালিয়েছেন। ১১০ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে তুমুল উত্তেজনা! মেস থেকে বেরনোর সময় যতীন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিল জ্ঞানচন্দ্রের নাম লেখা একখানা বই। যদি কোনও কারণে পুলিশ বাঘা যতীনকে ধরতে পারে, তাহলে তো মহাবিপদ! মেসবাড়ির বাসিন্দারাও রক্ষা পাবেন না।

৩

সেই যাত্রা অবশ্য যতীন্দ্রনাথের নাগাল পায়নি পুলিশ। তবে এই মেস-বাড়িতে আর কখনও আসা হয়নি তাঁর।এর কিছুদিন পরেই বুড়িবালামের তীরে নিজের রক্ত দিয়ে তিনি লিখবেন নতুন ইতিহাস। সেটা ১৯১৫ সালের অগস্ট মাস।

ওই বছরেই মেঘনাদ সাহা এম এস সি পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হলেন, ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তারপর আরও কিছুদিন ওই মেস-বাড়িতেই ছিলেন সকলে। তখনও মেঘনাদ সাহা চাকরি পাননি, একটা সাইকেলে করে শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে চড়কিপাক খেয়ে তিনটি টিউশন করতেন। চাকরি পেলেন পরের বছর, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত গণিতের অধ্যাপনা। মেসের বাকি আবাসিকরাও আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়লেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। সিট তো আর ফাঁকা থাকে না, নতুন আবাসিকেরা আসতে শুরু করলেন।

ডাক্তারবাবুর মেসের সোনার দিনগুলি শেষ হয়ে গেল।

৪

লকডাউনে পুরনো কলকাতার খোঁজখবর নিচ্ছি ঘুরে ঘুরে। সুনীল মুন্সির বইতে এই বাড়িটার কথা প্রথম পেয়েছিলাম। তারপর ডোয়ার্কিনের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়েও দেখলাম ১১০ নম্বর কলেজ স্ট্রিটের উল্লেখ। একদিন দুপুরবেলার পৌঁছে গেলাম বাড়িটায়। বাইরে রঙের প্রলেপ, ভিতরটা ঘুপচি, অন্ধকার। সিঁড়িতে বিকট গন্ধ। দো'তলায় পাইপ মার্চেন্টদের দোকান, তিনতলায় কয়েকটি পরিবারের বাস। ডাক্তারবাবুর মেসের কথা কেউ কেউ জানেন, অনেকে প্রফুল্লচন্দ্রের নামই শোনেননি৷ বৃষ্টি হচ্ছিল, খানিকক্ষণ আড্ডা দিয়ে  চা-বিস্কুট খেয়ে বিদায় নেওয়া গেল।

সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২০

পক্ষপাতদুষ্ট ফেসবুক ~ সুশোভন পাত্র

আপনার প্রোফাইলের রিচ কমে গেছে? আগের মত 'লাইক' হচ্ছে না? পেজের এনগেজমেন্ট ঝাড় খাচ্ছে? আপনার বন্ধুও কি "স্টিকার কমেন্ট প্লিজ" –করুন আর্তি জানাচ্ছে? রিফ্রেশ করলেও বারবার বস্তাপচা পোস্টই দেখতে পাচ্ছেন? সেক্সিস্ট, মিসোজিনিস্ট, হেট-স্পিচের প্রোফাইল গুলো মার্কেটে দিব্যি কলার তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে? রিপোর্ট করে লাভ হচ্ছে না বলছেন? ঠিকই বলছেন! অবাক হবেন না। আসলে আপনি ফেসবুকের ফাঁদে পড়েছেন! সিট ব্যাক, রিল্যাক্স অ্যান্ড লেট মি এক্সপ্লেন! 
প্রতিটা রান্নার যেমন নির্দিষ্ট একটা রেসিপি আছে; যেমন আপনি শুক্তো তে শুঁকনো লঙ্কা, আদাবাটা পাঁচ-ফোড়ন ব্যবহার করেন, ভিনিগার তো ঢালেন না, চিলি চিকেনে ক্যাপ্সিকাম ব্যবহার করেন কাঁচকলা তো দেন না; ঠিক সেরকমই যেকোনো কম্পিউটার গত বিষয়েও একটা রেসিপি আছে –টেকনিক্যাল টার্মে, অ্যালগরিদম। রেসিপি যেমন ধাপে ধাপে আপনাকে বলে দেয় কোন তেল ব্যবহার করবেন, কোন রান্নার শেষ চিনি মেশাবেন, কোনটায় কসুরি মেথি তড়কা মারবেন; ফেসবুকের অ্যালগরিদমও তেমন ঠিক করে দেয় কোন পেজের পোস্ট লোকে বেশি দেখবে, কার পোস্ট না চাইলেও টাইমলাইনে ভেসে উঠবে, কোনটা হালকা চেপে যাবে, কি করলে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভায়োলেট হবে, কোন ক্ষেত্রে প্রোফাইল রিপোর্ট খাবে। 
আচ্ছা এই অ্যালগোরিদম কি নিজে নিজেই রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে? না! কিন্তু অ্যালগোরিদম লেখার কিম্বা ব্যবহার করার মানুষটা তো রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হতেই পারে, তাই না? আর সেরকমই গুরুতর অভিযোগ ফেসবুকের বিরুদ্ধে। আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল ১৪ই অগাস্টের আর্টিকেলে নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে লিখেছে যে, ভারতে ফেসবুকের পলিসি মেকাররা ব্যাপকভাবে বিজেপির পক্ষে রাজনৈতিক পক্ষপাত দুষ্ট। কেমন?
অ্যালগরিদম অনুযায়ী ফেসবুকে ঘৃণা ছড়ানোর পোস্ট করা যায় না। এই বিষয়ে নজরদারির জন্য ভারতে ফেসবুকের যে টিম রয়েছে, সেই টিমই তেলেঙ্গানার বিজেপি নেতা টি রাজা সিং-র "মুসলিমরা বিশ্বাসঘাতক এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের গুলি করে মারা উচিৎ" –সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্টটি ডিলিট করার এবং তাঁকে 'বিপজ্জনক ব্যক্তি' হিসেবে চিহ্নিত করে অ্যাকাউন্টটি স্থায়ী ভাবে ব্যান করার প্রস্তাব পাঠায় টিম-লিড অফিসারের কাছে। তালিকায় ছিল দিল্লির দাঙ্গার আগে কপিল মিশ্রর উস্কানি মূলক ভিডিও, অনন্ত হেগড়ের সাম্প্রদায়িক মন্তব্যও। 
কিন্তু সর্ষের মধ্যেই ভূত। টিম লিড, সাউথ এশিয়ান জোনের ফেসবুকের পাবলিক পলিসি এক্সিকিউটিভ অফিসার আঁখি দাস বিজেপির নেতাদের পোস্ট ডিলিট কিম্বা অ্যাকাউন্ট ব্যান তো দুরস্ত, 'ব্যবসার ও শাসক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি হবে' -অজুহাতে একের পর এক সাম্প্রদায়িক পোস্ট অনুমোদন করতে থাকেন। 

কে এই আঁখি দাস? যিনি নিজে মোদীর প্রশংসায় অহরহ পোস্ট করেন। রবিশঙ্কর প্রসাদ, স্মৃতি ইরানির সঙ্গে গদগদ সেলফি তোলেন। ফেসবুকে ভারতীয় মুসলিমদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যকে সমর্থন করেন। এবং যার দিদি রশ্মি দাস JNU-র ABVP-র প্রেসিডেন্ট ছিলেন। রশ্মি দাস বর্তমানে WOSY-র নামে একটি NGO চালান। যে WOSY-র লিঙ্ক আপনি দেখতে পাবেন ABVP-র ওয়েবসাইটে। যে WOSY-র অফিস আপনি খুঁজে পাবেন দিল্লির RSS ভবনে! 
চেস বোর্ডে আঁখি দাস নেহাত বোড়ে। আড়ালের সমীকরণটাই রাজা। বিজেপি সরকার পলিসি মেকিং-এ ফেসবুক কে ব্যবসার  বাড়তি সুযোগ দেবে। আর বিনিময়ে ফেসবুকে বিজেপি নেতারা ফেসবুকে ইচ্ছেমত ঘৃণা ছড়াবে। বিজেপি বিরোধী পোস্ট সেন্সর হবে। এটা বুঝতে আপনাকে শার্লক হোমস লাগবে না। রাজস্থান নির্বাচনের আগে অমিত শাহই বলেছিলেন -"যে কোন খবর মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল করার ক্ষমতা আমাদের আছে। সে খবর টক-মিষ্টি-ঝাল কিম্বা মিথ্যা যাই হোক।" 
ফেসবুকের সর্ববৃহৎ মার্কেট ভারতে। ইউজার ২৯০ মিলিয়ন। তাই মোদীর জয়ের পরেই জুকেরবার্গ নিজেই আসেন ভারতে। সরকারের সঙ্গে ফেসবুকের বাণিজ্যিক প্রকল্পও চূড়ান্ত হয়। আর হালফিলের ক্রনলজিটাও দেখুন, ফেসবুক জিও-র সঙ্গে ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করল। টিকটক ব্যান হল। ফেসবুকের অধীনস্থ ইন্সট্রাগ্রাম টিকটকের অনুরূপ 'রিল্স' অ্যাপ বের করল এবং মুখ থুবড়ে পড়ল। দেরি না করে জিও-ও টিকটক কেনার নেগোশিয়েশন শুরু করল। 
রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া ব্যবসায়িক কারণেও ফেসবুকের অ্যালগরিদম খুবই চপল। ২০১২-র পরবর্তী সময়ে এই চপলতার মুখ্য লক্ষ্য, পোস্টের অরগ্যানিক রিচ কমিয়ে ইউজারদের পয়সা খরচে বাধ্য করা। ২০১২ তে, ফেসবুকে, আপনার পোস্ট অরগ্যানিক ভাবে, নিজেদের টাইমলাইনে দেখতে পেতেন প্রায় ১৬% 'ফ্রেন্ডস-ফলয়ার্স'। ২০১৫ তে সেটা ৫.৪%। ২০২০ শুরু থেকে সেটা ১%-র কাছাকাছি। অর্থাৎ আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে ৫০০০ বন্ধু থাকলেও, কোন একটি নির্দিষ্ট সময়ে, আপনার পোস্ট দেখতে পাচ্ছেন হাতে গোনা কয়েকজন। সোজা হিসেব, ফেলো কড়ি মাখো তেল। 
রইলো বাকি ডেটা সিকিউরিটি! ট্রাম্প কে জয়ী করতে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কে কিভাবে ফেসবুক সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছিল কিম্বা সম্প্রতি দিল্লির দাঙ্গা তে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ডেটা কিভাবে সাম্প্রদায়িক কারণে ব্যবহার হয়েছিল এসব আপনি ইন্টারনেট ঘাঁটলেই টুকটাক পাবেন। কিন্তু ডেটা সিকিউরিটি, বিগ ডেটা, ডেটা মাইনিং, AI-র হাতে গরম একটা উদাহরণ হল, ফেসবুক লগ-ইন থাকা অবস্থায় অ্যামাজনে একটা মিক্সচার গ্রাইন্ডার, কিম্বা মিন্ত্রা তে একটা সালোয়ার কামিজ সার্চ করে দেখুন; দুদিন পর দেখবেন ফেসবুকে বন্ধুদের পোস্টের মাঝে জুকেরবার্গ আপনাকে মিক্সচার গ্রাইন্ডার কিম্বা সালোয়ার কামিজের বিজ্ঞাপন দেখাতে শুরু করেছে।
যদি মনে হচ্ছে এসব আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির বিষয়ে সরকার কি করবে -তাহলে আপনি কার্টুন নেটওয়ার্ক দেখুন। ডেটা সিকিউরিটির কারণেই চিনের মত ফেসবুক ব্যান করে বিকল্প প্ল্যাটফর্ম বানাতে না পারলেও, পৃথিবীর বহু দেশ নাগরিকদের ব্যক্তিগত ডেটা নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করে, সেই শর্তের স্বত্বেই ফেসবুককে সে দেশ ব্যবসা করা অনুমোদন দিয়েছে। ফ্রান্স-জার্মানি সহ EU-র বহু দেশ ছাড়াও তালিকায় আছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়াও। 
নিশ্চয় ফেসবুকের রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতার বিরুদ্ধে লড়তে হবে। নিজেদের পোস্টে এনগেজমেন্ট বাড়িয়ে সংঘবদ্ধ হয়েই লড়তে হবে। ডেটা সিকিউরিটি, নেট নিউট্রালিটির দাবিতে লড়তে হবে। ডেটা মনোপলির বিরুদ্ধে লড়তে হবে। কিন্তু লড়াই মানে পাল্টা 'হেট স্পিচ' নয়, পাল্টা ফেক নিউজ নয়, ছবি কিম্বা বক্তব্য বিকৃত করা নয়, কপিরাইট মিউজিক নিজের ভিডিও তে ব্যবহার করে IPR-র বাঁশ খাওয়া নয়। কারণ এগুলো সুস্থ মস্তিষ্কের লক্ষণ নয়। আর সুস্থ মস্তিষ্কের লোকেরা বিজেপিও নয়।
কি বললেন? ফেসবুকের বিরুদ্ধে লড়ার কথা ফেসবুকেই? ব্যাপারটা Oxymoron হয়ে যাচ্ছে না? হ্যাঁ, হচ্ছে তো। আসলে দেশটাই Oxymoron-এ ভরে গেছে। জনকল্যাণকামী সরকার –Oxymoron, বিজেপি আর বিকাশ -Oxymoron, ভারতের গণতন্ত্র –Oxymoron, সংবিধান মেনে মোদীর শপথ –Oxymoron,  ফ্রিডম অফ স্পিচ –Oxymoron, স্বাধীন নিরপেক্ষ মিডিয়া –Oxymoron, সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামী –Oxymoron। তাই ওস্তাদ বলেছেন, রাষ্ট্রের মাথায় Moron-রা বসলে, Moron তাড়াতে, হেঁটে লড়তে হবে, নেটে লড়তে হবে, Oxymoron-এও লড়তে হবে।

সূত্র:


ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ~ অর্ক ভাদুরী

Md Ismail

সোহরাওয়র্দী সবেমাত্র ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ঘোষণা করেছেন। ১৯৪৬ সাল। গোটা কলকাতা শহর রক্তে ভাসছে। একদিকে মুসলিম গার্ড আর উল্টোদিকে গোপাল পাঁঠার দলবল দখল নিয়েছে গলি থেকে রাজপথ। শহর ছাড়িয়ে দাঙ্গার আগুন ছুঁয়ে ফেলছে গ্রাম-মফস্বল। বাড়িঘর ভিটেমাটি ছেড়ে পালাচ্ছে মানুষ। এর মধ্যেই সম্প্রীতির পাঁচিল তুলে দাঁড়াল কমিউনিস্টরা। দাঙ্গাবাজদের চোখে চোখ রেখে প্রতিরোধ করলেন ট্রাম শ্রমিক আন্দোলনের নেতা মহম্মদ ইসমাইল।

সামরিক পরিভাষায় যাকে ফায়ার পাওয়ার বলে, সেই ফায়ার পাওয়ার অনেক বেশি ছিল দাঙ্গাবাজদের।তাদের ছিল পেট্রল বোমা আর এই গরীব মানুষগুলোর সম্বল ছিল জেদ। মুসলিম গার্ডের দাঙ্গাবাজদের সেদিনের লক্ষ্য ছিল ভিক্টোরিয়া কলেজের নিরস্ত্র ছাত্রীরা। তাদের চোখে মুখে খুন ,ধর্ষণ লুটপাটের প্রবৃত্তি সুস্পষ্ট।
মহম্মদ ইসমাইলের নেতৃত্বেই সেদিন মধ্য-কলকাতা অঞ্চলের শ্রমিকরা, মজুর, কলাবাগান বস্তির মহিলারা, ঘরোয়া হাতা-খুন্তি বেলনা আর লাঠি, বেলচা নিয়ে এদের আটকে দেন। এক ঘন্টার লড়াই, স্রেফ ইট এবং খেটো লাঠি নিয়ে সোহরাওয়ার্দীর বাহিনীর মহড়া নিলেন শ্রমিকরা। সংখ্যায় বেশি হয়েও শ্রমিকদের প্রতিরোধের মুখে লেজ গুটিয়ে পালায় দাঙ্গাবাজরা। 

এতক্ষণ পড়ে কি মনে হল , ক্লাসিক টেল অফ ডেভিড ভার্সেস গোলাইয়াথ ?
মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক।সেদিন বাজপাখির সামনে পাজামা ভিজিয়ে ফেলেছিল রাজাবাজারের কুখ্যাত ডন। তিনদিন তিনরাত ছাত্রীদের আগলে রাখার পর যেদিন পুলিশের হাতে তাদের নিরাপদে তুলে দেওয়ার পালা এল সেদিন এক যুবক ব্রিটিশ অফিসার সেই শ্রমিকদের একজনকে প্রশ্ন করেন যে কোন অসম সাহসে তাঁরা এভাবে দুর্গের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন ....

