সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০১৫

​ শিল্প বিচার ~ কৌশিক সেনগুপ্ত

সিংহাসনে বসল রানি, বাজলো কাঁসর ঘন্টা,
ছটফটিয়ে উঠল কেঁপে সুব্রতদার মনটা,
রানি বলে, 'মন্ত্রী আমার রাজ্যে নেইকো শিল্প?'
মন্ত্রী বলে, 'ল্যাংচা সেটা শিল্প তো নয় অল্প।'
রানি বলেন 'অল্প বেশি দেখুক গিয়ে ববি',
ববি বলে 'আমার কেবল চেতলাটুকুই লবি'।
রানি হাঁকেন 'বোলাও তবে...বেহালার ঐ পার্থ',

মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০১৫

কদিন হল – শুভাশিষ আচার্য্য

কদিন হল সাহস গুলো বেড়াতে গেছে কিছুনা বলে
কেন্নো যেন কুঁকড়ে থাকি, বুকেতে হাত, বল নেইতো
পণ্য জন্ম হয়েছে কবে, কে জানে কখন লুঠ চলছে
জন্ম ভর দাস জন্ম, মাথাটা নুয়ে নিচের দিকে
কদিন হল সাহস গুলো বেড়াতে গেছে কিছুনা বলে

ওর চোখ দিয়ে – শুভাশিষ আচার্য্য

-- হ্যালো বাবা..
-- হ্যাঁ মা বল
-- কি করছিলে বাবা
-- এই একটু শুয়ে আছি একটু ক্লান্ত লাগছে তাই
-- ... তুমি ভাল আছ বাবা
-- হ্যাঁ রে মা ভাল আছি তুই চিন্তা করিস না
-- হ্যালো বাবাইরে
-- হুমম

না-মানুষের উপকথা - সুদীপ্ত চক্র

স্কুল থেকে ছেলে ফিরতেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল স্কুলের সাদা জামাটায় লাল ছোপ ছোপ দাগ, চুলগুলো সব এলোমেলো কাঞ্চন দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ছেলেকে
- কি হয়েছে বাবা ? জামায় এত রক্ত এলো কোথা থেকে !
ছেলে চুপ করে থাকে
কাঞ্চন কি বলবে ভেবে পায় না তার ছেলেতো এমন নয় শান্ত স্বভাবের ছেলের আজ হঠাত্ কি হলো ! ভেবে পায় না কাঞ্চন
- কি হয়েছে বাবা বল আমায়, কেউ কি তোকে মেরেছে ? রাস্তায় কোন দুর্ঘটনা হয়েছে ? চুপ করে থাকিস না বল আমায়

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০১৫

মেঘমুলুকে ঝাপসা পথে... - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

সোঁদা সোঁদা গন্ধ, ভিজে ভিজে রাস্তা, ঝিম ঝিমে নিস্তব্ধতা আর গোল গোল চোখ নিয়ে দেখি ওই উঁচুতে মেঘের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছে আস্ত একখানা আইফেল টাওয়ার। স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে আমার জ্ঞানগম্যির উচ্চতা পেয়ারাগাছ পেরোয় না। পাথর বা ইঁটের তৈরি স্তম্ভ মানেই কলকাতা ময়দানের মনুমেন্ট আর লোহা বা ইস্পাতের তৈরি উঁচুপানা কিছু দেখলেই আইফেল টাওয়ার, এর বাইরে অন্য কিছুর তুলনা টানতে পারিনা। আর এখানা দেখতেও অনেকটা আইফেল টাওয়ারেরই মত। ইয়াব্বড় হাঁ করে তাকিয়েছিলুম। গোটা দুয়েক সাহসী পাহাড়ি মাছি হাঁয়ের ভেতর ঢুকে সরেজমিনে দেখে নিয়ে আবার উড়ে বেরিয়ে গেল। শেষে ভাঙ্গা রাস্তার ঝাঁকুনিতে চোয়াল বন্ধ হয়ে কটা কথা বেরিয়ে এল – ওটা ওখানে উঠলো কি করে?  

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০১৫

সাংসদ ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

​সংসদে কেউ গলা ফাটাবেন আম জনতার স্বার্থে
প্লেনে চড়ে তাঁরা যাতায়াত করে কর দাতাদের অর্থে,
কেউ থাকে শুধু চুপচাপ বসে, বলেন যৎসামান্য
বিস্বয়ে কেউ হতবাক হন, বলেন জীবন ধন্য-
পেছন বেঞ্চে বসে দেন কেউ সামান্য দিবানিদ্রা
গালি দেন কেউ, মন দিয়ে শোনে দিকপাল ভাষাবিদরা;
গরম লাগছে ভয়ানক স্যার, অভিযোগ যায় স্পিকারে
কেউ ঘন ঘন পায়চারি করে গলা ভেজালেন লিকারে,
সংসদে কেউ বক্সিং লড়ে, চলে হাতাহাতি কুস্তি

​অনুগল্প ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য


রোজকার মত দোকান বন্ধ করে বাড়ির পথ ধরতে আজও ১১ তা বেজে গেল কাজলের। স্টেশানের পাশে ছোট চায়ের দোকান কাজলের, গ্রাজুয়েশান করে কিছুদিন টাইপ, শর্টহ্যান্ড শিখে বা সরকারি চাকরির পরীক্ষাও দিয়েছিল কিছু, তারপর এই চায়ের দোকান।বেশ চলে দুজন কর্মচারী, চা, বিস্কুট চায়ের আবার হরেক রকম লাল চা, লেবু চা, দুধ চা, চিনি ছাড়া যার যা পছন্দ।অনেকে খবরের কাগজ পড়ে, খেলা , রাজনীতি নিয়ে মত দেয়, তর্ক চলে বেশ লাগে কাজলের।

​কাল ছিল ডাল খালি ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

​কাল ছিল ডাল খালি (ভাত আর ডাল, ব্যাস?)
আজ ফুলে যায় ভরে (হোলো তো পেটেতে গ্যাস?)
বল দেখি তুই মালি (অন্তরা? ও কী জানে!)
হয় সে কেমন করে? ( বোঝো! কোনও হয় মানে!)
গাছের ভিতর থেকে ( জাইলেম, না কি যেন?)
করে ওরা যাওয়া আসা (ওরা কারা? যাবে কেন?)

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০১৫

নীল সাদা, সাদা নীল ~ অমিতাভ প্রামাণিক


ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি বেশ।
দু:খ হয়, জহরলাল জেনে যেতে পারলেন না
তার একটা জুড়ুয়া ভাই ছিল,
কুম্ভমেলায় নয়, সাঁওতাল বিদ্রোহে সে
হারিয়ে গেছে ভীড়ে।

মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০১৫

তেরো - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


রাত এখন কোপার কোপে। যাঁরা জানেন, তাঁরা তো জানেনই। আর যাঁরা আমার মত, বুঝতে না পারলে মুচকি মুচকি হাসেন, আর ভান করেন যেন সব বুঝেছেন, তাঁদের বলি, কোপা হলো কোপা আমেরিকা। আমেরিকা কাপ। ফুটবলের আসর। লাতিন ফুটবলের ধুন্ধুমার লড়াই। গেল হপ্তায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে বার্সিলোনা জুভেন্তাস ঘটে গেছে। শেষ রাতে সেই নিয়ে ফোনে মেসেজ চালাচালি করতে গিয়ে দেখলুম, অনেক বড় বড় ফুটবলপ্রেমীই কেমন যেন আড়ো আড়ো ছাড়োছাড়ো করছেন। সকালে বাসে অফিস যাবার সময় নিত্যযাত্রিদের জোরদার আলোচনায় দেখলুম বার্সিলোনা, কোপা, এমন কি হিউমের আতলেতিকো কলকাতায় যোগদানের আলোচনাও কেমন যেন ঝিমিয়ে। শেষে বলেই ফেললুম, হলোটা কি? কোপা তে মেসি-নেইমার-সাঞ্চেজ-সুয়ারেজ, আর সবাই এত ঠান্ডা? হই হই করে উত্তর এলো বেলো টা চলে গেল যে, বল্লুও নাকি যাবে যাবে করছে...। অন্য দিক তাক করেই ছিলো, এবার দাগল তোদের সঞ্জয় সেন তো আছে রে ভাই, ওটাই আসল, কাতু-সোনি উপরি। ব্যাস। বুঝলুম ফুটবল আছে ফুটবলেই। শুধু টিভির পাশে, পাশের মাঠের ছোঁয়ার আরো রঙিন হবার চেষ্টা চলছে মাত্র।

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০১৫

ডেসপাইট বিয়িং এ উওম্যান ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

মানে পাতি মেয়েছেলে হয়েও 
যে'ভাবে তুমি সন্ত্রাস রুখেছ… 

ইতিহাসে শূন্য পাওয়া
ভোটে জেতা লোকটা জানতই না
মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও, আজ্ঞে হ্যাঁ, মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও,
ক্যুরি বাড়ির মেয়েটা, দু' দু'বার নোবেল মঞ্চ আলো করেছিল।
কোনও শিশ্নউদ্ধত পুরুষ যে' সাফল্য ভাবেনি কখনও
একবার ফিজিক্সে অন্যবার কেমিস্ট্রিতে
কী সাহস ভাব একবার
মহামহিম ঐশ্বরিক প্রভু অবশ্য সে ঔদ্ধত্য মেনে নেয় নি
সওগাত পাঠিয়েছিল মৃত্যুমাখা রক্তরোগ

