মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬

হিন্দী একটি ঔপনিবেশিক ভাষা ~ কণিষ্ক ভট্টাচার্য 

সোনারকেল্লা – আরে ধোর মশাই

লালমোহন গাঙ্গুলিকে দিয়ে একটি ঐতিহাসিক কথা বলিয়ে নেন সত্যজিৎ।

আগের লেখায় লালমোহন গাঙ্গুলির গড়পাড়ের কলকাত্তাইয়া বাঙালির হিন্দিতে ‘জটায়ু’ ‘ছদমোনাম’ এর ব্যাখ্যা দেওয়ার কথা বলেছিলাম। এই অবধি ফেলুদা আর তোপসে বেশ হাসিহাসি মুখে শুনছিল। লালমোহন বাবু তাঁর রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের সাতাশ নম্বর বই ‘সাহারায় শিহরণ’ এর কপি বের করে তপেশরঞ্জনকে দেখান। কিন্তু তোপসে বাংলা পড়তে জানে দেখে লালমোহন অবাক হয়ে বলেন “কাঁহা শিখা?” লালমোহন অবাক। এমন সময়ে ফেলুদা বলে ওঠে। “আপনি হিন্দিটা চালিয়ে যেতে পারেন, বেশ লাগছে।”

গড়পাড়ের বাঙালি লালমোহন গাঙ্গুলি বলেন, “আরে ধোর! হিন্দি  কি কেউ সাধে বলে মশাই!”

না। হিন্দি কেউ সাধে বলে না। কারণ হিন্দি কোনও সহজাত ও স্বাভাবিক ভাষা নয়।

দাঁড়ান। রে রে করে উঠবেন না ভক্তকুল।

উপনিবেশ আর ভাষার সম্পর্ক জানলে আর রে রে করে উঠতেও হবে না।



Uploaded Image লালমোহনের বদলে আমরা বরং রামমোহনের কথা মনে করি। বর্ধমান জেলার রাধানগর (সেকালে রাধানগর হুগলী নয়, বর্ধমানের অন্তর্গত ছিল। যেমন বিদ্যাসাগরের জন্ম মেদিনীপুর নয় তৎকালিক হুগলীর বীরসিংহে।) গ্রামে জন্ম নেওয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পদবি এবং রায় (বস্তুত রায়রায়ান) উপাধিক শাণ্ডিল্য গোত্রের ব্রাহ্মণ সন্তান রামমোহনকে কিন্তু শৈশবে পাটনায় পাঠানো হয়েছিল, সেকালের শাসকের রাজকার্যের ভাষা আরবি ও ফারসি শিক্ষার জন্য। মনে রাখতে হবে রামমোহন বাংলায় লেখালিখির আগে ফারসি ভাষায় পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন এবং সেই ভাষাতেই লিখতেন। পত্রিকার নাম মিরাৎ-উল-আখবার! মনে রাখতে হবে এই রামমোহনই কিন্তু বাঙালির লেখা প্রথম বাংলা ব্যাকরণের রচয়িতা, তার নাম ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ।’

রামমোহনের জন্ম ১৭৭২ (মতান্তরে ১৭৭৪) অর্থাৎ আজ থেকে আড়াইশো (নির্দিষ্ট করে বললে ২৫৪) বছর আগেও এই হিন্দি বলে ভাষাটি ছিল না। ফলে আজকের তথাকথিত ‘হিন্দি হার্টল্যান্ড’ বা ‘গোবলয়ে’ যে হিন্দি আধিপত্য তারও প্রশ্ন ছিল না। স্মরণীয় বাংলা কিন্তু অষ্টম শতক থেকেই আছে।

তাহলে এই আজকের হিন্দিভাষা কোত্থেকে এলো? কেন এলো? এবং সর্বোপরি কারা, কী স্বার্থে এর জন্ম দিলো?

আগে স্বার্থটা বুঝে নেওয়া যাক। স্বার্থ দ্বিবিধ।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বাংলা উপনিবেশের অধিগত হয় আর ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের মাঝের একশো বছরে এদেশে তার বিস্তার।