শ্রমিকটির উত্তর ছিল ; " উও সুরখী ঝান্ডা দেখ রাহে হ্যায় সাহাব , উও সুরখী ঝান্ডা জব একবার উড়তা হ্যায় না তব উসকো উতারনা নামুনকিন হ্যায় "
বাজপাখির ডানা সেদিন আগলে রেখেছিল বাংলার সম্প্রীতি । 'সুরখী ঝান্ডা' অর্থাৎ লাল পতাকাকে টেনে নামানোর সাহস হয়নি ওদের ।

পাঁঠা হোক বা শুয়োর , প্যাদানি খাওয়ার ওয়ার্দী যে , তাকে কখনো রেয়াত করেনি এই 'সুরখী ঝান্ডা'।
সেই মাস্তানির উত্তরাধিকার আজও শিরায় উপশিরায় প্রবাহিত।

কৃতজ্ঞতা : 
*সাংবাদিক অর্ক ভাদুড়ির ফেসবুক পোস্ট
*ছেচল্লিশ এর দাঙ্গায় ট্রাম শ্রমিকদের অসামান্য বীরগাথা/সাধন ব্যানার্জি

কলকাতার ভাতের হোটেল ~ অর্ক ভাদুরী





বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম, করোনা আর লকডাউনের মাঝে কলকাতার ভাতের হোটেলগুলো কেমন আছে একটু খোঁজখবর নেব। আসলে, কয়েক মাস আগেও আমার কাছে চারবেলার খাওয়াদাওয়াটা ছিল অ্যাডভেঞ্চারের মতো। বাড়িতে রান্নাবান্নার পাট ছিল না। শহরের একপ্রান্তে লাঞ্চ করতাম, অন্যপ্রান্তে ডিনার। ব্রেকফাস্টে কখনও শ্যামবাজারের হরিদাস মোদক, কখনও রাসবিহারীর রাধুবাবু, কখনও বাগবাজারের পটলা। কখনও গড়িয়াহাটের দাস কেবিন, কখনও দেশপ্রিয় পার্কের আশেপাশের সাউথ ইন্ডিয়ান খাবারের দোকান বা এই রকম কোথাও। সন্ধেবেলায় কখনও সদানন্দ রোডের আপনজন, কখনও রাসবিহারী অ্যাভিনিউতে শংকরের ফ্রাই, কখনও কালিকা। উত্তরের দিকে গেলে শ্যামবাজারে বড়ুয়ার প্যান্থারাস, ফিয়ার্স লেনের অ্যাডামের কাবাব, গিরীশ পার্কের নিরঞ্জন আগারের কাটলেট। হাজরা মোড়ের কাফেতে প্রায় নিয়মিত চা-কফি-পুডিং। মাঝেমধ্যে শোভাবাজারের অ্যালেন কিচেনে বা অন্য কোথাও। কিন্তু লাঞ্চ আর ডিনারে তো এত অপশন নেই। শহরের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ৫-৬টা দোকানে ভাত খেতাম। কখনও কখনও যে অন্য কোথাও খাইনি তা নয়, কিন্তু চেষ্টা করতাম ওই কয়েকটা দোকানেই যেতে।

লকডাউনের শুরু থেকে গল্পটা বদলে গেল। বাড়িতে রান্নাবান্না শুরু হল। সেও এক নতুন মজা। কিন্তু আমার পছন্দের ভাতের হোটেলগুলো কেমন আছে, লকডাউন শিথিল হওয়ার পর ব্যবসাবাণিজ্য আদৌ হচ্ছে কিনা, সেসব না জানলে চলে! কিন্তু কিছুতেই আর সময় বের করে যাওয়া হচ্ছিল না। আচমকাই একটা সুযোগ চলে এল। একটি সংস্থা বলল, কলকাতার খাবারের দোকানগুলো নিয়ে একটু খোঁজখবর করতে হবে। অবশ্যই কেবলমাত্র আমার পছন্দের দোকানগুলো নিয়েই। তাই মনে হল, খুব সংক্ষেপে আমার প্রিয় ভাতের হোটেলগুলো কেমন আছে, বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করি।

১

স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল
৮/২ ভবানী দত্ত লেন

এই হোটেলটা সম্ভবত কলকাতার সবচেয়ে বিখ্যাত পাইস হোটেল। ১৯১০ সালে ভূবনেশ্বর থেকে দুই ভাই মনগোবিন্দ আর প্রহ্লাদচন্দ্র কলকাতায় এসে প্রেসিডেন্সি কলেজের কাছে হিন্দু হোটেল খুলে বসলেন। এক আনায় মাছ-ভাত। পেটচুক্তি খাওয়া। বাড়িটা ছিল এক মুসলিম পরিবারের। কিন্তু কোনওদিন সাম্প্রদায়িক ঝামেলা পোহাতে হয়নি। বরং বিপদে আপদে আশেপাশের মুসলিম বাসিন্দারা বুক দিয়ে রক্ষা করেছেন হিন্দু হোটেলকে। হিন্দু হোটেলে সুভাষচন্দ্র বসুর নিয়মিত আসা এবং পাত পেড়ে পুঁই-চচ্চড়ি খাওয়ার গল্প এখনও এই চত্বরে কান পাতলে শোনা যায়। মেয়র থাকাকালীনও সহকর্মীদের নিয়ে এসে দুপুরবেলায় ভাত খেয়ে যেতেন সুভাষচন্দ্র। আসতেন চিত্তরঞ্জন দাশ, সত্য বক্সী, হেমচন্দ্র গুহরা। লালবাজারের নথিতে ফেভারিট কেবিনের মতো হিন্দু হোটেলে কারা আসছেন, তার উপর নজর রাখার কথা রয়েছে।

১৯৪৩ সালে যখন মন্বন্তর এল, মনগোবিন্দ আর প্রহ্লাদচন্দ্র হোটেলের দরজা খুলে দিলেন সক্কলের জন্য। বিরাট বিরাট ডেকচিতে খিচুড়ি রান্না করে নিরন্ন মানুষের মুখে তুলে দিলেন তাঁরা। তার চার বছর পর দেশভাগ, ইংরেজ রাজত্বের অবসান। হিন্দু হোটেলের সামনে জাতীয় পতাকা তোলা হল ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট। পরের বছর হোটেলের নাম বদলে হল- স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল।

মনগোবিন্দ মারা গিয়েছেন আগেই। অতিবৃদ্ধ প্রল্হাদচন্দ্র  গত বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারি হিন্দু হোটেলে যাঁরা খেতে আসেন, তাঁদের পাতে বিনামূল্যে কয়েকটি পদ পরিবেশন করা হয়। ২০১৮ পর্যন্ত প্রতি বছর ১৫ অগস্ট দোকানের সামনে জাতীয় পতাকা তোলা হত। সাইনবোর্ডে নতুন রং করা হত। প্রল্হাদবাবুর মৃত্যুর পর থেকে সেসব বন্ধ আছে।

লকডাউনে একটানা কয়েক মাস ঝাঁপ বন্ধ ছিল স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেলের। তৃতীয় প্রজন্মের মালিক অরুণাংশু পণ্ডা এখনও ওড়িশায় আটকে আছেন। কিছুদিন হল হোটেল খুলছে বটে, কিন্তু খরিদ্দার নেই। আগে দিনে ২০০-২৫০ পাত পড়ত, এখন ২০-৩০ জনও আসেন না।

২

প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউজ / মহল
৬/৩ রমানাথ মজুমদার লেন

আমার খুব প্রিয় হোটেল। চমৎকার রান্না। ১৯১৭ সালে, রুশ বিপ্লবের বছরে নন্দলাল দত্ত প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউজ খুললেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, তপন সিংহ-সহ আরও অনেকে ছিলেন প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউজের বোর্ডার। একটা সময় ৫০-৬০ জন থাকতেন। এখন কমতে কমতে ১০-১২ জন। প্রথমে কেবল বোর্ডারদের জন্যই রান্নাবান্না হত। এখন যেখানে মহল হোটেলটা হয়েছে, সেটাই ছিল বোর্ডিং হাউজের রান্নাঘর। আর ভিতরে ঢুকে যে প্যাসেজটা রয়েছে, সেখানে সারিবদ্ধ ভাবে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ১৯৯১ সালে নন্দলালের নাতি সন্দীপ দত্ত রান্নাঘরটাকে ভিতরে নিয়ে গেলেন, বাইরের ঘরে খুললেন সর্বসাধারণের জন্য ভাতের হোটেল। সন্দীপবাবু বলছিলেন, "আটের দশক থেকেই মেস/বোর্ডিং ব্যবসা ক্রমশ অলাভজনক হয়ে পড়ছিল। তখন থেকেই অধিকাংশ মেস এবং বোর্ডিং বোর্ডারদের জন্য রান্না বন্ধ করে দিতে শুরু করে। আমরাও হোটেল খুলি তখনই।"

সন্দীপবাবুর বাবা নৃপেন্দ্রনাথ ছিলেন মেস-বোর্ডিং মালিকদের সংগঠনের প্রধান। ওই এলাকায় তো মেস আর বোর্ডিং-এর ছড়াছড়ি। একটু দূরে শিবরাম চক্রবর্তীর মেস। আরেকটু এগোলে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, সত্যেন বসুদের বিখ্যাত মেসবাড়ি, যেখানে বাঘাাযতীন আসতেন। কয়েকদিন আগে প্রফুল্লচন্দ্রের জন্মদিনে ওই মেসবাড়িটায় গিয়েছিলাম। সে অন্য গল্প।

লকডাউনের শুরু থেকেই মহল বন্ধ। এখনও খোলেনি৷ মাঝখানে রটে গিয়েছিল প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউজ নাকি বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও সেটা সর্বৈব বাজে কথা।

৩

জগন্মাতা ভোজনালয়
৪০, কৈলাশ বোস স্ট্রিট

এই দোকানটাও বেশ বিখ্যাত। তবে আমার যাতায়াত একটু কম। জগন্মাতার বৈশিষ্ট্য হল, এখানে টেবিল-চেয়ারের পাশাপাশি এখনও মাটিতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। রান্না বেশ ভাল। মুরগি ঢোকে না। কেবল পাঁঠার মাংস। বৃহস্পতিবারে মাংস হয় না। জগন্মাতায় রান্না হয় কয়লার উনুনে। শিলে বাটা মশলা ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করা হয় না।

ওড়িশা থেকে এসে বিকলচন্দ্র দাস জগন্মাতা ভোজনালয়ে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। এখন তৃতীয় প্রজন্মের গঙ্গাধর দাস দায়িত্বে। লকডাউনের শুরু থেকেই দোকান বন্ধ। এখনও খোলেনি।

৪

হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম
১৯, রানী রাসমণি রোড

দোকানের গায়ে প্রতিষ্ঠার বছর হিসাবে ১৯৩৮ থাকলেও পুরসভার নথি অনুযায়ী ১৯২৮ সালে ক্ষুদিরাম সরকার হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। রানী রাসমণির জানবাজারের বাড়ির খুব কাছে রানীর জমিতেই ভাড়া বাড়িতে হোটেল শুরু হয়। আগে একতলায় মেস ছিল, মূলত চাকরিজীবীরা থাকতেন। এখন মেস উঠে গিয়েছে। হোটেলের কর্মচারীরাই মেস করে থাকেন।

সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমের বৈশিষ্ট্য হল নানা রকমের মাছের চমৎকার রান্না। প্রতিদিন প্রায় ১২-১৫ রকমের মাছ থাকে। মাছের ডিশগুলোর দাম নির্দিষ্ট নয়, বাজারের দামের সঙ্গে ওঠানামা করে। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে বিনামূল্যে দই-রসগোল্লা খাওয়ানো হয়।

সিদ্ধেশ্বরী আশ্রমও এখন বন্ধ। একটু দূরেই রয়েছে ঢাকেশ্বরী হোটেল। সেটাও বন্ধ। কবে খুলবে কে জানে!

৫

তরুণ নিকেতন
১/৪ রাসবিহারী অ্যাভিনিউ

এই হোটেলের খাবার আমার যত না পছন্দ, তার চেয়েও পছন্দ হোটেলের পরিবেশ। ছোট ছোট খাটের চেয়ার, শ্বেতপাথরের টেবিল, লম্বা আয়না। ঢুকতেই চোখে পড়বে - 'এই হোটেল সম্পূর্ণভাবে পাইস হোটেলের নিয়ম অনুসারে পরিচালিত।' তরুণ নিকেতন পাঁঠার মাংসের একটা হাল্কা ঝোল করে, বেশ লাগে। অরুণ দে এখন মালিক। আড্ডাবাজ মানুষ। নিজেই লেক মার্কেট থেকে বাজার করেন। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে বিনামূল্যে সকলকে পায়েস খাওয়ান। 

এই দোকানেও আগে মুরগির মাংস ঢুকত না, খাইয়েদের চাপে এখন ঢোকে। তবে মুরগির ডিমের এখনও প্রবেশ নিষেধ। লকডাউন শিথিল হওয়ার পর তরুণ নিকেতন খুলছে। তবে খদ্দের প্রায় নেই। আগে দুপুরবেলা বসার জায়গা পাওয়া যেত না, অপেক্ষা করতে হত, এখন শুনশান।

....................................................

এই ৫ টা হোটেল আমার সবচেয়ে প্রিয়। এর বাইরেও আরও অনেক হোটেল চমৎকার রান্না করে। খিদিরপুরের ইয়ং বেঙ্গল হোটেল, কলেজ স্ট্রিটে জগন্নাথ হোটেল, গড়িয়াহাট বাজারের দো'তলায় কালীপদ মাইতির হোটেল, ফার্ন রোডের ফার্ন হোটেল, হাতিবাগানের বেশ কয়েকটা হোটেল, যাদবপুরে হালে তৈরি হওয়া শেফ, ভবানীপুরে জগুবাবুর বাজারের কাছে পার্বতী হোটেল- তালিকা শেষ হবে না। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ আর গণেশ অ্যাভিনিউ ক্রসিংটার কাছে, হেয়ার স্ট্রিট আর বউবাজার থানার গলিতে দু'টো চমৎকার হোটেল আছে। একদম ছোট, ঘিঞ্জি, টুলে বসে খেতে হয়। তার একটা এত ভাল মাটন করে যে বলে বোঝানো যাবে না। চাঁদনি চকের ভিতরের হোটেলটাও মন্দ নয়।
জেলার হোটেলগুলোও চমৎকার। কয়েকদিন আগে মুর্শিদাবাদে গিয়ে পদ্মপাতায় ভাত খেলাম, মন ভরে গেল। বীরভূম, নদীয়াতেও বেশ খেলাম। তবে করোনা আর লকডাউনের জাঁতাকলে কেউ ভাল নেই। ব্যবসা লাটে উঠেছে প্রায় সকলেরই। কলকাতার চপ-কাটলেটের দোকানগুলোরও প্রায় একই অবস্থা।

কবে সব ঠিক হবে কে জানে!