শনিবার, ৬ জুন, ২০১৫

বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০১৫

ভেজাল ~ সুশোভন পাত্র

​আপনি কি চিৎকার করে মজা পান ? হিন্দি গানের সুরে সিটি মারতে পারেন ? আপনি কি বিয়ে বাড়িতে 'উলু' স্পেশালিষ্ট ? কিম্বা শাঁখ বাজানোর এক্সপার্ট ?
কানের গোঁড়ায় শিঙা ফুঁকুন, ধুমধাড়াক্কা রিপাবলিক ডে-তে সবাই মিলে ড্রাম পিটুন, কালীপূজোয় বাজি ফাটিয়ে লোকের পিলে চমকে দিন, দিস-টাইম ফর আফ্রিকা'র ফুটবলে ভুভুজেলা কে মিশিয়ে দিন, ধর্ম-কম্মের দোহাই দিয়ে অন্যের কানের লতিতে মাইক বেঁধে গাঁতিয়ে কেত্তন শোনান, মনুমেন্টের ঘাড়ে মাইক বেঁধে গাঁকগাঁক করে আজান পড়ুন.. ঐ ডবল ডিমের অমলেটের ওপর ল্যাদ ছিটিয়ে স্যানক্স করা ভদ্রলোকের ডিমদের, ঘুম থেকে তুলে, আড়মোড় ভাঙ্গিয়ে দেখিয়ে দিন, এই যুগটা অযথা শব্দ করারই, যুগটা হুজুগের, যুগটা নিজের ঢাক নিজে পেটানোর, যুগটা বিজ্ঞাপনের, যুগটা ভেজালের।

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০১৫

ভালোবাসার টুকরো ছবি - শুভাশিষ আচার্য্য


জীবনের কিছু মোড় আছে কিছু সিদ্ধান্ত আছে যা যে মানুষ টা নিচ্ছে তাঁর কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ সেরকমই তার চারপাশের জড়িয়ে থাকা মানুষদের কাছে তা হয়ে ওঠে প্রভাবিত করার উপকরণ। আর একটা ব্যাপার আর সবথেকে মুল ব্যাপার হল এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সিদ্ধান্ত সময়োচিত হলে তিনি সফল আর তা না হলে সেটা আর সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়না। আর একটা ব্যাপার হল আমাদের দেশ কাল সমাজ। এ এমন এক মৈত্রীমণ্ডল এমন এক ছায়া যুদ্ধ এমন এক অপরিবেশ বান্ধব যে আজ রাতে রুটির সাথে পেঁয়াজ পাতে থাকবে কিনা সে সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে থাকেনা অনেক সময়। এরকম একটা বিষম সময় হুট করে তিনি সেই ভুবনজয়ী সিদ্ধান্তটা কত অনায়াসে নিয়েছিলেন। এক জ্ঞান তিতিক্ষু মন নিয়ে মাঝ রাতে ঠিক হয়ে গেল সরকারি চাকরির দরকারি কাজ গুল ছুড়ে দিয়ে কাল সকাল থেকে হবে শুধু লেখা লেখির কাজ। ভুবনজয়ী সিদ্ধান্ত। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আর আমরা প্রভাবিত হলাম।

সোমবার, ১১ মে, ২০১৫

বাঁচার গান - শুভাশিষ আচার্য্য

ফুল ছোঁড়গো পুষ্প দয়াল মাঝরাতে।
আসর যাব ব্যান্ড বাজছে শিশুর মন,
এলোমেলো কথা বারতা দিগদিশাহীন,
আর কত গো পুড়বো আমি আত্মতেজে,
বাঁচব আমি আরও বাঁচব মধুরবেদন,
যাক ছিঁড়ে যাক সব-ভাবনা গরল দহে,
ফুল ছোঁড়গো পুষ্প দয়াল মাঝরাতে।

শনিবার, ৯ মে, ২০১৫

শেষ হয়েও ... - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


টেবিলের কোনায় পড়ন্ত বিকেলের একটুকরো রোদ এসে পড়েছে। দক্ষিন পূর্ব বাভারিয়ায় গ্রীষ্মের তুলনা হয়ত পৃথিবীর কোথাও নেই। ঝিরিঝিরে হাওয়া, নরম সোনালি রোদ। গাছের পাতা গুলো মনে হচ্ছে হালকা সবুজ মাখনের তৈরি, যেন আর একটু রোদ পেলেই গলতে শুরু করবে। এ অঞ্চলের লোকজন ভারি হাসিমুখ। একটু গাঁইয়া বটে, কিন্তু হাঁদা হবার সুবিধে আছে। যাই বোঝানো হোক, ঝটপট বুঝে যায়। বিংশ শতকের শুরু থেকেই জীবনের লয় দ্রুত হতে শুরু করেছে। এই ১৯৩৭ সালের কেজো পৃথিবীর সঙ্গে গত শতকের অভিজাত ধীরলয়ের জীবনের অনেক পার্থক্য। সে জীবনে গতি ছিলোনা বটে, কিন্তু আভিজাত্য ছিলো, চিন্তার খোরাক ছিলো, মাথা খাটাবার জায়গা ছিলো, সুক্ষতা ছিলো, শিল্পের ছোঁয়া ছিলো সব কিছুর মধ্যেই, এমনকি অপরাধ ও অনেক......।

শুক্রবার, ৮ মে, ২০১৫

রাজপ্রাসাদ - শুভাশিষ আচার্য্য

আমাদের একটা রাজপ্রাসাদ আছে। এর নানা রঙ। নানা মহিমা। যখন উচ্ছ্বাস পিছলে বেরয় হৃদয় থেকে আমরা প্রাসাদের এই কক্ষ টাতে যাই। এখানে থরে থরে রয়েছে তাঁর হাতে সাজান আনন্দের উপঢৌকন। যেমন খুশি হাতে নেয়া যায় তা। মনে হয় "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে"। ভুবন আলো করা কক্ষ এটা আমাদের রাজার রাজপ্রাসাদে। অন্য দিকে যখন আমরা শোক পাই তখন ওই বিশাল থাম টাকে আঁকড়ে ধরি। মনে হয় সমস্ত শোক তাপ ওখানে প্রাজ্ঞ হয়ে থামটা দাঁড়িয়ে আছে গাছের মত। আমরা যারা কাজ করি, রোদ্দুরে ঘাম ঝরে ক্লান্ত হই, আমাদেরও এক কক্ষ আছে। সেখানে দেখতে পাই আমাদেরই শ্রম এখানে হয়ে আছে নানা কারুকার্য। যারা খেলতে থাকি সারাদিন আর এক দম পড়তে ভালবাসিনা  তাদেরও কঠিন কঠিন পড়া সহজ পাঠ হয়ে খেলা ঘর হয়ে আছে প্রাসাদের ভিতর। আরও কত কক্ষ যে রয়েছে এখানে এক জীবনে তা প্রদক্ষিণ করা মুশকিল।


বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০১৫

হিট অ্যান্ড রান - কৌশিক সেনগুপ্ত

কারো বুক ধড়ফড়,
কারো আনচান,
কেন আজ জেলে যায়
সাল মান খান?

হাপুস হুপুস - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

       - খামোখা ঝগড়া করলেএত রাগ করতে আছে? 

- আমি তো ঝগড়া করিনি, বরং একটা ভালো কথা বোঝাতে চেয়েছিলাম।

- ভারি তো বোঝানো হলো, মাঝখান থেকে রাগারাগি করে খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলে

- আমাকে এরকম করতে দেখেছো কখনো?

শনিবার, ২ মে, ২০১৫

ভরসা থাকুক - অবিন দত্তগুপ্ত

সমীরদাকে , প্রথম দেখেছি , ঢাকুরিয়া জোনাল অফিসে । আমাদের বিকল্প বায়স্কোপের মিটিং ছিল । ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের তিনটি বস্তি অঞ্চলে একসাথে সিনেমা দেখানো হবে । প্রথম এক্সপেরিমেন্ট । জায়গা বাছার জন্য , সমীর মন্ডল এসছিলেন । মিটিং-এ এক মধ্যবিত্ত কমরেড বলেছিলেন , " ওরা কি এগুলো বুঝবে ? "

শুক্রবার, ১ মে, ২০১৫

সক্কলকার পয়লা মে - শ্রেয়সী রায়

গতকাল শেষ , খুচরো হিসেব -
পান্তা ফুরোয় নুন আনতে ;
আজ শুরু হলো , রোদ উঠলেই
বাসনওয়ালীর পয়লা মে...