উপনিবেশিক শাসনকে বাঙালি গ্রহণ করেছিল আগে। কিন্তু বাঙালি তো বাঙালি – নর্ডিক থেকে দ্রাবিড়, মোঙ্গলীয় বহুরক্ত মিশ্রণে তৈরি একটি জাতি যা বিজ্ঞান অনুসারে বুদ্ধিমান সন্তানের জন্ম দেয় জিন মিশ্রণের কারণে। ফলে বাঙালি – রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘কেরানী তৈরির ইস্কুল’ বলেছিলেন, সেই মেকলের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে দুধ মেরে ক্ষীরটুকু তুলে নিল। উপনিবেশিক পড়াশোনা থেকেই যে বাঙালি প্রথম উপনিবেশকে গ্রহণ করেছিল সেই ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে বাঙালিই প্রথম একটি জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলে। এবং অবশ্যম্ভাবী ভাবে সেটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কারণ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার আগে এই ভূখণ্ড কখনও কোনোদিন এক শাসনের অধীনে আসেনি। চোল রাজাদের আমলেও নয়, মুঘলদের আমলেও নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বঙ্কিমের যে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে এদানীর বিতর্ক তা কোনও ভারতমাতার জন্য নয়, নির্বিকল্পভাবে বঙ্গমাতার জন্য। একইভাবে উল্লেখ করা যায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’ চিত্র – ওটিও সর্বার্থে বঙ্গমাতার চিত্র। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে হিন্দু প্রভাব বেশি, কারণ যে উপনিবেশিক শিক্ষা বাঙালি গ্রহণ করেছিল তা প্রধানত হিন্দু বাঙালি, মুসলমান বাঙালি কম। যে কারণে বন্দে মাতরম সংগীতে শাক্তদেবীর বন্দনাংশ পাওয়া যায়, যে কারণে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “সমস্ত গানটির মধ্যে হিন্দু দেবদেবীর নাম এমনভাবে জড়িত যে উহা এক বিশেষ ধর্মের স্তোত্ররূপে গণ্য হইতে বাধ্য এবং সে কারণেই উহা সর্বসাধারণের ব্যবহার্য জাতীয় সংগীত হইবার অযোগ্য।” [১৯৩৭ সালের অক্টোবরে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসুকে লেখা চিঠি]। অবন ঠাকুরের আঁকা বঙ্গমাতাও বেঙ্গল স্কুল অভ আর্টের ফসল। আদপেও ভারতীয় নয়।  

উপনিবেশিক শিক্ষা গ্রহণ ভারত উপনিবেশ বিস্তারের একশো বছরে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের কাছাকাছি বাঙালিকে যেভাবে পৌঁছে দিয়েছিল উত্তরভারতকে সেভাবে নয়। কিন্তু সাম্রাজ্যে বাঙালি আধিপত্য এদিকে আবার সেই বাঙালি এক জাতীয়তাবাদের নির্মাণ করে উপনিবেশের শাসকদের বিরুদ্ধেই কাজে লাগাচ্ছে সেটাই বা ব্রিটিশ শাসকদের কীভাবে সহ্য হয়! তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী ছিল কলকাতা আর প্রশাসনে বাঙালিদের আধিপত্য।

ঠিক এইখান থেকেই হিন্দি ভাষার জন্ম দেওয়া। ঔপনিবেশিক শাসকের দ্বারা, ঔপনিবেশিক শাসকের হাতে এবং ঔপনিবেশিক শাসকের স্বার্থে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভারসাম্য রক্ষা করতে হিন্দি ভাষার জন্ম ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্থানের মাধ্যমে ব্রিটিশরা উত্তর ভারতে একটি অনুগত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করতে চেয়েছিল – যা রাজনৈতিক ভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কাউন্টার করবে এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করবে। 

সমস্ত ভাষার একটা অন্তর্গত কাঠামো থাকে মানুষের শরীরে যেমন কঙ্কাল। যা ভাষার নির্দিষ্ট অবয়ব তৈরি করে। সেই বিচারে যে ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী থেকে ইন্দো ইরানীয় হয়ে প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা – মধ্যভারতীয় আর্যভাষা – নব্যভারতীয় আর্যভাষা্র যে ভাষাগুলির জন্ম – যেমন পূর্ব ভারতে বাংলা ওড়িয়া অসমীয়ার অন্তর্গড়নের সঙ্গে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের দ্বারা নির্মিত ভাষা হিন্দির পার্থক্য বিস্তর। লিঙ্গ ও লিঙ্গ নির্দিষ্ট ক্রিয়াপদের দিকে দেখলে তা স্পষ্ট হয়। বস্তুত নাগরী লিপি ভিন্ন সংস্কৃতের সঙ্গে হিন্দির মিল খুব সামান্য।