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০

শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর ছবি ~ অর্ক ভাদুরী

Sahid Khudiram

প্রতি বছর ১১ অগস্ট শহীদ ক্ষুদিরাম বসুর ছবিতে টাইমলাইন ভরে ওঠে। শুধু সোস্যাল মিডিয়ায় তো নয়, পাড়ায়-মহল্লায়-রাস্তার মোড়ে অসংখ্য মানুষ গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন তাঁকে। কিন্তু কিশোর বিপ্লবীর যে ছবিটি সবচেয়ে জনপ্রিয়, অধিকাংশ পোস্টারে, ব্যানারে যে ছবিটি দেখতে পাই, সেটি কিন্তু ক্ষুদিরামের কোনও ফটোগ্রাফ নয়, কলকাতা হাইকোর্টের সামনে যে চমৎকার মূর্তিটি রয়েছে, তার ছবি। ভাস্কর্য সম্পর্কে আমার তেমন কোনও জ্ঞান নেই, কিন্তু ক্ষুদিরামের এই মূর্তিটি বড্ড প্রিয়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, ভাস্কর্যটির মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে একটা আস্ত সময়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মরণজয়ী সংগ্রামের আঁচে অগ্নিশুদ্ধ হওয়া ওঠা সময়ের স্মারক যেন ওই ন'ফুট লম্বা মূর্তিটি।

কিন্তু কে তৈরি করেছিলেন ক্ষুদিরামের এই আশ্চর্য মূর্তি? তাঁর অন্য কোনও কাজের খোঁজ মেলে না কেন? উত্তর নেই। প্রতি বছর ১১ অগস্ট আসে, চলে যায়। শিল্পীর নাম সামনে আসে না। আমরা কেউ জানতেও পারি না এক আশ্চর্য কমিউনিস্টের গল্প।

চারের দশকের প্রায় শেষ। সবেমাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। বিহারের বাসিন্দা তাপস দত্ত শিল্পী হতে চেয়ে চলে এলেন কলকাতায়। ভর্তি হলেন আর্ট কলেজে। কিন্তু উত্তাল সময়ের ঢেউ বদলে দিল জীবনের গতি। একের পর এক আন্দোলনে রাজপথ তখন উত্তাল। সেই স্রোতে ডিঙি ভাসালেন তাপসবাবুও। বন্ধু শীতেশ দাশগুপ্তের হাত ধরে জড়িয়ে পড়লেন বামপন্থী রাজনীতিতে। সোস্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার (এস ইউ সি) দলের সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে ভিড়ে গেলেন লাল পতাকার মিছিলে। শিল্পী হওয়া আর হ'ল না বটে, কিন্তু পেয়ে গেলেন একটা অন্য রকমের জীবন। কমিউনিস্ট জীবন।

রাজনৈতিক কাজকর্মের ফাঁকে শিল্পচর্চা চলতে লাগল ঠিকই, কিন্তু ধ্যানজ্ঞান সবই তখন রাজনীতি। কখনও ডক শ্রমিকদের নিয়ে ইউনিয়ন করছেন, কখনও ছুটে যাচ্ছেন জুটমিলের শ্রমিক মহল্লায়, কখনও পার্টির নির্দেশে চষে ফেলছেন ওড়িশার গ্রাম, শহর, মফস্বল। আর এই এতকিছুর মাঝে, কখনও একটু অবসর জুটে গেলে বসে পড়ছেন রংতুলি নিয়ে।

এমন করেই চলছিল। অনেক বছর পর এল ১৯৬৭ সাল। কংগ্রেসকে হারিয়ে বাংলার বুকে তৈরি হল প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার। জ্যোতি বসু হলেন উপ-মুখ্যমন্ত্রী, তাপসবাবুদের দলের নেতা সুবোধ ব্যানার্জি শ্রমমন্ত্রী। কিন্তু সেই সরকার টিঁকল না। তারপর ১৯৬৯। আবার ক্ষমতায় এল যুক্তফ্রন্ট। এই দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্টের পূর্ত দফতর সিদ্ধান্ত নিল শহর জুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মূর্তি বসানো হবে। রাস্তাঘাট আর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরগুলির নাম রাখা হবে বিপ্লবীদের স্মরণে। অ্যান্ডারসন হাউজ হল বিপ্লবী ভবানী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে ভবানী ভবন, বিনয়-বাদল-দীনেশের স্মরণে হল বিবাদী বাগ, এমন আরও অনেক কিছু। ঠিক হল হাইকোর্টের সামনে বসবে ক্ষুদিরামের মূর্তি। শিল্পীদের কাছ থেকে নকশা আহ্বান করল সরকার।

অনেকদিন, অনেক অনেক দিন পর আবার সিরিয়াসলি খাতাকলম নিয়ে বসলেন তাপস দত্ত। ততদিনে তিনি বিশিষ্ট ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন। আরও অনেকের মতো তাপসবাবুও সরকারের কাছে মূর্তির একটি মডেল জমা দিলেন। এবং সেটিই নির্বাচিত হল! তারপর একটানা কয়েক মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাপসবাবু তৈরি করে ফেললেন এই মূর্তিটি। বিপুল প্রশংসিত হলেন। প্রশংসা করলেন স্বয়ং রামকিঙ্কর বেইজ। কিন্তু ওই শেষ। তারপর দীর্ঘদিন তাপসবাবু আর কোনও মূর্তি তৈরি করেননি। বহু বছর পর ঘাটশিলা তাঁদের দলের প্রতিষ্ঠাতার একটি পূর্ণাবয়ব মূর্তি বাদে তাপসবাবুর সম্ভবত কোনও মেজর কাজ নেই। ইন্দিরা গান্ধির আমলে কেন্দ্রীয় সরকার জওহরলাল নেহরুর মূর্তি তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিল বলে শুনেছি। কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তাপসবাবু রাজি হননি।

শহীদ ক্ষুদিরামের অধিকাংশ মূর্তিই কলকাতা হাইকোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মূর্তিটির আদলে নির্মিত। ক্ষুদিরামের অধিকাংশ ছবিও তাই। পোস্টারে, ব্যানারে সর্বত্র এই মূর্তিটির ছবি দেখি। কিন্তু কেন জানি না তাপস দত্তের কথা কেউ বলেন না। পরবর্তীকালে তাপসবাবু সোস্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টারের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হয়েছিলেন, শ্রমিক সংগঠন ইউ টি ইউ সি-র (লেনিন সরণী) সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব সামলেছেন। কিন্তু ভাস্কর তাপস দত্তের কথা কেন সামনে আসে না? তাঁর দলের কমরেডরাও কি আরেকটু বিশদে বলতে পারেন না এই কমিউনিস্ট শিল্পীর গল্প?

ক্ষুদিরাম ~ ঋতুপর্ণ বসু

----- আমি মেদিনীপুর জেলার অধিবাসী। বাপ মা নেই, ভাই নেই, কাকা, মামা কেউ নেই। এক দিদি আছেন। তাঁর অনেক ছেলেপুলে, বড়টি আমার সমবয়সী। মেদিনীপুরে, জজের হেডক্লার্ক, বাবু অমৃতলাল রায়ের সঙ্গে দিদির বিয়ে হয়। ওঁরাই আমার একমাত্র আত্মীয়। অবিনাশচন্দ্র বসুও আমার আত্মীয় কিন্তু আমার সম্পর্কে তাঁর কোন আগ্ৰহ আছে বলে মনে হয় না।
Khsudiram Basu
আমি সেকেন্ড ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিলাম কিন্তু দুতিন বছর আগে পড়া ছেড়ে দিয়েছি। তখন থেকে আমি স্বদেশী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্ৰহণ করি। সেই থেকে আমার জামাইবাবু ( অমৃতলাল রায় ) আমাকে ত‍্যাগ করেন। আমার মা নেই, আমার বাবা দশ এগারো বছর আগে মারা যান। আমার সৎমা ছিলেন। তিনি তাঁর ভাই সুরেন্দ্রনাথ ভন্জের কাছে থাকতেন। আমি তাঁর ঠিকানা জানি নে, কি করেন তাও জানি নে।
প্রশ্ন ; তুমি কি কাউকে দেখতে চাও ?
--- হ‍্যাঁ, আমি একবার মেদিনীপুর যেতে চাই, আমার দিদি ও ছেলেপুলেদের দেখতে চাই।
প্রশ্ন ; তোমার মনে কোন কষ্ট আছে ?
---- না, কোন কষ্ট নেই।
প্রশ্ন ; আত্মীয় স্বজনকে কোন কথা জানাতে চাও কি ? অথবা ওঁদের কেউ এসে তোমায় সাহায্য করুক এমন ইচ্ছে করে কি ?
---- না, আমার কোন ইচ্ছা তাঁদের জানাবার নেই। তাঁরা যদি ইচ্ছে করেন আসতে পারেন।
প্রশ্ন ; জেলে তোমার সাথে কি রকম ব‍্যবহার করা হয় ?
---- মোটামুটি ভাল। খাবারটা ( ভাতটা ?) বড় মোটা, আমার ঠিক সহ‍্য হয় না। শরীরটা খারাপ করে দিয়েছে। নচেৎ, আমার সঙ্গে অসৎ ব‍্যবহার করা হয় না। আমাকে একটা নিঃসঙ্গ সেলে আটকে রাখে। সেখানে দিনরাত্রি থাকতে হয়। একবার মাত্র স্নান করার সময় বেরিয়ে আসতে দেওয়া হয়। একা থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সংবাদপত্র বা অন‍্য কিছু পড়তে দেওয়া হয় না। এগুলো পেতে খুবই ইচ্ছা করে।
প্রশ্ন ঃ কোন রকম ভয় করে তোমার ?
---- ভয় করবে কেন ? ( হাসি )
প্রশ্ন ; গীতা পড়েছ ?
---- হ‍্যাঁ পড়েছি।
প্রশ্ন ; তুমি জান আমরা রংপুর থেকে তোমার পক্ষ সমর্থনে এসেছি, কিন্তু তুমি তো এর আগেই দোষ স্বীকার করেছ ?
----- কেন করব না ? ( হাসি )
( ক্ষুদিরামকে আইনি সহায়তা দেবার জন‍্য কালিদাস বসুর নেতৃত্বে একদল উকিল রংপুর থেকে মজঃফরপুরে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে বিচারাধীন ক্ষুদিরামের কথোপকথন প্রকাশিত হয়েছিল সাপ্তাহিক সন্জীবনি পত্রিকায়। তারিখ ১৮ ই জুন, ১৯০৮। ক্ষুদিরামের পক্ষ সমর্থনকারী বাবু সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর প্রশ্নের উত্তরে ক্ষুদিরাম উপরোক্ত কথাগুলি বলেন। )
ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির সময় দুজন বাঙালী উপস্থিত ছিলেন। একজন হলেন বেঙ্গলী কাগজের সংবাদদাতা ও উকিল উপেন্দ্র নাথ বসু আর অন্যজন হলেন ক্ষেত্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। উপেন্দ্র নাথ বসু ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি নিয়ে সেই সময় একটা লেখা লেখেন, নিচে রইল সেই লেখাটিই............
"মজঃফরপুরে আমাদের উকিলদের একটি ছোট্ট আড্ডা ছিল। আমরা প্রতি শনিবার সেখানে একত্রিত হইয়া গল্প করিতাম, রাজা উজির বধ করিতাম। ১লা মে শোনা গেল মজঃফরপুর হইতে ২৪ মাইল দূরে উষা নামক স্টেশনে একটি বাঙ্গালী ছাত্রকে পুলিশ ধরিয়া আনিয়াছে। দৌড়িয়া স্টেশনে গিয়া শুনিলাম পুলিশ ছাত্রটিকে লইয়া সোজা সাহেবদের ক্লাবের বাড়িতে গিয়াছে। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ উডম্যান তাহার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিতেছেন। পরদিন সকালে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ উডম্যান বাঙালী উকিলদিগকে নিজের এজলাসে ডাকাইয়া পাঠাইলেন। আমাদের মধ্যে প্রবীন উকিল শ্রীযুক্ত শিবচরণ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সরকারী উকিল। তাঁর সঙ্গে আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে উপস্থিত হইয়া দেখি, কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছে একটি ১৫/১৬ বছরের প্রিয়দর্শন বালক। এতোগুলো বাঙালী উকিল দেখিয়া ছেলেটি মৃদু মৃদু হাসিতেছে। কি সুন্দর চেহারা ছেলেটির, রঙ শ্যামবর্ণ কিন্তু মুখখানি এমনই চিত্তাকর্ষক যে দেখিলেই স্নেহ করিতে ইচ্ছা করে। উডম্যান সাহেব যখন ছেলেটির বর্ণনা পড়িয়া আমাদের শোনাইতে লাগিলেন, তখন জানিলাম ছেলেটির নাম ক্ষুদিরাম বসু নিবাস মেদিনীপুর। ক্ষুদিরামের বর্ণনা পড়িতে পড়িতে ক্রোধে উডম্যান সাহেবের বদন রক্তবর্ণ ও ওষ্ঠ কম্পিত হইতেছিল। দায়রায় ক্ষুদিরামের পক্ষ সমর্থনের জন্য কালিদাসবাবুর নেতৃত্বে আমরা প্রস্তুত হইতে লাগিলাম। নির্ধারিত দিনে রঙপুর হইতে দুজন উকিল এই কার্যে সহয়তা করিতে আসিলেন। একজনের নাম সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী। এজলাস লোকারণ্য, তিন-চার জন সাক্ষীর জবানবন্দী, জেরা ও বক্তৃতা শেষ হইলে, ক্ষুদিরামের উপর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হইল। আদেশ শুনিয়া ক্ষুদিরাম জজকে বলিলো, 'একটা কাগজ আর পেনসিল দিন, আমি বোমার চেহারাটা আঁকিয়া দেখাই। অনেকেরই ধারণাই নাই ওই বস্তুটি দেখিতে কিরকম'। জজ ক্ষুদিরামের এ অনুরোধ রক্ষা করিলেন না। বিরক্ত হইয়া ক্ষুদিরাম পাশে দাঁড়ানো কনস্টেবলকে ধাক্কা দিয়া বলিল, 'চলো বাইরে'। ইহার পর আমরা হাইকোর্টে আপিল করিলাম। ক্ষীণ আশা ছিল, যদি মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাব্বজীবন কারাদণ্ড হয়। জেলে তাহাকে এ প্রস্তাব করিতেই সে অসম্মতি জানালো, বলিল 'চিরজীবন জেলে থাকার চেয়ে মৃত্যু ভালো'। কালিদাস বোঝাইলেন দেশে এমন ঘটনা ঘটিতেও পারে যে তোমায় বেশিদিন জেলে থাকিতে নাও হইতে পারে। অবশেষে সে সম্মত হইল। কলকাতা হাইকোর্টের আপিলে প্রবীন উকিল শ্রীযুক্ত নরেন্দ্র নাথ বসু হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা দিলেন। কিন্তু ফাঁসীর হুকুম বহাল রহিল। ১১ আগস্ট ফাঁসির দিন ধার্য হইল।
আমরা দরখাস্ত দিলাম যে ফাঁসীর সময় উপস্থিত থাকিব। উডম্যান সাহেব আদেশ দিলেন দুইজন মাত্র বাঙালী ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিতে পারিবে। আর শব বহনের জন্য ১২ জন এবং শবের অনুগমনের জন্য ১২ জন থাকিতে পারিবে। ইহারা কতৃপক্ষের নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে যাইবে। ফাঁসির সময় উপস্থিত থাকিবার জন্য আমি ও ক্ষেত্রনাথ বন্দোপাধ্যায় উকিলের অনুমতি পাইলাম। আমি তখন বেঙ্গলী কাগজের স্থানীয় সংবাদদাতা। ভোর ছ'টায় ফাঁসী হইবে। পাঁচটার সময় আমি গাড়ির মাথায় খাটিয়াখানি ও সৎকারের অত্যাবশকীয় বস্ত্রাদি লইয়া জেলের ফটকে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম নিকটবর্তী রাস্তা লোকারন্য। সহজেই আমরা জেলের ভিতরে প্রবেশ করিলাম। ঢুকিতেই একজন পুলিশ কর্মচারী প্রশ্ন করিলেন বেঙ্গলী কাগজের সংবাদদাতা কে?
আমি উত্তর দিলে হাসিয়া বলিল, আচ্ছা ভিতরে যান। দ্বিতীয় লোহার দ্বার উন্মুক্ত হইলে আমরা জেলের আঙ্গিনায় প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম ডানদিকে একটু দূরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে ফাঁসির মঞ্চ। দুই দিকে দুই খুঁটি আর একটি মোটা লোহার রড যা আড়াআড়িভাবে যুক্ত তারই মধ্যখানে বাঁধা মোটা একগাছি দড়ি ঝুলিয়া আছে। তাহার শেষ প্রান্তে একটি ফাঁস। একটু অগ্রসর হইতে দেখিলাম ক্ষুদিরামকে লইয়া আসিতেছে চারজন পুলিশ। কথাটা ঠিক বলা হইল না। ক্ষুদিরামই আগে আগে অগ্রসর হইয়া যেন সিপাহীদের টানিয়া আনিতেছে। আমাদের দেখিয়া একটু হাসিল। স্নান সমাপন করিয়া আসিয়া ছিল। মঞ্চের উপস্থিত হইলে তাহার হাত দুইখানি পিছন দিকে আনিয়া রজ্জুবদ্ধ করা হল। একটি সবুজ রঙের টুপি দিয়া তাহার গ্রীবামূল পর্যন্ত ঢাকিয়া দিয়া ফাঁসি লাগাইয়া দেওয়া হইল। ক্ষুদিরাম সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। এদিক ওদিক একটুও নড়িল না।
উডম্যান সাহেব ঘড়ি দেখিয়া একটি রুমাল উড়াইয়া দিলেন। একটি প্রহরী মঞ্চের একপ্রান্তে অবস্থিত একটি হ্যান্ডেল টানিয়া দিল। ক্ষুদিরাম নিচে অদৃশ্য হইয়া গেল। কেবল কয়েক সেকেণ্ড ধরিয়া উপরের দিকের দড়িটা একটু নড়িতে লাগিল। তারপর সব স্থির। কর্তপক্ষের আদেশে আমরা নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়া শ্মশানে চলিতে লাগিলাম। রাস্তার দুপাশে কিছু দূর অন্তর পুলিশ প্রহরী দাঁড়াইয়া আছে। তাহাদের পশ্চাতে শহরের অগণিত লোক ভীড় করিয়া আছে। অনেকে শবের উপর ফুল দিয়া গেল। শ্মশানেও অনেক ফুল আসিতে লাগিল। চিতারোহণের আগে স্নান করাইতে মৃতদেহ বসাইতে গিয়া দেখি মস্তকটি মেরুদণ্ড চ্যুত হইয়া বুকের উপর ঝুলিয়া পড়িয়াছে। দুঃখে – বেদনায় – ক্রোধে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মাথাটি ধরিয়া রাখিলাম। বন্ধুগণ স্নান শেষ করাইলেন তারপর চিতায় শোয়ানো হইলে রাশিকৃত ফুল দিয়া মৃতদেহ সম্পূর্ণ ঢাকিয়া দেওয়া হইল। কেবল উহার হাস্যজ্বল মুখখানা অনাবৃত রহিল। দেহটি ভস্মিভূত হইতে বেশী সময় লাগিলো না। চিতার আগুন নিভাইতে গিয়া প্রথম কলসী ভরা জল ঢালিতেই তপ্ত ভস্মরাশির খানিকটা আমার বক্ষস্থলে আসিয়া পড়িল। তাহার জন্য জ্বালা যন্ত্রনা বোধ করিবার মতন মনের অবস্থা তখন ছিল না। আমরা শ্মশান বন্ধুগণ স্নান করিতে নদীতে নামিয়া গেলে পুলিশ প্রহরীগণ চলিয়া গেল। আর আমরা সমস্বরে বন্দেমাতরম বলিয়া মনের ভার খানিকটা লঘু করিয়া যে যাহার বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম। সঙ্গে লইয়া আসিলাম একটি টিনের কৌটায় কিছুটা চিতাভস্ম, কালিদাসবাবুর জন্য। ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলায় সে পবিত্র ভস্মাধার কোথায় হারাইয়া গিয়াছে ।"
বেঙ্গলী পত্রিকা, আগষ্ট, ১৯০৮
ফাঁসির সাজা ঘোষণা শুনে শুধু হেসেছিলেন। ফাঁসিকাঠে দাঁড়িয়ে যখন কালো মুখোশ পরানো হল, তখনও শেষবারের মতো দেখাগিয়েছিল সেই হাসি। তাঁর ফাঁসির পর ব্রিটিশ পত্রিকা 'এম্পায়ার'এ প্রকাশিত হয়, '…নিথর মৃতদেহ। কিন্তু, মুখের হাসি সেই হাসি।' এভাবেই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু। এই অগ্নিযুবকই হলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের কনিষ্ঠতম শহিদ। আজ তাঁর ১০৯তম মৃত্যুদিবস।