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৫

May Day - ভরসা দিবস - শুভাশিষ আচার্য্য

আপনি কথা বললে মুখে সুরভিত জোতদারের গন্ধ ছোটে।
রাস্তায় হেঁটে চললে মুঘল বাদশার জুতো শব্দ করে।
হাত নাড়লে, ঠাণ্ডা গাড়ির পেছন সিটের জানলা থেকে,
তেজি ঘোড়ার পিঠের থেকে চাবুক ঘোরে দলিত পিঠে।

একটি রঙিন গল্প ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

গত মঙ্গলবার দুপুর বারোটা সাতচল্লিশে আচমকা আমাকে দলে ডেকে নিল ওরা। আমি কোনও পার্টি করতাম না। তাই দলত্যাগ বা দলবদল জাতীয় মহান শব্দ আমার বেলা উচ্চারণ করা যাবেনা। দলে ভেড়াল বা দলভুক্তি ঘটল বলা যেতে পারে।

চাকরি পাই নি। কলকাতায় সেজপিসির বাড়িতে অনাহুত আশ্রিত। চাকরির পরীক্ষা দিই আর ফাইফরমাশ খাটি। মান্তুকে ইস্কুলবাসে পৌঁছে দেওয়া, দোকান বাজার মায় কাজের দিদি না এলে ইদানীং এমন কী কাপড়কাচা বাসনমাজাও। কী করা? দাদা বৌদি দু'জনেই অফিস যায়। পিসি বাতে শয্যাশায়ী। আমাকে যে থাকতে দিয়েছে এই ঢের। পরিবারটাকে সব মিলিয়ে মহানুভবও বলা যায়। 

বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৫

এক পশলা বিপ্লব জেগে উঠছে আবার - গোধুলি মিত্র


এক পশলা বিপ্লব জেগে উঠছে আবার
ভেঙ্গে যাওয়া শপথ,
মুচড়ে দেওয়া শিরদাঁড়া জুড়ে জুড়ে
আগুন জ্বালাচ্ছে দধীচি

​বিজয়োৎসব ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

আমাদের মুখ কালচে কালচে – মাটির মত
মাঠে ময়দানে, পুজো-পার্বনে খুশিরা ডাকতো
বারোয়ারি খানা, ভোগের খিচুড়ি, তপ্ত সুবাস
ছোট্ট পাড়াটা আরো ছোটোদের কান্না ঢাকতো

রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৫

দুপয়সার রবি - গোধুলি মিত্র

              
আমরা যারা রবি ঠাকুর বলি, শুনি, পড়ি বা গাই- আমাদের সাথে রবীন্দ্রনাথের প্রথম আলাপ হয় মা-বাবা, শিক্ষক কিম্বা নিছক পড়ার বইয়ের হাত ধরে। কেউ উপহার পেয়েছি, কেউ বাড়িতে পরম্পরায়, কেউ শখে ,কেউ বা লাইব্রেরীতে। যে মেয়েটার কথা এখন বলব, তার সাথে রবির আলাপ কিছুটা অন্যরকম, কিছুটা ব্যতিক্রম।

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৫

আমোদিনীর হালকা পালক ~ সংগীতা দাশগুপ্তরায়

আমার বড়মাসি ছিল তুমুল সুন্দরী। যাকে বলে ফাটাফাটি সুচিত্রা সেন টাইপ সুন্দরী। তখন ওটাই সৌন্দর্যের মাপকাঠি হিসেবে নাকি ধরা হত। তো মাসিমনি জামালপুরের সুচিত্রা সেন হয়ে বহু উত্তম মধ্যম ও অধমের বুকে দোলা লাগিয়ে চলেছে নিয়মিত। হেনকালে আমার বড়মামুর প্রাণের বন্ধু ভীমমামু মাসিমণির প্রেমে পড়ে একদম হাপুস হুপুস দশা । মুশকিল একটাই যে বন্ধুর বোনকে এভাবে ভাল লাগাটা ঘোরতর নিয়মবিরুদ্ধ। এদিকে বেচারা যত ভাবে ভুলে যাবে 'মনো মানে না' । শেষে মরিয়া হয়ে আগে বড়মামুর কাছেই কনফেস করল। বড়মামুর শুনে আপত্তি নেই কারন বন্ধুটিও বদ্যি (এটা একটা মারাত্মক ক্রাইটেরিয়া) এবং ভারি পরোপকারী ভালমানুষ ধরনের। হালত দেখে বড়মামুই হাল ধরল। মাসিমণিকে একদিন কথায় কথায় বলল "বুঝলি, ভীমের তোকে খুব পছন্দ" ।

বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৫

দুনিয়া কাঁপানো ১ দিন - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


(পাঠকের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, লেখাটি পুরো পড়বেন। নয়ত পড়বেন না)

৩০শে এপ্রিল ১৮৮৬, শুক্রবার

----------------------

আনন্দ –

ü  ৮ ঘন্টা কর্মদিবসের দাবিতে ৪ঠা মে শিকাগো তে বড় জমায়েতের ডাক দিলো মজদুর ইউনিয়ন।

ü  হুমকি ধর্মঘটের, নৈরাজ্যবাদী হামলার আশংকা মার্কিন সরকারের

ü  দাবী অন্যায্য, ধর্মঘট ক্ষতি করছে মার্কিন কর্মসংস্কৃতির – দাবী শিল্পপতি মহলের

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৫

দুষ্টু তিনু ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

দুষ্টু তিনু (সম্পুর্ণ নির্দোষ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রচনা; শ্রী যোগীন্দ্রনাথ সরকারের কবিতা অবলম্বনে)
গড় গড় ঘড় ঘড় চৌত্রিশ সাল
তিন লাফে এল তিনু বদলাতে হাল।
ফাঁকি দিয়ে ট্যাঁকি ভরা এই তার কাজ;
মনে ভাবে, ভারি মজা করিবে সে আজ।
চেপেচুপে বসে তিনু হয়ে গদিয়ান,
কিছুদিন পরে তার স্বরূপ দেখান।
ছড়িগাছা ল'য়ে সিবিয়াই ঘাড়ে চড়ে,
মনে মনে হাসে তিনু, ভয় নাই ধড়ে।
হামা দিয়া সিবিয়াই গুটি গুটি যায়,
ঝুপ করে নেমে তিনু ঢুকিল ডেলোয়।
হেঁট হয়ে সিবিয়াই দেখে চারি ধার,
কোথা গেল তিনুগুলো, খোঁজ মেলা ভার!
রেগে জ্ব'লে জনগণ থর থর কাঁপে,
তিনু গুলো তর্‌ তর্‌ গদি 'পরে চাপে।
সিবিয়াই ভ্যাবাচ্যাকা, সারা গায়ে ঘাম,
মহা খুশি তিনুগুলো ধরিল লাগাম!
তারপরে গেল গোটা রাজ্য চুলোতে,
টাকা, সম্মান সব লুটোল ধুলোতে!

বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০১৫

একটু খবর নিলে হয় - শুভাশিষ আচার্য্য

তোমাদের কস্টের বেঁচে থাকা মনে জাগায়
অনেক বিস্ময়।
টিভি তে খবরাখবর সকালের বাজার আর
সরকারে প্রত্যয়।
সোম থেকে শুক্র খাটুনি দিন শেষে এসি বা নন এসি
বাসে করে বাড়ি ফিরে বাচ্চার খুনসুটি
এবার একটা গাড়ি কিনলে হয়।
গাড়ির কত হবে ই এম আই সে আবার হিসাবের ব্যাপার
মাস গেলে স্যালারি ক্রেডিট তারপর একে একে সাবার।
সবকিছু ই এম আই জীবনের বীমা নিজস্ব ঘর আনন্দের পার্টি
অতটুকু পয়সা সেই বা আর কি কি সয়।
এদিকে সারাদিন ব্যস্ততা তার মাঝে লাইক ডিস্লাইক হয়নি
কত ছবি শেয়ার হয়নি নিজের কথা বলা হয়নি একেবারে জেরবার
কে জানে কে হল আভিমানি বা কেকে অভিমানিনী।
তোমাদের কস্টের বেঁচে থাকা মনে জাগায়
অনেক বিস্ময়।
ভালবাসা শেয়ার হয় বা নিদেন ই এম আই
একটু খবর নিলে হয়।

মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৫

গোগ্রাস - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


পুঁচকে বলে পুঁচকে? একদম এইটুকুনটি। কোলের ছেলে অস্কার। তা বাপ-মায়ের আর দোষ কি? ছেলের চাঁদপানা মুখটি দেখে বাবা বলে বসলেন ছেলে আমার বড় হয়ে অমুক হবে। ব্যাস। ক্ষুদে ছেলে গোঁসা করে ঠিক করল আর বড় হবে না। তা একটু গোঁয়ার হয় বটে জার্মানরা। তাও আবার যেমন তেমন শহরের জার্মান নাকি? এ হলো ডানৎসিগ (Danzig)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির থেকে ছেঁটে নিয়ে যে শহরকে স্বাধীন বলে ঘোষনা করেছিল মিত্রপক্ষ সেই ডানৎসিগ। অস্কার আর বড় হয়নি। ওই তিন বছরেই আটকেছিলো। তিন বছরের জন্মদিনে বাবার দেওয়া একখানা টিনের ড্রাম পিটে পিটে তার যত ডানপিটেমো। টিন-ড্রাম উপন্যাসটি লিখেছেন গুন্টার গ্রাস। ছবিও হয়েছে এই উপন্যাস নিয়ে। অস্কারের মত গুন্টার গ্রাসের জন্মও ওই ডানৎসিগ শহরে।

ছবি এঁকেছেন, লিখেছেন, মূর্তি গড়েছেন। আরো কত কি যে করেছেন!! সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন ১৯৯৯ সালে। ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রচুর। শান্তি আন্দোলনের দূত হয়ে ভ্রমন করেছেন একের পর এক দেশ। ১৯৮৬ সাল। গায়ে সাদা ফতুয়া, পরনে নীল-সাদা চেক কাটা লুঙ্গি। মুখে বিড়ি। গ্রাস বাবু হেঁটে চলেছেন কলকাতার রাস্তায়। এ শহরে কাটিয়ে গেছেন বেশ কিছুদিন। কালীঠাকুর তাঁকে বড়ই আশ্চর্‍্য্য করেছিলো। ওই জিভ কাটা মূর্তি নিয়ে পরে লেখালিখি করেছেন গ্রাস বাবু। কলকাতায় তাঁর বেশ আপন আপন লাগত।
 

একটু বাঁয়ে হেলেই থাকতেন। যদিও সাদা কে সাদা, কালোকে কালো বলতে দ্বিধা করেননি কখনো। ইরান, ইজরায়েল, আমেরিকাই হোক, বা হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত ট্যাঙ্ক, তাঁর কলমের গ্রাসে সব্বাই পড়েছে। দুই জার্মানি এক হওয়াও তাঁর মনঃপুত হয়নি। বলেছিলেন দুজনের আলাদা রাজনৈতিক অস্তিত্ব থাক, নইলে একজন অন্যজন কে গিলে খাবে। আলাদা স্বতন্ত্র সত্বায় বিশ্বাস করতেন, কিন্তু কাঁটাতারে কখনো বিশ্বাস করেন নি। চাইতেন সারা বিশ্বের সব জাতের মানুষ এসে জার্মানিতে থাকুক। মেলামেশা হোক, নতুন মানব সমাজ গড়ে উঠুক। জীবনের প্রথম দিকে নাৎসি ওয়াফেন এসএসের সৈনিক ছিলেন। ১০ নম্বর ট্যাঙ্ক ডিভিশানে থেকে বিশ্বযুদ্ধ শেষ করেন। সে কথা লুকোন নি। কিন্তু পরবর্তিকালে ভিলি ব্রান্ডটের সোসাল ডেমোক্রাসির একনিষ্ট সমর্থক। তা সত্বেও তিনি যেন ছিলেন আধুনিক জার্মানির বিবেক।

ঝুঁপো-গুঁফো হুঁকোমুখো দেখতে বটে সাহেব কে, কিন্তু রসবোধটি মোক্ষম। জীবনের শেষ দিকে এসে, আত্মজীবনী লেখায় হাত দিলেন যখন, সে লেখার নাম দিলেন – বাইম হাউটেন ডার ৎসুইগেল, মানে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো। ভেবে দেখুন। ঝাঁঝে চোখে জল আসবে। রান্নার সময় সে খোশার খোশবাইতে পাড়া মাত হয়ে যাবে। আপনি একের পর এক ছাড়িয়েই যাবেন। কিন্তু ভেতরে? স্রেফ ফক্কা।

মানুষটা চলে গেলেন গতকাল। ৮৭ বছর বয়সে। পেঁয়াজ রেখেই গেছেন। পড়ে দেখতে পারেন। গোগ্রাসে।
 
** ছবি ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত  

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

গণিত বিজ্ঞান প্রযুক্তি এবং বাংলাদেশের মেয়ে ~ মুহম্মদ জাফর ইকবাল

১.

আমাদের সবারই ধারণা, আমাদের সব কিছু ভুল, আমেরিকা-ইউরোপের সব কিছু ঠিকঠাক। সব কিছু নিখুঁত। লেখাপড়া, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিষয় হলে তো কথাই নেই, আমরা ধরে নেই পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে আমাদের নিশ্চয়ই কোনো তুলনাই হতে পারে না। সেই আমেরিকার একটা পরিসংখ্যান হঠাৎ করে আমার চোখে পড়েছে, পরিসংখ্যানটি মেয়েদের নিয়ে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে সেই দেশের মেয়েরা কেমন করছে তার পরিসংখ্যানটি দেখে আমার চোখ রীতিমতো ছানাবড়া হয়ে গেল। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি বা আরও স্পষ্ট করে বললে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে ১৯৮৫ সালে কোনো একটা মহাবিপর্যয় ঘটে যাবার পর সেই দেশের মেয়েরা হঠাৎ করে কম্পিউটার সায়েন্স পড়া ছেড়ে দিল এবং তারপর এই বিষয় মেয়েদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে এবং এখন সেই দেশে কম্পিউটার সায়েন্সে ছেলেমেয়েদের সংখ্যায় রীতিমতো আকাশপাতাল পার্থক্য।

১৯৮৫ সালে কী এমন ঘটনা ঘটেছিল যে কারণে সেই দেশের মেয়েরা কম্পিউটার সায়েন্স পড়া ছেড়ে দিল? সেই সময়টিতে আমি আমেরিকায় ছিলাম এবং মোটামুটিভাবে বিশ্লেষকদের সাথে আমি একমত, সেই সময়টিতে আসলে প্রথমবারের মতো পার্সোনাল কম্পিউটার বা পিসি বাজারে আসতে শুরু করেছিল। এর আগে কম্পিউটার ছিল বিশাল এবং সেগুলো বড় বড় অফিস বা ল্যাবরেটরিতে থাকত। কোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারত না যে, সেটা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্যে নিজের বাসায় পড়ার টেবিলে রাখা সম্ভব। বিশ্লেষকদের ধারণা, পার্সোনাল কম্পিউটার আসার সাথে সাথেই সেই দেশের মানুষেরা সেগুলো কিনতে থাকে।

সেই কম্পিউটার বিশেষ কিছু করতে পারত না। বলা যেতে পারে, সেগুলো ছিল মোটামুটি একটা খেলনা এবং আমেরিকান পরিবারে বাবারা সেই খেলনা নিয়ে খেলতে শুরু করল। বাবার সাথে সেই খেলনায় যোগ দিল তাদের ছেলেরা। যারা পার্সোনাল কম্পিউটার নামের সেই মূল্যবান খেলনাটি বাজারে বিক্রি করতে শুরু করল, তারা সেটাকে শুধুমাত্র পুরুষ এবং ছেলেদের খেলনা হিসেবে বিক্রি করতে শুরু করে এবং বাসার মেয়েটির যত আগ্রহই থাকুক তাকে সেটা নিয়ে খেলতে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হল না। ছেলেরা ধীরে ধীরে কম্পিউটার নিয়ে সময় কাটাতে শুরু করল, সেটা খুলে ভিতরে দেখতে শুরু করল, যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করতে শুরু করল এবং কিছুদিনের মাঝে দেখা গেল কম্পিউটার সংক্রান্ত বিষয়টিতে পুরুষদের একচেটিয়া রাজত্ব। মেয়েরা সেখানে পিছিয়ে পড়তে শুরু করেছে এবং তারা আর কখনও ছেলেদের সমান হতে পারেনি।

আমাদের দেশে বিষয়টা এত খারাপ হতে পারেনি। এই দেশে এসে আমি পদার্থবিজ্ঞানের মানুষ হয়েও দীর্ঘদিন কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগটি দেখেশুনে রেখেছি, আমি এই বিভাগ থেকে ছাত্রীদের ঝরে যেতে দেখিনি। বরং ছেলেদের মতো সমান আগ্রহ নিয়ে মেয়েদের এই বিষয়টি পড়তে দেখেছি। তারা হয়তো সংখ্যায় কম, কিন্তু তাদের আগ্রহ কম সেটি কিছুতেই বলা যাবে না।

সায়েন্স কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মেয়েরা কেন কম তার কারণ খুঁজে বের করা মোটেও কঠিন নয়। জন্মের পর থেকে তাদের কানের কাছে সবাই ঘ্যান ঘ্যান করে বলে গেছে, 'বড় হয়ে তুমি ডাক্তার হতে পার, কিন্তু খবরদার ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবে না'। কাজেই বড় হয়ে তাদের একটা অংশ নিজের অজান্তেই বিশ্বাস করে বসে থাকে যে, মেয়েদের ইঞ্জিনিয়ার হওয়া মনে হয় ঠিক নয়। তাদের অনেকে ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ভর্তি হয়, কিন্তু সব সময়েই তাদের ভেতর এক ধরনের দুর্ভাবনা কাজ করে। চারপাশের পুরুষ মানুষগুলো তাদেরকে সজ্ঞানে হোক অজ্ঞানে হোক বোঝানোর চেষ্টা করে যে, তারা ভুল বিষয়ে চলে এসেছে। একজন পুরুষ যখন তার জন্যে স্বাভাবিক পরিবেশে কাজ করে, মেয়েটিকে তখন একটা প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে হয়।

২.
যখন বয়স কম ছিল, তখন প্রচুর গল্প-উপন্যাস পড়েছি, প্রবন্ধের বইগুলো দূরে সরিয়ে রেখেছি। এখন বয়স হয়েছে, হঠাৎ করে আবিস্কার করেছি প্রবন্ধের বই পড়তে বেশ ভালো লাগে। কোনো একটি বিচিত্র কারণে মানুষের মস্তিস্ক কীভাবে কাজ করে সেই ধরনের বই পড়তে আমার খুব আগ্রহ হয় এবং সুযোগ পেলেই সেগুলো পড়ি। পুরুষ এবং মহিলার মস্তিস্কের মাঝে কোনো পার্থক্য আছে কী না সেটা জানার জন্যে আমি অনেক পরিশ্রম করেছি। পুরুষ এবং মহিলার চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়াতে পার্থক্য আছে সেটা অনেকেই স্বীকার করেছেন। কিন্তু আমি কোথাও দেখিনি যে, ছেলেরা মেয়েদের থেকে ভালো গণিত, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি বুঝতে পারে সেই ধরনের কোনো তথ্য পাওয়া গেছে।

পৃথিবীর এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে হার্ভার্ড। তার প্রেসিডেন্ট লরেন্স সামার্স একটা সভায় একবার বললেন, স্কুল-কলেজে ছেলেরা বিজ্ঞান এবং গণিত মেয়েদের থেকে ভালো বুঝতে পারে। সেটা বলার পর সবাই সেই প্রেসিডেন্টের পিছনে লেগে পড়ল; তার কাছে জানতে চাইল তিনি কোথায় সেই তথ্য পেয়েছেন। পৃথিবীতে কোথাও এটা বৈজ্ঞানিক তথ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এটা হচ্ছে পুরুষশাসিত সমাজে মাথামোটা পুরুষদের এক ধরনের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এই পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক কথাটা বলার কারণে হার্ভার্ড প্রেসিডেন্টকে বরখাস্ত করেছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশে আমরা পুরুষ মানুষেরা যদি নিরিবিলি কথা বলি এবং ছেলে এবং মেয়েদের বিজ্ঞান ও গণিতে আগ্রহ নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে অবধারিতভাবে আমরা তাদের কথায় হার্ভার্ডের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শুনতে পাব।

বেশিরভাগ পুরুষ মানুষেরই মেয়েদের বিজ্ঞান কিংবা গণিতে দখলের ব্যাপারে এক ধরনের অযৌক্তিক নেতিবাচক ধারণা আছে। তাদের একটা প্রধান যুক্তি, গণিতের নোবেল পুরস্কারের সমমানের পুরস্কারের নাম ফিল্ডস মেডেল এবং কোনো মেয়ে কখনও ফিল্ডস মেডেল পায়নি। তারা এখন সেই যুক্তিটি দেখাতে পারবে না; কারণ সর্বশেষ ফিল্ডস মেডেলটি পেয়েছে মরিয়ম মির্জাখানি নামে একজন মেয়ে। মেয়েটি ইরানি বংশোদ্ভূত এবং এখন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। কিন্তু সেটি আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়; কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানে মেয়েরা ছেলেদের সমান সমান কৃতিত্ব দেখাতে পারছে কী না সেটা যাচাই করার আগে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে মেয়েদের কি আমরা ছেলেদের সমান সমান সুযোগ দিতে পেরেছি কী না। আমরা পারিনি। একজন পুরুষ মানুষ তার জীবনের যে সময়টাতে তার ক্যারিয়ারটুকু গড়ে তুলেন, ঠিক সেই সময়াটাতে একজন মেয়েকে সন্তানের জন্ম দিয়ে সন্তানকে মানুষ করতে হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবদান রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে আমরা কখনও মেয়েদেরকে ছেলেদের সমান সুযোগ দিতে পারি না।

তাই আমরা যদি তাদেরকে ছেলেদের সমান সংখ্যক হিসাবে না পাই তাহলে অবাক হবার কী আছে? যখন একজন মেয়েকে ঠিক একজন ছেলের সমান সুযোগ দিব, তখনই তাদের দুজনের সাফল্যের তুলনা করার একটা সুযোগ পাব, তার আগে নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করার কারণে আমাকে অসংখ্যবার শিক্ষক নিয়োগের কমিটিতে বসে প্রার্থীদের ইন্টারভিউ নিতে হয়েছে। আমার সাথে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় অধ্যাপকরা থেকেছেন এবং তাদের কথাবর্তা শুনে মাঝে মাঝে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। একবার একজন মেয়ে প্রার্থী খুব চমৎকার ইন্টারভিউ দেওয়ার পর আমি যখন তাকে শিক্ষক হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছি, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাপক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ''এই মেয়ের বিয়ে হয়নি।"

আমি অবাক হয়ে বললাম, ''তাতে সমস্যা কী?''

''কয়দিন পর প্রেম করবে, বিয়ে করবে।''

আমি আরও অবাক হয়ে বললাম, ''নিশ্চয়ই করবে। সমস্যা কোথায়?''

''তখন সমস্যা শুরু হবে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাচ্চা হবে। ম্যাটার্নিটি লিভ দিতে হবে।''

আমি বললাম, ''দিতে হলে দিব।''

''বাচ্চা জন্মানোর পর আসল মজা টের পাবেন। আজ বাচ্চার জ্বর, কাল বাচ্চার ফ্লু, পরশু চিকেন পক্স। এই মেয়েকে ডিপার্টমেন্টে পাবেনই না।''

আমি অবাক হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাপকের দিকে তাকিয়ে রাইলাম। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন; বললেন, ''মেয়েদের টিচার হিসেবে নেবেন না। একটা ছেলে টিচারের অর্ধেক সার্ভিসও পাবেন না।''

সেই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাপকের প্রত্যেকটা কথাই সম্ভবত সত্যি; কিন্তু আমি সেই কথায় বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেইনি। সন্তানের জন্মকাল এবং লালনপালন প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকার কারণে একজন মেয়ের কাছ থেকে অর্ধেক সার্ভিস না পেলেও মেয়েরা অনুগ্রহ করে সন্তান জন্ম দেওয়ার এই দায়িত্বটা পালন করছে বলে এই পুরো মানব সভ্যতার জন্ম হয়েছে এবং পৃথিবীটা টিকে আছে। আমার মায়ের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতায় শেষ নেই যিনি সন্তান জন্ম দেওয়ার যন্ত্রণা এবং ঝামেলায় ত্যক্তবিরক্ত হয়ে আমাকে জন্ম দেওয়া থেকে বিরত হননি। তাহলে এই পৃথিবীটাই আমার দেখা হত না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করার সময় আমার মেয়ে সহকর্মীদের জীবনের সন্তানসংক্রান্ত বাড়তি কাজের জটিলতা দেখে আমার মনে হয়েছে, সব বিশ্ববিদ্যালয়েই ছোট শিশুদের দেখেশুনে রাখার জন্যে একটা চমৎকার ডে কেয়ার থাকা দরকার। শুধুমাত্র এই সেবাটুকু দিতে পারলেই আমাদের মেয়ে সহকর্মীদের জীবনটুকু অনেকখানি সহজ হয়ে যেতে পারত।

৩.
আমাদের খুবই সৌভাগ্য যে, আমাদের দেশে মেয়েদের লেখাপড়ায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিচু ক্লাসে ছেলে এবং মেয়ের সংখ্যা প্রায় সমান সমান। ছেলেমেয়েরা যখন বড় হতে থাকে তখন মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের সংখ্যা থেকে কমতে থাকে। অনেক মা-বাবাই তাদের মেয়েদের লেখাপড়ার পিছনে টাকা-পয়সা খরচ করতে আগ্রহ দেখান না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদেরকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করে দিতে অনেক বেশি আগ্রহ দেখান। আমি যখনই ছাত্রীদের সামনে কথা বলার সুযোগ পাই, তখনই অত্যন্ত চাঁছাছোলা ভাষায় তাদেরকে বলি, ''খবরদার, লেখাপড়া শেষ করে একটা চাকরি নেবার আগে কখনও বিয়ে করবে না।''

আমার ধারণা, অনেক বাবা-মা তাদের মেয়েদের মাথায় এই ধরনের বদবুদ্ধি ঢুকিয়ে দেবার জন্যে আমার উপরে খুবই বিরক্ত হন।

আমি মোটামুটি নিশ্চিতভাবে জানি, আমার আজকের এই লেখাটি পড়ে অনেক পুরুষ মানুষই খুব বাঁকা করে একটু হাসবেন এবং তার পাশে বসে থাকা আরেকজন পুরুষ মানুষের সাথে মেয়েদের নিয়ে কোনো এক ধরনের অসম্মানজনক কথা বলবেন এবং মেয়েদের নিয়ে কোনো এক ধরনের কৌতুক করবেন। কেউ কেউ তাদের ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন, গণিত, বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তিতে মেয়েরা আসলে দুর্বল– মুখে যত যাই বলা হোক। গণিত, বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তি মেয়েদের বিষয় নয়– মেয়েরা লেখাপড়া করুক, সেখানে তাদের কোনো আপত্তি নেই– কিন্তু গণিত, বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো ছেলেদের জন্যেই ছেড়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

আমি আশা করছি, আমার এই লেখাটি অনেক মেয়ের চোখে পড়ুক। তার কারণ, আমি নিশ্চিতভাবে জানি আমরা আমাদের দেশের মেয়েদের ছেলেদের সমান গুরুত্ব দিই না। বেশিরভাগ মেয়েই স্বীকার করবে তাদেরকে তাদের পরিবারের ছেলেদের সমান সুযোগ দিয়ে বড় করা হয়নি। তারা অভিযোগ করে বলবে যে, নানা রকম বিধি-নিষেধ দিয়ে তাদের হাত-পা বেঁধে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তাদেরকে বারবার বোঝানো হয়েছে, মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েছে বলে তাদের গাণিতিক বা বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিমত্তা কম কিংবা বলা হয়েছে, মেয়ে বলে তাদের জীবনে গণিত বা বিজ্ঞানের প্রয়োজন নেই। তাদের বাবা-মা বলেছেন; তাদের ভাইয়েরা বলেছেন; চাচারা বলেছেন; এমনকি তাদের স্কুলের অনেক শিক্ষকও এই কথা বলে এসেছেন।

আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, একটা ছেলে যেটুকু পারে একটি মেয়েও ঠিক সেটুকু পারে। সত্যি কথা বলতে কী, একটা মেয়েকে তার জীবনে আরও অনেক কিছু করতে হয় যেগুলো একটা ছেলেকে কখনও করতে হয় না। সেই হিসেবে একই জায়গায় পৌঁছানো একটা ছেলে এবং মেয়ের ভেতরে মেয়েটিকে অনেক বেশি কৃতিত্ব দিতে হবে। আমি বহুদিন থেকে এই দেশের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সাথে আছি। এই দেশের অলিম্পিয়াড আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার কারণে আমার খুব চমৎকার কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি অনেকবার আমার চোখের সামনে সাধারণ একটি শিশুকে অসাধারণ একজন গণিতবিদ হয়ে উঠতে দেখেছি। যে মেয়েটি ভয়ে ভয়ে আমাকে বলেছে, 'স্যার, আমি কিছু পারি না', তাকে আমি বলেছি, 'অবশ্যই তুমি পারবে, কে বলেছে তুমি পার না'– সেই মেয়েটি যখন আমার কথা বিশ্বাস করে। তখন দেখতে দেখতে সে আত্মবিশ্বাসহীন একজন মানুষ থেকে বিস্ময়কর আত্মবিশ্বাসী একজন গণিতবিদ কিংবা কম্পিউটার প্রোগ্রামার হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় তাদেরকে নেবার জন্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি শুরু করেছে।

তাই মাঝে মাঝেই আমার মনে হয়, আমার যদি সুযোগ থাকত তাহলে আমি আমাদের দেশের সব ছোট ছোট মেয়ের কাছে গিয়ে তাদের বলে আসতাম, বিজ্ঞান, গণিত কিংবা প্রযুক্তি মেয়েদের বিষয় নয়, সেটি মোটেও সত্যি কথা নয়। সত্যি কথা হচ্ছে, লেখাপড়ার ব্যাপারে একজন ছেলে যেটুকু পারে একটি মেয়েও ঠিক ততটুকু পারে। যদি প্রয়োজন হয় আর চেষ্টা করে তারা আরও বেশি পারে।

আমি সব সময় স্বপ্ন দেখি, আমাদের দেশের মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বিপুল সংখ্যায় গণিত, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে এগিয়ে এসে সারা পৃথিবীর একটা ভুল ধারণা ভেঙে দেবে।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল
০৮-০৪-২০১৫

​ হুমায়ুন আজাদ ~ রেজাউর রহমান খান

একজন লেখক,কবি, বিদ্বান এবং ভাষাবিদ ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ।৭০ টির বেশি বই লিখেছেন , বাংলাদেশ সরকার তাকে মরণোত্তর " একুশে পদক" দিয়েছিলেন ।
কবি হিসেবে লিখা শুরু করেন তিনি ।তারপরে সংবাদপত্রে "কলাম লেখক"।আশির দশকে (১৯৮০ সাল)তার ক্ষুরধার লিখনিতে সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবিচার,অনিয়ম এবং দুর্নীতি নিয়ে অত্যন্ত নির্মম ভাষায় লিখেছিলেন তিনি।।
তার সব থেকে খ্যাতনামা বই "নারী"...যা বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল ।
"পাক সার জামিন শাদ বাদ" ...লিখে তিনি উগ্রপন্থিদের কোপানলে পড়লেন । "মুরতাদ" ঘোষণা করা হল তাকে ....তার বিরুদ্ধে অনেক মিছিল মিটিং হল ।
।প্রায় এক দশক আগে ২৭ ফেব্রুয়ারি,২০০৪ সালে বইমেলা থেকে বাসায় ফিরবার পথে সন্ধ্যার সময়ে জনসমুদ্রের ভিড়ের মাঝেই তাকে ধারাল অস্ত্র দ্বারা কোপান হয় ।সেই ভয়াবহ ক্ষত নিয়ে কিছুদিন বেঁচে থাকলেও জার্মানিতে এর কিছুদিন পর মারা যান ।(সেই দুঃস্বপ্নের ভীতি ,হত্যাযজ্ঞের বিভীষিকা কাটতে না কাটতেই সেই বইমেলা চত্বরেই প্রকারান্তরে ,একই সময়ে একই দিনে একই কায়দায় হত্যা করা হল ব্লগার অভিজিৎকে) ।
হুমায়ুন আজাদ মারা গেলেন ।ধর্ম , বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম ...তিনি জীবিত অবস্থায় বিশ্বাস করেন নি।প্রায় তিনি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম নিয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতেন ।
নিজ গ্রাম বিক্রমপুরের "রাড়িখালে' নিয়ে যাওয়া হল।।বিখ্যাত গ্রাম, যেখানে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু জন্মগ্রহন করেছিলেন। গ্রামবাসী তাকে "মুরতাদ'' মনে করায় গ্রামের কবরস্থানেও স্থান হল না তার ।যদিও ঐ গ্রামের কবরস্তানটি তারি কোলকাতার চাচির উপহার । ঐ গ্রামে কোন কবরস্থান আগে ছিল না।
অবশেষে নিজ ভিটায় তাকে দাফন করা হল।কবর টি বাঁধানো ...একটি বইয়ের মতো ।
ধর্মীয় উগ্রবাদ বাংলাদেশে ছিলনা ।কিন্তু আস্তে আস্তে এর বিস্তার লাভ করছে ...সুস্থ সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং বিচার না থাকায় ।আইনের শাসন ও নেই ।ধর্মীয় কার্ড খেলছে রাজনৈতিক দলগুলি ...অন্যদিকে আমরা আস্তে আস্তে মানুষ থেকে অমানুষ এ পরিনত হচ্ছি ।
 



বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৫

ফুলমতি ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

আমার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সংখ্যা খুব একটা বেশী নয়। কিন্তু যে কটি আছে, তাদের প্রত্যেকটার একটা করে নাম আছে আলাদা আলাদা। কয়েকখানা নাম লোকজন জানে বটে, কিন্তু বেশীরভাগের নামই আমি বাদে দ্বিতীয় ব্যক্তির অজানা। এই যেমন ধরুন গিয়ে নিকুঞ্জবিহারি, সে হলো আমার ক্যামেরা। নিকষ কালো ক্যামেরার শরীরে লেখা রয়েছে নিকন। সেই দেখেই নাম দিয়েছি নিকুঞ্জবিহারি।
আমার মোবাইল ফোনের নাম আনন্দরূপ, ঘড়ির নাম টুনটুনি , মানিব্যাগের নাম বটুকেশ্বর, কলমের নাম কালিকিঙ্কর, যে ব্যাগ নিয়ে আপিস যাই তার নাম কল্পতরু। কল্পতরু নামের সার্থকতা আমার সহকর্মীরা কিছুটা জানেন। আরো আছে দু এক খানা এমন বস্তু। যেমন ধরুন আমার সাধের কিটোস পাদুকা। তার নাম দিয়েছি হিউয়েন সাং। এই মহাজ্ঞানী পর্যটকের প্রতি কোন অসন্মান প্রদর্শন আমার উদ্দেশ্য নয় । ছোটোবেলায় ইতিহাস বইতে দেখেছি, অবিকল আমার কিটোসের মত দেখতে একজোড়া পাদুকা হিউয়েন সাং এর পায়ে। আমার অতি প্রিয় সুইস ফৌজি ছুরির নাম ঘচাং-ফু। মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপে দুটোতেই লাগানো যায় এমন একখানা ৩২ গিগাবাইটের ফ্ল্যাশড্রাইভের নাম কিম ফিলবি। এম আই সিক্সেও আছেন, আবার কেজিবি তেও আছেন। কিন্তু যদি বলেন এদের মধ্যে আমার সব থেকে প্রিয় বস্তু কোনটা , আমি এক মিনিটও না ভেবে উত্তর দেবো ফুলমতি। ফুলমতি হলো আমার অতি প্রিয় পুরোনো ফুল-ফুল ছাপের লুঙ্গি। মাঝে মাঝে সে পাল্টায় বটে, কিন্তু নাম একই থাকে।
হিউয়েন সাং
গেল বছর আমার ভাতৃ-ভগ্নীস্থানীয় জনাচারেক ভরা গ্রীষ্মে আমার বাড়িতে পায়ের ধুলো দিয়েছিলো। তারা বাইরে আমাকে সাধারনত যেমন দেখেছে, ভেবেছে আমি তেমনই। বর্তমান পশ্চিমবাংলার শাসক দলের সমালোচনা করি বলে, আমার পোষাক-পরিচ্ছদও যে নেহাৎ "সাজানো ঘটনা", এইটা তারা আন্দাজ করতে পারেনি। শেষে যখন ট্যাক্সি থেকে দেখতে পেল আমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছি গলির মুখে, উর্ধাঙ্গে একখানা ধুদ্ধুড়ে গেঞ্জি আর নিম্নাঙ্গে ফুলমতি, তারা যারারপরনাই বিস্মিত হলো। আমাকে দাঁড় করিয়ে মোবাইলে ছবি তোলা হলো। "লুঙ্গি ম্যান" বলে সে ছবি সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়েও পড়ল হোয়াটস্‌অ্যাপ মারফত। যাই হোক বোনেদের তর্জনগর্জনে তখনকার মত ফুলমতি আলনার বনবাসে গেল। পাজামা গলিয়ে এলাম। বোন-জঙ্গলের রাজত্বে নিরীহ মানুষের স্বাধীনতা খর্ব হয় একথা কে না জানে? সন্ধ্যে ঢলার মুখে জমাটি আড্ডা মাটি করে "কাল আবার অফিস" দোহাই ঠেলে তেনারা বিদায় নিলেন। আড্ডা ভাঙ্গার আঘাতে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ঢিকির ঢিকির পায়ে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে আলনা থেকে ফুলমতিকে নামালাম। আহা, লুঙ্গির আরাম আর কিছুতে নেই। মন খারাপে মলম লাগল কিছুটা হলেও।

লুঙ্গির পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কিছু বলা যায়। আমি অবিশ্যি প্রানে ধরে বিপক্ষে বলতে পারবোনা। লুঙ্গির তিন ফুটের ঘের আমার স্বাধীনতা। সারা দিনের কাজকম্ম, দৌড়োদৌড়ি, হাঁপাহাঁপি, বকাঝকার থেকে দিনের শেষে লুঙ্গিটি গলালেই শারীরিক স্বাচ্ছন্দ আর মানসিক মুক্তি। বাড়তি পাওনা, লুঙ্গি পরে অস্থানে-কুস্থানে চুলকু করতে বড্ড সুবিধে। মোটের ওপর ভদ্দরনোক সুলভ বস্তু নয় এটি। এই ধরুন না, আপনি গরম কালের সন্ধ্যেবেলা কাজকম্ম সেরে বাড়ি ফিরেছেন, তার পরে গায়ে দু ঘটি জল ঢেলে, চুলে টেরি কেটে, কানের গোড়ায় হালকা পাউডার (কাল ভেদে ডিও) ছড়িয়ে ধোপ দুরস্ত পাঞ্জাবি পাজামা পরে নিজের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে প্রবেশ করছেন, অথবা টুকটুকে লাল টি শার্ট আর বারমুডা পরে স্টার স্পোর্টস ফোরে আর্সেনাল-চেলসির খেলা দেখতে বসেছেন। টি শার্ট অবশ্য নীল হতেও বাধা নেই। কিন্তু কেন? আমাদের আর্সেনাল থাকতে কোন শা.... । এখানেই লুঙ্গির সার্থকতা। লুঙ্গি পরলে আপনার সামাজিক শ্রেনীসচেতনতার ষষ্টিপূজো হয়ে যায়।আবার অন্যদিকে খিস্তি টিস্তি মারলে লোকে তেমন করে ব্যাঁকা চোখে তাকায়না। এই কারনেই আমার বাড়ির মহিলারা লুঙ্গি নিয়ে মাঝে মধ্যেই ঠারে ঠোরে বুঝিয়ে দেন, বস্তুটা সুবিধের না। অনেক কাল আগে একবার মধ্যরাত্রে দুই মাতাল চেল্লামেল্লি করে সবার ঘুম ভাঙ্গিয়ে পাড়া মাথায় করছিলো। খালি গায়ে লুঙ্গিতে মালকোঁচা মেরে, হাতে একখানা কাটারি নিয়ে রাত আড়াইটের সময় তাদের তাড়া করেছিলাম। দেখলাম, মাতাল তাড়ানো, আর হাতে প্রানঘাতী অস্ত্রর চেয়েও অন্দরমহলে বেশী আপত্তির কারন হয়ে উঠলো আমার মালকোঁচা মারা লুঙ্গি। তবে কিনা আজকাল, বাড়িতে বয়সে সবচেয়ে কম যে মহিলাটির, তিনি রীতিমত প্রকাশ্যে লুঙ্গির বিপক্ষে সোচ্চার। তাঁর বাবা যেন লুঙ্গি পরে কোনো মতেই বন্ধুবান্ধবের সামনে না হাজির হয়, সে ব্যাপারে তিনি সর্বদা সচেতন। 

কবে থেকে লুঙ্গি গলিয়েছি ঠিক মনে নেই। স্কুলের শেষ দিকে থাকতেই মনে হচ্ছে যতদুর। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই এই চিত্তজয়ী পোষাক আমাকে পেড়ে ফেলেছে এক্কেরে। ঢিলেঢালা বস্তু। গায়ে কামড়ে লেপ্টে যায়না। ইস্ত্রি করার ঝামেলা নেই, পরার ঝামেলাও যৎসামান্য। গলিয়ে নিন্‌, গিঁট মারুন, গুঁজেনিন। ৩ থেকে ৪ সেকেন্ডে লুঙ্গি পরা যায়, কেউ এই গতিতে পেন্টুল পরতে পারলে লুঙ্গি পরে বাড়ির বাইরে বেরোনো ছেড়ে দেবো কথা দিচ্ছি। লুঙ্গি শুনেই বুঝবেন আমি লোকটা তেমন উচ্চকোটির কেউকেটা গোছের নই। খোঁজ নিয়ে দেখুন, নেতাজী, রবিঠাকুর, সত্যজিত রায়, সৌমিত্র চাটুজ্যে মায় সৌরভ গাঙ্গুলীও লুঙ্গী পরেন না। উত্তমকুমার, জ্যোতিবাবুর নাম এড়িয়ে গেলাম, কারন এনাদের লুঙ্গি পরা ছবি আমি দেখেছি, তবে কিনা সে হলো বেশ বাহারের সিল্কের লুঙ্গি। আমার লুঙ্গি এনাদের চেয়ে আলাদা। সুতির ছাপা লুঙ্গি। তবুও কিভাবে কে জানে, ভুলটুল করেই হয়ত, আমাকে কর্মপলক্ষে ভারতবর্ষের সীমানা পেরতে হয়েছে। এরকমই একখানা হিমালয়প্রমান ভূলের ফলে আমাকে সিঙ্গাপুর যেতে হয়েছিল। বুকটুক বাজিয়ে বললুম – সিঙ্গাপুর যাচ্ছি। অভিজ্ঞ লোকজন বিদঘুটে কিছু নাম বললেন, মুস্তাফা, অর্চার্ড রোড, সেন্তোসা আরো সব খোদায় মালুম কি সব। বন্ধুবান্ধব বলল "পেট ভরে কলা খাস আর দু ছড়া আনিস"। আমার বাবা অল্প কথার মানুষ। যাবার আগে পিতৃবাক্য পেলুম - "ও তল্লাটে ভালো লুঙ্গি পাওয়া যাবার কথা"। বললে আপনার পেত্যয় হবে কিনা জানিনা, কিন্তু ঘটনা বস্তুতপক্ষে এটাই। মালয়-বর্মা অঞ্চলে প্রচুর লুঙ্গির চল। অবিশ্যি আগে চলত বলাই ভালো, গাঁ-গেরামে হয়ত এখনো চলে, তবে আমি ওনাদের গাঁয়ে তেমন ঘুরিনি, তাই বলতে পারবোনা। সিঙ্গাপুরের ঝাঁ-চকচকে রাস্তাঘাটে লুঙ্গি কিনিনি বটে, কিন্তু দেখেছি অনেক বিক্রি হতে। তবে কিনা দামের দিকে তাঁরা বেশ উচ্চকোটির। ওই দামের লুঙ্গি পরলে আমার অভ্যাসের শ্রেনীচরিত্র বদলে যেতে পারে।

লুঙ্গি নিয়ে দু একখানা বিপত্তি যে আমার হয়নি এমনটা হলফ করে বলব না। এই ধরুন না, একবার গলিতে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে, আর আমি যথারীতী লুঙ্গি পরে দাঁড়িয়ে আছি। গলির শেষ প্রান্তে একটা বড় নর্দমা, চওড়া গোছের। গলির শচীন মেরেছে তুলে ছক্কা, বল পড়ল নর্দমার ওপারে। ওয়াসিম আক্রম হেঁকে বলল "বলটা দেবে?"। আমিই সবচেয়ে কাছে ছিলুম। বলটা তুলে ফেরত দেবার জন্যে নর্দমা পেরিয়ে ওপাশে যাওয়া দরকার। লাফ মারলুম। দেখলুম আমার পা নর্দমার ওই প্রান্তে প্রায় পৌঁছে গেছে, এমন সময় ব্যাপারটা হলো। লুঙ্গির ঘেরে আটকে গেল পা। ওপার ওবধি পৌঁছলো না। তলপেটে কেমন যেন... কানের দুপাশে হুহু শব্দ। তার পরেই ঝপাং। আফ্রিদি আর দ্রাবিড় এসে টেনে তুললো। কুম্বলে, মালিক, সৌরভ সমেত বাকিরা খ্যাঁক খ্যাঁক করে দাঁত বের করে হাসল। পড়ে যাওয়ার শারীরিক ব্যাথা-যন্ত্রনা যেতে হপ্তা খানেক লেগেছিলো, মানসিক ব্যাথা এখনো আছে।

আমার বাবা চাকরির শেষের দিকে এসে একখানা স্কুটার কিনেছিলেন। আমিই চালাতাম। গাড়ি হামারা তেল তুমহারার ভিত্তিতে কেনা। মানে, স্কুটারের তেল-মোবিলের খরচা, সারাই-ঝাড়াইয়ের খরচা সব আমার। তখন ছাত্র পড়াই, হাতে কিছু পয়সাকড়ি আছে। কিন্তু বাঁচানোর চেষ্টাও আছে তার সঙ্গে। মাসে দু মাসে একবার করে স্কুটারের খোল-নলচে খুলে ধোয়ামোছা করে তেল রগড়ে আবার সব ফিট করে দিতাম নিজেই। মিস্তিরিকে দিলে ৩০০ টাকা চেয়ে বসবে। এই সব কাজ কম্ম করতে লুঙ্গির জুড়ি নেই। মালকোঁচা মেরে লুঙ্গি পরে সেই রকম এক দিন স্কুটার আবার জোড়া দিয়েছি। লাথি মেরে ইঞ্জিন চালিয়ে চড়ে বসেছি, এক পাক ঘুরে আসবো বলে। এদিকে স্টার্ট করতে গিয়ে কখন মালকোঁচা খুলে লুঙ্গি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের হয়ে গেছে খেয়াল করিনি। খেয়াল করলাম থামার সময়। ডান পা ব্রেকে রেখে, বাঁ পা বাড়িয়ে নিচে রাখতে গিয়ে দেখি পা পৌঁচচ্ছে না। আবার সেই লুঙ্গির ঘেরের গেরো। না থেমে স্পিড বাড়িয়ে আরেক চক্কর ঘুরে এলাম। আবার দেখি সেই কেলো। কিছুতেই পা যাচ্ছে না। আমাদের পাড়ার লোকজন ভারি পরোপোকারি। কয়েক পাকের পর দু চার জন শুভানুধ্যাইয়ী দেখলাম উপদেশ দিতে শুরু করেছেন। একজন বললেন মালকোঁচা মেরে নাও। হাতে স্কুটারের হ্যান্ডেল, হাত ছাড়া কিভাবে মালকোঁচা মারবো সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেন নি। আর একজন আরো দূরদর্শী, বললেন পড়ার সময় ছোট্ট করে লাফ মেরে দিও, তাতে স্কুটার ঘাড়ের ওপর পড়বে না। এনার ওপর আমার এখনো রাগ আছে। একদিন না একদিন ঠিক ল্যাং মেরে ফেলে দেবো রাস্তায়। ধোয়াপোঁছা খোলাখুলির সময় স্কুটারে বেশী তেল রাখতাম না, অযথা নষ্ট হবে বলে। স্কুটার না থামালে তেল শেষ হবে, আর আমিও পড়ে যাবো। আবার থামলেও পড়ে যাবো। এই করতে করতে আরো কয়েক চক্কর হয়ে গেল। শেষের হেনস্থার কথা আর বলছিনা। তবে তেল খতম – খেল খতম, এরকম ধরে নিন। বাঁ পায়ের আধখানা চেঁচে যাওয়া, কপালে একটা বড় আকারের আলু, ডান হাতের মচকানো কবজি, মালাইচাকির ওপরে ঢিপলি, পাঁজরায় ঘিনঘিনে যন্তন্নার সঙ্গে রাস্তায় শুয়ে শুয়ে আবিস্কার করলাম লুঙ্গিটা স্কুটারের পাদানি তে লটকে ঝুলছে। আমার থেকে ফুট চারেক দুরে।    

ওই একবারই। খুলে যাবার ইতিহাস আর নেই। তবে না খোলার ইতিহাস আছে। অবিশ্যি না খোলার কারনটা ঘোর বস্তুতান্ত্রিক। খুলেই কই। সেবার কলকাতায় এলেন ফিফার প্রেসিডেন্ট, আমাদের মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গল খেলা দেখবেন মাঠে বসে। এদিকে ভাগ্যের বিড়ম্বনায় আমি তখন সাতসমুদ্দুর তেরো নদীর পারে কোন চুলোর সান-ফ্রান্সিস্কোর উপকন্ঠে ফ্রিমন্ট বলে একটা ছোটো শহরে। সেদিন আবার পয়লা বৈশাখ। মাঝ রাতে উঠে ল্যাপটপ খুলে আপডেট দেখছি। মাঝে মধ্যে বাড়িতে ফোন। লোটারা প্রথমেই গোল করে এগিয়ে গেল। একে রাত্রি জাগরন। তার ওপর গোল হজম। সব  মিলিয়ে ঝিমিয়ে গেলাম। কিন্তু গপ্প বাকি ছিলো। মোহনবাগান দু খানা গোল করে খেলাটা জিতল, আর সেই ভোর রাত্রে আমি পেগলে গেলুম। পয়লা বৈশাখের এমন ভোর আমার জীবনে খুব কম এসেছে।  

সপ্তাহান্তের সাফ-সুতরোর দিন আজকে, ডাঁই করে রাখা আকাচা জামাকাপড় নিয়ে গিয়ে বেসমেন্টে ঢোকাতে হবে। গেলহপ্তায় কাচিনি। বড় গামলা ভর্তি জামাকাপড় নিয়ে বেসমেন্টে কাচতে গেলুম। সেখানে অতিকায় সব ধোয়ার যন্ত্র। যন্তর চলতে আরম্ভ করতেই খেয়াল করলুম কেলেঙ্কারি করেছি। আমার যাবতীয় প্যান্ট চলে গেছে ভেতরে। পরে বেরোবার কিছু নেই। দু পাঁচ মিনিটের দ্বীধার পর মাথায় উলের টুপি, গায়ে ছেয়ে রংয়ের জ্যাকেট, নিচে লালচে ফুলমতি আর পায়ে বাদামী স্নিকার পরে আমি ফ্রিমন্ট শহরের রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। নেহাত বিদেশ, রাস্তায় কুকুর নেই এক গাদা। কিন্তু পুলিস তো আছে। আমেরিকায় টিনটিনের সেই ছবিটা মনে আছে? যেখানে গাঁইয়া পোষাক পরে থাকার জন্যে পুলিস টিনটিন কে জরিমানা করেছিলো? আমাকে জেলেও দিতে পারে, দৃশ্য-আতংকবাদ ছড়ানোর অপরাধে। মিনিট দশেক হেঁটে বাজারে ঢুকলুম। শুনেছিলাম আমেরিকানরা সাধারনতঃ অদ্ভুত পোষাক পরিচ্ছদ দেখলে ড্যাবা ড্যাবা চোখ করে চেয়ে দেখে না। কে বলেছিলো কে জানে? ডাহা মিথ্যে। ওই সাত-সকালে বহুজোড়া চোখের কৌতুহলি দৃষ্টির সামনে দিয়ে বাজার দোকান সারলাম। একদম শেষে দাম দিচ্ছি যখন কাউন্টারে, দেখি আমাদেরই এক দেশোয়ালি মানুষ। কিছুক্ষন দেখলেন আমার দিকে, তার পরে শুধলেন – "ইন্ডিয়ান?" আমি এক গাল হেসে ওপর নিচে মাথা নেড়ে সায় দিলাম। খুচরো ফেরত নিয়ে চলে আসছি, দেখি ভদ্রলোক পাশের কাউন্টারে তাঁর দেশোয়ালি ভাইকে বলছেন – "দ্যাখলা? কুনো সেন্স নাই"।

আমেরিকায় টিনটিন
যাই হোক, এসব ত গেল বিপত্তির কিস্যা। লুঙ্গি নিয়ে আমার ভালো অভিজ্ঞতার সংখ্যা অনেক বেশী। বাড়িতে একা আমি নই, লুঙ্গি পরেন আমার বাবাও। বাপ-ব্যাটায় গ্রীষ্মের রাতে লুঙ্গি পরে আরাম করে বসে টিভি চালিয়ে বিদেশী ফুটবল দেখি। আমার কন্যা তার দাদুর কোলে উঠে বসে, আর সেই ছোট্ট বেলা থেকে দুই পায়ের ভাঁজে থাকা লুঙ্গির ঝুলি তার ইজি চেয়ার হয়। সেই থেকে সে তার দাদুর আদরের "পুঁটলি দিদিভাই"। আমার কন্যা তার বাবাকে লুঙ্গি পরা অবস্থায় বন্ধুদের কাছে যেতে দিতে নারাজ। খুব আপত্তি। কিন্তু একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। ট্রেনে করে কোথায় একটা যাচ্ছি, সে মেয়ের একা একা ট্রেনের বাঙ্কে শুতে ভয় করছে রাত্রি বেলা। আমি কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম। শেষে আধ ঘুমন্ত চোখে বলল "তোমার লুঙ্গিটা দাও"। ভাগ্যি ভালো আমি ট্রেনে জিন্স পরে ছিলাম, কিন্তু বেরোবার আগে কেচে পাট করে ফুলমতিকে ব্যাগে ঢুকিয়েছিলাম। সেটা বার করে ওকে দিতেই গায়ে হালকা করে জড়িয়ে নিয়ে এক মিনিটে ঘুমিয়ে পড়ল। পরের দিন জিজ্ঞেস করলাম, "অত তাড়াতাড়ি ঘুমোলি কি করে?"। গরম গরম ডিমের অমলেট খেতে খেতে মেয়ে উত্তর দিলো – "লুঙ্গিটা থাকলেই মনে হয়, তুমি আছো"।

যখন আমি থাকবোনা, তখনও ফুলমতি থেকে যাবে। অলমিতি বিস্তারেন।      

(দু খানা ছবিই ইন্টারনেট থেকে পাওয়া )