হিন্দি আর নাগরীর সম্পর্কের মধ্যেও একটা জোর খাটানোর ইতিহাস আছে। বাংলার জন্য বঙ্গলিপি যেমন একটা স্বাভাবিক বিবর্তন – যা প্রাচীন বাংলার হাজার বছরের টেক্সট দেখলে সহজেই বোঝা যায় – হিন্দির ক্ষেত্রে বিষয়টা তেমন নয়। ইতিহাস সাক্ষী, হিন্দির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য, বেশিদিন নয়, মাত্র ১২৭ বছর আগে ১৮৯৩ সালে এর শুরু। ওই বছরের ১৬ই জুলাই বারাণসীর (কাশীর) ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়ার নামে নামাঙ্কিত কুইন্স কলেজের তিন ছাত্র— শ্যামসুন্দর দাস, রামনারায়ণ মিশ্র এবং শিবকুমার সিংয়ের উদ্যোগে “নাগরী প্রচারিণী সভা” প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী কালে ভারতেন্দু হরিশ্চন্দ্রের মতো সাহিত্যিকরা এর সঙ্গে যুক্ত হন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দপ্তর ও আদালতে আরবি ফারসি লিপির (খড়িবোলি বা হিন্দুস্তানি আগে আরবি ফারসি আগত লিপি উর্দুতে লেখা হত। প্রেমচন্দ কিন্তু শুরু থেকে উর্দু লিপিতেই হিন্দুস্তানি বা খড়িবোলি ভাষায় লিখতেন।) পাশাপাশি নাগরী লিপির সরকারি স্বীকৃতি আদায় করা এবং এই আবেদন ঔপনিবেশিক শাসকের কাছেই, সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসকের কলেজে নির্মিত হিন্দি ভাষার সাহিত্যের বিকাশ ঘটানো। হিন্দিকে একটি রাজনীতি ও মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে এদেশে ঔপনিবেশিক শাসক ব্যবহার করে শুরু থেকেই। ব্রিটিশরা ‘নাগরী প্রচারিণী সভা’র এই আন্দোলনকে উর্দুর এক্ক আধিপত্য কমানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এর ফলে উত্তর ভারতের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে হিন্দু ও মুসলিম উচ্চবিত্তের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।

কিন্তু ভাষা হিসেবে হিন্দির জন্ম কোথায় হল!

আজ্ঞে, আপনার বাংলায়। আপনার কলকাতায়। আপনার হুগলীতে।

উনিশ শতকের আগে আজকের মতো কোনও একক বা নির্দিষ্ট হিন্দি ভাষা ছিল না। উত্তর ভারতে মূলত খড়িবোলি ভাষা প্রচলিত ছিল যাকে হিন্দুস্তানিও বলা হত। তার মধ্যে আজকের ভারতের মানচিত্র অনুসারে উত্তর প্রদেশে ছিল অওয়ধী, ব্রজভাষা, ভোজপুরী, বুন্দেলী, হিন্দুস্তানি। বিহারে ছিল মৈথিলী, ভোজপুরী, মাগাহী। ঝাড়খণ্ডে ছিল সাঁওতালী, কুরুখ, সাদরি, হো এবং মুন্ডারি। ছত্তিসগড়ে ছিল ছত্তিসগড়ী। মধ্য প্রদেশে ছিল মালভি, নিমাদি, বুন্দেলী, বাঘেলী, গোন্দি। রাজস্থানে ছিল রাজস্থানি। হরিয়ানায় ছিল হরিয়ানভি। উত্তরাখণ্ডে ছিল গাড়োয়ালী, কুমায়ুনী এবং পাহাড়ি। এই ভাষা উর্দু ও নাগরী উভয় লিপিতেই লেখা হত। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে কথ্য ও লিখিত রূপ হিসেবে দুটিই ব্যবহার করতেন [স্মরণীয় হিন্দু প্রেমচন্দ ও উর্দু স্ক্রিপ্ট]। তুলসীদাস রামচরিতমানস লিখেছিলেন কিন্তু হিন্দিতে নয় অবধী বা অওয়ধী ভাষায়। যার অংশ হনুমানচল্লিশা। অযোধ্যা অঞ্চলের ভাষা।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় হিন্দি ভাষার নির্মাণ হয় ইংরেজ শাসকের হাতে এবং খুব স্পষ্টভাবে সামাজিক রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক প্রভাব নির্মাণ করতে।