অবিভক্ত মেদিনীপুরে জন্ম ক্ষুদিরামের। শৈশবেই বাবা মা-কে হারান। মাত্র ১২ বছর বয়সেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন ক্ষুদিরাম। স্কুলে পড়াকালীন রিভলবার চেয়ে চমকে দিয়েছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগোকে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথমবার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাতে বোমা তুলে নেন। একাধিকবার পুলিশের হাতে ধরাও পড়েন।

তৎকালীন সময়ে বিহারের মুজাফ্ফরপুরের মেজিস্ট্রেট ছিলেন বড়লাট ডগলাস কিংসফোর্ড। কলকাতা প্রেসিডেন্সির চিফ মেজিস্ট্রেট থাকাকালীন বহু তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের নির্মম সাজা দিয়েছিলেন তিনি। অত্যাচারী এই ব্রিটিশ প্রশাসককে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে।

মুজাফ্ফরপুরের মোতিঝিল এলাকায় পাঠানো হয় ক্ষুদিরামকে। সেখানে হরেন সরকার নাম নিয়ে এক ধর্মাশালায় থাকতে শুরু করেন ক্ষুদিরাম। একইসঙ্গে নজর রাখছিলেন কিংসফোর্ডের গতিবিধির উপর।


১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় ইউরোপিয়ান ক্লাবের গেটে কিংসফোর্ডের গাড়ির অপেক্ষা করছিলেন ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী। গাড়ি ক্লাবের গেটে পৌঁছলে, একহাতে বন্দুক তুলে তা থামান ক্ষুদিরাম। এরপর আরেক হাতে বোমা নিয়ে গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়েন। বিস্ফোরণে ৩ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু, তাঁদের মধ্যে কিংসফোর্ড ছিলেন না। মুজাফ্ফরপুরের বার অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাডভোকেট প্রিঞ্জল কেনেডির পরিবারের সদস্যরা ওই বোমায় নিহত হন।

এরপরই প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরামের পিছনে ধাওয়া করে ব্রিটিশ পুলিশ। পরের দিনই পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম। কয়েকদিন পর মোকামঘাটের কাছে এক রেলস্টেশনে পুলিশের জালে ধরা পড়েন চাকী। কিন্তু, তিনি নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। আদালত দোষীসাব্যস্ত করে ক্ষুদিরাম বসুকে। ১৯০৮ সালের ১১ অগাস্ট ফাঁসি দেওয়া হয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কনিষ্ঠতম বিপ্লবীকে। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই শহিদ হন ক্ষুদিরাম।

দুঃসাহসী ক্ষুদিরামের বলিদান দেশের যুব সম্প্রদায়ের কাছে চিরঅমর রয়ে গেছে।

শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২০

মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি ~ সুশোভন পাত্র

ফোর্বসের 'রিয়েল টাইম বিলিওনারিস'-র লিস্টে পঞ্চম স্থানে উঠে এসে মুকেশ ভাই বলেছেন "টাকা কামানোর জন্য ব্যবসা করার মানেই হয় না। পৃথিবীতে টাকা দিয়ে বিশেষ কিছুই কেনা যায় না।" হ্যাংলা মিডিয়া মুকেশ ভাই-র হাম্বেল বাণী তে মুগ্ধ হয়ে হামলে পড়ে এমন জিভ বের করেছে যে, জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষকরা আজকাল অনলাইন ক্লাসে নাকি প্রতিবর্ত ক্রিয়া বোঝাতে কুকুরের জিভের বদলে অর্ণব গোস্বামীদের জিভের উদাহরণ দিচ্ছেন।  
কুকুরের কিংডমে এই নির্মম দখলদারি তে বিমর্ষ হয়ে, মুদি দোকানের লাইনে দাঁড়িয়ে রাস্তার কুকুরটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ওমনি পাড়ার রাজনৈতিক বিরোধী কাকু এসে বললেন "দেখলে তো, মুকেশ আম্বানি কেমন দিল! অর্থনীতি কে এবার রোখে কোন বাপের ব্যাটার সাধ্যি দেখি।" অগত্যা প্রতিবর্ত ক্রিয়া থেকে অর্থনীতি তে সুইচ করে বললাম, "কাকু, ২০১৯-২০ আর্থিক বর্ষে প্রতি মিনিটে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি গড়ে ২৩,৪০,১৫০টাকা করে বেড়েছে¹। আপনার স্যালারিটা যেন কত বেড়েছে?" বিরোধী কাকু জনসমক্ষে স্যালারির প্রসঙ্গ তোলায় পুরো জেনারেশেনের স্বভাব-ভদ্রতার ১৪গুষ্ঠি উদ্ধার করে দিলেন। কুকুরটা অবশ্য বসেই ছিল।
থাকুক গে। বিবেকানন্দ তো বলেছেন, যে বসে থাকে, তার ভাগ্যও নাকি বসে থাকে। অবশ্য এসব থিওরি সাধারণ মানুষের জন্য। মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম। মুকেশ ভাই বসে থাকলেও, ভাগ্য দাঁড়িয়েই থাকে। ঐ যে কি বলে যেন? 'ক্রনি ক্যাপিটালিজম' না কি ছাই! 
'ক্রনি-ফনি' ছাড়ুন। পয়েন্টে আসুন। ৪২তম অ্যানুয়াল জেনারেল মিটিং-এ মুকেশ ভাই যেদিন ঘোষণা করলেন ১৮মাসের মধ্যে রিলায়েন্স কে 'ঋণমুক্ত' করার রোডম্যাপ রেডি, তখন বাজারে রিলায়েন্সের মোট ঋণ ১.৫৪লক্ষ কোটি। ক্রেডিট সুইসের বিচারে স্টক মার্কেটে রিলায়েন্সের শেয়ারের মান 'নিম্ন'। 
ঘোষণার ৯দিনের মাথায়, Serious Fraud Investigation Office জানালো, যে সময়ে চিদাম্বরম INX মিডিয়া তে মরিসাসের কোম্পানির অবৈধ বিনিয়োগ কে মান্যতা দিয়েছিলেন, সেই সময়ে রিলায়েন্সই, INX-র অধীনস্থ নিউজ-X চ্যানেলের মালিকানা কিনে ঐ অবৈধ বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম করেছিল²। 
INX নিয়ে তদন্তের মাঝেই, মুম্বাই উপকূলে পান্না-মুক্তা-তাপ্তি বেসিনের গ্যাস এবং তেল উত্তোলনে আর্থিক অসঙ্গতির কারণে, দিল্লি হাইকোর্টে সৌদি আরামকোর সঙ্গে রিলায়েন্সের ৫৭হাজার কোটির চুক্তি আইনি জটিলতায় পড়ল। অন্যদিকে লকডাউনের মুখে, রাসায়নিক পিউরিফাইয়েড  টেরেফথালিক অ্যাসিডের আমদানি শুল্ক কমলে, পলিয়েস্টার তৈরিতে মার্কেটে রিলায়েন্সের একছত্র আধিপত্যও খর্ব হল। পর পর, বাণিজ্যিক ধাক্কায়, গোল্লায় যাওয়া 'মার্কেট রেপুটেশনের' ক্যাসক্যাডিং এফেক্টে রিলায়েন্সের শেয়ারের মূল্য তখন ১৩৫০টাকা থেকে গোত্তা খেয়ে ৮৬৭-তে³। 
কিন্তু মুকেশ ভাই তো ব্যতিক্রম। তাই মুকেশ ভাই-র ভাগ্য ফেরাতে মাঠে নামল স্বয়ং আরবিআই। রেপো রেট পরিবর্তন করে, সরকারী বন্ড কিনে, অর্থনীতি তে পর্যাপ্ত ক্যাশের জোগান বজায় রাখার মনিটারি পলিসির চল বহুদিনের। কিন্তু এই প্রথমবার আরবিআই জানালো, প্রয়োজনে ১৯৩৪-র অ্যাক্ট বদলে, 'কর্পোরেট বন্ড' কেনার কথাও ভাবছে তারা⁴। খবর চাউর হতেই রিলায়েন্সের শেয়ারের দাম বাড়ল ২৩%। ৬ মাসে প্রথমবার।  
প্রধানমন্ত্রীর 'আত্মনির্ভর' বক্তৃতার ২৪ঘণ্টা পেরনোর আগেই মুকেশ ভাই ঘোষণা করলেন 'সম্পূর্ণ দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে' টেলিকমে 5G-র বিপ্লব আনবে রিলায়েন্স। আমেরিকার Qualcomm আর দক্ষিণ কোরিয়ার Samsung-র সঙ্গে চুক্তি বদ্ধ হয়ে, Huawei-র পেটেন্ট ব্যবহার করে কিভাবে জিও "সম্পূর্ণ দেশীয় 5G-র বিপ্লব আনবে" সে প্রশ্ন শিকেয় তুলে, বক্তৃতা আর ঘোষণার আন্তঃ সম্পর্কের ইঙ্গিত বুঝতে ভুল হয়নি জুকেরবার্গের মত ব্যবসিকদের⁵। ফলত দু-মাসে জিও-র ঝুলিতে এলো ফেসবুক সহ বিভিন্ন কোম্পানির মোট ৮৬,৬৫৪কোটির চুক্তি। কিন্তু তখন রিলায়েন্স'র ১.৫লক্ষ কোটির 'ঋণমুক্তি'র লক্ষ্য দুরস্ত। 
তাই মুকেশ ভাই-র ইচ্ছে হল, মার্কিন শেয়ার বাজার ন্যাসড্যাকে রিলায়েন্সের 'রাইটস ইস্যু' করবেন। গোদা বাংলায়, শেয়ার হোল্ডারদের কম পয়সায় নতুন শেয়ার কেনার সুযোগ দিয়ে পয়সা কামাবেন। কিন্তু আপনি বলবেন তা আবার হয় নাকি? সেবি-র নিয়মে তো কোন কোম্পানির বিরুদ্ধে আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ থাকলে তার রাইটস নাকি ইস্যু করা যায় না? কাগজ-কলমে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া রাইটস নাকি ইস্যু করা যায় না? ভারতীয় কোন কোম্পানির রাইটস বিদেশী শেয়ার মার্কেটে নাকি ইস্যু করা যায় না⁶? 
'যায় না' নয়, বলুন যেত না। কারণ মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম। তাই দেখা গেলো মুকেশ ভাই-র 'রাইটস ইস্যু'র ইচ্ছে হওয়ার ঠিক আগেই, সেবি, প্রথম দুটি নিয়মই শিথিল করতে সার্কুলার জারি করেছে। আর অর্থমন্ত্রী স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার ভারতীয় কোম্পানির রাইটস ইস্যুর জন্য বিদেশের শেয়ার মার্কেটে ব্যবহারের অনুমতিও দিয়ে বসেছেন। অতএব, মুকেশ ভাই 'রাইটস ইস্যু'ও করলেন, ন্যাসড্যাকেই করলেন, ৮৪,৪৬৭কোটি ঘরেও তুললেন। রিলায়েন্স ঋণমুক্ত'ও হল। আর মুকেশ ভাই বিলিওনারিসের লিস্টে পঞ্চম স্থানে উঠেও এলো। 
রিলায়েন্স ছাড়া আর কোন কোম্পানি নতুন নিয়মের ভিত্তিতে রাইটস ইস্যু করল? হঠাৎ কেনই বা এতদিনের নিয়ম শিথিল হল? কেন INX মিডিয়ার তদন্ত থমকে গেলো? উত্তর খুঁজে লাভ নেই। কারণ মুকেশ ভাই ব্যতিক্রম হতে পারেন, বেইমান নয়! গুরুদক্ষিণা বাবদ PMCares-এ ৫০০ কোটি উনি আগেই দিয়েছেন⁷! 
এতক্ষণ সব ঠিকই ছিল। কিন্তু 'গুরুদক্ষিণা' কথা শুনেই কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। আর অমনি বিরোধী কাকু খেঁকিয়ে উঠে বললেন, "তো কি এমন অন্যায় হয়েছে? রিলায়েন্স অর্থনীতি তে কত কর্মসংস্থান তৈরি করে জানো? সরকার ওনাকে সুযোগ-সুবিধা দেবে না তো তোমাকে দেবে? র‍্যাস্কাল কোথাকার।" 
আসলে বিরোধী কাকুর, ব্রেকফাস্টে চিজ-বাটার, লাঞ্চে পাৎসা আর ডিনারে লো-ক্যালরি কর্ণফেল্কস আছে। বিরোধী কাকুর, মাস গেলে বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে। তাই বিরোধী কাকুর, হাতে অ্যান্ড্রয়েড ফোন গুঁজে, দেশের অর্থনীতি নিয়ে বাতেলা দেওয়ার সুযোগ আছে। উইকঅ্যান্ডে 30ml স্কচের পেগে, "রিলায়েন্স অর্থনীতি তে কত কর্মসংস্থান তৈরি করে জানো?" -ভেবে নাবালক সুলভ অবাক হবার ফ্যান্টাসি আছে। দুঃখ একটাই, এতো কিছু 'আছে'র মধ্যে বিরোধী কাকুর শুধু গায়ে মানুষের চামড়া রাখার অভ্যাসটাই বাদ পড়ে গেছে। 
না হলে বিরোধী কাকু জানতেন কর্মসংস্থান মানে কেবল হোয়াইট কলার জব নয়, কর্মসংস্থান মানে MNREGA-ও। না হলে জানতেন রিলায়েন্স গ্রুপে মোট কর্মসংস্থান ৭৫০০০। আর MNREGA-তে ৫.২কোটি⁸। না হলে জানতেন সম্প্রতি রাষ্ট্রসঙ্ঘ জানিয়েছে ২০০৫-১৫ ২৭কোটি ৩০লক্ষ মানুষ কে দরিদ্রের অন্ধকার থেকে টেনে তুলছে ভারত⁹। কোনও রিলায়েন্স-র দৌলতে নয়, বরং MNREGA-র সৌজন্যে।
তাই যে আপনার আশে পাশের যে সব বিরোধী কাকুরা, কর্মসংস্থান বলতে রিলায়েন্স বোঝেন কিন্তু MNREGA বোঝেন না; কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড়ে কর্মসংস্থানের যুক্তি খোঁজেন, কিন্তু MNREGA-র বাজেট বরাদ্দ ছাঁটাই হলে পুছেও দেখেন না; আম্বানি নিয়ে আদিখ্যেতা করেন, কিন্তু পাড়ার মস্তান তৃণমূল নেতা ক্যালাবে বলে রাজ্যে এসএসসি-টেটের কর্মসংস্থান নিয়ে ট্যাঁ-ফোও করেন না। এই দুঃসময়ে তাঁদের চিনুন। চিজ-বাটার-পাৎসা-কর্ণফেল্কসের নেপথ্যে তাঁদের শ্রেণী চরিত্রটা বুঝুন। চিনুন-বুঝুন, কারণেই পৃথিবীর রোগ একদিন ঠিক সেরে যাবে। তখন অবিকল মানুষের মত দেখতে এই জন্তুদের সোশ্যাল ডিসটেন্সিং লাগবে। কোয়রেন্টাইন লাগবে। দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা লাগবে।

সূত্র:



শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২০

উগ্রহিন্দুত্ববাদীর আদর্শ ~ অনির্বাণ রায়

সেকি আপনি কার্ল মার্ক্সের পরিচারিকার সাথে অবৈধ বাচ্চার কথা জানেন না? আরে ছিঃ ছিঃ জ্যোতি বসু তো বউ মরার পর শালীকে বিয়ে করেছিল! ফিদেল কাস্ত্রোর কটা রক্ষিতা ছিল জানিস? যাদবপুরে মেয়েরা ছোটো জামা পরে সিগ্রেট খায় আর ফাঁকা ফ্ল্যাটে লেনিন বোঝে।

আজ্ঞে হ্যাঁ। বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে, উগ্রহিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও আরএসএস মদতপুষ্ট 'বানরসেনা'রা এই ডিসকোর্সই ব্যবহার করে আজকাল। আপনি যদি না জেনে থাকেন, একটিবার ঘুরে আসুন তাদের পরিচালিত পেজগুলি থেকে৷ 

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন? কেন আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আদর্শ থাকছে না? লজিকের ভাষায় এই জাতীয় কুযুক্তির একটা নাম আছে। Argumentum ad hominem, আর Graham's hierarchy of disagreement এর সবচেয়ে নীচুস্তরের সবচেয়ে কদর্য কুযুক্তি হলো এই অ্যাড হোমিনেম ও Name Calling, অর্থাৎ, মার্ক্স খারাপ কারণ, ডেম্যুথের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ভারতের সবচেয়ে বড়ো ও আজকের দিনে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলকে ৭% এর বিরুদ্ধে এরকম কদর্য আক্রমণ করার দরকার পড়ছে কেন? 

পড়ছে তার কারণ খুব সোজা। Hate Sells, আমাদের সমাজে ঘৃণা বিক্রি হয়। আর তা যদি যৌনতাকেন্দ্রীক ঘৃণা হয়ে থাকে তবে তো কথাই নেই। "আমি শুতে পাচ্চিনে, ও কেন শোবে?" মানুষের ঈর্ষার আদিমতম প্রবৃত্তিকে উশকানি দিচ্ছে এই জাতীয় ডিস্কোর্স। খেয়াল করে দেখুন প্রথমে বলা সব কটি ব্যক্তিগতজীবনকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ে দেওয়া কুযুক্তির পিছনে রয়েছে এক অমোঘ হতাশা। যৌনহতাশা। আমি সারাজীবন ইনবক্সে "হাই ফ্র্যান্ডশিপ করবা" পাঠিয়ে একটা ন্যুড ছবি জোগাড় করতে পারলাম না, এরা যৌনতার উৎযাপন করবে কেন? তাদের বই, মতাদর্শ, চিন্তা, চেতনা সব তুচ্ছ। যৌনজীবনই বড়ো। আজ্ঞে হ্যাঁ, রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ও বাঙালির এই যৌনহতাশাকেই পুঁজি করে বছর বছর রবীন্দ্রকেচ্ছাকে 'বেস্টসেলার' বানিয়ে থাকেন। আজকের বাঙালি যতো না গীতবিতান ছুঁয়েছে, তার বেশি পড়েছে 'কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট', পেন্সিলে দাগ দিয়ে দিয়ে।

নীচের ছবি যে সংস্কৃতিতে মজার, 'কমন', স্বাভাবিক ও খিল্লি; সে সংস্কৃতিতে "পৃথিবীর ইতিহাস আসলে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস" এর থেকে "আব্বে শালীকে বিয়ে করেচে, জ্যোতি তো শালীমার" অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ও অনেকবেশি জনমোহিনী হবে তা বলাই বাহুল্য।


বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২০

৭% ভোট ~ সুশোভন পাত্র

গৃহপালিত মিডিয়ার ভাড়া করা পণ্ডিতরা বলেছেন বামপন্থীরা ভোট পাবে না! ৭%-র এক ইঞ্চিও এদিক সেদিক হবে না। সে বামপন্থীরা রাজ্য জুড়ে যতই ঐ সব, কমিউনিটি কিচেন করুক, শ্রমজীবী ক্যান্টিন খুলুক, মাস্ক-স্যানিটাইজার বিলি করুক, এক গলা জলে ডুবে রান্না করা খাবার ফেরি করুক, মুমূর্ষু রুগী কে রক্ত দান করুক, ত্রাণ নিয়ে আজ সন্দেশখালি, কাল হাসনাবাদে ঘুরুক, কৌটা নাড়িয়ে জোগাড় করা পয়সায় রেশন বিলি করুক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে পঞ্চায়েত অফিস ঘেরাও করুক, নন্দীগ্রামে বন্ধ হয়ে যাওয়া পার্টি অফিস খুলুক আর খেজুরি লাল ঝাণ্ডার মিছিলে সাজুক -বামপন্থীরা কিন্তু ভোট পাবে না! ৭%-র এক ইঞ্চিও এদিক সেদিক হবে না। 
তাহলে ভোট পাবে কে? পণ্ডিতরা সেফলজি গাঁতিয়ে বলেছেন, ভোট পাবেন 'বাংলার গব্বো মমতা'। ঐ যে ওনার খড়ি মাটি ঘষে রাস্তায় আঁকা গোল দাগে করোনা বৃত্তবন্দী হয়েছিল, ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে মিডিয়া খিচিক করে ফটো তুলেছিল, পরের দিনে ফ্রন্ট পেজে সিক্সটি পয়েন্টের গদগদ হেডিং টপকে পড়েছিল; ঐ যে টলিউডের নামকরা গ্রাফিক্স ডিজাইনারা আগুন ঝরা ছবি এঁকেছিল আর কিষানজির সেমি-হাফ-কোয়ার্টার-ফুল ভক্তরা ফেসবুকে 'দিদি-দিদি' করে উদ্বাহু হয়ে নেত্য করেছিল –এসবই নাকি পিকের কনটেম্পোরারি "হাউ টু উইন ইলেকশন"র কপিবুক ব্যাকরণ। মার্কেটে আজকাল নাকি এসবই ট্রেন্ডিং। কমিউনিটি কিচেন-টিচেন, ভুখা মানুষের পেট, যৌথ খামার -ওসব নাকি আজকাল ব্যাকডেটেড ফ্যাশন। 
আর ভোট পাবে কে? বিজেপি। ঐ যে দেখলেন না, দিলীপ ঘোষ আমফানের পর রাস্তায় দাঁড়িয়ে সং সেজে, ঢং করে গাছ কাটলেন, সন্ধেবেলা টক শো তে বাতেলা বাজির ঘুঁটে দিলেন, অগ্নিমিত্রা পল, লকেট চাটুজ্যে সাধ্যমত ফুটেজ খেলেন, আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা না করা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৮৫হাজার এলইডি টিভি লাগিয়ে বক্তৃতা দিলেন –এসবই নাকি অমিত মালব্য-র কনটেম্পোরারি "হাউ টু উইন ইলেকশন"র কপিবুক ব্যাকরণ। মার্কেটে আজকাল নাকি এসবই ট্রেন্ডিং। ওসব 'রক্ত দান জীবন দান' টাইপস শ্লোগান নাকি আজকাল আর কেউ খাচ্ছে না।
তৃণমূল ভোট পাবে কারণ, প্যান্ডেমিক ও আমফানের নির্মম আবহেও ত্রাণ লুটে লিমকা গিনেস বুকে নাম তুলছে তৃণমূল নেতারা। কেন পঞ্চায়েত-ব্লকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা টাঙ্গানো হচ্ছে না? কেন ওয়েবসাইটে তালিকা দেওয়া যাচ্ছে না? কে বানাল তালিকা? প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতি না শাসকদলের এমএলএ? কে সই করলেন তালিকায়? বিডিও না তার অধস্তন? কে পাঠালেন লুটের টাকা? ডিএম না তার অনুসঙ্গিরা  ? টাকা কি খোলামকুচি, না কারোর বাপের সম্পত্তি? লুটের দায় কার? চোরেদের বিরুদ্ধে সরকার কি ব্যবস্থা নিল? মুখ্যমন্ত্রী বলছেন "একটু দুর্নীতি!" কাইন্ডলি আপনারা মুখ্যমন্ত্রী কে এক-টু বিশ্বাস করুন। বোঝার চেষ্টা করুন, চোরেদের কে নিয়েই তো দল চালাতে হয় ওনাকে। তাই ওনার দোষ নেই। দুর্নীতির হিসেব নেই। সৎ প্রশ্নের জবাব নেই। কিন্তু গৃহপালিত মিডিয়া বলছে ভোট আছে। 
তৃণমূল ভোট পাবে কারণ, চিকিৎসার জন্য চোদ্দ ঘণ্টায় পাঁচটি হাসপাতাল-নার্সিংহোমে ঘুরে, মায়ের আত্মহত্যার হুমকি পর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে শুভ্রজিৎ-র। রাজ্যে, খোদ কলকাতায় সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে প্রতিদিন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বাড়ছে। রাজ্যে প্রথম ৫হাজার জন আক্রান্ত হয়েছিলেন ৭৪ দিনে। আর পরের ৫হাজার জন ৩দিনে। রেকর্ড হার আক্রান্ত গত ২৪ ঘণ্টায়। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যে কোভিড আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৬জন। মোট ১০৪৯। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু হার। সর্বনিম্ন পরীক্ষা। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন "সরকার কত করবে?"। ঠিকই তো! কাইন্ডলি আপনারা মুখ্যমন্ত্রী কে এক-টু বিশ্বাস করুন। বোঝার চেষ্টা করুন, এই সরকারের দায় নেই। দায়িত্ব নেই। লজ্জাও নেই। কিন্তু গৃহপালিত মিডিয়া বলছে ভোট আছে।
একান্তই তৃণমূল কে পছন্দ না হলে বিজেপি কে ভোট দিন। কারণ, আপনাকে বলা হয়েছিল 'মমতাকে আটকাতে পারে একমাত্র বিজেপি।' অতএব তৃণমূল ২২ বিজেপি ১৮। এই জরাসন্ধ-সময়ে সেই অমূল্য ১৮জন কোথায়? আমফান আছড়ে পড়ল। ৮৬জনের মৃত্যু হল। ঘর হারালেন কয়েক লক্ষ। তারপরও জল গড়াল মুড়িগঙ্গা, মৃদঙ্গভাঙা, তালপাটি দিয়ে। অথচ আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণার দাবী জানালেন না ১৮জন সাংসদের একজনও। লকডাউনে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি বাড়ল, পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ল, স্যানেটাইজারে ১৮% ট্যাক্স বসল। বিজেপির ইকুয়েশনে বিপর্যস্ত মানুষ নেই। অসহায় মানুষ নেই। বিপন্ন মানুষ নেই। কিন্তু বিজেপির ক্যালকুলেশনে ভোট আছে।    
বিজেপি ভোট পাবে কারণ বিজেপিই তো তৃণমূলের যোগ্য উত্তরসূরি। মিনাখায় হরিণখোল গ্রামে আমফানে যৌথভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করল বিজেপি এবং তৃণমূল। ক্ষতিগ্রস্ত ৫০৫। তালিকা হল ১২২ জনের। ভাগাভাগি তে ক্ষতিপূরণ পেল, তৃণমূলের ৬৭ বিজেপি'র ৫৫। আসল ক্ষতিগ্রস্তরা আঙুল চুষলেন। আর তাই, ৪১% ভোটে নিয়েও তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিজেপির প্রতিবাদ নেই, পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূলের সভাপতির চোখে চোখ রাখার হিম্মত নেই। লড়াই-সংগ্রামের-আন্দোলনের বালাই নেই। অবশ্য দরকারও নেই। কারণ তৃণমূলের সঙ্গে আপোষ আছে। পর্দার আড়ালে সেটিং আছে। 
কেমন সেটিং? কেমন আপোষ? যেমন ধরুন তৃণমূলের চাল চুরি তে বিজেপি স্পিকটি নট। বিজেপির ৪১টি কয়লা খনি নিলাম করলে মমতা ব্যানার্জি স্পিকটি নট। পিএম কেয়ারসের দুর্নীতি তে তৃণমূলের সাংসদরা স্পিকটি নট। আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় দাবী তে বিজেপির বাংলার সাংসদরা স্পিকটি নট। রেলের বেসরকারিকরণে প্রাক্তন রেলমন্ত্রী স্পিকটি নট। গোয়েঙ্কা ছাপ লাগাম ছাড়া ইলেকট্রিক বিলে দিলীপ ঘোষ স্পিকটি নট। কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার খর্ব হলে তৃণমূল স্পিকটি নট। শুভ্রজিৎ-র মৃত্যু নিয়ে বিজেপি স্পিকটি নট।   
তাই চোখ বন্ধ করে গৃহপালিত মিডিয়া কে বিশ্বাস করুন। ত্রাণের চাল চুরি তে রেকর্ড করতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। লোকাল  মস্তান নেতা কে আমফানের ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাৎ করার সুযোগ দিতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। করোনার মৃত্যু হারে দেশের মধ্যে পয়লা র‍্যাঙ্ক ধরে রাখতে তৃণমূলকেই ভোট দিন। সরকারী হসপিটালে শুভ্রজিৎ'দের বিনা চিকিৎসায় মরতে দিতে  তৃণমূলকেই ভোট দিন। 
আমফান কে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা করার দাবী কে সাবোটেজ করতে বিজেপিকেই ভোট দিন। আপনার রক্ত চুষে মুকেশ আম্বানির সম্পত্তি বাড়াতে বিজেপিকেই ভোট দিন। পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়াতে বিজেপিকেই ভোট দিন। তৃণমূলের সঙ্গে আপোষ করে লুটে খেতে বিজেপিকেই ভোট দিন। থানায় বসে তৃণমূলের পুলিশের সঙ্গে খাসি মাংস ভাত সাঁটাতে বিজেপিকেই ভোট দিন। 
আর তৃণমূল কে তাড়াতে চাইলে, বিজেপি কে ঠেকাতে চাইলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে চাইলে, আমফানের ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবী তে সোচ্চার হতে চাইলে, আপনার জীবন-জীবিকার প্রতিদিনের সমস্যার বিরুদ্ধে আপোষ হীন সংগ্রাম চাইলে -প্রকাশ্যে লাল ঝাণ্ডা ধরুন। কারণ গোপনে বিজেপি তো দিদিমণিও করেন।

রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

বেসরকারী পরী ~ অঙ্কুর চক্রবর্তী

কাল রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিলাম, ঘুম আসছিলো না... তাও চোখ বন্ধ করে জোর করে শুয়ে আছি- এমন সময় হঠাৎ বোম্ব্যাচ্যাক লেগে গেলো চোখে; বন্ধ চোখের মধ্যে দিয়েও বেশ বুঝতে পারলুম- ঘরের মধ্যে ঝকমকে আলো!!

চোখ অল্প ফাঁক করে দেখলুম- ঘরের মধ্যে সাদা কাপড় পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে, তার গা থেকেই কেমন যেন আলো বেরোচ্ছে... ঘুমচোখে ভাবছি- ইনি কি পাশের বাড়ির বিধবা ঠাকুমা, না কি রাণাঘাটের মিষ্টিপিসি- তখনই চটকাটা ভেঙে গেলো, আর চেয়ে দেখি- ও মা, এ যে নিযয্যস এক পরী! আমার ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে!!

গায়ে সাদা রঙের গাউনের মত কি যেন একটা, হাতে একটা সাদা লাঠির মতনও কি যেন আছে- লাঠির উপর আবার একটা তারামার্কা কি লাগানো...  মানে, একদম কপিবুক পরী আর কি... যখন দেখতে চেষ্টা করছি অন্য হাতে কাস্তে বা হাতুড়ি আছে কি না (এক হাতে তারা আছে কি না মশাই), পরী বলে উঠলো, "তা, বাবুমশাইয়ের ঘুম ভাঙলো?"

পরীর গলাটা কেমন যেন খ্যানখ্যানে... সে যাগগে; বললুম- "ঘুমাই নি তো; কিন্তু আপনি?..."

- "ধরেছিস ঠিকই, আমি একেবারে আদত পরীই বটে। কিন্তু বয়স হয়েছে, চোখেও ভালো দেখতে পাই না, এই পায়রার খোপের মত ফ্ল্যাটবাড়িতে ঠাওর করতে না পেরে কোন ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে কোন ফ্ল্যাটে ঢুকলুম কে জানে... হিসেবমতো এখানে তো একটা পাঁচ বছর একশো বিয়াল্লিশ দিন বয়সী কচি ফুটফুটে মেয়ে থাকার কথা, তা না, কোথাকার এক আধদামড়া মর্কট শুয়ে আছে..."

আমার ঘরে ঢুকে আমাকেই গাল দেওয়ায় একটু মাথা গরম হলো বৈ কি, কিন্তু ঠিক রিয়্যাক্ট করতে পারলুম না। একে তো পরী-টরী দেখে মাথা কেমন গুলিয়ে গেছে, তারপরে মনে মনে ভেবে দেখলাম- পরীদের ব্যাপারে আমার ডেটাবেস বড়ই কমজোরি। মানে, পরীরা পট করে রেগে উঠে চট করে শাপ দিয়ে ফেলে কি না, ঠিক কী ভাবে কথা বললে পরী তুষ্ট হয়, আর পরী রাগলেই বা কী করতে পারে- এসব কিছুই ঠিকমতো জানা নেই... অতএব, চটিয়ে লাভ নেই।

তাই আমতা আমতা করে বললুম- "এসেই যখন পড়েছেন, একটু বসুন না হয়..."
- "বসবো? বলছিস?" বলেই হাতের ডান্ডাটা দিয়ে ঘ্যাসঘ্যাস করে একটু পিঠ চুলকে নিলো পরী- "তা বসতে পারি, বলছিস যখন এত করে (একবারই বলেছি কিন্তু), কিন্তু কিছু খাওয়া, বড্ড ক্ষিদে লেগেছে।"

ইচ্ছে ছিলো না, কিন্তু ঘুমচোখেও উঠতেই হলো। আহা, খেতে চাইছে একজন, খাওয়াবো না? কিন্তু খাবার আছে কিছু? রান্না করা খাবার তো মনে হয় না কিছু আছে... আর আজকাল বাড়ি থেকে বেশি বেরোইনা বলে বাজারও কম করা হয়, আর সেই বাজার এক হপ্তা চালাতেও হয়। ফ্রিজ খুলে দেখি- একগাদা কোল্ডড্রিংক্স-এর বোতল। খাবার সেরকম কিছু চোখে পড়লো না। গোটাকয়েক টিফিন বাক্স আছে বটে, একটা খুলে দেখি- আধফালি কাঁচা কুমড়ো! আরেকটা খুলে দেখি, আদাবাটা!!

একটা টিফিন বাক্স খুলে কী একটা ঝোলের মত বেরোলো। শুঁকে বুঝলুম- দিন চারেক আগে বানানো মাংসের ঝোল। মাংস ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু ঝোলটা ভালো হয়েছিলো বলে বেঁচে যাওয়া ঝোলটা তুলে রেখেছি। অন্যসময় হলে রাখতুম না, কিন্তু এখন এই লকডাউন আর আনলকের বাজারে সবই দুর্মূল্য। 

কিন্তু ঝোলটা কী দিয়ে দেবো? আচমকা মনে পড়লো, বাড়িতে ফিশফ্রাই বানাবো বলে বাসা মাছের ফিলে এনেছিলাম, রাখা আছে ডিপফ্রিজে। ব্যস, চট করে একটা গ্যাসে ভাত বসিয়ে দিলাম, আর অন্য গ্যাসে একটা বাসার ফিলে নিয়ে, একটু নুন-হলুদ-লঙ্কাগুঁড়ো মাখিয়ে ভেজে নিয়ে, মাংসের ঝোলে দিয়ে বানিয়ে ফেললুম বাসা মাছের কারি। সিম্পল।

তারপর খাবার প্লেটে সাজিয়ে পরীকে ডাকতেই তার তো একগাল হাসি- "ও মা, এত তাড়াতাড়ি কী রান্না করলি রে?"

বললুম- "ভাত আর ভেটকি মাছের কারি..."

- "বাহ বাহ" বলে খেতে বসে এক টুকরো মাছ মুখে দিয়েই পরীর নাকচোখ কুঁচকে মুখটা কেমন ছাতুর পরোটার মত হয়ে গেল- "এটা কী মাছ রে? এটা ভেটকি মাছ? আমি খাস বাংলাদেশের মেয়ে, আমাকে ভেটকি মাছ চেনাচ্ছিস?"

এই রে, ভেটকি না বলে বাসা বললেই বোধহয় ভালো করতাম, রেগে আবার শাপটাপ না দিয়ে দেয়! মিনমিন করে বললাম- "আজ্ঞে, ভেটকি না, বাসা মাছ; একদম ভেটকির মতোই খেতে আর কি..."

- "অ্যাঁহ, একদম ভেটকির মত খেতে না কি! যত্তসব!! ভেটকি আমি খাইনি ভেবেছিস? আর বাড়িতে অতিথি এলে এইসব অখাদ্য-কুখাদ্য খাওয়াস বুঝি?"

মরিয়া হয়ে শেষচেষ্টা হিসেবে বলেই ফেললাম- "আজ্ঞে, পরীদের তো বাসার কারি খাইয়ে সেবা করাই নিয়ম!"

- "নিয়ম? এ আবার কোথাকার নিয়ম রে অলপ্পেয়ে??"

আমতা আমতা করে বললুম- "আজ্ঞে, ঠিক নিয়ম না, তবে বহুদিন ধরে অনেককেই বলতে শুনছি কি না যে...
.
.
.

..

Basarkari hola poriseba vala hoba" 🤭🤭😆😆

শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০

CESC বেসরকারীকরণ ~ সব্যসাচী চ্যাটার্জী

আচ্ছা  CESC নাকি জ্যোতি বোস বেসরকারিকরণ করেছিল...

এটা একটু পড়ে দেখতে পারেন।

সত্যিই কি লাভজনক সরকারি সংস্থা সি.ই.এস.সি. গোয়াঙ্কাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু ? 

লেটস চেক দ্যা ফ্যাক্ট এন্ড ল।

কলকাতার নগরায়নের ইতিহাসে বৈদ্যুতিকরণ ছিল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৮৭৬ সালে কলকাতা মিউনিস্যিপ্যাল কর্পোরেশন গড়ে ওঠে। ১৮৭৯ সালে কলকাতায় প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে বিদ্যুতের আলো জ্বালানো হয়। এই কাজে যার ভূমিকা অবস্মরণীয় তিনি রুকস ইভেলিন বেল ক্রম্পটন নামে এক বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ ও শিল্পপতি। তাঁরই উদ্যোগে ইংল্যান্ডের  আলোকিকরন হয়েছিল।যেকোনো শিল্পের মত এক্ষেত্রেও প্রযুক্তি এবং পুঁজির একত্র উদ্যোগে গড়ে ওঠে  বিভিন্ন ব্রিটিশ বিদ্যুৎ কোম্পানী। যেহেতু ভারতের মত ব্রিটিশ উপনিবেশে বিদ্যুতায়ন শুরু হয়েছিল ইংরেজদের উদ্যোগে সেহেতু সেই উদ্যোগের উদ্যেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক অর্থাৎ এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরবারহ সমস্ত কিছু শুরু হয়েছিল প্রথমত অফিস কাছারি ও শহরের কার্যক্ষেত্রের চাহিদা অনুসারে।যেমন বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে না বুঝলে বিদ্যুতায়ন বা বিদ্যুৎ পরিষেবা বোঝা সম্ভব নয়।তেমন ভারতের বৈদ্যুতিকরণের অগ্রগতি না বুঝলে বিদ্যুৎ পরিষেবার সমস্যা গুলি বোঝা কার্যত অসম্ভব। আম্ফান পরবর্তী সময়ে আমার নিজস্ব মতামত সম্বলিত কয়েকটি পোষ্টে অনেকে অনেকগুলি প্রশ্ন করেছেন, আমি সেই প্রশ্নগুলির জবাব দেবার চেষ্টা করব। বলে রাখা ভালো যে, আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিদ্যুৎ শিল্প বা পরিষেবা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ নই, তাই আমার এই উত্তরগুলিকে একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মীর বক্তব্য হিসাবেই ধরে নেওয়াটাই সঠিক হবে। প্রথমে প্রশ্ন গুলিকে ভাগ করে নেওয়া যাক। 

👉 আম্ফান পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ পুনরায় সংযুক্তিকরনের কাজে কোলকাতার বিদ্যুৎ সরবারহ সংস্থার ব্যর্থতা কি সঙ্গত? মানে তাঁদের কি কিছুই করার ছিলনা ? 

👉ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাল্পাই কর্পোরেশন কি শুধুই একটি বেসরকারি সংস্থা ? সরকার বা পুরসভার কিছুই কি করার নেই ?

👉বামফ্রন্টের আমলে কি ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন সরকারি নিয়ন্ত্রনমুক্ত করে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ? বিদ্যুৎ পরিষেবার ক্ষেত্রে এক্ট অফ গড বা ফোর্স মেজিওর ক্লজ কি কার্যকরী এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে ?

👉একটি অত্যাবশ্যক পরিষেবা প্রদানকারী বেসরকারি সংস্থার উপর সরকারের কি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই ?

নীচের ফ্যাক্টস গুলি দেখলেই উপরের প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়া যাবে। 

*পরাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রঃ
.............................................

পরাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্র ছিল সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে। একমাত্র বিদ্যুতের দাম নিয়ন্ত্রণের মত কয়েকটি ক্ষেত্রে আঞ্চলিক অথবা প্রাদেশিক সরকারগুলির ভূমিকা দেখা যায়।১৮৯৭ সালে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন গড়ে ওঠার প্রায় ষোল বছর আগে কলকাতায় প্রথম বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো হয়।সেটা ১৮৮৭ সালে চালু হয় কলকাতার বৈদ্যুতিকরনের আইন। এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবার কাজে কোনো কোম্পানীকে নিয়োগ করার ধারা ছিল না।১৮৯৬ সালে রুকস সাহেব গভর্মেন্ট বাহাদুরের আমন্ত্রণে এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো লাইসেন্সী নিয়োগের ধারা বানানোর জন্য ... কাজ শুরু করেন। এই সময়েই ১৯০০ সালে  সি.ই.এস. সি একচেটিয়া বিদ্যুতায়নের লাইসেন্স পায়।১৮৭৯ সালের ২৪ শে জুলাই কোলকাতায় P.W. Fleury and Co. এর উদ্যোগে প্রথম পরীক্ষামূলক ভাবে আলো জ্বালানো হয়।কলকাতার বৈদ্যুতিকরনের ক্ষেত্রে ইংরেজদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রখ্যাত ইংরেজ বিদ্যুৎ শিল্পপতি রুকস ইভলিন বেল ক্রম্পটন তিনি ইংরেজ সরকারকে প্রথম বিদ্যুত আইনের খসড়া বানাতে সহায়তা করেন।১৮৮৭ সালে বিদ্যুৎ আইন আসে। এই আইনে বিদ্যুৎ পরিষেবার কাজে কোনো কোম্পানীকে নিয়োগ করার ধারা ছিল না।  ১৮৯৫ সালে ক্যালকাটা ইলেক্ট্রিক লাইটিং এক্ট আসে। এই আইনে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে লাইসেন্সী নিয়োগ পদ্ধতির কথা বলা হয়। এই আইন অনুসারে ১৮৯৭ সালে মেসার্স Kilburn and Company যা Indian Electric Company র এজেন্ট একুশ বছরের জন্য  কোলকাতার বিদ্যুৎ লাইসেন্স পায়। ১৮৯৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় Indian Electric Company র নাম  Calcutta Electric Supply Corporation Ltd. হয়। তারা কলকাতা ও লাগোয়া অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবারহের ইজারা (লাইসেন্স) লাভ করে। ১৯১০ সালের ভারতীয় বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী সরকারের হাতে লাইসেন্স দেবার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু বাজারে একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী অভিজ্ঞতার কারনে সি.ই.এস.সি. বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে মনোপলি অর্জন করে। সেই থেকেই কলকাতায় এই কোম্পানীটির মনোপলির জন্ম।

সি.ই.এস.সির ক্ষেত্রে সরকার বা পুরসভার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেও কিছু বক্তব্য আছে। আইন অনুসারে সি.ই.এস.সিকে সমস্ত সহায়তা করার দায়িত্ব সরকারের ও নির্দিষ্ট ভাবে বললে, পুলিশ ও প্রশাসনের। একই ভাবে, দুর্যোগের প্রশ্নে সরকারকে আবশ্যিক সহায়তা করার দায়িত্ব সি.ই.এস.সি বা অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার। তাই কিছুই করার নেই বলাটা শুধুই মুর্খামি। মানুষকে চরমতম বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচানোর বদলে তাকে বিপদের সামনে ফেলে দেওয়ার জনৃ। চলুন ইতিহাসের পাতা থেকে একটু খুঁজে দেখার চেষ্টা করি এই ধরনের সংকট কিভাবে মোকাবিলা করা হয়েছিল কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে। এই প্রশ্নের উত্তরটি খুঁজতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে ১৯২৪ সালে। সেই যে বছর কোলকাতা কর্পোরেশন স্বরাজ পার্টির দখলে আসে।মেয়র হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস।এই সময় কলকাতা কর্পোরেশনের সাথে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের নানা বিষয়ে সংঘাত বাধে।প্রথমত, সেইসময় সি.ই.এস.সির সাথে বিরোধ হয় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে তাদের একচেটিয়া অধিকারের ইস্যুতে। সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কলকাতা কর্পোরেশন চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে বিদেশী নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ পরিষেবা কোম্পানীর জায়গায় দেশীয় কোম্পাণীগুলিকে উৎসাহিত করে।মনে রাখা দরকার এই যে এই সময় কলকাতা কর্পোরেশনের কাছে না ছিল ক্ষমতা, না ছিল আর্থিক সামর্থ।১৯৩০ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় থেকেই স্বরাজ পার্টির নিয়ন্ত্রণে থাকা কলকাতা কর্পোরেশন বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবীতে সি.ই.এস সি. কে চাপ দিতে থাকে। এই চাপ সৃষ্টির ফলে ১৯৩৩ সালে সি.ই.এস.সিকে তাদের বিদ্যুতের দাম কমাতে হয়।আসলে কলকাতা তথা ঔপনিবেশিক ভারতের বৈদ্যুতিকরণ না বুঝলে আজকের সমস্যা বোঝা যাবে না।

স্বাধীন ভারতে বিদ্যুৎ ক্ষেত্রঃ
....…....................................
বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে বুঝতে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে সরবারহ সবটাই বুঝতে হবে। দেশ স্বাধীন হবার পর পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। সরবারহ সুনিশ্চিত করতে রাজ্যে রাজ্যে স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি বোর্ড গঠিত হয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে।পশ্চিমবঙ্গে ১৯৫৫ সালে তৈরি হয় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ। ২০০৩ সালের কেন্দ্রীয় আইন অনুসারে এই সংস্থাটি অবলুপ্ত হয়ে বর্তমানে দুটি কোম্পানি গড়ে উঠেছে ২০০৭ সালে। প্রথমটি, পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য বিদ্যুৎ বন্টন নিগম বা ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ইলেকট্রিসিটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী‌। অন্যটি (WBSETCL-Transmission Co. Ltd.)। সংবিধান অনুসারে বিদ্যুত হল একটি যুগ্ম তালিকাভুক্ত বিষয়। ফলত, কেন্দ্রীয় আইনের বাইরে গিয়ে রাজ্যগুলি আইন বানালেও কেন্দ্রীয় আইন লাগু হয়। দেশের সংবিধান ও আইন ঘাঁটলে আমরা দেখি বিদ্যুৎ একটি অধিকার।সুপ্রীম কোর্ট বা হাইকোর্টের রায় দেখলে আমরা আরো দেখি যে, বিদ্যুৎ সংযোগ আমাদের  জীবনের অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।কারন জল বা বিদ্যুতের মত পরিষেবাগুলি মানুষের বেঁচে থাকার শর্ত। ঠিক যে কারনে কলকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন একটি বেসরকারি সংস্থা হলেও পরিষেবা প্রদানের চরিত্র অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট সংবিধানের ২২৬ নং অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্দেশ জারী করতে পারে। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত সি.ই.এস.সি. গেজেটে কথা কোম্পানীর অন্যতম উপদেষ্টা শ্রী এস.কে রায় লিখেছিলেন যে, এটি দেশের হাতে গোনা বেসরকারি সংস্থাগুলির একটি যারা জন হিতকর ক্ষেত্রে নিয়োজিত।এই কারনেই তাদের একচেটিয়া অবস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। তাই আর পাঁচটা বেসরকারি সংস্থার সাথে সি.ই.এস.সির তুলনা করা যুক্তিসংগত নয়।সি.ই.এস.সি র ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে কোনোদিনই সি.ই.এস.সির পরিচালনা সরকারের হাতে ছিলনা ১৯৭০ সালে শুধুমাত্র লন্ডনের পরিচালকমন্ডলীর হাত থেকে ভারতের পরিচালক মন্ডলীর হাতে আসে। ভারতীয় করনের জন্য ১৯৭৮ সালে ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই  (ইন্ডিয়া) লিমিটেড নাম হয় কোম্পানীর।১৯৮৭ সালে এই কোম্পানীর নাম বদল করে হয় সি.ই.এস.সি. লিমিটেড। অর্থাৎ, এগুলো শুধুই নাম বদল। জনহিতকর ক্ষেত্রে নিয়োজিত  একটি বেসরকারি কোম্পানীর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাখতে ১৯৯৮ সালে ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশন আইন আসে। এতদিন শুধু লাইসেন্সের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। এবার বিদ্যুতের দাম নির্ধারনের ক্ষেত্রে সেই নিয়ন্ত্রণ এলো।১৯৮৯ সাল থেকে সি.ই.এস.সির সঙ্গে গোয়েঙ্কাদের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।সেই ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা লাইসেন্সের ভিত্তিতেই তাঁরা কাজ করে আসছে। তাই লাইসেন্স দেবার ক্ষেত্রে বিধান রায়, জ্যোতিবসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিংবা মমতা বন্দোপাধ্যায় নতুন কিছু করেন নি।

গোয়েঙ্কা ও সি.ই.এস.সি
.....................................

এবার আসি আশির দশকের শেষের সি.ই.এস.সির শেয়ার কেনায় প্রশ্নে। সঞ্জীব গোয়েঙ্কার প্রয়াত বাবা রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কা দেশের অধিগ্রহণ সম্রাট বা টেকওভার কিং  বলে পরিচিত ছিলেন, ১৯৮৯ সাল থেকে সি.ই.এস.সি র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এটি ছিল একটি বেসরকারি সংস্থার আভ্যন্তরীণ ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। ভারতের কোম্পানী আইন অনুসারে এক্ষেত্রে কোনো সরকারের কোনো ভূমিকা থাকেনা। জ্যোতি বসু সরকারেরও কোনো ভূমিকা ছিলনা।
২০০৩ সালের আগে চালু থাকা তিনিটি কেন্দ্রীয় আইনকে একত্রিত করে ইলেকট্রিসিটি এক্ট ২০০৩ আসে। এই আইনে স্পষ্ট করে ভারতের বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকার প্রশ্নে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আসে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হল বেসরকারি সংস্থাগুলিকে লাইসেন্স দেওয়া ও একই জায়গায় দুটি সরবারহ কোম্পানীকে বিদ্যুত সরবারহের জন্য রাস্তা খুলে রাখা। এই প্রথম আইন করে একচেটিয়া সরবারহের সুযোগ পরিবর্তন করা হয়। সৃষ্টি হয় খোলা বাজারের প্রতিযোগিতা।তাহলে মমতা ব্যাণার্জীর সরকারের দোষ কোথায় ? না সি.ই.এস.সির আভ্যন্তরীণ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের হাত নেই।

কিন্তু পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিসের ক্ষেত্রে ডিসাসটার ম্যানেজমেন্ট এক্ট অনুযায়ী রাজ্য সরকার নিশ্চিত ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সি.ই.এস.সিকে।মমতা ব্যাণার্জী তা করেন নি।  বিদ্যুত বন্টন নেটওয়ার্কের যথাযথ মেনটিন্যান্সতো যেকোনও ইউটিলিটির পেরেনিয়াল নেচারের কাজ। সেই নেচারের কাজ যুগ যুগ ধরে ঠিকা শ্রমিকদের দিয়ে করানোটাইতো 'কন্ট্রাক্ট লেবার (রেগুলেশন এন্ড এ্যাবোলিশন) আইনে নিষিদ্ধ। বাকি রইল, এই কাজে যুক্ত স্থায়ী কর্মীবাহিনী যাদের লকডাউন ইত্যাদির কারনেও  যাদের বেতনে এখনও হাত পড়ে নি। তাহলে, যথেষ্ঠ পূর্বাভাস থাকা সত্বেও আগাম সতর্কতামূলক ম্যানপাওয়ার মোবিলাইজেসন করা যায় নি। শ্রমিকরা সব দেশে চলে গেছে বলে যুক্তিটা খুবই নড়বড়ে। সারা দেশে পরিযায়ী শ্রমিকরা যে সমস্যায় ঘরমুখি হতে উদগ্রীব হয়েছে, তা হল কর্মহীনতার সঙ্গে যুক্ত উপার্জনহীনতা এবং অনাহার। সিইএসসির একজন শ্রমিকেরওতো সেই সমস্যা নেই। তবে কেন তারা দলে দলে নিজের দেশে চলে যাবে ? একদম বাজে কথা। এছাড়া, আমরা জানি রাজ্য বন্টন সংস্থার প্রায় সব বন্টন সংযোগ ওভারহেড তারের মাধ্যমে হওয়ায়, ট্রাডিশনালি তারা খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাস থাকলেই নাগরিক সুরক্ষার জন্য নিজেরাই সংশ্লিষ্ট এলাকায় সব ট্রান্সফরমার বন্ধ করে গ্রাহককে সরবরাহ স্থগিত রাখে। আবার, আবহাওয়া ঠিক হলেই সেগুলি সচল করে দেয়। অথচ, সিইএসসি তে বন্টন ব্যাবস্থা ঠিক উল্টো। প্রায় সর্বত্র (এটা ৯৫% ক্ষেত্রে বলা যায়) আন্ডারগ্রাউন্ড তারের মাধ্যমে বন্টন। এখানেই তাদের যত ব্যর্থতার কারন লুকিয়ে আছে যা পেশাদারীত্বের বিলোপের জন্য তারা বুঝতে পারে নি। আন্ডারগ্রাউন্ড ডিসট্রিবিউসন নেটওয়ার্কেরও যে নিয়মিত পরীক্ষা, পরিচর্যা দরকার তা তারা কোনো দিনই ভাবে নি, করে নি। তাদের হয়ত একটা ধারনা তাড়া করে যে, মাটির ওপরে রাস্তা ইত্যাদি যতই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাক, ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কের কোনও ক্ষতি সম্ভব নয়। আমরা রোজ দেখছি, একজন একসময়ের গামোছা বিক্রেতা বা চা ওয়ালাও পৌরসভাগুলি থেকে এখন রোড রিপেয়ারিং এর বরাত পাচ্ছে। সোসাল মিডিয়ায় দেখেছি সেই রাস্তার হাল কি। আজ প্রমানিত হল যে, সিইএসসি গ্রাহকের বাড়ীর মিটার যেমন নিয়ম করে বদলে ফেলে, তেমনিভাবে ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্কটাও শতবর্ষ প্রাচীন হয়েছে। তাকে ধাপে ধাপে বদলানোর সময় পার হয়েছে। হ্যাঁ, গাছ কাটা সিইএস সির কাজ নয় বলেই, তেমন পরিকাঠামো তাদের নেই। কিন্তু, সেনা বাহিনী আগাম জানিয়ে জরুরী ভিত্তিতে সেই কাজ করতে এসে, আমরা জেনেছি, সিইএসসির লোকজনের অভাবে দু'ঘন্টা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হয়েছে। তারাতো আগে ঐ সমস্ত ভেঙ্গে পড়া গাছে জড়িয়ে থাকা জীবন্ত তারগুলো বিচ্ছিন্ন করবে। তবে তো বাহিনী মহিরুহ কাটবে, সরাবে। ভেঙ্গে পড়া গাছে জড়িয়ে থাকা তারগুলো বিচ্ছিন্ন না করে, অন্য কাজ শুরু করাটাই প্রাণঘাতি। অতএব, আমরা যতক্ষন না সময় পাই, বাহিনী ততক্ষন হাত গুটিয়ে অপেক্ষা করুক। একেই কি বলে সবাই হাতে হাত মিলিয়ে বিপর্যয়ের মোকাবিলা করা ?ঠিক এই খানেই ভুল হচ্ছে ম্যাডাম।তাই প্রশ্ন উঠছে, আপনার আমলে বঙ্গ বিভূষণ সঞ্জীব গোয়েঙ্কার কোম্পানি বলেই কি আপনি ছাড় দিচ্ছন! সামলান, ম্যাডাম সামলান।বিজেপি ইতিমধ্যেই মনোপলি ভাঙার কথা বলছে। সাধারণত তা ভাঙার দল তারা নয়। তাই, আশঙ্কা করছি মনোপলি ভাঙার নামে আম্বানীদের দালালি হয়ে যাবে না তো ? ভারতের বিদ্যুৎ শক্তি ক্ষেত্রে তারা কিন্তু বিগ প্লেয়ার। তখন সামলাতে পারবেন না।

ও আর একটা কথা ম্যাডাম। সাধারণত পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিস দেওয়া কোম্পানীগুলি মূল কোম্পানীর টাকা অন্য কোনো কোম্পানীতে ব্যবহার করতে পারে না... এও জানি এই নিয়মটা করা হয়েছে রেগুলেটারি কমিশনের তত্বাবধানে মূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে। তবে কানা ঘুষো যা শুনছি মানে কোয়েস্ট মল, স্পেনসর্স, সিইএসসি প্রপার্টিজ ইত্যাদি ইত্যাদি আর কি ! তাতে আপনার আরো সচেতন থাকা উচিৎ এদের ব্যাপারে। আফটার অল 'বেওসায়ী' তো!!মুনাফা ছাড়া কিচ্ছু করে না। মূলত, 'জনস্বার্থ' দেখাটা কোনও বেনিয়ার কাজ নয়।

গুলজার ~ অরিজিৎ গুহ

বোম্বের খেতওয়ারি মেন রোডের ওপর 'রেড ফ্ল্যাগ হল' তখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির পার্টি কমিউন। আটটা ঘর আর একটা হলঘর নিয়ে সেই কমিউনের অবস্থান। হলঘরে বসত পার্টির মিটিং আর আটটা ঘরে থাকতেন পরিবার সহ বিভিন্ন কমরেডরা। সেখানেই জীবনের প্রায় সারাটা বছর কাটিয়েছেন আলি সরদার জাফরি তাঁর স্ত্রী সুলতানা জাফরি আর দুই পুত্রকে নিয়ে। এখানে বসেই উনি খাজা আহমেদ আব্বাসের 'ধরতি কে লাল' সিনেমার গানের লিরিক্স সহ আরো অসাধারণ কিছু উর্দু কবিতার জন্ম দিয়েছেন।
   সদ্য সদ্য তখন পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠেছে। প্রকাশ্যে কাজকর্ম করা শুরু করেছে পার্টি। সেই সময়েই সরদার জাফরি রেড ফ্ল্যাগ হল এ নিয়ে এলেন একজন তরুণ পার্টির হোলটাইমার কমরেডকে। সাথে তাঁর স্ত্রী আর বছর খানেকের এক কন্যাসন্তান। একটা ঘর তখন ফাঁকা হয়েছে একজন কমরেড ছেড়ে দেওয়ার জন্য। সেই ফাঁকা ঘরে থাকতে এলেন সেই কমরেড। আইপিটিএর সক্রিয় কর্মী সেই তরুণ নিজের ব্রিফকেসে সব সময়ে পার্টির কার্ড নিয়ে ঘুরতেন। কেউ জিজ্ঞাসা করলেই কার্ডটা বের করে বলতেন 'এটা আমার জীবনের সবথেকে বড় সম্পদ'। 
   তরুণ কমরেডটি পার্টির কাজের পাশাপাশি লেখালেখিও করেন। ইতিমধ্যে বেশ কিছু উর্দু কবিতা লিখে মোটামুটি একটা পরিচিতি পেয়েছেন। রেড ফ্ল্যাগ হল এ এসে সেই তরুণ কমরেড একটা ইয়াং রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন গড়ে তুললেন। প্রতি রবিবার হলঘরে ইয়াং রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের তরুণ সাহিত্যিকদের গল্প ও কবিতা পাঠের আসর বসে।  সেই আসরে আসত সাগর সারহাদি, জাফর গোরখপুরি ইত্যাদি। এরা প্রত্যেকেই আবার আইপিটিএরও সদস্য। এদের সাথে সাথেই ফর্সা লম্বা মতন আরেকটি ছেলে আসত। নাম ছিল সম্পূরণ সিং কালরা। সদ্য সদ্য দেশভাগের পর সম্পূরণের বাবা মাখখন সিং তাঁর পরিবার নিয়ে বোম্বে চলে এসেছিলেন। ছেলের লেখালেখি করার খুব শখ, কিন্তু কোনো কারণে বাবা মাখখন সিং এর লেখালেখি ব্যাপারটা খুব অপছন্দের। জীবন ধারণের তাগিদে সম্পূরণ সিং নানা রকম ছোটখাটো কাজকর্ম করে যাচ্ছে বোম্বেতে। তার মধ্যেই একটা গ্যারেজে মোটর মেকানিকের কাজ করে কিছু পয়সা আসতে শুরু করেছে। এরই সাথে বাড়িতে বাবাকে লুকিয়ে চলছে সাহিত্যচর্চা। সেই সাহিত্যের তাগিদেই আসা শুরু হল রেড ফ্ল্যাগ হল এ।
   তরুণ কমরেডটি কবি হিসেবে পরিচিত হলেও উপার্জনের দিক থেকে সেরকম কিছু করতে পারছিলেন না। এদিক ওদিক পত্র পত্রিকায় লিখে কিছু হয়ত উপার্জন হয়, কিন্তু কন্যা সন্তানের পর আবার এক পুত্র সন্তান যখন হল তখন সত্যিই খুব বিপদে পড়লেন তিনি। যদিও তাঁর স্ত্রী তখন পৃথ্বি থিয়েটারের অভিনেত্রী, কিন্তু সংসারের সুরাহা কিছুতেই হয়ে উঠছে না। এরকম এক সময়ে এক নামী পরিচালকের এক সিনেমায় গান লেখার অফার এলো। ঠিক তার পরপরই আরো কিছু ছবিতে গান লেখার সুযোগ পেলেন। কিন্তু কপাল এমনই খারাপ যে গানগুলো হিট করলেও ছবিগুলো খুব বেশি হিট করল না। সিনেমার জগতে সেই তরুণের ছাপ পড়ে গেল দুর্ভাগা বলে। সেই জন্য আর কেউই এগিয়ে এলো না সিনেমার কাজ নিয়ে।
   বেশ কয়েক বছর বাদে রেড ফ্ল্যাগ হল এ সেই কবির ঘরে এলেন এক পরিচালক। তাঁর পরের ছবিতে সেই কবিকে দিয়ে তিনি গান লেখাতে চান। শুনে কবি বললেন, কেন শুধু শুধু আমাকে দিয়ে লেখাচ্ছেন? লোকে বলে আমার গান খারাপ নয়, তবে আমার নসীব খুব খারাপ। আপনি ডুবে যাবেন। শুনে সেই পরিচালক বললেন আমার নসীবও খুব খারাপ বুঝলেন। পরপর কয়েকটা ছবি আমার ফ্লপ করেছে। একবার ভাগ্যের চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেখাই যাক না।
   নেওয়া শুরু হল ভাগ্যের চ্যালেঞ্জ। ১৯৬২ সালের ভারত চিন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে তৈরি সেই সিনেমা রিলিজ করল ১৯৬৪ সালে। চেতন আনন্দের পরিচালনায় 'হাকিকত' জিতে নিল ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড সহ নানা পুরষ্কার। গীতিকার সেই কবি কইফি আজমির লেখা গান  'কার চলে হাম ফিদা জান ও তান সাথিও/ আব তুমহারে হাওয়ালে ওয়াতন সাথিও' গানটা ফিরতে লাগল সবার মুখে মুখে। আজও সেই গান অমর হয়ে রয়েছে।

   এর ঠিক আগের বছরই ১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় বিমল রায়ের শেষ ক্লাসিক 'বন্দিনী', যেখানে সেই মোটর মেকানিক সম্পূরণ সিং ছেলেটি গীতিকার হিসেবে নজর কেড়ে নিয়েছে অনেকের। বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য তার বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই সম্পূরণ সিং এর বদলে নিজের নাম সে লিখত 'গুলজার'।

বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২০

বামফ্রন্টের ৩৪ ~ ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত

৩৪ বছরে এমন কী কী হয়েছিল যার জন্যে আপনার এত গর্ব?
মাঝে মাঝে এরকম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান নাকি?
বন্ধু সংখ্যাতত্ত্ববিদ ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত আপনার জন্যে ১৫টি ( মাত্র ১৫) কারণ রেডি করে দিয়েছেন। 
ভূমি সংস্কার আর পঞ্চায়েত বাদ রেখে  ।  
চোখ বুলিয়ে নিন , গর্বের ৩৪ কেন আমাদের উদ্বুদ্ধ করে আজও। 

১. সাক্ষরতা, গড় আয়ুষ্কাল ২০১১ সাল পর্যন্ত  জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। 
২. মহিলা থেকে পুরুষ সাক্ষরতার ব্যবধান: ভারতের গড়ের  চেয়ে অনেক কম। 
৩. শিশু মৃত্যুর হার - ভারতের তুলনায় অনেক কম। 
৪. বছরের শিশুর মৃত্যুর হার - ভারতের তুলনায় অনেক কম । 
৫.  ভারতের তুলনায় শিশু অপুষ্টি সূচক কম। 
৬. ভারতের সর্বনিম্ন প্রজনন হারের  (ফারটিলিটি রেট) মধ্যে একটি। 
৭. একমাত্র রাজ্য যেখানে রাজ্য সরকার পরিচালনাধীন  শীর্ষস্থানীয় দুটি  বিশ্ববিদ্যালয়  দেশের সর্বোৎকৃষ্ট দশটির তালিকায় ।
৮. কাঠামোগতভাবে খাদ্য ঘাটতি রাজ্য  খাদ্য রফতানিকারী রাজ্যে   পরিণত হয়েছে। 
৯. কাঠামোগতভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি রাজ্য  বিদ্যুত- উদ্বৃত্ত অবস্থায় পরিণত । 
১০.  গ্রামীণ দারিদ্র্যের হারের বিচারে    ১৯৭৩-৭৪ সালে ভারতের মধ্যে সর্বোচ্চ যে রাজ্য , ২০১১-১২-এর মধ্যে সেখানে গ্রামীণ দারিদ্র্য জাতীয় হারের নিচে হ্রাস পায় । 
১১. এনসিআরবি'র পরিসংখ্যান অনুসারে, গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তর দশকে  সর্বাধিক অপরাধ প্রবণ রাজ্যগুলির মধ্যে  অন্যতম এমন একটি রাজ্য  ২০০০ সালে ন্যূনতম অপরাধের রাজ্যগুলির একটিতে পরিণত হয়েছিল। 
১২. সবচেয়ে দাঙ্গা-প্রবণ রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম একটি রাজ্য  স্বল্পতম ধর্মীয় সংঘর্ষের একটিতে পরিণত হয়েছিল। ১৩.  ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বৃদ্ধির   হার দেশের সর্বোচ্চ। 
১৪. কৃষক আত্মহত্যা  অতি সামান্য  পর্যায়ে। 
১৫. ১৯৮৭-২০১১ সালের মধ্যে পূর্ব ও উত্তর পূর্ব ভারতের সব বড় রাজ্যের মধ্যে দ্রুততম জিএসডিপি প্রবৃদ্ধি। 
১৬. ২০০৪-২০১১  পর্যন্ত  ভারতে সমস্ত নতুন উত্পাদন কাজের ৪০% সৃষ্টি হয় এই রাজ্যেই। 

তাই একটু গর্ব তো করাই যায় ৩৪ নিয়ে, বলুন?

বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০

ভারতীয় রেল বেসরকারীকরণ ~ শতদ্রু দাস

রেলের বেসরকারীকরণ নিয়ে কিছু ভুল ভাল মিথ্যে কথা বাজারে ঘুরছে,  যারা কিছু না জেনে না বুঝেই "basarkari hola bhalo hoba" বলে থাকে তারা সেগুলো চোখ কান বুজে খাচ্ছেও। তাই কয়েকটা কথা বলা জরুরি।

১. বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে, যেখানে বহু মানুষ ট্রেন ব্যবহার করেন, সেখানে রেল সরকারি সংস্থা বা পাবলিক সেক্টর ইউনিট।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ক্যানাডাতে রেল বেসরকারী কিন্তু ওই দেশগুলোতে খুব কম সংখ্যক মানুষ রেল ব্যবহার করেন। এসব দেশগুলোয় সাধারণ মানুষের যাতায়াতের উপায় হলো গাড়ি বা বিমান। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায়  অধিকাংশ স্থানে বিমান ভাড়া রেল ভাড়ার চেয়ে সস্তা বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রায়। এসব দেশগুলোতে রেল মূলত  বিলাসবহুল যাত্রার জন্য ব্যবহৃত হয়, পর্যটকরা ব্যবহার করে। 

৩. ইউরোপের সর্ববৃহৎ রেল সংস্থা ফ্রান্সের এসএনসিএফ, সরকারী সংস্থা। দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ হলো জার্মানির ডয়েচ বান, সেটাও পাবলিক সেক্টর ইউনিট।

৪. বিশ্বের সর্ববৃহৎ রেল নেটওয়ার্ক যে দেশের সেটি হলো চীন। বলাই বাহুল্য যে সেখানে রেল সরকারী সংস্থা।

৫. জাপান হলো এক মাত্র দেশ যেখানে  সাধারণ মানুষ রেল ব্যবহার করেন, রেলের নেটওয়ার্ক বৃহৎ, এবং রেল মূলত বেসরকারী (সরকারীও আছে, তবে সবচেয়ে ব্যস্ত রুটগুলো বেসরকারী।) কিন্তু জাপানের রেল বেসরকারীকরণ হয়েছে এক বৃহৎ কেলেঙ্কারির ওপর দাঁড়িয়ে, যার গল্প  ভারতের ক্ষেত্রে খুবই প্রযোজ্য। ভারতের মতোই জাপানের রেলও সম্পূর্ণ সরকারী সংস্থা ছিল ৮০-এর দশক অবধি। ৮০-এর দশকে জাপানে রেল বেসরকারীকরণ হয়, কিন্তু জাপানের রেলের বিপুল ঋণভার কোনো বেসরকারী সংস্থাই নিতে নারাজ হয়। তাই বেসরকারীকরণের জন্য এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করে জাপান সরকার। একটি সরকারী সংস্থা বানিয়ে রেলের যাবতীয় ঋণ সেই সংস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেই ঋণের মোট পরিমাণ ২৪ লক্ষ কোটি টাকা আজকের টাকার অংকে, তৎকালীন জাপানের জাতীয় আয়ের চেয়েও বেশি। যে সব বেসরকারী সংস্থা রেলের নেটওয়ার্ক কিনবে তাদের সাথে এই মর্মে চুক্তি হয় যে প্রতি বছর রেল চালিয়ে লাভের একটা অংশ তারা দেবে এই ঋণগ্রস্ত সরকারী সংস্থাটিকে যা দিয়ে সেই ঋণকে একটু একটু করে শোধ করা হবে। যদি লোকসান হয় বা লাভ খুব কম হয় তাহলে বেসরকারী সংস্থাগুলোর কোনো দায় থাকবে না ঋণ শোধের। অর্থাৎ ভালোটা প্রাইভেট কোম্পানির, খারাপের বোঝা শুধু সরকারের। এরপর রেল চালাতে গিয়ে দেখা যায় যে বেসরকারী সংস্থার ল্যাজে গোবরে দশা, বিপুল কর্মী ছাঁটাই করেও তারা লাভ করতে হিমশিম খাচ্ছে, ঋণ শোধ করতে গিয়ে রেলের লাইন বা স্টেশন বা জমি বিক্রি করতে হচ্ছে। তখন সরকার ঠিক করে যে মানুষের করের টাকা থেকেই ধার মেটানো হবে, বেসরকারী সংস্থার দায় নেই। সেই ২৪ লক্ষ কোটি টাকার ভেতর ১৬ লক্ষ কোটি টাকা এখনো পর্যন্ত মানুষের করের টাকা থেকেই মিটেছে, বাকিটা এখনো বকেয়াই পড়ে আছে। অর্থাৎ ভাবুন, বেসরকারীকরণ করতে গিয়ে মানুষের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে বেসরকারী সংস্থাকেই সাবসিডি দিতে হয়েছে। 

ভারতে রেল বেসরকারীকরণ হলে সেটাও ওই জাপানী পথেই হওয়ার সম্ভাবনা। ভারতীয় রেল একসময় অনেক অংশেই বেসরকারী ছিল, সেগুলোকে সরকার বাধ্য হয়ে গ্রহণ করে কারণ বেসরকারী সংস্থাগুলো একে একে বন্ধ হয়েছিল। রেলের কোচ, কামরা, রেল লাইন বানানোর বহু সংস্থা কয়েক দশক আগেও বেসরকারী ছিল, তাদের ভরাডুবি হতেই সরকার বাধ্য হয়ে সেগুলো গ্রহণ করে। চোখের সামনেই উদাহরণ বার্ন স্ট্যান্ডার্ড আর টেক্সম্যাকো। বার্ন স্ট্যান্ডার্ড সরকার অধিগ্রহণ করে, আর টেকসম্যাকো ধুঁকছে, সরকারী খয়রাতির ওপর বেঁচে আছে।