ভাষা হিসেবে হিন্দির জন্ম বাংলায়। কলকাতায় এবং হুগলীতে। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে [মনে করুন লিপির দাবিও রানির নামের কলেজ থেকে] এবং হুগলীর শ্রীরামপুর মিশনে। একটি নতুন ভাষার জন্ম দেওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের উপনিবেশ শাসনের জন্য। ভারতে শাসনযন্ত্র চালাতে এবং নিজেদের প্রশাসনিক কাজের সুবিধের জন্য একটি সহজ সার্বজনিক ভাষার প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে খ্রিস্টধর্ম প্রচার, বাইবেল অনুবাদ এবং নব্য ঔপনিবেশিক কর্মীবাহিনীকে দেশীয় ভাষা শেখানোর জন্য তারা উদ্যোগী হয়। ১৮০০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং হুগলীর শ্রীরামপুর মিশনের মুদ্রণ যন্ত্র এই ঔপনিবেশিক হিন্দি ভাষা নির্মাণে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। শ্রীরামপুর মিশন প্রেসেই প্রথম নাগরী [দেব নয়, ওটি হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডা, নগরে যে লিপি প্রচলিত তাকেই নাগরী লিপি বলে] হরফে টাইপ তৈরি হয়। খড়িবোলি ভাষা থেকে হিন্দির কৃত্রিম পৃথকীকরণ হয়। কে করেন? কারা করেন? জন গিলক্রিস্ট এবং অন্যান্য ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় লল্লু লাল ও সদল মিশ্রের মতো পণ্ডিতেরা খড়িবোলি ভাষা থেকে আরবি ফারসি শব্দ বেছে বেছে বাদ দিয়ে দেন। তার বদলে সেখানে সংস্কৃত শব্দ যুক্ত করে এক নতুন গদ্যরূপের নতুন ভাষা নির্মাণ করা হয়—ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকের ঔপনিবেশিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে। সেটাই আজকের হিন্দি।

এই নতুন ঔপনিবেশিক ভাষার সাহায্যে উনিশ শতকের আগে উত্তর ভারতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে উভয় সম্প্রদায় যে খড়িবোলি ভাষায় কথা বলত তাকে বলা হত ‘গঙ্গা যমুনা তহজিব’ অর্থাৎ গঙ্গা যমুনা সংস্কৃতি। কিন্তু যৌথ ভাষাগত সংস্কৃতি থাকলে ঔপনিবেশিক ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল” চলে কী করে! তাই ব্রিটিশরা এই ঐতিহ্যে ফাটল ধরাতে হিন্দিভাষার জন্ম দেয়। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে প্রচল উর্দু ও নাগরী স্ক্রিপ্টের খড়িবোলিকে ব্রিটিশ ভাসাবিদের সহায়তায় আরবি ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে তাকে “হিন্দুদের ভাষা” (হিন্দি); এবং সংস্কৃত শব্দ বাদ দিয়ে তাকে আরবি ফারসি লিপিপ্রধান রূপকে “মুসলমানের ভাষা” (উর্দু) হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে ভাষা আর ধর্ম একাকার হয়ে যায়। ঔপনিবেশিক শাসকের বিভাজন নীতি সফল হয়। ১৮৩৭ সালে ফারসির বদলে উর্দু ও ইংরেজিকে আদালতের সরকারি ভাষা করায় হিন্দু উচ্চবর্ণের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। ব্রিটিশরা তখন নাগরী লিপি ও নবনির্মিত হিন্দি ভাষার দাবিকে উসকে দেয়। যা সরকারি চাকরি ও সামাজিক ক্ষমতার দখল নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ও সংঘাত তৈরি করে। দেখুন, এটাই শাসকের লক্ষ্য। ভাষাভিত্তিক এই বিভাজন পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে – হিন্দি উর্দু বিতর্ক শেষ পর্যন্ত হিন্দু মুসলিম রাজনৈতিক দূরত্বকে এত বাড়িয়ে দেয় যা পরোক্ষ ভাবে দেশভাগের পটভূমি তৈরি করে।

বিভাজিত দেশের শাসকদের ভুমিকাও কম নয়! তারা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় ঠিক যে যে জায়গায় ইংরেজি ছিল ঠিক সেই সেই জায়গায় ঔপনিবেশিক শাসকের নির্মিত হিন্দিকে চাপিয়ে বসিয়ে দিতে চান।

আজকের ভারত বস্তুত এক হিন্দি আধিপত্যবাদী দেশ।

জটায়ু... থুড়ি লালমোহন বাবু... থুড়ি সত্যজিৎ ঠিক বলেছিলেন...

"হিন্দি কি কেউ সাধে বলে মশাই!"



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন